নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

গোলাকার পৃথিবীর অকাট্য প্রমাণ এবং ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির মূর্খামি

প্রাচীন ধারণা

বহুকাল আগে মানুষ ভাবতো পৃথিবী সমতল। কারণ দেখতে পৃথিবীকে সমতলই মনে হয়। সে সময়ের মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী অসীম। এর কোনো শুরু বা শেষ নেই। সূর্য নিয়েও নানারকম ধারণা ছিল তাদের মাঝে। কেউ বলতো প্রতিদিন একটা করে সূর্য তৈরি হয় আর ধ্বংস হয়। সূর্যকে দেবতা বলে মানা হতো। কেউ বলতো রথে করে দেবতা ঘুরে বেড়ায়। কারো কারো ধারণা ছিল নৌকায় করে সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরানো হয়।

প্রাচীন ভারতীয়রা বিশ্বাস করতো কতগুলো হাতি পৃথিবীকে ধরে রেখেছে, হাতিগুলো আছে কচ্ছপের পিঠে। কচ্ছপগুলো আবার পানিতে সাঁতার কাটছে। এরকম কিছু গোলমেলে ব্যাখ্যা তখন চালু ছিল। প্রাচীন মানুষেরা দূরে যেতে ভয় পেতো। দূরে গেলে যদি কখনো পৃথিবীর কিনারা দিয়ে অতল তলে পড়ে যায়!

কিন্তু এই গল্প-বিশ্বাসে সন্তুষ্ট ছিলেন না প্রাচীন গ্রিসের অ্যানাক্সিম্যান্ডার। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের কোনো এক সময়ে তিনি রাতের আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খেয়াল করলেন উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা বাদে সবগুলো তারা ছুটে বেড়ায়। ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে ঘোরে এমন কিছু বস্তুও দেখতে পান। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হচ্ছে- আকাশের বস্তুগুলো এলোমেলো ঘোরে না, নির্দিষ্ট কিছুকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

অ্যানাক্সিম্যান্ডারের ধারণা হয় আকাশটা হয়তো একটা ফাঁপা গোলক। ফাঁপা গোলকের গায়ে তারা, সূর্য, চাঁদ এসব সেঁটে আছে। গোলকটি একটি কাল্পনিক বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এর ফলেই চাঁদ-সূর্য উঠে এবং অস্ত যায়। সূর্য যখন এই পাতের নিচে যায় তখন রাত হয় আবার গোলক ঘুরতে ঘুরতে যখন পাতের নিচ থেকে সূর্যকে বের করে আনে তখন হয় সকাল।

অ্যানাক্সিম্যান্ডার পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। এতে ভূ-মধ্য এবং কৃষ্ণসাগরের আশেপাশের অঞ্চল দেখা যায়। তৎকালীন গ্রিকরা পৃথিবী বলতে অতটুকই বুঝতো। তবে একটা বিষয়ে গ্রিকরা প্রায় নিশ্চিত ছিল। যতই পূর্ব বা পশ্চিমে যাওয়া হোক না কেন সূর্যকে ধরা যাবে না। তারা ধারণা করে পৃথিবী সমতল, কিন্তু পাতের মতো নয় বরং গোলাকার প্লেটের মতো যার চারদিকে রয়েছে সমুদ্র।

সমুদ্রকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত ভাবার কারণ ভ্রমণকারীরা যেদিকেই যাক শেষ পর্যন্ত সমুদ্রই দেখতে পায়। তাছাড়া তখনো মহাসাগর পাড়ি দেবার বিদ্যা ভালোমতো রপ্ত হয়নি। আকাশের তারাগুলো তখন জোনাকির মতো মিটমিটে আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে সূর্য এবং চাঁদ নিয়ে অনেক ভাবতো গ্রিকরা।

গোলাকার পৃথিবীর ধারণা এবং সৌরজগতের কেন্দ্র বিতর্ক

৩৪০ খ্রিষ্টপূর্বে এরিস্টটল তার বই ‘অন দ্য হ্যাভেন’-এ পৃথিবীর গোলাকৃতির পক্ষে ২টি যুক্তি দেখান। যুক্তি দুটি হলো-

(১) চন্দ্রগ্রহণের কারণ সূর্য এবং চাঁদের মাঝে পৃথিবীর অবস্থান। চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া সবসময় গোলাকৃতির। পৃথিবী যদি সিলিন্ডার বা চ্যাপ্টা থালার মতো হতো তাহলে ছায়াটি লম্বাটে বা উপবৃত্তাকার হতো।

(২) গ্রিকরা ভ্রমণের ফলে জানতো- পৃথিবীর দক্ষিণ ভাগ থেকে তাকালে উত্তর ভাগ থেকে দেখা ধ্রুবতারাকে আকাশের অনেক নিচুতে দেখা যায়। যত উত্তরে যাওয়া যায় মনে হবে তারাটি ঠিক মাথার উপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু বিষুবরেখা থেকে এর অবস্থান দেখা যায় দিগন্ত রেখায়।

