প্রতিবেশী গ্যালাক্সির খোঁজে

১৭৮১ সালের শুরুর দিকে চার্লস মেসিয়ের নামে একজন ফরাসী জ্যোতির্বিদ ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষক ছিলেন। তিনি ধূমকেতুর মতো দেখতে ১০৩টি নাক্ষত্রিক বস্তুর তালিকা করেন যেন অন্যান্য ধূমকেতু পর্যবেক্ষকরা এদেরকে ধূমকেতু বলে ভুল না করে।

কারণ ধূমকেতু যখন সূর্যের কাছাকাছি থাকে তখন তার লম্বা লেজ বা পুচ্ছ দৃশ্যমান থাকে। ফলে তাদেরকে চেনা যায় সহজে। সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করলে লেজ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষক তাদেরকে ভুলভাবে নক্ষত্র বলে ধরে নেয়। তৎকালীন সময়ে উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই তিনি এমন চমৎকার কাজ করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে উইলিয়াম হার্শেল, জন হার্শেল, লুই ড্রেয়ার প্রভৃতি বিজ্ঞানীরা এই তালিকার উন্নয়ন করেন

মেসিয়েরের তালিকার অনেকগুলো বস্তু ছিল আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কি ওয়ের ভেতরের। তবে মেসিয়েরের তালিকার অনেক বস্তুই ছিল মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির বাইরের। তাদের মাঝে একটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। পরিষ্কার আকাশে খালি চোখেই একে দেখা যায়। দেখতে অনেকটা অস্পষ্ট কুয়াশাচ্ছন্ন বস্তু বলে মনে হয়।

৯৬৪ সালে পারস্যের জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আল-সুফি তার একটি বইয়ে এর কথা উল্লেখ করেন। বইতে একে ‘একটি ক্ষুদ্র মেঘ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বইয়ের নাম কিতাব সুয়ার আল কাওয়াকিব (Book of Fixed Stars)। পরে জানা যায় এই মেঘটি আমাদের গ্যালাক্সির মতোই আরেকটি গ্যালাক্সি এবং আকৃতির দিক থেকেও এটি আমাদের মিল্কিওয়ের মতোই সর্পিল। আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীও এটিই।

চিত্র: আব্দুর রহমান আল সুফি তার এক বইয়ে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

মেসিয়ের, হার্শেল ও ড্রেয়ার কর্তৃক তৈরিকৃত নেব্যুলির প্রকৃতি সম্বন্ধে ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে বড় ধরনের বিতর্ক বিদ্যমান ছিল। কেউ কেউ মনে করতো তাদের তালিকার নাক্ষত্রিক বস্তুর সবগুলোই আমাদের গ্যালাক্সিতে অবস্থিত অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করতো তালিকার কোনো কোনো বস্তুর অবস্থান আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে।

১৭৫৫ সালের দিকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেওছিলেন যে, কোনো কোনো গ্যালাক্সির অবস্থান অবশ্যই আমাদের আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি আরো বলেছিলেন এসব নেব্যুলির কোনো কোনোটির আকৃতি বৃত্তাকার ডিস্কের মতো। অনেক দূরে অবস্থান করে বলে তাদেরকে অনুজ্জ্বল দেখায়।

১৯২০ ও ১৯৩০ সালের মাঝামাঝিতে আমেরিকান জ্যোতির্বিদ এডউইন পাওয়েল হাবল (১৮৮৯ – ১৯৫৩)-এর মাধ্যমে এই বতর্কের অবসান ঘটে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন অধিকাংশ নেব্যুলির অবস্থানই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে। তিনি এমন অকাট্যভাবে তা প্রমাণ করেছিলেন যে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার বা কোনো বিতর্ক তৈরি করার কোনো অবকাশ থাকেনি। তার মাধ্যমে মানুষের মনে মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিস্তৃত একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়। তিনি যুগান্তকারী এই প্রমাণটি করেছিলেন নেব্যুলির লাল সরণ (Red Shift) পরিমাপ করে।

চিত্র: এডউইন হাবল। ছবি: নাসা

এ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস শহরের কাছে মাউন্ট উইলসনে একটি ১০০ ইঞ্চি টেলিস্কোপের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ঐ সময় এটিকে ব্যবহার করার সুযোগ পান। শক্তিশালী এই টেলিস্কোপটি ব্যবহারের মাধ্যমেই তিনি প্রথমবারের মতো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃতি উদ্ঘাটন করেন। এই গ্যালাক্সিটিতে তিনি একটি সর্পিল আকৃতি খুঁজে পান। উল্লেখ্য আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি যে তা তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠনের অংশগুলোতে তিনি কিছু বিষম তারার দেখা পান। কিছু কিছু তারা আছে যাদের উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়। এধরনের তারাকে বলা হয় বিষম তারা বা Variable star। এরকম তারা অবশ্য আমাদের গ্যালাক্সিতে আরো আগেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। এদেরকে সেফিড ভ্যারিয়েবল (Cepheid Variable) নামে ডাকা হতো। এদের মধ্যে বিশেষ কয়েকটিকে বলা হতো ডেলটা সেফাই (Delta Cephei)।

এন্ড্রোমিডার সর্পিল গঠন। ছবি: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এ ধরনের তারার উজ্জ্বলতা বাড়ে-কমে। কেউ যদি সময়ের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ চিত্র অংকন করে তাহলে নীচের চিত্রের একটি আকৃতি তৈরি হবে। উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট চক্র। সম্পূর্ণ একটি চক্রকে বলা যেতে পারে পর্যায়কাল বা Period।

সময়ের সাথে বিষম তারার উজ্জ্বলতার পরিবর্তন হয়। লেখ থেকে বোঝা যাচ্ছে দ্রুত সময়ে উজ্জ্বল হয় এবং অনুজ্জ্বল হয় তুলনামূলকভাবে ধীর সময়ে। ছবি: TUFOTU

হেনরিয়েটা সোয়ান লেভিট এবং হার্লো শেপলি নামের দুজন আমেরিকান জ্যোতির্বিদ সেফিড তারার প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার চক্রের মাঝে পারস্পরিক একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। প্রকৃত উজ্জ্বলতা বা Intrinsic brightness হলো সেফিড তারার মূল উজ্জ্বলতা। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকৃত উজ্জ্বলতাকে ‘এবসোলুট লুমিনোসিটি’ বলেও ডাকা হয়।

কোনো একটি নাক্ষত্রিক বস্তু সকল দিকে যে পরিমাণ আলো বিকিরণ করে তাকে বলা হয় এবসোলুট লুমিনোসিটি। কিছু কারণবশত আমাদের চোখে এসব তারার মূল উজ্জ্বলতা ধরা দেয় না। এধরনের নাক্ষত্রিক বস্তু আমাদের চোখে আপেক্ষিকভাবে যে পরিমাণ উজ্জ্বল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে বলে ‘এপারেন্ট লুমিনোসিটি’। টেলিস্কোপের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে নক্ষত্র থেকে যে পরিমাণ আলো এসে আপতিত হয় তাকে বলে এপারেন্ট লুমিনোসিটি বা দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা।

বিজ্ঞানী লেভিট ও শেপলি প্রকৃত উজ্জ্বলতা ও দৃশ্যমান উজ্জ্বলতার মাঝে যে সম্পর্ক খুঁজে পান তা লেখচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করলে অপর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত পরবর্তী চিত্রের মতো একটি অবস্থা পাওয়া যাবে। লেখটি একদমই সরল।

লেখ থেকে দেখা যাচ্ছে, কেউ যদি কোনো বিষম তারার উজ্জ্বলতার হ্রাস বৃদ্ধি চক্রের সময় (পর্যায়কাল) সম্পর্কে জানে তাহলে সহজেই এর প্রকৃত উজ্জ্বলতা বের করে নিতে পারবে। বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই পদ্ধতিতেই এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে বিষম তারার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় লেভিট-শেপলি সম্পর্ক।

এখন কেউ যদি কোনো মহাজাগতিক বস্তুর দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা এবং প্রকৃত উজ্জ্বলতা সম্পর্কে জানে তাহলে সেখান থেকে বস্তুটির দূরত্বও নির্ণয় করতে পারবে। কারণ দৃশ্যমান উজ্জ্বলতা কত হবে তা নির্ভর করে দূরত্বের উপর। বস্তুর দূরত্ব যত বেশি হবে তার উজ্জ্বলতা তত কম হবে।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে হাবল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থিত। এত বেশি পরিমাণ দূরত্বে থাকলে তার অবস্থান অবশ্যই আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে হবে। কেননা আমাদের সবচেয়ে দূরে যে বস্তুটি অবস্থিত তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দূরে অবস্থিত এটি। উল্লেখ্য আমাদের গ্যালাক্সির বিস্তৃত ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ আলোক বর্ষ।

পর্যায়কালের বিপরীতে উজ্জ্বলতার লেখ (সোজা ঢালু রেখাটি)। P যদি হয় উজ্জ্বলতার হ্রাস-বৃদ্ধি চক্রের পর্যায়কাল তাহলে সেখান থেকে অক্ষরেখার উপর লম্ব টেনে তারাটির প্রকৃত উজ্জ্বলতা কত তা বের করা সম্ভব। ছবি: IUFOTU

পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ দিকে এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে জার্মান বংশোদ্ভব আমেরিকান জ্যোতির্বিদ ওয়াল্টার বেইড (১৮৯৩ – ১৯৫০) এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন এধরনের বিষম তারা আসলে দুই প্রকার। এরা দুই ধরনের নিয়মনীতি মেনে চলে। লেভিট-শেপলি সম্পর্কের আওতার বাইরেও অনেক বিষম তারা আছে। যদিও এই সম্পর্কের মাধ্যমেই এন্ড্রোমিডার দূরত্ব পরিমাপ করেছিলেন এডউইন হাবল, কিন্তু তার পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারা এবং লেভিট কর্তৃক পর্যবেক্ষণকৃত বিষম তারার প্রকৃতি আসলে এক নয়।

হাবল এক্ষেত্রে পর্যায়কাল ও উজ্জ্বলতার ভুল সম্পর্ক ব্যবহার করেছিলেন। যার জন্য তার হিসেবেও ভুল ফলাফল এসেছে। পরবর্তীতে জানা যায় এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রকৃত দূরত্ব দুই মিলিয়ন আলোক বর্ষ, যেখানে হাবল বলেছিলে এই দূরত্ব ৯ লক্ষ আলোক বর্ষ। তবে হিসেবে ভুল হলেও হাবলের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, এন্ড্রোমিডা নেব্যুলা আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে অবস্থিত।

তথ্যসূত্র- Islam, Jamal N. (1983), The Ultimate Fate of the Universe, Page 13-16, Cambridge University Press থেকে অনুবাদকৃত। 

featured image: outerplaces.com

নীল আর্মস্ট্রংদের বাংলাদেশ সফর

চন্দ্রজয় হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। সে বছরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে সফরে এসেছিলেন চন্দ্রবিজয়ীরা। তেজগাঁও বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন। সে ঢলের ছবি এটি।

featured image: ibtimes.co.uk

ছায়াপথে/পৃথিবীতে থাকা স্বর্ণের রহস্যময় উৎস কোথায়?

ইতিহাস আর লোককথা ঘাঁটলে দেখা যায় যে পৃথিবীতে মজুদ থাকা স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে আরো বেশি পরিমাণে স্বর্ণ পাওয়া যায় এই চিন্তা বিভিন্ন সময়ে অনেক সুন্দর এবং চমকপ্রদ ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটিয়েছে। ইনকারা বিশ্বাস করতো সূর্য দেবতা ইনতি’র অশ্রু কিংবা ঘামের ফোঁটা আকাশ থেকে স্বর্ণ হিসেবে ঝরে পড়তো।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন ভূপৃষ্ঠের গভীরে থাকা পানিতে কোনোভাবে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ করলে তা সোনাতে পরিণত হতো। আইজ্যাক নিউটন পরশপাথর দিয়ে সোনা তৈরির রেসিপিই দিয়েছিলেন।আর রূপকথার রাম্পেলস্টিল্টস্কিন তো চরকি দিয়ে খড়কে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতো।

আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদদের অবশ্য এ নিয়ে নিজেদের একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো আজ থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে যখন পৃথিবী জায়মান ছিল অর্থাৎ উৎপত্তির শুরুর পর্যায়ে ছিল তখন উল্কাপিন্ডের ছিটেফোঁটা এসে ভূপৃষ্ঠে গেঁথে গিয়েছিল।এসব উল্কাপিন্ডে অন্যসব উপাদানের সাথে সোনাও ছিল।কিন্তু আসল প্রশ্নটা এখনো থেকেই যায়ঃ মহাবিশ্বের কোথায় কীভাবে এই স্বর্ণের উৎপত্তি হলো?

কয়েক দশক ধরে ভাবা হতো যে সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে স্বর্ণসহ পর্যায় সারণির নিচের সারির ডজনখানেক ভারী মৌলের সৃষ্টি হয়েছে।কিন্তু বর্তমানে সুপারনোভার কম্পিউটার মডেল আরো উন্নততর হয়েছে এবং সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে,সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় সোনা তৈরি হওয়া আর আলকেমিস্টদের পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা বানানোর উপকথার মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই।

বেশ কয়েক বছর হলো একটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন, দুটি নিউট্রন তারার স্থান-প্রকম্পন সমবায়ের সময় এসব ভারী ধাতু উৎপন্ন হয়।অন্যরা এর বিরোধিতা করেন।তাদের মতে সুপারনোভা বিস্ফোরণেই যদি ব্যাপারটা না ঘটে থাকে তাহলে ভিন্ন কোনো কারণের দ্বারস্থ হতে হবে।

এই বিতর্ক নিরসনের জন্য জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীগণ অপরাসায়নিক(অ্যালকেমি) প্রক্রিয়ার কম্পিউটার বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে গামা রশ্মি টেলিস্কোপ, গভীর সমুদ্রতলের ম্যাঙ্গানিজ ভূত্বক ইত্যাদিতে সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপারটির একটা সুরাহা করার জন্য তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চলছে যা মহাবিশ্বের অনেক জটিল একটি রহস্যের সমাধানের পথে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী মার্গারেট ও জিওফ্রে বারবিডজ,উইলিয়াম ফাওলার এবং ফ্রেড হোয়েল নক্ষত্রের জীবন ও মৃত্যু কীভাবে পর্যায় সারণির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং এর সবগুলো স্থান পূরণ করতে পারে তার একটা কৌশল উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয় আমাদের দেহ কিংবা দেহ যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত সেসব কোনো একসময় স্টারডাস্ট বা তারকা ধূলো ছিল। তার মানে স্বর্ণও তাই ছিল।

বিগ ব্যাং এর পরে হাইড্রোজেন,হিলিয়াম আর লিথিয়াম পড়ে থাকে।তারারা তারপরে এসব উপাদানকে একীভূত করে ভারী উপাদান তৈরি করে।কিন্তু এই প্রক্রিয়া লোহাতে এসে থেমে যায় কেননা লোহাই সবচেয়ে স্থিতিশীল মৌল। এরচে বড় নিউক্লিয়নে ধনাত্মক চার্জ এতো বেশি থাকে যে এদের একসাথে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ভারী কণা বানাতে লোহার নিউক্লিয়াসের সাথে চার্জমুক্ত নিউট্রনের উচ্চ গতিতে সংঘর্ষ ঘটাতে হয়। এতে করে নিউট্রন ক্ষয় হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়( একটা ইলেকট্রন আর একটা অ্যান্টিনিউট্রিনো বের হয়ে যায়)।প্রোটনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি নতুন ভারী মৌল তৈরি হয়। নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত নিউট্রন এদের ক্ষয় হবার তুলনায় ধীরে ধীরে নিক্ষিপ্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ধীর নিউট্রিন ক্যাপচার বা s প্রক্রিয়া।

এভাবে স্ট্রনশিয়াম, বেরিয়াম আর দস্তার মতো ধাতু উৎপন্ন হয়।কিন্তু যখন নিউট্রন ক্ষয় হবার চেয়ে দ্রুত গতিতে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তাকে দ্রুত নিউট্রন ক্যাপচার বা r প্রক্রিয়া বলা হয়। আর এ প্রক্রিয়াতেই ইউরেনিয়াম আর স্বর্ণের মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়।বারবিডজ ও তার সহকর্মীরা এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য কিছু জিনিসের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এজন্য আপনার দরকার হবে,অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ ভেজালহীন উৎস থেকে পাওয়া নিউট্রন।সাথে লাগবে ভারী নিউক্লিয়াস যা এসকল নিউট্রনকে বন্দী করবে।

এরপর এদেরকে একটি উত্তপ্ত ঘন মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে।আপনি চাইবেন এ প্রক্রিয়াটি একটি বিস্ফোরক ঘটনার মধ্যে হোক যাতে উৎপন্ন উপাদান মহাকাশের বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন এসকল শর্ত শুধুমাত্র একটি বস্তুতেই সংশ্লেষিত হতে পারেঃ সুপারনোভা।

কোন বিশালকার তারকা তার মধ্যে থাকা অন্তর্বস্তুকে যদি পর্যায়ক্রমে একীভূত করে ভারী কোনো উপাদানে রূপান্তরিত করতে পারে বিশেষ করে লোহা পর্যন্ত তাহলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটবে।এরপর একসময় ফিউশন থেমে যায় আর তারকার ভিতরগত পরিবেশের অবনমন ঘটে।সূর্যের সমান ভর মাত্র দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

অন্তর্বস্তু যখন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সমান ঘনত্বে পৌঁছে যায় তখন এটি দৃঢ়তা বজায় রাখে।তারপর শক্তি বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সংঘটিত হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ যা বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকেও দৃশ্যমান। তারকার পতনের সময় ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হতে বাধ্য হয়,নিউট্রন তৈরি হয় এবং এর কোর/অন্তর্বস্তু পরিণত হয় শিশু নিউট্রন তারকায়। এতে আয়রন প্রচুর থাকে।আর সহস্যাব্দ বছর ধরে উৎপাদিত উপাদানগুলো মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।

১৯৯০ এর দশকের দিকে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ছবি পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় একটি বৃহদায়তন তারকা ভেঙ্গে যাবার অর্ধ সেকেন্ড পর এর নিউট্রন বাষ্পের বেগে বের হয়ে আসে যা প্রায় এক মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। এতে আয়রনের নিউট্রন থাকতে পারে যা r প্রক্রিয়ায় ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু সুপারনোভা মডেলকে আগের তুলনায় আরো বাস্তবধর্মী করার পর পরিস্থিতির মোড় ভিন্ন দিকে চলে যায়।

এতে নিউট্রিনো চালিত বাতাসে তাপমাত্রা যথেষ্ট বেশি পাওয়া যায়নি।বাতাসের বেগও খুব ধীর হয় যা প্রচুর পরিমাণে নিউক্লেই তৈরি করে কিন্তু এসকল নিউক্লেই ভারী উপাদান যেমন ইউরেনিয়াম তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত নিউট্রন পায়না।এক্ষত্রে নিউট্রিনো নিউট্রনকে পুনরায় প্রোটনে পরিণত করে ফেলতে পারে যার কারণেও নিউট্রনের সংকট দেখা দিবে।

এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের সুপারনোভা মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দিকে নজর দিতে বাধ্য করে যেঃ সুপারনোভা থেকে নিউট্রন তারকা সৃষ্টি হয় যা এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ।

১৯৭৪ সালে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম বাইনারি নিউট্রিন তারকা পদ্ধতি আবিষ্কার করে।এতে প্রতি কক্ষপথের সাথে সাথে দুটি নিউট্রন তারকার শক্তি লোপ পেতে থাকে এবং একটা সময় এরা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।একই বছরে বিজ্ঞানী জেমস ল্যাটিমার ও ডেভিড স্ক্যাম দেখান যে, এই পরিস্থিতিতে দুটি নিউট্রন তারকার মধ্যে সংঘর্ষ হবে কিনা তা গণনা করা না গেলেও একটি নিউট্রন তারকা এবং ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায় ঘটবে।

যদিও সুপারনোভা বিস্ফোরণ মহাকাশের অনেক জায়গা থেকে দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু নিউট্রিন তারকার বেলায় তেমনটি ঘটেনা।যে সুপারনোভা ক্র্যাব নেবুলা তৈরি করেছিল তা ১০৫০ সালে অনেক স্থান দেখে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।কিন্তুএটি যে নিউট্রন তারকা রেখে গিয়েছিল তা ১৯৬৮ সালের আগে আমাদের দৃষ্টিসীমায় আসেনি। দুটি নিউট্রন তারকার সমবায় খুব সহজে দেখা যায়না বা বুঝাও যায়না।তবু এটা r প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণ কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণ দুটোই প্রক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম।কিন্তু এর মধ্যে একটা বিশাল ফারাক থেকে যায়। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে বড়জোর চাঁদের উপযোগী স্বর্ণ উৎপাদিত হতে পারে যেখানে নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণের ফলে উৎপাদিত স্বর্ণ বৃহস্পতি গ্রহের সমান ভরের কোনো গ্রহের উপযোগী যা সুপারনোভার চেয়ে দশ গুণ বেশি। একারণেই বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি r প্রক্রিয়ার উপাদানগুলোর বন্টনের উপর যাতে করে এদের উৎস সম্পর্কে আরো সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এর ফলে উৎপাদিত যে উপজাত থেক যায় তার সন্ধান চালানো হয়।গভীর সমুদ্রের তলদেশে তেজক্রিয় আয়রন-৬০ পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে।যদিও এটা r প্রক্রিয়ার কোনো উপাদান নয়;তবে অন্য একটি অস্থিতিশীল r উপাদান প্লুটোনয়াম-২৪৪ খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া গেছে।

