বিষ থেকে প্রাণরক্ষার ওষুধ

রোগব্যাধী ও মৃত্যু থেকে দূরে থাকার জন্য বর্তমানে আমাদের আছে বৈচিত্র্যময় ও বিশাল পরিমাণ ওষুধের সরবরাহ। মজার ব্যাপার হলো জীবন রক্ষাকারী অনেক ওষুধ তৈরী হয় প্রাণঘাতী বিভিন্ন বিষ থেকে।

চিত্র: বোটুলিনাম বিষের ত্রিমাত্রিক গঠন।

পাশের চিত্রটি মানুষের পরিচিত সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদানের ত্রিমাত্রিক গঠন। এই বিষাক্ত যৌগটির মাত্র এক চা চামচ পরিমাণ, আস্ত একটি দেশের সকল মানুষকে মারার জন্য যথেষ্ট। এক কেজি পরিমাণ এই বিষ সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষকে মারতে সক্ষম। এই বিষ এতটাই বিপদজনক যে কঠোর সামরিক নিরাপত্তায় এটিকে উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি, এ বিষের প্রতি কেজির মূল্য ১০০ ট্রিলিয়ন ইউরো। যা পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত তৈরী হওয়া সবচেয়ে দামী ও ব্যয়বহুল উপাদান।

মারাত্মক এই উপাদানটি হলো বোটুলিনাম বিষ। বোটক্স (Botox) নামেই অধিক পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সসেজ জাতীয় খাদ্যে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়ায় বোটক্স আবিষ্কৃত হয়। ল্যাটিন ভাষায় সসেজ মানে হলো বোটুলাস। এখান থেকেই এই বিষের নামকরণ করা হয়েছে।

বিষের বিষাক্ততা মাপা হয় আছে LD50 স্কেলে। বিষ প্রয়োগের পর বিষ দ্বারা আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক সংখ্যক মানুষ মারতে কত পরিমাণ সময় লাগে তার উপর ভিত্তি করে এই স্কেল তৈরি করা হয়েছে। এই স্কেলে বোটক্সের মান হলো ০.০০০০০১ মিলিগ্রাম/কেজি। অর্থাৎ একটি ৭০ কেজি ভরের মানুষকে মারতে আপনার মাত্র ০.০০০০৭ মিলিগ্রাম বোটক্স প্রয়োজন হবে।

অন্যভাবে বললে আপনার জন্য প্রাণঘাতী এক ডোজ বোটক্সের পরিমাণ এক কিউবিক মিলিমিটার বায়ু থেকেও কম। বোটুলিনাম বিষ শ্বসনক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিকে মেরে ফেলে। এটি নিউরোটক্সিন। স্নায়ু কোষে প্রবেশ করে কোষ ও কোষের অভ্যন্তরের প্রোটিন ধ্বংস করতে শুরু করে।

সাধারণত স্নায়ুকোষের অ্যাক্সন দ্বারা স্নায়ুর অনুভূতি তড়িৎ সংকেত বা Electric Impules হিসেবে স্নায়ুসন্ধির কাছাকাছি পৌঁছায়। সেখানে এটি বিশেষ এক রাসায়নিক সংকেতে পরিবর্তিত হয়ে স্নায়ুসন্ধি অতিক্রম করে এবং পেশীকোষে যায়। পেশীকোষের গিয়ে এই রাসায়নিক সংকেত পুনরায় তড়িৎ সংকেতে পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পেশী কোষ সংকোচিত হয়।

অ্যাক্সন নামক যে প্রান্ত দ্বারা একটি স্নায়ুকোষ, পেশীকোষের সাথে সন্ধি সৃষ্টি করে সেখান থেকে এসিটাইলকোলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রোগী পেশী সঞ্চালনে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং প্যারালাইসিসে আক্রান্ত্র হয়। শুধুমাত্র আক্রান্ত স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের মাধ্যমেই পেশির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সময় লাগতে পারে মাসের পর মাস।

চিত্র: স্নায়ুকোষ ও পেশীকোষের মাঝে বিদ্যমান স্নায়ুসন্ধি।

বোটক্স এত বিষাক্ত হওয়ার পরেও এত জনপ্রিয় কীভাবে হলো? বয়স বৃদ্ধির সাথে মানুষের চেহারায় ও ত্বকে যে ভাঁজ সৃষ্টি হয় তা এই বিষ দূর করতে সক্ষম। যেসকল স্নায়ুকোষ ত্বকে ভাঁজ সৃষ্টির জন্য দায়ী সেসব কোষ ধ্বংসের মাধ্যমে বোটক্স ত্বকের ভাঁজ হওয়া বা কুঞ্চন রোধ করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বোটক্সের পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র, যা প্রায় এক গ্রামের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ এবং এটি স্যালাইনের সাথে মিশ্রিত করে প্রদান করা হয়।

বোটক্স ব্যবহারের ফলে ত্বক ঠিকই মসৃণ হয়, কিন্তু স্নায়ুকোষের নতুন অ্যাক্সন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত মুখে এক অদ্ভুতুরে অভিব্যক্তির সৃষ্টি করে।

চিত্র: ত্বক মসৃণ করতে ব্যবহার হয় বোটক্স।

বোটুলিনাম বিষ শুধুমাত্র একটি সাধারণ সৌন্দর্য্যবর্ধক উপাদান হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তা কিন্তু নয়। নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা সমাধানেও বোটক্স অত্যন্ত উপযোগী। এদের মধ্যে আছে তির্যকদৃষ্টি, মাইগ্রেন, অত্যাধিক ঘামরোগ, দুর্বল মূত্রথলী ইত্যাদি। বর্তমানে ২০টিরও বেশি রোগ নিরাময়ের জন্য বোটক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিষ দিয়ে চিকিৎসার এটি তো একটি মাত্র উদাহরণ। এরকম আরো অনেক আছে। ক্যাপটোপ্রিল হলো উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান এক ওষুধ। এটি প্রস্তুত করা হয় সাপের বিষ থেকে। এক্সেনাটাই (বাণিজ্যিক নাম বেয়েট্টা, Byetta) একটি কার্যকরী ওষুধ। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোতে বাস করা গিরিগিটি জাতীয় প্রাণী গিলা মনস্টার-এর বিষাক্ত লালারস গবেষণা করে এই ওষুধটি আবিষ্কার করা হয়।

বিষ যে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে তার ইতিহাস কিন্তু মোটেও মধুর নয়। রাণী ভিক্টোরিয়ার যুগ, ব্রিটেনে তখন জীবন বীমার পরিমাণ হুড়হুড় করে বেড়ে চলেছে। বীমার সহজলভ্য টাকার লোভে খুনের পরিমাণও তুমুল পরিমাণে বাড়তে থাকে। এদের অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছিল বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে।

তখনকার অনেক বেশি আলোচিত মামলার একটি ছিল মেরি এন কটন নামক এক মহিলার নামে। তিনি ১৮৭৩ সালে একাধিকবার খুনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি ৪টি বিয়ে করেন এবং তার স্বামীর ৩ জনই সমৃদ্ধ বীমার মালিক ছিলেন। তারা সকলে স্ত্রীর হাতে খুন হন। বেঁচে যাওয়া স্বামী বীমা উত্তোলনে অস্বীকৃতি জানালে উনি তার স্বামীকে ত্যাগ করেন।

তার মোট ১০ সন্তান মারা যায় তাদের পরিপাক জটিলতার কারণে। মানবিকভাবে প্রত্যেকটা মৃত্যু দুঃখজনক হলেও কটনের জন্য তা ছিল আরো বীমার টাকার হাতছানি। তার শাশুড়ি, ননদ, স্বামী সবাই এক এক করে মারা যায়। ১৮৭২ সালের মাঝে তিনি বিস্ময়করভাবে ১৬ জন নিকট আত্মীয়কে হারান। বাকি ছিল শুধুমাত্র একজন। তার ৭ বছরের সৎ ছেলে চার্লস। তিনি তাকে স্থানীয় কারখানায় পাঠাতে চাইলেও কারখানার মালিক তাকে রাখতে রাজি হয়নি। এর কদিন পরেই অল্পবয়সী চার্লসও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কারখানার ম্যানেজারের মনে এই ঘটনা সন্দেহের উদ্রেক করলে তিনি স্থানীয় পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেন। নানা ঘটনা শেষে পুলিশ সিদ্ধান্তে আসেন যে তিনি, শিশু চার্লসকে বিষ প্রয়োগ করেছেন। তারা জানতে পারেন এ কাজটি করা হয়েছে আর্সেনিক প্রয়োগের মাধ্যমে।

চিত্র: আর্সেনিক অক্সাইড, এক নীরব বিষ।

আর্সেনিক অক্সাইড সমূহ হলো খনিজ। আর বিষ হিসেবে এসব খনিজ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অক্সাইড স্বাদহীন, গরম পানিতে দ্রবণীয় এবং একটি মানুষ মারার জন্য এক আউন্স পরিমাণের ১০০ ভাগের ১ ভাগই যথেষ্ট। তবুও উনবিংশ শতাব্দীতে এই আর্সেনিক খনিজ ইঁদুর মারার বিষ হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতে থাকে। সে সময় আর্সেনিক অক্সাইড ছিল সস্তা ও সহজলভ্য। শিশুরা খুশিমনে দোকান থেকে চা, চিনি কিংবা শুঁকনো খাবারের পাশাপাশি এটিও কিনতে পারত।

অন্যদিকে, আদালতে মেরি কটনের বিচার নির্ভর করছিল পুলিশ তার সৎ ছেলে চার্লসের দেহে আর্সেনিকের আলামতো খুঁজে পায় কিনা তার উপর। সে সময় ফরেনসিক বিজ্ঞান যথেষ্ট সমৃদ্ধ না হলেও আর্সেনিকের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য একটি ভালো পরীক্ষা তাদের জানা ছিল।

মৃত চার্লসের পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে নেয়া নমুনা এসিড ও কপারের সাথে উত্তপ্ত করা হয়। কপার গাড় ধূসর রঙ ধারণ করলেই আর্সেনিকের উপস্থিতি প্রমাণ হবে।

পুলিশ তদন্ত করে দেখায় যে, প্রাণঘাতী আর্সেনিকের ডোজ প্রদানের মাধ্যমে চার্লসকে হত্যা করা হয়। কটনকে চার্লসের খুনের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং দুরহাম জেলে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

এরকম বহু বেপরোয়া খুন ও বিষ প্রয়োগের ঘটনার কারণে প্রথম আর্সেনিক আইন ও এরপর ওষুধ আইন ১৮৬৮ এর দিকে নিয়ে যায়। এই আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন ফার্মাসিস্ট এবং ওষুধ-বিক্রেতাই নানাবিধ বিষাক্ত উপাদান ও বিপদজনক ওষুধ বিক্রি করতে পারবে।

বিষক্রিয়া, দুর্ঘটনা, খুন এসবের মাধ্য দিয়েই বর্তমান আধুনিক ওষুধ শিল্পের অঙ্কুরোদগম ঘটে। জানলে অবাক হবেন এই আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই ক্যান্সার প্রতিরোধে বৈধভাবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

তথ্যসূত্র: bbc.com/news/magazine-24551945

ফ্রিৎস হেবার: দানব নাকি দেবদূত?

১৯১৫ এর বসন্ত প্রায় শেষের পথে। বেলজিয়ামের ইপ্রা তেপান্তরে পঁচতে শুরু করেছে হাজারও যুবকের মৃতদেহ। সুরক্ষিত পরিখার নিচে গাদাগাদি করে শুয়ে রয়েছে কাঁদা লেপ্টে থাকা একদল সৈন্য। আর তাদের ঠিক নিচেই গোর দেওয়া লাশগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছি আর ইঁদুর। ইপ্রার এইপাশে বুলেটের ছোঁড়াছুড়ি থামছে না বললেই চলে, সাথে মর্টারের কান ফাটানো শব্দও ঢাকা পড়েছে আহতদের আর্তনাদে।

ইপ্রার জার্মান নাৎসিদের দখলে থাকা প্রান্তটা একটু অন্যরকম। সেদিকে চোখ ফেরালেই দেখা যাবে ছোটখাট টাক মাথার এক ভদ্রলোককে, নাম তার ফ্রিৎস হেবার। পিন্স-নেজ চশমার ফাঁক দিয়ে দেশের শত্রুদের দিকে চোখ বুলাচ্ছেন এই জার্মান-ইহুদী রসায়নবিদ।

হেবারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ৬ হাজার ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে তার হাত নাড়ানোর অপেক্ষায়। সন্ধ্যার দিকে বাতাসের গতিপথটা পরিবর্তন হতেই তার বিশাল গোঁফের নিচে জ্বলতে থাকা ভার্জিনিয়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, হাত নেড়ে সংকেত দিলেন। মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘God Punish England’-এর মতো স্বগতোক্তি।

হঠাৎ করেই ইপ্রার তেপান্তর ভেঙে পড়লো বিস্ফোরণের শব্দে। সিলিন্ডারের ভালভগুলো উন্মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ১৬৮ টন ক্লোরিন গ্যাস। সবুজাভ হলুদ রঙের কুয়াশার মতো ক্লোরিন গ্যাসের স্তর যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহের উপর দিয়ে চলে গেলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যের দিকে।

গাছের ডাল থেকে পাতা পড়ে যেতে থাকলো, সবুজ ঘাসের উপর ধাতবরঙা আস্তরণ পড়লো, আকাশ থেকে খসে পড়তে শুরু করলো উড়তে থাকা পাখি। এটুকু দেখেই যা বোঝার বুঝে নেয়া উচিৎ ছিল মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের। কিন্তু না, তারা নিজেদের জায়গাতেই বসে থাকল, এরকম জিনিস আগে কখনো দেখা হয়নি তাদের।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেঞ্চে শুয়ে থাকা সৈন্যদের ফুসফুসে আক্রমণ করলো ক্লোরিন গ্যাস। দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, যারা বসে ছিল তারা মাটিতেই শুয়ে পড়লো। অ্যালভিওলাই আর রক্তনালীগুলো ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো, মুখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হওয়ার আগে হলুদ মিউকাসে ভেসে গেলো তাদের চেহারা।

তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বলার আর সময় হলো না, মাটিতেই ডুবে মরতে হলো কয়েক হাজার সৈন্যকে। পড়ে যেতে থাকা সহচরদের দেখে ইপ্রা থেকে পিছু হটলো মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা, নিজেদের জীবনের সেরা দৌড়টা দিয়ে পালিয়ে বাঁচলো বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস থেকে।

এটাই ছিল ফ্রিৎস হেবারের পরিকল্পনা। তিনি নিজেই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এই প্রাণঘাতী পরিকল্পনায়। যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা করা জার্মান জেনারেলদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই জার্মানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে উৎসাহী করে তুলেছিলেন এই রসায়নবিদ।

এর তিন বছরের মাথায় নোবেলের সোনালী পদক গলায় ঝুলিয়ে হাসিমুখে ছবি তুললেন হেবার এবং সেটা অবশ্যই ভালো কারণে। এমনকি আপনি নিজেও হয়তো নিজের জীবনের জন্য এই বিজ্ঞানীর কাছে ঋণী!

হেবার তার ইতিবাচক বৈপ্লবিক আবিষ্কার করার আগ মুহূর্ত পর্যন্তও বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে ছিল জনসংখ্যার আধিক্য। পৃথিবীর দেড় বিলিয়ন মানুষের পেটকে শান্ত রাখা মুখের কথা নয়, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই কয়েক হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের আক্রমণে মাটিতে ঢলে পড়ছে। উনিশ শতাব্দীর শেষ দিকে জার্মানির মাঠ তখন ৩ কোটি মানুষের খাবারে পরিপূর্ণ, কিন্তু ফসলের ফলন ভালো না হলে না খেয়ে থাকতে হবে আরো ২ কোটি মানুষকে।

এ সমস্যার সমাধান তাত্ত্বিকভাবে খুবই সহজ। ১৮৪০ এর দশকেই ফন লিবিগ বলেছিলেন উদ্ভিদ কোষের বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন অপরিহার্য। ফসল কতোটুকু ফলবে তা-ও নির্ভর করে নাইট্রোজেন সরবরাহের মাত্রার উপর। ৪ হাজার ট্রিলিয়ন টন নাইট্রোজেন গ্যাস ঘোরাফেরা করছে আমাদের বায়ুমণ্ডলে, দখল করে রেখেছে প্রায় ৮০% এলাকা। কিন্তু কে বাতাস থেকে এই নাইট্রোজেনকে টেনে বের করে মাটিতে পুঁতে দেবে?

বাতাস থেকে নাইট্রোজেন আলাদা করার সবচেয়ে বড় বাধাটা হলো এর শক্তিশালী ত্রিযোজী বন্ধন। বায়ুতে উড়তে থাকা নাইট্রোজেন অণুগুলো পরস্পরের সাথে এত দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত যে এগুলোকে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদন করাও তৎকালীন সময়ে অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল।

ঠিক এই কারণেই দেশগুলোকে খুঁজতে হয়েছিল নাইট্রোজেনের বিকল্প উপায়– সমুদ্রশৈবাল আর পাখির মল থেকে তৈরি সার। কিন্তু এগুলোও এতটা দুর্লভ ছিল যে, পাখির মল ভর্তি দ্বীপ দখলের জন্য যুদ্ধে নামতে হয়েছিল স্পেন-চিলি-পেরুকে। শেষমেশ চিলি যখন যুদ্ধে জয়লাভ করে দ্বীপ দখলে নিলো, তাদের রাজস্ব আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯০০%-এরও বেশি!

