বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা ম্যাক্সওয়েল

শুরু করা যাক একটি মজাদার প্রশ্ন দিয়ে। এমন ৩ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম বলুন যারা পদার্থবিজ্ঞানের জগতটাকেই রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানে যাদের নুন্যতম ধারণা আছে, তারা ২ জনের নাম সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় বলবেন। একজন হলেন মহাকর্ষের সারথি স্যার আইজ্যাক নিউটন, অপরজন আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অবতারণাকারী আলবার্ট আইনস্টাইন।

কিন্তু তৃতীয় ব্যাক্তিটি কে হবেন? এটা বলতে গিয়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্তি বা সংশয়ে পড়ে গেছেন। এমনকি খোদ পদার্থবিদরাই এই প্রশ্নের উত্তরে একমত হতে পারেননি। তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে এই দুইজনের নামের পাশে যার নাম সবচেয়ে বেশি শোভা পায়, তিনি হচ্ছেন আলোর তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্বের প্রণেতা জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

১৮৩১ সালের ১৩ই জুন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের এক ধনাঢ্য স্কটিশ পরিবারে ম্যাক্সওয়েলের জন্ম। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তার নাম রেখেছিলেন ক্লার্ক। পরবর্তীতে তার বাবা তার নামের শেষে ম্যাক্সওয়েল যোগ করে দেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতুহলী মনের অধিকারী। ৩ বছর বয়স থেকেই চারপাশের বিভিন্ন ঘটনার কারণ সম্পর্কে মায়ের কাছে জানতে চাইতেন। শৈশবেই তার তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয়ও পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি কবি জন মিল্টন রচিত দীর্ঘ অনুচ্ছেদগুলো অনায়াসে পড়তে পারতেন।

চিত্র: জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

১৮৩৯ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ম্যাক্সওয়েলের মা মারা যান। বাবা এবং চাচী তার দেখাশোনা ও পড়ালেখার দেখভাল করেন। তবে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাশুরুর অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না।

ম্যাক্সওয়েলের প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং অজানাকে জানার প্রবল ইচ্ছা ছিল প্রবল। কিন্তু তার পড়াশোনায় মন ভরছিল না শিক্ষকের। তিনি ধারণা করেছিলেন, ম্যাক্সওয়েল সাধারণ বাচ্চাদের মতো কোনো জিনিস দ্রুত শিখতে পারে না। এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণে পড়ানোর সময় তিনি মাঝে মাঝে ম্যাক্সওয়েলের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করতেন। এ ঘটনা জানার পর সেই শিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয় এবং ১৮৪১ সালে তিনি বিখ্যাত এডিনবার্গ একাডেমির স্কুল শাখায় ভর্তি হন। সেখান থেকেই তার বিখ্যাত কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।

চিত্র: এডিনবার্গ একাডেমি

স্কুলে ভর্তি হলেও স্কুলের গৎবাঁধা নিয়ম আর সীমাবদ্ধ পড়াশোনায় তার তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও তিনি বেশ উদাসীন ছিলেন। তবে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনুসন্ধিৎসু মনটি ছিল সদা জাগ্রত।

শুনতে অবাক লাগলেও ম্যাক্সওয়েল যখন তার প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর! তার প্রথম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ছিল জ্যামিতিকেন্দ্রিক। গবেষণাপত্রে সরু দড়ির কুণ্ডলীর সাহায্যে গাণিতিক বক্ররেখাগুলোকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উপস্থাপনের পদ্ধতি বর্ণনা করেন।

এছাড়াও তিনি দুইয়ের অধিক কেন্দ্র সম্পন্ন সাধারণ উপবৃত্ত, কার্তেসীয় উপবৃত্ত সহ বিভিন্ন বক্ররেখার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণাপত্রে আলোচনা করেন। তার এই গবেষণালব্ধ ফলাফল এডিনবার্গ রয়েল সোসাইটিতে পর্যন্ত উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তার বয়স ছিল খুব কম। শিক্ষকেরা এই তরুণ বয়সে এত বড় কাজের ভার তার উপর দিতে চাননি। তাই তার অনুসন্ধানের পুরো বিষয়টি মঞ্চে উপস্থাপন করেছিলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক জেমস ফোর্বস। তৎকালীন সময়ে

চিত্র: এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়

পদার্থবিজ্ঞানকে ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ বা ‘ন্যাচারাল ফিলোসোফি’ নামে ডাকা হতো। মজার বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েল তখনও কলেজের গণ্ডিই পার করতে পারেননি।

১৬ বছর বয়সে ১৮৪৭ সালে ম্যাক্সওয়েল এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে প্রথম টার্ম পরীক্ষার পর তিনি এডিনবার্গের স্নাতক শেষ করবেন বলে মনস্থির করেন। এডিনবার্গে থাকাকালীন সময়েও তার লেখা ২টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

১৮৫০ সালের অক্টোবরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই তার সৃষ্টিশীল কাজের পরিচয় ফুটে ওঠে। ২৫ বছর বয়সে তাকে অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে একই সাথে অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হবার নজির খুবই বিরল।

কয়েক বছরের মাঝেই গবেষক হিসেবে তার নাম বিজ্ঞানমহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তিনিই সর্বপ্রথম শনির বলয়ের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন গাণিতিক পরিসংখ্যান এবং শনি গ্রহের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং সেগুলো যাচাই বাছাই করে বলেন, শনির বলয় আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে তৈরি। এই বস্তুগুলো একসাথে শনির চারপাশে ঘুরপাক খাওয়ার কারণেই এই বলয় তৈরি করে থাকে।

তার আগে কোনো গবেষকই বিষয়টিকে এভাবে চিন্তা করেননি। তাদের ধারণা ছিল, শনির বলয় হয়তো অবিচ্ছিন্ন কোনো দৃঢ় বস্তু দিয়ে তৈরি। এরকম হলে সেগুলো ঘূর্ণনের সময় একে অপরের সাথে ধাক্কা লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। এমনকি শনিগ্রহের সাথেও বলয়ের সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা থাকত। আবার বলয়টি তরল পদার্থের হলে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরার কারণে সেগুলো একে অপর থেকে ছিটকে যাবার কথা। কিন্তু সেরকমও তো হচ্ছে না।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ম্যাক্সওয়েল তখন গণিতের আশ্রয় নিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তিনি বলেন, শনির বলয়টি যদি অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়, তবেই সেটি মোটামুটি স্থিতিশীল ও অক্ষুন্ন থাকবে। প্রতিটি ক্ষুদ্র পদার্থ একেকটি উপগ্রহের ন্যায় শনি গ্রহের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে। একটি রিংয়ের সকল ক্ষুদ্র পদার্থ একটি নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট বেগে ঘোরে। এমনটা না হলে বলয়ের পদার্থগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষের ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই ধ্বংস হয়ে যেত।

চিত্র: শনির বলয় নিয়ে লেখা ম্যাক্সওয়েলের গবেষণাপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা।

ম্যাক্সওয়েল শুধু শনির বলয় সৃষ্টির কারণই ব্যাখ্যা করেননি, তিনি এর ভবিষ্যতও অনুমান করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, শনির বলয়টি ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করবে এবং একপর্যায়ে সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। শনিগ্রহের মহাকর্ষ বলের কারণেই মূলত এই ঘটনাটি ঘটবে।

প্রায় শতাধিক বছর পরে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। ভয়েজার মহাকাশযান শনিগ্রহকে ফ্লাইবাই করার সময় পাঠানো বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ম্যাক্সওয়েলের বিবৃতিটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক ছিল।

১৮৬০ সালে ম্যাক্সওয়েল যে কলেজের শিক্ষক ছিলেন সেটি আরেকটি কলেজের সাথে মিলিতভাবে কাজ শুরু করে। তখন তাঁকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই ঘটনার পর তিনি লন্ডনের কিংস কলেজের প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত আবিষ্কারটি করেছিলেন। তার সেই আবিষ্কারকে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা (আইনস্টাইন, ফাইনম্যান, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রমুখ) বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার বলে মনে করেন।

তিনি ৪টি গাণিতিক সমীকরণ প্রতিপাদন করেন। এই সমীকরণগুলোর সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন, আলো, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্ব- এরা একই বল থেকে সৃষ্টি। সেই বলের নাম তাড়িতচুম্বক বল। সমীকরণগুলো বর্তমানে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ নামে পরিচিত। তার এই আবিষ্কার এখন পর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞানের সার্বিক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব বা Grand Unified Theory of Physics তৈরিতে সবচেয়ে বড় সহায়ক।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ

বর্তমানে আমরা জানি, ইলেকট্রন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হবার মুহূর্তে আমরা বিদ্যুৎ শক্তি পাই। ইলেকট্রনগুলো যখন একই দিকে ঘুরতে থাকে তখন চৌম্বকত্ব পাওয়া যায়। আবার ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে উচ্চ শক্তিস্তর থেকে নিম্ন শক্তিস্তরে গমনের সময় ফোটন নির্গত হয়। সেখান থেকেই আলোক শক্তি পাওয়া যায়।

এই তিনটি ঘটনাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের বাস্তব উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে ইলেকট্রন আমাদের চেনা জানা জগতকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটা এই ঘটনাগুলোর সাহায্যেই বোঝা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ইলেকট্রন আবিষ্কারের প্রায় ৩০ বছর আগে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের জন্মস্থান। এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন।

তিনি মূলত ২টি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এই সমীকরণগুলো প্রতিপাদন করেছিলেন। প্রথমটি হচ্ছে বিদ্যুৎ কীভাবে চৌম্বকত্বকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয়টি ঠিক তার উলটো অর্থাৎ চৌম্বকত্ব কীভাবে বিদ্যুৎকে প্রভাবিত করে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্বের মাঝে প্রভাব বিস্তারকারী জিনিসটি হলো বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গটি তার উৎস থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি এই তরঙ্গের বেগ নির্ণয় করে দেখেন তা আলোর বেগের সমান। যেহেতু আলোর চেয়ে বেশি বেগে মহাবিশ্বে কোনো কিছু যেতে পারে না, তাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো অবশ্যই একই জিনিসের দুটি ভিন্ন রূপ হবে।

শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে শক্তির তরঙ্গরূপে ভ্রমণের ধারণাটি সে সময়ের সনাতনী নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানকে অনেক বড় ধাক্কা দেয়। কারণ নিউটন মনে করতেন, দুরে অবস্থিত কোনো বস্তুর উপর মহাকর্ষ বল ছাড়া আর কিছু প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

কিন্তু নতুন আবিষ্কার বলছে ভিন্ন কথা। নতুন এই ধারণাটির উপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানের আরেকটি নতুন শাখার জন্ম হয়। তার নাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

ম্যাক্সওয়েলের এই বিদ্যুৎচুম্বকত্বের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। তার সমীকরণের উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র (রেডিও, টেলিভিশন, রাডার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইত্যাদি) তৈরি করা হয়।

তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ছাড়াও ম্যাক্সওয়েলের আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার রয়েছে। গ্যাসের গতিতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তার এই তত্ত্ব পরিসংখ্যানিক পদার্থবিজ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। এর সাহায্যে ক্ষুদ্র মৌলিক কণার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিসংখ্যানের মাধ্যমে উপস্থাপনের এক অভিনব উপায় বের করা সম্ভব হয়েছিল। যা ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বশর্ত।

তিনিই বিশ্বে প্রথম রঙ্গিন ফোটোগ্রাফ তৈরি করেছিলেন। মানুষের চোখ যে লাল, নীল, সবুজ- এই তিনটি আলোর অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারে। এটাও তিনিই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। একারণে তিনি লাল, নীল ও সবুজ বর্ণের পৃথক ফিল্টার ব্যবহার করে তার ফটোগ্রাফার দিয়ে একটি পশমি কাপড়ের পটির ছবি তোলেন। পরবর্তীতে এই তিনটি ছবিকে স্তরীভুত করে ফিতার একটি পরিপূর্ণ রঙ্গিন ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। আধুনিক ফটোগ্রাফিতে তার এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

ম্যাক্সওয়েল ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার মায়ের মতোই পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অনেক বড় প্রভাব রেখে গিয়েছেন। আরো ২০-৩০ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো পদার্থবিজ্ঞানকে আরো অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন।

বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তার অবদানকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার তড়িৎচুম্বকীয় ধারণার উপর ভিত্তি করে Electric Fields and Waves নামে তড়িৎকৌশল একটি শাখা তৈরি করা হয়েছে। তার এই ধারণাটি এতটাই মৌলিক ও চমৎকার ছিল যে প্রযুক্তিবিদদের সবচেয়ে বড় সংগঠন IEEE-র লোগোতে সেটি স্থান পেয়েছে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

লোগোটিতে সোজা তীরচিহ্ন দিয়ে বিদ্যুৎ এবং বাঁকানো তীর চিহ্ন দিয়ে তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে বোঝানো হয়েছে। এর পেছনের মূল কারিগর নিঃসন্দেহে ম্যাক্সওয়েল। তিনিই ফ্যারাডে এবং অ্যাম্পিয়ারের সূত্র দুইটিকে একীভূত করতে পেরেছিলেন।

তার নামানুসারে সিজিএস পদ্ধতিতে চৌম্বক ফ্লাক্সের এককের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল। তার অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাবমিলিমিটার টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়েছে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল টেলিস্কোপ।

এছাড়াও শনির বলয়ের C রিংয়ের মধ্যবর্তী সবচেয়ে প্রশস্ত (২৭০ কিলোমিটার চওড়া) ফাঁকা স্থানের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল গ্যাপ।

তথ্যসূত্র

  1. https:// britannica.com/biography/James-Clerk-Maxwell
  2. https://iaus.archive.org/8/items/onstabilityofmot00maxw/onstabilityofmot00maxw.pdf
  3. https://youtube.com/watch?v=b2cVLHozb9k
  4. https://owlcation.com/humanities/The-Contributions-of-James-Clerk-Maxwell-to-Science

স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

অ্যাটাকামা’র মমি রহস্য

মমি– নামটা শুনলেই মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশর ও পিরামিডের ছবি। এককালের মহা প্রতাপশালী ফারাও রাজারা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে রয়েছেন এই মমির মাধ্যমে। তবে মৃতদেহকে মমি বানিয়ে অবিনশ্বর বানানোর চেষ্টা যে শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চীন, লিবিয়া, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশেও অতীতে মমিকরণের খোঁজ মিলেছে।

কিছু মমি ছিল মানবসৃষ্ট। আবার কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব মমির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। মমিগুলো এককালে জীবন্ত মানুষ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে ক্ষুদ্র কিন্তু অদ্ভুত এমন এক মমির খোঁজ মেলে। সাধারণ মানবদেহের কাঠামোর সাথে যার অনেক বৈশিষ্ট্যই বিরোধিতা করে।

আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান। বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে। এমন জায়গাও রয়েছে এই মরুভূমিতে, যেখানে কোনোদিনই বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এই জনমানবহীন স্থানে প্রাণের সন্ধান মেলে কদাচিৎ।

তবে ৭০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এখানে ‘চিনচিরো’ উপজাতির বসবাস ছিল। বর্তমানে যেসকল গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে, তাদের অধিকাংশেরই বাস সাগরের অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায়। এর মূল কারণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়।

চিত্র: অ্যাটাকামা মরুভূমি হতে প্রাপ্ত মমি

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম মমি নিয়ে। ২০০৩ সালে অস্কার মুনোজ নামের একজন শখের সংগ্রাহক এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে বেড়াতে আসেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এর লা নোরিয়া নামক স্থানে। অ্যাটাকামার এই জায়গাটিকে বলা হয় ঘোস্ট ভিলেজ। কারণ বহু আগে এখানে মানুষের বসবাস থাকলেও এখন সে জায়গা পুরোপুরি পরিত্যক্ত।

মুনোজের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে চামড়ার থলেতে মোড়ানো এক টুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। সংগ্রাহকের স্বভাবজাত কৌতূহলবশত তিনি কাপড়টা অনাবৃত করলে একটি ক্ষুদ্র মানবসদৃশ প্রাণীর কঙ্কাল দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে কঙ্কাল মনে হলেও পরে এর চামড়ার আস্তরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি বুঝলেন এটি আসলে একটি মমি।

দৈর্ঘে ৬ ইঞ্চি লম্বা মমিটির মাথা ছিল সাধারণ মানুষের মাথার তুলনায় অনেকাংশে লম্বা এবং চোখা। অক্ষিকোটর দুটোও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বড় এবং প্রায় ত্রিকোণাকার। ছিল লিকলিকে লম্বা দুটো হাত ও পা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের বক্ষপিঞ্জরে হাড় থাকে ১২ জোড়া, কিন্তু এর বুকে হাড়ের সংখ্যা ছিল ১০ জোড়া।

আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এটি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় মমিটি সকলে কাছে প্রায় অজানাই ছিল। এটি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আসে ২০০৯ সালে, যখন স্পেনের বার্সেলোনায় গবেষকদের সামনে একে উন্মোচন করা হয়।

চিত্র: অ্যাটা

এরও প্রায় চার বছর পর, ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান মমিটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এরপর একে একে বের হতে থাকে চমকপ্রদ সব তথ্য। প্রাপ্তিস্থান অ্যাটাকামার সাথে মিল রেখে তিনি মমিটির নামকরন করেন অ্যাটা।

নানা মুনির নানা মতের মতো অ্যাটাকে দেখার সাথে সাথেই বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেয়া শুরু করেন। কেউ বললেন এটি স্রেফ একটা গুজব, পুরোটাই ধোঁকাবাজি, মানুষের কারসাজি। কেউ কেউ বললেন এটি হয়তো আসলেই অজানা কোনো প্রজাতি বা এলিয়েনের নমুনা। আবার অনেকে বললেন, দেখতে যেমনই হোক, এটি আসলে একটি মানুষ।

অ্যাটাকে ধোঁকাবাজি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলোর ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়িই মিলে গেল। এর দেহ হতে প্রাপ্ত ডিনএনএ’র নমুনা বিশ্লেষণ করে নোলান প্রমাণ করলেন, অ্যাটা কোনো মানবসৃষ্ট ধোঁকা নয়, সে এককালে জীবিত থাকা পরিপূর্ণ একটি প্রাণের নমুনা।

প্রাণ পর্যন্ত তো হলো। বাকি রইলো একটি প্রশ্ন- অ্যাটা কি এককালে মানুষ ছিল? নাকি অন্যকিছু?

অ্যাটার বক্ষপিঞ্জরে যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সেখানে তার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিল। অত্যন্ত শুষ্ক স্থানে থাকার কারণে বহুকাল পরও তার দেহ প্রায় অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাটা’র মমিকে এক্স রে, ক্রোমাটোগ্রাফি ও জেনেটিক স্যাম্পলিং করে একে মানুষ বলেই ঘোষণা করলেন নোলান।

কিন্তু গবেষণার একটি ফল নোলানের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অ্যাটার ডিএনএ’র ৯১ শতাংশ মানুষের জিনোমের সাথে মিললেও বাকি ৯ শতাংশ মেলে না। নোলানের মতে, এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের অংশটুকুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, পুরো জিনোমের ক্ষেত্রে নয়। তবে এরপরও প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ মানব ভ্রূণের অনেক বৈশিষ্টের সাথেই অ্যাটার বৈশিষ্ট খাপ খায় না।

অ্যাটার করোটিতে পরিপূর্ণ দাঁতের সন্ধান পাওয়া। তার হাত ও পায়ের অস্থির গঠন ৬/৭ বছরের একটি শিশুর অস্থির গঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। মাত্র ৬ ইঞ্চি লম্বা একজন মানুষের হাড় ৬/৭ বছরের শিশুর মতো দৃঢ় কেন হবে? অপরিণত একটি মানুষের পূর্ণ বিকশিত দাঁত কীভাবে হয়? শিশু জন্মের কয়েক বছর পরই না দাঁত উঠে, তা-ও আবার থাকে অবিকশিত।

এই প্রশ্নে আবারো অ্যাটার আদি পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটার মালিক তাকে বিক্রি করে দিলে সে চলে যায় স্পেনের এক সংগ্রাহকের হাতে। ফলে থেমে যায় তাকে নিয়ে চলতে থাকা গবেষণা।

চিত্র: অ্যাটার আকার খুবই ছোট

২০১৮ সালে অ্যাটাকে নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন গ্যারি নোলান এবং তার সহকর্মী অতুল বাট। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তারা অ্যাটার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব তথ্য হয়তো হয়তো বলছে এটি কোনোভাবেই এলিয়েন নয়, কিন্তু তারপরেও সেসব তথ্য কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়।

গবেষণায় তারা জানতে পারেন, ভ্রূণ অবস্থাতেই অ্যাটার মৃত্যু হয়। ক্রোমোসোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে অ্যাটা ছিল একজন নারী এবং সে আসলে তৎকালীন অ্যাটাকামা অঞ্চলেরই স্থানীয় কোনো বাসিন্দার সন্তান।

মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ সপ্তাহের মতো। সাধারণত মৃত্যুর পর যত দিন যায়, ডিএনএ সূত্রগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছোট হতে থাকে। সেই তুলনায় অ্যাটার ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্ট যথেষ্ট লম্বা। এ থেকে ধারণা করা হয় যে অ্যাটার এই মমির বয়স ৫০০ বছরের বেশি নয়।

গবেষকদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় অ্যাটার শরীরে প্রায় ৫৪ রকমের মিউটেশন ঘটে। এরই বহিঃপ্রকাশ অ্যাটার এই অস্বাভাবিক অবয়ব। প্রথম দেখায় অনেকেই বলবে এটা পৃথিবীর কোনো প্রাণ নয়, এটা নির্ঘাত এলিয়েন। মিউটেশনগুলোর মধ্যে বামনত্ব (Dwarfism) এবং প্রোজেরিয়া (Progeria) অন্যতম।

বেশ কিছু মিউটেশনের ধরন এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। এগুলো সম্পর্কে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেলের মাধ্যমে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এই ৫৪টি মিউটেশন ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিকাশ ও ফলাফল পর্যপেক্ষণ করা। আরেকটি উপায় হচ্ছে অ্যাটার ডিএনএ’র ময়নাতদন্ত করা, যার মাধ্যমে হয়তো আমরা তার অতীতকে ঘেঁটে তার বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করতে পারব।

ছোট্ট একটা শরীরে এতগুলো মিউটেশনই অ্যাটার মৃত্যুর মূল কারণ। তার ১০ জোড়া বুকের পাঁজর, ভ্রূণ অবস্থায়ও প্রায় পরিপূর্ণ হাত ও পায়ের অস্থি, পূর্ণ বিকশিত দাঁত- সবই মিউটেশনের ফল হিসেবে ধারণা করা হয়। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার মাথা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার কারণে দেহের তুলনায় মাথার আকার বড় হয়ে যায়। অক্ষিকোটরও হয়ে যায় ত্রিকোণাকার। কিন্তু একটি সদ্য সৃষ্ট ভ্রূণের মধ্যে একসাথে এতগুলো মিউটেশন কীভাবে হওয়া সম্ভব, এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো দিতে পারেননি।

চিত্র: কিশতিম ডোয়ার্ফ মমি

তবে এই মমিটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্পই বেশি প্রচলিত রয়েছে। কারণ যিনি এটিকে সর্বপ্রথম পান, তিনি একে পাওয়ার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। এবং মমিটিও নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনেরা বলাবলি শুরু করে যে মমিটিকে তার প্রজাতির অন্যান্য সদস্যরা ইউএফওতে করে এসে তুলে নিয়ে গেছে!যদিও অ্যাটার এই অদ্ভুত ডিএনএ মিউটেশন বিজ্ঞানীমহলে মানবভ্রূণ ও এর জিনগত বৈশিষ্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে, কিন্তু এরকম মমির সন্ধানলাভ কিন্তু এই প্রথম নয়। অ্যাটারও পূর্বে, ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার কিশতিম শহরে এরকম খর্বাকৃতির একটি মমি পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয় ‘কিশতিম ডোয়ার্ফ’।

বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাকেও হার মানায়। চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমির প্রাচীন কন্যা অ্যাটা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। গবেষকরা অ্যাটাকে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে অনেক সময় নিজেরাই চমকিত হয়েছেন। শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের যেখানে ৯৬ শতাংশ জিনোম মিলে যায়, সেখানে মাত্র ৯১ শতাংশ মিল নিয়ে অ্যাটা কীভাবে মানুষ হতে পারে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই রহস্যের উদ্রেক ঘটায়।

ডিনএনএ পোস্ট মর্টেম ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা অ্যাটাকে পুরোপুরিভাবে জানতে পারবো। তার আগে ততদিন পর্যন্ত সে অ্যাটাকামা’র বিস্ময় হয়েই থাকবে আমাদের সকলের কাছে।

তথ্যসূত্র

  1. https:// nytimes.com/2018/03/22/science/ata-mummy-alien-chile.html
  2. https:// usatoday.com/story/news/world/2018/03/23/mystery-solved-alien-mummy- human-after-all/453323002/
  3. https://gizmodo.com/alien-mummy-found-in-atacama-desert-is-actually-a-tiny-1823988455

একজন বড় বিজ্ঞানীর টুকরো গল্প

এপ্রিলের কোনো এক পড়ন্ত বিকেল। রৌদ্রের শেষ লাল ছটা রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে টেবিলের উপর রাখা হাতের প্রান্ত ছুঁয়ে পড়ছে। লোকটি একাই বসে আছে। আসলে লোক বলা উচিৎ হবে না। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বসে থাকার কারণে উচ্চতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একনাগারে এক নারীর দিকে চেয়ে আছে।

আসলে ছেলেটি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিদিন এই মেয়েটিই তাকে সার্ভ করে। তাই কিছুটা হাই-হ্যালো কথাবার্তাও হয়। মেয়েটি এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েট্রেস। কাস্টমার আজ বেশি থাকাতে কাজের চাপ বেশ। আজ কথা বলার সময় নেই। ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাতে লাভ হল বলে মনে হলো না। মানুষের ব্যাস্ততা নিয়ে চিন্তা করে আপন মনেই হেঁসে উঠল। শেষমেশ টিপসটা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টিপস নিতে গিয়ে দেখে দুটি পানি ভর্তি গ্লাসের মাথায় কাগজ দিয়ে উল্টিয়ে রাখা, আর সাথে একটি ছোট কাগজের নোট। সেখানে লেখা— টিপসটা একটু সাবধানে নেবেন। মেয়েটি সামান্য অবাক হলো। কিন্তু গ্লাসগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। টিপসের কয়েনগুলো গ্লাসের ভেতরে।

মেয়েটি যদিও টিপস নিতে পেরেছিল, কিন্তু অনেক বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর ছেলেটা? সে আসলে মেয়েটিকে ব্যাস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই দেবার জন্য ঐ কাজ করেছিল।

গল্পের এই ছেলেটির নাম রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? তাকে আমরা অনেকেই চিনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি এরকম অসংখ্য মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন জীবনে।

জিনিয়াস ও কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মানুষটি নিউইয়র্কের ফার রকওয়ে শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মা লুসিলি নি ফিলিপস ছিলেন গৃহিণী আর বাবা মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান ছিলেন একজন সেলস ম্যানেজার।

তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড়। ছোট ভাই হেনরি ফিলিপস মাত্র ৪ সপ্তাহে মারা যায়। দুই ভাইবোনের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। পরিবারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার কারণেই তার বোন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পারেন। বর্তমানে তিনি একজন নামকরা জ্যোতিঃপদার্থবিদ, নাম জোয়ান ফাইনম্যান।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ফাইনম্যানও ছিলেন একজন লেইট টকার। তিনিও দেরীতে কথা বলতে শিখেছিলেন। তিন বছর বয়সে কথা বলা শুরু করা শিশুটি এমআইটি থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর জন আরকিবাল্ড হুইলারের অধীনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেখানে তার করা গবেষণা কোয়ান্টম মেকানিক্সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়যুক্তরাষ্ট্রেরর হয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার অবদান ছিল। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে সারা জীবন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। বলেছিলেন—

আমরা বিজ্ঞানীরা চালাক একটু বেশিই চালাক আপনারা সন্তুষ্ট নন? একটা বোমা দিয়ে চার কিলোমিটার উরিয়ে দেয়া কি যথেষ্ঠ নয়? মানুষ এখনো ভাবছে। বলুন, আর কতটুক বেশি ধ্বংসাত্মক চান আপনারা!

যুদ্ধ পরবর্তী সময় তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৫০ সালে ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আসেন।

ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তার লেকচারসমূহ The Feynman Lecture on Physics নামে প্রকাশিত হয়। এগুলো আজও সারা বিশ্বের সকল পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম পাঠ্য বই হিসেবে স্বীকৃত।

এ ছাড়াও Quantum Electrodynamics (1961) এবং The Theory of Fundamental Processes (1961) বই দুটি তার লেকচারের উপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি আর পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে লিখেছেন QED: The Strange Theory of Light and Matter, The Character of Physical Law সহ আরো বেশ কয়েকটি বই।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তার অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জুলিয়ান এস শোইনযার এবং জাপানী বিজ্ঞানী শিনিচিরো তোমোনাগা এ সম্মান লাভ করেন। যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে তার একটি উক্তি হলো—

আমার মনে হয়, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স কেউ বোঝে না

তার শেষ কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের ধ্বংস হবার কারণ বের করা। সেই দুর্ঘটনায় ৭ জন নভোচারী মারা যায়। যাদের একজন ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ফাইনম্যান সফলভাবেই তার কাজ সম্পাদনা করেন। তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারে সবার কাছে মহকাশযানটি ধ্বংস হবার কারণ নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এ জন্যে তিনি এক গ্লাস বরফশীতল ঠাণ্ডা পানিতে একটি রাবারের সিল ডুবিয়ে দেখান যে, এমন অবস্থায় রাবার স্বাভাবিক থাকে না। খুব ভঙ্গুর হয়ে যায়। বরফ শীতল সকালে মহাকাশযানের বুস্টার রকেটের রাবারের সিলটিও বেশ ভঙ্গুর ছিল। এ কারণে রকেটটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয় এবং মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়।

চিত্র: চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের ভেতর বিস্ফোরিত হয়

ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি কার্ল এবং মিশেল নামে দুই সন্তানের পিতা। ১৯৭৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিকেল চেকআপের পর দেখা গেল তিনি লিপোসারকোমা নামক এক বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর তার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

চিত্র: ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের ডিজাইন করা ভ্যানের সামনে ফাইনম্যান এবং তার পরিবার

তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার মৃত্যুর পর, তার প্রকাশিত সেমি-অটোবায়োগ্রাফি Surely You’re Joking Mr. Feynman! আর What Do You Care What Other People Think? এর কারণে। বই দুটি সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে তাকে। যতটুকু না বিজ্ঞানী হিসেবে, তার চেয়েও বেশি ঐ মজার মানুষ হিসেবে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তার শেষ উক্তি ছিল—

আমি দ্বিতীয় বার মরতে চাই না, এটা খুবই বিরক্তকর।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.britannica.com/biography/Richard-Feynman
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Feynman
  3. Surely You’re Joking, Mr. Feynman! By Richard p. Feynman

আইনস্টাইনের থিসিস বিড়ম্বনা

আলবার্ট আইনস্টাইনকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। প্রকৃতির বাস্তবতাকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের বাস্তবতা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়ে গেছেন তা সত্যি একজন সত্যিকার সৃজনশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

কম বেশি সকলেই জানে ছোটবেলায় আইনস্টাইন তেমন ছাত্র ছিলেন না। এমনও শোনা গেছে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বাদে অন্য সব বিষয়ে ফেল করতেন। তবে ছোটবেলা থেকে তার ভাবনার জগৎ ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতেন এবং যেকোনো সমস্যার পেছনে সময় দিতে পছন্দ করতেন।

এ অধ্যবসায়ের কারণে তিনি পরবর্তীতে সফল হয়েছেন। আপেক্ষিকতা, ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট, ভর শক্তি সমীকরণ (E = mc2) ইত্যাদি আবিষ্কারের কথা আমরা জানি। কিন্তু বিখ্যাত হবার আগে এই বিজ্ঞানীকেও কিন্তু পিএইচডি সম্পন্ন করে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। আমরা তার ছোটবেলার নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও তার পিএইচড নিয়ে তেমন বেশি আলোচনা হয়নি।