তবে অন্য একটি পরিষ্কার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।অনেক বামন ছায়াপথ স্থিতিশীল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে একবার ছোটখাটো বিস্ফোরণ অভিজ্ঞতা লাভ করে যা এই প্রক্রিয়া ঘটার একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা রেখে যায়।২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো বামন ছায়াপথে অবশ্য উপাদান সমৃদ্ধ কোনো গ্রহের দেখা পাওয়া যায়নি। এমআইটি’র স্নাতক ছাত্র অ্যালেক্স জি রেটিকুলাম-২ নামক একটি বামন ছায়াপথে r প্রক্রিয়ার উপাদান রয়েছে এমন সাতটি গ্রহ খুঁজে পান।

নিউট্রন তারকা সমবায় মডেলের সমর্থনকারীদের মতে এই মডেল বেশ ফিটফাট যদিও নিউট্রিন তারকা সংযুক্তি বেশ বিরল।আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের সমবায় প্রতি একশো মিলিয়ন বছরে একবার বা দশ হাজার বছরে একবার ঘটে থাকে।

image source: uk.businessinsider.com

তবে একটি নিউট্রন তারকা ও ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায়ের ফলে কি হয় তা জানা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে LIGO(the Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) কাজ করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের কাজ কখনোই শেষ হয়ে যায়না।একের পর এক নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বকে আরো সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে জানার জন্য বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থেমে নেই।পৃথিবীর স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে তা এলো তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবেনা।কিংবা তা জানা হয়ে গেলেও আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া থেমে থাকবেনা।

আমাদের কাজ শুধু চোখ কান খোলা রাখা আর কৌতুহলী মনকে সজাগ রাখা।হয়তো একদিন আমরাও বিজ্ঞানীদের কাতারে সামিল হয়ে এইসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নিয়োজিত করতে পারবো।

তথ্যসূত্রঃ

১।https://www.quantamagazine.org/20170323-where-did-gold-come-from-neutron-stars-or-supernovas/

২।https://www.washingtonpost.com/national/health-science/origin-of-gold-found-in-rare-neutron-star-collision

featured image: smithsonianmag.com

জীবন্ত কম্পিউটারেরাঃ যাদের হাত ধরে আমাদের মহাকাশ বিজয়

বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় সাফল্য সম্ভবত আমাদের এই সভ্যতার পরিধিকে এই পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অনন্ত অসীম মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত করা। মহাকাশে আজ আমরা হাজার হাজার আলোকবর্ষ নিয়ে কাজ করছি,মহাকাশযান পাঠিয়ে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করছি,উপনিবেশ স্থাপনের চিন্তা করছি, ভিনগ্রহের প্রাণিদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। এসবের পিছনে রয়েছে হাজার মানুষের অবিশ্রান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ,মেধা। তাদের অনেকেই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয়। দুর্ভাগ্যক্রমে অনেককেই ভুলে গেছি আমরা, অনেকেই পাননি তাদের প্রাপ্য মর্যাদা।

আজ আমরা কিছু ভুলে যাওয়া মানুষের কথা বলব যাদের অবদান ছাড়া বর্তমান অবস্থায় আমরা মহাকাশ প্রযুক্তিকে নিয়ে আসতে পারতাম না।

মহাকাশ যাত্রার জন্য হাজার হাজার জটিল গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজন হয় যা আজকের দিনে সুপার কম্পিউটার দিয়ে অনায়াসে করা যায়। কিন্তু যখন কম্পিউটার মাত্র বিকাশের পথে, নির্ভরযোগ্য ছিল না, ক্যালকুলেটরগুলো সামান্য কিছু ফাংশন ছাড়া কিছুই হিসাব করতে পারত না, তখন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল মহাকাশ যাত্রা?

scientists calculating trajectories manually

১৯৪০ এবং পঞ্চাশের দশকে এই কাজগুলা করতেন একদল “কম্পিউটার”, যারা কোনো যন্ত্র ছিলেন না, কিছু পুরুষ এবং মহিলা যারা দ্রুত হিসাব করতে পারদর্শী ছিলেন তারাই এই কাজগুলা করতেন। তাদের কাজ ছিল মহাকাশযানের গতিপথ ও বেগ নির্ণয় করা, পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে সেইগুলা লেখচিত্রে বসানো, রকেটের ডিজাইন পরিবর্তন ইত্যাদি।এদের কারণেই সম্ভব হয়েছিল প্রথম আমেরিকান স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা

Group photo, 1953, rocket girls or “computresses” courtesy: JPL,NASA

পরবর্তীতে নারীদের জন্য আলাদা দল গঠন করা হয়।এরা কাজ করতেন নাসার Jet Propulsion Laboratory(JPL),Pasadena, California তে।এই নারীদের একজন ছিলেন Macie Roberts।তাকে ১৯৪২ সালে গ্রুপ তত্ত্বাবধায়ক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি, ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি আর পুরুষদের সেই যুগের অসহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।

এই মেয়েরা সবাই কিন্তু ব্যাচেলর ডিগ্রি ধারী ছিলেন না।কেউ কেউ স্নাতক শেষ করেন নি আবার Janez Lawson(JPL এ কাজ করা প্রথম আফ্রো আমেরিকান মহিলা) ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক কিন্তু তাকে নেয়া হয়েছিল কম্পিউটার হিসাবে।তার অবদানে আর উৎসাহে Sylvia Miller এর মত নারীরা উঠে আসতে পেরেছিলেন যিনি শেষ পর্যন্ত Mars Program Office এর ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

Susan Finley(নাসার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মহিলা কর্মী ),Barbara Pulson, Elenor Frances (১৯৫৯ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন), Helen Ling( মহাকাশযান Mariner এ কাজ করেন computing supervisor হিসাবে),Dana Uleiri( ইঞ্জিনিয়ার,Mars mission tracking team), Katherine Johnson(চাঁদে যাওয়ার প্রথম গতিপথ হিসাব করেছিলেন )

SYLVIA MILLER

মেয়েদের এখানে কাজ করা সহজ ছিল না, পরিবেশ ছিল প্রতিকূল, গর্ভাবস্থা জানতে পারলেই ছাঁটাই করা হত, ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছিল না।পরিবার আর সন্তানদের সামলে কাজ করতেন অক্লান্তভাবে। তারা ছুটির সময় জমিয়ে রাখতেন যাতে সন্তান জন্মের পর কোনো অতিরিক্ত ছুটি ছাড়াই কাজে যোগদান করতে পারেন।সেসময় সন্তানসহ নারীরা বাইরে তেমন কাজ করতে পারতেন না।এই মহীয়সী মেয়েরা Werner Van Braun, Carl Sagan, Richard Feinmann এর মত মানুষদের পাশে কাজ করে গেছেন নিরবে।

Macie Roberts এর ভাষায় “They had to look like a girl, act like a lady, think like a man, and work like a dog”.

A human computer tracking spacecraft position on graph

কিন্তু তাদের এই অবদান স্বীকৃতি পায়নি, IBM কম্পিউটার আসার পর বেশিরভাগই চাকরি হারান। আর নাসা নতুন নিয়ম করে যে ব্যাচেলর ডিগ্রী ছাড়া কেউ চাকরি করতে পারবেন না। তাদের তথ্য আর্কাইভ jet propulsion laboratory রাখা হয়নি।এমনকি ২০০৮ সালে আমেরিকান স্পেস স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ৫০ তম বার্ষিকীতে তাদের আমন্ত্রন করতে ভুলে গিয়েছিল !

Human computers in workplace, standing one behind all is supervisor Macie Roberts; COURTESY :JPL,NASA.

তাদের এই ভুলে যাওয়া ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছেন জীববিজ্ঞানী ও লেখিকা Nathalia Holt।তিনি তার বইতে এই ক্ষণজন্মা, অসীম মানসিক শক্তির অধিকারী, সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কাজ করা নারীদের কথা তুলে ধরেছেন। তার “The Rise of Rocket Girls, The women Who propelled us from missiles to the moon to mars’’ বইতে স্থান পেয়েছে তাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রতিকূলতা, অদম্য মানবীয় প্রেরনা যা তাদের এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ কে উৎসাহিত করেছে আর যার প্রত্যক্ষ ফল আজকের “মহাকাশ যুগ”।

জনপ্রিয় ম্যাগাজিন Popular Science লিখেছে,“The [women’s] stories are fun, intense, and endearing, and they give a new perspective on the rise of the space age”

বইটির রিভিউতে Usa Today লিখেছে, “Illuminating… these women are vividly depicted at work, at play, in and out of love, raising children — and making history. What a team — and what a story!”

হয়ত তাদের নাম বড় বড় বিজ্ঞানীদের সাথে উচ্চারিত হবে না,নতুন প্রজন্ম তাদের নিয়ে জানতেও চাইবে না কিন্তু তাদের এই অবদান মানবসভ্যতার অগ্রগমনে মাইলফলক হয়ে থাকবে,অনুপ্রাণিত করবে অনন্তকাল।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https//en.wikipedia.org/wiki/Jet_Propulsion_Laboratory
  2. 2.news.national geographic.com/2016/05/160508
  3. The secret history of the woman who got us beyond the moon(18 may,2016)
  4. www.nathaliaholt.com/rise of rocket girl
  5. www.amazon.com/Rise-Rocket –Girls-Propelled- Missile
  6. www.jpl.nasa.gov/jplhistory/early/index.php
  7. www.thinkprogress.org//incredible story and NASA’s forgotten girls

ডার্ক ম্যাটার নিজের সাথে নিজেই মিথষ্ক্রিয়া করে না

ডার্ক ম্যাটার এখনো পদার্থবিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত কণা। নতুন এক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার আবেল ৩৮২৭ এ থাকা ডার্ক ম্যাটার স্পষ্টভাবে সব ধরণের পদার্থকে এড়িয়ে যায়— এমনকি নিজেকেও। ইংল্যান্ডের লিভারপুলে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশ বিজ্ঞান সপ্তাহে ৬ এপ্রিলে এ সংক্রান্ত তথ্য জ্যোতির্বিদরা প্রকাশ করেন।

গবেষণাপত্রটি অনলাইনে arXiv.org এ প্রকাশিতও হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল আবেল ৩৮২৭ এর ডার্ক ম্যাটার ঐ গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের নক্ষত্রগুলো থেকে আলাদা। ক্লাস্টার বদলে দল বোঝায়, এই গ্যালাক্সির দলটি চারটি সংঘর্ষপ্রবণ গ্যালাক্সির সমন্বয়ে গঠিত। পৃথিবী থেকে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এ সময়ে মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ রিচার্ড ম্যাসে এবং তার সহকর্মীরা বলেন এ ক্লাস্টারের ডার্ক ম্যাটার হয়ত গ্যালাক্সিগুলোর পেছনে পড়ে গেছে অন্য এক ঝোপ ডার্ক ম্যাটারের সাথে মিথষ্ক্রিয়ায়। কিন্তু বর্তমান তত্ত্বগুলোর কাছেও এ প্রস্তাবনা টেকে না। ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের ভরের অধিকাংশ গঠিত ডার্ক ম্যাটার দিয়ে। সাধারণ (মামুলি অর্থে) পদার্থের সাথে ডার্ক ম্যাটারের একমাত্র মিথষ্ক্রিয়া হল মহাকর্ষ। কেবলমাত্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণের মাধ্যমেই ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি বোঝা যেতে পারে।

ডার্ক ম্যাটার কী তার চেয়ে বরং আমরা জানি ডার্ক ম্যাটার কী নয়! ডার্ক ম্যাটার কিন্তু প্রতিপদার্থের সাথেও কোনো মিথষ্ক্রিয়া করে না। এমনকি ডার্ক ম্যাটার কৃষ্ণগহ্বরও না। ডার্ক ম্যাটার নামকরণের ডার্ক শব্দটি বোঝায় এটা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা। আমরা এর কিছুই জানি না কিভাবে এটা কী করে! কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবে জানি যে এর অস্তিত্ব আছে। আমরা যে পরিমাণ ভর গ্যালাক্সিগুলোয় দেখি আসলে সে ভর দিয়ে হিসেব করলে মহাকর্ষ প্রভাবের হিসেব মিলে না। মহাকর্ষ দৃশ্যমান ভরের হিসেবের চেয়ে বেশি। সেখান থেকেই আসে আরো কিছু আছে। তাই ডার্ক ম্যাটারকেই কারণ হিসেবে ধরা হয় গ্যালাক্সির অস্তিত্বের কারণ হিসেবে।

দৃশ্যমান ভর আসলে আমাদের মহাবিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ। বাকি ২৩ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার এবং ৭৩ শতাংশ ডার্ক এনার্জি।

কিন্তু সম্প্রতি চিলিতে অবস্থিত আতাকামা লার্জ মিলিমিটার অ্যারে দিয়ে করা পর্যবেক্ষণে ডার্ক ম্যাটারের অস্বাভাবিক কোনো আচরণ খেয়াল করা যায় নি। যেমনটা আচরণ করার কথা তেমনই ছিল। উল্লেখ্য এই পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি একটি রেডিও টেলিস্কোপ। রেডিও টেলিস্কোপ কাজ করে ভারী নক্ষত্র চিহ্নিত করতে। যেসব নক্ষত্র সাধারণ আলোতে দেখা যায় না, রেডিও টেলিস্কোপে ধরা পড়ার সুযোগ রয়েছে।

আতাকামায় অবস্থিত রেডিও টেলিস্কোপ; image source: European Southern Observatory

তবে রেডিও টেলিস্কোপও কিন্তু ডার্ক ম্যাটারকে ধরতে পারে না। কারণ ডার্ক ম্যাটার আসলে কোনো কিছুর সাথে সংঘর্ষ করে না। বায়ুশূন্য স্থানে অভিকর্ষের প্রভাবে যেমন কোনো কিছুই নিচে পড়তে কোনো বাধা পায় না তেমনি অনেকটা। ডার্ক ম্যাটার কোনো বিকিরণ শোষণও করে না আবার ত্যাগও করে না। অর্থাৎ রেডিও টেলিস্কোপ সরাসরি এদের ধরতে পারবে না। ডার্ক ম্যাটার ধরা পড়ার একমাত্র উপায় মহাকর্ষের প্রভাব। রেডিও টেলিস্কোপ আবার ভারী নক্ষত্র যেমন কোয়াসার, নিউট্রন তারা এদের চিহ্নিত করতে পারে। অতএব এদের সাথে মহাকর্ষের হিসেব করে ইঙ্গিত পাওয়ার উপায় রয়েছে।

ইংল্যান্ডের ডারহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ম্যাসে বলেন তারা দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং ডার্ক ম্যাটার যথাযথ অবস্থানেই আছে বলে মনে করেন।

তবে এটি এখনো সম্ভব যে অন্যান্য গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে ডার্ক ম্যাটারও আমাদের সংজ্ঞার পর্যবেক্ষণের বাইরে। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণেরও প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। গবেষক ম্যাসের দল একটি বেলুন টেলিস্কোপের ডিজাইন করেছেন। অর্থাৎ বেলুনে করে টেলিস্কোপ উপর আকাশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। সেখান থেকে টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ করবে মহাকাশ। এর নাম দিয়েছেন সুপারবিট (SuperBIT).

বিট উড্ডয়নের মুহূর্ত; image source: sites.physics.utoronto.ca

সুপারবিটের উদ্দেশ্য এ ধরণের শত শত গ্যালাক্সিগুলো ধরে ধরে পর্যায়ক্রমে যাচাই করা কোনগুলোয় এমন অজানা আচরণ করছে ডার্ক ম্যাটার। BIT বলতে বোঝায় Ballon-borne Imaging Telescope. অর্থাৎ, বেলুনে করে যে টেলিস্কোপ ছবি তোলে।

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে তোলা বেলুন টেলিস্কোপের সূর্যদয়ের ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

এ বেলুন টেলিস্কোপ কাজ করবে স্ট্রাটোস্ফিয়ারে। বেলুন টেলিস্কোপের বড় সুবিধা এটা ট্রপোমণ্ডলের ঘন বায়ুর বাধা কাটিয়ে উপর থেকে স্বচ্ছ ছবি পাঠাতে পারবে। স্বচ্ছতম ছবির জন্যই কিন্তু আমরা মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠাই, কিন্তু সে যজ্ঞের খরচও তো মাথায় রাখতে হবে। এদিক থেকে বেলুন টেলিস্কোপ একটি নির্ভরযোগ্য সমাধান খরচের সাথে তুলনায়। এরা ভূমি থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত উপরে গিয়ে কাজ করতে পারে।

সুপারবিটের তোলা ঈগল নীহারিকার ছবি; image source: sites.physics.utoronto.ca

আমরা ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে খুবই কম জানি— এটাই সবচেয়ে বড় সংকট। সেহেতু ধাপে ধাপে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে ডার্ক ম্যাটারের ব্যাপারে সামনে এগিয়ে যাবার কারণ, এর মাধ্যমে আসলে আমরা আসলে আমাদের  মহাবিশ্বের অতীতের দিকেও অগ্রসর হচ্ছি— কিভাবে শুরু হয়েছিল সবকিছুর।

 

সায়েন্স নিউজ অবলম্বনে।

প্লুটোর রয়েছে বালিয়াড়ি— তবে বালির নয়

প্লুটো প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত এক ভুতুড়ে উপত্যকাময় জগত। প্লুটোর পাহাড়গুলো দেখলে পৃথিবীর কথা ভেবে ভ্রমও হতে পারে।

নাসার নিউ হরাইজন মিশন, যেটি কিনা ২০১৫ এর জুলাইতে এই বামন গ্রহের কাছ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল তখন বহু উচ্চমানের ছবি পাঠায়। উল্লেখ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রই হল ছবি। সে ছবিগুলোতে দেখা গিয়েছিল প্লুটো যেন পর্বতময়, তবে কিন্তু পাথরের পর্বতের পরিবর্তে বরফ-পর্বত। রয়েছে জমাট নাইট্রোজেনের বিস্তীর্ণ সমভূমি এবং নীল রঙের আকাশ যার অধীন ধোঁয়াশাময় বায়ুমণ্ডল। প্লুটোর বায়ুমণ্ডলে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় অক্সিজেনও রয়েছে। প্লুটোর আকাশ নীল হওয়ার কারণ, নাইট্রোজেন, মিথেন এবং অ্যাসিটিলিনের উপস্থিতি।

বালিয়াড়ি বা ঢিবি হচ্ছে সমতল অপেক্ষা উঁচু এমন জায়গা যা বায়ুপ্রবাহে ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে। প্লুটোর ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে তেমন তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে প্লুটো ঢিবিময়। কিন্তু এ ঢিবিগুলোর পারিপার্শ্বিক বায়ুপ্রবাহ বরফের। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লুটোর আবহাওয়া এবং ভূমিপৃষ্ঠ এমনভাবে আচরণ করে যেন ভূতাত্ত্বিক হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। মনে হবে যেন ভূপৃষ্ঠটাই বদলে গেছে।

যেখানে পর্বত মিশেছে সমভূমির সাথে

ইংল্যান্ডে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব প্লেমাউথের ভৌত ভূগোলবিদ্যার অধ্যাপক ম্যাট টেফলার এবং তার সহকর্মীরা নিউ হরাইজনের তোলা ছবিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। তারা প্লুটোর স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অববাহিকায় মিশ্র ঢাল লক্ষ্য করেন। ঢালটি প্রায় ১০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া হচ্ছে প্লুটোর বরফাচ্ছাদিত এলাকা। এই ঢাল গঠিত নাইট্রোজেনের বরফে যা কিনা প্লুটো বিখ্যাত “হৃদপিণ্ড” (Heart shape region) এলাকার বাম দিকে অবস্থিত।

স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া অঞ্চল প্লুটোর যেখানে; image source: NASA.

