দ্য বাটার্ড ক্যাট প্যারাডক্স

পাঁচিলের উপর থেকে বিড়ালকে কখনো লাফ দিয়ে নীচে নামতে দেখেছেন? অথবা জানালা দিয়ে বিড়ালকে তুলে উলটো করে ফেলে দেখেছেন কখনো? প্রশ্নটা অদ্ভুত। তবে কাজটি যদি করে দেখতেন তাহলে খেয়াল করতেন বিড়ালকে উপর থেকে যেভাবে যে ভঙ্গিতেই ফেলা হোক না কেন ভূমিতে পড়ার সময় পায়ের দিক দিয়েই পড়বে।

পতনের শুরুতে বিড়ালের দেহ উলটো হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে যে কারণে আবার সোজা হয় তাকে বলা হয় রাইটিং রিফ্লেক্স (Righting Reflex)। এমনকি মাত্র তিন সপ্তাহ বয়সী বিড়ালের বাচ্চার বেলায়ও এই রিফ্লেক্স কাজ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিড়ালের শরীরের এই প্রতিক্রিয়া আরো বিকশিত হয়। এই প্রতিক্রিয়া আবার আরেকটি মজার বিষয়ের সাথে জড়িত। একে বলে The Buttered Cat Paradox।

আপনি যখন রুটি খান, রুটির একপাশে যদি মাখন লাগানো থাকে, আর রুটিটি যদি হাত থেকে পড়ে যায় তাহলে দেখবেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাখন লাগানো অংশটি মাটিতে লেপটে গেছে। এটি আর তুলে খাওয়ার উপায় নেই।

image source: mentalfloss.com

পাউরুটির তো আর বিড়ালের মতো কোনো রাইটিং রিফ্লেক্স নেই। মূলত কোমর সমান উচ্চতার টেবিল থেকে পড়তে দিলে পতনের স্বাভাবিক নিয়মেই মাখনের দিকটি নীচের দিকে মুখ করে পড়ে।

এখন যদি ধরে নেয়া হয় তারা এরকমই আচরণ করে সবসময়, এবং মাখন লাগানো একটি পাউরুটি বিড়ালের পিঠে বেধে দেয়া হয় তাহলে পতনের সময় কী হবে? বিড়াল যদি পা দিয়ে ভূমি স্পর্শ করে তাহলে পাউরুটি অক্ষত থেকে যাচ্ছে, যা সাধারণত হয় না। আবার পাউরুটি যদি নীচের দিকে পড়ে তাহলে বিড়ালের পা উপরের দিকে থাকছে, এটিও সাধারণত হয় না। তাহলে? এখান থেকে জন্ম নেয় প্যারাডক্স।

ফাউক্স প্যারাডক্স অনুযায়ী, বিড়ালের পতন ধীর হয়ে যাবে এবং ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি আসার পর পতন থেমে গিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের ঠিক উপরে ঝুলে একবার মাখন লাগানো টোস্টের দিক আরেকবার পায়ের দিক ভূ-পৃষ্ঠের দিকে মুখ করে ঘুরতে থাকবে! ব্যাপারটি বাস্তবিক নয়, তবে প্যারাডক্স হিসেবে চমকপ্রদ।

featured image: behance.net

ক্ষমতাধর এক অঙ্গভঙ্গির সাতকাহন

আনন্দ বা খুশির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি। প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখার চেয়ে সুখের কিছু আর হয় না। প্রতিনিয়তই হেসে যাই কিন্তু কখনো কি এটি নিয়ে একটু প্রশ্ন করে দেখেছি? আমরা কেন হাসি? কেনই বা আমরা প্রিয় কারো হাসি দেখে খুশি হই?

যেকোনো ঘটনার পেছনেই থাকে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান হাসিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে?

হাসির আগমন

যখন কোনো প্রাণী তার মুখের মাংসপেশি শক্ত করে দাঁত বের করে, তখন বোঝা যায় সে অন্য কোনো প্রাণীকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। হতে পারে সে ভীত, কিংবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কিংবা সে ফাঁদে পড়েছে কিন্তু বের হতে পারছে না। বেশিরভাগ প্রাণী দাঁত বের করে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায় বা অন্য কোনো প্রাণীকে হুমকি দিতে চায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। যখন কেউ এক পাটি দাঁত বের করে আপনার দিকে তাকাবে, তখন নিঃসন্দেহে বুঝবেন তিনি হাসছেন।

ধারণা করা হয়, এই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি আসলে বিবর্তনের ধারায় এসেছে প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে। জেনিস পোর্টেয়াস নামের একজন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক গবেষণা করেছেন হাস্যরস ও হাসির বিবর্তন নিয়ে। তার মতে, উচ্চতর প্রাণী যেমন রেসাস বানরদের ক্ষেত্রে হাসির উদাহরণ দেখা যায়।

বানরদের কোনো দলের অধস্তন সদস্যরা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের প্রতি এরকম দাঁত প্রদর্শন করে। যখন তারা এমন কোনো স্থান দখল করে যেটা সেই ঊর্ধ্বতন বা প্রভাবশালী প্রাণীরা দখল করতে চায়। এই ভঙ্গি দিয়ে তারা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের মন পরিবর্তন করার চেষ্টা করে যেন কোনো ঝগড়া বা বিবাদ সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ কিছুটা হাসির মতো ভঙ্গিমা দিয়ে তারা একইসাথে কর্তৃত্ব মেনে নেয়া এবং কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বোঝায়। এই উদাহরণ দিয়ে মানুষের হাসির কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

আমাদের মাঝে অনেকেই ভয়ে কিংবা নার্ভাস থাকার সময় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। আবার অনেকসময় বাচ্চারা বকা খাওয়ার পরেও হাসি থামাতে পারে না। রেসাস বানর দলের সেই ঘটনা দিয়ে এই ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যায়। জেনিস পোর্টেয়াসের মতে, এই হাসিও বড়দের কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করে তোলার জন্যই।

চিত্র: প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে হাসির আগমন বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া বিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জিদের মতো উন্নত প্রাণীদের মাঝেও এরকম দাঁত বের করে হাসির মতো ভঙ্গি খুঁজে পেয়েছেন। এতে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় কীভাবে হাসি মানুষের মাঝে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে প্রকাশ পেলো।

হাসি কেউ জন্মের পর শেখে না, বরং এটাকে একটা প্রিপ্রোগ্রামড ব্যবহার বলা যায় যা কিনা বিবর্তনের মাধ্যমেই আমাদের মাঝে এসেছে, এর এক অন্যতম উদাহরণ হল, যেসব মানুষ জন্ম থেকেই অন্ধ, তারাও স্বাভাবিক মানুষের মতোই একই পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে হাসে।

হাসি কেন সংক্রামক?

ঘরভর্তি মানুষের মাঝে যদি কেউ হাসে, তাহলে দেখা যাবে, আশেপাশের প্রত্যেকে কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করছে। প্রতিটা মানুষই যেন চেতনভাবে কিংবা অবচেতনে হাসছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কেউ কারো দিকে তাকিয়ে হাসে তখন অপরপক্ষের ব্যক্তির মুখের কাঠিন্য বজায় রাখা কঠিন। কাউকে হাসতে দেখতে আমাদের মিরর নিউরন উদ্দীপিত হয়। মিরর নিউরন হলো মস্তিষ্কের বিশেষ এক ধরনের কোষ। ব্যক্তি নিজে কোনো কাজ করলে মস্তিষ্ক যেভাবে সাড়া দিতো, ঠিক একইভাবে সাড়া দেয় কাজটি কাউকে করতে দেখলে।

এর সাধারণ কোনো উদাহরণ দিলে দেখানো যায়, কোনো দুঃখী মানুষকে দেখে আমাদের সহানুভূতি তৈরি হয়, কিংবা কাউকে ভয় পেতে দেখলে কিছুটা ভয় আমাদেরকেও স্পর্শ করে। কাউকে হাসতে দেখলে মিরর নিউরনের প্রভাবে আমাদের মুখের পেশীর উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। না চাইলেও আমরা প্রিয় মানুষের হাসি দেখে নিজেদের অজান্তেই হেসে ফেলি। তাই হাসি সংক্রমিত হয়, এই কথাটি একদম বিজ্ঞানসম্মত।

তো এরপর থেকে মন খারাপ থাকলে হাসিখুশি মানুষের সাথে মিশুন। তাদের সাথে সময় কাটান। বিজ্ঞান বলছে, তাদের সংস্পর্শে আপনার মুখেও হাসি ফুটবে।

নেপথ্য বিজ্ঞান

যখন কেউ হাসে তখন কী পরিবর্তন ঘটে তার মস্তিষ্কে? একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। ধরুন, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। দেখলেন আপনার টেবিলের উপর রঙিন কাগজে মোড়া একটা উপহার। উপরে লেখা আছে প্রিয় কোনো মানুষের নাম। মুখের রেখা বদলে গিয়ে হাসি ফুটে উঠবে নিশ্চয়।

অপ্রত্যাশিত বা ভালো লাগার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে মস্তিষ্কের কর্টেক্স থেকে স্নায়ুর সংকেত যায় প্রথমে ব্রেইনস্টেমে। সেখান থেকে প্রক্রিয়া শেষে এই সিগন্যাল যায় মুখের স্মাইলিং মাসলে। মুখে তখন ফুটে ওঠে প্রথম হাসির রেখা। এই কাজটির পেছনে ভূমিকা রাখে এনডরদিন নামক এক উপাদান।

সেই হাসি আবার শুরু করে পজিটিভ ফিডব্যাক চক্র। যখন প্রথম স্মাইলিং মাসল কাজ করে, তখন মস্তিষ্কে আবার সিগন্যাল যায়। এটি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। ফলে আরো বেশি এনডরফিন নিঃসৃত হয়। সেটি আবার কাজ করে স্মাইলিং মাসলে। তারপর আবার সিগন্যাল যায় মস্তিষ্কে। এভাবে একটা চক্র চলতে থাকে। যখন আমরা হাসি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভালো অনুভব করে। ফলে আমরা আরো হাসি, এবং তাতে মস্তিষ্ক আরো সুখী হয়। এভাবে হাসি চলতে থাকে দীর্ঘ সময়।

যেহেতু হাসিতে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম উদ্দীপিত হয়, তাই একে তুলনা দেওয়া যায় হঠাৎ উপহার পাওয়া বা চকলেট খাওয়া কিংবা লটারি পাওয়ার মতো কোনো অনুভূতির সাথে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাসির মাধ্যমে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম ততটা উদ্দীপিত হওয়া সম্ভব যতটা হতে পারে ২ হাজারটি চকলেট কিংবা কয়েক লক্ষ টাকা পেলে।

সুখী হওয়ার জন্য টাকা কিংবা চকলেটের মতো জিনিসের প্রয়োজন নেই। আপনার প্রাণখোলা হাসিই পারে আপনাকে সেই আনন্দ দিতে। ‘কোটি টাকার হাসি’ কথাটার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলা যায়! তাই নিজেকে ভালো রাখতে হাসুন মন খুলে। এমনকি হাসি না পেলেও মিথ্যা হাসি হাসুন। এটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সচল করে আপনাকে এনে দিতে পারে ভালো লাগার অনুভূতি। জীবনে হাসিখুশি মানুষের সঙ্গ তাই খুব জরুরী।

নকল হাসি

আমরা যখন হাসি, তখন প্রধানত মুখের দুই ধরনের পেশী সক্রিয় হয়। একটি হলো জাইগোম্যাটিকাস মেজর মাসল। এটি গালের ঠিক দুই পাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটিই শুধু কাজ করে তখন সেটা আসলে সত্যিকারের হাসি নয়। একে সামাজিক হাসি বলা যায়। যেমন অপ্রিয় কোনো মানুষের সাথে দেখা হলেও ভদ্রতার খাতিরে আমরা যে ধরনের হাসি হেসে থাকি তা।

দ্বিতীয়টি হলো অরবিক্যুলারিস অক্যুলি মাসল, যা আমাদের চোখের চারপাশ ঘিরে থাকে। যখন আমাদের হাসিতে আন্তরিকতা থাকে, কিংবা আমরা সত্যিই খুশি হই, তখন এই মাসল কাজ করে। সেই হাসিই বিশুদ্ধ যে হাসিতে আমাদের চোখও হাসে।

চিত্র: সত্যিকারের হাসি এবং সামাজিক হাসিতে মুখের ভিন্ন ভিন্ন মাংসপেশি কাজ করে।

স্বাস্থ্যের উপর হাসির প্রভাব

গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তিকর অবস্থায় হাসিমুখে কাজ করা ইতিবাচক। কেননা, হাসি ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। আপনি যখন হাসিমুখে কাজ করবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন ভেবে নেবে আপনি ভালো আছেন এবং সুখী আছেন। ফলে আপনার মুড ভালো থাকবে, কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়বে, বাড়বে কর্মদক্ষতা।

