তার ছাড়া বাতি

টেসলা কয়েল। তারবিহীন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরের স্বপ্ন থেকে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা সর্বপ্রথম এই পরীক্ষাটি করেন। পদার্থবিজ্ঞানী  মাইকেল ফ্যারাডের সূত্র অনু্যায়ী, যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর দিয়ে একটি চুম্বককে দ্রুত আনা নেওয়া করা যায় তাহলে পরিবর্তনশীল চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে তারের ভেতর তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হবে।

image source: drmegavolt.com

একইভাবে যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর পরিবর্তনশীল  তড়িৎ প্রবাহ চালানো যায় তাহলে ঐ কুণ্ডলির চারপাশে একটি অস্থায়ী চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হবে।  টেসলা কয়েল পরীক্ষায় একইসাথে দুটি কুণ্ডলিত তারের ব্যবহার করা হয়। একটি তিন কুণ্ডলির তারকে প্রায় তিনশো কুণ্ডলির তারের উপর বসানো হয়, যেন তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বারা এটি উচ্চধাপী ট্রান্সফর্মারের ন্যায় কাজ করে। এর কাজ হচ্ছে কম বিভবের তড়িৎকে উচ্চ বিভবের তড়িতে রূপান্তরিত করা।

ট্রানজিস্টর, রেজিস্ট্যান্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমে তিন কুণ্ডলির তারের ভেতর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত করা হয়। প্রবাহের ফলে উৎপন্ন চুম্বকক্ষেত্র তিনশো কুণ্ডলির তারের চারপাশে আবিষ্ট হয়। এটি তারের দুই প্রান্তে অত্যধিক উচ্চ বিভবের সৃষ্টি করে।

image source: stevespanglerscience.com

এখন এই তারের চারপাশে যদি কোনো প্রবাহী বস্তুকে আনা হয় তখন তা অত্যধিক উচ্চ বিভবের ফলে আয়নিত বস্তুর ন্যায় আচরণ করে। কোনো বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষেত্রে তা বাতির ভেতরে তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। ফলে বাতিটি কোনোপ্রকার তড়িৎ সংযোগ ছাড়াই শুধু মাত্র আবেশের প্রভাবে জ্বলে উঠে। তারবিহীন বিদ্যুৎ শক্তি  স্থানান্তরের এই অসাধারণ উপায়ের নাম টেসলা কয়েল।

featured image: stepbystepprojects.co.uk

‘ব্যর্থ’ পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের বিপ্লব

পদার্থবিজ্ঞানের উত্থানের উত্তপ্ত সময়টিতে অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ইথার’। ইথার বলতে এমন একটি কাল্পনিক মাধ্যমকে বোঝানো হতো যার ভেতর দিয়ে আলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়।

কিন্তু বিজ্ঞান ‘কাল্পনিক’ শব্দটাতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে তাই বিজ্ঞানী মহলে কম হুল্লোড় হয়নি। বিজ্ঞানীদের কাছে ইথার ছিল মরীচিকার সমার্থক। অসংখ্য আলোচনার জন্ম দেওয়া এই ইথারের সাথেই জড়িয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিন্তু আপাত ব্যর্থ ‘মাইকেলসন-মর্লির ইন্টারফেরোমিটার’ পরীক্ষা।

কী রহস্য এই ইথারের? ব্যর্থ পরীক্ষার ফলাফল কি আসলেই শূন্য ছিল? নাকি তার অভ্যন্তরেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবন?

