মূত্র থেকে প্লাস্টিক

মহাকাশ নিয়ে মানবজাতির তুমুল আগ্রহ। তারই ধারাবাহিকতায় স্পেস-এক্স এর তত্ত্বাবধায়নে এগিয়ে যাচ্ছে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের প্রস্ততি। মঙ্গল গ্রহে যাত্রা কিংবা অন্য যেকোনো গ্রহে যাত্রা যথেষ্ট দীর্ঘ হবে। সেখানে অবশ্যই থাকবে বস্তু ও সরঞ্জামের সমস্যা। তাই সকল বস্তু পূণর্ব্যবহা্রের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত থাকতে হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীরা মূত্র থেকে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত পানি পান করে থাকেন। মঙ্গল গ্রহের দীর্ঘ যাত্রায় সফল হতে চাইলে নভোচারীদের কাছে বিদ্যমান সবকিছুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সাউথ ক্যারোলিনার ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন এক প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে মূত্র ও নিঃশ্বাসের সাথে ত্যাগ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে প্লাস্টিক বানানো সম্ভব।

এ প্রক্রিয়ায় Yarrowia lipolytica  নামক ইস্ট ব্যবহার করা হয়। শুরুতে মূত্র থেকে প্রাপ্ত নাইট্রোজেন ও নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টকে প্রদান করা হয়। ইস্টকে এমনভাবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারং করা হয়েছে যেন তা নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের পর পলিএস্টার মনোমার তৈরী করে। এসকল মনোমার থেকে তৈরী হয় প্লাস্টিক পলিমার। প্রাপ্ত প্লাস্টিক একটি থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে ব্যবহার্য বস্তু তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

চিত্র: ঈস্ট ব্যবহার করে মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে প্লাস্টিক উৎপাদন

উক্ত ইস্টের ভিন্ন একটি স্ট্রেইন অনুরূপ প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে  মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড উৎপাদনে সক্ষম। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মানবদেহের জন্য অপরিহার্য এক উপাদান যা আমরা নিজেরা তৈরী করতে পারি না, খাদ্যবস্তু থেকে পাই।

নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টের গ্রহণ উপযোগী করার জন্য সায়নোব্যাকটেরিয়া বা শৈবাল ব্যবহৃত হয়।

তথ্যসূত্র: BBC Focus

বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

রোগব্যাধী ও মৃত্যু থেকে দূরে থাকার জন্য বর্তমানে আমাদের আছে বৈচিত্র্যময় ও বিশাল পরিমাণ ওষুধের সরবরাহ। মজার ব্যাপার হলো জীবন রক্ষাকারী অনেক ওষুধ তৈরী হয় প্রাণঘাতী বিভিন্ন বিষ থেকে।

চিত্র: বোটুলিনাম বিষের ত্রিমাত্রিক গঠন।

পাশের চিত্রটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদানের ত্রিমাত্রিক গঠন। এই বিষাক্ত যৌগটির মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ, আস্ত একটি দেশের সকল মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। এক কেজি পরিমাণ এই বিষ সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষকে মারতে সক্ষম। এই বিষ এতটাই বিপদজনক যে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় এটিকে উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষের প্রতি কেজির মূল্য ১০০ ট্রিলিয়ন ইউরো। যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া সবচেয়ে দামী ও ব্যয়বহুল উপাদান।

মারাত্মক এই উপাদানটি হলো বোটুলিনাম বিষ। বোটক্স (Botox) নামেই অধিক পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সসেজ জাতীয় খাদ্যে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়ায় বোটক্স আবিষ্কৃত হয়। ল্যাটিন ভাষায় সসেজ মানে হলো বোটুলাস। এখান থেকেই এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে।

বিষের বিষাক্ততা মাপা হয় আছে LD50 স্কেলে। বিষ প্রয়োগের পর বিষ দ্বারা আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মারতে কত পরিমাণ সময় লাগে তার উপর ভিত্তি করে এই স্কেল তৈরি করা হয়েছে। এই স্কেলে বোটক্সের মান হলো ০.০০০০০১ মিলিগ্রাম/কেজি। অর্থাৎ একটি ৭০ কেজি ভরের মানুষকে মারতে আপনার মাত্র ০.০০০০৭ মিলিগ্রাম বোটক্স প্রয়োজন হবে।

অন্যভাবে বললে আপনার জন্য প্রাণঘাতী এক ডোজ বোটক্সের পরিমাণ এক কিউবিক মিলিমিটার বায়ু থেকেও কম। বোটুলিনাম বিষ শ্বসনক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিকে মেরে ফেলে। এটি নিউরোটক্সিন। স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে কোষ ও কোষের অভ্যন্তরের প্রোটিন ধ্বংস করতে শুরু করে।

সাধারণত স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন দ্বারা স্নায়ুর অনুভূতি তড়িৎ সংকেত বা Electric Impules হিসেবে স্নায়ুসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে এটি বিশেষ এক রাসায়নিক সংকেতে পরিবর্তিত হয়ে স্নায়ুসন্ধি অতিক্রম করে এবং পেশীকোষে যায়। পেশীকোষের গিয়ে এই রাসায়নিক সংকেত পুনরায় তড়িৎ সংকেতে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পেশী কোষ সংকোচিত হয়।

