অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব?

অনুশীলনের মাধ্যমে কি সৃজনশীল হওয়া সম্ভব? এ বিষয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকানের ব্লগ অংশে Scott Barry Kaufman এর একটা লেখা পড়লাম। তিনি বলছেন, সৃষ্টিশীল লোকেরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যাপারটা এমন নয়। তারা চেনা পথে না চলে নিজেদের জন্যে নতুন পথ তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানী এরিকসন ও পুলের মতে সঠিক অনুশীলন আপনাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা এনে দেবে। সঠিক অনুশীলন বলতে উদ্দেশ্য ঠিক করা, কাজগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সম্পন্ন করা, নিজের আয়ত্তের জায়গা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করা। এ ধরনের অনুশীলন কাজে লাগতে পারে দাবা খেলায় কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে।

যে ধরনের কাজে একই প্যাটার্ন বার বার ঘুরে ফিরে আসে সেখানে অনুশীলন খুবই কাজের। কিন্তু সব ক্ষেত্রে অনুশীলনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু কিছু কাজ আছে যেখানে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ঐরকম ক্ষেত্রে একই কাজ বার বার করা সফলতার অন্তরায়ও হতে পারে! এ ধরনের কাজ হলো ছবি আঁকা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, লেখালেখি কিংবা কোনো সুর তৈরি করা। এক্ষেত্রে একই উপন্যাস বার বার লিখলে বা একই সায়েন্টিফিক পেপার বার বার লিখলে ঔপন্যাসিক কিংবা বিজ্ঞানী সফল হবেন না।

এজন্য সৃজনশীল মানুষদের উপর অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করার একটা মানসিক চাপ থাকে। সৃজনশীল কাজকে হতে হবে মৌলিক (original), অর্থপূর্ণ এবং চমকপূর্ণ! মৌলিক এই অর্থে কাজটিকে সাধারণের থেকে আলাদা হতে হবে। অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে কাজটি কোনো বিষয়কে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করবে। তাই সৃজনশীল মানুষেরা ক্রমাগত তাদের কাজের মাধ্যমে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে বেড়ায়। আর চমকপূর্ণ এই অর্থে তা মানুষের সচারাচর ধারণার বাইরে হবে। যেমন গ্যালিলিও কিংবা লিউয়েন হুকের আবিষ্কার ছিল সকলের কাছে নতুন ও বিস্ময়কর।

সৃজনশীলতা কি শুধুমাত্রই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব? এই যুক্তি খণ্ডনে স্কট ১২ টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

সৃজনশীলতা অনেকটা অজানার পথে পা বাড়ানোর মতো। সৃজনশীল কাজটি মানুষজন গ্রহণ করবে কিনা তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। মানুষের রুচি বুঝার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা একটা বড় ভূমিকা রাখে। অভিজ্ঞতার সাথে এই মুহূর্তে কী করতে হবে তার একটা উপলব্ধি চলে আসে। এখন থিওরি লেখা হবে নাকি এক্সপেরিমেন্ট, কবিতা নাকি নাটক, পোট্রেট নাকি ল্যান্ডস্কেপ, সিম্ফনি নাকি অপেরা এসব সিদ্ধান্ত এই অনুভূতি থেকেই আসে। কিন্তু সৃজনশীলতা যদি নিছক অনুশীলন হতো তাহলে ছক বাধা রুটিন থেকে আগেই অনুমান করে জানা যেত ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে।

সৃজনশীল মানুষেরা নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগোয়। এমন অনেক প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন যারা তাদের মাস্টারপিস সৃষ্টির পরে খুব ভালো সৃষ্টিকর্ম রেখে যেতে পারেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শেক্সপিয়ার তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টিকর্মগুলো যখন করেন তার বয়স তখন আটত্রিশের কোটায়। তখন তিনি হেমলেটের মতো বিশ্ববিখ্যাত কাজ উপহার দেন। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তার Trolius and Cressida খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি। সৃজনশীলতা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে সময়ের সাথে সাথে তার মান বাড়তো। কিন্তু দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষ তাদের মধ্য বয়সে তাদের সৃজনশীলতার শীর্ষে উঠেছেন।

সৃজনশীল কাজের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় না। এটা আপনি ওজন কমানোর প্রোগ্রামে কতটুকু সফল হয়েছেন তার জন্য ওজন চেক করার মতো নয়। একটা উপন্যাস লিখতে কিংবা গণিতের একটা সমীকরণ লিখতে একজনকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়। আর যখন প্রতিক্রিয়া আসে তখন একেকজন সমালোচক একেকভাবে সমালোচনা করে। কোন সমালোচনা আসলেই কাজে লাগবে তখন তা বেঁছে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। সৃষ্টিশীল কাজের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হচ্ছে। আজ যে বইটা বেস্ট সেলিং পরের প্রজন্মের কাছে সেটা জঘন্য মনে হতে পারে। এমন চেলেঞ্জিং পথে শুধুমাত্র অনুশীলন খুব একটা কাজে দিবে না।

একটা মিথ আছে, সৃজনশীলতার বিকাশের জন্যে কমপক্ষে দশ বছর সময় দরকার। কথাটি সত্য নয়। কিছু কিছু সুরকারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে তারা দশ বছরের আগেই তাদের কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের দশ বছরের বেশি লেগেছে। সৃজনশীলতার কোনো এক্সপায়ার ডেট নেই। সৃজনশীল কাজ তখনই হবে যখন সময় তার জন্যে প্রস্তুত।

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে প্রতিভার ভূমিকা আছে। কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাড়াতাড়ি শিখতে পারে। তবে কোনো কিছুতে দক্ষতা অর্জন করাই মূল লক্ষ্য নয়। একজন সৃজনশীল মানুষ বাহ্যিক সকল জ্ঞান গ্রহণ করে যেন সে বাহ্যিকভাবে পৃথিবীতে যা নেই তা সে সৃষ্টি করতে পারে!

ব্যক্তিত্ব সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। একেকজন মানুষ একেক রকম। গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল মানুষের মাঝে নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা, স্বাধীনচেতা, নানা ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন, ঝুঁকি নেয়া এমনকি সামান্য মনোরোগও দেখা যায়। সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজস্ব এক্স ফ্যাক্টর আছে। যেমন পদার্থবিজ্ঞানে শিল্পকলার চেয়ে বেশি আইকিউ দরকার।

জিনও সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। তবে তার মানে এই নয় যে জিন আমাদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে। তবে তাতে জিনের প্রভাব রয়েছে এটুকু বলা যায়। সিমনটনের মতে, সৃজনশীলতার উপর জিনের প্রভাব এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশের মতো।

সৃজনশীলতার উপর পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রভাব রয়েছে। সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক অবস্থা এই পারিপার্শ্বিকতার অন্তর্ভুক্ত। শিশুরা তার শৈশবে রোল মডেল হিসেবে কাকে পাচ্ছে এবং বেছে নিচ্ছে তাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।

সৃজনশীল মানুষদের আগ্রহের জায়গাটা ব্যাপক। যেমন যিনি সুরকার তিনি হয়তো শিল্পকলা পছন্দ করেন, হয়তোবা লেখালেখিও করেন। গ্যালিলিওর পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলা, সাহিত্য এবং সঙ্গীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এটা শুধুমাত্র অনুশীলন হলে অন্য ক্ষেত্রে আগ্রহের দরকার ছিল না।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিমাত্রায় অনুশীলন সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন প্রয়োজনের অতিরক্ত জ্ঞান আহরণ করলে ফিকশন লেখালেখিতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।

নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বহিরাগতরাও সৃজনশীল হতে পারে। সৃজনশীলতা যদি শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে হতো তাহলে তারা সৃজনশীল কাজ করতে পারতো না। কারণ বহিরাগতরা সুযোগ সুবিধা কম পান। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে সুরকার Irving Berlin কিংবা চলচ্চিত্রকার Ang Lee এর কথা।

সৃজনশীল মানুষেরা বাকিদের জন্যে নতুন পথ উন্মোচন করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গ্যালিলিওর কথা। তার আবিষ্কার ছিল প্লেটো এবং এরিস্টটলের জ্যোতির্বিজ্ঞান মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন গ্যালিলিও যদি তার পূর্বে তৈরি পথে কঠোর অনুশীলন করতেন তাহলে তিনি এই নতুন সত্য জগতের সামনে মেলে ধরতে পারতেন না। তিনি যা করেছেন তা তখনকার বিজ্ঞানীরা কেউ মেনে নেয়নি। কিন্তু তার সেই তৈরি পথেই পরবর্তীতে অনেক প্রতিভাবান মানুষেরা পৃথিবীকে নিত্যনতুন জ্ঞান উপহার দিয়েছে।

সৃজনশীলরা তাদের পাগলামির মাধ্যমে জগতকে এমনভাবে দেখেন যেটা আগে কেউ দেখেনি। সৃজনশীলতাকে তাই আমাদের সঠিকভাবে বুঝা উচিত যেন আমরা প্রকৃতিকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি আর এর মূল্য কতটুকু তার উপলব্ধি সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ব্লগ (blogs.scientificamerican.com/beautiful-minds/creativity-is-much-more-than-10-000-hours-of-deliberate-practice)

পাখি কেন একই গান বারবার গায়

গ্রীষ্ম আর বসন্ত জুড়ে গাছে গাছে পাখির অবিরত কলতান শোনা যায়। কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে তারা একই একই গান বারবার উচ্চারণ করে। একই শব্দ বারবার গেয়ে চলার কারণ কী? কোনো সমস্যা নয়তো?

আসলে আমরা যে শব্দগুলোকে ‘গান’ বলে ধরে নিচ্ছি সেগুলো পাখিদের কাছে শুধুই গান নয়। এর চেয়ে বেশি কিছু। পাখিরা তাদের মুখ থেকে উচ্চারণ করা শব্দের মাধ্যমে নিজেদের সীমানা নির্ধারণ করে। কুকুরদের বেলায় যেমনটা দেখা যায় অনেকটা তেমন।

কুকুররা নিজের অধিকৃত এলাকাকে ঘিরে মূত্র ত্যাগ করে। যতটুকু এলাকা জুড়ে মূত্রের গন্ধ বিরাজমান ততটুকু এলাকা তার নিজের বলে অন্য কুকুরদের জানান দেয়। অন্যরাও এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলে। ভুলে কোনো কুকুরের এলাকায় ঢুকে পড়লে লেজ গুটিয়ে রাখে। নাছোড়বান্দা বাঁকা লেজ কীভাবে যেন তখন সোজা হয়ে যায়!

অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এরকম নিজের সীমানা নির্ধারণের প্রবণতা দেখা যায়। কেউ কেউ মূত্রের মাধ্যমে এই কাজটা করে আবার কেউ কেউ নিজের গায়ের গন্ধ ছড়িয়ে দেবার মাধ্যমে এই কাজটা করে। এমনকি মানুষের মাঝেও এই প্রবণতা বিদ্যমান। মানুষ বেড়া বা দেয়াল তৈরি করে নিজের সীমানা নির্ধারণ করে। পাখিদের বেলায় এমন সুবিধা নেই। কিন্তু তাদের নিজেদের এলাকা নির্ধারণ করার প্রবণতা ঠিকই আছে। পাখিরা তাদের এলাকা নির্ধারণের কাজটা করে চিৎকার চেঁচামেচির মাধ্যমে। যতটুকু এলাকা এলাকা ঘিরে শব্দ বিস্তার লাভ করলে ততটুকু এলাকা তার অধীনে। একই গান বারবার গাইবার মাধ্যমে অন্যান্য পাখিদের এই বার্তাই দেয় পাখিরা।

পাখিদের বেলায় চেঁচামেচি আরো বাড়তি সুবিধা দেয়। পুরুষ প্রজাতির চেঁচামেচি নারী প্রজাতিদের আকর্ষণ করে। অধিক চেঁচামেচি, কোনো পাখিকে অধিক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করতে সাহায্য করে। নারী সদস্যরা যখন ডিম দেয় এবং ডিমে তা দেয় তখন নারীরা অন্য কোনো কাজ করার ফুরসত পায় না। অনাগত সন্তানদের নিরাপত্তার দিকটা একদমই দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিপরীত লিঙ্গের যে সদস্যটি তাকে অধিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিবে নারী সদস্যটি তার সাথেই জোড়া বাধবে।

ছবি ক্রেডিটঃ Dikky Oesin | Shutterstock.com

পুরুষদেরও গান গাইতে অনেক শক্তি ব্যয় হয়। যখন গান গায় চেঁচামেচি করে তখন খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। শক্তি ব্যয় হওয়া এবং নতুন শক্তির যোগান না হওয়া- দুই দিক থেকেই লোকসান। পাশাপাশি আরো একটি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। পাখিরা যখন গান গায় তখন অন্য শিকারি প্রাণী সহজে তাদের শনাক্ত করে ফেলতে পারে, যা তাদের জীবনের জন্য হুমকি। এতসব লোকসান থাকার পরেও পাখিরা চেঁচামেচির কাজটা করে যায়। উদ্দেশ্য একটাই, বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করা।

গান গাওয়ার মাধ্যমে সে যেন বলে চলছে- হে নারী, তুমি এদিক দিয়ে উড়ে যাচ্ছ, নিশ্চয় আমার গান শুনতে পাচ্ছ, শ্রাব্যতার সীমার বিস্তৃতি বেশি হয়ে থাকলে নিশ্চয় দেখবে আমার গলা কতদূর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করছে, এই সীমানায় তোমার ক্ষতি করে এমন কেউ প্রবেশ করেছে তো মরেছে, দেখো আমার কণ্ঠ কত দারুণ, বিবেচনা করে দেখ এই রাজ্যে আমিই তোমার জন্য সবচেয়ে যোগ্য পাত্র!

শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্য চেঁচামেচি অন্য বার্তা বহন করে। শিশুরা চেঁচামেচির মাধ্যমে তাদের খাদ্যের চাহিদার কথা জানান দেয়।

তথ্যসূত্রঃ

লাইভ সায়েন্স

সম্মোহনের অন্য দিক

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ২০০১ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল নাশকে সম্মোহনবিদ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। পাশাপাশি অপবিজ্ঞানের প্রতি সোচ্চার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রতি ভালোবাসা ধারণকারী এই বিজ্ঞান সাময়িকীটি ড. নাশকে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে, তারা ছাপানোর আগে এই প্রবন্ধটির যথার্থতা হাতে কলমে যাচাই করে দেখবে। যেই কথা সেই কাজ। ড. নাশ এবং মনোবিজ্ঞান গবেষক গ্রান্ট বেনহাম একেবারে উড়ে আসলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ে, হাতে কলমে সাময়িকীটির কর্মচারীদের সম্মোহনের অভিজ্ঞতা দিতে। এরপর যা ঘটলো তা ঐখানকার বিজ্ঞানপিপাসুদের মোটেও কাম্য ছিল না।

ছয়জন কর্মচারীর তিনজন পুরুষ, তিনজন মহিলা- সবাইকেই সম্মোহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই গবেষক। ঘটনাটি প্রমাণ দিচ্ছে সম্মোহনবিদ্যা শুধুমাত্র সিনেমা বা টিভি পর্দায় আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর ভিত্তি আছে।

সম্মোহনের একদম কেতাবী সংজ্ঞায় যাওয়ার আগে আসুন দেখে নেই, সম্মোহিত অবস্থায় কী কী ঘটে আর কী কী ঘটে না। সম্মোহন পরিমাপের একটি স্কেল আছে Stanford Hypnotic Susceptibility Scales। এই স্কেল ০ থেকে ১২ পর্যন্ত স্কোর করা। স্কোর দেয়া হয় যেকোনো ১২ টি কাজের ভিত্তিতে। যেমন সম্মোহনের মাত্রা নির্ধারণের পরীক্ষার একটি সংস্করণে একদম কম স্কোরের একটি কাজ ছিল দুই হাত ছড়িয়ে বসে থাকা, আর বেশি স্কোরের সম্মোহিত অবস্থার মধ্যে ছিল অদৃশ্য বোতল থেকে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা। একটি পরীক্ষায় সম্মোহিত ব্যক্তিদের বলা হলো, তারা একটি ভারী বল ধরে আছে, এবং যাদের

হাত অদৃশ্য ভারী বল নেবার কারণে ঝুঁকে পড়লো তাদের ‘পাশ মার্ক’ দেওয়া হলো। আরেকটি পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্রদের বলা হলো, তাদের গন্ধ অনুধাবন করার মতো কোনো শক্তি নেই। তারপর তাদের সামনে অ্যামোনিয়ার বোতল খোলা হলো। যাদের ধারণা নেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ কেমন, তাদের গণশৌচাগারের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছি! পরীক্ষার লোকদের মাঝে যাদের এই কড়া গন্ধেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তাদের বলা হলো ‘উচ্চমাত্রায় সম্মোহিত’।

কেউ কি Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ স্কোর ১২ তুলতে সক্ষম? আমরা আবার ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর কর্মচারীদের উপর চালানো পরীক্ষায় ফিরে যাই। এই পরীক্ষায় একজন সর্বোচ্চ স্কোর ১২ করেছিলেন। ১২ প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন পর্যায়ে সম্মোহিত হয়েছিলেন? তার সম্মোহিত অবস্থায় কী ঘটেছিল তা পরে আর মনে করতে পারেননি তিনি। কারণ, সম্মোহনকারী তাকে সম্মোহিত অবস্থায় তার করা যাবতীয় কাজ ভুলে যেতে প্রণোদনা (Suggestion) দিয়েছিলেন। সম্মোহনের এমন উচ্চমাত্রা অর্জন খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষই সম্মোহিত অবস্থা শেষ হবার পর ঠিকই মনে করতে পারেন, তারা ঐ সময় কী কী করতে পেরেছিলেন বা পারেননি।

আমাদের উপর সম্মোহনের প্রভাব কেমন? বেশিরভাগ মানুষ Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ ৫-৭ স্কোর (মাঝারী পর্যায়) তুলতে সক্ষম। ৯৫% মানুষ ন্যূনতম স্কোর ১ তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সকলেই মোটামুটি কিছু পরিমাণ সম্মোহনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম। খুব কম সংখ্যক মানুষ সর্বোচ্চ স্কোর ১২ তুলতে পারেন। যেমন- পূর্বে আলোচিত পরীক্ষায় ৬ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সর্বোচ্চ স্কোরের অধিকারী।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, আসলে সম্মোহনের কোনো ব্যাপারই নেই। সবই স্রেফ ধাপ্পাবাজি, অভিনয়। বিজ্ঞানীদের মনেও এই সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্ক্যান করার ব্যবস্থা করলেন। এতে দেখা গেল, যারা আসলেই সম্মোহিত হয়েছে তাদের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চল, যেমন ডান সেরেবেলাম, বাম থ্যালামাস অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায়। যারা সম্মোহনের ভান ধরে তাদের মস্তিষ্কে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটি ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখুন।

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য একটি কেতাবী সংজ্ঞা দেই। বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, সম্মোহিত অবস্থা আমাদের চেতন মনেরই একটা অবস্থা যেখানে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের অখণ্ড কেন্দ্রীভুত মনোযোগ থাকে। এই সময় আশেপাশের অন্যান্য ভাবনা কমে যায় এবং এই আবিষ্ট অবস্থায় অন্যের Suggestion গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে। সম্মোহিত অবস্থার সাথে মনোযোগ দিয়ে বই পড়া বা টিভি দেখার মিল আছে। মনে করে দেখুন তো প্রিয় কোনো বইয়ে ডুবে গেলে আপনার আশেপাশের জগত সংসারের কথা খেয়াল থাকে কিনা? সম্মোহন ব্যাপারটিও এরকম।

সম্মোহিত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা বুঝতে একটি উদাহরণ দেই। পরীক্ষার একটি অংশ আপনি নিজেই করতে পারেন। একটি খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখুন ‘নীল’ আর নীল কালি দিয়ে লিখুন ‘লাল’, এভাবে আরো কয়েকটি রঙের নাম লিখবেন, তবে ভিন্ন রঙের কালি দিয়ে। এখন আপনার কোনো এক বন্ধুকে ডেকে কী রঙের নাম লেখা পড়তে বলুন। কাজটি যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা সহজ কিন্তু নয়। আমাদের মস্তিষ্ক দ্বন্দে পড়ে যায় এসময় সঠিক রঙটি বলার ক্ষেত্রে। এখন, যদি রঙের নাম ইংরেজি বা বাংলায় না হয়ে আপনার অজানা কোনো ভাষায় লেখা হতো তাহলে কিন্তু আপনি বা আপনার বন্ধু মোটেও কোনো ঝামেলায় পড়তেন না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবককে সম্মোহিত করে বলা হয়েছিল, “এখানে লেখা শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো সোজা বাংলায় হিজিবিজি হিজিবিজি”। তারপর তাদের কাছ থেকে রঙগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে রঙ দেখেই বলে দিলেন। কী লেখা আছে তার ধারেকাছেও গেলেন না। এরকম হবার কারণ কী? স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের শব্দ পড়ার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া আর চটজলদি রঙ বলতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়।

অপরদিকে, সম্মোহিত অবস্থায় আপনার কাছ থেকে যখন রঙের নাম জানতে চাওয়া হয়, তখনকার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা গেছে, এসময় Angulate Cingulate Cortex অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উদ্দীপনা দেখায়। এই অঞ্চলটি এমন দুই দিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, Visual Cortex-ও কম উদ্দীপ্ত হয়। লিখিত শব্দ চেনার কাজে ভিজুয়াল কর্টেক্স দরকার হয়।

সম্মোহন কী তা নিয়ে অনেক বলা হলো, এবার দেখি সম্মোহন বা সম্মোহিত অবস্থা কী নয় তা নিয়ে।

সম্মোহন কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে না। আপনার কল্পনাশক্তি ভালো, তার অর্থ এই নয় আপনি সম্মোহনের স্কেলে বেশি স্কোর তুলতে পারবেন। সম্মোহিত হবার জন্য আপনাকে শুয়ে বা বসে থাকতে হবে না। স্থির বাইসাইকেল চালানো অবস্থায়ও অনেক ব্যক্তিকে সম্মোহনের জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন- এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে, এটিও সম্পূর্ণ ভুল।

সম্মোহন কী কাজে লাগতে পারে? সম্মোহন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে কার্যকর। International Journal of Clinical and Experimental Hypnosis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্মোহনের মাধ্যমে দেয়া প্রণোদনায় ২৭ টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৩৩ জন পরীক্ষণ-পাত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যথা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, সম্মোহন কখনোই একক চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন রোগীর অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এর সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা তা একমাত্র চিকিৎসকই ঠিক করে দিবেন।

তথ্যসূত্র

  1. The Truth and Hype of Hypnosys, Scientific American, July, 2001
  2. Watch: Does Hypnotysm has any scientific basis? Sciencealart, 19 Nov, 2015

     

প্রকৃতির ভুলঃ প্রিয়ন ও অট্টহাসি রোগ

প্রিয়নের নানা রূপ [রুহশান আহমেদ]

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের একটি দ্বীপরাষ্ট্র স্যান লরেঞ্জোর শাসক ‘পাপা মনজানো’র বাবা ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। তার একটি আবিষ্কার হলো রহস্যময় আইস-নাইন, যার সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিও জমে গিয়ে আইস-নাইনে পরিণত হয়। বহুকাল সেই আইস নাইন ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। একসময় পাপা মনজানো ক্যান্সারের যন্ত্রণা সইতে না পেরে আইস-নাইন খেয়ে আত্নহত্যা করেন। তার জমে যাওয়া দেহের স্পর্শে এসে তার ডাক্তারও জমে গিয়ে মারা যান। এ যেন ছোটবেলায় খেলা বরফ-পানির বাস্তব এবং ট্র্যাজিক সংস্করণ। এতটুকুই নয়, ঘটনাক্রমে পাপার দেহ গিয়ে পড়ে সমুদ্রে এবং সারা পৃথিবীর পৃষ্টে ও পেটে যত পানি আছে সব জমে গিয়ে বিশাল দূর্যোগ সৃষ্টি করে। বাকীটা জানতে হলে পড়তে হবে কার্ট ভনেগাট এর লেখা কল্পকাহিনী Cat’s Cradle।

আমাদের সৌভাগ্য যে, আইস-নাইন কাল্পনিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর জৈবিক প্রতিরূপ বাস্তব, যার নাম প্রিয়ন। ব্রায়ান কহে এবং পিটার ল্যান্সবারি ভেড়ার স্ক্র্যাপি রোগ সম্বন্ধে রচিত একটি নিবন্ধে কাল্পনিক আইস নাইনের সাথে প্রিয়নের তুলনা করেন। প্রিয়ন কী? সেটি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে প্রোটিন কী, মূলত প্রোটিনের গঠন জানলেই হবে।

কুড়ি ধরনের অ্যামিনো এসিড আছে, যারা মিলে মিশে হাজার হাজার প্রোটিন তৈরি করে। কোষে যখন প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়, তখন প্রথমে বিভিন্ন অ্যামিনো এসিড একে অপরের সাথে চেইনের মতো করে যুক্ত হয়। এ চেইন কিন্তু প্রোটিনের মতো কাজ করে না। এজন্য চেইনকে নানাভাবে ভাঁজ খেয়ে, প্যাঁচ খেয়ে, কখনো কখনো অন্য আরেক চেইনের সাথে গিট্টু বেঁধে নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকৃতি অর্জন করলে তবেই সেই প্রোটিন আমাদের উপকারে আসবে। সে এক বিশাল আয়োজন। তবে যা-ই হোক, এই যে প্যাঁচগোচের ব্যাপার আছে প্রোটিনের গঠনে, তাতে যদি উল্টা-পাল্টা কোনো ভুল হয়? হ্যাঁ, ভুলের সবসময়ই একটা মাশুল আছে যা সেই প্রোটিনকেই দিতে হয় অন্য আরেক প্রোটিনের ঘ্যাচঘোচের শিকার হয়ে! তবে কখনো কখনো, ভুল প্যাঁচের প্রোটিন ঠিকই ফাঁকি দিয়ে বেঁচে যায়। আর নানান অসুবিধার কারণ হয়, এদের মধ্যে যেগুলো ভাইরাস/ব্যাক্টেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোই প্রিয়ন।

আচ্ছা এগুলো নাহয় বুঝলাম, তো প্রিয়ন কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে?

উদাহরণ হিসেবে ভেড়ার রোগ স্ক্র্যাপির কথাই ধরি, তার আগে বলে নিই স্ক্র্যাপি হলে ভেড়ার কী হয়। নিজেই নিজের হাত পা কামড়ায়, হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঝাঁকায়, মাতালের মতো হাঁটাহাঁটি করে, কোনো জিনিসে ক্রমাগতভাবে আঘাত করতে থাকে, সময়ে সময়ে খরগোশের মতো সামনের দু’পা তুলে লাফানোরও চেষ্টা করে। ভেড়ার সমাজে কোনো গল্পকার থাকলে নিশ্চয়ই স্ক্র্যাপি আক্রান্ত ভেড়াদের নিয়ে ভয়ংকর সব গল্প লিখতে পারতেন। ভেড়ার মগজে প্রয়োজনীয় একটি প্রোটিনের ভুল প্যাঁচ খাওয়া রূপ স্ক্র্যাপির জন্য দায়ী একটি প্রিয়ন। এ প্রিয়নের সংস্পর্শে এলে ভালো প্রোটিনও নিজের আকৃতি বদলে প্রিয়ন হয়ে যায়, ঠিক যেমন আইস নাইনের সংস্পর্শে এসে পানি বদলে যায় আইস-নাইন এ। এভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রিয়ন জমে এবং ভেড়ার নিউরন ধ্বংস করে। ভেড়ার দেহ থেকে নানাভাবে এ প্রিয়ন পরিবেশে ছড়ায়। সুস্থ ভেড়া খাদ্যের সাথে কিংবা অন্য কোনোভাবে পরিবেশ থেকে এ প্রিয়ন গ্রহন করলে সেও স্ক্র্যাপিতে আক্রান্ত হয়। শুধু কি ভেড়া? গরুর বিখ্যাত “ম্যাড কাউ” রোগের কারণও প্রিয়ন। আফ্রিকার মানুষখেকো জংলী গোষ্ঠীতে ক্রাউতজফেলডট-জ্যাকবস ডিজিসের কারণ প্রিয়ন। এছাড়াও আলঝেইমার, পার্কিনসন্স, হান্টিঙ্গটনে কিছু প্রোটিনের প্রিয়নের মতো আচরণকে বিজ্ঞানীরা দায়ী করেন।

যদিও প্রিয়নে কোনো ডিএনএ/আরএনএ থাকে না, কিন্তু তবুও এরা ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়ার মতো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে এবং সেই তথ্য নিজেরা ধারণ করে। এরা আবার রোগেরও সৃষ্টি করে, সে রোগ আবার সংক্রামকও হয়। কোনো নিউক্লিক এসিডের সাথে যোগসাজস ছাড়াই শুধু প্রোটিন যে এসব করতে পারে, ১৯৮২ সালে স্ট্যানলি প্রুজিনারের দেয়া সেই ধারণা বিজ্ঞানীমহলে আমন্ত্রিত হয় যথেষ্ট বিদ্রুপ এবং উপহাসের সাথে। তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটি অহরহই ঘটে, সেকালের অপবাদ একালের মতবাদ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয়নের ব্যাপারটাও এমন। ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়লো। তবে ২০১০ সালে ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির জিয়ান মা এর হাত ধরে প্রিয়ন তার অকাট্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি তার সহকর্মীদের সাথে রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন থেকে একদম আনকোরা এক সংক্রামক প্রিয়ন তৈরি করে দেখান।

প্রিয়নের নামে অনেক বদনাম করা হলো, চলুন এবার কিছু ভালো কথা শোনা যাক। ঈস্টের নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্যের অমেন্ডেলীয় বংশগতি জিনতত্ববিদদের বহুদিন অন্ধকারে রেখেছিল। নিম্নমানের পুষ্টিকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম সুপার-ডুপার কোনো ঈস্ট এবং অতি সাধারণ কোনো ঈস্টের সাথে যদি মিলন হয়, তাহলে দেখা যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সবারই সেই সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মেন্ডেলীয় জিনতত্ব অনুযায়ী অর্ধেকে এ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারণের কথা। এ ধরনের বংশগতি এর আগে শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা জিন, যেমন মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএতে লেখা বৈশিষ্ট্যের জন্য দেখা গেছে। ১৯৯৪ সালে রিড উইকনার এ ধাঁধার সমাধান প্রদান করেন। তিনি বলেন, যে প্রোটিনের (URE2) কারণে এ সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, সেই প্রোটিনের গঠনে সামান্য একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রিয়ন তৈরি হয়। এ প্রিয়ন আবার অন্যান্য URE2-কেও প্রিয়নে বদলে ফেলে এবং কোষ বিভাজনের সময় ঠিকই দুটি নতুন কোষে মাতৃকোষ থেকে রয়ে যায়।

উইকনারের এ ধারণা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্মোচন করে। প্রথমত, প্রিয়ন স্তন্যপায়ী ছাড়াও প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রিয়ন বংশগতিতে অবদান রাখতে পারে। পরবর্তীতে

গবেষণার মাধ্যমে ঈস্টে আরো ডজনখানেক প্রিয়ন পাওয়া গেছে যেগুলো নানাভাবে ঈস্টের জন্য উপকারী। এর মধ্যে একটি হলো Flo11p। এ প্রিয়নগুলো ঈস্টকে প্রতিকূল পরিবেশে একে অন্যের সাথে জড়াজড়ি করে থাকতে, অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক পরিবেশের দিকে কলোনীর বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। Flo11p আবার আরেক গ্রুপ প্রিয়ন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এ গ্রুপের প্রিয়নগুলো এমনভাবে সমন্বিত যেন পরিবেশে খাদ্যের পরিমাণ, অম্লত্ব/ক্ষারত্বের পরিবর্তন- এসবের বিপরীতে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোকে ট্রিগার করে। অর্থাৎ অনেকটা সুইচের মতো কাজ করে।

কোষবিদ্যার নানা পর্যায়ে যেটা ঈস্টের জন্য সত্য, তার সত্যতা উচ্চতর প্রাণিদের মধ্যেও পাওয়া গেছে। পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, “তাহলে আমরাও কি প্রিয়ন সুইচের ব্যবহার করে আসছি অজান্তেই?”

২০০৩ সালে কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এরিক ক্যানডেলের মনে হলো CPEB (Cytoplasmic Polyadenylation Element Binding protein) নামের একটি নিউরন প্রোটিনের সাথে ঈস্টের কিছু প্রিয়নের মিল আছে। সামুদ্রিক স্লাগের CPEB নিয়ে নাড়াচাড়া করে তারা বের করেন যে, এ প্রোটিন দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে কাজে লাগে। আরো দেখা যায় এরা বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারে সাড়া দিয়ে সিনাপ্সে শুধু নিজেদেরই সংখ্যাবৃদ্ধি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে প্রয়োজনীয় আরো কিছু প্রোটিন সংশ্লেষে ভূমিকা রাখে। তার মানে আমাদের নিউরনও প্রিয়নকে সুইচের সুবিধা নিচ্ছে কোনো অঘটন ছাড়াই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিয়ন সুইচের কথা বলা যায়, যেটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সহায়তা করে। কোষ যদি ভাইরাস আক্রমণের শিকার হয় সেখানে MAVS প্রোটিনটি প্রিয়নের ন্যায় নিজেদের বহুসংখ্যক প্রতিলিপি তৈরি করে, যার ফলে ইন্টারফেরন নিঃসরণ আরো জোড়ালো হয় এবং দেহ দ্রুত ম্যাক্রোফাজের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এটি কোষের জন্য ভয়ানক, কিন্তু দেহের জন্য অপরিহার্য।

তো আমরা বুঝতে পারলাম, ক্ষেত্রবিশেষে প্রিয়নের ভূমিকা কখনো ভালো, কখনো মন্দ। কখনো মগজে মগজে করেনিউরন ধ্বংস, কখনো আচরণ যেন স্মৃতি ধারণের অংশ। আবার দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও প্রিয়নের হাত আছে। আর ঈস্টের ক্ষেত্রে তো দলবদ্ধভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলাতে প্রিয়নই সাহায্য করছে। আইস নাইন এর জৈবিক প্রতিরূপ এ প্রিয়ন। এরা কি ভালো না মন্দ? সে বিচার আপনার।

তথ্যসূত্রঃ

The bright side of prion by Randal Halfman, The Scientist

 

পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবী এবং বাঙ্গালী ডাক্তারের আত্মহত্যা

গুটি গুটি পায়ে গ্যালিলিও এসে বিচারকক্ষে প্রবেশ করলেন। বিশাল কক্ষটিতে বিচারকদের আসনে বসে আছেন ধর্মীয় যাজকরা। বাইরে অনেক মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। একসময় বিচার শুরু হলো। প্রধান ধর্মযাজক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালিলিওর দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করলেন- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী। সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি সূর্যও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আপনি কি বাইবেলের এই মহাসত্যকে অস্বীকার করছেন?” গ্যালিলিও তার মাথাটা উঁচু করলেন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ প্রধান যাজকের দিকে। হঠাৎ তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভ্র জোড়া কুঁচকে ফেললেন। কী যেন ভাবলেন। এরপর মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, ‘না’। যাজকদের মধ্যে বিজয়ের ক্রুর হাসি দেখা দিলো। দশর্কদের মধ্যে মৃদু গুজন উঠল। একজন কে জানি বলে উঠল, ‘সত্যকে হত্যা করা হলো’।

ঠিক একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার অদূরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ই নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে গঠিত একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’কে নিযুক্ত করলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক অভিযুক্তের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাবি করেছেন তিনি দূর্গা নামে এক টেস্টটিউব বেবির স্থপতি। দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি তার গবেষণার কথা দপ্তরের আমলাদেরকে আগে না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন?

কীভাবে তিনি তার সার্দান অ্যাভিনিউর ছোট ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু উপকরণ আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করে এমন একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করলেন যেখানে অন্যরা গবেষণার সকল উন্নত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও সে চিন্তা করতে পারছে না? আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই যে, তিনি কারো কাছে মাথা নোয়াতেন না। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন রেডিওফিজিসিস্ট। কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, একজন ফিজিওলজিস্ট আর একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হলো এদের কারোরই আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি (আইভিএফ-ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওই ভ্রূণগুলো কোথায় রেখেছিলেন?’ ডাঃ মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন, ‘সীল করা অ্যাম্পুলের মধ্যে’। উল্লেখ্য অ্যাম্পুল হলো ইনজেকশনের ওষুধ রাখার জন্য ছোট কাচের বোতল। ফের প্রশ্ন করা হলো, ‘অ্যাম্পুলটাকে সীল করেছেন কীভাবে?’ জবাব এলো, ‘সাধারণভাবে যেভাবে করে। তাপ দিয়ে।’ এভাবেই শুরু হলো জেরা-পাল্টা জেরা। কিছু অবান্তর ভিত্তিহীন, গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন প্রশ্ন করে তাকে অপমানের চুড়ান্ত করা হলো। বলা হলো, ‘ওহ-তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তাপের কারণে ভ্রূণগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি?

এই কমিটি কী রায় দিবে তা যখন পূর্বনির্ধারিতই তখন এটা আর বলার প্রয়োজন নেই যে এর সব কিছুই আমলাতান্ত্রিক কূটনৈতিক চালের কারণে হচ্ছে। কমিটি চূড়ান্ত রায় দিলো, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”

চিত্রঃ ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউন জন্ম নেয়। স্থপতি ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং প্যাট্রিক স্টেপটো। এ প্রক্রিয়ায় তারা ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিম্বাণুর বিভাজন ও পরিস্ফুটন পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কর্তন প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করে একটা ডিস্কে শুক্রাণুর সাহায্যে সেটাকে নিষিক্ত করেন। এরপর এ থেকে ভ্রূণ উৎপন্ন হলে সেটাকে আবার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করেন।

কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এজন্য তিনি এক প্রকার হরমোনের সাহায্যে ডিম্বাণুর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটান এবং ওখানেই এর বিকাশ সাধন করেন। এরপর ছোট একটা অপারেশনের সাহায্য নিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। আর একারণে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
কিন্তু সহকর্মী এবং সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বরণ করে নিতে হলো করূন পরিণতি।

চিত্রঃ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ডা. রবার্ট এডওয়ার্ডস।

প্রথমে তাকে বদলী করে দেয়া হলো কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার একটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। যাতে তিনি পরবর্তীতে তার গবেষণা চালিয়ে যেতে না পারেন। এরপর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ফের চলে এলেন কলকাতায়। চারতলার সিঁড়ি বেয়ে তাকে রোজ কাজ করতে যেতে হতো। জাপান থেকে তার কাজের উপর একটা সেমিনারে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। চুড়ান্ত অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার পর ১৯৮২ সালে ১৯ শে জুন এই মহান প্রতিভাবান ফিজিশিয়ান নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

আরো একবার যেন সত্যকে হত্যা করা হলো। ভারতের সরকার স্বীকৃত প্রথম টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি হলেন ডা. টি এস আনন্দ কুমার যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিচার্সের ডিরেক্টর। ১৯৮৬ সালের ১৬ ই আগস্ট তার অধীনে জন্ম নেয় ভারতের প্রথম (পড়ুন দ্বিতীয়) টেস্টটিউব বেবী হর্ষ।

১৯৯৭ সালে ডা. আনন্দ একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। তখন ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার সকল কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে এবং সেই টেস্টটিউব বেবী যার জন্ম হয়েছিল ডাঃ সুভাষের অধীনে-দূর্গা সেই শিশুটির মা-বাবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি। ডাঃ টি সি আনন্দ কুমারের উদ্যোগেই তিনি পরে ভারতবর্ষের স্বীকৃতি পান।

চিত্রঃ দূর্গা।

দূর্গা এখন দিল্লীতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি তার ২৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে প্রথম মিডিয়ার সামনে আসেন এবং নিজের জনক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে দেন যে ডা. সুভাষের দাবী নিতান্তই অমূলক বা বোগাস ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিকশনারী অব মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে যারা এই চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। আর এই তালিকায় ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামও রয়েছে।

যুগে যুগে মানুষের কাজের স্বীকৃতি পেতে মানুষকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, বরণ করে নিতে হয়েছে লাঞ্ছনা, অপমান আর উপহাস-ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। যেকোনো নতুন কাজের শুরুতেই সমাজ বাধা দিয়ে এসেছে। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা বাঙালীরা এই দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কি সাহিত্য কি বিজ্ঞান কি অন্য যেকোনো বিষয়, সবক্ষেত্রেই আমরা জীবদ্দশায় কৃতী ব্যক্তির সম্মান দিতে অপারগ থেকেছি। ডা. সুভাষের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উল্লেখ্য, ডা. সুভাষের কাজের উপর ভিত্তি করে গুণী পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯০ সালে একটি সিনেমা বানিয়েছেন। নাম ‘এক ডাক্তার কি মউত’। এই সিনেমার জন্য তিনি বেস্ট ডিরেকশনের অ্যাওয়ার্ড পান।

চিত্রঃ ‘এক ডাক্তার কি মউত’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটিউব বেবীর জন্ম হয় ২০০১ সালে ২৯ মে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে। একইসাথে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। ডাক্তার ছিলেন পারভীন ফাতেমা।

চিত্রঃ মা-বাবার কোলে হীরা, মণি আর মুক্তা।

২০১০ সালে স্যার রবার্ট এডওয়ার্ডকে ইন-ভিট্রো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় ভাইরাস কলেজের ছাত্রদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন কে? প্রায় সকলেই উত্তর দিতে পেরেছিল। কিন্তু কে দ্বিতীয় হয়েছেন তা কেউ বলতে পারেনি। ডাঃ সুভাষের ক্ষেত্রে এমনই ঘটলো। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে তিনি প্রথম টেস্টটিঊবের জনক হতে পারলেন না। তাতে কী হয়েছে? তিনি বাঙ্গালী। আর সে কারণেই আমাদের তাকে স্মরণ করা উচিত। হয়তো ২০১০ সালের নোবেল বাঙ্গালীদের ঘরেই আসতো। সে আফসোস করে লাভ নেই। বরং এদেশীয় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে যারা কাজ করছেন তারা অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে পৃথিবীর মঞ্চতে মাথা উঁচু করতে পারবেন সেই চেষ্টা যাতে অব্যাহত থাকে এই কামনা করতে পারি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি The Great Scientist Dr.Subash Mukhopadhyay এর স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ। পাশাপাশি অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে।

মহাজগতের জ্যামিতি

মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে যুগে যুগে প্রচলিত রূপকথার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। কখনো হাতির মাথায় থাকা পৃথিবী, কখনো কচ্ছপের পিঠে থাকা, কখনো বা বিরাট পানির আধারে ডুবে থাকার গল্প প্রচলিত ছিল প্রাচীন যুগের মানুষদের মাঝে। গ্রীকরা মনে করতো, মাথার উপর আকাশের শেষ প্রান্তে আছে এক গুহা, যেখানে দেবতা জিউসের তেজী ঘোড়াগুলো থাকতো। সকালে ঘোড়াগুলো আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে দৌড়ে যেত, তাই পৃথিবী আলোয় ভরে যেত। কয়েক শতাব্দী আগ পর্যন্তও মানুষের ধারণা ছিল,

মহাবিশ্ব মানে বোধহয় সৌরজগতটাই। কিন্তু যখনই মানুষ জানলো সৌরজগত আসলে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, তখন থেকেই প্রশ্ন জমতে লাগলো, মহাজগত কী আকারে সসীম হতে পারে? যদি তা হয়, তাহলে মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? দুটি প্রশ্নই এক বিন্দুতে গিয়ে মিলে- ‘মহাবিশ্বের আকার আসলে কেমন?’

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আগে জেনে নেয়া উচিৎ তলের বক্রতা (ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা সমতল) এবং মহাবিশ্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। যেমন, এর উপাদানগুলো কীভাবে একে অন্যের সাথে যুক্ত। গোলকাকৃতির পৃষ্ঠের বক্রতা হলো ধনাত্মক বক্রতা। পাম্পে ফুলানো একটা চাকার ভেতরের দিকটা হলো ঋণাত্মক বক্রতা বিশিষ্ট। যেহেতু আমরা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে জানি না, কাজেই এর সম্ভাব্য অনেক আকৃতিই আমরা ধরে নিতে পারি- গোলকাকৃতি, সিলিন্ডার আকৃতি, ঘনকাকৃতি অথবা অনির্দিষ্ট সংখ্যক বিন্যাস বিশিষ্ট ভুজ আকৃতি বা বিভিন্ন বক্রতল ও মোচড়বিশিষ্ট আকৃতি, কিংবা এমন কোনো অনির্দিষ্ট আকৃতি যার কোনো বিপরীত তল নেই।

প্রথমে আমরা আমাদের পরিচিত তিনটি আকৃতি নিয়ে চিন্তা করি। এই তিনটি আকৃতি হলো সমতল আকৃতি (flat shape), গোলকীয় আকৃতি (spherical shape) এবং বক্রতলীয় আকৃতি (hyperbolic shape)।

তলগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝার আগে একটি বিশেষ ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এটি হলো রেইম্যানের জ্যামিতি (Reiman’s Geometry)। আমরা সাধারণত যে জ্যামিতিক আকৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা করি, যেমন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বৃত্ত বা সরলরেখা, তার সবই কিন্তু আলোচনা করা হয় সমতল ক্ষেত্রের সাপেক্ষে। এটি আসলে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। কিন্তু যদি ক্ষেত্রটি গোলকীয় বা বক্রতল হয়? এটিই হচ্ছে অমর গণিতবিদ গাউসের সুযোগ্য ছাত্র রেইম্যানের কীর্তি!

রেইম্যান প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি গোলকীয় পৃষ্ঠে দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং বক্রতলীয় ক্ষেত্রে দুই সমকোণের চেয়ে কম হবে। তিনি এটাও বলেন যে, গোলক বা বক্রপৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে একটি বক্ররেখা। খটকা লাগতে পারে, কেননা প্রচলিত জ্যামিতিতে আমরা জানি দুটি বিন্দুর সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো সরলরেখা। কিন্তু সরলরেখা কল্পনা করলে তো সেটা সমতল ক্ষেত্রে চলে যায়, কাজেই সেটা ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আওতাধীন হয়ে যায়। রেইম্যান জ্যামিতি থেকে আরও দেখা যায়, সমতল ক্ষেত্রের দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি গোলকীয় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা একসময় নিজেদের ছেদ করবে। আবার বক্রতলে নিয়ে যাওয়া হলে তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে।

এখন দেখা যাক কোন আকৃতিতে মহাবিশ্ব কেমন হওয়ার কথা। আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করছে। সে হিসেবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সব বস্তুই আবার একীভূত হয়ে যাওয়ার কথা। এখন যদি মহাবিশ্ব সমতল হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলা যায় মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সমতলভাবে বিস্তৃত হবে এবং এক পর্যায়ে আবার একটি বিন্দুর দিকে ফিরে আসবে।

কিন্তু সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মহাবিশ্ব সমতল হতে গেলে মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তিঘনত্ব এক হওয়া প্রয়োজন। যেমন, কাগজের উপর ছড়িয়ে থাকা লোহার গুঁড়ার কাছাকাছি যদি দুটি ভিন্ন শক্তির চুম্বক রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে লোহার গুঁড়াগুলো যে তলে বিন্যস্ত হয়েছে সেটা সমতল থাকে না। মহাবিশ্বের

সব বস্তুর ঘনত্ব সমান নয়, এ কারণে তাদের শক্তি ঘনত্বেরও তারতম্য ঘটে। মহাবিশ্বের ঘনত্ব নির্ণয়ের একটা সুন্দর নাম আছে- Density Parameter। সমতল ভূমির ক্ষেত্রে এর মান হওয়ার কথা ১, অর্থাৎ কোনো একটাকে আদর্শ ধরে নিলে তার তুলনায় অন্য সবারই এই মান একই হবে। কিন্তু এটা সত্য নয়, কাজেই বলে দেয়া যায় মহাবিশ্ব সমতল নয়।

এবার আসি ‘মহাবিশ্ব গোলকাকার’ এ ধারণায়। প্রাকৃতিকভাবে আমরা দেখি, সব তরল বা গ্যাসই চেষ্টা করে গোলকীয় অবস্থায় থাকতে। এর কারণ, তরল বা গ্যাসের প্রতিটি ফোঁটায় যে অণু আছে তাদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল তাদের ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বলের চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে, মহাবিশ্ব সসীম হওয়ার কথা কিন্তু তার কোনো শেষ আমরা বের করতে পারবো না। যেমন একটা ফুটবলের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি না কোনো বিন্দুতে তার শুরু এবং কোনো বিন্দুতে শেষ।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা জানি, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে এবং এ প্রসারণের হার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি গোলকাকৃতির হয় তবে এই প্রসারণের হার বাড়া তো সম্ভব নয়, কেননা এই প্রসারণকে অতিক্রম করেই তো গোলক হতে হবে! রেইম্যানের জ্যামিতি থেকেও দেখা যায়, ধনাত্মক বক্রতার কোনো পৃষ্ঠে যেকোনো বল কেন্দ্রের দিকেই বেশি ক্রিয়াশীল হয়, ফলে Density Parameter এর মান ১ এর বেশি হয়। তাহলে মহাবিশ্বের প্রসারণ কমতে কমতে একসময় শূন্য এবং তারপর সংকোচন শুরু হওয়ার কথা, প্রসারণের মাত্রা বাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তাহলে শেষ আর একটি প্রকৃতিই বাকি থাকলো, ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্র অর্থাৎ Hyperbolic Space। হাইপারবোলিক স্পেস এ Density Parameter এর মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ‘মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তি ঘনত্ব সমান নয়’-এই তত্ত্ব একমাত্র হাইপারবোলিক স্পেসের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তাছাড়া রেইম্যান জ্যামিতি থেকে দেখা যায়, একমাত্র ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্রেই দুটি বস্তুর দূরে সরে যাওয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর যে এখানেই শেষ, তা বলা যায় না। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, মহাবিশ্ব সমতল ক্ষেত্রের উপর বিস্তৃত। এর সপক্ষে তারা উপস্থাপন করেন অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন এর চিত্র। যা দেখে কিছুটা মনে হয়, মহাবিশ্ব সম্ভবত সমতল।

চিত্রঃ অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন।

আরেকটা প্রশ্ন এখনো বাকি, মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো জোর উত্তর বিজ্ঞানীরা আজও দিতে পারেননি। তবে রেইম্যানের জ্যামিতি থেকে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মহাবিশ্বের মাত্রা যদি তিনটির চেয়ে বেশি হয়, তবে এর সঠিক আকৃতি আমাদের তিন মাত্রার কল্পনা দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যেমনঃ দ্বিমাত্রিক কাগজের পৃষ্ঠের উপর চলমান একটি পিঁপড়া তার তলের শুরু এবং শেষ বুঝতে পারবে। কিন্তু যদি সেই কাগজ পেঁচিয়ে ত্রিমাত্রিক সিলিন্ডার বানানো হয়, তবে পিঁপড়া সেই সিলিন্ডারের কোনো আদি-অন্ত খুঁজে পাবে না। অধুনা প্রতিষ্ঠিত ‘স্ট্রিং থিওরি’র অন্যতম বিজ্ঞানী জাপানের মিচিও কাকু গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্ব দশ মাত্রার। আমাদের দৃশ্যমান তিনটি মাত্রা ছাড়া অন্য

মাত্রাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে আমরা সেগুলো বুঝতে পারি না। যেমন, ত্রিমাত্রিক লোহার টুকরোকে সুক্ষ্ম করতে করতে যদি পাতে পরিণত করা হয়, তবে সেটা আমাদের কাছে দ্বিমাত্রিকই মনে হয়।

যা হোক, স্ট্রিং থিওরীর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ দশ মাত্রাকে গাণিতিক সমীকরণের আওতায় আনতে পারলেই মহাবিশ্বের আকৃতি ও এর সীমা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে। মানুষের জ্ঞান যত বিস্তৃত হচ্ছে, মহাবিশ্বই ততই হয়ে উঠছে রহস্যময়!

তথ্যসূত্র

১. জেমস সমবার্ট, ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনঃ http://abyss.uoregon.edu/~js/cosmo/lectures/lec15.html

২. ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিঃ http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/cosmology/geometry.html

৩. প্রফেসর বারবারা রীডেন, ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটিঃ http://www.astronomy.ohio-state.edu/~ryden/ast162_9/notes40.html

৪. স্ট্রীং থিওরি, লেখকঃ হিমাংশু কর

আলোর গল্প

আলো কী? প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো, আলো হচ্ছে দেবতাদের দেখার ক্ষমতা। যখন মিশরীয়দের দেবতা চোখ খুলত, তখন মহাবিশ্বে আলো আসত। সেই আলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেখতে পেত। সূর্য এবং চাঁদকে মিশরীয়রা তাদের দেবতা ‘রা’ এর দুই চোখ বলে মনে করতো। মিশরীয়দের পর পারস্যে সভ্যতা বেশ উন্নতি সাধন করে। এ পৃথিবীর আদিতম ধর্মগুলোর একটি হচ্ছে জরোআস্ট্রিয়ানিজম। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে জরোআস্ট্রিয়ানিজম ধর্মানুসারী অগ্নিপূজকরা আলোকে তাদের দেবতা ‘আহুরা মাজদা’র মঙ্গল সৃষ্টি বলে মনে করতো। আর অন্ধকারকে মনে করতো অমঙ্গল সৃষ্টি। মঙ্গল আলো দিনের বেলায় পৃথিবীকে আলোকিত করতো আর রাতের বেলায় অমঙ্গল সৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দিতো অন্ধকারের কালো চাদরে।

পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে আগুন এবং আলো ছিল দেবতাদের অধিকারে। জিউসের কাছে থেকে চুরি করে সেই আলো মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন আরেক দেবতা প্রমিথিউস। সেজন্য প্রমিথিউসকে দূর পাহাড়ে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয়। আর ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার কলিজা খেয়ে ফেলতো। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ সভ্যতার লোকজন এভাবেই আলোকে তাদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

চিত্রঃ প্রমিথিউস।

ধর্মের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও মনিষীরাও ধারণা করতে শুরু করেছিল আলো দুই ধরনের- বাইরের আলো এবং মনের আলো। এদের মধ্যে ছিলেন প্লেটো, এমপেডোক্লেস, ইউক্লিড, গ্যালেন ও আরো অনেকে। এ ধরনের চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম চিন্তা করেন মধ্যযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম (আল হ্যাজেন)। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন ক্যামেরা অবস্কিউরা বা অন্ধকুঠুরির ধারণা থেকে। ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা সর্বপ্রথম এসেছিল চীনা বিজ্ঞানী মজি’র সময়কালে (৪৭০~৩৯০

খ্রী.পূ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি অন্ধকার ঘরের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে দিলে বিপরীত পাশে পর্দায় একটি প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

আল হাইথামের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনোকিছু দেখার জন্যে বাইরের আলোর সাথে মনের আলো অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। মনের আলো এবং বাইরের আলো যখন একসাথে মিলে যায়, শুধুমাত্র তখনই আমরা দেখতে পাই। মনের আলো আসে মানুষের খাদ্য থেকে। মানুষ খাদ্য খাওয়ার পর তা আধ্যাত্মিক আলোতে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে থেকে যেতো। মানুষের মৃত্যু হলে এ আধ্যাত্মিক আলো চাঁদে গিয়ে পৌঁছতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে বেড়ে যেতো। যখন বাড়তে বাড়তে পরিপূর্ণ চাঁদ হয়ে যেতো, তখন সেখান থেকে আলো বা আত্মা ধীরে ধীরে দেবতার কাছে চলে যেতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে ক্ষয়ে যেতো। চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে এ আধ্যাত্মিক আলোকে সম্পর্কিত করেছিল ‘ম্যানিকায়িজম’ যা ছিল খ্রীঃ ২৫০ শতকে বর্তমানের বাগদাদে প্রচলিত ধর্ম। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আল-কিন্দী এ ধারণার প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।

আল হাইথামের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে থাকেন বাইরের আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা দেখতে পাই। যদি চোখের আলো গিয়ে বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসলেই কেবলমাত্র আমরা দেখতে পাই, তাহলে দূরের পাহাড় বা আকাশের তারা খুব সহজেই দেখতে পারার কথা নয়। তারপর আলো যদি বাইরে থেকে চোখেই প্রতিফলিত হবে, তাহলে আমাদের ভেতরের আলো বা অন্তরের আলোর আর দরকারই পড়বে না।

আলোর ধারণাকে গণিতের সাথে সম্পর্কিত করার প্রথম চেষ্টা ছিল ধর্মযাজক গ্রোস্তেস্ট এর লেখা ‘অন লাইট’ বা ‘দে লুচে’ বইয়ে। তিনিই প্রথম আলোর বস্তু-ধারণার জন্ম দেন। তারপর আলো নিয়ে মানুষের ধারণার বিশাল পরিবর্তন হয় মধ্য যুগে গ্যালিলিও গ্যালিলির গবেষণার মাধ্যমে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান সেগুলো পাথুরে গোলাকার বস্তু ছাড়া আর কিছু নয়, যেগুলোকে এর আগে মানুষ দেবতার নিখুঁত সৃষ্টি বা দেবতার চোখ বলে মনে করতো।

বিশেষ করে চাঁদ এবং সূর্যকে মানুষ নিখুঁত মনে করত। কিন্তু গ্যালিলিও দেখতে পান, চাঁদে বেশ কিছু গর্ত রয়েছে। একইভাবে সূর্যকে আপাতদৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের কালো দাগ মুক্ত মনে হলে আসলে তা নয়। এছাড়াও তৎকালীন ধারণা ছিল, পৃথিবীর চারপাশে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ঘুরছে। কিন্তু বৃহস্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান, সেই চাঁদগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ না করে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্যালিলিও আরও মনে করতেন, কোনো বস্তুকণাকে অতি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে থাকলে তা আলোক কণায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে নিউটনের প্রিজম পরীক্ষায় দেখা যায়, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের বর্ণালীতে বিভাজিত হচ্ছে। গ্যালিলিওর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিউটনও মনে করতেন, আলো হচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা যা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তার আকার অনুসারে আলাদা হয়েই রঙিন বর্ণালীর সৃষ্টি করছে।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফরাসী গণিতবিদ দেকার্ত মনে করতেন- আলো আর শব্দ একইরকম আচরণ করে। শব্দের যেমন গতি আছে, আলোরও গতি আছে। তিনি মনে করতেন আলোর গতি অসীম। আবার শব্দের চলতে যেমন মাধ্যম লাগে, আলোর চলতেও মাধ্যম লাগে এবং শব্দের মতো আলোও এক ধরনের তরঙ্গ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যম কী? এভাবেই ইথারের ধারণার জন্ম হয়।

আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায় আলোর অপবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারায়। দূরের কোনো আলোক উৎসকে আমরা যদি দেখি, তাহলে তার পাশে আলোকে অনেকটা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা দূরের কোনো ল্যাম্পপোস্ট এর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা এটা দেখতে পারব। ফরাসী প্রকৌশলী অগাস্টিন ফ্রেনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সমীকরণ সমাধান করে প’শন দেখান- আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব সত্যি হলে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে। পরবর্তীতে ফ্রেনেলেরই বন্ধু আর্গো ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। এতে করে আলোর তরঙ্গ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।

চিত্রঃ ল্যাম্পপোস্টে আলোর অপবর্তন।

পরবর্তী সময়ে ফ্যারাডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আলো মূলত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। এটি পূর্ণতা পায় ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে। কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের পর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ইথারের। মাইকেলসন-মর্লী’র পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার অস্তিত্বহীন বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা যা আলোর গতিতে চলছে, তার জন্যে সবকিছুই অতি নিকটে, তার কখনও দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। স্থান সংকোচনের কারণে দূরত্ব অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শুধুমাত্র আমরা যারা স্থির অবস্থায় আছি তাদের কাছেই সেগুলোকে দূরত্ব বলে মনে হয়। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফোটন থিওরী আলোর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গতত্ত্ব উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ আলো এমন কিছু যা একই সাথে কণা হিসেবে এবং তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ কর দেখান যে মহাকর্ষীয় বলের কারণে স্থান বেঁকে যায়। তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আলোও বিশাল মহাকর্ষীয় বস্তুর পাশে দিয়ে আসার সময় বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটনের পরীক্ষায় এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আলো ভারী কোনো নক্ষত্রের পাশে দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায়।

বর্তমানে আমরা আলোকে মনে করি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা একই সাথে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে। আলোর গতি সকল প্রসঙ্গ কাঠামোতে ধ্রুবক এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্থান বা সময় বদলে যায়, কিন্তু আলোর গতি? কখনোই নয়।

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

লম্বাগলা জিরাফ

পাশ দিয়ে ছ’ফুট লম্বা কেউ হেঁটে গেলে আমরা গলা লম্বা করে তাকাই, আর বলি বাহ কত লম্বা! জিরাফ, ডাঙার সবচেয়ে লম্বা প্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম G. Camelopardalis। একটি জিরাফ প্রায় ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। আজকে এই জিরাফ নিয়েই কিছু ব্যতিক্রমী জিনিস দেখবো।

​​লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্য জিরাফের হার্ট অনেক বড় এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। জিরাফের মাথায় দুই থেকে চারটি শিং দেখা যায়। যদিও বিজ্ঞানীরা একে শিং হিসাবে মানতে নারাজ। আসলে তরুণাস্থি দিয়ে মাথার ত্বকের উপরের এই শিং আসলেই cornual process of skull নয়।

জিরাফের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর। ফলে বহুদূরের শত্রুকেও জিরাফ সহজেই দেখতে পারে। এছাড়া জিরাফ খুব জোরে দৌড়াতে পারে। আক্রমণের শিকার হলে জিরাফকে ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে দেখা গেছে। জন্মের সময় একটি জিরাফ প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয় এবং এর ওজন থাকে গড়ে ৬৮ কেজি। অনেক জিরাফের মাথায় দুইটি বা চারটি ভোঁতা শিং থাকে। জিরাফের জিভও খুব লম্বা। নিজের কান পরিষ্কারের জন্য জিরাফ তার প্রায় ২১ ইঞ্চি লম্বা জিভ ব্যবহার করে।

দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে বলে সিংহকেও সাবধানে থাকতে হয়। কারণ জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারাত্মক আহত হতে পারে। এছাড়া আক্রমণের ভয়ে জিরাফ কখনো বসে ঘুমায় না বা বিশ্রাম নেয় না। কারণ জিরাফের বসতে যেমন সময় লাগে প্রচুর, তেমনি বসা থেকে দাঁড়াতেও অনেক সময় নেয়। এছাড়া প্রকৃতিগতভাবেই জিরাফ লম্বা হওয়ায় বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে দলগতভাবে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু জিরাফ মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নেয়। পানি খাওয়া, ঘুমানো কিংবা দিনের বেলা বিশ্রামের সময় অন্তত একটি জিরাফ আশেপাশে নজর রাখে শত্রুর উপস্থিতি জানানোর জন্য। খুব নিচু আওয়াজে এরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এদের গলার আওয়াজ ২০ হার্জেরও নিচে। ফলে জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় না। জিরাফ সাধারণত নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না। তবে খেলাধুলা করার সময় কিংবা খুব বেশি রাগান্বিত হলে পুরুষ জিরাফরা মাঝেমধ্যে এক অন্যের সাথে লড়াই করে।

দীর্ঘ আকাশিয়া গাছের পাতাই এদের অন্যতম খাদ্য। অন্য প্রাণীরা অবশ্য এই লম্বা গাছের পাতা খেতেও পারে না। জিরাফের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা উটের মতো পানি না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে একটানা সাতদিন পানি না খেলেও এদের কোনো সমস্যা হয় না। গাছের পাতায় যে পানি থাকে, তা দিয়েই তাদের চাহিদা মিটে যায়।

নাচতে জানে জিরাফ

নিজের দীর্ঘ ঘাড় ব্যবহার করে নাচ প্রদর্শন করে জিরাফ। জিরাফের এই নাচকে ইংরেজিতে বলা হয় নেকিং (necking)। নেক মানে ঘাড়। কিন্তু জিরাফের বেলায় আমরা বলতে পারি ঘাড়তেড়ামি! মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও আসলে দুই পুরুষ জিরাফের আধিপত্য ছড়ানোর লড়াই এটি। যাতে ঘাড়ই তাদের প্রধান ও একমাত্র অস্ত্র। লড়াইয়ে বিজয়ী পুরুষ জিরাফই স্ত্রী জিরাফের সংস্পর্শে আসতে পারে।

এত সুন্দর প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। IUCN এর Red List এ নাম উঠে গেছে তার। আসুন আমরা পরিবেশের প্রতি একটু সচেতন হই। আর এই বর্ষায় অন্তত একটি করে গাছ লাগাই।

তথ্যসূত্রঃ

১। World Animal Science: Zoo Animal, Pub: Elsevier, Amsterdam-Lausanne- New York- Oxford-Shannon- Tokyo

২। https://en.wikipedia.org/wiki/Giraffe

৩। http://animals.sandiegozoo.org/animals/giraffe

৪। www.banglanews24.com/feature/news/357155

৫। IUCN Red book.

মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান

এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ কত বছরই বা বাঁচতে পারে? গড়ে ৬০-৬৫ বছর। কিছু প্রাণী এর থেকেও কম সময় বাঁচে। আবার নীল তিমি প্রায় ৫০০ বছর বাঁচে। সেখানে কোনো জীব মিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে, এটা সাধারণের কল্পনার বাইরে। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় কল্পনার বাইরের এসব তথ্যই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।

ড. রাউল কানো একজন আমেরিকান মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন স্বনামধন্য প্রফেসর। প্রাচীন নমুনা থেকে অণুজীবের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে গবেষণা করা, তা থেকে জীবনের রহস্য বের করা ও অন্যান্য জীবের সাথে পারস্পরিক কী কী বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে, তা নিয়ে গবেষণা করাই তার নেশা। একবার তিনি মেক্সিকো ও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে কয়েকটি অ্যাম্বার (Amber) সংগ্রহ করলেন গবেষণার জন্য।

অ্যাম্বার হলো গাছের রেজিন (আঠা জাতীয় পদার্থ)। প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে হুলবিহীন একপ্রকার মৌমাছি (এখন বিলুপ্ত) মৌচাক তৈরির জন্য এসব রেজিন সংগ্রহ করতো। রেজিনগুলো পরবর্তীতে শক্ত হয়ে গিয়ে অ্যাম্বারের ক্রিস্টালে পরিণত হতো। ফলে মৌমাছি তার ভিতর আটকা পড়ে যেত। মৌমাছির পেটে স্বভাবতই এক প্রকার অণুজীব থাকে। এদের নাম Bacillus sphaericus, এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া। মৌমাছি হাবিজাবি যাই খায়, তা পরিপাকে এরা সাহায্য করে। পাশাপাশি মৌমাছির কাছে আশ্রয় পায় ও অতিরিক্ত পুষ্টি, যা মৌমাছির লাগে না, তা এরা গ্রহণ করে। অর্থাৎ উভয়ই উপকৃত হয়। এদের এই ভালোবাসাকে বলে মিথোজীবিতা।

চিত্রঃ অ্যাম্বারের ভিতর আটকা পড়া মৌমাছি।

তিনি প্রথমে এর বয়স মাপলেন। ২৫-৪০ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি কোনো এক সময়ের অ্যাম্বার ছিল এটা। তিনি এটা ছিদ্র করে দেখলেন, ভিতরে মরা মৌমাছি। তাও তিনি থামলেন না। মৌমাছির পেট কেটে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে অন্ত্র পর্যবেক্ষণ করলেন। দেখলেন, গোল গোল স্থির কী জানি দেখা যায়! তিনি এগুলা আলাদা করলেন, তারপর এগুলো একটি কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। পরবর্তীতে তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেন ওগুলো স্থির নেই, নড়ছে। কাহিনী কী? তারপর আরো কয়েকটি অ্যাম্বার ছিদ্র করে তিনি একই কাজ করলেন, ফলাফল একই। এরপর আরেকটি অ্যাম্বার নিলেন, এতে মৌমাছি বা গোল কিছু নেই। এর নমুনা কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। কিছুই কিলবিল করলো না।

পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি জানতে পারলেন, কিলবিল করা জীবগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের Bacillus sphaericus এর ৯৯% মিল রয়েছে, শুধু ডিএনএ-এর গঠনে সামান্য পার্থক্য আছে। আর গোল গোল বস্তুগুলো তার স্পোর। কোনো অণুজীব যেখানে থাকে, সেখানে যদি প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশের উদ্ভব হয়, তখন বেশিরভাগ অণুজীবই নিজেদের মোটা প্রোটিন আবরণ দিয়ে ঢেকে ফেলে। তার সকল শারীরিক কার্যকলাপ তখন বন্ধ করে দেয়। একে স্পোর বলে। এভাবে তারা শত বছর থাকতে পারে। তবে একটা সময়ে তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ প্রভৃতি কারণে স্পোর নষ্ট হয়ে যায়। আর অণুজীবও মারা যায়।

এখানে বিজ্ঞানী রাউল কানো শত বছর না, মিলিয়ন বছরের পুরাতন অণুজীবকে পুনরুজ্জীবিত করে ফেলেছেন। তার এ কাজকে গাঁজাখুরি গল্প বলে অনেক বিজ্ঞানী উড়িয়ে দিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, Bacillus sphaericus কেবল মৌমাছির পেটেই না, মাটি, বাতাস, সবখানেই এরা থাকে। তাদের মতে, গবেষণাটি ড: কানো যথাযথ Sterile (জীবাণুমুক্ত) পদ্ধতিতে করতে পারেননি। তাই তিনি ফলাফল হিসেবে যা পেয়েছেন, সেগুলো পরিবেশে থাকা এখনকার Bacillus sphaericus। তবে ড. কানোর পক্ষেও অনেক বিজ্ঞানী সুর মিলিয়েছেন।

তাকে সমর্থনকারী বিজ্ঞানী ড. পাবো দেখিয়েছেন জীব জীবিত থাকলে অ্যামাইনো এসিডগুলো L-amino acid হিসেবে থাকে। আর মারা গেলে, তা সময়ের সাথে সাথে L-amino acid ও D-amino acid এর রেসিমিক মিশ্রণে পরিণত হতে থাকে।

কোনো যৌগ যদি তল সমাবর্তিত আলোর দিক পরিবর্তন করতে পারে তবে তাকে আলোক সক্রিয় যৌগ বলে। যদি যৌগটির একটি সমাণু ঘড়ির কাঁটার দিকে তল সমাবর্তিত আলো ঘুরিয়ে দেয় তবে তা dextrorotatory (D) সমাণু। আর যদি অপর সমাণু ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেয় তবে তা levorotatory (L) সমাণু। রেসেমিক মিশ্রণ হলো একটি যৌগের dextrorotatory ও levorotatory সমাণুর মিশ্রণ। ড. পাবো অণুজীবকে মেরে দ্রুত অ্যাম্বারে ঢুকিয়ে অনেক দিন পর বের করে দেখলেন L-amino acid এখনও অপরিবর্তিত আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, অ্যাম্বার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রোটেক্টিভ শিল্ড, যা কোনো জৈব রাসায়নিক বস্তুকে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিকূলতা, তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ, ph পরিবর্তন, অন্য জীবের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে বছরের পর বছর।

ড. কানো দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সাবধানতার সাথে করেছেন, যার ফলে এ নিয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই। অণুজীবগুলো আসলেই ২৫-৪০ লাখ বছরের পুরাতন। আর ডিএনএ-র গঠনে যে পার্থক্য দেখা গিয়েছে, তার কারণ অ্যাম্বারের বাইরের মৌমাছিরা মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তাই তারা আলাদা। কিন্তু ঐ বেচারা অ্যাম্বারে আটকে গিয়ে জাগতিক সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই তার বিবর্তন হয়নি।

তিনি তার আবিষ্কার নিয়ে এতই আত্মবিশ্বাসী যে, কারো সমালোচনায় কান না দিয়ে, তিনি এ আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে ওষুধ তৈরি শুরু করে দিলেন, ওষুধ ফ্যাক্টরীর নাম দিলেন Ambergene Corporation। তার মতে, বর্তমানে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবগুলো প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অভিযোজিত হয়ে উঠছে। কিন্তু আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে তৈরি ওষুধ তাদের জ্ঞানের বাইরের বস্তু হবে, ফলে এ ওষুধ দিয়ে তাদের ধ্বংস করা যাবে। পাশাপাশি অনেক মারাত্মক রোগের ওষুধও আদিম ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই ফ্যাক্টরিটি ৩ ধরনের ওষুধ তৈরি করে প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করেছে।

তথ্যসূত্রঃ

 nytimes.com

একটুখানি সঙ্গীত এবং এমিলি হাওয়েলের গান

কোনো এক ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যা ছিল সেদিন। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু পাগল করা হাওয়া, ভেজা বাতাস, মাটির সুঘ্রাণ ইত্যাদি যাবতীয় কাব্যিক উপকরণ হাজির থাকায় পড়ায় মন বসছিল না। ওদিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল অঝোর বর্ষণের অপার্থিব সুর।

সঙ্গীত বা সুর বলতে আমরা আসলে যা বুঝি তার পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। মানসিক অর্থাৎ মন সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো আবার মানুষের খুব গর্বের বিষয়। কৈশোরে পড়া অসংখ্য সায়েন্স ফিকশন গল্পের সাধারণ একটা দৃশ্য থাকতো অনেকটা এরকম- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশের জোর দাবী জানাচ্ছে। বিদ্রোহী নায়ক তখন গলার রগ ফুলিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে আর বলবে, “ঐ কপোট্রনিক খুলিগুলো আর যা-ই পারুক, কখনো কি পারবে একটা সুর সৃষ্টি করতে? পারবে শেষ বিকেলে সূর্য ডোবার একটা মাস্টারপিস ছবি আঁকতে? বা একটা বৃষ্টির কবিতা লিখতে পারবে কখনো?”

একবিংশ শতকের এমন একটি সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি যে, নায়কের প্রথম প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক সুর দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে গান এবং শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রকাশ পাচ্ছে ‘তাদের’ একক এলবাম!

ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে, যন্ত্র তখনো সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’ শুরু করেনি। পূর্বে সংরক্ষিত ডাটা (এ ক্ষেত্রে শব্দ) পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে এবং নির্দেশনা (প্রোগ্রাম) অনুসারে কিছু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিডিও গেমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence – A.I) ব্যবহার শুরু হয়। গেমসের পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির সাথে তাল মেলানোর জন্য এ.আই এর প্রয়োগ ভিডিও গেমিং-এর অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। সময়ে সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের তাল বাড়িয়ে-কমিয়ে অথবা গেমসে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের আগমন-প্রস্থান, দৌড়াদৌড়ি- মোদ্দা কথা, বাস্তব অনুভূতি সৃষ্টির ভার পড়ে এ.আই এর ওপর। এক্ষেত্রে ন্যাচারাল লার্নিং (Natural Learning), সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস ইত্যাদি বিভিন্ন থিওরির প্রয়োগ ঘটানো হয়।

তবে এগুলো ছিল এ.আই ব্যবহারের একেবারে প্রথম দিককার কিছু কাজ। অনেকটা ছোট শিশুকে প্রাথমিক কিছু অক্ষরের সাথে পরিচিত করানোর মতো। এ বিষয়ে গবেষণা আরেকটু এগোনোর পর এ.আই মিউজিশিয়ানদের জন্য অনেকটা বন্ধুর মতো হয়ে দাঁড়ায়।

সঙ্গীত সম্পর্কিত ব্যাকরণ বা নিয়ম সৃষ্টির সূচনা ঘটেছে সেই পিথাগোরাসের যুগে এবং প্রথম দিকে সঙ্গীত গণিতজ্ঞ এবং পদার্থবিদদের গবেষণার খুব প্রিয় এক বিষয় ছিল। কেবলমাত্র পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নিয়মের মাঝেই রয়েছে অসংখ্য তাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল। তাছাড়া ঢাউস আকৃতির শত শত বই বিগত শতকগুলোতে সঙ্গীত সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণার ফলাফল ধারণ করে।

উদাহরণস্বরূপ পাশ্চাত্য, আরব, হাঙ্গেরিয়ান, বাইজেনটাইন, পারস্য ইত্যাদি অঞ্চলভিত্তিক সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকরণ এবং স্কেল রয়েছে। স্কেল, নোট, হারমনি, মেলোডি, টেম্পো সম্পর্কিত যে আলোচনা তা কেবল সমুদ্রসমই নয়, বরং জ্ঞানের এক পৃথক শাখা এবং এ লেখার সীমা আর উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যাবে। তবুও কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যার দাবী রাখে।

আমরা যেসব গান শুনি তার সুরটি একজন সুরকার সৃষ্টি করেন কীভাবে? বা গানের কথার সাথে মানানসই সুর বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কী? অতি পরিচিত বাদ্যযন্ত্র কীবোর্ডের সাহায্যে ব্যাপারগুলো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে রয়েছে ১২ টি নোট, নোট বলতে আপাতত আমরা সঙ্গীতের ক্ষুদ্রতম একক ধরি, যেগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গানের প্রতিটি শব্দকে সুর হিসেবে প্রকাশ করা যায়। নোটগুলো হলো- A A (sharp) B              C C (sharp)/D (flat) D D (s)/E (f) E F F(s)/G (f) G G (s)/A (f)

চিত্রঃ পিয়ানো বা কীবোর্ডের লে আউট।

কীবোর্ডে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো নোটগুলো Chromatic Scale নামক স্কেল থেকে প্রাপ্ত। # এবং b চিহ্ন যথাক্রমে মূল নোটের তীক্ষ্ণ বা মসৃণ রূপ (শ্রুতির ভিত্তিতে) বোঝায় যেখানে A-G হলো ৭ টি মূল নোট। এদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক কম্পনাঙ্ক বা স্বর রয়েছে। দৃশ্যত কয়েকটি নোটের Sharp বা Flat স্বর নেই এবং ২ টি নোটের মাঝের Sharp বা Flat নোটগুলোকে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের  ২টি নামের যেকোনো একটি দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘কী’তে পরপর একই নোটের পুনরাবৃত্তি ঘটে উচ্চতর বা নিম্ন অনুপাতের কম্পনাঙ্কে এবং প্রয়োজন অনুসারে সুরকার তা নির্ধারণ করে থাকেন।

চিত্রঃ বিভিন্ন নোটের frequency তালিকা, একই নোটের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে অনুপাত লক্ষণীয়।

এক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত গাণিতিক সূত্রটি হলো, Frequency = 440*(2^n/12); for n = -21, -19, …27। গীটারের ক্ষেত্রে নোটগুলোর বিন্যাস Frequency সহ লক্ষ্য করি-

নোটগুলো এভাবে নির্ধারিত হলো কেন সেই আলোচনা যেমন বিস্তৃত তেমনই ঐতিহাসিক। তবে সুপরিচিত Exponential Graph প্রমাণ করে এক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক গাণিতিক হিসাব রয়েছে।

চিত্রঃ frequency লেখচিত্র।

এ নোটগুলোকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে স্কেল বানান যায়। স্কেল বলতে আপাতত ধরে নেয়া হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠিত ফর্মুলা যার দ্বারা নির্দিষ্ট ক্রমে নোট বের করে পরপর বাজালে শ্রুতিমধুর সুর এবং একসাথে বাজিয়ে কর্ড (Chord) বানানো যায়। কয়েকটি সুপরিচিত স্কেল ফর্মুলা-

  • Major Scale: R, W, W, H, W, W, W, H
  • Natural Minor Scale: R, W, H, W, W, H, W, W
  • Harmonic Minor Scale: R, W, H, W, W, H, 1 1/2, H (notice the step and a half)
  • Melodic Minor Scale: going up is: R, W, H, W, W, W, W, H
    going down is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Dorian Mode is: R, W, H, W, W, W, H, W
  • Mixolydian Mode is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Ahava Raba Mode is: R, H, 1 1/2, H, W, H, W, W
  • A minor pentatonic blues scale (no sharped 5) is: R, 1 1/2, W, W, 1 1/2, W

এখানে R বলতে Root note বা প্রথম নোট, W (Whole) দ্বারা একটি নোটের দূরত্ব এবং H (half) দ্বারা ঠিক পরবর্তী নোট বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ ভাবা যাক আমরা মেজর স্কেলের একটি সুন্দর সুর বের করতে চাই যার প্রথম নোট হবে c নোট। যেহেতু c Root note হিসেবে ব্যবহৃত হবে একে বলা হবে c Major scale এবং সেটি হলো-

C             D             E             F              G             A             B             C

লক্ষণীয় এখানে আটটি নোটের গুচ্ছকে Octave বলে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া c নোটটি মূল নোটের দ্বিগুণ ফ্রিকোয়েন্সির। এক্ষেত্রে r w w h w w w h সূত্রের প্রয়োগ ঘটেছে এবং ব্যাপারটি যে শুভঙ্করের ফাঁকি নয় তা হাতের কাছে থাকা কোনো

কীবোর্ড বা গীটার বা মোবাইল অ্যাপে নির্দিষ্ট ক্রমে নোটগুলো বাজালেই বোঝা যাবে, শুনতে পারবেন অতি পরিচিত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা। এক্ষেত্রে Root note হিসেবে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে সূত্রটি প্রয়োগ করুন, সুরের অনুপাত এক থাকবে, হেরফের হবে না।

নোট বুঝলাম, স্কেল বুঝলাম, এবার কর্ডের (Chord) পালা। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে Chord বলতে তিনটি বা ততোধিক নোটের সম্মিলন বোঝায় যেগুলো একসাথে বাজালে ঐকতানে থাকবে, শ্রুতিমধুর শোনাবে। ফরাসি শব্দ Accord থেকে এর উৎপত্তি যার পরিভাষা Agreement বা চুক্তি অর্থাৎ একই সাথে মানিয়ে নেবার মতো একটি ব্যাপার।

পূর্বে আমরা Major scale বের করেছি। Chord বেরুবে স্কেল থেকে, উদাহরণস্বরূপ এ স্কেলের ১-৩-৫ নম্বর নোট একসাথে বাজালে একটি ঐকতানের সৃষ্টি হবে এবং তার নাম হবে c chord, এটিও সূত্রের প্রয়োগ। এর মাঝে আবার আরও কিছু নিয়ম আর সূত্র আছে যেগুলো প্রয়োগ করে সবগুলো Chord বের করা যায় এবং গণিতে উৎসাহী যে কেউ অনুধাবন করতে পারবে যে অসংখ্য স্কেল, তার থেকে আবার অসংখ্য Chord এর কী বিশাল সমাহার মিউজিশিয়ানদের হাতে থাকে।

এর গুরুত্ব কী? আমরা যদি কোনো গানের সাথে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে চাই, তবে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে, নির্দিষ্ট বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু Chord-ই বাজবে। একেকটি Chord-এর রূপ একেক রকম, যেন একেক রকম মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অসংখ্য সম্ভাব্য বিকল্প থেকে গানের কথার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো Chord মিউজিশিয়ান বেছে নেবেন এখানেই তার মুন্সিয়ানা, তার মাথায় ঘুরতে থাকা একটি সুরেলা গল্পকে তিনি বাস্তব রূপ দেবেন এবং কুড়োবেন প্রশংসা। উৎসাহীদের জন্য বিখ্যাত Titanic সিনেমার Soundtrack – My heart will go on গানটির কিয়দংশের Chord-

সুরসাগর থেকে এক গ্লাস জল উঠিয়ে এতক্ষণ ধরে ঢাললাম মাত্র। কিন্তু এর মাঝে এ.আই এর আগমন ঘটল কীভাবে? একটু আগে বলেছি Chord এর সমন্বয় কীভাবে সাধন করবেন এটি নিয়েই সুরকারের মাথাব্যাথা। ধরা যাক, প্রথম লাইনের অর্ধেকের সাথে বাজানোর জন্য অনেক ভেবে তিনি একটি Chord বাছাই করলেন। এখন তার কাজ হলো পরবর্তী আরেকটি Chord-এর মাধ্যমে ভাবের সমন্বয় সাধন করে লাইনটি শেষ করা। ব্যাপারটি যতটা সহজে বলা গেলো ঠিক ততটাই কঠিন। আগেই বলেছি, সামনে বাছাইয়ের জন্য অপশন রয়েছে অনেকগুলো। তার মধ্যে সেরা বাছাই কোনোটি হতে পারে? গানের লাইন আছে আরও বেশ কয়েকটি এবং পুরোটুকুর মাঝে এভাবে সমন্বয় সাধন করতে হবে! উপায় একটিই ছিল। সঙ্গীত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থেকে একটি Chord বেছে নেয়া। কিন্তু এর চেয়েও ভালো একটি বিকল্প হয়তো বাদ পরে গেলো!

একটি গান সুর করতে একাধিক মাস লেগেছে এটিই সঙ্গীতে সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি যদি একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় যা সম্ভাব্য অপশনগুলো দ্রুত বাজাবে একের পর এক এবং কোনো এক মুহূর্তে একটা সমন্বয় শুনে সুরকার বলে উঠবেন ‘ইউরেকা’, অথবা আরেকটি ভয়াবহ রকমের

সমন্বয়েরও মুখোমুখি হতে পারেন, যা নিজে সুস্থ মস্তিস্কে তিনি কখনো বাজাতেন না! যাই হোক, ঘণ্টা খানেকের মাঝেই সম্ভাব্য অনেকগুলো অপশন যাচাইবাছাই করা সম্ভব হবে, সময় বাঁচবে, গাণিতিকভাবে সম্ভাব্য সব বিকল্প ঘাটা যাবে, পৌঁছনো যাবে চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্তে এবং এতক্ষণ ধরে রূপকথার মতো সাধাসিধে ভঙ্গিতে যা বর্ণনা করলাম, তার গালভরা নাম হচ্ছে Algorithmic Composition। কৌশলগত আলোচনায় না গিয়ে কেবল মূল প্রক্রিয়াটি সরলভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা আরকি।

এ.আই এর দৌড় এখানেই শেষ নয়। যেমন কোনো একটা Chord-এর মাঝে অতিরিক্ত নোট যোগ, লয় (Tempo) বাড়ানো এবং একইসাথে একাধিক Chord বাজালে তার প্রভাব- ইত্যাদি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে একটি একটি করে পরীক্ষা করা যায়। তারপর সুরকার যদি নির্দিষ্ট কোনো একটি প্যাটার্ন বাছাই করে দেন যে, এই গানের সুরের আলোকে সম্ভাব্য আরেকটি সুর দাঁড় করাও, সেটিও সম্ভব। ব্যাপারটিকে বলা হয় Mimic করা যেখান থেকে এ.আই এর সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’র পরবর্তী গল্পের অধ্যায় শুরু।

চিত্রঃ সফটওয়্যার ব্যবহার করে Synthesis করবার একটি দৃশ্য।

এতক্ষণ ধরে একটি গানের সুর তৈরি করবার বা কাঠামো দাঁড় করাবার যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো তা নিছকই একটি উদাহরণ মাত্র। সুর করবার মতো সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে মানুষ চাইলেই কীভাবে যন্ত্রের সহযোগিতা নিতে পারে তা সঙ্গীতের মৌলিক কিছু উপকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশ্যই সুর সৃষ্টির কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। বর্তমান যুগে সঙ্গীতের জগতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেন বিতর্ক সৃষ্টি করছে তা কিছুটা হলেও হয়তো আঁচ করা যায়। এক্ষেত্রে Liquid Notes, Quartet Generator, Maestro Genesis বেশ প্রসিদ্ধ কয়েকটি সফটওয়্যার।

Experiments in Musical Intelligence (EMI)

এ.আই এর সংগীতচর্চা বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন গবেষক হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ড. ডেভিড কোপ। তিনি ১৯৮০ সালের দিকে এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন এবং প্রায় তিন যুগ ধরে এর সাথে জড়িত আছেন। তিনি একটি প্রজেক্ট শুরু করেন যেটিকে

প্রাথমিকভাবে Experiments in Musical Intelligence (EMI) বা সংক্ষেপে Emmy হিসেবে নামকরণ করা হয়। EMI তৈরির প্রথম দিকে লক্ষ্য ছিল মূলত বিভিন্ন গান ইনপুট হিসেবে দিয়ে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ভাঙার চেষ্টা করা। তারপর সেগুলো কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা, যেন কোনো একটি জিন-নকশা জেনে নিয়ে তাতে কিছু পরিবর্তন করা। প্রথমদিকে তিনি EMI ব্যাবহার করে নিজের সুর করা কিছু গানকে পরিবর্তন করতেন, উল্লেখ্য তিনি একইসাথে একজন সঙ্গীতজ্ঞ।

পরবর্তী ধাপে তিনি দেখলেন EMI পদ্ধতি কেবল তার করা অপেক্ষাকৃত সরল সুরগুলোকেই নয়, Bach, Beethoven, Mahler সহ ইতিহাসের প্রসিদ্ধ সব সঙ্গীতজ্ঞদের কাজকে অনুকরণ করতে পারছে। ফলাফল ছিল অনেকটা ভৌতিক। শত বছর আগের ধ্রুপদি শিল্পীদের কাজগুলো অনেকটা পুনর্জন্ম পেতে থাকে EMI প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ডেভিড কোপের একটি উক্তি উল্লেখ করবার মতো- “You name the composer and EMI could analyze his works to spit out a new piece that sounded just like the composer had written it himself. Except he hadn’t; a computer had.”

Emily Howell এর জন্ম

২০০৩ সালের দিকে কোপ সিদ্ধান্ত নেন EMI প্রজেক্টটি নতুন মাত্রায় নেবার। এর আগ পর্যন্ত তিনি EMI এর কাজগুলো সত্যিকারের মিউজিশিয়ানদের দ্বারা রেকর্ড করাতেন, সুরটি সৃষ্টির পর। কিন্তু তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন EMI এর কাজগুলো এবার ডাটাবেজ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন একটি প্রোগ্রাম ডিজাইন করবেন, কিন্তু তার স্বকীয়তা হবে এই যে তা শ্রোতাদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ইনপুট হিসেবে নেবে এবং বিভিন্ন ধাঁচের সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে একেবারেই নতুন সুরের জন্ম দেবে সত্যিকারের শিল্পীর মতো। এ ব্যাপারে তিনি ‘Computer Models of Musical Creativity’ নামক একটি বই লেখেন যাতে কৌশলগত দিকগুলোর বিশদ বিবরণ আছে।

২০০৯ সালে Centaur Records থেকে প্রকাশ পায় এমিলির প্রথম এলবাম- “From darkness, light” এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় এলবাম- “Breathless”! এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য এ.আই হলো ইউনিভার্সিটি অব মালাগায় তৈরি ‘Lamus’ নামক একটি Computer cluster যা সর্বোচ্চ ৮ মিনিটে পূর্ণদৈর্ঘ্য Symphony থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাঁচের নতুন সুর তৈরি করতে পারে এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে Lamus এর করা সুর এর ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে London Symphony Orchestra পারফর্ম করে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে!

ব্যাপারটা শেষে এখানে এসে ঠেকলো যে, যন্ত্র সুর করে দিচ্ছে আর গাইছে মানুষ, যেখানে প্রথম দিককার দিনগুলোতে মানুষের তৈরি গানের বিশ্লেষণের কাজেই কেবল এ.আই ব্যবহার করা হতো! সত্যি কথা বলতে গেলে, সৃজনশীল কাজে এ.আই-এর পারদর্শিতা বৃদ্ধির ব্যাপারটি চমকপ্রদ হলেও কিছুটা ভীতিকরও বটে! এখানে উল্লেখ্য ব্যাপারটি হলো এই যে, এ লেখায় সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার যে ধাপ বা প্রক্রিয়াগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কোনো বিধিবদ্ধ সূত্র নয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীতই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে! এগুলো ছিল নিছকই সাধারণ কিছু উদাহরণ এবং সঙ্গীতের বিশালতার তুলনায় কিছুটা হাস্যকরও বটে!

তবে মূল ব্যাপারটি হলো, যন্ত্র শিখছে এবং শিখছে বেশ দ্রুত। এ শিখন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ কী তা আমরা সময়ের পরিক্রমার সাথেই জানতে পারবো। সেই সাথে হয়তো নতুন করেনির্ধারিত হবে শিল্প এবং সৃজনশীলতার সংজ্ঞাও।

তথ্যসূত্র

  1. http://arstechnica.com/science/2009/09/virtual-composer-makes-beautiful-musicand-stirs-controversy/
  2. http://absolutelyunderstandguitar.com/index.php/all-hail-the-chromatic-scale
  3. https://wikipedia.org/wiki/Algorithmic_composition
  4. http://www.gizmag.com/creative-artificial-intelligence-computer-algorithmic-music/35764/
  5. https://en.m.wikipedia.org/wiki/­Diatonic_and_chromatic http://m.intmath.com/trigonometric-graphs/music.php
  6. http://www.musiclearning.com/lessoncentral/chords/buildingchords.html
  7. http://www.bandnotes.info/tidbits/scales/half-whl.htm
  8. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mathematics_of_musical_scales
  9. http://m.wikihow.com/Learn-All-the-Notes-on-the-Guitar
  10. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Musical_scale

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse

 

 

বুরানঃ একটি রুশ রূপকথা

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে এবার বুঝি আর রক্ষা পাওয়া যাবে না। মার্কিনীরা এমন এক মহাকাশযান তৈরি করছে যা মহাকাশে গিয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আবার ফিরে আসতে পারে। এবং এটি পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম। মার্কিনীরা যানটার নাম দিয়েছে ‘স্পেস শাটল’। স্নায়ুযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে এখন সোভিয়েতদেরও চাই এমন একটি যান যেটা কাজ করবে ঠিক মার্কিনীদের মহাকাশযানের মতো কিংবা তার থেকেও বেশি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এভাবেই শুরু হয় পুনরায় ব্যাবহারযোগ্য মহাকাশযান বানানোর প্রতিযোগিতা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক ডিক্রির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘বুরান-এনারগিয়া’ প্রজেক্ট।

চিত্রঃ মার্কিন স্পেস শাটল (বামে) ও রাশিয়ান বুরান (ডানে)।

কাজাখাস্থানের বৈকনুর কসমোড্রামের এক গোপন কারখানায় শুরু হয় এই প্রজেক্ট। রুশ ভাষায় বুরান শব্দের অর্থ ‘তুষার ঝড়’। মূল যান প্রস্তুত করার দায়িত্ব পায় সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রকেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি RKK Energia। প্রস্তুতকারক দলের প্রধান ছিলেন রকেট বিশেষজ্ঞ ‘গ্লেভ লোজিনো-লোজিনস্কি’, যিনি এর আগে ‘স্পাইরাল’ প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। তার সাথে যুক্ত হয় ১২০০ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং সোভিয়েত সরকারের প্রায় ১০০ মিনিস্ট্রি। বাজেট ধরা হয় প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন রুবল। সোভিয়েত রকেট বিজ্ঞানীরা ঠিক মার্কিনীদের মতোই একটি যান প্রস্তুত করতে থাকেন। তবে এটি আরো উন্নত সংস্করণ। বুরানকে মোট ১০ জন নভোচারী বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্থুত করা হয়। এর ওজন বহন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়। এটি ৩০ টন পরিমাণ ভর নিয়ে মহাকাশে যেতে পারত এবং ফিরে আসতে পারত ২০ টন নিয়ে। এর গায়ে তাপ নিরোধক প্রায় ৩৮০০০ টি টাইলস বসানো ছিল। যে বৈশিষ্ট্যটি বুরানকে মার্কিন স্পেস শাটল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল তা হলো, প্রকৌশলীরা একে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্তুত করেন। মানুষ্যবিহীন অবস্থায় মহাকাশে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে।

১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে বুরান তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মহাকাশে গিয়ে পৃথিবীকে ২০৬ মিনিটে দুইবার প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে। ২০১০ সাল পর্যন্ত বুরান ছিল একমাত্র মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান যেটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। বুরানের এই কীর্তি সোভিয়েত নেতাদের গোপনীয়তার কারণে দীর্ঘদিন পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি।

এর কিছুদিন পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অন্য অনেক প্রজেক্টের মতো ‘বুরান’ প্রজেক্টও বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেতসিন আনুষ্ঠানিকভাবে বুরান প্রজেক্টের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এই প্রজেক্টে বুরানের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি হয়, যাদের একটির নাম ‘পিচকা’, এর কাজ ৯৭% সম্পন্ন হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি প্রোটোটাইপ ‘বৈকাল’, এর ৫০% কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এটি দীর্ঘদিন ধরে অনেক অবহেলায় একটি পুরনো গাড়ির গেরেজে পড়ে ছিল। মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি পার্কের দর্শকরা সকাল-বিকাল দেখে তাদের স্বপ্নের করুণ অবস্থা। এখানেও রাখা আছে বুরানের একটি প্রোটোটাইপ। পর্যাপ্ত দেখভালের অভাবে যেটি ধ্বংসপ্রায়। প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুবল বাজেটের এই প্রজেক্টের কোনো মেটারিয়ালই পরবর্তীতে কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। রুশ মহাকাশ একাডেমির বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ঝিলকিয়ানভের কণ্ঠে নিদারুণ হতাশা ফুটে ওঠে- “Buran was made to shine in Space, but finally it died on Earth”।

বুরান গল্পের শুরু হয় ১৫ ই নভেম্বরের এক রৌদ্দোজ্বল দিনে। এই গল্প শেষ হয় ১২ ই মে ২০০২ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। কিছু কর্মী কাজাখাস্থান কসমোড্রামের হ্যাজ্ঞার ১১২ মেরামত করছিল যেখানে রয়েছে বুরান ১.০১। একমাত্র এই মডেলটিই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। মেরামতের এক পর্যায়ে হ্যাজ্ঞারটির ছাদ ধ্বসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ৭ কর্মীর মৃত্যু হয়। পাশাপাশি মৃত্যু হয় এক রঙিন স্বপ্নের। জন্ম হয় নতুন এক রুশ রুপকথার, যার নায়ক এক নিসঃজ্ঞ মহাকাশযান।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.russianspaceweb.com/buran.html
  2. http://www.buran.ru/htm/molniya.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Buran_programme
  4. http://www.buran.ru/htm/techno.htm

     

মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

বাস্তবতা কী?

জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তাই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?

এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। বিশটিরও অধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বেশি শক্তিশালী। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।

কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলবো? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?

ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে

বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।

আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।

অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌড়ে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।

এদিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।

আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই,

এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।

আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এদিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।

মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।

সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।

নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কিওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster) স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।

এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

যেসকল জিনিসের বাস্তবতা ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় না, সেসকল জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেন। পদ্ধতিটির নাম ‘মডেল’। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি পরিচিত নয়। মডেল হচ্ছে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার সত্যিকার মাধ্যম। আমাদের আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের আশেপাশের এইখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল। এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জীব জগৎ ও জড় জগৎ নিয়ে এভাবেই বৈজ্ঞানিক মডেল উপস্থাপন করেন। মডেল প্রদানের পর ঐ মডেলকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। মডেল হতে পারে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি কোনো রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি কিংবা হতে পারে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কিংবা হতে পারে কম্পিউটারের কোনো সিমুলেশন।

এই মডেল যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ফলাফল হিসেবে কী দেখার কথা বা কী শোনার কথা কিংবা কোনো যন্ত্রে কী প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে মডেলের বেলায় গাণিতিক হিসাব নিকাশ করেও গাণিতিক ফলাফল কী পাবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মডেলে দাবি করা কথাগুলো যাচাই করা হয় এবং এই মডেল সঠিক হয়ে থাকলে এটির ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো কিছু সম্পর্কে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। সঠিক হয়ে থাকলে কী দেখতে পাবার কথা বা কী শুনতে পাবার কথা কিংবা কী উপলব্ধি করতে পারার কথা তা মিলিয়ে দেখা হয়। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় তাহলে মডেলকে আপাতত

সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে পারি যে, মডেলে যা দাবি করা হচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার অংশ।

উৎরে যাওয়া মডেলকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যত বেশি পরীক্ষায় পাশ করবে তত বেশি পরিমাণ নির্ভুল ও তত বেশি পরিমাণ বাস্তব বলে বিবেচিত হবে। যদি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী না মিলে তাহলে এটিকে বাতিল ও ভুল বলে গণ্য করা হয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। অন্য উপায়েও যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তাহলে মডেলটিকে সংশোধন করে আবারো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বেলায় কোনো ছাড় নেই।

বৈজ্ঞানিক মডেল নিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমরা জানি বংশগতির একক জিন, DNA নামক এক প্রকার তন্তু দিয়ে গঠিত। আজকের যুগে DNA সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। DNA কী, কীভাবে কাজ করে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানি। কিন্তু DNA’র গঠন কেমন তা দেখতে পারি না। এমনকি খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেও এর গঠন দেখা যায় না। DNA সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় সবই এসেছে কল্পনায় তৈরি করা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল ও মডেলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।

মানুষ যখন DNA সম্পর্কে কিছুই জানতো না, এমনকি DNA -র নামও শুনেনি তখনও জিন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের জানা ছিল। দেড়শো বছর আগের কথা, ইতালির পাশের দেশ অস্ট্রিয়ায় গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। মেন্ডেল তার গির্জার বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। মটরশুঁটি বীজ নিয়ে তার মনে একটা ভাবনা খেলা করায় তিনি যত্ন নিয়ে বাগানে বেশ কিছু মটরশুঁটি রোপণ করলেন, এবং পরিচর্যা করে বড় করতে লাগলেন। যে যে গাছ ফল হিসেবে সবুজ বা হলুদ কিংবা উভয়ের মিশ্রণ দিয়েছে তাদের গুনে রাখলেন। এ বীজগুলো থেকে আবার চারা তৈরি করে ঐ চারার বীজের রঙ পর্যবেক্ষণ করলেন। এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে তিনি চমৎকার একটি সূত্র খুঁজে পান।

চিত্রঃ মগ্ন মেন্ডেল। চিত্রঃ Charley Harper Art Studio

তিনি খেয়াল করে দেখলেন মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্যগুলো চমৎকার একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে বংশ পরম্পরায় বয়ে চলে। মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সন্তানরা দেখতে শুনতে কিংবা অন্য কোনো

বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রায় সময় তাদের বাবা-মায়ের মতো হয়। মেন্ডেলের আবিষ্কার করা এই জিনিসটার জন্যই সন্তানেরা বাবা-মায়ের মতো হয়।

মেন্ডেল কিন্তু কোনো জিনকে কখনো চোখে দেখেননি বা ছুঁতেও পারেননি। কিন্তু তারপরেও তিনি অনুধাবন করেছিলেন ‘কিছু একটা’ জিনিস আছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এর সবগুলোই তিনি করেছিলেন গণনা ও হিসাব নিকাশের মাধ্যমে। মটরশুঁটি গাছের সবুজ ও হলুদ বীজ নিয়ে তিনি একটি মডেল প্রদান করেছিলেন। এই মডেল যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবুজ ও হলুদ মটরশুঁটিকে বিশেষ উপায়ে নিষিক্ত করা হলে এক পর্যায়ে সবুজ মটরশুঁটির তিনগুণ হলুদ মটরশুঁটি পাওয়া যাবে। এবং তার পরীক্ষার ফলাফলে ঠিক এমনটাই পাওয়া গিয়েছিল।

বিপ্লবী এই আবিষ্কারটা তিনি করেছিলেন তার কল্পনার মডেলের মাধ্যমেই। এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক আবিষ্কার হয়েছে মডেলের মাধ্যমে। মেন্ডেলের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার কোনো উপায় ছিল না। এসব সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের মডেলের আরো উন্নয়ন করেন। মটরশুঁটি বীজের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের উপরও এই সূত্র প্রয়োগ করেন।

মেন্ডেল DNA দেখতে পাননি। DNA-র আকার আকৃতি কেমন আজকের যুগে আমরা তা জানি। শুধু আকার আকৃতিই না, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে DNA সম্পর্কে অনেক অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছে।

DNA-র সত্যিকার আকৃতি কেমন তা জানতে পেরেছি বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের কল্যাণে। ওয়াটসন ও ক্রিকের পাশাপাশি তাদের আগে ও পরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও অবদান আছে। ওয়াটসন আর ক্রিকও কিন্তু DNA-র আকৃতি নিজেদের চোখে দেখননি। তারাও গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি করেছিলেন তাদের কল্পিত মডেল প্রদানের মাধ্যমে এবং ঐ মডেলের সত্যাসত্য যাচাইয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।

তাদের মডেল বাস্তবায়নের জন্য লোহা ও কাঠ ব্যবহার করে DNA-র আনুমানিক গঠনের একটি রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। এই মডেল সঠিক হলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে তাও গবেষণা-হিসাব-নিকাশ করে বের করলেন। অর্থাৎ কিছু একটা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

রোজালিল্ড ফ্রাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ওয়াটসন ও ক্রিকের দাবী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। তারা এক্স-রে বীম দিয়ে বিশুদ্ধ DNA ক্রিস্টালের ছবি তুললেন। তাদের তোলা ছবিতে DNA-র গঠন আর ওয়াটসন ও ক্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করা DNA-র গঠন ঠিক ঠিক মিলে যায়। এর ফলে একটি কল্পিত মডেল যুগান্তকারী এক আবিষ্কারে পরিণত হয়। ওয়াটসন ও ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল মূলত মেন্ডেলেরই আবিষ্কারের আধুনিক রূপ।

চিত্রঃ ওয়াটসন ও ক্রিক। অলংকরণঃ Dave McKean

আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাস্তবতা কী, তিনটি ভিন্ন উপায়ে বাস্তবতা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানলাম। প্রথমটি হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি কোনোকিছুকে উপলব্ধি করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শেষের পদ্ধতিটি হচ্ছে মডেল তৈরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা ঐ মডেলের সত্যাসত্য নির্ণয়ের মাধ্যমে আরো পরোক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। মানে ঘুরেফিরে এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে সেটি শেষমেশ ইন্দ্রিয়তে গিয়েই শেষ হচ্ছে। যে পদ্ধতিতেই হোক, বেলা শেষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বাস্তবতা নির্ধারিত হচ্ছে।

তাহলে তার মানে কি এই, যা নির্ণয়-নির্ধারণ করা যাবে তা-ই শুধু বাস্তব আর বাকি সব অবাস্তব? তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালোবাসার মতো জিনিসগুলো কোথায় যাবে? তারা কি অবাস্তব?

অবশ্যই এরা বাস্তব। কিন্তু এই আবেগ-অনুভূতিগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের উপর তাদের তীব্রতার পরিমাণ নির্ভর করে। আবার সব প্রাণীর মস্তিষ্কে সব ধরনের আবেগ-অনুভূতি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক কিংবা অন্যান্য উন্নত প্রাণী যেমন- শিম্পাঞ্জী, কুকুর, তিমি মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের তীব্র আবেগ অনুভূতি আছে। ইট-পাথর পাথরের কোনো আনন্দ-বেদনা নেই, পাহাড়-পর্বতেরা কখনো প্রেমে পড়ে না।

এই অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে তখনই বাস্তব হবে যখন মস্তিষ্ক এই অনুভূতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করবে। অভিজ্ঞতা লাভ করার আগ পর্যন্ত এর সত্যিকার রূপ সম্বন্ধে মস্তিষ্ক কিছুই জানবে না। একটা উদাহরণ দেই। একটি ছেলে বা মেয়ের কথা বিবেচনা করি, যে তার জীবনে এখন পর্যন্ত একটাও আম খেয়ে দেখেনি। বই-পুস্তকে অনেকবার পড়েছে ও অনেকের কাছে শুনেছে, পাকা টসটসে হিমসাগর আম অনেক সুস্বাদু হয়। বইতে আরো পড়েছে এই জাতের আম অনেক মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হয়, কিন্তু খেয়ে দেখেনি কখনো। সে বই-পুস্তকে যত বিবরণই পড়ুক, যত প্রশংসাই শুনুক, পাকা আমের সত্যিকার স্বাদ সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্তু কিছুই জানতে পারছে না। মস্তিষ্কে অনুভূতি তখনই বাস্তব হবে যখন ঐ অনুভূতি সম্পর্কে মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

চিত্রঃ এখানের সবকটি ফলের স্বাদের অনুভূতি কি আপনার আছে? ছবিঃ Visual Encyclopedia of Fruits

তবে আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করতে পারি না অন্যরা সেই অনুভূতি ঠিকই অনুভব করতে পারে। এমনও অনুভূতি থাকতে পারে যার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। এমনও হতে পারে দূরের কোনো গ্রহে এমন কোনো এলিয়েন আছে যাদের মস্তিষ্কে আমাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো অনুভূতি কাজ করছে। কে জানে কী অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক অনুভূতি খেলা করছে তাদের মস্তিষ্কে।

তথ্যসূত্র

লেখাটি The Magic of Reality: How we know whats really true, D. Richard, Free Press, New York, 2011 এর প্রথম অধ্যায় what is reality? What is magic? এর প্রথম অংশের ভাবানুবাদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং প্রয়োজনীয় ছবি যোগ করা হয়েছে।