অভ্যাসের শক্তি ও অবিশ্বাস্য রহস্যময়তা

মানুষ অভ্যাসের দাস। এ কথা সবাই জানি। আমরা যদি নিজেদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবো এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের উপকার করছে। পাশাপাশি এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের ক্ষতি করছে। এর পাশাপাশি হয়তো নতুন কোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি, কিংবা বাজে কোনো অভ্যাস থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করেছি। হয়তো সফল হতে পেরেছি, কিংবা হতে পারিনি।

কখনো কি নিজেদের অভ্যাসগুলোর মধ্যেকার প্যাটার্ন খুঁজতে চেষ্টা করেছি? যে অভ্যাসের আমরা দাস সেই বিষয়টা নিয়ে খুব করে ভেবেছি কি? নাকি মেনেই নিয়েছি এই দাসত্ব থেকে বের হবার উপায় নেই?

আপনি-আমি না ভাবলেও অনেকেই ভাবে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা ভাবে। ভালো ভালো কোম্পানিগুলোর হর্তাকর্তারা শুধু ভাবেনই না, মোটা অংকের টাকাও ঢালেন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

এখানে একজন মানুষের গল্প বলবো। তার নাম ইউজিন পলি। স্মৃতিভ্রংশ (Amnesia) আক্রান্ত যত কেস আছে তার মধ্যে খ্যাতির দিক দিয়ে তিনি দ্বিতীয়। তবে ইউজিনের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার এবং তার পরিবারের জন্য দুঃখজনক। তবে সেসব ঘটনাগুলোই বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে এনেছে স্মৃতি ও অভ্যাস নিয়ে আমাদের চিন্তাধারায়।

তখন ১৯৯৩ সাল। ৭০ বছর বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান ইউজিন পলি ও তার স্ত্রী বেভারলি এক সন্ধ্যায় ডিনার করছিলেন। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, যখন বেভারলি জানালেন যে পরের দিন তাদের সন্তান মাইকেল দেখা করতে আসছে তখন ইউজিন একটু উদ্ভট আচরণ দেখালেন। তিনি যেন মনে করতে পারছিলেন না তাদের কোনো সন্তান আছে।

পরের দিন ইউজিন বমি এবং পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৪ ঘণ্টায় তার পানিশূন্যতা মারাত্মক আকার ধারণ করলে শঙ্কিত বেভারলি তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলেন। ইউজিনের দেহের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ঠেকলো আর তার হলুদাভ ঘামে ভিজে যাচ্ছিলো শুভ্র বিছানার চাদর। ইউজিন বিকারগ্রস্ত ও হিংস্র হয়ে পড়লে তাকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে যায়। বহু কষ্টে চেতনা নাশক প্রয়োগ করে শান্ত করলেন। এরপর ডাক্তাররা তার মেরুদণ্ডের ভেতর নিডল ঢুকিয়ে কয়েক ফোটা সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষা করে দেখা যায় ইউজিন ভাইরাল এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত। এনসেফালাইটিস ঘটায় এক প্রায় নিরীহ ভাইরাস হার্পিস সিমপ্লেক্স। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা জ্বর-ঠোসা কিংবা ত্বকের ফুসকুড়ি বেশি ক্ষতি করতে পারে না। যদিও অত্যন্ত বিরল, তারপরেও এই ভাইরাস যদি রক্তে ভেসে ভেসে কোনোক্রমে মাথায় পৌঁছে যায় তাহলে মগজের সুস্বাদু ব্রেইন টিস্যু খেতে থাকে। যে টিস্যুতে আমাদের ভাবনা, স্মৃতি, স্বপ্ন, দক্ষতা ইত্যাদি সবকিছুই অবস্থান করে।

চিত্র: হার্পিস সিমপ্লেক্স সাধারণত জ্বর-ঠোসা-ফুসকুড়ির বেশি ক্ষতি করতে পারে না।

ডাক্তাররা তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কিন্ত তারপরেও উচ্চ মাত্রার এন্টিভাইরাল প্রয়োগ করে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিয়ে বিস্তার এই আক্রমণ ঠেকানো গেলো। কিন্তু যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তা আর ফেরানো যায়নি। ব্রেইন স্ক্যানে ধরা পড়ে মগজের মধ্যভাগে এক অশুভ ছায়া। ক্র্যানিয়াম এবং স্পাইনাল কলাম যেখানে মিলিত হয় সেখানের অনেকখানি টিস্যু ভাইরাস ধ্বংস করে দিয়েছে।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন ইউজিন বেশ দুর্বল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে অবস্থা ভালো হলো। তিনি স্বাভাবিক মানুষের মতোই চলাফেরা করতে শুরু করলেন। কিন্তু, তিনি বুঝতে পারছিলেন না সপ্তাহের কোন দিন এটি। কিংবা ডাক্তার ও নার্সদের নাম বারবার বলার পরও কেন তাদের নাম মনে রাখতে পারছিলেন না। এমনকি তাদের সাথে যে পরিচয় হয়েছে সেটাও তার স্মৃতিতে নেই।

বাড়িতে নিয়ে আসার পর আরও অদ্ভুত সমস্যা দেখা গেলো। ইউজিন তার বন্ধুদের কথা ভুলে গেছেন। তিনি কথোপকথন চালিয়ে নিতে পারছিলেন না। কোনো কোনো সকালে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত। উঠে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেতেন। তারপর আবার বিছানায় শুয়ে মাথা চাদরের নিচে ঢুকিয়ে রেডিও চালিয়ে দিতেন। কিছু সময় পর তিনি আবার একইভাবে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেয়ে বিছানায় গিয়ে চাদরে মাথা মুড়ে রেডিও শুনতেন। একই কাজ এভাবে বেশ কয়েকবার চলতো।

ঘটনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন বেভারলি। তিনি ইউজিনকে নিয়ে ছুটলেন বিশেষজ্ঞদের কাছে। তার মধ্যে একজন হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্রফেসর ল্যারি স্কুইর। স্মৃতির নিউরো এনাটমি নিয়ে এই বিজ্ঞানীর তখন ৩ দশকের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে এই ব্যাপারে তার আগ্রহও ছিল বেশ। ইউজিন পলিকে নিয়ে ল্যারি স্কুইরের কাজ অচিরেই তার নিজের কাছে নতুন জগতের উন্মোচন করলো। পাশাপাশি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের জন্যও হয়ে উঠলো নতুন দুয়ার।

‘অভ্যাস’ জিনিসটা কত শক্তিশালী, আর কতটা গভীরে অভ্যাসের অনুরণন- এই ব্যাপারগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদেরকে। স্কুইরের কাজ এটাই প্রমাণ করেছিল, নিজের নাম ও বয়সের মতো তথ্যও মনে রাখতে পারে না এমন কারো পক্ষেও জটিল কোনো অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।

চিত্র: ল্যারি স্কুইর

চিকিৎসার সময় বিশেষজ্ঞ স্কুইর রোগী ইউজিনের সাথে কথাবার্তা শুরু করলেন তার যুবক বয়সের কথা জানতে চেয়ে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বলে গেলেন সেন্ট্রাল ক্যালিফোর্নিয়ার যে শহরে তিনি বড় হয়েছেন তার কথা। মার্চেন্ট মেরিন থাকার সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় সফরের কথা। জীবনের বেশিরভাগ স্মৃতিই মনে করতে পারছেন যেগুলো ১৯৬০ এর আগে ঘটেছিল।

যখন স্কয়ার এর পরের কোনো সময়ের কথা জানতে চাইছিলেন তখন ইউজিন বিনয়ের সাথে বলছিলেন “দুঃখিত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মনে করতে আমার সমস্যা হয়।”

প্রফেসর তার বুদ্ধিমত্তার কিছু পরীক্ষা নিলেন, দেখা গেল তিনি সেসবে বেশ ভালো করলেন। যেসব স্বাভাবিক অভ্যাস অনেক আগেই গড়ে উঠেছিল সেসবও তার মধ্যে ভালোভাবেই ছিল। যেমন স্কুইর যখন তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন, তিনি ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। প্রফেসর যখন ইউজিনের কোনো উত্তরে খুশি হয়ে প্রশংসা করছিলেন তিনিও প্রতিউত্তরে প্রশংসা করছিলেন।

নতুন কারো সাথে দেখা হলে তিনি নিজেই আগে পরিচয় দিয়ে দিনটি কেমন কাটল জিজ্ঞেস করছিলেন। কিন্তু স্কুইর যখন তাকে একটা সংখ্যার সিরিজ মুখস্থ করতে দিচ্ছিলেন, অথবা ঘরের বাইরের হলওয়ের স্কেচ আঁকতে বলছিলেন, তা তিনি পারছিলেন না। আসলে নতুন কোনো তথ্যই তার মাথায় মিনিট খানেকের বেশি থাকতো না।

