ত্বকের কোষ থেকে সন্তান উৎপাদন

বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বসে নেই। তারা নিত্যনতুন চিন্তা ভাবনা করে চলেছেন। বিজ্ঞানীদের নানা কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয় যা আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক জীবেরই প্রজনন হয়। প্রাণীদের ক্ষেত্রে সেই প্রজনন ঘটে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে। যৌনক্রিয়ার সময় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু মিলিত হয় এবং নিষেকের পর ভ্রূণ গঠিত হয়। সেই ভ্রূণ পরিণত হয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এটাই প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজননের সরল একটি বর্ণনা।

কিন্তু বিজ্ঞান তো এতটুকুতেই থেমে নেই। তারা মানবদেহের প্রজনন ক্রিয়া বোঝার জন্য অনরবত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার ফলস্বরূপ ১৯৯৭ সালে আমরা পেয়েছি ‘ডলি’কে। ডলি ভেড়ার কথা আমরা সবাই জানি। ডলির মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা প্রথম কোনো স্তন্যপায়ীকে ক্লোন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর আগে ব্যাঙের ক্লোন করা হয়েছিল।

ডলির ক্লোন করা ছিল প্রজনন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ। তারপর আমরা দেখেছি টেস্টটিউব শিশু। এখানে নারী ও পুরুষের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দেহের বাইরে মিলিত করা হয়। কিন্তু ত্বকের কোষ? এটি নিশ্চয় পরোক্ষ হোক আর প্রত্যক্ষ হোক প্রজননের মতো কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যদি বলা হয় ত্বকের কোষ থেকে শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণু তৈরি সম্ভব তাহলে হতবাক হতেই হয়।

চিত্র: ল্যাবরেটরিতে তৈরি ডিম্বাণু

বিজ্ঞানী হাইয়াশি ইঁদুরের ত্বক কোষ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তা থেকে ইঁদুরের সন্তানের জন্ম হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষেত্রেও এটি সম্ভব হবে। এমন অনেক দম্পতি আছেন যাদের সন্তান হয় না। অনেক সময় দেখা যায় পুরুষের শুক্রাণুতে সমস্যা রয়েছে। আবার অনেক সময় নারীর ডিম্বাণুতেও সমস্যা দেখা দেয়। আবার বয়স হয়ে গেলে নারীরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে যায়, কারণ তখন তাদের ডিম্বাণু তৈরি হয় না।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ল্যাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব। তাই তখন যেকোনো নারী অথবা পুরুষ শুধুমাত্র একটু রক্ত দিলেই তা থেকে তৈরি হতে পারে তাদের সন্তান। এমনকি যারা সমলিঙ্গ বিবাহিত তারাও তাদের জৈবিক সন্তান পেতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত মানুষের উপর এটি প্রয়োগ করা হয়নি।

হাইয়াশি এই পদ্ধতিটির মূল কঠামো পেয়েছিলেন ইয়ামানাকার গবেষণা থেকে। জাপানের কয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ামানাকা গবেষণা করে বের করেছিলেন কীভাবে যেকোনো কোষকে স্টেম কোষে রূপান্তরিত করা যায়। এ আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

প্রথমে হাইয়াশি একটি পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের লেজ থেকে কোষ নেন। তারপর সেই কোষকে রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে মেশান। সেই রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে থাকে চার ধরনের জিন। এগুলো ঐ কোষকে স্টেম কোষে পরিণত করে। স্টেম কোষ ডিম্বাণু তৈরিতে সক্ষম।

এই ডিম্বাণুকে পরিণত হিসেবে করার জন্য সঠিক পরিবেশ দরকার। বিজ্ঞানীরা এজন্য ডিম্বাণু তৈরিতে প্রস্তুত সেই স্টেম কোষকে জীবিত ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করান। কিন্তু তাতে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ডিম্বাণুটি পুরোপুরি তৈরি করতে ডিম্বাশয়েরর উপর নির্ভর করইতে হচ্ছে। এবার তারা ইঁদুরেরে ডিম্বাশয়ের কোষ নিয়ে তা সেই স্টেম কোষটির সাথে রাখলেন যেন স্টেম কোষটি মনে করে সে ডিম্বাশয়ে আছে।

পাঁচ সপ্তাহে ডিম্বাণুটি পরিণত হলে এটিকে একটি স্বাভাবিক শুক্রাণুর সাথে মিলিত করেন। উৎপন্ন ভ্রূণ একটি ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করান। এই গবেষণায় আটটি ইঁদুর টিকে থাকে। পরবর্তীতে এই ইঁদুরগুলো নিজেরা বংশবৃদ্ধি করে।

চিত্র: কৃত্রিম ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়া ইঁদুর

আমেরিকার ১০% নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম। অনেকে তখন আইভিএফ তথা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের শরণাপন্ন হন। আইভিএফকে আমরা সবাই টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি নামে চিনি। এই পদ্ধতিটি অনেক ব্যয়বহুল। এতে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে। তার উপর শতকরা ৬৫ ভাগ সময় এটি ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রীর যেকোনো একজনের জনন কোষ সুস্থ না থাকলে তখন শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণুদাতা খুঁজতে হয়। যা সকলে গ্রহণ করতে চান না। কারণ এতে যেকোনো একজন (পুরুষ কিংবা নারী) সন্তানটির জৈবিক অভিভাবক হওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে বাবা মা উভয়ই সন্তানের জৈবিক অভিভাবক হতে পারেন। এতে নারীদের কৃত্রিমভাবে হরমোন দেয়া হয় যেন তিনি পরিমাণে ডিম্বাণু তৈরি করে। তবে এই অতিরিক্ত হরমোন প্রদানে নারীদেহে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হয় কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে এটি করা সহজ হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এত সহজ নয়। কারণ ইঁদুরের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে পাঁচ দিন। আর মানুষের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে ৩০ দিন। এতদিন ধরে ডিম্বাণুটিকে ঠিক রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা করা শুরু করে দিয়েছেন। মারমোসেট বানর নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এই বানরের গর্ভ ধারণে ১৪০ দিন সময় লাগে। তবে এখন বানরের পরিবর্তে শুকরও ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ শুকরের ভ্রূণের গঠনের ধাপ মানুষের সাথে মিলে। আর শুকর বানরের চেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ডিম্বাণুকে পরিণত করার জন্য ডিম্বাশয়ের কোষ লাগে। বিজ্ঞানী হায়াসী চাইছেন ভিন্ন কিছু। যে কোষটি ডিম্বাণু পরিণত করার সিগন্যাল দেয় সেটিকে শনাক্ত করতে চাইছেন। স্টেম কোষ থেকে সেই কোষটি তৈরি করার পদ্ধতিও তিনি বের করতে চান। যেন ডিম্বাণু তৈরি থেকে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়াটি গবেষণাগারে সম্পন্ন করা যায়। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন ডিম্বাণুগুলোকে গবেষণাগারে পরিণত করলে কিছু সমস্যা থেকে যাবে। এতে হয়তো দুর্বল শুক্রাণু তৈরি হতে পারে।

চিত্র: সবকিছু সম্পূর্ণরূপে গবেষণাগারে তৈরি করলে দেখা দিতে পারে সমস্যা।

শুক্রাণু তৈরিতে সক্ষম স্টেম সেলকে সরাসরিই যদি শুক্রাশয়ে স্থানান্তর করা যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের প্রজননের সময় যে শুক্রাণুগুলো সুস্থ শুধু সেগুলোই নির্বাচিত হয় এবং নিষিক্ত হয়। গবেষণাগারে অযোগ্য শুক্রাণু দ্বারা নিষেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তারা কৃত্রিমভাবে তৈরি শুক্রাণু শুক্রাশয়ে স্থাপনের পক্ষপাতী।

অনেকে এই কৃত্রিম ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরিতে সম্মতি দেন না। কারণ এতে বিকলাঙ্গ ও দুর্বল সন্তান জন্ম নিতে পারে। শিশু হয়তো পরবর্তীতে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এতে মূল্যবোধজনিত কিছু সমস্যাও থেকে যায়। কারণ এই পদ্ধতিতে যেকোনো ব্যক্তির কোষ নিয়ে তার সম্মতি ছাড়াই সন্তান তৈরি করা যায়। নিজের অজান্তেই মানুষ হয়ে যেতে পারে সন্তানের পিতা-মাতা।

এভাবে অতি সহজে মানুষ তৈরি মানুষের জীবনের গুরুত্ব কমিয়ে দিবে। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান কমে যেতে পারে সহজে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো এতে একজন মানুষের কোষ থেকেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করে সন্তান তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সে সন্তানের মা ও বাবা একজনই হবে।

এসব দিক চিন্তা করে ভ্রূণ গবেষণায় টাকার অনুদান কমিয়ে দেয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসন এটাকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এটিকে আবারো কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে দেশ ভেদেও গবেষণা নির্ভর করে। যেমন জাপানে ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা নিষেধ। কিন্তু ইজারাইলে এ নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই বরং এতে উৎসাহ দেয়া হয়।

তবে এই গবেষণার ভালো ফলগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সন্তান জন্মদানে অক্ষম স্বামী-স্ত্রী এই পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে পারে। আবার এপিজেনেটিক্সে পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নানা রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। \

তাই সকল পক্ষের সাথে বসে এই গবেষণা নিয়ে গভীর আলোচনা করা দরকার। এই গবেষণার সুফল যেন আমরা ভোগ করতে পারি এবং এর খারাপ দিক থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারি, এগুলোই যেন হয় এ সংক্রান্ত গবেষণার ভবিষ্যৎ।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান, মার্চ ২০১৮

featured image: truthpraiseandhelp.wordpress.com

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী মহামারী

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব গিয়েনার গ্রাম মিলেন্ডাও-তে দুই বছর বয়সী একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির নাম এমিল ওয়ামনো। প্রথমে তার জ্বর হয়। তারপর তীব্র বমি ও সাথে রক্ত আমাশয়। গ্রামে এ ধরনের রোগ কেউ আগে দেখেনি। শিশুটির পরিবারের লোকজন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শিশুটি মারা গেলো। তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল একটি ভাইরাস।

এই ভাইরাসটি তার পরিবারের মাঝেও ছড়িয়ে যায়। শীঘ্রই শিশুটির ৪ বছর বয়সী বোনটিও একই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। একই ঘটনা ঘটে ওয়ামনোর মা ও দাদীর সাথে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো তারা সবাই মারা গেছেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে।

যদি ভাইরাসটি আর না ছড়াতো তাহলে মিলেন্ডাও গ্রামের বাইরে আর কেউ এই পরিবারের করুণ পরিণতির কথা জানতো না। কারণ গিয়েনাতে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষই মারা যায়। কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সে সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ শতাংশ লোকই মারা যেতো।