তার অন্যান্য আবিষ্কারের মতো পিএইচডি থিসিসটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মজার কথা হচ্ছে তার থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪। এখন যারা পিএইচডি করেন তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে এটা সত্যি যে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা কম হতেই পারে।

চিত্র: জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়- আইনস্টাইন যেখানে তার পিএইচডি করেছেন

আইনস্টাইনের পিএইচডি নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। কয়েকবার করে তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন হচ্ছিল। তার প্রথম থিসিস সুপারভাইজর ছিলেন বিজ্ঞানী হেনরি ফ্রেড্রিক ওয়েবার। ১৯০০ থেকে ১৯০১ এর মধ্যে বেশ কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন করেন। তাছাড়া আইনস্টাইনের কাছে ওয়েবারের লেকচার ভালো লাগেনি। তার লেকচারগুলো ছিল অনেক পুরনো ধাঁচের। এমনকি তার পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারে ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের কোনো উল্লেখ নাকি ছিল না।

প্রফেসরকে পছন্দ না হওয়ায় ১৯০১ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ক্লেইনের কাছে পিএইচডি করতে যান। সেখানেও প্রথম দিকে কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় গ্রহণ করা হয়নি। পরে আবার জমা দিলে তা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেখানেও একটু সমস্যা ছিল। থিসিসটি ছিল অনেক ছোট। আইনস্টাইনের বোনের মারফত জানতে পারা যায় যে ওইবার থিসিস বড় করার জন্য তাকে ফেরত দেয়া হলে সেখানে আইনস্টাইন শুধু একটি মাত্র বাক্য যোগ করেছিলেন এবং সেভাবেই আবারো জমা দিয়েছিলেন।

ক্লেইনার, আইনস্টাইনের থিসিস সুপারভাইজর

এবার ক্লেইনার এবং আরেকজন প্রফেসর সেটি মূল্যায়ন করেন এবং থিসিসটি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার থিসিসটি Annalen der Physik জার্নালে পাঠান। কিন্তু তারাও সেটা বাদ দিয়ে দেয়। তারা বলে যে তথ্য এবং উপাত্ত আইনস্টাইন ব্যবহার করেছে সেগুলো পুরনো হয়ে গেছে। আরও নতুন তথ্য দিতে হবে।

আইনস্টাইন এরপর সেখানে যাবতীয় নতুন তথ্য সংযোজন করেন (Addendum) এবং পুনরায় সেই জার্নালে পাঠিয়ে দেন। এবার জার্নালটিতে গবেষণাটি প্রকাশ পায়। সে সময়টিতে আসলে কী হয়েছিল আইনস্টাইনের সাথে? কেন এতবার তার থিসিস বাতিল করা হয়? কী ছিল তার পিএইচডি থিসিসে?

চিত্র: আইনস্টাইনের থিসিস

ওয়েবারের কাছে যখন প্রথম পিএইচডি-র প্রজেক্টের বিষয়ের কথা হয়, তখন প্রথমে আইনস্টাইন ব্যাতিচার যন্ত্র ব্যবহার করে আলোর বেগ c পরিমাপ করতে চেয়েছিলেন। ততদিনে মাইকেলসন ও মর্লি সেটি করে ফেলেছিল। এ সম্পর্কে আইনস্টাইন জানতেন না।

এরপর কোনো পদার্থে বিদ্যুৎ প্রবাহকালে এর উপর তাপের কী প্রভাব, তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। কিন্তু এটাও বাদ দেয়া হয়। তারপর তিনি তাপ পরিবাহিতা নিয়ে কিছু গবেষণা করেন এবং ফলাফল বের করে ওয়েবারকে দেন। এটাও বাদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, আইনস্টাইনের করা এ গবেষণাটি ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে।

এরপর ক্লেইনারের কাছে আইনস্টাইন প্রথমে তরল থেকে গ্যাসে পরিণত হওয়ার সময় আন্তঃআণবিক বলের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞানী বোলজম্যান এটা নিয়ে কিছু কাজ করে রেখেছিলেন এবং আইনস্টাইনের দেয়া প্রস্তাবনা অনেকটাই বোলজম্যানের সাথে মিলে যাচ্ছিল। সেজন্য এটা বাদ দিতে হয়।

এরপরের বিষয়টি ছিল কোনো গতিশীল বস্তুর ইলেক্ট্রো-ডাইনামিক্স নিয়ে। কিন্তু সেটাও গ্রহণ করা হয়নি, কারণ এটা পুরোটুকুই ছিল শুধু তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। আর যে প্রফেসর এটা পর্যালোচনা করেছিলেন তারা এর মর্মই বুঝতে পারেননি।

এতকিছুর পর একদম শেষে তিনি তার পিএইচডি করতে পেরেছিলেন চিনির অণুর আনবিক মাত্রা বের করা সংক্রান্ত গবেষণায়। এখানে তিনি অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মান বের করেছিলেন। সেই অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা, যেটা আমাদেরকে মুখস্ত করতে হয়, যার মান N = 6.023 × 1023। কিন্তু এটি কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল সে সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য আমাদের দেয়া হয় না। যাহোক, তার পাওয়া ফলাফলে পরে ভুল ধরা পড়েছিল। ভুল ধরার পরে তাত্ত্বিকভাবে আবারো আইনস্টাইন আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

এখানে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মানে কয়েক ইউনিট ভুল ছিল। তিনি যে উত্তর পেয়েছিলেন তার মান এসেছিল N = 2.1 × 1023। পরে গাণিতিক হিসাবে তার ভুল বের করতে পেরেছিলেন এবং পরে আবার তার গবেষণাপত্র ভুল সংশোধন করে ছাপা হয়েছিল। সংশোধন করার পর তার মান এসেছিলো N = 4.15 × 1023

কিছুদিন পরে রসায়নের একটি ব্যবহারিক গবেষণায় অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার প্রকৃত মান পাওয়া যায়। যা থেকে আবারো প্রমাণিত হয় যে আইনস্টাইনের সমীকরণের কোথাও ভুল আছে। এরপর আইনস্টাইন আবারো তার গবেষণাপত্রটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং আবারো তার ভুল সংশোধন করেন। এবার তাত্ত্বিকভাবে সেই মান আসে N = 6.56 × 1023। দেখা যাচ্ছে এ মান মূল মানের অনেক কাছাকাছি পর্যন্ত ঠিক উত্তর দিতে পেরেছিল। অনেকে মনে করতে পারেন, ভুল থাকার পরেও কেন তাকে পিএইচডি দেয়া হলো?

তখনকার সময় জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকে গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি পাওয়ার জন্য এই কাজ যথেষ্ট ছিল। আইনস্টাইন নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যেটা দিয়ে এই মান মোটামটি সঠিকভাবে বের করা যাচ্ছিল। এটা অনেক বড় আবিষ্কার।

তাছাড়া জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জার্মানির অন্যান্য জায়গাতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে ব্যাবহারিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশী চর্চা করছিল সবাই। তাত্ত্বিক বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলক কম হচ্ছিল। ক্লেইনার তাত্ত্বিক গবেষণা পছন্দ করতেন দেখে তিনি আইনস্টাইনকে এ বিষয়ে কাজ করতে দিয়েছিলেন।

১৯০৫ সালে তার থিসিস গবেষণাপত্রে প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পেপার প্রকাশিত হয় যেমন- Photoelectric Effect, Brownian motion, Electrodynamics of Moving Bodies, E=mc2 এবং Molecular Dimension যেটা তার থিসিসের বিষয় ছিল। শেষেরটির উল্লেখ গবেষণাপত্রগুলোতে অন্যান্যগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশীবার হয়েছে।

চিত্র: তার থিসিসটি Annalen der Physik নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়।

আইনস্টাইনের নিজের কাছেও তার থিসিসের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তিনি যদি একটি অণুর আকার- আয়তন বের করার কোনো মাধ্যম বা পদ্ধতি দিতে পারেন তাহলে সেটার গুরুত্ব অনেক। কারণ এতে ম্যাক্স প্লাঙ্কের রেডিয়েশন ফর্মুলা আরো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা যাবে। তাছাড়া তার এই থিসিসে এমন একটি কাজ করা হয়েছিল যেটা দিয়ে একটি আণবিক হাইপোথিসিস দাড় করানো গিয়েছিল। তার এই গবেষণার কারণে ব্রাউনীয় গতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করা সম্ভব হয়েছিল।

আসলে আইনস্টাইনের পিএইচডি-র সময় বাধা আসার মূল কারণ ছিল পরিস্থিতি। তখন তাত্ত্বিক পারমাণবিক বিষয় নিয়ে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব বেশী গ্রহণ করা হতো না। যদিও কেউ কেউ এসব বিষয় নিয়ে অন্যান্য জায়গায় গবেষণা করছেন, কিন্তু তখন ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন এমন সব আবিষ্কার হচ্ছিল যে, সবাই সেসব আবিষ্কার নিয়ে ব্যবহারিক গবেষণা করার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত এই ধারাটা চলছিল। এরপর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।

আমিনা গুরিব-ফাকিম

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ-রাষ্ট্র মরিশাসে জন্ম তার। গাছের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ। আগ্রহ বায়োডাইভার্সিটি নিয়ে। এ্যারোমেটিক এবং মেডিসিনাল হার্ব কিংবা ফুল নিয়ে কাজ করতেন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কখনো কখনো চলে যেতেন কবিরাজদের কাছে। বাওবাব গাছ তার সবচে প্রিয়। এতো এতো কাজে ব্যবহার হয় এ গাছ!

আমিনা ভাবতো, আমরা গাছদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। বেনজয়িনের কথাই ধরা যাক। তারা কত চতুর, পাতার আকার পরিবর্তনের পাশাপাশি আকৃতিও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। গাছেরা হলো জীববিজ্ঞানের জীবন্ত গবেষণাগার। পরবর্তীতে তিনিই একসময় মরিশাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন জীববিজ্ঞানের জন্য অনেক কর্মকাণ্ড করেন।

featured image: dw.com

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ঃ একজন বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবকের কথা

খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি গ্রামে ১৮৬১ সালের ২রা আগস্ট তার জন্ম। বাবা হরিশ্চন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মা ভুবনমোহিনী দেবী। সকলে তাকে ডাকতো ‘ফুলু’ নামে। প্রফুল্লচন্দ্রের বাবা যেমন ছিলেন প্রাচ্য শিক্ষায় শিক্ষিত ঠিক তেমনই পাশ্চাত্যের সমৃদ্ধ কৃষ্টির অনুরাগী। ফলে ছোটবেলায় ঘরেই যখন প্রফুল্লচন্দ্রের জ্ঞানচর্চার হাতেখড়ি হয় জমিদার ও তথাকথিত উচ্চ হিন্দু বংশের সন্তান হওয়া সত্বেও কখনো কোনরূপ গোঁড়ামি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

বাবার কাছ থেকে শেখা স্বাভাবিক শিক্ষাগত ঔদার্যই তাকে পরবর্তীতে প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক ও প্রণিধানযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। পাশাপাশি নিজের গ্রামেই বাবার একটি নিজস্ব লাইব্রেরি থাকায় বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তার জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণরূপে।

স্থানীয় পড়াশুনোর পাট শেষ হবার পর তাকে ভর্তি করা হলো কলকাতার হেয়ার স্কুলে। তার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো না থাকায় এর দুই বছর পরেই রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হলেন। ফলে বিরতি পড়লো পড়াশোনায়। বিরতির পর তিনি ভর্তি হলেন কেশবচন্দ্র সেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এলবার্ট স্কুলে। এ স্কুল থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদ্যাসাগর কলেজ (তৎকালীন মেট্রোপলিটন কলেজ) থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এফ. এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

যুবক বয়সে প্রফুল্লচন্দ্র

প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি এরপর গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতে পাড়ি জমান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে পড়াশুনায় যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের পরিচয় দেন। সেখানে থাকাকালীন সময়েই তিনি সিপাহী বিদ্রোহের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা শীর্ষক একটি রাজনৈতিক গবেষণামূলক বই লেখেন।

এ থেকে দেখা যায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক জ্ঞানও যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছয় বছর পর তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব সায়েন্স উপাধি অর্জন করেন। এর আগে মাত্র একজন বাঙালি এই উপাধি অর্জন করতে পেরেছিলেন। তিনি ডাঃ অঘোর নাথ চট্টোপাধ্যায়। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে তার জ্ঞানসাধনা সম্বন্ধে তিনি বলেছিলেন-

আমি যখন এডিনবরাতে পড়তাম India & British Rule নামে একটি বই লিখেছিলাম। ফলে লর্ড বায়রনের মতো Awoke one fine morning and found myself famous এইরকম ভাবে রাজনীতির চর্চা করেছি, নানা প্রকার বই লেখার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি

দেশে ফিরেই তিনি শুরু করেন তার কর্মযজ্ঞ। প্রথমেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দিলেন। এখানেই তিনি গবেষণা চালাতে থাকেন। প্রথম গবেষণার ফল বের হয় জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে। গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল মারকিউরাস নাইট্রাইট।

নাইট্রাইট যৌগসমূহ খুব বেশি একটা স্থায়ী হয় না। এজন্যে তিনি সে সময় প্রেসিডেন্সি কলেজে বসে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সহজেই অপেক্ষাকৃত স্থায়ী নাইট্রাইট তৈরির উপায় উদ্ভাবন করেছিলেন। এটি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কারণ ছিল। এ কাজের স্মরণে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন এই বলে-

বিসম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালি দিয়েছে বিয়া,

বাঙালির নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত ধাতব নাইট্রাইটের উপর তার গবেষণা বিভিন্ন কেমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এছাড়া পারদ-সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতব যৌগ আবিষ্কার করে তিনি রসায়নজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

সম্পূর্ণ নতুন উপায়ে গবাদি পশুর হাড় পুড়িয়ে তাতে সালফিউরিক এসিড যোগ করে তিনি সুপার ফসফেট অব লাইম তৈরি করেন। ভৌত রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে তার পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল আমরা দেখতে পাই তার গবেষণাপত্রের মান এবং তার সংখ্যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকাকালীন সময়ে দেশি বিদেশি নামকরা জার্নালে তার মোট গবেষণাপত্র ১০১টি।

একজন গবেষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্র যেরকম অসম্ভব মেধার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনই শিক্ষক হিসেবেও স্থায়ী আসন গ্রহণ করেছেন ছাত্রদের হৃদয়ে। নিজের ছাত্রদের তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করতেন এবং খুব আনন্দঘন উপায়ে জটিল ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলিকে ছাত্রদের সামনে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষক হিসেবে নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-

গবেষণারত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়


প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানতঃ নিচের ক্লাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমতো আকার দিতে পারে
, হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোনো নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে পাঠদান দিতাম না।

কেবলমাত্র তার নিজের যশ খ্যাতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি। পাশাপাশি তৈরি করেছেন এক দল দক্ষ ছাত্র ও সহকারী গবেষক, যারা তার কাজে যুগপৎ সাহায্য করেছেন এবং পরবর্তীতেও নিজেদেরকে স্বাধীন ও প্রকৃষ্ট গবেষক রূপে গড়ে তুলেছেন। নীলরতন ধর, রসিকলাল দত্ত, পঞ্চানন নিয়োগী, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নামজাদা বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের দ্বারাই উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ডিগ্রির দিকে না তাকিয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন একজন ছাত্রের গবেষণার প্রবৃত্তি ও উৎসাহের উপর। তার একজন ছাত্রকে সাথে নিয়ে তিনি এমাইন নাইট্রেট আবিষ্কার করেছিলেন। অথচ শ্রীযুক্ত রক্ষিত নামের এই সহকারীটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তার গবেষণার সুপ্ত প্রতিভা প্রফুল্লচন্দ্র ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিলেন। তাকে পরবর্তী গবেষণার সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখেন আর এইখানেই ছিল একজন শিক্ষক হিসেবে প্রফুল্লচন্দ্রের সার্থকতা।

১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অবসর নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন, যতদিন তিনি অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ততদিন তিনি এক কপর্দক বেতন নেননি। এ অর্থ সঞ্চিত থাকতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সব সময় তার ছাত্রদের নিজের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করতেন। জাগতিক কোন কিছুর প্রতি তার কোন লোভ ছিল না কখনোই।

চিত্র: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকদের সাথে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মাঝে উপবিষ্ট আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সর্ব ডানে বসা সত্যেন্দ্র নাথ বসু, সর্ব বামে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ সাহা।

শুধুমাত্র গবেষণার কাজে তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকে রাখেননি। জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে তার অর্জিত সকল অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিরূপে নিয়োগ করেছিলেন দেশের কাজে। যেখানেই দারিদ্র্য, বন্যা, মহামারি, দুর্যোগ সেখানেই তিনি তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করেছেন। সমগ্র বিশ্বই ছিল তার সংসার। তাই তিনি বৈরাগ্যের মধ্যেই নিজের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজের স্থান করেনিয়েছিলেন।

তখন ছিল ইংরেজ শাসনামল। শাসকের অধীনস্ত হয়ে কখনো তিনি কোনো অন্যায় সহ্য করেননি। এর স্বরূপ আমরা দেখতে পাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পাশকৃত বঞ্চনাকর রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরে। ১৯১৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কলকাতা টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা হয় সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র ও যোগদান করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন-

আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এই আইনের তীব্র প্রতিবাদ করিতেছি।

এছাড়া আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মহাত্মা গান্ধীর একান্ত অনুরাগী ছিলেন। দেশজ পণ্য ব্যবহারের জন্য যে আন্দোলন তখন বৈপ্লবিক আকার ধারণ করে সেই আন্দোলনে প্রফুল্লচন্দ্র ও একাত্মতা ঘোষণা করেন। ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর খাতায় তাকে ‘বিজ্ঞানীর বেশে বিপ্লবী’ নামে ডাকা হতো।

পাশ্চাত্যের অনেক আগে, প্রাচীন ভারতে বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন মুনি ঋষির হাত ধরে বিজ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। প্রফুল্লচন্দ্রকে এ বিষয়টি আকৃষ্ট করে প্রবলভাবে। তাই তিনি সেই বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা হিন্দু রসায়নের ক্রমবিবর্তনকে লিপিবদ্ধ করবার উদ্যোগ নেন।

১৯০২ এবং ১৯১৯ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় তার রচিত ‘আ হিস্ট্রি অব হিন্দু কেমিস্ট্রি’ বা ‘হিন্দু রসায়নের ইতিহাস’। এটি তার অসামান্য কীর্তি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পুঁথিপত্রের উপর বিস্তর গবেষণা করে এ গ্রন্থ টি রচনা করেন। পুরো ভারতবর্ষ, নেপাল ও লন্ডনের অনেক জায়গা ঘুরে তিনি এ গ্রন্থ লেখবার দুষ্প্রাপ্য ও প্রয়োজনীয় পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি সংগ্রহ করেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর শোকসভায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ও মহাত্মা গান্ধী

বইটির উপর একটি আলোচনা মূলক প্রবন্ধে এক গবেষকগণ মন্তব্য করেন-

In this book he showed from an unbiased scientific standpoint, how much the knowledge of acids, alkali, metals, and alloys proceeded in different epochs of Indian history. He showed that, the science of metallurgy and of medicine had advanced significantly in ancient India; when Europe was practising alchemy, India was not far behind.

বইটির প্রশংসা করে তৎকালীন প্রখ্যাত রসায়নবিদ মারসেলিন বার্থেলো স্বয়ং চিঠি লিখেন প্রফুল্লচন্দ্রকে। সে সময়ে বিশেষত পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধির কথা জানানোর জন্যে বার্থেলো প্রফুল্লচন্দ্রকে ধন্যবাদ জানান।

চিত্র: আ হিস্ট্রি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রির সম্মুখপট

এতক্ষণ যে প্রফুল্লচন্দ্রের কথা বললাম তিনি একজন গবেষক, বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তা, ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু তিনি একজন গুণী শিল্পোদ্যোক্তাও ছিলেন। অসাধারণ বাণিজ্যিক দূরদর্শিতার অধিকারীও ছিলেন।

মাত্র আটশ টাকা মূলধনে আপার সার্কুলার রোডের একটা ছোট ঘরে প্রফুল্লচন্দ্র গড়ে তুললেন তার স্বপ্নের বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিটিউক্যালস ওয়ার্কস। প্রচণ্ড ধৈর্য আর নিষ্ঠার সাথে অক্লান্ত পরিশ্রমে যে প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুললেন, যার মূলধন ছিল মাত্র ৮০০ টাকা, তার পরিমাণ আজকে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট কোটি টাকার কাছাকাছি।

উদ্যোক্তা হিসেবে ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সততাই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। আজকে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্যোক্তাদের (বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের) পুঁজি-মূলধন নিয়ে আক্ষেপ করতে শোনা যায়। এই হতাশায় প্রফুল্লচন্দ্রের আদর্শ আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

প্রফুল্লচন্দ্র অধ্যাপনা থেকে ৭৫ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের অধ্যয়ন ও জ্ঞান চর্চা করে গেছেন। জ্ঞান চর্চাকেই তিনি তার জীবনের সাধনা ও একমাত্র ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি কখনো বিয়ে করেননি। এক হতে বহুত্বে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া, উপনিষদের এই বাণীকে তিনি তার জীবনের পাথেয় করেনিয়েছিলেন। তাই সর্বদা মানুষের কল্যাণে সমাজের সকল স্তরের জনমানুষের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। অধ্যাপক থাকার সময় ডক্টর কুদরত-ই-খোদা এম.এস.সিতে প্রথম স্থান অধিকার করলে অনেকে তাকে প্রথম স্থান না দেবার জন্যে প্রফুল্লচন্দ্রকে সুপারিশ করলে তিনি এর ঘোর বিরোধিতা করেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি জাতিভেদ প্রথায়ও বিশ্বাসী ছিলেন না। প্রাচীন ভারতে হিন্দু রসায়ন চর্চা তথা বিজ্ঞান সাধনার এত সমৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও জ্ঞান বিজ্ঞানে ভারতীয় উপমহাদেশের পিছিয়ে পড়ার পেছনে তিনি জাতিভেদ প্রথাকেই দায়ী করেছিলেন।

তার বইতে দেখিয়েছিলেন যাদের কাছে বিজ্ঞানের হাতে-কলমে ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাদেরকে যখন জ্ঞান চর্চা থেকে বিরত রাখা হয় তখন থেকেই বিজ্ঞানের বিস্তারের দরজা সংকীর্ণ হতে থাকে।

জীবন যাপনে তিনি ছিলেন একদম সাদামাটা। এক পয়সার বেশি সকালের নাশতার পেছনে ব্যয় করলে রেগে যেতেন। জামাকাপড়ও খুবই সাধারণ মানের পরতেন। অনেক মানুষ এত বড় অধ্যাপকের পোশাক দেখে অবাক হয়ে যেতো।

তার অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত বিভিন্ন কলেজ, মানবকল্যান সংস্থা, দরিদ্র তহবিল, বিজ্ঞান সংগঠন প্রভৃতির প্রতি। সে সময় বাংলায় স্থাপিত এরকম কোনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে তার অনুদান ছিল না। ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন আর.কে.বি.কে হরিশ চন্দ্র ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল)। নিজের গ্রামে তার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর-খুলনার প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ‘ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। বাগেরহাট পিসি কলেজও তারই কীর্তি।

সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুলও পি সি রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করে ছিলেন। একাধারে একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, বিপ্লবী দেশপ্রেমিক, অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯৪৪ সালের ১৬ ই জুন ৮৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পুরো জীবনটি এক অনির্বচনীয় প্রেরণার উৎস। তার প্রতি আমাদের যথার্থ শ্রদ্ধা অর্থপূর্ণ হবে তখনই যখন আমরা তার জীবন দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যাব। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তিনি একজন সত্যিকার জ্ঞানতপস্বীর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

১. আত্মচরিত- আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

২. আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র – শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু

৩. আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবনবেদ- নন্দলাল মাইতি

৪. পাইকগাছা ও কয়রা থানার স্মরনীয় ও বরণীয় যারা- সম্পাদনা-শেখ শাহাদাত হোসেন বাচ্চু

৫. P. C. Ray, “Life and experiences of a Bengali chemist,” 2 vols. Calcutta: Chuckervertty, Chatterjee & Co. 1932 and 1935

পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমঃ প্রাচীন সভ্যতার অত্যাধুনিক উদ্ভাবন

জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সকলেরই আকর্ষণের বিষয়। আলপিনতুল্য মানব সম্প্রদায় তার উৎপত্তিলগ্ন থেকেই ঐরাবতসম মহাকাশ ও তার সৃষ্টিরহস্য ভেদে বিভোর হয়ে আছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই মহাকাশবিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের নির্ভুল তথ্য আমরা এখন পৃথিবীতে বসেই জানতে পারি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করছি, এর রূপরেখা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগেই প্রাচীন গ্রীসের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছিলেন। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামের এ প্রযুক্তিকে বলা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার।

১৯০০ সালের কথা। গ্রীসের একদল স্পঞ্জ ডাইভার দেশটির অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে। খুঁজে পান বহু বছরের প্রাচীন সব অলংকার, মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত সকল বস্তুই তারা গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন গ্রীসের ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে।

প্রাপ্ত বস্তুগুলোর মধ্যে কিছু ব্রোঞ্জ ও পাথরের পিণ্ডের মতো অনিয়মিত আকারের জিনিস ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে তারা উদ্ধারকৃত অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করেন। এর কারণে উদ্ধারের প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করেনি। সত্যিকার অর্থে, সবুজ শ্যাওলা পড়া জিনিসগুলোর প্রতি আদপে তারা খুব একটা আগ্রহবোধ করেনি। কিন্তু কে জানতো? এই মাটির ঢিবি সদৃশ বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আশ্চর্য এক উদ্ভাবন!

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের অংশ বিশেষ

দুই বছর পর ১৯০২ সালে গ্রিক আর্কিওলজিস্ট ভ্যালেরিওস স্টাইস জিনিসগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি আবিষ্কার করেন, উদ্ধারকৃত পাথর ও ব্রোঞ্জের পিণ্ডগুলোর একটির মধ্যে ঘুর্নায়মান চাকা রয়েছে।

প্রথমে তিনি একে ঘড়ি ভাবলেও পরে আরো গভীর পর্যপেক্ষণের মাধ্যমে এর মধ্যে জটিল এক যন্ত্রকৌশল আবিষ্কার করেন। স্টাইসের আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এ নিয়ে গবেষণা বন্ধ ছিল। মূলত এই গবেষণা হতে ফলপ্রসু কিছু পাওয়া যাবে না- এ কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেরেক প্রাইস এটি নিয়ে পুনরায় নাড়াচাড়া শুরু করেন। তিনি এটিকে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক্স রে ও গামা রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এর সম্ভাব্য ৮২টি টুকরোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি এ আবিষ্কারের উপর ৭০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার। প্রফেসর প্রাইসের ভাষ্যমতে, এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর মূল উপাদান ছিল ব্রোঞ্জ এবং অল্প পরিমাণ টিন। এছাড়া পাথর ও কাঠের বিভিন্ন কাঠামোও এতে ব্যবহার করা হয়। গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয় হেলেনিস্টিক সময়কালে (খ্রী: পূ: ৩২৩ – খ্রী: পূ: ৩১) এই যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা ছোটখাট ঘড়ির মতো। এতে অনেকগুলো ডায়াল এবং কাঁটা বিদ্যমান। ডায়ালগুলো চন্দ্র, সূর্য এবং পাঁচটি গ্রহকে নির্দেশ করে। এগুলো ছাড়াও এর মাঝে কয়েকটি সংখ্যা খচিত ব্লক রয়েছে। এগুলোর সাহায্যে জ্যোতির্বিদ্যার জটিল হিসাব করা যেত সহজেই।

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের কম্পিউটারাইজড থ্রিডি মডেল

প্রাইসের শনাক্ত করা ৮২টি টুকরোর মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ৭টি টুকরো। ১৬টি পাওয়া গেছে ভগ্ন অবস্থায়। বাকিগুলো হয় এখনো সাগরতলেই লুকায়িত রয়েছে, না হয় কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অক্ষত ৭টি টুকরোকে মেজর ফ্র্যাগমেন্ট এবং বাকি টুকরোগুলোকে মাইনর ফ্র্যাগমেন্ট বলা হয়। মেজর ফ্র্যাগমেন্টগুলোকে A, B, C, D, E, F এবং G- এ সাত ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ A-এর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিলিমিটার, প্রস্থ ১৫০ মিলিমিটার। প্রতিটি অংশেই বিভিন্ন গিয়ার, ডায়াল ও ঘড়ির চাকতি সদৃশ বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টগুলোর গায়ে বিভিন্ন সাংকেতিক লিপি খোদাই করা আছে। মাইনর ফ্র্যাগমেন্টগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হলেও এদের পৃষ্ঠেও বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অনেক দূর এগিয়েছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে তারা অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। যন্ত্রটির সামনের দিকে দুটো ডায়াল দেখা যায় যেগুলো রাশিচক্র ও সৌর বছরকে চিহ্নিত করে। সেখান থেকে আরো দুটো রেখার মতো দাগ বের হয়েছে যেগুলো চন্দ্র ও সুর্যের সম্যক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চিত্র: সাগরের তলদেশ হতে প্রাপ্ত যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ

যন্ত্রটির পেছনে দুটি ঘূর্ণায়মান রেখা যথাক্রমে সারস ও ক্যালিপিক চক্র নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হতো। এ চক্র দুটি প্রতি ১৮ ও ৭৬ বছরে চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল বের করতে পারতো। মূল যন্ত্রের সাথে একটি L আকৃতির হাতল যুক্ত ছিল যার সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে সেই তারিখের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। যন্ত্রের গঠনশৈলী থেকে বোঝা যায় তৎকালীন গ্রিক পণ্ডিতরা সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নিয়েই এ যন্ত্রের নকশা করেছিলেন।

এত ছোট একটি যন্ত্র এত জটিল সব হিসেব কীভাবে সম্পাদন করতো, সে রহস্য আজও গবেষকরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি। তাদের মতে, সূক্ষ্ম এবং সঠিক মাপের গিয়ারের ব্যবহারই যন্ত্রটির আকার কমিয়ে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের গিয়ারের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মডেল প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাইট প্রপোজাল, ইভান’স প্রপোজাল ও ফ্রিথ প্রপোজাল অন্যতম।

শুধু যে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ধারণ করতেই এ যন্ত্র ব্যবহৃত হতো, তা কিন্তু না। ২০০৮ সালে করা এক গবেষণায় জানা যায়, এ যন্ত্র তৎকালীন বিভিন্ন উৎসব, যেমন প্রাচীন অলিম্পিক গেমস এর দিনক্ষণের হিসেবও রাখতো। যন্ত্রটির গায়ে থাকা লিপিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর সাথে একটি পূর্ণ সৌর মডেল যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন গোলকের মাধ্যমে গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করা হতো। লিপিগুলোতে থাকা মাসের নাম ও ক্যালেন্ডার দেখে ধারণা করা হয় গ্রীসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের করিন্থিয়া অঞ্চলে এ যন্ত্রের প্রচলন ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে এখনো। বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে থাকা জটিল কৌশলগুলোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। দুই হাজার বছর আগে যেখানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা ছিল প্রকট, জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত, সেখানে সামান্য ব্রোঞ্জ, কাঠ ও পাথর দিয়ে তখনকার প্রকৌশলীরা এত নির্ভুল একটি যন্ত্র কীভাবে তৈরী করলেন, এ প্রশ্ন এখনো মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম তাই শুধুই একটি যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি তৎকালীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণের নতুন এক দ্বারও উন্মোচন করেছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://age-of-the-sage.org/archaeology/antikythera_mechanism.html
  2. https://smithsonianmag.com/history/decoding-antikythera-mechanism-first-computer-180953979
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Antikythera_mechanism

ভুলে যাওয়া বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। ছিল না কোনো বড় সার্টিফিকেট। কিন্তু কেবলমাত্র নিজের ইচ্ছায় ভর করে তিনি নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। সাধনা নামক জিনিসটি থাকলে শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।

১৮৭৮ সালের ১৬ ই জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন যশোর জেলার বকচর গ্রামে। বাবা গোরাচাঁদ ছিলেন স্থানীয় একজন ডাক্তারের সহকারী। মা পদ্মামুখ ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলায় সমবয়সী অন্যান্যদের মতোই তিনি ছিলেন খানিকটা দুরন্ত। বিদ্যালয়ের পড়াশোনায় কিছুটা অমনোযোগী। কিন্তু যে জিনিসটিতে রাধাগোবিন্দ অন্য সকলের চেয়ে আলাদা ছিলেন সেটি হলো আকাশের প্রতি আগ্রহ। মামার বাড়ির লাইব্রেরিটা ছিল তার সবচে’ প্রিয় জায়গা। কত ধরনের বই সেখানে! আর মামার বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে আকাশ দেখতে কী যে আনন্দ!

মামার বাড়ির একজনের কাছে তার সব প্রশ্ন আর কৌতূহল। তিনি তার দিদা, সারদা সুন্দরী ধর, এর কোলে শুয়ে রাতের আকাশ দেখতেন। পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহের পটভূমি রচিত হয় সেই থেকেই।

দশ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন যশোরের জিলা স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে তার পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে বিজ্ঞানী অক্ষয় কুমার দত্তের লেখা চারুপাঠ বইতে ‘ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড!’ প্রবন্ধটি তাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। এ প্রবন্ধ তার জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার প্রতি আগ্রহ আরো তীব্র করে তোলে। এই ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় আদি আর কোথায়ই বা অন্ত- এ প্রশ্ন তাকে স্বপ্নবিভোর করে তোলে। তার নিজের রচিত পাণ্ডুলিপিতে তিনি লিখেছেন-

অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।

কিন্তু এই স্বপ্নবিভোরতা তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে দেয়। জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স দিলেন, পাশ করতে পারলেন না। তিন তিন বার চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হলেন। এরপর ১৮৯৯ সালে ২১ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ৯ বছর বয়স্কা মুর্শিদাবাদের মেয়ে মোহিনীকে। বিয়ের পর তিনি আরেকবার এন্ট্রান্স দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবার তিনি পড়াশোনার পাট শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কারণ সাংসারিক দায়িত্ব তখন তার হাতে। মাত্র ১৫ টাকা বেতনে তিনি যশোর কালেক্টরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকরি নেন।

কিন্তু তার আকাশ দেখা থেমে থাকে না। সে সময়ে যশোরের আইনজীবী কালীনাথ মুখোপাধ্যায় তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় সাহায্য করেন। কালীনাথ মুখোপাধ্যায় নিজে আইনজীবী হলেও তার মূল আগ্রহ ছিল আকাশচর্চায়। সংস্কৃতে ‘খগোলচিত্রম’ বাংলায় ‘তারা’ এবং ইংরেজিতে ‘পপুলার হিন্দু এস্ট্রোনমি’ নামে তিনি কিছু বই লিখেন যা সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

উল্লেখ্য, সংস্কৃতে খগোল অর্থ জ্যোতিষ্কমণ্ডল। কালীনাথবাবু তার নিজের নক্ষত্র মানচিত্রটি (স্টার ম্যাপ) দিলেন রাধাগোবিন্দকে। এতে তারা দেখতে সুবিধা হয় তার। চাকরির কাজ শেষে সন্ধ্যে হলেই তিনি উঠে যেতেন ছাদে। স্টারম্যাপ কাজে লাগিয়ে চেনার চেষ্টা করতেন নক্ষত্রগুলোকে। কখনো কখনো সফল হতেন আবার কখনো হতেন না। তবে কোনো যন্ত্রপাতি বা কোনো শিক্ষক ছাড়াই খালি চোখে আকাশ দেখে তারা চেনা শুরু করেছিলেন তিনি।

এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। তিনি নিজে গিয়ে ‘খগোলচিত্রম’ আর ‘তারা’ বই দুটি কিনে নিয়ে আসেন। সাথে নিয়ে আসেন অল্প দামের একটি বাইনোকুলার। সামান্য এই বাইনোকুলার দিয়েই তিনি দেখেন হ্যালির ধূমকেতু। ধূমকেতু বস্তুতই তার জীবনে ধূমকেতুর ন্যায় পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ধূমকেতুর বর্ণনা তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখেন যা বিস্তারিত আকারে পরবর্তীতে হিন্দু পত্রিকায় ছাপা হয়।

সে সময় ধীরে ধীরে রাধাগোবিন্দ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় ছোট ছোট প্রবন্ধ পাঠাতে থাকেন। তার সেসব লেখা শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের চোখে পড়লে তিনি রাধাগোবিন্দের কাছে প্রশংসাসূচক চিঠি লিখেন এবং তাকে একটি ভালো মানের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনতে পরামর্শ দিলেন।

কাজের এটুকু স্বীকৃতি পেয়ে উৎসাহিত হলেন রাধাগোবিন্দ। নিজের সামান্য কিছু জমি বিক্রি করে ২৭৫ টাকা দিয়ে একটি তিন ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনলেন। ১৯১২ সালের সেপ্টেম্বরে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ইংল্যান্ড থেকে মেসার্স কক্স শিপিং এজেন্সি লিমিটেডের মাধ্যমে রাগাগোবিন্দের কাছে এসে পৌঁছায়। স্বল্প আয়ের রাধাগোবিন্দকে খুব হিসেব করে চলতে হতো।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় তার যা ব্যয় হতো তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সম্পূর্ণ যন্ত্রটির দাম পড়েছিল ১৬০ টাকা ১০ আনা ৬ পাই। প্রথমে মূল দূরবীনটির টিউব ছিল কার্ডবোর্ডের তৈরি যা পরে তিনি ইংল্যান্ডের মেসার্স ব্রহার্স্ট এণ্ড ক্লার্কসন থেকে পিতলের টিউব আনিয়ে নেন অতিরিক্ত ৯৬ টাকা ১০ আনা খরচ করে। পাশাপাশি এর উন্নতিও সাধন করে নেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন-

সন ১৩১৯ সালের আশ্বিন মাসে দুরবিন আসার পরে আমার নক্ষত্রবিদ্যা অনুশীলনের ৪র্থ পর্ব আরম্ভ। এই সময়ে আমি কালীনাথ মুখোপাধ্যায়ের খগোলচিত্রমতারা পুস্তকের সাহায্যে এটা-ওটা করিয়া যুগল নক্ষত্র, নক্ষত্র-পুঞ্চ নীহারিকা, শনি, মঙ্গল প্রভৃতি গ্রহ দেখিতাম। পরে জগদানন্দ রায়ের উপদেশ মত স্টার অ্যাটলাস এবং ওয়েবস সিলেসিয়াল অবজেক্ট ক্রয় করিয়া যথারীতি গগন পর্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করি। কিন্তু ইহাতেও আমার কার্য্য বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই। তবে আমি এই সময়ে গগনের সমস্তরাশি নক্ষত্র ও যাবতীয় তারা চিনিয়া লইয়াছিলাম এবং কোনো নির্দিষ্ট তারায় দুরবিন স্থাপনা করিতে পারিতাম।

এরপর থেকে নতুন উদ্যমে তিনি পর্যবেক্ষণ করে চললেন ভ্যারিয়েবল স্টারদের। মহাকাশে কিছু তারা রয়েছে যাদের ঔজ্জ্বল্য নিয়ত পরিবর্তনশীল। এদেরকে বলে ভেরিয়েবল স্টার। ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টারস অবজারভারস’ বা এভসোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোটামুটি দেড় লক্ষের মতো ভ্যারিয়েবল স্টারের সন্ধান মিলেছে। রাধাগোবিন্দ ভ্যারিয়েবল স্টারদের বাংলা নাম দিয়েছিলেন ‘বহুরূপ তারা’।

আকাশ দেখতে দেখতে এলো ১৯১৮ সালের ৭ই জুন। অন্যদিনের মতোই রাধাগোবিন্দ বহুরূপ তারাদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু সেদিনকার আকাশটা অন্যদিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই উজ্জ্বলতার উৎস ঠিক কোথায়।

উৎসটা ঠিক কী এটা নিয়ে তার মনে যখন গজিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন, সে সময় তিনি আকাশে ঝলমলে একটি তারা দেখতে পান এবং সেটিকে দেখামাত্র পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার পর তিনি বুঝতে পারেন আসলে ঐ উজ্জ্বল তারাটি একটি নোভা যার নাম পরে দেয়া হয় ‘নোভা একুইলা ১৯১৮’ বা ‘নোভা একুইলা ৩’।

প্রবাসী পত্রিকাতে তিনি এটি নিয়ে লেখালেখিও করেন। আবার জগনানন্দ রায়ের উপদেশে রাধাগোবিন্দ তার লিপিবদ্ধ বিস্তারিত বিবরণ পাঠিয়ে দেন হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের চার্লস পিকারিং এর কাছে।

তখনকার দিনে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকার ফলে সে চিঠি পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু হার্ভার্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ তাকে অভিনন্দন জানায় এবং বেশ কিছু তারা মানচিত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর বই পাঠিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। চিঠিতে হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক হারলো শ্যাপলি অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন

বিদেশ থেকে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যেসব পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

এরপর আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার এর সদস্য করে নেয়া হয় তাকে। ১৯২৬ সালে চার্লস এলমার এভসো থেকে তাকে একটি ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ উপহার দেন। এলমারের দেওয়া সে টেলিস্কোপটি তার মৃত্যুর পরে দক্ষিণ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ভেইনু বাপ্পুর কাছে কিছুদিন থাকার পর এখন পরম যত্নে রাখা আছে দক্ষিণ ভারতের কাভালুর মানমন্দিরে।

এরপরে ফরাসি সরকার ভ্যারিয়েবল স্টারের উপর তার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে, ১৯২৮ সালে তাকে OARF (Officers Academic republican francaise) সম্মানসূচক উপাধি ও পদক প্রদান করেন। কলকাতায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মারফত তাকে এ সম্মান জানানো হয়। এর আগে কোনো বাঙ্গালি ফ্রান্স সরকারের এমন সম্মান অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেননি। তাকে সদস্য করে নেয়া হয় Association francaise des Observateurs detoiles Variables (AFOEV) এবং ব্রিটিশ এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনে।

১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সালের ভেতর প্রায় ৩৮ হাজার ভ্যারিয়েবল স্টার পর্যবেক্ষণ করে এ সমস্ত সংগঠনকে তার পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধে জানান। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন বাঙালি জ্যোতির্বিদের এমন অসাধারণ কর্মকে বিশ্ব নতশিরে সম্মান জানায়।

দেশে-বিদেশে তার অসাধারণ কীর্তি নিয়ে তাকে প্রশংসার জলে ভাসানো হলেও শেষ জীবনটা তার কেটেছিল অনেক দারিদ্র্য আর অবহেলার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি ভারতে চলে যান। আভসো থেকে পাঠানো সেই টেলিস্কোপটি বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে কেড়ে রেখে দেয়। পরে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের সাথে যোগাযোগের পর যশোরের জেলা প্রশাসক নিজে গিয়ে তার বাড়িতে টেলিস্কোপটি তাকে ফেরত দিয়ে আসেন।

ভারতে যাওয়ার পর তিনি যথেষ্ট আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। অভাব অনটনে খাবারের সংস্থান করতেও তার সংগ্রাম করতে হতো। বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে ১৯৭৫ সালে ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার প্রায় সমস্ত বইপত্র এবং তিন ইঞ্চির সেই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তিনি দান করে দিয়ে যান বারাসাতের সত্যভারতী বিদ্যাপীঠে।

কোনোরকম ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি যে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন এর জন্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।

তথ্যসূত্র

  1. Rajesh Kochhar and Jayant Narlikar, Astronomy in India: Past, Present and Future (IUCAA, Pune and IIA, Bangalore, 1993)
  2. Otto Struve and Velta Zebres, Astronomy in the 20th Century (Macmillan Co., New York, p. 354, 1962)
  3. Nature, Vol. 107, No. 2700, p. 694 (1921)
  4. Monthly Reports and Annual Reports of the American Association of Variable Star Observers, p. 133 (1926)
  5. বিজ্ঞান সাধক রাধাগোবিন্দ, অমলেন্দু বন্দোপাধ্যায়
  6. বাংলার জ্যোতির্বিদ রাধাগোবিন্দ চন্দ্র- নাঈমুল ইসলাম অপু
  7. তিন অবহেলিত জ্যোতিষ্ক- রণতোষ চক্রবর্তী

জেফ বেজোসঃ অ্যামাজন ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা

জেফ বেজোস। পড়াশোনা করেছিলেন ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। চাকরি বাদ দিয়ে অনলাইন বইয়ের দোকান হিসেবে শুরু করেন amazon.com, তারপর একে একে নতুন নতুন সংযোজন এবং কাস্টোমারের কাছে নিজের কোম্পানি আর ওয়েবসাইটের পরিচিতি বাড়ানো। সেখান থেকেই তিনি আজ ছয় অঙ্কের বেতন হাঁকান আর মালিক হয়েছেন ১০৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের।

image source: blog.creativewebo.com

featured image: afr.com

বিজ্ঞানী পরিচিতিঃ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা জনকদের মধ্যে একজন। তিনি বিবিধ বিষয়ে দক্ষ ছিলেন। ফ্রাঙ্কলিন একাধারে একজন লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্ভাবক, রাষ্ট্রপ্রধান, কৌতুকবিদ, গণআন্দোলনকারী এবং কূটনীতিক। বিজ্ঞান বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে তার অবদানসমূহ বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তড়িৎ সংক্রান্ত বিবিধ বিষয়ে তার অবদান রাখেন। তিনি বজ্রনিরোধক দন্ড, বাইফোকাল লেন্স, ফ্রাঙ্কলিনের চুলা, অডোমিটার, ফ্রাঙ্কলিন হারমোনিকা ইত্যাদি উদ্ভাবন করেন।

featured image: nps.gov

নীল আর্মস্ট্রংদের বাংলাদেশ সফর

চন্দ্রজয় হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। সে বছরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন চন্দ্রবিজয়ীরা। তেজগাঁও বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন। সে ঢলের ছবি এটি।

featured image: ibtimes.co.uk

জীবন্ত কম্পিউটারেরাঃ যাদের হাত ধরে আমাদের মহাকাশ বিজয়

বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় সাফল্য সম্ভবত আমাদের এই সভ্যতার পরিধিকে এই পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অনন্ত অসীম মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত করা। মহাকাশে আজ আমরা হাজার হাজার আলোকবর্ষ নিয়ে কাজ করছি,মহাকাশযান পাঠিয়ে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করছি,উপনিবেশ স্থাপনের চিন্তা করছি, ভিনগ্রহের প্রাণিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। এসবের পিছনে রয়েছে হাজার মানুষের অবিশ্রান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ,মেধা। তাদের অনেকেই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়। দুর্ভাগ্যক্রমে অনেককেই ভুলে গেছি আমরা, অনেকেই পাননি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা।

আজ আমরা কিছু ভুলে যাওয়া মানুষের কথা বলব যাদের অবদান ছাড়া বর্তমান অবস্থায় আমরা মহাকাশ প্রযুক্তিকে নিয়ে আসতে পারতাম না।

মহাকাশ যাত্রার জন্য হাজার হাজার জটিল গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন হয় যা আজকের দিনে সুপার কম্পিউটার দিয়ে অনায়াসে করা যায়। কিন্তু যখন কম্পিউটার মাত্র বিকাশের পথে, নির্ভরযোগ্য ছিল না, ক্যালকুলেটরগুলো সামান্য কিছু ফাংশন ছাড়া কিছুই হিসাব করতে পারত না, তখন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল মহাকাশ যাত্রা?

scientists calculating trajectories manually

১৯৪০ এবং পঞ্চাশের দশকে এই কাজগুলা করতেন একদল “কম্পিউটার”, যারা কোনো যন্ত্র ছিলেন না, কিছু পুরুষ এবং মহিলা যারা দ্রুত হিসাব করতে পারদর্শী ছিলেন তারাই এই কাজগুলা করতেন। তাদের কাজ ছিল মহাকাশযানের গতিপথ ও বেগ নির্ণয় করা, পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে সেইগুলা লেখচিত্রে বসানো, রকেটের ডিজাইন পরিবর্তন ইত্যাদি।এদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল প্রথম আমেরিকান স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা

Group photo, 1953, rocket girls or “computresses” courtesy: JPL,NASA

পরবর্তীতে নারীদের জন্য আলাদা দল গঠন করা হয়।এরা কাজ করতেন নাসার Jet Propulsion Laboratory(JPL),Pasadena, California তে।এই নারীদের একজন ছিলেন Macie Roberts।তাকে ১৯৪২ সালে গ্রুপ তত্ত্বাবধায়ক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি, ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি আর পুরুষদের সেই যুগের অসহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।

এই মেয়েরা সবাই কিন্তু ব্যাচেলর ডিগ্রি ধারী ছিলেন না।কেউ কেউ স্নাতক শেষ করেন নি আবার Janez Lawson(JPL এ কাজ করা প্রথম আফ্রো আমেরিকান মহিলা) ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক কিন্তু তাকে নেয়া হয়েছিল কম্পিউটার হিসাবে।তার অবদানে আর উৎসাহে Sylvia Miller এর মত নারীরা উঠে আসতে পেরেছিলেন যিনি শেষ পর্যন্ত Mars Program Office এর ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

Susan Finley(নাসার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মহিলা কর্মী ),Barbara Pulson, Elenor Frances (১৯৫৯ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন), Helen Ling( মহাকাশযান Mariner এ কাজ করেন computing supervisor হিসাবে),Dana Uleiri( ইঞ্জিনিয়ার,Mars mission tracking team), Katherine Johnson(চাঁদে যাওয়ার প্রথম গতিপথ হিসাব করেছিলেন )

SYLVIA MILLER

মেয়েদের এখানে কাজ করা সহজ ছিল না, পরিবেশ ছিল প্রতিকূল, গর্ভাবস্থা জানতে পারলেই ছাঁটাই করা হত, ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।পরিবার আর সন্তানদের সামলে কাজ করতেন অক্লান্তভাবে। তারা ছুটির সময় জমিয়ে রাখতেন যাতে সন্তান জন্মের পর কোনো অতিরিক্ত ছুটি ছাড়াই কাজে যোগদান করতে পারেন।সেসময় সন্তানসহ নারীরা বাইরে তেমন কাজ করতে পারতেন না।এই মহীয়সী মেয়েরা Werner Van Braun, Carl Sagan, Richard Feinmann এর মত মানুষদের পাশে কাজ করে গেছেন নিরবে।

Macie Roberts এর ভাষায় “They had to look like a girl, act like a lady, think like a man, and work like a dog”.

A human computer tracking spacecraft position on graph

কিন্তু তাদের এই অবদান স্বীকৃতি পায়নি, IBM কম্পিউটার আসার পর বেশিরভাগই চাকরি হারান। আর নাসা নতুন নিয়ম করে যে ব্যাচেলর ডিগ্রী ছাড়া কেউ চাকরি করতে পারবেন না। তাদের তথ্য আর্কাইভ jet propulsion laboratory রাখা হয়নি।এমনকি ২০০৮ সালে আমেরিকান স্পেস স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ৫০ তম বার্ষিকীতে তাদের আমন্ত্রন করতে ভুলে গিয়েছিল !

Human computers in workplace, standing one behind all is supervisor Macie Roberts; COURTESY :JPL,NASA.

তাদের এই ভুলে যাওয়া ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছেন জীববিজ্ঞানী ও লেখিকা Nathalia Holt।তিনি তার বইতে এই ক্ষণজন্মা, অসীম মানসিক শক্তির অধিকারী, সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কাজ করা নারীদের কথা তুলে ধরেছেন। তার “The Rise of Rocket Girls, The women Who propelled us from missiles to the moon to mars’’ বইতে স্থান পেয়েছে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রতিকূলতা, অদম্য মানবীয় প্রেরনা যা তাদের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ কে উৎসাহিত করেছে আর যার প্রত্যক্ষ ফল আজকের “মহাকাশ যুগ”।

জনপ্রিয় ম্যাগাজিন Popular Science লিখেছে,“The [women’s] stories are fun, intense, and endearing, and they give a new perspective on the rise of the space age”

বইটির রিভিউতে Usa Today লিখেছে, “Illuminating… these women are vividly depicted at work, at play, in and out of love, raising children — and making history. What a team — and what a story!”

হয়ত তাদের নাম বড় বড় বিজ্ঞানীদের সাথে উচ্চারিত হবে না,নতুন প্রজন্ম তাদের নিয়ে জানতেও চাইবে না কিন্তু তাদের এই অবদান মানবসভ্যতার অগ্রগমনে মাইলফলক হয়ে থাকবে,অনুপ্রাণিত করবে অনন্তকাল।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https//en.wikipedia.org/wiki/Jet_Propulsion_Laboratory
  2. 2.news.national geographic.com/2016/05/160508
  3. The secret history of the woman who got us beyond the moon(18 may,2016)
  4. www.nathaliaholt.com/rise of rocket girl
  5. www.amazon.com/Rise-Rocket –Girls-Propelled- Missile
  6. www.jpl.nasa.gov/jplhistory/early/index.php
  7. www.thinkprogress.org//incredible story and NASA’s forgotten girls