বলা হয়ে থাকে, মন খুলে হাসলে শরীর এবং মন দুটোই অনেকটা সতেজ হয়। একে একটা ভালো ঘুমের পরের অবস্থার সাথে তুলনা দেয়া যায়। মানুষ যখন শিশুদের সংস্পর্শে থাকে, তখন অনেক বেশি সুখী অনুভব করে। কারণ বাচ্চারা বড়দের তুলনায় বেশি হাসে। ফলে তারাও হাসে। পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে এটি আমাদের মাঝে আরো পজিটিভ ইমোশন তৈরি করে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪০০ বার হাসে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হাসির সংখ্যা দিনে মাত্র ২০ বার।

বায়োকেমিক্যাল-এর দৃষ্টিকোণ থেকেও এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। ক্লান্তির ফলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। মানসিক অবসাদগ্রস্থতা থেকে শুরু করে স্থূলতা, হার্ট ডিসিসের মতো ভয়ংকর রোগের সূচনা করতে পারে এটি। হাসলে পরে হাসি সেই হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। তাছাড়া হাসি উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির ইতিবাচক কিছু প্রভাব আছে। নিউরোট্রান্সমিটার হলো কিছু শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান। এগুলো আমাদের শারীরিক, মানসিক এবং কগনিটিভ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

ঘুম, ব্যথা, ওজন এমনকি মানসিক অবস্থাও এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নিউরোট্রান্সমিটারের কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে স্থূলতা, অ্যালকোহল, ক্যাফেইন ও নিকোটিনের প্রতি আসক্তি, হতাশা, প্যানিক অ্যাটাক, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো আরো অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যেহেতু নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির কিছু প্রভাব আছে, তাই সাধারণ হাসিখুশি জীবন আপনাকে শারীরিক ও মানসিক অনেক ধরনের জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সব মিলিয়ে আপনার দীর্ঘজীবী হওয়ার পেছনে হাসির একটা বড় ভূমিকা আছে।

আপনার হাসিমুখ আপনাকে অন্যদের কাছে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আন্তরিক এবং আকর্ষণীয় করে তোলে। স্কটল্যান্ডের ফেইস রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক পরীক্ষায় একদল নারী এবং পুরুষকে কিছু মানুষের ছবি দেখিয়ে তাদের আকর্ষণীয়তার উপর রেটিং করতে বলা হয়।

দেখা যায়, ছবিতে যারা হাসিমুখে আছে তারা এগিয়ে আছে। যারা একদমই হাসেনি তাদের থেকে আকর্ষণীয়তার দিক থেকে বেশি রেটিং পেয়েছে। টিভিতে আমরা সেলিব্রিটিদের যেকোনো ইন্টারভিউ কিংবা অনুষ্ঠানে ঘন ঘন হাসতে দেখি। এতে তাদেরকে একইসাথে বেশি তারুণ্যময় ও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

মাদার তেরেসার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি। We shall never know all the good that a simple smile can do”। তাই হাসিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলুন। হাসুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.livescience.com/34056-evolution-smiling.html
  2. https://www.auraortho.com/a-brief-history-of-smiling-laughter/amp/
  3. https://sunwarrior.com/healthhub/15-health-benefits-of-smiling
  4. https://www.scientificamerican.com/article/how-did-the-smile-become-a-friendly-gesture-in-humans/
  5. https://www.pickthebrain.com/blog/the-science-behind-smiling/
  6. https://blog.bufferapp.com/the-science-of-smiling-a-guide-to-humans-most-powerful-gesture
  7. https://www.britishcouncil.org/voices-magazine/famelab-whats-science-behind-smile
  8. http://www.apa.org/monitor/oct05/mirror.aspx
  9. https://www.sciencedaily.com/releases/2016/02/160211140428.htm

আন্ডারগ্র্যাড সমাপনী বর্ষঃ যেভাবে থিসিস লিখবেন

চতুর্থ বর্ষের শুরুতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে হয় তা হলো, তারা থিসিস করবে নাকি প্রজেক্ট? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর-

১) কে আপনার রিসার্চ সুপারভাইজার হবেন?

২) আপনি আসলে পাস করার পর কী করতে চান?

আপনি যদি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার কথা চিন্তা করেন তাহলে চোখ বন্ধ করে আপনার থিসিস করতে নেমে যাওয়া উচিত। যদিও আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কেও মৌলিক গবেষণা আশা করে না, এমনকি বাইরের দেশগুলোতেও আন্ডারগ্র্যাডের শিক্ষার্থীরা সাধারণত প্রজেক্টই করে। কিন্তু আপনি যদি থিসিস করেন এবং তা যদি কোনোভাবে কোনো জার্নাল কিংবা ভালো কনফারেন্সে পাবলিশ করতে পারেন তাহলে তা উচ্চ শিক্ষার জন্য আপনার যাত্রাকে অনেকখানি সহজ করে দেবে।

তবে এর মানে এই না যে, যারা প্রজেক্ট করেন তারা খুব সহজেই পার পেয়ে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার প্রজেক্টের কাজটিও যথেষ্ট জটিল এবং বড় হতে পারে। সহজ কথায় প্রজেক্ট ও থিসিসের পার্থক্য এখানে উল্লেখ করছি।

ধরা যাক, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই নেবেন। এর জন্য প্রথমে আপনাকে লাইব্রেরিতে গিয়ে অনেক সময় লাগিয়ে শেলফ থেকে বইটি খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তা নিয়ে কাউন্টারে জমা দিতে হবে এবং অতঃপর একজন ব্যক্তি রেজিস্টারে বইয়ের নাম, আপনার নাম, কবে নিলেন এবং কবে ফেরত দেবেন ইত্যাদি এন্ট্রি করে আপনাকে সবশেষে বইটি হাতে তুলে দিলেন।

অথচ এই পুরো ব্যাপারটা কিন্তু এক ক্লিকেই হয়ে যেতে পারত। আপনার মোবাইলে লাইব্রেরির একটা অ্যাপ থাকবে, যেখানে আপনি বইয়ের নাম লিখে সার্চ দিলে আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত বইটি লাইব্রেরি থেকে নেয়া যাবে কিনা তা দেখাবে।

এরপর আপনি বইটি যে নিতে চান তা অ্যাপের কোনো নির্দিষ্ট অপশনে গিয়ে জানিয়ে দিলে সাথে সাথেই লাইব্রেরিয়ানের কাছে নোটিফিকেশন চলে গেল যে, অমুক শিক্ষার্থী বইটি নিতে আসবে। তৎক্ষণাৎ লাইব্রেরিয়ান বইটি আপনার নামে রেজিস্টার করে সামনের কাউন্টারে দিয়ে রাখলেন যাতে আপনি আসা মাত্রই বইটি পেয়ে যেতে পারেন। এই অ্যাপ ডিজাইনের যে কাজ- এটাই একটা প্রজেক্ট।

আরেকজন ছাত্র চিন্তা করল, সামনের বছর থেকে যেহেতু সম্মিলিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে তাই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর জন্য নতুন ধরনের একটি এনক্রিপশন সিস্টেম উদ্ভাবন করা দরকার। সে টেক্সট এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার না করে প্রথমে প্রশ্নপত্রগুলাকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করবে এবং তারপর সেই ইমেজকে এনক্রিপ্ট করবে। এই যে কোনো টেক্সট ফাইলকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করে তা এনক্রিপ্ট করার নতুন ধারণা এবং তার সম্ভাব্য সমাধান– এই কাজটিই হলো থিসিস।

যদিও থিসিসের উদাহরণটি আন্ডারগ্র্যাড ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটু কঠিন হয়ে গেল, তবে সাধারণত তাদের কাছ থেকে কোনো যুগান্তকারী সমাধান আশা করা হয় না। সাধারণত কোনো একটি ছোট সমস্যা দিয়ে তাদেরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট থিওরির উপর ভিত্তি করে সমাধান করতে বলা হয়।

তবে থিসিস কিংবা প্রজেক্ট যে কাজই আপনিই করুন না কেন, দেখা হয় আপনার মাঝে অনুসন্ধানমূলক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা আছে কিনা এবং কোনো সমস্যা সমাধান করার যে ধাপগুলো আছে তা আপনি শিখতে পারছেন কিনা।

থিসিসের পূর্বপ্রস্তুতি

ভালো থিসিস করার পূর্বশর্ত হলো রিসার্চ পেপার পড়ার অভ্যাস করা। পাশাপাশি তত্ত্বীয় বিষয়গুলো নিয়ে নিজের ধারণা ঠিক করে নেয়া। থিসিস টপিক ঠিক হওয়ার পর অন্তত তিন মাস টপিক রিলেটেড রিসার্চ পেপারগুলো খুঁজে বের করে পড়া উচিত। শুরুর দিকে হয়তো কোনোকিছু বোধগম্য হবে না, কিন্তু এই তিন মাসে অন্তত যেসব পেপার পরবর্তীতে আপনার থিসিস লিখতে আপনাকে সাহায্য করবে তা চিহ্নিত করা যায়।

কাউকে যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং করতে হয়, তাহলে তার উচিত পুরনো পেপার খুঁজে বের করা। এ ধরনের পেপারগুলোতে ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন এবং তার সল্যুশনগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এজন্য পেপার পড়ার সময় রেফারেন্সগুলো চেক করা উচিত।

সাধারণত একই ধরনের ইক্যুয়েশন ব্যবহার করলে তা আগের প্রকাশিত হওয়া কোন রিসার্চ থেকে নেয়া হয়েছে তা সবাই উল্লেখ করে। এবং যেসব রিসার্চার এসব ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন তৈরি করেছিলেন, তাদের পুরনো পেপারগুলোতে খুবই বিস্তারিতভাবে তা দেয়া থাকে।

সেইসাথে জানতে হবে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথনের বেসিক প্রোগ্রামিংয়ের খুটিনাটি। বর্তমান সময়ে প্রোগ্রামিং জানাটা ইংরেজি জানার মতোই অত্যাবশ্যকীয়। আপনি যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং কিংবা সিমুলেশন ভিত্তিক কাজ করেন, তাহলে আপনাকে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথন ব্যবহার করে সেই কাজ করতেই হবে। আর যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজও করেন, সেখানেও কোনো ইক্যুয়েশন দিয়ে আপনার এক্সপেরিমেন্টাল রেজাল্টের ডাটা ফিটিং করার পদ্ধতিও আপনাকে জানতে হবে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর তেমন কোর্সওয়ার্ক করানো হয় না। তাই একাডেমিক রাইটিংয়ের বেশিরভাগ নিয়মকানুনই আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়। এজন্য ইউটিউব হতে পারে সবচেয়ে আদর্শ মাধ্যম। শুধু একাডেমিক রাইটিং লিখে সার্চ দিলেই অনেক ভিডিও আপনি পাবেন।

এরপর যেসব ভিডিওর ভিউ অনেক বেশি কিংবা যেসব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার অনেক বেশি, সেগুলো আপনি ফলো করতে পারেন। coursera.org কিংবা edx.org এর মতো সাইটেও একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর অনলাইন কোর্স পাওয়া যায়- আপনি চাইলেই যেকোনো একটি কোর্স শেষ করে ফেলতে পারেন।

কীভাবে ডাউনলোড করবেন রিসার্চ পেপার

রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সাই-হাব (Sci-hub)। সাই-হাব মূলত শুরু হয় আলেক্সান্দ্রা এলবাকিয়ানের হাত ধরে। তিনি একজন রাশিয়ান সফটওয়ার ডেভেলপার এবং নিউরোটেকনোলজি গবেষক। তিনি একাডেমিয়ার দস্যু রানী হিসেবে পরিচতি। তার নিজ হাতে তৈরি সাই-হাব থেকে বিনামূল্যে ৬৪.৫ মিলিয়নের অধিক একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল সরাসরি ডাউনলোড করা যায়, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের ছাত্র-ছাত্রী এবং গবেষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যেহেতু এ সাইট থেকে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার ইলেকট্রনিক পেমেন্ট মেথডকে এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি যেকোনো একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল নামানো যায়, তাই বিভিন্ন সময় এর ডোমেইনকে ব্লক করে রাখা হয়।