ওয়ামনোর পরিবার থেকে এই ভাইরাস একজন নার্স ও গ্রামের একজন ধাত্রীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। ধাত্রীটিকে সেবা শুশ্রূষার জন্য তার গ্রামে নেয়া হলে সেখানও ভাইরাস ছড়িয়ে যায়। আর যারা এমিলি ওয়ামনোর দাদীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তারাও তাদের গ্রামে ভাইরাস নিয়ে গেলেন।

খুব দ্রুত ভাইরাসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে গেলো। কারণ মিলেন্ডাও গ্রাম গিয়েনা, সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। আর মিলেন্ডাওয়ে সবাই ব্যবসা কিংবা আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আসতো। ভাইরাসটি তখনও কিছু কিছু গ্রামে ছড়াচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীর অতটা টনক নড়েনি এই ব্যাপারে। ২০১৪ সালের মার্চে গিয়েনার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ এই রোগের কারণ হিসেবে ইবোলা ভাইরাসের নাম ঘোষণা করলেন। তখন সারা পৃথিবী এই রোগের ভয়াবহতা ব্যাপারে জানতে পারলো।

কিছু ভাইরাস আমাদের পূর্ব শত্রু। রাইনো ভাইরাস প্রথম আক্রান্ত করেছে মিশরীয়দের। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাস দশ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের জিনোমে প্রবেশ করেছে। অন্য ভাইরাসরা তুলনামুলকভাবে নতুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এইচআইভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র এক শতক হলো। নতুন ভাইরাসরাও মহামারী সৃষ্টি করছে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হতে যাচ্ছে ইবোলা।

ইবোলা ভাইরাস তার ভয়ংকর যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে যায়রে নামক এক দূরবর্তী অঞ্চলে। আক্রান্ত লোকেরা জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বমি করে। কিছু রোগীর শরীরের সকল ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে থাকে। এমনকি চোখ থেকেও! একজন ডাক্তার এক মুমূর্ষু সন্ন্যাসিনীর রক্তের নমুনা নিয়ে কিনহাসাতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পিটার পাইয়ট নামের একজন ভাইরাসবিদ নমুনাগুলো ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সাপের আকৃতির কিছু ভাইরাস দেখতে পান।


চিত্র: ইবোলা ভাইরাস

সেই সময় বিজ্ঞানীরা সর্পাকৃতির আরেকটি ভাইরাস সম্বন্ধে জানতেন। ভাইরাসটির নাম মার্গবার্গ ভাইরাস। মার্গবার্গ ভাইরাসটির নাম এসেছে জার্মানির মার্গবার্গ শহর থেকে। ওই শহরের ল্যাব কর্মীরা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করার ফলে রক্তক্ষরণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাইয়ট বুঝতে পারেন তিনি যে ভাইরাসটি দেখেছেন তা মার্গবার্গ ভাইরাস নয়। বরং তার কোনো আত্মীয়।

পাইয়ট ও তার সহকর্মীরা ভাইরাসটির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জায়েরার গ্রাম ইয়ামবুকুতে চলে গেলেন। তারা একটা অতিথিশালা খুঁজে পেলেন যেখানে যাজক ও সন্ন্যাসিরা দড়ি দিয়ে সে জায়গাটুকু আলাদা করে রেখেছেন যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। দড়ি থেকে একটা সাইন ঝোলানো আছে যাতে লেখা “অনুগ্রহ করে থামুন। যে এই লাইন অতিক্রম করবে সে মারা যেতে পারে।”

পাইয়ট ও তার দল একটা সমীক্ষা করলেন। তারা বের করলেন কে কে আক্রান্ত হয়েছে এবং কখন হয়েছে। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা হামের মতো বাতাসে ছড়াচ্ছে না। বরং রোগীর শরীরের তরল পদার্থ দিয়ে তা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতাল যেগুলোতে একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে ওখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যেসব মানুষ এসব রোগীর সেবা করছে কিংবা মৃত দেহের গোসলের কাজ করছে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাস ভয়ংকর হলেও এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা ছিল খুব সহজ। পাইয়ট ও তার দল হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিলেন। আর কেউ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখলেন। তিন মাস পরে মহামারী থামলো। ফলাফল ৩১৮ জনের মৃত্যু। পাইয়ট যদি এ উদ্যোগ না নিতেন তাহলে হয়তো মহামারীর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারতো। এখন বাকি রইলো ভাইরাসটিকে একটি নাম দেয়া। পাইয়ট পাশে বয়ে যাওয়া একটি নদীর দিকে তাকালেন। নদীর নাম ‘ইবোলা’।

চিত্র: ৪০ বছর আগে পিটার পাইয়ট আবিষ্কার করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস।

একই বছর সুদানেও ইবোলা দেখা দেয়। এতে ২৮৪ জন মারা যায়। তিন বছর পর সুদানে আবার ইবোলা দেখা দেয়। এবার মারা যায় ৩৪ জন। তারপর বছর পনেরোর জন্য ইবোলাকে আর দেখা যায়নি। ১৯৯৪ সালে এটি গেবনে আঘাত হানে। ফলাফাল ৫২ জনের মৃত্যু।

প্রতিবার ইবোলার এই আঘাতের সাথে পাইয়টের পরবর্তী বিজ্ঞানীরা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে লাগলেন। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত এবং বাকিদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে তারা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ করার চেষ্টা করতো। কারণ ওই সময় কোনো ভ্যাক্সিন বা অন্য কোনো ওষুধ ছিল না।

সঠিক পরিবেশ পেলে অনেক ভাইরাসই মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু হাম অথবা জলবসন্তের মতো রোগ একবার মহামারী হওয়ার মাধ্যমে হারিয়ে যায় না। এরা তখনও কম মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আলাদা। ইবোলার একবার মহামারী হলে অনেক বছর ধরে আর কোনো মহামারী হয় না। দীর্ঘ সময় পর সে তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবার হাজির হয়।

মাঝখানের বছরগুলোতে ইবোলা কোথায় হারিয়ে যায়? ভাইরাসবিদরা এই ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। তারা দেখলেন গরিলা ও শিম্পাঞ্জীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা বাদুড়েও ইবোলার বিরুদ্ধে এন্টিবডি পেলেন। কিন্তু বাদুর এই ভাইরাস সহ্য করতে পারে। এমন হতে পারে ইবোলা এমনিতে বাদুর থেকে বাদুরে ছড়ায় কোনো রোগ তৈরি ছাড়া। আর সময়ে সময়ে মানুষে মহামারী সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাস আমাদের কাছে নতুন হলেও এই ভাইরাস আসলে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরে ইবোলার মতো একটা ভাইরাসের জিন পেয়েছেন। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাসের মতো এই ভাইরাস তার পোষকের দেহে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে গিয়েছে। ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরের পূর্বপুরুষ বাস করতো আজ থেকে ষোল মিলিয়ন বছর আগে। আর তখনই হয়তো ইবোলা ভাইরাস তার নিকট আত্মীয় মার্গবার্গ ভাইরাস হতে বর্তমান রূপে অবতীর্ণ হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইবোলার বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস স্তন্যপায়ীদের আক্রান্ত করে আসছে। অনেক পোষকে তারা কোনো ক্ষতি করতো না। ওই পোষক থেকে অন্য প্রজাতির কোনো পোষকে গেলে হয়তো তা তার জন্য মারণরূপ ধারণ করতো। ইবোলার শেষ আশ্রয় মানুষ।

এমন হতে পারে মানুষ যখন আক্রান্ত পশুর মাংস খায় কিংবা বাদুরের লালা যুক্ত ফল খায় তখন সে ইবোলায় আক্রান্ত হয়। ইবোলা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষকে আক্রান্ত করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভয়াবহ ডাইরিয়া, বমি এবং অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়।

ইবোলা একজন মানুষকে আক্রান্ত করার পরে তা অন্য কারও কাছে ছড়াবে কি ছড়াবে না তা নির্ভর করে পাশের মানুষগুলো কাজকর্মের উপর। যদি তারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তাহলে তারাও ইবোলা দিয়ে আক্রান্ত হবে। ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ৩৭ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় প্রথম মহামারী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ইবোলা ভাইরাস হারিয়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রত্যেকেই হয়তো মারা গিয়েছিল।

গত ৩৭ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ সালে আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল ২২১ মিলিয়ন। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ বিলিয়নের উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়ানোই অনেক কঠিন ছিল। এখন বনজঙ্গল কেটে শহর হচ্ছে। বাড়ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর সাথে বাড়ছে ইবোলার সংক্রমণ।

কিন্তু গিয়েনা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনি এর মতো দেশে গণস্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর দারিদ্রের ফলে এসব দেশে ডাক্তার ও হাসপাতালের সংখ্যা কম। আর ইবোলায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরাও এতে আক্রান্ত হয়। ফলে মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব পড়ে।

চিত্র: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরাও ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের নাগরিক পলিনকে যিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কেউ জানে না এমিলি ওয়ামনো কীভাবে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু থেকে ছড়ানো ভাইরাসটিই ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী সৃষ্টি করে। দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে তাদেরকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পোলিও নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ইবোলাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিম আফ্রিকার সরকারগুলো ইবোলায় আক্রান্ত পুরো গ্রাম কিংবা এলাকাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকলো। কারণ তাদের আর কিছু করার ছিল না। আর অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

ইবোলা সর্বপ্রথম বাইরের দেশে যায় এরোপ্লেনের মাধ্যমে। একবার ইবোলায় আক্রান্ত এক কূটনীতিবিদ প্ল্যানে নাইজেরিয়া যান। ওখানে তার ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আরেকটি প্ল্যানে একজন আক্রান্ত নার্সকে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আর দুইটি প্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাস আসে। একটা হোস্টনে আরেকটা নিউইয়র্কে।

আফ্রিকার বাইরের খুব কম মানুষ ইবোলা সম্বন্ধে জানতো। একটু আধটু যা জানতো তা রিচার্ড প্রেস্টনের ‘দ্য হট জোন’ এর মতো ভীতিকর বই কিংবা ‘আউটব্রেক’ নামের কাল্পনিক মুভি থেকে। পুরো আমেরিকা ইবোলার ভয়ে ভীত ছিল। ২০১৪ সালের নেয়া এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করে আমেরিকায় ইবোলার মহামারী হতে পারে। ৪৩ শতাংশ লোক মনে করেন তিনি ইবোলায় আক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে গেলো যে ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখ খবর এলো যে ডাক্তার গিয়েনাতে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন। রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে তিনি এক জায়গায় বোলিং করতে যান।

