ডাচ দুর্ভিক্ষ ও আমাদের জিনের গল্প

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়। নেদারল্যান্ডসের রেলওয়ে শ্রমিকেরা নাৎসি বাহিনীর এগিয়ে যাওয়া ঠেকাতে রেলপথ অবরোধ ঘোষণা করে। শাস্তিস্বরূপ, নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে পশ্চিম নেদারল্যান্ডসে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ৬ সপ্তাহ পর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও বিধ্বস্ত রেলওয়ে ব্যবস্থা, জার্মান বাহিনীর খাদ্য বাজেয়াপ্তকরণ, আগের চার বছরের বিরূপ আবহাওয়া- সব মিলিয়ে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হয় কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা মানবসৃষ্ট এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের।

১৯৪৫ সালে নাৎসি বাহিনীর কাছ মুক্তির আগে এই দূর্ভিক্ষে ততদিন পর্যন্ত ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পরিচিত Hunger winter (The Dutch famine, 1944-45) নামে।

কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে এই ডাচ দুর্ভিক্ষ বেশ অনন্য। এর শুরু এবং শেষ বেশ আকস্মিক ছিল। যার কারণে একে তুলনা করা যায় জনস্বাস্থ্যের উপর ঘটে যাওয়া এক অপরিকল্পিত পরীক্ষা হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা এসময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। দুর্ভিক্ষের শিকার এই মায়েদের গর্ভ থেকে জন্মানো শিশুরা সারাজীবন এর ছাপ বয়ে বেড়িয়েছে।

চিত্র: ডাচ দুর্ভিক্ষের এক অসহায় শিকার

বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য, খাদ্যাভাবে জন্মানো এই শিশুরাই তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন এসে গড়পড়তা মানুষের তুলনায় কয়েক পাউন্ড বেশি ওজন বহন করেছে। মধ্য বয়সে এসে রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

মাতৃগর্ভ থেকে দুর্ভিক্ষের প্রভাবে বড় হয়ে উঠা এসব মানুষের মধ্যবয়স কেটেছে মোটাপন, ডায়াবেটিস, সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ মোকাবেলা করে। এই ঘটনার উপর গবেষণা চালানোর জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে বেছে নিলেন, Retrospective research পদ্ধতি, অর্থাৎ পেছনে ফিরে গিয়ে এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে উপসংহারে পৌঁছানো।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এল এইচ লুমেই ১৯৪০ সালে জন্মানো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানালেন, এই দুর্ভিক্ষের সময়ে জন্মানো মানুষের মাঝে স্বাভাবিকের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। তবে তা ৬৮ বছর বয়স পেরোনোর পর।

কিন্ত কীভাবে একজনের শরীর তার মাতৃগর্ভের পরিবেশ মনে রেখে দিতে পারে? শুধু মনে রেখে দিতে পারে তা-ই নয়, কীভাবে এর প্রভাব এত বছর পরেও পড়তে পারে? ড. হেইমেন, ড. লুমেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে জিন সাইলেন্সিং (Gene silencing)-এর মধ্যে।

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে একইরকম জিন থাকে। সব কোষের জিনের ভেতরকার গঠন একইরকম। অর্থাৎ ধরুন, আপনার চোখের কোষের জিনের একটি অংশ বলছে, তার গঠনের সজ্জা ATCCCGTA। আবার, হাড়ের কোষের একটি জিনের একটি অংশের গঠন ATCCCGTA। একইরকম। কিন্তু তারপও চোখের কোষ আর হাড়ের কোষ তো এক নয়। কেন তবে এই পার্থক্য? এক হয়েও কেন এক নয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে এপিজেনেটিক্সের মধ্যে। আমাদের দেহের ডিএনএ কিন্তু খুব সহজ-সরল লাঠির মতো আমাদের দেহে শুয়ে নেই। বরং তাদের অবস্থা অনেকটা স্প্রিংয়ের কুণ্ডলীর মতো। আমরা যখন বলি অমুক কোষে এই জিন প্রকাশিত নয়, তখন আসলে কী বোঝানো হয়? এই জিনের expression নেই বা এই জিন silenced বলতে আমরা বোঝাই এই জিন কোনো প্রোটিন তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। Gene silencing অথবা expression অনেকভাবেই হতে পারে, যার মধ্যে একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে, ডিএনএ মিথাইলেশন।