এছাড়াও আরো দুটি যুক্তি তিনি দেখান-

(৩) দূর থেকে যখন কোনো জাহাজ আসতো তখন মাস্তুল আগে দেখা যেতো। এর মানে জাহাজের উঁচু অংশ আগে দেখা যেতো যা গ্রিকরা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করেছিল।

(৪) যেহেতু পৃথিবীর সবকিছু কেন্দ্র দ্বারা আকর্ষিত তাই একে গোল হতেই হবে। সমুদ্রের পানি আর বাতাস কেন পিছলে যায় না তা চতুর্থ যুক্তি থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

উপরের যুক্তিগুলো থেকে এরিস্টটল সিদ্ধান্ত নেন যে, পৃথিবী গোল। কোনোভাবেই সমতল নয়। মিশর এবং গ্রিসে ধ্রুবতারার অবস্থানের তারতম্য থেকে পৃথিবীর পরিধির অনুমানও করেন তিনি। এরিস্টটল পৃথিবীর পরিধি ৪ লক্ষ স্টান্ডিয়া নির্ধারণ করেছিলেন (১ স্টান্ডিয়া = ২০০ গজ এর মতো)। তবে বাস্তবে আমাদের গ্রহের পরিধি এর অর্ধেক।

এরিস্টটল ভাবতেন পৃথিবীটা স্থির। সূর্য এবং অন্য গ্রহ তারকারা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে। সেই সময়ে মানুষ বিশ্বাস করতো পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত। ২য় খ্রিস্টাব্দে টলেমি মহাকাশের কেন্দ্রে পৃথিবীকে কল্পনা করে ব্রহ্মাণ্ডের মানচিত্র তৈরি করেন। চার্চের গুরুরা এই মানচিত্রটি মেনে নেয়। চার্চ একে মেনে নেওয়ার কারণ হলো- টলেমির মডেলটি ছিল গোলাকার এবং এর বাইরে স্বর্গ এবং নরকের জন্য জায়গা ছিল।

১৫১৪ সালে কোপার্নিকাস নামে একজন পোলিশ পুরোহিত সূর্যকে কেন্দ্রে রেখে একটি মডেল প্রকাশ করেন। চার্চের ভয়ে অবশ্য তিনি নিজের নাম দিয়ে প্রকাশ করেননি। এক শতাব্দী পর গ্যালিলিও এবং কেপলার কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। গ্যালিলিও তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নেন সূর্য সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। এরপর গ্যালিলিওর কী হয়েছিল সেটা সম্ভবত সবারই জানা আছে।

সমতল পৃথিবী বা ফ্ল্যাট আর্থ কন্সপিরেসি

এরিস্টটলের পর সমতল পৃথিবীর ধারণা পরিত্যক্ত হয় এবং একটা সময়ে গ্যালিলিওর তত্ত্ব স্বীকৃতি পায়। মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে পৃথিবী গোল এবং ষোড়শ শতকের পর মেনে নেয় যে পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তবে বর্তমানে কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা ফ্ল্যাট আর্থ বা সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসী এবং সমতল পৃথিবী নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরি প্রচার করে থাকে।

আগে বোঝা দরকার কন্সপিরেসি থিওরি জিনিসটা আসলে কী এবং এটা বিজ্ঞানকে কীভাবে দূষিত করে।

ধরা যাক, কোনো একটি বিষয়কে আমরা ধ্রুব সত্য বলে জানি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আমরা জানি পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী দূরে থাক কোনো অণুজীবের অস্তিত্ত্ব পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটিই আপনি এতদিন জেনে এসেছেন।

কিন্তু হঠাৎ করে একদিন ইন্টারনেট বা কোনো সংবাদে দেখলেন চাঁদে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে এবং নাসার সাথে তাদের সখ্যতাও রয়েছে। বিষয়টি নাসা এতদিন গোপন করে গেছে। এ ধরনের সংবাদের সাথে মুখরোচক কোনো শিরোনাম এবং সূক্ষ্ম গ্রাফিক্সে করা কোন ছবি। একটি স্বাভাবিক খবর মানুষের মনে যতটা প্রভাব ফেলে তার থেকে অস্বাভাবিক খবর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আমরা বিচার বিশ্লেষণ না করে উপস্থাপিত তথ্যগুলো বিশ্বাস করা শুরু করে দেই।

