ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ঘুমের জন্য ক্ষতিকর

তথ্য ও যোগাযোগ বিপ্লবের দুনিয়ায় ২৪ ঘন্টা উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া বেশ বড়সড় সুযোগ। কিন্তু এ সুযোগের অপর পিঠে অনেক কিছু বিসর্জনেরও ব্যাপার জড়িত। নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আধুনিক যুগের জনজীবনে ঘুমের একটি ক্ষতিকারক। নিদ্রাহীনতা এবং নিম্নমানের ঘুমের সাথে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। বিছানায় যাবার নিকট সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবহার এই সমস্যার দিকে সহজে ঠেলে দেয়।

আধুনিক যুগে এসে অপর্যাপ্ত ঘুম খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ইতোমধ্যেই অপর্যাপ্ত ঘুম যে জনস্বাস্থ্য এবং জনগণের মানসিক দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব রাখছে তা স্পষ্ট। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু গবেষণার ফলাফলে তা উঠে এসেছে।

খারাপ খবর হল, এ সমস্যা দিন যত যাচ্ছে আগের চেয়েও গুরুতর হচ্ছে। বহু উন্নত দেশেও মানুষ কম ঘুমের সমস্যার সম্মুখীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ৭ থেকে ৯ ঘন্টার ঘুম দেয়ার সংকট দেখা দিচ্ছে। আর এই ঘুমের ঘাটতির সমস্যা বড় হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

যখন এ ঘুমহীনতা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, একই সাথে বেড়ে চলছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। আমাদের ঘুমের চক্র ভেঙে দিচ্ছে যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এখন পর্যন্ত খুব কমই প্রামাণ্য উপাত্ত রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে ঘুমের সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত দেখানোর ক্ষেত্রে।

ইন্টারনেটের কাছে নাচের পুতুল হয়ে গেলেন না তো? | Image Source: salon.com

ঘুম এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের মধ্যকার সম্পর্ক ও প্রভাব নির্ণয় করতে জার্মান একদল বিজ্ঞানী তাদের দেশের মানুষের উপর একটি জনজরিপ পরিচালনা করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে তুলন্নামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে ঘুমের  সাথে কতটা সম্পর্কিত সেদিকটা খেয়াল রেখে। গবেষণা থেকে উঠে এসেছে যে, যারা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকেন তারা অন্যান্যদের তুলনায় গড়পড়তায় ২৫ মিনিট দেরীতে ঘুমিয়ে থাকেন। আরো উল্লেখ্য, এরা ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রতি খেয়াল রাখতে পারেন না। ফলশ্রুতিতে, ঘুম পরিপূর্ণ হয় না এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। উল্লেখ্য, ২৫ মিনিটের হিসেব একটি গড় মান। আপাতদৃষ্টে বেশ কম মনে হলেও অনেকের ক্ষেত্রেই আশংকার জন্য যথেষ্ঠ।

ইন্টারনেট এমনিতেই একটি বহুমুখী জগৎ। একে তো বহুমুখী, তার পরে আবার এ জগতের কোন শেষ নেই। আবার উচ্চগতির ইন্টারনেট সে বহুমুখী জগতের সবগুলো দুয়ার খুলে দেয়। ফলত, উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রলুদ্ধ করে অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে ভিডিও গেমস, ওয়েবে ঘোরাঘুরি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতে।

মোবাইলের ভিতর কী থাকে? সারাদিন পড়ে থাকে কেন? | Image Source: dailymail.co.uk

ইতিপূর্বের প্রতি প্রজন্মের জন্যই, প্রযুক্তির মোহের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ছিল। টিনেজারদের মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ভিডিও গেমস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার প্রবণতা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা গিয়েছে। তবে, বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের ব্যবহারকে ঘুমের সময়ের সাথে অধিক শক্তিশালীভাবে সম্পর্কিত পাওয়া গিয়েছে।

মিলানের বক্কোনি ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যা তত্ত্বের অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো বিল্লারি ব্যাখ্যা করেন, ব্যক্তি ডিজিটাল দুনিয়ার প্রলোভনে বিছানায় যেতে দেরী করায় ঘুম শুরু করতে দেরী হচ্ছে। যাদের দেরীতে ওঠার সুযোগ নেই তারা সেই ক্ষতিপূরণও করতে পারছে না সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠে। ফলত, ঘুমের দৈর্ঘ্য প্রয়োজনীয় মাত্রার আগেই কেটে যাচ্ছে।

মোটের উপর, গবেষণার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছ থেকে যারা রাতে ঘুমের আগে ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করে থাকে। ফলে সর্বসাধারণের জন্য বিষয়ভিত্তিকভাবে এ তথ্য পরিবেশন করা  যাচ্ছে না।

গবেষণাটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এই মুদ্রার অপর পিঠের অবাক করা ব্যাপার হল টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপরও তথ্য সীমিত। অর্থাৎ ঘুমের আচরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার তথ্যের ফারাক রয়েছে। কারণ, ঘুমের চাহিদার বয়সভেদে ভিন্ন, আবার বয়সভেদে ইন্টারনেট আসক্তির ধরণও ভিন্ন। এর সাথে গবেষণা লক্ষ্য ধরে রেখে ইন্টারেনেটের কারণে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের বৃদ্ধির হার ও এই বহুমাত্রিক রাশির উর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের সাথে ব্যক্তির ঘুমের আচরণের পরিবর্তন যাচাই করতে হচ্ছে।

গবেষকরা ইন্টারনেট আসক্তির ভিত্তিতে টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপর গবেষণা করার আহবান জানাচ্ছেন। যেহেতু ইন্টারনেট জড়িত প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে, তাই এখন প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইন্টারনেটমুখী হয়ে উঠছে পণ্যের মধ্যে সেই ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রাখার দিক থেকে। একটি আরেকটির সম্পূরক হয়ে ক্রেতাকে ঠেলে দিচ্ছে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের দিকে।

ডিজিটাল দুনিয়ার ব্যস্ততা বাড়ছে যেমন হড়হড়িয়ে তেমনি প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সুস্থভাবে টিকে থাকতেও মানুষকে রাখতে হচ্ছে নানান দুনিয়ার খবর। ইন্টারনেটের কাছে যে স্বাস্থ্যের সতর্কতা রাখতে হবে এ আন্দাজ কেউ করেনি। তবে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে এবং একই সাথে আমাদের স্বাস্থ্য এবং কর্মদক্ষতার উপরও নজর রাখতে হচ্ছে।  প্রযুক্তিপণ্যের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির তথ্য যত বেশি পাওয়া যাবে তত সহজে সচেতনতার জন্য, সাবধানতার জন্য পদক্ষেপ নেয়া যাবে।

যন্ত্রের যন্ত্রণায় ঘুমকে বাঁচাতে যা করা যেতে পারে:

  • ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার সন্ধ্যায় সীমিত রাখা।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
  • বিভিন্ন কাজের মধ্যেঅগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে ডিভাইসে বুঁদ হয়ে না যাওয়া। এক্ষেত্রে বারবার সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ঢুঁ না মেরে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করা।
  • যন্ত্রের বাইরে জীবন উচ্ছ্বল– একথা মাথায় রাখা ও নিজের শরীর মনের সুস্বাস্থ্যের জন্য নিজেকে অনুপ্রাণিত করা। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে করতে দেরীতে ঘুমাতে যাবার চেয়ে বরং শীঘ্র ঘুমানোর নিয়ত করা যাতে সকালে উঠে ঢুঁ মেরে দেখে নেয়া যায়।
ইন্টারনেট যুগের সবচেয়ে ক্রমাগত ব্যক্তিগত সমস্যা সবদিকে মন গড়ানো। এটা মাথায় রাখুন, পৃথিবীর সব ঘটনা উপভোগ করার দরকার নেই, বরং সুস্থ থাকা উপভোগ করুন। আনন্দ সর্বোচ্চ উপভোগের জন্য সুস্থতা সবচেয়ে বড় শর্ত। | Image Source: gojessego.com

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইকোনমিক বিহেইভিওর এন্ড অর্গানাইজেশন গবেষণাপত্রে।

 

— ScienceAlert অবলম্বনে।

পার্কার সোলার প্রোব: ১২ আগস্ট উৎক্ষেপিত যে মহাকাশযান অর্জন করবে মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসের রেকর্ড বেগ

নাসা এবং United Launch Alliance মিলে উৎক্ষেপণ করল সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই স্পেসপ্রোবটি যাত্রা করে সূর্যের দিকে। সম্মিলিত উৎক্ষেপণ জোট বা ইউএলএ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এই কোম্পানির রয়েছে একাধারে ১২০টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করার রেকর্ড এবং উৎক্ষেপণে ১০০% সফলতা। এ প্রকল্পটির আর্থিক খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশযানটি গতকাল (১১ই আগস্ট ২০১৮) উৎক্ষেপণের কথা ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের শেষ মিনিটে ত্রুটি ধরা পড়ায় সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। উৎক্ষেপণের নতুন সূচি ঠিক করা হয় আজ রবিবার (১২ আগস্ট ২০১৮) ফ্লোড়িডার কেপ ক্যানাভারালের স্থানীয় সময় রাত ৩:৩১ এ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে এর উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় এটি উৎক্ষেপিত হয়েছে। পার্কার সোলার প্রোব উৎক্ষেপণের ভিডিও অবলোকন করা যাবে এখানে

এই প্রোবকে মহাকাশে নিয়ে গেছে ইউএলএ এর শক্তিশালী রকেট ডেল্টা IV। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ এর ডিসেম্বরে পার্কার সোলার প্রোব হবে ইতিহাসের দ্রুততম মহাকাশযান। এ ঘটনাটি ঘটবে যখন প্রোবটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছুবে। এ অভিযানের রূটম্যাপ বলছে এটি সূর্য থেকে ৩.৮৩ মিলিয়ন মাইল (৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূর দিয়ে যাবে। ঐ বিন্দুতে গিয়ে প্রোবটির গতি হবে ৬৯২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটারেরও বেশি।

এ দূরত্ব কত বড় আন্দাজ করতে পৃথিবীর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই গতিতে প্রোবটির ওয়াশিংটন ডিসি থেকে টোকিওতে যেতে ১ মিনিটেরও কম সময় লাগত। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যেতে চার সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়!

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে পার্কার সোলার প্রোব টিম প্রোবের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন তাপীয় বায়ুশূন্য চেম্বারে; Image Credit: Ed Whitman/Johns Hopkins APL/Nasa

পার্কার স্পেসপ্রোবের পেছনে কাজ করা দলটি অবশ্য নির্বিকার এই রেকর্ডভাঙা কাজে। তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ অভিযানের খুঁটিনাটিতে। এই প্রজেক্টের ম্যানেজার এন্ড্রু ড্রিসম্যান নিযুক্ত আছেন জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তিনি বলেন, “মহাকাশে কোনো কিছু দ্রুতবেগে ছোটার জন্য সেটার ডিজাইন করা যতটা কঠিন তেমনি ধীরে ছোটার ডিজাইন করাও সমান মাত্রার কঠিন। কারণ হল, মহাশূন্যে তো একটা চালু দশাকে ঠেকানোর মত কিছু নেই।”

এ ব্যাপারগুলো অরবিটাল মেকানিক্সে ধারণা থাকলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। গতি বাড়ানো যেমন সমস্যা, তেমনি মহাকাশযান টিকিয়ে রেখে এমন গতিপথ বাছাই করাও সমস্যা যা ঐ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষের আকর্ষণে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। উল্লেখ্য মহাকাশে কোনো মহাকাশযানের গতিবৃদ্ধির এখনো পর্যন্ত সেরা উপায় হল কোনো গ্রহের বা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণক্ষেত্রকে কাজে লাগানো। ড্রিসম্যান অবশ্য মজা করে বলেন, “মহাকাশযান কেবল জানে না এটি যে দ্রুতগতিতে ছুটছে।”

পার্কার সোলার প্রোবের অভিযানের গতিপথ | Image Credit: HORIZONS System, JPL, NASA

যাই হোক, এটা যে নিতান্ত ঝামেলাবিহীন অভিয়ান নয় তা স্পষ্ট। স্পেসপ্রোব না জানলেও, বিজ্ঞানীদের ঠিকই স্পেসপ্রোবকে সম্মুখীন হতে হবে এমন বিবিধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পার্কার সোলার প্রোব অতিদ্রুতবেগে ছোটার সাথে হিসেবে রাখতে হচ্ছে কোন মহাকাশীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এটি গমন করছে। এটির অভিযানপথে রয়েছে এমন ধুলোময় পরিবেশ যাকে বলা হয় হাইপারভেলোসিটি ডাস্ট এনভায়রনমেন্ট। অর্থাৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বহু ধুলিকণাময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাবে পার্কার।

হাইপারভেলোসিটি অর্থাৎ উচ্চগতি বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয় ৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগকে। এই বেগের ফলে দ্রুত ছোটা কণাগুলোর ভরবেগও যথেষ্ঠ মাত্রায় বেশি। ফলে এরা প্রবল ভরবেগে আঘাত করবে পার্কার সোলার প্রোবকে যার কারণে প্রোবের বেগের দিক বিদিকও হয়ে যেতে পারে। আসলে মহাকাশে অল্প আঘাতই বিশাল দূরত্বে ছোটা বস্তুর জন্য যথেষ্ঠ দিক বিদিকের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এ সমস্যা নিরসণে বিজ্ঞানীরা স্পেসক্রাফটে ব্যবহার করবেন কেভলার কম্বল। এ বিশেষ কম্বল অধিক তাপসহ আর সিন্থেটিক ফাইবারের তৈরি। এ ধরণের ফ্যাব্রিকের বহুল ব্যবহার রয়েছে বুলেট প্রতিরোধী জ্যাকেট, শরীরের বর্ম, বোমার চাদর ইত্যাদি নির্মাণে। অর্থাৎ এই সমাধান বহু আঘাতে টেকসই থাকার সুবিধা দিতে পারছে।

শুক্রের অভিকর্ষকেও পার্কার সোলার প্রোব কাজে লাগাবে। শুক্রের কাছ দিয়ে পার্কার সোলার প্রোব ৭ বার অতিক্রম করবে। সূর্যের দিকে পাঠিয়ে সূর্য ওপাশ দিয়ে প্রোবকে ফেরত আনার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পৃথিবী নিজেই সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে, সে অনুসারে এই আদিবেগ পেয়ে যাচ্ছে প্রোব। কিন্তু এটি সূর্যের দিকের সাথে সমকোণে হলে পথ বেঁকে বড় হয়ে যাবে। ফলে সময় লাগবে আরো বেশি, উদ্দিষ্ট লক্ষ্যও টিকবে না। বেগ সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে দেখতে পারেন এই ভিডিওটি।

 

অভিযানের পথ অনুযায়ী, পার্কার সোলার প্রোব যখন সূর্যের সবচেয়ে নিকট বিন্দু দিয়ে যাবে তখন এর বেগ হবে ভয়েজার ১ এর বেগেরও দশগুণের বেশি। ভয়েজার ১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ এ, পাঁচ বছর আগে এটি সৌরজগতের বাইরে চলে গিয়েছে। প্রক্সিমা সেন্টরাইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬১,০০০ কিলোমিটার বেগে

 

পার্কার সোলার প্রোবের গতিপথে শুক্রের এবং সূর্যের অভিকর্ষ যেভাবে ব্যবহার করে উচ্চগতি অর্জিত হবে; Image Credit: Guardian graphic | Source: The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory

স্বাভাবিক হিসেবে গতি অর্জনের কৌশলের দিক থেকে ভয়েজার ১-ই ইতিহাসখ্যাত। তবে ২০১৬ এর জুলাইতে নাসার জুনো প্রোব বৃহস্পতির অভিকর্ষের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বৃহস্পতির গ্যাসীয় জমিনে পড়ে ধ্বংস হয়। তখন এর বেগ পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় ২৬৬,০০০ কিলোমিটারে। এ গতিবেগ কাজে না লাগলেও কতদূর অর্জনযোগ্য এটার একটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল।

গ্রহের অভিকর্ষকে ব্যবহার না করে, কেবল সূর্যের অভিকর্ষকে ব্যবহার করে রেকর্ডধারী স্পেসক্রাফট দুটি হল হেলিওস I এবং II. ১৯৭০ এর দশকে এরা উৎক্ষেপিত হয়েছিল। বুধ সূর্যের যত কাছে হেলিওস মহাকাশযান-যুগল তার চেয়েও কাছে প্রবেশ করেছিল। এরা অর্জন করেছিল ঘণ্টায় ২৪১,০০০ কিলোমিটার বেগ বা সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার।

পার্কার সোলার প্রোব দৃশ্যমান সৌরপৃষ্ঠ থেকে চার মিলিয়ন মাইল (৬.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার) নিকট দিয়ে যাবে। ফলে হেলিওসের চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেগে দৌঁড়াবে এটি। সূর্যের উত্তাপকে আরেক ধাপ এগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথে অভিযাত্রা শুরু হয়ে গেছে… গতি অর্জন মানে তো আমাদের স্বপ্নে আশার সঞ্চার… বহুদূর ছুটে যেতে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.space.com/41447-parker-solar-probe-fastest-spacecraft-ever.html
  2. https://www.theguardian.com/science/2018/aug/10/mission-to-touch-the-sun-nasa-to-launch-parker-solar-probe
  3. https://blogs.scientificamerican.com/life-unbounded/the-fastest-spacecraft-ever/
  4. https://www.space.com/41461-parker-solar-probe-launch-delayed.html
  5. https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/

পৃথিবীর আদি রঙ ছিল গোলাপি

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে
প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে–

জীবনানন্দ দাশ সাগরের নীলে প্রেম খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু জীবনানন্দ কেন, এমন শত কবি সহস্রবার যে নীলে উদাস হয়েছেন… সে নীলে আমরাও হারিয়েছি। আকাশ আর সাগরময় পৃথিবী নীল হয়েছে এ দুইয়ে। কিন্তু এই নীলই কি আদি রঙ? পুরোটা অতীত কি নীল পৃথিবীরই?

প্রাগৈতিহাসিক সাগরও কি নীল ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাচীন সাগর ছিল গোলাপী রঙের। সে হিসেবে গোলাপী হবে মানুষের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে আদি রঙ। নীল পৃথিবী আজ গোলাপি পৃথিবীর ভবিষ্যত।

গবেষকরা এই গোলাপি রঙের হদিস পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়, সাহারা মরুভূমিতে ব্যাকটেরিয়ায় ফসিলে। প্রাপ্ত ফসিল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার, মনে করা হচ্ছে এরা ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগের। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেঁচে থাকত। দীর্ঘসময় ধরে সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সাগরে সাগরে রাজত্ব করেছে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বরং শৈবালের থেকেও আদিম। বিবর্তনীয় ধারায় জীবনের বিকাশে সায়ানোব্যাকটেরিয়া আদি উৎসদের মধ্যে অন্যতম। বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যত বিবর্তনীয় ইতিহাস ধরে পিছনে যাওয়া যাবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কাছে পৌঁছে যেতে হবে। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে এবছরের ৯ই জুলাই।

এই অণুজীবদের গোলাপি হওয়ার পেছনের কারণ কী? অন্য রঙ না হয়ে গোলাপিই কেন হল। ফসিল অবস্থায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ক্লোরোফিলকে পাওয়া যাচ্ছে গাঢ় লাল এবং বেগুনি রঙে, অধিক ঘনমাত্রার দশায়। অর্থাৎ, যখন মাটি পানির সাথে মিশে এর ঘনমাত্রা কমে যাবে তখন এটি গোলাপি রঙ দিবে পানিতে। অর্থাৎ, উপসংহার টেনে বললে সাগরের ক্ষেত্রেও রঙের প্রভাব তাই হওয়ার কথা।

ক্লোরোফিল বলতেই সবুজ রঙ মাথায় খেলে যায়। কিন্তু ক্লোরোফিল আজকের জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অস্ত্র, আদিম পৃথিবীর প্রাণ এত উন্নত ছিল না, শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাও এতটা দক্ষ ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার পূর্বে ছিল বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব। অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণ তখনকার জন্য বহুদূরের গল্প, পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন সালফারময় পরিবেশে। এজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কাজ ছিল ইলেকট্রন আলাদা করে ফেলা। এদের ছিল বেগুনী কণিকা যা সবুজ আলো শোষণ করত এবং লাল ও নীল রঙের আলো ছেড়ে দিত।

৪,৪০০ গুণ বিবর্ধিত বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া। স্বাদু এবং নোনা উভয় জলাশয়েই এদের অস্তিত্ব ছিল; Image Credit: Dennis Kunkel /Science Photo Library

অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণে সায়ানোব্যাকটেরিয়া একেবারেই আদি, শুরুটা হয় বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার পরিত্যক্ত শক্তি ব্যবহার করে। বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার ত্যাগ করা লাল এবং বেগুনী রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তি কাজে লাগাত আদি সায়ানোব্যাকটেরিয়া। প্রাচীন ক্লোরোফিলের উপর ব্যাকটেরিয়ার ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

৬৫ কোটি বছরের ব্যবধানে যখন আমরা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা করছি, তাদের চেহারা একই রকম হওয়ার কথা নয়। ; Image Credit: River Dell High School | Slideplayer.com

এই প্রাচীন ক্লোরোফিল ধরা পড়ার জন্য উপযুক্ত ঘটনারও তো দরকার রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই নমুনা সম্ভবত কোনো কারণে দ্রুত সাগরগর্ভে চাপা পড়ে যায়। এজন্য অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশের দরকার ছিল। আর একবার চাপা পড়ার পর অণুজীবেরা একে ফসিলে পরিণত করেছে, ফলে এরা স্থবির হয়ে রয়ে গেছে তাদের চাপা পড়া স্থানেই।

 

— HowStuffWorks অবলম্বনে।

বৃহস্পতির কেন ৭৯টা উপগ্রহ যেখানে পৃথিবীর মাত্র একটা

পৃথিবীর সবেধন নীলমণি উপগ্রহ কেবল চাঁদ, অথচ বৃহস্পতির? ডজনকে ডজন উপগ্রহ! বৃহস্পতি অবশ্য সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। মজার ব্যাপার এখনো বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা হচ্ছে। এইতো কদিন আগেই (১৬ জুলাই ২০১৮) কার্নেগি ইন্সটিটিউট ফর সায়েন্স এর বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন বৃহস্পতির আরো ১২ টি উপগ্রহ রয়েছে যেগুলো আমরা জানতাম না।

যে অনুসন্ধানকারী দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন স্কট শেপার্ড। তবে তারা কাজ করছিলেন সৌরজগতের দূরতম কাইপার বেল্টে নতুন কোনো বস্তু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কাইপার বেল্ট নেপচুন কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত যা হচ্ছে দীর্ঘাকার রিঙ। মূলত এর উপাদান সৌরজগত সৃষ্টির ধ্বংসাবশেষ। কাজের একটা বিরতি হিসেবেই তারা মূল উদ্দেশ্য কাইপার বেল্ট থেকে মোড় ঘুরিয়ে জুপিটারকে দেখার চিন্তা করল। আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই পেয়ে গেল গ্যালিলিওর চাঁদের নতুন সঙ্গী!

১৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মহান জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলেই সর্বপ্রথম চারটি স্বর্গীয় বস্তু প্রত্যক্ষ করেন জুপিটারকে ঘিরে ঘুরছে। সেগুলোর নামকরণ করা হয় আয়ো, ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং ক্যালিস্টো নামে। এগুলোই ছিল জুপিটারের বড় চাঁদ— একই সাথে প্রথম আবিষ্কৃত চাঁদও। গ্যালিলিওর এই পর্যবেক্ষণই ছিল মানবজাতির জন্য ভিনগ্রহের প্রথম উপগ্রহ। তারাদেখার প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নয়নের সাথে, এটা স্পষ্ট হয়ে যায় জুপিটারের চৌহদ্দি কেবল ঐ চার উপগ্রহকে নিয়েই নয়। ২০১৮ এর জুলাইয়ের পূর্ব পর্যন্তও জুপিটারের আবিষ্কৃত উপগ্রহ ছিল ৬৭টি। এখন হিসেব দাঁড়াল জুপিটারের ৭৯টি গ্রহ বের করতে মানুষের লেগে গেল চারশ বছরের অধিক সময়।

এই মহাসমাহার সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ করতে পারে নি, আপাতত পারবেও না। রানার আপ শনির রয়েছে ৬২টি উপগ্রহ আর তৃতীয় অবস্থানে ইউরেনাস রয়েছে ২৭টি উপগ্রহকে ঘিরে। নেপচুনের ১৪টি এবং আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের দুটি উপগ্রহ— ডিমোস এবং ফোবোস। অন্যদিকে পৃথিবীর মাত্র ১টি উপগ্রহ থাকলেও শুক্র আর বুধের কোনো উপগ্রহই নেই।

বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ থাকার কারণ এক কথায় মহাকর্ষ। কিন্তু শুধু এই কারণ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধরা যাবে না। অন্যান্য কিছু শর্ত জুড়ে দিলে তারপর মহাকর্ষকে বহু উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ বলা যাবে।

বৃহস্পতির মহাকর্ষের প্রভাব

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের গ্রহগুলোকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এদের গড়নের ভিত্তিতে। সূর্যের নিকটতম চারটি গ্রহকে বলা হয় ভূসদৃশ গ্রহ— বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গলকে। অর্থাৎ যেগুলোর কঠিন অভ্যন্তরভাগ রয়েছে। এজন্য এদের পাথুরে গ্রহও বলা হয়। আরেক ধরণের হল গ্যাসীয় দানব: বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন।

দুইদলের গ্রহগুলোর আকারের পার্থক্যও ভাগ করার বৈশিষ্ট্যসূচক হিসেবে নেয়া যেত। গ্যাসীয় দানবের সবচেয়ে ছোট সদস্য ইউরেনাসও ভূসদৃশ গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পৃথিবীর চেয়ে ১৫গুণ বিশাল। আর অতিকায় জুপিটারের কাছে তো পাথুরে গ্রহের বাকিরা সে হিসেবে নস্যি! বৃহস্পতির সমান ওজনদার হতে পৃথিবীর সমান আরো তিনশোরও বেশি গ্রহ লাগবে। গ্রহ হিসেবে এটি একেবারে আদর্শ দানব।

সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহ চারটি যদি সূর্যের সাথে ছবি তুলত তবে যেমন দেখাত; image source: NASA & Wikipedia User HalloweenNight

আইজ্যাক নিউটনের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া যায়, কোনো বস্তুর ভরের সাথে ঐ বস্তুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা জড়িত। যেহেতু গ্যাসীয় গ্রহগুলো অতিকায়, অর্থাৎ ভারী, সুতরাং তারা অধিকসংখ্যক উপগ্রহকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয় জুপিটারের মত বড় গ্রহের অধিক উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে। আমাদের সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহগুলো সূর্য থেকে দূরে, অর্থাৎ বাইরের দিকে অবস্থিত। কিন্তু সৌরজগতের বাইরে আমরা এমন অনেক নক্ষত্রকে যাদের জুপিটারের মত উপগ্রহ রয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে দেখা যাবে সে গ্যাসীয় দানবগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। ব্যাপারটা কেমন তা কল্পনা করা যেতে পারে বুধের জায়গায় শনিকে সূর্যের পাশে বসিয়ে।