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই হেবার এই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। পরীক্ষার জন্য তৈরি করলেন বিশাল এক লোহার ট্যাংক, তারমধ্যে বাতাস আর হাইড্রোজেন ঢুকিয়ে দিলেন। দিয়ে প্রচণ্ড চাপ, সাথে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা প্রয়োগ করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নাইট্রোজেনের বন্ধন ভেঙে তিনটি হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হলো অ্যামোনিয়া, ট্যাংকের নিচ থেকে বের হয়ে এলো তরল সার। অবশেষে উদ্ভাবন হলো বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করে নিয়ে আসার উপায়, আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর ১৯০৯ সালে পৃথিবীবাসীর সামনে হেবার প্রকাশ করলেন তার আবিষ্কার।

প্রতিবছর ১০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি সার উৎপাদন করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। আপনি সহ ৭ বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দেহের অর্ধেক নাইট্রোজেনই আসে এই হেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার হিসেবে মনে করা হয় এই হেবার প্রক্রিয়াকে যেটি থামিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ, পেটের ক্ষুধা নিবারণ করে মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে এবং আধুনিক সভ্যতার দিকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে জার্মানির অর্থনীতির চাকাও ঘুরতে থাকলো দ্রুতগতিতে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাম্রাজ্যবাদী জার্মানি তাদের সীমানা বাড়াতে হাত বাড়ালো বেলজিয়ামে, সেখান থেকে ফ্রান্স। শুরু হয়ে গেলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানরা ভেবেছিল খুব অল্প সময়েই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম, মিত্রবাহিনীর নৌবহর সাগর থেকে আসা অস্ত্র-বারুদের কাঁচামালের রসদ আটকে দিল।

বুকে একসাগর দেশপ্রেম নিয়ে বেড়ে ওঠা ফ্রিৎস হেবার সেনাবাহিনীর কাছে চিঠি পাঠালেন। রসায়নের তত্ত্বানুযায়ী নাইট্রোজেনকে ভাঙতে যতোটুকু শক্তি পাওয়া গিয়েছিল, জুড়তে পারলে ঠিক ততোটুকুই শক্তি ফিরে পাওয়া যাবে। যে বিক্রিয়া দিয়ে তিনি হাজারও জীবন রক্ষা করেছেন, তার উল্টোটা করলেই ঝরে পড়বে জার্মানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা হাজারও মিত্রবাহিনীর সৈন্যের লাশ। তার এই পরিকল্পনার সদ্ব্যবহার করতেই সারা জার্মানিজুড়ে বসানো হলো বিস্ফোরক তৈরির কারখানা, বিশ্বযুদ্ধ স্থায়ী হলো আরো ৩ বছর।

কিন্তু এত পরিকল্পনার পরেও খুব একটা সুবিধা হয়নি জার্মানির। মিত্রবাহিনীর কাছেও রয়েছে একই প্রযুক্তি, বরং তাদের সৈন্যসংখ্যা ঢের বেশি। হেবার এবার তার শেষ পরিকল্পনাটা শোনালেন। ক্লোরিন গ্যাসের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে অ্যামোনিয়া, তৈরি হবে শ্বাসরোধ করে ফেলা গ্যাস, মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে হাজারও সৈন্য। এভাবে মেরে ফেলা নিয়ে হেবারের কোনো আফসোস ছিল না। এই জার্মান ইহুদীর ভাষ্যমতে, যুদ্ধহীন অবস্থায় একজন বিজ্ঞানী পুরো বিশ্বের জন্য, কিন্তু যুদ্ধের সময় তার পুরোটাই দেশের জন্য।

ইপ্রার তেপান্তরে পরীক্ষামূলকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নতুনভাবে শুরু হলো যুদ্ধ। হেবারকে পদোন্নতি দিয়ে জার্মান বাহিনীর ক্যাপ্টেন বানানো হলো। এদিকে হেগ চুক্তি ভঙ্গের প্রতিশোধ নিতে মিত্রবাহিনীও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করলো জার্মানদের উপর। অবশেষে আত্মসমর্পন করলো অক্ষবাহিনী, উভয় পক্ষেরই এক লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে গ্যাসের আক্রমণে, লক্ষ লক্ষ মানুষ আহত হয়েছে হেবারের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বিষের আঘাতে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অন্যান্য জার্মানদের সাথে হেবারও মাথা হেট করে ফিরে আসলো নিজ দেশে। জার্মানি তখন বিধ্বস্ত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের বেঁচে থাকাও কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। দেশের এই দুঃসময়ে হেবার সাগরের পানি ছেঁকে সোনা বের করার উপায় খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু, বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বের করা আর সাগরের পানি থেকে সোনা বের করা তো এক জিনিস নয়।

হেবারের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়লো যখন হিটলারের নাৎসি বাহিনী জার্মানির কর্তৃত্ব হাতে পেলো। তার মতো ইহুদীদের বিরুদ্ধে তখন উঠেপড়ে লেগেছে নাৎসিরা। তার হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া উইলহেম কাইসার বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট তখন ইহুদী বিজ্ঞানীদের আঁতুড়ঘর। হেবারসহ তার ইহুদী সহকর্মীরা উৎখাত হলো জার্মানি থেকে। হেবার এবার পালিয়ে বেড়ালেন ইউরোপের এমাথা থেকে ওমাথা। ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে অধ্যাপনা করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নাম লেখালেন, ফ্রান্সেও তাই!

এভাবে পালিয়ে বেড়ানোর ফলে শরীর খারাপ হয়ে পড়লো। সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার পথে তার হৃৎপিণ্ড প্রায় থেমে গিয়েছিল। তারপর সেখানে পৌঁছানোর পর হোটেল রুমেই দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক করে পরলোকে পাড়ি জমালেন ১৯১৮ সালের এই নোবেল বিজয়ী। বিলাসিতায় ডুবে থাকা এই বিজ্ঞানী শেষ বয়সে মারা গেলেন একাকী এবং দেউলিয়া অবস্থায়, যে অশুভ জিনিসকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তা নিয়ে অনুতপ্ত হয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই ইহলীলা সাঙ্গ করেছিলেন হেবার, কিন্তু তার আবিষ্কার করা অনেক কিছু তখনও ব্যবহার হচ্ছিল, যার মধ্যে একটি হলো জিকলন নামের হাইড্রোজেন-সায়ানাইড যৌগ। নাৎসি বিজ্ঞানীরা হেবারের এই আবিষ্কারকে সামান্য পরিবর্তন করে এর গন্ধটুকু বের করে নিলেন। আর এই গন্ধহীন গ্যাস বুকে টেনে নিয়ে অসউইটজ ক্যাম্পেই প্রাণ হারালেন হেবারের পরিবার-বন্ধুসহ কয়েক লক্ষ ইহুদী।

ফ্রিৎস হেবারকে নিয়ে ইতিহাসবিদরা এখনো বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। কোটি কোটি লোকের অস্তিত্বই থাকতো না যদি না হেবার থাকতেন। আবার তিনি না থাকলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধও অনেক আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেও প্রাণ দিতে হতো না লক্ষ লক্ষ মানুষকে। একইসাথে সৃষ্টিশীল এবং ধ্বংসাত্মক, দয়ালু এবং পাষাণহৃদয় এই রসায়নবিদ যেমন নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি মানুষকে পেটভরে খাইয়েছেন, তেমনি প্রতিপক্ষের করুণ আর্তনাদেও উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন।

তার পাপ এবং পুণ্য পরিমাপ করার কোনো সহজ উপায় নেই, হয়তো তা পরিমাপ করার প্রয়োজনও নেই। দিনশেষে তিনি ফ্রিৎস হেবার, বিজ্ঞানের ব্যবহার আর অপব্যবহারের নিখুঁত উদাহরণ।

তথ্যসূত্র

১. https://www.smithsonianmag.com/history/fritz-habers-experiments-in-life-and-death-114161301/

২. https://medium.com/the-mission/the-tragedy-of-fritz-haber-the-monster-who-fed-the-world/
৩. http://www.bbc.com/news/world-13015210

সোঁদা মাটির মন মাতানো গন্ধের উৎস

অনেকেই বৃষ্টির গন্ধ পছন্দ করে। বৃষ্টির মিষ্টি গন্ধ অনেকের কাছে সজীবতা, পরিচ্ছন্নতা বা আর্দ্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। কিন্ত পানির তো নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই, তাহলে এই ভেজা সুগন্ধটি কোথা থেকে আসে?

বৃষ্টির গন্ধের একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক নাম আছে- পেট্রিকোর (petrichor)। ১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর দুই গবেষক ইসাবেল জয় বেয়ার এবং রিচার্ড জি. থমাস নেচার পত্রিকায় বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ Nature of Argillaceous Odor লেখার সময় এই নামটি প্রদান করেন। এর বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘মৃন্ময় গন্ধের প্রকৃতি’। এই শব্দটি গ্রীক petra (বা পাথর) আর ichor (গ্রীক দেবতাদের শরীরে রক্তের মতো যে পদার্থ প্রবাহিত হয়) এর সমন্বয়ে তৈরি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদিও বৃষ্টির গন্ধের মাঝে আমরা একটি সজীব পরিচ্ছন্ন ভাব খুঁজে পাই, কিন্ত এই গন্ধ আসলে মাটির ধুলা-ময়লা আর পাথর থেকে তৈরি হয়। অবশ্য পাথর নিজেও এই গন্ধের উৎস নয়, পাথর এখানে গন্ধের বাহক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এই গন্ধের পেছনে দায়ী যৌগগুলো আসে প্রধানত বিভিন্ন গাছপালা থেকে। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ায় বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি হয় না, তখন কিছু উদ্ভিদ উদ্বায়ী ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ তেল মাটিতে নিঃসরণ করে। এই ফ্যাটি এসিডগুলোর কয়েকটি আমাদের বেশ পরিচিত। এদের কোনো কোনোটি যেমন পামিটিক বা স্টিয়ারিক এসিড আমাদের খাবারে পাওয়া যায়।

অবশ্য, এই তেলের সব উপাদান এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ এর দশকে বিজ্ঞানী ন্যান্সি এন. জার্বার এই তেল থেকে ‘২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন’ পৃথক করেন। এই যৌগটির বেশ তীব্র ‘বৃষ্টির মতো’ গন্ধ আছে।

২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন

শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটিতে পানির পরিমাণ যখন খুব কমে যায়, তখন কিছু গাছপালা টিকে থাকার জন্য এই তেল নিঃসরণ করে। সময়ের সাথে সাথে মাটি এবং পাথরে তেল জমতে থাকে। এমন অবস্থায় বৃষ্টি হলে সেগুলো মাটি থেকে বাতাসে ব্যাপিত হয়ে ভেঙে সুগন্ধি উদ্বায়ী যৌগ তৈরি করে। ফলে আমরা সেই সজীব, উদ্ভিজ্জ আর সবমিলিয়ে সুন্দর গন্ধটি পাই।

জিওস্মিন

কিন্ত এই সুগন্ধি উদ্ভিজ্জাত তেল অবশ্য বৃষ্টির গন্ধের একমাত্র উপাদান নয়। পেট্রিকোরের আরেকটি বড় উপাদান হচ্ছে জিওস্মিন (geosmin) নামের একটি যৌগ। গ্রীক ভাষায় জিওস্মিন শব্দের অর্থ ‘পৃথিবীর গন্ধ’। মাটিতে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া (যেমন একটিনোব্যাকটেরিয়া) এই যৌগটি উৎপাদন করে আর এই যৌগটিই মাটির নিজস্ব গন্ধের জন্য দায়ী। মানুষের নাক এই যৌগের গন্ধে খুবই সংবেদনশীল, বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি ট্রিলিয়নে ৫ ভাগ, অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে মাত্র ৫ ন্যানোগ্রাম (৫ × ১০-৯ গ্রাম) থাকলেই মানুষের নাক তা শনাক্ত করতে পারে।

রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে জিওস্মিন যৌগটি আসলে একধরনের অ্যালকোহল। এতে –OH গ্রুপ উপস্থিত আছে। জিওস্মিন আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্ত ওয়াইনে এই যৌগের উপস্থিতি ওয়াইনের স্বাদে কিছুটা ‘স্যাঁতসেঁতে’ ভাব এনে দেয় যা তার গুনাগুণ বা গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। একইভাবে, পানিতে এই যৌগ উপস্থিত থাকলে পানির স্বাদ ‘কর্দমাক্ত’ হয়ে যায়, যা ঐ পানির পানযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

মাটিতে উপস্থিত কিছু ব্যাকটেরিয়া মারা গেলে বা সুপ্তাবস্থায় যাবার সময় মাটিতে জিওস্মিন নিঃসরণ করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে খরা চললে এই নিঃসরণের হার আরো বেড়ে যায়। এরপর যখন বৃষ্টি হয় তখন এই যৌগটি মাটি থেকে নির্গত হয়ে মিহি কুয়াশার মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

চিত্রঃ বৃষ্টির মন মাতানো গন্ধ আসলে মাটির গন্ধ।

যেহেতু দীর্ঘদিন খরা চললে মাটিতে এসব যৌগের ঘনত্ব বেড়ে যেতে থাকে, তাই অনেকদিন পর বৃষ্টি হলে এর গন্ধও তীব্র হয়। বৃষ্টির গন্ধের আরো একটি উৎস বাকি আছে, যার গন্ধ আমরা এমনকি বৃষ্টি শুরু হবার আগে থেকেই পাওয়া শুরু করি। এটি হচ্ছে ওজোন গ্যাস। এর গন্ধ এতোই আলাদা যে এর নাম থেকেই তা অনুমান করা যাবে। এর নাম এসেছে গ্রীক শব্দ Ozein থেকে, যার অর্থ To smell।

বাতাসে বিদ্যুৎক্ষরণ ঘটালে ঝাঁঝালো গন্ধের এই ওজোন গ্যাস তৈরি হয়

3O2 (g) → 2O3 (g)

উল্লেখ্য, জিওস্মিনের মতো মানুষের নাক ওজোনের গন্ধের প্রতিও খুবই সংবেদনশী। বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি বিলিয়নে মাত্র ১০ ভাগ হলেই অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে ওজোন গ্যাসের পরিমাণ মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম থাকলেই আমরা যৌগটির গন্ধ শনাক্ত করতে পারি।

বজ্র-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসের অণুকে ভেঙে ফেলে। কিছু পরিমাণ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন একত্রে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড পরে বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে ওজোন গ্যাস উৎপন্ন করে।এই গ্যাস পরে নিম্নমুখী বাতাসে ভেসে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। আর আমরা এর গন্ধ পেয়ে বৃষ্টি হবার আগেই বুঝতে পারি যে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি হবে।

মানুষের গন্ধের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। এর অনেক গন্ধই আমাদের স্মৃতিতে জমা হয়ে যায়। যেমন আপনার মায়ের গায়ের ঘ্রাণ, আপনার প্রথম পোষা প্রাণীটির ঘ্রাণ, অথবা বৃষ্টির এই গন্ধ (পেট্রিকোর) ইত্যাদি।

চিত্রঃ মানুষের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেট্রিকোর পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে আমাদের শুধু আনমনাই করে না, এটি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রেও ভূমিকা রাখে। যেমন, কোনো কোনো জীববিজ্ঞানী ধারণা করেন, জলপথে পেট্রিকোর ছড়িয়ে পড়লে তা মিঠাপানির মাছদের ডিম পাড়ার সংকেত দেয়। যেমন আমরা জানি প্রতিবছর হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস ও কার্প জাতীয় মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে।

জো হবার জন্য অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হবার সাথে সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে হয়। অর্থাৎ হালদা নদীতে মাছের ডিম পাড়ার সময় বৃষ্টির গন্ধের ভূমিকা থাকতে পারে, যা ঐ জীববিজ্ঞানীদের সন্দেহকেই সমর্থন করে। আবার ইংল্যান্ডের জন ইনস সেন্টারের অণুজীববিজ্ঞানী কিথ চেটার প্রস্তাব করেন, জিওস্মিনের গন্ধ হয়তো মরুভূমিতে উটকে মরূদ্যান খুঁজে পেতে সংকেতের মতো কাজ করে।

সেই হিসেবে বৃষ্টির এই গন্ধ কি মানুষের জীবনযাত্রাতেও এভাবে প্রভাব রাখে? অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ডানা ইয়াং অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির আদিবাসীদের উপরে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান এই সম্প্রদায়ের কাছে শীতকাল আর গ্রীষ্মকালের প্রথম বৃষ্টির গুরুত্ব অনেক। এই বৃষ্টির ফলে ক্যাঙ্গারু আর ইমু প্রাণীদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং মরুভূমিতে গাছপালা জন্মে সবুজ ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি হয়। ইয়াং বলেন, এই জনগোষ্ঠীর কাছে বৃষ্টির গন্ধ তাই ‘সবুজ রঙ’য়ের সাথে সম্পর্কিত।

এখানের আলোচনার সারকথা হলো উদ্ভিজ্জাত তেল, ব্যাকটেরিয়া ও ওজোন গ্যাসের সমন্বয়ে পেট্রিকোর গঠিত। কিন্ত পেট্রিকোরের গন্ধ মাটি থেকে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায় কেমন করে?

২০১৫ সালে এম.আই.টি’র বিজ্ঞানীরা হাই স্পিড ক্যামেরা (প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ বা ১০০০ এর উপরে ফ্রেম ধারণ করতে পারে) ব্যবহার করে বাতাসে সুগন্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা চালান। এই গবেষণায় প্রায় ২৮ টি ভিন্ন ভিন্ন পৃষ্ঠতল, ১২ টি কৃত্রিম পৃষ্ঠতল এবং ১৬ টি মাটির নমুনার উপরে ৬০০ টি পরীক্ষা চালানো হয়।

আবার বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টির জন্য সুগন্ধের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। বৃষ্টির পানি যত উপর থেকে ফেলা হয় মাটিতে পড়ার আগে তার গতি তত বেশি হয়। এতে দেখা যায়, যখন বৃষ্টির ফোঁটা কোনো সচ্ছিদ্র পৃষ্ঠতলের (যেমন মাটি) উপরে এসে পড়ে, তখন ছিদ্রের বাতাসের সাথে মিশে বুদবুদ তৈরি হয়। বুদবুদে করে সুগন্ধের পাশাপাশি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এরোসল আকারে বাতাসে নিঃসৃত হয়। এ পরীক্ষায় আরো দেখা যায়, বৃষ্টির ফোঁটার গতি কম হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এরোসলের পরিমাণ বেড়ে যায় কারণ গতি বেশি হলে বুদবুদ তৈরি হবার সময় হয় না। এ কারণেই হাল্কা বৃষ্টির পরে পেট্রিকোরের তীব্রতা বেশি থাকে।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার জন্য বৃষ্টির উপরে নির্ভর করতে হতো, যার কারণে আমাদের কাছে বৃষ্টির গন্ধ এতো ভাল লাগে।

বিজ্ঞানীরা এখনো কৃত্রিমভাবে পেট্রিকোর তৈরির উপায় বের করতে পারেননি। কারণ এর রাসয়নিক গঠন এত জটিল আর এর কিছু উপাদান এত অল্প পরিমাণে থাকে যে আমাদের নাক তা শনাক্ত করতে পারলেও কোনো মেশিন তা আলাদা করতে পারে না। তাই এই মিষ্টি সুবাস বোতলজাত অবস্থায় বাজারে থরে থরে সাজানো অবস্থায় দেখা যায় না। বাজারে সজ্জিত দেখতে হলে আরো বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এর পর থেকে যখন বৃষ্টি উপভোগ করবেন, তখন আপনাকে আনমনা করে দেওয়া ঐ বৃষ্টির গন্ধের জন্য এর পেছনের রসায়নকেও একটা ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না।

তথ্যসূত্র

  1. https://youtube.com/watch?v=PDrElHWBT6A
  2. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  3. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  4. Section 21.5 Oxygen and Sulfur, Subsection: Ozone (Page 916) Chemistry (Ninth Edition) Raymond Chang
  5. https://youtube.com/watch?v=K8_05IpT7cA
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Petrichor
  7. https://youtube.com/watch?v=DyFm-UQ5-ag
  8. http://climatecentral.org/news/thunderstorms-ozone-atmosphere-18600
  9. http://huffingtonpost.com/2012/07/19/rain-smells-approaching-storm_n_html
  10. http://smithsonianmag.com/science-nature/what-makes-rain-smell-so-good-13806085/
  11. http://todayifoundout.com/index.php/2014/05/causes-smell-rain/

ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

ট্রাইএঙ্গুলিনঃ পদার্থবিজ্ঞান যেখানে রসায়নকে হারিয়ে দিল

প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রধান দুটি শাখা রসায়ন আর পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ– বিজ্ঞানীদের মধ্যেকার এই দ্বৈরথটি বেশ পুরনো। এই খবরটি পড়ার পর তাই পদার্থবিজ্ঞানের কোনো ছাত্রের একটু আনন্দ লাগতেই পারে যে- একদল পদার্থবিজ্ঞানী পুরো রসায়নবিজ্ঞানকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। এই কথাটি কি বেশি বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে? আচ্ছা একটু অন্যভাবে বলি- এই পদার্থবিদেরা আসলে রসায়নের গবেষকদেরকে তাদের নিজেদের শক্তির জায়গাতেই হারিয়ে দিয়েছেন।

আইবিএম-এর একদল পদার্থবিদ ট্রাইএঙ্গুলিন (Triangulene) নামের একটি নতুন ধরনের অণু সংশ্লেষণে সক্ষম হয়েছেন। রসায়নের বহু গবেষক দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করার চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। পদার্থবিদরা সাধারণত রাসয়নিক যৌগ সংশ্লেষণ করে না। এটা রসায়নবিদদের কাজ। এখানে তার উলটোটাই ঘটেছে। এই বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছে, যেখানে রসায়নের অন্য সকল পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে, ভৌত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সেখানে কোনো কোনো অণু তৈরি করা সম্ভব।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন বা আইবিএম একটি আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্ক ভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটির ১৭০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম রয়েছে। গবেষণাক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটির অবদান ব্যাপক। গত ২৪ বছর ধরে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্যাটেন্ট করানোর রেকর্ড আইবিএম-এর দখলে।

আমাদের পরিচিত অটোম্যাটেড টেলার মেশিন বা এটিএম, ফ্লপি ডিস্ক বা হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ এই আইবিএমের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীদের হাতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল।

চিত্রঃ বামে একটি প্রায় কাল্পনিক অণু ট্রাইএঙ্গুলিন অণুর গাঠনিক সংকেত ডানে অণুটির ত্রিমাত্রিক চিত্র।

নাম থেকেই যা বোঝা যাচ্ছে এই অণুটি ত্রিভুজাকৃতির। উল্লেখ্য, প্রকৃতিতে এঙ্গেল স্ট্রেইন তথা কৌণিক পীড়নের কারণে ত্রিভুজাকৃতির অণু সাধারণত দেখা যায় না। অণুগুলো বেশ অস্থিতিশীল হয়। রাসায়নিকভাবে এরা বেশ সক্রিয় এবং বিভিন্ন পরিবেশে এগুলি সহজেই ভেঙ্গে অন্য অণুতে পরিণত হয়ে যায়।

বিজ্ঞানের নিয়মই হচ্ছে যেকোনো বস্তু সর্বনিম্ন শক্তি ধারণ করে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে চায়। যেহেতু, ত্রিভুজাকৃতির অণুতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে, তাই প্রকৃতিতে ত্রিভুজাকৃতির অণু বেশ দুর্লভ।

বেশ কয়েক বছর ধরে রসায়নের বিভিন্ন গবেষণাতে ক্ষুদ্র ষষ্ঠতলকীয় গঠন থেকে তত্ত্বীয়ভাবে ত্রিভুজাকার ট্রাইএঙ্গুলিনের স্তর তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ হয়ে আসছে। তবে আসলেও প্রচলিত রাসয়নিক পদ্ধতিগুলোতে এই অণুটির স্থিতিশীল কোনো অবস্থা তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। এরকম অবস্থায় দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটল আইবিএমের বিজ্ঞানীদের। তারা প্রথমে ইংল্যান্ডের রসায়নবিদদের কাছ থেকে ট্রাইএঙ্গুলিনের একটি জাতক ধার নেন গবেষণার জন্য।

তারা এই যৌগটিকে তামা আর কিছু অন্তরক পাতের উপরে রেখে একটি এটমিক ইমেজিং ডিভাইস (পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্র)-এ সোনা আর কার্বন মনো-অক্সাইড দিয়ে তৈরি প্রোব দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। এই একই যন্ত্র দিয়ে পূর্বে অলিম্পিসিনের মতো অদ্ভুত যৌগের অণুর ছবি তোলা হয়েছিল। যদিও এভাবে তোলা ছবি সাধারণত ঝাপসা হয়, তবু এই ছবিতে প্রতিটি পারমাণবিক বন্ধন আলাদা করে শনাক্ত করা যায়।

পরবর্তী ছবিতে দেখা যাচ্ছে অলিম্পিসিন অণুর দ্বিমাত্রিক চিত্র। পাশে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তোলা অলিম্পিসিন অণুর ছবি। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের মার্চ মাসে এন্টোনি উইলিয়ামস এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাহাম রিচার্ডস ২০১২ সালের আসন্ন লন্ডন অলিম্পিকস গেম উদযাপনের অংশ হিসেবে এরকম অণুর অস্তিত্বের ধারণা করেন।

পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অনীশ মিস্ত্রি আর ডেভিড ফক্স সত্যি সত্যি এমন যৌগের সংশ্লেষণে সক্ষম হন। মজার কথা হলো, শেষোক্ত দুই গবেষক ট্রাইএঙ্গুলিন সংশ্লেষণের গবেষণাতেও ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল নেতৃত্ব দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এই যন্ত্রটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ ও এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। একে সংক্ষেপে STM/AFM বলা হয়। লেখায় সামনে এগোনোর আগে আসুন এই যন্ত্রগুলি আসলে কীভাবে কাজ করে তা একটু দেখি।

আমরা জানি, ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ গবেষণা কাজে ব্যবহৃত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। এতে ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্মকে কাজে লাগানো হয়। সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে যে আলো ব্যবহার করা হচ্ছে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অর্ধেকের চেয়ে বেশি ছোট কোনো বস্তু সেই যন্ত্র দিয়ে দেখা যায় না। যেহেতু তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালীর ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য অঞ্চল থেকে দৃশ্যমান আলো শুরু হয়, তাই আমরা ২ × ১০-৭ মিটারের চেয়ে ছোট দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তু এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে পাই না।

তত্ত্বীয়ভাবে যদিও আমাদের এক্স রে ব্যবহার করে পারমাণবিক স্কেলে বস্তু দেখতে পারার কথা। কিন্ত এক্সরেকে কোনো বিন্দুর উপরে ফোকাস করা যায় না। তাই এভাবে ছবি তোলা গেলেও ভালভাবে তা বোঝা যায় না।

চিত্র: একটি সাধারণ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ

ইলেকট্রন হচ্ছে চার্জিত কণা। এগুলোকে তড়িৎ ক্ষেত্র বা চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করে ফোকাসও করা যায়। কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা নীতি অনুযায়ী, কোনো ইলেকট্রনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য তার বেগের ব্যস্তানুপাতিক। তাই যদি কোনো ব্যবস্থায় ইলেকট্রনের বেগ অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে ০.০৪ ন্যানোমিটার বা তার চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ইলেকট্রন তরঙ্গ পাওয়া যাবে। ফলে এই তরঙ্গ ব্যবহার করে অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাজ করলে তা দিয়ে অনেক বেশি ছোট বস্তু যেমন অণু পরমাণুর ছবি তোলা যাবে।

আরেক ধরনের ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র হচ্ছে এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ। এখানে ইলেকট্রনের আরেকটি কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে কোনো তলের উপরে পরমাণুর ছবি তোলা হয়। ইলেকট্রন কোনো বাধার উপর দিয়ে অতিক্রম না করে ভিতর দিয়ে গর্ত খুড়ে বা টানেল তৈরি করে শক্তির বাধা পার করতে পারে। একে বলে কোয়ান্টাম টানেলিং।

সামনে একটি দেয়াল আছে, আপনি পার হতে চাইলে তা উপর দিয়ে টপকিয়ে পার হওয়ার কথাই ভাববেন। কিন্ত ক্ষুদ্র কণাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের সামনে কোনো শক্তির বাধা পড়লে তা না টপকিয়ে ভেতর দিয়ে অপর পাশে চলে যেতে পারে। কণাদের অদ্ভুত এই বৈশিষ্ট্যকেই কোয়ান্টাম টানেলিং বলে।

স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপে টাংস্টেন দিয়ে তৈরি একটি সূচের মতো অংশ থাকে। এর অগ্রভাগ খুবই সূক্ষ্ম। এই অগ্রভাগ থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। পরীক্ষার সময় নমুনা তল থেকে সূচের মতো অংশটিকে কয়েক পারমাণবিক ব্যাসার্ধ দূরে রেখে তলের উপর দিয়ে সূচটিকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে সৃষ্ট টানেলিং কারেন্ট মাপা হয়।

তল থেকে দূরত্ব বাড়লে কারেন্ট কমে যায়, তাই সূচটিকে চালানোর সময় তল থেকে এর দূরত্ব সবসময় নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আর এই ব্যবস্থা বজায় রাখতে যে পরিবর্তন করতে হয় তা থেকে নমুনা তলের একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র পাওয়া যায়।

চিত্র: একটি স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ।

উল্লেখ্য, এই স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের জন্য ১৯৮৬ সালে জার্মান পদার্থবিদ Gerd Binnig এবং সুইস পদার্থবিদ Heinrich Rohrer পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

অন্যদিকে এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের স্ক্যানিং অণুবীক্ষণ যন্ত্র। এতে স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপের মতোই একটি সূচাল অগ্রভাগ থাকে। এই অগ্রভাগ একটি তলের উপর দিয়ে চালিয়ে নেয়া হয় এবং একটি লেজার রশ্মি দিয়ে তলের উপর চলার সময়ে অগ্রভাগটিকে কত উঁচু নিচু পথ অতিক্রম করতে হয়েছে তা পরিমাপ করে ঐ তলের একটি ছবি তৈরি করা হয়।

এভাবে সৃষ্ট ছবির রেজ্যুলেশন এক ন্যানোমিটারের ভগ্নাংশ পর্যন্ত যায়। অর্থাৎ এই যন্ত্র দিয়ে তলের প্রকৃতি একদম পারমাণবিক স্কেলে পরিমাপ করা সম্ভব। বর্তমানে অবশ্য তলের উপর দিয়ে অগ্রভাগ চালিয়ে নেওয়ার বদলে সূচাল অগ্রভাগ উঁচু নিচু করে তা দিয়ে তলের উপরে টোকা (Tap) দেওয়া হয়। এভাবে তলের আরও সঠিক ছবি পাওয়া যায়।

এই যন্ত্রে তলের উপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে অগ্রভাগে কতটুকু বল প্রযুক্ত হলো তাও মাপা যায়। এ কারণে এর নাম পারমাণবিক বল অণুবীক্ষণ যন্ত্র (এটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ) রাখা হয়েছে। এই দুই ধরনের মাইক্রোস্কোপের সমন্বয়েই আমাদের আলোচ্য বিজ্ঞানীদের পারমাণবিক চিত্রধারক যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল।

এই যন্ত্রটি পরিবর্তনশীল ভোল্টেজ ব্যবহার করে অণুটির ইলেকট্রনগুলির সাথে সরাসরি মিথস্ক্রিয়াতে অংশ নেয়। এর সাহায্যে গবেষকরা ট্রাইএঙ্গুলিনের জাতক অণুর জটিল আণবিক গঠন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ছবি তোলার পরপরই এই বিজ্ঞানীদের মাথায় ধারণা আসে যে এই একই মিথস্ক্রিয়ার সাহায্যে হয়তো অণুটির রাসায়নিক গঠনেও পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা তখন আগের পদ্ধতিতেই অণুটির বিভিন্ন স্থানে অতি-সূক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের বিদ্যুৎ চালনা করে ট্রাইএঙ্গুলিনের এই জাতক অণু থেকে অতিরিক্ত দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। সরিয়ে নেবার ফলে তৈরি হয় সেই বহুল আরাধ্য ট্রাইএঙ্গুলিন অণু।

এই অণুটি এরপর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (নিম্ন চাপ ও তাপমাত্রায়) চারদিন টিকে ছিল। এরপর তা এর চেয়ে স্থিতিশীল অন্য অণুতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সময়টা কম নয়। এর অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট সময়। বলা যায় প্রয়োজনীয় সময়ের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ছিল এটি।

জুরিখে আইবিএমের গবেষক দলের প্রধান লিউ গ্রোস নেচার পত্রিকাকে এক সাক্ষাৎকারে এ আবিষ্কারের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন যে ট্রাইএঙ্গুলিনই প্রথম অণু যেটি তারা (পদার্থবিদরা) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যেখানে অন্যান্য রসায়নবিদরা তৈরির বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

১৯৫৩ সালে চেক রসায়নবিদ এরিক ক্লার ট্রাইএঙ্গুলিনের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। উল্লেখের পর থেকেই এটিকে রহস্যময় যৌগ হিসেবে ধরা হতো- এটি সংশ্লেষণের জন্য বহু চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত বিফল হয়েছে।

অবশেষে এই ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনীশ মিস্ত্রি ও ডেভিড ফক্সদের গবেষণা দল ও আইবিএম-এর গবেষণা দলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যৌগটি তৈরি করা সম্ভবপর হলো। নেচার ন্যানোটেকনোলজি পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ইস্যুতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.iflscience.com/physics/physicists-forge-impossible-molecule-chemists-failed-make/
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/IBM Section 12.7 Baeyer Strain Theory (Page 442), Chapter 12 Alicyclic Hydrocarbons, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene.svg
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene#/media/File:Olympicene_AFM.jpg
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Olympicene
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Triangulene https://en.wikipedia.org/wiki/Toluene#/media/File:Toluol.svg https://en.wikipedia.org/wiki/Benzene https://en.wikipedia.org/wiki/Erich_Clar
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Scanning_tunneling_microscope
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Atomic-force_microscopy
  9. https://en.wikipedia.org/wiki/Radical_(chemistry)
  10. Section 13.2 Structure of benzene (Page 478), Chapter 12 Aromaticity Benzene, Organic Chemistry Fifth Edition, Robert Thornton Morrison, Robert Neilson Boyd

কীভাবে এলো পেট্রোলিয়াম জেলী?

১৮৫৯ সালের কথা। তরুণ রসায়নবিদ রবার্ট চিসব্রগ গিয়েছেন পেনিসিলভানিয়ার ছোট শহর টিটাসভ্যলী ভ্রমণে। সেখানে সেসময় তেলের খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা নিজেদের পুড়ে যাওয়া চামড়া আর ক্ষত স্থান সারাতে রড ওয়াক্স নামে এক ধরনের জেল ব্যবহার করতো। সেটা ছিল তেলের খনিতে খনন কাজের একটা উপজাত। এটি মূলত পেট্রোলিয়ামের অবিশুদ্ধ রূপ।

image source: biocoshop.eu

রড ওয়াক্সের ক্ষত সারানোর এই ধর্মের উপর কৌতূহলী হয়ে তরুণ রসায়নবিদ রবার্ট চিসব্রগ এর উপর গবেষণা করেন। অতঃপর বেশ কিছু পরিশোধন ও বিশুদ্ধকরণের পর তিনি বেশ হালকা এবং স্বচ্ছ একধরনের জেলী বের করতে সক্ষম হন। যা আজকে পেট্রোলিয়াম জেলী হিসেবে আমরা চিনি। রবার্ট চিজব্রগ ১৮৬৫ সালে এটি নিজের নামে পেটেন্ট করান।

featured image: srbija24.com

কিছু রাসায়নিক ত্বকে লাগলে দাগ পড়ে কেন?

“আপনাদের আমি আগেই বলেছি, আমাকেও যে ভয় দেখানো হবে, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম এবং মনে মনে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। … রাতের বেলা যতবার বাথরুমে যেতাম ততবারই বাথরুমের বাইরের নবে কয়েক ফোঁটা সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ দিয়ে রাখতাম। …যে ভয় দেখাতে আসছে, সে কোনো কিছু না ভেবেই নবে হাত দিবে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে দাগ পড়ে যাবে। সিলভার নাইট্রেটের দাগ কঠিন দাগ। সপ্তাহখানেক থাকবেই।” -মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য, হুমায়ুন আহমেদ

সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ হাতে পড়লে কালো দাগ হয়ে যায়। হাতের তালুতে এক চামচ চিনি নিয়ে নাড়াচাড়া করলে কোনো দাগ পড়ে না। কিছু কেমিক্যাল হাতে পড়লে দাগ পড়ে যাচ্ছে, আবার কিছু হাতে নিয়ে বসে থাকলেও কিছু হচ্ছে না। কেন এমন হচ্ছে?