সমতল পৃথিবীর পক্ষে দেখানো যুক্তি এবং তার ব্যাখ্যা

(১) দিগন্তরেখা সমান: সমতল পৃথিবীর ধারণায় বিশ্বাসীদের একটি খুব সাধারণ তত্ত্ব হলো দিগন্তরেখা সমান। ভূমি থেকে দিগন্তরেখাকে যেমন সমান দেখা যায় তেমনি উঁচু কোনো পাহাড় বা বিমান থেকেও দিগন্তরেখাকে সমানই দেখা যায়। সম্ভবত সমতল পৃথিবীর ধারণাকারীদের বিশ্বাসের উৎপত্তি এখান থেকেই।

এই ধারণার ব্যবচ্ছেদ করার জন্য আমরা কয়েকটি ছবি নিয়ে আলোচনা করবো। নিচের প্রথম ৩টি ছবি দ্রষ্টব্য, যা নিয়ে সমতল এবং গোলাকৃতির বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক হয়। এই ছবি ৩টিতে দেখা যায় একটি পাল তোলা ছোট নৌকা দিগন্তরেখার পার হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এর নিচের অংশ যেন ডুবে যাচ্ছে। সমতল ধারণায় বিশ্বাসীদের মতে এটি উত্তাল সাগরের স্রোতের জন্য হয়।

হ্যাঁ, অবশ্যই স্রোতের ক্ষমতা আছে ছোট নৌকোটিকে এমনভাবে দেখানোর। কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের সমুদ্র সৈকতে গেলে আমরা এমনটি অহরহ দেখতে পাই কিন্তু প্রথম তিনটির কোন ছবিতেই স্রোত নেই।

আচ্ছা ধরে নিলাম স্রোত আছে এবং ছোট নৌকোটির নিচের অংশ স্রোতের জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ৪ নম্বর ছবির ক্রুজশীপের যে উচ্চতা তা উত্তাল সাগর বা সাগরের স্রোত ক্রুজশীপের এতখানি অংশ অদৃশ্য করে দিতে পারে না। শীপটি দিগন্তরেখা পার করে ফেলেছে এবং এজন্যই এটার নিচের অংশ আমাদের চোখের বাইরে। হিসাব করলে দেখা যাবে অদৃশ্য হওয়া অংশ শীপের মোট উচ্চতা থেকে দৃশ্যমান অংশের বিয়োগফল।

(২) টরেন্টো শহরের সিএন টাওয়ার

নিচের ছবিতে কানাডার সিএন টাওয়ারকে দেখা যাচ্ছে যার উচ্চতা ১৮১৫ ফুট। এর পরের ছবিতে ৩০ মাইল দূর থেকে একই স্থানের ছবি তোলা হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সিএন টাওয়ারের নিচের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে না। ৩০ মাইল দূর থেকে ১৮১৫ ফুট উচ্চতার ২৬% দিগন্তের নিচে অদৃশ্য হবার কথা এবং ঠিক সেটাই হয়েছে। সিএন টাওয়ারের ২৬% বা ৪৮৬ ফুট দেখা যাচ্ছে না।

তাহলে দিগন্তরেখা কেন সমান দেখায়? পৃথিবীর আকৃতির তুলনায় মানুষের আকৃতি এতোই ছোট যে পৃথিবীর বক্রতা আমরা বুঝতে পারি না। এমনকি ১৫০০০ ফুট উঁচুতে থাকা বিমান থেকেও না। যত উপরে উঠতে থাকা যায় দিগন্তের বিস্তৃতি তত বৃদ্ধি পায়। এমনকি ৪০০০০ ফুট উঁচুতেও দিগন্তের বাঁক মাত্র ৩.৫ ডিগ্রি।

(৩) উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থেকে তারার অবস্থানে ভিন্নতা

উত্তর মেরুতে পরিষ্কার আকাশে তারা পর্যবেক্ষণ করলে ১ম ছবির মতো কিছু তারকা-বিন্যাস পাওয়া যাবে। কিন্তু যদি দক্ষিণ মেরু থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে আগের বিন্যাসের মতো কিছুই পাওয়া যাবে না। নতুন একটি বিন্যাসের দেখা মিলবে।

দুই মেরুতে ভিন্ন ভিন্ন তারকার বিন্যাস গোলাকার পৃথিবীর পক্ষে সমর্থন প্রদান করে। পৃথিবীর গোলাকৃতির জন্য উত্তর মেরুর পর্যবেক্ষক নিচের দিকে দেখতে পায় না, একইভাবে দক্ষিণ মেরুর পর্যবেক্ষক উপরের অংশ দেখতে পায় না। তাই তারার বিন্যাসের ভিন্নতা দেখা যায়।

(৪) কেন্দ্রের তারা এবং ঘূর্ণনদিকে ভিন্নতা

রাতের পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য তারা দেখা যায়। একটু সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। উত্তর মেরুতে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরছে এবং একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করেই ঘুরছে। কেন্দ্রের তারাটি হলো পোলারিস বা নর্থ স্টার। আকাশের অন্যান্য তারা থেকে এটি কিছুটা উজ্জ্বল। কয়েক রাত ধরে নজর রাখলে দেখা যাবে বিগ ডিপারের (একটি তারামণ্ডলী) শেষ প্রান্ত পোলারিসের দিকেই থাকে।

