চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবারের নোবেল

২০১৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল দেয়া হয় জাপানের কোষ জীববিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি’কে। ‘অটোফ্যাগি’ নামক এক ধরনের কোষীয় প্রক্রিয়া নিয়ে তার কাজের অবদান স্বরূপ তাকে এই সম্মাননা দেয়া হয়। ‘অটোফ্যাগি’ একটি গ্রিক শব্দ। auto এবং phagin এর অর্থ যথাক্রমে ‘স্ব’ বা ‘নিজ’ এবং ‘ভক্ষণ করা’। স্ব-ভক্ষণ বা আত্ম-ভক্ষণের মিলিত রূপই হলো ‘অটোফ্যাগি’।

অটোফ্যাগি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় কোষ নিজের অন্তঃস্থ উপাদানগুলোকে নিজে ধ্বংস করে এবং পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। কোষীয় অনাহারের সময় কোষের দীর্ঘজীবী প্রোটিন এবং অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ভেঙ্গে যায় এবং সেগুলো পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে কোষ শক্তি উৎপাদন করে থাকে। এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কোষগুলো বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করে। তাছাড়া কোষের ক্ষতিগ্রস্ত গঠনতন্ত্র ঠিক করতেও এ প্রক্রিয়া সহায়তা করে।

অটোফ্যাগি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষকে রুখে দেয়া, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, অনাক্রম্যমূলক রোগের প্রতিকার করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ার থেমে যাবার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হবার সাথে সম্পর্ক রয়েছে।

ড. ওসুমি ২৭ বছর আগে ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এর সাথে জিনের সম্পর্ক, রোগ প্রতিরোধে এর ভূমীকা এবং এর স্বাভাবিক ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে জানতে পারেন।

তার এর আবিষ্কারের সাথে সূত্র খুঁজতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। সেই সময় বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষায়িত কোষীয় অঙ্গাণু খুঁজে পান যাতে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং লিপিড (ফ্যাট) বিদ্যমান। গবেষকরা পরবর্তীতে জানতে পারেন যে, বিস্ময়জনকভাবে ‘লাইসোসোম’ নামক একটি কোষীয় অঙ্গাণুতে ঠিক একই রকম সব উপাদান রয়েছে। তারা ধরে নেন যে, এ অপেক্ষাকৃত বড় অঙ্গাণুটির সাথে মূল কোষের একটি পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। এ পরিবহণকারী মাধ্যমগুলোকে বলা হয় ‘অটোফ্যাগোসোম’। এরা কোষীয় প্রয়োজনীয় উপাদানকে লাইসোসোমে বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু মূল রহস্য হলো কীভাবে এ অঙ্গাণু জটিল প্রোটিন ও অন্যান্য বস্তুকে ভেঙ্গে পুনরায় ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। আর এখানেই ডঃ ওসুমির গবেষণা মূল ভূমিকা পালন করে।

ওসুমি বলেন, “কোষীয় ভ্যাকুওলের কোষের বর্জ্য পদার্থ হিসেবে ভাবা হতো এবং কোনো গবেষকই এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখান নি। তাই আমি ভাবলাম, ভ্যাকুওলের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করলে ভালো হয়। এ কাজে তেমন প্রতিযোগিতাও ছিল না।”

ওসুমি মানুষের দেহকোষের লাইসোসোমে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন। ঈস্টকে মানবকোষের যথার্থ মডেল ধরা হলেও ঈস্ট আকৃতিতে ছিল ছোটো। তিনি ঈস্ট কোষের অন্তর্বর্তী কার্যক্রম দেখার জন্য একটা পথ খুঁজে বের করলেন। অটোফ্যাগি চলার সময় ভ্যাকুওলের অবনয়ন কিংবা ক্ষয় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা গেলে অটোফ্যাগোসোমগুলো ভ্যাকুওলকে স্তুপাকারে জমা করে। আর তখন ভ্যাকুওলগুলো মাইক্রোস্কোপের নীচে দৃশ্যমান হয়।

অবনয়ন প্রক্রিয়ার কারণে কোষে এনজাইম কমে যায়। আর সেই কম এনজাইমযুক্ত পরিবর্তিত ঈস্টে অটোফ্যাগি প্রক্রিয়া ভালোভাবে দেখতে পান ড. ওসুমি। তিনি ধ্বংস না হওয়া ছোট ছোট ভেসিকলযুক্ত ভ্যাকুওল দেখতে পান এবং প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি হয় এবং সেই সাথে এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত জিন শনাক্ত করতে পারেন।

অটোফ্যাগি প্রক্রিয়াটি কোষের টিকে থাকা এবং সঠিকভাবে কোষীয় কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি যদিও ঈস্ট কোষে অটোফ্যাগি জীণ এবং এর মেটাবলিক পথ আবিষ্কার করেন তবুও এটি উন্নততর কোষ যেমন মানবকোষেও একই পদ্ধতিতে কাজ করে। এ সকল জীনে মিউটেশন ঘটলে রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও থাকে। ইউশোনারির এ কাজ পৃথিবীর অনেক গবেষকের জন্য অনুপ্রেরণার যোগান দেয় এবং সেই সাথে এ বিষয়ে আরো অধিক গবেষণা চালাবার নতুন পথ খুলে দেয়। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর প্যাথোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিউংমিন ওয়াং জানান, ”ডঃ ওসুমি বাদে জীববিজ্ঞানের এ শাখাটির কথা চিন্তাই করা যায় না।”

চিত্রঃ নোবেল বিজয়ী ইয়োশিনোরি ওসুমি

ডঃ ওসুমি ১৯৪৫ সালে জাপানের ফুকোকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় হতে পি.এইচ.ডি সম্পন্ন করেন। প্রথম জীবনে রসায়ন নিয়ে কাজ করতে চাইলেও সুযোগ ও সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে সচেষ্ট হন। কিন্তু তার পি.এইচ.ডি গবেষণা ততটা ফলপ্রসূ ছিল না বলে চাকরি পেতে তাঁকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এরপর তার পরামর্শক তাঁকে নিউয়র্কের রকফেলার ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে পরামর্শ দেন যেখানে তিনি ইঁদুরের ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন নিয়ে কাজ করেন।

২০১২ সালে ‘জার্নাল অব সেল বায়োলজি’কে তিনি জানান, “সেই সময় আমি বেশ হতাশ ছিলাম।” পরবর্তীতে তিনি ঈস্টের ডিএনএর দ্বিতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। এ কাজ তাঁকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে জুনিয়র প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পেতে সহায়তা করে। সেখানেই তিনি মাইক্রোস্কোপ নিয়ে ঈস্টের কোষ নিয়ে গবেষণা চালান। সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর। আর আজ এতো বছর পর সে কাজেরই স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরস্কার নোবেল দেয়া হলো। জাপানিজ টেলিভিশিন NHK-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নোবেল পাবার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, এ পুরস্কার আমার জন্য অনেক সম্মানের। তরুণদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, যে কেউ বিজ্ঞান নিয়ে সফলতা অর্জন করতে পারবে। কিন্তু সেজন্য তাকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।” তিনি বর্তমানে টোকিও ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে অনারারি প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রথা অনুযায়ী আগামী ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অন্যান্য নোবেল বিজয়ীদের সাথে তার হাতে নোবেল পদক এবং পুরস্কারের অর্থমূল্য তুলে দেয়া হবে।

তথ্যসূত্রঃ

১/https://www.nobelprize.org/nobel_prizes/medicine/laureates/2016/

২/http://www.livescience.com/56349-japanese-scientist-wins-nobel-prize-in-medicine.html

৩/https://www.newscientist.com/article/2107747-medicine-nobel-prize-goes-to-discovery-of-how-our-cells-recycle/

স্পেস পেন

স্পেস পেন

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় আমির খানের সেই বিশেষ কলমের কথা সবারই মনে আছে, যে কলম দিয়ে মহাশূন্যেও নির্বিঘ্নে লেখা যেতো। শুধু সিনেমাতেই নয়, আসলে বাস্তবেও এমন বিশেষ কলম আছে। ছবিতে দেখানো কলমটিই সেই বিশেষ কলম।

১৯৬৭ সালে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর নাসা তাদের মনুষ্যবাহী স্পেস মিশনের জন্য এ ‘ফিশার স্পেস পেন’ বেছে নেয়। এখন আমেরিকা আর রাশিয়া দুই দেশই এটা ব্যবহার করছে। আর আমজনতা, যাদের কাছে মহাশূন্যে যাওয়া কেবলই এক স্বপ্নের নাম, তাদের জন্যও এই কলমটি কিনতে পাওয়া যায়।

‘জিরো গ্র্যাভিটি পেন’ নামে পরিচিত এ কলমে ব্যবহার করা হয়েছে প্রেশারাইজড্‌ ইঙ্ক কার্ট্রিজ। পানির নিচে, মহাশূন্যে, ভেজা ও তৈলাক্ত কাগজের উপরও এর সাহায্যে লেখা যাবে। এ কলমটি উদ্ভাবনের পেছনে ছিলেন অস্ট্রিয়ার ফ্রিডরিখ শাখতার, আমেরিকার পল সি ফিশার এবং আরেক অস্ট্রিয়ান আরউইন রাথ।

 

টাইটানে কয়েক শত মিটার গভীর খাঁদের সন্ধান

শনির উপগ্রহগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় এটি। এই উপগ্রহটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যাসিনি স্পেসক্রাফট প্রেরণ করা হয়।ক্যাসিনির দেয়া সাম্প্রতিক তথ্য বলছে টাইটানের বুকে কয়েকশত মিটার গভীর খাঁদের অস্তিত্ব আছে এবং ঐ খাঁদে মিথেন বয়ে চলে । সময়ে সময়ে এই এলাকায় মিথেনের বন্যা ও হয়।খাদগুলো ২৪০ থেকে ৫৭০ মিটার গভীর (৭৯০ থেকে ১৮৭০ ফুট)। খুব বেশি প্রশস্ত নয়, আধা মাইলের চেয়েও কম। খাঁদের ঢাল খুব খাড়া।গড় পড়তা ৪০ ডিগ্রি কোণে হেলানো। এই খাঁদের তলদেশে বিজ্ঞানীরা তরলিত হাইড্রোকার্বন (মিথেন)-এর সন্ধান পেয়েছেন।তরলিত এই মিথেন গুলো টাইটানের সাগর থেকে এসেছে।

গবেষকরা এখনো নিশ্চিতনন কীভাবে এই খাঁদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল।দ্রুতগতির কিংবা স্বল্প গতির ভূমিক্ষয় কিংবা অকস্মাৎ ভূমির পরিবর্তন কিংবা সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতার পরিবর্তন দায়ী থাকতে পারে এর পেছনে। সব গুলোর সম্ভাবনার কথাই ভেবে দেখা হচ্ছে।

জিকা ভাইরাসঃ পৃথিবীবাসীর নতুন আতঙ্ক

মানুষ আর প্রকৃতি এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতি সর্বদাই মানুষের জীবনকে প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। মানুষের উপর প্রকৃতির ঋণাত্মক প্রভাবও হয় খুব ভয়ংকর। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মতো দুর্যোগগুলো মানব সম্প্রদায়কে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছিল, জিকা ভাইরাস যেন তার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই নতুন এক আতংকের নাম হিসেবে পদার্পণ করেছে পৃথিবীর বুকে।

জিকা ভাইরাস কী?

জিকা ইনফেকশন রোগটি আমাদের অতি পরিচিত ডেঙ্গু রোগের মতো। এটি ছড়ায়ও এডিস মশার মাধ্যমেই। আজকাল এ রোগের কথা সংবাদমাধ্যমে, টিভি মিডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে শোনা গেলেও এমন কিন্তু না যে এ রোগের উৎপত্তি হয়েছে অল্প কয়েকদিন হলো। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা ফরেস্টে এ রোগ সর্বপ্রথম রেসাস বানরের মধ্যে থেকে মশাদের শরীরে ছড়ায়। সর্বপ্রথম এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে নাইজেরিয়ায়। আফ্রিকায় এ রোগ কিছু কিছু সময় দেখতে পাওয়া গেলেও পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত মে মাস থেকে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কোনো সুদূরপ্রসারী ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে আসেনি। কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এ রোগ মহামারীর থেকেও বেশি ভয়ানক। কেন? সেই কথায় আসছি কিছুক্ষণ পরেই।

জিকা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

জিকা ভাইরাস ছড়ায় মূলত মশার মাধ্যমে। তবে সব ধরনের মশা নয়, শুধু এডিস গণের (genus) মশাই এ রোগের জন্য দায়ী। এ মশা যেমন একটি বড়সড় পুলের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বোতলের মুখের মধ্যে রাখা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়। এদের গোত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ সদস্য হলো এডিস এজিপ্টি যারা জিকা রোগের প্রধান বাহক। এদের বিচরণ আমেরিকায় শুধুমাত্র ফ্লোরিডা, গালফ কোস্ট আর হাওয়াই-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে খুব গরমের সময় এদের ওয়াশিংটনেও দেখা যায়। এশিয়ার টাইগার মশা এডিস এল্বোপিকটাসও এ রোগ ছড়ায়, কিন্তু পরিসরে এজিপ্টির থেকে কম।

এসব মশা যখন কোনো আক্রান্ত মানুষকে কামড়ায়, তখন রোগীর কাছ থেকে মশা জিকা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সংক্রমিত মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সে আবার জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। জিকা ভাইরাস এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সবার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলুন এ প্রশ্নের জটগুলো খোলার চেষ্টা করে দেখি।

১. জিকা ভাইরাস কি মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে ছড়ায়?2

এখন পর্যন্ত এক কথায় উত্তর হলো, হ্যাঁ! সন্তান প্রসবের পূর্ব মুহূর্তে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে এ রোগ প্রবেশ করতে পারে। মাইক্রোফেলি নামক ভয়ংকর ধরনের এক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে অনেক শিশু জন্ম নেয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে সম্প্রতি। এ রোগাক্রান্ত শিশুদের মাথা অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ছোট আর এ সমস্ত শিশুদের মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। মাইক্রোফেলি রোগে যেসব শিশুরা আক্রান্ত হয় এদের মধ্যে সৌভাগ্যবান ১৫% থাকে যাদের শুধু মাথাটাই ছোট হয়, কিন্তু অভাগা বাকি ৮৫% শিশুর মস্তিষ্কের উপর মাইক্রোফেলি ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এদের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং এরা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়। জিকা ভাইরাস আর অদ্ভুত এ সমস্যার একদম ঠিকঠিক যোগসূত্রটা যে কোথায় তা এখনো আবিষ্কৃত না হলেও বিশেষজ্ঞগণ গর্ভবতী মায়েদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন। ব্রাজিলে এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪,০০০ শিশুর রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৩৮ জন মারা গেছে। এমনকি ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদরে আপাতত সন্তান ধারণ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২. রক্ত বা শুক্রাণু কি জিকা ভাইরাস বহন করে?

