আইনস্টাইনের থিসিস বিড়ম্বনা

আলবার্ট আইনস্টাইনকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। প্রকৃতির বাস্তবতাকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের বাস্তবতা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়ে গেছেন তা সত্যি একজন সত্যিকার সৃজনশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

কম বেশি সকলেই জানে ছোটবেলায় আইনস্টাইন তেমন ছাত্র ছিলেন না। এমনও শোনা গেছে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বাদে অন্য সব বিষয়ে ফেল করতেন। তবে ছোটবেলা থেকে তার ভাবনার জগৎ ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতেন এবং যেকোনো সমস্যার পেছনে সময় দিতে পছন্দ করতেন।

এ অধ্যবসায়ের কারণে তিনি পরবর্তীতে সফল হয়েছেন। আপেক্ষিকতা, ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট, ভর শক্তি সমীকরণ (E = mc2) ইত্যাদি আবিষ্কারের কথা আমরা জানি। কিন্তু বিখ্যাত হবার আগে এই বিজ্ঞানীকেও কিন্তু পিএইচডি সম্পন্ন করে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। আমরা তার ছোটবেলার নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও তার পিএইচড নিয়ে তেমন বেশি আলোচনা হয়নি।

তার অন্যান্য আবিষ্কারের মতো পিএইচডি থিসিসটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মজার কথা হচ্ছে তার থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪। এখন যারা পিএইচডি করেন তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে এটা সত্যি যে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা কম হতেই পারে।

চিত্র: জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়- আইনস্টাইন যেখানে তার পিএইচডি করেছেন

আইনস্টাইনের পিএইচডি নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। কয়েকবার করে তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন হচ্ছিল। তার প্রথম থিসিস সুপারভাইজর ছিলেন বিজ্ঞানী হেনরি ফ্রেড্রিক ওয়েবার। ১৯০০ থেকে ১৯০১ এর মধ্যে বেশ কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন করেন। তাছাড়া আইনস্টাইনের কাছে ওয়েবারের লেকচার ভালো লাগেনি। তার লেকচারগুলো ছিল অনেক পুরনো ধাঁচের। এমনকি তার পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারে ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের কোনো উল্লেখ নাকি ছিল না।

প্রফেসরকে পছন্দ না হওয়ায় ১৯০১ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ক্লেইনের কাছে পিএইচডি করতে যান। সেখানেও প্রথম দিকে কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় গ্রহণ করা হয়নি। পরে আবার জমা দিলে তা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেখানেও একটু সমস্যা ছিল। থিসিসটি ছিল অনেক ছোট। আইনস্টাইনের বোনের মারফত জানতে পারা যায় যে ওইবার থিসিস বড় করার জন্য তাকে ফেরত দেয়া হলে সেখানে আইনস্টাইন শুধু একটি মাত্র বাক্য যোগ করেছিলেন এবং সেভাবেই আবারো জমা দিয়েছিলেন।

ক্লেইনার, আইনস্টাইনের থিসিস সুপারভাইজর

এবার ক্লেইনার এবং আরেকজন প্রফেসর সেটি মূল্যায়ন করেন এবং থিসিসটি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার থিসিসটি Annalen der Physik জার্নালে পাঠান। কিন্তু তারাও সেটা বাদ দিয়ে দেয়। তারা বলে যে তথ্য এবং উপাত্ত আইনস্টাইন ব্যবহার করেছে সেগুলো পুরনো হয়ে গেছে। আরও নতুন তথ্য দিতে হবে।

আইনস্টাইন এরপর সেখানে যাবতীয় নতুন তথ্য সংযোজন করেন (Addendum) এবং পুনরায় সেই জার্নালে পাঠিয়ে দেন। এবার জার্নালটিতে গবেষণাটি প্রকাশ পায়। সে সময়টিতে আসলে কী হয়েছিল আইনস্টাইনের সাথে? কেন এতবার তার থিসিস বাতিল করা হয়? কী ছিল তার পিএইচডি থিসিসে?

চিত্র: আইনস্টাইনের থিসিস

ওয়েবারের কাছে যখন প্রথম পিএইচডি-র প্রজেক্টের বিষয়ের কথা হয়, তখন প্রথমে আইনস্টাইন ব্যাতিচার যন্ত্র ব্যবহার করে আলোর বেগ c পরিমাপ করতে চেয়েছিলেন। ততদিনে মাইকেলসন ও মর্লি সেটি করে ফেলেছিল। এ সম্পর্কে আইনস্টাইন জানতেন না।

এরপর কোনো পদার্থে বিদ্যুৎ প্রবাহকালে এর উপর তাপের কী প্রভাব, তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। কিন্তু এটাও বাদ দেয়া হয়। তারপর তিনি তাপ পরিবাহিতা নিয়ে কিছু গবেষণা করেন এবং ফলাফল বের করে ওয়েবারকে দেন। এটাও বাদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, আইনস্টাইনের করা এ গবেষণাটি ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে।

