পৃথিবীর আদি রঙ ছিল গোলাপি

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে
প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে–

জীবনানন্দ দাশ সাগরের নীলে প্রেম খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু জীবনানন্দ কেন, এমন শত কবি সহস্রবার যে নীলে উদাস হয়েছেন… সে নীলে আমরাও হারিয়েছি। আকাশ আর সাগরময় পৃথিবী নীল হয়েছে এ দুইয়ে। কিন্তু এই নীলই কি আদি রঙ? পুরোটা অতীত কি নীল পৃথিবীরই?

প্রাগৈতিহাসিক সাগরও কি নীল ছিল? বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রাচীন সাগর ছিল গোলাপী রঙের। সে হিসেবে গোলাপী হবে মানুষের জানা পৃথিবীর সবচেয়ে আদি রঙ। নীল পৃথিবী আজ গোলাপি পৃথিবীর ভবিষ্যত।

গবেষকরা এই গোলাপি রঙের হদিস পেয়েছেন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায়, সাহারা মরুভূমিতে ব্যাকটেরিয়ায় ফসিলে। প্রাপ্ত ফসিল সায়ানোব্যাকটেরিয়ার, মনে করা হচ্ছে এরা ৬৫০ মিলিয়ন বছর আগের। এরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে বেঁচে থাকত। দীর্ঘসময় ধরে সায়ানোব্যাকটেরিয়া পৃথিবীর সাগরে সাগরে রাজত্ব করেছে। সায়ানোব্যাকটেরিয়া বরং শৈবালের থেকেও আদিম। বিবর্তনীয় ধারায় জীবনের বিকাশে সায়ানোব্যাকটেরিয়া আদি উৎসদের মধ্যে অন্যতম। বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রেও যত বিবর্তনীয় ইতিহাস ধরে পিছনে যাওয়া যাবে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কাছে পৌঁছে যেতে হবে। এ সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে এবছরের ৯ই জুলাই।

এই অণুজীবদের গোলাপি হওয়ার পেছনের কারণ কী? অন্য রঙ না হয়ে গোলাপিই কেন হল। ফসিল অবস্থায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়ার ভেতর ক্লোরোফিলকে পাওয়া যাচ্ছে গাঢ় লাল এবং বেগুনি রঙে, অধিক ঘনমাত্রার দশায়। অর্থাৎ, যখন মাটি পানির সাথে মিশে এর ঘনমাত্রা কমে যাবে তখন এটি গোলাপি রঙ দিবে পানিতে। অর্থাৎ, উপসংহার টেনে বললে সাগরের ক্ষেত্রেও রঙের প্রভাব তাই হওয়ার কথা।

ক্লোরোফিল বলতেই সবুজ রঙ মাথায় খেলে যায়। কিন্তু ক্লোরোফিল আজকের জীবজগতের শক্তি উৎপাদনের অস্ত্র, আদিম পৃথিবীর প্রাণ এত উন্নত ছিল না, শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থাও এতটা দক্ষ ছিল না। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার পূর্বে ছিল বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব। অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণ তখনকার জন্য বহুদূরের গল্প, পৃথিবী তখন আচ্ছন্ন সালফারময় পরিবেশে। এজাতীয় ব্যাকটেরিয়ার কাজ ছিল ইলেকট্রন আলাদা করে ফেলা। এদের ছিল বেগুনী কণিকা যা সবুজ আলো শোষণ করত এবং লাল ও নীল রঙের আলো ছেড়ে দিত।

৪,৪০০ গুণ বিবর্ধিত বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া। স্বাদু এবং নোনা উভয় জলাশয়েই এদের অস্তিত্ব ছিল; Image Credit: Dennis Kunkel /Science Photo Library

অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষণে সায়ানোব্যাকটেরিয়া একেবারেই আদি, শুরুটা হয় বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার পরিত্যক্ত শক্তি ব্যবহার করে। বেগুনী সালফার ব্যাকটেরিয়ার ত্যাগ করা লাল এবং বেগুনী রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের শক্তি কাজে লাগাত আদি সায়ানোব্যাকটেরিয়া। প্রাচীন ক্লোরোফিলের উপর ব্যাকটেরিয়ার ফসিল সম্পর্কিত গবেষণা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

৬৫ কোটি বছরের ব্যবধানে যখন আমরা সায়ানোব্যাকটেরিয়ার কথা চিন্তা করছি, তাদের চেহারা একই রকম হওয়ার কথা নয়। ; Image Credit: River Dell High School | Slideplayer.com

এই প্রাচীন ক্লোরোফিল ধরা পড়ার জন্য উপযুক্ত ঘটনারও তো দরকার রয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন এই নমুনা সম্ভবত কোনো কারণে দ্রুত সাগরগর্ভে চাপা পড়ে যায়। এজন্য অক্সিজেনমুক্ত পরিবেশের দরকার ছিল। আর একবার চাপা পড়ার পর অণুজীবেরা একে ফসিলে পরিণত করেছে, ফলে এরা স্থবির হয়ে রয়ে গেছে তাদের চাপা পড়া স্থানেই।

 

— HowStuffWorks অবলম্বনে।

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

পৃথিবীর ভূত্বকের নাইট্রোজেন রহস্য

পৃথিবীর বায়ুমন্ডল নাইট্রোজেনের সাগর, সে নাইট্রোজেনের সাগরে মিশে আছে যেন অক্সিজেনের শরবত। নাইট্রোজেনের পরিমাণের ব্যাপারে আপনার আন্দাজ ভূপাতিত হতে পারে যখন ভূত্বকে নাইট্রোজেনের রাজত্ব কতটুকু তা খুঁজতে যাবেন। ভূত্বকের প্রায় অর্ধেক (৪৬%) অক্সিজেন, আর দ্বিতীয় প্রাচুর্য সিলিকনের(২৮%)। ভূত্বকে প্রাচুর্যতার দিক থেকে নাইট্রোজেনের ক্রম হয়েছে ৩০টি মৌলের পরে ০.০০২% হারের উপস্থিতিতে

বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন ভূত্বকে পাওয়া নাইট্রোজেন এসেছে বায়ুমণ্ডল থেকেই। অণুজীবের মাধ্যমে অথবা বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু থেকে ভূমিতে সংবন্ধন ঘটেছে। কিন্তু নতুন গবেষণা উঁকি দিয়ে বলছে আরো নব্য কোনো প্রধান উৎস থাকতে পারে এই উপাদানটির। মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। ভূত্বকে থাকা নাইট্রোজেনের এক চতুর্থাংশ আসে ভূমন্ডলের পাথুরে স্তরে থেকে। এ বিষয়ক গবেষণাপত্র বেরিয়েছে সায়েন্স জার্নালে। পুরো গবেষণাপত্র পড়ুন এখানে

কিছু বিক্ষিপ্ত গবেষণা ছাড়া গবেষক সমাজ ভূগর্ভস্থ পাথরকে নাইট্রোজেনের উৎস হিসেবে দেখেনি বলে মত দেন এই গবেষণাপত্রের লেখক বেঞ্জামিন হোল্টন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের একজন বৈশ্বিক পরিবেশবিদ। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর নাইট্রোজেন চক্রের প্রক্রিয়ায়; এটি বিশ্বের জলবায়ু মডেলেও প্রভাব রাখতে পারে। যেহেতু নাইট্রোজেনের উৎস সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য এর দায় রয়েছে— সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বের করতে পারব কোথায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি দ্রুত হবে পূর্বানুমানের চেয়ে। আর উদ্ভিদের অধিক বৃদ্ধি তো সম্পূরকভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের রাস্তা দেখিয়ে দিবেই।

যেহেতু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, তাই কী পরিমাণ তাপ কার্বন ডাই অক্সাইডের ফাঁদে আটকা পড়ছে তার খতিয়ান রাখা ক্রমশ গুরুতর ব্যাপার হয়ে উঠছে। তাপ আটকে থাকার বৃদ্ধির সঠিক হিসেব এখনো অনিশ্চিত, তাই বলে এর প্রতিকার প্রচেষ্টায় বসে থাকা যায় না। নতুন তথ্য কাজে লাগিয়ে কার্বন দূষণ প্রশমন করা সম্ভব।

কী পরিমাণ নাইট্রোজেন ভূত্বকের গভীরে পলির মধ্যে রয়েছে এবং কতখানি আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হচ্ছে তার মধ্যকার ভারসাম্য নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো পরীক্ষা করেছে। ‘৭০ এর দশকের শুরুতে করা কিছু গবেষণা বলছে এ ধরণের পাললিক শিলায় নাইট্রোজেন থাকার কারণ হবে মৃত গাছপালা, শৈবাল এবং প্রাচীন সমুদ্রতলে জমা প্রাণীদেহ। বেশকিছু গবেষণাপত্র বলছে নাইট্রোজেন এসকল জীবদেহ মিশ্রণে তৈরি উৎস থেকে পরিস্রুত হয়ে মাটিতে এসকল জায়গায় পাওয়া যাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ ধরনের আবিষ্কারে নজর দেননি, আর পাললিক শিলা নিঃসৃত নাইট্রোজেনের পরিমাণ যথেষ্ঠ তাৎপরযপূর্ণ মনে করা হয়নি পূর্বে। ফলে আমরা নাইট্রোজেন চক্র যেভাবে ঘটে থাকে বলে বর্ণনা করি সে বর্ণনায় আমাদের ভুল করে গুরুত্ব না দেয়া ব্যাপার অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। পাললিক শিলার নাইট্রোজেন নিঃসরণ আমাদের বর্ণনা করা নাইট্রোজেন চক্রে বিবেচনাই করা হয়নি।

রেডউড বৃক্ষের বনভূমি বেড়ে ওঠে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটিতে যে কারণে এরা এত দীর্ঘ আর অতিকায় হয়ে উঠতে পারে; source: Bob Pool, Getty Images

হোল্টন এবং তার সহকর্মীরা ২০১১তে একটি গবেষণা করেছিলেন দুই ধরনের বনভূমির মাটি তুলনা করে— পাললিক শিলার উপর বেড়ে ওঠা বনভূমির মাটির সাথে আগ্নেয় শিলার উপর গড়ে ওঠা বনভূমির মাটি। দেখা যায় প্রথমটির মাটির ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের পরিমাণ দ্বিতীয়টির দেড়গুণ! ৫০ শতাংশ বেশি! গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় নেচার জার্নালে। আগ্নেয় শিলা সমৃদ্ধ স্তর আগ্নেয়গিরি সুলভ ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের ইঙ্গিত করে। আবার ঐ একই ধরনের বনভূমির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ দেহে পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ বেশি নাইট্রোজেন। যদিও স্বাভাবিকভাবে এমনটাই হওয়ার কথা যে বনের মাটিতে নাইট্রোজেন বেশি সে বনের উদ্ভিদও তো একটু বেশিই শোষণ করবে, তবুও এ গবেষণা খুব একটা সাড়া ফেলে নি বিশ্বব্যাপী।

তাদের নতুন গবেষণায়, তারা ক্যালিফোর্নিয়াকে ভূতাত্ত্বিক সিস্টেমের মডেল ধরে কাজ করেছে। কারণ, এই অঙ্গরাজ্যের ভূমন্ডল পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় সব ধরণের শিলা ধারণ করে। তারা ক্যালিফোর্নিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশের ১০০০টি স্থানের মাটির নাইট্রোজেনের মাত্রা পরিমাপ করে। এরপর একটি কম্পিউটার মডেল দাঁড় করায় কত দ্রুত পৃথিবীর ভূত্বক থেকে নাইট্রোজেন নিঃসৃত হচ্ছে।