 

সাধারণভাবে, কোনো রঙিন বস্তু ধরলে সেই রঙ হাত লেগে যেতে পারে। যেমন, মাঠের ঘাসের উপর শুয়ে থাকলে কাপড়ে সবুজ দাগ হয়ে যায়। ঘাসের ক্লোরোফিল আসঞ্জন বলের মাধ্যমে আপনার কাপড়ে লেগে যাচ্ছে, তাই কাপড়েও সবুজ দাগ পড়ছে। একই প্রক্রিয়ায় সদ্য রঙ করা দেয়ালে হাত দিলে হাতে রঙ লেগে যায়।

সব রঙিন বস্তুর ক্ষেত্রেই আবার এমনটি ঘটে না। একটি বাটিতে ডিম ভেঙ্গে রেখে তার মধ্যে হাত দিয়ে রাখলে যতটুকু ডিমের কুসুম হাতে লাগবে, এতে হাত হলুদ হয় না। কারণ যে যে অণুর (Lutein, Zeaxanthin) কারণে ডিমের কুসুম হলুদ দেখায়, তা আপেক্ষিকভাবে অন্যান্য অণুর তুলনায় অনেক বড় বলে ত্বকে লেগে থাকে না।

কিন্তু অণু যদি অনেক ছোট হয়, সেক্ষেত্রে ছোট অণু ত্বকের ছিদ্রে আটকে যেতে পারে। এমনকি ত্বকের সাথে রাসায়নিক বন্ধনও করে ফেলতে পারে। তখন শুধু অনেক পানি দিয়ে ধুলেই হবে না, ত্বকের যে স্তরে ওই রঞ্জক পদার্থ লেগে আছে, ঘষে তুলে ফেলতে হবে।

কিছু কিছু রাসায়নিক পদার্থ আছে, যারা ত্বকের সাথে বিক্রিয়া করে রঙ পরিবর্তন করে। যেমন আমরা শুরুতেই দেখলাম, সিলভার নাইট্রেট ত্বকে কাল দাগ ফেলে। একইভাবে হাতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণ পড়লে হাত বাদামি হয়ে যায়, নাইট্রিক এসিড পড়লে পুড়ে তো যায়ই, পাশাপাশি হলুদ দাগও পড়ে। আর সালফিউরিক এসিডে ত্বক পুড়ে যাবে এবং ত্বকের গঠন ভেঙ্গে পানি বেরিয়ে যাবে, পড়ে থাকবে মৌলিক কালো কার্বন। ফলে পুড়ে যাওয়া ছাড়াও ত্বকে খয়েরি, মরিচা রঙের অথবা কালচে বাদামী রঙের দাগ পড়ে। এসব পদার্থের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? সিলভার নাইট্রেট ত্বকের উপরের স্তরের লবনের সাথে বিক্রিয়া করে সিলভার ক্লোরাইডে পরিণত হয়, যা আলোতে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রুপার কণায় পরিণত হয়। এই রুপার কণা ত্বকের গর্তে আটকে যায়, ফলে কালো দেখায়। এই দাগ সহজে যায় না, এমনকি প্রচুর পানি দিয়ে ধুলেও না।

চিত্রঃ হাতে সিলভার নাইট্রেট দ্রবণের কাল দাগ

আমাদের ত্বকের উপরের স্তর ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, পুরাতন কোষ মরে ঝরে পড়ছে, নতুন স্তর তার জায়গায় আসছে। সিলভারের দাগ তাই কয়েকদিন পর আপনাআপনি পুরাতন কোষের ঝরে পড়ার সাথে সাথে চলে যাবে।

পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কাপড়, কাগজ আর ত্বকে গাঢ় বাদামী দাগ ফেলে। এই দাগ ঘষে তুলে ফেলা যায় না। যতদিন না ত্বকের উপরের স্তর ঝরে পড়ছে এটি ততদিন পর্যন্ত থাকবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে কী ঘটছে? পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নিজে গাঢ় বেগুনী বর্ণের কঠিন পদার্থ। এই কেমিক্যাল হাতে বা কাপড়ে পড়লে বিয়োজিত হয়ে বাদামী দানাদার ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড (MnO2) উৎপন্ন করে।

4MnO4 (aq) + 4H+ (aq) = 3O2 (g) + 2H2O (l) + 4MnO2 (s)

এই MnO2 এর ক্ষুদ্র ক্রিস্টাল ত্বকের ছিদ্রে আটকে যায়। ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড পানিতে অদ্রবণীয়, তাই পানি দিয়ে ধোয়ার চেষ্টা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। তবে এই বাদামী দাগ যদি কাপড়ের উপরে হয়, তাহলে লঘু হাইড্রোক্লোরিক এসিড প্রয়োগ করলে ম্যাঙ্গানিজের বর্ণহীন দ্রবণীয় লবন উৎপন্ন হবে, তখন দাগ চলে যাবে।

চিত্রঃ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের বাদামী দাগ

MnO2 (s) + 4 HCl (aq) = MnCl2 (aq) + Cl2 (g) + 2 H2O (l)

খনিজ এসিড, যেমন সালফিউরিক এসিড আর নাইট্রিক এসিড, হাতে পড়লে কেন রঙিন দাগ পড়ে? এই দুই এসিড হাতে পড়লে আসলে কী হয়? অবশ্যই পুড়ে যায়। কিন্ত কেন পুড়ে যাচ্ছে? প্রথমত এই দুই এসিড হলো ক্ষয়কারী পদার্থ এবং এরা জীবন্ত টিস্যুর (ত্বক, মাংস, কর্নিয়া) উপরে পড়লে বিক্রিয়া করে পুড়িয়ে ফেলে। এদের বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্যর মূলে আছে অম্ল-ক্ষারক বিক্রিয়া। অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিস এবং এস্টার হাইড্রোলাইসিস। প্রোটিন অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে হাইড্রোলাইজড হয়ে ভেঙ্গে যায়, যেখানে লিপিড (চর্বি) এস্টার হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। এভাবে প্রোটিন এবং ফ্যাট তথা টিস্যু বিনষ্ট হয়। এছাড়া এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় যার ফলে টিস্যু গলে ও পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একে বলে কেমিক্যাল বার্ন।

ঘন সালফিউরিক এসিড ক্ষয়কারী পদার্থ হবার পাশাপাশি শক্তিশালী নিরুদকও। ত্বকে পড়লে প্রথমত অম্লীয় হাইড্রোলাইসিস এর মাধ্যমে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর ত্বকের কোষ থেকে পানি টেনে বের করে আনে, ফলে কোষ পানিশূন্য হয়ে যায়। উল্লেখ্য ত্বকের কোষের ৯০ ভাগই পানি। এই নিরুদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে ত্বকে সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন হয়।

সালফিউরিক এসিড এত শক্তিশালী নিরুদক যে এটি প্রায় সকল জৈব যৌগ থেকেই পানি বের করে আনে। একটি বিকারে চিনি নিয়ে তার মধ্যে ঘন সালফিউরিক এসিড নিয়ে এটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। চিনিকে রাসায়নিকভাবে বলা হয় সুক্রোজ, যা মূলত কার্বন, অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন দিয়ে গঠিত (সংকেত C12H22O11)। সালফিউরিক এসিড চিনির সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে চিনির অণু থেকে পানি আলাদা করে ফেলে, ফলে কাল কার্বন উৎপন্ন হয়।

C12H22O11 + H2SO4 → 12 C + 11 H2O + পানি এবং এসিডের মিশ্রণ

বাতাসের উপস্থিতিতে এই বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড, জলীয় বাষ্প এবং সালফার ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়।১০ এই বিক্রিয়ায় এত কার্বন উৎপন্ন হয় যে তা বিকার থেকে উপচিয়ে পড়ে। নিচের ইউটিউবের ভিডিও লিঙ্কটিতে গিয়ে এই বিক্রিয়াটা দেখে নিতে পারেন। youtube.com/watch?v=zg9wmU7Z-6s. সালফিউরিক এসিড একই প্রক্রিয়ায় কাগজ আর কাঠ থেকে, এবং হাতে পড়লে আপনার ত্বক থেকে পানি বের করে আনবে।

নাইট্রিক এসিড একটি ক্ষয়কারক এসিড এবং শক্তিশালী জারক১১। এই এসিড অম্লীয় হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যু ধ্বংস করে, পাশাপাশি ত্বকে গাঢ় হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে। এই হলুদ দাগ Xanthoproteic বিক্রিয়া3 – ত্বকের কেরাটিন প্রোটিনের ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের কারণে হয়। অ্যারোমেটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিনে ফিনাইল গ্রুপ আছে। এই হলুদ দাগ (ফিনাইল নাইট্রেট) ক্ষারের উপস্থিতিতে কমলা হয়ে যায়।

চিত্রঃ হাতের তর্জনীর উপরে নাইট্রিক এসিড পড়ায় সেকেন্ডারি বার্ন ঘটেছে। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আশেপাশের চামড়া হলুদ হয়ে গিয়েছে

ত্বকের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ পড়লে ত্বক সাময়িকভাবে সাদা হয়ে যায়১২। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড একটি শক্তিশালী জারক। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ ত্বকে পড়লে Capillary embolism ঘটে, অর্থাৎ ঐ স্থানের কৈশিক- নালীতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের বিয়োজনের ফলে উৎপন্ন হওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্সিজেনের বুদবুদ প্রবেশ করায় সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে ত্বক সাদা দেখায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পর ত্বক আবার নিজে নিজেই স্বাভাবিক রঙ ফিরে পায়। অর্থাৎ এখানে পার অক্সাইড ত্বককে বিরঞ্জিত করে না, সাময়িকভাবে জারিত করে।

চিত্রঃ হাতের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ৩৫% জলীয় দ্রবণ পড়ায় আঙ্গুল সাদা হয়ে গিয়েছে

বোঝা গেল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ হাতে পড়লে দাগ পড়ে যেতে পারে, হাতের টিস্যু বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; ত্বক, টিস্যু ভেদ করে রক্তে মিশে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে, এমনকি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। তাই রান্নাঘর থেকে কেমিস্ট্রি ল্যাব, ভিনেগার থেকে নাইট্রিক এসিড, রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় অবশ্যই অতি সাবধানতা মেনে চলা উচিত।

টীকা

১. Adhesive force- ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের অণুর মধ্যেকার আকর্ষণ বলকে আসঞ্জন বল বলে। যেমন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে দাগ টানলে আসঞ্জন বলের কারণে চক বোর্ডে লেগে থাকে।

২.Chemical Burn- জীবন্ত টিস্যু ক্ষয়কারী পদার্থ যেমন শক্তিশালী অম্ল বা ক্ষারের সংস্পর্শে আসায় ঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপের ফলে পুড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে chemical burn বলে। Chemical Burn কেও সাধারণ Burn এর মতো ভাগ করা করা যায়। তবে সাধারণ Burn আর Chemical Burn এর কিছু পার্থক্য আছে। যেমনঃ ১. এর জন্য তাপের কোনো উৎস না থাকলেও চলে; ২. কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে ঘটতে পারে; ৩. সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে নাও বুঝা যেতে পারে যে ত্বক পুড়ে গিয়েছে; ৪. প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হয়; ৫. ত্বকের উপরিভাগের কোনো ক্ষতি না করে ত্বক ভেদ করে টিস্যুতে প্রবেশ করে টিস্যুর গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

চিত্রঃ Chemical burn (হাতের উপরে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ পড়ার ৪৪ ঘণ্টা পরে।)

৩. Xanthoproteic reaction

কোনো নমুনায় প্রোটিনের উপস্থিতি নির্ণয় করতে সাধারণত Xanthoproteic reaction করা হয়। এই বিক্রিয়ায় বিকারক হিসেবে গাঢ় নাইট্রিক এসিড ব্যবহৃত হয়। নাইট্রিক এসিড প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে হলুদ বর্ণের নাইট্রেটেড প্রোডাক্ট তৈরি করে। এই বিক্রিয়ায় পরীক্ষণীয় বস্তু বা দ্রবণে গাঢ় নাইট্রিক এসিড যোগ করে মিশ্রণটি উত্তপ্ত করা হয়। যদি মিশ্রণে প্রোটিন উপস্থিত থাকে, তবে মিশ্রণ হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এই মিশ্রণে এরপর শক্তিশালী ক্ষার, যেমন তরল অ্যামোনিয়া যোগ করা হলে মিশ্রণ হলুদ থেকে কমলা বর্ণের হয়ে যায়। অ্যারোমাটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিন এই বিক্রিয়া দেয়। ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের ফলে যে Xanthoproteic acid উৎপন্ন হয় তা হলুদ বর্ণের হওয়ার জন্যই এইধরনের রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। ত্বকের আবরণী কোষের উপরে নাইট্রিক এসিড পড়লেও একই প্রক্রিয়ায় হলুদ বর্ণের Xanthoprotein উৎপন্ন হয়, যে কারণে নাইট্রিক এসিড ত্বকে হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে।

চিত্রঃ Xanthoproteic reaction

তথ্যসূত্র

১. www.pdf-archive.com/2014/09/17/misir-alir-amimangsito-rahasya-allbdbooks-com/preview/page/63

২. Why do some chemicals stain your hands? http://questions.sci-toys.com/node/130

৩. Yolk, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/ wiki/Yolk

৪. https://books.google.com.bd/books?id=LRMlBQAAQBAJ

৫. Silver Chloride, From Wikipedia https://en.wikipedia.org/wiki/ Silver_Chloride

৬. How many skin cells do you shed every day? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/faq/permanganate-stains.shtml

৭. How does permanganate cause stains? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/fag/permanganate-stains.shtml

৮. Corrosive substances

From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Corrosive_substance

৯. Why does sulfuric acid melt people’s skin? https://answers.yahoo .com/question/index?qid=20080722005356AAPbpjg

১০. http://www.chemeddl.org/alfresco/service/org/chemeddl/ video.html?options=false&ID=vid:5892&guest=true

১১. Nitric acid, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Nitric_acid

১২. http://www.beautyclue.com/skin-whitening/can-hydrogen-peroxide-bleach-your-skin-lighten-dark-spots-acne-scars/

পর্যায় সারণীর চারটি নতুন মৌলের স্বীকৃতি

পর্যায় সারণীতে নতুন ৪ টি মৌল যুক্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংস্থা IUPAC যা পর্যায় সারণী সংক্রান্ত সবরকমের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে সেই ৪ টি মৌলের আবিষ্কারের সত্যতা যাচাই করার পরে এ সিদ্ধান্ত নিলেন। এর মাধ্যমে ২০১১ সালের পরে এই প্রথম পর্যায় সারণীতে মৌল অন্তর্ভুক্তির ঘটনা ঘটল। এর মাধ্যমে সারণীর ৭ম সারিটি সম্পূর্ণ হলো।

সকল মানবসৃষ্ট মৌলকে আপাতত পর্যায় সারণীতে স্থানদখলকারী সংখ্যার ভিত্তিতে নামকরণ করা হবে। ১১৩ নং মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া জাপানের হচ্ছে RIKEN ইনস্টিটিউটকে। মৌল ১১৫,১১৭, ১১৮ নম্বরের আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ ইন ডুবনা, রাশিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স রিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির একদল বিজ্ঞানীকে।

অত্যধিক ভারী মৌল আবিষ্কার কষ্টসাধ্য, কারণ এগুলো খুবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এই ভারী মৌল আবিষ্কার করতে গিয়ে দেখা গেছে এগুলো আগের মৌলগুলো থেকে একটু বেশিই স্থায়ী হয়েছে।

রাইকেন ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী কসুকে মরিতা ১১৩ তম মৌলের আবিষ্কারের সময় জানিয়েছিলেন,“তার দলটি এখন পর্যায় সারণির অজানা এলাকা ১১৯ তম মৌল ও তার চেয়েও ভারী মৌলের আবিষ্কারের জন্য চেষ্টা করবেন।” (বিবিসি)

হারিয়ে যাওয়া অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিপদার্থের খোঁজে

মহাবিশ্বে যা কিছু আছে, তা হোক কোনো ছায়াপথ বা, গ্রহ বা, হোক তা নক্ষত্র সবকিছুই এক অপরিহার্য উপাদান দিয়ে তৈরি। আর তা হচ্ছে বস্তু। ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে বিগ ব্যাংগ হওয়ার সাথে সাথে মহাবিশ্বে বস্তু (matter) এবং বস্তুর বিপরীত সত্ত্বা প্রতিবস্তু (antimatter) সমান ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বস্তু এবং প্রতিবস্তুর ধর্মই ছচ্ছে তারা একে অপরকে ধ্বংস করবে। তাই সে হিসাবে সদ্য নির্মিত তৎকালীন মহাবিশ্বে শুধু শক্তি ছাড়া আর কিছুই থাকার কথা না, কারণ বস্তু এবং প্রতিবস্তুর সংঘর্ষে শক্তি নির্গত হয়। কিন্তু এই ভারসাম্য মহাবিশ্ব তার প্রারম্ভিক দিকে ধরে রাখতে পারেনি এবং দুই স্বত্বার মধ্যে থেকে সে বস্তু কে বেছে নেয়।

কিন্তু কেনো এই পক্ষপাতিত্ব? তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীরা অতিপারমাণবিক কণা নিউট্রিনো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন। যদি নিউট্রিনো তার নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন যে মহাবিশ্ব কেনো বস্তুর পক্ষ বেছে নিয়েছিল তার উত্তর এখান থেকেই পাওয়া যাবে।

তাই বিজ্ঞানীরদের অক্লান্ত চেষ্টাটাও শুরু হয়ে গেছে এটা প্রমাণ করার জন্য। এ পর্যন্ত চারটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়ে গেছে কিন্তু তারা কোনো আশার আলো দেখতে পাননি। তবুও তারা দমে যাওয়ার পাত্র নন। ইতোমধ্যে তারা আরো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছেন। আর নতুন এই পরীক্ষার নামকরণ করা হয়েছে, KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

বস্তু এবং প্রতিবস্তুর উভয়ের রয়েছে একে অপরের বিপরীত ইলেক্ট্রিক বা, বৈদ্যুতিক চার্জ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইলেকট্রনের প্রতিবস্তু বা, প্রতিপদার্থ হচ্ছে পজিট্রন এবং প্রোটনের প্রতিবস্তু হচ্ছে অ্যান্টিপ্রোটন। কিন্তু এই নিয়ম খাটে না নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে, যার কোনো ইলেক্ট্রিক চার্জ নেই। নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানী জেসন ডেটউইলার বলেন, “নিউট্রিনো হচ্ছে একটি অদ্বিতীয় অতিপারমাণবিক কণা যার মতো অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না।”

যেভাবে কাজ করে  KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY

সাধারণ বেটা ডিকে ঘটার সময় (বামের চিত্র) একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয় এবং একটি ইলেক্ট্রন (নীল) এবং একটি অ্যান্টিনিউট্রিনো (লাল) ছেড়ে দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাবল বেটা ডিকে ঘটে থাকে বা, বেটা ডিকে একই সময়ে দুইবার ঘটে। কিন্তু যদি নিউট্রিনো নিজের প্রতিবস্তু হয় তাহলে বেটা ডিকের সময় উৎপন্ন হওয়া নিউট্রিনো দুটি নিজেদের কখনো কখনো ধ্বংসও করে ফেলবে, যার ফলে কোনো কোনো ডাবল বেটা ডিকেতে আমরা শুধু দেখবো নিউক্লিয়াস দুটি ইলেক্ট্রন ছেড়ে দিচ্ছে। কোনো অ্যান্টিনিউট্রিনো নেই।

যেভাবে কাজ করে KamLAND-Zen neutrino-less double beta decay ; image source: www.sciencenews.org

কিন্তু এই পরীক্ষা টি এত সহজ নয় কারণ এর জন্য অনেক দূষ্প্রাপ্য আইসোটপের প্রয়োজন হয়।

আগের পরীক্ষাগুলোতে KamLAND-Zen পানিতে নিমজ্জিত Xenon-136 আইসোটোপ এর ক্ষয় পর্যবেক্ষন করত। কিন্তু এখন KamLAND-Zen এ নতুন এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে যেখানে আগের চাইতে ২ গুন Xenon ব্যবহার করা হবে যার ফলে আরো দূর্লভ ক্ষয়ের সন্ধান হয়ত পাওয়া যাবে।

নতুন সন্ধানের খোঁজে

নতুন ধরণের আইসোটোপ, যা থাকবে পরিষ্কার, ধুলাবালি থেকে মুক্ত এমন কিছুই খুজছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তার জন্য আরও বৃহৎ গবেষণা হওয়া উচিত। “আমরা যেই আইসোটোপের ক্ষয় খুঁজছি তা খুবই, খুবই, খুবই, খুবই দূর্লভ”,বলেন ইটালির পাওডা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিকার্ডো ব্রাগনেরা। খুবই ছোট একটি ব্যাপারও এরকম পরীক্ষার ফলাফল বদলে দিতে পারে। KamLAND-Zen NEUTRINOLESS DOUBLE BETA DECAY এখন পর্যন্ত সফল না হলেও তার দেখাদেখি অনেক বিজ্ঞানীরাই আরো বড় পরিসরে এই পরীক্ষাগুলো নতুন করে চালাতে চাচ্ছেন। তার মধ্যে বড় একটি প্রজেক্ট হচ্ছে LEGENDএই নতুন প্রজেক্টে নতুন বিজ্ঞানীরা ছাড়াও আগের প্রজেক্টেরও বেশ কয়েকজন থাকবেন।

