ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

পিঁপড়ার ব্যক্তিত্ব

একটি স্বপ্ন। একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একটি সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্নই মানুষকে অণুপ্রাণিত করেছে সমাজের ছায়াতলে এসে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের। কথাটি শুধু মানবসমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, ক্ষুদ্রাকার পিপীলিকা সমাজের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়ে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের মতামতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মতামত কেমন হবে তা নির্ভর করে সদস্যটির ব্যক্তিত্ব, রুচিশীলতা প্রভৃতির উপর।

সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব আলাদা। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের কারণে তৈরি হওয়া বিচিত্র মতামতকে বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মানুষ বৈচিত্র্যময় পন্থার কথা ভেবেছে। প্রয়োগও করেছে। তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত এবং প্রচলিত পন্থা সম্ভবত ভোট দেয়া। এখন পিঁপড়াদের মধ্যে তো ভোটাভুটির মতো কোনো ব্যাপার প্রচলিত নেই। তাহলে পিঁপড়া সমাজ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

পিঁপড়ারা সিদ্ধান্ত নেয় কোরাম (quoram) করে। মানে কিছু পিঁপড়া কোনো ব্যাপারে একমত হলে দলের অন্যান্য পিঁপড়াও তাদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে।

পিঁপড়া সমাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটি ব্যাপার। তবে তারচেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে- মানব সমাজের প্রতিটি মানুষের মতো পিপীলিকা সমাজের প্রতিটি পিপীলিকার আচরণে রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি পিঁপড়া চলনে-বলনে অন্যান্য পিঁপড়া থেকে আলাদা। বিষয়টিকে পিঁপড়ার ব্যক্তিত্বও বলা যায়।

পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা মানুষের মতোই পিঁপড়া সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়াকে প্রভাবিত করে। মোটামুটি অবিশ্বাস্য শোনালোও পিঁপড়া নিয়ে নতুন একটি গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

রক এন্টদের (Temnothorax albipennis) পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বাড়ি বানায় পাহাড়ের সরু কোনো ফাটলে। এ ধরনের ফাটল প্রচুর পাওয়া যায় তবে তা সহজেই বিনষ্ট হতে পারে পাথর ধ্বসে বা বৃহৎ প্রাণীদের উৎপাতে। যদি তাদের বাসা ভেঙে যায় বা দলের সন্ধানী পিপীলিকারা নতুন কোনো সুবিধাজনক বাসার সন্ধান পায় তাহলে তারা নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হয়।

চিত্র: রক এন্ট বা পাথুরে পিঁপড়া।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের এন্ট ল্যাবের থমাস হোয়েলার বলেন, “নতুন বাসা খোঁজার সময় অনুসন্ধিৎসু পিপীলিকারা অনেক প্রয়োজন মাথায় রাখে। তারা এমন বাসার সন্ধান করে যেখানে হালকা আলো থাকবে, বাসার দরজা হবে ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার মাপের, বাসার উচ্চতা হবে ২ মিলিমিটার এবং বাসার ভেতরের জায়গা হবে প্রায় ২০ বর্গসেন্টিমিটার।”

আলাদাভাবে দলের প্রত্যেকটি পিঁপড়া তাদের সম্ভাব্য বাড়ির ব্যাপারে কী ভাবে এবং এটা কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা পরীক্ষা করতে হোয়েলার ও তার সহকর্মীরা ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কলোনী থেকে ১৬টি করে মোট ১৬০টি পিপড়াকে কৃত্রিমভাবে তৈরি বাসায় ছেড়ে দেন। বাসাগুলো ছিল তিন ধরনের। খুব ভালো, তুলনামুলক কম ভালো এবং জীর্ণ।

এতে স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটল তা হলো বাসাটা যত ভাল হলো পিঁপড়ারা তত বেশি সময় সেখানে কাটাল এবং দলের সঙ্গীরা যাতে তাদের খুঁজে পায় এজন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে রাখল। হোয়েলার বলেন “কোনো একটা বাসায় অবস্থান করে পিঁপড়ারা কার্যকরভাবে কোরামে বা একমত হবার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। যত বেশি সময় একটা পিঁপড়া কোনো বাসায় অবস্থান করবে, তত বেশি পিঁপড়া তার সাথে যোগ দেবে।”

হোয়েলারের গবেষক দল এটি থেকে দেখতে পান কোনো বিশেষ ধরনের বাসায় ভিন্ন ভিন্ন পিঁপড়াদের কাটানো সময় ভিন্ন। হোয়েলার এ সম্পর্কে বলেন, “কিছু পিঁপড়া আছে খুতখুতে, কিছু পিঁপড়া আবার স্বাধীনচেতা। তারা তাদের বর্তমান বাসার চেয়ে ভাল বাসা পেলেই খুশী। অনেকটা মানুষের মতোই।”

কিছু পিঁপড়াকে কখনোই সুখী মনে হয় না, তাদের বাসা যত সুন্দরই হোক না কেন। এই অস্থির স্বভাবের পিঁপড়ারা যে বাসায় বাস করে তারচেয়েও সুন্দর বাসার সন্ধানে থাকে। এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং তারা সবসময় নতুন কিছুতে আগ্রহী। কোনো কোনো পিঁপড়া আবার শান্ত স্বভাবের।

গবেষক দল দেখতে পান পিঁপড়ারা নির্বোধই হোক আর চালাকই হোক দুটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে একটি বেছে নিতে তাদের নির্বোধ বা চালাক ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটামুটি একই গতিতে হয়ে থাকে।

কিন্তু পিপড়ার কলোনীটি যদি দুটি ছন্নছাড়া বাসা থেকে একটি বেছে নিতে চায় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া (heterogeneity of responses) দেখা যায়। ফলে তারা দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। একটু কড়া স্বভাবের পিঁপড়ারা কলোনীর বাসিন্দাদের এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

image source: insider.si.edu

হোয়েলারোর সহকর্মীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে কোনটি বেছে নেবে তা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপরও নির্ভর করে। হোয়েলারের ভাষ্যমতে, যদি পিঁপড়ারা খুব ভালো বাসা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ভালো বাসায় যায় তাহলে তারা বুঝতে পারে যে এটা আগেরটার মতো ভালো নয়। যদি পিঁপড়ারা জীর্ণ কোনো বাসায় থাকে তাহলে পরে খুঁজে পাওয়া ভাল বাসায় বেশি সময় কাটায় তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণ কী? গবেষক ডর্নহেউস বলেন “অনেক নিয়ামকই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত পারে। হরমোনের মাত্রায় পার্থক্য, সেন্সরি রিসেপ্টরের সংখ্যায় পার্থক্য, বয়স, দেহের আকার অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত করে কোনোকিছু বলা মুশকিল।”

এখন সামনে গবেষকদেরকে জানতে হবে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তার পেছনে কী দায়ী এবং বিবর্তনের পথে এর ভূমিকা কী। এই গবেষণা অন্তত আমাদের এটুকু জানাতে পেরেছে যে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা আসলে প্রয়োজনীয় এবং তা পিপড়া কলোনীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

Ant’s choosiness reveals that they all have different personalities by Chris Simms, the new scientist, February 1, 2017.

featured image: aquarianonline.com

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

দেজা ভূ’র রহস্যময়তা

মনে করুন আপনি প্রথমবার জাফলং বেড়াতে গেছেন। জাফলংয়ের চোখ জুড়ানো অপরূপ সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করে মগ্ন হয়ে আছেন। হঠাৎই চমকে উঠলেন। মনে হতে লাগলো যে, দৃশ্যগুলো আপনার অতি পরিচিত, যেন আগেও কোথাও দেখেছেন। কিন্তু কোথায় দেখেছেন? কোথায় দেখেছেন? কোথায়? নাহ, কিছুতেই মনে পড়লো না। কিংবা এরকমও মনে হতে পারে যে, আপনি যেন আগেও জাফলং এসেছিলেন আর এরকম দৃশ্যই দেখেছিলেন। কিন্তু কবে এসেছিলেন মনে করতে পারলেন না।