ধরে নেওয়া যাক, এক একটি মিথাইল (CH3-) গ্রুপ এক একটি পাথরের মতো (পরবর্তী পৃষ্ঠার চিত্র খেয়াল করুন)। DNA-র জায়গায় জায়গায় এই পাথর বসতে পারে। যখন DNA-র উপর এই পাথর চেপে বসে তখন এই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা DNA-র কুণ্ডলী কিছুটা খুলে যায়। ফলে বাইরের প্রোটিনের সাথে আর যোগাযোগ করতে পারে না। এই যোগাযোগহীনতার ফলশ্রুতিতে DNA বাইরের কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে মিলেমিশে আর কাজ করতে পারে না। তাই আর নতুন প্রোটিনও তৈরী হয় না।

আবার ফিরে আসি ডাচ দুর্ভিক্ষের গল্পে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করেছিলেন সেই ১৯৯০ সাল থেকে। ড. লুমেই ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় জন্মানো তৎকালীন মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত নিলেন। তুলনামূলক পরীক্ষার জন্য আরো রক্ত নিলেন দুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মানো তাদের ভাইবোনদের। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রক্ত থেকে ডিএনএ নিয়ে তারা মনোযোগ দিলেন DNA-র কোথায় কেমন মিথাইলেশন ঘটেছে তা দেখায়।

তারা খুঁজছিলেন এমন কোনো জায়গায় কোনোভাবে মিথাইলেশন হয়েছে কিনা যা দুর্ভিক্ষের সময় জন্মগ্রহণকারীদুর্ভিক্ষের আগে বা পরে জন্মগ্রহণকারীর মধ্যে আলাদা। পেয়েও গেলেন তারা এরকম। যেমন- দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম নেয়া লোকদের মাঝে এক মিথাইল গ্রুপ পাওয়া গেলো যারা PIM3 জিনের প্রকাশে বাধা দেয়। এই PIM3 জিন শরীরের ক্যালরি খরচে কাজ করে, এই জিন কাজ করতে না পারার ফলে ক্যালরি খরচ হয় না এবং ওজন বেড়ে যায়।

চিত্র: উপরের অংশে দেখা যাচ্ছে কুণ্ডলী পাকানো ডিএনএ কিছুটা খুলে এক বিশেষ প্রোটিন (সবুজ বর্ণের, RNA polymerase II) এর সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। ফলে জিনের প্রকাশ বা ট্রান্সক্রিপশন ঘটছে। ফলে RNA এবং পরবর্তীতে প্রোটিন তৈরী হবে।

নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে মিথাইলেশনের কারণে (ছোট ছোট গাঢ় ডট) DNA খুব শক্তভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে, ফলে কোনো প্রোটিন (ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর) তার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। যার কারণে কোনো RNA এবং প্রোটিন তৈরি হচ্ছে না।

তাই তত্ত্ব এই দাঁড়ালো যে, ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় দুর্ভিক্ষপীড়িত মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর PIM3 জিনে মিথাইলগ্রুপ যোগ হয়, যা PIM3 জিনকে কম সক্রিয় বানায় এবং যা চলতে থাকে পুরো জীবন জুড়ে। ডাচ দুর্ভিক্ষের সময় প্রচুর গর্ভপাত, অকাল মৃত্যু ঘটেছে। হয়তোবা যেসব শিশু তখন সুস্থভাবে জন্মগ্রহণ করতে পেরেছে তাদের জিনে এই এপিজেনেটিক্স বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বদল ঘটাতে পেরেছিল যার কারণে তাদের এই বেঁচে থাকা সম্ভব হয়েছে।

যেমন- যদি আপনি কম খাদ্য পান তবে কি কম ক্যালরি খরচ করতে পারা নাকি স্বাভাবিকভাবে ক্যালরি খরচ করতে পারা হবে আপনার জন্য সুবিধাজনক? ভেবে দেখুন।

তবে এখনো এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এখনো আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম এ ব্যাপারে নতুন সংবাদ শোনার জন্য।

তথ্যসূত্র

https://nytimes.com/2018/01/31/science/dutch-famine-genes.html

featured image: myajc.com

মাল্টিপল অ্যালিল এবং পিতৃত্বের জটিলতা

রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ প্রকার ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত হলো ABO এবং Rh ফ্যাক্টর ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম।

ABO সিস্টেম অনুযায়ী চার ধরনের ব্লাড গ্রুপ বিদ্যমান। A, B, AB এবং O। গ্রুপগুলো মূলত লোহিত রক্ত কণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের ধরনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। A গ্রুপের লোহিত কণিকায় একধরনের গ্লাইকোলিপিড থাকে আর B গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের। AB গ্রুপে থাকে উভয় ধরনের আর O গ্রুপে থাকে না কোনোটিই।

জিনতত্ত্ব বলছে সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বায়ী হলো জিন। তেমনই ABO ব্লাড গ্রুপের জন্যও দায়ী হলো জিন। A গ্রুপের জন্য আছে A অ্যালিল, B গ্রুপের জন্য B অ্যালিল, AB গ্রুপের জন্য A ও B উভয় অ্যালিল এবং O গ্রুপের জন্য নাল (শূন্য) অ্যালিল।

অ্যালিল আবার কী জিনিস? গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আছে দুটি করে অ্যালিল। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এটি অনুধাবন করতে হলে কলেজ পর্যায়ের জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা চাই।

ধরি কোনো একটি ইঁদুরের লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য জিন আছে। এর জিনোটাইপ (Tt)। এক্ষেত্রে লম্বা লেজ (T), খাটো লেজের (t) উপর প্রকট। ইঁদুরের দেহে লম্বা (T) লেজের জিন এসেছে তার পিতার জনন কোষ থেকে আর খাটো (t) লেজের জিন এসেছে তার মাতার জনন কোষ থেকে। ইঁদুরের লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য পিতা (T) এবং মাতা (t) থেকে আগত জিন দুটির একটিকে অপরটির অ্যালিল বলে।

চিত্র: মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যালিল সঞ্চারণ

অর্থাৎ মেন্ডেলিয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি জিনের দুটি করে চেহারা বা রূপ থাকে। প্রতিটি চেহারাকে অ্যালিল বলে। এ দুটির একটি অ্যালিল আসে মাতা থেকে আর অন্যটি আসে পিতা থেকে।

কিন্তু এ নিয়ম ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। কেননা এখানে লোহিত রক্তকণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের জন্য রয়েছে A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল। তিনটি অ্যালিল কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে? একে মেন্ডেলিয় তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এরূপ ঘটনাকে বলা হয় মাল্টিপল অ্যালিল।

যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুইয়ের অধিক অ্যাালিল কাজ করে তখন তাকে মাল্টিপল অ্যালিল বলে। মজার বিষয় হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক অ্যালিল থাকলেও ডিপ্লয়েড জীব বলে আমাদের কোষে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকা সম্ভব। মাল্টিপল অ্যালিল ব্যাপারটি সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্যাচ লেগে গেল? তাহলে একটু গল্পের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। ধরি বাসায় ১০ জন মানুষ আছে। সবার জন্য বিস্কুট আনা হলো বাজার থেকে। তিন ধরনের বিস্কুট আছে- অরেঞ্জ বিস্কুট, চকলেট বিস্কুট এবং লেমন বিস্কট। কিন্তু শর্ত হলো প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র দুটি করে বিস্কুট নিতে পারবে। এ শর্তে বিস্কুট বন্টনের পর দেখা যাবে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেকোনো একধরনের দুটি বিস্কুট (অরেঞ্জ-অরেঞ্জ, চকলেট-চকলেট, লেমন-লেমন) বা দুটি ভিন্ন ধরনের বিস্কুট (অরেঞ্জ-লেমন, অরেঞ্জ-চকলেট, চকলেট-লেমন) বিদ্যমান।

তাহলে সবাই কী ধরনের খাবার পেয়েছে? বিস্কুট পেয়ছে। কিন্তু বিস্কুটের ধরন ছিল ভিন্ন। তাহলে সামগ্রিকভাবে ১০ জনের জন্য কত ধরনের বিস্কুট ছিল? তিন ধরনের। ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক পদ্ধতি বিদ্যমান। সকল মানুষের রক্তের জন্য A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল বিদ্যমান।