চিত্র: শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় বিগ ডিপারের শেষ প্রান্ত সবসময়
পোলারিস বা নর্থ স্টারের দিকেই থাকে।

দক্ষিণ মেরুতে তারার ঘূর্ণন দেখা যাবে কিন্তু তারাগুলো উত্তর মেরুর মতো ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরে না বরং ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে। দক্ষিণের তারাগুলোও সিগমা অক্টানিস নামের একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করে ঘোরে। দুই মেরুর তারকার ঘূর্ণন দিকের ভিন্নতা এটা ব্যাখ্যা করে যে পৃথিবীর আকৃতি সমতল নয়।

(৫) পোলারিসের অবস্থান

সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীরা আরেকটি প্রশ্ন করে থাকে- সূর্য, পৃথিবী এবং সমগ্র মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যখন ঘুরছে তখন বছরের পর বছর পোলারিসের অবস্থান কেন এক থাকে? পৃথিবী থেকে পোলারিসের দূরত্ব ৩২৩ আলোকবর্ষ।

৬ মাস পর পৃথিবী যখন সূর্যের অপর পাশে অবস্থান করে তখন তার আগের অবস্থান থেকে দূরত্বের পরিবর্তন হয় ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। তাহলে আমাদের সাপেক্ষে পোলারিসের অবস্থান কতটুক পরিবর্তন হবে? উত্তর হলো মাত্র ০.০০০০০৫৬ ডিগ্রি। এতো কম হবার কারণ ৩২৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের কাছে ১৮৬ মিলিয়ন মাইল খুবই সামান্য। খালি চোখে এটা দেখা অসম্ভব।

(৬) চাঁদ

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ যা ২৯ দিনে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের বেশিরভাগের মতে চাঁদ একটি ডিস্ক আকৃতির বস্তু। কিন্তু পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই চাঁদের ছবি তোলা হোক না কেন চাঁদকে গোলাকৃতির দেখায়। চাঁদ যদি ডিস্কই হতো তবে একে পৃথিবীর বিভিন্ন অবস্থান থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপবৃত্তাকার দেখাতো।

নিচে ১ম ছবিতে পূর্ণ চাঁদকে আকাশে দেখা যাচ্ছে। ফ্ল্যাট আর্থ তত্ত্ব অনুযায়ী চাঁদ ২য় ছবির বা ৩য় ছবির মতো ধীরে ধীরে ছোট এবং উপবৃত্তাকার হয়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না বরং চাঁদ তার নিজের আকৃতি বজায় রেখে দিগন্তের অপর পাশে হারিয়ে যায়। ফ্ল্যাট আর্থ মডেল এখানেও ব্যর্থ।

(৭) চাঁদের দূরত্ব এবং পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ

পৃথিবীর দুই মেরু থেকে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করে ত্রিকোণমিতির সাহায্যে চাঁদ এবং পৃথিবীর দূরত্ব পাওয়া যায় ২ লক্ষ ৩৯ হাজার মাইল যা লেজার বা রাডারে পরিমাপ করা দূরত্বের প্রায় সমান। কিন্তু ফ্ল্যাট আর্থ মডেলে একই ফর্মুলা ব্যবহার করলে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় মাত্র ৩ হাজার মাইল এবং হাস্যকরভাবে এটিই ফ্ল্যাট আর্থ বিশ্বাসীরা প্রচার করে।

তাহলে উড়োজাহাজ নিয়েই বিকেলে চাঁদ থেকে ঘুরে আসা যাক! ধরি কোনোভাবে চাঁদ পৃথিবীর ৩ হাজার মাইল উপরেই আছে। যুক্তির খাতিরে এখানেও ধরে নেয়া হলো চাঁদ ডিস্ক আকৃতির। এখন মধ্যরেখার উপরে যদি চাঁদ অবস্থান করে থাকে এবং মধ্যরেখা থেকে উত্তর এবং দক্ষিণে ৩ হাজার মাইল দূরত্বের চাঁদের সাথে ভূমি থেকে দৃশ্যমান কোণ ৪৫ ডিগ্রি হবার কথা। জ্যামিতির নিয়ম অনুসারে ৪৫ ডিগ্রিই হবে। অর্থাৎ দুই মেরু থেকে চাঁদের ভিন্ন ভিন্ন অংশ দেখা যাবে (২য় ছবির মতো) কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না। দুই মেরু থেকে চাঁদের একই অংশ দেখা যায়।

এছাড়াও আমাদের প্রতিবেশি সব গ্রহই গোলাকৃতির। মাত্র ৫০ ডলারের কোনো টেলিস্কোপ দিয়েই প্রতিবেশি গ্রহদের পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যসব গ্রহ গোল হলে পৃথিবী আসলে কোন যুক্তিতে সমতল হতে পারে সেটার কোনো ব্যাখ্যা ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি দিয়ে থাকে না।

সমতল পৃথিবী প্রচারে সুবিধা কার?

