ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ঘুমের জন্য ক্ষতিকর

তথ্য ও যোগাযোগ বিপ্লবের দুনিয়ায় ২৪ ঘন্টা উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া বেশ বড়সড় সুযোগ। কিন্তু এ সুযোগের অপর পিঠে অনেক কিছু বিসর্জনেরও ব্যাপার জড়িত। নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আধুনিক যুগের জনজীবনে ঘুমের একটি ক্ষতিকারক। নিদ্রাহীনতা এবং নিম্নমানের ঘুমের সাথে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। বিছানায় যাবার নিকট সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবহার এই সমস্যার দিকে সহজে ঠেলে দেয়।

আধুনিক যুগে এসে অপর্যাপ্ত ঘুম খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ইতোমধ্যেই অপর্যাপ্ত ঘুম যে জনস্বাস্থ্য এবং জনগণের মানসিক দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব রাখছে তা স্পষ্ট। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু গবেষণার ফলাফলে তা উঠে এসেছে।

খারাপ খবর হল, এ সমস্যা দিন যত যাচ্ছে আগের চেয়েও গুরুতর হচ্ছে। বহু উন্নত দেশেও মানুষ কম ঘুমের সমস্যার সম্মুখীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ৭ থেকে ৯ ঘন্টার ঘুম দেয়ার সংকট দেখা দিচ্ছে। আর এই ঘুমের ঘাটতির সমস্যা বড় হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

যখন এ ঘুমহীনতা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, একই সাথে বেড়ে চলছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। আমাদের ঘুমের চক্র ভেঙে দিচ্ছে যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এখন পর্যন্ত খুব কমই প্রামাণ্য উপাত্ত রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে ঘুমের সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত দেখানোর ক্ষেত্রে।

ইন্টারনেটের কাছে নাচের পুতুল হয়ে গেলেন না তো? | Image Source: salon.com

ঘুম এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের মধ্যকার সম্পর্ক ও প্রভাব নির্ণয় করতে জার্মান একদল বিজ্ঞানী তাদের দেশের মানুষের উপর একটি জনজরিপ পরিচালনা করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে তুলন্নামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে ঘুমের  সাথে কতটা সম্পর্কিত সেদিকটা খেয়াল রেখে। গবেষণা থেকে উঠে এসেছে যে, যারা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকেন তারা অন্যান্যদের তুলনায় গড়পড়তায় ২৫ মিনিট দেরীতে ঘুমিয়ে থাকেন। আরো উল্লেখ্য, এরা ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রতি খেয়াল রাখতে পারেন না। ফলশ্রুতিতে, ঘুম পরিপূর্ণ হয় না এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। উল্লেখ্য, ২৫ মিনিটের হিসেব একটি গড় মান। আপাতদৃষ্টে বেশ কম মনে হলেও অনেকের ক্ষেত্রেই আশংকার জন্য যথেষ্ঠ।

ইন্টারনেট এমনিতেই একটি বহুমুখী জগৎ। একে তো বহুমুখী, তার পরে আবার এ জগতের কোন শেষ নেই। আবার উচ্চগতির ইন্টারনেট সে বহুমুখী জগতের সবগুলো দুয়ার খুলে দেয়। ফলত, উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রলুদ্ধ করে অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে ভিডিও গেমস, ওয়েবে ঘোরাঘুরি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতে।

মোবাইলের ভিতর কী থাকে? সারাদিন পড়ে থাকে কেন? | Image Source: dailymail.co.uk

ইতিপূর্বের প্রতি প্রজন্মের জন্যই, প্রযুক্তির মোহের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ছিল। টিনেজারদের মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ভিডিও গেমস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার প্রবণতা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা গিয়েছে। তবে, বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের ব্যবহারকে ঘুমের সময়ের সাথে অধিক শক্তিশালীভাবে সম্পর্কিত পাওয়া গিয়েছে।

মিলানের বক্কোনি ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যা তত্ত্বের অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো বিল্লারি ব্যাখ্যা করেন, ব্যক্তি ডিজিটাল দুনিয়ার প্রলোভনে বিছানায় যেতে দেরী করায় ঘুম শুরু করতে দেরী হচ্ছে। যাদের দেরীতে ওঠার সুযোগ নেই তারা সেই ক্ষতিপূরণও করতে পারছে না সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠে। ফলত, ঘুমের দৈর্ঘ্য প্রয়োজনীয় মাত্রার আগেই কেটে যাচ্ছে।

মোটের উপর, গবেষণার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছ থেকে যারা রাতে ঘুমের আগে ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করে থাকে। ফলে সর্বসাধারণের জন্য বিষয়ভিত্তিকভাবে এ তথ্য পরিবেশন করা  যাচ্ছে না।

গবেষণাটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এই মুদ্রার অপর পিঠের অবাক করা ব্যাপার হল টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপরও তথ্য সীমিত। অর্থাৎ ঘুমের আচরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার তথ্যের ফারাক রয়েছে। কারণ, ঘুমের চাহিদার বয়সভেদে ভিন্ন, আবার বয়সভেদে ইন্টারনেট আসক্তির ধরণও ভিন্ন। এর সাথে গবেষণা লক্ষ্য ধরে রেখে ইন্টারেনেটের কারণে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের বৃদ্ধির হার ও এই বহুমাত্রিক রাশির উর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের সাথে ব্যক্তির ঘুমের আচরণের পরিবর্তন যাচাই করতে হচ্ছে।

গবেষকরা ইন্টারনেট আসক্তির ভিত্তিতে টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপর গবেষণা করার আহবান জানাচ্ছেন। যেহেতু ইন্টারনেট জড়িত প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে, তাই এখন প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইন্টারনেটমুখী হয়ে উঠছে পণ্যের মধ্যে সেই ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রাখার দিক থেকে। একটি আরেকটির সম্পূরক হয়ে ক্রেতাকে ঠেলে দিচ্ছে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের দিকে।

ডিজিটাল দুনিয়ার ব্যস্ততা বাড়ছে যেমন হড়হড়িয়ে তেমনি প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সুস্থভাবে টিকে থাকতেও মানুষকে রাখতে হচ্ছে নানান দুনিয়ার খবর। ইন্টারনেটের কাছে যে স্বাস্থ্যের সতর্কতা রাখতে হবে এ আন্দাজ কেউ করেনি। তবে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে এবং একই সাথে আমাদের স্বাস্থ্য এবং কর্মদক্ষতার উপরও নজর রাখতে হচ্ছে।  প্রযুক্তিপণ্যের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির তথ্য যত বেশি পাওয়া যাবে তত সহজে সচেতনতার জন্য, সাবধানতার জন্য পদক্ষেপ নেয়া যাবে।

যন্ত্রের যন্ত্রণায় ঘুমকে বাঁচাতে যা করা যেতে পারে:

  • ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার সন্ধ্যায় সীমিত রাখা।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
  • বিভিন্ন কাজের মধ্যেঅগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে ডিভাইসে বুঁদ হয়ে না যাওয়া। এক্ষেত্রে বারবার সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ঢুঁ না মেরে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করা।
  • যন্ত্রের বাইরে জীবন উচ্ছ্বল– একথা মাথায় রাখা ও নিজের শরীর মনের সুস্বাস্থ্যের জন্য নিজেকে অনুপ্রাণিত করা। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে করতে দেরীতে ঘুমাতে যাবার চেয়ে বরং শীঘ্র ঘুমানোর নিয়ত করা যাতে সকালে উঠে ঢুঁ মেরে দেখে নেয়া যায়।
ইন্টারনেট যুগের সবচেয়ে ক্রমাগত ব্যক্তিগত সমস্যা সবদিকে মন গড়ানো। এটা মাথায় রাখুন, পৃথিবীর সব ঘটনা উপভোগ করার দরকার নেই, বরং সুস্থ থাকা উপভোগ করুন। আনন্দ সর্বোচ্চ উপভোগের জন্য সুস্থতা সবচেয়ে বড় শর্ত। | Image Source: gojessego.com

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইকোনমিক বিহেইভিওর এন্ড অর্গানাইজেশন গবেষণাপত্রে।

 

— ScienceAlert অবলম্বনে।

ত্বকের কোষ থেকে সন্তান উৎপাদন

বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বসে নেই। তারা নিত্যনতুন চিন্তা ভাবনা করে চলেছেন। বিজ্ঞানীদের নানা কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয় যা আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

প্রত্যেক জীবেরই প্রজনন হয়। প্রাণীদের ক্ষেত্রে সেই প্রজনন ঘটে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে। যৌনক্রিয়ার সময় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু মিলিত হয় এবং নিষেকের পর ভ্রূণ গঠিত হয়। সেই ভ্রূণ পরিণত হয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এটাই প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজননের সরল একটি বর্ণনা।

কিন্তু বিজ্ঞান তো এতটুকুতেই থেমে নেই। তারা মানবদেহের প্রজনন ক্রিয়া বোঝার জন্য অনরবত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার ফলস্বরূপ ১৯৯৭ সালে আমরা পেয়েছি ‘ডলি’কে। ডলি ভেড়ার কথা আমরা সবাই জানি। ডলির মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা প্রথম কোনো স্তন্যপায়ীকে ক্লোন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর আগে ব্যাঙের ক্লোন করা হয়েছিল।

ডলির ক্লোন করা ছিল প্রজনন বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশাল পদক্ষেপ। তারপর আমরা দেখেছি টেস্টটিউব শিশু। এখানে নারী ও পুরুষের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দেহের বাইরে মিলিত করা হয়। কিন্তু ত্বকের কোষ? এটি নিশ্চয় পরোক্ষ হোক আর প্রত্যক্ষ হোক প্রজননের মতো কোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যদি বলা হয় ত্বকের কোষ থেকে শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণু তৈরি সম্ভব তাহলে হতবাক হতেই হয়।

চিত্র: ল্যাবরেটরিতে তৈরি ডিম্বাণু

বিজ্ঞানী হাইয়াশি ইঁদুরের ত্বক কোষ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তা থেকে ইঁদুরের সন্তানের জন্ম হয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষেত্রেও এটি সম্ভব হবে। এমন অনেক দম্পতি আছেন যাদের সন্তান হয় না। অনেক সময় দেখা যায় পুরুষের শুক্রাণুতে সমস্যা রয়েছে। আবার অনেক সময় নারীর ডিম্বাণুতেও সমস্যা দেখা দেয়। আবার বয়স হয়ে গেলে নারীরা সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হয়ে যায়, কারণ তখন তাদের ডিম্বাণু তৈরি হয় না।

এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ল্যাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব। তাই তখন যেকোনো নারী অথবা পুরুষ শুধুমাত্র একটু রক্ত দিলেই তা থেকে তৈরি হতে পারে তাদের সন্তান। এমনকি যারা সমলিঙ্গ বিবাহিত তারাও তাদের জৈবিক সন্তান পেতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত মানুষের উপর এটি প্রয়োগ করা হয়নি।

হাইয়াশি এই পদ্ধতিটির মূল কঠামো পেয়েছিলেন ইয়ামানাকার গবেষণা থেকে। জাপানের কয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ামানাকা গবেষণা করে বের করেছিলেন কীভাবে যেকোনো কোষকে স্টেম কোষে রূপান্তরিত করা যায়। এ আবিষ্কারের জন্য তিনি ২০১২ সালে নোবেল পুরস্কার পান।

প্রথমে হাইয়াশি একটি পূর্ণবয়স্ক ইঁদুরের লেজ থেকে কোষ নেন। তারপর সেই কোষকে রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে মেশান। সেই রাসায়নিক দ্রব্যের সাথে থাকে চার ধরনের জিন। এগুলো ঐ কোষকে স্টেম কোষে পরিণত করে। স্টেম কোষ ডিম্বাণু তৈরিতে সক্ষম।

এই ডিম্বাণুকে পরিণত হিসেবে করার জন্য সঠিক পরিবেশ দরকার। বিজ্ঞানীরা এজন্য ডিম্বাণু তৈরিতে প্রস্তুত সেই স্টেম কোষকে জীবিত ইঁদুরের ডিম্বাশয়ে প্রবেশ করান। কিন্তু তাতে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ডিম্বাণুটি পুরোপুরি তৈরি করতে ডিম্বাশয়েরর উপর নির্ভর করইতে হচ্ছে। এবার তারা ইঁদুরেরে ডিম্বাশয়ের কোষ নিয়ে তা সেই স্টেম কোষটির সাথে রাখলেন যেন স্টেম কোষটি মনে করে সে ডিম্বাশয়ে আছে।

পাঁচ সপ্তাহে ডিম্বাণুটি পরিণত হলে এটিকে একটি স্বাভাবিক শুক্রাণুর সাথে মিলিত করেন। উৎপন্ন ভ্রূণ একটি ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করান। এই গবেষণায় আটটি ইঁদুর টিকে থাকে। পরবর্তীতে এই ইঁদুরগুলো নিজেরা বংশবৃদ্ধি করে।

চিত্র: কৃত্রিম ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেয়া ইঁদুর

আমেরিকার ১০% নারী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে অক্ষম। অনেকে তখন আইভিএফ তথা ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের শরণাপন্ন হন। আইভিএফকে আমরা সবাই টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি নামে চিনি। এই পদ্ধতিটি অনেক ব্যয়বহুল। এতে প্রায় ২০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে। তার উপর শতকরা ৬৫ ভাগ সময় এটি ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রীর যেকোনো একজনের জনন কোষ সুস্থ না থাকলে তখন শুক্রাণু কিংবা ডিম্বাণুদাতা খুঁজতে হয়। যা সকলে গ্রহণ করতে চান না। কারণ এতে যেকোনো একজন (পুরুষ কিংবা নারী) সন্তানটির জৈবিক অভিভাবক হওয়া থেকে বঞ্চিত হন।

কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে বাবা মা উভয়ই সন্তানের জৈবিক অভিভাবক হতে পারেন। এতে নারীদের কৃত্রিমভাবে হরমোন দেয়া হয় যেন তিনি পরিমাণে ডিম্বাণু তৈরি করে। তবে এই অতিরিক্ত হরমোন প্রদানে নারীদেহে কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হয় কিনা তা এখনো জানা যায়নি।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে এটি করা সহজ হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এত সহজ নয়। কারণ ইঁদুরের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে পাঁচ দিন। আর মানুষের ডিম্বাণু পরিণত হতে সময় লাগে ৩০ দিন। এতদিন ধরে ডিম্বাণুটিকে ঠিক রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রাইমেট নিয়ে গবেষণা করা শুরু করে দিয়েছেন। মারমোসেট বানর নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এই বানরের গর্ভ ধারণে ১৪০ দিন সময় লাগে। তবে এখন বানরের পরিবর্তে শুকরও ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ শুকরের ভ্রূণের গঠনের ধাপ মানুষের সাথে মিলে। আর শুকর বানরের চেয়ে সহজলভ্য ও সস্তা।

আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ডিম্বাণুকে পরিণত করার জন্য ডিম্বাশয়ের কোষ লাগে। বিজ্ঞানী হায়াসী চাইছেন ভিন্ন কিছু। যে কোষটি ডিম্বাণু পরিণত করার সিগন্যাল দেয় সেটিকে শনাক্ত করতে চাইছেন। স্টেম কোষ থেকে সেই কোষটি তৈরি করার পদ্ধতিও তিনি বের করতে চান। যেন ডিম্বাণু তৈরি থেকে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়াটি গবেষণাগারে সম্পন্ন করা যায়। কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন ডিম্বাণুগুলোকে গবেষণাগারে পরিণত করলে কিছু সমস্যা থেকে যাবে। এতে হয়তো দুর্বল শুক্রাণু তৈরি হতে পারে।

চিত্র: সবকিছু সম্পূর্ণরূপে গবেষণাগারে তৈরি করলে দেখা দিতে পারে সমস্যা।

শুক্রাণু তৈরিতে সক্ষম স্টেম সেলকে সরাসরিই যদি শুক্রাশয়ে স্থানান্তর করা যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের প্রজননের সময় যে শুক্রাণুগুলো সুস্থ শুধু সেগুলোই নির্বাচিত হয় এবং নিষিক্ত হয়। গবেষণাগারে অযোগ্য শুক্রাণু দ্বারা নিষেক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তারা কৃত্রিমভাবে তৈরি শুক্রাণু শুক্রাশয়ে স্থাপনের পক্ষপাতী।

অনেকে এই কৃত্রিম ডিম্বাণু ও শুক্রাণু তৈরিতে সম্মতি দেন না। কারণ এতে বিকলাঙ্গ ও দুর্বল সন্তান জন্ম নিতে পারে। শিশু হয়তো পরবর্তীতে জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এতে মূল্যবোধজনিত কিছু সমস্যাও থেকে যায়। কারণ এই পদ্ধতিতে যেকোনো ব্যক্তির কোষ নিয়ে তার সম্মতি ছাড়াই সন্তান তৈরি করা যায়। নিজের অজান্তেই মানুষ হয়ে যেতে পারে সন্তানের পিতা-মাতা।

এভাবে অতি সহজে মানুষ তৈরি মানুষের জীবনের গুরুত্ব কমিয়ে দিবে। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান কমে যেতে পারে সহজে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো এতে একজন মানুষের কোষ থেকেই শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করে সন্তান তৈরি করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সে সন্তানের মা ও বাবা একজনই হবে।

এসব দিক চিন্তা করে ভ্রূণ গবেষণায় টাকার অনুদান কমিয়ে দেয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওবামা প্রশাসন এটাকে সামান্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এটিকে আবারো কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে দেশ ভেদেও গবেষণা নির্ভর করে। যেমন জাপানে ভ্রূণ নিয়ে গবেষণা নিষেধ। কিন্তু ইজারাইলে এ নিয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই বরং এতে উৎসাহ দেয়া হয়।

তবে এই গবেষণার ভালো ফলগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সন্তান জন্মদানে অক্ষম স্বামী-স্ত্রী এই পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান লাভ করতে পারে। আবার এপিজেনেটিক্সে পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি নানা রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। বিলুপ্ত প্রায় প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। \

তাই সকল পক্ষের সাথে বসে এই গবেষণা নিয়ে গভীর আলোচনা করা দরকার। এই গবেষণার সুফল যেন আমরা ভোগ করতে পারি এবং এর খারাপ দিক থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারি, এগুলোই যেন হয় এ সংক্রান্ত গবেষণার ভবিষ্যৎ।

তথ্যসূত্র

সায়েন্টিফিক আমেরিকান, মার্চ ২০১৮

featured image: truthpraiseandhelp.wordpress.com

প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্ক কি সত্যিই নতুন নিউরন তৈরি করতে পারে?

গত বিশ বছর যাবৎ ধারণা করা হচ্ছে একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষের মস্তিষ্ক অসংখ্য নতুন নিউরন বা কোষ তৈরি করতে পারে, আর এই ধারনাটিই মানুষকে আশা জাগাচ্ছে যে কৃত্রিম উপায়ে কোষ উৎপাদন সম্ভব। স্নায়ুবিজ্ঞানের উন্নতি , নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির জন্য গবেষকদের গবেষণা – এ সব কিছুই হতাশা বা অ্যালজেইমার ব্যাধি ( Alzheimer’s Disease)  এর মত অসুখ বিসুখের চিকিৎসা বা প্রতিরোধ করতে পারে।

কিন্তু নেচার (Nature)  জার্নালে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত গবেষণার কারণে উপরোক্ত আশাটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী নতুন নিউরন তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিপুর্ণ মানুষ হিসেবে ক্রমবিকাশ লাভের পর অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়েই কমতে শুরু করে এবং প্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়ার পর পুরোপুরিভাবে থেমে যায়।

হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেন, টরেন্টো, কানাডা এর স্নায়ুতত্ত্ববিদ Paul Frankland বলেন, “প্রাপ্ত বয়ষ্ক মানুষ এবং বানরের ব্রেইনে নতুন স্নায়ুকোষ খোঁজার গবেষণার ফলাফল অনেককেই হতাশ করবে”।

“নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রক্রিয়াটি কার্যগতভাবে আসলে খুবই দূর্বল”, বলেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী Rene Hen.

তবে সকলের মতেই এ গবেষণাগুলোতে আসলে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে। টিস্যুগুলো পরিক্ষানীরিক্ষা করার পদ্ধতি, রোগীর মানসিক অবস্থার ঘটনা কাহিনী, তাদের ব্রেইনে কোনো ধরনের প্রদাহ ছিল কিনা, এসবের দ্বারা হয়তো ব্যাখ্যা করা সম্ভব কেন গবেষকরা এখনো পুরোপুরিভাবে সফল হতে পারেননি।

 

সূত্রপাতঃ

নিউরন বা স্নায়ুকোষ সৃষ্টির প্রথম ঘটনা দেখা যায় ১৯৯৮ সালে। ক্যান্সার রোগীদের উপর জীবিত অবস্থাতেই একটি রাসায়নিক উপাদান ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। নাম ছিল- ব্রোমোডিঅক্সিইউরিডিন (Bromodeoxyuridine)। রাসায়নিকটি প্রয়োগের পর তাদের মস্থিষ্কে নতুন বিভাজিত কোষ দেখা যায়। মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে যেমন নতুন কোষগুলো ছড়ানো অবস্থায় থাকে এটা কিছুটা সেরকম। স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের Jonas Frisen’s ল্যাবের একটি গবেষণা এই বিষয়টি কে আর শক্তিশালী করে। ৫৫ জন রোগ্রাক্রান্ত মানুষের প্রত্যেকের ব্রেইন টিস্যুর প্রতিটি নিউরনের ‘কার্বন ডেটিং’ করা হয়। এ পদ্ধতিতে নিউরনের বয়স নির্ধারণ করার পর সিদ্ধান্তে আসা হয় ঐ মানুষগুলোর মস্তিষ্কের ডেন্টেট জাইরাস (Dentate gyrus)এ প্রায় ৭০০টি পুরাতন নিউরন নতুন নিউরন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

Arturo Alvarez-Buylla (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকো) ১৯৮০ সাল থেকে গবেষণা করছেন মস্তিষ্কের নতুন কোষ উৎপাদনের ক্ষমতার উপর। কিন্তু তিনিও সন্দেহপ্রবণ। তিনি দেখিয়েছিলেন (Rodent) বা নিচু শ্রেণীর তীক্ষ্ণ দাঁত বিশিষ্ট কিছু প্রাণীদের মস্তিষ্কে স্টেম সেল কীভাবে নতুন অংশ পুনরুৎপাদন করে। কিন্তু কার্বন ডেটিং এ প্রাপ্ত ফলাফল এটি প্রমাণ করে না যে, মানব মস্তিষ্কেও ঠিক একই বিষয়টিই ঘটে।

মানব মস্তিষ্কের বিষয়টির ক্ষেত্রে অনেক ধাপ রয়েছে। আবার অনেক ধাপে ধারণা করে নেওয়া হয়েছে এমন বিষয়ও রয়েছে। যার কারনে আসল ব্যাপারটিতে পৌঁছানোর আগে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

Buylla এবং তাঁর দল ৫ বছর ধরে ৫৯ জন মানুষের ব্রেইন টিস্যু সংগ্রহ করেন। যাদের কেউ বা মারা গিয়েছিলেন, কারও আবার বিভিন্ন বয়সে সার্জারি করে খিঁচুনীর জন্য দায়ী টিস্যু ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ মানুষগুলোর বয়স ছিল মোটামুটি জন্মের আগ থেকে শুরু করে ৭৭ বছর পর্যন্ত। নিউরনের পূর্ণতা প্রাপ্তির বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন থাকে, এগুলোকে স্পেসিফিক প্রোটিন নামেই ডাকা হয়ে থাকে। এই প্রোটিন গুলোকে চিহ্নিত করতে ফ্লুরোসেন্ট এন্টিবডি ব্যবহার করা হয়েছিল। আর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসা হয়েছিল কোনও লম্বা সহজ সরল আকৃতির বাচ্চা নিউরনকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।

[ইঁদুরের রেটিনায়  নতুন কোষ বিভাজন]

গবেষণাকারী এই দলটি দেখতে পেলেন, নবজাতকের ব্রেইনে একটি বড় সংখ্যায় জন্মদাতা কোষ অর্থাৎ প্রোজেনিটর সেল (progenitor cell) এবং স্টেম সেলের উপস্থিতি আছে। জন্মের সময় এই সংখ্যাটি মোটামুটি প্রতি মিলিমিটার ব্রেইন টিস্যুতে ১৬১৮টি নতুন নিউরন এরকম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কোষগুলো নতুন কোষ তৈরিতে অংশ নেয় না। এক থেকে সাত বছরের মধ্যে নতুন নিউরন সৃষ্টি প্রায় ২৩ শতাংশ কমে যায়। পূর্ণবয়ষ্ক হতে হতে নতুন নিউরনের জোগান প্রায় পুরোপুরিভাবেই থেমে যায়।

Alvarez-Buylla এর মতে, “অন্যরা এ নিয়ে কী দাবী করছে তা আমাদের দেখার বিষয় নয়”

অপরদিকে আবার Frisen এর মতে, এন্টিবডি মার্কার পদ্ধতিটি পুরোপুরিভাবে নির্ভরযোগ্য নয়, কারন এতে ব্যবহৃত ফ্লুরোসেন্স ফলাফলকে ঘোলাটে করে দিতে পারে। তিনি দাবী করেন এ পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য গবেষকেরা প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্রেইনে নতুন কোষ উৎপাদন দেখেছেন। Frankland এর মতে ,”এ তর্ক চলতেই থাকবে, আরো অনেক কিছু এখনো বাকি”।

 

 

অট্টহাসি রোগ ও অনিষ্টের রূপ

কখনো কখনো আমরা সবকিছু ভিন্ন চোখে দেখতে বাধ্য হই। তবে এটা মোটেও সহজ নয়। মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই আমরা প্রথম দর্শনে যা ভাবতে অভ্যস্ত হই তার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাই। প্রিয়নদের ব্যপারে ঠিক এরকমই ঘটেছে। প্রিয়ন এক ধরনের প্রোটিন। এদের আকার নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে বদলে যায়। ফলাফলে এরা মারাত্মক রোগের মূল কারণ হয়ে পড়ে। কোনো প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বদলে গেলে তা অনেক ব্যাধির কারণ হতে পারে। তাই প্রিয়ন-প্রোটিনের আকার বদলে গিয়ে রোগের কারণ হয়ে যাওয়াটা অণুপ্রাণবিজ্ঞানে নতুন কোনো ধারণা নয়। যে ধারণা নতুন তা হলো প্রোটিন নিজেই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ হতে পারে।

সংক্রমক বলতে একটি অস্তিত্বকে বোঝানো হয় যা কোনো জীব থেকে অন্য জীবে (বা এক কোষ থেকে অন্য কোষে) ছড়ানোর মাধ্যমে রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কোনো জীবে সংক্রমিত হওয়ার সময় নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এসময় বিভিন্ন কোষ মেরে ফেলে এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যেমন উদাহরণ টানা যায় মেনিনজাইটিস, ফ্লু কিংবা এইডস রোগের ক্ষেত্রে। তেমনি কিছু কিছু প্রিয়ন প্রোটিন আছে যাদের আকার বদলে গেলে সংক্রমণশীল হয়ে পড়ে। ফলে ভেড়ার স্ক্র্যাপি বা মানুষের ক্রুয়েটজফেল্ড-জ্যাকব রোগের মতো স্নায়ু্ক্ষয়জনিত অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এরা। সম্প্রতি এমন একটি প্রিয়ন আবিষ্কৃত হয়েছে যার স্বভাব ভিন্ন প্রকৃতির। এটি নিজের রূপ বদলাতে চায় না। এর নাম PrP V127

প্রচলিত মতের বিপরীতে প্রিয়ন (PrP) মাত্রই যে ক্ষতিকর এমনটা নয়। বিভিন্ন জীবে এরা প্রাকৃতিকভাবেই

বিরাজ করে (PrPc)– বিশেষত মগজে। কোষ দৃঢ়সংলগ্ন হয়ে লেগে থাকাতে আর কোষের ভেতরে সংকেত পরিবহনে এরা ভূমিকা পালন করে বলে ভাবা হয়। তবে ত্রিমাত্রিক গঠন ভুলভাবে ভাঁজ হয়ে গেলে (PrPSc) এরা অনিষ্টকারী হয়ে পড়ে। রূপের পরিবর্তনের কারণে কেন এরা নির্দোষ থেকে অনিষ্টকারীতে পরিণত হয় তা এখনো বোঝা যায়নি। হয়তো কোনো তাপগতীয় বাঁধ রয়েছে যার ফলে নির্দোষ ভাজ বদলে রূপটি অনিষ্টকারী রূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন নির্দোষ রূপে (PrPc) ফেরত যাবার জন্য দরকারী তাপ এতো বেশি যে অনিষ্টকারী রূপটি (PrPSc) এর নতুন আকৃতিতে আটকা পড়ে যায়। এ দুই আকৃতি এতটাই ভিন্ন যে তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। PrPc একদিকে আলফা হেলিক্সের প্যাঁচ দিয়ে পূর্ণ, অন্যদিকে PrPSc বিটা শিটের আস্তরনে স্ফীত।

এই গাঠনিক পার্থক্যটি লক্ষণীয় কারণ এদের অ্যামিনো এসিড অনুক্রমে (বা প্রোটিন সিকোয়েন্স) কোনো পরিবর্তন হয় না। ভুলভাবে ভাঁজ হওয়া প্রিয়ন তারপর জমা হতে থাকে। প্রথমে একটি PrPSc বীজ হিসেবে কাজ করে যা এই প্রিয়নের অনিষ্টকারী রূপটিকে স্থিতিশীল করে। এ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। একসময় ছোট ছোট অলিগোমার ফাইব্রিলের তন্তুতে রূপ নেয়, যারা পরে একে অপরে জড়ো হয়ে বৃহত্তর জমায়েতে পরিণত হয়। এ বৃহত্তর জমায়েত মস্তিষ্কে থোক তৈরি করে করে স্নায়ু ক্ষয়কে এগিয়ে নিতে থাকে।

প্রিয়ন প্রোটিন আবিষ্কারের বহু আগেই এর কারণে সৃষ্ট অসুখ সম্পর্কে জানা যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ মেষপালকরা তাদের মেরিনো জাতের ভেড়ায় অদ্ভূত আচরণ খেয়াল করেন।

চিত্রঃ PrPC প্রিয়নে চারটি প্যাঁচালো আলফা হেলিক্স দেখা যাচ্ছে (a)। এটি যখন PrPSc-তে রূপান্তরিত হয় তখন চারটি বিটা শিটের আস্তরণ তৈরি হয় (b)। দুইটির গঠনে ভিন্নতা লক্ষ্যণীয়।

ভেড়াগুলোর হাঁটার চাল বদলে যায়, চাটাচাটি বেড়ে যায় আর তীব্র চুলকানি দৃষ্টিগোচর হয়। এরা ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে বেড়ার গায়ে নিজেদের দেহ ঘষাতে। স্পানিশ রাখালরা এ রোগের নাম দিয়েছিল ‘স্ক্র্যাপি’। এর প্রায় দুইশ’ বছর পর জার্মান স্নায়ুবিদ এইচ.জি. ক্রুটজফেল্ড ও এ.এম. জ্যাকব এক ধরনের স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ চিহ্নিত করেন যার লক্ষণ ছিল স্ক্রাপির অনুরূপ। এ রোগের নাম দেয়া হয় ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (সিজেডি)। এই রোগটি ধীরগতির হলেও সময়ের সাথে সাথে অবস্থার অবনতি হতে থাকতো। এ ধরনের ধীরগতির অবনতির পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবলেন হয়তো কোনো ‘ঢিলা ভাইরাস’ এর পেছনে দায়ী।

১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ জৈবপদার্থবিদ জে.এস. গ্রিফিথ প্রস্তাব করলেন যে স্ক্র্যাপির পেছনে সম্ভবত প্রোটিন নির্মিত কোনোকিছু দায়ী। তবে সংক্রামক প্রতিনিধি হিসেবে প্রোটিন দায়ী এ মতামতটি সংশয়ের মুখে পড়ে। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মতটি উপেক্ষা করা হচ্ছিল। প্রোটিনরা যে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, বিশ বছর পর এই ধারণাটিকে পুনরিজ্জীবিত করেন আমেরিকান স্নায়ুবিদ এস.বি. প্রুশিনার ও সুইস অণুপ্রাণবিজ্ঞানী চার্লস উইসম্যান।

শেষ পর্যন্ত গত শতাব্দীর শেষ দিকে আর একবিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে বিশেষতঃ ম্যাড কাউ রোগের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে প্রোটিন নির্মিত সংক্রামক কণার ধারণাটি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। অবশ্য কয়েকজন বিজ্ঞানী এখনো এ বিষয়টিতে সন্দেহমুক্ত নন। তবে সম্প্রতি প্রিয়নের সূক্ষ্মতর প্রকারভেদ করা গেছে। মানুষে প্রিয়ন-ভিত্তিক ব্যাধির সংক্রমণ অত্যন্ত দূর্লভ। শুধুমাত্র টিস্যুকলা প্রতিস্থাপন, শল্যচিকিৎসার

অস্ত্র বা দূষিত মাংস-পণ্য থেকে প্রিয়নের সংক্রমণ হয়। যেমন এখন মানুষে প্রিয়নের ব্যাধিকে সংক্রমণশীল হিসেবে ধরা হয় না। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এ ব্যাধিকে ধরা হয় এমন শারিরীক বিপর্যয় হিসেবে যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে দলা তৈরি ও জমা হতে থাকে। এ প্রক্রিয়াটি অন্যান্য স্নায়ুক্ষয়ী রোগের অনুরূপ।

তবে অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী মাইকেল আলপের্স ১৯৬০-র দশকে কুরু নামক স্নায়ুক্ষয়ী প্রিয়ন রোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। পাপুয়া নিউগিনির ফোর নৃজাতিগোষ্ঠীর উপর মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে তিনি এ রোগের কথা জানতে পারেন। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করে অট্টাহাসি হাসা শুরু করতো। তাই ঐ জাতির মধ্যে এ রোগটি ‘অট্টহাসি রোগ’ নামে পরিচিত ছিল। কুরু শব্দটির আক্ষরিক অর্থই হলো ‘ঝাঁকানো’। পরবর্তীতে দেখা গেল আত্মীয়ের মৃত্যুর পর তার মাংস খাওয়া থেকে এ রোগটি ছড়ায়। ফোর নৃজাতিগোষ্ঠী সমাধিসংক্রান্ত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মৃতের মাংশ ও মগজ কাঁচা খাওয়া হতো।

এই মহামারীর শুরু হয়েছিল সম্ভবত ১৯০০-শতকের শুরুর দিকে যখন ঐ জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য CJD রোগের একটি ধরণে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে অবশ্য এখন এ রোগটি নেই। এ রোগে ২০০৫ সালে সর্বশেষ মৃত্যু হয়। বিস্ময়ের ব্যপার হলো পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু ব্যক্তি কুরু রোগে একেবারেই অপ্রভাবিত ছিল। তারা একধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছিল। দেখা গেল PrP V127 নামক PrP-র একটি ভিন্ন প্রকরণের কারণে এমনটা হচ্ছে। PrP V127 তে ১২৭ নম্বর অ্যমিনো এসিডে গ্লাইসিনের স্থলে ভ্যালিন স্থানান্তরিত হয়েছিল। ইঁদুরে জেনেটিক পরিবর্তন করে দেখা গেছে তাদের PrP V127 প্রিয়ন তৈরি হলে তা কুরু ও ধ্রুপদী CJD প্রিয়ন প্রতিরোধ করে। কিন্তু কীভাবে? PrP V127 রূপ বদলিয়ে PrP-র অনিষ্টকারী চেহারায় বদলায় না। ফলে এই প্রকরণ বহন করা ব্যক্তি স্নায়ুক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় না।

আরেকটি PrP প্রকরণের কথা জানা যায় যা বিক্ষিপ্ত CJD রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে মানুষকে রক্ষা করে। তবে এর কর্মকৌশল PrP V127 এর মতো নয়। বরং এটি প্রিয়ন উৎপাদন চলমান থাকা অবস্থায় প্রোটিন-প্রোটিন মিথষ্ক্রিয়া আটকে রাখে। কীভাবে PrP V127 প্রিয়নের রূপ-বদলানো প্রতিরোধ করে তা বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা প্রিয়নের রোগতত্ব ও উৎপাদনের প্রাণ-রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি উপলদ্ধি করতে পারবেন। এছাড়াও ঔষুধ তৈরিতেও এটি অন্তর্দৃষ্টি দেবে। স্বজাতিভক্ষণ নিষিদ্ধ করে দেয়ার ফলে ফোর জনগোষ্ঠি চলমান কুরু মহামারী থেকে বেঁচে যায়। তবে PrP V127 প্রকরণের উপস্থিতি এটাই নির্দেশ করে যে সময়ের সাথে সাথে কুরু-প্রতিরোধি ব্যক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকতো। এটা মহামারীর পাল্টা জবাব হিসেবে প্রাকৃতিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার মধ্যমেই হতো। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতির নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে।

তথ্যসূত্র

  • এক্সপ্যাসি প্রোটিন স্পটলাইটের ১৭৯ ইস্যু The shape of harm-র অনুবাদ। লেখকঃ ভিভিয়েন বেইলি গ্যারিস্টেন।
  • org/spotlight/back_issues/179/

রাত জাগা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি ১০ শতাংশ

যারা রাত জাগতে পছন্দ করেন আর সকাল হলে নিজেকে টেনেও বিছানা থেকে নামানো যায় না তাদের জন্য দুঃসংবাদ। রাতজাগা পাখিদের রয়েছে শীঘ্র মৃত্যুর ঝুঁকি, যাদের স্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিছানায় যাবার এবং সকাল সকাল জেগে ওঠার অভ্যাস রয়েছে তাদের তুলনায়। এ বিষয়ক গবেষণা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব সারে

এ গবেষণায় ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য নেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংক থেকে। সাড়ে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণের অধীন ছিল আর ফল হচ্ছে পেঁচার অনুসারীরা সকালের চড়ুইদের তুলনায় ১০ শতাংশ অধিক মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকে। গবেষণা নমুনায় এমন ৫০,০০০ লোক ছিল যারা মৃত্যুঝুঁকি, অন্যান্য রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছিল।

চোখের আলোয় রাতের অন্ধকার, রাত বাড়ে ঘুম কেড়ে; image source: Huffington Post

রাত জাগানিয়া ব্যক্তিরা যখন ভোর থেকে কাজ শুরু করা ব্যক্তির মত কাজ শুরু করেন তাদের ক্ষেত্রেও দৈহিক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানান এই গবেষণার সহদলনেতা ক্রিস্টেন নুটসন। তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক।

এই বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিপাকীয় ক্রিয়ার ত্রুটি এবং হৃদযন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যার হার বৃদ্ধির উপর। বলা যায়, প্রথমবারের মত ক্রিস্টেনের গবেষণাই ঘুমের অভ্যাসের ভিত্তিতে মৃত্যুহার নিয়ে কাজ করছে। এটি প্রকাশিত হয়েছে ক্রোনোবায়োলজি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে।

বিজ্ঞানীরা রাত জাগানিয়াদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। এরপরও মৃত্যু ঝুঁকির হার তাদের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত ছিল।

প্রশ্ন জনস্বাস্থ্যের বলে এটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে মন্তব্য  করেন ইউনিভার্সিটি অব সারে এর ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক ম্যালকম ভন শান্টজ। ঘুমের সাথে দেহঘড়ির ব্যাপার সম্পৃক্ত। যারা রাতে কাজ করেন তাদের জন্য তারা কিভাবে দিনের আলোর সাথে দেহঘড়ির মিল ঘটিয়ে কাজ করতে পারেন এ ব্যাপারে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব অন্তত রাতের কাজ পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে। ক্ষুদ্র সময় ও ব্যক্তির বিচারে হয়ত এটা আমাদের কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না, কিন্তু বড় স্কেলে তা জনজীবনের লাইফস্টাইল ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর।

নুটসনের মতে, হতে পারে যারা রাত জেগে থাকেন তাদের একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি রয়েছে যা তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মিলে না। মানসিক চাপ, ভুল সময়ে খাদ্য গ্রহণ, যথেষ্ঠ শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের অভাব, ঘুমের অভাব, একা রাত জাগা ইত্যাদি কারণে দেহঘড়ির গোলমাল লেগে থাকতে পারে। একা রাত জাগার ক্ষেত্রে মাদক, এলকোহল, এমনকি অধুনা ডিজিটাল আসক্তিও দায়ী। রাতের অন্ধকারকে সময় দেয়ার সাথে স্বাস্থ্য পরিপন্থী বহু আচরণ সম্পর্কিত।

আরো ভয়ংকর ব্যাপার হল রাত জাগাদের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুতর অসুস্থতার হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে: ডায়াবেটিস, মানসিক বৈকল্য এবং স্নায়বিক বৈকল্য।

রাত জাগুনিয়ারা কি ভোরের পাখি হতে পারে?

জিনতত্ত্ব এবং পরিবেশ সমান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আমরা কি রাতের না ভোরের পাখি হব। কী ধরনের হবে কোন ব্যক্তি এ ব্যাপারে উক্ত দুই বিষয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন লেখক প্রতিবেদন প্রকাশও করেছেন।

রাতের ঘুমের সাথে সমস্যার দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নয়। কিছু কিছুর উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সব নয়। ঘুমের অভ্যাসের সময়সূচি পরিবর্তনের একটি ভাল উপায় আলোতে সাড়া দেয়া। আলো বলতে অবশ্য দিনের আলোর কথাই বলা হচ্ছে। সকালে আলো ফোটার সাথে বিছানা ছেড়ে দেয়া এবং রাতের অন্ধকার গভীর হলে বিছানার সাথে নীরব হয়ে যাওয়ার শুরু করা যেতে পারে। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়মিত সময় মেনে ঘুম চর্চা করা। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা এবং পরবর্তী দিন যেন সময়টা পিছিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা।

নিয়মিত সময়ে ঘুম না হলে দিনের সময়সূচি খাপ খাবে না; image source: Phd Comics

নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে অভিযোজিত হতে হবে। আপনার কখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত এ ব্যাপারে নিজের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে, বদঅভ্যাসের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না।

সমাজও যেভাবে সহায়ক হতে পারে

আমরা যদি দেহঘড়ির ঘুমের এ ধরণের সময়সূচির ব্যাপার ধরতে পারি, অংশত, যাদের ক্ষেত্রে জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং অভ্যাসের বশে এমন হচ্ছে না তবে তাদের জন্য কাজকর্ম, চাকরির সময়সূচি নমনীয়তা হয়ত উপকারে আসবে। তাদের হয়ত সকাল ৮টার আগেই ঘুম ভাঙার জন্য চিন্তায় থাকতে হবে না। কাজের সময়বণ্টনের মাধ্যমে তাদের সে সুযোগ দেয়া যায়। কিছু মানুষ রাতেই কাজের সাথে বেশি মানিয়ে নিতে পারে।

ভবিষ্যত গবেষণায়, নুটসন এবং তার সহকর্মীরা রাত জাগুনিয়াদের নিয়ে একটি পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। তাদের দেহঘড়ি একটু এগিয়ে আসলে কেমন আচরণ করে তাই যাচাইয়ের লক্ষ্য। মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি— দৈহিক ও মানসিক উন্নতি, রক্তচাপ ইত্যাদির উপর বিশেষ নজর থাকবে।

দিনের আলো সংরক্ষণ কর্মসূচির একটি উপজাত সংকট; image source: someecards.com

দিনের আলোর ব্যবহার বাড়াতে শীতপ্রধান দেশগুলোতে যখন ডে-লাইট সেভিং কর্মসূচি চালু হয় অথবা যখন গ্রীষ্ম চলে দেখা গেছে তখন সাধারণভাবেই এ ধরনের লোকেদের অধিক সমস্যা হয়।

গ্রীষ্মকালীন সময়সূচির সময় ইতোমধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়ার প্রতিবেদন রয়েছে বলে জানান ভন শান্টজ। আমাদের আরো স্মরণে রাখা দরকার যে প্রতিবছর এই পরিবর্তন ছোট ঝুঁকি হলেও প্রভাবিত করছে ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে। তিনি মনে করেন এ ব্যাপারটি গুরুতরভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে যে এই সময়সূচির লাভ উক্ত ঝুঁকির চেয়েও বেশি কিনা।

যেভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে

এ গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব সারে এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একেক জন ব্যক্তির সকালের এবং রাতের কাজকর্মের ঝোঁকের সূত্র খুঁজেছেন। এর সাথে হিসেব করেছেন তাদের সম্যক অবস্থার সাথে মৃত্যুঝুঁকির হার। তারা যে ৪,৩৩,২৬৮ জন ব্যক্তির তথ্য নিয়েছেন তাদের সকলের বয়স ছিল ৩৮ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে এটা ভাগ করতে যে তারা ভোরের পাখি নাকি প্রায় রাতের পাখি নাকি ঘোরতর হুতুম পেঁচার দলে। নমুনা ব্যক্তিদের মৃত্যুর তথ্য সাড়ে ছয় বছর ধরে নেয়া হয়েছে।

গবেষণাটির সহায়তায় ছিল ইউনিভার্সিটি অব সারে ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড স্টাডিজ স্যান্টান্ডার ফেলোশিপ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিজ এন্ড ডাইজেস্টিভ এন্ড কিডনী ডিজিজ গ্র্যান্ট R01DK095207.

 

সায়েন্স ডেইলি অবলম্বনে।

দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ

দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন দুগ্ধজাত পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও মাখনের রঙ দুধ থেকে ভিন্ন হয়। মাখন কিছুটা হলদেটে হয় আর দুধ হয় ধবধবে সাদা। এক জাতীয় উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে রঙের ভিন্নতা দেখা যায় কেন?

দুধ বা মাখনের রঙের ভিন্নতা মূলত নির্ভর করে এদের মাঝে চর্বি বা ফ্যাট কী পরিমাণে আছে তার উপর। পরিমাণের পাশাপাশি চর্বি কী অবস্থায় আছে তার উপরও নির্ভর করে রঙ কেমন দেখাবে। গরু সাধারণত খাদ্য হিসেবে ঘাস, ঘাসের ফুল ও লতা-পাতা খায়। এসব ঘাস, লতা-পাতা ও ফুলের মাঝে ‘ক্যারোটিন’ নামে একধরনের হলুদ বর্ণ-কণিকা থাকে। ক্লোরোফিলের কারণে যেমন উদ্ভিদের পাতা সবুজ হয়, তেমনই ক্যারোটিনের কারণে পাতা বা ফুল হলুদ হয়। বয়স্ক হলুদ পাতার পাশাপাশি সবুজ পাতার মাঝেও অল্প পরিমাণে ক্যারোটিন উপস্থিত থাকে।

গরু যখন খাদ্য হিসেবে এসব ফুল-পাতা খায় তখন পাতার সাথে ক্যারোটিন চলে যায় উদরে। এই ক্যারোটিন পাওয়া যায় গরুর চর্বিতে। দুধেও স্বল্প পরিমাণ চর্বি থাকে এবং চর্বির সাথেও মিশে চলে যায় ক্যারোটিন নামের এই উপাদানটি। তবে দুধে এর রঙের প্রভাব দেখা যায় না। কারণ দুধের প্রায় সবটাই পানি, চর্বির পরিমাণ খুবই কম। সাকুল্যে চর্বি থাকে মাত্র ৩% থেকে ৪%। অন্যদিকে দুধ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপন্ন মাখনের মাঝে চর্বির উপস্থিতি প্রায় ৮০%। অধিক পরিমাণ চর্বির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এতে রঙের ভিন্নতা দেখা দিবে।

শুধু এটাই নয়। দুধ-মাখনের মাঝেও আছে পদার্থবিজ্ঞানের কারসাজি। দুধের মাঝে চর্বির বিন্দুগুলো (globule) একটি পাতলা পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে ক্যারোটিনগুলোও আবৃত হয়ে যায়। যখন আলোক রশ্মি এদের উপর এসে পড়ে তখন পর্দায় প্রতিফলিত হয়ে চলে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পর্দার রঙ দেখতে পাই, আড়ালে থাকা ক্যারোটিনের রঙ দেখতে পাই না। অন্যদিকে মাখন তৈরি করার সময় দুধকে প্রচুর নাড়াচাড়া করা হয়। ঘন ঘন নাড়ার ফলে দুধ থেকে মাখন বের হয়ে আসে। যখন তীব্রভাবে দ্রুত গতিতে নাড়াচাড়া করা হয় তখন চর্বি বা চর্বিগুচ্ছের আবরণকারী পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। পর্দা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যারোটিনের হলদেটে রঙ প্রতিফলিত হয়ে চোখে ধরা দেয় এবং আমরা মাখনকে কিছুটা হলুদাভ হিসেবে দেখতে পাই।

চিত্রঃ প্রচুর নাড়াচাড়া করে মাখন তৈরি করা হয়। ছবিঃ Survivopedia

হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ভেড়া বা ছাগল বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি মাখন সাদা রঙের হয়। এসব প্রাণীতে মাখন সাদা হবার কারণ হলো গরু যেভাবে শারীরিক প্রক্রিয়ায় বিটা ক্যারোটিন সংগ্রহ করে রাখতে পারে এরা সেভাবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে না। এদের শারীরিক প্রক্রিয়ায় এই বাড়তি সুবিধাটি নেই। তারা এর বদলে বিটা ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত করে ফেলে। ভিটামিন এ আবার বর্ণহীন, যার কারণে দুধ ও মাখনের রঙে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।

গরু যদি চারণভূমিতে পালন করা হয় তাহলে এর দুধ থেকে তৈরিকৃত মাখন অধিক হলুদাভ হয়। এসব চারণভূমিতে শীত ও গ্রীষ্মে পাতার মানের তারতম্য ঘটে, তাই শীত ও গ্রীষ্মের মাখনেও হলুদ রঙের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের বেলায় গরুর দুধের মাখন কম হলুদ হয়। অন্যদিকে যেসব গরু ফার্মে লালন-পালন করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে ঘাস-লতা-পাতা দেয়া না হয় তাহলে তাদের দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন প্রায় সাদাই হবে। কারণ তখন দুধে ক্যারোটিন থাকবে না। একারণেই বিদেশের দোকানগুলোতে সময়ে সময়ে মাখনের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।

তথ্যসূত্র

১. নিউ-ইয়র্ক টাইমস ওয়েল ব্লগ

২. কোরা (Quora) প্রশ্নোত্তর

সিরাজাম মুনির

ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়। সমস্ত পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এসব অপচয়ের পেছনে থাকবে চিকিৎসা সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস সহ আরো অনেক কিছু।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যখন এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সবসময় কাজ করবে। সে সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত সব

ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতো। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগগুলোকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারানো যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতো লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। যদি এরকম হয় (এরকম হবারই কথা) তাহলে তা মানুষের জন্য শতাব্দীর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

আগে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে যেসব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে করা যেত সেসব রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর অনেক স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে যৌন-বাহিত রোগ গনেরিয়া প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রকরণ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে, এই খবরটি অবশ্যই আশঙ্কাজনক। এমনকি সাধারণ ছোটখাটো সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সমগ্র বিশ্বে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদির মতো মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ, যেগুলো আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিল সেগুলো এখন একদমই অপ্রতিরোধ্য। কোনোভাবেই এদেরকে বশ মানানো যায় না। ফলে প্রতি বছর এসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। রোগগুলো দেখতে হয়তো ক্যানসার বা এইডসের মতো ভয়াবহ নায় কিন্তু তারপরেও অপ্রতিরোধ্য হবার কারণে কেড়ে নিচ্ছে প্রচুর মানুষের প্রাণ। ক্যানসার বা এইডস না হওয়াতে এগুলো মানুষের নজরও কেড়ে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণুগুলো। মূলত মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যেমন খুশি তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই যত্রতত্র ওষুধ ব্যবহারের

কারণে জীবাণুর এরকম শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বললে ব্যাপারটি এরকম- মনে করুন ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে। এর প্রতিকারের জন্য আপনি একধরনের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন। আপনার ডাক্তার বলেছিল যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে। চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে। ভালো দেখে আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন।

চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে আসলে সকল ব্যাকটেরিয়া মরেনি। যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ঐ ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। অর্থাৎ যে আঘাত আপনাকে মারতে পারে না সে আঘাত আপনাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে- এই প্রবাদের মতো। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে দেহের মতো কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ। কিন্তু একটি এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি জীবাণুর কয়েক দিন সময় লাগে মাত্র। ব্যবহারকারীরা যদি অসাবধান হয় এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে বিশ্বকে ক্ষুদ্র দানবের সৃষ্টি করে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ যে এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগেছিল, অনেক অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, অনেক অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছিল, সেখানে ব্যবহারকারীর অবহেলার কারণে এই মূল্যবান শ্রম, অর্থ ও সময়গুলো ভেস্তে যাচ্ছে এক নিমেষেই। এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে ‘সুপারবাগ’ (Superbugs) বলা হয়।

মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ‘মানব’ দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত। এসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বক পরিষ্কার রাখে এবং আরো অনেক উপকারী কাজ করে।

সমস্যা হচ্ছে যে, ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও। যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য নিউমোনিয়ার জীবাণুর পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে অন্ত্র বা পেটের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে। এরা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা সহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে মানুষ যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অনেকটাই জীবাণুদের দ্বারা নির্গত। বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল চক্রের মাধ্যমে তারা এই কাজটি করে।

চিত্রঃ ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতটা দরকারি। তাই টিকে থাকার জন্যই তাদেরকে আমাদের দরকার। সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী, এগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চাপের মুখে রাখে। যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মরে যায়। অথচ দেহের জন্য এরাই সবচেয়ে যোগ্য ওষুধ।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে। যেমন ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন। কিন্তু এসব সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় ‘শেষ’ হয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে আমরা এসব প্রাকৃতিক ওষুধের অধিকাংশই কোনো না কোনো ওষুধের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার।

অন্যান্য প্রাণীর মতো ব্যাকটেরিয়ার DNA-তেও বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময় এসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়। এগুলো তাদের অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক হয় না। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কোনো কোনোটি ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য শক্তি দান করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির সূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও সঞ্চালিত হয়।

চিত্রঃ ব্যাকটেরিয়া পরস্পরের সাথে ডিএনএ আদান প্রদান করতে পারে।

অনেকে ধারণা করতেন নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে। তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলেও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না। যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে প্রচুর সময় লাগে এবং অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দ্রুত তাই তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানিও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলেও সেটির বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কয়েক বছরের ভেতরেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক।

এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় (যেমন, কানাডা) সেসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানি কিছু একটা উপায় বের করে ওষুধ নামিয়ে ফেলবে, এরকম ভাবনায় আশা পেয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদেরকেই এর জন্য নেমে আসতে হবে। জীবাণুগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠেকাতে আমাদেরকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে। সতর্ক ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রমণের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিৎ। এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে। সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে ঠেকানোর উপায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক না নিয়ে এর বিকল্প চিকিৎসা নিতে হবে। যেমন ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের

(fecal matter transplants) মাধ্যমেও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী- এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, এন্টিবায়োটিক শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেহে ও আশেপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরো বেশি প্রতিরোধী করে তুলি। জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশের পরিবর্তে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। এগুলোও শিক্ষিত মননের সচেতনতার অংশ।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল বা এরকম দূরবর্তী স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এমন নয়, আমাদের আশেপাশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গরাজ্য। কারণ যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এসে মেশে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের যাপিত পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপ কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতেও এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি আছে। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় প্রায় ৬০ টিরও বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহর সংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রেও এইরকম হবে। চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলাশয়ে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। শুধু চীন নয়, ভারত, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি দেশ ও শহরে-ও কম বেশি একই অবস্থা। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারখানা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে কী করা হয় তা অনুসন্ধান ও প্রয়োজনে সমাধান করা জরুরি।

চিত্রঃ ওষুধ কোম্পানিগুলোর আশেপাশের এলাকা অনুসন্ধান জরুরী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম স্থান হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদী। অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বুড়িগঙ্গা আজ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অন্যতম স্থান। এছাড়া আমাদের দেশে যাবতীয় শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্জ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে মেশে নদী ও প্রবাহিত পানিতে। যেহেতু শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস নদী তাই এসব পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একবার আমাদের খাদ্য ও পানি চক্রে এইসব ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে গেলে

কিংবা এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের মাঝে সংক্রমিত হলে এর নির্মূল কঠিন হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, তাই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে। এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭ টি দেশের মধ্যে ২২ টি দেশেই (জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে। ভারতের অবস্থা-ও বেশ নাজুক, অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। যেহেতু অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো বাংলাদেশে এসব বিষয়ে উপাত্ত নেই তাই বাংলাদেশের অবস্থা কী তা সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারতের নাজুক অবস্থা তাই বলা চলে বাংলাদেশের অবস্থা-ও ভালো নয়।

চিত্রঃ বাংলাদেশের নদীগুলোও ব্যাপকভাবে ‘এন্টিবায়োটিক দূষিত’ হতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা প্রদান ও আলোচনা করলেও এসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এ ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।

অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

ডার্ক চকলেট বাড়াবে জীবনীশক্তি

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে ডার্ক চকলেট খেলে তা দৈনন্দিন জীবনে খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। এটি শরীরের বিভিন্ন ধকল এবং প্রদাহ কমায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও মন মেজাজ ভাল রাখতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডার্ক চকলেট থেকে কয়েক ধরনের শারীরিক উপকারিতা লাভ করা সম্ভব। 

সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি-২০১৮ এর একটি কনফারেন্সে এ সংক্রান্ত দুটি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, ডার্ক চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাকাও (Cacao) থাকে। প্রদাহ ও ধকল কমাতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ইত্যাদি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এই ক্যাকাও।

ফ্লাভোনয়েডস নামক একটি মূল্যবান খাদ্য উপাদানের প্রধান উৎস হলো ক্যাকাও। গবেষণায় জানা যায় বুদ্ধিবৃত্তি, রক্তসঞ্চালন, এমনকি দেহের বিভিন্ন নিঃসরনের ক্ষেত্রে ফ্লাভোনয়েডস ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

image source: dietitianrenupreet.com

সাইকোনিউরোইমিউনোলজি এবং ফুড সায়েন্সের গবেষক লি এস বার্ক উপরোক্ত গবেষণাগুলোতে প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। “কয়েক বছর ধরে আমরা নিউরনের উপর ডার্ক চকলেটের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে এসেছি” বলেন বার্ক। 

পরীক্ষাগুলো থেকে দেখা যায়, যত বেশি ক্যাকাও তত বেশি দেহের বুদ্ধি, স্মৃতি, মন মেজাজ ইত্যাদির উপর ভালো প্রভাব। ক্যাকাও-তে যে ফ্লাভোনয়েডস নামক পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায় তা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রদাহপ্রতিরোধকারী হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্ক এবং হৃৎপিণ্ডের জন্যও বেশ উপকারী।

এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলোজি- ২০১৮ এর কনফারেন্সে উপস্থাপিত কিছু ফলাফল এখানে তুলে ধরা হলো। 

(১)

কোষের প্রতিরক্ষা, স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং বিভিন্ন সংবেদনশীলতায় ভুমিকা রাখে

(২)

ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের EEG ক্ষমতা বাড়ায়। মস্তিষ্কে কতটা ইলেকট্রিক্যাল একটিভিটি উৎপন্ন হচ্ছে তা জানা যায় EEG পদ্ধতিতে। নতুন কিছু শেখা, কোনো কিছু মনে করা, সামঞ্জস্যতা, ধ্যান, মস্তিষ্কের নমনীয়তা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে এটি।

 

গবেষক বার্ক বলেন, এটি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। বিশেষ করে দেহের প্রতিরক্ষা এবং মস্তিষ্কের কার্যকরিতার উপর এটির কী প্রভাব ফেলে তা জানার জন্য, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপর পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। অধিক মাত্রায় ডার্ক চকলেট গ্রহণ করলে মস্তিষ্ক এবং আচরণের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা ফেললে তার প্রভাব কেমন হবে এটি এখন গবেষণা করে দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: sciencedaily

কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী মহামারী

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব গিয়েনার গ্রাম মিলেন্ডাও-তে দুই বছর বয়সী একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির নাম এমিল ওয়ামনো। প্রথমে তার জ্বর হয়। তারপর তীব্র বমি ও সাথে রক্ত আমাশয়। গ্রামে এ ধরনের রোগ কেউ আগে দেখেনি। শিশুটির পরিবারের লোকজন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শিশুটি মারা গেলো। তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল একটি ভাইরাস।

এই ভাইরাসটি তার পরিবারের মাঝেও ছড়িয়ে যায়। শীঘ্রই শিশুটির ৪ বছর বয়সী বোনটিও একই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। একই ঘটনা ঘটে ওয়ামনোর মা ও দাদীর সাথে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো তারা সবাই মারা গেছেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে।

যদি ভাইরাসটি আর না ছড়াতো তাহলে মিলেন্ডাও গ্রামের বাইরে আর কেউ এই পরিবারের করুণ পরিণতির কথা জানতো না। কারণ গিয়েনাতে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষই মারা যায়। কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সে সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ শতাংশ লোকই মারা যেতো।

ওয়ামনোর পরিবার থেকে এই ভাইরাস একজন নার্স ও গ্রামের একজন ধাত্রীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। ধাত্রীটিকে সেবা শুশ্রূষার জন্য তার গ্রামে নেয়া হলে সেখানও ভাইরাস ছড়িয়ে যায়। আর যারা এমিলি ওয়ামনোর দাদীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তারাও তাদের গ্রামে ভাইরাস নিয়ে গেলেন।

খুব দ্রুত ভাইরাসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে গেলো। কারণ মিলেন্ডাও গ্রাম গিয়েনা, সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। আর মিলেন্ডাওয়ে সবাই ব্যবসা কিংবা আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আসতো। ভাইরাসটি তখনও কিছু কিছু গ্রামে ছড়াচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীর অতটা টনক নড়েনি এই ব্যাপারে। ২০১৪ সালের মার্চে গিয়েনার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ এই রোগের কারণ হিসেবে ইবোলা ভাইরাসের নাম ঘোষণা করলেন। তখন সারা পৃথিবী এই রোগের ভয়াবহতা ব্যাপারে জানতে পারলো।

কিছু ভাইরাস আমাদের পূর্ব শত্রু। রাইনো ভাইরাস প্রথম আক্রান্ত করেছে মিশরীয়দের। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাস দশ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের জিনোমে প্রবেশ করেছে। অন্য ভাইরাসরা তুলনামুলকভাবে নতুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এইচআইভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র এক শতক হলো। নতুন ভাইরাসরাও মহামারী সৃষ্টি করছে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হতে যাচ্ছে ইবোলা।

ইবোলা ভাইরাস তার ভয়ংকর যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে যায়রে নামক এক দূরবর্তী অঞ্চলে। আক্রান্ত লোকেরা জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বমি করে। কিছু রোগীর শরীরের সকল ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে থাকে। এমনকি চোখ থেকেও! একজন ডাক্তার এক মুমূর্ষু সন্ন্যাসিনীর রক্তের নমুনা নিয়ে কিনহাসাতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পিটার পাইয়ট নামের একজন ভাইরাসবিদ নমুনাগুলো ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সাপের আকৃতির কিছু ভাইরাস দেখতে পান।


চিত্র: ইবোলা ভাইরাস

সেই সময় বিজ্ঞানীরা সর্পাকৃতির আরেকটি ভাইরাস সম্বন্ধে জানতেন। ভাইরাসটির নাম মার্গবার্গ ভাইরাস। মার্গবার্গ ভাইরাসটির নাম এসেছে জার্মানির মার্গবার্গ শহর থেকে। ওই শহরের ল্যাব কর্মীরা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করার ফলে রক্তক্ষরণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাইয়ট বুঝতে পারেন তিনি যে ভাইরাসটি দেখেছেন তা মার্গবার্গ ভাইরাস নয়। বরং তার কোনো আত্মীয়।

পাইয়ট ও তার সহকর্মীরা ভাইরাসটির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জায়েরার গ্রাম ইয়ামবুকুতে চলে গেলেন। তারা একটা অতিথিশালা খুঁজে পেলেন যেখানে যাজক ও সন্ন্যাসিরা দড়ি দিয়ে সে জায়গাটুকু আলাদা করে রেখেছেন যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। দড়ি থেকে একটা সাইন ঝোলানো আছে যাতে লেখা “অনুগ্রহ করে থামুন। যে এই লাইন অতিক্রম করবে সে মারা যেতে পারে।”

পাইয়ট ও তার দল একটা সমীক্ষা করলেন। তারা বের করলেন কে কে আক্রান্ত হয়েছে এবং কখন হয়েছে। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা হামের মতো বাতাসে ছড়াচ্ছে না। বরং রোগীর শরীরের তরল পদার্থ দিয়ে তা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতাল যেগুলোতে একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে ওখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যেসব মানুষ এসব রোগীর সেবা করছে কিংবা মৃত দেহের গোসলের কাজ করছে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাস ভয়ংকর হলেও এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা ছিল খুব সহজ। পাইয়ট ও তার দল হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিলেন। আর কেউ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখলেন। তিন মাস পরে মহামারী থামলো। ফলাফল ৩১৮ জনের মৃত্যু। পাইয়ট যদি এ উদ্যোগ না নিতেন তাহলে হয়তো মহামারীর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারতো। এখন বাকি রইলো ভাইরাসটিকে একটি নাম দেয়া। পাইয়ট পাশে বয়ে যাওয়া একটি নদীর দিকে তাকালেন। নদীর নাম ‘ইবোলা’।

চিত্র: ৪০ বছর আগে পিটার পাইয়ট আবিষ্কার করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস।

একই বছর সুদানেও ইবোলা দেখা দেয়। এতে ২৮৪ জন মারা যায়। তিন বছর পর সুদানে আবার ইবোলা দেখা দেয়। এবার মারা যায় ৩৪ জন। তারপর বছর পনেরোর জন্য ইবোলাকে আর দেখা যায়নি। ১৯৯৪ সালে এটি গেবনে আঘাত হানে। ফলাফাল ৫২ জনের মৃত্যু।

প্রতিবার ইবোলার এই আঘাতের সাথে পাইয়টের পরবর্তী বিজ্ঞানীরা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে লাগলেন। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত এবং বাকিদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে তারা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ করার চেষ্টা করতো। কারণ ওই সময় কোনো ভ্যাক্সিন বা অন্য কোনো ওষুধ ছিল না।

সঠিক পরিবেশ পেলে অনেক ভাইরাসই মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু হাম অথবা জলবসন্তের মতো রোগ একবার মহামারী হওয়ার মাধ্যমে হারিয়ে যায় না। এরা তখনও কম মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আলাদা। ইবোলার একবার মহামারী হলে অনেক বছর ধরে আর কোনো মহামারী হয় না। দীর্ঘ সময় পর সে তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবার হাজির হয়।

মাঝখানের বছরগুলোতে ইবোলা কোথায় হারিয়ে যায়? ভাইরাসবিদরা এই ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। তারা দেখলেন গরিলা ও শিম্পাঞ্জীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা বাদুড়েও ইবোলার বিরুদ্ধে এন্টিবডি পেলেন। কিন্তু বাদুর এই ভাইরাস সহ্য করতে পারে। এমন হতে পারে ইবোলা এমনিতে বাদুর থেকে বাদুরে ছড়ায় কোনো রোগ তৈরি ছাড়া। আর সময়ে সময়ে মানুষে মহামারী সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাস আমাদের কাছে নতুন হলেও এই ভাইরাস আসলে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরে ইবোলার মতো একটা ভাইরাসের জিন পেয়েছেন। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাসের মতো এই ভাইরাস তার পোষকের দেহে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে গিয়েছে। ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরের পূর্বপুরুষ বাস করতো আজ থেকে ষোল মিলিয়ন বছর আগে। আর তখনই হয়তো ইবোলা ভাইরাস তার নিকট আত্মীয় মার্গবার্গ ভাইরাস হতে বর্তমান রূপে অবতীর্ণ হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইবোলার বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস স্তন্যপায়ীদের আক্রান্ত করে আসছে। অনেক পোষকে তারা কোনো ক্ষতি করতো না। ওই পোষক থেকে অন্য প্রজাতির কোনো পোষকে গেলে হয়তো তা তার জন্য মারণরূপ ধারণ করতো। ইবোলার শেষ আশ্রয় মানুষ।

এমন হতে পারে মানুষ যখন আক্রান্ত পশুর মাংস খায় কিংবা বাদুরের লালা যুক্ত ফল খায় তখন সে ইবোলায় আক্রান্ত হয়। ইবোলা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষকে আক্রান্ত করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভয়াবহ ডাইরিয়া, বমি এবং অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়।

ইবোলা একজন মানুষকে আক্রান্ত করার পরে তা অন্য কারও কাছে ছড়াবে কি ছড়াবে না তা নির্ভর করে পাশের মানুষগুলো কাজকর্মের উপর। যদি তারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তাহলে তারাও ইবোলা দিয়ে আক্রান্ত হবে। ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ৩৭ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় প্রথম মহামারী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ইবোলা ভাইরাস হারিয়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রত্যেকেই হয়তো মারা গিয়েছিল।

গত ৩৭ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ সালে আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল ২২১ মিলিয়ন। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ বিলিয়নের উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়ানোই অনেক কঠিন ছিল। এখন বনজঙ্গল কেটে শহর হচ্ছে। বাড়ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর সাথে বাড়ছে ইবোলার সংক্রমণ।

কিন্তু গিয়েনা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনি এর মতো দেশে গণস্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর দারিদ্রের ফলে এসব দেশে ডাক্তার ও হাসপাতালের সংখ্যা কম। আর ইবোলায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরাও এতে আক্রান্ত হয়। ফলে মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব পড়ে।

চিত্র: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরাও ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের নাগরিক পলিনকে যিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কেউ জানে না এমিলি ওয়ামনো কীভাবে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু থেকে ছড়ানো ভাইরাসটিই ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী সৃষ্টি করে। দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে তাদেরকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পোলিও নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ইবোলাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিম আফ্রিকার সরকারগুলো ইবোলায় আক্রান্ত পুরো গ্রাম কিংবা এলাকাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকলো। কারণ তাদের আর কিছু করার ছিল না। আর অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

ইবোলা সর্বপ্রথম বাইরের দেশে যায় এরোপ্লেনের মাধ্যমে। একবার ইবোলায় আক্রান্ত এক কূটনীতিবিদ প্ল্যানে নাইজেরিয়া যান। ওখানে তার ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আরেকটি প্ল্যানে একজন আক্রান্ত নার্সকে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আর দুইটি প্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাস আসে। একটা হোস্টনে আরেকটা নিউইয়র্কে।

আফ্রিকার বাইরের খুব কম মানুষ ইবোলা সম্বন্ধে জানতো। একটু আধটু যা জানতো তা রিচার্ড প্রেস্টনের ‘দ্য হট জোন’ এর মতো ভীতিকর বই কিংবা ‘আউটব্রেক’ নামের কাল্পনিক মুভি থেকে। পুরো আমেরিকা ইবোলার ভয়ে ভীত ছিল। ২০১৪ সালের নেয়া এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করে আমেরিকায় ইবোলার মহামারী হতে পারে। ৪৩ শতাংশ লোক মনে করেন তিনি ইবোলায় আক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে গেলো যে ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখ খবর এলো যে ডাক্তার গিয়েনাতে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন। রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে তিনি এক জায়গায় বোলিং করতে যান।

উদ্বিগ্ন পাঠকরা নিউইয়র্ক টাইমসকে জিজ্ঞেস করতে থাকে বল থেকে ইবোলা ছড়াতে পারে কিনা। সাংবাদিক ডোনাল্ড ম্যাকনিল জুনিয়র খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ইবোলায় আক্রান্ত কেউ যদি রক্ত, বমি কিংবা মল বলে রেখে যায় আর আরেকজন যদি তাতে হাত রাখে। পরে সেই হাত চোখে, নাকে কিংবা নাকে লাগায় তাহলে ইবোলা ছড়াতে পারে।”

এত আশঙ্কার পরেও আমেরিকাতে ইবোলার কোনো মহামারী হয়নি। এমনকি অন্য কোথাও হয়নি। নাইজেরিয়াতে ২০ জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে আটজন মারা যায়। সেনেগালে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়। মালিতে মহামারী বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এসব দেশ মহামারী ঠেকাতে সক্ষম হওয়ার একটা কারণ হলো তাদের কাছে আগে থেকে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল। অন্যদিকে লাইবেরিয়া, গিনিয়া এবং সিয়েরা লিওনিতে ইবোলার সংক্রমণ চলতে থাকে। এসব দেশে ইবোলার সংক্রমণ এতই বেশি যে সেখানে এতো সহজে তা থামার নয়।

বিশেষজ্ঞরা ইবোলার এই মাত্রা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ দশমিক ৪ মিলিয়নে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং কিউবা সেসব আক্রান্ত এলাকায় ডাক্তার ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

নতুন ইবোলা হাসপাতাল তৈরি হলো। গণস্বাস্থ্য কর্মীরা মানুষকে সচেতন করে দিলো যাতে তারা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সাবধানের সাথে দাফন করে। যাতে করে মৃত ব্যক্তি থেকে জীবাণু না ছড়ায়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে লাইবেরিয়া, গিনিয়াতে মহামারীর মাত্রা কমতে থাকে। পরের কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক কমে যায়।

তবে মনে করার কোনো কারণ নেই যে এই মহামারী শেষ হলেই ইবোলা চিরতরে বিদায় নেবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে যেখানে ইবোলা ভবিষ্যতে আঘাত হানতে পারে, কোন কোন প্রাণীতে এই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে আর ওই এলাকায় মানুষের বসবাসের অবস্থার তার উপর ভিত্তি করে এই ম্যাপটি করা হয়েছে।

এই ম্যাপের বেশিরভাগ অংশ মধ্য আফ্রিকা জুড়ে। আর বাকি অংশগুলো তানজানিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই ম্যাপ অনুসারে ২২ মিলিয়ন লোকের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আর আফ্রিকার লোক যত বাড়ছে এই ঝুকিও দিন দিন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিত্র: ইবোলা সংক্রমণের অনুমিত ম্যাপ।

ইবোলার মতো এরকম আরও অনেক ভাইরাস নানা সময় আবির্ভাব হয়েছে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের এক কৃষক অতিরিক্ত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে চীনের ওই অঞ্চলের লোক ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে থাকে। কিন্তু সবাই তখনো এই রোগ সম্বন্ধে জানতো না।

একবার এক আমেরিকান ব্যবসায়ী চীন থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে এরোপ্লেনে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্লেনটি হানই এ থামে এবং লোকটি মারা যায়। এই ঘটনার ফলে পুরো বিশ্বে নাড়া পড়ে। সারা পৃথিবী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় চীন ও হংকং। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ লোক মারা যায়। ডাক্তাররা এই নতুন রোগের নাম দেন সার্স (Severe acute respiratory syndrome)।

চিত্র: সার্স ভাইরাস।

বিজ্ঞানীরা এই রোগে আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলেন। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মালিক পেইরিস ও তার দল এই রোগের কারণ খুঁজে পান। এই ভাইরাসটি ছিল করোনাভাইরাস (Coronavirus) গ্রুপের। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করলেন এইচআইভি এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো সার্স ভাইরাসও হয়তো এমন কোনো ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়েছে যা কোনো পশুকে আক্রমণ করতো।

চীনের মানুষেরা যেসব পশুর সাথে সচরাচর বেশি সংস্পর্শে থাকে তাদের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এভাবে তারা সার্স ভাইরাসের বিবর্তন বৃক্ষ পেয়ে গেলেন। জানা হলো সার্স ভাইরাসের ইতিহাস।

এই ভাইরাস হয়তো প্রথমে চীনের বাদুড়ে পাওয়া যায়। বাদুড় থেকে বিড়াল সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘সিভিট’ (Civet)-এ ছড়ায়। সিভিট চীনের পশু বাজারে নিত্যদিন দেখা যায়। সিভিট থেকে এই ভাইরাস পরে মানুষে ছড়ায়। আর এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়াতে পারে। যেমন হাঁচি-কাশির মতো খুব সাধারণ ব্যাপার থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

ইবোলা সংক্রমণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল সার্সের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সেগুলো সফলও হয়। সার্সের ফলে ৯০০০ লোক এতে আক্রান্ত হয় এবং ৯০০ লোক মারা যায়। আর এরকম ফ্লু-তে আড়াই লাখ মানুষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। সার্স সে তুলনায় খুব অল্পতেই সেরে গিয়েছে বলা যায়।

এর এক যুগ পর আরেক ধরনের করোনাভাইরাস সৌদি আরবে দেখা যায়। ২০১২ সালে সৌদি আরবের ডাক্তাররা দেখতে পেলেন তাদের রোগীরা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা এই রোগ আসলে কী নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আক্রান্ত রোগীর এক তৃতীয়াংশ এই রোগে মারা যায়।

রোগটি MERS (Middle Eastern Respiratory Syndrome) নামে পরিচিত হয়। খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভাইরাসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ভাইরাসের জিনোমে সিকুয়েন্সিং করে তারা এর কাছাকাছি একটি ভাইরাস আফ্রিকার বাদুড়ের মধ্যে পেলেন।

আফ্রিকার বাদুড় থেকে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রোগ ছড়াতে পারে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। তারা সৌদি আরবের মানুষের জীবন যার উপর নির্ভর করে তাকে গবেষণা শুরু করলেন। আর তা হলো উট। তারা উটের সর্দিতে MERS ভাইরাস পেলেন।

এখন প্রশ্ন আসে আফ্রিকার বাদুড় হতে মধ্যপ্রাচ্যের উটে এই ভাইরাস কীভাবে আসলো? এর কেবল একটাই উত্তর হতে পারে। বাদুড় হতে উত্তর আফ্রিকার উটে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়ায়। আর উত্তর আফ্রিকা হতে মধ্যপ্রাচ্যে উট কেনাবেচা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে উত্তর আফ্রিকার আক্রান্ত কোনো উট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উটগুলো MERS ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

SARS থেকে MERS আরও অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৌদি আরবে প্রতি বছর দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ সারা পৃথিবী থেকে হজ্জ করতে আসে। তাই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য এটা খুব ভালো পরিবেশ।

মানুষগুলো তখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজের দেশে গেলে ওখানেও সেই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০২৬ জন লোক MERS এ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গিয়েছে ৩৭৬ জন। আর এই ঘটনাগুলো সবই সৌদি আরবের ভেতরে। সৌদি আরবের বাইরে এই ভাইরাস এখনো ছড়ায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই ভাইরাস শুধুমাত্র দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মানুষেই রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের জন্যে একটা হুমকির কারণ হতে পারে।

চিত্র: হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয়, যা মহামারীর জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হজযাত্রী এবং হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভাইরাসের মহামারীর ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরকে খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরবর্তী মহামারীর ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী হতে আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে। আমরা হয়তো সেই ভাইরাস সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্যে বিজ্ঞানীরা পশুর মধ্যকার ভাইরাস সমীক্ষা করছেন।

কিন্তু আমরা যেহেতু ভাইরাসের কিলবিল করা পৃথিবীতে বাস করি তাই এই কাজটা বেশ কঠিন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক শহরে ১৩৩টি ইঁদুর ধরেন এবং ১৮ ধরনের ভাইরাস পান যা মানুষে আক্রমণকারী জীবাণুর কাছাকাছি। আরেক গবেষণায় বাংলাদেশের এক প্রজাতির বাদুড়ের উপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায় বাদুড়ে পাওয়া ৫৫টি ভাইরাসের ৫০টি ভাইরাসই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা!

এই অজানা ভাইরাসের কোনো একটি থেকে হয়তো সামনে বড় ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। তার মানে এই না যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। ভাইরাসগুলো যাতে অন্য প্রাণী হতে আমাদের মধ্যে না ছড়াতে পারে সেজন্যে সব ধরনের ব্যবস্থা আমাদের নিয়ে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses, Carl Zimmer

featured image: sciencealert.com

বিভিন্ন ভিটামিনের নামকরণের বিচিত্র ইতিহাস

১৯১২ সালে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ঘোষণা করেন, তিনি লাল চাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি খাদ্য উপাদান আলাদা করেছেন। এই উপাদানটি ছিল মানুষের আবিষ্কৃত প্রথম ভিটামিন। ভিটামিনগুলো এমন পদার্থ যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত দরকারি কিন্ত আমাদের শরীর তা প্রস্তুত করতে পারে না। এরপর একশো বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, এবং গোটা কুড়ি ভিটামিনের নাম জানা গেছে।

কিন্ত এই নামগুলো বেশ অদ্ভুত। ভিটামিন এ, বি, সি আর ডি শুনতে প্রথমে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও যখন জানবেন আট রকম ভিন্ন ভিটামিন বি রয়েছে কিন্ত নাম আছে ভিটামিন বি১২ পর্যন্ত এবং এফ, জি, এইচ বাদ দিয়ে কে (K) ভিটামিন আছে, তবে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্ত এই নামগুলো এরকম কেন? প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ের মতো ভিটামিনের এই অদ্ভুত নামকরণের পেছনেও একটি বিচিত্র ইতিহাস আছে।

ভিটামিনের ধারণা প্রথম আসে ১৮৮১ সালে। রুশ সার্জন নিকোলাই লুনিন, জার্মান বিজ্ঞানী গুস্তাভ ফন বাঞ্জ এর অধীনে খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণা করার সময় লক্ষ্য করেন, যে সকল ইঁদুর দিনে দুধ পাচ্ছে তারা বেঁচে থাকলেও শর্করা, আমিষ, চর্বি এবং বিভিন্ন খনিজ পদার্থের কৃত্রিম মিশ্রণ খাওয়া ইঁদুর মারা যাচ্ছে। তাই তিনিই প্রথম বুঝতে পারেন প্রাকৃতিক খাদ্যে এসকল পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন অজানা পদার্থ আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। কিন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানী একই গবেষণা চালিয়ে ভিন্ন ফল পেলেন।

অন্যদিকে প্রায় কুড়ি বছর আগে ফরাসি রসায়নবিদ লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন, বিভিন্ন রোগের জন্য প্রকৃতপক্ষে আণুবীক্ষণিক জীব দায়ী। ডাচ চিকিৎসক ক্রিশ্চিয়ান আইকম্যান যখন জাভায় ১৮৯০ সালে বেরিবেরি রোগের কারণ খুঁজতে গিয়েছিলেন তখন তিনিও ধরে নিয়েছিলেন এই রোগের জন্য জীবাণুই দায়ী। কিন্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করেও তিনি কোনো জীবাণু পাননি।

অবশেষে ১৮৯৬ সালে লক্ষ্য করেন, তার গবেষণাগারে মুরগির বাচ্চার মধ্যে মড়ক লেগেছে। কিন্ত এই মড়ক অসুস্থ বাচ্চা থেকে সুস্থ বাচ্চার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, একদিন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, বাচ্চাদের রোগ আপনা আপনিই সেরে যাচ্ছে।

তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, হাসপাতালের বাবুর্চি রোগীদের পথ্যের জন্য রাখা সাদা চাল খাওয়াতে শুরু করেছিলেন বাচ্চাদের। সাদা চাল প্রদানের ফলে মড়কের সূচনা ঘটে আর এই কাজ বন্ধ করা মাত্র বাচ্চাদের অসুখ ভাল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি ভুলভাবে মনে করেছিলেন যে, উচ্চ মাত্রার শর্করার বিষক্রিয়ায় বেরিবেরি হয়।

এরপরে আইকম্যানের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তার গবেষণার দায়িত্ব পড়ে তার সহকারি গেহিত গ্রিঞ্জ এর উপর। ১৯০১ সালে লক্ষ্য করেন, শুধুমাত্র মাংস খাওয়ালেও মুরগীর বাচ্চাদের মধ্যে বেরিবেরি রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং লাল চাল খাওয়ালে তারা সুস্থ্য হয়ে উঠে। এই প্রথম তার মনে হলো খাবারের কোনো উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে।

এই উপলব্ধির পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এবার লাল চাল নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই উপাদানকে শনাক্ত করে পৃথক করা এবং কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এরই ফলশ্রুতিতে পোলিশ প্রাণরসায়নবিদ ক্যাসিমির ফাঙ্ক ১৯১২ সালে ঘোষণা করেন চালের লাল আবরণ থেকে তিনি এই সক্রিয় উপাদান পৃথক করেছেন। এতে অ্যামিন গ্রুপ বিদ্যমান আছে।

তিনি ধারণা করেন সম্পূর্ণ নতুন গ্রুপের অ্যামিন যৌগ তিনি আবিষ্কার করেছেন। এদের নাম দেন ভাইটাল অ্যামিন। এই Vital amine থেকে এসেছে vitamin (ভিটামিন)। প্রকৃতপক্ষে সব ধরনের ভিটামিনই অ্যামিন যৌগ নয়। আর তিনিও আসলে প্রকৃত উপাদানটি পৃথক করতে পারেননি। বেরিবেরি রোগটি হয় থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১ এর অভাবে। তিনি মূলত নিকোটিনিক এসিড বা ভিটামিন বি-৩ পৃথক করেছিলেন।

১৯৩৩ সালে রবার্ট রানেলস উইলিয়াম প্রায় ১২ শত কেজি লাল চাল থেকে মাত্র এক তুলা বা ১১.৬৬ গ্রাম বিশুদ্ধ থায়ামিন পৃথক করেন। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে মাত্র এক কণা থায়ামিন কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে জানা গেল সকল ভিটামিনে অ্যামিন গ্রুপ থাকে না এবং তাই বিজ্ঞানি জ্যাক সিসিল ড্রামোনডের প্রস্তাবনা অনুযায়ী vitamine নামটির পরিবর্তে vitamin ব্যবহার করা শুরু হল। e বাদ দিয়ে দিলেন, ফলে এটি আর অ্যামিনের প্রতিনিধিত্ব করে না।

ইতিমধ্যে ১৯১২ সালে ফ্রেডরিক হপকিন্স ইঁদুরের উপর কেসিন, লারড, সুক্রোজ, স্টার্চ এবং বিভিন্ন মিনারেল নিয়ে গবেষণা করে দেখান, যেসকল ইঁদুর এসব উপাদানের সাথে সামান্য পরিমাণ দুধ খায় তাদের বৃদ্ধি ভাল হয়। দুধ না খেলে ইঁদুরের ভর কমতে থাকে। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে আসেন দুধে সামান্য পরিমাণে অজানা জৈব যৌগ রয়েছে যেটি ছাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি এ বিষয় নিয়ে আর কাজ করেননি।

এরপরে ১৯১৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানি এলমার ম্যাককলাম মাখনের ফ্যাট থেকে একটি ভিটামিন পৃথক করেন এবং নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর এ’। পরে চালের লাল আবরণ থেকে পৃথক করা ভিটামিনের নাম রাখেন ‘ফ্যাক্টর বি’। তবে এসব যৌগকে ‘ভিটামিন এ’ এবং ‘ভিটামিন বি’ হিসেবে প্রথম নামকরণ করেন ম্যাককলামের অধীনে গবেষণারত স্নাতকোত্তর ছাত্রী কর্নেলিয়া কেনেডি। কিন্ত দুঃখজনকভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানী এমনকি ম্যাককলাম নিজেও এই নামকরণের কৃতিত্ব নিজের বলে দাবি করেছেন।

image source: india.com

যে উপাদানের অভাবে স্কার্ভি হয় তার নাম ‘ভিটামিন সি’ রাখার প্রস্তাব রাখা হয় ১৯১৯ সালে। কিন্ত এর পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন ভিটামিন এ এবং বি উভয়েই প্রকৃতপক্ষে একাধিক যৌগের মিশ্রণ। ম্যাককলাম ১৯২০ সালে ভিটামিন এ থেকে দুটি উপাদান পৃথক করেন। এদের মাঝে যেটি রাতকানা রোগের প্রতিরোধ করে তার নাম ‘ভিটামিন এ’ রেখে দেয়া হয়। আর অন্যটির নাম রাখা হয় ‘ভিটামিন ডি।

একই বছর বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ইস্ট থেকে পৃথককৃত ‘ভিটামিন বি’ একইসাথে বেরিবেরি এবং পেলাগ্রা প্রতিরোধ করে। কিন্ত এই উপাদানটিকে উত্তপ্ত করলে তা আর পেলাগ্রা প্রতিরোধ করতে পারে না। তার মানে ভিটামিন বি’তে প্রকৃতপক্ষে একাধিক উপাদান রয়েছে। তারা দুটি উপাদানকে পৃথক করতে সক্ষমও হন।

কেউ কেউ এগুলোকে ‘ভিটামিন এফ’ এবং ‘ভিটামিন জি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্ত বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই এদেরকে ‘ভিটামিন বি১’ এবং ‘ভিটামিন বি২’ নামে ডাকেন। কিন্ত ১৯২২ সালে তারা বুঝতে পারলেন ভিটামিন বি২ আসলে অনেকগুলো যৌগের মিশ্রণ। তাই তারা একে ‘ভিটামিন বি২ কমপ্লেক্স’ হিসেবে অভিহিত করেন।

১৯৩৩ সালে বিজ্ঞানী রিশার্ড খুন এবং ভাগনার এওয়ায়েগ এই কমপ্লেক্স থেকে রিবোফ্ল্যাভিন পৃথক করেন। এটিই ভিটামিন বি২। এটিই প্রথমে ভিটামিন জি নামে পরিচিত ছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে আর্নল্ড এলভিহেম নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) শনাক্ত করেন।

পিরিডক্সিন (ভিটামিন বি৬) ১৯৩৪ সালে এবং ফলিক এসিড (ভিটামিন বি৯) ১৯৪১ সালে আবিষ্কৃত হয়। মাঝে বিজ্ঞানীগণ ভিটামিন বি৪ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে করেন কিন্ত পরবর্তীতে দেখা যায় তা এডেনিন, কারটিনিন এবং কোলিনের মিশ্রণ। এদের কোনোটাই আমাদের খাবারের সাথে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। এজন্য ভিটামিন বি৪ বলে কিছু নেই। একই কারণে ভিটামিন বি৮, বি১০ এবং বি১১ এর অস্তিত্বও নেই।

১৯২২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক ডাক্তার হার্বার্ট ইভান্স এবং তার সহকারী ক্যাথেরিন বিশপ লেটুস পাতার লিপিড অংশ থেকে চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন ই আবিষ্কার করেন। ওদিকে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেনেট শিউর এক বছর আগেই এই ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তী দশ বছরে তারা আবিষ্কার করেন এই ভিটামিন আটটি ভিন্ন ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে আলফা, বিটা, গামা ও ডেলটা টকোফেরল এবং টকটোট্রাইইনল।

পরবর্তী ভিটামিন আবিষ্কার করেন জার্মান বিজ্ঞানীগণ। তারা এই বর্ণ-অনুক্রমিক ধারা মানতে রাজি হননি। এর বদলে তারা অন্য প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হন। যেহেতু এই ভিটামিন রক্ত জমাট বাঁধতে বা জার্মান ভাষায় koagulation করতে সহায়তা করে সেহেতু তারা একে ‘ভিটামিন কে’ নামে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য শুধুমাত্র ও, এক্স, ওয়াই এবং জেড এই চারটি অক্ষরের জন্যই কোনো ভিটামিনের নাম প্রস্তাব করা হয়নি।

featured image: gizmodo.com

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দেহের আভ্যন্তরীণ নীরব প্রতিরোধ ব্যবস্থা

আপনি কোথায় বাস করছেন তার উপর নির্ভর করে আপনার বাসস্থানের নিরাপত্তা কেমন হবে। বিভিন্নভাবে আপনার বাসস্থানকে নিরাপদ করতে পারেন। গ্রামগঞ্জের বাড়িগুলোর চারপাশ এখনো খোলামেলাই থাকে, অনেকে বেড়া তুলে দেয় কিংবা খুব বেশি হলে দেয়াল।

শহুরে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি। আপনার সামর্থ্য থাকলে ইলেকট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর এমনকি একজন এক্স-কমান্ডোকেও নিরাপত্তার জন্য ভাড়া পেতে পারেন। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর, ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।

আপনার দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। এই ব্যবস্থা নানা ধরনের বিপদ-আপদ থেকে আপনাকে সুরক্ষা দেয়। আপনার হাড় ও চামড়া দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে পিছলে পড়ে যাবার অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত কিংবা আচমকা উড়ে আসা ঢিল থেকে বাঁচায়। চোখের পাতা চোখকে ধূলাবালি এবং দুষ্ট ছেলেদের আঙ্গুল থেকে রক্ষা করে।

এছাড়াও দেহে আরো অনেক ব্যবস্থা আছে যা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে ও গোপনে। যা আপনি দেখেন না, অনুভবও করেন না। কিন্তু এটি আছে বলেই আপনি সুস্থ আছেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হন। এটা হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা Immune System। এই ব্যাবস্থাটিকেই বলা হয় ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’।

শুধুমাত্র একটি কারণেই আপনার দেহে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এর অনুপস্থিতিতে আপনার দেহ ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং বিভিন্ন পরজীবীর জন্য মনোরম জায়গায় পরিণত হতো। আপনার দেহ উষ্ণ, সিক্ত, পুষ্টিযুক্ত এবং জীবাণুর অন্যান্য বাসস্থানের তুলনার হাজারগুন আরামদায়ক। তবে যেসকল পরজীবী আপনার দেহে আশ্রয় নিয়েছে, তারা আপনারই খেয়ে পড়ে নিজেদের বংশ বিস্তার করে চলেছে তুমুল গতিতে।

তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার আশা করবেন? তা নিতান্তই মিছে। সত্যি বলতে এদের বেশিরভাগেরই কিছুই আসে যায় না আপনার কী হলো না হলো। অনেক জীবাণু আপনাকে অসুস্থ্ করে ফেলতে পারে। এমনকি মারাও যেতে পারেন। এরকম হলে তা অবশ্যই হবে আপনাকে নিয়ে প্রকৃতির পরিকল্পনার পরিপন্থী।

পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই জীবাণুরা ছিল। সৃষ্টির শুরুর দিকে আসলে সব জীবসত্ত্বাই ছিল এককোষী। এখনো আপনার আমার মতো বহুকোষী প্রাণের মচ্ছবের মধ্যেও ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকেরা এককোষী। অনেক অনেক আগে যখন এককোষী জীবসত্ত্বাগুলো বহুকোষীতে বিবর্তিত হয়ে প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের অস্তিত্বের রূপ নিলো তখন কিছু চতুর এককোষী তরুণ, পৃথিবীর প্রতিকূল আবাসে কষ্ট করে থাকা বাদ দিয়ে এসব বহুকোষীর দেহে ঢুকে পড়লো। তারা হয়ে গেল পরজীবী।

বহুকোষীদেরকে এই অবস্থায় চারপাশে ক্ষুদ্র ঘাতকে পরিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই বিবর্তিত হতে হয়েছে। সফলভাবে বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের লক্ষ্যে তাদের তৈরি করতে হয়েছে এমন ব্যবস্থা যা তাদের সুরক্ষা দেবে। মানুষ, গরু, ছাগল, গাছপালা সহ এই পৃথিবীর সব বহুকোষীকেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং এদের সকলেরই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে।

জীবাণুদের মারার জন্য বহুকোষীরা যখন বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কৌশল বের করছিল, জীবাণুরাও তখন চুপচাপ বসে থাকেনি। তারাও প্রত্যেকটি কৌশলকে ফাঁকি দেবার প্রতিকৌশল বের করেছিল। শুরু থেকেই এই মহাযুদ্ধ চলে এসেছে। এখনো চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

জীবাণুদের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এই মহাযুদ্ধে টিকে থাকতে তারা কিছু অসম সুবিধা ভোগ করে। একটি হচ্ছে বংশবৃদ্ধির গতি। বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো প্রাণের আকার। বিবর্তনের সময় প্রাণীদের আকার সাধারণত বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, কেউ যত বড় হবে অন্যের শিকার থেকে শিকারী হয়ে উঠার সম্ভাবনা তত বেড়ে যাবে।

তবে এটাও সত্য, কোনো প্রাণী যত বড় সেই প্রাণীকে বিকশিত হতে তত বেশি সময় লাগবে। একটা ব্যাকটেরিয়া যদি উষ্ণ পরিবেশ এবং পানি-পুষ্টি পায় তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে সে প্রজননে সক্ষম হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের জন্য সেটা সম্ভব হতে কয়েক বছর লেগে যাবে!

টিকে থাকার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশের প্রভাবে যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনগুলো ঘটে সেগুলো উৎপত্তি লাভ করে জীবের ডিএনএ’তে পরিব্যক্তি বা Mutation-এর ফলে। আর পরিব্যক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রজনন।

প্রতিবার কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ অনুলিপি তৈরি হয়। এই অনুলিপির প্রক্রিয়াটি বেশ দক্ষ। তবে ততটা দক্ষ নয় যে একেবারেই নির্ভুল অনুলিপি তৈরি হবে। বেশির ভাগ ভুলই ঠিক করে ফেলা হয়। কিছু কিছু ভুল ঠিক করে ফেলার কৌশলেও ভুল হয়। তাই মাঝে মাঝে কিছু ভুলও স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে প্রতি প্রজন্মেই কিছু ভিন্নতা ডিএনএ’র মধ্যে ঢুকে পড়ে। এই ভুল বা মিউটেশনগুলোই বিবর্তন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাঁচামাল।

কিন্তু এসবের সাথে এককোষী ও বহুকোষীর টিকে থাকার লড়াইয়ের সম্পর্ক কী? জীবাণুর ডিএনএ-তে কি প্রজন্মান্তরে ভুল হয় না? তা হয় কিন্তু জীবাণুরা তাদের বিবর্তনের জন্য দরকারী জিনগত পরিবর্তন আমাদের তুলনায় ট্রিলিয়ন ভাগ দ্রুত তৈরি করতে পারে।

মানুষের একটা নিষিক্ত ডিম্বাণু আর একটা ব্যাকটেরিয়াকে যদি উপযুক্ত পরিবেশে সংখ্যাবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামতে দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে ২ দিন পরও ডিম্বাণুর কোনো খোঁজ নেই কিন্তু ব্যাকটেরিয়াটি এতোই সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে যে তার অস্তিত্ব বুঝতে আর মাইক্রোস্কোপ লাগছে না, খালি চোখেই তার আলামতের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে।

জীবাণুদের এই অসম্ভব রকমের বংশবৃদ্ধি এবং পরিব্যক্তির গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বহুকোষীদের নিরাপত্তার জন্যই অনাক্রম্য ব্যবস্থার মতো চমৎকার প্রক্রিয়াটির জন্ম হয়েছে। এটা শুধু বর্তমানে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ানো জীবাণুদেরই চিনে ধ্বংস করতে পারে তা নয় বরং অদূর ভবিষ্যতে যেসবের উদ্ভব হতে পারে তাদের বিরুদ্ধেও কাজ করতে সদা প্রস্তুত।

আপনার দেহে জীবাণুরা প্রবেশ করলে একে বলা হয় সংক্রমণ (Infection)। সাধারণত সংক্রমণের ফলে সামান্য জ্বর আসে, পেটে গোলমাল হয়। বিশ্রাম নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা সেরে যায়। এটার জন্য আপনার অনাক্রম্য ব্যবস্থাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন। কিন্তু এতেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।

নিশ্চয়ই জানা আছে যে সবারই একবার করে জলবসন্ত হয় কিংবা প্রতি বছর এক-দুই বার করে স্বর্দি লাগে। কেন এসব বারবার হয় না? এই ব্যাপারটাই অনাক্রম্য ব্যবস্থার আরেকটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য। আপনি কোনো জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ঐ জীবাণুর দেখা পেলেই কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।

বিজ্ঞানীরা একে বলেন অনাক্রম্যতার স্মৃতি (Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর আক্রমণের সময় আর সাহায্য করতে পারবে না। শরীরে প্রতিদিনই হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে। স্মৃতিতে জমা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ টীকা মূলত রোগের জীবাণুরই বিশেষায়িত রূপ।

একটি দালানের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে ইট। তেমনই আমাদের দেহের সবচেয়ে ছোট একক হচ্ছে কোষ (Cell)। অনাক্রম্য ব্যবস্থাও আসলে বিশেষ ধরনের কিছু কোষের প্রক্রিয়া।নিশ্চয়ই ছোটবেলায় টিকা বা ভ্যাকসিন নিয়েছেন। টিকা আসলে অন্য কিছু নয়। যে রোগের টিকা সেই রোগেরই জীবাণু হচ্ছে ভ্যাকসিন! তবে সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। সে দুর্বল। ভ্যাকসিনকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন আপনার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একে চিনে নেবার সুযোগও পায় এবং এর ফলে কোনো রোগের সৃষ্টিও না হয়।

আপনার রক্তের রং লাল, কারণ এতে প্রচুর লোহিত কণিকা (Erythrocytes) থাকে। লোহিত কণিকা ছাড়াও থাকে শ্বেতকণিকা (Leucocytes)। শ্বেতকণিকাগুলো হচ্ছে অনাক্রম্য ব্যবস্থার অংশ। যেহেতু রক্ত সমস্ত শরীরেই সঞ্চলিত হয় তাই সমস্ত শরীরেই শ্বেতকণিকা আছে। তাই সমস্ত শরীরেই অনাক্রম্য ব্যবস্থা বিরাজমান।

তবে শরীরের কিছু কিছু অংশে অনাক্রম্য কোষের সংখ্যা একটু বেশিই থাকে। তা হচ্ছে লসিকা গ্রন্থি (Lymph node) এবং প্লীহা (spleen) এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন আপনি আক্রান্ত হন তখন এখান থেকেই অনাক্রম্য ব্যবস্থার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়।

অনাক্রম্যতার বিভিন্ন কোষ

নিউট্রোফিলঃ যদি আপনি চলার পথে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পান এবং কোথাও কেটে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তখন সেই স্থান দিয়ে বিভিন্ন জীবাণু আপনার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় রক্তের নিউট্রোফিল সেই ক্ষত স্থানে ছুটে গিয়ে জীবাণুদের ঠেকায়। এরা শ্বেতকণিকার অংশ।

ম্যাক্রোফাজঃ এরা আরেক ধরনের শ্বেত কণিকা। গ্রীক ভাষায় ম্যাক্রোফাজ অর্থ বড় খাদক। এর কাজও সেরকম, সরাসরি জীবাণুদের খেয়ে ফেলে তাদের ধংস করে। ফুসফুস, যকৃত, পেটের নাড়িভুড়ি এমনকি আপনার চামড়াতেও এদের খুঁজে পেতে পারেন।

নিউট্রোফিল
ম্যাক্রোফাজ

ডেন্ড্রাইটিক কোষঃ গ্রীক ভাষায় ডেনড্রন শব্দের অর্থ হলো গাছ। গাছের মতো ছড়ানো শাখা প্রশাখা থাকে বলে এ ধরনের কোষের এরকম নাম। এরাও অনাক্রম্য ব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এর কাজ হচ্ছে সমস্ত দেহ থেকে সন্দেহজনক কোষগুলোকে ধরে লসিকা গ্রন্থিতে নিয়ে আসা এবং সেখানে অবস্থানরত অনাক্রম্য কোষগুলোকে বুঝতে সাহায্য করা। অনুপ্রবেশকারী জীবাণু কী ধরনের এবং কোন উপায়ে একে সহজে ধ্বংস করা যায় এসব।

চিত্র: ডেন্ড্রাইটিক কোষ।

লিম্ফোসাইটঃ যত ধরনের শ্বেত কণিকা আছে লিম্ফোসাইট তাদের মধ্য সবচেয়ে ছোট। আপনি যদি মাইক্রোস্কোপে এদের দেখার চেষ্টা করেন তাহলে সকল লিম্ফোসাইটকে একইরকম মনে হতে পারে। কিন্তু যদি গভীরভাবে খেয়াল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, এরা আসলে আলাদা।

এদের একটি হচ্ছে বি-লিম্ফোসাইট। বি-দের কাজ হচ্ছে বিশেষ একটি অস্ত্র ‘এন্টিবডি’ তৈরি করা। আরেকটি-লিম্ফোসাইট হলো টি-লিম্ফোসাইট। টি-লিম্ফোসাইট আবার দুই প্রকার, সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট এবং হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট। সাহায্যকারী টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইটকে এন্টিবডি তৈরির কাজে সাহায্য করে। অন্যদিকে হত্যাকারী টি-লিম্ফোসাইট?

নাম শুনেই বুঝা যাচ্ছে এর কাজ। দেহের আক্রান্ত কোষগুলোকে এরা মেরে ফেলে। টি-লিম্ফোসাইট এবং বি-লিম্ফোসাইট মিলে আধুনিক মেরুদণ্ডী এবং প্রাচীন অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের অনাক্রম্য ব্যবস্থার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। এদের কারণে আমাদের অনাক্রম্য ব্যাবস্থা এতটাই যথাযথ এবং সূক্ষ্ম যে একটা কেঁচো তা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না।

চিত্রঃ বি এবং টি-লিম্ফোসাইট।

অনাক্রম্য কোষগুলো সমস্ত দেহে ছড়ানো থাকলেও কিছু কিছু অঙ্গে এদের ঘনত্ব বেশি থাকে। এদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও সকলে একসাথে দেহকে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে সুরক্ষা দিতে সবসময় সচেষ্ট।

যদিও অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত বেশিরভাগ ঘটনাই আণুবীক্ষণিক দুনিয়ায় ঘটে তবে দেহের কিছু বৃহৎ অঙ্গের অবদান অস্বীকার করলে এই লেখাটি অপূর্ণই থেকে যাবে। এদের মধ্যে প্রথমেই আসে অস্থিমজ্জার কথা। ফ্যাকাসে-হলদে-সাদাটে এই বস্তুটি দেহের বেশিরভাগ হাড়ের ভেতরে পাওয়া যায়। অস্থিমজ্জা মূলত সবরকম রক্তকণিকার আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে। এখানেই তৈরি হয় লোহিত কণিকা ও শ্বেতকণিকা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে থাইমাস। এর অবস্থান হৃৎপিণ্ডের ঠিক উপরের দিকে। দেহের টি-লিম্ফোসাইটগুলো এখানেই বড় হয়। অস্থিমজ্জায় তরুণ টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হবার পর তারা চলে আসে থাইমাসে। এখানেই এদের যোগ্য করে তোলা হয় দেহের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য। আর এই প্রক্রিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ টি-লিম্ফোসাইটকে ছাঁটাই হতে হয়। থাইমাসে টি-লিম্ফোসাইট এবং অস্থিমজ্জায় বি-লিম্ফোসাইট যখন পরিপক্ক হয়, তখন তারা চলে আসে লসিকা গ্রন্থি এবং প্লীহায়।

দেহে শুধুমাত্র একটি প্লীহা আছে, যার অবস্থান পাকস্থলির পাশে। তবে লসিকাগ্রন্থি আছে হাজার হাজার যা ছড়িয়ে আছে সারা শরীরে। লসিকাগ্রন্থির বাইরের দিকে থাকে বি-লিম্ফোসাইট আর ভেতরের দিকে টি-লিম্ফোসাইট। এর ভেতর দিয়ে যখন রক্ত এবং লসিকা চলাচল করে তখন তারা কী বহন করছে তা বি-লিম্ফোসাইট এবং টি-লিম্ফোসাইট ভালোভাবে পরীক্ষা করে। ঠিক চেকপোস্টের মতো।

আর ডেনড্রাইটিক কোষগুলো সন্দেহজনক জিনিসপত্র পরীক্ষার জন্যও এখানেই ধরে আনে। বহিরাগত কোনোকিছু শনাক্ত হলেই এলার্ম বাজতে থাকে এবং শুরু হয়ে যায় অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া (Immune response)।

বি-লিম্ফোসাইটগুলো এন্টিবডি তৈরি শুরু করে আর টি-লিম্ফোসাইটগুলো খুঁজতে বের হয়ে যায় সমস্যার উৎস কী। প্লীহার মূল কাজ আসলে মৃত এবং মৃতপ্রায় লোহিতকণিকা থেকে আয়রন সংগ্রহ করে এদেকে রক্ত থেকে সরিয়ে ফেলা। তবে এরা বিশালাকার লসিকাগ্রন্থির মতোও কাজ করে। এর মধ্যেও রক্ত ও লসিকার বহনকারী জিনিসগুলো টি এবং বি-লিম্ফোসাইটের পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

চিত্রঃ অস্থিমজ্জা হতে অনাক্রম্য কোষের সৃষ্টি।

অনাক্রম্য ব্যবস্থা যে কতটা দরকারী এবং একটি কার্যকর সেটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু নয়। আপনার শরীরে অনাক্রম্য ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার জন্য নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান অনুভব করা উচিৎ।

শেষ করছি ডেভিড ফিলিপ ভেটার নামক এক দুর্ভাগার গল্প বলে। সে জন্মেছিল severe combined immunodeficiency রোগ নিয়ে। এটি এখন Bubble Boy Disease হিসেবে পরিচিত। এটা এমনই এক জিনগত রোগ যার কারণে দেহে কোনো কার্যকর বি এবং টি-লিম্ফোসাইট তৈরি হয় না। ফলে অনাক্রম্য ব্যবস্থা একরকম থাকে না বললেই চলে। সংক্রমণের ব্যাপারে আক্রান্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক রকমের নাজুক হয়ে পড়ে।

ডেভিড ভেটারকে জন্মের পরপরই জীবাণুমুক্ত প্লাস্টিক বেলুনের মতো চেম্বারের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। এর ভেতরেই তাকে খাবার দেয়া হতো, ডায়পার বদলানো হতো, ওষুধ দেয়া হতো। সবই হতো বিশেষভাবে জীবাণুমুক্ত করে। ভেটারকে শুধুমাত্র স্পর্শ করা যেত চেম্বারের দেয়ালে স্থাপিত বিশেষ গ্লাভসের মাধ্যমে। চেম্বারটি কম্প্রেসার দিয়ে ফুলিয়ে রাখা হতো যেটা প্রচুর শব্দ করতো যার ফলে ভেটারের সাথে যোগাযোগ করা ছিল দুরূহ ব্যাপার।

তিন বছর বয়সে চিকিৎসক দল তাদের বাসায় আরো বড় একটা জীবাণুমুক্ত চেম্বার এবং একটি ট্রান্সপোর্ট চেম্বার তৈরি করে দেয়, যার ফলে সে হাসপাতাল এবং বাড়িতে যাতায়াত করতে পারতো।

ভেটারের বয়স যখন ৪ বছর তখন সে আবিষ্কার করে চেম্বারের ভেতরে ভুলে রেখে যাওয়া একটা সিরিঞ্জ দিয়ে সে চেম্বারের গায়ে ফুটো করতে পারে! এই অবস্থায় তাকে বোঝানো হয় জীবাণু কী এবং তার অবস্থা। সে আরো বড় হয় এবং চেম্বারের বাইরের রঙিন পৃথিবী সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে।

৬ বছর বয়সে নাসার বিজ্ঞানীরা তাকে স্পেসস্যুটের আদলে একটি বিশেষ পোশাক বানিয়ে দেয়। এই পোশাক তার চেম্বারের সাথে যুক্ত। এটার ভেতর ঢুকে সে বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারতো। তবে সে মাত্র সাত বার ঐ স্যুটটি ব্যবহার করেছিল। কারণ দ্রুতই সে স্যুটের সাইজের তুলনায় বড় হয়ে যায়।

ভেটারের চিকিৎসায় সেই আমলের ১.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হলেও শেষপর্যন্ত আরোগ্য মেলেনি। ১২ বছর বয়সে তার বোনের কাছ থেকে অস্থিমজ্জা ট্রান্সপ্ল্যান্ট গ্রহণ করে। তার দেহ যদিও এর সাথে মানিয়ে নিয়েছিল কিন্তু কয়েক মাস পরে অসুস্থ্ হয়ে মারা যায়।

মৃতদেহের ময়নাতদন্ত থেকে জানা যায় দাতার অস্থিমজ্জায় লুকানো ছিল এপস্টেইন বার ভাইরাসের বীজ, যেটা ট্রান্সপ্ল্যান্টের আগে শনাক্ত করা যায়নি। SCID নিয়ে অনেক শিশুই জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সবাই তো ডেভিড ভেটার হতে পারে না, তাই জন্মের পরপরই সংক্রমণে মারা যায়। যদিও ভেটার এই রোগ নিয়েও ১২ বছর বেঁচে ছিল, কিন্তু সেটাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে?

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Immunology; David Male, Jonathan Brostoff, David B. Roth, Ivan Roitt

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/David_Vetter