উদ্বিগ্ন পাঠকরা নিউইয়র্ক টাইমসকে জিজ্ঞেস করতে থাকে বল থেকে ইবোলা ছড়াতে পারে কিনা। সাংবাদিক ডোনাল্ড ম্যাকনিল জুনিয়র খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ইবোলায় আক্রান্ত কেউ যদি রক্ত, বমি কিংবা মল বলে রেখে যায় আর আরেকজন যদি তাতে হাত রাখে। পরে সেই হাত চোখে, নাকে কিংবা নাকে লাগায় তাহলে ইবোলা ছড়াতে পারে।”

এত আশঙ্কার পরেও আমেরিকাতে ইবোলার কোনো মহামারী হয়নি। এমনকি অন্য কোথাও হয়নি। নাইজেরিয়াতে ২০ জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে আটজন মারা যায়। সেনেগালে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়। মালিতে মহামারী বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এসব দেশ মহামারী ঠেকাতে সক্ষম হওয়ার একটা কারণ হলো তাদের কাছে আগে থেকে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল। অন্যদিকে লাইবেরিয়া, গিনিয়া এবং সিয়েরা লিওনিতে ইবোলার সংক্রমণ চলতে থাকে। এসব দেশে ইবোলার সংক্রমণ এতই বেশি যে সেখানে এতো সহজে তা থামার নয়।

বিশেষজ্ঞরা ইবোলার এই মাত্রা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ দশমিক ৪ মিলিয়নে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং কিউবা সেসব আক্রান্ত এলাকায় ডাক্তার ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

নতুন ইবোলা হাসপাতাল তৈরি হলো। গণস্বাস্থ্য কর্মীরা মানুষকে সচেতন করে দিলো যাতে তারা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সাবধানের সাথে দাফন করে। যাতে করে মৃত ব্যক্তি থেকে জীবাণু না ছড়ায়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে লাইবেরিয়া, গিনিয়াতে মহামারীর মাত্রা কমতে থাকে। পরের কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক কমে যায়।

তবে মনে করার কোনো কারণ নেই যে এই মহামারী শেষ হলেই ইবোলা চিরতরে বিদায় নেবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে যেখানে ইবোলা ভবিষ্যতে আঘাত হানতে পারে, কোন কোন প্রাণীতে এই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে আর ওই এলাকায় মানুষের বসবাসের অবস্থার তার উপর ভিত্তি করে এই ম্যাপটি করা হয়েছে।

এই ম্যাপের বেশিরভাগ অংশ মধ্য আফ্রিকা জুড়ে। আর বাকি অংশগুলো তানজানিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই ম্যাপ অনুসারে ২২ মিলিয়ন লোকের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আর আফ্রিকার লোক যত বাড়ছে এই ঝুকিও দিন দিন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিত্র: ইবোলা সংক্রমণের অনুমিত ম্যাপ।

ইবোলার মতো এরকম আরও অনেক ভাইরাস নানা সময় আবির্ভাব হয়েছে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের এক কৃষক অতিরিক্ত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে চীনের ওই অঞ্চলের লোক ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে থাকে। কিন্তু সবাই তখনো এই রোগ সম্বন্ধে জানতো না।

একবার এক আমেরিকান ব্যবসায়ী চীন থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে এরোপ্লেনে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্লেনটি হানই এ থামে এবং লোকটি মারা যায়। এই ঘটনার ফলে পুরো বিশ্বে নাড়া পড়ে। সারা পৃথিবী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় চীন ও হংকং। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ লোক মারা যায়। ডাক্তাররা এই নতুন রোগের নাম দেন সার্স (Severe acute respiratory syndrome)।

চিত্র: সার্স ভাইরাস।

বিজ্ঞানীরা এই রোগে আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলেন। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মালিক পেইরিস ও তার দল এই রোগের কারণ খুঁজে পান। এই ভাইরাসটি ছিল করোনাভাইরাস (Coronavirus) গ্রুপের। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করলেন এইচআইভি এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো সার্স ভাইরাসও হয়তো এমন কোনো ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়েছে যা কোনো পশুকে আক্রমণ করতো।

চীনের মানুষেরা যেসব পশুর সাথে সচরাচর বেশি সংস্পর্শে থাকে তাদের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এভাবে তারা সার্স ভাইরাসের বিবর্তন বৃক্ষ পেয়ে গেলেন। জানা হলো সার্স ভাইরাসের ইতিহাস।

এই ভাইরাস হয়তো প্রথমে চীনের বাদুড়ে পাওয়া যায়। বাদুড় থেকে বিড়াল সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘সিভিট’ (Civet)-এ ছড়ায়। সিভিট চীনের পশু বাজারে নিত্যদিন দেখা যায়। সিভিট থেকে এই ভাইরাস পরে মানুষে ছড়ায়। আর এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়াতে পারে। যেমন হাঁচি-কাশির মতো খুব সাধারণ ব্যাপার থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

ইবোলা সংক্রমণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল সার্সের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সেগুলো সফলও হয়। সার্সের ফলে ৯০০০ লোক এতে আক্রান্ত হয় এবং ৯০০ লোক মারা যায়। আর এরকম ফ্লু-তে আড়াই লাখ মানুষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। সার্স সে তুলনায় খুব অল্পতেই সেরে গিয়েছে বলা যায়।

এর এক যুগ পর আরেক ধরনের করোনাভাইরাস সৌদি আরবে দেখা যায়। ২০১২ সালে সৌদি আরবের ডাক্তাররা দেখতে পেলেন তাদের রোগীরা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা এই রোগ আসলে কী নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আক্রান্ত রোগীর এক তৃতীয়াংশ এই রোগে মারা যায়।

রোগটি MERS (Middle Eastern Respiratory Syndrome) নামে পরিচিত হয়। খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভাইরাসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ভাইরাসের জিনোমে সিকুয়েন্সিং করে তারা এর কাছাকাছি একটি ভাইরাস আফ্রিকার বাদুড়ের মধ্যে পেলেন।

আফ্রিকার বাদুড় থেকে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রোগ ছড়াতে পারে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। তারা সৌদি আরবের মানুষের জীবন যার উপর নির্ভর করে তাকে গবেষণা শুরু করলেন। আর তা হলো উট। তারা উটের সর্দিতে MERS ভাইরাস পেলেন।

এখন প্রশ্ন আসে আফ্রিকার বাদুড় হতে মধ্যপ্রাচ্যের উটে এই ভাইরাস কীভাবে আসলো? এর কেবল একটাই উত্তর হতে পারে। বাদুড় হতে উত্তর আফ্রিকার উটে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়ায়। আর উত্তর আফ্রিকা হতে মধ্যপ্রাচ্যে উট কেনাবেচা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে উত্তর আফ্রিকার আক্রান্ত কোনো উট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উটগুলো MERS ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

SARS থেকে MERS আরও অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৌদি আরবে প্রতি বছর দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ সারা পৃথিবী থেকে হজ্জ করতে আসে। তাই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য এটা খুব ভালো পরিবেশ।

মানুষগুলো তখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজের দেশে গেলে ওখানেও সেই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০২৬ জন লোক MERS এ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গিয়েছে ৩৭৬ জন। আর এই ঘটনাগুলো সবই সৌদি আরবের ভেতরে। সৌদি আরবের বাইরে এই ভাইরাস এখনো ছড়ায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই ভাইরাস শুধুমাত্র দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মানুষেই রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের জন্যে একটা হুমকির কারণ হতে পারে।

চিত্র: হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয়, যা মহামারীর জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হজযাত্রী এবং হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভাইরাসের মহামারীর ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরকে খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরবর্তী মহামারীর ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী হতে আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে। আমরা হয়তো সেই ভাইরাস সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্যে বিজ্ঞানীরা পশুর মধ্যকার ভাইরাস সমীক্ষা করছেন।

কিন্তু আমরা যেহেতু ভাইরাসের কিলবিল করা পৃথিবীতে বাস করি তাই এই কাজটা বেশ কঠিন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক শহরে ১৩৩টি ইঁদুর ধরেন এবং ১৮ ধরনের ভাইরাস পান যা মানুষে আক্রমণকারী জীবাণুর কাছাকাছি। আরেক গবেষণায় বাংলাদেশের এক প্রজাতির বাদুড়ের উপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায় বাদুড়ে পাওয়া ৫৫টি ভাইরাসের ৫০টি ভাইরাসই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা!

এই অজানা ভাইরাসের কোনো একটি থেকে হয়তো সামনে বড় ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। তার মানে এই না যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। ভাইরাসগুলো যাতে অন্য প্রাণী হতে আমাদের মধ্যে না ছড়াতে পারে সেজন্যে সব ধরনের ব্যবস্থা আমাদের নিয়ে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses, Carl Zimmer

featured image: sciencealert.com

বৃহদাকার ভাইরাসে প্রাণের সংজ্ঞার দোটানা

যেখানেই পানি সেখানেই জীবন। সেই পানি হতে পারে বিশ্ববিখ্যাত ইয়েলোস্টোনের উষ্ণ প্রস্রবণ অথবা হাসপাতালের কুলিং টাওয়ারের পানি কিংবা হাকালুকি হাওরের ঘোলা পানি।

১৯৯২ সালে টিমোথি রোবোথাম নামের একজন অণুজীববিজ্ঞানী ইংল্যান্ডের একটি শহরের হাসপাতালের কুলিং টাওয়ার থেকে পানি সংগ্রহ করেন। কিছু অ্যামিবা ও এককোষী প্রটোজোয়া দেখতে পান সেখানে। সেগুলো আকারের দিক থেকে মানুষের কোষের সমান ছিল। ব্যাকটেরিয়ার দেখাও পেলেন, তবে সেগুলো একশো গুণ ছোট ছিল।

রোবোথাম ঐ শহরে নিউমোনিয়া মহামারীর কারণ খুঁজছিলেন। এটির দেখা পাবার পর তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার কাঙ্ক্ষিত কারণ পেয়ে গেছেন। রোবোথাম ভাবলেন তিনি একটি নতুন ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এই নতুন ব্যাকটেরিয়ার নাম দিলেন ব্রেডফোর্ডকক্কাস। এমন নামের কারণ হচ্ছে, ঐ শহরটির নাম ছিল ব্রেডফোর্ড।

বছরের পর বছর ব্রেডফোর্ডকক্কাস নিয়ে পড়ে রইলেন তিনি। দেখতে চাইলেন এটা আসলেই নিউমোনিয়া মহামারীর কারণ কিনা। অন্য প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার সাথে ব্রেডফোর্ডকক্কাসের জিন তুলনা করলেন। কিন্তু কোন মিল পেলেন না। শেষমেশ অর্থসংস্থান শেষ হয়ে যাওয়ায় তার ল্যাব বন্ধ করে দিতে হয়। পরে তার অদ্ভুত ব্রেডফোর্ডকক্কাসের নমুনা তার ফরাসি সহকর্মীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

তারপর বছরের পর বছর ব্রেডফোর্ডকক্কাস অবহেলার অন্ধকারে রয়ে যায়। অবশেষে বার্নার্ড লা স্কলা এই বিষয়টি দেখার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রেডফোর্ডকক্কাসকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখার সাথে সাথেই লা স্কলা বুঝতে পারেন কোথাও একটা বড় ধরনের সমস্যা আছে।

ব্রেডফোর্ডকক্কাসের পৃষ্ঠ ব্যাকটেরিয়ার মতো মসৃণ ছিল না। বরং এটা অনেকটা সকার বলের মতো ছিল। অনেকগুলো প্লেট একটির সাথে আরেকটি জোড়া লাগানো। বাইরের আবরণ থেকে চুলের মতো এক ধরনের প্রোটিন বের হয়েছে। বিজ্ঞানী লা স্কলা জানাতেন যে এধরনের গঠন কেবলমাত্র ভাইরাসেই দেখা যায়। কিন্তু ব্রেডফোর্ডকক্কাস ভাইরাস থেকে আকারে একশো গুণ বড় ছিল। এত বড় হলে কীভাবে কী?

অবশেষে প্রমাণিত হলো ব্রেডফোর্ডকক্কাস আসলে ভাইরাস। লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা যখন আবার পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন এটা অ্যামিবার ভেতরে প্রবেশ করে নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে। শুধুমাত্র ভাইরাসই এই উপায়ে বংশবৃদ্ধি করে। লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা ব্রেডফোর্ডকক্কাসের নতুন নাম দিলেন মিমিভাইরাস (Mimivirus)। কারণ তাদের আকার ব্যাকটেরিয়ার মতো (Mimic)।

চিত্রঃ ছোট ছোট খাঁজকাটা বলের আকৃতির মিমি ভাইরাস।

ফরাসি বিজ্ঞানীরা একসময় এই ভাইরাসের জিন বিশ্লেষণ করা শুরু করলেন। রোবোথাম মিমিভাইরাসের জিনকে ব্যাকটেরিয়ার জিনের সাথে তুলনা করে কোনো মিল খুঁজে পাননি। কিন্তু ফরাসি বিজ্ঞানীরা এবার মিমিভাইরাসকে অন্য ভাইরাসের সাথে তুলনা করে অনেক মিল পেলেন। মিমিভাইরাসে জিনের সংখ্যা ১০১৮।

ব্যাপারটা অনেকটা এমন যেন ফ্লু ও গুটি বসন্ত সহ আরো শখানেক ভাইরাসের জিন যেন এর একটি প্রোটিন আবরণে পুরে দেয়া হয়েছে। মিমি ভাইরাসের জিনের সংখ্যা অনেক ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও বেশি। আকার এবং জিন সংখ্যা উভয় দিক থেকেই এটি ভাইরাসের চিরায়িত সংজ্ঞাকে হার মানিয়েছে।

লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা ২০০৩ সালে মিমি ভাইরাস সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেন। তারা ভাবতে লাগলেন এমন বৃহদাকার ভাইরাস আরো আছে কিনা। ফ্রান্সের একটি কুলিং টাওয়ার থেকে পানি নিয়ে তাতে অ্যামিবা প্রদান করেন। উদ্দেশ্য পানির মধ্যকার কোনো কিছু অ্যামিবাকে আক্রান্ত করে কিনা তা দেখা।

দেখা গেল অ্যামিবাগুলো ভেঙ্গে টুকরো হয়ে নতুন ভাইরাস বের হচ্ছে। এরা মিমিভাইরাস নয়। এরা অন্য প্রজাতির। এদের জিন সংখ্যা ১০৫৯ যা ভাইরাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই ভাইরাসটি দেখতে মিমিভাইরাসের মতো হলেও এদের জিনোম আলাদা। বিজ্ঞানীরা মিমিভাইরাসের সাথে এর জিনোম তুলনা করে ৮৩৩ টি জিনের মিল পেয়েছে। নতুন এই ভাইরাসটির একটি নাম দরকার ছিল। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন মামা ভাইরাস।

এরপর অন্য গবেষকরাও বৃহদাকার ভাইরাসের খোঁজে লেগে গেলেন। দেখা গেলো এরা সবখানেই আছে। নদী, সাগর এমনকি অ্যান্টার্কটিকার বরফের নীচেও এদের দেখা পাওয়া গেছে। ২০১৪ সালে ফ্রান্সের গবেষকরা সাইবেরিয়ার চিরহিমায়িত অঞ্চলের বরফের টুকরো গলায় যা ৩০ হাজার বছর ধরে হিমায়িত ছিল। তারা সেখানে ১.৫ মাইক্রোমিটার আকারের বিশালাকার ভাইরাস পান। এত বড় ভাইরাস এখন পর্যন্ত আর পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞানীরা এবার প্রাণীদেহে কোনো বৃহদাকার ভাইরাস আছে কিনা তা খুঁজতে শুরু করেছেন। লা স্কলা এবং তার সহকর্মীরা ব্রাজিলিয়ান বিজ্ঞানীদের নিয়ে একত্র হয়ে স্তন্যপায়ীদের রক্ত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তারা বানর এবং গরুর রক্তে বৃহদাকার ভাইরাসের জন্য এন্টিবডি পেয়েছেন। গবেষকরা মানুষ থেকেও এধরনের ভাইরাস পেয়েছেন। নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী থেকেও এই ভাইরাস পাওয়া গেছে। এরা আমাদের শরীরে কী করে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

বৃহদাকার এই ভাইরাসগুলোর কাহিনী থেকে বোঝা যায় ভাইরাসের পৃথিবী সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানের গণ্ডি কত সীমাবদ্ধ। ভাইরাস শত বছরের পুরনো প্রশ্ন আমাদের সামনে আবার হাজির করেছে। বেঁচে থাকা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

ভাইরাস আবিষ্কারের পূর্বে বিজ্ঞানীরা জীবনের সংজ্ঞা নিয়ে একমত ছিলেন। জীব তাদের রাসায়নিক বিপাকের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে, বড় হয় এবং বংশবৃদ্ধি করে। অন্য বস্তু যেমন মেঘ কিংবা স্ফটিককে এক দিক থেকে জীব মনে হলেও এরা জীবের সকল শর্ত পূরণ করতে পারে না।

ওয়েন্ডেল স্টেনলি যখন টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক তৈরি করলেন তখন তিনি জীব ও জড়ের যে সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল তা ভেঙ্গে দেন। স্ফটিকের ভেতরে ভাইরাস বরফ কিংবা ডায়মণ্ডের মতো আচরণ করে। কিন্তু তামাক পাতার ভেতরে সেই একই ভাইরাস জীবের মতো আচরণ করে।

অণুপ্রাণ বিজ্ঞানের (Molecular Biology) উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা জানালেন ভাইরাসরা জীবের মতো কিন্তু সত্যিকারের জীব নয়। বিজ্ঞানীরা ভাইরাসের জিন গবেষণা করে দেখলেন ভাইরাসের জিন ন্যূনতম কিছু কাজ করতে পারে। যেমন পোষকের দেহে প্রবেশ করা, তাদের জিন পোষকের কোষে ছড়িয়ে দেয়া। কিন্তু পুরোপুরি জীব হওয়ার জন্য যে জিন দরকার তা এদের নেই। যেমন তাদের রাইবোজোম তৈরির কোন জিন নেই।

রাইবোজোমই আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরি করে। ভাইরাসের খাবার ভাঙবার যে এনজাইম দরকার সেই এনজাইম তৈরির জিন নেই। এককথায় পুরোপুরি জীব বলার জন্য যে জিনগুলি দরকার তা ভাইরাসের স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে নেই।

তাত্ত্বিকভাবে ভাইরাসের পক্ষেও পুরোপুরি জীব হওয়া সম্ভব। যতই হোক ভাইরাস তো আর পাথরের মতো জড় নয়। মিউটেশনের ফলে হয়তো কখনো ভাইরাসে নতুন কোনো ক্ষমতা যোগ হতে পারে। একটা ভাইরাস হয়তো অন্য ভাইরাস কিংবা অন্য কোনো পোষক থেকে জিন নিয়ে নিতে পারে। জিনোম বৃদ্ধির মাধ্যমে এরা হয়তো নিজে নিজে খাওয়া দাওয়া এবং বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

যখনই মনে হচ্ছিল ভাইরাস হয়তো প্রকৃত ‘জীব’ হতে পারে, তখনই বিজ্ঞানীরা তার উপর এক বিশাল বড় ‘না’ ঝুলিয়ে দিলেন। যেসব জীবের বড় জিনোম আছে তাদের সঠিকভাবে বংশবৃদ্ধির জন্যে কিছু উপায় অবলম্বন করতে হয়। আমরা আমাদের বৃহৎ জিনকে বাঁচানোর জন্য ভুল সংশোধনী (repair) এনজাইম তৈরি করি। এই কাজ পশুপাখি, গাছ, ছত্রাক, প্রটোজোয়া এমনকি ব্যাকটেরিয়াও করে। কিন্তু ভাইরাসের কোনো সংশোধনী এনজাইম নেই। ফলে তাদের প্রতিলিপি তৈরিতে অনেক ভুল হবে। অনেকসময় তা স্বাভাবিকের চেয়েও হাজারগুণ বেশি হবে।

এই অধিক মিউটেশনের হার ভাইরাসকে প্রকৃত জীব হবার ক্ষেত্রে বাঁধা প্রদান করবে। কোনো ভাইরাসের জিনোম বড় হয়ে গেলে তা ভাইরাসের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। একারণেই হয়তো প্রাকৃতিক নির্বচন ভাইরাসের ছোট জিনোমকেই সমর্থন করেছে। ভাইরাস নতুন কোনো জিন যোগ করতে অপারগ। ফলে তারা কখনো একটি থেকে দুটি এভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারবে না। সবকথার এক কথা হলো ভাইরাস জীব নয়।

অণুজীববিজ্ঞানী আন্দ্রে লোফ ১৯৬৭ সালে নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করার সময় বলেন ‘জীব কোষ দিয়ে গঠিত’। ভাইরাসের কোন কোষ নেই। এদের শুধুমাত্র পোষক কোষে বংশবৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয় জিন আছে। ২০০০ সালে International Committee on Taxonomy of Virus সোজাসাপ্টা ঘোষণা করে ভাইরাস জীব নয়।

কিন্তু এই ঘোষণার কয়েক বছর পর ভাইরাসবিদরা এর বিরুদ্ধে অবস্থা গ্রহণ করে! নতুন আবিষ্কারের মুখে পুরনো সত্য অনেক সময় হুমকির মুখে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে বৃহদাকার ভাইরাসের কথা বলা যায়। এরা অনেকদিন ধরে চোখের অগোচরে থেকে যায়, কারণ এদের ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করতে সময় লেগে যায়।