বর্তমানে মুখরোচক শিরোনামে সমতল পৃথিবীর ধারণা প্রচারে অসাধু প্রকাশকদেরই লাভ বেশি। গতবছর “টানা ৮ দিন সূর্য উঠবে না” বা “সবুজ চাঁদ দেখা যাবে” এরকম শিরোনামে অনেক সংবাদ দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানের ন্যূনতম জ্ঞান না থাকার পরও এসব প্রচার করার কারণ একটিই, Rumor is a great traveler।

দুঃখের বিষয় এটাই যে চিন্তা-ভাবনা না করেই আমরা সব বিশ্বাস করতে শুরু করে দেই এবং নিজেদের সংবাদ মাধ্যমের প্রচার বাড়াতে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিজ্ঞানের শত বছরের গবেষণা লব্ধ ফলকে কলুষিত করছে।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.youtube.com/watch?v=W9ksbh88OJs
  2. https://www.youtube.com/watch?v=NGZEXkSX9wI
  3. https://www.youtube.com/watch?v=FTBaOmJEQg0
  4. http://www.popsci.com/10-ways-you-can-prove-earth-is-round
  5. http://www.space.com/32599-green-moon-april-lunar-hoax-debunked.html
  6. http://www.history.com/topics/galileo-galilei
  7. http://epod.usra.edu/blog/2013/05/earths-rotation-and-polaris.html
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Celestial_pole
  9. https://exploratorium.edu/eclipse/video/why-dont-we-have-an-eclipse-every-month
  10. A brief history of time

featured image: klikkout.sk

সুপার হিউম্যান তৈরির অমানবিক এক্সপেরিমেন্ট

গত শতাব্দীতে জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে যে পরিমাণ উন্নতি সাধিত হয়েছে তা বিগত কয়েক হাজার বছরের উন্নতি থেকেও বেশি। মানবসভ্যতাকে এখন রোগ-মহামারীর ভয়ে বিলীন হতে হয় হয় না। এমনকি এমন বিলীন হয়ে যাওয়া নিয়ে ভয়ও পেতে হয় না। বিজ্ঞান উন্নত হয়েছে, অবশ্যই এটা ভালো দিক।

তবে কখনো কখনো ভালোর মাঝেও খারাপ থাকে। চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানের প্রয়োজনে মানুষকে বহুবার বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হিসেবে করা হয়েছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে অনেকবারই মানবিকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অতিমানব বানানোর প্রচেষ্টা করা হয়েছে। অমানবিকভাবে করা এমন কিছু এক্সপেরিমেন্টের কথাই বলবো এখানে।

যুদ্ধবাজ জেনারেলদের সবসময় চাই নতুন নতুন অস্ত্র। যে অস্ত্র প্রতিপক্ষ থেকে নিজেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে। ১ম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত বিশ্ব অনেকগুলো যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। যতই দূরপাল্লার মিসাইল বা বিমান নির্মাণ করা হোক না কেন ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধের জন্য পদাতিক বাহিনী লাগবেই। যদি সৈন্যদের শারীরিকভাবে একটু উন্নত করা যায় তাহলে হয়তো যুদ্ধের অঙ্ক বদলে যাবে। আর এসব ভেবেই অতিমানব তৈরির প্রচেষ্টা চালানো হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বার্থে মানবদেহের উপর এক্সপেরিমেন্ট সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। কিন্তু গত শতাব্দীতে মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে পরীক্ষা চালানোর উদাহারণ অনেক বেশি। বেশিরভাগ মানুষই জানতো না তাদের উপর কী পরীক্ষা চালানো হবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ জানলেও তাদের অধিকার বলে কিছু ছিল না। কারণ তারা ছিল প্রতিপক্ষ শিবিরে আবদ্ধ যুদ্ধবন্দী।

নাৎসি জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট

১৯৪১ সালে জার্মানরা হাইপোথার্মিয়া প্রতিরোধ নিয়ে কয়েকটি এক্সপেরিমেন্ট করে। হাইপোথার্মিয়ার ফলে দেহে কোন ধরনের পরিবর্তন সম্পন্ন হয় তা বুঝতে বন্দীদেরকে হিমাংকের নীচে ৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখা হতো। এই পরীক্ষায় প্রায় সবাই মারা যায়।

১৯৪২ – ১৯৪৫ সালের সময়কালে আরো একটি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। দাচু কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ১২ শত বন্দীকে ম্যালেরিয়ার দ্বারা সংক্রমিত করা হয়। তাদের তৈরিকৃত ওষুধ কেমন কার্যকর তা জানতেই পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়েছিল ম্যালেরিয়ার জীবাণু। এক্ষেত্রেও প্রায় অর্ধেক বন্দী মারা যায়।