তার আগে আপেক্ষিকতার কিছু সহজ বিষয়ে চোখ বুলিয়ে নেই। সহজ ভাষায় আপেক্ষিকতা হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ কাঠামোতে কোনো বস্তুর গতি ভিন্ন হওয়া। এটি গ্যালিলিয়ান আপেক্ষিকতা হিসেবে পরিচিত। বাস্তব জীবনে যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে এই বিষয়ক উদাহরণের কমতি পড়বে না।

ধরা যাক, আপনি ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছেন, ট্রেনটি প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার বেগে গতিশীল। ট্রেনের কামড়ার এক পাশে দাঁড়িয়ে আপনি অপর পাশের দেয়াল বরাবর (যেদিক বরাবর ট্রেন গতিশীল) একটি বল ছুড়ে মারলেন ৫ মিটার/সেকেন্ড গতিতে। আপনার কাছে বলটির গতি ৫ মিটা/সেকেন্ড। কারণ আপনি আর ট্রেন একই বেগে আছেন এবং আপনার প্রসঙ্গ কাঠামোয় ট্রেন আর আপনি স্থির।

কিন্তু ঠিক একই সময়ে যদি ট্রেনের বাইরে দাঁড়ানো কেউ এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে তাহলে তার জন্য বলটির গতি হবে ২৫ মিটার/সেকেন্ড। আগের গতির সাথে মিল নেই। কেন? কারণ তার প্রসঙ্গ কাঠামোয় বল, আপনি এবং ট্রেন প্রথম অবস্থা থেকেই ২০ মিটার/সেকেন্ড বেগে গতিশীল ছিলেন। তার মানে বাস্তবিকে একেক বস্তুর গতি একেক প্রসঙ্গ কাঠামো বা পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে একেক রকম হবে। এর ফলশ্রুতিতে বলা যায় কোনোভাবেই কোনো বস্তুর পরম গতি নির্ণয় করা সম্ভব না।

এখন আসি গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল এর কাছে। ম্যাক্সওয়েল ১৮৬০ সালে ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম নিয়ে তার জগৎ বিখ্যাত সূত্রগুলো প্রদান করেন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যে তার সমীকরণগুলোর সমন্বয় থেকে তড়িৎচুম্বক বিকিরণের জন্য বেগের মান নির্ণয় করা যায়। এই বেগের মান একটি ধ্রুবক সংখ্যা যা প্রায় আলোর বেগের সমান। এই ফলাফল থেকে ধারণা করা হয় আলো তড়িৎচুম্বক বিকিরণেরই একটি বিশেষ রূপ। আর এর বেগের মান ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত বেগের মানের সমান এবং ধ্রুবক।

আলো যদি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গই হয়ে থাকে তবে শূন্য মাধ্যমে কীভাবে স্থানান্তরিত হয়? যেকোনো ধরনের তরঙ্গ স্থানান্তরিত হবার জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আলোর জন্য শূন্য মাধ্যমে কোন ধরনের প্রভাবক কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার জন্যই বিজ্ঞানীরা তখন ‘ইথার’ নামক একটি কাল্পনিক মাধ্যমের আশ্রয় নেন। ইথারকে সমগ্র মহাবিশ্ব বিস্তৃত, নিরবিচ্ছিন্ন ও পরম স্থির এক অদৃশ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। মহাবিশ্বের সবকিছুই এই ইথারের মধ্যে ভাসমান।

ইথারকে পরম স্থির প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে ম্যাক্সওয়েলের প্রাপ্ত ফলাফল অনু্যায়ী আলোর বেগকে সার্বজনীন ধ্রুবক হিসেবে চিন্তা করা হলো। পাশাপাশি শূন্যস্থানে আলো স্থানান্তরের জন্য মাধ্যম জনিত সমস্যার সমাধানও ঘটল। কিন্তু এই কাল্পনিক ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে দেরি হলো না।

সেই সূত্র ধরেই অ্যালবার্ট মাইকেলসন এবং এডওয়ার্ড মর্লি ১৮৮৭ সালে আলোর ব্যতিচার ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটি এক্সপেরিমেন্টের পরিকল্পনা করেন। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ইথার যদি আসলেই থেকে থাকে তবে তার অস্তিত্ব নিরুপণের জন্য দৃঢ় প্রমাণ সংগ্রহ করা। সময়ের প্রেক্ষাপটে এই পরীক্ষার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। এবং ফলাফলের ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষায় যাবার আগে আবারো সেই ট্রেন থেকে ঘুরে আসি। ধরা যাক আপনি এবার ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। যথারীতি আপনার হাতে সেই বল। ট্রেনের ছাদে দাড়ানোর পরপর প্রথমেই অনুভব হবে বাতাসের তীব্র ঝাপটা। আদতে চারপাশের বাতাস কিন্তু স্থির কিন্তু ট্রেন সেই বাতাসের ভেতর দিয়ে গতিশীল হওয়ায় মনে হচ্ছে বাতাস আপনার দিকে ছুটে আসছে।

