কৃষিশিল্পে বৈচিত্র্য কেন প্রয়োজন


অতীতের কৃষিশিল্পে একই সাথে বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করা হতো, বর্তমানের সাথে যার সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা কৃষিব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ নাকি তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া জীববৈচিত্র্যের ফলে যে আমাদের খাদ্যের যোগান ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার উপর অধিকাংশ মানুষই কোনো কর্ণপাত করে না। তবে আশার কথা, হাতে গোনা কয়েকজন এই বিষয়টি উপলব্ধি করেন, এবং এর সমাধানে নানা রকম ভাবনা চিন্তাও করেন।

পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল, কেননা তাদের সময় হরেক জাতের ফসল ফলানো হতো। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আজকে আমাদের খাদ্য তালিকায় খুঁজে পাওয়া ভার, কারণ সেই কৃষি-ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন, যার জন্য পূর্বে উৎপাদিত হওয়া বিভিন্ন রকম শস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন আর উৎপাদনই করা হয় না। বর্তমানে আমাদের উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সিংহভাগ আসে মাত্র পনেরো জাতের উদ্ভিদ থেকে। আর পুরো বিশ্বের শর্করা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি যোগান আসে গম, চাল আর ভুট্টা থেকে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কৃষি-ব্যবস্থায় কৃষক সমাজ, বিভিন্ন প্রকরণের শস্যের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎপাদন করার এক বিস্ময়কর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যাকে বলা হতো ‘ল্যান্ডরেস’। স্থানীয় পরিবেশের সাথে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ্ধতিটি। প্রত্যেক নবান্নের সময় কৃষকেরা পরবর্তী বছরে চাষ করার জন্য কিছু বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ করে রাখতো, ভবিষ্যতের দুর্যোগ সামাল দেবার উদ্দেশ্যেও এটি কাজ করা হতো।

যেহেতু একই জমিতে একই ফসল বার বার উৎপাদন করা হলে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে তাই কৃষকেরা প্রতি বছর ফসলের পরিবর্তন করতো। একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতো। এতে করে জমি তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতো। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি কোনো ফসল কীটপতঙ্গ বা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতো, তাহলে তার ক্ষতি নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তা করতো না, কারণ ক্ষতি সামাল দিতে আরো বাকি ফসল রয়েছে। এটা ছিল ‘ল্যান্ডরেস’ এর একটি বড় সুবিধা।

কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে পূর্বের প্রেক্ষাপটের কোনো মিল তো নেই-ই, বরং একটি যে আরেকটির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করে, তা বললে খুব একটা ভুল বোধ হয় হবে না। কারণ বহু জাতের ফসল উৎপাদন যেখানে পূর্বের কৃষি শিল্পে প্রাধান্য ছিলো সেখানে বর্তমানের কৃষিশিল্পের প্রাধান্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক-ফসলী উৎপাদন বা মনোকালচার।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্পোদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, কৃষিশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্ব এখনো ‘দুর্ভিক্ষ’ নামক মারাত্মক সমস্যার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

ব্যাপারটাকে একটু খোলসা করে বলা যাক। প্রতিযোগিতামূলক বাজের টিকে থাকার জন্য এসময়ের ফার্মগুলো কেবল এক জাতের ফসল উৎপাদন করার জন্য অদরকারিভাবে বিশালায়তনের জমি ব্যবহার করছে। আর এর পেছনে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে তা সহজেই অনুমেয়।

অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অত্যাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রযুক্তির কথা এসে পড়ে। বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য বেশি পরিমাণে কীটনাশক, সার প্রয়োগের দরকার হয়, উন্নতমানের সেচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি এই ফার্মগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে ঠিকই কিন্তু তার পরিবর্তে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে সাথে সাথে। কেননা অত্যধিক পরিমাণে এসব ব্যবহারের ফলে মাটি একসময় তার বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করে।

কোন ফসল উৎপাদন করা হবে তা পুরোপুরি কৃষকদের উপর নির্ভর করলেও তারা উৎপাদনের জন্য সেই ফসলই নির্বাচন করে থাকে যা সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল এবং যা উৎপাদন করলে বাজারের অন্যান্য ফার্মদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে, এবং যেখানে আরো অনেক ফসল আছে যা তাদের পরিবেশের অবস্থা এবং মাটির ধরণ অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী। এর ফলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য তাদেরকে অত্যাধিক পরিশ্রম করে বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে হয়। এটা তাদের করতে হতো না যদি না তারা তাদের জমির জন্য উপযোগী অন্যান্য ফসলগুলো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিতো। কিন্তু যাদের লক্ষ্য থাকে অন্যান্য ফার্মগুলোকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করা, তাদেরকে এটা বুঝাবে এমন সাধ্যি কার?

2 চিত্রঃ এই সবজিগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং আমাদের খাদ্যের সিংহভাগ যোগান এরাই দিয়ে থাকে। ছবিঃ dumbonyc.

মনোকালচারের একটি পরিণতি হচ্ছে, এর ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক শতাব্দীতে যত ধরনের শস্যাদি উৎপাদিত হতো, তার মধ্যে মাত্র দশ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। আঠারো শতকে প্রায় ৭০০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদন করা হতো, আর আজকে কেবল ১০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনকারীরা তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে যা উৎপাদন করবে, তাই আমাদের খেতে হবে। আমরা যে এখন তাদের উপরেই নির্ভরশীল- তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনোকালচারের আরেকটি সুবিধা হলো এটি ফসলের রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একবার যদি কয়েকটি শস্যদানা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে একটি চারাগাছ আক্রান্ত হবে, এরপর পুরো ফার্ম, এবং এরপর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ফার্মে সেই রোগের সংক্রমণ ঘটবে।

এসব নানাবিধ অসুবিধা নির্মূল করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের উচিত ‘ল্যান্ডরেস’ এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা যাতে তারা এমন একটি জিন খুঁজে পায় যা চারাগাছগুলোকে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। তবে রোগের সংক্রমণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনও ফসলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘মনোকালচার’ চলটা বদলানোর জন্য আমাদের হাতে এখনো কিছু সময় আছে। পূর্বে বর্ণিত কৃষকসমাজ ‘ল্যান্ডরেস’ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আমরা যদি ঠিক সেই কাজটির মাধ্যমে আমাদের খাদ্যাভাসে একটু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেই তাহলে বর্তমান কৃষিশিল্প বাধ্য হবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে। তবে আমরা যদি এজন্য খুব তাড়াতাড়ি কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অচিরেই এ নিয়ে আমাদের বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা সায়েন্স এক্সপ্লোরার (http://thescienceexplorer.com/nature/why-we-need-biodiversity-our-crops)

লেখিকাঃ কাজী ফাতিহা বিনতে হাবিব
আইডিয়াল কলেজ, মতিঝিল

সূর্যরশ্মিঃ বন্ধু নাকি শত্রু

ছোটবেলায় মা ভরদুপুরে বাইরে খেলতে দেয় না, বেশি রোদে বাইরে বেরুতে দেয় না। বেশি রোদ দেখলে আমরা সেই রোদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কখনো ছাতা মাথায় রোদ এড়িয়ে চলি, কিংবা কখনো সানব্লক ক্রিম মাখি। এতোকিছু করা হয় শুধুমাত্র ভয়ের কারণে, রোদে পুড়ে ত্বক যেন কালো হয়ে না যায়। আবার কখনো ছেলে-বুড়ো সকল বয়সের মানুষেরা সকালের হাল্কা মিষ্টি রোদে হাটতে বের হই এই ভেবে যে, এই রোদ আমাদের শরীরের জন্য উপকারী, হালকা রোদ ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে।

শীতপ্রধান দেশে যেখানে মানুষ রোদের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে, সেখানে গ্রীষ্মকাল আসলেই তাদের মাঝে অন্য এক আনন্দের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সব বয়সের মানুষ দিনের সময়টা বাইরে ঘোরাঘুরি করে। রোদের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করে। তারপরও বহু মানুষের মাঝে ভুল ধারণা থাকে সূর্যের আলো আমাদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। তাই এখানে সূর্য আমাদের কতটুকু ক্ষতি করে, কীভাবে করে, এবং কতটুকু উপকার করে তা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করবো।

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ এক ধরনের বিচ্ছুরিত শক্তি যা তড়িৎচুম্বকীয় কৌশলে নির্গত হয়। তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্র একসাথে স্পন্দনের মাধ্যমে তরঙ্গ আকারে শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং শক্তি সঞ্চারিত করে। এখানে তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্রের স্পন্দনের দিক একে অপরের সাথে লম্বভাবে হতে থাকে। দৃশ্যমান সূর্যের আলো তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের একটি ভালো উদাহরণ। এছাড়াও আরো অনেক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ আছে যা আমাদের চোকে দৃশ্যমান নয়। যেমন বেতার তরঙ্গ, ইনফ্রারেড রশ্মি, এক্স রে ইত্যাদি।

2চিত্রঃ তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের কৌশল।

আমরা জানি, সূর্যরশ্মির কণা ধর্ম ও তরঙ্গধর্ম উভয়ই আছে। সূর্যরশ্মির কণা ফোটন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে স্পন্দিত হয়ে তরঙ্গ আকারে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। একটি ফোটন কণা কতটুকু তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি বহন করে নিয়ে যায় সেটি নির্ভর করে সেই তরঙ্গের কম্পাঙ্কের উপর। বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্কের সমীকরণ  দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শক্তি কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক যেখানে  হলো প্ল্যাংকের ধ্রুবক,  (নিউ) হলো কম্পাংক। আবার  যেখানে  হলো আলোর বেগ এবং  হলো এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

তাহলে আমরা বলতে পারি একটি ফোটন যতটুকু শক্তি বহন করে তা তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক। এর মানে দাঁড়ায় তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বাড়তে থাকবে শক্তির পরিমাণ ততই কমতে থাকবে। সাধারণত এই বিকিরণকে আমরা ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাংক এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করি। যেমন কোনো রেডিও স্টেশন ৬৮০ কিলোহার্জ ফ্রিকোয়েন্সিতে তথ্য পাঠায়। এছাড়া তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেলায় আমরা বলি অতিবেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রাভায়োলেট রে ১০০-৪০০ মিলিমিটার সীমায় কাজ করে।3

আইনস্টাইনের ফটোতড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কে কম বেশি অনেকেই জানে। ফটোতড়িৎ ক্রিয়া দেখিয়ে ১৯১২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন কোনো ফোটন কণা যখন কোনো বস্তুকণার উপর আঘাত করে তখন সেখান থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াটা কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যখন পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন ফোটন কণা কোনো বস্তুকণার উপর এসে পড়ে তখন বস্তুকণার মাঝে ইলেকট্রনের উত্তেজিত অবস্থা এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনের প্রমোশন বা উত্তীর্ণকরণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থানকালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন সাধারণত শক্তি শোষণও করে না, বর্জনও করে না এবং তা ঐ কক্ষপথে নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুরতে থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে শক্তি দেয়া হলে ইলেকট্রন সেই শক্তি শোষণ করতে বাধ্য হয় এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একে বলে উত্তেজিতকরণ অবস্থা। এরপর সেই শক্তি নিয়ে ইলেকট্রন উপরের কক্ষপথে লাফ দিয়ে চলে যায়। একে বলে উত্তীর্ণকরণ অবস্থা। পুরো প্রক্রিয়া খুব স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হয়। ইলেকট্রন শীঘ্রই আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে এবং গ্রহণ করা অতিরিক্ত শক্তি তড়িৎচুম্বক বিকিরণ আকারে বের করে দেয়।

সূর্যরশ্মি কেন আমাদের সানবার্নের জন্য দায়ী

অতিরিক্ত রোদে চলাফেরা করলে ত্বকের বেশ ক্ষতি হয়। ত্বকের রঙ কালো হতে থাকে এবং ত্বক পুনরায় আগের রঙ ফিরে পায় না। এছাড়াও অতিরিক্ত সূর্য-রশ্মি অল্প বয়সে ত্বকে বয়স্ক ভাব এনে দেওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের ঝুকিও বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সূর্য-রশ্মি আমাদের ত্বকের এই পুড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কেন? ব্যাপারটা এমন না যে রোদে আমাদের অনেক গরম অনুভূত হয় এবং প্রচণ্ড গরমে আমাদের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আমাদের এই ক্ষতির কারণ তাপীয় প্রভাবের কারণে নয় বরং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে।

সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি নির্গত হয় তা তড়িৎচুম্বক বিকিরণের সমষ্টি, যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনী, দৃশ্যমান ও অবলোহিত বা ইনফ্রারেড অঞ্চলের মাঝে পড়ে। এদের মধ্যে কিছু বিকিরণ আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগে পুরোপুরি এসে পৌছায় না। আমরা সবাই পৃথিবীর ওজোন স্তরের কথা জানি। সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি এই ওজোন স্তর শোষণ করে আমাদের রক্ষা করে। ওজোন স্তর ওজোন গ্যাস (O3) দিয়ে গঠিত যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে নেয় এবং ভেঙ্গে একটি অক্সিজেন অণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু গঠিত করে। পরবর্তীতে এই অক্সিজেন পরমাণু আবার অপর এক অক্সিজেন অণুর সাথে মিলত হয়ে ওজোন অণু গঠন করে। এভাবে চলতে থাকে। পৃথিবীর মাঝে পানি এবং বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন সূর্যরশ্মির ইনফ্রারেড অংশ শোষণ করে ফেলে। ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান আলো যা আমাদের ত্বকের উপর পড়ে এবং আমরা গরম অনুভূত করি। এই অংশগুলোর বিকিরণ শক্তি আমাদের ত্বকের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলেও মূলত ক্ষতি করে অতিবেগুনী রশ্মি, যার ফোটন কণা যথেষ্ট শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে।4