অ্যাক্সন নামক যে প্রান্ত দ্বারা একটি স্নায়ুকোষ, পেশীকোষের সাথে সন্ধি সৃষ্টি করে সেখান থেকে এসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রোগী পেশী সঞ্চালনে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত্র হয়। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের মাধ্যমেই পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সময় লাগতে পারে মাসের পর মাস।

চিত্র: স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে বিদ্যমান স্নায়ুসন্ধি।

বোটক্স এত বিষাক্ত হওয়ার পরেও এত জনপ্রিয় কীভাবে হলো? বয়স বৃদ্ধির সাথে মানুষের চেহারায় ও ত্বকে যে ভাঁজ সৃষ্টি হয় তা এই বিষ দূর করতে সক্ষম। যেসকল স্নায়ুকোষ ত্বকে ভাঁজ সৃষ্টির জন্য দায়ী সেসব কোষ ধ্বংসের মাধ্যমে বোটক্স ত্বকের ভাঁজ হওয়া বা কুঞ্চন রোধ করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বোটক্সের পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র, যা প্রায় এক গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ এবং এটি স্যালাইনের সাথে মিশ্রিত করে প্রদান করা হয়।

বোটক্স ব্যবহারের ফলে ত্বক ঠিকই মসৃণ হয়, কিন্তু স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুখে এক অদ্ভুতুরে অভিব্যক্তির সৃষ্টি করে।

চিত্র: ত্বক মসৃণ করতে ব্যবহার হয় বোটক্স।

বোটুলিনাম বিষ শুধুমাত্র একটি সাধারণ সৌন্দর্য্যবর্ধক উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তা কিন্তু নয়। নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানেও বোটক্স অত্যন্ত উপযোগী। এদের মধ্যে আছে তির্যকদৃষ্টি, মাইগ্রেন, অত্যাধিক ঘামরোগ, দুর্বল মূত্রথলী ইত্যাদি। বর্তমানে ২০টিরও বেশি রোগ নিরাময়ের জন্য বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিষ দিয়ে চিকিৎসার এটি তো একটি মাত্র উদাহরণ। এরকম আরো অনেক আছে। ক্যাপটোপ্রিল হলো উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান এক ওষুধ। এটি প্রস্তুত করা হয় সাপের বিষ থেকে। এক্সেনাটাই (বাণিজ্যিক নাম বেয়েট্টা, Byetta) একটি কার্যকরী ওষুধ। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে বাস করা গিরিগিটি জাতীয় প্রাণী গিলা মনস্টার-এর বিষাক্ত লালারস গবেষণা করে এই ওষুধটি আবিষ্কার করা হয়।

বিষ যে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে তার ইতিহাস কিন্তু মোটেও মধুর নয়। রাণী ভিক্টোরিয়ার যুগ, ব্রিটেনে তখন জীবন বীমার পরিমাণ হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে। বীমার সহজলভ্য টাকার লোভে খুনের পরিমাণও তুমুল পরিমাণে বাড়তে থাকে। এদের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে।

তখনকার অনেক বেশি আলোচিত মামলার একটি ছিল মেরি এন কটন নামক এক মহিলার নামে। তিনি ১৮৭৩ সালে একাধিকবার খুনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি ৪টি বিয়ে করেন এবং তার স্বামীর ৩ জনই সমৃদ্ধ বীমার মালিক ছিলেন। তারা সকলে স্ত্রীর হাতে খুন হন। বেঁচে যাওয়া স্বামী বীমা উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানালে উনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন।

তার মোট ১০ সন্তান মারা যায় তাদের পরিপাক জটিলতার কারণে। মানবিকভাবে প্রত্যেকটা মৃত্যু দুঃখজনক হলেও কটনের জন্য তা ছিল আরো বীমার টাকার হাতছানি। তার শাশুড়ি, ননদ, স্বামী সবাই এক এক করে মারা যায়। ১৮৭২ সালের মাঝে তিনি বিস্ময়করভাবে ১৬ জন নিকট আত্মীয়কে হারান। বাকি ছিল শুধুমাত্র একজন। তার ৭ বছরের সৎ ছেলে চার্লস। তিনি তাকে স্থানীয় কারখানায় পাঠাতে চাইলেও কারখানার মালিক তাকে রাখতে রাজি হয়নি। এর কদিন পরেই অল্পবয়সী চার্লসও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কারখানার ম্যানেজারের মনে এই ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করলে তিনি স্থানীয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। নানা ঘটনা শেষে পুলিশ সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনি, শিশু চার্লসকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। তারা জানতে পারেন এ কাজটি করা হয়েছে আর্সেনিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

চিত্র: আর্সেনিক অক্সাইড, এক নীরব বিষ।

আর্সেনিক অক্সাইড সমূহ হলো খনিজ। আর বিষ হিসেবে এসব খনিজ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অক্সাইড স্বাদহীন, গরম পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি মানুষ মারার জন্য এক আউন্স পরিমাণের ১০০ ভাগের ১ ভাগই যথেষ্ট। তবুও উনবিংশ শতাব্দীতে এই আর্সেনিক খনিজ ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতে থাকে। সে সময় আর্সেনিক অক্সাইড ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। শিশুরা খুশিমনে দোকান থেকে চা, চিনি কিংবা শুঁকনো খাবারের পাশাপাশি এটিও কিনতে পারত।