এই অভিজ্ঞতাকেই বলা হয় দেজা ভূ। অর্থাৎ বর্তমান সময়ের কোনো ঘটনার সাথে অজ্ঞাত অতীতে ঘটা কোনো ঘটনার তীব্র সাদৃশ্য অনুভব করা। বেশিরভাগ লোকই জীবনে অন্তত একবার এই অভিজ্ঞতা লাভ করে। যাদের দেজা ভূর অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাছে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত মনে হয়। আর এই ঘটনার খুব তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী একটি প্রভাবও থেকে যায় মস্তিষ্কে।

যাদের জীবনে দেজা ভূ ঘটেনি তাদের কাছে ব্যাপারটা প্রায় অসম্ভব ও অকল্পনীয় মনে হয়। দেজা ভূ মনোবিজ্ঞানে খুবই জনপ্রিয় এবং রহস্যময় একটি ঘটনা। এ নিয়ে নানারকম তত্ত্ব আর গুজব প্রচলিত থাকলেও সত্যিকার গবেষণা হয়েছে খুবই কম।

কেন? তার কারণও বিচিত্র। দেজা ভূর জন্য নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যায় এমন কোনো উদ্দীপনা নেই। এজন্য এটা নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন। তাছাড়া দেজা ভূ নিয়ে নানা রকম সত্য-মিথ্যা ধারণা প্রচলিত থাকায় এর সংজ্ঞা স্থির করাও কঠিন। তাই ঠিক কোনখানে গবেষণা করতে হবে তা ঠিক করাই মুশকিল। তবে সম্প্রতি দেজা ভূর সাথে সম্পর্কযুক্ত অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা হচ্ছে।

দেজা ভূর বৈজ্ঞানিক ব্যাখার আগে চলুন জেনে আসি এর ইতিহাস সম্পর্কে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং লোকমুখে প্রচলনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে দেজা ভূর। তবে এর প্রকৃত রূপ অনেকটাই অজানা। না জানার পেছনে দীর্ঘকাল ধরে দেজা ভূ নিয়ে প্রচলিত বিচিত্র ও ভুলভাল ধারণা অনেকাংশে দায়ী। আজ যা দেজা ভূ বলে পরিচিত সেরকম একই ধারণা প্রচলিত ছিল এরিস্টটল, প্লেটো, পিথাগোরাসের সময়েও।

তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে দেজা ভূকে প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণার আওতায় আনা হয় ফ্রান্সে। তখন স্মৃতি গবেষণা তুমুল জনপ্রিয় ছিল। প্রথম থেকে দেজা ভূকে স্মৃতিজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে স্মৃতি জনিত সমস্যা বা প্যারামেনশিয়া নিয়ে আগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে দেজা ভূ নিয়েও মানুষের আগ্রহ বাড়ে। আসলে দেজা ভূ শব্দটাই প্রচলিত হয়নি ১৮৯০ এর দশকের মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত। তারপর নানাভাবে এর ব্যাখা দেবার চেষ্টা করা হয়। যেমন পূর্ব জন্মের স্মৃতির অনুভূতি, কল্পনা, স্মৃতিচারণ, স্মৃতি ভ্রংশ প্রভৃতি। তারপর বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় চলে আসে দেজা ভূ।

প্রথমদিকে দেজা ভূকে প্যাথোলজির সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। বিশেষ করে টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি ও সিজোফ্রানিয়ার লক্ষণ হিসেবে দেজা ভূকে চিহ্নিত করা হয়। তবে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া ওষুধের ব্যবহার এবং ওষুধ ব্যবহার বন্ধের সাথে পুনঃপুন দেজা ভূ ঘটার ইতিবাচক সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে।

দেজা ভূ আসলে কী

দেজা ভূ শব্দটি ফরাসি। এর ইংরেজি অর্থ করলে দাড়ায় already seen। অর্থাৎ দৃশ্যগুলো আগেও দেখা হয়েছে। আমজনতার মধ্যে দেজা ভূ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা দেখা গেলেও খুব কম মানুষই এর প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানে। কেউ কেউ কোথাও অদ্ভুত কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়াকেও দেজা ভূ বলে চালিয়ে দেয়।