এক্ষেত্রে বাতাসের বেগ আর ট্রেনের বেগ সমান। এখন বাতাসের গতির দিকে অর্থাৎ ট্রেনের গতির বিপরীত দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলেন এবং এর গতি পরিমাপ করলেন। তাহলে যে মান পাওয়া যাবে, ঠিক বাতাসের উল্টো দিকে বলটিকে নিক্ষেপ করলে যে বেগ পাওয়া যাবে তা পরস্পর সমান নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বেগের মান কমে যাবে। সহজ ভাষায় বাতাসের বাধার কারণে বলটির বেগের তারতম্য ঘটবে।

একই আইডিয়া মাইকেলসন আর মর্লির চিন্তাতেও আসলো। ইথার যেহেতু সকল শূন্যস্থানে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত এবং তা পরম স্থির, তাহলে এর মধ্য দিয়ে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনও ঐ ট্রেনের ছাদ ও বাতাসের বাধার মতো আচরণ করবে। অপরদিকে আলো ইথারের মধ্য দিয়ে তরঙ্গ হিসেবে সঞ্চালিত হয়। যদি তা-ই হয় তাহলে ইথার ক্ষেত্রে কোনো দিকে গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে আলোর বেগ যেমন হওয়া উচিৎ তার বিপরীত বা অন্যান্য দিকে তার চেয়ে কম পাওয়ার কথা। কিছু একটা তারতম্য হবার কথা।

আলোর বেগের এই তারতম্য যদি সত্যি সত্যিই পাওয়া যায় তাহলে ইথারের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় এবং তা মেনে নিতে হবে। এই আইডিয়া থেকেই মাইকেলসন ও মর্লি মিলে এই পরীক্ষা করতে পারবে এমন একটি ইন্টারফেরোমিটার তৈরি করেন।

চিত্র: মাইকেলসন ও মর্লির তৈরি করা ইন্টারফেরোমিটার যন্ত্রের নমুনা।

এই ইন্টারফেরোমিটারে একটি অর্ধপ্রলেপ দেওয়া সিলভারের আয়না আড়াআড়ি করে রাখা হয়। পাশে দুটি সম্পূর্ণ প্রতিফলক আয়না পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে অর্ধপ্রলেপ দেয়া সিলভার আয়না থেকে সমান দূরত্বে রেখে বসানো হয়।

ব্যতিচার বা ইন্টারফিয়ারেন্স-এর ক্ষেত্রে একই কম্পাংকের দুটি আলোক রশ্মি পরস্পরের উপর উপরিপাতিত হয়ে পর্যবেক্ষণ পর্দার কোথাও উজ্জ্বল এবং কোথাও অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে। আলোকরশ্মিদ্বয় যদি একই দশায় আপতিত হয় তবে উজ্জ্বল এবং সম্পূর্ণ বিপরীত দশায় আপতিত হলে কালো বা অনুজ্জ্বল ডোরার সৃষ্টি করে।

মাইকেলসন-মর্লির পরীক্ষায় একই উৎস থেকে একটি আলোক রশ্মি নির্গত হয়ে সিলভারের অর্ধ-প্রলেপ দেয়া আয়নায় আপতিত হয় এবং এর একটা অংশ প্রতিসরিত হয়ে অপর পাশে রাখা আয়নায় প্রতিফলিত হয়। আরেকটা অংশ সিলভার আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে উলম্ব বরাবর রাখা আয়নায় গিয়ে প্রতিফলিত হয়।

