ফুসফুসটির বয়স মাত্র ছয় মাস!

দেহের প্রতিটি কোষের একটি নির্দিষ্ট আয়ু আছে। এই আয়ু পার হয়ে গেলে কোষ মরে যায় এবং নতুন কোষ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। সেই হিসেবে আপনার ফুসফুসের প্রতিটি কোষ ছয়মাসের মধ্যে প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। তাই বলা যেতে পারে আপনার ফুসফুসটির বয়স মাত্র ছয় মাস।

image source: sarpoosh.com

একইভাবে লোহিত রক্ত কণিকা প্রতি চার মাসে, শুক্রাণু মাত্র তিন দিনে, বহিঃত্বক দুই থেকে চার সাপ্তাহে, যকৃৎ পাঁচ মাসে, হাড় ১০ বছরে এবং হৃৎপিণ্ড ২০ বছরে পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী কোষ হচ্ছে মানুষের স্নায়ু এবং চোখের কোষ। এই কোষগুলো আপনার জন্মের আগেই গঠিত হয় এবং সারাজীবনে আর প্রতিস্থাপিত হয় না। তাই আপনার মস্তিষ্ক ও চোখের বয়স আপনার বয়সেরই সমান।

তথ্যসূত্রঃ bigganpotrika.com

featured image: morristownhamblen.com

আলসারের ব্যাকটেরিয়া

আলসার রোগটি সারা পৃথিবীতেই মানুষের জন্য এক উৎপাতের নাম। আমাদের পাকস্থলিতে আলসার হবার একটি কারণ Helicobacter pilori নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। ড. ব্যারি মার্শাল এই বিষয়টি আবিষ্কার করেন কিন্তু কেউ তার কথায় গুরুত্ব দেয়নি এবং তাকে বিশ্বাস করেনি। শেষে উপায়ান্তর না দেখে ১৯৮৪ সালে পেট্রিডিশে গবেষণার জন্য রাখা H. pilori ভর্তি তরল পান করে ফেলেন তিনি। এ থেকে কিছুদিনের মধ্যে তার আলসার হয়।

image source: livescience.com

ব্যাকটেরিয়া পানের পঞ্চম দিন হতে তার আলসার জনিত বমি শুরু হয়। চতুর্দশ দিন হতে তিনি এন্টিবায়োটিক গ্রহণ শুরু করেন এবং আলসার ভালো হতে শুরু করে। পরের বছর তিনি এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। ২০০৫ সালে তিনি এই ব্যাকটেরিয়া আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তথ্যসূত্রঃ bigganpotrika.com

featured image: coxshoney.com

লাইফ-স্ট্র

বর্তমান বিশ্বের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে ভোগছে। water.org সংস্থার তথ্য-উপাত্ত মতে, প্রতি বছর প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ বিশুদ্ধ পানি, অপুষ্টি ও যথোপযুক্ত বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার অভাবে মৃত্যুবরণ করছে। দৈনিক প্রায় ৬ হাজার শিশু অকালেই মারা যাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ অন্যান্য দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে ‘লাইফ স্ট্র’।

এটি একটি শক্তিশালী ফিল্টার যা দিয়ে অতি সহজে পানি পরিশুদ্ধ করা যায়। নলাকার এ টিউবটি লম্বায় ২৫ সে.মি. এবং ব্যাসার্ধে ২৯ মি.মি.। এর এক প্রান্ত পানিতে প্রবেশ করিয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে সেই পানি মুখ অথবা কোনো ভ্যাকুয়াম দিয়ে টানা হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি পানিকে কেবল ময়লা-আবর্জনামুক্তই করে না, সেই সাথে পানিবাহিত বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া স্যালমোনেলা, শিজেলা, এন্টারোকক্কাস এবং স্টেফাইলোকক্কাসের হাত থেকেও রক্ষা করে।

লাইফ-স্ট্রকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন এর কোনো অংশ কিছুদিন পরপর পরিবর্তন না করতে হয়। সব অংশগুলো দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। বিদ্যুত ছাড়াই এটিকে সহজে ব্যবহার করা যায়। মূল পরিকল্পনাকারী ভেস্টারগার্ড ফ্রান্ডসেনের মতে, এমনকি ছোট শিশুরাও ফিডারের মতো করে এর থেকে চুষে পানি পান করতে পারবে।

কার্যপ্রণালী

(১) প্রান্ত পানিতে ডুবিয়ে (৪) প্রান্ত দিয়ে টান দেওয়া হয়। (৪) প্রান্তে রয়েছে পলিয়েস্টারের সূক্ষ্ম জালিকা যার ছিদ্রপথ ১০০ মাইক্রন। পরবর্তীতে পানি পলিএস্টারের দ্বিতীয় জালক দিয়ে প্রবেশ করে যার ছিদ্রপথ ১৫ মাইক্রন। এরপর পানি নলাকৃতির ফাঁপা ফাইবারগুলোতে (২) প্রবেশ করে। পানি এর ভিতর দিয়ে উপরে যাওয়ার সময় পাশে অবস্থিত ০.২ মাইক্রন সরু ছিদ্র পথে (৩) পরিষ্কার পানি বের হয়ে আসে।

সবগুলো ফাইবার থেকে বের হওয়া পানিই উপরে (১) প্রান্ত দিয়ে মানুষের মুখে প্রবেশ করে। আর কাদা, ময়লা-আবর্জনা, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ফাইবারগুলোতে আটকা পড়ে যায়। পানি পান করার পর কেবল ফুঁ দিলেই এটি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায়।

লাইফ-স্ট্রর জীবনকাল ১ হাজার লিটার, যা একজন মানুষের সারা বছরের পানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এটি কেবল বিশুদ্ধ পানিরই ব্যবস্থা করেনি, পাশাপাশি কলেরা, ডায়রিয়া এবং ডিপথেরিয়ার হাত থেকেও মানুষকে রক্ষা করছে। এটি সহজলভ্য হওয়ায় এবং বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সুযোগ সৃষ্টি করার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

featured image: groupon.com

তিন পিতা-মাতার ডিএনএ বহনকারী শিশু

আমরা জানি সন্তানের পঞ্চাশ ভাগ ডিএনএ আসে মায়ের কাছ থেকে ও বাকি পঞ্চাশ ভাগ পিতার কাছ থেকে। কিন্তু নব জন্ম নেয়া এই শিশুটির ক্ষেত্রে তিনজন “পিতামাতার” ডিএনএ আছে।

গতবছর ব্রিটেনে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এই প্রক্রিয়া- যার ফলে কোনো শিশুর মায়ের মাইটোক্রন্ডিয়া (কোষের শক্তি-কেন্দ্র) ডিএনএ’তে গুরুতর মিউটেনশন থাকলে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ নিয়ে নিষিক্ত কোষের সৃষ্টি করা হয়- অর্থাৎ মূল বাবা-মায়ের ডিএনএ’র সাথে অন্য মহিলার মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ যুক্ত করা হয়। উল্লেখ্য সন্তানরা মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ পায় শুধুমাত্র মায়ের কাছ থেকে।

আপেল খাচ্ছেন নাকি এর উপর দেয়া মোম খাচ্ছেন?

কখনো লক্ষ্য করেছেন কিনা ফলের দোকানে একটু আলোতে আপেলগুলো যেন চকচক করছে বলে মনে হয়। কিংবা কাপড়ে হালকাভাবে আপেল ঘষে দেখলে তা আরো চকচক করে দেখতে। তাহলে আপেলের ভেতরে কি এমন কোনো পদার্থ লুকিয়ে আছে যা চকচক করার জন্য দায়ী কিংবা আপেলকে খাওয়ার জন্য আমাদের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়?

আসলে পদার্থটি আপেলের ভেতরে নয় বরং আপেলের বাইরে অবস্থান করে। শুধু আপেলই নয়, আরো অনেক ধরনের শাক সবজিতেও এই পদার্থটি উপস্থিত থাকে। যেমন শসা, তাল ইত্যাদি। পদার্থটি হচ্ছে মোম! প্রাকৃতিকভাবেই আপেল সহ বেশ কিছু সবজি মোম উৎপন্ন করে থাকে। বাইরের আর্দ্র আবহাওয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এর প্রয়োজন। এছাড়া এদের ত্বকে ছত্রাকের উপস্থিতিও থাকে একই কারণে। মোমের উপস্থিতি না থাকলে পানি ধরে না রাখতে পেরে আপেল শুকিয়ে যেত।

বাংলাদেশে আপেল উৎপাদিত হয় না। দূর দূরান্তের দেশ থেকে এদেশে আপেল আসে। দূর থেকে এখানে আপেল আসতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। ভ্রমণপথে আপেলগুলো এত দিন যাবৎ টিকে থাকে কীভাবে? ফরমালিন ব্যবহারের কথা নিশ্চয় মাথায় আসছে? আমাদের দেশে না হয় ফরমালিনের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হয় কিন্তু অন্যান্য ফরমালিনের এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্ভব নয়। তাহলে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা আপেলকে কয়েক মাসব্যাপী এমনকি বছর ব্যাপীও সংরক্ষণ করে?

আপেলের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই মোম উৎপন্ন হয়। আপেল উৎপাদনে পর তা সংগ্রহ করে ধুয়ে রাখা হয়, যেন এর গায়ে লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন আপেলের গায়ে যে প্রাকৃতিক মোম ছিল তার উপস্থিতি অনেকংশে কমে যায়।

এর জন্য কৃত্রিমভাবে মৌমাছি, এমনকি গুবরে পোকা থেকে প্রাপ্ত মোম আবার অনেক সময় পেট্রোলিয়াম জাতীয় মোম আপেলের আস্তরণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে করে আপেল যেমন দেখতে আরো আকর্ষণীয় ঠেকে ক্রেতার নিকট, ঠিক তেমনি পচন হতেও রক্ষা পায়। কেননা ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের বংশবিস্তারের উত্তম মাধ্যম হচ্ছে ভেজা বা স্যাঁতস্যাঁতে স্থান। মোম দিয়ে আপেলকে আবৃত করে রাখলে আপেল বাইরের দিক দিয়ে আর্দ্র অবস্থা থেকে তথা বিভিন্ন অণুজীবের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।

মজার ব্যাপার হলো আপেলের উপর মোমের এমন প্রলেপ দেবার পদ্ধতি বেশ পুরনো। সেই ১৯২০ সাল হতে প্রচলিত এ প্রক্রিয়া। ১ কেজি মোম দিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার আপেলেকে মোমের কোট পরানো সম্ভব। US Food And Administration-এ মোমকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দেবার পরেও প্রশ্ন থেকেই যায়।

আপেল + মোম খাওয়া কতটুকু স্বাস্থ্যকর?

স্বাস্থ্যবিদদের মতে, মোম খাওয়া স্বাস্থ্য জন্য অবশ্যই সম্মত নয়। এর প্রতিকারের জন্য আপেলকে পানি বা ভিনেগার দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নতুবা ছিলে খাওয়া উচিত। তবে আপেলের ত্বকের ঠিক নিচেই অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকে। তাই ভালো হয় যদি কেবল আপেলের পাতলা ত্বকটুকুই সাবধানে চিরে ফেলে দেয়া যায়।

তথ্যসূত্র

http://www.whfoods.com

http://www.ndtv.com

featured image: stepbystep.com

সন্ন্যাসরোগঃ প্যারালাইসিসের প্রধান কারণ

মানব মস্তিষ্কের ১৫০০ ঘন সেন্টিমিটারে প্রায় ১০ বিলিয়ন নিউরন কর্মরত। চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছা প্রভৃতি মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রক এটি। এছাড়া শ্রবণ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ, স্পর্শ, বাকশক্তি, আবেগ, দেহের ভারসাম্য থেকে শুরু করে মানবদেহের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করছে দেড় কেজি ওজনের এ অঙ্গটি। কিন্তু মাঝে মাঝে এই মস্তিষ্ক এমন কিছু সমস্যার সামনে ব্যর্থ হয় যার কারণে আমাদের শারীরিক কাজে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এসব সমস্যার মধ্যে মস্তিষ্ক সংক্রান্ত স্ট্রোক তথা সন্ন্যাসরোগ অন্যতম। যা প্যারালাইসিসের সবচেয়ে বড় কারণ।

সন্ন্যসরোগ কী?

কোনো ধরনের আঘাত ব্যতীত মস্তিষ্কের কাজে ব্যঘাত ঘটার নামই হলো সন্ন্যাসরোগ। এটি সেরেব্রাল স্ট্রোক নামেও পরিচিত। ধরুন আপনার সাথে একজন লোক কথা বলছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে তিনি একটা শ্বাসরুদ্ধকর শব্দ করে আপনার সামনে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তখন ধরে নিবেন তার উপর সন্ন্যাসরোগ ভর করেছে। অনেকে হয়ত মৃগী রোগীকেও এর আওতায় নিয়ে আসেন।

মৃগী রোগের সাথে সন্নাসরোগ বা অ্যাপোপ্লেক্সির লক্ষণের দিক দিয়ে কিছুটা মিল আছে বটে। কিন্তু কারণের দিক দিয়ে এদের মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন মৃগী রোগ সৃষ্টি হয় ব্রেন টিউমার থেকে। আর অ্যাপোপ্লেক্সির সৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য কারণে।

সন্ন্যাসরোগ কেন হয়?

সন্ন্যাসরোগ প্রধানত রক্ত প্রবাহের বাঁধার কারণে হয়ে থাকে। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনীর মাধ্যমে রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। কোনো কারণে যদি এ পথে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে সেরেব্রাল স্ট্রোকের সৃষ্টি হয়। এ কারণটা আরো গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা মূল তিনটা কারণের কথা উল্লেখ করেন।

১. সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস নামটা দেখেই বোঝা যায় এটা রক্ত জমাট বাঁধার কথা বলছে। মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহের পথে যখন রক্ত জমাট বাঁধা শুরু করে তখন তাকে সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস বলে। এক্ষেত্রে মধ্য মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধতে বেশি দেখা যায়।

সেরেব্রাল থ্রম্বোসিস হওয়ার প্রধান কারণ হলো নিম্ন রক্তচাপ। যখন আমাদের রক্ত প্রবাহের গতি কমে আসে তখন সেরেব্রাল ধমনীতে রক্ত জমা হতে থাকে। পরিণামে সেখানে ধীরে ধীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং একসময় দেখা যায় জমাটকৃত রক্তপিন্ড ধমনীটি আটকে ফেলে রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে নির্দিষ্ট স্থানে রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না এবং স্ট্রোকের দেখা দেয়। সাধারণত এর প্রভাব বেশি দেখা যায় ৬০-৬২ বৎসর বয়সে।

চিত্রঃ রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার দৃশ্য।

২. সেরেব্রাল হ্যামোরেজঃ মস্তিষ্ক পথের রক্তনালী ফেটে যাবার কারণে সেরেব্রাল হ্যামোরেজের সৃষ্টি হয়। যখন রক্তচাপ বেড়ে যায় তখন অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ রক্তনালী সহ্য করতে পারে না। যার ফলে ফাটল ধরে রক্ত নালীতে। পরে বের হয়ে যাওয়া রক্ত জমাট বেঁধে উক্ত স্থানের লসিকার মুখে আঁটকে থাকে। ফলে রক্ত উক্ত কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং কোষটি মারা যায়। এভাবে বেশ কিছু কোষ নষ্টের কারণে মস্তিষ্কের কাজ ব্যাহত হয়। ফলে দেখা দেয় স্ট্রোক।

সাধারণত মাদক দ্রব্য গ্রহণের সময় এর প্রভাবটা বেশি হয়। কারণ তখন রক্তচাপ অসম্ভব রকম বেড়ে যায়। কাশি, হাঁচি এবং আপনার কোনো বন্ধু আপনাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেও এর সৃষ্টি হয়ে থাকে। তাছাড়া ইমোশনাল কারণেও সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হয়ে থাকে। যেমন হঠাৎ করে কোনো দুঃসংবাদ অথবা এমন আনন্দ সংবাদ শুনা যা আপনার কল্পনাও ছিল না।

৩. সেরেব্রাল এমবোলিজম এ ব্যাপারটা থ্রম্বোসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হৃৎপিন্ড থেকে সেরেব্রাল ধমনী পথের জমাট বাঁধা রক্তপিন্ড যখন রক্ত প্রবাহের সাথে পরিবহণ করে, তখন এ পিন্ড অপেক্ষাকৃত ছোট রক্তনালী অথবা লসিকা দিয়ে যেতে না পেরে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যার ফলে সৃষ্টি হয় স্ট্রোকের। এটি সরাসরি হৃৎপিন্ডের রোগের সাথে জড়িত। রক্তপিন্ডটা হৃৎপিন্ডের অলিন্দ হতেও আসতে পারে।

অর্থাৎ শরীরের কোনো স্থানের জমাটকৃত রক্তপিন্ড নালীর মাধ্যমে যদি হৃৎপিন্ডে পৌঁছে যায়, তবে এ পিন্ডটা আবার রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সেরেব্রাল ধমণীতেও আসতে পারে। যার ফলে সেরেব্রাল এমবোলিজমের হয়ে যায়। এর প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৫-৩০ বৎসর বয়সে।

সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ

সাধারণত সন্ন্যাসরোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা যায়। তবে মাঝে মাঝে খুব দ্রুত এর উপসর্গ প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, চোখ ব্যথা করা, চোখ লাল হওয়া, চোখ জ্বালা করা, রণন, চোখে কম দেখা, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

তাছাড়া এর প্রভাবে কথা বলতেও অনেকের অসুবিধা দেখা দেয়। অনেকটা তোতলামিতে কথা বলার মতো। সাময়িক দুর্বলতার জন্যও সন্ন্যাসরোগের ভূমিকা রয়েছে। অনেক সময় একে নীরব ঘাতকও বলা হয়ে থাকে। কারণ এ রোগের লক্ষণগুলো খুবই সাধারণ, যা আমাদের প্রায় রোগের ক্ষেত্রে দেখা দেয়। যেমন জ্বর হলে আমদের মাথা ব্যথা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

সেরেব্রাল হ্যামোরেজের ফলে ধীরে ধীরে আমাদের চোখে-মুখে, ঘাড়ে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যায়। তখন আমাদের চোখ-মুখে লাল রঙের একটা আভা তৈরি হয়। নিচের ছবিটার দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

সন্ন্যাসরোগের দ্বারা সৃষ্ট প্যারালাইসিস

সচারচর দেখা যায় কিছু মানুষের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ বা দেহের কোনো একটা পাশ অবশ হয়ে যায়। যাকে বলা হয় প্যারালাইসিস। প্যারালাইসিস হওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত কারণ হলো সন্ন্যাসরোগ। বিভিন্ন ধরনের অঙ্গবিকৃতির মধ্যে হ্যামিপ্লেজিয়া ও মনোপ্লেজিয়া হলো অন্যতম। হ্যামিপ্লেজিয়া হলো আমাদের দেহের পুরো এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাথার এক পাশ, হাত এবং পা।

সন্ন্যসরোগ যখন ব্রেনের এক পাশ নষ্ট করে দেয় তখন তার ফলে অঙ্গবিকৃতি হয় ঠিক নষ্ট হওয়া ব্রেনের বিপরীত পাশে। অর্থাৎ ডান ব্রেন নষ্ট হলে অঙ্গবিকৃতি বাম পাশে দেখা দেয়। দেহের ডান পাশ প্যারালাইজড হওয়ার কারণে অনেকে বাকশক্তি হারায় এবং মুখমন্ডল যদি এ অঙ্গবিকৃতির আওতায় পড়ে তবে আমাদের মুখ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। আর মনোপ্লেজিয়াটা হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ প্যারালাইজড হওয়া। যেমন হাত, পা বা শরীরের যেকোনো একটা অঙ্গ।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

সন্ন্যাসরোগের কারণে সৃষ্ট রোগের মধ্যে অঙ্গবিকৃতিই প্রধান। যা ইতিমধ্যে জেনেছি। সারাজীবন আপনার হাঁটা, চলা, কথা বলা ইত্যাদি স্বাভাবিক কাজ করা থেকে দূরে সরিয়ে দিবে এ নীরব ঘাতক। তাই এর প্রতিরোধ ব্যাবস্থাটা জানা আমাদের অতীব জরুরী।

সন্ন্যাসরোগ প্রতিরোধ করার প্রধান দিকটা হলো আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা। যদি দেখেন আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই তখন বিশ্রাম নেয়াটা আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রামটা হলো এ রোগের জন্য সবচে বড় ওষুধ। কারণ একমাত্র বিশ্রামের মাধ্যমে আমাদের রক্তপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে ভালো হবে।

তাছাড়া আপনি শারিরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে এর প্রতিরোধ করতে পারেন। তবে ব্যায়ামটা যেন বেশি পরিশ্রমের না হয়। কারণ এক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে সেরেব্রাল হ্যামোরেজ হতে পারে।

কোনো আঘাত ছাড়া যদি বেশ কিছুদিন ধরে সন্ন্যাসরোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় তবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন অনেক দিন ধরে মাথা ব্যাথা করা, চোখ দিয়ে পানি পড়া, চোখ ব্যাথা করা, চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি।

মাছ, মাংস, শাক-সবজি ইত্যাদি খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে। মাদক দ্রব্য ব্যবহার করলে এ রোগ আপনার বন্ধুর মতো আপনাকে জাপটে ধরবে। তাই যতটা সম্ভব মাদক দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। অনেক সময় আমরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া মেডিসিন ব্যবহার করে থাকি। যা সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। কারণ বিনা কারণে মেডিসিন আপনার দেহের জন্য ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার হবে। যা আপনার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে।

এ পর্বে এটুকু লিখলাম। সেরেব্রাল স্ট্রোকের কারণে আরো বেশ কিছু রোগ সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে লিখার চেষ্টা করব।

তথ্যসূত্র

১. Health & Medicinal journal, The Independent. (6 June, 2016)

২. https://www.wikipedia.org/apoplexy

৩. https://www.wikipedia.org/stroke

৪. https://www.wikipedia.org/paralysis

জেনেটিক সুপারহিরোদের দুনিয়ায়

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে।

image source: fastcompany.com

এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন।

image source: technologyreview.com

এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য।

হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

featured image: nerdist.com

চা পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।

২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়।

কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।

পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
  2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
  3. http://bn.wikipedia.org/
  4. Pean university recerch center.

featured image: vitalerstoffwechsel.de

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডঃ অহেতুক আতঙ্ক

ল্যাবরেটরিতে যারা কাজ করেন তাদেরকে বিভিন্ন বিপজ্জনক বস্তু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সবসময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। এমনই একটি বিপজ্জনক বস্তু হচ্ছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড। অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের জন্য ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। কিন্তু প্রত্যহ ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটি নিয়ে অনেক গবেষককেই মহা আতঙ্কে থাকতে দেখা যায়। এই বুঝি হাতে লেগে গেল!

ল্যাবে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড সংশ্লিষ্ট বস্তুগুলোকে অন্যান্য বস্তু থেকে সবসময় আলাদা করে রাখা হয়। অনেকটা একঘরে করে রাখার মতোই। ব্যবহার করার সময় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড যেন শরীরে কিংবা ল্যাবের অন্য কোনো অংশে না লাগে তার জন্যে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনামাও দেয়া হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে এই অতিরিক্ত সতর্কতা এবং আতঙ্ক কতটুকু সঠিক?

প্রথমেই দেখে নেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড কীভাবে কাজ করে। ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি রঞ্জক পদার্থ যা জিনের উপস্থিতি বিশেষ করে ডিএনএ-র উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য জেল ইলেকট্রোফোরেসিস পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ইন্টারক্যালেটিং এজেন্ট।

পরীক্ষাগারে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ডিএনএ-র সাথে মিশ্রিত করলে এটি ডিএনএ-র এডিনিন ও থাইমিন বেসের মধ্যে নিবেশিত হয়ে থাকে এবং অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে যা আমাদেরকে ডিএনএ-র উপস্থিতি সনাক্ত করতে সহায়তা করে।

চিত্রঃ অতিবেগুনী রশ্মির উপস্থিতিতে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড মিশ্রিত ডিএনএ উজ্জ্বল বর্ণ প্রদান করে।

কিন্তু এই ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে কেন এত সতর্কতা? এর কারণ হলো সজীব কোষের ডিএনএ-র ভিতর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের উপস্থিতি কোষের ডিএনএ-র স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ করে। প্রতিলিপিকরণ, অনুলিপিকরণ ইতাদি স্বাভাবিকভাবে হয় না। বলা হয়ে থাকে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হচ্ছে একইসাথে একটি মিউটাজেনিক এবং টেরাটোজেনিক পদার্থ। অর্থাৎ এটি কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধিকে ব্যহত করার মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ সন্তান উৎপাদনেও ভূমিকা পালন করতে পারে।

এতক্ষণ যেসব কথা বলা হলো তার সবই মূলত ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেসব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের একইসাথে ফ্রেম শিফট মিউটেশন, ক্রোমোসোমের পুনর্বিন্যাস, কোষ বিভাজন রুদ্ধ করা এবং ভ্রূণের সঠিক বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টি করবার ক্ষমতা রয়েছে।

এই পরীক্ষাগুলোর সবকটিই কেবলমাত্র একটি কোষ বা অরক্ষিত কোনো ভ্রূণের উপর ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারে কিন্তু একটি জীবন্ত প্রাণীতে সেই প্রভাব কত মাত্রায় হতে পারে তা ব্যাখ্যা করতে পারে না। কিছু গবেষণায় আবার এও দেখা গেছে, যতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় সেটিও সরাসরি ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের দ্বারা হয়ে থাকে না বরং ইথিডিয়াম ব্রোমাইড হতে উৎপন্ন অন্য কোনো মেটাবোলাইট কর্তৃক হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে বহু আগে থেকেই নানান রোগে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের সহনীয় মাত্রা নির্ধারিত আছে ১ মিলিগ্রাম/কিলোগ্রাম। আমরা ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তার আদর্শ মাত্রা হলো ১ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। এটা সহজেই অনুমেয় যে আমরা গবেষণার কাজে যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহার করি তা খুবই স্বল্প মাত্রার। এই স্বল্প মাত্রার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড প্রসঙ্গে রোসি রেডফিল্ডের তুলনাটি উল্লেখ করা যায়।

তিনি বলেছেন- “৫০ কিলোগ্রাম একজন ব্যক্তি ৫০,০০০ লিটার ইথিডিয়াম ব্রোমাইড খেলেও তা গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার ডোজের চেয়ে কম মাত্রার হয়”।

আফ্রিকার দেশগুলোতে ১৯৫০ সাল থেকে গবাদি পশুর পরজীবঘটিত রোগ স্লিপিং সিকনেস-এর চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই চিকিৎসায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে গবাদি পশুর মধ্যে টিউমারের আধিক্য কিংবা জন্মগত ত্রুটির বিস্তার ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যা গবেষণাগারে কৃত্রিম টিস্যু এবং ভ্রূণের উপর করা পরীক্ষার সাথে বৈপরীত্য প্রকাশ করে। উপরন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে অকার্যকর করার ক্ষমতা এবং আছে যা ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইড নিয়ে আসল ভয়ের ব্যাপার হলো, প্রকৃতপক্ষে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড আমাদের জন্য যতটা না ক্ষতিকর, একে নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কের ফলে আমরা যে সতর্কতাগুলো অবলম্বন করি সেগুলোই আমাদেরকে আরো বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

যেমন ব্যবহৃত ইথিডিয়াম ব্রোমাইডকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য বর্তমান পদ্ধতিতে প্রথমে একে চারকোল দ্বারা শোষণ করা হয় অতঃপর পোড়ানো হয়। কিন্তু চারকোল দ্বারা শোষণ করার ফলে ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শক্তিমাত্রা না কমে বরং বেড়ে যায়, যা ঝুঁকিকে না কমিয়ে আরো বাড়িয়ে তুলে।

ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের শোধনের আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফসফরিক এসিড, হাইড্রোক্লোরিক এসিড, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদির সাথে মিশ্রণ করা। কিন্তু এই পদার্থগুলো নিজেরাই অনেক বেশি বিপজ্জনক।

উপরন্তু মিশ্রণের পর তারা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও ক্ষতিকর কোনো পদার্থ তৈরি করতে পারে। আবার ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের প্রতি এই অতিমাত্রার ভীতির সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু প্রতিষ্ঠান কেবল ‘সেফ’ শব্দ যুক্ত করেই ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের বিকল্প হিসেবে আরও বেশি ক্ষতিকর কিছু বাজারজাত করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ SYBR safe এর কথা বলা যায়। ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে এটির বিষাক্তটা ইথিডিয়াম ব্রোমাইডের চেয়েও বেশি।

অণুজীববিজ্ঞানের গবেষণায় ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এই বস্তুটি যে গবেষণার কাজে কতখানি গুরুত্ব বহন করে তা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিমাত্রই জানে। এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইথিডিয়াম ব্রোমাইড একটি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক পদার্থ। কিন্তু এই বস্তুটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে যে পরিমাণ ভীতি কাজ করে সেটাও একটু বাহুল্যই বটে।

তাই এই রাসায়নিক পদার্থটি নিয়ে প্রচলিত মিথগুলো থেকে বের হয়ে এসে আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে এবং যতদিন পর্যন্ত এর বিকল্প হিসেবে অধিক নিরাপদ ও কার্যকরী কোনো রঞ্জক পদার্থের আগমন না ঘটছে ততদিন পর্যন্ত এটিকেই আমাদেরকে আরো সঠিক ও যৌক্তিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে।

তথ্যসূত্র

https://en.wikipedia.org/wiki/Ethidium_bromide

http://www.bitesizebio.com/95/ethidium-bromide-a-reality-check/

http://blogs.sciencemag.org/pipeline/archives/2016/04/18/the-myth-of-ethidium-bromide

featured image: mysafetylabels.com

হেনরিয়েটা ল্যাক্সঃ ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা

‘শুধু বিষ, শুধু বিষ দাও, অমৃত চাই না,

অমরত্বের লোভ করুক বিক্ষোভ,

জীবনকে যদি দাও নীল বিষাক্ত ছোপ

থাকবে না, থাকবে না, থাকবে না ক্ষোভ

আমার মৃত দেহে ঝুলবে নোটিশ বোর্ড, কর্তৃপক্ষ দায়ী না।’

 

প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তীর এই গানটি শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল একজন নারী বিজ্ঞানীর কথা। তিনি কোনো প্রভাবশালী বা তারকা ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। জীবনের নীল বিষাক্ত ছোপে জর্জরিত হয়েছিলেন বারংবার। তাই, অমরত্বের লোভও হয়ত তিনি কখনো করেননি। কিন্তু, পৃথিবীর ইতিহাসে তিনিই হয়ে রইলেন অমরত্বের প্রতীক। বলছিলাম ‘অমর’ বিজ্ঞানের নায়িকা হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর কথা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর জন্ম ১৯২০ সালের ১ আগস্ট, আমেরিকার ভার্জিনিয়া প্রদেশের রোয়ানোকি গ্রামে। জন্মের সময় নাম ছিল লরেটা। ডাকনাম হ্যানি। হ্যানি থেকে হেনরিয়েটা।

হেনরিয়েটা ল্যাক্স

কিন্তু, না। হেনরিয়েটার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সবটা কিন্তু শেষ হয়ে গেল না। বরং, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর তেজস্ক্রিয় চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে কর্তব্যরত সার্জন তাঁকে না জানিয়ে কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই তাঁর গর্ভাশয়ের কিছু সুস্থ কোষ এবং গর্ভাশয় টিউমারের কিছু ক্যান্সারের নমুনা কোষ সংগ্রহ করে নেন গবেষণাগারে পরীক্ষা করার জন্য।১৯৫১ সালের ২৯ জানুয়ারি হেনরিয়েটা হঠাৎ তলপেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করেন। ছুটে গেলেন জন হপকিন্স হাসপাতালে। তখনকার সময়ে তার মতো কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে নিকটবর্তী হাসপাতাল। শনাক্ত হলো তিনি গর্ভাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসা হিসেবে আক্রান্ত স্থানে তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করা হলো। কিন্তু, শেষ রক্ষা হলো না। ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন হেনরিয়েটা। শেষ হলো হেনরিয়েটার ইহলৌকিক জীবন।

সেই নমুনাগুলোকে নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিস্ময়ে তাজ্জব বনে গেলেন গবেষকরা। সুস্থ, স্বাভাবিক কোষ সাধারণত উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কয়েক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, এর পরে মরে যায়। কিন্তু গবেষকরা দেখলেন, হেনরিয়েটার টিউমার কোষগুলো মরছে না। উপযুক্ত খাদ্য এবং পরিবেশে সেগুলো শুধু বেঁচেই থাকছে না, বরং বংশবৃদ্ধিও করে চলেছে।

হেনরিয়েটার সুস্থ কোষগুলো যেখানে গবেষণাগারে জন্মানোর কিছু দিনের মধ্যেই মারা যায়, সেখানে তার টিউমার কোষগুলো প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছিল। স্বাভাবিক কোষের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছিল টিউমার কোষগুলো।

ব্যস, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা পেয়ে গেলেন মানুষের অমর কোষের খোঁজ। এখান থেকে গবেষণার জন্য তৈরি হলো immortal cell line। হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর ইংরেজি নাম থেকে সেল লাইনটির নামকরণ করা হলো হিলা (HeLa) সেল লাইন। Henrietta থেকে He এবং Lacks থেকে La নিয়ে একসাথে HeLa।

অবশেষে, ২০১০ সালে হেনরিয়েটা ল্যাক্স এর অমরত্বের কাহিনী নিয়ে লেখিকা রেবেকা স্ক্লুট রচনা করেন The Immortal Life of Henrietta Lacks নামের বই। গবেষণাগারের টেস্টটিউব ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় তার অমরত্বের ইতিহাস। অচিরেই বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নেয় লেখিকা রেবেকার এই বইটি।

হেনরিয়েটা ল্যাক্সের টিউমার কোষগুলো শুধুমাত্র ক্যান্সার গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। জিরো গ্রাভিটিতে মানুষের কোষের অবস্থা কেমন হয় তা দেখার জন্য প্রথম মহাশূন্য অভিযানে পাঠানো হয়েছিল তাঁর কোষ। তাঁর কোষ ব্যবহার করে বিজ্ঞানী জোনাস স্যাক (Jonas Salk) তৈরি করেছিলেন পোলিও ভ্যাক্‌সিন।

এছাড়াও, ক্লোনিং, জিন ম্যাপিং, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন এর মতো বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কোষ। আর এভাবে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা কর্মকাণ্ডেরর মধ্য দিয়ে অমর হয়ে রইলেন হেনরিয়েটা ল্যাক্স, বেঁচে রইলেন পৃথিবীর অজস্র গবেষণাগারে।

তথ্যসূত্রঃ

১. Rebecca Skloot (2010) “The Immortal Life of Henrietta Lacks”

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Henrietta_Lacks

featured image: hackaday.com

বায়োনিক কান

প্রতিদিনই নানা রকম শব্দের সম্মুখীন হই। কিন্তু সব শব্দই কি শুনতে ভালো লাগে? গান কিংবা কোনো মধুর কন্ঠস্বর শুনতে হয়তো কোনো সমস্যা নেই কারো কিন্তু সেটা যদি হয় বাস, ট্রাক বা ট্রেনের হুইসেল কিংবা কোনো সমাবেশে লোকজনের অবাঞ্চিত চিৎকার-চেঁচামেচি, তাহলে সেটা বিরক্তির জন্ম দেয়। এরকম অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা প্রতিনিয়তই। আর আমরা যারা বাংলাদেশের বিশেষ করে ঢাকার নাগরিক তাদের কথা নাই বললাম।

কেমন হতো যদি আমরা এই শ্রুতিকটু শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম? আপনার বাসায় উচ্চ শব্দে টেলিভিশন চলছে বা গান বাজছে, তখন আপনি কী করবেন? হয়তো টিভিসেটের সাউন্ড কমিয়ে দিবেন। তেমনি, আমরা যখন হট্টগোলে পরে যাই যা শুনতে আমাদের বিরক্তি লাগে, তখন যদি সেই শব্দগুলোর ভলিউম কমিয়ে শুনতে পারতাম কিংবা যে শ্রুতিমধুর শব্দের ভলিউম কম সেটাকে যদি বাড়িয়ে শুনতে পারতাম তাহলে ব্যাপারটা দারুণ হতো না?

ঠিক তেমনই একটা যুগান্তকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান ডপলার ল্যাব। এর নাম বায়োনিক কান (Bionic ears)। এই যন্ত্রটির সাহায্যে আমরা চাইলেই যেকোনো শব্দের ভলিউম কমাতে বা বাড়াতে পারব।

যারা কানে শুনতে পায় না অথবা কম শুনে তাদের জন্য এটি আরো খুশির বার্তা নিয়ে এসেছে। যন্ত্রটি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের প্রধান জেফ গ্রেইনারের মতে এই যন্ত্রটি দ্বারা বধিররা আগের তুলনায় ১০-৫০ গুণ পরিষ্কারভাবে শুনতে পারবে।

সংক্ষেপে এই যুগান্তকারী যন্ত্রটির গঠনকৌশল এবং এর কার্যপ্রণালী জেনে নেয়া যাক। এই যন্ত্রটিকে দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমটি internal part এবং দ্বিতীয়টি external part। এই প্রধান অংশগুলোর আবার বিভিন্ন উপাংশ রয়েছে।

Internal part ভিতরের অংশ এই অংশটুকু একটা ছোট অপারেশনের মাধ্যমে কানের অভ্যন্তরে ককলিয়ার সাথে বসানো হয় এবং ককলিয়ার স্নায়ুর সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই অংশে glutamate নামক একটা যন্ত্র থাকে যার মাধ্যমে ককলিয়ার স্নায়ুকে উদ্দীপিত করা হয় যার ফলে উক্ত স্নায়ু external part থেকে প্রাপ্ত শব্দকে মস্তিস্কে প্রেরণ করে এবং মস্তিষ্ক শ্রবণের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে আমরা সেই শব্দগুলো শুনতে পাই, যেগুলো external part থেকে আগেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসে।

External part বাইরের অংশ এটা খুব ছোট একটা যন্ত্র যা আমাদের কানের পিছনের অংশে লাগানো থাকে। এই যন্ত্রটির কয়েকটা উপ-অংশ নিয়ে গঠিত। ১. মাইক্রোফোন, যা পরিবেশ থেকে শব্দকে গ্রহণ করে। ২. শব্দ নিয়ন্ত্রক, যা মাইক্রোফোন থেকে প্রাপ্ত শব্দকে প্রয়োজন অনুসারে কমিয়ে বা বাড়িয়ে শ্রবণ উপযোগী করে তুলে। ৩. একটা প্রেরক যন্ত্র (transmitter) যা তড়িৎ-চুম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত শব্দকে কানের অভ্যন্তরে রাখা internal device-এ প্রেরণ করে।

কিন্তু এই আলোচিত যন্ত্রটি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কতটুকু সফল বা ফলপ্রসূ হতে পেরেছে? সর্বপ্রথম Alex Fitzpatrick নামক একজন ব্যক্তির দেহে এই বায়োনিক কান সফলভাবে লাগানো হয়। ১ ডিসেম্বর, ২০১৩ অবধি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই ৩ লক্ষ ২৪ হাজার জন লোক এই যন্ত্রটি ব্যবহার করছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৩৮ হাজার শিশু। এছারাও যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, ইসরাইল, নিউজিল্যান্ড, চীন সহ আরো অনেক দেশেই এ যন্ত্রটি ব্যাপকভাবে প্রসারলাভ করেছে।

যদিও এ যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল শুধুমাত্র মিউজিসিয়ানদের জন্য কিন্ত পরবর্তীতে সাধারণ জনগণও এটা ব্যবহার করতে শুরু করে। এমনটাই বলেছেন ডপলার ল্যাবের CEO জনাব Noah Kraft।

তথ্যসূত্রঃ

১. en.wikipedia.org/wiki/Cochlear_implant

২. http://techfreep.com/bionic-ear-gives-cyborg-like-hearing.htm

featured image: thenextweb.com

দুধসহ চা, দুধ ছাড়া চা: বিজ্ঞান কোনটার পক্ষে?

চা। আমাদের অতি পছন্দের একটি পানীয়। পৃথিবীর ২০০ কোটির উপরে মানুষ চা পান করে থাকে। শুধু ব্রিটেনেই প্রতিদিন ১৬ কোটি ৫ লাখ কাপ চা পান করা হয়ে থাকে। যার অর্থ ব্রিটেনের প্রতিটি মানুষ দিনে গড়ে ৩ কাপ করে চা পান করে থাকে। কেউ চা খায় ঘুম তাড়াতে, কেউ চা খায় স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, কেউ চা খায় বন্ধুদের সঙ্গ দিতে আর কেউবা নিছকই অভ্যাসবশতই খেয়ে থাকে। চা পান অনেকে মানুষকে বিভিন্ন চিন্তা থেকেও দূরে রাখে। চা পানকারীদের মধ্যেও আছে নানা রকম বিভাজন। কেউ পছন্দ করে দুধ চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া রঙ চা খেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করে বেশি। কেউ গ্রীন টি বা, সবুজ চা আবার কেউ উলং চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ৪ ধরনের চা কিন্তু আসে একই গাছ থেকে। সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেসিস

কিন্তু কোন ধরণের চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি? দুধ চা নাকি রঙ চা? চলুন উত্তর খোঁজা যাক। কিন্তু সাধারণভাবে নয়, একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

রঙ চা বনাম দুধ চা; image source: medianp.net

চায়ের মাঝে অ্যান্টিওক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এছাড়াও চা পানকারীরা খুব সাধারণভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত থাকেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, চা পানকারীদের এসকল সুবিধা সম্পূর্ণরুপে বাতিল হয়ে যায় যদি তারা অধিকাংশ চা পানকারীদের মতো চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খান।  

চা কে অনেক আগে থেকেই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। চা যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, তেমনি আবার ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে। আবার দেহের বাড়তি মেদ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, দেহের কোষের সুরক্ষা প্রদানেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জার্মানীর এক দল গবেষকের ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে কয়েক বছর আগে  প্রকাশিত এক পেপারে দেখানো হয়েছে যে, চায়ে দুধের ব্যবহার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চায়ের যে উপকারিতা তার অনেকগুলোকেই নষ্ট করে দেয়।

চায়ে ক্যাটেচিন্স নামের এক ধরণের উপাদান থাকে। এই ক্যাটেচিন্সকেই চায়ের সেই উপাদান হিসেবে ধারণা করা হয় যা আমাদের হৃদপিন্ডকে সুরক্ষিত রাখে এবং আমাদের রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে চায়ের সাথে দুধ মেশালে এই প্রভাব কমে যেতে থাকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যারিটে হসপিটালের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার কাজটি পরিচালনা করেছেন।

রঙ চা; image source: lifehack.org

এই গবেষণা ১৬ জন সুস্থ মহিলার উপর পরিচালনা করা হয়। তাদেরকে আধা লিটার চা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া পান করতে দেয়া হয়েছিল। চা খাওয়ার পরে তাদের বাহুর মাঝ দিয়ে রক্ত চলাচল আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল।

রঙ চা খাওয়ার পরে মহিলাদের রক্ত চলাচলের বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু এই উন্নতির কোনো লক্ষণ দুধ চায়ের মাঝে দেখা গেল না। এরপর গবেষকরা এক দল ইঁদুরের উপরও একই পরীক্ষা চালালেন। এক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করা গেল।

মূলত দুধে অবস্থান করা ক্যাসেইন্স নামের এক দল প্রোটিন চায়ের সাথে বিক্রিয়া করে এবং চায়ে থাকা ক্যাটেচিন্সের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও সকল বিজ্ঞানীরা এখনো এটা বিশ্বাস করেন না যে চায়ের সাথে দুধ মেশালে সেটি খুব বেশি পরিমাণে এই প্রভাবগুলো কমিয়ে দেয়।

দুধ চা; image source: Healthmania.org

তবে এই ফলাফলের ঠিক বিপরীত ফলাফলও আছে। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডে একদল বিজ্ঞানী ১২ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা চালান। দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চা পান করার পর তাদের দেহের ক্যাটেচিন্সের (যে উপাদানের কারণে দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি দেখা যায়) পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তারা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চায়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য দেখলেন না। কিন্তু এই গবেষণা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি গবেষণা ছিল। এই গবেষণাটি মূলত ইউনিলিভার কোম্পানির অর্থায়নে হয়েছিল। চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইউনিলিভার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। লিপ্টন, পি জি টিপস তাদের চায়ের ব্র্যান্ড। গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের চাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বৈজ্ঞানিকগবেষণার কোনোভাবেই আদর্শ হতে পারে না।

২০১১ সালেও আরো একটি গবেষণায় উপরের ফলাফলের মতো আরো একটি ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এবারো এই গবেষণার অর্থায়নে ছিল ইউনিলিভার এবং শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ডের চাকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে হওয়া পৃথক ৩টি গবেষণার ৩টিই চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খাওয়ার চেয়ে রঙ চা খাওয়াকে বেশি উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে এরপরও যদি কেউ একান্তই দুধ ছাড়া চা না খেতে পারে তবে সে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন। সয়া দুধে লেসিথিন রয়েছে, যার আণবিক গঠন ক্যাসেইন্সের চেয়ে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। এই লেসিথিনের ক্যাটেচিনের সাথে বিক্রিয়া করার সম্ভাবনা ক্যাসেইন্সের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই এক্ষেত্রে দুধ চা পানকারীদের ভালো বিকল্প হতে পারে সয়া দুধ।

যদিও এটা সত্য যে, খাবারের কাছে এসে এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বা, বাঁধা নিষেধ মেনে চলা বেশ কঠিন একটা কাজ। আমাদের স্বাদের অনুভবের কাছে বিজ্ঞানের এসব নির্দেশনা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে বিজ্ঞানের নির্দেশ অমান্য করলেও যে চলে না। এরপর থেকে চায়ে দুধ মেশানোর আগে আরেকটিবার ভাববেন কি? অন্তত নিজের জন্য?

ফিচারড ইমেজঃ medianp.net

ঋতুস্রাবের কারণ ও বিচিত্র ইতিহাস

মেয়েটির বয়স যখন কেবল এগারো তখনই হয়তো তার পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব (menstruation) এর অভিজ্ঞতা হয়। তারপরের কয়েক বছর তা শুধু বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণই হয়ে দাঁড়ায় না, সাথে তাকে সহ্য করতে হয় অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা। এসময়টা হট ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে তাকে কুঁকড়ে থাকতে হয় বিছানায়, সামান্য নড়াচড়া করাটাও যেন হয়ে ওঠে বিশাল যন্ত্রণা। অধিকাংশ মেয়েদেরকেই এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো একদমই অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে অন্যান্য প্রাণীদের এই পিরিয়ডের ঝামেলা নেই। তাই এই প্রক্রিয়াটি কিছুটা রহস্যজনকও বটে। ঋতুস্রাব কেন হয়? কেন শুধু মানুষের মাঝেই এটি দেখা যায়? এটি দরকারি হয়ে থাকলে অন্যান্য প্রাণীদের বেলায় কেন নেই?

ঋতুচক্র প্রজননের একটি অংশ। নারীর প্রজনন প্রক্রিয়া প্রতি মাসে দুটি হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের প্রতি সাড়া দেয়। প্রতিমাসে জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তর, এন্ডোমেট্রিয়াম গর্ভধারণের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে ঋতুস্রাবের সাহায্যে।

এন্ডোমেট্রিয়াম কতগুলো স্তরে সজ্জিত এবং রক্তনালিকা সমৃদ্ধ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গর্ভধারণ না করলে প্রোজেস্টেরন লেভেল কমতে থাকে। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং রক্তনালিকাগুলো তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং যোনিপথে বেরিয়ে যায়। এই রক্তপাতকেই বলে ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড। সাধারণত প্রতি ২৮ দিন পর পর এই চক্র সম্পন্ন হয়ে থাকে।  এই চক্রকে বলে ঋতুচক্র।

একজন নারীর ঋতুস্রাবের সময় গড়পড়তা ৩  থেকে ৭ দিন। এই সময়ে মোটামুটি ৩০ থেকে ৯০ মিলিলিটার  ফ্লুইড দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। এই ফ্লুইডে থাকে রক্ত, মিউকাস ও এন্ডোমেট্রিয়ামের ভাঙা অংশ। এই পরিমাণটা জানা খুব সহজ, ব্যবহার করার আগের ও পরের স্যানিটারী ন্যাপকিনের ভরের পার্থক্য থেকেই বের করা যায়।

অনেকেই এই প্রক্রিয়াটিকে অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয় বলে মনে করে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এর প্রয়োজনীয়তা কী? কেন এটা হয়? আগে মনে করা হতো ঋতুস্রাব হয়ে থাকে নারীদেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেবার জন্য। ১৯০০ সালের দিকের বেশিরভাগ গবেষণা মেয়েদের ঋতুস্রাবকে ট্যাবু হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধারণা এখনো রয়ে গেছে।

১৯২০ সালে Bela Schick নামের একজন বিখ্যাত শারীরতত্ত্ববিদ ‘Menotoxin’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি একটি গবেষণা করেছিলেন যেখানে দুইজন মহিলা হাতে কিছু ফুল নিয়ে ধরে থাকেন। একজনের পিরিয়ড চলছিল এবং আরেকজন স্বাভাবিক ছিলেন। schick প্রস্তাব করেন, পিরিয়ড চলাকালীন মহিলার চামড়া থেকে বিষাক্ত পদার্থ (menotoxin) নিঃসৃত হয় যার কারণে ফুল নেতিয়ে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, পিরিয়ডকালীন এই বিষাক্ত পদার্থ ইস্টের বংশবৃদ্ধিও রহিত করে দেয়। তার ধারণা ছিল এই বিষাক্ত পদার্থটি পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে নারীর ঘামের সাথে নিঃসৃত হয়ে থাকতে পারে। কয়েকজন বিজ্ঞানী আবার তাকে সমর্থনও জানালেন। তারা বললেন, পিরিয়ড চলাকালীন একজন মহিলা তার গা থেকে নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে গাছের বৃদ্ধি রহিত করে ফেলতে পারে, এমনকি বিয়ার, ওয়াইন, পিকেলসও নষ্ট করে ফেলতে পারে।

চিত্রঃ না, ঋতুস্রাব চলাকালীন নারী ফুলের নেতিয়ে পড়ার কারণ নয়

ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা

গবেষক Clancy আবার মত প্রকাশ করেন, এসব গবেষণা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এগুলো করা হয়েছিল সেই সময়ে যখন সমাজে মেয়েদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচের দিকে। বলা যায় অনেকটা পরিকল্পতভাবেই এমন ত্রুটিপূর্ণ গবেষণা করা হয়েছিল। এসব গবেষণার সাহায্যে এটি কখনোই প্রমাণ হয় না যে, আসলেই মেনোটক্সিন নামক কোনো বিষাক্ত কিছু পিরিয়ডের সময় নিঃসৃত হয়।

১৯২৩ সালে ঋতুস্রাব নিয়ে আরেকটি অনুমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার Margie Profet প্রস্তাব করেন, নারীদেহে শুক্রাণুর সাথে যে রোগজীবাণু প্রবেশ করে তাদের থেকে রক্ষার জন্যই ঋতুস্রাব হয়ে থাকে। Clancy আবার এসময় বলেন যে, “আসলে পুরুষেরাই হলো অপরিচ্ছন্ন, পুরুষের এই অপরিচ্ছন্নতার জন্য প্রবেশকৃত রোগ জীবাণু দূর করার জন্যই মেয়েদের ঋতুস্রাব হয়।”

চিত্রঃ শুক্রাণুই কি নারীর ঋতুস্রাবের কারণ?

উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে profet এর ধারণার খুব তাড়াতাড়িই মুখ থুবড়ে পড়ে। কেননা তার ধারণা সঠিক হলে ঋতুস্রাবের আগে জরায়ুতে অনেক রোগজীবাণু থাকার কথা ছিল, কিন্তু এমনটা হয় না। এমনকি কিছু কিছু গবেষণা এটাও বলে যে ঋতুস্রাব ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। সেখানে ব্যাকটেরিয়া রক্তে ভালো বংশবিস্তার করতে পারে। এখানে আয়রন, প্রোটিন, সুগার সবই থাকে। আবার ঋতুস্রাবের সময় যোনিপথের আশেপাশে মিউকাসের পরিমাণ কম থাকে, ফলে ব্যাকটেরিয়ার জন্য বেঁচে থাকা খুবই সুবিধাজনক হয়।

শক্তির ব্যবহার

Profet এর সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মিশিগান ইউনিভার্সিটির Beverly Strassmann. ১৯৯৬ সালে তিনি নিজের ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন ঋতুস্রাব বোঝার জন্য শুধু মানুষের উপর গবেষণা করলেই চলবে না,অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের বংশবিস্তার সমন্ধেও গবেষণা দরকার। তাদের প্রক্রিয়াও আলোচনায় আনা জরুরী। তার মতে, জরায়ুর মধ্যকার একটি পুরু রক্তনালিকা সমৃদ্ধ স্তরকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রেও জরায়ুর ভেতরের স্তরটি থাকে। গর্ভধারণ না করলে স্তরটির ভেতরের পদার্থগুলো শোষিত হয়ে যায় অথবা ভেঙে বেরিয়ে যায়। স্ট্রেসম্যানের মতে,স্তরটি ভেঙে আবার তৈরি করতে কম শক্তির প্রয়োজন হয়।

তিনি আসলে এখানে শক্তির মিতব্যয়ীতা বোঝাতে চেয়েছেন,রক্তপাতের কারণ ব্যাখ্যা করতে চাননি। অবশ্য নারীদেহ সম্পূর্ণ রক্ত শোষণ করতে পারবে কিনা এটাও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। অনেক বেশি পরিমাণ রক্ত হলে ঋতুস্রাবই ভালো পন্থা। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে এ ধরনের রক্তপাত অভিযোজন নয় বরং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

মায়ের সাথে গভীরভাবে প্রোথিত

লিভারপুল ইউনিভার্সিটির Colin Finn এমনই আরেকটি ধারণা দেন ১৯৯৮ সালে। তার মতে শক্তি সংরক্ষণের জন্য নয় বরং ডিম্বাণুর বেড়ে ওঠার জন্য ঋতুস্রাব প্রয়োজনীয়। ফিনের মতে ভ্রুণ বিভিন্ন স্তরের সাহায্যে মায়ের শরীরের সাথে খুব গভীরভাবে প্রোথিত থাকে। যার কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর কিছু সময়ের জন্য জরায়ু গর্ভধারণের জন্য যথাযথভাবে তৈরি থাকে। সময়মতো গর্ভধারণ না করলে উপরের স্তর আবার ভেঙে যায়।

উপরের দুটি ধারণাই সঠিক হতে পারে। সত্য অনুসন্ধানের জন্য আমাদের তুলনা করতে হবে অন্যান্য প্রজাতির সাথে যাদের ঋতুস্রাব হয় আর যাদের হয় না। মানুষ ছাড়া আর যেসব প্রাণীর ঋতুস্রাব হয় তাদের অধিকাংশই প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত। বানর, এপ, মানুষ সবাই আছে এর মাঝে।

ঋতুস্রাব হয় এমন একটি প্রজাতি হলো rhesus macaques. বড় আকারের এপের ক্ষেত্রেও এটি দেখা যায়। এছাড়া শিম্পাঞ্জি আর গিবনের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই দেখা যায়। গরিলা আর ওরাং-ওটাং এর মধ্যে অবশ্য বহুলভাবে দেখা যায় না। অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে টারশিয়ারের ঋতুস্রাব দেখা যায়, তবে খুব বিরল।

চিত্রঃ rhesus macaques, এদের মানুষের মতো ঋতুস্রাব হয়

পরিচিত প্রাণীদের মধ্যে হাতি আর বাদুরের ঋতুস্রাবীয় রক্তপাত হয়ে থাকে। নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির John Rasweiler এর মতে বাদুরের দুইটি গোত্র, free tailed bats এবং leaf-nosed bats এর পিরিয়ড হয়ে থাকে।

ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণী খুবই অল্প

উপরে উল্লেখিত প্রজাতিদের ঋতুস্রাব মোটামুটি মানুষের মতোই। শর্ট টেইলড ফ্রুট বাদুরের রজঃচক্র ২১–২৭ দিনের যেমনটা হয় মানুষের। বাদুরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্য মানুষের মতো তেমন স্পষ্ট নয়। স্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও এটি বোঝা যায় কারণ এই বাদুরগুলোর জরায়ুকে ঘিরে ছোট ছোট রক্তনালিকা থাকে। দেখা যাচ্ছে ঋতুস্রাব হয় এমন প্রজাতি হাতে গোনা যায়। মানুষ, এপ, বানর, বাদুর এবং হাতী।

ভ্রুণ হতে আসা সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে জরায়ুর পরিবর্তন

ইয়েল ইউনিভার্সিটির Deena Emera’র মতে, একজন মায়ের তার জরায়ুর উপর কতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে সেটি তার নিজের উপরই নির্ভর করে। ২০১১ তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ইমেরা এবং তার সহকর্মীগণ উল্লেখ করেন, ঋতুস্রাব হয় এমন প্রাণীদের জরায়ুর ভেতরের স্তরটি সম্পূর্ণরূপে মায়ের দেহের প্রোজেস্টেরন হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ভ্রুণ শুধুমাত্র তখনই জরায়ুতে স্থাপিত হয় যখন জরায়ুর ভেতরের দেয়াল পুরু আর বড় বিশেষায়িত কোষযুক্ত হয়। একজন মহিলা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি গর্ভবতী হবেন কিনা। এই ক্ষমতাকে বলে ‘spontaneous decidualisation.

অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর ক্ষেত্রে ভ্রুণ হতে আসা সংকেত জরায়ুর পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গর্ভাবস্থার প্রতি সাড়া দিতেই জরায়ুর পরিবর্তন হয়ে থাকে। ইমেরার মতে, “যেসব প্রজাতির ঋতুস্রাব হয় এবং যারা spontaneous decidualisation ক্ষমতা প্রদর্শন করে তাদের মধ্যে একটি বিশেষ আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।”

এর উপর ভর করেই তিনি মূল জিজ্ঞাসা খুঁজে বের করেন- “কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে কেন গর্ভাবস্থা মা নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে আর কিছু প্রজাতির তা নিয়ন্ত্রিত হয় ভ্রুণ দ্বারা?” তিনি মত প্রকাশ করেন spontaneous decidualisation ক্ষমতাটা তৈরি হয়েছে মা এবং ভ্রুণের মধ্যে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য।

এই প্রশ্নের উত্তরে প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে এবার দুটি সম্ভাবনা দেখানো যায়। প্রথমটি হলোঃ spontaneous decidualisation (গর্ভাবস্থা নিয়ন্ত্রণে মায়ের ক্ষমতা), যা আক্রমণাত্মক ফিটাস হতে মাকে রক্ষা করার জন্য বিকশিত হয়েছে।

সকল ভ্রুণই মায়ের জরায়ুতে গভীর পরিচর্যার জন্য আশ্রয় নেয়। ঘোড়া,গরু,শূকর এদের ক্ষেত্রে ভ্রুণ আলতোভাবে জরায়ুর উপরে স্থান নেয়। বিড়াল,কুকুরের ক্ষেত্রে ভ্রুণটি আরেকটু গভীরে প্রবেশ করে। কিন্তু মানুষ সহ অন্যান্য প্রাইমেটদের ভ্রুণ অত্যন্ত গভীরভাবে জরায়ু প্রাচীরে প্রোথিত হয়। কেউ কেউ এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, মা আর শিশু যেন একটি “চিরায়ত রশি টানাটানি” যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

মা চায় তার প্রত্যেক সন্তানের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি বরাদ্দ রাখতে যাতে করে তার শক্তি কিছুটা বাঁচে এবং তা অন্য সন্তানকে দিতে পারে। অপরদিকে বেড়ে উঠতে থাকা বাচ্চাটি চায় তার মা থেকে যতটা সম্ভব বেশি শক্তি ব্যবহার করতে। ইমেরার মতে, “বাচ্চাটি যত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মা ততই সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে থাকে বাচ্চার আক্রমণ ঠেকানোর জন্য।”

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো, spontaneous decidualisation ব্যবস্থাটি উন্নতি লাভ করেছে অনাকাঙ্খিত ভ্রুণ প্রতিরোধ করার জন্য। জীনগত অস্বাভাবিকতা ভ্রুণের ক্ষেত্রে খুব বেশি দেখা যায়। যার কারণে গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই অনেকের গর্ভপাত হয়। এটা হতে পারে অস্বাভাবিক যৌন ক্রিয়াকলাপের কারণে।

ভ্রুণে পরিণত হওয়া ডিম্বাণুটির বয়স বেশিও হতে পারে

মানুষ যেকোনো সময় যৌন সঙ্গমে মিলিত হতে পারে যেখানে অন্যান্য প্রাণীরা শুধুমাত্র ডিম্বপাতের সময় অর্থাৎ প্রজননকালে যৌন সঙ্গম করে। এটিকে বলে সম্প্রসারিত যৌন কাল।

অন্যান্য কিছু ঋতুস্রাবীয় প্রাইমেটদের ক্ষেত্রেও এই সম্প্রসারিত যৌনকাল দেখা যায়। ফলশ্রুতিতে অনেক সময় নিষিক্ত ডিম্বাণুর বয়স বেশ বেশি থাকে, যার কারণে এতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। জরায়ু পুরু হয়ে পরিবর্তিত হয়ে গেলে এটি স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক ভ্রুণের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারে। spontaneous decidualisation মাকে বাঁচানোর একটি পদ্ধতি হতে পারে। এটি মাকে অস্বাভাবিক ভ্রুণ হতে রক্ষা করে এবং নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করে।

এ থেকে একটি বিষয়ে ধারণা লাভ করা যায়, অধিকাংশ ঋতুস্রাবীয় স্তন্যপায়ীদের গর্ভকাল একটি দীর্ঘ সময়ব্যাপী হয়ে থাকে এবং তারা সন্তান ভূমিষ্ঠ করতে অধিক শক্তি বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়। ঝামেলাজনক গর্ভাবস্থা এড়ানোর জন্যই তারা বিবর্তিত হয়েছে।

সুতরাং ঋতুস্রাব বিবর্তনের একটি পার্শ্বক্রিয়া

২০০৮ সালে রেসাস বানরের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, এদের ভ্রুণের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রে এরকম তথ্য না পাওয়ার কারণে এই গবেষণা বেশি দূর এগোয়নি। সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা spontaneous decidualisation এর কারণ খুঁজে বের করতে পারছি,ততক্ষণ ঋতুস্রাবের ধাঁধার জট খুলতে পারবো না।

স্ট্রেসম্যান,ফিন,ইমিরা সহ সকলের গবেষণা একটি দিক নির্দেশ করছে যে,ঋতুস্রাব প্রজননজনিত কারণে বিবর্তনের একটি আকস্মিক ঘটনা। যেসব প্রজাতি অন্যভাবে প্রজনন ঘটিয়ে থাকে তাদের ঋতুস্রাবের প্রয়োজন হয় না। বন্যপ্রাণীদের মধ্যে ঋতুস্রাব খুব বিরল হয়ে থাকে।

মানুষের ক্ষেত্রে,যেসকল সমাজে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা কম,তাদের ঋতুস্রাবও কম হয়। এমনকি সেসব স্থানে মানুষ এখনো প্রাকৃতিক জন্মদানের উপর নির্ভরশীল। সেখানকার মহিলারা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটায় সন্তান জন্ম দিয়ে অথবা সন্তানকে স্তন্যদান করে।

মালির ডগন সম্প্রদায়ে গবেষণা করে স্ট্রেসম্যান আবিষ্কার করেছেন সেখানের মহিলারা জীবনে ১০০ টি পিরিয়ড পেয়ে থাকেন যেটা আমাদের প্রজাতির ক্ষেত্রে মোটামুটি স্বাভাবিক। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো স্বাভাবিক বিশ্বের মহিলারা ৩০০–৫০০ টি পিরিয়ড পান।

চিত্রঃ ডগন নারীরা নারীত্বের বেশিরভাগ সময়েই গর্ভবতী কিংবা দুগ্ধদানরত অবস্থায় থাকেন

Clancy বলেন, “এমন অনেক মহিলা আছেন যারা পিরিয়ড না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন। কিন্তু আসলে আমাদের দেহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বিস্তৃতি আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বিশাল। সুতরাং প্রতিটি সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত না হয়ে বরং একটু সময় নেওয়াই ভাল।”

যাহোক এত বিশাল আলোচনা হয়তো একটি ১১ বছর বয়সী মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাবের যন্ত্রণাকে কমাতে পারবে না। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ঠেলে দিয়ে আমাদের সকলের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীই পারে এই কষ্টকে ঘুচাতে। হাজার হোক একজন মানুষ, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, তার জন্ম তো হয় এই ঋতুস্রাব প্রক্রিয়ার কারণেই।

তথ্যসূত্রঃ BBC Earth, http://www.bbc.co.uk/earth/story/20150420-why-do-women-have-periods

ধূমপানের মহাবিপদ সংকেত

একজন মানুষের শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধতে কার্যত দীর্ঘ সময় নিয়ে থাকে। হতে পারে সেটি কয়েক বছর বা এমনকি কয়েক দশকও। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে একজন ৭০ বছর বয়সী ব্যক্তির মলাশয় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি একজন ১০ বছর বয়সী বালকের চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। ঠিক একইভাবে, ফুসফুস ক্যান্সারও একজন মানুষের শরীরে খুব দীর্ঘ সময় নিয়েই বাসা বেঁধে থাকে। মূলত, ফুসফুস ক্যান্সার শরীরে বাসা বাঁধার জন্য তিন দশক বা তারও অধিক পর্যন্ত সময় নিতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ধূমপান আদৌ জনপ্রিয় ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের একটা বড় অংশ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

image source: dailymail.co.uk

এর কারণ হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তাদের রেশনের অংশ হিসেবে সিগারেট পেতেন। এর প্রায় ত্রিশ বছর পরে, ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে। ঠিক একই সময়ে ধূমপান সমস্ত বিশ্বে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে এবং এর সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটে নব্বই এর দশকে। এতে করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুর বৈশ্বিক হার ২০২০ সাল পরবর্তী সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ন্যাচারে প্রকাশিত বিজ্ঞানী রবার্ট এন. প্রক্টর এর একটি গবেষণাপত্র থেকে সংগৃহীত নিচের গ্রাফটি থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এখন পর্যন্ত ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হারটা হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু এ কথা খুব জোর দিয়েই বলা যায়, খুব শীঘ্রই এই হারটা আশঙ্কাজনক হারেই বৃদ্ধি পাবে। তাই যে সমস্ত ধূমপায়ী প্রায়শই প্রশ্ন তুলে থাকেন, “ধূমপানের কারণে আপনি কি কাউকে ক্যান্সারে মারা যেতে দেখেছেন?”, তারা হয়তো খুব শীঘ্রই তাদের সেই প্রশ্নের উত্তরটা পেতে চলেছেন।

তথ্যসূত্রঃ

১. Proctor RN (2001) Tobacco and the Global Lung Cancer Epidemic. Nat Rev Cancer; 1(1):82-6.

২. Weinberg RA (2013), the Biology of Cancer. Garland Science, New York.

featured image: choicesdomatter.org

লেজার দিয়ে নিউরনের জোড়া-তালি!

আমার আপনার স্নায়বিক উদ্দীপনা বৈদ্যুতিক সংকেত হিসেবে মস্তিষ্কে প্রেরণকারী শারীরিক অংশটিই হচ্ছে নিউরন বা স্নায়ু। এ স্নায়ুগুলো আবার একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং তাদের সংযোগস্থলকে বলা হয় সিন্যাপ্স। নিউরনের প্রধান অংশ সোমা থেকে এ সংকেতগুলোকে দূরে বহন করে নিয়ে যায় লম্বা দন্ডাকার অ্যাক্সন। এ অ্যাক্সন আবার অন্য আরেক নিউরনের সিন্যাপ্সের সাথে যুক্ত হয়। নিউরনের এ সকল অংশ ফ্যাটি এসিড দিয়ে গঠিত মায়োলিন নামক আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে। এ কারণে নিউরন সুরক্ষিত থাকে এবং সংকেত দ্রুত পরিবাহিত হয়।

image source: kurzweilai.net

এই মায়োলিন আবরণ যদি কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা নিউরনের অন্য যে কোনো অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা সংকেত পরিবহণ প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিতে পারে। ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হতে পারে। নিউরন বিভাজিত হয় না। ফলে আমাদের স্নায়বিক যে কোনো রোগের সমাধান করা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু আশার কথা হলো, ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবার্টার এক দল ইঞ্জিনিয়ার লেজার রশ্মির মাধ্যমে নিউরনের মাঝে সংযোগ স্থাপন করার পদ্ধতির উন্নত সংস্করণ উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন। যদিও এ পদ্ধতির গণ্ডি এতদিন যাবৎ গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিল। গবেষকেরা আশা করছেন, বিভিন্ন স্নায়বিক জটিল রোগের সমস্যার সমাধানে এ পদ্ধতি কাজে লাগানো যেতে পারে।

image source: iflscience.com

স্নায়ু জোড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে গবেষকেরা ফেমটোসেকেন্ড নামক এক রঞ্জন রশ্মির ব্যবহার করেছেন। ফেমটোসেকেন্ড লেজার থেকে নিঃসৃত স্পন্দন ফ্যাটি অ্যাসিডের আবরণের অণু এবং তাদের বন্ধনগুলো ভেঙে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং এ অবস্থায় তাদেরকে বাধ্য করে পার্শ্ববর্তী স্নায়ুর অবরণের অণুর সাথে নতুন বন্ধন গঠন করতে।

তথ্যসূত্রঃ www.iflscience.com

featured image: wonderfulengineering.com