হাবল কীভাবে গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করেছিলেন?

গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত অপসারিত হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। এ নিয়ে বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের সূত্র আছে। সূত্রের সাহায্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতিবেগ সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

হাবল তো আর এমনিতেই এই ধারণাটি পাননি। তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় হাবল কীভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করলেন? এর জন্য তিনি সেসব গ্যালাক্সি থেকে নির্গত আলোর লাল সরণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। লাল সরণ বিশ্লেষণ করলে গতিশীল বস্তুর বেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

ধরি একজন দর্শক একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং একটি গাড়ি সাইরেন বাঁজাতে বাঁজাতে যাচ্ছে। গাড়িটি যখন দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যায় তখন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতাও কমে যায়। গাড়ির গতিবেগ যত বেশি হবে তীক্ষ্ণতার পরিবর্তনও হবে তত বেশি। কোনোভাবে যদি সাইরেনের শব্দের কম্পাংক জানা যায় তাহলে সেখান থেকে গাড়িটির বেগ বের করা সামান্য কিছু গাণিতিক হিসেবের ব্যাপার মাত্র। সাইরেনের প্রারম্ভিক কম্পাংক এবং দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংককে তুলনা করলেই গাড়িটির গতিবেগ বের হয়ে যাবে।

কোনো একটি উৎস যদি আলো বা শব্দের মতো কোনো সিগন্যাল প্রেরণ করতে থাকে তাহলে তার প্রারম্ভিক সিগন্যালগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম্পন সম্পন্ন করবে। কিন্তু যখন এই সিগন্যাল কোনো দর্শকের কাছে পৌঁছুবে তখন দর্শকের সাপেক্ষে এর কম্পনের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

দর্শকের সাপেক্ষে উৎস কত বেগে চলমান কিংবা উৎসের সাপেক্ষে দর্শক কত বেগে চলমান তার উপর নির্ভর করে সিগন্যালের কম্পন কত হবে। উৎস যদি দর্শকের কাছে আসতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের অধিক কম্পন অনুভব করবে। কারণ সেক্ষেত্রে সিগন্যালের কম্পন বা স্পন্দনগুলো ঘন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে উৎস যদি দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের স্বল্প কম্পন অনুভব করবে।

চিত্র: সাইরেনের কম্পাংক জানলেই বের হয়ে আসবে গাড়ির গতিবেগ। ছবি: সিকে

চমকপ্রদ এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান জোহান ডপলার (১৮০৩–১৮৫৩)। তার নাম অনুসারেই সিগন্যাল বা তরঙ্গের বিশেষ এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ডপলার প্রভাব। বিখ্যাত একটি পরীক্ষণের মাধ্যমে শব্দের ডপলার প্রভাবের সঠিকতা যাচাই করে দেখেছিলেন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ হেনড্রিক (১৮১৮–১৮৯০)।

দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই ডপলার প্রভাবকেই ব্যবহার করেছিলেন। দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে নির্গত আলোর স্বাভাবিক কম্পাংক এবং ঐ একই আলোর দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংকের মাঝে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থেকেই হাবল তাদের বেগ নির্ণয় করেছিলেন।

কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়? নিম্নবর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যাবে। তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের অনেকগুলো রূপ আছে। তাদের মাঝে একটি হলো আলো। এই বিকিরণকে তরঙ্গের মতো করে সাদামাটাভাবে নীচের চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। কয়েকটি শীর্ষ আছে এখানে। দুটি শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বলা হয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য। এই বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যখন ০.০০০০২ থেকে ০.০০০১ সেন্টিমিটারের মাঝে থাকবে তখন একে আমরা বলি ‘আলো’। কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই সীমা পর্যন্ত আমাদের চোখ সংবেদনশীল।

চিত্র: দুই শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

এর চেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। সেসবের উদাহরণ ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও ওয়েভ। ইনফ্রারেড বিকিরণ হলো তাপ। উত্তপ্ত বস্তু থেকে এটি বের হয়। আলোর চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। এর উদাহরণ আল্ট্রাভায়োলেট, এক্স-রে এবং গামা রে। নীচের সারণিতে এই বিকিরণগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো।

বিকিরণের প্রকৃতি তরঙ্গদৈর্ঘ্য (সেন্টিমিটার)
রেডিও ১০ এর চেয়ে বড়
মাইক্রোওয়েভ ০.০১ – ১০
ইনফ্রারেড (তাপ) ০.০০০১ – ০.০১
দৃশ্যমান আলো ০.০০০০২ – ০.০০০১
অতিবেগুনী রশ্মি ১০-৭ – ০.০০০০২
এক্স-রে ১০-৯ – ১০-৭
গামা রে ১০-৯ এর চেয়ে ছোট

সারণি: তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও বিকিরণের প্রকৃতি

তরঙ্গদৈর্ঘ্য যা-ই হোক, সকল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ একই বেগে চলে। সকলের বেগই আলোর বেগের সমান। তরঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘কম্পাংক’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। কোনো বিকিরণ প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো কম্পন সম্পন্ন করে তাকে বলা হয় কম্পাংক। পূর্ববর্তী চিত্রে কতগুলো পূর্ণ তরঙ্গ দেখানো হয়েছে। একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হলে একে বলা যায় একটি কম্পন।

প্রতি সেকেন্ডে এরকম হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ কম্পন সম্পন্ন করে তড়িৎচুম্বকের একেকটি বিকিরণ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাংক পরস্পর সম্পর্কিত। আলোর বেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে কম্পাংক পাওয়া যায়। এ হিসেবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বড় হবে বিকিরণের কম্পাংক তত কম হবে। উল্টোভাবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হবে কম্পাংক তত বেশি হবে।

কোনো নক্ষত্র কিংবা কোনো গ্যালাক্সি সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিকিরণ করে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে ঘটা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া (mechanism)-র ফলে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটে চলছে। এর ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপ ও আলোক শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। নক্ষত্র সেই তাপ ও আলোক শক্তিকে বিকিরণের মাধ্যমে চারদিকে নিঃসরণ করে দিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছে।

চিত্র: নক্ষত্রগুলো প্রতিনিয়ত বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ছবি: নাসা/উইকিমিডিয়া কমন্স

বিশাল নক্ষত্র ছেড়ে অতি ক্ষুদ্র জগতে গেলেও দেখা যাবে সেখানে বিকিরণ হচ্ছে। বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণার গতির ফলেও বিকিরণ তৈরি হয়। যেমন ইলেকট্রন ও প্রোটন। এদের দ্বারাই জগতের সকল বস্তু গঠিত। এই বিকিরণ নিঃসৃত হবার সময় চার্জিত বস্তু থেকে শক্তি বহন করে নিয়ে আসে। ফলে বস্তুটি শক্তি হারায়।

সত্যি কথা বলতে কি, সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে, সকল প্রকার বিকিরণই আসলে চার্জিত কণার গতির ফলে সৃষ্টি। যেকোনো পদার্থের মাঝেই তার ইলেকট্রনগুলো এলোমেলোভাবে গতিশীল থাকে। লোহা বা অন্য কোনো ধাতুকে যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন আসলে তার মাঝে থাকা ইলেকট্রনের এলোমেলো গতির পরিমাণ বেড়ে যায়। গতি বাড়লে সেখান থেকে তাপ বা ইনফ্রা-রেড তরঙ্গ বিকিরিত হয়।

আরো বেশি উত্তপ্ত করলে সেখানের ইলেকট্রনের গতি আরো বেড়ে যায়। গতি আরো বেড়ে গেলে সেখান থেকে ইনফ্রা-রেডের চেয়েও উচ্চ তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। ইনফ্রা-রেডের চেয়ে উচ্চ তরঙ্গ হলো দৃশ্যমান আলোক রশ্মি। এদের মাঝে সবচেয়ে কাছের হলো লাল রঙের তরঙ্গ। সেজন্যই দেখা যায় লোহার কোনো খণ্ডকে বেশি উত্তপ্ত করলে সেটি লালচে আভা বিকিরণ করে।

উত্তপ্ত লোহা থেকে লালচে আভা বের হয়। এর পেছনে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার কার্যকলাপ। ছবি: ড্রিমসটাইম

নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং তাদের কর্তৃক বিকিরণ সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বর্ণালি বা স্পেকট্রাম। স্পেকট্রোমিটার বা বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণের বর্ণালি বের করা হয়। বর্ণালিবীক্ষণের একদম সরলীকৃত রূপ হলো প্রিজম। প্রিজমের মাঝেও বিকিরণের বর্ণালির ক্ষুদ্র একই অংশ দেখা যায়। অন্যদিকে স্পেকট্রোমিটারে বিকিরণের বর্ণালির খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানা যায়।

ভিন্ন ভিন্ন বিকিরণকারী বস্তুর বর্ণালি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণ যেমন হয়ে থাকে, নক্ষত্র থেকে নির্গত বিকিরণ তেমন হবে না। আবার এক খণ্ড লোহা থেকে যে বিকিরণ বের হয় তা গ্যালাক্সি কিংবা নক্ষত্র কিংবা অন্য কোনোকিছুর মতো হবে না।

কিছু কিছু নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বাইরের দিকে শীতল গ্যাসের আবরণ থাকে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কিছু বিকিরণ ঐ আবরণে শোষিত হয়ে যায়। এই শোষণ একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে হয়। কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের পদার্থে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আবৃত আছে তার উপর।

গ্যাসীয় আবরণে ক্যালসিয়াম পরমাণু থাকলে বর্ণালির এক অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, লোহা থাকলে অন্য অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, অন্য কোনো মৌল থাকলে অন্য কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে।

কোন কোন উপাদান কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষণ করে তা বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানেন। গবেষণাগারে সেসব উপাদানকে বিশ্লেষণ করে তারা এটি বের করেছেন।

নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির গ্যাসীয় আবরণ যদি বিশেষ কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণকে শোষণ করে নেয় তাহলে ঐ নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বর্ণালির মাঝে একটি শূন্যতা তৈরি হবে। যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হয়েছে, বর্ণালির ঐ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অংশে একটি অন্ধকার অঞ্চল (Dark line) দেখা যাবে। যার অর্থ হলো ঐ অংশের বিকিরণ এসে পৌঁছাতে পারেনি, কোথাও আটকে গেছে।

চিত্র: নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির আবরণকারী উপাদানভেদে বর্ণালির বিভিন্ন অংশে অন্ধকার অঞ্চল দেখা যায়। ছবি: নাসা

বিজ্ঞানী হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে আগত আলো এবং তাদের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করলেন। তিনি দেখতে পেলেন বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্রমেই বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে।

অনেকগুলো গ্যালাক্সির বর্ণালি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর ক্রম-অপসারণ বেগের কারণেই বর্ণালিতে এই সরণ ঘটছে। এই সরণই হলো লাল সরণ বা রেড শিফট। বর্ণালির অন্ধকার অংশের সরণ হচ্ছে বড় তরঙ্গের দিকে, আর দৃশ্যমান আলোতে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বড়, তাই এই সরণের নাম দেয়া হয়েছে লাল সরণ।

হাবলই কিন্তু প্রথম নন, মহাজাগতিক বস্তুর বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চলের উপস্থিতি সম্পর্কে আরো অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। জার্মান পদার্থবিদ জসেফ ভন ফ্রনহফার (১৭৪৭ – ১৮২৬) সূর্যের আলোর বর্ণালি সর্বপ্রথমতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৮০২ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওয়ালাস্টোনও বিকিরণকারী বস্তুর মাঝে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান।

চিত্র: এডউইন হাবলের আগেই বিজ্ঞানী ফ্রনহফার নক্ষত্রের বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান। ছবি: উকিমিডিয়া কমন্স

১৮৬৮ সালের দিকে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হিউগিনস (১৮২৪ – ১৯১০) এ সম্পর্কিত বেশ কিছু গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে, কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে লাল অংশের দিকে কিংবা ধীরে ধীরে নীল অংশের দিকে সরে যাচ্ছে।

তিনি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ডপলার প্রভাবের সাহায্যে এবং এই ব্যাখ্যা ছিল সঠিক। তিনি বলেন, নক্ষত্রগুলো ক্রমান্বয়ে আমাদের নিকটে আসার কারণে কিংবা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার কারণে এটি হয়েছে।

ক্যাপেলা (capella) নামে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আছে। উজ্জ্বলতার বিচারে এটির অবস্থান ষষ্ঠ। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়।

সূর্যের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলের চেয়ে ক্যাপেলার বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল লাল তরঙ্গের দিকে 0.01% বেশি অগ্রসর হয়ে আছে। যেহেতু লালের দিকে তথা বড় তরঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাই এখান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্যাপেলা আমদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরে সরে যাবার বেগ, আলর বেগের 0.01%। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে। আলর বেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার।

প্রতি মুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছে ক্যাপেলা নক্ষত্র। ছবি: বব মুলার

পরবর্তী বেশ কয়েক দশক পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল নক্ষত্র, শনির বলয় ইত্যাদির বেগ নির্ণয় করতে ডপলার প্রভাব ব্যবহার করা হতো।

তো হাবল কীভাবে জানলেন, বেশি লাল সরণের গ্যালাক্সিগুলো কিংবা বেশি বেগে অপসৃয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো বেশি দূরে অবস্থিত? তিনি জেনেছেন কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন গড়পড়তাভাবে যে নক্ষত্রগুলো যত ক্ষীণ (অনুজ্জ্বল) সেগুলোর লাল সরণ তত বেশি। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে অনুজ্জ্বল বা ক্ষীণ নক্ষত্রগুলোই দূরে অবস্থান করছে।

তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ শুধুমাত্র দূরে অবস্থান করলেই যে গ্যালাক্সি অনুজ্জ্বল হবে এমন নয়। কম পরিমাণে বিকিরণ করার কারণেও উজ্জ্বলতা কম হতে পারে। হতে পারে এর নিজস্ব উজ্জ্বলতাই অল্প, যার কারণে কাছে থাকা সত্ত্বেও ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। সেজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছে।

হিসেবের জন্য তাকে বিশেষ শ্রেণির কিছু গ্যালাক্সিকে বেছে আলাদা করে নিতে হয়েছে যেন হিসেবে ঝামেলা না হয়। বাছাইকৃত এ শ্রেণির গ্যালাক্সিকে বলা হয় ‘মানবাতি’ বা Standard Candle বিশেষ এ শ্রেণির গ্যালাক্সিগুলোর আপাত উজ্জ্বলতা দেখেই বের করা যায় এরা কত দূরে অবস্থিত। যদি কোনো গ্যালাক্সি ‘মানবাতি’ শ্রেণিতে পড়ে এবং এর উজ্জ্বলতা খুব ক্ষীণ হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি অবশ্যই অনেক দূরে অবস্থিত আছে। মানবাতির উজ্জ্বলতা যত ক্ষীণ হবে পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব তত বেশি হবে।

আবার অন্যদিকে মানবাতি খুঁজে পাওয়াও বেশ দুরূহ কাজ। দুরূহ কর্ম সম্পন্ন করে হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির আপাত উজ্জ্বলতা এবং তাদের লাল সরণের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। এই সম্পর্ক থেকে বলা যায় যে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং তাদের অপসরণ বেগও পরস্পর সম্পর্কিত। যেহেতু এই বিশেষ শ্রেণির গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতা তাদের দূরত্বের উপর নির্ভর করে এবং দূরত্ব বেশি হলে লাল সরণও বেশি হয় তাই বলা যায় দূরের গ্যালাক্সিগুলো বেশি দ্রুত বেগে অপসারিত হচ্ছে।

চিত্র: এডউইন হাবল

একে বলা যায় আগেভাগেই ফলাফল অনুমান করে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সকল শ্রেণির গ্যালাক্সিকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে কাজ করলে হয়তো ফলাফলটা এত সহজে পাওয়া যেত না। তাই আগে থেকেই একটা অনুমান করে নিয়েছেন যে, ‘সম্ভবত’ গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। আসলেই দূরে সরে যাচ্ছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ কিছু গ্যালাক্সিকে আলাদা করে নিয়েছেন যেন হিসেবের জটিলতা কমে যায়। এর মানে আগে থেকেই ফলাফল অনুমান করে নেয়া। এমনিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলাফল আগে থেকে অনুমান করে নিলে ক্ষেত্রবিশেষে সেটি গবেষণার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

আলোর উৎসের অপসারণ বেগ ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াতেও লাল সরণ ঘটতে পারে। যেমন আলো যদি শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সম্পন্ন কোনো উৎস থেকে নির্গত হয় এবং সে আলো যদি দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রে অবস্থান করা কোনো পর্যবেক্ষক বিশ্লেষণ করে তাহলে ঐ পর্যবেক্ষণ আলোর লাল সরণ দেখতে পাবে।

তবে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় উৎসের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর লাল সরণ ঘটছে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক। পর্যবেক্ষণে যে পরিমাণ লাল সরণ পাওয়া গেছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কারণে এত পরিমাণ লাল সরণ ঘটে না। দ্বিতীয়ত, ক্রম-প্রসারণের ফলে লাল সরণের যে সুস্থিত ও নিয়মতান্ত্রিক বৃদ্ধি ঘটেছে তা মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের লাল সরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা ঐক্যমতে এলেন যে, গ্যালাক্সির অপসরণ বেগের কারণেই লাল সরণ ঘটছে।

তবে এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে। সেটি বলছে, অন্ততপক্ষে সামান্য কিছু লাল সরণের পেছনে তাদের পশ্চাদপসরণ দায়ী নয়। এদের ক্ষেত্রে হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র দায়ী নাহয় তাদের পেছনে এমন কোনো ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করছে যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

এ বেলায় আরেকটি সমস্যার দিকে আলোকপাত করা দরকার। হাবলের সূত্র বলছে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব যত বেশি হবে তাদের অপসরণ বেগও তত বেশি হবে। এ অপসরণ বেগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। যত খুশি তত পরিমাণে উন্নীত হতে পারে। এদিকে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাহলে গ্যালাক্সির যত খুশি তত বেগে উন্নীত হওয়া কি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে লঙ্ঘন করছে না?