সবচেয়ে দুঃখজনক যে তার অসুস্থতা কিংবা ঐ সময়ে হাসপাতালে থাকা সংক্রান্ত কোনো স্মৃতিই মনে নেই। আসলে তার নিজের যে মানসিক প্রতিচ্ছবি ছিল তাতে কোনো অসুস্থতা বা স্মৃতিভ্রষ্টতা সংক্রান্ত তথ্য নেই। সে কারণে তার সমস্যা কী সেটাও তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি সবসময় নিজেকে সুস্থই ভাবতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভেবে গেছেন তার বয়স ৬০ বছর। অথচ তিনি আক্রান্তই হয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সে।

মাস খানেক পর ইউজিন ও বেভারলি তাদের বসবাসের জায়গা বদলিয়ে স্যান ডিয়াগোতে চলে আসেন। সেসময় প্রায়ই প্রফেসর স্কুইর তথ্য নিতে ঐ বাসায় যেতেন। একদিন স্কুইর ইউজিনকে বললেন তাদের নতুন বাসার কোনো ঘর কোথায় আছে সেটার একটা ব্লু-প্রিন্ট এঁকে দিতে। তিনি সেটা করতে পারলেন না। এরপর স্কুইর তার কম্পিউটারে কাজে মন দিলেন। ইউজিন তখন উঠে গিয়ে বাথরুমে গেলেন। সেখান থেকে ফ্ল্যাশের শব্দও এলো। কাজ সেরে টাওয়েলে হাত মুছে তিনি ফিরেও এলেন স্কয়ারের পাশে।

সেই সময়ে কেউই ভাবেনি, একটি মানুষ তার বাসার কোন রুম কোথায় আছে সেটা এঁকে দেখাতে পারে না কিন্তু একা একাই বাথরুম করে আসতে পারছে কোনো সমস্যা ছাড়াই। এরকম ঘটনা এবং কাছাকাছি এধরনের আরো কিছু জিজ্ঞাসাই পরবর্তীতে এমন কিছু আবিষ্কারের রাস্তা খুলে দিয়েছিল যার মাধ্যমে অভ্যাসের শক্তি সম্পর্কে মানুষ বুঝতে পেরেছে।

স্যান ডিয়াগোতে আসার প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেভারলি নিজেই ইউজিনকে দুই বেলা করে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। ডাক্তারদের নির্দেশনা ছিল যে তার চলাফেরা ও ব্যায়ামের দরকার। তাছাড়া ঘরে থাকলে বারবার একই প্রশ্ন করে করে তিনি বেভারলিকে পাগল করে দিতেন। যেহেতু তিনি সবই কয়েক মিনিটের মধ্যে ভুলে যান, তাই সবসময় বাইরে তার সঙ্গী কেউ একজন থাকতে হবে। নয়তো তিনি হারিয়ে গেলে হয়তো আর ফিরে আসতে পারবেন না।

কিন্তু এক সকালে বেভারলি তৈরি হবার আগেই ইউজিন বেরিয়ে যান। একা একা। টের পেলে বেভারলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি পাগলের মতো এখানে সেখানে খুঁজে যখন পেলেন না তখন পুলিশকে জানিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেন। দেখা গেল ইউজিন ঘরে বসে আছেন, তার সামনে টেবিলে একটা পাইন-কোন রাখা।

পরবর্তীতে বুঝা গেল যে ইউজিনের যদিও ধারণা নেই তিনি কোথায় থাকেন, তারা বাড়ি কোনোটি। কিন্তু বেভারলির সাথে সকাল বিকাল হাঁটতে হাঁটতে তার অভ্যাস দাড়িয়ে গেছে যার মাধ্যমে তিনি অবচেতনেই চিনে চিনে হেঁটে আসেন ঐদিন।

বেভারলি তাকে নিষেধ করেছিলেন একা বাইরে যেতে, কিন্তু সেটা মেনে নিয়ে মনে রাখা সম্ভব হতো না। তিনি ভুলে যেতেন আর বেরিয়ে পড়তেন। শুরুতে কিছুদিন তাকে অনুসরণ করতেন যেন হারিয়ে না যান। পরে দেখা গেল না, তিনি আসলেই একা চলাফেরা করতে পারছেন। কখনো কখনো পাইন কোন, ফল, পাথর এসব নিয়ে আসতেন। একদিন ওয়ালেট আর আরেকদিন কুকুরছানাও ঘরে এনেছিলেন। কিন্তু তার স্মরণেই নেই সেসব কোথায় পেয়েছিলেন।

এই ঘটনাগুলো শোনার পর প্রফেসর স্কুইর একদিন তার সঙ্গীদের সাথে করে নিয়ে এলেন। হাঁটার সময় হলে ইউজিন তাদের একজনের সাথে হাঁটতে বের হলেন যার ওই এলাকার পথঘাট সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ইউজিন নিজেই পথ দেখিয়ে ঘুরে আসলেন। যখন বাসার কাছাকাছি চলে এসেছেন তখন সেই বিজ্ঞানী জানতে চাইলেন কোনটা ইউজিনের বাসা, ইউজিন সেটা বলতে পারলেন না।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে একদম ঠিক জায়গাতেই পৌঁছালেন। কিংবা ঘরের ভেতর যখন জিজ্ঞেস করা হলো রান্নাঘর কোনদিকে সেটাও তিনি বলতে পারলেন না। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, যখন জিজ্ঞেস করা হলো ক্ষুধা লাগলে তিনি কী করতেন। দেখা গেলো তিনি উঠে গিয়ে রান্না ঘরে বয়াম থেকে খাবার বের করে নিয়ে এলেন।

এরকম আরো কিছু ঘটনার পর আর বুঝতে বাকী রইলো না যে ইউজিনের মস্তিষ্ক যদিও সচেতনভাবে কোনো নতুন তথ্য গ্রহণ করছে না কিন্তু অবচেতনভাবে ঠিকই করছে। এবং তা ব্যবহারও করছে। এরপর বেশ কিছু এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও অভ্যাসের এই ব্যাপারটি প্রমাণ করা সম্ভব হয়।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে মস্তিষ্কের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সবাই জানতে পারলেন যে একটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে সবকিছু ভুলে গেলেও সেই অনুযায়ী অবচেতনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব। ইউজিন এবং স্কুইর আমাদের দেখালেন যে স্মৃতি এবং বোধের সাথে সাথে অভ্যাসও আমাদের আমাদের আচরণের মূল ভিত্তি গঠন করে।

আমাদের হয়তো মনে না-ও থাকতে পারে কীভাবে বা কী কারণে কোনো একটা অভ্যাস আমরা গড়ে তুলেছি। কিন্তু একবার সেগুলো নিউরনে সংরক্ষিত হয়ে গেলে, তা আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে, আমাদের অজান্তেই।

ইউজিনকে নিয়ে স্কুইরের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হবার পরে অভ্যাস গঠনের বিজ্ঞান পরিণত হল গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়ে। ডিউক, হার্ভার্ড, প্রিন্সটনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রোক্টর এন্ড গ্যাম্বল, গুগল, মাইক্রোসফট সহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা অভ্যাসের নিউরোলজি এবং সাইকোলজি, এর শক্তি ও দুর্বলতা, কীভাবে অভ্যাস তৈরি হয় এবং নিজেদের কাজে লাগানো যায় সেসব বুঝার জন্য শ্রম দেয়া শুরু করলেন।

সব অভ্যাসেই তিনটা স্তর আছে। Cue-Routine-Reward। গবেষকরা জানতে পারলেন Cue হতে পারে যেকোনো কিছুই। হতে পারে সেটা টসটসে ক্যান্ডি বার, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, কোনো বিশেষ জায়গা, দিনের কোনো একটি সময়, আবেগ, চিন্তার ক্রম কিংবা বিশেষ কোনো মানুষের সাহচর্য। Routine হতে পারে প্রার্থনার মতো জটিল কিংবা বাটন চাপার মতো সহজ কোনো কাজ। আবার Reward ও হতে পারে কোনো খাবার বা রাসায়নিক যেটা দেহে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে, কিংবা গর্ব অথবা আত্মতুষ্টির মতো আবাগীয় প্রণোদনা।

পরবর্তী প্রতিটা এক্সপেরিমেন্টই ইউজিনের সাথে স্কুইরের আবিষ্কার প্রতিধ্বনিত হয়েছে। অভ্যাস অনেক শক্তিশালী, কিন্তু বেশ সূক্ষ্ম। তারা আমাদের সচেতনতার বাইরে তৈরি হতে পারে, অথবা তাদেরকে সুচারুভাবে সাজিয়ে নেয়া যেতে পারে। যতটা আমরা ভাবছি তারচেয়েও জোরালোভাবে আমাদের জীবন অভ্যাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তারা এতটাই আগ্রাসী যে আমাদের মগজ এমনকি কমন সেন্স বাদ দিয়ে হলেও এদেরকে মেনে চলে।