এই ঢেউ খেলানো ঢিবিগুলো স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ার পশ্চিম তীর দিয়ে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার প্রশস্ত, যেখানে সমভূমি থেকে আল-ইদ্রিসি মন্টেস পর্বতের উচ্চতা পরিসর ৫ কিলোমিটার। নতুনভাবে শনাক্ত করা ঢিবিগুলোর বৈশিষ্ট্য  দেখে মনে হচ্ছে এগুলো বায়ুপ্রবাহের কারণে ঢিবির আকার পেয়েছে।

এই বালিয়াড়ি বা ঢিবিগুলো পৃথিবীরগুলোর চেয়ে বেশ সরল বরং। কারণ বরফের তৈরি হলেও পৃথিবীতে যেমন জমাট বরফের স্রোত তৈরি (Glacial Movement) খুব নিয়মিত এখানে তেমনটা নয়।  অবস্থান, বিন্যস্ততা, দিকমুখিতা এবং এলাকা ভিত্তিক পরিবর্তন আর ফাঁকা স্থান সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে এরা বহুকাল ধরে এই এলাকাতেই থিতু রয়েছে।

পর্বতের ঢাল থেকে মিথেন এবং নাইট্রোজেন গ্যাসের উর্ধ্বপাতনের ফলে খাদ তৈরি হতে পারে সূর্যকিরণের প্রভাবে। যথেষ্ঠ পরিমাণ বরফ জাতীয় পদার্থ যদি তাপের কারণে কঠিন দশা থেকে গ্যাসে পরিণত হয়ে যায় তাহলে সে ধরণের খাদ তৈরি হতে পারে। নিউ হরাইজনের ছবিসমূহে প্রতীয়মান হয় এমন সহস্র অবনমন রয়েছে স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায়। আর লাইন ধরে ধারাবাহিক খাদগুলো ঢিবি বৈশিষ্ট্যের জন্য সবচেয়ে শক্ত ব্যাখ্যা দেয়।

গবেষকরা ঢিবির জন্য উর্ধ্বপাতনকে ধরছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে। কম্পিউটারে অনুরূপ মডেল তৈরি করে সিমুলেশন করে দেখা গেছে প্লুটোর এই দুর্বল বায়ুপ্রবাহও বালিয়াড়ি বা ঢিবি তৈরি জন্য যথেষ্ঠ। প্লুটোর বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মত এত পুরু নয়। এ কারণে এর বায়ুচাপ খুবই কম। আবার প্লুটোর অভিকর্ষও কম, পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ।সূর্যের অধিক দূরত্বে থাকার প্রভাব। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের চল্লিশগুণ দূরে অবস্থিত এই বামন গ্রহ। অতএব, পৃথিবীর তুলনায় প্লুটোতে সূর্যের তাপ হবে ১৬০০ গুণ কম! এরই সাথে চাপ কম হওয়ায় এর পরিবেশ উর্ধ্বপাতনসুলভ। [উল্লেখ্য, প্লুটোর তাপমাত্রা -২২৫° সেলসিয়াস থেকে -২৪০° সেলসিয়াস]

যে বায়ুপ্রবাহ বয়ে যায় সেটি মূলত জমাট মিথেনের দানা। সাথে নাইট্রোজেনের উপস্থিতি থাকাও স্বাভাবিক। মিথেনের জমাট দানা উর্ধ্বপাতিত হয়েছে নিকটবর্তী পর্বত এলাকা থেকে।

আমরা চাঁদের গায়ে অনেক গর্ত দেখে থাকি যেগুলো মহাকাশ থেকে পড়া উল্কাপিণ্ডের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়ায় তেমন গর্ত দেখা যায় না। চাঁদের ভূমির সাথে বায়ুমণ্ডলের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে প্লুটোর ঐখানে গর্ত না থাকা ভূপৃষ্ঠে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আর ঢিবিগুলো সেখানে বিগত পাঁচ লক্ষ বছরে গঠিত হয়েছে বলে গবেষক দল জানিয়েছে।

প্লুটোর বালিয়াড়ি বা ঢিবি কেন চমকে দিল বিজ্ঞানীদের

বালিয়াড়ি বা ঢিবি গঠিত হবার প্রক্রিয়া সৌরজগতজুড়ে একই। এধরনের প্রক্রিয়ায় পৃথিবী, মঙ্গল, শুক্র, শনির বিশাল চাঁদ টাইটানে ঢিবির গঠন পাওয়া গিয়েছে। গ্রহ-উপগ্রহ ছাড়াও চুরিওমোভ গেরাসিমেঙ্কো ধূমকেতুতেও ঢিবির দেখা পাওয়া গিয়েছে। সেটা ধরা পড়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত পরিচালিত ইউরোপের রোজেটা মিশন থেকে।

কিন্তু প্লুটোর ক্ষেত্রে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল দুর্বল অভিকর্ষক্ষেত্র, পাতলা বায়ুমণ্ডলের কারণে। এ দুইয়ে মিলে প্লুটোর বায়ুচাপ দাঁড়ায় মাত্র ১ প্যাসকেল, অর্থাৎ প্লুটোয় প্রতি বর্গমিটারে বায়ু মাত্র ১ নিউটন চাপ দেয়। আর পৃথিবীর তুলনায় সেটা ১ লক্ষ গুণ কম। এ গবেষণার সাথে যুক্ত নন এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলেকজান্ডার হায়েস মনে করেন এই বিশ্লেষণ আমাদের দৃষ্টিকোণকে আরো গভীর করে তুলবে। কারণ, এই নিয়ামকগুলো দিয়ে আমরা ধরে নিয়েছিলাম সেখানে এ ধরনের পরিবেশ থাকা সম্ভব নয়। অথচ পরবর্তীতে একই নিয়ামকগুলো দিয়ে কারণ যাচাই করা গিয়েছে।

ছবির একেবারে নিচের দিকে অল্প যেটুকু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে সেখানে খেয়াল করলে কিছু আঁচড়ের মত মনে হবে। দূর থেকে ঢিবিগুলোকেই এমন দেখা যাচ্ছে; image source: NASA/Jet Propulsion Labratory.

টেফলার এই বিশ্লেষণের গণিতের কথা স্মরণ করেছেন। কারণ কম্পিউটার সিমুলেশন না করে এটা কল্পনা করা কঠিন ছিল যে এরা কিভাবে বায়ুপ্রবাহের প্রভাব তৈরি করতে পারে। তবে হায়েস মনে করেন এ নতুন গবেষণা প্লুটোর ঢিবির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

তার মতে, প্রকৃতি চায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরলতর গঠন এবং নকশায় রূপ নিতে। অনুরূপভাবে, এই গবেষণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ঠ পরিমাণ কাজ বাকি রয়েছে। বিশেষ করে, ঢিবিগুলোর উচ্চতা ঠিক কত, সেগুলো কখন সবচেয়ে সক্রিয় ছিল, তারা পরিবর্তন হয় কি না, হলে কী হারে ইত্যাদি বিষয় সূক্ষ্ম যাচাই প্রয়োজন।

ইতোমধ্যে নিউ হরাইজন বেশ দূরে চলে গেছে। নিউ হরাইজনের পরবর্তী লক্ষ্যের নাম ২০১৪ এমইউ৬৯ যেটি প্লুটো থেকে ১ বিলিয়ন মাইল (১৬০ কোটি কিলোমিটার) দূরে।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.scientificamerican.com/article/pluto-has-dunes-but-theyre-not-made-of-sand/
  2. https://news.nationalgeographic.com/2018/05/pluto-dunes-methane-winds-new-horizons-space-science/
  3. http://science.sciencemag.org/content/360/6392/992.full

সূর্যের কেন্দ্র থেকে পৃথিবীতে যেভাবে আলো আসে

নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়ার নাম শুনে থাকবো নিশ্চয়। সূর্যের কেন্দ্রে অবিরাম সংঘটিত হচ্ছে এই বিক্রিয়া। উৎপন্ন করছে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রা এবং বিপুল শক্তি। মানুষের বেঁচে থাকতে হলে যেমন হার্টের কার্যকারিতা প্রয়োজন, তেমনি সূর্যের তেজ বা জীবন এই ফিউশন বিক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল।

সূর্য গাঠনিকভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত। যেমন: কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিকিরণ অঞ্চল, পরিচলন অঞ্চল ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সূর্যের জ্বালানী ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাকি অঞ্চলগুলো কেন্দ্রে উৎপন্ন ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপমাত্রাকে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

সূর্যের কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত বিলিয়ন বিলিয়ন পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে চলছে। প্রতি সেকেন্ডে ৫৬৪ মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে ৫৬০ মিলিয়ন টন হিলিয়াম তৈরি হচ্ছে। আর বাকি চার মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন থেকে উল্লেখিত শক্তি তৈরি হচ্ছে। ফিউশন বিক্রিয়ায় সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন এই শক্তি সূর্যের বহিরাংশের দিকে ফোটন তথা তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ হিসেবে আলোক কণা সৌর পৃষ্ঠ থেকে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব পানির ঘনত্বের ১৫ গুন বেশি। আবার সূর্যের বিষুবীয় অঞ্চল বরাবর মোট ব্যাসার্ধ ৬,৯৫,৭০০ কিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ব্যাসার্ধের ১০৯ গুন। সূর্যের কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। যদিও সূর্যের কেন্দ্র থেকে বাইরের অঞ্চলের দিকে ঘনত্ব পর্যায়ক্রমে হ্রাস পায়,তবুও কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোকে এই বিশাল অঞ্চল পাড়ি দিতে অনেক সময় লাগে। আপনারা জেনে আশ্চর্য হবেন যে, বিকিরণ অঞ্চলকে পাড়ি দিতে একটি গামা রশ্মির তথা ফোটন কণার গড়ে ১,৭১,০০০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ বছর সময় লাগে এবং সৌর পৃষ্ঠ হতে পৃথিবীতে আসতে লাগে মাত্র সোয়া আট মিনিট।

সুতরাং চিন্তা করতেও অবাক লাগে, আমরা পৃথিবীতে বসে আজকে যে আলো পাচ্ছি তা কত লক্ষ বছর পূর্বে সূর্যের কেন্দ্রের ফিউশন বিক্রিয়ার ফল? একারণেই বলতে হয়, আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকালে শুধু অতীতকেই দেখতে পাই। আমরা আজ আলোচনা করব কীভাবে তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ এই বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ছে।

সূর্যের কেন্দ্রকে ঘিরে রাখা প্লাজমার ( ইলেকট্রন ও আয়নের মিশ্রণ) ঘনত্ব অনেক বেশি। তাইতো ফিউশন বিক্রিয়ায় নির্গত গামা রশ্মি( ফোটনের সর্বনিম্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য) খুব কম দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার পূর্বে ইলেকট্রন দ্বারা শুষিত হয়। এই ইলেকট্রন সমূহ শোষিত ফোটনকে সকল দিকে পুনরায় নির্গমন করে, কিন্তু এই ঘটনায় কিছু পরিমান শক্তি খোয়া যায়। পরবর্তীতে এই ফোটন সমূহ বিকিরণ অঞ্চলে প্রবেশ করে।

বিকিরণ অঞ্চল সূর্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের জন্য অন্তরকের আবরণ হিসেবে কাজ করে, যাতে ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন তাপ ধরে রেখে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়। এই অঞ্চল পাড়ি দিতে একটি ফোটন অসংখ্য বার ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত ও নির্গত হয়, ফলে নেট শক্তি প্রবাহের গতি ধীর হয়ে যায় এবং শক্তির পরিমান কমে যায়। ফলে গামা রশ্মি থেকে এক্সরে তে পরিণত হয়।

চিত্র : সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সমূহ

কেন্দ্রে উৎপন্ন তাপ ও আলোক শক্তি তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গ তথা ফোটন ( প্রধানত এক্সরে) হিসেবে বিকিরণ, তাপীয় পরিবহন প্রক্রিয়ায় বিকিরণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ অঞ্চলের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা কেন্দ্র থেকে কম কিন্তু পরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশি।

কেন্দ্রে উৎপন্ন এক্সরে বাবল তৈরি করে কম তাপমাত্রা, ঘনত্ব, চাপের পথ অনুসরণ করেন সূর্য পৃষ্ঠের দিকে ধাবিত হয়। হাইড্রোজেন, হিলয়াম, অসম্পৃক্ত ইলেকট্রন দ্বারা বিকিরণ অঞ্চল পূর্ণ থাকে। এ অঞ্চলের গভীরে, এক্সরে বিভিন্ন কনার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বারবার সংঘর্ষের ফলে এক্সরের দিক বারবার পরিবর্তন হয়। দুটি ধাক্কার মধ্যে এক্স রে মাত্র কয়েক মিলিমিটার পথ অতিক্রম করে।

এভাবে ধাক্কার পর ধাক্কা খেয়ে এক্সরে সৌর পৃষ্ঠের দিকে গমন করে। তাই ফোটন তথা এক্সরের এই অঞ্চল পাড়ি দিতে ১৭১,০০০ থেকে ১ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। ধাক্কার দরুন এক্সরের শক্তি প্লাজমা অনু কর্তৃক শোষিত হওয়ায় এক্সরে এর শক্তি কমে যায় কিন্তু তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। ধীরে ধীরে এই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে এবং পৃষ্ঠে এসে দৃশ্যমান আলোয় পরিনত হয়। একই সাথে এই অঞ্চলে তাপমাত্রা ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিন থেকে ১.৫ মিলিয়ন ডিগ্রী কেলভিনে হ্রাস পায়।

বিকিরণ অঞ্চলকে বেষ্টন কারী পরবর্তী পরিচলন অঞ্চলের ব্যাসার্ধ সূর্যের মোট ব্যাসার্ধের প্রায় ৩০% হয়ে থাকে। এটি সূর্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলসমূহের মধ্যে সর্ববহিঃস্থস্তর। এর তাপমাত্রা ও ঘনত্ব বিকিরণ অঞ্চল থেকে কম।

প্রথমত, এ আবরণের নিন্ম প্রান্তে অবস্থিত গ্যাসীয় অনুসমুহ বিকিরণ অঞ্চল থেকে বিকিরিত তাপ গ্রহণ করে। ফলে অনুসমুহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরা প্রসারিত হয়ে বেলুনের তথা বাবলের মত ফুলে যায়। ফলে এদের ঘনত্ব কমে যায়। তখন তারা পরিচলন অঞ্চলের উপরে অংশে তুলনামূলক কম তাপমাত্রার দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে।

image source: scienceisntscary.wordpress.com

যখন এই উত্তপ্ত গ্যাসীয় অনুসমুহ পরিচলন অঞ্চলের বহির্ভাগে পৌঁছায়, তখন এরা তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়। ফলে তাদের আয়তন কমে গিয়ে ঘনত্ব বেড়ে যায়। এরা আবার পরিচলন অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে আসে এবং পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

এর তাপ পরিবহন দৃশ্য অনেকটা পানির স্ফুটন দৃশ্যের মত, যেখানে বাবল ( bubble) তৈরি হয়। বাবল তৈরির এ প্রক্রিয়াকে গ্রানুলেশন বলা হয়। এখানে তাপ স্থানান্তর প্রক্রিয়া এতই দ্রুত যে, এক গুচ্ছ ফোটনের এ অঞ্চল পাড়ি দিতে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময় লাগে।

চিত্র : সূর্যের পরিচলন অঞ্চল দিয়ে তাপের পরিবহন

আমরা জানি তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গ হলো গামা রশ্মির।তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট বলে গামা রশ্মির শক্তি অনেক বেশি। সূর্যের কেন্দ্র থেকে এই রশ্মি বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে দৃশ্যমান আলোতে পরিনত হয়।

আমরা সূর্যের দিকে তাকালে সূর্যে আলোক মন্ডল নামক অঞ্চল টি দেখতে পাই, কারণ তা দৃশ্যমান আলো বিকিরণ করে।গামা রশ্মি বিভিন্ন কনার সাথে ধাক্কা খেয়ে কিংবা ইলেকট্রন কর্তৃক শোষিত হয়ে শক্তি হারিয়ে ফেলে। শক্তি হারানোর ফলে ফোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। তাইতো দৃশ্যমান আলো সূর্য থেকে পাওয়া যায়। এভাবেই সূর্য থেকে তড়িচ্চুম্বক বর্ণালীর ক্ষুদ্র বর্ণালী থেকে বহৎ বর্ণালী পাওয়া যায়।

উৎস:

১. http://sciexplorer.blogspot.com/2013/03/the-sun-part-5-how-inner-layers-work.html?m=1

২. http://www.astronoo.com

৩. https://www.universetoday.com/40631/parts-of-the-sun/

৪.http://solar.physics.montana.edu/ypop/Spotlight/SunInfo/Radzone.html

featured image: planetfacts.org

নক্ষত্র যাত্রাঃ সায়েন্স ফিকশন থেকে বাস্তবতায়

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয়। এই সূত্রের উপর ভরসা করে স্টারট্রেক সিনেমার ওয়ার্প ড্রাইভ বা কৃত্রিম ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষকরা দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এধরনের প্রযুক্তি মানুষের আয়ত্বে আসলে এখনো অনেক সময় বাকি। তবে তার মধ্যে কিছু আশার কথাও শোনা যায়। যেমন ১৯০৩ সালে রাইট ব্রাদার্স মানবজাতির প্রথম ফ্লাইট সম্পন্ন করে। এর পরের ১০০ বছরে তাদের সেই আনাড়ি উড্ডয়নের অকল্পনীয় উন্নয়ন হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন এই দেশ থেকে ঐ দেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে অনায়াসে। এরকম উদাহরণ থেকে বলা যায় সৌরজগতের বাইরে দূরের কোনো নক্ষত্রে পৌঁছার কল্পনা আজকে অবাস্তব বলে মনে হলেও সময়ের প্রবাহের সাথে সাথে আগামী কয়েক শতকের মাঝে তা মানুষের হাতের নাগালে চলে আসবে।

সঠিক গ্রহ নির্বাচন

খোলা চোখেই হাজার হাজার নক্ষত্রম দেখা যায়। টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে নক্ষত্রের পরিমাণ তো প্রায় অসীমের পর্যায়ে চলে যায়। এক্ষেত্রে দূরের বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র আর তাদের মধ্যে জীবন ধারনের উপযোগী সঠিক গ্রহটি খুঁজে বের করাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। জীবন ধারণের উপযোগী পৃথিবী সদৃশ কোনো গ্রহ যদি পাওয়া যায় এবং সেটিকে টার্গেট করা হয় তাহলে সেই মিশনে প্রচুর অর্থ আর সময় দরকার হয়। সাথে দরকার হয় হাজার হাজার গবেষকের মেধা। তার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বদিচ্ছাও থাকতে হবে। কারণ অর্থ সরবরাহ করতে তারা অস্বীকৃতি জানালে মিশন আটকে যাবে।

এরকম মিশনে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ বিষয় হলো কম দুরত্বের মাঝে পৃথিবী সদৃশ গ্রহ খুঁজে পাওয়া। দূরত্ব যত বেশি হবে অর্থ ও সময়ও তত বেশি লাগবে। কাছে কোনো প্রাণবান্ধব এলাকায় গ্রহের সন্ধান পাওয়া গেলে তাহলে তা সময় ও অর্থ উভয়ই বাঁচিয়ে দেবে।

মানুষ তার মহাকাশ অভিযানের প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে চাঁদে অবতরণের মধ্যে দিয়ে। স্থায়ীভাবে বসবাস না করলেও সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে গবেষণা করার মতো ঘাঁটি এই শতকের ভেতরেই তৈরি সম্ভব। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্রের সংখ্যা ১০ হাজার কোটিরও বেশি। ১৫-২০ আলোক বর্ষের ভেতর নক্ষত্র আছে ৬০-৬৫ টি। প্রাথমিক অবস্থায় কাছের এই নক্ষত্রের দিকেই যাত্রা করতে হবে।

সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশি নক্ষত্র হচ্ছে আলফা সেন্টারি। কম দূরত্ব মানে ৪.৩৭ আলোকবর্ষ। প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার করে গেলেও সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ৪ বছর লেগে যাবে। ২০১২ সালে আলফা সেন্টারির পাশে একটি পৃথিবী সদৃশ গ্রহের অস্তিত্ব খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। গ্রহটি পৃথিবী সদৃশ হলেও জীবন ধারনের জন্য যে অতিরিক্ত উত্তপ্ত হবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। মিশনের আগে গ্রহের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা জরুরি। নক্ষত্রের আকৃতি, বয়স, তাপমাত্রা, চম্বুকত্বের তীব্রতা ইত্যাদির উপর গ্রহের অবস্থা নির্ভর করে। মিশনের আগে এগুলোও জানা জরুরী। ২০১৮ সালে নাসার পরিকল্পনামতো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) উৎক্ষেপণ করা হলে এসব অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করেন গবেষকরা।

চিত্রঃ যেমন ওয়েবার স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পাওয়া যেতে পারে অনেক নক্ষত্রের অজানা তথ্য। ছবিঃ Northrup Gruman

রকেট প্রোপালশন 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন জাতি সম্ভবত একটিও পাওয়া যাবে না। তবে শুধু আগ্রহ দিয়ে হবে না, মহাকাশ নিয়ে ভালো কিছু করতে হলে বিশাল অর্থ ভাণ্ডারও দরকার। এযাবৎ কালে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢেলে আসা দেশটি হলো যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৪৬ সালে পারমাণবিক বোমা নিয়ে কাজ করা ম্যানহাটন প্রজেক্টের একজন বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার বোমার বিপুল শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর প্রস্তাব করেন। নিউক্লিয়ার বোমাগুলো হবে ছোট আকারের। যুদ্ধের জন্য বানানো বোমার মতো এত বড় ও বিধ্বংসী না। ষাটের দশকে ‘ওরিয়ন’ নামে একটি গোপন প্রজেক্ট শুরু করে নাসার গবেষকরা। এখানে বিজ্ঞানীরা শিপের জ্বালানী হিসেবে নিউক্লিয়ার পালস ইউনিটের কথা ভাবেন অর্থাৎ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে স্পেসশিপ চালানোর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। নীল গ্রহ পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে যাওয়া এবং আসা মিলে মাত্র ১২৫ দিন লাগতো তাদের প্রস্তাবিত নিউক্লয়ার শক্তি চালিত নভোযানে। এ ধরনের স্পেসশিপে বিস্ফোরণ গ্রাহক অংশে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। নভোচারীদের থাকার স্থান বিস্ফোরণ অংশ থেকে কিছুটা দূরে থাকবে যেন তাদের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না হয়। ওরিয়ন বিস্ফোরণের শক্তিকে ব্যবহার করে স্পেসশিপকে সামনে ঠেলে দিতো। নিউক্লিয়ার শক্তি ব্যবহার করে এধরনের স্পেসশিপ আলোর গতির ৫% গতি অর্জন করতে সক্ষম। ওরিয়ন স্পেসশিপ সেকেন্ডে ৩০কিমি অর্জন করতে পারবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিরোধী চুক্তি এবং ১৯৬৭ সালে এরকমই আরেকটি চুক্তি অনুসারে মহাশূন্যে কোনো ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে না। তাই এধরনের কাজে বেশ জটিলতা তৈরি হয় এবং পরে সোভিয়েত রাশিয়া ও আমেরিকা এ সম্পর্কিত গবেষণা গুটিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওরিয়নের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায় এবং এই গবেষণার মৃত্যু ঘটে।

নিউক্লয়ার শক্তি বিপজ্জনক। এ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সরানোও ঝামেলার কাজ। তাছাড়া স্পেসশিপ পরিচালনার জন্য যে নিউক্লয়ার ইঞ্জিন হতে হবে তার ভর সাধারণ ইঞ্জিন থেকে ১০ গুণ বেশি, যা উড্ডয়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করবে। পাস্পাশি এর রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ঝামেলার।

ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটি ৭০ এর দশকে প্রজেক্ট ডায়েডেলাস হাতে নেয়। লক্ষ্য আলফা সেন্টারি ছাড়িয়ে দ্বিতীয় নিকটবর্তী নক্ষত্র বার্নার্ডা পৌঁছানো। আলোর ১২% গতি লাভ করতে সক্ষম এধরনের যান ৪০ বছরে আলফা সেন্টারি পৌছাতে পারে।

এই ধরনের স্পেসশিপের নকশা অনুসারে ইঞ্জিনের পারমাণবিক চেম্বারে থার্মোনিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। বিস্ফোরণে পারমাণবিক ভাঙন হবে এবং এতে উত্তপ্ত প্লাজমা হতে প্রচণ্ড শক্তিশালী প্রবাহ মহাকাশযানের পেছন দিয়ে নিঃসরিত হবে। প্রবাহের উল্টমুখি ধাক্কার ফলে স্পেসশিপ সামনে এগিয়ে যাবে নিউটনের ৩য় সূত্র অনুসারে।

অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প

সুবিধা থাকলেও এরকম ভারী মহাকাশযান উৎক্ষেপণের জন্য কোনো স্টেশন তৈরি হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতে তৈরির সম্ভাবনাও নেই। এর একটি সমাধান হতে পারে বাসার্ড র‌্যামস্কোপ এর ধারণা। আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বাসার্ডের নাম থেকেই বাসার্ড র‌্যামস্কোপের উৎপত্তি।

মহাকাশের বিশাল শূন্যতার পরতে পরতে হাইড্রোজেন ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি মহাকাশযান এমন হয় যে এটি কোনো একভাবে মহাকাশ থেকেই হাইড্রোজেন সংগ্রহ করবে এবং ইঞ্জিনের রিঅ্যাক্টরে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর এই শক্তিকেই মহাকাশযানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। মহাকাশের সবখানে হাইড্রোজেন পাওয়া গেলেও এর ঘনত্ব এত বেশি নয়। প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে একটি বা দুটি কণা আছে বড়জোর। মহাকাশযানের শক্তিশালী ইঞ্জিন চালাতে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন লাগবে তা সংগ্রহ করতে বিশাল আকারের সংগ্রাহক লাগবে। সংগ্রাহককে হতে হবে অনেকটা মাছের হাঁ আকৃতির জাল বা ফাঁদের মতো মতো। মাত্র কয়েকশো মিটারের নয়, এই ফাঁদ হতে হবে কয়েক হাজার কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। ছোট্ট র‌্যামজেটের বিশাল সংগ্রাহক নিয়ে চলা অসম্ভব। আর সংগ্রাহকে হাইড্রোজেনের পাশাপাশি অন্যান্য অণু পরমাণুও ধরা পড়বে। এসব কণাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় তার ভালো কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এমন বিশাল আকৃতির র‌্যামজেট বানানোও প্রায় অসাধ্য। তাত্ত্বিককভাবেই এই ধারণাটি অনেক সীমাবদ্ধ।

জেনারেশন স্টারশিপ

দূর দূরান্তের নক্ষত্ররাজ্যে এক জীবনে কি যাওয়া সম্ভব? এমন প্রশের মুখে দূর নক্ষত্রে যাবার জন্য দুটো উপায় খোলা আছে। মহাকাশযানকে হতে হবে অনেক বেশি গতি-সম্পন্ন, যেন চোখের পলকে আলোকবর্ষ পরিমাণ দূরত্ব পার হয়ে যাওয়া যায়। অথবা মহাকাশযানেই এক বা একাধিক প্রজন্ম তৈরি করে লম্বা সময় নিয়ে যাওয়া। যুগের পর যুগ স্পেসশিপ মহাকাশ ভ্রমণ করে বেড়াবে আর এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম তার দায়িত্ব নিবে। এভাবে চলতে চলতে একদিন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

বলতে যতটা সহজ আসলে তা কিন্তু মোটেও এত সহজ না। স্টারশিপকে পৃথিবীর পরিবেশের মতো করে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল থাকে। উপযুক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল ছাড়া জেনারেশান স্টারশিপ অনেকটা ডাঙ্গায় মাছ উঠে আসার মতো হবে। মাধ্যাকর্ষণ বল আনতে স্টারশিপের মডেলটি হতে হবে চাকতি আকৃতির। চাকতির ভেতরটি হবে ফাঁপা এবং ভেতরে হাজার খানেক মানুষের স্থান থাকতে হবে। শুধু মানুষ নয় সঙ্গী হিসেবে কিছু প্রাণীরও দরকার হবে। কৃত্তিম উপায়ে চাষাবাদ, অক্সিজেন সরবরাহ, বর্জ্য নিষ্কাশন, বিনোদনের সুবিধাও থাকতে হবে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নতুন গ্রহে কলোনি স্থাপনের সব উপকরণও থাকা চাই।

চিত্রঃ কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির জন্য স্টারশিপগুলো হতে হবে চাকতি আকৃতির।

এবার সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা উল্লেখ করা উচিৎ। স্টারশিপে গড়ে উঠবে বিচ্ছিন্ন ও নিজস্ব একটি সংস্কৃতি। নির্ধারিত গ্রহে যেতে ১০ হাজার বছর সময়ও লেগে যেতে পারে। এমনও হতে পারে পৃথিবী থেকে তাদের যাত্রা শুরুর কিছুদিন পর পৃথিবী থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় স্টারশিপের ছোট্ট গণ্ডিই নিজেদের সব।

নিজেদের মধ্যে বিবাদ তৈরি করে মিশনের দায়িত্ব পালন না করে কেউ যেন বিচ্যুত হয়ে না যায় তাও গুরুত্বের সাথে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, স্টারশিপে লোকবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্টারশিপে লক্ষ্য থাকবে নতুন কোনো গ্রহে কলোনি স্থাপন করে বসবাসযোগ্য আরেকটি পৃথিবী তৈরি করা। কলম্বাস যেমন সামনে কোনো ডাঙ্গা আছে কিনা না জেনেই বেড়িয়ে গিয়েছিলেন জেনারেশান স্টারশিপের ব্যাপারটাও অনেকটা তেমন। সীমাহীন মহাকাশে আদৌ কিছু মিলবে কিনা তা না জেনেই বেড়িয়ে পড়া।

এগশীপ

এগশীপ স্টারশিপেরই অন্য আরেকটি রূপ। এখানে বেশিরভাগ কাজ করবে সুপার কম্পিউটার অথবা পৃথিবীর কোনো নিয়ন্ত্রক। স্টারশিপে দূরের কোনো গন্তব্যে যাবে কিন্তু কলোনি স্থাপন বা আনুষঙ্গিক কাজগুলো কে করবে? এই সমস্যায় এগশিপ মডেলের মহাকাশযানের হিমাগারে সংরক্ষিত থাকবে মানব ভ্রূণ। সময়মতো তাদেরকে কৃত্তিম জন্ম দেয়া হবে। জৈব প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মাতৃহীন জন্ম সম্ভবত কয়েক দশকের ভেতরেইই রপ্ত হয়ে যাবে। তবে সেটাকে মহাকাশ ভ্রমণে ব্যাবহার খুব সহজ নয়। হাজার খানেক ভ্রূণ কৃত্তিম জরায়ুতে পুষ্টি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা এবং দৈনিক তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ। রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম জরায়ু, সুপার কম্পিউটারের সক্ষমতা এবং সবশেষে সদ্য জন্ম নেয়া মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই এগশীপ এখনো একটি কল্পকাহিনী।

সাসপেনশন অ্যানিমেশন

এটি একটি বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কোনো প্রাণকে আকস্মিকভাবে যদি স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে ঐ প্রাণের যাবতীয় কর্মকাণ্ড মুহূর্ত থেমে যাবে। আক্ষরিক অর্থে সে মৃত। হৃদযন্ত্র এবং কোষ বিভাজন বন্ধ। ফলে তার আয়ু থেমে যাবে অর্থাৎ বয়স বাড়বে না। এধরনের কারিগরি দিকের একটি সম্ভাবনা হলো সদ্য মৃত জীবদেহকে তাৎক্ষণিকভাবে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার নাইট্রোজেনে ডুবিয়ে রাখলে এবং উপযুক্ত পদ্ধতি আয়ত্বে থাকলে কোনো একদিন ঐ জীবের প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সাসপেনডেড অ্যানিমেশন থেকে জাগিয়ে তোলার পদ্ধতি হচ্ছে আকস্মিকভাবে তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলা। এতে জীবটির জৈবিক ক্রিয়া আবার শুরু হতে পারে। সফলভাবে সম্পন্ন হলে মনে হবে একটা দারুণ লম্বা ঘুম দিয়ে উঠেছে সে। মনেই হবে না যে ঘুমিয়ে শত বছর পার করে দিয়েছে।

তবে দুঃখের বিষয় যে এটা এখনো কল্পনা। কিছুক্ষণের জন্য জীবদেহের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হলেও স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব নয়। যেমন সাপ বা ব্যাঙ গোটা শীতকাল ঘুমিয়ে কাটায়। দেহের কার্যক্রম একদম সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু একেবারে থেমে যায় না। এরা ছাড়া অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই এই শীতনিদ্রা দেখা যায়। এদের কেউই একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। মানুষকে এখনো শীতনিদ্রায় পাঠানো সম্ভব হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রায়োনিক সোসাইটি বিশ্বাস করে আগামী কয়েক দশকেই এধরনের কোনো প্রযুক্তি আবিস্কার হবে যা দিয়ে মানুষকে শীতনিদ্রায় পাঠানো যাবে। বাস্তবে এখন পর্যন্ত সম্ভব না হলেও মানুষের দীর্ঘ শীতনিদ্রা নিয়ে মুভি-সিনেমা কম তৈরি হয়নি।

সাসপেনডেড অ্যানিমেশন সম্ভব হলে স্পেস মিশনে যে বিপ্লব আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্পেসশিপে প্রাথমিক কিছু কাজ করে সুপার কম্পিউটারের হাতে নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ঘুমিয়ে যাও তারপর যখন দরকার কম্পিউটারই ডেকে তুলবে। দিনের পর দিন কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে বুড়িয়ে যাবার প্রয়োজন নেই।

এই ধরনের প্রজেক্ট আরো একটি উচ্চাভিলাশী চিন্তা। তবে উচ্চাভিলাশ থেকেই বিজ্ঞান অগ্রগতি। আজকের সায়েন্স ফিকশনই আগামী দিনের বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র

  1. http://blogs.discovermagazine.com/crux/2016/08/10/interstellar-warp-drive-space-travel/#.WCV_ydJ97IX
  2. http://www.eyewitnesstohistory.com/wright.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/General_relativity
  4. http://earthsky.org/brightest-stars/alpha-centauri-is-the-nearest-bright-star
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/James_Webb_Space_Telescope
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Project_Orion_(nuclear_propulsion)
  7. https://www.youtube.com/watch?v=pBenHWEGozE
  8. http://i4is.org/the-starship-log/interstellar-ramjets
  9. https://www.youtube.com/watch?v=Z-Zs0q6cDPI
  10. http://www.sf-encyclopedia.com/entry/generation_starships
  11. https://www.kirkusreviews.com/features/generation-starships-fiction-and-fact/
  12. http://www.eetimes.com/author.asp?doc_id=1285658
  13. http://www.astrosociology.org/Library/PDF/Caroti_SPESIF2009.pdf
  14. http://www.mybestbuddymedia.com/2016/03/9-reasons-space-dreams-will-die.html
  15. https://en.wikipedia.org/wiki/Suspended_animation

 

E=mc^2 আইনস্টাইনই কি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন?

যদি বর্তমানে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় যে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমীকরণ কোনটা? বা, যদি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় সমীকরণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে যে সমীকরণটির কথা সবার আগে আসবে সেটি হল,  । এই সমীকরণটির পূর্বে সম্ভবত নিউটনের মহাকর্ষের সূত্রটিকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় সূত্র হিসেবে ধরে নেয়া হত। এই সমীকরণ আমাদের বলে ভর আর শক্তি আসলে একই জিনিস। একে অপরের অন্য রুপ! এই সমীকরণ আমাদের বলে কোন সিস্টেমের শক্তি, E হলে তার পরিমাণ হবে সেই সিস্টেমের ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গ গুন করলে যে পরিমাণ পাব ঠিক সেই পরিমাণ।  সমীকরণটির প্রমাণ আমরা অন্য কোন এক দিন দেখব। আজ দেখবো এই সমীকরণটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস। আজ আমরা জানব যে, আইনস্টাইনই কি প্রথম এর কথা বলেছিলেন? তিনিই কি প্রথম ভর-শক্তির নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন?

Image result

প্রকৃতপক্ষে ভর শক্তির এ নিত্যতা সূত্রের কথা ১৮৭০ সালের পর থেকেই বেশ আলোচনায় উঠে এসেছিল। এ ধরনের নিত্যতা সূত্রের কথা বলেছিলেন জে.জে. থমসনও। হ্যাঁ, ইনি সেই জে.জে. থমসন যিনি ইলেক্ট্রনের আবিষ্কার করেছিলেন। ইলেক্ট্রনের আবিষ্কারেরও বেশ আগে ১৮৮১ সালে তার ভর শক্তির নিত্যতা বিষয়ক ফলাফলটি ছিল বেশ জটিল। তার ফলাফলে বস্তুর চার্জ, ব্যাসার্ধ এমন কিছু বিষয়ের বেশ প্রভাব ছিল। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ইংরেজ পদার্থবিদ অলিভার হেভিসাইড তার এই কাজ আরো কিছুটা সরল করে দেখালেন যে, কোন গোলাকার ইলেক্ট্রিক ফিল্ডের শক্তি আসলে,  । এখানে m কে  উল্লেখ করা হয়েছিল কার্যকর ভর হিসেবে।

Image result
চিত্রঃ জে. জে. থমসন

ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশান বা, কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক ভীনের সূত্রের কথা আমরা অনেকেই শুনে থাকব। জার্মান পদার্থবিদ উইলহেল্ম ভীনও তার হিসাব নিকাশ থেকে এই একই সূত্র পেলেন। এমনকি ম্যাক্স আব্রাহামও সম্পূর্ণ নতুন ভাবে হিসাব নিকাশ করে বের করলেন যে,  । সমীকরণের এই ভর ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রনের “ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ভর” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেল। যদিও এই ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ভর পাওয়ার জন্য বস্তুকে চার্জিত এবং গতিশীল হতে হত। তাই এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে এই সূত্রটি সকল ধরনের সাধারণ পদার্থের জন্য সত্য ছিল না। এই পুরো হিসাব নিকাশ করা হয়েছিল ক্ল্যাসিকাল ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স আর ইথার ধারণার উপড় ভিত্তি করে।

Image result for Wilhelm Wien
চিত্রঃ উইলহেল্ম ভীন

১৯০০ সালে হেনরি পয়েনকেয়ার ইকেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে এক ধরণের তরলের মত কল্পনা করে তার জন্য  সূত্রটি বের করে ফেললেন। তিনি বললেন যে, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণেরও ভরবেগ আছে এবং তাই অবশ্যই তার ভরও আছে। যদিও কোন বাস্তব বস্তুর ভরের সাথে শক্তির নিত্যতা দেখাতে তিনি ব্যার্থ হয়ে ছিলেন।

Image result

১৯০৩ সালের ১৬ জুন ‘অলিন্টো ডি প্রেট্ট’ নামের একজন ইটালিয়ান ব্যবসায়ী এবং ভূবিজ্ঞানী সকল ধরনের ভরের জন্য এই  সূত্রটি প্রদান করলেন। তিনি ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার ঘটনাকে ভরের শক্তিতে রুপান্তর হওয়ার ঘটনা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরলেন।

Image result for olinto de pretto

১৯০৪ সালে ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল ( Fritz Hasenöhrl ) ছিলেন সেসময় অস্ট্রিয়ার প্রধান পদার্থবিদদের একজন। তিনি লুইজ বোল্টজম্যানের ছাত্রও ছিলেন।তিনি ভর আর শক্তির সম্পর্ক বোঝার জন্য একটা থট এক্সপেরিমেন্ট চালালেন। পর পর তিনটি অসাধারণ পেপার লিখলেন তিনি। পেপারগুলো ছিল গতিশীল বস্তুর বিকিরণ বিষয়ক। ১৯০৪ আর ১৯০৫ সালে তার এ বিষয়ক দুটি পেপার অ্যানালেন ডার ফিজিকে প্রকাশিত হয়। এটি সেই জার্নাল যেখানে ১ বছর পরে আইনস্টাইন তার  বিষয়ক পেপারটি প্রকাশ করেছিলেন।

Image result for Fritz Hasenöhrl
চিত্রঃ ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল

ফ্রিটজ হ্যাসেনওরল তার এই প্রথম দুটি পেপারে কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণের ভর নির্ণয় করলেন ,   । যার অর্থ  পরবর্তিতে ম্যাক্স আব্রাহামের সাথে কথা বলার পর তিনি তার হিসাব নিকাশে গাণিতিক কিছু ভুল খুঁজে পান। তার সংশোধিত তৃতীয় পেপারে তিনি শক্তির মান বের করলেন 

এরপরই ১৯০৫ সালে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির বিখ্যাত পেপারে আইনস্টাইন দেখালেন যে,  । যদিও তার পেপারে তিনি মূলত প্রথমে স্পেশাল রিলেটিভিটি ব্যবহার করেই শু্রু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু সীমাবদ্ধতা টেনে ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিজ্ঞানেই প্রবেশ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে ম্যাক্স প্লাঙ্ক নতুন করে এই সূত্রটি প্রমাণ করলেন এবং উল্লেখ করলেন যে আইনস্টাইনের কাজে ধারণাগত এবং গাণিতিক দিক থেকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

Image result for einstein

সুতরাং আমরা দেখলাম যে আইনস্টাইন আসলে রাতারাতি  এই সূত্রটি দিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা কিন্তু এমন ছিল না। তারও আগে অনেক বিজ্ঞানীই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছিলেন। এছাড়াও আইনস্টাইনের প্রমাণেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল যা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তার স্পেশাল রিলেটিভিটি ভর আর শক্তির সম্পর্ক স্থাপনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাই স্পেশাল রিলেটিভিটির জনক হিসেবে ভর শক্তির নিত্যতা সূত্র এ আইনস্টাইনের অবদান আসলে অনস্বীকার্য।

 

নতুন পৃথিবীর সন্ধানেঃ ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’

গ্রীক পুরাণে ভিনগ্রহবাসীদের নিয়ে অনেক রকমের কল্পকথা আছে। মানুষের এই কল্পনার জগতই পরবর্তীতে বিজ্ঞানের হাত ধরে অপার সম্ভাবনার নতুন এক দ্বার খুলে দিয়েছে। মহাশূন্যে কি আর কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে? আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় এই প্রশ্নের উত্তরে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম, ‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’।

কী এটি

‘প্রক্সিমা সেন্টরি-বি’কে আমাদের প্রতিবেশিই বলা যায়। প্রক্সিমা সেন্টরি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা অনেকটাই পৃথিবীর মতো এ গ্রহটি সৌরজগত থেকে মাত্র ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমাদের সবচেয়ে কাছের এ নক্ষত্র কিন্তু সূর্যের মতো এতটা উত্তপ্ত নয়। বামন আকৃতির শান্তশিষ্ট এই নক্ষত্রটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘রেড ডোয়ার্ফ স্টার’ বা লাল বামন নক্ষত্র।

গ্রহটি মোটামুটি পৃথিবী থেকে ২৫ ট্রিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থিত। এর ভর পৃথিবীর ভরের থেকে ৩০% বেশি। গ্রহটিতে গেলে মাত্র ১১ দিন পরপরই আপনার জন্মদিন পালন করতে পারবেন। কারণ পৃথিবীর মাত্র ১১ দিন সময়ে গ্রহটি তার নক্ষত্রের চারপাশে একবার ঘুরে আসে, পৃথিবীর ১১ দিনে সেখানে এক বছর হয়।

কোন বৈশিষ্ট্যর কারণে এতটা গুরুত্ব পাচ্ছে

১৯৯২ সালে সৌরজগতের বাইরে প্রথম কোনো গ্রহ আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। মাঝে চলে গেছে প্রায় বিশটি বছর, এর মধ্যে কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে তিন হাজারেরও বেশি ভিন গ্রহের দেখা মিলেছে। তবে কোনো নক্ষত্রের প্রাণ বান্ধব অঞ্চলে এবং একইসাথে পৃথিবীর এত কাছে থাকা কোনো গ্রহের সন্ধান মিলল এই প্রথম।

যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গ্রহটি ঘোরে তার ভর সূর্যের ভরের মাত্র ১২%। ভর কম হওয়াতে এর হ্যাবিটেবল জোন নক্ষত্রের অনেক কাছ থেকেই শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের যত কাছে অবস্থিত তার চেয়ে ২৫ গুণ কাছে অবস্থিত গ্রহটি। গ্রহটিতে যদি বায়ুমণ্ডল থাকে তাহলে এর তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে হবে যেটি ঐ গ্রহে পানির থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করে। কারণ এই তাপমাত্রায় পানি বাষ্পীভূত হবে না। আর পানি থাকলে প্রাণের অস্তিত্ব মিলবে- এমন আশা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রাণ সৃষ্টিতে কিছু অন্তরায় থাকতে পারে

কোনো গ্রহে প্রাণ সৃষ্টির জন্য বায়ুমণ্ডল থাকাটা খুব জরুরি। প্রক্সিমা সেন্টরি-বি গ্রহে বায়ুমণ্ডল আছে কিনা বা তা কোনো কালে ছিল কিনা, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

প্রক্সিমা-বি এর নক্ষত্রের অনেক কাছ দিয়ে একে প্রদক্ষিণ করে। নক্ষত্রের চারপাশ দিয়ে ঘোরার সময় নক্ষত্রটির আকর্ষণে ‘টাইডালি লক’ হয়ে শুধুমাত্র এর একটি পৃষ্ঠই নক্ষত্রের দিকে থাকে, যেমনটি চাঁদ পৃথিবীর দিকে এর একপাশ দিয়েই ঘুরতে থাকে। অন্য দিকটিতে নক্ষত্রের আলো বা তাপ সেক্ষেত্রে পৌঁছাতেই পারে না। এমনকি এখানে কোনো দিন-রাত বা আহ্নিক গতি বলে কিছু নেই। যে অক্ষে এটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে তা পুরোপুরি গোলাকার হওয়ায় এখানে কোনো ঋতুও নেই।

ঐ ভিন গ্রহের যে দিকটা তার নক্ষত্রের সামনে রয়েছে, তার ওপর অনবরত এসে আছড়ে পড়ে সৌরঝড়, মহাজাগতিক রশ্মি, নানা রকমের বিকিরণ, যা প্রাণ সৃষ্টিতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এত প্রতিকূলতার পরেও যদি অতীতে কখনো সেখানে প্রাণের সৃষ্টি হয়েও থাকে বা ভবিষ্যতে সম্ভাবনা থেকে থাকে তাহলে এ সৌরঝড় বা বিকিরণের দরুণ প্রাণের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পৃথিবীর দুই মেরুকেও কিন্তু এরকম সৌরঝড় বা মহাজাগতিক রশ্মির মোকাবেলা করতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র খুব শক্তিশালী হওয়ায় তা এই বিপজ্জনক কণাগুলিকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে আসতে না দিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এ ধরনের প্রতিরক্ষা আদৌ আছে কিনা সদ্য আবিষ্কৃত ভিন গ্রহে, সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

পৌঁছানো কি সম্ভব

চার আলোকবর্ষ অনেক দীর্ঘ পথ, ২৫ ট্রিলিয়ন মাইলেরও বেশি। বর্তমানে যে প্রযুক্তির রকেট রয়েছে তাতে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৮০ হাজার বছর লেগে যাবে। ভবিষ্যতের কোনো অগ্রগতির সময়ে পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের পদচারণা ঘটতে পারে গ্রহটিতে। কিন্তু তাহলে কি এত বড় আবিষ্কারের পরও বিজ্ঞানীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন ৮০ হাজার বছর? না, সম্প্রতি নাসা নতুন একটি মহাকাশযান তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন যার মাধ্যমে মাত্র ২০ বছরেই প্রাণের সন্ধানে পৌঁছে যাওয়া যাবে এ গ্রহে।

২০১৫ সালে নাসার নিউ হরাইজনস প্রোব ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫২,০০০ মাইল গতিতে ৯.৫ বছরে ৩ বিলিয়ন মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্লুটো ভ্রমণ সম্পন্ন করে। নিউ হরাইজনস প্রোবকে প্রক্সিমা-বি তে পাঠিয়ে দিলে এর কক্ষপথে প্রবেশ করতে মহাকাশযানটির লাগবে ৫৪,৪০০ বছর। জুপিটারের কক্ষপথে নাসার জুনো প্রোব ঘণ্টায় ১,৬৫,০০০ মাইল গতি নিয়ে প্রবেশ করে, যা প্রক্সিমা-বি পর্যন্ত যাত্রা করতে সময় নেবে ১৭,১৫৭ বছর। এ সংখ্যাটিও কিন্তু বিশাল।

আশার বাণী হলো ব্রেকথ্রু স্টারশট ইনিশিয়েটিভ-এর প্রতিষ্ঠাতাগণ উচ্চগতির অতি পাতলা এক ধরনের প্রোব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লেজারের মাধ্যমে একে আলোর ২০% গতিতে ত্বরান্বিত করা সম্ভব (ঘণ্টায় ১৩৪.১২ মিলিয়ন মাইল)। এই গতিতে চললে প্রোবটি ২০-২৫ বছরেই পৌঁছে যাবে প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে। সেখান থেকে পৃথিবীতে সিগনাল আসতে সময় লাগবে ৪.৩ বছর।

এ প্রজেক্টটির পেছনে খরচ হবে ১০ বিলিয়ন ডলার আর মহাকাশযানটি তৈরিতে লেগে যাবে ২০-৩০ বছরের মতো। অর্থাৎ সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির প্রোবটিও প্রস্তুত হতে ও গ্রহটিতে পৌঁছতে মোট সময় লাগবে ৫৫ বছরের মতো অর্থাৎ প্রায় ২০৭০ সাল।

প্রক্সিমা-বি তে যদি পৌঁছে যান তাহলে ২৪ ঘন্টা অতিবেগুনী রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন মেখে ঘোরার সাথে সাথে যাবতীয় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার থেকেও আপনাকে বিরত থাকতে হবে। লাল বামন থেকে উদ্ভুত অগ্নিশিখা এবং অন্যান্য বিপজ্জনক রশ্মি এর পৃষ্ঠে ইলেকট্রনিক এমনকি জৈবকোষও ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই প্রক্সিমা সেন্টরি-বি তে প্রথম পদক্ষেপের জন্য এর অন্ধকার অংশটাই তুলনামূলক নিরাপদ।

আপাতত অবস্থা যেমনই হোক, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা ভালো কিছুর আশা নিয়েই তাদের গবেষণার পথ পাড়ি দেবেন। বর্তমানে গবেষকগণ এ গ্রহের আবহাওয়াকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দশ বছরের মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে যাওয়া ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ অথবা আরো পরবর্তীতে চিলি ও হাওয়াইয়ে ভূপৃষ্ঠের উপর নির্মার্ণাধীন (২০-৪০ মিটার ব্যাসের দর্পণ বিশিষ্ট) টেলিস্কোপ গবেষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে।

আমরা শুধু অপেক্ষাই করতে পারি। হতে পারে প্রক্সিমা সেন্টরি-বিই হতে যাচ্ছে শত-সহস্র বছর পরের প্রাণের আধার। যখন এ নতুন গ্রহ আবিষ্কারের খবর পেলাম, রাতের আকাশে তাকিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টরিকে নিয়ে ভাবছিলাম। কী আছে ওখানে? কে আছে ওখানে? কল্পনা করতে ভালো লাগছিল যে হয়তো মিটমিট করে জ্বলতে থাকা ঐ তারকারাজীর মধ্যেই কোনো একটি গ্রহে বসে কেউ একজন আমাদের সূর্যের দিকে তাকিয়েও ঠিক এভাবেই শিহরিত হচ্ছে।

তথ্যসূত্র

www.space.com/­33932-proxima-b-alien-life-down-the-block.html

www.eso.org/public/­news/eso1629/

www.nature.com/news/earth-sized-planet-around-nearby-star-is-astronomy-dream-come­true-1.20445

ভরবেগের আপেক্ষিকতা

আমরা আগেই সময় এবং দৈর্ঘ্যের আপেক্ষিকতা সম্বন্ধে জেনেছি। আজ আমরা ভর বা, ভরবেগের আপেক্ষিকতার বিষয়েও জানব। যদিও পদার্থবিজ্ঞানীরা বর্তমানে ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি আর ব্যবহার করেন না। তারা এটি বাদেই স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি ব্যাখ্যা করে থাকেন। তারপরও অনেক পাঠ্যবইয়ে এখনো এই ভরের আপেক্ষিকতা বিষয়টি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভরের আপেক্ষিকতার গাণিতিক প্রমাণ বেশ কিছুটা জটিল। আবার এই ধারণাটি আর পদার্থবিজ্ঞানে সেভাবে ব্যবহৃতও হয়না। তাই আমরা এর প্রমাণের দিকে না যেয়ে সরাসরি ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি লিখে ফেলব। আমরা এর আগে দেখেছি দৈর্ঘ্য সঙ্কোচনের বা, কাল দীর্ঘায়নের সময়   এই ফ্যাক্টটির দ্বারা গুন বা, ভাগ করতে হয়। যদি আমরা ভরকেও আপেক্ষিক ধরে নেই তবে আগের দৈর্ঘ্য এবং সময়ের আপেক্ষিকতা থেকে আমরা আশা করতে পারি এ ক্ষেত্রেও স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দিয়ে ভাগ বা,    দিয়ে গুন এর যেকোন একটা করতে হবে।

বিজ্ঞানীরা তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে দেখেছেন যে একটা বস্তুর বেগ যত বাড়ানো হয় তার ভর বা, ভরবেগ তত বাড়ছে এমনটা মনে হয় এবং একটা অবস্থার পর ভর এতই বেড়ে যায় যে ভরবেগ আর বাড়ানো যায়না। কিন্তু যেহেতু আমরা গাণিতিক বা, যৌক্তিকভাবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি বের করার চেষ্টা করছিনা, তাই আমরা এই পর্যবেক্ষণটিকে ব্যবহার করব। এপর্যবেক্ষণের অর্থ হল বেগ বাড়ালে বস্তুর ভর বেড়ে যায়। অর্থাৎ স্থির অবস্থার ভরকে আমাদের   দ্বারা আসলে গুন করতে হবে। কারণ   ফ্যাক্টরটি সর্বদাই ১ এর চেয়ে বড়। স্থির অবস্থার কোন বস্তুর ভর যদি  হয় এবং গতিশীল অবস্থায় যদি স্থির কোন পর্যবেক্ষক তার ভর মাপে m, তবে ভরের আপেক্ষিকতার সূত্রটি দাঁড়াবে,

অর্থাৎ, গতিশীল কোন বস্তুর ভর বেড়ে যায়!! যদিও আলোর চেয়ে অনেক কম বেগে এই প্রভাবটা আমরা বুঝতে পারিনা। আমরা সেটা বুঝতে পারি শুধুমাত্র আলোর মোটামুটি কাছাকাছি বেগে কোনকিছু চললে। এখন উপড়ের সমীকরণ অনুসারে যদি কোণ কিছুর বেগ আলোর বেগের সমান হয়ে যায় তখন কি ঘটবে? তখন    হয়ে যাবে।

তাহলে,  হয়ে যাবে। অর্থাৎ, আলোর বেগের খুব কাছাকাছি যেতে লাগলেই তকোন কিছুর ভর অসীম হয়ে যায়। যা অসম্ভব! তাই এথেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ভরযুক্ত কোন বস্তুই আসলে আলোর বেগে চলাচল করতে পারে না।

আইনস্টাইন নিজেও ভরের এ ধরনের আপেক্ষিকতার বিষয়টি প্রথমদিকে সমর্থন করলেও পরের দিকে এ বিষয়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন,

“ভরের আপেক্ষিকতার ধারণা আসলে ভাল নয়।  এই আপেক্ষিক ভরের আসলে স্পষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। তাই স্থির ভর  বাদে আর অন্য কোন ধরনের ভরের ধারণা আনা আসলে সঠিক নয়। আপেক্ষিক ভর m ব্যবহারের চেয়ে আসলে ভরবেগ এবং গতিশীল বস্তুর শক্তির বিষয়ে বলাই অধিক ভাল”।

যদিও ভরের আপেক্ষিকতা বেশ কিছু বিষয় খুব ভালভাবে ব্যাখ্যা করে কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা বা, জটিলতা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা এর পরিবর্তে ভরবেগের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে থাকেন। নিউটনীয় পদার্থবিদ্যায় ভর হল ভরবেগের গুনফল। অর্থাৎ, ভরবেগ,p=  v. কিন্তু ভরবেগের আপেক্ষিকতায় একে ভরের মতই  ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করতে হবে। এই ফ্যাক্টরকে বলে গামা ()। অর্থাৎ,  ।

185380-049-7bf1e117

তাহলে আপেক্ষিক ভরবেগ, p= v.

স্থির অবস্থায়  এর মান ১ হয়ে যেয়ে তা নিউটনীয়ান ভরবেগে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

আজ আমরা আপেক্ষিক ভরবেগ সম্বন্ধে কিছুটা জানলাম। পরবর্তিতে স্পেশাল রিলেটিভিটির আরো কিছু বিষয় সম্বন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

কাল দীর্ঘায়নের বাস্তবতা

আইনস্টাইনের স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটি সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি। এ থিওরি বা, তত্ত্ব আমাদের বলে যে, গতিশীল কোন বস্তুর সময় স্থির বস্তুর সময়ের চেয়ে ধীরে চলে! অর্থাৎ, তুমি যদি একটি ঘড়ি নিয়ে দৌড় শুরু করো তাহলে তোমার ঘড়ি তোমার সাপেক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন বন্ধুর চেয়ে ধীরে চলবে। আমি জানি তোমাদের অনেকেই মনে করো বিষয়টা আসলে সত্যি সত্যি ঘটেনা, বরং এমনটা আমাদের মনে হয়। সত্যি বলতে তুমি যদি এমন ভেবে থাক তাহলে তুমি কিন্তু বড় ধরনের ভুল করছ। কাল দীর্ঘায়নের এ ঘটনা কিন্তু একদম সত্যি সত্যিই ঘটে এখানে মনে হওয়া বা, না হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা চল প্রকৃতিতে ঘটে এমন একটি কাল দীর্ঘায়নের উদাহরণ দেখা যাক।

মিউওন কণা

মহাশূন্য থেকে আসা প্রোটন এবং অন্যান্য পারমাণবিক কণাসমূহকে কসমিক রে বা, মহাজাগতিক রশ্মি বলা হয়ে থাকে। এই মহাজাগতিক রশ্মি যখন বায়ুমন্ডলের উপর আঘাত করে তখন সে স্থানে বিভিন্ন ধরণের কণার তৈরি করে। এ কণাগুলোর একটিকে বলা হয় মিউওন। একে গ্রীক অক্ষর  (মিউ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এভাবে সৃষ্ট মিউওনের পরিমাণ প্রচুর হয়ে থাকে। কিন্তু তারপরও মিউওনকে আমাদের পরিবেশে দেখা যায় না। কিন্তু কেন? এর কারণ হল মিউওন খুবই রেডিওঅ্যাক্টিভ। এর জীবনকাল গড়ে মাত্র ২.২ মাইক্রো সেকেন্ড (১ মাইক্রোসেকেন্ড হল ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ সময়)। এই জীবনকালের পরেই তারা ১ টি ইলেক্ট্রন এবং ২ টি নিউট্রিনোতে রুপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন বায়ু মন্ডলে তৈরি হওয়া এই মিউওন যদি আলোর বেগের খুব কাছাকাছি বেগেও পৃথিবীর দিকে আসে তবুও তার আয়ুষ্কাল ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডে সে অতিক্রম করবে  মিটার=660 মিটার। এই ৬৬০ মিটার দূরত্বটি অত্যন্ত কম। ১ কি.মি. রাস্তা মানেই তো ১০০০ মিটার। তাহলে? তাহলে তো পৃথিবীতে বসে মিউওন দেখতে পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টির ৬৬০ মিটার অতিক্রমের পরেই এর ইলেক্ট্রন এবং নিউট্রিনোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এমনটাতো হয়ই না বরং পৃথিবীতে বসেই প্রচুর পরিমাণে মিউওন দেখতে পাওয়া যায়। এর পরিমাণ এত বেশি যে বিজ্ঞানিরা যারা পৃথিবীতে বসে সূক্ষাতিসূক্ষ পরীক্ষা চালাতে চায় তারা এই বিপুল পরিমাণ মিউওনের জ্বালায় এক রকম প্রায় অতিষ্ট হয়ে ওঠে।

Image result

আইনস্টাইন তার যুগান্তকারি রিলেটিভিটির তত্ত্ব প্রকাশের আগে কিন্তু এই সমস্যার কোন সমাধান ছিল না। কিন্তু এই তত্ত্ব আসার পর এই অদ্ভুতুরে ঘটনার ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু এখন খুব সহজেই এর সমাধান করে ফেলা যায়। আসলে মিউওনের আয়ু কিন্তু বেড়ে যায়নি। সবসময় সেই ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডই ছিল। বিষয়টা হল মিউওন তার নিজের আয়ু সর্বদাই সেই ২.২ সেকেন্ডই দেখবে। কিন্তু কসমিক রে বায়ুমন্ডলে আঘাতের ফলে এই কণার সৃষ্টি বলে এর বেগ অত্যন্ত বেশি হবে। আলোর বেগের ৯৯.৯৪%। অর্থাৎ, মিউওনের বেগ হবে- (আলোর বেগ X ০.৯৯৯৪) মিটার/সেকেন্ড। এত বেশি বেগে আসার কারণে মিউওনের ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড আমাদের কাছে অনেক দীর্ঘ এক সময় মনে হবে। কতটা দীর্ঘ? চলো আইনস্টাইনের কাল দীর্ঘায়ন সূত্রে এই বেগের মান বসিয়েই দেখি।

 

 

বা,

 

 

বা,

t= 63.51 মাইক্রোসেকেন্ড

অর্থাৎ, পৃথিবীতে বসে আমাদের কাছে মনে হবে মিউওনের আয়ু যেনো ৬৩.৫১ মাইক্রোসেকেন্ড হয়ে গেছে!! যা মিউওনের নিজের সময়ের প্রায় আর এ সময়ে তার অতিক্রম করা দূরত্ব হবে আমাদের আগের হিসেব করা দূরত্বের প্রায় ২৯ গুন বেশি হবে! এই দূরত্ব হবে ১৯ কি.মি. এরও বেশি। আর এ দূরত্ব অতিক্রম করে খুব সহজেই মিউওন কণাগুলো পৃথবীর পৃষ্ঠে চলে আসতে পারে।

সত্যিকারের পরীক্ষা

আমি জানি, জোরে দৌড়ালেই যে আমাদের ঘড়ি ধীরে চলতে শুরু করে এই বিষয়টি এখনো অনেকেই মেনে নিতে পারছ না। এর কারণ হল বিষয়টা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে একদমই সাংঘর্ষিক। প্রতিদিনের জীবনে আমরা ঘড়ির এ ধীরে চলা কখনই দেখিনা। এর কারণ হল আমরা যে গতিতে চলাচল করতে পারি তা আসলে অনেক কম। রকেটের গতিতেও এ কাল দীর্ঘায়নের ঘটনা এত কম আকারে ঘটে যে সেটা বুঝতে পারাও খুবই খুবই কঠিন। আমরা যখন আলোর বেগের কাছাকছি চলতে পারব তখনই শুধু খুব বড় আকারে এ পরিবর্তনটা বুঝতে পারব। যেমন ঘটেছে মিউওনের ক্ষেত্রে। সময় প্রায় ২৯ গুন প্রসারিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, আমাদের ২৯ সেকেন্ড মিউওনের কাছে নিজের ১ সেকেন্ডের সমান মনে হবে। তারপরও বিজ্ঞানীরা কিন্তু পৃথিবীতে বসেই এই কাল দীর্ঘায়নের পরীক্ষাটি সত্যি সত্যিই করে দেখেছেন। ১৯৭১ সালে করা এ পরীক্ষার নাম হল হাফেলে কিটিং এক্সপেরিমেন্ট।

Related image

 

এ পরিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল মোট ৪ টি সিজিয়াম-বিম অ্যাটমিক ক্লক বা, সিজিয়াম-বিম পারমাণবিক ঘড়ি। এই ৪ টি ঘড়ি নিয়ে কয়েকজন বিজ্ঞানী অত্যন্ত দ্রুত গতির একটি জেট প্লেনে উঠে ২ বার পৃথিবী ভ্রমণ করলেন। একবার পূর্বে আরেকবার পশ্চিমে। তাদের এই ভ্রমণ শেষে সত্যি সত্যিই ভিন্ন সময় দেখাতে শুরু করল। ১ সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ সময় কম দেখাল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে পাওয়া হিসাব নিকাশের সাথেও তা মিলে গেল।

হাফেলে কিটিং পরিক্ষায় ব্যবহৃত সত্যিকারের অ্যাটমিক ঘড়িটি

শুধু তাই না। এখন আমরা যে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা, জি পি এস ব্যবহার করে থাকি সেট ব্যবহারের সময়ও কাল দীর্ঘায়নের কারণে সময়ের বেশ পার্থক্য হয়ে যায়। তাই আমাদের পৃথিবীর সুবিধার জন্য নিয়মিত এই ঘড়ির সময়গুলো ঠিক (নাকি ভুল?) করে দিতে হয়।

সময় নিয়ে মজার কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করব। আইনস্টাইনের স্পেশাল রিলেটিভিটি থেকে বোঝা যায় যে সময়ও পরম কিছু নয়। আমরা যেনো সময়ের উপড় বিভিন্ন হারে ভ্রমণ করে চলেছি। সময়ও যেনো একটা মাত্রা, অনেকটা দৈঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার মতো। আমরা কোন স্থানে সামনে পেছনে যেতে পারলেও সময়ের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও পেছনে যাওয়া সম্ভব হয় নি। শুধু সামনে যাওয়াটাই সম্ভব হয়েছে।

স্থির পৃথিবীর সময়ের সাপেক্ষে একটি স্থির রকেট প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সামনে এগিয়ে যায়। অর্থাৎ, স্থির রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার হার ২৪ ঘন্টা প্রতিদিন। এটাই সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে ভ্রমণের সর্বোচ্চ বেগ। অর্থাৎ, আমরা যখন একটা স্থির রকেটকে দেখি তখন এটি স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন (শূন্য) বেগে ভ্রমণ করছে, কিন্তু সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ হারে ভ্রমণ করছে।

এখন যদি রকেটটি আলোর বেগের একদম কাছাকছি বেগে বা, আলোর বেগে চলত তাহলে তার সাপেক্ষে পৃথিবীর সময় একদম স্থির হয়ে যেত। অর্থাৎ, আলোর বেগে গতিশীল রকেটের সময়ের ভেতর দিয়ে আলোর বেগে বা, সর্বোচ্চ বেগে যাওয়ার সময় সে সময়ের ভেতর দিয়ে আর সামনে আগায় না। একদম স্থির হয়ে যায়। তাই বলা যায় আমরা যখন একটা রকেটকে স্থানের ভেতর দিয়ে সর্বোচ্চ বেগে চলতে দেখি তখন তা সময়ের ভেতর দিয়ে সর্বনিম্ন হারে সামনে এগিয়ে যায়।

আজ সময় বা, কাল নিয়ে বললাম। পরবর্তিতে রিলেটিভিটির অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয়গুলোর বিষয়ে বলার আশা রেখে আজকের মতো শেষ করছি। সবাইকে ধন্যবাদ।

সৌরমডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বা কোনো কিছুর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে আমাদের ইন্দ্রিয়ের সাহায্য নিতে হয়। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনোকিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলে আমরা তাকে বলি ‘বাস্তব’। কোনো কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অস্তিত্ব সম্পন্ন হলে তাকে সত্যিকার জিনিস বা সত্যিকার ঘটনা বা বাস্তবতা বলে ধরে নেয়া হয়। যেমন শব্দ বাস্তব, কারণ তা শুনতে পাই। তেঁতুল টক, কারণ তার স্বাদ নিতে পারি। পাতার রঙ সবুজ, কারণ তা দেখতে পাই।

তবে সবসময় সবকিছু ইন্দ্রিয়ে ধরা দেয় না। ধরা না দিলেও তারা বাস্তব বা সত্য হবার দাবী রাখে। যে সকল ক্ষেত্রে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে না সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মডেলের সাহায্য নেন।

আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামতই হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো সচরাচরই ভাবি আমাদের আশেপাশের এখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল।

এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। একজনের দেয়া মডেল পরবর্তীতে অন্যজন ভুল প্রমাণ করতে পারে। আজকে যে মডেল সঠিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে আগামীতে সেটা বাদ যেতে পারে।

চিত্রঃ পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে বাস্তবতা সম্বন্ধে জানা যায়।

মডেলের এরকম নাটকীয় গ্রহণ-বর্জন-পরিবর্তন ঘটেছে সৌরজগতের ক্ষেত্রে। প্রাচীনকাল থেকেই অনেক বিজ্ঞানী অনেকভাবে সৌরজগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক রকমের মডেল প্রদান করেছেন। তাদের কারো কারোটা ছিল যৌক্তিক, কারো কারোটা ছিল আংশিক যৌক্তিক আবার কারো কারো দেয়া মডেল ছিল একদমই অযৌক্তিক।

সুদূর প্রাচীনকালে মননশীল সত্ত্বার বিকাশের সময় থেকেই মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়েছে, তারাখচিত রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং আকাশজগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। আকাশকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা হিসেবে সৌরজগৎ তথা বিশ্বজগতের গঠন বর্ণনা করতে বিভিন্ন রকমের মতবাদ বা মডেল প্রদান করেছে সময়ে সময়ে।

সেসব মডেলই যুগ যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হতে হতে বর্তমান উন্নত অবস্থানে এসেছে। সেই এরিস্টার্কাস-টলেমীর যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানে এডুইন হাবল-এলান গুথ পর্যন্ত। যেন ছলনাময়ীর মতো বিশ্বজগতের মডেল কিছুদিন পরপরই তার রূপ পাল্টায়। আজকে সৌরজগতের মডেলের ক্রমান্বয়িক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা রইলো।

প্রাচীন যুগ

প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস ছিল তাদের বসবাসের পৃথিবী হচ্ছে সমগ্র বিশ্বজগতের কেন্দ্র। সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলো পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। নিজেদের বসবাসের স্থলকে কেন্দ্রে রাখার পেছনে কাজ করেছে মানুষের স্বভাবজাত সেরা হবার প্রবণতা। তখনকার মানুষের একটা অলিখিত নিয়ম ছিল বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসই সুন্দর এবং বৃত্তের মাঝে সেরা অংশটি হচ্ছে তার কেন্দ্র। কেন্দ্রই মুখ্য আর কেন্দ্রের বাইরের সমস্ত এলাকা গৌণ।

তার উপর মানুষ নিজেকে প্রাণিজগতের সেরা সৃষ্টি বা দেবতাদের সেরা কৃপা বলে মনে করতো। জাগতিক সবকিছুই সেরা জিনিসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে এটা সাধারণ যুক্তির কথা। এখনো মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা হিসেবে ভাবে। আশরাফুল মাখলুকাত নামে চমৎকার একটি টার্মও আছে মানুষকে ঘিরে।

যদিও বিজ্ঞানের দিক থেকে মানুষ সব দিক থেকে সেরা নয়। মানুষের কিছু কিছু দিক আছে উন্নত আবার কিছু কিছু দিক আছে অনুন্নত। কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষ সেরা আবার কোনো ঘটনা, সময় বা অবস্থানের প্রেক্ষিতে মানুষের শারীরিক গঠন ও মনন নিম্ন পর্যায়ের। যা হোক এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। তবে এটা সত্য যে মানুষ সব সময়ই নিজেকে সেরা হিসেবে ভেবে এসেছে এবং নিজেকে সেরা ভাবতে স্বছন্দ বোধ করে।

নিজেকে সেরা মনে করার প্রভাব থেকে মানুষ নিজেই নিজেদের বসিয়ে দিয়েছে বিশ্বজগতের কেন্দ্রে। কারণ নিজেরা কেন্দ্রে না থাকলে কিংবা অন্য কোনো কিছুকে কেন্দ্রে রেখে নিজেরা বাইরে থেকে ঘুরলে সেটা একদমই মর্যাদাহানিকর ব্যাপার। মহাজাগতিক মান সম্মান বলে কথা!

এরিস্টার্কাস থেকে টলেমী

এতসব প্রভাবের মাঝে থেকেও তখনকার কিছু পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের নাম শোনা যায়। তাদের একজন এরিস্টার্কাস (খ্রি. পূ. ৩১০-২১০)। এই আয়োনিয়ান (গ্রীক) বিজ্ঞানী খ্রিষ্টের জন্মের অনেক আগেই বলেছিলেন পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়।

ঐতিহাসিক বিবেচনায় ধারণাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর জন্য তিনি একটি চন্দ্রগ্রহণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়ার আকার নির্ণয় করে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের সাহায্যে সিদ্ধান্তে আসেন, সূর্য পৃথিবীর চেয়ে অনেক বড়। ছোট জিনিস সবসময়ই বড় জিনিসকে কেন্দ্র করে ঘুরে। যেহেতু সূর্য বড় এবং পৃথিবী ছোট তাই পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র হতে পারে না।

চিত্র: এরিস্টার্কাস

শুধু তাই নয়, তিনি এও ধারণা করেছিলেন, রাতের আকাশে আমরা যে তারাগুলো দেখি সেগুলো দূরবর্তী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়, কিন্তু দূরে অবস্থান করার কারণে ছোট থালার সমান বলে মনে হয়। তেমনই তারাগুলোও হয়তো এতটাই বেশি দূরে অবস্থান করছ যে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদ্র বিন্দু বলে মনে হয়। এরিস্টার্কাসের অনুমান আজকের আধুনিক মহাকাশবিদ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এত প্রাচীনকালে কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে আসা সত্যিই একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

এরপর উল্লেখ করা যায় গণিতবিদ টলেমীর (আনুমানিক ৮৫-১৬৫) কথা। প্রাচীন মিশরের জ্ঞানের রাজধানী ছিল আলেক্সান্দ্রিয়া। আলেক্সান্দ্রিয়ার গণিতবিদ ছিলেন টলেমী। টলেমী বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে তার করা পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাব নিকাশ থেকে বলেন, বিশ্বজগতের কেন্দ্র হলো আমাদের পৃথিবী। পৃথিবীর চারপাশেই ঘুরছে বিশ্বজগতের সবকিছু। ভুল হোক বা সঠিক হোক তিনি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে চমৎকার একটি কাজ করেছিলেন। বিশ্বজগৎ নিয়ে তিনিই প্রথম একটি মডেল তৈরি করেন।

যদিও তার মডেলে পৃথিবী ছিল কেন্দ্রে কিন্তু তারপরেও এটি মডেল এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় মডেল গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। পরে হয়তো কোনো মডেল ভুল প্রমাণিত হতে পারে কিন্তু তার মতবাদের সাথে গাণিতিক যুক্তি কিংবা সৌরজগতের অনুমান নির্ভর একটি রেপ্লিকা (প্রতিলিপি) তৈরি করেছিলেন। তার এই মডেলটি পৃথিবীকেন্দ্রিক মডেল বা geocentric model নামে পরিচিত।

চিত্র: টলেমী ও টলেমীর মডেলের রেপ্লিকা। ছবি: westsea.com

উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেলটি ছিল অনেক ঝামেলাপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। জটিল গাণিতিক হিসাব নিকাশে ভরা। এই মডেল দূরবর্তী তারকাগুলো আসলে কী তার সামান্য ধারণাও দিতে পারে না। এই মডেলে তিনি সকল তারাগুলোকে একত্রে একটি স্তর কল্পনা করেছিলেন এবং সেটিই ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ স্তর। তারাগুলো ঐ স্তরে থেকেই নিজেরা নিজেদের মাঝে অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তবে কখনোই অন্য স্তরে যেতে পারে না। আর তারকা স্তরের সকলটা ছিল ফাঁকা স্থান।

চিত্রঃ টলেমীর দৃষ্টিতে বিশ্বজগৎ। এই মডেলে তারার স্তর ছিল বিশ্বজগতের সর্বশেষ সীমা। 

আরো উল্লেখ্য, টলেমীর এই মডেল চার্চ মেনে নিয়েছিল এবং ধর্মীয় সমর্থন পেয়েছিল। মেনে নেবার কারণ এই মডেল বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে বাইবেলের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দেয়। তারার সর্বশেষ স্তরের বাইরে স্বর্গ ও নরকের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা পাওয়া যায়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে খুব দরকারি। ধর্মের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত শ্রদ্ধা থাকাতে এবং এই মডেল ধর্মের সমর্থন পাওয়াতে এটি পরবর্তীতে অনেক বছর পর্যন্ত টিকে রয়েছিল।

কোপার্নিকান যুগ

নাম করা যায় একজন বিজ্ঞানীর যিনি অনুমান এবং কল্পনাকে পাশ কাটিয়ে পর্যবেক্ষণের আলোকে বলেছিলেন পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র নয়। সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে না বরং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। ষোড়শ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানীর নাম নিকোলাস কোপার্নিকাস। তার দেয়া মতবাদ প্রথম থেকেই বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের বক্তব্য ছিল নিজের চোখে এবং খোলা চোখেই তো দেখা যাচ্ছে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। তাহলে কেন বলবো সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র?

আর যদি পৃথিবীই ঘুরবে তবে তো ঘূর্ণনের ফলে তার বায়ুমণ্ডল মহাশূন্যে হারিয়ে যাবার কথা। তার উপর যদি পৃথিবীই ঘুরে থাকে তবে তো পাখিরা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর বাসায় আর ফিরে আসতে পারতো না। হারিয়ে যেতো। পৃথিবী যদি ঘুরে তবে তার সাথে সাথে গাছপালাও ঘুরবে। গাছপালার সাথে সাথে পাখির বাসাও ঘুরবে। তবে কীভাবে পাখিরা তাদের বাসায় ফিরে যায়? শুধুমাত্র পৃথিবী স্থির থাকলেই এরকমটা সম্ভব।

চিত্র: কোপার্নিকাস

তখন পর্যন্ত এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে, বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর অভিকর্ষে বাধা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে সাথে বায়ুমণ্ডলও ঘুরছে। বায়ুর স্তরের পরে আছে শূন্যস্থান। শূন্যস্থানে কোনো কিছুর সংঘর্ষ হবার প্রশ্নই আসে না সেটা বায়ু হোক আর যাই হোক। সংঘর্ষ না হলে বায়ুর মহাশূন্যে হারিয়ে যাওয়াটাও অযৌক্তিক। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর সাথে সাথেই ঘুরছে। এর সাথে ঘুরছে পাখিরাও। তবে তাদের হারিয়ে যাবার প্রশ্ন কেন?

তাদের বিপক্ষে কোপার্নিকাসের যুক্তি কী ছিল? তিনি আঙুল তুলেছিলেন, যদি পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র হয় তবে কেন বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঋতু দেখা যায়? এবং কেন ঠিক এক বছর পর পর একই ঋতু ফিরে আসে? সূর্য যদি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতো তাহলে এরকমটা পাওয়া যাবার কথা নয়। এরকমটা ব্যাখ্যা করা যায় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর বার্ষিক গতির মাধ্যমে। অর্থাৎ এই সমস্যার সহজ সমাধান পাওয়া যায় যদি ধরে নেয়া হয় পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে।

কোপার্নিকাসের সময়কালে চার্চের বিরুদ্ধে যায় এমন কথা উচ্চারণ করা ছিল মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সমতুল্য। তাই কোপার্নিকাস তার সৌর-মডেল বিষয়ক বইটি প্রকাশ করেছিলেন কথোপকথন আকারে। চার্চের রোষের মুখে যেন না পড়েন সেজন্য বইটি উৎসর্গ করে দেন চার্চের একজন পাদ্রিকে।

বইয়ের কথোপকথনে সূর্যকেন্দ্রীক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তির তুখোড় যুক্তিতে পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতে বিশ্বাসী ব্যক্তি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। বইটি প্রকাশ করেছিলেন তার জীবনের একদম শেষ পর্যায়ে। যখন বইটি মুদ্রিত হয়ে তার হাতে এসেছিল তখন তিনি বার্ধক্যের শয্যায়। বইটি কয়েকবার নাড়াচাড়া করে দেখতে পেরেছিলেন মাত্র। এর পরপরই তিনি পরলোকগত হন।

চিত্র: জাদুঘরে সংরক্ষিত কোপার্নিকাসের বই।

চার্চের প্রবল প্রতাপের সময় বইটি যিনি প্রকাশ করেছিলেন তার সাহস আছে বলা যায়। তবে এখানে প্রকাশক একটা কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। কথিত আছে, প্রকাশক বইয়ের শুরুতেই বলে দিয়েছিলেন, বইয়ে ব্যবহৃত তত্ত্বগুলো সত্য নয়! এই তত্ত্বগুলোর মাধ্যমে সৌরজগতকে সহজে ব্যাখ্যা করা যায়। জটিলতার পরিমাণ কমে যায়। অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যাখ্যা করা যায় বলে এটি প্রকাশ করা হলো। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল নেই।

টলেমীর মডেল প্রায় ১২০০ বছর পর্যন্ত টিকে ছিল। কোপার্নিকাসই প্রথম এর বাইরে গিয়ে মতবাদ প্রদান করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে সৌরজগতের গঠন ব্যাখ্যায় গাণিতিক মডেলসহ তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। টলেমীর মডেল যেখানে অনেক জটিলতায় পূর্ণ ছিল সেখানে কোপার্নিকাসের মডেল ছিল অপেক্ষাকৃত সরল। তার দেয়া তত্ত্বটি Heliocentrism নামে পরিচিত। হিলিয়াস অর্থ সূর্য (গ্রিকদের দেবতা), আর সেন্টার অর্থ কেন্দ্র। দুটি মিলে হেলিওসেন্ট্রিজম শব্দের অর্থ হয় সূর্যকেন্দ্রিক।

যাহোক, কোপার্নিকাস মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন বা তার জীবনের মাঝামাঝিতে বইটি প্রকাশ করতেন তাহলে গ্যালিলিওর মতো তাকেও অপমানের শিকার হতে হতো। নিজের দাবীগুলোকে ভুল বলে স্বীকার না করলে বা ক্ষমা না চাইলে হয়তোবা জিওর্দানো ব্রুনোর মতো তাকেও পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো।

উল্লেখ্য, কোপার্নিকাসের মডেলেও ত্রুটি ছিল। তার মডেল অনুসারে পৃথিবী সহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। কিন্তু আদতে গ্রহগুলো বৃত্তাকারে নয়, উপবৃত্তাকারে ঘুরছে। সত্যি কথা বলতে কি, তখনকার সময়ে উপবৃত্তের ধারণা এখনকার মতো এতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না। ঐ সময়ে বৃত্তাকার যেকোনো জিনিসকেই সুন্দর বলে মনে করা হতো।

কোনো কিছু বৃত্তাকার, তার মানে হলো এটি সুন্দর ও সুস্থিত। পৃথিবীর গতিপথ উপবৃত্তাকার হতে পারে এই ভাবনাটাই আসেনি তখন। কোপার্নিকাস প্রথা বা প্রভাবের বাইরে গিয়ে বিপ্লবী একটা কাজ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু এই তিনিই বৃত্তাকারের প্রভাবের বলয় থেকে বের হতে পারেননি।

চিত্রঃ কোপার্নিকান বৃত্তাকার মডেল। ছবিঃ chronozoom.com

টাইকো ব্রাহে ও কেপলারের যুগ

পরবর্তীতে সৌরমডেলে সর্বপ্রথম উপবৃত্তের ধারণা নিয়ে আসেন ডাচ বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)। কেপলার ছিলেন জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের শিষ্য। টাইকো ব্রাহে ছিলেন খুব গোছালো মানুষ। তিনি তার জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সকল পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।

তার ব্যক্তিগত একটি মানমন্দির ছিল। বোঝাই যায় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি কী তখনকার সময়ে কী পরিমাণ সুবিধা পেয়েছিলেন। একটু সন্দেহবাতিকও ছিলেন, তার করা পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারকে দিতে চাইতেন না, লুকিয়ে রাখতেন। আবার অন্যদিকে কেপলারকে ছাত্র হিসেবে পেতেও চাইতেন, কারণ কেপলার মেধাবী।

১৬০১ সালে হঠাৎ করে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে টাইকো ব্রাহের মৃত্যু হয়। এর ফলে লিপিবদ্ধ পর্যবেক্ষণগুলো কেপলারের হাতে আসে। কেপলার দেখতে পান মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের যেসব পর্যবেক্ষণ আছে তা কিছুতেই বৃত্তাকার কক্ষপথের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। তারপর আরো পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নিলেন পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। গ্রহদের এই ঘূর্ণন সংক্রান্ত ৩ টি সূত্রও প্রদান করেন। একদম পাক্কা আধুনিক বিজ্ঞানীর মতো কাজ। কোনো ঘটনা গাণিতিকভাবে প্রমাণ হয়ে গেলে তাকে আর সহজে বর্জন করা যায় না।

এখানেও উল্লেখ্য যে, কেপলার বিশ্বাস করতেন গ্রহগুলোর অনুভূতি ও চেতনা আছে। অর্থাৎ এদের প্রাণ আছে। এরা কোনো এক সত্তার আদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্রহগুলো কেন ঘুরছে এবং কোনো শক্তির প্রভাবে ঘুরছে সে ব্যাখ্যা কেপলার দিতে পারেনি।

নিউটন-আইনস্টাইনের যুগ

পরবর্তীতে পদার্থবিজ্ঞানী বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রে এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। নিউটন তার মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে কেন এবং কীভাবে গ্রহগুলো সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীতে দেখা গেল তার দেয়া মহাকর্ষের সূত্র সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য গ্রহের কক্ষপথের বেলায়ও সঠিক। এই সূত্রের সাহায্যে জোয়ার-ভাটার কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি এর সাহায্যে পৃথিবীতে বসেই চাঁদের ঘূর্ণন বেগ বের করেছিলেন নিউটন।

চাঁদ কেন ঝুলে আছে? চাঁদ কেন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে? বস্তুগুলো যদি পারস্পরিকভাবে একে অপরকে আকর্ষণ করে তাহলে চাঁদ কেন পৃথিবীর আকর্ষণে পড়ে যাচ্ছে না? তিনি হিসাবের মাধ্যমে দেখালেন চাঁদ আসলে পৃথিবীতে পড়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে সর্বদাই পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বল ও বেগের পাশাপাশি চাঁদে আরো একটি বেগ কার্যকর।

চাঁদ পৃথিবী থেকে বহির্মুখী একটা বলে সর্বদা পৃথিবী থেকে বাইরের দিকে ছুটছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহ যখন তৈরি হয় কিংবা মহাজাগতিক সংঘর্ষে পৃথিবীর পাশে চাঁদ যখন তৈরি হয় তখন থেকেই বাইরের দিকে এই বেগ কার্যকর ছিল। চাঁদের উপর পৃথিবীর আকর্ষণ বল এবং বাইরের দিকে বহির্মুখী বল পরস্পর কাটাকাটি যাচ্ছে। কাটাকাটি যাবার ফলে এটি একূল ওকূল না গিয়ে চারপাশে ঘুরছে।

চাঁদের ঘূর্ণন বেগ কত হলে তা পৃথিবীর আকর্ষণ দ্বারা নাকচ হতে পারে তা অংকের মাধ্যমে হিসাব করে বের করলেন নিউটন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পরিমাপকৃত বেগের সাথে তার নির্ণয় করা বেগ প্রায় মিলে যায়। একেই বলে গণিতের শক্তি। বেশিরভাগ সময়েই গণিত অকাট্য হয়।

নিউটনের তত্ত্ব এখনো নির্ভুলভাবে আছে। এখনো পড়ানো হয় দেশে দেশে বিজ্ঞানের সিলেবাসে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে হলেও সার্বিক বিবেচনায় নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব তার নির্ভুলতা হারায়। মহাকর্ষকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব (General Theory of Relativity) প্রদান করেন।

আইনস্টাইনের তত্ত্বটি জটিল হলেও এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে নির্ভুল তত্ত্ব। এই তত্ত্ব প্রদান করার পর অনেকবার এর সত্যতা যাচাই করে দেখা হয়েছিল। সকল ক্ষেত্রেই এর নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়েছে।

আধুনিক যুগ

এরপর চলে আসে মহাবিশ্বের উৎপত্তি প্রসঙ্গ। ইতিহাসের সমস্ত সময় জুড়েই ছিল ঐশ্বরিক ধারণার প্রভাব। দেব-দেবতারা মানুষের জন্য জগৎ সৃষ্টি করে দিয়েছে এবং মানুষ এতে বসবাস করছে এর বাইরে যাওয়া বলতে গেলে অসম্ভবই ছিল। এর মানে হচ্ছে আজকে আমরা মহাবিশ্বকে যেমন দেখছি একশো বছর এক হাজার বছর এক লক্ষ বছর আগেও এরকমই ছিল। আজ থেকে শত হাজার লক্ষ বছর পরেও এরকমই থাকবে। মহাবিশ্বের এরকম ধারণার নাম স্টিডি স্টেট মহাবিশ্ব।

এর বাইরে চিন্তাভাবনা করা উচ্চ ও আধুনিক দার্শনিকতার দাবী রাখে বলে ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই স্থিতিশীল মহাবিশ্ব জায়গা করে নিয়েছিল। কারণ এর বাইরে চিন্তা করতে গেলে পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা নিরীক্ষা তথ্য উপাত্ত লাগবে। আধুনিক টেলিস্কোপ ছাড়া এরকম ভাবনা নিয়ে খেলা করা তো প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।

পরবর্তীকালে বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে এর গণ্ডি ভাঙে। প্রায় একশত অনেক আগে থেকেই বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রচলিত ছিল, কিন্তু কারো নজর তেমন কাড়েনি। পরবর্তীতে এডুইন হাবল তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর সত্যতা খুঁজে পান। এরপর রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায় এই তত্ত্বটি।

বিগ ব্যাং থিওরি বা মহা বিস্ফোরণ তত্ত্ব মতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল ক্ষুদ্র বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে। বিস্ফোরণের ফলে এটি প্রসারিত হয়। প্রসারিত হতে হতে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে আবার এই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে।

বর্তমান কালের জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (A Brief History Of Time)’ বইতে বিগ ব্যাং থিওরির উপর যুক্তি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে NASA কর্তৃক উৎক্ষেপিত হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ছবি বিগ ব্যাং থিওরির সত্যতা প্রমাণ করে যাচ্ছে। বিগ ব্যাং থিওরিই সর্বপ্রথম প্রসারমাণ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে ধারণা প্রদান করে আমাদের।

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রদান করার পর থেকে মহাবিশ্বকে ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছিল। এবং এর সত্যতার পেছনে সমর্থন দেবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণও আছে। তবে প্রচুর তথ্য-প্রমাণ ও সমর্থন থাকলেও তা সকল প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। যেমন মহাবিশ্বের একদম প্রাথমিক পর্যায়ে অতি-ছোট বিন্দুবৎ অবস্থায় থাকার সময়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে।

যখন থেকে বিগ ব্যাং তত্ত্বের এই সীমাবদ্ধতা ধরা দেয় তখন থেকেই এর বিকল্প তত্ত্ব অনুসন্ধান শুরু হয়। সময়ে সময়ে মহাবিশ্বকে পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বেশ কয়েকটি জটিল তত্ত্ব প্রস্তাবও করা হয়। এর মাঝে একটি হচ্ছে ‘বিগ বাউন্স তত্ত্ব’।

এই তত্ত্ব আজ থেকে অনেক আগেই প্রস্তাবিত হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত হলেও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে সাম্প্রতিক কিছু গবেষক এটি নিয়ে কাজ করে একে অধিকতর উপযুক্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং বলছেন মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য এটি বিগ ব্যাং এর চেয়েও বেশি কার্যকর।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব কোনো একটি বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। মহাবিশ্ব চিরকালই অস্তিত্ববান ছিল। এই তত্ত্ব শুনতে অনেকটা স্থির মহাবিশ্ব তত্ত্বের মতো হলেও এটি স্থির মহাবিশ্বকে বাতিল করে দেয়।

এই তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব সংকোচন ও প্রসারণের চক্রের মাধ্যমে চলছে। অনেকটা বেলুনের মতো, খুব স্থিতিস্থাপক কোনো বেলুনকে ফোলালে ফুলতে ফুলতে একসময় তা ক্রান্তি অবস্থানে এসে পৌঁছাবে। তারপর অল্প অল্প করে বাতাস চলে যেতে দিলে তা ধীরে ধীরে সংকুচিত হবে।

সর্বনিম্ন পরিমাণ সংকোচনের পর তা আবার প্রসারিত হওয়া শুরু করবে। বিগ বাউন্স অনুসারে মহাবিশ্ব অনেকটা এরকমই। চক্রাকারে সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। যখন সংকোচনের ক্রান্তি পর্যায়ে চলে আসে তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু নিয়মের প্রভাবে আরো সংকোচিত হয়ে ক্ষুদ্র বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি তৈরি করতে পারে না। ঐ অবস্থান থেকে আবার প্রসারণ শুরু হয়ে যায়।

চিত্র: বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকল্প হিসেবে বিগ বাউন্স তত্ত্বকে ভাবা হচ্ছে।

পরিশিষ্ট

এখানে আরো একজন মহান বিজ্ঞানীর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন গালিলিও গ্যালিলি। তিনিই নভো দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপ নির্মাণ করেছিলেন, আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ১৬০৯ সালে। নতুন তৈরি করা টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে দেখতে লাগলেন চাঁদ, সূর্য ও অন্যান্য গ্রহ নক্ষত্র।

এর সাহায্যে চাঁদের বুকে পাহাড়-পর্বত ও নানা রকম খানাখন্দ দেখতে পেলেন। সূর্যের গায়ে খুঁজে পেলেন কালো কালো দাগ। ১৬১০ সালে বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণের সময় দেখতে পেলেন চারটি বস্তু। এগুলো বৃহস্পতির চাঁদ (উপগ্রহ) এবং এরা বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরছে।

তখনো পৃথিবীকেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারণাই প্রবল ছিল। কিন্তু তিনি তো নিজের চোখে দেখলেন সবকিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে না। বৃহস্পতি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তাই তার পর্যবেক্ষণের কথা জানালেন সবাইকে। আর সবাই কেন তার কথা মেনে নিবে? ফলে সকলে বলতে লাগলো, গ্যালিলিও নামের এই লোকটা মাথায় ছিট আছে। হয়তো মানসিক সমস্যায় পড়ে এসব উল্টাপাল্টা জিনিস দেখছে।

তাদেরকে ডেকে এনে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে দেখালে তারা বলে হয়তো যন্ত্রের মাঝে সমস্যা আছে। চাঁদের মতো সুন্দর জিনিসে খানাখন্দ খালবিল পাহাড় পর্বত কীভাবে থাকবে? সূর্যে কালো দাগ থাকা মানে তো কলঙ্ক হয়ে যাওয়া।

তার এই মতবাদে রোমান ক্যাথলিক চার্চ খুবই নাখোশ হয়। চার্চ তার এই মতবাদ তো গ্রহণ করেইনি উপরন্তু বৃদ্ধ বয়সে গ্যালিলিওকে অমানুষিক শাস্তি দিয়েছিল। জোর করে তাকে বলিয়েছিল এর সব মিথ্যা। নিজ মতামতকে মিথ্যা বলতে এবং বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য নয় এমন কথা বলাতে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। বাধ্য না হলে হয়তো তার গর্দান চলে যেত কিংবা তাকে পুড়িয়ে মারা হতো।

কথিত আছে প্রহসন মূলক ক্ষমা প্রার্থনার নাটক ও শাস্তির পর অসুস্থ গ্যালিলিও বিড়বিড় করে বলেছিলেন ‘Eppur si muove’। এর বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘কিন্তু এটি (পৃথিবী) এখনো ঘুরছে।’। অর্থাৎ আমি নিজেও যদি মুখে হাজার বার বলি ‘পৃথিবী স্থির’ তারপরও এটি ঘুরেই চলবে।

কালের প্রবাহে কালের মঞ্চে অনেক নাটকই প্রদর্শিত হয়। কালের শত শত বছরের অতিক্রমের পর দেখা যায় প্রায় ২৮০ বছর পর ১৯৯২ সালে ক্যাথলিক চার্চ স্বীকার করেছে, গ্যালিলিও নির্দোষ ছিলেন। গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যস্ত করাটা ভুল ছিল। চার্চ যে এর জন্য তাদের ভুল স্বীকার করেছে এটাই তো অনেক কিছু। এরকম প্রতিষ্ঠান থেকে এরকম কিছু আশা করা যায় না সচরাচর।

চিত্র: গ্যালিলিও

প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা বলা দরকার। আগে ল্যাটিন ছিল আভিজাত্যের ভাষা। ল্যাটিন ছাড়া অন্য ভাষায় কেউ লিখলে তাকে ভালো লেখক বলে গণ্য করা হতো না। গ্যালিলিওই প্রথম পণ্ডিতদের ভাষা ল্যাটিনকে বর্জন করে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা লিখেছিলেন। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তা। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চা অন্য ভাষার মতো বেশি একটা হয় না। ছাত্ররা বাংলায় লেখা বিজ্ঞান বইয়ের অভাব অনুভব করে। এর জন্য বাংলা ভাষায় প্রচুর বিজ্ঞান চর্চা দরকার।

তবে আশার কথা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা দিন দিন বেড়ে চলছে। এই ধারায় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সত্যিই সমৃদ্ধ হয়ে যাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা। অন্তত গাণিতিক বাস্তবতা তা-ই বলে।

তথ্যসূত্র

  1. মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design), স্টিফেন হকিং ও লিওনার্ড ম্লোডিনো, (অনুবাদ আশরাফ মাহমুদ), রাত্রি প্রকাশনী।
  2. আবিষ্কারের নেশায়, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  3. ইউডক্সাসের গোলক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, শুদ্ধস্বর, ২০১৩
  4. মহাকাশে কী ঘটছে, আব্দুল্লাহ আল-মুতী, অনুপম প্রকাশনী।
  5. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ১০০ মনীষীর জীবনী (The 100), মাইকেল এইচ. হার্ট।
  6. বিগ ব্যাং নাকি বিগ বাউন্স, বিজ্ঞান পত্রিকা
  7. http://sciencelearn.org.nz/Contexts/Satellites/Looking-Closer/Our-solar-system-revolutionary-ideas
  8. http://www.tiki-toki.com/timeline/entry/76343/Astronomy-Model-Timeline/
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernican_Revolution

featured image: orcadian.co.uk

আইনস্টাইনের ঘড়ি

আজ আমরা যে বিষয়ে জানবো তা হল টাইম ডাইলেশান বা, কাল দীর্ঘায়ন। বোঝা গেলো না তো বিষয়টা? তাহলে চলুন একটা উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

ধরুন আপনি এবং আইনস্টাইন সকাল বেলা ঠিক একই কম্পানির দুটি ঘড়ি হাতে পড়লেন। হাতে পড়ার সময় আপনারা ঘড়ি দুটোর সময় ঠিক ঠিক মিলিয়ে নিলেন যে দুটি ঘড়িতেই ৮ টা ১৫ বাজে। এখন আপনি যেখানে ছিলেন ঠিক সেখানেই বসে রইলেন, আর আইনস্টাইন তার হাত ঘড়িটি নিয়ে আপনার হিসেবে ১ দিন ১ ঘন্টা ধরে একটি উচ্চ গতির রকেট নিয়ে মহাকাশ থেকে ঘুরে আসলেন। ফিরে আসার পর যদি আপনি এবং আইনস্টাইন আপনাদের হাত ঘড়ি দুটো মিলিয়ে দেখেন তাহলে কি দেখার কথা? নিশ্চয় ভাবছেন যে, আপনার ঘড়িতে যদি তখন ৯ টা ১৫ দেখায় তাহলে আইনস্টাইনের ঘড়িতেও সেই একই সময় দেখাবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা আমাদের তাই বলে থাকে। কিন্তু বিষয়টি ভুল। আসলে দেখা যাবে আপনার ঘড়িতে যদি ৯ টা ১৫ দেখায় তবে আইনস্টাইনের ঘড়িতে অবশ্যই তার চেয়ে কম সময় দেখাবে। হয়তো ৯ টা বা, ৮ টা ১৫ মিনিট দেখাবে (কত কম সেটা নির্ভর করবে আইনস্টাইনের রকেটের বেগের উপড়)।

জানি বিষয়টা অবিশ্বাস্য লাগছে। বিষয়টা গাণিতিকভাবে আমরা দেখবো একটু পরে। চলুন তার আগে একটা থট এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। তার আগে আইনস্টাইনে স্পেশাল থিওরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য দুটি আরেকবার পড়ে নেয়া যাক।

১। “একে অপরের সাপেক্ষে সমবেগে গতিশীল দুটি সিস্টেমে পদার্থবিজ্ঞান আসলে একই রকমভাবে কাজ করে এবং একই রকম ফলাফল দেয়” (গ্যালিলিওর প্রথম স্বীকার্যের অনুরুপ)

২। আলোর বেগ সকল কিছুর সাপেক্ষেই সর্বদা ধ্রুব বা, একই থাকে। আলোর বেগ যেভাবেই মাপা হোক না কেন তা সর্বদা ৩,০০,০০০ কি.মি./সেকেন্ডই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন আমাদের থট এক্সপেরিমেন্টটি শুরু করা যাক। মনে করুন আপনি একটি ট্রেন বা, ট্রলিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখান থেকে বাইরের রেল লাইনের ট্র্যাকটি স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি যে দিকে মুখ করে বাইরে তাকিয়ে আছেন (নিচের ছবির হলুদ গেঞ্জি পড়া মানুষটির মতো) ট্রেনটি তার বিপরীত দিকে খুব ধীর গতিতে গতিশীল আছে। ট্রলিটির ট্র্যাকের পাশে একটা বিশাল ঘড়ি ছিল যাকে অতিক্রম করে ট্রলিটি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এখন ঘড়িটির দিকে তাকান আর দেখেন সেখানে সকাল ৯ টা বাজে এর অর্থ কি? এর অর্থ হল ঘড়িতে ৯ টা বাজার পর আলোক রশ্মি সেই ঘড়িতে প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে আসার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ঘড়িতে আসলে ৯ টা বাজে। এখন মহাকাশ থেকে যদি কোন এলিয়েন ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে থাকে তাহলে ৯ টা বাজার অনেক পরে তার চোখে সেই আলোক রশ্মিটি (যদি তারও আমাদের মতো চোখ থেকে থাকে) যেয়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, একই ঘড়িতে দুইজন দূরত্বের কারণে দুই রকম সময় দেখবে। এটা খুবই সাধারণ একটা বিষয়। এবার আমরা আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা শুরু করি চলুন।

dxcf-gh

ধরুণ আপনি দেখলেন ঘড়িতে ৯ টা বাজে আর এর পর পরই আলোর বেগের ৩ ভাগের ১ ভাগ বেগে ঘড়ি থেকে দূরে সড়ে যেতে লাগলেন। তাহলে পরবর্তি আলোক রশ্মিটি আপনার চোখে পৌঁছাতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় নেবে। কারণ ইতোমধ্যেই আপনি ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেছেন ।অর্থাৎ, ট্রলিটি স্থির থাকলে ৯ টা বাজার যতক্ষণ পর ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড দেখা যেতো, ট্রলিটি অনেক বেশি গতিতে গতিশীল থাকলে এ সময়টা (৯ টা থেকে ৯ টা ১ সেকেন্ড বাজার সময়) অনেক দীর্ঘ দেখাতো। এবার চিন্তা করুন আপনার চোখে যখন ৯ টা বাজে এই তথ্য বহনকারী আলোক রশ্মিটি এসে আঘাত করল ঠিক তার সাথে সাথেই ট্রলিটি আলোর বেগে ঘড়িটি থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, তাহলে কি ঘটবে?

তাহলে আপনার চোখে সবসময় সেই ৯ টা বাজার সময়ের চিত্রটিই গেঁথে যাবে। আপনার চোখের সাথে সাথে সেই রশ্মিটিও আলোর বেগে যেতে থাকবে। আর পরবর্তি আলোক রশ্মিটি যেটি ৯ টা বেজে ১ সেকেন্ড এই তথ্যটি বহন করছে তা আলোর বেগে আপনার দিকে আসলেও কখনই আপনার চোখে পৌঁছাবে না। কারণ আপনিও আলোর বেগে দূরে সরে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আপনি দেখবেন ঘড়ির কাটাগুলো ৯ টা বাজার পর একদম স্থির হয়ে গেছে। অর্থাৎ, মনে হবে সময়ই স্থির হয়ে গেছে!! অর্থাৎ কাটার পরবর্তি টিক হতে অসীম সময় লাগছে এমনটাই আপনার মনে হবে। ট্রলির লাইনের পাশে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কেউ কিন্তু ঘড়িটিকে স্বাভাবিকভাবেই চলতে দেখবে। এই থট এক্সপেরিমেন্ট থেকে আমরা বুঝতে পারি কোন ঘড়ির সাপেক্ষে আলোর বেগে গেলে ঘড়িটিকে আমরা স্থির দাঁড়িয়ে যেতে দেখবো। যদিও থট এক্সপেরিমেন্টটি সম্পূর্ণরুপে সঠিক নয় কিন্তু এটি আমাদের সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে।

এবার আরেকটু ভাল করে আমরা বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করি। মনে করুন একটা কাচের তৈরি স্পেস শিপের ভেতরে আপনার বন্ধু বসে আছে। এই স্পেস শিপটি আপনার সাপেক্ষে সমবেগে অনেক বেশি গতিতে চলছে। আপনি স্পেশ শিপের বাইরে একটি খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থেকে স্পেস শিপটি দেখছেন। স্পেস শিপের মাঝে আপনার বন্ধু দুইটি সমান্তরাল আয়না এমনভাবে রাখল যাতে আলো এক আয়না থেকে প্রতিফলিত হয়ে গিয়ে অন্য আয়নায় গিয়ে আঘাত করে। আয়না দুটির মাঝে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বিদ্যমান। এই আয়না আর আলোর সমন্বয়ে তাহলে আপনার বন্ধু একটি আলোর ঘড়ি বানিয়ে ফেলল যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর এক আয়না থেকে আরেক আয়নায় আঘাত করে। রকেটটি কিন্তু আলোর বেগের দিকের সাথে সমকোণে ছুঁটে চলেছে।

dtrvyn

এখন রকেটের ভেতর আপনার যে বন্ধুটি বসে আছে সে দেখবে আলো প্রথমে এক আয়না থেকে অন্য আয়নায় একদম সোজাসুজি গিয়ে আঘাত করছে। তারপর সোজাসুজি ফিরে আসছে। স্পেস শিপটি স্থির অবস্থাতেও আপনার বন্ধুটি আলোর উঠা নামা ঠিক এমনই দেখতো ঠিক যেমনটি সে গতিশীল অবস্থায় দেখছে।

rxctvybun
আপনার বন্ধু আলোর ওঠা নামা যেমনটি দেখবে

কিন্তু আপনি যখন এক সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে এই আলোর উঠা নামা দেখবেন তখন কিন্তু আপনি তাকে সোজাসুজি উপড়ে নিচে যাওয়া আসা করতে দেখবেন না। দেখবেন কিছুটা বেঁকে যেতে। আপনি যখন একটি নদীতে সাঁতার কাটতে যান তখন স্রোতের সাথে লম্বালম্বি সাঁতার কাটলে আপনাকে স্রোত যেমন একটু বাঁকা পথে নিয়ে চলে যাবে অনেকটা তেমন। স্রোত আপনাকে বাঁকা পথে নিয়ে যাবে কারণ হল, স্রোতের বেগ আর আপনার বেগ সমকোণে থাকার কারণে এ দুটোর মিলিত বেগ আপনাকে এ দু দিকের মাঝামাঝি একটি বাঁকা পথে যেতে বাধ্য করে। ঠিক তেমনি আলোর সমকোণে স্পেস শিপটি চলায় আলোর বেগ এবং রকেটের বেগ আলোকে বেশ কিছুটা বাঁকিয়ে দেবে। রকেটের ভেতরে থাকা আপনার বন্ধু স্পেস শিপের ভেতরে থাকায় স্পেস শিপটির বেগ অনুভব করবেনা, শুধু আলোর বেগ তার কাছে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু আপনি বাইরে থাকায় আলো আর স্পেস শিপ দুটির বেগই দেখছেন। তাই আলোকে কর্ণ বরাবর বেঁকে যেতেও দেখছেন। আর আলোকে আয়নাটিতে আঘাত করে আবার নিচের আয়নায় ফেরত আসতে হলে নিচের ছবির মতো বাঁকা পথ অনুসরণ করতেই হবে। কারণ আলো উপড়ে আয়নায় যেতে যেতে উপড়ের আয়নাটিও স্পেস শিপের বেগের কারণে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়েছে। নিচের (a) ছবিতে দেখানো হয়েছে স্পেস শিপ বা, রকেটের ভেতরের বন্ধুটি কি দেখবে এবং (b) ছবিটিতে দেখানো হয়েছে যে আপনি বাইরে থেকে কি দেখবেন।

এ ছবি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, রকেটে বসা একজন আলোকে একবার উপড়ে নিচে আয়নায় ধাক্কা খেতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার চেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে দেখবে।

এখন আমরা জানি, বেগ=দূরত্ব/সময়। বা, সময়=দূরত্ব/বেগ। এক্ষেত্রে আমরা আলোর তৈরি ঘড়ি দ্বারা সময় পরিমাপ করেছি। তাই এখানকার দূরত্ব হবে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব। আর বেগ হবে আলোর বেগ। কিন্তু আইনস্টাইনের ২য় স্বীকার্য থেকে আমরা জানি যে, আলোর বেগ সর্বদা সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ধ্রুব। তাহলে সময় নির্ভর করছে শুধুমাত্র আলোর অতিক্রান্ত দূরত্বের উপড়। এখন রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর কাছে আলোর অতিক্রান্ত দূরতে বাইরে থাকা বন্ধুর চেয়ে অনেক কম। অর্থাৎ, রকেটের ভেতরে থাকা বন্ধুর মাপা সময় বাইরের বন্ধুর মাপা সময়ের চেয়ে কম হবে। এটাই কাল দীর্ঘায়ন। রকেটের বেগ যত বেশি হবে আলো তত বেঁকে যাবে। ফলে আলোর তখন আরো বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। ফলে কাল দীর্ঘায়ন আরো বেশি হবে। অর্থাৎ, আপনার বেগ যত বেশি হবে, আপনার স্পেশ শিপের বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কোন পর্যবেক্ষকের কাছে আলোর ঘড়িটি তত ধীরে চলবে।

বিষয়টি কিন্তু শুধু আলোর তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে সত্য নয়। বরং পৃথিবীর যেকোন ধরনের মেকানিক্যাল বা, ডিজিটাল ঘড়ির ক্ষেত্রেও সত্য। অর্থাৎ, গতিশীল অবস্থায় ঘড়ি সত্যি সত্যিই ধীরে চলে। তবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে বেগে আমরা চলাচল করি সেই বেগের আমাদের ঘড়ির উপড় কোন প্রভাব নেই বললেই চলে। সময়ের দীর্ঘায়নের এই প্রভাব বুঝতে হলে আমাদের বেগ অনেক বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভাল বোঝা যেতো যদি আমরা আমাদের বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারতাম।

এবার আমরা একদম গণিতের সাহায্যে সময়ের এই দীর্ঘায়নটি বোঝার চেষ্টা করব। তাহলে শুরু করা যাক। তবে কেউ যদি চায় তবে এই গণিতের অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দিয়েও পড়া চালিয়ে যেতে পারে। তবুও বুঝতে কোনরকম সমস্যা হবার কথা নয়।

*গণিত শুরু*

উপড়ে উদাহরণে আমরা দেখেছি রকেটের বাইরে থেকে যে আলোর ঘড়িটি পর্যবেক্ষণ করবে সে আলোকে নিচের আয়না থেক সোজা বেঁকে গিয়ে উপড়ের আয়নায় আঘাত খেয়ে আবার সোজা বেঁকে নিচের আয়নায় আঘাত করতে দেখবে।

ধরি, রকেটের ভেতরে বসে থাকা বন্ধু আলোর নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় যাওয়ার সময় মাপল  । আলোর বেগ c । তাহলে, রকেটে বসে থাকা বন্ধুর কাছে মনে হবে আলো মোট  দূরত্ব অতিক্রম করবে (দূরত্ব= বেগ X সময়)।

আবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আলোকে কিছুটা বেঁকে যেতে দেখবে। ফলে আলোর অতিক্রান্ত দূরত্ব বেড়ে যাবে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যবেক্ষকের মাপা সময় যদি t হয় এবং আলোর বেগ c হয় তবে এ বাঁকা পথে নিচের আয়না থেকে উপড়ের আয়নায় অতিক্রান্ত দূরত্ব হবে “ct” । রকেটের বেগ v ধরে নিলে এ t সময়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্থির পর্যবেক্ষক রকেটটিকে vt দূরত্ব সরে যেতে দেখবে। অর্থাৎ, এ তিনটি দূরত্ব এক ছবিতে প্রকাশ করলে আমরা উপড়ের চিত্রটি পাবো।

আমরা দেখতে পাচ্ছি চিত্রটিতে একটি সমকোণী ত্রিভুজের সৃষ্টি হয়েছে (চিত্রের শুধু বাম পাশের অংশটি বিবেচনা করি)। তাহলে পিথাগোরাসের সূত্র অনুসারে আমরা লিখতে পারি,

বা,

বা,

বা,

বা,

বা,

                                                                                                                                   ………………………………………….(1)

*গণিত শেষ*

এবার আমরা (1) নম্বর সমীকরণের দিকে একটু লক্ষ্য করি। এখানে t হল স্থির পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময় এবং  হল গতিশীল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে মাপা সময়। এই ফ্যাক্টরটির সাথে আমরা আগে “ইথারকে বাঁচাতে ফিটজগোরাল্ড-লরেন্টেজের হাইপোথিসিস” নামক লেখায় পরিচিত হয়েছি। এই ফ্যাক্টরকে বলে লরেন্টজ ফ্যাক্টর। যদি আমরা v এর মান c এর চেয়ে বেশি বসায় তাহলে,  ফ্যাক্টরটির  অংশটি ১ এর চেয়ে বড় হয়ে যায় এবং বর্গমূলের মাঝে একটি মাইনাস বা, ঋণাত্মক চিহ্ন আসে। বর্গমূলের ভেতরে ঋণাত্মক চিহ্ন আসলে তাকে জটিল সংখ্যা বলে। তাই কোন কিছুই আসলে আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। যদি v এর মান c এর সমান হয় তাহলে  এর মান শূন্য হয়। কারণ তখন  হয়ে যায়। ভাগ চিহ্নের নিচে বা, হরে শূন্য আসলে গণিতের সেই অবস্থাকে অসঙ্গায়িত অবস্থা বলে। অনেক সময় এ ধরণের ভাগ ফলকে অসীমও বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি কেউ আলোর বেগে গতিশীল হয় তাহলে তার ১ সেকেন্ড পৃথিবীর অসীম সময়ের সমান হয়ে যাবে। আসলেই কি গতিশীল বস্তুর সময় ধীরে চলে? আসলেই কি কোন বস্তু আলোর বেগে যেতে পারে?

Image result

পরবর্তিতে উদাহরণ এবং গণিতের সাহায্যে বিষয়গুলো আরো ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করব আমরা। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

featured image: motive4you.com

মহাকর্ষ যেভাবে শ্রোডিংগারের বিড়ালকে ধ্বংস করে

অনেকের কাছে বিড়াল বেশ আদুরে। পদার্থবিজ্ঞানেও একটি আদুরে বিড়াল আছে। পৃথিবীর আর সব বিড়ালের সাথে পার্থক্য এটাই যে এর কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই। গালভরা নাম- শ্রোডিংগারের বিড়াল। এই উপমা নিহিত বিড়ালটি পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার শাখা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আচরণ বোঝাতে বর্ণনা করা হয়।

অস্ট্রিয় পদার্থবিদ আরভিন শ্রোডিংগার বিখ্যাত এই মানস-পরীক্ষণের ব্যাখ্যাকার। বিড়াল যদি কোয়ান্টাম তত্ত্বানুযায়ী আচরণ করে, তাহলে এটি একইসাথে একাধিক দশায় অবস্থান করবে। একইসাথে জীবিত এবং মৃত হিসেবে থাকবে। পর্যবেক্ষণ না করে নিশ্চিতভাবে কখনোই বলা সম্ভব না বিড়ালটি কোন দশায় আছে। এই ঘটনাটি অণু-পরমাণুর জগতে ঘটে, যা বাস্তব জগতের একটি বস্তু দিয়ে বোঝানো হয় কোয়ান্টাম জগতে এর আচরণ কেমন।

প্রাত্যহিক জীবনে এমন বিড়াল দূরে থাক, বিড়ালের লেজও তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন পাওয়া যাবে না তার উত্তর কী? দৈনন্দিন পৃথিবীতে কোয়ান্টাম সুপারপজিশন না দেখতে পাওয়ার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কারণ হিসেবে আঙুল তুলেন পরিবেশে বিদ্যমান ঘটনার ব্যতিচারকে। সুপারপজিশন? এর মানে হলো কোনো বস্তু একই সময়ে দুটি ভিন্ন স্থানে অবস্থান করা।

ঘটনার ব্যতিচার হচ্ছে যখন দুটো ঘটনা একটি আরেকটিকে নাকচ করে দেয়। যখনই কোনো কোয়ান্টাম বস্তু কোনো বিক্ষিপ্ত বা ইতস্তত পরিভ্রমণরত কণার সাথে মিথষ্ক্রিয়া করে তখন প্রকৃতি কেবল একটি দশাকে বেছে নেয়। আমাদের দৈনন্দিন দৃষ্টিভঙ্গির আদলে কেবল একটি দশাই ফলাফল হিসেবে থাকে। বিড়ালের বাক্স খুলে ফেলা হলো মিথষ্ক্রিয়ার উপমা। বাক্স খোলামাত্র বিড়ালকে একটি দশায় পাওয়া যাবে, কিন্তু খোলার আগে কোনো দশাই নিশ্চিত নয়।

কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যদি কোনো বৃহৎ বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করতে পারতেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে, এরপরও সেটি একটি দশায় গিয়ে ঠেকবে। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষকেরা বলেন, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে কোয়ান্টাম সংলগ্নতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে কোথাও শ্রোডিংগারের বিড়ালের হয়তো একটি সুযোগ থাকতে পারে, কিন্তু পৃথিবী বা কোনো নিকট গ্রহে সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। গবেষক ইগোর পাইকোভস্কি বলেন এর কারণ, মহাকর্ষ।

বিজ্ঞানের সেরা জার্নাল নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে পাইকোভস্কি[] এবং তার সহকর্মীদের এ ধারণা বর্তমানে গাণিতিক যুক্তিতর্কের অধীনে রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের পরীক্ষণ-পদার্থবিদ হেন্ড্রিক আলব্রিক্ট এর পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টার আশাবাদ করেন। তিনি এই গবেষণাপত্রের নিরীক্ষণের দায়িত্বে আছেন। তবে পরীক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

অভিকর্ষ কীভাবে বিড়ালকে নাকচ করে দেয়?

সিনেমাপ্রেমী দর্শক যারা ইন্টারস্টেলার মুভিটি দেখেছেন তারা এই গবেষণাপত্রের মূলনীতির সাথে সহজে পরিচিত হতে পারবেন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের কাছে যাওয়া যাক। যদি কোনো অতিকায় ভরবিশিষ্ট বস্তুর কাছাকাছি কোনো ঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে সেটা খুব ধীরে চলবে। শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেবে।

ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায় অভিযাত্রীরা কৃষ্ণবিবরের কাছে এক গ্রহে অবতরণের পর সেখানকার এক ঘণ্টায় পৃথিবীতে সাত বছর পেরিয়ে যায়।[] শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সেখানকার সময়কে শ্লথ করে দিয়েছে। এই সময় শ্লথের বিষয়টি যন্ত্র-নিরপেক্ষ। কাঁটার ঘড়ি হোক, ডিজিটাল ডিসপ্লের ঘড়ি বা কোনো সিজিয়াম পরমাণুর কম্পন দিয়েই মাপা হোক সময়ের পরিমাপ শ্লথই পাওয়া যাবে।

বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত সূক্ষ্মতর স্কেলে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিকটে স্থাপিত কোনো অণু পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে দূরে স্থাপিত কোনো অণুর সাথে সময়ের ধীরলয় পাওয়া গেছে।

পাইকোভস্কির দল ধরতে পারে যে, স্থান-কালের উপর মহাকর্ষের প্রভাবে অণুর অন্তঃশক্তি প্রভাবিত হয়। অণুতে কণাসমূহের কম্পনের মাধ্যমে সময়ের সাপেক্ষে সেটা প্রকাশ পাবে। এবার আসছি আসল রাস্তায়- যদি কোনো অণুকে দুটো কোয়ান্টাম সুপারপজিশনে রাখা যায়, এদের অবস্থান এবং অন্তঃশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বৈততাকে ভেঙে দেবে যাতে অণু একটি অবস্থান বা পথ বেছে নিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো বাহ্যিক কারণে অসঙ্গতি ঘটে থাকে কিন্তু এখানে অন্তঃকম্পন মিথষ্ক্রিয়া করছে অণুর নিজস্ব গতির সাথেই।

একটি বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা

উৎসের অসঙ্গতির কারণে কেউই এখনো এই প্রভাবকে পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি। যেমন চৌম্বকক্ষেত্র, তাপীয় বিকিরণ এবং কম্পন- এই বিষয়গুলো গতানুগতিকভাবে মহাকর্ষের চেয়ে শক্তিশালী। এর ফলে এরা কোয়ান্টাম প্রক্রিয়াগুলোকে বিলীন করে দেয় মহাকর্ষের প্রভাবকে ছাপিয়ে। কিন্তু পরীক্ষণবিদরা চেষ্টা করতে আগ্রহী।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার পরীক্ষণ-পদার্থবিদ মার্কাস আর্ন্ডট ইতোমধ্যেই পরীক্ষা করে ফেলেছেন কোয়ান্টাম সুপারপজিশন পর্যবেক্ষণ করা যাবে কিনা। তিনি কণা-তরঙ্গ (দ্বৈত চরিত্র) ইন্টারফেরোমিটারের মধ্য দিয়ে এমন প্রক্রিয়ায় বড় আকারের অণু পাঠিয়েছেন যেন প্রতিটি অণু চলার পথে দুটো ভিন্ন পথ পায়। চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, একটি অণু কেবল একটি পথেই পরিভ্রমণ করে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম অণু কার্যত উভয় পথেই পরিভ্রমণ করে এবং নিজের সাথেই ব্যতিচার ঘটায়। ছবিতে ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যসূচক তরঙ্গের প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে।

চিত্র: জটিল ও বড় অণু ব্যবহার করে প্রাপ্ত ব্যতিচার

কোয়ান্টাম আচরণ ভেঙে দিতে মহাকর্ষের সক্ষমতা পরীক্ষায় অনুরূপ পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। উল্লম্ব ইন্টারফেরোমিটারের সাথে তুলনা করলে এক পথের সাথে অন্য পথের সাপেক্ষে সময়-প্রসারণের ফলে সুপারপজিশন অসঙ্গত হয়ে পড়বে। ইন্টারফেরোমিটার হচ্ছে ব্যতিচার (Interference) ব্যবহার করে দুটো আলোক রশ্মির সূক্ষ্ম মাপজোখ করার যন্ত্রবিশেষ।

গত বছর যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (যা খুবই সূক্ষ্ম) পাওয়া গিয়েছিল তা খুঁজে পেতেও ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছিল। মহাকর্ষের প্রভাব পেতে ইন্টারফেরোমিটারের আনুভূমিক সেট আপে সুপারপজিশন দেখা যেতে পারে। আর্ন্ডট ৮১০ পরমাণু বিশিষ্ট বড় অণু পর্যন্ত এই প্রভাব পরীক্ষা করেছেন।[]

বড় অণুগুলো মহাকর্ষীয় প্রভাব পরীক্ষণে সুবিধাজনক। কেননা তারা অধিক সংখ্যক কণা ধারণ করে যারা অন্তঃশক্তিতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সূক্ষ্মতর পরীক্ষণগুলোর সতর্কতাও রাখতে হয় তুঙ্গে। এ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে যে শুধু বাহ্যিক পরিবেশের প্রভাবককেই দমিয়ে রাখতে হবে তা নয়। তাদের পরীক্ষণে দুটো পথের দূরত্ব রাখা হয় মাইক্রোমিটার সীমায়, হয় এই সীমাকে মিটারে নিয়ে যেতে হবে নয়তো ১০ লক্ষ গুণ বড় অণু ব্যবহার করতে হবে। দুটো বিষয়ই একে অপরের প্রতিকূল বলে এক্সপেরিমেন্ট এগিয়ে নেয়া খুব চ্যালেঞ্জিং।

যদি মহাকর্ষের প্রভাব পৃথিবীতে কোয়ান্টাম আচরণের সীমা টেনে দিতে পারে, বড় বস্তুর জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা আমাদেরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.nature.com/news/how-gravity-kills-schr%C3%B6dinger-s-cat-1.17773

[২] http://interstellarfilm.wikia.com/wiki/Gargantua

[৩] http://pubs.rsc.org/en/Content/ArticleLanding/2013/CP/c3cp51500a

featured image: phys.org