সম্প্রতি মানুষের রক্ত আর শুক্রাণুতেও এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। রক্ত নেয়া বা শারীরিক সম্পর্কের ফলে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন রোগীর রিপোর্ট পাওয়া গেলেও সংখ্যায় তা অতি নগণ্য। আবার ভেবে দেখুন, যদি রক্তের মাধ্যমে রোগ আসলেই ছড়াত তাহলে রোগীকে কামড়ালে যেকোনো ধরনের মশাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতো। এমনটি কিন্তু হচ্ছে না। তাই আপাতত সঠিকভাবে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে তো মানা নেই।

. জিকা ভাইরাস কি জিবিএস এর জন্ম দেয়?

জিবিএস (Guillain–Barré Syndrome) নামের এক বিশেষ ধরনের রোগ আছে যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শরীরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। তখন এরা রোগজীবাণু ধ্বংস করা বাদ দিয়ে স্নায়ুকোষগুলোকে ধ্বংস করা শুরু করে। এর ফলে মাংসপেশির দুর্বলতা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসও দেখা যায়। সাধারণত এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকে। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষ এর প্রভাব সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায়, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আসলে জিকা কিংবা অন্য কোনো ভাইরাস এ রোগের উৎপত্তি ঘটায় কিনা তা এখনও বলা সম্ভব হয়নি। তবে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সাথে সাথে ব্রাজিলে জিবিএসও তীব্র আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই গবেষকরা মাথা চুলকাতে বসে গেছেন- আসলেই কি জিকা ভাইরাস টেনে আনছে জিবিএস এর মতো মারাত্মক রোগকেও?

জিকা ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষ্মণ

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের একজন মানুষের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে আছে জ্বর, শরীরে র‍্যাশের সৃষ্টি, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথার অনুভূতি, চোখ ওঠা ইত্যাদি। এছাড়াও এ সময় মাথা ব্যথা আর মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। 3জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই কিন্তু এসব উপসর্গ দেখা যায় না, বেশ কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর রোগীর মধ্যে এ লক্ষণগুলো দেখা যেতে থাকে।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অসুস্থতা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। হাসপাতালে যাবার মতো অবস্থাও কিন্তু তৈরি হয় না। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পরিমাণ খুবই নগণ্য। আপনার অসুস্থতা কমে গেলেও রক্তের মধ্যে এ ভাইরাস কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত তার উপস্থিতি জানান দিতে পারে। র‍্যাশ ওঠার কারণে অনেকেই এ অসুখটিকে ডেঙ্গু বা হামের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাই সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরী।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

জিকা ভাইরাস আপাতদৃষ্টিতে খুব ভয়ংকর না হলেও এর ক্ষতিকর দিক কিন্তু অনেক। এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমরা তো আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। যেহেতু এডিস মশা যেকোনো জায়গায় জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয়, তাই আশেপাশের কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল করতে হবে। এরা দিনের বেলাতেই আপনাকে আক্রমণ করবে। তাই দিনের বেলা ঘুমালেও মশারী টানাতে ভুলবেন না। খেয়াল রাখবেন যে, কোনো মশা যেন আপনাকে না কামড়ায়। জানালার চারিদিকে আলাদা করে এমন জালিকা স্থাপন করতে পারেন যাতে মশা ঘরে না ঢুকতে পারে। যেকোনো রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সবথেকে ভালো উপায় হলো নিজেকে সতর্ক রাখা। এলাকার মানুষজন মিলে কিছুদিন পরপর বিভিন্ন কীটনাশক দূরীকরণের স্প্রে প্রয়োগ একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ঝুঁকি আছে এমন এলাকায় যদি আপনি ভ্রমণ করতে চান তাহলে অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।

জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক আমাদের হাতের নাগালে আসতে আসতে পার হয়ে যাবে আরও প্রায় দেড় বছর। প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান এ দৌড়ে সামিল হয়ে থাকলেও তাদের কাজ একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। জেনেভার এক সম্মেলনে এ সংস্থার মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রে খুব শীঘ্রই এর পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি স্বীকৃত হয়ে মানুষের নাগালে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হবে আরও অনেকটা সময়।

বাংলাদেশ এবং জিকা ভাইরাসঃ আমরা কি হুমকির মুখে?

জিকা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। বাংলাদেশে কি এই রোগে আক্রান্ত হবার কোনো সম্ভাবনা আছে? চিন্তার বিষয়। প্রতিষেধকবিহীন এ রোগ খুব দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই আমরা যে একেবারে হুমকির সম্মুখে না, তা বলা যায় না। তবে আশার কথা এই যে, দক্ষিণ এশিয়াতে এখন পর্যন্ত জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাই আশা করা যায় আমাদের সেই খারাপ দিন দেখার সম্ভাবনা খুব কম, যেখানে ফুটফুটে একটি শিশুকে অপরিণত মস্তিষ্ক আর ছোট্ট একটি মাথা নিয়ে চলাচল করতে দেখতে হবে।

জিকা ভাইরাসের গোপন নথি!

এতক্ষণ যা বললাম তা নিত্যদিনের খবর হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার আমার জানার বাইরেও কিছু খবর আছে, যা হয়তো ইচ্ছে করেই রাখা হচ্ছে সবার অগোচরে। বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের নাম নিশ্চয় সবাই শুনেছেন। এ ফাউন্ডেশনের ব্রিটিশ বায়োটেক কোম্পানি ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য বিশেষ ধরনের জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ার্ড এক ধরনের মশার উদ্ভাবন করে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিশেষ ধরনের মশাই আসলে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। যে ভাইরাস মানুষের জীবনে আতংক বয়ে নিয়ে এসেছে, যে রোগ নিয়ে নিত্যদিন মিডিয়া এত বিপুল পরিমাণে মেতে উঠেছে তা প্রাকৃতিক কোনো রোগ নয়! ২০১১ সাল থেকে অক্সিটেক নামের এ কোম্পানি ব্রাজিলের গহীন অরণ্যে এ মশার বংশবিস্তার করে চলেছে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য। এক সপ্তাহে তারা প্রায় দুই মিলিয়ন মশা উৎপাদন করে ব্রাজিলের ক্যম্পিনাসে অবস্থিত ফ্যাক্টরিতে। আরেকটি রহস্যময় তথ্য জেনে নিন। ২০১৫ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার গর্ভবতী মায়েদের একটি নতুন ভ্যাক্সিন নেয়া অত্যাবশ্যক করেন। টিডিএপি নামক এ ভ্যাক্সিনের সঠিকভাবে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই হঠাৎ এভাবে আবশ্যকীয় করে দেয়া আর ঠিক একই সময়ে এরকম অদ্ভুত শিশু জন্মের হার হুহু করে বেড়ে যাওয়াটা আসলে কাকতালীয় ঘটনা থেকে একটু বেশি কিছুই বলে মনে হয়। এ ভ্যাক্সিনের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে শুরু করলেই একটি নাম আবার সামনে পেয়ে যাবেন- বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এমনকি এ ভ্যাক্সিন লাইসেন্সড হবার আগে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের শরীরে গিয়ে আসলেই কাজ করে কিনা সেই ব্যাপারে পরীক্ষা করার কোনো নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

একটু যদি অন্যভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখি তাহলে কি এটাই মনে হয় না, জন্মগত এ ত্রুটি আর জিকা ভাইরাসকে একই সময়ে সামনে আনা হয়েছে? ব্রাজিলই বা কেন আমেরিকা থেকে এমন একটি ভ্যাক্সিন কিনে তার দেশে অত্যাবশ্যক করে দিলো যার কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ইতিহাস নেই? নাকি এজন্য তারা উপযুক্ত পরিমাণে পকেট গরম করার সুযোগ পেয়েছে? এখন আবার আমেরিকা জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধকের পেছনে ছুটছে। চেষ্টা করে দেখুন তো এমনই কোনো ঘটনার কথা স্মৃতিতে আসে কি না? হ্যাঁ, একইভাবে মিডিয়া ইবোলা ভাইরাস নিয়েও মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি করেছিল।4

যেমনটি আগেই বলেছি অনেক দেশে গর্ভধারণ এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আসলেই বিল গেটস এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্প্রতি মাত্র একজন মানুষের শুক্রাণুতে এ ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই একে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের কাতারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানব মনে শারীরিক সম্পর্ক এবং সন্তান ধারণের প্রতি আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকেই বিল গেটস জোরপূর্বক ভ্যক্সিনাইজেশন করে জন্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে কথা বলেছেন।

তবে এ রহস্যের কূলকিনারা এতো সহজে সম্ভব নয়। বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে বা সপক্ষে কথা বলার মানুষের অভাব কখনোই ছিল না। তাই আমরা শুধু আপনাদের চলতি বিশ্বের পরিস্থিতির কাছাকাছিই নিয়ে যেতে পারি। সত্য-মিথ্যা জানার জন্য আমাদের হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু সময়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক ঘটনার সুরাহা যে আমাদের কান পর্যন্ত আসে না, এ নতুন কিছু নয়। তাই আপাতত এসব কোন্দলে না পড়ে আমরা নিজেদের ও নিজ নিজ সন্তানদের নিরাপত্তা প্রদানের দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আশা করি বিশ্বে বিরাজমান এ জিকা ভাইরাস আতঙ্ক আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে কখনোই হানা দেবে না।

 

ফাহমিদা ফারজানা অনন্যা
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

কিছু রাসায়নিক ত্বকে লাগলে দাগ পড়ে কেন

“আপনাদের আমি আগেই বলেছি, আমাকেও যে ভয় দেখানো হবে, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম এবং মনে মনে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। … রাতের বেলা যতবার বাথরুমে যেতাম ততবারই বাথরুমের বাইরের নবে কয়েক ফোঁটা সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ দিয়ে রাখতাম। …যে ভয় দেখাতে আসছে, সে কোনো কিছু না ভেবেই নবে হাত দিবে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে দাগ পড়ে যাবে। সিলভার নাইট্রেটের দাগ কঠিন দাগ। সপ্তাহখানেক থাকবেই।” -মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য, হুমায়ুন আহমেদ

সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ হাতে পড়লে কালো দাগ হয়ে যায়। হাতের তালুতে এক চামচ চিনি নিয়ে নাড়াচাড়া করলে কোনো দাগ পড়ে না। কিছু কেমিক্যাল হাতে পড়লে দাগ পড়ে যাচ্ছে, আবার কিছু হাতে নিয়ে বসে থাকলেও কিছু হচ্ছে না। কেন এমন হচ্ছে?

সাধারণভাবে, কোনো রঙিন বস্তু ধরলে সেই রঙ হাত লেগে যেতে পারে। যেমন, মাঠের ঘাসের উপর শুয়ে থাকলে কাপড়ে সবুজ দাগ হয়ে যায়। ঘাসের ক্লোরোফিল আসঞ্জন বলের মাধ্যমে আপনার কাপড়ে লেগে যাচ্ছে, তাই কাপড়েও সবুজ দাগ পড়ছে। একই প্রক্রিয়ায় সদ্য রঙ করা দেয়ালে হাত দিলে হাতে রঙ লেগে যায়।

সব রঙিন বস্তুর ক্ষেত্রেই আবার এমনটি ঘটে না। একটি বাটিতে ডিম ভেঙ্গে রেখে তার মধ্যে হাত দিয়ে রাখলে যতটুকু ডিমের কুসুম হাতে লাগবে, এতে হাত হলুদ হয় না। কারণ যে যে অণুর (Lutein, Zeaxanthin) কারণে ডিমের কুসুম হলুদ দেখায়, তা আপেক্ষিকভাবে অন্যান্য অণুর তুলনায় অনেক বড় বলে ত্বকে লেগে থাকে না।

কিন্তু অণু যদি অনেক ছোট হয়, সেক্ষেত্রে ছোট অণু ত্বকের ছিদ্রে আটকে যেতে পারে। এমনকি ত্বকের সাথে রাসায়নিক বন্ধনও করে ফেলতে পারে। তখন শুধু অনেক পানি দিয়ে ধুলেই হবে না, ত্বকের যে স্তরে ওই রঞ্জক পদার্থ লেগে আছে, ঘষে তুলে ফেলতে হবে।

কিছু কিছু রাসায়নিক পদার্থ আছে, যারা ত্বকের সাথে বিক্রিয়া করে রঙ পরিবর্তন করে। যেমন আমরা শুরুতেই দেখলাম, সিলভার নাইট্রেট ত্বকে কাল দাগ ফেলে। একইভাবে হাতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণ পড়লে হাত বাদামি হয়ে যায়, নাইট্রিক এসিড পড়লে পুড়ে তো যায়ই, পাশাপাশি হলুদ দাগও পড়ে। আর সালফিউরিক এসিডে ত্বক পুড়ে যাবে এবং ত্বকের গঠন ভেঙ্গে পানি বেরিয়ে যাবে, পড়ে থাকবে মৌলিক কালো কার্বন। ফলে পুড়ে যাওয়া ছাড়াও ত্বকে খয়েরি, মরিচা রঙের অথবা কালচে বাদামী রঙের দাগ পড়ে। এসব পদার্থের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? সিলভার নাইট্রেট ত্বকের উপরের স্তরের লবনের সাথে বিক্রিয়া করে সিলভার ক্লোরাইডে পরিণত হয়, যা আলোতে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রুপার কণায় পরিণত হয়। এই রুপার কণা ত্বকের গর্তে আটকে যায়, ফলে কালো দেখায়। এই দাগ সহজে যায় না, এমনকি প্রচুর পানি দিয়ে ধুলেও না।

2 চিত্রঃ হাতে সিলভার নাইট্রেট দ্রবণের কাল দাগ।

আমাদের ত্বকের উপরের স্তর ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, পুরাতন কোষ মরে ঝরে পড়ছে, নতুন স্তর তার জায়গায় আসছে। সিলভারের দাগ তাই কয়েকদিন পর আপনাআপনি পুরাতন কোষের ঝরে পড়ার সাথে সাথে চলে যাবে।

পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কাপড়, কাগজ আর ত্বকে গাঢ় বাদামী দাগ ফেলে। এই দাগ ঘষে তুলে ফেলা যায় না। যতদিন না ত্বকের উপরের স্তর ঝরে পড়ছে এটি ততদিন পর্যন্ত থাকবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে কী ঘটছে? পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নিজে গাঢ় বেগুনী বর্ণের কঠিন পদার্থ। এই কেমিক্যাল হাতে বা কাপড়ে পড়লে বিয়োজিত হয়ে বাদামী দানাদার ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড (MnO2) উৎপন্ন করে।

4MnO4 (aq) + 4H+ (aq) = 3O2 (g) + 2H2O (l) + 4MnO2 (s)

এই MnO2 এর ক্ষুদ্র ক্রিস্টাল ত্বকের ছিদ্রে আটকে যায়। ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড পানিতে অদ্রবণীয়, তাই পানি দিয়ে ধোয়ার চেষ্টা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। তবে এই বাদামী দাগ যদি কাপড়ের উপরে হয়, তাহলে লঘু হাইড্রোক্লোরিক এসিড প্রয়োগ করলে ম্যাঙ্গানিজের বর্ণহীন দ্রবণীয় লবন উৎপন্ন হবে, তখন দাগ চলে যাবে।

MnO2 (s) + 4 HCl (aq) = MnCl2 (aq) + Cl2 (g) + 2 H2O (l)

3 চিত্রঃ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের বাদামী দাগ।

খনিজ এসিড, যেমন সালফিউরিক এসিড আর নাইট্রিক এসিড, হাতে পড়লে কেন রঙিন দাগ পড়ে? এই দুই এসিড হাতে পড়লে আসলে কী হয়? অবশ্যই পুড়ে যায়। কিন্ত কেন পুড়ে যাচ্ছে? প্রথমত এই দুই এসিড হলো ক্ষয়কারী পদার্থ এবং এরা জীবন্ত টিস্যুর (ত্বক, মাংস, কর্নিয়া) উপরে পড়লে বিক্রিয়া করে পুড়িয়ে ফেলে। এদের বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্যর মূলে আছে অম্ল-ক্ষারক বিক্রিয়া। অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিস এবং এস্টার হাইড্রোলাইসিস। প্রোটিন অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে হাইড্রোলাইজড হয়ে ভেঙ্গে যায়, যেখানে লিপিড (চর্বি) এস্টার হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। এভাবে প্রোটিন এবং ফ্যাট তথা টিস্যু বিনষ্ট হয়। এছাড়া এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় যার ফলে টিস্যু গলে ও পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একে বলে কেমিক্যাল বার্ন।

ঘন সালফিউরিক এসিড ক্ষয়কারী পদার্থ হবার পাশাপাশি শক্তিশালী নিরুদকও। ত্বকে পড়লে প্রথমত অম্লীয় হাইড্রোলাইসিস এর মাধ্যমে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর ত্বকের কোষ থেকে পানি টেনে বের করে আনে, ফলে কোষ পানিশূন্য হয়ে যায়। উল্লেখ্য ত্বকের কোষের ৯০ ভাগই পানি। এই নিরুদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে ত্বকে সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন হয়।

সালফিউরিক এসিড এত শক্তিশালী নিরুদক যে এটি প্রায় সকল জৈব যৌগ থেকেই পানি বের করে আনে। একটি বিকারে চিনি নিয়ে তার মধ্যে ঘন সালফিউরিক এসিড নিয়ে এটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। চিনিকে রাসায়নিকভাবে বলা হয় সুক্রোজ, যা মূলত কার্বন, অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন দিয়ে গঠিত (সংকেত C12H22O11)। সালফিউরিক এসিড চিনির সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে চিনির অণু থেকে পানি আলাদা করে ফেলে, ফলে কাল কার্বন উৎপন্ন হয়।

C12H22O11 + H2SO4 → 12 C + 11 H2O + পানি এবং এসিডের মিশ্রণ

বাতাসের উপস্থিতিতে এই বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড, জলীয় বাষ্প এবং সালফার ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়।১০ এই বিক্রিয়ায় এত কার্বন উৎপন্ন হয় যে তা বিকার থেকে উপচিয়ে পড়ে। নিচের ইউটিউবের ভিডিও লিঙ্কটিতে গিয়ে এই বিক্রিয়াটা দেখে নিতে পারেন। youtube.com/watch?v=zg9wmU7Z-6s সালফিউরিক এসিড একই প্রক্রিয়ায় কাগজ আর কাঠ থেকে, এবং হাতে পড়লে আপনার ত্বক থেকে পানি বের করে আনবে।

নাইট্রিক এসিড একটি ক্ষয়কারক এসিড এবং শক্তিশালী জারক১১। এই এসিড অম্লীয় হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যু ধ্বংস করে, পাশাপাশি ত্বকে গাঢ় হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে। এই হলুদ দাগ Xanthoproteic বিক্রিয়া3 – ত্বকের কেরাটিন প্রোটিনের ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের কারণে হয়। অ্যারোমেটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিনে ফিনাইল গ্রুপ আছে। এই হলুদ দাগ (ফিনাইল নাইট্রেট) ক্ষারের উপস্থিতিতে কমলা হয়ে যায়।

5চিত্রঃ হাতের তর্জনীর উপরে নাইট্রিক এসিড পড়ায় সেকেন্ডারি বার্ন ঘটেছে। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আশেপাশের চামড়া হলুদ হয়ে গিয়েছে।

ত্বকের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ পড়লে ত্বক সাময়িকভাবে সাদা হয়ে যায়১২। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড একটি শক্তিশালী জারক। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ ত্বকে পড়লে Capillary embolism ঘটে, অর্থাৎ ঐ স্থানের কৈশিক- নালীতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের বিয়োজনের ফলে উৎপন্ন হওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্সিজেনের বুদবুদ প্রবেশ করায় সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে ত্বক সাদা দেখায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পর ত্বক আবার নিজে নিজেই স্বাভাবিক রঙ ফিরে পায়। অর্থাৎ এখানে পার অক্সাইড ত্বককে বিরঞ্জিত করে না, সাময়িকভাবে জারিত করে।

4 চিত্রঃ হাতের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ৩৫% জলীয় দ্রবণ পড়ায় আঙ্গুল সাদা হয়ে গিয়েছে।

বোঝা গেল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ হাতে পড়লে দাগ পড়ে যেতে পারে, হাতের টিস্যু বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; ত্বক, টিস্যু ভেদ করে রক্তে মিশে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে, এমনকি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। তাই রান্নাঘর থেকে কেমিস্ট্রি ল্যাব, ভিনেগার থেকে নাইট্রিক এসিড, রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় অবশ্যই অতি সাবধানতা মেনে চলা উচিত।

টীকা

১. Adhesive force- ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের অণুর মধ্যেকার আকর্ষণ বলকে আসঞ্জন বল বলে। যেমন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে দাগ টানলে আসঞ্জন বলের কারণে চক বোর্ডে লেগে থাকে।

২.Chemical Burn- জীবন্ত টিস্যু ক্ষয়কারী পদার্থ যেমন শক্তিশালী অম্ল বা ক্ষারের সংস্পর্শে আসায় ঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপের ফলে পুড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে chemical burn বলে। Chemical Burn কেও সাধারণ Burn এর মতো ভাগ করা করা যায়। তবে সাধারণ Burn আর Chemical Burn এর কিছু পার্থক্য আছে। যেমনঃ ১. এর জন্য তাপের কোনো উৎস না থাকলেও চলে; ২. কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে ঘটতে পারে; ৩. সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে নাও বুঝা যেতে পারে যে ত্বক পুড়ে গিয়েছে; ৪. প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হয়; ৫. ত্বকের উপরিভাগের কোনো ক্ষতি না করে ত্বক ভেদ করে টিস্যুতে প্রবেশ করে টিস্যুর গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

7চিত্রঃ Chemical burn (হাতের উপরে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ পড়ার ৪৪ ঘণ্টা পরে।)

৩. Xanthoproteic reaction
কোনো নমুনায় প্রোটিনের উপস্থিতি নির্ণয় করতে সাধারণত Xanthoproteic reaction করা হয়। এই বিক্রিয়ায় বিকারক হিসেবে গাঢ় নাইট্রিক এসিড ব্যবহৃত হয়। নাইট্রিক এসিড প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে হলুদ বর্ণের নাইট্রেটেড প্রোডাক্ট তৈরি করে। এই বিক্রিয়ায় পরীক্ষণীয় বস্তু বা দ্রবণে গাঢ় নাইট্রিক এসিড যোগ করে মিশ্রণটি উত্তপ্ত করা হয়। যদি মিশ্রণে প্রোটিন উপস্থিত থাকে, তবে মিশ্রণ হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এই মিশ্রণে এরপর শক্তিশালী ক্ষার, যেমন তরল অ্যামোনিয়া যোগ করা হলে মিশ্রণ হলুদ থেকে কমলা বর্ণের হয়ে যায়। অ্যারোমাটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিন এই বিক্রিয়া দেয়। ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের ফলে যে Xanthoproteic acid উৎপন্ন হয় তা হলুদ বর্ণের হওয়ার জন্যই এইধরনের রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। ত্বকের আবরণী কোষের উপরে নাইট্রিক এসিড পড়লেও একই প্রক্রিয়ায় হলুদ বর্ণের Xanthoprotein উৎপন্ন হয়, যে কারণে নাইট্রিক এসিড ত্বকে হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে।

তথ্যসূত্র

১. www.pdf-archive.com/2014/09/17/misir-alir-amimangsito-rahasya-allbdbooks-com/preview/page/63

২. Why do some chemicals stain your hands? http://questions.sci-toys.com/node/130

৩. Yolk, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/ wiki/Yolk

৪. https://books.google.com.bd/books?id=LRMlBQAAQBAJ

৫. Silver Chloride, From Wikipedia https://en.wikipedia.org/wiki/ Silver_Chloride

৬. How many skin cells do you shed every day? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/faq/permanganate-stains.shtml

৭. How does permanganate cause stains? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/fag/permanganate-stains.shtml

৮. Corrosive substances

From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Corrosive_substance

৯. Why does sulfuric acid melt people’s skin? https://answers.yahoo .com/question/index?qid=20080722005356AAPbpjg

১০. http://www.chemeddl.org/alfresco/service/org/chemeddl/ video.html?options=false&ID=vid:5892&guest=true

১১. Nitric acid, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Nitric_acid

১২. http://www.beautyclue.com/skin-whitening/can-hydrogen-peroxide-bleach-your-skin-lighten-dark-spots-acne-scars/

 

নাভিদ আহমেদ সাদমান

রসায়ন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূর্যরশ্মিঃ বন্ধু নাকি শত্রু

ছোটবেলায় মা ভরদুপুরে বাইরে খেলতে দেয় না, বেশি রোদে বাইরে বেরুতে দেয় না। বেশি রোদ দেখলে আমরা সেই রোদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কখনো ছাতা মাথায় রোদ এড়িয়ে চলি, কিংবা কখনো সানব্লক ক্রিম মাখি। এতোকিছু করা হয় শুধুমাত্র ভয়ের কারণে, রোদে পুড়ে ত্বক যেন কালো হয়ে না যায়। আবার কখনো ছেলে-বুড়ো সকল বয়সের মানুষেরা সকালের হাল্কা মিষ্টি রোদে হাটতে বের হই এই ভেবে যে, এই রোদ আমাদের শরীরের জন্য উপকারী, হালকা রোদ ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে।

শীতপ্রধান দেশে যেখানে মানুষ রোদের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে, সেখানে গ্রীষ্মকাল আসলেই তাদের মাঝে অন্য এক আনন্দের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সব বয়সের মানুষ দিনের সময়টা বাইরে ঘোরাঘুরি করে। রোদের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করে। তারপরও বহু মানুষের মাঝে ভুল ধারণা থাকে সূর্যের আলো আমাদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। তাই এখানে সূর্য আমাদের কতটুকু ক্ষতি করে, কীভাবে করে, এবং কতটুকু উপকার করে তা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করবো।

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ এক ধরনের বিচ্ছুরিত শক্তি যা তড়িৎচুম্বকীয় কৌশলে নির্গত হয়। তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্র একসাথে স্পন্দনের মাধ্যমে তরঙ্গ আকারে শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং শক্তি সঞ্চারিত করে। এখানে তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্রের স্পন্দনের দিক একে অপরের সাথে লম্বভাবে হতে থাকে। দৃশ্যমান সূর্যের আলো তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের একটি ভালো উদাহরণ। এছাড়াও আরো অনেক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ আছে যা আমাদের চোকে দৃশ্যমান নয়। যেমন বেতার তরঙ্গ, ইনফ্রারেড রশ্মি, এক্স রে ইত্যাদি।

2চিত্রঃ তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের কৌশল।

আমরা জানি, সূর্যরশ্মির কণা ধর্ম ও তরঙ্গধর্ম উভয়ই আছে। সূর্যরশ্মির কণা ফোটন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে স্পন্দিত হয়ে তরঙ্গ আকারে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। একটি ফোটন কণা কতটুকু তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি বহন করে নিয়ে যায় সেটি নির্ভর করে সেই তরঙ্গের কম্পাঙ্কের উপর। বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্কের সমীকরণ  দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শক্তি কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক যেখানে  হলো প্ল্যাংকের ধ্রুবক,  (নিউ) হলো কম্পাংক। আবার  যেখানে  হলো আলোর বেগ এবং  হলো এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

তাহলে আমরা বলতে পারি একটি ফোটন যতটুকু শক্তি বহন করে তা তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক। এর মানে দাঁড়ায় তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বাড়তে থাকবে শক্তির পরিমাণ ততই কমতে থাকবে। সাধারণত এই বিকিরণকে আমরা ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাংক এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করি। যেমন কোনো রেডিও স্টেশন ৬৮০ কিলোহার্জ ফ্রিকোয়েন্সিতে তথ্য পাঠায়। এছাড়া তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেলায় আমরা বলি অতিবেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রাভায়োলেট রে ১০০-৪০০ মিলিমিটার সীমায় কাজ করে।3

আইনস্টাইনের ফটোতড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কে কম বেশি অনেকেই জানে। ফটোতড়িৎ ক্রিয়া দেখিয়ে ১৯১২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন কোনো ফোটন কণা যখন কোনো বস্তুকণার উপর আঘাত করে তখন সেখান থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াটা কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যখন পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন ফোটন কণা কোনো বস্তুকণার উপর এসে পড়ে তখন বস্তুকণার মাঝে ইলেকট্রনের উত্তেজিত অবস্থা এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনের প্রমোশন বা উত্তীর্ণকরণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থানকালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন সাধারণত শক্তি শোষণও করে না, বর্জনও করে না এবং তা ঐ কক্ষপথে নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুরতে থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে শক্তি দেয়া হলে ইলেকট্রন সেই শক্তি শোষণ করতে বাধ্য হয় এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একে বলে উত্তেজিতকরণ অবস্থা। এরপর সেই শক্তি নিয়ে ইলেকট্রন উপরের কক্ষপথে লাফ দিয়ে চলে যায়। একে বলে উত্তীর্ণকরণ অবস্থা। পুরো প্রক্রিয়া খুব স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হয়। ইলেকট্রন শীঘ্রই আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে এবং গ্রহণ করা অতিরিক্ত শক্তি তড়িৎচুম্বক বিকিরণ আকারে বের করে দেয়।

সূর্যরশ্মি কেন আমাদের সানবার্নের জন্য দায়ী

অতিরিক্ত রোদে চলাফেরা করলে ত্বকের বেশ ক্ষতি হয়। ত্বকের রঙ কালো হতে থাকে এবং ত্বক পুনরায় আগের রঙ ফিরে পায় না। এছাড়াও অতিরিক্ত সূর্য-রশ্মি অল্প বয়সে ত্বকে বয়স্ক ভাব এনে দেওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের ঝুকিও বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সূর্য-রশ্মি আমাদের ত্বকের এই পুড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কেন? ব্যাপারটা এমন না যে রোদে আমাদের অনেক গরম অনুভূত হয় এবং প্রচণ্ড গরমে আমাদের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আমাদের এই ক্ষতির কারণ তাপীয় প্রভাবের কারণে নয় বরং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে।

সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি নির্গত হয় তা তড়িৎচুম্বক বিকিরণের সমষ্টি, যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনী, দৃশ্যমান ও অবলোহিত বা ইনফ্রারেড অঞ্চলের মাঝে পড়ে। এদের মধ্যে কিছু বিকিরণ আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগে পুরোপুরি এসে পৌছায় না। আমরা সবাই পৃথিবীর ওজোন স্তরের কথা জানি। সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি এই ওজোন স্তর শোষণ করে আমাদের রক্ষা করে। ওজোন স্তর ওজোন গ্যাস (O3) দিয়ে গঠিত যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে নেয় এবং ভেঙ্গে একটি অক্সিজেন অণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু গঠিত করে। পরবর্তীতে এই অক্সিজেন পরমাণু আবার অপর এক অক্সিজেন অণুর সাথে মিলত হয়ে ওজোন অণু গঠন করে। এভাবে চলতে থাকে। পৃথিবীর মাঝে পানি এবং বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন সূর্যরশ্মির ইনফ্রারেড অংশ শোষণ করে ফেলে। ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান আলো যা আমাদের ত্বকের উপর পড়ে এবং আমরা গরম অনুভূত করি। এই অংশগুলোর বিকিরণ শক্তি আমাদের ত্বকের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলেও মূলত ক্ষতি করে অতিবেগুনী রশ্মি, যার ফোটন কণা যথেষ্ট শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে।4

অতিবেগুনী রশ্মিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এরা হলো UV-A, UV-B ও UV-C। এদের মধ্যে UV-C এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক কম বলে এই রশ্মির ফোটন অনেক উচ্চ শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে। ওজোন স্তর UVC কে পুরোপুরি শোষণ করে ফেলে। যদি UVC পৃথিবীতে ঢুকে যায় তাহলে প্রাণীকুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে। UVA বাকী দুটোর তুলনায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। এতে এর ফোটন কণার শক্তিও যথেষ্ট কম। যদিও UVA, UVC এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকর নয় তবে এটিও আমাদের কম ক্ষতি করে না। বায়ুমন্ডল ভেদ করে যতটুকু পরিমাণ অতিবেগুনী রশ্মি আসে তার প্রায় ৯৫ শতাংশ আল্ট্রাভায়োলেটে গঠিত।

এতক্ষণ ফটোতড়িৎ ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এর সূত্র ধরেই এখন আমরা জানবো সূর্যরশ্মি কীভাবে আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন UV রশ্মির ফোটন কণা আমাদের শরীরের পরমাণু উপর পড়ে সেখান থেকে ইলেকট্রন সম্পূর্ণ বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। ফলের পরমাণুর আয়ন অবস্থার সৃষ্টি হতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা এমন যে দুটো পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রন জোড়া শেয়ারের মাধ্যমে যে রাসায়নিক বন্ধনের সৃষ্টি হয় তা এই পর্যাপ্ত শক্তির প্রভাবে এদের মাঝখানে ফাটল ধরে যাতে করে এরা দুটো র‍্যাডিক্যাল বা মুক্ত পরমাণু হতে বাধ্য হয়। এদের প্রত্যেকটির কাছে একটি করে শেয়ারের ইলেকট্রন থাকে। যে শক্তির কারণে এই অবস্থা ঘটে তাকে বন্ধন ভাঙ্গন শক্তি বলে।

মানুষ সহ সকল জৈবিক প্রাণীদের শরীর কার্বন-কার্বন পরমাণুর বন্ধন দিয়ে তৈরি। একটি একক কার্বন-কার্বন বন্ধন ভাঙ্গতে প্রায় ৩৫০-৪৮০ কিলোজুল/মোল শক্তি প্রয়োজন যা আল্ট্রাভায়োলেট বিকিরণ প্রদান করতে সক্ষম।

২০১২ সালের আগ পর্যন্ত কীভাবে সানবার্ন হয় তা বিজ্ঞানীরা জানতেন না। কিন্তু অবশেষে বিজ্ঞানী রিচার্ড গ্যালো “নেচার মেডিসিনে” প্রকাশিত তার এক নিবন্ধে সম্পূর্ণ ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির পর্যাপ্ত পরিমাণের শক্তি আমাদের কোষের মাঝে বিশেষ ধরনের RNA কে ভেঙ্গে ফেলে এবং পরিবর্তিত করে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষ তার ভেঙ্গে যাওয়া RNA কে মুক্ত করে পাশের সুস্থ কোষগুলোকে উত্তেজিত করে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলোকে ঠিক করার জন্য সুস্থ কোষগুলোর মাঝে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটি এভাবে চলতেই থাকে।

আল্ট্রাভায়োলেটের অতিমাত্রার প্রভাবে পুড়ে যাবার আগে ত্বক ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে। ত্বকের কোষগুলোর চমৎকার আত্মরক্ষাত্মক প্রক্রিয়ায় UVA প্রতিহত করার জন্য কোষে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক তৈরি হয় যা প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ UV বিকিরণ প্রতিহত করে। কিন্তু প্রতিহত ব্যবস্থাটি কতটুকু হবে তা নির্ভর করে আমাদের কোষে কতটুকু মেলানিন তৈরি হচ্ছে বা আছে তার উপর। সাধারণত কালো চামড়ার মানুষের দেহে যথেষ্ট পরিমাণে মেলানিন আছে যাতে করে তাদের উপর প্রভাবটা কম পড়ে। কিন্তু ফর্সা চামড়ার মানুষের দেহে মেলানিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হতে পারে না বলে UVA রশ্মি পুরোপুরি প্রতিহত হয়। এতে আমাদের কোষের ক্ষতি হতে থাকে এবং ত্বক পুড়ে যায়। যাকে বলে সানবার্ন।

সূর্য আমাদের বন্ধু নাকি শত্রু এই নিয়ে মানুষের মাঝে তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। বহু মানুষ ক্ষতির ভয়ে সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আদৌ কি সূর্যের আলো শুধু আমাদের ক্ষতিই করে যায়? না। মানবদেহে সূর্যের আলোর অনেক উপকারী দিকও আছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রায় ১৫ টি দেশ থেকে শীতকালীন সময়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সূর্যের আলোর উপর গবেষণা চালিয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্যগুলোর মাধ্যমে তারা ১৭৭ টি দেশের মানুষের রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ নির্ণয় করার চেষ্টা চালায়। তথ্য যাচাই-বাছাই করে অবশেষে তারা সিদ্ধান্তে আসেন, নিম্ন মাত্রার ভিটামিন ডি’র সাথে স্তন ক্যান্সার ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। তাদের মতে, যদি রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাহলে ক্যান্সারের ঝুকি অনেকাংশে কমে যায়। ডায়েট, বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চার পাশাপাশি দিনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলোতে থাকলে দেহ যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ পায়, যা মানবদেহের জন্য অনেক উপকারী।

সূর্যের আলোর উপকারিতা

রাতে ভালো ঘুম হওয়াঃ মানব দেহ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। একে সার্কোডিয়ান চক্র বলে। ২৪ ঘণ্টা সময়ের মাঝে মানবদেহের দৈহিক, মানসিক, আচরণগত পরিবর্তন এবং দিনের আলো ও রাতের সময়টা মানব দেহের উপর কী প্রভাব ফেলে, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে এই চক্র গঠিত। সুস্থ ও ভালোভাবে এই চক্র সম্পাদনের জন্য সূর্যের আলোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। দিনের বেলা আমরা জেগে তাকি, রাতে আমাদের ঘুমোতে হয়, আমাদের দেহ ঘড়ি সবসময় এই নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে চলে।

সাধারণত দিনের আলো আমাদের শরীরকে সংকেত দেয় এটা দিনের আলো এবং আমাদের শরীর ঘড়ি সচল হয়ে যায় এবং সারাটা দিন সচল হয়ে দিন কাটাতে সাহায্য করে। দিনের আলো ছাড়া কোনো মানুষকে যদি ২৪ ঘণ্টা কৃত্রিম আলোতে রাখা হয় তাহলে দেহ ঘড়ি তার নির্দিষ্ট ছন্দ গুলিয়ে ফেলে। এতে মানসিক ও দৈহিক অনেক প্রভাব ফেলে। চক্রের মাঝে বিশৃংখলা দেখা দেয়। রাতে সময়মতো ঘুম আসে না, সকালেও সময়মতো উঠা যায় না। সকালের আলো থেকে যতটা দূরে থাকবো ততই আমাদের শরীরবৃত্তিয় চক্রের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে।

মেজাজ ফুরফুরে করাঃ মেজাজ ফুরফুরে থাকা, চিন্তা ভাবনায় সক্রিয় ও সতর্ক থাকার সাথে সূর্যের আলোর ভালো সম্পর্ক আছে। প্রতিদিন সূর্যের আলো আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে সেরেটোনিন তৈরি করে। সেরেটোনিন আমাদের মেজাজ ফুরফুরে রাখতে সাহায্য রাখে। গবেষকরা বহু মানুষের মাঝে গবেষণা করে দেখতে পান, কোনো মানুষ কত ঘণ্টা সূর্যের আলোতে ছিল এবং তাদের শরীরে সেরেটোনিনের মাত্রা কেমন হচ্ছে, এই দুইয়ের মাঝে যোগসূত্র আছে। আরো দেখতে পান পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলোতে থাকার সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে দেহে উৎপন্ন সেরোটোনিনের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

ভিটামিন ডি তৈরিঃ যে ক্রিয়া-কৌশলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে ঠিক সেই ক্রিয়াকৌশলেই আমাদের ত্বক ভিটামিন ডি তৈরি করে। সাধারণত ২৯৫-৩০০ মিলিমিটার ব্যবধির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো আমাদের ত্বক শোষণ করলে, ঐ আলো যে পরিমাণ শক্তি বহন করে তা ত্বকে দুই ধাপ সংঘটিত বিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তির যোগান দেয়। এই বিক্রিয়ায় ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল, কোলক্যালসিফেরলে পরিণত হয়। এই কোলক্যালসিফেরলকে আমরা ভিটামিন D3 নামে জানি। এখানে বলে রাখা ভাল সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে যে ভিটামিন তৈরি করে তা খাদ্যের মাধ্যমে গৃহীত ভিটামিন ডি থেকে কিছুটা আলাদা। খাদ্যের মাধ্যমে এরগোক্যালসিফেরল বা ভিটামিন ডি-২ গ্রহণ করি।

রক্তচাপ কমায়ঃ সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বক থেকে নাইট্রিক অক্সাইড নামক এক ধরনের যৌগ নিঃসৃত করায় যা আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে ও কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের মানুষদের বেলায় মৃদু সূর্যের আলো উপকারী হতে পারে। সম্প্রতি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক ৩৪ জন মানুষের উপর UV বাতি ও সাধারণ বাতির আলোর প্রয়োগ করে এদের দেহের রক্তচাপ ও ভিটামিন ডি এর মাত্রা নির্ণয় করেন। ফলাফল হিসেবে তারা দেখেন শুধুমাত্র UV বাতির আলোতে তাদের দেহের রক্তচাপের হ্রাস ঘটে কিন্তু সাধারণ বাতির আলোতে রক্তচাপের কোনো পরিবর্তন হয় না।

সবশেষে একটা ব্যাপার লিখে এই শেষ করছি, সূর্য আমাদের উপকার করছে নাকি ক্ষতি করছে সেটি সঠিকভাবে চিন্তা করে যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব। অতিরিক্ত সূর্যের আলো যেমন ক্ষতি করে তেমনি আমাদের দৃষ্টির জন্য এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে না। বহু মানুষ বিশেষ করে মেয়েদের মাঝে সূর্যকে ক্ষতিকর ভাবার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তারা সূর্যের ভয়ে ত্বকে বিভিন্ন রকমের সানব্লক ক্রিম মাখে। কিন্তু এই ক্রিম আসলে কতটা উপকার করে? গবেষণায় দেখা গেছে এই ক্রিম উপকারের চাইতে অপকারই করছে বেশি। বহু সানব্লক ক্রিমে জিংক অক্সাইড আছে যা সূর্যের UV রশ্মির সাথে বিক্রিয়া করে ত্বকের উপরিভাগের কোষগুলোর অনেক ক্ষতি করে। এতে করে ত্বকের সৌন্দর্য, কোমলতা নষ্ট হয়। এটা আমাদেরই দায়িত্ব সব জেনে বুঝে নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সকল সন্দেহ কাটিয়ে সঠিকটা গ্রহণ করা।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://www.atomsandnumbers.com/2013/why-the-sun-can-harm-you-and-wifi-cant-and-how-microwave-ovens-cook-your-food/
  2. http://www.medicaldaily.com/sun-exposure-vitamin-d-and-other-health-benefits-sunlight-246487
  3. http://articles.mercola.com/sites/articles/archive/2012/09/29/sun-exposure-vitamin-d-production-benefits.aspx

http://www.cancercouncil.com.au/25277/b1000/skin-cancer-30/protecting-your-skin/

জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন?

এক মাইলকে অর্ধেক করুন। আধেক আধেক পেলেন তো? আধেককেও সমান ভাগে অর্ধেক করুন। চতুর্থাংশ পেলেন। এমন করে চলতে দিলাম, যতক্ষণ না একটা পরমাণুর ব্যাসের দৈর্ঘ্য পর্যন্ত পৌঁছানো গেল। কিন্তু, এরপর? আমরা কি অসীম পর্যন্ত এটা চালিয়ে যেতে পারব? নাকি একটা সীমায় গিয়ে থমকে যেতে হবে? প্রশ্নটি হচ্ছে আসলে কতটুকু সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব? আবার তার সীমা আছে কিনা?

2চিত্রঃ কত ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য পর্যন্ত আমরা মাপতে পারব?

সমকালীন কিছু তত্ত্বের সাফল্য একে ব্যাখ্যার আওতায় ফেলে দিতে সক্ষম। কিন্তু এই ধাঁধাঁটি আড়াই হাজার বছর আগের। গ্রীক দার্শনিক জেনোর বিখ্যাত এক প্যারাডক্স। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী থেকে এ রহস্যজনক ধাঁধাঁটির বিরাজ শুরু। এই কেবল ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে এর জট খুলতে সক্ষম হলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সমাধানের পর আরেক প্রশ্ন এসে হাজির, ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্য কি আছে, যার পর আর ভাগ করা যাবে না? প্যারাডক্সটি সমাধান হয়েও এই আঙুল তোলা প্রশ্নটি সেঁটে আছে। জেনোর প্যারাডক্সটি সংক্ষেপে এমনঃ গ্রীক বীর একিলিস আর কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা। একিলিস সেরা দৌড়বিদ, আর কচ্ছপ তো কচ্ছপের মতোই।

জেনো বললেন,কচ্ছপকে যদি সামান্য সামনে থেকেও শুরু করতে দেয়া হয় একিলিস কখনো কচ্ছপকে পিছনে ফেলতে পারবে না। বাস্তবিক দৃষ্টিতে,একিলিসের টপকে যাওয়া কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু জেনোর যুক্তি প্রদর্শনের দৃষ্টিকোণই একে দীর্ঘায়ু দান করেছে। জেনো দেখালেন,কচ্ছপ সামনে থাকার কারণে ধীরগতির হলেও একিলিস যখন এসে কচ্ছপকে ধরে ফেলবেন ততক্ষণে কচ্ছপ আরেকটু এগিয়ে যাবে। এভাবে আসলে কচ্ছপটা এগিয়েই থাকছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যবধানে।

3 চিত্রঃ জেনোর যুক্তি বলছে,একিলিস কচ্ছপ থেকে দূরত্ব কমাতে থাকবে কিন্তু তারপরেও পিছিয়েই থাকবে।

অবাক করা দিকটি হলো, জেনোর এই প্যারাডক্সের সমাধান করতে দীর্ঘ সময় ধরে গণিতকে উন্নয়ন করতে হয়েছে। এখন আমরা জানি জেনোর যুক্তি স্পষ্টভাবে ভুল ছিল। গণিতবিদেরা অসীম সংখ্যাকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে যোগফল বের করা শিখে যাওয়ার পর এখন ঠিক কোন সময়টাতে একিলিস কচ্ছপকে পার করে ফেলবে তার গণিতও বের করে ফেলেছেন। বর্তমান পর্যায়ে এসে পদার্থবিদেরা ন্যূনতম পরম দৈর্ঘ্য থাকার অস্তিত্ব থাকাকে আরেক তত্ত্বের সহায়ক বলে মনে করছেন। যখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোয়ান্টাম ভার্সনে প্রবেশ করা হয় অসীমের ব্যাপার স্যাপার চলে আসে। এর আদুরে নাম ‘কোয়ান্টাম গ্রাভিটি’।

জেনোর বিশ্বাসের মতো করে ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যকে মেনে নিলে তত্ত্ববিদেরা অসীমতা সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটিকে সসীম সংখ্যায় দেখাতে পারেন। আর সসীম দৈর্ঘ্য পাওয়ার এক উপায় স্থান-কালকে কেটে কুঁচি কুঁচি করে হিসাব করা। মানে একে বিচ্ছিন্নতায় ফেলে দেয়া। এ পর্যায়ে এসে জেনোও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বেন। কারণ,কোয়ান্টাম গ্রাভিটিকে যৎসামান্য দৈর্ঘ্যের ধারণায় আনা গেলেও,বিচ্ছিন্নতা দিয়ে সর্বোপরি এটাকে ধরে রাখা যায় না। মানে স্থান এবং কালকে আলাদা করে তো আর এটা করা সম্ভব না। কোয়ান্টাম গ্রাভিটির কিছু তত্ত্ব বলে,ন্যূনতম দৈর্ঘ্যের কথা আসে রেজুলেশন লিমিট থেকে,যেখানে রেজুলেশন লিমিট বিচ্ছিন্নতার ধার ধারে না।

মাইক্রোস্কোপ দিয়ে কোনো নমুনা পর্যবেক্ষণ করার কথা কল্পনা করা যাক। বিবর্ধন করতে করতে মাইক্রোস্কোপের রেজুলেশন লিমিট অতিক্রম করে ফেললে ছবিটি ঘোলা হয়ে যাবে। এটা যদি ডিজিটাল ফটোর মতো জুম করা হয়,আমরা দেখতে পাব আলাদা আলাদা একেকটা পিক্সেল। কিন্তু আরো জুম করলেও সেই পিক্সেলের থেকে নতুন কোনো তথ্য আমরা পাব না। উভয় ক্ষেত্রেই রেজুলেশনের একটা বাধাধরা ব্যাপার বা সীমা আছে।

স্ট্রিং থিওরিতে স্ট্রিং এর সম্প্রসারণ সীমাবদ্ধ বলে বিশ্লেষণ করা হয়। একারণে নয় যে,সব বস্তুই চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন। এখানে লুপ কোয়ান্টাম গ্রাভিটি নামে আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী তত্ত্বের কথা এসে যায়, যেখানে বলা হচ্ছে স্থান ও কাল পৃথক পৃথক ব্লকে বিচ্ছিন্ন। প্ল্যাংকের ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘ্যের (১০–৩৫ মিটার) তথ্যটিও এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আইনস্টাইন বলেছেন স্থান এবং কাল হচ্ছে যুগ্ম-একক সত্তা, একে বলে ‘স্থান-কাল’। অধিকাংশ পদার্থবিদই আইনস্টাইনের এ দৃষ্টিভঙ্গীকে মেনে নেন। তাই বেশিরভাগ প্রস্তাবনা বা অগ্রসরতাই কোয়ান্টাম গ্রাভিটির স্থান এবং কালকে হয় অবিচ্ছিন্ন না হয় উভয়কেই বিচ্ছিন্ন হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু কিছু ভিন্ন মতাবলম্বী কেবল স্থান বা কেবল কালকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে ধরার পক্ষে।

কেমন করে পদার্থবিদেরা ঠিক করবেন,স্থান-কাল বিচ্ছিন্ন নাকি অবিচ্ছিন্ন? বিচ্ছিন্ন গঠন এত ক্ষুদ্র যে, পরিমাপ করা অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু কিছু মডেল অনুযায়ী বিচ্ছিন্নতা কণাসমূহ কীভাবে স্থান দিয়ে চলে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রভাব,কিন্তু কণাদের যোগফল অনেক বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করায়। এটা যদি সত্য হয় তবে দূর নাক্ষত্রিক বস্তু থেকে পাওয়া ছবি আমাদের ভুল তথ্য দিতে পারে। ছবির ওপর ছবি উপরিপাতিত বা ছবি বিচ্ছিন্ন হয়ে আসতে পারে। বিভিন্ন সময়ে নির্গত কণা একই সময়ে পৃথিবীতে আসায় অথবা একই সময়ে নির্গত হওয়া কণার বিভিন্ন সময়ে গন্তব্যে আসায় এমন হতে পারে। জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানীরা দুই ধরনের সিগনালের জন্যই অনুসন্ধান চালিয়েছেন,কিন্তু সেই সোনার হরিণরূপী সিগনালের কোনো নজির খুঁজে পাননি। তাই সিদ্ধান্তও নেয়া যায়নি।

এমনকি যদি কণাদের গতির ওপর সরাসরি প্রভাব অপরিমাপযোগ্য হয়, বিচ্ছিন্ন স্ট্রাকচারে ত্রুটি ধরে ফেলা যাবে। একটি হীরক খণ্ড কল্পনা করা যাক। হীরক খণ্ডে আণবিক স্ফটিকে সামান্যতম ভেজাল থাকলে স্ফটিকের নির্দিষ্ট পথে আলো পরিবহনই নষ্ট হয়ে যায়। এটা হীরকের স্বচ্ছতা ধ্বংস করে। যদি আপনি অলংকারের দোকান থেকে হীরের দাম থেকে কিছু বুঝতে চান সেটা হল হীরেটা কতটা নিখুঁত তার হার! স্থান-কালের ব্যাপারটাও তেমন, যদি বিচ্ছিন্ন হয় তবে ত্রুটি থাকবে, সেই ত্রুটি আলোর পরিবহনে বাধা দিবে।

স্থান-কালের বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ খোঁজা ভবিষ্যতের আধুনিক প্যারাডক্স হতে যাচ্ছে। ব্ল্যাক হোলের তথ্য হারানোর সমস্যা তার মধ্যে একটি। স্টিফেন হকিং যেটা ১৯৭৪ সালে বিবৃত করেছেন। আশা করি জেনোর অসন্তোষজনক প্যারাডক্স এর মত স্থান-কালের প্যারাডক্স সমাধান করতে আমাদের ২০০০ বছর লাগবে না!

তথ্যসূত্রঃ

http://www.pbs.org/wgbh/nova/blogs/physics/2015/10/are-space-and-time-discrete-or-continuous/

 

শাহরিয়ার কবির পাভেল
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি

ডিএনএ চরিত

“আচ্ছা ভাই/আপু ডিএনএ কে আবিষ্কার করেন?” আমি এই প্রশ্নটি মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্নাতক পড়ুয়া কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা সকলেই বিজ্ঞানের ছাত্র এবং আমার জানামতে জীববিজ্ঞানের প্রতি তারা কমবেশি অনুরাগী, এমনকি জীববিজ্ঞানের উপর উচ্চতর ডিগ্রীও নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারে না। মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে একথাও বলা যায় না যে, অন্যরাও এ বিষয়ে অবগত নয়। তবে এ কথাও তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ জীববিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক বিষয়ে উদাসীন।

জীববিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে তার মাঝে ডিএনএ’র আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে শুধুমাত্র নিত্য নতুন যুগোপযোগী তথ্যই দেয়নি, এর উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখারও আবির্ভাব হয়েছে। Biotechnology, Genetic Engineering, Molecular Biology, Molecular Genetics, Bioinformatics, Genomics and Proteomics সহ আরো উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয়।

লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ডিএনএ’র আবিষ্কারক ওয়াটসন ও ক্রিক। ডিএনএ নামের সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক এর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে ডিএনএ’র উপর সময়ের পরিক্রমা অনুসারে কাজের ক্রম সাজালে তারা দুজনের নাম অনেক পরে উচ্চারিত হয়। আর আবিষ্কার তো অনেক আগেই নিভৃতে জার্মানে বসে এক বিজ্ঞানী করে গেছেন, কালক্রমে যার কথা আমরা ভুলতে বসেছি।2

ডিএনএ’র কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন বংশগতিবিদ্যার জনক গ্রেগর মেন্ডেল। মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে যুগান্তকারী দুটি সূত্র প্রদান করেছিলেন তিনি। সূত্র দুটি বর্তমানে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যাকে ডিএনএ নামে অবিহিত করি,
তিনি তার নাম দেন ‘ফ্যাক্টর’। উল্লেখ্য এখানে তিনি কিন্তু ফ্যাক্টর নামে কিছু কল্পনা করে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, এই ফ্যাক্টরই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। কিন্তু তার পক্ষে ফ্যাক্টর বা ডিএনএ যাই বলা হোক না কেন তা কিন্তু স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তৎকালীন প্রচলিত রীতিনীতি ও জ্ঞানের বাইরেও তিনি যে কল্পনা করতে পেরেছিলেন এবং পরীক্ষণের দ্বারা সেটাকে সূত্র হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার এই গবেষণা আরো বেশি তাৎপর্যময় এই কারণে যে, তিনিই সর্বপ্রথম পরিসংখ্যানকে জীববিজ্ঞানে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের এই দুটি শাখা একত্রে জীবপরিসংখ্যানবিদ্যা নামে পরিচিত।

মেন্ডেলের এই গবেষণার পর তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী ছিলেন সুইস ডাক্তার ও গবেষক ফ্রেডরিখ মিশার। 3
প্রায় দেড়শ বছর আগে জার্মানির এক অতি সামান্য গবেষণাগারে অসামান্য এক বস্তু আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীতে ডিএনএ নামে খ্যাত হয়। মিশার সুইজারল্যান্ডের বেসেলে ১৩ আগস্ট, ১৮৪৪ সালে এক বিজ্ঞানী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জোহান এফ. মিশার ছিলেন একজন গবেষক আর তার চাচা উলহেম হিজও ছিলেন বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির অধ্যাপক। তিনিই সর্বপ্রথম ‘ডেনড্রাইট’ এর নামকরণ করেছিলেন।

মিশার বাল্যকাল থেকেই বিজ্ঞানের আবহাওয়ায় বড় হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বেসেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করলেও দুর্বল শ্রবণ ক্ষমতার কারণে পরিবারের সম্মতি নিয়েই জার্মানিতে তখনকার বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোপ-সেইলারের অধীনে বিজ্ঞান সাধনা করার জন্য চলে আসেন। হোপ-সেইলারের একমাত্র গবেষক ছাত্র হিসেবে মিশার কোষের রাসায়নিক গঠন নির্ণয় করার চেষ্টা করছিলেন। প্রাথমিকভাবে তিনি লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে কোষ আলাদা করে তার উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু লসিকা গ্রন্থি থেকে লসিকা কোষ আলাদা করা এবং তার থেকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লসিকা কোষ পাওয়া একইসাথে কষ্টসাধ্য এবং প্রায় অসম্ভবপর ছিল। পরবর্তীতে তিনি হোপ-সেইলারের পরামর্শে নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সার্জিক্যাল ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোষ আলাদা করতে সমর্থ হন।

গবেষণার শুরুতে মিশার কোষের বিভিন্ন প্রোটিনের উপর আলোকপাত করেন এবং প্রোটিনের শ্রেণিবিভাগ করারও চেষ্টা করেন। প্রোটিন নিয়ে গবেষণাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেন, যখন দ্রবণে এসিড যোগ করা হয় তখন কিছু বস্তু অধঃক্ষিপ্ত হয়। যখন ক্ষার যোগ করা হয় তখন পুনরায় দ্রবীভূত হয়। মিশার যা লক্ষ্য করলেন তা আর কিছুই নয়, ডিএনএ।  সর্বপ্রথম তিনিই ডিএনএ পর্যবেক্ষণ করতে সমর্থ হন।

মিশার তার স্বভাবসুলভ দূরদর্শিতা দিয়ে নতুন বস্তুটির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হন। নতুন প্রাপ্ত বস্তুটির উপর আরো গবেষণা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদিও বস্তুটির অনেক গুণাবলী প্রোটিনের সাথে মিলে যায় তথাপি এটি প্রোটিন নয়। তিনি তার এই রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের ঘটনা ১৮৬৯ সালে এক চিঠির মাধ্যমে তার বিজ্ঞানী চাচাকে এভাবে জানিয়েছিলেন, ‘In my experiments with low alkaline liquids, precipitates formed in the solutions after neutralization that could not be dissolved in water, acetic acid, highly diluted hydro-chloric acid or in a salt solution, and therefore do not belong to any known type of protein.’

মিশার রহস্যময় নতুন এই পদার্থটির নামকরণ করেন ‘নিউক্লিন’। এটি বর্তমানে ডিএনএ নামে পরিচিত। নিউক্লিনের উপর পরবর্তীতে বিস্তর গবেষণা করে তিনি নির্ণয় করেন, নিউক্লিনে প্রোটিনের ন্যায় সালফারের উপস্থিতি নেই কিন্তু উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস রয়েছে।

মিশার তার সমগ্র বিজ্ঞান সাধনার জীবনে মাত্র নয়টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৭১ সালে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেটা তিনি হোপ-সেইলারের অধীনে সম্পন্ন করেছিলেন। মিশারের মতো হোপ-সেইলারও উল্লেখ করেন, তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর সাথেই মিশারের নিউক্লিনের কোনো মিল নেই। এরপর তিনি বেসেলে ফিরে আসেন এবং বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। বেসেলে তিনি পুনরায় নিউক্লিনের উপর গবেষণা শুরু করেন। এবার তিনি নিউক্লিনের উৎস হিসেবে স্যামন মাছের শুক্রাণুকে বিবেচনা করেন। স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউক্লিন পৃথক করতে সমর্থ হন এবং গবেষণার জন্য আরো জটিল প্রোটোকল ঠিক করেন।

4

 চিত্রঃ স্যামন মাছের শুক্রাণু থেকে ফ্রেডরিখ মিশার কর্তৃক শনাক্তকৃত নিউক্লিন বা ডিএনএ।

বেসেলে তিনি প্রাথমিকভাবে পূর্বের গবেষণা পুনরায় সম্পন্ন করেন এবং নিশ্চিত হন যে, নিউক্লিন শুধুমাত্র কার্বন, নাইট্রোজেন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত। এবং এতে সালফারের কোনো উপস্থিতি নেই বরং উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসফরাস আছে। তিনি স্যামন মাছের শুক্রাণুর নিউক্লিনে P2O5 এর পরিমাণ নির্ধারণ করেন মোট ভরের ২২.৫% যেটা বর্তমানে নির্ণীত পরিমাণ ২২.৯% এর খুব কাছাকাছি। তিনি এও উল্লেখ করেন, ফসফরাস নিউক্লিনের ভেতর ফসফরিক এসিড হিসাবে থাকে। আরো বলেন, নিউক্লিন বহু-ক্ষার বিশিষ্ট এক প্রকার জৈব যৌগ যাতে কমপক্ষে তিনটি এমনকি চারটি ক্ষারও থাকতে পারে। এটি বর্তমানে প্রমাণিত। নিউক্লিন উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট। আণবিক ভর ৫-৬০০ এবং নিউক্লিনের কিছু সম্ভাব্য আণবিক সঙ্কেত প্রদান করেন, যেমন C22H32N6P2O16 C29H49N9P3O22 । ১৮৭২ সালে মিশার তার স্যামন মাছের শুক্রাণুর উপর গবেষণার ফলাফল Naturalist Society in Basel এ উপস্থাপন করেন।

4

 চিত্রঃ জার্মানির যে গবেষণাগারে ফ্রেডরিখ মিশার সর্বপ্রথম ডিএনএ সনাক্ত করেন।

১৮৭৪ সালের পরে মিশার তার গবেষণা থেকে ক্রমশ সরে আসতে থাকেন এবং শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর গাঠনিক ধর্ম, রাসায়নিক ধর্ম ও তাদের আভ্যন্তরীণ পার্থক্যের দিকে নজর দেন। মিশার বংশগতিতে নিউক্লিনের গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৮৭৪ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “If one …wants to assume that a single substance …is the specific cause of fertilization, then one should undoubtedly first and foremost consider nuclein.”

১৮৭১ সালে মিশারের প্রবন্ধ প্রকাশের পর অন্য বিজ্ঞানীরাও নিউক্লিনের উপর গবেষণা করেন যাদের ভিতর অধিকাংশই ছিলেন রসায়নবিদ, তাদের মধ্যে Albrecht Kossel, Jules Piccard এবং Jacob Worm-Muller উল্লেখযোগ্য। তাদের ভিতর Albrecht Kossel ছিলেন হোপ-সেইলারের গবেষণাগারের গবেষক। নিউক্লিন যে চারটি ক্ষার এবং স্যুগারের সমন্বয়ে গঠিত তা আবিষ্কারের জন্য তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এতকিছুর পরেও মিশারের জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর নিউক্লিন তৎকালীন বিজ্ঞানী মহলে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তখনকার বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে নিউক্লিনের দ্বারা আর যাই হোক বংশগতির ধারক ও বাহক হওয়া সম্ভবপর নয়। কারণ, নিউক্লিনে রয়েছে মাত্র চার প্রকারের নিউক্লিওটাইড, যেটা প্রোটিনের তুলনায় খুবই নগণ্য। অন্যদিকে প্রোটিনে রয়েছে ২০ প্রকারের অ্যামিনো এসিড। তখনকার বিজ্ঞনীদের ধারণা ছিল, বংশগতির মতো জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেবলমাত্র প্রোটিনের মতো জটিল যৌগের ভিতরই থাকা সম্ভব।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিন জন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নিউক্লিন বা ডিএনএ বিজ্ঞান জগতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, ডিএনএ-ই বংশগতির ধারক ও বাহক। Avery, MacLeod এবং McCarthy’র প্রমাণ বর্তমান বিজ্ঞান জগতে পুনরায় নতুন ধারার সৃষ্টি করে। যা শুরু হয়েছিল মেন্ডেলের হাত ধরে।

অবশেষে ১৯৫৩ সালে নেচার পত্রিকায় ওয়াটসন ও ক্রিকের দ্বারা প্রকাশিত তিনটি প্রবন্ধ ঈশান থেকে নৈর্ঋত, বায়ু থেকে অগ্নি চারিদিকের বিজ্ঞান5 সাধনায় এক নতুন ধারার সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য ওয়াটসন ও ক্রিকের এই মডেল ব্যবহার করা হয় ডিএনএ’র গঠন ও কার্যাবলী যেমন রেপ্লিকেশন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য। ওয়াটসন ও ক্রিক এই দিক থেকে বিপ্লবী হলেও ডিএনএ’র আবিষ্কারক কিন্তু নন।

মেরিলিন মনরো কিংবা প্রিয়তমার মায়াবী চোখের মায়া থেকেও আপানর মুক্তি মিলতে পারে কিন্তু আপনি যদি একবার ডিএনএ’র মায়ার জালে জড়িয়ে পড়েন তাহলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মায়া থেকে মুক্তি মেলা ভার। তাই সাবধান!

 

ডিএনএ তার চারপাশে এমনই এক মায়ার জাল বুনেছে যার জন্য খালি চোখে তো দূরে কথা জটিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারাও দেখা যায় না, যার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র। ডিএনএ বৃক্ষ যা মেন্ডেলের হাতে ফ্যাক্টর নামে রোপিত হয়েছিল, পরবর্তীতে যা মিশারের হাতে নিউক্লিন নামে চারা গাছের জন্ম হয় এবং দীর্ঘকাল অবহেলায়, অযত্নে পরিবেশের এক কোণে সবার অগোচরে পড়ে থাকা চারা গাছটিকে অশেষ ভালবাসা দিয়ে পুনরায় জীবনদান করেন Avery, MacLeod এবং McCarthy, অবশেষে ওয়াটসন ও ক্রিকের হাত দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে বর্তমানে তা মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এই মহীরুহের শাখা প্রশাখা থেকে একদিকে যেমন মানুষ জীবনদায়ী ওষুধ পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি অন্নপূর্ণা দেবীর ন্যায় খাদ্যশস্য প্রদান করছে। ভাগ্যদেবী লক্ষ্মীর ন্যায় অগণিত মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

সমগ্র বিজ্ঞান জগতে ডিএনএ’র প্রভাব কতটা তা বোঝা যায় নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস লক্ষ্য করলে। সেই ১৯১০ সালে Albrecht Kossel এর নোবেল প্রাপ্তি দিয়ে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে ডিএনএ’র আগমন, আর অদ্যাবধি ডিএনএ’র উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গবেষণা করে সর্বমোট ৪০ জন বিজ্ঞানী ১৯ বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

২৫ শে এপ্রিল ২০০৩, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম এক দিন। ঠিক ৫০ বছর আগের ওই দিনেই ওয়াটসন ও ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ২৫ শে এপ্রিলকে ডিএনএ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৩ সালে নেচার পত্রিকা ডিএনএ দিবসের রৌপ্যজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে মেন্ডেল নামক মহারথীর হাত ধরে ডিএনএ নামক বিজয়-রথের যাত্রা শুরু। আজ অবধি অগণিত রথী মহারথীর হাত ধরে সেই রথের চাকা আজ আরো বেশি বেগবান ও তেজবান।

এক নজরে ডিএনএ পরিক্রমা

১৮৬৫ – গ্রেগর জোহান মেন্ডেল মটরশুটি গাছের উপর গবেষণা করে দুটি সূত্র প্রদান করেন যা পরবর্তীতে ‘মেন্ডেলের সূত্র’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৬৬ – আরনেস্ট হেকেল বলেন, নিউক্লিয়াস বংশগতি সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর ধারণ করে।

১৮৬৯ – ফ্রেডরিখ মিশার কোষ থেকে ডিএনএ আলাদা ও সনাক্ত করতে সমর্থ হন।

১৮৭১ – ফ্রেডরিখ মিশার, ফেলিক্স হোপ সেইলার এবং পি. পোলয কর্তৃক প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রথম ডিএনএ বা নিউক্লিনের বর্ণনা।

১৮৮২ – ওয়াল্টার ফ্লেমিং ক্রোমোসোম এবং কোষ বিভাজনের সময় তার ধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেন।

১৮৮৯ – রিচার্ড অল্টম্যান ‘নিউক্লিন’কে ‘নিউক্লিক এসিড’ নামকরণ করেন।

১৯০০ – কার্ল করেন্‌স, হুগো দি ভ্রিস এবং এরিক ভন শেমার্ক প্রত্যেকে স্বতন্ত্রভাবে পুনরায় মেন্ডেলের সূত্র আবিষ্কার করেন।

১৯০৯ – উলহেম জোহানসেন সর্বপ্রথম বংশগতির একক বোঝাতে ‘জিন’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

১৯১০ – থমাস হান্ট মর্গান Drosophila কে মডেল অঙ্গাণু হিসেবে ব্যবহার করে সর্বপ্রথম মিউটেশন আবিষ্কার করেন।

১৯২৮ – ফ্রেডরিখ গ্রিফথ ব্যাকটেরিয়ার উপর গবেষণা করে “transforming principle” আবিষ্কার করেন।

১৯২৯ – লেভিন অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন এবং থাইমিনকে ডিএনএ’র গাঠনিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন।

১৯৪১ – জর্জ বিডল এবং এডওয়ার্ড টটাম বলেন যে, প্রতিটি জিন একটিমাত্র এনজাইম উৎপাদনের জন্য দায়ী।

১৯৪৪ – Oswald T. Avery, Colin MacLeod, এবং Maclyn McCarthy সর্বপ্রথম প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে, ডিএনএ’ই বংশগতির মূল উপাদান এবং ধারক ও বাহক।

১৯৪৯ – Erwin Chargaff প্রমাণ করেন, ডিএনএ’র গঠন প্রজাতি থেকে প্রজাতিতে ভিন্নতর। তবে একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিতে তা সবসময়ই নির্দিষ্ট। অ্যাডেনিনের সমপরিমাণ থাইমিন এবং গুয়ানিনের সমপরিমাণ সাইটোসিন ডিএনএ তে থাকে।

১৯৫২ – Alfred Hershey এবং Martha Chase T2  ফাজ ভাইরাস ব্যবহার করে দেখান, T2  ব্যাকটেরিওফাজ যখন ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ6 করে তখন কেবলমাত্র তার ডিএনএ অংশটুকুই ব্যাকটেরিয়ার ভিতরে প্রবেশ করে। উৎপন্ন ভাইরাসে ঐ ডিএনএ অংশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়।

১৯৫৩ – Rosalind Franklin এবং Maurice Wilkins ডিএনএ’র উপর এক্স-রে নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে, ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট সর্পিলাকার বা হেলিক্যাল গঠন রয়েছে।

১৯৫৬ – আর্থার কোরেনবার্গ ডিএনএ পলিমারেজ এনজাইম আবিষ্কার করেন যা ডিএনএ’র রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম।১৯৫৩ – জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ’র উপর তাদের সর্বোচ্চ আলোচিত ও গুরত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে তারা ডিএনএ’র আণবিক গঠন এবং হেলিক্যালে কীভাবে অ্যাডেনিনের সাথে সবসময় থাইমিন এবং গুয়ানিনের সাথে সবসময় সাইটোসিন বন্ধনযুক্ত থাকে তার ব্যাখ্যা দেন। তাদের এই মডেল ডিএনএ’র “ডাবল হেলিক্যাল মডেল” নামে খ্যাত।

১৯৫৭ – ফ্রান্সিস ক্রিক “Central dogma of life” প্রস্তাব করেন এবং বলেন যে, ডিএনএ’র যে কোনো তিনটি ক্ষার একটি অ্যামিনো এসিডকে নির্দেশ করে।

১৯৫৮ – ম্যাথু মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্কলিন স্টাহল ডিএনএ’র সেমিকনজার্ভেটিভ মডেল প্রকাশ করেন।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ – Robert W. Holley, Har Gobind Khorana, Heinrich Matthaei, Marshall W. Nirenberg এবং তাদের সহকর্মীরা মিলে ডিএনএ’র জেনেটিক কোড আবিষ্কার করেন।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ – Werner Arber, Hamilton Smith এবং Daniel Nathans রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম ডিএনএ’র একটি নির্দিষ্ট অংশ কাটতে সমর্থ হন।

১৯৭২ – পল বার্গ রেসট্রিকশন এনজাইম ব্যবহার করে সর্বপ্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করেন।

১৯৭৭ – Frederick Sanger, Allan Maxam, এবং Walter Gilbert ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৮২ – রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ ব্যবহার করে সর্বপ্রথম কোন ওষুধ (ইনসুলিন) বাজারে আসে।

১৯৮৩ – Kary Mullis ডিএনএ’র পিসিআর (PCR) পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

১৯৯০ – মানুষের জিনোমের সিকোয়েন্সিং করা শুরু হয়।

১৯৯৫ – সর্বপ্রথম Haemophilus influenzae নামক ব্যাকটেরিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোন ইউক্যারিওটিক অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৬ – সর্বপ্রথম কোনো বহুকোষী অঙ্গাণুর সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

১৯৯৯ – সর্বপ্রথম মানুষের ২২ টি ক্রোমোসোমের জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০০ – Drosophila নামক মাছির এবং Arabidopsis নামক উদ্ভিদের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০১ – মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

২০০২ – ইঁদুরের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স প্রকাশ করা হয়।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at King’s College, London).
  3. Dahm, R., (2005) Friedrich Miescher and the discovery of DNA, Developmantal Biology 278, 274-288.
  4. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  5. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  6. Klug, A., (2004) the Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  7. Mayr, E., 1982. The Growth of Biological Thought: Diversity, Evolution, and Inheritance. Belknap Press, Cambridge, MA
  8. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  9. Watson, J.D, Crick, F.H.C., 1953. A Structure for Deoxyribose Nucleic Acid. Nature 171, 737–738.

 

লেখকঃ

চিন্ময় সেন
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন বিভাগ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

কৃষিশিল্পে বৈচিত্র্য কেন প্রয়োজন


অতীতের কৃষিশিল্পে একই সাথে বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করা হতো, বর্তমানের সাথে যার সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা কৃষিব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ নাকি তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া জীববৈচিত্র্যের ফলে যে আমাদের খাদ্যের যোগান ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার উপর অধিকাংশ মানুষই কোনো কর্ণপাত করে না। তবে আশার কথা, হাতে গোনা কয়েকজন এই বিষয়টি উপলব্ধি করেন, এবং এর সমাধানে নানা রকম ভাবনা চিন্তাও করেন।

পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল, কেননা তাদের সময় হরেক জাতের ফসল ফলানো হতো। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আজকে আমাদের খাদ্য তালিকায় খুঁজে পাওয়া ভার, কারণ সেই কৃষি-ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন, যার জন্য পূর্বে উৎপাদিত হওয়া বিভিন্ন রকম শস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন আর উৎপাদনই করা হয় না। বর্তমানে আমাদের উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সিংহভাগ আসে মাত্র পনেরো জাতের উদ্ভিদ থেকে। আর পুরো বিশ্বের শর্করা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি যোগান আসে গম, চাল আর ভুট্টা থেকে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কৃষি-ব্যবস্থায় কৃষক সমাজ, বিভিন্ন প্রকরণের শস্যের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎপাদন করার এক বিস্ময়কর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যাকে বলা হতো ‘ল্যান্ডরেস’। স্থানীয় পরিবেশের সাথে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ্ধতিটি। প্রত্যেক নবান্নের সময় কৃষকেরা পরবর্তী বছরে চাষ করার জন্য কিছু বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ করে রাখতো, ভবিষ্যতের দুর্যোগ সামাল দেবার উদ্দেশ্যেও এটি কাজ করা হতো।

যেহেতু একই জমিতে একই ফসল বার বার উৎপাদন করা হলে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে তাই কৃষকেরা প্রতি বছর ফসলের পরিবর্তন করতো। একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতো। এতে করে জমি তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতো। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি কোনো ফসল কীটপতঙ্গ বা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতো, তাহলে তার ক্ষতি নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তা করতো না, কারণ ক্ষতি সামাল দিতে আরো বাকি ফসল রয়েছে। এটা ছিল ‘ল্যান্ডরেস’ এর একটি বড় সুবিধা।

কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে পূর্বের প্রেক্ষাপটের কোনো মিল তো নেই-ই, বরং একটি যে আরেকটির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করে, তা বললে খুব একটা ভুল বোধ হয় হবে না। কারণ বহু জাতের ফসল উৎপাদন যেখানে পূর্বের কৃষি শিল্পে প্রাধান্য ছিলো সেখানে বর্তমানের কৃষিশিল্পের প্রাধান্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক-ফসলী উৎপাদন বা মনোকালচার।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্পোদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, কৃষিশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্ব এখনো ‘দুর্ভিক্ষ’ নামক মারাত্মক সমস্যার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

ব্যাপারটাকে একটু খোলসা করে বলা যাক। প্রতিযোগিতামূলক বাজের টিকে থাকার জন্য এসময়ের ফার্মগুলো কেবল এক জাতের ফসল উৎপাদন করার জন্য অদরকারিভাবে বিশালায়তনের জমি ব্যবহার করছে। আর এর পেছনে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে তা সহজেই অনুমেয়।

অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অত্যাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রযুক্তির কথা এসে পড়ে। বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য বেশি পরিমাণে কীটনাশক, সার প্রয়োগের দরকার হয়, উন্নতমানের সেচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি এই ফার্মগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে ঠিকই কিন্তু তার পরিবর্তে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে সাথে সাথে। কেননা অত্যধিক পরিমাণে এসব ব্যবহারের ফলে মাটি একসময় তার বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করে।

কোন ফসল উৎপাদন করা হবে তা পুরোপুরি কৃষকদের উপর নির্ভর করলেও তারা উৎপাদনের জন্য সেই ফসলই নির্বাচন করে থাকে যা সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল এবং যা উৎপাদন করলে বাজারের অন্যান্য ফার্মদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে, এবং যেখানে আরো অনেক ফসল আছে যা তাদের পরিবেশের অবস্থা এবং মাটির ধরণ অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী। এর ফলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য তাদেরকে অত্যাধিক পরিশ্রম করে বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে হয়। এটা তাদের করতে হতো না যদি না তারা তাদের জমির জন্য উপযোগী অন্যান্য ফসলগুলো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিতো। কিন্তু যাদের লক্ষ্য থাকে অন্যান্য ফার্মগুলোকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করা, তাদেরকে এটা বুঝাবে এমন সাধ্যি কার?

2 চিত্রঃ এই সবজিগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং আমাদের খাদ্যের সিংহভাগ যোগান এরাই দিয়ে থাকে। ছবিঃ dumbonyc.

মনোকালচারের একটি পরিণতি হচ্ছে, এর ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক শতাব্দীতে যত ধরনের শস্যাদি উৎপাদিত হতো, তার মধ্যে মাত্র দশ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। আঠারো শতকে প্রায় ৭০০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদন করা হতো, আর আজকে কেবল ১০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনকারীরা তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে যা উৎপাদন করবে, তাই আমাদের খেতে হবে। আমরা যে এখন তাদের উপরেই নির্ভরশীল- তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনোকালচারের আরেকটি সুবিধা হলো এটি ফসলের রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একবার যদি কয়েকটি শস্যদানা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে একটি চারাগাছ আক্রান্ত হবে, এরপর পুরো ফার্ম, এবং এরপর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ফার্মে সেই রোগের সংক্রমণ ঘটবে।

এসব নানাবিধ অসুবিধা নির্মূল করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের উচিত ‘ল্যান্ডরেস’ এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা যাতে তারা এমন একটি জিন খুঁজে পায় যা চারাগাছগুলোকে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। তবে রোগের সংক্রমণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনও ফসলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘মনোকালচার’ চলটা বদলানোর জন্য আমাদের হাতে এখনো কিছু সময় আছে। পূর্বে বর্ণিত কৃষকসমাজ ‘ল্যান্ডরেস’ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আমরা যদি ঠিক সেই কাজটির মাধ্যমে আমাদের খাদ্যাভাসে একটু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেই তাহলে বর্তমান কৃষিশিল্প বাধ্য হবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে। তবে আমরা যদি এজন্য খুব তাড়াতাড়ি কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অচিরেই এ নিয়ে আমাদের বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা সায়েন্স এক্সপ্লোরার (http://thescienceexplorer.com/nature/why-we-need-biodiversity-our-crops)

লেখিকাঃ কাজী ফাতিহা বিনতে হাবিব
আইডিয়াল কলেজ, মতিঝিল

নারী কেন পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে

গড়পড়তা পুরো পৃথিবীতেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘ জীবনকাল উপভোগ করে। ডেভিড রেবসন নামে একজন লোক অনেক খেটেখুটে এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তার ভাষায়- যে মুহূর্তে আমার জন্ম হয়েছিল,সে মুহূর্ত থেকে আমার সাথে জন্ম নেয়া অর্ধেক শিশুর আগেই আমার মারা যাওয়ার নিয়তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা এমন এক অভিশাপ যা আমার এড়িয়ে যাবার কোনো অবকাশ নেই। এর কারণ? আমার লিঙ্গ। আমি পুরুষ হবার কারণে একই দিনে জন্ম নেয়া নারীদের তুলনায় প্রায় তিন বছর আগে আমার মৃত্যু হবে- পরিসংখ্যান এমনটাই বলছে।

কেন একজন ছেলে হবার কারণে আমি আমার সমবয়সী নারীদের তুলনায় আগে মারা যাব? এবং আমার কি এই লিঙ্গের অভিশাপ থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব? এই গোলমেলে বৈষম্যটি কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এর কিছু উত্তরে এসে পৌঁছেছে। একটি প্রাথমিক ধারণা হলো,পুরুষেরা নিজেরাই এর পেছনে দায়ী।

যুদ্ধে অংশ নিয়ে, খনিতে কাজ করে কিংবা জমিতে চাষ করে তারা তাদের প্রাণের উপর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। তবে, এটাই যদি মূল কারণ হয়ে থাকে তবে নারী পুরুষ উভয়কে মিলিতভাবে একই রকম পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে দিয়ে আমরা এ বৈষম্য দূর করতে পারি।

সত্যিকার অর্থে বিশাল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হলেও নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার এই বৈষম্য ঠিকয় বজায় থাকে। সুইডেনের কথাই ধরা যাক, এই দেশটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পেশ করে থাকে। ১৮০০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৩৩ বছর এবং পুরুষদের ৩১ বছর। বর্তমানে এটি যথাক্রমে ৮৩.৫ বছর এবং ৭৯.৫ বছর। এই দুই ক্রান্তিকালেই নারীরা দৃশ্যত পুরুষদের তুলনায় ৫ শতাংশ সময় বেশি বাঁচে।

2চিত্রঃ নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে, এবং এর ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানটি পূরণ হচ্ছে না।

একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে- “পুরুষদের তুলনায় এই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বেঁচে থাকার সুবিধা নারীদের প্রাথমিক,বার্ধক্য এবং সম্পূর্ণ জীবনে; প্রতিটি দেশে,প্রতিটি বছর দেখা যায়। নারী পুরুষের মাঝে এটিই মনে হয় সবচেয়ে ক্লাসিক বৈষম্য।

এটাও দাবী করা যায় না যে, পুরুষেরা তাদের শরীর তথা জীবনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম যত্নশীল। ধূমপান,মদ্যপান এবং অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের মতো বিষয়গুলো হয়তো ব্যাপারটাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এটাই চূড়ান্ত কারণ নয়। রাশিয়াতে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা ১৯ বছর আগে মারা যায়,আংশিকভাবে যার কারণ অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নারী শিম্পাঞ্জি, নারী গরিলা এবং নারী ওরাংওটাংরাও তাদের প্রজাতির পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। আপনি কি কখনো কোনো শিম্পাঞ্জি,গরিলা কিংবা ওরাংওটাংকে সিগারেট বা মদের গ্লাস হাতে দেখেছেন? না।

এটা বোঝা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের আয়ু সংক্রান্ত উত্তরটা আমাদের বিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। “অবশ্যই সামাজিক এবং জীবনভিত্তিক বিষয়গুলো আয়ুর উপর প্রভাব ফেলে,কিন্তু তার চেয়েও গভীর কিছু রয়েছে আমাদের পরস্পরের জীববিজ্ঞানের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ইউরোপের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক টম কার্কউড।

জীববিজ্ঞানের অনেক বিষয় এর পেছনে কাজ করে। গুচ্ছ-ডিএনএ দিয়ে শুরু হোক। এরা প্রতিটি কোষের মধ্যে যা ক্রোমোসোম হিসেবে পরিচিত। ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে,এবং নারীদের দুটি X ক্রোমোসোম, পুরুষদের একটি X ও একটি Y। ক্রোমোসোম সংক্রান্ত এই পার্থক্যটি খুব চতুরভাবে কোষের বয়স পরিবর্তন করে দিতে পারে। যেহেতু নারীদের প্রতি কোষে দুটি X ক্রোমোসোম রয়েছে, তাই তাদের প্রতিটি জিনের অনুলিপি থাকে,অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত একটি থেকে যায়,যদি অপরটি কাজ না করে অথবা নষ্ট হয় তখন কাজে লাগে। পুরুষদের বেলায় এমন বিকল্প কিছু নেই।

3চিত্রঃ যদিও জীবন-যাপনের কিছু উপাদান দোষের, কিন্তু তারপরেও সেই উপাদানগুলো পরিহার করা কঠিন।

নারীদের মতো কোনো বিকল্প না থাকার কারণে ফলাফল স্বরূপ অনেক কোষই সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে যাবার সম্ভাবনায় থাকে। এতে পুরুষদের রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অন্যান্য বিকল্প বিষয়গুলোর মধ্যে ‘ব্যায়ামকারী নারীর হৃদপিণ্ড’ (jogging female heart) হাইপোথিসিস। এর ধারণাটি হলো, একজন নারীর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে রজচক্রের দ্বিতীয় অর্ধাংশে,যা পরিমিত ব্যায়ামের মতই উপযোগী। এবং এই প্রক্রিয়াটি হৃদপিণ্ডজনিত যেকোনো রোগ হবার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

অথবা হতে পারে আকৃতিগত কোনো সহজ ব্যাপার। লম্বা মানুষদের শরীরে কোষের সংখ্যা বেশি,এই ধরনের কোষগুলো ক্ষতিকরভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তুলনামূলকভাবে বড় শারীরিক গঠন অধিক পরিমাণ শক্তি দহন করে। যেহেতু পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে প্রায়ই লম্বা হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের আরো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত টেস্টোস্টেরনের মাঝে নিহিত আছে, যা অধিকাংশ পুরুষদের পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। গভীর কণ্ঠস্বর, লোমশ বুক হতে শুরু করে নিরাভরণ টাক মাথা পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য টেস্টোস্টেরন দায়ী।

কোরিয়ার Court of the Chosun Dynasty থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি কোরিয়ান বিজ্ঞানী হান নাম পার্ক উনিশ শতাব্দী থেকে কোর্ট লাইফ রেকর্ডগুলো বিশ্লেষন করেন,তার মধ্যে ৮১ জন নপুংসকও ছিল। যাদের বয়ঃসন্ধির আগেই শুক্রাশয় অপসারণ করে ফেলা হয়। তার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ঐ নপুংসকেরা ৭০ বছরের মতো আয়ু পেতো, যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক পুরুষেরা আয়ু পেতো গড়ে ৫০ বছর। তাদের ১০০ তম জন্মদিন পালনের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। এমনকি ঐ সময়ের রাজারাও এমন আয়ুর কাছাকাছি আসতে পারতো না।

যদিও শুক্রাশয় নিয়ে অন্য সব গবেষণা আয়ু নিয়ে এমন পার্থক্য দেখায় না। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শুক্রাশয় ছাড়া পুরুষ মানুষ ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীরা বেশিদিন বেঁচে থাকে।

4 চিত্রঃ পুরুষ এবং নারীর ক্রোমোসোমের পার্থক্য কোষের বয়স প্রভাবিত করতে পারে।

আয়ুর পার্থক্যের সঠিক কারণগুলো এখনো অধরা। তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডেভিড জেমস মনে করেন করেন, এই ক্ষতি হয়তো বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হয়ে যাবার কারণেই হয়। তার দাবী প্রমাণের জন্য তিনি মানসিক রোগীদের কিছু বিষন্ন কেস উপস্থাপন করেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই রোগীদেরকে নপুংসকে পরিণত করতে হয়। কোরিয়ান নপুংসকদের মতো তারাও অন্যান্যদের চেয়ে অনেকদিন বেশি বেঁচে ছিল। উল্লেখ্য তাদের ১৫ বছরের আগেই খোঁজাকৃত করা হয়। টেস্টোস্টেরন হয়তো পুরুষের শরীরকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই পরিবর্তন তাদের হৃদপিণ্ডজনিত রোগ সহ অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।

উদাহারণসরূপ বলা যায়, টেস্টোস্টেরন হয়তো আমাদের দেহে সেমিনাল ফ্লুইডের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, কিংবা হৃদপিণ্ডের সংবহনন্তান্ত্রিক ক্রিয়া পরিবর্তন করে দিতে পারে যা প্রথম দিকে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করলেও পরবর্তীতে উচ্চ-রক্তচাপ, অথেরোস্ক্লেরোসিসের জন্ম দিতে পারে। এমনটাই বলেন জনাব জেমস।

নারীরা শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরনের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত নয়, পাশাপাশি তারা আরো সুবিধাও পায়। তারা নিজেদের “যৌবনের স্পর্শমণি” (elixir of youth) থেকেও সুবিধা পায়, যা তাদের ভবিষ্যতের ভয়াবহতাগুলো থেকে সহজে উৎরে যেতে সাহায্য করে। নারীর সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন একটি “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”,যা কোষে চাপ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থদের বিতাড়িত করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এটা কার্যকর। প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি হলে কিংবা যারা ইস্ট্রোজেন স্বল্পতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা বেশিদিন বাঁচে না। ঠিক বিপরীতটি ঘটে পুরুষ নপুংসকদের ক্ষেত্রে।

নপুংসকতাকে দূরে ঠেলে বংশগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এমনটি ঘটে থাকে। এ হিসেবে পুরুষের সামান্য স্বল্প আয়ু মানুষ তথা পুরো প্রাণিজগতকে বিবর্তনীয় উপযোগীতা প্রদান করে। কিছু পার্থক্য নারী-পুরুষ উভয়কেই টিকে থাকতে সাহায্য করে। মিলনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রধানত অধিক পরিমাণ পুরুষালী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তথা অধিক পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নিঃসরণকারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে করে আয়ু বৈষম্যের ধারাও অধিক হতে থাকে। চাইলেও সহজ কিছু প্রচেষ্টা কিংবা উদ্যোগ দিয়ে এটা দূর করা সম্ভব নয়।

5 চিত্রঃ বয়সের বৈষম্য হয়তো টেস্টোস্টেরনের কারণে হয়ে থাকতে পারে।

যদিও ব্যাপারটি পুরুষের ভালো লাগার কথা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর একটি সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে। কার্কউডের মতে- হরমোন সহ অন্যান্য নিয়ামক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতে পারে, এই অর্জিত জ্ঞানই আমাদের দীর্ঘ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি ফিউচার, (http://www.bbc.com/future/story/20151001-why-women-live-longer-than-men)

লেখিকাঃ ইফ্ফাত সাবরিন তুহিন

একঘেয়েমী কেন দরকারী

একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাই না। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে,কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ,দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই,এদের পেতে বা এদের থেকে রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট, একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কী আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো,তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কী? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কী? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের চিন্তা-ভাবনা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেই সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারণা দেয়ার।

ভেবে দেখবেন তো,একঘেয়ে লাগার জন্য কারণ থাকে,নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোনো একটা কারণ দরকার? আমরা সাধারণত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে,কারো লাগে মিটিংয়ে,ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আশেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস,মুরগী,গরু, ছাগল,কুকুর-বিড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর এক প্রজাতির সংস্করণ আছে। প্রাণিজগতে এ ব্যাপারটির বিস্তার দেখে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোনো অবদান আছে কী?”

শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যাঁ, বলতে পারেন ঠিক সেই ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি। বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি-মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়,সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুঁজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিণ করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমণের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে,যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।”

এ দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষণই কাজে আসবে যতক্ষণ অন্বেষণের আগ্রহ থাকবে। ওমেলস্ফেল্ডার আরো বলেন, “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উদ্ভট আচরণ করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারে না, ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী,নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়।”

যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল, তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষণার উদাহরণ দেয়া যায়। একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিরস কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাঁড়ায়,প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায় না,যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যর্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষণা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়,এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা,বিষন্নতার মতো অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারণা করেন, একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরণের একঘেয়েমীর শ্রেণীবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে- একজন মানুষ কোনো না কোনো সময় যেকোনো একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোনো একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোনো কাজে জড়িত না থাকলেও,খুব একটা বিরক্তও থাকে না। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তার মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এ ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে”- এমনই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন, আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই, তবে ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়,এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

গত বছর এক পরীক্ষায় দু’দল স্বেচ্ছাসেবককে গবেষকেরা বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিল,অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিল। আর ফলাফলে পরের দলের বের করা আইডিয়াগুলো বেশি মজার ছিল। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিল যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিল। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিল না। স্যান্ডি এ পরীক্ষার উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে,কেননা সেই সময় মন নিজের মতো চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড,স্যান্ডির তত্ত্বের সাথে একমত নন। তার ভাষ্যমতে, আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা,তবে এ অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ব্যথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন হতাম না। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে,একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে,কোনো একটি পরিবেশে আমরা কী অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে, আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংখাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো- এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায়, একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে- একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গা মতো রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরণার অভাব নয়,বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় স্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ার কারণে তখন মনে হতে থাকে যেন তা খুব ধীরে চলছে। আবার জোর করে উত্তরণের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে।

মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে,সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন,চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনোযোগ প্রদানে ব্যর্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করে না,সবই অর্থহীন মনে হয়।

জন ইস্টউড এখন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন এ মনোযোগ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারণাটি এখনো প্রাথমিক,তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবণতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রান্ত হন।

মনোযোগ দিতে অপারগতার কারণ বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন,যেটার কাজ ছিল দিনের যেকোনো সময়ে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না,তারাই বেশি অসুখী।

কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া,ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক,জুয়া এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবীদের বলা হয়েছিল তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারে না,একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কী করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের কাছ থেকে আমরা একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে,তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি,ফাস্টফুড কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তরণের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে,তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে,রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার,তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

 

লেখকঃ রুহশান আহমেদ

পড়াশুনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন ‘সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার’ সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন।

পেনসিল কীভাবে বানায়

আজকের লেখার শুরুতেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করা যাক। চিন্তা করুন আপনার ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন আপনার মা অথবা বাবা হাতে হাত রেখে আপনাকে ‘অ আ ক খ’ আর ‘A B C D’ লেখা শেখাতেন। কী চমৎকারই না ছিল সেই দিনগুলো, তাই না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের হাতে লেখার দক্ষতা অর্জন করলেও ছোটবেলায় সঙ্গী পেনসিল কিন্তু আমাদের ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন ছবি আঁকাআঁকির কাজে আজও আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী কাঠের তৈরি এ জিনিসটি।

মজার ব্যাপার হলো আমরা অনেকেই জানি না কীভাবে বানানো হয় পেনসিল। একেবারে কাঠ থেকে শুরু করে পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত রুপে পেনসিল বানানোর পদ্ধতিটি জানলে খানিকটা আশ্চর্যই হতে হয়। আজ আমরা জানতে যাচ্ছি মজার সেই প্রক্রিয়াটিই।

পেনসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সীস যা দিয়ে আমরা লেখালেখি কিংবা আঁকাআঁকির কাজ করি। এর ইংরেজি নাম Lead। নাম Lead হলেও বাস্তবে কিন্তু এ সীসের মধ্যে সীসা থাকে না, বরং সেখানে থাকে কার্বনের রূপভেদ গ্রাফাইট আর কাদামাটির সংমিশ্রণ। প্রথমে এ সীস বানানোর প্রক্রিয়াটি জেনে নেয়া যাক।

১. প্রথমে অনেকগুলো গ্রাফাইট খন্ড আর কাদামাটি নিয়ে সেগুলো একটি বিশালাকৃতির ঘূর্ণনশীল ড্রামে রাখা হয়। ড্রামে আগে থেকেই রাখা থাকে বড় বড় পাথরের টুকরা। যখন ড্রামটি ঘুরতে থাকে তখন পাথরের টুকরার চাপে গ্রাফাইট আর কাদামাটি একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পাউডারে পরিণত হয়ে যায়। এরপর এ মিশ্রণে পানি মিশিয়ে তিন দিনের মতো রেখে দেয়া হয়।

২. এরপর একটি মেশিনের সাহায্যে এ মিশ্রণ থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এভাবে পাওয়া কাদার মতো পদার্থটিকে পরে চারদিনের জন্য রেখে দেয়া হয় যাতে এটি শুকিয়ে শক্ত হতে পারে।

ছবিতে একজন শ্রমিককে গ্রাফাইট-কাদামাটির পানি নিষ্কাশিত অবস্থাকে একটি কেবিনেটে রাখতে দেখা যাচ্ছে।

2

৩. মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে আরেকটি মেশিনের সাহায্যে একে আবার পাউডারে পরিণত করা হয়। এরপর সেখানে পানি মিশিয়ে মিশ্রণটিকে নরম করা হয়।

3

৪. নরম এ মিশ্রণকে পরে ধাতব টিউবের ভেতর ঢুকিয়ে চিকন রডের আকৃতি দেয়া হয়। এরপর সেই রডগুলোকে পেনসিলের সমান আকারে কাটা হয় মেশিনের সাহায্যে। সীসগুলোকে তারপর তুলে দেয়া হয় কনভেয়ার বেল্টে যেখানে তারা শুকাতে থাকে।

4

৫. শুকানোর পর সীসগুলোকে ওভেনে ১৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে সীসগুলো আরো মসৃণ ও শক্ত হয়ে ওঠে।

5

এবার আসা যাক পেনসিলে ব্যবহৃত কাঠের কথায়। পেনসিলের জন্য এমন কাঠ বেছে নিতে হবে যা নিয়মিত কাটাকাটির ধকল সহ্য করতে পারে। অধিকাংশ পেনসিলের জন্যই সীডার গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয় কারণ এতে সুগন্ধ আছে। এছাড়া এর আকারও সহজে বিকৃত হয় না। এবার তাহলে এ কাঠের প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে জানা যাক।

6১. সীডার গাছের কাঠ কেটে ও দরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর একে ব্লকের আকার দেয়া হয়।

২. ব্লকটি কেটে চিকন অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত করা হয় যাকে ইংরেজিতে বলে স্ল্যাট (Slat)। এগুলো ৭.২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ০.২৫ ইঞ্চি পুরুত্ব ও ২.৭৫ ইঞ্চি প্রস্থের হয়ে থাকে। কোম্পানিভেদে এ মাপ ভিন্ন হতে পারে। স্ল্যাটগুলোকে এরপর কনভেয়ার বেল্টে তুলে দেয়া হয়।

৩. এবার স্ল্যাটের তলকে মসৃণ করা হয়।

৪. বেল্টে থাকা অবস্থাতেই স্ল্যাটে অর্ধবৃত্তাকার খাঁজ কাটা হয়। খাঁজগুলোর পুরুত্ব হয় সীসের পুরুত্বের অর্ধেক।

৫. এরপর স্ল্যাটগুলোতে আঠা লাগানো হয় আর খাঁজের ভেতরে পেনসিলের সীসগুলো বসিয়ে দেয়া হয়।

৬. উপরের চারটি ধাপ যখন চলছিল তখন আরেকটি কনভেয়ার বেল্ট অন্য আরেক ব্যাচ স্ল্যাট বহন করে আনছিল। এগুলোর আকার, খাঁজের ধরণ সবই পূর্বোক্ত স্ল্যাটগুলোর মতোই। শুধু এগুলোতে কোনো আঠা লাগানো থাকে না এবং খাঁজগুলোতে কোনো সীসও রাখা থাকে না। একসময় এসব স্ল্যাটকে ৪র্থ ধাপে উল্লেখ করা স্ল্যাটগুলোর উপর বসিয়ে দেয়া হয়। এভাবে একটি স্যান্ডউইচ বানানো হয়। এসব স্যান্ডউইচকে বেল্ট থেকে তুলে ক্ল্যাম্পের সাহায্যে আটকে রাখা হয়। এরপর এগুলোকে হাইড্রোলিক প্রেসের সাহায্যে চাপ দেয়া হয় যাতে বাড়তি আঠা চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখনও স্যান্ডউইচগুলোকে ক্ল্যাম্পে আটকে রাখা হয় শুকানোর জন্য। শুকিয়ে গেলে বাড়তি আঠাগুলো ছেঁটে ফেলা হয়।

৭. এবার স্যান্ডউইচগুলোর দায়িত্ব নেয় কাটিং মেশিন। দ্রুত ঘুর্ণায়মান স্টিল ব্লেডের সাহায্যে এগুলোকে বৃত্তাকার অথবা ষড়ভূজাকার করে কাটা হয়।

৮. একই মেশিনের সাহায্যে প্রতিটি স্ল্যাট থেকে ৬-৯টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা পেনসিল কেটে নেয়া হয়।

৯. প্রতিটি পেনসিলকে এরপর মসৃণ করা হয় এবং বার্নিশ করে শুকানো হয়। এ কাজগুলোও করা হয়ে থাকে মেশিনের সাহায্যে। যতক্ষণ না পেনসিলে কাঙ্ক্ষিত রঙ ফুটে উঠে ততক্ষণ এ প্রক্রিয়াটি বারবার চলতে থাকে।

১০. সবার শেষে এসব পেনসিলের পেছনে আঠা অথবা ধাতব কাঁটার সাহায্যে ধাতব কেস লাগানো হয়। এরপর এসব কেসের ভেতর ইরেজার বসিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় একেকটি পেনসিল।

গ্রাফাইট খন্ড দিয়ে সীস বানানো থেকে শুরু করে সীডার গাছের কাঠ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ একটি পেনসিল পাওয়ার পেছনের প্রযুক্তিগুলো আসলেই বেশ চমৎকার। পেনসিল বানানোর কৌশলের ইতি টানছি এখানেই। তবে শেষ করার আগে একটি মজার ঘটনা বলে বিদায় নিচ্ছি।

হাইমেন লিপম্যান ছিলেন একজন আমেরিকান। একসময় তিনি খেয়াল করলেন পেন্সিল আর ইরেজার আলাদা থাকায় অনেক সময়ই তাকে কিছু ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ ঝামেলা থেকেই তিনি পেয়ে গেলেন এক নতুন আইডিয়া, পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগিয়ে দিলেই তো হয়! আইডিয়াটি তিনি শুধু নিজের পেন্সিলে কাজে লাগিয়েই থেমে যান নি। বরং ১৮৫৮ সালের ৩০ মার্চ তিনি এ আইডিয়াটি নিজের নামে পেটেন্টও করিয়ে নেন। ফলে পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগানোর প্রথম রেজিস্টার্ড কৃতিত্বটুকু বগলদাবা করে নেন লিপম্যান।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না, বরং এখন তা শুরু হতে যাচ্ছে। ১৮৬২ সালে লিপম্যান তার পেটেন্টটি ১,০০,০০০ ডলারে জোসেফ রেকেনডর্ফার নামে এক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন! ভাবা যায়? সেই আমলের এক লাখ ডলার!

১৮৭৫ সালে শুরু হয় এ ঘটনার ট্রাজেডিক অংশটুকু। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট লিপম্যানের এ উদ্ভাবনকে বাতিল ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে লিপম্যান নতুন কিছু করেন নি বরং প্রচলিত দুটি জিনিসকে একত্রিত করেছেন মাত্র! অবশ্য ততদিনে তো লিপম্যানের পকেট ঠিকই ফুলে উঠেছিল।

 

মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি