ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ঘুমের অনিয়মের জন্য দায়ী

তথ্য ও যোগাযোগ বিপ্লবের দুনিয়ায় ২৪ ঘন্টা উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া বেশ বড়সড় সুযোগ। কিন্তু এ সুযোগের অপর পিঠে অনেক কিছু বিসর্জনেরও ব্যাপার জড়িত। নতুন এক গবেষণা বলছে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আধুনিক যুগের জনজীবনে ঘুমের একটি ক্ষতিকারক। নিদ্রাহীনতা এবং নিম্নমানের ঘুমের সাথে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। বিছানায় যাবার নিকট সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবহার এই সমস্যার দিকে সহজে ঠেলে দেয়।

আধুনিক যুগে এসে অপর্যাপ্ত ঘুম খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ইতোমধ্যেই অপর্যাপ্ত ঘুম যে জনস্বাস্থ্য এবং জনগণের মানসিক দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব রাখছে তা স্পষ্ট। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু গবেষণার ফলাফলে তা উঠে এসেছে।

খারাপ খবর হল, এ সমস্যা দিন যত যাচ্ছে আগের চেয়েও গুরুতর হচ্ছে। বহু উন্নত দেশেও মানুষ কম ঘুমের সমস্যার সম্মুখীন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় ৭ থেকে ৯ ঘন্টার ঘুম দেয়ার সংকট দেখা দিচ্ছে। আর এই ঘুমের ঘাটতির সমস্যা বড় হয়ে উঠছে দিনকে দিন।

যখন এ ঘুমহীনতা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, একই সাথে বেড়ে চলছে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার। আমাদের ঘুমের চক্র ভেঙে দিচ্ছে যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এখন পর্যন্ত খুব কমই প্রামাণ্য উপাত্ত রয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে ঘুমের সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত দেখানোর ক্ষেত্রে।

ইন্টারনেটের কাছে নাচের পুতুল হয়ে গেলেন না তো? | Image Source: salon.com

ঘুম এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের মধ্যকার সম্পর্ক ও প্রভাব নির্ণয় করতে জার্মান একদল বিজ্ঞানী তাদের দেশের মানুষের উপর একটি জনজরিপ পরিচালনা করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে তুলন্নামূলকভাবে যাচাই করা হয়েছে ঘুমের  সাথে কতটা সম্পর্কিত সেদিকটা খেয়াল রেখে। গবেষণা থেকে উঠে এসেছে যে, যারা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকেন তারা অন্যান্যদের তুলনায় গড়পড়তায় ২৫ মিনিট দেরীতে ঘুমিয়ে থাকেন। আরো উল্লেখ্য, এরা ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমের প্রতি খেয়াল রাখতে পারেন না। ফলশ্রুতিতে, ঘুম পরিপূর্ণ হয় না এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে অসন্তুষ্টি থেকে যায়। উল্লেখ্য, ২৫ মিনিটের হিসেব একটি গড় মান। আপাতদৃষ্টে বেশ কম মনে হলেও অনেকের ক্ষেত্রেই আশংকার জন্য যথেষ্ঠ।

ইন্টারনেট এমনিতেই একটি বহুমুখী জগৎ। একে তো বহুমুখী, তার পরে আবার এ জগতের কোন শেষ নেই। আবার উচ্চগতির ইন্টারনেট সে বহুমুখী জগতের সবগুলো দুয়ার খুলে দেয়। ফলত, উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রলুদ্ধ করে অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে ভিডিও গেমস, ওয়েবে ঘোরাঘুরি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাতে।

মোবাইলের ভিতর কী থাকে? সারাদিন পড়ে থাকে কেন? | Image Source: dailymail.co.uk

ইতিপূর্বের প্রতি প্রজন্মের জন্যই, প্রযুক্তির মোহের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ছিল। টিনেজারদের মধ্যে উদাহরণস্বরূপ, ভিডিও গেমস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার প্রবণতা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা গিয়েছে। তবে, বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কম্পিউটার এবং স্মার্টফোনের ব্যবহারকে ঘুমের সময়ের সাথে অধিক শক্তিশালীভাবে সম্পর্কিত পাওয়া গিয়েছে।

মিলানের বক্কোনি ইউনিভার্সিটির জনসংখ্যা তত্ত্বের অধ্যাপক ফ্রান্সেস্কো বিল্লারি ব্যাখ্যা করেন, ব্যক্তি ডিজিটাল দুনিয়ার প্রলোভনে বিছানায় যেতে দেরী করায় ঘুম শুরু করতে দেরী হচ্ছে। যাদের দেরীতে ওঠার সুযোগ নেই তারা সেই ক্ষতিপূরণও করতে পারছে না সকালে দেরীতে ঘুম থেকে উঠে। ফলত, ঘুমের দৈর্ঘ্য প্রয়োজনীয় মাত্রার আগেই কেটে যাচ্ছে।

মোটের উপর, গবেষণার তথ্য সংগৃহীত হয়েছে অপেক্ষাকৃত তরুণ সমাজের কাছ থেকে যারা রাতে ঘুমের আগে ইন্টারনেট সুবিধাযুক্ত প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহার করে থাকে। ফলে সর্বসাধারণের জন্য বিষয়ভিত্তিকভাবে এ তথ্য পরিবেশন করা  যাচ্ছে না।

গবেষণাটি যেমন আকর্ষণীয় তেমনি এই মুদ্রার অপর পিঠের অবাক করা ব্যাপার হল টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপরও তথ্য সীমিত। অর্থাৎ ঘুমের আচরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার তথ্যের ফারাক রয়েছে। কারণ, ঘুমের চাহিদার বয়সভেদে ভিন্ন, আবার বয়সভেদে ইন্টারনেট আসক্তির ধরণও ভিন্ন। এর সাথে গবেষণা লক্ষ্য ধরে রেখে ইন্টারেনেটের কারণে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহারের বৃদ্ধির হার ও এই বহুমাত্রিক রাশির উর্ধ্বমুখী লেখচিত্রের সাথে ব্যক্তির ঘুমের আচরণের পরিবর্তন যাচাই করতে হচ্ছে।

গবেষকরা ইন্টারনেট আসক্তির ভিত্তিতে টিনেজারদের ঘুমের আচরণের উপর গবেষণা করার আহবান জানাচ্ছেন। যেহেতু ইন্টারনেট জড়িত প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে, তাই এখন প্রযুক্তি পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইন্টারনেটমুখী হয়ে উঠছে পণ্যের মধ্যে সেই ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রাখার দিক থেকে। একটি আরেকটির সম্পূরক হয়ে ক্রেতাকে ঠেলে দিচ্ছে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের দিকে।

ডিজিটাল দুনিয়ার ব্যস্ততা বাড়ছে যেমন হড়হড়িয়ে তেমনি প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সুস্থভাবে টিকে থাকতেও মানুষকে রাখতে হচ্ছে নানান দুনিয়ার খবর। ইন্টারনেটের কাছে যে স্বাস্থ্যের সতর্কতা রাখতে হবে এ আন্দাজ কেউ করেনি। তবে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে এবং একই সাথে আমাদের স্বাস্থ্য এবং কর্মদক্ষতার উপরও নজর রাখতে হচ্ছে।  প্রযুক্তিপণ্যের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির তথ্য যত বেশি পাওয়া যাবে তত সহজে সচেতনতার জন্য, সাবধানতার জন্য পদক্ষেপ নেয়া যাবে।

যন্ত্রের যন্ত্রণায় ঘুমকে বাঁচাতে যা করা যেতে পারে:

  • ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার সন্ধ্যায় সীমিত রাখা।
  • প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
  • বিভিন্ন কাজের মধ্যেঅগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা।
  • সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে ডিভাইসে বুঁদ হয়ে না যাওয়া। এক্ষেত্রে বারবার সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ঢুঁ না মেরে একটি নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করা।
  • যন্ত্রের বাইরে জীবন উচ্ছ্বল– একথা মাথায় রাখা ও নিজের শরীর মনের সুস্বাস্থ্যের জন্য নিজেকে অনুপ্রাণিত করা। ইন্টারনেট ব্যবহার করতে করতে দেরীতে ঘুমাতে যাবার চেয়ে বরং শীঘ্র ঘুমানোর নিয়ত করা যাতে সকালে উঠে ঢুঁ মেরে দেখে নেয়া যায়।
ইন্টারনেট যুগের সবচেয়ে ক্রমাগত ব্যক্তিগত সমস্যা সবদিকে মন গড়ানো। এটা মাথায় রাখুন, পৃথিবীর সব ঘটনা উপভোগ করার দরকার নেই, বরং সুস্থ থাকা উপভোগ করুন। আনন্দ সর্বোচ্চ উপভোগের জন্য সুস্থতা সবচেয়ে বড় শর্ত। | Image Source: gojessego.com

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ইকোনমিক বিহেইভিওর এন্ড অর্গানাইজেশন গবেষণাপত্রে।

 

— ScienceAlert অবলম্বনে।

আন্ডারগ্র্যাড সমাপনী বর্ষঃ যেভাবে থিসিস লিখবেন

চতুর্থ বর্ষের শুরুতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগতে হয় তা হলো, তারা থিসিস করবে নাকি প্রজেক্ট? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর-

১) কে আপনার রিসার্চ সুপারভাইজার হবেন?

২) আপনি আসলে পাস করার পর কী করতে চান?

আপনি যদি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার কথা চিন্তা করেন তাহলে চোখ বন্ধ করে আপনার থিসিস করতে নেমে যাওয়া উচিত। যদিও আন্ডারগ্র্যাডের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কেও মৌলিক গবেষণা আশা করে না, এমনকি বাইরের দেশগুলোতেও আন্ডারগ্র্যাডের শিক্ষার্থীরা সাধারণত প্রজেক্টই করে। কিন্তু আপনি যদি থিসিস করেন এবং তা যদি কোনোভাবে কোনো জার্নাল কিংবা ভালো কনফারেন্সে পাবলিশ করতে পারেন তাহলে তা উচ্চ শিক্ষার জন্য আপনার যাত্রাকে অনেকখানি সহজ করে দেবে।

তবে এর মানে এই না যে, যারা প্রজেক্ট করেন তারা খুব সহজেই পার পেয়ে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার প্রজেক্টের কাজটিও যথেষ্ট জটিল এবং বড় হতে পারে। সহজ কথায় প্রজেক্ট ও থিসিসের পার্থক্য এখানে উল্লেখ করছি।

ধরা যাক, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে বই নেবেন। এর জন্য প্রথমে আপনাকে লাইব্রেরিতে গিয়ে অনেক সময় লাগিয়ে শেলফ থেকে বইটি খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তা নিয়ে কাউন্টারে জমা দিতে হবে এবং অতঃপর একজন ব্যক্তি রেজিস্টারে বইয়ের নাম, আপনার নাম, কবে নিলেন এবং কবে ফেরত দেবেন ইত্যাদি এন্ট্রি করে আপনাকে সবশেষে বইটি হাতে তুলে দিলেন।

অথচ এই পুরো ব্যাপারটা কিন্তু এক ক্লিকেই হয়ে যেতে পারত। আপনার মোবাইলে লাইব্রেরির একটা অ্যাপ থাকবে, যেখানে আপনি বইয়ের নাম লিখে সার্চ দিলে আপনাকে আপনার কাঙ্ক্ষিত বইটি লাইব্রেরি থেকে নেয়া যাবে কিনা তা দেখাবে।

এরপর আপনি বইটি যে নিতে চান তা অ্যাপের কোনো নির্দিষ্ট অপশনে গিয়ে জানিয়ে দিলে সাথে সাথেই লাইব্রেরিয়ানের কাছে নোটিফিকেশন চলে গেল যে, অমুক শিক্ষার্থী বইটি নিতে আসবে। তৎক্ষণাৎ লাইব্রেরিয়ান বইটি আপনার নামে রেজিস্টার করে সামনের কাউন্টারে দিয়ে রাখলেন যাতে আপনি আসা মাত্রই বইটি পেয়ে যেতে পারেন। এই অ্যাপ ডিজাইনের যে কাজ- এটাই একটা প্রজেক্ট।

আরেকজন ছাত্র চিন্তা করল, সামনের বছর থেকে যেহেতু সম্মিলিতভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে তাই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানোর জন্য নতুন ধরনের একটি এনক্রিপশন সিস্টেম উদ্ভাবন করা দরকার। সে টেক্সট এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার না করে প্রথমে প্রশ্নপত্রগুলাকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করবে এবং তারপর সেই ইমেজকে এনক্রিপ্ট করবে। এই যে কোনো টেক্সট ফাইলকে ইমেজ হিসেবে স্ক্যান করে তা এনক্রিপ্ট করার নতুন ধারণা এবং তার সম্ভাব্য সমাধান– এই কাজটিই হলো থিসিস।

যদিও থিসিসের উদাহরণটি আন্ডারগ্র্যাড ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটু কঠিন হয়ে গেল, তবে সাধারণত তাদের কাছ থেকে কোনো যুগান্তকারী সমাধান আশা করা হয় না। সাধারণত কোনো একটি ছোট সমস্যা দিয়ে তাদেরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট থিওরির উপর ভিত্তি করে সমাধান করতে বলা হয়।

তবে থিসিস কিংবা প্রজেক্ট যে কাজই আপনিই করুন না কেন, দেখা হয় আপনার মাঝে অনুসন্ধানমূলক চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা আছে কিনা এবং কোনো সমস্যা সমাধান করার যে ধাপগুলো আছে তা আপনি শিখতে পারছেন কিনা।

থিসিসের পূর্বপ্রস্তুতি

ভালো থিসিস করার পূর্বশর্ত হলো রিসার্চ পেপার পড়ার অভ্যাস করা। পাশাপাশি তত্ত্বীয় বিষয়গুলো নিয়ে নিজের ধারণা ঠিক করে নেয়া। থিসিস টপিক ঠিক হওয়ার পর অন্তত তিন মাস টপিক রিলেটেড রিসার্চ পেপারগুলো খুঁজে বের করে পড়া উচিত। শুরুর দিকে হয়তো কোনোকিছু বোধগম্য হবে না, কিন্তু এই তিন মাসে অন্তত যেসব পেপার পরবর্তীতে আপনার থিসিস লিখতে আপনাকে সাহায্য করবে তা চিহ্নিত করা যায়।

কাউকে যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং করতে হয়, তাহলে তার উচিত পুরনো পেপার খুঁজে বের করা। এ ধরনের পেপারগুলোতে ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন এবং তার সল্যুশনগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়। এজন্য পেপার পড়ার সময় রেফারেন্সগুলো চেক করা উচিত।

সাধারণত একই ধরনের ইক্যুয়েশন ব্যবহার করলে তা আগের প্রকাশিত হওয়া কোন রিসার্চ থেকে নেয়া হয়েছে তা সবাই উল্লেখ করে। এবং যেসব রিসার্চার এসব ম্যাথমেটিক্যাল ইক্যুয়েশন তৈরি করেছিলেন, তাদের পুরনো পেপারগুলোতে খুবই বিস্তারিতভাবে তা দেয়া থাকে।

সেইসাথে জানতে হবে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথনের বেসিক প্রোগ্রামিংয়ের খুটিনাটি। বর্তমান সময়ে প্রোগ্রামিং জানাটা ইংরেজি জানার মতোই অত্যাবশ্যকীয়। আপনি যদি ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং কিংবা সিমুলেশন ভিত্তিক কাজ করেন, তাহলে আপনাকে ম্যাটল্যাব কিংবা পাইথন ব্যবহার করে সেই কাজ করতেই হবে। আর যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজও করেন, সেখানেও কোনো ইক্যুয়েশন দিয়ে আপনার এক্সপেরিমেন্টাল রেজাল্টের ডাটা ফিটিং করার পদ্ধতিও আপনাকে জানতে হবে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর তেমন কোর্সওয়ার্ক করানো হয় না। তাই একাডেমিক রাইটিংয়ের বেশিরভাগ নিয়মকানুনই আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়। এজন্য ইউটিউব হতে পারে সবচেয়ে আদর্শ মাধ্যম। শুধু একাডেমিক রাইটিং লিখে সার্চ দিলেই অনেক ভিডিও আপনি পাবেন।

এরপর যেসব ভিডিওর ভিউ অনেক বেশি কিংবা যেসব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার অনেক বেশি, সেগুলো আপনি ফলো করতে পারেন। coursera.org কিংবা edx.org এর মতো সাইটেও একাডেমিক রাইটিংয়ের উপর অনলাইন কোর্স পাওয়া যায়- আপনি চাইলেই যেকোনো একটি কোর্স শেষ করে ফেলতে পারেন।

কীভাবে ডাউনলোড করবেন রিসার্চ পেপার

রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সাই-হাব (Sci-hub)। সাই-হাব মূলত শুরু হয় আলেক্সান্দ্রা এলবাকিয়ানের হাত ধরে। তিনি একজন রাশিয়ান সফটওয়ার ডেভেলপার এবং নিউরোটেকনোলজি গবেষক। তিনি একাডেমিয়ার দস্যু রানী হিসেবে পরিচতি। তার নিজ হাতে তৈরি সাই-হাব থেকে বিনামূল্যে ৬৪.৫ মিলিয়নের অধিক একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল সরাসরি ডাউনলোড করা যায়, যা তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের ছাত্র-ছাত্রী এবং গবেষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যেহেতু এ সাইট থেকে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার ইলেকট্রনিক পেমেন্ট মেথডকে এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি যেকোনো একাডেমিক পেপার এবং আর্টিকেল নামানো যায়, তাই বিভিন্ন সময় এর ডোমেইনকে ব্লক করে রাখা হয়।

তবে আপনি যদি কোনোভাবেই সাই-হাবের কার্যকরী ডোমেইনটি খুঁজে না পান, তাহলে সেক্ষেত্রে libgen.io এই সাইটে গিয়ে Scientific Articles সিলেক্ট করে সার্চ বারে যে পেপারটি নামাতে চান তার শিরোনাম লিখে দিয়ে সার্চ করলেই তা আপনাকে সাই-হাবে নিয়ে যাবে, এবং সেখান থেকে আপনি পেপারটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

কীভাবে শুরু করবেন থিসিস পেপার লেখা

ধরে নিলাম, আপনার থিসিস সম্পর্কিত যাবতীয় কাজ প্রায় শেষের দিকে, আপনি এখন থিসিস লেখায় পুরাপুরি মনোনিবেশ করতে চান। তাই শুরুতেই কোনো কিছু লেখার আগে একটি স্ট্রাকচার সাজিয়ে নেয়া ভাল। আন্ডারগ্র্যাডের থিসিসের কাজ যেহেতু খুব ছোট পরিসরে হয়, সেক্ষেত্রে আপনার থিসিসের স্ট্রাকচারটি হতে পারে এরকম।

১) অ্যাবস্ট্রাক্ট (Abstract)

অ্যাবস্ট্রাকটকে বলা হয় আপনার পুরো গবেষণা কাজের সারমর্ম। এটি ৩০০-৩৫০ শব্দের মধ্যে হলেই ভালো। যদিও এটি সবার শুরুতে থাকে, কিন্তু এটি সবার শেষে লেখাই উত্তম। মানে মূল রচনা লেখা শেষ হলে তারপর অ্যাবস্ট্রাকট লিখবেন। সাধারণত একজন পাঠক আপনার থিসিস পেপার পড়বে কিনা তা নির্ভর করে আপনার লেখা অ্যাবস্ট্রাক্টে তিনি নিম্নোক্ত পাঁচ প্রশ্নের উত্তর সে পাচ্ছে কিনা তার উপর।

  • আপনি এই গবেষণায় কী ধরনের কাজ করেছেন?
  • আপনার এই গবেষণার কাজের পেছনে কী কী কারণ ছিল? অন্যকথায়, আপনি কী ধরনের সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন?
  • আপনি কোন প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান করেছেন?
  • আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো কী ছিল?
  • আপনার গবেষণালব্ধ ফলাফল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আপনি যদি চান মানুষ আপনার গবেষণাটি সম্পর্কে জানুক, তাহলে আপনার উচিত এ প্রশ্নগুলোর উত্তর অ্যাবস্ট্রাক্ট-এ গল্প আকারে লেখা।

২) ইন্ট্রোডাকশন (Introduction)

সাধারণত এটি অ্যাবস্ট্রাক্টের তুলনায় বেশ বড় হয় এবং তাতে অবশ্যই আপনার থিসিসের ব্যাকগ্রাউন্ড, কী ধরনের কাজ এ পর্যন্ত হয়েছে তার আলোচনা, কোন কোন সমস্যার এখনও সমাধান হয়নি, আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন, কীভাবে কাজ করবেন তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে ইন্ট্রোডাকশন শেষ করতে পারেন।

৩) লিটারেচার রিভিউ (Literature Review)

মূলত এ অংশে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন তা নিয়ে পূর্বে বিভিন্ন সময়ে যেসকল উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এবং কী ধরনের সমস্যার সমাধান করা এখনও বাকি আছে এবং আপনি কোন সমস্যাটি নিয়ে কাজ করবেন তার বর্ণনা থাকা উচিত।

আপনি চাইলে এই সেকশনটি আলাদাভাবে লিখতে পারেন, আর যদি আপনার হাতে লেখার সময় কম থাকে, তাহলে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে তা ইন্ট্রোডাকশনের সাথে জুড়ে দিতে পারেন। তবে সেই সাথে যেসকল একাডেমিক পেপার কিংবা বই থেকে তথ্য নিয়েছেন তা অবশ্যই বিস্তারিত রেফারেন্স সহকারে উল্লেখ করতে হবে।

৪) মেথড (Method)

এই অংশে মূলত আপনি কী ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে আপনার গবেষণার সমস্যাটির সমাধান করেছেন তার বর্ণনা থাকবে। আপনার যদি এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয় তাহলে এক্সপেরিমেন্টের বিশদ বর্ণনা, থিওরিটিক্যাল মডেলিংয়ের কাজ হলে আপনি যেসব ইকুয়েশন সমাধান করে আপনার কাজটি করেছেন তার বিশদ ব্যাখ্যা থাকা চাই।

৫) রেজাল্ট (Result)

এই সেকশনে মূলত আপনি আপনার গবেষণা থেকে কী কী উত্তর খুঁজে পেলেন তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকা উচিত। আপনি সবসময় চেষ্টা করবেন আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো গ্রাফ আকারে রিপ্রেজেন্ট করতে। এতে করে যিনি ফলাফলগুলো দেখবেন তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো একটি টেবিল থেকে ডাটা পড়ার চেয়ে একটি গ্রাফ পড়া এবং বোঝা অনেক সহজ।

৬) ডিসকাশন (Discussion)

এই সেকশনে মূলত আপনার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সম্পর্কে আপনার মতামত, ফলাফল থেকে আমরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি, আপনার গবেষণার ফলাফলে কোনো অপ্রত্যাশিত ফলাফল আছে কিনা, থাকলে কী কী কারণে তা হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। সেই সাথে আপনার কাজের সীমাবদ্ধতা কী ছিল, ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে এবং সেই সাথে আপনি যে টপিকের উপর কাজ করছেন সেই টপিকে কী ধরনের কাজ করা যেতে পারে তা নিয়ে আপনার মতামত দিতে পারেন।

৭) কনক্লুশন (Conclusion)

এই সেকশনটিতে মূলত আপনি বলবেন আপনার গবেষণার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল কী ছিল এবং তা থেকে আপনি সমস্যাটির সমাধানের যাবতীয় সকল প্রকার উত্তর পেয়ে গিয়েছেন; আর সেই সাথে আপনার কাজটি কেন এবং কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা পুনরায় সংক্ষেপে বলে লেখা শেষ করতে পারেন।

সবশেষে থাকবে রেফারেন্স সেকশন, যেখানে আপনি আপনার থিসিস লেখার সময় যেসকল একাডেমিক পেপার থেকে তথ্য কিংবা উপাত্ত নিয়েছেন ক্রমানুসারে সেই সকল পেপার এর বিস্তারিত শিরোনাম উল্লেখ থাকবে, যাতে কেউ চাইলে সহজেই সেই পেপারটি খুঁজে পায়।

থিসিস লেখার সহজীয়া পন্থা

থিসিস লেখার সময় অনেকেই ইন্ট্রোডাকশন লেখা দিয়ে শুরু করেন। কিন্তু আমার মতে শুরুতে আসলে মেথড, রেজাল্ট এবং ডিসকাশন এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা উচিত। কারণ আপনি কী কাজ করেছেন এবং আপনার গবেষণার ফলাফল কী সে সম্পর্কে আপনার চাইতে ভালো আর কেউ জানে না।

এই তিনটি সেকশনে পুরোটাই আপনার নিজের কাজের বর্ণনা থাকে। তাই এই তিনটি সেকশন লিখে ফেলা খুব সহজ হয়। আর যেহেতু সময় অনেক বেশি পাওয়া যায়, কাজেই এক্সপেরিমেন্টাল ডাটা এবং গ্রাফগুলো ভালোভাবে প্রেজেন্ট করার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

যদি পাবলিকেশন কোয়ালিটির ফিগার চান, তাহলে Origin Pro কিংবা KaleidaGraph ব্যবহার করতে পারেন। আমরা যদিও সবাই MATLAB ব্যবহার করি, কিন্তু উপরের দুটি সফটওয়্যার আমার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ। এদের ইমেজ কোয়ালিটি বেশ ভালো।

অনেকেই থিসিসের সবশেষে Appendix সেকশনে নিজেদের ম্যাটল্যাবের কোড দিয়ে থাকেন (যদি কাজের প্রয়োজনে লাগে)। কখনো কখনো এতে আপনার কাজ চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আপনার কোডটিকে চাইলে কেউ একটু উন্নত করে আরো ভালো রেজাল্ট জেনারেট করে দেখা যাবে আপনার আগেই কোনো জার্নাল কিংবা কনফারেন্সে পেপার পাবলিশ করে ফেলেছে।

এই তিন সেকশন লেখা শেষ হলে আপনি ইন্ট্রোডাকশন এবং লিটারেচার রিভিউ লেখা শুরু করতে পারেন। এই দুই সেকশন নতুনদের জন্য লেখা বেশ কষ্টসাধ্য এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রচুর তথ্য ধার করে তা নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখতে হয়।

এই দুটো সেকশন শুরুর দিকে লিখতে গেলে হয়তো দেখা যাবে আপনার বেশিরভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে এবং বাদবাকী গুরুত্বপূর্ণ সেকশনগুলো লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন না। তাই এই দুই সেকশন শেষেই লিখুন, এবং খুব বেশি সময় না পেলে সংক্ষেপে শেষ করে দিন। আর সবশেষে লিখে ফেলুন কনক্লুশন।

এই হলো থিসিস লেখার খুটিনাটি। পরবর্তী পর্বে আপনার থিসিসটি কীভাবে জার্নালে কিংবা কনফারেন্সে পাবলিশ করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

রাত জাগা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি ১০ শতাংশ

যারা রাত জাগতে পছন্দ করেন আর সকাল হলে নিজেকে টেনেও বিছানা থেকে নামানো যায় না তাদের জন্য দুঃসংবাদ। রাতজাগা পাখিদের রয়েছে শীঘ্র মৃত্যুর ঝুঁকি, যাদের স্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিছানায় যাবার এবং সকাল সকাল জেগে ওঠার অভ্যাস রয়েছে তাদের তুলনায়। এ বিষয়ক গবেষণা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব সারে

এ গবেষণায় ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য নেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংক থেকে। সাড়ে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণের অধীন ছিল আর ফল হচ্ছে পেঁচার অনুসারীরা সকালের চড়ুইদের তুলনায় ১০ শতাংশ অধিক মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকে। গবেষণা নমুনায় এমন ৫০,০০০ লোক ছিল যারা মৃত্যুঝুঁকি, অন্যান্য রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছিল।

চোখের আলোয় রাতের অন্ধকার, রাত বাড়ে ঘুম কেড়ে; image source: Huffington Post

রাত জাগানিয়া ব্যক্তিরা যখন ভোর থেকে কাজ শুরু করা ব্যক্তির মত কাজ শুরু করেন তাদের ক্ষেত্রেও দৈহিক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানান এই গবেষণার সহদলনেতা ক্রিস্টেন নুটসন। তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক।

এই বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিপাকীয় ক্রিয়ার ত্রুটি এবং হৃদযন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যার হার বৃদ্ধির উপর। বলা যায়, প্রথমবারের মত ক্রিস্টেনের গবেষণাই ঘুমের অভ্যাসের ভিত্তিতে মৃত্যুহার নিয়ে কাজ করছে। এটি প্রকাশিত হয়েছে ক্রোনোবায়োলজি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে।

বিজ্ঞানীরা রাত জাগানিয়াদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। এরপরও মৃত্যু ঝুঁকির হার তাদের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত ছিল।

প্রশ্ন জনস্বাস্থ্যের বলে এটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে মন্তব্য  করেন ইউনিভার্সিটি অব সারে এর ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক ম্যালকম ভন শান্টজ। ঘুমের সাথে দেহঘড়ির ব্যাপার সম্পৃক্ত। যারা রাতে কাজ করেন তাদের জন্য তারা কিভাবে দিনের আলোর সাথে দেহঘড়ির মিল ঘটিয়ে কাজ করতে পারেন এ ব্যাপারে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব অন্তত রাতের কাজ পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে। ক্ষুদ্র সময় ও ব্যক্তির বিচারে হয়ত এটা আমাদের কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না, কিন্তু বড় স্কেলে তা জনজীবনের লাইফস্টাইল ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর।

নুটসনের মতে, হতে পারে যারা রাত জেগে থাকেন তাদের একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি রয়েছে যা তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মিলে না। মানসিক চাপ, ভুল সময়ে খাদ্য গ্রহণ, যথেষ্ঠ শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের অভাব, ঘুমের অভাব, একা রাত জাগা ইত্যাদি কারণে দেহঘড়ির গোলমাল লেগে থাকতে পারে। একা রাত জাগার ক্ষেত্রে মাদক, এলকোহল, এমনকি অধুনা ডিজিটাল আসক্তিও দায়ী। রাতের অন্ধকারকে সময় দেয়ার সাথে স্বাস্থ্য পরিপন্থী বহু আচরণ সম্পর্কিত।

আরো ভয়ংকর ব্যাপার হল রাত জাগাদের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুতর অসুস্থতার হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে: ডায়াবেটিস, মানসিক বৈকল্য এবং স্নায়বিক বৈকল্য।

রাত জাগুনিয়ারা কি ভোরের পাখি হতে পারে?

জিনতত্ত্ব এবং পরিবেশ সমান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আমরা কি রাতের না ভোরের পাখি হব। কী ধরনের হবে কোন ব্যক্তি এ ব্যাপারে উক্ত দুই বিষয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন লেখক প্রতিবেদন প্রকাশও করেছেন।

রাতের ঘুমের সাথে সমস্যার দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নয়। কিছু কিছুর উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সব নয়। ঘুমের অভ্যাসের সময়সূচি পরিবর্তনের একটি ভাল উপায় আলোতে সাড়া দেয়া। আলো বলতে অবশ্য দিনের আলোর কথাই বলা হচ্ছে। সকালে আলো ফোটার সাথে বিছানা ছেড়ে দেয়া এবং রাতের অন্ধকার গভীর হলে বিছানার সাথে নীরব হয়ে যাওয়ার শুরু করা যেতে পারে। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়মিত সময় মেনে ঘুম চর্চা করা। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা এবং পরবর্তী দিন যেন সময়টা পিছিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা।

নিয়মিত সময়ে ঘুম না হলে দিনের সময়সূচি খাপ খাবে না; image source: Phd Comics

নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে অভিযোজিত হতে হবে। আপনার কখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত এ ব্যাপারে নিজের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে, বদঅভ্যাসের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না।

সমাজও যেভাবে সহায়ক হতে পারে

আমরা যদি দেহঘড়ির ঘুমের এ ধরণের সময়সূচির ব্যাপার ধরতে পারি, অংশত, যাদের ক্ষেত্রে জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং অভ্যাসের বশে এমন হচ্ছে না তবে তাদের জন্য কাজকর্ম, চাকরির সময়সূচি নমনীয়তা হয়ত উপকারে আসবে। তাদের হয়ত সকাল ৮টার আগেই ঘুম ভাঙার জন্য চিন্তায় থাকতে হবে না। কাজের সময়বণ্টনের মাধ্যমে তাদের সে সুযোগ দেয়া যায়। কিছু মানুষ রাতেই কাজের সাথে বেশি মানিয়ে নিতে পারে।

ভবিষ্যত গবেষণায়, নুটসন এবং তার সহকর্মীরা রাত জাগুনিয়াদের নিয়ে একটি পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। তাদের দেহঘড়ি একটু এগিয়ে আসলে কেমন আচরণ করে তাই যাচাইয়ের লক্ষ্য। মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি— দৈহিক ও মানসিক উন্নতি, রক্তচাপ ইত্যাদির উপর বিশেষ নজর থাকবে।

দিনের আলো সংরক্ষণ কর্মসূচির একটি উপজাত সংকট; image source: someecards.com

দিনের আলোর ব্যবহার বাড়াতে শীতপ্রধান দেশগুলোতে যখন ডে-লাইট সেভিং কর্মসূচি চালু হয় অথবা যখন গ্রীষ্ম চলে দেখা গেছে তখন সাধারণভাবেই এ ধরনের লোকেদের অধিক সমস্যা হয়।

গ্রীষ্মকালীন সময়সূচির সময় ইতোমধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়ার প্রতিবেদন রয়েছে বলে জানান ভন শান্টজ। আমাদের আরো স্মরণে রাখা দরকার যে প্রতিবছর এই পরিবর্তন ছোট ঝুঁকি হলেও প্রভাবিত করছে ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে। তিনি মনে করেন এ ব্যাপারটি গুরুতরভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে যে এই সময়সূচির লাভ উক্ত ঝুঁকির চেয়েও বেশি কিনা।

যেভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে

এ গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব সারে এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একেক জন ব্যক্তির সকালের এবং রাতের কাজকর্মের ঝোঁকের সূত্র খুঁজেছেন। এর সাথে হিসেব করেছেন তাদের সম্যক অবস্থার সাথে মৃত্যুঝুঁকির হার। তারা যে ৪,৩৩,২৬৮ জন ব্যক্তির তথ্য নিয়েছেন তাদের সকলের বয়স ছিল ৩৮ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে এটা ভাগ করতে যে তারা ভোরের পাখি নাকি প্রায় রাতের পাখি নাকি ঘোরতর হুতুম পেঁচার দলে। নমুনা ব্যক্তিদের মৃত্যুর তথ্য সাড়ে ছয় বছর ধরে নেয়া হয়েছে।

গবেষণাটির সহায়তায় ছিল ইউনিভার্সিটি অব সারে ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড স্টাডিজ স্যান্টান্ডার ফেলোশিপ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিজ এন্ড ডাইজেস্টিভ এন্ড কিডনী ডিজিজ গ্র্যান্ট R01DK095207.

 

সায়েন্স ডেইলি অবলম্বনে।

ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

দুপুরের হালকা ঘুম— বাড়িয়ে দেয় পড়াশোনার কার্যকারিতা

“ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকদের করা গবেষণা বলছে দুপুরের ঘুম হতে পারে স্নায়বিক কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার সহায়ক যা উপকারে আসতে পারে কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন ক্লান্তির সমাধান হিসেবে।” 

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে সহকারী অধ্যাপক জিয়াওপেঙ জি এবং প্রধান অনুসন্ধানকারী জিয়াংহং লিউ (ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া) চীনা ক্লাসরুমগুলোর উপর একটি গবেষণা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। জিনতান থেকে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের দুপুরের হালকা ঘুম আর রাতের ঘুমের স্থিতিকাল পরিমাপ করেন। একই সাথে ঘুমের মান অর্থাৎ গভীরতা ও কার্যকারিতা কেমন তাও টুকে নেয়া হয়। কার্যকারিতা পরিমাপে বহুবিধ স্নায়ুভিত্তিক কাজকর্ম করতে দেয়া হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

জিয়াওপেঙ জির মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ ছিল ঘুম এবং চেতনা বা বোধশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের। যেকোনো নিবিড় শিক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদার জন্য তরুণ সম্প্রদায়ই মূল উৎস। স্নায়বিক চেতনার কার্যক্রমগুলো ভূমিকা রাখে কোনো কিছু শেখা, আবেগ প্রকাশ এবং কেউ কিভাবে আচরণ করবে এ সংক্রান্ত ঘটনায়। তার গবেষণা থেকে দুপুরের হালকা ঘুম আর স্নায়বিক কাজকর্মগুলোর মধ্যে সহায়তা করার বৈশিষ্ট্যে প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, চীনে দুপুরের দিকে হালকা একটা ঘুম দেয়া তাদের সংস্কৃতি চর্চার অংশ। বাংলাদেশেও কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা প্রচলিত। দুপুরের ভাত খাওয়ার পর আমাদের দেশে এই হালকা ঘুমকে বলে ভাতঘুম।

ঘুমের পৃথিবী কিশোর-দুপুরের। চীনে দুপুরের ঘুম একটি সংস্কৃতি। ; source: asiapacificglobal.com

কিন্তু পশ্চিমাবিশ্বে আবার বিপরীত সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনো বালাই নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে, একটানা ঘুমের ধরণকে মস্তিষ্কের পূর্ণতার জন্য সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনে দুপুরঘুমের ব্যাপারটির চল রয়েছে অফিস আদালতে কর্মচারী এবং বিদ্যাপীঠগুলোয় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার পরবর্তী সময়ে।

জি গবেষণা করেছেন মানুষের ২৪ ঘন্টার দেহঘড়ির সাথে ঘুমের ছন্দ কিভাবে তাল খেলে। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরের ক্রমবিকাশের সময় দেহঘড়ির ছন্দের তাল-লয়ের পরিবর্তন হয়। টিনেজারদের ক্ষেত্রে তাদের প্রাক-কৈশোরের অবস্থার সাপেক্ষে দেহঘড়ির তাল-লয় এক থেকে দুই ঘন্টা পিছিয়ে পড়ে।

আব্বু !উঠে পড়, সারারাত ঘুমিয়েছ! স্কুল আছে!; source: New Scientist

এই দশা পরিবর্তনে দায়ী আসলে কিশোরদের জৈবিক পরিবর্তন। এ দশা পরিবর্তনের সময়, দেহঘড়ির কারণে শারীরিক কিছু অভ্যাস সময়ের সাথে বদলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে থাকে দৈনন্দিন জীবনে। যেমন বাচ্চাদের (প্রাক-কৈশোরে) বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কিন্তু এই জৈবিক পরিবর্তনের কারণে দেহঘড়ির যে বিলম্ব যুক্ত হয় প্রতিদিনিকার রুটিনে, তার কারণে এ বয়সীদের (১৩-১৯ বছর) বিছানায় ঘুমাতে যেতেও দেরী হয়। সকালের ঘুম ভাঙার সময় একই থাকায় ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি নিয়মিত হতে থাকে।

জি মনে করেন জৈবিক কারণের এ আকস্মিক পরিবর্তনে ঘুমের সময়সূচির সমস্যা কিশোরদের স্নায়বিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে। যে কারণে, স্কুলে মনোযোগ দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি হতে পারে স্মৃতিশক্তি এবং কার্যকারণ দক্ষতারও।

দেহঘড়ি কমজোর হয়ে পড়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যকালে। দিনের এ পর্যায়ে কিশোরদের ঘুমভাব চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর সময়সূচির কারণে কিশোরদের সে সুযোগ পাওয়ার উপায় নেই।

শৈশবের পর্যায় এগুতে এগুতে, আমেরিকার বাচ্চাদের হালকা ঘুমের অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। বাচ্চাদের এমন সময়সূচির মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত হতে থাকে যে তারা  দৈনন্দিন এই নিয়মকানুনের কারণে একসময় দুপুরের হালকা ঘুমের চাহিদা থেকে বিরত থাকতে শিখে যায়। বিপরীত দিকে, চীনে, স্কুলগুলোর সময়সূচিতে এ সুযোগটা আছে। তাই নিয়মকানুনের চাপ ঐ নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ছে না। ফলত, চীনে কিশোরদের দুপুরের হালকা ঘুমের অভ্যাস সময়ের পরিক্রমায় অপরিবর্তিত থাকছে।

হালকা ঘুমের ব্যাপারে গবেষকদের এসপার ওসপার অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে দিনের হালকা ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে মিটিয়ে দেয়; আরেক দল মনে করে এটি নিয়মিত হলে রাতের ঘুমের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বহু গবেষণায় ল্যাবরেটরিতে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে এধরনের পরীক্ষার তথ্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশের সাথে নতুন কৃত্রিম পরিবেশে নিয়মিত অভ্যাসের পার্থক্য হ্রাস করা খুব জটিল ব্যাপার। তাই পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের আচরণের প্রভাব কতটা বিশুদ্ধ তা নিয়ে শংকা থাকে। কারণ, আসলে যাচাই করা হচ্ছে অভ্যাসগত ঘুমের প্রভাব। তাই সেই অভ্যাসের সাথে আনুষঙ্গিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের ঘরের বিছানাসহ ঘুম পরীক্ষার অংশ করে ফেলার কথা ভেবে ফেলেন জি।

পূর্ণবয়স্কদের উপর ঘুম সংক্রান্ত যথেষ্ঠ গবেষণা হলেও, টিনেজারদের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল ছিল। তাই আঁটঘাট বেঁধে নামতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি। যেহেতু আমেরিকার স্কুলগুলোর সময়সূচি গবেষণার উদ্দিষ্ট ঘুমের সময়ের পরিপন্থী, সেকারণেই চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যৌথ এ প্রচেষ্টায়।

যা পাওয়া গেল

জি হালকা ঘুমের দুটো পরিমাপক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন— একটি হল ঘুমের সংখ্যা এবং অপরটি ঘুমের স্থায়ীত্ব। নিয়মিত হালকা ঘুমওয়ালারা— যারা সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা ঘুম ছাড়া থাকতে পারেন না তাদের ওপর কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। দেখা গেছে, তারা দৃষ্টি সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং স্থান, পরিপার্শ্বীয় স্মৃতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় বেশ ভাল দক্ষতা দেখিয়েছে। এরপর আসে এই হালকা ঘুম কতক্ষণ দীর্ঘ হবে? গবেষণা বলছে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট। এক ঘন্টার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেলে আবার সে ঘুমের কারণে দেহঘড়ির ছন্দপতন হতে পারে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ঘুমিয়েছে তারা অধিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছে। একই সাথে একই লোকদের ক্ষেত্রে কাজের গতিও বেশি পাওয়া গেছে। তবে বিকেল ৪টার পর এ ঘুম না নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

গবেষকরা দুপুরের হালকা ঘুম এবং নিশিতনিদ্রার মধ্যকার ইতিবাচক সম্পর্ক ধরতে পেরে বেশ অবাক হয়েছেন। দেখা গেছে, হুটহাট হালকা ঘুমের চেয়ে যারা নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ঘুম দিয়ে থাকেন তারা রাতেও ভাল ঘুমাতে পারেন।

পশ্চিম চায়নার একটি স্কুলের দৃশ্য। বাচ্চাদের ডর্মিটরি বা বাসা একটু দূরে বলে ঘুমচর্চা ক্লাসরুমেই সেরে নিচ্ছে যা চীনে দুপুর-ঘুম সংস্কৃতির আবহমানতা প্রকাশ করে।; source: dailymail.co.uk

আমেরিকার সাথে পার্থক্য তৈরি করছে আসলে মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন। দিনের ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিতে পারে আবার পরের রাতের জন্য ঘাটতির কারণ হতে পারে সেখানে। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের সাথে তাল মিলিয়ে এই অভ্যাসে প্রস্তুত নয়। কিন্তু চীনে নিয়মিত ঘুমানোর সংস্কৃতি থাকায় দুপুরের ঘুমও চলছে আবার রাতের ঘুমেরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জি তার এই গবেষণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন যে তার কাজ ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তিনি এর কার্যকারণের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এতে অবশ্য ফলাফলের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে না। তিনি আশা করেন এ কাজ ভবিষ্যত গবেষণায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে কাজে লাগতে পারে।

 

— ScienceDaily অবলম্বনে

রাস্তায় চলার আইন-কানুন

রাস্তায় চলতে গিয়ে বিভিন্ন সময় তাতে সাদা-হলুদ বিভিন্ন রকম দাগ দেখা যায়। এসব ভিন্ন ভিন্ন রঙ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। কোনটি কী প্রকাশ করে সেটি জেনে নিন এখন।

১) Solid white line – আপনি যে লেনে আছেন সেখানেই থাকতে হবে। কোনোভাবেই লেন চেঞ্জ করা যাবে না।

২) Broken white line – আপনি লেন চেঞ্জ করতে পারবেন, তবে সেটি সতর্কতার সাথে করতে হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

৩) One solid yellow line – অন্য গাড়িকে ওভারটেক করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে হলুদ দাগ অতিক্রম করা যাবে না। তবে সব জায়গায় এটি খাটে না। যেমন ভারতে অঙ্গরাজ্য ভেদে এ নিয়মটি পাল্টে যায়। তেলেঙ্গানায় (Telangana) এ দাগ দিয়ে বোঝায় কোনো ওভারটেক করা যাবে না।

image source: powerful4x4.com.au

৪) Double solid yellow lines – লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া যাবে না।

৫) Broken Yellow Line – লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া যাবে, তবে সেটি সতর্কতার সাথে করতে হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

৬) Solid yellow line with broken yellow line- ভাঙা হলুদ লাইনের পাশে থাকলে আপনি ওভারটেক করতে পারবেন, তবে অন্য পাশে থাকলে পারবেন না।

বি.দ্রঃ আমার দেশে ট্রাফিক আইন-কানুন সেভাবে মানা হয় না। এসব রঙ দেখে চলা তো পরের কথা। তারপরেও জানিয়ে রাখলাম। যদি কেউ মানার কারণে অন্য কেউ সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে নিস্তার পায় তাহলেই আমি সার্থক।

featured image: perc.org

দুধসহ চা, দুধ ছাড়া চা: বিজ্ঞান কোনটার পক্ষে?

চা। আমাদের অতি পছন্দের একটি পানীয়। পৃথিবীর ২০০ কোটির উপরে মানুষ চা পান করে থাকে। শুধু ব্রিটেনেই প্রতিদিন ১৬ কোটি ৫ লাখ কাপ চা পান করা হয়ে থাকে। যার অর্থ ব্রিটেনের প্রতিটি মানুষ দিনে গড়ে ৩ কাপ করে চা পান করে থাকে। কেউ চা খায় ঘুম তাড়াতে, কেউ চা খায় স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে, কেউ চা খায় বন্ধুদের সঙ্গ দিতে আর কেউবা নিছকই অভ্যাসবশতই খেয়ে থাকে। চা পান অনেকে মানুষকে বিভিন্ন চিন্তা থেকেও দূরে রাখে। চা পানকারীদের মধ্যেও আছে নানা রকম বিভাজন। কেউ পছন্দ করে দুধ চা, আবার কেউ দুধ ছাড়া রঙ চা খেতেই স্বাছন্দ্য বোধ করে বেশি। কেউ গ্রীন টি বা, সবুজ চা আবার কেউ উলং চা খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু এই ৪ ধরনের চা কিন্তু আসে একই গাছ থেকে। সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেসিস

কিন্তু কোন ধরণের চা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারি? দুধ চা নাকি রঙ চা? চলুন উত্তর খোঁজা যাক। কিন্তু সাধারণভাবে নয়, একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

রঙ চা বনাম দুধ চা; image source: medianp.net

চায়ের মাঝে অ্যান্টিওক্সিডেন্ট এবং ভিটামিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এছাড়াও চা পানকারীরা খুব সাধারণভাবেই হৃদরোগের সম্ভাবনা থেকে বেশ কিছুটা মুক্ত থাকেন। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, চা পানকারীদের এসকল সুবিধা সম্পূর্ণরুপে বাতিল হয়ে যায় যদি তারা অধিকাংশ চা পানকারীদের মতো চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খান।  

চা কে অনেক আগে থেকেই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। চা যেমন হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়, তেমনি আবার ক্যান্সার প্রতিরোধেও এর ভূমিকা রয়েছে। আবার দেহের বাড়তি মেদ কমাতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, দেহের কোষের সুরক্ষা প্রদানেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জার্মানীর এক দল গবেষকের ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে কয়েক বছর আগে  প্রকাশিত এক পেপারে দেখানো হয়েছে যে, চায়ে দুধের ব্যবহার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে চায়ের যে উপকারিতা তার অনেকগুলোকেই নষ্ট করে দেয়।

চায়ে ক্যাটেচিন্স নামের এক ধরণের উপাদান থাকে। এই ক্যাটেচিন্সকেই চায়ের সেই উপাদান হিসেবে ধারণা করা হয় যা আমাদের হৃদপিন্ডকে সুরক্ষিত রাখে এবং আমাদের রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে চায়ের সাথে দুধ মেশালে এই প্রভাব কমে যেতে থাকে। বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যারিটে হসপিটালের একদল বিজ্ঞানী এই গবেষণার কাজটি পরিচালনা করেছেন।

রঙ চা; image source: lifehack.org

এই গবেষণা ১৬ জন সুস্থ মহিলার উপর পরিচালনা করা হয়। তাদেরকে আধা লিটার চা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া পান করতে দেয়া হয়েছিল। চা খাওয়ার পরে তাদের বাহুর মাঝ দিয়ে রক্ত চলাচল আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছিল।

রঙ চা খাওয়ার পরে মহিলাদের রক্ত চলাচলের বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা গেল। কিন্তু এই উন্নতির কোনো লক্ষণ দুধ চায়ের মাঝে দেখা গেল না। এরপর গবেষকরা এক দল ইঁদুরের উপরও একই পরীক্ষা চালালেন। এক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল লক্ষ্য করা গেল।

মূলত দুধে অবস্থান করা ক্যাসেইন্স নামের এক দল প্রোটিন চায়ের সাথে বিক্রিয়া করে এবং চায়ে থাকা ক্যাটেচিন্সের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দেয়। যদিও সকল বিজ্ঞানীরা এখনো এটা বিশ্বাস করেন না যে চায়ের সাথে দুধ মেশালে সেটি খুব বেশি পরিমাণে এই প্রভাবগুলো কমিয়ে দেয়।

দুধ চা; image source: Healthmania.org

তবে এই ফলাফলের ঠিক বিপরীত ফলাফলও আছে। ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডে একদল বিজ্ঞানী ১২ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা চালান। দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চা পান করার পর তাদের দেহের ক্যাটেচিন্সের (যে উপাদানের কারণে দেহের রক্ত চলাচলের উন্নতি দেখা যায়) পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। তারা দুধসহ এবং দুধ ছাড়া চায়ের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য দেখলেন না। কিন্তু এই গবেষণা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ একটি গবেষণা ছিল। এই গবেষণাটি মূলত ইউনিলিভার কোম্পানির অর্থায়নে হয়েছিল। চায়ের ব্যবসার ক্ষেত্রে ইউনিলিভার বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। লিপ্টন, পি জি টিপস তাদের চায়ের ব্র্যান্ড। গবেষণার ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র ইউনিলিভার ব্র্যান্ডের চাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছিল, যা বৈজ্ঞানিকগবেষণার কোনোভাবেই আদর্শ হতে পারে না।

২০১১ সালেও আরো একটি গবেষণায় উপরের ফলাফলের মতো আরো একটি ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এবারো এই গবেষণার অর্থায়নে ছিল ইউনিলিভার এবং শুধুমাত্র তাদের ব্র্যান্ডের চাকেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

তবে ২০০২ এবং ২০০৬ সালে হওয়া পৃথক ৩টি গবেষণার ৩টিই চায়ের সাথে দুধ মিশিয়ে খাওয়ার চেয়ে রঙ চা খাওয়াকে বেশি উপকারী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে এরপরও যদি কেউ একান্তই দুধ ছাড়া চা না খেতে পারে তবে সে সাধারণ দুধের পরিবর্তে সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন। সয়া দুধে লেসিথিন রয়েছে, যার আণবিক গঠন ক্যাসেইন্সের চেয়ে সম্পূর্ণরুপে আলাদা। এই লেসিথিনের ক্যাটেচিনের সাথে বিক্রিয়া করার সম্ভাবনা ক্যাসেইন্সের চেয়ে অনেক কম থাকে। তাই এক্ষেত্রে দুধ চা পানকারীদের ভালো বিকল্প হতে পারে সয়া দুধ।

যদিও এটা সত্য যে, খাবারের কাছে এসে এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বা, বাঁধা নিষেধ মেনে চলা বেশ কঠিন একটা কাজ। আমাদের স্বাদের অনুভবের কাছে বিজ্ঞানের এসব নির্দেশনা ধূলোয় লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু সুস্থ থাকতে হলে বিজ্ঞানের নির্দেশ অমান্য করলেও যে চলে না। এরপর থেকে চায়ে দুধ মেশানোর আগে আরেকটিবার ভাববেন কি? অন্তত নিজের জন্য?

ফিচারড ইমেজঃ medianp.net

নিদ্রাহীনতা দূর করে যেসব খাদ্য

ঘুম হলো শান্তির বাহন। ক্লান্তি দূর হয়ে প্রশান্তি ফিরে আসে এই ঘুমে। ঘুম স্মৃতিশক্তি ও মেধাশক্তি বাড়ায়। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের সকল কোষ ও কার্যক্রম ঠিক রাখে। সারাদিনের ক্লান্তিকর খাটুনি বা মানসিক পরিশ্রমের অবসান ঘটে ঘুমের মাধ্যমে। সুস্থতা ও সুন্দর জীবনের জন্য ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বর্তমানে নানা কারণে নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। হতাশা, দুশ্চিন্তা সহ নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক জটিলতার অন্যতম কারন নিদ্রাহীনতা। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। তাই ঘুমের সমস্যা সমাধানের কিছু উপকারি টিপস নিয়ে এই আয়োজন।

যে সমস্ত উপাদান ঘুমের জন্য সহায়ক তা হলো-

ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ

Natural-Sleep-Aids-to-Help-You-Fall-Asleep-Faster
TATIANA AYAZO/RD.COM

ঘুমের সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা অপরিসীম। ম্যাগনেশিয়াম পেশির সংকোচন এবং রিলাক্সেশনে বড় ভূমিকা পালন করে। এক গবেষণায় দেখা যায়, ম্যাগনেশিয়াম ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের ক্ষরণ বাড়াতে সাহায্য করে। কম ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণের সাথে নিদ্রাহীনতার সম্পর্ক বিদ্যমান। যারা সারা রাত জেগে থাকে, ঘুমাতে পারে না তাদের জন্য কার্যকরী উপায় হলো ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণের পরিমাণ বাড়ানো। ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণ বাড়ালে ঘুম না আসা ও নির্ঘুম রাত কাটানোর সমস্যা দূরীভূত হবে। তাছাড়া নিয়মিত পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণ করলে রেস্টলেসনেস লেগ সিন্ড্রোমের মতো সমস্যাও অনেকটা কমবে।

ক্যালশিয়াম গ্রহণ

দই বানিয়ে ফেলুন। এটি আপনার ভালো বন্ধু হবে। উপকারি ব্যাকটেরিয়ায় ভরপুর ক্যালসিয়ামপূর্ণ খাবার ঘুমাতে সাহায্য করে। এই মিনারেল ব্রেনকে ট্রিপ্টোফ্যান অ্যামাইনো অ্যাসিড ব্যবহারে সহায়তা করে মেলাটোনিন হরমোন উৎপন্ন করে। অপর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামের কারণে মেলাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ কম হয় ফলে ঘুমের ঘাটতি দেখা যায়। ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি সম্পন্ন খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভিটামিন ডি গ্রহণ

ভিটামিন ডি এর ঘাটতি হলে ঘুমের গুণগত মান ও পরিমাণ কমে যায়। পাশাপাশি দিনের ক্লান্তি ও তন্দ্রাভাব বৃদ্ধি পায়। এক বিশেষজ্ঞের মতে, এই উপাদানের ঘাটতির সাথে মেজাজের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক আছে ফলে তা ডিপ্রেশন বাড়ায় এবং পরবর্তীতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় ও নিদ্রাহীনতার জন্ম দেয়।

ভিটামিন সি

Natural-Sleep-Aids-to-Help-You-Fall-Asleep-Faster
TATIANA AYAZO/RD.COM

ভিটামিন সি আপনার শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাটকে মেটাবলাইজ করে। কিন্তু এটাও যে আপনার ঘুমের উপকার করে তা কি জানেন? বিজ্ঞানী ওয়েড-এর মতে, ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্ট। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা যায় রক্তে বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি থাকলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের ক্ষরণ কম হয় এবং দ্রুত স্ট্রেস কাটিয়ে প্রশান্তি দিতে পারে। যেহেতু বেশি মাত্রায় কর্টিসল নিদ্রাহীনতার জন্ম দেয় তাই পর্যাপ্ত ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।

আয়রন

শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোমের (আরএলএস) ঝুঁকি বাড়ে। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরো বেশি। আরএলএসের অন্যতম লক্ষণ হল ঘুমাতে না পারা ও নির্ঘুম থাকা। খাবারের সাথে আয়রন বেশি খেলে আর এল এস হওয়ার সম্ভাবনা কমে এবং ঘুম ভালো হয়।

মাছ

মাছ খাওয়া ঘুমের পক্ষে ভালো কাজ করে। শুধু তাই নয়, রাতে মাছ খেলে আপনার মেধাশক্তি বৃদ্ধিতেও কাজ করে। গবেষণায় দেখা যায়, মাছ খাওয়ার সাথে ভালো ঘুম, মেধাশক্তি ও আইকিউ-এর একটি ইতিবাচক সম্পর্ক আছে।

চেরি ফলের জুস

চেরি ফলের জুস ঘুমের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন এক গ্লাস চেরি ফলের জুস খেলে অন্তত ৫০ মিনিট বেশি ঘুম হয়। ঘুমের গুণগত মানও বৃদ্ধি পায়। যেকোন জুস খাওয়ানো যেতে পারে এক্ষেত্রে।

রিবোফ্লাভিন

রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন বি২ গ্রহণের ফলে প্রস্রাবের রঙ উজ্জ্বল হলদে আকার ধারণ করে। রিবোফ্লাভিন আপনার ঘুমে যথেষ্ট সহযোগীতা করে। রিবোফ্লাভিন সমৃদ্ধ গরু ও খাসির কলিজা এবং পর্যাপ্ত দুধ খেলে ঘুমের প্রশান্তি ফিরে আসবে।

অশ্বগন্ধা

Natural-Sleep-Aids-to-Help-You-Fall-Asleep-Faster
TATIANA AYAZO/RD.COM

ইন্ডিয়া সহ অনান্য দেশে হার্বাল ও আয়ুর্বেদিক মেডিসিন হিসাবে অশ্বগন্ধার বেশ সুনাম রয়েছে। এটাকে নিদ্রাহীনতার উপযুক্ত ওষুধ মনে করেন হার্বাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা। এতে ম্যাজিকের গতিতে ফল পাওয়া যায়। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা ক্লিনিক্যাল প্রমাণ দিয়ে অশ্বগন্ধার এমন ঘুম বৃদ্ধির ক্ষমতা আছে বলে সমর্থন দিয়েছেন।

তাজা আখের রস

তাজা আখের রসে যে পরিমাণ অক্টাকোসানল উপাদান আছে যা উন্নত ঘুমের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অথচ প্রস্তুতকৃত চিনিতে এ ধরনের উপাদান নেই। সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, আখের রসের মধ্যে সবুজের মাঝে যে সাদা আবরণ থাকে তা অক্টাকোসানলের উত্তম উৎস। এই উপদান ঘুম বৃদ্ধিতে কার্যকরি ভূমিকা পালন করে। এটা আপনার শরীরের স্ট্রেস   কমিয়ে  ঘুমাতে সাহায্য করে।

মৌরি

সাধারণ চিকিৎসায় ও মায়েদের স্বাস্থ্য রক্ষায় মৌরির ব্যবহার অতুলনীয়। এটি গর্ভবতী মায়েদের বাচ্চা প্রসবকালীন সমস্যা সমাধান করার পাশাপশি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। অন্য গবেষণায় প্রমাণিত যে, মৌরি ঘুমের ঘাটতি পূরণে এবং নিদ্রাহীনতায় টনিকের মত কাজ করে।

তথ্যসূত্র: রিডার ডাইজেস্ট