আগের উদাহরণে সবার জন্য যেমন বিস্কুট ছিল তেমনই এ ক্ষেত্রেও সকল মানুষের লোহিত রক্তকণিকার জন্য আছে একটি ABO জিন। কিন্তু বিস্কুটের যেমন তিনটি ধরন ছিল তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও ABO জিনের ধরন তিনটি। এদের নাম হলো A, B এবং O অ্যালিল।

কিন্তু যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব তাই আমাদের কোষে শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকতে পারে। তাই ABO জিনের ক্ষেত্রে তিনিটি অ্যালিল থাকলেও জীনোটাইপ হবে শুধুমাত্র AA, AO, BB, BO, AB এবং OO। মানে মানুষের সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যালিল প্রযোজ্য, কিন্তু একটি মাত্র মানুষের দেহে অ্যালিল থাকবে দুটি।

চিত্র: ABO ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে মাল্টিপল অ্যালিল পদ্ধতিতে সন্তানে অ্যালিল সঞ্চারণ

এ নিয়ম অনুযায়ী পিতা যদি হয় A ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ AO) এবং মাতা যদি হয় B ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ BO) তাহলে সন্তানের ব্লাড গ্রুপ A, B, AB এবং O এই চার ধরনেরই হতে পারে। আর যদি পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BO হয় তাহলে সন্তান হবে A এবং AB এই দুই গ্রুপের।

পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে শুধুমাত্র AB গ্রুপের। পিতার জিনোটাইপ AO মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে AB এবং B ব্লাড গ্রুপের। পিতামাতা উভয় O হলে সন্তান সবাই O হবে।

A ও B জিন দুটি সমান প্রকট হওয়ায় তারা একত্রে থাকলে উভয়েই সমানভাবে প্রকাশ লাভ করে এবং AB ব্লাড গ্রুপ গঠন করে। কিন্তু O জিন প্রচ্ছন্ন হওয়ায় A বা B জিনের সাথে থাকলে প্রকাশ লাভ করে না। শুধুমাত্র O জিন থাকলে প্রকাশ লাভ করে O ব্লাড গ্রুপ গঠন করে।

ABO ব্লাড গ্রুপ কি সবসময় এ নিয়ম মেনে চলে? মাঝে মাঝে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ম অনুযায়ী মাতা B এবং পিতা O ব্লাড গ্রুপ হলে সন্তান B কিংবা O ব্লাড গ্রুপের হওয়া সম্ভব। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানের এক পরিবারে দেখা গেল স্বামীর ব্লাড O আর স্ত্রীর ব্লাড B গ্রুপের হলেও সন্তানের ব্লাড গ্রুপ হয়েছে A। বাঁধল ঝামেলা, অভিযোগ আসল উনি এই সন্তানের বাবা নন!

আদালত পর্যন্ত গড়ালে পরে গবেষণা করে জানা গেল উনিই আসল বাবা। কিন্তু এই তথৈবচ ঘটনা কীভাবে ঘটল? মূলত এমন ব্যতিক্রম হয়েছে মিউটেশনের ফলে। কীভাবে? চলুন জেনে আসি।

খুব সহজে বলতে গেলে ডিএনএ’র মাঝে যেকোনো পরিবর্তন হওয়াকে মিউটেশন বলে। কোষ বিভাজনের পূর্বে ডিএনএ অনুলিপনের সময়ও ডিএনএতে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। জন্মের সময় আমাদের দেহে গড়ে প্রায় ১০০ বা তারও বেশি সংখ্যক মিউটেশন ঘটে থাকে।

চিত্র: AO এবং BO জিনোটাইপের পিতামাতার সন্তানের ব্লাড গ্রুপ

আমরা জানি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অংখ্য অণু দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে নাইট্রোজেন বেস। জিন হলো একটি রেসিপি যে রেসিপি অনুসরণ করে প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করা হয়। ABO ব্লাড গ্রুপের জন্য A, B এবং O অ্যালিল দায়ী।

এ তিনটি অ্যালিলের মাঝে গাঠনিক পার্থক্যও সামান্য, তাই এদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন ব্লাড গ্রুপের ব্যতিক্রমের কারণ হতে পারে। A ও O অ্যালিলের মধ্যে মাত্র একটি নাইট্রোজেন বেসের পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে A ও B অ্যালিলের মাঝে পার্থক্য সাতটি নাইট্রোজেন বেসে।