ড. জোসেফ মেঙ্গেল নামে একজন গবেষক জেনেটিক যমজদের মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে একটি এক্সপেরিমেন্ট করেন। চোখে রঙ প্রবেশ করানো, দুজন আলাদা যমজ দিয়ে যুক্ত যমজ তৈরি ইত্যাদি। যমজদের উপর এক্সপেরিমেন্ট শেষে সরাসরি হৃদপিণ্ডে ক্লোরোফর্ম প্রবেশ করিয়ে হত্যা করা হতো।

আরেক গবেষক ড. কার্ল কুবার্কের নেতৃত্বে ৩০০ জন নারী বন্দীর দেহে কৃত্তিমভাবে অজ্ঞাত শুক্রাণু প্রবেশ করানো হয়। এই পরীক্ষায় নারীদেরকে জানানো হতো তাদের গর্ভে পশু বেড়ে উঠছে। এই প্রজেক্ট সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে পরে তাদেরকে যে হত্যা করা হতো তা জানা যায়।

চিত্রঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জার্মানদের এক্সপেরিমেন্ট।


ইউনিট ৭৩১ রাভেনবার্ক কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হাড়, স্নায়ু, পেশী ইত্যাদি পুনরুৎপাদন এবং প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে বন্দীদের শরীর থেকে এই অঙ্গগুলো আলাদা করা হতো। আর এই কাজ করা হতো কোনো ব্যথানাশক ছাড়াই। এই পরীক্ষার কোনো ব্যক্তি সুস্থ তো হতে পারেইনি বরং বেশিরভাগই মারা যায়। এছাড়া নাৎসিরা মানব চর্বি থেকে সাবান তৈরির চেষ্টাও করেছিল।

এটি জাপানিদের কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র নিয়ে গবেষণার প্রজেক্ট। জাপানের হারবিন শহরে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত এটি চলে। সেখানে বন্দী হওয়া রুশ ও চাইনিজরা ছিল এখানকার সাবজেক্ট।

জীবিত ও সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় বন্দীর শরীর থেকে মস্তিষ্ক, চোখ, যকৃত, কিডনি খুলে নেয়া হতো। এসব কাজে নেতৃত্ব দিতো জাপানি সার্জন কিন ইয়ুশা। তার ধারণা ছিল শতভাগ অক্ষত ও কার্যকর অঙ্গ পেতে হলে জীবিত শরীর থেকে অঙ্গ খুলে নিতে হবে।

ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার জন্য বন্দীদের শরীরে রোগ প্রবেশ করানো ছিল ইউনিট ৭৩১ এর একটি রুটিনবদ্ধ কাজ। প্লেগ, এনথ্রাক্স, কলেরা ইত্যাদির জীবাণুবাহী বোমা ফেলে ৪ লক্ষ চাইনিজকে হত্যার অভিযোগ আছে ইউনিট ৭৩১ এর বিরুদ্ধে। বিপজ্জনক জীবাণু অস্ত্র নিয়ে কাজ করার সময় ১ হাজার ৭০০ জন জাপানির মৃত্যুও হয়। Unit 731 Laboratory Of The Devil নামে একটি সিনেমা আছে। সেখানে ইউনিট ৭৩১ এর ভয়াবহতা ও নির্মমতা তুলে ধরা হয়েছে।

চিত্রঃ অজ্ঞাত ক্যাম্পে জাপানিদের এক্সপেরিমেন্ট। পেছনে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পর্যবেক্ষণ করছেন।

প্রজেক্ট এম কে আলট্রা

নাৎসিদের কাছ থেকে জব্দ করা নথির উপর ভিত্তি করে ১৯৫০ সালে প্রজেক্ট এম কে আলট্রা শুরু হয় এবং ১৯৬০ পর্যন্ত এটি চলে। উত্তর কোরিয়াতে বন্দী মার্কিন সৈন্যদের উপর সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের চালানো এক্সপেরিমেন্ট সিআইএকে উদ্বুদ্ধ করে। মানবতার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ এই প্রজেক্ট। প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ছিল হিপনোসিস ও মন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষা করা। এমন গুপ্তচর তৈরি করা যারা নিজেরাও জানে না যে তারা আসলে গুপ্তচর।

এম কে আলট্রার আরেকটি সফল অধ্যায় ছিল ‘ট্রুথ সিরাম’ তৈরি করা। ট্রুথ সিরাম কেন্দ্রীয় স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয় এবং মস্তিষ্ক তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে অনেকটা নিজের অজান্তেই জেরার সময় সত্য বলতে বাধ্য হয়।

চিত্রঃ ট্রুথ সিরামের উপাদান অ্যামোবারবিটাল।

এম কে আলট্রা সমালোচিত হবার কারণ হলো কর্তৃপক্ষরা পরীক্ষাধীন ব্যক্তির উপর এল.এস.ডি ড্রাগ ব্যবহার করে। এল.এস.ডি স্নায়ুতে ক্ষণিক সময়ের জন্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো। ব্যক্তির অজান্তেই এগুলো প্রয়োগ করা হতো। এল.এস.ডি ছাড়াও বারবিচুরেট-৪, আমফেটামিন-৪, টেমাজিপাম (অজ্ঞাত ড্রাগ) ব্যবহার করা হতো। বারবিচুরেট-৪ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর পরে আমফেটামিন-৪ প্রয়োগ করা হতো বলে পরীক্ষাধীন ব্যক্তি তন্দ্রাভাবে নিজের অবচেতন মনে সব নির্দেশ গ্রহণ করতো।

ডিসকভারি চ্যানেলে প্রচারিত Deception with Keith Barry অনুষ্ঠানটি যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় হিপনোসিস সম্বন্ধে ধারণা রাখেন। এর একটি পর্বে দেখানো হয় ঘুম থেকে উঠার পর একজন মানুষ মনে করতে পারে না যে সে ঘুমের মাঝে উঠে চুরি করতে গিয়েছিল। ইউটিউবে সার্চ করলেও এ নিয়ে অনেক ভিডিও পাবেন যেখানে লাইভ শোতে হিপনোসিস করা হয়।

জেসন বর্ন মুভিতে দেখা যায় একজন স্মৃতিভ্রষ্ট সিআইএ এজেন্ট তার পূর্বপরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে হত্যার মিশনে নিয়োজিত হয়। বাস্তবেও হয়তো এমনটা সম্ভব করে ফেলেছিল সিআইএ।

চিত্রঃ মিডিয়াতে এমকে আলট্রা সংক্রান্ত খবর।

গর্ভবতী নারীর উপর তেজস্ক্রিয় পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যানডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২৯ জন গর্ভবতী মহিলাকে শিশুর বিকাশ বৃদ্ধির ভিটামিন-পানীয় বলে তেজস্ক্রিয় পানীয় খাওয়ানো হয়। ডিম্বকবাহী গর্ভফুলে কত তাড়াতাড়ি তেজস্ক্রিয়তা প্রভাব ফেলে এটা পর্যবেক্ষণ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। লিউকোমিয়া এবং ক্যানসারে ৭ টি শিশু নিশ্চিতভাবে মারা যায়। বেঁচে থাকা শিশু ও মা উভয়কেই অনেক রোগের শিকার হতে হয় পরবর্তী জীবনে। প্রতিপক্ষের ভবিষ্যৎ শিশুদের পঙ্গু করা যায় কিনা এরকম ভাবনা থেকেই এই এক্সপেরিমেন্ট করা হয়।

চিত্রঃ তেজস্ক্রিয়তা প্রদান করা হচ্ছে।

গুয়েতমালা সিফিলিস পরীক্ষা

১৯৪৬ – ৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও গুয়েতেমালা সরকারের সম্মতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে জেলখানার বন্দী, সৈন্য, পতিতা এবং মানসিক রোগীদের মধ্যে সিফিলিস ছড়ানো হয়। শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়েটিক দিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হয় এবং অফিশিয়ালি ৩০ জনের মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয় প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি।

অতিমানব তৈরির উচ্চাভিলাস

ফিকশন বা ভিডিও গেমে অহরহ দেখা যায় এমন সুপারহিউম্যান যে একাই হাজার জনের কাজ করতে পারে। সামরিক দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা এমন সৈন্য তৈরি করা যারা অন্তত ১২০ ঘণ্টা নির্ঘুম থাকতে পারবে, নিজের ভরের চেয়ে বেশি ভর বহন করে অলিম্পিক অ্যাথলেটদের সমান গতিতে দৌড়াতে পারবে, অনেকদিন খাবার গ্রহণ না করে সঞ্চিত ফ্যাট থেকে শক্তি নিতে পারবে এবং আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত দেহের প্রত্যঙ্গ নিজেই পুনরুৎপাদন করতে পারবে।

অতিমানব বা সুপার-হিউম্যান তৈরি কল্পকাহিনীতে যতটা সহজ বাস্তবে ঠিক ততটাই কঠিন। অন্তত আগামী ১০০ বছরের জন্য তা আকাশ কুসুম কল্পনা। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যে মানব জিন মডিফায়িং গবেষণা নিষিদ্ধ। কিন্তু ডিফেন্স এডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (DARPA) সুপার-সোলজার বা অতি ক্ষমতাধর সৈনিক তৈরির কাজ করে যাচ্ছে।

এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কিছু যান্ত্রিক কংকালতন্ত্রের সফল পরীক্ষা করেছে যা এখনই যুদ্ধে ব্যবহার উপযোগী। যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র এমন একটি কাঠামো যা মানবদেহের হাড়ের সমান্তরালে থেকে বাড়তি শক্তি যোগাবে।

পক্ষাঘাতে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অ্যালুমিনিয়াম আর কার্বন ফাইবারের মিশ্রণে তৈরি যান্ত্রিক কংকালতন্ত্র বাজারে এসেছে। মানবদেহের জন্য কৃত্তিম হাত-পা অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। এখন এগুলোর মাঝে মস্তিষ্ক থেকে ডিজিটাল সিগন্যাল গ্রহণ করে মস্তিষ্কের নির্দেশমতো চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি আসতেও সম্ভবত খুব দেরি নেই।

২০১৫ সালে ব্রিটিশ গবেষকরা আশা প্রকাশ করেন আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে তারা মানুষের জিন মডিফাই করে গর্ভাবস্থায় অন্ধত্ব প্রতিরোধ করতে পারবেন। ২০১৬ তে চাইনিজ গবেষকরা ২১৩ টি নিষিক্ত মানব ডিম্বাণুর সাথে জিনোমের মডিফাই করতে পেরেছেন যা এইচ.আই.ভির সাথে লড়াই করতে সক্ষম। গবেষক স্টিভ শু এর মতে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানবের আইকিউ লেভেল ১০০০ বা তার বেশিও হতে পারে। উল্লেখ্য আইনস্টাইনের আইকিউ স্কোর ছিল ১৬০।

বর্তমানে অহরহ দেখা যাচ্ছে শস্যের জিন মডিফাই করে তাদের আরো বেশি উৎপাদনশীল করা হচ্ছে এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর সাথে দ্রুত খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মানুষের সাথে তাহলে এমন করতে সমস্যাটা কোথায়?

একটি শস্যের প্রজাতিকে নতুনভাবে মডিফাই করতে ঐ প্রজাতির হাজার হাজার গাছ লাগিয়ে পরীক্ষা করা হয় কিন্তু আমরা কি মানুষকেও এভাবে পরীক্ষা করবো? ধরা যাক কৃত্রিম জরায়ু এবং সেখানে স্থাপন করা ভ্রূণে পুষ্টি প্রদানের প্রযুক্তি রপ্ত করা হয়ে গেছে। একটি মানুষকে এভাবে জন্ম দিলে তার পরিচয় কী হবে বা পরীক্ষার পর তাদের কী করা হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।

The Island সিনেমায় দেখা যায় পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের ক্লোন করা হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। জেনেটিকভাবে তাদের এতই মডিফাই করা হয়েছে যে তারা শুধু খাওয়া ঘুম এবং কতৃপক্ষের বলা একটি তথাকথিত দ্বীপে যাওয়ার জন্য বেঁচে থাকে। In Time সিনেমায় দেখা যায় জেনেটিকালি মডিফাই করে মানুষের আয়ু ২৫ বছর করা হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা থেকে যায়। যদি কোনোভাবে মাতৃহীন মডিফাই করা মানুষ বানানো সম্ভব হয়, তাহলে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাকে কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে। তখন হয়তো The Island সিনেমার কাহিনীর মতো একেকটি প্রজন্মকে মাটি চাপা দিতে হবে আর সেই সাথে মানবিকতাকেও।

বর্তমানে রপ্ত করা জেনেটিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি, ন্যানোটেকনোলজি দিয়ে মানুষের বেশ কিছু

রোগ নির্মূল, শারীরিক অক্ষমতা দূর, অঙ্গ পুনঃনির্মাণ সম্ভব হবে। তবে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা অতিমানব এখনো কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রচেষ্টা থেমে থাকবে না এবং আগের প্রজেক্টগুলোর মতো অসংখ্য নিরীহ মানুষকে সবার অগোচরে শিকার হতে হবে এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিজ্ঞানের উন্নতি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিৎ কিন্তু ল্যাবরেটরির বাইরে সমস্ত মনুষ্যত্বকে বলিদান করে নয়।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Doctors from Hell by vivien spitz
  2. Nuremberg: Evil on Trial
  3. Unit731: Japan’s Secret Biological Warfare in WWII
  4. MKULTRA: the CIA’s Secret Program in Human Experimentation and behavior Modification by GEORGE ENDREWS
  5. http://creepypasta.wikia.com/wiki/The_Russian_Sleep_Experiment
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_MKUltra
  7. http://bestpsychologydegrees.com/30-most-disturbing-human-experiments-in-history/
  8. http://theatlantic.com/international/archive/2015/09/military-technology-pentagon-robots/406786/
  9. http://sciencealert.com/scientists-genetically-modify-an-embryo-for-only-the-second-time-ever

featured image: collective-evolution.com

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation