যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারণা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। তবে ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতো যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারণা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতো না। তখন তারা ভেবে নিতো হয়তো অ্যান্টিবডি সম্পর্কেই এখনো তারা অনেক কিছু জানেন না, তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রম ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, আর উপেক্ষা করা গেল না। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ দানকৃত অঙ্গটি গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীরে লাগানো হয়, তখন সে অঙ্গের কোষকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় গ্রহীতার দেহে।

দেহে কোনো এন্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ঐ অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ গ্রহণ করে, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই, তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন যেন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইঁদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটি প্রত্যাখ্যান (Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবলো ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোনো আত্নীয়ের দেহে প্রবেশ করানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখে না। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটি একটি বড় সমস্যা ছিল বহু বছর। এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কিনা।

কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোনো পদ্ধতি খুঁজতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ কেউই জানতো না যে আসলে কী খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী! ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মুরগীর পরিপাকতন্ত্রের নীচের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। থলেটির নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস।

এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বোঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো। এ জিনিসটির প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস। আর পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

ব্রুস গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন (Bursectomy) এবং অপেক্ষা করলেন কী হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোনো পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন। যেহেতু মুরগিগুলোতে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নেই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গ-এর কিছু মুরগি দরকার পড়লো সে সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের অঙ্গ কর্তিত মুরগিগুলোই নিলেন।

কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করলো না। এ পর্যায়ে যে কেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কিন্তু এ দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরো কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথমবারের মতো বোঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতো না। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটি ইমিউনলজির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটির জন্য তৈরি ছিল না তখন।

স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স-এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এর খোজ পেলেন, সেটি হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

তাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখল যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ব্যতীত দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো।

অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মতো থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিল ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সির কেসগুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলেন। এক ধরনের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তবে তারা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে।

তাদের অবস্থা বার্সার ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয়, এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এসবকিছু অবশেষে বুঝালো যে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ (B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ।

মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো। এমন নামের ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।

একঘেয়েমী কেন দরকারী

একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাই না। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে,কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ,দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই,এদের পেতে বা এদের থেকে রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট, একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কী আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো,তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কী? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কী? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের চিন্তা-ভাবনা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেই সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারণা দেয়ার।

ভেবে দেখবেন তো,একঘেয়ে লাগার জন্য কারণ থাকে,নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোনো একটা কারণ দরকার? আমরা সাধারণত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে,কারো লাগে মিটিংয়ে,ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আশেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস,মুরগী,গরু, ছাগল,কুকুর-বিড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর এক প্রজাতির সংস্করণ আছে। প্রাণিজগতে এ ব্যাপারটির বিস্তার দেখে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোনো অবদান আছে কী?”

শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যাঁ, বলতে পারেন ঠিক সেই ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি। বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি-মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়,সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুঁজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিণ করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমণের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে,যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।”

এ দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষণই কাজে আসবে যতক্ষণ অন্বেষণের আগ্রহ থাকবে। ওমেলস্ফেল্ডার আরো বলেন, “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উদ্ভট আচরণ করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারে না, ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী,নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়।”

যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল, তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষণার উদাহরণ দেয়া যায়। একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিরস কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাঁড়ায়,প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায় না,যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যর্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষণা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়,এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা,বিষন্নতার মতো অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারণা করেন, একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরণের একঘেয়েমীর শ্রেণীবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে- একজন মানুষ কোনো না কোনো সময় যেকোনো একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোনো একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোনো কাজে জড়িত না থাকলেও,খুব একটা বিরক্তও থাকে না। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তার মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এ ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে”- এমনই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন, আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই, তবে ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়,এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

গত বছর এক পরীক্ষায় দু’দল স্বেচ্ছাসেবককে গবেষকেরা বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিল,অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিল। আর ফলাফলে পরের দলের বের করা আইডিয়াগুলো বেশি মজার ছিল। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিল যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিল। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিল না। স্যান্ডি এ পরীক্ষার উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে,কেননা সেই সময় মন নিজের মতো চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড,স্যান্ডির তত্ত্বের সাথে একমত নন। তার ভাষ্যমতে, আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা,তবে এ অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ব্যথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন হতাম না। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে,একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে,কোনো একটি পরিবেশে আমরা কী অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে, আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংখাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো- এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায়, একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে- একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গা মতো রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরণার অভাব নয়,বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় স্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ার কারণে তখন মনে হতে থাকে যেন তা খুব ধীরে চলছে। আবার জোর করে উত্তরণের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে।

মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে,সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন,চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনোযোগ প্রদানে ব্যর্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করে না,সবই অর্থহীন মনে হয়।

জন ইস্টউড এখন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন এ মনোযোগ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারণাটি এখনো প্রাথমিক,তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবণতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রান্ত হন।

মনোযোগ দিতে অপারগতার কারণ বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন,যেটার কাজ ছিল দিনের যেকোনো সময়ে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না,তারাই বেশি অসুখী।

কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া,ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক,জুয়া এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবীদের বলা হয়েছিল তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারে না,একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কী করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের কাছ থেকে আমরা একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে,তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি,ফাস্টফুড কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তরণের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে,তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে,রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার,তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

 

লেখকঃ রুহশান আহমেদ

পড়াশুনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন ‘সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার’ সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন।

অ্যান্টিবডির ইতিহাস ও গাঠনিক বৈচিত্র্য

প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং সেনাপতি ছিলেন থুসিডাইডেস। স্পার্টান এবং এথেনিয়ানদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন History of the Peloponnesian War নামে একটি বই। এই বইয়ের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কী সেটা জানার অনেক অনেক আগেই মানুষ জানতো মানবদেহে এই জিনিসটা রয়েছে।

খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে থুসিডাইডেসের পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ নিয়ে লেখা বইতেও আমরা সেই উদাহরণ খুঁজে পাই। উনি লক্ষ্য করেছিলেন, যেসব সৈন্যেরা কোনো রোগে অসুস্থ হবার পর আবার সুস্থ হয়, তারাই নতুন আক্রান্ত সৈন্যদের সেবা দেয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ তারা সাধারণত ঐ রোগে পুনরায় আক্রান্ত হয় না। হলেও সেটা আর মারাত্নক আকার ধারণ করে না। থুসিডাইডেস নিজের অজান্তেই বর্ণনা করছিলেন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম চমকপ্রদ একটা বৈশিষ্ট্য, যাকে বলে ইমিউনোলজিক্যাল মেমরি।

এরকম নিজের অজান্তেই বিশাল কিছু করে ফেলা আরেক অমর ব্যক্তিত্ব ব্রিটিশ সার্জন এডওয়ার্ড জেনার। ১৭০০ সালের দিকে স্মলপক্স ছিল মানুষের জন্য এক বিভিষীকা। এই স্মলপক্সেরই আরেক মৃদুরূপ দেখা যেত গরুতে। এর নাম কাউপক্স। এডওয়ার্ড সাহেব মানুষকে কাউপক্সে আক্রান্ত করার চেষ্টা করে দেখতে পান তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মারাত্নক স্মলপক্স থেকে সুরক্ষিত থাকছে।

উনি যেধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন এ যুগে সেটা হতো ঘৃণ্য অপরাধ। তবে তখন সময় ছিল অন্যরকম আর তার টার্গেট ছিল প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর মানুষ তাই আইনের চোখ হয়তোবা রয়েল সোসাইটির সদস্য এডওয়ার্ড জেনারের প্রতি সহনশীল ছিল। সেই এক্সপেরিমেন্টগুলোতে গরু থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার হতো। আর গরুর ল্যাটিন নাম হচ্ছে Vacca, সেখান থেকেই এসেছে Vaccination যাকে আমরা বাংলায় টিকা বলে থাকি।

চিত্র: এডওয়ার্ড জেনার

জেনার কিংবা অন্য কারো বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে, জিনিসটা কেন কাজ করছে। তবে দার্শনিক না হয়ে বাস্তববাদী মানুষ হওয়ায় তিনি সেটা খুব একটা গায়ে মাখেননি। যে রোগে প্রতি বছর শুধু ইউরোপেই অর্ধলক্ষাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে এবং তার প্রায় ৪ গুণ মানুষ বাকি জীবন বিকৃত চেহারা নিয়ে কাটাচ্ছে সেরকম একটা যুগেটিকার কার্যকরণ খুঁজে সময় নষ্ট করাটা ছিল বিলাসিতা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, রোগটা কেন হচ্ছে সেটাই তখন কেউ বুঝতো না। বেশিরভাগই মানুষই ভাবতো রোগব্যাধী স্রেফ দূর্ভাগ্য। পাদ্রীরা বলতো সৃষ্টিকর্তার দ্বারা মানুষকে শাস্তি দেয়ার পন্থা হচ্ছে রোগ। এডওয়ার্ড জেনারেরটিকা আবিষ্কারের প্রায় এক শতক পরে বিজ্ঞানীরা অণুজীবের অস্তিত্ব এবং ছোঁয়াচে রোগের সাথে এর সম্পর্কের কথা প্রমাণ করেন। তবে যাদেরকে চোখেই দেখা যায় না তারা নাকি জ্যান্ত আবার তারাই নাকি এমন সর্বনাশ ঘটাতে পারে সেটা সাধারণ মানুষকে বুঝাতে অবশ্যই আরো অনেক সময় লেগেছিল।

তবে আপাত অদৃশ্য জিনিসগুলো যে আসলেই রোগ সৃষ্টি করতে পারে সেটার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যায় ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে। না, এবার কোন মানুষ নয় বরং রেশম পোকা হচ্ছে ভুক্তভোগী। সে সময় ফ্রান্সে দেখা গেল মুলবেরী পাতা খেয়ে কিছু পোকা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর তার পরপরই পুরো পোকার পাল বিনাশ হয়ে গেলো।

অনেকেই ধারণা করলেন হয়তো মুলবেরি পাতায় থাকা বিষাক্ত কোনোকিছুর কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু লুই পাস্তুর এগিয়ে আসেন ভিন্ন ধারণা নিয়ে। তিনি দেখান যে মারা যাওয়া পোকাগুলোর ভেতরে এক ধরনের অণুজীব কিলবিল করছে যাদের মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যাচ্ছে। সে অণুজীবগুলো পৃথক করে সুস্থ পোকার দেহে ঢুকালে সেটিও আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এটাই ছিল রোগের জীবাণুতত্ত্বের (Germ Theory of Disease) জন্ম। কিছুদিনের মধ্যেই পাস্তুর আবার দেখান যে একই ঘটনা ভেড়ার এনথ্রাক্স-এর ক্ষেত্রেও সত্য।

রোগের জীবাণুতত্ত্বের অন্বেষণে ছিলেন ফ্রান্সে লুই পাস্তুর এবং জার্মানিতে রবার্ট কচ। রোগের কারণ হিসেবে অন্য কোনো ধারণার পেছনে সারাজীবন ব্যয় করা অনেক রথী মহারথীরা এই তত্ত্বকে প্রচণ্ডভাবে নাকচ করে দেয়। তবে ১৮৯১ সালে কচ যক্ষ্মার পেছনে অণুজীবের তৎপরতার শক্তিশালী প্রমাণ নিয়ে আসেন। কীভাবে এদের খুঁজে পেতে হয় তা বুঝতে পারার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুদিনের মধ্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন মারাত্মক রোগের সাথে জড়িত অণুজীবদের কাহিনী একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে।

এটা মেনে নেয়া কষ্টকর আর মেনে নিলে তো চিন্তা আরো বেড়ে যায়। যাদের দেখাই যায় না তাদের থেকে আমরা কীভাবে নিরাপদে থাকবো? সবাই কি তবে মাইক্রোস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো আর কোনো কিছু ধরা বা ছোঁয়ার আগে দেখে নিতে হবে অণুজীব মুক্ত কি না? জীবন তো তাহলে তেজপাতা হয়ে যাবে।

