কেন জন্মায় রোবটের প্রতি মায়া?

পিক্সার এনিমেশনের চমৎকার সৃষ্টি WALL-E নামের এনিমেটেড চলচ্চিত্র। এ নামে সে মুভিতে চমৎকার একটি রোবট থাকে। আদুরে রোবটটি যখন তার ভালোবাসার সন্ধানে মহাকাশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়ায় তখন সকলের মন ছুঁয়ে যায়। যদিও WALL-E এখানে নিছকই একটি রোবট কিন্তু তবুও তার সামান্য মানুষের মতো নিষ্পাপ চেহারাটি দর্শকদের মনের কোণে মানবিক অংশে স্থান করে নেয়। সাধারণ মানুষের বেলায় যেমন অনুভব করতো এই রোবটের বেলাতেও তেমনই অনুভব করে।

মজার ব্যাপার হলো দর্শক তার প্রতি হৃদয়ে যে সহানভূতি অনুভব করে তা শুধুমাত্র চলচ্চিত্রটির গল্প ও শৈল্পিকতার কারণে নয়। কয়েকজন মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, একজন মানুষকে কষ্টে দেখলে আরেকজন মানুষের মস্তিষ্কে যেসব কার্যক্রম হয়, রোবটকে কষ্টে দেখলেও মস্তিষ্কে একই রকম ঘটনা ঘটে।

জার্মানির ডুইশবার্গ এশেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক fMRI ব্যবহার করলেন ১৪ জন অংশগ্রহনকারী মানুষের উপর। তাদেরকে প্রথমে মানুষ, রোবট এবং প্রাণহীন কিছু বস্তুর ভিডিও দেখানো হলো। সেসব ভিডিওতে তাদের উপর স্নেহপূর্ণ কিংবা রূঢ় আচরণ করা হচ্ছে। fMRI ব্যবহার করে বিজ্ঞানীগণ ভিডিও দেখার পর মানুষগুদের প্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ইত্যাদি পর্যালোচনা করলেন। গবেষণা দল লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেন।

ফলাফলে দেখা যায় তারা অংশগ্রহণকারীদেরকে ডায়নোসরের মতো দেখতে Pleo নামের একটি রোবটের ভিডিও দেখান। এটিকে খাওয়ানো হচ্ছে অথবা সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। তখন দর্শকদের মস্তিষ্কের লিম্বিক অংশ কার্যকর হয়ে উঠে। এ অংশটি অনুভূতির সাথে জড়িত। আবার একইভাবে যখন তাদের মানুষের ভিডিও দেখানো হয়, যাকে ম্যাসাজ করে দেওয়া হচ্ছে, তখনো নিউরনের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই হয়।

image source: telegraph.co.uk

এবার উলটো ধরনের ভিডিও দেখানো হলো। মানুষ এবং রোবট উভয়ের সাথে বেশ রুঢ় আচরণ করা হচ্ছে এমন ভিডিও। তাদেরকে ঝাঁকানো হচ্ছে অথবা ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, fMRI তে যে ফলাফল পাওয়া গেল তা হলো, মানুষকে খারাপ অবস্থায় দেখার চেয়ে রোবটকে খারাপ অবস্থায় দেখার পর অংশগ্রহনকারীদের লিম্বিক সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া অনেক অনেক বেশি।

দেখা যাচ্ছে একজন মানুষ, অন্য মানুষ বা রোবট কিংবা উভয়ের প্রতিই সহানুভূতি অনুভব করে। আমরা এখনো ভালোভাবে জানি না এ সহানুভূতির কারণ আসলে কী।

রোবোটিক্স গবেষণায় বর্তমানে একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এমন রোবট তৈরি করা। এ ধরনের রোবট বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দেখাশোনার ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসতে পারে। কিছু সায়েন্স ফিকশনে তো রোবটের সাথে মানুষের ঘর বাঁধাও হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২ জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে রোবটের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তারা রোবটের সাথে কথা বলে, একটি নামে ডাকে, এমনকি তাদেরকে রোবটের সাথে হাসতেও দেখা যায়।

রোবটের জন্য সহানুভূতি হয়তো অনেকটা তাদের শারীরিক গঠনের উপরও নির্ভর করে। তাদের চেহারা, আচরণ, দুই পায়ে হাঁটে কিনা,  ইত্যাদি সবকিছু তাদের সাথে মানুষের স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে।

এখানে আনক্যানি ভ্যালি তত্ত্বের কথা বলা যায়। এ তত্ত্ব অনুসারে, যেসব রোবট বা অ্যানিমেশন দেখতে মানুষের মতো নয়, দর্শক তাদের কম পছন্দ করে। Roomba নামে একটি রোবটের কথা উল্লেখ করা যায়। সে ঘর সংসারের সকল কাজ করতে পারতো। একদিন সেটি আগুনে পুড়ে যায়। তার চেহারা মানুষের মতো ছিল না, কিন্তু মানুষ ঠিকই তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় চেহারা মানুষের মতো না হলেও সহানুভূতি অনুভব করে মানুষ। মানব মন তথা মানব মস্তিষ্ক বড়ই রহস্যজনক।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ডট কম

featured image: bbport.ru

স্বপ্ন : এক রহস্যময় জগত

পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে কীনা স্বপ্ন দেখে না।সব মানুষই স্বপ্ন দেখে।আবার একেকজনের স্বপ্নের ধরনও একেকরকম।আজকে একটা ভালো স্বপ্ন দেখলেন তো কালকে হয়তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখবেন।আজকে যদি দেখেন পাহাড়ে উঠে মাস্তি করতেছেন তাহলে কালকে হয়তো দেখবেন পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছেন।আজকে সালমান খানের সাথে নাচছেন তো কালকে হয়তো ভুতের তাড়া খাচ্ছেন।

এরকম প্রায় প্রতিরাতেই আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি।কোন স্বপ্ন সুখের আবার কোনো স্বপ্ন দুঃখের।স্বপ্ন নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই।স্বপ্নের ব্যাপারটা বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপরি বুঝে উঠতে পারেননি।এ নিয়ে এখনো চলছে বিস্তর গবেষণা।

স্বপ্ন কী, আমরা কেনো স্বপ্ন দেখি,আজকে এই স্বপ্ন দেখলাম তো কালকে ঐ স্বপ্ন দেখলাম কেনো,ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আমাদের মনে ঘুরপাক খায়।এই লেখাই আমরা চেষ্টা করবো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে।চলুন শুরু করা যাক।স্বপ্ন আসলে জিনিসটা কী?এটা খাই না মাথায় দেই?এই প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রথমে জানবো।আমাদের এনসাইক্লোপিডিয়া অর্থ্যাৎ উইকিপিডিয়া বলে, “স্বপ্ন মানুষের একটি মানসিক অবস্থা, যাতে মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় বিভিন্ন কাল্পনিক ঘটনা অবেচেতনভাবে অনুভব করে থাকে।”

তাহলে বুঝা যাচ্ছে যে স্বপ্ন হলো আমাদের কিছু কল্পনার সমষ্টি যা আমরা ঘুমন্ত অবস্থাই দেখে থাকি।অনেকে বলে থাকেন স্বপ্ন হলো আমাদের জীবনের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কল্পনা যা আমরা করে থাকি।ক্যালভিন এস হল ১৯৪০-১৯৮৫ পর্যন্ত ৫০ হাজারেরও বেশি স্বপ্ন সম্বন্ধীয় প্রতিবেদন সংগ্রহ করে একটি গবেষণা করেন।এই গবেষণা থেকে তিনি সিদ্বান্তে পৌছেন যে, সমগ্র বিশ্বের মানুষ প্রায় একই ধরনের বিষয় নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং প্রায় সব স্বপ্নের বিষয় গতদিন বা গত সপ্তাহের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকে।

image source: thegood.co

অনেক সময় দেখা যায় সারাদিন আমরা যে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করেছি তা নিয়েই স্বপ্ন দেখছি।এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে, মানুষ যখন কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভাবতে থাকে তখন সে ভাবনার ক্ষরিত রূপ তার মস্তিষ্কে থেকে যায়।ঘুমালেও এই ভাবনার প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে ও তা স্বপ্ন হিসেবে প্রকাশ পায়।

তো কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি?এটা খুবই কমন প্রশ্ন যে কেনো আমরা স্বপ্ন দেখি।কিন্তু এর উত্তরটা প্রশ্নের মতো এতটা সহজ নয়।কারণ স্বপ্ন নিয়ে গবেষনা এতটা সহজসাধ্য নয়।স্বপ্ন দেখার কারণ সম্বন্ধে কয়েকটি হাইপোথিসিস রয়েছে।যেমনঃ আমরা স্বপ্ন দেখি আমাদের অজানা ইচ্ছা ও চাওয়া গুলোকে জানার জন্য।আবার অনেকের মতে স্বপ্ন ঘুমের REM (Rapid Eye Movement) স্তরে মস্তিষ্কের অতি সক্রিয়তার কারণে হয়ে থাকে।

স্বপ্ন আমাদের অনেকের ভয়ের কারণ হয়েও দাড়ায়।কারণ আমরা অনেক সময় বিভিন্ন ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে থাকি।তবে এই স্বপ্নের কারণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারও হয়েছে।পর্যায় সারণির মূল ভিত্তিটা এসেছে স্বপ্নের মাধ্যমে।পর্যায় সারণির উদ্ভাবক দিমিত্রি ইভানোভিচ মেন্ডেলিফ একদিন পর্যায় সারণি নিয়ে গবেষণা করতে করতে তার ডেস্কেই ঘুমিয়ে পড়েন।তখন তিনি স্বপ্নে মৌলগুলোর বিন্যাস কৌশল দেখতে পান।

ঘুম ভাঙার পর তিনি তা একটি কাগজে লিখে ফেলেন।এটারই সংশোধিত রূপ আজকের পর্যায় সারণি।এ সম্বন্ধে মেন্ডেলিফ বলেন, ‘স্বপ্নে আমি দেখলাম একটা ছকে সবগুলো উপাদান জায়গামতো বসে যাচ্ছে এবং ঘুম ভাঙার সাথে সাথে একটি কাগজে আমি তা লিখে ফেলি’।

আবার বেনজিন চক্রও এসেছিল স্বপ্নের মাধ্যমে।১৮৬৫ সালে বিজ্ঞানী অগাস্ট কালকুলেল গবেষণা করতে করতে তার চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েন।স্বপ্নে তিনি দেখতে পান একটি সাপ চক্রাকারে ঘুরছে ও নিজের লেজ খেয়ে ফেলছে।সাপটির গায়ে তিনি কার্বন ও হাইড্রোজেনের সঠিক অনুপাত দেখতে পান।ঘুম ভাঙার পর এ থেকেই তিনি বের করে ফেলেন বেনজিন চক্র।

image source: dreams.co.uk

বিখ্যাত গণিতবিদ রামানুজান আচার্য দাবি করেন তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে গণিতের নতুন নতুন সুত্র পেয়ে যেতেন।তিনি বলেন, ‘ঘুমানোর সময় আমার অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়।আমি দেখছিলাম রক্তে বয়ে যাওয়া লাল একটি পর্দা যাতে হঠাৎ করে একটি হাত এসে লেখতে শুরু করলো।হাতটি উপবৃত্ত সম্পর্কিত কিছু যোগজও লিখলো।জেগে উঠার পর যত দ্রুত সম্ভব আমি তা একটি কাগজে লিখে ফেললাম’।

এরকমভাবে আমরা স্বপ্নে অনেক সময় অনেক কিছু দেখে থাকি যা আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত।সেসব স্বপ্নের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও হয়ে থাকতে পারে।

স্বপ্ন মানুষের কাছে সবসময়ই রহস্যময়।এ নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ সবসময়ই প্রকট ছিল।আগে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা তেমন একটা করা যায়নি।তবে বর্তমানে বিভিন্ন সুবিধার কারণে স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা খুবই দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।আশা করা যায় খুব দ্রুতই আমরা স্বপ্নের রহস্য উদঘাটন করতে পারবো।

আজকে এই পর্যন্তই।সবাই ভালো থাকবেন এবং জিরো টু ইনফিনিটির সাথেই থাকবেন।

তথ্যসুত্রঃ ১) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dream

২) https://bn.m.wikipedia.org/wiki/স্বপ্ন

৩) https://www.medicalnewstoday.com/articles/284378.php

৪) https://psychologytoday.com/blog/sleep-newzzz/201501/why-we-dream-what-we-dream

৫) https://www.roarbangla.com/tech/science/the-deduction-of-dream/

featured image: viralnovelty.net

খাবার কেন পচে?

খাদ্য যে খাওয়ার অযোগ্য বা নষ্ট হয়ে গেছে তা খাবারের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ প্রভৃতি দেখে সহজেই আঁচ করা যায়। কোনো খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়, কোনোটা আবার অনেকদিন ভালো থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই ঘটে। কেন হচ্ছে এরকম পচনশীলতার তারতম্য? বুঝতে হলে চিনতে হবে সৃষ্টির সেই অংশকে যাদের একটি বড় অংশ আমাদের খালি চোখে সাধারণত দৃশ্যমান নয়।

বিভিন্ন অণুজীব খাবার নষ্টের জন্য দায়ী। খাবারে যেসব পুষ্টি উপাদান থাকে এরা সেগুলোকে ভেঙ্গে ফেলে ছোট ছোট অংশে। এসব খাবারের ক্ষুদ্রাংশ সহজেই তাদের কোষ প্রাচীরের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এতে খাবারের স্বাভাবিক গঠন আর আগের মতো থাকে না। এ প্রক্রিয়ার ফলে যেসব উপজাত তৈরি হয় সেগুলোই মূলত দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং খাবারকে বিস্বাদ করে একেবারেই খাওয়ার অনুপযোগী করে তোলে।

অণুজীবগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক (ঈস্ট, মোল্ড) ইত্যাদি। খাবারে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে মোল্ড। মোল্ডের সূক্ষ্ম শাখাতন্তু হাইফির বর্ধিষ্ণু অগ্রভাগে একপ্রকার এনজাইম তৈরি হয় যা সেলুলোজ বা স্টার্চ এর মতো মজবুত অণুকে ভেঙ্গে কম মজবুত নরম পদার্থে রূপান্তর করে। খাবারের গায়ে বা ওপরে যে দাগ এবং স্তর দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে জালের মতো পরষ্পর সংযুক্ত বৃহৎ হাইফি কলোনি, যা খাদ্য দ্রব্যের পৃষ্ঠদেশের উপরে থেকে বেড়ে চলে।

ঈস্ট এবং ব্যাকটেরিয়াও খাবার নষ্টের ব্যপারে কম যায় না। খাবারের বারোটা বাজাতে ঈস্ট বেছে নেয় গাঁজন প্রক্রিয়া। আচারের উপর আমরা যে শুকনো স্তর জমতে দেখি তা মহামান্য ঈস্টেরই কাণ্ড। বিভিন্ন স্পোর এবং নন-স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়াও খাদ্যকে অখাদ্য বানাতে কম ভূমিকা রাখে না।

কিছু কিছু খাবার যেমন- দুধ, মাংস, মাছ প্রভৃতি খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ফল, শস্য এবং সবজি অনেকদিন ভালো থাকে। এর কারণ হলো অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য পূরণ হওয়া চাই কিছু শর্ত- সঠিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, পুষ্টি, খাদ্যদ্রব্যের ভেদ্যতা ইত্যাদি। ৪০-১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা অণুজীবের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। কিছু কিছু ফল বা সবজির বহিরাবরণ অণুজীবের জন্য দুর্ভেদ্য। তাই সেগুলো দেরিতে পচে। আবার খাবারে পানির পরিমাণ বেশি হলে সেটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কেননা এ পানিকে অণুজীব তাদের অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার রসদ হিসেবে ব্যবহার করে।

শুকনো শস্য বা খাবারে পানি কম থাকায় সেটি অনেক দিন ভালো থাকে। অনুরূপভাবে অক্সিজেনের উপস্থিতি পচনকে ত্বরান্বিত করে। শুষ্ক ফল ও উচ্চমাত্রায় চিনি বা লবণযুক্ত খাবার অনেকদিন ভালো থাকে। কেননা শুষ্ক ফলে পানি খুবই কম থাকে আর উচ্চমাত্রার চিনি, এসিড কিংবা লবণযুক্ত খাবারে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় অণুজীবের কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করার কারণেই ৫ হাজার বছর পুরনো মিশরীয় ফারাওয়ের পিরামিড থেকে আবিষ্কৃত মধু অদ্যাবধি অক্ষত আছে!

খাবার পচানোর একচ্ছত্র অধিপতি কিন্তু অণুজীব নয়, খাদ্যের ভেতরের এনজাইমসমূহের নানা কার্যক্ষমতাও খাবার পচাতে ভূমিকা রাখে। যেমন- কলা কেটে রাখলে তার সাথে বাতাসের অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মেলানিন, যা কলার গায়ে বাদামী রঙ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আপেল কুচির বাদামী হয়ে যাওয়ার নেপথ্যেও রয়েছে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া।

এতক্ষণে কি দুষতে শুরু করেছেন ‘খলনায়ক’ অণুজীবদের? এই বেলা অণুজীবদের নায়কোচিত অবদানের কথা দিয়ে শেষ করছি। অণুজীবগুলোর মহান কীর্তিকলাপে খাবার নষ্ট হলেও এই অণুজীব ব্যবহার করেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু সব খাবার। দই থেকে শুরু করে সয়া সস কিংবা মুখরোচক পনির থেকে শুরু করে দামি ওয়াইন, বিয়ার সবই তৈরি হয় অণুজীবের সাহায্যে। সুস্বাদু বেকারী পণ্য থেকে শুরু করে জিভে জল আনা চকলেট তৈরিতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র

১। https://www.leaf.tv/articles/how-does-food-decompose/

২। http://www.wonderpolis.org/wonder/why-does-food-rot/

৩। https://www.reference.com/food/food-rot-b4d00189173c0c70

৪। http://www.eng.buffalo.edu/shaw/student/m2_design/01_home/ksb/ KSB_S2/old_FoodSpoilage.htm

মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং যেভাবে বন্ধ করা যেতে পারে এর বিস্তার

কোন কিছু অর্জন করতে সক্ষম হলে আমাদের ভাল লাগে। প্রকৃতপক্ষে খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চা, প্রজনন কিংবা বিপদ থেকে বেঁচে ফেরা; জীবজগতে টিকে থাকার জন্য যাই করুন না কেন আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে তা করতে উৎসাহিত করবে এই “আনন্দের অনুভূতি” দিয়ে পুরস্কৃত করে।

প্রায় দুই লক্ষ বছর ধরে আধুনিক মানুষের বিবর্তনে এই প্রক্রিয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।কিন্ত এখন আমরা এসব কিছু না করেই কীভাবে (যেমন ড্রাগ নিয়ে) এই পুরস্কার পাওয়া যায় তা জেনে গিয়েছি।এই অনুভুতির সহজলভ্যতা তাই এসব কাজ বারবার করার আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,যা থেকে উৎপত্তি হয় আসক্তির।

এখন প্রশ্ন হল,এই আসক্তি আসলে কি?কেউ যদি বিনোদনের জন্য কোনো ড্রাগ(যেমন হেরোইন)নেয়,তাহলে কিছুদিন পরেই তার মধ্যে ঐ ড্রাগ নিয়মিত গ্রহণের দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষা জন্মে।ফলে ঐ ব্যক্তি তখন আর ড্রাগ না গ্রহণ করে থাকতে পারে না,তাই নিজের এবং ড্রাগের পরিমাণের উপরেও কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

দীর্ঘকাল ধরে উচ্চমাত্রায় ড্রাগ গ্রহনে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ঘটে,তখন স্বাভাবিকভাবে আনন্দিত হওয়া আর সম্ভব হয় না এবং আমাদের কোনো কিছু শেখা বা প্রেরণা পাওয়ার প্রক্রিয়াও ব্যহত হয়।“আসক্তি” বা addiction শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ addictus থেকে,যার অর্থ “বাধ্য হওয়া বা ক্রীতদাস হয়ে যাওয়া”,যা থেকে বুঝা যায় এই আসক্তি প্রকৃতপক্ষে কতটা শক্তিশালী।

আমাদের মস্তিষ্কের Limbic System,বা কেন্দ্রের একটি অংশ যা বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তাবাহক(নিউরোট্রান্সমিটার)নিঃসরণ করে বিভিন্ন নিউরনের মধ্যে সংকেত পাঠিয়ে বা কোষগুচ্ছকে সক্রিয় করে আমাদের আবেগ এবং প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে;তা আসক্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।প্রকৃতপক্ষে এরকম প্রায় ১০০টি নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে যেগুলিকে দুটি বড় শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।

১)Excitatory neurotransmitter বা উত্তেজক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা তাদের টার্গেট কোষসমূহকে উত্তেজিত করে তোলে(যেমন এন্ডোরফিন শ্রেণীর নিউরোট্রান্সমিটারসমূহ;যা আমরা যখন ব্যায়াম করি,ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করি বা প্রচণ্ড ব্যথা পাই তখন নিঃসৃত হয়ে পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বা ব্যথা কমিয়ে ফেলতে সহায়তা করে)।

২)Inhibitory neurotransmitter বা দমনমূলক নিউরো-ট্রান্সমিটার,যা টার্গেট কোষসমূহকে শান্ত করে(যেমন সেরোটনিন;যা আমাদের মুড,খাওয়ার রুচি এবং ঘুমের সাইকেল নিয়ন্ত্রণ করে।)

এখন মানবমস্তিষ্কের Limbic System ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক বা নিউরোট্রান্সমিটার সিরেব্রালকর্টেক্স এর নিচে “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”নামক স্থানে(যেখানে অনেকগুলি নার্ভকোষ রয়েছে) নিঃসরণ করলে আমরা আনন্দ অনুভব করি।আমাদের আনন্দের সাথে জড়িত বলে এই “নিউক্লিয়াস একাম্বেন্স”কে স্নায়ুবিজ্ঞানিগন Reward Centre of Brain বা “মস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্র” হিসেবে অভিহিত করেন।

চিত্রঃ৩,৪-ডাইহাইড্রক্সিফিনইথাইলঅ্যামিন বা ৪-(২-অ্যামিনোইথাইল)-বেনজিন-১,২- ডাইঅল,সাধারণভাবে যা ডোপামিন নামে পরিচিত।এটি মানবদেহে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্বাস করে যে একটি কাজ মনে রাখা খুব জরুরি তখন তা ডোপামিন নিঃসৃত করে।এই নিউরোট্রান্সমিটার আমাদের আনন্দের অনুভূতি,কোন কিছু মনে রাখা,নতুন কিছু শেখা এবং বিপদের মুখোমুখি হলে বাঁচার চেষ্টা করা প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত।তাই ডোপামিনের নিঃসরণে আমরা যে উত্তেজনা অনুভব করি তা প্রকৃতপক্ষে আমাদেরটিকে থাকার জন্য উদ্দীপ্ত করে।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কিন্ত এই ডোপামিনই আসক্তির জন্য অনেকাংশে দায়ী।নিকোটিন থেকে শুরু করে হেরোইন পর্যন্ত সকল আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগই আমাদের মস্তিষ্কের নিউক্লিয়াস একাম্বেন্সে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,ফলে আমাদের কিছু না করেই অস্বাভাবিক এবং দ্রুত পরিতৃপ্তি অর্জন করা সম্ভব হয়।এসময় সাথে সাথে হিপোক্যাম্পাস অংশও উদ্দীপ্ত হয় ফলে এ অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্ক স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারে। আর সবশেষে অ্যামিগডালায় তার জন্য একটি প্রতিক্রিয়া (তীব্র আকাঙ্ক্ষা)সৃষ্টি হয়।

এখন বিজ্ঞানীগণ মনে করেন ডোপামিন প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করে,কারণ কোনো কাজ করলে যদি তা নিঃসরিত হয় তবে মানুষ ঐ কাজ বারবার করতে উদ্ভুদ্ধ হয়। সুতরাং ডোপামিন নিঃসরণের সাথে আনন্দ অনুভবের সম্পর্ক থাকলেও তা যে তীব্র আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে,সম্ভবত সেকারণেই ড্রাগে আসক্ত মানুষ আর পরিতৃপ্তি না পেলেও নেশা চালিয়ে যায়।

এখন ডোপামিন নিঃসরণের ফলে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় বিধায় পুনরায় ভারসাম্য আনার জন্য মস্তিষ্ক বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।তাই দীর্ঘদিন কোনো নির্দিষ্ট ড্রাগ ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক নিউরোট্রান্সমিটার বা টার্গেটকোষে তার গ্রাহক বা রিসেপ্টর সংখ্যা কমিয়ে ফেলে,যার জন্য প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উদ্দীপনা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে যা Hypo-Reward System নামে পরিচিত।এজন্য ড্রাগ ব্যবহারকারীর আনন্দ অনুভবের ক্ষমতা কমে যায়,তাই সে ধীরে ধীরে বিষণ্ণ ও হতাশ হয়ে পড়ে।

স্বাভাবিকভাবে যা তাকে আনন্দ দিত তাতে আর সে খুশি হয় না এবং তাই ড্রাগের পরিমাণ বাড়িয়ে ফেলতে হয় শুধু মন স্বাভাবিক করতেই,যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে;কারণ দীর্ঘদিন ব্যবহারে সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় বিধায় আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণে ড্রাগ গ্রহণ করতে হয় একইরকম পরিতৃপ্তি পেতে।অবশেষে ক্রমাগত ড্রাগের অপব্যবহারে বিভিন্ন মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুও ঘটে যায়।

চিত্রঃমস্তিষ্কের পুরষ্কার কেন্দ্রকে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন ড্রাগ-আসক্তি আমাদের মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডকে দুই উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে-:

১)তারা এক বা দুইটি প্রাকৃতিক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের হতে পারে বা

২)তারা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় কিংবা তাদের পুনঃশোষণ বাধাগ্রস্ত করে।

এখন হেরোইন কিংবা অন্যান্য অপিয়েট যেমন মরফিন বা কোডিন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগসমূহের অন্যতম এবং তাদের গঠন এন্ডোরফিনের অনুরূপ।তাই তারা এন্ডোরফিনের জন্য নির্দিষ্ট করা স্নায়ুকোষের বিভিন্ন রিসেপ্টরের সাথে বিশাল সংখ্যায় যুক্ত হয়,ফলে এন্ডোরফিনের ব্যাথানাশক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং মনে তীব্র আনন্দের বা ইউফোরিয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,মৃদু থেকে তীব্র ব্যাথায় এইসকল অপিয়েট ব্যবহৃত হয়;বিশেষ করে মরফিন, হাইড্রোকোডিন (প্যারাসিটামল বা অ্যাসপিরিনের সাথে একত্রে “ভাইকোডিন” নামে)এবং ক্ষেত্রবিশেষে হেরোইন কোনো অপারেশনের পরে ব্যাথা কমাতে রোগীকে দেওয়া হয়।

চিত্রঃ কোডিন চিত্রঃ হেরোইন চিত্রঃ হাইড্রোকোডিন চিত্রঃ মরফিন

অন্যদিকে,নিকোটিন এর গঠন অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ। এর জন্যও প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয় যা পুনরায় সিগারেট এর জন্য আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করে।এটি একই সাথে গ্লুটামেট নামক আরেকটি উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটার নিঃসরণ করে যা স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং তাই তা এই সিগারেট গ্রহণের অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

তৃতীয়ত,তা GABA নামক একটি দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারও এতই অত্যাধিক পরিমাণে নিঃসরণ করে যে ২০ মিনিটের মধ্যে GABA এর রিসেপ্টরগুলো খুবই কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে,তাই মস্তিষ্ক নিজে থেকে প্রস্তুত করলেও কোনো প্রভাব পড়ে না।এসকল কারণেই ধূমপান ছেড়ে দেওয়া বেশ কঠিন।

চিত্রঃ নিকোটিন

এলকোহল (Ethanol, CH3CH2OH) মূলত মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট করে যার ফলে ব্রেন আর শরীরের একসাথে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার,(যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন)এবং একইসাথে দমনমূলক নিউরোট্রান্সমিটারের(যেমন সেরোটোনিন)জন্য নির্দিষ্ট করা রিসেপ্টর এর সাথেও যুক্ত হয়।একারণেই মদ খাওয়ার সময় প্রাথমিকভাবে উচ্ছ্বসিত হলেও পরবর্তীতে মানুষ চুপচাপ হয়ে যায় এবং একইভাবে মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে যোগাযোগও ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে অধিকমাত্রায় মদ সেবন করলে মস্তিষ্ক তাই চেষ্টা করে নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় গতিশীল করতে এবং এজন্য প্রচুর পরিমাণে উত্তেজক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হতে থাকে। একারণেই মদ্যপানকারী ব্যক্তি যখন মদ খাওয়া ছেড়ে দেন তখন মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উদ্দীপক নিউরো-ট্রান্সমিটারের প্রভাবে বেশ কিছুদিন তার হাত-পা অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে থাকে,যা এলকোহলের অন্যতম প্রধান withdrawal symptom (প্রশ্ন হতে পারে,এই “উইথড্রয়াল সিম্পটম” আসলে কি?

প্রকৃতপক্ষে কোনো ড্রাগ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে দেহ-মন তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে,তাই হঠাৎ করে ছেড়ে দিলে নিজেকে আবার নতুন সমন্বয় করতে হয় এবং এজন্য ব্যবহারকারী বেশ কিছু অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়।এইটাই “উইথড্রয়াল” নামে পরিচিত।যেমন এলকোহলের ক্ষেত্রে হাত-পা এর অনিয়ন্ত্রিত কাঁপা,হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা বা অনুভব করা যা প্রকৃতপক্ষে বাস্তবে ঘটছে না ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য)।

আবার কিছু ড্রাগ রয়েছে যা Stimulant বা উত্তেজক হিসেবে কাজ করে,যেমন কোকেইন এবং বিভিন্ন অ্যাম্পফেটামিন।প্রকৃতপক্ষে আমাদের মস্তিষ্কে যখন ডোপামিন এবং অন্যান্য উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসৃত হয় তখন আমরা আনন্দিত ও একাগ্র হয়ে উঠি;যদিও কিছুক্ষণ পরেই সেগুলি পুনঃশোষিত হয়ে যায় বিধায় মস্তিষ্ক স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে।এতক্ষণ যেসকল ড্রাগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলি মূলত বিভিন্ন উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অনুরূপ গঠনের বিধায় ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায়।

কিন্ত Stimulant সমূহ উদ্দীপক নিউরোট্রান্সমিটারের অত্যাধিক নিঃসরণের পাশাপাশি তাদের পুনঃশোষণেও বাধা দেয়।যেমন কোকেনের প্রভাবে ডোপামিন এবং নোরেপিনেপফ্রিন(যার গঠন অ্যাড্রেনালিন এর অনুরূপ)এর শোষণ বাধাপ্রাপ্ত হয়,তাই “কোক” ব্যবহারকারী অত্যাধিক আনন্দ এবং কর্মশক্তি অনুভব করবে।কিন্ত এদের অত্যাধিক পরিমাণে মস্তিষ্ক দ্রুতই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাই স্বাভাবিক উপায়ে খুশি বা কর্মক্ষম হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চিত্রঃকোকেন চিত্রঃনোরেপিনেফ্রিন বা (R)-৪-(২-অ্যামিনো-১-হাইড্রক্সিইথাইল)বেনজিন১,২-ডাইঅল
চিত্রঃঅ্যাড্রেনালিন।লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নোরেপিনেপফ্রিনের অ্যামিনো গ্রুপের একটি -H কে -CH3 দ্বারা প্রতিস্থাপিত করলেই এই নিউরোট্রান্সমিটার পাওয়া যায়।

আবার অ্যাম্পফেটামিন বিভিন্ন স্নায়বিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকলেও এটি আসক্তি-সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে।বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে MDMA বা Ecstasy, মেথাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথসহ আরও অনেক অ্যাম্পফেটামিন-জাতক (Derivative) দিয়ে নেশা করা হচ্ছে যেগুলির চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো ব্যবহার তো নেই-ই,বরং এগুলি প্রচণ্ড নেশা সৃষ্টি করে এবং অত্যন্ত বিষাক্ত।

কোকেনের উত্তেজনা ১ ঘণ্টা থাকলেও এগুলির জন্য তা ১২ ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে,যার প্রভাবে মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি হয়।এগুলি মূলত মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকরকম বেশি পরিমাণে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায়,তাই ব্যবহারকারী প্রায় ঘোরের মধ্যে চলে যান।

কিছুদিন ব্যবহারের পরেই তাই মস্তিষ্ক বাধ্য হয় ঘাতক এনজাইম নিঃসরণ করে এই অতিরিক্ত ডোপামিন নষ্ট করতে,যার ফলে এই নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনের ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়;যা একজন মানুষের শেখা,আনন্দ বা প্রেরণা পাওয়া এককথায় বেঁচে থাকাই প্রায় অসম্ভব করে তোলে।

চিত্রঃ অ্যাম্পফেটামিন(α-মিথাইলফিনইথাইলঅ্যামিন) চিত্রঃN-মিথাইলঅ্যাম্পফেটামিন বা ক্রিস্টাল মেথ
চিত্রঃ৩,৪-মিথিলিনডাইঅক্সিমেথাম্পফেটামিন (MDMA)

এরকম আরও বহু ড্রাগ রয়েছে যা আসক্তি সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে,যেগুলি একইভাবে মস্তিষ্ককে বোকা বানিয়ে রিওয়ার্ড সেন্টারে ডোপামিন এর নিঃসরণ ঘটায় বা পুনঃশোষণে বাধা দেয়।কিন্ত তবুও প্রশ্ন থেকে যায়,আসক্তি কেন এত তীব্র হবে যে মানুষ নিজের এবং তার ভালবাসার সবকিছু ধ্বংস করে নেশা করে যাবে?

১৯৩০ সালে যখন গবেষকগন সর্বপ্রথম এই বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন তখন তারাও মনে করেছিলেন যে যারা নেশা করে তাঁদের নৈতিকতায় ত্রুটি আছে কিংবা অথবা ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি রয়েছে।তাই তারা ড্রাগে-আসক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে বা নেশা ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করেই দায়িত্ব শেষ করতেন।

কিন্ত বর্তমানে গবেষণায় জানা গিয়েছে যে ড্রাগের আসক্তি ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতই একটি মারাত্মক অসুখ যা মস্তিষ্কের গঠন ও কর্মকাণ্ডের আমূল পরিবর্তন ঘটায় এবং সামান্য কৌতূহল শেষ পর্যন্ত অদম্য আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়;যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

১৯৮৮ সালে ইটালির কাগিয়ারি ইউনিভার্সিটির পরীক্ষামূলক ঔষধবিজ্ঞান এবং বিষবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডি কিয়ারাজি এবং এম্পেরাতোর গবেষণা অনুযায়ী,ড্রাগ গ্রহনে স্বাভাবিক কোনো কাজের (যেমন খাওয়া) চেয়ে প্রায় ২ থেকে ১০ গুণ বেশি পরিমাণে ডোপামিন নিঃসৃত হয়।সুতরাং কোনো কষ্ট না করেই আমরা আনন্দ লাভের একটি শর্টকাট পেয়ে যাই এবং এইসকল উদ্দীপনায় মস্তিষ্ক তা ভাল করে মনেও রাখে এবং পুনরায় করার জন্য তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষাও করে।এজন্যই বিজ্ঞানীগন বলে থাকেন “ড্রাগের অপব্যবহার এমন এক কাজ যা আমরা খুবই ভালভাবে শিখে থাকি।”

প্রকৃতপক্ষে নানা কারণেই মানুষ আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ গ্রহণ করে,যদিও বাকি জীবন নেশা করে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে কেউ এই পথে আসে না।ড্রাগ গ্রহণে বিষণ্ণ মনে উদ্দীপনা আসে এবং তারপরে কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও আত্ম-বিশ্বাস জন্মে,মানুষের উপরে তাই প্রাথমিক প্রভাব ইতিবাচক বলা চলে।কিন্ত ধীরে ধীরে এই ড্রাগ মনকে এমনভাবেই পরিবর্তন করে ফেলে যে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না;ফলে সৃজনশীলতা,কাজের জন্য প্রেরণা সব নষ্ট হয়ে যায়।

তাই ব্যর্থতা ভুলতে যে মানুষ নেশা শুরু করেছিল সে জীবনে আরও ব্যর্থ হয়,যা ভুলে থাকতে সে আরও নেশার দিকে পা বাড়ায় এবং এভাবে একসময় সে ড্রাগের দাসে পরিণত হয়,ফলে দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।২০০৫ সালে সারা বিশ্বের ট্রাফিক দুর্ঘটনার শতকরা ৩৯ ভাগ মদ খেয়ে গাড়ি চালানো বা রাস্তায় চলার কারণে হয়েছিল,ইংল্যান্ডে ঐ জন্য ৬৫৭০ জন এবং পরের বছরে ৮৭৫০ জন মারা গিয়েছিল;যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যাটা প্রায় ১৩,০০০ ছুঁয়েছিল ২০০৭ সালে।

প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ লোককে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য গ্রেফতার করা হয়।শুধু তাই নয়,নেশাগ্রস্ত মানুষের হৃদরোগ, স্ট্রোক,ক্যান্সার এবং মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।আবার অন্তঃসত্বা মহিলা ড্রাগ নিলে তার বাচ্চার উপরেও যেমন কুপ্রভাব পড়ে তেমনি ধূমপায়ীর কাছে থাকলেও হৃদরোগ আর ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (সার্জন জেনারেল,২০০৬ রিপোর্ট)।

প্রায় ১২ শতাংশ এইডস রোগের জন্য ইনজেকশনের মাধ্যমে কোকেন,হেরোইন এবং ক্রিস্টাল মেথ সেবন দায়ী,এবং হেপাটাইটিস-বি বা সি এর ঝুঁকিও একারণে বাড়ে।এক হিসেবে দেখা যায় শুধু ধূমপানের কারণেই বর্তমানে প্রতি বছর সারাবিশ্বে ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যায়,এবং উনবিংশ শতাব্দীতে এভাবে প্রায় ১০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছে।

হেরোইন সেবনে শরীর অনেক দুর্বল হয়ে যায়, ফলে যক্ষ্মা ও আর্থাইটিস রোগের সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পায়।এভাবে বিভিন্ন ড্রাগের প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্ক,ফুসফুস,যকৃত,কিডনি,অগ্ন্যাশয়, স্নায়ুতন্ত্র,পাকস্থলি সহ সারা শরীরের ক্ষতি সাধন হয়।

তাহলে এই ভয়াবহ অসুখ থেকে বাঁচার উপায় কি?প্রথমত,ড্রাগে আসক্ত কেউই স্বীকার করতে চাননা তাঁদের কোনো সমস্যা রয়েছে।ড্রাগ পুনর্বাসন কেন্দ্রে তাই শুরুতেই তাঁদের এই ভুল ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।এরপরে যখন তারা স্বীকার করেন তাঁদের জীবনে ড্রাগ আসলেই একটি বড় সমস্যা,তখন নির্ণয় করা হয় ঠিক কোনো পরিস্থিতিতে তারা ড্রাগ নিতে প্রলুব্ধ হন।

এটা হতে পারে যখন তারা একটি নির্দিষ্ট বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরেন বা যখন তাঁদের কাজের চাপ অত্যাধিক হয়ে পড়ে।সবশেষে ডাক্তার এবং কাউন্সেলরগন চেষ্টা করেন কীভাবে এইরকম পরিস্থিতির মোকাবেলা করা যায়,এজন্য তারা গ্রুপ থেরাপি,কাউন্সেলিং এমনকি অন্য কোনো ঔষধও ব্যবহার করতে পারেন।

তবে নিরাময় তখনই সম্ভব যখন আসক্ত ব্যক্তি নিজেই তার জীবনে পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক হন।কিন্ত একজন মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও তার সারাজীবনই পুনরায় ড্রাগ গ্রহণের প্রলোভনের সাথে যুদ্ধ করে যেতে হয়,যেমন একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি দশ বছর পরেও সিগারেটে পুনরায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।

কিন্ত তবুও তো প্রতি বছরই ড্রাগে আসক্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।তাই সময় এসেছে আমাদের পুরো পরিস্থিতিই নতুন করে পর্যালোচনা করার।আমাদের ড্রাগে আসক্তি সম্পর্কে ধারণা এসেছে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের খুব সহজ একটি পরীক্ষা থেকে।

আপনি যদি একটি ল্যাব-ইঁদুরকে খাঁচার মধ্যে বন্দী করে তার সামনে দুইটি বোতলে পানি রাখেন যার মধ্যে একটিতে আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগ যেমন হেরোইন বা কোকেন মেশানো আর অপরটিতে শুধু পানি রাখা,তবে প্রায় প্রত্যেকবারই ইঁদুরটি ড্রাগ-মিশ্রিত পানি খেয়ে তাতে আসক্ত হয়ে যাবে এবং অত্যাধিক পরিমাণে গ্রহণে শেষপর্যন্ত মারাই যাবে।কিন্ত বিষয়টি কি এতই সহজ?

মনে করুন কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙ্গে ফেলেছেন।তাঁকে হাসপাতালে ব্যাথা কমানোর জন্য অপিয়েট ড্রাগ,যেমন মরফিন বা হেরোইন দেওয়া হবে।হাসপাতালে এই মুহূর্তেই বহু রোগীকে দিনের পর দিন এইসকল ড্রাগ দেওয়া হচ্ছে।শুধু তাই নয়,এগুলি অত্যন্ত উন্নতমানের ড্রাগ কারণ বিভিন্ন জায়গায় ড্রাগ ডিলাররা নানাকিছু দিয়ে এইসকল ড্রাগের ঘনত্ব কমিয়ে ফেলতে গিয়ে ড্রাগে বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ফেলে, যেখানে হাসপাতালে দেওয়া অপিয়েট ড্রাগগুলিকে খুব যত্ন করে বিশুদ্ধ রাখা হয়। কিন্ত এত দীর্ঘ-মেয়াদী ব্যবহারের পরেও এসকল রোগীর কেউই কিন্ত এইসকল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন না,যা ঐ পরীক্ষার ফলাফলের সাথে একদমই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চিত্রঃ“র‍্যাট পার্ক” এর ধারণা ড্রাগ আসক্তির সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে।

১৯৭০ সালে কানাডিয়ান সাইকোলজিস্ট অ্যালেক্সান্ডার ঐ পরীক্ষার একটি বড় ত্রুটি লক্ষ্য করেন।এই ইঁদুরগুলি খুবই সামাজিক জীব হলেও এখানে তাদের একা একটি খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং তাই তাদের ড্রাগ গ্রহণ ছাড়া আর কিছু করারও নাই।এই সমস্যা সমাধানে তিনি ইঁদুরদের জন্য একটি “পার্ক” নির্মাণ করেন যেখানে ১৫-১৬টি ইঁদুরের জন্য একটি বড় খাঁচা(যার আয়তন স্বাভাবিক খাঁচার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি)রঙিন বল,টানেল (যার মধ্যে দিয়ে ইঁদুরগুলি খেলতে পারবে) দিয়ে সাজানো হয়।

এ পার্কে অনেক ইঁদুরকে একসাথে রাখা হয়, ফলে তারা নিজেরা খেলতেও পারবে আর মনের আনন্দে বংশ বৃদ্ধিও চালিয়ে যেতে পারবে – অর্থাৎ এই পার্কটিতে তিনি আসলে ইঁদুরদের জন্য একটি স্বর্গ বানিয়ে ফেলেন। তিনি লক্ষ করেন, এই ইদুরগুলি ড্রাগ মেশানো পানি প্রায় গ্রহণই করে না,বা করলেও তা দিয়ে নেশা করে না। পরবর্তীতে অবশ্য অন্যান্য গবেষকগণ এই পরীক্ষার ফলাফল পুনরূৎপাদন করতে ব্যর্থ হন।তবে আমরা কিন্ত এই ধারণা দিয়ে হাসপাতালে রোগীদের নেশা না হওয়া ব্যাখ্যা করতে পারি।

চিত্রঃ সাইমন-ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের কানাডিয়ান প্রফেসর এমিরেটাস ডঃ ব্রুস অ্যালেক্সান্ডার(১৯৩৯-)।

ইদুরের পার্ক নিয়ে তার প্রকল্প “সায়েন্স” এবং “নেচার” পত্রিকা প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেও ১৯৭৮ সালে “সাইকোফার্মাকোলজি” শাখায় প্রকাশ করে।এই ধারণা প্রথমে কেউ মানতে চায়নি;অবশেষে দীর্ঘদিন পরে তিনি ২০০৭ সালে আসক্তি নিয়ে তার কাজের জন্য “স্টারলিং প্রাইজ” পেয়েছেন।

আবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়টি বিবেচনা করা যাক।ঐ সময়ে শতকরা ২০ ভাগ আমেরিকান সৈন্য অত্যাধিক পরিমাণে হেরোইন গ্রহণ করছিল,যার ফলে দেশের মানুষ বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়ে।কিন্ত যুদ্ধ শেষে শতকরা ৯৫ ভাগ সৈন্যই হেরোইন সেবন একদম ছেড়ে দেয়,এজন্য তাঁদের কোনো “উইথড্রয়াল” এর কষ্টকর অভিজ্ঞতাও হয়নি বা পুনর্বাসন-কেন্দ্রেও যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।

প্রকৃতপক্ষে কাউকে যদি বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাঠানো হয় এবং বাধ্য করা হয় অন্যকে হত্যা করতে,সে সময় কাটানোর জন্য ড্রাগ বেছে নিতেই পারে।কিন্ত আপনি যখন দেশে প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাবেন,তখন প্রকৃতপক্ষে তা হবে খাঁচা থেকে বের হয়ে “পার্কে” যাওয়ার অনুরূপ।ডঃ অ্যালেক্সান্ডার মনে করেন,ড্রাগ-আসক্তি কার্যত একটি সামাজিক সমস্যা এবং তাই যখন একটি সমাজব্যবস্থা নানা সমস্যায় ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে তখনই এই আসক্তি একটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়।

মানুষ বিপর্যস্ত সমাজে মানিয়ে নিতে ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ে,কারণ আমাদের সহজাত চাহিদাই হল সমাজবদ্ধভাবে থাকা। এজন্য সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ তার প্রিয়জনদের সাথে একত্রে বাঁচতে চায়,কিন্ত নানা সমস্যায় মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে তখন তারা এমন কিছু করে যা তার সমস্যা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলিয়ে দেয়।এজন্য কেউ সামাজিক মাধ্যমে(যেমন ফেসবুক, টুইটার বা ইন্সট্রাগ্রাম)সময় কাটায়,কেউবা ভিডিও গেম বা জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই ড্রাগ গ্রহণ শুরু করে।

প্রকৃতপক্ষে আসক্তি আমাদের নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার জন্যই সৃষ্টি হয়।যুক্তরাষ্ট্রের করনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে আমেরিকানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ২ জনে নেমে এসেছে।

শুধু তাই নয়,সমাজবিজ্ঞানী ডঃ ম্যাথিউ ব্রেশার ২০০০ জন মানুষের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন,শতকরা ৪৮ ভাগের মাত্র একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু রয়েছে, ১৮ ভাগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ২ জন এবং মাত্র ২৯ ভাগের প্রিয় বন্ধুর সংখ্যা ২ জনের বেশি।সবচেয়ে দুঃখজনক হল, ৪ জন পাওয়া যায় যাদের কোনো ভাল বন্ধুই নেই।

১৯৭১ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন আসক্তি-সৃষ্টিকারী ড্রাগের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ” ঘোষণা করেছিলেন,কিন্ত আজ প্রায় ৪৫ বছর পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি এর জন্য বিশাল সংখ্যায় কারাদণ্ড প্রদান, দুর্নীতি,রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই হয় নাই,যদিও প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও ড্রাগের বিস্তৃতি থামানো যাচ্ছে না(US এ ২০১৫ সালে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ ডলার ব্যয় করা হয়েছিল এই খাতে,কিন্ত দেশে ড্রাগের বিস্তৃতি রোধে ড্রাগ এনফোর্সমেনট এজেন্সির সাফল্য ১% এর ও কম)।তাই সমাজ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং এই “যুদ্ধের” ফলে মানুষ হত্যার পরিমাণ ২৫-৭৫% বেড়ে গিয়েছে।

মেক্সিকোতে প্রায় ১ লক্ষ ৬৪ হাজার মানুষ মারা গিয়েছে ড্রাগ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যা ঐ একইসময়ে ইরাক আর আফগান যুদ্ধে সম্মিলিত মৃত্যুর চেয়ে বেশি।যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১৯ সেকেন্ডে একজনকে গ্রেফতার করা হয় ড্রাগের সাথে সংশ্লিষ্টতার জন্য এবং তাই ঐ দেশে বিশ্বের ৫ ভাগ মানুষ থাকলেও ২৫ ভাগ কয়েদী বাস করে।

তাই ড্রাগে আসক্ত ব্যক্তিকে আমরা আজ সাহায্য করার বদলে একঘরে করে ফেলছি।তাদেরকে জেলে কয়েদ করা হচ্ছে,ফলে একদল অসুখী মানুষ আরও খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং নিজেদেরকেই ঘৃণা করছে আপন অবস্থার জন্য।

সুতরাং এখন আমাদের ড্রাগের প্রতি আসক্তি সমস্যার সমাধানে নতুন পথ বেছে নিতে হবে।সমাজের প্রতিটা স্তরে এই ভয়াবহ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে,তাই স্বতন্ত্র আরোগ্যের বদলে চেষ্টা করতে হবে সমস্যাটিকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করার।

গোটা সমাজটাই আজ বিকৃত হয়ে গিয়েছে,ফলে মানুষও প্রিয়জন বা বন্ধুবান্ধবদের ভুলে ড্রাগে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে।এজন্য যদি আজ আবার নতুন করে অগ্রসর হতে হয় তবে এখনই সময় অস্বাভাবিক জীবনপদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে পরস্পরের সাথে একত্রে মিলেমিশে নতুন সমাজ গড়ে তোলার।ড্রাগে আসক্তির সমাধান তাই একা একা নেশা ছাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া নয়,বরং সবাই মিলেমিশে বেঁচে থাকাই পারে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে।

References:

  1. https://www.youtube.com/watch?v=ukFjH9odsXw&t=493s
  2. https://www.youtube.com/watch?v=ao8L-0nSYzg&t=3s
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Dopamine
  4. https://www.helpguide.org/harvard/how-addiction-hijacks-the-brain.htm
  5. http://www.universetoday.com/38125/how-long-have-humans-been-on-earth
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Neurotransmitter
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Drug_tolerance
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Heroin
  9. 9. https://en.wikipedia.org/wiki/Codeine
  10. 10. https://en.wikipedia.org/wiki/Hydrocodone
  11. https://en.wikipedia.org/wiki/Nicotine
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Opioid_use_disorder
  13. https://en.wikipedia.org/wiki/Addiction
  14. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/drugs-brain
  15. https://www.drugs.com/health-guide/alcohol-withdrawal.html
  16. https://en.wikipedia.org/wiki/Cocaine
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Norepinephrine
  18. 18. https://en.wikipedia.org/wiki/Epinephrinehttps://www.youtube.com/watch?annotation_id=annotation_198404&feature=iv&src_vid=ukFjH9odsXw&v=DxR4PqPlgzQ
  19. https://en.wikipedia.org/wiki/Methamphetamine
  20. https://www.drugabuse.gov/publications/drugs-brains-behavior-science-addiction/addiction-health
  21. Di Chiara G, Imperato A. Drugs abused by humans preferentially increase synaptic dopamine concentrations in the mesolimbic system of freely moving rats. Proc Natl Acad Sci85:5274-5278, 1988.
  22. https://www.drugabuse.gov/publications/drugfacts/nationwide-trends
  23. http://www.rehabs.com/about/rehab-treatment/
  24. U.S. Department of Health and Human Services. The health consequences of smoking: a report of the Surgeon General. Atlanta, Georgia. U.S. Department of Health and Human Services, Centers for Disease Control and Prevention, National Center for Chronic Disease Prevention and Health Promotion, Office on Smoking and Health; Washington, DC, 2004.
  25. https://www.cdc.gov/hiv/statistics/index.html
  26. Alexander, B.K., Beyerstein, B.L., Hadaway, P.F. & Coambs, R.B. (1981). The effects of early and later colony housing on oral ingestion of morphine in rats. Pharmacology, Biochemistry, & Behavior, 15, 571-576.
  27. Alexander, B.K. (2000). The globalization of addiction. Addiction Research, 8, 501-526.
  28. http://www.livescience.com/16879-close-friends-decrease-today.html
  29. Potter, Ned. “More Facebook Friends, Fewer Real Ones, Says Cornell Study.” 8 November 2011.ABC News.1 December 2011. < http://abcnews.go.com/Technology/facebook-friends-fewer-close-friends-cornell-sociologist/story?id=14896994#.Ttfpzla8GSp>.
  30. https://www.youtube.com/watch?v=wJUXLqNHCaI&t=310s
  31. The U.S. federal government spent over $15 billion dollars in 2010 on the War on Drugs, at a rate of about $500 per second.Source:Office of National Drug Control Policy .State and local governments spent at least another 25 billion dollars. Source: Jeffrey A. Miron & Kathrine Waldock: “The Budgetary Impact of Drug Prohibition,” 2010.
  32. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/heroin/long-term-effects.html
  33. http://www.drugfreeworld.org/drugfacts/alcohol/international-statistics.html
  34. https://www.youtube.com/watch?v=sbQFNe3pkss
  35. “Chasing the Dream: The First and Last Days on the War on Drugs”-Johann Hari

featured image: palmerlakerecovery.com

রাত জাগা ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি ১০ শতাংশ

যারা রাত জাগতে পছন্দ করেন আর সকাল হলে নিজেকে টেনেও বিছানা থেকে নামানো যায় না তাদের জন্য দুঃসংবাদ। রাতজাগা পাখিদের রয়েছে শীঘ্র মৃত্যুর ঝুঁকি, যাদের স্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিছানায় যাবার এবং সকাল সকাল জেগে ওঠার অভ্যাস রয়েছে তাদের তুলনায়। এ বিষয়ক গবেষণা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন এবং ইউনিভার্সিটি অব সারে

এ গবেষণায় ৪ লক্ষ ৩৩ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য নেয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংক থেকে। সাড়ে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণের অধীন ছিল আর ফল হচ্ছে পেঁচার অনুসারীরা সকালের চড়ুইদের তুলনায় ১০ শতাংশ অধিক মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকে। গবেষণা নমুনায় এমন ৫০,০০০ লোক ছিল যারা মৃত্যুঝুঁকি, অন্যান্য রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে ভুগছিল।

চোখের আলোয় রাতের অন্ধকার, রাত বাড়ে ঘুম কেড়ে; image source: Huffington Post

রাত জাগানিয়া ব্যক্তিরা যখন ভোর থেকে কাজ শুরু করা ব্যক্তির মত কাজ শুরু করেন তাদের ক্ষেত্রেও দৈহিক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়ে গেছে বলে জানান এই গবেষণার সহদলনেতা ক্রিস্টেন নুটসন। তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফেইনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক।

এই বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিপাকীয় ক্রিয়ার ত্রুটি এবং হৃদযন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যার হার বৃদ্ধির উপর। বলা যায়, প্রথমবারের মত ক্রিস্টেনের গবেষণাই ঘুমের অভ্যাসের ভিত্তিতে মৃত্যুহার নিয়ে কাজ করছে। এটি প্রকাশিত হয়েছে ক্রোনোবায়োলজি ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে।

বিজ্ঞানীরা রাত জাগানিয়াদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। এরপরও মৃত্যু ঝুঁকির হার তাদের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত ছিল।

প্রশ্ন জনস্বাস্থ্যের বলে এটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলে মন্তব্য  করেন ইউনিভার্সিটি অব সারে এর ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক ম্যালকম ভন শান্টজ। ঘুমের সাথে দেহঘড়ির ব্যাপার সম্পৃক্ত। যারা রাতে কাজ করেন তাদের জন্য তারা কিভাবে দিনের আলোর সাথে দেহঘড়ির মিল ঘটিয়ে কাজ করতে পারেন এ ব্যাপারে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। যেখানে সম্ভব অন্তত রাতের কাজ পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে। ক্ষুদ্র সময় ও ব্যক্তির বিচারে হয়ত এটা আমাদের কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না, কিন্তু বড় স্কেলে তা জনজীবনের লাইফস্টাইল ও জনস্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর।

নুটসনের মতে, হতে পারে যারা রাত জেগে থাকেন তাদের একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি রয়েছে যা তাদের বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মিলে না। মানসিক চাপ, ভুল সময়ে খাদ্য গ্রহণ, যথেষ্ঠ শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের অভাব, ঘুমের অভাব, একা রাত জাগা ইত্যাদি কারণে দেহঘড়ির গোলমাল লেগে থাকতে পারে। একা রাত জাগার ক্ষেত্রে মাদক, এলকোহল, এমনকি অধুনা ডিজিটাল আসক্তিও দায়ী। রাতের অন্ধকারকে সময় দেয়ার সাথে স্বাস্থ্য পরিপন্থী বহু আচরণ সম্পর্কিত।

আরো ভয়ংকর ব্যাপার হল রাত জাগাদের ক্ষেত্রে তিনটি গুরুতর অসুস্থতার হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে: ডায়াবেটিস, মানসিক বৈকল্য এবং স্নায়বিক বৈকল্য।

রাত জাগুনিয়ারা কি ভোরের পাখি হতে পারে?

জিনতত্ত্ব এবং পরিবেশ সমান সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আমরা কি রাতের না ভোরের পাখি হব। কী ধরনের হবে কোন ব্যক্তি এ ব্যাপারে উক্ত দুই বিষয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন লেখক প্রতিবেদন প্রকাশও করেছেন।

রাতের ঘুমের সাথে সমস্যার দায় সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নয়। কিছু কিছুর উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সব নয়। ঘুমের অভ্যাসের সময়সূচি পরিবর্তনের একটি ভাল উপায় আলোতে সাড়া দেয়া। আলো বলতে অবশ্য দিনের আলোর কথাই বলা হচ্ছে। সকালে আলো ফোটার সাথে বিছানা ছেড়ে দেয়া এবং রাতের অন্ধকার গভীর হলে বিছানার সাথে নীরব হয়ে যাওয়ার শুরু করা যেতে পারে। এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়মিত সময় মেনে ঘুম চর্চা করা। রাতের নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা এবং পরবর্তী দিন যেন সময়টা পিছিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা।

নিয়মিত সময়ে ঘুম না হলে দিনের সময়সূচি খাপ খাবে না; image source: Phd Comics

নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে অভিযোজিত হতে হবে। আপনার কখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত এ ব্যাপারে নিজের মতকে গুরুত্ব দিতে হবে, বদঅভ্যাসের কাছে হেরে যাওয়া যাবে না।

সমাজও যেভাবে সহায়ক হতে পারে

আমরা যদি দেহঘড়ির ঘুমের এ ধরণের সময়সূচির ব্যাপার ধরতে পারি, অংশত, যাদের ক্ষেত্রে জিনগতভাবে নির্ধারিত এবং অভ্যাসের বশে এমন হচ্ছে না তবে তাদের জন্য কাজকর্ম, চাকরির সময়সূচি নমনীয়তা হয়ত উপকারে আসবে। তাদের হয়ত সকাল ৮টার আগেই ঘুম ভাঙার জন্য চিন্তায় থাকতে হবে না। কাজের সময়বণ্টনের মাধ্যমে তাদের সে সুযোগ দেয়া যায়। কিছু মানুষ রাতেই কাজের সাথে বেশি মানিয়ে নিতে পারে।

ভবিষ্যত গবেষণায়, নুটসন এবং তার সহকর্মীরা রাত জাগুনিয়াদের নিয়ে একটি পরীক্ষা করতে চাচ্ছেন। তাদের দেহঘড়ি একটু এগিয়ে আসলে কেমন আচরণ করে তাই যাচাইয়ের লক্ষ্য। মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়াদি— দৈহিক ও মানসিক উন্নতি, রক্তচাপ ইত্যাদির উপর বিশেষ নজর থাকবে।

দিনের আলো সংরক্ষণ কর্মসূচির একটি উপজাত সংকট; image source: someecards.com

দিনের আলোর ব্যবহার বাড়াতে শীতপ্রধান দেশগুলোতে যখন ডে-লাইট সেভিং কর্মসূচি চালু হয় অথবা যখন গ্রীষ্ম চলে দেখা গেছে তখন সাধারণভাবেই এ ধরনের লোকেদের অধিক সমস্যা হয়।

গ্রীষ্মকালীন সময়সূচির সময় ইতোমধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্তের হার বেশি পাওয়ার প্রতিবেদন রয়েছে বলে জানান ভন শান্টজ। আমাদের আরো স্মরণে রাখা দরকার যে প্রতিবছর এই পরিবর্তন ছোট ঝুঁকি হলেও প্রভাবিত করছে ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে। তিনি মনে করেন এ ব্যাপারটি গুরুতরভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে যে এই সময়সূচির লাভ উক্ত ঝুঁকির চেয়েও বেশি কিনা।

যেভাবে গবেষণাটি করা হয়েছে

এ গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব সারে এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একেক জন ব্যক্তির সকালের এবং রাতের কাজকর্মের ঝোঁকের সূত্র খুঁজেছেন। এর সাথে হিসেব করেছেন তাদের সম্যক অবস্থার সাথে মৃত্যুঝুঁকির হার। তারা যে ৪,৩৩,২৬৮ জন ব্যক্তির তথ্য নিয়েছেন তাদের সকলের বয়স ছিল ৩৮ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে এটা ভাগ করতে যে তারা ভোরের পাখি নাকি প্রায় রাতের পাখি নাকি ঘোরতর হুতুম পেঁচার দলে। নমুনা ব্যক্তিদের মৃত্যুর তথ্য সাড়ে ছয় বছর ধরে নেয়া হয়েছে।

গবেষণাটির সহায়তায় ছিল ইউনিভার্সিটি অব সারে ইনস্টিটিউট অব এডভান্সড স্টাডিজ স্যান্টান্ডার ফেলোশিপ এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ থেকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিজ এন্ড ডাইজেস্টিভ এন্ড কিডনী ডিজিজ গ্র্যান্ট R01DK095207.

 

সায়েন্স ডেইলি অবলম্বনে।

বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা, দ্বিমেরু ব্যাধিঃ ভিন্ন রকম এক মানসিক সমস্যা

দ্বিমেরু ব্যাধি বা বাইপোলার ডিজঅর্ডারকে বলা হয়ে থাকে ম্যানিক-ডিপ্রেসিভ ইলনেস। এটা মূলত একধরনের ব্রেন ডিজঅর্ডার। এর ফলে ব্যক্তির মানসিক অবস্থার খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে।

মস্তিষ্কের একধরনের অস্বাভাবিক অবস্থার কারণে আমাদের মুডে খুব ঘনঘন পরিবর্তন আসে। তখন কাজ করার স্পৃহা, কর্মক্ষমতা এবং নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজগুলো করা কঠিন হয়ে পড়ে। মোটামুটিভাবে চার ভাগে ভাগ করা যায় এই বাইপোলার ডিজঅর্ডারকে। যার কারণে একজন মানুষের মুড একদম ফুরফুরে মেজাজ থেকে একেবারে খাদে নেমে যেতে পারে।

এই যে তার মন খুব ভাল আছে বা খুব সাবলীল তার আচার-আচরণ, এ সময়টাকে বলা হয়ে থাকে ম্যানিক এপিসোড। আর যখন সেই একই ব্যক্তি দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে একদম আশাহত হয়ে পড়ে বা মানসিকভাবে খুব খারাপ বোধ করে সে সময়টাকে বলা হয় ডিপ্রেসিভ এপিসোড। এখানে বলে রাখা ভাল যে ম্যানিক এপিসোডের তীব্রতা যদি তুলনামূলক কম হয় তখন সেটাকে বলে হাইপোম্যানিক এপিসোড।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের রকমফের

চার রকমের মাঝে সাধারণত যে দুটোর কথা চলেই আসে সেগুলো হল যথাক্রমে বাইপোলার I এবং বাইপোলার II

বাইপোলার I কে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে বলা হয়, ম্যানিক এপিসোড নিদেনপক্ষে এক সপ্তাহব্যাপী থাকবে এমনকি এও হতে পারে যে কারও অবস্থা এতটাই গুরুতর যে তাকে হসপিটালাইজড করতে হতে পারে। আর ওদিকটায় ডিপ্রেসিভ এপিসোড কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে চলে সাধারণত। এই ক্ষেত্রে এমন হওয়াটাও অসম্ভব না যে দুটো এপিসোডই একই সাথে চলছে।

এবারে আসা যাক বাইপোলার II– এ। এই ক্ষেত্রে ডিপ্রেসিভ এপিসোড থাকবে আর তার সাথে চলবে হাইপোম্যানিক এপিসোড অর্থাৎ ম্যানিক এপিসোডের তীব্রতা পুরোপুরি অনুভূত হবে না।

এছাড়াও আরও যে দুটো ভাগ আছে সেগুলো একটার বেশ শক্ত নাম আছে- সাইক্লোথাইমিক ডিজঅর্ডার বা সাইক্লোথাইমিয়া। এই ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায় সেটা হচ্ছে হাইপোম্যানিক এপিসোড এবং ডিপ্রেসিভ এপিসোড উভয়ের সংখ্যাই খুব বেড়ে যায় এবং এর ব্যাপ্তি থাকে কমপক্ষে দুই বছর।তবে শিশু এবং বয়ঃসন্ধিকালে উপনীতদের ক্ষেত্রে এক বছর।

একদম শেষ যে ভাগটা সেটাকে প্রকৃতপক্ষে আলাদা কোনো নামে ডাকা হয় না। এটা বলতে এমন কিছু ভিন্নধর্মী লক্ষণ বোঝায় যেগুলো ওপরের তিনটি ভাগের কোনোটির সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের লক্ষণসমূহ

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের কিছু নীরব কারণ থাকে অর্থাৎ সাধারণভাবে অনেকেই এসব কারণকে এড়িয়ে যায়। এবারে সেগুলোর কথাই জেনে নেওয়া যাক।

  • বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন মানুষ ঠিক তেমনটাই অনুভব করতে পারেন যেরকম অনুভব করেন একজন ডিপ্রেশনের রোগী। তাহলে ডিপ্রেশন আর বাইপোলার ডিজঅর্ডারের পার্থক্য কোথায়? বাইপোলার ডিজঅর্ডারে একটা ছন্দ থাকে দুটো পর্যায়ের মাঝে অর্থাৎ পর্যায়ক্রমিকভাবে ম্যানিক আর ডিপ্রেসিভ এপিসোডের পালাবদল ঘটে। তাই খুব জরুরি একটা বিষয়- থেরাপিস্টের সাথে একজন ব্যক্তির নিজস্ব মুডের ফ্লাকচুয়েশন বা ওঠানামাটা উল্লেখ করা। কারণ ডিপ্রেশনের চিকিৎসা আর অন্যদিকে বাইপোলার ডিজঅর্ডারের চিকিৎসা- দুটো ভিন্নধর্মী আর এ পার্থক্য গড়ে দেয় ম্যানিয়া অথবা ভিন্নভাবে বললে এলিভেটেড মুডের থাকা বা না থাকা। অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট একজন বাইপোলার ডিজঅর্ডারের রোগীকে হুট করেই ম্যানিয়াতে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং খুব সতর্কতার সাথে এ দুইটি আপাতদৃষ্টিতে এক মনে হওয়া বিষয়কে বিচার করা উচিৎ।
  • ঘুমের বেশ একটা তারতম্য হয়। যেটা দেখা যায়- ম্যানিক ফেইজ চলাকালীন সময়ে টানা বেশ কয়েকদিন ঠিকমত ঘুম না হওয়ার পরেও একজন ব্যক্তি যথেষ্ট সবল অনুভব করছেন কিন্তু সেই একই মানুষ যখন ডিপ্রেসিভ ফেইজে চলে যাচ্ছেন তখন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ দীর্ঘক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছেন।

  • মন ভাল হলে তো ভালই হয়, তাই না? এ নিয়ে প্রশ্ন করার কি আছে? কিন্তু মন খুব তীব্রভাবে ভাল থাকাটা এবং তাও আবার টানা সাতদিন বা তারও অধিক সময় ধরে, এটা কি স্বাভাবিক কিছু? এমনটা হতে পারে কেউ যদি বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং এ সময়টা যতক্ষণ স্থায়ী থাকে ততক্ষণ একজন মানুষ খুব ভাল বোধ করতে পারেন তার অতিরিক্ত সৃজনশীলতা বা কর্মক্ষমতার জন্য। এই মন ভাল থাকাটা কখনও এমন হয় যে এটা যে অস্বাভাবিকতা সেটা নিরূপণ করাটাও কঠিন হয়ে পড়ে কেন না শুধু এতটা মন ভাল থাকা অথবা পর্যায়ক্রমিকভাবে মুড অন- অফ হওয়াটা বাইপোলার ডিজঅর্ডার II এর ক্ষেত্রে এতটাই অল্প হয় যে বোঝাই যায় না।
  • কোনো কাজই ভালভাবে সম্পন্ন করতে না পারাটাও একটা কারণ হতে পারে। ব্যাপারটা আসলে হচ্ছে মন কোনো এক জায়গায় বা একটা সুনির্দিষ্ট কাজে স্থির হতে পারছে না। খুব তাড়াতাড়ি একটা কাজ থেকে আরেকটা কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে ফেলা এবং এরকম করতে থাকা একটা কাজও সম্পূর্ণ শেষ না করেই।
  • বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ভুগতে থাকলে কেউ কেউ অসংলগ্ন কিছু আচরণ করে ফেলে। যেমন খুব সামান্য একটা ঘটনাতেও হয়তো মাত্রাতিরিক্ত রাগ দেখিয়ে ফেলা, একজন মানুষের সাথে সাবলীলভাবে না মিশে ক্ষণে ক্ষণে একেক জনের সাথে মেশার চেষ্টা করা বা অনেকটা হয়তো নিজের মুড চেঞ্জের উপর নিজেরই কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকা।
  • ম্যানিয়া অথবা হাইপোম্যানিয়া এপিসোডে থাকলে অনেক সময় খুব বেশি ঘন কথা বলা এবং খুব দ্রুত চিন্তা করে থাকে অনেকে। ঘন বা দ্রুত অনেকেই কথা বলে কিন্তু এদের ক্ষেত্রে এটা মাত্রা ছাড়ানো হয়ে থাকে। এরা তখন এতটাই দ্রুত কথা বলে যে উপস্থিত অনেকেই হয়তো তার কথার সাথে তাল মেলাতে পারছে না বা বুঝতে পারছে না। অর্থাৎ এদের চিন্তার পরিমাণ এবং সে অনুযায়ী কথা বলার প্রবণতা এতটাই বেশি হয় যে অপর পক্ষের মানুষটি হয়তো একটা শব্দ বলার অবকাশও পান না।

  • সাধারণভাবে বলতে গেলে নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে পারাটা খুব চমৎকার একটা বিষয়। কিন্তু বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গ নিজের সম্পর্কে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকেন কিন্তু তবুও এদের দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো উপযুক্ত বা ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু এ ব্যাপারটাও তাদের চিন্তায় খেলে না কারণ তাদের কাছে যা হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে সবকিছুই খুব ঠিকঠাক মনে হয় সবসময়। ফলে দেখা যায় যে এরা কাজ করে বা সিদ্ধান্ত নেয় পরিণাম বা ফলাফল না ভেবে। তারা হয়তো এতটা খরচের কাজ করে ফেলতে উদ্যত হয় যতটা বাস্তবিকপক্ষে তাদের বহন করা সম্ভব না কিংবা তারা হয়তো হুট করেই একটা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
  • বাইপোলার ডিজঅর্ডারে যারা ভুগে থাকেন তাদের স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আগ্রহ থাকে মদ্যপানের প্রতি বা মাদকের প্রতি। যখন তারা খুব উত্তেজিত থাকেন অর্থাৎ ম্যানিক দশায় থাকেন তখন তারা মদ্যপান করে থাকেন শান্ত হওয়ার জন্য আর ঠিক বিপরীত কারণে মদ্যপান করেন যখন ডিপ্রেসিভ দশায় থাকেন।

তবে এ কারণগুলোকে আবার এভাবেও দেখানো যায় যে কীভাবে তারা বিপরীত একটা সম্পর্ক বজায় রাখে। অর্থাৎ ম্যানিক এপিসোডে যা অনুভূত হচ্ছে ডিপ্রেসিভ এপিসোডে সেগুলো অনেকাংশেই উল্টো হয়ে যাচ্ছে।

কেন হয় বাইপোলার ডিজঅর্ডার?

আজ অবধি বিজ্ঞানীরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেন নি কেন বাইপোলার ডিজঅর্ডার হয়। তবে তাদের মতামত এরকম যে বেশ কিছু বিষয় জড়িত থাকে এই সমস্যাটার সঙ্গে।

  • দেখা গেছে মস্তিষ্কের গঠন এবং কাজ করার পদ্ধতি অনেকটা আলাদা বাইপোলার ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের মাঝে, তাদের তুলনায় যারা সুস্থ বা হয়তো অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।
  • কিছু নির্দিষ্ট জিন বহনকারী মানুষের মাঝে বাইপোলার ডিজঅর্ডার হওয়ার হারটা বেশি দেখা গেছে। তবে অবশ্যই এ কথা বলা যাবে না যে জিনই একমাত্র দায়ী ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। এর স্বপক্ষে প্রমাণ যা আছে তা হল- আইডেন্টিক্যাল টুইন নিয়ে গবেষণার ফলাফল এটাই বলে যে তাদের একজন যদি বাইপোলার ডিজঅর্ডারের শিকার হয়ও তবুও সবসময় অন্যজন আক্রান্ত হবেন না যদিও তারা একই জিন শেয়ার করেছে।
  • বংশপরম্পরায় এই রোগ বহন করার ঘটনা বেশ দেখা গেছে। যাদের কোনো ধরনের পারিবারিক ইতিহাস নেই বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকার, তাদের তুলনায়- যাদের মা-বাবা অথবা ভাই-বোনের এই অসুখটি আছে তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে এটাও সবসময় সত্য নয় যে পারিবারিক ইতিহাস থাকলেই কেউ এই রোগে আক্রান্ত হবেন।

চিকিৎসা

চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে খুব তীব্র পর্যায়ের বাইপোলার ডিজঅর্ডারও ভাল হয়। মূলত এই অসুখটা সমগ্র জীবনব্যাপী। সবচেয়ে ইতিবাচক সমাধান হল একই সাথে মেডিকেশন এবং সাইকোথেরাপি নেওয়া যেটাকে বলা হয়ে থাকে টক থেরাপি। এই যে মুডের হুটহাট পরিবর্তনের সমস্যা এটা কারও কারও জীবনে একদম স্বাভাবিক হয়ে আসে আবার কখনও কখনও দীর্ঘ সময় পরে হলেও ফিরে আসে। সেজন্য সামগ্রিকভাবে অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট, পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্ক, নিজস্ব ব্যবহারের একটা ধারাবাহিক পরিবর্তন, সামাজিক জীবনে চলাফেরা এবং এরই মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন চলার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা উচিৎ।

তথ্যসূত্রঃ

Reader’s Digest

National Institute of Mental Health

featured image: delfi.lt

নিমগ্নতার সুখ

আমরা জীবনে সুখের হরিণের পেছনে ছুটে বেড়াই। গড়পড়তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, কবি-লেখক-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে ধর্মবেত্তা-দার্শনিক সকলেই সুখ পাখিটা ধরতে চায়। তবে যারা সুখ জিনিসটা কী তা বোঝার চেষ্টা করেন তাদের অনুসন্ধানটা ভিন্ন। তারা সুখকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেন। এ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরাও পিছিয়ে নেই। বিজ্ঞান হয়তো বলবে এন্ডরফিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হলে মানুষ সুখানুভূতি পায়, তবে তারপরও কাজের সাথে সুখানুভূতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এক জন মনোবিজ্ঞানীর গবেষণা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাক।

কখনো কি এমন কোনো কাজে ডুবে গিয়েছিলেন যে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিলেন? বেলা গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা হয়েছে টের পাননি? কিংবা রাতে খাবার পর কাজে বসে হঠাৎ টের পেয়েছেন যে ভোর হয়ে গেছে? কাজে এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, সময় পার হবার অনুভূতি লোপ পেয়েছিল, ক্ষুধা অনুভব করেননি? এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই একবার না একবার হয়েছে। বিশেষ করে যখন হাতের কাজটি চ্যালেঞ্জিং আর আগ্রহোদ্দীপক কিছু হয়ে থাকে।

টানটান উত্তেজনাপূর্ণ কোনো খেলা দেখার সময়েও এরকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে, অনেক সময় মজার অথচ জটিল কোনো গেম খেলার মধ্যে ডুবে গেলেও এ অবস্থা তৈরি হয়। অনেক প্রোগ্রামার রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ রাতে সাধারণত অন্য কেউ কথা বলে না, ডাক দেয় না, বিরক্ত করে না। তখন তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো সমস্যা সমাধানে কাটিয়ে দিতে পারে। এ সমস্ত ক্ষেত্রে একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ফ্লো’ (Flow)। বাংলায় একে আমরা নিবিষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা নিমগ্নতা বলতে পারি।

এখানে নিমগ্ন দশার সাথে সুখের সম্পর্কটা কী? এ প্রসঙ্গে ফ্লো তত্ত্বের জনক চেক মনোবিজ্ঞানী মিহাই চিকসেন্টমিহাইয়ের গবেষণা সম্পর্কে আলোকপাত করি।[১] ১৯৫৬ সালে এক জরিপে প্রায় ৩০ শতাংশ আমেরিকান উল্লেখ করেন যে, তারা জীবন নিয়ে অত্যন্ত সুখী (গ্রাফ দ্রষ্টব্য)। তখন থেকে কয়েক বছর পরপর নিয়মিত এ জরিপটি করা হয়েছে। দেখা গেছে ১৯৫৬ সালের পরে আমেরিকানদের গড়পড়তা আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়লেও ‘সুখী’ আমেরিকানদের অনুপাত বাড়েনি। তার মানে, দারিদ্র্যসীমার নীচে আয় থাকলে তা অবশ্যই দুঃখের কারণ হবে। কিন্তু আয় অনেক বাড়লে সুখানুভূতি বাড়বে এমন কোনো কথা নেই। অর্থাৎ অধিক উপার্জন মানুষকে অধিক সুখী করে তুলতে পারে না।

চিত্রঃ আমেরিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে সুখের সম্পর্ক।

২০০৫ সালে আমেরিকানদের গড় ক্রয় ক্ষমতা ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। সে তুলনায় সুখী মানুষের অনুপাতের কোনো পরিবর্তন হয়নি।[২] ছোট কালো বিন্দু দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে। বড় চতুষ্কোণ বিন্দু দিয়ে সুখী মানুষের অনুপাত বোঝানো হচ্ছে।

এই প্রেক্ষিতে মিহাই সুখ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। দৈনন্দিন জীবনে আমরা কি আসলেই সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করি? এটিই ছিল তার অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন। তিনি প্রথমে সৃজনশীল ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয়া শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিল শিল্পী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানুষজন। তাদের সাক্ষাৎকারে যখন তারা নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে অন্যরকম ভাবাবেশের কথা উল্লেখ করেন তখন বার বার একটি অনুভূতির কথা উঠে আসে। সাক্ষাৎকারে অংশ নেয়া অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের সৃজনশীল কাজের মধ্যে একটি উচ্ছসিত আনন্দের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। সৃজনশীল কাজটি সহজে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে এরকম অবস্থায় এ আনন্দময় দশাটি তৈরি হবার কথা উঠে আসে তাদের সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি মিহাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজের মধ্যে থাকা

অবস্থায় প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার অনুভূতি কেমন সেই তথ্য সংগ্রহ করা শুরু করেন। তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের পেজার নামক একটি যন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পেজার মূলত মোবাইল ফোনের পূর্বপুরুষ। অংশগ্রহণকারীদের নিত্যদিনের কাজের মাঝে বিভিন্ন সময়ে এ পেজারটি বেজে উঠতো। অংশগ্রহণকারী ঐ মুহূর্তে কী কাজ করছেন, কাজ করতে কেমন লাগছে, কাজটি কোথায় করা হচ্ছে, কাজ করার সময় কী নিয়ে চিন্তা করছেন এসব তথ্য তিনি লিপিবদ্ধ করেন।

এ ছাড়াও আরো দুটি পরিমাপ করা হয়। প্রথমত, অংশগ্রহণকারী যে কাজটি করছেন তা কতটুকু কঠিন। দ্বিতীয়ত, কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী কতটুকু দক্ষ। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন সময়ে করা বিভিন্ন কাজের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়। এভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে মিহাই

একটি ডায়াগ্রাম তৈরি করেন। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর কাছে দিনভর কাজ কতটুকু সহজ বা কঠিন মনে হয় এবং বিভিন্ন কাজের জন্য তার কতটুকু দক্ষতা আছে, এ দুটি পরিমাপের মাঝামাঝি একটি বিন্দু ঠিক করা যায়। এ কেন্দ্রবিন্দু থেকে বোঝা সম্ভব কখন একজন অংশগ্রহণকারী ‘মগ্নতা‘ দশায় প্রবেশ করবেন।

চিত্রঃ কাজ কতটা চ্যালেঞ্জিং ও মানুষের দক্ষতা কতটুকু এবং এর সাথে সম্পর্কিত অনুভূতির চার্ট।

যখন আমাদের হাতের কাজটি খুব কঠিন, কিন্তু সে কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে তখন আমরা উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করি। আর যখন কাজটা খুব সহজ হয় আর কাজের জন্য দরকারী দক্ষতা পর্যাপ্ত থাকে, তখন আমরা বেশ আরামে থাকি। তবে যখন কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয় আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দরকারী দক্ষতাও উপস্থিত থাকে, তখন আমরা মগ্নদশায় প্রবেশ করি। এই নিমগ্ন অবস্থায় কাজের চ্যালেঞ্জকে টক্কর দেবার সাথে সাথে একধরনের ভাবাবেশ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়।

তখন ক্ষুধা, সময় ইত্যাদির অনুভূতি থাকে না, আমরা ডুবে যাই কাজের ধারায়, লাভ করি চ্যালেঞ্জ খণ্ডনের তৃপ্তিময় আনন্দ। যখন হাতের কাজটি খুবই সোজা, আর সেটি করতেও তেমন কোনো দক্ষতা লাগে না, তখন মানুষ অনীহা/ঔদাসীন্য/বিরক্তি অনুভব করে। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশন দেখার সময় মানুষ এই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। (ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে ফিড ঘাঁটার সময়ে এরকম বোধ করি।)

‘নিমগ্ন’ দশার মূল বৈশিষ্ট্য হলো- আমরা যে কাজটি করছি তাতে সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে নিবদ্ধ থাকে ঐ কাজে। এছাড়া এ অবস্থার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।[৩] যেমনঃ

১. নৈমিত্তিক জীবনের বাইরে তৃপ্তিময় ভাবাবেশের অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়।

২. মনের ভেতরে স্বচ্ছতার অনুভূতি থাকে। আপনি জানেন কী করা দরকার। আর আপনি কাজটা ঠিক মতো করছেন কি না, তা নিজে থেকেই বুঝতে পারেন।

৩. আপনি জানেন কাজটি শেষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কর্মসম্পাদনের দরকারী দক্ষতা আপনার আছে।

৪. নিজের সম্পর্কে কোনো খেয়াল থাকে না। আপনার সকল উদ্বেগ ও ভাবনা দূরে সরে যায়।

৫. আপনি সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। আর কেবল বর্তমানে হাতের কাজটিতে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন।

৬. কাজের মধ্যে একটা প্রণোদনা লুকানো থাকে। নিমগ্ন অবস্থাটি যে কাজের মাধ্যমেই তৈরি হোক না কেন, কাজ করাটাই তখন পুরষ্কার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মানুষের মনোনিবেশ করার ক্ষমতা সীমিত। মিহাই উল্লেখ করেন, মানব মস্তিষ্ক সেকেন্ডে ১১০ বিট তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। এই পরিমাণটি বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু নিত্যদিনের ছোট ছোট কাজে অনেক তথ্য প্রয়োজন হয়। যেমন কথার অর্থ উদ্ধার করতে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ বিট তথ্য লেগে যায়। এ কারণে কারো সাথে কথা বলার সময় অন্য কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা যায় না। ক্ষুধাবোধ, সময়জ্ঞান এগুলোও তথ্য যা বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুপথের মাধ্যমে মস্তিষ্কে এসে পৌঁছায়। কিন্তু এগুলোকে প্রক্রিয়াজাত না করলে

এ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই না। নিমগ্ন অবস্থায় আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতা পুরোটাই ব্যবহৃত হয় হাতের কাজটি সম্পন্ন করার জন্য। তাই নাওয়া-খাওয়া ও সময়ের কথা আমাদের খেয়াল থাকে না। এরকম অবস্থায় দেহের অনুভূতি বোঝার জন্য কোনো মনোযোগ অবশিষ্ট থাকে না।

নিমগ্নতা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো এ দশায় ইচ্ছে হলেই প্রবেশ করা যায় না। তবে এ পর্যায়ে পৌঁছতে হলে কাজের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। কিংবা এমন কোনো দুরূহ কাজ হাতে নেয়া যায়, যা চ্যলেঞ্জিং হলেও সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা আমাদের রয়েছে। অর্থ-বিত্ত ইত্যাদির পেছনে না ছুটে এরকম চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ্য হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা জীবনে আনন্দময় সুখ লাভের নিশ্চিত উপায় হতে পারে।

তথ্যসূত্র

[১] Flow, the secret to happiness. TED-talk by Mihaly Csikszentmihalyi.http://ted.com

[২] Happiness data from National Opinion Research Center General Social Survey; income data from Historical Statistics of the United States and Economic Indicators.

[৩] What Is Flow? Understanding the Psychology of Flow.https://www.verywell.com

ইন্দ্রিয়ের এলোমেলো অবস্থান

মানবদেহের প্রতিটা অঙ্গেরই নির্দিষ্ট কিছু কাজ আছে। পা দিয়ে হাঁটি, হাত দিয়ে লিখি, পেট দিয়ে খাবার হজম করি। যেসব অঙ্গের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা লাভ করি তাদের বলি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখি, চোখ আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়। কান দিয়ে শুনি, কান আমাদের শ্রবণেন্দ্রিয়। কখনো কিন্তু চামড়া দিয়ে ঘ্রাণ নেয়া, কিংবা পাকস্থলি দিয়ে স্বাদ নেয়ার কথা ভাবি না। ভাবার দরকারও পড়ে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এক ইন্দ্রিয়ের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ অন্য অঙ্গেও থাকে। আমরা যদিও তাদেরকে ইচ্ছা অনুসারে ব্যবহার করতে পারি না, কিন্ত তারা আমাদের অজান্তে কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। এরকম কয়েকটি ব্যাপার নিয়েই আজকের এই লেখাটি।

গন্ধ শুকে চলো

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিই। ঘ্রাণ নিতে পারার ক্ষমতার সাথে জড়িত আছে বিভিন্ন ধরনের সংগ্রাহী অংশ বা receptor। এদের গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরিতে যেসব জিন জড়িত তার প্রথম বর্ণনা দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড অ্যাক্সেল এবং লিন্ডা বাক। তা প্রায় আজ থেকে ২৫ বছর আগে ১৯৯১ সালে।

স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ে ধারণা ছিল এই ঘ্রাণজ সংগ্রাহী (olfactory receptor) শুধুমাত্র নাকের মধ্যে থাকে। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্যান্য টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর খোঁজ পাওয়া যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের কথা। তাতে ব্রাসেলসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কুকুরের শুক্রাণুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তবে তা শুধু তৈরি হয়েই বসে আছে, নাকি কোনো কাজ করছে সেটা তখনো অজানা ছিল।

এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে জার্মানির রাহর বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্যান্স হ্যাটস সিদ্ধান্ত নেন, মানুষের শুক্রাণুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহী আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবেন। অনেক পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তিনি

সফল হন এমনকি এটাও দেখতে পান ঘ্রাণ অণুর উপস্থিতিতে এরা ঠিক নাকের মতোই সক্রিয় থাকে। তবে প্রথমদিকে অন্যান্য বিজ্ঞাণীদের এটা বিশ্বাস করানো বেশ কষ্টকর ছিল যে নাক ছাড়াও অন্য টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহী থাকতে পারে। পরের দশকে হ্যাটসের দল এবং অন্যান্য অনেকে বিভিন্ন টিস্যুতেও ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। যেমনঃ ফুসফুস, লিভার, চামড়া, হৃৎপিন্ড ও অন্ত্র। এমনকি কিছু কিছু টিস্যুতে ঘ্রানজ সংগ্রাহীগুলোই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রকাশিত জিন।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিভিন্ন টিস্যুতে ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলো কী করছে? সমস্যা হলো এদের কাজ বুঝতে হলে আগে বের করতে হবে কীসের মাধ্যমে এরা সক্রিয় হয়। মানুষের রয়েছ ৩৫০ ধরনের ঘ্রাণজ সংগ্রাহী, অন্যদিকে ইঁদুরের মধ্যে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। এখন পর্যন্ত গবেষকরা এদের মাত্র ১০-২০ শতাংশের জন্য সক্রিয়ক ঘ্রাণ অণু খুঁজে পেয়েছেন।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

হ্যাটস এবং তার দল স্যান্ডালোর নামের আরেকটি কৃত্রিম সুগন্ধী পেয়েছেন যার প্রভাবে চামড়াতে যেসব ঘ্রাণজ সংগ্রাহী রয়েছে সেগুলো সক্রিয় হয়। এদের সক্রিয়করণের ফলে ধারণকারী কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয়ে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ক্ষত পূরণে নিযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রেও মানবদেহে এর প্রাকৃতিক প্রতিরূপ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।হ্যাটস তার পরীক্ষায় জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে মানুষের পরীক্ষামূলক কোষে বিকাশিত ঘ্রাণজ সংগ্রাহীগুলোকে হাজার রকমের ঘ্রাণ অণুর সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কৃত্রিম সুগন্ধী যেগুলো পারফিউম এবং কসমেটিক্সে ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে তিনি একটি ঘ্রাণ অণু পেয়েছেন যেটা শুক্রাণুর ঘ্রাণজ সংগ্রাহীকে সক্রিয় করতে পারে। এই গন্ধ Lily of Valley ফুলের মতো। দেখা গেছে শুক্রাণু এই গন্ধের দিকে সাঁতার কেটে যায় এবং গন্ধের মাত্রা বাড়ালে শুক্রাণুর গতিও বাড়ে। হ্যাট অনুমান করেন, এই বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুকে ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হতে প্রভাবিত করে। তবে গবেষকরা এখনো এই অণুকল্প প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। ব্যাপারটি এখনো সর্বজন সমর্থিত নয়।

অন্যান্য টিস্যুতে পাওয়া কিছু কিছু ঘ্রাণজ সংগ্রাহীও প্রায় একইরকম কাজ করে। এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেস পাভলাথ গবেষণা করছিলেন কীভাবে একাধিক পেশীতন্তু একীভূত হয়ে বহু নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ কোষ তৈরি করে। সেসময় তিনি দেখতে পান পেশীতে একটি ঘ্রাণজ সংগ্রাহী বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হচ্ছে যে ব্যাপারটা হ্যাটস দেখতে পেয়েছিলেন শুক্রাণুতে।

গ্রেস বর্ণনা করেন, এই সংগ্রাহীগুলোর কারণে পেশীতন্তুগুলো একটি বিশেষ ঘ্রাণের দিকে স্থানান্তরিত হয় এবং পুনর্যোজনে (regeneration) অংশ নেয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই সংগ্রাহী ছাড়া ইঁদুরে পেশীতন্তুগুলো ক্ষয়প্রবণ হয় এবং দূর্বল পুনর্যোজন দেখায়। এই গ্রাহকের সক্রিয়ক প্রাকৃতিক প্রতিরূপ খুজে পেলে পেশী পুনর্যোজনের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষকরা বিভিন্ন ঘ্রাণজ সংগ্রাহীর জন্য প্রাকৃতিক প্রতিরূপ পেয়ে গেছেন। যেমন কিডনিতে Olfr78 নামক ঘ্রাণজ সংগ্রাহী সক্রিয় হয় অন্ত্রে বসবাসরত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা নিঃসৃত বিশেষ ধরনের

ফ্যাটি এসিডের প্রভাবে। এই সংগ্রাহী ‘শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড’-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং রক্তচাপ বৃদ্ধির জন্য সংকেত পাঠায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট চেইন ফ্যাটি এসিড তৈরি করে যখন তারা আঁশ জাতীয় খাবার হজম করে। তাই একসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আঁশ জাতীয় খাবারের ভুমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

হ্যান্স হ্যাটস তার গবেষণায় এমন কিছু ঘ্রাণ সংগ্রাহী পেয়েছেন যেগুলো ক্যান্সার কোষে থাকে এবং তাদের সক্রিয় করার ফলে ক্যান্সার টিস্যুর সংকোচিত হয়ে যায়। যদিও সত্যিকারের ক্যান্সার থেরাপিতে এদের নিয়ে আসার জন্য আরো বহু গবেষণা প্রয়োজন। সুদূর ভবিষ্যতে আমরা হয়তো সুগন্ধি মেখেই ক্যান্সার দূর করতে, কেটে যাওয়া ক্ষত পূরণ করতে কিংবা প্রজনন ক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম হতে পারবো।

আলোয় উপশম

আমাদের চোখে অনেক ধরনের আলোক সংবেদী কোষ থাকে। এরা হচ্ছে অপসিন, রোডপসিন, মেলানোপসিন। এদের আবিষ্কার কিন্তু ধাপে ধাপে হয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও প্রভেন্সিও স্তন্যপায়ী প্রাণীতে মেলানোপসিন খোঁজা শুরু করেন। তখন পর্যন্ত ধারণা ছিল যে মেলানোপসিন সাধারণত উভচরের চোখে পাওয়া যায়, তাই সেসময় দৃষ্টি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে ইগনাসিওর কাজ ছিল নিতান্তই দূরদৃষ্টির অভাব। তবে ১০ বছর পর তিনি মানুষের রেটিনাতেও রড এবং কোন কোষে অপসিনের পাশাপাশি মেলানোপসিনের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এর পর মানবদেহে মেলানোপসিনের কাজ সম্পর্কে ধীরে ধীরে তথ্য উন্মোচিত হতে থাকে। এটা ঘুম জাগরণ চক্র, চোখের তারার সংকোচন, দক্ষতা অর্জন এমনকি বিপাকেও ভূমিকা রাখে।

তবে রেটিনা ছাড়াও অন্যত্র যে মেলানোপসিন থাকতে পারে সেটা চমৎকার একটি ঘটনার মাধ্যমে বের হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যান বার্কোভিৎজ তার ল্যাবে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য স্বয়ংক্রিয় বাতি লাগান, যেগুলো মানুষের উপস্থিতিতে জ্বলে উঠে। তার এক ছাত্র একদিন লক্ষ্য করলেন গবেষণার জন্য যে রক্তনালীতে ফোর্স ট্রান্সডিউসার লাগানো যা সারাক্ষণই তথ্য দিতে থাকে, সেটাতে বাতি জ্বলে উঠলে রক্তচাপ কমে যায়!

যদিও ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফটোরিলাক্সেশন ব্যপারটার অস্তিত্ব বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত কিন্তু অন্তর্নিহিত রহস্যটা কারো জানা ছিল না। বার্কোভিৎজ এবং তার দল এরপরে অনুসন্ধান করে সেই রক্তনালীতে মেলানোপসিন প্রোটিন এবং তার সৃষ্টির জন্য দায়ী জিন Opn4 কে শনাক্ত করেন। নীল আলোর প্রভাবে মেলানোপসিনের উপস্থিতিতে রক্তনালী প্রসারিত হয় যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়। জেনে রাখা ভালো মেলানোপসিন নীল আলো সংবেদী এবং ঘুম জাগরণের সাথে জড়িত বলেই ঘুমানোর আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার

চিত্রঃ আলোক সংবেদী মেলানোপসিন

ইঁদুরের লেজকে নীল আলোয় আলোকিত করে দেখা যায় আসলেই তখন লেজের রক্তচাপ কমে যায়। কিন্তু ঘটনা হলো ইঁদুরের লেজের রক্তনালীগুলো চামড়ার কাছকাছি যার ফলে আলো প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ রক্তনালীই দেহের এত ভেতরে যেখানে কোনোভাবেই আলো প্রবেশ করতে পারে না। নিষেধ করা হয়।

তাহলে সেখানে এই আলোকীয় সংগ্রাহী কীভাবে কাজ করতে পারে? বার্কোভিৎজ বলেন, এটা হতে পারে বিবর্তনের পদচিহ্ন কিংবা আলো ছাড়াও দেহে এমন কিছু আছে যেটা এদের সক্রিয় করতে পারে অথবা কোনো অজানা পদ্ধতিতে দেহের ভেতরেই নীল আলো তৈরি হয় হয়তো! যা আমরা জানি না।

এর সত্যিকার কাজ সম্পর্কে সন্দেহ থাকলেও বার্কোভিৎজ চেষ্টা করছেন এমন কোনো বুদ্ধি বের করতে যাতে রক্তচাপ জনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এই মেলানোপসিন সংক্রান্ত ফটোরিলাক্সেশনকে কাজে লাগানো যায়। রেনড’স ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঠাণ্ডার প্রভাবে হাত ও পায়ের আঙ্গুলে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়ে যায় এবং তারা অবশ কিংবা ব্যথা অনুভব করেন।

তারা এমন মোজা পড়তে পারেন যা তাদের আঙুল নীল আলোয় আলোকিত করে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে আনবে ও ব্যথার উপশম ঘটাবে। নবজাতক শিশুরা যারা পালমোনারি হাইপারটেনশনে ভোগে তাদের ক্ষেত্রেও আলোকীয় চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে। রক্তচাপ জনিত রোগগুলোতে বর্তমানে যেসব ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হয় তাতে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই আলো হতে পারে এসব ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ বিকল্প। তবে তার জন্য আমাদের কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা আগে থেকেই বলা যাচ্ছে না।

স্বাদেই নিস্তার

খাওয়ার সময় যে বিভিন্ন খাবারের স্বাদ নেই, সেই স্বাদ নেয়ার কাজটি করে থাকে বিভিন্ন স্বাদ সংগ্রাহক কোষ। নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন এইবার বলবো এরা মুখ ছাড়াও দেহের অন্য কোথায় কোথায় আছে। তারা পেটের ভেতরে আছে, শুক্রাণুতে আছে, শুক্রাশয়ে আছে, চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে দেহের ভেতর এদের কাজটা বের করা। কিছু কিছু কাজ অবশ্য জানা গেছে, যেমন পেটের ভেতরে যেসব স্বাদ সংগ্রাহী আছে তারা খাবারের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করে। আবার কিছু কিছু কাজ অর্ধেক জানা গেছে, যেমন ইঁদুরের শুক্রাশয়ে যেসব স্বাদ গ্রাহক আছে তাদের নিষ্ক্রিয় করে দিলে ইঁদুরগুলোর প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কেন এমন হয়? তার উত্তর জানা নেই।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ফিঙ্গার শুরুর দিকে মাছে একধরনের সংবেদনশীল কোষ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন যা জৈবরাসায়নিক এবং গাঠনিক দিক থেকে আমাদের স্বাদ কোড়কের সাথে সাদৃশ্যতা দেখায়। তিনি এর নাম দেন নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ (solitary chemosensory cell)। ২০০৩ সালে তিনি দেখতে পান একই ধরনের কোষ স্তন্যপায়ীদের নাকেও আছে। তবে আমাদের চিন্তা এর নিঃসঙ্গতা নিয়ে নয়। জেনে রাখা ভালো আমরা যে টক, ঝাল, মিষ্টি বিভিন্ন স্বাদ গ্রহণ করি তার জন্য আলাদা আলাদা স্বাদ সংগ্রাহী আছে। ২০০৩ সালে ফিংগার ইঁদুরের শ্বাসনালীর উপরের দিকে অবস্থিত নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষের মধ্যে তেতো স্বাদ সংগ্রাহী শনাক্ত করেন যেগুলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিকের প্রভাবে সক্রিয় হয়।

চিত্রঃ স্বাদ গ্রাহক, ছড়িয়ে আছে সারা দেহে

কোহেন শনাক্ত করেন মিষ্টি স্বাদ গ্রাহক। ধারণা করা হয় এরা একই সাথে কাজ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে।ইঁদুরে সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তীতে ফিংগার মানুষের উচ্চতর শ্বাসনালীর নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষেও তেতো স্বাদ সংগ্রাহী খুঁজে পান। অন্যদিকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াম

গ্লুকোজ কিংবা সুক্রোজের মাধ্যমে মিষ্টি স্বাদ সংগ্রাহী সক্রিয় হলে একই কোষের তেতো স্বাদ সংগ্রাহী নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। কোহেন দেখেন যে স্বাভাবিক স্বল্প মাত্রার গ্লুকোজই তেতো স্বাদ সংগ্রাহীকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। শ্বাসনালীতে ব্যাকটেরিয়া প্রধানত গ্লুকোজ খেয়ে বেঁচে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকলে গ্লুকোজ কমতে কমতে এক সময় তেতো স্বাদ গ্রাহক মুক্ত হয়ে গেলে এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সাইনুসাইটিস কিংবা ডায়বেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসনালীতে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকায় তারা প্রায়ই এ ধরনের সংক্রমণের শিকার হন যা সহজে সাড়ে না।

নিঃসঙ্গ রাসায়নিক সংবেদী কোষ ছাড়াও আরেক জায়গায় তেতো সংগ্রাহী পাওয়া যায়। উচ্চতর শ্বাসতন্ত্রে চুলের ন্যায় একধরনের কোষ থাকে যাদের সিলিয়া বলে, এরা ব্যাকটেরিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর জিনিস যুক্ত মিউকাস বাইরে বের করে দেয়। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল সিলিয়াতেও তেতো স্বাদ গ্রাহকের অস্তিত্ব পেয়েছেন যেগুলো ব্যাকটেরিয়ার খোঁজ পেলে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া শুরু করতে পারে। এই অবস্থায় মিউকাস বের করে দেবার গতিও বাড়ে। কোহেন একটি বিশেষ তেতো স্বাদ সংগ্রাহী T2R38 নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন। ধারণা করা হয় এই সংগ্রাহীর উপস্থিতিই কিছু কিছু মানুষকে সুপার-টেস্টার বানিয়ে দেয়। এরা অতি অল্প মাত্রায় তেতো পদার্থের উপস্থিতিও সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারে। মজার বিষয় হলো এদের সিলিয়া অতি সামান্য ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও ধরে ফেলে। ফলে ওনারা ভাগ্যবান যে তাদেরকে খুব কমই গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের শিকার হতে হয়।

কোহেন বলেন, কোনো ব্যাক্তিতে নিরাপদ তেতো পদার্থের স্বাদ গ্রহণ করতে দিয়ে বলতে পারি তিনি কতটা তেতো অনুভব করছেন। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বলা সম্ভব হতে পারে তিনি কতটা সংবেদনশীল। যে বেশি তেতো অনুভব করবেন, তার অনাক্রম্যতা বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এক্ষেত্রে তত শক্তিশালী। অদূর ভবিষ্যতে এটা এমনও হতে পারে তিক্ততার মাত্রা যাচাইয়ের মাধ্যমে আক্রমণকারী অণুজীবের পরিচয় জানা যাবে। নাকের মধ্যে তেতো কিছু ঢুকিয়ে দিয়ে অনাক্রম্যতা বা শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উত্তেজিত করে চিকিৎসাও সম্ভব হতে পারে।

শ্বাসনালী ছাড়াও সাম্প্রতিক কালে পেটের ভেতরে স্বাদ সংগ্রাহী পাওয়া গেছে। এরাও অনাক্রম্যতায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্ত্রের টাফট কোষে স্বাদ সংগ্রাহী থাকে, ধারণা করা হতো এদের কাজ হয়তো খাদ্যের সাথে কোনো বিক্রিয়া করা।

পরিশেষে অনুসন্ধ্যিৎসু মনে অনেক অনেক প্রশ্ন নিয়েই শেষ করতে হচ্ছে। তবে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ প্রশ্ন করতে পেরেছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছে। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে এসে কেউ কেউ ভাবতে পেরেছে বলেই আমরা জানতে পেরেছি আমাদের দেহেই গণ্ডির বাইরে কত ঘটনা ঘটে। অনেক কিছুই এখনো অজানা, কীভাবে এরা সক্রিয় হয়, কী কাজ করে। তবে পরীক্ষাগারে এদের নিয়ে কাজ হচ্ছে, দিগন্তে উকি দিচ্ছে আরো চমকপ্রদ চিকিৎসা প্রযুক্তি। আমরা যদি সভ্য থাকি, বিজ্ঞান আমাদের সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দেবে, ভাবতে দোষ কি?

তথ্যসূত্র

  1. Senses in unlikely places, Sandeep Ravindran, The Scientist, September, 2016
  2. http://the-scientist.com/?articles.view/articleNo/46831/title/What-Sensory-Receptors-Do-Outside-of-Sense-Organs/

 

 

ডিজিটাল আসক্তি— বাড়িয়ে দেয় একাকিত্ব, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার আমাদের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে এটা ছাড়া যেন জীবনই অসম্পূর্ণ। একমত না হলে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আরেকবার ভেবে দেখা যেতে পারে হাঁসফাস লাগে নাকি। কী বলেন? স্মার্টফোন আমাদের সর্বদা যোগাযোগ ও তথ্যের দুনিয়ায় যুক্ত রাখছে —এটা আসলেই বড় একটা সুবিধা। কিন্তু, এ সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নীরব ঘাতক। স্মার্টফোন ক্রমাগত রিংটোন, বিবিধ এলার্ট টোন, ভাইব্রেশান ইত্যাদি সিগন্যাল দিতেই থাকে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নতুন কোন ইমেইল, টেক্সট মেসেজ বা ছবি শেয়ার কিংবা ইন্টারনেট দুনিয়ায় একটু পরপর ঢুঁ মারার লোভ এড়ানোই যায় না।

সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্বাস্থ্য শিক্ষার অধ্যাপক এরিক পেপের এবং সহযোগী অধ্যাপক রিচার্ড হার্ভে এ ব্যাপারে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন নিউরো রেগুলেশন জার্নালে। তাদের মতে স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সোজা কথায় অন্য যেকোন জিনিস বা পণ্যের অপব্যবহারের মতই। একে বিশেষ নজরের আওতায় ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

“আফিম জাতীয় আসক্তির ক্ষেত্রে নেশাকারী অক্সিকন্টিন(OxyContin) গ্রহণ করে থাকে ব্যথানাশক হিসেবে — বেশ ধীর প্রক্রিয়া এটি। এর কারণে কোনো ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে ধরনের স্নায়বিক সংযোগ স্থাপন হতে থাকে সে তথ্য গবেষকদের কাছে আছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একজন মানুষের ঐ ডিভাইসের প্রতি যে আচরণগত আসক্তির জন্ম হয় তার কারণেও মস্তিষ্কের স্নায়ু একই প্যাটার্নে সংযোগ ঘটাচ্ছে।

ডুবে বুঁদ ডিজিটাল নেশায়; image source: indianexpress.com

গোদের উপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবার আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দৌড়াত্ম্য। আসলে এ যোগাযোগ সামাজিকতার মোড়কে চিৎকার করলেও কার্যত বাস্তবিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির ১৩৫ জন শিক্ষার্থীর উপর এক জরিপ পরিচালনা করেন পেপের এবং হার্ভে। জরিপে পাওয়া তথ্য থেকে তারা প্রতিবেদনে প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা তখনই বেশিরভাগ সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন যখন তারা আলাদা হয়ে যান, একাকিত্বে, হতাশায় এবং দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

মানুষের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ায় আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকে। শারীরিক ভাষা, মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য অঙ্গভঙ্গি, ইঙ্গিত, ব্যঞ্জনা ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে থাকে। আবার এই ক্ষেত্রে তেমন কোনো সিগন্যাল নেই যা সহজেই বাধার সৃষ্টি করবে বা হুট করেই মানুষের সাথে মানুষের এই বাস্তব সংযোগকে ব্যাহত করবে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনে যেমন আমরা এক সিগনাল থেকে আরেক সিগনালে লাফিয়ে বেড়াই বাস্তবিক আচরণে সে বহুমুখিতা থাকছে না– এক রাস্তায় চলা যাচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব কর্মকাণ্ডকে প্রতিস্থাপন করে যখন স্মার্টফোন জায়গা করে নেয় তখন যোগাযোগ বা মিথষ্ক্রিয়ার বিষয়টি আমূল বদলে যায় যার ফলে একাকিত্ব অনুভূত হয়।

তারা আরো আবিষ্কার করেন যে ঐ একই শিক্ষার্থীরা ক্রমাগত নিয়মিতভাবে ফোন ব্যবহার করতে থাকে (মাল্টিটাস্কিং) তাদের পড়াশোনা, খাওয়া, ক্লাসে উপস্থিত হওয়া, চলাফেরার সময়ও। এই চলমান প্রক্রিয়া শরীর ও মনের জন্য বিশ্রাম ও উদ্যমকে খেয়ে দেয়। আবার একই সাথে মূলত যে কাজ করা হচ্ছিল তা প্রধান কাজ থেকে উপ-কাজে পরিণত হয়ে পড়ে। হয়ত একসাথে দুই তিন দিক রক্ষা হচ্ছে– এই বিশ্বাস তৈরি হয়। আদতে কাজের মান হ্রাস পায়, মনোযোগ দিয়ে একক সময়ে একটি কাজ করাই দক্ষতার প্রকাশ করে।

পেপের এবং হার্ভে বলেন, ডিজিটাল আসক্তি আমাদের দোষ নয়। কিন্তু প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রিগুলোর লভ্যাংশের প্রতি লোভের তোপে পড়ে এ ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। যেহেতু এ ধরনের আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের মূলনীতিই হল “যত দেখা, তত ক্লিক, তত টাকা”– এই অর্থের মোহ থেকেই আধুনিক নিরর্থের জন্ম। তাই তাদের লক্ষ্য থাকে যত বেশি বেশি নোটিফিকেশন, কম্পন বা অন্যান্য সিগনাল গ্রাহকের কাছে পাঠানো যায় ততই তাদের অর্থসাধনের উদ্দেশ্য হয়। ক্রমাগত যখন এভাবে স্রোতের মত সংকেত, এলার্ট আসতেই থাকে আমরা সেদিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হই। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্কে যে স্নায়ুপথে সতর্কতা তৈরি করছে তা আবার দায়ী যখন আমরা কোনো শিকারী প্রাণির আক্রমণের মুখে পড়ি তখনও ঠিক সে স্নায়ুপথই আমাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সতর্কতার আচরণের ফাঁদেই আমরা আটকে গেছি নগন্য তথ্যের কাছে।

ডিজিটাল ডিভাইসের কূপে পড়ে আছেন?; image source: thenextweb.com

তবে, যেহেতু আমরা আমাদের অভ্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, যেমন- কম চিনি খাওয়ার অভ্যাস করা, তেমনি করে আমরা আমাদের ফোন এবং কম্পিউটার আসক্তি থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারব। প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, এটা বুঝতে পারা যে প্রযুক্তি কোম্পানির লক্ষ্য হল আমাদের অন্তঃস্থ জৈবিক আচরণকে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা।

পরিত্রাণের সহজ উপায়

  • নোটিফিকেশন এলার্ট অফ করে রাখতে হবে। এলার্ট অফ করে আবার এলার্টের জন্য বসে থাকবেন না। ফোনের বাইরেটাই জগত এটা বিশ্বাস করা ভুলে যাবেন না।
  • ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া প্রত্যুত্তর কেবল দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিন। যখন তখন চেক করার অভ্যাস পরিহার করুন।
  • এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝে কখনোই মনোযোগ ডিভাইসের দিকে না সরানো। হয়ত একটি বই পড়তে পড়তে আপনার চোখ ধরে এসেছে, ভাবলেন ৫ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে নিই। বিশ্রাম নিন, কিন্তু এই ৫ মিনিটে আবার ডিভাইসের দিকে হাত বাড়াবেন না। বিশ্রামটাও মনোযোগ দিয়েই নিন।
ওয়াইফাই দেখলেই হামলে পড়বেন না; image source: shutterstock.com

বাস্তব উদাহরণ

পেপেরের দুই শিক্ষার্থী আবার নিজ উদ্যোগে সমাধান বেছে নিয়েছে। তারা তাদের প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারের ধরণকে পাল্টে দিতে নিজেদের প্ররোচিত করেছে। বিনোদন, পার্ক এবং ভ্রমণ বিষয়ে পড়ছে এমন একজন খারি ম্যাককেন্ডেল তার সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে ৬ মাস পূর্বে এই উদ্দেশ্যে যেন বাস্তবের মুখোমুখি মিথষ্ক্রিয়ার আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে পারে। সে কিন্তু তখনও (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দিলেও) পরিচিতদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে ফোন বা টেক্সট করে। মানুষের সাথে কোনো ডিভাইসের সত্তার চেয়ে ব্যক্তি হিসেবে সময় কাটানোর চেষ্টা কাজে দিয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী সিয়েরা হিঙ্কেল যিনি তুলনামূলক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে পড়ছেন তিনি আরো সহজভাবে সমাধান শুরু করেছেন। তিনি চলাফেরার সময় হেডফোন ব্যবহার করেন না, বরং চারপাশ পর্যবেক্ষণে মনোযোগ দেন। আর যখন বন্ধুদের সাথে সময় কাটান তখন বন্ধুরা সবাই মিলে তাদের ফোনগুলো একসাথে টেবিলের ঠিক মাঝখানে রেখে দেন। আড্ডার মাঝে যে প্রথম ফোন তুলবে সেখান থেকে তার পক্ষ থেকে সবাইকে ড্রিংকস খাওয়াতে হবে। এই সমাধানটি কিন্তু যথেষ্ট সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। এখানেও মানুষের আচরণ করার ইচ্ছাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে কিন্তু একদিকে কার্যকরীভাবে সমাধানও চলে আসছে আবার আড্ডাটাও জমছে!

সিদ্ধান্ত নেয়ার কাজটা করতে হবে নিজেকে। আপনার যদি মনে হয়ে থাকে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট, আইপড ছাড়া বাঁচতে পারবেন না সাথে এটাও নিজেকে মনে করিয়ে দিন এগুলোর উপজাত একাকিত্ব, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা আপনাকে বেঁচে থেকে বাঁচার আনন্দ পেতে দিবে না।

ডিজিটাল ডিভাইসের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসুন। বাইরের পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করুন। যেখানে জীবন মরণশীল সেখানেই জীবনের উচ্ছ্বাস। ;image source: Federico Rizzato (National Geographic)

বেঁচে থেকেও বাঁচার আনন্দ হতে নিজেকে বঞ্চিত করার কোনো মানে হয় না। একটুখানি ঝেরে নিন নিজেকে। সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীটায় ওড়ার কল্পনা করুন না।

সায়েন্স ডেইলি  অবলম্বনে।

ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

অভ্যাসের শক্তি ও অবিশ্বাস্য রহস্যময়তা

মানুষ অভ্যাসের দাস। এ কথা সবাই জানি। আমরা যদি নিজেদের জীবনের দিকে তাকাই, তাহলে নিশ্চয়ই খুঁজে পাবো এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের উপকার করছে। পাশাপাশি এমন কিছু অভ্যাস আছে যা আমাদের ক্ষতি করছে। এর পাশাপাশি হয়তো নতুন কোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি, কিংবা বাজে কোনো অভ্যাস থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করেছি। হয়তো সফল হতে পেরেছি, কিংবা হতে পারিনি।

কখনো কি নিজেদের অভ্যাসগুলোর মধ্যেকার প্যাটার্ন খুঁজতে চেষ্টা করেছি? যে অভ্যাসের আমরা দাস সেই বিষয়টা নিয়ে খুব করে ভেবেছি কি? নাকি মেনেই নিয়েছি এই দাসত্ব থেকে বের হবার উপায় নেই?

আপনি-আমি না ভাবলেও অনেকেই ভাবে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা ভাবে। ভালো ভালো কোম্পানিগুলোর হর্তাকর্তারা শুধু ভাবেনই না, মোটা অংকের টাকাও ঢালেন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

এখানে একজন মানুষের গল্প বলবো। তার নাম ইউজিন পলি। স্মৃতিভ্রংশ (Amnesia) আক্রান্ত যত কেস আছে তার মধ্যে খ্যাতির দিক দিয়ে তিনি দ্বিতীয়। তবে ইউজিনের জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তার এবং তার পরিবারের জন্য দুঃখজনক। তবে সেসব ঘটনাগুলোই বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে এনেছে স্মৃতি ও অভ্যাস নিয়ে আমাদের চিন্তাধারায়।

তখন ১৯৯৩ সাল। ৭০ বছর বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান ইউজিন পলি ও তার স্ত্রী বেভারলি এক সন্ধ্যায় ডিনার করছিলেন। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, যখন বেভারলি জানালেন যে পরের দিন তাদের সন্তান মাইকেল দেখা করতে আসছে তখন ইউজিন একটু উদ্ভট আচরণ দেখালেন। তিনি যেন মনে করতে পারছিলেন না তাদের কোনো সন্তান আছে।

পরের দিন ইউজিন বমি এবং পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৪ ঘণ্টায় তার পানিশূন্যতা মারাত্মক আকার ধারণ করলে শঙ্কিত বেভারলি তাকে হাসপাতালে নিয়ে ছুটলেন। ইউজিনের দেহের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে ঠেকলো আর তার হলুদাভ ঘামে ভিজে যাচ্ছিলো শুভ্র বিছানার চাদর। ইউজিন বিকারগ্রস্ত ও হিংস্র হয়ে পড়লে তাকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে যায়। বহু কষ্টে চেতনা নাশক প্রয়োগ করে শান্ত করলেন। এরপর ডাক্তাররা তার মেরুদণ্ডের ভেতর নিডল ঢুকিয়ে কয়েক ফোটা সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষা করে দেখা যায় ইউজিন ভাইরাল এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত। এনসেফালাইটিস ঘটায় এক প্রায় নিরীহ ভাইরাস হার্পিস সিমপ্লেক্স। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরা জ্বর-ঠোসা কিংবা ত্বকের ফুসকুড়ি বেশি ক্ষতি করতে পারে না। যদিও অত্যন্ত বিরল, তারপরেও এই ভাইরাস যদি রক্তে ভেসে ভেসে কোনোক্রমে মাথায় পৌঁছে যায় তাহলে মগজের সুস্বাদু ব্রেইন টিস্যু খেতে থাকে। যে টিস্যুতে আমাদের ভাবনা, স্মৃতি, স্বপ্ন, দক্ষতা ইত্যাদি সবকিছুই অবস্থান করে।

চিত্র: হার্পিস সিমপ্লেক্স সাধারণত জ্বর-ঠোসা-ফুসকুড়ির বেশি ক্ষতি করতে পারে না।

ডাক্তাররা তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কিন্ত তারপরেও উচ্চ মাত্রার এন্টিভাইরাল প্রয়োগ করে ভাইরাসের সংক্রমণ রুখে দিয়ে বিস্তার এই আক্রমণ ঠেকানো গেলো। কিন্তু যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তা আর ফেরানো যায়নি। ব্রেইন স্ক্যানে ধরা পড়ে মগজের মধ্যভাগে এক অশুভ ছায়া। ক্র্যানিয়াম এবং স্পাইনাল কলাম যেখানে মিলিত হয় সেখানের অনেকখানি টিস্যু ভাইরাস ধ্বংস করে দিয়েছে।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন ইউজিন বেশ দুর্বল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। তবে ধীরে ধীরে অবস্থা ভালো হলো। তিনি স্বাভাবিক মানুষের মতোই চলাফেরা করতে শুরু করলেন। কিন্তু, তিনি বুঝতে পারছিলেন না সপ্তাহের কোন দিন এটি। কিংবা ডাক্তার ও নার্সদের নাম বারবার বলার পরও কেন তাদের নাম মনে রাখতে পারছিলেন না। এমনকি তাদের সাথে যে পরিচয় হয়েছে সেটাও তার স্মৃতিতে নেই।

বাড়িতে নিয়ে আসার পর আরও অদ্ভুত সমস্যা দেখা গেলো। ইউজিন তার বন্ধুদের কথা ভুলে গেছেন। তিনি কথোপকথন চালিয়ে নিতে পারছিলেন না। কোনো কোনো সকালে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত। উঠে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেতেন। তারপর আবার বিছানায় শুয়ে মাথা চাদরের নিচে ঢুকিয়ে রেডিও চালিয়ে দিতেন। কিছু সময় পর তিনি আবার একইভাবে রান্নাঘরে গিয়ে বেকন আর ডিম খেয়ে বিছানায় গিয়ে চাদরে মাথা মুড়ে রেডিও শুনতেন। একই কাজ এভাবে বেশ কয়েকবার চলতো।

ঘটনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েন বেভারলি। তিনি ইউজিনকে নিয়ে ছুটলেন বিশেষজ্ঞদের কাছে। তার মধ্যে একজন হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্রফেসর ল্যারি স্কুইর। স্মৃতির নিউরো এনাটমি নিয়ে এই বিজ্ঞানীর তখন ৩ দশকের কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতি ধারণ করে এই ব্যাপারে তার আগ্রহও ছিল বেশ। ইউজিন পলিকে নিয়ে ল্যারি স্কুইরের কাজ অচিরেই তার নিজের কাছে নতুন জগতের উন্মোচন করলো। পাশাপাশি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের জন্যও হয়ে উঠলো নতুন দুয়ার।

‘অভ্যাস’ জিনিসটা কত শক্তিশালী, আর কতটা গভীরে অভ্যাসের অনুরণন- এই ব্যাপারগুলো নাড়িয়ে দিয়েছিল বিজ্ঞানীদেরকে। স্কুইরের কাজ এটাই প্রমাণ করেছিল, নিজের নাম ও বয়সের মতো তথ্যও মনে রাখতে পারে না এমন কারো পক্ষেও জটিল কোনো অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।

চিত্র: ল্যারি স্কুইর

চিকিৎসার সময় বিশেষজ্ঞ স্কুইর রোগী ইউজিনের সাথে কথাবার্তা শুরু করলেন তার যুবক বয়সের কথা জানতে চেয়ে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই বলে গেলেন সেন্ট্রাল ক্যালিফোর্নিয়ার যে শহরে তিনি বড় হয়েছেন তার কথা। মার্চেন্ট মেরিন থাকার সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় সফরের কথা। জীবনের বেশিরভাগ স্মৃতিই মনে করতে পারছেন যেগুলো ১৯৬০ এর আগে ঘটেছিল।

যখন স্কয়ার এর পরের কোনো সময়ের কথা জানতে চাইছিলেন তখন ইউজিন বিনয়ের সাথে বলছিলেন “দুঃখিত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মনে করতে আমার সমস্যা হয়।”

প্রফেসর তার বুদ্ধিমত্তার কিছু পরীক্ষা নিলেন, দেখা গেল তিনি সেসবে বেশ ভালো করলেন। যেসব স্বাভাবিক অভ্যাস অনেক আগেই গড়ে উঠেছিল সেসবও তার মধ্যে ভালোভাবেই ছিল। যেমন স্কুইর যখন তাকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন, তিনি ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। প্রফেসর যখন ইউজিনের কোনো উত্তরে খুশি হয়ে প্রশংসা করছিলেন তিনিও প্রতিউত্তরে প্রশংসা করছিলেন।

নতুন কারো সাথে দেখা হলে তিনি নিজেই আগে পরিচয় দিয়ে দিনটি কেমন কাটল জিজ্ঞেস করছিলেন। কিন্তু স্কুইর যখন তাকে একটা সংখ্যার সিরিজ মুখস্থ করতে দিচ্ছিলেন, অথবা ঘরের বাইরের হলওয়ের স্কেচ আঁকতে বলছিলেন, তা তিনি পারছিলেন না। আসলে নতুন কোনো তথ্যই তার মাথায় মিনিট খানেকের বেশি থাকতো না।

সবচেয়ে দুঃখজনক যে তার অসুস্থতা কিংবা ঐ সময়ে হাসপাতালে থাকা সংক্রান্ত কোনো স্মৃতিই মনে নেই। আসলে তার নিজের যে মানসিক প্রতিচ্ছবি ছিল তাতে কোনো অসুস্থতা বা স্মৃতিভ্রষ্টতা সংক্রান্ত তথ্য নেই। সে কারণে তার সমস্যা কী সেটাও তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি সবসময় নিজেকে সুস্থই ভাবতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ভেবে গেছেন তার বয়স ৬০ বছর। অথচ তিনি আক্রান্তই হয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সে।

মাস খানেক পর ইউজিন ও বেভারলি তাদের বসবাসের জায়গা বদলিয়ে স্যান ডিয়াগোতে চলে আসেন। সেসময় প্রায়ই প্রফেসর স্কুইর তথ্য নিতে ঐ বাসায় যেতেন। একদিন স্কুইর ইউজিনকে বললেন তাদের নতুন বাসার কোনো ঘর কোথায় আছে সেটার একটা ব্লু-প্রিন্ট এঁকে দিতে। তিনি সেটা করতে পারলেন না। এরপর স্কুইর তার কম্পিউটারে কাজে মন দিলেন। ইউজিন তখন উঠে গিয়ে বাথরুমে গেলেন। সেখান থেকে ফ্ল্যাশের শব্দও এলো। কাজ সেরে টাওয়েলে হাত মুছে তিনি ফিরেও এলেন স্কয়ারের পাশে।

সেই সময়ে কেউই ভাবেনি, একটি মানুষ তার বাসার কোন রুম কোথায় আছে সেটা এঁকে দেখাতে পারে না কিন্তু একা একাই বাথরুম করে আসতে পারছে কোনো সমস্যা ছাড়াই। এরকম ঘটনা এবং কাছাকাছি এধরনের আরো কিছু জিজ্ঞাসাই পরবর্তীতে এমন কিছু আবিষ্কারের রাস্তা খুলে দিয়েছিল যার মাধ্যমে অভ্যাসের শক্তি সম্পর্কে মানুষ বুঝতে পেরেছে।

স্যান ডিয়াগোতে আসার প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেভারলি নিজেই ইউজিনকে দুই বেলা করে হাঁটতে নিয়ে যেতেন। ডাক্তারদের নির্দেশনা ছিল যে তার চলাফেরা ও ব্যায়ামের দরকার। তাছাড়া ঘরে থাকলে বারবার একই প্রশ্ন করে করে তিনি বেভারলিকে পাগল করে দিতেন। যেহেতু তিনি সবই কয়েক মিনিটের মধ্যে ভুলে যান, তাই সবসময় বাইরে তার সঙ্গী কেউ একজন থাকতে হবে। নয়তো তিনি হারিয়ে গেলে হয়তো আর ফিরে আসতে পারবেন না।

কিন্তু এক সকালে বেভারলি তৈরি হবার আগেই ইউজিন বেরিয়ে যান। একা একা। টের পেলে বেভারলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তিনি পাগলের মতো এখানে সেখানে খুঁজে যখন পেলেন না তখন পুলিশকে জানিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেন। দেখা গেল ইউজিন ঘরে বসে আছেন, তার সামনে টেবিলে একটা পাইন-কোন রাখা।

পরবর্তীতে বুঝা গেল যে ইউজিনের যদিও ধারণা নেই তিনি কোথায় থাকেন, তারা বাড়ি কোনোটি। কিন্তু বেভারলির সাথে সকাল বিকাল হাঁটতে হাঁটতে তার অভ্যাস দাড়িয়ে গেছে যার মাধ্যমে তিনি অবচেতনেই চিনে চিনে হেঁটে আসেন ঐদিন।

বেভারলি তাকে নিষেধ করেছিলেন একা বাইরে যেতে, কিন্তু সেটা মেনে নিয়ে মনে রাখা সম্ভব হতো না। তিনি ভুলে যেতেন আর বেরিয়ে পড়তেন। শুরুতে কিছুদিন তাকে অনুসরণ করতেন যেন হারিয়ে না যান। পরে দেখা গেল না, তিনি আসলেই একা চলাফেরা করতে পারছেন। কখনো কখনো পাইন কোন, ফল, পাথর এসব নিয়ে আসতেন। একদিন ওয়ালেট আর আরেকদিন কুকুরছানাও ঘরে এনেছিলেন। কিন্তু তার স্মরণেই নেই সেসব কোথায় পেয়েছিলেন।

এই ঘটনাগুলো শোনার পর প্রফেসর স্কুইর একদিন তার সঙ্গীদের সাথে করে নিয়ে এলেন। হাঁটার সময় হলে ইউজিন তাদের একজনের সাথে হাঁটতে বের হলেন যার ওই এলাকার পথঘাট সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ইউজিন নিজেই পথ দেখিয়ে ঘুরে আসলেন। যখন বাসার কাছাকাছি চলে এসেছেন তখন সেই বিজ্ঞানী জানতে চাইলেন কোনটা ইউজিনের বাসা, ইউজিন সেটা বলতে পারলেন না।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে একদম ঠিক জায়গাতেই পৌঁছালেন। কিংবা ঘরের ভেতর যখন জিজ্ঞেস করা হলো রান্নাঘর কোনদিকে সেটাও তিনি বলতে পারলেন না। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, যখন জিজ্ঞেস করা হলো ক্ষুধা লাগলে তিনি কী করতেন। দেখা গেলো তিনি উঠে গিয়ে রান্না ঘরে বয়াম থেকে খাবার বের করে নিয়ে এলেন।

এরকম আরো কিছু ঘটনার পর আর বুঝতে বাকী রইলো না যে ইউজিনের মস্তিষ্ক যদিও সচেতনভাবে কোনো নতুন তথ্য গ্রহণ করছে না কিন্তু অবচেতনভাবে ঠিকই করছে। এবং তা ব্যবহারও করছে। এরপর বেশ কিছু এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও অভ্যাসের এই ব্যাপারটি প্রমাণ করা সম্ভব হয়।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে মস্তিষ্কের কর্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সবাই জানতে পারলেন যে একটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে সবকিছু ভুলে গেলেও সেই অনুযায়ী অবচেতনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব। ইউজিন এবং স্কুইর আমাদের দেখালেন যে স্মৃতি এবং বোধের সাথে সাথে অভ্যাসও আমাদের আমাদের আচরণের মূল ভিত্তি গঠন করে।

আমাদের হয়তো মনে না-ও থাকতে পারে কীভাবে বা কী কারণে কোনো একটা অভ্যাস আমরা গড়ে তুলেছি। কিন্তু একবার সেগুলো নিউরনে সংরক্ষিত হয়ে গেলে, তা আমাদের আচরণকে প্রভাবিত করে, আমাদের অজান্তেই।

ইউজিনকে নিয়ে স্কুইরের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ হবার পরে অভ্যাস গঠনের বিজ্ঞান পরিণত হল গুরুত্বপূর্ণ চর্চার বিষয়ে। ডিউক, হার্ভার্ড, প্রিন্সটনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রোক্টর এন্ড গ্যাম্বল, গুগল, মাইক্রোসফট সহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা অভ্যাসের নিউরোলজি এবং সাইকোলজি, এর শক্তি ও দুর্বলতা, কীভাবে অভ্যাস তৈরি হয় এবং নিজেদের কাজে লাগানো যায় সেসব বুঝার জন্য শ্রম দেয়া শুরু করলেন।

সব অভ্যাসেই তিনটা স্তর আছে। Cue-Routine-Reward। গবেষকরা জানতে পারলেন Cue হতে পারে যেকোনো কিছুই। হতে পারে সেটা টসটসে ক্যান্ডি বার, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন, কোনো বিশেষ জায়গা, দিনের কোনো একটি সময়, আবেগ, চিন্তার ক্রম কিংবা বিশেষ কোনো মানুষের সাহচর্য। Routine হতে পারে প্রার্থনার মতো জটিল কিংবা বাটন চাপার মতো সহজ কোনো কাজ। আবার Reward ও হতে পারে কোনো খাবার বা রাসায়নিক যেটা দেহে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে, কিংবা গর্ব অথবা আত্মতুষ্টির মতো আবাগীয় প্রণোদনা।

পরবর্তী প্রতিটা এক্সপেরিমেন্টই ইউজিনের সাথে স্কুইরের আবিষ্কার প্রতিধ্বনিত হয়েছে। অভ্যাস অনেক শক্তিশালী, কিন্তু বেশ সূক্ষ্ম। তারা আমাদের সচেতনতার বাইরে তৈরি হতে পারে, অথবা তাদেরকে সুচারুভাবে সাজিয়ে নেয়া যেতে পারে। যতটা আমরা ভাবছি তারচেয়েও জোরালোভাবে আমাদের জীবন অভ্যাস দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তারা এতটাই আগ্রাসী যে আমাদের মগজ এমনকি কমন সেন্স বাদ দিয়ে হলেও এদেরকে মেনে চলে।

আক্রান্ত হবার ৭ বছর পর, ২০০০ সালে ইউজিনের জীবনে একধরনের ভারসাম্য আসে। তিনি প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বেরুতেন। যা ভালো লাগতো খেতেন, কখনো কখনো দিনে ৬ বারও তার আহার হয়ে যেতো। ডাক্তার তার স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিলেও কাজ হয়নি। হবে কীভাবে? কেউ নিষেধ করলেও তো তা তিনি কয়েক মিনিট পরই ভুলে যেতেন। তার স্ত্রী স্কুইরের সাথে পরামর্শ করে চেষ্টা করতেন সবজি জাতীয় খাবার রুটিনে ঢুকাতে।

ইউজিনের দেহ বৃদ্ধ হলেও তিনি নিজেকে ভাবতেন ২০ বছর কম বয়সী। তাই চলাফেরায় যতটা সাবধানতা দরকার, তা তিনি আনতে পারেননি। তার স্বাস্থ্য ভালো রাখার নানা রকম চেষ্টা করা হলেও পরে খারাপ হতে থাকে। এক সকালে প্রচণ্ড বুকে ব্যথা নিয়ে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। হাসপাতালে নেয়ার পর বোঝা গেল এটি ছোটখাটো একটা হার্ট অ্যাটাক।

তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় যখন ব্যথা সেরে গেল তখন তিনি বার বার বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে চাইলেন। দেহের সাথে যুক্ত প্রোবগুলো খুলে ফেলতে চাইলেন যাতে তিনি উপুড় হয়ে ঘুমাতে পারেন। ডাক্তার এবং নার্সদের অনুনয়, বিনয়, হুমকি কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না।

একসময় তার মেয়ে বুদ্ধি দিলেন, যদি তার স্থির থাকাকে প্রশংসা করা হয়, কিংবা বুঝানো হয় তিনি ডাক্তারদের সহায়তা করে বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তাহলে কাজ হতে পারে। হ্যাঁ, তাতে কাজ হয়েছিল। এর পরের কয়েকদিন নার্সরা তাকে যেটাই বলতেন সেটাই ইউজিন শুনতেন। কিছুদিন পরে তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

২০০৮ সালে আরেক অঘটন ঘটলো। ফায়ারপ্লেসের পাশে রাখা খড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙ্গে গেলো। তাকে আবার হাসপাতালে যাওয়া লাগলো। স্কুইর এবং তার দল চিন্তিত হয়ে গেলেন। ইউজিন হয়তো হাসপাতালে নিজেকে একা দেখে ভয় পেয়ে উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে। তাই তারা বিছানার পাশে তার কী হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল এসব সম্পর্কে নোট রাখতেন।

তবে এবার ইউজিন বেশ শান্ত থাকলেন। তিনি যে সবকিছু সবসময় বুঝবেন না, এই বিষয়টাতে হয়তো তার মন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। বেভারলি তখন প্রতিদিন যেতেন হাসপাতালে।

তিনি বলেন “তাকে বলতাম আমি কতটা ভালোবাসি। আমাদের জীবন কত সুন্দর। পরিবারের অন্যদের ছবি দেখাতাম। তাকে জানাতাম সবাই তাকে কত পছন্দ করে। আমাদের ৫৭ বছরের বিবাহিত জীবনে ৪২ বছর ছিল স্বাভাবিক। কখনো কখনো এটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো, আমি পুরনো ইউজিনকে ফিরে পেতে চাইতাম। কিন্তু, অন্তত সে আনন্দে আছে ভেবে শান্তি পেতাম।”

এক বিকেলে তার মেয়ে ক্যারোল আসলেন দেখা করতে। তিনি ইউজিনকে সাথে নিয়ে হাসপাতালের লনে বেড়াতে গেলেন। অনেক্ষন ঘুরাঘুরি, গল্পসল্প করার পর সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছিল দেখে ক্যারল ইউজিনকে ভেতরে নেবার প্রস্তুতি শুরু করলেন। তখন ইউজিন আচমকা বলে বসলেন ‘তোমার মতো কন্যা পেয়ে আমি ভাগ্যবান’। একথা শুনে ক্যারল হতবাক হয়ে যান। তার বাবা শেষ কবে এত মিষ্টি করে কিছু বলেছিলেন তা তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন।

সেই রাতে যখন একটা বাজে তখন বেভারলির ফোন বেজে উঠে। ওপাশ থেকে জানানো হল ইউজিন চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। তার বিদায়ে বিজ্ঞানীমহল মর্মাহত, ইউজিনকে নিয়ে গবেষণা, তার ব্রেইন স্ক্যান, তার জীবনযাপন বহু বিজ্ঞানীকে উপকৃত করেছে এবং করবে। বেভারলি বলেছিলেন “বিজ্ঞানে ইউজিনের অবদান তাকে গর্বিত করে। আমাদের বিয়ের পরপরই ইউজিন বলেছিল যে সে জীবনে অর্থপূর্ণ কিছু করতে চায়, এবং সে তা করেছিল। কিন্তু আফসোস, সে কোনোদিন তা জানতেও পারেনি।”

ইউজিন পলির সমাধিস্থল

তথ্যসূত্র

Charles Duhigg রচিত The Power of Habit থেকে অনুপ্রাণিত

দুপুরের হালকা ঘুম— বাড়িয়ে দেয় পড়াশোনার কার্যকারিতা

“ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের গবেষকদের করা গবেষণা বলছে দুপুরের ঘুম হতে পারে স্নায়বিক কার্যক্ষমতা ও দক্ষতার সহায়ক যা উপকারে আসতে পারে কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন ক্লান্তির সমাধান হিসেবে।” 

ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের অর্থায়নে সহকারী অধ্যাপক জিয়াওপেঙ জি এবং প্রধান অনুসন্ধানকারী জিয়াংহং লিউ (ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া) চীনা ক্লাসরুমগুলোর উপর একটি গবেষণা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। জিনতান থেকে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের দুপুরের হালকা ঘুম আর রাতের ঘুমের স্থিতিকাল পরিমাপ করেন। একই সাথে ঘুমের মান অর্থাৎ গভীরতা ও কার্যকারিতা কেমন তাও টুকে নেয়া হয়। কার্যকারিতা পরিমাপে বহুবিধ স্নায়ুভিত্তিক কাজকর্ম করতে দেয়া হয়েছিল শিক্ষার্থীদের।

জিয়াওপেঙ জির মূল লক্ষ্য নিবদ্ধ ছিল ঘুম এবং চেতনা বা বোধশক্তির মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের। যেকোনো নিবিড় শিক্ষা এবং শিক্ষার চাহিদার জন্য তরুণ সম্প্রদায়ই মূল উৎস। স্নায়বিক চেতনার কার্যক্রমগুলো ভূমিকা রাখে কোনো কিছু শেখা, আবেগ প্রকাশ এবং কেউ কিভাবে আচরণ করবে এ সংক্রান্ত ঘটনায়। তার গবেষণা থেকে দুপুরের হালকা ঘুম আর স্নায়বিক কাজকর্মগুলোর মধ্যে সহায়তা করার বৈশিষ্ট্যে প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত, চীনে দুপুরের দিকে হালকা একটা ঘুম দেয়া তাদের সংস্কৃতি চর্চার অংশ। বাংলাদেশেও কিন্তু গ্রামে ব্যাপারটা প্রচলিত। দুপুরের ভাত খাওয়ার পর আমাদের দেশে এই হালকা ঘুমকে বলে ভাতঘুম।

ঘুমের পৃথিবী কিশোর-দুপুরের। চীনে দুপুরের ঘুম একটি সংস্কৃতি। ; source: asiapacificglobal.com

কিন্তু পশ্চিমাবিশ্বে আবার বিপরীত সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর কোনো বালাই নেই। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে, একটানা ঘুমের ধরণকে মস্তিষ্কের পূর্ণতার জন্য সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। চীনে দুপুরঘুমের ব্যাপারটির চল রয়েছে অফিস আদালতে কর্মচারী এবং বিদ্যাপীঠগুলোয় শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবার পরবর্তী সময়ে।

জি গবেষণা করেছেন মানুষের ২৪ ঘন্টার দেহঘড়ির সাথে ঘুমের ছন্দ কিভাবে তাল খেলে। বয়ঃসন্ধি বা কৈশোরের ক্রমবিকাশের সময় দেহঘড়ির ছন্দের তাল-লয়ের পরিবর্তন হয়। টিনেজারদের ক্ষেত্রে তাদের প্রাক-কৈশোরের অবস্থার সাপেক্ষে দেহঘড়ির তাল-লয় এক থেকে দুই ঘন্টা পিছিয়ে পড়ে।

আব্বু !উঠে পড়, সারারাত ঘুমিয়েছ! স্কুল আছে!; source: New Scientist

এই দশা পরিবর্তনে দায়ী আসলে কিশোরদের জৈবিক পরিবর্তন। এ দশা পরিবর্তনের সময়, দেহঘড়ির কারণে শারীরিক কিছু অভ্যাস সময়ের সাথে বদলে গিয়ে প্রভাব ফেলতে থাকে দৈনন্দিন জীবনে। যেমন বাচ্চাদের (প্রাক-কৈশোরে) বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয়। কিন্তু এই জৈবিক পরিবর্তনের কারণে দেহঘড়ির যে বিলম্ব যুক্ত হয় প্রতিদিনিকার রুটিনে, তার কারণে এ বয়সীদের (১৩-১৯ বছর) বিছানায় ঘুমাতে যেতেও দেরী হয়। সকালের ঘুম ভাঙার সময় একই থাকায় ধীরে ধীরে ঘুমের ঘাটতি নিয়মিত হতে থাকে।

জি মনে করেন জৈবিক কারণের এ আকস্মিক পরিবর্তনে ঘুমের সময়সূচির সমস্যা কিশোরদের স্নায়বিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে। যে কারণে, স্কুলে মনোযোগ দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ক্ষতি হতে পারে স্মৃতিশক্তি এবং কার্যকারণ দক্ষতারও।

দেহঘড়ি কমজোর হয়ে পড়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যকালে। দিনের এ পর্যায়ে কিশোরদের ঘুমভাব চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোর সময়সূচির কারণে কিশোরদের সে সুযোগ পাওয়ার উপায় নেই।

শৈশবের পর্যায় এগুতে এগুতে, আমেরিকার বাচ্চাদের হালকা ঘুমের অভ্যাস হ্রাস পাওয়ার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। বাচ্চাদের এমন সময়সূচির মধ্য দিয়ে শৈশব অতিবাহিত হতে থাকে যে তারা  দৈনন্দিন এই নিয়মকানুনের কারণে একসময় দুপুরের হালকা ঘুমের চাহিদা থেকে বিরত থাকতে শিখে যায়। বিপরীত দিকে, চীনে, স্কুলগুলোর সময়সূচিতে এ সুযোগটা আছে। তাই নিয়মকানুনের চাপ ঐ নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ছে না। ফলত, চীনে কিশোরদের দুপুরের হালকা ঘুমের অভ্যাস সময়ের পরিক্রমায় অপরিবর্তিত থাকছে।

হালকা ঘুমের ব্যাপারে গবেষকদের এসপার ওসপার অবস্থান নিতে দেখা যায়। অনেকে মনে করে দিনের হালকা ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে মিটিয়ে দেয়; আরেক দল মনে করে এটি নিয়মিত হলে রাতের ঘুমের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বহু গবেষণায় ল্যাবরেটরিতে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে এধরনের পরীক্ষার তথ্য নেয়া হয়েছে। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশের সাথে নতুন কৃত্রিম পরিবেশে নিয়মিত অভ্যাসের পার্থক্য হ্রাস করা খুব জটিল ব্যাপার। তাই পরীক্ষায় অংশ নেয়াদের আচরণের প্রভাব কতটা বিশুদ্ধ তা নিয়ে শংকা থাকে। কারণ, আসলে যাচাই করা হচ্ছে অভ্যাসগত ঘুমের প্রভাব। তাই সেই অভ্যাসের সাথে আনুষঙ্গিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজের ঘরের বিছানাসহ ঘুম পরীক্ষার অংশ করে ফেলার কথা ভেবে ফেলেন জি।

পূর্ণবয়স্কদের উপর ঘুম সংক্রান্ত যথেষ্ঠ গবেষণা হলেও, টিনেজারদের ক্ষেত্রে ঘুমসংক্রান্ত গবেষণা অপ্রতুল ছিল। তাই আঁটঘাট বেঁধে নামতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জি। যেহেতু আমেরিকার স্কুলগুলোর সময়সূচি গবেষণার উদ্দিষ্ট ঘুমের সময়ের পরিপন্থী, সেকারণেই চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার যৌথ এ প্রচেষ্টায়।

যা পাওয়া গেল

জি হালকা ঘুমের দুটো পরিমাপক নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন— একটি হল ঘুমের সংখ্যা এবং অপরটি ঘুমের স্থায়ীত্ব। নিয়মিত হালকা ঘুমওয়ালারা— যারা সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ দিন হালকা ঘুম ছাড়া থাকতে পারেন না তাদের ওপর কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। দেখা গেছে, তারা দৃষ্টি সংক্রান্ত পরীক্ষা এবং স্থান, পরিপার্শ্বীয় স্মৃতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় বেশ ভাল দক্ষতা দেখিয়েছে। এরপর আসে এই হালকা ঘুম কতক্ষণ দীর্ঘ হবে? গবেষণা বলছে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট। এক ঘন্টার চেয়ে দীর্ঘ হয়ে গেলে আবার সে ঘুমের কারণে দেহঘড়ির ছন্দপতন হতে পারে। এ গবেষণার জরিপে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ থেকে ৬০ মিনিট ঘুমিয়েছে তারা অধিক কর্মদক্ষতা দেখিয়েছে। একই সাথে একই লোকদের ক্ষেত্রে কাজের গতিও বেশি পাওয়া গেছে। তবে বিকেল ৪টার পর এ ঘুম না নিতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

গবেষকরা দুপুরের হালকা ঘুম এবং নিশিতনিদ্রার মধ্যকার ইতিবাচক সম্পর্ক ধরতে পেরে বেশ অবাক হয়েছেন। দেখা গেছে, হুটহাট হালকা ঘুমের চেয়ে যারা নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ঘুম দিয়ে থাকেন তারা রাতেও ভাল ঘুমাতে পারেন।

পশ্চিম চায়নার একটি স্কুলের দৃশ্য। বাচ্চাদের ডর্মিটরি বা বাসা একটু দূরে বলে ঘুমচর্চা ক্লাসরুমেই সেরে নিচ্ছে যা চীনে দুপুর-ঘুম সংস্কৃতির আবহমানতা প্রকাশ করে।; source: dailymail.co.uk

আমেরিকার সাথে পার্থক্য তৈরি করছে আসলে মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন। দিনের ঘুম রাতের ঘুমের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিতে পারে আবার পরের রাতের জন্য ঘাটতির কারণ হতে পারে সেখানে। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের সাথে তাল মিলিয়ে এই অভ্যাসে প্রস্তুত নয়। কিন্তু চীনে নিয়মিত ঘুমানোর সংস্কৃতি থাকায় দুপুরের ঘুমও চলছে আবার রাতের ঘুমেরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

জি তার এই গবেষণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন যে তার কাজ ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তিনি এর কার্যকারণের নিগূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু বলতে পারছেন না। এতে অবশ্য ফলাফলের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে না। তিনি আশা করেন এ কাজ ভবিষ্যত গবেষণায় এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে কাজে লাগতে পারে।

 

— ScienceDaily অবলম্বনে

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

একঘেয়েমী কেন দরকারী

একঘেয়েমী এক ধরনের অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা যাকে আমরা কেউই চাই না। অনেক মানুষ পাওয়া যাবে যারা কষ্ট পেতেও ভালোবাসে,কিন্তু একঘেয়েমীর প্রশ্নে পলায়নপর। আমরা আমজনতা নিজেদের সুখ,দুঃখ নিয়ে যতটা পেরেশান হই,এদের পেতে বা এদের থেকে রেহাই পেতে যতটা সচেষ্ট, একঘেয়েমী নিয়ে কি ততটা ভাবি? প্রশ্ন করতে পারেন, এটা নিয়ে ভাবার কী আছে? ভ্যান গগ তো বলেই গেছেন- একঘেয়েমীতে ভোগার চাইতে মরে যাওয়া ভালো,তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। তারা খুঁজে চলেছেন একঘেয়েমী আসলে কী? এটা ভালো না খারাপ? কোন ধরনের মানুষ অতি সহজে এতে আক্রান্ত হয়? আক্রান্ত হলে প্রতিকার কী? ইত্যাদি নানা কিছু। তাদের চিন্তা-ভাবনা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে সেই সম্পর্কেই চেষ্টা করবো একটু ধারণা দেয়ার।

ভেবে দেখবেন তো,একঘেয়ে লাগার জন্য কারণ থাকে,নাকি একঘেয়ে যাতে না লাগে সেজন্য কোনো একটা কারণ দরকার? আমরা সাধারণত কোথায় একঘেয়েমীতে ভুগি? কারো ক্লাসে একঘেয়ে লাগে,কারো লাগে মিটিংয়ে,ট্রাফিক জ্যামে পড়লে তো কমবেশি সবারই লাগে। আপনার আশেপাশের সবারই নানান কিছু একঘেয়ে লাগে। সবারই বলতে কিন্ত মানুষ ছাড়াও পরিবেশের অন্যান্য সদস্যদের কথাও বলেছি। হাঁস,মুরগী,গরু, ছাগল,কুকুর-বিড়ালেও অন্যান্য বিভিন্ন অনুভূতির সাথে একঘেয়েমীর এক প্রজাতির সংস্করণ আছে। প্রাণিজগতে এ ব্যাপারটির বিস্তার দেখে কৌতুহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, “টিকে থাকার লড়াইয়ে একঘেয়েমীর কোনো অবদান আছে কী?”

শুনতে যেমনই লাগুক, বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন একঘেয়েমী এক ধরনের প্রেরণার উৎস। হ্যাঁ, বলতে পারেন ঠিক সেই ধরনের প্রেরণা নয় যার টানে আমরা কিছু একটা করে থাকি। বরং উল্টো এটা আমাদের ইচ্ছাকে ঠেলাঠেলি করে কাজ করার লেভেলে নিয়ে যায়। প্রাণি-মনস্তত্ববিদ ফ্রাঙ্কোয়ে ওমেলস্ফেল্ডার বলেন “আমরা অনেক প্রমাণ পেয়েছি যদি একটি বন্য জন্তু অনেকটা সময় কিছু না করে কাটিয়ে দেয়,সে এর পরে ঠিকই করার জন্য কিছু একটা খুঁজে নেবে এবং এর মধ্যে অবশ্যই টিকে থাকার একটা যোগসূত্র রয়েছে। হয়তো সে নিজের এলাকা প্রদক্ষিণ করতে যাবে এবং দেখতে পাবে শিকারীর আক্রমণের সময় পালানোর জন্য অপরিহার্য রাস্তাটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে রয়েছে,যা ঠিক করে ফেলার মাধ্যমে তার টিকে থাকার সম্ভাব্যতা সে বাড়িয়ে ফেললো।”

এ দিকটাকে যদি উপকারী হিসেবে ধরেন তাহলে এটা ততক্ষণই কাজে আসবে যতক্ষণ অন্বেষণের আগ্রহ থাকবে। ওমেলস্ফেল্ডার আরো বলেন, “সব প্রাণিরই প্রকৃতির সাথে মিথস্ক্রিয়ার চাহিদা এবং প্রয়োজন আছে। তাই বন্দি অবস্থায় তারা একঘেয়ে অনুভব করে এবং উদ্ভট আচরণ করে থাকে। তারা হয়তো ঠিক ভাবতে পারে না, ‘উফফ এত বোরিং কেন?’ তবে তাদের অশান্ত পায়চারী,নিজের লোম উপড়ানো দেখে এটা বুঝা যায়।”

যদিও মানুষের একঘেয়েমী আরো জটিল, তবে কিছু সামঞ্জস্যও রয়েছে। অন্যান্য প্রাণির সাথে মিল খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা মানুষেরা শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়লে একঘেয়েমী নাড়া দিয়ে ওঠে। একটি গবেষণার উদাহরণ দেয়া যায়। একদল লোককে পছন্দ করার সুযোগ ছাড়াই ঠিক করে দেয়া হয়েছিল কোনো একটি নিরস কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আরেক দল পছন্দ করে সেই একই কাজে অংশগ্রহণ করে। প্রথম দলের ক্ষেত্রে সময়কে দীর্ঘ এবং কাজটিকে বেশি একঘেয়ে মনে হয়েছিল।

আমরা সবাই জানি, একঘেয়েমী কাকে বলে। সময় থমকে দাঁড়ায়,প্রয়োজনীয় কাজে মনযোগ দেয়া যায় না,যেসব কাজে আনন্দ পেতাম সবই একে একে ব্যর্থ হয়। তবে পরীক্ষাগারে গবেষণা করার জন্য সঠিকভাবে একঘেয়েমীকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন। এটা শুধু কাজে অরুচি আর বন্দিত্বের অনুভুতিই নয়,এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশা, উদাসীনতা,বিষন্নতার মতো অনুভুতি। একঘেয়েমী কি শুধুই নিস্তেজ আর খাপছাড়া ভাব নাকি ক্রমাগত অস্থিরতাকেও একঘেয়েমীর কাতারে ফেলা যায় তা নিয়ে কোনো সমাধানে এখনো পৌছানো যায়নি। জার্মানির কন্সতানয বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস গোয়েটস ধারণা করেন, একঘেয়েমী আসলে এগুলোর সবই। মানুষের একঘেয়েমী নিয়ে অভিজ্ঞতার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে টমাস এবং তার দল ৫ ধরণের একঘেয়েমীর শ্রেণীবিভাগ করেছেন। দেখা গেছে- একজন মানুষ কোনো না কোনো সময় যেকোনো একঘেয়েমীর শিকার হতে পারেন এবং উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এক ধাঁচ থেকে অন্য ধাঁচে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু প্রত্যেকেই যেকোনো একটি ধাঁচে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন। অর্থাৎ একটি বিশেষ ধরনের একঘেয়েমী তার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাড়ায়।

এই পাঁচটি ধাঁচের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো প্রতিক্রিয়াশীলতা। বিপজ্জনক মাত্রার উত্তেজনা ও নেতিবাচক অনুভুতির সাথে অস্থিরতা যুক্ত হয়ে একটি রাগান্বিত অবস্থার সৃষ্টি হয়। গোয়েটসের মতে উদাসীনতা হলো সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। এতে কেউ খুব মনমুগ্ধকর কোনো কাজে জড়িত না থাকলেও,খুব একটা বিরক্তও থাকে না। বরং একটি নির্ভার এবং শান্তির অনুভুতিতে ডুবে থাকে। তার মতে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এ ধরনের একঘেয়েমী হতে পরে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। “মনের ভেতর একঘেয়েমী সহ অন্যান্য সব অনুভুতির আবাসের পেছনে উপযুক্ত কারণ রয়েছে”- এমনই মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ল্যাঙ্কাশায়ারের মনস্তত্ববিদ স্যান্ডি মান। তিনি বলেন, আমরা সবাই একঘেয়েমী ভয় পাই, তবে ইতিবাচক একঘেয়েমী কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু উপকারীই নয়,এটা আমাদের সৃষ্টিশীল কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

গত বছর এক পরীক্ষায় দু’দল স্বেচ্ছাসেবককে গবেষকেরা বলেছিলেন প্লাস্টিকের ফেলনা কাপ দিয়ে মজার কিছু করে দেখাতে। এক দল সরাসরি কাজে নেমে গিয়েছিল,অন্য দল ১৫ মিনিট ধরে টেলিফোন ইন্ডেক্সের নাম্বার কপি করেছিল। আর ফলাফলে পরের দলের বের করা আইডিয়াগুলো বেশি মজার ছিল। অবশ্য তাদের সাথে আরেকটি দল ছিল যারা শুধু টেলিফোন ইন্ডেক্স ১৫ মিনিট ধরে পড়ে কাজে নেমেছিল। তাদের আইডিয়াগুলোও খারাপ ছিল না। স্যান্ডি এ পরীক্ষার উপসংহারে বলেন, নিষ্ক্রিয় একঘেয়ে কাজ সৃষ্টিশীলতাকে উজ্জীবিত করতে পারে,কেননা সেই সময় মন নিজের মতো চড়ে বেড়ানোর সুযোগ পায়।

তবে কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জন ইস্টউড,স্যান্ডির তত্ত্বের সাথে একমত নন। তার ভাষ্যমতে, আপনার মন যদি মুক্তই থাকলো তাহলে সেটা একঘেয়েমী নয়। “আমার মতে একঘেয়েমী নিরাসক্ত ও অনাহূত একটা মানসিক অবস্থা,তবে এ অবস্থার সাথে আমরা মানিয়ে নিতে পারি।” তিনি আরো যোগ করেন, “ব্যথার অনুভুতির সাথেও আমরা মানিয়ে নিতে পারি। শারীরিক যন্ত্রণার অনুভুতি না থাকলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমরা সচেতন হতাম না। তার মানে কি আমাদের ব্যাথার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে হবে? না” অন্য কথায় একঘেয়েমী যদি আমাদের টিকে থাকায় সাহায্য করেও থাকে,একে পুষে রাখাটা যুক্তিযুক্ত নয়।

অনুভুতিগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে,কোনো একটি পরিবেশে আমরা কী অবস্থায় আছি। একঘেয়েমী এটাই বলে যে, আমরা আমাদের কাজের ক্ষমতা এবং পৃথিবীর সাথে যুক্ত হবার আকাংখাকে আটকে দিয়েছি। প্রশ্ন হলো- এ অবস্থায় আমরা কী করতে পারি? ইস্টউডের বিশেষ আগ্রহ একঘেয়েমীকে সঠিকভাবে বোঝা এবং তার মডেল থেকে দেখা যায়, একঘেয়েমী সহ্য করা কেন এমন কঠিন। তার মডেল অনুসারে- একঘেয়েমীর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমাদের মনযোগকে যায়গা মতো রাখার ব্যার্থতা। সমস্যাটা অনুপ্রেরণার অভাব নয়,বরং নির্দিষ্ট কিছুতে মনোনিবেশ করতে না পারা। সময় স্রোতের থেকে মনযোগ সরানোর মতো কিছু খুঁজে না পাওয়ার কারণে তখন মনে হতে থাকে যেন তা খুব ধীরে চলছে। আবার জোর করে উত্তরণের চেষ্টা আরো খারাপ লাগার সৃষ্টি করে।

মানুষ পৃথিবীর সাথে যুক্ত হতে চেষ্টা করে,সেটা করতে না পারলে আসে হতাশা এবং বিরক্তি। এরপর তারা চেষ্টা করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তাতেও ভালো না লাগায় তারা আবার সক্রিয় হতে চেষ্টা করে। তার মানে নিষ্পৃহ আর অতিষ্পৃহ অবস্থার একটা দোলাচাল চলতে থাকে সমস্যাটি সমাধানের জন্য। ইস্টউড বলেন,চিন্তার বিষয় হচ্ছে বারবার মনোযোগ প্রদানে ব্যর্থতা এমন অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে আমাদের আর কিছুই করতে ইচ্ছে করে না,সবই অর্থহীন মনে হয়।

জন ইস্টউড এখন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেন এ মনোযোগ প্রক্রিয়া ব্যহত হয়। যদিও ধারণাটি এখনো প্রাথমিক,তবে তাদের মতে একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হবার প্রবণতা ব্যাক্তিত্বের সাথে জড়িত। যেসব মানুষ আনন্দ-উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত তারা খুব বাজেভাবে একঘেয়েমীতে ভোগেন। আবার দুশ্চিন্তাগ্রস্তরাও এতে আক্রান্ত হন।

মনোযোগ দিতে অপারগতার কারণ বের করা গেলে সেটা হয়তো বুঝতে সাহায্য করবে কেন একঘেয়েমী এত খারাপ লাগে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা একটি স্মার্টফোন অ্যাপ বানিয়েছিলেন,যেটার কাজ ছিল দিনের যেকোনো সময়ে ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞেস করা তিনি কাজ করছেন কিনা এবং তিনি কতটা সুখী। এর থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেল যারা তাদের কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না,তারাই বেশি অসুখী।

কিছু কিছু সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যারা সহজেই একঘেয়েমীতে আক্রান্ত হয় তারা লেখাপড়া,ক্যারিয়ার তথা সামগ্রিক জীবনে খুব একটা উন্নতি করতে পারেন না। তাদের রাগ ও অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থাকে। তারা মাদক,জুয়া এবং এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আরেকটি সমীক্ষায় এমনও দেখা গেছে যে একঘেয়েমী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ১৯৮৫ সালে লন্ডনে সরকারী কর্মজীবীদের বলা হয়েছিল তাদের একঘেয়েমীর মাত্রাকে নিজেরা রেটিং করতে। ২০০০ সালে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো যারা বলেছিলেন তারা বেশি একঘেয়েমীতে ভোগেন তারা অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন।

তবে একঘেয়েমী নিজে কাউকে মারে না,একঘেয়েমী কাটাতে আমরা যেসব করতে যাই সেগুলোই আমাদের বিপদে ফেলে দেয়। তো বিপদে পড়ার আগেই একে প্রতিরোধ করতে আমরা কী করতে পারি? টমাস গোয়েটস এবং তার দলের কাছ থেকে আমরা একটি পরামর্শ পাই। কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যারা কোনো প্রয়োজনীয় কাজকে একঘেয়ে হিসেবে মেনে নিয়েও তাতে লেগে থাকে,তাদের তুলনায় যারা এই পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে তাদেরই ভোগান্তি বেশি। তাই যখন একঘেয়েমী ঘিরে ধরে তখন নিজেকে টিভি,ফাস্টফুড কিংবা ফেসবুকে ব্যাস্ত রাখার চেষ্টা খুব একটা ভালো বুদ্ধি না। আপনার যদি একঘেয়েমী থেকে গঠনমূলকভাবে উত্তরণের ইচ্ছা বা উপায় ভেতর থেকে না আসে,তখনই শূন্যতা নিরসনের জন্য ক্ষতিকর কিছুতে লিপ্ত হন। যাদের সেই পরিস্থিতিকে মেনে নেয়ার মত ধৈর্য রয়েছে,রয়েছে আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিশীলতা নতুনত্বের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার,তারাই পারেন এর থেকে ভালো কিছু বের করে আনতে।

 

লেখকঃ রুহশান আহমেদ

পড়াশুনা করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন প্রকৌশল ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন ‘সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার’ সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন।

সাইকো জিন

অনেকেই এরকম বলে থাকে যে, মনের কাছে মস্তিষ্কের পরাজয় হয়েছে। মন আর মস্তিষ্ক দুটোকে আলাদা করে ভাবলেও মস্তিষ্কই আসলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের কিছু অংশের পরিবর্তনের কারণে মাঝে মাঝে মনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এরকম কিছু পরিবর্তনের জন্য দায়ী ‘সাইকো জিন’। এটি MAOA (Mono Amine Oxidase A) জিন নামে পরিচিত। এর কাজ হচ্ছে MAOA এনজাইম উৎপাদন করা।

মস্তিষ্কে নানা ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার উৎপন্ন হয়। এরা শরীর ও মনের বিভিন্ন কাজ যেমন ঘুম, আবেগ, স্মৃতি, মেজাজ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো প্রয়োজনের অধিক উৎপন্ন হতে পারে। MAOA এনজাইমগুলো এই নিউরোট্রান্সমিটারকে ভেঙে প্রয়োজনের অধিক উৎপাদন হওয়া থেকে সমতা রক্ষা করে। কিন্তু যখন MAOA এর মাঝে পরিবর্তন ঘটে তখন আর আগের মতো নিউরোট্রান্সমিটারকে ভাঙতে পারে না। ফলে অধিক পরিমানে নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হতে থাকে।

অধিক নিউরোট্রান্সমিটারের কারণে অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবেগতাড়িত হয়ে যাওয়া, ঘুমতাড়িত হওয়া, মানসিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন, হাইপার সেক্সুয়ালিটি, হিংস্রতা, আক্রমণাত্মক আচরণে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি। এমনও দেখা গেছে যারা এর কারণে মারাত্মক খারাপ কাজে জড়িয়ে গেছে তারা হয়তো এর আগে কখনোই খারাপ কাজ করেনি।

প্রথমে মনে করা হতো মারাত্মক এই আচরণকারীর অর্ধেকই হয়তো জিনগত সমস্যায় আক্রান্ত। পরে দেখা যায় সাধরণত খারাপ কাজের সাথে সম্পর্কিত অর্ধেক পুরুষ এই জিনগত সমস্যায় ভোগছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে এই জিন X ক্রোমজমের সাথে জড়িত। মহিলাদের দুটি X ক্রোমজোম থাকে আর পুরুষদের একটি X এবং একটি Y ক্রমোজোম থাকে। পুরুষদের একটি জিনেই যদি এই বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকে তাহলে তাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে সাথে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যা মহিলাদের জন্য কম আশংকাজনক।

সাইকোপ্যাথদের শাস্তির ক্ষেত্রে অনেকেই এই জিনগত কারণগুলোকে আমলে নেয়া অর্থহীন বলে মনে করে। আবার কেউ কেউ মনে করে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কেউ কেউ মনে করে সাইকোপ্যাথরা জিনগত সমস্যায় ভুগছে। তবে শুধুমাত্র জীনকেই দায়ী করা যায় না। জীন আর পরিবেশ একসাথেও psychopath তৈরিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে মনে করেন নিয়ন্ত্রিত আচরণের জন্যে পুরষ্কৃত করে হয়তো এদেরকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখা যাবে।

তথ্যসূত্র

দ্য বায়োলজিস্ট, সায়েন্টিফিক আরেরিকান, বিজনেস ইনসাইডার

featured image: selinaargyrou.wordpress.com