পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবী এবং বাঙ্গালী ডাক্তারের আত্মহত্যা

গুটি গুটি পায়ে গ্যালিলিও এসে বিচারকক্ষে প্রবেশ করলেন। বিশাল কক্ষটিতে বিচারকদের আসনে বসে আছেন ধর্মীয় যাজকরা। বাইরে অনেক মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে। একসময় বিচার শুরু হলো। প্রধান ধর্মযাজক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গ্যালিলিওর দিকে আঙ্গুল তাক করে জিজ্ঞেস করলেন- “এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র হলো পৃথিবী। সকল গ্রহ-নক্ষত্র এমনকি সূর্যও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আপনি কি বাইবেলের এই মহাসত্যকে অস্বীকার করছেন?” গ্যালিলিও তার মাথাটা উঁচু করলেন। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ প্রধান যাজকের দিকে। হঠাৎ তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো, ভ্র জোড়া কুঁচকে ফেললেন। কী যেন ভাবলেন। এরপর মাথাটা নীচের দিকে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে আস্তে আস্তে বলে উঠলেন, ‘না’। যাজকদের মধ্যে বিজয়ের ক্রুর হাসি দেখা দিলো। দশর্কদের মধ্যে মৃদু গুজন উঠল। একজন কে জানি বলে উঠল, ‘সত্যকে হত্যা করা হলো’।

ঠিক একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার অদূরে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ই নভেম্বর। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে গঠিত একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’কে নিযুক্ত করলেন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামক এক অভিযুক্তের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দাবি করেছেন তিনি দূর্গা নামে এক টেস্টটিউব বেবির স্থপতি। দ্বিতীয় অভিযোগ তিনি তার গবেষণার কথা দপ্তরের আমলাদেরকে আগে না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন?

কীভাবে তিনি তার সার্দান অ্যাভিনিউর ছোট ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু উপকরণ আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করে এমন একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করলেন যেখানে অন্যরা গবেষণার সকল উন্নত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও সে চিন্তা করতে পারছে না? আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই যে, তিনি কারো কাছে মাথা নোয়াতেন না। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি ছিলেন একজন রেডিওফিজিসিস্ট। কমিটির সদস্যদের মধ্যে একজন গাইনোকলোজিস্ট, একজন ফিজিওলজিস্ট আর একজন নিউরোফিজিওলজিস্ট ছিলেন।

মজার বিষয় হলো এদের কারোরই আধুনিক প্রজনন পদ্ধতি (আইভিএফ-ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। একজন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওই ভ্রূণগুলো কোথায় রেখেছিলেন?’ ডাঃ মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন, ‘সীল করা অ্যাম্পুলের মধ্যে’। উল্লেখ্য অ্যাম্পুল হলো ইনজেকশনের ওষুধ রাখার জন্য ছোট কাচের বোতল। ফের প্রশ্ন করা হলো, ‘অ্যাম্পুলটাকে সীল করেছেন কীভাবে?’ জবাব এলো, ‘সাধারণভাবে যেভাবে করে। তাপ দিয়ে।’ এভাবেই শুরু হলো জেরা-পাল্টা জেরা। কিছু অবান্তর ভিত্তিহীন, গবেষণার সাথে সম্পর্কহীন প্রশ্ন করে তাকে অপমানের চুড়ান্ত করা হলো। বলা হলো, ‘ওহ-তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তাপের কারণে ভ্রূণগুলো নষ্ট হয়ে যায়নি?

এই কমিটি কী রায় দিবে তা যখন পূর্বনির্ধারিতই তখন এটা আর বলার প্রয়োজন নেই যে এর সব কিছুই আমলাতান্ত্রিক কূটনৈতিক চালের কারণে হচ্ছে। কমিটি চূড়ান্ত রায় দিলো, “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.”

চিত্রঃ ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের অধীনে টেস্টটিউব বেবির জন্মের মাত্র ৬৭ দিন আগে ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই রাত ১১ টা ৪৫ মিনিটে ইংল্যান্ডের ওল্ডহ্যাম জেনারেল হাসপাতালে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবী লুইস ব্রাউন জন্ম নেয়। স্থপতি ছিলেন রবার্ট এডওয়ার্ডস এবং প্যাট্রিক স্টেপটো। এ প্রক্রিয়ায় তারা ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্যে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এর আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে ডিম্বাণুর বিভাজন ও পরিস্ফুটন পর্যবেক্ষণ করেন। তারপর কর্তন প্রক্রিয়ায় ডিম্বাণু সংগ্রহ করে একটা ডিস্কে শুক্রাণুর সাহায্যে সেটাকে নিষিক্ত করেন। এরপর এ থেকে ভ্রূণ উৎপন্ন হলে সেটাকে আবার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করেন।

কিন্তু ডাঃ মুখোপাধ্যায় এক্ষেত্রে ল্যাপোরোস্কোপি যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। এজন্য তিনি এক প্রকার হরমোনের সাহায্যে ডিম্বাণুর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটান এবং ওখানেই এর বিকাশ সাধন করেন। এরপর ছোট একটা অপারেশনের সাহায্য নিয়ে ডিম্বাণু সংগ্রহ করেন। আর একারণে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও অনেকাংশে বেড়ে যায়।
কিন্তু সহকর্মী এবং সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে বরণ করে নিতে হলো করূন পরিণতি।

চিত্রঃ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটো এবং ডা. রবার্ট এডওয়ার্ডস।

প্রথমে তাকে বদলী করে দেয়া হলো কলকাতা থেকে বাঁকুড়ার একটি হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে। যাতে তিনি পরবর্তীতে তার গবেষণা চালিয়ে যেতে না পারেন। এরপর তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। ফের চলে এলেন কলকাতায়। চারতলার সিঁড়ি বেয়ে তাকে রোজ কাজ করতে যেতে হতো। জাপান থেকে তার কাজের উপর একটা সেমিনারে বক্তৃতা করার আমন্ত্রণও পেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে যেতে দেয়া হয়নি। চুড়ান্ত অপমান, উপহাস আর লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার পর ১৯৮২ সালে ১৯ শে জুন এই মহান প্রতিভাবান ফিজিশিয়ান নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন।

আরো একবার যেন সত্যকে হত্যা করা হলো। ভারতের সরকার স্বীকৃত প্রথম টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি হলেন ডা. টি এস আনন্দ কুমার যিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিচার্সের ডিরেক্টর। ১৯৮৬ সালের ১৬ ই আগস্ট তার অধীনে জন্ম নেয় ভারতের প্রথম (পড়ুন দ্বিতীয়) টেস্টটিউব বেবী হর্ষ।

১৯৯৭ সালে ডা. আনন্দ একটা বিজ্ঞান সম্মেলনে যোগ দিতে আসেন। তখন ডাঃ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার সকল কাগজপত্র তার হাতে তুলে দেয়া হয়। নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করে এবং সেই টেস্টটিউব বেবী যার জন্ম হয়েছিল ডাঃ সুভাষের অধীনে-দূর্গা সেই শিশুটির মা-বাবার সাথে আলাপ-আলোচনা করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্টটিউব বেবীর স্থপতি। ডাঃ টি সি আনন্দ কুমারের উদ্যোগেই তিনি পরে ভারতবর্ষের স্বীকৃতি পান।

চিত্রঃ দূর্গা।

দূর্গা এখন দিল্লীতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি তার ২৫ তম জন্ম বার্ষিকীতে প্রথম মিডিয়ার সামনে আসেন এবং নিজের জনক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে দেন যে ডা. সুভাষের দাবী নিতান্তই অমূলক বা বোগাস ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিকশনারী অব মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে যারা এই চিকিৎসা শাস্ত্রের উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন। আর এই তালিকায় ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নামও রয়েছে।

যুগে যুগে মানুষের কাজের স্বীকৃতি পেতে মানুষকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে, বরণ করে নিতে হয়েছে লাঞ্ছনা, অপমান আর উপহাস-ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। যেকোনো নতুন কাজের শুরুতেই সমাজ বাধা দিয়ে এসেছে। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। আর আমরা বাঙালীরা এই দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে। কি সাহিত্য কি বিজ্ঞান কি অন্য যেকোনো বিষয়, সবক্ষেত্রেই আমরা জীবদ্দশায় কৃতী ব্যক্তির সম্মান দিতে অপারগ থেকেছি। ডা. সুভাষের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। উল্লেখ্য, ডা. সুভাষের কাজের উপর ভিত্তি করে গুণী পরিচালক তপন সিনহা ১৯৯০ সালে একটি সিনেমা বানিয়েছেন। নাম ‘এক ডাক্তার কি মউত’। এই সিনেমার জন্য তিনি বেস্ট ডিরেকশনের অ্যাওয়ার্ড পান।

চিত্রঃ ‘এক ডাক্তার কি মউত’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটিউব বেবীর জন্ম হয় ২০০১ সালে ২৯ মে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে। একইসাথে হীরা, মণি ও মুক্তা নামে তিনটি শিশুর জন্ম হয়। ডাক্তার ছিলেন পারভীন ফাতেমা।

চিত্রঃ মা-বাবার কোলে হীরা, মণি আর মুক্তা।

২০১০ সালে স্যার রবার্ট এডওয়ার্ডকে ইন-ভিট্রো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় ভাইরাস কলেজের ছাত্রদের একটা কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, চাঁদে প্রথম পা রেখেছিলেন কে? প্রায় সকলেই উত্তর দিতে পেরেছিল। কিন্তু কে দ্বিতীয় হয়েছেন তা কেউ বলতে পারেনি। ডাঃ সুভাষের ক্ষেত্রে এমনই ঘটলো। মাত্র অল্প ক’দিনের ব্যবধানে তিনি প্রথম টেস্টটিঊবের জনক হতে পারলেন না। তাতে কী হয়েছে? তিনি বাঙ্গালী। আর সে কারণেই আমাদের তাকে স্মরণ করা উচিত। হয়তো ২০১০ সালের নোবেল বাঙ্গালীদের ঘরেই আসতো। সে আফসোস করে লাভ নেই। বরং এদেশীয় বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে যারা কাজ করছেন তারা অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে পৃথিবীর মঞ্চতে মাথা উঁচু করতে পারবেন সেই চেষ্টা যাতে অব্যাহত থাকে এই কামনা করতে পারি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি The Great Scientist Dr.Subash Mukhopadhyay এর স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ। পাশাপাশি অন্যান্য সূত্র থেকেও সাহায্য নেয়া হয়েছে।

প্রকৃতির ভুলঃ প্রিয়ন ও অট্টহাসি রোগ

প্রিয়নের নানা রূপ [রুহশান আহমেদ]

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের একটি দ্বীপরাষ্ট্র স্যান লরেঞ্জোর শাসক ‘পাপা মনজানো’র বাবা ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। তার একটি আবিষ্কার হলো রহস্যময় আইস-নাইন, যার সংস্পর্শে আসলে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিও জমে গিয়ে আইস-নাইনে পরিণত হয়। বহুকাল সেই আইস নাইন ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। একসময় পাপা মনজানো ক্যান্সারের যন্ত্রণা সইতে না পেরে আইস-নাইন খেয়ে আত্নহত্যা করেন। তার জমে যাওয়া দেহের স্পর্শে এসে তার ডাক্তারও জমে গিয়ে মারা যান। এ যেন ছোটবেলায় খেলা বরফ-পানির বাস্তব এবং ট্র্যাজিক সংস্করণ। এতটুকুই নয়, ঘটনাক্রমে পাপার দেহ গিয়ে পড়ে সমুদ্রে এবং সারা পৃথিবীর পৃষ্টে ও পেটে যত পানি আছে সব জমে গিয়ে বিশাল দূর্যোগ সৃষ্টি করে। বাকীটা জানতে হলে পড়তে হবে কার্ট ভনেগাট এর লেখা কল্পকাহিনী Cat’s Cradle।

আমাদের সৌভাগ্য যে, আইস-নাইন কাল্পনিক। কিন্তু দুর্ভাগ্য এর জৈবিক প্রতিরূপ বাস্তব, যার নাম প্রিয়ন। ব্রায়ান কহে এবং পিটার ল্যান্সবারি ভেড়ার স্ক্র্যাপি রোগ সম্বন্ধে রচিত একটি নিবন্ধে কাল্পনিক আইস নাইনের সাথে প্রিয়নের তুলনা করেন। প্রিয়ন কী? সেটি বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে প্রোটিন কী, মূলত প্রোটিনের গঠন জানলেই হবে।

কুড়ি ধরনের অ্যামিনো এসিড আছে, যারা মিলে মিশে হাজার হাজার প্রোটিন তৈরি করে। কোষে যখন প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়, তখন প্রথমে বিভিন্ন অ্যামিনো এসিড একে অপরের সাথে চেইনের মতো করে যুক্ত হয়। এ চেইন কিন্তু প্রোটিনের মতো কাজ করে না। এজন্য চেইনকে নানাভাবে ভাঁজ খেয়ে, প্যাঁচ খেয়ে, কখনো কখনো অন্য আরেক চেইনের সাথে গিট্টু বেঁধে নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক আকৃতি অর্জন করলে তবেই সেই প্রোটিন আমাদের উপকারে আসবে। সে এক বিশাল আয়োজন। তবে যা-ই হোক, এই যে প্যাঁচগোচের ব্যাপার আছে প্রোটিনের গঠনে, তাতে যদি উল্টা-পাল্টা কোনো ভুল হয়? হ্যাঁ, ভুলের সবসময়ই একটা মাশুল আছে যা সেই প্রোটিনকেই দিতে হয় অন্য আরেক প্রোটিনের ঘ্যাচঘোচের শিকার হয়ে! তবে কখনো কখনো, ভুল প্যাঁচের প্রোটিন ঠিকই ফাঁকি দিয়ে বেঁচে যায়। আর নানান অসুবিধার কারণ হয়, এদের মধ্যে যেগুলো ভাইরাস/ব্যাক্টেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোই প্রিয়ন।

আচ্ছা এগুলো নাহয় বুঝলাম, তো প্রিয়ন কীভাবে রোগ সৃষ্টি করে?

উদাহরণ হিসেবে ভেড়ার রোগ স্ক্র্যাপির কথাই ধরি, তার আগে বলে নিই স্ক্র্যাপি হলে ভেড়ার কী হয়। নিজেই নিজের হাত পা কামড়ায়, হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঝাঁকায়, মাতালের মতো হাঁটাহাঁটি করে, কোনো জিনিসে ক্রমাগতভাবে আঘাত করতে থাকে, সময়ে সময়ে খরগোশের মতো সামনের দু’পা তুলে লাফানোরও চেষ্টা করে। ভেড়ার সমাজে কোনো গল্পকার থাকলে নিশ্চয়ই স্ক্র্যাপি আক্রান্ত ভেড়াদের নিয়ে ভয়ংকর সব গল্প লিখতে পারতেন। ভেড়ার মগজে প্রয়োজনীয় একটি প্রোটিনের ভুল প্যাঁচ খাওয়া রূপ স্ক্র্যাপির জন্য দায়ী একটি প্রিয়ন। এ প্রিয়নের সংস্পর্শে এলে ভালো প্রোটিনও নিজের আকৃতি বদলে প্রিয়ন হয়ে যায়, ঠিক যেমন আইস নাইনের সংস্পর্শে এসে পানি বদলে যায় আইস-নাইন এ। এভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রিয়ন জমে এবং ভেড়ার নিউরন ধ্বংস করে। ভেড়ার দেহ থেকে নানাভাবে এ প্রিয়ন পরিবেশে ছড়ায়। সুস্থ ভেড়া খাদ্যের সাথে কিংবা অন্য কোনোভাবে পরিবেশ থেকে এ প্রিয়ন গ্রহন করলে সেও স্ক্র্যাপিতে আক্রান্ত হয়। শুধু কি ভেড়া? গরুর বিখ্যাত “ম্যাড কাউ” রোগের কারণও প্রিয়ন। আফ্রিকার মানুষখেকো জংলী গোষ্ঠীতে ক্রাউতজফেলডট-জ্যাকবস ডিজিসের কারণ প্রিয়ন। এছাড়াও আলঝেইমার, পার্কিনসন্স, হান্টিঙ্গটনে কিছু প্রোটিনের প্রিয়নের মতো আচরণকে বিজ্ঞানীরা দায়ী করেন।

যদিও প্রিয়নে কোনো ডিএনএ/আরএনএ থাকে না, কিন্তু তবুও এরা ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়ার মতো নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে এবং সেই তথ্য নিজেরা ধারণ করে। এরা আবার রোগেরও সৃষ্টি করে, সে রোগ আবার সংক্রামকও হয়। কোনো নিউক্লিক এসিডের সাথে যোগসাজস ছাড়াই শুধু প্রোটিন যে এসব করতে পারে, ১৯৮২ সালে স্ট্যানলি প্রুজিনারের দেয়া সেই ধারণা বিজ্ঞানীমহলে আমন্ত্রিত হয় যথেষ্ট বিদ্রুপ এবং উপহাসের সাথে। তবে বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনটি অহরহই ঘটে, সেকালের অপবাদ একালের মতবাদ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয়নের ব্যাপারটাও এমন। ধীরে ধীরে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়লো। তবে ২০১০ সালে ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির জিয়ান মা এর হাত ধরে প্রিয়ন তার অকাট্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি তার সহকর্মীদের সাথে রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন থেকে একদম আনকোরা এক সংক্রামক প্রিয়ন তৈরি করে দেখান।

প্রিয়নের নামে অনেক বদনাম করা হলো, চলুন এবার কিছু ভালো কথা শোনা যাক। ঈস্টের নির্দিষ্ট একটি বৈশিষ্ট্যের অমেন্ডেলীয় বংশগতি জিনতত্ববিদদের বহুদিন অন্ধকারে রেখেছিল। নিম্নমানের পুষ্টিকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম সুপার-ডুপার কোনো ঈস্ট এবং অতি সাধারণ কোনো ঈস্টের সাথে যদি মিলন হয়, তাহলে দেখা যায় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের সবারই সেই সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মেন্ডেলীয় জিনতত্ব অনুযায়ী অর্ধেকে এ বৈশিষ্ট্য সঞ্চারণের কথা। এ ধরনের বংশগতি এর আগে শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকা জিন, যেমন মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএতে লেখা বৈশিষ্ট্যের জন্য দেখা গেছে। ১৯৯৪ সালে রিড উইকনার এ ধাঁধার সমাধান প্রদান করেন। তিনি বলেন, যে প্রোটিনের (URE2) কারণে এ সুপার-ডুপার বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে, সেই প্রোটিনের গঠনে সামান্য একটু পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রিয়ন তৈরি হয়। এ প্রিয়ন আবার অন্যান্য URE2-কেও প্রিয়নে বদলে ফেলে এবং কোষ বিভাজনের সময় ঠিকই দুটি নতুন কোষে মাতৃকোষ থেকে রয়ে যায়।

উইকনারের এ ধারণা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্মোচন করে। প্রথমত, প্রিয়ন স্তন্যপায়ী ছাড়াও প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, প্রিয়ন বংশগতিতে অবদান রাখতে পারে। পরবর্তীতে

গবেষণার মাধ্যমে ঈস্টে আরো ডজনখানেক প্রিয়ন পাওয়া গেছে যেগুলো নানাভাবে ঈস্টের জন্য উপকারী। এর মধ্যে একটি হলো Flo11p। এ প্রিয়নগুলো ঈস্টকে প্রতিকূল পরিবেশে একে অন্যের সাথে জড়াজড়ি করে থাকতে, অপেক্ষাকৃত আরামদায়ক পরিবেশের দিকে কলোনীর বৃদ্ধিতে কাজে লাগে। Flo11p আবার আরেক গ্রুপ প্রিয়ন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এ গ্রুপের প্রিয়নগুলো এমনভাবে সমন্বিত যেন পরিবেশে খাদ্যের পরিমাণ, অম্লত্ব/ক্ষারত্বের পরিবর্তন- এসবের বিপরীতে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য শারীরিক প্রক্রিয়াগুলোকে ট্রিগার করে। অর্থাৎ অনেকটা সুইচের মতো কাজ করে।

কোষবিদ্যার নানা পর্যায়ে যেটা ঈস্টের জন্য সত্য, তার সত্যতা উচ্চতর প্রাণিদের মধ্যেও পাওয়া গেছে। পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, “তাহলে আমরাও কি প্রিয়ন সুইচের ব্যবহার করে আসছি অজান্তেই?”

২০০৩ সালে কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এরিক ক্যানডেলের মনে হলো CPEB (Cytoplasmic Polyadenylation Element Binding protein) নামের একটি নিউরন প্রোটিনের সাথে ঈস্টের কিছু প্রিয়নের মিল আছে। সামুদ্রিক স্লাগের CPEB নিয়ে নাড়াচাড়া করে তারা বের করেন যে, এ প্রোটিন দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে কাজে লাগে। আরো দেখা যায় এরা বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারে সাড়া দিয়ে সিনাপ্সে শুধু নিজেদেরই সংখ্যাবৃদ্ধি করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি গঠনে প্রয়োজনীয় আরো কিছু প্রোটিন সংশ্লেষে ভূমিকা রাখে। তার মানে আমাদের নিউরনও প্রিয়নকে সুইচের সুবিধা নিচ্ছে কোনো অঘটন ছাড়াই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রিয়ন সুইচের কথা বলা যায়, যেটি আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে সহায়তা করে। কোষ যদি ভাইরাস আক্রমণের শিকার হয় সেখানে MAVS প্রোটিনটি প্রিয়নের ন্যায় নিজেদের বহুসংখ্যক প্রতিলিপি তৈরি করে, যার ফলে ইন্টারফেরন নিঃসরণ আরো জোড়ালো হয় এবং দেহ দ্রুত ম্যাক্রোফাজের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এটি কোষের জন্য ভয়ানক, কিন্তু দেহের জন্য অপরিহার্য।

তো আমরা বুঝতে পারলাম, ক্ষেত্রবিশেষে প্রিয়নের ভূমিকা কখনো ভালো, কখনো মন্দ। কখনো মগজে মগজে করেনিউরন ধ্বংস, কখনো আচরণ যেন স্মৃতি ধারণের অংশ। আবার দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও প্রিয়নের হাত আছে। আর ঈস্টের ক্ষেত্রে তো দলবদ্ধভাবে প্রতিকূলতার মোকাবিলাতে প্রিয়নই সাহায্য করছে। আইস নাইন এর জৈবিক প্রতিরূপ এ প্রিয়ন। এরা কি ভালো না মন্দ? সে বিচার আপনার।

তথ্যসূত্রঃ

The bright side of prion by Randal Halfman, The Scientist

 

চা-পাতায় ক্যান্সার কোষ নিধন

বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য চমকপ্রদ একটি বছর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। এই বছরে বিজ্ঞানজগতে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। যার কারণে এ বছরটিকে ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অব সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যাজড টেকনোলজি’ বলে ঘোষণা করা হয়। অনেকগুলো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মাঝে একটি হলো হলো মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী। যুক্তরাষ্ট্রের পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। আজকে এ সম্পর্কেই আমরা জানবো।

মুখের ক্যান্সার

ক্যান্সার বলতে সাধারণত বুঝি কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি, যা তার পাশের ভালো কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। মুখের ক্যান্সার হলো নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কণ্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে। নিচের ছবি দুটি লক্ষ্য করুন।

চিত্রঃ মুখ-ক্যান্সারের নমুনা।

আক্রান্ত হবার কারণ

অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এই ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। আমাদের দেশে পান খাওয়ার জনপ্রিয়তার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা

‘ক্যামেলিয়া সিনেসিস’ নামক এক উদ্ভিদ থেকে সবুজ চা-পাতা সংগ্রহ করা হয়। এর উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি শুধু ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এই পাতার রাসায়নিক গঠন দেখলে অনুধাবন করা যাবে এটি আমাদের কতটা উপকারী। এই দিক থেকে এই পাতাকে ঔষুধি উদ্ভিদও বলা যায়।

চিত্রঃ কাঁচা চা পাতা।

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে। তাছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে।

নিধন প্রক্রিয়া

পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয়। তবে এটি কাজ করে একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটি। তিনি আরো জানান, ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে কিছু বিশেষ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ ধরনের কোষকে নষ্ট করে দেয়।
ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরি করে ক্যান্সার কোষের ভেতরে
মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট করার প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “এই ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রণ করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ইজিসিজি তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী। এই সময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ ঊক্ত ক্যান্সার কোষ নষ্ট হয়ে যায়।”

চিত্রঃ মাইট্রোকন্দ্রিয়ার বিরুদ্ধে ইজিসিজির ক্রিয়া-কৌশল।

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে। তারা আরো জানান, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারে না।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ওষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক সব রোগের ওষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে।

তথ্যসূত্র

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
 2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
 3. http://bn.wikipedia.org/
 4. Pean university recerch center

 

দুধ সাদা, কিন্তু সাদা দুধের মাখন কেন হলুদ

দুধ থেকে মাখন তৈরি হয়। মাখন দুগ্ধজাত পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও মাখনের রঙ দুধ থেকে ভিন্ন হয়। মাখন কিছুটা হলদেটে হয় আর দুধ হয় ধবধবে সাদা। এক জাতীয় উপাদান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে রঙের ভিন্নতা দেখা যায় কেন?

দুধ বা মাখনের রঙের ভিন্নতা মূলত নির্ভর করে এদের মাঝে চর্বি বা ফ্যাট কী পরিমাণে আছে তার উপর। পরিমাণের পাশাপাশি চর্বি কী অবস্থায় আছে তার উপরও নির্ভর করে রঙ কেমন দেখাবে। গরু সাধারণত খাদ্য হিসেবে ঘাস, ঘাসের ফুল ও লতা-পাতা খায়। এসব ঘাস, লতা-পাতা ও ফুলের মাঝে ‘ক্যারোটিন’ নামে একধরনের হলুদ বর্ণ-কণিকা থাকে। ক্লোরোফিলের কারণে যেমন উদ্ভিদের পাতা সবুজ হয়, তেমনই ক্যারোটিনের কারণে পাতা বা ফুল হলুদ হয়। বয়স্ক হলুদ পাতার পাশাপাশি সবুজ পাতার মাঝেও অল্প পরিমাণে ক্যারোটিন উপস্থিত থাকে।

গরু যখন খাদ্য হিসেবে এসব ফুল-পাতা খায় তখন পাতার সাথে ক্যারোটিন চলে যায় উদরে। এই ক্যারোটিন পাওয়া যায় গরুর চর্বিতে। দুধেও স্বল্প পরিমাণ চর্বি থাকে এবং চর্বির সাথেও মিশে চলে যায় ক্যারোটিন নামের এই উপাদানটি। তবে দুধে এর রঙের প্রভাব দেখা যায় না। কারণ দুধের প্রায় সবটাই পানি, চর্বির পরিমাণ খুবই কম। সাকুল্যে চর্বি থাকে মাত্র ৩% থেকে ৪%। অন্যদিকে দুধ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে উৎপন্ন মাখনের মাঝে চর্বির উপস্থিতি প্রায় ৮০%। অধিক পরিমাণ চর্বির কারণে স্বাভাবিকভাবেই এতে রঙের ভিন্নতা দেখা দিবে।

শুধু এটাই নয়। দুধ-মাখনের মাঝেও আছে পদার্থবিজ্ঞানের কারসাজি। দুধের মাঝে চর্বির বিন্দুগুলো (globule) একটি পাতলা পর্দা বা মেমব্রেন দ্বারা আবৃত থাকে। ফলে ক্যারোটিনগুলোও আবৃত হয়ে যায়। যখন আলোক রশ্মি এদের উপর এসে পড়ে তখন পর্দায় প্রতিফলিত হয়ে চলে আসে। ফলাফল হিসেবে আমরা পর্দার রঙ দেখতে পাই, আড়ালে থাকা ক্যারোটিনের রঙ দেখতে পাই না। অন্যদিকে মাখন তৈরি করার সময় দুধকে প্রচুর নাড়াচাড়া করা হয়। ঘন ঘন নাড়ার ফলে দুধ থেকে মাখন বের হয়ে আসে। যখন তীব্রভাবে দ্রুত গতিতে নাড়াচাড়া করা হয় তখন চর্বি বা চর্বিগুচ্ছের আবরণকারী পর্দা নষ্ট হয়ে যায়। পর্দা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যারোটিনের হলদেটে রঙ প্রতিফলিত হয়ে চোখে ধরা দেয় এবং আমরা মাখনকে কিছুটা হলুদাভ হিসেবে দেখতে পাই।

চিত্রঃ প্রচুর নাড়াচাড়া করে মাখন তৈরি করা হয়। ছবিঃ Survivopedia

হয়তো খেয়াল করে থাকবেন ভেড়া বা ছাগল বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি মাখন সাদা রঙের হয়। এসব প্রাণীতে মাখন সাদা হবার কারণ হলো গরু যেভাবে শারীরিক প্রক্রিয়ায় বিটা ক্যারোটিন সংগ্রহ করে রাখতে পারে এরা সেভাবে সংগ্রহ করে রাখতে পারে না। এদের শারীরিক প্রক্রিয়ায় এই বাড়তি সুবিধাটি নেই। তারা এর বদলে বিটা ক্যারোটিনকে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত করে ফেলে। ভিটামিন এ আবার বর্ণহীন, যার কারণে দুধ ও মাখনের রঙে তার কোনো প্রভাব পড়ে না।

গরু যদি চারণভূমিতে পালন করা হয় তাহলে এর দুধ থেকে তৈরিকৃত মাখন অধিক হলুদাভ হয়। এসব চারণভূমিতে শীত ও গ্রীষ্মে পাতার মানের তারতম্য ঘটে, তাই শীত ও গ্রীষ্মের মাখনেও হলুদ রঙের তারতম্য ঘটে। সাধারণত শীতের বেলায় গরুর দুধের মাখন কম হলুদ হয়। অন্যদিকে যেসব গরু ফার্মে লালন-পালন করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে ঘাস-লতা-পাতা দেয়া না হয় তাহলে তাদের দুধ থেকে উৎপন্ন মাখন প্রায় সাদাই হবে। কারণ তখন দুধে ক্যারোটিন থাকবে না। একারণেই বিদেশের দোকানগুলোতে সময়ে সময়ে মাখনের রঙের ভিন্নতা দেখা যায়।

তথ্যসূত্র

১. নিউ-ইয়র্ক টাইমস ওয়েল ব্লগ

২. কোরা (Quora) প্রশ্নোত্তর

সিরাজাম মুনির

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার। ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে এবং সে বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে এবং এবার ২০১৬ সালে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সবগুলো সদস্য রাষ্ট্র যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়। সমস্ত পৃথিবীতে বছরে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এসব অপচয়ের পেছনে থাকবে চিকিৎসা সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস সহ আরো অনেক কিছু।

বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে যখন এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো এটি ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সবসময় কাজ করবে। সে সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত সব

ধরনের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল করা আর সম্ভব নয়।

এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতো। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হয়। এই রোগগুলোকে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারানো যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতো লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। যদি এরকম হয় (এরকম হবারই কথা) তাহলে তা মানুষের জন্য শতাব্দীর সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিবে।

আগে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে যেসব রোগের চিকিৎসা সফলভাবে করা যেত সেসব রোগের ক্ষেত্রেও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর অনেক স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে যৌন-বাহিত রোগ গনেরিয়া প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে।

এছাড়া ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রকরণ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সকল এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলেছে, এই খবরটি অবশ্যই আশঙ্কাজনক। এমনকি সাধারণ ছোটখাটো সংক্রমণের ক্ষেত্রেও সমগ্র বিশ্বে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদির মতো মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ, যেগুলো আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিল সেগুলো এখন একদমই অপ্রতিরোধ্য। কোনোভাবেই এদেরকে বশ মানানো যায় না। ফলে প্রতি বছর এসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। রোগগুলো দেখতে হয়তো ক্যানসার বা এইডসের মতো ভয়াবহ নায় কিন্তু তারপরেও অপ্রতিরোধ্য হবার কারণে কেড়ে নিচ্ছে প্রচুর মানুষের প্রাণ। ক্যানসার বা এইডস না হওয়াতে এগুলো মানুষের নজরও কেড়ে নিতে পারছে না।

প্রশ্ন হতে পারে, ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণুগুলো। মূলত মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যেমন খুশি তেমনভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই যত্রতত্র ওষুধ ব্যবহারের

কারণে জীবাণুর এরকম শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে বললে ব্যাপারটি এরকম- মনে করুন ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে। এর প্রতিকারের জন্য আপনি একধরনের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন। আপনার ডাক্তার বলেছিল যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে। চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে। ভালো দেখে আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন।

চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলেও হয়তো দেখা যেতে পারে আসলে সকল ব্যাকটেরিয়া মরেনি। যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ঐ ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে। অর্থাৎ যে আঘাত আপনাকে মারতে পারে না সে আঘাত আপনাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে- এই প্রবাদের মতো। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে দেহের মতো কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ। কিন্তু একটি এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে  প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি জীবাণুর কয়েক দিন সময় লাগে মাত্র। ব্যবহারকারীরা যদি অসাবধান হয় এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে বিশ্বকে ক্ষুদ্র দানবের সৃষ্টি করে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ যে এন্টিবায়োটিক তৈরি করতে বিজ্ঞানীদের বছরের পর বছর সময় লেগেছিল, অনেক অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, অনেক অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছিল, সেখানে ব্যবহারকারীর অবহেলার কারণে এই মূল্যবান শ্রম, অর্থ ও সময়গুলো ভেস্তে যাচ্ছে এক নিমেষেই। এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে ‘সুপারবাগ’ (Superbugs) বলা হয়।

মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ ‘মানব’ দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত। এসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, ত্বক পরিষ্কার রাখে এবং আরো অনেক উপকারী কাজ করে।

সমস্যা হচ্ছে যে, ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও। যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য নিউমোনিয়ার জীবাণুর পাশাপাশি মেরে ফেলা হচ্ছে অন্ত্র বা পেটের অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে। এরা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্ণতা সহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে মানুষ যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অনেকটাই জীবাণুদের দ্বারা নির্গত। বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও জটিল চক্রের মাধ্যমে তারা এই কাজটি করে।

চিত্রঃ ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এখান থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতটা দরকারি। তাই টিকে থাকার জন্যই তাদেরকে আমাদের দরকার। সেজন্য আমাদের সকলেরই উচিৎ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী, এগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে চাপের মুখে রাখে। যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মরে যায়। অথচ দেহের জন্য এরাই সবচেয়ে যোগ্য ওষুধ।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজলভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা। অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে। যেমন ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন। কিন্তু এসব সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় ‘শেষ’ হয়ে এসেছে। বলা হয়ে থাকে আমরা এসব প্রাকৃতিক ওষুধের অধিকাংশই কোনো না কোনো ওষুধের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে। কিন্তু এটি বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার।

অন্যান্য প্রাণীর মতো ব্যাকটেরিয়ার DNA-তেও বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে। অধিকাংশ সময় এসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়। এগুলো তাদের অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক হয় না। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে এসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কোনো কোনোটি ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য শক্তি দান করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতির সূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতেও সঞ্চালিত হয়।

চিত্রঃ ব্যাকটেরিয়া পরস্পরের সাথে ডিএনএ আদান প্রদান করতে পারে।

অনেকে ধারণা করতেন নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে। তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলেও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না। যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে প্রচুর সময় লাগে এবং অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বেশ দ্রুত তাই তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানিও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলেও সেটির বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে কয়েক বছরের ভেতরেই। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক।

এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় (যেমন, কানাডা) সেসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানি কিছু একটা উপায় বের করে ওষুধ নামিয়ে ফেলবে, এরকম ভাবনায় আশা পেয়ে লাভ নেই। আমাদের নিজেদেরকেই এর জন্য নেমে আসতে হবে। জীবাণুগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠেকাতে আমাদেরকেই এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে। সতর্ক ও বিবেক সম্পন্ন হতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রমণের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিৎ। এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে। সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে ঠেকানোর উপায় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক না নিয়ে এর বিকল্প চিকিৎসা নিতে হবে। যেমন ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের

(fecal matter transplants) মাধ্যমেও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী- এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, এন্টিবায়োটিক শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহারও সমান ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেহে ও আশেপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরো বেশি প্রতিরোধী করে তুলি। জীবাণুনাশক হ্যান্ডওয়াশের পরিবর্তে সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। এগুলোও শিক্ষিত মননের সচেতনতার অংশ।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল বা এরকম দূরবর্তী স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় এমন নয়, আমাদের আশেপাশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গরাজ্য। কারণ যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এসে মেশে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের যাপিত পরিবেশে সহজেই মিশে যেতে পারে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপ কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতেও এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি আছে। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় প্রায় ৬০ টিরও বেশি এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহর সংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রেও এইরকম হবে। চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলাশয়ে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। শুধু চীন নয়, ভারত, নিউ ইয়র্ক ইত্যাদি দেশ ও শহরে-ও কম বেশি একই অবস্থা। আমাদের দেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কারখানা ও বর্জ্য নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে কী করা হয় তা অনুসন্ধান ও প্রয়োজনে সমাধান করা জরুরি।

চিত্রঃ ওষুধ কোম্পানিগুলোর আশেপাশের এলাকা অনুসন্ধান জরুরী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার অন্যতম স্থান হতে পারে বুড়িগঙ্গা নদী। অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার কারণে বুড়িগঙ্গা আজ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অন্যতম স্থান। এছাড়া আমাদের দেশে যাবতীয় শিল্পকারখানার বর্জ্য, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্জ্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত গিয়ে মেশে নদী ও প্রবাহিত পানিতে। যেহেতু শহরাঞ্চলে পানির সরবরাহের অন্যতম উৎস নদী তাই এসব পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একবার আমাদের খাদ্য ও পানি চক্রে এইসব ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশ ঘটে গেলে

কিংবা এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের মাঝে সংক্রমিত হলে এর নির্মূল কঠিন হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশ অনেক ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ, তাই রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটার সম্ভাবনা বেশি।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে। এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭ টি দেশের মধ্যে ২২ টি দেশেই (জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে। ভারতের অবস্থা-ও বেশ নাজুক, অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। যেহেতু অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো বাংলাদেশে এসব বিষয়ে উপাত্ত নেই তাই বাংলাদেশের অবস্থা কী তা সঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু প্রতিবেশি দেশ ভারতের নাজুক অবস্থা তাই বলা চলে বাংলাদেশের অবস্থা-ও ভালো নয়।

চিত্রঃ বাংলাদেশের নদীগুলোও ব্যাপকভাবে ‘এন্টিবায়োটিক দূষিত’ হতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা প্রদান ও আলোচনা করলেও এসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এ ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।

অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা শাস্ত্র

ইতিহাসের উত্তরোত্তর উন্নতির সাথে চিকিৎসাশাস্ত্রেও ঘটে যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এটি রূপ নিতে থকে এক অভিজাত শিল্প হিসেবে। এর কিছুটা ঝলক বা ছোঁয়া দেখা যায় তৎকালীন পশ্চিম এশিয়ার উর্বর সভ্যতাগুলোতে। বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরবর্তী মেসোপটেমিয়ান সভ্যতায়। সেইসাথে তুরস্ক, সিরিয়া আর ইরানের উর্বর ভূমিগুলোতেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বছর আগের সুমেরীয় এবং তার পরবর্তী আক্কাডীয়, অ্যাসেডীয় আর ব্যাবলনীয় সভ্যতার কিছু কীলক-লিপি থেকে সেই সময়কার চিকিৎসাশাস্ত্র এবং এ ব্যাপারে অন্যান্য কাজকর্মের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তখনকার অনেক চিকিৎসক মনে করতেন অসুখ-বিসুখ হয় মূলত জাদুবিদ্যা বা দুষ্ট প্রেতাত্মা দ্বারা এবং এর প্রতিকারও শুধুমাত্র জাদুবিদ্যা দ্বারাই সম্ভব। তারা তথাকথিত তন্ত্র-মন্ত্র, তাবিজ-কবজ আর গাল-মন্দ করে সেই দুষ্ট প্রেতাত্মা তাড়াবার ব্যবস্থা করতেন। এ ধরনের চিকিৎসক বা ওঝাদের নাম ছিল আসিপুস।

আরেক ধরনের চিকিৎসক যারা আসুস নামে পরিচিত ছিলেন তারা বিশ্বাস করতেন কার্যকরী পন্থাগুলোতে। তারা বিভিন্ন ভেষজ তরল মিশ্রণ, ক্ষতস্থান পরিষ্কারকরণ, আক্রান্ত স্থান ম্যাসাজ কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যান্ডেজ ও মলম ব্যবহার করতেন। আসিপুস আর আসুস- এ দু’দলই পাশাপাশি চিকিৎসা চালাতেন। তারা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং সাহায্য-সহায়তাও করতেন। তবে বাণিজ্যিক ব্যাপারগুলো গোপন রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতেন।

চিত্রঃ আইনপ্রণেতা হাম্বুরাবি সূর্যদেবতা শামাস থেকে রাজকীয় মর্যাদা নিচ্ছেন।

৩,৮০০ কি ৩,৭৬০ বছর আগে হাম্বুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনের শাসক। কীলক-লিপিতে লিখিত আইনশাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। বিশ্বের প্রথম আইন প্রণেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। আর এই আইনশাস্ত্রে চিকিৎসা বিষয়ক কিছু ঘোষণাও ছিল। এই ঘোষণাগুলো চিকিৎসকদের সফলতা আর ব্যর্থতা উভয়ের

জন্যই দায়ী ছিল। রোগীকে রোগমুক্ত করতে পারলে যেমন পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল, তেমনি ব্যর্থতার জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থাও বলবৎ ছিল। কোনো অভিজাত ব্যক্তির চিকিৎসা করে রোগ সারাতে পারলে ব্রোঞ্জের ল্যান্সেট (বর্তমান ইসরাইলি দশ শেকেলের সমান) দেয়া হতো যা কোনো সওদাগরের এক বছরের আয়েরও অনেক বেশি। আর কোনো দাসের জীবন বাঁচাতে পারলে দেয়া হতো দুই শেকেল। কিন্তু যদি কোনো সার্জনের ছুরির তলায় অভিজাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হতো, তাহলে শাস্তি হিসেবে সেই সার্জনের এক হাত কেটে নেয়া হতো। সেই সাথে তাকে একজন দাসও হারাতে হতো।

দুঃখজনক বিষয় এই যে, হাম্বুরাবি আইনে খুব কম নির্দেশনা দেয়া থাকায় ঠিক কী উপায়ে তারা সেই সময় চিকিৎসা চালাতো তা জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো জাদুটোনা, দুষ্ট প্রেতাত্মা অথবা পাপের কারণে অসুখ-বিসুখ হয় এই ধারণা থাকায় এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না।

গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন ব্যাবলনীয়দের আরোগ্যদেবী। তাকে চিকিৎসকদের পৃষ্টপোষোকতাকারী দেবীও বলা যায়। নিনকার্ককে সাধারণত এক নারীরূপে দেখানো হতো যার সঙ্গী একটি কুকুর কিংবা কুকুরের মাথার মতো কোন মুর্তিকেও নিনকার্ক হিসেবে দেখা হতো। সেসময় রোগীরা রোগমুক্তির জন্য নিনকার্কের মন্দিরে কুকুরের মুর্তি দিত। মাঝে মাঝে কুকুর বলিও দেয়া হতো বলে জানা যায়। কিছু কিছু সূত্র বলে, গুলা বা নিনকার্ক ছিলেন নেকড়েমুখো কোনো দানবী। এই নিনকার্কের আবির্ভাব ঘটে প্রায় ৩,৬০০ বছর আগে ক্যাসিটস নামক এক ব্যাবলনীয় সভ্যতার আমলে। নিনকার্কের প্রধান মন্দির ছিল ঈসিনে (বর্ত্মা ইশান-আল বাহরিয়া, ইরাক) এবং নিপ্পুরে (বর্ত্মান নুফফার-ইন আফক, ইরাক)।

ভেষজ ও অন্যান্য গুল্মলতা প্রতিকারক হিসেবে সেসময় ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। রোগ প্রতিকারের জন্য তারা ওয়াইন, আলুবোখারা (পাম ফলের চাটনি) আর পাইন গাছের রস ব্যবহার করতো। এরসাথে টিকটিকির মল মেশানো হতো যা ঔষধ সহজে গিলতে অসুবিধা সৃষ্টি করলেও ওষুধি ভাব আনতে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। এসব ওষুধে অ্যান্টিবায়োটিক গুণাগুণও বিদ্যমান ছিল।

প্রাচীন মিশরের সাধারণ জনগণ ও অভিজাত লোকদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে দেবতা আর আত্মারা এতটা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল যে বর্তমান আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তখনকার চিকিৎসকদের ধর্মীয় এবং তাত্ত্বিক কাজ আলাদাভাবে জানা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপারটি আরো জটিল আকার ধারণ করে যখন এই আলোচনায় ইমহোটেপ নামক এক পুরোহিত চিকিৎসক প্রশ্নবিদ্ধ হন। ইমহোটেপের আমল ছিল প্রায় ৪,৬৫০ বছর পূর্বে। ইমহোটেপ মিশরীয় রাজত্বকালের প্রথমদিকে ছিলেন। খুব দ্রুতই চারদিকে তার নাম ডাক ছড়িয়ে পড়ে। তার জনপ্রিয়তা এতোই বেড়ে যায় যে জীবদ্দশাতেই তাকে ঈশ্বরপুত্র (Demi-God) হিসেবে সম্মান দেয়া হতো, যে সম্মান সাধারণ কোনো নাগরিকের পক্ষে পাওয়া নিতান্তই অসম্ভব। সে সময় শুধুমাত্র রাজকীয় লোকদের এ ধরনের সম্মান জানানো হতো।

তিন হাজার বছর পূর্বে, মিশরীয় নতুন রাজত্বকালে তাকে পুরোপুরি দেবতারূপে গণ্য করা হতো। তাকে বলা হতো, তার পুত্র (Son Of Ptah), সৃষ্টির স্রষ্টা অথবা মহাবিশ্বের রূপকার। সেই সাথে কারিগরদের ত্রাণকর্তা বিশেষণও দেয়া হয়। তার সঙ্গী ছিলেন সেকমেট (Sekhmet)।

এ সেকমেট মিশরীয়দের সিংহকেশী সমর ও আরোগ্যের দেবী। সেই সাথে ইমহোটেপের মাও ছিলেন। কিছু ঐতিহাসিকের নথিপত্র ঘাঁটলে জানা যায়, ইমহোটেপ আসলে ছিলেন ঘেঁটে আর সন্ধি বাতের চিকিৎসক। তিনি এক ধরনের তরল মিশ্রণ বানাতে দক্ষ ছিলেন যা এ ধরনের রোগ ভালো করে দিতো। অন্যান্য সূত্র বলে, তিনি নাকি ছিলেন কিছু ধান্দাবাজ ওঝাদের দলনেতা যে তার অধীনস্থদের সফলতার সুফল ভোগ করলেও ব্যর্থতার দায়ভার বা নিন্দা নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন।

চিত্রঃ ইমহোটেপের মা দেবী সেকমেট। তিনি সমর এবং আরোগ্য দেবী হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।

প্রাচীন গ্রীসেও ইমহোটেপের প্রভাব বিদ্যমান ছিল। তবে কখনো কখনো তাকে প্রাচীন গ্রীক আরোগ্যদেবতা অ্যাসলেপিয়াস (Aselepios) এর যমজ ভাই মনে করা হতো। কখনোবা অ্যাসলেপিয়াসকেই ইমহোটেপ বলা হতো।

ইমহোটেপের সময়কালের আরেক বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন হেসি-রা, যিনি ফারাও জোসার এর প্রধান চিকিৎসক ছিলেন। হেসি-রা দন্ত চিকিৎসক হিসেবেই বেশি বিখ্যাত ছিলেন। শোনা যায়, দাঁত তোলা আর মুখের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে পটুত্ব ছিল তার। সেইসাথে বর্তমানকালে আমরা যাকে ডায়াবেটিস বা বহুমুত্র রোগ বলি সেটা সম্পর্কেও অল্প বিস্তর ধারণা ছিল। রোগীদের বারবার মূত্র বিসর্জন দেখে এ ধারণা তার মাথায় আসে।

সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদ অঞ্চলের হোগলাজাতীয় গুল্ম বা ঘাস জাতীয় প্যাপারি থেকে তৈরি প্যাপিরাস থেকে প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়, যার একটির নাম- ‘স্মিথ প্যাপিরাস’। বিখ্যাত আমেরিকান মিশরীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংগ্রাহক এডউইন স্মিথের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। তিনিই প্রাচীন এ নথি ১৮৬২ সালে লুক্সর থেকে উদ্ধার করেন।

স্মিথ প্যাপিরাস একদম অসম্পূর্ণ। দেখলে মনে হবে মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া এটি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বছর পুরনো। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক আর শব্দশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি আরো প্রাচীন এক নথি থেকে নকল করা হয়েছে। সেই প্রাচীন নথিটি যথাসম্ভব ইমহোটেপের নিজের হাতে লেখা বা তার অধীনে লেখা। সে সময়ের অন্যান্য প্রাচীন প্যাপিরাসের তুলনায় স্মিথ প্যাপিরাস ঐন্দ্রজালিক বা জাদুকরী চিকিৎসার চেয়ে সাধারণ জখম, ক্ষত, পচন আর অস্ত্রোপচার সম্পর্কেই বেশি তথ্য দেয়। শুধুমাত্র একটি স্থানে আরোগ্য লাভের জন্য ঈশ্বর বা দেবতার কৃপা কামনা করা হয়েছে। নথিটিতে মস্তকের সামনের অংশ থেকে পেছনের দিক পর্যন্ত বিস্তৃত বর্ণনা আছে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পেশি, হাড়, অস্থিসন্ধি আর রক্তের সরবরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্যাপিরাসটি ৪৮ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগেই একদম পরিচিত আধুনিক পদ্ধতির মতো একেকটি সমস্যার বর্ণনা। কারণ, প্রতিকার থেকে শুরু করে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ এবং তা সারাবার বিষয়াদিও বিস্তারিতভাবে আছে।

রোগীকে প্রথমে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা, রোগীর ইতিহাস নেয়া বর্তমানকালের অত্যাধুনিক চিকিৎসার নিয়ম হলেও প্রাচীন গ্রীসে, যেখানে দেবতারা শাসন করতেন, সেখানে এরকম পদ্ধতি ছিল কিছুটা অজ্ঞতার আড়ালে থাকা রহস্যের মতো।

এ স্মিথ প্যাপিরাসেই করোটিসন্ধি সম্পর্কে সবচেয়ে পুরাতন তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া মেনিনজাইটিস (মস্তকের কোষপর্দা) এবং সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা যায়। মাথার ও ঘাড়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, বিশেষ করে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ও পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্যও এতে পাওয়া যায়। স্মিথ প্যাপিরাসে ক্ষতস্থানে সেলাই করা, কাঁচা মাংস ব্যবহার করে রক্তপাত বন্ধ করা এবং মধু ব্যবহার করে রোগ প্রতিকারের কথাও বলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনটি ব্যাপারের কথা বলা যায়। যেমন- একজন লোক, যার মাথায় ক্ষত হয়েছে, তার জন্য প্রথমে মাথাটাকে সঠিকভাবে জায়গানুসারে বিভিন্ন অংশে সেলাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাজা কাঁচা মাংস ক্ষতস্থানে বেঁধে দিতে হবে। এরপর গ্রীজ, মধু এবং অন্যান্য ভেষজ তরল ব্যবহার করতে হবে যতদিন না লোকটি সুস্থ হয়ে উঠে। স্মিথ প্যাপিরসে মূলত অ্যাক্সিডেন্ট সম্পর্কিত কথা বেশি থাকায় ধারণা করা হয় এটি শুধুমাত্র যুদ্ধাহত সৈন্যদের কিংবা পিরামিড বানানোর কারিগরদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হতো। স্মিথ প্যাপিরাসে বর্ণিত ৪৮টি চিকিৎসা ধরনের মধ্যে ১৪ টিকেই চিকিৎসার অনুপযুক্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ সকল রোগের প্রতিকার সেই সময় তাদের জানা ছিল না।

তখনকার আরেকটি বিখ্যাত পুরাতন নথি বা পুঁথি হলো ইবারস প্যাপিরাস (Ebers Papyrus)। এটি প্রায় স্মিথ প্যাপিরাসের মতোই। এটি ৩,৫০০ বছর আগের বলে গবেষকরা মনে করেন। কিন্তু কেউ কেউ বলেন এটিও অন্য আরেকটি পুঁথির নকল, যথাসম্ভব ইমহোটোপের আমলেরই কোনো নথি হবে।

১৮৭২ সালে জার্মান লেখন এবং মিশরীয় বিশেষজ্ঞ জর্জ ইবারস এ পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। তিনি লাইপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। সেখানেই এ ইবারস প্যাপিরাস সংরক্ষিত আছে। এতে প্রায় ১১০ পৃষ্ঠা রয়েছে, লম্বায় প্রায় সাড়ে ৬৬ ফুট আর প্রস্থে ১২ ইঞ্চির মতো।

স্মিথ প্যাপিরাসের সাথে তুলনা করলে ইবারস প্যাপিরাসে শত শত জাদুমন্ত্র আর অভিশাপের মাধ্যমে রোগ সারানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সাথে ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সাহায্যে চিকিৎসার বিবরণ রয়েছে। তবে এটি অন্য নথিগুলোর দিক থেকে সাজসজ্জায় বেশ দুর্বল। তারা জাদুমন্ত্র দিয়ে বাজে, অশুভ প্রেতাত্মা তাড়াবার কৌশল কাজে লাগাতো। পরজীবীর কারণে ঘটিত বাত, ত্বকসমস্যা, আলসার বা পেটের ক্ষত, পায়ু সংক্রান্ত সমস্যা, হৃদরোগ, প্রস্রাবে অসুবিধা, বিভিন্ন ক্ষত এবং প্রসূতিরোগের চিকিৎসার বিবিধ বিধান এতে পাওয়া যায়।

তবে প্রসূতিরোগ সম্পর্কিত প্যাপিরাস হলো ‘কাহুন গাইনোকোলজিক্যাল প্যাপিরাস। প্রায় ৩,৮০০ বছর আগের এ নথিকে চিকিৎসা সম্পর্কিত প্রথম নথিগুলার একটি হিসেবে ধরা হয়। এটি বর্তমানে লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজে সংরক্ষিত আছে। এতে মূলত নারীদের প্রজনন বিষয়ক ব্যাপার আলোচনা করা হয়েছে। গর্ভধারণে সক্ষমতা, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থার পরীক্ষণ এবং গর্ভনিরোধক ইত্যাদি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের মাসিক এবং সে সম্পর্কিত ব্যথার কথাও আছে। বলা আছে- যে গর্ভবতী মহিলা সবসময় বিছানায় থাকতে ভালোবাসে, তাকে কখনো উঠানো উচিৎ নয়। বরং তাকে নাড়াচাড়া করাও ঠিক নয়। এতে তার গর্ভের বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। তাকে খাওউই নামক একটি জিনিস এক গ্যালনের চতুর্থাংশ খাওয়ানো হয়।

আবার এক চিত্র-বিচিত্র পাত্রকে গর্ভবতীদের জন্য ঐশ্বরিক সুরক্ষা কবজ হিসেবে ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এতে করে শয়তান আত্মার হাত থেকে গর্ভের বাচ্চাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে প্রাচীনকালের মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো। মজার এবং একই সাথে ভয়ানক এক তথ্য- গর্ভনিরোধক হিসেবে তারা মধু, টক দই আর কুমিরের গোবরের একটা মিশ্রণ নারী যৌনাঙ্গে ব্যবহার করতো।

চিত্রঃ ঐশ্বরিক তাবিজ-কবজ যা অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে রক্ষা করে বলে মনে করা হতো।

স্মিথ ও ইবারস প্যাপিরাসের কিছুকাল পরেই দ্য হার্স্ট, ব্রুগশ্চ এবং লন্ডন মেডিক্যাল প্যাপিরাস পাওয়া যায়। সমাধি ভাস্কর্যের আকার-আকৃতি, বিভিন্ন হস্ত নির্মিত তৈজসপত্রের সাথে সাথে মমিকরণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ত্থেকে পুরানো ইতিহাসের প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মমিকরণের জন্য মিশরীয় চিকিৎসকরা যে দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গাদিসমূহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন তা এমনিতেই বোঝা যায়। তারা এসব কাজে করাত, ড্রিল মেশিন, সাঁড়াশি, কাঁচি ইত্যাদি নানারকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন।

তবে অপারেশনের বা সার্জারি চিকিৎসা মূলত দূর্ঘটনাসমূহ চিকিৎসার সাথে জড়িত ছিল বেশি। প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসকরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর সুষম খাদ্যাভাসের প্রতিও জোর দিতেন। নকল চোখ, নকল দাঁত- এসব বানাতেও তারা দক্ষ ছিলেন। তারপরও সেই সময়কার মিশরীয় সমাজে আত্মিক এবং ঐন্দ্রজালিক চিকিৎসাই প্রধান ভূমিকা রাখতো। তারা ঘাড়, বাহু, হাত, কব্জি কিংবা গোড়ালিতে মাদুলি ব্যবহার করতো। এতে করে ভৌতিক অপদেবতা হতে রক্ষা পাবে বলে মনে করতো তারা। তবে কেউ যদি ভুলে অসুখে পড়ে যায় তবে যৌক্তিক মেডিক্যাল চিকিৎসার চেয়ে ওঝাদের মাধ্যমে চিকিৎসাই বেশি প্রাধান্য পেতো।

প্রাচীন মিশরের অস্ত্রপচার ব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরের চিকিৎসকদের আলাদাভাবে সম্মান দেয়া হতো। জীবনদানকারী ত্রাতারূপে তাঁদের গণ্য করা হতো সমাজের উঁচু স্তরে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনাজনিত চিকিৎসা করতো তারা। তারা কাটা অংশ সেলাই করতেন, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেন। এছাড়া উইলো গাছের পাতা ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টিউমার অপারেশনও করা হতো। এসব অপারেশনে নানা রকম ছুরি ব্যবহার হতো। সেইসাথে পাথরের তৈরি ধারালো বিভিন্ন রকম যন্ত্রপাতিও কাজে লাগাতেন চিকিৎসকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রাচীনকালে ব্যবহৃত নকল পায়ের গোড়ালি পেয়েছেন মিশরে, যার কিছুটা কাঠের আর কিছুটা চামড়ার ও কাপড়ের তৈরি। এ ধরনের প্রস্থেটিক

যন্ত্রপাতি দুর্ঘটনায় অথবা গ্যাংগ্রিনের কারণে অঙ্গ হারানো মানুষদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হতো। এতে করে রোগীরা সহজে ভারসাম্য রেখে প্রাত্যহিক জীবনযাপন করতে পারতো। বলে রাখা উচিৎ, প্রাচীন মিশরীয়রা ঐতিহ্যগতভাবে পায়ে স্যান্ডেল পরিধান করতো।

চিত্রঃ প্রাচীন মিশরে ব্যবহৃত নকল গোড়ালি।

মমিকরণ

অভিজাত, উঁচু বংশের কিংবা ধনী কেউ মারা গেলে তার মরদেহ মমি করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় দেহের অভ্যন্তরীণ সমস্ত অঙ্গ বের করে ফেলা হতো। মিশরীয়রা মমি করার ব্যাপারে পরবর্তী অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মতো কুসংস্কারপূর্ণ ছিল না। কিন্তু ঠিক কী উপায়ে তারা এ মমি করতো তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

দ্বিতীয় শতকের রোমান সাম্রাজ্যের কুমির দেবতা সোবেক (Sobek) এর মন্দিরে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল ছুরি, চিকিৎসার অন্যান্য যন্ত্রপাতি, ওষুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেছে। তখন বিশাল এক হূঁকের মাধ্যমে নাকের মাঝ দিয়ে মস্তিষ্ক বের করা হতো। আর অন্ত্র, যকৃত, পাকস্থলী, ফুফফুস ইত্যাদি শরীরের বাম পাশ কেটে সরানো হতো। এসব কাজ শরীরে পচন শুরু হবার আগেই সমাধা করা হতো।

হার্ট বা হৃদপিণ্ড, যা আবেগের এবং বুদ্ধিমত্তার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো, তা সরানো হতো না। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য সেটি শরীরের মধ্যেই রেখে দেয়া হতো। আর বাকি সব অঙ্গ বের করে ফেলা হতো।

চিত্রঃ ক্যানোপিক বা অঙ্গ সংরণের পাত্র।

মমিকরণবিদরা শরীর হতে বের করা অঙ্গগুলোকে জলশূন্য করে পুনরায় শরীরে স্থাপন করতেন অথবা ক্যানোপিক (Canopic) নামক এক ধরনের পাত্রে সংরক্ষণ করতেন। এ পাত্রগুলো ছোট আকৃতির কফিনের মতো দেখতে। এগুলো মমিকৃত দেহের কিংবা কবরের পাশাপাশি স্থানে রাখা হতো।

তথ্যসূত্র

The priest physician of Egypt

আপেলের ত্বকে মোম!

কখনো লক্ষ্য করেছেন কিনা ফলের দোকানে একটু আলোতে আপেলগুলো যেন চকচক করছে বলে মনে হয়।কিংবা কাপড়ে হালকাভাবে আপেল ঘষে দেখলে তা আরো চকচক করে দেখতে। তাহলে আপেলের ভেতরে কি এমন কোনো পদার্থ লুকিয়ে আছে যা চকচক করার জন্য দায়ী কিংবা আপেলকে খাওয়ার জন্য আমাদের আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়?

আসলে পদার্থটি আপেলের ভেতরেনয়বরং আপেলের বাইরে অবস্থান করে। শুধু আপেলই নয়, আরো অনেক ধরনের শাক সবজিতেও এই পদার্থটি উপস্থিত থাকে।যেমন শসা, তাল ইত্যাদি। পদার্থটি হচ্ছে মোম! প্রাকৃতিকভাবেই আপেল সহ বেশ কিছু সবজি মোম উৎপন্ন করে থাকে। বাইরের আর্দ্র আবহাওয়া থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য এর প্রয়োজন। এছাড়াএদের ত্বকেছত্রাকের উপস্থিতিও থাকে একই কারণে। মোমের উপস্থিতি না থাকলে পানি ধরে না রাখতে পেরে আপেল শুকিয়ে যেত।

আপেলের ত্বকে মোম

বাংলাদেশে আপেল উৎপাদিত হয় না।দূর দূরান্তের দেশ থেকে এদেশে আপেল আসে। দূর থেকে এখানে আপেল আসতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। ভ্রমণপথে আপেলগুলো এত দিন যাবৎ টিকে থাকে কীভাবে? ফরমালিন ব্যবহারের কথা নিশ্চয় মাথায় আসছে? আমাদের দেশে না হয় ফরমালিনের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হয় কিন্তু অন্যান্য ফরমালিনের এমন অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সম্ভব নয়। তাহলে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা আপেলকে কয়েক মাসব্যাপী এমনকি বছর ব্যাপীও সংরক্ষণ করে?

আপেলের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই মোম উৎপন্ন হয়। আপেল উৎপাদনে পর তা সংগ্রহ করে ধুয়ে রাখা হয়, যেন এর গায়ে লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন আপেলের গায়ে যে প্রাকৃতিক মোম ছিল তার উপস্থিতি অনেকংশে কমে যায়। এর জন্য কৃত্রিমভাবে মৌমাছি, এমনকি গুবরে পোকা থেকে প্রাপ্ত মোম আবার অনেক সময় পেট্রোলিয়াম জাতীয় মোম আপেলের আস্তরণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। এতে করে আপেল যেমন দেখতে আরো আকর্ষণীয় ঠেকে ক্রেতার নিকট, ঠিক তেমনি পচন হতেও রক্ষা পায়। কেননা ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীবের বংশবিস্তারের উত্তম মাধ্যম হচ্ছে ভেজা বা স্যাঁতস্যাঁতে স্থান। মোম দিয়ে আপেলকে আবৃত করে রাখলে আপেল বাইরের দিক দিয়ে আর্দ্র অবস্থা থেকে তথা বিভিন্ন অণুজীবের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।

মজার ব্যাপার হলো আপেলের উপর মোমের এমন প্রলেপ দেবার পদ্ধতি বেশ পুরনো। সেই ১৯২০ সাল হতে প্রচলিত এ প্রক্রিয়া। ১ কেজি মোম দিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার আপেলেকে মোমের কোট পরানো সম্ভব। US Food And Administration-এ মোমকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দেবার পরেওপ্রশ্ন থেকেই যায়।

আপেল + মোম খাওয়া কতটুকু স্বাস্থ্যকর?

স্বাস্থ্যবিদদের মতে, মোম খাওয়া স্বাস্থ্য জন্য অবশ্যই সম্মত নয়। এর প্রতিকারের জন্য আপেলকেপানি বা ভিনেগার দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নতুবা ছিলে খাওয়া উচিত। তবে আপেলের ত্বকের ঠিক নিচেই অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকে। তাই ভালো হয় যদি কেবল আপেলের পাতলা ত্বকটুকুই সাবধানে চিরে ফেলে দেয়া যায়।

তথ্যসূত্র

http://www.whfoods.com

http://www.ndtv.com

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

আজ থেকে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের কথা। শেষ বরফ যুগের কাছাকাছি। স্থানঃ পশ্চিম ইউরোপের আইবেরিয়ান পেনিনসুলার কোনো গুহার সামনের ফাঁকা একটি জায়গা। ঠিক সন্ধ্যে নামার মূহুর্তে একদল গাট্টাগোট্টা মানুষের দেখা মেলে, যাদের গায়ে ছিল অমসৃন লোমশ আবরণ। এরা ভীড় জমাতে শুরু করে ফার্ন, মস ইত্যাদি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি একটি মঞ্চের মতো জায়গার চারপাশে। মঞ্চের উপরে বসে ছিলেন দলের সবচেয়ে প্রবীন সদস্যটি। বয়স প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি। দেখে মনে হবেতার চোখ বন্ধ, যেন তিনি ঘুমাচ্ছেন। গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে আর নিঃশ্বাস ধীরগতির। হঠাৎতাকে ঘিরে থাকা দর্শকের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। একসময় তারা স্তব গাইতে শুরু করল। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার হাত তুলে অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করতে লাগলো। আগুনের ঝিকিমিকি ছটার মাঝে কমবয়সী একজন তরুণী আর্তনাদের মতো শব্দ করে সামনে লাফিয়ে এগিয়ে আসলো এবং তিক্ত গন্ধযুক্ত একটি মিশ্রণ বৃদ্ধের মুখের সামনে ধরলো। খুব ধীরে প্রবীণ নড়ে উঠলেন, চোখ খুললেন এবং মৃদু হাসলেন।

প্রাগৈতিহাসিক ওষুধপত্র

দৃশ্যটি আসলে পুরোপুরিই কল্পিত। কিন্তু এমনই কিছু একটা হয়তো ঘটেছিল এল সিডারন নামের উত্তর পশ্চিম স্পেনের প্রসিদ্ধ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে। এখানে পাওয়া গেছে হাড় ও দাঁতের শত শত ফসিল বা জীবাশ্ম যা আসলে নিয়ান্ডারথাল(Homo neanderthalensis)প্রজাতির। এরাআমাদের সহোদর প্রজাতি। এই প্রজাতিটি ৩০ হাজার থেকে ২৫ হাজার বছর পূর্বেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ২০১২ সালে বিজ্ঞানীরা নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির ৫টি দাঁত বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তারা গ্যাস ক্রোমোটোগ্রাফি নামের

খুব উন্নত একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।প্রত্যেকটি দাঁতের ক্যালকুলাস নামক শক্ত প্লাক স্তরে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে ক্ষুদ্র অণুজীব এবং কিছু উদ্ভিদের জীবাশ্ম।

ধারণা করা হয়, দাঁতের মালিক উদ্ভিদগুলো কোনো কারণে খেয়েছিলেন ফলে সেগুলো প্লাক স্তরে আটকে গিয়েছিল। এর মধ্যে একজনের মুখে তিক্তস্বাদযুক্ত কিছু গুল্ম পাওয়া গেছে।যেমন ইয়েরো নামক উগ্রগন্ধের ফুল এবং ক্যারোমিল। এসব উদ্ভিদের আসলে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। তবে কেন এসবখেয়েছিল? একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে উদ্ভিদগুলোর ওষুধিগুণ ছিল। ইয়েরো উদ্ভিদ যুগ যুগ ধরে শক্তিবর্ধক হিসেবে আর ক্যারোমিল উত্তেজনা ও প্রদাহ নিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

এল সিডারনে পাওয়া এই প্রমাণ আদিকালের রোগবালাইয়ের প্রতিষেধক, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে সাহায্য করে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানার্জন নির্ভর করে মূলত সংরক্ষিত মৃতদেহ, হস্তনির্মিত বস্তু(যেমন যন্ত্রপাতি, অলংকার) কিংবা প্রাকৃতিক জিনিসপত্র(যেমন উদ্ভিদের বীজ,প্রাণীর জীবাশ্ম) ইত্যাদির উপর। এছাড়া গুহাচিত্র আর প্রস্তরশিল্প থেকেও অনেক কিছু ধারণা করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক চিত্রগুলোতে মানবদেহের গঠনগত চিত্র দেখা যায়। এসব চিত্রেহৃৎপিণ্ডও রয়েছে।

আধুনিক নৃবিদ্যা প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ব্যবহৃত ওষুধের দিকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলর ইতিহাসে। এ অঞ্চলগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,রোগশোক সম্বন্ধে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো একটি মিশ্র অনুভূতি ছিল। তারা মনে করতো কোনো শয়তান বা অপদেবতার অভিশাপে কিংবা তারা যেসকল পাপ করেছে তার শাস্তি হিসেবে অসুখ বিসুখগুলো হয়ে থাকে। আর এসবের প্রতিকারের জন্য তারা রহস্যময় ও অতিপ্রাকৃত কিছু পদ্ধতির আশ্রয় নিতো।যেমন আত্মার উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন, ঈশ্বরের জন্য আত্মত্যাগ, অভিশাপ গুলো তুলে নেবার জন্য বিভিন্ন অজুহাত স্থাপন ইত্যাদি। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ধরনের মলম বা প্রলেপ জাতীয় জিনিসও ব্যবহার করতো যা তৈরি হতো উদ্ভিদ থেকে বা প্রাণীর বিভিন্ন অংশ যেমন রক্ত,হাড়ের গুঁড়া ইত্যাদি থেকে।

বিভিন্ন এলাকায় ব্যবহৃত ওষুধ বিভিন্ন রকম হতো, কেননা তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। ফলে নিজ এলাকায় যা পাওয়া যেত তাই কাজে লাগানো হতো। নৃবিজ্ঞানীগণধারণা করেন, প্রতি এলাকায় একজন করে ওঝা থাকতো যে এসব নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতো। তাকে বিজ্ঞ ব্যক্তি, ধর্মযাজক, উপদেষ্টা এমনকি কখনো কখনো শাসকও মানা হতো। বিশ্বাস করা হতো যে, এই বিশেষ ব্যক্তিটির ঈশ্বর কিংবা আত্মার সাথে যোগাযোগ করার এক বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি প্রাকৃতিক ওষুধ তৈরিতে কিংবা মালিশ করার মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধহস্ত।

প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা নিয়ে গবেষণার পর তাদের কিছু নিরাময় পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যায়। যেমন হাড় ভেঙে গেলে সেটিকে ঠিক করার জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় এনে কাদা মাটি দিয়ে প্লাস্টার করে শুকাতে দেয়া হতো।বর্তমানেযেমনটা করা হয় সেটিরই তৎকালীন ভার্সন আরকি। সাথে বেঁধে দেয়া হতো

বন্ধফলক যেটি তৈরি হতো কাঠ, হাড় কিংবা শিং দিয়ে। ক্ষত স্থানে লাগানো হতো গাছের পাতায় তৈরি উপকারী প্রলেপ আর ব্যান্ডেজ হিসেবে ব্যবহার করা হতো প্রাণীর চামড়া।

পেটের পীড়া থেকে মুক্তি মিলতো অর্কিডের মূলের রস পানে। উইলো গাছের ছাল হচ্ছে অ্যাসিটাইল-স্যালিসাইলিক এসিড, সোজা কথায় অ্যাসপিরিনের উৎস। এটি চিবিয়ে খেলে ব্যথা উপশম হতো এবং ফুলে উঠা কমে যেত। শরীরের কোনো স্থান পুড়ে গেলে বিভিন্ন গাছের জাদুকরী রস লাগানো হতো। দূষিত খাদ্য থেকে রক্ষা পেতে কিংবা খাবারে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহের জন্য খাওয়া হতো বিশেষ ধরনের কাদামাটি, যা geophagy বা মৃত্তিকাভক্ষক নামেপরিচিত।

দন্ত চিকিৎসাও পিছিয়ে ছিল না। মধ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সিবির কাছে মেহেরগড় নামক প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে পাওয়া হাজারো জিনিসের মধ্যে এগারোটি ছিল মোলার দাঁত বা পেষণ দন্ত। এগুলো সম্ভবত নয়জন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির দাঁত ছিল। মজার ব্যপার হলো, চকচকে ধারালো সরু প্রান্ত যুক্ত কোনো একটি যন্ত্র দিয়ে দাঁতগুলো ছিদ্র করা হয়েছিল। গবেষকরা যন্ত্রটি পুনরায় তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। সম্ভবত যন্ত্রটি দিয়ে এক মিনিটের কম সময়ে দাঁতে ছিদ্র করা যেত। দাঁতের ও ছিদ্রের অবস্থা দেখে ধারণা করা হয় ছিদ্র করার সময় দাঁতের মালিক জীবিতই ছিলেন।

তুরপুন দিয়ে ছিদ্র করার এ পদ্ধতিটি মাথার খুলি ছিদ্র করে মস্তিস্কের আবরণ মেনিনজেস বের করার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হতো। পরে এ কাজটি করা হতো পাথরের ভাঙা ধারালো প্রান্ত দিয়ে হাড় বের করে আনার ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে হাড় টুকরো টুকরো করে অথবা মধ্যের স্থান থেকে উপড়িয়ে বের করে আনা হতো। আরো আধুনিক পদ্ধতি ছিল ঘূর্ণীয়মান করাতের ব্যবহার। ছিদ্র করার এ প্রক্রিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল রোগীর শরীর থেক অশুভ শক্তিকে বের করে দেয়া। ছিদ্র করে বের করে আনা ভাঙা হাড়কেকবচ হিসেবে রাখা হতো যাতে সেই অশুভ জিনিসটি আবার ফিরে না আসে।

বর্তমানে অনুমান করা হয়, যেসব রোগীর ওপর এ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে তারা সম্ভত অসহ্য মাইগ্রেনের ব্যথায় ভুগছিলেন অথবা তাদের অনিচ্ছাপূর্বক ধরে আনা হয়েছিল। এছাড়া আরো কারণ হতে পারে গভীর হতাশা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার কিংবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। এরকম রক্তক্ষরণে মৃত্যুও হতে পারে। মস্তিষ্কের এসকল সমস্যার কারণে খুলি ছিদ্রকরণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। এটি সম্ভবত রক্তক্ষরণের কারণে জমে থাকা রক্ত বের করে চাপ কমাতে সাহায্য করতো।

১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির মধ্যকার সীমান্তের কাছাকাছি আলপসনামক স্থানে প্রাকৃতিক উপায়ে মমি করে সংরক্ষণ করা একটি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। এরনাম দেয়া হয় Otzi, the iceman। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার গবেষণা করা মানুষের মৃতদেহ। Otzi-র বয়স ছিল ৪৫ বছর, মারা গিয়েছিল এখন হতে প্রায় ৫৩০০ বছর আগে। তার পরনে ছিল ঘাস দিয়ে বোনা আবরণ। তার গায়ে ছিল সত্যিকারের চামড়ার তৈরি গাত্রাবরণ এবং জুতা। সাথে রাখা ছিল ছুরি, কুঠার, তীর, ধনুক, গাছের ছাল এবং তৎকালীন চিকিৎসার জন্য যা যা লাগতো তার সব।

অটজির দেহের কিছু স্থান দখল করেছিল বুড়ো আঙ্গুলের সমান আকারের ২টি ফাঙাসের পিণ্ডবা মোল্ড। ফাঙ্গাস প্রজাতিটির নামPiptoporus betulinus। প্রত্যেকটি পিণ্ডে একটি করে ছিদ্র ছিল যাতে তারা সুরক্ষিতভাবে চামড়ার বস্ত্রের উপর অবস্থান করতে পারে। চিকিৎসাশাস্ত্রে এইফাঙ্গাসটির বেশ কিছু ব্যবহার আছে। এটি রেচক(কোষ্ঠ দূর করে এমন) হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে সেসাথে এটি ডায়রিয়া সৃষ্টির কারণও হতে পারে। এর কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গুণও আছে, অন্ত্রের কৃমি ধ্বংসের জন্য এটি উপকারী। এরকমটা হয়েছিল কারণঅটজির দেহের বিস্তৃত গবেষণার পর তার বৃহদন্ত্রে কৃমির ডিমের সন্ধান পাওয়া যায়।

চিত্রঃ অটজির গায়ের ট্যাটু।

স্বাভাবিকভাবেই এই জায়গাগুলোতে তীব্র ব্যথা অনুভব করত সে। ট্যাটুগুলো আঁকা হয়েছিল ব্যথার এই স্থানগুলোতেই। তাহলে দাঁড়ায়, ট্যাটুগুলো ব্যথা হতে মুক্তির এক ধরনের সাংকেতিক চিকিৎসা। আরেকটি ব্যাপার ধারণা করা হয়, সমান্তরাল রেখাগুলি আকুপাংচার থেরাপির কারণে সৃষ্ট। চৈনিক চিকিৎসাবিদ্যায় এধরনের রেখাকে বলা হয় channels of meridians। অটজির সম্পূর্ণ রহস্য এখনো কিছুটা অজানা। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক চিকিৎসা যে বর্তমান অনেক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী ছিলOtzi তারই একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।অটজির আরো চমকপ্রদ জিনিস হচ্ছে তার গায়ের ট্যাটু। সারা শরীর জুড়ে তার ৫০টিরও বেশি ট্যাটু রয়েছে। বাঁ হাতের কবজি, বাঁ পায়ের গুলি, ডান হাঁটু, উভয় গোড়ালি, ডান পায়ের পাতাএবং মেরুদণ্ডের নিচের দিকে উভয় পাশে ট্যাটুগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যেন একগুচ্ছ সমান্তরাল রেখা। চামড়ার উপরে কিছু দিয়ে কাটার পর তাতে চারকোল ঘষে দেয়া হয়েছে। এত জায়গাজুড়ে ট্যাটুগুলো আঁকানোর পরেও সেগুলো আসলে গায়ের আবরণ এবং জুতা দিয়ে ঢাকা থাকে। সুতরাং মনে হয় না যে সেগুলো শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যই আঁকা হয়েছে। এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান করে দেখা গেছে অটজির মেরুদণ্ড, হাঁটু এবং গোড়ালির হাড়গুলোতে ক্ষয় হয়ে যাবার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

জিকা ভাইরাসঃ পৃথিবীবাসীর নতুন আতঙ্ক

মানুষ আর প্রকৃতি এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ। প্রকৃতি সর্বদাই মানুষের জীবনকে প্রাণপ্রাচুর্যে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। মানুষের উপর প্রকৃতির ঋণাত্মক প্রভাবও হয় খুব ভয়ংকর। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মতো দুর্যোগগুলো মানব সম্প্রদায়কে যে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছিল, জিকা ভাইরাস যেন তার স্মৃতি মনে করিয়ে দিতেই নতুন এক আতংকের নাম হিসেবে পদার্পণ করেছে পৃথিবীর বুকে।

জিকা ভাইরাস কী?

জিকা ইনফেকশন রোগটি আমাদের অতি পরিচিত ডেঙ্গু রোগের মতো। এটি ছড়ায়ও এডিস মশার মাধ্যমেই। আজকাল এ রোগের কথা সংবাদমাধ্যমে, টিভি মিডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে শোনা গেলেও এমন কিন্তু না যে এ রোগের উৎপত্তি হয়েছে অল্প কয়েকদিন হলো। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা ফরেস্টে এ রোগ সর্বপ্রথম রেসাস বানরের মধ্যে থেকে মশাদের শরীরে ছড়ায়। সর্বপ্রথম এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৪৮ সালে নাইজেরিয়ায়। আফ্রিকায় এ রোগ কিছু কিছু সময় দেখতে পাওয়া গেলেও পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত মে মাস থেকে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কোনো সুদূরপ্রসারী ক্ষতির চিহ্ন নিয়ে আসেনি। কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এ রোগ মহামারীর থেকেও বেশি ভয়ানক। কেন? সেই কথায় আসছি কিছুক্ষণ পরেই।

জিকা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

জিকা ভাইরাস ছড়ায় মূলত মশার মাধ্যমে। তবে সব ধরনের মশা নয়, শুধু এডিস গণের (genus) মশাই এ রোগের জন্য দায়ী। এ মশা যেমন একটি বড়সড় পুলের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে, ঠিক তেমনি একটি বোতলের মুখের মধ্যে রাখা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়। এদের গোত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ সদস্য হলো এডিস এজিপ্টি যারা জিকা রোগের প্রধান বাহক। এদের বিচরণ আমেরিকায় শুধুমাত্র ফ্লোরিডা, গালফ কোস্ট আর হাওয়াই-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে খুব গরমের সময় এদের ওয়াশিংটনেও দেখা যায়। এশিয়ার টাইগার মশা এডিস এল্বোপিকটাসও এ রোগ ছড়ায়, কিন্তু পরিসরে এজিপ্টির থেকে কম।

এসব মশা যখন কোনো আক্রান্ত মানুষকে কামড়ায়, তখন রোগীর কাছ থেকে মশা জিকা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে সংক্রমিত মশা সুস্থ মানুষকে কামড়ালে সে আবার জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। জিকা ভাইরাস এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সবার মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলুন এ প্রশ্নের জটগুলো খোলার চেষ্টা করে দেখি।

১. জিকা ভাইরাস কি মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে ছড়ায়?2

এখন পর্যন্ত এক কথায় উত্তর হলো, হ্যাঁ! সন্তান প্রসবের পূর্ব মুহূর্তে মায়ের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে এ রোগ প্রবেশ করতে পারে। মাইক্রোফেলি নামক ভয়ংকর ধরনের এক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে অনেক শিশু জন্ম নেয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে সম্প্রতি। এ রোগাক্রান্ত শিশুদের মাথা অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ছোট আর এ সমস্ত শিশুদের মায়েরা গর্ভকালীন সময়ে জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। মাইক্রোফেলি রোগে যেসব শিশুরা আক্রান্ত হয় এদের মধ্যে সৌভাগ্যবান ১৫% থাকে যাদের শুধু মাথাটাই ছোট হয়, কিন্তু অভাগা বাকি ৮৫% শিশুর মস্তিষ্কের উপর মাইক্রোফেলি ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে এদের বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না এবং এরা বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী হয়। জিকা ভাইরাস আর অদ্ভুত এ সমস্যার একদম ঠিকঠিক যোগসূত্রটা যে কোথায় তা এখনো আবিষ্কৃত না হলেও বিশেষজ্ঞগণ গর্ভবতী মায়েদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলেছেন। ব্রাজিলে এ রোগে আক্রান্ত প্রায় ৪,০০০ শিশুর রিপোর্ট পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৩৮ জন মারা গেছে। এমনকি ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদরে আপাতত সন্তান ধারণ না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

২. রক্ত বা শুক্রাণু কি জিকা ভাইরাস বহন করে?

সম্প্রতি মানুষের রক্ত আর শুক্রাণুতেও এর উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। রক্ত নেয়া বা শারীরিক সম্পর্কের ফলে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এমন রোগীর রিপোর্ট পাওয়া গেলেও সংখ্যায় তা অতি নগণ্য। আবার ভেবে দেখুন, যদি রক্তের মাধ্যমে রোগ আসলেই ছড়াত তাহলে রোগীকে কামড়ালে যেকোনো ধরনের মশাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতো। এমনটি কিন্তু হচ্ছে না। তাই আপাতত সঠিকভাবে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না গেলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে তো মানা নেই।

. জিকা ভাইরাস কি জিবিএস এর জন্ম দেয়?

জিবিএস (Guillain–Barré Syndrome) নামের এক বিশেষ ধরনের রোগ আছে যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শরীরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেয়। তখন এরা রোগজীবাণু ধ্বংস করা বাদ দিয়ে স্নায়ুকোষগুলোকে ধ্বংস করা শুরু করে। এর ফলে মাংসপেশির দুর্বলতা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্যারালাইসিসও দেখা যায়। সাধারণত এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকে। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মানুষ এর প্রভাব সারাজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায়, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। আসলে জিকা কিংবা অন্য কোনো ভাইরাস এ রোগের উৎপত্তি ঘটায় কিনা তা এখনও বলা সম্ভব হয়নি। তবে জিকা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়ার সাথে সাথে ব্রাজিলে জিবিএসও তীব্র আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই গবেষকরা মাথা চুলকাতে বসে গেছেন- আসলেই কি জিকা ভাইরাস টেনে আনছে জিবিএস এর মতো মারাত্মক রোগকেও?

জিকা ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষ্মণ

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের একজন মানুষের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়। কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে আছে জ্বর, শরীরে র‍্যাশের সৃষ্টি, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যথার অনুভূতি, চোখ ওঠা ইত্যাদি। এছাড়াও এ সময় মাথা ব্যথা আর মাংসপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। 3জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সাথে সাথেই কিন্তু এসব উপসর্গ দেখা যায় না, বেশ কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর রোগীর মধ্যে এ লক্ষণগুলো দেখা যেতে থাকে।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অসুস্থতা বড়জোর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। হাসপাতালে যাবার মতো অবস্থাও কিন্তু তৈরি হয় না। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পরিমাণ খুবই নগণ্য। আপনার অসুস্থতা কমে গেলেও রক্তের মধ্যে এ ভাইরাস কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত তার উপস্থিতি জানান দিতে পারে। র‍্যাশ ওঠার কারণে অনেকেই এ অসুখটিকে ডেঙ্গু বা হামের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। তাই সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত জরুরী।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার

জিকা ভাইরাস আপাতদৃষ্টিতে খুব ভয়ংকর না হলেও এর ক্ষতিকর দিক কিন্তু অনেক। এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক তৈরি হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমরা তো আর হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। যেহেতু এডিস মশা যেকোনো জায়গায় জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয়, তাই আশেপাশের কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল করতে হবে। এরা দিনের বেলাতেই আপনাকে আক্রমণ করবে। তাই দিনের বেলা ঘুমালেও মশারী টানাতে ভুলবেন না। খেয়াল রাখবেন যে, কোনো মশা যেন আপনাকে না কামড়ায়। জানালার চারিদিকে আলাদা করে এমন জালিকা স্থাপন করতে পারেন যাতে মশা ঘরে না ঢুকতে পারে। যেকোনো রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সবথেকে ভালো উপায় হলো নিজেকে সতর্ক রাখা। এলাকার মানুষজন মিলে কিছুদিন পরপর বিভিন্ন কীটনাশক দূরীকরণের স্প্রে প্রয়োগ একটি ভালো উদ্যোগ। তবে ঝুঁকি আছে এমন এলাকায় যদি আপনি ভ্রমণ করতে চান তাহলে অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন।

জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক আমাদের হাতের নাগালে আসতে আসতে পার হয়ে যাবে আরও প্রায় দেড় বছর। প্রায় ১৫টি প্রতিষ্ঠান এ দৌড়ে সামিল হয়ে থাকলেও তাদের কাজ একদমই প্রাথমিক পর্যায়ে। জেনেভার এক সম্মেলনে এ সংস্থার মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্রে খুব শীঘ্রই এর পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি স্বীকৃত হয়ে মানুষের নাগালে পৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হবে আরও অনেকটা সময়।

বাংলাদেশ এবং জিকা ভাইরাসঃ আমরা কি হুমকির মুখে?

জিকা ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। বাংলাদেশে কি এই রোগে আক্রান্ত হবার কোনো সম্ভাবনা আছে? চিন্তার বিষয়। প্রতিষেধকবিহীন এ রোগ খুব দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই আমরা যে একেবারে হুমকির সম্মুখে না, তা বলা যায় না। তবে আশার কথা এই যে, দক্ষিণ এশিয়াতে এখন পর্যন্ত জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তাই আশা করা যায় আমাদের সেই খারাপ দিন দেখার সম্ভাবনা খুব কম, যেখানে ফুটফুটে একটি শিশুকে অপরিণত মস্তিষ্ক আর ছোট্ট একটি মাথা নিয়ে চলাচল করতে দেখতে হবে।

জিকা ভাইরাসের গোপন নথি!

এতক্ষণ যা বললাম তা নিত্যদিনের খবর হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার আমার জানার বাইরেও কিছু খবর আছে, যা হয়তো ইচ্ছে করেই রাখা হচ্ছে সবার অগোচরে। বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের নাম নিশ্চয় সবাই শুনেছেন। এ ফাউন্ডেশনের ব্রিটিশ বায়োটেক কোম্পানি ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য বিশেষ ধরনের জেনেটিকালি ইঞ্জিনিয়ার্ড এক ধরনের মশার উদ্ভাবন করে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বিশেষ ধরনের মশাই আসলে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। যে ভাইরাস মানুষের জীবনে আতংক বয়ে নিয়ে এসেছে, যে রোগ নিয়ে নিত্যদিন মিডিয়া এত বিপুল পরিমাণে মেতে উঠেছে তা প্রাকৃতিক কোনো রোগ নয়! ২০১১ সাল থেকে অক্সিটেক নামের এ কোম্পানি ব্রাজিলের গহীন অরণ্যে এ মশার বংশবিস্তার করে চলেছে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য। এক সপ্তাহে তারা প্রায় দুই মিলিয়ন মশা উৎপাদন করে ব্রাজিলের ক্যম্পিনাসে অবস্থিত ফ্যাক্টরিতে। আরেকটি রহস্যময় তথ্য জেনে নিন। ২০১৫ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার গর্ভবতী মায়েদের একটি নতুন ভ্যাক্সিন নেয়া অত্যাবশ্যক করেন। টিডিএপি নামক এ ভ্যাক্সিনের সঠিকভাবে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই হঠাৎ এভাবে আবশ্যকীয় করে দেয়া আর ঠিক একই সময়ে এরকম অদ্ভুত শিশু জন্মের হার হুহু করে বেড়ে যাওয়াটা আসলে কাকতালীয় ঘটনা থেকে একটু বেশি কিছুই বলে মনে হয়। এ ভ্যাক্সিনের উৎপত্তিস্থল সম্পর্কে একটু খোঁজ নিতে শুরু করলেই একটি নাম আবার সামনে পেয়ে যাবেন- বিল গেটস-মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এমনকি এ ভ্যাক্সিন লাইসেন্সড হবার আগে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অর্থাৎ গর্ভবতী মায়ের শরীরে গিয়ে আসলেই কাজ করে কিনা সেই ব্যাপারে পরীক্ষা করার কোনো নথিপত্রও পাওয়া যায়নি।

একটু যদি অন্যভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখি তাহলে কি এটাই মনে হয় না, জন্মগত এ ত্রুটি আর জিকা ভাইরাসকে একই সময়ে সামনে আনা হয়েছে? ব্রাজিলই বা কেন আমেরিকা থেকে এমন একটি ভ্যাক্সিন কিনে তার দেশে অত্যাবশ্যক করে দিলো যার কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ইতিহাস নেই? নাকি এজন্য তারা উপযুক্ত পরিমাণে পকেট গরম করার সুযোগ পেয়েছে? এখন আবার আমেরিকা জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধকের পেছনে ছুটছে। চেষ্টা করে দেখুন তো এমনই কোনো ঘটনার কথা স্মৃতিতে আসে কি না? হ্যাঁ, একইভাবে মিডিয়া ইবোলা ভাইরাস নিয়েও মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি করেছিল।4

যেমনটি আগেই বলেছি অনেক দেশে গর্ভধারণ এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আসলেই বিল গেটস এর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্প্রতি মাত্র একজন মানুষের শুক্রাণুতে এ ভাইরাসের উপস্থিতি টের পাওয়ার সাথে সাথেই একে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ানো রোগের কাতারে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানব মনে শারীরিক সম্পর্ক এবং সন্তান ধারণের প্রতি আতঙ্কের সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকেই বিল গেটস জোরপূর্বক ভ্যক্সিনাইজেশন করে জন্মনিয়ন্ত্রণের সপক্ষে কথা বলেছেন।

তবে এ রহস্যের কূলকিনারা এতো সহজে সম্ভব নয়। বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে বা সপক্ষে কথা বলার মানুষের অভাব কখনোই ছিল না। তাই আমরা শুধু আপনাদের চলতি বিশ্বের পরিস্থিতির কাছাকাছিই নিয়ে যেতে পারি। সত্য-মিথ্যা জানার জন্য আমাদের হয়ত অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছু সময়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক ঘটনার সুরাহা যে আমাদের কান পর্যন্ত আসে না, এ নতুন কিছু নয়। তাই আপাতত এসব কোন্দলে না পড়ে আমরা নিজেদের ও নিজ নিজ সন্তানদের নিরাপত্তা প্রদানের দিকেই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আশা করি বিশ্বে বিরাজমান এ জিকা ভাইরাস আতঙ্ক আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে কখনোই হানা দেবে না।

 

ফাহমিদা ফারজানা অনন্যা
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মোশন সিকনেসের কারণ

আপনি হয়তো একটা দারুণ লং ড্রাইভ অথবা লং জার্নির পরিকল্পনা করলেন। হয়তো ঘুরতে যাচ্ছেন কোথাও কিংবা যাচ্ছেন জরুরী কোনো কাজে। বাস বা প্রাইভেট কারে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো অস্বস্তি। বমি থেকে শুরু করে ঘাম, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ- দীর্ঘ সময় এভাবে ভ্রমণ করলে বেশিরভাগ মানুষেরই কমবেশি এ সমস্যা হয়ে থাকে যা ‘মোশন সিকনেস’ বা ‘কার সিকনেস’ নামে পরিচিত। এ সমস্যার পেছনে মূলত দায়ী আমাদের মস্তিস্ক।

ভ্রমণের সময় মস্তিষ্ক মনে করে, তাকে হঠাৎ তীব্র মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। মূলত কার সিকনেস আমাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের অপারগতার একটি ফল। ভেঙে বললে, ভ্রমণের সময় আমাদের চোখ এবং কানসহ অন্যান্য সংবেদনশীল অংশগুলো মস্তিষ্কে যে সিগনাল পাঠায় সেগুলো পরষ্পর বিরোধী হয়ে থাকে। ফলে মস্তিষ্ক দ্বিধান্বিত হয়ে যায় যেমনটা অনেক সময় বিষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।

বাসে বা গাড়িতে চলাচলের সময় আমরা স্থির হয়ে বসে থাকি, ঐ সময় মস্তিষ্ক ও চোখ তা-ই বিশ্বাস করে। অনুভব করে যে আমাদের শরীর স্থির। তাই সে মস্তিষ্কে অনুরূপ বার্তাই পাঠায়। কিন্তু একই সময়ে ভ্রমণের গতিজনিত ঝাঁকি আমাদের অন্তঃকর্ণের ভেতরে যে তরল পদার্থ সম্বলিত টিউব রয়েছে, সেসব তরল পদার্থে আলোড়ন সৃষ্টি করে। অর্থাৎ অন্তঃকর্ণের অভ্যন্তরীণ এই তরল পদার্থ যা শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় নিয়োজিত, সেটি গতিশীলতার জানান দেয়। আবার শরীরের অন্যান্য সংবেদী অঙ্গও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানান দেয় যে শরীর স্থির অবস্থায় বিরাজমান। একই সময়ে একবার স্থিরতা আর একবার গতিশীলতার এতগুলো সিগন্যাল পেয়ে ঘাবড়ে যায় বেচারা মস্তিষ্ক! কোনটা সঠিক সেটা না বুঝতে পারায় বিচলিত মস্তিষ্কের গোবেচারা থ্যালামাস সিদ্ধান্ত নেয় সে অসুস্থ কিংবা বিষাক্ততার শিকার। কাজেই সে সেসব অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ করে।

2

এখন প্রশ্ন হলো- এ বিড়ম্বনা লাঘবের উপায় কী? এর থেকে নিস্তার পেতে হলে মস্তিষ্ককে বোঝাতে হবে সে আসলে কোনো অবস্থায় আছে। যেমন বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মস্তিষ্ককে বোঝানো যায় যে সে গতির মধ্যে আছে। ফলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোটানা কমে গিয়ে কার সিকনেস কমে যায়। উপরন্তু বই পড়লে বা কোনো একটা কিছু (যেমন ম্যাপ) খুঁটিয়ে দেখার সময় এটা বেড়ে যায়। কেননা এগুলো আমাদের মস্তিষ্কে বেশি বেশি শারীরিক স্থিরতার বার্তা পাঠায়। অনেক সময় পছন্দসই গান শুনলেও কার সিকনেস দূর হয়। বিশুদ্ধ বাতাসে শান্ত হয়ে লম্বা শ্বাস নিলেও সেটা কাজে দেয়। আপনি নিজে যখন চালকের আসনে থাকেন, তখন মোশন সিকনেস আপনাকে খুব একটা কুপোকাত করতে পারে না। কারণ প্রথমত উইন্ডশিন্ড এবং জানালার বাইরের দৃশ্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে জানান দেবে যে, আপনি গতিশীল। তেমনি নিজেই গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করায় আপনি নিজের গতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৫-১২ বছরের শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধদের মোশন সিকনেসের প্রবণতা বেশি। এটি ব্যক্তিভেদে কমবেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে বিবর্তনের একটি ভূমিকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। বেশিরভাগ মানুষ, যাদের ভারসাম্যজনিত সমস্যা বা মাইগ্রেনের উপদ্রব রয়েছে, তারা বেশি তাড়াতাড়ি মোশন সিকনেসে আক্রান্ত হন।

মোশন সিকনেসের জন্য কিছু মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এবং আদা, পেপারমিন্ট, চা এর ব্যবহার কিংবা আকুপ্রেশার ট্রিটমেন্টের চল আছে যা কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ। বর্তমানে এর উপরে আরও গবেষণা হচ্ছে যেন গাড়িতে চড়লেই আর অস্বস্তিতে না পড়তে হয়।

তথ্যসূত্র

১) www.sciencealert.com/here-s-why-you-get-car-sick-your-brain-thinks-it-s-being-poisoned

২) www.webmd.com/cold-and-flu/ear-infection/tc/motion-sickness-topic-overview

৩) www.medicinenet.com/motion_sickness_sea_sickness_car_sickness

৪) www.nhs.uk/conditions/motion-sickness/pages/introduction.aspx

 

লেখকঃ অনন্যা আজাদ
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়