এই নাইট্রোজেন নিঃসরণের প্রক্রিয়া চলতে চলতে অবশেষে নাইট্রেজেনের পরিণতি হয় সাগরে, যেখানে সাগরের তলদেশে পাথরে চাপা পড়ে জমতে থাকে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে এ পাথরসমূহের স্থানচ্যুতি হয় উপরের দিকে। পরিবর্তনের ফল হিসেবে ভেঙে যায় এবং নাইট্রোজেন নিঃসরণ করে। এই নাইট্রোজেনই উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের মাধ্যমে গৃহীত হয়। পরিবেশীয় প্রক্রিয়ায় এই জীবদেহ থেকে পুনরায় পাথরে ফিরে এসে তৈরি করে নাইট্রোজেন চক্র। এ নিঃসরণের ঘটনা সমুদ্রতলের পাথর থেকে ব্যতীত পর্বতময় এলাকায়ও ঘটতে পারে রাসায়নিক বিগলনের কারণে। যেমন, এসিড বৃষ্টি হলে পাথরে থাকা বিভিন্ন উপাদানের সাথে এসিডের বিক্রিয়া ঘটে থাকে। তখন বিক্রিয়ায় ক্ষয়ের কারণে পাথরের ভৌত পরিবর্তনও নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির একজন জীবভূরসায়নবিদ (biogeochemist) উইলিয়াম শ্লেশিঙ্গার,  যিনি কিনা হোল্টনের গবেষণার সাথে যুক্ত নন, তিনি ভূত্বকের পাথরসমূহের মধ্যে উপস্থিত নাইট্রোজেন পরিমাপ করেছিলেন। কিন্তু প্রসঙ্গত, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারেন নি। যতটা থাকার কথা আর পরিমাপে পাওয়া পরিমাণের মধ্যকার সম্পর্কের সমাধান মেলেনি তার কাছে। তাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার পরীক্ষিত নমুনা হয়ত অন্যান্য তথ্যের সাপেক্ষে আদর্শ ছিল না। হোল্টনের গবেষণার ব্যাপারে তিনি মনে করেন তার কাজ আরো বৈশ্বিক মডেলে করা প্রয়োজন। আবার এটি আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে বদলে দেয়ার ব্যাপারে শ্লেশিঙ্গার দ্বিমত পোষণ করেন।

তবে যাই হোক, নতুন কারণ সম্বলিত তথ্য আমাদের ঠিকই ব্যাখ্যা করে মাটিতে নাইট্রোজের পরিমাণের রহস্য। আমাদের পূর্বে জানা কারণ দিয়ে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন থাকার কথা ছিল তার চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বেশি। নিঃসন্দেহে এ আবিষ্কার সেই জানার ফোঁকড়কে হ্রাস করে। নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ বন যেগুলো কানাডা এবং রাশিয়ায় অবস্থিত পাললিক শিলার গঠনের উপর বিস্তৃত সেসব এলাকার জন্য বেশ ফলপ্রসু কাজ এটি।

হোল্টন ভূগর্ভস্থ খনন শিল্পবিপ্লব ও আধুনিকায়নের প্রভাবে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর ফলে নাইট্রোজেন নিঃসরণের পরিমাপ হোল্টনের দল বিবেচনায় আনে নি। বরং রক্ষণশীলভাবে পরিমাপ করার কথা মাথায় রেখে গবেষণা কাজটি করা হয়েছে। এ গবেষণায় পরিবেশ সংরক্ষণে আরেকটি সতর্কতা হয়ত যুক্ত হল।

 

— সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

প্রকৃতিতে কেন ষড়ভুজের ছড়াছড়ি

মৌমাছির বাসা বা মধুর চাককে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাহলে সেখানে স্তরে স্তরে সজ্জিত ষড়ভুজের সজ্জা পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য তারা যে ঘর বানায় তার স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ষড়ভুজ আকৃতির প্রত্যেকটি খোপের দেয়ালের কৌণিক ঢাল সমান। খোপ ও দেয়ালের পুরুত্বও একদম ঠিকঠিক বাহুল্যবর্জিত হতে থাকে।

ষড়ভুজাকার খোপগুলো এমনভাবে হেলে থাকে যেন তরল মধুর সামান্য অংশও নিচে না পড়ে। সবগুলো খোপ একই আকারের একই আকৃতির। কোনোটার কম-বেশ হয় না। পুরো বাসাটা আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থান করে।

এমন নিয়মতান্ত্রিক গঠন কেন? আর মৌমাছিরা কীভাবেই বা এরকম স্থাপত্য তৈরি করে? দুই একটা বাসায় যদি এরকম সজ্জা পাওয়া যেত তাহলে কোনো একটা কিছু দিয়ে চালিয়ে দেয়া সম্ভব হতো, কিন্তু মৌমাছির প্রতিটি বাসাতেই এরকম সজ্জার উপস্থিতি থাকে। তার উপর একটি বাসায় শত শত মৌমাছি কাজ করে।

বারোয়ারী সদস্যের কাজে বেমিল ও হেরফের হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো এক কারণে মৌমাছির বাসাগুলোতে চমৎকার নিয়মতান্ত্রিকতা দেখা যায়। এরকম নিয়মতান্ত্রিকতার উপস্থিতির কারণে একে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

গ্রিক দার্শনিক পাপাস মনে করতেন, মৌমাছিরা স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা এরকম স্থাপত্য তৈরি করতে পারে। উইলিয়াম কার্বি নামে একজন ব্যক্তি ১৮৫২ সালে বলেছিলেন, মৌমাছিরা হচ্ছে ‘স্বর্গ থেকে তৈরিকৃত গণিতবিদ’।

কিন্তু প্রকৃতিবিদ চার্লস রবার্ট ডারউইন এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি মৌমাছিদের এমন ক্ষমতার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। এর জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছিলেন। পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলেন মৌমাছিদের এই ক্ষমতা আসলে বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত।

হতে পারে শুরুতে নিখুঁত এবং অ-নিখুঁত সকল প্রকার মৌচাকই ছিল। অ-নিখুঁত বাসার ক্ষেত্রে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সমান্তরাল না থাকার কারণে হয়তো ভালোভাবেটিকে থাকার উপযোগ কম পেয়েছে। কিংবা খোপগুলো সুষম ষড়ভুজ না হবার কারণে বা ছোট-বড় হবার কারণে সঠিকভাবে হেলানো না থাকার কারণে ভেতরে মধু আটকে থাকতে পারেনি।

মধু সাধারণত তার পৃষ্ঠটান ও সান্দ্রতা ব্যবহার করে দেয়ালে আটকে থাকে। খোপ যদি বড় হয় কিংবা খোপের দেয়ালের কৌণিক অবস্থান ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে মধুর অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠটান মধুকে দেয়ালে আটকে রাখতে পারে না।

যারা এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারেনি তারা বেঁচে থাকার জন্য ভালো উপযোগ পায়নি। টিকে থাকার ভালো উপযোগ না পাওয়াতে তারা ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়েছে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা ভালোভাবে বাসা তৈরি করতে পেরেছে তারাটিকে থাকার জন্য বাড়তি উপযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে অ-নিখুঁতদের উপর কর্তৃত্ব করেছে। অ-নিখুঁতরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াতে একসময় তারাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।

পৃষ্ঠটানের এই দিকটাকে কাজে লাগিয়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে এক পাশে রেখে পদার্থবিদরা বলছে, মৌচাকের এরকম আকৃতির পেছনে আসলে পৃষ্ঠটান ধর্ম কাজ করছে। পৃষ্ঠটান ধর্মই তার প্রভাবের মাধ্যমে খোপগুলোকে সুষম ষড়ভুজ আকৃতি প্রদান করে।

চিত্রঃ মৌচাক। ছবিঃ Grafissimo

নিয়মতান্ত্রিকতা আছে, ভালো কথা। কিন্তু এত এত জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে ষড়ভুজের আকৃতি কেন? আসলে জ্যামিতিক স্বাভাবিকতা অনুসারে ষড়ভুজই হওয়া উচিৎ। যদি এমন কোনো জ্যামিতিক আকৃতির কথা বিবেচনা করা হয় যাদেরকে পাশাপাশি সজ্জিত করলে কোনো অতিরিক্ত ফাঁকা থাকবে না তাহলে মাত্র তিনটি আকৃতি পাওয়া যাবে। সমবাহু ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও ষড়ভুজ।

এদের মাঝে ষড়ভুজেই বেশি দেয়াল বিদ্যমান এবং ভেতরের জায়গা সবচেয়ে কম অপচয় হয়। বাকি দুই প্রকারের ক্ষেত্র ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজের কোনাগুলো ব্যবহার করা যায় না, মোম বা মধু সেখানটাতে পৌঁছায় না। স্থানের অপচয় হয়। এদিক বিবেচনা করে পরিশ্রম-ক্লান্ত মৌমাছিরা অবশ্যই এমন আকৃতিকে বেছে নেবে যেখানে স্থানের ব্যবহার করা যায় সর্বোচ্চ এবং শ্রমের অপচয় হয় সর্বনিম্ন।

এখন এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নিখুঁত ষড়ভুজ আকৃতির বাসা বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষমতা মৌমাছিদের আছে। তবে ষড়ভুজের প্রাকৃতিক বিস্তৃতি উপলব্ধির জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত গুণাবলির উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই ষড়ভুজ উৎপন্ন করে।

পানির পৃষ্ঠে যদি বুদবুদের একটি স্তর তৈরি করা হয় তাহলে স্তরে অবস্থান করা বুদবুদগুলো ষড়ভুজ আকৃতির হবে। পুরোপুরি নিখুঁত ষড়ভুজ না হলেও মোটামুটিভাবে ষড়ভুজ হবে। ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আকৃতির বুদবুদ কখনোই পাওয়া যাবে না। যখন তিন-চারটি বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ বুদবুদ একত্র হয় তখন তারা এমনভাবে অবস্থান করে যে তিনটি বুদবুদের তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে মিলিত হয়। মার্সিডিজ-বেনজ কোম্পানির প্রতীকের মতো।

এই সজ্জাটিই সবচেয়ে বেশি সুস্থিত সুগঠিত। এভাবে অবস্থান করলেই তাদের স্থায়িত্ব বেশি হয়। অনেকটা দালান তৈরিতে ইট যেভাবে গাথা হয় তেমন। নিচের স্তরের ইটের অবস্থানের সাথে উপরের স্তরের ইটের অবস্থানের মিল নেই। দালানের ইট যদি এক মিলে একটির বরাবর আরেকটি বসিয়ে গাথুনি দেয়া হয় তাহলে দালান ভেঙে পড়তে বেশিদিন সময় লাগবে না।

চিত্রঃ মার্সিডিজ-বেনজ এর প্রতীক এবং দালানে ইটের গাথুনি। গাথুনিতে এক স্তরের সাথে আরেক স্তরের মিল নেই। ছবিঃ 123rf.com

মৌমাছির বাসার গঠনে স্বয়ং মৌমাছিরা স্থপতি হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এখানে ফেনার বেলায় এরকম সজ্জা প্রদানের জন্য কাউকে কোনো কিছু করে দিতে হয় না। এখানে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কাজ করছে। এক স্তরের বুদবুদ পেরিয়ে বহু স্তরের ফেলার বেলাতেও এই কথা প্রযোজ্য।

বালতিতে পানি রেখে তাতে ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নাড়াচাড়া করলে বেশ ফেনা উৎপন্ন হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসব ফেনার সংযোগস্থলও এখানের সংযোগস্থলের মতোই। তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে বিল্ডিং ব্লকের মতো মিলিত হয়।

চিত্রঃ ষড়ভুজাকার বুদবুদ সজ্জা। ছবিঃ শাটারস্টক।

মৌমাছির বাসায় অপচয় কম হবার জন্য এবং উপযোগ বেশি পাবার জন্য মৌমাছিরা নিজেরা খেটে বিশেষ আকৃতির বাসা বানায়। কিন্তু বুদবুদের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কোনো জিনিস বা কোনো নিয়ম কাজ করছে? এক্ষেত্রে বলতে হবে প্রকৃতি আসলে মৌমাছির চেয়েও আরো বেশি হিসেবি। বুদবুদ ও সাবানের ফেনার প্রধান উপাদান হচ্ছে পানি। সাবানের ফেনায় পানির উপরিস্তরে সাবানের কিছু অণু থাকে। পানির পৃষ্ঠটান পানিকে যতটা সম্ভব কম ক্ষেত্রফলের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গোলক আকৃতির হয়ে থাকে। কারণ গোলক আকৃতিই হচ্ছে সকল ত্রিমাতৃক জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে সবচেয়ে স্বল্প ক্ষেত্রফলের অধিকারী। একই আয়তনের কোনো বস্তুকে বিভিন্ন আকৃতি প্রদান করা হলে তাদের মাঝে গোলক আকৃতিই সবচেয়ে কম ক্ষেত্রফল দখল করবে।

বুদবুদ বা ফেনার বেলায় একাধিক ফেনার পাশাপাশি অবস্থান, তাদের সংযোগস্থলে সুস্থিতি অর্জন, মধ্যবর্তী স্থানের অপচয় রোধ এবং পৃষ্ঠটানের ফলে স্বল্প ক্ষেত্রফল অর্জন এসবের মিলিত প্রভাবে বুদবুদগুলো মোটামুটি ষড়ভুজ আকৃতির হয়ে থাকে।

পতঙ্গের চোখ? ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে তোলা ছবিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পতঙ্গের চোখগুলো অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে চোখ বা অক্ষির এই পুঞ্জ গঠিত বলে এদেরকে বলা হয় পুঞ্জাক্ষি। পুঞ্জাক্ষির প্রতিটি অংশ আসলে ষড়ভুজ আকৃতির। বড় করে দেখার সুযোগ থাকলে দেখা যাবে প্রতিটি ষড়ভুজের মিলনস্থলে তিনটি কোনা একত্র হয়েছে। সেই সাবানের ফেনার দেয়াল আর ইটের বিসদৃশ ব্লকের মতো।

বিবর্তনের পথে ধীরে ধীরে পতঙ্গের মধ্যে এধরনের চোখের আবির্ভাব ঘটেছে। এধরনের পুঞ্জাক্ষি দ্রুত গতিতে চলমান বস্তু (খাবার) ধরতে সাহায্য করে। কারণ এতগুলো ক্ষুদ্র চোখে একসাথে অনেকগুলো ছবি ওঠে চলমান বস্তুর। এতগুলো চোখকে ফাঁকি দেয়া বেশ কঠিন কাজ।

প্রকৃতির পরতে পরতে অনেক জটিলতার দেখা পাওয়া যায়। আবার এসব জটিলতার মাঝেও অনেক সারল্যের খোঁজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সত্যিই খুব অবাক হতে হয়। নিয়মহীন ছন্নছাড়া প্রকৃতির মাঝেও কত সুন্দর প্যাটার্ন কত সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে।

তথ্যসূত্র

  1. Why Nature Prefers Hexagons, The geometric rules behind fly eyes, honeycombs, and soap bubbles, by Philip Ball, April 7, 2016 http://nautil.us/issue/35/boundaries/why-nature-prefers-hexagons
  2. Why do Flies have Compound Eyes? http://www.pitara.com/science-for-kids/5ws-and-h/why-do-flies-have-compound-eyes

featured image: mt.nl

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

গোলাকার পৃথিবীর অকাট্য প্রমাণ এবং ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির মূর্খামি

প্রাচীন ধারণা

বহুকাল আগে মানুষ ভাবতো পৃথিবী সমতল। কারণ দেখতে পৃথিবীকে সমতলই মনে হয়। সে সময়ের মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী অসীম। এর কোনো শুরু বা শেষ নেই। সূর্য নিয়েও নানারকম ধারণা ছিল তাদের মাঝে। কেউ বলতো প্রতিদিন একটা করে সূর্য তৈরি হয় আর ধ্বংস হয়। সূর্যকে দেবতা বলে মানা হতো। কেউ বলতো রথে করে দেবতা ঘুরে বেড়ায়। কারো কারো ধারণা ছিল নৌকায় করে সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরানো হয়।

প্রাচীন ভারতীয়রা বিশ্বাস করতো কতগুলো হাতি পৃথিবীকে ধরে রেখেছে, হাতিগুলো আছে কচ্ছপের পিঠে। কচ্ছপগুলো আবার পানিতে সাঁতার কাটছে। এরকম কিছু গোলমেলে ব্যাখ্যা তখন চালু ছিল। প্রাচীন মানুষেরা দূরে যেতে ভয় পেতো। দূরে গেলে যদি কখনো পৃথিবীর কিনারা দিয়ে অতল তলে পড়ে যায়!

কিন্তু এই গল্প-বিশ্বাসে সন্তুষ্ট ছিলেন না প্রাচীন গ্রিসের অ্যানাক্সিম্যান্ডার। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের কোনো এক সময়ে তিনি রাতের আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খেয়াল করলেন উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা বাদে সবগুলো তারা ছুটে বেড়ায়। ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে ঘোরে এমন কিছু বস্তুও দেখতে পান। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হচ্ছে- আকাশের বস্তুগুলো এলোমেলো ঘোরে না, নির্দিষ্ট কিছুকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

অ্যানাক্সিম্যান্ডারের ধারণা হয় আকাশটা হয়তো একটা ফাঁপা গোলক। ফাঁপা গোলকের গায়ে তারা, সূর্য, চাঁদ এসব সেঁটে আছে। গোলকটি একটি কাল্পনিক বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এর ফলেই চাঁদ-সূর্য উঠে এবং অস্ত যায়। সূর্য যখন এই পাতের নিচে যায় তখন রাত হয় আবার গোলক ঘুরতে ঘুরতে যখন পাতের নিচ থেকে সূর্যকে বের করে আনে তখন হয় সকাল।

অ্যানাক্সিম্যান্ডার পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। এতে ভূ-মধ্য এবং কৃষ্ণসাগরের আশেপাশের অঞ্চল দেখা যায়। তৎকালীন গ্রিকরা পৃথিবী বলতে অতটুকই বুঝতো। তবে একটা বিষয়ে গ্রিকরা প্রায় নিশ্চিত ছিল। যতই পূর্ব বা পশ্চিমে যাওয়া হোক না কেন সূর্যকে ধরা যাবে না। তারা ধারণা করে পৃথিবী সমতল, কিন্তু পাতের মতো নয় বরং গোলাকার প্লেটের মতো যার চারদিকে রয়েছে সমুদ্র।

সমুদ্রকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত ভাবার কারণ ভ্রমণকারীরা যেদিকেই যাক শেষ পর্যন্ত সমুদ্রই দেখতে পায়। তাছাড়া তখনো মহাসাগর পাড়ি দেবার বিদ্যা ভালোমতো রপ্ত হয়নি। আকাশের তারাগুলো তখন জোনাকির মতো মিটমিটে আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে সূর্য এবং চাঁদ নিয়ে অনেক ভাবতো গ্রিকরা।

গোলাকার পৃথিবীর ধারণা এবং সৌরজগতের কেন্দ্র বিতর্ক

৩৪০ খ্রিষ্টপূর্বে এরিস্টটল তার বই ‘অন দ্য হ্যাভেন’-এ পৃথিবীর গোলাকৃতির পক্ষে ২টি যুক্তি দেখান। যুক্তি দুটি হলো-

(১) চন্দ্রগ্রহণের কারণ সূর্য এবং চাঁদের মাঝে পৃথিবীর অবস্থান। চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া সবসময় গোলাকৃতির। পৃথিবী যদি সিলিন্ডার বা চ্যাপ্টা থালার মতো হতো তাহলে ছায়াটি লম্বাটে বা উপবৃত্তাকার হতো।

(২) গ্রিকরা ভ্রমণের ফলে জানতো- পৃথিবীর দক্ষিণ ভাগ থেকে তাকালে উত্তর ভাগ থেকে দেখা ধ্রুবতারাকে আকাশের অনেক নিচুতে দেখা যায়। যত উত্তরে যাওয়া যায় মনে হবে তারাটি ঠিক মাথার উপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু বিষুবরেখা থেকে এর অবস্থান দেখা যায় দিগন্ত রেখায়।

এছাড়াও আরো দুটি যুক্তি তিনি দেখান-

(৩) দূর থেকে যখন কোনো জাহাজ আসতো তখন মাস্তুল আগে দেখা যেতো। এর মানে জাহাজের উঁচু অংশ আগে দেখা যেতো যা গ্রিকরা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করেছিল।

(৪) যেহেতু পৃথিবীর সবকিছু কেন্দ্র দ্বারা আকর্ষিত তাই একে গোল হতেই হবে। সমুদ্রের পানি আর বাতাস কেন পিছলে যায় না তা চতুর্থ যুক্তি থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

উপরের যুক্তিগুলো থেকে এরিস্টটল সিদ্ধান্ত নেন যে, পৃথিবী গোল। কোনোভাবেই সমতল নয়। মিশর এবং গ্রিসে ধ্রুবতারার অবস্থানের তারতম্য থেকে পৃথিবীর পরিধির অনুমানও করেন তিনি। এরিস্টটল পৃথিবীর পরিধি ৪ লক্ষ স্টান্ডিয়া নির্ধারণ করেছিলেন (১ স্টান্ডিয়া = ২০০ গজ এর মতো)। তবে বাস্তবে আমাদের গ্রহের পরিধি এর অর্ধেক।

এরিস্টটল ভাবতেন পৃথিবীটা স্থির। সূর্য এবং অন্য গ্রহ তারকারা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে। সেই সময়ে মানুষ বিশ্বাস করতো পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত। ২য় খ্রিস্টাব্দে টলেমি মহাকাশের কেন্দ্রে পৃথিবীকে কল্পনা করে ব্রহ্মাণ্ডের মানচিত্র তৈরি করেন। চার্চের গুরুরা এই মানচিত্রটি মেনে নেয়। চার্চ একে মেনে নেওয়ার কারণ হলো- টলেমির মডেলটি ছিল গোলাকার এবং এর বাইরে স্বর্গ এবং নরকের জন্য জায়গা ছিল।

১৫১৪ সালে কোপার্নিকাস নামে একজন পোলিশ পুরোহিত সূর্যকে কেন্দ্রে রেখে একটি মডেল প্রকাশ করেন। চার্চের ভয়ে অবশ্য তিনি নিজের নাম দিয়ে প্রকাশ করেননি। এক শতাব্দী পর গ্যালিলিও এবং কেপলার কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। গ্যালিলিও তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নেন সূর্য সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। এরপর গ্যালিলিওর কী হয়েছিল সেটা সম্ভবত সবারই জানা আছে।

সমতল পৃথিবী বা ফ্ল্যাট আর্থ কন্সপিরেসি

এরিস্টটলের পর সমতল পৃথিবীর ধারণা পরিত্যক্ত হয় এবং একটা সময়ে গ্যালিলিওর তত্ত্ব স্বীকৃতি পায়। মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে পৃথিবী গোল এবং ষোড়শ শতকের পর মেনে নেয় যে পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তবে বর্তমানে কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা ফ্ল্যাট আর্থ বা সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসী এবং সমতল পৃথিবী নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরি প্রচার করে থাকে।

আগে বোঝা দরকার কন্সপিরেসি থিওরি জিনিসটা আসলে কী এবং এটা বিজ্ঞানকে কীভাবে দূষিত করে।

ধরা যাক, কোনো একটি বিষয়কে আমরা ধ্রুব সত্য বলে জানি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আমরা জানি পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী দূরে থাক কোনো অণুজীবের অস্তিত্ত্ব পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটিই আপনি এতদিন জেনে এসেছেন।

কিন্তু হঠাৎ করে একদিন ইন্টারনেট বা কোনো সংবাদে দেখলেন চাঁদে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে এবং নাসার সাথে তাদের সখ্যতাও রয়েছে। বিষয়টি নাসা এতদিন গোপন করে গেছে। এ ধরনের সংবাদের সাথে মুখরোচক কোনো শিরোনাম এবং সূক্ষ্ম গ্রাফিক্সে করা কোন ছবি। একটি স্বাভাবিক খবর মানুষের মনে যতটা প্রভাব ফেলে তার থেকে অস্বাভাবিক খবর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আমরা বিচার বিশ্লেষণ না করে উপস্থাপিত তথ্যগুলো বিশ্বাস করা শুরু করে দেই।

সমতল পৃথিবীর পক্ষে দেখানো যুক্তি এবং তার ব্যাখ্যা

(১) দিগন্তরেখা সমান: সমতল পৃথিবীর ধারণায় বিশ্বাসীদের একটি খুব সাধারণ তত্ত্ব হলো দিগন্তরেখা সমান। ভূমি থেকে দিগন্তরেখাকে যেমন সমান দেখা যায় তেমনি উঁচু কোনো পাহাড় বা বিমান থেকেও দিগন্তরেখাকে সমানই দেখা যায়। সম্ভবত সমতল পৃথিবীর ধারণাকারীদের বিশ্বাসের উৎপত্তি এখান থেকেই।