২০১০ সালে এক ফরাসি জ্যোতির্বিদ, ফাথি নামোনি রীতিমত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যে জুপিটারের মত গ্রহদের উপগ্রহ বলতে গেলে থাকেই না। ধরা হয়ে থাকে এমন অতিকায় গ্রহগুলো এদের নক্ষত্র সিস্টেমের বাইরে সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে। আর আসার পথে যেহেতু নিজে ভারী, যথেষ্ঠ মহাকর্ষ শক্তিওয়ালা তাই বহু উপগ্রহ ধরা পড়ে এর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের প্রবলতায়।

গ্যাস দানব বড়, কিন্তু নক্ষত্র তো বড়োর চেয়েও বড়— বিশাল। একারণে তাদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও ব্যাপক মাত্রায় প্রবল হবে। তাই যখন কোনো জুপিটারের মত গ্রহ উপগ্রহ ভিড়িয়ে কাছে চলে আসে, নক্ষত্র উপগ্রহদের গিলে ফেলে।

উপগ্রহময় গ্রহরাজ বৃহস্পতি; image source: ROBERTO MOLAR-CANDANOSA/CARNEGIE INSTITUTION FOR SCIENCE

নক্ষত্র থেকে যত দূরে যাওয়া যায় বস্তুর প্রতি এর আকর্ষণ বলও কমতে থাকে। মহাকর্ষের প্রাবল্যের গণিত বলে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে শক্তি কমে যায় চারগুণ, দূরত্ব তিনগুণ হলে শক্তি কমে যায় ৯ গুণ। মানে একই পরিমাণ দূরত্ব বৃদ্ধির জন্য মহাকর্ষের প্রাবল্য হ্রাস ঘটছে বেশি বেশি করে, যত দূরে যাওয়া হচ্ছে। সে অনুসারে নামোনিই সঠিক, জুপিটারের ৭৯টা উপগ্রহ থাকার প্রথম কারণ এর মহাকর্ষ বল প্রবল। আর এই ৭৯টা উপগ্রহই জুপিটারের কাছে টিকে থাকার কারণ, জুপিটার সূর্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।

বড় পরিবার, বৃহস্পতি পরিবার

জুপিটারের উপগ্রহগুলো শিলাময়। উপগ্রহ আয়ো সক্রিয় আগ্নেয়গিরিময়, ইউরোপাতে গুপ্ত আছে মহাসাগর এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্যানিমিড যা কিনা এই সৌরজগতের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক উপগ্রহ। গ্যানিমিড মঙ্গলের দুই তৃতীয়াংশ এমনকি বুধের চেয়েও বড়।

অনুমান করা হয় এই তিন উপগ্রহ, ক্যালিস্টো আর বৃহস্পতি নিজে সম্ভবত পরপর একই সাথে গঠিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ গ্যাসের চাকতি আর ধুলা মিলেমিশে আজকের বৃহস্পতিকে গঠন করে। যখন জুপিটার আকার গঠন করে ফেলে, অন্যান্য পদার্থ এর চারপাশে পাক খাচ্ছিল যা জমে চারটি উপগ্রহে পরিণত হয়। গ্যালিলিও প্রথম এই উপগ্রহ চারটি দেখতে পান বলে এগুলোকে গ্যালিলিওর চাঁদ বলা হয়।

এই চারটি উপগ্রহই বলতে গেলে জুপিটারের উপগ্রহগুলোর ভরসমষ্টির সবটা। এই চারটি বাদে বাকিগুলো মিলে উপগ্রহগুলোর মোট ভরের মাত্র ০.০০৩%।

শনি গ্রহও এই প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে থাকবে কিছুটা। অনুকল্প (হাইপোথিসিস) করা হয় যে, আদি বৃহস্পতি শনির কিছু কক্ষপথ বিচ্যুত উপগ্রহকে নিজের কক্ষপথে টেনে নেয়। অন্যান্য উপগ্রহগুলো এমন যে বৃহস্পতির জন্মের সাথে তাদের জন্ম সংগতিপূর্ণ মনে হয় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বৃহস্পতির বহু চাঁদগুলো গঠিত হয়েছে এর মহাকর্ষের প্রভাবে ছুটতে থাকা পাথরের খন্ডগুলোর এক হওয়ার মাধ্যমে।

সব কথা শেষ করার আগে চাঁদের আচরণ নিয়ে কিছু জানাতে হবে। বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ বৃহস্পতি যেদিকে পাক খায় সেভাবেই বৃহস্পতিকে একই দিক ধরে প্রদক্ষিণ করে। আবার কতকগুলো বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যেও দুটো বিপরীত দিকে ঘোরে। বিপরীত দিকে ঘোরার ক্ষেত্রে ঝুঁকি হল দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যেকোন সময় একটি আরেকটির সাথে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। বহু উপগ্রহ বহুদিকে প্রদক্ষিণ করায় সংঘর্ষ এড়ানোই কঠিন ব্যাপার হবে। আর এক উপগ্রহ আরেক উপগ্রহের উপর আছড়ে পড়লে বৃহস্পতি সেই সুযোগে পেয়ে যেতে পারে নতুন উপগ্রহ। এটাও বহু উপগ্রহ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

HowStuffWorks অবলম্বনে।

featured image: express.co.uk

 

আজ ২৭ জুলাই শুক্রবার দেখা যাবে শতাব্দীর দীর্ঘতম রেকর্ড চন্দ্রগ্রহণ

আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণ

কখনো কি লক্ষ্য করেছেন, কোনো চন্দ্রগ্রহণ বা সৌরগ্রহণ একটি আরেকটির সপ্তাহ দুয়েক আগে-পরে সংঘটিত হয়েছে? মাঝে মাঝে আমরা এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপারের সম্মুখীন হব। আমরা একমাসের মধ্যেই এমন তিনটি গ্রহণ পেয়ে যেতে পারি।

ঠিক এমনই একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে আজ। এই মাসেই ১৩ জুলাইতে একটি আংশিক সৌরগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা হয়েছে, যদিও বিরল জনবসতি এন্টার্কটিকা, তাসমানিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এলাকায়। পরবর্তী আংশিক সূর্যগ্রহণটি হবে ১১ই আগস্টে, দেখা যাবে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। ইউরোপ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বেশ বড় অংশ সে সুযোগ পাবে। এমনকি উত্তর ও পূর্ব কানাডার অধিবাসীদেরও খানিক সম্ভাবনা আছে সূর্যোদয়ের সময় গ্রহণের অভিবাদন পাবার।

আর এ দুই সৌরগ্রহণের মাঝে অবস্থান করে নিয়েছে একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আজ ২৭ জুলাইতে। এ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘকালীন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ।

আজ চাঁদ অতিক্রম করবে অয়নবৃত্ত। অয়নবৃত্ত হল সূর্য পৃথিবীর আকাশ দিয়ে যে পথ বরাবর এগিয়ে চলে। তাই হিসেব করে দেখা গেছে, যখন চাঁদ পূর্ণিমায় অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ পেয়ে যাই। আবার যখন নতুন চাঁদ অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা সৌরগ্রহণ পেয়ে যাই। এ কারণেই সূর্যের বার্ষিক পরিক্রমণ পথ— অয়নবৃত্তকে আরেক নামে ডাকা হয় গ্রহণবৃত্ত।

যখন পূর্ণ বা নতুন চাঁদ এই গ্রহণবৃত্ত বা অয়নবৃত্তকে চাঁদের কক্ষপথের একপাশ দিয়ে অতিক্রম করে, এটি অপরপাশ দিয়েও অয়নবৃত্তকে অতিক্রম করবে। আর দুই অতিক্রম হবে দুই সপ্তাহ আগে বা দুই সপ্তাহ পরে। যেকারণে, এই গ্রহণের পর্যায়কালটাকে আমরা বলে থাকি “গ্রহণ মৌসুম”।

সাধারণত, একটা গ্রহণ মৌসুমে আমরা দুটো গ্রহণ পেয়ে থাকি। কিন্তু পূর্ববৎ, এই মৌসুমের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি গ্রহণ পেয়ে যাচ্ছি ২৯.৫৩ দিনের মধ্যে— যতটা সময় লাগে এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদের সময় শুরু হতে।

আজ ২৭শে জুলাই শুক্রবারের আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হতে যাচ্ছে এ কারণে যেহেতু উপগ্রহটি ঠিক উত্তর দিক দিয়ে পৃথিবীর ছায়া অতিক্রম করবে। কার্যত, চাঁদ এর কক্ষপথের অধোগামী বিন্দুতে পৌঁছে যাবে। কক্ষপথের এই বিন্দুটি হচ্ছে যেখান থেকে চাঁদ আবার তার কেন্দ্রের বস্তুর দিকে এগুবে— এর ১৩৮ মিনিটের মাথায় চাঁদ পূর্ণ দশায় অবস্থান করবে।

এর কারণে, দুই নতুন চাঁদ যার মাঝে পড়েছে ২৭ জুলাই। আর আগের ও পরের দুই সপ্তাহের মাথায় চাঁদ প্রায় ঠিক ঠাক এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যে সূর্যের গ্রহণের জন্য যথেষ্ঠ হয়। এই সুযোগে আমরা পেয়ে যাচ্ছি গ্রহণের ত্রয়ী।

ক্ষুদ্র, ধীরতর চাঁদ + দীর্ঘ ছায়া = একটি দীর্ঘ চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদের আশপাশ এবার পৃথিবীর ছায়া বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ঘিরে ফেলবে যা সাধারণত বিরল। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি হওয়ার অবশ্য কারণ চাঁদই। আজ গ্রহণের সময় পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূর দিয়ে অতিক্রম করবে যেটিকে বলে অপভূ (Apogee)— ৪০৬,২২৩ কিলোমিটার দূর দিয়ে। আবার আরেক ব্যাপার, সবচেয়ে দূর বিন্দু দিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদ অতিক্রম করে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

সে হিসেবে দূর ও ধীর মিলিয়ে এবারের চন্দ্রগ্রহণ বিজ্ঞানের মহিমায়ই দীর্ঘতম। এর ফলে চাঁদকে গড় আকারের চেয়ে ক্ষুদ্রতর দেখাবে। কার্যত, আরো তথ্য হল, ২০১৮ এর ক্ষুদ্রাকার পূর্ণচন্দ্রও আজই। এ গ্রহণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে পৃথিবী অপসূর বিন্দু অতিক্রম করার তিন সপ্তাহেরও পর। অপসূর (Aphelion) বিন্দু হচ্ছে সূর্য থেকে কোন কিছুর দূরতম বিন্দু, এ সময়ে পৃথিবীর প্রচ্ছায়া কৌণিকভাবে সবচেয়ে বড় থাকে।

তো, সবকিছু  হিসেব করে দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা একটি ক্ষুদ্রাকার চাঁদ দেখতে পাব— যদিও পূর্ণচন্দ্র, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরতর বেগে ছোটা চাঁদ যা অতিক্রম করবে প্রায় সোজাসুজি পৃথিবীর ছায়ার মাঝ দিয়ে। যে ছায়া কিনা আবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও প্রলম্বিত। ফলে এই চন্দ্রগ্রহণের স্থিতিকাল হবে ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। উল্লেখ্য, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণের চেয়ে মাত্র ৪ মিনিট কম এই স্থিতিকাল।

যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখেন বা পছন্দ করেন তাদের জন্য আরেকটু বাড়িয়ে জানাই। চাঁদ সৃষ্টির পর থেকে খুবই অল্প মাত্রায় পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে গ্রহণের এই সর্বোচ্চ সময়টা বিশ্বজনীন সময়ের মাপকাঠিতে না। এটি হিসেব করা হয়েছে ৫০০০ বছরের সীমায় (খ্রিস্টপূর্ব ১৯৯৯ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অবসরপ্রাপ্ত এমেরিটাস আমেরিকান জ্যোতিঃপদার্থবিদ ফ্রেড এস্পেনাক এবং বেলজিয়ান আবহাওয়াবিদ ও অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাঁ মিয়াসের বিবৃতি অনুযায়ী আজকের গ্রহণটি ৯জুন, ২১২৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘতম।

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের গড় স্থিতিকাল প্রায় ৫০ মিনিট।

উত্তর আমেরিকা, ঘুমিয়ে থাকো!

যারা উত্তর আমেরিকায় বা মধ্য আমেরিকায় রয়েছে তাদের জন্য অবশ্য দুঃসংবাদ। কোনো গ্রহণই তারা অবলোকন করতে পারবে না। এমনকি পূর্ণ গ্রহণ হলেও ঘটনার আংশিকও দেখতে পাবে না— কারণ, পুরো ঘটনা ঘটার সময় আমেরিকা মহাদেশে দুপুর এবং বিকেল, পূর্ণচাঁদ থাকে এসময় দিগন্তের নিচে।

ইউরোপ, আফ্রিকা অথবা এশিয়ায় এ ঘটনা দেখার সুযোগ থাকছে। এদিকে পূর্বে থাকা জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া চাঁদকে দেখতে পাবে যখন প্রায় পুরোটা পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে। মধ্য এবং পূর্ব আমেরিকায় চাঁদকে উঠতেই দেখা যাবে সম্পূর্ণ গ্রহণ হয়ে যাবার পর।

বাংলাদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ আরম্ভ হবে রাত ১১টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হবে আগামীকাল ভোর ৫টা বেজে ২৮ মিনিটে। পূর্ণ গ্রহণের সময় রাত ২টা ২১ মিনিটে। সময়ের টিক টক মেপে গ্রহণের পূর্বাভাস দেখুন এখানে

মঙ্গলকে ভুলে যেও না!

চাঁদ পূর্ণগ্রহণের সাথে আকাশে আরো কিছু চমক রয়েছে। মঙ্গলকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের দিন পাওয়া যাবে সূর্যের ঠিক বিপ্পরীত দিকে অবস্থান করতে। চিলিক ছড়াবে হলুদাভ-কমলা দ্যুতিতে। আকাশে মঙ্গলকে দেখা যাবে চাঁদ থেকে ৬ ডিগ্রি নিচে। গ্রহণ দেখতে প্রত্যাশীরা আকাশে পাবেন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া চাঁদের সাথে অত্যুজ্জ্বল মঙ্গলকে। ঠিক এমনিভাবে গ্রহণের দিনে উজ্জ্বল মঙ্গলের সাথে পৃথিবীর মানুষের দেখা হয়েছিল গত শতাব্দীতে— ১৯৭১ এর ৬ আগস্টে। দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণের পিছে ছোটা অনেক প্রবীণ হয়ত মিলিয়ে দেখে নিতে পারবে পুরনো সময়ের সাথে।

তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর সাথে মঙ্গলের সর্বনিম্ন দূরত্ব হওয়া সম্ভব ৫৪.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। আজকে মঙ্গলের দূরত্ব থাকবে ৫৭.৭ মিলিয়ন কিলোমিটার। অর্থাৎ, একে তো নিকটবর্তী আবার তারপর গ্রহণের সময়— দুইয়ে মিলে মঙ্গলকে আজ উজ্জ্বলতায় দেখার অপেক্ষা।

আবার কবে…

পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে আগামী বছর ২০১৯ এর ২০ জানুয়ারি, রোববার। উত্তর আমেরিকাবাসী যেহেতু এ সামার শো’তে গ্রহণ দেখতে পারছে না, তাই পরবর্তী চন্দ্রগ্রহণ পশ্চিমাংশে জোরালো হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শুরু-শেষ পরিপূর্ণভাবে সে গ্রহণ তখন দেখা যাবে। এছাড়া, পূর্ণভাবে ঢাকা চাঁদকে শীতের আকাশে খাড়া উপর থেকে দেখা যাবে।

এ গ্রহণ উদযাপনের জন্য জাতীয় দিনপঞ্জিও দর্শকদের পক্ষে থাকবে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মরণে তিনি দিনের ছুটি চলবে তখন আমেরিকায়। বলা যায়, ১৯৭৫ এর পর কোনো ছুটিতে চন্দ্রগ্রহণ না পাওয়া আমেরিকানদের কাছে এটি বেশ সাড়া জাগাবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

সকলের জন্য শুভেচ্ছা রইল, আশা করি আবহাওয়া আপনার এলাকায় সদয় হবে এ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণটির সাক্ষী হতে।

 

— Scientific American অবলম্বনে।

তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

ধূমকেতুতে পাওয়া আণবিক অক্সিজেন ধূমকেতুতে তৈরি হয় নি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার রোসেটা মহাকাশযান ৬৭পি ধূমকেতুকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘসময়। আগস্ট ২০১৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছিল। ধূমকেতু ৬৭পি এর অপর নাম চুরিয়ুমোভ গেরাসিমেঙ্কো। আর রোসেটার অভিযানকাল ছিল দীর্ঘ ১২ বছর। রোসেটা এ ধূমকেতুর উপর একটি প্রোবও পাঠিয়েছিল যা পরিশেষে বিপর্যস্ত হয়ে এর পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

রোসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি। ছবিটি তোলা হয়েছিল সূর্যকে নিকট দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময়; Image Source: European Space Agency

যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন এর বরফ সূর্যের তাপে উর্ধ্বপাতিত হয়। উর্ধ্বপাতনের ফলে কোনো পদার্থ কঠিন থেকে সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই গ্যাস একটি আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর যেটিকে মনে হয় ধূমকেতুর মাথা। কখনো কখনো একে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসও বলে।

ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা মাথায় মূলত থাকে পানি, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। রোসেটার যন্ত্রপাতি কর্তৃক পর্যবেক্ষণের তথ্য বলছে এর মাঝে আণবিক অক্সিজেনও রয়েছে। আণবিক অক্সিজেন বলতে বোঝায় অক্সিজেন গ্যাসের মৌল দশা– কোনো যৌগে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকা অক্সিজেন নয়।

ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ যে নামে চিহ্নিত হয়; image source: Quora

এই আণবিক অক্সিজেন গঠিত হয় দুটো অক্সিজেন পরমাণু একে অপরের সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে। পৃথিবীতে আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন পাই তার উৎপাদন হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মত এত অক্সিজেন তো এখনো কোথাও পাওয়া যায় নি, যাও অল্পসংখ্যক স্থানে পাওয়া গেছে তাও খুব নগণ্য মাত্রায়। ইতিপূর্বে জুপিটারের কিছু বরফময় উপগ্রহে আণবিক অক্সিজেনের দেখা মিলেছে, কিন্তু কখনো ধূমকেতুতে পাওয়া যাবে এমনটা আশা করা হয় নি।

ধূমকেতুসহ আমাদের পুরো সৌরমণ্ডল গঠিত হয়েছিল অতিকায়, বিস্তৃত গ্যাসের মেঘ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। অধিকাংশ পদার্থ মিলে গ্রহ তৈরি করেছিল, এছাড়াও কিছু ক্ষুদ্র দলা আকৃতির গ্যাস আর ধুলা জমাট বেধেছিল সৌরমণ্ডলের বাইরে। বাইরে হওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট কম ছিল যাতে বরফ গঠিত হতে পারে। আর ধূমকেতুর উপাদানগত কারণে এর অপর নাম কিন্তু ”নোংরা তুষারবল”।

রোসেটার বিজ্ঞানী দল তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, এই অক্সিজেন ধূমকেতুর মূলদেহ বা নিউকিয়াসে গঠিত হয় নি। অর্থাৎ, আগে থেকেই এই আণবিক বা মৌলিক অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল। সৌরমণ্ডলে ৪৬০ কোটি বছর আগে এটি গঠন হওয়ার সময়ই এতে অক্সিজেন উপস্থিত ছিল।

এই গবেষকদলের সাথে যুক্ত নয় এমন আরেকটি গবেষকদল অক্সিজেনের উৎসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে ধূমকেতুতে অক্সিজেন অন্য কোনো উপায়ে সঞ্চার হতে পারে। তারা একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছে কিভাবে মহাশূন্যে আণবিক অক্সিজেন সৃষ্টি হতে পারে। বৈদ্যুতিকভাবে আহিত অণু বা শক্তিশালী আয়নের নির্দিষ্ট দিকে আলোড়নের মাধ্যমেও অক্সিজেন অণু গঠিত হতে পারে। অনেকটা নির্দিষ্ট দিকে আয়ন দিয়ে গুলি করার মত ব্যাপার।

তাদের প্রস্তাবনা ৬৭পি এর পৃষ্ঠের সাথে শক্তিশালী আয়নের বিক্রিয়ায় এই অক্সিজেন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। মহাকাশে এমন শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।

আর তাই রোসেটা বিজ্ঞানীদলের সদস্যরা ৬৭পি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নতুন তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করেছেন। নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তারা ধূমকেতুর পৃষ্ঠে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়ার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে সে পরিমাণে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া যথেষ্ট নয়। রোসেটা বিজ্ঞানীদলে কাজ করছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কতক পদার্থবিজ্ঞানী।

গবেষণাপত্রের শীর্ষ লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কেভিন হেরিটায়ার বলেন, ৬৭পি এর মাথায় প্রথমবারের মত আণবিক অক্সিজেন আবিষ্কার একই সাথে ছিল চমক জাগানিয়া এবং উত্তেজনাকর। আমরা আণবিক অক্সিজেন তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শক্তিশালী আয়ন, কণার বিচ্ছুরণের পরিমাণ ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে নতুন অক্সিজেন গ্যাস উৎপাদন করার হার থেকে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের পরিমাণের সাথে গরমিল রয়েছে। শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণ কোনোভাবেই এ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করার জন্য দায়ী হতে পারে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক ডক্টর ম্যারিনা গালান্ড যিনি একই কর্মস্থানে কাজ করছেন হেরিটায়ারের সাথে রোসেটা প্লাজমা কনসোর্টিয়ামে সহ-অনুসন্ধানকারী হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে একই সুরে মত দেন। ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আয়ন আপতিত হয়ে অণু গঠন সম্ভব কিন্তু সে পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

নতুন বিশ্লেষণ এই গবেষক দলের মূল সারাংশের সাথে মিলে যায়, এই আণবিক দশার অক্সিজেন ধূমকেতু গঠনের সময়কার। অন্যান্য আরো তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে যা এখনো একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। তবে ধূমকেতু গঠনের সময়ই অক্সিজেনের সংযুক্তির তত্ত্ব এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ অন্ধকার মেঘ এবং আদি সৌরজগতের পরিবেশে আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিকে সমর্থন করে। এই মডেলে আণবিক অক্সিজেন গঠনের পর জমে যায়, পরিণত হয় ক্ষুদ্র ধুলিকণায়। মহাকাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার অজস্র নক্ষত্র থাকলেও বিশালতার কারণে মহাশূন্যের তাপমাত্রা খুবই কম, গড় তাপমাত্রা পরম তাপমাত্রার মাত্র তিন ডিগ্রি উপরে। তাই গ্যাস জমে দানা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

অক্সিজেনের এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মিশে ক্রমে ধূমকেতু গঠন করে আর অক্সিজেন ধূমকেতুতে আটকা পড়ে থাকে। সূর্যের কাছে আসায় উত্তাপে জমাট অক্সিজেন ও অন্যান্য পদার্থ আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস ঘিরে। উপরের ভিডিও ইলাস্ট্রেশন থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে থাকবেন পাঠক।

 

Sciencedaily অবলম্বনে। 

মারিয়া আগনেসি: এক বিস্মৃত নারী গণিতবিদ

নারীদের জন্য গণিত নয় এ সেকেলে ধারণা ভেঙে যায় যখন মরিয়ম মির্জাখানি ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন। ৩০০ বছর আগেও এমন এক নারী গণিতবিদের জন্ম হয়েছিল, মারিয়া আগনেসি। আগনেসি ছিলেন প্রথম নারী যিনি কোনো গণিতের পাঠ্যবই রচনা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরও গণিতের পদে বহাল ছিলেন। এরপরও তার জীবন বিভ্রান্তিময় ছিল।

মেধাবী, ধনী এবং বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অবশেষে বেছে নিয়েছিলেন দারিদ্র্যতা ও দরিদ্রের প্রতি সেবার জীবন। তার জীবনের সবিষেশ ইতিবৃত্ত আজও গণিতের ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণীয়।

শৈশবকাল

আগনেসি ১৬ই মে ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার রেশম ব্যবসায়ী ধনাঢ্য পিতার ২১ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ৫ বছর বয়সের মাঝে তিনি শিখে ফেলেছিলেন ফ্রেঞ্চ, ১১ বছর বয়সের মধ্যে তিনি মিলানের সমাজে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন সপ্তভাষী কথক হিসেবে। তার বাবাও মেয়েকে সম্ভাব্য সেরা শিক্ষা দিতে তৎকালীন শীর্ষ পণ্ডিতদের নিয়োগ করেছিলেন। নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সে আমলে ছিল না বলে তার বাবা সুযোগকে ঘরে এনে দিয়েছিলেন আগনেসির জন্য।

যখন আগনেসির বয়স ছিল ৯, তিনি তার এক শিক্ষকের রচিত ল্যাটিন ভাষণ স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করেন। এই ভাষণে সমালোচনা করা হয় নারীদের বিজ্ঞান ও কলায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তৎকালে ভাবা হত ঘরদোর সামলানো মেয়েদের মূল কাজ আর এজন্য তাদের শিক্ষাগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। আগনেসি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট এবং প্রত্যয়ী বিতর্ক উপস্থাপন করেন যে, পুরুষদের জন্য সুলভ শিক্ষা নারীদের জন্যও উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

আগনেসি সময়ের পরিক্রমায় তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা প্রদর্শনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংসারত্যাগী হয়ে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। যখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে, তিনি ঘর দেখাশোনা ও তার অনুজ ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেন।

এই ভূমিকার কারণে, তিনি টের পান শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্তারিত মাত্রার গণিতের পাঠ্যবইয়ের দরকার যাতে ইতালিয়ান শিক্ষার্থীরা গণিতের নতুন আবিষ্কারের সাথে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই

আগনেসি গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন। তার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানে তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ভ্রমাত্মক হতে পারে এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। গণিতের সত্য সত্যিকারের চিরন্তন ও বিশুদ্ধ সত্য, এ ধরণের চিন্তন এক অনন্য আনন্দের উৎস। তিনি তার পাঠ্যবই রচনার সময়, শুধুমাত্র শিক্ষার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং চিন্তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

আগনেসির ২৯৬ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৪, ১৬ মে তারিখে গুগলের প্রকাশিত ডুডল।; image source: Google

১৭৪৮এ দুই খণ্ডে প্রকাশিত আগনেসির বইয়ের নাম ছিল “বিশ্লেষণের প্রাথমিক তত্ত্ব”। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এটি ল্যাটিনে লেখা হয় নি। সে কালে লেখক যে ভাষারই হোক রীতি ছিল ল্যাটিনে বই প্রকাশ করার। তিনি তার বই প্রকাশ করেন ইতালিয়ান ভাষায়, যেন শিক্ষার্থীদের কাছে আরো সহজে পৌঁছে যায়।

তার প্রথম দিকের এক পাঠ্যবই তিনি উপস্থাপন করেন গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসের উপর। তার এই বই গণিতের কয়েক প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করেছে। ইতালির বাইরে প্যারিস এবং ক্যামব্রিজেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাই অনুবাদ করে পাঠদান করা হত।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই ১৭৪৯ এ ফরাসি একাডেমি কর্তৃক প্রশংসিত হয়। সমকালীন গণিতবিদ ও ইতিহাসবেত্তা জাঁ ইতিয়েনে মন্টুক্লাও তার ব্যাপারে প্রশংশাবাক্য ঝরিয়েছেন। আগনেসি তার “মৌলিক নীতিসমূহ” বইটি উৎসর্গ করেন্ন অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেজাকে। মারিয়া থেরেজা এই সম্মান গ্রহণ করেন আগনেসিকে ধন্যবাদান্তের চিঠি ও হীরা উপহার পাঠিয়ে। তাকে পোপ বেনেডিক্ট ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনায় গণিতের চেয়ার গ্রহণে নিয়োগ দেন, যদিও আগনেসি কখনো সেখানে যান নি সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে।

সেবায় নিয়োজিত জীবন

নারী এবং গরীবের শিক্ষার জন্য আগনেসিকে বলা যায় একজন উদ্দমী উদ্যোক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং গণিত শিক্ষা কার্যক্রমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস জোরালো থাকায় তিনি মনে করতেন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক বিষয়ে পড়াশোনা স্রষ্টার সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

আগনেসির বাবা মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি তখন ধর্মের দিকে নিজেকে ব্যস্ত করেন, নিজেকে একান্তভাবে নিয়োজিত করেন গরিব, অসুস্থ ও গৃহহীনদের সেবায়। ঘরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছোট হাসপাতালের। ক্রমে তিনি বিলিয়ে দিতে থাকেন তার সম্পদ, এমনকি সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারও। তার জীবনযাপনের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায় তার কবরস্থান থেকে। ৮০ বছর বয়সে আগনেসি মৃত্যুবরণ করেন, তাকে কবর দেয়া হয় জনগণের টাকায় গড়া কবরস্থানে যেখানে কবর দেয়া হয় সে সকল ব্যক্তিদের যাদের কবরের জন্য আর্থিক সঙ্গতি থাকে না।

আজকের দিনে, আগনেসির গণিত থেকে ধর্মীয় কার্যকলাপে মোড় নেয়ার ঘটনা গণিতবিদদের অবাক করে। কিন্তু তার কাছে এটা সঙ্গত ছিল। তার দৃষ্টিতে, মানুষ একই সাথে জ্ঞানার্জনে ও ভালবাসায় সক্ষম। একদিকে যেমন বিভিন্ন সত্যের দিকে চমকিত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে, অন্যদিকে ভালবাসায় বদলে যাওয়ার গুরুত্ব্ও তার চেয়ে কম নয়।

আগনেসি বলেন, “মানুষ সর্বদা লক্ষ্য অর্জন করতে চায়; খ্রিস্টানদের লক্ষ্য স্রষ্টার গৌরব অর্জন করা। আমি আশা করি আমার কাজ স্রষ্টার গৌরব এনে দিয়েছে, যেহেতু সে কাজ অন্যদের উপকারে এসেছে। আমার কাজ অনুগত্য থেকে উদ্ভূত, কারণ এ-ই ছিল আমার বাবার ইচ্ছা। এখন আমি উত্তম পথ খুঁজে পেয়েছি যেন স্রষ্টার সেবায় ও অন্যদের উপকারে আসতে পারি।”

যদিও আগনেসি বর্তমানে তেমন স্মরণীয় হতে পারেননি, তিনি গণিতের বিকাশে রেখেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাসে তিনি এক অনুপ্রেরণার গল্প। গণিত ও বিজ্ঞানে নারীদের আলোকচ্ছটার পদানুসরণের দাগ রেখে গেছেন পরের প্রজন্মের জন্য।

 

দি কনভার্সেশন অবলম্বনে।

ফুলেরা কীভাবে জানে কখন ফুটতে হবে?

শীতপ্রধান দেশগুলোয় শুভ্র তুষারের খাঁজ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি – এ দৃশ্যটি একটি আনন্দের খবর ইঙ্গিত করে। বসন্ত আসছে শীঘ্রই। কী বুদ্ধি! ফুলের পাপড়ির উঁকি দেখে আমরা মানুষেরা বলে দিবো বসন্ত আসছে। কিন্তু উদ্ভিদকে কে বলে দিল যে এখন ফুল ফোটার সময় হয়েছে? ড্যাফোডিল কেন বসন্ত এলেই ফুটতে যায়, গোলাপ কেন গ্রীষ্মের কাছে ধরা দেয়?

উদ্ভিদের এ ফুল ফোটানোর ছদ্মবেশী বৌদ্ধিক প্রবৃত্তির পেছনে আসলে কাজ করছে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া।

এপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এ জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেয়া থাকে, যেভাবেই বলা হোক আর কি।

প্রভুসুলভ এ একাকী জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকান্ড শুরু করার জন্য হুকুম করে বলা চলে। অনেকটা আমাদের ঘড়ি বা ফোনে এলার্ম দিয়ে রাখার মতো। সময় হলে যেমন ঘড়ি বা ফোন নিজে থেকে বেজে উঠে আমাদের জানিয়ে দেয়, তেমনি এপেটেলা১ জিনটি এলার্মের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি। আর এ এলার্মিং এর কাজটি এপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

উদ্ভিদের মাঝে আবার এপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপার আছে। এ জিন সক্রিয় থাকলে ফুল ফোটে, আর যে উদ্ভিদে নিষ্ক্রিয় সেটায় ফুল ফোটা বিরল প্রায়। ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কান্ড পত্রবহুল হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি এপেটেলা১ একটি প্রভুসুলভ একাকী জিন। এটি প্রোটিন তৈরি করে, যার ফলে সে প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে। এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্ল্যান্ট ডেভেলাপমেন্টাল জেনেটিক্স গবেষণাগারের গবেষকরা।

প্রায় এক দশক আগে এপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী গুরু নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা এপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পুষ্পায়পনের জন্য কল্পনা করেছিলেন কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী, যার ফলে ফুলের কুঁড়ির আবির্ভাব হয় গাছে। সে পদার্থটির নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (florigen)।

ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিক্সের ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, “আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোনো জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য যে, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।”

বিষয়টির চমক পাঠককে ধরিয়ে দিচ্ছি। ধরুন, একটি শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটি যন্ত্রপাতির জন্য একটি করে সুইচ আছে। আর সবগুলো সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে, লক্ষ লক্ষ! আর আপনি এর মধ্যে থাকা একটি সুইচ যেটা কিনা হয়ত শহরের সাইরেনের সুইচ সেটা চিনে গেলেন। মানে হচ্ছে একটি বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়ত কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন, বা সেটি আপনার ঘরের বাতির সুইচও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়ত আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ার কুলার ছেড়ে দিতেন!

এপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন এপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্যান্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হলো উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদেরকে একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো, যাতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায় এবং পাতার পরিবর্তে ফুলগঠনের দিকে ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছেঃ আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এ পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো এপেটেলা১ এর কাছে পৌছে যায়। আর এপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের উপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। তথ্যটি নেয়া হয়েছে নেচার ক্যালেন্ডারের উপাত্ত থেকে। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্ট এর সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH) এর অধীনে।

ব্রিটেনের নাগরিকদের দেয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, এ গবেষণার লাভটা কী? ফুলের ফোটার সময়ের কারণ জেনে আমরা কী করব?

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে এপেটেলা১ এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে আমরা আমরা জিন প্রকৌশলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রজননকারী এবং চাষীদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল, আরেক অর্থে বললে ফসলের উৎপাদন করতে। উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফল/ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে।

ওয়েলমার বলেন, “ফুল ফোটার উপর বিস্তারিত জ্ঞান প্রজননকারীদের নিপুণভাবে উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ ও বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য দক্ষ চাষাবাদের সুযোগ বাড়বে।”

– শাহরিয়ার কবির পাভেল

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ,শাবিপ্রবি

 

তথ্যসূত্র:

http://www.livescience.com/32529-how-do-flowers-know-when-to-bloom.html

http://www.livescience.com/377-mystery-solved-plants-flower.html

 

আমরা কত দূর জানতে পারি— বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধতার বাঁধা

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির রয়েছে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা আর প্রকৃতির গভীরতম রহস্যগুলোয়ে রয়েছে এক সহজাত অভেদ্যতা।

আমরা যা দেখি পর্যবেক্ষণ করি তাই প্রকৃতি নয় বরং প্রকৃতি আমাদের সামনে তাকে প্রকাশ করে আমরা কিভাবে তাকে দেখি। এ ভাবুক ভাবুক কঠিন কথা আমার নয়। জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এই ভাব নিয়েছেন। তিনিই কিন্তু প্রথম কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে অনিশ্চয়তার ব্যাপার বিধৃত রয়েছে বলে অনুমান করেন। যারা বিজ্ঞানকে একেবারে সত্যপথের যুধিষ্ঠির ভেবে থাকেন তাদের অবাক করতে পারে। হয়ত নাখোশও করে থাকবে কতক। হাইজেনবার্গ কি বলতে চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে আরোপিত হচ্ছে? যদি তাই বলেন এবং তাকে বিজ্ঞানের যুধিষ্ঠির পথিকদের একজন স্বীকার করা হয়ে থাকে তবে কিন্তু আমরা যাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলছি তাই এক বিরাট বিভ্রম তৈরি করে বসে। তাই না?

কেন বিমান ওড়ে, কেন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে, কেন আমরা এমন যন্ত্র বানাতে সক্ষম হই যা আশ্চর্যজনকভাবে তথ্য বিনিময়ে নিখুঁত কাজ করতে পারে?— মানুষ হয়ত বেঁকে বসবে এ ধরণের প্রশ্ন করে। নিশ্চিতভাবেই এমন আবিষ্কার আর অন্যান্য যা আছে (প্রাকৃতিক আইনকে কাজে লাগিয়ে তৈরি যেগুলো) সেসব আমাদের পর্যবেক্ষণ বা আচরণের অধীনেই কাজ করে। মহাবিশ্বে সুশৃঙ্খলা রয়েছে, বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে তা আবিষ্কার করছে।

মহাবিশ্বে যে শৃঙ্খলা রয়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানের অধিকাংশ কাজই হল বিভিন্ন আচরণের প্যাটার্ন খুঁজে বের করা। কোয়ার্ক থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী, গ্যালাক্সি, পরমাণু, জিনতত্ত্ব সবকিছুর জন্য আমরা চেষ্টা করি একটা সাধারণ নিয়ম বের করে আনতে। ক্ষেত্র বিশেষে এজন্য আমরা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বর্জন করি যেন প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারি।

এরপর আমরা কোনো পদ্ধতি, ঘটনার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা রচনা করে থাকি। কোন কোন ক্ষেত্রে এটা পর্যবেক্ষণভিত্তিক আর সবচেয়ে সেরা ক্ষেত্রে পূর্বানুমান ঠিক ঠিক মিলে যায়। আগেই জানি আমরা কী হবে, পরে কেবল নিশ্চায়ন। যেমন, ১৯১৯ এ সূর্যগ্রহণ দেখার সময় স্থান কালের বক্রতার সত্যতা নিশ্চায়ন।

কখনো কখনো আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ করছি তার ব্যাপারে অন্যান্যদের মিথষ্ক্রিয়া প্রয়োজন পড়ে, গবেষণার অত্যুৎসাহও এর একটা দিক। আমরা কোনো ঘটনার আচরণ পর্যবেক্ষণ করি এবং গাণিতিক বা কাল্পনিক মডেল দাঁড় করাই ভালভাবে বোঝার জন্য, আর এসব করতে আমাদের কিছু যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন হয়। এটা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতাকে কমিয়ে আনে। যেমন খুব সূক্ষ্ম বস্তু দেখা, খুব দ্রুত গতি মাপা, বহুদূরের কোনকিছুর দূরত্ব মাপা, আবার যা বাস্তবে ধরা ছোঁয়া সম্ভব নয় এমন এমন ক্ষেত্রে (উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মস্তিষ্কে কী আছে বা পৃথিবীর কেন্দ্রটাই বা কেমন!)।

আমরা শাদা চোখে যা দেখি প্রকৃতি কেবল তাই নয়, বরং এ ধরণের যন্ত্রপাতি এবং দক্ষতা থেকে যেসকল তথ্য বা জ্ঞান অর্জন করি তাও প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণার অংশ। অনুরূপভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ নির্ভর করে আমরা কী পরিমাণ ও কী কী তথ্য যন্ত্র ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। যেহেতু যন্ত্র এবং দক্ষতার একটা সীমারেখা আছে তাই বিশ্ব সম্পর্কেও আমাদের অভিজ্ঞতা হবে স্বল্পদৃষ্টির। আমরা কেবল প্রকৃতির ততটা অর্জন করতে পারি যতটা বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বিশ্বদেখার ক্ষমতা কাজ করে।

বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে আমরা যদি কিছু উদ্ভাবনের আগে ও পরে ঐ বিষয়ের পার্থক্যটায় খেয়াল করি। যেমন মাইক্রোস্কোপ উদ্ভাবন বা জিন সিক্যুয়েন্সিং অথবা টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে ও পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা কোলাইডার উদ্ভাবনের আগে পরে কণা পদার্থবিজ্ঞান। এক একটা যন্ত্র যে নতুন যুগের সূচনা করেছিল ছিল তা ছিল প্রভূত বিপ্লব। ১৭শ শতকের তত্ত্বসমগ্রের কারণে বিশ্বের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি যেমন ছিল যন্ত্রদক্ষতার পর আজ তার বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটেছে। এই ঐতিহ্যটি বিজ্ঞানের একটি ট্রেডমার্ক বলা যায়।

কখনো কখনো লোকজন বিজ্ঞানের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিবৃতিকে “পরাজিতদের মত” হিসেবে আখ্যা দেয়। আমরা যদি কোনো কিছু জানার শেষ না করতে পারি তো সমস্যা কী— এ ধরণের বিবৃতি দিয়ে ভুল বোঝা হয়। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আবিষ্কারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্য আসলে পরাজিত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতির গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা নির্মাণে বিজ্ঞান আমাদের সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি হিসেবে থাকবে। পরিবর্তন হবে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা-প্রয়াসের— বিজ্ঞান পৌঁছাতে না পারলে তার বাইরে কিছু নেই এই বিশ্বাসের।

স্পষ্টতই বিজ্ঞানে জানা অসম্ভব এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রসঙ্গত প্রশ্ন থাকতে পারে, যদি বর্তমানে আমাদের মেনে নেয়া প্রাকৃতিক আইনসমূহ ভুল হয়, তবে আমরা উত্তরও বের করতে পারব না। একটি উদাহরণ হতে পারে মাল্টিভার্স: মাল্টিভার্সের কনজেকচার (অনুমান) আমাদের বলে আমাদের মহাবিশ্ব এমন বহু মহাবিশ্বের একটি যাদের প্রত্যেকটির থাকতে পারে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক আইন। অন্যান্য মহাবিশ্ব আমাদের দৃষ্টির বাইরে, (বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির বাইরে অবশ্যই) যার ফলে আমরা কখনো সেখান থেকে কোন সংকেত পাব না, পাঠাতেও পারব না। এ ধরণের সংকেতের অবশ্য প্রামাণ্য নজির চাই।

বিজ্ঞানের অজ্ঞাত এমন অন্যান্য উদাহরণ মিশে আছে সৃষ্টি সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নে। মহাবিশ্ব, জীবন এবং চেতনা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ সৃষ্টিকালীন প্রক্রিয়া আমরা আমাদের জানা জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না। বিগ ব্যাং সংঘটনের সময় আমাদের ধারণাসঙ্গত তত্ত্ব কাজ করার কোন উপায় আমরা পাই না। উদাহরণস্বরূপ: শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কথা বলা যায় এ প্রসঙ্গে। আমাদের বিশ্ব বর্ণনায় মহাবিশ্ব কেন এই নিয়মগুলোরই অধীন, অন্য নিয়মের অধীন কেন নয় সেও তো বিজ্ঞানের প্রতি একটা আপত্তি জানানো।

অনুরূপভাবে, আমরা যতক্ষণ না জড় থেকে জীবনের উদ্ভবের সুনির্দিষ্ট কোনো একক জৈবরাসায়নিক পথ বাতলাতে না পারি, নিশ্চিতভাবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের রহস্যও সমাধান পারছি না। চেতনা বা চিন্তার ক্ষেত্রে সমস্যা হল বস্তু থেকে বিষয়ে ঝাঁপ দিয়ে ফেলা— উদাহরণস্বরূপ ব্যথা পেলে অথবা লাল রঙ দেখে স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সম্ভবত এক ধরণের অপরিণত বা প্রাথমিক উপলব্ধির উত্থান ঘটে যথেষ্ঠ জটিল যন্ত্রে বা ব্যক্তিতে (যন্ত্র বলতে প্রাণীদেহের কথাই বলা হচ্ছে, উপলব্ধি উত্থানের আগের দশাকে যন্ত্র দশা মনে করে)। কিন্তু এটা আমরা কিভাবে প্রমাণ করতে পারি যে চেতনা বলে কিছু রয়েছে? প্রমাণ করতে গেলেও কি চেতনাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে?

স্ববিরোধী মনে হলেও সত্য যে, আমরা আমাদের চেতনার মাধ্যমেই এই বিশ্বকে অনুভব করি, সেটা অসম্পূর্ণভাবেই হোক কি ত্রুটিপূর্ণই হোক। আমরা কি নিশ্চিতভাবে এমন কোন কিছুর পরিপূর্ণ অর্থোদ্ধার করতে পারি– যার কিনা আবার আমরা নিজেরাই অংশ?

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সাপের মত কি আমরা আটকে আছি কোনো সীমাবদ্ধতার বৃত্তে? ;image source: publishingperspectives.com

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সেই সাপের মত আমরা আটকে আছি বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জীবন অভিজ্ঞতার বৃত্তে। আমরা এমনকি ‘আমাদের উপলব্ধ বাস্তবতা’ থেকেও ‘আমাদের বর্ণিত বাস্তবতা’কে আলাদা করতে পারি না। আমরা আছি এমন এক ক্রীড়াক্ষেত্রে যেখানে বিজ্ঞানের খেল বহুমাত্রিকতায় উৎসারিত হচ্ছে। আর আমরা যদি যা দেখতে পাচ্ছি সে নিয়ম (দেখতে পাওয়া ছাড়া যদি সব নিয়মের বাইরে ধরে নেই) অনুযায়ীই কেবল খেলি তবে তো আমরা স্পষ্টতই এড়িয়ে যাব দৃষ্টির বাইরের জগতকে। দেখতে পাব না বলে তো আর দৃষ্টির বাইরের জগত নাই হয়ে যায় না।

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? [১] থাকে না।

 

মূল: মার্সেলো গ্লেইসার, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা, ডার্টমাউথ কলেজ, হ্যানোভার, যুক্তরাষ্ট্র।

[১] পঙক্তিটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতা থেকে নেয়া।

ডার্ক ম্যাটার নিজের সাথে নিজেই মিথষ্ক্রিয়া করে না

ডার্ক ম্যাটার এখনো পদার্থবিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত কণা। নতুন এক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার আবেল ৩৮২৭ এ থাকা ডার্ক ম্যাটার স্পষ্টভাবে সব ধরণের পদার্থকে এড়িয়ে যায়— এমনকি নিজেকেও। ইংল্যান্ডের লিভারপুলে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ বিজ্ঞান সপ্তাহে ৬ এপ্রিলে এ সংক্রান্ত তথ্য জ্যোতির্বিদরা প্রকাশ করেন।

গবেষণাপত্রটি অনলাইনে arXiv.org এ প্রকাশিতও হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল আবেল ৩৮২৭ এর ডার্ক ম্যাটার ঐ গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের নক্ষত্রগুলো থেকে আলাদা। ক্লাস্টার বদলে দল বোঝায়, এই গ্যালাক্সির দলটি চারটি সংঘর্ষপ্রবণ গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত। পৃথিবী থেকে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ সময়ে মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ রিচার্ড ম্যাসে এবং তার সহকর্মীরা বলেন এ ক্লাস্টারের ডার্ক ম্যাটার হয়ত গ্যালাক্সিগুলোর পেছনে পড়ে গেছে অন্য এক ঝোপ ডার্ক ম্যাটারের সাথে মিথষ্ক্রিয়ায়। কিন্তু বর্তমান তত্ত্বগুলোর কাছেও এ প্রস্তাবনা টেকে না। ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের ভরের অধিকাংশ গঠিত ডার্ক ম্যাটার দিয়ে। সাধারণ (মামুলি অর্থে) পদার্থের সাথে ডার্ক ম্যাটারের একমাত্র মিথষ্ক্রিয়া হল মহাকর্ষ। কেবলমাত্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণের মাধ্যমেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি বোঝা যেতে পারে।

ডার্ক ম্যাটার কী তার চেয়ে বরং আমরা জানি ডার্ক ম্যাটার কী নয়! ডার্ক ম্যাটার কিন্তু প্রতিপদার্থের সাথেও কোনো মিথষ্ক্রিয়া করে না। এমনকি ডার্ক ম্যাটার কৃষ্ণগহ্বরও না। ডার্ক ম্যাটার নামকরণের ডার্ক শব্দটি বোঝায় এটা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা। আমরা এর কিছুই জানি না কিভাবে এটা কী করে! কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবে জানি যে এর অস্তিত্ব আছে। আমরা যে পরিমাণ ভর গ্যালাক্সিগুলোয় দেখি আসলে সে ভর দিয়ে হিসেব করলে মহাকর্ষ প্রভাবের হিসেব মিলে না। মহাকর্ষ দৃশ্যমান ভরের হিসেবের চেয়ে বেশি। সেখান থেকেই আসে আরো কিছু আছে। তাই ডার্ক ম্যাটারকেই কারণ হিসেবে ধরা হয় গ্যালাক্সির অস্তিত্বের কারণ হিসেবে।

দৃশ্যমান ভর আসলে আমাদের মহাবিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ। বাকি ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ৭৩ শতাংশ ডার্ক এনার্জি।

কিন্তু সম্প্রতি চিলিতে অবস্থিত আতাকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারে দিয়ে করা পর্যবেক্ষণে ডার্ক ম্যাটারের অস্বাভাবিক কোনো আচরণ খেয়াল করা যায় নি। যেমনটা আচরণ করার কথা তেমনই ছিল। উল্লেখ্য এই পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি একটি রেডিও টেলিস্কোপ। রেডিও টেলিস্কোপ কাজ করে ভারী নক্ষত্র চিহ্নিত করতে। যেসব নক্ষত্র সাধারণ আলোতে দেখা যায় না, রেডিও টেলিস্কোপে ধরা পড়ার সুযোগ রয়েছে।

আতাকামায় অবস্থিত রেডিও টেলিস্কোপ; image source: European Southern Observatory

তবে রেডিও টেলিস্কোপও কিন্তু ডার্ক ম্যাটারকে ধরতে পারে না। কারণ ডার্ক ম্যাটার আসলে কোনো কিছুর সাথে সংঘর্ষ করে না। বায়ুশূন্য স্থানে অভিকর্ষের প্রভাবে যেমন কোনো কিছুই নিচে পড়তে কোনো বাধা পায় না তেমনি অনেকটা। ডার্ক ম্যাটার কোনো বিকিরণ শোষণও করে না আবার ত্যাগও করে না। অর্থাৎ রেডিও টেলিস্কোপ সরাসরি এদের ধরতে পারবে না। ডার্ক ম্যাটার ধরা পড়ার একমাত্র উপায় মহাকর্ষের প্রভাব। রেডিও টেলিস্কোপ আবার ভারী নক্ষত্র যেমন কোয়াসার, নিউট্রন তারা এদের চিহ্নিত করতে পারে। অতএব এদের সাথে মহাকর্ষের হিসেব করে ইঙ্গিত পাওয়ার উপায় রয়েছে।

ইংল্যান্ডের ডারহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ম্যাসে বলেন তারা দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ডার্ক ম্যাটার যথাযথ অবস্থানেই আছে বলে মনে করেন।

তবে এটি এখনো সম্ভব যে অন্যান্য গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারও আমাদের সংজ্ঞার পর্যবেক্ষণের বাইরে। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণেরও প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গবেষক ম্যাসের দল একটি বেলুন টেলিস্কোপের ডিজাইন করেছেন। অর্থাৎ বেলুনে করে টেলিস্কোপ উপর আকাশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ করবে মহাকাশ। এর নাম দিয়েছেন সুপারবিট (SuperBIT).

বিট উড্ডয়নের মুহূর্ত; image source: sites.physics.utoronto.ca

সুপারবিটের উদ্দেশ্য এ ধরণের শত শত গ্যালাক্সিগুলো ধরে ধরে পর্যায়ক্রমে যাচাই করা কোনগুলোয় এমন অজানা আচরণ করছে ডার্ক ম্যাটার। BIT বলতে বোঝায় Ballon-borne Imaging Telescope. অর্থাৎ, বেলুনে করে যে টেলিস্কোপ ছবি তোলে।

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে তোলা বেলুন টেলিস্কোপের সূর্যদয়ের ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

এ বেলুন টেলিস্কোপ কাজ করবে স্ট্রাটোস্ফিয়ারে। বেলুন টেলিস্কোপের বড় সুবিধা এটা ট্রপোমণ্ডলের ঘন বায়ুর বাধা কাটিয়ে উপর থেকে স্বচ্ছ ছবি পাঠাতে পারবে। স্বচ্ছতম ছবির জন্যই কিন্তু আমরা মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠাই, কিন্তু সে যজ্ঞের খরচও তো মাথায় রাখতে হবে। এদিক থেকে বেলুন টেলিস্কোপ একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান খরচের সাথে তুলনায়। এরা ভূমি থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে গিয়ে কাজ করতে পারে।

সুপারবিটের তোলা ঈগল নীহারিকার ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

আমরা ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে খুবই কম জানি— এটাই সবচেয়ে বড় সংকট। সেহেতু ধাপে ধাপে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে সামনে এগিয়ে যাবার কারণ, এর মাধ্যমে আসলে আমরা আসলে আমাদের  মহাবিশ্বের অতীতের দিকেও অগ্রসর হচ্ছি— কিভাবে শুরু হয়েছিল সবকিছুর।

 

সায়েন্স নিউজ অবলম্বনে।

রাত জাগা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি ১০ শতাংশ

যারা রাত জাগতে পছন্দ করেন আর সকাল হলে নিজেকে টেনেও বিছানা থেকে নামানো যায় না তাদের জন্য দুঃসংবাদ। রাতজাগা পাখিদের রয়েছে শীঘ্র মৃত্যুর ঝুঁকি, যাদের স্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিছানায় যাবার এবং সকাল সকাল জেগে ওঠার অভ্যাস রয়েছে তাদের তুলনায়। এ বিষয়ক গবেষণা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব সারে

এ গবেষণায় ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য নেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংক থেকে। সাড়ে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণের অধীন ছিল আর ফল হচ্ছে পেঁচার অনুসারীরা সকালের চড়ুইদের তুলনায় ১০ শতাংশ অধিক মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকে। গবেষণা নমুনায় এমন ৫০,০০০ লোক ছিল যারা মৃত্যুঝুঁকি, অন্যান্য রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছিল।

চোখের আলোয় রাতের অন্ধকার, রাত বাড়ে ঘুম কেড়ে; image source: Huffington Post

রাত জাগানিয়া ব্যক্তিরা যখন ভোর থেকে কাজ শুরু করা ব্যক্তির মত কাজ শুরু করেন তাদের ক্ষেত্রেও দৈহিক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানান এই গবেষণার সহদলনেতা ক্রিস্টেন নুটসন। তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক।

এই বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিপাকীয় ক্রিয়ার ত্রুটি এবং হৃদযন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যার হার বৃদ্ধির উপর। বলা যায়, প্রথমবারের মত ক্রিস্টেনের গবেষণাই ঘুমের অভ্যাসের ভিত্তিতে মৃত্যুহার নিয়ে কাজ করছে। এটি প্রকাশিত হয়েছে ক্রোনোবায়োলজি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে।

বিজ্ঞানীরা রাত জাগানিয়াদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। এরপরও মৃত্যু ঝুঁকির হার তাদের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত ছিল।

প্রশ্ন জনস্বাস্থ্যের বলে এটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে মন্তব্য  করেন ইউনিভার্সিটি অব সারে এর ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক ম্যালকম ভন শান্টজ। ঘুমের সাথে দেহঘড়ির ব্যাপার সম্পৃক্ত। যারা রাতে কাজ করেন তাদের জন্য তারা কিভাবে দিনের আলোর সাথে দেহঘড়ির মিল ঘটিয়ে কাজ করতে পারেন এ ব্যাপারে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব অন্তত রাতের কাজ পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে। ক্ষুদ্র সময় ও ব্যক্তির বিচারে হয়ত এটা আমাদের কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না, কিন্তু বড় স্কেলে তা জনজীবনের লাইফস্টাইল ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর।

নুটসনের মতে, হতে পারে যারা রাত জেগে থাকেন তাদের একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি রয়েছে যা তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মিলে না। মানসিক চাপ, ভুল সময়ে খাদ্য গ্রহণ, যথেষ্ঠ শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের অভাব, ঘুমের অভাব, একা রাত জাগা ইত্যাদি কারণে দেহঘড়ির গোলমাল লেগে থাকতে পারে। একা রাত জাগার ক্ষেত্রে মাদক, এলকোহল, এমনকি অধুনা ডিজিটাল আসক্তিও দায়ী। রাতের অন্ধকারকে সময় দেয়ার সাথে স্বাস্থ্য পরিপন্থী বহু আচরণ সম্পর্কিত।

আরো ভয়ংকর ব্যাপার হল রাত জাগাদের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুতর অসুস্থতার হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে: ডায়াবেটিস, মানসিক বৈকল্য এবং স্নায়বিক বৈকল্য।

রাত জাগুনিয়ারা কি ভোরের পাখি হতে পারে?

জিনতত্ত্ব এবং পরিবেশ সমান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আমরা কি রাতের না ভোরের পাখি হব। কী ধরনের হবে কোন ব্যক্তি এ ব্যাপারে উক্ত দুই বিষয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন লেখক প্রতিবেদন প্রকাশও করেছেন।

রাতের ঘুমের সাথে সমস্যার দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নয়। কিছু কিছুর উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সব নয়। ঘুমের অভ্যাসের সময়সূচি পরিবর্তনের একটি ভাল উপায় আলোতে সাড়া দেয়া। আলো বলতে অবশ্য দিনের আলোর কথাই বলা হচ্ছে। সকালে আলো ফোটার সাথে বিছানা ছেড়ে দেয়া এবং রাতের অন্ধকার গভীর হলে বিছানার সাথে নীরব হয়ে যাওয়ার শুরু করা যেতে পারে। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়মিত সময় মেনে ঘুম চর্চা করা। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা এবং পরবর্তী দিন যেন সময়টা পিছিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা।

নিয়মিত সময়ে ঘুম না হলে দিনের সময়সূচি খাপ খাবে না; image source: Phd Comics

নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে অভিযোজিত হতে হবে। আপনার কখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত এ ব্যাপারে নিজের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে, বদঅভ্যাসের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না।

সমাজও যেভাবে সহায়ক হতে পারে

আমরা যদি দেহঘড়ির ঘুমের এ ধরণের সময়সূচির ব্যাপার ধরতে পারি, অংশত, যাদের ক্ষেত্রে জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং অভ্যাসের বশে এমন হচ্ছে না তবে তাদের জন্য কাজকর্ম, চাকরির সময়সূচি নমনীয়তা হয়ত উপকারে আসবে। তাদের হয়ত সকাল ৮টার আগেই ঘুম ভাঙার জন্য চিন্তায় থাকতে হবে না। কাজের সময়বণ্টনের মাধ্যমে তাদের সে সুযোগ দেয়া যায়। কিছু মানুষ রাতেই কাজের সাথে বেশি মানিয়ে নিতে পারে।

ভবিষ্যত গবেষণায়, নুটসন এবং তার সহকর্মীরা রাত জাগুনিয়াদের নিয়ে একটি পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। তাদের দেহঘড়ি একটু এগিয়ে আসলে কেমন আচরণ করে তাই যাচাইয়ের লক্ষ্য। মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি— দৈহিক ও মানসিক উন্নতি, রক্তচাপ ইত্যাদির উপর বিশেষ নজর থাকবে।

দিনের আলো সংরক্ষণ কর্মসূচির একটি উপজাত সংকট; image source: someecards.com

দিনের আলোর ব্যবহার বাড়াতে শীতপ্রধান দেশগুলোতে যখন ডে-লাইট সেভিং কর্মসূচি চালু হয় অথবা যখন গ্রীষ্ম চলে দেখা গেছে তখন সাধারণভাবেই এ ধরনের লোকেদের অধিক সমস্যা হয়।

গ্রীষ্মকালীন সময়সূচির সময় ইতোমধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়ার প্রতিবেদন রয়েছে বলে জানান ভন শান্টজ। আমাদের আরো স্মরণে রাখা দরকার যে প্রতিবছর এই পরিবর্তন ছোট ঝুঁকি হলেও প্রভাবিত করছে ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে। তিনি মনে করেন এ ব্যাপারটি গুরুতরভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে যে এই সময়সূচির লাভ উক্ত ঝুঁকির চেয়েও বেশি কিনা।

যেভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে

এ গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব সারে এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একেক জন ব্যক্তির সকালের এবং রাতের কাজকর্মের ঝোঁকের সূত্র খুঁজেছেন। এর সাথে হিসেব করেছেন তাদের সম্যক অবস্থার সাথে মৃত্যুঝুঁকির হার। তারা যে ৪,৩৩,২৬৮ জন ব্যক্তির তথ্য নিয়েছেন তাদের সকলের বয়স ছিল ৩৮ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে এটা ভাগ করতে যে তারা ভোরের পাখি নাকি প্রায় রাতের পাখি নাকি ঘোরতর হুতুম পেঁচার দলে। নমুনা ব্যক্তিদের মৃত্যুর তথ্য সাড়ে ছয় বছর ধরে নেয়া হয়েছে।

গবেষণাটির সহায়তায় ছিল ইউনিভার্সিটি অব সারে ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড স্টাডিজ স্যান্টান্ডার ফেলোশিপ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিজ এন্ড ডাইজেস্টিভ এন্ড কিডনী ডিজিজ গ্র্যান্ট R01DK095207.

 

সায়েন্স ডেইলি অবলম্বনে।

প্লুটোর রয়েছে বালিয়াড়ি— তবে বালির নয়

প্লুটো প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত এক ভুতুড়ে উপত্যকাময় জগত। প্লুটোর পাহাড়গুলো দেখলে পৃথিবীর কথা ভেবে ভ্রমও হতে পারে।

নাসার নিউ হরাইজন মিশন, যেটি কিনা ২০১৫ এর জুলাইতে এই বামন গ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন বহু উচ্চমানের ছবি পাঠায়। উল্লেখ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রই হল ছবি। সে ছবিগুলোতে দেখা গিয়েছিল প্লুটো যেন পর্বতময়, তবে কিন্তু পাথরের পর্বতের পরিবর্তে বরফ-পর্বত। রয়েছে জমাট নাইট্রোজেনের বিস্তীর্ণ সমভূমি এবং নীল রঙের আকাশ যার অধীন ধোঁয়াশাময় বায়ুমণ্ডল। প্লুটোর বায়ুমণ্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় অক্সিজেনও রয়েছে। প্লুটোর আকাশ নীল হওয়ার কারণ, নাইট্রোজেন, মিথেন এবং অ্যাসিটিলিনের উপস্থিতি।

বালিয়াড়ি বা ঢিবি হচ্ছে সমতল অপেক্ষা উঁচু এমন জায়গা যা বায়ুপ্রবাহে ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে। প্লুটোর ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে তেমন তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে প্লুটো ঢিবিময়। কিন্তু এ ঢিবিগুলোর পারিপার্শ্বিক বায়ুপ্রবাহ বরফের। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লুটোর আবহাওয়া এবং ভূমিপৃষ্ঠ এমনভাবে আচরণ করে যেন ভূতাত্ত্বিক হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হবে যেন ভূপৃষ্ঠটাই বদলে গেছে।

যেখানে পর্বত মিশেছে সমভূমির সাথে

ইংল্যান্ডে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব প্লেমাউথের ভৌত ভূগোলবিদ্যার অধ্যাপক ম্যাট টেফলার এবং তার সহকর্মীরা নিউ হরাইজনের তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তারা প্লুটোর স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অববাহিকায় মিশ্র ঢাল লক্ষ্য করেন। ঢালটি প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া হচ্ছে প্লুটোর বরফাচ্ছাদিত এলাকা। এই ঢাল গঠিত নাইট্রোজেনের বরফে যা কিনা প্লুটো বিখ্যাত “হৃদপিণ্ড” (Heart shape region) এলাকার বাম দিকে অবস্থিত।

স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অঞ্চল প্লুটোর যেখানে; image source: NASA.

এই ঢেউ খেলানো ঢিবিগুলো স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ার পশ্চিম তীর দিয়ে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার প্রশস্ত, যেখানে সমভূমি থেকে আল-ইদ্রিসি মন্টেস পর্বতের উচ্চতা পরিসর ৫ কিলোমিটার। নতুনভাবে শনাক্ত করা ঢিবিগুলোর বৈশিষ্ট্য  দেখে মনে হচ্ছে এগুলো বায়ুপ্রবাহের কারণে ঢিবির আকার পেয়েছে।

এই বালিয়াড়ি বা ঢিবিগুলো পৃথিবীরগুলোর চেয়ে বেশ সরল বরং। কারণ বরফের তৈরি হলেও পৃথিবীতে যেমন জমাট বরফের স্রোত তৈরি (Glacial Movement) খুব নিয়মিত এখানে তেমনটা নয়।  অবস্থান, বিন্যস্ততা, দিকমুখিতা এবং এলাকা ভিত্তিক পরিবর্তন আর ফাঁকা স্থান সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে এরা বহুকাল ধরে এই এলাকাতেই থিতু রয়েছে।

পর্বতের ঢাল থেকে মিথেন এবং নাইট্রোজেন গ্যাসের উর্ধ্বপাতনের ফলে খাদ তৈরি হতে পারে সূর্যকিরণের প্রভাবে। যথেষ্ঠ পরিমাণ বরফ জাতীয় পদার্থ যদি তাপের কারণে কঠিন দশা থেকে গ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তাহলে সে ধরণের খাদ তৈরি হতে পারে। নিউ হরাইজনের ছবিসমূহে প্রতীয়মান হয় এমন সহস্র অবনমন রয়েছে স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায়। আর লাইন ধরে ধারাবাহিক খাদগুলো ঢিবি বৈশিষ্ট্যের জন্য সবচেয়ে শক্ত ব্যাখ্যা দেয়।

গবেষকরা ঢিবির জন্য উর্ধ্বপাতনকে ধরছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে। কম্পিউটারে অনুরূপ মডেল তৈরি করে সিমুলেশন করে দেখা গেছে প্লুটোর এই দুর্বল বায়ুপ্রবাহও বালিয়াড়ি বা ঢিবি তৈরি জন্য যথেষ্ঠ। প্লুটোর বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মত এত পুরু নয়। এ কারণে এর বায়ুচাপ খুবই কম। আবার প্লুটোর অভিকর্ষও কম, পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ।সূর্যের অধিক দূরত্বে থাকার প্রভাব। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের চল্লিশগুণ দূরে অবস্থিত এই বামন গ্রহ। অতএব, পৃথিবীর তুলনায় প্লুটোতে সূর্যের তাপ হবে ১৬০০ গুণ কম! এরই সাথে চাপ কম হওয়ায় এর পরিবেশ উর্ধ্বপাতনসুলভ। [উল্লেখ্য, প্লুটোর তাপমাত্রা -২২৫° সেলসিয়াস থেকে -২৪০° সেলসিয়াস]

যে বায়ুপ্রবাহ বয়ে যায় সেটি মূলত জমাট মিথেনের দানা। সাথে নাইট্রোজেনের উপস্থিতি থাকাও স্বাভাবিক। মিথেনের জমাট দানা উর্ধ্বপাতিত হয়েছে নিকটবর্তী পর্বত এলাকা থেকে।

আমরা চাঁদের গায়ে অনেক গর্ত দেখে থাকি যেগুলো মহাকাশ থেকে পড়া উল্কাপিণ্ডের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায় তেমন গর্ত দেখা যায় না। চাঁদের ভূমির সাথে বায়ুমণ্ডলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে প্লুটোর ঐখানে গর্ত না থাকা ভূপৃষ্ঠে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আর ঢিবিগুলো সেখানে বিগত পাঁচ লক্ষ বছরে গঠিত হয়েছে বলে গবেষক দল জানিয়েছে।