আক্রান্ত হবার ৭ বছর পর, ২০০০ সালে ইউজিনের জীবনে একধরনের ভারসাম্য আসে। তিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরুতেন। যা ভালো লাগতো খেতেন, কখনো কখনো দিনে ৬ বারও তার আহার হয়ে যেতো। ডাক্তার তার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিলেও কাজ হয়নি। হবে কীভাবে? কেউ নিষেধ করলেও তো তা তিনি কয়েক মিনিট পরই ভুলে যেতেন। তার স্ত্রী স্কুইরের সাথে পরামর্শ করে চেষ্টা করতেন সবজি জাতীয় খাবার রুটিনে ঢুকাতে।

ইউজিনের দেহ বৃদ্ধ হলেও তিনি নিজেকে ভাবতেন ২০ বছর কম বয়সী। তাই চলাফেরায় যতটা সাবধানতা দরকার, তা তিনি আনতে পারেননি। তার স্বাস্থ্য ভালো রাখার নানা রকম চেষ্টা করা হলেও পরে খারাপ হতে থাকে। এক সকালে প্রচণ্ড বুকে ব্যথা নিয়ে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। হাসপাতালে নেয়ার পর বোঝা গেল এটি ছোটখাটো একটা হার্ট অ্যাটাক।

তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় যখন ব্যথা সেরে গেল তখন তিনি বার বার বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে চাইলেন। দেহের সাথে যুক্ত প্রোবগুলো খুলে ফেলতে চাইলেন যাতে তিনি উপুড় হয়ে ঘুমাতে পারেন। ডাক্তার এবং নার্সদের অনুনয়, বিনয়, হুমকি কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না।

একসময় তার মেয়ে বুদ্ধি দিলেন, যদি তার স্থির থাকাকে প্রশংসা করা হয়, কিংবা বুঝানো হয় তিনি ডাক্তারদের সহায়তা করে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তাহলে কাজ হতে পারে। হ্যাঁ, তাতে কাজ হয়েছিল। এর পরের কয়েকদিন নার্সরা তাকে যেটাই বলতেন সেটাই ইউজিন শুনতেন। কিছুদিন পরে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

২০০৮ সালে আরেক অঘটন ঘটলো। ফায়ারপ্লেসের পাশে রাখা খড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙ্গে গেলো। তাকে আবার হাসপাতালে যাওয়া লাগলো। স্কুইর এবং তার দল চিন্তিত হয়ে গেলেন। ইউজিন হয়তো হাসপাতালে নিজেকে একা দেখে ভয় পেয়ে উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে। তাই তারা বিছানার পাশে তার কী হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল এসব সম্পর্কে নোট রাখতেন।

তবে এবার ইউজিন বেশ শান্ত থাকলেন। তিনি যে সবকিছু সবসময় বুঝবেন না, এই বিষয়টাতে হয়তো তার মন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। বেভারলি তখন প্রতিদিন যেতেন হাসপাতালে।

তিনি বলেন “তাকে বলতাম আমি কতটা ভালোবাসি। আমাদের জীবন কত সুন্দর। পরিবারের অন্যদের ছবি দেখাতাম। তাকে জানাতাম সবাই তাকে কত পছন্দ করে। আমাদের ৫৭ বছরের বিবাহিত জীবনে ৪২ বছর ছিল স্বাভাবিক। কখনো কখনো এটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো, আমি পুরনো ইউজিনকে ফিরে পেতে চাইতাম। কিন্তু, অন্তত সে আনন্দে আছে ভেবে শান্তি পেতাম।”

এক বিকেলে তার মেয়ে ক্যারোল আসলেন দেখা করতে। তিনি ইউজিনকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের লনে বেড়াতে গেলেন। অনেক্ষন ঘুরাঘুরি, গল্পসল্প করার পর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল দেখে ক্যারল ইউজিনকে ভেতরে নেবার প্রস্তুতি শুরু করলেন। তখন ইউজিন আচমকা বলে বসলেন ‘তোমার মতো কন্যা পেয়ে আমি ভাগ্যবান’। একথা শুনে ক্যারল হতবাক হয়ে যান। তার বাবা শেষ কবে এত মিষ্টি করে কিছু বলেছিলেন তা তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।

সেই রাতে যখন একটা বাজে তখন বেভারলির ফোন বেজে উঠে। ওপাশ থেকে জানানো হল ইউজিন চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তার বিদায়ে বিজ্ঞানীমহল মর্মাহত, ইউজিনকে নিয়ে গবেষণা, তার ব্রেইন স্ক্যান, তার জীবনযাপন বহু বিজ্ঞানীকে উপকৃত করেছে এবং করবে। বেভারলি বলেছিলেন “বিজ্ঞানে ইউজিনের অবদান তাকে গর্বিত করে। আমাদের বিয়ের পরপরই ইউজিন বলেছিল যে সে জীবনে অর্থপূর্ণ কিছু করতে চায়, এবং সে তা করেছিল। কিন্তু আফসোস, সে কোনোদিন তা জানতেও পারেনি।”

ইউজিন পলির সমাধিস্থল

তথ্যসূত্র

Charles Duhigg রচিত The Power of Habit থেকে অনুপ্রাণিত

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

গোঁফ কেটে স্ট্রোকের চিকিৎসা

স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার পর সুস্থ্য হতে কতদিন লাগবে কিংবা আদৌ সুস্থ হবেন কি না তা ঠিক আগে থেকেই বলা যায়না। কিন্তু কিছু কিছু কার্যকলাপ যদি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে সুস্থ করতে পারে।

সম্প্রতি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন মু লি উদ্ভাবন করেছেন যে, ইঁদুরের গোঁফ ছোট করে দিলে তারা স্ট্রোক থেকে অপেক্ষাকৃত দ্রুত সুস্থ হয়। তিনি বলেছেন “এটাই প্রথম গবেষণা যাতে মগজের বিশেষ কিছু অংশকে পুনর্বিন্যাসের প্রতি সংবেদনশীল করা গেছে।”

তাদের পরীক্ষায় লি ও তার দল ইঁদুরের মস্তিষ্কের সামনের ডান পায়ের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রক অংশে কৃত্রিমভাবে স্ট্রোক ঘটান। এরপর অর্ধেক সংখ্যক ইদুরের গোঁফ ছোট করে ৮ সপ্তাহ রাখেন।

image source: flickriver.com

দেখা গেল ছোট গোঁফের ইদুরগুলো ৫ সপ্তাহের মধ্যে নিরাময় লাভ করলো এবং ডান পাটিকে সম্পুর্নরূপে ব্যবহার করতে শুরু করলো। অন্যদিকে লম্বা গোঁফের ইদুরগুলোর ৭ সপ্তাহে পুরো সুস্থ্য হয়নি আর কখনোই ডান পা কে ঠিক মত ব্যবহার করতে পারেনি।

ছবি তুলে জানা গেছে ছোট গোঁফের ইঁদুরের মস্তিষ্কের রিম্যাপিং ঘটেছে। যেই অংশ আগে গোঁফ থেকে আগত স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতো সেটা এখন সামনের পায়ের স্নায়ু নিয়ন্ত্রনের কাজও করছে। এটা অন্য ইদুরগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু হয়নি। যখন গোঁফ পুনরায় বড় হলো, রিম্যাপ হওয়া অংশ একই সাথে পা এবং গোঁফের স্নায়বিক সংকেত নিয়ে কাজ করতে পারছে।

লি বলেন, অন্ধ প্রাণি কিংবা মানুষের ক্ষেত্রে যা ঘটে, রিম্যাপিং আসলে সেটাই। যখন চোখ থেকে কোন সংকেত আসেনা তখন তার জন্য সংরক্ষিত মস্তিষ্কের অংশ শব্দ, ভাষা কিংবা গণিতে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

লি আশা করেন এই নতুন অনুধাবন রোগীদের জন্য নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজে দেবে।

ব্যাঙ যখন বোকা শিকারী

১৯৯৭ সালে বের হওয়া অ্যানাকোন্ডা মুভিতে গল্পের খাতিরে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার দেখানো হয়েছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো যে, অ্যানাকোন্ডা তার গিলে ফেলা শিকারকে জ্যান্ত উগড়ে বের করে দেয় আরেকবার হত্যার রোমাঞ্চ পেতে। প্রকৃতপক্ষে অ্যানাকোন্ডার গেলার সময় শিকারকে যে ধরনের সংকোচন প্রসারণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বের হবার সময় তাতে আর প্রাণপাখির পালকটাও থাকে না।

bombardier beetle
ফোরসেপ দিয়ে উত্যক্ত করায় বোম্বার্ডিয়ার বিটলের ঘটানো বিস্ফোরন; image source: Nbcnews