চিত্র: গ্যালাক্সিগুলো কি আসলেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে ছুটছে? ছবি: বিগ থিংক

জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের পরিমাণকে z দিয়ে প্রকাশ করেন। উৎস হতে নির্গত তরঙ্গের মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং পর্যবেক্ষক কর্তৃক গৃহীত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পার্থক্য (বিয়োগ) বের করা হয়। তারপর ঐ পার্থক্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করা হয়। তারপর যে মানটি পাওয়া যায় তা-ই হলো z এর মান।

এই z এর সাহায্যে গ্যালাক্সিগুলোর বেগ সহজেই বের করা যায়। আলোর বেগের সাথে লাল সরণ z-কে গুণ করে দিলেই গ্যালাক্সির গতিবেগ পাওয়া যাবে। আলোর বেগ c হলে গ্যালাক্সির বেগ cz। যেমন, কোনো গ্যালাক্সির লাল সরণের মান যদি হয় ০.১৫ তাহলে তার অপসরণ বেগ আলোর বেগের ১৫ শতাংশ। লাল সরণের মান ০.২৫ হলে তার অপসরণ ২৫ শতাংশ।

তবে এ নিয়মটি শুধুমাত্র আলোর বেগের তুলনায় খুব স্বল্প বেগে ধাবমান গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি হলেই এ নিয়ম আর কাজ করে না। এমনিতে বিজ্ঞানীদের পক্ষে খুব বেশি মানের লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব (সেটা যে উৎসেরই হোক), কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে ধাবমান কোনো গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আবার তত্ত্ব বলছে লাল সরণ যদি খুব বেশি হয়ে যায় তাহলে উৎসের গতিও আলোর বেগের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

যে দূরত্বে গেলে গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণ বেগ আলোর বেগের সমান হয় সে দূরত্বকে বলা হয় দিগন্ত বা হরাইজন। দিগন্তের বাইরের কোনো গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণ করা যম্ভব নয়। তাহলে কি এর মানে এমন দাড়াচ্ছে না যে, বাইরের গ্যালাক্সিগুলোর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি? কিছু দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, হ্যাঁ, এদের বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাতে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।

কীভাবে? বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নিয়ম-নীতি তখনই খাটবে যখন কোনোপ্রকার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতি থাকবে না। কিন্তু মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রেই মহাকর্ষ বিদ্যমান। এই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান ও কালের প্রকৃতিকে আমূলে পালটে দেয়। আর এটি ঘটে আইনস্টাইনেরই দেয়া সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে।

ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘বস্তু’ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। এখানে মূলত ‘স্থান’ নিজেই প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। বস্তু হয়তো আলোর বেগের বেশি বেগে চলতে পারে না কিন্তু স্থান ঠিকই পারে। আর ঐ বেশি বেগে চলা স্থানে যদি কোনো বস্তু থাকে তাহলে স্থানের সাথে সাথে বস্তুটিও বেশি বেগেই চলবে। বস্তু হয়তো আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলছে না, কিন্তু স্থান তাকে চালিয়ে নিচ্ছে।

যদিও আমরা দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সিগুলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু স্থানের প্রসারণের প্রকৃতি থেকে তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সির গতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি জটিল ফর্মুলার মাধ্যমে সুরাহা করা যায়। তবে এখানে আলচ্য বিষয় অনুধাবন করার জন্য এত সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশের প্রয়োজন নেই।

উৎস Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Chapter 3, Cambridge University Press

featured image: scitechdaily.com

পার্কার সোলার প্রোব: ১২ আগস্ট উৎক্ষেপিত যে মহাকাশযান অর্জন করবে মহাকাশ অভিযাত্রার ইতিহাসের রেকর্ড বেগ

নাসা এবং United Launch Alliance মিলে উৎক্ষেপণ করল সবচেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশযান পার্কার সোলার প্রোব। নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই স্পেসপ্রোবটি যাত্রা করে সূর্যের দিকে। সম্মিলিত উৎক্ষেপণ জোট বা ইউএলএ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মহাকাশে যান উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এই কোম্পানির রয়েছে একাধারে ১২০টি উৎক্ষেপণ পরিচালনা করার রেকর্ড এবং উৎক্ষেপণে ১০০% সফলতা। এ প্রকল্পটির আর্থিক খরচ ১.৫ বিলিয়ন ডলার।

মহাকাশযানটি গতকাল (১১ই আগস্ট ২০১৮) উৎক্ষেপণের কথা ছিল, কিন্তু উৎক্ষেপণের শেষ মিনিটে ত্রুটি ধরা পড়ায় সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। উৎক্ষেপণের নতুন সূচি ঠিক করা হয় আজ রবিবার (১২ আগস্ট ২০১৮) ফ্লোড়িডার কেপ ক্যানাভারালের স্থানীয় সময় রাত ৩:৩১ এ। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে এর উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য সময় এটি উৎক্ষেপিত হয়েছে। পার্কার সোলার প্রোব উৎক্ষেপণের ভিডিও অবলোকন করা যাবে এখানে

এই প্রোবকে মহাকাশে নিয়ে গেছে ইউএলএ এর শক্তিশালী রকেট ডেল্টা IV। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৪ এর ডিসেম্বরে পার্কার সোলার প্রোব হবে ইতিহাসের দ্রুততম মহাকাশযান। এ ঘটনাটি ঘটবে যখন প্রোবটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছুবে। এ অভিযানের রূটম্যাপ বলছে এটি সূর্য থেকে ৩.৮৩ মিলিয়ন মাইল (৬ মিলিয়ন কিলোমিটার) দূর দিয়ে যাবে। ঐ বিন্দুতে গিয়ে প্রোবটির গতি হবে ৬৯২,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটারেরও বেশি।

এ দূরত্ব কত বড় আন্দাজ করতে পৃথিবীর সাথে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই গতিতে প্রোবটির ওয়াশিংটন ডিসি থেকে টোকিওতে যেতে ১ মিনিটেরও কম সময় লাগত। আর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যেতে চার সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময়!

নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে পার্কার সোলার প্রোব টিম প্রোবের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন তাপীয় বায়ুশূন্য চেম্বারে; Image Credit: Ed Whitman/Johns Hopkins APL/Nasa

পার্কার স্পেসপ্রোবের পেছনে কাজ করা দলটি অবশ্য নির্বিকার এই রেকর্ডভাঙা কাজে। তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ অভিযানের খুঁটিনাটিতে। এই প্রজেক্টের ম্যানেজার এন্ড্রু ড্রিসম্যান নিযুক্ত আছেন জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তিনি বলেন, “মহাকাশে কোনো কিছু দ্রুতবেগে ছোটার জন্য সেটার ডিজাইন করা যতটা কঠিন তেমনি ধীরে ছোটার ডিজাইন করাও সমান মাত্রার কঠিন। কারণ হল, মহাশূন্যে তো একটা চালু দশাকে ঠেকানোর মত কিছু নেই।”

এ ব্যাপারগুলো অরবিটাল মেকানিক্সে ধারণা থাকলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। গতি বাড়ানো যেমন সমস্যা, তেমনি মহাকাশযান টিকিয়ে রেখে এমন গতিপথ বাছাই করাও সমস্যা যা ঐ গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে মহাকর্ষের আকর্ষণে বিচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করবে। উল্লেখ্য মহাকাশে কোনো মহাকাশযানের গতিবৃদ্ধির এখনো পর্যন্ত সেরা উপায় হল কোনো গ্রহের বা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণক্ষেত্রকে কাজে লাগানো। ড্রিসম্যান অবশ্য মজা করে বলেন, “মহাকাশযান কেবল জানে না এটি যে দ্রুতগতিতে ছুটছে।”

পার্কার সোলার প্রোবের অভিযানের গতিপথ | Image Credit: HORIZONS System, JPL, NASA

যাই হোক, এটা যে নিতান্ত ঝামেলাবিহীন অভিয়ান নয় তা স্পষ্ট। স্পেসপ্রোব না জানলেও, বিজ্ঞানীদের ঠিকই স্পেসপ্রোবকে সম্মুখীন হতে হবে এমন বিবিধ পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখতে হয়। পার্কার সোলার প্রোব অতিদ্রুতবেগে ছোটার সাথে হিসেবে রাখতে হচ্ছে কোন মহাকাশীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে এটি গমন করছে। এটির অভিযানপথে রয়েছে এমন ধুলোময় পরিবেশ যাকে বলা হয় হাইপারভেলোসিটি ডাস্ট এনভায়রনমেন্ট। অর্থাৎ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বহু ধুলিকণাময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাবে পার্কার।

হাইপারভেলোসিটি অর্থাৎ উচ্চগতি বলতে প্রচলিতভাবে ধরা হয় ৩ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগকে। এই বেগের ফলে দ্রুত ছোটা কণাগুলোর ভরবেগও যথেষ্ঠ মাত্রায় বেশি। ফলে এরা প্রবল ভরবেগে আঘাত করবে পার্কার সোলার প্রোবকে যার কারণে প্রোবের বেগের দিক বিদিকও হয়ে যেতে পারে। আসলে মহাকাশে অল্প আঘাতই বিশাল দূরত্বে ছোটা বস্তুর জন্য যথেষ্ঠ দিক বিদিকের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। এ সমস্যা নিরসণে বিজ্ঞানীরা স্পেসক্রাফটে ব্যবহার করবেন কেভলার কম্বল। এ বিশেষ কম্বল অধিক তাপসহ আর সিন্থেটিক ফাইবারের তৈরি। এ ধরণের ফ্যাব্রিকের বহুল ব্যবহার রয়েছে বুলেট প্রতিরোধী জ্যাকেট, শরীরের বর্ম, বোমার চাদর ইত্যাদি নির্মাণে। অর্থাৎ এই সমাধান বহু আঘাতে টেকসই থাকার সুবিধা দিতে পারছে।

শুক্রের অভিকর্ষকেও পার্কার সোলার প্রোব কাজে লাগাবে। শুক্রের কাছ দিয়ে পার্কার সোলার প্রোব ৭ বার অতিক্রম করবে। সূর্যের দিকে পাঠিয়ে সূর্য ওপাশ দিয়ে প্রোবকে ফেরত আনার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পৃথিবী নিজেই সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াচ্ছে, সে অনুসারে এই আদিবেগ পেয়ে যাচ্ছে প্রোব। কিন্তু এটি সূর্যের দিকের সাথে সমকোণে হলে পথ বেঁকে বড় হয়ে যাবে। ফলে সময় লাগবে আরো বেশি, উদ্দিষ্ট লক্ষ্যও টিকবে না। বেগ সংক্রান্ত সমস্যা বুঝতে দেখতে পারেন এই ভিডিওটি।

 

অভিযানের পথ অনুযায়ী, পার্কার সোলার প্রোব যখন সূর্যের সবচেয়ে নিকট বিন্দু দিয়ে যাবে তখন এর বেগ হবে ভয়েজার ১ এর বেগেরও দশগুণের বেশি। ভয়েজার ১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ এ, পাঁচ বছর আগে এটি সৌরজগতের বাইরে চলে গিয়েছে। প্রক্সিমা সেন্টরাইয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ঘণ্টায় ৬১,০০০ কিলোমিটার বেগে

 

পার্কার সোলার প্রোবের গতিপথে শুক্রের এবং সূর্যের অভিকর্ষ যেভাবে ব্যবহার করে উচ্চগতি অর্জিত হবে; Image Credit: Guardian graphic | Source: The Johns Hopkins University Applied Physics Laboratory

স্বাভাবিক হিসেবে গতি অর্জনের কৌশলের দিক থেকে ভয়েজার ১-ই ইতিহাসখ্যাত। তবে ২০১৬ এর জুলাইতে নাসার জুনো প্রোব বৃহস্পতির অভিকর্ষের প্রভাবে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে বৃহস্পতির গ্যাসীয় জমিনে পড়ে ধ্বংস হয়। তখন এর বেগ পৌঁছে গিয়েছিল ঘণ্টায় ২৬৬,০০০ কিলোমিটারে। এ গতিবেগ কাজে না লাগলেও কতদূর অর্জনযোগ্য এটার একটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল।

গ্রহের অভিকর্ষকে ব্যবহার না করে, কেবল সূর্যের অভিকর্ষকে ব্যবহার করে রেকর্ডধারী স্পেসক্রাফট দুটি হল হেলিওস I এবং II. ১৯৭০ এর দশকে এরা উৎক্ষেপিত হয়েছিল। বুধ সূর্যের যত কাছে হেলিওস মহাকাশযান-যুগল তার চেয়েও কাছে প্রবেশ করেছিল। এরা অর্জন করেছিল ঘণ্টায় ২৪১,০০০ কিলোমিটার বেগ বা সেকেন্ডে ৭০ কিলোমিটার।

পার্কার সোলার প্রোব দৃশ্যমান সৌরপৃষ্ঠ থেকে চার মিলিয়ন মাইল (৬.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার) নিকট দিয়ে যাবে। ফলে হেলিওসের চেয়েও প্রায় তিনগুণ বেগে দৌঁড়াবে এটি। সূর্যের উত্তাপকে আরেক ধাপ এগিয়ে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথে অভিযাত্রা শুরু হয়ে গেছে… গতি অর্জন মানে তো আমাদের স্বপ্নে আশার সঞ্চার… বহুদূর ছুটে যেতে।

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.space.com/41447-parker-solar-probe-fastest-spacecraft-ever.html
  2. https://www.theguardian.com/science/2018/aug/10/mission-to-touch-the-sun-nasa-to-launch-parker-solar-probe
  3. https://blogs.scientificamerican.com/life-unbounded/the-fastest-spacecraft-ever/
  4. https://www.space.com/41461-parker-solar-probe-launch-delayed.html
  5. https://voyager.jpl.nasa.gov/mission/status/

উষ্ণতম গ্রহ বুধ নয় শুক্র

সূর্যের সবচেয়ে নিকটে থাকা সত্ত্বেও বুধ সৌরজগতের সবচেয়ে উষ্ণতম গ্রহ নয়। কারণ বুধের কোনো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে সূর্যের বিকিরণ ধরে রাখতে পারে না। অন্যদিকে এর পরের গ্রহ শুক্রে বায়ুমণ্ডল আছে এবং তাতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকায় সূর্য থেকে নির্গত তাপ বেশি পরিমাণে শোষণ করে নিতে পারে।

featured image: astrobob.areavoices.com

 

বৃহস্পতির কেন ৭৯টা উপগ্রহ যেখানে পৃথিবীর মাত্র একটা

পৃথিবীর সবেধন নীলমণি উপগ্রহ কেবল চাঁদ, অথচ বৃহস্পতির? ডজনকে ডজন উপগ্রহ! বৃহস্পতি অবশ্য সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। মজার ব্যাপার এখনো বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা হচ্ছে। এইতো কদিন আগেই (১৬ জুলাই ২০১৮) কার্নেগি ইন্সটিটিউট ফর সায়েন্স এর বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করলেন বৃহস্পতির আরো ১২ টি উপগ্রহ রয়েছে যেগুলো আমরা জানতাম না।

যে অনুসন্ধানকারী দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন স্কট শেপার্ড। তবে তারা কাজ করছিলেন সৌরজগতের দূরতম কাইপার বেল্টে নতুন কোনো বস্তু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কাইপার বেল্ট নেপচুন কক্ষপথের বাইরে অবস্থিত যা হচ্ছে দীর্ঘাকার রিঙ। মূলত এর উপাদান সৌরজগত সৃষ্টির ধ্বংসাবশেষ। কাজের একটা বিরতি হিসেবেই তারা মূল উদ্দেশ্য কাইপার বেল্ট থেকে মোড় ঘুরিয়ে জুপিটারকে দেখার চিন্তা করল। আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই পেয়ে গেল গ্যালিলিওর চাঁদের নতুন সঙ্গী!

১৬১০ খ্রিস্টাব্দে, মহান জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও গ্যালিলেই সর্বপ্রথম চারটি স্বর্গীয় বস্তু প্রত্যক্ষ করেন জুপিটারকে ঘিরে ঘুরছে। সেগুলোর নামকরণ করা হয় আয়ো, ইউরোপা, গ্যানিমিড এবং ক্যালিস্টো নামে। এগুলোই ছিল জুপিটারের বড় চাঁদ— একই সাথে প্রথম আবিষ্কৃত চাঁদও। গ্যালিলিওর এই পর্যবেক্ষণই ছিল মানবজাতির জন্য ভিনগ্রহের প্রথম উপগ্রহ। তারাদেখার প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নয়নের সাথে, এটা স্পষ্ট হয়ে যায় জুপিটারের চৌহদ্দি কেবল ঐ চার উপগ্রহকে নিয়েই নয়। ২০১৮ এর জুলাইয়ের পূর্ব পর্যন্তও জুপিটারের আবিষ্কৃত উপগ্রহ ছিল ৬৭টি। এখন হিসেব দাঁড়াল জুপিটারের ৭৯টি গ্রহ বের করতে মানুষের লেগে গেল চারশ বছরের অধিক সময়।

এই মহাসমাহার সৌরজগতের আর কোনো গ্রহ করতে পারে নি, আপাতত পারবেও না। রানার আপ শনির রয়েছে ৬২টি উপগ্রহ আর তৃতীয় অবস্থানে ইউরেনাস রয়েছে ২৭টি উপগ্রহকে ঘিরে। নেপচুনের ১৪টি এবং আমাদের প্রতিবেশী গ্রহ মঙ্গলের দুটি উপগ্রহ— ডিমোস এবং ফোবোস। অন্যদিকে পৃথিবীর মাত্র ১টি উপগ্রহ থাকলেও শুক্র আর বুধের কোনো উপগ্রহই নেই।

বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ থাকার কারণ এক কথায় মহাকর্ষ। কিন্তু শুধু এই কারণ দিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধরা যাবে না। অন্যান্য কিছু শর্ত জুড়ে দিলে তারপর মহাকর্ষকে বহু উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ বলা যাবে।

বৃহস্পতির মহাকর্ষের প্রভাব

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের গ্রহগুলোকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন এদের গড়নের ভিত্তিতে। সূর্যের নিকটতম চারটি গ্রহকে বলা হয় ভূসদৃশ গ্রহ— বুধ, শুক্র, পৃথিবী এবং মঙ্গলকে। অর্থাৎ যেগুলোর কঠিন অভ্যন্তরভাগ রয়েছে। এজন্য এদের পাথুরে গ্রহও বলা হয়। আরেক ধরণের হল গ্যাসীয় দানব: বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন।

দুইদলের গ্রহগুলোর আকারের পার্থক্যও ভাগ করার বৈশিষ্ট্যসূচক হিসেবে নেয়া যেত। গ্যাসীয় দানবের সবচেয়ে ছোট সদস্য ইউরেনাসও ভূসদৃশ গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পৃথিবীর চেয়ে ১৫গুণ বিশাল। আর অতিকায় জুপিটারের কাছে তো পাথুরে গ্রহের বাকিরা সে হিসেবে নস্যি! বৃহস্পতির সমান ওজনদার হতে পৃথিবীর সমান আরো তিনশোরও বেশি গ্রহ লাগবে। গ্রহ হিসেবে এটি একেবারে আদর্শ দানব।

সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহ চারটি যদি সূর্যের সাথে ছবি তুলত তবে যেমন দেখাত; image source: NASA & Wikipedia User HalloweenNight

আইজ্যাক নিউটনের পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া যায়, কোনো বস্তুর ভরের সাথে ঐ বস্তুর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের শক্তিমত্তা জড়িত। যেহেতু গ্যাসীয় গ্রহগুলো অতিকায়, অর্থাৎ ভারী, সুতরাং তারা অধিকসংখ্যক উপগ্রহকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে।

তবে এটিই একমাত্র কারণ নয় জুপিটারের মত বড় গ্রহের অধিক উপগ্রহ থাকার ক্ষেত্রে। আমাদের সৌরজগতের গ্যাসীয় গ্রহগুলো সূর্য থেকে দূরে, অর্থাৎ বাইরের দিকে অবস্থিত। কিন্তু সৌরজগতের বাইরে আমরা এমন অনেক নক্ষত্রকে যাদের জুপিটারের মত উপগ্রহ রয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে দেখা যাবে সে গ্যাসীয় দানবগুলো তাদের নক্ষত্রের খুব নিকট দিয়ে অতিক্রম করে। ব্যাপারটা কেমন তা কল্পনা করা যেতে পারে বুধের জায়গায় শনিকে সূর্যের পাশে বসিয়ে।

২০১০ সালে এক ফরাসি জ্যোতির্বিদ, ফাথি নামোনি রীতিমত গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যে জুপিটারের মত গ্রহদের উপগ্রহ বলতে গেলে থাকেই না। ধরা হয়ে থাকে এমন অতিকায় গ্রহগুলো এদের নক্ষত্র সিস্টেমের বাইরে সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে। আর আসার পথে যেহেতু নিজে ভারী, যথেষ্ঠ মহাকর্ষ শক্তিওয়ালা তাই বহু উপগ্রহ ধরা পড়ে এর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের প্রবলতায়।

গ্যাস দানব বড়, কিন্তু নক্ষত্র তো বড়োর চেয়েও বড়— বিশাল। একারণে তাদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রও ব্যাপক মাত্রায় প্রবল হবে। তাই যখন কোনো জুপিটারের মত গ্রহ উপগ্রহ ভিড়িয়ে কাছে চলে আসে, নক্ষত্র উপগ্রহদের গিলে ফেলে।

উপগ্রহময় গ্রহরাজ বৃহস্পতি; image source: ROBERTO MOLAR-CANDANOSA/CARNEGIE INSTITUTION FOR SCIENCE

নক্ষত্র থেকে যত দূরে যাওয়া যায় বস্তুর প্রতি এর আকর্ষণ বলও কমতে থাকে। মহাকর্ষের প্রাবল্যের গণিত বলে দূরত্ব দ্বিগুণ হলে শক্তি কমে যায় চারগুণ, দূরত্ব তিনগুণ হলে শক্তি কমে যায় ৯ গুণ। মানে একই পরিমাণ দূরত্ব বৃদ্ধির জন্য মহাকর্ষের প্রাবল্য হ্রাস ঘটছে বেশি বেশি করে, যত দূরে যাওয়া হচ্ছে। সে অনুসারে নামোনিই সঠিক, জুপিটারের ৭৯টা উপগ্রহ থাকার প্রথম কারণ এর মহাকর্ষ বল প্রবল। আর এই ৭৯টা উপগ্রহই জুপিটারের কাছে টিকে থাকার কারণ, জুপিটার সূর্য থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে।

বড় পরিবার, বৃহস্পতি পরিবার

জুপিটারের উপগ্রহগুলো শিলাময়। উপগ্রহ আয়ো সক্রিয় আগ্নেয়গিরিময়, ইউরোপাতে গুপ্ত আছে মহাসাগর এবং গুরুত্বপূর্ণ গ্যানিমিড যা কিনা এই সৌরজগতের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক উপগ্রহ। গ্যানিমিড মঙ্গলের দুই তৃতীয়াংশ এমনকি বুধের চেয়েও বড়।

অনুমান করা হয় এই তিন উপগ্রহ, ক্যালিস্টো আর বৃহস্পতি নিজে সম্ভবত পরপর একই সাথে গঠিত হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ গ্যাসের চাকতি আর ধুলা মিলেমিশে আজকের বৃহস্পতিকে গঠন করে। যখন জুপিটার আকার গঠন করে ফেলে, অন্যান্য পদার্থ এর চারপাশে পাক খাচ্ছিল যা জমে চারটি উপগ্রহে পরিণত হয়। গ্যালিলিও প্রথম এই উপগ্রহ চারটি দেখতে পান বলে এগুলোকে গ্যালিলিওর চাঁদ বলা হয়।

এই চারটি উপগ্রহই বলতে গেলে জুপিটারের উপগ্রহগুলোর ভরসমষ্টির সবটা। এই চারটি বাদে বাকিগুলো মিলে উপগ্রহগুলোর মোট ভরের মাত্র ০.০০৩%।

শনি গ্রহও এই প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে থাকবে কিছুটা। অনুকল্প (হাইপোথিসিস) করা হয় যে, আদি বৃহস্পতি শনির কিছু কক্ষপথ বিচ্যুত উপগ্রহকে নিজের কক্ষপথে টেনে নেয়। অন্যান্য উপগ্রহগুলো এমন যে বৃহস্পতির জন্মের সাথে তাদের জন্ম সংগতিপূর্ণ মনে হয় না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বৃহস্পতির বহু চাঁদগুলো গঠিত হয়েছে এর মহাকর্ষের প্রভাবে ছুটতে থাকা পাথরের খন্ডগুলোর এক হওয়ার মাধ্যমে।

সব কথা শেষ করার আগে চাঁদের আচরণ নিয়ে কিছু জানাতে হবে। বৃহস্পতির অনেকগুলো উপগ্রহ বৃহস্পতি যেদিকে পাক খায় সেভাবেই বৃহস্পতিকে একই দিক ধরে প্রদক্ষিণ করে। আবার কতকগুলো বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে। নতুন আবিষ্কৃত গ্রহগুলোর মধ্যেও দুটো বিপরীত দিকে ঘোরে। বিপরীত দিকে ঘোরার ক্ষেত্রে ঝুঁকি হল দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে যেকোন সময় একটি আরেকটির সাথে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। বহু উপগ্রহ বহুদিকে প্রদক্ষিণ করায় সংঘর্ষ এড়ানোই কঠিন ব্যাপার হবে। আর এক উপগ্রহ আরেক উপগ্রহের উপর আছড়ে পড়লে বৃহস্পতি সেই সুযোগে পেয়ে যেতে পারে নতুন উপগ্রহ। এটাও বহু উপগ্রহ থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

HowStuffWorks অবলম্বনে।

featured image: express.co.uk

 

স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

আজ ২৭ জুলাই শুক্রবার দেখা যাবে শতাব্দীর দীর্ঘতম রেকর্ড চন্দ্রগ্রহণ

আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে একবিংশ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণ

কখনো কি লক্ষ্য করেছেন, কোনো চন্দ্রগ্রহণ বা সৌরগ্রহণ একটি আরেকটির সপ্তাহ দুয়েক আগে-পরে সংঘটিত হয়েছে? মাঝে মাঝে আমরা এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপারের সম্মুখীন হব। আমরা একমাসের মধ্যেই এমন তিনটি গ্রহণ পেয়ে যেতে পারি।

ঠিক এমনই একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে আজ। এই মাসেই ১৩ জুলাইতে একটি আংশিক সৌরগ্রহণ প্রত্যক্ষ করা হয়েছে, যদিও বিরল জনবসতি এন্টার্কটিকা, তাসমানিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এলাকায়। পরবর্তী আংশিক সূর্যগ্রহণটি হবে ১১ই আগস্টে, দেখা যাবে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে। ইউরোপ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বেশ বড় অংশ সে সুযোগ পাবে। এমনকি উত্তর ও পূর্ব কানাডার অধিবাসীদেরও খানিক সম্ভাবনা আছে সূর্যোদয়ের সময় গ্রহণের অভিবাদন পাবার।

আর এ দুই সৌরগ্রহণের মাঝে অবস্থান করে নিয়েছে একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আজ ২৭ জুলাইতে। এ শতাব্দীর সবচেয়ে দীর্ঘকালীন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ।

আজ চাঁদ অতিক্রম করবে অয়নবৃত্ত। অয়নবৃত্ত হল সূর্য পৃথিবীর আকাশ দিয়ে যে পথ বরাবর এগিয়ে চলে। তাই হিসেব করে দেখা গেছে, যখন চাঁদ পূর্ণিমায় অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ পেয়ে যাই। আবার যখন নতুন চাঁদ অয়নবৃত্ত অতিক্রম করে আমরা একটা সৌরগ্রহণ পেয়ে যাই। এ কারণেই সূর্যের বার্ষিক পরিক্রমণ পথ— অয়নবৃত্তকে আরেক নামে ডাকা হয় গ্রহণবৃত্ত।

যখন পূর্ণ বা নতুন চাঁদ এই গ্রহণবৃত্ত বা অয়নবৃত্তকে চাঁদের কক্ষপথের একপাশ দিয়ে অতিক্রম করে, এটি অপরপাশ দিয়েও অয়নবৃত্তকে অতিক্রম করবে। আর দুই অতিক্রম হবে দুই সপ্তাহ আগে বা দুই সপ্তাহ পরে। যেকারণে, এই গ্রহণের পর্যায়কালটাকে আমরা বলে থাকি “গ্রহণ মৌসুম”।

সাধারণত, একটা গ্রহণ মৌসুমে আমরা দুটো গ্রহণ পেয়ে থাকি। কিন্তু পূর্ববৎ, এই মৌসুমের ক্ষেত্রে আমরা তিনটি গ্রহণ পেয়ে যাচ্ছি ২৯.৫৩ দিনের মধ্যে— যতটা সময় লাগে এক চাঁদ থেকে আরেক চাঁদের সময় শুরু হতে।

আজ ২৭শে জুলাই শুক্রবারের আসন্ন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয় হতে যাচ্ছে এ কারণে যেহেতু উপগ্রহটি ঠিক উত্তর দিক দিয়ে পৃথিবীর ছায়া অতিক্রম করবে। কার্যত, চাঁদ এর কক্ষপথের অধোগামী বিন্দুতে পৌঁছে যাবে। কক্ষপথের এই বিন্দুটি হচ্ছে যেখান থেকে চাঁদ আবার তার কেন্দ্রের বস্তুর দিকে এগুবে— এর ১৩৮ মিনিটের মাথায় চাঁদ পূর্ণ দশায় অবস্থান করবে।

এর কারণে, দুই নতুন চাঁদ যার মাঝে পড়েছে ২৭ জুলাই। আর আগের ও পরের দুই সপ্তাহের মাথায় চাঁদ প্রায় ঠিক ঠাক এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যে সূর্যের গ্রহণের জন্য যথেষ্ঠ হয়। এই সুযোগে আমরা পেয়ে যাচ্ছি গ্রহণের ত্রয়ী।

ক্ষুদ্র, ধীরতর চাঁদ + দীর্ঘ ছায়া = একটি দীর্ঘ চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদের আশপাশ এবার পৃথিবীর ছায়া বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ঘিরে ফেলবে যা সাধারণত বিরল। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি হওয়ার অবশ্য কারণ চাঁদই। আজ গ্রহণের সময় পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূর দিয়ে অতিক্রম করবে যেটিকে বলে অপভূ (Apogee)— ৪০৬,২২৩ কিলোমিটার দূর দিয়ে। আবার আরেক ব্যাপার, সবচেয়ে দূর বিন্দু দিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদ অতিক্রম করে সবচেয়ে ধীরগতিতে।

সে হিসেবে দূর ও ধীর মিলিয়ে এবারের চন্দ্রগ্রহণ বিজ্ঞানের মহিমায়ই দীর্ঘতম। এর ফলে চাঁদকে গড় আকারের চেয়ে ক্ষুদ্রতর দেখাবে। কার্যত, আরো তথ্য হল, ২০১৮ এর ক্ষুদ্রাকার পূর্ণচন্দ্রও আজই। এ গ্রহণ সংঘটিত হতে যাচ্ছে পৃথিবী অপসূর বিন্দু অতিক্রম করার তিন সপ্তাহেরও পর। অপসূর (Aphelion) বিন্দু হচ্ছে সূর্য থেকে কোন কিছুর দূরতম বিন্দু, এ সময়ে পৃথিবীর প্রচ্ছায়া কৌণিকভাবে সবচেয়ে বড় থাকে।

তো, সবকিছু  হিসেব করে দাঁড়াচ্ছে যে, আমরা একটি ক্ষুদ্রাকার চাঁদ দেখতে পাব— যদিও পূর্ণচন্দ্র, স্বাভাবিকের চেয়ে ধীরতর বেগে ছোটা চাঁদ যা অতিক্রম করবে প্রায় সোজাসুজি পৃথিবীর ছায়ার মাঝ দিয়ে। যে ছায়া কিনা আবার স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও প্রলম্বিত। ফলে এই চন্দ্রগ্রহণের স্থিতিকাল হবে ১ ঘন্টা ৪৩ মিনিট। উল্লেখ্য, তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব সবচেয়ে দীর্ঘতম চন্দ্রগ্রহণের চেয়ে মাত্র ৪ মিনিট কম এই স্থিতিকাল।

যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব রাখেন বা পছন্দ করেন তাদের জন্য আরেকটু বাড়িয়ে জানাই। চাঁদ সৃষ্টির পর থেকে খুবই অল্প মাত্রায় পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে গ্রহণের এই সর্বোচ্চ সময়টা বিশ্বজনীন সময়ের মাপকাঠিতে না। এটি হিসেব করা হয়েছে ৫০০০ বছরের সীমায় (খ্রিস্টপূর্ব ১৯৯৯ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের অবসরপ্রাপ্ত এমেরিটাস আমেরিকান জ্যোতিঃপদার্থবিদ ফ্রেড এস্পেনাক এবং বেলজিয়ান আবহাওয়াবিদ ও অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী জাঁ মিয়াসের বিবৃতি অনুযায়ী আজকের গ্রহণটি ৯জুন, ২১২৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘতম।

একটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের গড় স্থিতিকাল প্রায় ৫০ মিনিট।

উত্তর আমেরিকা, ঘুমিয়ে থাকো!

যারা উত্তর আমেরিকায় বা মধ্য আমেরিকায় রয়েছে তাদের জন্য অবশ্য দুঃসংবাদ। কোনো গ্রহণই তারা অবলোকন করতে পারবে না। এমনকি পূর্ণ গ্রহণ হলেও ঘটনার আংশিকও দেখতে পাবে না— কারণ, পুরো ঘটনা ঘটার সময় আমেরিকা মহাদেশে দুপুর এবং বিকেল, পূর্ণচাঁদ থাকে এসময় দিগন্তের নিচে।

ইউরোপ, আফ্রিকা অথবা এশিয়ায় এ ঘটনা দেখার সুযোগ থাকছে। এদিকে পূর্বে থাকা জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া চাঁদকে দেখতে পাবে যখন প্রায় পুরোটা পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে যাবে। মধ্য এবং পূর্ব আমেরিকায় চাঁদকে উঠতেই দেখা যাবে সম্পূর্ণ গ্রহণ হয়ে যাবার পর।

বাংলাদেশ থেকে চন্দ্রগ্রহণ আরম্ভ হবে রাত ১১টা ১৪ মিনিটে এবং শেষ হবে আগামীকাল ভোর ৫টা বেজে ২৮ মিনিটে। পূর্ণ গ্রহণের সময় রাত ২টা ২১ মিনিটে। সময়ের টিক টক মেপে গ্রহণের পূর্বাভাস দেখুন এখানে

মঙ্গলকে ভুলে যেও না!

চাঁদ পূর্ণগ্রহণের সাথে আকাশে আরো কিছু চমক রয়েছে। মঙ্গলকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের দিন পাওয়া যাবে সূর্যের ঠিক বিপ্পরীত দিকে অবস্থান করতে। চিলিক ছড়াবে হলুদাভ-কমলা দ্যুতিতে। আকাশে মঙ্গলকে দেখা যাবে চাঁদ থেকে ৬ ডিগ্রি নিচে। গ্রহণ দেখতে প্রত্যাশীরা আকাশে পাবেন অন্ধকারে ডুবে যাওয়া চাঁদের সাথে অত্যুজ্জ্বল মঙ্গলকে। ঠিক এমনিভাবে গ্রহণের দিনে উজ্জ্বল মঙ্গলের সাথে পৃথিবীর মানুষের দেখা হয়েছিল গত শতাব্দীতে— ১৯৭১ এর ৬ আগস্টে। দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণের পিছে ছোটা অনেক প্রবীণ হয়ত মিলিয়ে দেখে নিতে পারবে পুরনো সময়ের সাথে।

তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবীর সাথে মঙ্গলের সর্বনিম্ন দূরত্ব হওয়া সম্ভব ৫৪.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার। আজকে মঙ্গলের দূরত্ব থাকবে ৫৭.৭ মিলিয়ন কিলোমিটার। অর্থাৎ, একে তো নিকটবর্তী আবার তারপর গ্রহণের সময়— দুইয়ে মিলে মঙ্গলকে আজ উজ্জ্বলতায় দেখার অপেক্ষা।

আবার কবে…

পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হবে আগামী বছর ২০১৯ এর ২০ জানুয়ারি, রোববার। উত্তর আমেরিকাবাসী যেহেতু এ সামার শো’তে গ্রহণ দেখতে পারছে না, তাই পরবর্তী চন্দ্রগ্রহণ পশ্চিমাংশে জোরালো হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শুরু-শেষ পরিপূর্ণভাবে সে গ্রহণ তখন দেখা যাবে। এছাড়া, পূর্ণভাবে ঢাকা চাঁদকে শীতের আকাশে খাড়া উপর থেকে দেখা যাবে।

এ গ্রহণ উদযাপনের জন্য জাতীয় দিনপঞ্জিও দর্শকদের পক্ষে থাকবে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মরণে তিনি দিনের ছুটি চলবে তখন আমেরিকায়। বলা যায়, ১৯৭৫ এর পর কোনো ছুটিতে চন্দ্রগ্রহণ না পাওয়া আমেরিকানদের কাছে এটি বেশ সাড়া জাগাবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

সকলের জন্য শুভেচ্ছা রইল, আশা করি আবহাওয়া আপনার এলাকায় সদয় হবে এ শতাব্দীর দীর্ঘতম গ্রহণটির সাক্ষী হতে।

 

— Scientific American অবলম্বনে।

তরল পানির হ্রদের দেখা মিলল মঙ্গলে

অশেষ জল্পনা কল্পনা আমাদের মঙ্গলকে ঘিরে। মঙ্গলে পানি পাওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে বহু অনুমান করা হয়। মঙ্গলে পানি তরল দশায় পাওয়া যেতে পারে সে প্রকল্প (Hypothesis) ৩০ বছর আগে প্রথম করা হয়েছিল। আন্দাজ করা হত, মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই পানির হ্রদ থাকতে পারে বরফের নিচে যা প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত।

অতীতে সম্পন্ন গবেষণাগুলো অনিয়ত পানির প্রবাহের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিল মঙ্গলপৃষ্ঠে। কিন্তু বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য নিয়মিত অবস্থান করা পানির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিওরোসিটির মাধ্যমে এমন হ্রদগুলোয় ইতিপূর্বে পানির ঐতিহাসিক উপস্থিতির লক্ষণ আবিষ্কৃত হয়েছিল। মঙ্গলের জলবায়ু আগের চেয়ে শীতল হয়েছে। প্রথমত এর আবহাওয়া মণ্ডল অত্যন্ত পাতলা। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ পানি বরফের নিচেই আটকে আছে।

এ আবিষ্কার সম্পন হয়েছে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির মার্স এক্সপ্রেস অরবিটারের একটি রাডার যন্ত্রের সাহায্যে যেটির নাম মার্সিস। যারপরনাই বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত এ আবিষ্কারে।

আবিষ্কৃত হ্রদটি অবস্থিত মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে; image source: NASA

ইতালীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এস্ট্রোফিজিসিস্টের প্রফেসর রবার্তো ওরোসেই বলেন, এটা সম্ভবত খুব বেশি বড় নয়। মার্সিস হ্রদে পানির অস্তিত্ব চিহ্নিত করতে পারলেও এর গভীরতা বা পুরুত্ব নির্ণয় করতে পারে নি। অবশ্য গবেষক দল অনুমান করছেন ১ মিটার গভীরতা হতে পারে এর।

প্রফেসর ওরোসেই এর মতে, এ গভীরতা হ্রদ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কারণ, এটি পাহাড় আর বরফের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গায় বরফ গলা পানির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় যেমনটা পৃথিবীতে তুষারস্রোতের কারণে হয়ে থাকে।

শিল্পীর কল্পনায় মঙ্গলের চারদিকে পরিভ্রমণরত মার্সিস রাডারের কার্যক্রম; image source: ESA

কিভাবে খুঁজে পাওয়া গেল এই হ্রদ?

রাডারের কাজ করার নীতি হচ্ছে একটা তরঙ্গ প্রেরণ করা কোনো দিকে এবং সে তরঙ্গ কোনো বস্তু বা পৃষ্ঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসার পর সে তরঙ্গ গ্রহণ করা। মার্সিসও এমনই এক রাডার, এটি মঙ্গলের পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠে তরঙ্গসংকেত প্রেরণ করে। আর ফিরে আসা তরঙ্গ পরীক্ষা করে বাধা দেয়া পৃষ্ঠের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়।

রাডারের ফল থেকে পাওয়া নিয়মিত দাগগুলো দক্ষিণ মেরুস্থ স্তরীভূত বরফের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাদা পেস্ট্রি মতন দেখতে বরফ, পানি এবং ধুলোর মিশ্রণের হিমশীতল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার নিচে অস্বাভাবিক কিছু চিহ্নিত করেন। নীল আলোয় দেখা যায় তলানির প্রতিফলন এর পৃষ্ঠের প্রতিফলনের চেয়ে তীব্র। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করে নেন বরফের তলায় পানির অস্তিত্ব।

বিশ্লেষিত চিত্রপটে গাঢ় নীল রঙ পানির অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা; image source: bbc.com

মঙ্গলে জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে এ ঘটনা কিছু বলে কিনা?

এর সোজাসুজি উত্তর এখনো পর্যন্ত জীবনের উপস্থিতির ব্যাপারে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ওপেন ইউনিভার্সিটির ড. মানিশ প্যাটেল ব্যাখ্যা করেন: “আমরা দীর্ঘসময় ধরেই যেহেতু জানি মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠ জীবন ধারণের জন্য অনুপযোগী, সুতরাং মঙ্গলে জীবনের চিহ্ন খঁজায় আমাদের লক্ষ্য হবে এর তলদেশ।”

এর যৌক্তিক কারণ ভূপৃষ্ঠের নিচে ক্ষতিকর বিকিরণের অনুপস্থিতি আর তাপমাত্রা ও চাপের ভারসাম্য অনুকূল মাত্রায় রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলতে গেলে, এই বৈশিষ্ট্য তরল পানির পরিবেশ যোগান দেয় যা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়।

জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানের জন্য এই নীতি অনুসরণ করা, জীবনের অস্তিত্ব গবেষণায় একটি প্রধান সম্ভাব্যতা। যেহেতু পৃথিবীর জীবনের সৃষ্টির পেছনের কারণই আমাদের অভিজ্ঞতার পাথেয়। তাই, যখনই কোথাও পানি পাওয়া যায়, নিশ্চিত করে অন্য কিছু বলে ফেলা যায় না।

ড. প্যাটেলের মতে, আমরা জীবন চিহ্নিত করার ধারে কাছে নেই সত্য। তবে এই আবিষ্কার আমাদের বলে দিচ্ছে মঙ্গলের কোথায় আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিত। অনেকটা ধন ভাণ্ডার লুকিয়ে থাকা কোনো মানচিত্রে সম্পদের নিশানাযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়া।

পৃথিবীর নোনাপানির হ্রদগুলোয় কিভাবে প্রাণের কার্যক্রম কাজ করছে তা সাহায্য করতে পারে মঙ্গলের জন্য অনুসিদ্ধান্ত তৈরিতে; image source: Science Photo Library

পানির তাপমাত্রা এবং রাসায়নিক পরিবেশও একটি সমস্যা হতে পারে যেকোনো সম্ভাব্য মঙ্গলীয় জীবদেহের জন্য। এই শীতল পরিবেশে সেখানের তাপমাত্রা হতে পারে -১০ থেকে -৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানিতে দ্রবীভূত থাকতে পারে বিবিধ ধরণের লবণ, ফলে ঘন হয়ে নিম্ন তাপমাত্রায়ও তরল থাকবে পানি।

অতিরিক্ত শীতল এবং নোনা পরিবেশ প্রাণের জন্য খুবই বৈরী পরিস্থিতির হবে বলে ব্যাখ্যা করেন ড. ক্লেয়ার কাজিন্স, যিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট এন্ড্রুজের একজন জ্যোতিঃজীববিজ্ঞানী।

এরপর কী?

মঙ্গলে প্রাণের দেখা পেতে বিজ্ঞানীরা বারবার আশার দোলাচলে দুলেছেন। যখনই কোনো সম্ভাবনার দেখা মিলেছে, অতীত বা বর্তমানে প্রাণের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে তথ্য ও আরো গভীর গবেষণা চিরন্তন চাহিদাই ছিল। বরাবরের মত, এই হ্রদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। এ হ্রদের বৈশিষ্ট্য, ধর্ম যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে।

ওপেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ম্যাট বাম বলেন, বর্তমান করণীয় হল একই ধরণের মাপজোখ, জরিপ অন্যান্য স্থানগুলোতেও করা, একই ধরণের সংকেত খুঁজে বের করা, এমনকি সম্ভব হলে, অন্যান্য সকল ব্যাখ্যা পরীক্ষা করা এবং একে একে সেগুলোর যাচাইয়ে এই আবিষ্কারের সন্দেহ ছেঁটে ফেলা।

হয়ত এর ফলে মঙ্গলে অভিযানের ক্ষেত্রে এই পানিকূপে খননের প্রকল্প উদ্ভাসিত হতে পারে। এমনটা ইতিমধ্যে পৃথিবীতে এন্টার্কটিকায় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের অবাক করে দেয় যখন এন্টার্কটিকার চাপা পড়া ভস্টোক হ্রদে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই খননের পূর্ব পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ও অনুমান সেখানে প্রাণের অস্তিতে থাকার বৈধতা দিত না। তবে, মঙ্গলের ক্ষেত্রে এ ধরণের খনন যথেষ্ঠ উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রকল্প হবে।

মঙ্গলে পৌঁছানো এবং চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য নজির বের করা চারটিখানি কথা নয়। এখানে শুধু অভিযানই যথেষ্ঠ নয়, মঙ্গলের পরিবেশে রবোট খনন কাজ চালানোর জন্য যথেষ্ঠ মাত্রার প্রযুক্তি দক্ষতাও আমাদের অর্জন করতে হবে।

দক্ষিণ মেরুর ভস্টোক হ্রদ, পৃথিবীর সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গা প্রাণ পাওয়ার ক্ষেত্রে; image source: extremetech.com

এন্টার্কটিকার সেই ভস্টোক হ্রদের কথা বলার কারণ, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্ন তাপমাত্রার এলাকা। এর 3.5 কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে ৩৫০০ প্রজাতির প্রাণের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এত চরমতাপমাত্রার এলাকায় যদি নৈরাশ্যে ফল পেতে পারি, তবে মঙ্গলে কেন নয়?

 

বিবিসি এবং সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

জুলাই ২৭ তারিখে উপভোগ করুন পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ আর মঙ্গলকে দেখুন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ থেকে

চলতি মাস জুলাই আমাদের জন্য নিয়ে এসেছে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। এ মাসেই মঙ্গল গ্রহকে  দেখা যাবে অনেক কাছ থেকে আর অনেক উজ্জ্বলরূপে। শেষবার ২০০৩ সালে অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছর আগে মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে এবং এত উজ্জ্বল ভাবে দেখা গিয়েছিল। এমনকি প্রায় ৪ ঘন্টা ব্যাপী চন্দ্রগ্রহণও ঘটতে চলেছে এ মাসেই।

ছবিসূত্রঃ The Christian Science Monitor
ছবিসূত্রঃ NDTV.com

মঙ্গল আসছে পৃথিবীর নিকটতম দূরত্বে

লাল এই গ্রহটি আর কিছুদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে এর কক্ষপথের অপোজিশন নামক অংশে যেখানে পৃথিবীর সাপেক্ষে এর অবস্থান হবে সূর্যের ঠিক বিপরীতে। গত ১৫ বছরের মধ্যে এবারই মঙ্গলকে পৃথিবীর এত কাছ থেকে দেখা যাবে। সূর্যকে পৃথিবী ও মঙ্গল ২টি আলাদা কক্ষপথে আবর্তন করে। মঙ্গলের চেয়ে আবার পৃথিবীই সূর্যের অধিক নিকটবর্তী। তাই পৃথিবী মঙ্গলের চেয়ে দ্রুত বা কম সময়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পারে। ফলে প্রতি ২ বছরে অন্তত একবার করে সূর্য, পৃথিবী ও মঙ্গল একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান করে যাকে বলে অপোজিশন।

ছবিসূত্রঃ Phys.org

চলমান বছরে এই অপোজিশন হতে চলেছে জুলাই এর ২৭ তারিখে। আর পৃথিবী থেকে মঙ্গলকে সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যাবে জুলাই এর ৩১ তারিখে (সময় রাত ৩.৫০ EDT)। তাছাড়া মঙ্গলকে দেখা যাবে আরও উজ্জ্বলরূপে। ১৫ বছর আগে ২০০৩ সালে মঙ্গলকে বিগত ৬০,০০০ বছরের মধ্যে প্রথমবার এত উজ্জ্বলরূপে দেখা গিয়েছিল যখন এটি পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৪.৭ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান নিয়েছিল। নাসা কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এবারে মঙ্গলের অবস্থান হবে পৃথিবী থেকে মাত্র ৩৫.৮ মিলিয়ন মাইল বা প্রায় ৫৭.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার এবং এটি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হবে।

তবে EarthSky.org এ দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও মঙ্গলকে দেখা যাবে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে ক্যাপ্রিকর্ন নক্ষত্রমণ্ডলের অভ্যন্তরে। আর জুলাইয়ের ২১ থেকে আগস্টের ৩ তারিখ পর্যন্ত একে দেখা যাবে এর সবচেয়ে উজ্জ্বলরূপে। তবে যদিও মঙ্গল এর সবচেয়ে উজ্জ্বল রূপ আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছে, এটি ভাবার কোন কারণ নেই যে মঙ্গলকে দেখতে চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল লাগবে।

ব্লাড মুন

ছবিসূত্রঃ India Today

এই শতাব্দির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণও পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানকে কিছু সময়ের জন্য গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে আগমন করছে এই মাসেই। এই গ্রহণ ঘটতে চলেছে জুলাইয়ের ২৭ তারিখে এবং এর ব্যাপ্তি হবে প্রায় ৪ ঘণ্টা। ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও মধ্য প্রাচ্য থেকে এটি দেখা গেলেও যুক্তরাস্ট্র এবার এই চন্দ্রগ্রহণ উপভোগ করতে পারবে না। আবার পৃথিবীর অনেক স্থান থেকেই এই গ্রহণের কিছু অংশ দেখা গেলেও উত্তর আফ্রিকা, মধ্য প্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু জায়গা থেকে এটির লালবর্ণ ধারণ করা থেকে পুর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া সম্পুর্ণটাই সবচেয়ে ভালভাবে অবলোকন করা সম্ভব হবে। এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণে পৃথিবীর ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলবে এবং পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। একে বলা হয় টোটালিটি। এর ব্যাপ্তি হবে ১ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট।

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ কি?