KamLAND-Zen এর একটি ডিডেকটর যা Xenon-136 এর Double Beta Decay পর্যবেক্ষন করে; image source: https://www.sciencenews.org

 

বদলে যেতে পারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ধারণা

যদি বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ করে ফেলতে পারেন যে, নিউট্রিনোরাই তাদের নিজদের প্রতিবস্তু, তাহলে অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিবস্তু কেন এত দূর্লভ তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এছাড়া নিউট্রিনো কেনো অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণার চেয়ে হালকা সেটাও বোঝা যাবে। “এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত আবিষ্কার হবে এটি”, বলেন কনরাড নামক বিজ্ঞানী।

তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা ধারণা করেন যে, নিউট্রিনোরা যদি নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু হয় তাহলে দেখতে না পাওয়া ভারী নিউট্রিনো হয়ত হালকা নিউট্রনের (যা আমরা দেখতে পাই) সাথে জোড়ায় থাকে। কিন্তু যদি এটা প্রমানিত হয়ে যায় যে নিউট্রিনোরা নিজেরা নিজেদের প্রতিবস্তু তাহলে তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের অনেক তত্ত্বই আর টিকবে না।

কনরাড বলেন, “মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো যে কে এই অ্যান্টিম্যাটার বা, প্রতিবস্তুগুলোকে চুরি করল। এর চাইতে বড় চুরি আর কখনো হয়নি।”

featured image: socratic.org

কিছু রাসায়নিক ত্বকে লাগলে দাগ পড়ে কেন

“আপনাদের আমি আগেই বলেছি, আমাকেও যে ভয় দেখানো হবে, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম এবং মনে মনে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। … রাতের বেলা যতবার বাথরুমে যেতাম ততবারই বাথরুমের বাইরের নবে কয়েক ফোঁটা সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ দিয়ে রাখতাম। …যে ভয় দেখাতে আসছে, সে কোনো কিছু না ভেবেই নবে হাত দিবে। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে দাগ পড়ে যাবে। সিলভার নাইট্রেটের দাগ কঠিন দাগ। সপ্তাহখানেক থাকবেই।” -মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য, হুমায়ুন আহমেদ

সিলভার নাইট্রেট দ্রবণ হাতে পড়লে কালো দাগ হয়ে যায়। হাতের তালুতে এক চামচ চিনি নিয়ে নাড়াচাড়া করলে কোনো দাগ পড়ে না। কিছু কেমিক্যাল হাতে পড়লে দাগ পড়ে যাচ্ছে, আবার কিছু হাতে নিয়ে বসে থাকলেও কিছু হচ্ছে না। কেন এমন হচ্ছে?

সাধারণভাবে, কোনো রঙিন বস্তু ধরলে সেই রঙ হাত লেগে যেতে পারে। যেমন, মাঠের ঘাসের উপর শুয়ে থাকলে কাপড়ে সবুজ দাগ হয়ে যায়। ঘাসের ক্লোরোফিল আসঞ্জন বলের মাধ্যমে আপনার কাপড়ে লেগে যাচ্ছে, তাই কাপড়েও সবুজ দাগ পড়ছে। একই প্রক্রিয়ায় সদ্য রঙ করা দেয়ালে হাত দিলে হাতে রঙ লেগে যায়।

সব রঙিন বস্তুর ক্ষেত্রেই আবার এমনটি ঘটে না। একটি বাটিতে ডিম ভেঙ্গে রেখে তার মধ্যে হাত দিয়ে রাখলে যতটুকু ডিমের কুসুম হাতে লাগবে, এতে হাত হলুদ হয় না। কারণ যে যে অণুর (Lutein, Zeaxanthin) কারণে ডিমের কুসুম হলুদ দেখায়, তা আপেক্ষিকভাবে অন্যান্য অণুর তুলনায় অনেক বড় বলে ত্বকে লেগে থাকে না।

কিন্তু অণু যদি অনেক ছোট হয়, সেক্ষেত্রে ছোট অণু ত্বকের ছিদ্রে আটকে যেতে পারে। এমনকি ত্বকের সাথে রাসায়নিক বন্ধনও করে ফেলতে পারে। তখন শুধু অনেক পানি দিয়ে ধুলেই হবে না, ত্বকের যে স্তরে ওই রঞ্জক পদার্থ লেগে আছে, ঘষে তুলে ফেলতে হবে।

কিছু কিছু রাসায়নিক পদার্থ আছে, যারা ত্বকের সাথে বিক্রিয়া করে রঙ পরিবর্তন করে। যেমন আমরা শুরুতেই দেখলাম, সিলভার নাইট্রেট ত্বকে কাল দাগ ফেলে। একইভাবে হাতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণ পড়লে হাত বাদামি হয়ে যায়, নাইট্রিক এসিড পড়লে পুড়ে তো যায়ই, পাশাপাশি হলুদ দাগও পড়ে। আর সালফিউরিক এসিডে ত্বক পুড়ে যাবে এবং ত্বকের গঠন ভেঙ্গে পানি বেরিয়ে যাবে, পড়ে থাকবে মৌলিক কালো কার্বন। ফলে পুড়ে যাওয়া ছাড়াও ত্বকে খয়েরি, মরিচা রঙের অথবা কালচে বাদামী রঙের দাগ পড়ে। এসব পদার্থের ক্ষেত্রে কী ঘটছে? সিলভার নাইট্রেট ত্বকের উপরের স্তরের লবনের সাথে বিক্রিয়া করে সিলভার ক্লোরাইডে পরিণত হয়, যা আলোতে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রুপার কণায় পরিণত হয়। এই রুপার কণা ত্বকের গর্তে আটকে যায়, ফলে কালো দেখায়। এই দাগ সহজে যায় না, এমনকি প্রচুর পানি দিয়ে ধুলেও না।

2 চিত্রঃ হাতে সিলভার নাইট্রেট দ্রবণের কাল দাগ।

আমাদের ত্বকের উপরের স্তর ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, পুরাতন কোষ মরে ঝরে পড়ছে, নতুন স্তর তার জায়গায় আসছে। সিলভারের দাগ তাই কয়েকদিন পর আপনাআপনি পুরাতন কোষের ঝরে পড়ার সাথে সাথে চলে যাবে।

পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কাপড়, কাগজ আর ত্বকে গাঢ় বাদামী দাগ ফেলে। এই দাগ ঘষে তুলে ফেলা যায় না। যতদিন না ত্বকের উপরের স্তর ঝরে পড়ছে এটি ততদিন পর্যন্ত থাকবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে কী ঘটছে? পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নিজে গাঢ় বেগুনী বর্ণের কঠিন পদার্থ। এই কেমিক্যাল হাতে বা কাপড়ে পড়লে বিয়োজিত হয়ে বাদামী দানাদার ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড (MnO2) উৎপন্ন করে।

4MnO4 (aq) + 4H+ (aq) = 3O2 (g) + 2H2O (l) + 4MnO2 (s)

এই MnO2 এর ক্ষুদ্র ক্রিস্টাল ত্বকের ছিদ্রে আটকে যায়। ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড পানিতে অদ্রবণীয়, তাই পানি দিয়ে ধোয়ার চেষ্টা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। তবে এই বাদামী দাগ যদি কাপড়ের উপরে হয়, তাহলে লঘু হাইড্রোক্লোরিক এসিড প্রয়োগ করলে ম্যাঙ্গানিজের বর্ণহীন দ্রবণীয় লবন উৎপন্ন হবে, তখন দাগ চলে যাবে।

MnO2 (s) + 4 HCl (aq) = MnCl2 (aq) + Cl2 (g) + 2 H2O (l)

3 চিত্রঃ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের বাদামী দাগ।

খনিজ এসিড, যেমন সালফিউরিক এসিড আর নাইট্রিক এসিড, হাতে পড়লে কেন রঙিন দাগ পড়ে? এই দুই এসিড হাতে পড়লে আসলে কী হয়? অবশ্যই পুড়ে যায়। কিন্ত কেন পুড়ে যাচ্ছে? প্রথমত এই দুই এসিড হলো ক্ষয়কারী পদার্থ এবং এরা জীবন্ত টিস্যুর (ত্বক, মাংস, কর্নিয়া) উপরে পড়লে বিক্রিয়া করে পুড়িয়ে ফেলে। এদের বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্যর মূলে আছে অম্ল-ক্ষারক বিক্রিয়া। অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিস এবং এস্টার হাইড্রোলাইসিস। প্রোটিন অ্যামাইড হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে হাইড্রোলাইজড হয়ে ভেঙ্গে যায়, যেখানে লিপিড (চর্বি) এস্টার হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে ধ্বংস হয়। এভাবে প্রোটিন এবং ফ্যাট তথা টিস্যু বিনষ্ট হয়। এছাড়া এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় যার ফলে টিস্যু গলে ও পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একে বলে কেমিক্যাল বার্ন।

ঘন সালফিউরিক এসিড ক্ষয়কারী পদার্থ হবার পাশাপাশি শক্তিশালী নিরুদকও। ত্বকে পড়লে প্রথমত অম্লীয় হাইড্রোলাইসিস এর মাধ্যমে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর ত্বকের কোষ থেকে পানি টেনে বের করে আনে, ফলে কোষ পানিশূন্য হয়ে যায়। উল্লেখ্য ত্বকের কোষের ৯০ ভাগই পানি। এই নিরুদন প্রক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে ত্বকে সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন হয়।

সালফিউরিক এসিড এত শক্তিশালী নিরুদক যে এটি প্রায় সকল জৈব যৌগ থেকেই পানি বের করে আনে। একটি বিকারে চিনি নিয়ে তার মধ্যে ঘন সালফিউরিক এসিড নিয়ে এটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। চিনিকে রাসায়নিকভাবে বলা হয় সুক্রোজ, যা মূলত কার্বন, অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন দিয়ে গঠিত (সংকেত C12H22O11)। সালফিউরিক এসিড চিনির সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে চিনির অণু থেকে পানি আলাদা করে ফেলে, ফলে কাল কার্বন উৎপন্ন হয়।

C12H22O11 + H2SO4 → 12 C + 11 H2O + পানি এবং এসিডের মিশ্রণ

বাতাসের উপস্থিতিতে এই বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড, জলীয় বাষ্প এবং সালফার ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়।১০ এই বিক্রিয়ায় এত কার্বন উৎপন্ন হয় যে তা বিকার থেকে উপচিয়ে পড়ে। নিচের ইউটিউবের ভিডিও লিঙ্কটিতে গিয়ে এই বিক্রিয়াটা দেখে নিতে পারেন। youtube.com/watch?v=zg9wmU7Z-6s সালফিউরিক এসিড একই প্রক্রিয়ায় কাগজ আর কাঠ থেকে, এবং হাতে পড়লে আপনার ত্বক থেকে পানি বের করে আনবে।

নাইট্রিক এসিড একটি ক্ষয়কারক এসিড এবং শক্তিশালী জারক১১। এই এসিড অম্লীয় হাইড্রোলাইসিসের মাধ্যমে জীবন্ত টিস্যু ধ্বংস করে, পাশাপাশি ত্বকে গাঢ় হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে। এই হলুদ দাগ Xanthoproteic বিক্রিয়া3 – ত্বকের কেরাটিন প্রোটিনের ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের কারণে হয়। অ্যারোমেটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিনে ফিনাইল গ্রুপ আছে। এই হলুদ দাগ (ফিনাইল নাইট্রেট) ক্ষারের উপস্থিতিতে কমলা হয়ে যায়।

5চিত্রঃ হাতের তর্জনীর উপরে নাইট্রিক এসিড পড়ায় সেকেন্ডারি বার্ন ঘটেছে। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আশেপাশের চামড়া হলুদ হয়ে গিয়েছে।

ত্বকের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ পড়লে ত্বক সাময়িকভাবে সাদা হয়ে যায়১২। হাইড্রোজেন পার অক্সাইড একটি শক্তিশালী জারক। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের লঘু দ্রবণ ত্বকে পড়লে Capillary embolism ঘটে, অর্থাৎ ঐ স্থানের কৈশিক- নালীতে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের বিয়োজনের ফলে উৎপন্ন হওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্সিজেনের বুদবুদ প্রবেশ করায় সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে ত্বক সাদা দেখায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পর ত্বক আবার নিজে নিজেই স্বাভাবিক রঙ ফিরে পায়। অর্থাৎ এখানে পার অক্সাইড ত্বককে বিরঞ্জিত করে না, সাময়িকভাবে জারিত করে।

4 চিত্রঃ হাতের উপরে হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের ৩৫% জলীয় দ্রবণ পড়ায় আঙ্গুল সাদা হয়ে গিয়েছে।

বোঝা গেল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ হাতে পড়লে দাগ পড়ে যেতে পারে, হাতের টিস্যু বাজেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; ত্বক, টিস্যু ভেদ করে রক্তে মিশে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে, এমনকি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। তাই রান্নাঘর থেকে কেমিস্ট্রি ল্যাব, ভিনেগার থেকে নাইট্রিক এসিড, রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় অবশ্যই অতি সাবধানতা মেনে চলা উচিত।

টীকা

১. Adhesive force- ভিন্ন ভিন্ন পদার্থের অণুর মধ্যেকার আকর্ষণ বলকে আসঞ্জন বল বলে। যেমন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে দাগ টানলে আসঞ্জন বলের কারণে চক বোর্ডে লেগে থাকে।

২.Chemical Burn- জীবন্ত টিস্যু ক্ষয়কারী পদার্থ যেমন শক্তিশালী অম্ল বা ক্ষারের সংস্পর্শে আসায় ঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপের ফলে পুড়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে chemical burn বলে। Chemical Burn কেও সাধারণ Burn এর মতো ভাগ করা করা যায়। তবে সাধারণ Burn আর Chemical Burn এর কিছু পার্থক্য আছে। যেমনঃ ১. এর জন্য তাপের কোনো উৎস না থাকলেও চলে; ২. কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে ঘটতে পারে; ৩. সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে নাও বুঝা যেতে পারে যে ত্বক পুড়ে গিয়েছে; ৪. প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হয়; ৫. ত্বকের উপরিভাগের কোনো ক্ষতি না করে ত্বক ভেদ করে টিস্যুতে প্রবেশ করে টিস্যুর গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

7চিত্রঃ Chemical burn (হাতের উপরে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড দ্রবণ পড়ার ৪৪ ঘণ্টা পরে।)

৩. Xanthoproteic reaction
কোনো নমুনায় প্রোটিনের উপস্থিতি নির্ণয় করতে সাধারণত Xanthoproteic reaction করা হয়। এই বিক্রিয়ায় বিকারক হিসেবে গাঢ় নাইট্রিক এসিড ব্যবহৃত হয়। নাইট্রিক এসিড প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে হলুদ বর্ণের নাইট্রেটেড প্রোডাক্ট তৈরি করে। এই বিক্রিয়ায় পরীক্ষণীয় বস্তু বা দ্রবণে গাঢ় নাইট্রিক এসিড যোগ করে মিশ্রণটি উত্তপ্ত করা হয়। যদি মিশ্রণে প্রোটিন উপস্থিত থাকে, তবে মিশ্রণ হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এই মিশ্রণে এরপর শক্তিশালী ক্ষার, যেমন তরল অ্যামোনিয়া যোগ করা হলে মিশ্রণ হলুদ থেকে কমলা বর্ণের হয়ে যায়। অ্যারোমাটিক অ্যামিনো এসিড যেমন ফিনাইল এলানিন, ট্রিপটোফ্যান, টাইরোসিন এই বিক্রিয়া দেয়। ফিনাইল গ্রুপের নাইট্রেশনের ফলে যে Xanthoproteic acid উৎপন্ন হয় তা হলুদ বর্ণের হওয়ার জন্যই এইধরনের রঙের পরিবর্তন দেখা যায়। ত্বকের আবরণী কোষের উপরে নাইট্রিক এসিড পড়লেও একই প্রক্রিয়ায় হলুদ বর্ণের Xanthoprotein উৎপন্ন হয়, যে কারণে নাইট্রিক এসিড ত্বকে হলুদ বর্ণের দাগ ফেলে।

তথ্যসূত্র

১. www.pdf-archive.com/2014/09/17/misir-alir-amimangsito-rahasya-allbdbooks-com/preview/page/63

২. Why do some chemicals stain your hands? http://questions.sci-toys.com/node/130

৩. Yolk, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/ wiki/Yolk

৪. https://books.google.com.bd/books?id=LRMlBQAAQBAJ

৫. Silver Chloride, From Wikipedia https://en.wikipedia.org/wiki/ Silver_Chloride

৬. How many skin cells do you shed every day? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/faq/permanganate-stains.shtml

৭. How does permanganate cause stains? http://antoine.frostburg .edu/chem/senese/101/redox/fag/permanganate-stains.shtml

৮. Corrosive substances

From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Corrosive_substance

৯. Why does sulfuric acid melt people’s skin? https://answers.yahoo .com/question/index?qid=20080722005356AAPbpjg

১০. http://www.chemeddl.org/alfresco/service/org/chemeddl/ video.html?options=false&ID=vid:5892&guest=true

১১. Nitric acid, From Wikipedia, https://en.wikipedia.org/wiki/Nitric_acid

১২. http://www.beautyclue.com/skin-whitening/can-hydrogen-peroxide-bleach-your-skin-lighten-dark-spots-acne-scars/

 

নাভিদ আহমেদ সাদমান

রসায়ন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বইয়ের গন্ধের খোঁজে

বইয়ের পোকাদের কাছে বইয়ের গন্ধ একধরনের মাদকতার সৃষ্টি করে। কোথা থেকে আসে এ গন্ধ? কেনই বা এ গন্ধের আবির্ভাব ঘটে?  নতুন ও পুরাতন উভয় প্রকার বই থেকেই কয়েক ধরনের উদ্বায়ী পদার্থ নির্গত হয়। এসব পদার্থ বা উপাদানগুলোর উৎস আবার ভিন্ন ভিন্ন। কোনো কোনোটির উৎস হিসেবে থাকে বিযোজিত পদার্থ আবার কোনো কোনোটির উৎস হিসেবে থাকে বইয়ে ব্যবহৃত কালি বা বইয়ের পৃষ্ঠার ধরণ।

বইয়ের পৃষ্ঠায় থাকা সেলুলোজের ক্রমান্বয়িক ভাঙন সম্পন্ন হয় এবং লিগনিনের উপস্থিতিতে আরো কিছু জৈব উপাদা তৈরি হয়। কাগজের ধরণ এবং আয়ুর উপর নির্ভর করে এসব জৈব উপাদানগুলো ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় তৈরি হয়। বেশি পুরাতন বইয়ে লিগনিনের উপস্থিতি যেকোনো নতুন বই থেকে বেশি থাকবে।

নীচে কিছু যৌগের নাম এবং তাদের ভূমিকা তুলে ধরা হলোঃ

১. টলুইন- মিষ্টি গন্ধের জন্য দায়ী।

২. ভ্যানিলিন- ভ্যানিলা ফ্লেভারের গন্ধ প্রদান করে থাকে। কেক বা আইস্ক্রিমের মাঝে যেরকম ফ্লেভার থাকে সেরকম।

৩. ২-ইথাইল হেক্সানল- যা গাছপালা বা তৃণ জাতীয় গন্ধ প্রদান করে।

৪. ইথাইল বেনজিন- এটিও মিষ্টি জাতীয় গন্ধের জন্য দায়ী।

৫. বেনজালডিহাইড-  বাদাম জাতীয় গন্ধের জন্য দায়ী।

৬. ফারফিউরাল- এটি এক ধরনের হেটারো সাইক্লিক যৌগ। পৃষ্ঠায় বাদাম জাতীয় গন্ধ প্রদান করে।

নতুন বইগুলোর গন্ধ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। বইতে ব্যবহৃত আঠা, কালি ও পৃষ্ঠা তৈরির উপাদানের উপর নির্ভর করে তার থেকে আসা গন্ধ কেমন হবে।

এখনকার আঠা সাধারণত কো-পলিমার ধাঁচের উপাদান দ্বারা তৈরি। যেমন- ভিনাইল অ্যাসিটেট ইথাইলিন। কাগজ যখন বানানো হয় তখন প্রত্যাশিত গুণগত মান সম্পন্ন কাগজ পাবার উদ্দেশ্যে কাগজের মণ্ডে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত করা হয়। এসব যৌগের মাঝে কোনো কোনোটির আবার নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই। কিন্তু এই যৌগগুলো অন্যন্য উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে উদ্বায়ী পদার্থের নিঃসরণ ঘটাতে পারে।

ভিনাইল অ্যাসিটেট ইথাইলিন নামের একটি যৌগ আঠাতে ব্যবহার করা হয়। রাবারের শিট বা ম্যাট তৈরিতেও এগুলো ব্যবহৃত হয়। কালি ও কাগজ তৈরিতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহৃত হয়।

তথ্যসূত্র

http://www.compoundchem.com/infographics/

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethylene-vinyl_acetate

 

সোঁদা মাটির মন মাতানো গন্ধের উৎস

অনেকেই বৃষ্টির গন্ধ পছন্দ করে। বৃষ্টির মিষ্টি গন্ধ অনেকের কাছে সজীবতা, পরিচ্ছন্নতা বা আর্দ্রতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। কিন্ত পানির তো নিজস্ব কোনো গন্ধ নেই, তাহলে এই ভেজা সুগন্ধটি কোথা থেকে আসে?

বৃষ্টির গন্ধের একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক নাম আছে- পেট্রিকোর (petrichor)। ১৯৬৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ এর দুই গবেষক ইসাবেল জয় বেয়ার এবং রিচার্ড জি. থমাস নেচার পত্রিকায় বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ Nature of Argillaceous Odor লেখার সময় এই নামটি প্রদান করেন। এর বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘মৃন্ময় গন্ধের প্রকৃতি’। এই শব্দটি গ্রীক petra (বা পাথর) আর ichor (গ্রীক দেবতাদের শরীরে রক্তের মতো যে পদার্থ প্রবাহিত হয়) এর সমন্বয়ে তৈরি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদিও বৃষ্টির গন্ধের মাঝে আমরা একটি সজীব পরিচ্ছন্ন ভাব খুঁজে পাই, কিন্ত এই গন্ধ আসলে মাটির ধুলা-ময়লা আর পাথর থেকে তৈরি হয়। অবশ্য পাথর নিজেও এই গন্ধের উৎস নয়, পাথর এখানে গন্ধের বাহক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এই গন্ধের পেছনে দায়ী যৌগগুলো আসে প্রধানত বিভিন্ন গাছপালা থেকে। সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ায় বিশেষ করে যখন দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি হয় না, তখন কিছু উদ্ভিদ উদ্বায়ী ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ তেল মাটিতে নিঃসরণ করে। এই ফ্যাটি এসিডগুলোর কয়েকটি আমাদের বেশ পরিচিত। এদের কোনো কোনোটি যেমন পামিটিক বা স্টিয়ারিক এসিড আমাদের খাবারে পাওয়া যায়।

অবশ্য, এই তেলের সব উপাদান এখনো পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯৭০ এর দশকে বিজ্ঞানী ন্যান্সি এন. জার্বার এই তেল থেকে ‘২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন’ পৃথক করেন। এই যৌগটির বেশ তীব্র ‘বৃষ্টির মতো’ গন্ধ আছে।

২-আইসোপ্রোপাইল-৩-মিথোক্সি পাইরাজিন

শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটিতে পানির পরিমাণ যখন খুব কমে যায়, তখন কিছু গাছপালা টিকে থাকার জন্য এই তেল নিঃসরণ করে। সময়ের সাথে সাথে মাটি এবং পাথরে তেল জমতে থাকে। এমন অবস্থায় বৃষ্টি হলে সেগুলো মাটি থেকে বাতাসে ব্যাপিত হয়ে ভেঙে সুগন্ধি উদ্বায়ী যৌগ তৈরি করে। ফলে আমরা সেই সজীব, উদ্ভিজ্জ আর সবমিলিয়ে সুন্দর গন্ধটি পাই।

জিওস্মিন

কিন্ত এই সুগন্ধি উদ্ভিজ্জাত তেল অবশ্য বৃষ্টির গন্ধের একমাত্র উপাদান নয়। পেট্রিকোরের আরেকটি বড় উপাদান হচ্ছে জিওস্মিন (geosmin) নামের একটি যৌগ। গ্রীক ভাষায় জিওস্মিন শব্দের অর্থ ‘পৃথিবীর গন্ধ’। মাটিতে থাকা কিছু ব্যাকটেরিয়া (যেমন একটিনোব্যাকটেরিয়া) এই যৌগটি উৎপাদন করে আর এই যৌগটিই মাটির নিজস্ব গন্ধের জন্য দায়ী। মানুষের নাক এই যৌগের গন্ধে খুবই সংবেদনশীল, বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি ট্রিলিয়নে ৫ ভাগ, অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে মাত্র ৫ ন্যানোগ্রাম (৫ × ১০-৯ গ্রাম) থাকলেই মানুষের নাক তা শনাক্ত করতে পারে।

রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে জিওস্মিন যৌগটি আসলে একধরনের অ্যালকোহল। এতে –OH গ্রুপ উপস্থিত আছে। জিওস্মিন আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্ত ওয়াইনে এই যৌগের উপস্থিতি ওয়াইনের স্বাদে কিছুটা ‘স্যাঁতসেঁতে’ ভাব এনে দেয় যা তার গুনাগুণ বা গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। একইভাবে, পানিতে এই যৌগ উপস্থিত থাকলে পানির স্বাদ ‘কর্দমাক্ত’ হয়ে যায়, যা ঐ পানির পানযোগ্যতা কমিয়ে দেয়।

মাটিতে উপস্থিত কিছু ব্যাকটেরিয়া মারা গেলে বা সুপ্তাবস্থায় যাবার সময় মাটিতে জিওস্মিন নিঃসরণ করে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে খরা চললে এই নিঃসরণের হার আরো বেড়ে যায়। এরপর যখন বৃষ্টি হয় তখন এই যৌগটি মাটি থেকে নির্গত হয়ে মিহি কুয়াশার মতো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

চিত্রঃ বৃষ্টির মন মাতানো গন্ধ আসলে মাটির গন্ধ।

যেহেতু দীর্ঘদিন খরা চললে মাটিতে এসব যৌগের ঘনত্ব বেড়ে যেতে থাকে, তাই অনেকদিন পর বৃষ্টি হলে এর গন্ধও তীব্র হয়। বৃষ্টির গন্ধের আরো একটি উৎস বাকি আছে, যার গন্ধ আমরা এমনকি বৃষ্টি শুরু হবার আগে থেকেই পাওয়া শুরু করি। এটি হচ্ছে ওজোন গ্যাস। এর গন্ধ এতোই আলাদা যে এর নাম থেকেই তা অনুমান করা যাবে। এর নাম এসেছে গ্রীক শব্দ Ozein থেকে, যার অর্থ To smell।

বাতাসে বিদ্যুৎক্ষরণ ঘটালে ঝাঁঝালো গন্ধের এই ওজোন গ্যাস তৈরি হয়

3O2 (g) → 2O3 (g)

উল্লেখ্য, জিওস্মিনের মতো মানুষের নাক ওজোনের গন্ধের প্রতিও খুবই সংবেদনশী। বাতাসে এর পরিমাণ প্রতি বিলিয়নে মাত্র ১০ ভাগ হলেই অর্থাৎ প্রতি কেজি বাতাসে ওজোন গ্যাসের পরিমাণ মাত্র ১০ মাইক্রোগ্রাম থাকলেই আমরা যৌগটির গন্ধ শনাক্ত করতে পারি।

বজ্র-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের বিদ্যুৎ বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন গ্যাসের অণুকে ভেঙে ফেলে। কিছু পরিমাণ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন একত্রে যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড (NO) তৈরি করে। এই নাইট্রিক অক্সাইড পরে বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে ওজোন গ্যাস উৎপন্ন করে।এই গ্যাস পরে নিম্নমুখী বাতাসে ভেসে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়। আর আমরা এর গন্ধ পেয়ে বৃষ্টি হবার আগেই বুঝতে পারি যে কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি হবে।

মানুষের গন্ধের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। এর অনেক গন্ধই আমাদের স্মৃতিতে জমা হয়ে যায়। যেমন আপনার মায়ের গায়ের ঘ্রাণ, আপনার প্রথম পোষা প্রাণীটির ঘ্রাণ, অথবা বৃষ্টির এই গন্ধ (পেট্রিকোর) ইত্যাদি।

চিত্রঃ মানুষের ইন্দ্রিয় কয়েক ট্রিলিয়ন পরিমাণ গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পেট্রিকোর পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে আমাদের শুধু আনমনাই করে না, এটি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রেও ভূমিকা রাখে। যেমন, কোনো কোনো জীববিজ্ঞানী ধারণা করেন, জলপথে পেট্রিকোর ছড়িয়ে পড়লে তা মিঠাপানির মাছদের ডিম পাড়ার সংকেত দেয়। যেমন আমরা জানি প্রতিবছর হালদা নদীতে একটি বিশেষ মূহুর্তে ও বিশেষ পরিবেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউস ও কার্প জাতীয় মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত শুধু অমাবস্যা বা পূর্ণিমার তিথিতে অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ সময়কে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে।

জো হবার জন্য অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হবার সাথে সাথে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হতে হয়। অর্থাৎ হালদা নদীতে মাছের ডিম পাড়ার সময় বৃষ্টির গন্ধের ভূমিকা থাকতে পারে, যা ঐ জীববিজ্ঞানীদের সন্দেহকেই সমর্থন করে। আবার ইংল্যান্ডের জন ইনস সেন্টারের অণুজীববিজ্ঞানী কিথ চেটার প্রস্তাব করেন, জিওস্মিনের গন্ধ হয়তো মরুভূমিতে উটকে মরূদ্যান খুঁজে পেতে সংকেতের মতো কাজ করে।

সেই হিসেবে বৃষ্টির এই গন্ধ কি মানুষের জীবনযাত্রাতেও এভাবে প্রভাব রাখে? অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ডানা ইয়াং অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমির আদিবাসীদের উপরে গবেষণা চালিয়ে দেখতে পান এই সম্প্রদায়ের কাছে শীতকাল আর গ্রীষ্মকালের প্রথম বৃষ্টির গুরুত্ব অনেক। এই বৃষ্টির ফলে ক্যাঙ্গারু আর ইমু প্রাণীদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং মরুভূমিতে গাছপালা জন্মে সবুজ ভূপ্রকৃতির সৃষ্টি হয়। ইয়াং বলেন, এই জনগোষ্ঠীর কাছে বৃষ্টির গন্ধ তাই ‘সবুজ রঙ’য়ের সাথে সম্পর্কিত।

এখানের আলোচনার সারকথা হলো উদ্ভিজ্জাত তেল, ব্যাকটেরিয়া ও ওজোন গ্যাসের সমন্বয়ে পেট্রিকোর গঠিত। কিন্ত পেট্রিকোরের গন্ধ মাটি থেকে আমাদের নাকে এসে পৌঁছায় কেমন করে?

২০১৫ সালে এম.আই.টি’র বিজ্ঞানীরা হাই স্পিড ক্যামেরা (প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ বা ১০০০ এর উপরে ফ্রেম ধারণ করতে পারে) ব্যবহার করে বাতাসে সুগন্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষণা চালান। এই গবেষণায় প্রায় ২৮ টি ভিন্ন ভিন্ন পৃষ্ঠতল, ১২ টি কৃত্রিম পৃষ্ঠতল এবং ১৬ টি মাটির নমুনার উপরে ৬০০ টি পরীক্ষা চালানো হয়।

আবার বিভিন্ন ধরনের বৃষ্টির জন্য সুগন্ধের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন। বৃষ্টির পানি যত উপর থেকে ফেলা হয় মাটিতে পড়ার আগে তার গতি তত বেশি হয়। এতে দেখা যায়, যখন বৃষ্টির ফোঁটা কোনো সচ্ছিদ্র পৃষ্ঠতলের (যেমন মাটি) উপরে এসে পড়ে, তখন ছিদ্রের বাতাসের সাথে মিশে বুদবুদ তৈরি হয়। বুদবুদে করে সুগন্ধের পাশাপাশি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এরোসল আকারে বাতাসে নিঃসৃত হয়। এ পরীক্ষায় আরো দেখা যায়, বৃষ্টির ফোঁটার গতি কম হলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া এরোসলের পরিমাণ বেড়ে যায় কারণ গতি বেশি হলে বুদবুদ তৈরি হবার সময় হয় না। এ কারণেই হাল্কা বৃষ্টির পরে পেট্রিকোরের তীব্রতা বেশি থাকে।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকার জন্য বৃষ্টির উপরে নির্ভর করতে হতো, যার কারণে আমাদের কাছে বৃষ্টির গন্ধ এতো ভাল লাগে।

বিজ্ঞানীরা এখনো কৃত্রিমভাবে পেট্রিকোর তৈরির উপায় বের করতে পারেননি। কারণ এর রাসয়নিক গঠন এত জটিল আর এর কিছু উপাদান এত অল্প পরিমাণে থাকে যে আমাদের নাক তা শনাক্ত করতে পারলেও কোনো মেশিন তা আলাদা করতে পারে না। তাই এই মিষ্টি সুবাস বোতলজাত অবস্থায় বাজারে থরে থরে সাজানো অবস্থায় দেখা যায় না। বাজারে সজ্জিত দেখতে হলে আরো বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এর পর থেকে যখন বৃষ্টি উপভোগ করবেন, তখন আপনাকে আনমনা করে দেওয়া ঐ বৃষ্টির গন্ধের জন্য এর পেছনের রসায়নকেও একটা ধন্যবাদ দিতে ভুলবেন না।

তথ্যসূত্র

  1. https://youtube.com/watch?v=PDrElHWBT6A
  2. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  3. http://winespectator.com/drvinny/show/id/5453
  4. Section 21.5 Oxygen and Sulfur, Subsection: Ozone (Page 916) Chemistry (Ninth Edition) Raymond Chang
  5. https://youtube.com/watch?v=K8_05IpT7cA
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Petrichor
  7. https://youtube.com/watch?v=DyFm-UQ5-ag
  8. http://climatecentral.org/news/thunderstorms-ozone-atmosphere-18600
  9. http://huffingtonpost.com/2012/07/19/rain-smells-approaching-storm_n_html
  10. http://smithsonianmag.com/science-nature/what-makes-rain-smell-so-good-13806085/
  11. http://todayifoundout.com/index.php/2014/05/causes-smell-rain/

চারটি নতুন মৌলের নামকরণ পূর্ণ হলো অসম্পূর্ণ পর্যায় সারণী

এতদিনে নিশ্চয় সবাই জেনে গিয়েছেন গত জুন মাসের ৮ তারিখে IUPACএবং IUPAPএর একটি যৌথ দল১১৩,১১৫,১১৭ ও ১১৮ নম্বর মৌলের আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাবিত নাম ও প্রতীক প্রকাশ করেছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে অবশেষে পর্যায় সারণীর ৭ম পর্যায় পূর্ণ হলো। এ মৌলগুলো কারা কীভাবে তৈরি করল,কীভাবে এদের আবিষ্কারের স্বীকৃতি এল, কীসের উপরে ভিত্তি করে এদের নাম দেয়া হলো, তার আদি অন্ত নিয়েই আজকের প্রবন্ধ।

শুরুর আগে

 ২০০৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিউর এন্ড এপ্লায়েড কেমিস্ট্রি(IUPAC)এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিউর এন্ড এপ্লায়েড ফিজিক্স(IUPAP)-এর প্রেসিডেন্টদ্বয় দুই ইউনিয়ন থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে Joint Working Party (JWP)গঠন করেন। এটি একটি সাময়িক যৌথ দল, যা গঠন করার মূল উদ্দেশ্য ছিলকোনো নতুন মৌল আবিষ্কারের দাবির সত্যতা যাচাই করা এবং তা প্রমাণিত হলে মৌলগুলোর নতুন নাম দেয়া।

উল্লেখ্য, এই যৌথ দলই ১১২,১১৪ আর ১১৬ নম্বর মৌল আবিষ্কারের স্বীকৃতি দেয়। যাদের নাম পরবর্তীতে যথাক্রমে কোপার্নিসিয়াম, লিভারমোরিয়াম এবং ফ্লেরোভিয়ামদেয়া হয়। এখানে নম্বরের মাধ্যমে পারমাণবিক সংখ্যা অর্থাৎ মৌলের পরমাণুতে প্রোটনের সংখ্যাকে নির্দেশ করা হচ্ছে।

যেভাবে শুরু হলো

২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর যৌথ দলের সদস্যরা পর্যায় সারণীর ১১৩,১১৫,১১৭ এবং ১১৮ তম মৌল আবিষ্কার সংক্রান্ত পেপার রিভিউ করে রিপোর্ট জমা দেয়। তাদের এই রিপোর্টে দেখানো হয় এই মৌলসমূহের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশিত হবার আগে রিপোর্টের ড্রাফট, আবিষ্কার সংক্রান্ত ল্যাবগুলোতে পাঠানো হয় রিপোর্টের বিষয়বস্তু ও উপাত্ত যাচাই করে দেখার জন্য। উদ্দেশ্য টেকনিকাল খুঁটিনাটিতে যেনকোনো ভুল না থাকে। এরপরএই রিপোর্ট ১৫জন বিশেষজ্ঞ রিভিউ করে দেখেন যা পরে IUPAC এবং IUPAPএর নির্বাহী কমিটি গ্রহণ করে। সবশেষে IUPACএর অজৈব রসায়ন বিভাগের কমিটি দ্বারা এই রিপোর্ট গৃহীত হয়।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে এই রিপোর্ট IUPACএর জার্নাল Pure And Applied Chemistry-র ২০১৬ সংখ্যায় দুটি পেপারে প্রকাশিত হয়। রিপোর্টেজাপানের ওয়াকোতে অবস্থিত রিকেন ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের ১১৩ তম মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয়। এছাড়া বলা হয় রাশিয়ার দুবনাতে অবস্থিত জয়েন্ট ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং টেনেসি স্টেটের ওক রিড ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত সমন্বিত দল ১১৫ এবং ১১৭ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে। এই দলটিকে দুবনা টিমনামেও ডাকা হয়।

নিবন্ধের শেষে উল্লেখ করা হয় রাশিয়ার জয়েন্ট ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ এবং আমেরিকার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিরবিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত সমন্বিত দল ১১৮ তমমৌলের আবিষ্কার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য,একই দলের সাথে ওকে রিজ ন্যাশলান ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা যুক্ত হয়েছিলেন ১১৫ ও ১১৭ নম্বর মৌল আবিষ্কারের জন্য। লক্ষ্যণীয়,১১৩ তম মৌল আবিষ্কারের বিস্তারিত রিপোর্ট Journal Of Physical Society of Japan-এর একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।

মৌল চারটির অস্তিত্ব প্রমাণিত হবার নিশ্চয়তা দেবার পরIUPAC এরঅজৈব রসায়ন বিভাগেরপ্রধান জন রেডিক এক বক্তব্যে জানান,IUPACএই মৌল চারটির নাম ও প্রতীক প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। এতদিন এই মৌল চারটিকে সাময়িকভাবে যথাক্রমে Ununtrium,Ununpentium, Ununseptiumএবং Ununoctium নাম দ্বারা চিহ্নিত করা হতো।

নাম ও প্রতীকের জন্য IUPACএর সুপারিশ

IUPACএর ঐতিহ্য অনুযায়ী, নতুন আবিষ্কৃত কোনো মৌলের নাম রাখা যাবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্র অনুসারে-

১. কোনো পৌরণিক চরিত্র বা ধারণা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসংক্রান্ত বস্তুর নামে।যেমন, ক্যাডমিয়ামেরনাম গ্রিক পুরাণের চরিত্রথিবিসশহরের রাজা এবং প্রতিষ্ঠাতাক্যাডমাসের নামানুসারে দেয়া হয়।প্লুটোনিয়ামের নাম সৌরজগতের বামন গ্রহ প্লুটোর নামে রাখা হয়। এই গ্রহের নাম আবার গ্রিক পুরাণের মৃত্যুর দেবতা প্লুটোর নামে রাখা হয়েছে।

২.কোনো খনিজ পদার্থের নামে।স্যামারিয়াম(Sm) মৌলের নাম খনিজ পদার্থSamarskiteএর নামে রাখা হয়েছে।

চিত্রঃ IUPAC এর লগো।

৪. ঐ মৌলের কোনো ধর্মের নামে।ব্রোমাইডের নাম গ্রিক শব্দ bromosথেকে নেয়া। এর অর্থ stenchবা দুর্গন্ধ,যা এই মৌলের নিজস্ব গন্ধের দিকে নির্দেশ করে। একইভাবে ক্লোরিনেরনাম গ্রিক শব্দ chlorosথেকে নেয়া হয়েছে। এই শব্দের অর্থ হলুদাভ সবুজ বা সবুজাভ হলুদ, যা এই গ্যাসের সবুজাভ হলুদ রঙকে নির্দেশ করে। ৩.কোনোস্থান বা ভৌগলিক অঞ্চলের নামে। আমেরিকিয়ামের নাম আমেরিকা মহাদেশের নামে রাখা হয়েছে। এরকম আরেকটি মৌল হলোইউরোপিয়াম।এর নাম ইউরোপ মহাদেশের নামে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্যআমেরিকা মহাদেশের নাম ইতালীয় নাবিক Amerigo Vespucci-র নামে রাখা হয়। পর্যায় সারণীতে এখন পর্যন্ত২৫টি মৌলের ক্ষেত্রে নাম ভৌগলিক স্থানের নামে রাখা হয়েছে।

(একেক বইতে এই গ্যাসের একেক রঙ দেয়া আছে,কেউ একে সবুজাভ হলুদ,কেউ শুধু সবুজ আর কেউ হলুদাভ সবুজ রঙের গ্যাস বলেছেন। সবচেয়ে ভালো হয়,আপনি যদি ইউটিউবে ক্লোরিন গ্যাস সংক্রান্ত ভিডিও দেখেন। তাহলে নিজের চোখেই মূল রঙ সম্বন্ধে ধারণা নিতে পারবেন।)

৫. কোনো বিজ্ঞানীর নামে। এরকম মৌলের মোট সংখ্যা ১৫।যেমন রাদারফোর্ডিয়াম, কোপার্নিকিয়াম, আইনস্টাইনিয়াম, বোরিয়াম ইত্যাদি।

এছাড়া নাম দেবার সময় আরো কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। যেমন ধরা যাক, একটি নতুন আবিষ্কৃত মৌলের জন্য একটি নাম প্রস্তাবিত হলো। কিন্ত পরে ঐ মৌলের জন্য অন্য একটি নাম ঠিক করা হলো। তাহলে জটিলতা এড়াবার জন্য গৃহীত না হওয়া প্রথম নামটিঅন্য কোনো মৌলের জন্য প্রস্তাব করা

যাবে না। মৌলের প্রতীকের ক্ষেত্রেও এই নিয়মটি প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, কোপার্নিকিয়ামেরপ্রতীক প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল Cp,পরে দেখা যায় এই প্রতীক আগে ক্যাসিওপিয়ামমৌলেরজন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল।নাম হিসেবে ক্যাসিওপিয়াম গৃহীত হয়নি।মৌলটির বর্তমান নাম লুটেটিয়াম ও প্রতীক Lu।এমন অবস্থায়IUPAC কর্তৃপক্ষ‘Cp’প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করে,যে কারণে পরে এই মৌলের প্রতীক Cnঠিক করা হয়।

একইভাবে, নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নামের শেষাংশ এমন হতে হবে যা ঐ মৌলের ঐতিহাসিক এবং রাসয়নিক সঙ্গতি মেনে চলে। এই নিয়ম অনুসারে, গ্রুপ ১-১৬ এর অন্তর্ভুক্ত মৌলসমূহের নামের শেষাংশে –ium থাকবে,নতুন মৌল গ্রুপ ১৭ এর অন্তর্ভুক্ত হলে নামের শেষাংশে –ine এবং নতুন মৌল গ্রুপ ১৮ এর সদস্য হলে নামের শেষে –on থাকবে। সবশেষে,ইংরেজিতে মৌলটির নাম এমন হতে হবে যেন নামটি প্রধান প্রধান ভাষায় সহজে অনুবাদযোগ্য হয়।

এখন নতুন আবিষ্কৃত মৌলদের কাছে ফিরে যাই। জানুয়ারি মাসে IUPAC চারটি নতুন মৌলের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেবার পরে মৌল ১১৩ তম মৌলের জন্য জাপানের রিকেন ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের দলকে, ১১৫ ও ১১৭ তম মৌলের জন্য জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, ওক রিড ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সমন্বিত দলকেএবং সবশেষে ১১৮ তম মৌলের জন্য জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চএবং লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সমন্বিত দলকে নামকরণের নিয়মাবলী অনুযায়ী নাম ও দুই অক্ষরের প্রতীক প্রস্তাবের অনুরোধ করে। অনুরোধের প্রেক্ষিতে আবিষ্কারকরা তাদের নিজ নিজ পছন্দসই নাম ও প্রতীক প্রস্তাব করে যা IUPACএর অজৈব রসায়ন বিভাগ কর্তৃক স্বীকৃত হয়।

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর IUPAC গত জুন মাসের ৮ তারিখে নাম ও প্রতীক চারটি জনমত যাচাইয়ের জন্য উপস্থাপিত করে। ইউটিউবের Periodic Table of Videos এর অন্যতম প্রধান উপস্থাপক স্যার মার্টিন পলিয়াকফের মতে, ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম যেখানেIUPAC একসাথে এতগুলো নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নাম প্রকাশ করল।

৫ মাসের জনমত এই বছর নভেম্বরের ৮ তারিখে শেষ হবে। আপনি চাইলে এই নাম ও প্রতীকগুলো সম্পর্কে নিজের অভিমত তুলে ধরতে পারবেন। তার জন্য এই ওয়েবসাইটে যেতে হবে।http://iupac.org/recommendations/under-review-by-the-public।জনমত শেষ হবার পর IUPAC এর সর্বোচ্চ কমিটি মৌলসমূহের নাম, তাদের দুই অক্ষরের প্রতীক এবং পর্যায় সারণীতে তাদের সংযোজনের ব্যাপারে শেষ সিদ্ধান্ত নিবে।

এবার আসুন আমরা এক নজরে মৌলগুলোর প্রস্তাবিত নাম আর প্রতীকগুলো দেখিঃ

মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা প্রস্তাবিত নাম প্রস্তাবিত প্রতীক
১১৩ নিহোনিয়াম Nh
১১৫ মস্কোভিয়াম Mc
১১৭ টেনেসিন Ts
১১৮ ওগানেসন Og

যেভাবে নাম দেয়া হলো

নতুন মৌলগুলোকে সাধারণ মৌল যেমন সোনা,লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না,শুধুমাত্র ল্যাবে খুবই অল্প সময়ের জন্য প্রস্তুত করা যায়। ল্যাবরেটরিতে দুটি ভিন্ন মৌলের হালকা পরমাণুর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়, পরে সংঘর্ষে সৃষ্ট ভারী নিউক্লিয়াসের ক্ষয় অনুসরণ করে যে ভারী মৌলটি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল আদৌ তা সৃষ্টি হয়েছিল কিনা এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তাহলে এই মৌলগুলো আবিষ্কার করতে এতদিন লাগল কেন?সর্বশেষ আবিষ্কৃত ১১৬ তম মৌল লিভারমোরিয়াম। এটি২০০০ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং ২০১২ সালে IUPAC কর্তৃক স্বীকৃতি পায়। এতদিন দেরি হবার ব্যাপারে অধ্যাপক পল ক্যারল বলেন,“এসব মৌলের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মৌলগুলোর পরমাণু তৈরি হবার সাথে সাথেই অতি-অল্প সময়ের ভেতরহালকা মৌলের আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়ে যায়।এদের কিছু কিছু আইসোটোপ সম্পর্কে আমরা এতদিন জানতাম না। তাই সেসব আইসোটোপকে আবার দ্ব্যর্থহীনভাবে চিহ্নিত করতে হয়েছিল।”

উপরের কথাটি বিস্তৃত করতে হলে আমাদের কিছু বিষয়ে জানতে হবে। প্রথমেই আইসোটোপ কী তা দেখা যাক। মৌলের পরমাণুর একটি কেন্দ্র থাকে, যাকে বলে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসে প্রধানত থাকে প্রোটন আর নিউট্রন। এর বাইরে থাকে ইলেকট্রন। আমরা কোনো মৌলকে চিহ্নিত করি সেই মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা দিয়ে। প্রোটন সংখ্যাকেই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা বলে এবং এই সংখ্যা অনুসারেই পর্যায় সারণীতে মৌল সাজানো হয়।কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যদি একটি প্রোটন থাকে, তাহলে মৌলটির নাম হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেনের বেশিরভাগ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে শুধু একটি প্রোটন থাকে, কোনো নিউট্রন থাকে না। কিন্ত অল্প কিছু পরমাণুর (০.০১৪%) নিউক্লিয়াসে ১ টি নিউট্রন আর খুবই অল্পসংখ্যক পরমাণুর (৭ x ১০-১৬%) নিউক্লিয়াসে ২ টি নিউট্রন থাকে। এই দুটি ব্যতিক্রমী পরমাণুও হাইড্রোজেন মৌলেরই পরমাণু। শুধু পার্থক্য এদের ভর সংখ্যায়। উল্লেখ্য প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভর সংখ্যা বলে। এখানে এদের ভর সংখ্যা যথাক্রমে ১,২ ও ৩।

এখানে তিনটি ভিন্ন ভর সংখ্যা বিশিষ্ট পরমাণু প্রত্যেককে একে অপরের আইসোটোপ বলে। তিনটি পরমাণুই হাইড্রোজেনের আইসোটোপ। এদের মধ্যে ৩ ভর সংখ্যাবিশিষ্ট পরমাণুটি তেজস্ক্রিয় (অর্ধায়ু ১২.২৬ বছর)। যেহেতু হাইড্রোজেন নিজে একটি স্থিতিশীল মৌল, তাই গবেষণা করে এর কয়টি আইসোটোপ তা বের করা সম্ভব হয়েছে। হাইড্রোজেনের আরো দুটি আইসোটোপ 4Hআর7Hতৈরি করা হয়েছে ল্যাবে,এগুলো খুবই অস্থিতিশীল।অস্থিতিশীল বলে অন্য তিনটি আইসোটোপের মতো এদের প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না।

রসায়নে ভারী মৌল বলতে সেসব মৌলকে নির্দেশ করে, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ৯২ এর উপরে। প্রত্যেকটি ভারী মৌলই তেজস্ক্রিয়। এরা তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত করতে করতে ভেঙে এর চেয়ে হালকা অথবা ক্ষেত্রবিশেষে ভারী মৌলে পরিণত হয়। তেজস্ক্রিয় বলে এদের বেশিরভাগের অর্ধায়ু খুবই কম-১ সেকেন্ডের হাজার কোটি ভাগের একভাগ মাত্র। তাই এদের নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন। এদের মোট কয়টি আইসোটোপ রয়েছে,তা জানাও বেশ দুঃসাধ্য।

যখন ভারীকোনো মৌলের পরমাণু তৈরি করার চেষ্টা চালানো হয়, তখন ঐ পরমাণু তৈরি হয়েই হয়তোভেঙে এরচেয়ে হালকাকোনো মৌলের আইসোটোপে পরিণত হয়। যেহেতু এই হালকা পরমাণুও তেজস্ক্রিয় তথা অস্থিতিশীল, তাই একটা বড়রকম সম্ভাবনা থেকে যায়, যে আইসোটোপ এভাবে তৈরি হবে সেটি এর আগে কোনোদিন দেখা যায়নি। তখনআমাদের ঐ আইসোটোপকেও চিহ্নিত করতে হয়। যেটিএকইরকম কঠিন হবার কথা। কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে এরকম বড় সমস্যার মুখোমুখি হবার কারণেই মূলত মৌল আবিষ্কার এবং আবিষ্কারের স্বীকৃতি দিতে এতদিন লাগে। অবশ্য এ সমস্যার সমাধানকল্পে অধ্যাপক পল ক্যারল জানান, “ভবিষ্যতে আমরা আমাদের পদ্ধতি আরো উন্নত করতে চাই যেন আমরা প্রস্তুতকৃত মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা সরাসরি নির্ণয় করতে পারি।” এবারে মৌলগুলোর নাম কীভাবেদেয়া হলো,তা একটু খেয়াল করি।

১১৩ তম মৌল

১১৩ তম মৌলই প্রথম মৌল যেটি এশিয়ার কোনো দেশে আবিষ্কৃত হলো। এই মৌলের আবিষ্কার সম্পর্কেই সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া গেছে। আবিষ্কারকেরা এই মৌলের নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে নিহোনিয়াম(Nihonium)এবং Nhপ্রস্তাব করেছেন। Nihon-যে নাম অনুসারে এই মৌলের নাম দেয়া হয়েছে তা দিয়ে জাপানিজরা নিজের দেশকে নির্দেশ করে। ভারতীয়রাযেমন নিজের দেশকে হিন্দুস্তান বলে অনেকটা তেমন। নিহনের অর্থ হচ্ছে ‘সূর্যোদয়ের দেশ’। উল্লেখ্য,জাপানীরা নিজের দেশকে ডাকে মূলতনিপ্পনঅথবা নিহননামে। আগে এই দেশের নাম ছিল নিপ্পন কোকু বা নিহন কুকো স্টেট অব জাপান।আবিষ্কারকরা মৌলের আবিষ্কারস্থল জাপানের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য এমন নামকরণ করেন।

আবিষ্কারকরা তাদের আবিষ্কার তাদের পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী মাসাতাকা ওগাউয়াএবং তার ৪৩ তম মৌল আবিষ্কার ও নামকরণের প্রচেষ্টাকে উৎসর্গ করেছেন(নোট ১ দ্রষ্টব্য)।

রিকেন ইন্সটিটিউটেরবিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে বিসমাথ মৌলের একটি পাতলা আবরণকে আলোর বেগের ১০% বেগে গতিশীল জিংক আয়ন দিয়ে আঘাত করেন। তাত্ত্বিক নিয়ম অনুসারে এভাবে আঘাত করতে থাকলে মাঝে মাঝে ১১৩ তম মৌলের পরমাণু সৃষ্টি হওয়ার কথা। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে বিজ্ঞানীদের এই দল এই আঘাতের মাধ্যমে১০৫ তম মৌল ডুবনিয়াম-২৬২এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করেন।এটি ১১৩ তম মৌলের পরমাণু ক্ষয় হয়ে সৃষ্টি হবার কথা। কিন্ত তারপরেও এই আইসোটোপের অস্তিত্ব১১৩ তম মৌলের পরমাণু সৃষ্টি হয়েছে তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

গবেষক দলপরবর্তীতে একটি নতুন পরীক্ষা চালান।কুরিয়াম মৌলের টার্গেটে সোডিয়াম আয়নের বিম দিয়ে আঘাত করেন। ফলে বোরিয়াম-২৬৬ আইসোটোপ তৈরি হয় যা থেকে ডুবনিয়াম- ২৬২ সৃষ্টি হয়। এই পর্যবেক্ষণ ১১৩ তম মৌলের পরমাণু তৈরি হবার ঘটনাকে শক্তভাবে সমর্থন করে। গবেষকরা এরপর অপেক্ষা করতে থাকেন কখন এদের মধ্যে একটি পরমাণু স্বতঃস্ফূর্ত ভাঙ্গনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে আলফা চেইনের মাধ্যমে ক্ষয়ে যাবে। ২০১২ সালে এই গবেষকরা তথ্য-উপাত্ত থেকে এরূপ ক্ষয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। এরপর IUPAC আরো চার বছর ধরে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে,এই পর্যবেক্ষণ ১১৩ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

এরপরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যৌথ সংস্থা ১১৩ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়।

১১৫ তম মৌল

এই মৌলের নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে মস্কোভিয়াম(Moscovium) এবং Mc প্রস্তাব করা হয়েছে। IUPACথেকে জানানো হয়,মস্কোভিয়াম নাম রাশিয়ার প্রাচীন রাজধানী মস্কো শহরের প্রতি সম্মানদেখিয়ে সুপারিশ করা

হয়েছে। এই শহরের দুবনাশহরে অবস্থিতজয়েন্টইন্সটিটিউটঅবনিউক্লিয়াররিসার্চ এবং ফ্লেরভ ল্যাবরেটরি অব নিউক্লিয়ার রিয়েকশনের যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগার ব্যবহার করে ১১৫ তম মৌল আবিষ্কারের পরীক্ষাগুলো চালানো হয়। মজার ব্যাপার হলো স্কটল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষের পদবিশুরু হয় Mcদিয়ে। সে হিসেবে মৌলটি অনেকটা রাশিয়ান-স্কটিশ মৌল।

২০০৪ এর২ ফেব্রুয়ারিতে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, রাশিয়া ও আমেরিকার তিনটিল্যাবের সমন্বিত দলরাশিয়ার দুবনাতে ২০০৩ সালে আমেরিকিয়াম-২৪৩ আইসোটোপকে ক্যালসিয়াম-৪৮আয়ন দিয়ে আঘাত করে মৌল ১১৫ তম মৌলের চারটি পরমাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই চারটি পরমাণুই ১০০ মিলি-সেকেন্ডের মাঝে আলফা কণা নির্গমন করেবর্তমান ১১৩ তম মৌলনিহোনিয়ামের পরমাণুতে পরিণত হয়। কিন্ত যেহেতু তখন পর্যন্ত ১১৩ বা ১১৫ তম মৌলেরকোনোটিই আবিষ্কৃত হয়নি, তাই ১১৫ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীরা এই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার সর্বশেষ উৎপাদ ডুবনিয়াম-২৬৮আইসোটোপ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জুন ২০০৪ ও ডিসেম্বর ২০০৫ এর দুটি পরীক্ষায় ডুবনিয়াম-২৬৮ আইসোটোপের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়। এ থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেনতাদের প্রথম পরীক্ষায় ১১৫ তম মৌলেরপরমাণু উৎপন্ন হয়েছিল।

অথচ২০১১ সালে IUPAC ও IUPAP-র যৌথ দল ঘোষণাদেয়দুবনারপরীক্ষানিরীক্ষায়প্রাপ্তফলাফল১১৫তমমৌলেরঅস্তিত্বপ্রমাণেরজন্যযথেষ্টনয়।এরপরঅন্যএকটিপরীক্ষারমাধ্যমেদুবনারগবেষকদলথেকেআবারো১১৫তমমৌলেরআবিষ্কারেরদাবিজানায়।আবার২০১৩সালেরআগস্টমাসে লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ওআরেকটি প্রতিষ্ঠানের একটিদলঘোষণাকরেতারাদুবনাতেতেপরিচালিত২০০৪সালেরপরীক্ষাটিচালিয়েএকইরকমফলাফলপেয়েছেন। দুবনার২০০৪সালেরআবিষ্কারেরদাবিটিসঠিকছিল।এরপর২০১৫সালেক্যালিফোর্নিয়াবিশ্ববিদ্যালয়েরএকটিদলওসফলভাবে এইপরীক্ষাটিচালাতেসমর্থহয়।অবশেষে২০১৫সালেরডিসেম্বরেIUPAC/IUPAP এর যৌথ দল১১৫ তম মৌলেরঅস্তিত্বপ্রমাণিতহয়েছেবলেঘোষণাদেয়।

১১৭ তম মৌল

এর নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে টেনেসিন(Tennessine)এবং Tsপ্রস্তাবিত হয়েছে। IUPACথেকে জানানো হয়, এই নাম আমেরিকার টেনেসিরাজ্যের প্রতি। এখানেঅতিভারীমৌল, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ১০০ এর উপরে, তাদের নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। তাই ঐ রাজ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে এই নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। উল্লেখ্য,এই রাজ্যেই ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, ভেন্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি এবং টেনেসি ইউনিভার্সিটি অবস্থিত। ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে টার্গেট করে স্বতন্ত্র এক্টিনাইডউৎপাদন এবং

রাসয়নিকভাবে পৃথকীকরণ করা হয়।এবং উৎপন্ন এক্টিনয়েড ধাতু ৯টি অতিভারীমৌল আবিষ্কার এবং অস্তিত্ব নিশ্চিতকরণে ব্যবহৃত হয়েছে।

উল্লেখ্য,রসায়নে Tosylগ্রুপকে সংক্ষেপে Tsদিয়ে শনাক্ত করা হয়। ফলে ১১৭ তম মৌল ও এই গ্রুপের জন্য একই প্রতীক ব্যবহারে জটিলতা সৃষ্টির আশংকা উত্থাপিত হয়। কিন্ত IUPACএই আশঙ্কাকে গ্রহণযোগ্য আপত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেয়নি। কারণ বহুদিন ধরে কোনো জটিলতা ছাড়াই Acদিয়ে একইসাথে এক্টিনিয়ামমৌল এবং Acylগ্রুপআর Prদিয়ে একইসাথে প্যারাসেডিমিয়াম এবং প্রোপিলগ্রুপকে নির্দেশ করা হচ্ছেকোনোরূপ সমস্যা ছাড়াই। তাই Tsনিয়ে Tosyl গ্রুপ আর টেনেসিনের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারপরেও বলা হয়,প্রতীক হিসেবে হয়তোTnকে প্রস্তাব করা যেত,কিন্তু যেহেতু আগে থেকেই রেডন-২২০আইসোটোপের জন্য Tnপ্রতীক ব্যবহৃত হয়ে আসছেতাই শেষমেশ Tsপ্রতীকই প্রস্তাবিত হয়েছে।

২০০৯ সালে ১১৭ তম মৌল আবিষ্কারের প্রচেষ্টা হিসেবে বারকেলিয়াম-২৪৯ এর আইসোটোপকে ক্যালসিয়াম-৪৮ আয়ন দিয়ে আঘাত করা হয়। ২০১০ সালে ফ্লেরভ ল্যাবরেটরি অব নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশনের বিজ্ঞানীরা অভ্যন্তরীণভাবে ঘোষণা দেন,তারা একটি নতুন মৌলের ক্ষয় হবার প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছেন। এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্ত অধিক বিশ্লেষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরলরেন্সলিভারমোরন্যাশনালল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ঐ বছর ৯-ই আগস্ট ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার জার্নালের একটি অফিসিয়াল রিপোর্টে আনআনসেপ্টিয়ামমৌলের ২৯৩ ও ২৯৪ ভরসংখ্যাবিশিষ্ট দুইটি আইসোটোপকে শনাক্তকরণের কথা উল্লেখ করা হয়।

যেহেতু ১১৭ তম মৌলের পরমাণু ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যেসব আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়, তাদের কোনোটিই আগে থেকে পরিচিত ছিল না, তাই এই গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্ত দিয়ে ১১৭ তম আবিষ্কারের দাবি জানানো যায়নি। ২০১১ সালে ১১৭ তমমৌলের একটি অপত্য আইসোটোপমস্কোভিয়ামসরাসরি তৈরি করা হয়। ২০১২ সালে দুবনা দল আগের পরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ১১৭ তম মৌলের সাতটি পরমাণু উৎপাদন করে। এবারের উপাত্ত নিয়ে দুবনা গবেষক দল নতুন মৌল আবিষ্কারের দাবি জানায়। আবার ২০১৪ সালে জার্মান ও আমেরিকান বিজ্ঞানীদের সমন্বিত একটি দল দুবনা টিমেরপরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ১১৭ তম মৌলের দুটি ২৯৪ ভর সংখ্যাবিশিষ্ট আইসোটোপ তৈরি করে এবং দুবনা টিমের দাবিকে সমর্থন জানায়।

অবশেষে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেIUPAC ও IUPAP-রযৌথ দল ১১৭ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে টেনেসিকে সম্মানিত করা হলো পর্যায় সারণীতে। এর আগে ১৯৫০ সালে আবিষ্কৃত ৯৮ তম মৌলের নাম ক্যালিফোর্নিয়াম (Cf) রাখা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সম্মানে।

১১৮ তম মৌল

এর নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে ওগানেসন(Oganesson)এবং Ogপ্রস্তাব করা হয়েছে। IUPACজানায়,রাশিয়ান পরমাণু বিজ্ঞানী Yuri Tsolakovich Oganessian(1933-) এর ট্রান্স-এক্টিনয়েড মৌলসমূহের গবেষণায়অগ্রগামী অবদানরাখার সম্মানে তার নামে এই মৌলের নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। প্রথিতযশা এই বিজ্ঞানী নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি মস্কোভিয়াম,টেনেসিয়াম এবং ওগানেসন আবিষ্কারকারী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

নেচার সাময়িকীর রিচার্ড নুর্ডেনের বলেন,এই নামকরণের মাধ্যমে IUPAC-এর ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতোকোনো জীবিত বিজ্ঞানীর নামে নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নাম প্রস্তাবিত হলো। প্রথমবার ১৯৯৩ সালে লরেন্স বারকেলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের একটি দল ১০৬ তম মৌলের জন্য সীবর্জিয়াম নামটি, তখন পর্যন্ত জীবিত আমেরিকান নোবেল বিজয়ী রসায়নবিদ গ্লেন সীবর্গ(১৯১২-১৯৯৯)এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রস্তাব করে। এ প্রস্তাবনা সে সময় প্রচুর বিতর্কের জন্ম দেয়।তখনকার IUPACকমিটি এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এবং সিদ্ধান্ত পাশ করে যে কোনো জীবিত বিজ্ঞানীর নামে কোনো নব-আবিষ্কৃত মৌলের নাম দেয়া যাবে না। কিন্ত১৯৯৭ সালে IUPAC ১০৬ তম মৌলের জন্য সীবর্জিয়াম(Sg)নামটি গ্রহণ করে।

এছাড়া অবশ্য গল্প প্রচলিত আছে আইনস্টাইনজানতেন একটি মৌল তার নামেনামকরণ করা হবে। ৯৯ তম মৌল আইনস্টাইনিয়াম(Es) এর নাম দেবার আগেঅবশ্য (১৯৫৭) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৯৮ সালের শেষের দিকে পোলিশ পদার্থবিদ Robert Smolańczuk এর প্রকাশিত হিসাব নিকাশে অনুমান করা হয়, সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ক্রিপটন মৌলের পরমাণুর সাথে সীসার পরমাণুর ফিউশনের মাধ্যমে ১১৮ তম মৌল আনআনঅক্টিয়াম প্রস্তুত করা সম্ভব। ১৯৯৯ সালে লরেন্স বারকেলি ন্যাশনাল ল্যাবরটরিরগবেষকরা এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গবেষণা করেন এবং ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার জার্নালে প্রকাশিত একটি পেপারে লিভারমোরিয়াম এবং ১১৮ তম মৌল আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী তারা ক্রিপটন-৮৬পরমাণুর সাথে লেড-২০৮ পরমাণুর ফিউশনের মাধ্যমে আনআনঅক্টিয়াম-২৯৪ পরমাণু প্রস্তুত করতে সমর্থ হন। তাদের গবেষণার ফলাফল সে বছরই সায়েন্স জার্নালে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

কিন্ত২০০০ সালে এই গবেষকরা ১৯৯৯ সালের রিপোর্ট প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ আগের রিপোর্ট প্রকাশের পরে অন্য ল্যাবের গবেষকদের পাশাপাশি বারকেলি ল্যাবের বিজ্ঞানীরা নিজেরাও আগের পরীক্ষা পরিচালনা করে একই ফলাফল লাভে অর্থাৎ ১১৮ তম মৌল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পরে ২০০২ সালে

এই ল্যাবের প্রধান জানান, ১৯৯৯ সালের ঐ নিবন্ধের প্রধান লেখক ভিক্টর নিনভ মূল তথ্যে বড়রকমের জালিয়াতি করেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটিযুক্ত তথ্য থেকে ল্যাবের গবেষকরা ১১৮ তম মৌল উৎপাদনের ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

২০০২ সালে বিজ্ঞানীদেরসমন্বিত দল রাশিয়ার দুবনাতে ১১৮ তম মৌলের পরমাণুর প্রথম ক্ষয় পর্যবেক্ষণ করেন। এই দলের প্রধান ছিলেন রাশিয়ান পরমাণু বিজ্ঞানী ইউরি ওগানেসিয়ান।২০০৬ সালের অক্টোবরে এইগবেষ দল ঘোষণা করে, ক্যালিফোর্নিয়াম-২৪৯ পরমাণুর সাথে ক্যালসিয়াম-৪৮ আয়নের সংঘর্ষে মোট তিনটি (অথবা ৪টি) আনআনঅক্টিয়াম-২৯৪ পরমাণুর উৎপাদন পরোক্ষভাবে শনাক্ত করেছেন। ২০০২ সালে ১টি বা ২টি এবং ২০০৫ সালে আরো ২টি। ২০১১ সালে IUPAC ও IUPAP এর যৌথ দলপ্রথমে দুবনা-লিভারমোর এর সমন্বিত দলের ২০০৬ সালে করা গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে রায় দেয় যেহেতু এখানে ১১৮ তম মৌলের ক্ষয়ের ফলে প্রাপ্ত কোনো আইসোটোপই পরিচিত নয় তাই দলটির ১১৮ তম মৌল আবিষ্কারের দাবির শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্ত এরপরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেযৌথ কমিটি ২০০৬ সালের গবেষণায় ১১৮ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়।কারণ ততদিনে ১১৮ তম মৌলের ক্ষয়ের ফলে প্রাপ্ত আইসোটোপগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গিয়েছিল। ১১৮ তম মৌলের নামকরণের জন্য বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট ঘিয়োর্সো, বিজ্ঞানী জর্জি ফ্লিয়োরভ এবং মস্কো শহরের নাম বিবেচনা করা হলেও শেষপর্যন্ত বিজ্ঞানী ইউরি ওগানেসিয়ানেরনামানুসারেই মৌলটির নাম প্রস্তাবিত হয়।

যদিও এই চারটি মৌলের স্বীকৃতির সাথে সাথে আমাদের পর্যায়সারণী কার্যত পূরণ হয়ে গেছে, কিন্ত অদূর ভবিষ্যতে রসায়নবিদদের লালিত এই সারণী নিয়ে গবেষণা শেষ হবার কোনোরকম সম্ভাবনা দেখা যায়নি। জাপানের রিকেন কোলাবোরেশন টিম এখন ১১৯ তম মৌল ও তারচেয়ে ভারী মৌলসমূহের অপ্রদর্শিত অঞ্চল (Uncharted Territory)অনুসন্ধানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাই আশা করা যায়কিছুদিন পরেই হয়তোপর্যায় সারণী নিয়ে এরকম কোনো চমকপ্রদ আবিষ্কারের খবর শোনা যাবে।

untitled-4
চিত্রঃ পূর্ণতা পাচ্ছে পর্যায় সারণী।

নোট ১:

৪৩ তম মৌলটেকনেশিয়াম(Tc) পর্যায় সারণীর সবচেয়ে হালকা মৌল যার সকল আইসোটোপ তেজস্ক্রিয় এবং অস্থিতিশীল। এটি এমন দুইটি মৌলের একটি,যাদের পরবর্তী মৌলের স্থিতিশীল আইসোটোপ রয়েছে।বহু বিজ্ঞানীপর্যায় সারণী প্রকাশের আগে ও পরে৪৩ নাম্বার মৌল আবিষ্কার ও নামকরণের জন্য ব্যগ্র হয়ে ছিলেন। কারণ এই মৌলের সারণীতে অবস্থান থেকে বুঝা যায় তখন পর্যন্ত অন্যান্য অনাবিষ্কৃত মৌলের তুলনায় এই মৌল আবিষ্কার সহজ হবার কথা।

বিজ্ঞানীদের আকুল প্রচেষ্টার কারণে বেশ কিছু ভুল দাবি উত্থাপিত হয়,যেখানে বিজ্ঞানীরা অন্য কোনো মৌলকে ভুল করে ৪৩ নাম্বার মৌল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নামও দিয়ে ফেলেছেন। জাপানী বিজ্ঞানী মাসাতাকা ওগাওয়াও তাদের অন্যতম।তিনি ১৯০৮ সালে ঘোষণা দেন, তিনি ৪৩ তম মৌল আবিষ্কার করেছেন। আবিষ্কৃত মৌলের নাম দেন নিপ্পনিয়াম, প্রতীকNp। এই প্রতীক পরবর্তীতে নেপচুনিয়ামের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্ত তার আবিষ্কার বিশ্লেষণ করে পরবর্তীতে ৭৫ তম মৌল রেনিয়াম(Re) এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও৪৩ তম মৌলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নতুন১১৩ তম মৌলের আবিষ্কারকেরা ওগাওয়ার একটি মৌলের নাম মাতৃভূমি জাপানের নামে দেয়ার এই প্রচেষ্টাকেই স্মরণ করেছেন।

তথ্যসূত্র

১.https://www.youtube.com/watch?v=wswa0NuBbMw#t=294.381

২.http://www.iflscience.com/chemistry/periodic-tables-7th-row-completed-discovery-four-new-elements/

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernicium

৪.http://iupac.org/cms/wp-content/uploads/2016/06/names-and-symbols-of-elements.pdf

৫.http://iupac.org/recommendation/names-and-symbols-of-the-elements-with-atomic-numbers-113-115-117-and-118/

৬.http://www.rsc.org/chemistryworld/2016/06/iupac-announces-proposed-new-element-names

৭.http://edition.cnn.com/2016/06/08/health/periodic-table-new-elements-names/

৮.http://www.sciencealert.com/the-4-newest-elements-on-the-periodic-table-have-just-been-named

৯.https://en.wikipedia.org/wiki/Yuri_Oganessian

১০. https://en.wikipedia.org/wiki/IUPAC/IUPAP_Joint_Working_Party

১১.http://iupac.org/discovery-and-assignment-of-elements-with-atomic-numbers-113-115-117-and-118/

১২.https://en.wikipedia.org/wiki/Cadmus

১৩. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_chemical_element_name_etymologies

১৪.http://www.sciencealert.com/four-elements-have-just-earned-a-permanent-spot-in-the-periodic-table

১৫.https://en.wikipedia.org/wiki/Livermorium

১৬.https://en.wikipedia.org/wiki/Hydrogen

১৭.https://en.wikipedia.org/wiki/Technetium

১৮.https://en.wikipedia.org/wiki/Rhenium

১৯.https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_scientists_whose_names_are_used_in_chemical_element_names

২০.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununpentium

২১.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununseptium

২২.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununoctium

২৩.https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_places_used_in_the_names_of_chemical_elements

২৪.https://en.wikipedia.org/wiki/Seaborgium

২৫.https://en.wikipedia.org/wiki/Glenn_T._Seaborg

২৬.https://en.wikipedia.org/wiki/Einsteinium

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট। পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম

ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক। উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে। তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট। পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম

ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক। উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে। তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide