মারিয়া আগনেসি: এক বিস্মৃত নারী গণিতবিদ

নারীদের জন্য গণিত নয় এ সেকেলে ধারণা ভেঙে যায় যখন মরিয়ম মির্জাখানি ২০১৪ সালে গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কার ফিল্ডস মেডেল অর্জন করেন। ৩০০ বছর আগেও এমন এক নারী গণিতবিদের জন্ম হয়েছিল, মারিয়া আগনেসি। আগনেসি ছিলেন প্রথম নারী যিনি কোনো গণিতের পাঠ্যবই রচনা করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়েরও গণিতের পদে বহাল ছিলেন। এরপরও তার জীবন বিভ্রান্তিময় ছিল।

মেধাবী, ধনী এবং বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অবশেষে বেছে নিয়েছিলেন দারিদ্র্যতা ও দরিদ্রের প্রতি সেবার জীবন। তার জীবনের সবিষেশ ইতিবৃত্ত আজও গণিতের ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে স্মরণীয়।

শৈশবকাল

আগনেসি ১৬ই মে ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালির মিলানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার রেশম ব্যবসায়ী ধনাঢ্য পিতার ২১ সন্তানের মধ্যে সবার বড়। ৫ বছর বয়সের মাঝে তিনি শিখে ফেলেছিলেন ফ্রেঞ্চ, ১১ বছর বয়সের মধ্যে তিনি মিলানের সমাজে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন সপ্তভাষী কথক হিসেবে। তার বাবাও মেয়েকে সম্ভাব্য সেরা শিক্ষা দিতে তৎকালীন শীর্ষ পণ্ডিতদের নিয়োগ করেছিলেন। নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সে আমলে ছিল না বলে তার বাবা সুযোগকে ঘরে এনে দিয়েছিলেন আগনেসির জন্য।

যখন আগনেসির বয়স ছিল ৯, তিনি তার এক শিক্ষকের রচিত ল্যাটিন ভাষণ স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করেন। এই ভাষণে সমালোচনা করা হয় নারীদের বিজ্ঞান ও কলায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তৎকালে ভাবা হত ঘরদোর সামলানো মেয়েদের মূল কাজ আর এজন্য তাদের শিক্ষাগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। আগনেসি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে স্পষ্ট এবং প্রত্যয়ী বিতর্ক উপস্থাপন করেন যে, পুরুষদের জন্য সুলভ শিক্ষা নারীদের জন্যও উন্মুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

আগনেসি সময়ের পরিক্রমায় তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা প্রদর্শনে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংসারত্যাগী হয়ে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। যখন তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে, তিনি ঘর দেখাশোনা ও তার অনুজ ভাইবোনদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নেন।

এই ভূমিকার কারণে, তিনি টের পান শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্তারিত মাত্রার গণিতের পাঠ্যবইয়ের দরকার যাতে ইতালিয়ান শিক্ষার্থীরা গণিতের নতুন আবিষ্কারের সাথে আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই

আগনেসি গণিতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করেন। তার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞানে তিনি বিশ্বাস করতেন, জ্ঞান ভ্রমাত্মক হতে পারে এবং বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। গণিতের সত্য সত্যিকারের চিরন্তন ও বিশুদ্ধ সত্য, এ ধরণের চিন্তন এক অনন্য আনন্দের উৎস। তিনি তার পাঠ্যবই রচনার সময়, শুধুমাত্র শিক্ষার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং চিন্তার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

আগনেসির ২৯৬ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৪, ১৬ মে তারিখে গুগলের প্রকাশিত ডুডল।; image source: Google

১৭৪৮এ দুই খণ্ডে প্রকাশিত আগনেসির বইয়ের নাম ছিল “বিশ্লেষণের প্রাথমিক তত্ত্ব”। লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এটি ল্যাটিনে লেখা হয় নি। সে কালে লেখক যে ভাষারই হোক রীতি ছিল ল্যাটিনে বই প্রকাশ করার। তিনি তার বই প্রকাশ করেন ইতালিয়ান ভাষায়, যেন শিক্ষার্থীদের কাছে আরো সহজে পৌঁছে যায়।

তার প্রথম দিকের এক পাঠ্যবই তিনি উপস্থাপন করেন গণিতের নতুন শাখা ক্যালকুলাসের উপর। তার এই বই গণিতের কয়েক প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা অনুসরণ করেছে। ইতালির বাইরে প্যারিস এবং ক্যামব্রিজেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার বাই অনুবাদ করে পাঠদান করা হত।

আগনেসির রচিত পাঠ্যবই ১৭৪৯ এ ফরাসি একাডেমি কর্তৃক প্রশংসিত হয়। সমকালীন গণিতবিদ ও ইতিহাসবেত্তা জাঁ ইতিয়েনে মন্টুক্লাও তার ব্যাপারে প্রশংশাবাক্য ঝরিয়েছেন। আগনেসি তার “মৌলিক নীতিসমূহ” বইটি উৎসর্গ করেন্ন অস্ট্রিয়ার সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেজাকে। মারিয়া থেরেজা এই সম্মান গ্রহণ করেন আগনেসিকে ধন্যবাদান্তের চিঠি ও হীরা উপহার পাঠিয়ে। তাকে পোপ বেনেডিক্ট ইউনিভার্সিটি অব বোলোগনায় গণিতের চেয়ার গ্রহণে নিয়োগ দেন, যদিও আগনেসি কখনো সেখানে যান নি সে দায়িত্ব গ্রহণ করতে।

সেবায় নিয়োজিত জীবন

নারী এবং গরীবের শিক্ষার জন্য আগনেসিকে বলা যায় একজন উদ্দমী উদ্যোক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং গণিত শিক্ষা কার্যক্রমে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিশ্বাস জোরালো থাকায় তিনি মনে করতেন বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক বিষয়ে পড়াশোনা স্রষ্টার সৃষ্টির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

আগনেসির বাবা মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি তখন ধর্মের দিকে নিজেকে ব্যস্ত করেন, নিজেকে একান্তভাবে নিয়োজিত করেন গরিব, অসুস্থ ও গৃহহীনদের সেবায়। ঘরেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ছোট হাসপাতালের। ক্রমে তিনি বিলিয়ে দিতে থাকেন তার সম্পদ, এমনকি সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবান উপহারও। তার জীবনযাপনের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায় তার কবরস্থান থেকে। ৮০ বছর বয়সে আগনেসি মৃত্যুবরণ করেন, তাকে কবর দেয়া হয় জনগণের টাকায় গড়া কবরস্থানে যেখানে কবর দেয়া হয় সে সকল ব্যক্তিদের যাদের কবরের জন্য আর্থিক সঙ্গতি থাকে না।

আজকের দিনে, আগনেসির গণিত থেকে ধর্মীয় কার্যকলাপে মোড় নেয়ার ঘটনা গণিতবিদদের অবাক করে। কিন্তু তার কাছে এটা সঙ্গত ছিল। তার দৃষ্টিতে, মানুষ একই সাথে জ্ঞানার্জনে ও ভালবাসায় সক্ষম। একদিকে যেমন বিভিন্ন সত্যের দিকে চমকিত হওয়ার ব্যাপার রয়েছে, অন্যদিকে ভালবাসায় বদলে যাওয়ার গুরুত্ব্ও তার চেয়ে কম নয়।

আগনেসি বলেন, “মানুষ সর্বদা লক্ষ্য অর্জন করতে চায়; খ্রিস্টানদের লক্ষ্য স্রষ্টার গৌরব অর্জন করা। আমি আশা করি আমার কাজ স্রষ্টার গৌরব এনে দিয়েছে, যেহেতু সে কাজ অন্যদের উপকারে এসেছে। আমার কাজ অনুগত্য থেকে উদ্ভূত, কারণ এ-ই ছিল আমার বাবার ইচ্ছা। এখন আমি উত্তম পথ খুঁজে পেয়েছি যেন স্রষ্টার সেবায় ও অন্যদের উপকারে আসতে পারি।”

যদিও আগনেসি বর্তমানে তেমন স্মরণীয় হতে পারেননি, তিনি গণিতের বিকাশে রেখেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। লিঙ্গবৈষম্যের ইতিহাসে তিনি এক অনুপ্রেরণার গল্প। গণিত ও বিজ্ঞানে নারীদের আলোকচ্ছটার পদানুসরণের দাগ রেখে গেছেন পরের প্রজন্মের জন্য।

 

দি কনভার্সেশন অবলম্বনে।

৩ স্মরণীয় নারী গণিতবিদ জুলিয়া-এমি-আডা

যখন সবাই বলে গণিতের ইতিহাস পুরুষের ইতিহাস, তখন সবার ভুলই ইতিহাস হয়ে রয়।  

বিশাল মহাশূন্যের রহস্য উন্মোচন থেকে শুরু করে যত দূর পর্যন্ত মানুষের আবিষ্কার অর্জিত হয়েছে তা সে কল্পনা বা যুক্তি যে দৃষ্টিকোণেরই হোক, গণিতের ইতিহাস আদ্যন্তই দেখা দেখা হয়েছে পুরুষিক প্রচেষ্টা হিসেবে। গাউস, অয়লার, রিম্যান, পয়েনকেয়ার, এরডস এবং বর্তমান আধুনিক যুগের উইলস, টাও, পেরেলমান, ঝাং যার নামই নেই না কেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম যে গণিতগুলো আবিষ্কার হয়েছে মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে সকল অবদানই যেন পুরুষের। ১৯৩৭ এ এরিক টেম্পল বেলের লেখা বই গণিতের মানুষেরা(পুরুষেরা) [Men of Mathematics] একটি উদাহরণ যা প্রকাশ করে গণিতে কতটা লিঙ্গভেদ ধারণা কাজ করছে গণমানুষের মাঝে।

এমনকি আজ পর্যন্তও, এটা বলা বাহুল্য যে গণিত হচ্ছে পুরুষ গণিতবিদদের একক প্রচেষ্টাক্ষেত্র। কিন্তু এ থেকেই আমাদের কিছু নারী গণিতবিদের যুগান্তকারী অবদানকে ভুলে যাওয়াও উচিত নয়। আমরা এমন কিছু উল্লেখযোগ্য নারী গণিতবিদ পেয়েছি  যারা কম্পিউটার বিজ্ঞান, মহাশূন্যের জ্যামিতি, বিমূর্ত বীজগণিতের ভিত্তি গঠনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণিত তত্ত্ব, সংখ্যাতত্ত্বে এবং মহাশূন্য বলবিদ্যায় অবদান রেখেছেন যা আমাদের আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় পাথেয়। এসকল অবদানের উপর ভিত্তি করে প্রশস্ততর হয়েছে ক্রিপ্টোগ্রাফি, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের জগত।

সংখ্যাতত্ত্বে হিলবার্টের দশম গাণিতিক সমস্যার উপর জুলিয়া রবিনসনের কাজ, এমি নোয়েথারের বিমূর্ত বীজগণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের কাজ আর আডা লাভলেসের কম্পিউটার বিজ্ঞানে সৃষ্টিপ্রচেষ্টা— কেবল তিনটি উদাহরণ নারীদের পক্ষ থেকে। এই তিনজনকে আজ একটু চেনার চেষ্টা থাকবে।

জুলিয়া রবিনসন (১৯১৯-১৯৮৫)

বিংশ শতাব্দী উঁকি দিতে দিতে বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এক সেট গাণিতিক সমস্যার সংকলন প্রকাশ করলেন। সেটে ছিল ২৩টি সমস্যা— আগড় বাগড় কোনো সমস্যা না, বরং যেগুলো গণিতবিদদের ধাঁধায় ফেলে রেখেছে। আরো বলে দিলেন সামনের ১০০ বছর এই সমস্যাগুলো নিয়ে গণিতবিদেরা ব্যস্ত থাকবেন। এ কথাটির সোজাসুজি অর্থ হচ্ছে ১০০ বছরের চেষ্টায়ও সবগুলো সমাধান করা যাবে না।

১৯৭৫ সালে বার্কলেতে তোলা ছবিতে জুলিয়া রবিনসন; source: George Bergman

তো সেগুলোর মধ্যে দশতম সমস্যাটির দাবি ছিল ডায়োফ্যান্টাইনের সমীকরণের সমাধানযোগ্যতা নিরূপণে একটি সাধারণ অ্যালগরিদম গঠন করা যাবে কি না। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ হল যেসকল বহুপদী সমীকরণের সহগ এবং সমাধান সকলই পূর্ণসংখ্যা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, কল্পনা করুন এমন কোনো যন্ত্র যা কিনা সকল ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের অসীমসংখ্যক সমাধান সেট থেকে বলে দিবে সেটি সমাধান করা সম্ভব নাকি সম্ভব না। গণিতবিদরা প্রায়শই এ ধরনের অসীমতক ধারণার প্রশ্নের মুখোমুখি হন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান বের করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে থাকে। তো এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি বার্কলের গণিতবিদ জুলিয়া রবিনসনকে আগ্রহী করে তুলেছিল। কয়েক দশক ধরে তিনি মার্টিন ডেভিস এবং হিলারি পুটনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছিলেন। এর ফলস্বরূপ, হিলবার্টের এই সমস্যাটির  একটি শর্ত বাতলানো গিয়েছিল যে এটি হিলবার্টের প্রশ্নের না বোধক উত্তর দিবে।

১৯৭০ এ এক তরুণ রাশিয়ান গণিতবিদ ইউরি মাতিয়াসেভিচ এই সমস্যাটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান করেন রবিনসন, ডেভিস এবং পুটনামের দেখানো পথে। সংখ্যাতত্ত্বে উজ্জ্বল অবদান রাখা রবিনসন ছিলেন একজন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গণিতবিদ যিনি বিশুদ্ধ গণিতের কোনো এক সমস্যার সমাধানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস এর প্রথম নারী গণিতবিদ। ১৮৮৮ এ আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর অপেক্ষার পর একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়া গিয়েছিল— জুলিয়া বাউমেন রবিনসনকে। তার উপর লেখা জীবনীগ্রন্থ “The Autobiography of Julia Robinson“.

এমি নোয়েথার (১৮৮২-১৯৩৫)

অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রার কোর্স করা মানেই কেউ এমি নোয়েথারের নাম শুনতে বাধ্য। তার কাজ বিস্তৃত পদার্থবিজ্ঞান থেকে আধুনিক বীজগণিত পর্যন্ত। যে কারণে নোয়েথার গণিতের ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন হিসেবে। তার ১৯১৩ সালে করা ক্যালকুলাস অব ভেরিয়েশনস এর কাজ যা নোয়েথার থিওরেমে পরিণত হয়েছে পরবর্তীতে— বিবেচনা করা হয় গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে। নোয়েথার থিওরেম যে পদার্থবিজ্ঞানকে প্রভাবিত করেছে তাও স্বীকৃত। উচ্চতর বীজগণিতের যে কোনো গবেষকের জন্য নোয়েথারের তত্ত্বের নীতি এবং কমিউটেটিভ রিঙ এই ক্ষেত্রের ভিত্তি প্রস্তুত করে দেয়। নোয়েথারের তত্ত্ব আর বিনিময়যোগ্য রিঙ কী তা বলতে গেলে নোয়েথার লেখা থেকে হারিয়ে যেতে পারেন। যথেষ্ঠ নয় এমন বর্ণনার আদলে বলতে পারি কমিউটেটিভ রিঙ হচ্ছে যেকোনো অশূন্য উপাদানের পরিপূরক বিপরীত রাশি থাকবে।

তাঁর কাজের পরিধি বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলোর মত বুদ্ধিদীপ্ত অনুমানের পথ দেখায় যারা বাস্তবতাকে আরো গভীরতর দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে দেখতে চান। কিন্তু এ দেখতে চাওয়া বা বুঝতে চাওয়ার ব্যাপারটি কিন্তু বিমূর্ত, কল্পনার।  গণিতবিদ এবং পদার্থবিদেরা তার এই যুগজয়ী অবদানকে সম্মানের সাথে স্বীকার করেন তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে গভীর দৃষ্টিকোণ অর্জনের পথ সৃষ্টি করার জন্য। ১৯৩৫ এ আলবার্ট আইনস্টাইন নিউইয়র্ক টাইমসকে এমির ব্যাপারে লিখেন, “সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন জীবিত গণিতবেত্তাদের বিচারে, অবিবাহিত জার্মান গৃহশিক্ষিকা নোয়েথার হচ্ছেন নারীদের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যবহ গাণিতিক প্রতিভা। ”

আডা লাভলেস (১৮১৫-১৮৫২)

 

আডা লাভলেস; source: উন্মুক্ত লাইসেন্সের আওতায়।

১৮৪২ এ ক্যামব্রিজের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজ ইতালিতে ইউনিভার্সিটি অব তুরিনে বিশ্লেষণ করতে পারে এমন মেশিন বিষয়ে লেকচার দেন। লুইগি মেনাব্রিয়া নামের এক গণিতবিদ পরবর্তীতে সেই বক্তৃতার লিখিত নোটকে ফ্রেঞ্চে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ব্যাবেজের এক বন্ধু চার্লস হুইটস্টোন তরুণী আডা লাভলেসকে নিযুক্ত করেন মেনাব্রিয়ার ফ্রেঞ্চে লেখা নোটটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে। আডা লাভলেস সেই ট্রান্সক্রিপ্টের উন্নতি করে প্রকাশ করেন যার মাঝে তার নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে তাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার। ১৮৪৩ এ প্রকাশিত সে অনুবাদে একটি অংশে লাভলেস নিজের তৈরি নোট যুক্ত করে দেন, যে অংশটিতে একটি অ্যালগরিদমের রূপরেখা দিয়েছিলেন বেরনুলির সংখ্যা হিসেব করার জন্য। ব্যাবেজ যা করেছিলেন তা ছিল একটি তত্ত্বীয় ইঞ্জিন, লাভলেস সেটাকে কম্পিউট করার বাস্তবতার সীমারেখায় এনে দেন। সে পথ ধরে উন্মোচিত হয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের গণনা বা হিসেব করার নতুন মাত্রার, নতুন বহু কিছু হিসেবের আওতায় আসার সুযোগ। প্রযুক্তি বিপ্লবের বীজ থেকে অঙ্কুর মেলে এই ফাঁকেই।

 

তাদের অসামান্য অবদান সত্ত্বেও, এ তিন নারীর আবিষ্কার ঢাকা পরে যায় তাদের গণিতক্ষেত্রের পুরুষ সারথিদের অর্জনের কাছে। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে খুঁটিয়ে দেখলে এমন আরো বহু নারী গণিতবিদের কথা বলা যাবে। নারী অবদান ছায়ায় পড়ে থাকার একটি বড় কারণ—- আমরা আমাদের ইতিহাস নির্মাণে ব্যর্থতার গল্পগুলো আড়াল করে ফেলি। ক্রমিক পর্যায়ে মানুষের সাফল্যের পথ সৃষ্টিতে আপাত ব্যর্থতাও দীর্ঘ ইতিহাসের সময়ের মাপকাঠিতে অর্জনের অংশ। সভ্যতার বিকাশে নারীদের অবদান সৃষ্টি ও স্বীকারে তাদের অর্জনকেও সমানভাবে স্বীকার করা আবশ্যক। জ্ঞানের রাজ্যের লিঙ্গভেদ না থাকলেই বরং সবচেয়ে ফলপ্রসু ভবিষ্যতের সৃষ্টি হয়।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

featured image: dawn.com

কেওস থিওরিঃ বিশৃঙ্খলাই যেখানে শৃঙ্খলার পরিচায়ক

শুরুতেই একটি বাস্তব দৃশ্যপট কল্পনা করুন। মাসুদ সাহেব প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন। হাতমুখ ধুয়ে একটু শরীরচর্চা করেন, নাস্তা খান, এরপর অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। নিত্যদিনের মতো আজও তিনি সব কাজ সেরে নাস্তা করতে বসেছেন কিন্তু বসেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। উনার স্ত্রী অন্যমনস্ক থাকায় নাস্তার রুটি পুড়ে গেছে।

পোঁড়া কালো রুটি দেখে উনার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। এই রাগ তিনি কিছুক্ষণ ঝাড়লেন স্ত্রীর উপর। স্ত্রীও কম যান না, সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাসুদ সাহেবের বাড়াবাড়ি দেখে উনিও রাগ করে তখনই ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলেন তার ভাইয়ের বাসায়। অনেকদিন ধরেই স্ত্রীর সাথে বনিবনা হচ্ছিলো না, তাই মাসুদ সাহেবও চললেন তার এক আইনজীবী বন্ধুর বাসায়। এবারে ডিভোর্সটা দিয়েই ছাড়বেন তিনি।

উল্লেখিত দৃশ্যপটের শুরুটা ছিল পুড়ে যাওয়া রুটি নিয়ে। এবং সেটি শেষ হলো একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে। গণিতের ভাষায় এই ঘটনাকে বলে কেওস (Chaos) বা বিশৃঙ্খলা। আর এ ধরনের বিশৃঙ্খলাকে ব্যাখ্যা করে যে তত্ত্ব, তার নাম কেওস থিওরি।

মার্কিন গণিতবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ এই থিওরির প্রতিষ্ঠাতা। কেওস থিওরি অনুসারে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু ও ঘটনা পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। কোনো একটি বিষয়ের সামান্য পরিবর্তনের ফলে অন্য একটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

এই থিওরি বলে, কোনো স্থানে প্রজাপতির পাখা ঝাপটানোর মতো অতি সামান্য একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেই স্থান থেকে বহু দূরে টর্নেডোর মতো ভয়ানক দুর্যোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া, দুর্ঘটনা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি বিশৃঙ্খল ঘটনা। এ ধরনের ঘটনাকে সাধারণত গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রে ফেলা যায় না। যে সকল ঘটনা সম্পর্কে আপনি অংক কষে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করতে পারবেন না, কেওস থিওরির মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়মিত ঘটনাকে ব্যখ্যা করা যায়।

একটি বিশৃঙ্খল সিস্টেমের দুই ধরনের রূপ থাকে। আপাতদৃষ্টিতে তারা অনিয়মিত আচরণ প্রদর্শন করলেও মূল ঘটনাগুলোকে আপনি চাইলেই ঘড়ির কাঁটার মতো চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান একটি সমীকরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আবার এর ঠিক উল্টোটাও ঘটতে পারে, একগুচ্ছ শৃঙ্খলাবদ্ধ ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ছোট ছোট অসংখ্য বিশৃঙ্খলা। প্রশ্ন হচ্ছে, এমন কেন হয়? বিশৃঙ্খল এই ঘটনাগুলো কেওস থিওরি মেনে চলেই বা কেন?