তবে কিছু কিছু পান্ডব আছে, যারা শিকারির পেটের ভিতর থেকে ঘুরে আসতে পারে। এরকম একটি হচ্ছে বোম্বার্ডিয়ার বিটল। এরা এক ধরনের জ্বালাময় রাসায়নিক নিক্ষেপ করে বলে তাদের এমন নাম। দুটো আলাদা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত আপাত নিষ্ক্রিয় দুই ধরনের রাসায়নিক উপাদান যখন মিশ্রিত হয় তখন এক ধরনের বিস্ফোরণ হয়। এই বিটলরা সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার এমন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। যার ফলে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রাসায়নিক তার শরীর থেকে ঘন্টায় ২২ মাইল বেগে বের হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় বেশিরভাগ শিকারি ভয় পেয়ে গেলেও ব্যাঙ এর কাছে বোম্বার্ডিয়ার কিছুটা অসহায়। কারণ ব্যাঙ এত দ্রুত তার জিহবা দিয়ে ছোঁ মারে যে পোকাটি কিছু বুঝে উঠার আগেই পেটের ভিতর চলে যায়। তবে এরপর পোকাটি ব্যাঙের পেটের ভিতরই যখন তার অস্ত্র চালায় তখন বাইরে থেকেও তার শব্দ পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক বিষাক্ত না হলেও এতটাই বিচ্ছিরি যে ব্যাং তাকে উগলে দিতে বাধ্য হয়। তবে, ব্যাঙের কিন্তু আমাদের মতো গ্যাগ রিফ্লেক্স নেই যার কারণে সে বমি করতে পারে না। তাদের একমাত্র উপায় পাকস্থলিকে উল্টে ফেলা। যা করতে তার ৪৫ মিনিট সময় লাগে। এই পোকাগুলো নিজেরা কিন্তু বিষাক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ফোরসেপ দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরক্ত করার পর যখন তাদের বিস্ফোরক সম্পুর্ণ্রুপে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তারপর কিন্তু ব্যাঙ এদের আরামেই খেয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে বোম্বার্ডিয়ারের মধ্যেও কিন্তু পাকস্থলির এসিডপূর্ণ পরিবেশেও বহুক্ষণ টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে।

ব্যাঙের পেট থেকে ছাড়া পাবার আরো কিছু ঘটনা রয়েছে। ২০০২ সালে পূর্ব তিমুরে অভিযানের সময় মার্ক’ও শেয়া তার ল্যাবের দরজা খোলা রাখার জন্য একটা পাথর খুঁজতে যান। একটাকে সুবিধাজনক মনে হওয়ায় যখন সেটা তুলতে গেলেন দেখা গেলো পেছনে একটা কোলাব্যাঙ এবং তার পিছন দিয়ে বের হয়ে আছে একটা ব্রাহ্মিনি সাপ। এই সাপটি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো। ফুলের টবে লুকিয়ে থাকার স্বভাবের কারণে এরা সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে গেছে। অন্ধকার, অক্সিজেন শূন্য কিংবা সংকোচনশীল পরিবেশে এরা টিকে থাকতে পারলেও ব্যাঙের পশ্চাৎদেশ এদের প্রাকৃতিক আবাসন নয়। ব্যাঙটি হয়তো তাকে কেঁচো ভেবে গিলে ফেলেছিল এবং সর্পসাহেব তার ভক্ষকের সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্র ঘুরে এসে পেছন দিয়ে বের হতে চেষ্টা করছে। ও’শিয়া এদেরকে ধরে নিয়ে আলাদা হতে সাহায্য করেন। সাপটি অবশ্য এর পর আর কয়েক ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনি।

brahminy blind snake
ব্রাহ্মিনি সাপ, image source: californiaherps.com

কিছু কিছু প্রাণীর জন্য কিন্তু ভক্ষিত হওয়া সুবিধাজনক। বহু শামুক পাখির পেটে গেলেও বেঁচে থাকে আর এভাবে করে দূর দূরান্তে ছড়াতে পারে। যদিও ডাঙ্গার শামুকের চলাচলের প্রকৃতি খুবই ধীর, কিন্তু পাখির মাধ্যমে তারা ভিন্ন মহাদেশেও পৌঁছে যেতে পারে, যে সম্ভাবনার কথা ডারউইন বলে গিয়েছিলেন আর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন।

epomis beetle infesting on frog
ইপোমিস বিটলের লার্ভা দ্বারা আক্রান্ত ব্যাঙ

কখনো কখনো কিন্তু ভক্ষিত প্রাণী তার ভক্ষনকারীর অবস্থা নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে। গিল উইজেন এবং আভিতাল গাসিথ এমনই এক নজির পেয়েছেন ইপোমিস বিটল সম্পর্কে জানতে গিয়ে। এই পোকারা ব্যাঙ ছাড়া কিছু খায় না। ব্যাঙ যখন এদের ধরার জন্য জিভ ছোটায় তখন এরা সুকৌশলে আক্রমণকারীর মুখ কামড়ে ধরে এবং ধীরে ধীরে তাকে খেয়ে নেয়। বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০০ পর্যবেক্ষণে প্রতিটাতেই জিতেছিলো ইপোমিস। শুধু একটা ঘটনায় প্রথমে ইপোমিস হেরে যায়। কিন্তু ২ ঘন্টা পর ব্যাঙটি ইপোমিসকে উগড়ে দেয়ার পর নাটকীয়ভাবে সে তার খাদককে খেতে শুরু করে।

ব্যাক্টেরিয়ার ন্যানোফাঁদ

পৃথিবীতে সাতশ প্রজাতির মাংশাসী গাছ রয়েছে। তাদেরই মধ্যে অন্যতম ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ। যুগে যুগে এই উদ্ভিদ বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী এবং আলোকচিত্রকরদের আগ্রহের বস্তু ছিলো। আর কিছুদিন আগে একদন বিজ্ঞানী ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বানিয়েছেন ব্যাক্টেরিয়া ধরার ন্যানোফাঁদ।

venus flytrap
চিত্রঃ ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ

যখন ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া রক্তে প্রবেশ করে তখন তারা দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে মারাত্বক সব রোগ তৈরি করে। এই অবস্থায় অ্যান্টিবায়োটিক যদিও কার্যকর সমাধান, তবে আর কতদিন? কিছুদিন পরপরই তো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। আবার আক্রান্ত রক্ত যদি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করা হয় তখন ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়া আলাদা করা গেলেও দ্রুত প্রবাহমান ধারা অনেকসময় আটকে যাওয়া ব্যাক্টেরিয়াকে আবার রক্তে টেনে নেয়।

dialysis vs nanotrap
চিত্রঃ ডায়ালাইসিসে জীবাণু ছুটে গেলেও ন্যানোফাঁদে ছুটবেনা

চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সের সো টিয়ে এবং তার সহকর্মীরা তাই ফ্লাইট্র্যাপের মত এক ধরনের ন্যানোফাঁদ বানিয়েছেন যা আরো দক্ষভাবে ব্যাক্টেরিয়া ধরতে পারে। এই ফাঁদের চারদিকে রয়েছে বাঁকানো ন্যানো তন্তু, সেই তন্তু গায়ে রয়েছে লেকটিনের আবরণ। লেকটিন এক ধরণের প্রোটিন যা ব্যাক্টেরিয়ার গায়ের কার্বোহাইড্রেটের সাথে সহজেই বন্ধন তৈরি করে। তন্তুগুলো ব্যাক্টেরিয়ার সাথে জড়িয়ে তাকে একটা সূক্ষ্ম খাঁচায় আটকে ফেলে।

টাইফয়েডসহ নানা রোগের জনক সালমোনেলা নিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে এই ন্যানোফাঁদ ৯৭ শতাংশ জীবাণুকে আলাদা করতে পারে। আবিষ্কারকরা বলছেন একই পদ্ধতিতে ভাইরাস, ক্যান্সার কোষ এসবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিনের রিচার্ড স্টলবার বলেন, এই পদ্ধতি অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে কাজে লাগতে পারে। কারণ এরকম জটিল ন্যানোমেশিনকে ফাঁকি দেয়ার উপায় বের করা ব্যাক্টেরিয়ার জন্য অত্যন্ত কঠিন।

প্রকৃতির ভুলঃ প্রিয়ন ও অট্টহাসি রোগ

প্রিয়নের নানা রূপ [রুহশান আহমেদ]

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের একটি দ্বীপরাষ্ট্র স্যান লরেঞ্জোর শাসক ‘পাপা মনজানো’র বাবা ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। তার একটি আবিষ্কার হলো রহস্যময় আইস-নাইন, যার সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিও জমে গিয়ে আইস-নাইনে পরিণত হয়। বহুকাল সেই আইস নাইন ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। একসময় পাপা মনজানো ক্যান্সারের যন্ত্রণা সইতে না পেরে আইস-নাইন খেয়ে আত্নহত্যা করেন। তার জমে যাওয়া দেহের স্পর্শে এসে তার ডাক্তারও জমে গিয়ে মারা যান। এ যেন ছোটবেলায় খেলা বরফ-পানির বাস্তব এবং ট্র্যাজিক সংস্করণ। এতটুকুই নয়, ঘটনাক্রমে পাপার দেহ গিয়ে পড়ে সমুদ্রে এবং সারা পৃথিবীর পৃষ্টে ও পেটে যত পানি আছে সব জমে গিয়ে বিশাল দূর্যোগ সৃষ্টি করে। বাকীটা জানতে হলে পড়তে হবে কার্ট ভনেগাট এর লেখা কল্পকাহিনী Cat’s Cradle।

আমাদের সৌভাগ্য যে, আইস-নাইন কাল্পনিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর জৈবিক প্রতিরূপ বাস্তব, যার নাম প্রিয়ন। ব্রায়ান কহে এবং পিটার ল্যান্সবারি ভেড়ার স্ক্র্যাপি রোগ সম্বন্ধে রচিত একটি নিবন্ধে কাল্পনিক আইস নাইনের সাথে প্রিয়নের তুলনা করেন। প্রিয়ন কী? সেটি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে প্রোটিন কী, মূলত প্রোটিনের গঠন জানলেই হবে।

কুড়ি ধরনের অ্যামিনো এসিড আছে, যারা মিলে মিশে হাজার হাজার প্রোটিন তৈরি করে। কোষে যখন প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়, তখন প্রথমে বিভিন্ন অ্যামিনো এসিড একে অপরের সাথে চেইনের মতো করে যুক্ত হয়। এ চেইন কিন্তু প্রোটিনের মতো কাজ করে না। এজন্য চেইনকে নানাভাবে ভাঁজ খেয়ে, প্যাঁচ খেয়ে, কখনো কখনো অন্য আরেক চেইনের সাথে গিট্টু বেঁধে নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকৃতি অর্জন করলে তবেই সেই প্রোটিন আমাদের উপকারে আসবে। সে এক বিশাল আয়োজন। তবে যা-ই হোক, এই যে প্যাঁচগোচের ব্যাপার আছে প্রোটিনের গঠনে, তাতে যদি উল্টা-পাল্টা কোনো ভুল হয়? হ্যাঁ, ভুলের সবসময়ই একটা মাশুল আছে যা সেই প্রোটিনকেই দিতে হয় অন্য আরেক প্রোটিনের ঘ্যাচঘোচের শিকার হয়ে! তবে কখনো কখনো, ভুল প্যাঁচের প্রোটিন ঠিকই ফাঁকি দিয়ে বেঁচে যায়। আর নানান অসুবিধার কারণ হয়, এদের মধ্যে যেগুলো ভাইরাস/ব্যাক্টেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোই প্রিয়ন।

আচ্ছা এগুলো নাহয় বুঝলাম, তো প্রিয়ন কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে?

উদাহরণ হিসেবে ভেড়ার রোগ স্ক্র্যাপির কথাই ধরি, তার আগে বলে নিই স্ক্র্যাপি হলে ভেড়ার কী হয়। নিজেই নিজের হাত পা কামড়ায়, হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঝাঁকায়, মাতালের মতো হাঁটাহাঁটি করে, কোনো জিনিসে ক্রমাগতভাবে আঘাত করতে থাকে, সময়ে সময়ে খরগোশের মতো সামনের দু’পা তুলে লাফানোরও চেষ্টা করে। ভেড়ার সমাজে কোনো গল্পকার থাকলে নিশ্চয়ই স্ক্র্যাপি আক্রান্ত ভেড়াদের নিয়ে ভয়ংকর সব গল্প লিখতে পারতেন। ভেড়ার মগজে প্রয়োজনীয় একটি প্রোটিনের ভুল প্যাঁচ খাওয়া রূপ স্ক্র্যাপির জন্য দায়ী একটি প্রিয়ন। এ প্রিয়নের সংস্পর্শে এলে ভালো প্রোটিনও নিজের আকৃতি বদলে প্রিয়ন হয়ে যায়, ঠিক যেমন আইস নাইনের সংস্পর্শে এসে পানি বদলে যায় আইস-নাইন এ। এভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রিয়ন জমে এবং ভেড়ার নিউরন ধ্বংস করে। ভেড়ার দেহ থেকে নানাভাবে এ প্রিয়ন পরিবেশে ছড়ায়। সুস্থ ভেড়া খাদ্যের সাথে কিংবা অন্য কোনোভাবে পরিবেশ থেকে এ প্রিয়ন গ্রহন করলে সেও স্ক্র্যাপিতে আক্রান্ত হয়। শুধু কি ভেড়া? গরুর বিখ্যাত “ম্যাড কাউ” রোগের কারণও প্রিয়ন। আফ্রিকার মানুষখেকো জংলী গোষ্ঠীতে ক্রাউতজফেলডট-জ্যাকবস ডিজিসের কারণ প্রিয়ন। এছাড়াও আলঝেইমার, পার্কিনসন্স, হান্টিঙ্গটনে কিছু প্রোটিনের প্রিয়নের মতো আচরণকে বিজ্ঞানীরা দায়ী করেন।

যদিও প্রিয়নে কোনো ডিএনএ/আরএনএ থাকে না, কিন্তু তবুও এরা ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়ার মতো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে এবং সেই তথ্য নিজেরা ধারণ করে। এরা আবার রোগেরও সৃষ্টি করে, সে রোগ আবার সংক্রামকও হয়। কোনো নিউক্লিক এসিডের সাথে যোগসাজস ছাড়াই শুধু প্রোটিন যে এসব করতে পারে, ১৯৮২ সালে স্ট্যানলি প্রুজিনারের দেয়া সেই ধারণা বিজ্ঞানীমহলে আমন্ত্রিত হয় যথেষ্ট বিদ্রুপ এবং উপহাসের সাথে। তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটি অহরহই ঘটে, সেকালের অপবাদ একালের মতবাদ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয়নের ব্যাপারটাও এমন। ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়লো। তবে ২০১০ সালে ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির জিয়ান মা এর হাত ধরে প্রিয়ন তার অকাট্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি তার সহকর্মীদের সাথে রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন থেকে একদম আনকোরা এক সংক্রামক প্রিয়ন তৈরি করে দেখান।

প্রিয়নের নামে অনেক বদনাম করা হলো, চলুন এবার কিছু ভালো কথা শোনা যাক। ঈস্টের নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্যের অমেন্ডেলীয় বংশগতি জিনতত্ববিদদের বহুদিন অন্ধকারে রেখেছিল। নিম্নমানের পুষ্টিকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম সুপার-ডুপার কোনো ঈস্ট এবং অতি সাধারণ কোনো ঈস্টের সাথে যদি মিলন হয়, তাহলে দেখা যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সবারই সেই সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মেন্ডেলীয় জিনতত্ব অনুযায়ী অর্ধেকে এ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারণের কথা। এ ধরনের বংশগতি এর আগে শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা জিন, যেমন মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএতে লেখা বৈশিষ্ট্যের জন্য দেখা গেছে। ১৯৯৪ সালে রিড উইকনার এ ধাঁধার সমাধান প্রদান করেন। তিনি বলেন, যে প্রোটিনের (URE2) কারণে এ সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, সেই প্রোটিনের গঠনে সামান্য একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রিয়ন তৈরি হয়। এ প্রিয়ন আবার অন্যান্য URE2-কেও প্রিয়নে বদলে ফেলে এবং কোষ বিভাজনের সময় ঠিকই দুটি নতুন কোষে মাতৃকোষ থেকে রয়ে যায়।

উইকনারের এ ধারণা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্মোচন করে। প্রথমত, প্রিয়ন স্তন্যপায়ী ছাড়াও প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রিয়ন বংশগতিতে অবদান রাখতে পারে। পরবর্তীতে

গবেষণার মাধ্যমে ঈস্টে আরো ডজনখানেক প্রিয়ন পাওয়া গেছে যেগুলো নানাভাবে ঈস্টের জন্য উপকারী। এর মধ্যে একটি হলো Flo11p। এ প্রিয়নগুলো ঈস্টকে প্রতিকূল পরিবেশে একে অন্যের সাথে জড়াজড়ি করে থাকতে, অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক পরিবেশের দিকে কলোনীর বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। Flo11p আবার আরেক গ্রুপ প্রিয়ন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এ গ্রুপের প্রিয়নগুলো এমনভাবে সমন্বিত যেন পরিবেশে খাদ্যের পরিমাণ, অম্লত্ব/ক্ষারত্বের পরিবর্তন- এসবের বিপরীতে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোকে ট্রিগার করে। অর্থাৎ অনেকটা সুইচের মতো কাজ করে।

কোষবিদ্যার নানা পর্যায়ে যেটা ঈস্টের জন্য সত্য, তার সত্যতা উচ্চতর প্রাণিদের মধ্যেও পাওয়া গেছে। পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, “তাহলে আমরাও কি প্রিয়ন সুইচের ব্যবহার করে আসছি অজান্তেই?”

২০০৩ সালে কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এরিক ক্যানডেলের মনে হলো CPEB (Cytoplasmic Polyadenylation Element Binding protein) নামের একটি নিউরন প্রোটিনের সাথে ঈস্টের কিছু প্রিয়নের মিল আছে। সামুদ্রিক স্লাগের CPEB নিয়ে নাড়াচাড়া করে তারা বের করেন যে, এ প্রোটিন দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে কাজে লাগে। আরো দেখা যায় এরা বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারে সাড়া দিয়ে সিনাপ্সে শুধু নিজেদেরই সংখ্যাবৃদ্ধি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে প্রয়োজনীয় আরো কিছু প্রোটিন সংশ্লেষে ভূমিকা রাখে। তার মানে আমাদের নিউরনও প্রিয়নকে সুইচের সুবিধা নিচ্ছে কোনো অঘটন ছাড়াই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিয়ন সুইচের কথা বলা যায়, যেটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সহায়তা করে। কোষ যদি ভাইরাস আক্রমণের শিকার হয় সেখানে MAVS প্রোটিনটি প্রিয়নের ন্যায় নিজেদের বহুসংখ্যক প্রতিলিপি তৈরি করে, যার ফলে ইন্টারফেরন নিঃসরণ আরো জোড়ালো হয় এবং দেহ দ্রুত ম্যাক্রোফাজের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এটি কোষের জন্য ভয়ানক, কিন্তু দেহের জন্য অপরিহার্য।

তো আমরা বুঝতে পারলাম, ক্ষেত্রবিশেষে প্রিয়নের ভূমিকা কখনো ভালো, কখনো মন্দ। কখনো মগজে মগজে করেনিউরন ধ্বংস, কখনো আচরণ যেন স্মৃতি ধারণের অংশ। আবার দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও প্রিয়নের হাত আছে। আর ঈস্টের ক্ষেত্রে তো দলবদ্ধভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলাতে প্রিয়নই সাহায্য করছে। আইস নাইন এর জৈবিক প্রতিরূপ এ প্রিয়ন। এরা কি ভালো না মন্দ? সে বিচার আপনার।

তথ্যসূত্রঃ

The bright side of prion by Randal Halfman, The Scientist

 

জেনেটিক সুপারহিরো

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে। এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন। এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা

সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য। হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

গাছেদের বায়বীয় যোগাযোগ

গাছেদের বায়বীয় যোগাযোগ

ছোট্ট শহর সিটকা সম্ভবত আলাস্কার সবচেয়ে আরামদায়ক স্থান। বারানফ দ্বীপে অবস্থিত সমুদ্র তীরবর্তী শহর সিটকা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে সবসময়ই এখানকার আবহাওয়া মাতৃকোমল। এক মাসের গড় তাপমাত্রা সবসময়ই হিমাঙ্কের উপরে থাকে। ১৮৬৭ সালের অল্প কয়েকটি দিন ছাড়া শহরটির ইতিহাসে বলার মতো তেমন কোনো ঘটনা নেই। তখন সারা পৃথিবীর রাজনীতি সচেতন মানুষদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল এই সিটকা।

সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার অনেক কূটনীতিক সেখানে জড়ো হন। প্রতি একর মাত্র দুই সেন্টের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ানদের থেকে আলাস্কা কিনে নেয়। অর্ধ-মিলিয়ন বর্গমাইল বাবদ মাত্র সাত মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে আলাস্কার মালিকানা যুক্তরাষ্ট্র পাবে এমন চুক্তি হয় দুই দেশের মধ্যে। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিকের জন্য এই অংকটা অযৌক্তিক রকমের বেশি। যারা পক্ষের ছিল, তাদের দাবী ছিল- পরবর্তী পদক্ষেপে কানাডার প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়াকেও কিনে ফেলা হোক, আর বিপক্ষের লোকেদের যুক্তি ছিল জনমানবশূন্য এসব এলাকা অধিগ্রহণ করা দেশের জন্য বোঝাস্বরূপ। সে যাই হোক, কেউ কেউ আবার বলে থাকে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্যই সরকার তখন এই নাটকীয় চুক্তিটি সম্পন্ন করে।

সিটকা সংক্রান্ত আরেকটি নাটকের পর্দা উন্মোচিত হয় ১৯৮০ সালের দিকে। এই নাটক দুই জাতির মধ্যে হওয়া চুক্তির নয় বরং দুই প্রজাতির মধ্যে সংঘর্ষের।

বৃক্ষরাজি সিটকাকে ভালোবাসে। সিটকা সেই ভালোবাসার প্রতিদান দেয় লম্বা গ্রীষ্মকাল ও শান্ত আবহাওয়ায় গাছগুলোকে জড়িয়ে রেখে। ওখানকার জল, আলো, আর্দ্রতা সবই গাছেদের বসবাস এবং বেড়ে উঠার চমৎকার সংমিশ্রণ। সিটকা স্প্রাস, সিটকা অ্যাল্ডার, সিটকা অ্যাশ, সিটকা উইলো এরা হলো এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা। এছাড়াও এই প্রজাতির গাছগুলো সফলতার সাথে পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ওয়াশিংটন, ওরেগন এবং ক্যালিফোর্নিয়াতেও ছড়িয়ে গেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে অমায়িক বলা চলে সিটকা উইলোকে। দেখতে তেমন মনোরম নয়, উচ্চতা সর্বোচ্চ তেইশ ফিট। একদম সাদামাটা একটা গাছ। কিন্তু অন্যান্য অনেক গাছের মতোই সিটকা উইলোতেও যা কিছু দেখি বা জানি, তার চেয়ে অদেখা, অজানা ব্যপারগুলোর সংখ্যাই বেশি।

আপনি যখন ইউক্যালিপটাস বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটাচলা করেন তখন অনেক সময় ঝাঁঝালো, তীব্র ঘ্রাণের অস্তিত্ব টের পান। আসলে আপনি নিঃশ্বাসের সাথে নিচ্ছেন বাতাসে ভেসের বেড়ানো এক ধরনের রাসায়নিক যাকে বলা হয় উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compound) সংক্ষেপে ভিওসি। অনেক গাছই ভিওসি তৈরি করে। ভিওসি কোনো পুষ্টি সরবরাহ করে না, তাই মৌলিক জীবন প্রক্রিয়ার জন্য এরা গৌণ। ভিওসির অনেক ব্যবহার আছে যা আমরা জানি, আর অগুণিত সংখ্যক আছে যেসব আমরা জানি না। ইউক্যালিপটাস ভিওসি নিঃসরণ করে জীবাণুনাশক হিসেবে। গাছের পাতা কিংবা বাকল আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যেন কোনো জীবাণুর সংক্রমণের শিকার না হয় সেজন্য এই ব্যবস্থা।

বেশিরভাগ ভিওসি যৌগে কোনো নাইট্রোজেন থাকে না। তাই এটা তৈরি করা সহজ এবং সস্তা। ইউক্যালিপটাসের মতো বাতাসে এত এত ভিওসি ছেড়ে দিয়ে আশপাশ গন্ধ বানিয়ে ফেললেও গাছের তেমন কিছু আসে যায় না। তবে বেশিরভাগ ভিওসি কিন্তু আমাদের নাসারন্ধ্রে কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করে না। এতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ একে তো আমাদের ঘ্রাণশক্তি অন্যান্য প্রাণীর মতো এত তীব্র নয়, আর ঘ্রাণ ছড়ানোও ভিওসির উদ্দেশ্য নয়। বনের মধ্যে ভিওসির উৎপাদন কখনো বাড়ে, কখনো কমে।

নির্দিষ্ট ভিওসির উৎপাদন চালু কিংবা বন্ধ হয় বিশেষ কিছু সংকেতের মাধ্যমে। এরকম একটি সাংকেতিক যৌগ হলো জ্যাসমোনিক এসিড, যা কোনো গাছ আঘাতপ্রাপ্ত হলে প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়।

গাছ এবং পোকাদের যুদ্ধ হাজার হাজার বছর ধরে চলছে। এই যুদ্ধে দুই পক্ষেই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই যুদ্ধেরই এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান রচিত হয় ১৯৭৭ সালে। এক পক্ষ নিরীহদর্শন সিটকা উইলো, আরেক পক্ষ ভয়ানক তাবু শুঁয়োপোকা (Tent catterpillar)। তাবুর মতো দেখতে বাসা বাঁধে বলে এরা এমন নাম পেয়েছে। ওয়াশিংটনের কিং কান্ট্রিতে স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা কাজে ব্যবহৃত বনটিকে এই পোকা আক্রমণ করে। এই পোকাগুলা নিষ্ঠুর এবং খুবই লোভী। পুরো বনে ছড়িয়ে যেতে যেতে এরা কয়েকটা গাছের সবগুলো পাতা নষ্ট করে ফেলে এবং আরো অনেক গাছের মারাত্মক ক্ষতি করে। আমরা জানি যে লড়াইতে হেরে গেলেও যুদ্ধে যেতা সম্ভব, গাছেদের ইতিহাসে এটা খুব বেশি রকম সত্য।

শুঁয়োপোকাদের আক্রমণের পরেও বেঁচে থাকা গাছেদের পাতা নিয়ে ২ বছর পরে সেই ইউনিভার্সিটিতে একটা পরীক্ষা করা হয়। ঐ গাছগুলোর পাতা শুঁয়োপোকাদের খাওয়ানোর পর দেখা যায় এদের বৃদ্ধির হার খুব কম। অথচ একই গাছের পাতা ২ বছর আগে খেয়ে তারা তুমুল গতিতে বেড়েছিল, বংশবৃদ্ধি করেছিল, অন্য গাছ আক্রমণ করেছিল। এর থেকে খুব সহজেই বুঝা যায়, পাতায় এমন কিছু আছে যা পোকাগুলোকে অসুস্থ বানিয়ে ফেলছে। আমরা যারা গাছ নই তাদের ইমিউন সিস্টেমও কিন্তু এমন ব্যবস্থা থাকে, যাতে একটা জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেলে পরে আর সেই জীবাণু (যেমনঃ বসন্ত) সাধারণত কিছু করতে পারে না।

তবে আশ্চর্যের ব্যপার এটাই যে, ঐ বন থেকে পুরো এক মাইল দূরের সুস্থ্য সিটকা উইলো গাছ, যেগুলো কখনোই আক্রান্ত হয়নি তাদের পাতাও দেখা গেলো শুঁয়োপোকাদের জন্য বিষাক্ত। সেই পাতা খেয়ে পোকাগুলো এতটাই নিস্তেজ আর নাজুক হয়ে গেল যে দুই বছর আগেকার তাদের ধ্বংসাত্নক রূপ কল্পনাও করা যাচ্ছিল না।

বিজ্ঞানীরা কাছাকাছি গাছেদের মধ্যে মূল থেকে মূলে যোগাযোগের ব্যপারে জানতেন। এই যোগাযোগ মাটির নীচে মূল থেকে ক্ষরিত বিভিন্ন পদার্থের মাধ্যমে হয়। কিন্তু মাইলখানেক দূরে অবস্থিত দুই দল উইলো গাছের মধ্যে কোনো মৃত্তিকাকথনের সুযোগ নেই দূরত্বের কারণে। হয়তো মাটির উপরে কোনো সংকেত অদল বদল হয়েছে এক্ষেত্রে। বিজ্ঞানীরা পরে উপসংহার টেনেছেন গাছগুলো যখন শুঁয়োপোকা দিয়ে আক্রান্ত হয়, তখন তারা পাতাগুলোতে পোকাদের জন্য বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করা শুরু করে। এই ঘটনা বিভিন্ন ভিওসির উৎপাদনকেও নাড়া দেয়। গবেষকদের অনুমান, এই ভিওসি বাতাসে ভেসে দূরের উইলো গাছগুলোর আসেপাশে পৌছালে তারা একে সতর্কতা সংকেত ধরে নিয়ে নিজেদের দেহেও সেই শুঁয়োপোকানাশক তৈরি শুরু করে। ১৯৮০ সালের মধ্যে ওই বনে এবং তার আশেপাশে শুঁয়োপোকাদের বংশের পর বংশ শোচনীয়ভাবে ধ্বংস হতে থাকে এসব বিষের কারণে। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চাল দিয়ে গাছেরা যুদ্ধের পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই নিয়ে নেয়।

বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা প্রতীত হলেন, বায়বীয় কোনো সংকেতের উপস্থিতিই এই ঘটনার সম্ভাব্য ব্যখ্যা। গাছেদের হয়তো আমাদের মতো চিন্তা করার, অনুভব করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তারা হয়তো ঠিকই একে অপরের খেয়াল রাখে। সংকটের সময় শুধু নিজেদের মধ্যে নয়, দূরবর্তী স্বজাতিকেও জানিয়ে দেয় বিপদের কথা। সিটকা উইলো এক্সপেরিমেন্ট একটি চমৎকার ও অসাধারণ উদাহরণ যা বদলে দিয়েছিল অনেক কিছু। সমস্যা একটাই, গাছ থেকে গাছে দূর-আলাপনের মতো ব্যাবস্থার অস্তিত্ব কাউকে বিশ্বাস করাতে ২০ বছর লেগেছিল।

[প্রফেসর হোপ জাহরেন এর আত্মচরিত Lab Girl বইটির একাদশ তম অধ্যায়ের ভাবানুবাদ]

জেনেটিক সুপারহিরো

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে। এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন। এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা

সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য। হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

প্রকৃতির ভুলঃ প্রিয়ন ও অট্টহাসি রোগ

প্রিয়নের নানা রূপ [রুহশান আহমেদ]

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের একটি দ্বীপরাষ্ট্র স্যান লরেঞ্জোর শাসক ‘পাপা মনজানো’র বাবা ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। তার একটি আবিষ্কার হলো রহস্যময় আইস-নাইন, যার সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিও জমে গিয়ে আইস-নাইনে পরিণত হয়। বহুকাল সেই আইস নাইন ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। একসময় পাপা মনজানো ক্যান্সারের যন্ত্রণা সইতে না পেরে আইস-নাইন খেয়ে আত্নহত্যা করেন। তার জমে যাওয়া দেহের স্পর্শে এসে তার ডাক্তারও জমে গিয়ে মারা যান। এ যেন ছোটবেলায় খেলা বরফ-পানির বাস্তব এবং ট্র্যাজিক সংস্করণ। এতটুকুই নয়, ঘটনাক্রমে পাপার দেহ গিয়ে পড়ে সমুদ্রে এবং সারা পৃথিবীর পৃষ্টে ও পেটে যত পানি আছে সব জমে গিয়ে বিশাল দূর্যোগ সৃষ্টি করে। বাকীটা জানতে হলে পড়তে হবে কার্ট ভনেগাট এর লেখা কল্পকাহিনী Cat’s Cradle।

আমাদের সৌভাগ্য যে, আইস-নাইন কাল্পনিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর জৈবিক প্রতিরূপ বাস্তব, যার নাম প্রিয়ন। ব্রায়ান কহে এবং পিটার ল্যান্সবারি ভেড়ার স্ক্র্যাপি রোগ সম্বন্ধে রচিত একটি নিবন্ধে কাল্পনিক আইস নাইনের সাথে প্রিয়নের তুলনা করেন। প্রিয়ন কী? সেটি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে প্রোটিন কী, মূলত প্রোটিনের গঠন জানলেই হবে।

কুড়ি ধরনের অ্যামিনো এসিড আছে, যারা মিলে মিশে হাজার হাজার প্রোটিন তৈরি করে। কোষে যখন প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়, তখন প্রথমে বিভিন্ন অ্যামিনো এসিড একে অপরের সাথে চেইনের মতো করে যুক্ত হয়। এ চেইন কিন্তু প্রোটিনের মতো কাজ করে না। এজন্য চেইনকে নানাভাবে ভাঁজ খেয়ে, প্যাঁচ খেয়ে, কখনো কখনো অন্য আরেক চেইনের সাথে গিট্টু বেঁধে নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকৃতি অর্জন করলে তবেই সেই প্রোটিন আমাদের উপকারে আসবে। সে এক বিশাল আয়োজন। তবে যা-ই হোক, এই যে প্যাঁচগোচের ব্যাপার আছে প্রোটিনের গঠনে, তাতে যদি উল্টা-পাল্টা কোনো ভুল হয়? হ্যাঁ, ভুলের সবসময়ই একটা মাশুল আছে যা সেই প্রোটিনকেই দিতে হয় অন্য আরেক প্রোটিনের ঘ্যাচঘোচের শিকার হয়ে! তবে কখনো কখনো, ভুল প্যাঁচের প্রোটিন ঠিকই ফাঁকি দিয়ে বেঁচে যায়। আর নানান অসুবিধার কারণ হয়, এদের মধ্যে যেগুলো ভাইরাস/ব্যাক্টেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোই প্রিয়ন।

আচ্ছা এগুলো নাহয় বুঝলাম, তো প্রিয়ন কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে?

উদাহরণ হিসেবে ভেড়ার রোগ স্ক্র্যাপির কথাই ধরি, তার আগে বলে নিই স্ক্র্যাপি হলে ভেড়ার কী হয়। নিজেই নিজের হাত পা কামড়ায়, হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঝাঁকায়, মাতালের মতো হাঁটাহাঁটি করে, কোনো জিনিসে ক্রমাগতভাবে আঘাত করতে থাকে, সময়ে সময়ে খরগোশের মতো সামনের দু’পা তুলে লাফানোরও চেষ্টা করে। ভেড়ার সমাজে কোনো গল্পকার থাকলে নিশ্চয়ই স্ক্র্যাপি আক্রান্ত ভেড়াদের নিয়ে ভয়ংকর সব গল্প লিখতে পারতেন। ভেড়ার মগজে প্রয়োজনীয় একটি প্রোটিনের ভুল প্যাঁচ খাওয়া রূপ স্ক্র্যাপির জন্য দায়ী একটি প্রিয়ন। এ প্রিয়নের সংস্পর্শে এলে ভালো প্রোটিনও নিজের আকৃতি বদলে প্রিয়ন হয়ে যায়, ঠিক যেমন আইস নাইনের সংস্পর্শে এসে পানি বদলে যায় আইস-নাইন এ। এভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রিয়ন জমে এবং ভেড়ার নিউরন ধ্বংস করে। ভেড়ার দেহ থেকে নানাভাবে এ প্রিয়ন পরিবেশে ছড়ায়। সুস্থ ভেড়া খাদ্যের সাথে কিংবা অন্য কোনোভাবে পরিবেশ থেকে এ প্রিয়ন গ্রহন করলে সেও স্ক্র্যাপিতে আক্রান্ত হয়। শুধু কি ভেড়া? গরুর বিখ্যাত “ম্যাড কাউ” রোগের কারণও প্রিয়ন। আফ্রিকার মানুষখেকো জংলী গোষ্ঠীতে ক্রাউতজফেলডট-জ্যাকবস ডিজিসের কারণ প্রিয়ন। এছাড়াও আলঝেইমার, পার্কিনসন্স, হান্টিঙ্গটনে কিছু প্রোটিনের প্রিয়নের মতো আচরণকে বিজ্ঞানীরা দায়ী করেন।

যদিও প্রিয়নে কোনো ডিএনএ/আরএনএ থাকে না, কিন্তু তবুও এরা ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়ার মতো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে এবং সেই তথ্য নিজেরা ধারণ করে। এরা আবার রোগেরও সৃষ্টি করে, সে রোগ আবার সংক্রামকও হয়। কোনো নিউক্লিক এসিডের সাথে যোগসাজস ছাড়াই শুধু প্রোটিন যে এসব করতে পারে, ১৯৮২ সালে স্ট্যানলি প্রুজিনারের দেয়া সেই ধারণা বিজ্ঞানীমহলে আমন্ত্রিত হয় যথেষ্ট বিদ্রুপ এবং উপহাসের সাথে। তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটি অহরহই ঘটে, সেকালের অপবাদ একালের মতবাদ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয়নের ব্যাপারটাও এমন। ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়লো। তবে ২০১০ সালে ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির জিয়ান মা এর হাত ধরে প্রিয়ন তার অকাট্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি তার সহকর্মীদের সাথে রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন থেকে একদম আনকোরা এক সংক্রামক প্রিয়ন তৈরি করে দেখান।

প্রিয়নের নামে অনেক বদনাম করা হলো, চলুন এবার কিছু ভালো কথা শোনা যাক। ঈস্টের নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্যের অমেন্ডেলীয় বংশগতি জিনতত্ববিদদের বহুদিন অন্ধকারে রেখেছিল। নিম্নমানের পুষ্টিকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম সুপার-ডুপার কোনো ঈস্ট এবং অতি সাধারণ কোনো ঈস্টের সাথে যদি মিলন হয়, তাহলে দেখা যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সবারই সেই সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মেন্ডেলীয় জিনতত্ব অনুযায়ী অর্ধেকে এ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারণের কথা। এ ধরনের বংশগতি এর আগে শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা জিন, যেমন মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএতে লেখা বৈশিষ্ট্যের জন্য দেখা গেছে। ১৯৯৪ সালে রিড উইকনার এ ধাঁধার সমাধান প্রদান করেন। তিনি বলেন, যে প্রোটিনের (URE2) কারণে এ সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, সেই প্রোটিনের গঠনে সামান্য একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রিয়ন তৈরি হয়। এ প্রিয়ন আবার অন্যান্য URE2-কেও প্রিয়নে বদলে ফেলে এবং কোষ বিভাজনের সময় ঠিকই দুটি নতুন কোষে মাতৃকোষ থেকে রয়ে যায়।

উইকনারের এ ধারণা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্মোচন করে। প্রথমত, প্রিয়ন স্তন্যপায়ী ছাড়াও প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রিয়ন বংশগতিতে অবদান রাখতে পারে। পরবর্তীতে

গবেষণার মাধ্যমে ঈস্টে আরো ডজনখানেক প্রিয়ন পাওয়া গেছে যেগুলো নানাভাবে ঈস্টের জন্য উপকারী। এর মধ্যে একটি হলো Flo11p। এ প্রিয়নগুলো ঈস্টকে প্রতিকূল পরিবেশে একে অন্যের সাথে জড়াজড়ি করে থাকতে, অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক পরিবেশের দিকে কলোনীর বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। Flo11p আবার আরেক গ্রুপ প্রিয়ন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এ গ্রুপের প্রিয়নগুলো এমনভাবে সমন্বিত যেন পরিবেশে খাদ্যের পরিমাণ, অম্লত্ব/ক্ষারত্বের পরিবর্তন- এসবের বিপরীতে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোকে ট্রিগার করে। অর্থাৎ অনেকটা সুইচের মতো কাজ করে।

কোষবিদ্যার নানা পর্যায়ে যেটা ঈস্টের জন্য সত্য, তার সত্যতা উচ্চতর প্রাণিদের মধ্যেও পাওয়া গেছে। পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, “তাহলে আমরাও কি প্রিয়ন সুইচের ব্যবহার করে আসছি অজান্তেই?”

২০০৩ সালে কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এরিক ক্যানডেলের মনে হলো CPEB (Cytoplasmic Polyadenylation Element Binding protein) নামের একটি নিউরন প্রোটিনের সাথে ঈস্টের কিছু প্রিয়নের মিল আছে। সামুদ্রিক স্লাগের CPEB নিয়ে নাড়াচাড়া করে তারা বের করেন যে, এ প্রোটিন দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে কাজে লাগে। আরো দেখা যায় এরা বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারে সাড়া দিয়ে সিনাপ্সে শুধু নিজেদেরই সংখ্যাবৃদ্ধি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে প্রয়োজনীয় আরো কিছু প্রোটিন সংশ্লেষে ভূমিকা রাখে। তার মানে আমাদের নিউরনও প্রিয়নকে সুইচের সুবিধা নিচ্ছে কোনো অঘটন ছাড়াই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিয়ন সুইচের কথা বলা যায়, যেটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সহায়তা করে। কোষ যদি ভাইরাস আক্রমণের শিকার হয় সেখানে MAVS প্রোটিনটি প্রিয়নের ন্যায় নিজেদের বহুসংখ্যক প্রতিলিপি তৈরি করে, যার ফলে ইন্টারফেরন নিঃসরণ আরো জোড়ালো হয় এবং দেহ দ্রুত ম্যাক্রোফাজের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এটি কোষের জন্য ভয়ানক, কিন্তু দেহের জন্য অপরিহার্য।

তো আমরা বুঝতে পারলাম, ক্ষেত্রবিশেষে প্রিয়নের ভূমিকা কখনো ভালো, কখনো মন্দ। কখনো মগজে মগজে করেনিউরন ধ্বংস, কখনো আচরণ যেন স্মৃতি ধারণের অংশ। আবার দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও প্রিয়নের হাত আছে। আর ঈস্টের ক্ষেত্রে তো দলবদ্ধভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলাতে প্রিয়নই সাহায্য করছে। আইস নাইন এর জৈবিক প্রতিরূপ এ প্রিয়ন। এরা কি ভালো না মন্দ? সে বিচার আপনার।

তথ্যসূত্রঃ

The bright side of prion by Randal Halfman, The Scientist

 

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।