এসব বৃহদাকার ভাইরাসে জিনের সংখ্যা অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা জানেন না এই ভাইরাসগুলো তাদের এত জিন দিয়ে কী করে। কেউ কেউ মনে করে তারা এসব জিন দিয়ে জীবের মতো কিছু না কিছু করে। কিছু কিছু জিন ভুল সংশোধনী এনজাইম তৈরি করে।

বৃহদাকার ভাইরাসগুলোর ‘ভাইরাল ফ্যাক্টরি’ আকৃতিতে ও কাজে অনেকটা কোষেরই মতো। ২০০৮ সালে লা স্কলা ও তার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেন এরা অন্য ভাইরাস দিয়েও আক্রান্ত হতে পারে। তারা ঐ ভাইরাসগুলোর নাম দেন ভিরোফাজ। এরা ভাইরাস ফ্যাক্টরির ভেতরে প্রবেশ করে বৃহদাকার ভাইরাস তৈরির বদলে ভিরোফাজ তৈরি করে।

প্রকৃতির মাঝে বিভেদ রেখা তৈরি করলে এতে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজ করতে সুবিধা হবে। কিন্তু জীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে গেলে এসব বিভেদ রেখা কৃত্রিম কিছু পরিমাপক ছাড়া আর কিছু নয়। ভাইরাস ও অন্যান্য জীব এক সূত্রে গাঁথা। ভাইরাসের জীবন আছে কি নেই এই বিতর্কের চেয়ে এই অনুধাবনই আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা মানুষরা স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ভাইরাসের জিনের মিশ্রণ। ভাইরাসের জিন যদি আমাদের শরীর থেকে বের করে ফেলা হয় তাহলে হয়তো আমরা গর্ভেই মারা যাব। বিভিন্ন সংক্রমণের প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও ভাইরাসের ডিএনএ আমাদের সাহায্য করে। আমরা প্রতি মুহূর্তে যে শ্বাস নেই তার কিছু অংশ আসে সমুদ্রের ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে।

নিশ্চিতভাবেই বলা যায় বৃহদাকার ভাইরাসগুলো সাধারণ ভাইরাস ও কোষের মধ্যবর্তী অবস্থা। কিন্তু এ অবস্থা তারা কীভাবে অর্জন করেছে তা এখনো অজানা। কিছু গবেষক মনে করেন বৃহদাকার ভাইরাসগুলো আগে সাধারণ ভাইরাসের মতোই ছিল। পরে পোষক থেকে জিন নিয়ে বর্তমান অবস্থায় এসেছে। আবার অনেকের মতে তারা প্রথমে মুক্ত কোষ হিসেবে ছিল। বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পথ পরিক্রমায় তারা বর্তমান অবস্থায় এসেছে।

জীব ও জড়ের মধ্যে একটি বিভেদ রেখা টানলে যে শুধু ভাইরাসকে বুঝতে অসুবিধা হয় তা-ই নয়, জীবন শুরুর পথকেই আসলে তখন অবজ্ঞা করা হয়। জীবন কীভাবে শুরু হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো কাজ করছেন। তবে তারা একটি ব্যাপারে নিশ্চিত। জীবন আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয়নি। বহুল সমর্থিত মত অনুসারে এটি সুগার ও ফসফেটের জটিল বিক্রিয়ায় ক্রমে ক্রমে সৃষ্টি হয়েছে।

হতে পারে একসূত্রক আরএনএ ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। তারপর সেই আরএনএ নিজের প্রতিলিপি তৈরি করার ক্ষমতা অর্জন করে। আরএনএ’র পৃথিবীতে জীবন ছিল কিছু জিনের পারস্পরিক সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে কিছু জিন টিকে থাকতো আর বাকি জিনগুলো পরজীবীর মতো আচরণ করতো। সেই আদি পরজীবীর কোনো কোনোটি হয়তো ভাইরাসে পরিণত হয়।

পেট্রিক ফর্টার নামের একজন ফরাসি ভাইরাসবিদের মতে আরএনএ পৃথিবীতে ভাইরাসরা নিজেদের জিন বাঁচানোর জন্য ডিএনএ তৈরি করেছিল। পরে তাদের দেহের পোষক তাদের ডিএনএ দখন করে নেয়। জীবন বলতে যা বুঝি তা আজকের অবস্থায় আসার জন্য ভাইরাসের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

আমরা ভাইরাসের দ্বৈত পৃথিবীর দেখা পাচ্ছি। যার একদিক হলো জীবন সৃষ্টিকারী আর অন্য দিক হলো জীবন বিনাশী। সৃষ্টি ও ধ্বংস যেন এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses (Second Edition), Carl Zimmer, University of Chicago Press (2015)

featured image: .quantamagazine.org

শরীর বাঁকানো রোগ ধনুষ্টঙ্কারের গল্প

ছোটবেলায় দুষ্টুমি করতে গিয়ে কতো লোহা-পেরেকের গুঁতো খেয়েছি। মায়ের কাছ থেকে শুনতে হতো- ‘লোহার গুঁতো খেলে কিন্তু টিটেনাস ইনজেকশন দিতে হবে’। এর অভিজ্ঞতাও আছে, লোহার গুঁতো খেয়ে আমাকে ইনজেকশনের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তখন মনে করতাম, ধনুষ্টঙ্কার হলে ঘাড় মটকিয়ে যায়। তাই ছোটবেলায় পেরেককে ভয় পেতাম খুব। আজ এতদিন পর আমি সেই ধনুষ্টঙ্কারের জন্য দায়ী অণুজীব নিয়েই আলোচনা করতে বসেছি।

ধনুষ্টঙ্কার সৃষ্টির জন্য দায়ী মূল অণুজীব হলো Clostridium tetani. কিতাসাতো নামের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম মানবদেহ থেকে ক্লস্ট্রিডিয়াম টিটানি আলাদা করেন। এরা কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে তা জানার আগে এদের সাথে একটু পরিচিত হওয়া দরকার। এদের প্রথম পরিচয় এরা গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া। দেখতে রডের মতো এবং অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এরা বাঁচতে পারে না। এজন্য এদেরকে অবাত শ্বসনকারী বলা হয়। এমনিতে অধিক তাপ সহ্য করতে পারে না, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে স্পোর সৃষ্টি করে।

মাটিতে, মানুষ ও পশুর মলে এদের বিচরণ। তবে এরা এমনিতেই মানবদেহে সংক্রমিত হয় না। শরীরে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হলে সেই ক্ষতে যদি এরা প্রবেশ করে তবে ধনুষ্টঙ্কার হয়। এরা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ও লসিকার মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে সাধারণত কয়েক মাস সময় লাগতে পারে তবে গড়ে ৮ দিনের মতো সময় লাগে। নবজাতকের ক্ষেত্রে সময় লাগে গড়ে ৭ দিনের মতো।

একটি অণুজীব শরীরে প্রবেশ করলেই রোগ সৃষ্টি করবে, এমন কিন্তু না। প্রত্যেক অণুজীবের নিজস্ব উপাদান থাকে যার মাধ্যমে সে রোগ সৃষ্টি করে। ইংরেজিতে যাকে বলে virulence factor. C.tetani’র ক্ষেত্রে সেই উপাদানটি হলো একটি টক্সিন, টিটানোস্পাসমিন (Tetanospasmin).

আমাদের শরীরের পেশী সংকোচন করে এসিটাইলকোলিন। ইনহিবিটোরি নিউরো-ট্রান্সমিটার এসিটাইলকোলিনকে শরীরে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে পেশী স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। কিন্তু টিটানোস্পাসমিন ইনহিবিটোরি নিউরোট্রান্সমিটারকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। ফলে শরীরে অস্বাভাবিক পেশী সংকোচন দেখা দেয়।

image source: medicalnewstoday.com

প্রথম দিকের এ রোগের উপসর্গ, মুখের চোয়াল লেগে যাওয়া। যাকে ‘লক জ’ (Lock jaw) বলে। অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো খিঁচুনি, খাবার গিলতে সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ঘাম, জ্বর ইত্যাদি। পেশীর অত্যধিক সংকোচনের ফলে স্পাইনাল কর্ড কিংবা শরীরের হাড় ভেঙ্গে যেতে পারে। শ্বাস প্রক্রিয়াও ব্যহত হতে পারে। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

ধনুষ্টঙ্কার চার ধরনের হতে পারে। একটি হলো সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার। আমরা ধনুষ্টঙ্কার বলতে মূলত একেই বুঝি। এটা আক্রান্ত স্থান থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রথম উপসর্গ হলো ‘লক জ’ বা চোয়াল লেগে জাওয়া। ধীরে ধীরে বাকি উপসর্গগুলো দেখা দেয়। সাধারণ ধনুষ্টঙ্কার থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক মাস সময় লাগে।

দ্বিতীয় প্রকার ধনুষ্টঙ্কার হলো লোকালাইজড (Localized) ধনুষ্টঙ্কার। এর মানে হলো আক্রান্ত স্থানেই এই ধনুষ্টঙ্কার সীমাবদ্ধ থাকে। এই ধনুষ্টঙ্কার খুবই কম হয়। এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।

তিন নম্বর ধনুষ্টঙ্কারটি হলো সেফালিক (Cephalic) ধনুষ্টঙ্কার। এটাও এক ধরনের লোকালাইজড ধনুষ্টঙ্কার। এটা আমাদের ক্রেনিয়াল নার্ভকে আক্রান্ত করে। ফলে মুখের পেশী আক্রান্ত হয়।

চিত্রঃ স্টেইনিংয়ের পর C.tetani কে টেনিস রেকেটের মতো দেখায়

সর্বশেষ ধনুষ্টঙ্কারটি হলো নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার। জন্মের পর নাড়ি কাটার সময় যদি জীবাণুযুক্ত কাচি ব্যবহার করা হয় তখন এ রোগের সংক্রমণ হয়। কিছু কিছু সংস্কৃতিতে নাড়ি কাটার পর তাতে গরুর গোবর দেয়া হয়। কি সাঙ্ঘাতিক! এ যেন দাওয়াত দিয়ে ধনুষ্টঙ্কার ডেকে নিয়ে আসা! যদিও এই রোগ ধীরে ধীরে কমছে তবুও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও এই রোগের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় করা যায় না। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয় মূলত রোগের উপসর্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়। কারণ C.tetani চিহ্নিত করার সমস্যা। আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ৩০% C.tetani শনাক্ত করা যায়। এমনকি সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও C.tetani চিহ্নিত হতে পারে। ধনুষ্টঙ্কার নির্ণয়ের আরেকটি উপায় হলো স্পাটুলা টেস্ট।

