জীবন্ত কম্পিউটারেরাঃ যাদের হাত ধরে আমাদের মহাকাশ বিজয়

বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় সাফল্য সম্ভবত আমাদের এই সভ্যতার পরিধিকে এই পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অনন্ত অসীম মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত করা। মহাকাশে আজ আমরা হাজার হাজার আলোকবর্ষ নিয়ে কাজ করছি,মহাকাশযান পাঠিয়ে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করছি,উপনিবেশ স্থাপনের চিন্তা করছি, ভিনগ্রহের প্রাণিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। এসবের পিছনে রয়েছে হাজার মানুষের অবিশ্রান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ,মেধা। তাদের অনেকেই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়। দুর্ভাগ্যক্রমে অনেককেই ভুলে গেছি আমরা, অনেকেই পাননি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা।

আজ আমরা কিছু ভুলে যাওয়া মানুষের কথা বলব যাদের অবদান ছাড়া বর্তমান অবস্থায় আমরা মহাকাশ প্রযুক্তিকে নিয়ে আসতে পারতাম না।

মহাকাশ যাত্রার জন্য হাজার হাজার জটিল গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন হয় যা আজকের দিনে সুপার কম্পিউটার দিয়ে অনায়াসে করা যায়। কিন্তু যখন কম্পিউটার মাত্র বিকাশের পথে, নির্ভরযোগ্য ছিল না, ক্যালকুলেটরগুলো সামান্য কিছু ফাংশন ছাড়া কিছুই হিসাব করতে পারত না, তখন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল মহাকাশ যাত্রা?

scientists calculating trajectories manually

১৯৪০ এবং পঞ্চাশের দশকে এই কাজগুলা করতেন একদল “কম্পিউটার”, যারা কোনো যন্ত্র ছিলেন না, কিছু পুরুষ এবং মহিলা যারা দ্রুত হিসাব করতে পারদর্শী ছিলেন তারাই এই কাজগুলা করতেন। তাদের কাজ ছিল মহাকাশযানের গতিপথ ও বেগ নির্ণয় করা, পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে সেইগুলা লেখচিত্রে বসানো, রকেটের ডিজাইন পরিবর্তন ইত্যাদি।এদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল প্রথম আমেরিকান স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা

Group photo, 1953, rocket girls or “computresses” courtesy: JPL,NASA

পরবর্তীতে নারীদের জন্য আলাদা দল গঠন করা হয়।এরা কাজ করতেন নাসার Jet Propulsion Laboratory(JPL),Pasadena, California তে।এই নারীদের একজন ছিলেন Macie Roberts।তাকে ১৯৪২ সালে গ্রুপ তত্ত্বাবধায়ক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি, ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি আর পুরুষদের সেই যুগের অসহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।

এই মেয়েরা সবাই কিন্তু ব্যাচেলর ডিগ্রি ধারী ছিলেন না।কেউ কেউ স্নাতক শেষ করেন নি আবার Janez Lawson(JPL এ কাজ করা প্রথম আফ্রো আমেরিকান মহিলা) ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক কিন্তু তাকে নেয়া হয়েছিল কম্পিউটার হিসাবে।তার অবদানে আর উৎসাহে Sylvia Miller এর মত নারীরা উঠে আসতে পেরেছিলেন যিনি শেষ পর্যন্ত Mars Program Office এর ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

Susan Finley(নাসার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মহিলা কর্মী ),Barbara Pulson, Elenor Frances (১৯৫৯ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন), Helen Ling( মহাকাশযান Mariner এ কাজ করেন computing supervisor হিসাবে),Dana Uleiri( ইঞ্জিনিয়ার,Mars mission tracking team), Katherine Johnson(চাঁদে যাওয়ার প্রথম গতিপথ হিসাব করেছিলেন )

SYLVIA MILLER

মেয়েদের এখানে কাজ করা সহজ ছিল না, পরিবেশ ছিল প্রতিকূল, গর্ভাবস্থা জানতে পারলেই ছাঁটাই করা হত, ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।পরিবার আর সন্তানদের সামলে কাজ করতেন অক্লান্তভাবে। তারা ছুটির সময় জমিয়ে রাখতেন যাতে সন্তান জন্মের পর কোনো অতিরিক্ত ছুটি ছাড়াই কাজে যোগদান করতে পারেন।সেসময় সন্তানসহ নারীরা বাইরে তেমন কাজ করতে পারতেন না।এই মহীয়সী মেয়েরা Werner Van Braun, Carl Sagan, Richard Feinmann এর মত মানুষদের পাশে কাজ করে গেছেন নিরবে।

Macie Roberts এর ভাষায় “They had to look like a girl, act like a lady, think like a man, and work like a dog”.

A human computer tracking spacecraft position on graph

কিন্তু তাদের এই অবদান স্বীকৃতি পায়নি, IBM কম্পিউটার আসার পর বেশিরভাগই চাকরি হারান। আর নাসা নতুন নিয়ম করে যে ব্যাচেলর ডিগ্রী ছাড়া কেউ চাকরি করতে পারবেন না। তাদের তথ্য আর্কাইভ jet propulsion laboratory রাখা হয়নি।এমনকি ২০০৮ সালে আমেরিকান স্পেস স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ৫০ তম বার্ষিকীতে তাদের আমন্ত্রন করতে ভুলে গিয়েছিল !

Human computers in workplace, standing one behind all is supervisor Macie Roberts; COURTESY :JPL,NASA.

তাদের এই ভুলে যাওয়া ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছেন জীববিজ্ঞানী ও লেখিকা Nathalia Holt।তিনি তার বইতে এই ক্ষণজন্মা, অসীম মানসিক শক্তির অধিকারী, সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কাজ করা নারীদের কথা তুলে ধরেছেন। তার “The Rise of Rocket Girls, The women Who propelled us from missiles to the moon to mars’’ বইতে স্থান পেয়েছে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রতিকূলতা, অদম্য মানবীয় প্রেরনা যা তাদের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ কে উৎসাহিত করেছে আর যার প্রত্যক্ষ ফল আজকের “মহাকাশ যুগ”।

জনপ্রিয় ম্যাগাজিন Popular Science লিখেছে,“The [women’s] stories are fun, intense, and endearing, and they give a new perspective on the rise of the space age”

বইটির রিভিউতে Usa Today লিখেছে, “Illuminating… these women are vividly depicted at work, at play, in and out of love, raising children — and making history. What a team — and what a story!”

হয়ত তাদের নাম বড় বড় বিজ্ঞানীদের সাথে উচ্চারিত হবে না,নতুন প্রজন্ম তাদের নিয়ে জানতেও চাইবে না কিন্তু তাদের এই অবদান মানবসভ্যতার অগ্রগমনে মাইলফলক হয়ে থাকবে,অনুপ্রাণিত করবে অনন্তকাল।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https//en.wikipedia.org/wiki/Jet_Propulsion_Laboratory
  2. 2.news.national geographic.com/2016/05/160508
  3. The secret history of the woman who got us beyond the moon(18 may,2016)
  4. www.nathaliaholt.com/rise of rocket girl
  5. www.amazon.com/Rise-Rocket –Girls-Propelled- Missile
  6. www.jpl.nasa.gov/jplhistory/early/index.php
  7. www.thinkprogress.org//incredible story and NASA’s forgotten girls