চিত্র: A, B এবং O অ্যালিলের গাঠনিক পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটিমাত্র বেস কম থাকা বা সাতটি ভিন্ন বেস থাকা তেমন কিছু না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি জিনের ক্ষেত্রে তিনটি করে বেস একটি জেনেটিক কোড হিসেবে কাজ করে। তাই যেকোনো একটি বেসে পরিবর্তন হলে সম্পূর্ণ কোডটিকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, The old man had one new hat. বাক্যটিতে প্রতিটি শব্দে তিনটি করে অক্ষর আছে। বাক্যের প্রতিটি অক্ষরকে নাইট্রোজেন বেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

এখন যদি প্রথম শব্দ থেকে একটি অক্ষর E কমে যায় তাহলে বাক্যটি হয়, Tho ldm anh ado nen ewh am. নতুন বাক্যে যদিও তিনটি করে অক্ষর একত্রিত হয়েছে কিন্তু একটিমাত্র অক্ষর হারিয়ে গেছে বলে বাক্যটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন। জিনে সামান্য মিউটেশনের ফলে অনেকটা এরূপ ঘটনাই ঘটে থাকে। অল্প একটু পরিবর্তনে বিশাল ফলাফল।

এরকম এক মিউটেশনের ফলেই A ব্লাড গ্রুপ থেকে O ব্লাড গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। সদূর অতীতে A ব্লাড গ্রুপের জিনের মিউটেশনের ফলে একটি নাইট্রোজেন বেস হারিয়ে গেলেই আবির্ভাব হয় নতুন ব্লাড গ্রুপ O এর।

তাহলে কি B ব্লাড গ্রুপ থেকে A ব্লাড গ্রুপ পাওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, মিউটেশনের ফলে এটিও সম্ভব। ধরুণ, আবুল নামের এক ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ B এবং ব্লাড গ্রুপের জিনোটাইপ BO। তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম অনু্যায়ী উনার প্রতিটি শুক্রাণুতে হয় B অ্যালিল থাকবে নয়ত O অ্যালিল। কারণ জনন কোষ হলো হ্যাপ্লয়েড তাই কেবল একটি করে অ্যালিল অবস্থান করবে।

আগেই জেনেছি যে O অ্যালিল দেখতে অনেকটা A অ্যালিলের মতো, শুধুমাত্র একটি নাইট্রোজেন বেস কম রয়েছে। তাই আবুল সাহেবের শুক্রাণু গঠনের পূর্বে যদি রিকম্বিনেশনের ফলে B ও O অ্যালিলের মাঝে অংশ বিনিময় হয়, তাহলে O অ্যালিল তার হারানো নাইট্রোজেন বেস ফিরে পেয়ে A অ্যালিল রূপে কাজ করতে পারে। এরূপ মিউটেশন হলে আবুল সাহেবের শুক্রাণু A অ্যালিল বহন করবে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব ছিল। এই শুক্রাণু A বা O অ্যালিল বিশিষ্ট্য ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন হবে।

চিত্র: BO জিনোটাইপের ব্লাডে মিউটেশনের ফলে A গ্রুপ সৃষ্টি

পূর্বে উল্লিখিত জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিল। এ দম্পতির মাঝে স্বামীর যেহেতু ব্লাড গ্রুপ O তাই তার সকল শুক্রাণু O অ্যালিল বহন করবে। কিন্তু স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ B বলে চিত্রে উল্লিখিত মিউটেশন হলে তার ডিম্বাণু B বা O এর পরিবর্তে A অ্যালিল বিশিষ্ট্য হতে পারবে। আবুল সাহেবের মতো একই মিউটেশনের ফলে স্ত্রীর ডিম্বাণু A অ্যালিল বহন করে যা স্বামীর O অ্যালিল বিশিষ্ট্য শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন করে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সন্তানের B বা O ব্লাড গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল।

চিত্র: জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা

শেষ বেলায় আরো একটি তথ্য দিতে চাই। শুধুমাত্র ABO ব্লাড গ্রুপ নয়, অন্য কোনো জিনের ক্ষেত্রেও মিউটেশন বা রিকম্বিনেশনের ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা দেখা যেতে পারে।