অতিবেগুনী রশ্মিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এরা হলো UV-A, UV-B ও UV-C। এদের মধ্যে UV-C এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক কম বলে এই রশ্মির ফোটন অনেক উচ্চ শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে। ওজোন স্তর UVC কে পুরোপুরি শোষণ করে ফেলে। যদি UVC পৃথিবীতে ঢুকে যায় তাহলে প্রাণীকুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে। UVA বাকী দুটোর তুলনায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। এতে এর ফোটন কণার শক্তিও যথেষ্ট কম। যদিও UVA, UVC এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকর নয় তবে এটিও আমাদের কম ক্ষতি করে না। বায়ুমন্ডল ভেদ করে যতটুকু পরিমাণ অতিবেগুনী রশ্মি আসে তার প্রায় ৯৫ শতাংশ আল্ট্রাভায়োলেটে গঠিত।

এতক্ষণ ফটোতড়িৎ ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এর সূত্র ধরেই এখন আমরা জানবো সূর্যরশ্মি কীভাবে আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন UV রশ্মির ফোটন কণা আমাদের শরীরের পরমাণু উপর পড়ে সেখান থেকে ইলেকট্রন সম্পূর্ণ বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। ফলের পরমাণুর আয়ন অবস্থার সৃষ্টি হতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা এমন যে দুটো পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রন জোড়া শেয়ারের মাধ্যমে যে রাসায়নিক বন্ধনের সৃষ্টি হয় তা এই পর্যাপ্ত শক্তির প্রভাবে এদের মাঝখানে ফাটল ধরে যাতে করে এরা দুটো র‍্যাডিক্যাল বা মুক্ত পরমাণু হতে বাধ্য হয়। এদের প্রত্যেকটির কাছে একটি করে শেয়ারের ইলেকট্রন থাকে। যে শক্তির কারণে এই অবস্থা ঘটে তাকে বন্ধন ভাঙ্গন শক্তি বলে।

মানুষ সহ সকল জৈবিক প্রাণীদের শরীর কার্বন-কার্বন পরমাণুর বন্ধন দিয়ে তৈরি। একটি একক কার্বন-কার্বন বন্ধন ভাঙ্গতে প্রায় ৩৫০-৪৮০ কিলোজুল/মোল শক্তি প্রয়োজন যা আল্ট্রাভায়োলেট বিকিরণ প্রদান করতে সক্ষম।

২০১২ সালের আগ পর্যন্ত কীভাবে সানবার্ন হয় তা বিজ্ঞানীরা জানতেন না। কিন্তু অবশেষে বিজ্ঞানী রিচার্ড গ্যালো “নেচার মেডিসিনে” প্রকাশিত তার এক নিবন্ধে সম্পূর্ণ ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির পর্যাপ্ত পরিমাণের শক্তি আমাদের কোষের মাঝে বিশেষ ধরনের RNA কে ভেঙ্গে ফেলে এবং পরিবর্তিত করে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষ তার ভেঙ্গে যাওয়া RNA কে মুক্ত করে পাশের সুস্থ কোষগুলোকে উত্তেজিত করে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলোকে ঠিক করার জন্য সুস্থ কোষগুলোর মাঝে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটি এভাবে চলতেই থাকে।

আল্ট্রাভায়োলেটের অতিমাত্রার প্রভাবে পুড়ে যাবার আগে ত্বক ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে। ত্বকের কোষগুলোর চমৎকার আত্মরক্ষাত্মক প্রক্রিয়ায় UVA প্রতিহত করার জন্য কোষে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক তৈরি হয় যা প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ UV বিকিরণ প্রতিহত করে। কিন্তু প্রতিহত ব্যবস্থাটি কতটুকু হবে তা নির্ভর করে আমাদের কোষে কতটুকু মেলানিন তৈরি হচ্ছে বা আছে তার উপর। সাধারণত কালো চামড়ার মানুষের দেহে যথেষ্ট পরিমাণে মেলানিন আছে যাতে করে তাদের উপর প্রভাবটা কম পড়ে। কিন্তু ফর্সা চামড়ার মানুষের দেহে মেলানিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হতে পারে না বলে UVA রশ্মি পুরোপুরি প্রতিহত হয়। এতে আমাদের কোষের ক্ষতি হতে থাকে এবং ত্বক পুড়ে যায়। যাকে বলে সানবার্ন।

সূর্য আমাদের বন্ধু নাকি শত্রু এই নিয়ে মানুষের মাঝে তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। বহু মানুষ ক্ষতির ভয়ে সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আদৌ কি সূর্যের আলো শুধু আমাদের ক্ষতিই করে যায়? না। মানবদেহে সূর্যের আলোর অনেক উপকারী দিকও আছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রায় ১৫ টি দেশ থেকে শীতকালীন সময়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সূর্যের আলোর উপর গবেষণা চালিয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্যগুলোর মাধ্যমে তারা ১৭৭ টি দেশের মানুষের রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ নির্ণয় করার চেষ্টা চালায়। তথ্য যাচাই-বাছাই করে অবশেষে তারা সিদ্ধান্তে আসেন, নিম্ন মাত্রার ভিটামিন ডি’র সাথে স্তন ক্যান্সার ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। তাদের মতে, যদি রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাহলে ক্যান্সারের ঝুকি অনেকাংশে কমে যায়। ডায়েট, বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চার পাশাপাশি দিনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলোতে থাকলে দেহ যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ পায়, যা মানবদেহের জন্য অনেক উপকারী।

সূর্যের আলোর উপকারিতা

রাতে ভালো ঘুম হওয়াঃ মানব দেহ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। একে সার্কোডিয়ান চক্র বলে। ২৪ ঘণ্টা সময়ের মাঝে মানবদেহের দৈহিক, মানসিক, আচরণগত পরিবর্তন এবং দিনের আলো ও রাতের সময়টা মানব দেহের উপর কী প্রভাব ফেলে, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে এই চক্র গঠিত। সুস্থ ও ভালোভাবে এই চক্র সম্পাদনের জন্য সূর্যের আলোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। দিনের বেলা আমরা জেগে তাকি, রাতে আমাদের ঘুমোতে হয়, আমাদের দেহ ঘড়ি সবসময় এই নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে চলে।

সাধারণত দিনের আলো আমাদের শরীরকে সংকেত দেয় এটা দিনের আলো এবং আমাদের শরীর ঘড়ি সচল হয়ে যায় এবং সারাটা দিন সচল হয়ে দিন কাটাতে সাহায্য করে। দিনের আলো ছাড়া কোনো মানুষকে যদি ২৪ ঘণ্টা কৃত্রিম আলোতে রাখা হয় তাহলে দেহ ঘড়ি তার নির্দিষ্ট ছন্দ গুলিয়ে ফেলে। এতে মানসিক ও দৈহিক অনেক প্রভাব ফেলে। চক্রের মাঝে বিশৃংখলা দেখা দেয়। রাতে সময়মতো ঘুম আসে না, সকালেও সময়মতো উঠা যায় না। সকালের আলো থেকে যতটা দূরে থাকবো ততই আমাদের শরীরবৃত্তিয় চক্রের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে।

মেজাজ ফুরফুরে করাঃ মেজাজ ফুরফুরে থাকা, চিন্তা ভাবনায় সক্রিয় ও সতর্ক থাকার সাথে সূর্যের আলোর ভালো সম্পর্ক আছে। প্রতিদিন সূর্যের আলো আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে সেরেটোনিন তৈরি করে। সেরেটোনিন আমাদের মেজাজ ফুরফুরে রাখতে সাহায্য রাখে। গবেষকরা বহু মানুষের মাঝে গবেষণা করে দেখতে পান, কোনো মানুষ কত ঘণ্টা সূর্যের আলোতে ছিল এবং তাদের শরীরে সেরেটোনিনের মাত্রা কেমন হচ্ছে, এই দুইয়ের মাঝে যোগসূত্র আছে। আরো দেখতে পান পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলোতে থাকার সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে দেহে উৎপন্ন সেরোটোনিনের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

ভিটামিন ডি তৈরিঃ যে ক্রিয়া-কৌশলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে ঠিক সেই ক্রিয়াকৌশলেই আমাদের ত্বক ভিটামিন ডি তৈরি করে। সাধারণত ২৯৫-৩০০ মিলিমিটার ব্যবধির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো আমাদের ত্বক শোষণ করলে, ঐ আলো যে পরিমাণ শক্তি বহন করে তা ত্বকে দুই ধাপ সংঘটিত বিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তির যোগান দেয়। এই বিক্রিয়ায় ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল, কোলক্যালসিফেরলে পরিণত হয়। এই কোলক্যালসিফেরলকে আমরা ভিটামিন D3 নামে জানি। এখানে বলে রাখা ভাল সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে যে ভিটামিন তৈরি করে তা খাদ্যের মাধ্যমে গৃহীত ভিটামিন ডি থেকে কিছুটা আলাদা। খাদ্যের মাধ্যমে এরগোক্যালসিফেরল বা ভিটামিন ডি-২ গ্রহণ করি।

রক্তচাপ কমায়ঃ সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বক থেকে নাইট্রিক অক্সাইড নামক এক ধরনের যৌগ নিঃসৃত করায় যা আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে ও কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের মানুষদের বেলায় মৃদু সূর্যের আলো উপকারী হতে পারে। সম্প্রতি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক ৩৪ জন মানুষের উপর UV বাতি ও সাধারণ বাতির আলোর প্রয়োগ করে এদের দেহের রক্তচাপ ও ভিটামিন ডি এর মাত্রা নির্ণয় করেন। ফলাফল হিসেবে তারা দেখেন শুধুমাত্র UV বাতির আলোতে তাদের দেহের রক্তচাপের হ্রাস ঘটে কিন্তু সাধারণ বাতির আলোতে রক্তচাপের কোনো পরিবর্তন হয় না।

সবশেষে একটা ব্যাপার লিখে এই শেষ করছি, সূর্য আমাদের উপকার করছে নাকি ক্ষতি করছে সেটি সঠিকভাবে চিন্তা করে যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব। অতিরিক্ত সূর্যের আলো যেমন ক্ষতি করে তেমনি আমাদের দৃষ্টির জন্য এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে না। বহু মানুষ বিশেষ করে মেয়েদের মাঝে সূর্যকে ক্ষতিকর ভাবার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তারা সূর্যের ভয়ে ত্বকে বিভিন্ন রকমের সানব্লক ক্রিম মাখে। কিন্তু এই ক্রিম আসলে কতটা উপকার করে? গবেষণায় দেখা গেছে এই ক্রিম উপকারের চাইতে অপকারই করছে বেশি। বহু সানব্লক ক্রিমে জিংক অক্সাইড আছে যা সূর্যের UV রশ্মির সাথে বিক্রিয়া করে ত্বকের উপরিভাগের কোষগুলোর অনেক ক্ষতি করে। এতে করে ত্বকের সৌন্দর্য, কোমলতা নষ্ট হয়। এটা আমাদেরই দায়িত্ব সব জেনে বুঝে নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সকল সন্দেহ কাটিয়ে সঠিকটা গ্রহণ করা।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://www.atomsandnumbers.com/2013/why-the-sun-can-harm-you-and-wifi-cant-and-how-microwave-ovens-cook-your-food/
  2. http://www.medicaldaily.com/sun-exposure-vitamin-d-and-other-health-benefits-sunlight-246487
  3. http://articles.mercola.com/sites/articles/archive/2012/09/29/sun-exposure-vitamin-d-production-benefits.aspx

http://www.cancercouncil.com.au/25277/b1000/skin-cancer-30/protecting-your-skin/

জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

জিকা ভাইরাসঃ পৃথিবীবাসীর নতুন আতঙ্ক

মানুষ আর প্রকৃতি এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতি সর্বদাই মানুষের জীবনকে প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। মানুষের উপর প্রকৃতির ঋণাত্মক প্রভাবও হয় খুব ভয়ংকর। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মতো দুর্যোগগুলো মানব সম্প্রদায়কে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছিল, জিকা ভাইরাস যেন তার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই নতুন এক আতংকের নাম হিসেবে পদার্পণ করেছে পৃথিবীর বুকে।

জিকা ভাইরাস কী?

জিকা ইনফেকশন রোগটি আমাদের অতি পরিচিত ডেঙ্গু রোগের মতো। এটি ছড়ায়ও এডিস মশার মাধ্যমেই। আজকাল এ রোগের কথা সংবাদমাধ্যমে, টিভি মিডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে শোনা গেলেও এমন কিন্তু না যে এ রোগের উৎপত্তি হয়েছে অল্প কয়েকদিন হলো। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা ফরেস্টে এ রোগ সর্বপ্রথম রেসাস বানরের মধ্যে থেকে মশাদের শরীরে ছড়ায়। সর্বপ্রথম এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে নাইজেরিয়ায়। আফ্রিকায় এ রোগ কিছু কিছু সময় দেখতে পাওয়া গেলেও পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত মে মাস থেকে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কোনো সুদূরপ্রসারী ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে আসেনি। কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এ রোগ মহামারীর থেকেও বেশি ভয়ানক। কেন? সেই কথায় আসছি কিছুক্ষণ পরেই।

জিকা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

জিকা ভাইরাস ছড়ায় মূলত মশার মাধ্যমে। তবে সব ধরনের মশা নয়, শুধু এডিস গণের (genus) মশাই এ রোগের জন্য দায়ী। এ মশা যেমন একটি বড়সড় পুলের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বোতলের মুখের মধ্যে রাখা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়। এদের গোত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ সদস্য হলো এডিস এজিপ্টি যারা জিকা রোগের প্রধান বাহক। এদের বিচরণ আমেরিকায় শুধুমাত্র ফ্লোরিডা, গালফ কোস্ট আর হাওয়াই-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে খুব গরমের সময় এদের ওয়াশিংটনেও দেখা যায়। এশিয়ার টাইগার মশা এডিস এল্বোপিকটাসও এ রোগ ছড়ায়, কিন্তু পরিসরে এজিপ্টির থেকে কম।

এসব মশা যখন কোনো আক্রান্ত মানুষকে কামড়ায়, তখন রোগীর কাছ থেকে মশা জিকা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সংক্রমিত মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সে আবার জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। জিকা ভাইরাস এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সবার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলুন এ প্রশ্নের জটগুলো খোলার চেষ্টা করে দেখি।

১. জিকা ভাইরাস কি মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে ছড়ায়?2

এখন পর্যন্ত এক কথায় উত্তর হলো, হ্যাঁ! সন্তান প্রসবের পূর্ব মুহূর্তে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে এ রোগ প্রবেশ করতে পারে। মাইক্রোফেলি নামক ভয়ংকর ধরনের এক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে অনেক শিশু জন্ম নেয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে সম্প্রতি। এ রোগাক্রান্ত শিশুদের মাথা অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ছোট আর এ সমস্ত শিশুদের মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। মাইক্রোফেলি রোগে যেসব শিশুরা আক্রান্ত হয় এদের মধ্যে সৌভাগ্যবান ১৫% থাকে যাদের শুধু মাথাটাই ছোট হয়, কিন্তু অভাগা বাকি ৮৫% শিশুর মস্তিষ্কের উপর মাইক্রোফেলি ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এদের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং এরা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়। জিকা ভাইরাস আর অদ্ভুত এ সমস্যার একদম ঠিকঠিক যোগসূত্রটা যে কোথায় তা এখনো আবিষ্কৃত না হলেও বিশেষজ্ঞগণ গর্ভবতী মায়েদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন। ব্রাজিলে এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪,০০০ শিশুর রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৩৮ জন মারা গেছে। এমনকি ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদরে আপাতত সন্তান ধারণ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২. রক্ত বা শুক্রাণু কি জিকা ভাইরাস বহন করে?

সম্প্রতি মানুষের রক্ত আর শুক্রাণুতেও এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। রক্ত নেয়া বা শারীরিক সম্পর্কের ফলে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন রোগীর রিপোর্ট পাওয়া গেলেও সংখ্যায় তা অতি নগণ্য। আবার ভেবে দেখুন, যদি রক্তের মাধ্যমে রোগ আসলেই ছড়াত তাহলে রোগীকে কামড়ালে যেকোনো ধরনের মশাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতো। এমনটি কিন্তু হচ্ছে না। তাই আপাতত সঠিকভাবে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে তো মানা নেই।

. জিকা ভাইরাস কি জিবিএস এর জন্ম দেয়?

জিবিএস (Guillain–Barré Syndrome) নামের এক বিশেষ ধরনের রোগ আছে যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শরীরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। তখন এরা রোগজীবাণু ধ্বংস করা বাদ দিয়ে স্নায়ুকোষগুলোকে ধ্বংস করা শুরু করে। এর ফলে মাংসপেশির দুর্বলতা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসও দেখা যায়। সাধারণত এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকে। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষ এর প্রভাব সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায়, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আসলে জিকা কিংবা অন্য কোনো ভাইরাস এ রোগের উৎপত্তি ঘটায় কিনা তা এখনও বলা সম্ভব হয়নি। তবে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সাথে সাথে ব্রাজিলে জিবিএসও তীব্র আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই গবেষকরা মাথা চুলকাতে বসে গেছেন- আসলেই কি জিকা ভাইরাস টেনে আনছে জিবিএস এর মতো মারাত্মক রোগকেও?

জিকা ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষ্মণ

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের একজন মানুষের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে আছে জ্বর, শরীরে র‍্যাশের সৃষ্টি, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথার অনুভূতি, চোখ ওঠা ইত্যাদি। এছাড়াও এ সময় মাথা ব্যথা আর মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। 3জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই কিন্তু এসব উপসর্গ দেখা যায় না, বেশ কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর রোগীর মধ্যে এ লক্ষণগুলো দেখা যেতে থাকে।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অসুস্থতা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। হাসপাতালে যাবার মতো অবস্থাও কিন্তু তৈরি হয় না। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পরিমাণ খুবই নগণ্য। আপনার অসুস্থতা কমে গেলেও রক্তের মধ্যে এ ভাইরাস কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত তার উপস্থিতি জানান দিতে পারে। র‍্যাশ ওঠার কারণে অনেকেই এ অসুখটিকে ডেঙ্গু বা হামের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাই সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরী।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

জিকা ভাইরাস আপাতদৃষ্টিতে খুব ভয়ংকর না হলেও এর ক্ষতিকর দিক কিন্তু অনেক। এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমরা তো আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। যেহেতু এডিস মশা যেকোনো জায়গায় জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয়, তাই আশেপাশের কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল করতে হবে। এরা দিনের বেলাতেই আপনাকে আক্রমণ করবে। তাই দিনের বেলা ঘুমালেও মশারী টানাতে ভুলবেন না। খেয়াল রাখবেন যে, কোনো মশা যেন আপনাকে না কামড়ায়। জানালার চারিদিকে আলাদা করে এমন জালিকা স্থাপন করতে পারেন যাতে মশা ঘরে না ঢুকতে পারে। যেকোনো রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সবথেকে ভালো উপায় হলো নিজেকে সতর্ক রাখা। এলাকার মানুষজন মিলে কিছুদিন পরপর বিভিন্ন কীটনাশক দূরীকরণের স্প্রে প্রয়োগ একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ঝুঁকি আছে এমন এলাকায় যদি আপনি ভ্রমণ করতে চান তাহলে অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।

জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক আমাদের হাতের নাগালে আসতে আসতে পার হয়ে যাবে আরও প্রায় দেড় বছর। প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান এ দৌড়ে সামিল হয়ে থাকলেও তাদের কাজ একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। জেনেভার এক সম্মেলনে এ সংস্থার মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রে খুব শীঘ্রই এর পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি স্বীকৃত হয়ে মানুষের নাগালে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হবে আরও অনেকটা সময়।

বাংলাদেশ এবং জিকা ভাইরাসঃ আমরা কি হুমকির মুখে?

জিকা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। বাংলাদেশে কি এই রোগে আক্রান্ত হবার কোনো সম্ভাবনা আছে? চিন্তার বিষয়। প্রতিষেধকবিহীন এ রোগ খুব দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই আমরা যে একেবারে হুমকির সম্মুখে না, তা বলা যায় না। তবে আশার কথা এই যে, দক্ষিণ এশিয়াতে এখন পর্যন্ত জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাই আশা করা যায় আমাদের সেই খারাপ দিন দেখার সম্ভাবনা খুব কম, যেখানে ফুটফুটে একটি শিশুকে অপরিণত মস্তিষ্ক আর ছোট্ট একটি মাথা নিয়ে চলাচল করতে দেখতে হবে।

জিকা ভাইরাসের গোপন নথি!

এতক্ষণ যা বললাম তা নিত্যদিনের খবর হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার আমার জানার বাইরেও কিছু খবর আছে, যা হয়তো ইচ্ছে করেই রাখা হচ্ছে সবার অগোচরে। বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের নাম নিশ্চয় সবাই শুনেছেন। এ ফাউন্ডেশনের ব্রিটিশ বায়োটেক কোম্পানি ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য বিশেষ ধরনের জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ার্ড এক ধরনের মশার উদ্ভাবন করে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিশেষ ধরনের মশাই আসলে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। যে ভাইরাস মানুষের জীবনে আতংক বয়ে নিয়ে এসেছে, যে রোগ নিয়ে নিত্যদিন মিডিয়া এত বিপুল পরিমাণে মেতে উঠেছে তা প্রাকৃতিক কোনো রোগ নয়! ২০১১ সাল থেকে অক্সিটেক নামের এ কোম্পানি ব্রাজিলের গহীন অরণ্যে এ মশার বংশবিস্তার করে চলেছে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য। এক সপ্তাহে তারা প্রায় দুই মিলিয়ন মশা উৎপাদন করে ব্রাজিলের ক্যম্পিনাসে অবস্থিত ফ্যাক্টরিতে। আরেকটি রহস্যময় তথ্য জেনে নিন। ২০১৫ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার গর্ভবতী মায়েদের একটি নতুন ভ্যাক্সিন নেয়া অত্যাবশ্যক করেন। টিডিএপি নামক এ ভ্যাক্সিনের সঠিকভাবে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই হঠাৎ এভাবে আবশ্যকীয় করে দেয়া আর ঠিক একই সময়ে এরকম অদ্ভুত শিশু জন্মের হার হুহু করে বেড়ে যাওয়াটা আসলে কাকতালীয় ঘটনা থেকে একটু বেশি কিছুই বলে মনে হয়। এ ভ্যাক্সিনের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে শুরু করলেই একটি নাম আবার সামনে পেয়ে যাবেন- বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এমনকি এ ভ্যাক্সিন লাইসেন্সড হবার আগে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের শরীরে গিয়ে আসলেই কাজ করে কিনা সেই ব্যাপারে পরীক্ষা করার কোনো নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

একটু যদি অন্যভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখি তাহলে কি এটাই মনে হয় না, জন্মগত এ ত্রুটি আর জিকা ভাইরাসকে একই সময়ে সামনে আনা হয়েছে? ব্রাজিলই বা কেন আমেরিকা থেকে এমন একটি ভ্যাক্সিন কিনে তার দেশে অত্যাবশ্যক করে দিলো যার কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ইতিহাস নেই? নাকি এজন্য তারা উপযুক্ত পরিমাণে পকেট গরম করার সুযোগ পেয়েছে? এখন আবার আমেরিকা জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধকের পেছনে ছুটছে। চেষ্টা করে দেখুন তো এমনই কোনো ঘটনার কথা স্মৃতিতে আসে কি না? হ্যাঁ, একইভাবে মিডিয়া ইবোলা ভাইরাস নিয়েও মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি করেছিল।4

যেমনটি আগেই বলেছি অনেক দেশে গর্ভধারণ এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আসলেই বিল গেটস এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্প্রতি মাত্র একজন মানুষের শুক্রাণুতে এ ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই একে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের কাতারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানব মনে শারীরিক সম্পর্ক এবং সন্তান ধারণের প্রতি আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকেই বিল গেটস জোরপূর্বক ভ্যক্সিনাইজেশন করে জন্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে কথা বলেছেন।

তবে এ রহস্যের কূলকিনারা এতো সহজে সম্ভব নয়। বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে বা সপক্ষে কথা বলার মানুষের অভাব কখনোই ছিল না। তাই আমরা শুধু আপনাদের চলতি বিশ্বের পরিস্থিতির কাছাকাছিই নিয়ে যেতে পারি। সত্য-মিথ্যা জানার জন্য আমাদের হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু সময়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক ঘটনার সুরাহা যে আমাদের কান পর্যন্ত আসে না, এ নতুন কিছু নয়। তাই আপাতত এসব কোন্দলে না পড়ে আমরা নিজেদের ও নিজ নিজ সন্তানদের নিরাপত্তা প্রদানের দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আশা করি বিশ্বে বিরাজমান এ জিকা ভাইরাস আতঙ্ক আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে কখনোই হানা দেবে না।

 

ফাহমিদা ফারজানা অনন্যা
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সাইবেরিয়ার ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো পাতালপুরীর দরজা

এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাইবেরিয়ার ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল পাতলা বরফ দ্বারা আবৃত। এই অবস্থা জায়গাভেদে এতই মারাত্বক আকার ধারণ করেছে যে, বিশাল বিশাল গর্ত হঠাৎ করে জেগে উঠছে। স্থানীয় ইয়াকুশান লোকদের কাছে এই এলাকার সবচেয়ে বড় খাঁদটি “পাতালপুরীর দরজা” হিসেবেই পরিচিত এবং তা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে বরফের নিচ থেকে ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো জঙ্গল, পশুপাখির মৃতদেহ বেরিয়ে আসছে।

 

ব্যাটাগাইকা খাঁদ; image source: sciencealert.com

ব্যাটাগাইকা খাঁদ নামে পরিচিত হলেও অফিশিয়ালি এগুলোকে বলা হয় “মেগাস্লাম্প” বা “থারমোকার্স্ট”।

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশকিছু মেগাস্লাম্প সাইবেরিয়া জুড়ে দেখা গেলেও, গবেষকদের ধারণা ব্যাটাগাইকা এই অঞ্চলের মেগাস্লাম্পগুলো অন্য গুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক। এই অঞ্চলটি ইয়াকুটস্ক শহরের ৬৬০ কিলোমিটার (৪১০ মাইল) উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত।

এই খাঁদ টি যে শুধুই বড় তা কিন্তু না। প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা এবং ৮৬ মিটার (২৮২ ফিট) গভীর এই খাঁদটি ক্রমবর্ধমান।

২০১৬ সালের একটি গবেষনায় জার্মানির আলফ্রেড ওয়েজেনার ইনস্টিটিউট এর ফ্র্যাঙ্ক গানথার প্রকাশ করেন যে, গত এক দশকে এই খাঁদটি প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১০ মিটার করে বেড়ে চলছে এবং অপেক্ষাকৃত গরম সময়ে প্রতি বছরে এর বৃদ্ধি ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি আরো আশংকা করেন, ভবিষ্যতে উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য খাঁদের আকার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তা পার্শ্ববর্তী উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বরফের উপরে তৈরি হওয়া ভূমির ধ্বস হতে পারে।

বিবিসি হতে আগত মেলিসাকে গানথার বলেন,“গড়ে অনেক বছর আমরা এমনও দেখেছি যে খাঁদ এর বৃদ্ধির হার খুব বেশি বাড়েও নি আবার কমেও নি, কিন্তু এর গভীরতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।”

প্রতিবছর ই বেড়ে চলেছে এই খাঁদ; image source :eoimages.gsfc.nasa.gov

আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এটি খুব ভালো সংবাদ নয়। এই খাঁদের গঠন প্রথম শুরু হয় ১৯৬০ সালে নিকটবর্তী বিশাল অরন্যের বিনাশ ঘটানোর পরে।

২০০৮ সালে ভয়াবহ বন্যা এই বরফের গলনকে আরো ত্বরান্বিত করে এবং খাঁদের বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