এরপর ক্লেইনারের কাছে আইনস্টাইন প্রথমে তরল থেকে গ্যাসে পরিণত হওয়ার সময় আন্তঃআণবিক বলের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞানী বোলজম্যান এটা নিয়ে কিছু কাজ করে রেখেছিলেন এবং আইনস্টাইনের দেয়া প্রস্তাবনা অনেকটাই বোলজম্যানের সাথে মিলে যাচ্ছিল। সেজন্য এটা বাদ দিতে হয়।

এরপরের বিষয়টি ছিল কোনো গতিশীল বস্তুর ইলেক্ট্রো-ডাইনামিক্স নিয়ে। কিন্তু সেটাও গ্রহণ করা হয়নি, কারণ এটা পুরোটুকুই ছিল শুধু তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। আর যে প্রফেসর এটা পর্যালোচনা করেছিলেন তারা এর মর্মই বুঝতে পারেননি।

এতকিছুর পর একদম শেষে তিনি তার পিএইচডি করতে পেরেছিলেন চিনির অণুর আনবিক মাত্রা বের করা সংক্রান্ত গবেষণায়। এখানে তিনি অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মান বের করেছিলেন। সেই অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা, যেটা আমাদেরকে মুখস্ত করতে হয়, যার মান N = 6.023 × 1023। কিন্তু এটি কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল সে সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য আমাদের দেয়া হয় না। যাহোক, তার পাওয়া ফলাফলে পরে ভুল ধরা পড়েছিল। ভুল ধরার পরে তাত্ত্বিকভাবে আবারো আইনস্টাইন আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

এখানে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মানে কয়েক ইউনিট ভুল ছিল। তিনি যে উত্তর পেয়েছিলেন তার মান এসেছিল N = 2.1 × 1023। পরে গাণিতিক হিসাবে তার ভুল বের করতে পেরেছিলেন এবং পরে আবার তার গবেষণাপত্র ভুল সংশোধন করে ছাপা হয়েছিল। সংশোধন করার পর তার মান এসেছিলো N = 4.15 × 1023

কিছুদিন পরে রসায়নের একটি ব্যবহারিক গবেষণায় অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার প্রকৃত মান পাওয়া যায়। যা থেকে আবারো প্রমাণিত হয় যে আইনস্টাইনের সমীকরণের কোথাও ভুল আছে। এরপর আইনস্টাইন আবারো তার গবেষণাপত্রটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং আবারো তার ভুল সংশোধন করেন। এবার তাত্ত্বিকভাবে সেই মান আসে N = 6.56 × 1023। দেখা যাচ্ছে এ মান মূল মানের অনেক কাছাকাছি পর্যন্ত ঠিক উত্তর দিতে পেরেছিল। অনেকে মনে করতে পারেন, ভুল থাকার পরেও কেন তাকে পিএইচডি দেয়া হলো?

তখনকার সময় জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকে গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি পাওয়ার জন্য এই কাজ যথেষ্ট ছিল। আইনস্টাইন নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যেটা দিয়ে এই মান মোটামটি সঠিকভাবে বের করা যাচ্ছিল। এটা অনেক বড় আবিষ্কার।

তাছাড়া জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জার্মানির অন্যান্য জায়গাতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে ব্যাবহারিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশী চর্চা করছিল সবাই। তাত্ত্বিক বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলক কম হচ্ছিল। ক্লেইনার তাত্ত্বিক গবেষণা পছন্দ করতেন দেখে তিনি আইনস্টাইনকে এ বিষয়ে কাজ করতে দিয়েছিলেন।

১৯০৫ সালে তার থিসিস গবেষণাপত্রে প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পেপার প্রকাশিত হয় যেমন- Photoelectric Effect, Brownian motion, Electrodynamics of Moving Bodies, E=mc2 এবং Molecular Dimension যেটা তার থিসিসের বিষয় ছিল। শেষেরটির উল্লেখ গবেষণাপত্রগুলোতে অন্যান্যগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশীবার হয়েছে।

চিত্র: তার থিসিসটি Annalen der Physik নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়।

আইনস্টাইনের নিজের কাছেও তার থিসিসের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তিনি যদি একটি অণুর আকার- আয়তন বের করার কোনো মাধ্যম বা পদ্ধতি দিতে পারেন তাহলে সেটার গুরুত্ব অনেক। কারণ এতে ম্যাক্স প্লাঙ্কের রেডিয়েশন ফর্মুলা আরো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা যাবে। তাছাড়া তার এই থিসিসে এমন একটি কাজ করা হয়েছিল যেটা দিয়ে একটি আণবিক হাইপোথিসিস দাড় করানো গিয়েছিল। তার এই গবেষণার কারণে ব্রাউনীয় গতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করা সম্ভব হয়েছিল।

আসলে আইনস্টাইনের পিএইচডি-র সময় বাধা আসার মূল কারণ ছিল পরিস্থিতি। তখন তাত্ত্বিক পারমাণবিক বিষয় নিয়ে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব বেশী গ্রহণ করা হতো না। যদিও কেউ কেউ এসব বিষয় নিয়ে অন্যান্য জায়গায় গবেষণা করছেন, কিন্তু তখন ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন এমন সব আবিষ্কার হচ্ছিল যে, সবাই সেসব আবিষ্কার নিয়ে ব্যবহারিক গবেষণা করার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত এই ধারাটা চলছিল। এরপর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।