ছবিসূত্রঃ TimeAndDate.com

চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্যকে ও চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এরা একটি সরলরেখা বরাবর অবস্থান নেয় এবং সূর্য ও চাঁদকে দুই পাশে রেখে মাঝখানে অবস্থান করে পৃথিবী। ফলে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পরে। যখন এই ছায়া সমগ্র চাঁদকে ঢেকে ফেলে তখনই একে বলা পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় কখনও কখনও চাঁদ লাল বর্ণ ধারণ করে। নাসার তথ্য অনুসারে, এর কারণ হল পৃথিবীতে সূর্য ওঠা ও অস্ত যাবার সময় সূর্যের লাল আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কর্তৃক সামান্য প্রতিসরিত হয় তথা বেঁকে যায়। এই প্রতিসরিত লাল আলো আবার পৃথিবী দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে চাঁদের ওপর পড়ে। ফলে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদকে রক্তবর্ণ তথা লাল দেখায়, আর একে বলা হয় ব্লাডমুন।

২০১৭ এর সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ কয়েক মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল কারণ চাঁদ সূর্যের সামনে এসে পড়েছিল আর চাঁদের ছায়া পড়েছিল পৃথিবীর উপর। সূর্যগ্রহণ সাধারণত খুব অল্প সময়ের জন্য হয় কারণ চাঁদ সূর্যের তুলনায় খুব ছোট হওয়ায় চাঁদের ছোট্ট ছায়া পৃথিবীর অল্প জায়গার উপর পরে এবং সেটুকুই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। অর্থ্যাৎ সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে আপনাকে থাকতে হবে চাঁদের ছায়া যেখানে পড়ছে সেখানে, কিন্তু চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় পৃথিবীর যে পৃষ্ঠে ঐ সময়ে রাত সেই পুরো অংশ জুড়েই।

তবে অনেকেই এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত যে এই পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। বিজ্ঞানীদের মতে এই গ্রহণ খালি চোখে দেখা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সূর্য গ্রহণের সময় সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো হয় বলে সূর্যরশ্মি দ্বারা চোখের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই এসময় সূর্যের আলো প্রতিরোধকারী চশমা ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের দিকে তাকানো হয়, আর এর আলো প্রতিফলিত সূর্য রশ্মি যা চোখের কোন ক্ষতি করেনা। ফলে কোন আলো প্রতিরোধকারী চশমার প্রয়োজন হয় না।

আরেকটি মজার তথ্য হল একই দিনে অর্থাৎ জুলাইএর ২৭ তারিখে আপনি মঙ্গলকে দেখতে পাবেন এর উজ্জ্বলতম রূপে। আবার মিল্কি ওয়ে গ্যলাক্সিকেও খালি চোখেই দেখতে পাবেন অনেকটা স্পষ্টভাবে যা অন্য সময় সচরাচর দেখা যায় না।

এখানে একটি বিষয় বলে রাখা জরুরী। যদিও ৩১ জুলাই মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসবে, কিন্তু ২৭ জুলাইও মোটামুটি একই রকম দূরত্বে থাকবে মঙ্গল। উপরন্তু ২৭ জুলাই চন্দ্রগ্রহণের অন্ধকারে মঙ্গল গ্রহকে অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাবে, যা ৩১ জুলাই চাঁদের আলোতে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।

আকাশ দেখা যাদের নেশা তাদের জন্য এই ৩ টি অভিনব সুন্দর মহাজাগতিক দৃশ্য একই সময়ে দেখতে পারা সত্যিই চমকপ্রদ ও সৌভাগ্যময় ঘটনা।

ধূমকেতুতে পাওয়া আণবিক অক্সিজেন ধূমকেতুতে তৈরি হয় নি

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার রোসেটা মহাকাশযান ৬৭পি ধূমকেতুকে পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘসময়। আগস্ট ২০১৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছিল। ধূমকেতু ৬৭পি এর অপর নাম চুরিয়ুমোভ গেরাসিমেঙ্কো। আর রোসেটার অভিযানকাল ছিল দীর্ঘ ১২ বছর। রোসেটা এ ধূমকেতুর উপর একটি প্রোবও পাঠিয়েছিল যা পরিশেষে বিপর্যস্ত হয়ে এর পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

রোসেটার তোলা ৬৭পি ধূমকেতুর ছবি। ছবিটি তোলা হয়েছিল সূর্যকে নিকট দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময়; Image Source: European Space Agency

যখন ধূমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন এর বরফ সূর্যের তাপে উর্ধ্বপাতিত হয়। উর্ধ্বপাতনের ফলে কোনো পদার্থ কঠিন থেকে সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এই গ্যাস একটি আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর যেটিকে মনে হয় ধূমকেতুর মাথা। কখনো কখনো একে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসও বলে।

ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস বা মাথায় মূলত থাকে পানি, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই অক্সাইড। রোসেটার যন্ত্রপাতি কর্তৃক পর্যবেক্ষণের তথ্য বলছে এর মাঝে আণবিক অক্সিজেনও রয়েছে। আণবিক অক্সিজেন বলতে বোঝায় অক্সিজেন গ্যাসের মৌল দশা– কোনো যৌগে অন্য মৌলের সাথে যুক্ত থাকা অক্সিজেন নয়।

ধূমকেতুর বিভিন্ন অংশ যে নামে চিহ্নিত হয়; image source: Quora

এই আণবিক অক্সিজেন গঠিত হয় দুটো অক্সিজেন পরমাণু একে অপরের সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে। পৃথিবীতে আমরা জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুমণ্ডলে যে অক্সিজেন পাই তার উৎপাদন হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মত এত অক্সিজেন তো এখনো কোথাও পাওয়া যায় নি, যাও অল্পসংখ্যক স্থানে পাওয়া গেছে তাও খুব নগণ্য মাত্রায়। ইতিপূর্বে জুপিটারের কিছু বরফময় উপগ্রহে আণবিক অক্সিজেনের দেখা মিলেছে, কিন্তু কখনো ধূমকেতুতে পাওয়া যাবে এমনটা আশা করা হয় নি।

ধূমকেতুসহ আমাদের পুরো সৌরমণ্ডল গঠিত হয়েছিল অতিকায়, বিস্তৃত গ্যাসের মেঘ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে। অধিকাংশ পদার্থ মিলে গ্রহ তৈরি করেছিল, এছাড়াও কিছু ক্ষুদ্র দলা আকৃতির গ্যাস আর ধুলা জমাট বেধেছিল সৌরমণ্ডলের বাইরে। বাইরে হওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট কম ছিল যাতে বরফ গঠিত হতে পারে। আর ধূমকেতুর উপাদানগত কারণে এর অপর নাম কিন্তু ”নোংরা তুষারবল”।

রোসেটার বিজ্ঞানী দল তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ করে, এই অক্সিজেন ধূমকেতুর মূলদেহ বা নিউকিয়াসে গঠিত হয় নি। অর্থাৎ, আগে থেকেই এই আণবিক বা মৌলিক অক্সিজেনের অস্তিত্ব ছিল। সৌরমণ্ডলে ৪৬০ কোটি বছর আগে এটি গঠন হওয়ার সময়ই এতে অক্সিজেন উপস্থিত ছিল।

এই গবেষকদলের সাথে যুক্ত নয় এমন আরেকটি গবেষকদল অক্সিজেনের উৎসের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তারা মনে করে ধূমকেতুতে অক্সিজেন অন্য কোনো উপায়ে সঞ্চার হতে পারে। তারা একটি উপায়ও বাতলে দিয়েছে কিভাবে মহাশূন্যে আণবিক অক্সিজেন সৃষ্টি হতে পারে। বৈদ্যুতিকভাবে আহিত অণু বা শক্তিশালী আয়নের নির্দিষ্ট দিকে আলোড়নের মাধ্যমেও অক্সিজেন অণু গঠিত হতে পারে। অনেকটা নির্দিষ্ট দিকে আয়ন দিয়ে গুলি করার মত ব্যাপার।

তাদের প্রস্তাবনা ৬৭পি এর পৃষ্ঠের সাথে শক্তিশালী আয়নের বিক্রিয়ায় এই অক্সিজেন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। মহাকাশে এমন শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়।

আর তাই রোসেটা বিজ্ঞানীদলের সদস্যরা ৬৭পি থেকে প্রাপ্ত তথ্য নতুন তত্ত্বের আলোয় বিশ্লেষণ করেছেন। নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তারা ধূমকেতুর পৃষ্ঠে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়ার প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন। পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অক্সিজেন পাওয়া গিয়েছে সে পরিমাণে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া যথেষ্ট নয়। রোসেটা বিজ্ঞানীদলে কাজ করছেন ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের কতক পদার্থবিজ্ঞানী।

গবেষণাপত্রের শীর্ষ লেখক ইম্পেরিয়াল কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের কেভিন হেরিটায়ার বলেন, ৬৭পি এর মাথায় প্রথমবারের মত আণবিক অক্সিজেন আবিষ্কার একই সাথে ছিল চমক জাগানিয়া এবং উত্তেজনাকর। আমরা আণবিক অক্সিজেন তৈরির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। শক্তিশালী আয়ন, কণার বিচ্ছুরণের পরিমাণ ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আপতিত হয়ে নতুন অক্সিজেন গ্যাস উৎপাদন করার হার থেকে আমাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অক্সিজেনের পরিমাণের সাথে গরমিল রয়েছে। শক্তিশালী আয়নের বিচ্ছুরণ কোনোভাবেই এ পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করার জন্য দায়ী হতে পারে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক ডক্টর ম্যারিনা গালান্ড যিনি একই কর্মস্থানে কাজ করছেন হেরিটায়ারের সাথে রোসেটা প্লাজমা কনসোর্টিয়ামে সহ-অনুসন্ধানকারী হিসেবে তিনি এ ব্যাপারে একই সুরে মত দেন। ধূমকেতুর পৃষ্ঠে আয়ন আপতিত হয়ে অণু গঠন সম্ভব কিন্তু সে পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ নয়।

নতুন বিশ্লেষণ এই গবেষক দলের মূল সারাংশের সাথে মিলে যায়, এই আণবিক দশার অক্সিজেন ধূমকেতু গঠনের সময়কার। অন্যান্য আরো তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে যা এখনো একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। তবে ধূমকেতু গঠনের সময়ই অক্সিজেনের সংযুক্তির তত্ত্ব এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উপযোগী তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক তত্ত্বসমূহ অন্ধকার মেঘ এবং আদি সৌরজগতের পরিবেশে আণবিক অক্সিজেনের উপস্থিতিকে সমর্থন করে। এই মডেলে আণবিক অক্সিজেন গঠনের পর জমে যায়, পরিণত হয় ক্ষুদ্র ধুলিকণায়। মহাকাশে হাজার হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার অজস্র নক্ষত্র থাকলেও বিশালতার কারণে মহাশূন্যের তাপমাত্রা খুবই কম, গড় তাপমাত্রা পরম তাপমাত্রার মাত্র তিন ডিগ্রি উপরে। তাই গ্যাস জমে দানা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

অক্সিজেনের এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর সাথে আরো অন্যান্য উপাদান মিশে ক্রমে ধূমকেতু গঠন করে আর অক্সিজেন ধূমকেতুতে আটকা পড়ে থাকে। সূর্যের কাছে আসায় উত্তাপে জমাট অক্সিজেন ও অন্যান্য পদার্থ আবহাওয়ামণ্ডল তৈরি করে ধূমকেতুর নিউক্লিয়াস ঘিরে। উপরের ভিডিও ইলাস্ট্রেশন থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করে থাকবেন পাঠক।

 

Sciencedaily অবলম্বনে। 

যেভাবে হতে পারে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সমাপ্তি

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নাসার প্রেরিত হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলছে। নিঃসন্দেহে ২৬ বছর অনেক বড় একটা সময়। ২৬ বছর ধরে একটা যন্ত্র ঠিকঠাক মতো কাজ করে যাওয়াও খুব ইতিবাচক একটা লক্ষণ। তবে এটাও সত্য যে অন্যান্য যন্ত্রের মতো হাবল টেলিস্কোপও চিরস্থায়ী নয়। অনেকদিন ধরে টিকে আছে মানে এটা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শীঘ্রই এর ভগ্নদশা চলে আসছে। সময় থাকতে আগেভাগেই কিছু একটা করা উচিত।

স্পেস শাটল ডিসকভারির মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল হাবল টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। কেন একটা টেলিস্কোপকে মহাকাশে প্রেরণ করতে হবে? অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা অনুভব করে আসছিলেন ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া চিত্র অনেক ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বায়ুমণ্ডল দূষিত। মহাকাশের পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় না।

১৯৪৬ সালের দিকে লাইম্যান স্পিটজার নামে একজন বিজ্ঞানী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে একটি টেলিস্কোপ স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও তার সুবিধাদির কথা বর্ণনা করে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তখন থেকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে টেলিস্কোপ স্থাপনের ব্যাপারটি জোর পায়। কিন্তু প্রযুক্তি অনুকূলে হয় না। অনেকদিন পরে ১৯৯০ সালে এই চাহিদা বাস্তবে রূপ নিলো, হাবল বায়ুমণ্ডলের বাইরে স্থাপিত হলো।

চিত্রঃ উৎক্ষেপণ মুহূর্তে হাবল টেলিস্কোপ

কক্ষপথে স্থাপনের পর থেকেই হাবল মহাকাশ সম্বন্ধে একের পর এক অসাধারণ তথ্য ও প্রমাণাদি দিয়ে যাচ্ছিল। মাঝে একটি সমস্যা হয়েছিল, ছবি ঝাপসা আসছিল। পরে ১৯৯৩ সালে মহাকাশচারীদের নিয়ে টিম গঠন করে এর ত্রুটি সংশোধন করা হয়। সংশোধনের পাশাপাশি আরো উন্নতও করা হয়। এই টেলিস্কোপকে ব্যবহার করে মহাকাশ ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান সম্বন্ধীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এর মাঝে আছে মহাবিশ্বের প্রসারণের প্রমাণ, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব ইত্যাদি।

সময়ের সাথে সাথে যেন এটিও বয়স্ক হয়ে গেছে। এই কিংবদন্তীর সমাপ্তি নিয়েও ভাবনা চিন্তা করার সময় চলে এসেছে। হাবল টেলিস্কোপকে অপারেট করার দল আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যক্ত করেছেন যে, হাবল ২০২০ সাল পর্যন্ত ত্রুটিহীনভাবেই সেবা দিয়ে যাবে। এমনকি ২০২০ সালের পরেও আরো বেশ কয়েক বছর ভালোভাবে সেবা দেবার সম্ভাবনা আছে।

এ মুহূর্তে হাবল কেমন অবস্থানে আছে? অল্প স্বল্প ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে? হাবল মিশন অফিসের প্রধান কেন সেমব্যাচ জানিয়েছিলেন, হাবল এখন চমৎকার অবস্থায় আছে। নিকট ভবিষ্যতে হাবলের কোনো সমস্যা হবে বলেও তিনি মনে করেন না।

কীসের এদিক সেদিক হতে পারে?