এই এলাকার অস্থায়িত্ব শুধুমাত্র স্থানীয়দের জন্য বিপজ্জনক নয়। উদ্বেগের বিষয় যে, এই খাঁদ যত গভীর হবে তত এটি কার্বনের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেবে, যা হাজার হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল।

বিবিসিকে গানথার বলেন, “বায়ুমন্ডলে যে পরিমান কার্বন রয়েছে তা সমগ্র ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল এ চাপা পড়ে থাকা কার্বনের সমান।”

খাঁদের বরফ যত গলতে থাকবে ততই এটি বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস ছাড়তে থাকবে এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বেড়ে যাবে।

“এটাকেই আমরা বলি ধনাত্নক প্রতিক্রিয়া”, যোগ করলেন গানথার। “উষ্ণতা বাড়ায় উষ্ণতা, এবং এই প্রতিক্রিয়া অন্যান্য স্থানেও হতে পারে।”

কিন্তু সব খারাপ খবরের মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে।  ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি তে এক গবেষণায় বলা হয় যে, খাঁদে যেসকল লেয়ার আবিষ্কার হয়েছে বা হচ্ছে তাতে ২০০,০০০ বছরের পুরোনো আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষিত আছে।

এছাড়াও এখানে বরফে জমে থাকা অনেক পুরোনো বন-জঙ্গল, পরাগরেণুর নমুনা এবং এমনকি ষাঁড়, ম্যামথ এবং ৪,৪০০ বছর পুরোনো ঘোড়ার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

জুলিয়ান মুরটনের আবিষ্কৃত গাছের গুড়ি; image source : sciencealert.com

এই রিসার্চ টি ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স এর জুলিয়ান মুরটন করেছিলেন, যিনি বলেছেন এইসকল আবিষ্কৃত পলিমাটি আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে যে সাইবেরিয়ার আবহাওয়া পূর্বে কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা কিভাবে হবে।

যেখানে বিগত ২০০,০০ বছরে পৃথিবী উষ্ণ এবং ঠান্ডা উভয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে সেখানে সাইবেরিয়ার আবহাওয়ার ইতিহাস একেবারেই অজানা।

কিন্তু মুরটন এর ভাষ্যমতে সাইবেরিয়ায় শেষ এই ধরনের স্লাম্পিং হয়েছিল প্রায় ১০,০০০ বছর আগে যখন পৃথিবী তার শেষ বরফ যুগ থেকে বের হয়ে আসছিল।

বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা সেই সময়ের চাইতে এখন অনেক বেশি। আমরা ৪০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) কার্বন-ডাই-অক্সাইড পার করে ফেলেছি যেখানে সর্বশেষ বরফ যুগ যখন শেষ হয় তখন তা ছিল ২৪০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)।

ব্যাটাগাইকার এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বরফের লেয়ার রয়েছে যেখানে দুইটি পুরু বন-জঙ্গলের আস্তরন আছে যা পুর্বের উষ্ণ থেকে উষ্ণতর আবহাওয়ার নির্দেশ করে বর্তমান সময়ের আবহাওয়ার চাইতে।

ওপরের বন-জঙ্গলের আস্তরনটি আরেকটি পুরোনো মাটির আস্তরনের উপর আছে যা সম্ভবত পূর্বে যখন আবহাওয়া উষ্ণ হয়েছিল তখন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গলে গিয়েছিল। তবে গলে কি হয়েছিল তা জানতে পারলে হয়ত আমরা পরবর্তীতে যখন এরকম হবে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবো।

কাছে থেকে ব্যাটাগাইকা খাঁদ দেখতে যেমন; image source : inhabitat.com

কিন্তু এ বিষয়ে আরো গবেষনা দরকার, “কারণ খাঁদে আবিষ্কৃত পলিমাটির সঠিক বয়স আমরা এখনো জানি না” বলেন মুরটন।

তিনি এখন এই অঞ্চলে গর্ত খনন করার চিন্তা করছেন, এতে করে তিনি প্রাপ্ত পলিমাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে পারবেন অতীতে আসলেই কি হয়েছিল এখানে।

“সর্বশেষভাবে, আমরা আসলে দেখতে চাচ্ছি সাইবেরিয়াতে শেষ বরফ যুগে যা হয়েছিল তা উত্তর অ্যাটলান্টিক এর সাথে মিল আছে কি না।” – মুরটন ।

সাইবেরিয়ার ব্যাটাগাইকা খাঁদেই হয়ত হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর রহস্য লুকিয়ে আছে। এখন শুধু তা সবার সামনে আসার অপেক্ষা করছে মাত্র।

featured image: news.nationalgeographic.com

ভূমিকম্পের পূর্বাভাসঃ বর্তমান প্রেক্ষাপট

ভূমিকম্পে পৃথিবীর মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে, এই বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্র প্রচুর। অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে, এখন হচ্ছে এবং পরেও হবে। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস খুবই জনপ্রিয় এবং গবেষণার বড় একটি ক্ষেত্র। যদিও এ বিষয়ে গবেষণা করাটা বেশ জটিল আর অন্যান্য গবেষণার তুলনায় এই বিষয়ে গবেষণা প্রায় অপরিপক্বই বলা যায়। কিন্তু যতটুকু গবেষণাই হয়েছে তার মূল্য অনেক। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে গবেষণার ফলাফল বেলাশেষে আমাদের আশার বাণীই শোনায়।

কিছু কিছু পূর্ব লক্ষণের কথা অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলেন। যেমনঃ

1) Ground Uplift and Tilt, 2) Groundwater Fluctuation, 3) Chemical Changes in Groundwater, 4) Decrease of electrical resistivity of rocks.  এগুলো কমবেশি সবারই জানার কথা। এবার কয়েকটা ঘটনার কথা বলে ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের কথা বলবো।

২০১১ সালের জাপানের তোহুকুতে যে ভূমিকম্প হয়েছিল তার সম্পর্কে সবার মনে থাকার কথা। ইতিহাসের ভয়ঙ্কর যে কয়েকটা ভূমিকম্প হয়েছে তার মধ্যে এটিকে উপরের দিকে স্থান দেয়া যায়। জাপানের একদম কাছাকছি স্থানে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। এই ভূমিকম্পে ১৫ হাজার ৮৪৪ জন মারা যায়, ৩ হাজার ৪৫০ জনকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৩৫ বিলিয়ন ডলার।

আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে এই ভূমিকম্প যে হবে তার কথা ১০ বছর আগে বিজ্ঞানীরা জানান দিয়ে রেখেছিলেন। সেই পূর্বাভাসে যে সময়, অবস্থান এবং ভূমিকম্পের তীব্রতার কথা বলা হয়েছিল তার ৭০ শতাংশ সঠিক ছিল। এমনকি এটি ঘটার আগের কয়েক দিন পরিবেশে বিভিন্ন রকম অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

M8-MSc নামক এলগরিদমের সাহায্যে এই পূর্বাভাসটি দেয়া হয় ২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তখন বলা হয় ভূমিকম্পটি হনসু বা হোকায়দোর আশেপাশে হতে পারে। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, M8-MSc এর আগের ২৫ বছর ৮ বা তার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প পূর্বাভাসে ৭০% পর্যন্ত সফল। ২০১০ সালের চিলির ভূমিকম্পের কথাও জানান দেয় M8। এসব পরিসংখ্যান দেখেও ইচ্ছে করলে অনেক ক্ষতি এড়ানো যেত। International Journal of Disaster-এ ২০১২ সালে Risk Reduction বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ হয় যেখানে একে বলা হয় “a missed opportunity for disaster preparedness”

পূর্বাভাসের এই বিষয়টি আসলে অনেক বড় একটা গবেষণার ক্ষেত্র। Chaos Theory, Statistical Physics, Joint Optimization এর মতো গাণিতিক পদ্ধতি ব্যাবহার করা হয় এই ধরনের গবেষণাতে।

চিত্রঃ M8 and MSc alarm regions (তারকা চিহ্নিত স্থানটিই তোহুকু ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র। ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল ২০০১ সালে।)

এখন আরেকটু ভেতরে যাই। তোহুকু ভূমিকম্পের আগের কয়েকটা দিন আবহাওয়াতে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা যায়। ঐ স্থানেই তারতম্যগুলো হয়েছিল। যেমনঃ ১১ মার্চ ২০১১ তে ভূমিকম্পটি হয়। ৭ মার্চ ২০১১-তে ভূমিকম্পের এপিসেন্টারের কাছে infrared radiation এর হার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। পাশাপাশি ইলেকট্রন ঘনত্বের পরিমাণও বেড়ে যেতে দেখা গেছে। মার্চের ৩ – ১১ তারিখ পর্যন্ত ইলেকট্রনের ঘনমাত্রার রেকর্ড দেখা হয়। দেখা গেছে, এই সময়টাতে ইলেকট্রন ঘনমাত্রার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল কিন্তু কম্পনটি হবার পর এটি কমে যায়।

২০০৮ সালে Applied Radiation and Isotopes নামক জার্নালে “Radon anomaly in soil gas as an earthquake precursor” – নামক প্রবন্ধ প্রকাশ হয়। এখানে দেখানো হয়, ভূমিকম্প হবার আগে মাটিতে এবং ভূগর্ভের পানিতে রেডন গ্যাসের পরিমাণ অনেক হারে বেড়ে যায়।

এই মাসে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা হলো, পরবর্তী কোনো এক সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা রেখে এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

  1. International Journal of Disaster Risk Reduction 1 (2012) 17–32
  2. Science (2011) 24: 557–564
  3. Applied Radiation and Isotopes 66 (2008) 1459–1466
   4. http://www.npa.go.jp/ archive/keibi/biki/higaijokyo_e.pdf

জীবন্ত শৈবালের বসতবাড়ি

প্রতিটি মানুষের আশা থাকে তার স্বপ্নের বাড়িটি হবে ঝকঝকে-তকতকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর সেটি যে দেখতে অসাধারণ হতে হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আগে মানুষ দর্শণধারী, পরে গুণবিচারী। বাইরের রঙটা হবে এমন যে, তা যে কারো মন কাড়তে বাধ্য। এর জন্য দরকার কত ঘষাঘষি, চুনকাম, ওয়েদার প্রটেকটিভ কোটিং, রং-বেরংয়ের প্রলেপসহ আরও কত কী! তার মনে আশা থাকে ঝড়বাদল, স্যাঁতস্যাঁতে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে দিনের পর দিন বাড়িটি রূপ-রং ঝরাবে। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি দিয়ে কেউ যদি ইচ্ছা করেই ছত্রাক-শৈবাল লালন করে সেই বাড়ীর বারোটা বাজায়, তবে তাকে বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। এমনই কিছু উন্মাদের কথা বলতেই আজকের এ লেখা।

এবার শুধু উন্মাদ বিজ্ঞানীরাই না, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিল্ডিং এক্সপার্ট এবং আর্কিটেক্টরাও, যারা অস্ট্রেলিয়াতে জীবন্ত শৈবাল নিয়ে বাড়ি বানাতে যাচ্ছেন, যেখানে এগুলোই বাড়ীর বহিরাবণ আবৃত করে রাখবে!

কিন্তু তার আগেই বলে রাখা দরকার, এটাই প্রথমবারের মতো পাগলামি না। এর আগেও একই কাজ হয়েছে। জার্মানির হামবুর্গে ২০১৩ সালে IBA (International Bar Association) একটি আন্তর্জাতিক ভবন প্রদর্শনীর আয়োজন করে যাতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভবনের ধারণা উঠে আসে।

 

ভবনের সামনের দিকটায় সবুজ যে গ্লাসগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে কিন্তু রয়েছে জীবন্ত শৈবাল। এ সবুজ রং নিয়ত পরিবর্তনশীল। শৈবালের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এর রঙ হাল্কা সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হতে থাকে। একদম গাঢ় হয়ে গেলে কাচে ঘেরা মিডিয়ামকে সবুজ লাভার মতো মনে হয় যা থেকে ফুলকির মতো বুদবুদ অক্সিজেন নির্গত হয়।

সবুজ শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক ও পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং পানির সাথে বিক্রিয়ায় বায়োমাস ও তাপ তৈরি করে। এ বায়োমাসকে সংগ্রহ করে বায়োমাস রিঅ্যাক্টরে বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও বায়ো অয়েল তৈরি করা হয়, যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, এ বায়োজ্বালানীর গুণগত মান যথেষ্ট উচ্চমানের। এ জ্বালানী থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করে বাড়ির ভিতরে প্রেরণ করা হয়। আর বিক্তিয়ার উৎপাদ হিসেবে তৈরি তাপকে ওয়াশ রুমের গরম পানির প্রবাহের জন্য ও ঘর গরম রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডকে পুনরায় টিউবের মাধ্যমে কাঁচেঘেরা প্লান্টে পাঠানো হয়। আর পুরোনো শৈবালগুলা সংগ্রহ করে মানুষের এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে শৈবাল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ, সমস্ত বাড়ি যদি সোলার প্যানেল দিয়ে দ্বারা ঘিরে দেওয়া হতো, তবে তার থেকে কোনো অংশে কম হতো না।

এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে স্বনির্ভর বাড়ি তৈরির পথে মানুষের অগ্রযাত্রা কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। শুধু বাড়ির সৌন্দর্যের জন্যই নয়, পরিবেশের উপর এ ধরনের বাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তথ্যসূত্রঃ

thescienceexplorer.com/technology/living-algae-buildings-coming-soon-australia

 

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

দগ্ধ পৃথিবীঃ ২২০০ খ্রিষ্টাব্দ

 

জলবায়ুর পরিবর্তন পরাস্ত করেছে মানুষের দাপট। মাত্র পঞ্চাশ কোটি পৃথিবীবাসী অবশিষ্ট উত্তরের জীবন-তরীতে। কীভাবে বেঁচে আছে তারা?

অভেদ্য, নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার সুউচ্চ বহুতল ভবনের ৩০০ তলায় ক্ষুদ্র ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে তাকাই। মাটির আধামাইল উপরে আমার ফ্ল্যাট। এখান থেকে মনোমুগ্ধকর বীথিদৃশ্য চোখে পড়ে। বেশ কিছু বাংলো, ছিমছাম উঠান, পান্না-সবুজ রাঙা খেলার মাঠ, সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়া সুইমিং পুল, আর দীর্ঘ বেলাভূমির ওপারে তৈরি কিছু প্রাসাদসম অট্টালিকা। দৃশ্যগুলো লস এঞ্জেলস শহরের স্মৃতি মনে করিয়ে আকুল করে দেয়। শহরটি এখন অস্তিত্বহীন, যেখানে শান্তিপূর্ণ সময়ে বড় হয়েছেলিন আমার দাদার-দাদা, যখন নবজাতকের জন্মদান কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো না, আর সাতশ’ কোটি মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতো পৃথিবী বুকে।

এখন পৃথিবীতে আমরা মাত্র পঞ্চাশ কোটি মানুষ বেঁচে আছি, জলবায়ুর পরিবর্তন এ গ্রহের ধারণ ক্ষমতা (carrying capacity) কমিয়ে এনেছে। একটি পরিবেশে জনসংখ্যা সর্বোচ্চ কতটুকু বাড়তে পারবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর বাইরে যাওয়া যাবে না। বিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক যাকে বলেছিলেন জীবন-তরী, এখন তার মাঝেই উত্তরমেরুর দূরপ্রান্তে বসবাস করছে বেশিরভাগ মানুষ। একসময় এখানে ছিল কানাডা, চীন, রাশিয়াসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো। জলবায়ুর পরিবর্তন একটু হলেও সহনশীল এদিকটায়। একসময় এখানেই কোটি কোটি মরিয়া উদ্বাস্তুকে স্থান দিতে নিমেষেই তৈরি করা হয়েছিলো অনুপযোগী শহর।

জানলার বাইরে যে দৃশ্য আমি ‘দেখছি’ তা আসলে বিভ্রম। আমার আবেগী মস্তিষ্কে তার একটি কোমল ও অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু কঠোর বাস্তবতায় অবিচলিত থাকা যায় না। যতদূরে দৃষ্টি যায় চোখে পড়ে কাঁচ দিয়ে ঘেরা সভ্যতার উচ্ছ্বিষ্ট। বুলেট ট্রেনকে পারাপার করার জন্যে ফিতার মতো রাজপথ ঘিরে আছে এই প্রকাণ্ডপুরীকে। আকাশভেদী কয়েক শত তলা উঁচু ভবন, যেখানে ঠাঁসাঠাসি করে বসবাস করছে কোটি কোটি মানুষ। গ্রীনহাউসের ভেতর বিস্তৃত জমিতে রাসায়নিক-পুষ্টিতে বাড়ছে ফল-মূল-শাক-সবজি। চরে বেড়ানো গবাদিপশু কিংবা বসন্তের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হেঁটে বেড়ানোর জন্য কৃত্রিম গ্রামীণ পরিবেশ।

ভীষণ-বিপর্যয়ের ভূকম্পীয় আঘাতের আগে মানুষের চলাচল ছিল বন্ধনহীন। মুক্তবায়ুতে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারতো। ঘুরে বেড়াতে পারতো জঙ্গলে। বাচ্চাদের বল খেলা দেখতে পারতো মাঠে। বিস্তৃত ভূমিগুলো এখন নিষিদ্ধ এলাকা। সে অঞ্চলে বিভিন্ন রোগ ও দূর্যোগের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। প্রবল বৃষ্টির উপদ্রব সাথে নিয়ে ঝড়ো হাওয়া ঘণ্টায় শত কিলোমিটার বেগে আর্তনাদ করে বেড়ায়। বৃষ্টি না থাকলে রুক্ষ ধুলি-ঝড় হামলে পড়ে। যেখানে একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মরুভূমি থেকে গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে ভূমি-সুনামি ঢেকে দেয় বিশাল অঞ্চল। বন্য-আবহাওয়া যখন খানিকটা বিরাম নেয়, তখন দাহক সূর্য অবিরত পুড়িয়ে দেয় বায়ুমন্ডলকে। দিনের মাঝভাগে তাপমাত্রা উঠে যায় ১৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইটেরও ওপরে। বিশেষ-দেহবর্ম ও অক্সিজেন ট্যাঙ্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া তখন অসম্ভব হয় যায়।

আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বদলে গেছে। ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় ধর্মীয় ও সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কর্তৃত্ব করতো। এখন তা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ, কারণ পৃথিবীতে ঐ অঞ্চলগুলো এখন আর নেই।

উপরের কথা হয়তো কোনো রোগীর জ্বরের ঘোরে দুঃস্বপ্নদুষ্ট প্রলাপ মনে হতে পারে। তবে এখন থেকে তিন হাজার বছর আগেও জলবায়ুর পরিবর্তন অগ্রসর সভ্যতা পতনের সূচনা হিসেবে কাজ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে দেড়শ বছর ধরে ঘটে চলা ভূমিকম্প, খরা ও দূর্ভিক্ষের মতো দূর্যোগ-পরম্পরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল পূর্ব-ভূমধ্য অঞ্চলে শেষ ব্রোঞ্জ যুগে টিকে থাকা রাজ্যগুলোর ভাঙ্গনের গতিপথ। এখন যেখানে রয়েছে গ্রীস, ইসরায়েল, লেবানন, তুরস্ক ও সিরিয়া। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা নিদর্শন অনুযায়ী পৃথিবীর ঐ অঞ্চল অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রয়োগিক উন্নতির স্পন্দনের মধ্য দিয়ে গেছে তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে। প্রাচীন মাইসেনিয়া, মিনোয়া থেকে হিট্টাইট, অসিরিয়া, সমাজ ছিল সাইপ্রিয়ট ও মিশরীয়দের পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত। তারা চিকিৎসক, সংগীতজ্ঞ ও কারিগরদের সেবা বিনিময় করতো। বিকশিত-বাণিজ্যপথে ব্রোঞ্জ তৈরিতে দরকারী টিনের মতো পণ্যদ্রব্য, বিভিন্ন মালামাল ও প্রাকৃতিক সম্পদও বিনিময় করতো।

তবে ২০১২ সালের একটি গবেষণায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে ভূমধ্য সাগরের পৃষ্ঠীয় তাপমাত্রা খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাবার খবর উঠে আসে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বলছে এ ঘটনা তীব্র খরাকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে দেখা দেয় খাদ্য সঙ্কট, গণহারে দেশত্যাগ, কৃষক-বিদ্রোহ। পরিণামে এক সময়ের জৌলুশপূর্ণ ব্রোঞ্জযুগীয় সমাজের কেন্দ্রীয় শহরগুলো বহিরাগত সৈন্যবাহিনীর আক্রমণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যে বাহিনীর সেনারা সম্ভবত নিজেরাই খরা-পিড়ীত স্বদেশ ছেড়ে পলায়ন করে। বিনাশ হয় সংস্কৃতির, ভাষার ও প্রযুক্তির। ফলাফল হিসেবে দেখা দেয় প্রথম অন্ধকার যুগ। হয় ব্রোঞ্জ যুগের পতন। এক সময়ের পরিশীলিত ও সূক্ষ্ম সমাজের অস্তিত্ব নাশ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার পুননির্মাণ ও পুনরুদ্ধারে করতে চলে যায় কয়েক শতাব্দী।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও 1177 BC: The Year Civilization Collapsed বইয়ের লেখক এরিক এইচ ক্লিন বলেন –

“তখনকার সময় সেটি ছিল একটি বিশ্বায়িত সমাজ, প্রত্যেকেই অন্যের সাথে সংযুক্ত ছিল, নির্ভর করতো

একে অপরের ওপর। ফলে আপনারা একটা ডমিনো প্রভাব লক্ষ্য করবেন, একটি সংস্কৃতি দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে পড়লে তা ধারাবাহিকভাবে বাকিদের ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। মিশর টিকে যায় কারণ তারা প্রস্তুতি নিতে তুলনামুলক সক্ষম ছিল। কিন্তু সে বিজয় ছিল বহু বিপর্যয়ের, কারণ তাদের সকল বাণিজ্য-অংশীদার হারিয়ে গেছে। এক শতাব্দীর ভেতর তাদের সকল জানা বিশ্বের পতন হয়েছে।”

এর আগে সতের’শ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীর বুকে যখন ৫০ কোটি মানুষ বসবাস করতো সে সময়ে ফিরে তাকালে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যায়। কাকতালীয়ভাবে তখনো ছিল জলবায়ু-প্ররোচিত ভীষণ অভ্যূত্থান-কাল। একইসাথে সময়টাকে ধরা হয় আধুনিক ইউরোপের ভোর। ভাবুন নিউটন, রেমব্রানৎস, গ্যালিলিও কিংবা ষোড়ষ লুইসের কথা। তখন যা ঘটেছিল আর আজকে আমরা যেরকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়। ইতিহাসবিদরা সে সময়টাকে বলেন সর্বজনীন সংকটের যুগ, কারণ সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশ বছরের যুদ্ধ, চীনে মিং রাজবংশ ও ইংল্যান্ডে স্টুয়ার্ট রাজতন্ত্রের পতন।

তার উপরে সময়টা ছিল সেই শতাব্দী, যখন শিশু-তুষার যুগ সবচেয়ে তীব্র হয়ে এই গ্রহের শীতলীকরণে নের্তৃত্ব দিচ্ছিল। এর প্রভাব উত্তর-গোলার্ধে বসবাসকারী মানুষজন টের পাচ্ছিল ভালোভাবেই। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জেফরি পার্কারের মতে সতের’শ শতাব্দীর বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকটের পেছনে আবহাওয়ার ভীষণ পরিবর্তনকে প্রভাবক হিসেবে পাওয়া যাবে। শীতল আবহাওয়া, ঝড় তৈরি করা এল-নিনোর বাড়তি পর্যায়- যার পরিণাম বন্যা, কৃষি বিপর্যয়, খরা ও দূর্ভিক্ষ। যার পরিণাম সামাজিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ। টানা সংকট স্পেন, রাশিয়া ও অটোমান সাম্রাজ্যের মতো কর্তৃত্বশালী রাজ্যগুলোকে দূর্বল করে দেয়। মৃত্যু হয় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার।

ক্লাইনের ভাষায়, “অতীতের সমাজের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তারা টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিমাতার দৈবানুগ্রহের উপর নির্ভরশীল ছিলে। (তার বিপরীতে) আমরা নিজেদের পতনের জন্য দায়ী হবো কিনা সেটা দেখা এখনো দেখার বাকি আছে। আমাদের পূর্বে যেসব সভ্যতা এসেছিল শেষ পর্যন্ত ধ্বসে গেছে। আমরা কেন ভাবছি যে আমরা নিরাপদ?”

আমরা পরিবেশ-প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি করবো, তার ফলে পরিবর্তিত জলবায়ুতে প্রথমে স্বপ্নের মতো করে বলা বিজ্ঞানী লাভলকের কল্পিত জীবনতরীতে নিজেদেরকে যেকোনোভাবে বাঁচাতে পারবো এমন চিন্তা করাটা এক ধরনের ঔদ্ধ্যত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল অনুযায়ী চলতি শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাবে অন্তত চার ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিংবা তার চেয়েও বেশি। এ অবস্থাকে গবেষক কেভিন এন্ডারসন বর্ণনা করেছেন “যে কোনো সংগঠিত, ন্যায়নিষ্ঠ ও সভ্য বিশ্ব-সমাজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।”

প্রিন্সটনের এন.পি.ও. ক্লাইমেট সেন্টারের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি কুলেন বলেন, “মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা আমরা পরিলক্ষিত করব- যে তাপমাত্রার জন্য আমরা কোনোভাবেই অভিযোজিত নই।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের জন্য কল্পনা করা কঠিন যে পৃথিবীর একটা বিশাল অঞ্চল মানব-বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।”

তাপমাত্রা চার ডিগ্রী বাড়লে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র কিছু অঞ্চল থেকে গণদেশান্তর দেখতে পাবো। আমাজন, ভারতের কিছু অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চল এর আওতায় পড়বে। সাগরতল উচ্চতায় চার ফুট কিংবা তার চেয়েও বেশি বাড়বে। টোকিও থেকে মুম্বাইয়ের মতো উপকূলীয় শহর হিংস্র ঝড়ের বন্যায় ভেসে যাবে। বাংলাদেশ ও ফ্লোরিডার মতো নিচু অঞ্চলগুলো পানিতে অর্ধনিমজ্জিত হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে বাস্তুচ্যুত।

অন্যদিকে মধ্য চীন থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চল, আফ্রিকা, আস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও

ল্যাটিন আমেরিকার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশুষ্ক হয়ে পড়বে। সেসব এলাকায় ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে যেটুকু পানি ছিল তা শুষে নিবে। ধ্বংস হবে ফসল, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র গবেষণা ও তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীবাসীর অর্ধেক, অন্তত চার’শ কোটি মানুষ পানির দুঃসহ সংকটে আর অনাহারে ভুগবে।

ঝলসে দেয়া তাপীয় প্রবাহ আর ভয়াবহ অগ্নিকান্ড খাদ্য-দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও গণদেশান্তর উসকে দেবে। দ্রুত বেড়ে গিযে কীট-পতঙ্গেরা টাইফাস, কলেরা, পীতজ্বর, ডেঙ্গু ও ম্যালিরিয়াসহ দীর্ঘদিন ধরে সুপ্ত থাকতে সক্ষম জীবাণু, এমনকি একেবারে নতুন জীবাণু দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্তার ঘটবে অজস্র মহামারীর, যা পৃথিবীকে আবার ব্ল্যাক ডেথের কথা মনে করিয়ে দিবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যে প্লেগ-মহামারী ইউরোপের প্রায় ২০ কোটি মানুষ মেরে ফেলেছিল। এক সময়ের জমজমাট মহানগরগুলো পরিণত হবে নিস্তেজ ভূতুড়ে শহরে। ভেবে দেখুন ম্যানহাটন, টোকিও, সাও পাওলো পানির নিচে চলে গেছে। এলোমেলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো কলোনিতে বেঁচে থাকছে কয়জন টিকে যাওয়া কষ্টসহিষ্ণু মানুষ যারা অন্ধকারাচ্ছন্ন বদ্ধ জায়গায় খুব সাবধানে বেঁচে থাকছে গল্পের ভ্যাম্পায়ারের মতো। কেবল রাত হলেই বাইরে আসছে যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। গড় তাপমাত্রা সাত ডিগ্রী বেড়ে গিয়েই স্থিতিশীল হবে না, আরো বাড়বে। ইতিমধ্যে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে নিঃসরিত হয়েছে সেগুলোর তাপের অধিক ধারণক্ষমতার কারণে জলবায়ু একশো বছরেও নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাবে না। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ জেমস হ্যানসেন বলেন, “বায়ুমণ্ডলে ইতিমধ্যে নিঃসরিত গ্যাসের জন্যে জলবায়ুর যে পরিবর্তন হবে তার খুব সামন্যই আমরা অনুভব করছি। আরো গ্যাস বায়ুস্তরে ছড়াবে, কারণ পৃথিবীর জলবায়ুর বিশাল জাড্যতা রয়েছে বলে তা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।” মানব সভ্যতার বেশিরভাগকে বিদায়-চুম্বন জানানোর আগ পর্যন্ত এই গ্রহ তাই ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকবে। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনে চক্রাকারে যোগাতে থাকবে আরো বেশি ইন্ধন।

দ্বিবিংশতম শতাব্দীতে যখন আমরা প্রবেশ করব, পৃথিবীর ফুসফুস বলে পরিচিত ক্রান্তীয় রেইন ফরেস্ট মরু-আবৃত হয়ে পড়বে। ছোট ছোট বনসমূহ দাবানলের রোষে রুষ্ট হবে। বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জীববিজ্ঞানী রডলফ ডিরাজো ও সহকর্মীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আমরা এই পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির প্রান্তে আছি, যা পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতীর মাঝে ৯০ শতাংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে। পৃথিবীর বিষুবীয় এলাকায় যে সব পশু-পাখিরা ঘুরে বেড়ায় তারা হারিয়ে যাবে। অস্ট্রেলিয়া পুনরায় মনুষ্যবিহীন গনগনে মরুভূমিতে পরিণত হবে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলি- হাওয়াই থেকে ফিজি, চলে যাবে সাগরতলে।

এত কিছুর পরেও ইতিহাস আমাদের প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য একটা পথ দেখায়। পার্কার তার তথ্যবহুল গবেষণার বিশ্লেষণে এক চমকপ্রদ উপসংহার টেনেছেন। সপ্তদশ-শতাব্দীর বঞ্চনা কল্যাণ-রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দেয়, যা উনবিংশ শতাব্দীতে সকল আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর রাষ্ট্রসমূহের মূল-বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সপ্তদশ-শতাব্দীর মতোই একবিংশ-শতাব্দীতেও ব্যাপক মাত্রায় বিপর্যয় সামলাতে হলে যে সম্পদ লাগবে তা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই ব্যবস্থা করতে পারবে।”

আগামীর মহাবিপর্যয়ের চিত্র কল্পনা করে অনেকে যে শঙ্কিত, সে তুলনায় আমরা মানুষ প্রযুক্তিতে অনেক-উন্নত। আশা করা যায়, সামাজিকভাবে পরিশীলিতও বটে। তাই জলবায়ু বিপর্যয় বর্বরদের মতো মোকাবেলা না করে মনুষ্যপ্রজাতির বেঁচে যাওয়া সদস্যরা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাবার খেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উঁচু ভবনের মাঝে ভিড় করবে, ভূমি থেকে বহু উপরে যেখানে তারা পুনর্বার তৈরি করবে পৃথিবীর নতুন সংস্কৃতি।

তথ্যসূত্র

মূল লেখাঃ Scorched Earth, 2200 AD by Linda Marsa. Published in Aeon (online magazine). 10 February 2015.

লেখক পরিচিতিঃ লিন্ডা মার্সা ডিসকভার ম্যাগাজিনের অবদানকারী-সম্পাদক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলসের লেখক প্রোগ্রামের শিক্ষক ও ২০১৩ সালে প্রকাশিত Fevered: Why a Hotter Planet Will Hurt Our Health বইটির লেখক।

মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান

এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ কত বছরই বা বাঁচতে পারে? গড়ে ৬০-৬৫ বছর। কিছু প্রাণী এর থেকেও কম সময় বাঁচে। আবার নীল তিমি প্রায় ৫০০ বছর বাঁচে। সেখানে কোনো জীব মিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে, এটা সাধারণের কল্পনার বাইরে। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় কল্পনার বাইরের এসব তথ্যই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।

ড. রাউল কানো একজন আমেরিকান মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন স্বনামধন্য প্রফেসর। প্রাচীন নমুনা থেকে অণুজীবের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে গবেষণা করা, তা থেকে জীবনের রহস্য বের করা ও অন্যান্য জীবের সাথে পারস্পরিক কী কী বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে, তা নিয়ে গবেষণা করাই তার নেশা। একবার তিনি মেক্সিকো ও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে কয়েকটি অ্যাম্বার (Amber) সংগ্রহ করলেন গবেষণার জন্য।

অ্যাম্বার হলো গাছের রেজিন (আঠা জাতীয় পদার্থ)। প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে হুলবিহীন একপ্রকার মৌমাছি (এখন বিলুপ্ত) মৌচাক তৈরির জন্য এসব রেজিন সংগ্রহ করতো। রেজিনগুলো পরবর্তীতে শক্ত হয়ে গিয়ে অ্যাম্বারের ক্রিস্টালে পরিণত হতো। ফলে মৌমাছি তার ভিতর আটকা পড়ে যেত। মৌমাছির পেটে স্বভাবতই এক প্রকার অণুজীব থাকে। এদের নাম Bacillus sphaericus, এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া। মৌমাছি হাবিজাবি যাই খায়, তা পরিপাকে এরা সাহায্য করে। পাশাপাশি মৌমাছির কাছে আশ্রয় পায় ও অতিরিক্ত পুষ্টি, যা মৌমাছির লাগে না, তা এরা গ্রহণ করে। অর্থাৎ উভয়ই উপকৃত হয়। এদের এই ভালোবাসাকে বলে মিথোজীবিতা।

চিত্রঃ অ্যাম্বারের ভিতর আটকা পড়া মৌমাছি।

তিনি প্রথমে এর বয়স মাপলেন। ২৫-৪০ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি কোনো এক সময়ের অ্যাম্বার ছিল এটা। তিনি এটা ছিদ্র করে দেখলেন, ভিতরে মরা মৌমাছি। তাও তিনি থামলেন না। মৌমাছির পেট কেটে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে অন্ত্র পর্যবেক্ষণ করলেন। দেখলেন, গোল গোল স্থির কী জানি দেখা যায়! তিনি এগুলা আলাদা করলেন, তারপর এগুলো একটি কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। পরবর্তীতে তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেন ওগুলো স্থির নেই, নড়ছে। কাহিনী কী? তারপর আরো কয়েকটি অ্যাম্বার ছিদ্র করে তিনি একই কাজ করলেন, ফলাফল একই। এরপর আরেকটি অ্যাম্বার নিলেন, এতে মৌমাছি বা গোল কিছু নেই। এর নমুনা কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। কিছুই কিলবিল করলো না।

পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি জানতে পারলেন, কিলবিল করা জীবগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের Bacillus sphaericus এর ৯৯% মিল রয়েছে, শুধু ডিএনএ-এর গঠনে সামান্য পার্থক্য আছে। আর গোল গোল বস্তুগুলো তার স্পোর। কোনো অণুজীব যেখানে থাকে, সেখানে যদি প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশের উদ্ভব হয়, তখন বেশিরভাগ অণুজীবই নিজেদের মোটা প্রোটিন আবরণ দিয়ে ঢেকে ফেলে। তার সকল শারীরিক কার্যকলাপ তখন বন্ধ করে দেয়। একে স্পোর বলে। এভাবে তারা শত বছর থাকতে পারে। তবে একটা সময়ে তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ প্রভৃতি কারণে স্পোর নষ্ট হয়ে যায়। আর অণুজীবও মারা যায়।

এখানে বিজ্ঞানী রাউল কানো শত বছর না, মিলিয়ন বছরের পুরাতন অণুজীবকে পুনরুজ্জীবিত করে ফেলেছেন। তার এ কাজকে গাঁজাখুরি গল্প বলে অনেক বিজ্ঞানী উড়িয়ে দিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, Bacillus sphaericus কেবল মৌমাছির পেটেই না, মাটি, বাতাস, সবখানেই এরা থাকে। তাদের মতে, গবেষণাটি ড: কানো যথাযথ Sterile (জীবাণুমুক্ত) পদ্ধতিতে করতে পারেননি। তাই তিনি ফলাফল হিসেবে যা পেয়েছেন, সেগুলো পরিবেশে থাকা এখনকার Bacillus sphaericus। তবে ড. কানোর পক্ষেও অনেক বিজ্ঞানী সুর মিলিয়েছেন।

তাকে সমর্থনকারী বিজ্ঞানী ড. পাবো দেখিয়েছেন জীব জীবিত থাকলে অ্যামাইনো এসিডগুলো L-amino acid হিসেবে থাকে। আর মারা গেলে, তা সময়ের সাথে সাথে L-amino acid ও D-amino acid এর রেসিমিক মিশ্রণে পরিণত হতে থাকে।

কোনো যৌগ যদি তল সমাবর্তিত আলোর দিক পরিবর্তন করতে পারে তবে তাকে আলোক সক্রিয় যৌগ বলে। যদি যৌগটির একটি সমাণু ঘড়ির কাঁটার দিকে তল সমাবর্তিত আলো ঘুরিয়ে দেয় তবে তা dextrorotatory (D) সমাণু। আর যদি অপর সমাণু ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেয় তবে তা levorotatory (L) সমাণু। রেসেমিক মিশ্রণ হলো একটি যৌগের dextrorotatory ও levorotatory সমাণুর মিশ্রণ। ড. পাবো অণুজীবকে মেরে দ্রুত অ্যাম্বারে ঢুকিয়ে অনেক দিন পর বের করে দেখলেন L-amino acid এখনও অপরিবর্তিত আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, অ্যাম্বার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রোটেক্টিভ শিল্ড, যা কোনো জৈব রাসায়নিক বস্তুকে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিকূলতা, তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ, ph পরিবর্তন, অন্য জীবের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে বছরের পর বছর।

ড. কানো দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সাবধানতার সাথে করেছেন, যার ফলে এ নিয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই। অণুজীবগুলো আসলেই ২৫-৪০ লাখ বছরের পুরাতন। আর ডিএনএ-র গঠনে যে পার্থক্য দেখা গিয়েছে, তার কারণ অ্যাম্বারের বাইরের মৌমাছিরা মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তাই তারা আলাদা। কিন্তু ঐ বেচারা অ্যাম্বারে আটকে গিয়ে জাগতিক সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই তার বিবর্তন হয়নি।

তিনি তার আবিষ্কার নিয়ে এতই আত্মবিশ্বাসী যে, কারো সমালোচনায় কান না দিয়ে, তিনি এ আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে ওষুধ তৈরি শুরু করে দিলেন, ওষুধ ফ্যাক্টরীর নাম দিলেন Ambergene Corporation। তার মতে, বর্তমানে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবগুলো প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অভিযোজিত হয়ে উঠছে। কিন্তু আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে তৈরি ওষুধ তাদের জ্ঞানের বাইরের বস্তু হবে, ফলে এ ওষুধ দিয়ে তাদের ধ্বংস করা যাবে। পাশাপাশি অনেক মারাত্মক রোগের ওষুধও আদিম ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই ফ্যাক্টরিটি ৩ ধরনের ওষুধ তৈরি করে প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করেছে।

তথ্যসূত্রঃ

 nytimes.com

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না। ১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন। ২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে। এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে। দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না। তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে

গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে। আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত

Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে। ২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে। আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত। তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  14. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  15. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  16. Salmon (2003)."Artificial night lighting and sea turtles" (PDF). Biologist 50: 163–168
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  18. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  19. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  20. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollutionhtm

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

চিত্র-বিচিত্র মানচিত্র

আপনার হাতের কাছে পৃথিবীর মানচিত্রটি আছে? চলুন আমরা আমাদের এই দ্বিমাত্রিক মানচিত্রকে ত্রিমাত্রিক করার একটু চেষ্টা করি। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, এই মানচিত্রের অক্ষরেখা এবং দ্রাঘিমারেখাগুলো লম্বভাবে আঁকা, মানে ৯০ ডিগ্রি করে আঁকা। মানচিত্রটি হাতে নিয়ে যদি অক্ষরেখা বরাবর পূর্ব (জাপান) ও পশ্চিম (আমেরিকা) দিক মিলিয়ে দেন তাহলে দেখতে পাবেন আপনার হাতে একটি সিলিন্ডার আকৃতির পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো সিলিন্ডার আকৃতির নয়। এটি গোলাকার বস্তু। তাহলে কাগজের মানচিত্রকে গোলাকার করতে গেলে কী করতে হবে? মানচিত্রের মেরুর দিকের অংশকে কিছুটা বিকৃত করে ভাঁজ করতে হবে।

এবার যদি আপনাকে বলি একটি গোলাকার টেনিস বলকে কেটে তাকে অবিকৃত রেখে সমতল কাগজের মতো বানিয়ে ফেলতে, কীভাবে বানাবেন? একটু ভেবে দেখুন, অবিকৃত রেখে করা সম্ভব নয়, কিছুটা বিকৃত করতেই হবে। আমাদের গোলাকার পৃথিবীর মানচিত্র তৈরির সময় মানচিত্রকরদের ঠিক একই সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এবং এর সমাধান তারা করেছেন কিছু অঞ্চল বিকৃতিকে মেনে নিয়েই।

চিত্রঃ পৃথিবীর প্রচলিত মানচিত্র।

সচরাচর আমরা যে মানচিত্রটি দেখে থাকি তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল প্রচলিত মারকেটর প্রজেকশন দ্বারা গঠিত। মারকেটর প্রজেকশন মানচিত্রের আবিষ্কারক ষোল শতকের জেরারডার্স মারকেটর। তিনি এই মানচিত্র তৈরি করতে পৃথিবীর আকৃতিকে গোলাকার হিসেবে চিন্তা না করে একটি সিলিন্ডারের আকৃতির মতো করে কল্পনা করেছেন। সিলিন্ডারের পৃষ্ঠটিকে কেটে সোজা করলে তা সহজেই আয়তাকৃতির হয়ে যায় এবং চাইলে পুনরায় এর পূর্ব এবং পশ্চিম দিক সহজেই যুক্ত করে দেয়া যায়। এই মানচিত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- সমুদ্রে চলাচলের সময় এ মানচিত্র জাহাজকে সবচেয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আর এ কারণেই প্রথম মানচিত্র তৈরির ৪৪৬ বছরের ইতিহাসে শত শত মানচিত্রের ভিড়ে কেবল এ মানচিত্রটিই আদর্শ মানচিত্র হিসেবে টিকে গেছে।

গোলাকার পৃথিবীকে সরলরেখায় উপস্থাপন করতে গিয়ে মেরুর দিকের অঞ্চলগুলোকে (আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া) তার প্রকৃত আকারের তুলনায় বর্ধিত করে এবং বিষুবীয় অঞ্চলগুলোকে (যেমন আফ্রিকা) ক্ষুদ্র করে দেখাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মারকেটর প্রজেকশনে গ্রিনল্যান্ডের আকার আফ্রিকার প্রায় সমান দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ০.৮ মিলিয়ন বর্গ মাইল, এবং আফ্রিকার আয়তন ১১.৬ মিলিয়ন বর্গ মাইল, যা গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় সাড়ে চৌদ্দ গুণ বেশি!

চিত্রঃ মানচিত্রের বিভিন্ন স্থানে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান এবং এর কারণে আকৃতিতে পরিবর্তন।

একইভাবে কানাডাকে মেরু অঞ্চল থেকে বিষুবীয় অঞ্চলে নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার জায়গায় বসালে তাকে আর আগের মতো বিশাল দেখায় না। মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াকে আমেরিকার চেয়ে অনেক ছোট দেখালেও আসলে এদের আয়তন খুব কাছাকাছি। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন ২.৯৭ মিলিয়ন বর্গ মাইল এবং আমেরিকার আয়তন ৩.৮১ মিলিয়ন বর্গ মাইল।

চিত্রঃ অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রাখলে দেখা যায় তারা প্রায় সমান আকৃতির।

আবার বিপরীতক্রমে বিষুবীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে উত্তর মেরুর দিকে নিয়ে বসালে তা আকারে অনেক বড় হয়ে যায়। বর্তমান মানচিত্র থেকে প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো আরেকটি বিষয় হলো কেন এই মানচিত্রে উত্তর দিককে উপর দিকে দেখানো হয়েছে? কেন দক্ষিণ বা অন্য কোনো দিক নয়? এর সহজ উত্তর হলো এটি তৈরি করেছে ইউরোপিয়ানরা। তাই তারা তাদেরকে উপরে রাখতে চেয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। ১৯৭৯ সালে ম্যাক আর্থারের তৈরি করা ‘ইউনিভার্সাল কারেক্টিভ ম্যাপ’-এ দক্ষিণ দিককে উপরে দেখানো হয়েছে। আবার ১১৫৪ সালে মরোক্কোর মানচিত্রকর মুহাম্মদ আল ইদ্রিসির মানচিত্রে পুরো দিকের ব্যাপারটিকেই অন্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে উত্তরকে উপরে রেখে মানচিত্র তৈরির পথ সুগম করে গেছেন প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিত টলেমী। তার আঁকা মানচিত্রে উত্তরকে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

ছবি এবং তথ্য থেকে বোঝা যায়, আসলে সঠিক মানচিত্র বলতে কিছু নেই। কারণ মানচিত্র প্রাকৃতিক নয়। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে এটি তৈরি করেনিয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মতো আমাদের মানচিত্রের স্থিতিবিন্যাসও সম্ভাবনা, প্রযুক্তি এবং রাজনীতির পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে আজ এ অবস্থায় এসেছে। এটিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তথ্যসূত্র

  1. boredpanda.com/true-size-countries-mercator-map-projection-james-talmage-damon-maneice/
  2. aljazeera.com/opinions/2014/2/maps-cartographycolonialismnortheurocentricglobe.html
  3. citymetric.com/politics/will-metro-mayors-be-powerful-enough-get-things-done-2371

ব্যাঙ যখন বোকা শিকারী

১৯৯৭ সালে বের হওয়া অ্যানাকোন্ডা মুভিতে গল্পের খাতিরে বেশ কিছু অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার দেখানো হয়েছিলো। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো যে, অ্যানাকোন্ডা তার গিলে ফেলা শিকারকে জ্যান্ত উগড়ে বের করে দেয় আরেকবার হত্যার রোমাঞ্চ পেতে। প্রকৃতপক্ষে অ্যানাকোন্ডার গেলার সময় শিকারকে যে ধরনের সংকোচন প্রসারণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, বের হবার সময় তাতে আর প্রাণপাখির পালকটাও থাকে না।

bombardier beetle
ফোরসেপ দিয়ে উত্যক্ত করায় বোম্বার্ডিয়ার বিটলের ঘটানো বিস্ফোরন; image source: Nbcnews

তবে কিছু কিছু পান্ডব আছে, যারা শিকারির পেটের ভিতর থেকে ঘুরে আসতে পারে। এরকম একটি হচ্ছে বোম্বার্ডিয়ার বিটল। এরা এক ধরনের জ্বালাময় রাসায়নিক নিক্ষেপ করে বলে তাদের এমন নাম। দুটো আলাদা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত আপাত নিষ্ক্রিয় দুই ধরনের রাসায়নিক উপাদান যখন মিশ্রিত হয় তখন এক ধরনের বিস্ফোরণ হয়। এই বিটলরা সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার এমন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। যার ফলে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার রাসায়নিক তার শরীর থেকে ঘন্টায় ২২ মাইল বেগে বের হয়।

ঘটনার আকস্মিকতায় বেশিরভাগ শিকারি ভয় পেয়ে গেলেও ব্যাঙ এর কাছে বোম্বার্ডিয়ার কিছুটা অসহায়। কারণ ব্যাঙ এত দ্রুত তার জিহবা দিয়ে ছোঁ মারে যে পোকাটি কিছু বুঝে উঠার আগেই পেটের ভিতর চলে যায়। তবে এরপর পোকাটি ব্যাঙের পেটের ভিতরই যখন তার অস্ত্র চালায় তখন বাইরে থেকেও তার শব্দ পাওয়া যায়। এই রাসায়নিক বিষাক্ত না হলেও এতটাই বিচ্ছিরি যে ব্যাং তাকে উগলে দিতে বাধ্য হয়। তবে, ব্যাঙের কিন্তু আমাদের মতো গ্যাগ রিফ্লেক্স নেই যার কারণে সে বমি করতে পারে না। তাদের একমাত্র উপায় পাকস্থলিকে উল্টে ফেলা। যা করতে তার ৪৫ মিনিট সময় লাগে। এই পোকাগুলো নিজেরা কিন্তু বিষাক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, ফোরসেপ দিয়ে বেশ কয়েকবার বিরক্ত করার পর যখন তাদের বিস্ফোরক সম্পুর্ণ্রুপে নিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তারপর কিন্তু ব্যাঙ এদের আরামেই খেয়ে নিতে পারে। অন্যদিকে বোম্বার্ডিয়ারের মধ্যেও কিন্তু পাকস্থলির এসিডপূর্ণ পরিবেশেও বহুক্ষণ টিকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে।

ব্যাঙের পেট থেকে ছাড়া পাবার আরো কিছু ঘটনা রয়েছে। ২০০২ সালে পূর্ব তিমুরে অভিযানের সময় মার্ক’ও শেয়া তার ল্যাবের দরজা খোলা রাখার জন্য একটা পাথর খুঁজতে যান। একটাকে সুবিধাজনক মনে হওয়ায় যখন সেটা তুলতে গেলেন দেখা গেলো পেছনে একটা কোলাব্যাঙ এবং তার পিছন দিয়ে বের হয়ে আছে একটা ব্রাহ্মিনি সাপ। এই সাপটি দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো। ফুলের টবে লুকিয়ে থাকার স্বভাবের কারণে এরা সারা দুনিয়াতেই ছড়িয়ে গেছে। অন্ধকার, অক্সিজেন শূন্য কিংবা সংকোচনশীল পরিবেশে এরা টিকে থাকতে পারলেও ব্যাঙের পশ্চাৎদেশ এদের প্রাকৃতিক আবাসন নয়। ব্যাঙটি হয়তো তাকে কেঁচো ভেবে গিলে ফেলেছিল এবং সর্পসাহেব তার ভক্ষকের সম্পূর্ণ পরিপাকতন্ত্র ঘুরে এসে পেছন দিয়ে বের হতে চেষ্টা করছে। ও’শিয়া এদেরকে ধরে নিয়ে আলাদা হতে সাহায্য করেন। সাপটি অবশ্য এর পর আর কয়েক ঘন্টার বেশি বাঁচতে পারেনি।

brahminy blind snake
ব্রাহ্মিনি সাপ, image source: californiaherps.com

কিছু কিছু প্রাণীর জন্য কিন্তু ভক্ষিত হওয়া সুবিধাজনক। বহু শামুক পাখির পেটে গেলেও বেঁচে থাকে আর এভাবে করে দূর দূরান্তে ছড়াতে পারে। যদিও ডাঙ্গার শামুকের চলাচলের প্রকৃতি খুবই ধীর, কিন্তু পাখির মাধ্যমে তারা ভিন্ন মহাদেশেও পৌঁছে যেতে পারে, যে সম্ভাবনার কথা ডারউইন বলে গিয়েছিলেন আর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন।

epomis beetle infesting on frog
ইপোমিস বিটলের লার্ভা দ্বারা আক্রান্ত ব্যাঙ

কখনো কখনো কিন্তু ভক্ষিত প্রাণী তার ভক্ষনকারীর অবস্থা নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে। গিল উইজেন এবং আভিতাল গাসিথ এমনই এক নজির পেয়েছেন ইপোমিস বিটল সম্পর্কে জানতে গিয়ে। এই পোকারা ব্যাঙ ছাড়া কিছু খায় না। ব্যাঙ যখন এদের ধরার জন্য জিভ ছোটায় তখন এরা সুকৌশলে আক্রমণকারীর মুখ কামড়ে ধরে এবং ধীরে ধীরে তাকে খেয়ে নেয়। বিজ্ঞানীদের প্রায় ৪০০ পর্যবেক্ষণে প্রতিটাতেই জিতেছিলো ইপোমিস। শুধু একটা ঘটনায় প্রথমে ইপোমিস হেরে যায়। কিন্তু ২ ঘন্টা পর ব্যাঙটি ইপোমিসকে উগড়ে দেয়ার পর নাটকীয়ভাবে সে তার খাদককে খেতে শুরু করে।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাসঃ বর্তমান প্রেক্ষাপট

ভূমিকম্পে পৃথিবীর মানুষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে, এই বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্র প্রচুর। অতীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে, এখন হচ্ছে এবং পরেও হবে। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস খুবই জনপ্রিয় এবং গবেষণার বড় একটি ক্ষেত্র। যদিও এ বিষয়ে গবেষণা করাটা বেশ জটিল আর অন্যান্য গবেষণার তুলনায় এই বিষয়ে গবেষণা প্রায় অপরিপক্বই বলা যায়। কিন্তু যতটুকু গবেষণাই হয়েছে তার মূল্য অনেক। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে গবেষণার ফলাফল বেলাশেষে আমাদের আশার বাণীই শোনায়।

কিছু কিছু পূর্ব লক্ষণের কথা অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলেন। যেমনঃ

1) Ground Uplift and Tilt, 2) Groundwater Fluctuation, 3) Chemical Changes in Groundwater, 4) Decrease of electrical resistivity of rocks.  এগুলো কমবেশি সবারই জানার কথা। এবার কয়েকটা ঘটনার কথা বলে ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের কথা বলবো।

২০১১ সালের জাপানের তোহুকুতে যে ভূমিকম্প হয়েছিল তার সম্পর্কে সবার মনে থাকার কথা। ইতিহাসের ভয়ঙ্কর যে কয়েকটা ভূমিকম্প হয়েছে তার মধ্যে এটিকে উপরের দিকে স্থান দেয়া যায়। জাপানের একদম কাছাকছি স্থানে ছিল এর উৎপত্তিস্থল। এই ভূমিকম্পে ১৫ হাজার ৮৪৪ জন মারা যায়, ৩ হাজার ৪৫০ জনকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৩৫ বিলিয়ন ডলার।

আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে এই ভূমিকম্প যে হবে তার কথা ১০ বছর আগে বিজ্ঞানীরা জানান দিয়ে রেখেছিলেন। সেই পূর্বাভাসে যে সময়, অবস্থান এবং ভূমিকম্পের তীব্রতার কথা বলা হয়েছিল তার ৭০ শতাংশ সঠিক ছিল। এমনকি এটি ঘটার আগের কয়েক দিন পরিবেশে বিভিন্ন রকম অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

M8-MSc নামক এলগরিদমের সাহায্যে এই পূর্বাভাসটি দেয়া হয় ২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে। তখন বলা হয় ভূমিকম্পটি হনসু বা হোকায়দোর আশেপাশে হতে পারে। এখানে একটা কথা না বললেই নয়, M8-MSc এর আগের ২৫ বছর ৮ বা তার থেকে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প পূর্বাভাসে ৭০% পর্যন্ত সফল। ২০১০ সালের চিলির ভূমিকম্পের কথাও জানান দেয় M8। এসব পরিসংখ্যান দেখেও ইচ্ছে করলে অনেক ক্ষতি এড়ানো যেত। International Journal of Disaster-এ ২০১২ সালে Risk Reduction বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ হয় যেখানে একে বলা হয় “a missed opportunity for disaster preparedness”

পূর্বাভাসের এই বিষয়টি আসলে অনেক বড় একটা গবেষণার ক্ষেত্র। Chaos Theory, Statistical Physics, Joint Optimization এর মতো গাণিতিক পদ্ধতি ব্যাবহার করা হয় এই ধরনের গবেষণাতে।

চিত্রঃ M8 and MSc alarm regions (তারকা চিহ্নিত স্থানটিই তোহুকু ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র। ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল ২০০১ সালে।)

এখন আরেকটু ভেতরে যাই। তোহুকু ভূমিকম্পের আগের কয়েকটা দিন আবহাওয়াতে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা যায়। ঐ স্থানেই তারতম্যগুলো হয়েছিল। যেমনঃ ১১ মার্চ ২০১১ তে ভূমিকম্পটি হয়। ৭ মার্চ ২০১১-তে ভূমিকম্পের এপিসেন্টারের কাছে infrared radiation এর হার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। পাশাপাশি ইলেকট্রন ঘনত্বের পরিমাণও বেড়ে যেতে দেখা গেছে। মার্চের ৩ – ১১ তারিখ পর্যন্ত ইলেকট্রনের ঘনমাত্রার রেকর্ড দেখা হয়। দেখা গেছে, এই সময়টাতে ইলেকট্রন ঘনমাত্রার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল কিন্তু কম্পনটি হবার পর এটি কমে যায়।

২০০৮ সালে Applied Radiation and Isotopes নামক জার্নালে “Radon anomaly in soil gas as an earthquake precursor” – নামক প্রবন্ধ প্রকাশ হয়। এখানে দেখানো হয়, ভূমিকম্প হবার আগে মাটিতে এবং ভূগর্ভের পানিতে রেডন গ্যাসের পরিমাণ অনেক হারে বেড়ে যায়।

এই মাসে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নিয়ে প্রাথমিক কিছু কথাবার্তা হলো, পরবর্তী কোনো এক সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা রেখে এখানেই শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

  1. International Journal of Disaster Risk Reduction 1 (2012) 17–32
  2. Science (2011) 24: 557–564
  3. Applied Radiation and Isotopes 66 (2008) 1459–1466
   4. http://www.npa.go.jp/ archive/keibi/biki/higaijokyo_e.pdf

জীবন্ত শৈবালের বসতবাড়ি

প্রতিটি মানুষের আশা থাকে তার স্বপ্নের বাড়িটি হবে ঝকঝকে-তকতকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আর সেটি যে দেখতে অসাধারণ হতে হবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আগে মানুষ দর্শণধারী, পরে গুণবিচারী। বাইরের রঙটা হবে এমন যে, তা যে কারো মন কাড়তে বাধ্য। এর জন্য দরকার কত ঘষাঘষি, চুনকাম, ওয়েদার প্রটেকটিভ কোটিং, রং-বেরংয়ের প্রলেপসহ আরও কত কী! তার মনে আশা থাকে ঝড়বাদল, স্যাঁতস্যাঁতে পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করে দিনের পর দিন বাড়িটি রূপ-রং ঝরাবে। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি দিয়ে কেউ যদি ইচ্ছা করেই ছত্রাক-শৈবাল লালন করে সেই বাড়ীর বারোটা বাজায়, তবে তাকে বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। এমনই কিছু উন্মাদের কথা বলতেই আজকের এ লেখা।

এবার শুধু উন্মাদ বিজ্ঞানীরাই না, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন বিল্ডিং এক্সপার্ট এবং আর্কিটেক্টরাও, যারা অস্ট্রেলিয়াতে জীবন্ত শৈবাল নিয়ে বাড়ি বানাতে যাচ্ছেন, যেখানে এগুলোই বাড়ীর বহিরাবণ আবৃত করে রাখবে!

কিন্তু তার আগেই বলে রাখা দরকার, এটাই প্রথমবারের মতো পাগলামি না। এর আগেও একই কাজ হয়েছে। জার্মানির হামবুর্গে ২০১৩ সালে IBA (International Bar Association) একটি আন্তর্জাতিক ভবন প্রদর্শনীর আয়োজন করে যাতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভবনের ধারণা উঠে আসে।

 

ভবনের সামনের দিকটায় সবুজ যে গ্লাসগুলো দেখা যাচ্ছে তাতে কিন্তু রয়েছে জীবন্ত শৈবাল। এ সবুজ রং নিয়ত পরিবর্তনশীল। শৈবালের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এর রঙ হাল্কা সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হতে থাকে। একদম গাঢ় হয়ে গেলে কাচে ঘেরা মিডিয়ামকে সবুজ লাভার মতো মনে হয় যা থেকে ফুলকির মতো বুদবুদ অক্সিজেন নির্গত হয়।

সবুজ শৈবাল সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোক ও পুষ্টি উপাদান নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং পানির সাথে বিক্রিয়ায় বায়োমাস ও তাপ তৈরি করে। এ বায়োমাসকে সংগ্রহ করে বায়োমাস রিঅ্যাক্টরে বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়োগ্যাস ও বায়ো অয়েল তৈরি করা হয়, যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উল্লেখ্য, এ বায়োজ্বালানীর গুণগত মান যথেষ্ট উচ্চমানের। এ জ্বালানী থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করে বাড়ির ভিতরে প্রেরণ করা হয়। আর বিক্তিয়ার উৎপাদ হিসেবে তৈরি তাপকে ওয়াশ রুমের গরম পানির প্রবাহের জন্য ও ঘর গরম রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইডকে পুনরায় টিউবের মাধ্যমে কাঁচেঘেরা প্লান্টে পাঠানো হয়। আর পুরোনো শৈবালগুলা সংগ্রহ করে মানুষের এবং মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে শৈবাল থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ, সমস্ত বাড়ি যদি সোলার প্যানেল দিয়ে দ্বারা ঘিরে দেওয়া হতো, তবে তার থেকে কোনো অংশে কম হতো না।

এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে স্বনির্ভর বাড়ি তৈরির পথে মানুষের অগ্রযাত্রা কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলো। শুধু বাড়ির সৌন্দর্যের জন্যই নয়, পরিবেশের উপর এ ধরনের বাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তথ্যসূত্রঃ

thescienceexplorer.com/technology/living-algae-buildings-coming-soon-australia

 

মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান

এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ কত বছরই বা বাঁচতে পারে? গড়ে ৬০-৬৫ বছর। কিছু প্রাণী এর থেকেও কম সময় বাঁচে। আবার নীল তিমি প্রায় ৫০০ বছর বাঁচে। সেখানে কোনো জীব মিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে, এটা সাধারণের কল্পনার বাইরে। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় কল্পনার বাইরের এসব তথ্যই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।

ড. রাউল কানো একজন আমেরিকান মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন স্বনামধন্য প্রফেসর। প্রাচীন নমুনা থেকে অণুজীবের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে গবেষণা করা, তা থেকে জীবনের রহস্য বের করা ও অন্যান্য জীবের সাথে পারস্পরিক কী কী বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে, তা নিয়ে গবেষণা করাই তার নেশা। একবার তিনি মেক্সিকো ও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে কয়েকটি অ্যাম্বার (Amber) সংগ্রহ করলেন গবেষণার জন্য।

অ্যাম্বার হলো গাছের রেজিন (আঠা জাতীয় পদার্থ)। প্রায় ৪০ লাখ বছর আগে হুলবিহীন একপ্রকার মৌমাছি (এখন বিলুপ্ত) মৌচাক তৈরির জন্য এসব রেজিন সংগ্রহ করতো। রেজিনগুলো পরবর্তীতে শক্ত হয়ে গিয়ে অ্যাম্বারের ক্রিস্টালে পরিণত হতো। ফলে মৌমাছি তার ভিতর আটকা পড়ে যেত। মৌমাছির পেটে স্বভাবতই এক প্রকার অণুজীব থাকে। এদের নাম Bacillus sphaericus, এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া। মৌমাছি হাবিজাবি যাই খায়, তা পরিপাকে এরা সাহায্য করে। পাশাপাশি মৌমাছির কাছে আশ্রয় পায় ও অতিরিক্ত পুষ্টি, যা মৌমাছির লাগে না, তা এরা গ্রহণ করে। অর্থাৎ উভয়ই উপকৃত হয়। এদের এই ভালোবাসাকে বলে মিথোজীবিতা।

চিত্রঃ অ্যাম্বারের ভিতর আটকা পড়া মৌমাছি।

তিনি প্রথমে এর বয়স মাপলেন। ২৫-৪০ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি কোনো এক সময়ের অ্যাম্বার ছিল এটা। তিনি এটা ছিদ্র করে দেখলেন, ভিতরে মরা মৌমাছি। তাও তিনি থামলেন না। মৌমাছির পেট কেটে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে অন্ত্র পর্যবেক্ষণ করলেন। দেখলেন, গোল গোল স্থির কী জানি দেখা যায়! তিনি এগুলা আলাদা করলেন, তারপর এগুলো একটি কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। পরবর্তীতে তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেন ওগুলো স্থির নেই, নড়ছে। কাহিনী কী? তারপর আরো কয়েকটি অ্যাম্বার ছিদ্র করে তিনি একই কাজ করলেন, ফলাফল একই। এরপর আরেকটি অ্যাম্বার নিলেন, এতে মৌমাছি বা গোল কিছু নেই। এর নমুনা কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। কিছুই কিলবিল করলো না।

পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি জানতে পারলেন, কিলবিল করা জীবগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের Bacillus sphaericus এর ৯৯% মিল রয়েছে, শুধু ডিএনএ-এর গঠনে সামান্য পার্থক্য আছে। আর গোল গোল বস্তুগুলো তার স্পোর। কোনো অণুজীব যেখানে থাকে, সেখানে যদি প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশের উদ্ভব হয়, তখন বেশিরভাগ অণুজীবই নিজেদের মোটা প্রোটিন আবরণ দিয়ে ঢেকে ফেলে। তার সকল শারীরিক কার্যকলাপ তখন বন্ধ করে দেয়। একে স্পোর বলে। এভাবে তারা শত বছর থাকতে পারে। তবে একটা সময়ে তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ প্রভৃতি কারণে স্পোর নষ্ট হয়ে যায়। আর অণুজীবও মারা যায়।

এখানে বিজ্ঞানী রাউল কানো শত বছর না, মিলিয়ন বছরের পুরাতন অণুজীবকে পুনরুজ্জীবিত করে ফেলেছেন। তার এ কাজকে গাঁজাখুরি গল্প বলে অনেক বিজ্ঞানী উড়িয়ে দিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, Bacillus sphaericus কেবল মৌমাছির পেটেই না, মাটি, বাতাস, সবখানেই এরা থাকে। তাদের মতে, গবেষণাটি ড: কানো যথাযথ Sterile (জীবাণুমুক্ত) পদ্ধতিতে করতে পারেননি। তাই তিনি ফলাফল হিসেবে যা পেয়েছেন, সেগুলো পরিবেশে থাকা এখনকার Bacillus sphaericus। তবে ড. কানোর পক্ষেও অনেক বিজ্ঞানী সুর মিলিয়েছেন।

তাকে সমর্থনকারী বিজ্ঞানী ড. পাবো দেখিয়েছেন জীব জীবিত থাকলে অ্যামাইনো এসিডগুলো L-amino acid হিসেবে থাকে। আর মারা গেলে, তা সময়ের সাথে সাথে L-amino acid ও D-amino acid এর রেসিমিক মিশ্রণে পরিণত হতে থাকে।

কোনো যৌগ যদি তল সমাবর্তিত আলোর দিক পরিবর্তন করতে পারে তবে তাকে আলোক সক্রিয় যৌগ বলে। যদি যৌগটির একটি সমাণু ঘড়ির কাঁটার দিকে তল সমাবর্তিত আলো ঘুরিয়ে দেয় তবে তা dextrorotatory (D) সমাণু। আর যদি অপর সমাণু ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেয় তবে তা levorotatory (L) সমাণু। রেসেমিক মিশ্রণ হলো একটি যৌগের dextrorotatory ও levorotatory সমাণুর মিশ্রণ। ড. পাবো অণুজীবকে মেরে দ্রুত অ্যাম্বারে ঢুকিয়ে অনেক দিন পর বের করে দেখলেন L-amino acid এখনও অপরিবর্তিত আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, অ্যাম্বার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রোটেক্টিভ শিল্ড, যা কোনো জৈব রাসায়নিক বস্তুকে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিকূলতা, তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ, ph পরিবর্তন, অন্য জীবের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে বছরের পর বছর।

ড. কানো দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সাবধানতার সাথে করেছেন, যার ফলে এ নিয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই। অণুজীবগুলো আসলেই ২৫-৪০ লাখ বছরের পুরাতন। আর ডিএনএ-র গঠনে যে পার্থক্য দেখা গিয়েছে, তার কারণ অ্যাম্বারের বাইরের মৌমাছিরা মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তাই তারা আলাদা। কিন্তু ঐ বেচারা অ্যাম্বারে আটকে গিয়ে জাগতিক সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই তার বিবর্তন হয়নি।

তিনি তার আবিষ্কার নিয়ে এতই আত্মবিশ্বাসী যে, কারো সমালোচনায় কান না দিয়ে, তিনি এ আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে ওষুধ তৈরি শুরু করে দিলেন, ওষুধ ফ্যাক্টরীর নাম দিলেন Ambergene Corporation। তার মতে, বর্তমানে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবগুলো প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অভিযোজিত হয়ে উঠছে। কিন্তু আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে তৈরি ওষুধ তাদের জ্ঞানের বাইরের বস্তু হবে, ফলে এ ওষুধ দিয়ে তাদের ধ্বংস করা যাবে। পাশাপাশি অনেক মারাত্মক রোগের ওষুধও আদিম ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই ফ্যাক্টরিটি ৩ ধরনের ওষুধ তৈরি করে প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করেছে।

তথ্যসূত্রঃ

 nytimes.com