চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট।

পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে।

এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়।

তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক।

উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে।

তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

featured image: mysafetylabels.com

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

একজনব্যবসায়ীর চিঠি এবং নতুন জগতের সন্ধান

“দীর্ঘ সময় ধরেকরে যাওয়া একটি কাজের জন্য এখন আমি যে প্রশংসা উপভোগ করছি, তা শুধুমাত্র প্রশংসার জন্য ছিলনা। এটি ছিল মূলত জ্ঞানের প্রতি আমার প্রবল তৃষ্ণা, যা আমি অন্যদের চেয়ে আমার মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণে দেখেছি। পাশাপাশি যখনই আমি অসাধারণ কিছু খুঁজে পেয়েছি, আমার মনে হয়েছে এটি কাগজে লিখে রাখা আমার কর্তব্য, যেন প্রতিভাধর মানুষেরা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন”। (এন্টনি ভন লিউয়েন হুক, ১২ জুন, ১৭১৬)

বিজ্ঞানী বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যা বুঝি লিউয়েন হুক সেরকম ছিলেন না। তার কোনো উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যা-লয়ের ডিগ্রিও ছিলনা। এমনকি তিনি তার মাতৃভাষা ডাচ ছাড়া অন্য কোনো ভাষাও জানতেন না। তিনি ছিলেন নেদারল্যান্ডের ডেল্ট শহরের একজন সাধারণ পোশাক শিল্পের উপকরণ ব্যবসায়ী। এই সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় যে ষোলো শতকের তৎকালীন কুলীন বিজ্ঞান সমাজে স্থান পাওয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই তার ছিল না। কিন্তু তার মধ্যে ছিল একটি নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু মন এবং কঠোর অধ্যবসায়। এছাড়াও প্রচলিত মতবাদ এবং আবিষ্কারের বাইরে ভিন্নভাবে চিন্তা করার সহজাত দক্ষতা। এগুলো থাকার কারণেই তিনি বিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা উন্মোচন করতে পেরেছিলেন এবং পরিচিতি পেয়েছেন ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এর জনক হিসেবে।

লিউয়েন হুকই সর্বপ্রথম ব্যাকটেরিয়া, আণুবীক্ষণিক পরজীবী, শুক্রাণু, রক্তকোষ, আণুবীক্ষণিক নেমাটোড, রটিফার এবং আরও অসংখ্য ক্ষুদ্রকায় বস্তু স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেন। তার বহুল প্রচারিত এসব আবিষ্কারের ফলেই আণুবীক্ষণিক জীবের এক বিশাল জগত বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিগোচরে আসে এবং শুরু হয় পৃথিবীর অদৃশ্য এক জগতের জ্ঞানযাত্রা ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এর। অণুজীববিজ্ঞানের জনক লিউয়েন হুককে কখনো কখনো অনুবীক্ষণ যন্ত্রের উদ্ভাবক বলা হয়ে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি তার উদ্ভাবক ছিলেন না। লিউয়েন হুকের জন্মের প্রায় চল্লিশ বছর আগেইজটিল বা যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র (অর্থাৎ একাধিক লেন্স যুক্ত অণুবীক্ষণ যন্ত্র) উদ্ভাবিত হয়েছিল।

লিউয়েনহুকের পূর্বসুরী এবং সমসাময়িক অনেকেই যেমন ইংল্যান্ডের রবার্ট হুক, নেদারল্যান্ডের জ্যান সামারড্যাম যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন এবং সেগুলো দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারও করেছিলেন। যন্ত্রের নকশার দিক থেকে সেগুলোর অনেকগুলোই আজকের যুগে ব্যবহৃত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অনুরূপ ছিল। কিন্তু নানা রকম কারিগরী প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রথম দিকের সেসব যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলো কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত আকারের চাইতে বিশ বা ত্রিশ গুনের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো না।

কিন্তু হুকের লেন্স চুর্ণনের সহজাত দক্ষতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি এবং আলোক রশ্মিকেবস্তু দেখার কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারার কারণে তার তৈরি লেন্স দিয়ে কোনো বস্তুকে দুই শত গুণের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো। পাশাপাশি কোনো বস্তুকে সমসাময়িক অন্য কারো যন্ত্রের চেয়ে অধিক পরিস্কার এবং উজ্জ্বল করে দেখার সক্ষমতা এনে দিয়েছে তার যন্ত্র। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির কারণে তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা যায় তা হলো, যেকোনো বস্তুকেই লেন্সের নিচে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করার অসীম কৌতূহল এবং পর্যবেক্ষণের সকল বর্ণনা অতি যত্ন সহকারে লিপিবদ্ধ করার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। এমনকি তিনি নিজে ভালো আঁকতে পারতেন না বলে একজন অঙ্কনশিল্পীকে দিয়ে তিনি তার পর্যবেক্ষণ করা বস্তুগুলোর হুবহু চিত্র অঙ্কন করে নিয়েছিলেন।

চিত্রঃ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে লিউয়েন হুকের দেখা অণুজীবের অঙ্কিত চিত্র।

লিউয়েন হুকের নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলোর মধ্যে মাত্রবর্তমানে দশটিরও কম পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা করা যায়, হুকের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর নকশায়প্রধান বস্তু ছিল কেবল একটি শক্তিশালী বিবর্ধক লেন্স। হুকের নিজের অংকিত চিত্র থেকে দেখা যায়, একটি পিতলের প্লেটের কাঠামোর মধ্যে একটি ছোট গর্তে শুধুমাত্র একটি লেন্স বসানো থাকে। লেন্সের সামনে একটি সূচালো দণ্ডে পর্যবেক্ষণের জন্য নমুনা রাখা হয়।এর অবস্থান এবং ফোকাস দুটি স্ক্রু দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পুরো যন্ত্রটি মাত্র ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা ছিলএবং এটিকে চোখের একেবারে কাছে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হতো। তবে পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আলো এবং অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল, যা লিউয়েন হুক বেশ আনন্দের সাথেই করতেন।

চিত্রঃ লিউয়েন হুকের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের একটি রেপ্লিকা।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ব্যাপারেলিউয়েনহুক মূলত অনুপ্রাণিত হন তারই সমসাময়িক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী রবার্ট হুকের সচিত্র বই ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’থেকে। ব্যাপক জনপ্রিয় এই বইতে রবার্ট হুক তার নিজস্ব আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলি তুলে ধরেছিলেন। ১৬৬৮ সালের কিছু সময়আগে লিউয়েনহুকলেন্স চূর্ণ করার পদ্ধতিশেখেন এবং তা দিয়ে আতশী কাচ বা সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করতে থাকেন। জানা যায়, লিউয়েন হুক বিভিন্ন বিবর্ধন ক্ষমতার প্রায় পাঁচ’শয়েরও বেশি পরিমাণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। প্রথমদিকে এই জিনিসটির প্রয়োজন পড়েছিল তার ব্যবসায়িক কাজের খাতিরেই। তিনি এইসব অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাপড়ের সুতার মান যাচাই করতে ব্যবহার করতেন। কিন্তু তার জ্ঞানপিপাসু মন তার দৃষ্টিকে শুধুমাত্র কাপড়ের তন্তুর মাঝেই সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিয়ে দেখতেন। এটি তার কাছে অনেকটা খেলনার মতো ছিল। কোনো কিছুই তারপর্যবেক্ষণ থেকে বাদ পড়তো না। বৃষ্টির পানি, কুপের পানি, সমুদ্রের পানি, দাঁতের ময়লা সব কিছুকেই কেবল কৌতূহলবশত তিনি তার যন্ত্রের নিচে নিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখতেন।

প্রচারবিমুখ লিউয়েন হুক তার ডাক্তার বন্ধু রেইনিয়ার ডি গ্রুফের পরামর্শে প্রথমবারের মতো তার আণুবীক্ষণিকপর্যবেক্ষণের বর্ণনা দিয়ে লন্ডনের নবগঠিত রয়েল সোসাইটি বরাবর চিঠি লিখেন ১৬৭৩ সালে। তার প্রথম চিঠিটি ছিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মৌমাছি, পরজীবী এবং মোল্ড পর্যবেক্ষণ নিয়ে। পরবর্তী পঞ্চাশ বছর ধরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ রেখেছিলেন। সর্বমোট ৫৬০ টির মতো চিঠি তিনি রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন। তার লেখা চিঠিগুলো ছিলসাধারণ ডাচ ভাষায় লেখা, যেগুলোপরে ইংরেজি এবং ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং “Philosophical Transactions of the Royal Society” তে মুদ্রিত হয়েছে।