একটু গভীরে যাওয়া যাক। একটি সিস্টেম বা ঘটনা বিশৃঙ্খল কিনা, এবং বিশৃঙ্খল হলেও তা কতটুকু বিশৃঙ্খল- সেটা জানার জন্য চলুন কেওস থিওরির কয়েকটি শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

১৯৬১ সাল, বিজ্ঞানী লরেঞ্জ সদ্য আবিষ্কৃত একটি মেশিন নিয়ে তার ল্যাবে কাজ করছিলেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানের চলমান আবহাওয়া অর্থাৎ তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরগুলোকে ১২ টি ভিন্ন ডিফারেনশিয়াল সমীকরণের মাধ্যমে একত্র করলেন। সেই সমীকরণকে একটি গাণিতিক সংখ্যা আকারে সদ্য আবিষ্কৃত যন্ত্রে ইনপুট দিয়ে দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কিছুদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে পারতো।

ভালোই চলছিল কাজ। একদিন কী মনে করে তিনি প্রথমে সমীকরণ দিয়ে শুরু করার বদলে আগে থেকেই মেশিন হতে প্রাপ্ত কিছু ডাটা নিয়ে পরীক্ষা চালু করেন। শুরু থেকে ইনপুট দিলে যেই ফলাফল আসে, এবারও ঠিক তেমন ফলাফল আসার কথা। কিন্তু দেখা গেল ফলাফল ভিন্ন দেখাচ্ছে। লরেঞ্জ দেখলেন গ্রাফটি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ যাওয়ার পর এলোমেলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।

চিত্রঃ লরেঞ্জের মেশিন হতে প্রাপ্ত গ্রাফ।

প্রথমে এটিকে যান্ত্রিক গোলযোগ ভাবলেও পরে বুঝতে পারলেন সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। মেশিনটি কাজ করছিল ৬ ডিজিটের সংখ্যা নিয়ে কিন্তু ফলাফল দেখাচ্ছিল ৩ ডিজিটের সংখ্যার আকারে। ইনপুট হিসেবে মেশিনটি নিয়েছিল ০.৫০৬১২৭- দশমিকের পর ছয় ঘর। কিন্তু আউটপুট রেজাল্টের সময় সংখ্যাটিকে ০.৫০৬ হিসেবে ধরে ফলাফল গ্রাফটি প্রিন্ট করেছিল। দশমিকের পর তিন ঘর। সামান্য ০.০০০১২৭ এর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়া পূর্বাভাসের গ্রাফে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

লরেঞ্জ এটিকে আখ্যায়িত করেন ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ নামে। তিনি বলেন, আমাজন জঙ্গলে কোনো এক প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর ফলে ভবিষ্যতের কোনো একসময় পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে বিশাল টাইফুনেরও সৃষ্টি হতে পারে। সামান্যতম পরিবর্তনে অসামান্য ফলাফল- এই হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্টের মূল কথা।

চিত্রঃ লরেঞ্জের আঁকা বাটারফ্লাই ইফেক্টের ডায়াগ্রাম।

আকর্ষক, আকর্ষণ ও অনিয়মিত আচরণ

একটি প্যাসেঞ্জার বিমান যখন আকাশে উড়ে, ভেতরে থাকা যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা সর্বদাই আশা করেন যাতে প্লেনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে। আকাশে যদি ছোটখাটো কোনো দুর্যোগ সৃষ্টিও হয়, প্লেনটি যেন নিজের অবস্থান সর্বদা ধরে রাখতে পারে।

ঠিক তেমনিভাবে, একটি ফাইটার বিমানের পাইলট সর্বদা চান তার প্লেনটি যেন আকাশ ও বায়ুমণ্ডলের তুচ্ছ পরিবর্তনও বুঝতে পারে। পাইলট তার বিমানের অভ্যন্তরীণ গঠন, ইঞ্জিন, উড্ডয়ন কৌশল সম্পর্কে যত ভালো ধারণা রাখবেন, তত ভালোভাবে বিমানটিকে তিনি নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবেন।

কেওস থিওরিও অনেকটা বিমানের মতোই কাজ করে। আপনি যদি কোনো ঘটনার কেন্দ্রে থাকা বিশৃঙ্খলাকে বের করতে পারেন তাহলে সেই ঘটনার ভবিষ্যৎ তত নিখুঁতভাবে বলতে পারবেন। পাশাপাশি ঘটনাটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও আনতে পারবেন।

একটি সিস্টেমের মধ্যে লুকায়িত বিশৃঙ্খলাকে খুঁজে পেতে হলে তার কিছু Behavior বা আচরণসমষ্টিকে জানতে হবে। এগুলোকে গণিতবিদরা নাম দিয়েছেন Attractor বা আকর্ষক। কেওস থিওরিতে আকর্ষকের ভূমিকা অনুধাবন করার জন্য নিম্নোক্ত উদাহরণটি দেয়া যেতে পারে-

আপনার হাতে একটি পিং-পং বল আছে। সাগরের সামনে গিয়ে বলটিকে ছেড়ে দিলেন। পানির উপর থেকে যদি বলটি ছেড়ে দেন তাহলে সেটি পানিতে পড়ে ভাসতে থাকবে। আর যদি পানির তলদেশে গিয়ে বলটিকে ছাড়েন, তাহলে সেটি ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাবে এবং উপরের স্তরে এসে ভাসবে। অর্থাৎ যেখান থেকেই বলটি ছাড়া হোক না কেন, সেটি পানিতেই ভেসে থাকবে।

এখানে বলটি হচ্ছে একটি ঘটনা, পানির তল হচ্ছে ঘটনাটির আকর্ষক এবং সাগর হচ্ছে বস্তুজগতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা।

যদিও আমরা একটি বিশৃঙ্খল ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না, তবে ঘটনাটির আকর্ষক সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা তার ফলাফল ধারণা করতে সক্ষম হবো। একটি শৃঙ্খল ও স্থিতিশীল ঘটনার সাথে আকর্ষকের এই সম্পর্ক সাধারণ একটি জ্যামিতিক লুপ মেনে চলে।

কিন্তু কেওস থিওরির ক্ষেত্রে সেটি ভিন্ন। কেওস থিওরির সাথে আকর্ষক কাজ করে ফ্র্যাকটাল আকারে। (ফ্র্যাকটাল হচ্ছে অনিয়মিত জ্যামিতিক আকার।) অর্থাৎ একই সিস্টেমের মধ্যে থাকা একাধিক ঘটনার আকর্ষক এক হলেও তাদের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

চিত্রঃ একটি ফ্র্যাকটাল আকৃতি।

এরকম বিশৃঙ্খলার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে মানুষের হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডে কোষের সংখ্যা প্রায় ৩ মিলিয়ন। প্রত্যেকটি কোষ তাদের নিজস্ব ছন্দে রক্ত পাম্প করে। কিছু কিছু কোষ একটু আগে সংকুচিত হয়, আবার কিছু কিছু হয় একটু পরে। যদিও এই পরিবর্তন খুবই সামান্য। এখানে সকল কোষ একই সিস্টেমের অংশ, তাদের আকর্ষকও অভিন্ন, কিন্তু তবুও প্রত্যেকটি কোষ তার নিজস্ব বিধি মেনে চলে। এবং কোষগুলোর কম্পনে সামান্য এই পরিবর্তনের কারণে হৃদপিণ্ডের স্থায়িত্ব ও কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।

আলপিন থেকে ঐরাবত- বিশৃঙ্খলা রয়েছে সবখানেই

কেওস থিওরি শুধু যে গাণিতিক ব্যাখ্যা দেয় তা কিন্তু নয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি হতে শুরু করে বস্তুজগতের সবখানেই রয়েছে বিশৃঙ্খলা। আর সেই বিশৃঙ্খলাকে বোধগম্য করতে রয়েছে কেওস থিওরি। দুটি ঘটনা বিবেচনা করুন। এক- একটি আধখোলা পানির কল, যেখান থেকে একটি বালতির মধ্যে টিপটিপ করে পানি পড়ছে। দুই- লার্জ হাড্রন কলাইডারের মধ্যে থাকা হিলিয়াম গ্যাস, যা কলাইডারের শীতক (coolant) হিসেবে কাজ করে।

আপাতদৃষ্টিতে দুটি ঘটনাই নিয়মিত এবং বিশৃঙ্খলাহীন ঘটনা। কিন্তু পানির কলটি যদি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেন, পানি পড়ার পরিমাণও বাড়তে থাকবে এবং বালতির মধ্যে পানি পড়ার শব্দও পরিবর্তিত হতে থাকবে। ঠিক তেমনই, লার্জ হাড্রন কলাইডারে থাকা হিলিয়ামের তাপমাত্রা যদি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানেও আণবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। পরিশেষে দুটি শৃঙ্খল ঘটনা থেকে সৃষ্টি হবে অবিরাম পানির স্রোত ও উত্তপ্ত হিলিয়ামের দুটি বিশৃঙ্খলা।

মজার ব্যাপার হলো, একটি শৃঙ্খল অবস্থা থেকে বিশৃঙ্খল ঘটনাতে রূপান্তর সর্বদা একটি ধ্রুবক অনুসারে সংঘটিত হয়ে থাকে। এই ধ্রুবককে বলা হয় ‘ফাইজেনবাম ধ্রুবক’। ফাইজেনবাম ধ্রুবক মূলত দুটি সংখ্যা। এর দ্বারা একটি লিনিয়ার সিস্টেম কী করে নন-লিনিয়ার তথা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয় তা ব্যাখ্যা করা যায়।

চিত্র: ক্যাওস থিওরির প্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড লরেঞ্জ; image source:
thegwpf.com

কেওস থিওরি আমাদের অতি পরিচিত প্রকৃতিকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। যেসকল ঘটনাকে আমরা দৈব ঘটনা, দুর্যোগ ইত্যাদি বলে চিনেছি সেগুলো আসলে পূর্বে ঘটে যাওয়া কোনো বিশৃঙ্খলারই ফলাফল।

পরিবেশের সামান্য একটি পরিবর্তন কী সুবিশাল পরিণাম ডেকে আনতে পারে, আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হওয়া কোনো ঘটনার পেছনেও যে থাকতে পারে অতি জটিল গাণিতিক হিসেব- তা অনুধাবন করা যায় কেওস থিওরির মাধ্যমে। কেওস থিওরি আমাদের সামনে বারবার একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে- আমরা আমাদের এই অতি পরিচিত পৃথিবীকে আসলে কতটুকু চিনতে পেরেছি?

তথ্যসুত্র

(i) http://theconversation.com/explainer-what-is-chaos-theory-10620

(ii) https://en.wikipedia.org/wiki/Chaos_theory

(iii) Book: Jurassic Park by Michael Crichton

গণিতের বরপুত্র জন ন্যাশ এবং অনন্য ‘গেম থিওরি’

১৯৫০ সাল; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের ২১ বছর বয়সী একজন ছাত্র মাত্র ২৮ পৃষ্ঠার একটি পিএইচডি থিসিস জমা দেন। শিরোনাম ছিল, “Non Cooperative Games”। থিসিস পেপারটি কেবল দুইজন বিজ্ঞানীর (John von Neumann & Oskar Morgenstern) পূর্বের গবেষণার আলোকে লেখা হয়েছিল। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, স্বল্পদৈর্ঘ্য এই পেপারটির উপর ভিত্তি করে আবিষ্কৃত তত্ত্বের জন্যে অর্থনীতিতে ১৯৯৪ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

জন ন্যাশ

হ্যাঁ ! গণিত এবং অর্থনীতিতে গত শতাব্দীতে যাঁর অবদান জীববিজ্ঞানে ডিএনএ মডেল আবিষ্কারের সমতুল্য ধরা হয়, তিনি ‘অ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ খ্যাত ‘জন ফোর্বস ন্যাশ’। তাঁর গবেষণাকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ‘গেম থিওরি’। শুধুমাত্র গণিতে নয়; অর্থনীতি, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা, নীতিশাস্ত্র, এবং বিশেষত বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সাইবারনেটিক্সে ‘গেম থিওরি’র সফল ব্যবহার রয়েছে।

জন ন্যাশ ১৯২৮ সালের ১৩ জুন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ব্লু ফিল্ডে জন্ম গ্রহণ করেন। মা ল্যাটিন ভাষার শিক্ষক এবং বাবা তড়িৎ প্রকৌশলী। ছোটবেলা থেকেই ন্যাশের গণিতে আগ্রহ। গণিত নিয়ে পড়ে থাকা এই ছেলেটির বন্ধুমহলে তাই নাম জুটে গিয়েছিল ‘বড় মাথা’! বাবার কথামতো প্রথম জীবনে সে সময়ের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি টেক-এ কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন তিনি।

কিন্তু ক্রমশই বুঝতে পারেন, তাঁর উপলব্ধজ্ঞান প্রায়োগিক বিজ্ঞানের চাইতে বেশি কিছু। তাই প্রকৌশল থেকে রসায়ন এবং শেষে তাঁর স্বকীয়ক্ষেত্র- গণিতে স্থিত হন। গণিতের মূল চর্চাকেন্দ্র তখন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি। যেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন, জন ভন নিউম্যান, রবার্ট ওপেনহেইমার, কার্ট গোয়েডলসহ আরো অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের আনাগোনা।

জন ন্যাশের পিএইচডি থিসিস শুরু হয় এখানেই। তাঁর সুপারভাইসর তাকে প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, ‘হি ইজ অ্যা মেথেমেটিক্যাল জিনিয়াস’। আসলেই তাই, ১৯৫৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সেই ফরচুন ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের সেরা গণিতবিদদের একজন বলে স্বীকৃতি দেয়।

যদিও বাস্তব জীবনে অসাধারণ প্রতিভার এই মানুষটি ছিলেন প্রচন্ড নিভৃতচারী। তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এসময় তাঁর পারিবারিক এবং শারীরিক জীবনের নানা উত্থান-পতন ঘটে। অল্প বয়সেই তিনি স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। এছাড়া বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদ, একের পর এক প্রেমিকা বদল এবং একাধিক সমকামী সম্পর্কের জন্যে পুলিশের কাছে গ্রেফতারও হন।

এক গভীর অন্ধকার তাঁর জীবনে নেমে আসে। প্রায় উন্মাদের মতো প্যারিস আর লন্ডনের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন। নিজেকে ভাবতে শুরু করলেন এ্যান্টার্ক্টিকার প্রেসিডেন্ট, যার কাছে টেরেস্ট্রিয়াল গোপন বার্তা পাঠানো হয়। এসময় তাঁর পাশে একজনই ছিলেন, স্ত্রী এ্যালিসিয়া। তার পরিচর্যায় ন্যাশ কিছুটা সুস্থতা লাভ করেন। এভাবে প্রথমে প্যারানয়েড স্কিৎজোফ্রেনিয়া, তারপর সেখান থেকে ক্রমশ সুস্থ হয়ে ফিরে আসা এবং তারও অনেক পরে তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি পান নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

যে কমিটি জন ন্যাশকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল, তার প্রধান আসার লিন্ডবেক বলেছিলেন, ‘আমরা তাঁকে দিনের আলোতে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছি। নোবেল জেতা তাঁর জন্য ছিল পুনরুত্থান’। এরপর তিনি আরো অনেকগুলো পুরষ্কার পেয়েছেন। গণিতে নোবেল পুরস্কার খ্যাত ‘অ্যাবেল পুরস্কার’ পেয়েছিলেন ২০১৫-তে। এছাড়া সিলভিয়া নাসার লেখা জন ন্যাশের জীবনী নিয়ে ২০০১-এ ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ সিনেমাটি ন্যাশকে রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দেয়।

২০১৫ সালের ২৩ মে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্ত্রী এ্যালিসিয়া এবং জন ন্যাশ দুজনই মারা যান। অসম্ভব প্রতিভাবান গণিতের এই বরপুত্রকে তাই শুধুমাত্র তত্ত্ব আলোচনার জন্য নয়, স্মরণ করতে হয় নিভৃত অথচ বিকশিত সুন্দর মননের প্রতিচ্ছবি রূপে।

জন ন্যাশের ‘গেম থিওরি’, যাকে বাংলায় ‘ক্রীড়াতত্ত্ব’ বলা যায়, মূলত ফলিত গণিত এবং অর্থশাস্ত্রের একটি শাখা। গণিতের অন্যান্য তত্ত্বের চাইতে এটা ব্যাখ্যা করা তুলনামূলক সহজ। কারণ, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ এতো বেশি যে, আমরা হরহামেশাই নিজের অজান্তে ‘গেম থিওরি’ ব্যবহার করে থাকি!