অন্যদিকে, আদালতে মেরি কটনের বিচার নির্ভর করছিল পুলিশ তার সৎ ছেলে চার্লসের দেহে আর্সেনিকের আলামতো খুঁজে পায় কিনা তার উপর। সে সময় ফরেনসিক বিজ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও আর্সেনিকের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য একটি ভালো পরীক্ষা তাদের জানা ছিল।

মৃত চার্লসের পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে নেয়া নমুনা এসিড ও কপারের সাথে উত্তপ্ত করা হয়। কপার গাড় ধূসর রঙ ধারণ করলেই আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণ হবে।

পুলিশ তদন্ত করে দেখায় যে, প্রাণঘাতী আর্সেনিকের ডোজ প্রদানের মাধ্যমে চার্লসকে হত্যা করা হয়। কটনকে চার্লসের খুনের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং দুরহাম জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

এরকম বহু বেপরোয়া খুন ও বিষ প্রয়োগের ঘটনার কারণে প্রথম আর্সেনিক আইন ও এরপর ওষুধ আইন ১৮৬৮ এর দিকে নিয়ে যায়। এই আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট এবং ওষুধ-বিক্রেতাই নানাবিধ বিষাক্ত উপাদান ও বিপদজনক ওষুধ বিক্রি করতে পারবে।

বিষক্রিয়া, দুর্ঘটনা, খুন এসবের মাধ্য দিয়েই বর্তমান আধুনিক ওষুধ শিল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে। জানলে অবাক হবেন এই আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই ক্যান্সার প্রতিরোধে বৈধভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

তথ্যসূত্র: bbc.com/news/magazine-24551945

স্ট্রোকের সময় কী ঘটে দেহে?

প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এবং প্রতি ৬ জন মানুষের একজন তার জীবনকালে একবার হলেও স্ট্রোকের শিকার হয়।

মস্তিষ্কের রক্তনালী আঘাতগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অপর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ফলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে স্ট্রোক বলে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী প্যারালাইসিসের শিকার হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মানুষের মৃত্যূর জন্য খুব সাধারণ একটি কারণ হলো স্ট্রোক। যখন কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অপরিহার্য। নইলে মস্তিষ্কে হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী ক্ষতি।

স্ট্রোকে কেন মানুষ আক্রান্ত হয়?

আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেনের অভাবে কোনো কোষ জীবিত থাকতে পারে না। এই অক্সিজেন প্রতিটি কোষে সরবরাহ হয় রক্তের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক যদিও সমগ্র দেহের ভরের মাত্র ২% বহন করে কিন্তু সারা দেহে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের ২০% খরচ করে এই মস্তিষ্ক।

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ধমনীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ক্যারোটিড ধমনী মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে এবং ভার্টিব্রাল ধমনী মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই দুই ধমনী পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে Circle Of Willis গঠন করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতুম অংশে বিভক্ত হয়ে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ সকল রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে স্নায়ুকোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। একেই আমরা স্ট্রোক বলি।

চিত্রঃ ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল ধমনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় Circle of Willis

স্ট্রোক দুই প্রকার। হ্যামোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke) ও ইসকিমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)। আঘাত বা অন্য কোনো কারণে যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে এবং রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ঐ ব্যক্তি হ্যামোরেজিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মস্তিষ্কের রক্তনালীকে বন্ধ করে দেয়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ইসকিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এই স্ট্রোকই বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আঘাত বা রক্তপাত ব্যতীত এই রক্ত জমাট বাঁধে কীভাবে?

মাঝে মাঝে, হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ছন্দে গড়মিল দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ডে দুটি অলিন্দ থাকে। মাঝে মাঝে অলিন্দ দুটির স্বাভাবিক সংকোচন ঘটে না। ফলশ্রুতিতে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চালনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই সুযোগে রক্তে বিদ্যমান অণুচক্রিকা, ক্লটিং ফ্যাক্টর এবং ফাইব্রিন একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা কুণ্ডলী গঠন করে। সেটি রক্তেই ভাসমান থাকে। জমাটবাধা অংশটি রক্তে সাথে প্রবাহিত হতে হতে একসময় মস্তিষ্কের অতি সরু রক্তনালীতে এসে আঁটকে যায়। এই ঘটনাকে বলে এম্বোলিজম (Embolism)।

এম্বোলিজমের কারণে উক্ত রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঐ রক্তনালী যেসকল কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতো, সেসকল কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে। মস্তিষ্ক ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যথা পাই। কিন্তু মস্তিষ্কে ঘটলে ব্যথা পাওয়া যায় না। কারণ মস্তিষ্কে ব্যথা-সংবেদী স্নায়ুকোষ থাকে না।

অক্সিজেন সরবারহ না হওয়ায় স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু কিছু আচরণগত অস্বাভাবিকত্ব ও লক্ষণ দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটি ভাষা প্রকাশের কাজ করে থাকে তাহলে ঐ বক্তির স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হবে।

যদি আক্রান্ত অঞ্চল পেশি সঞ্চালনের কাজ করে তবে দেহের কোনো অঙ্গ দূর্বল হয়ে পড়বে এবং নড়াচড়া করতে সমস্যা হবে। এভাবে যদি মস্তিষ্কের অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তবে চিরস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রক্তে টিস্যু প্লাজমিনোজেন একটিভেটর (TPA) প্রবেশ করানো হয়। এটি রক্তনালীতে আটকে থাকা রক্তকুণ্ডলীকে ভেঙ্গে দেয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্ত নালীতে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হয়।

স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটি প্রদান করতে পারলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। যদি কোনো কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে TPA প্রদান করা সম্ভব না হয় (রক্ত কুণ্ডলী অনেক বড় হলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো মেডিসিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে) তবে চিকিৎসকরা Endovascular Thrombectomy নামক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ফ্লোরোসেন্ট ডাই প্রদান করা হয়। এরপর শক্তিশালী এক্স-রে যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোথায় এবং কোন রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নির্ণয় করা হয়। তারপর একটি অতি সূক্ষ্ম নল পায়ের ধমনী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রেরণ করা হয়। এই নলের ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে জমাট রক্তকুণ্ডলী বাইরে বের করে আনা হয়।

চিত্র: তন্তু ব্যবহার করে জমাট রক্তকুন্ডলী বের করে আনার কৌশল

স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত জরুরী। কেননা সময় যত যেতে থাকবে ক্ষতির পরিমাণ ও তীব্রতা ততই বাড়তে থাকবে। তাই রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্ট্রোক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করার জন্য Fast Test পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ।

১) ব্যক্তিকে হাসতে বলা। মুখমণ্ডলে সংকুচিত কিংবা বাঁকা পেশি দুর্বলতার সংকেত বহন করে। যা স্ট্রোকের ফলে হতে পারে।

২) ব্যক্তিকে দুই হাত উপরে তুলতে বলা। যদি পেশি দুর্বলতার জন্য হাত উপরে তুলতে না পারে তবে এটিও স্ট্রোকের লক্ষণ।

৩) কোনো একটি শব্দ বার বার বলতে বলা। যদি ব্যক্তি এটি স্বাভাবিকভাবে বলতে না পারে তবে হতে পারে স্ট্রোকের কারণে তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা প্রকাশ কেন্দ্রে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

উক্ত তিনটি লক্ষণের একটি দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে স্ট্রোকের প্রকটতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র

https://ed.ted.com/lessons/what-happens-during-a-stroke-vaibhav-goswami

featured image: thinkhealth.priorityhealth.com

মাল্টিপল অ্যালিল এবং পিতৃত্বের জটিলতা

রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ প্রকার ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত হলো ABO এবং Rh ফ্যাক্টর ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম।

ABO সিস্টেম অনুযায়ী চার ধরনের ব্লাড গ্রুপ বিদ্যমান। A, B, AB এবং O। গ্রুপগুলো মূলত লোহিত রক্ত কণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের ধরনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। A গ্রুপের লোহিত কণিকায় একধরনের গ্লাইকোলিপিড থাকে আর B গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের। AB গ্রুপে থাকে উভয় ধরনের আর O গ্রুপে থাকে না কোনোটিই।

জিনতত্ত্ব বলছে সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বায়ী হলো জিন। তেমনই ABO ব্লাড গ্রুপের জন্যও দায়ী হলো জিন। A গ্রুপের জন্য আছে A অ্যালিল, B গ্রুপের জন্য B অ্যালিল, AB গ্রুপের জন্য A ও B উভয় অ্যালিল এবং O গ্রুপের জন্য নাল (শূন্য) অ্যালিল।

অ্যালিল আবার কী জিনিস? গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আছে দুটি করে অ্যালিল। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এটি অনুধাবন করতে হলে কলেজ পর্যায়ের জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা চাই।

ধরি কোনো একটি ইঁদুরের লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য জিন আছে। এর জিনোটাইপ (Tt)। এক্ষেত্রে লম্বা লেজ (T), খাটো লেজের (t) উপর প্রকট। ইঁদুরের দেহে লম্বা (T) লেজের জিন এসেছে তার পিতার জনন কোষ থেকে আর খাটো (t) লেজের জিন এসেছে তার মাতার জনন কোষ থেকে। ইঁদুরের লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য পিতা (T) এবং মাতা (t) থেকে আগত জিন দুটির একটিকে অপরটির অ্যালিল বলে।

চিত্র: মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যালিল সঞ্চারণ

অর্থাৎ মেন্ডেলিয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি জিনের দুটি করে চেহারা বা রূপ থাকে। প্রতিটি চেহারাকে অ্যালিল বলে। এ দুটির একটি অ্যালিল আসে মাতা থেকে আর অন্যটি আসে পিতা থেকে।

কিন্তু এ নিয়ম ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। কেননা এখানে লোহিত রক্তকণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের জন্য রয়েছে A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল। তিনটি অ্যালিল কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে? একে মেন্ডেলিয় তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এরূপ ঘটনাকে বলা হয় মাল্টিপল অ্যালিল।

যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুইয়ের অধিক অ্যাালিল কাজ করে তখন তাকে মাল্টিপল অ্যালিল বলে। মজার বিষয় হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক অ্যালিল থাকলেও ডিপ্লয়েড জীব বলে আমাদের কোষে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকা সম্ভব। মাল্টিপল অ্যালিল ব্যাপারটি সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্যাচ লেগে গেল? তাহলে একটু গল্পের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। ধরি বাসায় ১০ জন মানুষ আছে। সবার জন্য বিস্কুট আনা হলো বাজার থেকে। তিন ধরনের বিস্কুট আছে- অরেঞ্জ বিস্কুট, চকলেট বিস্কুট এবং লেমন বিস্কট। কিন্তু শর্ত হলো প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র দুটি করে বিস্কুট নিতে পারবে। এ শর্তে বিস্কুট বন্টনের পর দেখা যাবে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেকোনো একধরনের দুটি বিস্কুট (অরেঞ্জ-অরেঞ্জ, চকলেট-চকলেট, লেমন-লেমন) বা দুটি ভিন্ন ধরনের বিস্কুট (অরেঞ্জ-লেমন, অরেঞ্জ-চকলেট, চকলেট-লেমন) বিদ্যমান।

তাহলে সবাই কী ধরনের খাবার পেয়েছে? বিস্কুট পেয়ছে। কিন্তু বিস্কুটের ধরন ছিল ভিন্ন। তাহলে সামগ্রিকভাবে ১০ জনের জন্য কত ধরনের বিস্কুট ছিল? তিন ধরনের। ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক পদ্ধতি বিদ্যমান। সকল মানুষের রক্তের জন্য A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল বিদ্যমান।

আগের উদাহরণে সবার জন্য যেমন বিস্কুট ছিল তেমনই এ ক্ষেত্রেও সকল মানুষের লোহিত রক্তকণিকার জন্য আছে একটি ABO জিন। কিন্তু বিস্কুটের যেমন তিনটি ধরন ছিল তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও ABO জিনের ধরন তিনটি। এদের নাম হলো A, B এবং O অ্যালিল।

কিন্তু যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব তাই আমাদের কোষে শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকতে পারে। তাই ABO জিনের ক্ষেত্রে তিনিটি অ্যালিল থাকলেও জীনোটাইপ হবে শুধুমাত্র AA, AO, BB, BO, AB এবং OO। মানে মানুষের সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যালিল প্রযোজ্য, কিন্তু একটি মাত্র মানুষের দেহে অ্যালিল থাকবে দুটি।

চিত্র: ABO ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে মাল্টিপল অ্যালিল পদ্ধতিতে সন্তানে অ্যালিল সঞ্চারণ

এ নিয়ম অনুযায়ী পিতা যদি হয় A ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ AO) এবং মাতা যদি হয় B ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ BO) তাহলে সন্তানের ব্লাড গ্রুপ A, B, AB এবং O এই চার ধরনেরই হতে পারে। আর যদি পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BO হয় তাহলে সন্তান হবে A এবং AB এই দুই গ্রুপের।

পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে শুধুমাত্র AB গ্রুপের। পিতার জিনোটাইপ AO মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে AB এবং B ব্লাড গ্রুপের। পিতামাতা উভয় O হলে সন্তান সবাই O হবে।

A ও B জিন দুটি সমান প্রকট হওয়ায় তারা একত্রে থাকলে উভয়েই সমানভাবে প্রকাশ লাভ করে এবং AB ব্লাড গ্রুপ গঠন করে। কিন্তু O জিন প্রচ্ছন্ন হওয়ায় A বা B জিনের সাথে থাকলে প্রকাশ লাভ করে না। শুধুমাত্র O জিন থাকলে প্রকাশ লাভ করে O ব্লাড গ্রুপ গঠন করে।

ABO ব্লাড গ্রুপ কি সবসময় এ নিয়ম মেনে চলে? মাঝে মাঝে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ম অনুযায়ী মাতা B এবং পিতা O ব্লাড গ্রুপ হলে সন্তান B কিংবা O ব্লাড গ্রুপের হওয়া সম্ভব। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানের এক পরিবারে দেখা গেল স্বামীর ব্লাড O আর স্ত্রীর ব্লাড B গ্রুপের হলেও সন্তানের ব্লাড গ্রুপ হয়েছে A। বাঁধল ঝামেলা, অভিযোগ আসল উনি এই সন্তানের বাবা নন!

আদালত পর্যন্ত গড়ালে পরে গবেষণা করে জানা গেল উনিই আসল বাবা। কিন্তু এই তথৈবচ ঘটনা কীভাবে ঘটল? মূলত এমন ব্যতিক্রম হয়েছে মিউটেশনের ফলে। কীভাবে? চলুন জেনে আসি।

খুব সহজে বলতে গেলে ডিএনএ’র মাঝে যেকোনো পরিবর্তন হওয়াকে মিউটেশন বলে। কোষ বিভাজনের পূর্বে ডিএনএ অনুলিপনের সময়ও ডিএনএতে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। জন্মের সময় আমাদের দেহে গড়ে প্রায় ১০০ বা তারও বেশি সংখ্যক মিউটেশন ঘটে থাকে।

চিত্র: AO এবং BO জিনোটাইপের পিতামাতার সন্তানের ব্লাড গ্রুপ

আমরা জানি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অংখ্য অণু দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে নাইট্রোজেন বেস। জিন হলো একটি রেসিপি যে রেসিপি অনুসরণ করে প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করা হয়। ABO ব্লাড গ্রুপের জন্য A, B এবং O অ্যালিল দায়ী।

এ তিনটি অ্যালিলের মাঝে গাঠনিক পার্থক্যও সামান্য, তাই এদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন ব্লাড গ্রুপের ব্যতিক্রমের কারণ হতে পারে। A ও O অ্যালিলের মধ্যে মাত্র একটি নাইট্রোজেন বেসের পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে A ও B অ্যালিলের মাঝে পার্থক্য সাতটি নাইট্রোজেন বেসে।

চিত্র: A, B এবং O অ্যালিলের গাঠনিক পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটিমাত্র বেস কম থাকা বা সাতটি ভিন্ন বেস থাকা তেমন কিছু না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি জিনের ক্ষেত্রে তিনটি করে বেস একটি জেনেটিক কোড হিসেবে কাজ করে। তাই যেকোনো একটি বেসে পরিবর্তন হলে সম্পূর্ণ কোডটিকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, The old man had one new hat. বাক্যটিতে প্রতিটি শব্দে তিনটি করে অক্ষর আছে। বাক্যের প্রতিটি অক্ষরকে নাইট্রোজেন বেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

এখন যদি প্রথম শব্দ থেকে একটি অক্ষর E কমে যায় তাহলে বাক্যটি হয়, Tho ldm anh ado nen ewh am. নতুন বাক্যে যদিও তিনটি করে অক্ষর একত্রিত হয়েছে কিন্তু একটিমাত্র অক্ষর হারিয়ে গেছে বলে বাক্যটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন। জিনে সামান্য মিউটেশনের ফলে অনেকটা এরূপ ঘটনাই ঘটে থাকে। অল্প একটু পরিবর্তনে বিশাল ফলাফল।

এরকম এক মিউটেশনের ফলেই A ব্লাড গ্রুপ থেকে O ব্লাড গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। সদূর অতীতে A ব্লাড গ্রুপের জিনের মিউটেশনের ফলে একটি নাইট্রোজেন বেস হারিয়ে গেলেই আবির্ভাব হয় নতুন ব্লাড গ্রুপ O এর।

তাহলে কি B ব্লাড গ্রুপ থেকে A ব্লাড গ্রুপ পাওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, মিউটেশনের ফলে এটিও সম্ভব। ধরুণ, আবুল নামের এক ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ B এবং ব্লাড গ্রুপের জিনোটাইপ BO। তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম অনু্যায়ী উনার প্রতিটি শুক্রাণুতে হয় B অ্যালিল থাকবে নয়ত O অ্যালিল। কারণ জনন কোষ হলো হ্যাপ্লয়েড তাই কেবল একটি করে অ্যালিল অবস্থান করবে।

আগেই জেনেছি যে O অ্যালিল দেখতে অনেকটা A অ্যালিলের মতো, শুধুমাত্র একটি নাইট্রোজেন বেস কম রয়েছে। তাই আবুল সাহেবের শুক্রাণু গঠনের পূর্বে যদি রিকম্বিনেশনের ফলে B ও O অ্যালিলের মাঝে অংশ বিনিময় হয়, তাহলে O অ্যালিল তার হারানো নাইট্রোজেন বেস ফিরে পেয়ে A অ্যালিল রূপে কাজ করতে পারে। এরূপ মিউটেশন হলে আবুল সাহেবের শুক্রাণু A অ্যালিল বহন করবে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব ছিল। এই শুক্রাণু A বা O অ্যালিল বিশিষ্ট্য ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন হবে।

চিত্র: BO জিনোটাইপের ব্লাডে মিউটেশনের ফলে A গ্রুপ সৃষ্টি

পূর্বে উল্লিখিত জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিল। এ দম্পতির মাঝে স্বামীর যেহেতু ব্লাড গ্রুপ O তাই তার সকল শুক্রাণু O অ্যালিল বহন করবে। কিন্তু স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ B বলে চিত্রে উল্লিখিত মিউটেশন হলে তার ডিম্বাণু B বা O এর পরিবর্তে A অ্যালিল বিশিষ্ট্য হতে পারবে। আবুল সাহেবের মতো একই মিউটেশনের ফলে স্ত্রীর ডিম্বাণু A অ্যালিল বহন করে যা স্বামীর O অ্যালিল বিশিষ্ট্য শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন করে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সন্তানের B বা O ব্লাড গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল।

চিত্র: জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা

শেষ বেলায় আরো একটি তথ্য দিতে চাই। শুধুমাত্র ABO ব্লাড গ্রুপ নয়, অন্য কোনো জিনের ক্ষেত্রেও মিউটেশন বা রিকম্বিনেশনের ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা দেখা যেতে পারে।

নবজাত শিশুর মাথায় নরম অংশটি কেন থাকে?

সকল নবজাত শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায় এদের মাথার খুলির উপরে একটি অংশ নরম, শুধু চামড়া দ্বারা আবৃত, কোনো অস্থি নেই। শিশুদের মাথায় অস্থিবিহীন, ঝিল্লী দ্বারা আবৃত নরম এই অংশকে বলে ফন্টান্যাল (Fontanelle)

ঘুমন্ত শিশুর মাথায় ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

নবজাতক শিশুদের মাথায় জন্মের সময় সকল অস্থি পূর্ণ গঠিত অবস্থায় থাকে না। জন্মের পরে ধীরে ধীরে সে অস্থিগুলো বৃদ্ধি লাভ করে। যেসকল স্থানে অস্থি সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয় না সে সকল স্থানই ফন্টান্যাল নামে পরিচিত। এমন ফন্টান্যাল নবজাত শিশুর মাথায় প্রায় ৬টি থাকে। এর মাঝে প্রধান দুটি হলো-

১. সম্মুখ ফন্টান্যালঃ মাথার সামনে ফ্রন্টাল ও দুটি প্যারাইটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে । এটি শিশুর ১-৩ বছর বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। তাই বয়স বৃদ্ধির পর শিশুর দেহে এই নরম জায়গা আর দেখা যায়না।

২. পশ্চাৎ ফন্টান্যালঃ মাথার পেছনে প্যারাইটাল অস্থি ও অক্সিপিটাল অস্থির মিলিত হওয়ার স্থানে থাকে। এটি শিশুর ৬ মাস বয়সের মাঝে অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

সম্মুখ ও পশ্চাৎ ফন্টান্যাল; image source: en.wikipedia.org

শিশুদেহে এই ফন্টান্যালগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জন্মের সময় এতো সরু নালী দিয়ে শিশুর মাথা বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ফন্টান্যালগুলোর স্থানে শিশুর মাথার অস্থি একটার সাথে আরেকটা উপরিপাতিত হয়। ফলে শিশুর মাথা স্বাভাবিক থেকে ছোট আকার লাভ করে এবং মায়ের প্রসব কষ্ট অনেকটা হ্রাস পায়।

অন্যদিকে নবজাত শিশুর মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্কের প্রায় ২৫ ভাগ হয়, যা এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০ ভাগ। মস্তিষ্কের এই বৃদ্ধি  প্রায় ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ফন্টান্যাল না থাকলে জন্মের পর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হত। ফন্টান্যাল থাকায়, এগুলো অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক বৃদ্ধি চলতে থাকে।

Feature image: heylittleyou.co.uk

সকল নীল চোখের মানুষের আছে একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ

বিশ্ববিখ্যাত সংগীতশিল্পী টেইলর সুইফট, নীল চোখের এক অনন্যসুন্দরী। তার রূপ-লাবণ্যে যে কত সহস্র লোকের হ্রদয় হরণ হয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু তিনি কীভাবে পেলেন এই নীল চোখ, যা তাকে অন্যান্যদের মাঝে ব্যতিক্রম করে তুলেছে?

বিশ্ববিখ্যাত সংগীতশিল্পী টেইলর সুইফট; image source: onehallyu.com

নীল চোখ আমাদের কাছে খুব ব্যতিক্রম মনে হলেও বাস্তবে কিন্তু তা নয়। ব্রিটেনের প্রায় ৪৮% মানুষ নীল চোখের অধিকারী।কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণায় জানা যায়, বর্তমান মানুষদের মাঝে নীল চোখের বৈশিষ্ট্যটি একটিমাত্র সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে। গবেষণায় আমাদের জিনোমে প্রায় ১০ হাজার বছর পূর্বের একটি মিউটেশনের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষণা বলছে এই মিউটেশনই বর্তমান নীল চোখের জন্য দায়ী।

কী এই মিউটেশন? অধ্যাপক হানস এইবার্গ বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমরা সকল মানুষই বাদামী চোখের অধিকারী ছিলাম। কিন্তু আমাদের ক্রোমোসোমের OCA₂ নামক একটি জিনে মিউটেশন ঘটে। মিউটেশনের ফলে এমন একটি ‘জেনেটিক সুইচ’ গঠিত হয় যা আমাদের বাদামী চোখ গঠন বন্ধ করে দেয়।”

OCA₂ জিন একটি প্রোটিনের জন্য কোড করে। এই প্রোটিন আবার কোষে মেলানিন প্রস্তুতের সাথে জড়িত। আর এই মেলানিন আমাদের চুল, চোখ ও ত্বকের রঙের জন্য দায়ী। প্রকৃতপক্ষে, মিউটেশনের ফলে উদ্ভুত ‘সুইচ’ OCA₂ জিনের কাজ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয় না। এটি বরং এই জিনের বহিঃপ্রকাশকে অনেকাংশে বাঁধাগ্রস্ত করে। যার ফলে মেলানিন উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বাদামী আইরিশের পরিবর্তে নীল আইরিশ গঠিত হয়।

OCA₂ জিনের উপর ‘সুইচ’টির প্রভাব খুবই নির্দিষ্ট। কারণ, OCA₂ জিন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের চুল, ত্বক ও চোখ মেলানিন বিহীন হতো। এরকম অবস্থাকে বলা হয় ধবলরোগ বা Albinism।

ধবল রোগ; image source: imgur.com

সীমিত জিনগত বৈচিত্র্য

বাদামী থেকে সবুজ চোখের রঙের ক্ষেত্রে সকল বৈচিত্র্য আইরিশের বিদ্যমান মেলানিনের পরিমাণ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু নীল চোখের ব্যক্তিদের চোখে মেলানিনের খুব সামান্য মাত্রারই বৈচিত্র্য রয়েছে। এইবার্গ বলেন,“এ ঘটনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, নীল চোখের সকল মানুষ একটিমাত্র পূর্বপুরুষের সাথে সম্পর্কিত। তাদের সকলের ডিএনএ-র একই জায়গায় একই রকম ‘সুইচ’ উদ্ভাবিত হয়েছে।” অন্যদিকে বাদামী চোখের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিএনএ-র মেলানিন উৎপাদনের জন্য দায়ী স্থানটি হুবহু এক না হয়ে অনেকটা বৈচিত্রপূর্ণ হয়।

প্রকৃতি আমাদের জিনকে অদলবদল করে

মিউটেশনের ফলে বাদামী চোখ থেকে নীল চোখ সৃষ্টি কোনো ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক নয়। এটি একটি নিরপেক্ষ মিউটেশন। এই মিউটেশন অনেকটা মানুষের চুলের রঙ, জন্মদাগ কিংবা টাক মাথার মতো। এগুলো মানুষের টিকে থাকার সম্ভাবনাকে বৃদ্ধি বা হ্রাস কোনোটাই করে না।

তথ্যসূত্রঃ https://knowridge.com/2016/11/people-with-blue-eyes-have-a-single-common-ancestor/

Feature image : omgfacts.com

বানরের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার

প্রজাতি কী? খুব সহজ করে বললে, প্রজাতি হলো সর্বাধিক মিল সম্পন্ন একদল জীবগোষ্ঠী। এ গোষ্ঠীর সদস্যরা নিজেদের মাঝে প্রজননের ফলে উর্বর সন্তান উৎপাদনে সক্ষম। প্রতিটি প্রজাতি অন্য একটি প্রজাতি থেকে প্রজননগতভাবে আলাদা হয়। এর মানে হলো একটি প্রজাতির প্রাণী অন্য একটি প্রজাতির প্রাণীর সাথে প্রজনন করে স্বাভাবিক সন্তান উৎপাদন করতে পারে না।

প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাসে প্রজাতি হলো সর্বনিম্ন একক। শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যায় কোনো একটি প্রাণীকে তার বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে কিছু ক্যাটাগরীতে ভাগ করা হয়। তাছাড়া কোনো একটি প্রাণীর বিবর্তন তাত্ত্বিক ইতিহাস এবং বংশ পরিচয়ের উপর ভিত্তি করেও প্রজাতি ব্যাখ্যা করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় জাতিজনি (Phylogenetics)।

যে প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত বিবর্তনের ফলে পূর্ববর্তী কোনো প্রজাতি থেকে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয় তাকে বলা হয় প্রজাতিকরণ বা Speciation।

চিত্রঃ পিগমি মারমোসেট (Cebuella pygmae); image source: www.certapet.com

পিগমি মারমোসেট পৃথীবির সবচেয়ে ক্ষুদ্রকায় বানর। এই প্রজাতির বানর পৃথিবীতে একটিই আছে বলে মনে করা হতো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের মাঝে আছে দুটি আলাদা প্রজাতি। যুক্তরাজ্যের স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানীরা বেশ কিছু পিগমি মারমোসেটের জিনোম নিয়ে গবেষণা করে এর প্রমাণ করেছেন।

তাদের উদ্দেশ্য ছিল এই বানর প্রজাতির বিবর্তনিক ইতিহাস উন্মোচন করা। কাজ করতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করলেন, পিগমি পারমোসেটের দুটি প্রজাতি প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর আগে পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যায়। আমাজান নদী প্রজাতি দুটির একটিকে ভৌগলিকভাবে উত্তর দিকে এবং অন্যটিকে দক্ষিণ দিকে বিভক্ত করে দেয়।

আমাজান বনের পশ্চিমাংশে পিগমি মারমোসেটদের বসবাস। এরা পতঙ্গভোগী প্রাণী। প্রতিটি বানর ভরে প্রায় ১০০ গ্রাম হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে, জিনোমিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বর্তমান পিগমি মারমোসেটে দুটি আলাদা প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। খালি চোখেও এদের মাঝে কিছু বাহ্যিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। আমাজন নদীর উত্তর পাশের মারমোসেটদের গায়ে হালকা ডোরাকাটা দাগ থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ পাশের মারমোসেটদের গায়ে থাকে গাড় রঙের ডোরাকাটা দাগ।

মাঝে মাঝে, নদী বা ভৌগলিক কোনো বাঁধার কারণে কোনো প্রজাতির একটি পপুলেশন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পরে। বিভক্তির ফলে সৃষ্ট দুটি পপুলেশনের মাঝে ভৌগলিক বাঁধার কারণে প্রজনন করা সম্ভব হয় না। পপুলেশন দুটির মাঝে জিনের আদানপ্রদান বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি পপুলেশন স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হতে থাকে। ক্রমবিবর্তনের ফলে এদের মাঝে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন আসে। একটা সময় পর ভৌগলিক বাঁধা অতিক্রম করতে পারলেও দুটি পপুলেশনের কেউ কারো সাথে প্রজনন করতে পারে না। তখন দুটি পপুলেশনকে দুটি ভিন্ন প্রজাতি হিসেবে গণ্য করা হয়। এভাবে কোন একটি প্রজাতি থেকে দুটি প্রজাতি উদ্ভবের প্রক্রিয়াকে এলোপেট্রিক প্রজাতিকরণ (Allopatric Speciation) বলে।

 

চিত্রঃ এলোপেট্রিক প্রাজতিকরণ প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজাতির উদ্ভব image source : evolution.berkeley.edu

এ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো শিম্পাঞ্জী ও বনোবো। বহুকাল আগে এরা একটিমাত্র প্রজাতি ছিল। ২ মিলিয়ন বছর পূর্বে কঙ্গো নদী গঠনের ফলে সেই প্রজাতির পপুলেশনটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ২ মিলিয়ন বছরব্যপী চলা বিবর্তনের ফলে দুটি পপুলেশনের একটি আজকের শিম্পাঞ্জী এবং অন্যটি বনোবো তে পরিণত হয়েছে।

পিগমি মারমোসেটের সদ্য আবিস্কৃত দুটি প্রজাতি এই এলোপেট্রিক প্রজাতিকরণের মাধ্যমেই বিবর্তিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: IFLScience

Feature image: philadelphiazoo.org