চিত্র: রবার্ট কচ

এবারও ত্রানকর্তা হিসেবে আসেন রবার্ট কচ। ১৮৯০ সালের দিকে জানা গিয়েছিল ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণের মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। কচের ল্যাবরেটরির ছাত্ররা করলো কি, ব্যাকটেরিয়া থেকে ধনুষ্টংকারের জন্য দায়ী এই বিষাক্ত পদার্থ সংগ্রহ করে অল্প মাত্রায় খরগোশের দেহে ঢুকিয়ে দিলো। মাত্রাটা এমন ছিল যে খরগোশটি অসুস্থ হবে কিন্তু মারা যাবে না। এরপরে তারা ঐ খরগোশের রক্ত থেকে রক্তরস (Serum) আলাদা করার পর পরীক্ষা করে পেল যে এর মধ্যে এমন কিছু আছে যা ওই ব্যাকটেরিয়াকে মারতে এবং তার বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

আরেকটি অজান্তেই আবিষ্কারের খবর, এবারের আবিষ্কার অ্যান্টিবডি! অল্পদিনেই রবার্ট কচ এবং তার দল বুঝতে পারেন এই পদ্ধতিতে শুধু প্রতিরোধই নয়, প্রতিকারও সম্ভব। ১৮৯১ সালের ক্রিসমাসে বার্লিনের বার্গম্যান ক্লিনিকে ডিপথেরিয়া আক্রান্ত এক মেয়ের দেহে প্রথম অ্যান্টিসিরাম (যে সিরামে অ্যান্টিবডি রয়েছে) দেয়া হয়।

ডিপথেরিয়া তখন একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ ছিল যা প্রায়ই বিভিন্ন শহরের হাঁসিখুশি শিশুদের খেলার মাঠকে গোরস্থান বানিয়ে দিতো। সেই মেয়েটি বেঁচে গিয়েছিল। এই চমৎকারীত্বের অন্যতম কারিগর এমিল ভন বেহরিং পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রথম নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করেন। অ্যান্টিসিরাম দেয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ্য করে তোলা এখনো কার্যকর। বায়োটেররিজম, সাপের দংশনে কিংবা এধরনের জরুরী অবস্থায় অ্যান্টিসিরাম বহুল ব্যবহৃত।

এই সবকিছুই ছিল শুরুর কথা। জ্ঞানের নতুন একটি ক্ষেত্রের আবির্ভাব হলো, যার নাম রোগপ্রতিরোধবিদ্যা (Immunology)। এমিল ভন বেহরিং দিয়ে শুরু করে এই ফিল্ডের গবেষকরা এখন পর্যন্ত আরো ২২টি নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

ইমিউনোলজি নামের বিজ্ঞানের এই নব্য শাখাটির নবীন বিজ্ঞানীদের ডাকা হয় ইমিউনোলজিস্ট বলে। প্রথম প্রজন্মের ইমিউনোলজিস্টদের মাথাব্যথাই ছিল এন্টিবডি কী সেটা আয়ত্ব করা। এই যে রক্তের মধ্যে থাকা সুরক্ষাদানকারী বস্তু যেটা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় কিংবা কৃত্রিমভাবে প্রয়োগ করা যায় সেটা যে আসলে কী তা বুঝতে মেলাদিন সময় লেগেছিল। ৩০ বছর কাঠখড় পোড়ানোর পর জানা গেল এটা আর কিছুই না, গামা গ্লোবিউলিন শ্রেণীরই অন্তর্গত একগুচ্ছ প্রোটিন।

তবে এন্টিবডি সম্পর্কে কাজের কিছু বুঝার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। সে বছর রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরার্ড এডেলম্যান এবং লন্ডনের রডনি পোর্টার অ্যান্টিবডির গঠন বর্ণনা করেন। জেনে রাখুন এরা সেই ২২টি নোবেল পুরষ্কারের একটির যৌথ মালিক। অ্যান্টিবডি দেখতে ঠিক এরকম

চিত্রঃ অ্যান্টিবডির গঠন

এন্টিবডি Y আকৃতির। দ্বিপ্রতিসম এই জিনিসটির প্রতি অংশে রয়েছে একটি করে ভারী চেইন আর একটি হালকা চেইন। যে অংশ দুটিতে হালকা এবং ভারী চেইন পাশাপাশি রয়েছে সেই অংশটিই অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করে। কোন জিনিসটা কার জন্যে অ্যান্টিজেন হবে সেটা প্রত্যেক প্রাণীতে আলাদা।

আমার রক্ত আমার জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু সেটা আপনার কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য অ্যান্টিজেনস্বরূপ। যেকোনো জৈব বস্তু যা আপনার দেহে সচরাচর দেখা যায় না কিংবা বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করে তা-ই আপনার সাপেক্ষে অ্যান্টিজেন।

বিজ্ঞানীদের অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অংশটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি উৎস যা থেকে প্রচুর অ্যান্টিবডি পাওয়া যাবে এবং ল্যাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ হবে। তারা এজন্য বি-সেল লিম্ফোমা (B Cell Lymphoma) নামের এক ধরনের টিউমারকে বেছে নিলেন।

এই টিউমারে যত বি-সেল রয়েছে তারা সবাই একই রকম অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কারণ টিউমারের সব বি-সেল একই রকম। এরা প্রত্যেকেই একটি কোষের ক্লোন যেটার স্বাভাবিক কোষীয় চক্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং এরপর থেকে উপর্যুপরি কোষ বিভাজিত হতে থাকছে।

দিনে দিনে নতুন নতুন এরকম টিউমার এবং তাদের থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিকে বিজ্ঞানীরা চিনতে পারলেন। একটি একটি নতুন টিউমারের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয় আর তাদের কপালে চিন্তার রেখা মোটা হয়। কারণ কোনো একটা অ্যান্টিবডিই অন্যটির মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা।

কখনো কখনো এদের কয়েকটিকে দেখে মনে হয় এরা হয়তো কোনোভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু তবুও আলাদা। দুটি অ্যান্টিবডি, যারা একই অ্যান্টিজেনের প্রতি সাড়া দেয়, এমনকি একই প্রাণীর দেহেই তৈরি হয়, তবুও কখনোই তারা সম্পূর্ণ একরকম না।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল টিউমার হয়তো সুস্থ্ স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে দ্রুতই সেই ধারণা উবে গিয়েছিল। তারা যে হাজার হাজার আলাদা বি-সেল লিম্ফোমা দেখছেন তা প্রকৃতপক্ষেই দেহের মধ্যে হাজার হাজার ভিন্ন বি-সেল থাকার প্রতিফলন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিটি আলাদা বি-সেল আলাদা অ্যান্টিবডিই তৈরি করে।

জিরো টু ইনফিনিটির জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত আমার লেখাটিতে বলেছিলাম অণুজীবদের প্রজনন অসম্ভব রকমের দ্রুত গতি সম্পন্ন। সংখ্যাবৃদ্ধি ও মিউটেশন আমাদের লড়াইয়ে তাদেরকে সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। অ্যান্টিবডির মাধ্যমেই জীণুদের শনাক্তকরণ এবং নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অনুমান করা হয় মানুষ কিংবা ইঁদুর একশ মিলিয়ন কিংবা তারও বেশি সংখ্যক আলাদা আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে, যা আলাদা আলাদা অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করতে পারে। এই অ্যান্টিজেনদের মধ্যে এসব জীবাণু তো রয়েছেই।

প্রশ্ন আসতে পারে এত ভিন্ন ভিন্ন অ্যান্টিবডি তৈরি করা কীভাবে সম্ভব? এর উত্তর দিতে দুই ধরনের তত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছিল। একটা হলো জার্মলাইন থিওরি। এর মতে প্রচুর সংখ্যক অ্যান্টিবডির আগে থেকে বিদ্যমান জিন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিচালিত হয়।

অন্যটি সোমাটিক মিউটেশন থিওরি। কয়েক বছরের টানাহেঁচড়ার পর শেষ পর্যন্ত সোমাটিক মিউটেশন থিওরিই বিতর্কে টিকে যায় এবং আরেকটি নোবেল প্রাইজ ইমিউনোলজিস্টদের দখলে যায়। এবারের বিজয়ী জাপানের তরুণ বিজ্ঞানী সুসুমু তোনেগাওয়া।

দুটি অ্যান্টিবডির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে মূলত তার পরিবর্তনশীল অংশটি। হালকা এবং ভারী চেইনের এই পরিবর্তনশীল অংশটি মিলে তৈরি হয় অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চল। এর বৈচিত্র্যের কারণেই অ্যান্টিবডিগুলো বিচিত্র সব অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে পারে।

বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমরা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার জিন পেয়ে থাকি, এসব জিনকে একসাথে বলে জিনোম। দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই এই জিনোম রয়েছে। জিনোমের মধ্যে কিছু জিন চামড়া তৈরি করে, কিছু পেশী তৈরি করে, কিছু হাড় তৈরি করে এভাবে এদের কাজ ভাগ করে দেয়া। তেমনই কিছু জিন অ্যান্টিজেন গ্রাহক তৈরি করে।

যদিও সহজ করে বুঝার জন্য আমরা বলে থাকি এই জিনটা দেহের ওই অংশটা তৈরি করে। কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজ না। যদি অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের কথাই চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে, শুধু এতটুকুর জন্যই অনেকগুলো জিন কাজ করে। সেই জিনগুলো আবার জিনোমের একেক জায়গায় থাকে। পাজলের মতো।

আগেই বলেছি জিনোম দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই থাকে। কিন্তু সব জিন সব কোষে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। শুধুমাত্র লিম্ফোসাইটের মধ্যেই এই জিনগুলো বিভিন্ন বিন্যাসে সাজিয়ে অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়। এটাই সোমাটিক মিউটেশন থিওরি।

এবার অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্যের একটু ক্রিটিকাল বর্ণনা দিতে চাই। তাই পাঠকের বিশেষ মনোযোগ আশা করছি। অ্যান্টিবডির চিত্রটি খেয়াল করুন, দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। V (Variable) পরিবর্তনশীল অঞ্চল এবং C (Constant) অপরিবর্তনশীল অঞ্চল।

C অঞ্চলটি একই শ্রেণীভুক্ত বিভিন্ন অ্যান্টিবডির মধ্যে স্থির থাকে আর এর কাজ মূলত অ্যান্টিবডির গাঠনিক সংযুক্তি বজায় রাখা। কিন্তু V অঞ্চল C এর তুলনায় বেশ ছোট হলেও তিন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন সেটের থেকে আসা জিনখণ্ড (Gene fragment) নিয়ে একটি কার্যকর পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরি হয়। তিনটি সেটকে আবার বলা হয় V, D এবং J।

এখন যদি একটি ভারী চেইন তৈরি করতে হয় তাহলে প্রথমে J সেটের অনেকগুলো জিনখণ্ড থেকে একটা পছন্দ করা হয়, তারপর তার সাথে D সেট থেকে একটা জুড়ে দেয়া হয়। এই জোড়ার সাথে তারপর যুক্ত হয় V সেট থেকে আসা আরেকটি জিনখণ্ড। এখন পর্যন্ত তাহলে পরিবর্তনশীল অঞ্চলটি প্রস্তুত হলো। এবার এর সাথে C অর্থাৎ অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ডটি লাগিয়ে দিলেই একটা ভারী চেইনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনটা তৈরি হলো।

এবার জেনে রাখুন V, D ও J সেটের ভেতর যথাক্রমে ৫০, ৬ এবং ২৭টি জিনের টুকরা শনাক্ত করা গেছে। তাই এদের থেকে দৈবভাবে একটা করে নিয়ে ৫০ × ৬ × ২৭ = ৮১০০টি ভিন্ন পরিবর্তনশীল অঞ্চল সম্ভব যার সাথে অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ড যুক্ত হয়ে তৈরি হবে ভারী চেইন।

প্রায় একই উপায়ে প্রায় ৪৩৩ রকমের হালকা চেইন তৈরি সম্ভব। কিন্তু অ্যান্টিজেন গ্রাহকে তো পাশাপাশি একটা হালকা ও ভারী চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল থাকে। আর ভারী আর হালকা চেইনও যেহেতু দৈবভাবেই মিলিয়ে দেয়া হয় তাই এখানেও ৪৩৩ × ৮১০০ = ৩৫০৭৩০০ আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব শুধুমাত্র দৈবচয়নের ভিত্তিতে।

এখানেই শেষ হয় প্রতিটা চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরির সময় যখন আলাদা আলাদা সেট থেকে আসা জিনখণ্ড যুক্ত করা হয় তখন প্রায় সময়েই বাড়তি কিছু সিকোয়েন্স চলে আসে কিংবা কিছু সিকোয়েন্স হারিয়ে যায়। তাহলে শেষ পর্যন্ত বলা যায় যে আসলে অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্য সংখ্যায় অনুমান করা কষ্টকর।

এই মহাবিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবাণুদের সাথে পাল্লা দিতে এর চেয়ে চমৎকার সমাধান আর কী হতে পারে? হ্যাঁ, স্বাভাবিক প্রজননে জিনের গুচ্ছে অদলবদল হয়। কিন্তু তা যথেষ্ট ধীর। সেভাবে হয়তো প্রতি প্রজন্মে হাজার খানেক নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হতো। কিন্তু সোমাটিক মিউটেশনের মাধ্যকে প্রত্যেক ঘণ্টাতেই শত শত মিলিয়ন নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে আমাদের সুরক্ষায়।

অ্যান্টিবডির ইতিহাস, গঠন ও গাঠনিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার পর এবার ছোট্ট করে বলতে চাই সত্যিকারের জীবন্ত প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবডি কীভাবে কাজ করে। অ্যান্টিবডি তৈরি করে বি সেল। এই বি সেল তৈরি হয় অস্থিমজ্জায়। এরা পরিণত হবার পর লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় অবস্থান নেয়। পরিণত হবার সময়ে প্রতিটা বি সেলের মধ্যেই ভারী চেইন এবং হালকা চেইনের জিনখণ্ডগুলোর মধ্যে উপরের বর্ণনার মতো সমন্বয় ঘটে আর সেই অনুযায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।

বি সেল একটি অ্যান্টিবডি তার কোষদেহের বাইরের দিকে সবসময় রেখে দেয়। এটা বলা যায় তার পরিচিতির মতো যে সে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। আবার এটার মাধ্যমেই সে কিন্তু সব অ্যান্টিজেনকে যাচাই করে থাকে। তাই এটাকে বলা হয় বি সেলের অ্যান্টিজেন গ্রাহক (Antigen receptor)।

যে সকল বি সেল কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা পায়নি তারা লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় বসবাস শুরু করে এবং অ্যান্টিজেনের জন্য অপেক্ষায় থাকে। প্রতিটা বি সেল জন্মের সময়ই তার ভেতরে কিছু আত্নবিধ্বংসী যন্ত্রপাতি নিয়ে জন্মায় এবং যদি প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সে কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা না পায় তখন এই যন্ত্রপাতিগুলো চালু হয়ে বি সেলটি মারা যায় এবং নতুন নতুন বি সেল তার জায়গা দখল করে।

কিন্তু যখন কোনো বি সেল অ্যান্টিজেনের দেখা পায় মানে আসলে কোনো অ্যান্টিজেন যখন সেলটির গ্রাহকের সাথে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় তখনই সে সক্রিয় হয় এবং ভুর ভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু করে। সেই অ্যান্টিবডিগুলো রক্ত ও লসিকায় ঘুরে ঘুরে সেই অ্যান্টিজেনের অন্য কপিগুলো খুঁজে।

আরেকটি ঘটনা ঘটে, তা হলো বি সেল সক্রিয় হবার পর নিজের অনেক ক্লোন তৈরি করে। ক্লোনগুলো আবার এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যেন তারা অনেকদিন টিকে থাকে এবং স্বাভাবিক বি সেলের চেয়ে অনেক দ্রুত সাড়া দিয়ে ভুরভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। এভাবেই আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো সংক্রমণকে চিনে রাখে যাকে বলা হয় ইমিউনোলজিক্যাল মেমরী।

এটাই সেই শত বছর আগে থুসিডাইডেস বর্ণনা করেছিলেন। আর যে পদ্ধতিতে সক্রিয় বি সেল নিজের কপি তৈরি করে তাকে বলে ক্লোনাল এক্সপানশন এবং এই তত্ত্বের জন্য ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকফার্লেন বার্নেট… বাকিটা ধরতেই পারছেন আশা করি।

চিত্রঃ বি সেলের ক্লোনাল এক্সপ্যানশন

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Roitt’s Essential Immunology; P. Delves

featured image: bioradiations.com

দেহের আভ্যন্তরীণ নীরব প্রতিরোধ ব্যবস্থা

আপনি কোথায় বাস করছেন তার উপর নির্ভর করে আপনার বাসস্থানের নিরাপত্তা কেমন হবে। বিভিন্নভাবে আপনার বাসস্থানকে নিরাপদ করতে পারেন। গ্রামগঞ্জের বাড়িগুলোর চারপাশ এখনো খোলামেলাই থাকে, অনেকে বেড়া তুলে দেয় কিংবা খুব বেশি হলে দেয়াল।

শহুরে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি। আপনার সামর্থ্য থাকলে ইলেকট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর এমনকি একজন এক্স-কমান্ডোকেও নিরাপত্তার জন্য ভাড়া পেতে পারেন। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর, ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।

আপনার দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা নানা ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আপনাকে সুরক্ষা দেয়। আপনার হাড় ও চামড়া দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে পিছলে পড়ে যাবার অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত কিংবা আচমকা উড়ে আসা ঢিল থেকে বাঁচায়। চোখের পাতা চোখকে ধূলাবালি এবং দুষ্ট ছেলেদের আঙ্গুল থেকে রক্ষা করে।

এছাড়াও দেহে আরো অনেক ব্যবস্থা আছে যা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে ও গোপনে। যা আপনি দেখেন না, অনুভবও করেন না। কিন্তু এটি আছে বলেই আপনি সুস্থ আছেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হন। এটা হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা Immune System। এই ব্যাবস্থাটিকেই বলা হয় ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’।

শুধুমাত্র একটি কারণেই আপনার দেহে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এর অনুপস্থিতিতে আপনার দেহ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং বিভিন্ন পরজীবীর জন্য মনোরম জায়গায় পরিণত হতো। আপনার দেহ উষ্ণ, সিক্ত, পুষ্টিযুক্ত এবং জীবাণুর অন্যান্য বাসস্থানের তুলনার হাজারগুন আরামদায়ক। তবে যেসকল পরজীবী আপনার দেহে আশ্রয় নিয়েছে, তারা আপনারই খেয়ে পড়ে নিজেদের বংশ বিস্তার করে চলেছে তুমুল গতিতে।

তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার আশা করবেন? তা নিতান্তই মিছে। সত্যি বলতে এদের বেশিরভাগেরই কিছুই আসে যায় না আপনার কী হলো না হলো। অনেক জীবাণু আপনাকে অসুস্থ্ করে ফেলতে পারে। এমনকি মারাও যেতে পারেন। এরকম হলে তা অবশ্যই হবে আপনাকে নিয়ে প্রকৃতির পরিকল্পনার পরিপন্থী।

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই জীবাণুরা ছিল। সৃষ্টির শুরুর দিকে আসলে সব জীবসত্ত্বাই ছিল এককোষী। এখনো আপনার আমার মতো বহুকোষী প্রাণের মচ্ছবের মধ্যেও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকেরা এককোষী। অনেক অনেক আগে যখন এককোষী জীবসত্ত্বাগুলো বহুকোষীতে বিবর্তিত হয়ে প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের অস্তিত্বের রূপ নিলো তখন কিছু চতুর এককোষী তরুণ, পৃথিবীর প্রতিকূল আবাসে কষ্ট করে থাকা বাদ দিয়ে এসব বহুকোষীর দেহে ঢুকে পড়লো। তারা হয়ে গেল পরজীবী।

বহুকোষীদেরকে এই অবস্থায় চারপাশে ক্ষুদ্র ঘাতকে পরিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই বিবর্তিত হতে হয়েছে। সফলভাবে বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের লক্ষ্যে তাদের তৈরি করতে হয়েছে এমন ব্যবস্থা যা তাদের সুরক্ষা দেবে। মানুষ, গরু, ছাগল, গাছপালা সহ এই পৃথিবীর সব বহুকোষীকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং এদের সকলেরই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে।

জীবাণুদের মারার জন্য বহুকোষীরা যখন বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশল বের করছিল, জীবাণুরাও তখন চুপচাপ বসে থাকেনি। তারাও প্রত্যেকটি কৌশলকে ফাঁকি দেবার প্রতিকৌশল বের করেছিল। শুরু থেকেই এই মহাযুদ্ধ চলে এসেছে। এখনো চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

জীবাণুদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই মহাযুদ্ধে টিকে থাকতে তারা কিছু অসম সুবিধা ভোগ করে। একটি হচ্ছে বংশবৃদ্ধির গতি। বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো প্রাণের আকার। বিবর্তনের সময় প্রাণীদের আকার সাধারণত বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, কেউ যত বড় হবে অন্যের শিকার থেকে শিকারী হয়ে উঠার সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।

তবে এটাও সত্য, কোনো প্রাণী যত বড় সেই প্রাণীকে বিকশিত হতে তত বেশি সময় লাগবে। একটা ব্যাকটেরিয়া যদি উষ্ণ পরিবেশ এবং পানি-পুষ্টি পায় তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে সে প্রজননে সক্ষম হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের জন্য সেটা সম্ভব হতে কয়েক বছর লেগে যাবে!

টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশের প্রভাবে যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনগুলো ঘটে সেগুলো উৎপত্তি লাভ করে জীবের ডিএনএ’তে পরিব্যক্তি বা Mutation-এর ফলে। আর পরিব্যক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রজনন।

প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ অনুলিপি তৈরি হয়। এই অনুলিপির প্রক্রিয়াটি বেশ দক্ষ। তবে ততটা দক্ষ নয় যে একেবারেই নির্ভুল অনুলিপি তৈরি হবে। বেশির ভাগ ভুলই ঠিক করে ফেলা হয়। কিছু কিছু ভুল ঠিক করে ফেলার কৌশলেও ভুল হয়। তাই মাঝে মাঝে কিছু ভুলও স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে প্রতি প্রজন্মেই কিছু ভিন্নতা ডিএনএ’র মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই ভুল বা মিউটেশনগুলোই বিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাঁচামাল।

কিন্তু এসবের সাথে এককোষী ও বহুকোষীর টিকে থাকার লড়াইয়ের সম্পর্ক কী? জীবাণুর ডিএনএ-তে কি প্রজন্মান্তরে ভুল হয় না? তা হয় কিন্তু জীবাণুরা তাদের বিবর্তনের জন্য দরকারী জিনগত পরিবর্তন আমাদের তুলনায় ট্রিলিয়ন ভাগ দ্রুত তৈরি করতে পারে।

মানুষের একটা নিষিক্ত ডিম্বাণু আর একটা ব্যাকটেরিয়াকে যদি উপযুক্ত পরিবেশে সংখ্যাবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামতে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে ২ দিন পরও ডিম্বাণুর কোনো খোঁজ নেই কিন্তু ব্যাকটেরিয়াটি এতোই সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে যে তার অস্তিত্ব বুঝতে আর মাইক্রোস্কোপ লাগছে না, খালি চোখেই তার আলামতের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে।

জীবাণুদের এই অসম্ভব রকমের বংশবৃদ্ধি এবং পরিব্যক্তির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বহুকোষীদের নিরাপত্তার জন্যই অনাক্রম্য ব্যবস্থার মতো চমৎকার প্রক্রিয়াটির জন্ম হয়েছে। এটা শুধু বর্তমানে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো জীবাণুদেরই চিনে ধ্বংস করতে পারে তা নয় বরং অদূর ভবিষ্যতে যেসবের উদ্ভব হতে পারে তাদের বিরুদ্ধেও কাজ করতে সদা প্রস্তুত।

আপনার দেহে জীবাণুরা প্রবেশ করলে একে বলা হয় সংক্রমণ (Infection)। সাধারণত সংক্রমণের ফলে সামান্য জ্বর আসে, পেটে গোলমাল হয়। বিশ্রাম নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সেরে যায়। এটার জন্য আপনার অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন। কিন্তু এতেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।