  • নিয়ন্ত্রণের কৌশলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। হাবলের তিনটি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড আছে। তিনটিই আগের প্রযুক্তির। এখনকার প্রেক্ষিতে বলা যায় এগুলোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
  • নিয়ন্ত্রণ সেন্সরগুলো ঠিকমতো অপরিবর্তিত থাকতে হয়, কিন্তু এরা উচ্চ বিকিরণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
চিত্রঃ কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ
  • তবে আশার কথা হচ্ছে এটা নিয়ে ভাবার আরো অনেক সময় আছে। কম করে হলেও আরো ২০২০ সাল পর্যন্ত ভালোভাবে কাজ করবে হাবল টেলিস্কোপ। যদি এর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয় তাহলেও এর ধ্বংস হতে অন্তত ২০৩০ সাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।
  • রি-একশন হুইল ঠিকঠাকমতো কাজ না করলে হাবল তার উপজোগীতা হারাবে। হাবলের চারটি রি-একশন হুইল আছে। কাজ চালানোর জন্য কমপক্ষে তিনটি হুইল সক্রিয় থাকতে হয়। হাবলের একটি হুইল নষ্ট হয়ে গেলে আর কোনো বিকল্প থাকবে না। তখন অকেজো হবার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এখানে উল্লেখ করে রাখা উচিত যে ২০০৯ সালে নাসার প্রেরিত কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ তার কার্যকারিতা হারিয়েছিল হুইল নষ্ট হয়ে যাবার জন্যই। ২০১৩ সালে এর চারটির মাঝে দুটি হুইল নষ্ট হয়ে যায়। (তবে কেপলার একেবারেই অকেজো হয়ে যায়নি, K2 নামে নতুন একটি মিশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কেপলারকে।)
  • কম্পিউটার ও প্রোগ্রাম সংক্রান্ত কোনো ত্রুটির ফলেও হাবলের সমাপ্তি ঘটতে পারে। সমস্ত সিস্টেমের সাথে যুক্ত আছে এমন কোনো প্যানেলে ত্রুটি দেখা দিলে টেলিস্কোপের পুরো সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিবে। এর ফলে হাবল ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। এমনটা হওয়া খুব দুর্লভ কিছু নয়। তবে কর্তৃপক্ষ আশার কথা জানাচ্ছেন, হাবলের বেলায় এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা একদমই কম।
  • হাবল পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৫৬৮ কিলোমিটার উপরে থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলীয় ঘর্ষণের কারণে এই দূরত্বের পরিমাণ কমছে। এভাবে দূরত্ব কমতে থাকলে এবং নিজের ক্ষতি করতে থাকলে ভাবতে হয় এটি আর কতদিন সুস্থ ও বৈজ্ঞানিকভাবে উৎপাদনশীল থাকবে? এই অবস্থায় দুটি কাজ করা যেতে পারে। প্রথমটা হচ্ছে প্রথাগত উপায়ে হাবলকে আরো নিচে নামিয়ে কোনো সমুদ্রের মাঝে নামিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত বিশেষ পদ্ধতিতে একে আরো উপরের স্তরে পৌঁছে দেয়া।

  • হাবল টেলিস্কোপকে নিয়ে যদি কোনো চিন্তাই করা না হয়, কোনো খোঁজ-খবর নেয়া না হয় তাহলে একদিন এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে প্রবল ঘর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে একে শেষ হয়ে যেতে দিলে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন কিছু বিশেষজ্ঞ।
  • তাই হাবলকে উপরে পাঠালে কিংবা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নীচে নামিয়ে আনলেই হবে ভালো একটা সমাধান। কিন্তু দুইটা উপায়ের যেটাই করা হোক না কেন তাতে একটা স্পেস মিশনের দরকার হবে। কিন্তু এখনকার প্রযুক্তির তুলনায় পুরাতন এই টেলিস্কোপটিকে আবারো অনেক ব্যয় ও ঝামেলা করে উপরের স্তরে পাঠানো হবে নাকি এই অর্থ, সময় ও শ্রম নতুন কোনো একটি স্পেস টেলিস্কোপের পেছনে দেয়া হবে তাও ভাবার বিষয়।

পাশাপাশি হাবলকে নিয়ে অন্যান্য বিকল্প চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। নাসার প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট জেমস ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)-র সাথে হাবলের সমাবেশ ঘটানোর কথাও বলা হচ্ছে। জেমস ওয়েবার টেলিস্কোপ ছবি তুলবে অবলোহিত (Infrared) আলোকের চোখ দিয়ে, আর হাবল ছবি তুলে দৃশ্যমান আলোকের চোখ দিয়ে।

দৃশ্যমান আলোতে তোলা ছবি ও অবলোহিত আলোতে তোলে ছবি পরস্পর তুলনা করলে অনেক ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে হাবলের কিংবা জেমস ওয়েবারের একার তোলা ছবি থেকে উভয়ের তোলা ছবির সম্মিলিত রূপ অধিক পরিমাণ সঠিক তথ্য বহন করবে।

তথ্যসূত্র-স্পেস ডট কম, জিরো টু ইনফিনিটি (এপ্রিল ২০১৫) ও নাসা

মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন

আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এম. এল. হিউমাসন লাল সরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেকগুলো নাক্ষত্রিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের সাহায্যে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেন যে, আকাশপটে দৃশ্যমান অধিকাংশ ক্ষীণ বস্তুই আসলে আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি। দেখতে স্বল্প উজ্জ্বলতার হলেও বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে একেকটি গ্যালাক্সি গঠিত। খুব বেশি দূরে অবস্থান করছে বলে তাদেরকে ক্ষীণ বলে প্রতিভাত হয়।

তখন পর্যন্ত এটি পরিষ্কার যে, সমস্ত মহাবিশ্বই গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ। সবচেয়ে শক্তিশালী অপটিক্যাল টেলিস্কোপ বা সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সবচেয়ে দূরে পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যাবে সে অংশটি গ্যালাক্সি দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। বিস্তৃত শূন্যস্থানের মাধ্যমে এসব গ্যালাক্সি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। মহাবিশ্ব নিয়ে আলোচনার গভীরে যাবার আগে পরিষ্কার হওয়া উচিৎ ‘মহাবিশ্ব’ বলতে কী বোঝায়।

শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানেও আমরা গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছি। এমনটা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে পর্যবেক্ষণকৃত সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সির বাইরেও আরো অনেক গ্যালাক্সি বিদ্যমান আছে।

ধারণা করা হয়, আমাদের চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সিতে যদি বুদ্ধিমান প্রাণের অস্তিত্ব থাকে এবং তারাও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে আমাদের মতোই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। যেদিকেই তাকাক না কেন, যত দূরেই তাকাক না কেন, সবদিকে সবখানেই গ্যালাক্সির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। এভাবে হিসাবকৃত সকল গ্যালাক্সির সমষ্টিকে বলা যেতে পারে ‘মহাবিশ্ব’।

চিত্র: প্রত্যেকটি বিন্দুই এক একটি স্বতন্ত্র গ্যালাক্সি। ছবি: নাসা

উপরের বক্তব্যকে মহাবিশ্বের সংজ্ঞা বলে ধরে নিলে এখান থেকে একটি প্রশ্নের জন্ম হয়। এমন কোনো গ্যালাক্সির অস্তিত্ব থাকতে পারে কি যারা এই সমষ্টির বাইরে অবস্থিত? এই প্রশ্ন আবার মহাবিশ্বের আরেকটি বিকল্প সংজ্ঞার সাথে সাথে সম্পর্কিত- জগতে অস্তিত্বমান সকল বস্তুকে একত্রে মহাবিশ্ব বলে। সংজ্ঞা দুটির মাঝে মিল থাকলেও তারা উভয়ে এক নয়। আমরা এখানে প্রথম সংজ্ঞাটিকেই ব্যবহার করবো, কারণ দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি কিছুটা জটিলতার জন্ম দেয়।

কিছু কিছু গ্যালাক্সি একত্রে একটি গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলে ক্লাস্টার। একেকটি ক্লাস্টারে কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত গ্যালাক্সি থাকতে পারে। কিছু তথ্য-উপাত্ত বলছে ক্লাস্টারগুলোও একটি আরেকটির সাথে মিলে গ্রুপ তৈরি করে। এধরনের গ্রুপকে বলা হয় সুপারক্লাস্টার। কয়েকটি সুপার ক্লাস্টারগুলো মিলে আবার আরো বড় গ্রুপ তৈরি করে কিনা? সুপার ক্লাস্টারের গ্রুপ কিংবা তার চেয়েও বড় কোনো গ্রুপের সন্ধান এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গড়পড়তাভাবে মহাবিশ্বের সকল স্থানে গ্যালাক্সিগুলো সমানভাবে বণ্টিত। আমরা যদি মহাবিশ্বের দুটি অংশকে বিবেচনা করি এবং গড়পড়তাভাবে তুলনা করি তাহলে তাদেরকে একইরকম বলে মনে হবে। দুই ভিন্ন অংশে গ্যালাক্সির পরিমাণ এবং গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে গড় দূরত্ব প্রায় একই থাকবে।

হিসাব অনুসারে এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সির গড় দূরত্ব গড় দূরত্ব প্রায় এক মিলিয়ন আলোক বর্ষ। এখন আমরা যদি এই মহাবিশ্বের মাঝে একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ দৈর্ঘ্য, একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ প্রস্থ এবং একশো মিলিয়ন আলোক বর্ষ উচ্চতার দুটি ঘনক কল্পনা করি এবং তাদেরকে তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে তারা প্রায় একইরকম। দেখা যাবে উভয়ের মাঝে মোট গ্যালাক্সির পরিমাণ প্রায় একই এবং গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে গড় দূরত্বও প্রায় একই।

ঘনক দুটি মহাবিশ্বের যে স্থানেই অবস্থান করুক না কেন তাদের মাঝে গ্যালাক্সির বণ্টন গড়পড়তা একই হবে। এটি শুধু বর্তমান কালের জন্যই নয়, অতীত বা ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের বেলাতেই তারা এরকম সদৃশ হবে। এখানে ‘যেকোনো সময়’-এর নামে মহাবিশ্বের গঠনবিন্যাস সম্পর্কে যে শর্তটি উল্লেখ করা হয়েছে সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহাবিশ্ব পরিবর্তনশীল এবং মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে গ্যালাক্সির সংখ্যাও সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

পাশাপাশি দূরের গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। দূরের গ্যালাক্সি থেকে অবমুক্ত হওয়া আলো অনেক অনেক পথ অতিক্রম করে আমাদের চোখে এসে ধরা দেয়। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে আলোর মিলিয়ন মিলিয়ন বছর লেগে যায়। বর্তমানে গ্যালাক্সিকে যেরকম দেখছি তা আসলে গ্যালাক্সির মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের রূপ। সেসব গ্যালাক্সির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্যই নেই আমাদের কাছে।

গ্যালাক্সিগুলো আইসোট্রপিক

আমাদের সাপেক্ষে গ্যালাক্সির বিন্যাস আইসোট্রপিক। এর মানে যেভাবেই পর্যবেক্ষণ করি না কেন, সবদিক থেকে গ্যালাক্সির বিন্যাস একইরকম বলে মনে হবে। আর যদি মেনে নেই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান বিশেষ কোনো স্থানে নয়, ‘শ্রেষ্ঠ’ তকমার কোনোকিছু দখলও করে রাখছি না, আমাদের গ্যালাক্সিও অন্যান্য সকল গ্যালাক্সির মতোই সাধারণ তাহলে আরো চমকপ্রদ কিছুর প্রত্যক্ষ করবো। তাহলে দেখতে পাবো গ্যালাক্সিসমূহের বিন্যাস মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানের সাপেক্ষেই আইসোট্রপিক।

শুধু আমাদের সাপেক্ষেই নয়, মহাবিশ্বের যেকোনোকিছুর সাপেক্ষেই গ্যালাক্সিগুলো সমরূপে বিন্যস্ত। শুধু বর্তমানের কালের জন্যই নয়, অতীত ও ভবিষ্যতের যেকোনো সময়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য।

তার উপর গ্যালাক্সির বিন্যাস ও বিস্তৃত যদি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই আইসোট্রপিক হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে দেখানো যায় যে, গ্যালাক্সিগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

১৯৩০ সালের দিকে হাবল আবিষ্কার করেন দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু এতটুকোই নয়, তিনি তাদের মধ্যে সুস্থিত কিছু নিয়মবদ্ধতাও খুঁজে পান। তিনি দেখতে পান কোনো গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে যত দূরে অবস্থিত তার অপসরণের বেগ তত বেশি। দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণের এই বেগ একটি নিয়ম মেনে চলে। একে বলা হয় হাবলের নীতি বা Hubbles’ Law।

এই নীতি বলছে যে, গ্যালাক্সির দূরত্ব কত সেটি জানলেই তার অপসরণ বেগ বের করা যাবে। দূরত্বকে বিশেষ একটি ধ্রুবক দিয়ে গুণ করলেই তার বেগ পাওয়া যাবে। বিশেষ এই ধ্রুবককে বলা হয় হাবল ধ্রুবক। এই ধ্রুবক সকল গ্যালাক্সির জন্য এবং সকল সময়ের জন্য একই থাকে।

গ্যালাক্সির অপসরণের এই ব্যাপারটিকে অন্যাভাবেও বলা যায়। গ্যালাক্সির অপসরণ বেগ তার দূরত্বের সমানুপাতিক। উদাহরণ হিসেবে দুটি গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করতে পারি। একটি গ্যালাক্সি আমাদের কাছ থেকে কোনো এক বেগে দূরে সরে যাচ্ছে। অপর গ্যালাক্সির অবস্থান প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ দূরে। দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থানের কারণে তার অপসরণ বেগও হবে প্রথম গ্যালাক্সির দ্বিগুণ।

হাবলের এই নীতিটি সকল প্রেক্ষাপটে সঠিক নয়, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেসকল গ্যালাক্সি আমাদের নিকটে অবস্থান করছে তাদের বেলায় এই নীতি কাজ করে না। সকল গ্যালাক্সিতেই অপসরণ বেগের পাশাপাশি আরো কিছু বেগ কাজ করে। যেমন এক গ্যালাক্সির প্রতি আরেক গ্যালাক্সির আকর্ষণ বেগ।

আমাদের নিকটবর্তী গ্যালাক্সিগুলোতেও এরকম কিছু বেগ ক্রিয়াশীল আছে। হয়তো এই ক্রিয়াশীল বেগ এবং অপসরণ বেগ পরস্পর কাটাকাটি হয়ে যায়, যার কারণে তারা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় না। এর অন্যতম একটি উদাহরণ হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি দূরে সরে তো যায়ই না উপরন্তু আরো কাছে ধেয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের কাছে চলে আসছে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি
ছবি: পপুলার সায়েন্স

অন্যদিকে খুব নিকটের গ্যালাক্সির পাশাপাশি খুব বেশি দূরের গ্যালাক্সির বেলাতেও হাবলের নীতি কাজ করে না। কারণ, অতি-দূরের গ্যালাক্সিগুলোর বেলায় যদি হাবলের সূত্র প্রয়োগ করা হয় তাহলে দেখা যাবে এদের অপসারণ বেগও হয়ে গেছে অকল্পনীয় পরিমাণ বেশি।

এতই বেশি যে এর পরিমাণ হবে আলোর বেগের চেয়েও অধিক। কিন্তু আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না। বেগের এই সমস্যার অবশ্য সুরাহা আছে, তবে এই সুরাহা অনেক সূক্ষ্ম ও জটিলতাপূর্ণ।

পাশাপাশি অতি-দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেলায় যে হাবলের নীতি কাজ করে না সেটিও একদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই নীতির সাপেক্ষে অতি-দূরের গ্যালাক্সির ব্যতিক্রমী আচরণ আমলে নিয়ে মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

সেসব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে পরবর্তী সংখ্যায়।

উৎস- Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Page 16-18, Cambridge University Press

featured image: bbc.com

প্রক্সিমা সেনটাউরিতে বড় এক বিস্ফোরণ

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র হচ্ছে প্রক্সিমা সেনটাউরি। গত বছরের মার্চ মাসে সেখানে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। পৃথিবী থেকে এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে এই বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। অনেক শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরণ ছিল এটি। উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সূর্যের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশী আলো ছড়িয়েছে এই বিস্ফোরণের ফলে।

image source: dailymail.co.uk

Astrophysical Journal Letters এ এই বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় যেখানে এই বিশ্লেষণের ফলাফলগুলো প্রকাশ করা হয়। এই গবেষণার একজন গবেষক Dr. MacGregor বলেছেন যে মার্চ ২৪, ২০১৭ প্রক্সিমা সেন্টারির জন্য অন্য কোনো সাধারণ দিনের মতো ছিল না। এই বিস্ফোরণের ফলে যে আলোর ঝলকানির তৈরি হয় তা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে দৃশ্যমান আলো থেকে প্রায় ১০০০ গুণ বেড়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র: https://sciencedaily.com/releases/2018/02/180226103341.htm

 

 

 

নক্ষত্র হতে আগত অলংকার

পৃথিবীতে অন্যান্য মৌলের তুলনায় স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। স্বর্ণ যে শুধু পৃথিবীতেই কম তা নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেই কম। সমগ্র মহাবিশ্বে কেন কম হবে তার পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত পরিমাণ স্বর্ণ আছে তার সামান্যতম অংশও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। অল্প-স্বল্প স্বর্ণ যা-ই আছে তার সবই এসেছে সৌরজগৎ তথা পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে। এটা কীভাবে হয়? এর উত্তর পেতে হলে জানতে হবে গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে।

