সনোজেনেটিক্সঃ শ্রবণোত্তর শব্দের জাদু

আলিফ লায়লার গল্পে দেখা যেত হাততালি বা অন্য কোনো শব্দে বা মন্ত্রের বাহাদুরীতে কোনো জাদুর দরজা খুলে যাচ্ছে বা কোনো পর্দা সরে যাচ্ছে। কেমন হতো যদি বাস্তবেও এমন হতো? বাস্তবে সত্যিই এক ধরনের ইলেকট্রনিক সুইচ আছে যা আলিফ লায়লার গল্পের মতোই শব্দে সাড়া দেয়। আলিফ লায়লার বাস্তব সংস্করণ এই সুইচটির নাম ‘দ্য ক্ল্যাপার’। ক্ল্যাপার নামটিও এসেছে, ‘ক্ল্যাপিং’ অর্থাৎ হাততালি থেকে। আপনি হাততালি দিবেন আর ক্ল্যাপার লাগানো যন্ত্রটি চালু হয়ে যাবে। হোক সেটি টেলিভিশন, দরজা কিংবা অন্য কিছু।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যদিও বলা হয় হাততালি দিলে যন্ত্র চালু হবে কিন্তু আদতে ব্যাপারটা তারচেয়েও বেশি কিছু। মানে হাসি, হাঁচি, কাশি, ঠকঠক- যেকোনো ধরনের শব্দেই ক্ল্যাপার সাড়া দেয়। ভাবছেন এ আবার কেমন কথা? তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে ততোধিক আশ্চর্য ও চমকপ্রদ একটি তথ্য আপনাকে জানাতে চাই। তার আগে চলুন ছোট্ট একটি সায়েন্স ফিকশনের কথা চিন্তা করা যাক।

কোনো এক সুন্দর সোনালী বিকেলে আপনি হাঁটছেন কোনো মেঠোপথে। কানে হেডফোন। শুনছেন প্রিয় শিল্পীর প্রিয় কোনো গান। সেটি হতে পারে ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ…’। রাঙ্গামাটির পথের অপরূপ সৌন্দর্য ও সূর মূর্চ্ছনায় আপনি বিমোহিত। হঠাতই আবিষ্কার করলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। আপনি কে, কোথায় আছেন কিছু বুঝতে পারছেন না। চিনতে পারছেন না কোনো কিছু। রাঙ্গামাটি নাকি খাগড়াছড়িতে সেটা বোঝার আগেই আপনার জানা সমস্ত তথ্যও স্মৃতি থেকে উধাও।

প্রিয় গানের সুরে কোথায় হারাবেন আপনি অন্য ভূবনে তা না উল্টো নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন। আশ্চর্যজনক বটে। সত্যিই কি মানুষ ক্ল্যাপারের কোনো জটিল ভার্সন? যেকোনো শব্দ শুনলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে কেন?

নিউরোসায়েন্সের নতুন একটি গবেষণা বলছে শব্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে মানুষের নিউরন, এমনকি শরীরের যে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তবে এটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়। এই শব্দটি হতে হবে শব্দোত্তর তরঙ্গ (Ultrasound wave)। শব্দোত্তর তরঙ্গ মানুষ শুনতে পায় না। এর কম্পাঙ্ক ২০ কিলোহার্জ থেকে কয়েক গিগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের মস্তিষ্ক শব্দোত্তর তরঙ্গ শনাক্ত করতে না পারলেও বাঁদুর এবং অন্যান্য কিছু প্রাণী ঠিকই পারে।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শ্রবণোত্তর শব্দকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট প্রাণীতে কোনো অস্ত্রোপচার করতে হয়নি। কোনোরকম কাটাছেড়া ছাড়াই মস্তিষ্কের বাইরে থেকে নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। যেহেতু কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয় না তাই এই কৌশলটি প্রয়োগ করে দূর থেকেও নিউরনকে সক্রিয় করা সম্ভব। মস্তিষ্কের বাইরে থেকে একটি সাউন্ড পালস পাঠিয়ে আমরা কোনো প্রাণীর আচরণ ও চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারি। নতুন এই প্রযুক্তিটিকে বলা হচ্ছে সনোজেনেটিক্স।

অধিকাংশ স্নায়ুকোষই শ্রবণোত্তর শব্দতরঙ্গে সাড়া দেয় না। সেক্ষেত্রে তাদের সাড়া দেয়ানোর ব্যবস্থা করতে বিজ্ঞানীদের একটু পরিশ্রম করতে হয়। তারা স্নায়ুকোষগুলোতে জিনগতভাবে সামান্য পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এরপর বিজ্ঞানীরা স্নায়ুকোষগুলোকে মস্তিষ্কের বাইরে থেকে সক্রিয় করতে পারেন।

কীভাবে? সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লা জলাতে অবস্থিত সাল্ক ইন্সটিটিউটের একদল স্নায়ুবিজ্ঞানী সনোজেনেটিক্স প্রয়োগ করে নেমাটোড C. elegans এর বিশেষ কিছু নিউরনকে সক্রিয় করতে পেরেছেন। গবেষনাটিতে কাজ করেছেন বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট ইবসেন, প্রফেসর শ্রীকান্ত চালসানি এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ। সনোজেনেটিক্সের এই গবেষণাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications এ।

2চিত্রঃ নেমাটোড C. elegans

আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল সনোজেনেটিক্সে ব্যবহার করা হয় আল্ট্রাসাউন্ড। আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। আগেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যাবহৃত সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আগে আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহৃত হতো একগুচ্ছ নিউরনকে বা শরীরের অভ্যন্তরের কোনো টিস্যুতে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে, হাতের ব্যথা সারাতে এমনকি ক্যান্সার চিকিৎসাতেও। ক্যান্সার আক্রান্ত কোষের আশেপাশের নিরীহ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি না করে কালপ্রিট ক্যান্সার কোষগুলো অপসারণেও আল্ট্রাসাউন্ড কাজ করেছে।

তবে আগে আল্ট্রাসাউন্ড পারেনি যেটা বা বিজ্ঞানীরা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে করাতে পারেননি যেটা সেটা হলো- একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করা। সনোজেনেটিক্সে আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে এই কাজটিই করানো হয়।3

সনোজেনেটিক্সের আগে এক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিটি ছিল অপ্টোজেনেটিক্স। যেটাতে আলোকে কাজে লাগিয়ে একটি বা একগুচ্ছ নিউরনকে সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় করা যায়। তবে অপ্টোজেনেটিক্সের ব্যর্থতা হলো এক্ষেত্রে কাটাছেড়ার প্রয়োজন হয়। যার নিউরনকে সক্রিয় করতে হবে সেই প্রাণীর মাথায় অস্ত্রোপচার করে একটা ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো হয়। তারপর আলো ফেললে নিউরন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হয়। সমস্যা আরো আছে। আলো শরীরের অন্যান্য টিস্যু বা কাংক্ষিত নিউরনের আসেপাশের নিউরন দ্বারা বিচ্ছুরিত হয়। আলট্রাসাউন্ডে এটি হয় না। যেহেতু বিচ্ছুরনের ভয় নেই তাই মস্তিষ্কের ঠিক যে নিউরনকে বা নিউরন গুচ্ছকে আপনি নাচাতে চান ঠিক সেই নিউরনটিই নাচবে। শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে অবস্থিত কোনো নির্দিষ্ট কলাগুচ্ছকেও এভাবে সক্রিয় করা সম্ভব।

নিউরোসায়েন্সের বহুদিনের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল নির্ভরযোগ্যভাবে কোনো একটি একক নিউরনকে সক্রিয় করে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করা। সাল্ক ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা এই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। কীভাবে? বিজ্ঞানীরা এজন্য বেছে নিয়েছিলেন C. elegans নামের এক ধরনের নেমাটোডকে। গিনিপীগরূপী C. elegans বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কিছু আচরণ করে যা পর্যবেক্ষণ করে এর স্নায়ুবিক কার্যকলাপ বোঝা সম্ভব। এছাড়া মাত্র ৩০২ টি নিউরন নিয়ে গঠিত C. elegans এর ক্ষুদ্রাকার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা সহজ বলেও বিজ্ঞানীরা একে বেছে নেন।

এরপর তারা যে চমকপ্রদ কাজটি করেন সেটি হচ্ছে নেমাটোডটিতে বিশেষ একটি আয়ন চ্যানেল শনাক্ত করেন। আয়ন চ্যানেল হলো কোষঝিল্লীতে থাকা বিশেষ এক ধরনের প্রোটিন যারা কোষে আয়নের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে। C. elegans এর আয়ন চ্যানেলটি ছিল ছিদ্রযুক্ত, ক্যাটায়ন পরিবহকারী, সংবেদী একটি প্রোটিন। এর নাম হল TRP-4। এটি কোষে বিভিন্ন অনুভূতি যেমন- চাপ, স্পর্শ, তাপ প্রভৃতি বহন করে। বিশেষ করে এটি একটি চাপ সংবেদী প্রোটিন। দেখা গেছে এই TRP-4 আয়ন চ্যানেলটি কম চাপের আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল। আরো দেখা গেছে আল্ট্রাসাউন্ডের উপস্থিতিতে কিছু কিছু নিউরনে TRP-4 প্রোটিনের ভুলভাল অভিব্যক্তি সেই নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে। ফলে সক্রিয় নিউরনের প্রভাবে প্রাণীটিতে একটি আচরণ তৈরি হয়। সরলরেখা ধরে চলমান C. elegans আট্রাসাউন্ডের প্রভাবে বড় কোণে বাক নেয়। এভাবে আল্ট্রাসাউন্ড প্রাণীর আচরতণগত সাড়া দেয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

স্বাভাবিকভাবে C. elegans আল্ট্রাসাউন্ড পালসে খুব একটা সাড়া দেয় না। তবে মাইক্রোবাবলস দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখায়। মাইক্রোবাবলস হলো এক মিলিমিটারের কম ব্যাসের কিন্তু এক মাইক্রোমিটারের বেশি ব্যাসের এক ধরনের বাবল। এরা সাধারণত গ্যাস বা বায়ুপূর্ণ থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত মাইক্রোবাবলসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এরা আল্ট্রাসাউন্ডে সাড়া দেয়। এই মাইক্রোবাবলসগুলো পারফ্লুরোহেক্সেন নামক রাসায়নিক ও বায়ুর মিশ্রণ দ্বারা ভর্তি করা হয়। আল্ট্রাসাউন্ড ওয়েভ সঞ্চালনে মাইক্রোবাবলস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। তাদের এ আন্দোলনের ফলে আল্ট্রাসাউন্ড বিবর্ধিত হয় যা C. elegans এ উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

4চিত্রঃ সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের ফলে C. elegans এ প্রতিক্রিয়া।

অ্যাগার প্লেটে রাখা এই নেমাটোডগুলো মাইক্রোবাবল-আল্ট্রাসাউন্ড আন্তঃক্রিয়াতে সাড়া দিয়ে তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখায়। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে C. elegans এর ASH ও AWC সংবেদী নিউরনকে সক্রিয় করা গেছে। এছাড়াও নির্ণয় করা গেছে এতদিন ধরে অজ্ঞাত থাকা PVD নিউরনের কাজ। দেখা গেছে এটি প্রাণীর চলনের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আরো যে কাজটি করা গেছে তা হলো, C. elegans এর ত্বক থেকে ২৫ মাইক্রোমিটার নিচে অবস্থিত AIY নিউরন সক্রিয় করা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে PVD নিউরনগুচ্ছের কাজকে পরিবর্তন করাও সম্ভব হয়েছে।

আল্ট্রাসাউন্ডের একটি বড় সুবিধা হলো এর সর্বনিম্ন ফোকাস করার স্থান খুবই কম। মাত্র কয়েক মিলিমিটার। আল্ট্রাসাউন্ডের এই কম ফোকাল এরিয়া এবং AIY নিউরনগুচ্ছের সক্রিয়করণ থেকে বোঝা যায় যে, এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত কোনো নিউরন বা নিউরনগুচ্ছকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

সব মিলিয়ে স্নায়বিক কার্যকলাপ কীভাবে প্রাণীর আচরণকে প্রভাবিত করে এই গবেষণাটির মাধ্যমে তা নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। C. elegans ছাড়াও ইঁদুরে সনোজেনেটিক্স প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ইঁদুরে TRP-4 নিজে থেকে তৈরি হয় না। সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার থেকে হয়তো প্রাণীর আচরণ সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানা সম্ভব হবে।

নিউরনের আন্তঃসংযোগের ফলেই স্মৃতি গঠিত হয়। আমরা যদি নিউরনের কাজের ধরনকে পরিবর্তন করতে পারি এবং ইচ্ছামতো নিউরনগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি তাহলে স্মৃতিকে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে।

5

সনোজেনেটিক্সের প্রয়োগ-ক্ষেত্র হতে পারে অত্যন্ত বিস্তৃত। যেমন অপ্রিয় কোনো স্মৃতি যা মানব মনকে বারবার বিপর্যস্ত করে তা মস্তিষ্ক থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব। সনোজেনেটিক্স প্রয়োগে স্নায়ুবিজ্ঞানে পরবর্তীতে মনে করা, ভুলে যাওয়া, ভুল স্মৃতি, স্মৃতি সংযোগ বা বিয়োজন নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা সম্ভব হতে পারে। মেমোরী ফর্মেশন নিয়ে নতুন তথ্যও জানা যাবে যা স্নায়ুবিজ্ঞানকে অন্য মাত্রা দেবে। এছাড়া পার্কিনসন্স, আলঝেইমার প্রভৃতি স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় বিপ্লব আনতে পারে সনোজেনেটিক্স।

আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি নেয়ার আগে আপনাকে সতর্ক করতে চাই যে, এটা শুধু পোকামাকড়ের উপর পরীক্ষিত খুবই নতুন একটি প্রযুক্তি। এটা কিছুটা হতাশাব্যাঞ্জক শোনালেও অন্তত একটা ভবিষ্যদ্বাণী তো করা যায় যে স্মৃতিবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন খুব কাছেই।

তথ্যসূত্র

১. wikipedia.org/wiki/The_Clapper

২. http://www.nature.com/articles/ncomms9264

৩. http://sage.buckinstitute.org/sonogenetics-sound-waves-and-mechanosensory-response/

৪. http://www.ibtimes.co.uk/sonogenetics-sound-waves-successfully-used-control-brain-cells-worms-1519831

লেখকঃ

সাবরিনা সুমাইয়া
মনোবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম শব্দ যা পুরো পৃথিবীকে চারবার প্রদক্ষিণ করেছিল

২৭ আগস্ট, ১৮৮৩। ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে তখন সকাল ১০ টা বেজে ০২ মিনিট। পৃথিবীর বুক চিরে এক বিকট শব্দ শোনা গেলো। শব্দটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপ। সম্ভবত এই শব্দটিই এ যাবৎকালের পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্রতম শব্দ।

ক্রাকাতোয়া দ্বীপটি জাভা ও সুমাত্রার একদম মাঝামাঝি অবস্থিত একটি দ্বীপ। এখানে উৎপন্ন হওয়া শব্দটি এতটাই তীব্র ছিল যে, ১,৩০০ মাইল দূরের আন্দামান এবং নিকোবার দ্বীপ থেকেও বন্দুকের আওয়াজের মতো তীব্রভাবে এই শব্দটি শোনা গিয়েছিল। এমনকি ২,০০০ মাইল দূরের নিউ গিনি এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, ৩,০০০ মাইল দূরের ভারতীয় সাগরের রদ্রিগেজ দ্বীপ এবং মৌরিতিয়াস থেকেও এই বিকট শব্দটি শোনা গিয়েছিল। ৫০ এর উপরে ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা থেকে এই শব্দ শোনা গিয়েছিল তখন।

কি? এরপরও বিস্ময়কর লাগছে না? তাহলে বলুন তো শব্দের বেগ কত? শব্দের বেগ হলো প্রতি ঘন্টায় ৭৬৬ মাইল। এ হিসেবে ৩,০০০ মাইল পথ পারি দিতে এই শব্দটির লেগেছিল ৪ ঘন্টারও চেয়েও বেশি সময়। এর অর্থ শব্দটি তৈরি হওয়ার পর সেই শব্দটিই ৪ ঘন্টা বাতাসে ভ্রমণ করার পর কোন এক মানুষের কানে গিয়ে পৌঁছেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে  সংরক্ষিত তথ্য মতে এই শব্দটিই সবচেয়ে দূর থেকে শুনতে পাওয়ার রেকর্ডের অধিকারী।

যেসব এলাকা থেকে ক্রাকাতোয়া বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল তার একটি মানচিত্র; image source: nautil.us

তাহলে চলুন এবার অনুসন্ধান করা যাক যে এই বিকট শব্দের পেছনের কারণ কি? খুব ছোট করে বললে এই প্রশ্নটির উত্তর হলো, একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। হ্যাঁ, ক্রাকাতোয়া দ্বীপের একটি আগ্নেয়গিরির বিকট অগ্ন্যুৎপাতের ফলেই এ শব্দ তৈরি হয়েছিল।

শুধু কি শব্দ? এই বিস্ফোরণ একটি অত্যন্ত ভয়াবহ সুনামিও উৎপন্ন করেছিল, যার উচ্চতা ছিল ১০০ ফিট বা, ৩০ মিটার। সমুদ্র তীরবর্তি প্রায় ১৬৫টা গ্রাম এই সুনামিতে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই সুনামি ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।

বিস্ফোরণের সময় ক্রাকাতোয়ার মাত্র ২০ মাইলের ভেতরে নরম্যান নামের একটি জাহাজ অবস্থান করছিল। জাহাজের ক্যাপ্টেন এই ঘটনার রেকর্ড হিসেবে লিখেছিলেন, ” বিস্ফোরণটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, আমার জাহাজের প্রায় অর্ধেক কর্মচারীর কান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার স্ত্রীকে শেষবারের মতো বললাম, আমি নিশ্চিত যে, শেষ বিচারের দিন আসন্ন হয়ে এসেছে।”

ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির এই বিস্ফোরণ এতটাই প্রকট ছিল যে, ১০০ মাইল দূর থেকেও ১৭২ ডেসিবেলের শব্দ শোনার বিষয়টি নথিভুক্ত করা  হয়েছিল। ১৭২ ডেসিবেলের শব্দের মাত্রা সম্বন্ধে কল্পনা করা একটু কঠিনই বটে। আপনার একদম কানের পাশ দিয়ে যদি কোন জেট বিমান চলে যায় তাহলে সেই শব্দের মাত্রা হবে ১৩০ ডেসিবেল।

শিল্পীর চোখে ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত; image source: nautil.us

আমরা যখন কোন শব্দ করি তখন সেই শব্দ বাতাসের অণুসমূহের কম্পন বা, সামনে পেছনে নড়াচড়ার মাধ্যমে বাতাসের কাল্পনিক স্তর সঙ্কুচিত এবং প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বাতসের কোথাও চাপের পরিমাণ বেশি হয় আবার কোথাও কম হয়। এ ঘটনার সময় অণুগুলো সেকেন্ডে কয়েকশতবার পর্যন্ত সামনে পেছনে নড়াচড়া করতে পারে। এরকম পরিস্থিতির একটি চরম অবস্থা রয়েছে। এই চরম অবস্থায় বাতাসের অণুগুলোর নড়াচড়া বা, বাতাসের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের চাপের পার্থক্য এতটাই বেড়ে যায় যে বাতাসের কম চাপের অঞ্চলটি একদম বায়ু শূন্য হয়ে যায়। ফলে মহাশূন্যের মতো এক ফাঁকা স্থানের সৃষ্টি হয়। শূন্যের চেয়ে নিচে কোন চাপ থাকতে পারে না। পৃথবীর বায়ুমন্ডলের জন্য শব্দের এই উচ্চতার সীমাটি হলো ১৯৪ ডেসিবেল। তীব্রতা এর চেয়ে বেশি হলে শব্দ শুধু বাতাসের মাধ্যমে সামনেই এগিয়ে যায় না, বাতাসকেই ঠেলে সামনের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। এই ঘটনাকে শক ওয়েভ বলে।

ক্রাকাতোয়ার খুব কাছে শব্দের তীব্রতা এই সীমার অনেক উপরে ছিল। যার ফলে নরম্যান জাহাজের নাবিকদের কান সম্পূর্ণরুপে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতীয় সাগরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শব্দের এই তীব্রতা অনেক কমে যায়। ৩,০০০ মাইল পাড়ি দিতে দিতে এই শব্দের এমন অবস্থা হয় যে মানুষের কান আর সেই শব্দ সনাক্ত করার ক্ষমতা রাখে না। তবে শব্দটি কিন্তু ধ্বংস হয়ে যায়না। শব্দটি বাতাসের মাধ্যমের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলতেই থাকে। কানে শোনা না গেলেও শব্দটির প্রভাব আমাদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সনাক্ত করা ঠিকই সম্ভব।

১৮৮৩ সালের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ব্যারোমিটার দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের চাপের পরিবর্তন মাপার বা, সনাক্ত করার ব্যবস্থা ছিলো। ক্রাকাতোয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ৬ ঘন্টা ৪৭ মিনিট পর কলকাতার বায়ুমন্ডলের চাপের মানে হঠাত একটা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। বিস্ফোরণের ৮ ঘন্টা পরে পশ্চিমের মৌরিতিয়াস এবং পূর্বে মেলবোর্ন এবং সিডনীতে একই ধরনের পরিবর্তন সনাক্ত করা হয়। ১২ ঘন্টা পর সেন্ট পিটার্সবার্গে, ১৮ ঘন্টার মাঝে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি এবং টরেন্টোতে বায়ুমন্ডলের চাপের এই অকস্মাত তীব্র পরিবর্তনটি ধরা ধরা পড়ল।

আশ্চর্যজনকভাবে বিস্ফোরণের পর প্রায় ৫ দিন ধরে পৃথিবীর ৫০ টি অঞ্চলের বিভিন্ন আবহাওয়া বিভাগে নিয়মিত বিরতিতে বায়ুচাপ পরিবর্তনের এই সংকেত ধরা পড়তে লাগল। মোটামুটিভাবে ৩৪ ঘন্টা পর পর সংকেতটি একই স্থানের আবহাওয়া বিভাগে ফিরে আসছিল। আর আশ্চর্যজনকভাবে শব্দের বেগে কোনো কিছু চললে তার পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে আসতে প্রায় ৩৪ ঘন্টা সময়ই লাগে।

সবমিলিয়ে এই শব্দটি পৃথিবীর চারদিকে ৩ থেকে ৪ বার ঘুরে এসেছিল। এক্ষেত্রে একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় আছে। আর তা হলো, কোন কোন স্থানের ব্যারোমিটারগুলোতে মোট ৭ বার পর্যন্ত এই পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। এর কারণ হল, কোন শব্দ তৈরি হওয়ার পর তা প্রায় সমানভাবেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তাই একই উৎস থেকে উৎপত্তি হওয়া শব্দ একই সাথে পূর্ব দিকে আবার পশ্চিম দিকে দুই দিকেই ভ্রমণ শুরু করে। আর এই বিপরীত দিক থেকে আসা শব্দগুলো কোন এক স্থানে দুটি করে বায়ুচাপ পরিবর্তনের সংকেত তৈরি করেছিল।

ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া দ্বীপে উৎপন্ন হওয়া এই শব্দটি এমন এক শব্দ ছিল যা একসময় আর শোনা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার প্রভাব ঠিকই পৃথিবীজুড়ে অনুভব করা যাচ্ছিল। এছাড়াও ভারত, ইংল্যান্ড আর সানফ্রান্সিস্কোতে এই বায়ুচাপের বিশাল পরিবর্তনের সাথে সাথেই সাগরের ঢেউয়ের উচ্চতাতেও বিশাল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অসাধারণ ঘটনা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। ১৮৮৩ সালের এই ঘটনাটি বৈজ্ঞানিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও এই আগ্নেয়োগিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর পৃথবীর মানুষ বেশ ভালোভাবেই শব্দের শক্তি অনুভব করতে পেরেছিল।

ফিচারড ইমেজঃ www.altereddimensions.net

সম্মোহনের অন্য দিক

বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ ২০০১ সালে টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল নাশকে সম্মোহনবিদ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। পাশাপাশি অপবিজ্ঞানের প্রতি সোচ্চার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের প্রতি ভালোবাসা ধারণকারী এই বিজ্ঞান সাময়িকীটি ড. নাশকে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে, তারা ছাপানোর আগে এই প্রবন্ধটির যথার্থতা হাতে কলমে যাচাই করে দেখবে। যেই কথা সেই কাজ। ড. নাশ এবং মনোবিজ্ঞান গবেষক গ্রান্ট বেনহাম একেবারে উড়ে আসলেন সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নিউ ইয়র্ক কার্যালয়ে, হাতে কলমে সাময়িকীটির কর্মচারীদের সম্মোহনের অভিজ্ঞতা দিতে। এরপর যা ঘটলো তা ঐখানকার বিজ্ঞানপিপাসুদের মোটেও কাম্য ছিল না।

ছয়জন কর্মচারীর তিনজন পুরুষ, তিনজন মহিলা- সবাইকেই সম্মোহিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই গবেষক। ঘটনাটি প্রমাণ দিচ্ছে সম্মোহনবিদ্যা শুধুমাত্র সিনেমা বা টিভি পর্দায় আবদ্ধ নয়, বাস্তব জীবনেও এর ভিত্তি আছে।

সম্মোহনের একদম কেতাবী সংজ্ঞায় যাওয়ার আগে আসুন দেখে নেই, সম্মোহিত অবস্থায় কী কী ঘটে আর কী কী ঘটে না। সম্মোহন পরিমাপের একটি স্কেল আছে Stanford Hypnotic Susceptibility Scales। এই স্কেল ০ থেকে ১২ পর্যন্ত স্কোর করা। স্কোর দেয়া হয় যেকোনো ১২ টি কাজের ভিত্তিতে। যেমন সম্মোহনের মাত্রা নির্ধারণের পরীক্ষার একটি সংস্করণে একদম কম স্কোরের একটি কাজ ছিল দুই হাত ছড়িয়ে বসে থাকা, আর বেশি স্কোরের সম্মোহিত অবস্থার মধ্যে ছিল অদৃশ্য বোতল থেকে গন্ধ শোঁকার চেষ্টা। একটি পরীক্ষায় সম্মোহিত ব্যক্তিদের বলা হলো, তারা একটি ভারী বল ধরে আছে, এবং যাদের

হাত অদৃশ্য ভারী বল নেবার কারণে ঝুঁকে পড়লো তাদের ‘পাশ মার্ক’ দেওয়া হলো। আরেকটি পরীক্ষায় পরীক্ষণ পাত্রদের বলা হলো, তাদের গন্ধ অনুধাবন করার মতো কোনো শক্তি নেই। তারপর তাদের সামনে অ্যামোনিয়ার বোতল খোলা হলো। যাদের ধারণা নেই অ্যামোনিয়ার গন্ধ কেমন, তাদের গণশৌচাগারের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থানের অনুরোধ জানাচ্ছি! পরীক্ষার লোকদের মাঝে যাদের এই কড়া গন্ধেও কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না তাদের বলা হলো ‘উচ্চমাত্রায় সম্মোহিত’।

কেউ কি Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ স্কোর ১২ তুলতে সক্ষম? আমরা আবার ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর কর্মচারীদের উপর চালানো পরীক্ষায় ফিরে যাই। এই পরীক্ষায় একজন সর্বোচ্চ স্কোর ১২ করেছিলেন। ১২ প্রাপ্ত ব্যক্তি কোন পর্যায়ে সম্মোহিত হয়েছিলেন? তার সম্মোহিত অবস্থায় কী ঘটেছিল তা পরে আর মনে করতে পারেননি তিনি। কারণ, সম্মোহনকারী তাকে সম্মোহিত অবস্থায় তার করা যাবতীয় কাজ ভুলে যেতে প্রণোদনা (Suggestion) দিয়েছিলেন। সম্মোহনের এমন উচ্চমাত্রা অর্জন খুবই বিরল। বেশিরভাগ মানুষই সম্মোহিত অবস্থা শেষ হবার পর ঠিকই মনে করতে পারেন, তারা ঐ সময় কী কী করতে পেরেছিলেন বা পারেননি।

আমাদের উপর সম্মোহনের প্রভাব কেমন? বেশিরভাগ মানুষ Stanford Hypnotic Susceptibility Scales এ ৫-৭ স্কোর (মাঝারী পর্যায়) তুলতে সক্ষম। ৯৫% মানুষ ন্যূনতম স্কোর ১ তুলতে সক্ষম। অর্থাৎ আমাদের সকলেই মোটামুটি কিছু পরিমাণ সম্মোহনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে সক্ষম। খুব কম সংখ্যক মানুষ সর্বোচ্চ স্কোর ১২ তুলতে পারেন। যেমন- পূর্বে আলোচিত পরীক্ষায় ৬ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সর্বোচ্চ স্কোরের অধিকারী।

আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, আসলে সম্মোহনের কোনো ব্যাপারই নেই। সবই স্রেফ ধাপ্পাবাজি, অভিনয়। বিজ্ঞানীদের মনেও এই সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। তাই তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্ক্যান করার ব্যবস্থা করলেন। এতে দেখা গেল, যারা আসলেই সম্মোহিত হয়েছে তাদের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চল, যেমন ডান সেরেবেলাম, বাম থ্যালামাস অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায়। যারা সম্মোহনের ভান ধরে তাদের মস্তিষ্কে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটি ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখুন।

এবার আপনাদের বোঝার সুবিধার জন্য একটি কেতাবী সংজ্ঞা দেই। বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুসারে, সম্মোহিত অবস্থা আমাদের চেতন মনেরই একটা অবস্থা যেখানে কোনো বিষয়ের প্রতি আমাদের অখণ্ড কেন্দ্রীভুত মনোযোগ থাকে। এই সময় আশেপাশের অন্যান্য ভাবনা কমে যায় এবং এই আবিষ্ট অবস্থায় অন্যের Suggestion গ্রহণ করার ক্ষমতা বাড়ে। সম্মোহিত অবস্থার সাথে মনোযোগ দিয়ে বই পড়া বা টিভি দেখার মিল আছে। মনে করে দেখুন তো প্রিয় কোনো বইয়ে ডুবে গেলে আপনার আশেপাশের জগত সংসারের কথা খেয়াল থাকে কিনা? সম্মোহন ব্যাপারটিও এরকম।

সম্মোহিত অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের অবস্থা বুঝতে একটি উদাহরণ দেই। পরীক্ষার একটি অংশ আপনি নিজেই করতে পারেন। একটি খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখুন ‘নীল’ আর নীল কালি দিয়ে লিখুন ‘লাল’, এভাবে আরো কয়েকটি রঙের নাম লিখবেন, তবে ভিন্ন রঙের কালি দিয়ে। এখন আপনার কোনো এক বন্ধুকে ডেকে কী রঙের নাম লেখা পড়তে বলুন। কাজটি যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা সহজ কিন্তু নয়। আমাদের মস্তিষ্ক দ্বন্দে পড়ে যায় এসময় সঠিক রঙটি বলার ক্ষেত্রে। এখন, যদি রঙের নাম ইংরেজি বা বাংলায় না হয়ে আপনার অজানা কোনো ভাষায় লেখা হতো তাহলে কিন্তু আপনি বা আপনার বন্ধু মোটেও কোনো ঝামেলায় পড়তেন না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, কিছু স্বেচ্ছাসেবককে সম্মোহিত করে বলা হয়েছিল, “এখানে লেখা শব্দগুলোর কোনো অর্থ নেই, এগুলো সোজা বাংলায় হিজিবিজি হিজিবিজি”। তারপর তাদের কাছ থেকে রঙগুলোর নাম জানতে চাওয়া হলো। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরাও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে রঙ দেখেই বলে দিলেন। কী লেখা আছে তার ধারেকাছেও গেলেন না। এরকম হবার কারণ কী? স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের মস্তিষ্কের শব্দ পড়ার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া আর চটজলদি রঙ বলতে চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে যায়।

অপরদিকে, সম্মোহিত অবস্থায় আপনার কাছ থেকে যখন রঙের নাম জানতে চাওয়া হয়, তখনকার মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা গেছে, এসময় Angulate Cingulate Cortex অঞ্চল অপেক্ষাকৃত কম উদ্দীপনা দেখায়। এই অঞ্চলটি এমন দুই দিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, Visual Cortex-ও কম উদ্দীপ্ত হয়। লিখিত শব্দ চেনার কাজে ভিজুয়াল কর্টেক্স দরকার হয়।

সম্মোহন কী তা নিয়ে অনেক বলা হলো, এবার দেখি সম্মোহন বা সম্মোহিত অবস্থা কী নয় তা নিয়ে।

সম্মোহন কল্পনাশক্তির উপর নির্ভর করে না। আপনার কল্পনাশক্তি ভালো, তার অর্থ এই নয় আপনি সম্মোহনের স্কেলে বেশি স্কোর তুলতে পারবেন। সম্মোহিত হবার জন্য আপনাকে শুয়ে বা বসে থাকতে হবে না। স্থির বাইসাইকেল চালানো অবস্থায়ও অনেক ব্যক্তিকে সম্মোহনের জালে আটকানো সম্ভব হয়েছে। সম্মোহিত ব্যক্তি নিজের মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে অনেক কাজ করতে পারেন- এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে, এটিও সম্পূর্ণ ভুল।

সম্মোহন কী কাজে লাগতে পারে? সম্মোহন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কমাতে কার্যকর। International Journal of Clinical and Experimental Hypnosis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সম্মোহনের মাধ্যমে দেয়া প্রণোদনায় ২৭ টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৩৩ জন পরীক্ষণ-পাত্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যথা কমাতে সক্ষম হয়েছেন। তবে, সম্মোহন কখনোই একক চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একজন রোগীর অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এর সাহায্য নেওয়া যাবে কিনা তা একমাত্র চিকিৎসকই ঠিক করে দিবেন।

তথ্যসূত্র

  1. The Truth and Hype of Hypnosys, Scientific American, July, 2001
  2. Watch: Does Hypnotysm has any scientific basis? Sciencealart, 19 Nov, 2015

     

আলোর গল্প

আলো কী? প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো, আলো হচ্ছে দেবতাদের দেখার ক্ষমতা। যখন মিশরীয়দের দেবতা চোখ খুলত, তখন মহাবিশ্বে আলো আসত। সেই আলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেখতে পেত। সূর্য এবং চাঁদকে মিশরীয়রা তাদের দেবতা ‘রা’ এর দুই চোখ বলে মনে করতো। মিশরীয়দের পর পারস্যে সভ্যতা বেশ উন্নতি সাধন করে। এ পৃথিবীর আদিতম ধর্মগুলোর একটি হচ্ছে জরোআস্ট্রিয়ানিজম। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে জরোআস্ট্রিয়ানিজম ধর্মানুসারী অগ্নিপূজকরা আলোকে তাদের দেবতা ‘আহুরা মাজদা’র মঙ্গল সৃষ্টি বলে মনে করতো। আর অন্ধকারকে মনে করতো অমঙ্গল সৃষ্টি। মঙ্গল আলো দিনের বেলায় পৃথিবীকে আলোকিত করতো আর রাতের বেলায় অমঙ্গল সৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দিতো অন্ধকারের কালো চাদরে।

পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে আগুন এবং আলো ছিল দেবতাদের অধিকারে। জিউসের কাছে থেকে চুরি করে সেই আলো মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন আরেক দেবতা প্রমিথিউস। সেজন্য প্রমিথিউসকে দূর পাহাড়ে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয়। আর ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার কলিজা খেয়ে ফেলতো। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ সভ্যতার লোকজন এভাবেই আলোকে তাদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

চিত্রঃ প্রমিথিউস।

ধর্মের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও মনিষীরাও ধারণা করতে শুরু করেছিল আলো দুই ধরনের- বাইরের আলো এবং মনের আলো। এদের মধ্যে ছিলেন প্লেটো, এমপেডোক্লেস, ইউক্লিড, গ্যালেন ও আরো অনেকে। এ ধরনের চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম চিন্তা করেন মধ্যযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম (আল হ্যাজেন)। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন ক্যামেরা অবস্কিউরা বা অন্ধকুঠুরির ধারণা থেকে। ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা সর্বপ্রথম এসেছিল চীনা বিজ্ঞানী মজি’র সময়কালে (৪৭০~৩৯০

খ্রী.পূ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি অন্ধকার ঘরের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে দিলে বিপরীত পাশে পর্দায় একটি প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

আল হাইথামের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনোকিছু দেখার জন্যে বাইরের আলোর সাথে মনের আলো অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। মনের আলো এবং বাইরের আলো যখন একসাথে মিলে যায়, শুধুমাত্র তখনই আমরা দেখতে পাই। মনের আলো আসে মানুষের খাদ্য থেকে। মানুষ খাদ্য খাওয়ার পর তা আধ্যাত্মিক আলোতে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে থেকে যেতো। মানুষের মৃত্যু হলে এ আধ্যাত্মিক আলো চাঁদে গিয়ে পৌঁছতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে বেড়ে যেতো। যখন বাড়তে বাড়তে পরিপূর্ণ চাঁদ হয়ে যেতো, তখন সেখান থেকে আলো বা আত্মা ধীরে ধীরে দেবতার কাছে চলে যেতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে ক্ষয়ে যেতো। চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে এ আধ্যাত্মিক আলোকে সম্পর্কিত করেছিল ‘ম্যানিকায়িজম’ যা ছিল খ্রীঃ ২৫০ শতকে বর্তমানের বাগদাদে প্রচলিত ধর্ম। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আল-কিন্দী এ ধারণার প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।

আল হাইথামের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে থাকেন বাইরের আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা দেখতে পাই। যদি চোখের আলো গিয়ে বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসলেই কেবলমাত্র আমরা দেখতে পাই, তাহলে দূরের পাহাড় বা আকাশের তারা খুব সহজেই দেখতে পারার কথা নয়। তারপর আলো যদি বাইরে থেকে চোখেই প্রতিফলিত হবে, তাহলে আমাদের ভেতরের আলো বা অন্তরের আলোর আর দরকারই পড়বে না।

আলোর ধারণাকে গণিতের সাথে সম্পর্কিত করার প্রথম চেষ্টা ছিল ধর্মযাজক গ্রোস্তেস্ট এর লেখা ‘অন লাইট’ বা ‘দে লুচে’ বইয়ে। তিনিই প্রথম আলোর বস্তু-ধারণার জন্ম দেন। তারপর আলো নিয়ে মানুষের ধারণার বিশাল পরিবর্তন হয় মধ্য যুগে গ্যালিলিও গ্যালিলির গবেষণার মাধ্যমে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান সেগুলো পাথুরে গোলাকার বস্তু ছাড়া আর কিছু নয়, যেগুলোকে এর আগে মানুষ দেবতার নিখুঁত সৃষ্টি বা দেবতার চোখ বলে মনে করতো।

বিশেষ করে চাঁদ এবং সূর্যকে মানুষ নিখুঁত মনে করত। কিন্তু গ্যালিলিও দেখতে পান, চাঁদে বেশ কিছু গর্ত রয়েছে। একইভাবে সূর্যকে আপাতদৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের কালো দাগ মুক্ত মনে হলে আসলে তা নয়। এছাড়াও তৎকালীন ধারণা ছিল, পৃথিবীর চারপাশে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ঘুরছে। কিন্তু বৃহস্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান, সেই চাঁদগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ না করে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্যালিলিও আরও মনে করতেন, কোনো বস্তুকণাকে অতি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে থাকলে তা আলোক কণায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে নিউটনের প্রিজম পরীক্ষায় দেখা যায়, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের বর্ণালীতে বিভাজিত হচ্ছে। গ্যালিলিওর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিউটনও মনে করতেন, আলো হচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা যা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তার আকার অনুসারে আলাদা হয়েই রঙিন বর্ণালীর সৃষ্টি করছে।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফরাসী গণিতবিদ দেকার্ত মনে করতেন- আলো আর শব্দ একইরকম আচরণ করে। শব্দের যেমন গতি আছে, আলোরও গতি আছে। তিনি মনে করতেন আলোর গতি অসীম। আবার শব্দের চলতে যেমন মাধ্যম লাগে, আলোর চলতেও মাধ্যম লাগে এবং শব্দের মতো আলোও এক ধরনের তরঙ্গ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যম কী? এভাবেই ইথারের ধারণার জন্ম হয়।

আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায় আলোর অপবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারায়। দূরের কোনো আলোক উৎসকে আমরা যদি দেখি, তাহলে তার পাশে আলোকে অনেকটা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা দূরের কোনো ল্যাম্পপোস্ট এর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা এটা দেখতে পারব। ফরাসী প্রকৌশলী অগাস্টিন ফ্রেনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সমীকরণ সমাধান করে প’শন দেখান- আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব সত্যি হলে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে। পরবর্তীতে ফ্রেনেলেরই বন্ধু আর্গো ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। এতে করে আলোর তরঙ্গ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।

চিত্রঃ ল্যাম্পপোস্টে আলোর অপবর্তন।

পরবর্তী সময়ে ফ্যারাডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আলো মূলত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। এটি পূর্ণতা পায় ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে। কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের পর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ইথারের। মাইকেলসন-মর্লী’র পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার অস্তিত্বহীন বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা যা আলোর গতিতে চলছে, তার জন্যে সবকিছুই অতি নিকটে, তার কখনও দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। স্থান সংকোচনের কারণে দূরত্ব অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শুধুমাত্র আমরা যারা স্থির অবস্থায় আছি তাদের কাছেই সেগুলোকে দূরত্ব বলে মনে হয়। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফোটন থিওরী আলোর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গতত্ত্ব উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ আলো এমন কিছু যা একই সাথে কণা হিসেবে এবং তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ কর দেখান যে মহাকর্ষীয় বলের কারণে স্থান বেঁকে যায়। তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আলোও বিশাল মহাকর্ষীয় বস্তুর পাশে দিয়ে আসার সময় বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটনের পরীক্ষায় এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আলো ভারী কোনো নক্ষত্রের পাশে দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায়।

বর্তমানে আমরা আলোকে মনে করি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা একই সাথে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে। আলোর গতি সকল প্রসঙ্গ কাঠামোতে ধ্রুবক এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্থান বা সময় বদলে যায়, কিন্তু আলোর গতি? কখনোই নয়।

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

একটুখানি সঙ্গীত এবং এমিলি হাওয়েলের গান

কোনো এক ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যা ছিল সেদিন। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু পাগল করা হাওয়া, ভেজা বাতাস, মাটির সুঘ্রাণ ইত্যাদি যাবতীয় কাব্যিক উপকরণ হাজির থাকায় পড়ায় মন বসছিল না। ওদিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল অঝোর বর্ষণের অপার্থিব সুর।

সঙ্গীত বা সুর বলতে আমরা আসলে যা বুঝি তার পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। মানসিক অর্থাৎ মন সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো আবার মানুষের খুব গর্বের বিষয়। কৈশোরে পড়া অসংখ্য সায়েন্স ফিকশন গল্পের সাধারণ একটা দৃশ্য থাকতো অনেকটা এরকম- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশের জোর দাবী জানাচ্ছে। বিদ্রোহী নায়ক তখন গলার রগ ফুলিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে আর বলবে, “ঐ কপোট্রনিক খুলিগুলো আর যা-ই পারুক, কখনো কি পারবে একটা সুর সৃষ্টি করতে? পারবে শেষ বিকেলে সূর্য ডোবার একটা মাস্টারপিস ছবি আঁকতে? বা একটা বৃষ্টির কবিতা লিখতে পারবে কখনো?”

একবিংশ শতকের এমন একটি সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি যে, নায়কের প্রথম প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক সুর দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে গান এবং শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রকাশ পাচ্ছে ‘তাদের’ একক এলবাম!

ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে, যন্ত্র তখনো সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’ শুরু করেনি। পূর্বে সংরক্ষিত ডাটা (এ ক্ষেত্রে শব্দ) পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে এবং নির্দেশনা (প্রোগ্রাম) অনুসারে কিছু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিডিও গেমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence – A.I) ব্যবহার শুরু হয়। গেমসের পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির সাথে তাল মেলানোর জন্য এ.আই এর প্রয়োগ ভিডিও গেমিং-এর অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। সময়ে সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের তাল বাড়িয়ে-কমিয়ে অথবা গেমসে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের আগমন-প্রস্থান, দৌড়াদৌড়ি- মোদ্দা কথা, বাস্তব অনুভূতি সৃষ্টির ভার পড়ে এ.আই এর ওপর। এক্ষেত্রে ন্যাচারাল লার্নিং (Natural Learning), সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস ইত্যাদি বিভিন্ন থিওরির প্রয়োগ ঘটানো হয়।

তবে এগুলো ছিল এ.আই ব্যবহারের একেবারে প্রথম দিককার কিছু কাজ। অনেকটা ছোট শিশুকে প্রাথমিক কিছু অক্ষরের সাথে পরিচিত করানোর মতো। এ বিষয়ে গবেষণা আরেকটু এগোনোর পর এ.আই মিউজিশিয়ানদের জন্য অনেকটা বন্ধুর মতো হয়ে দাঁড়ায়।

সঙ্গীত সম্পর্কিত ব্যাকরণ বা নিয়ম সৃষ্টির সূচনা ঘটেছে সেই পিথাগোরাসের যুগে এবং প্রথম দিকে সঙ্গীত গণিতজ্ঞ এবং পদার্থবিদদের গবেষণার খুব প্রিয় এক বিষয় ছিল। কেবলমাত্র পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নিয়মের মাঝেই রয়েছে অসংখ্য তাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল। তাছাড়া ঢাউস আকৃতির শত শত বই বিগত শতকগুলোতে সঙ্গীত সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণার ফলাফল ধারণ করে।

উদাহরণস্বরূপ পাশ্চাত্য, আরব, হাঙ্গেরিয়ান, বাইজেনটাইন, পারস্য ইত্যাদি অঞ্চলভিত্তিক সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকরণ এবং স্কেল রয়েছে। স্কেল, নোট, হারমনি, মেলোডি, টেম্পো সম্পর্কিত যে আলোচনা তা কেবল সমুদ্রসমই নয়, বরং জ্ঞানের এক পৃথক শাখা এবং এ লেখার সীমা আর উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যাবে। তবুও কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যার দাবী রাখে।

আমরা যেসব গান শুনি তার সুরটি একজন সুরকার সৃষ্টি করেন কীভাবে? বা গানের কথার সাথে মানানসই সুর বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কী? অতি পরিচিত বাদ্যযন্ত্র কীবোর্ডের সাহায্যে ব্যাপারগুলো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে রয়েছে ১২ টি নোট, নোট বলতে আপাতত আমরা সঙ্গীতের ক্ষুদ্রতম একক ধরি, যেগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গানের প্রতিটি শব্দকে সুর হিসেবে প্রকাশ করা যায়। নোটগুলো হলো- A A (sharp) B              C C (sharp)/D (flat) D D (s)/E (f) E F F(s)/G (f) G G (s)/A (f)

চিত্রঃ পিয়ানো বা কীবোর্ডের লে আউট।

কীবোর্ডে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো নোটগুলো Chromatic Scale নামক স্কেল থেকে প্রাপ্ত। # এবং b চিহ্ন যথাক্রমে মূল নোটের তীক্ষ্ণ বা মসৃণ রূপ (শ্রুতির ভিত্তিতে) বোঝায় যেখানে A-G হলো ৭ টি মূল নোট। এদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক কম্পনাঙ্ক বা স্বর রয়েছে। দৃশ্যত কয়েকটি নোটের Sharp বা Flat স্বর নেই এবং ২ টি নোটের মাঝের Sharp বা Flat নোটগুলোকে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের  ২টি নামের যেকোনো একটি দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘কী’তে পরপর একই নোটের পুনরাবৃত্তি ঘটে উচ্চতর বা নিম্ন অনুপাতের কম্পনাঙ্কে এবং প্রয়োজন অনুসারে সুরকার তা নির্ধারণ করে থাকেন।

চিত্রঃ বিভিন্ন নোটের frequency তালিকা, একই নোটের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে অনুপাত লক্ষণীয়।

এক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত গাণিতিক সূত্রটি হলো, Frequency = 440*(2^n/12); for n = -21, -19, …27। গীটারের ক্ষেত্রে নোটগুলোর বিন্যাস Frequency সহ লক্ষ্য করি-

নোটগুলো এভাবে নির্ধারিত হলো কেন সেই আলোচনা যেমন বিস্তৃত তেমনই ঐতিহাসিক। তবে সুপরিচিত Exponential Graph প্রমাণ করে এক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক গাণিতিক হিসাব রয়েছে।

চিত্রঃ frequency লেখচিত্র।

এ নোটগুলোকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে স্কেল বানান যায়। স্কেল বলতে আপাতত ধরে নেয়া হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠিত ফর্মুলা যার দ্বারা নির্দিষ্ট ক্রমে নোট বের করে পরপর বাজালে শ্রুতিমধুর সুর এবং একসাথে বাজিয়ে কর্ড (Chord) বানানো যায়। কয়েকটি সুপরিচিত স্কেল ফর্মুলা-

  • Major Scale: R, W, W, H, W, W, W, H
  • Natural Minor Scale: R, W, H, W, W, H, W, W
  • Harmonic Minor Scale: R, W, H, W, W, H, 1 1/2, H (notice the step and a half)
  • Melodic Minor Scale: going up is: R, W, H, W, W, W, W, H
    going down is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Dorian Mode is: R, W, H, W, W, W, H, W
  • Mixolydian Mode is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Ahava Raba Mode is: R, H, 1 1/2, H, W, H, W, W
  • A minor pentatonic blues scale (no sharped 5) is: R, 1 1/2, W, W, 1 1/2, W

এখানে R বলতে Root note বা প্রথম নোট, W (Whole) দ্বারা একটি নোটের দূরত্ব এবং H (half) দ্বারা ঠিক পরবর্তী নোট বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ ভাবা যাক আমরা মেজর স্কেলের একটি সুন্দর সুর বের করতে চাই যার প্রথম নোট হবে c নোট। যেহেতু c Root note হিসেবে ব্যবহৃত হবে একে বলা হবে c Major scale এবং সেটি হলো-

C             D             E             F              G             A             B             C

লক্ষণীয় এখানে আটটি নোটের গুচ্ছকে Octave বলে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া c নোটটি মূল নোটের দ্বিগুণ ফ্রিকোয়েন্সির। এক্ষেত্রে r w w h w w w h সূত্রের প্রয়োগ ঘটেছে এবং ব্যাপারটি যে শুভঙ্করের ফাঁকি নয় তা হাতের কাছে থাকা কোনো

কীবোর্ড বা গীটার বা মোবাইল অ্যাপে নির্দিষ্ট ক্রমে নোটগুলো বাজালেই বোঝা যাবে, শুনতে পারবেন অতি পরিচিত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা। এক্ষেত্রে Root note হিসেবে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে সূত্রটি প্রয়োগ করুন, সুরের অনুপাত এক থাকবে, হেরফের হবে না।

নোট বুঝলাম, স্কেল বুঝলাম, এবার কর্ডের (Chord) পালা। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে Chord বলতে তিনটি বা ততোধিক নোটের সম্মিলন বোঝায় যেগুলো একসাথে বাজালে ঐকতানে থাকবে, শ্রুতিমধুর শোনাবে। ফরাসি শব্দ Accord থেকে এর উৎপত্তি যার পরিভাষা Agreement বা চুক্তি অর্থাৎ একই সাথে মানিয়ে নেবার মতো একটি ব্যাপার।

পূর্বে আমরা Major scale বের করেছি। Chord বেরুবে স্কেল থেকে, উদাহরণস্বরূপ এ স্কেলের ১-৩-৫ নম্বর নোট একসাথে বাজালে একটি ঐকতানের সৃষ্টি হবে এবং তার নাম হবে c chord, এটিও সূত্রের প্রয়োগ। এর মাঝে আবার আরও কিছু নিয়ম আর সূত্র আছে যেগুলো প্রয়োগ করে সবগুলো Chord বের করা যায় এবং গণিতে উৎসাহী যে কেউ অনুধাবন করতে পারবে যে অসংখ্য স্কেল, তার থেকে আবার অসংখ্য Chord এর কী বিশাল সমাহার মিউজিশিয়ানদের হাতে থাকে।

এর গুরুত্ব কী? আমরা যদি কোনো গানের সাথে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে চাই, তবে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে, নির্দিষ্ট বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু Chord-ই বাজবে। একেকটি Chord-এর রূপ একেক রকম, যেন একেক রকম মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অসংখ্য সম্ভাব্য বিকল্প থেকে গানের কথার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো Chord মিউজিশিয়ান বেছে নেবেন এখানেই তার মুন্সিয়ানা, তার মাথায় ঘুরতে থাকা একটি সুরেলা গল্পকে তিনি বাস্তব রূপ দেবেন এবং কুড়োবেন প্রশংসা। উৎসাহীদের জন্য বিখ্যাত Titanic সিনেমার Soundtrack – My heart will go on গানটির কিয়দংশের Chord-

সুরসাগর থেকে এক গ্লাস জল উঠিয়ে এতক্ষণ ধরে ঢাললাম মাত্র। কিন্তু এর মাঝে এ.আই এর আগমন ঘটল কীভাবে? একটু আগে বলেছি Chord এর সমন্বয় কীভাবে সাধন করবেন এটি নিয়েই সুরকারের মাথাব্যাথা। ধরা যাক, প্রথম লাইনের অর্ধেকের সাথে বাজানোর জন্য অনেক ভেবে তিনি একটি Chord বাছাই করলেন। এখন তার কাজ হলো পরবর্তী আরেকটি Chord-এর মাধ্যমে ভাবের সমন্বয় সাধন করে লাইনটি শেষ করা। ব্যাপারটি যতটা সহজে বলা গেলো ঠিক ততটাই কঠিন। আগেই বলেছি, সামনে বাছাইয়ের জন্য অপশন রয়েছে অনেকগুলো। তার মধ্যে সেরা বাছাই কোনোটি হতে পারে? গানের লাইন আছে আরও বেশ কয়েকটি এবং পুরোটুকুর মাঝে এভাবে সমন্বয় সাধন করতে হবে! উপায় একটিই ছিল। সঙ্গীত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থেকে একটি Chord বেছে নেয়া। কিন্তু এর চেয়েও ভালো একটি বিকল্প হয়তো বাদ পরে গেলো!

একটি গান সুর করতে একাধিক মাস লেগেছে এটিই সঙ্গীতে সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি যদি একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় যা সম্ভাব্য অপশনগুলো দ্রুত বাজাবে একের পর এক এবং কোনো এক মুহূর্তে একটা সমন্বয় শুনে সুরকার বলে উঠবেন ‘ইউরেকা’, অথবা আরেকটি ভয়াবহ রকমের

সমন্বয়েরও মুখোমুখি হতে পারেন, যা নিজে সুস্থ মস্তিস্কে তিনি কখনো বাজাতেন না! যাই হোক, ঘণ্টা খানেকের মাঝেই সম্ভাব্য অনেকগুলো অপশন যাচাইবাছাই করা সম্ভব হবে, সময় বাঁচবে, গাণিতিকভাবে সম্ভাব্য সব বিকল্প ঘাটা যাবে, পৌঁছনো যাবে চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্তে এবং এতক্ষণ ধরে রূপকথার মতো সাধাসিধে ভঙ্গিতে যা বর্ণনা করলাম, তার গালভরা নাম হচ্ছে Algorithmic Composition। কৌশলগত আলোচনায় না গিয়ে কেবল মূল প্রক্রিয়াটি সরলভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা আরকি।

এ.আই এর দৌড় এখানেই শেষ নয়। যেমন কোনো একটা Chord-এর মাঝে অতিরিক্ত নোট যোগ, লয় (Tempo) বাড়ানো এবং একইসাথে একাধিক Chord বাজালে তার প্রভাব- ইত্যাদি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে একটি একটি করে পরীক্ষা করা যায়। তারপর সুরকার যদি নির্দিষ্ট কোনো একটি প্যাটার্ন বাছাই করে দেন যে, এই গানের সুরের আলোকে সম্ভাব্য আরেকটি সুর দাঁড় করাও, সেটিও সম্ভব। ব্যাপারটিকে বলা হয় Mimic করা যেখান থেকে এ.আই এর সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’র পরবর্তী গল্পের অধ্যায় শুরু।

চিত্রঃ সফটওয়্যার ব্যবহার করে Synthesis করবার একটি দৃশ্য।

এতক্ষণ ধরে একটি গানের সুর তৈরি করবার বা কাঠামো দাঁড় করাবার যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো তা নিছকই একটি উদাহরণ মাত্র। সুর করবার মতো সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে মানুষ চাইলেই কীভাবে যন্ত্রের সহযোগিতা নিতে পারে তা সঙ্গীতের মৌলিক কিছু উপকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশ্যই সুর সৃষ্টির কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। বর্তমান যুগে সঙ্গীতের জগতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেন বিতর্ক সৃষ্টি করছে তা কিছুটা হলেও হয়তো আঁচ করা যায়। এক্ষেত্রে Liquid Notes, Quartet Generator, Maestro Genesis বেশ প্রসিদ্ধ কয়েকটি সফটওয়্যার।

Experiments in Musical Intelligence (EMI)

এ.আই এর সংগীতচর্চা বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন গবেষক হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ড. ডেভিড কোপ। তিনি ১৯৮০ সালের দিকে এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন এবং প্রায় তিন যুগ ধরে এর সাথে জড়িত আছেন। তিনি একটি প্রজেক্ট শুরু করেন যেটিকে

প্রাথমিকভাবে Experiments in Musical Intelligence (EMI) বা সংক্ষেপে Emmy হিসেবে নামকরণ করা হয়। EMI তৈরির প্রথম দিকে লক্ষ্য ছিল মূলত বিভিন্ন গান ইনপুট হিসেবে দিয়ে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ভাঙার চেষ্টা করা। তারপর সেগুলো কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা, যেন কোনো একটি জিন-নকশা জেনে নিয়ে তাতে কিছু পরিবর্তন করা। প্রথমদিকে তিনি EMI ব্যাবহার করে নিজের সুর করা কিছু গানকে পরিবর্তন করতেন, উল্লেখ্য তিনি একইসাথে একজন সঙ্গীতজ্ঞ।

পরবর্তী ধাপে তিনি দেখলেন EMI পদ্ধতি কেবল তার করা অপেক্ষাকৃত সরল সুরগুলোকেই নয়, Bach, Beethoven, Mahler সহ ইতিহাসের প্রসিদ্ধ সব সঙ্গীতজ্ঞদের কাজকে অনুকরণ করতে পারছে। ফলাফল ছিল অনেকটা ভৌতিক। শত বছর আগের ধ্রুপদি শিল্পীদের কাজগুলো অনেকটা পুনর্জন্ম পেতে থাকে EMI প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ডেভিড কোপের একটি উক্তি উল্লেখ করবার মতো- “You name the composer and EMI could analyze his works to spit out a new piece that sounded just like the composer had written it himself. Except he hadn’t; a computer had.”

Emily Howell এর জন্ম

২০০৩ সালের দিকে কোপ সিদ্ধান্ত নেন EMI প্রজেক্টটি নতুন মাত্রায় নেবার। এর আগ পর্যন্ত তিনি EMI এর কাজগুলো সত্যিকারের মিউজিশিয়ানদের দ্বারা রেকর্ড করাতেন, সুরটি সৃষ্টির পর। কিন্তু তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন EMI এর কাজগুলো এবার ডাটাবেজ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন একটি প্রোগ্রাম ডিজাইন করবেন, কিন্তু তার স্বকীয়তা হবে এই যে তা শ্রোতাদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ইনপুট হিসেবে নেবে এবং বিভিন্ন ধাঁচের সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে একেবারেই নতুন সুরের জন্ম দেবে সত্যিকারের শিল্পীর মতো। এ ব্যাপারে তিনি ‘Computer Models of Musical Creativity’ নামক একটি বই লেখেন যাতে কৌশলগত দিকগুলোর বিশদ বিবরণ আছে।

২০০৯ সালে Centaur Records থেকে প্রকাশ পায় এমিলির প্রথম এলবাম- “From darkness, light” এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় এলবাম- “Breathless”! এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য এ.আই হলো ইউনিভার্সিটি অব মালাগায় তৈরি ‘Lamus’ নামক একটি Computer cluster যা সর্বোচ্চ ৮ মিনিটে পূর্ণদৈর্ঘ্য Symphony থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাঁচের নতুন সুর তৈরি করতে পারে এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে Lamus এর করা সুর এর ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে London Symphony Orchestra পারফর্ম করে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে!

ব্যাপারটা শেষে এখানে এসে ঠেকলো যে, যন্ত্র সুর করে দিচ্ছে আর গাইছে মানুষ, যেখানে প্রথম দিককার দিনগুলোতে মানুষের তৈরি গানের বিশ্লেষণের কাজেই কেবল এ.আই ব্যবহার করা হতো! সত্যি কথা বলতে গেলে, সৃজনশীল কাজে এ.আই-এর পারদর্শিতা বৃদ্ধির ব্যাপারটি চমকপ্রদ হলেও কিছুটা ভীতিকরও বটে! এখানে উল্লেখ্য ব্যাপারটি হলো এই যে, এ লেখায় সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার যে ধাপ বা প্রক্রিয়াগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কোনো বিধিবদ্ধ সূত্র নয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীতই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে! এগুলো ছিল নিছকই সাধারণ কিছু উদাহরণ এবং সঙ্গীতের বিশালতার তুলনায় কিছুটা হাস্যকরও বটে!

তবে মূল ব্যাপারটি হলো, যন্ত্র শিখছে এবং শিখছে বেশ দ্রুত। এ শিখন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ কী তা আমরা সময়ের পরিক্রমার সাথেই জানতে পারবো। সেই সাথে হয়তো নতুন করেনির্ধারিত হবে শিল্প এবং সৃজনশীলতার সংজ্ঞাও।

তথ্যসূত্র

  1. http://arstechnica.com/science/2009/09/virtual-composer-makes-beautiful-musicand-stirs-controversy/
  2. http://absolutelyunderstandguitar.com/index.php/all-hail-the-chromatic-scale
  3. https://wikipedia.org/wiki/Algorithmic_composition
  4. http://www.gizmag.com/creative-artificial-intelligence-computer-algorithmic-music/35764/
  5. https://en.m.wikipedia.org/wiki/­Diatonic_and_chromatic http://m.intmath.com/trigonometric-graphs/music.php
  6. http://www.musiclearning.com/lessoncentral/chords/buildingchords.html
  7. http://www.bandnotes.info/tidbits/scales/half-whl.htm
  8. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mathematics_of_musical_scales
  9. http://m.wikihow.com/Learn-All-the-Notes-on-the-Guitar
  10. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Musical_scale

বাস্তবতা কী?

জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তাই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?

এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। বিশটিরও অধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বেশি শক্তিশালী। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।

কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলবো? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?

ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে

বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।

আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।

অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌড়ে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।

এদিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।

আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই,

এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।

আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এদিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।

মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।

আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।

সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।

নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কিওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster) স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।

এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

যেসকল জিনিসের বাস্তবতা ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় না, সেসকল জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেন। পদ্ধতিটির নাম ‘মডেল’। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি পরিচিত নয়। মডেল হচ্ছে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার সত্যিকার মাধ্যম। আমাদের আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের আশেপাশের এইখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল। এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা জীব জগৎ ও জড় জগৎ নিয়ে এভাবেই বৈজ্ঞানিক মডেল উপস্থাপন করেন। মডেল প্রদানের পর ঐ মডেলকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। মডেল হতে পারে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি কোনো রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি কিংবা হতে পারে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কিংবা হতে পারে কম্পিউটারের কোনো সিমুলেশন।

এই মডেল যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ফলাফল হিসেবে কী দেখার কথা বা কী শোনার কথা কিংবা কোনো যন্ত্রে কী প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে মডেলের বেলায় গাণিতিক হিসাব নিকাশ করেও গাণিতিক ফলাফল কী পাবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মডেলে দাবি করা কথাগুলো যাচাই করা হয় এবং এই মডেল সঠিক হয়ে থাকলে এটির ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো কিছু সম্পর্কে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। সঠিক হয়ে থাকলে কী দেখতে পাবার কথা বা কী শুনতে পাবার কথা কিংবা কী উপলব্ধি করতে পারার কথা তা মিলিয়ে দেখা হয়। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় তাহলে মডেলকে আপাতত

সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে পারি যে, মডেলে যা দাবি করা হচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার অংশ।

উৎরে যাওয়া মডেলকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যত বেশি পরীক্ষায় পাশ করবে তত বেশি পরিমাণ নির্ভুল ও তত বেশি পরিমাণ বাস্তব বলে বিবেচিত হবে। যদি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী না মিলে তাহলে এটিকে বাতিল ও ভুল বলে গণ্য করা হয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। অন্য উপায়েও যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তাহলে মডেলটিকে সংশোধন করে আবারো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বেলায় কোনো ছাড় নেই।

বৈজ্ঞানিক মডেল নিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমরা জানি বংশগতির একক জিন, DNA নামক এক প্রকার তন্তু দিয়ে গঠিত। আজকের যুগে DNA সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। DNA কী, কীভাবে কাজ করে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানি। কিন্তু DNA’র গঠন কেমন তা দেখতে পারি না। এমনকি খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেও এর গঠন দেখা যায় না। DNA সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় সবই এসেছে কল্পনায় তৈরি করা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল ও মডেলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।

মানুষ যখন DNA সম্পর্কে কিছুই জানতো না, এমনকি DNA -র নামও শুনেনি তখনও জিন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের জানা ছিল। দেড়শো বছর আগের কথা, ইতালির পাশের দেশ অস্ট্রিয়ায় গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। মেন্ডেল তার গির্জার বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। মটরশুঁটি বীজ নিয়ে তার মনে একটা ভাবনা খেলা করায় তিনি যত্ন নিয়ে বাগানে বেশ কিছু মটরশুঁটি রোপণ করলেন, এবং পরিচর্যা করে বড় করতে লাগলেন। যে যে গাছ ফল হিসেবে সবুজ বা হলুদ কিংবা উভয়ের মিশ্রণ দিয়েছে তাদের গুনে রাখলেন। এ বীজগুলো থেকে আবার চারা তৈরি করে ঐ চারার বীজের রঙ পর্যবেক্ষণ করলেন। এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে তিনি চমৎকার একটি সূত্র খুঁজে পান।

চিত্রঃ মগ্ন মেন্ডেল। চিত্রঃ Charley Harper Art Studio

তিনি খেয়াল করে দেখলেন মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্যগুলো চমৎকার একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে বংশ পরম্পরায় বয়ে চলে। মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সন্তানরা দেখতে শুনতে কিংবা অন্য কোনো

বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রায় সময় তাদের বাবা-মায়ের মতো হয়। মেন্ডেলের আবিষ্কার করা এই জিনিসটার জন্যই সন্তানেরা বাবা-মায়ের মতো হয়।

মেন্ডেল কিন্তু কোনো জিনকে কখনো চোখে দেখেননি বা ছুঁতেও পারেননি। কিন্তু তারপরেও তিনি অনুধাবন করেছিলেন ‘কিছু একটা’ জিনিস আছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এর সবগুলোই তিনি করেছিলেন গণনা ও হিসাব নিকাশের মাধ্যমে। মটরশুঁটি গাছের সবুজ ও হলুদ বীজ নিয়ে তিনি একটি মডেল প্রদান করেছিলেন। এই মডেল যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবুজ ও হলুদ মটরশুঁটিকে বিশেষ উপায়ে নিষিক্ত করা হলে এক পর্যায়ে সবুজ মটরশুঁটির তিনগুণ হলুদ মটরশুঁটি পাওয়া যাবে। এবং তার পরীক্ষার ফলাফলে ঠিক এমনটাই পাওয়া গিয়েছিল।

বিপ্লবী এই আবিষ্কারটা তিনি করেছিলেন তার কল্পনার মডেলের মাধ্যমেই। এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক আবিষ্কার হয়েছে মডেলের মাধ্যমে। মেন্ডেলের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার কোনো উপায় ছিল না। এসব সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের মডেলের আরো উন্নয়ন করেন। মটরশুঁটি বীজের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের উপরও এই সূত্র প্রয়োগ করেন।

মেন্ডেল DNA দেখতে পাননি। DNA-র আকার আকৃতি কেমন আজকের যুগে আমরা তা জানি। শুধু আকার আকৃতিই না, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে DNA সম্পর্কে অনেক অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছে।

DNA-র সত্যিকার আকৃতি কেমন তা জানতে পেরেছি বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের কল্যাণে। ওয়াটসন ও ক্রিকের পাশাপাশি তাদের আগে ও পরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও অবদান আছে। ওয়াটসন আর ক্রিকও কিন্তু DNA-র আকৃতি নিজেদের চোখে দেখননি। তারাও গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি করেছিলেন তাদের কল্পিত মডেল প্রদানের মাধ্যমে এবং ঐ মডেলের সত্যাসত্য যাচাইয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।

তাদের মডেল বাস্তবায়নের জন্য লোহা ও কাঠ ব্যবহার করে DNA-র আনুমানিক গঠনের একটি রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। এই মডেল সঠিক হলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে তাও গবেষণা-হিসাব-নিকাশ করে বের করলেন। অর্থাৎ কিছু একটা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

রোজালিল্ড ফ্রাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ওয়াটসন ও ক্রিকের দাবী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। তারা এক্স-রে বীম দিয়ে বিশুদ্ধ DNA ক্রিস্টালের ছবি তুললেন। তাদের তোলা ছবিতে DNA-র গঠন আর ওয়াটসন ও ক্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করা DNA-র গঠন ঠিক ঠিক মিলে যায়। এর ফলে একটি কল্পিত মডেল যুগান্তকারী এক আবিষ্কারে পরিণত হয়। ওয়াটসন ও ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল মূলত মেন্ডেলেরই আবিষ্কারের আধুনিক রূপ।

চিত্রঃ ওয়াটসন ও ক্রিক। অলংকরণঃ Dave McKean

আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাস্তবতা কী, তিনটি ভিন্ন উপায়ে বাস্তবতা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানলাম। প্রথমটি হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি কোনোকিছুকে উপলব্ধি করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শেষের পদ্ধতিটি হচ্ছে মডেল তৈরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা ঐ মডেলের সত্যাসত্য নির্ণয়ের মাধ্যমে আরো পরোক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। মানে ঘুরেফিরে এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে সেটি শেষমেশ ইন্দ্রিয়তে গিয়েই শেষ হচ্ছে। যে পদ্ধতিতেই হোক, বেলা শেষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বাস্তবতা নির্ধারিত হচ্ছে।

তাহলে তার মানে কি এই, যা নির্ণয়-নির্ধারণ করা যাবে তা-ই শুধু বাস্তব আর বাকি সব অবাস্তব? তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালোবাসার মতো জিনিসগুলো কোথায় যাবে? তারা কি অবাস্তব?

অবশ্যই এরা বাস্তব। কিন্তু এই আবেগ-অনুভূতিগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের উপর তাদের তীব্রতার পরিমাণ নির্ভর করে। আবার সব প্রাণীর মস্তিষ্কে সব ধরনের আবেগ-অনুভূতি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক কিংবা অন্যান্য উন্নত প্রাণী যেমন- শিম্পাঞ্জী, কুকুর, তিমি মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের তীব্র আবেগ অনুভূতি আছে। ইট-পাথর পাথরের কোনো আনন্দ-বেদনা নেই, পাহাড়-পর্বতেরা কখনো প্রেমে পড়ে না।

এই অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে তখনই বাস্তব হবে যখন মস্তিষ্ক এই অনুভূতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করবে। অভিজ্ঞতা লাভ করার আগ পর্যন্ত এর সত্যিকার রূপ সম্বন্ধে মস্তিষ্ক কিছুই জানবে না। একটা উদাহরণ দেই। একটি ছেলে বা মেয়ের কথা বিবেচনা করি, যে তার জীবনে এখন পর্যন্ত একটাও আম খেয়ে দেখেনি। বই-পুস্তকে অনেকবার পড়েছে ও অনেকের কাছে শুনেছে, পাকা টসটসে হিমসাগর আম অনেক সুস্বাদু হয়। বইতে আরো পড়েছে এই জাতের আম অনেক মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হয়, কিন্তু খেয়ে দেখেনি কখনো। সে বই-পুস্তকে যত বিবরণই পড়ুক, যত প্রশংসাই শুনুক, পাকা আমের সত্যিকার স্বাদ সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্তু কিছুই জানতে পারছে না। মস্তিষ্কে অনুভূতি তখনই বাস্তব হবে যখন ঐ অনুভূতি সম্পর্কে মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা লাভ করবে।

চিত্রঃ এখানের সবকটি ফলের স্বাদের অনুভূতি কি আপনার আছে? ছবিঃ Visual Encyclopedia of Fruits

তবে আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করতে পারি না অন্যরা সেই অনুভূতি ঠিকই অনুভব করতে পারে। এমনও অনুভূতি থাকতে পারে যার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। এমনও হতে পারে দূরের কোনো গ্রহে এমন কোনো এলিয়েন আছে যাদের মস্তিষ্কে আমাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো অনুভূতি কাজ করছে। কে জানে কী অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক অনুভূতি খেলা করছে তাদের মস্তিষ্কে।

তথ্যসূত্র

লেখাটি The Magic of Reality: How we know whats really true, D. Richard, Free Press, New York, 2011 এর প্রথম অধ্যায় what is reality? What is magic? এর প্রথম অংশের ভাবানুবাদ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং প্রয়োজনীয় ছবি যোগ করা হয়েছে।

 

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

একটুখানি সঙ্গীত এবং এমিলি হাওয়েলের গান

কোনো এক ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যা ছিল সেদিন। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু পাগল করা হাওয়া, ভেজা বাতাস, মাটির সুঘ্রাণ ইত্যাদি যাবতীয় কাব্যিক উপকরণ হাজির থাকায় পড়ায় মন বসছিল না। ওদিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল অঝোর বর্ষণের অপার্থিব সুর।

সঙ্গীত বা সুর বলতে আমরা আসলে যা বুঝি তার পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। মানসিক অর্থাৎ মন সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো আবার মানুষের খুব গর্বের বিষয়। কৈশোরে পড়া অসংখ্য সায়েন্স ফিকশন গল্পের সাধারণ একটা দৃশ্য থাকতো অনেকটা এরকম- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশের জোর দাবী জানাচ্ছে। বিদ্রোহী নায়ক তখন গলার রগ ফুলিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে আর বলবে, “ঐ কপোট্রনিক খুলিগুলো আর যা-ই পারুক, কখনো কি পারবে একটা সুর সৃষ্টি করতে? পারবে শেষ বিকেলে সূর্য ডোবার একটা মাস্টারপিস ছবি আঁকতে? বা একটা বৃষ্টির কবিতা লিখতে পারবে কখনো?”

একবিংশ শতকের এমন একটি সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি যে, নায়কের প্রথম প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক সুর দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে গান এবং শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রকাশ পাচ্ছে ‘তাদের’ একক এলবাম!

ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে, যন্ত্র তখনো সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’ শুরু করেনি। পূর্বে সংরক্ষিত ডাটা (এ ক্ষেত্রে শব্দ) পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে এবং নির্দেশনা (প্রোগ্রাম) অনুসারে কিছু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিডিও গেমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence – A.I) ব্যবহার শুরু হয়। গেমসের পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির সাথে তাল মেলানোর জন্য এ.আই এর প্রয়োগ ভিডিও গেমিং-এর অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। সময়ে সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের তাল বাড়িয়ে-কমিয়ে অথবা গেমসে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের আগমন-প্রস্থান, দৌড়াদৌড়ি- মোদ্দা কথা, বাস্তব অনুভূতি সৃষ্টির ভার পড়ে এ.আই এর ওপর। এক্ষেত্রে ন্যাচারাল লার্নিং (Natural Learning), সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস ইত্যাদি বিভিন্ন থিওরির প্রয়োগ ঘটানো হয়।

তবে এগুলো ছিল এ.আই ব্যবহারের একেবারে প্রথম দিককার কিছু কাজ। অনেকটা ছোট শিশুকে প্রাথমিক কিছু অক্ষরের সাথে পরিচিত করানোর মতো। এ বিষয়ে গবেষণা আরেকটু এগোনোর পর এ.আই মিউজিশিয়ানদের জন্য অনেকটা বন্ধুর মতো হয়ে দাঁড়ায়।

সঙ্গীত সম্পর্কিত ব্যাকরণ বা নিয়ম সৃষ্টির সূচনা ঘটেছে সেই পিথাগোরাসের যুগে এবং প্রথম দিকে সঙ্গীত গণিতজ্ঞ এবং পদার্থবিদদের গবেষণার খুব প্রিয় এক বিষয় ছিল। কেবলমাত্র পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নিয়মের মাঝেই রয়েছে অসংখ্য তাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল। তাছাড়া ঢাউস আকৃতির শত শত বই বিগত শতকগুলোতে সঙ্গীত সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণার ফলাফল ধারণ করে।

উদাহরণস্বরূপ পাশ্চাত্য, আরব, হাঙ্গেরিয়ান, বাইজেনটাইন, পারস্য ইত্যাদি অঞ্চলভিত্তিক সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকরণ এবং স্কেল রয়েছে। স্কেল, নোট, হারমনি, মেলোডি, টেম্পো সম্পর্কিত যে আলোচনা তা কেবল সমুদ্রসমই নয়, বরং জ্ঞানের এক পৃথক শাখা এবং এ লেখার সীমা আর উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যাবে। তবুও কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যার দাবী রাখে।

আমরা যেসব গান শুনি তার সুরটি একজন সুরকার সৃষ্টি করেন কীভাবে? বা গানের কথার সাথে মানানসই সুর বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কী? অতি পরিচিত বাদ্যযন্ত্র কীবোর্ডের সাহায্যে ব্যাপারগুলো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে রয়েছে ১২ টি নোট, নোট বলতে আপাতত আমরা সঙ্গীতের ক্ষুদ্রতম একক ধরি, যেগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গানের প্রতিটি শব্দকে সুর হিসেবে প্রকাশ করা যায়। নোটগুলো হলো- A A (sharp) B              C C (sharp)/D (flat) D D (s)/E (f) E F F(s)/G (f) G G (s)/A (f)

চিত্রঃ পিয়ানো বা কীবোর্ডের লে আউট।

কীবোর্ডে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো নোটগুলো Chromatic Scale নামক স্কেল থেকে প্রাপ্ত। # এবং b চিহ্ন যথাক্রমে মূল নোটের তীক্ষ্ণ বা মসৃণ রূপ (শ্রুতির ভিত্তিতে) বোঝায় যেখানে A-G হলো ৭ টি মূল নোট। এদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক কম্পনাঙ্ক বা স্বর রয়েছে। দৃশ্যত কয়েকটি নোটের Sharp বা Flat স্বর নেই এবং ২ টি নোটের মাঝের Sharp বা Flat নোটগুলোকে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের  ২টি নামের যেকোনো একটি দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘কী’তে পরপর একই নোটের পুনরাবৃত্তি ঘটে উচ্চতর বা নিম্ন অনুপাতের কম্পনাঙ্কে এবং প্রয়োজন অনুসারে সুরকার তা নির্ধারণ করে থাকেন।

চিত্রঃ বিভিন্ন নোটের frequency তালিকা, একই নোটের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে অনুপাত লক্ষণীয়।

এক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত গাণিতিক সূত্রটি হলো, Frequency = 440*(2^n/12); for n = -21, -19, …27। গীটারের ক্ষেত্রে নোটগুলোর বিন্যাস Frequency সহ লক্ষ্য করি-

 

নোটগুলো এভাবে নির্ধারিত হলো কেন সেই আলোচনা যেমন বিস্তৃত তেমনই ঐতিহাসিক। তবে সুপরিচিত Exponential Graph প্রমাণ করে এক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক গাণিতিক হিসাব রয়েছে।

চিত্রঃ frequency লেখচিত্র।

এ নোটগুলোকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে স্কেল বানান যায়। স্কেল বলতে আপাতত ধরে নেয়া হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠিত ফর্মুলা যার দ্বারা নির্দিষ্ট ক্রমে নোট বের করে পরপর বাজালে শ্রুতিমধুর সুর এবং একসাথে বাজিয়ে কর্ড (Chord) বানানো যায়। কয়েকটি সুপরিচিত স্কেল ফর্মুলা-

  • Major Scale: R, W, W, H, W, W, W, H
  • Natural Minor Scale: R, W, H, W, W, H, W, W
  • Harmonic Minor Scale: R, W, H, W, W, H, 1 1/2, H (notice the step and a half)
  • Melodic Minor Scale: going up is: R, W, H, W, W, W, W, H
    going down is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Dorian Mode is: R, W, H, W, W, W, H, W
  • Mixolydian Mode is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Ahava Raba Mode is: R, H, 1 1/2, H, W, H, W, W
  • A minor pentatonic blues scale (no sharped 5) is: R, 1 1/2, W, W, 1 1/2, W

এখানে R বলতে Root note বা প্রথম নোট, W (Whole) দ্বারা একটি নোটের দূরত্ব এবং H (half) দ্বারা ঠিক পরবর্তী নোট বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ ভাবা যাক আমরা মেজর স্কেলের একটি সুন্দর সুর বের করতে চাই যার প্রথম নোট হবে c নোট। যেহেতু c Root note হিসেবে ব্যবহৃত হবে একে বলা হবে c Major scale এবং সেটি হলো-

C             D             E             F              G             A             B             C

লক্ষণীয় এখানে আটটি নোটের গুচ্ছকে Octave বলে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া c নোটটি মূল নোটের দ্বিগুণ ফ্রিকোয়েন্সির। এক্ষেত্রে r w w h w w w h সূত্রের প্রয়োগ ঘটেছে এবং ব্যাপারটি যে শুভঙ্করের ফাঁকি নয় তা হাতের কাছে থাকা কোনো

কীবোর্ড বা গীটার বা মোবাইল অ্যাপে নির্দিষ্ট ক্রমে নোটগুলো বাজালেই বোঝা যাবে, শুনতে পারবেন অতি পরিচিত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা। এক্ষেত্রে Root note হিসেবে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে সূত্রটি প্রয়োগ করুন, সুরের অনুপাত এক থাকবে, হেরফের হবে না।

নোট বুঝলাম, স্কেল বুঝলাম, এবার কর্ডের (Chord) পালা। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে Chord বলতে তিনটি বা ততোধিক নোটের সম্মিলন বোঝায় যেগুলো একসাথে বাজালে ঐকতানে থাকবে, শ্রুতিমধুর শোনাবে। ফরাসি শব্দ Accord থেকে এর উৎপত্তি যার পরিভাষা Agreement বা চুক্তি অর্থাৎ একই সাথে মানিয়ে নেবার মতো একটি ব্যাপার।

পূর্বে আমরা Major scale বের করেছি। Chord বেরুবে স্কেল থেকে, উদাহরণস্বরূপ এ স্কেলের ১-৩-৫ নম্বর নোট একসাথে বাজালে একটি ঐকতানের সৃষ্টি হবে এবং তার নাম হবে c chord, এটিও সূত্রের প্রয়োগ। এর মাঝে আবার আরও কিছু নিয়ম আর সূত্র আছে যেগুলো প্রয়োগ করে সবগুলো Chord বের করা যায় এবং গণিতে উৎসাহী যে কেউ অনুধাবন করতে পারবে যে অসংখ্য স্কেল, তার থেকে আবার অসংখ্য Chord এর কী বিশাল সমাহার মিউজিশিয়ানদের হাতে থাকে।

এর গুরুত্ব কী? আমরা যদি কোনো গানের সাথে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে চাই, তবে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে, নির্দিষ্ট বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু Chord-ই বাজবে। একেকটি Chord-এর রূপ একেক রকম, যেন একেক রকম মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অসংখ্য সম্ভাব্য বিকল্প থেকে গানের কথার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো Chord মিউজিশিয়ান বেছে নেবেন এখানেই তার মুন্সিয়ানা, তার মাথায় ঘুরতে থাকা একটি সুরেলা গল্পকে তিনি বাস্তব রূপ দেবেন এবং কুড়োবেন প্রশংসা। উৎসাহীদের জন্য বিখ্যাত Titanic সিনেমার Soundtrack – My heart will go on গানটির কিয়দংশের Chord-

সুরসাগর থেকে এক গ্লাস জল উঠিয়ে এতক্ষণ ধরে ঢাললাম মাত্র। কিন্তু এর মাঝে এ.আই এর আগমন ঘটল কীভাবে? একটু আগে বলেছি Chord এর সমন্বয় কীভাবে সাধন করবেন এটি নিয়েই সুরকারের মাথাব্যাথা। ধরা যাক, প্রথম লাইনের অর্ধেকের সাথে বাজানোর জন্য অনেক ভেবে তিনি একটি Chord বাছাই করলেন। এখন তার কাজ হলো পরবর্তী আরেকটি Chord-এর মাধ্যমে ভাবের সমন্বয় সাধন করে লাইনটি শেষ করা। ব্যাপারটি যতটা সহজে বলা গেলো ঠিক ততটাই কঠিন। আগেই বলেছি, সামনে বাছাইয়ের জন্য অপশন রয়েছে অনেকগুলো। তার মধ্যে সেরা বাছাই কোনোটি হতে পারে? গানের লাইন আছে আরও বেশ কয়েকটি এবং পুরোটুকুর মাঝে এভাবে সমন্বয় সাধন করতে হবে! উপায় একটিই ছিল। সঙ্গীত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থেকে একটি Chord বেছে নেয়া। কিন্তু এর চেয়েও ভালো একটি বিকল্প হয়তো বাদ পরে গেলো!

একটি গান সুর করতে একাধিক মাস লেগেছে এটিই সঙ্গীতে সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি যদি একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় যা সম্ভাব্য অপশনগুলো দ্রুত বাজাবে একের পর এক এবং কোনো এক মুহূর্তে একটা সমন্বয় শুনে সুরকার বলে উঠবেন ‘ইউরেকা’, অথবা আরেকটি ভয়াবহ রকমের

সমন্বয়েরও মুখোমুখি হতে পারেন, যা নিজে সুস্থ মস্তিস্কে তিনি কখনো বাজাতেন না! যাই হোক, ঘণ্টা খানেকের মাঝেই সম্ভাব্য অনেকগুলো অপশন যাচাইবাছাই করা সম্ভব হবে, সময় বাঁচবে, গাণিতিকভাবে সম্ভাব্য সব বিকল্প ঘাটা যাবে, পৌঁছনো যাবে চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্তে এবং এতক্ষণ ধরে রূপকথার মতো সাধাসিধে ভঙ্গিতে যা বর্ণনা করলাম, তার গালভরা নাম হচ্ছে Algorithmic Composition। কৌশলগত আলোচনায় না গিয়ে কেবল মূল প্রক্রিয়াটি সরলভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা আরকি।

এ.আই এর দৌড় এখানেই শেষ নয়। যেমন কোনো একটা Chord-এর মাঝে অতিরিক্ত নোট যোগ, লয় (Tempo) বাড়ানো এবং একইসাথে একাধিক Chord বাজালে তার প্রভাব- ইত্যাদি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে একটি একটি করে পরীক্ষা করা যায়। তারপর সুরকার যদি নির্দিষ্ট কোনো একটি প্যাটার্ন বাছাই করে দেন যে, এই গানের সুরের আলোকে সম্ভাব্য আরেকটি সুর দাঁড় করাও, সেটিও সম্ভব। ব্যাপারটিকে বলা হয় Mimic করা যেখান থেকে এ.আই এর সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’র পরবর্তী গল্পের অধ্যায় শুরু।

চিত্রঃ সফটওয়্যার ব্যবহার করে Synthesis করবার একটি দৃশ্য।

এতক্ষণ ধরে একটি গানের সুর তৈরি করবার বা কাঠামো দাঁড় করাবার যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো তা নিছকই একটি উদাহরণ মাত্র। সুর করবার মতো সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে মানুষ চাইলেই কীভাবে যন্ত্রের সহযোগিতা নিতে পারে তা সঙ্গীতের মৌলিক কিছু উপকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশ্যই সুর সৃষ্টির কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। বর্তমান যুগে সঙ্গীতের জগতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেন বিতর্ক সৃষ্টি করছে তা কিছুটা হলেও হয়তো আঁচ করা যায়। এক্ষেত্রে Liquid Notes, Quartet Generator, Maestro Genesis বেশ প্রসিদ্ধ কয়েকটি সফটওয়্যার।

Experiments in Musical Intelligence (EMI)

এ.আই এর সংগীতচর্চা বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন গবেষক হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ড. ডেভিড কোপ। তিনি ১৯৮০ সালের দিকে এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন এবং প্রায় তিন যুগ ধরে এর সাথে জড়িত আছেন। তিনি একটি প্রজেক্ট শুরু করেন যেটিকে

প্রাথমিকভাবে Experiments in Musical Intelligence (EMI) বা সংক্ষেপে Emmy হিসেবে নামকরণ করা হয়। EMI তৈরির প্রথম দিকে লক্ষ্য ছিল মূলত বিভিন্ন গান ইনপুট হিসেবে দিয়ে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ভাঙার চেষ্টা করা। তারপর সেগুলো কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা, যেন কোনো একটি জিন-নকশা জেনে নিয়ে তাতে কিছু পরিবর্তন করা। প্রথমদিকে তিনি EMI ব্যাবহার করে নিজের সুর করা কিছু গানকে পরিবর্তন করতেন, উল্লেখ্য তিনি একইসাথে একজন সঙ্গীতজ্ঞ।

পরবর্তী ধাপে তিনি দেখলেন EMI পদ্ধতি কেবল তার করা অপেক্ষাকৃত সরল সুরগুলোকেই নয়, Bach, Beethoven, Mahler সহ ইতিহাসের প্রসিদ্ধ সব সঙ্গীতজ্ঞদের কাজকে অনুকরণ করতে পারছে। ফলাফল ছিল অনেকটা ভৌতিক। শত বছর আগের ধ্রুপদি শিল্পীদের কাজগুলো অনেকটা পুনর্জন্ম পেতে থাকে EMI প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ডেভিড কোপের একটি উক্তি উল্লেখ করবার মতো- “You name the composer and EMI could analyze his works to spit out a new piece that sounded just like the composer had written it himself. Except he hadn’t; a computer had.”

Emily Howell এর জন্ম

২০০৩ সালের দিকে কোপ সিদ্ধান্ত নেন EMI প্রজেক্টটি নতুন মাত্রায় নেবার। এর আগ পর্যন্ত তিনি EMI এর কাজগুলো সত্যিকারের মিউজিশিয়ানদের দ্বারা রেকর্ড করাতেন, সুরটি সৃষ্টির পর। কিন্তু তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন EMI এর কাজগুলো এবার ডাটাবেজ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন একটি প্রোগ্রাম ডিজাইন করবেন, কিন্তু তার স্বকীয়তা হবে এই যে তা শ্রোতাদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ইনপুট হিসেবে নেবে এবং বিভিন্ন ধাঁচের সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে একেবারেই নতুন সুরের জন্ম দেবে সত্যিকারের শিল্পীর মতো। এ ব্যাপারে তিনি ‘Computer Models of Musical Creativity’ নামক একটি বই লেখেন যাতে কৌশলগত দিকগুলোর বিশদ বিবরণ আছে।

২০০৯ সালে Centaur Records থেকে প্রকাশ পায় এমিলির প্রথম এলবাম- “From darkness, light” এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় এলবাম- “Breathless”! এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য এ.আই হলো ইউনিভার্সিটি অব মালাগায় তৈরি ‘Lamus’ নামক একটি Computer cluster যা সর্বোচ্চ ৮ মিনিটে পূর্ণদৈর্ঘ্য Symphony থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাঁচের নতুন সুর তৈরি করতে পারে এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে Lamus এর করা সুর এর ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে London Symphony Orchestra পারফর্ম করে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে!

ব্যাপারটা শেষে এখানে এসে ঠেকলো যে, যন্ত্র সুর করে দিচ্ছে আর গাইছে মানুষ, যেখানে প্রথম দিককার দিনগুলোতে মানুষের তৈরি গানের বিশ্লেষণের কাজেই কেবল এ.আই ব্যবহার করা হতো! সত্যি কথা বলতে গেলে, সৃজনশীল কাজে এ.আই-এর পারদর্শিতা বৃদ্ধির ব্যাপারটি চমকপ্রদ হলেও কিছুটা ভীতিকরও বটে! এখানে উল্লেখ্য ব্যাপারটি হলো এই যে, এ লেখায় সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার যে ধাপ বা প্রক্রিয়াগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কোনো বিধিবদ্ধ সূত্র নয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীতই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে! এগুলো ছিল নিছকই সাধারণ কিছু উদাহরণ এবং সঙ্গীতের বিশালতার তুলনায় কিছুটা হাস্যকরও বটে!

তবে মূল ব্যাপারটি হলো, যন্ত্র শিখছে এবং শিখছে বেশ দ্রুত। এ শিখন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ কী তা আমরা সময়ের পরিক্রমার সাথেই জানতে পারবো। সেই সাথে হয়তো নতুন করেনির্ধারিত হবে শিল্প এবং সৃজনশীলতার সংজ্ঞাও।

তথ্যসূত্র

  1. http://arstechnica.com/science/2009/09/virtual-composer-makes-beautiful-musicand-stirs-controversy/
  2. http://absolutelyunderstandguitar.com/index.php/all-hail-the-chromatic-scale
  3. https://wikipedia.org/wiki/Algorithmic_composition
  4. http://www.gizmag.com/creative-artificial-intelligence-computer-algorithmic-music/35764/
  5. https://en.m.wikipedia.org/wiki/­Diatonic_and_chromatic http://m.intmath.com/trigonometric-graphs/music.php
  6. http://www.musiclearning.com/lessoncentral/chords/buildingchords.html
  7. http://www.bandnotes.info/tidbits/scales/half-whl.htm
  8. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mathematics_of_musical_scales
  9. http://m.wikihow.com/Learn-All-the-Notes-on-the-Guitar
  10. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Musical_scale

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

 

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering

মহাজগতের জ্যামিতি

মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে যুগে যুগে প্রচলিত রূপকথার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। কখনো হাতির মাথায় থাকা পৃথিবী, কখনো কচ্ছপের পিঠে থাকা, কখনো বা বিরাট পানির আধারে ডুবে থাকার গল্প প্রচলিত ছিল প্রাচীন যুগের মানুষদের মাঝে। গ্রীকরা মনে করতো, মাথার উপর আকাশের শেষ প্রান্তে আছে এক গুহা, যেখানে দেবতা জিউসের তেজী ঘোড়াগুলো থাকতো। সকালে ঘোড়াগুলো আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে দৌড়ে যেত, তাই পৃথিবী আলোয় ভরে যেত। কয়েক শতাব্দী আগ পর্যন্তও মানুষের ধারণা ছিল,

মহাবিশ্ব মানে বোধহয় সৌরজগতটাই। কিন্তু যখনই মানুষ জানলো সৌরজগত আসলে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, তখন থেকেই প্রশ্ন জমতে লাগলো, মহাজগত কী আকারে সসীম হতে পারে? যদি তা হয়, তাহলে মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? দুটি প্রশ্নই এক বিন্দুতে গিয়ে মিলে- ‘মহাবিশ্বের আকার আসলে কেমন?’

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আগে জেনে নেয়া উচিৎ তলের বক্রতা (ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা সমতল) এবং মহাবিশ্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। যেমন, এর উপাদানগুলো কীভাবে একে অন্যের সাথে যুক্ত। গোলকাকৃতির পৃষ্ঠের বক্রতা হলো ধনাত্মক বক্রতা। পাম্পে ফুলানো একটা চাকার ভেতরের দিকটা হলো ঋণাত্মক বক্রতা বিশিষ্ট। যেহেতু আমরা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে জানি না, কাজেই এর সম্ভাব্য অনেক আকৃতিই আমরা ধরে নিতে পারি- গোলকাকৃতি, সিলিন্ডার আকৃতি, ঘনকাকৃতি অথবা অনির্দিষ্ট সংখ্যক বিন্যাস বিশিষ্ট ভুজ আকৃতি বা বিভিন্ন বক্রতল ও মোচড়বিশিষ্ট আকৃতি, কিংবা এমন কোনো অনির্দিষ্ট আকৃতি যার কোনো বিপরীত তল নেই।

প্রথমে আমরা আমাদের পরিচিত তিনটি আকৃতি নিয়ে চিন্তা করি। এই তিনটি আকৃতি হলো সমতল আকৃতি (flat shape), গোলকীয় আকৃতি (spherical shape) এবং বক্রতলীয় আকৃতি (hyperbolic shape)।

তলগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝার আগে একটি বিশেষ ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এটি হলো রেইম্যানের জ্যামিতি (Reiman’s Geometry)। আমরা সাধারণত যে জ্যামিতিক আকৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা করি, যেমন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বৃত্ত বা সরলরেখা, তার সবই কিন্তু আলোচনা করা হয় সমতল ক্ষেত্রের সাপেক্ষে। এটি আসলে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। কিন্তু যদি ক্ষেত্রটি গোলকীয় বা বক্রতল হয়? এটিই হচ্ছে অমর গণিতবিদ গাউসের সুযোগ্য ছাত্র রেইম্যানের কীর্তি!

রেইম্যান প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি গোলকীয় পৃষ্ঠে দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং বক্রতলীয় ক্ষেত্রে দুই সমকোণের চেয়ে কম হবে। তিনি এটাও বলেন যে, গোলক বা বক্রপৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে একটি বক্ররেখা। খটকা লাগতে পারে, কেননা প্রচলিত জ্যামিতিতে আমরা জানি দুটি বিন্দুর সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো সরলরেখা। কিন্তু সরলরেখা কল্পনা করলে তো সেটা সমতল ক্ষেত্রে চলে যায়, কাজেই সেটা ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আওতাধীন হয়ে যায়। রেইম্যান জ্যামিতি থেকে আরও দেখা যায়, সমতল ক্ষেত্রের দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি গোলকীয় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা একসময় নিজেদের ছেদ করবে। আবার বক্রতলে নিয়ে যাওয়া হলে তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে।

এখন দেখা যাক কোন আকৃতিতে মহাবিশ্ব কেমন হওয়ার কথা। আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করছে। সে হিসেবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সব বস্তুই আবার একীভূত হয়ে যাওয়ার কথা। এখন যদি মহাবিশ্ব সমতল হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলা যায় মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সমতলভাবে বিস্তৃত হবে এবং এক পর্যায়ে আবার একটি বিন্দুর দিকে ফিরে আসবে।

কিন্তু সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মহাবিশ্ব সমতল হতে গেলে মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তিঘনত্ব এক হওয়া প্রয়োজন। যেমন, কাগজের উপর ছড়িয়ে থাকা লোহার গুঁড়ার কাছাকাছি যদি দুটি ভিন্ন শক্তির চুম্বক রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে লোহার গুঁড়াগুলো যে তলে বিন্যস্ত হয়েছে সেটা সমতল থাকে না। মহাবিশ্বের

সব বস্তুর ঘনত্ব সমান নয়, এ কারণে তাদের শক্তি ঘনত্বেরও তারতম্য ঘটে। মহাবিশ্বের ঘনত্ব নির্ণয়ের একটা সুন্দর নাম আছে- Density Parameter। সমতল ভূমির ক্ষেত্রে এর মান হওয়ার কথা ১, অর্থাৎ কোনো একটাকে আদর্শ ধরে নিলে তার তুলনায় অন্য সবারই এই মান একই হবে। কিন্তু এটা সত্য নয়, কাজেই বলে দেয়া যায় মহাবিশ্ব সমতল নয়।

এবার আসি ‘মহাবিশ্ব গোলকাকার’ এ ধারণায়। প্রাকৃতিকভাবে আমরা দেখি, সব তরল বা গ্যাসই চেষ্টা করে গোলকীয় অবস্থায় থাকতে। এর কারণ, তরল বা গ্যাসের প্রতিটি ফোঁটায় যে অণু আছে তাদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল তাদের ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বলের চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে, মহাবিশ্ব সসীম হওয়ার কথা কিন্তু তার কোনো শেষ আমরা বের করতে পারবো না। যেমন একটা ফুটবলের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি না কোনো বিন্দুতে তার শুরু এবং কোনো বিন্দুতে শেষ।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা জানি, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে এবং এ প্রসারণের হার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি গোলকাকৃতির হয় তবে এই প্রসারণের হার বাড়া তো সম্ভব নয়, কেননা এই প্রসারণকে অতিক্রম করেই তো গোলক হতে হবে! রেইম্যানের জ্যামিতি থেকেও দেখা যায়, ধনাত্মক বক্রতার কোনো পৃষ্ঠে যেকোনো বল কেন্দ্রের দিকেই বেশি ক্রিয়াশীল হয়, ফলে Density Parameter এর মান ১ এর বেশি হয়। তাহলে মহাবিশ্বের প্রসারণ কমতে কমতে একসময় শূন্য এবং তারপর সংকোচন শুরু হওয়ার কথা, প্রসারণের মাত্রা বাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তাহলে শেষ আর একটি প্রকৃতিই বাকি থাকলো, ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্র অর্থাৎ Hyperbolic Space। হাইপারবোলিক স্পেস এ Density Parameter এর মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ‘মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তি ঘনত্ব সমান নয়’-এই তত্ত্ব একমাত্র হাইপারবোলিক স্পেসের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তাছাড়া রেইম্যান জ্যামিতি থেকে দেখা যায়, একমাত্র ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্রেই দুটি বস্তুর দূরে সরে যাওয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর যে এখানেই শেষ, তা বলা যায় না। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, মহাবিশ্ব সমতল ক্ষেত্রের উপর বিস্তৃত। এর সপক্ষে তারা উপস্থাপন করেন অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন এর চিত্র। যা দেখে কিছুটা মনে হয়, মহাবিশ্ব সম্ভবত সমতল।

চিত্রঃ অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন।

আরেকটা প্রশ্ন এখনো বাকি, মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো জোর উত্তর বিজ্ঞানীরা আজও দিতে পারেননি। তবে রেইম্যানের জ্যামিতি থেকে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মহাবিশ্বের মাত্রা যদি তিনটির চেয়ে বেশি হয়, তবে এর সঠিক আকৃতি আমাদের তিন মাত্রার কল্পনা দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যেমনঃ দ্বিমাত্রিক কাগজের পৃষ্ঠের উপর চলমান একটি পিঁপড়া তার তলের শুরু এবং শেষ বুঝতে পারবে। কিন্তু যদি সেই কাগজ পেঁচিয়ে ত্রিমাত্রিক সিলিন্ডার বানানো হয়, তবে পিঁপড়া সেই সিলিন্ডারের কোনো আদি-অন্ত খুঁজে পাবে না। অধুনা প্রতিষ্ঠিত ‘স্ট্রিং থিওরি’র অন্যতম বিজ্ঞানী জাপানের মিচিও কাকু গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্ব দশ মাত্রার। আমাদের দৃশ্যমান তিনটি মাত্রা ছাড়া অন্য

মাত্রাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে আমরা সেগুলো বুঝতে পারি না। যেমন, ত্রিমাত্রিক লোহার টুকরোকে সুক্ষ্ম করতে করতে যদি পাতে পরিণত করা হয়, তবে সেটা আমাদের কাছে দ্বিমাত্রিকই মনে হয়।

যা হোক, স্ট্রিং থিওরীর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ দশ মাত্রাকে গাণিতিক সমীকরণের আওতায় আনতে পারলেই মহাবিশ্বের আকৃতি ও এর সীমা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে। মানুষের জ্ঞান যত বিস্তৃত হচ্ছে, মহাবিশ্বই ততই হয়ে উঠছে রহস্যময়!

তথ্যসূত্র

১. জেমস সমবার্ট, ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনঃ http://abyss.uoregon.edu/~js/cosmo/lectures/lec15.html

২. ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিঃ http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/cosmology/geometry.html

৩. প্রফেসর বারবারা রীডেন, ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটিঃ http://www.astronomy.ohio-state.edu/~ryden/ast162_9/notes40.html

৪. স্ট্রীং থিওরি, লেখকঃ হিমাংশু কর

আলোর গল্প

আলো কী? প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো, আলো হচ্ছে দেবতাদের দেখার ক্ষমতা। যখন মিশরীয়দের দেবতা চোখ খুলত, তখন মহাবিশ্বে আলো আসত। সেই আলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেখতে পেত। সূর্য এবং চাঁদকে মিশরীয়রা তাদের দেবতা ‘রা’ এর দুই চোখ বলে মনে করতো। মিশরীয়দের পর পারস্যে সভ্যতা বেশ উন্নতি সাধন করে। এ পৃথিবীর আদিতম ধর্মগুলোর একটি হচ্ছে জরোআস্ট্রিয়ানিজম। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে জরোআস্ট্রিয়ানিজম ধর্মানুসারী অগ্নিপূজকরা আলোকে তাদের দেবতা ‘আহুরা মাজদা’র মঙ্গল সৃষ্টি বলে মনে করতো। আর অন্ধকারকে মনে করতো অমঙ্গল সৃষ্টি। মঙ্গল আলো দিনের বেলায় পৃথিবীকে আলোকিত করতো আর রাতের বেলায় অমঙ্গল সৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দিতো অন্ধকারের কালো চাদরে।

পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে আগুন এবং আলো ছিল দেবতাদের অধিকারে। জিউসের কাছে থেকে চুরি করে সেই আলো মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন আরেক দেবতা প্রমিথিউস। সেজন্য প্রমিথিউসকে দূর পাহাড়ে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয়। আর ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার কলিজা খেয়ে ফেলতো। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ সভ্যতার লোকজন এভাবেই আলোকে তাদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

চিত্রঃ প্রমিথিউস।

ধর্মের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও মনিষীরাও ধারণা করতে শুরু করেছিল আলো দুই ধরনের- বাইরের আলো এবং মনের আলো। এদের মধ্যে ছিলেন প্লেটো, এমপেডোক্লেস, ইউক্লিড, গ্যালেন ও আরো অনেকে। এ ধরনের চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম চিন্তা করেন মধ্যযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম (আল হ্যাজেন)। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন ক্যামেরা অবস্কিউরা বা অন্ধকুঠুরির ধারণা থেকে। ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা সর্বপ্রথম এসেছিল চীনা বিজ্ঞানী মজি’র সময়কালে (৪৭০~৩৯০

খ্রী.পূ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি অন্ধকার ঘরের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে দিলে বিপরীত পাশে পর্দায় একটি প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

আল হাইথামের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনোকিছু দেখার জন্যে বাইরের আলোর সাথে মনের আলো অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। মনের আলো এবং বাইরের আলো যখন একসাথে মিলে যায়, শুধুমাত্র তখনই আমরা দেখতে পাই। মনের আলো আসে মানুষের খাদ্য থেকে। মানুষ খাদ্য খাওয়ার পর তা আধ্যাত্মিক আলোতে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে থেকে যেতো। মানুষের মৃত্যু হলে এ আধ্যাত্মিক আলো চাঁদে গিয়ে পৌঁছতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে বেড়ে যেতো। যখন বাড়তে বাড়তে পরিপূর্ণ চাঁদ হয়ে যেতো, তখন সেখান থেকে আলো বা আত্মা ধীরে ধীরে দেবতার কাছে চলে যেতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে ক্ষয়ে যেতো। চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে এ আধ্যাত্মিক আলোকে সম্পর্কিত করেছিল ‘ম্যানিকায়িজম’ যা ছিল খ্রীঃ ২৫০ শতকে বর্তমানের বাগদাদে প্রচলিত ধর্ম। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আল-কিন্দী এ ধারণার প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।

আল হাইথামের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে থাকেন বাইরের আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা দেখতে পাই। যদি চোখের আলো গিয়ে বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসলেই কেবলমাত্র আমরা দেখতে পাই, তাহলে দূরের পাহাড় বা আকাশের তারা খুব সহজেই দেখতে পারার কথা নয়। তারপর আলো যদি বাইরে থেকে চোখেই প্রতিফলিত হবে, তাহলে আমাদের ভেতরের আলো বা অন্তরের আলোর আর দরকারই পড়বে না।

আলোর ধারণাকে গণিতের সাথে সম্পর্কিত করার প্রথম চেষ্টা ছিল ধর্মযাজক গ্রোস্তেস্ট এর লেখা ‘অন লাইট’ বা ‘দে লুচে’ বইয়ে। তিনিই প্রথম আলোর বস্তু-ধারণার জন্ম দেন। তারপর আলো নিয়ে মানুষের ধারণার বিশাল পরিবর্তন হয় মধ্য যুগে গ্যালিলিও গ্যালিলির গবেষণার মাধ্যমে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান সেগুলো পাথুরে গোলাকার বস্তু ছাড়া আর কিছু নয়, যেগুলোকে এর আগে মানুষ দেবতার নিখুঁত সৃষ্টি বা দেবতার চোখ বলে মনে করতো।

বিশেষ করে চাঁদ এবং সূর্যকে মানুষ নিখুঁত মনে করত। কিন্তু গ্যালিলিও দেখতে পান, চাঁদে বেশ কিছু গর্ত রয়েছে। একইভাবে সূর্যকে আপাতদৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের কালো দাগ মুক্ত মনে হলে আসলে তা নয়। এছাড়াও তৎকালীন ধারণা ছিল, পৃথিবীর চারপাশে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ঘুরছে। কিন্তু বৃহস্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান, সেই চাঁদগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ না করে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্যালিলিও আরও মনে করতেন, কোনো বস্তুকণাকে অতি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে থাকলে তা আলোক কণায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে নিউটনের প্রিজম পরীক্ষায় দেখা যায়, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের বর্ণালীতে বিভাজিত হচ্ছে। গ্যালিলিওর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিউটনও মনে করতেন, আলো হচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা যা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তার আকার অনুসারে আলাদা হয়েই রঙিন বর্ণালীর সৃষ্টি করছে।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফরাসী গণিতবিদ দেকার্ত মনে করতেন- আলো আর শব্দ একইরকম আচরণ করে। শব্দের যেমন গতি আছে, আলোরও গতি আছে। তিনি মনে করতেন আলোর গতি অসীম। আবার শব্দের চলতে যেমন মাধ্যম লাগে, আলোর চলতেও মাধ্যম লাগে এবং শব্দের মতো আলোও এক ধরনের তরঙ্গ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যম কী? এভাবেই ইথারের ধারণার জন্ম হয়।

আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায় আলোর অপবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারায়। দূরের কোনো আলোক উৎসকে আমরা যদি দেখি, তাহলে তার পাশে আলোকে অনেকটা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা দূরের কোনো ল্যাম্পপোস্ট এর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা এটা দেখতে পারব। ফরাসী প্রকৌশলী অগাস্টিন ফ্রেনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সমীকরণ সমাধান করে প’শন দেখান- আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব সত্যি হলে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে। পরবর্তীতে ফ্রেনেলেরই বন্ধু আর্গো ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। এতে করে আলোর তরঙ্গ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।

চিত্রঃ ল্যাম্পপোস্টে আলোর অপবর্তন।

পরবর্তী সময়ে ফ্যারাডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আলো মূলত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। এটি পূর্ণতা পায় ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে। কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের পর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ইথারের। মাইকেলসন-মর্লী’র পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার অস্তিত্বহীন বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা যা আলোর গতিতে চলছে, তার জন্যে সবকিছুই অতি নিকটে, তার কখনও দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। স্থান সংকোচনের কারণে দূরত্ব অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শুধুমাত্র আমরা যারা স্থির অবস্থায় আছি তাদের কাছেই সেগুলোকে দূরত্ব বলে মনে হয়। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফোটন থিওরী আলোর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গতত্ত্ব উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ আলো এমন কিছু যা একই সাথে কণা হিসেবে এবং তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ কর দেখান যে মহাকর্ষীয় বলের কারণে স্থান বেঁকে যায়। তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আলোও বিশাল মহাকর্ষীয় বস্তুর পাশে দিয়ে আসার সময় বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটনের পরীক্ষায় এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আলো ভারী কোনো নক্ষত্রের পাশে দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায়।

বর্তমানে আমরা আলোকে মনে করি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা একই সাথে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে। আলোর গতি সকল প্রসঙ্গ কাঠামোতে ধ্রুবক এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্থান বা সময় বদলে যায়, কিন্তু আলোর গতি? কখনোই নয়।

কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের কারসাজি

পৃথিবীপৃষ্ঠে বসিয়ে রাখা একটি রকেট নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কাল দীর্ঘায়নে মহাকর্ষের প্রভাব বুঝে ফেলা যায়। কিছুক্ষণ পরেই তা করতে যাচ্ছি আমরা। তবে তার আগে কিছু কথা বলে রাখা জরুরী।

এরিস্টটল মনে করতেন, স্থান ও কাল দুটোই পরম। কোনো ঘটনা কোথায় এবং কখন ঘটেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যবেক্ষক একমত হবেন। নিউটন এসে পরম স্থানের ধারণাকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এসে বিদায় দেন পরম সময়কেও। তবে পরম সময়ের কফিনে মাত্র একটি পেরেক ঠুকে তার মন ভরেনি। ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, আলোর কাছাকাছি বেগে গতিশীল অভিযাত্রীর সময় চলবে তুলনামূলকভাবে অনেক ধীরে। ১৯১৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন আরো যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। এটিই হলো মহাকর্ষের সর্বাধুনিক তত্ত্ব যাকে বলা হয় সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। অবশ্য উচ্চ গতির মতো মহাকর্ষও যে কাল দীর্ঘায়ন ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ১৯০৮ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধেই অনুমান করেন।

আপেক্ষিক তত্ত্বের দুই রূপেই একটি করে মৌলিক নীতি মেনে চলা হয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে সেটি হলো আপেক্ষিকতার মৌলিক স্বীকার্য। এর বক্তব্য হলো- মুক্তভাবে গতিশীল সকল পর্যবেক্ষকের কাছে বিজ্ঞানের সূত্রগুলো একই থাকবে। বেগ যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না। এখানে ত্বরণ সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের মৌলিক নীতিটি হলো সমতুল্যতার নীতি (Principle of equivalence)। এ নীতির বক্তব্য হলো- যথেষ্ট ক্ষুদ্র স্থানের অঞ্চলে অবস্থান করে এটি বলা সম্ভব নয় যে, আপনি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছেন, নাকি শূন্য স্থানে সুষম হারের ত্বরণ নিয়ে চলছেন।

এই গুরুগম্ভীর কথাটি বুঝতে অসুবিধা হলে সমস্যা নেই। বরং চলুন একটি উদাহরণ দেখি। মনে করুন, আপনি মহাশূন্যের মধ্যে এমন একটি লিফটে আছেন, যেখানে মহাকর্ষ বল অনুপস্থিত। ফলে এখানে উপর

বা নিচ বলতে কিছু নেই। আপনি মুক্তভাবে ভেসে আছেন। একটু পর লিফটটি সমত্বরণে চলা শুরু করলো। এখন কিন্তু হঠাৎ করে আপনি ওজন অনুভব করবেন। লিফটের এক প্রান্তের দিকে একটি টান অনুভব করবেন। এখন এ দিকটিকেই আপনার কাছে মেঝে বলে মনে হবে!

এখন হাত থেকে একটি আপেল ছেড়ে দিলে এটি মেঝের দিকে চলে যাবে। আসলে এখন আপনার মতোই লিফটের ভেতরের সব কিছুর ত্বরণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আসলে লিফটটি মোটেই গতিশীল নয়, বরং এটি একটি সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থিরাবস্থায় আছে। আইনস্টাইন বুঝতে পারলেন যে, ট্রেনের ভেতরে বসে যেমন আপনি বলতে পারেন না যে আপনি সমবেগে চলছেন নাকি চলছেন না, তেমনি লিফটের ভেতরে বসেও আপনি বুঝতে পারবেন না আপনি সুষম ত্বরণে চলছেন, নাকি কোনো সুষম মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছেন। আইনস্টাইনের এ চিন্তার ফলাফলই হলো সমতুল্যতার নীতি।

সমতুল্যতার নীতি এবং এর উপরের উদাহরণটি সত্য হলে বস্তুর জড় ভর ও মহাকর্ষীয় ভরকে অবশ্যই একই জিনিস হতে হবে। বল প্রয়োগের ফলে কতটুকু ত্বরণ হবে তা নির্ভর করে জড় ভরের ওপর। এই ভর নিয়েই বলা হয়েছে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রে। অন্য দিকে মহাকর্ষীয় ভরের কথা আছে নিউটনের মহাকর্ষীয় সূত্রে। আপনি কতটুকু মহাকর্ষীয় বল অনুভব করবেন তা নির্ভর করে এ ভরের ওপর।

সমতুল্যতার নীতি জানলাম। আইনস্টাইনের যুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এবার একটি থট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। থট এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে যে পরীক্ষা বাস্তবে করা যায় না, চিন্তা করে করে বুঝতে হয়। এখানের থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তন পরীক্ষা আমাদেরকে দেখাবে মহাকর্ষ সময়কে কীভাবে প্রভাবিত করে।

মহাশূন্যে অবস্থিত একটি রকেটের কথা চিন্তা করুন। সুবিধার জন্যে মনে করুন রকেটটি এত বড় যে এর শীর্ষ থেকে তলায় আলো পৌঁছতে এক সেকেন্ড লাগে, অর্থাৎ এর দৈর্ঘ্য ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। আরো মনে করুন, রকেটের সিলিং ও মেঝেতে একজন করে দর্শক আছেন। দুজনের কাছেই অবিকল একই রকম একটি করে ঘড়ি আছে যা প্রতি সেকেন্ডে একটি করে টিক দেয়।

মনে করুন, সিলিংয়ের দর্শক ঘড়ির টিকের অপেক্ষায় আছেন। টিক পেয়েই তিনি মেঝের দর্শকের দিকে একটি আলোক সঙ্কেত পাঠালেন। পরে ঘড়িটি আবারো টিক দিলে তিনি আরেকটি সঙ্কেত পাঠালেন। এ অবস্থায় প্রতিটি সঙ্কেত এক সেকেন্ড পর মেঝের দর্শকের কাছে পৌঁছায়। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যাবধানে দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত দুটি পাবে।

মহাশূন্যে মুক্তভাবে ভেসে না চলে রকেটটি যদি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টানের মধ্যে থাকতো তাহলে কী ঘটতো? নিউটনীয় তত্ত্বানুযায়ী এ ঘটনায় মহাকর্ষের কোনো হাত নেই। সিলিংয়ের দর্শক এক সেকেন্ডের ব্যবধানে সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শকও এক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পাবেন। কিন্তু সমতুল্যতার নীতি ভিন্ন কথা বলে। চলুন দেখা যাক নীতিটি কাজে লাগিয়ে আমরা মহাকর্ষের বদলে সুষম ত্বরণ নিয়ে চিন্তা করে কী পাই। নিজের মহাকর্ষ থিওরি তৈরি করতে আইনস্টাইন সমতুল্যতা নীতিকে যেভাবে কাজে লাগিয়েছেন এটি হলো তার একটি উদাহরণ।

মনে করুন রকেটটি ত্বরণ নিয়ে চলছে। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এর বেগ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আপাতত ধরে নিচ্ছি এর ত্বরণের মান ক্ষুদ্র, তা না হলে এটি আবার একসময় আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে! রকেটটি উপরের দিকে গতিশীল বলে প্রথম সঙ্কেতটিকে আগের চেয়ে (যখন রকেট স্থির ছিল) কম দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। কাজেই সঙ্কেতটি এখন এক সেকেন্ড পার হবার আগেই নীচে পৌঁছে যাবে। রকেটটি যদি নির্দিষ্ট বেগে (ত্বরণহীন) চলতো, তাহলে আগে-পরের সব সঙ্কেত এক সেকেন্ড পরপরই পৌঁছাতো। কিন্তু এখানে ত্বরণ আছে বলে দ্বিতীয় সঙ্কেতকে আরো কম দূরত্ব পার হতে হবে। ফলে এটি পৌঁছতেও আরো কম সময় লাগবে। কাজেই মেঝের দর্শক দুই সঙ্কেতের মাঝে সময় ব্যাবধান পাবেন এক সেকেন্ডের চেয়ে কম। অথচ সিলিং-এর দর্শক তা পাঠিয়েছেন ঠিক এক সেকেন্ড পরে। হয়ে গেলো সময়ের গরমিল।

ত্বরণপ্রাপ্ত রকেটের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত লাগছে না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে, সমতুল্যতার নীতি বলছে রকেটটি যদি কোনো মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও স্থির থাকে তবু একই ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ রকেটটি যদি ত্বরণপ্রাপ্ত না-ও হয় (যেমন ধরুন এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে উৎক্ষেপণের জন্যে বসিয়ে রাখা আছে) তাহলেও সিলিং এর দর্শক এক সেকেন্ড পর দুটি সঙ্কেত পাঠালে মেঝের দর্শক তা পাবেন এক সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যেই। এবার অদ্ভুত লাগছে, তাই না!

হয়তো মাথায় প্রশ্ন আসবে, এর অর্থ তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে- মহাকর্ষ কি সময়কে বিকৃত করছে, নাকি ঘড়িকে অচল করে দিচ্ছে? ধরুন, মেঝের দর্শক উপরে উঠে সিলিংয়ের দর্শকের সাথে ঘড়ি মিলিয়ে নিলো। দেখা গেলো দুটো ঘড়ি অবিকল একই রকম। তারা এটিও নিশ্চিত যে, দুজনে এক সেকেন্ড বলতে সমান পরিমাণ সময়কেই বোঝেন। মেঝের দর্শকের ঘড়িতে কোনো ঝামেলা নেই। এটি যেখানেই থাকুক, তা তার স্থানীয় সময়ের প্রবাহই মাপবে। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদের বলছে, ভিন্ন বেগে চলা দর্শকের জন্য সময় ভিন্ন গতিতে চলে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব বলছে, একই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের গতি আলাদা। সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বানুসারে, মেঝের দর্শক এক সেকেন্ডের চেয়ে কম সময় পেয়েছেন, কারণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছে সময় অপেক্ষাকৃত ধীরে চলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্র শক্তিশালী হলে এ প্রভাবও হবে বেশি। নিউটনের গতি সূত্রের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছিল পরম স্থানের ধারণা। এবার আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম সময়কেও বিদায় জানিয়ে দিলো।

১৯৬২ সালে এই অনুমান একটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একটি ওয়াটার টাওয়ারের উপরে ও নীচে দুটি অতি সূক্ষ্ম ঘড়ি বসানো হয়। দেখা গেল নীচের ঘড়িটিতে (যেটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের বেশি কাছে আছে) সময় ধীরে চলছে, ঠিক সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমনটি অনুমান করেছিল তেমনই। এ প্রভাব খুব ক্ষুদ্র। সূর্যের পৃষ্ঠে রাখা কোনো ঘড়িও পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক মিনিট পার্থক্য দেখাবে। কিন্তু পৃথিবীর উপরের বিভিন্ন উচ্চতায় সময়ের এ ক্ষুদ্র পার্থক্যই বর্তমানে বাস্তব ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্যাটেলাইট থেকে আসা সঙ্কেতের মাধ্যমে আমাদের নেভিগেশন সিস্টেমকে ঠিক রাখার জন্যে এর প্রয়োজন হয়। এ প্রভাব উপেক্ষা করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবস্থান বের করলে ভুল হয়ে যাবে কয়েক মাইল!

সময়ের প্রবাহের পার্থক্য ধরা পড়ে আমাদের শরীরেও। এমন এক জোড়া যমজের কথা চিন্তা করুন, যাদের একজন বাস করছে পাহাড়ের চূড়ায় এবং আরেকজন সমুদ্র সমতলে। প্রথম জনের বয়স অপরজনের চেয়ে দ্রুত বাড়বে। দুজনে আবার দেখা করলে দেখা যাবে একজনের বয়স আরেকজনের চেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য যদিও খুব ক্ষুদ্র হবে, কিন্তু তারপরেও এটি একটি পার্থক্য। অন্যদিকে এদের একজন যদি আলোর কাছাকাছি গতিতে মহাকাশযানে করে দীর্ঘ ভ্রমণ করে ফিরে আসে তাহলে দেখা যাবে যমজের চেয়ে তার বয়স অনেক বেশি পরিমাণে কম হচ্ছে।

বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বে পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে অনেক বেশি বেগে ভ্রমণ করে এলে আপনার বয়স অপেক্ষাকৃত কম হবে। আর সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বে আপনি পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে দূরে অবস্থান করলে বয়স

দ্রুত বাড়বে। একটি প্রভাব আপাত দৃষ্টিতে আরেকটি থেকে উল্টোভাবে কাজ করে। অবশ্য বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব কার্যকর হবার জন্যে আপনাকে রকেটে চড়ে মহাশূন্যেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি পৃথিবীতেই একটি অসম্ভব দ্রুতগামী ট্রেনে চড়েও ভ্রমণ করেন, তবু ট্রেনের বাইরে থাকা আপনার বন্ধুর চেয়ে আপনার বয়স কম হবে।

একে বলা হয় টুইন প্যারাডক্স। তবে মাথার মধ্যে পরম সময়ের ধারণাকে স্থান দিলে তবেই একে প্যারাডক্স (পরস্পর বিরোধী বা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব ঘটনা) মনে হবে। আপেক্ষিক তত্ত্বে একক পরম সময় বলতে কিছু নেই। বরং প্রত্যেক দর্শক তার নিজের মতো করে সময় মাপেন। এটি মেনে নিলেই আর কোনো প্যারাডক্স থাকে না।

যে শব্দে পৃথিবী কেঁপেছিল বারবার

১৮৮৩ সালের ২৭ আগস্ট। ব্রিটিশ জাহাজ‘ নরহ্যামক্যাসেল’ তখন ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপপুঞ্জের মধ্যেকার সুন্দাপ্রণালী অতিক্রম করছিল। শান্ত আবহাওয়ায় জাহাজের সকালগুলো যেমন হয় তার ব্যতিক্রম ছিল না সেদিন। ঘণ্টা-ধ্বনির মাধ্যমে সকাল দশটা বেজেছে জানা গেল। একদল নাবিকের সাথে আরেক দলের লগ বই এবং সংক্ষিপ্ত কিছু কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে টহল বদলে গেল। সেইলিং মাস্টার তার একশিষ্যকে সঙ্গেকরে ক্যাপ্টেনের সাথে গতি পথ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন সেসময়। অন্যদিকে কোয়ার্টারমাস্টার গুদাম থেকে দুপুরেররান্নার রেশন পাচকদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। সারেং তার সকাল বেলার পরিদর্শন শেষে আয়েশ করে একটা চুরুট ধরিয়েছেন। কোথাও বিন্দুমাত্র বিপর্যয়ের আভাস নেই। জাহাজের নাবিকেরা যদি জানতো,কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই তাদের অর্ধেকের কানের পর্দা ফাটতে যাচ্ছে। তখনতারা কীকরতো?

চিত্রঃনরহ্যামক্যাসেলজাহাজ

তীব্র শব্দ । সাথেসাথে চারদিক আঁধার হয়ে এল। ধোঁয়া ও ছাইপূর্ণ আকাশে সূর্যেররং হয়েগেল সবুজাভ। নরহ্যামক্যাসেলের ক্যাপ্টেনের ডায়েরী থেকে জানাযায় তারা এতটাই ভীতহয়ে পড়েছিলেন যে, সেই পরিস্থিতিতে যেন মনেহয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। তো এমন গগণ বিদারী কিংবাকর্ণবিদারীশব্দের কারণ কী? কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, এই আগ্নেয়গিরিটি নরহ্যামকাসেল থেকে ৪০ মাইল দূরে ক্রাকাতোয়ানামের দ্বীপের বুকচিরে এততীব্রভাবে বিস্ফোরিত হয়েছিল যে ভেতরের গলিতকাদা, ছাই, গ্যাস ঘণ্টায় ১৬০০ মাইল বেগে ছুটে বের হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলী আকারে আকাশে ১৭ মাইল উচ্চতা ছুঁয়েছিল। এর ফলে সৃষ্টিহওয়া সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতাছিল ১০০ ফুট এবং ১৬৫ টি উপকূলবর্তী গ্রাম ও লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার তখনকার ঔপনিবেশিক শাসক ডাচদের সরকারি হিসেবে এই দূর্যোগে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে তা প্রায় দেড়লাখ। শব্দের কথা বলছিলাম, শব্দ প্রবাহিত হয় কম্পনের মাধ্যমে। তা বাতাস, পানি কিংবা লোহা যে মাধ্যমেই হোক।বাতাসে শব্দের তীব্রতা বায়ুরচাপের তারতম্যের মাধ্যমে ধরা যায়। ক্রাকাতোয়ার ১০০ মাইল দূরে‘ বাটাভিয়া গ্যাসওয়ার্ক’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের ব্যারোমিটারে তাৎক্ষণিক বায়ুচাপ বেড়েছিল পারদস্তম্ভে ২.৫ ইঞ্চি, যা তীব্রতায় রূপান্তরিত করলে পাওয়া যায় অকল্পনীয় প্রাবল্যের ১৭২ ডেসিবল!মানুষের ব্যথা সহ্যের সীমা ১৩০ ডেসিবল, আর আপনার যদি জেট প্লেনের কাছে দাড়িয়ে থাকার দূর্ভাগ্য হয় তাহলে অনুভব করবেন ১৫০ ডেসিবল ।

untitled-4

untitled-4

 

আপনি যখন স্বাভাবিক কথা বলেন অথবা গুনগুন করেন তখন চারপাশের বায়ুকণাগুলো এদিকওদিক নড়ে, অর্থাৎ আন্দোলিত হয়। এই আন্দোলনের ফলে খুব ছোট করে হলেও কোথাওচাপ বাড়ে, কোথাও কমে।চাপের তারতম্য ঢেউয়ের মতো করে ছড়িয়ে যায়। শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথেসাথে এই আন্দোলনের প্রাবল্য বাড়তে থাকে। তবেতার ও একটা সীমা আছে।একটা পর্যায়ে উচ্চ চাপের অঞ্চলের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বল্প চাপের অঞ্চলে চাপশূন্য হয়ে যায়। মানে যার চেয়ে কম আর সম্ভবনয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এই ঘটনাঘটে ১৯৪ ডেসিবেলে। তখন শব্দ শুধু বাতাসকে কাঁপায়ই না, বরং বাতাসকে সাথে নিয়ে ছুটতে থাকে এবং এর ফলে সৃষ্টি হয় শক ওয়েভ।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

ক্রাকাতোয়ার কাছে বিস্ফোরণের  শব্দ নিশ্চয়ই  এই  সীমার উপরে ছিল। এর ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ৪০ মাইল দূরের জাহাজের নাবিকদের কানের পর্দা ফেটে যায়। হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে যখন শব্দ পৌঁছালো অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারত মহাসাগরে তখন এর তীব্রতা হ্রাস পেয়ে দূরবর্তী গুলির আওয়াজের মত শোনা গেল। তিনহাজার মাইল পাড়িদেবার পর শব্দটি আর মানুষের শ্রবণ সীমায় রইলোনা।  কিন্তু এর ভ্রমণ তখনো চলছে, কয়েক দিন যাবৎ বায়ুমণ্ডলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের শ্রবণসীমার নিচ দিয়ে ,যা শুধু মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই টের পাওয়া গিয়েছিল।

চিত্রঃক্রাকাতোয়ারস্যাটেলাইটছবি

১৮৮৩ সালে বিভিন্ন শহরে আবহাওয়া অফিসে ব্যারোমিটার ব্যবহার করে বায়ুচাপের রেকর্ড রাখা হতো। ক্রাকাতোয়ার বিস্ফোরণের ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট পরে কলকাতার আবহাওয়া অফিসে অপ্রত্যাশিত বায়ুচাপ বৃদ্ধি রেকর্ড হয়। ৮ ঘণ্টা পর একই ঘটনা ঘটে ক্রাকাতোয়ার পূর্বে মরিশাস আর পশ্চিমে মেলবোর্ন এবং সিডনিতে। সেন্টপিটার্সবার্গ আকস্মিক পালসটি শনাক্ত করে ১২ ঘণ্টা পর। ১৮ ঘণ্টার মাথায় পালসটি পৌঁছে যায় নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন এবং টরন্টোতে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এটাই যে, পরবর্তী প্রায় ৫ দিন যাবতসারা পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি আবহাওয়া অফিস থেকে এ অভূতপূর্ব পালসটি টের পাওয়া যায় ৩৪ ঘণ্টা পরপর। আর পৃথিবীর ব্যাস(২৪,৯০১মাইল) অতিক্রম করতে শব্দের(ঘণ্টায়৭৬১মাইলবেগে) কত সময় লাগতে পারে? প্রায় ৩৪ ঘণ্টা। উৎপত্তিস্থল ক্রাকাতোয়া থেকে এই চাপীয়ঢেউ সকল দিকে পৃথিবীকে তিন থেকে চারবার প্রদক্ষিণ করে। কিছু শহরের আবহাওয়া অফিসে সর্বোচ্চ সাতবার পর্যন্ত পালস রেকর্ড করা হয়েছিল। শুধুতা-ইনয়, ভারত, ইংল্যান্ড এমন কি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেস ইংল্যান্ড এমনকি স্যানফ্রান্সিসকোতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা পালসের সাথেসাথে বেড়ে গিয়েছিল। অবস্থা এমন যে, শব্দটা শোনা যাচ্ছিলনা কিন্তু তবুও তা দেশদেশান্তর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। মানুষ তখন তার নাম দিয়েছিল ‘The great air wave’। কিন্তু ক্রাকাতোয়ার পরিণতি কী হলো? উদগিরণ শেষ হতেহতে এই দ্বীপটির মাত্র একতৃতীয়াংশ সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ছিল। ক্রাকাতোয়ার উত্তরে যেখানে সমুদ্রের গভীরতা ছিল ৩৬ মিটার সেখানে অগ্নুৎপাত থেকে ছুটে আসাডাক্টাইট, রায়োলাইট প্রভৃতিশিলা এবং ছাইয়ে পূর্ণ নতুন একটি দ্বীপ তৈরি হয়েছিল। ক্রাকাতোয়ার অগ্নুৎপাত এখনো সক্রিয়। আঞ্চলিক ভাষায় এর অবশিষ্টাংশের নাম দেয়া হয়েছে Anak Krakatau অর্থাৎ ক্রাকাতোয়ার সন্তান। এর থেকে সারাক্ষণই উদ্‌গিরণ চলছে তবে দুই/এক বছর পরপর যখন ভুস-ভাস বেড়ে যায় তখন লোকের নজরে আসে কিংবা খবরে প্রচার করা হয়।