নিশ্চয়ই জানা আছে যে সবারই একবার করে জলবসন্ত হয় কিংবা প্রতি বছর এক-দুই বার করে স্বর্দি লাগে। কেন এসব বারবার হয় না? এই ব্যাপারটাই অনাক্রম্য ব্যবস্থার আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য। আপনি কোনো জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ঐ জীবাণুর দেখা পেলেই কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন অনাক্রম্যতার স্মৃতি (Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর আক্রমণের সময় আর সাহায্য করতে পারবে না। শরীরে প্রতিদিনই হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে। স্মৃতিতে জমা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ টীকা মূলত রোগের জীবাণুরই বিশেষায়িত রূপ।

একটি দালানের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে ইট। তেমনই আমাদের দেহের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে কোষ (Cell)। অনাক্রম্য ব্যবস্থাও আসলে বিশেষ ধরনের কিছু কোষের প্রক্রিয়া।নিশ্চয়ই ছোটবেলায় টিকা বা ভ্যাকসিন নিয়েছেন। টিকা আসলে অন্য কিছু নয়। যে রোগের টিকা সেই রোগেরই জীবাণু হচ্ছে ভ্যাকসিন! তবে সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সে দুর্বল। ভ্যাকসিনকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে চিনে নেবার সুযোগও পায় এবং এর ফলে কোনো রোগের সৃষ্টিও না হয়।

আপনার রক্তের রং লাল, কারণ এতে প্রচুর লোহিত কণিকা (Erythrocytes) থাকে। লোহিত কণিকা ছাড়াও থাকে শ্বেতকণিকা (Leucocytes)। শ্বেতকণিকাগুলো হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থার অংশ। যেহেতু রক্ত সমস্ত শরীরেই সঞ্চলিত হয় তাই সমস্ত শরীরেই শ্বেতকণিকা আছে। তাই সমস্ত শরীরেই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বিরাজমান।

তবে শরীরের কিছু কিছু অংশে অনাক্রম্য কোষের সংখ্যা একটু বেশিই থাকে। তা হচ্ছে লসিকা গ্রন্থি (Lymph node) এবং প্লীহা (spleen) এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন আপনি আক্রান্ত হন তখন এখান থেকেই অনাক্রম্য ব্যবস্থার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।

অনাক্রম্যতার বিভিন্ন কোষ

নিউট্রোফিলঃ যদি আপনি চলার পথে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পান এবং কোথাও কেটে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তখন সেই স্থান দিয়ে বিভিন্ন জীবাণু আপনার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় রক্তের নিউট্রোফিল সেই ক্ষত স্থানে ছুটে গিয়ে জীবাণুদের ঠেকায়। এরা শ্বেতকণিকার অংশ।

ম্যাক্রোফাজঃ এরা আরেক ধরনের শ্বেত কণিকা। গ্রীক ভাষায় ম্যাক্রোফাজ অর্থ বড় খাদক। এর কাজও সেরকম, সরাসরি জীবাণুদের খেয়ে ফেলে তাদের ধংস করে। ফুসফুস, যকৃত, পেটের নাড়িভুড়ি এমনকি আপনার চামড়াতেও এদের খুঁজে পেতে পারেন।

নিউট্রোফিল
ম্যাক্রোফাজ

ডেন্ড্রাইটিক কোষঃ গ্রীক ভাষায় ডেনড্রন শব্দের অর্থ হলো গাছ। গাছের মতো ছড়ানো শাখা প্রশাখা থাকে বলে এ ধরনের কোষের এরকম নাম। এরাও অনাক্রম্য ব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এর কাজ হচ্ছে সমস্ত দেহ থেকে সন্দেহজনক কোষগুলোকে ধরে লসিকা গ্রন্থিতে নিয়ে আসা এবং সেখানে অবস্থানরত অনাক্রম্য কোষগুলোকে বুঝতে সাহায্য করা। অনুপ্রবেশকারী জীবাণু কী ধরনের এবং কোন উপায়ে একে সহজে ধ্বংস করা যায় এসব।

চিত্র: ডেন্ড্রাইটিক কোষ।

লিম্ফোসাইটঃ যত ধরনের শ্বেত কণিকা আছে লিম্ফোসাইট তাদের মধ্য সবচেয়ে ছোট। আপনি যদি মাইক্রোস্কোপে এদের দেখার চেষ্টা করেন তাহলে সকল লিম্ফোসাইটকে একইরকম মনে হতে পারে। কিন্তু যদি গভীরভাবে খেয়াল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, এরা আসলে আলাদা।

এদের একটি হচ্ছে বি-লিম্ফোসাইট। বি-দের কাজ হচ্ছে বিশেষ একটি অস্ত্র ‘এন্টিবডি’ তৈরি করা। আরেকটি-লিম্ফোসাইট হলো টি-লিম্ফোসাইট। টি-লিম্ফোসাইট আবার দুই প্রকার, সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট এবং হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট। সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইটকে এন্টিবডি তৈরির কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট?

নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এর কাজ। দেহের আক্রান্ত কোষগুলোকে এরা মেরে ফেলে। টি-লিম্ফোসাইট এবং বি-লিম্ফোসাইট মিলে আধুনিক মেরুদণ্ডী এবং প্রাচীন অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এদের কারণে আমাদের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা এতটাই যথাযথ এবং সূক্ষ্ম যে একটা কেঁচো তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

চিত্রঃ বি এবং টি-লিম্ফোসাইট।

অনাক্রম্য কোষগুলো সমস্ত দেহে ছড়ানো থাকলেও কিছু কিছু অঙ্গে এদের ঘনত্ব বেশি থাকে। এদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও সকলে একসাথে দেহকে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে সবসময় সচেষ্ট।

যদিও অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত বেশিরভাগ ঘটনাই আণুবীক্ষণিক দুনিয়ায় ঘটে তবে দেহের কিছু বৃহৎ অঙ্গের অবদান অস্বীকার করলে এই লেখাটি অপূর্ণই থেকে যাবে। এদের মধ্যে প্রথমেই আসে অস্থিমজ্জার কথা। ফ্যাকাসে-হলদে-সাদাটে এই বস্তুটি দেহের বেশিরভাগ হাড়ের ভেতরে পাওয়া যায়। অস্থিমজ্জা মূলত সবরকম রক্তকণিকার আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে। এখানেই তৈরি হয় লোহিত কণিকা ও শ্বেতকণিকা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে থাইমাস। এর অবস্থান হৃৎপিণ্ডের ঠিক উপরের দিকে। দেহের টি-লিম্ফোসাইটগুলো এখানেই বড় হয়। অস্থিমজ্জায় তরুণ টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হবার পর তারা চলে আসে থাইমাসে। এখানেই এদের যোগ্য করে তোলা হয় দেহের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য। আর এই প্রক্রিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ টি-লিম্ফোসাইটকে ছাঁটাই হতে হয়। থাইমাসে টি-লিম্ফোসাইট এবং অস্থিমজ্জায় বি-লিম্ফোসাইট যখন পরিপক্ক হয়, তখন তারা চলে আসে লসিকা গ্রন্থি এবং প্লীহায়।

দেহে শুধুমাত্র একটি প্লীহা আছে, যার অবস্থান পাকস্থলির পাশে। তবে লসিকাগ্রন্থি আছে হাজার হাজার যা ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে। লসিকাগ্রন্থির বাইরের দিকে থাকে বি-লিম্ফোসাইট আর ভেতরের দিকে টি-লিম্ফোসাইট। এর ভেতর দিয়ে যখন রক্ত এবং লসিকা চলাচল করে তখন তারা কী বহন করছে তা বি-লিম্ফোসাইট এবং টি-লিম্ফোসাইট ভালোভাবে পরীক্ষা করে। ঠিক চেকপোস্টের মতো।

আর ডেনড্রাইটিক কোষগুলো সন্দেহজনক জিনিসপত্র পরীক্ষার জন্যও এখানেই ধরে আনে। বহিরাগত কোনোকিছু শনাক্ত হলেই এলার্ম বাজতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (Immune response)।

বি-লিম্ফোসাইটগুলো এন্টিবডি তৈরি শুরু করে আর টি-লিম্ফোসাইটগুলো খুঁজতে বের হয়ে যায় সমস্যার উৎস কী। প্লীহার মূল কাজ আসলে মৃত এবং মৃতপ্রায় লোহিতকণিকা থেকে আয়রন সংগ্রহ করে এদেকে রক্ত থেকে সরিয়ে ফেলা। তবে এরা বিশালাকার লসিকাগ্রন্থির মতোও কাজ করে। এর মধ্যেও রক্ত ও লসিকার বহনকারী জিনিসগুলো টি এবং বি-লিম্ফোসাইটের পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

চিত্রঃ অস্থিমজ্জা হতে অনাক্রম্য কোষের সৃষ্টি।

অনাক্রম্য ব্যবস্থা যে কতটা দরকারী এবং একটি কার্যকর সেটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু নয়। আপনার শরীরে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার জন্য নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান অনুভব করা উচিৎ।

শেষ করছি ডেভিড ফিলিপ ভেটার নামক এক দুর্ভাগার গল্প বলে। সে জন্মেছিল severe combined immunodeficiency রোগ নিয়ে। এটি এখন Bubble Boy Disease হিসেবে পরিচিত। এটা এমনই এক জিনগত রোগ যার কারণে দেহে কোনো কার্যকর বি এবং টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হয় না। ফলে অনাক্রম্য ব্যবস্থা একরকম থাকে না বললেই চলে। সংক্রমণের ব্যাপারে আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক রকমের নাজুক হয়ে পড়ে।

ডেভিড ভেটারকে জন্মের পরপরই জীবাণুমুক্ত প্লাস্টিক বেলুনের মতো চেম্বারের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। এর ভেতরেই তাকে খাবার দেয়া হতো, ডায়পার বদলানো হতো, ওষুধ দেয়া হতো। সবই হতো বিশেষভাবে জীবাণুমুক্ত করে। ভেটারকে শুধুমাত্র স্পর্শ করা যেত চেম্বারের দেয়ালে স্থাপিত বিশেষ গ্লাভসের মাধ্যমে। চেম্বারটি কম্প্রেসার দিয়ে ফুলিয়ে রাখা হতো যেটা প্রচুর শব্দ করতো যার ফলে ভেটারের সাথে যোগাযোগ করা ছিল দুরূহ ব্যাপার।

তিন বছর বয়সে চিকিৎসক দল তাদের বাসায় আরো বড় একটা জীবাণুমুক্ত চেম্বার এবং একটি ট্রান্সপোর্ট চেম্বার তৈরি করে দেয়, যার ফলে সে হাসপাতাল এবং বাড়িতে যাতায়াত করতে পারতো।

ভেটারের বয়স যখন ৪ বছর তখন সে আবিষ্কার করে চেম্বারের ভেতরে ভুলে রেখে যাওয়া একটা সিরিঞ্জ দিয়ে সে চেম্বারের গায়ে ফুটো করতে পারে! এই অবস্থায় তাকে বোঝানো হয় জীবাণু কী এবং তার অবস্থা। সে আরো বড় হয় এবং চেম্বারের বাইরের রঙিন পৃথিবী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে।

৬ বছর বয়সে নাসার বিজ্ঞানীরা তাকে স্পেসস্যুটের আদলে একটি বিশেষ পোশাক বানিয়ে দেয়। এই পোশাক তার চেম্বারের সাথে যুক্ত। এটার ভেতর ঢুকে সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারতো। তবে সে মাত্র সাত বার ঐ স্যুটটি ব্যবহার করেছিল। কারণ দ্রুতই সে স্যুটের সাইজের তুলনায় বড় হয়ে যায়।

ভেটারের চিকিৎসায় সেই আমলের ১.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হলেও শেষপর্যন্ত আরোগ্য মেলেনি। ১২ বছর বয়সে তার বোনের কাছ থেকে অস্থিমজ্জা ট্রান্সপ্ল্যান্ট গ্রহণ করে। তার দেহ যদিও এর সাথে মানিয়ে নিয়েছিল কিন্তু কয়েক মাস পরে অসুস্থ্ হয়ে মারা যায়।

মৃতদেহের ময়নাতদন্ত থেকে জানা যায় দাতার অস্থিমজ্জায় লুকানো ছিল এপস্টেইন বার ভাইরাসের বীজ, যেটা ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে শনাক্ত করা যায়নি। SCID নিয়ে অনেক শিশুই জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই তো ডেভিড ভেটার হতে পারে না, তাই জন্মের পরপরই সংক্রমণে মারা যায়। যদিও ভেটার এই রোগ নিয়েও ১২ বছর বেঁচে ছিল, কিন্তু সেটাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে?

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Immunology; David Male, Jonathan Brostoff, David B. Roth, Ivan Roitt

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/David_Vetter

জেনেটিক সুপারহিরোদের দুনিয়ায়

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে।

image source: fastcompany.com

এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন।

image source: technologyreview.com

এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য।

হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

featured image: nerdist.com

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

প্ল্যাস্টিক খাওয়া ব্যাকটেরিয়ার গল্প

বর্তমান সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৩১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক তৈরি হয় যার বিশাল একটি অংশ ব্যবহৃত হয় প্যাকেজিং শিল্পে। এদের মধ্যে মাত্র ১৪% পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয় আর বাকিটা থেকে যায় পরিবেশে। প্লাস্টিক পঁচনশীল নয় বলে এদের অস্তিত্ব অন্যান্য অস্তিত্বকে ফেলে দেয় ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে সামুদ্রিক দূষণের অন্যতম হোতা হচ্ছে প্লাস্টিক। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে বর্তমানে পঁচনশীল প্লাস্টিক তৈরির জন্য যে গবেষণা চলছে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আশা দিতে সক্ষম হলেও আশু সমাধান এর থেকে সম্ভব নয়।

তাহলে উপায়? একটা সময় মানুষেরা ছিল পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। আমাদের পূর্বপুরুষেরা দৈনন্দিন জীবনের নানা উপকরণ প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতো। কালের পরিক্রমায় আমরা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিকে ব্যবহার করা শিখলাম। সেই ব্যবহার এখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। সে যাই হোক, প্লাস্টিক আমাদের জীবনযাত্রা সহজ করে থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নিঃসন্দেহে পরিবেশের বারোটা বাজাচ্ছে ৭০ বছর ধরে। এই সমস্যা সমাধানের আভাস যখন প্রকৃতির মাঝেই পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তখন আশাবাদী মন ভাবতেই পারে, সেরা জীব হিসেবে মানুষের স্পর্ধা অহংকারের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকলেও, প্রকৃতি হয়তো এখনো আমাদের ভালোবাসে।

জাপানের বিজ্ঞানীরা সন্ধান পেয়েছেন প্লাস্টিকভুক এক ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির। এই ব্যাকটেরিয়া পলিথাইলিন টেরেফথ্যালেট (Polyethylene Terephthalate) সংক্ষেপে PET কে ভাঙ্গতে সক্ষম। এই পি.ই.টি. দিয়ে সাধারণত বিভিন্ন পানীয় কিংবা খাবারের বোতল তৈরি হয়। বিশ্বের প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ পি.ই.টি। প্রাকৃতিকভাবে এই প্লাস্টিকের ক্ষয় হতে ৫ থেকে ১০ বছর লাগলেও নতুন আবিষ্কৃত ব্যাকটেরিয়াটি এর পাতলা ফিল্মকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙ্গে নিয়ে যায় এর কার্বন উৎসে। এই আবিষ্কার ক্ষতিকারক প্লাস্টিক থেকে আমাদের পরিবেশকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়র হতে পারে।

চিত্রঃ মাইক্রোস্কোপের নিচে Ideonella sakaiensis

এতদিন পর্যন্ত আমরা জানতাম পি.ই.টি এর জৈববিভাজন (Bio-degradation) সম্ভব নয়। কিন্ত একেও বিভাজিত করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব স্বয়ং আবিষ্কারকদেরকেও বিস্মিত করেছে। এমনটাই জানিয়েছেন জাপানের কিয়োটো ইন্সটিউট অব টেকনোলজির অণুজীববিজ্ঞানী কোহেই ওদা। নতুন আবিষ্কৃত প্লাস্টিকভুক ব্যাকটেরিয়ার নাম Ideonella sakaiensis। যেহেতু বিভিন্ন জটিল অণুকে ডিগ্রেড করার যুদ্ধে বিভিন্ন অণুজীব সবসময়ই থাকে একেবারে সামনের সারিতে, তাই এই আবিষ্কার কোনো দূর্ঘটনা নয়। প্রকৃতিতে বিভিন্ন অণুজীব বিভিন্ন জটিল অণুকে সরল অণুতে পরিণত করার এনজাইম নিঃসরণ করে থাকে। কিন্তু অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকে একেবারেই পাত্তা না দেয়া PET এর রাসায়নিক বন্ধনগুলোকে ভাঙ্গতে পারছে বলেই আইডিওনেলা ব্যাকটেরিয়াটি এতটা অনন্য।

আইডিওনেলাকে পাবার জন্য জাপানের ওসাকা শহরের প্লাস্টিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের পলি, মাটি, বর্জ্যপানি এবং কাঁদা থেকে ২৫০ ধরনের প্লাস্টিকের ভগ্নাবশেষ সংগ্রহ করা হয়। এদের মধ্যে থেকে যাচাই বাছাই শেষে একটিতে পাওয়া গিয়েছে এই আনকোরা অণুজীবটি। এটি শুধুমাত্র প্লাস্টিককে তার একমাত্র পুষ্টির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে টিকে থাকছে। ব্যাপারটা দুই ধাপে ঘটে। প্রথমে এরা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি এনজাইম PETase নিঃসরণ করে। এই এনজাইম পি.ই.টি প্লাস্টিককে বিভাজত করে তৈরি করে Mono Hydroxyethyl Terephthalic Acid (MHET)। MHET কে ব্যাকটেরিয়াটি নিজের দেহে শোষণ করে নেয়। সেখানে MHET hydrolase এর মাধ্যমে ইথিলিন গ্লাইকল এবং টেরেফথ্যালিক এসিড তৈরি হয়। মজার বিষয় হলো, টেরেফথ্যালিক এসিডকে পি.ই.টি প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদি এই ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে প্লাস্টিক থেকে টেরেফথ্যালিক এসিড সংগ্রহ করা যায় তাহলে এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল-ভিত্তিক কাঁচামাল বাঁচানো সম্ভব।

চিত্রঃ আইডিওনেলার প্লাস্টিক ভোজন প্রক্রিয়া।

যেহেতু এখনো এর জৈববিভাজন ক্ষমতা খুবই ধীর, তাই ব্যবহারিক পর্যায়ে যেতে আরো সময় লাগবে। এমন হতে পারে যে আইডিওনেলাকে আরো শক্তিশালী করা হলো, কিংবা এর যে জিনগুলোর দ্বারা PETase এবং MHET hydrolase তৈরি হচ্ছে সেসব সংগ্রহ করে অন্য আরেকটি ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডের মাঝে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ঢুকিয়ে বিপুল পরিমাণে এই এনজাইমগুলো তৈরি করা হলো। তবে তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

পি.ই.টি প্লাস্টিক প্রকৃতিতে আছে মাত্র ৭০ বছর। এই সময়ের কোনো পর্যায়ে আইডিওনেলা গণের ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হলো কিংবা যদি এরা আগে থেকেও থেকে থাকে কীভাবে এই প্লাস্টিকে এদের রুচি তৈরি হলো সেটাও কিন্তু ভাবার বিষয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রকৃতিতে হয়তো অন্যান্য প্লাস্টিকের জৈববিভাজনে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াও ইতোমধ্যে আবির্ভুত হয়ে গেছে। আমাদের শুধু সঠিক উপায়ে, সঠিক জায়গায় খুঁজে দেখতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ

Feeding on plastic a bacterium completely degrades poly (ethylene terephthalate) by Uwe T. Bornscheuer, Science magazine, 11th March, 2016

অতিকায় ভাইরাসের গল্প

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও তামাক একটি অর্থকরী ফসল। এই ফসল যদি এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয় যার ফলে কৃষকেরা চাষ করাই ছেড়ে দিচ্ছেন,তাহলে তামাক উৎপাদনকারী একটি দেশের জন্য চিন্তার উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক।

১৮৭৯ সালে নেদারল্যান্ডের এগ্রিকালচারাল এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের ডিরেক্টর এডলফ মেয়ারের নজরে আনা হয় এমন এক অদ্ভুত রোগ ‘টোবাকো মোজাইক ডিজিজ’। তিনি বহুদিন এটা নিয়ে কাজ করলেন,কিন্তু কীসের জন্য যে এই রোগটা হচ্ছে সেটা ঠিক বের করতে পারলেন না। তিনি বললেন যে,আক্রান্ত গাছের রস ফিল্টার পেপারের মাধ্যমে পরিশোধিত করা হলে প্রাথমিকভাবে সংক্রামক থাকলেও বেশ কয়েকবার ফিল্টার করার পর করার রসটাতে আর সংক্রমক থাকছে না। সুতরাং কোনো অজানা ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হচ্ছে।

১৮৯২ সালের দিকে রাশিয়ান উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দিমিত্রি আইভানভস্কি একই রোগে আক্রান্ত গাছের রস সেই একই পদ্ধতিতে পরিশোধিত করেন,শুধু মাধ্যমটা ভিন্ন। তিনি ব্যবহার করেন প্রলেপবিহীন পোরসেলিন ফিল্টার যার পোর সাইজ ০ ১ থেকে ১ মাইক্রন। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না,ঠিকই সেই রসে সংক্রামক রয়ে গেল। তিনি বললেন,এটা ব্যাকটেরিয়া নয়। বরং তার চেয়েও অনেক ছোট কিছু এই রোগের জন্য দায়ী। পরবর্তীতে যা ভাইরাস হিসেবে শনাক্ত হয়। হ্যাঁ,এবং সেই ভাইরাসের নাম ‘টোবাকো মোজাইক ভাইরাস’।

ভাইরাস তো আবিষ্কার হলো,সেই সাথে একে খুঁজে পেতে যে কাঠ-খড়টা পুরলো। সে কারণে সবাই ধরেই নিলো ভাইরাসের আকৃতি হবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। এই প্রচলিত ধারণের কারণেই হয়তো অনেকদিন অন্য আরেকটি জগৎ আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য ছিল।

আইভানভস্কির এক্সপেরিমেন্টের একশ বছর পর ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাডফোর্ডের একটি হাসপাতালে নিউমোনিয়া প্রাদুর্ভাব দেখা দিলো। এর উৎস খুঁজতে খুঁজতেই কাছের পানির টাওয়ার থেকে পাওয়া একটি অ্যামিবার ভেতরে দেখা গেল নতুন একটি গ্রাম পজিটিভের অস্তিত্ব। তাৎক্ষণিকভাবে একে কোনো বর্গীভূত না করা হলেও পরবর্তীতে ব্র্যাডফোর্ডকক্কাস ব্যাকটেরিয়া নাম দিয়ে ফ্রীজে ঢুকিয়ে ভুলে যাওয়া হয়।

১৯৯৮ সালে বার্নার্ড লা স্কোলা নামক এক ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের মধ্যে দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত বিষয়। এর মধ্যে কোনো রাইবোজোম নেই!

রাইবোজোম হচ্ছে কোনো কোষের প্রোটিন তৈরির কারখানা। এই ঘটনা ব্র্যাডফোর্ডকক্কাসের চরিত্র সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক ঘটালে আরেক দল বিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এরা অন্য সকল ব্যাকটেরিয়ার মতো বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধিও করে না। এর মাধ্যমে এই নকুলে ভাইরাস সম্পর্কে সব রহস্যের অবসান নয়,বরং সূচনা হলো। যাকে এখন আমরা ‘মিমি ভাইরাস’ বলে চিনি। যেহেতু এরা গ্রাম স্টেইনিং পরীক্ষায় গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়াকে অনুকরণ (Mimic) করে সেজন্যই এই নাম।

অণুজীব নিয়ে যদি আপনার পড়াশোনা এবং আগ্রহ দুটোই থেকে থাকে আর এমন যদি হয় যে মিমি ভাইরাস সম্পর্কে আজই প্রথম শুনছেন তাহলে ‘গ্রাম পজিটিভ ভাইরাস’ শুনেই আপনার মুখ হা হয়ে যাওয়ার কথা। যদি তা-ই হয়ে,তাহলে আপনাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়ার মতো দুটো তথ্য দিয়ে আমোদিত করতে চাই। মিমি ভাইরাস দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০০ ন্যানোমিটার,এবং জিনের সংখ্যা ১০১৮টি। যেখানে তারই বন্ধু এইচআইভি’র জিন মাত্র ৯টি!

চিত্রঃ বিভিন্ন অতিকায় ভাইরাসের সাথে এইচআইভি এবং ব্যাকটেরিয়ার তুলনা।

ফ্রান্সের এক্সিস-মার্সিয়েলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মিমি ভাইরাস শনাক্ত করার পর এরকম বড় বড় ভাইরাস খুঁজতে শুরু করেন। দিদিয়ার রাউল্ট নামের একজন গবেষক খুঁজতে থাকেন সবচেয়ে সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে, অর্থাৎ অন্যান্য পানির টাওয়ার ইত্যাদি। এবং তিনি প্যারিসে যেন স্বর্ণের খনি পেয়ে বসলেন। তিনি যে ভাইরাসটি পেয়েছিলেন তার নাম দেয়া হয় ‘মামা ভাইরাস’। তবে চিত্তাকর্ষক ব্যাপার,তার ভেতরে যেটা পাওয়া গেলো, একটি ‘স্পুটনিক ভাইরোফাজ’।

প্রথমবারের মতো দেখা গেলো একটি ভাইরাস অন্য আরেকটি ভাইরাসকে আক্রান্ত করছে। এই ঘটনা ভাইরাস কি জীবিত না মৃত সেই পুরনো বিতর্ক আবারো উস্কে দিলো। কারণ এখানে মামা ভাইরাস অন্য ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হচ্ছে।

২০১০ সালে রাউল্ট নদী,হ্রদ,ট্যাপ সহ বিভিন্ন জায়গার পানির মধ্যে পাওয়া নতুন ১৯টি নমুনা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন। এর পরের বছর রাউল্টের আরেক সহকর্মী জ্যা-মাইকেল ক্ল্যাভেরি পেলেন আরো বড় আকৃতির ভাইরাস। চিলির সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাওয়া এই ভাইরাসের নাম দেন ‘মেগা ভাইরাস’।

এরপর চিলির নদী এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি পুকুরের কাদা থেকে তিনি শনাক্ত করেন ‘প্যানডোরা ভাইরাসে’র দুটো প্রকরণ। যার একটিতে রয়েছে ১৫০০ টি জিন এবং অন্যটিতে প্রায় ২৫৫০। এরপরই ক্ল্যাভেরি সম্ভবত সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটি করেন। ৩০,০০০ বছর পুরনো বরফের টুকরোর মর্মস্থল থেকে শনাক্ত করেন দর্শনীয় পিথো-ভাইরাস। এটি লম্বায় প্রায় দেড় মাইক্রোমিটার,যা সবার পরিচিত একটি ভাইরাস E. coli এর কাছাকাছি।

এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মেমব্রেনের গায়ের একটি ফুটো,যা কর্কের মতো একটি জিনিস দ্বারা আটকানো থাকে। ক্ল্যাভেরির ভাষ্যমতে “এখন আমরা বলতেই পারি যে, অতিকায় ভাইরাসেরা সর্বত্রই ছড়ানো। আমরা যদি সঠিক পদ্ধতিতে দেখি তবে আমি নিশ্চিত আপনার বাগানেও এদের পাওয়া যেতে পারে।”

যে প্রশ্নটি বিজ্ঞানীদের বিব্রত করে আসছে তা হলো, অতিকায় ভাইরাসগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং জীবনের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাসের কোন স্তরে এদের ফেলা যায়? গোড়ার দিকে এই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতির দুই শাখা (ডোমেইন),আদিকোষী এবং প্রকৃতকোষী। প্রকৃতকোষীর মধ্য রয়েছে সব প্রাণী ও গাছপালা।

আদিকোষীর দুইভাগের একটি হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া,অন্যটি আর্কিয়া। ব্যাকটেরিয়ার কোষগুলো প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের চেয়ে সরল এবং নিউক্লিয়াসবিহীন। আর্কিয়া ব্যাকটেরিয়ার মতো হলেও এদের রসায়নটা ভিন্ন। এই তিন মৌলিক শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে সব ধরনের জীবসত্বাকে জায়গা দিতে পারার কথা।

কিন্তু আপনি যদি এই অতিকায় ভাইরাসগুলোর জিনের দিকে তাকান,তাদের ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ জিনই আর কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি অতিকায় ভাইরাসের একেকটি গোত্রের মধ্যেও খুব বেশি সাধারণ জিন নেই। কেউ কেউ বলে থাকেন এই অতিকায় ভাইরাসগুলো কিছু বিলুপ্ত ডোমেইনের অবশেষ। তাই এদেরকে শ্রেণিবিন্যাসের যদি জায়গা দিতেই হয়,তাহলে একাধিক ডোমেইনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ক্ল্যাভেরির ভাষায় “মিমি ভাইরাসের সন্ধান পাওয়ার পরই আমরা বলেছিলাম, চতুর্থ একটি ডোমেইন সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এখন বিশ্বাস করি এটা শুধু চতুর্থ নয় বরং পঞ্চম,ষষ্ঠ এবং সপ্তম।”

২০১২ সালে একদল বিজ্ঞানী বিভিন্ন ভাইরাস এবং অন্যান্য যেসব কোষের একই ধরনের প্রোটিন রয়েছে তাদের নিয়ে একটি বিবর্তনিক বৃক্ষ (Evolutionary Tree) তৈরি করেন যেটা থেকে অনুমান করা যায় অতিকায় ভাইরাসগুলো অন্য সব কিছু থেকেও প্রাচীন, যা একদিক দিয়ে ক্ল্যাভেরির ধারণাকেই শক্তিশালী করে। ক্ল্যাভেরির সমালোচকরা বলেন, সব ভাইরাসই হচ্ছে মিউটেশনের রাজা। তাই একটি জিনকে যদি চিনতে না পারেন, তাহলে সেটা এমনও হতে পারে যে একটি পরিচিত জিনই উপর্যুপরি মিউটেশনের জন্য এমন অবস্থায় এসেছে যে তাকে আর আলাদা করা যাচ্ছে না।

চিত্রঃ অণুজীবের বিবর্তনীয় বৃক্ষ

তবে এটাও যৌক্তিক যে একটা অণুজীব, পরজীবী জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে তার জিনোম ক্রমাগত ছোট হবার কথা,যেহেতু সে পোষকের যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করছে তার মৌলিক কার্যকলাপের জন্য। তাই এর থেকেও বলা যায় যে অতিকায় ভাইরাসগুলো আমাদের অন্যান্য পরিচিত ভাইরাসের তুলনায় প্রাচীন।

অতিকায় ভাইরাসদের আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের প্রাণের সংজ্ঞা সম্পর্কে ভাবাচ্ছে। তারা বলছেন,ভাইরাসকে বিচার করতে চাইলে তার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় নয় বরং সে পোষকের জিনোমের সাথে একীভূত হওয়া অবস্থায় কীভাবে আছে সেটার ভিত্তিতে বিচার করা উচিৎ। এ অবস্থায় সে একটি পরজীবী ব্যাকটেরিয়ার মতো আচরণ করে প্রায়। অবশ্য একে জীবিত বলার জন্য জন্য আমাদের চিন্তাধারাকে আরো প্রশস্ত করতে হবে। শুধু চলৎক্ষম রাইবোজোম বাহক কোষকেই জীবিত বলতে হবে,এটা খুবই কায়েমী মনোভাব। আমরা বরং জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি,রাইবোজোম থাকলে রাইবোসেল এবং ভাইরাস চালিত ভাইরোসেল।

তবে এটা পরিষ্কার যে, জীবন এবং ভাইরাসের মধ্যকার দেয়ালটা বেশ ঝাপসা। ভাইরাস নাকি কোষ? কে জীবন্ত কে মৃত এই প্রশ্নে মাথা খারাপ করে দিলেও কিছু করার নেই। এখন পর্যন্ত অতিকায় ভাইরাসের অনুসন্ধান শুধু অ্যামিবার মধ্যেই চলতো,কারণ মূলত এরা একটি জানা পোষক এবং ল্যাবে এদের নিয়ে কাজ করাও সহজ। তার মানে এখনো বহু বহু পোষক প্রকটিত করা বাকী। যা ক্ল্যাভেরির মত বিজ্ঞানীর জন্য একইসাথে ভীতিকর এবং রোমাঞ্চকর। তার নিজের ভাষায় –

“We don’t know what a virus is any more – or what to expect next.”

তথ্যসূত্রঃ

  • Infect and Direct, Gary Hamilton, New Scientist Magazine, January 15, 2016.
  • A phylogenomic data-driven exploration of viral origins and evolution, Arshan Nasir, Gustavo Caetano-Anollés, Science Advances, September 25, 2015.

ক্যান্সারের কারণ ও এর প্রতিরোধ

যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে হিপোক্রিটাস বলেছিলেন,আমাদের দেহ চার ধরনের তরলে গঠিত। এ চার ধরনের তরলের মধ্যে সবসময় ভারসাম্য বজায় থাকে,যা নষ্ট হলেই নানাবিধ অসুখ হয়। এর মাঝে ব্ল্যাক বাইল নামক তরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে যেটা হয় তাকে কার্সিনোস এবং কার্সিনোমা বলে বলে ডাকতেন তিনি। যার উৎপত্তি গ্রীক ‘Karkinos’ থেকে। এর অর্থ হচ্ছে কাঁকড়া। আক্রান্ত টিস্যু থেকে চারপাশে রক্তনালীগুলোর ছড়িয়ে পড়া দেখতে অনেকটা কাঁকড়ার থাবার মতো বলেই এ নামকরণ। ধীরে ধীরে একসময় ক্যান্সার নামটি প্রচলিত হয়।

এখন ২০১৫ সালে এসে এতগুলো বছরের গবেষণা,এতগুলো মলাটবদ্ধ প্রকাশনা, এতগুলো পরীক্ষা-নীরিক্ষা, বস্তা বস্তা টাকা ঢালার পরও কেন ক্যান্সারের কোনো প্রতিষ্ঠিত নিরাময় নেই? কারণ ক্যান্সারকে কোনো সূত্রে বাধা সম্ভব নয়। সকাল বিকাল আমরা এক নামে একে ডাকলেও প্রতিটি ক্যান্সার আলাদা,প্রতিটি ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর গল্প আলাদা।

ক্যান্সার এতটাই রহস্যময় যে,প্রায়ই দেখা যায়, যে চিকিৎসায় একজন রোগী সুস্থ হয়ে গেছেন,সেই একই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত আরেকজনের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা আর কাজ করে না। দেহের যেকোনো টিস্যুকে আক্রান্ত করতে সক্ষম এ ক্যান্সারের কারণ হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শুরু করে সূর্য রশ্মি পর্যন্ত হাজার হাজার এজেন্ট ছড়িয়ে আছে।

আগেই বলেছি,ক্যান্সারকে যেহেতু আমরা এক নামে চিনি সেই কারণে একে একক কিছু ভাবলে ভুল হবে। ক্যান্সার আসলে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি যাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন যা শুরু হয় কিছু জিনের মাঝে আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে।

আমাদের দেহের গঠন ও অন্যান্য কারিগরিতে জড়িত থাকে নানা ধরনের প্রোটিন। প্রতিনিয়ত এসব প্রোটিন তৈরি হচ্ছে,আবার কাজ শেষে নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। কোন প্রোটিন কেমন হবে সেই তথ্য থাকে আমাদের জিনগুলোতে। তাই জিনের পরিবর্তন প্রোটিনকেও প্রভাবিত করে। এ পরিবর্তনের ফলে যে বাটারফ্লাই ইফেক্ট শুরু হয়ে যায়,শেষ পর্যন্ত তার ফলাফল মোটামুটি একই। লাগামছাড়াভাবে কিছু কোষ বিভাজিত হচ্ছে, দেহের বিভিন্ন প্রান্তে দুষ্ট কোষগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে,অন্যান্য টিস্যুকে আক্রমণ করছে এবং পুরো ব্যাপারটিই খুব ভয়ংকর।

জিনের এ পরিবর্তনকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে মিউটেশন। দুই ধরনের জিনে মিউটেশনের কারণে ক্যান্সার হয়। একটিকে বলে অনকোজিন,আরেকটিকে বলে টিউমার সাপ্রেসর জিন। তবে আসলে মিউটেশন হবার পরে একে অনকোজিন বলে,এর আগে এর নাম প্রোটো-অনকোজিন। প্রোটো-অনকোজিন থাকা অবস্থায় এরা স্বাভাবিক জিনের মতোই আচরণ করে। যাদের কাজ হচ্ছে এমন প্রোটিন তৈরি করা যা কোষের বিকাশ ও বিভাজনে সাহায্য করে। কিন্তু একটি মিউটেশন এদেরকে এতটাই পাগল করে দেয় যে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো যায় না। কোষের মাঝে এরা ক্রমাগত চেচামেচি করতে থাকে, “বড় হ,বিভাজিত হ! বড় হ,বিভাজিত হ!”

মিউটেশনের ফলে এ জিন যে প্রোটিন তৈরি করার কথা তার আকৃতি যায় বদলে। সে এমন একটি অবস্থায় আটকে যায় যে ক্রমাগত কোষে বড় হবার সংকেত দিতে থাকে। এ নতুন আকৃতির কারণে অন্যান্য যেসব প্রোটিনের কথা ছিল কাজ শেষ হলে এদের আটকানোর তারাও চিনতে পারে না। তাই কোষগুলো ক্রমগত বড় হয়ে বিভাজিত হতে হতে একটি টিউমারে পরিণত হয়।

‘টিউমার সাপ্রেসর’ নাম থেকেই বোঝা যায় এর কাজ হলো বিপথে যাওয়া কোষগুলোকে রুখে দেয়া। সকল জিনের মতো আমাদের প্রতিটি কোষেও দুই কপি করে টিউমার সাপ্রেসর জিন থাকে। যদি এক কপিতে কোনো কারণে মিউটেশন হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয় তখনো অন্য কপি ঠিকই কাজ করতে থাকে। দেখা গেছে যে,একই লোকাসে অবস্থিত দুটি টিউমার সাপ্রেসরের যেটিতে মিউটেশন হয় সেটি প্রচ্ছন্ন হয়ে পড়ে,কিন্তু একই লোকাসে অবস্থিত অনকোজিনে মিউটেশন হলে সেটি হয়ে যায় প্রকট এবং অন্য কপিকে আর সুস্থভাবে কাজ করতে দেয় না। যাই হোক,ক্যান্সারের প্রবৃত্তিই হলো সব রকম প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার ফাঁক গলে বের হয়ে যাওয়া। কখনো এমনও হতে পারে যে দুটো কপিতেই মিউটেশন হলো কিংবা একটি কপিতে মিউটেশন হলেও অন্য সুস্থ কপি কোনো কারণে হারিয়ে গেল। তখন আর টিউমারকে আটকানোর মত কেউ থাকে না।

এখানেই শেষ নয়। একটা দুটো মিউটেশন হলেই তা ক্যান্সার হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যাবস্থা ডিএনএ’র ছোটোখাটো মিউটেশনগুলোকে ঠিক করে নিতে পারে কিংবা খারাপ অবস্থায় চলে গেলে দেহের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা আক্রান্ত কোষটিকে ধ্বংস করে ফেলে। একটি সুস্থ কোষকে ক্যান্সারে পরিণত হবার জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ টি মিউটেশনের শিকার হতে হয়।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘মিউটেশন অর্ডার’অর্থাৎ কোনো জিনের মিউটেশন আগে,কোনো জিনের মিউটেশন পরে হলে সেটিও ক্যান্সারের তীব্রতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেহের স্বাভাবিক কোষগুলো প্রতিবার বিভাজিত হবার সময় এর ক্রোমোজোমের এক প্রান্ত ছোট হতে থাকে। একসময় কোষটি মরে যায় এবং নতুন সুস্থ কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। কিন্তু ক্যান্সার কোষ এ ব্যাবস্থাকে ঠকিয়ে নিজের ক্রোমোজোমকে খুব যত্ন করে আগলে রাখে। ফলে ক্যান্সার কোষগুলো বলা চলে অমর হয়ে যায়।

যেহেতু প্রতিটি টিউমার ভিন্ন পথ অবলম্বন করে বিকশিত হয়, এটা চিকিৎসক এবং গবেষকদের জন্য কঠিন যে কোন পথকে আসলে টার্গেট করতে হবে। তাহলে কোন কোন উচ্ছন্নে যাওয়া জিনের কারণে টিউমার হয়েছে সেটাকে না জেনে কীভাবে তারা এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেবেন? একটি উপায় হতে পারে ছুরি নিয়ে টিউমারটি ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলা। কিন্তু সেটা তো সব সময় সম্ভব হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কেটে ফেলার পরেও টিউমার ফিরে আসে।

অনেক দিন ধরে ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে ভালো সমাধান ছিল দেহে কিছু একটা প্রয়োগ করা যা সমস্ত দ্রুত বিভাজনশীল কোষকে আক্রমন করবে। যেমন কেমোথেরাপী কিংবা রেডিওথেরাপী। রেডিওথেরাপীতে এমন ধরনের তেজস্ক্রিয়তা প্রয়োগ করা হয় যা কোষের ডিএনএ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো এ তেজস্ক্রিয়তা আশেপাশে সুস্থ কোষেরও ক্ষতি করে। তাই চিকিৎসকরা প্রয়োগ করার সময় খুব চেষ্টা করেন যাতে যথাসম্ভব কম ক্ষতি হয়।

কেমোথেরাপী রয়েছে একাধিক ধরনের। তবে এরা যেহেতু রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়,এদের কারণে সারা দেহ প্রভাবিত হতে পারে। কিছু কিছু কেমো ডিএনএ’র গাঠনিক এককের ছদ্মবেশে থাকে। ক্যান্সার কোষ বিভাজিত হবার সময় তা নতুন ডিএনএ সূত্রক তৈরি করে এবং এদেরকে নতুন ডিএনএ-তে যুক্ত করে ফেলে। কিন্তু সেই ডিএনএ আর সঠিক কার্যক্ষম থাকে না। অনেকটা বিষটোপ দিয়ে শত্রুনাশের মতো ব্যাপার। কিছু কিছু কেমো আবার কোষের অন্তঃকংকালকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে কোষটি আর বিভাজিত হতে পারে না।

কেমোথেরাপী ক্যান্সারের বৃদ্ধি দমাতে পারলেও আমাদের দেহে প্রচুর সুস্থ কোষও আছে যাদের বিভাজিত হওয়া প্রয়োজন। যেমন চুলের ফলিকল বিভাজিত না হলে চুলের বৃদ্ধি হবে না। আবার হজমের সময় নিঃসৃত এসিডের কারণে অন্ত্রের আস্তরনের যে ক্ষয় হয় সেটিও পূরণ করা দরকার।

এ কারণেই কেমোথেরাপীর ফলে চুল পড়ে যায়,হজমে সমস্যা দেখা যায়। এরকম হাজারো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে সাথে নিয়ে কেমোথেরাপী কাজ করে। ক্যান্সার রোগীর শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি প্রচন্ড মানসিক চাপেরও সৃষ্টি করে। তাই ন্যাড়া মাথার কাউকে দেখে মজা করার আগে সবসময় খেয়াল করবেন তার চোখে ভ্রু আছে কিনা।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যে অস্ত্রটিকে বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে উন্নত করার চেষ্টা করে আসছেন তা হলো জিনোম সিকোয়েন্সিং। এ প্রক্রিয়াটি এখন এতটাই দ্রুত আর সস্তা যা দশ বছর আগেও শুধু স্বপ্নেই সম্ভব ছিল। এখন এটি সরাসরি রোগীদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।

বর্তমানে কয়েক দিনের ব্যাবধানে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার কোষের জিনোম সিকোয়েন্স করে তার কোথায় এবং কীভাবে মিউটেশন ঘটেছে তা বের করা সম্ভব। এ তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াই পার্সোনালাইজড মেডিসিন দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির, নির্দিষ্ট ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা সম্ভব।

যে দুটো বড় প্রজেক্ট এ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তারা হলো- ১. ক্যান্সার জিনোম প্রজেক্ট ও ২. ক্যান্সার সেল লাইন এনসাইক্লোপিডিয়া।

তারা নানা ধরনের ক্যান্সার কোষের বিপরীতে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রভাব পরীক্ষা করেছে। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু কিছু ওষুধ বিশেষ বিশেষ ক্যান্সার কোষের বিপরীতে ভালো কাজ করে। তারা মিউটেশনের ধরনের উপর ভিত্তি করে কোনো ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন। তাই ক্যান্সারের জন্য ওষুধ নির্বাচন এখন আর অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মত নয়। অন্তত তত্ত্ব সেটাই বলে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে আরেকটি কার্যকর অস্ত্র হতে পারে ন্যানোটেকনোলজি। ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার স্কেলে যে টেকনোলজি কাজ করে সেটাই অল্প কথায় ন্যানোটেকনোলজি। বেশির ভাগ সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়া এবং যেসব প্রক্রিয়া ক্যান্সারের কারণ হতে পারে সেগুলোও ন্যানোস্কেলে সংঘটিত হয়। তাই ন্যানোটেকনোলজির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে নিরাময় পর্যন্ত সকল পর্যায়েই বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের সুবিধা পাওয়ার কথা।

ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য বায়োপসি করার আগে সাধারণত ইমেজিং কিংবা স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া হয়। ন্যানোটেকনোলজি দুটো পদ্ধতিকেই আরো দক্ষ করে তুলতে পারে। যেমন ইমেজিং এর কথা যদি বলি,এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তখনই ক্যান্সার নির্ণয় করা যায় তখন বিপুল সংখ্যক কোষের ক্যান্সারে রূপান্তরের কারণে টিস্যুতে দৃষ্টিগ্রাহ্য কোনো পরিবর্তন আসে। তবে ততক্ষণে হয়তো হাজার হাজার ক্যান্সার কোষ এদিক ওদিকে ছড়িয়ে গেছে। আবার দেখা গেলেও সেটা কতোটা মারাত্মক সেটা বোঝার জন্য বায়োপসি ছাড়া উপায় নেই।

ইমেজিংকে কার্যকর করার জন্য দুটি জিনিস দরকার। এমন কিছু যেটা একদম খাপে খাপ ক্যান্সার কোষকে চিনে নিতে পারবে এবং স্ক্যানিং ডিভাইসকে চেনাতে সাহায্য করবে। দুটোই ন্যানোটেকনোলজির দ্বারা অর্জন করা সম্ভব। যেমন, যেসব অ্যান্টিবডি ক্যান্সার কোষের রিসেপ্টরের সাথে যুক্ত হতে পারে তাদেরকে ন্যানো আকারের ধাতব অক্সাইডের গায়ে লেপে দিলে তারা MRI কিংবা CT Scan এ স্পষ্টতর সংকেত তৈরি করতে পারে।

ন্যানোটেকনোলজির ভিত্তিতে যেসব ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে সেগুলো সাধারণের তুলনায় বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভালো কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এসবের অর্ধায়ু, স্থায়ীত্ব, আক্রান্ত কোষ চেনার ক্ষমতা অধিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ন্যানোপার্টিকেল ব্যবহার করে মাল্টিড্রাগ ডেলিভারি সিস্টেম তৈরির চেষ্টা করছেন যেগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্যান্সারের বিপক্ষে শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

ক্যান্সার নিয়ে আসলেই অনেক কাজ হচ্ছে সারা বিশ্বে। গুগল ট্রেন্ডে গিয়ে যদি ক্যান্সার এবং এইডস এই দুটি রোগের নাম সার্চ আইটেম হিসেব লিখেন তাহলে এরকম একটি গ্রাফ পাবেনঃ

এটা কিন্ত এদের আপেক্ষিক গুরুত্ব নয় বরং ইন্টারনেটে এদের জনপ্রিয়তার একটা তুলনা। যদিও এইডস রোগটি কম ভয়ানক নয়,ইন্টারনেটে এর জনপ্রিয়তা যে কারণেই হ্রাস পাক,ক্যান্সার কিন্তু বিগত কয়েক বছরে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। তো আমরা ধরে নিতেই পারি যে,সামাজিক নেটওয়ার্ক,ব্লগ ও নিউজপোর্টালগুলো ছাড়াও বৈজ্ঞানিক জার্নাল-গুলোতেও ক্রমাগত এ শব্দটি বারবার এসেছে। তবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যে ধরনের অগ্রগতি সাধন করেছে,আমরা তার কতোটা আমদানী করতে পেরেছি?

আমাদের ক্যান্সার আক্রান্তরা কেমন সেবা পাচ্ছে সেটাও ভাবার বিষয়। ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৪ কোটি মানুষের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত প্রায় ১৫ লক্ষ। এত বিশাল সংখ্যক আক্রান্ত জনগোষ্ঠী মানেই বিশাল একটা ব্যবসা। তাই রথী-মহারথীদের ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের জন্য নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন ও প্রদানের মাধ্যমে সংবাদপত্রের হেডলাইন হতে ও টাকা কামাতে যতটা উৎসাহ, ততটা কি পুরোপুরি নিরাময় লক্ষ্যে কাজ করাতে আছে?

তথ্যসূত্রঃ

১. Mutation order reveals what cancer will do next by Andy Coghlan, New Scientist Magazine

২. nano.cancer.gov

৩. Fighting Cancer with Nanomedicine by Dean Ho, The Scientist Magazine.

৪. Syed Md Akram Hussain, Comprehensive update on cancer scenario of Bangladesh, South Asian Journal of Cancer.

৫. The Cancer Industry is Too Prosperous to Allow a Cure By John P. Thomas, The Health impact News.

featured image: trans4mind.com

গাছেদের বায়বীয় যোগাযোগ

গাছেদের বায়বীয় যোগাযোগ

ছোট্ট শহর সিটকা সম্ভবত আলাস্কার সবচেয়ে আরামদায়ক স্থান। বারানফ দ্বীপে অবস্থিত সমুদ্র তীরবর্তী শহর সিটকা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে সবসময়ই এখানকার আবহাওয়া মাতৃকোমল। এক মাসের গড় তাপমাত্রা সবসময়ই হিমাঙ্কের উপরে থাকে। ১৮৬৭ সালের অল্প কয়েকটি দিন ছাড়া শহরটির ইতিহাসে বলার মতো তেমন কোনো ঘটনা নেই। তখন সারা পৃথিবীর রাজনীতি সচেতন মানুষদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল এই সিটকা।

সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার অনেক কূটনীতিক সেখানে জড়ো হন। প্রতি একর মাত্র দুই সেন্টের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ানদের থেকে আলাস্কা কিনে নেয়। অর্ধ-মিলিয়ন বর্গমাইল বাবদ মাত্র সাত মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে আলাস্কার মালিকানা যুক্তরাষ্ট্র পাবে এমন চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিকের জন্য এই অংকটা অযৌক্তিক রকমের বেশি। যারা পক্ষের ছিল, তাদের দাবী ছিল- পরবর্তী পদক্ষেপে কানাডার প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়াকেও কিনে ফেলা হোক, আর বিপক্ষের লোকেদের যুক্তি ছিল জনমানবশূন্য এসব এলাকা অধিগ্রহণ করা দেশের জন্য বোঝাস্বরূপ। সে যাই হোক, কেউ কেউ আবার বলে থাকে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্যই সরকার তখন এই নাটকীয় চুক্তিটি সম্পন্ন করে।

সিটকা সংক্রান্ত আরেকটি নাটকের পর্দা উন্মোচিত হয় ১৯৮০ সালের দিকে। এই নাটক দুই জাতির মধ্যে হওয়া চুক্তির নয় বরং দুই প্রজাতির মধ্যে সংঘর্ষের।

বৃক্ষরাজি সিটকাকে ভালোবাসে। সিটকা সেই ভালোবাসার প্রতিদান দেয় লম্বা গ্রীষ্মকাল ও শান্ত আবহাওয়ায় গাছগুলোকে জড়িয়ে রেখে। ওখানকার জল, আলো, আর্দ্রতা সবই গাছেদের বসবাস এবং বেড়ে উঠার চমৎকার সংমিশ্রণ। সিটকা স্প্রাস, সিটকা অ্যাল্ডার, সিটকা অ্যাশ, সিটকা উইলো এরা হলো এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। এছাড়াও এই প্রজাতির গাছগুলো সফলতার সাথে পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ওয়াশিংটন, ওরেগন এবং ক্যালিফোর্নিয়াতেও ছড়িয়ে গেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে অমায়িক বলা চলে সিটকা উইলোকে। দেখতে তেমন মনোরম নয়, উচ্চতা সর্বোচ্চ তেইশ ফিট। একদম সাদামাটা একটা গাছ। কিন্তু অন্যান্য অনেক গাছের মতোই সিটকা উইলোতেও যা কিছু দেখি বা জানি, তার চেয়ে অদেখা, অজানা ব্যপারগুলোর সংখ্যাই বেশি।

আপনি যখন ইউক্যালিপটাস বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটাচলা করেন তখন অনেক সময় ঝাঁঝালো, তীব্র ঘ্রাণের অস্তিত্ব টের পান। আসলে আপনি নিঃশ্বাসের সাথে নিচ্ছেন বাতাসে ভেসের বেড়ানো এক ধরনের রাসায়নিক যাকে বলা হয় উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compound) সংক্ষেপে ভিওসি। অনেক গাছই ভিওসি তৈরি করে। ভিওসি কোনো পুষ্টি সরবরাহ করে না, তাই মৌলিক জীবন প্রক্রিয়ার জন্য এরা গৌণ। ভিওসির অনেক ব্যবহার আছে যা আমরা জানি, আর অগুণিত সংখ্যক আছে যেসব আমরা জানি না। ইউক্যালিপটাস ভিওসি নিঃসরণ করে জীবাণুনাশক হিসেবে। গাছের পাতা কিংবা বাকল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যেন কোনো জীবাণুর সংক্রমণের শিকার না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা।

বেশিরভাগ ভিওসি যৌগে কোনো নাইট্রোজেন থাকে না। তাই এটা তৈরি করা সহজ এবং সস্তা। ইউক্যালিপটাসের মতো বাতাসে এত এত ভিওসি ছেড়ে দিয়ে আশপাশ গন্ধ বানিয়ে ফেললেও গাছের তেমন কিছু আসে যায় না। তবে বেশিরভাগ ভিওসি কিন্তু আমাদের নাসারন্ধ্রে কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করে না। এতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ একে তো আমাদের ঘ্রাণশক্তি অন্যান্য প্রাণীর মতো এত তীব্র নয়, আর ঘ্রাণ ছড়ানোও ভিওসির উদ্দেশ্য নয়। বনের মধ্যে ভিওসির উৎপাদন কখনো বাড়ে, কখনো কমে।

নির্দিষ্ট ভিওসির উৎপাদন চালু কিংবা বন্ধ হয় বিশেষ কিছু সংকেতের মাধ্যমে। এরকম একটি সাংকেতিক যৌগ হলো জ্যাসমোনিক এসিড, যা কোনো গাছ আঘাতপ্রাপ্ত হলে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়।

গাছ এবং পোকাদের যুদ্ধ হাজার হাজার বছর ধরে চলছে। এই যুদ্ধে দুই পক্ষেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই যুদ্ধেরই এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান রচিত হয় ১৯৭৭ সালে। এক পক্ষ নিরীহদর্শন সিটকা উইলো, আরেক পক্ষ ভয়ানক তাবু শুঁয়োপোকা (Tent catterpillar)। তাবুর মতো দেখতে বাসা বাঁধে বলে এরা এমন নাম পেয়েছে। ওয়াশিংটনের কিং কান্ট্রিতে স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা কাজে ব্যবহৃত বনটিকে এই পোকা আক্রমণ করে। এই পোকাগুলা নিষ্ঠুর এবং খুবই লোভী। পুরো বনে ছড়িয়ে যেতে যেতে এরা কয়েকটা গাছের সবগুলো পাতা নষ্ট করে ফেলে এবং আরো অনেক গাছের মারাত্মক ক্ষতি করে। আমরা জানি যে লড়াইতে হেরে গেলেও যুদ্ধে যেতা সম্ভব, গাছেদের ইতিহাসে এটা খুব বেশি রকম সত্য।

শুঁয়োপোকাদের আক্রমণের পরেও বেঁচে থাকা গাছেদের পাতা নিয়ে ২ বছর পরে সেই ইউনিভার্সিটিতে একটা পরীক্ষা করা হয়। ঐ গাছগুলোর পাতা শুঁয়োপোকাদের খাওয়ানোর পর দেখা যায় এদের বৃদ্ধির হার খুব কম। অথচ একই গাছের পাতা ২ বছর আগে খেয়ে তারা তুমুল গতিতে বেড়েছিল, বংশবৃদ্ধি করেছিল, অন্য গাছ আক্রমণ করেছিল। এর থেকে খুব সহজেই বুঝা যায়, পাতায় এমন কিছু আছে যা পোকাগুলোকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলছে। আমরা যারা গাছ নই তাদের ইমিউন সিস্টেমও কিন্তু এমন ব্যবস্থা থাকে, যাতে একটা জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলে পরে আর সেই জীবাণু (যেমনঃ বসন্ত) সাধারণত কিছু করতে পারে না।

তবে আশ্চর্যের ব্যপার এটাই যে, ঐ বন থেকে পুরো এক মাইল দূরের সুস্থ্য সিটকা উইলো গাছ, যেগুলো কখনোই আক্রান্ত হয়নি তাদের পাতাও দেখা গেলো শুঁয়োপোকাদের জন্য বিষাক্ত। সেই পাতা খেয়ে পোকাগুলো এতটাই নিস্তেজ আর নাজুক হয়ে গেল যে দুই বছর আগেকার তাদের ধ্বংসাত্নক রূপ কল্পনাও করা যাচ্ছিল না।

বিজ্ঞানীরা কাছাকাছি গাছেদের মধ্যে মূল থেকে মূলে যোগাযোগের ব্যপারে জানতেন। এই যোগাযোগ মাটির নীচে মূল থেকে ক্ষরিত বিভিন্ন পদার্থের মাধ্যমে হয়। কিন্তু মাইলখানেক দূরে অবস্থিত দুই দল উইলো গাছের মধ্যে কোনো মৃত্তিকাকথনের সুযোগ নেই দূরত্বের কারণে। হয়তো মাটির উপরে কোনো সংকেত অদল বদল হয়েছে এক্ষেত্রে। বিজ্ঞানীরা পরে উপসংহার টেনেছেন গাছগুলো যখন শুঁয়োপোকা দিয়ে আক্রান্ত হয়, তখন তারা পাতাগুলোতে পোকাদের জন্য বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করা শুরু করে। এই ঘটনা বিভিন্ন ভিওসির উৎপাদনকেও নাড়া দেয়। গবেষকদের অনুমান, এই ভিওসি বাতাসে ভেসে দূরের উইলো গাছগুলোর আসেপাশে পৌছালে তারা একে সতর্কতা সংকেত ধরে নিয়ে নিজেদের দেহেও সেই শুঁয়োপোকানাশক তৈরি শুরু করে। ১৯৮০ সালের মধ্যে ওই বনে এবং তার আশেপাশে শুঁয়োপোকাদের বংশের পর বংশ শোচনীয়ভাবে ধ্বংস হতে থাকে এসব বিষের কারণে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চাল দিয়ে গাছেরা যুদ্ধের পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই নিয়ে নেয়।

বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা প্রতীত হলেন, বায়বীয় কোনো সংকেতের উপস্থিতিই এই ঘটনার সম্ভাব্য ব্যখ্যা। গাছেদের হয়তো আমাদের মতো চিন্তা করার, অনুভব করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা হয়তো ঠিকই একে অপরের খেয়াল রাখে। সংকটের সময় শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, দূরবর্তী স্বজাতিকেও জানিয়ে দেয় বিপদের কথা। সিটকা উইলো এক্সপেরিমেন্ট একটি চমৎকার ও অসাধারণ উদাহরণ যা বদলে দিয়েছিল অনেক কিছু। সমস্যা একটাই, গাছ থেকে গাছে দূর-আলাপনের মতো ব্যাবস্থার অস্তিত্ব কাউকে বিশ্বাস করাতে ২০ বছর লেগেছিল।

[প্রফেসর হোপ জাহরেন এর আত্মচরিত Lab Girl বইটির একাদশ তম অধ্যায়ের ভাবানুবাদ]