প্রচলিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা কর্মের পদ্ধতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না বলে তিনি তার আবিষ্কারকে কোনো নিবন্ধ আকারে প্রকাশ করেননি এবং সেরকম কোনো চেষ্টাও করেননি। তিনি তারপর্যবেক্ষণের সকল কাজ একাই করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং নিজের তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেন্সগুলোর প্রস্তুত প্রণালীও প্রকাশ করতে চাইতেন না। ফলে তার সকল অদ্ভুত পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলো অন্যেরা কেবলমাত্র তার চিঠিগুলোর মাধ্যমেই জানতে পারতো।

১৬৭৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হুকের লেখা একটি চিঠিতে লেকের পানিতে ভাসমান সবুজ শৈবালস্পাইরোগাইরার বর্ণনা ছিল এরকম,“…লেকের পানির উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। …পরের দিন এই পানি পরীক্ষা করে দেখতে পেলাম তাতে অনেক ভাসমান কণাএবং কিছু সবুজ সর্পিলাকার, সুসজ্জিত, তামা বা টিন রঙের পোকার মতো কিছু।অনেকটা শিল্পকারখানায় এলকোহল জাতীয় পানীয় ঠাণ্ডা করার কাজে যে বস্তু ব্যবহার করা হয় তার মতো। প্রতিটি বস্তুর পরিধি ছিল মাথার একটি চুলের পুরুত্বের সমান… এদের প্রত্যেকেই ছোট ছোট সবুজ বর্তুলাকৃতির সংযুক্ত বস্তুনিয়ে গঠিত ছিল।সংযুক্ত বস্তুর পাশাপাশি সেখানেছোট ছোট অনেক পৃথক বর্তুলাকৃতির বস্তুও ছিল।”

১৬৮৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, লিউয়েনহুক তার নিজের দাঁতের মধ্যেকার প্ল্যাক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে রয়েল সোসাইটির উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেন,“একটি সামান্য সাদা পদার্থ, এতোটাই পুরু যেন মনে হয় দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে।”
তার এই পর্যবেক্ষণ আরো দুইজন মহিলার (সম্ভবত তার নিজের স্ত্রী এবং কন্যা) এবং দুইজন বৃদ্ধ লোকের দাঁতের উপর পুনরাবৃত্তি করেন। বৃদ্ধ লোকগুলো আবার সারা জীবনে কখনো দাঁত পরিষ্কার করেনি। এ বিষয়েলিউয়েনহুক তার রিপোর্টে লিখেন“আমি তখন অন্যান্য বারের মতোই চরম আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলামযে, দাঁতের মধ্যকার সেইসব সাদা বস্তুর মধ্যে খুব সাবলীলভাবে চলমান কিছু ক্ষুদ্র জীবন্ত প্রাণী দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই ছিল… খুবই শক্তিশালী এবং ক্ষীপ্রগতির, অনেকটা পানির উপর পাইক মাছের চলাচলের মতো।”

একজন বৃদ্ধ লোকের মুখ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কেলিউয়েনহুক লিখেন“অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্তপ্রাণীদের সমাবেশ এবং তাদের অতি সাবলীল চলাচল যা আমি এ পর্যন্ত আর কোথাও দেখিনি। সবচেয়ে বড়টি… সামনে চলাচলের জন্য তাদের শরীরকে বাঁকিয়ে থাকে… তাছাড়াঅন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো সংখ্যায় এতো বেশি ছিল যে, সম্পূর্ণ পানিকেই… জীবন্ত মনে হচ্ছিল।”
লিউয়েন হুকের লেখা এই চিঠিগুলোই ছিল জীবিত ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণের প্রথম রেকর্ড।

১৭০২ সালের ২৫ ডিসেম্বরে এক চিঠিতে লিউয়েন হুক প্রোটিস্টের বর্ণনা দেন এভাবে- “এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর আকৃতি ছিল ঘণ্টার মতো, এবং এদের বৃত্তাকার উন্মুক্ত অংশের দিকে তারা এমন আলোড়ন সৃষ্টি করেযেন ঐ স্থানের কাছাকাছি পানিতে অবস্থিত কণার চলাচল শুরুহয়… আমি এরকম প্রায় বিশটি প্রাণীকে দেখেছি। তাদের লেজগুলোকে পরস্পর পাশাপাশি হয়ে তাদের ধীর গতির চলাচল, তাদের উন্মীলিত দেহ এবং সোজা হয়ে থাকা লেজ, তবুও এক নিমিষে তাৎক্ষণিকভাবে, তারা তাদের দেহ এবং লেজকে একসাথে টেনে নিয়েছিল।তাদের দেহ এবং লেজকে সংকুচিত করার সাথে সাথে তারা আবার খুব ধীরভাবে লেজগুলো বের করে এনেছিল। এভাবে কিছু সময় তাদের মৃদু গতির চলাচল অব্যাহত ছিল, যা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক বলে মনে হয়েছে।”

লিউয়েনহুকপ্রাণী টিস্যু, উদ্ভিদ টিস্যু, খনিজ স্ফটিক ও জীবাশ্ম সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আণুবীক্ষণিক ফোরামিনিফেরা দেখতে পাওয়া প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনিইরক্তকোষ আবিষ্কার করেন এবং সর্বপ্রথম প্রাণীর শুক্রাণুর জীবিত কোষ দেখতে পান। তিনিই নেমাটোড এবং রটিফারের মতো আণুবীক্ষণিক প্রাণী আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কারের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে এবং বাড়তেই থাকে। তার এসব আবিষ্কারের চিঠিগুলো প্রকাশ এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবার সাথে সাথে তিনি খুব শীঘ্রই বিখ্যাত হয়ে উঠেন।

১৬৮০ সালে, রয়েল সোসাইটিতে যখন রবার্ট হুক, হেনরি ওডেলবার্গ, রবার্ট বয়েল, ক্রিস্টোফার রেন-এর মতো কিংবদন্তী বিজ্ঞানীরা সদস্য হিসেবে ছিলেন, ঠিক সে সময়ই লিউয়েন হুক রয়েল সোসাইটিতে একজন পূর্ণ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬৯৮ সালে তিনি রাশিয়ার কিংবদন্তী জার পিটারকে একটি ইলের ভিতরকৈশিক জালিকায় রক্তপ্রবাহ দেখিয়েছিলেন। তার কাছে এসব অদ্ভুত জিনিস দেখতে আসা অসংখ্য কৌতুহলী দর্শকদের আগমন অব্যাহত রেখেছিলেন। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পর্যবেক্ষণচালিয়ে গিয়েছিলেন।

১৭২৩ সালের ৩০ আগস্ট হুকের মৃত্যুর পর, ডেল্ট-এরনিউ চার্চের যাজক রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন,“…অ্যান্টনি ভ্ন লিউয়েনহুক বিশ্বাস করতেন, প্রাকৃতিক দর্শনে যা কিছু সত্য তা সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, কেবলমাত্র অনুভূতির প্রমাণ দ্বারা। সে কারণেইঅধ্যবসায় এবং অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তিনি তার নিজের হাতে চমৎকার সব লেন্স তৈরি করেছেন, যার সাহায্যে তিনি প্রকৃতির অনেক রহস্য আবিষ্কার করেছেন, যা এখন পুরো বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত।”

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ব্রায়ান জে ফোর্ড লন্ডনের রয়েল সোসাইটির আর্কাইভ থেকে লিউয়েন হুকের ব্যবহৃত কিছু মূল নমুনা পুনরাবিষ্কার করেছেন। এই ঐতিহাসিক নমুনা, লিউয়েনহুকেরনিজের ব্যবহৃতও তৈরিকৃত অন্যান্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং অন্যান্য উপাদান নিয়েকরা গবেষণার মাধ্যমে ফোর্ড দেখিয়েছেন, পেশায় ব্যবসায়ী হলেও লিউয়েনহুক সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর এবং উন্নত মানের বিজ্ঞানী। তার লেখা এই সাধারণ চিঠিগুলো তাই এখন বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হয়েও লিউয়েন হুকের জানার অসীম কৌতূহল এবং আজীবন ধরে এর পেছনে লেগে থাকা খুলে দিয়েছিল এক নতুন জগত, যার হাত ধরে পৃথিবীবাসী আজ অণুজীবকে আরো ভালোভাবে জানার মাধ্যমে নানান নতুন গবেষণার দ্বার উন্মোচন করে চলেছে। এজন্যই বিশ্ববাসীর কাছে লিউয়েন হুক আজ ব্যবসায়ী নয় বরং ‘অণুজীববিজ্ঞানেরজনক’হিসেবে সুপরিচিত।

তথ্যসূত্র

1. https://en.wikipedia.org/wiki/Antonie van Leeuwenhoek
 2. History of Microbiology:Milton Wainwright and Joshua Lederberg
 3. Microbe Hunters: Paul De Kruif

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট। পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম

ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক। উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে। তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট। পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম

ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক। উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে। তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

একজনব্যবসায়ীর চিঠি এবং নতুন জগতের সন্ধান

“দীর্ঘ সময় ধরেকরে যাওয়া একটি কাজের জন্য এখন আমি যে প্রশংসা উপভোগ করছি, তা শুধুমাত্র প্রশংসার জন্য ছিলনা। এটি ছিল মূলত জ্ঞানের প্রতি আমার প্রবল তৃষ্ণা, যা আমি অন্যদের চেয়ে আমার মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণে দেখেছি। পাশাপাশি যখনই আমি অসাধারণ কিছু খুঁজে পেয়েছি, আমার মনে হয়েছে এটি কাগজে লিখে রাখা আমার কর্তব্য, যেন প্রতিভাধর মানুষেরা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন”। (এন্টনি ভন লিউয়েন হুক, ১২ জুন, ১৭১৬)

বিজ্ঞানী বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যা বুঝি লিউয়েন হুক সেরকম ছিলেন না। তার কোনো উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যা-লয়ের ডিগ্রিও ছিলনা। এমনকি তিনি তার মাতৃভাষা ডাচ ছাড়া অন্য কোনো ভাষাও জানতেন না। তিনি ছিলেন নেদারল্যান্ডেরডেল্ট শহরের একজন সাধারণ পোশাক শিল্পের উপকরণ ব্যবসায়ী। এই সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় যে ষোলো শতকের তৎকালীন কুলীন বিজ্ঞান সমাজে স্থান পাওয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই তার ছিলনা। কিন্তু তার মধ্যে ছিল একটি নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু মন এবং কঠোর অধ্যবসায়। এছাড়াওপ্রচলিত মতবাদ এবং আবিষ্কারের বাইরে ভিন্নভাবে চিন্তা করার সহজাত দক্ষতা। এগুলো থাকার কারণেই তিনিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা উন্মোচন করতে পেরেছিলেন এবং পরিচিতি পেয়েছেন ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এরজনকহিসেবে।
লিউয়েন হুকই সর্বপ্রথম ব্যাকটেরিয়া, আণুবীক্ষণিক পরজীবী, শুক্রাণু, রক্তকোষ, আণুবীক্ষণিক নেমাটোড,রটিফার এবং আরও অসংখ্য ক্ষুদ্রকায় বস্তু স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেন। তার বহুল প্রচারিত এসব আবিষ্কারের ফলেই আণুবীক্ষণিক জীবের এক বিশাল জগত বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিগোচরে আসে এবং শুরু হয় পৃথিবীর অদৃশ্য এক জগতের জ্ঞানযাত্রা ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এর। অণুজীববিজ্ঞানেরজনক লিউয়েনহুককেকখনোকখনোঅনুবীক্ষণযন্ত্রেরউদ্ভাবকবলাহয়ে থাকলেও প্রকৃতপক্ষেতিনি তার উদ্ভাবক ছিলেন না। লিউয়েনহুকের জন্মের প্রায় চল্লিশ বছর আগেইজটিল বা যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র (অর্থাৎএকাধিকলেন্সযুক্তঅণুবীক্ষণযন্ত্র) উদ্ভাবিতহয়েছিল।
লিউয়েনহুকের পূর্বসুরী এবং সমসাময়িক অনেকেইযেমনইংল্যান্ডেররবার্টহুক, নেদারল্যান্ডের জ্যান সামারড্যাম যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন এবং সেগুলো দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারও করেছিলেন। যন্ত্রেরনকশার দিক থেকে সেগুলোর অনেকগুলোই আজকের যুগে ব্যবহৃত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অনুরূপ ছিল। কিন্তু নানা রকম কারিগরী প্রতিবন্ধকতার কারণেপ্রথম দিকের সেসব যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলো কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত আকারের চাইতে বিশ বা ত্রিশ গুনের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো না।
কিন্তু হুকের লেন্স চুর্ণনের সহজাত দক্ষতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি এবং আলোক রশ্মিকেবস্তু দেখার কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারার কারণে তার তৈরি লেন্স দিয়ে কোনো বস্তুকে দুই শত গুণের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো। পাশাপাশি কোনো বস্তুকে সমসাময়িক অন্য কারো যন্ত্রের চেয়ে অধিক পরিস্কার এবং উজ্জ্বল করে দেখার সক্ষমতা এনে দিয়েছে তার যন্ত্র। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির কারণে তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা যায় তা হলো, যেকোনো বস্তুকেই লেন্সের নিচে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করার অসীম কৌতূহল এবং পর্যবেক্ষণের সকল বর্ণনা অতি যত্ন সহকারে লিপিবদ্ধ করার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। এমনকি তিনি নিজে ভালো আঁকতে পারতেন না বলে একজন অঙ্কনশিল্পীকে দিয়ে তিনি তার পর্যবেক্ষণ করা বস্তুগুলোর হুবহু চিত্র অঙ্কন করে নিয়েছিলেন।

চিত্রঃ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে লিউয়েন হুকের দেখা অণুজীবের অঙ্কিত চিত্র।

লিউয়েন হুকের নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলোর মধ্যে মাত্রবর্তমানে দশটিরও কম পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা করা যায়, হুকের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর নকশায়প্রধান বস্তু ছিল কেবল একটি শক্তিশালী বিবর্ধক লেন্স। হুকের নিজের অংকিত চিত্র থেকে দেখা যায়, একটি পিতলের প্লেটের কাঠামোর মধ্যে একটি ছোট গর্তে শুধুমাত্র একটি লেন্স বসানো থাকে। লেন্সের সামনে একটি সূচালো দণ্ডে পর্যবেক্ষণের জন্য নমুনা রাখা হয়।এর অবস্থান এবং ফোকাস দুটি স্ক্রু দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পুরো যন্ত্রটি মাত্র ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা ছিলএবং এটিকে চোখের একেবারে কাছে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হতো। তবে পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আলো এবং অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল, যা লিউয়েন হুক বেশ আনন্দের সাথেই করতেন।

চিত্রঃ লিউয়েন হুকের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের একটি রেপ্লিকা।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ব্যাপারেলিউয়েনহুক মূলত অনুপ্রাণিত হন তারই সমসাময়িক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী রবার্ট হুকের সচিত্র বই ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’থেকে। ব্যাপক জনপ্রিয় এই বইতে রবার্ট হুক তার নিজস্ব আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলি তুলে ধরেছিলেন। ১৬৬৮ সালের কিছু সময়আগে লিউয়েনহুকলেন্স চূর্ণ করার পদ্ধতিশেখেন এবং তা দিয়ে আতশী কাচ বা সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করতে থাকেন। জানা যায়, লিউয়েন হুক বিভিন্ন বিবর্ধন ক্ষমতার প্রায় পাঁচ’শয়েরও বেশি পরিমাণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। প্রথমদিকে এই জিনিসটির প্রয়োজন পড়েছিল তার ব্যবসায়িক কাজের খাতিরেই। তিনি এইসব অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাপড়ের সুতার মান যাচাই করতে ব্যবহার করতেন। কিন্তু তার জ্ঞানপিপাসু মন তার দৃষ্টিকে শুধুমাত্র কাপড়ের তন্তুর মাঝেই সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিয়ে দেখতেন। এটি তার কাছে অনেকটা খেলনার মতো ছিল। কোনো কিছুই তারপর্যবেক্ষণ থেকে বাদ পড়তো না। বৃষ্টির পানি, কুপের পানি, সমুদ্রের পানি, দাঁতের ময়লা সব কিছুকেই কেবল কৌতূহলবশত তিনি তার যন্ত্রের নিচে নিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখতেন।
প্রচারবিমুখ লিউয়েনহুক তার ডাক্তার বন্ধু রেইনিয়ার ডি গ্রুফের পরামর্শে প্রথমবারের মতো তার আণুবীক্ষণিকপর্যবেক্ষণের বর্ণনা দিয়ে লন্ডনের নবগঠিত রয়েল সোসাইটি বরাবর চিঠি লিখেন ১৬৭৩ সালে। তার প্রথম চিঠিটি ছিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মৌমাছি, পরজীবী এবং মোল্ড পর্যবেক্ষণ নিয়ে। পরবর্তী পঞ্চাশ বছর ধরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ রেখেছিলেন। সর্বমোট ৫৬০ টির মতো চিঠি তিনি রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন। তার লেখা চিঠিগুলো ছিলসাধারণ ডাচ ভাষায় লেখা, যেগুলোপরে ইংরেজি এবং ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং “Philosophical Transactions of the Royal Society” তে মুদ্রিত হয়েছে।
প্রচলিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা কর্মের পদ্ধতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিলনা বলে তিনি তার আবিষ্কারকে কোনো নিবন্ধ আকারে প্রকাশ করেননি এবং সেরকম কোনো চেষ্টাও করেননি। তিনি তারপর্যবেক্ষণের সকল কাজ একাই করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং নিজের তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেন্সগুলোর প্রস্তুত প্রণালীও প্রকাশ করতে চাইতেন না। ফলে তার সকল অদ্ভুত পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলো অন্যেরা কেবলমাত্র তার চিঠিগুলোর মাধ্যমেই জানতে পারতো।
১৬৭৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হুকের লেখা একটি চিঠিতে লেকের পানিতে ভাসমান সবুজ শৈবালস্পাইরোগাইরার বর্ণনা ছিল এরকম,“…লেকের পানির উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। …পরের দিন এই পানি পরীক্ষা করে দেখতে পেলাম তাতে অনেক ভাসমান কণাএবং কিছু সবুজ সর্পিলাকার, সুসজ্জিত, তামা বা টিন রঙের পোকার মতো কিছু।অনেকটা শিল্পকারখানায় এলকোহল জাতীয় পানীয় ঠাণ্ডা করার কাজে যে বস্তু ব্যবহার করা হয় তার মতো। প্রতিটি বস্তুর পরিধি ছিল মাথার একটি চুলের পুরুত্বের সমান… এদের প্রত্যেকেই ছোট ছোট সবুজ বর্তুলাকৃতির সংযুক্ত বস্তুনিয়ে গঠিত ছিল।সংযুক্ত বস্তুর পাশাপাশি সেখানেছোট ছোট অনেক পৃথক বর্তুলাকৃতির বস্তুও ছিল।”
১৬৮৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, লিউয়েনহুক তার নিজের দাঁতের মধ্যেকার প্ল্যাক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে রয়েল সোসাইটির উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেন,“একটি সামান্য সাদা পদার্থ, এতোটাই পুরু যেন মনে হয় দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে।”
তার এই পর্যবেক্ষণ আরো দুইজন মহিলার (সম্ভবত তার নিজের স্ত্রী এবং কন্যা) এবং দুইজন বৃদ্ধ লোকের দাঁতের উপর পুনরাবৃত্তি করেন। বৃদ্ধ লোকগুলো আবার সারা জীবনে কখনো দাঁত পরিষ্কার করেনি। এ বিষয়েলিউয়েনহুক তার রিপোর্টে লিখেন“আমি তখন অন্যান্য বারের মতোই চরম আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলামযে, দাঁতের মধ্যকার সেইসব সাদা বস্তুর মধ্যে খুব সাবলীলভাবে চলমান কিছু ক্ষুদ্র জীবন্ত প্রাণী দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই ছিল… খুবই শক্তিশালী এবং ক্ষীপ্রগতির, অনেকটা পানির উপর পাইক মাছের চলাচলের মতো।”
একজন বৃদ্ধ লোকের মুখ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কেলিউয়েনহুক লিখেন“অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্তপ্রাণীদের সমাবেশ এবং তাদের অতি সাবলীল চলাচল যা আমি এ পর্যন্ত আর কোথাও দেখিনি। সবচেয়ে বড়টি… সামনে চলাচলের জন্য তাদের শরীরকে বাঁকিয়ে থাকে… তাছাড়াঅন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো সংখ্যায় এতো বেশি ছিল যে, সম্পূর্ণ পানিকেই… জীবন্ত মনে হচ্ছিল।”
লিউয়েন হুকের লেখা এই চিঠিগুলোই ছিল জীবিত ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণের প্রথম রেকর্ড।
চিত্রঃ লিউয়েন হুকের স্বহস্তে লেখা একটি চিঠি যেটি তিনি ১৬৭৭ সালে ওডেলবার্গকে পাঠিয়েছিলেন।
১৭০২ সালের ২৫ ডিসেম্বরে এক চিঠিতে লিউয়েন হুক প্রোটিস্টের বর্ণনা দেন এভাবে- “এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর আকৃতি ছিল ঘণ্টার মতো, এবং এদের বৃত্তাকার উন্মুক্ত অংশের দিকে তারা এমন আলোড়ন সৃষ্টি করেযেন ঐ স্থানের কাছাকাছি পানিতে অবস্থিত কণার চলাচল শুরুহয়… আমি এরকম প্রায় বিশটি প্রাণীকে দেখেছি। তাদের লেজগুলোকে পরস্পর পাশাপাশি হয়ে তাদের ধীর গতির চলাচল, তাদের উন্মীলিত দেহ এবং সোজা হয়ে থাকা লেজ, তবুও এক নিমিষেতাৎক্ষণিকভাবে,তারা তাদের দেহ এবং লেজকে একসাথে টেনে নিয়েছিল।তাদের দেহ এবং লেজকে সংকুচিত করার সাথে সাথে তারা আবার খুব ধীরভাবে লেজগুলো বের করে এনেছিল। এভাবে কিছু সময় তাদের মৃদু গতির চলাচল অব্যাহত ছিল, যা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক বলে মনে হয়েছে।”

লিউয়েনহুকপ্রাণী টিস্যু, উদ্ভিদ টিস্যু, খনিজ স্ফটিক ও জীবাশ্ম সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আণুবীক্ষণিক ফোরামিনিফেরা দেখতে পাওয়া প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনিইরক্তকোষ আবিষ্কার করেন এবং সর্বপ্রথম প্রাণীর শুক্রাণুর জীবিত কোষ দেখতে পান। তিনিই নেমাটোড এবং রটিফারের মতো আণুবীক্ষণিক প্রাণী আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কারের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে এবং বাড়তেই থাকে। তার এসব আবিষ্কারের চিঠিগুলো প্রকাশ এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবার সাথে সাথে তিনি খুব শীঘ্রই বিখ্যাত হয়ে উঠেন।
১৬৮০ সালে, রয়েল সোসাইটিতে যখন রবার্ট হুক, হেনরি ওডেলবার্গ, রবার্ট বয়েল, ক্রিস্টোফার রেন-এর মতো কিংবদন্তী বিজ্ঞানীরা সদস্য হিসেবে ছিলেন, ঠিক সে সময়ই লিউয়েন হুক রয়েল সোসাইটিতে একজন পূর্ণ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬৯৮ সালে তিনি রাশিয়ার কিংবদন্তী জার পিটারকে একটি ইলের ভিতরকৈশিক জালিকায় রক্তপ্রবাহ দেখিয়েছিলেন। তার কাছে এসব অদ্ভুত জিনিস দেখতে আসা অসংখ্য কৌতুহলী দর্শকদের আগমন অব্যাহত রেখেছিলেন। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পর্যবেক্ষণচালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৭২৩ সালের ৩০ আগস্ট হুকের মৃত্যুর পর, ডেল্ট-এরনিউ চার্চের যাজক রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন,“…অ্যান্টনি ভ্ন লিউয়েনহুক বিশ্বাস করতেন, প্রাকৃতিক দর্শনে যা কিছু সত্য তা সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, কেবলমাত্র অনুভূতির প্রমাণ দ্বারা। সে কারণেইঅধ্যবসায় এবং অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তিনি তার নিজের হাতে চমৎকার সব লেন্স তৈরি করেছেন, যার সাহায্যে তিনি প্রকৃতির অনেক রহস্য আবিষ্কার করেছেন, যা এখন পুরো বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত।”
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ব্রায়ান জে ফোর্ড লন্ডনের রয়েল সোসাইটির আর্কাইভ থেকে লিউয়েন হুকের ব্যবহৃত কিছু মূল নমুনা পুনরাবিষ্কার করেছেন। এই ঐতিহাসিক নমুনা, লিউয়েনহুকেরনিজের ব্যবহৃতও তৈরিকৃত অন্যান্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং অন্যান্য উপাদান নিয়েকরা গবেষণার মাধ্যমে ফোর্ড দেখিয়েছেন, পেশায় ব্যবসায়ী হলেও লিউয়েনহুক সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর এবং উন্নত মানের বিজ্ঞানী। তার লেখা এই সাধারণ চিঠিগুলো তাই এখন বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হয়েও লিউয়েন হুকের জানার অসীম কৌতূহল এবং আজীবন ধরে এর পেছনে লেগে থাকা খুলে দিয়েছিল এক নতুন জগত, যার হাত ধরে পৃথিবীবাসী আজ অণুজীবকে আরো ভালোভাবে জানার মাধ্যমে নানান নতুন গবেষণার দ্বার উন্মোচন করে চলেছে।
এজন্যই বিশ্ববাসীর কাছে লিউয়েন হুক আজ ব্যবসায়ী নয় বরং ‘অণুজীববিজ্ঞানেরজনক’হিসেবে সুপরিচিত।

তথ্যসূত্র

1. https://en.wikipedia.org/wiki/Antonie van Leeuwenhoek
 2. History of Microbiology:Milton Wainwright and Joshua Lederberg
 3. Microbe Hunters: Paul De Kruif