নক্ষত্র গঠনের মূল উপাদান হলো মহাজাগতিক ধূলি। এই ধূলির মাঝে থাকে হাইড্রোজেন গ্যাস, হিলিয়াম গ্যাস, লিথিয়াম গ্যাস সহ আরো অনেক উপাদান। তবে সেসবের মাঝে সবচেয়ে বেশি থাকে হাইড্রোজেন। এই হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের ভেতরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ভারী মৌল গঠন করে। বিগ ব্যাং এর পর পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম অনুসরণ করে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়াম মৌলগুলো তৈরি হয়েছে। এরপর মহাবিশ্বও প্রসারিত হয়েছে এবং তারাও ছড়িয়ে পড়েছে মহাবিশ্বের সর্বত্র।

কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী বিস্তৃত এরকম ধূলিমেঘ থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। কোনো একটি এলাকায় কিছু গ্যাস মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একত্র হয়। একত্র হলে ঐ অংশের ভর বেড়ে যায়। মহাকর্ষ বলের নিয়ম অনুসারে কোনো বস্তুর ভর বেশি হলে তার আকর্ষণও বেশি হবে। সে হিসেবে ঐ একত্র হওয়া ধূলির মেঘ আরো বেশি বলে আকর্ষণ করবে পাশের মেঘকে। এভাবে আরো ভর বাড়বে এবং আরো বেশি আকর্ষণ ক্ষমতা অর্জন করবে। এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।

এক পর্যায়ে দেখা যাবে ঐ বস্তুটি এত বড় হয়ে গেছে যে সেখানে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। নিজের মহাকর্ষের শক্তিতেই নিজের পরমাণু লেপ্টে যাচ্ছে। এমন শক্তিশালী আভ্যন্তরীণ চাপে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে যায়। দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একত্র হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে।

একাধিক ছোট পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে একটি বড় পরমাণু তৈরি করার এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। আমরা যে সূর্যের তাপ শক্তি ও আলোক শক্তি পাচ্ছি তার সবই আসছে এই ফিউশন প্রক্রিয়ায়।

চিত্র: সূর্যের সকল শক্তি আসছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। ছবি: Imgur

ফিউশন প্রক্রিয়ায় একত্র হতে হতে সকল হাইড্রোজেনই একসময় হিলিয়ামে পরিণত হয়ে যায়। তখন হিলিয়াম আবার একত্র হওয়া শুরু হয়। এ পর্যায়ে দুটি হিলিয়াম পরমাণু একত্র হয়ে একটি কার্বন পরমাণু তৈরি করে। হিলিয়াম পরমাণু শেষ হয়ে গেলে কার্বনও আরো ভারী মৌল তৈরি করে।

এ প্রক্রিয়ায় পর্যায় সারণীর শুরুর দিকের হালকা মৌলগুলো তৈরি হয়। লোহা বা তার চেয়েও বেশি ভারী মৌলগুলো এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না। কারণ লোহা তৈরি করতে যে পরিমাণ আভ্যন্তরীণ চাপীয় শক্তি প্রদান করতে হবে সাধারণ নক্ষত্রগুলোর সে শক্তি নেই।

যেমন আমাদের সূর্যের কথাই বিবেচনা করা যাক। এর এত তেজ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নক্ষত্ররে তুলনায় এটি একদমই মামুলী একটি নক্ষত্র। সূর্যের আভ্যন্তরীণ চাপে শুধুমাত্র হিলিয়াম থেকে কার্বন পর্যন্ত চক্র চলবে। এরপর আরো ভারী মৌল তৈরি করতে যে পরিমাণ চাপ থাকা দরকার সূর্যের তা নেই।

তাহলে লোহা এলো কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা হিসাব নিকাশ ও পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় লোহা তৈরি হতে পারে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে পদার্থবিদ্যার কিছু নিয়ম অনুসারে প্রবল চাপে চুপসে যায় নক্ষত্র। প্রবল সে চাপে লোহা তৈরি হওয়া সম্ভব।

সুপারনোভা কেন বিস্ফোরিত হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সুপারনোভাও অন্যান্য নক্ষত্রের মতো বিশেষ একপ্রকার নক্ষত্র। সাধারণ নক্ষত্রে অভ্যন্তরীণ চাপ ও বহির্মুখী চাপ একটি সাম্যাবস্থায় থাকে। অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয় মহাকর্ষের ফলে। আর একাধিক পরমাণু একত্র হয়ে যে প্রবল শক্তি তৈরি করছে তা বাইরের দিকে চাপ দেয়। এই দুই বিপরীতধর্মী চাপের ফলে নক্ষত্র একটি সাম্যাবস্থায় থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে বহির্মুখী চাপ, অভ্যন্তরীণ চাপের চেয়ে খুব বেশি হয়ে যায়। সেসব নক্ষত্র প্রচণ্ড বেগে বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এধরনের নক্ষত্রকে বলে সুপারনোভা। সুপারনোভার বিস্ফোরণেই লোহা বা তার চেয়ে সামান্য বেশি ভারী মৌলগুলো তৈরি হবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চাপ পায়।

চিত্র: সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে তৈরি হয় লোহা।
ছবি: Gemini Observatory/Lynette Cook

কিন্তু স্বর্ণ? লোহার পারমাণবিক ভর ৫৬ আর স্বর্ণের পারমাণবিক ভর ১৯৬। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে লোহার চেয়ে স্বর্ণের ভর অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন এরকম কোনো বিস্ফোরণই স্বর্ণ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে যে পরিমাণ চাপ তৈরি হয় তার চেয়েও ১০০ গুণ বেশি চাপ প্রয়োজন হবে স্বর্ণের পরমাণু তৈরিতে।

এরকম চাপ তৈরি হতে পারে খুব ভারী কোনো নক্ষত্রের সাথে আরেকটি ভারী নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। সাধারণ নক্ষত্রের সংঘর্ষে এত চাপ তৈরি হবে না। এটি সম্ভব খুব ভারী দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে কিংবা একটি নিউট্রন নক্ষত্র ও একটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষে। উল্লেখ্য ব্ল্যাকহোলও একপ্রকার নক্ষত্র।

তত্ত্ব অনুসারে এভাবে স্বর্ণ তৈরি হবে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে তো মেনে নেয়া যায় না। কে জানে এই মহাজগতে এমন কোনো প্রপঞ্চ হয়তো লুকিয়ে আছে যার মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে স্বর্ণ তৈরি হচ্ছে, আর সেই প্রপঞ্চ আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ অনিশ্চয়তা নিয়ে আর মন খারাপ করতে হবে না। সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০১৭) বিজ্ঞানীরা এর একটি সমাধান পেয়েছেন। এই সমাধান সম্প্রতি পেলেও এর জন্ম হয়েছিল অনেক আগেই।

আজ থেকে ১৩০ মিলিয়ন বছর আগে, আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরের এক গ্যালাক্সিতে দুটি নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বেশ কিছুটা সময় তারা একে অপরকে সর্পিলাকারে আবর্তন করে, সজোরে আছড়ে পড়ে একটি আরেকটির উপর।

অত্যন্ত শক্তিশালী এই সংঘর্ষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নক্ষত্রের ভগ্ন অংশ। পাশাপাশি আরো ছড়ায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং অতীব তীব্র আলোক রশ্মি। সূর্যের সাথে তুলনা করলে সে তীব্রতা হবে সূর্যের চেয়ে মিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বেশি। এতই তীব্র যে সেগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরত্ব থেকেও দেখা যায়।

দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয়া এসব তরঙ্গ যাত্রা শুরু করে পৃথিবীর দিকে। লক্ষ লক্ষ বছর ব্যাপী ভ্রমণ করতে থাকে পথ। করতে করতে ১৩০ মিলিয়ন বছর পার করে এসে পৌঁছায় পৃথিবীর বুকে। আর ঘটনাক্রমে এই সময়টাতেই বিজ্ঞানীরা তাক করে রেখেছিল টেলিস্কোপ সহ অন্যান্য শনাক্তকরণ যন্ত্র। আর তাক করার দিক ছিল ঠিক ঐ নক্ষত্রের দিকেই। বিজ্ঞানের কল্যাণে তাই আমরা এখানে বসে আজ থেকে দূরের ১৩০ মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি।

এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে স্বর্ণ জন্ম নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন এরকম সংঘর্ষের মাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা স্বর্ণ ও প্লাটিনামের মতো মৌল তৈরির জন্য সকল শর্ত পূরণ করে।

চিত্র: স্বর্ণ তৈরি হয়েছে সুপারনোভা কিংবা ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে। ছবি: Agora Economics

এ তো গেল এক রহস্যের সমাধান। দূর নক্ষত্রের মিলনে স্বর্ণের জন্ম হয় ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে জন্ম নেয়া স্বর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্যান্য গ্রহে কীভাবে যায়? দুই সুপারনোভার যখন সংঘর্ষ ঘটে তখন সেখান থেকে প্রচুর নাক্ষত্রিক উপাদান বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে। সেসব ছিটকে যাওয়া পদার্থের সাথে স্বর্ণও থাকে। আবার এই সংঘর্ষের পর সুপারনোভার বিস্ফোরণ হলে তার উপাদান চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেসবের মাঝে স্বর্ণও আছে। এভাবে বিস্ফোরণের টুকরো টুকরো হয়ে গেলেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। মূলত এর মাধ্যমে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা হয়।

এই ছিটকে যাওয়া অংশগুলো আবার মহাজাগতিক ধূলিমেঘের সাথে মিলে আরেকটি নতুন নক্ষত্র গঠনে কাজে লেগে যায়। নক্ষত্রের গঠন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের সাথে গ্রহও তৈরি হয়, যেমন হয়েছিল সূর্যের পাশাপাশি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো।

ঐ যে সুপারনোভা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণগুলো সেগুলো তখন গ্রহ গঠনের সময় গ্রহের ভেতরে ঢুকে যায়। পৃথিবীতে আমরা যত স্বর্ণ দেখি তার সবই আসলে এসেছে এই দীর্ঘ আন্তঃনাক্ষত্রিক ধাপ পার হয়ে। তাই আমরা যখন নিজেদের হাতে কোনো স্বর্ণ দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবো তখন ভাবতে হবে, এই স্বর্ণ নিছকই কোনো ধাতু নয়। পৃথিবীর কোনো তাপ-চাপই এর কাছে কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে সুপারনোভার চাপ এবং সংঘর্ষের অকল্পনীয় ধাক্কা পার হয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে এই স্বর্ণ।

স্বর্ণ শুধু মামুলী অলংকার জাতীয় পদার্থ নয়, এর মাঝে লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের গান

স্বর্ণকে অনেকেই মূল্যবান পদার্থ হিসেবে দেখে, কারণ এটি খুব দুর্লভ। কোনো বস্তু দুর্লভ হলে তার মূল্য বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে তো দেখতে পারে সকলেই, তারাই তো অনন্য যারা স্বর্ণের ভেতরে নাক্ষত্রিক ও মহাজাগতিক কাব্যিকতা খুঁজে পায়।

তথ্যসূত্র

  1. https://theatlantic.com/science/archive/2017/10/the-making-of-cosmic-bling/543030
  2. https://quantamagazine.org/did-neutron-stars-or-supernovas-forge-the-universes-supply-of-gold-20170323/
  3. https://journals.aps.org/prl/abstract/1103/PhysRevLett.119.161101
  4. https://cnbc.com/2017/10/16/scientists-discover-neutron-star-collisions-make-gold-other-elements.html

featured image: smithsonianmag.com

ভুলে যাওয়া বাঙালি জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্র

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। ছিল না কোনো বড় সার্টিফিকেট। কিন্তু কেবলমাত্র নিজের ইচ্ছায় ভর করে তিনি নাম লিখিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। সাধনা নামক জিনিসটি থাকলে শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও যে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি।

১৮৭৮ সালের ১৬ ই জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন যশোর জেলার বকচর গ্রামে। বাবা গোরাচাঁদ ছিলেন স্থানীয় একজন ডাক্তারের সহকারী। মা পদ্মামুখ ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলায় সমবয়সী অন্যান্যদের মতোই তিনি ছিলেন খানিকটা দুরন্ত। বিদ্যালয়ের পড়াশোনায় কিছুটা অমনোযোগী। কিন্তু যে জিনিসটিতে রাধাগোবিন্দ অন্য সকলের চেয়ে আলাদা ছিলেন সেটি হলো আকাশের প্রতি আগ্রহ। মামার বাড়ির লাইব্রেরিটা ছিল তার সবচে’ প্রিয় জায়গা। কত ধরনের বই সেখানে! আর মামার বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে আকাশ দেখতে কী যে আনন্দ!

মামার বাড়ির একজনের কাছে তার সব প্রশ্ন আর কৌতূহল। তিনি তার দিদা, সারদা সুন্দরী ধর, এর কোলে শুয়ে রাতের আকাশ দেখতেন। পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহের পটভূমি রচিত হয় সেই থেকেই।

দশ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন যশোরের জিলা স্কুলে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে তার পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে বিজ্ঞানী অক্ষয় কুমার দত্তের লেখা চারুপাঠ বইতে ‘ব্রহ্মাণ্ড কী প্রকাণ্ড!’ প্রবন্ধটি তাকে বেশ আলোড়িত করেছিল। এ প্রবন্ধ তার জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার প্রতি আগ্রহ আরো তীব্র করে তোলে। এই ব্রহ্মাণ্ডের কোথায় আদি আর কোথায়ই বা অন্ত- এ প্রশ্ন তাকে স্বপ্নবিভোর করে তোলে। তার নিজের রচিত পাণ্ডুলিপিতে তিনি লিখেছেন-

অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ তৃতীয় ভাগ পড়িয়া, নক্ষত্রবিদ হইবার জন্যে আর কাহারো বাসনা ফলবর্তী হইয়াছিল কিনা জানি না, আমার হইয়াছিল। সেই উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল বাসনার গতিরোধ করিতে আমি চেষ্টা করি নাই।

কিন্তু এই স্বপ্নবিভোরতা তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে পিছিয়ে দেয়। জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স দিলেন, পাশ করতে পারলেন না। তিন তিন বার চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হলেন। এরপর ১৮৯৯ সালে ২১ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন ৯ বছর বয়স্কা মুর্শিদাবাদের মেয়ে মোহিনীকে। বিয়ের পর তিনি আরেকবার এন্ট্রান্স দেওয়ার চেষ্টা করেন। এবার তিনি পড়াশোনার পাট শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কারণ সাংসারিক দায়িত্ব তখন তার হাতে। মাত্র ১৫ টাকা বেতনে তিনি যশোর কালেক্টরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকরি নেন।

কিন্তু তার আকাশ দেখা থেমে থাকে না। সে সময়ে যশোরের আইনজীবী কালীনাথ মুখোপাধ্যায় তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় সাহায্য করেন। কালীনাথ মুখোপাধ্যায় নিজে আইনজীবী হলেও তার মূল আগ্রহ ছিল আকাশচর্চায়। সংস্কৃতে ‘খগোলচিত্রম’ বাংলায় ‘তারা’ এবং ইংরেজিতে ‘পপুলার হিন্দু এস্ট্রোনমি’ নামে তিনি কিছু বই লিখেন যা সে সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

উল্লেখ্য, সংস্কৃতে খগোল অর্থ জ্যোতিষ্কমণ্ডল। কালীনাথবাবু তার নিজের নক্ষত্র মানচিত্রটি (স্টার ম্যাপ) দিলেন রাধাগোবিন্দকে। এতে তারা দেখতে সুবিধা হয় তার। চাকরির কাজ শেষে সন্ধ্যে হলেই তিনি উঠে যেতেন ছাদে। স্টারম্যাপ কাজে লাগিয়ে চেনার চেষ্টা করতেন নক্ষত্রগুলোকে। কখনো কখনো সফল হতেন আবার কখনো হতেন না। তবে কোনো যন্ত্রপাতি বা কোনো শিক্ষক ছাড়াই খালি চোখে আকাশ দেখে তারা চেনা শুরু করেছিলেন তিনি।

এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। তিনি নিজে গিয়ে ‘খগোলচিত্রম’ আর ‘তারা’ বই দুটি কিনে নিয়ে আসেন। সাথে নিয়ে আসেন অল্প দামের একটি বাইনোকুলার। সামান্য এই বাইনোকুলার দিয়েই তিনি দেখেন হ্যালির ধূমকেতু। ধূমকেতু বস্তুতই তার জীবনে ধূমকেতুর ন্যায় পরিবর্তন এনে দিয়েছিল। ধূমকেতুর বর্ণনা তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখেন যা বিস্তারিত আকারে পরবর্তীতে হিন্দু পত্রিকায় ছাপা হয়।

সে সময় ধীরে ধীরে রাধাগোবিন্দ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় ছোট ছোট প্রবন্ধ পাঠাতে থাকেন। তার সেসব লেখা শান্তিনিকেতনের শিক্ষক জগদানন্দ রায়ের চোখে পড়লে তিনি রাধাগোবিন্দের কাছে প্রশংসাসূচক চিঠি লিখেন এবং তাকে একটি ভালো মানের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনতে পরামর্শ দিলেন।

কাজের এটুকু স্বীকৃতি পেয়ে উৎসাহিত হলেন রাধাগোবিন্দ। নিজের সামান্য কিছু জমি বিক্রি করে ২৭৫ টাকা দিয়ে একটি তিন ইঞ্চি ব্যাসের দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিনলেন। ১৯১২ সালের সেপ্টেম্বরে দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি ইংল্যান্ড থেকে মেসার্স কক্স শিপিং এজেন্সি লিমিটেডের মাধ্যমে রাগাগোবিন্দের কাছে এসে পৌঁছায়। স্বল্প আয়ের রাধাগোবিন্দকে খুব হিসেব করে চলতে হতো।

জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় তার যা ব্যয় হতো তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। সম্পূর্ণ যন্ত্রটির দাম পড়েছিল ১৬০ টাকা ১০ আনা ৬ পাই। প্রথমে মূল দূরবীনটির টিউব ছিল কার্ডবোর্ডের তৈরি যা পরে তিনি ইংল্যান্ডের মেসার্স ব্রহার্স্ট এণ্ড ক্লার্কসন থেকে পিতলের টিউব আনিয়ে নেন অতিরিক্ত ৯৬ টাকা ১০ আনা খরচ করে। পাশাপাশি এর উন্নতিও সাধন করে নেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন-

সন ১৩১৯ সালের আশ্বিন মাসে দুরবিন আসার পরে আমার নক্ষত্রবিদ্যা অনুশীলনের ৪র্থ পর্ব আরম্ভ। এই সময়ে আমি কালীনাথ মুখোপাধ্যায়ের খগোলচিত্রমতারা পুস্তকের সাহায্যে এটা-ওটা করিয়া যুগল নক্ষত্র, নক্ষত্র-পুঞ্চ নীহারিকা, শনি, মঙ্গল প্রভৃতি গ্রহ দেখিতাম। পরে জগদানন্দ রায়ের উপদেশ মত স্টার অ্যাটলাস এবং ওয়েবস সিলেসিয়াল অবজেক্ট ক্রয় করিয়া যথারীতি গগন পর্যবেক্ষণ করিতে আরম্ভ করি। কিন্তু ইহাতেও আমার কার্য্য বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই। তবে আমি এই সময়ে গগনের সমস্তরাশি নক্ষত্র ও যাবতীয় তারা চিনিয়া লইয়াছিলাম এবং কোনো নির্দিষ্ট তারায় দুরবিন স্থাপনা করিতে পারিতাম।

এরপর থেকে নতুন উদ্যমে তিনি পর্যবেক্ষণ করে চললেন ভ্যারিয়েবল স্টারদের। মহাকাশে কিছু তারা রয়েছে যাদের ঔজ্জ্বল্য নিয়ত পরিবর্তনশীল। এদেরকে বলে ভেরিয়েবল স্টার। ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টারস অবজারভারস’ বা এভসোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত মোটামুটি দেড় লক্ষের মতো ভ্যারিয়েবল স্টারের সন্ধান মিলেছে। রাধাগোবিন্দ ভ্যারিয়েবল স্টারদের বাংলা নাম দিয়েছিলেন ‘বহুরূপ তারা’।

আকাশ দেখতে দেখতে এলো ১৯১৮ সালের ৭ই জুন। অন্যদিনের মতোই রাধাগোবিন্দ বহুরূপ তারাদের পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু সেদিনকার আকাশটা অন্যদিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই উজ্জ্বলতার উৎস ঠিক কোথায়।

উৎসটা ঠিক কী এটা নিয়ে তার মনে যখন গজিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন, সে সময় তিনি আকাশে ঝলমলে একটি তারা দেখতে পান এবং সেটিকে দেখামাত্র পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার পর তিনি বুঝতে পারেন আসলে ঐ উজ্জ্বল তারাটি একটি নোভা যার নাম পরে দেয়া হয় ‘নোভা একুইলা ১৯১৮’ বা ‘নোভা একুইলা ৩’।

প্রবাসী পত্রিকাতে তিনি এটি নিয়ে লেখালেখিও করেন। আবার জগনানন্দ রায়ের উপদেশে রাধাগোবিন্দ তার লিপিবদ্ধ বিস্তারিত বিবরণ পাঠিয়ে দেন হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের চার্লস পিকারিং এর কাছে।

তখনকার দিনে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকার ফলে সে চিঠি পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। কিন্তু হার্ভার্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ তাকে অভিনন্দন জানায় এবং বেশ কিছু তারা মানচিত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর বই পাঠিয়ে তাকে সম্মানিত করেন। চিঠিতে হার্ভার্ড মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক হারলো শ্যাপলি অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন

বিদেশ থেকে পরিবর্তনশীল নক্ষত্র সম্পর্কে আমরা যেসব পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য পেয়ে থাকি তার মধ্যে আপনার দান অন্যতম। আপনাকে আমরা আন্তরিক শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

এরপর আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার এর সদস্য করে নেয়া হয় তাকে। ১৯২৬ সালে চার্লস এলমার এভসো থেকে তাকে একটি ৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ উপহার দেন। এলমারের দেওয়া সে টেলিস্কোপটি তার মৃত্যুর পরে দক্ষিণ ভারতীয় জ্যোতির্বিদ ভেইনু বাপ্পুর কাছে কিছুদিন থাকার পর এখন পরম যত্নে রাখা আছে দক্ষিণ ভারতের কাভালুর মানমন্দিরে।

এরপরে ফরাসি সরকার ভ্যারিয়েবল স্টারের উপর তার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে, ১৯২৮ সালে তাকে OARF (Officers Academic republican francaise) সম্মানসূচক উপাধি ও পদক প্রদান করেন। কলকাতায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মারফত তাকে এ সম্মান জানানো হয়। এর আগে কোনো বাঙ্গালি ফ্রান্স সরকারের এমন সম্মান অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেননি। তাকে সদস্য করে নেয়া হয় Association francaise des Observateurs detoiles Variables (AFOEV) এবং ব্রিটিশ এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনে।

১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সালের ভেতর প্রায় ৩৮ হাজার ভ্যারিয়েবল স্টার পর্যবেক্ষণ করে এ সমস্ত সংগঠনকে তার পর্যবেক্ষণ সম্বন্ধে জানান। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একজন বাঙালি জ্যোতির্বিদের এমন অসাধারণ কর্মকে বিশ্ব নতশিরে সম্মান জানায়।

দেশে-বিদেশে তার অসাধারণ কীর্তি নিয়ে তাকে প্রশংসার জলে ভাসানো হলেও শেষ জীবনটা তার কেটেছিল অনেক দারিদ্র্য আর অবহেলার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি ভারতে চলে যান। আভসো থেকে পাঠানো সেই টেলিস্কোপটি বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে কেড়ে রেখে দেয়। পরে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স সরকারের সাথে যোগাযোগের পর যশোরের জেলা প্রশাসক নিজে গিয়ে তার বাড়িতে টেলিস্কোপটি তাকে ফেরত দিয়ে আসেন।

ভারতে যাওয়ার পর তিনি যথেষ্ট আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে পড়েন। অভাব অনটনে খাবারের সংস্থান করতেও তার সংগ্রাম করতে হতো। বারাসাতের দুর্গাপল্লীতে ১৯৭৫ সালে ৯৭ বছর বয়সে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় তার প্রায় সমস্ত বইপত্র এবং তিন ইঞ্চির সেই দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি তিনি দান করে দিয়ে যান বারাসাতের সত্যভারতী বিদ্যাপীঠে।

কোনোরকম ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি যে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সাথে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন এর জন্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।

তথ্যসূত্র

  1. Rajesh Kochhar and Jayant Narlikar, Astronomy in India: Past, Present and Future (IUCAA, Pune and IIA, Bangalore, 1993)
  2. Otto Struve and Velta Zebres, Astronomy in the 20th Century (Macmillan Co., New York, p. 354, 1962)
  3. Nature, Vol. 107, No. 2700, p. 694 (1921)
  4. Monthly Reports and Annual Reports of the American Association of Variable Star Observers, p. 133 (1926)
  5. বিজ্ঞান সাধক রাধাগোবিন্দ, অমলেন্দু বন্দোপাধ্যায়
  6. বাংলার জ্যোতির্বিদ রাধাগোবিন্দ চন্দ্র- নাঈমুল ইসলাম অপু
  7. তিন অবহেলিত জ্যোতিষ্ক- রণতোষ চক্রবর্তী

বন্দী হবে গ্রহাণু

গ্রহাণুদেরকে একসময় মহাকাশের ভিলেন হিসেবে দেখা হতো। জ্যোতির্বিদরা দূর নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কোনো ছবি তুলতে গেলে সেখানে প্রায় সময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো এক গ্রহাণু। এদের যন্ত্রণায় নির্ভুল ছবি পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গ্রহাণুরা পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রাণিজগতের জন্য বিশাল হুমকি হতে পারে। পৃথিবীতে প্রতাপের সাথে দাপিয়ে বেড়ানো ডায়নোসরদের সমস্ত প্রজাতি তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবীতে গ্রহাণুর আছড়ে পড়ার কারণেই।

কিন্তু সময় এখন পাল্টেছে। গ্রহাণু হতে পারে মহাকাশ গবেষণার চমকপ্রদ এক বিষয়। আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তি বিকাশ ও বিবর্তনের অনেক তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে গ্রহাণু নিয়ে গবেষণা-বিশ্লেষণ করলে। ভবিষ্যতের মহাকাশ বাণিজ্যের এক উল্লেখযোগ্য উপাদান হবার সম্ভাবনা আছে এই গ্রহাণুর।

image source: cnet.com

জাপানের হায়াবুসা মহাকাশযান ২০১০ সালে একটি গ্রহাণু থেকে কিছু পরিমাণ ধূলিকণা নিয়ে ফিরে এসেছিল। নাসা এর চেয়েও বড় এক প্ল্যান করেছিল। একটি মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্রহাণু থেকে বড় আকারের নুড়ি নিয়ে আসা ছিল এ প্ল্যানের অংশ। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রজেক্টে নাসার পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট হয়নি, যার কারণে এটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু তারপরেও গ্রহাণুকে ধরা, এতে অনুসন্ধান ও গবেষণা করার যথেষ্ট ভালো কারণ আছে। নাসা এর পেছনে সময় ও লোকবল দিয়ে খাটছেও।

কীভাবে করা হবে এ কাজ

প্রথমে নাসা কর্তৃপক্ষ রাসায়নিক জ্বালানী সম্বলিত একটি রকেটের সাহায্যে একটি রোবটিক মহাকাশযান প্রেরণ করবে। পাশাপাশি থাকবে খুবই কার্যকর একটি ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম। এই সিস্টেম প্রয়োজনের সময় মহাকাশযানকে উপযুক্ত স্থানে বয়ে নিতে পারবে। সূক্ষ্মভাবে মহাকাশযানকে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে অবতরণ করিয়ে সেখান থেকে উপযুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েক টন ওজনের একটি নুড়ি তুলে আনবে।

এই নুড়ি তুলে আনতে রোবটিক হাত ব্যবহার করা হবে। ভরের দিক থেকে স্বল্প হবার কারণে গ্রহাণুর অভিকর্ষীয় টান কম। অভিকর্ষীয় টান কম বলে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে এই কাজটা করতে কষ্টকর হবে। তবে আশার কথা যে গ্রহাণুর অভিকর্ষ বল কম হলেও একদমই শূন্য নয়। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।

এরপর নুড়িটিকে সযত্নে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। সম্ভব হলে পৃথিবীতে নিয়ে আসবে। একবার সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা গেলে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা সহজেই ছোটখাটো মিশন নিয়ে এটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা গবেষণা করতে পারবে।

কেন প্রয়োজন

আজকের যুগে পর্যটকরা যেমন বার্লিন, প্যারিস, কক্সবাজার, সুন্দরবন ঘুরে বেড়ায় তেমনই এমন এক সময় আসবে যখন এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে যাওয়াও কক্সবাজার-সুন্দরবনের মতোই মামুলি ব্যাপার হয়ে যাবে। এমন ধরনের অল্প দূরত্বের বা অধিক দূরত্বের মহাকাশ ভ্রমণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হচ্ছে পানি।

পৃথিবীতে প্রচুর পানি থাকলেও সৌরজগতের অভ্যন্তরে কিংবা নাক্ষত্রিক ভ্রমণে যথেষ্ট পরিমাণ পানি উড্ডয়নের সময় মহাকাশযানের সাথে করে নিয়ে যাওয়া যায় না। প্রকৌশলগত কিছু সমস্যা আছে তাতে। বেশি পানি নিলে ওজন বেড়ে যাবে, যা মহাকাশযানকে স্বল্প সময়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে বাধার সৃষ্টি করবে।

জ্বালানীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেশি জ্বালানী নিলে বেশি পথ ভ্রমণ করা যাবে, আবার খুব বেশি নিলে ভর বেড়ে যাবে যা প্রাথমিক মুক্তিবেগ কাটিয়ে উড্ডয়নে সমস্যা করবে কিংবা উড়িয়ে নিতে সমস্যা করবে।

image source: theweek.com

এ সমস্যার মোটামুটি একটি সমাধান দিতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুগুলোতে প্রচুর পানি বরফায়িত অবস্থায় থাকে। গ্রহাণুর জ্ঞাতি ভাই ধূমকেতু তো সবটাই বরফ। বর্তমানে মহাকাশে প্রতি কেজি পানি বহনে খরচ পড়ে ১০ হাজার ডলার। গ্রহাণু থেকে পানি ব্যবহার করলে খরচের পরিমাণ কমে যাবে দশ গুণ। প্রতি কেজি পানি বহন করতে লাগবে ১ হাজার ডলার।

চিত্রঃ এভাবেই নুড়ির বড় খণ্ডকে নিয়ে আসা হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে চাঁদের পৃষ্ঠেও বরফ আছে। কিন্তু চাঁদে বরফ থাকলেও তা থেকে বরফ মুক্ত করে কক্ষপথে নিয়ে আসা যথেষ্ট জটিল কাজ। চাঁদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজে করা যাবে গ্রহাণু থেকে পানি সংগ্রহের কাজ।

একটি গবেষণায় দুই জন বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন সৌরজগতে অনেক অনেক গ্রহাণু আছে যারা পানি বহন করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য এগুলো যথেষ্ট। এদের মাঝে অনেক গ্রহাণুই আছে যাদের কাছে সহজে পৌঁছা সম্ভব।  এসব গ্রহাণু থেকে বরফ সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে আসা এবং সৌরশক্তি বা যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে তাদের গলিয়ে পানিতে রূপান্তর করা প্রকৌশলগত দিক থেকে অসম্ভব কিছু না।

যথেষ্ট পরিমাণ প্রযুক্তিগত উন্নতি লাভ করলে গ্রহাণু থেকে মহাকাশযানের জ্বালানীও সংগ্রহ করা যেতে পারে। ওজন বহনের সীমাবদ্ধতার কারণে মহাকাশযানগুলো বেশি জ্বালানী নিতে পারে না, সেক্ষেত্রে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুর বরফকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন।

অক্সিজেন জ্বলতে সাহায্য করে আর হাইড্রোজেন ব্যবহার করা যেতে পারে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ক হিসেবে। যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। যদিও হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়াটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। উল্লেখ্য সূর্যের সমস্ত শক্তি তৈরি হচ্ছে হাইড্রোজেনের নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমেই।

অন্যদিকে  মানুষের জন্য অক্সিজেন কতটা মূল্যবান তা না বললেও চলে। পৃথিবীতে অক্সিজেন অহরহ ও সহজলভ্য হলেও মহাকাশযানে তা সহজলভ্য নয়। পৃথিবীতে যেমন না চাইলেও অক্সিজেনের সাগরে ভেসে থাকা যায় মহাকাশযানে এমন সুবিধা নেই। তাই এখানে মানবিক প্রয়োজনেও গ্রহাণু তথা অক্সিজেন খুব কাজে আসতে পারে।

আরো বেশি কাল্পনিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করলে চলে আসে মহাকাশে কলোনি তৈরির কথা। হাইটেক সায়েন্স ফিকশন। পৃথিবী দূষিত হয়ে গেছে তাই পৃথিবী থেকে বাইরে থাকতে হচ্ছে- এমন পরিস্থিতিতে মানুষের পক্ষে কলোনি তৈরি করা লাগতে পারে। আর কলোনি তৈরি করতে হলে অবশ্যই মাল মশলা লাগবে। এসব ইট পাথর কাঁচামালের যোগান দিতে পারে গ্রহাণুরা। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে ভবিষ্যতে আমাদেরকে সেবা দেবার জন্য।

তবে এখানে সমস্যা কিছু সমস্যা আছে। এই ধরনের মিশন প্রচুর ঝুঁকিপূর্ণ। ছোটখাটো একসিডেন্টে বড় ধরণের মূল্য দিতে হবে। তার উপর গ্রহাণু শিকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির দিক থেকে আরো উন্নত হতে হবে পৃথিবীকে। পৃথিবীবাসী হিসেবে এমন একটা দিনের আশা করছি যেখানে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশলে এমন উন্নতি লাভ করবে যে গ্রহাণু শিকার করা একটা মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: IFLScience, University of Glasgow, NASA