প্রক্সিমা সেনটাউরিতে বড় এক বিস্ফোরণ

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হচ্ছে প্রক্সিমা সেনটাউরি। গত বছরের মার্চ মাসে সেখানে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। পৃথিবী থেকে এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। অনেক শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ ছিল এটি। উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সূর্যের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশী আলো ছড়িয়েছে এই বিস্ফোরণের ফলে।

image source: dailymail.co.uk

Astrophysical Journal Letters এ এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেখানে এই বিশ্লেষণের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা হয়। এই গবেষণার একজন গবেষক Dr. MacGregor বলেছেন যে মার্চ ২৪, ২০১৭ প্রক্সিমা সেন্টারির জন্য অন্য কোনো সাধারণ দিনের মতো ছিল না। এই বিস্ফোরণের ফলে যে আলোর ঝলকানির তৈরি হয় তা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান আলো থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র: https://sciencedaily.com/releases/2018/02/180226103341.htm

 

 

 

বায়েস থিওরির বিশ্ব জয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাদের একটু নাড়াচাড়া আছে তারা বায়েস তত্ত্ব সম্পর্কে জানবেই জানবে। গণিত, পরিসংখ্যান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বাণিজ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পূরকৌশল– সকল প্রধান বৈজ্ঞানিক শাখাতে বায়েস থিওরী প্রয়োগ আছে। এর প্রায়োগিক ক্ষমতা প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু, এ তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক কাঠখর পোহাতে হয়েছিল। আনুমানিক ১৫০ বছর লড়াই করার পর, বিংশ শতকে এসে তত্ত্বটি মোটামুটি সবার কাছে গৃহীত হয়। কিন্তু, কেন এত সময় লাগলো?

বায়েস তত্ত্ব খুবই মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। যেমনঃ কীভাবে আমরা প্রমাণ বিশ্লেষণ করি, পুরনো তথ্যের সাথে কীভাবে নতুন তথ্য সংযোজন এবং সেখান থেকে নতুন আরও তথ্য পেতে পারি, এবং অনিশ্চয়তার মুখে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারি? ছোট্ট এক লাইনের একটা সমীকরণ এতসব তথ্য দিতে পারে।

বায়েস তত্ত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদেরকে সে বিষয়ের পূর্ব প্রমাণ সম্পর্কে জানতে হবে। ইংল্যান্ডে ১৭৪০ সালের দিকে বায়েস তত্ত্বটির উদ্ভব। এটি আবিষ্কার করেন ইংলিশ গণিতবিদ রেভারেনড থমাস বায়েস (১৭০১ – ১৭৬১)। তার জীবদ্দশায় সূত্রটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। তার মৃত্যুর পর তারই বন্ধু রিচার্ড প্রাইস (১৭২৩ – ১৭৯১) তার সমস্ত কাজ প্রকাশ করেন। মূলত প্রাইসের কারণেই বায়েস সবার কাছে পরিচিতি পান।

বায়েস থিওরিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেন আরেক বিখ্যাত ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। বর্তমানে বায়েস থিওরির যে রূপ দেখতে পাই তা মূলত লাপ্লাসের অবদান। এ সূত্র ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেন যে ছেলেদের জন্মহার মেয়েদের থেকে বেশী।

image source: probabilisticworld.com

লাপ্লাসের মৃত্যুর পর পরবর্তী ১০০ বছর বায়েস থিওরির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং কিছু কিছু প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা লাপ্লাসের কাজকে অনেক বেশী বৈষয়িক (Subjective) বলে মনে করেন। সবচেয়ে বেশী সমালোচনার শিকার হয় এই প্রেক্ষিতে যে কেন এখনকার বা ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্যতা নির্ণয়ের জন্য পূর্ব প্রমাণ প্রয়োজন হবে? তবে কিছু কিছু গণিতবিদ বাস্তব জরুরী সমস্যার সমাধানের জন্য বায়েস থিওরি ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বিজয় তখনই সাধিত হয় যখন বিখ্যাত ইংরেজ গণিতবিদ এলান টিউরিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নেভির গোপন সঙ্কেত এনিগমা কোড ভাঙ্গার জন্য বায়েস তত্ত্ব ব্যবহার করেন। এ সময়টাতেই রুশ বিজ্ঞানী আন্দ্রেই কলমোগরভ এবং মার্কিন ক্লড শেনন যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই তত্ত্বটি ব্যবহার করেন।