তবে আপনি যদি কোনোভাবেই সাই-হাবের কার্যকরী ডোমেইনটি খুঁজে না পান, তাহলে সেক্ষেত্রে libgen.io এই সাইটে গিয়ে Scientific Articles সিলেক্ট করে সার্চ বারে যে পেপারটি নামাতে চান তার শিরোনাম লিখে দিয়ে সার্চ করলেই তা আপনাকে সাই-হাবে নিয়ে যাবে, এবং সেখান থেকে আপনি পেপারটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

কীভাবে শুরু করবেন থিসিস পেপার লেখা

ধরে নিলাম, আপনার থিসিস সম্পর্কিত যাবতীয় কাজ প্রায় শেষের দিকে, আপনি এখন থিসিস লেখায় পুরাপুরি মনোনিবেশ করতে চান। তাই শুরুতেই কোনো কিছু লেখার আগে একটি স্ট্রাকচার সাজিয়ে নেয়া ভাল। আন্ডারগ্র্যাডের থিসিসের কাজ যেহেতু খুব ছোট পরিসরে হয়, সেক্ষেত্রে আপনার থিসিসের স্ট্রাকচারটি হতে পারে এরকম।

১) অ্যাবস্ট্রাক্ট (Abstract)

অ্যাবস্ট্রাকটকে বলা হয় আপনার পুরো গবেষণা কাজের সারমর্ম। এটি ৩০০-৩৫০ শব্দের মধ্যে হলেই ভালো। যদিও এটি সবার শুরুতে থাকে, কিন্তু এটি সবার শেষে লেখাই উত্তম। মানে মূল রচনা লেখা শেষ হলে তারপর অ্যাবস্ট্রাকট লিখবেন। সাধারণত একজন পাঠক আপনার থিসিস পেপার পড়বে কিনা তা নির্ভর করে আপনার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্টে তিনি নিম্নোক্ত পাঁচ প্রশ্নের উত্তর সে পাচ্ছে কিনা তার উপর।

  • আপনি এই গবেষণায় কী ধরনের কাজ করেছেন?
  • আপনার এই গবেষণার কাজের পেছনে কী কী কারণ ছিল? অন্যকথায়, আপনি কী ধরনের সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন?
  • আপনি কোন প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করেছেন?
  • আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো কী ছিল?
  • আপনার গবেষণালব্ধ ফলাফল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আপনি যদি চান মানুষ আপনার গবেষণাটি সম্পর্কে জানুক, তাহলে আপনার উচিত এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অ্যাবস্ট্রাক্ট-এ গল্প আকারে লেখা।

২) ইন্ট্রোডাকশন (Introduction)

সাধারণত এটি অ্যাবস্ট্রাক্টের তুলনায় বেশ বড় হয় এবং তাতে অবশ্যই আপনার থিসিসের ব্যাকগ্রাউন্ড, কী ধরনের কাজ এ পর্যন্ত হয়েছে তার আলোচনা, কোন কোন সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি, আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন, কীভাবে কাজ করবেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে ইন্ট্রোডাকশন শেষ করতে পারেন।

৩) লিটারেচার রিভিউ (Literature Review)

মূলত এ অংশে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন তা নিয়ে পূর্বে বিভিন্ন সময়ে যেসকল উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এবং কী ধরনের সমস্যার সমাধান করা এখনও বাকি আছে এবং আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন তার বর্ণনা থাকা উচিত।

আপনি চাইলে এই সেকশনটি আলাদাভাবে লিখতে পারেন, আর যদি আপনার হাতে লেখার সময় কম থাকে, তাহলে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে তা ইন্ট্রোডাকশনের সাথে জুড়ে দিতে পারেন। তবে সেই সাথে যেসকল একাডেমিক পেপার কিংবা বই থেকে তথ্য নিয়েছেন তা অবশ্যই বিস্তারিত রেফারেন্স সহকারে উল্লেখ করতে হবে।

৪) মেথড (Method)

এই অংশে মূলত আপনি কী ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে আপনার গবেষণার সমস্যাটির সমাধান করেছেন তার বর্ণনা থাকবে। আপনার যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয় তাহলে এক্সপেরিমেন্টের বিশদ বর্ণনা, থিওরিটিক্যাল মডেলিংয়ের কাজ হলে আপনি যেসব ইকুয়েশন সমাধান করে আপনার কাজটি করেছেন তার বিশদ ব্যাখ্যা থাকা চাই।

৫) রেজাল্ট (Result)

এই সেকশনে মূলত আপনি আপনার গবেষণা থেকে কী কী উত্তর খুঁজে পেলেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকা উচিত। আপনি সবসময় চেষ্টা করবেন আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো গ্রাফ আকারে রিপ্রেজেন্ট করতে। এতে করে যিনি ফলাফলগুলো দেখবেন তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো একটি টেবিল থেকে ডাটা পড়ার চেয়ে একটি গ্রাফ পড়া এবং বোঝা অনেক সহজ।

৬) ডিসকাশন (Discussion)

এই সেকশনে মূলত আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সম্পর্কে আপনার মতামত, ফলাফল থেকে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, আপনার গবেষণার ফলাফলে কোনো অপ্রত্যাশিত ফলাফল আছে কিনা, থাকলে কী কী কারণে তা হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সেই সাথে আপনার কাজের সীমাবদ্ধতা কী ছিল, ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে এবং সেই সাথে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন সেই টপিকে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে তা নিয়ে আপনার মতামত দিতে পারেন।

৭) কনক্লুশন (Conclusion)

এই সেকশনটিতে মূলত আপনি বলবেন আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল কী ছিল এবং তা থেকে আপনি সমস্যাটির সমাধানের যাবতীয় সকল প্রকার উত্তর পেয়ে গিয়েছেন; আর সেই সাথে আপনার কাজটি কেন এবং কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা পুনরায় সংক্ষেপে বলে লেখা শেষ করতে পারেন।

সবশেষে থাকবে রেফারেন্স সেকশন, যেখানে আপনি আপনার থিসিস লেখার সময় যেসকল একাডেমিক পেপার থেকে তথ্য কিংবা উপাত্ত নিয়েছেন ক্রমানুসারে সেই সকল পেপার এর বিস্তারিত শিরোনাম উল্লেখ থাকবে, যাতে কেউ চাইলে সহজেই সেই পেপারটি খুঁজে পায়।

থিসিস লেখার সহজীয়া পন্থা

থিসিস লেখার সময় অনেকেই ইন্ট্রোডাকশন লেখা দিয়ে শুরু করেন। কিন্তু আমার মতে শুরুতে আসলে মেথড, রেজাল্ট এবং ডিসকাশন এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা উচিত। কারণ আপনি কী কাজ করেছেন এবং আপনার গবেষণার ফলাফল কী সে সম্পর্কে আপনার চাইতে ভালো আর কেউ জানে না।

এই তিনটি সেকশনে পুরোটাই আপনার নিজের কাজের বর্ণনা থাকে। তাই এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা খুব সহজ হয়। আর যেহেতু সময় অনেক বেশি পাওয়া যায়, কাজেই এক্সপেরিমেন্টাল ডাটা এবং গ্রাফগুলো ভালোভাবে প্রেজেন্ট করার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

যদি পাবলিকেশন কোয়ালিটির ফিগার চান, তাহলে Origin Pro কিংবা KaleidaGraph ব্যবহার করতে পারেন। আমরা যদিও সবাই MATLAB ব্যবহার করি, কিন্তু উপরের দুটি সফটওয়্যার আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ। এদের ইমেজ কোয়ালিটি বেশ ভালো।

অনেকেই থিসিসের সবশেষে Appendix সেকশনে নিজেদের ম্যাটল্যাবের কোড দিয়ে থাকেন (যদি কাজের প্রয়োজনে লাগে)। কখনো কখনো এতে আপনার কাজ চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আপনার কোডটিকে চাইলে কেউ একটু উন্নত করে আরো ভালো রেজাল্ট জেনারেট করে দেখা যাবে আপনার আগেই কোনো জার্নাল কিংবা কনফারেন্সে পেপার পাবলিশ করে ফেলেছে।

এই তিন সেকশন লেখা শেষ হলে আপনি ইন্ট্রোডাকশন এবং লিটারেচার রিভিউ লেখা শুরু করতে পারেন। এই দুই সেকশন নতুনদের জন্য লেখা বেশ কষ্টসাধ্য এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রচুর তথ্য ধার করে তা নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখতে হয়।

এই দুটো সেকশন শুরুর দিকে লিখতে গেলে হয়তো দেখা যাবে আপনার বেশিরভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে এবং বাদবাকী গুরুত্বপূর্ণ সেকশনগুলো লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। তাই এই দুই সেকশন শেষেই লিখুন, এবং খুব বেশি সময় না পেলে সংক্ষেপে শেষ করে দিন। আর সবশেষে লিখে ফেলুন কনক্লুশন।

এই হলো থিসিস লেখার খুটিনাটি। পরবর্তী পর্বে আপনার থিসিসটি কীভাবে জার্নালে কিংবা কনফারেন্সে পাবলিশ করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

বৃহস্পতির কেন ৭৯টা উপগ্রহ যেখানে পৃথিবীর মাত্র একটা

পৃথিবীর সবেধন নীলমণি উপগ্রহ কেবল চাঁদ, অথচ বৃহস্পতির? ডজনকে ডজন উপগ্রহ! বৃহস্পতি অবশ্য সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। মজার ব্যাপার এখনো বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা হচ্ছে। এইতো কদিন আগেই (১৬ জুলাই ২০১৮) কার্নেগি ইন্সটিটিউট ফর সায়েন্স এর বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন বৃহস্পতির আরো ১২ টি উপগ্রহ রয়েছে যেগুলো আমরা জানতাম না।

যে অনুসন্ধানকারী দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন স্কট শেপার্ড। তবে তারা কাজ করছিলেন সৌরজগতের দূরতম কাইপার বেল্টে নতুন কোনো বস্তু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কাইপার বেল্ট নেপচুন কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত যা হচ্ছে দীর্ঘাকার রিঙ। মূলত এর উপাদান সৌরজগত সৃষ্টির ধ্বংসাবশেষ। কাজের একটা বিরতি হিসেবেই তারা মূল উদ্দেশ্য কাইপার বেল্ট থেকে মোড় ঘুরিয়ে জুপিটারকে দেখার চিন্তা করল। আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই পেয়ে গেল গ্যালিলিওর চাঁদের নতুন সঙ্গী!

১৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মহান জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলেই সর্বপ্রথম চারটি স্বর্গীয় বস্তু প্রত্যক্ষ করেন জুপিটারকে ঘিরে ঘুরছে। সেগুলোর নামকরণ করা হয় আয়ো, ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং ক্যালিস্টো নামে। এগুলোই ছিল জুপিটারের বড় চাঁদ— একই সাথে প্রথম আবিষ্কৃত চাঁদও। গ্যালিলিওর এই পর্যবেক্ষণই ছিল মানবজাতির জন্য ভিনগ্রহের প্রথম উপগ্রহ। তারাদেখার প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নয়নের সাথে, এটা স্পষ্ট হয়ে যায় জুপিটারের চৌহদ্দি কেবল ঐ চার উপগ্রহকে নিয়েই নয়। ২০১৮ এর জুলাইয়ের পূর্ব পর্যন্তও জুপিটারের আবিষ্কৃত উপগ্রহ ছিল ৬৭টি। এখন হিসেব দাঁড়াল জুপিটারের ৭৯টি গ্রহ বের করতে মানুষের লেগে গেল চারশ বছরের অধিক সময়।

এই মহাসমাহার সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ করতে পারে নি, আপাতত পারবেও না। রানার আপ শনির রয়েছে ৬২টি উপগ্রহ আর তৃতীয় অবস্থানে ইউরেনাস রয়েছে ২৭টি উপগ্রহকে ঘিরে। নেপচুনের ১৪টি এবং আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের দুটি উপগ্রহ— ডিমোস এবং ফোবোস। অন্যদিকে পৃথিবীর মাত্র ১টি উপগ্রহ থাকলেও শুক্র আর বুধের কোনো উপগ্রহই নেই।

বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ থাকার কারণ এক কথায় মহাকর্ষ। কিন্তু শুধু এই কারণ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধরা যাবে না। অন্যান্য কিছু শর্ত জুড়ে দিলে তারপর মহাকর্ষকে বহু উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ বলা যাবে।

বৃহস্পতির মহাকর্ষের প্রভাব

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের গ্রহগুলোকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এদের গড়নের ভিত্তিতে। সূর্যের নিকটতম চারটি গ্রহকে বলা হয় ভূসদৃশ গ্রহ— বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গলকে। অর্থাৎ যেগুলোর কঠিন অভ্যন্তরভাগ রয়েছে। এজন্য এদের পাথুরে গ্রহও বলা হয়। আরেক ধরণের হল গ্যাসীয় দানব: বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন।

দুইদলের গ্রহগুলোর আকারের পার্থক্যও ভাগ করার বৈশিষ্ট্যসূচক হিসেবে নেয়া যেত। গ্যাসীয় দানবের সবচেয়ে ছোট সদস্য ইউরেনাসও ভূসদৃশ গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পৃথিবীর চেয়ে ১৫গুণ বিশাল। আর অতিকায় জুপিটারের কাছে তো পাথুরে গ্রহের বাকিরা সে হিসেবে নস্যি! বৃহস্পতির সমান ওজনদার হতে পৃথিবীর সমান আরো তিনশোরও বেশি গ্রহ লাগবে। গ্রহ হিসেবে এটি একেবারে আদর্শ দানব।

সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহ চারটি যদি সূর্যের সাথে ছবি তুলত তবে যেমন দেখাত; image source: NASA & Wikipedia User HalloweenNight

আইজ্যাক নিউটনের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া যায়, কোনো বস্তুর ভরের সাথে ঐ বস্তুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা জড়িত। যেহেতু গ্যাসীয় গ্রহগুলো অতিকায়, অর্থাৎ ভারী, সুতরাং তারা অধিকসংখ্যক উপগ্রহকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয় জুপিটারের মত বড় গ্রহের অধিক উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে। আমাদের সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহগুলো সূর্য থেকে দূরে, অর্থাৎ বাইরের দিকে অবস্থিত। কিন্তু সৌরজগতের বাইরে আমরা এমন অনেক নক্ষত্রকে যাদের জুপিটারের মত উপগ্রহ রয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে দেখা যাবে সে গ্যাসীয় দানবগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। ব্যাপারটা কেমন তা কল্পনা করা যেতে পারে বুধের জায়গায় শনিকে সূর্যের পাশে বসিয়ে।

২০১০ সালে এক ফরাসি জ্যোতির্বিদ, ফাথি নামোনি রীতিমত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যে জুপিটারের মত গ্রহদের উপগ্রহ বলতে গেলে থাকেই না। ধরা হয়ে থাকে এমন অতিকায় গ্রহগুলো এদের নক্ষত্র সিস্টেমের বাইরে সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে। আর আসার পথে যেহেতু নিজে ভারী, যথেষ্ঠ মহাকর্ষ শক্তিওয়ালা তাই বহু উপগ্রহ ধরা পড়ে এর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের প্রবলতায়।

গ্যাস দানব বড়, কিন্তু নক্ষত্র তো বড়োর চেয়েও বড়— বিশাল। একারণে তাদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও ব্যাপক মাত্রায় প্রবল হবে। তাই যখন কোনো জুপিটারের মত গ্রহ উপগ্রহ ভিড়িয়ে কাছে চলে আসে, নক্ষত্র উপগ্রহদের গিলে ফেলে।

উপগ্রহময় গ্রহরাজ বৃহস্পতি; image source: ROBERTO MOLAR-CANDANOSA/CARNEGIE INSTITUTION FOR SCIENCE

নক্ষত্র থেকে যত দূরে যাওয়া যায় বস্তুর প্রতি এর আকর্ষণ বলও কমতে থাকে। মহাকর্ষের প্রাবল্যের গণিত বলে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে শক্তি কমে যায় চারগুণ, দূরত্ব তিনগুণ হলে শক্তি কমে যায় ৯ গুণ। মানে একই পরিমাণ দূরত্ব বৃদ্ধির জন্য মহাকর্ষের প্রাবল্য হ্রাস ঘটছে বেশি বেশি করে, যত দূরে যাওয়া হচ্ছে। সে অনুসারে নামোনিই সঠিক, জুপিটারের ৭৯টা উপগ্রহ থাকার প্রথম কারণ এর মহাকর্ষ বল প্রবল। আর এই ৭৯টা উপগ্রহই জুপিটারের কাছে টিকে থাকার কারণ, জুপিটার সূর্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।

বড় পরিবার, বৃহস্পতি পরিবার

জুপিটারের উপগ্রহগুলো শিলাময়। উপগ্রহ আয়ো সক্রিয় আগ্নেয়গিরিময়, ইউরোপাতে গুপ্ত আছে মহাসাগর এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্যানিমিড যা কিনা এই সৌরজগতের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক উপগ্রহ। গ্যানিমিড মঙ্গলের দুই তৃতীয়াংশ এমনকি বুধের চেয়েও বড়।

অনুমান করা হয় এই তিন উপগ্রহ, ক্যালিস্টো আর বৃহস্পতি নিজে সম্ভবত পরপর একই সাথে গঠিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ গ্যাসের চাকতি আর ধুলা মিলেমিশে আজকের বৃহস্পতিকে গঠন করে। যখন জুপিটার আকার গঠন করে ফেলে, অন্যান্য পদার্থ এর চারপাশে পাক খাচ্ছিল যা জমে চারটি উপগ্রহে পরিণত হয়। গ্যালিলিও প্রথম এই উপগ্রহ চারটি দেখতে পান বলে এগুলোকে গ্যালিলিওর চাঁদ বলা হয়।

এই চারটি উপগ্রহই বলতে গেলে জুপিটারের উপগ্রহগুলোর ভরসমষ্টির সবটা। এই চারটি বাদে বাকিগুলো মিলে উপগ্রহগুলোর মোট ভরের মাত্র ০.০০৩%।

শনি গ্রহও এই প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে থাকবে কিছুটা। অনুকল্প (হাইপোথিসিস) করা হয় যে, আদি বৃহস্পতি শনির কিছু কক্ষপথ বিচ্যুত উপগ্রহকে নিজের কক্ষপথে টেনে নেয়। অন্যান্য উপগ্রহগুলো এমন যে বৃহস্পতির জন্মের সাথে তাদের জন্ম সংগতিপূর্ণ মনে হয় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বৃহস্পতির বহু চাঁদগুলো গঠিত হয়েছে এর মহাকর্ষের প্রভাবে ছুটতে থাকা পাথরের খন্ডগুলোর এক হওয়ার মাধ্যমে।

সব কথা শেষ করার আগে চাঁদের আচরণ নিয়ে কিছু জানাতে হবে। বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ বৃহস্পতি যেদিকে পাক খায় সেভাবেই বৃহস্পতিকে একই দিক ধরে প্রদক্ষিণ করে। আবার কতকগুলো বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যেও দুটো বিপরীত দিকে ঘোরে। বিপরীত দিকে ঘোরার ক্ষেত্রে ঝুঁকি হল দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যেকোন সময় একটি আরেকটির সাথে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। বহু উপগ্রহ বহুদিকে প্রদক্ষিণ করায় সংঘর্ষ এড়ানোই কঠিন ব্যাপার হবে। আর এক উপগ্রহ আরেক উপগ্রহের উপর আছড়ে পড়লে বৃহস্পতি সেই সুযোগে পেয়ে যেতে পারে নতুন উপগ্রহ। এটাও বহু উপগ্রহ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

HowStuffWorks অবলম্বনে।

featured image: express.co.uk

 

সৌরজগতের শীতলতম স্থান

সূর্যের অনেক নিকটে থাকা সত্ত্বেও সৌরজগতের সবচেয়ে শীতলতম স্থান চাঁদে অবস্থিত। এমনকি সবচেয়ে দূরে অবস্থিত প্লুটোতেও নয়। চাঁদের একটা অংশে কখনোই সূর্যের আলো পৌঁছায় না। যার কারণে সে স্থানে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। হিমাংকের নীচে প্রায় ৪০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। এমনকি সূর্যের নিকটতম গ্রহ বুধের অনেক অংশেও কখনো সূর্যের আলো যেতে পারে না। ফলে বলে সেখানেও তাপমাত্রা অনেক কম থাকে।

featured image: wired.jp

বায়েস থিওরির বিশ্ব জয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যাদের একটু নাড়াচাড়া আছে তারা বায়েস তত্ত্ব সম্পর্কে জানবেই জানবে। গণিত, পরিসংখ্যান, জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, বাণিজ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান, পূরকৌশল– সকল প্রধান বৈজ্ঞানিক শাখাতে বায়েস থিওরী প্রয়োগ আছে। এর প্রায়োগিক ক্ষমতা প্রমাণিতও হয়েছে। কিন্তু, এ তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক কাঠখর পোহাতে হয়েছিল। আনুমানিক ১৫০ বছর লড়াই করার পর, বিংশ শতকে এসে তত্ত্বটি মোটামুটি সবার কাছে গৃহীত হয়। কিন্তু, কেন এত সময় লাগলো?

বায়েস তত্ত্ব খুবই মৌলিক কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে। যেমনঃ কীভাবে আমরা প্রমাণ বিশ্লেষণ করি, পুরনো তথ্যের সাথে কীভাবে নতুন তথ্য সংযোজন এবং সেখান থেকে নতুন আরও তথ্য পেতে পারি, এবং অনিশ্চয়তার মুখে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারি? ছোট্ট এক লাইনের একটা সমীকরণ এতসব তথ্য দিতে পারে।

বায়েস তত্ত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদেরকে সে বিষয়ের পূর্ব প্রমাণ সম্পর্কে জানতে হবে। ইংল্যান্ডে ১৭৪০ সালের দিকে বায়েস তত্ত্বটির উদ্ভব। এটি আবিষ্কার করেন ইংলিশ গণিতবিদ রেভারেনড থমাস বায়েস (১৭০১ – ১৭৬১)। তার জীবদ্দশায় সূত্রটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। তার মৃত্যুর পর তারই বন্ধু রিচার্ড প্রাইস (১৭২৩ – ১৭৯১) তার সমস্ত কাজ প্রকাশ করেন। মূলত প্রাইসের কারণেই বায়েস সবার কাছে পরিচিতি পান।

বায়েস থিওরিকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন করেন আরেক বিখ্যাত ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সাইমন লাপ্লাস। বর্তমানে বায়েস থিওরির যে রূপ দেখতে পাই তা মূলত লাপ্লাসের অবদান। এ সূত্র ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেন যে ছেলেদের জন্মহার মেয়েদের থেকে বেশী।

image source: probabilisticworld.com

লাপ্লাসের মৃত্যুর পর পরবর্তী ১০০ বছর বায়েস থিওরির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং কিছু কিছু প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা লাপ্লাসের কাজকে অনেক বেশী বৈষয়িক (Subjective) বলে মনে করেন। সবচেয়ে বেশী সমালোচনার শিকার হয় এই প্রেক্ষিতে যে কেন এখনকার বা ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্যতা নির্ণয়ের জন্য পূর্ব প্রমাণ প্রয়োজন হবে? তবে কিছু কিছু গণিতবিদ বাস্তব জরুরী সমস্যার সমাধানের জন্য বায়েস থিওরি ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় বিজয় তখনই সাধিত হয় যখন বিখ্যাত ইংরেজ গণিতবিদ এলান টিউরিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নেভির গোপন সঙ্কেত এনিগমা কোড ভাঙ্গার জন্য বায়েস তত্ত্ব ব্যবহার করেন। এ সময়টাতেই রুশ বিজ্ঞানী আন্দ্রেই কলমোগরভ এবং মার্কিন ক্লড শেনন যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এই তত্ত্বটি ব্যবহার করেন।

বায়েস থিওরির আরো কিছু নমুনা ইতিহাস থেকেই পাওয়া যাবে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের বীমা ক্ষতিপূরণের হিসাব মেলানোর বিষয়ে বায়েস ব্যবহার করা হয়। জার্মান U-Boat শনাক্তকরণে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র বের করতে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লোহার শনাক্তকরণেও বায়েস তত্ত্ব সফলতার সাথে প্রয়োগ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার স্নায়ু যুদ্ধের সময় বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে সাবমেরিন, এইচ বম্ব শনাক্ত করা হয়। পারমাণবিক চুল্লীর নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়, ধূমপানের কারণে যে ক্যান্সার হতে পারে সেটি গাণিতিকভাবে বায়েস থিওরি দিয়ে প্রমাণ করা হয়। চ্যালেঞ্জার শাটল দুর্ঘটনার জন্য ফাইনম্যান যে  O– ring কে দায়ী করেন সেটি তিনি বায়েস থিওরি প্রয়োগ করে বের করেছিলেন। এনরিকো ফার্মি, রিচার্ড ফাইনম্যানদের মতো বিজ্ঞানীরা তাদের পদার্থবিজ্ঞানের কাজে এ তত্ত্ব সফলতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।

image source: theguardian.com

বায়েস তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এটি কম অথবা বেশী দুই ধরনের ডাটা নিয়ে কাজ করতে পারে। এবং তা থেকেই নতুন তথ্য বের করে আনতে পারে। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে বায়েস খুবই সূক্ষ্মতার সাথে সম্ভাব্যতা বের করে আনতে পারে। বায়েস প্রয়োগ করার পর এর সঠিকতা যাচাই করার জন্য accuracy rate, false alarm rate বের করা হয়। যেকোনো বিষয়তেই দেখা গেছে অন্যান্য পদ্ধতির থেকে বায়েস সঠিকভাবে যে কোনো ডাটা থেকে তথ্য বের করে আনতে পারে।

বর্তমানে বায়েস তত্ত্ব ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশিন লারনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে বায়েস তত্ত্ব এখন এক অনিবার্য বিষয়। বায়েস তত্ত্ব এখন অনেক বেশী আধুনিক রূপ নিয়েছে। এর অনেকগুলো শাখা তৈরি হয়ে গেছে। যেমনঃ বায়েসিয়ান নেটওয়ার্ক, বায়েসিয়ান পরিসংখ্যান, বায়েসিয়ান প্যাটার্ন রেকগনিশন, বায়েসিয়ান বিলিফ, বায়েসিয়ান এ আই ইত্যাদি।

গত ২০ বছরে Intelligent Transportation Sector-এ এক নতুন বিষয় অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে যার নাম Real-time crash prediction model (RTCPM)। গাড়ি দুর্ঘটনা নিত্য বিষয়ে পরিণত হয়ে গেছে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য ট্রান্সপোর্ট বিজ্ঞানীরা আগেভাগে দুর্ঘটনা যেন বোঝা যায় এমন কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেন। এই গবেষণায় বায়েস থিওরি ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রনিক বিজ্ঞান, আধুনিক ডিটেক্টর, পরিসংখ্যান, রবোটিক্স, ট্রান্সপোর্ট সায়েন্স এসবের সম্মিলিত প্রয়োগে এই ফিল্ডে গবেষণা করা হয়।

image source: gainweightjournal.com

জাপানের Tokyo Institute of Technology-তে এ বিষয়ে প্রথম গবেষণা করেন ড. মইনুল হোসেন। বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুরের Islamic University of Technology (IUT)-তে তিনি এবং তার দল এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছেন।

Loughborough University এর ড.কুদ্দুস প্রথম Real-time Crash Prediction Model for Autonomous Vehicle– তার PhD ছাত্রকে দিয়ে বের করেন যেখানে তিনি Dynamic Bayesian Network ব্যবহার করেন। গুগল যে সেলফ ড্রাইভিং কার তৈরি করেছে সেইটা পুরোপুরি কাজ করে বায়েস থিওরি ব্যবহার করে।

যেকোনো দিক থেকে বিবেচনা করলেই দেখা যাবে বায়েস থিওরি অত্যন্ত প্রায়োগিক এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

featured image: bbc.com

ছোট্ট দেশ ভ্যাটিকান সিটি’র সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ভ্যাটিকান সিটি একটি প্রাচীরবেষ্টিত ছোট শহর, যার চারিদিকে ইতালির রাজধানী রোম পরিবেষ্টন করে আছে। আয়তন এবং জনসংখ্যা উভয় বিচারেই এটি বিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র। এর আয়তন মাত্র ৪৪ হেক্টর যা মোটামুটি আধা বর্গকিলোমিটারের সমান। জনসংখ্যা মোটামুটি ৮০০ জনের মতো। যার মধ্যে কেবল ৪৫০ জনের নাগরিকত্ব রয়েছে। অবশিষ্ট ৩৫০ জনের কেবলমাত্র সেখানে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি রয়েছে।

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাধার

পৃথিবী বসবাসযোগ্য গ্রহ হবার অন্যতম প্রধান কারণ হলো পানি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রাণের সব দিককে প্রভাবিত করছে পানি। পানি ছাড়া পৃথিবীতে কোনো উদ্ভিদ বা প্রাণী থাকতো না। বর্তমানে যেমন দেখতে তাই তার তুলনায় গ্রহটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ভূ-পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% পানি দ্বারা আচ্ছাদিত, যার প্রায় ৯৬.৫% পানি সমুদ্রগুলো ধারণ করছে। এছাড়া নদীনালা, হ্রদ, বাতাসের জলীয় বাষ্প, হিমবাহ, মাটির আর্দ্রতা এবং আপনার-আমার মধ্যেও পানি রয়েছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধারের অবস্থান ভূপৃষ্ঠের উপরে কোথাও নয়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মাইল অভ্যন্তরে এর অবস্থান।

পৃথিবীকে ভূতাত্ত্বিকভাবে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায় Crust, Mantle ও Core। এগুলোর মধ্যে Mantle স্তরটি খানিকটা জটিল। এর নিজেরই আবার স্বতন্ত্র চারটি স্তর রয়েছে- Lithosphere, Athenosphere, Upper mantle ও Lower mantle। এ স্তরগুলোর মধ্যেও আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়। এগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। Mantle এর শেষোক্ত দুইটি স্তরের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় Transition zone। এ অংশেই রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলাধার।

যে জলাধারের কথা বলছি তা ভূ-পৃষ্ঠের উপরের জলাশয়গুলোর মতো নয় যেখানে আমরা মাছ চলাচল করতে দেখি। পানির যে তিনটি রূপের সাথে আমরা পরিচিত, এটি তার থেকে আলাদা। বলা যেতে পারে পানির চতুর্থ অবস্থা সেটি। ভু-অভ্যন্তরে এত গভীরে অত্যাধিক তাপমাত্রা ও চাপের কারণে পানি বিভাজিত হয়ে হাইড্রক্সিল মুলক (OH¯) আকারে থাকে যা এক ধরনের শিলার মধ্যে আণবিক স্তরে চাপা পড়ে আছে। এ শিলার নাম দেয়া হয়েছে Ringwoodite। শিলাটি অনেকটা পানি দ্বারা সিক্ত স্পঞ্জের ন্যায় আচরণ করে। শিলাটির বিশেষ স্ফটিক গঠন হাইড্রোজেনকে আকর্ষণ করে পানিকে আটকে ফেলতে পারে। Ringwoodite পানির এক সুবিশাল আধার। Transition zone এর এই শিলার যদি এক শতাংশও গঠনগতভাবে তরল পানি হয় তাহলে তার দ্বারা পৃথিবীর সমুদ্রগুলোকে প্রায় তিন বার প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

ভূ-অভ্যন্তরে এই সুবিশাল জলাধারের সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীদের এখন ধারণা, ভূপৃষ্ঠের এ বিশাল সমুদ্রগুলোর পানির উৎস আসলে ভূ-অভ্যন্তরে আটকে থাকা পানিই। যদিও পূর্বে সর্বাধিক স্বীকৃত ধারণা ছিল- প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন বছর আগে বরফতুল্য ধূমকেতু ও গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ থেকেই এ সমুদ্রগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ভূতাত্তিক কার্যকলাপ এবং অত্যাধিক চাপের কারণে ভু-অভ্যন্তরের আটকে থাকা পানির অণুগুলো ভূপৃষ্ঠের দিকে উঠে এসে এই সমুদ্রগুলোর জন্ম দিয়েছে। এর থেকে বিজ্ঞানীদের ধারণা পানি চক্র কেবল ভূ-পৃষ্ঠ এবং বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভু-অভ্যন্তরের অনেক গভীরে পর্যন্ত প্রসারিত। এছাড়াও ধারণা করা হয় ভু-অভ্যন্তরের এই পানিই বাফার হিসেবে ক্রিয়া করছে যার জন্য কোটি কোটি বছরেও সমুদ্রের উচ্চতার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

আমাদের সৌভাগ্য যে এই সুবিশাল জলরাশি পৃথিবীর অভ্যন্তরেই চাপা পরে আছে। নতুবা যদি তা সম্পূর্ণভাবে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসতো তাহলে আমরা স্থলভাগ বলতে কেবল পর্বতচূড়াগুলোকেই দেখতে পেতাম।

ফটো ফিফটি ওয়ানঃ একের পর এক নোবেল পুরস্কার এসেছে যে ছবির হাত ধরে

যদি বিখ্যাত কোনো স্থিরচিত্র বা ছবির কথা কল্পনা করতে বলা হয় তাহলে আপনার মনে হয়তোবা ছবিই ভাসবে। যেমন সেই আফগান নারীর বিস্ময়কর মায়াবী সবুজ চোখ অথবা খাবারের অভাবে মৃত্যুবরণ করা সেই আফ্রিকান শিশুর কথা। কিংবা এমনই আরো অনেক কিছু।

কিন্তু কখনো কি চিন্তা করেছেন, কোনো একটা ছবির অবদান আধুনিক বিজ্ঞান জগতে কতটুকু হতে পারে? এমনকি সেই ছবির জন্য নোবেল দেওয়ার কথা পর্যন্ত উঠতে পারে? কোনোটার একটাও যদি কখনো কল্পনা করে থাকেন তাহলে আপনাকে এই লেখায় স্বাগতম।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘ফটো ৫১’? বিজ্ঞান জগতে কেন এর এত গুরুত্ব যার জন্য নোবেল পুরষ্কারের কথা পর্যন্ত উঠবে? কেমন দেখতে এই ফটো? এর পেছনে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা। রয়েছে কিছুটা আক্ষেপ ক্ষোভ আর লজ্জা।

অবদানের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই এটুকু অন্তত বলতে পারি, এই ফটো ৫১ যদি ঐ সময়ে তোলা না হতো তাহলে জীববিজ্ঞানের উন্নতি অনেক পিছিয়ে যেতো। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার আজ যে মহীয়সী রূপ তা সম্পন্ন হতে আরো অনেক বছর পার হয়ে যেত। কারণ এই ছবি ব্যতীত বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের পক্ষে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল দেয়া সম্ভব ছিল না।

এই মডেল প্রদান করেই এরা পরবর্তীতে মরিস উইলকিন্সের সাথে ১৯৫৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে। কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, ফটো ৫১ এর আসল যে কারিগর, সেই মহীয়সী নারীর ভাগ্যে কী হয়েছিলো? এখানে সে সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করবো।

ফটো ৫১ সম্বন্ধে জানার আগে যে পদ্ধতির মাধ্যমে এটি তোলা হয়েছিল সে সম্বন্ধে জানা উচিৎ। পদ্ধতিটির নাম এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি। সাধারণ ছবি তোলার জন্য যে উপায় অবলম্বন করা হয় এটি তারই মতো তবে এর প্রক্রিয়া খানিকটা জটিল।

নামে যেহেতু এক্স-রে কথাটি আছে তার মানে বুঝতে হবে এখানে এক্স-রে নিয়ে কিছুটা হলেও কারিকুরি আছে। রাদারফোর্ড যে প্রক্রিয়ায় তার পরমাণু মডেলের পরীক্ষা করেছিলেন এটিও অনেকটা সেরকমই। রাদারফোর্ডের পরীক্ষায় আলোক উৎস হিসেবে হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে আলোক উৎস হিসেবে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ক্রিস্টালের গঠন নির্ণয় করার জন্য পদার্থের স্ফটিকের উপর উৎস থেকে এক্স-রে ফেলা হয়। এরপর বিশেষ ধরনের আলোক সংবেদনশীল পদার্থের উপর বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিকে গ্রহণ করা হয়। এর উপরই উৎস থেকে বিক্ষিপ্ত এক্স-রে নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত হয়। এই সজ্জাকে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে উক্ত পদার্থের ত্রিমাত্রিক গঠন ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

চিত্রঃ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি

ডিএনএ’র একক বা মনোমারের চিত্র অত্যন্ত নিখুতভাবে তুলতে সমর্থ হয়েছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। এরপর তার পলিমারের গঠন সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন ওয়াটসন ও ক্রিক।

কে এই রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন? ১৯২০ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঙ্কলিন ১৯৩৮ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি লাভ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাথে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে প্রথম মহিলা প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্যারিসের CNRS Lab of Molecular Genetics-এ চার বছর কাজ করেন। সেখানে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে উচ্চতর জ্ঞান লাভ করেন। এই বিষয়ে তিনি এতটাই পারদর্শিতা লাভ করেন যে, তাকে লন্ডনের কিংস কলেজে যোগদান করার জন্য আহ্বান করা হয়। দেশের ডাক উপেক্ষা না করে ১৯৫১ সালে কিংস কলেজে যোগদান করেন।

কিন্তু আহ্বানকারী জন র‍্যানডল একইসাথে একটা সংকটপূর্ণ অবস্থাও তৈরি করলেন। ইতিপূর্বে মরিস উইলকিন্স (পরবর্তীতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী) যে পদে ছিলেন ফ্রাঙ্কলিনকে সেই পদে নিযুক্ত করলেন। পাশাপাশি মরিসের যে পিএইচডি ছাত্র ছিল, তাকেও ফ্রাঙ্কলিনের অধীনে দিয়ে দেন। তাছাড়া ফ্রাঙ্কলিন যে সময়টাতে কিংস কলেজে যোগদান করেন তখন মরিস উইলকিন্স ছুটিতে ছিলেন। ফলে তিনি যখন ফিরে এলেন তখন দেখলেন কোনো ধরনের অপরাধ ছাড়াই প্রথমত, তিনি তার ল্যাবের একক অধিকার হারালেন। তার উপর তিনি তার অধীনস্থ পিএইচডি ছাত্রটিকেও হারালেন।

গবেষণার সাথে যারা জড়িত তারা এ ধরনের ঘটনার গুরুত্ব একজন বিজ্ঞানীর কাছে কতটুকু তা সহজেই অনুমান করতে পারবে। এই ঘটনা আর যাই হোক উইলকিন্সকে অন্তত খুশি করতে পারেনি। তাই প্রথম থেকেই উইলকিন্স এবং ফ্রাঙ্কলিনের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় এবং যার ভবিষ্যত ফল খুব একটা ভালো হয়নি।

চিত্র: উইলকিন্স

ফ্রাঙ্কলিন কিংস কলেজে আসার আগমুহূর্তে উইলকিন্স ডিএনএ’র কিছু ছবি তুলেছিলেন এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সাহায্যে। কিন্তু ছবিগুলো অস্পষ্ট ছিল। তিনি ঐ ছবিগুলো ইতালির নেপলসে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে প্রদর্শন করেন।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেমস ওয়াটসন। তিনি পরে উইলকিন্সের সাথে যোগাযোগ করেন তার অধীনে গবেষণা করার জন্য। অবশ্য তার এ প্রচেষ্টা পূর্ণ হয়নি। ওয়াটসন পরে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের অধীনে তার পিএইচডি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। এর ফলশ্রুতিতেই তৈরি হয় ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল মডেল।

অন্যদিকে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন তার কঠোর পরিশ্রমে এক বছরে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ডিএনএ’র নমুনায় আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে দেখান যে, A (৭৫%) এবং B দুই প্রকারের ডিএনএ সম্ভব। উপস্থিতির দিকে লক্ষ্য রেখে ফ্রাঙ্কলিন A এর উপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। এই দিকটিকেই ওয়াটসন পরবর্তীতে নিজের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করেন। কারণ, B ডিএনএ’র ছবি A এর চেয়ে অধিক পরিষ্কার ছিল।

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত B ডিএনএ’র ছবির উপর ভিত্তি করে তাদের ডাবল হেলিক্যাল মডেল প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমরা যদি ফ্রাঙ্কলিনের ব্যক্তিগত নোটের দিকে লক্ষ্য করি, যা নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, তাহলে আমরা চমকপ্রদ কিছু দেখতে পাই। তার নোটে ডিএনএ’র ডাবল হেলিক্যাল গঠন সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন এবং কিছুটা কল্পনাও করতে পেরেছিলেন।

চিত্রঃ A এবং B গঠনের ডি এন এ।
চিত্রঃ ডিএনএ’র গঠন সম্পর্কে ফ্রাঙ্কলিনের নোট বইয়ে আঁকা চিত্র।

১৯৫২ সালে ফ্রাঙ্কলিন B প্রকারের ডিএনএ’র যে ছবি তুলেছিলেন সেটিকেই ফটো ৫১ নামে অভিহিত করা হয়। এই পরীক্ষা চালানোর পর ফ্রাল্কলিন কিংস কলেজ ত্যাগ করে লন্ডনের ব্রুক বেক কলেজে যোগদান করেন। সেখানে ১৯৫৩ – ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভাইরাস রিসার্চ ল্যাবে ভাইরাস গবেষক হিসাবে অতিবাহিত করেন। ঐ সময় উল্লেখযোগ্য কিছু গবেষণাপত্র বের করতে সমর্থ হন যেখান তার সঙ্গী ছিলেন পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী অ্যারন ক্লুগ।

ইতোমধ্যে ফ্রাঙ্কলিনের পুরোপুরি অজান্তে ফটো ৫১ ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু ফটো ৫১ ই নয়, ফ্রাঙ্কলিনের কাজের সমস্ত নথিপত্র উইলকিন্স, ওয়াটসন ও ক্রিকের কাছে দিয়ে দেন। যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং একই সাথে গবেষণা নীতির বিরোধী।

ফটো ৫১ হাতে পাওয়ার সাথে সাথে ওয়াটসন ও ক্রিক দ্রুত গতিতে তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কেননা, তখনকার সময় ওয়াটসন ও ক্রিক ব্যতীত আরো অনেক বিজ্ঞানী ডিএনএ’র গঠন ব্যাখ্যা করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী লিনাস পলিং। কিন্তু পলিং তার সাফল্যের অনেক কাছাকাছি পৌঁছালেও সামান্য কিছু ভুলের জন্য ডিএনএ এর গঠন ব্যাখ্যা করতে পারেননি। আর তাই হয়তবা তিনি তার তৃতীয় নোবেল পুরষ্কারটাও হাতছাড়া করলেন!

ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের কাজ খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যান এবং এক সপ্তাহের মধ্যে তারা তাদের মডেল দাঁড় করাতে সক্ষম হন। কিন্তু তাদের মডেল যে সঠিক সেটার জন্য অবশ্যই কোনো বিদগ্ধ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতির প্রয়োজন। কিন্তু কাকে তারা দেখাবেন? অবশেষে তারা স্বয়ং রোজালিন্ড ফ্রঙ্কলিনকেই আমন্ত্রণ জানান!

ফ্রাঙ্কলিন ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরিতে গিয়ে তাদের মডেল দেখেন এবং সাথে সাথে তিনি ঐ মডেলের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার স্বীকৃতি দান করেন। ফ্রাঙ্কলিন তখনও জানতেন না যে তার পরিশ্রমের ফটো ৫১ এর উপর ভিত্তি করেই তারা ঐ মডেলটি তৈরি করেছেন। ওয়াটসন এই ঘটনা সম্পর্কে তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’-এ লিখেছেন “ত্বরিত স্বীকৃতি আমাকে অবাক করেছে”।

চিত্র: ডিএনএ মডেলের রেপ্লিকার সামনে ওয়াটসন ও ক্রিক।

ওয়াটসন ও ক্রিক ক্যাভেন্ডিস ল্যাবরেটরির প্রধান স্যার লরেন্স ব্রাগকে অবহিত করেন এবং অনুরোধ করেন তাদের গবেষণাপত্র যেন দ্রুত প্রকাশ করা হয়। স্যার লরেন্স ব্রাগ এর পরই ‘নেচার’ সাময়িকীতে অতিদ্রুত তাদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে দেন। ইতিহাসে আর মাত্র একবারই নেচার এমন কাজ করেছে, হরগোবিন্দ খোরানা এবং তার সহকারীদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।

কিন্তু নেচার যে ঘটনার জন্ম দেয় তা অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়। নেচার তার ১৯৫৩ সালের এপ্রিল ইস্যুতে প্রথমে ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্র এবং তারপর উইলকিন্স ও তার সহকারীবৃন্দের এবং সবশেষে রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্রমটা কি আসলেই সঠিক? এর দ্বারা কী বোঝানো হচ্ছে? বোঝানো হচ্ছে যে, ফ্রাঙ্কলিন ও গোসলিং এর গবেষণাপত্রের অবদান ওয়াটসন ও ক্রিকের গবেষণাপত্রে খুব কম বা নেই বললেই চলে।

এরপর যা হয় আর কি, তাবৎ দুনিয়া ফ্রাঙ্কলিনকে ভুলেই গেল আর ওয়াটসন ও ক্রিককে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিল। আর অন্যদিকে ফ্রাঙ্কলিন ডিএনএ ছেড়ে ভাইরাস গবেষণা নিয়ে মেতে উঠলেন আর তিনি এমন কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার করলেন যার জন্য তিনি মূলত ভাইরাস গবেষক হিসেবেই বিজ্ঞানী মহলে সমাদৃত হতে লাগলেন।

কিন্তু স্বীকৃতি আর বেশি দিন তার ভাগ্যে সহ্য হলো না। ১৯৫৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বিষয়ক কিছু ভ্রমণের পরপরই উদরের ব্যথা অনুভব করেন এবং শীঘ্রই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন।

চিত্রঃ রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

ধারণা করা হয়, অতিরিক্ত পরিমাণ এক্স-রে তার শরীরের উপর পড়ার কারণেই তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। ইতিহাসে আর মাত্র একজন বিজ্ঞানীই এরকম অতিরিক্ত পরিমাণ তেজস্ক্রিয় রশ্মির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি পদার্থ ও রসায়নে দুবার নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী মহীয়সী নারী মাদাম কুরী। ১৬ ই এপ্রিল ১৯৫৮, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন মৃত্যুবরণ করেন। মানবসমাজ তার অন্যতম এক কৃতি সন্তানকে হারায়।

তার সমাধির উপর লেখা আছে, তিনি একজন ভাইরাস গবেষক। কিন্তু হায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্তও তিনি জেনে যেতে পারলেন না মানব সমাজকে তিনি কী উপহার দিয়ে গেলেন। নেচার যা করেছে সেটা না হয় কাকতালীয় হতে পারে কিন্ত নোবেল কমিটি কী করলো? ফ্রাঙ্কলিনের মৃত্যুর পর ১৯৬২ সালে ওয়াটসন, ক্রিক ও উইলকিন্সকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয় molecular structure of nucleic acids and its significance for information transfer in living material”

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘molecular structure of nucleic acids’ এর এই কাজটি কার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল? এমন দাবী করা হচ্ছে না যে নোবেল কমিটি তাদের নিয়ম ভঙ্গ করে একজন মৃত ব্যক্তিকে পুরষ্কার দিক। কিন্তু ন্যূনতম যে মর্যাদা সেটা তো ফ্রাঙ্কলিনের প্রাপ্য হতেই পারতো। অবশ্য তিনি মৃত্যুবরণ করে নোবেল কমিটিকে তাদের কাজ অনেকটা সহজই করে দিলেন।

আরেকটি ঘটনার অবতারণা এখানে না করলেই নয়। সেটা হলো ওয়াটসন তার বই ‘দ্য ডাবল হেলিক্স’ এ ফ্রাঙ্কলিনকে খুবই বাজেভাবে উপস্থাপিত করেছেন এবং ওয়াটসন যখন তার বইটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য পাঠান তখন ক্রিক ও উইল্কিন্সের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা বিভাগ তা প্রত্যাখান করে।

উপায় না দেখে তিনি অন্য প্রকাশনা থেকে দ্রুত তার বইটি প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কে উইলকিন্স বলেছেন If there was one of thing that was objectionable in the book, it was his portrayal of Rosalind, it was always silly matter about clothing or something, I thought it was pretty inane and they’re not true to say the least was a very presentable person। বুঝুন তাহলে অবস্থাটা।

কিছু কিছু মানুষ হয়তোবা সারাটা জীবন দেওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেন, গ্রহণের জন্য নয়।

“In my view, all that necessary for faith, is the belief that doing our best we should success in our aims. The improvement of mankind.” – Franklin.

তথ্যসূত্র

  1. A Brief History of DNA, Integrated DNA Technologies, 1-6.
  2. Chomet, S. ed. 1993. Genesis of a Discovery: DNA Structure, Newman Hemisphere, London (Accounts of the work at Kings College, London).
  3. DNA’s Double Helix: 50 Years of Discoveries and Mysteries An Exhibit of Scientific Achievement, University of Buffalo Libraries, University of Buffalo, The State University of New York.
  4. Dunn, L.C., 1991. A Short History of Genetics: The Development of Some of the Main Lines of Thought, 1864–1939. Iowa State Univ. Press, Ames.
  5. Klug, A., (2004) The Discovery of the DNA Double Helix, J. Mol. Biol 335, 3-26.
  6. Singer, M.F., 1968. 1968 Nobel Laureate in Medicine or Physiology. Science 162, 433–436.
  7. PBS: The Secret of Photo 51
  8. PBS: The Secret of Life

পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস

এটা সাধারণ একটা মাথার খুলি হতে পারে, কিন্তু যদি বলি এটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা জিনিস তাহলে? অবাক হলেও সত্য। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফেলনা বস্তুটি হচ্ছে এই খুলিটি যার মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলার! কেন? কারণ এটি সাধারণ কোনো খুলি নয়, এটির নাম Damien Hirst diamond skull।

image source: vimeo.com

নাম দেখেই বুঝতে পারছেন হীরার কথা। এটি তৈরি করেন Damien Hirst নামক একজন শিল্পী। তিনি এই অষ্টাদশ শতাব্দীর মাথার খুলিতে যুক্ত করেন প্লাটিনাম আর ৮৬০১ টি হীরক খণ্ড। যার মধ্যে একটি গোলাপি বর্ণের হীরাও রয়েছে যেটি মাত্র ৫২ ক্যারেটের। এই খুলিটির দেখা পেতে হলে আপনাকে পাড়ি জমাতে হবে লন্ডনের White Cube gallery-তে।

মানচিত্র : যে সবসময় মিথ্যা বলে এসেছে

যত ধরনের মানচিত্র প্রচলিত আছে তাদের প্রায় সবকটিই সত্যিকার পৃথিবীর শতভাগ সঠিক আকৃতি দিতে ব্যর্থ। মানচিত্রের মাঝে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ‘মার্কেটর প্রজেকশন ম্যাপ’। এই মানচিত্রে এক দেশের সাথে আরেক দেশের আকারের খুব বাজে রকমের হেরফের হয়।

হাতের কাছের কোনো একটি সমতল মানচিত্র খুলে ধরে অস্ট্রেলিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রফল অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফলের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের সত্যিকার ক্ষেত্রফল হচ্ছে ২২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার আর অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রফল ৭৭ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। বাস্তবতার সাথে সমতল মানচিত্রের যেনো আকাশ পাতাল পার্থক্য।

চিত্রঃ বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশন ম্যাপ। ছবিঃ Strebe

আবার আফ্রিকার দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিলে দেখা যাবে মোটামুটি বড়ই একটা অংশ হিসেবে বিরাজ করছে আফ্রিকা। কিন্তু আফ্রিকার সত্যিকার আকৃতি, আমরা যেমনটা ভেবেছি তার থেকেও অনেক বড়। আফ্রিকাকে গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ১৪ গুণ বড় হিসেবে ভাবতে হবে। এই আফ্রিকার ভেতরে পুরো আমেরিকা, চীন, ভারত, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য সহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ আটকে যাবে।[১] আমেরিকার ক্ষেত্রফল যেখানে ৯ ৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার সেখানে আফ্রিকার ক্ষেত্রফল ৩০ ৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার।[২] বিশ্বে বেশি ক্ষেত্রফলধারী প্রথম ১৫টি দেশের ক্ষেত্রফল এই লেখার শেষে সংযুক্ত করা হলো।

মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যায় আরেকটি পদ্ধতি আছে ‘গুড হোমোলোসাইন প্রজেকশন’। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মহাদেশগুলোর তুলনামূলক আকৃতির মোটামুটি সঠিক ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের পরস্পরের দূরত্ব নিয়ে নতুন করে ঝামেলা বাঁধে। এছাড়া মহাসাগরগুলোর প্রতি অবহেলা করার ব্যাপারটা তো চোখে পড়েই।

চিত্রঃ গুড হোমোলোসাইন প্রজেকশন। ছবিঃ Strebe

এমন অনেক মানচিত্রই তৈরি হয়েছে। একটা মানচিত্র একদিক থেকে সুবিধা বাড়িয়ে দেয় আবার অন্যদিক থেকে সুবিধা কমিয়ে দেয়। মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যায় এই সুবিধার দেয়া-নেয়ার ব্যাপারটা একটি স্থায়ী সমস্যা।

এতোসব সমস্যার জন্ম হয়েছে পৃথিবীর আকৃতির জন্য। পৃথিবী গোলাকার হওয়াতে সমতল কাগজে কোনোভাবেই গোলাকার মানচিত্রের সব খুঁটিনাটি তুলে আনা যায় না। ব্যাপারটি অনুধাবন করতে আমরা পৃথিবীকে কমলার সাথে তুলনা করতে পারি।

কমলার খোসাকে মানচিত্রের কাগজের প্রতিনিধিত্বকারী বলে বিবেচনা করতে পারি। কমলার খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে সমতলে বিছিয়ে দেবার চেষ্টা করলে দেখা যাবে কোনোভাবেই সমতল মানচিত্রের মতো হচ্ছে না। মাঝখান দিয়ে কাটতে হচ্ছে। ফলে তল অসম্পূর্ণ রয়ে যাচ্ছে, এবং এরপরও পুরোপুরি সমতল হচ্ছে না।

মার্কেটর প্রজেকশন মানচিত্রে গোলক আকৃতির পৃথিবীকে সমতল দেখানো হয়। মূলত পুরো গোলকটিকে একটি সিলিন্ডারে উন্নীত করা হয়, এতে করে আনুপাতিক হারে দেশের আঁকার পাল্টে যায়। সিলিন্ডারটির বক্রতলকে সমতলে বসিয়ে নিলে সবার জন্য বুঝতে সহজ মনচিত্রটি পাওয়া যায়।

চিত্রঃ মার্কেটর প্রজেকশনে মানচিত্রের রূপান্তর।

এমতাবস্থায় যে মানচিত্রটি সবচেয়ে ভালো উপযোগ দেবে সেটি ব্যবহার করাই উত্তম। নির্ভুলতার কথা চিন্তা করলে অবশ্যই গ্লোব বা গোলাকার মানচিত্রের উপরে কিছু নেই। কিন্তু মানচিত্র জিনিসটা যাদের বেশি কাজে লাগে তাদের বেলায় বড় আঁকারের গোলক বহন করা বেশ সমস্যাসাপেক্ষ ব্যাপার। আবার তুলনামূলক মাপজোখ করতে এটি অসুবিধাজনক।

গোলাকার মানচিত্র অধিকতর নির্ভুল হলেও উপযোগের দিক থেকে বিবেচনা করলে পিছিয়ে পড়বে। এই দিক থেকে মার্কেটর মানচিত্র সবথেকে কাজের। অনেক কাজের বলেই স্থান ও ব্যক্তি নির্বিশেষে সকলের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নাবিকদের জন্য এটি একটি আদর্শ ম্যাপ। তার উপর নাবিকদের কাছে মূল মানচিত্রের পাশাপাশি প্রতিটা স্থানের আলাদা আলাদা মানচিত্র আছে, যখন প্রয়োজন হয় তখন তা ব্যবহার করে নাবিকেরা। ছোট স্কেলে গোলাকার ও সমতলে পরিমাপের খুব বেশি পার্থক্য হয় না।

গোলক ও সরলরেখা নিয়ে এখানেও আরেকটা সমস্যার কথা বলি। আগে দেখেছিলাম পৃথিবীর সমতল মানচিত্রে আঁকা সোজা রেখা আসলে সর্বনিম্ন পথ রচনা করে না। পৃথিবীর এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যে পথে গেলে সর্বনিম্ন পথ রচিত হবে তা দেখতে বক্ররেখার মতো। যেমন নিচের চিত্রে ইয়োকোহামা থেকে পানামা খাল পর্যন্ত যাবার দুটি পথ আঁকা রয়েছে। একটি বক্র, আরেকটি সোজা। এখানে বক্ররেখাটিই সবচেয়ে কম পরিমাণ দূরের।

এমনটা হবার কারণ এই লাইনগুলো সমতলে চিত্রিত বলে। গোলাকার পৃথিবীর আকৃতিকে সমতলে রূপান্তরিত করে ফেললে তা বিকৃত হয়ে যায়। এই বক্ররেখাটিই যদি গ্লোব মানচিত্রে আঁকা হয় তাহলে স্পষ্ট দেখা যাবে এতক্ষণ যে রেখাটিকে বক্র, ও দূরের পথ রচনাকারী বলে মনে হয়েছিল, সেটি এখন সর্বনিম্ন পথ রচনা করছে।

তবে সমতলে বাঁকা রেখাতে পথ সর্বনিম্ন হলেও অনেক সময় নাবিকেরা সেটা জেনেও সর্বনিম্ন পথে ভ্রমণ করেন না। কারণ মাঝে মাঝে সর্বনিম্ন পথের রেখা এমন কিছু এলাকার উপর দিয়ে যায় যেদিক দিয়ে জাহাজ চালানো দুরূহ। যেমন বরফ। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাবার এমন অনেক সংক্ষিপ্ত পথ আছে যেগুলো এন্টার্কটিকার বরফের উপর দিয়ে গেছে।[৩] এমন পরিস্থিতিতে গোলকের আকৃতির প্রেক্ষাপটের সর্বনিম্ন পথ পরিহার করে সমতলের আপাত দৃশ্যমান সোজা পথ অনুসরণ করাই উত্তম। পৃথিবীর গোলাকৃতি যেমন সুবিধা দেয় তেমনই অল্প-বিস্তর অসুবিধার সৃষ্টিও করে।

Area of top 15 countries

(Millions of square kilometers)[৪]

Africa 30.4
Russia 17.1
Canada 10.0
China 9.6
U.S. 9.5
Brazil 8.5
Australia 7.7
India 3.3
Argentina 2.8
Kazakhstan 2.7
Algeria 2.4
DR Congo 2.3
Greenland 2.2
Saudi Arabia 2.1
Mexico 2.0
Indonesia 1.9

 

তথ্যসূত্র

[১] Mark Fischetti, Africa Is Way Bigger Than You Think, Scientific American Blog, http://blogs.scientificamerican.com/observations/africa-is-way-bigger-than-you-think/

[২] পূর্বোক্ত

[৩] জ্যোতির্বিদ্যার খোশখবর: ইয়াকভ পেরেলম্যান; অনুবাদ: শুভময় ঘোষ; অনুপম প্রকাশনী, ২০১০

[৪] Scientific American এর সৌজন্যে।

featured image: ian.macky.net

পেনসিল কীভাবে বানায়

আজকের লেখার শুরুতেই একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করা যাক। চিন্তা করুন আপনার ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা যখন আপনার মা অথবা বাবা হাতে হাত রেখে আপনাকে ‘অ আ ক খ’ আর ‘A B C D’ লেখা শেখাতেন। কী চমৎকারই না ছিল সেই দিনগুলো, তাই না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের হাতে লেখার দক্ষতা অর্জন করলেও ছোটবেলায় সঙ্গী পেনসিল কিন্তু আমাদের ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন ছবি আঁকাআঁকির কাজে আজও আমাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী কাঠের তৈরি এ জিনিসটি।

মজার ব্যাপার হলো আমরা অনেকেই জানি না কীভাবে বানানো হয় পেনসিল। একেবারে কাঠ থেকে শুরু করে পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত রুপে পেনসিল বানানোর পদ্ধতিটি জানলে খানিকটা আশ্চর্যই হতে হয়। আজ আমরা জানতে যাচ্ছি মজার সেই প্রক্রিয়াটিই।

পেনসিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সীস যা দিয়ে আমরা লেখালেখি কিংবা আঁকাআঁকির কাজ করি। এর ইংরেজি নাম Lead। নাম Lead হলেও বাস্তবে কিন্তু এ সীসের মধ্যে সীসা থাকে না, বরং সেখানে থাকে কার্বনের রূপভেদ গ্রাফাইট আর কাদামাটির সংমিশ্রণ। প্রথমে এ সীস বানানোর প্রক্রিয়াটি জেনে নেয়া যাক।

১. প্রথমে অনেকগুলো গ্রাফাইট খন্ড আর কাদামাটি নিয়ে সেগুলো একটি বিশালাকৃতির ঘূর্ণনশীল ড্রামে রাখা হয়। ড্রামে আগে থেকেই রাখা থাকে বড় বড় পাথরের টুকরা। যখন ড্রামটি ঘুরতে থাকে তখন পাথরের টুকরার চাপে গ্রাফাইট আর কাদামাটি একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পাউডারে পরিণত হয়ে যায়। এরপর এ মিশ্রণে পানি মিশিয়ে তিন দিনের মতো রেখে দেয়া হয়।

২. এরপর একটি মেশিনের সাহায্যে এ মিশ্রণ থেকে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এভাবে পাওয়া কাদার মতো পদার্থটিকে পরে চারদিনের জন্য রেখে দেয়া হয় যাতে এটি শুকিয়ে শক্ত হতে পারে।

ছবিতে একজন শ্রমিককে গ্রাফাইট-কাদামাটির পানি নিষ্কাশিত অবস্থাকে একটি কেবিনেটে রাখতে দেখা যাচ্ছে।

2

৩. মিশ্রণটি শুকিয়ে গেলে আরেকটি মেশিনের সাহায্যে একে আবার পাউডারে পরিণত করা হয়। এরপর সেখানে পানি মিশিয়ে মিশ্রণটিকে নরম করা হয়।

3

৪. নরম এ মিশ্রণকে পরে ধাতব টিউবের ভেতর ঢুকিয়ে চিকন রডের আকৃতি দেয়া হয়। এরপর সেই রডগুলোকে পেনসিলের সমান আকারে কাটা হয় মেশিনের সাহায্যে। সীসগুলোকে তারপর তুলে দেয়া হয় কনভেয়ার বেল্টে যেখানে তারা শুকাতে থাকে।

4

৫. শুকানোর পর সীসগুলোকে ওভেনে ১৮০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ফলে সীসগুলো আরো মসৃণ ও শক্ত হয়ে ওঠে।

5

এবার আসা যাক পেনসিলে ব্যবহৃত কাঠের কথায়। পেনসিলের জন্য এমন কাঠ বেছে নিতে হবে যা নিয়মিত কাটাকাটির ধকল সহ্য করতে পারে। অধিকাংশ পেনসিলের জন্যই সীডার গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয় কারণ এতে সুগন্ধ আছে। এছাড়া এর আকারও সহজে বিকৃত হয় না। এবার তাহলে এ কাঠের প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে জানা যাক।

6১. সীডার গাছের কাঠ কেটে ও দরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণের পর একে ব্লকের আকার দেয়া হয়।

২. ব্লকটি কেটে চিকন অনেকগুলো খণ্ডে বিভক্ত করা হয় যাকে ইংরেজিতে বলে স্ল্যাট (Slat)। এগুলো ৭.২৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ০.২৫ ইঞ্চি পুরুত্ব ও ২.৭৫ ইঞ্চি প্রস্থের হয়ে থাকে। কোম্পানিভেদে এ মাপ ভিন্ন হতে পারে। স্ল্যাটগুলোকে এরপর কনভেয়ার বেল্টে তুলে দেয়া হয়।

৩. এবার স্ল্যাটের তলকে মসৃণ করা হয়।

৪. বেল্টে থাকা অবস্থাতেই স্ল্যাটে অর্ধবৃত্তাকার খাঁজ কাটা হয়। খাঁজগুলোর পুরুত্ব হয় সীসের পুরুত্বের অর্ধেক।

৫. এরপর স্ল্যাটগুলোতে আঠা লাগানো হয় আর খাঁজের ভেতরে পেনসিলের সীসগুলো বসিয়ে দেয়া হয়।

৬. উপরের চারটি ধাপ যখন চলছিল তখন আরেকটি কনভেয়ার বেল্ট অন্য আরেক ব্যাচ স্ল্যাট বহন করে আনছিল। এগুলোর আকার, খাঁজের ধরণ সবই পূর্বোক্ত স্ল্যাটগুলোর মতোই। শুধু এগুলোতে কোনো আঠা লাগানো থাকে না এবং খাঁজগুলোতে কোনো সীসও রাখা থাকে না। একসময় এসব স্ল্যাটকে ৪র্থ ধাপে উল্লেখ করা স্ল্যাটগুলোর উপর বসিয়ে দেয়া হয়। এভাবে একটি স্যান্ডউইচ বানানো হয়। এসব স্যান্ডউইচকে বেল্ট থেকে তুলে ক্ল্যাম্পের সাহায্যে আটকে রাখা হয়। এরপর এগুলোকে হাইড্রোলিক প্রেসের সাহায্যে চাপ দেয়া হয় যাতে বাড়তি আঠা চারপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে। তখনও স্যান্ডউইচগুলোকে ক্ল্যাম্পে আটকে রাখা হয় শুকানোর জন্য। শুকিয়ে গেলে বাড়তি আঠাগুলো ছেঁটে ফেলা হয়।

৭. এবার স্যান্ডউইচগুলোর দায়িত্ব নেয় কাটিং মেশিন। দ্রুত ঘুর্ণায়মান স্টিল ব্লেডের সাহায্যে এগুলোকে বৃত্তাকার অথবা ষড়ভূজাকার করে কাটা হয়।

৮. একই মেশিনের সাহায্যে প্রতিটি স্ল্যাট থেকে ৬-৯টি পর্যন্ত আলাদা আলাদা পেনসিল কেটে নেয়া হয়।

৯. প্রতিটি পেনসিলকে এরপর মসৃণ করা হয় এবং বার্নিশ করে শুকানো হয়। এ কাজগুলোও করা হয়ে থাকে মেশিনের সাহায্যে। যতক্ষণ না পেনসিলে কাঙ্ক্ষিত রঙ ফুটে উঠে ততক্ষণ এ প্রক্রিয়াটি বারবার চলতে থাকে।

১০. সবার শেষে এসব পেনসিলের পেছনে আঠা অথবা ধাতব কাঁটার সাহায্যে ধাতব কেস লাগানো হয়। এরপর এসব কেসের ভেতর ইরেজার বসিয়ে দিলেই তৈরি হয়ে যায় একেকটি পেনসিল।

গ্রাফাইট খন্ড দিয়ে সীস বানানো থেকে শুরু করে সীডার গাছের কাঠ দিয়ে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ একটি পেনসিল পাওয়ার পেছনের প্রযুক্তিগুলো আসলেই বেশ চমৎকার। পেনসিল বানানোর কৌশলের ইতি টানছি এখানেই। তবে শেষ করার আগে একটি মজার ঘটনা বলে বিদায় নিচ্ছি।

হাইমেন লিপম্যান ছিলেন একজন আমেরিকান। একসময় তিনি খেয়াল করলেন পেন্সিল আর ইরেজার আলাদা থাকায় অনেক সময়ই তাকে কিছু ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এ ঝামেলা থেকেই তিনি পেয়ে গেলেন এক নতুন আইডিয়া, পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগিয়ে দিলেই তো হয়! আইডিয়াটি তিনি শুধু নিজের পেন্সিলে কাজে লাগিয়েই থেমে যান নি। বরং ১৮৫৮ সালের ৩০ মার্চ তিনি এ আইডিয়াটি নিজের নামে পেটেন্টও করিয়ে নেন। ফলে পেন্সিলের পেছনে ইরেজার লাগানোর প্রথম রেজিস্টার্ড কৃতিত্বটুকু বগলদাবা করে নেন লিপম্যান।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না, বরং এখন তা শুরু হতে যাচ্ছে। ১৮৬২ সালে লিপম্যান তার পেটেন্টটি ১,০০,০০০ ডলারে জোসেফ রেকেনডর্ফার নামে এক লোকের কাছে বিক্রি করে দেন! ভাবা যায়? সেই আমলের এক লাখ ডলার!

১৮৭৫ সালে শুরু হয় এ ঘটনার ট্রাজেডিক অংশটুকু। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট লিপম্যানের এ উদ্ভাবনকে বাতিল ঘোষণা করে। কারণ তাদের মতে লিপম্যান নতুন কিছু করেন নি বরং প্রচলিত দুটি জিনিসকে একত্রিত করেছেন মাত্র! অবশ্য ততদিনে তো লিপম্যানের পকেট ঠিকই ফুলে উঠেছিল।

 

মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক
সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

বিচিত্র কাপ

ভিক্টোরিয়ান যুগে পুরুষদের মুখের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল গোঁফ। এমনকি নিজেদের বড় গোঁফকে শক্ত রাখতে তারা তাতে মোমও ব্যবহার করতো! কিন্তু বিপত্তি বাধতো চা পানের সময়। চায়ের গরম ধোঁয়ায় সেই মোমের কিছুটা গলে কাপে পড়ে গিয়ে বিচ্ছিরি এক ব্যাপার ঘটতো। তাই সেই যুগের ‘আসল পুরুষ’দেরকে এমন ঝামেলা থেকে বাঁচাতে ১৮৬০ সালে এগিয়ে আসেন এক ইংরেজ, নাম হার্ভে অ্যাডামস।

তিনি কাপের একদিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির এ ধারকটি যুক্ত করে দেন যাতে করে সেটা অনেকটা গোঁফের কেস হিসেবে কাজ করতো। ফলে চা পানের বেলায় উটকো ঝামেলায় পড়া থেকে বেঁচে যায় গোঁফধারী সকলেই।

featured image: yandex.ru

বিড়ালের লেখা বৈজ্ঞানিক পেপার

১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বরে Physical Review Letters-এ একটি পেপার প্রকাশ করা হয় ‘Two-, Three- and Four- Atom Exchange Effects in bcc3 He’ নামে। সেই পেপারের লেখক ছিলেন দুজন, জে. এইচ. হেথারিংটন ও এফ. ডি. সি. উইলার্ড। হেথারিংটন ছিলেন মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। পেপারটি বেশ মানসম্মত ছিল বলে আজও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর রেফারেন্স দেয়া হয়। কিন্তু হেথারিংটন যখন এটি সাবমিট করতে গিয়েছিলেন, তখন বেধেছিলো এক উটকো ঝামেলা।

পুরো পেপারটির জন্য কাজ করেছিলেন হেথারিংটন একাই। নিজের কৃতিত্বের ভাগ তিনি অন্য কাউকে দিতে চাননি। কিন্তু পেপারে সব জায়গায় তিনি ‘আমি’র বদলে ‘আমরা’ ব্যবহার করেছিলেন। কাজ করেছিলেন তিনি একাই, কিন্তু পেপারটির ভাষা দেখে মনে হবে তিনি দলবদ্ধভাবে কাজ করেছিলেন। ওদিকে পেপারের লেখকের জায়গায় আবার শুধু তার নামই ছিলো, অন্য কারো না।

চিত্রের এই বিড়ালটি কিন্তু প্রতীকী বিড়াল। জার্নাল পেপারের লেখকের স্বীকৃতি পাওয়া বিড়াল নয়; image source: academiaobscura.com

এখানেই বাঁধে বিপত্তি, কারণ জার্নালটিতে লেখা প্রকাশের নীতিমালায় বলেই দেয়া ছিলো যে, একাধিক লেখক না থাকলে ‘আমরা’ ব্যবহার করা যাবে না। এখন সমস্ত পেপার খুঁজে সব জায়গায় ‘আমরা’ কেটে আবার ‘আমি’ বসানোর কোনো ইচ্ছাও তার ছিল না। তাই চুপচাপ নিজের সেক্রেটারিকে ডেকে বলে দিলেন শুধু টাইটেল পেজ পরিবর্তন করে সেখানে লেখকের জায়গায় তার পোষা বিড়ালের নামটিও যোগ করে দেয়ার জন্য! এভাবেই আসলো পেপারটির সহ-লেখক ‘এফ. ডি. সি. উইলার্ড’-এর নাম, যার পূর্ণ রুপ Felis Domesticus Chester Willard।

এফ. ডি. সি. উইলার্ড বিড়ালের হাতের ছাপের সাক্ষর।

হেথারিংটনের তার ১০ জন বন্ধুকে সেই পেপারটির সাইন করা কপি দিয়েছিলেন। এর বাম পাশে ছিলো তার নিজের সাইন, আর ডানদিকে ছিলো উইলার্ডের থাবার ছাপ! আর উইলার্ডের পরিচয়ও অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। একবার একজন এসে হেথারিংটনের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাকে না পাওয়ায় সেই আগন্তুক এরপর উইলার্ডের সাথে দেখা করতে চান। এরপরই থলের ভেতর থেকে উইলার্ড নামক বেড়ালের উইয়ার্ড ঘটনাটি বেরিয়ে আসে।

feature image: thehistoryofrome.typepad.com (চিত্রের এই বিড়ালটি প্রতীকী বিড়াল। জার্নাল পেপারের লেখকের স্বীকৃতি পাওয়া বিড়াল নয়) 

কলমের ক্যাপে ছিদ্র থাকে কেনো?

ফ্রান্সের বিখ্যাত এক বলপয়েন্ট কলম নির্মাতা কোম্পানি হলো Société Bic। কোম্পানিটি তাদের বানানো কলমগুলোর ক্যাপের অগ্রভাগে ছোটখাট একটি ছিদ্র রেখে দেয়। কেন? অনেকেই আছে যারা কোনো কিছু লেখার সময় চিন্তার রাজ্যে ডুবে গেলে কলমের ক্যাপ কামড়ে একেবারে দফারফা করে ছাড়ে। আর এ বদভ্যাস ‘পালন’ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত ক্যাপ গিলে ফেলার ঘটনাও বিরল নয়।

মাত্র ৯ বছর আগেই এমন এক দুর্ঘটনায় দম বন্ধ হয়ে যুক্তরাজ্যের বেন স্টিরল্যান্ড নামের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর মারা গিয়েছিল। তাই কলমের ক্যাপ গিলে ফেললেও ইমার্জেন্সি হিসেবে যাতে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ না হয়ে যায় সেজন্যই এ ছিদ্রটি করে রাখা।

image source: factrider.com

featured image: officesuppliesblog.co.uk