এই ধারণার ব্যবচ্ছেদ করার জন্য আমরা কয়েকটি ছবি নিয়ে আলোচনা করবো। নিচের প্রথম ৩টি ছবি দ্রষ্টব্য, যা নিয়ে সমতল এবং গোলাকৃতির বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক হয়। এই ছবি ৩টিতে দেখা যায় একটি পাল তোলা ছোট নৌকা দিগন্তরেখার পার হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এর নিচের অংশ যেন ডুবে যাচ্ছে। সমতল ধারণায় বিশ্বাসীদের মতে এটি উত্তাল সাগরের স্রোতের জন্য হয়।

হ্যাঁ, অবশ্যই স্রোতের ক্ষমতা আছে ছোট নৌকোটিকে এমনভাবে দেখানোর। কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের সমুদ্র সৈকতে গেলে আমরা এমনটি অহরহ দেখতে পাই কিন্তু প্রথম তিনটির কোন ছবিতেই স্রোত নেই।

আচ্ছা ধরে নিলাম স্রোত আছে এবং ছোট নৌকোটির নিচের অংশ স্রোতের জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ৪ নম্বর ছবির ক্রুজশীপের যে উচ্চতা তা উত্তাল সাগর বা সাগরের স্রোত ক্রুজশীপের এতখানি অংশ অদৃশ্য করে দিতে পারে না। শীপটি দিগন্তরেখা পার করে ফেলেছে এবং এজন্যই এটার নিচের অংশ আমাদের চোখের বাইরে। হিসাব করলে দেখা যাবে অদৃশ্য হওয়া অংশ শীপের মোট উচ্চতা থেকে দৃশ্যমান অংশের বিয়োগফল।

(২) টরেন্টো শহরের সিএন টাওয়ার

নিচের ছবিতে কানাডার সিএন টাওয়ারকে দেখা যাচ্ছে যার উচ্চতা ১৮১৫ ফুট। এর পরের ছবিতে ৩০ মাইল দূর থেকে একই স্থানের ছবি তোলা হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সিএন টাওয়ারের নিচের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে না। ৩০ মাইল দূর থেকে ১৮১৫ ফুট উচ্চতার ২৬% দিগন্তের নিচে অদৃশ্য হবার কথা এবং ঠিক সেটাই হয়েছে। সিএন টাওয়ারের ২৬% বা ৪৮৬ ফুট দেখা যাচ্ছে না।

তাহলে দিগন্তরেখা কেন সমান দেখায়? পৃথিবীর আকৃতির তুলনায় মানুষের আকৃতি এতোই ছোট যে পৃথিবীর বক্রতা আমরা বুঝতে পারি না। এমনকি ১৫০০০ ফুট উঁচুতে থাকা বিমান থেকেও না। যত উপরে উঠতে থাকা যায় দিগন্তের বিস্তৃতি তত বৃদ্ধি পায়। এমনকি ৪০০০০ ফুট উঁচুতেও দিগন্তের বাঁক মাত্র ৩.৫ ডিগ্রি।

(৩) উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থেকে তারার অবস্থানে ভিন্নতা

উত্তর মেরুতে পরিষ্কার আকাশে তারা পর্যবেক্ষণ করলে ১ম ছবির মতো কিছু তারকা-বিন্যাস পাওয়া যাবে। কিন্তু যদি দক্ষিণ মেরু থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে আগের বিন্যাসের মতো কিছুই পাওয়া যাবে না। নতুন একটি বিন্যাসের দেখা মিলবে।

দুই মেরুতে ভিন্ন ভিন্ন তারকার বিন্যাস গোলাকার পৃথিবীর পক্ষে সমর্থন প্রদান করে। পৃথিবীর গোলাকৃতির জন্য উত্তর মেরুর পর্যবেক্ষক নিচের দিকে দেখতে পায় না, একইভাবে দক্ষিণ মেরুর পর্যবেক্ষক উপরের অংশ দেখতে পায় না। তাই তারার বিন্যাসের ভিন্নতা দেখা যায়।

(৪) কেন্দ্রের তারা এবং ঘূর্ণনদিকে ভিন্নতা

রাতের পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য তারা দেখা যায়। একটু সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। উত্তর মেরুতে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরছে এবং একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করেই ঘুরছে। কেন্দ্রের তারাটি হলো পোলারিস বা নর্থ স্টার। আকাশের অন্যান্য তারা থেকে এটি কিছুটা উজ্জ্বল। কয়েক রাত ধরে নজর রাখলে দেখা যাবে বিগ ডিপারের (একটি তারামণ্ডলী) শেষ প্রান্ত পোলারিসের দিকেই থাকে।

চিত্র: শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় বিগ ডিপারের শেষ প্রান্ত সবসময়
পোলারিস বা নর্থ স্টারের দিকেই থাকে।

দক্ষিণ মেরুতে তারার ঘূর্ণন দেখা যাবে কিন্তু তারাগুলো উত্তর মেরুর মতো ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরে না বরং ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে। দক্ষিণের তারাগুলোও সিগমা অক্টানিস নামের একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করে ঘোরে। দুই মেরুর তারকার ঘূর্ণন দিকের ভিন্নতা এটা ব্যাখ্যা করে যে পৃথিবীর আকৃতি সমতল নয়।

(৫) পোলারিসের অবস্থান

সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীরা আরেকটি প্রশ্ন করে থাকে- সূর্য, পৃথিবী এবং সমগ্র মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যখন ঘুরছে তখন বছরের পর বছর পোলারিসের অবস্থান কেন এক থাকে? পৃথিবী থেকে পোলারিসের দূরত্ব ৩২৩ আলোকবর্ষ।

৬ মাস পর পৃথিবী যখন সূর্যের অপর পাশে অবস্থান করে তখন তার আগের অবস্থান থেকে দূরত্বের পরিবর্তন হয় ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। তাহলে আমাদের সাপেক্ষে পোলারিসের অবস্থান কতটুক পরিবর্তন হবে? উত্তর হলো মাত্র ০.০০০০০৫৬ ডিগ্রি। এতো কম হবার কারণ ৩২৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের কাছে ১৮৬ মিলিয়ন মাইল খুবই সামান্য। খালি চোখে এটা দেখা অসম্ভব।

(৬) চাঁদ

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ যা ২৯ দিনে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের বেশিরভাগের মতে চাঁদ একটি ডিস্ক আকৃতির বস্তু। কিন্তু পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই চাঁদের ছবি তোলা হোক না কেন চাঁদকে গোলাকৃতির দেখায়। চাঁদ যদি ডিস্কই হতো তবে একে পৃথিবীর বিভিন্ন অবস্থান থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপবৃত্তাকার দেখাতো।

নিচে ১ম ছবিতে পূর্ণ চাঁদকে আকাশে দেখা যাচ্ছে। ফ্ল্যাট আর্থ তত্ত্ব অনুযায়ী চাঁদ ২য় ছবির বা ৩য় ছবির মতো ধীরে ধীরে ছোট এবং উপবৃত্তাকার হয়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না বরং চাঁদ তার নিজের আকৃতি বজায় রেখে দিগন্তের অপর পাশে হারিয়ে যায়। ফ্ল্যাট আর্থ মডেল এখানেও ব্যর্থ।

(৭) চাঁদের দূরত্ব এবং পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ

পৃথিবীর দুই মেরু থেকে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করে ত্রিকোণমিতির সাহায্যে চাঁদ এবং পৃথিবীর দূরত্ব পাওয়া যায় ২ লক্ষ ৩৯ হাজার মাইল যা লেজার বা রাডারে পরিমাপ করা দূরত্বের প্রায় সমান। কিন্তু ফ্ল্যাট আর্থ মডেলে একই ফর্মুলা ব্যবহার করলে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় মাত্র ৩ হাজার মাইল এবং হাস্যকরভাবে এটিই ফ্ল্যাট আর্থ বিশ্বাসীরা প্রচার করে।

তাহলে উড়োজাহাজ নিয়েই বিকেলে চাঁদ থেকে ঘুরে আসা যাক! ধরি কোনোভাবে চাঁদ পৃথিবীর ৩ হাজার মাইল উপরেই আছে। যুক্তির খাতিরে এখানেও ধরে নেয়া হলো চাঁদ ডিস্ক আকৃতির। এখন মধ্যরেখার উপরে যদি চাঁদ অবস্থান করে থাকে এবং মধ্যরেখা থেকে উত্তর এবং দক্ষিণে ৩ হাজার মাইল দূরত্বের চাঁদের সাথে ভূমি থেকে দৃশ্যমান কোণ ৪৫ ডিগ্রি হবার কথা। জ্যামিতির নিয়ম অনুসারে ৪৫ ডিগ্রিই হবে। অর্থাৎ দুই মেরু থেকে চাঁদের ভিন্ন ভিন্ন অংশ দেখা যাবে (২য় ছবির মতো) কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না। দুই মেরু থেকে চাঁদের একই অংশ দেখা যায়।

এছাড়াও আমাদের প্রতিবেশি সব গ্রহই গোলাকৃতির। মাত্র ৫০ ডলারের কোনো টেলিস্কোপ দিয়েই প্রতিবেশি গ্রহদের পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যসব গ্রহ গোল হলে পৃথিবী আসলে কোন যুক্তিতে সমতল হতে পারে সেটার কোনো ব্যাখ্যা ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি দিয়ে থাকে না।

সমতল পৃথিবী প্রচারে সুবিধা কার?

বর্তমানে মুখরোচক শিরোনামে সমতল পৃথিবীর ধারণা প্রচারে অসাধু প্রকাশকদেরই লাভ বেশি। গতবছর “টানা ৮ দিন সূর্য উঠবে না” বা “সবুজ চাঁদ দেখা যাবে” এরকম শিরোনামে অনেক সংবাদ দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানের ন্যূনতম জ্ঞান না থাকার পরও এসব প্রচার করার কারণ একটিই, Rumor is a great traveler।

দুঃখের বিষয় এটাই যে চিন্তা-ভাবনা না করেই আমরা সব বিশ্বাস করতে শুরু করে দেই এবং নিজেদের সংবাদ মাধ্যমের প্রচার বাড়াতে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিজ্ঞানের শত বছরের গবেষণা লব্ধ ফলকে কলুষিত করছে।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.youtube.com/watch?v=W9ksbh88OJs
  2. https://www.youtube.com/watch?v=NGZEXkSX9wI
  3. https://www.youtube.com/watch?v=FTBaOmJEQg0
  4. http://www.popsci.com/10-ways-you-can-prove-earth-is-round
  5. http://www.space.com/32599-green-moon-april-lunar-hoax-debunked.html
  6. http://www.history.com/topics/galileo-galilei
  7. http://epod.usra.edu/blog/2013/05/earths-rotation-and-polaris.html
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Celestial_pole
  9. https://exploratorium.edu/eclipse/video/why-dont-we-have-an-eclipse-every-month
  10. A brief history of time

featured image: klikkout.sk

আগামী ২০০ বছরের মাঝে হয়ত গরুই হবে ভূ-পৃষ্ঠের সর্ববৃহৎ স্তন্যপায়ী

১৩,০০০ বছর পূর্বে উত্তর আমেরিকায় ছিল বর্তমান আফ্রিকার চেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ স্তন্যপায়ীর সমাহার। ছিল বহু সংখ্যক প্রজাতির ঘোড়া, উট, লামা আর বর্তমানে বিলুপ্ত এক প্রাণী গ্লিপ্টোডন যা ছিল আর্মাডিলোর আকারের। ছিল স্মাইলোডন নামের এক ধরনের বাঁকানো লম্বাটে দাঁতের বিড়াল— আমাদের দেখা আফ্রিকান সিংহের মত বড় হবে। এরা তৃণভূমি জুড়ে স্লথ আর ম্যামথের খোঁজে গুপ্তভাবে বিচরণ করত। সাত ফুট দীর্ঘ ভোঁদড় তাদের খাবার সারত বড় বড় গাছে। আর এমন বড় প্রাণী কেবল উত্তর আমেরিকাতেই ছিল না। প্লাইস্টোসিন যুগের শেষের দিকে প্রতি মহাদেশেই গড়পড়তার চেয়ে বৃহত্তর স্তন্যপায়ীর বিচরণ ছিল। এ যুগ বিদ্যমান ছিল ২৫ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে ১১,৭০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত।

আর্মাডিলোর মত দেখতে গ্লিপ্টোডন
লম্বাটে দাঁতের শিকারী- স্মাইলোডন

বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে কী কারণে এ সকল অতিকায়দেহী স্তন্যপায়ীরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে যেখানে তাদের চেয়ে ক্ষুদ্রতর আকারওয়ালারা ঠিকই টিকে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো একদল গবেষক জীববিজ্ঞানী ফেলিসা স্মিথের নেতৃত্বে কয়েক মিলিয়ন বছরের স্তন্যপায়ীদের বিলুপ্তির কারণ, প্রামাণ্য তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। আর একটু অবাক করে দিয়েই বিশ্লেষণ থেকে বেরিয়ে এল মানুষের সংশ্লিষ্টতার গল্প। প্রতিটি মহাদেশে অতিকায় স্তন্যপায়ীদের বিলুপ্তি ঘটতে থাকার সময় আর মানুষের ঐ মহাদেশীয় ভূখণ্ডে প্রতাপ অর্জন সমসাময়িক। তাদের এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় সায়েন্স জার্নালে। [অত্যুৎসাহীরা এখান থেকে পড়তে পারেন।]

গণবিলুপ্তি যদি দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকে আধুনিক হাতি, গণ্ডার, জিরাফ, জলহস্তী, বাইসন, বাঘ আর এমন বহু বৃহদাকার স্তন্যপায়ী শীঘ্রই হারিয়ে যাবে। প্রাথমিক শংকা তৈরি হয়ে গেছে মানুষ যখন থেকে অধিক পরিমাণে পশু শিকার, ধ্বংস ও বিবিধ কারণে হত্যায় নেমেছে তখন থেকেই। শিকারের বাইরে রয়েছে বাসস্থান ধ্বংস, বিচ্ছিন্ন করে দেয়া ইত্যাদি। ফেলিসা স্মিথের গবেষণা বলছে এখন থেকে ২০০ বছর পর স্থলজ বৃহত্তম স্তন্যপায়ী প্রাণী হবে গৃহপালিত গরু।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী এই দায় সম্পূর্ণরূপে মানুষের ঘাড়ে আরোপ করেন, অধিক পরিমাণে শিকার এ পৃথিবীর প্রাণীজগতকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের হোমিনিড গোত্রের আত্মীয় হোমো ইরেকটাসরা (Homo erectus) আফ্রিকা থেকে ইউরেশিয়ায় চলে এসেছিল দুই মিলিয়ন বছর আগে। সেই বিস্তরণে বিচরণের পথ অনুসরণ করেছি আমরা হোমো সেপিয়েন্সরা (Homo sapiens) ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ বছর আগে। এই বিস্তরণ মিশে যায়  আমাদের নিকটভাতৃকুল নিয়ানডার্থাল (Homo neanderthalensis) এবং ডেনিসোভান্সদের (Denisovans) সাথে। এটা ধরে নেয়া হয়, হোমো সেপিয়েন্সরা ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর পূর্বে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে যায় আর ১৩,০০০-১৫,০০০ বছর পূর্বে আমেরিকা মহাদেশে বসতি স্থাপন করে ফেলে।

মানুষের মহাদেশীয় বিস্তরণপথ; Source: Wikipedia, User:Altaileopard. 

স্তন্যপায়ীদের বিলুপ্তির সময়কালে বৃহদাকার প্রাণীরা হারিয়ে যেতে শুরু করে যখন মানুষ বা তাদের সগোত্রীয়রা শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু এ ব্যাপারটি কি কাকতালীয় হতে পারে? হয়ত দু’পক্ষের ঘটনাই সমসাময়িকভাবে হচ্ছিল কিন্তু একটির ওপর আরেকটির দায় ছিল না। এ ধারণার মূলে যুক্তি দেয়া হয় গণবিলুপ্তির পেছনে সবচেয়ে বড় দায় জলবায়ুর পরিবর্তনকে।

তাদের নতুন গবেষণায় স্মিথ এবং তার দল ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে অর্থাৎ যখন পৃথিবীর প্রানীজগতের নিশ্চিত গণবিলুপ্তি ঘটেছে তখন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল স্থলজ প্রাণীর বিস্তার-বিচরণের তথ্যউপাত্ত তৈরি করেছেন। আর প্রতি এক মিলিয়ন বছরকে বিশ্লেষণের জন্য সাজিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ সব ধরণের প্রাণীর তথ্য উপাত্ত ধারাবাহিক সময়ের সাথে তুলনা করেছেন। অতএব যদি কোনো আকস্মিক জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে থাকে এই ৬৫ মিলিয়ন বছরের মধ্যে তবে সেটা ধরা পড়বে। কিন্তু বিশ্লেষণে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে স্তন্যপায়ী বিলুপ্তির লক্ষণ খুঁজে পাননি।

কিন্তু ১,২৫,০০০ বছর পূর্ব থেকে এখন পর্যন্ত বৃহদাকার প্রাণীদের বিলুপ্তি ক্ষুদ্রাকারদের তুলনায় বেশি। ফলত, স্তন্যপায়ীদের টিকে থাকার গড় আকার কমেছে। সুতরাং ঐ বড় স্তন্যপায়ী বিলুপ্তির সাথে মানুষের রাজ্যগ্রাস আবির্ভাবকে সম্পর্কিত করার প্রশ্ন আবার উঠে আসছে।

উত্তর আমেরিকায় মানুষের পা রাখার পূর্বে স্তন্যপায়ীদের গড় ওজন ছিল ৯৮ কেজি। এখন গড় মাত্র ৮ কেজি! আমাদের উপমহাদেশের লাল বাঁদরের (Rhesus Monkey) সমতুল আকারের। অর্থাৎ আমরা বেশ বড়সড় মানের কয়েক ধাপ স্তন্যপায়ীর সংস্থান হারিয়ে যাওয়ার তথ্য পাচ্ছি। অধিকাংশ স্তন্যপায়ীদের বিবর্তনীয় ইতিহাস কিন্তু এর বিলুপ্তির জন্য এর এর আকারের কথা বলে না। বিবর্তনবাদে এটা স্পষ্টভাবেই প্রমাণিত। সে হিসেবে বড় স্তন্যপায়ীদের সাথে মানুষের সহাবস্থানের সূত্রই উঠে আসে।

এই গবেষণা আবার এটাও কিন্তু বোঝাচ্ছে না যে, জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবর্তনে বন্যপ্রাণীর সংকট তৈরি করবে না। বরং পূর্বের ঘটনার কারণ যে জলবায়ুর পরিবর্তন নয় তাই প্রতীয়মান করে, অর্থাৎ বর্তমানে মানুষের আগ্রাসন ও জলবায়ু ক্রমশ পরিবর্তন প্রাণীজগতের পতনকে আরো ত্বরান্বিত করে। যে কয়েকদল প্রাণী ইউরেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকায় বিবর্তিত হতে পেরেছিল অস্ত্র-সস্ত্রে শিকারী, আগুন দক্ষতা, দলবেঁধে বাস করা মানুষের কাছে তারাও নতুন হুমকি হয়ে উঠল। সোজাসুজিভাবে এই দু-পেয়ে মানুষের সক্ষমতার সাথে তাদের বিবর্তনীয় টিকে থাকার লড়াই দ্রুত অভিযোজিত হতে পারেনি।

স্মিথের গবেষণায় আফ্রিকার সাথে ইউরেশিয়ার হোমিনিডদের বিস্তরণের তুলনায় স্তন্যপায়ীদের আকারের বণ্টনের বিশ্লেষণও রয়েছে। দেখা যায়, আফ্রিকায়ও যখন হোমিনিডরা আবির্ভূত হতে শুরু করে মহাদেশের বিভিন্ন অংশে সেখানেও স্তন্যপায়ীদের গড় আকার ক্রমশ ছোট হতে থাকে। প্রত্নবাস্তুবিদরাও হোমো সেপিয়েন্সের সাথে স্তন্যপায়ীদের বণ্টনের উপর প্রভাব থাকার প্রমাণের কথা বলেন। কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি হুট করে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয় সাধারণত। বড় প্রাণীদের প্রকৃতি থেকে নাশ করার হার উৎপাদনের হার থেকে খানিক বেশি হলেই বিলুপ্তির জন্য যথেষ্ট। হাজার বছরের ব্যবধানে ঐ ক্ষতিপূরণ সাধন আর হয় না বড় প্রাণীদের ক্ষেত্রে। ফলে, প্রাকৃতিকভাবেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঋণাত্মক হার প্রজাতিটিকে বিলুপ্ত করে দেয়।

বড় আকারের স্তন্যপায়ীরা বিশেষত অধিক বিপদে থাকে কারণ এদের প্রজনন ধীর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ম্যামথ এবং ম্যাস্টোডনের গর্ভকাল ছিল দুই বছর আর মাত্র একটাই বাচ্চা দিত। [ম্যামথ এবং ম্যাস্টোডন দেখতে প্রায় একই রকমের হলেও এরা আসলে ভিন্ন প্রজাতি। কাছাকাছি হিসেবে বললে এরা দেখতে বর্তমান হাতিদের মত, আকারে আরো বড়।] কিন্তু, খরগোশ মাত্র ৩০দিনে বাচ্চা দেয় একেকবারে ২-১২টি। বাচ্চা দেয়ার পরদিনই এরা আবার পুনরায় গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, ১ লক্ষ ম্যামথের জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সুযোগ ১ লক্ষ খরগোশের তুলনায় বেশ সুলভ।

বৃহদাকার প্রাণীদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে তাদের বাস্তুতন্ত্রের উপর। তারা বীজ ধ্বংস করে, গাছ উপড়ে ফেলে, আবার চলাফেরায় মাটির পরিবর্তন করে দেয়। দলবেঁধে ভ্রমণে তারা পাহাড়ের পাদদেশে পানির স্রোত এবং মাটিক্ষয়ের জন্যও প্রভাব রাখতে পারে। আবার এরা অন্য ছোট প্রাণীদের জন্য থাকার স্থানের সংকুলানও করে। উদাহরণস্বরূপ, হাতিরা যখন কাদায় গর্ত করে তাদের পায়ের চাপে সেখানটা জলজ অমেরুদন্ডীদের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে।

এ গবেষণা থেকে যে আপাত নিরীহ অথচ ভয়ংকর তথ্যটি বেরিয়ে আসে তা হল, হোমিনিড পরম্পরা সময়ের ভাঁজে ভাঁজে আমাদের দক্ষ হন্তারক হিসেবে প্রস্তুত করেছে। এখনি আমাদের এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, জীবনমানের উচ্চতার সংজ্ঞায়ন পৌঁছে গেছে ভোগবাদে। আমরা পৃথিবীকে কিভাবে ব্যবহার করব সেটার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ এখনই জরুরী। কেননা, মানুষের মধ্যেই একটা শ্রেণী এমন অবস্থানে আছে যে তাদের কর্মকাণ্ডের ক্ষমতা বলে দিচ্ছে তারা হয়ে উঠেছে পরিবেশের চালক। পরিবেশের স্বার্থ বুঝতে না পারার কারণে পৃথিবীর প্রাণিজগতে পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে তাদের সিদ্ধান্তেই।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকান  অবলম্বনে।

পৃথিবীর কেন্দ্রে বৃহদায়তন ধাতব বস্তু

পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ কয়েকটি স্তরে গঠিত। সবচেয়ে গভীরে যে স্তরটি আছে তাকে বলে কেন্দ্রমণ্ডল। কেন্দ্রমণ্ডলের বাইরের পৃষ্ঠের এলাকায় র্পিলাকৃতির বিস্তৃত লোহার কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে। বলা যায় এতদিন লুকায়িত ছিল এটি। প্রতি বছর প্রায় ৫১ কিলোমিটার ভ্রমণ করে এই লোহার স্তর। বর্তমানে এটি উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করছে এবং ধীরে ধীরে পশ্চিমমুখী হয়ে আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার দিকে এগুচ্ছে।

সান ফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন (AGU)-এর বার্ষিক এক সমাবেশে এই ঘোষণা করা হয়। এখানে বলা হয়, লোহার এই স্তর সম্ভবত পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। চৌম্বকক্ষেত্রের এর মধ্যে কিছুটা পরিবর্তনও ঘটছে।

অভ্যন্তরে অবস্থিত এই স্তুটি প্রথম শনাক্ত করা হয় ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সী’র একটি প্রোগ্রামে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের মানচিত্র তৈরি করার উদ্দেশ্যে এই প্রোগ্রামের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বর্তমানে লোহার এই স্তর প্রায় ৪২০ কিলোমিটার চওড়া, যা এই গ্রহের প্রায় অর্ধেক পরিধি জুড়ে অবস্থান করছে। ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এর প্রশস্ততা রহস্যজনকভাবে বেড়েই চলেছে। প্রতি বছরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার করে এটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি এতটাই শক্তিশালী চুম্বকে পরিণত হচ্ছে যে পৃথিবীর অন্তঃভাগের কঠিন কেন্দ্রমণ্ডলের আবর্তনকেও প্রভাবিত করছে।

এমনকি এই সর্পিলাকার লোহার স্তর আবিষ্কারের আগেও অর্ধতরল কেন্দ্রভাগে বাইরের স্তর ছিল অবিশ্বাস্যভাবে গতিশীল। বিশাল কেন্দ্রমণ্ডলে অবস্থিত আংশিক গলিত অবস্থায় থাকা এই স্তরটি মোটামুটিভাবে ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পুরু।

চিত্রঃ তরলিত লোহা। চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে ঐ স্তর তরলিত লোহা দিয়ে গঠিত।

প্রায় ৭ হাজার ৩০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস উত্তপ্ত এই বহিঃস্থ কেন্দ্র এক ধরনের তাপ ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করে। এর নিজস্ব পরিচলন স্রোত টেকটোনিক প্লেটের গতিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য টেকটোনিক প্লেটের চলনের ফলেই মহাদেশীয় সঞ্চরণ সম্পন্ন হয় এবং বিস্তৃত পর্বতমালার সৃষ্টি হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি সম্পর্কে আরো অনেক তথ্য জানার বাকি আছে। অনেক কিছু বিজ্ঞানীরা এখনো বুঝতে পারছে না। তাই এ সম্পর্কে আরো বেশি গবেষণা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের জানার জগতে নতুন নতুন তথ্য সংযোজন করবে আর সেইসাথে পুরনো অনেক প্রশ্নের জবাব দেবে বলে আশা করা যায়।

তথ্যসূত্রঃ iflscience.com

featured image: crossfitmeppel.nl

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না।

১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়।

প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন।

২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে।

এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে।

দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক।

জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।

এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল।

মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়।

যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না।

তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে।

আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।

অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী।

উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে।

International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে।

২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

চিত্রঃ ফ্ল্যাগস্টাফ শহরের সান ফ্রান্সিসকো থেকে মিল্কিওয়ের দৃশ্য। (চিত্রগ্রাহক Dan & Cindy Duriscoe)

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে।

আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত।

তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. https://youtube.com/watch?v=te_H0Uo6YEA
  14. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  15. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  16. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  17. Salmon (2003).“Artificial night lighting and sea turtles” (PDF). Biologist 50: 163–168
  18. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  19. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  20. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  21. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollution2.htm

featured image: need-less.org.uk

পানির সুরক্ষায় প্লাস্টিকের বল

‘শেড বল’ পানিকে ময়লা-আবর্জনা, বন্যপ্রাণী ও অন্যান্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। লস এঞ্জেলস শহরে পানি নিরাপদ রাখার জন্য এদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় ৯৬ মিলিয়ন প্লাস্টিকের বল কাজে লাগানো হয়েছে সেখানে।

এত এত প্লাস্টিকের বল দিয়ে বোঝাই জলাধারগুলোকে দেখলে হয়তো বল দিয়ে বানানো বিশালাকৃতির একটা কূপ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে হবে। এই শেড বলগুলো ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রতিরোধ করে সূর্যরশ্মিকে পানির নাগাল পাওয়া থেকে বাধা দেয়।

জলাধারগুলোর নিম্নদেশের পানিতে ব্রোমাইড এবং ক্লোরিন উভয় বিদ্যমান যেগুলো সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে এসে বিক্রিয়া করে ‘ব্রোমেট’ গঠন করে। ব্রোমেট একটি যৌগিক পদার্থ যা মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বলগুলো বাষ্পীভবন প্রতিরোধেও সাহায্য করার মাধ্যমে প্রতি বছর এক বিলিয়ন লিটার পানি সঞ্চয় করতে পারে।

featured image: inhabitat.com

নিজেদের ঠাণ্ডা রাখার জন্য গাছেরাও ঘামে

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অংশে সাম্প্রতিককালের গ্রীষ্মের দাবদাহ এতটা অধিক ছিল যে পিচ গলানোর দশা। যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সংকট ঘন ঘন হচ্ছে। অনেক উদ্ভিদই অভিযোজন করতে না পেরে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইউক্যালিপটাসের অন্তত একটি প্রজাতি রয়েছে যেটি অত্যধিক তাপেও ঘামতে থাকে, যখন কিনা অন্যান্য প্রক্রিয়া ক্রমশ থেমেও যায়। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

উদ্ভিদ যা করে— সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য তৈরি করে যার নাম ফটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া। পাতায় থাকা পত্ররন্ধ্র দিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এ প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে। এ পত্ররন্ধ্রগুলো দিয়ে প্রস্বেদনের মাধ্যমে পানি জলীয়বাষ্প নির্গত হয়, যে পানি উদ্ভিদের অভ্যন্তরভাগে বিভিন্ন অংশে খনিজ পরিবহনের কাজ করে। আর পত্ররন্ধ্রগুলো সে পানিকে জলীয়বাষ্প হিসেবে বের করে দেয়ার ফলে উদ্ভিদদেহ শীতল হতে থাকে বাষ্পীভবনের ফলে। কিন্তু যান্ত্রিকতার মত বিষয়টা তত সরল নয়। সালোকসংশ্লেষণেরও একটি কার্যকরী তাপমাত্রা সীমা রয়েছে ক্রিয়াশীল থাকার ক্ষেত্রে। অত্যধিক তাপমাত্রা সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস করে দেয়— ফলে অধিকাংশ উদ্ভিদের এই ক্রিয়ার সাথে সংলগ্ন থাকা উপজাত ক্রিয়া প্রস্বেদনও হ্রাস পায়। অর্থাৎ, উদ্ভিদদেহের তাপমাত্রা হ্রাস অধিক তাপমাত্রায় ব্যাহত হচ্ছে! বিবিধ প্রজাতির উদ্ভিদ এই প্রতিকূলতা কিভাবে সামাল দিবে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের খুব একটা জানা নেই এই অর্থে একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে উদ্ভিদের বৈচিত্র্যতার মাত্রা কেমন হবে তার ভিত্তিতে।

E. parramattensis এর পাতা; source: Peter Woodard

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজের পরিবেশ ও বনবিদ্যা বিভাগের পরিবেশবিদ জন ড্রেক এবং তার সহকর্মীরা এক ডজন ইউক্যালিপটাস প্রজাতিয় উদ্ভিদ বড় করে তুলেছেন। চলতি নাম প্যারামাটা রেড গাম বা Parramatta red gum (বৈজ্ঞানিক নাম Eucalyptus parramattensis)। তারা এই ইউক্যালিপটাস গাছগুলো রোপন করেছেন নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াসম্পন্ন প্লাস্টিকের খাঁচায় এক বছরের জন্য অস্ট্রেলিয়ার রিচমন্ডে। এদের ছয়টিকে রাখা হয়েছিল পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার সামঞ্জস্যে এবং বাকি ছয়টি ছিল ঐ তাপমাত্রার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি আবহাওয়ায়। গবেষকরা ১২টি গাছের ক্ষেত্রেই এদের মাটিতে সেচ দেন নি একমাস যাবৎ যাতে হালকা ধরনের খরা পরিস্থিতিতে গাছগুলোকে রাখা। এরপর টানা চারদিন উষ্ণতা বাড়িয়ে দেন ৩টি-৩টি করে ৬টি খাঁচার গাছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকা ৩টি আর ৩ডিগ্রি অধিক তাপমাত্রায় থাকা তিনটির আবহাওয়া নিয়ে যাওয়া হয় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

অত্যধিক তাপমাত্রায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া কার্যত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গবেষকরা চমকে যান এই বিশেষ গাছগুলো প্রায় স্বাভাবিক মাত্রাতেই প্রস্বেদন ঘটিয়ে চলতে থাকায়। অর্থাৎ, এই প্যারামাটা রেড গাম গাছগুলোর বাড়তি ক্ষমতা রয়েছে সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস পেয়ে যাবার পরও উত্তাপ নির্গমনে প্রস্বেদন চালু রাখতে। গবেষকরা তাদের সিদ্ধান্ত পেয়ে গেলেন— উষ্ণতর স্থানেও স্বাভাবিক আবহাওয়া ও পরিবেশের মত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে এ জাতীয় ইউক্যালিপটাস। শুধু তাই নয়, তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে স্বাভাবিক হলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, অধিক তাপমাত্রার প্রতিকূলতায় কেবল সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ করে কেবল প্রস্বেদনে ব্যস্ত থাকছে। ফেব্রুয়ারিতে এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় মাসিক জার্নাল Global Change Biology এ।

গবেষকরা মনে করেন এ বিশেষ গাছের কার্যকরী মাত্রায় প্রস্বেদনের কারণ— এরা মাটির গভীর থেকে পানি শোষণ করতে পারে। এ কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার পরেও তাদের উত্তাপ হ্রাসে প্রস্বেদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে পেরেছিল। তবে উত্তাপ, খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সংকট একই সময়ে হলে এ গাছেদের জন্যও আর উপযোগিতা অবশিষ্ট থাকবে না।

অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আশা যোগান দিচ্ছে এ ফলাফল। লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পরিবেশবিদ ট্রেভর কীনান মনে করেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর। অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করতে পারে এখন সেটাই দেখার বিষয়। এ গবেষণার প্রধান ড্রেক উত্তর আমেরিকার সুলভ গাছগুলোর উপর অনুরূপ পরীক্ষা করার আশা করেন।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বলতে বাংলাদেশেরও উচিত এ জাতীয় গবেষণায় এগিয়ে আসা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ একটি দীর্ঘ ও যথেষ্ট অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। তাই অন্যান্য প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের অঞ্চলের যে সকল অতি প্রচলিত গাছ আছে সেগুলো কতটুকু টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে তা পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কোনসকল বৃক্ষের টিকে থাকার অভিযোজন ক্ষমতা বেশি সেগুলো নিয়েই বনায়নের দিকে জোর দেয়া উচিত। কারণ টেকসই বনায়নের একটি নির্ণায়ক গাছেদের টিকে থাকার ক্ষমতা।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

শরতের পাতার রঙের রসায়ন

শরতের আগমনের সাথে সাথেই গাছের পাতার রঙের মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। এ বিচিত্রতা যদিও আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে চোখে পড়ে, কিন্তু এর মধ্যে যে রসায়নের খেলা চলে তা নিয়ে আমরা হয়তো খুব কমই মাথা ঘামাই।

পাতায় বিভিন্ন রঙ প্রদানকারী যৌগ সম্পর্কে জানার আগে করার আগে প্রাথমিক অবস্থায় এদের উৎপত্তি বিষয়ে জেনে নেই। এ উদ্দেশ্যে যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বন্ধনের উদ্ভব ঘটে। শরতের পাতার রঙ পরিবর্তনের পিছনে একক ও দ্বি-বন্ধনের মিশ্রিণ এবং কনজুগেশন বন্ধনেরও ভূমিকা আছে। কজুগেশন বন্ধনের কারণে পাতায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের দৃশ্যমান আলো শোষিত হতে পারে। চোখে আপতিত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ভিন্নতার কারণে পাতার রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়।

ক্লোরোফিল

পাতার সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল নামের উপাদানটি। পাতার কোষের ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকে এ ক্লোরোফিল, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ক্লোরোফিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক।

গ্রীষ্ম শেষ হবার সাথে সাথে যেহেতু উষ্ণতা ও সূর্যালোক উভয়ই প্রতিকূলে যেতে থাকে তাই তখন ক্লোরোফিল উৎপাদনের হারও কমতে থাকে। অন্যদিকে পাতার মাঝে সঞ্চিত ক্লোরোফিল বিয়োজিত হতে থাকে। এ অবস্থায় পাতার রঙ সবুজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আদি হলদেটে রূপ ধারণ করে।

ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড

রাসায়নিক যৌগের পরিবারের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড বিশাল স্থান দখল করে আছে। এরা লাল ও হলুদ রঙের জন্য দায়ী। ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্যাভিনয়েড ক্লোরোফিলের সাথে উপস্থিত থাকে। এমনকি এমনকি গ্রীষ্মেও। তবে গ্রীষ্মে ক্লোরোফিল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে বিধায় পাতার মাঝে এদের প্রভাব দেখা যায় না। ফলে পাতা সবুজ দেখায়।

তবে শরতের আগমনের সাথে সাথে আবার ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি প্রকট হতে থাকে ফলে হলুদ রঙের উদ্ভব ঘটে। এদের মাঝে ক্যারোটিনয়েড লাল আর ফ্যাভিনয়েড কমলা রঙের আবির্ভাব ঘটায়। শরত শেষ হবার সাথে সাথে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি কমতে থাকে।

ক্যারোটিনয়েডের আরো কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিন (গাজরে থাকে), লুটেইন (ডিমের কুসুমের হলুদ রঙের জন্য দায়ী), লাইকোপিন (টমেটোর টকটকে লাল রঙের জন্য দায়ী)।

অ্যান্থোসায়ানিন

ফ্যাভিনয়েড শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত অ্যান্থোসায়ানিন। কিন্তু ফ্যাভিনয়েডের মতো অ্যান্থোসায়ানিন সারা বছর জুড়ে পাতার মধ্যে থাকে না। বেলা নামার সাথে সাথে পাতার মাঝে অবশিষ্ট শর্করা সূর্যালোকের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন ঘটায়।

যদিও পাতার মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রকৃত ভূমিকা জানা যায়নি, ধারণা করা হয় অ্যান্থোসায়ানিন আলোক নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। অর্থাৎ পাতাকে অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। আর পাতাকে রঙ দানের ক্ষেত্রে অ্যান্থোসায়ানিন লাল, বেগুনি ও অন্যান্য মিশ্রিত রঙের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকে। পাতার রসের মধ্যে অম্লের উপস্থিতির কারণেও রঙের আবির্ভাবের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ কম্পাউন্ড কেমিস্ট্রি, http://www.compoundchem.com/2014/09/11/autumnleaves/

featured image: turningstar.com

পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়লে কী হবে?

মানুষসহ সকল প্রাণির জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ। তাপমাত্রা বা উষ্ণতা পরিবেশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। খুব কম তাপমাত্রা যেমন বসবাসের অনুপযোগী ঠিক তেমনি উষ্ণতা বৃদ্ধিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। শীতের দিনে উষ্ণতা পেতে ভালোই লাগে কিন্তু গরমের দিনে আবার সেই উষ্ণতাই অশান্তির কারণ হয়। বর্তমানে কার্বন ডাই অক্সাইডের নি:সরণ বেশি হওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্বের তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে নানা প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হবে।

image source: helpsavenature.com

এ কারণেই জলবায়ু বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার পদক্ষেপ হিসাবে আন্তর্জাতিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পাদন করেছিল জাতিসংঘ। এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি যেন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম থাকে।

শিল্পায়নের ফলে যখন কারখানার গ্রিন হাউজ গ্যাস বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে, তার ফলশ্রুতিতে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল জি ৮ (যদিও এটা এখন জি ৭) এর নীতি নির্ধারকরা বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আবহাওয়া মানুষ ও জীব জগতের সাথে বৈরী আচরণ করবে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো অনাবৃষ্টি, দাবানল, সাইক্লোন ও টর্ণেডো প্রভৃতি আঘাত হানবে।

কিন্তু এই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আমরা জানি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে। কিন্তু এর সাথে আসলে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের সম্পর্কটা কি?

প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট শেষ মান আছে, যে মান পর্যন্ত স্বাভবিক অবস্থা বিরাজ করে। কিন্তু তা অতিক্রম করলেই অবস্থার পরিবর্তন হয়। এই শেষ মানকে থ্রেসহোল্ড বলে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির থ্রেসহোল্ড মান হলো ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৯৭৫ সালে সর্ব প্রথম এটি নিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে মত প্রকাশ করে অর্থনীতি বিদ ড. ইউলিয়াম নর্দুয়াস বলেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা । ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এপ্লাইড সিস্টেম এনালাইসিস এর একটি গ্রুপ যারা আন্তর্জাতিক সীমারেখায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কর্মরত, তার সহকর্মিদের তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিভাবে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড নি:সরণ নিয়ন্ত্রণ করবো? নর্দুয়াস বলেন, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড (মানুষের তৈরি কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা সৃষ্ট) বৃদ্ধি পেলে তা, পৃথিবীর জলবায়ুকে এমন ভাবে পরিবর্তন করবে যা গত কয়েক লক্ষ বছর ধরে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। এক জন অর্থনীতিবিদ হিসাবে নর্দুয়াস গবেষণা করে দেখেন যে, যেভাবে কার্বন ডাই আক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে তা যদি দুইগুণ হয়, সেটা হবে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির সম পরিমান।

image source: wattsupwiththat.com

এখন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিপদজনক অবস্থায় থাকবে পরিবেশ। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্ববাসীকে মানুষের তৈরি গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ভয়াবহতার ব্যাপারে সর্তক করে আসছেন। ১৯৯২ সালে মানব হস্তক্ষেপের ফলে জলবায়ুর বিপদজনক পরিবর্তন বন্ধের লক্ষ্যে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কনভেনশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছেনা।

নর্দুয়াসের গবেষণার ৪০ বছর পর ২০১৬ সালে জাতিসংঘ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখার পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০ শতকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৮৮০ সালে এই তাপমাত্রা অনেক কম ছিল। ১৯৭৫ সালের পর থেকে প্রতিনিয়ত দশমিক হারে তাপমাত্রা বাড়ছে বলে নর্দুয়াস তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। ২১ শতকের প্রতিটি বছর, অর্থাৎ, গত ২০ বছর ছিল সর্বোচ্চ উষ্ণতম বছর। ইতোমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর বৈরি আচরণের স্বীকার বিশ্ববাসী। মানব সৃষ্ট কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ২০১৭ সালে হারিকেন বেশি আঘাত হেনেছে এবং ১০ গুণ বেশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় খরা ও গরমের তীব্রতায় কম বৃষ্টিপাত, শুষ্ক মাটি ও দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে। যদি তাপমাত্রা ২ ডিগ্রীর বেশি বেড়ে যায় তাহলে পৃথিবী অনেক উষ্ণ হবে যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, কৃষি, কাঠামো ও পরিবেশের উপর। বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থার ধ্বংস এবং প্রবালদ্বীপ এবং আর্কটিক এলাকার অনেক প্রজাতি বিপন্ন হবে। গ্রিনল্যান্ড বরফ এবং আর্টিক বরফ দ্রুত গতিতে গলতে শুরু করলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চল ও ছোট ছোট দ্বীপ গুলো নিশ্চিহ্ন হবে। ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পুরো জাতির অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে। সমুদ্র উপকুলীয় পর্যটন শিল্প মারাত্বক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে।

বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত কি তাদের কার্বন ডাই আক্সাইডের নিঃসরণ কমিয়ে উষ্ণতা ২ ডিগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনা? পারে। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন। আই পি সিসির এক গবেষণা বলছে যে তারা ৯৫% ভাগই নিশ্চিত যে, ২১০০ সালের মধ্যে ২ ডিগ্রী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছাড়িয়ে যাবে। তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সচেতন হয়ে বসবাসের উপযোগী পৃথিবী রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

featured image: pbs.org

পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

হেল অন আর্থ। কখনো শুনেছেন এরকম ? দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে একটি বৃহৎ মরুভূমি আছে, যাকে পৃথিবীর নরক বলা হয়। কিন্তু এই নরকের সাথে আরেকটি লাল রঙে আচ্ছাদিত এক স্থানের মিল দেখে বিজ্ঞানীরা একই সাথে উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

চিলির আটাকামা মরুভূমি হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। এই মরুভূমি এতই শুষ্ক যে কোনো কোনো সময় কয়েক দশক বা শতক ধরেও এখানে কোনো বৃষ্টির দেখা যায় না। আর এই প্রতিকূল স্থানকে আমরা পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরো মঙ্গল গ্রহ বলতে পারি এবং বিজ্ঞানীরা এই স্থানের ব্যাপারে এক মস্ত আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

চিলির আটাকামা ম্রুভূমি; image source: dailygalaxy.com

এই প্রথমবাবের মত গবেষকরা আটামাকার অস্বাভাবাবিক শুষ্ক মরুভূমিতে মাইক্রোবায়াল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই শুষ্ক এবং অত্যন্ত গরম পরিবেশে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের একটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রও আছে। তাই মঙ্গল গ্রহের প্রাণের আবিষ্কারের পূর্বে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার।

“এটা আমাকে সবসময়ই অবাক করে দেয় যে, মানুষ যেখানে চিন্তাও করত পারে না এইরকম একটা স্থানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে সেইরকম পরিবেশেও দেখা যায় যে জীবন ঠিকই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে আছে।” বলেন ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন যে, “জীবন যদি পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্ক পরিবেশে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে বেশ একটা ভালো সম্ভাবনা আছে যে, একইভাবে মঙ্গল গ্রহেও জীবনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।”

যদিও এর আগে বিজ্ঞানীরা আটাকামা মরুভূমিতে জীবাণু খুঁজে পেয়েছিলেন। পূর্বের গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, বালিমাটিতে যে সকল প্রাণের আবিষ্কার হবে তা হয় আগেই মারা গেছে বা, মৃতপ্রায় টেকসই কোষের অবশিষ্টাংশ হঠাৎ বায়ুমন্ডলীয় প্রক্রিয়ায় জমা থাকবে।

কিন্তু এইবার তারা আসলেই প্রমাণ পেয়েছেন দলবদ্ধ এবং বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় এক ধরনের জীবাণুর যারা বর্ধনশীল বা অন্তত টিকে থাকার চেষ্টা করছে প্রতিকূল পরিবেশে।

২০১৫ সালে ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক এবং তার সাথে গবেষকারা আটাকামা মরুভূমিতে পৌঁছানোর কিছু পরেই আকাশে বৃষ্টির দেখা দেয় যা কিনা খুবই দূর্লভ ঘটনা। এতটাই দূর্লভ যে ৪০ বছর আগেও মনে হয় এত বৃষ্টিপাত হয়নি বা তা রেকর্ড করা হয়নি।

এই অভাবনীয় বৃষ্টিপাতের পর পরই গবেষকরা মরুভূমির মাটিতে অস্বাভাবিক জীবত্বাত্তিক বিস্ফোরণ দেখতে পান। তারা অন্তত ৮ টি যায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একই ফলাফল দেখতে পান।

এর পর তারা ফিরে আসেন এবং পর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবার অনুসন্ধান চালান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা কোনো রকম বৃষ্টির দেখা পাননি এবং জীবন এর চিহ্ন পরবর্তী নমুনা গুলোতে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছিল।

আটাকামা মরুভূমিতে গবেষনায় ব্যাস্ত বিজ্ঞানীরা; image source: sciencealert.com

তবুও তারা জীনগত এবং কিছু রাসায়নিক পরীক্ষা করেন এবং টেস্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, এই জীবাণুরা এই বিশেষ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এইসকল কষ্টসহিষ্ণু ব্যাক্টেরিয়া দলবদ্ধভাবে মরুভূমির মাটির বেশ কয়েক হাত নিচে অনেক দিন পর্যন্ত পানি ছাড়া ঘুমিয়ে থাকে এবং যখন আবার বৃষ্টিপাত হয় তখন তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম আবার চালু হয়ে যায়।

“আটাকামার মরুভূমির মত এত প্রতিকূল পরিবেশে এত অটলভাবে বেঁচে থাকা কোনো জীবকে এই প্রথম কেউ খুঁজে পেল” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এই সকল অণুজীব যেভাবে শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় চিলির নরকের মতো মরুভূমিতে বেঁচে থাকতে পারে ঠিক তেমনি মঙ্গল গ্রহেও এরকম অণুজীব পাওয়া সম্ভব যারা অনেক বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।”

কিন্তু আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে চিলির আটাকাম মরুভূমি যতই রুক্ষ প্রকৃতির হোক না কেন মঙ্গল গ্রহ তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি রুক্ষ এবং ঠান্ডা।

আটাকামা মরুভূমি এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সাদৃশ্য; image source: sciencealert.com

তারপরেও যদি বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাণের আশা করে থাকেন তবে চিলির মরুভূমিতে আবিষ্কৃত অণুজীব গুলোই হবে মানদণ্ড স্বরূপ, কেননা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ হয়তবা এরকম কোন অনুজীবকে হয়ত বাঁচতে দিবে তার মাটির কয়েক স্তরের নিচে।

নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রমাণ পেয়েছেন যে ৪,০০,০০০ বছর আগেও মঙ্গল গ্রহে বরফ যুগ ছিল । এখনো মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে এবং তা আছে এই গ্রহের দুই মেরুতে।

“আমরা জানি যে মঙ্গলের মাটিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের বেলায় মঙ্গলে বরফ পড়ে তার একটা শক্ত ধারণা আমরা পেয়েছি। ফলে রাতের বেলায় এই লাল গ্রহের মাটিতে আর্দ্রতা সম্পৃক্ত ঘটনা ঘটে যার ফলে আমাদের আশংকা যে এখনো এখানে হয়ত মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে পৃথিবীর মতোই কিন্তু পৃথিবীর চাইতে কয়েক গুন বেশী সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অণুজীব।” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক ।

যদি কখনো মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা হয়ত রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নিচের আরেকটি স্তরে পাওয়া যাবে। আর তখন এসব গবেষণায় হয়ে থাকবে পথিকৃৎ।

featured image: the-martian.wikia.com

যে গভীরতায় এভারেস্টও হার মানে

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ একটি অর্ধচন্দ্রাকার খাঁদ, যা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম অঞ্চলের মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের কাছে অবস্থিত। এর আশাপাশের পরিবেশ কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম খাঁদটি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে অবস্থিত। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের দক্ষিন অংশের নাম হচ্ছে চ্যালেঞ্জার ডিপ এবং এটিই মহাসাগরের সবচেয়ে গভীরতম বিন্দু। এর একদম সঠিক গভীরতা নির্ণয় করা একটু কষ্টসাধ্যই বটে, কিন্তু আধুনিক পরিমাপক দ্বারা নিখুঁত মাপ পাওয়া না গেলেও অনেকাংশে সঠিক পরিমাপ বের করা সম্ভব হয়েছে।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ভৌগলিক অবস্থান; image source: earth.google

২০১০ সালে চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা ৩৬,০৭০ ফিট (১০,৯৯৪ মিটার) পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছিল শব্দের কম্পন/প্রতিধ্বনি দ্বারা এবং জরিপটি করেছিল National Oceanic and Atmosphere Administration (NOAA)। বিখ্যাত মুভি ডিরেক্টর জেমস ক্যামেরন ২০১২ সালে তার গভীর সমুদ্রের অভিযান হিসাবে চ্যালেঞ্জার ডিপের উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং তিনি ৩৫,৭৫৬ ফিট (১০,৮৯৮ মিটার) পর্যন্ত পৌঁছান। ২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অফ হ্যাম্পশায়ারের কিছু গবেষক সমুদ্রের তলদেশের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন এবং চ্যালেঞ্জার ডিপ ৩৬,০৩৭ ফিট (১০,৯৮৪ মিটার) বলে ঘোষণা দেন। মহাসাগরের দ্বিতীয় গভীরতম স্থানটিও মারিয়ানা ট্রেঞ্চেই অবস্থিত যার নাম দ্য সিরেনা ডিপ। এটি চ্যালেঞ্জার ডিপ থেকে ১২৪ মাইল (২০০ কিলোমিটার) পূর্বে অবস্থিত এবং ৩৫,৪৬২ ফিট (১০,৮০৯ মিটার) গভীর। যদি মাউন্ট এভারেস্টের সাথে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তুলনা করা হয় তাহলে মাউন্ট এভারেস্ট অনায়াসে হেরে যাবে। কারণ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ২৯,০২৯ ফিট, আর অপর দিকে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ৩৬,০৭০ ফিট গভীর। ফলে এভারেস্টকে যদি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে নিমজ্জিত করা হয় তাহলে তার চূড়ারও খোঁজ পাওয়া যাবে না।

এভারেস্ট বনাম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ; image source: thinglink.com

রক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ ১,৫৮০ মাইল (২,৫৪২ কিলোমিটার) দীর্ঘ যা ৫ টি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চাইতেও বড় কিন্তু প্রস্থে মাত্র ৪৩ মাইল (৬৯ কিলোমিটার)। যেহেতু গুয়াম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এবং ১৫ টি মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথের সাথে যুক্ত তাই আইনগতভাবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিও বুশ মারিয়ানা ট্রেঞ্চকে জাতীয় সামুদ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা দেন। যার ফলে ১,৯৫,০০০ বর্গ মাইল (৫,০৬,০০০ বর্গ মিটার) পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশে এবং পানির চারপাশের বিছিন্ন দ্বীপগুলো সুরক্ষিত সামুদ্রিক রিজার্ভের আওতায় পড়ে যায়। এর মধ্যে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের বেশীরভাগ দ্বীপ এবং পানির নিচের ২১ টি আগ্নেয়গিরিও অন্তর্ভুক্ত।

কিভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ?

মারিয়ানা ট্রেঞ্চ তৈরি হয়েছিল এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যা সাবডাকশন বলয়ে ঘটে থাকে। (নোটঃ সাবডাকশন বলয় হচ্ছে এককেন্দ্রমুখি প্লেট, যেখানে অন্তত একটি টেকটনিক প্লেট হচ্ছে সামুদ্রিক ভূ-ত্বকের।) সাবডাকশন বলয়ে একটি সামুদ্রিক প্লেটকে অপর প্লেটের সাথে চাপ দেওয়া হয়, ফলে একটি প্লেট আরেকটি প্লেটের নিচে চলে যায়  এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।  যেখানে এই সংঘর্ষটি হয় সেখানে বিশাল খাঁদের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের প্লেটটি ফিলিপাইনের প্লেটের সাথে চাপ লেগে বেঁকে যাচ্ছে। খাঁদ গভীর হলেও সেটা যে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকবে এমনটা কিন্তু নয়। যেমন ইকুয়েটর অঞ্চলে পৃথিবী হচ্ছে স্ফীত আর মেরু অঞ্চলের প্লেট পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি, তাই চ্যালেঞ্জার ডিপ গভীর হলেও তা কিন্তু পৃথিবীর কাছাকাছি নয়।খাঁদের তলদেশে পানির চাপ অত্যাধিক বেশি, প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে প্রায় ৮ টন (৭০৩ কিলোগ্রাম প্রতি বর্গ মিটারে)। এটি সমুদ্রের পৃষ্ঠের চাপের চাইতে প্রায় ১০০০ গুন বেশি বা, ৫০ টি জাম্বো জেট প্লেন একজন মানুষের উপর স্তুপ করে রাখার সমান।

যেভাবে তৈরি হয়েছিল এই খাঁদ; image source: worldbeneaththewaves.com

অস্বাভাবিক আগ্নেয়গিরি সমূহ

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সারিবদ্ধ যেসব আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের উপর মাথা তুলে আছে তারাই অর্ধচন্দ্রাকৃতির মারিয়ানা দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও সমুদ্রের নিচে কিছু অদ্ভুত আগ্নেয়গিরি দেখা যায়, যেমন – এইফুকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি তরল কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। যে তরল এখান থেকে বের হয়ে আসে তার তাপমাত্রা ১০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দাইকোকু সমুদ্রগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরি বিগলিত সালফার নির্গমন করে, যা আর পৃথিবীর কোথাও দেখেতে পাওয়া যায় না।

খাঁদে যাদের বসবাস

সাম্প্রতিক কিছু অভিজানের পর অবাক করে দেওয়া বিচিত্র জীবনযাত্রার খোঁজ পাওয়া গেছে খাঁদের কঠিন পরিবেশে। যেসকল জীব মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীর অঞ্চলে বসবাস করে তারা অত্যাধিক চাপ এবং নিকষ কালো অন্ধকারে থাকে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চে খাবার খুবই সীমিত, কারণ পানির উপরিভাগের খাবার এত গভীরে পৌঁছাতে পারে না। তাই পানির নিচে জীবাণু ও ছোট প্রাণীরা রাসায়নিক পদার্থ, যেমন: মিথাইন বা সালফার এর ওপর নির্ভর করে থাকে। সাধারণত তিন ধরণের জীব দেখা যায় মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে, সেগুলো হল – জেনোফাইওফোরস, অ্যাম্ফিপডস এবং সি কিউকাম্বার।

মারিয়ানা ট্রেঞ্চের প্রধান তিন ধরণের প্রানী; image source: zmescience.com,pinterest.com,deepseanews.com

জেনোফাইওফোরস হচ্ছে এককোষী কিন্তু বৃহৎ আকারের অ্যামিবা এবং তারা আশেপাশে যা পায় তাই খায়। অ্যাম্ফিপড হচ্ছে চকচকে কিছুটা চিংড়ি মাছের মতো দেখতে এবং তারা ময়লা আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকে। এদেরকেই মূলত খাঁদে বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা দুইশতাধিক বিভিন্ন ধরণের অনুজীবের সন্ধান পেয়েছেন সেখান থেকে কাদা তুলে আনার পর। এছাড়াও ২০১২ সালের জেমস ক্যামেরন এর অভিযানের সময় বিজ্ঞানীরা মাইক্রোবায়াল ম্যাট সনাক্ত করেন চ্যালেঞ্জার ডিপে। মাইক্রোবায়াল ম্যাট হাইড্রোজেন এবং মিথাইন শোষণ করে বেঁচে থাকে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু অদ্ভুত ধরণের মাছও এখানে দেখতে পাওয়া যায় এবং এরাই কিন্তু এখানে খাদ্য শিকল এর উপরের স্তরে রয়েছে। এই সকল জীব সাধারণত ২৬,২০০ ফিট (৮,০০০ মিটার) গভীরে দেখতে পাওয়া যায় যেখানে সূর্যের আলো একদমই পৌঁছায় না। এ কারণেই এরা দেখতেও অদ্ভুত এবং এদের শারীরিক কাঠামোও আলদা।

এই গভীরেও রয়েছে দূষন

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে এই গভীর খাঁদেও পাওয়া গেছে মানুষের তৈরি দূষণের চিহ্ন। ১৯৭০ সালে যে সকল ক্ষতিকর রাসায়নিক নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তা এখনো সমুদ্রের গভীরতম অংশে ওঁত পেতে আছে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ থেকে নিয়ে আসা অ্যাম্ফিপড পরীক্ষা করার সময় একদল বিজ্ঞানী এরমধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এই সব রাসায়নিক ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ব্যবহার হয়েছিল এবং পরে তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

“এত গভীর এবং এত দুর্ভেদ্য অঞ্চলে মানুষের তৈরি অতিমাত্রার দূষণ খুঁজে পাওয়া খুবই দুঃখজনক এবং এটার একটা বিধ্বংসী প্রভাব পড়বে সমগ্র মানবজাতির উপরে দীর্ঘ সময়ের জন্য” বলে মন্তব্য করেন নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান লেখক জেইমসিন।

গবেষকরা বলছেন যে, পরবর্তী ধাপ বুঝে কাজ করতে হবে এবং আগে যা কিছু হয়েছে তার ফলাফলের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ এটি আমাদের বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ।

featured image: eoimages.gsfc.nasa.gov