বায়েস থিওরির আরো কিছু নমুনা ইতিহাস থেকেই পাওয়া যাবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের বীমা ক্ষতিপূরণের হিসাব মেলানোর বিষয়ে বায়েস ব্যবহার করা হয়। জার্মান U-Boat শনাক্তকরণে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বের করতে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার শনাক্তকরণেও বায়েস তত্ত্ব সফলতার সাথে প্রয়োগ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার স্নায়ু যুদ্ধের সময় বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে সাবমেরিন, এইচ বম্ব শনাক্ত করা হয়। পারমাণবিক চুল্লীর নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়, ধূমপানের কারণে যে ক্যান্সার হতে পারে সেটি গাণিতিকভাবে বায়েস থিওরি দিয়ে প্রমাণ করা হয়। চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার জন্য ফাইনম্যান যে  O– ring কে দায়ী করেন সেটি তিনি বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে বের করেছিলেন। এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যানদের মতো বিজ্ঞানীরা তাদের পদার্থবিজ্ঞানের কাজে এ তত্ত্ব সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।

image source: theguardian.com

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি কম অথবা বেশী দুই ধরনের ডাটা নিয়ে কাজ করতে পারে। এবং তা থেকেই নতুন তথ্য বের করে আনতে পারে। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে বায়েস খুবই সূক্ষ্মতার সাথে সম্ভাব্যতা বের করে আনতে পারে। বায়েস প্রয়োগ করার পর এর সঠিকতা যাচাই করার জন্য accuracy rate, false alarm rate বের করা হয়। যেকোনো বিষয়তেই দেখা গেছে অন্যান্য পদ্ধতির থেকে বায়েস সঠিকভাবে যে কোনো ডাটা থেকে তথ্য বের করে আনতে পারে।

বর্তমানে বায়েস তত্ত্ব ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশিন লারনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে বায়েস তত্ত্ব এখন এক অনিবার্য বিষয়। বায়েস তত্ত্ব এখন অনেক বেশী আধুনিক রূপ নিয়েছে। এর অনেকগুলো শাখা তৈরি হয়ে গেছে। যেমনঃ বায়েসিয়ান নেটওয়ার্ক, বায়েসিয়ান পরিসংখ্যান, বায়েসিয়ান প্যাটার্ন রেকগনিশন, বায়েসিয়ান বিলিফ, বায়েসিয়ান এ আই ইত্যাদি।

গত ২০ বছরে Intelligent Transportation Sector-এ এক নতুন বিষয় অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যার নাম Real-time crash prediction model (RTCPM)। গাড়ি দুর্ঘটনা নিত্য বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য ট্রান্সপোর্ট বিজ্ঞানীরা আগেভাগে দুর্ঘটনা যেন বোঝা যায় এমন কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। এই গবেষণায় বায়েস থিওরি ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক বিজ্ঞান, আধুনিক ডিটেক্টর, পরিসংখ্যান, রবোটিক্স, ট্রান্সপোর্ট সায়েন্স এসবের সম্মিলিত প্রয়োগে এই ফিল্ডে গবেষণা করা হয়।

image source: gainweightjournal.com

জাপানের Tokyo Institute of Technology-তে এ বিষয়ে প্রথম গবেষণা করেন ড. মইনুল হোসেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুরের Islamic University of Technology (IUT)-তে তিনি এবং তার দল এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছেন।

Loughborough University এর ড.কুদ্দুস প্রথম Real-time Crash Prediction Model for Autonomous Vehicle– তার PhD ছাত্রকে দিয়ে বের করেন যেখানে তিনি Dynamic Bayesian Network ব্যবহার করেন। গুগল যে সেলফ ড্রাইভিং কার তৈরি করেছে সেইটা পুরোপুরি কাজ করে বায়েস থিওরি ব্যবহার করে।

যেকোনো দিক থেকে বিবেচনা করলেই দেখা যাবে বায়েস থিওরি অত্যন্ত প্রায়োগিক এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

featured image: bbc.com

সাপ যখন উড়ে চলা পাখি

যারা সাপকে ভয় পায়, তাদের জন্য এটা একটা দুঃস্বপ্ন। আর যদি সাপটি এমন হয় যেটা উড়ে উড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সাপ তাদের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন একধরনের সাপ হচ্ছে উড়ন্ত সাপ।

প্রাণিজগতে যেসব প্রাণীর উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে, তারা গবেষকদের কাছে সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। পাখি, বাদুড়, পোকা-মাকড়দের উড়ে বেড়ানো নিয়ে কম গবেষণা হয়নি। এসব প্রাণীর সৃতিবিদ্যা (Kinematics) নিয়ে গবেষণার সাথে সাথে এদের বাতাসে ভেসে চলার গতি নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু যেসব প্রাণীর ডানা নেই, যেমন সাপ, তারা কীভাবে বাতাসে ভেসে চলে সেটা অনেক দেরীতে আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এদের বাতাসে ভেসে যাওয়ার গতি গবেষকদের সবচেয়ে বেশী আশ্চর্য করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গাছে বসবাসরত ৫ প্রজাতির সাপের মধ্যে একধরনের সাপ হচ্ছে এই উড়ন্ত সাপ। ইংরেজিতে এই সাপের পরিচিত নাম হচ্ছে Paradise tree snake। বৈজ্ঞানিক নাম Chrysopelea paradise

অনেকে এ সাপকে গেছো সাপ বলে। সাধারণত সবুজ রঙের হয় সাপগুলো, কিন্তু অন্য রঙেরও হতে পারে। সাপগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা গাছে উঠতে পারে, উঁচু স্থান থেকে লাফ দিতে পারে, মসৃণ গতিতে উঁচু স্থান থেকে নিচু জায়গায় উড়ে যেতে পারে। এমনকি উড়ন্ত অবস্থায় এই সাপগুলো নিজের যাত্রাপথ পরিবর্তনও করতে পারে!