উভয় প্রতিফলিত রশ্মি পুনরায় সিলভার আয়নায় ফিরে এসে আবার যথাক্রমে প্রতিফলন এবং প্রতিসরণের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ পর্দায় আপতিত হয়। এখন যদি আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় থাকে তাহলে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচারের জন্য উজ্জ্বল আলোক দেখা এবং বিপরীত দশায় থাকলে পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারের জন্য অনুজ্জ্বল বা অন্ধকার এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে।

যেহেতু আলোক রশ্মিদ্বয় সমান পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেক্ষেত্রে ইথার যদি না থাকে তবে পর্দায় গঠনমূলক ব্যতিচার দেখা যাবে। কিন্তু যদি ইথার থাকে তবে? ইথার যদি সত্যি হয় তবে ইথার বাতাসের কারণে আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগ একই হবে না, কেননা তারা পরস্পরের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে যাতায়াত করেছে। সেক্ষেত্রে তারা পর্দায় একই দশায় আপতিত না হয়ে ভিন্ন কোনো দশায় আপতিত হবে এবং পর্দায় ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার প্রদর্শিত হবে।

চিত্রঃ মাইকেলসন-মর্লির ব্যতিচার পরীক্ষা।

তো মাইকেলসন মর্লি তাদের পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপে কী পেলেন? তারা দেখতে পেলেন পর্দায় আলোকরশ্মিদ্বয় আপতিত হয়ে গঠণমূলক ব্যতিচার তৈরি করছে অর্থাৎ আলোক রশ্মিদ্বয়ের বেগে কোনো পার্থক্য হচ্ছে না। আর আলোক রশ্মিগুলো একই দশায় আপতিত হচ্ছে যা ইথারের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।

তারা তাদের যন্ত্রকে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাপেক্ষে বিভিন্ন দিকে বসিয়ে পরীক্ষা করেন এবং প্রতিবার প্রায় একইরকম ফলাফল পান। তাদের এই ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই পুরো বিজ্ঞানমহলে অসংখ্য বিতর্কের জন্ম দিল। এক্ষেত্রে দুটি উপসংহারে আসা যায়, এক- পৃথিবী ও ইথার একইসাথে পরম স্থির, দুই- ইথারের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রথম সিদ্ধান্তের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটিই বেশি গ্রহণযোগ্য। এতদিন ধরে ইথারকে কল্পনা করে শূন্য মাধ্যমে আলোর তরঙ্গ আকারে স্থানান্তরের ব্যাখ্যা মুহুর্তেই দোলাচালে পড়ে গেল।

ইথার যদি না থাকে তবে সেক্ষেত্রে আলোর প্রকৃতি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। এরকম ক্রান্তিকালে আইনস্টাইন হাজির হলেন তার স্পেশাল ও জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। তার থিওরি অনুযায়ী আলোর বেগ শূন্য মাধ্যমে পরম এবং এর বেগের মান সকল প্রসঙ্গ কাঠামো এবং সকল পর্যবেক্ষকের জন্য সমান। একইসাথে তিনি কাল্পনিক ইথার মাধ্যমের অস্তিত্বকে নাকচ করে দিলেন।

নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মূল্যবান থিওরিগুলোর মধ্যে একটি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। কেননা আইনস্টানের থিওরি অব রিলেটিভিটি তখনই সত্য যখন ইথার এর কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার ইথারের অস্তিত্বের প্রমাণ মিললে থিওরি অব রিলেটিভিটি দিয়ে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা আলোর প্রকৃতিও নড়বড়ে হয়ে যায়।

তাই ১৯০৬ সালে আমেরিকান ফিজিকাল সোসাইটির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পদার্থবিজ্ঞানী ডেটন মিলার মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষাটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি পূর্বেকার চেয়েও আরো উন্নত যন্ত্র নিয়ে পরিক্ষাটি চালান এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অসংখ্যবার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি দাবি করেন যে, মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতো তার পরীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্তের ফলাফল শূন্য নয় বরং সেখানে আসল ফলাফলের চেয়ে সামান্য কিছুটা বিচ্যুতি পাওয়া যায়। এই বক্তব্য ইথার এর অস্তিত্ব এর স্বপক্ষে অবস্থান নেয়।

ডেটন মিলারের প্রাপ্ত ফলাফল যদি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে ইথার বিদ্যমান এবং সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের এর থিওরি অব রিলেটিভিটি অকেজো। তবে থিওরি অব রিলেটিভিটির জনপ্রিয়তার কাছে সে ফলাফল চাপা পড়ে যায়। আইনস্টাইন ১৯২১ সালে মিলারের সাথে দেখা করে তাকে এই পরীক্ষা আরো নিখুঁতভাবে করার জন্য অনুরোধ করেন।

মিলারের ধারণা ছিল পৃথিবী পৃষ্ঠে এই পরীক্ষা চালানোয় ইথার ক্ষেত্রের ঘর্ষণের প্রভাব ভালোভাবে পাওয়া যায়নি, তাই তিনি তার পরীক্ষাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭৫০ মিটার উচ্চতায় মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরিতে পরিচালনা করেন এবং প্রায় ২৫০০০০ বারের মতো পরীক্ষার উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

কিন্তু মিলারের প্রাপ্ত ফলাফলের বেশিরভাগই ছিল শূন্য, অতি সামান্য কিছু ফলাফলই কেবল ইথারের স্বপক্ষে পজিটিভ মান দিয়েছিল যা ছিল খুবই নগণ্য। ফলে মিলার কখনোই তার পরীক্ষায় পাওয়া পজিটিভ ফলাফল এর স্বপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেননি।

তার পরীক্ষাও মাইকেলসন মর্লির পরীক্ষার মতোই ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে চাপা পড়ে যায়। মিলার অবশ্য তার বিভিন্ন লেখনীতে ইথার থাকার সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেননি। ধারণা করা হয় যে মিলারের এই দীর্ঘসময়ব্যপী করা পরীক্ষার কারণেই আইনস্টাইন তার থিওরি অব রিলেটিভিটির জন্য নোবেল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। (আইনস্টাইন নোবেল পেয়েছিলেন ফটো তড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যা করার জন্য)।

চিত্র: ডেটন মিলার

যাহোক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী ইথারের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। গ্যালিলিও বা নিউটনের পর পদার্থবিজ্ঞান অনেকখানি পথ এগিয়ে এসেছে। এখনো বহুদূর বাকি। পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামোতে পরিবর্তনটাও এসেছে সবচেয়ে বেশি। এই পরিবর্তনের অংশীদার মাইকেলসন – মর্লির পরীক্ষার মতো অজস্র প্রচেষ্টা। পদার্থবিজ্ঞানের এই অসম্ভব সুন্দর যাত্রা এভাবেই গৌরবের সহিত এগিয়ে যাক এবং আমাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হোক। ইথার গল্পটার এখানেই সমাপ্তি।

তথ্যসূত্র

Michelson-Morley & The Story of The Aether Theory, by Richard Milton

feature image: quora.com

একই নক্ষত্রে সাতটি প্রাণবান্ধব গ্রহের সন্ধান

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূচনালগ্ন থেকেই মহাকাশ অনুরাগীদের মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়ে গেছে, এই অনন্ত মহাবিশ্বে আমরা কি একা? মহাবিশ্বের কোনো এক অজানা প্রান্তের নীল সবুজ গ্রহটিতেই কি প্রাণের স্পন্দন সীমাবদ্ধ?

এসকল প্রশ্ন আসলে নিজেদেরই অস্তিত্বের প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যই বছরের পর বছর বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারই ফলশ্রুতিতে সন্ধান মিলল TRAPPIST-1 নামক এক অনুজ্জ্বল লোহিত বামন নক্ষত্র যার চারপাশে আবর্তন করছে একটি নয় দুটি নয় সাত সাতটি গ্রহ। এদের প্রত্যেকটিতেই প্রাণের সঞ্চারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্তত তিনটি গ্রহে প্রাণ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সহজেই বোঝা যাচ্ছে এই আবিষ্কারের খবর বিজ্ঞান মহলে কতটা উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে।

এক্সোপ্লানেট বা বহির্গ্রহের সন্ধান পাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক যুগে অসংখ্য বহির্গ্রহের সন্ধান মিলেছে। ওপেন এক্সোপ্লানেট ক্যাটালগ অনুযায়ী সন্ধান পাওয়া প্রাণবান্ধব গ্রহের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০। এমনকি গত বছরেই সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারির পাশেই পাওয়া গিয়েছিল দুটি বাসযোগ্য গ্রহ।

তবে TRAPPIST-1 এর মতো একসাথে এতোগুলো প্রাণবান্ধব গ্রহের সন্ধান এই প্রথম মিললো। TRAPPIST-1 একটি অনুজ্জ্বল ও তীব্র শীতল লোহিত বামন নক্ষত্র যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। মাইলের হিসেবে সেটি হবে প্রায় ২৩৫ ট্রিলিয়ন মাইল। আকারে বৃহস্পতি গ্রহের চেয়ে সামান্য বড় এই নক্ষত্রের ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৮ শতাংশ। আর এর উজ্জ্বলতা সূর্যের প্রায় ০.০৫ শতাংশ। নক্ষত্রের উপরিতলের গড় তাপমাত্রা ৪ হাজার ১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

TRAPPIST-1 নিয়ে সর্বপ্রথম কাজ করে একই নামের একটি রবোটিক টেলিস্কোপ যা চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত। ট্রাপিস্ট এর পূর্ণরূপ Transiting Planets & Planetesimals Small Telescope। পরবর্তীতে নাসার স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপ এই নক্ষত্র ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা শুরু করে। এ ধরনের বামন নক্ষত্রের সংখ্যা গ্যালাক্সিতে সর্বাধিক। তাই বাসযোগ্য গ্রহের সন্ধান করার সময় এই নক্ষত্রগুলোর দিকে নজর দেয়াই সবচেয়ে ফলপ্রসূ।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্পিটজার টেলিস্কোপ একটানা প্রায় ২০ দিন এই ছোট্ট নক্ষত্রটির উপর নজরদারি করে অসাধারণ কিছু ফলাফল পায়। ২০ দিনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নক্ষত্রটির আলো কিছু সময় পর পর একবার উজ্জ্বল একবার অনুজ্জ্বল হচ্ছে।

এরকম ঘটনা ঘটলো প্রায় ৩৪ বার। এর মানে হচ্ছে নক্ষত্রকে আবর্তনকারী কোনোকিছু একটু পরপর নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাধা দিচ্ছে। গবেষকরা এ থেকে ধারণা করেন যে একের অধিক গ্রহ এই নক্ষত্রটিকে ঘিরে আবর্তন করছে। এরাই আলোর এই উঠানামার জন্য দায়ী।

চিত্র: উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল। প্রাথমিক অবস্থায় টেলিস্কোপের চোখে
যেমন ছিল গ্রহগুলোর রূপ।

প্রথম অবস্থায় তিনটি গ্রহের ধারণা করা হলেও গত ২২ ফেব্রুয়ারী ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে ৭টি গ্রহের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সাতটি গ্রহই আকারে প্রায় একইরকম এবং এরা স্বল্প ব্যাসার্ধের উপবৃত্তাকার পথে নক্ষত্রটির চারপাশে ঘোরছে।

গ্রহগুলোর বর্ণালী বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নক্ষত্রের নিকটতম দুটি গ্রহের কোনোটির বায়ুমণ্ডলেই হাইড্রোজেন গ্যাসের পুরো বলয় নেই। এই তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, গ্রহ দুটি গ্যাসীয় অবস্থায় নেই। তাদের রয়েছে পৃথিবীর মতো পাথুরে ভূমি। কেন্দ্র থেকে চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা তিনটি গ্রহই নক্ষত্রটির “হেবিটেবল জোন” বা প্রাণ গঠণের জন্য উপযুক্ত অবস্থানে অবস্থিত। এমনও হতে পারে, তিনটি গ্রহের প্রত্যেকটিরই রয়েছে পৃথিবীর মতো সমুদ্র, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনের সমন্বয়ে তৈরি বায়ুমণ্ডল। এসব উপাদানগুলোই প্রাথমিক অবস্থায় পৃথিবীতে প্রাণ সঞ্চারণের জন্য দায়ী ছিল।

গ্রহগুলোর উপবৃত্তাকার পথ খুব ছোট হওয়ায় তাদের আবর্তনকালও খুব সংক্ষিপ্ত। ভেতরের দিকে সবচেয়ে কাছের গ্রহটির আবর্তনকাল মাত্র ১.৫ দিন আর সবচেয়ে দূরে অবস্থিত গ্রহটির জন্য তা মাত্র ২০ দিন। নক্ষত্রের কাছাকাছি অবস্থান করার কারণে গবেষকরা ধারণা করছেন যে প্রতিটি গ্রহই নক্ষত্রটির সাথে গ্র্যাভিটেশনালি লকড। অর্থাৎ তাদের একটা পাশ সর্বদাই নক্ষত্রটির দিকে মুখ করে থাকে। ঠিক যেমনটা পৃথিবী আর চাঁদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। চাঁদের কিন্তু এক পিঠই আমরা সবসময় দেখতে পাই। অপর পিঠ কখনোই দেখা যায় না।

এরকম হলে গ্রহগুলোর ঐ দুই পৃষ্ঠের সামগ্রিক আবহাওয়ায় ব্যাপক পার্থক্য থাকতে পারে যা প্রাণ গঠনের জন্য অনুকূল নাও হতে পারে। তবে গবেষকরা আশার বাণী দিয়েছেন যে, যদি পৃথিবীর মতো সুগঠিত বায়ুমণ্ডল থাকে তবে ঐ বায়ুমণ্ডলই তাপ পরিবহনের মাধ্যমে গ্রহগুলোর উভয় পৃষ্ঠে তাপীয় ভারসাম্য বজায় রাখবে।

কেউ যদি ঐ গ্রহগুলোর কোনো একটিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায় তাহলে সে চাঁদের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ আকারের আরো ৬টি উজ্জ্বল গ্রহ দেখতে পাবে। কী অদ্ভুত সুন্দর! TRAPPIST-1 নিয়ে আশাবাদী হবার আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে এর দীর্ঘ আয়ুষ্কাল। যেখানে আমাদের সূর্যের আয়ু আর মাত্র ১০ বিলিয়ন বছর সেখানে TRAPPIST-1 বেঁচে থাকবে আরো প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন বছর!

ট্রাপিস্ট- ১ এর সাতটি গ্রহ আবিষ্কারের মাধ্যমে মহাবিশ্বে প্রাণের সন্ধান নতুন করে বেগ পেলো। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো এই অভিযান খুব দ্রুততর হচ্ছে না, তবে প্রতি মুহুর্তেই তা একটু একটু করে নতুন উদ্যম পাচ্ছে। আগামী বছরেই নাসা তাদের বহুল আলোচিত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ প্রক্ষেপণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

এই শক্তিশালী টেলিস্কোপ ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করে তথ্য পাঠাতে সক্ষম, যা বামন নক্ষত্র এবং বাহ্যগ্রহ থেকে আসা ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে আরো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে পারবে। জেমস ওয়েব, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ সহ আরো অসংখ্য প্রযুক্তির সমন্বয় আমাদের দৃষ্টি সহায়ক হয়ে মহাবিশ্বে প্রবল আকাঙ্খিত সেই প্রাণ স্পন্দনের সন্ধানে নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটাবে। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। কে জানে, ৪০ আলোকবর্ষ দূরে কেউ কেউ হয়ত আমাদের সন্ধানে বসে আছে।

তথ্যসূত্র

নিউ ইয়র্ক টাইমস

দ্য গার্ডিয়ান

IFLScience

featured image: sciencealert.com