ধনুষ্টঙ্কার প্রতিরোধের জন্যে Tetanus toxoid টীকা নেয়া হয়। CDC এর মতে প্রতি দশ বছর পর পর ধনুষ্টঙ্কারের টীকা নেয়া উচিৎ। ধনুষ্টংকার চিকিৎসার জন্যে metronidazole, diazepam ব্যবহার করা হয়। শুরুতে পেরেক আর ধনুষ্টংকার নিয়ে যে কথা বলেছিলাম সেক্ষেত্রে বলে রাখি পেরেক বা লোহা বিঁধলেই যে ধনুষ্টংকার হবে এমন কোন কথা নেই। ধনুষ্টংকার হতে হলে সেই পেরেকে C.tetani থাকতে হবে।

featured image: oshatrainingu.com

অণুজীব পরিচিতিঃ ই-কোলাই

ইশেরেকিয়া কোলাই বা ই. কোলাই হলো অণুজীব জগতের তারকা-নায়ক। যারা খুব অল্প কয়েকটি অণুজীবের সাথে পরিচিত, তাদের অল্প কয়েকটির মাঝে অবশ্যই ই. কোলাই অণুজীবটি থাকে। ১৮৮৫ সালে জার্মান-অস্ট্রিয়ান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ Theodor Escherich মানুষের মলে ই. কোলাই আবিষ্কার করেন। তিনি খেয়াল করে দেখেন অনেক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যাচ্ছে। জার্ম থিওরি তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এশেরিখ ধারণা করলেন জার্ম থিওরির মাধ্যমেই এই রোগের কারণ বের করা যাবে। তিনি শিশুদের মল সংগ্রহ করে তা কালচার করলেন এবং তাতে রড আকারের এক ধরনের অণুজীব দেখলেন। তিনি তার নাম দিলেন Bacillus communis coli। এশেরিখের মৃত্যুর পর তার সম্মানে অণুজীবটির নাম রাখা হলো Escherichia Coli

চিত্রঃ থিওডর এশেরিখ।

ই. কোলাই রড আকারের একটি গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া। এরা fecultative anaerobic ধরনের। এ কথাটির মানে হলো, এরা অক্সিজেনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাতেই টিকে থাকতে পারে। এরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর অন্ত্রে বাস করে। মাত্র বিশ মিনিটে ই. কোলাই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলো এদের জন্যে অনুকূল তাপমাত্রা। ই. কোলাই মূলত কোলিফর্ম (Coliform) গোত্রের অণুজীব। কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া তারাই যারা ল্যাকটোজকে ফার্মেন্ট করতে পারে।

চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে ই. কোলাই।

আমাদের শরীরে কিছু অণুজীব এমনিতেই থাকে। এরা আমদের কোনো ক্ষতি করে না। উল্টো আমাদের শরীরবৃত্তীয় নানা কাজে সাহায্য করে। এদেরকে বলা হয় Normal Microbiota। ই. কোলাই নরমাল মাইক্রোবায়োটার অংশ। জন্মগ্রহণের সময় মানব শিশুর দেহে কোনো মাইক্রোবায়োটা

থাকে না। মায়ের দুধ থেকে, নার্স কিংবা আশেপাশের অন্যান্য মানুষ থেকে প্রায় হাজার ধরনের অণুজীব শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। তাদের মাঝে একটি হলো ই. কোলাই।

জেনেটিক্স এবং অণুজীববিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে ই. কোলাইকে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। Cohen এবং Herbert Boyer ই. কোলাইকে ব্যবহার করে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেছিন। এভাবে ই. কোলাইকে জেনেটিক দিক থেকে পরিবর্তন করে ভ্যাক্সিন তৈরি সহ নানা ধরনের এনজাইম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ার একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ই. কোলাই ব্যবহার করে ইনসুলিন তৈরি, যা লাখ লাখ ডায়েবেটিস রোগীর জীবনকে সহজ করেছে।

চিত্রঃ বায়ো আর্ট পদ্ধতিতে ই. কোলাই দিয়ে আঁকা আলবার্ট আইনস্টাইন।

নানাবিধ সুবিধা থাকার কারণে ই. কোলাইকে মডেল অর্গানিজম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। Joshoua Lederberg এবং Edward Tatum ১৯৪৬ সালে ই. কোলাই ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন আবিষ্কার করেন। T2 ফাজ ভাইরাসের জেনেটিক্স বোঝার জন্যেও ই. কোলাই বিশাল বড় ভূমিকা রেখেছে। Carl Zimmer এক ইন্টারভিউতে বলছিলেন, তিনি জানতে চাচ্ছিলেন জীবন কী? জীবনের প্রকৃতি কী? তো তিনি একটা বই লিখতে চাইলেন এ বিষয়ে। তিনি দেখলেন এ বিষয় নিয়ে বই লিখতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেগে যাবে। তো এটাকে ফোকাস করার জন্যে লিখলেন “Microcosm: E. Coli and the New Science of Life” যেখানে তিনি একটি বিষয় নিয়েই লিখেছেন কিন্তু তা শুধুমাত্র ই. কোলাই এর উপরে। একটি মাত্র অণুজীব নিয়ে আস্ত একটি বই, অবিশ্বাস্য!

প্রতিটি ই. কোলাইতে প্রায় ৪ হাজারের মতো জিন আছে। যেখানে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ায় জিনের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ’। ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম ই. কোলাইয়ের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয়। দেখা গেছে ই. কোলাইয়ের বিভিন্ন স্ট্রেইনের মধ্যে ২০% জিনের মিল আছে। বাকি ৮০% মিল নেই। এ ৮০% মিউটেশন ও অন্য প্রজাতি থেকে জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে হয়েছে। ই. কোলাইয়ের প্রতিটি জিনকে চারটি অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হয়। রিকম্বিনেশনের জন্যে দায়ী জিনকে recA দ্বারা প্রকাশ করা হয়। একইভাবে রয়েছে recB, recC, recD ইত্যাদি। আর প্রোটিনগুলোকে লেখা হয় বড় হাতের অক্ষর দিয়ে যেমনঃ RecA, RecB, RecC ইত্যাদি। জিন সিকোয়েন্সিং করার পর জিনগুলোকে সংখ্যা দ্বারা লেখা হয়। যেমনঃ b2819 দিয়ে recD জিনকে বোঝায়।

ই. কোলাই আমাদের জন্যে ভিটামিনকে তৈরি করে। ই. কোলাই অন্ত্রের অক্সিজেন ব্যবহার করে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে যা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার জন্যে সহায়ক। ওসব ব্যাকটেরিয়া তখন নানা ধরনের খাবার ভেঙ্গে দিয়ে হজমে সাহায্য করে। ই. কোলাই এর সব স্ট্রেইন রোগ সৃষ্টি করে না। কয়েক ধরনের ই. কোলাই রোগ সৃষ্টি করে। প্রত্যেকটা ধরণকে এক একটা ভিরোটাইপ (Virotype) বলে। নিচে ভিরোটাইপগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলার চেষ্টা করা হলো।

১. ETEC অর্থাৎ Enterotoxigenic E coli। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এরা টক্সিন তৈরি অর্থাৎ বিষক্রিয়ার মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। এরা শিশুদের ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। সাথে তৈরি করে ট্র্যাভেলার্স ডায়েরিয়া। ২. এরপর আসে EPEC। EPEC মানে হলো Enteropathogenic E. Coli। এরা কোনো বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এদের রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকটা Shigella অণুজীবের মতো। এরা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। ৩. EHEC বা Enterohemorrhagic E. coli। এদের কারণে রক্ত ডায়েরিয়া হয়। ৪. EIEC বা Enteroinvasive E. coli এবং EAEC বা Enteroaggregative E. coli, এ দুই ভিরোটাইপের জন্যেও ডায়েরিয়া হয়।

ই. কোলাই দ্বারা আক্রান্ত হলে পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, গ্যাস, ক্ষুধামন্দা, বমি ভাব, জ্বর এই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। রোগ আরো খারাপ পর্যায়ে গেলে প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। ই. কোলাই ঘটিত ডায়েরিয়ার জন্যে মূলত সালফোনামাইডস, এম্পিসিলিন, সেফালোসপরিন, ফ্লোরোকুইনোলোন্স, এমিনোগ্লাইকো-সাইড ব্যবহার করা হয়। তার সাথে রোগীকে যথেষ্ট পরিমাণে পানি, স্যালাইন খেতে হবে ও প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। উপসর্গ যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও দরকার হতে পারে।

এ ধরনের রোগ থেকে বাঁচার জন্যে খাবার ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। হাসপাতালে যাতে ই. কোলাই এর সংক্রমণ না হয় সে জন্যে সেখানে সবসময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

আগামী লেখায় টাইফয়েড রোগের জীবাণু Salmonella Typhi নিয়ে আলোচনা থাকবে। সে পর্যন্ত সবাই ই. কোলাই এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকুন।

তথ্যসূত্র

 

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব? এ বিষয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের ব্লগ অংশে Scott Barry Kaufman এর একটা লেখা পড়লাম। তিনি বলছেন, সৃষ্টিশীল লোকেরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যাপারটা এমন নয়। তারা চেনা পথে না চলে নিজেদের জন্যে নতুন পথ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী এরিকসন ও পুলের মতে সঠিক অনুশীলন আপনাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা এনে দেবে। সঠিক অনুশীলন বলতে উদ্দেশ্য ঠিক করা, কাজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সম্পন্ন করা, নিজের আয়ত্তের জায়গা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করা। এ ধরনের অনুশীলন কাজে লাগতে পারে দাবা খেলায় কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে।

যে ধরনের কাজে একই প্যাটার্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেখানে অনুশীলন খুবই কাজের। কিন্তু সব ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ঐরকম ক্ষেত্রে একই কাজ বার বার করা সফলতার অন্তরায়ও হতে পারে! এ ধরনের কাজ হলো ছবি আঁকা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, লেখালেখি কিংবা কোনো সুর তৈরি করা। এক্ষেত্রে একই উপন্যাস বার বার লিখলে বা একই সায়েন্টিফিক পেপার বার বার লিখলে ঔপন্যাসিক কিংবা বিজ্ঞানী সফল হবেন না।

এজন্য সৃজনশীল মানুষদের উপর অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করার একটা মানসিক চাপ থাকে। সৃজনশীল কাজকে হতে হবে মৌলিক (original), অর্থপূর্ণ এবং চমকপূর্ণ! মৌলিক এই অর্থে কাজটিকে সাধারণের থেকে আলাদা হতে হবে। অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে কাজটি কোনো বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। তাই সৃজনশীল মানুষেরা ক্রমাগত তাদের কাজের মাধ্যমে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে বেড়ায়। আর চমকপূর্ণ এই অর্থে তা মানুষের সচারাচর ধারণার বাইরে হবে। যেমন গ্যালিলিও কিংবা লিউয়েন হুকের আবিষ্কার ছিল সকলের কাছে নতুন ও বিস্ময়কর।

সৃজনশীলতা কি শুধুমাত্রই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব? এই যুক্তি খণ্ডনে স্কট ১২ টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

সৃজনশীলতা অনেকটা অজানার পথে পা বাড়ানোর মতো। সৃজনশীল কাজটি মানুষজন গ্রহণ করবে কিনা তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। মানুষের রুচি বুঝার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড় ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞতার সাথে এই মুহূর্তে কী করতে হবে তার একটা উপলব্ধি চলে আসে। এখন থিওরি লেখা হবে নাকি এক্সপেরিমেন্ট, কবিতা নাকি নাটক, পোট্রেট নাকি ল্যান্ডস্কেপ, সিম্ফনি নাকি অপেরা এসব সিদ্ধান্ত এই অনুভূতি থেকেই আসে। কিন্তু সৃজনশীলতা যদি নিছক অনুশীলন হতো তাহলে ছক বাধা রুটিন থেকে আগেই অনুমান করে জানা যেত ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

সৃজনশীল মানুষেরা নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগোয়। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন যারা তাদের মাস্টারপিস সৃষ্টির পরে খুব ভালো সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেক্সপিয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্মগুলো যখন করেন তার বয়স তখন আটত্রিশের কোটায়। তখন তিনি হেমলেটের মতো বিশ্ববিখ্যাত কাজ উপহার দেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তার Trolius and Cressida খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়তো। কিন্তু দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মধ্য বয়সে তাদের সৃজনশীলতার শীর্ষে উঠেছেন।

সৃজনশীল কাজের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। এটা আপনি ওজন কমানোর প্রোগ্রামে কতটুকু সফল হয়েছেন তার জন্য ওজন চেক করার মতো নয়। একটা উপন্যাস লিখতে কিংবা গণিতের একটা সমীকরণ লিখতে একজনকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন প্রতিক্রিয়া আসে তখন একেকজন সমালোচক একেকভাবে সমালোচনা করে। কোন সমালোচনা আসলেই কাজে লাগবে তখন তা বেঁছে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। সৃষ্টিশীল কাজের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে বইটা বেস্ট সেলিং পরের প্রজন্মের কাছে সেটা জঘন্য মনে হতে পারে। এমন চেলেঞ্জিং পথে শুধুমাত্র অনুশীলন খুব একটা কাজে দিবে না।

একটা মিথ আছে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্যে কমপক্ষে দশ বছর সময় দরকার। কথাটি সত্য নয়। কিছু কিছু সুরকারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা দশ বছরের আগেই তাদের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের দশ বছরের বেশি লেগেছে। সৃজনশীলতার কোনো এক্সপায়ার ডেট নেই। সৃজনশীল কাজ তখনই হবে যখন সময় তার জন্যে প্রস্তুত।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিভার ভূমিকা আছে। কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখতে পারে। তবে কোনো কিছুতে দক্ষতা অর্জন করাই মূল লক্ষ্য নয়। একজন সৃজনশীল মানুষ বাহ্যিক সকল জ্ঞান গ্রহণ করে যেন সে বাহ্যিকভাবে পৃথিবীতে যা নেই তা সে সৃষ্টি করতে পারে!

ব্যক্তিত্ব সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। একেকজন মানুষ একেক রকম। গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়। সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক্স ফ্যাক্টর আছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে শিল্পকলার চেয়ে বেশি আইকিউ দরকার।

জিনও সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। তবে তার মানে এই নয় যে জিন আমাদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তাতে জিনের প্রভাব রয়েছে এটুকু বলা যায়। সিমনটনের মতে, সৃজনশীলতার উপর জিনের প্রভাব এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশের মতো।

সৃজনশীলতার উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা এই পারিপার্শ্বিকতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা তার শৈশবে রোল মডেল হিসেবে কাকে পাচ্ছে এবং বেছে নিচ্ছে তাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

সৃজনশীল মানুষদের আগ্রহের জায়গাটা ব্যাপক। যেমন যিনি সুরকার তিনি হয়তো শিল্পকলা পছন্দ করেন, হয়তোবা লেখালেখিও করেন। গ্যালিলিওর পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এটা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে অন্য ক্ষেত্রে আগ্রহের দরকার ছিল না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিমাত্রায় অনুশীলন সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন প্রয়োজনের অতিরক্ত জ্ঞান আহরণ করলে ফিকশন লেখালেখিতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বহিরাগতরাও সৃজনশীল হতে পারে। সৃজনশীলতা যদি শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে হতো তাহলে তারা সৃজনশীল কাজ করতে পারতো না। কারণ বহিরাগতরা সুযোগ সুবিধা কম পান। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সুরকার Irving Berlin কিংবা চলচ্চিত্রকার Ang Lee এর কথা।

সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথ উন্মোচন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গ্যালিলিওর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতেন তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতেন না। তিনি যা করেছেন তা তখনকার বিজ্ঞানীরা কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু তার সেই তৈরি পথেই পরবর্তীতে অনেক প্রতিভাবান মানুষেরা পৃথিবীকে নিত্যনতুন জ্ঞান উপহার দিয়েছে।

সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখেন যেটা আগে কেউ দেখেনি। সৃজনশীলতাকে তাই আমাদের সঠিকভাবে বুঝা উচিত যেন আমরা প্রকৃতিকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি আর এর মূল্য কতটুকু তার উপলব্ধি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ব্লগ (blogs.scientificamerican.com/beautiful-minds/creativity-is-much-more-than-10-000-hours-of-deliberate-practice)

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

অণুজীব পরিচিতিঃ ই-কোলাই

ইশেরেকিয়া কোলাই বা ই. কোলাই হলো অণুজীব জগতের তারকা-নায়ক। যারা খুব অল্প কয়েকটি অণুজীবের সাথে পরিচিত, তাদের অল্প কয়েকটির মাঝে অবশ্যই ই. কোলাই অণুজীবটি থাকে। ১৮৮৫ সালে জার্মান-অস্ট্রিয়ান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ Theodor Escherich মানুষের মলে ই. কোলাই আবিষ্কার করেন। তিনি খেয়াল করে দেখেন অনেক শিশু ডায়রিয়ায় মারা যাচ্ছে। জার্ম থিওরি তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এশেরিখ ধারণা করলেন জার্ম থিওরির মাধ্যমেই এই রোগের কারণ বের করা যাবে। তিনি শিশুদের মল সংগ্রহ করে তা কালচার করলেন এবং তাতে রড আকারের এক ধরনের অণুজীব দেখলেন। তিনি তার নাম দিলেন Bacillus communis coli। এশেরিখের মৃত্যুর পর তার সম্মানে অণুজীবটির নাম রাখা হলো Escherichia Coli

চিত্রঃ থিওডর এশেরিখ।

ই. কোলাই রড আকারের একটি গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া। এরা fecultative anaerobic ধরনের। এ কথাটির মানে হলো, এরা অক্সিজেনের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি উভয় অবস্থাতেই টিকে থাকতে পারে। এরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর অন্ত্রে বাস করে। মাত্র বিশ মিনিটে ই. কোলাই বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হলো এদের জন্যে অনুকূল তাপমাত্রা। ই. কোলাই মূলত কোলিফর্ম (Coliform) গোত্রের অণুজীব। কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া তারাই যারা ল্যাকটোজকে ফার্মেন্ট করতে পারে।

চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে ই. কোলাই।

আমাদের শরীরে কিছু অণুজীব এমনিতেই থাকে। এরা আমদের কোনো ক্ষতি করে না। উল্টো আমাদের শরীরবৃত্তীয় নানা কাজে সাহায্য করে। এদেরকে বলা হয় Normal Microbiota। ই. কোলাই নরমাল মাইক্রোবায়োটার অংশ। জন্মগ্রহণের সময় মানব শিশুর দেহে কোনো মাইক্রোবায়োটা

থাকে না। মায়ের দুধ থেকে, নার্স কিংবা আশেপাশের অন্যান্য মানুষ থেকে প্রায় হাজার ধরনের অণুজীব শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। তাদের মাঝে একটি হলো ই. কোলাই।

জেনেটিক্স এবং অণুজীববিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে ই. কোলাইকে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়। Cohen এবং Herbert Boyer ই. কোলাইকে ব্যবহার করে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেছিন। এভাবে ই. কোলাইকে জেনেটিক দিক থেকে পরিবর্তন করে ভ্যাক্সিন তৈরি সহ নানা ধরনের এনজাইম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ার একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ই. কোলাই ব্যবহার করে ইনসুলিন তৈরি, যা লাখ লাখ ডায়েবেটিস রোগীর জীবনকে সহজ করেছে।

চিত্রঃ বায়ো আর্ট পদ্ধতিতে ই. কোলাই দিয়ে আঁকা আলবার্ট আইনস্টাইন।

নানাবিধ সুবিধা থাকার কারণে ই. কোলাইকে মডেল অর্গানিজম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। Joshoua Lederberg এবং Edward Tatum ১৯৪৬ সালে ই. কোলাই ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন আবিষ্কার করেন। T2 ফাজ ভাইরাসের জেনেটিক্স বোঝার জন্যেও ই. কোলাই বিশাল বড় ভূমিকা রেখেছে। Carl Zimmer এক ইন্টারভিউতে বলছিলেন, তিনি জানতে চাচ্ছিলেন জীবন কী? জীবনের প্রকৃতি কী? তো তিনি একটা বই লিখতে চাইলেন এ বিষয়ে। তিনি দেখলেন এ বিষয় নিয়ে বই লিখতে গেলে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লেগে যাবে। তো এটাকে ফোকাস করার জন্যে লিখলেন “Microcosm: E. Coli and the New Science of Life” যেখানে তিনি একটি বিষয় নিয়েই লিখেছেন কিন্তু তা শুধুমাত্র ই. কোলাই এর উপরে। একটি মাত্র অণুজীব নিয়ে আস্ত একটি বই, অবিশ্বাস্য!

প্রতিটি ই. কোলাইতে প্রায় ৪ হাজারের মতো জিন আছে। যেখানে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ায় জিনের সংখ্যা মাত্র কয়েকশ’। ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম ই. কোলাইয়ের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করা হয়। দেখা গেছে ই. কোলাইয়ের বিভিন্ন স্ট্রেইনের মধ্যে ২০% জিনের মিল আছে। বাকি ৮০% মিল নেই। এ ৮০% মিউটেশন ও অন্য প্রজাতি থেকে জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে হয়েছে। ই. কোলাইয়ের প্রতিটি জিনকে চারটি অক্ষর দ্বারা প্রকাশ করা হয়। রিকম্বিনেশনের জন্যে দায়ী জিনকে recA দ্বারা প্রকাশ করা হয়। একইভাবে রয়েছে recB, recC, recD ইত্যাদি। আর প্রোটিনগুলোকে লেখা হয় বড় হাতের অক্ষর দিয়ে যেমনঃ RecA, RecB, RecC ইত্যাদি। জিন সিকোয়েন্সিং করার পর জিনগুলোকে সংখ্যা দ্বারা লেখা হয়। যেমনঃ b2819 দিয়ে recD জিনকে বোঝায়।

ই. কোলাই আমাদের জন্যে ভিটামিনকে তৈরি করে। ই. কোলাই অন্ত্রের অক্সিজেন ব্যবহার করে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে যা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার জন্যে সহায়ক। ওসব ব্যাকটেরিয়া তখন নানা ধরনের খাবার ভেঙ্গে দিয়ে হজমে সাহায্য করে। ই. কোলাই এর সব স্ট্রেইন রোগ সৃষ্টি করে না। কয়েক ধরনের ই. কোলাই রোগ সৃষ্টি করে। প্রত্যেকটা ধরণকে এক একটা ভিরোটাইপ (Virotype) বলে। নিচে ভিরোটাইপগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলার চেষ্টা করা হলো।

১. ETEC অর্থাৎ Enterotoxigenic E coli। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এরা টক্সিন তৈরি অর্থাৎ বিষক্রিয়ার মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। এরা শিশুদের ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। সাথে তৈরি করে ট্র্যাভেলার্স ডায়েরিয়া। ২. এরপর আসে EPEC। EPEC মানে হলো Enteropathogenic E. Coli। এরা কোনো বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এদের রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেকটা Shigella অণুজীবের মতো। এরা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়েরিয়া সৃষ্টি করে। ৩. EHEC বা Enterohemorrhagic E. coli। এদের কারণে রক্ত ডায়েরিয়া হয়। ৪. EIEC বা Enteroinvasive E. coli এবং EAEC বা Enteroaggregative E. coli, এ দুই ভিরোটাইপের জন্যেও ডায়েরিয়া হয়।

ই. কোলাই দ্বারা আক্রান্ত হলে পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, গ্যাস, ক্ষুধামন্দা, বমি ভাব, জ্বর এই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। রোগ আরো খারাপ পর্যায়ে গেলে প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। ই. কোলাই ঘটিত ডায়েরিয়ার জন্যে মূলত সালফোনামাইডস, এম্পিসিলিন, সেফালোসপরিন, ফ্লোরোকুইনোলোন্স, এমিনোগ্লাইকো-সাইড ব্যবহার করা হয়। তার সাথে রোগীকে যথেষ্ট পরিমাণে পানি, স্যালাইন খেতে হবে ও প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। উপসর্গ যদি খারাপের দিকে যায় তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ারও দরকার হতে পারে।

এ ধরনের রোগ থেকে বাঁচার জন্যে খাবার ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। হাসপাতালে যাতে ই. কোলাই এর সংক্রমণ না হয় সে জন্যে সেখানে সবসময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।

আগামী লেখায় টাইফয়েড রোগের জীবাণু Salmonella Typhi নিয়ে আলোচনা থাকবে। সে পর্যন্ত সবাই ই. কোলাই এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকুন।

তথ্যসূত্র

 

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব? এ বিষয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের ব্লগ অংশে Scott Barry Kaufman এর একটা লেখা পড়লাম। তিনি বলছেন, সৃষ্টিশীল লোকেরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যাপারটা এমন নয়। তারা চেনা পথে না চলে নিজেদের জন্যে নতুন পথ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী এরিকসন ও পুলের মতে সঠিক অনুশীলন আপনাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা এনে দেবে। সঠিক অনুশীলন বলতে উদ্দেশ্য ঠিক করা, কাজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সম্পন্ন করা, নিজের আয়ত্তের জায়গা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করা। এ ধরনের অনুশীলন কাজে লাগতে পারে দাবা খেলায় কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে।

যে ধরনের কাজে একই প্যাটার্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেখানে অনুশীলন খুবই কাজের। কিন্তু সব ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ঐরকম ক্ষেত্রে একই কাজ বার বার করা সফলতার অন্তরায়ও হতে পারে! এ ধরনের কাজ হলো ছবি আঁকা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, লেখালেখি কিংবা কোনো সুর তৈরি করা। এক্ষেত্রে একই উপন্যাস বার বার লিখলে বা একই সায়েন্টিফিক পেপার বার বার লিখলে ঔপন্যাসিক কিংবা বিজ্ঞানী সফল হবেন না।

এজন্য সৃজনশীল মানুষদের উপর অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করার একটা মানসিক চাপ থাকে। সৃজনশীল কাজকে হতে হবে মৌলিক (original), অর্থপূর্ণ এবং চমকপূর্ণ! মৌলিক এই অর্থে কাজটিকে সাধারণের থেকে আলাদা হতে হবে। অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে কাজটি কোনো বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। তাই সৃজনশীল মানুষেরা ক্রমাগত তাদের কাজের মাধ্যমে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে বেড়ায়। আর চমকপূর্ণ এই অর্থে তা মানুষের সচারাচর ধারণার বাইরে হবে। যেমন গ্যালিলিও কিংবা লিউয়েন হুকের আবিষ্কার ছিল সকলের কাছে নতুন ও বিস্ময়কর।

সৃজনশীলতা কি শুধুমাত্রই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব? এই যুক্তি খণ্ডনে স্কট ১২ টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

সৃজনশীলতা অনেকটা অজানার পথে পা বাড়ানোর মতো। সৃজনশীল কাজটি মানুষজন গ্রহণ করবে কিনা তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। মানুষের রুচি বুঝার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড় ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞতার সাথে এই মুহূর্তে কী করতে হবে তার একটা উপলব্ধি চলে আসে। এখন থিওরি লেখা হবে নাকি এক্সপেরিমেন্ট, কবিতা নাকি নাটক, পোট্রেট নাকি ল্যান্ডস্কেপ, সিম্ফনি নাকি অপেরা এসব সিদ্ধান্ত এই অনুভূতি থেকেই আসে। কিন্তু সৃজনশীলতা যদি নিছক অনুশীলন হতো তাহলে ছক বাধা রুটিন থেকে আগেই অনুমান করে জানা যেত ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

সৃজনশীল মানুষেরা নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগোয়। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন যারা তাদের মাস্টারপিস সৃষ্টির পরে খুব ভালো সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেক্সপিয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্মগুলো যখন করেন তার বয়স তখন আটত্রিশের কোটায়। তখন তিনি হেমলেটের মতো বিশ্ববিখ্যাত কাজ উপহার দেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তার Trolius and Cressida খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়তো। কিন্তু দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মধ্য বয়সে তাদের সৃজনশীলতার শীর্ষে উঠেছেন।

সৃজনশীল কাজের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। এটা আপনি ওজন কমানোর প্রোগ্রামে কতটুকু সফল হয়েছেন তার জন্য ওজন চেক করার মতো নয়। একটা উপন্যাস লিখতে কিংবা গণিতের একটা সমীকরণ লিখতে একজনকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন প্রতিক্রিয়া আসে তখন একেকজন সমালোচক একেকভাবে সমালোচনা করে। কোন সমালোচনা আসলেই কাজে লাগবে তখন তা বেঁছে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। সৃষ্টিশীল কাজের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে বইটা বেস্ট সেলিং পরের প্রজন্মের কাছে সেটা জঘন্য মনে হতে পারে। এমন চেলেঞ্জিং পথে শুধুমাত্র অনুশীলন খুব একটা কাজে দিবে না।

একটা মিথ আছে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্যে কমপক্ষে দশ বছর সময় দরকার। কথাটি সত্য নয়। কিছু কিছু সুরকারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা দশ বছরের আগেই তাদের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের দশ বছরের বেশি লেগেছে। সৃজনশীলতার কোনো এক্সপায়ার ডেট নেই। সৃজনশীল কাজ তখনই হবে যখন সময় তার জন্যে প্রস্তুত।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিভার ভূমিকা আছে। কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখতে পারে। তবে কোনো কিছুতে দক্ষতা অর্জন করাই মূল লক্ষ্য নয়। একজন সৃজনশীল মানুষ বাহ্যিক সকল জ্ঞান গ্রহণ করে যেন সে বাহ্যিকভাবে পৃথিবীতে যা নেই তা সে সৃষ্টি করতে পারে!

ব্যক্তিত্ব সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। একেকজন মানুষ একেক রকম। গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়। সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক্স ফ্যাক্টর আছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে শিল্পকলার চেয়ে বেশি আইকিউ দরকার।

জিনও সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। তবে তার মানে এই নয় যে জিন আমাদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তাতে জিনের প্রভাব রয়েছে এটুকু বলা যায়। সিমনটনের মতে, সৃজনশীলতার উপর জিনের প্রভাব এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশের মতো।

সৃজনশীলতার উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা এই পারিপার্শ্বিকতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা তার শৈশবে রোল মডেল হিসেবে কাকে পাচ্ছে এবং বেছে নিচ্ছে তাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

সৃজনশীল মানুষদের আগ্রহের জায়গাটা ব্যাপক। যেমন যিনি সুরকার তিনি হয়তো শিল্পকলা পছন্দ করেন, হয়তোবা লেখালেখিও করেন। গ্যালিলিওর পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এটা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে অন্য ক্ষেত্রে আগ্রহের দরকার ছিল না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিমাত্রায় অনুশীলন সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন প্রয়োজনের অতিরক্ত জ্ঞান আহরণ করলে ফিকশন লেখালেখিতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বহিরাগতরাও সৃজনশীল হতে পারে। সৃজনশীলতা যদি শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে হতো তাহলে তারা সৃজনশীল কাজ করতে পারতো না। কারণ বহিরাগতরা সুযোগ সুবিধা কম পান। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সুরকার Irving Berlin কিংবা চলচ্চিত্রকার Ang Lee এর কথা।

সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথ উন্মোচন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গ্যালিলিওর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতেন তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতেন না। তিনি যা করেছেন তা তখনকার বিজ্ঞানীরা কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু তার সেই তৈরি পথেই পরবর্তীতে অনেক প্রতিভাবান মানুষেরা পৃথিবীকে নিত্যনতুন জ্ঞান উপহার দিয়েছে।

সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখেন যেটা আগে কেউ দেখেনি। সৃজনশীলতাকে তাই আমাদের সঠিকভাবে বুঝা উচিত যেন আমরা প্রকৃতিকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি আর এর মূল্য কতটুকু তার উপলব্ধি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ব্লগ (blogs.scientificamerican.com/beautiful-minds/creativity-is-much-more-than-10-000-hours-of-deliberate-practice)

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।