এভাবে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাতায়াত করে এই গাছ সাপগুলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে একটি সাপ কোনো প্রকার ডানা ছাড়া বাতাসে উড়তে পারে? কী এমন ঘটে এদের শরীরে যেটা এদেরকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে?

এ সাপগুলো প্রথমে গাছের কোনো এক শাখায় পেঁচিয়ে অবস্থান করে। দেহের সামনের  অংশ গাছের শাখার সাথে ঝুলে থাকে। বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার আগমুহূর্তে সাপগুলো একটু উপর দিক করে ঝাঁপ দেয় এবং একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়। গাছের শাখা থেকে যখন সাপগুলো ঝুলে পড়ে, তখন এরা শরীরের সামনের অংশ ‘J’ আকৃতির করে ফেলে এবং এরপর উপরের দিকে ত্বরণ তৈরি করে বাতাসে ঝাঁপ দেয়[১]

এই সাপগুলোর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এরা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। কীভাবে এরা নিজেদের ভার উত্তোলন (Lifting) করে শুধুমাত্র আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়? এ আশ্চর্য প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানও এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে।

সহজ করে ব্যাখ্যা দিতে হলে এই সাপের গতিপথকে কাগজের বিমানের সাথে তুলনা করা যায়। গাছের শাখা থেকে বের হয়ে সাপগুলো যখন গতিপ্রাপ্ত হয় তখন এরা একটু অন্যরকম আচরণ করে। বাতাসে এরা ‘S’ আকৃতির রূপ নেয় এবং আনুভূমিকভাবে দুই পাশে তরঙ্গায়িত হতে থাকে।

গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই তরঙ্গায়িত হবার ফলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তা ১.৩ হার্জের। অর্থাৎ এক সেকেন্ডে ১.৩ বার কম্পন সৃষ্টি হয়। এরকম হবার সাথে সাথে সাপের গতিপথ (Gliding path) ছোট হয়ে আসে। এরকম দোলন বা তরঙ্গ প্রাপ্ত হবার কারণে কোনোএকভাবে সাপের নিজের ভারবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বাতাসে এই সাপগুলোর গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৮ মিটার এবং নিচের দিকে নামার সময় এদের গতি হয় সেকেন্ডে ৫ মিটার। এরা ৩০ ডিগ্রি কোণে গ্লাইড করে এগিয়ে যায়[২]

উড়ন্ত সাপগুলোর গতি নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ গবেষণাই করা হয়েছে এর ভেসে থাকা অবস্থায় ত্রিমাত্রিক গতি নিয়ে। এরা নিজেদের যাত্রাপথও পরিবর্তন করতে পারে। এদের পুরো শরীরের স্পন্দন হয় এটা আগেই বলা হয়েছে।

সাপগুলোর মাথার দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর শরীরের পেছনের অংশ কাত হয়ে যায় এবং দিক পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় যায়। এরকম স্পন্দন বা তরঙ্গায়িত হবার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। তবুও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, এ ধরনের সাপের পেছনের ভাগে যে অবতল আকৃতির সৃষ্টি হয় সেটার বাম-ডানে গতি বা স্পন্দনের কারণে সাপের নিচের দিকের অবস্থান পরিবর্তন হয়।

সাপের গতিপথের ভিডিও দেখলে বোঝা যাবে যে, আসলেই লেজের দিকের অবস্থান বাম এবং ডান দিকে পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, যদি শরীরের পেছনের অংশ একটু কাত হয়ে একবার বামে এবং একবার ডানে যায়, তাহলে সাপের নিজস্ব ভারোত্তোলন ক্ষমতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ শরীরের লিফটিং কাজ করে বেশী[৩]

 

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে কিছু কিছু প্রাণী আছে যারা নিজেদের পাখনা ব্যবহার করে উড়তে পারে, যেমন উড়ন্ত কাঠবিড়ালী। কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে নিজের ভার উত্তোলন করে বাতাসে ভেসে চলাচল করার কোনো মাধ্যম নেই।

বাতাসের ভিতর দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করা মাটির উপর দিয়ে চলাচল করার থেকে অনেক বেশী জটিল। কারণ বাতাসে পাখা ছাড়া ওড়ার কারণে নিজেকে গ্লাইডিং করতে হয় এবং সাপের শরীর বেঁকে গিয়ে পার্শ্বীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করে। সাথে সাথে বাতাসে অবতল আকৃতিও বজায় রাখতে হয়। এ দুটি কাজ একসাথে কোনো সাপ করতে পারে কিনা জানা নেই। হয়তো এ দুটি কাজ একসাথে করার জন্য কোনো বিশেষ স্নায়বিক পেশীর নিয়ন্ত্রণের দরকার পড়ে।

বাতাসে ভেসে চলাচল করা প্রাণীদের মধ্যে শিকার ধরে নিজের খাদ্য সংস্থান করে এমন প্রাণী হলো উড়ন্ত সাপ এবং Draco নামক লিজার্ড। ভেসে চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক গবেষক ড্রাকোকে বেশী দক্ষ বলে মনে করেন। অন্যদিকে ড্রাকো দিক পরিবর্তন করলে এর গতি অনেকখানি কমে যায়, কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না।

তবে কিছু কিছু বিষয়ের সমাধান এবং উত্তর এখনও জানা যায়নি, যেমন উড়ন্ত সাপগুলোর বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার ধরন দেখলে বোঝা যাবে অনেকটা বিশৃঙ্খল এবং আকস্মিকভাবে এরা লাফ দেয়। এরকম লাফ দেয়াটা শুধু যে শিকার দেখা দিলেই হয় তা কিন্তু না, সবসময়ই। এর পেছনে কী কারণ এবং প্রভাবক কাজ করে তা বিজ্ঞানীরা এখনও জানতে পারেননি।

উড়ন্ত সাপগুলো বিভিন্ন সময়ে নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন লুপ আকৃতির তৈরি করে এরপর লাফ দেয়। সাপের এরকম লাফিয়ে ভেসে যাওয়ার মধ্যে দুটি গতি থাকে। একটি হচ্ছে আনুভূমিক গতি, অপরটি হচ্ছে উলম্ব গতি। এই দুই গতির ধরন কী এক নাকি আলাদা সেটা এখনও জানা যায়নি। সাপের লাফ দেয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ধরা হয় গাছের শাখাগুলোকে। এই শাখাগুলোর দৈর্ঘ্য, ব্যাস, আকৃতি, নমনীয়তা সাপের উড়ে যাওয়াতে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে সেটিও একটি গবেষণার বিষয়।

এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারলে আমাদের পরিবেশের বাস্তুসংস্থানের নতুন এবং অজানা কোনো দিক সম্পর্কে আমরা জানতে পারবো। বিশেষ করে সাপের ডানা ছাড়া উড়ে যাবার কৌশল আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারলে বায়ুগতিবিদ্যাতে এর কলাকৌশল নিয়ে নতুন দিক তৈরি হবে[৪]

তথ্যসূত্র

[১] Holden, D., Socha, J.J., Cardwell, N.D, and Vlachos, P.P. (2014). Aerodynamics of the flying snake Chrysopelea paradisi: how a bluff body cross-sectional shape contributes to gliding performance. The Journal of Experimental Biology, 2014, pp.382-394.

[২] Walker, J. (2007). The Flying Circus of Physics, John Wiley & Sons, Inc.

[৩] Socha, J. J. (2002). Gliding flight in the paradise tree snake,” Nature, 418, 603-604.

[৪] Socha, J.J. (2006) Becoming airborne without legs: the kinematics of take-off in a flying snake, Chrysopelea paradise. The Journal fo Experimental Biology, 209, pp. 3357-3369

আশ্চর্য কীট টিউবওয়ার্ম

১৯৯২ সালের কথা। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর মনিকা ব্রাইট গভীর সমুদ্রবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে চান। সেজন্য ঐ বছরই তিনি গভীর সমুদ্রে ডাইভ দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি এলভিন নামক একটি সাবমারসিবলে করে গভীর সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করতে বেরিয়ে পড়েন। সেখানে একধরনের আশ্চর্য কীট দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। পরে এটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেন। সেই কীটটির চোখ, মুখ, পেট কিছুই নেই। এটি বেঁচে থাকে এর ভিতরে অবস্থিত ব্যাকটেরিয়ার সিম্বায়োটিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অমেরুদণ্ডী এই কীটটির নাম হচ্ছে টিউবওয়ার্ম। বৈজ্ঞানিক নাম Riftia pachyptila। অ্যানিলিডা বর্গের প্রাণী।

টিউবওয়ার্মটি ব্যাকটেরিয়াকে নিজের দেহে থাকতে দেয় এবং এর বদলে ব্যাকটেরিয়া টিউবওয়ার্মের জন্য খাবার তৈরি করে দেয়। যে প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া খাবার তৈরি করে তাকে কেমোসিন্থেসিস বলা হয়। টিউবওয়ার্মের বিষাক্ত উপাদানকে রূপান্তর করে এই খাদ্য তৈরি করা হয়।

সর্বপ্রথম এই টিউবওয়ার্ম পাওয়া যায় গ্যালাপোগাসে। ফ্রান্স ও আমেরিকা একটা যৌথ অভিযান চালিয়েছিল সেখানে। সেখানে গভীর সমুদ্রে তারা একটি হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আবিষ্কার করেন। এটি একধরনের খোলা গর্তের মতো যেখান থেকে গরম খনিজ সমৃদ্ধ তরল বের হয়ে আসে। এখান থেকেই প্রথম Riftia pachyptil-এর সন্ধান পাওয়া যায়।

ড. ব্রাইটের অভিযানের পরে একটা প্রশ্নের জন্ম নেয়, এতো এতো ব্যাকটেরিয়া টিউবওয়ার্মগুলোর ভেতরে প্রবেশ করে কীভাবে? ২০০৮ সাল পর্যন্ত এর কোনো উত্তর ছিল না। ড. ব্রাইট এবং তার সহকর্মীরা ২০০৮ সালে বিখ্যাত জার্নাল Nature এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেখানে কখন, কীভাবে, কেন ব্যাকটেরিয়াগুলো টিউবওয়ার্মের ভেতর নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করে এবং সিমবায়সিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে নিজেরা বেঁচে থাকে এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়।

২০০৪ সালে তারা কিছু বাচ্চা টিউবওয়ার্ম স্যাম্পল হিসেবে সংগ্রহ করেন। এরপর এগুলোকে Vestimentiferan Artificial Settlement Device (VASDs) এ প্রয়োগ করা হয় এবং পর্যবেক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ ৪ বছর গবেষণা করার পর তারা বুঝতে পারেন যে, ওয়ার্ম এর skin infection মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াগুলো এর মধ্যে প্রবেশ করে। এখান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এরা ওয়ার্মের টিস্যুর ভেতর চলে যায়। সেখানে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের জন্য ট্রপোসোম বানিয়ে নিয়ে থাকা শুরু করে। ট্রপোসোম হচ্ছে একধরনের অঙ্গ যেটা পোষকরূপে ব্যাকটেরিয়াকে ধারণ করে।

image source: bbc.co.uk

এখান থেকেই সিমবায়সিস প্রক্রিয়া শুরু হয়। ট্রপোসোম কিন্তু একটা উন্নতমানের অঙ্গ। এর ভেতরকার কোষীয় গঠন উন্নতমানের এবং অনেকগুলো লোবযুক্ত। বেশিরভাগ ট্রপোসোমের ভেতর ব্যাকটেরিওসাইট থাকে যেগুলো একটা কোষীয় চক্র মেনে চলে। বলা যায় টিউবওয়ার্মের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য বেশ আশ্চর্য রকমের।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আসছে নেচারের নতুন জার্নাল

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বিশিষ্ট জার্নালগুলোর মাঝে নেচার-এর অবস্থান সবার উপরে। নেচার থেকে প্রকাশিত প্রায় সবগুলো জার্নালই উঁচু দরের। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে নেচার কর্তৃপক্ষ থেকে আগে কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ পেতো না। সামান্য কিছু পেলেও সেগুলো অন্য জার্নালগুলোতে পেতো। আলাদা করে একক কোনো জার্নাল ছিল না।

কিন্তু এবার নেচার থেকে আসলো সুসংবাদ। নেচার মেশিন ইন্টেলিজেন্স নামে একটি জার্নাল নেচার থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর অর্থাৎ, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এই জার্নালটির যাত্রা শুরু হতে হচ্ছে। বিগ ডাটা এবং এআই এর যুগে প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে নতুন নতুন গবেষণা করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু নেচারের মতো খ্যাতনামা প্রকাশনীর এ বিষয়ের উপর কোনো একক গবেষণা সাময়িকী বা জার্নাল প্রকাশিত হতো না। এবার থেকে সেই দরজা খুলে গেলো।

image source: medium.com

মূলত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স, ডাটা মাইনিং ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা সংবলিত গবেষণাপত্র ছাপা হবে এখানে। তাছাড়া মানুষ এবং রোবটের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার অন্যান্য বিষয়ের উপর কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এগুলো নিয়েও গবেষণা প্রকাশ করা যাবে।

সম্পাদক লিজবেথ ভেনামা; Image Source: twitter.com

এই জার্নালে মৌলিক গবেষণা, রিভিউ আর্টিকেল, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার তত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সংবাদ, মতামত, চিঠিপত্র কিংবা মন্তব্য ইত্যাদি বিষয়াদিও প্রকাশ করা যাবে। লিজবেথ ভেনামা হচ্ছেন এই জার্নালের সম্পাদক। এর আগে তিনি নেচার ফিজিক্স-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন।

ফিচার ইমেজ: The Economist

শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী তুললেন সুপারনোভার জন্মকালীন সময়ের ছবি

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভিক্টর বুসো তার টেলিস্কোপে নতুন ক্যামেরা লাগাতে চাইছিলেন। নিজের অবজারভেটরি খুলতে হলে অনেক শব্দ হবে দেখে তিনি প্রতিবেশীদের বিরক্ত করতে চাইছিলেন না। ঘরের ভিতরের একটি খোলা অংশ দিয়ে তিনি এটি আকাশের দিকে তাক করেন। দক্ষিণ দিকে একটি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি NGC 613 যেটা ৮৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত সেখান থেকে তিনি উজ্জল আলোর অনেকগুলো ছবি পান। এরপর এটি নিয়ে গবেষণা করে নেচার সাময়িকীতে এটা নিয়ে লেখা দেয়া হয়। পরে নেচারের বিবৃতিতে বলা হয় যে সম্ভবত এটাই প্রথম সুপারনোভার জন্মের কাছের সময়কার ছবি।

image source: ispacea.com

“এই ধরনের ছবি পাওয়ার সম্ভাবনা লটারিতে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনার থেকেও কম, এই ধরনের ছবি দেখতে পাওয়া এবং সেটা তুলে বিশ্লেষণ করা সত্যিই উত্তেজনাকর”- এমটাই অভিমত প্রকাশ করেছেন বন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ নরবারট লেঙ্গার।

ফিচার ইমেজঃ Nature, Credit: Victor Buso (ভিক্টর বুসো কর্তৃক তোলা সুপারনোভার ছবি)

তথ্যসূত্র- নেচার সাময়িকী

কংক্রিটের ফাটল সারাবে ছত্রাক

শরীরের কোথাও কেটে গেলে যেমন নিজে নিজেই জায়গাটি সেরে উঠে ঠিক সেভাবেই ছত্রাকও কোন অবকাঠামোতে ফাটল ধরলে নিজে থেকেই সেটাকে সারিয়ে তুলতে পারবে এমনটাই দাবি করছেন বিংগহামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। Trichoderma reesei নামক এক ছত্রাককে কাজে লাগানো হবে এতে।

বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক নিয়ে পরীক্ষা করা হয় যে কোন ছত্রাক ফাটল সারাতে সাহায্য করবে; Image Source: Scientific American

কংক্রিট বড় বড় সব অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এ অবকাঠামোগুলোকে বিভিন্ন কারণে প্রচণ্ড বল, চাপ সহ্য করতে হয়। তাই কংক্রিটে যদি ছোট ফাটলও তৈরি হয় তাতে এর ভিতর পানি বা অক্সিজেন ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কংক্রিটের ভেতরে থাকে প্রসারণ বা টান সহ্য করার জন্য রড। এই রডগুলো আবার পানি বা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসলে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে এতে ফাটল ধরতে পারে যেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অনেক কঠিন। এর জন্য অনেক জনবল এবং অর্থ প্রয়োজন।

Trichoderma reesei নামক ছত্রাক; Image Source: Scientific American

এসব কারণে বিজ্ঞানীরা এখন চেষ্টা করছেন এমন কিছু উপায় আবিষ্কার করা যেটা নিজে নিজেই ফাটল ঘটলে সারিয়ে তুলবে। বিজ্ঞানীদের তত্ত্বটি এমন যে কংক্রিটের মধ্যে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে। আবার এই ছত্রাকও ক্যালসিয়ামযুক্ত পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত। তাই বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে যদি কংক্রিট তৈরির প্রাথমিক অবস্থায়ই এই ছত্রাকগুলোকে কংক্রিট তৈরির অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় তাহলে পরে গিয়ে যখন এতে ফাটল ধরবে তখন যদি এর ভিতরে পানি যায় তাহলে এই ছত্রাকগুলো পানির সংস্পর্শে এসে অঙ্কুরিত হতে পারবে এবং কংক্রিটের ভিতর জন্মাতে পারবে। এরফলে ফাটলের এখানে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কেলাস তৈরি হবে এবং ফাটলকে মিলিয়ে দিতে সাহায্য করবে। এখনও এই তত্ত্ব পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। তবে খুব শিগগিরি বিজ্ঞানীরা বাস্তবে এর প্রয়োগ শুরু করবেন।

তথ্যসূত্র- সায়েন্টিফিক আমেরিকান

ফিচার ইমেজঃ liftrightconcrete.com

নতুন পর্যবেক্ষণ বলছে প্রক্সিমা সেন্টারিতে প্রাণের অস্তিত্ব না থাকার সম্ভাবনাই বেশি

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারি। বিজ্ঞানীরা মহাকাশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণের খোঁজ করে চলছেন। এই প্রক্সিমা সেনটারিও আছে তালিকায়। গত বছরের মার্চের ২৪ তারিখে এখানে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয় যা পৃথিবী থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। অনেক শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ ছিল সেটি। বিজ্ঞানীরা এখান থেকে যে যে উপাত্ত সংগ্রহ করতে পেরেছেন তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহ জেগেছে- আদৌ কি এরকম স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব?

উজ্জ্বল অংশের ঠিক ডান পাশের লাল বৃত্তটি প্রক্সিমা সেন্টারি; Image Source: New Scientist

উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আমাদের সূর্যের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশী আলো ছড়িয়েছে এই বিস্ফোরণের ফলে। এস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার-এ এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে এই বিশ্লেষণের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। এই গবেষণার একজন গবেষক ড. ম্যাকগ্রেগর বলেছেন, মার্চ ২৪, ২০১৭ প্রক্সিমা সেঞ্চুরির জন্য অন্য কোনো সাধারণ দিনের মতো ছিল না। এই বিস্ফোরণের ফলে যে আলোর ঝলকানির তৈরি হয় তা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান আলো থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা।

এরকম পরিবেশের কারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে, আমাদের সৌরজগতের মতো সেখানে এমন কোনো জায়গা থাকবে না যেখানে বসবাস করা যেতে পারে। আর এমন কোনো সম্ভাবনাও আসলে আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

তথ্যসূত্রঃ সায়েন্স ডেইলি

featured image: Science Daily