প্লুটোর বালিয়াড়ি বা ঢিবি কেন চমকে দিল বিজ্ঞানীদের

বালিয়াড়ি বা ঢিবি গঠিত হবার প্রক্রিয়া সৌরজগতজুড়ে একই। এধরনের প্রক্রিয়ায় পৃথিবী, মঙ্গল, শুক্র, শনির বিশাল চাঁদ টাইটানে ঢিবির গঠন পাওয়া গিয়েছে। গ্রহ-উপগ্রহ ছাড়াও চুরিওমোভ গেরাসিমেঙ্কো ধূমকেতুতেও ঢিবির দেখা পাওয়া গিয়েছে। সেটা ধরা পড়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পরিচালিত ইউরোপের রোজেটা মিশন থেকে।

কিন্তু প্লুটোর ক্ষেত্রে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল দুর্বল অভিকর্ষক্ষেত্র, পাতলা বায়ুমণ্ডলের কারণে। এ দুইয়ে মিলে প্লুটোর বায়ুচাপ দাঁড়ায় মাত্র ১ প্যাসকেল, অর্থাৎ প্লুটোয় প্রতি বর্গমিটারে বায়ু মাত্র ১ নিউটন চাপ দেয়। আর পৃথিবীর তুলনায় সেটা ১ লক্ষ গুণ কম। এ গবেষণার সাথে যুক্ত নন এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলেকজান্ডার হায়েস মনে করেন এই বিশ্লেষণ আমাদের দৃষ্টিকোণকে আরো গভীর করে তুলবে। কারণ, এই নিয়ামকগুলো দিয়ে আমরা ধরে নিয়েছিলাম সেখানে এ ধরনের পরিবেশ থাকা সম্ভব নয়। অথচ পরবর্তীতে একই নিয়ামকগুলো দিয়ে কারণ যাচাই করা গিয়েছে।

ছবির একেবারে নিচের দিকে অল্প যেটুকু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে সেখানে খেয়াল করলে কিছু আঁচড়ের মত মনে হবে। দূর থেকে ঢিবিগুলোকেই এমন দেখা যাচ্ছে; image source: NASA/Jet Propulsion Labratory.

টেফলার এই বিশ্লেষণের গণিতের কথা স্মরণ করেছেন। কারণ কম্পিউটার সিমুলেশন না করে এটা কল্পনা করা কঠিন ছিল যে এরা কিভাবে বায়ুপ্রবাহের প্রভাব তৈরি করতে পারে। তবে হায়েস মনে করেন এ নতুন গবেষণা প্লুটোর ঢিবির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

তার মতে, প্রকৃতি চায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরলতর গঠন এবং নকশায় রূপ নিতে। অনুরূপভাবে, এই গবেষণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ঠ পরিমাণ কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে, ঢিবিগুলোর উচ্চতা ঠিক কত, সেগুলো কখন সবচেয়ে সক্রিয় ছিল, তারা পরিবর্তন হয় কি না, হলে কী হারে ইত্যাদি বিষয় সূক্ষ্ম যাচাই প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে নিউ হরাইজন বেশ দূরে চলে গেছে। নিউ হরাইজনের পরবর্তী লক্ষ্যের নাম ২০১৪ এমইউ৬৯ যেটি প্লুটো থেকে ১ বিলিয়ন মাইল (১৬০ কোটি কিলোমিটার) দূরে।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.scientificamerican.com/article/pluto-has-dunes-but-theyre-not-made-of-sand/
  2. https://news.nationalgeographic.com/2018/05/pluto-dunes-methane-winds-new-horizons-space-science/
  3. http://science.sciencemag.org/content/360/6392/992.full

ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

পৃথিবীর ভূত্বকের নাইট্রোজেন রহস্য

পৃথিবীর বায়ুমন্ডল নাইট্রোজেনের সাগর, সে নাইট্রোজেনের সাগরে মিশে আছে যেন অক্সিজেনের শরবত। নাইট্রোজেনের পরিমাণের ব্যাপারে আপনার আন্দাজ ভূপাতিত হতে পারে যখন ভূত্বকে নাইট্রোজেনের রাজত্ব কতটুকু তা খুঁজতে যাবেন। ভূত্বকের প্রায় অর্ধেক (৪৬%) অক্সিজেন, আর দ্বিতীয় প্রাচুর্য সিলিকনের(২৮%)। ভূত্বকে প্রাচুর্যতার দিক থেকে নাইট্রোজেনের ক্রম হয়েছে ৩০টি মৌলের পরে ০.০০২% হারের উপস্থিতিতে

বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন ভূত্বকে পাওয়া নাইট্রোজেন এসেছে বায়ুমণ্ডল থেকেই। অণুজীবের মাধ্যমে অথবা বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু থেকে ভূমিতে সংবন্ধন ঘটেছে। কিন্তু নতুন গবেষণা উঁকি দিয়ে বলছে আরো নব্য কোনো প্রধান উৎস থাকতে পারে এই উপাদানটির। মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। ভূত্বকে থাকা নাইট্রোজেনের এক চতুর্থাংশ আসে ভূমন্ডলের পাথুরে স্তরে থেকে। এ বিষয়ক গবেষণাপত্র বেরিয়েছে সায়েন্স জার্নালে। পুরো গবেষণাপত্র পড়ুন এখানে

কিছু বিক্ষিপ্ত গবেষণা ছাড়া গবেষক সমাজ ভূগর্ভস্থ পাথরকে নাইট্রোজেনের উৎস হিসেবে দেখেনি বলে মত দেন এই গবেষণাপত্রের লেখক বেঞ্জামিন হোল্টন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের একজন বৈশ্বিক পরিবেশবিদ। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর নাইট্রোজেন চক্রের প্রক্রিয়ায়; এটি বিশ্বের জলবায়ু মডেলেও প্রভাব রাখতে পারে। যেহেতু নাইট্রোজেনের উৎস সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য এর দায় রয়েছে— সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বের করতে পারব কোথায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি দ্রুত হবে পূর্বানুমানের চেয়ে। আর উদ্ভিদের অধিক বৃদ্ধি তো সম্পূরকভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের রাস্তা দেখিয়ে দিবেই।

যেহেতু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, তাই কী পরিমাণ তাপ কার্বন ডাই অক্সাইডের ফাঁদে আটকা পড়ছে তার খতিয়ান রাখা ক্রমশ গুরুতর ব্যাপার হয়ে উঠছে। তাপ আটকে থাকার বৃদ্ধির সঠিক হিসেব এখনো অনিশ্চিত, তাই বলে এর প্রতিকার প্রচেষ্টায় বসে থাকা যায় না। নতুন তথ্য কাজে লাগিয়ে কার্বন দূষণ প্রশমন করা সম্ভব।

কী পরিমাণ নাইট্রোজেন ভূত্বকের গভীরে পলির মধ্যে রয়েছে এবং কতখানি আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হচ্ছে তার মধ্যকার ভারসাম্য নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো পরীক্ষা করেছে। ‘৭০ এর দশকের শুরুতে করা কিছু গবেষণা বলছে এ ধরণের পাললিক শিলায় নাইট্রোজেন থাকার কারণ হবে মৃত গাছপালা, শৈবাল এবং প্রাচীন সমুদ্রতলে জমা প্রাণীদেহ। বেশকিছু গবেষণাপত্র বলছে নাইট্রোজেন এসকল জীবদেহ মিশ্রণে তৈরি উৎস থেকে পরিস্রুত হয়ে মাটিতে এসকল জায়গায় পাওয়া যাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ ধরনের আবিষ্কারে নজর দেননি, আর পাললিক শিলা নিঃসৃত নাইট্রোজেনের পরিমাণ যথেষ্ঠ তাৎপরযপূর্ণ মনে করা হয়নি পূর্বে। ফলে আমরা নাইট্রোজেন চক্র যেভাবে ঘটে থাকে বলে বর্ণনা করি সে বর্ণনায় আমাদের ভুল করে গুরুত্ব না দেয়া ব্যাপার অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। পাললিক শিলার নাইট্রোজেন নিঃসরণ আমাদের বর্ণনা করা নাইট্রোজেন চক্রে বিবেচনাই করা হয়নি।

রেডউড বৃক্ষের বনভূমি বেড়ে ওঠে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটিতে যে কারণে এরা এত দীর্ঘ আর অতিকায় হয়ে উঠতে পারে; source: Bob Pool, Getty Images

হোল্টন এবং তার সহকর্মীরা ২০১১তে একটি গবেষণা করেছিলেন দুই ধরনের বনভূমির মাটি তুলনা করে— পাললিক শিলার উপর বেড়ে ওঠা বনভূমির মাটির সাথে আগ্নেয় শিলার উপর গড়ে ওঠা বনভূমির মাটি। দেখা যায় প্রথমটির মাটির ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের পরিমাণ দ্বিতীয়টির দেড়গুণ! ৫০ শতাংশ বেশি! গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় নেচার জার্নালে। আগ্নেয় শিলা সমৃদ্ধ স্তর আগ্নেয়গিরি সুলভ ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের ইঙ্গিত করে। আবার ঐ একই ধরনের বনভূমির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ দেহে পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ বেশি নাইট্রোজেন। যদিও স্বাভাবিকভাবে এমনটাই হওয়ার কথা যে বনের মাটিতে নাইট্রোজেন বেশি সে বনের উদ্ভিদও তো একটু বেশিই শোষণ করবে, তবুও এ গবেষণা খুব একটা সাড়া ফেলে নি বিশ্বব্যাপী।

তাদের নতুন গবেষণায়, তারা ক্যালিফোর্নিয়াকে ভূতাত্ত্বিক সিস্টেমের মডেল ধরে কাজ করেছে। কারণ, এই অঙ্গরাজ্যের ভূমন্ডল পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় সব ধরণের শিলা ধারণ করে। তারা ক্যালিফোর্নিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশের ১০০০টি স্থানের মাটির নাইট্রোজেনের মাত্রা পরিমাপ করে। এরপর একটি কম্পিউটার মডেল দাঁড় করায় কত দ্রুত পৃথিবীর ভূত্বক থেকে নাইট্রোজেন নিঃসৃত হচ্ছে।

এই নাইট্রোজেন নিঃসরণের প্রক্রিয়া চলতে চলতে অবশেষে নাইট্রেজেনের পরিণতি হয় সাগরে, যেখানে সাগরের তলদেশে পাথরে চাপা পড়ে জমতে থাকে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে এ পাথরসমূহের স্থানচ্যুতি হয় উপরের দিকে। পরিবর্তনের ফল হিসেবে ভেঙে যায় এবং নাইট্রোজেন নিঃসরণ করে। এই নাইট্রোজেনই উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের মাধ্যমে গৃহীত হয়। পরিবেশীয় প্রক্রিয়ায় এই জীবদেহ থেকে পুনরায় পাথরে ফিরে এসে তৈরি করে নাইট্রোজেন চক্র। এ নিঃসরণের ঘটনা সমুদ্রতলের পাথর থেকে ব্যতীত পর্বতময় এলাকায়ও ঘটতে পারে রাসায়নিক বিগলনের কারণে। যেমন, এসিড বৃষ্টি হলে পাথরে থাকা বিভিন্ন উপাদানের সাথে এসিডের বিক্রিয়া ঘটে থাকে। তখন বিক্রিয়ায় ক্ষয়ের কারণে পাথরের ভৌত পরিবর্তনও নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির একজন জীবভূরসায়নবিদ (biogeochemist) উইলিয়াম শ্লেশিঙ্গার,  যিনি কিনা হোল্টনের গবেষণার সাথে যুক্ত নন, তিনি ভূত্বকের পাথরসমূহের মধ্যে উপস্থিত নাইট্রোজেন পরিমাপ করেছিলেন। কিন্তু প্রসঙ্গত, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারেন নি। যতটা থাকার কথা আর পরিমাপে পাওয়া পরিমাণের মধ্যকার সম্পর্কের সমাধান মেলেনি তার কাছে। তাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার পরীক্ষিত নমুনা হয়ত অন্যান্য তথ্যের সাপেক্ষে আদর্শ ছিল না। হোল্টনের গবেষণার ব্যাপারে তিনি মনে করেন তার কাজ আরো বৈশ্বিক মডেলে করা প্রয়োজন। আবার এটি আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে বদলে দেয়ার ব্যাপারে শ্লেশিঙ্গার দ্বিমত পোষণ করেন।

তবে যাই হোক, নতুন কারণ সম্বলিত তথ্য আমাদের ঠিকই ব্যাখ্যা করে মাটিতে নাইট্রোজের পরিমাণের রহস্য। আমাদের পূর্বে জানা কারণ দিয়ে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন থাকার কথা ছিল তার চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বেশি। নিঃসন্দেহে এ আবিষ্কার সেই জানার ফোঁকড়কে হ্রাস করে। নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ বন যেগুলো কানাডা এবং রাশিয়ায় অবস্থিত পাললিক শিলার গঠনের উপর বিস্তৃত সেসব এলাকার জন্য বেশ ফলপ্রসু কাজ এটি।

হোল্টন ভূগর্ভস্থ খনন শিল্পবিপ্লব ও আধুনিকায়নের প্রভাবে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর ফলে নাইট্রোজেন নিঃসরণের পরিমাপ হোল্টনের দল বিবেচনায় আনে নি। বরং রক্ষণশীলভাবে পরিমাপ করার কথা মাথায় রেখে গবেষণা কাজটি করা হয়েছে। এ গবেষণায় পরিবেশ সংরক্ষণে আরেকটি সতর্কতা হয়ত যুক্ত হল।

 

— সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।