দেজা ভূ বলতে আসলে বোঝায় নির্দিষ্ট কোনো তীব্র অনুভূতি। যেন পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমান ঘটনার সাদৃশ্য রয়েছে কিন্তু দুটো ঘটনা পুরোপুরি এক নয়। অথবা ভবিষ্যৎ জেনে যাবার মতো অনুভূতি যেন কেউ জানে যে পরবর্তীতে কী ঘটবে। এই অনুভূতি কয়েক মিনিটের মতো স্থায়ী হতে পারে, তবে সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থাকে।

দেজা ভূ নিয়ে অনেক তত্ত্ব প্রচলিত থাকলেও মোটামুটি চারটি প্রধান তত্ত্ব দ্বারা একে ব্যাখা করা যায়। এগুলো হলো ডুয়াল প্রসেসিং থিওরি, নিউরোলজিক্যাল থিওরি, মেমোরি থিওরি, এবং এটেনশনাল থিওরি।

ডুয়েল প্রসেসিং থিওরিঃ এই তত্ত্ব অনুসারে দুটি নিরীহ চিন্তা একইসাথে চলতে চলতে হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য আলাদা হয়ে গেলে দেজা ভূ ঘটে। এরকম আলাদা হবার ঘটনা ঘটে যখন দুটি চিন্তার মাঝে একটি ভুল সময়ে আবির্ভূত হয়। আবার এর বিপরীত চিন্তাপ্রবাহও দেজা ভূ ঘটায়। দুটি চিন্তা আলাদাভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একসাথে মিলিত হয়ে গেলে দেজা ভূ ঘটে। তরঙ্গের উপরিপাতনের মতো।

নিউরোলজিক্যাল থিওরিঃ এই তত্ত্ব বলে, মস্তিষ্কে প্রবাহিত সংকেতের গতির পরিবর্তনের ফলে দেজা ভূ ঘটে। সংকেত প্রবাহের গতির এই পরিবর্তন দুইভাবে ঘটে। একক পথে ও দ্বৈত পথে। একক পথে সংকেত প্রবাহিত হলে তা মস্তিষ্কে একটু ধীরে পৌঁছায়। স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরে যাওয়ায় মস্তিষ্কে দেজা ভূ ঘটে। দ্বৈত সংকেত প্রবাহের ক্ষেত্রে মূখ্য সংকেতটি ধীরে যায়। আগের ও পরের সংকেত মিলে এমন একটা অবস্থা হয় যে মনে হয় এটি আগেও হয়েছিল কিংবা ভবিষ্যতের কিছু জেনে গেছে।

মেমোরি থিওরিঃ মেমোরি তত্ত্বে বস্তুগত সাদৃশ্যকে আলোকপাত করা হয়। এ থিওরি অনুযায়ী একটি দৃশ্যের কোনো বস্তু বা পুরো দৃশ্যটাই অন্য দৃশ্যের সাথে মিল আছে বলে মনে হতে পারে।

এটেনশনাল থিওরিঃ এই তত্ত্বে ধারণা করা হয়, একই উদ্দীপনা সম্পর্কে দ্রুত দুটি অনুভূতি অনুভব করার জন্য দেজা ভূ ঘটে। হতে পারে আপনি কোনোকিছু নিয়ে পূর্ণ সচেতনতার সাথে চিন্তা করছেন। এরপর কিছুক্ষণের জন্য চিত্তে বিক্ষেপ ঘটলো। মনোযোগে খুব সামান্য একধরনের সাদৃশ্যের অনুভূতি নিয়ে আসতে পারে।

দেজা ভূর উল্টো পিঠ

জামিয়াস ভূ হচ্ছে দেজা ভূর ঠিক বিপরীত ঘটনা। দেজা ভূ’তে সাদৃশ্যের অনুভূতি অনুভূত হয়। কিন্তু জামিয়াস ভূ’তে অনুভূত হয় বৈসাদৃশ্যের অনুভূতি। জামিয়াস ভূ’র অর্থ হচ্ছে never seen অর্থাৎ কখনোই দেখা হয়নি এমন দৃশ্য। জামিয়াস ভূ হচ্ছে এরকম যেন আপনার বর্তমান পরিস্থিতি কোথাও দেখেছেন কিন্ত তা আপনার অপরিচিত লাগছে।

ধরুন আপনি আপনার শোবার ঘরে হাঁটছেন, তখন মনে হতে পারে আপনি কখনো এখানে আসেনইনি। কিন্তু আপনি নিশ্চিত জানেন যে এটা আপনারই শোবার ঘর। জামিয়াস ভূ দেজা ভূর তুলনায় খুবই অল্প ঘটে। মানসিক চাপ, ক্লান্তি সহ অন্যান্য কারণে জামিয়াস ভূর অভিজ্ঞতা হতে পারে।

দেজা ভূ একটি সাধারণ ঘটনা তবে সার্বজনীন ঘটনা নয়। এটি তরুণদের মাঝে বেশি দেখা যায়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দেজা ভূর পৌনঃপৌনিকতা কমে আসে। ভ্রমণ, ক্লান্তি, মানসিক চাপ প্রভৃতির প্রভাবেও দেজা ভূ ঘটে থাকে। যদিও এখন পর্যন্ত দেয়া কোনো তত্ত্বই দেজা ভূকে পুরোপুরি ব্যাখা করতে পারে না তবে কগনিটিভ সায়েন্সের ভবিষ্যত গবেষণা এ নিয়ে আমাদের আরো নতুন তথ্য জানাতে পারে বলে আশা করা যায়।

তথ্যসূত্র

Scientific theories on deja vu phenomenon by Reckard Redgard

কান্না নিয়ে যত কথা

জীবন শুরু হয় কান্না দিয়ে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় সমস্ত উপলক্ষে জড়িয়ে আছে কান্না। কখনো কাঁদি বিষাদে, কখনো বা আনন্দে, কখনো বা কারণ ছাড়াই। কান্না নিয়ে কত গল্পগাথা, কত কবিতা, কত গান। কখনো কি ভেবে দেখেছি আমরা কীভাবে কাঁদি? কেন কাঁদি? পেঁয়াজ কান্নার সাথে আনন্দে কান্না বা বিষাদে কান্নার পার্থক্য কিসে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা নিয়েই আজকের লেখাটি।

কান্না হচ্ছে আবেগের প্রতি সাড়া দিয়ে চোখের মাধ্যমে জল পড়া। চোখের উপরের পাতায় অশ্রুগ্রন্থির অবস্থান। এখানেই অশ্রুর উৎপত্তি হয়। চোখের উপরের অংশের কর্নিয়া এবং শ্বেত-তন্তুতে অনেকগুলো ছোট ছোট অশ্রুনালী (tear ducts) থাকে। এই নালী পথে অশ্রু পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। অশ্রু এই প্রক্রিয়ায় চোখকে আর্দ্র রাখে।

অশ্রুনালী ছড়িয়ে থাকে নাসাগহ্বরেও। যখন কোনো শক্তিশালী আবেগ আমাদের নাড়া দেয় অর্থাৎ আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে তখন চোখ দিয়ে তো অঝোরে জল ঝরেই, নাক দিয়েও ঝরে। একেই বলে ‘নাকের জলে চোখের জলে এক হওয়া’।

ভালো কাঁদতে পারা বা না পারা মনোশারীরিক কোনো মেধার স্বাক্ষর বহন করে কিনা, কিংবা সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভেদে কান্নার ধরণ আলাদা কিনা মনোবিজ্ঞীরা এইসব প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণা আমাদের সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কান্নাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।

নারীরা অবশ্যই পুরুষদের তুলনায় বেশি কাঁদেন। জার্মান সোসাইটি অব অপথ্যালমোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে বছরে নারীরা গড়ে ৩০ থেকে ৬৪ বার আর পুরুষেরা গড়ে ৬ থেকে ১৭ বার কাঁদেন। শব্দ করে কান্নার ক্ষেত্রে নারীদের হার ৬৫%। পুরুষরা এদিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে! মাত্র ৬% পুরুষ শব্দ করে কাঁদেন।

প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন হয়?

শারীরতাত্ত্বিক দিক থেকে বলতে গেলে পুরুষের শরীরে থাকা টেস্টোস্টেরণ হরমোনই কান্নাকে দমিয়ে রাখে। অন্যদিকে, নারীদের শরীরে থাকে প্রোল্যাক্টিন। প্রোলাক্টিনের উপস্থিতির কারণেই নারীর কান্নার প্রবণতা বেশি। কিন্তু এই দুটি হরমোনের উপস্থিতিই যে আপনার কান্না বা কান্নাহীনতার জন্য সর্বাংশে দায়ী তা কিন্তু নয়। কান্না মূলত তিন প্রকার এবং প্রত্যেক প্রকার কান্নার ধরণ ও কান্নায় জড়িত রাসায়নিক পদার্থগুলো আলাদা।

কান্নার প্রকারভেদ

চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ, ব্যাকটেরিয়ানাশক এক প্রকার তরল পদার্থ নির্গত হয়। চোখ মিটমিট করলে এই তরল পুরো চোখে ছড়িয়ে যায়। এই ধরনের কান্নাকে বলে বেসাল কান্না (basal tears)। এর ফলে আমাদের চোখ সবসময় আর্দ্র এবং সুরক্ষিত থাকে।

পেঁয়াজ কাটার সময়ের কান্না। এই কান্নাকে বলে রিফ্লেক্স কান্না (reflex tears)। রিফ্লেক্স কান্না চোখকে ক্ষতিকর পদার্থ যেমন বাতাস, ধোঁয়া এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ থেকে রক্ষা করে। এর ফলে চোখে হঠাৎ করে পড়া ময়লা, পোকামাকড় চোখ থেকে বেরিয়ে যায়।

তৃতীয় প্রকার কান্না হচ্ছে প্রাকৃতিক কান্না (physic tears)। এটা হলো আবেগজনিত কান্না। এই ধরনের কান্নার ফলে চোখ থেকে ঝর ঝর বাদল ধারার মতো অশ্রুধারা নামতে থাকে! মানসিক চাপ, হতাশা, বিষন্নতা থেকে এই কান্নার সৃষ্টি। এমনকি অনেক সময় অতিরিক্ত হাসলেও আমাদের চোখ থেকে পানি পড়ে। এটাও আবেগজনিত কান্না।

বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, আনন্দের ফলে চোখ থেকে অশ্রু ঝরা শরীরের আবেগীয় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এক পরীক্ষায় দেখেন, যারা ইতিবাচক সংবাদে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান তারা দ্রুত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

আচ্ছা, এসব নানা প্রকার চোখের জল কি একই রকম দেখতে? উত্তর হচ্ছে- না। ফটোগ্রাফার রোজলিন ফিশার তার নতুন প্রজেক্ট ‘টপোগ্রাফি অব টিয়ারস’ নিয়ে কাজ করার সময় চোখের জলের ব্যাপারে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন। তার নিজের চোখের জলকে একটি স্লাইডে রেখে শুকিয়ে ফেলেন। তারপর আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণের পর তার অনুভুতি প্রকাশ করেছেন- “এটা সত্যিই মজার ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্লেন থেকে দেখা নিচের কোনো দৃশ্য।”

ফিশার বিভিন্নরকম অশ্রু একই রকম দেখতে কিনা তা জানার জন্য কয়েক বছর ধরে ফটোগ্রাফি প্রজেক্টটি করেন। নিজের এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে একশয়েরও বেশি চোখের জলের নমুনা সংগ্রহ করেন। এগুলো পরীক্ষা করেন এবং ছবি তোলেন। এর মধ্যে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর অশ্রুও ছিল। তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে চোখের জলের যে গঠন দেখেন সাধারণভাবে তা ছিল স্ফটিকাকার লবণ।

কিন্তু, বিভিন্ন আবেগীয় অবস্থায় ঝরা জলের আণুবীক্ষনিক পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় এদের আকার এবং গঠন ভিন্ন। একই রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত দুটি প্রাকৃতিক কান্নার ছবি ছিল ভিন্ন। মানে আপনি আনন্দে কাঁদলেন আর আপনার বন্ধু দুঃখ পেয়ে কাঁদলেন, এই দূরকম চোখের জল দেখতে আলাদা হবে। এদের সান্দ্রতা, গঠন, বাষ্পীভবনের হার সহ আরো অনেক কিছুতেই পার্থক্য থাকবে।

চিত্রঃ বিভিন্ন সময়ের কান্নার আণুবীক্ষণিক গঠন।

ফিশারের গবেষণা এবং পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় বিভিন্ন দৃষ্টকোণ থেকে দেখা চোখের শুকনো জলের স্লাইড আকাশ থেকে দেখা বিশাল কোনো দৃশ্যের মতো। তাই তিনি একে বলেন, ‘মনোভূখন্ডের অন্তরীক্ষ দৃশ্য’।

কান্নার সাথে জড়িত হরমোন

প্রোল্যাক্টিন এবং টেস্টোস্টেরণ ছাড়াও কান্নায় আরো কিছু হরমোন এবং নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা আছে। সেরকম একটি হরমোন হচ্ছে সেরেটোনিন। গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চা জন্মদানের পরে শরীরে ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। ট্রিপটোফ্যান সেরেটোনিনের ক্ষরণ ত্বরান্বিত করে। ট্রিপটোফ্যান কমে গেলে আবেগীয় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় এবং কান্নার প্রবণতা বাড়ে। প্রেমে পড়লেও ট্রিপটোফ্যান কমে যায়। এজন্যই দেখা যায় প্রেমাক্রান্ত নারী বেশি কাঁদে।

কান্না কি উপকারী?

হ্যাঁ, উপকারী। চলুন দেখি কান্না আমাদের কী কী উপকার করে। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে ATCH (Adrenocorticotropic hormone) ক্ষরিত হয়। এর প্রভাবে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল উৎপন্ন হয়। কর্টিসল রক্তচাপ বাড়ায়। রক্তে চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়িয়ে তোলে। আরো বিভিন্ন শারীরতাত্ত্বিক পরিবর্তন আমাদেরকে কাজ করতে উদ্দীপ্ত করে। এর ফলে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। এই চাপ কমানোর মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে কান্না।

কান্নাকাটির পর শান্ত অনুভব করার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই আছে। এর কারণ হলো, কাঁদলে অতিরিক্ত ATCH বের হয়ে যায় এবং কর্টিসোলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে চাপ কমে যায়। আমাদের শরীরে থাকা চাপ নিবারক আরেকটি উপাদান হচ্ছে লিউসিন এনকেফালিন (leucine enkephalin)। আবেগজনিত অশ্রুর সাথে এটি নিঃসৃত হয়। এটি ব্যথা কমায় এবং মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়। পেইনকিলার হিসেবে আমরা যে ওষুধগুলো খাই লিউ এনকেফালিন অনেকটা সেরকম কাজ করে।

বিভিন্ন বয়সে কান্না

প্রথমেই তাকাই শৈশবে। নতুন জন্মানো শিশুর কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। পানি পড়ে আরেকটু বড় হলে। কান্না আসলে শিশুদের যোগাযোগের মাধ্যম। ক্ষুধা লাগলে বা ঘুম পেলে কিংবা ব্যথা পেলে তারা কাঁদে। শিশু আরেকটু বড় হলে ধরা যাক ১০ মাস বয়সে কাঁদে মনোযোগ আকর্ষণের জন্য। দক্ষ অভিনেতার মতো এ কান্নাকে বলে মায়াকান্না (crocodile tears)।

বয়সন্ধীকালে টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণ ক্ষরিত হয়। এসময় মেয়েরা বেশি কাঁদে। ছেলেরা লক্ষ্যণীয়ভাবে কম কাঁদে। মেয়েদের বেশি কাঁদার আরেকটা কারণ তাদের অশ্রুনালী ছেলেদের তুলনায় কম দীর্ঘ। এজন্য দ্রুত চোখে পানি আসে। প্রাপ্ত বয়স্ক হবার সাথে সাথে কান্নার ধরণ বদলাতে থাকে। কারণ টেস্টোস্টেরণ এবং প্রোজেস্টেরণের মাত্রায় পরিবর্তন আসে তখন। পুরুষেরা বেশি কাঁদতে থাকে, নারীরা কম।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কান্না

সংস্কৃতি ভেদে কান্না ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন পশ্চিমা সমাজে কান্নাকে ইতিবাচকভাবে নেয়া হলেও এশীয় সমাজে বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে ধরা হয়। এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকা এবং ইতালির লোকজন চীন এবং ঘানার লোকজনের চেয়ে বেশি কাঁদে।

পার্থক্য আছে শেষকৃত্যে কান্নার ধরণেও। যেমন ফিজিতে আপনি মরদেহ দাফন করার আগে পর্যন্ত কাঁদতে পারবেন না। ইরানে আবার জোরে জোরে কাঁদলে সমস্যা নাই। ধর্মভেদেও কান্না আলাদা হয়। যেমন ইসলামে কান্নাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আবার বুদ্ধধর্মে কান্না অনুমোদিত নয়।

কতটুকু কান্না স্বাভাবিক?

শিশুদের জন্য প্রতিদিন তিন ঘন্টা কাঁদা স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি কাঁদলে বুঝতে হবে তাদের চিকিৎসা দরকার। ঠান্ডা লাগা বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্কদের কান্নার ক্ষেত্রে কোনো সময় আসলে নাই। কান্নার পরিমাণ অনেকাংশেই প্রভাবিত হয় মানুষের পরিবেশ দ্বারা।

আপনি কতটুকু কাঁদছেন তা বলে দেয় আপনি মানসিকভাবে কতটুকু সুস্থ। অতিরিক্ত কান্নাকাটি ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। আবার একেবারে না কাঁদা বা কম কাঁদাটাও তীব্র ডিপ্রেসনের উপসর্গ হতে পারে। এই ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন, নেদারল্যান্ডসের গবেষকরা বেশি কান্না বা কম কান্না ডিপ্রেসনের লক্ষণ এই দাবীর পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাননি।

কান্না যখন আবেগ ছাড়াও বেশি কিছু

আপনাকে কেউ অশ্রুসজল চোখে দেখার মানে এই নয় যে আপনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন! শরীরের অন্য কোনো সমস্যার কারণে এমন হতে পারে। অশ্রুনালী বন্ধ হয়ে গেলেও আপনার চোখ প্লাবিত হতে পারে। বার্ধক্য, আঘাত, সংক্রমণ, প্রদাহের কারণে এমন হতে পারে। এই ধরনের কান্নার প্রতি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে বলে প্যাথলজিক্যাল কান্না। আবার কিছু কিছু রোগ যেমন, স্ট্রোক, আলঝেইমার, মাল্টিপল সেরোসিস ইত্যাদির কারণেও চোখ থেকে পানি পড়তে পারে।

গবেষকরা বলেন, এরকম অতিরিক্ত কান্নাকাটি বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনা ছাড়াও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সেরেটোনিনের পরিমাণ কমে যাওয়ার উপর দোষ চাপানো যেতে পারে। সর্বোপরি, কান্না যতক্ষণ না প্যাথলজিক্যাল হচ্ছে এর জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

সবশেষে বলা যায়, মানুষ একমাত্র প্রাণী যে আবেগে কাঁদতে পারে। কান্না শুধু মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্যেই নয়, এর আছে মানিসকভাবে মানুষকে সুস্থ রাখার বিশাল শক্তি। মন খুলে কাঁদা আমাদের সুস্থ এবং চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করে। কান্না কোনো দুর্বলতা নয়, এটা একটা শক্তি। তাই, কান্না পেলে মন খুলে কাঁদুন। সুস্থ থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. wikipedia.org/wiki/crying

২. www.apa.org/monitor/2014/02/cry.apx

৩. http://www.telegraph.co.uk/news/science/science-news/11227082/Why-do-we-cry-tears-of-joy.html

৪. Microscopic view of dried human tears, joseph stromberg, smithsonian magazine

featured image: istockphoto.com

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়