প্রথমে আমরা অর্থনীতির দিক থেকে ‘গেম থিওরি’কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো। অর্থনীতিতে এই তত্ত্ব এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক খেলাকে নির্দেশ করে, যেখানে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করবে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

‘ওয়ালকন’ কোম্পানি কোনো একটা স্মার্টফোন প্রোডাক্ট থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।
অন্যদিকে ‘সিমকনি’ কোম্পানিও সমান কনফিগারেশনের একটা স্মার্টফোন থেকে মাসিক মুনাফা পায়- ৫০,০০,০০,০০০ টাকা।

এখন ওয়ালকন ভাবল যে, তাদের পণ্যের দাম যদি খানিকটা কমানো যায়, তাহলে বিক্রি বেশি হবে। তখন লাভ আগের চাইতে বেশি হবে। ধরা যাক, তখন লাভ হল, ৫৫,০০,০০,০০০ টাকা। এতে ওয়ালকনের বিক্রি ও লাভ বাড়লেও সিমকনির কিন্তু বিক্রি কমবে, লাভও কমবে। কারণ, একই জিনিস বেশি দাম দিয়ে কে কিনতে চাইবে! তাই সিম্ফনিও একইভাবে দাম কমিয়ে আনবে। তখন এই দু’টো কোম্পানির অ্যাবসলিউট লাভ হয়ত আগের চাইতে বাড়বে, কিন্তু রিলেটিভ লাভ আগে যা ছিল তাই থাকবে। ফলে, পুরো ব্যবস্থাটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

এই জিনিসটা আরেকটু গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। ১৯৯৪ সালে কর্ণেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক কৌশিক বসু এই অবস্থাটিকে ব্যাখ্যা করার জন্যে ‘গেম থিওরি’র একটা মজার সমস্যা প্রস্তাবনা করেন। যা ‘ট্রাভেলারস ডিলেমা’(travelers dilemma) বা, ভ্রমণকারীর উভয়সঙ্কট নামে পরিচিত।

লুসি এবং পিট দুজন যাত্রী। যারা শখের বসে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শেষে প্লেনে করে ফিরছিল। দুইজনই একদম একই রকম ও একই দামের একটা মূর্তি কিনেছিল। যাত্রাশেষে দেখা গেল, জিনিস দুটোই ভেঙে গেছে।

এয়ারলাইন ম্যানেজার তাদেরকে বলল যে, তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছেন। কিন্তু তিনি ঠিক কতটা ক্ষতিপূরণ দেবেন তা বের করার জন্য তিনি একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তাদের দুজনকে আলাদা জায়গায় রেখে বলা হল জিনিসটার দাম লিখে ম্যানেজারকে লিখে দিতে। কিন্তু সেখানে কিছু শর্ত ছিলঃ

১। দামটা ২ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে হতে হবে।
২। যদি ২ জন একই দাম লিখে দেয়, তাহলে ম্যানেজার সেই ডলারই দুইজনকে দিয়ে দিবে। যেমনঃ লুসি এবং পিট দুইজনই যদি ৫০ ডলার লেখে, তাহলে দুইজনকেই ৫০ ডলার দিয়ে দেওয়া হবে।
৩। যদি দুইজনের মধ্যে কোন একজন আরেকজনের চেয়ে কম দাম লেখে, তাহলে ম্যানেজার কম পরিমানের ডলারটাকে আসল বা বেস ধরবে। একইসাথে যে কম ডলারটা লিখল তার ডলারের পরিমাণকে সত্যি ধরে সততার পুরস্কার হিসেবে তাকে ২ ডলার বেশি দিয়ে দিবে এবং যে বেশি পরিমাণ ডলার দাবি করল তাকে ২ ডলার কম দিবে। যেমনঃ লুসি যদি দাবি করে ৪৪ ডলার এবং পিট দাবি করে ৪৬ ডলার; তাহলে বেস ধরা হবে ৪৪ ডলার। লুসি যেহেতু কম বলল, সে পাবে (৪৪+২) বা ৪৬ ডলার। পিট যেহেতু বেশি বলল, সে পাবে (৪৪-২) বা ৪২ ডলার।

এই হল শর্ত। এগুলো আলাদা আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিয়ে লুসি এবং পিটকে দু’টি আলাদা আলাদা ঘরে রাখা হলো এবং বলা হলো দামটা লিখে ম্যানেজারকে দিতে। এখানে ধরে নেওয়া যাক, লুসি এবং পিট দুজনই সমান এবং বেশ ভাল মানের বোধবুদ্ধিসম্পন্ন। অর্থাৎ দুজনেই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে। এবং তারা দু’জন দুজনের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও অবগত। সেইসাথে দুজনই অধিক মুনাফা লাভের ব্যাপারে আগ্রহী।

এখন আমরা যুক্তির বিচারে তাদের দুজনের অবস্থাকে বর্ণনা করব। লুসি কাগজ পাওয়ার সাথে সাথেই হয়ত ১০০ ডলার লিখে ফেলবে। কারণ এটাই সবচেয়ে বেশি মানের ডলার যা সে পেতে পারে। জিনিসটার দাম যদি ১০০ ডলারের কম হয় তাহলে ১০০ ডলার পেলে তো তার লাভই হয়!

কিন্তু ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপারও আসবে। সে তখন ভাববে, পিটও হয়ত ১০০ ডলারই লিখবে। এর চেয়ে বরং আমি এক কাজ করি। আমি লিখে দেই ৯৯ ডলার। এতে করে সে সততার পুরস্কার হিসেবে (৯৯+২) বা ১০১ ডলার পেয়ে যাবে। ওদিকে পিট পাবে (৯৯-২) বা ৯৭ ডলার। ফলে, কৌশলগত কারণে লুসি পিটের চাইতে ৪ ডলার বেশি পাচ্ছে! এই ভেবে সে যখনই ৯৯ ডলার লিখে ফেলবে ঠিক তখনি তার মাথায় আরেকটা ব্যাপার খেলা করবে। সে ভাববে, পিটও নিশ্চয়ই আমি যা ভাবছি তা ভাবছে (কারণ দুজনই যুক্তিসঙ্গত চিন্তা করে এবং তা উভয়েই জানে) তাহলে সেও তো ৯৯ ডলারই লিখবে! তাহলে আমি ৯৯ ডলার না লিখে বরং ৯৮ ডলার লিখি তাহলে আমি পাব (৯৮+২) বা ১০০ ডলার আর পিট পাবে (৯৮-২) ডলার বা ৯৬ ডলার! এখানেও ৪ ডলার বেশি।

এই যুক্তিকে আরো আগে বাড়তে দিলে দেখা যায় এই ব্যাপারটা একটা সিরিজের মত করে চলতে থাকবে আর লুসিও তার ডলারের পরিমানটা আস্তে আস্তে কমাতেই থাকবে! ৯৮ থেকে ৯৭, ৯৭ থেকে ৯৬, ৯৬ থেকে ৯৫- তাত্ত্বিকভাবে ডলারের পরিমানটা কমেই যেতে থাকবে। একটা সময় কমতে কমতে এটা তাত্ত্বিকভাবে ২ ডলারে গিয়ে থামবে! যেহেতু পণ্যের মূল্য সর্বনিম্ন ছিল ২। এই চিন্তাভাবনাগুলো কিন্তু পিটের মাথায়ও খেলা করতে থাকবে! কিভাবে নিজে একটু বেশি ডলার পাওয়া যায়, সেটার জন্য লুসি কম পেলে পাক!

এখানেই ‘গেম থিওরি’র শুরু। ছোট্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে লুসি এবং পিটের মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়ে গেছে। অবশ্য অনেকেই বলতে পারে, দুজনেই যদি সত্যিটা লিখে, তাহলে তো আর কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যবসার ক্ষেত্রে হিসেব-নিকেশগুলো এরকময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। যাহোক, লুসি এবং পিটের বিভিন্ন স্ট্রাটেজি ও তার ফলাফলকে আমরা বোঝার সুবিধার্তে নিচের ম্যাট্রিক্স আকারে সাজিয়ে লিখতে পারি-

গেম থিওরিতে এ ধরণের ম্যাট্রিক্সকে বলা হয় পে-অফ ম্যাট্রিক্স। পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা খেয়াল করলে দেখা যাবে- এখানে লুসি এবং পিটের লেখা বিভিন্ন ডলার পরিমানের সাপেক্ষে তাদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণকে দেখানো হয়েছে।

যেমনঃ লুসি এবং পিট দু’জনই যদি ১০০ ডলার লেখে, আমরা জানি যে দুজনই ১০০ ডলার করে পাবে। একদম নিচে সবচেয়ে ডানের ঘরে তাই আমরা (100 100) দেখতে পাচ্ছি। আবার ধরি, লুসি লিখল ৩ ডলার, পিট লিখল ৪ ডলার। তাহলে আমরা জানি যে ম্যানেজার ৩ ডলারকে বেস হিসেবে ধরে লুসিকে দিবে (৩+২) বা ৫ ডলার। আর পিটকে দিবে (৩-২) বা ১ ডলার। (5 1) লেখা ঘরটা কিন্তু তাই নির্দেশ করে।

এই পুরো ব্যাপারটা থেকে আসলে যে সিদ্ধান্তটা নেওয়া যায় তা হচ্ছে, সবসময় অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেয় না। সহযোগিতাপূর্ণ এবং নৈতিক চিন্তাভাবনা আমাদের জন্যে বেশি লাভজনক।

‘গেম থিওরি’র আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তা হল- ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ । পুরো পে-অফ ম্যাট্রিক্সের মধ্যে একটা বিশেষ ঘরের দিকে লক্ষ্য করা যাক। ঘরটা হচ্ছে (2 2)। মনে করে দেখি পিট এবং লুসির শেষমেশ দুইজনই ২ ডলার করে লিখেছিল। এই ঘরটার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য ঘরগুলোর নেই।

পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে, যে কোন একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে যদি আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকে তাহলে এই (2 2) বাদে বাকি সব ঘরের জন্যই দুই প্লেয়ারের অন্তত একজন হলেও লাভবান হয় অর্থাৎ বেশি ডলার পায়। ব্যাপারটা একটু বিস্তারিতভাবে বলা যাক। (2 2) ছাড়া ম্যাট্রিক্সের যে কোনো একটা ঘর নিই।

ধরা যাক, লুসি লিখল ৩ এবং পিটও লিখল ৩। তাহলে আমরা পে-অফ ম্যাট্রিক্সের যে ঘরটায় থাকব তা হচ্ছে (3 3)। ধরে নিই পিট তার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রাখবে অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। এখন লুসি যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে তাহলে কি হয় দেখা যাক।

একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাব যে লুসি যদি ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (4 0) ঘরে অর্থাৎ লুসি ৪ ডলার (২+২) পাবে, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। আর পিট পাবে ০ ডলার (২-২)। আবার ধরি লুসি তার সিধান্তের পরিবর্তন করবেনা অর্থাৎ সে ৩ ই লিখবে। পিট যদি তার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করে ৩ না লিখে ২ লিখে তাহলে আমরা থাকব (0 4) ঘরে অর্থাৎ পিট পাবে ৪ ডলার, যেখানে আগে সে পেত ৩ ডলার। এখান থেকে আমরা যা বুঝতে পারি (3 3) ঘরে থাকলে লুসি তার পাওয়া ডলারের পরিমানটাকে কিন্তু বাড়িয়ে নিতে পারবে, যদি পিট তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। একই কথা পিটের জন্যেও খাটবে।

কিন্তু এবার (2 2) ঘরটার কথা ভাবা যাক। আমরা যদি পে-অফ ম্যাট্রিক্সটা একটু ভালভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব, একজন প্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে অপরিবর্তিত রেখে আরেকজন তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে সে কখনোই লাভবান হতে পারবেনা।

ব্যাপারটাকে এভাবে বলা যায় যে লুসি যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে পিট যাই লিখুক না কেন কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা আর সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। আবার পিটও যদি ২ ডলার লিখে সে নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে যে লুসি কখনোই ২ ডলারের চেয়ে বেশি পাবেনা এবং সে নিজে অন্তত ২ ডলার পাবেই। কারণ, ২ ডলারই বেস। ২ ডলার যে-ই লিখুক না কেন, ম্যানেজার তখন ২-কে বেজ ধরবে। তাই (2 2) ঘরেই এসে শেষমেশ তারা স্থির হবে। ফলে (2 2) ঘরটা একটা সাম্যাবস্থা নির্দেশ করবে। একেই বলা হয় Nash Equilibrium বা ‘ন্যাশের সাম্যাবস্থা’।

এই তত্ত্বটি শুধুমাত্র কাগজে কলমে সত্যি এমন নয়। কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যদি বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক আচরণের কারণে তার সমসাময়িক অন্য প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা না করে কোনো পণ্যের দাম কমিয়ে আনে এবং অন্য কোম্পানি না কমায়, তখন আলটিমেটলি লস হয়। এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। রবি ইয়োন্ডার মিউজিক অ্যাপ তাদের নতুন ক্যাম্পেইন ‘নো মানি ফর মিউজিক’ এর ঘোষণা দিয়েছে। এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে শ্রোতারা এখন ইন্টারনেট চার্জ ছাড়াই গান শুনতে পারেন। অন্যদিকে গ্রামীনফোনে মাসিক ৪২.৬১ টাকা দিয়ে অ্যাপের মাধ্যমে গান শোনা যায়। এখানে একক বা ইনডিভিজুয়ালি রবির লাভ হলেও সামগ্রিকভাবে ‘মিউজিক অ্যাপ’ তৈরির যে ক্ষেত্র বাংলাদেশে হতে পারত, রবির কারণে তা অনেকাংশেই ব্যাহত হবে।

কারণ, বিখ্যাত একটা ব্রান্ড যেখানে ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে, সেখানে টাকা দিয়ে গান শোনার মতো অ্যাপ আর কে বানাতে যাবে? বানালেও মানুষ তো ফ্রি টা দিয়েই শুনবে! একই কথা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জিরো ডট ফেসবুক এবং ফ্রি ম্যাসেঞ্জারের (ফ্রি বলতে ডেটা ছাড়াই ইউজ করা যায়) কারণেই বোধহয় বাংলাদেশ, এমনকি ভারতের টপ লিস্টেও এমন কোনো চ্যাট অ্যাপ দেখা যায় না, যেটা লোকাল ডেভেলপারদের তৈরি।

যাহোক, ট্রাভেলারস এলগোরিদম দিয়ে শেষ একটা তথ্য দেওয়া প্রয়োজন, তা হল- এই ডিলেমা বা, উভয়সঙ্কট নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা আসলেই করা হয়েছে। ইসরায়েলের একজন ইকোনোমিস্ট Ariel Rubinstein একবার একটা ওয়েব বেসড পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। যেখানে ৭টি দেশের ২৫০০ জনের মত মানুষ অংশ নিয়েছিল। একদম একই রকম পরীক্ষা, শুধু তাদের ১৮০ থেকে ৩০০ ডলারের মধ্যে কোন একটা ডলারের পরিমান লিখতে বলা হয়েছিল এবং শাস্তি বা পুরস্কার হিসেবে আমাদের উদাহরণের ২ ডলারের জায়গায় ছিল ৫ ডলার।

দেখা গিয়েছিল সাতজনের মধ্যে একজন মাত্র ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়ামের ডলার পরিমানটা লিখেছে। ৫৫ শতাংশ ৩০০ ডলার লিখে দিয়েছে। নিচে একটা পাই চার্টে ঐ পরীক্ষার রেসাল্ট এবং একইসাথে রেসপন্সের সময়টাও বার চার্ট দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া আছে। এটার দিকে একটু তাকালেই বোঝা যায় কতভাগ মানুষ আসলেই চিন্তা ভাবনা করে উত্তর করেছে, কতভাগ করেনি!

এখানে মনে হতে পারে, স্বতস্ফূর্তভাবে দাম লেখার সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই এটিই বেশি লাভজনক। আপাত দৃষ্টিতে এটা ঠিক। কারণ একক ব্যক্তির জন্যে হেড-টু-হেড ডিসিশনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার চাইতে স্বার্থপরতা অনেক সময় বেশি সাফল্য এনে দেয়। কিন্তু একের অধিক খেলোয়াড়, যারা পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত একজন আরেকজনের প্রতি, যেমনঃ একটা গোষ্ঠী বা অনেক মানুষের কথা চিন্তা করা হলে, তখন সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ বা ‘ন্যাশ সাম্যাবস্থা’ই আমাদেরকে অধিক লাভের দিকে নিয়ে যায়।

এখানে অধিক লাভ শুধুমাত্র একক ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে ঘটে, এমন নয়। সিস্টেমে সকলের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে। এটাই ‘গেম থিওরি’র মূলকথা। ধ্রুপদী অর্থনীতিতে যেমন সবসময় পরিপূর্ণভাবে স্বার্থবাদী চিন্তা করা হয়, ‘গেম থিওরি’তে তা করা হয় না। ‘গেম থিওরি’ আমাদেরকে ‘বাউন্ডেডলি র‍্যাশনাল’ চিন্তা করতে শেখায়।

কারণ, ট্রাভেলারস ডিলেমা থেকে আমরা দেখেছি দু’জন মানুষ নিজেদের সেরাটা দিয়ে চিন্তা করেও সব থেকে ভালো পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে পারছেন না। এখানে মানুষের চিন্তাজগৎতে আমূল পরিবর্তন ঘটায় ‘গেম থিওরি’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বুদ্ধি খরচ করে যে সিদ্ধান্তটি নেব, তা আমাদেরকে যে অভীষ্ট লক্ষ্য পোঁছে দেবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই সহজ সত্যটা এই যুগে ক’জন বোঝে!

তথ্যসূত্রঃ
১। THE TRAVELER’S By Kaushik Basu
২। A Survey of Game Theory as Applied to Network Security by Sankardas Roy, Charles Ellis, Sajjan Shiva, Dipankar Dasgupta, Vivek Shandilya, Qishi Wu
৩। Game Theory Through Examples by Erich Prisner

featured image: houseofstaunton.com

অটোকী সাইফার- গোপন বার্তা আদান-প্রদান এবং ‘কী’ না জেনেও তা ভাঙ্গার কৌশল

আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগেকার কথা। ইতালীয় আইনজ্ঞ ফাজিও কার্দানো ও চিয়ারা মিচেরির ভালোবাসার ফলস্বরুপ ১৫০১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর অধিবাসীদের তালিকায় নাম যোগ হয় এক ছেলের, বাবার নামের সাথে মিলিয়ে যার নাম রাখা হয় জিরোলামো কার্দানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, জিরোলামো তার বাবা-মায়ের বৈধ সন্তান ছিল না। জন্মগত এ অবৈধতা তার বাকি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিরুপ প্রভাব ফেলেছে বিভিন্নভাবে।

মানুষের ভেতরে যদি আসলেই কোনো গুণ থাকে তাহলে একদিন যে তা ঠিকই প্রকাশ পায়, মানুষের জন্ম নয় বরং কর্মই যে অমর করে রাখে, বাকি জীবন জুড়ে এ কথাগুলোর বাস্তব প্রমাণই দিয়ে গেছেন জিরোলামো কার্দানো।

রেনেসাঁ যুগের সেরা গণিতবিদ বলে স্বীকৃত কার্দানো ছিলেন একাধারে একজন গণিতবিদ, চিকিৎসক, জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী, দার্শনিক, লেখক ও জুয়াড়ি! পরবর্তী সময়ে তার কাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ব্লেইজ প্যাসকেল, পিয়েরে দ্য ফার্মা, আইজ্যাক নিউটন, গটফ্রেড লিবনিজ, মারিয়া অ্যাগনেসি, জোসেফ লুইস ল্যাগ্রাঞ্জ ও কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের মতো মানুষেরা।

অনাগত ভবিষ্যতের বুকে নিজের নামটি খোঁদাই করে রাখতে মানুষের প্রচেষ্টার কোনো অন্ত নেই। জিরোলামো কার্দানোও ছিলেন এমনই একজন। জীবদ্দশায় মোট ২৪২ টি বই লিখেছিলেন তিনি! এর মাঝে ১৩১ টি বই তাঁর জীবিত অবস্থাতেই প্রকাশিত হয়। বাকি ১১১ টি পান্ডুলিপিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুই শতাধিক বইয়ে তিনি কী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন তা জিজ্ঞেস না করে বরং কী নিয়ে আলোচনা করেননি তা জিজ্ঞেস করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র, দাবা, পদার্থবিজ্ঞান, জুয়া, আত্মার অমরত্ম, সক্রেটিসের ভাবধারা, রত্ন, বিষ, বাতাস, পানি, পুষ্টিবিদ্যা, স্বপ্ন, মূত্র, দাঁত, সঙ্গীত, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বহুবিধ বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছেন তিনি।

মজার ব্যাপার হলো, আমাদের আজকের আলোচ্য ক্রিপ্টোলজির অটোকী সাইফার (Autokey Cipher) নিয়ে কিন্তু কার্দানোর আলাদা কোনো বই নেই। তার সর্বাধিক বিক্রিত দুটি বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ে তিনি ক্রিপ্টোলজি সম্বন্ধে অল্প বিস্তর আলোচনা করেছিলেন অবশ্য।

এর মাঝে প্রথমটি ছিল De Subtilitate। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৫৫০ সালে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে কার্দানোর চমৎকার উপস্থাপনা পাঠক সমাজকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। বইটির সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাই ছয় বছর পর তিনি বের করেন এর দ্বিতীয় খন্ড- De Rerum Varietate। বিপুল জনপ্রিয়তার ফলে দুটি বই-ই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় এবং নকল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপ জুড়ে।

অটোকী সাইফারকে অটোক্লেভ (Autoclave) সাইফারও বলা হয়ে থাকে। এ সাইফারে Key বানানো হয় Plain Text এর উপর ভিত্তি করে অর্থাৎ অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলতে থাকে এর Key। এজন্য Key-এর আগে Auto বসিয়ে সাইফারটির নাম হয়েছে Autokey সাইফার। এ সাইফারের সাহায্যে কোনো মেসেজকে এনক্রিপ্ট করতে আমাদের দরকার একটি টেবুলা রেক্টা (Tabula Recta) টেবিল।

এনক্রিপশন

ধরা যাক, আমরা যে মেসেজটি এনক্রিপ্ট করবো সেটি হলো- “To be prepared is half the victory”। এটি মিগুয়েল ডি সার্ভেন্টেসের উক্তি। ধরে নিই, আমাদের Key হলো Miguel। যেহেতু অটোকী সাইফারে আমাদের দরকার Keystream, তাই Plain Text এর সাথে Keystream-কে সাজাতে হবে নিচের মতো করেঃ

ভালো করে একবার Keystream সাজানোর পদ্ধতিটি দেখুন। প্রথমে আমি Key Miguel লিখেছি। এরপর থেকে Plain Text এর মেসেজটিই হুবহু লিখে গিয়েছি। এভাবে Plain Text এর শেষ পর্যন্ত Keystream লিখে যেতে হবে। এখানে Key নিজে বারবার না এসে Plain Text-ই Keystream এ রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

এবার আসা যাক দ্বিতীয় ধাপে। এখন আমাদের টেবুলা রেক্টার সাহায্য লাগবে। পাশের চিত্র দ্রষ্টব্য। আমরা প্রথম যে বর্ণটি এনক্রিপ্ট করবো তা হলো ‘t’। তাহলে টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে (গাঢ় কাল অক্ষর) প্রথমেই t এর নিচে থাকা Keystream ‘m’ কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর একেবারে বামের কলাম থেকে (গাঢ় কালো অক্ষর) Plaintext ‘t’ কে খুঁজতে হবে।

m ও t থেকে যদি আমরা যথাক্রমে উপর থেকে নিচে এবং বাম থেকে ডানে এগোই তাহলে তারা পরস্পরকে F এ ছেদ করবে। অর্থাৎ F হলো t এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এবার আসা যাক Plaintext এর ২য় বর্ণ ‘o’তে। এর নিচে থাকা Keystream হলো ‘i’। এবারও আগের মতোই টেবুলা রেক্টার সবার উপরের সারি থেকে i এবং একেবারে বামপাশের কলাম থেকে o-কে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর I থেকে নিচে এবং o থেকে ডানে এগোতে থাকলে একসময় তারা পরস্পরকে W-এ ছেদ করবে। অর্থাৎ W হলো o এর এনক্রিপ্ট করা রূপ।

এভাবে Plain Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও টেবুলা রেক্টা ও Keystream এর সাহায্যে এনক্রিপ্ট করা যাবে। পুরো মেসেজটি এনক্রিপ্ট করলে তাহলে আমরা পাচ্ছিঃ

ডিক্রিপশন

ধরা যাক, আমাদের কাছে এনক্রিপ্ট করা একটি মেসেজ এসেছে যেখানে লেখা আছে- BIOXJZA BG FSZK”। প্রেরক আমাদের জানিয়েছে, এ মেসেজের Key হলো ‘Game’। এবার মেসেজটি ডিক্রিপ্ট করে মূল মেসেজ বের করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রথমেই তাহলে আগের মতো করে একটি টেবিলে Keystream ও Cipher Text সাজিয়ে নেয়া যাক। যেহেতু আমরা Keystream-এর কেবল ‘game’ অংশটুকু জানি, তাই বাকি ঘরগুলো ফাঁকা রাখতে হবে।

এখন আবারো যেতে হবে টেবুলা রেক্টার কাছে। Cipher Text এ আমাদের প্রথম বর্ণ ‘B’। অন্যদিকে Keystream-এ প্রথম বর্ণ ‘g’। টেবুলা রেক্টার একেবারে উপরের সারি থেকে প্রথমে তাই g-কে খুঁজে বের করতে হবে। এরপর g-এর কলাম ধরে নিচে নামতে হবে যতক্ষণ না B-কে পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ। B পাওয়া গেলে এরপর সেখান থেকে একেবারে বামের কলামে যে বর্ণটি আমরা পাবো সেটিই হবে B এর ডিক্রিপ্ট করা বর্ণ। এক্ষেত্রে এটি V। নিচের চিত্রে পুরো ব্যাপারটি দেখানো হয়েছে।

যেহেতু আমরা Plain Text এর একটি বর্ণ পেয়েছি তাই টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করে নিতে হবে। এনক্রিপশনের সময় আমরা দেখেছিলাম, Keystream এ Key এর পর থেকেই Plain Text শুরু হচ্ছে। এবারও তাই ‘game’ এর পরই এসেছে ‘V’।

এবার আসা যাক Cipher Text এর দ্বিতীয় বর্ণ I এর কাছে। এক্ষেত্রে Keystream হলো ‘a’। তাহলে আগের মতো করেই প্রথমে টেবুলা রেক্টার উপরের সারি থেকে ‘a’ খুঁজে সেখান থেকে নিচে নেমে ‘I’ কে বের করতে হবে। I থেকে একেবারে বামের কলামে গেলে আমরা পাবো এর ডিক্রিপ্ট করা রূপ। এক্ষেত্রে সেটি ‘I’।

আবারো আগের মতো করে টেবিলকে নিচের মতো করে আপডেট করতে হবেঃ

এভাবে Cipher Text এর বাকি বর্ণগুলোকেও Keystream আর টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ডিক্রিপ্ট করলে আমরা মূল মেসেজটি পেয়ে যাবো।

গল্প করতে করতে কখন যে আপনাকে একজন পলিম্যাথের আবিষ্কার করা একটি সাইফার সিস্টেম শিখে নিলাম তা নিজেও খেয়াল করিনি! তবে ঠান্ডা মাথায় পুরো পদ্ধতিটুকু যদি আপনি পড়ে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে মাথা খাটানোর অনেক কিছুই আছে এখানে।

দুর্গে ফাটল

এতক্ষণ ধরে অটোকী সাইফার নিয়ে পড়ার পর যে কেউই মেনে নিতে বাধ্য যে এ সাইফারটি বেশ সুরক্ষিত। কিন্তু সুরক্ষিত এ দুর্গের কি কোনো ফাটল নেই? অবশ্যই আছে। এবার সেই ফাটলেই সাথেই পরিচিত হওয়া যাক।

অটোকী সাইফারের Keystream বানানো হয় Plain Text কে ব্যবহার করে। Plain Text এ কোনো বহুল ব্যবহৃত শব্দ আসতেই পারে; যেমন- AND, THE ইত্যাদি। এ শব্দগুলোকে ক্লু হিসেবে ব্যবহার করেই পুরো অটোকী সিস্টেমকে ডিক্রিপ্ট করা সম্ভব।

ধরে নিচ্ছি, আমাদের কাছে একটি একটি মেসেজ এসেছে যাতে লেখা আছে PKBNEOAMMHGLRXTRSGUEWX। আমাদেরকে এটাও বলে দেয়া হয়েছে যে, এখানে অটোকী সাইফার ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু Key জানা না থাকায় আমরা Plain Text পর্যন্ত যেতে পারছি না। কাজে এগোনোর স্বার্থে ধরে নিই, Plain Text এ ‘THE’ শব্দটি অন্তত একবার হলেও এসেছে। তাহলে ‘THE’ Keystream-এও এসেছে ধরে নিয়ে এগোনো যাক।

Keystream এর প্রতিটি ঘরে THE বসালে আমাদের হাতে থাকে Keystream ও Cipher Text। তখন একটু আগেই আলোচনা করা ডিক্রিপশনের নিয়মটি অনুসরণ করলে আমরা নিচের টেবিলটি পাবোঃ

Keystream এ THE এর অবস্থান সামনে-পেছনে নিয়ে আমরা নিচের আরো দু’ধরনের বিন্যাস পেতে পারি।

এখন এ তিনটি টেবিল ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা যাক। আমরা মূলত এখন ঘোরাঘুরি করবো Plain Text এর ঘরগুলোতে। সেখানে কোনো অর্থপূর্ণ শব্দাংশ খুঁজে বের করাই আমাদের লক্ষ্য।

যেমন- ২য় টেবিলের ‘ihw’ কিংবা ৩য় টেবিলের ‘skt’ একেবারেই নিরর্থক। কিন্তু ৩য় টেবিলেরই ‘tac’ কিংবা ‘ako’ এর কোনো শব্দাংশ হবার সম্ভাবনাকে একেবারে নাকচ করে দেয়া যায় না। আমরা তাই ‘tac’ নিয়ে এগোবো। যেহেতু অটোকী সাইফারে একই জিনিস Plain Text ও Keystream এ থাকে, তাই আমাদের আলোচ্য THE ও tac এ দু’জায়গায়ই আছে বলে ধরে নিচ্ছি।

প্রথমে মনে করি, আমাদের অজানা Key এর দৈর্ঘ্য ৪ অর্থাৎ এটি ৪টি বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত। তাহলে Plain Text এ থাকা the এর t থেকে Keystream এর THE এর T ৪ বর্ণ পরিমাণ দূরে থাকবে। একই কথা বলা যাবে tac এর ক্ষেত্রেও।

Plain Text ও Keystream এর ঘরগুলো যথাক্রমে ‘the’, ‘tac’, ‘THE’ ও ‘TAC’ দিয়ে পূরণ করার পর যে ঘরগুলো বাকি থাকবে সেগুলোকে পূর্বে আলোচনা করা এনক্রিপশন-ডিক্রিপশনের পদ্ধতিতে টেবুলা রেক্টার সাহায্যে ভরাট করতে হবে। যে ঘরগুলো এভাবে ভরাট করতে হবে, পরবর্তী টেবিলে সেগুলো ডিম্বাকৃতির বক্সের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।

এখান থেকে পাওয়া ‘yxr’ Plain Text শব্দাংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য না। তাই নিচের টেবিল দুটোতে যথাক্রমে ৫ ও ৬ বর্ণবিশিষ্ট Key ধরে এগোনো হয়েছে। এ টেবিল দুটোতেও যে ঘরগুলো ফাঁকা থাকবে তা টেবুলা রেক্টা দিয়ে পূরণ করতে হবে।

উপরের টেবিল দুটি থেকেও আমরা কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ (‘etp’ ও ‘arq’) পেলাম না। তাই এখন আমরা ‘tac’ বাদ দিয়ে এখন ‘ako’ দিয়ে এগোতে থাকবো। তাহলে আবার এ অংশের শুরুতে আলোচনা করা তিনটি টেবিলের মাঝে তৃতীয়টির শরণাপন্ন হতে হবে। Key এর দৈর্ঘ্য এক এক করে বৃদ্ধি করে এগোনো যাক।

প্রথমে Key এর দৈর্ঘ্য ৪। তখন Plain Text হিসেবে পাওয়া ‘uui’ কোনো গ্রহণযোগ্য শব্দাংশ হতে পারে না। তবে Keystream অংশে থাকা ‘NEN’ এর সেই সম্ভাবনা আছে।

অনুসন্ধান চলতে থাকুক আগের মতোই। নিচের টেবিল দুটিতে Key এর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৫ ও ৬।

শেষের টেবিলের Keystream এ পাওয়া ‘TAC’ ও Plain Text এ পাওয়া ‘wn’ দুটোরই অর্থপূর্ণ শব্দাংশ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন আগের মতোই এগোতে হবে আমাদের। যেহেতু ‘TAC’ Keystream এ আছে, সুতরাং এটি Plain Text-এও থাকবে। সেক্ষেত্রে আমরা নিচের টেবিলটি পাবো। এ টেবিলে কিন্তু ঠিক আগের টেবিলের তথ্যগুলোই আছে। ফলে এখানেও Key এর দৈর্ঘ্য ৬-ই থাকছে।

দুর্গের ফাটল এতক্ষণে ধরা দিতে শুরু করেছে। আমরা ধরেছিলাম, Keystream এ Key এর দৈর্ঘ্য ৬। উপরের টেবিলের Keystream এ ‘INC’ দখল করেছে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম স্থান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘INC’ এর সামনে-পেছনে বর্ণ বসিয়ে একে ৬ বর্ণের একটি Key-তেই রূপান্তর করা সম্ভব! কীভাবে?

‘Prince’ কিংবা ‘Flinch’ এর মতো শব্দ যে ঠিকই আছে ইংরেজী শব্দের ভান্ডারে! রাজপুত্র অর্থাৎ Prince কে দিয়েই তাহলে সম্ভাব্য জয়যাত্রা শুরু করা যাক। Key হিসেবে Prince লেখার পর এর উপরের Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্য নিয়ে পূরণ করা হয়েছে।

কী আনন্দ! আরেকটি অর্থপূর্ণ শব্দ পেয়ে গেলাম আমরা, ‘attack’! আক্রমণ আরো জোরদার করা দরকার এখন। দূর্গের দেয়াল ভেঙে পড়তে বুঝি আর বেশি দেরি নেই আমার ক্লান্ত সৈনিকেরা। ঐ তো দেয়ালের পাথরগুলো এক এক করে খসে পড়ছে। যেহেতু Key পাওয়া গেছে, তাহলে এখন Plain Text কে Keystream এ বসানো শুরু করতে পারি আমরা। এভাবে PRINCE এর পর ATTACK আসলে নিচের টেবিলটি পাবো আমরা।

এভাবে Plain Text এর ফাঁকা জায়গাগুলো টেবুলা রেক্টার সাহায্যে এবং Keystream এর ফাঁকা জায়গাগুলো আবার Plain Text এর সাহায্যে ভরাট করলেই একসময় আমরা পেয়ে যাবো আমাদের কাঙ্ক্ষিত মেসেজ- ‘attack at the break of dawn’।

মারহাবা, মারহাবা! শত্রুপক্ষের দুর্গ একেবারেই ভেঙে পড়েছে। অনেক মাথা খাটিয়ে বিজয়ের সন্ধান পেলাম আমরা অবশেষে।

প্রকৃতপক্ষে অটোকী সাইফারের Key জানা না থাকলেও কীভাবে তার মর্মোদ্ধার করা যায় তার খুব সহজ উদাহরণ ছিল এটি। এখানে এমন একটি মেসেজই দেয়া হয়েছে যাতে ‘THE’ শব্দটি ছিল। বাস্তবে কিন্তু অনেক শব্দ ঘাটাঘাটি করে পরেই পাওয়া যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত শব্দটি!

আবার আমরা কিন্তু ‘tac’ দিয়ে কাজ না হবার পরপরই সোজাসুজি ‘ako’-তে চলে এসেছি। বাস্তব জগতের সমস্যা এতটা সহজ হবে এমন আশা করা বৃথা! Key হিসেবে আমরা এ উদাহরণে পেয়েছি Prince যা একটি শব্দ। কিন্তু তথ্যের সুরক্ষার জন্য কেউই প্রকৃতপক্ষে চেনা-পরিচিত কোনো শব্দ ব্যবহার করবে না। বরং অর্থহীন কোনোকিছু এক্ষেত্রে বেশি সুরক্ষা দিবে।

ক্রিপ্টোলজির নিয়মিত পাঠকেরা আজকের এ লেখার মাধ্যমে অনেক উঁচু কোনো পাহাড়কে ছোঁয়ার আনন্দ পেয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস। সাথেই থাকুন, কারণ সামনে আসছে আরো অসাধারণ সব সাইফার, অসাধারণ অনেক ঐতিহাসিক কাহিনী যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অ্যাডভেঞ্চার।

featured image: disneydude-94.deviantart.com

‘পাই’ (π) কি তবে ভুল ছিল?

১. বৃত্তের ধ্রুবক

গণিতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা বলা হয়ে থাকে ‘পাই’কে। বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত থেকে আমরা পাইয়ের ধারণা পাই। জ্যামিতিতে বিভিন্ন আকৃতির যেসব বস্তু আমরা কল্পনা করতে পারি, তাদের মধ্যে বৃত্তের গঠনকে সবচেয়ে নিঁখুত ধরা হয়। আর পাই নামের সেই অমূলদ সংখ্যাটি, যেটি বৃত্ত সংক্রান্ত যেকোনো জ্যামিতির হিসাব নিকাশের জন্যে অপরিহার্য। তাই পাই নিয়ে গণিতজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণের শেষ নেই। তবে Bob Palais নামক এক গণিতবিদ Pi is Wrong শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা এই লেখার মাধ্যমে পাই সম্পর্কে এই গণিতবিদের ধারণাকে পর্যালোচনা করবো।

১.১ অস্বচ্ছ প্রস্তাবনা

পাই সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা রয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে পাইকে সঠিকভাবে অনুধাবণ করতে হবে। পাই সম্পর্কিত সর্বজনগৃহীত সংজ্ঞা হচ্ছ, পাই বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত।

π = C/D = 3.14159265… (C = বৃত্তের পরিধি, D = বৃত্তের ব্যাস)

পাইয়ের অনেক চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা একে বেশি পরিমাণে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যেমন: পাই সংখ্যাটি অমূলদ। অর্থাৎ, একে দুটি সংখ্যার ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করা যায় না। এবং এটি একটি তুরীয় সংখ্যা (Transcendental Number)। যেসকল সংখ্যাকে কোনো বহুপদী সমীকরণের চলকসমূহের মূল (root) হিসেবে প্রকাশ করা যায় না, সেটাই তুরীয় সংখ্যা। এরকম অনেক গাণিতিক বিশেষত্ব নিয়ে পাই সংখ্যাটি বিশেষভাবে আলোচিত।

আসলে পাই সংখ্যাটি যে ভুল- ব্যাপারটি আদৌ এমন নয়। কিন্তু সত্যটি হলো, পাই সংখ্যাটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। তাই যখন আমরা বলি, ‘পাই ভুল’, তার অর্থ এই যে, বৃত্তের একটি ধ্রুবক হিসেবে পাই সংখ্যাটি কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। আরো স্পষ্ট করতে বলতে গেলে, বৃত্ত হচ্ছে অসংখ্য বিন্দুর সমষ্টি, যে বিন্দুগুলো অপর একটি নির্দিষ্ট বিন্দু (বৃত্তের কেন্দ্র) হতে সর্বদা সমদূরবর্তী। এই সমদূরত্বটিই ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধকে নির্দেশ করে। বলে রাখা প্রয়োজন, ব্যাস হলো বৃত্তের পরিধির উপরিস্থ যেকোনো দুটি বিপরীত বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। অন্যদিকে ব্যাসার্ধ হলো, বৃত্তের কেন্দ্র এবং পরিধির উপরিস্থ যেকোনো বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। এখন নিচের চিত্রটা থেকে দেখা যায়, ব্যাসকে ধ্রুবক রেখে অসংখ্য আকৃতি গঠন করা সম্ভব। কিন্তু ব্যাসার্ধকে ধ্রুবক রাখলে কেবল একটি আকৃতি আসে। ফলে, এটি অনেক বেশি গঠনমূলক বৃত্তের ধ্রুবক তৈরি করে।

যেহেতু বৃত্তের ব্যাস এর ব্যাসার্ধের দ্বিগুণ, তাই নতুন এই ধ্রুবকটি হবে পাইয়ের দ্বিগুণ (ব্যাসার্ধ হর হিসেবে থাকায়)। পাইয়ের মতো এটিও তুরীয় এবং অমূলদ সংখ্যা হবে।

খেয়াল করলে দেখা যায় গণিত, পদার্থবিদ্যার অনেক সূত্রে 2π ব্যবহার করা হয়। Pi is Wrong প্রবন্ধে লেখক বৃত্তের ধ্রুবকের জন্যে ব্যাসার্ধ সংক্রান্ত সংজ্ঞাটিই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। তিনি একে বৃত্তের এক চক্র বা one turn বলে পরিচিত করেছেন। এবং চিহ্ন হিসেবে τ (tau) ‘কে বেছে নিয়েছেন।

τ = C/r = 6.283185307179586… (C = বৃত্তের পরিধি, r = বৃত্তের ব্যাসার্ধ)

১.২ পাই (π)-য়ের জনপ্রিয়তা

বৃত্তের ধ্রুবক হিসেবে যে টাউ (τ)-য়ের ব্যবহারই স্বাভাবিক হতে পারত, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পূর্বে আমরা দেখে নিতে পারি- আমাদের মাঝে পাই কতটা জনপ্রিয়। প্রথমেই আমাদের এই সত্যটি স্বীকার করে নিতে হবে যে, প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে আমাদের মাঝে পাইয়ের জনপ্রিয়তা একটা অন্ধ বিশ্বাসের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাই এর গুণাবলি নিয়ে উচ্চ প্রশংসা করে বিভিন্ন বইও লেখা হয়েছে। এমনকি পাইয়ের জন্যে অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ঈশ্বরের মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা। যেমন: ২০১০ সালে গুগল পাই দিবসকে উদযাপন করেছে, তাদের লোগো পরিবর্তনের মাধ্যমে।

গুগলের বিশেষ লোগো

কিছু কিছু পাইপ্রেমী মানুষ পাইয়ের মান শতক বা হাজার ঘর পর্যন্ত মুখস্ত করে ফেলে! তাই সত্যি কথা বলতে, টাউকে পাইয়ের মতো একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। যদিও আমরা টাউ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই বেশি যৌক্তিক পক্ষে অবস্থান করি।

২. টাউ সংখ্যাটি কী?

উপরের ১.১ অংশে আমরা দেখেছি ‘টাউ’ (τ)-কে 2π হিসেবে লেখা যায়। গণিতের বিভিন্ন সূত্রে আমরা এই 2π কে দেখতে পাই। যেমন:

$latex \int_0^{2\pi}\int_0^\infty f(r,\theta)\,r\,dr\,d\theta$

এই সূত্রে পোলার স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় একটি স্থানের সমাকলন করার সময় আমরা শূন্য (0) থেকে 2π ব্যবধানের মান বের করি।

$latex \frac{1}{\sqrt{2\pi}\sigma}e^{-\frac{(x-\mu)^2}{2\sigma^2}},$

২য় সূত্রটি পরিমিত বিন্যাস সম্পর্কিত। একে গসিয়ান ডিস্ট্রিবিউশনও বলা হয়। ‘পরিমিত বিন্যাস’ ব্যাপারটি একটি সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। যেমন: বাংলাদেশের একজন পুরুষকে যদি দৈবচয়নে নির্বাচন করা হয়, তাহলে তার উচ্চতা ৫ ফুট থেকে ৫.৫ ফুটের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা কত? এই সম্ভাবনা বের করার জন্য যে সূত্র, সেক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই 2π কে।

$latex f(x) = \int_{-\infty}^\infty F(k)\, e^{2\pi ikx}\,dk$
$latex F(k) = \int_{-\infty}^\infty f(x)\, e^{-2\pi ikx}\,dx$

৩য় সূত্রটি ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম-এর। বিভিন্ন ধরণের তরঙ্গের কম্পাঙ্ক, অনুপাত ইত্যাদি বের করার জন্যে সূত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সূত্রেও 2π রয়েছে।

$latex f(a) = \frac{1}{2\pi i}\oint_\gamma\frac{f(z)}{z-a}\,dz,$

৪র্থ’টি গণিতবিদ অগাস্টিন লুইস কচির বিখ্যাত একটি সূত্র। জটিল সংখ্যা (complex number) ’কে ব্যবহার করে যে ফাংশন তৈরি করা হয়, তার সমাকলন করার জন্যে এই সূত্রটি ব্যবহৃত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এখানেও 2π দেখা যাচ্ছে।

$latex z^n = 1 \Rightarrow z = e^{2\pi i/n},$

৫ নম্বরে এককের n তম বর্গমূল বের করার জন্যে e এর পাওয়ার হিসেবে 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

$latex \zeta(2n)=\sum_{k=1}^\infty \frac{1}{k^{2n}}=\frac{B_n}{2(2n)!}\,(2\pi)^{2n}.\qquad n=1,2,3,\ldots$

সবশেষে, গণিতের একটি অসাধারণ সূত্র রেইম্যান-জেটা ফাংশন। বাস্তব অথবা জটিল সংখ্যা ব্যবহার করে একটি অসীম ধারা তৈরি করা হয়েছে, যা রেইম্যান-জেটা ফাংশন নামে পরিচিত। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এখানেও 2π ব্যবহার করা হয়েছে।

[রেইম্যান-জেটা ফাংশনটি 2n এর পরিবর্তে -১ ব্যবহার করলে যে ধারাটি পাওয়া যায়, সেটি হলো ১+২+৩+৪+৫…∞,অর্থাৎ সমস্ত স্বাভাবিক সংখ্যার যোগফল। সূত্রের ফলাফল হিসেবে মানটি আসে -১/১২ । মজার ব্যাপার হলো, ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজন আরেকটি ভিন্ন উপায়ে খুব সহজেই এই একই মান বের করেন।]

এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন উপরের এই সূত্রগুলো আমরা বেছে-বেছে নিয়েছি, যেখানে 2π -ই রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি আপনার গণিত অথবা পদার্থবিদ্যার বইটা খুলে দেখেন, তাহলে দেখবেন সেখানে অসংখ্য সূত্র রয়েছে, যেগুলোতে 2π ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এই রহস্যের সমাধান করতে আমাদেরকে বৃত্তের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশদ ধারণা লাভ করতে হবে। যদিও কমবেশি সবারই বৃত্তের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে, তারপরও ‘টাউ’ সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারনা পেতে আমাদেরকে বৃত্তের উপর একবার নতুন করে চোখ বুলিয়ে নিতেই হবে।

২.১ বৃত্ত এবং কোণ

বৃত্ত এবং কোণের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। নিচের ছবিতে একই কেন্দ্র বিশিষ্ট দু’টি ভিন্ন ব্যাসার্ধের বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। যাদের পরিধি থেকে ভিন্ন দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট দু’টি অংশ বা ‘চাপ’ (arc lengths) কেটে নিলেও তাদের মধ্যবর্তী কোণের পরিমাণ (θ) একই থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, বৃত্তের ‘চাপ’ পরিমাপ করার সময় ব্যাসার্ধ এবং কোণ পরস্পর স্বাধীনভাবে আচরণ করে। তবে যখন আমরা শুধুমাত্র একটি বৃত্ত নিয়ে বিভিন্ন পরিমাপ করতে চাই, তখন ব্যাসার্ধটি অবশ্যই অপরিবর্তনীয় থাকে এবং ঐ বৃত্তের দু’টি ব্যাসার্ধের মধ্যবর্তী অংশকে পরিমাপ করার জন্যেই আমরা ‘কোণ’ মেপে থাকি।

চিত্র- i

সম্ভবত কোণ পরিমাপের সবচেয়ে প্রাথমিক পদ্ধতি হলো ‘ডিগ্রি’। এটা বৃত্তকে ৩৬০ ভাগে ভাগ করে। নিচের ছবিতে ত্রিকোণমিতিতে ব্যবহৃত কিছু প্রচলিত কোণের পরিমাপ দেখানো হলো-

চিত্র- ii

কোণ পরিমাপের আরেকটি মৌলিক পদ্ধতি হলো, কোনো বৃত্তের চাপের দৈর্ঘ্যের সাথে ঐ বৃত্তের ব্যাসার্ধের অনুপাত বের করা। একে রেডিয়ান পদ্ধতি বলা হয়। উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বৃত্তের চাপ এবং ব্যাসার্ধ পরস্পরের সামাণুপাতিক। এবং সেখানে ধ্রুবক হলো ‘কোণ’। এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেহেতু ‘চাপ’ এবং ব্যাসার্ধ উভয়ের দৈর্ঘ্যের এককই সমান, তাই এর কোনো একক নেই। রেডিয়ান কোণের ব্যবহার গণিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করা সমাকলন বা ব্যবকলন করার সময় যে কোণের হিসাব করা হয়, সেগুলো সবই রেডিয়ান কোণ। যেমন: sinθ-কে যদি θ এর সাপেক্ষে ব্যবকলন করা হয়, তাহলে আমরা cosθ পাই। এখানে θ দ্বারা রেডিয়ান কোণই নির্দেশ করা হয়েছে। এবং এই ব্যবকলন শুধুমাত্র রেডিয়ান কোণের জন্যেই সঠিক হবে।

সাধারণত, ত্রিকোণমিতিতে কোণের হিসাব করার জন্যে রেডিয়ান কোণই ব্যবহার করা হয়। আমরা উচ্চমাধ্যমিকে ত্রিকোণমিতির যে বিশেষ কোণগুলোর (30, 45, 60, 90…) মান মনে রাখার চেষ্টা করতাম, সেগুলো আসলে ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমে লেখা ছিল।

চিত্র- iii
চিত্র- iv

এখন আমরা সেই ‘পাই-রেডিয়ান’ সিস্টেমের একটা অন্যরূপ দেখাতে পারি। যেখানে আমাদের পরিচিত কোণগুলোকে লেখা হবে একটা বৃত্তের বিভিন্ন ভগ্নাংশরূপে। আর এই পদ্ধতি আমাদেরকে রেডিয়ান কোণ পরিমাপের সংজ্ঞাকে নতুনভাবে যাচাই করতে সাহায্য করবে। এখানে আমরা বৃত্তের চাপের (s) পরিবর্তে পুরো বৃত্তের পরিধির (C) ভগ্নাংশ (f)-কে লিখতে পারি। তাহলে, s = fC :

θ = s/r = fC/r = f (C/r) ≡ fτ

খেয়াল করলে দেখা যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানে ‘টাও (τ)’ চলে এসেছে। যদি সত্যিকার অর্থেই আপনার ‘পাই’ এর প্রতি একটা অন্ধবিশ্বাস থেকে থাকে, তাহলে আমার আশঙ্কা- উপরের এই চিত্র এবং সমীকরণ আপনার সেই বিশ্বাসের মূলে একটা চিড় ধরাতে পেরেছে।

চিত্র- v

যদিও ‘টাও’ এর পক্ষে অনেক যুক্তিই রয়েছে, কিন্তু উপরের ছবিটা বোধহয় সবচেয়ে মারত্মক যুক্তি। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি Bob Palais এর সেই ‘এক চক্র’-র বাস্তব রূপ। যার সংজ্ঞাটা এখন সহজেই করা যাবে: ‘টাও’ হলোরেডিয়ান পদ্ধতিতে বৃত্তের এক চক্র পরিমাপের একটি একক। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ‘টাও’কে মুখস্ত করার কিছু নেই। বৃত্তের বারো চক্রের একভাগ হলো τ/১২, আট চক্রের একভাগ হলো τ/৮ । তাই ‘টাও’ এর ব্যবহার আমাদেরকে বৃত্তের কোণ-ব্যাসার্ধ সম্পর্কে একটা বাস্তব ধারণা তৈরি করতে অত্যন্ত সহায়ক এবং হিসাবের নিকাশের জন্যেও সহায়ক। যেমন: τ/১২ কেবলমাত্র একটা সংখ্যাকে নির্দেশ করে-

বারো চক্রের একভাগ = τ/ ১২ ≈ ৬.২৮৩১৮৫…/১২ = ০.৫২৩৫৯৮৮…

সবশেষে আমরা আরেকবার, চিত্র-iii এবং চিত্র-v থেকে দেখে নিতে পারি যে, ২π ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝামেলাটা আসলে কোথায়। যদিও বৃত্তের এক চক্র ১τ মানে কিন্তু ২π –ই। তাই সংখ্যাগত দিক থেকে এই দুটি জিনিস এক হলেও, বাস্তবসম্মত চিন্তা করার ক্ষেত্রে ‘পাই’ এবং ‘টাও’ এর মধ্যে রয়েছে বিস্তার ফারাক।

featured image: supertv.it

গণিতের একীভূত তত্ত্বের জালে আটকে গেল আবেল ২০১৮

কানাডিয়ান গণিতবিদ রবার্ট ফেলান ল্যাঙল্যান্ডস (Robert Phelan Langlands) জিতে নিলেন ২০১৮র আবেল পুরস্কার— গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। নরওয়েজিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স অ্যান্ড লেটারস গত ২০শে মার্চ তার নাম ঘোষণা করে বীজগণিত, সংখ্যাতত্ত্ব ও বিশ্লেষণ এর মধ্যকার চমকপ্রদ ও সুদূরপ্রসারী যোগসূত্র আবিষ্কার করার জন্য।

ল্যাঙল্যান্ডসের ঘড়িতে বলছে ৮১ বছর। এখনো তিনি প্রিন্সটন, নিউ জার্সিতে অবস্থিত ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির সক্রিয় সদস্য। তিনি যে অফিসটিতে বসেন ঠিক ওখানেই একদা বসতেন মহামতি আলবার্ট আইনস্টাইন।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রোজেটা স্টোন। Source: Hans Hillewaert

গণিতবিদদের রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামকে। রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সংখ্যাতত্ত্ব এবং জ্যামিতির গুরুত্বপূর্ণ অনুমান বা প্রকল্পগুলো (conjectures) মধ্যকার সম্পর্কসূচক প্রোগ্রাম প্রস্তাবনা করেন। এ প্রোগ্রামের ব্যাপারটি অনেকটা প্রাচীন মিশরের রোজেটা স্টোনের মত। রোজেটা স্টোনে খোদাই করা আছে প্রাচীন তিন ধরনের লিপি।

 

তিন লিপিতে একই কথা বলা আছে তবে কী বলা আছে তা এখনো পড়তে শেখা বাকি। ল্যাঙল্যান্ডসের প্রোগ্রামও এমন বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রস্তাবিত। গণিতের বিভিন্ন শাখার সাথে এ প্রোগ্রামটি আসলে একটি যোগসূত্র বা অনুবাদকের মত কাজ করবে। তাহলে, যখন কোনো সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব বলে মনে হবে তখন অন্য কোনো গণিতের ক্ষেত্রে নিয়ে একে যাচাই করা হবে। হয়ত গণিতের ঐ শাখা সমস্যাটির সমাধান বলে দিতে পারে। দুটি শাখার মধ্যে এই সংযোগ আসলে আরো নিগুঢ় রহস্যকে তুলে আনে।

 

কম্পাঙ্ক ৫২০১ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র
কম্পাঙ্ক ৩২৪০ হার্জ এর অনুনাদ চিত্র

অন্যান্য গবেষকরা এই প্রোগ্রামের সুবিধা অর্জনে বিস্তর কাজ করতে থাকেন। নিদেনপক্ষে, তিনজন গণিতবিদ এই মহাপরিকল্পনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে কাজ করে ফিল্ডস পদক জিতে নিয়েছেন। সময় গড়াতে গড়াতে গবেষকরা অচিরেই বুঝে ফেললেন গণিতবিদদের সমাধান করা ইতিপূর্বের কিছু প্রাচীন সমস্যা আসলে এই বিরাট অনুক্রমের বিশেষ অংশ। একটি হল ভেইল কনজেকচার (Weil Conjecture) যেটা সমাধান করে বেলজিয়ামের গণিতবিদ পিয়েরে ডিলাইন (Pierre Deligne) দখল করে নিয়েছেন ২০১৩ এর আবেল পুরস্কার। আরেকটি— গণিতের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন এমন সর্বসাধারণের জানাশোনার মাঝে— ৯০ এর দশকে এন্ড্রু উইলস এক সহলেখকের সাথে ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করেন, যেকারণে ২০১৬তে তিনি আবেলে অলংকৃত হন।

একের সাথে আরেকটির সম্পর্কের বিস্তার এত বড় যে সত্যি সত্যি তার এই প্রোগ্রামটি “গণিতের একীভূতকরণ তত্ত্ব” নামে পরিচিত হতে লাগল— ব্যাপারটি ল্যাঙল্যান্ডসকেই হতবুদ্ধ করে। এই চমকপ্রদ অনুভূতিটি সুন্দর করে বুঝিয়েছেন ইন্সটিউটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির প্রধান রবার্ট ডাইক্সগ্রাফ (Robbert Dijkgraaf)— “এটা অনেকটা এমন যে, আপনি একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। মরুভূমিতে বালি খুঁড়ে একটি পাথর খুঁজে পেলেন— আর দেখা গেল এ পাথরটি যেন একটা পিরামিডের শীর্ষে ছিল!” উল্লেখ্য, ডাইক্সগ্রাফ নিজে একজন গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী।

আবেল পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে ২০০৩ সাল থেকে।

আবেল পুরস্কারের উত্থান নোবেল পুরস্কারের অনুকরণেই। গণিত এত গুরুত্বপূর্ণ শাখা অথচ নোবেলে গণিতের জন্য কোনো জায়গা নেই সেই অভাব পূরণেই ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ঘোষণা করা হচ্ছে। এর অর্থমূল্য ৬ মিলিয়ন ক্রোনার (ডলারে ৭৭৭,০০০ বা সাড়ে ৬ কোটি টাকা)।

ল্যাঙল্যান্ডস প্রথম এই প্রোগ্রামটির রূপরেখা তৈরি করেন ১৯৬৭ সালে যখন কিনা তিনি একই ইন্সটিটিউটে তরুণ গণিতবিদ ছিলেন। শুরু করেছিলেন সরল বীজগাণিতিক সমীকরণ দিয়ে, যেমন- দ্বিঘাত সমীকরণ; বাচ্চারা যা স্কুলেই শিখে ফেলে। একটু পেছনে, ১৮০০ এর দিকে এভারিস্ট গ্যালোয়া বের করেছিলেন, সাধারণভাবে, উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো কেবল আংশিক সমাধান করা সম্ভব। অবশ্য গ্যালোয়া আরো দেখান, এ ধরনের প্রতিটি সমীকরণের সমাধানগুলোর মধ্যে একটি প্রতিসাম্যতা বজায় থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, x^5 = 1 সমীকরণের সমাধানে বীজগুলো একটা বৃত্তে অবস্থিত যে বৃত্তটি লেখচিত্রে এক অক্ষে বাস্তব সংখ্যা ও অন্য অক্ষে জটিল সংখ্যাকে নির্দেশ করে আঁকা। তিনি দেখান, যখন এমন উচ্চঘাতের সমীকরণগুলো সমাধান করা যাবে না, তারপরও তাদের প্রতিসাম্যতা থেকে সমাধানের আভাস বের করে নেয়া সম্ভব।

গ্যালোয়ার তত্ত্বের উত্তরকালীন উন্নয়নের অনুপ্রাণিত হয়ে ল্যাঙল্যান্ডসের এগুনোর পদ্ধতি গবেষকদের সুযোগ করে দিল বীজগাণিতিক সমস্যাকে হারমোনিক এনালাইসিসে রূপান্তর করতে। হারমোনিক এনালাইসিস বলতে সোজা কথায় কোনো ফাংশন অথবা সংকেতের উপস্থাপন। হারমোনিক এনালাইসিসের মাধ্যমে জটিল তরঙ্গরূপকে ভেঙে সাইন ও কোসাইন তরঙ্গে রূপান্তরিত করে।

‘৮০র দশকে, এক ইউক্রেনীয় গণিতবিদ ভ্লাদিমির দ্রিনফেল্ড আরো কয়েকজনের সাথে মিলে জ্যামিতি আর হারমোনিক এনালাইসিসের মধ্যে অনুরূপ একটি সম্পর্কের প্রস্তাবনা আনলেন। যদিও এই ব্যাপারটি আসলে মোটাদাগে ল্যাঙল্যান্ডসের ধারণা থেকেই অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়, গণিতবিদরা পরবর্তীতে এই দুই শাখার মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের শক্ত প্রমাণ পেলেন। সে সুবাদে দ্রিনফেল্ড ১৯৯০ এ পেয়ে গেলেন ফিল্ডস পদক। তিনি বর্তমানে ইলিনয়তে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে অধ্যাপনা করছেন।

এই জ্যামিতির প্রোগ্রাম আবার পুরনো এক কনজেকচারকেও (অনুমান) অন্তর্ভুক্ত করে, যা আবার হারমোনিক এনালাইসিসের সাথে সম্পর্কিত। ফার্মার শেষ উপপাদ্যের উইলসের প্রমাণের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হয়েছিল। ফার্মার উপপাদ্যটি সংখ্যাতত্ত্বের এমন এক সমস্যা ছিল যা সমাধান করতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩০০ বছরেরও বেশি সময়। উইলস তাদের প্রমাণের কাজে ল্যাঙল্যান্ডসের কিছু কাজ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, অর্থাৎ কাজে লাগিয়েছিলেন। সে সূত্রে, ২০০৭ এ ল্যাঙল্যান্ডস কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “এটা ছিল আমার জন্য আনন্দের এবং একই সাথে বিস্ময়েরও।”

অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডির এক কনফারেন্সে (২০১৬); Source:Dan Komoda

ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের মাধ্যমে যেভাবে গণিতের শাখা এত বিশাল হয়ে উঠেছে তার সবটা নাকি তিনি নিজেও বোঝেন না। আন্তঃসম্পর্কগুলো কিভাবে কাজ করে তাও পুরোপুরি বোধগম্য নয়। বিশেষত, জ্যামিতিক ক্ষেত্রের কিছু কিছু প্রভাব পদার্থবিজ্ঞানে কাজে লাগবে। তার ইন্সটিটিউশনাল সহকর্মী তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেন মনে করেন তিনি ল্যাঙল্যান্ডস প্রোগ্রামের খুব ক্ষুদ অংশই ধরতে পারেন। উল্লেখ্য, উইটেন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও একজন ফিল্ডস পদকজয়ী ১৯৯০ এ। ২০০০ এর দশকে তিনি এ প্রোগ্রামের সম্পর্কগুলো নিয়ে কাজ করেছিলেন।

 

—নেচার অবলম্বনে

রোগ সংক্রমণবিদ্যার মাঝে লুকিয়ে থাকা গণিত

. রোগতত্ত্ববিদ্যার মশকীয় উদ্ভব

রোনাল্ড রস তখন মাত্র ব্রিটিশ আর্মির সার্জন হিসেবে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে কাজ শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে খুশিই ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব সার্জন থেকে বের হয়েছেন মাত্র বছর-দুই হলো। তরুণ বয়সে ইচ্ছে ছিল লেখক হবেন; কিন্তু তার বাবা তাকে লন্ডনের একটি মেডিকেল কলেজে পড়াশুনার ব্যবস্থা করে দেন। রস যে মেডিকেল কলেজে কঠোর পরিশ্রমে পড়াশুনা করতেন এমন না। তার অনেকটা সময় চলে যেত কবিতা লিখে,নাটক আর সঙ্গীত রচনা করে।

সময়টা ১৮৮৩ সাল,পেশাগত জীবন মাত্র শুরু তখন। ভারতের ব্যাঙালোর বেশ পছন্দই হলো তার। ব্যাঙ্গালোরের রৌদ্রজ্বল দিন, বাগান আর ভিলা তার মতে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম সুন্দর জায়গা। কিন্তু রোনাল্ড রস যখন মশার উপদ্রপে অতিষ্ট হয়ে তার বাংলোর বাইরে পানির ট্যাঙ্কি উপর করে দেন,তখন কি তিনি জানতেন মশাদের বিরুদ্ধে এটা তার জীবন-যুদ্ধ হতে যাচ্ছে?

ব্যাঙ্গালোরে পৌঁছে রস দেখলেন তার ঘর মশাদের গুঞ্জনের শব্দে ভরে আছে। তখন ঠিক করলেন মশাদের সংখ্যা কমাতে হবে, এদের আর প্রজনন করতে দেয়া যাবে না। তাই বাংলোর আশেপাশে যেখানে যেখানে বদ্ধ পানি জমে থাকতে দেখলেন সেখানকার পানি সরিয়ে দিলেন। এ পদ্ধতি কাজ করলো, কমে গেল মশকীর সংখ্যা।

স্যার রোনাল্ড রস।

ঐ অঞ্চলে দিনযাপনের সাথে সাথে রোনাল্ড রস ক্রমেই একটা ধারণা বদ্ধমত হতে থাকেন যে সেখানকার মশারা সম্ভবত ম্যালেরিয়া রোগ ছড়াচ্ছে। ম্যালেরিয়া একটা প্রাণঘাতী রোগ। প্রচন্ড জ্বরের সাথে সাথে ফ্লু-এর বিভিন্ন লক্ষণ সাথে নিয়ে হাজির হয় এই রোগটি। বর্তমান মানব প্রজাতী, Homo sapiens এর উদ্ভবের প্রায় শুরু থেকেই এই রোগটি ছিল। পূর্বে ধারণা ছিল কোনো খারাপ বাতাসের সংস্পর্শে আসলে মানুষের এই রোগটি হয়। ম্যালেরিয়া শব্দটা এসেছে ইতালিয় ভাষার ‘ম্যালএরিয়া’ থেকে যার অর্থ খারাপ বাতাস।

মশা ও ম্যালেরিয়া রোগের মধ্যকার সম্পর্ক প্রমাণের জন্য রোনাল্ড রস পাখি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেন। তিনি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত পাখিকে মশা কামড়ানোর ব্যবস্থা করেন। তারপর ওই মশাদের সুস্থ পাখির রক্ত চোষার ব্যবস্থা করেন। দেখা গেল কিছু দিনের মধ্যেই সুস্থ পাখিগুলোও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেছে।

তার এই মশকী-তত্ত্ব যাচাই করে দেখার জন্য রস এই মশকীগুলোর ব্যবচ্ছেদ করেন। এই মশকীগুলোর লালাগ্রন্থিতে ম্যালেরিয়ার জীবাণু খুঁজে পান তিনি। পরবর্তীতে একজন ফরাসি মিলিটারী ডাক্তার এই জীবাণুকে প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) হিসেবে সনাক্ত করেন। সেই ফরাসী ডাক্তার মাত্র কয়েক বছর আগেই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তকোষে এই জীবাণু আবিষ্কার করেছিলেন।

ম্যালেরিয়া রোগ বিস্তার কীভাবে থামানো যায় তা রোনাল্ড রসের গবেষণার পরবর্তী আগ্রহ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাঙ্গালোর জীবনে প্রবেশ করার সময় বদ্ধ ট্যাঙ্কি থেকে পানি ফেলে দেয়ার পদ্ধতিটা এ সময় আবারো উপযুক্ত মনে হয় তার কাছে। তিনি প্রস্তাব করেন,মশকীর সংখ্যা যথেষ্ট পরিমাণে কমাতে পারলে ম্যালেরিয়ার বিস্তার এমনিতেই কমে আসবে। ছাত্রজীবনে গণিত প্রেমী রোনাল্ড রস তার এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এবার তার গণিতজ্ঞান কাজে লাগালেন। তিনি একটি গাণিতিক

মডেল তৈরি করলেন, যাকে বলা যায় মশকী তত্ত্ব। এই মশকী তত্ত্ব গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করলো কীভাবে একটি নির্দিষ্ট মানব জনপুঞ্জে (human population) মশকী ম্যালেরিয়া ছড়াতে পারে। তিনি সেই মডেলে মানব জনপুঞ্জকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন– একদলে রইলো সুস্থ,অন্যদলে আক্রান্ত। তারপর তিনি বেশ কিছু গাণিতিক সমীকরণ লিখে ফেললেন যারা ব্যাখ্যা করে যে মশার সংখ্যা কীভাবে এই রোগের বিস্তারকে প্রভাবিত করতে পারে।

ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্লাজমোডিয়াম হলো পরজীবী। প্লাজমোডিয়ামের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করার জন্য ওর মানুষ ও মশা দুই বাহকেরই প্রয়োজন হয়। দেখা যায় কারো ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবার হারের সঙ্গে তিনি কতবার প্লাজমোডিয়াম-বাহক মশার কামড় খেয়েছেন তার একটা সম্পর্ক আছে। প্লাজমোডিয়াম-বাহক মশার সাথে আবার সম্পর্ক রয়েছে কতজন ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাজমোডিয়াম কীট রয়েছে। অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর রক্তে প্লাজমোডিয়াম কীট থাকা অবস্থায় রোগীর রক্ত চুষে ফেললে একটি সাধারণ মশা প্লাজমোডিয়ামে আক্রান্ত হয়ে যাবে। এই সম্পর্কগুলোকেই রোনাল্ড রস গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করেন।

তিনি দেখলেন ভারতের মতো জায়গায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ স্থায়ীভাবে ঘটতে হলে সেখানে প্রতি মাসে কত জন নতুন করে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবে তা অবশ্যই ঐ মাসে কতজন রোগী ম্যালেরিয়া থেকে সুস্থ হয়ে উঠছে তার সমান হতে হবে।

এক প্রকার প্লাজমোডিয়াম

এই গাণিতিক মডেলটি ব্যবহার করে রস দেখালেন ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সব মশা মেরে ফেলার কোনো দরকার নেই। যথেষ্ট পরিমাণ মশা মেরে ফেলো,তাহলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী যথেষ্ট পরিমাণ মশা কামড়ানোর আগেই সে সেরে উঠবে। ফলে রোগসংক্রামণের হারও আর আগের মতো থাকবে না। ফলশ্রুতিতে ম্যালেরিয়া রোগের বিস্তার কমে আসা শুরু করবে।

অন্যভাবে বলা যায় সংক্রামণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে। এ পরিমাণের চেয়ে বেশি সংক্রামণ হলে তা মহামারীতে পরিণত হবে আর কম হলে রোগটি আপনা আপনিই কমে যাবে।

রসের এই কাজ ১৯০২ সালে তাকে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল এনে দেয়। বিভিন্ন রোগের বিস্তার ও মহামারীকে যে গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব সেই সম্ভাবনার ভিত্তিরোপন করে রসের এই কাজটি। রোনাল্ড রসের এই অন্তর্দৃষ্টি ভ্যাক্সিন প্রয়োগের নীতিকেও প্রভাবিত করে দলীয়-অনাক্রম্যতা বা দলীয়-রোগ-প্রতিরোধ-ব্যবস্থার (Herd Immunity) ধারণার মাধ্যমে।

দলীয়-অনাক্রম্যতার মূল ধারণা হলো একটি জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে কোন রোগের টীকা দিয়ে দাও;তাতে ওই রোগ বিস্তার কমে যাবে আপনা আপনিই। তার মানে টীকা দেয়া কর্মসূচী থেকে কিছু মানুষ বাদ গেলেও সে কর্মসূচী সফলভাবে কাজ করতে পারে। যদিও টীকা দেয়ার থেকে রোনাল্ড রসের কর্মসূচী ভিন্ন ছিল। রস টীকা দেননি;তিনি মশার পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তবুও উভয়ক্ষেত্রে মূলনীতিটা একই।

কোনো জনপুঞ্জে সকলকে টীকা দেয়ার দরকার নেই বা সকল মশা সরানোর দরকার নেই। প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট সংকট সীমায় (critical threshold) পৌঁছানো। যদি সে সীমায় পৌঁছানো যায় তাহলে ওই রোগটির নিজেকে ছড়ানোর জন্য ভীষণ মুশকিলে পড়তে হবে।

. অঙ্ক যখন মহামারীর গল্প বলে

রোনাল্ড রসের আগেও বিজ্ঞানীরা রোগব্যাধি বিষয়ক গবেষণায় গণিতকে প্রয়োগ করেছিলেন। তবে তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল অতীতের ঘটনা। যেমন জন স্নো নামের একজন চিকিৎসক ১৮৫৪ সালে লন্ডনে কলেরা রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ খোঁজার জন্যে যুক্তিবিদ্যার সহায়তা নিয়েছিলেন। তখন বেশিরভাগ মানুষই ম্যালেরিয়ার মতো কলেরাও “খারাপ বাতাস”-এর প্রভাবে হয়ে থাকে বলে মনে করতেন।

কলেরা কোনো কোনো স্থানে ঘটেছিল জন স্নো সেটা ম্যাপে চিহ্নিত করা শুরু করেন। তখন তিনি খেয়াল করলেন লন্ডনের সোহো পাড়ার পানির পাম্প থেকে কলেরা আক্রান্ত বাড়িগুলোতে পানির সরবরাহ করা হয়। তিনি যুক্তি দিলেন যে রোগীরা কলেরা আক্রান্ত হচ্ছে দূষিত পানি থেকে আর বোর্ড স্ট্রিটের ওই পানির উৎস সরিয়ে ফললে কলেরার বিস্তার থেমে পড়বে।

অতীতের ঘটনায় না তাকিয়ে রোনাল্ড রস দেখলেন ভবিষ্যতের দিকে। মহামারী কিংবা রোগবিস্তারের গতিপথ ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্যে তার উৎসাহ-উদ্দীপনার মাধ্যমে প্রভাবিত হলেন রোনাল্ড রসের সহকর্মীদের। এন্ডারসন ম্যাককেন্ড্রিক নামের একজন তরুণ স্কটিশ গণিতবিদ রসের সাথে দেখা করেছিলেন সিয়েরা লিয়নের একটি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কার্যক্রমে।

ম্যাককেন্ড্রিক তখন ভারতীয় মেডিক্যাল সার্ভিসের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করছিলেন। তবে ১৯২০ সারে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ভারত ছেড়ে চলে যান স্কটলান্ডে। রাজধানী এডিনবার্গে তিনি রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান-এর গবেষণাগারে যোগ দেন সুপারইন্ডেন্ট হিসেবে। সেখানে ম্যাককেন্ড্রিকের কথা হয় সংক্রামক রোগ বিষয়ে আগ্রহী একজন রসায়নবিদ উইলিয়াম কারম্যাকের সঙ্গে।

প্লেগের মতো রোগের সাথে ম্যালেরিয়ার মতো রোগের পার্থক্য হলো ম্যালেরিয়ার মতো মহামারী একটি জনপুঞ্জে সবসময়ে টিকে থাকে পারে। আর প্লেগের মতো রোগ একটি জনপুঞ্জ থেকে চলে যাওয়ার আগে বিষ্ফোরণের মতো ছড়িয়ে পড়ে। রোনাল্ড রস মহামারীর গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন,সে পদ্ধতিকে আরো সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক কাজ শুরু করেন। ম্যালেরিয়ার মতো রোগের পাশাপাশি তারা প্লেগের মতো মহামারী নিয়েও গবেষণা করতে থাকেন।

রসের মতোই একটি কাল্পনিক জনপুঞ্জের সদস্যদের স্বাস্থ্যবান কিংবা রোগাক্রান্ত এই দুইটি দলে বিভক্ত করেন তারা। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো মশা বাহক মধ্যবর্তী হিসেবে রোগ সংক্রমণ না করে বরং মানুষ থেকে মানুষেই রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে। আগের মতোই জনপুঞ্জের সদস্যরা শুরুর দিকে রোগের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। জীবাণুর সংস্পর্শে এসে তারা সুস্থ দল থেকে রোগাক্রান্ত হিসেবে চলে আসে। শেষে হয়তো তারা রোগাক্রান্ত দল থেকে আবার সুস্থ দলে চলে আসে (তাদের দেহ ঐ রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা গড়ে তোলে। যেমন হাম কিংবা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা) কিংবা রোগে ভুগে মারা যায় (যেমনটা হয় প্লেগের ক্ষেত্রে)।

অগ্রগতির পথ সবসময় মসৃণ হয় না। ১৯২৪ সালে ল্যাবের এক দূর্ঘটনায় কারম্যাক অন্ধ হয়ে পড়েন। সে সময় থেকে তিনি দমে না গিয়ে মাথার মধ্যেই দরকারী হিসেব কষা শুরু করেন। তিনি ও ম্যাককেন্ড্রিক দুজনে মিলে তাদের গবেষণার ফলাফল ১৯২৭ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন লন্ডনের রয়েল সোসাইটির প্রসেডিংসে। গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘A Contribution to the Mathematical Theory of Epidemics’। বিশ পৃষ্ঠার এই গবেষণাপত্রে তারা রোগতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনাসামনি হয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়ার প্রচেষ্টা চালান। সে প্রশ্নটি হলো ঠিক কোন কারণে কোন মহামারীর অবসান হয়?

ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা প্লেগ- যেকোনো মহামারীর শুরুতে রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায়ই সূচকীয় হারে বাড়তে থাকে। কিছু সময় পর মহামারী একটি সর্বোচ্চ সীমার চূড়ায় পৌঁছে যায়। তারপর ঐ মহামারীতে রোগাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক তাদের গবেষণা শুরু করেন তখন সমকালীন বিজ্ঞানী মহলে এই কমতি-র দুইটি ব্যাখ্যা প্রচলিত ছিল।

হয়তো জীবাণুর ক্ষমতা সময়ের সাথে কমে এসেছে;কিংবা ঐ রোগের প্রতি সংবেদনশীল মানুষ ঐ জনপুঞ্জে আর নেই। ঐ জনপুঞ্জের সকলেই রোগাক্রান্ত হয়েছিল- প্রত্যেকে হয় মারা গেছে কিংবা ঐ রোগের বিরুদ্ধে অনাক্রম্যতা অর্জন করে ফেলেছে।

ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেলে তারা ধরে নিলেন যে সময়ের সাথে মহামারীর জীবাণু দূর্বল হয়ে যায়নি, একই রকম রয়েছে। তারপরও তাদের গাণিতিক মডেলে দেখা গেল এক সময় ঠিকই রোগাক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। যখন বিজ্ঞানী-যুগল ভারতের বোম্বে শহরে (এখনকার মুম্বাই) ১৯০৫ সালে প্লেগ মহামারীর তথ্য নিয়ে কাজ করলেন দেখা গেল তাদের মডেল বিভিন্ন সময়ে রোগাক্রান্তের যে সংখ্যা পূর্বানুমান করছে তা প্রকৃত রোগীর সংখ্যার সাথে মিলে যাচ্ছে।

তাহলে কি মহামারীর এই কমতি রোগের প্রতি সংবেদনশীল মানুষের অভাবেই ঘটছে? আপাতদৃষ্টিতে না। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেল মহামারীর শেষ পর্যায়েও বেশ কিছু সংবেদনশীল ব্যক্তি রয়েই যান। ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাক দেখান যে মহামারীর শেষ দিকে রোগীর সংখ্যা কমে আসার কারণ এই নয় যে জনপুঞ্জের সকলেই রোগাক্রান্ত হয়েছে। রোগীর সংখ্যা কমার আরেকটি কারণ হলো ওই জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি থাকে না যারা রোগসংক্রমণ জিইয়ে রাখবেন।

যখন কোনো জনপুঞ্জে যথেষ্ট সংখ্যক সদস্য রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন তখন রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা আরেকজন সংবেদনশীল সদস্যের সাথে সংস্পর্শে আসবেন সেই সম্ভাব্যতা কমে আসে। তার মানে তখন সচরাচর রোগাক্রান্ত ব্যক্তি হতে অন্য ব্যক্তিদের দেহে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই তারা সুস্থ হয়ে উঠছেন।

কোনো মহামারীর শেষ দিকে এই পরিণতি অনিবার্যভাবে ঘটবে। এর বাইরেও মহামারীকে এই অবস্থায় চলে যেতে বাধ্য করা যেতে পারে। রসের মডেল অনুযায়ী ম্যালেরিয়া সংক্রমণ কমানো হয়েছিল মশার সংখ্যা কমিয়ে। আর টিকা দান কর্মসূচীতে এই পরিস্থিতি জনপুঞ্জে রোগের প্রতি সংবেদনশীল একটি বড় অংশকে লক্ষ্য করে রোগ ছড়ানো বন্ধ করা হয় (কিংবা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়)।

ম্যাককেন্ড্রিক ও কারম্যাকের মডেলের পরবর্তী বড়সড় মৌলিক আবিষ্কারের জন্য রোগতত্ত্বকে অপেক্ষা করতে হয় আরো কয়েকটি দশক। ১৯৭০ এর দশকে গণিতবিদ ক্লাউস ডিয়েট্জ এবং দুই বাস্তুবিদ (ecologist) রয় এন্ডারসন ও রবার্ট মে ‘পুনরুৎপাদন সংখ্যা’ বা reproduction number ধারণার উপর তাদের অগ্রণী গবেষণা শুরু করেন। রোগতত্ত্বে পুনরুৎপাদন সংখ্যা বলতে বোঝায় একটি রোগে আক্রান্ত রোগী রোগে ভোগা অবস্থায় গড়ে নতুন কতজন সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে।

একটি রোগের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রক্রিয়া ভূমিকা পালন করে। রোগীর সামাজিক মেলামেশা থেকে শুরু করে জীবাণুর আক্রমণ করার জৈবিক ক্ষমতা সহ অনেক কিছুই। পুনরুৎপাদন সংখ্যার মাধ্যমে এসব প্রক্রিয়াকে একটি মাত্র পরিমাপে নিয়ে আসা যায়। যদি পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর চাইতে ছোট হয়,প্রতিটি রোগীর মাধ্যমে গড়ে একের চেয়ে কম সংখ্যায় কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করবে ঐ রোগ। সেক্ষেত্র কোনো বড় আকারে ছড়িয়ে না পড়ে রোগটি জনপুঞ্জ থেকে চলে যাবে। কিন্তু এই সংখ্যাটা যদি ১ এর চেয়ে বেশি হয় তাহলে সময়ের সাথে সাথে জনপুঞ্জে তা ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।

কোনো রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা অনেকভাবেই গোনা যায়। যদি জানি একটি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কত দিনের জন্য অন্য সুস্থ ব্যক্তিদের আক্রান্ত করাতে পারে, আর যদি জানি একটি নতুন রোগের ঘটনা থেকে অন্য একটি রোগের ঘটনার মধ্যকার গড় সময় পার্থক্য, তাহলে কতো দ্রুত মহামারী বেড়ে উঠছে সেখান থেকে পুনরুৎপাদন সংখ্যা আমরা বের করতে পারবো। কিংবা কোনো রোগে মানুষ গড়ে কত বছর বয়সে আক্রান্ত হয় সেটা জানা থাকলেও পুনরুৎপাদন সংখ্যা বের করা যায়। একটি রোগ যত বেশি সংক্রামক হবে তত দ্রুত কোনো ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হবে।

বিভিন্ন রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা তুলনা করে বিভিন্ন রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। যেমন হাম খুবই সংক্রামক রোগ। টিকা দেয়া হয়নি এমন জনপুঞ্জে এর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১২ থেকে ১৮ হতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় যে কেন হামকে ছোটদের রোগ হিসেবে ধরা হয়।

অন্যদিকে কুখ্যাত স্প্যানিশ ফ্লু-র পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ থেকে ৩-র মাঝামাঝি। ১৯১৮/১৯ সালে স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে আক্রান্ত করেছিল। এ রোগে মারা গিয়েছিল তখনকার পৃথিবীর ৩ থেকে ৫ শতাংশ অধিবাসী। এ রোগে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় তুলনামূলক কম পুনরুৎপাদন সংখ্যা হলেও তা পৃথিবী জুড়ে একটা ধ্বংসযজ্ঞ ছড়াতে পেরেছিল। পুনরুৎপাদন সংখ্যার স্কেলে মাঝামাঝি আছে পোলিও (৫ থেকে ৭) ও মাম্পস (৪ থেকে ৭)।

একটি রোগ কত দ্রুত ছড়াবে সে সম্পর্কে পুনরুৎপাদন সংখ্যা কোনো তথ্য দেয় না। তবে টিকা দান কর্মসূচীর মাধ্যমে কোনো রোগকে নির্মূল করে ফেলতে কী পরিমাণ প্রচেষ্টা চালানো লাগবে তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।

যেমন হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে জনপুঞ্জের ভালো পরিমাণ সদস্যকে টিকা দিতে হবে যাতে প্রাথমিক রোগী থেকে হাম তেমন একটা না ছড়ায়,যাতে পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর নিচে চলে আসে। এমন নয় পুনরুৎপাদন সংখ্যা মানুষের পরিচিত রোগের ক্ষেত্রেই সহায়ক। ইবোলার মতো নতুন রোগ কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে সেক্ষেত্রেও এ সংখ্যাটি আমাদের সহায়তা করে।

. ইবোলার লড়াইয়ে গাণিতিকরণকৌশল

২০০৩ সাল। হংকং-এর মেট্রোপোল হোটেল। রুম নম্বর ৯১১। এক ব্যক্তি সে হোটেলে ২১ তারিখ চেক-ইন করলেন। অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। এক চাচাতো ভাইয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন তিনি। দক্ষিণ চিন থেকে আসার পথে কোনো কিছু তাকে সংক্রমিত করে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে তাকে নিতে হয়। এর মাত্র দশ দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান।

ওই সংক্রমণের নাম দেয়া হয় Severe Acute Respiratory Syndrome (SARS)। কিছুদিনের মধ্যেই অন্যান্য শহরে সার্স ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে- সিঙ্গাপুর,ব্যাংকক এমনকি টরেন্টো। তখন স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- ভাইরাসটি কী করে সংক্রমিত হচ্ছে;কে কে এই ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন;কী জরুরী ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে?

২০০৩ এর বসন্তকালে লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা বিভিন্ন গাণিতিক মডেল ব্যবহার করতে শুরু করলেন হংকং-এর সার্স মহামারীর উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য। তারা দেখলেন যখন সার্স নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় থাকে না তখন এর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ থেকে ৩ এর মাঝামাঝি হয়।

পুনরুৎপাদন সংখ্যা ৩ এমন কোনো মহামারীর বিরুদ্ধে টিকা কার্যক্রম সফল হতে হলে জনপুঞ্জের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে টিকা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বাকি এক-তৃতীয়াংশ সদস্যরা ঐ রোগের প্রতি সংবেদনশীল রয়েই যায়। তবে ঐ মহামারীর পুনরুৎপাদন সংখ্যা ১ এর চেয়ে কমে যায়। তখন এমনি এমনিই মহামারীর বিস্তার কমে যায়।

টিকা দেয়ার এই পদ্ধতি হামের মতো রোগ বিস্তার রুখতে সাহায্য করলেও সার্সের জন্য করবে না। কারণ সার্স যখন প্রথম দেখা দেয় তখনতো এর বিরুদ্ধে কোনো টিকাই নেই। মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রম বা মার্স (MERS) কিংবা ইবোলার মতো নতুন রোগের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার মুখোমুখি পড়তে হয়।

কোনো টিকা আবিষ্কার ও মানুষের ব্যবহার উপযোগী করতে বহু বছর সময় লেগে যায়। বিশেষ করে যে ভাইরাস পূর্বে কেউ দেখেইনি,তাদের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কার বেশ জটিল। তাই সার্স মহামারীর সময়ে বিশেষজ্ঞরা টিকার বাইরে অন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায় কিনা তা ভাবতে শুরু করেন।

যখন দ্রুত সংক্রমণশীল রোগের বিরুদ্ধে কোনো টিকা না থাকে তখন স্বাস্থ সংস্থাগুলো দুটি খুব জরুরী কাজ করতে পারে। প্রথমতঃ কোনো ব্যক্তি যদি ঐ রোগের কোনো লক্ষণ দেখান তাহলে নিশ্চিত করতে হবে তাকে অন্য সবার মাঝ থেকে আলাদা করে ফেলা। এর মাধ্যমে ঐ ব্যক্তি আর রোগ ছড়াবেন না সেটা নিশ্চিত করা যায়। দ্বিতীয়তঃ ঐ ব্যক্তিকে সবার কাছ থেকে আলাদা করার আগে তিনি যেসব ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন তাদেরকেও খুঁজে বের করতে হবে। তারপর তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে যে তাদের রোগ হয়েছে কিনা।

সার্স মহামারীর গাণিতিক বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখলেন রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সংক্রমণের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী ব্যবস্থা। যখন আক্রান্ত ব্যাক্তিরা তাদের চলাফেরা সীমিত করে ফেলে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেন তা তখন মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কাজে দেয়।

২০০৩ সালের ৫ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা দেয় যে সার্স মহামারী নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে। তবে লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকরা আরো স্বচ্ছভাবে বুঝতে চাচ্ছিলেন রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কেন এতো কাজে দিলো; আর একই পদ্ধতি অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে কিনা।

তারা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করলেন যা দিয়ে ব্যখ্যা করা যাবে কীভাবে রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেললে সেটা রোগ সংক্রমণকে ব্যাহত করে। সে মডেল থেকে তারা দেখলেন যে বিচ্ছিন্নতার কার্যকরিতা শুধু যে পুনরুৎপাদন সংখ্যার উপর নির্ভর করে তা নয়। রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগে কতটুকু সংক্রমণ ঘটে তার উপরেও বিচ্ছিন্নতা পদ্ধতির সফলতা নির্ভর করে।

সার্স রোগের ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী সবচেয়ে বেশি রোগ ছড়ান কেবলমাত্র দৃশ্যমানভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর। ঠিক এজন্যেই বিচ্ছিন্নতা পদ্ধতি এ মহামারীতে এতটা কার্যকরী ছিল। কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জার (ফ্লু)ক্ষেত্রে অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি রোগ ছড়ান তিনি দৃশ্যমানভাবে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আগেই। ফ্লু মহামারীর সময় রোগীদের বিচ্ছিন্ন করে আলাদা রাখার কার্যকারিতা কম। কারণ রোগী নিজে অসুস্থ হওয়ার আগেই অন্যদের মাঝে রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে এ রোগে।

রস তার মশকীয় তত্ত্ব প্রকাশের এক শতাব্দীর মাঝেই এ ধরনের গবেষণা বিভিন্ন মহামারীর বিশ্লেষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বজনীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা মহামারীর মতো নতুন রোগের মুখোমুখী হয়ে আমরা এ ধরনের গাণিতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখতে পারি এ রোগটির পুনরুৎপাদন সংখ্যা কত। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে কিছু কিছু জায়গায় এ রোগের পুনরুৎপাদন সংখ্যা ২ এর কাছাকাছি। তাই এই রোগটি সূচকীয় হারে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

মহামারীকে একটি গতিশীল,পরিবর্তনীয় ব্যবস্থা হিসেবে চিন্তা করা যেতে পারে। তাহলে মহামারীর বিরুদ্ধে সাম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আমরা মূল্যায়ন করতে পারবো। যেমন আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাজ্য নতুন একটি গাণিতিক মডেলের উপর ভিত্তি করে শিশুদের টিকা দেবে।

গবেষকরা এর আগে দেখেছেন বিভিন্ন বয়সী ব্যক্তিদের ভিন্ন সমন্বয়ে টিকা দিলে কী হয়,আর জনপুঞ্জের কেবল নির্দিষ্ট অংশকে টিকা দিলে কী হয়। গবেষণার ফলাফল বলছে বয়সে ছোট ও বৃদ্ধদের লক্ষ্য করে টিকা দেওয়াই হলো শ্রেয় পদ্ধতি;এর মাধ্যমেই ইনফ্লুয়েঞ্জার অসুস্থতা কমানো যাবে।

মহামারীর বিভিন্ন অবস্থার পূর্বাভাস দিতে পারাটাই গাণিতিক মডেলগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী দিকের মাঝে অন্যতম। এসব মডেল ব্যবহার করে মহামারী নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা তুলনা করতে পারি।

আমরা যদি অনেকগুলো পদ্ধতি মহামারীর সময় প্রয়োগ করে তার ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত নেই কোনোটি ভালো,তাহলে অনেক বেশি সময় চলে যাবে সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই। ততক্ষণে হয়তো ভুল পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে মহামারী ছড়াবে আরো বেশি। তবে এখন আমরা গাণিতিকভাবে দ্রুত পরীক্ষা করতে পারি কোন পদ্ধতিটি মহামারী মোকাবেলায় সবচেয়ে ভালো কাজে দেবে;আর সেই পদ্ধতিই বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারি।

ধন্যবাদ রোনাল্ড রস ও তার উত্তরসূরীদের। আমাদের এখন জমে থাকা পানিটার ট্যাঙ্কি উল্টিয়ে অপেক্ষা করে দেখতে হয় না মহামারী প্রতিরোধে সেটা ভালো উপায় কিনা।

[এ লেখাটি The Calculus of Contagionর ভাষান্তর]

অন্যান্য তথ্যসূত্র:

১) Malaria, mosquitoes and the legacy of Ronald Ross: http://www.who.int/bulletin/volumes/85/11/04-020735/en/

২) Ross and the Discovery that Mosquitoes Transmit Malaria Parasites: http://www.cdc.gov/malaria/about/history/ross.html

feature image: tuasaude.com

প্রোগ্রামিং- কেন শিখবো? কীভাবে শিখবো?

একটি সমস্যা দিয়ে শুরু করা যাক। ধরুন আপনাকে বলা হলো ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যার যে ক’টি সংখ্যা ৩ দিয়ে ভাগ করা যায় সেগুলোর যোগফল কত তা বের করতে। কাজটা কিন্তু খুবই সহজ, কারণ ১ থেকে ১০ এর মধ্যে ৩ দিয়ে ভাগ যায় ৩, ৬ ও ৯। এদের যোগফল ১৮। এটা সমাধান করতে যে আপনার এক মিনিটের বেশি লাগবে না সেটা নিশ্চিত। কিন্তু যদি বলা হয় ১ থেকে ১০০০ পর্যন্ত যে সংখ্যাগুলো ৩ অথবা ৫ দিয়ে ভাগ যায় তার যোগফল বের করতে, তাহলে কিন্তু আপনি একটু ঝামেলায় পড়ে যাবেন। কারণ এবার আপনি একটি একটি সংখ্যা নিয়ে যাচাই করতে গেলে কিন্তু অনেক সময় লেগে যাবে।

ঠিক এখানে আপনার দরকার একটি গণকযন্ত্র বা, কম্পিউটার। আপনি যদি কম্পিউটারকে বলেন ১ থেকে ১০০০ এর মধ্যে যে সংখ্যাগুলো ৩ দিয়ে ভাগ করা যায় তাদের আলাদা করে রাখো এবং শেষে সবগুলো যোগ করে উত্তরটা বলো, তাহলে এক সেকেন্ডেই আপনি উত্তর পেয়ে যাবেন।

এই যে নির্দেশনা দিচ্ছেন এর জন্য তো আর কম্পিউটারকে বাংলায় বলে বোঝাতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনাকে বিশেষ ভাষা ব্যবহার করে একটি প্রোগ্রাম লিখতে হবে। অর্থাৎ প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করতে হবে। এখানেই কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা, এখানেই প্রোগ্রামিং ভাষার গুরুত্ব। এগুলো দিয়ে আমরা অনেক বড় বড় হিসাবের কাজ দ্রুত করিয়ে নিতে পারি।

এবার তাহলে উপরের সমস্যাটা নিয়েই এগোনো যাক। প্রোগ্রাম লিখে এখন আপনি ১ থেকে ১০০০ এর মধ্যে যে সংখ্যাগুলো ৩ দিয়ে ভাগ যায় সেগুলোকে আলাদা করবেন। সেক্ষেত্রে আপনাকে একটি লুপ বা ঘূর্ণি চালাতে হবে, যেটা বার বার ঘুরে ঘুরে একই নির্দেশনা সম্পাদন করবে। এই লুপের ভেতর একটি চলকের মান ১ থেকে শুরু করে ১০০০ পর্যন্ত যাবে এবং প্রতিবার ঘোরার সময় চলকটিকে ৩ দ্বারা ভাগ করা হবে। যদি ভাগশেষ শূন্য হয় তাহলে সংখ্যাটিকে আপনি আরেকটি চলকের সাথে যোগ করবেন। সেক্ষেত্রে আপনার কোডটির ধরন হবে অনেকটা এরকম-

x = 0
for i in range(0,1000):
    if i%3==0:
        x = x + i

print(x)

এখন এটুকু যদি আপনি বুঝতে পারেন তাহলে যেকোনো প্রোগ্রামিং ভাষাতেই তা লিখে আপনি সমস্যাটির সমাধান করতে পারেন। এখানে প্রথম x = 0 দিয়ে আসলে একটি চলক ধরে নেয়া হয়েছে (declare করা হয়েছে) এবং তার মান ধরা হয়েছে শূন্য। এবার একটি for লুপ চালানো হয়েছে যেখানে ‘i’ নামের আরেকটি চলক রয়েছে যার মান লুপের ভেতর ০ থেকে ১০০০ পর্যন্ত যাবে এবং প্রতি ধাপে এটি i এর যে মান থাকবে তাকে ৩ দিয়ে mod করে দেখবে যে ভাগশেষ ০ থাকে কিনা। যদি(if) ভাগশেষ ০ হয় তাহলে i এর মান x এর সাথে যোগ করবে। এবং প্রোগ্রাম শেষে x এর মান আপনার স্ক্রিনে print করে দেবে (স্ক্রিনে দেখিয়ে দেবে)।

সমস্যাটা এখানেই সমাধান হয়ে গেল, তাই তো? কিন্তু এখানে আরো একটি মজার ব্যাপার আছে। দেখুন, তো ০ থেকে ১০০০ পর্যন্ত লুপ চালানো ছাড়াই আপনি সমস্যাটা সমাধান করতে পারেন কিনা!

প্রথমে দেখুন ১ থেকে ১০ পর্যন্ত আমাদের যোগফল এরকম আসবে-

18 = 3 + 6 + 9

একে এরকমও লেখা যায়-

18 = 3(1+ 2 + 3)

এক্ষেত্রে আপনি কিন্তু একটা সিরিজ n সংখ্যক সংখ্যার একটা বীজগাণিতিক সিরিজ পাচ্ছেন। ১০০ এর ক্ষেত্রে এই সিরিজটা হবে এরকমঃ
3(1+2+3+4+…+33)

এ ধরনের সিরিজের যোগফল কিন্তু আপনি সহজেই এই সূত্র দিয়ে বের করতে পারবেন-

$latex \displaystyle \large S_{n}=\frac{n(n+1)}{2}$

সেক্ষেত্রে কিন্তু আপনাকে লুপ না চালিয়ে এই সূত্র আপনার প্রোগামে বসিয়ে নিমিষেই কাজটা করে ফেলতে পারছেন। এর একটা সুবিধা আছে। প্রতিবার লুপ চালাতে একটা নির্দিষ্ট সময় খরচ করা লাগে। তাই লুপ ঘোরার পরিমাণ বেশি হলে সময়টাও বেশি লাগবে। ছোট খাটো কাজের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আপনার চোখে পড়বে না। কিন্তু এই সমস্যাটির সীমা যদি ০ থেকে ১০০,০০০,০০০ এর মধ্যে হয়? তখন আপনি লুপ দিয়ে আপনার বাসার কম্পিউটারে সমাধান করতে গেলে সময়ের ব্যাপারটি চোখে পড়বে। এখানে গাণিতিক সূত্র প্রয়োগ করে যে আমরা এই সময়সীমা কমিয়ে আনলাম একে বলে Optimization। এটাও একজন দক্ষ প্রোগ্রামারের লক্ষ্য।

কোন প্রোগ্রামিং ভাষা দিয়ে শুরু করবো? image source: wikihow.com

প্রোগ্রামিং শেখার শুরুতে অনেকে এই ভেবেই কূল পায় না যে, কোন ভাষা দিয়ে শুরু করবেন। Java, C++ নাকি Python? আবার যারা C দিয়ে শুরু করেন তাদের মনে আবার খচ খচ করতে থাকে – “C++ তো আরও আধুনিক বা, আপগ্রেডেড, ওটা দিয়ে শুরু করলে ভালো হত না?”। আসল কথা হলো, আপনি যেকোনো একটা দিয়ে শুরু করতে পারেন। কিন্তু দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার জন্য আসলে আগে প্রয়োজন আপনি একটি সমস্যাকে কীভাবে দেখেন। একটি সমস্যা প্রোগ্রামিং করে সমাধানের আগে সেটা আসলে আমাদের চিন্তার জগতে সমাধান করা লাগে। সেই চিন্তাটাই যদি আপনি না করতে পারেন তাহলে চার পাঁচটা প্রোগ্রামিং শিখেও আপনি খুব একটা দক্ষ প্রোগ্রামার হতে পারবেন না।

মূলত প্রোগ্রামিংয়ের বেসিক যে ধারণাগুলো শেখার দরকার হয় সেগুলো হলো- চলক (variable), শর্তমূলক নির্দেশনা (conditional program), লুপ, ডাটা স্ট্রাকচার এবং লাইব্রেরি। এই পাঁচটি ধারণা আপনি ধরতে পারলে যেকোনো প্রোগ্রামিং ভাষাই আপনি রপ্ত করে নিতে পারবেন।

প্রোগ্রামিং-এর মৌলিক ধারণা

একটি প্রোগ্রামিং ভাষা পারলে অন্য যেকোনোটির মূল কথা বুঝতে আপনার সময় লাগবে মাত্র দুই দিনের মতো। ইন্টারনেটে প্রোগ্রামিং বিষয়ক উপকরণের অভাব নেই। বাংলা ভাষাতেও প্রচুর তথ্য যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু তার আগে আপনাকে চিন্তা করাও শিখতে হবে। সেক্ষেত্রে আপনি একটি ভাষা শিখে সেটি দিয়ে অনলাইনে কিছু প্রোগ্রামিং সমস্যার সমাধান করতে পারেন। সেক্ষেত্রে Hackerrank, UVa, URI এই তিনটি ওয়েবসাইট‎ শুরু করার জন্য ভালো।

কিছু প্রশ্ন

১. প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হওয়ার জন্য কতগুলো সমস্যার সমাধান করবো?

অনেকে হয়তো লেখার প্রথম অংশে সমস্যা সসমাধানের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে গেছেন। আপনি হয়তো একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যে প্রোগ্রামিংটা দ্রুত শিখে ফেলে ডেক্সটপ বা স্মার্টফোনের জন্য  দারুণ দারুণ এপ্লিকেশন বানাতে চান। সেজন্য সমস্যাকে ইতিবাচক দিক থেকে গ্রহণ করতে হবে।

আপনি যদি ডেক্সটপ এপ্লিকেশন (অ্যাপ) বানাতে চান সেক্ষেত্রে C++ বা Python শিখতে পারেন। Python শেখার সুবিধা হলো, এটি শেখা সহজ এবং এখনকার সময়ে অনেক জনপ্রিয়। আর মোবাইল App বানাতে চাইলে আপনাকে Java শিখতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও দক্ষভাবে প্রোগ্রাম লিখতে গেলে আগে থেকে কিছু সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা থাকা ভালো। এতে আপনার প্রোগ্রামিং দক্ষতা যেমন বাড়বে, বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করার ধৈর্য্যও বাড়বে। কিন্তু প্রতিযোগী প্রোগ্রামার না হলেও চলবে। প্রোগ্রামিং সমস্যার সমাধান করা আসলে প্রোগ্রামারদের কাছে একটা খেলার মতো।

২.প্রোগ্রামিং শেখার জন্য খুব বেশি করে গণিত শেখা দরকার কি?

অন্তত স্কুল লেভেলের গণিত ভালোভাবে জানা থাকলেই ভালো। আসলে গণিত একটি হাতিয়ার যেটি আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে আমাদের কাজ সহজ করে ফেলতে পারি। উপরে যেমনটি দেখালাম, একটি সূত্র ব্যবহার করে আমরা কীভাবে একটি প্রোগ্রামকে সহজ বা সরল করে ফেললাম। এর জন্য আপনাকে সব সময় জানার দরকারও পড়বে না সূত্রটা ঠিক কীভাবে এলো। আপনাকে মূলত জানতে হবে গণিত কীভাবে এবং কোথায় ব্যবহার করতে হয়। আমাদের দেশে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গণিতকে আনন্দের সাথে শেখানো হয় না। তাই দেখা যায় গণিত নিয়ে অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করে।

৩. বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং শিখবো কোথায় থেকে?

এখন এদেশে অনেকেই বাংলায় ব্লগ লেখে। প্রোগ্রামিং যারা করে তারাও লিখছে খুব। তাই বাংলাতে প্রোগ্রামিং বিষয়ক রিসোর্স খুব দ্রুতই সমৃদ্ধ হচ্ছে। গুগল করলেই অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। C দিয়ে শুরু করার জন্য সুবিনের ব্লগ দেখতে পারেন। এছাড়া বাংলায় অনেক বই আছে প্রোগ্রামিং-এর উপর। ইউটিউবেও টিউটোরিয়াল আছে।

৪. দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার জন্য কি মেধাবী হতে হবে?

তার আগে জানতে হবে মেধাবীর সংজ্ঞা কী? আচ্ছা, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমাদের ইউনিভার্সিটিতে প্রোগ্রামিং কোর্সের শুরুতে এক বন্ধুকে দেখেছিলাম যে কিনা জীবনে প্রথমবারের মতো কম্পিউটার ধরছে। প্রোগ্রামিং কী করবে , কী-বোর্ডের কোথায় কোন অক্ষর আছে তা খুঁজতেই দিন পার হয়ে যেত। কিন্তু সে নিজের চেষ্টায় রাত জেগে জেগে অনুশীলন করে নিজের দক্ষতা এতটাই বাড়াতে সক্ষম হয়েছে যে আগে থেকে শিখে আসা শিক্ষার্থীরাও তার পেছনে পড়ে গিয়েছিল। আসলে দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার জন্য আপনাকে মেধাবী হওয়ার দরকার নেই, বরং প্রোগ্রামিং দক্ষভাবে করতে শিখে গেলে লোকজনই আপনাকে মেধাবী ডাকবে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা, ফ্লু ভ্যাকসিন এবং মহামারী প্রতিরোধের গণিত

গুজব শুনতে তো মজাই লাগে তাই না? আর মানুষের মাঝে গুজব শুনে ভালো লাগার এই বিষয় আছে বলেই চটকদার অনলাইন পত্রিকাগুলোর আজকের এই রমরমা ব্যবসা। ধরুন আপনিও এরকম একটি চটকদার গুজব শুনলেন। আপনি চাচ্ছেন না এই গুজব ছড়িয়ে দিতে। আবার নিজের মনের মাঝে চেপেও রাখতে পারছেন না। আপনি তাই শুধুমমাত্র নিজের খুব পরিচিত এবং কাছের ১ জন মানুষকে এ বিষয়ে জানালেন এবং নিজের মুখ এরপর বন্ধ করে ফেললেন। খুব বড় কোন বিষয় মনে হচ্ছে না। তাই না? কিন্তু আপনি যাকে এই গুজবটি বললেন তিনিও যদি একই নীতি অবলম্বন করেন এবং কেবলমাত্র ১ জনকে এ বিষয়ে বলার জন্য মনোস্থির করেন তাহলে? তাহলেও কিন্তু গুজবটি খুব বেশি ছড়াবে না। যদি প্রতিদিন একজন নতুন মানুষ এই গুজব শুনতে থাকে তাহলে ১ মাস পর গুজবটি ৩১ জন মানুষ জানতে পারবে (আপনিসহ)।

গুজব যেভাবে ছড়ায়; image source: unseminary.com

কিন্তু এখন যদি গুজবটি একজনকে না বলে সবাই ২ জন করে মানুষকে বলার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে? এই ছোট্ট পরিবর্তনেই কিন্তু অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। যদি প্রতিদিন নতুন যারা গুজবটি শুনছে তারা পরের দিন ২ জন করে নতুন মানুষকে গুজবটি বলে বেড়ায় তাহলে ৩০ দিন পরে পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও বেশি মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। ঠিক ঠিক হিসেব করলে সংখ্যাটি হবে ২^৩১ – ১= ২,১৪,৭৪,৮৩,৬৪৭ জন মানুষ গুজবটি সম্বন্ধে জেনে যাবে। কিভাবে একজন মানুষের বদলে দুইজন মানুষকে বলার মতো একটা ক্ষুদ্র পরিবর্তন এত বিশাল একটি প্রভাব রাখছে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের হারের মাঝে।

১ম দৃশ্যে দেখা যায়, গুজবটি প্রতিদিন মাত্র ১ জন নতুন মানুষই জানছে আর এই নতুন জানা মানুষটি পরের দিন আরেকজন নতুন মানুষকে জানাচ্ছে। প্রতিদিন তাই ১ জন মাত্র মানুষই বিষয়টা জানছে। প্রতিদিন নতুন জানা মানুষের সংখ্যার পরিবর্তনের হার একটি ধ্রুবকই থাকছে।

কিন্তু গুজবটি যদি প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ জানছে পরের দিন তার দ্বিগুন পরিমাণ নতুন মানুষ জানতে থাকে (যা আমাদের দ্বিতীয় দৃশ্যে দেখা যায়। ১ম দিন ১ জন বলে ২ জনকে, ২য় দিন এই ২জন মোট ৪ জনকে, ৩য় দিন এই ৪ জন মোট ৮ জনকে এবং এভাবেই চলছে) তাহলে গুজবটি এক্সপনেনশিয়ালি বা, সূচকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে প্রত্যেকজন যে পরের ২ জনকে বলবে তাদের আগে থেকেই এই গুজব শুনে থাকলে চলবে না এবং ধীরে ধীরে এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আপাতত এসব নিয়ে আমরা চিন্তিত নই।

কিন্তু এই যে বিশাল একটা পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে এর কারণ কি তাহলে? পুরোটাই সরলরৈখিক বৃদ্ধি এবং এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধির পার্থক্যের কারণে। একই হারে এখানে যে পরিবর্তন ঘটছে তা আসলে সরলরৈখিক পরিবর্তন। কিন্তু এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি একই হারে না বেড়ে বরং একই ত্বরণে বাড়তে থাকে। আর এটাই এক মাস পরে ৩১ জন মানুষ না জেনে গুজবটি ২০০ কোটিরও অধিক মানুষের জানার মূল কারণ।

                                                                             image source: quantamagazine.org

এই একই মডেল কিন্তু কাজ করে আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা, বিভিন্ন রোগ জীবাণু ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ।

‌ভাইরাসজনিত অসুখগুলো অনেকটাই এই গুজব ছড়ানোর মতো করে ছড়িয়ে থাকে। কেউ নিজে এই ভাইরাসের জীবাণুগুলো বহন করে এবং তা অন্য একজনের দেহেও ভাইরাস অনেকটা গুজব জানানোর মতো করে দিয়ে দেয়। দুটোর মাঝে অবশ্যই কিছুটা পার্থক্য আছে। তবে মূল কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যাবে দুটি ঘটনা প্রায় একইরকম। ভাইরাস যদি একজন থেকে প্রতিদিন মাত্র নতুন ১ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় বা, যদি প্রতিদিন নতুন ২ জনের ক্ষতি করতে সক্ষম হয় তাহলে তা ছড়ানোর পার্থক্যটাও সেই গুজব ছড়ানোর মতই হবে।

তবে রোগ জীবাণু ছড়ানোর এই বিষয়টি আবার আরো বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। জৈবিক, পরিবেশগত এবং সামাজিক বিষয়গুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। মহামারী বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই অন্যান্য প্রভাবগুলোকে বিবেচনা করে ‘মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা’ নামে একটি সংখ্যা দ্বারা একজন সংক্রামক রোগের রোগী গড়ে কতজনকে এই রোগে সরাসরি আক্রান্ত করতে পারে তা প্রকাশ করে থাকেন। এই সংখ্যাটিকে আমরা R দিয়ে প্রকাশ করতে পারি। আমাদের গুজব ছড়ানোর প্রথম ঘটনার ক্ষেত্রে R=১ ছিল। কারণ, একজন মানুষ শুধুমাত্র নতুন একজনকেই গুজবটি বলছিল। এবং ২য় ঘটনার ক্ষেত্রে R=২ ছিল, কারণ ১ জন মানুষ নতুন ২ জনকে সেই গুজব সম্বন্ধে বলছিল।

পরিচিত সংক্রামক রোগগুলোর মাঝে হামের ক্ষেত্রে এই R এর মান হলো ১২ থেকে ১৮, বসন্তের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা সব রোগের ক্ষেত্রেই কিন্তু ১ থেকে অনেক বেশি। আর এ কারণেই এই রোগগুলো এত ভয়ঙ্কর। এ কারণেই এই রোগগুলো এক্সপনেনশিয়ালি ছড়িয়ে যেতে থাকে বা, যাওয়ার কথা। আর তাই পৃথিবীর উপর এই রোগগুলোর বেশ প্রভাব রয়েছে। তবে সংক্রামক অসুখের এই এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধি কি কোনোভাবেই কমানো সম্ভব নয়? এটাকে কোনোভাবেই সরলরৈখিক বৃদ্ধিতে পরিণত করা যায় না? R এর মান কি কোনোভাবেই ১ এ নামিয়ে আনা যায় না?

আর এসব প্রশ্নের উত্তরেই ভ্যাকসিনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। ভ্যাকসিন দেয়া হলে মানুষ এসব রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। যদিও এই সাফল্যের হার এদিক ওদিক একটু পরিবর্তন হয়, কিন্তু আমরা আমাদের সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি যাকে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সে সেই রোগ থেকে ১০০% মুক্ত থাকবে। এভাবে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী সরাসরি নিজের লাভ করছে নিজেকে রোগ থেকে বাঁচিয়ে। তবে মজার বিষয় সে শুধু নিজের লাভই করছে না, পরোক্ষভাবে গোটা মনুষ্যজাতিরই এক বিশাল উপকার করছে। যদি কোনো এলাকার অনেক মানুষ কোনো রোগের ভ্যাকসিন গ্রহণ করে তবে সেই রোগটি তেমন আর ছড়াতেই পারে না।

এভাবেই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যার মান ১ এ নামিয়ে আনা যায়। আর এই কাজ করতে কতজন মানুষকে কোনো একটি রোগের ভ্যাকসিন প্রদান করতে হবে? চলুন সেই হিসেবটিই করা যাক।

এক্ষেত্রে আমরা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি নিয়ে কাজ করব। ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য আমরা ধরে নিলাম R এর মান ২ এর সমান। ধরে নেই ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত কোনো একজন ১০ জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে।

                                                                               image source: quantamagazine.org

অর্থাৎ, ১ জন থেকে ১০ জনেরই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু, যেহেতু, R=২, আমরা ধরে নিতে পারি এদের মাঝে শুধুমাত্র ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে।

                                                                          image source: quantamagazine.org

যার অর্থ প্রত্যেকজনের ২/১০ বা, ২০ শতাংশ করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন ধরা যাক, এই ১০ জনের মাঝে ২ জনকে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া আছে। কিন্তু বাকি ৮ জনের কিন্তু এখনো ২০% করে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই গেলো। তার মানে এখন এই ১০ জনের মাঝে ০.২ x ৮= ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হবে। 

সুতরাং, দেখা গেলো কাউকেই ভ্যাকসিন না দিলে ১০ জনের মাঝে ২ জন ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত হয়, কিন্তু ১০ জনের মাঝে ২ জনের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ১০ জনের মাঝে ১.৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়। সুতরাং, ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে R এর মান ২ থেকে কমে ১.৬ এ নেমে আসল। তাহলে কিভাবে আমরা এই R এর মান ১ এ নামিয়ে আনতে পারি?

ধরি, ১০ জনের মাঝে অজানা ‘ক’ সংখ্যক জনের এই রোগের ভ্যাকসিন আগে থেকেই দেয়া ছিল। সুতরাং, আগের হিসেবের মতই ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে আক্রান্ত হবে o.২ x (১০-ক) জন। R=১ এর জন্য, o.২ x (১০-ক)=১ সমাধান করে আমরা পাই, ক=৫ জন। অর্থাৎ, ১০ জনের মাঝে ৫ জনের পূর্ব থেকেই ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি আর এক্সপনেনশিয়ালি না বেড়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

এখন এই গাণিতিক হিসেবটিকে আরেকটু এগিয়ে নেয়া যাক। যদি আমরা ধরে নেই কোনো একটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তার রোগ বহনের সময়কালে N জন নতুন মানুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে প্রত্যেকের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা (R/N)। অর্থাৎ, R=২ এবং N=১০ হলে, R/N=০.২, যা ইনফ্লুয়েঞ্জার উপরের উদাহরণে আমরা দেখেছি। কিন্তু যদি এই N সংখ্যক মানুষের  মাঝে ‘ক’ সংখ্যক মানুষের ঐ রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকে তাহলে সেই N সংখ্যক মানুষের মাঝে এই রোগে আক্রান্ত হবে R/N(N-ক) জন। আমরা চাই গুজবের মতো এক্ষেত্রেও ১ জন শুধুমাত্র নতুন ১ জনকেই রোগে আক্রান্ত করুক। সুতরাং, আমাদের সমীকরণটি দাঁড়াবে, R/N(N-ক)=১। এ সমীকরণ থেকে খুব সহজেই আমরা ক/N=১-(১/R) এই সমীকরণে আসতে পারি। এখানে, ক/N স্পষ্টতই N সংখ্যক মানুষ এবং তাদের মাঝে যতজন মানুষকে ভ্যাকসিন দেয়া হলে আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাব তার অনুপাত প্রকাশ করছে। আর আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য হলো রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে এক্সপনেনশিয়াল থেকে সরল রৈখিকে পরিণত করা।

হামের ক্ষেত্রে মৌলিক পুনরুৎপাদন সংখ্যা, R=১২, অর্থাৎ, ক/N= ১-(১/R)= ১-(১/১২)= ০.৯১৭ =৯১.৭%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে প্রায় ৯২% মানুষের আগে থেকেই হামের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলে এই রোগটি আর ভয়ঙ্করভাবে ছড়াতে পারবে না। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে R=২, তাই (১-১/২)= ০.৫ =৫০%। অর্থাৎ, রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে যারা আসবে তাদের মাঝে ৫০% এর ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের ভ্যাকসিন দেয়া থাকলেও রোগটি এক্সপনেনশিয়ালি না ছড়িয়ে সরলরৈখিকভাবে বাড়বে।

সুতরাং, ভ্যাকসিন নেয়া শুধু আপনার জন্যই উপকারী নয় এটি নেয়ার মাধ্যমে আপনি নিজের অজান্তেই প্রতিনিয়ত গোটা মানব সমাজের উপকার করেই চলেছেন। আমরা যারা ভ্যাকসিন নিয়েছি তারা শুধু নিজেদেরই উপকার করছি না, যারা এই ভ্যাকসিন নেয়নি তাদেরও এই রোগ থেকে নিরাপদ রাখছি। অনেকটা নিঃস্বার্থ সুপার হিরোর মতো। আর এভাবেই ভ্যাকসিনগুলো মহামারী প্রতিরোধ করছে। সুতরাং, সংক্রামক রোগগুলো না ছড়িয়ে বরং আপনার বন্ধুকে ভ্যাকসিন নেয়ার কথা বলুন। আর একজন বন্ধুকে না বলে অন্তত দুইজন বন্ধুকে বলুন। কি বলবেন তো?