হাবল কীভাবে গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করেছিলেন?

গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত অপসারিত হচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। এ নিয়ে বিজ্ঞানী এডউইন হাবলের সূত্র আছে। সূত্রের সাহায্যে দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতিবেগ সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়।

হাবল তো আর এমনিতেই এই ধারণাটি পাননি। তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছে। পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় হাবল কীভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয় করলেন? এর জন্য তিনি সেসব গ্যালাক্সি থেকে নির্গত আলোর লাল সরণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। লাল সরণ বিশ্লেষণ করলে গতিশীল বস্তুর বেগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

ধরি একজন দর্শক একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং একটি গাড়ি সাইরেন বাঁজাতে বাঁজাতে যাচ্ছে। গাড়িটি যখন দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যায় তখন সাইরেনের শব্দের তীক্ষ্ণতাও কমে যায়। গাড়ির গতিবেগ যত বেশি হবে তীক্ষ্ণতার পরিবর্তনও হবে তত বেশি। কোনোভাবে যদি সাইরেনের শব্দের কম্পাংক জানা যায় তাহলে সেখান থেকে গাড়িটির বেগ বের করা সামান্য কিছু গাণিতিক হিসেবের ব্যাপার মাত্র। সাইরেনের প্রারম্ভিক কম্পাংক এবং দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংককে তুলনা করলেই গাড়িটির গতিবেগ বের হয়ে যাবে।

কোনো একটি উৎস যদি আলো বা শব্দের মতো কোনো সিগন্যাল প্রেরণ করতে থাকে তাহলে তার প্রারম্ভিক সিগন্যালগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কম্পন সম্পন্ন করবে। কিন্তু যখন এই সিগন্যাল কোনো দর্শকের কাছে পৌঁছুবে তখন দর্শকের সাপেক্ষে এর কম্পনের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

দর্শকের সাপেক্ষে উৎস কত বেগে চলমান কিংবা উৎসের সাপেক্ষে দর্শক কত বেগে চলমান তার উপর নির্ভর করে সিগন্যালের কম্পন কত হবে। উৎস যদি দর্শকের কাছে আসতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের অধিক কম্পন অনুভব করবে। কারণ সেক্ষেত্রে সিগন্যালের কম্পন বা স্পন্দনগুলো ঘন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে উৎস যদি দর্শকের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে থাকে তাহলে দর্শক সিগন্যালের স্বল্প কম্পন অনুভব করবে।

চিত্র: সাইরেনের কম্পাংক জানলেই বের হয়ে আসবে গাড়ির গতিবেগ। ছবি: সিকে

চমকপ্রদ এই ব্যাপারটি আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান জোহান ডপলার (১৮০৩–১৮৫৩)। তার নাম অনুসারেই সিগন্যাল বা তরঙ্গের বিশেষ এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ডপলার প্রভাব। বিখ্যাত একটি পরীক্ষণের মাধ্যমে শব্দের ডপলার প্রভাবের সঠিকতা যাচাই করে দেখেছিলেন ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ হেনড্রিক (১৮১৮–১৮৯০)।

দূরবর্তী গ্যালাক্সির বেগ নির্ণয়ের জন্য বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এই ডপলার প্রভাবকেই ব্যবহার করেছিলেন। দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে নির্গত আলোর স্বাভাবিক কম্পাংক এবং ঐ একই আলোর দর্শক কর্তৃক গৃহীত কম্পাংকের মাঝে পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থেকেই হাবল তাদের বেগ নির্ণয় করেছিলেন।

কীভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়? নিম্নবর্ণিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যাবে। তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের অনেকগুলো রূপ আছে। তাদের মাঝে একটি হলো আলো। এই বিকিরণকে তরঙ্গের মতো করে সাদামাটাভাবে নীচের চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। কয়েকটি শীর্ষ আছে এখানে। দুটি শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্বকে বলা হয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য। এই বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যখন ০.০০০০২ থেকে ০.০০০১ সেন্টিমিটারের মাঝে থাকবে তখন একে আমরা বলি ‘আলো’। কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই সীমা পর্যন্ত আমাদের চোখ সংবেদনশীল।

চিত্র: দুই শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্ব হলো একটি তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

এর চেয়ে বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। সেসবের উদাহরণ ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও ওয়েভ। ইনফ্রারেড বিকিরণ হলো তাপ। উত্তপ্ত বস্তু থেকে এটি বের হয়। আলোর চেয়ে ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ আছে। এর উদাহরণ আল্ট্রাভায়োলেট, এক্স-রে এবং গামা রে। নীচের সারণিতে এই বিকিরণগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিমাণ উল্লেখ করা হলো।

বিকিরণের প্রকৃতি তরঙ্গদৈর্ঘ্য (সেন্টিমিটার)
রেডিও ১০ এর চেয়ে বড়
মাইক্রোওয়েভ ০.০১ – ১০
ইনফ্রারেড (তাপ) ০.০০০১ – ০.০১
দৃশ্যমান আলো ০.০০০০২ – ০.০০০১
অতিবেগুনী রশ্মি ১০-৭ – ০.০০০০২
এক্স-রে ১০-৯ – ১০-৭
গামা রে ১০-৯ এর চেয়ে ছোট

সারণি: তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও বিকিরণের প্রকৃতি

তরঙ্গদৈর্ঘ্য যা-ই হোক, সকল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ একই বেগে চলে। সকলের বেগই আলোর বেগের সমান। তরঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘কম্পাংক’ নামে একটি বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে হয়। কোনো বিকিরণ প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো কম্পন সম্পন্ন করে তাকে বলা হয় কম্পাংক। পূর্ববর্তী চিত্রে কতগুলো পূর্ণ তরঙ্গ দেখানো হয়েছে। একটি পূর্ণ তরঙ্গ সম্পন্ন হলে একে বলা যায় একটি কম্পন।

প্রতি সেকেন্ডে এরকম হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ কম্পন সম্পন্ন করে তড়িৎচুম্বকের একেকটি বিকিরণ। তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাংক পরস্পর সম্পর্কিত। আলোর বেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে কম্পাংক পাওয়া যায়। এ হিসেবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বড় হবে বিকিরণের কম্পাংক তত কম হবে। উল্টোভাবে তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হবে কম্পাংক তত বেশি হবে।

কোনো নক্ষত্র কিংবা কোনো গ্যালাক্সি সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিকিরণ করে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির অভ্যন্তরে ঘটা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া (mechanism)-র ফলে ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যায়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ঘটে চলছে। এর ফলে সেখানে প্রচুর পরিমাণে তাপ ও আলোক শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। নক্ষত্র সেই তাপ ও আলোক শক্তিকে বিকিরণের মাধ্যমে চারদিকে নিঃসরণ করে দিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছে।

চিত্র: নক্ষত্রগুলো প্রতিনিয়ত বিকিরণের মাধ্যমে শীতল হচ্ছে। ছবি: নাসা/উইকিমিডিয়া কমন্স

বিশাল নক্ষত্র ছেড়ে অতি ক্ষুদ্র জগতে গেলেও দেখা যাবে সেখানে বিকিরণ হচ্ছে। বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণার গতির ফলেও বিকিরণ তৈরি হয়। যেমন ইলেকট্রন ও প্রোটন। এদের দ্বারাই জগতের সকল বস্তু গঠিত। এই বিকিরণ নিঃসৃত হবার সময় চার্জিত বস্তু থেকে শক্তি বহন করে নিয়ে আসে। ফলে বস্তুটি শক্তি হারায়।

সত্যি কথা বলতে কি, সূক্ষ্মভাবে বিচার করে দেখলে, সকল প্রকার বিকিরণই আসলে চার্জিত কণার গতির ফলে সৃষ্টি। যেকোনো পদার্থের মাঝেই তার ইলেকট্রনগুলো এলোমেলোভাবে গতিশীল থাকে। লোহা বা অন্য কোনো ধাতুকে যখন উত্তপ্ত করা হয় তখন আসলে তার মাঝে থাকা ইলেকট্রনের এলোমেলো গতির পরিমাণ বেড়ে যায়। গতি বাড়লে সেখান থেকে তাপ বা ইনফ্রা-রেড তরঙ্গ বিকিরিত হয়।

আরো বেশি উত্তপ্ত করলে সেখানের ইলেকট্রনের গতি আরো বেড়ে যায়। গতি আরো বেড়ে গেলে সেখান থেকে ইনফ্রা-রেডের চেয়েও উচ্চ তরঙ্গের বিকিরণ নিঃসৃত হয়। ইনফ্রা-রেডের চেয়ে উচ্চ তরঙ্গ হলো দৃশ্যমান আলোক রশ্মি। এদের মাঝে সবচেয়ে কাছের হলো লাল রঙের তরঙ্গ। সেজন্যই দেখা যায় লোহার কোনো খণ্ডকে বেশি উত্তপ্ত করলে সেটি লালচে আভা বিকিরণ করে।

উত্তপ্ত লোহা থেকে লালচে আভা বের হয়। এর পেছনে আছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার কার্যকলাপ। ছবি: ড্রিমসটাইম

নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং তাদের কর্তৃক বিকিরণ সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো বর্ণালি বা স্পেকট্রাম। স্পেকট্রোমিটার বা বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণের বর্ণালি বের করা হয়। বর্ণালিবীক্ষণের একদম সরলীকৃত রূপ হলো প্রিজম। প্রিজমের মাঝেও বিকিরণের বর্ণালির ক্ষুদ্র একই অংশ দেখা যায়। অন্যদিকে স্পেকট্রোমিটারে বিকিরণের বর্ণালির খুঁটিনাটি বিস্তারিত জানা যায়।

ভিন্ন ভিন্ন বিকিরণকারী বস্তুর বর্ণালি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হয়ে থাকে। গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণ যেমন হয়ে থাকে, নক্ষত্র থেকে নির্গত বিকিরণ তেমন হবে না। আবার এক খণ্ড লোহা থেকে যে বিকিরণ বের হয় তা গ্যালাক্সি কিংবা নক্ষত্র কিংবা অন্য কোনোকিছুর মতো হবে না।

কিছু কিছু নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বাইরের দিকে শীতল গ্যাসের আবরণ থাকে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কিছু বিকিরণ ঐ আবরণে শোষিত হয়ে যায়। এই শোষণ একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে হয়। কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হবে তা নির্ভর করে কোন ধরনের পদার্থে নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি আবৃত আছে তার উপর।

গ্যাসীয় আবরণে ক্যালসিয়াম পরমাণু থাকলে বর্ণালির এক অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, লোহা থাকলে অন্য অঞ্চলের তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে, অন্য কোনো মৌল থাকলে অন্য কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে।

কোন কোন উপাদান কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষণ করে তা বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানেন। গবেষণাগারে সেসব উপাদানকে বিশ্লেষণ করে তারা এটি বের করেছেন।

নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির গ্যাসীয় আবরণ যদি বিশেষ কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণকে শোষণ করে নেয় তাহলে ঐ নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির বর্ণালির মাঝে একটি শূন্যতা তৈরি হবে। যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণ শোষিত হয়েছে, বর্ণালির ঐ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অংশে একটি অন্ধকার অঞ্চল (Dark line) দেখা যাবে। যার অর্থ হলো ঐ অংশের বিকিরণ এসে পৌঁছাতে পারেনি, কোথাও আটকে গেছে।

চিত্র: নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির আবরণকারী উপাদানভেদে বর্ণালির বিভিন্ন অংশে অন্ধকার অঞ্চল দেখা যায়। ছবি: নাসা

বিজ্ঞানী হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সি হতে আগত আলো এবং তাদের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করলেন। তিনি দেখতে পেলেন বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্রমেই বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে।

অনেকগুলো গ্যালাক্সির বর্ণালি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসলেন যে, গ্যালাক্সিগুলোর ক্রম-অপসারণ বেগের কারণেই বর্ণালিতে এই সরণ ঘটছে। এই সরণই হলো লাল সরণ বা রেড শিফট। বর্ণালির অন্ধকার অংশের সরণ হচ্ছে বড় তরঙ্গের দিকে, আর দৃশ্যমান আলোতে লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যই সবচেয়ে বড়, তাই এই সরণের নাম দেয়া হয়েছে লাল সরণ।

হাবলই কিন্তু প্রথম নন, মহাজাগতিক বস্তুর বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চলের উপস্থিতি সম্পর্কে আরো অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। জার্মান পদার্থবিদ জসেফ ভন ফ্রনহফার (১৭৪৭ – ১৮২৬) সূর্যের আলোর বর্ণালি সর্বপ্রথমতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৮০২ সালে ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওয়ালাস্টোনও বিকিরণকারী বস্তুর মাঝে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান।

চিত্র: এডউইন হাবলের আগেই বিজ্ঞানী ফ্রনহফার নক্ষত্রের বর্ণালিতে অন্ধকার অঞ্চল খুঁজে পান। ছবি: উকিমিডিয়া কমন্স

১৮৬৮ সালের দিকে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হিউগিনস (১৮২৪ – ১৯১০) এ সম্পর্কিত বেশ কিছু গবেষণা করেন। তিনি দেখান যে, কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে লাল অংশের দিকে কিংবা ধীরে ধীরে নীল অংশের দিকে সরে যাচ্ছে।

তিনি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ডপলার প্রভাবের সাহায্যে এবং এই ব্যাখ্যা ছিল সঠিক। তিনি বলেন, নক্ষত্রগুলো ক্রমান্বয়ে আমাদের নিকটে আসার কারণে কিংবা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার কারণে এটি হয়েছে।

ক্যাপেলা (capella) নামে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আছে। উজ্জ্বলতার বিচারে এটির অবস্থান ষষ্ঠ। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়। সূর্যের বর্ণালির তুলনায় ক্যাপেলার বর্ণালিতে ভিন্নতার দেখা পাওয়া যায়।

সূর্যের বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চলের চেয়ে ক্যাপেলার বর্ণালির অন্ধকার অঞ্চল লাল তরঙ্গের দিকে 0.01% বেশি অগ্রসর হয়ে আছে। যেহেতু লালের দিকে তথা বড় তরঙ্গের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাই এখান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্যাপেলা আমদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই দূরে সরে যাবার বেগ, আলর বেগের 0.01%। অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে। আলর বেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার।

প্রতি মুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছে ক্যাপেলা নক্ষত্র। ছবি: বব মুলার

পরবর্তী বেশ কয়েক দশক পর্যন্ত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল নক্ষত্র, শনির বলয় ইত্যাদির বেগ নির্ণয় করতে ডপলার প্রভাব ব্যবহার করা হতো।

তো হাবল কীভাবে জানলেন, বেশি লাল সরণের গ্যালাক্সিগুলো কিংবা বেশি বেগে অপসৃয়মাণ গ্যালাক্সিগুলো বেশি দূরে অবস্থিত? তিনি জেনেছেন কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন গড়পড়তাভাবে যে নক্ষত্রগুলো যত ক্ষীণ (অনুজ্জ্বল) সেগুলোর লাল সরণ তত বেশি। সাধারণভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে অনুজ্জ্বল বা ক্ষীণ নক্ষত্রগুলোই দূরে অবস্থান করছে।

তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। কারণ শুধুমাত্র দূরে অবস্থান করলেই যে গ্যালাক্সি অনুজ্জ্বল হবে এমন নয়। কম পরিমাণে বিকিরণ করার কারণেও উজ্জ্বলতা কম হতে পারে। হতে পারে এর নিজস্ব উজ্জ্বলতাই অল্প, যার কারণে কাছে থাকা সত্ত্বেও ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে। সেজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছে।

হিসেবের জন্য তাকে বিশেষ শ্রেণির কিছু গ্যালাক্সিকে বেছে আলাদা করে নিতে হয়েছে যেন হিসেবে ঝামেলা না হয়। বাছাইকৃত এ শ্রেণির গ্যালাক্সিকে বলা হয় ‘মানবাতি’ বা Standard Candle বিশেষ এ শ্রেণির গ্যালাক্সিগুলোর আপাত উজ্জ্বলতা দেখেই বের করা যায় এরা কত দূরে অবস্থিত। যদি কোনো গ্যালাক্সি ‘মানবাতি’ শ্রেণিতে পড়ে এবং এর উজ্জ্বলতা খুব ক্ষীণ হয় তাহলে বুঝতে হবে এটি অবশ্যই অনেক দূরে অবস্থিত আছে। মানবাতির উজ্জ্বলতা যত ক্ষীণ হবে পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব তত বেশি হবে।

আবার অন্যদিকে মানবাতি খুঁজে পাওয়াও বেশ দুরূহ কাজ। দুরূহ কর্ম সম্পন্ন করে হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির আপাত উজ্জ্বলতা এবং তাদের লাল সরণের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। এই সম্পর্ক থেকে বলা যায় যে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব এবং তাদের অপসরণ বেগও পরস্পর সম্পর্কিত। যেহেতু এই বিশেষ শ্রেণির গ্যালাক্সির উজ্জ্বলতা তাদের দূরত্বের উপর নির্ভর করে এবং দূরত্ব বেশি হলে লাল সরণও বেশি হয় তাই বলা যায় দূরের গ্যালাক্সিগুলো বেশি দ্রুত বেগে অপসারিত হচ্ছে।

চিত্র: এডউইন হাবল

একে বলা যায় আগেভাগেই ফলাফল অনুমান করে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে সকল শ্রেণির গ্যালাক্সিকে হিসেবের মধ্যে নিয়ে কাজ করলে হয়তো ফলাফলটা এত সহজে পাওয়া যেত না। তাই আগে থেকেই একটা অনুমান করে নিয়েছেন যে, ‘সম্ভবত’ গ্যালাক্সিগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। আসলেই দূরে সরে যাচ্ছে কিনা সেটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ কিছু গ্যালাক্সিকে আলাদা করে নিয়েছেন যেন হিসেবের জটিলতা কমে যায়। এর মানে আগে থেকেই ফলাফল অনুমান করে নেয়া। এমনিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ফলাফল আগে থেকে অনুমান করে নিলে ক্ষেত্রবিশেষে সেটি গবেষণার জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

আলোর উৎসের অপসারণ বেগ ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াতেও লাল সরণ ঘটতে পারে। যেমন আলো যদি শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র সম্পন্ন কোনো উৎস থেকে নির্গত হয় এবং সে আলো যদি দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রে অবস্থান করা কোনো পর্যবেক্ষক বিশ্লেষণ করে তাহলে ঐ পর্যবেক্ষণ আলোর লাল সরণ দেখতে পাবে।

তবে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় উৎসের কারণে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোর লাল সরণ ঘটছে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক। পর্যবেক্ষণে যে পরিমাণ লাল সরণ পাওয়া গেছে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কারণে এত পরিমাণ লাল সরণ ঘটে না। দ্বিতীয়ত, ক্রম-প্রসারণের ফলে লাল সরণের যে সুস্থিত ও নিয়মতান্ত্রিক বৃদ্ধি ঘটেছে তা মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের লাল সরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা ঐক্যমতে এলেন যে, গ্যালাক্সির অপসরণ বেগের কারণেই লাল সরণ ঘটছে।

তবে এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিকল্প ব্যাখ্যাও আছে। সেটি বলছে, অন্ততপক্ষে সামান্য কিছু লাল সরণের পেছনে তাদের পশ্চাদপসরণ দায়ী নয়। এদের ক্ষেত্রে হয় মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র দায়ী নাহয় তাদের পেছনে এমন কোনো ভৌত প্রক্রিয়া কাজ করছে যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

এ বেলায় আরেকটি সমস্যার দিকে আলোকপাত করা দরকার। হাবলের সূত্র বলছে গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব যত বেশি হবে তাদের অপসরণ বেগও তত বেশি হবে। এ অপসরণ বেগের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। যত খুশি তত পরিমাণে উন্নীত হতে পারে। এদিকে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে কোনোকিছুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাহলে গ্যালাক্সির যত খুশি তত বেগে উন্নীত হওয়া কি বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে লঙ্ঘন করছে না?

চিত্র: গ্যালাক্সিগুলো কি আসলেই আলোর চেয়ে বেশি বেগে ছুটছে? ছবি: বিগ থিংক

জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের পরিমাণকে z দিয়ে প্রকাশ করেন। উৎস হতে নির্গত তরঙ্গের মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং পর্যবেক্ষক কর্তৃক গৃহীত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পার্থক্য (বিয়োগ) বের করা হয়। তারপর ঐ পার্থক্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করা হয়। তারপর যে মানটি পাওয়া যায় তা-ই হলো z এর মান।

এই z এর সাহায্যে গ্যালাক্সিগুলোর বেগ সহজেই বের করা যায়। আলোর বেগের সাথে লাল সরণ z-কে গুণ করে দিলেই গ্যালাক্সির গতিবেগ পাওয়া যাবে। আলোর বেগ c হলে গ্যালাক্সির বেগ cz। যেমন, কোনো গ্যালাক্সির লাল সরণের মান যদি হয় ০.১৫ তাহলে তার অপসরণ বেগ আলোর বেগের ১৫ শতাংশ। লাল সরণের মান ০.২৫ হলে তার অপসরণ ২৫ শতাংশ।

তবে এ নিয়মটি শুধুমাত্র আলোর বেগের তুলনায় খুব স্বল্প বেগে ধাবমান গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগের চেয়ে বেশি হলেই এ নিয়ম আর কাজ করে না। এমনিতে বিজ্ঞানীদের পক্ষে খুব বেশি মানের লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব (সেটা যে উৎসেরই হোক), কিন্তু আলোর চেয়ে বেশি বেগে ধাবমান কোনো গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। আবার তত্ত্ব বলছে লাল সরণ যদি খুব বেশি হয়ে যায় তাহলে উৎসের গতিও আলোর বেগের সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়।

যে দূরত্বে গেলে গ্যালাক্সিগুলোর অপসরণ বেগ আলোর বেগের সমান হয় সে দূরত্বকে বলা হয় দিগন্ত বা হরাইজন। দিগন্তের বাইরের কোনো গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণ করা যম্ভব নয়। তাহলে কি এর মানে এমন দাড়াচ্ছে না যে, বাইরের গ্যালাক্সিগুলোর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি? কিছু দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, হ্যাঁ, এদের বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাতে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোনো লঙ্ঘন হচ্ছে না।

কীভাবে? বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের নিয়ম-নীতি তখনই খাটবে যখন কোনোপ্রকার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের উপস্থিতি থাকবে না। কিন্তু মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রেই মহাকর্ষ বিদ্যমান। এই মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান ও কালের প্রকৃতিকে আমূলে পালটে দেয়। আর এটি ঘটে আইনস্টাইনেরই দেয়া সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে।

ব্যাপারটা এমন না যে কোনো ‘বস্তু’ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। এখানে মূলত ‘স্থান’ নিজেই প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে আলোর চেয়ে বেশি বেগে। বস্তু হয়তো আলোর বেগের বেশি বেগে চলতে পারে না কিন্তু স্থান ঠিকই পারে। আর ঐ বেশি বেগে চলা স্থানে যদি কোনো বস্তু থাকে তাহলে স্থানের সাথে সাথে বস্তুটিও বেশি বেগেই চলবে। বস্তু হয়তো আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলছে না, কিন্তু স্থান তাকে চালিয়ে নিচ্ছে।

যদিও আমরা দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সিগুলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু স্থানের প্রসারণের প্রকৃতি থেকে তাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

দিগন্তের বাইরের গ্যালাক্সির গতি নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি জটিল ফর্মুলার মাধ্যমে সুরাহা করা যায়। তবে এখানে আলচ্য বিষয় অনুধাবন করার জন্য এত সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশের প্রয়োজন নেই।

উৎস Islam, Jamal N. (1983), the Ultimate Fate of the Universe, Chapter 3, Cambridge University Press

featured image: scitechdaily.com

বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর প্রতিভা ম্যাক্সওয়েল

শুরু করা যাক একটি মজাদার প্রশ্ন দিয়ে। এমন ৩ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম বলুন যারা পদার্থবিজ্ঞানের জগতটাকেই রাতারাতি পাল্টে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানে যাদের নুন্যতম ধারণা আছে, তারা ২ জনের নাম সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় বলবেন। একজন হলেন মহাকর্ষের সারথি স্যার আইজ্যাক নিউটন, অপরজন আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অবতারণাকারী আলবার্ট আইনস্টাইন।

কিন্তু তৃতীয় ব্যাক্তিটি কে হবেন? এটা বলতে গিয়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্তি বা সংশয়ে পড়ে গেছেন। এমনকি খোদ পদার্থবিদরাই এই প্রশ্নের উত্তরে একমত হতে পারেননি। তবে অধিকাংশ বিজ্ঞানীদের মতে এই দুইজনের নামের পাশে যার নাম সবচেয়ে বেশি শোভা পায়, তিনি হচ্ছেন আলোর তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্বের প্রণেতা জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

১৮৩১ সালের ১৩ই জুন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের এক ধনাঢ্য স্কটিশ পরিবারে ম্যাক্সওয়েলের জন্ম। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তার নাম রেখেছিলেন ক্লার্ক। পরবর্তীতে তার বাবা তার নামের শেষে ম্যাক্সওয়েল যোগ করে দেন।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কৌতুহলী মনের অধিকারী। ৩ বছর বয়স থেকেই চারপাশের বিভিন্ন ঘটনার কারণ সম্পর্কে মায়ের কাছে জানতে চাইতেন। শৈশবেই তার তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয়ও পাওয়া গিয়েছিল। মাত্র ৮ বছর বয়সেই তিনি কবি জন মিল্টন রচিত দীর্ঘ অনুচ্ছেদগুলো অনায়াসে পড়তে পারতেন।

চিত্র: জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

১৮৩৯ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ম্যাক্সওয়েলের মা মারা যান। বাবা এবং চাচী তার দেখাশোনা ও পড়ালেখার দেখভাল করেন। তবে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাশুরুর অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না।

ম্যাক্সওয়েলের প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং অজানাকে জানার প্রবল ইচ্ছা ছিল প্রবল। কিন্তু তার পড়াশোনায় মন ভরছিল না শিক্ষকের। তিনি ধারণা করেছিলেন, ম্যাক্সওয়েল সাধারণ বাচ্চাদের মতো কোনো জিনিস দ্রুত শিখতে পারে না। এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণে পড়ানোর সময় তিনি মাঝে মাঝে ম্যাক্সওয়েলের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করতেন। এ ঘটনা জানার পর সেই শিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয় এবং ১৮৪১ সালে তিনি বিখ্যাত এডিনবার্গ একাডেমির স্কুল শাখায় ভর্তি হন। সেখান থেকেই তার বিখ্যাত কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।

চিত্র: এডিনবার্গ একাডেমি

স্কুলে ভর্তি হলেও স্কুলের গৎবাঁধা নিয়ম আর সীমাবদ্ধ পড়াশোনায় তার তেমন আগ্রহ ছিল না। এমনকি পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও তিনি বেশ উদাসীন ছিলেন। তবে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনুসন্ধিৎসু মনটি ছিল সদা জাগ্রত।

শুনতে অবাক লাগলেও ম্যাক্সওয়েল যখন তার প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর! তার প্রথম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু ছিল জ্যামিতিকেন্দ্রিক। গবেষণাপত্রে সরু দড়ির কুণ্ডলীর সাহায্যে গাণিতিক বক্ররেখাগুলোকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উপস্থাপনের পদ্ধতি বর্ণনা করেন।

এছাড়াও তিনি দুইয়ের অধিক কেন্দ্র সম্পন্ন সাধারণ উপবৃত্ত, কার্তেসীয় উপবৃত্ত সহ বিভিন্ন বক্ররেখার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণাপত্রে আলোচনা করেন। তার এই গবেষণালব্ধ ফলাফল এডিনবার্গ রয়েল সোসাইটিতে পর্যন্ত উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় তার বয়স ছিল খুব কম। শিক্ষকেরা এই তরুণ বয়সে এত বড় কাজের ভার তার উপর দিতে চাননি। তাই তার অনুসন্ধানের পুরো বিষয়টি মঞ্চে উপস্থাপন করেছিলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের অধ্যাপক জেমস ফোর্বস। তৎকালীন সময়ে

চিত্র: এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়

পদার্থবিজ্ঞানকে ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ বা ‘ন্যাচারাল ফিলোসোফি’ নামে ডাকা হতো। মজার বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েল তখনও কলেজের গণ্ডিই পার করতে পারেননি।

১৬ বছর বয়সে ১৮৪৭ সালে ম্যাক্সওয়েল এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে প্রথম টার্ম পরীক্ষার পর তিনি এডিনবার্গের স্নাতক শেষ করবেন বলে মনস্থির করেন। এডিনবার্গে থাকাকালীন সময়েও তার লেখা ২টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

১৮৫০ সালের অক্টোবরে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই তার সৃষ্টিশীল কাজের পরিচয় ফুটে ওঠে। ২৫ বছর বয়সে তাকে অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে একই সাথে অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হবার নজির খুবই বিরল।

কয়েক বছরের মাঝেই গবেষক হিসেবে তার নাম বিজ্ঞানমহলে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। তিনিই সর্বপ্রথম শনির বলয়ের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন গাণিতিক পরিসংখ্যান এবং শনি গ্রহের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং সেগুলো যাচাই বাছাই করে বলেন, শনির বলয় আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু দিয়ে তৈরি। এই বস্তুগুলো একসাথে শনির চারপাশে ঘুরপাক খাওয়ার কারণেই এই বলয় তৈরি করে থাকে।

তার আগে কোনো গবেষকই বিষয়টিকে এভাবে চিন্তা করেননি। তাদের ধারণা ছিল, শনির বলয় হয়তো অবিচ্ছিন্ন কোনো দৃঢ় বস্তু দিয়ে তৈরি। এরকম হলে সেগুলো ঘূর্ণনের সময় একে অপরের সাথে ধাক্কা লেগে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেত। এমনকি শনিগ্রহের সাথেও বলয়ের সংঘর্ষ হবার সম্ভাবনা থাকত। আবার বলয়টি তরল পদার্থের হলে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরার কারণে সেগুলো একে অপর থেকে ছিটকে যাবার কথা। কিন্তু সেরকমও তো হচ্ছে না।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ম্যাক্সওয়েল তখন গণিতের আশ্রয় নিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তিনি বলেন, শনির বলয়টি যদি অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদার্থের সমন্বয়ে তৈরি হয়, তবেই সেটি মোটামুটি স্থিতিশীল ও অক্ষুন্ন থাকবে। প্রতিটি ক্ষুদ্র পদার্থ একেকটি উপগ্রহের ন্যায় শনি গ্রহের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে। একটি রিংয়ের সকল ক্ষুদ্র পদার্থ একটি নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট বেগে ঘোরে। এমনটা না হলে বলয়ের পদার্থগুলো একে অপরের সাথে সংঘর্ষের ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই ধ্বংস হয়ে যেত।

চিত্র: শনির বলয় নিয়ে লেখা ম্যাক্সওয়েলের গবেষণাপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা।

ম্যাক্সওয়েল শুধু শনির বলয় সৃষ্টির কারণই ব্যাখ্যা করেননি, তিনি এর ভবিষ্যতও অনুমান করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, শনির বলয়টি ধীরে ধীরে বিস্তৃতি লাভ করবে এবং একপর্যায়ে সেটি অদৃশ্য হয়ে যাবে। শনিগ্রহের মহাকর্ষ বলের কারণেই মূলত এই ঘটনাটি ঘটবে।

প্রায় শতাধিক বছর পরে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। ভয়েজার মহাকাশযান শনিগ্রহকে ফ্লাইবাই করার সময় পাঠানো বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ম্যাক্সওয়েলের বিবৃতিটি সম্পূর্ণরূপে সঠিক ছিল।

১৮৬০ সালে ম্যাক্সওয়েল যে কলেজের শিক্ষক ছিলেন সেটি আরেকটি কলেজের সাথে মিলিতভাবে কাজ শুরু করে। তখন তাঁকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এই ঘটনার পর তিনি লন্ডনের কিংস কলেজের প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত আবিষ্কারটি করেছিলেন। তার সেই আবিষ্কারকে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা (আইনস্টাইন, ফাইনম্যান, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক প্রমুখ) বিংশ শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার বলে মনে করেন।

তিনি ৪টি গাণিতিক সমীকরণ প্রতিপাদন করেন। এই সমীকরণগুলোর সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন, আলো, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্ব- এরা একই বল থেকে সৃষ্টি। সেই বলের নাম তাড়িতচুম্বক বল। সমীকরণগুলো বর্তমানে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ নামে পরিচিত। তার এই আবিষ্কার এখন পর্যন্ত পদার্থ বিজ্ঞানের সার্বিক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব বা Grand Unified Theory of Physics তৈরিতে সবচেয়ে বড় সহায়ক।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ

বর্তমানে আমরা জানি, ইলেকট্রন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হবার মুহূর্তে আমরা বিদ্যুৎ শক্তি পাই। ইলেকট্রনগুলো যখন একই দিকে ঘুরতে থাকে তখন চৌম্বকত্ব পাওয়া যায়। আবার ইলেকট্রন শক্তি বিকিরণ করে উচ্চ শক্তিস্তর থেকে নিম্ন শক্তিস্তরে গমনের সময় ফোটন নির্গত হয়। সেখান থেকেই আলোক শক্তি পাওয়া যায়।

এই তিনটি ঘটনাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় বলের বাস্তব উদাহরণ। প্রকৃতপক্ষে ইলেকট্রন আমাদের চেনা জানা জগতকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটা এই ঘটনাগুলোর সাহায্যেই বোঝা যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ইলেকট্রন আবিষ্কারের প্রায় ৩০ বছর আগে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের জন্মস্থান। এই বাড়িতেই তিনি জন্মেছিলেন।

তিনি মূলত ২টি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে এই সমীকরণগুলো প্রতিপাদন করেছিলেন। প্রথমটি হচ্ছে বিদ্যুৎ কীভাবে চৌম্বকত্বকে প্রভাবিত করে। দ্বিতীয়টি ঠিক তার উলটো অর্থাৎ চৌম্বকত্ব কীভাবে বিদ্যুৎকে প্রভাবিত করে। পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেন, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্বের মাঝে প্রভাব বিস্তারকারী জিনিসটি হলো বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গটি তার উৎস থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি এই তরঙ্গের বেগ নির্ণয় করে দেখেন তা আলোর বেগের সমান। যেহেতু আলোর চেয়ে বেশি বেগে মহাবিশ্বে কোনো কিছু যেতে পারে না, তাই বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং আলো অবশ্যই একই জিনিসের দুটি ভিন্ন রূপ হবে।

শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে শক্তির তরঙ্গরূপে ভ্রমণের ধারণাটি সে সময়ের সনাতনী নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানকে অনেক বড় ধাক্কা দেয়। কারণ নিউটন মনে করতেন, দুরে অবস্থিত কোনো বস্তুর উপর মহাকর্ষ বল ছাড়া আর কিছু প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

কিন্তু নতুন আবিষ্কার বলছে ভিন্ন কথা। নতুন এই ধারণাটির উপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানের আরেকটি নতুন শাখার জন্ম হয়। তার নাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স।

ম্যাক্সওয়েলের এই বিদ্যুৎচুম্বকত্বের ধারণা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করেছে। তার সমীকরণের উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র (রেডিও, টেলিভিশন, রাডার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইত্যাদি) তৈরি করা হয়।

তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ছাড়াও ম্যাক্সওয়েলের আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার রয়েছে। গ্যাসের গতিতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তার এই তত্ত্ব পরিসংখ্যানিক পদার্থবিজ্ঞানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। এর সাহায্যে ক্ষুদ্র মৌলিক কণার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিসংখ্যানের মাধ্যমে উপস্থাপনের এক অভিনব উপায় বের করা সম্ভব হয়েছিল। যা ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বশর্ত।

তিনিই বিশ্বে প্রথম রঙ্গিন ফোটোগ্রাফ তৈরি করেছিলেন। মানুষের চোখ যে লাল, নীল, সবুজ- এই তিনটি আলোর অনুভূতি উপলব্ধি করতে পারে। এটাও তিনিই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন। একারণে তিনি লাল, নীল ও সবুজ বর্ণের পৃথক ফিল্টার ব্যবহার করে তার ফটোগ্রাফার দিয়ে একটি পশমি কাপড়ের পটির ছবি তোলেন। পরবর্তীতে এই তিনটি ছবিকে স্তরীভুত করে ফিতার একটি পরিপূর্ণ রঙ্গিন ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। আধুনিক ফটোগ্রাফিতে তার এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

ম্যাক্সওয়েল ১৮৭৯ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তার মায়ের মতোই পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি পদার্থবিজ্ঞানের জগতে অনেক বড় প্রভাব রেখে গিয়েছেন। আরো ২০-৩০ বছর বেঁচে থাকলে হয়তো পদার্থবিজ্ঞানকে আরো অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন।

বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তার অবদানকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার তড়িৎচুম্বকীয় ধারণার উপর ভিত্তি করে Electric Fields and Waves নামে তড়িৎকৌশল একটি শাখা তৈরি করা হয়েছে। তার এই ধারণাটি এতটাই মৌলিক ও চমৎকার ছিল যে প্রযুক্তিবিদদের সবচেয়ে বড় সংগঠন IEEE-র লোগোতে সেটি স্থান পেয়েছে।

চিত্র: ম্যাক্সওয়েলের প্রচেষ্টায় তৈরিকৃত পৃথিবীর প্রথম রঙিন ফটো।

লোগোটিতে সোজা তীরচিহ্ন দিয়ে বিদ্যুৎ এবং বাঁকানো তীর চিহ্ন দিয়ে তড়িৎ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রকে বোঝানো হয়েছে। এর পেছনের মূল কারিগর নিঃসন্দেহে ম্যাক্সওয়েল। তিনিই ফ্যারাডে এবং অ্যাম্পিয়ারের সূত্র দুইটিকে একীভূত করতে পেরেছিলেন।

তার নামানুসারে সিজিএস পদ্ধতিতে চৌম্বক ফ্লাক্সের এককের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল। তার অসামান্য অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সাবমিলিমিটার টেলিস্কোপটির নাম রাখা হয়েছে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল টেলিস্কোপ।

এছাড়াও শনির বলয়ের C রিংয়ের মধ্যবর্তী সবচেয়ে প্রশস্ত (২৭০ কিলোমিটার চওড়া) ফাঁকা স্থানের নাম রাখা হয়েছে ম্যাক্সওয়েল গ্যাপ।

তথ্যসূত্র

  1. https:// britannica.com/biography/James-Clerk-Maxwell
  2. https://iaus.archive.org/8/items/onstabilityofmot00maxw/onstabilityofmot00maxw.pdf
  3. https://youtube.com/watch?v=b2cVLHozb9k
  4. https://owlcation.com/humanities/The-Contributions-of-James-Clerk-Maxwell-to-Science

তার ছাড়া বাতি

টেসলা কয়েল। তারবিহীন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরের স্বপ্ন থেকে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা সর্বপ্রথম এই পরীক্ষাটি করেন। পদার্থবিজ্ঞানী  মাইকেল ফ্যারাডের সূত্র অনু্যায়ী, যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর দিয়ে একটি চুম্বককে দ্রুত আনা নেওয়া করা যায় তাহলে পরিবর্তনশীল চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে তারের ভেতর তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হবে।

image source: drmegavolt.com

একইভাবে যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর পরিবর্তনশীল  তড়িৎ প্রবাহ চালানো যায় তাহলে ঐ কুণ্ডলির চারপাশে একটি অস্থায়ী চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হবে।  টেসলা কয়েল পরীক্ষায় একইসাথে দুটি কুণ্ডলিত তারের ব্যবহার করা হয়। একটি তিন কুণ্ডলির তারকে প্রায় তিনশো কুণ্ডলির তারের উপর বসানো হয়, যেন তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বারা এটি উচ্চধাপী ট্রান্সফর্মারের ন্যায় কাজ করে। এর কাজ হচ্ছে কম বিভবের তড়িৎকে উচ্চ বিভবের তড়িতে রূপান্তরিত করা।

ট্রানজিস্টর, রেজিস্ট্যান্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমে তিন কুণ্ডলির তারের ভেতর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত করা হয়। প্রবাহের ফলে উৎপন্ন চুম্বকক্ষেত্র তিনশো কুণ্ডলির তারের চারপাশে আবিষ্ট হয়। এটি তারের দুই প্রান্তে অত্যধিক উচ্চ বিভবের সৃষ্টি করে।

image source: stevespanglerscience.com

এখন এই তারের চারপাশে যদি কোনো প্রবাহী বস্তুকে আনা হয় তখন তা অত্যধিক উচ্চ বিভবের ফলে আয়নিত বস্তুর ন্যায় আচরণ করে। কোনো বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষেত্রে তা বাতির ভেতরে তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। ফলে বাতিটি কোনোপ্রকার তড়িৎ সংযোগ ছাড়াই শুধু মাত্র আবেশের প্রভাবে জ্বলে উঠে। তারবিহীন বিদ্যুৎ শক্তি  স্থানান্তরের এই অসাধারণ উপায়ের নাম টেসলা কয়েল।

featured image: stepbystepprojects.co.uk

স্টিফেন হকিং কেন স্পেশাল?

মাঝে মাঝে মনে হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যদি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা না আঁকতেন তাহলে ভালো হতো। কারণ মোনালিসার এত আলো যে সে আলোর প্রাবল্যে ঢাকা পড়ে গেছে দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন।

গণিত, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা সহ অন্যান্য অনেক শাখায় তার এমন অনেক অবদান আছে যে সেগুলো নিঃসন্দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার নাম যখন মানুষের মনে আসবে তখন সেগুলোও যদি মনে আসে তাহলে তার মেধার সত্যিকার বিস্তৃতি সম্বন্ধে মানুষ অনুধাবন করতে পারতো।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এতই উজ্জ্বল হয়ে আছে যে সে উজ্জ্বলতার চাপে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার বিজ্ঞানে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় জটিল জটিল বিষয়ে এত চমৎকার সব গবেষণা তিনি করে রেখেছেন যে সেগুলোর জন্য তাকে আরো পাঁচ বার নোবেল পুরষ্কার দেয়া যায়। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তীব্রতায় সেগুলো সম্বন্ধে মানুষ তেমন জানেই না।

আইজ্যাক নিউটনের বেলাতেও তা-ই। বিজ্ঞান, গণিত এমনকি রসায়নেও তার এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে যে সেগুলোর প্রত্যেকটিই যুগান্তকারী। কিন্তু মহাকর্ষ তত্ত্বের বিশালতায় মানুষ ভালোভাবে জানেই না তার অবদানের কথা।

সম্প্রতি (১৪ই মার্চ, ২০১৮) পরলোকগত হয়েছেন বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং। তার বেলাতেও এমনই ঘটনা ঘটেছে। আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইয়ের মাধ্যমে তিনি বিজ্ঞান ও না-বিজ্ঞানের মানুষদের মাঝে যে পরিমাণ বিখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাসে অন্য কোনো বিজ্ঞানীই তাদের বইয়ের মাধ্যমে সে পরিমাণ বিখ্যাত হননি।

স্টিফেন হকিংয়ের নাম নিলে মানুষের মনে অবশ্যই এ বইটির নাম চলে আসবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতি অনুসন্ধানে বইটি তখনকার সময়ের জন্য এক বিপ্লব ছিল। যারা সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের খোঁজ খবর রাখেন তারা হয়তো ২০১০ সালে প্রকাশিত তার আরেকটি বই দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন-এর কথাও বলবেন। এ বইটির কারণেও তিনি নতুন করে আলোচিত ও বিতর্কিত হন।

কিন্তু স্টিফেন হকিংয়ের মূল গুরুত্ব সেখানে নয়। যে যে বিষয় নিয়ে তার বিখ্যাত হওয়া উচিত ছিল, যে যে বিষয়ে বিখ্যাত হলে তার মেধার ক্ষমতা ও বিচরণের বিস্তৃতি সম্বন্ধে প্রকৃত মূল্যায়ন করা হতো সে সে বিষয় সম্বন্ধে অধিকাংশ মানুষ জানেই না। যারা জানে তাদের পরিমাণ খুবই অল্প। অথচ তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বলা যায়।

বিংশ শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী কে, এ প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেসব জরিপে স্টিফেন হকিংয়ের নাম থাকে না বললেই চলে[1] থাকলেও তার অবস্থান হয় একদম তলানিতে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাগুলো খুবই উঁচু মানের এবং নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

সকলেরই উচিত তার কাজগুলো সম্বন্ধে ধারণা রাখা। তার উপর তাকে যদি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পপুলার সায়েন্সের বইগুলো নয়, অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার গবেষণাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। সেজন্য বিজ্ঞানে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ নিয়ে আলোচনা করা হলো এখানে।

হকিং তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করেছেন মূলত মহাকর্ষ তত্ত্ব, সৃষ্টি তত্ত্ব (Cosmology), কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যা (Thermodynamics) ও ইনফরমেশন তত্ত্বে।

হকিংয়ের কাজ ব্যাখ্যা করতে গেলে শুরু করতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে। ১৯১০ সালে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদান করেন। আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্বে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা দূর হয় এ তত্ত্বের মাধ্যমে।

চিত্র: স্টিফেন হকিং (১৯৪২–২০১৮); ছবি: Steemit

নিউটনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মহাকর্ষ হলো বস্তুর ভরের সাথে সম্পর্কিত একটি জিনিস। ভারী বস্তু তার চারপাশের এলাকায় মহাকর্ষের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন তার চৌম্বকক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে তেমনই ভারী বস্তুও তার মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মাঝে অবস্থান করা বস্তুকে আকর্ষণ করে। যেমন চাঁদ ও পৃথিবী।

পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে চাঁদ অবস্থান করছে বলে পৃথিবী তার আকর্ষণ বলের মাধ্যমে চাঁদকে নিজের চারপাশে আটকে রাখছে। অন্যদিকে, দূরের গ্রহ পর্যন্ত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র বিস্তৃত নয়, তাই তাদেরকে আকর্ষণ করে ধরে রাখতে পারে না পৃথিবী।

এ মহাকর্ষ জিনিসটি কী? কী কারণে এর অস্তিত্ব আছে তা ব্যাখ্যা করেননি নিউটন। নিউটনের সূত্র শুধু এটিই বলছে যে, যার ভর আছে তাতে প্রাকৃতিক কোনো উপায়ে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়।

এর বিপরীতে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, মহাকর্ষ শূন্যের মাঝে বা স্থানের মাঝে তৈরি হওয়া বিশেষ কোনো ‘ক্ষেত্র’ নয়। স্থানের নিজেরই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য হলো মহাকর্ষ।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- একটি প্লাস্টিকের গামলা (bowl)-র মাঝে যদি একটি ছোট বল (ball)-কে রেখে কৌশলে চরকির মতো ঘোরানো হয় তাহলে ছোট বলটি গামলার দেয়ালে ঠেকে ঘুরতে থাকবে। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে সূর্য ও পৃথিবীর আকর্ষণও অনেকটা গামলার দেয়ালে বলের ঘোরার মতো।

সূর্য তার প্রবল ভরের প্রভাবে চারপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে নিয়েছে যে তা অনেকটা এখানের গামলার দেয়ালের মতো হয়ে গেছে। এই দেয়ালকে ঘেঁষে প্রতিনিয়ত ঘুরে চলছে পৃথিবী। অর্থাৎ স্থান নিজেই এমন রূপ ধারণ করে আছে যে এতে আটকা পড়ে প্রতিনিয়ত ঘুরছে পৃথিবী।

স্বাভাবিক বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে হিসেব করলে এ ব্যাখ্যা অনুধাবন করা যাবে না। এর জন্য কাল্পনিকভাবে ধরে নিতে হবে স্থান একটি নিরবিচ্ছিন্ন চাদরের মতো। এই চাদরের যেখানে কোনো ভারী জিনিস (সূর্য বা নক্ষত্র) রাখা হয় সে অঞ্চলের চাদর নীচের দিকে দেবে যায়। দেবে যাওয়া অংশে দেয়ালের মতো অংশ তৈরি হয়। ঐ দেয়ালে আটকা পড়ে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে ঘুরে চলে।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিশেষ একটি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, যথেষ্ট পরিমাণ ভারী বস্তু, যেমন খুব বড় কোনো নক্ষত্র, বিশেষ এক প্রক্রিয়ায় তার নিজের মহাকর্ষের চাপে নিজেই সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। সংকুচিত হয়ে সকল ভর একত্রিত হতে পারে একটি অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দুতে। তখন এর ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে প্রায় অসীম ঘনত্বের এ অবস্থাটিকে বলা হয় সিঙ্গুলারিটি।

এই সংকোচন তার আশেপাশের স্থানকে এমনভাবে বাকিয়ে ফেলে যে সেখান থেকে কোনোকিছুই আর বের হয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।[2] ঐ সিঙ্গুলারিটি বিন্দুকে আজকে আমরা বলি ব্ল্যাক হোল।

স্থানের বক্রতা, সিঙ্গুলারিটি বিন্দু এবং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত এ ব্যাপারটি প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান পদার্থবিদ রবার্ট ওপেনহেইমার। ১৯৩৯ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে[3] তিনি এটি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তখনকার সময়ের পদার্থবিদরা এ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি।[4] একটি অদ্ভুত বিন্দুতে এমন অদ্ভুত দশার সৃষ্টি হবে এমনটি তারা গ্রহণই করতে পারেনি। তাই অল্প ক’দিনেই এটি চাপা পড়ে যায়।

চিত্র: রবার্ট ওপেনহাইমার; ছবি: US Department of Energy

দীর্ঘদিন পর ১৯৫৯ সালের দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়য়ের একজন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। ছাত্রটির নাম স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ডে তার পড়াশোনা শেষ করার পর পিএইচডির জন্য ভর্তি হলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ে। সেখানে তার আগ্রহের বিষয় ছিল সাধারণ আপেক্ষিকতা ও ব্ল্যাক হোল। তার পিএইচডি সুপারভাইজর ডেনিস সায়ামা এ ক্ষেত্রগুলোতে তার আগ্রহের ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন।

সায়ামার অধীনে তিনি বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও ব্ল্যাক হোলের সাথে সম্পর্কিত। বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলছে আমাদের মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি ক্ষুদ্র একটি বিন্দু থেকে। সময়ের সাথে সাথে এটি প্রসারিত হয়ে আজকের এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।

বর্তমানে বিগ ব্যাং তত্ত্ব সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সকলের কাছে স্বাভাবিক। কিন্তু স্টিফেন হকিং যখন এটি নিয়ে কাজ করছিলেন তখন বিগ ব্যাং তত্ত্ব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক প্রচলিত ছিল। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল।

হকিং এখানে বিগ ব্যাং ও ব্ল্যাক হোলের মাঝে একটি সম্পর্ক খুঁজে পান। তিনি অনুধাবন করেন ব্ল্যাক হোল তৈরি হবার ঠিক উলটো প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে এই মহাবিশ্ব। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি রজার পেনরোজের সাথে গবেষণা করেন এবং ১৯৭০ সালে রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন[5] এখানে তারা দেখিয়েছেন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এমন আভাষ দিচ্ছে যে এ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল অতিক্ষুদ্র এক সিঙ্গুলারিটি বিন্দু থেকে।

এ সময়টায় হকিং অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ক্র্যাচের উপর ভর দিয়েও চলাফেরা করতে পারছিলেন না। শুয়ে থাকাটাই দিনের বেশিরভাগ সময়ের কাজ। ১৯৭০ এর শেষ দিকে শুয়ে রয়েছেন এমন অবস্থায় তার মাথায় হঠাৎ কিছু আইডিয়া খেলে গেল। গাণিতিক হিসাব নিকাশ কষে তিনি অনুধাবন করলেন, ব্ল্যাকহোল শুধুমাত্র আকারে বৃদ্ধিই পেতে পারে, কখনোই হ্রাস পেতে পারে না। অথচ তার পূর্ববর্তী গবেষকরা বলেছিলেন ব্ল্যাকহোল সংকুচিত হতে হতে অতি ক্ষুদ্র সিঙ্গুলারিটি বিন্দুতে পরিণত হতে পারে।[6]

চিত্র: তরুণ বয়সে স্টিফেন হকিং। ছবি: Liam White/Alamy Stock Photo

ব্ল্যাক হোলের আকার কখনো কমতে পারে না, ধীরে ধীরে বেড়েই চলে- স্বাভাবিক দৃষ্টিতে এটাই হবার কথা। কারণ ব্ল্যাক হোলের আশেপাশে যা-ই আসুক না কেন তাকেই নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে ভর ও আকার বাড়তেই থাকবে।

ভরের কথা আসলে চলে যেতে হবে ঘটনা দিগন্ত (event horizon) নামের আরেক বিষয়ে। কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোলটির ভরের উপর। উল্টোভাবে দেখলে, কোনো ব্ল্যাক হোলের আকার যদি জানা যায় তাহলে এর ভর কত তা জানা যাবে। ব্ল্যাক হোলের আকার নির্ণয় করা যায় ঘটনা দিগন্ত হতে। ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের একটি প্রান্তিক সীমানা, যেখানের পর থেকে কিছু আর ফেরত আসতে পারে না।

দিগন্তকে একটি বৃত্তাকার সীমানা বলে বিবেচনা করা যায়। এই সীমানার বাইরে কোনো বস্তু থাকলে তাকে দেখা সম্ভব কিন্তু সীমানা স্পর্শ করে ফেললে কিংবা সীমানা পার করে ফেললে তাকে আর দেখা সম্ভব নয়।

একদিকে ব্ল্যাক হোল তার পেটে বস্তু গ্রহণ করে করে আকারে বড় হয়েই চলছে আর অন্যদিকে ঘটনা দিগন্ত তার সীমানা হিসেবে কাজ করছে। তার মানে দাড়ায়, ঘটনা দিগন্তের আকার বেড়েই যাবে দিন দিন। অনেকটা বেলুনের পৃষ্ঠের মতো, ফুঁয়ের সাথে সাথে যার আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে।

চিত্র: ঘটনা দিগন্তের ভেতরে পড়ে গেলে কোনোকিছুই আর ফিরে আসে না। ছবি: Mark Garlick/Science Photo Library

হকিং দেখান যে ব্ল্যাক হোল আকারে ছোট হতে পারে না, ভেঙে ছোট টুকরোও হতে পারে না। এমনকি অন্য একটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষেও না।[7]

তারপর তিনি আরো একটি হেঁয়ালি কাজ করেন। তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের অন্য একটি নিয়মও ব্ল্যাক হোলের ক্রম প্রসারমান দিগন্তের ব্যাপারটি সমর্থন করে। নিয়মটি হলো এনট্রপি।

এনট্রপিকে অনেকটা বিশৃঙ্খলার সাথে তুলনা করা যায়। দুটি তাপীয় উৎসের তাপমাত্রা যদি ভিন্ন হয়, এবং এদেরকে যদি কোনো একভাবে সংযোগ করিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেখানে তাপের আদান প্রদান হবে। তাপীয় পার্থক্য বেশি হলে এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এনট্রপি কম।

[তাপের এই আদান প্রদান থেকে আমরা অনেক কিছু করে নিতে পারি। আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি তা আসে অনেকটা এরকম প্রক্রিয়া থেকেই। এখন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তাপের আদান প্রাদানও শেষ হয়ে যাবে। ফলে সভ্যতার অবস্থা কেমন হবে তা না বলে দিলেও অনুমান করা যায়। তাপমাত্রার পার্থক্য না থাকার এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে বেশি এনট্রপি।]

পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম যেহেতু পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য তাই এনট্রপির হিসেবও পুরো মহাবিশ্বের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমানে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রার বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। বাস্তবতা বলছে মহাবিশ্বের এমন একদিন আসবে যেদিন সকল স্থানের তাপমাত্রা এক হয়ে যাবে। কোনোপ্রকার তাপীয় আদান-প্রদান ঘটবে না, ফলে তাপীয়ভাবে মৃত্যু ঘটবে এই মহাবিশ্বের। এটি হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক এনট্রপি।

চিত্র: মহাবিশ্ব ক্রমান্বয়ে সর্বাধিক বিশৃঙ্খলার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ছবি: ES Sense Club

মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোনায় নানাভাবে হয়তো আমরা তাপীয় পার্থক্যের নানান কিছু দেখতে পাই। ক্ষুদ্র একটি অঞ্চল বিবেচনা করলে হয়তো দেখতে পাই তাপীয় পার্থক্য বাড়ছে। কিন্তু তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র বলছে, কোনায় কানায় যা-ই হোক না কেন, ‘সামগ্রিকভাবে’ পুরো মহাবিশ্বের এনট্রপি বেড়েই চলছে। কখনোই কমছে না।

হকিং এই দুই নিয়মের মাঝে একটি মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখালেন ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের আকারের বৃদ্ধি এবং মহাবিশ্বের এনট্রপি বৃদ্ধি সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ ব্ল্যাক হোলের মাঝে চলে এলো এনট্রপির ব্যাপার।

হকিং তার এই হেঁয়ালি ধারণাটি প্রদান করেন ১৯৭০ সালের শেষ দিকে। সে সময়ই জ্যাকব বেকেনস্টাইন নামে এক তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী হকিংয়ের ধারণা নিয়ে অদ্ভুত এক প্রস্তাব করে বসেন। হকিং তার ধারণাটি উপমা কিংবা কল্পনা হিসেবেই প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বেকেনস্টাইন বলেন হতেও তো পারে এটি শুধুই কোনো কল্পনা নয়, শুধুই কোনো উপমা নয়। কী হবে যদি এই উপমাটিই সঠিক হয়? তিনি প্রস্তাব করেন ব্ল্যাক হোলের এনট্রপি থেকেই তার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বের করা যেতে পারে। পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল পাওয়া মানেই এর আকার আকৃতি ও ভর সম্পর্কে জানা।

কিন্তু ঢালাওভাবে এটি মেনে নিতে একটু সমস্যা আছে। কোনো বস্তুর যদি এনট্রপি থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই তার তাপমাত্রা থাকতে হবে। আর যদি তার তাপমাত্রা থাকে তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে শক্তির বিকিরণ নির্গত হবে। কিন্তু ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে ঝামেলা হলো কোনো কিছুই সেখান থেকে নির্গত হতে পারে না, এমনকি নগণ্য বিকিরণও না। তাহলে?

বহু পদার্থবিজ্ঞানী এমনকি স্টিফেন হকিং নিজেও ধরে নিলেন বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এদিকে বেকেনস্টাইন নিজেও ভাবলেন যেহেতু এই প্রস্তাবে এক প্যারাডক্সের[8] জন্ম হচ্ছে সেহেতু এটি বাস্তব হতে পারে না।

বেকেনস্টাইনের প্রস্তাবনা তো ব্ল্যাক হোল অঙ্গনে একটি লেজুড় সদৃশ ঝামেলা হয়ে ঝুলে আছে। এ লেজুড় দূর করতে হলে তার প্রস্তাবনাকে তো ভুল প্রমাণ করা দরকার। স্টিফেন হকিং নামলেন তাকে ভুল প্রমাণ করার কাজে। কিন্তু মাঠে নেমে দেখেন বেকেনস্টানই আসলে সঠিক। দুই মেরুর প্যারাডক্স সদৃশ অবস্থার মীমাংসা করার জন্য তিনি এমন একটি কাজ করেন যা এর আগে কোনো বিজ্ঞানী করতে পারেনি। তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সমন্বয় ঘটান এখানে।

চিত্র: জ্যাকব বেকেনস্টাইন; ছবি: পিন্টারেস্ট

পদার্থবিজ্ঞান মোটা দাগে কয়েক ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো- ক্ষুদ্র বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে বৃহৎ বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না আবার বৃহৎ বস্তুর নিয়মনীতি দিয়ে ক্ষুদ্র বস্তুকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সূত্র কাজ করে বৃহৎ ও ভারী বস্তু যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ইত্যাদির ক্ষেত্রে। আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্র কাজ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু, পরমাণু, মৌলিক কণা প্রভৃতির ক্ষেত্রে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে স্থান চাদরের মতো মসৃণ, আর কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে জাগতিক সকল কিছুই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার সমন্বয়ে গঠিত। দুই তত্ত্ব অনেকটা একে অন্যের বিপরীতই যেন।

অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞান সার্বজনীন। একইরকম সূত্র দিয়ে জাগতিক সকলকিছুর ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। সেজন্য বিজ্ঞানীরা এক জগতের সাথে আরেক জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। পদার্থবিজ্ঞানের বিভক্ত শাখাগুলোকে একইরকম সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা পেয়ে যাবেন একটি ‘থিওরি অব এভরিথিং’ বা ‘সার্বিক তত্ত্ব’।

বিজ্ঞানীদের কাছে থিওরি অব এভরিথিং অনেকটা হলি গ্রেইলের মতো। এটি না হলে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান যেন কোনোভাবেই পূর্ণ হচ্ছে না। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু আছে, কিন্তু তারপরেও যেন পূর্ণতা পাচ্ছে না একটি থিওরি অব এভরিথিং-এর অভাবে।

একটি থিওরি অব এভরিথিং তৈরিতে বিজ্ঞানীরা রাত দিন খেটে যাচ্ছেন। কিন্তু খেটে গেলে কী হবে? পদার্থবিজ্ঞানের আলাদা জগতগুলোর মেলবন্ধন তো আর ঘটে না সহজে। সেদিক থেকে স্টিফেন হকিংয়ের কাজটি ছিল বেশ বিপ্লবী। তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বকে সাধার আপেক্ষিকতার তত্ত্বের সাথে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তার এই কাজ থিওরি অব এভরিথিং-এর বাস্তবায়নে নিঃসন্দেহে এগিয়ে নিয়েছে অনেকটা পথ।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। কোয়ান্টাম স্কেলে শূন্যস্থান যথেষ্ট সক্রিয় ও জীবন্ত। প্রতিনিয়ত সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিভিন্ন কণার জন্ম হচ্ছে। জোড়ার একটি ম্যাটার এবং অপরটি অ্যান্টি-ম্যাটার। ম্যাটারে আছে ধনাত্মক শক্তি আর অ্যান্টি-ম্যাটারে আছে ঋণাত্মক শক্তি। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক মিলে কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই সার্বিক হিসেবে নতুন কোনো শক্তি তৈরি হচ্ছে না তাদের দ্বারা। কণা জোড়ার সৃষ্টির পরপরই তারা একে অন্যকে ধ্বংস করে দেয়।[9]

কাজটি এতই দ্রুততার সাথে ঘটে যে সরাসরি তাদের পর্যবেক্ষণ করা যায় না। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়তই ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটারের সৃষ্টি ও ধ্বংস হয়ে চলছে, কিন্তু আমরা তাদের দেখতে পারছি না। ঘটে চলছে কিন্তু ধরা-ছোঁয়া যাচ্ছে না- সেজন্য এদেরকে বলা হয় ‘ভার্চুয়াল কণা’।

চিত্র: প্রতিনিয়ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে কণা। ছবি: University of California

হকিং বলছেন যে, ভার্চুয়াল কণাকে বাস্তব কণায় পরিণত করা সম্ভব। যদি ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি তৈরি হয় তাহলে শর্ত সাপেক্ষে তারা বাস্তব কণা হিসেবে রূপান্তরিত হতে পারে। ভার্চুয়াল কণার জোড়াটি যদি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের প্রান্তে তৈরি হয় তাহলে সম্ভাবনা আছে যে জোড়ার একটি কণা ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হবে, আর অপরটি বাইরে থাকবে। সেটি দিগন্ত থেকে বাইরে মহাশূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল কিছু নিয়ম কাজ করে এই বাইরে যাবার ঘটনার পেছনে।

জোড়ার ঋণাত্মক শক্তির কণাটি যদি ব্ল্যাক হোল কর্তৃক গৃহীত হয় তাহলে সেটি ভেতরে গিয়ে ব্ল্যাক হোলের মোট শক্তিকে কমিয়ে দেবে। শক্তি কমে যাওয়া মানে ভর কমে যাওয়া।[10] একদিক থেকে বলা যায় জোড়ার অপর যে কণাটি বাইরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল সেটি ব্ল্যাক হোলের শক্তিকে ক্ষয় করে নিয়ে যাচ্ছে।

এখন সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে ব্ল্যাক হোল থেকে শক্তির বিকিরণ হচ্ছে! অথচ স্বাভাবিকতা বলছে ব্ল্যাক হোল থেকে কোনোকিছুই বের হয়ে আসতে পারে না। ব্যতিক্রমী এই বিকিরণকে বলা হয় ‘হকিং বিকিরণ’। এই বিকিরণ প্রদান করেই ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে ভর হারিয়ে ক্ষুদ্র হয়ে আসে।

হকিংই বলেছিলেন ব্ল্যাক হোল শুধু আকারে বড়ই হতে পারে, কখনোই ছোট হতে পারে না। আবার এখানে দেখিয়েছেন বিকিরণের মাধ্যমে ছোট হতে পারে। তারমানে হকিং নিজেই নিজেকে ভুল প্রমাণ করেছেন।

এই বিকিরণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় ব্ল্যাক হোল ক্ষয় হতে হতে একদময় উবে যাবে। আর এটি যেহেতু কোনো না কোনোকিছু বিকিরণ করে তাই বলা যায় ব্ল্যাক হোল পুরোপুরিভাবে কালো নয়। যখন একটি বস্তু থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারে না তখনই শুধু সেটি পুরোপুরি কালো হয়। যদি সামান্যতম বিকিরণও সেখান থেকে বের হয় তাহলে বলা যায় সেটি শতভাগ কালো নয়। সে হিসেবে ব্ল্যাক হোলও শতভাগ কালো নয়।

চিত্র: ব্ল্যাকহোল থেকে প্রতিনিয়ত হচ্ছে বিকিরণ। ছবি: Quora

১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা নিয়ে হাজির হন। তিনি প্রস্তাব করেন, বিগ ব্যাংয়ের সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার ব্ল্যাক হোল (miniature black hole) তৈরি হয়েছিল। এসব ব্ল্যাকহোলের ভর ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন টন। শুনতে খুব বড় কিছু মনে হলেও এসব ব্ল্যাকহোলের আকার ছিল খুবই ছোট। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় এর আকার এতই ছোট হতে পারে যে তা একটি পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র হয়ে দাড়ায়।

এদিকে দিগন্ত থেকে হকিং বিকিরণের মাধ্যমে ব্ল্যাক হোলের আকার ছোট হয়ে আসছে। আকারে যেহেতু ছোট হচ্ছে, মানে ভর হারাচ্ছে, তার অর্থ হলো ভেতরে ভেতরে এটি গরম হচ্ছে। এই বিশেষ ধরনের উত্তপ্ত হবার ঘটনাকে হকিং নাম দিয়েছেন শুভ্র উত্তাপ বা White hot। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হবার আগ পর্যন্ত উত্তপ্ত হতেই থাকে।

তাদের শেষটা শান্তশিষ্টভাবে হয় না। ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোলগুলো যত ক্ষুদ্র হয় তার উত্তাপ ততই বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এটি মিলিয়ন মিলিয়ন টন হাইড্রোজেন বোমার সমপরিমাণ শক্তি নিয়ে বিস্ফোরিত হয়।

চিত্র: মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তৈরি হয়েছিল কিছু পরিমাণ ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল। ছবি: John Cramer

১৯৭৪ সালে নেচার সাময়িকীতে তার একটি গবেষণাপত্রের[11] মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র ব্ল্যাক হোল ও হকিং বিকিরণের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় এই প্রস্তাব ছিল খুবই বিতর্কিত। অনেকেই মেনে নিতে পারেনি এই বক্তব্য। এতদিন পর বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানীই তার বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এত বছর পরেও কেউ ব্ল্যাক হোলের এই বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেনি। এটা অবাক হবার মতো কিছু নয়, এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। সাধারণ ব্ল্যাকহোলের তাপমাত্রা এতই কম হবে যে বলা যায় এটি পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি। অর্থাৎ হকিং বিকিরণের মাত্রা হবে অতি ক্ষীণ। মহাকাশের এত এত বিকিরণের মাঝে এত দুর্বল বিকিরণ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এর সাত বছর পর হকিং ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে আরো এক মজার বিষয় নিয়ে হাজির হলেন। এবারের প্রসঙ্গ আগের প্রসঙ্গগুলো থেকে একদমই ভিন্ন। তিনি বললেন ব্ল্যাকহোল তথ্য (Information) ধ্বংস করে।

শক্তির বেলায় আমরা জেনেছি, শক্তিকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র। তেমনই কথা তথ্য বা ইনফরমেশনের বেলাতেও প্রযোজ্য। ইনফরমেশনকে সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় মাত্র।

কিন্তু ব্ল্যাক হোলের আচরণ সে নীতি ভঙ্গ করছে। যখন কোনো কণা বা তরঙ্গ ব্ল্যাক হোলের ভেতর পতিত হয় তখন সেটি আর কখনোই মহাবিশ্বের কোথাও ফিরে আসে না। কণা, তরঙ্গ কিংবা যেকোনো কিছুই তথ্য বহন করে। ব্যাপারটা কীরকম? একটি কণার কথা বিবেচনা করা যাক। এটি তার সাথে তার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্য বহন করে। যখন সেটি কোনো ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তখন সেই তথ্যগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা এভাবে বিবেচনা করতে পারি। একটি কণা যদি ব্ল্যাক হোলে পতিত হয় তাহলে সেটি সেখানেই থেকে যায় সবসময়। আবার আমরা এ-ও জেনেছি ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে উবে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যখন সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে তখন সেসব কণার অবস্থান ও ভরবেগের তথ্যগুলো কোথায় যায়? এ এক জটিল প্যারাডক্স।

চিত্র: ব্ল্যাকহোলে কোনো তথ্য পতিত হলে তার পরিণতি কী হয়? ছবি: Jean-Francois Podevin/Science Photo Library

এ সমস্যার সম্ভাব্য দুটি উত্তর আছে। এক, এটি কোনো এক অজানা প্রক্রিয়ায় হকিং বিকিরণের সাথে সম্পর্কিত। হকিং বিকিরণের মাধ্যমে তথ্যগুলো মহাবিশ্বে ফেরত আসে। দুই, তথ্যগুলো চিরকালের জন্য হারিয়ে যায়।

১৯৮১ সালে স্টিফেন হকিং যখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ব্ল্যাক হোলের ইনফরমেশন প্যারাডক্স নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন মার্কিন পদার্থবিদ লিউনার্ড সাসকিন্ড তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি দেখান মহাবিশ্ব থেকে তথ্য হারিয়ে গেলে কী কী জটিলতার জন্ম হবে। আসলেই, তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা শুনতে হালকা মনে হলেও এর প্রভাব হতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে মহাবিশ্বের সকল ক্ষেত্রে।

যেহেতু মহাবিশ্ব স্বাভাবিকভাবে বিরাজ করছে তার মানে তথ্য হারিয়ে যাবার ব্যাপারটায় কিছুটা কিন্তু আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৯৭ সালের দিকে এই বিতর্ক আরো জোরদার হয় হয় এবং নতুন নাটকীয়তার জন্ম নেয়। সে সময় ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিদ জন প্রেসকিলের সাথে স্টিফেন হকিং বাজি ধরেন। হকিং বলছেন তথ্য ধ্বংস হয় আর প্রেসকিল বলছেন হয় না। বাজিতে জিতলে প্রেসকিল তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন আর হারলে তিনি প্রেসকিলকে এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দেবেন।

এই ঘটনার কয়েক বছর পরের কথা। ২০০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক কনফারেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন হকিং। সেখানে তিনি স্বীকার করেন লিওনার্ড সাসকিন্ডই আসলে সঠিক ছিলেন। সেজন্য জন প্রেসকিল তার বাজির এনসাইক্লোপিডিয়া পাওয়ার দাবী রাখেন।

তবে এখানেও তিনি একটা ‘কিন্তু’ রেখে দেন। তিনি বলেন তথ্য ফিরে আসবে ঠিক আছে, তবে তা আসবে বিকৃত রূপে (in a corrupted form)।[12] এই রূপ থেকে তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব।

চিত্র: ব্ল্যাক হোল থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে, তবে সে তথ্য হবে বিকৃত। ছবি: নাসা

এটাই যেন তার স্বভাব। আগের আবিষ্কারগুলো অনেকটা এরকম কথাই বলে। হুট করে এমন যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন যেগুলো কারো ভাবনাতেও আসে না। আসলেও তাত্ত্বিক নিয়ম দিয়ে বাধতে পারে না। আবার কিছুদিন পর নিজের দাবীর ঠিক বিপরীত দাবী নিজেই উপস্থাপন করেন। আর সেগুলোও হয় মহাকাব্যিক। মাঝে মাঝে ভুলও করেন, যেমন করেছিলেন আইনস্টাইন সহ অন্যান্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা।

সমস্ত পৃথিবীতে আলোড়ন ফেলে দেয়া হিগস বোসনের আবিষ্কারের ব্যাপারে স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল নেতিবাচক। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধ্যাপক গর্ডন কেইনের সাথে তিনি বাজি ধরেছিলেন, হিগস বোসন পাওয়া যাবে না[13] কিন্তু তিনি হেরে যান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন,

এ আবিষ্কারের জন্য অধ্যাপক পিটার হিগস নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দাবী রাখেন। কিন্তু নতুন কণার এই আবিষ্কার এমনি এমনি হয়ে যায়নি। এর জন্য আমাকে ১০০ ডলার খোয়াতে হয়েছে।

চিত্র: হিগস বোসন আবিষ্কৃত হওয়ায় স্টিফেন হকিংকে গুনতে হয়েছিল ১০০ ডলার। ছবি: টাইম

১৯৮০ সালের দিকে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্যে বিগ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। পদার্থবিদ জেমস হার্টলের সাথে মিলে এমন একটি কোয়ান্টাম সমীকরণ তৈরি করেন যা মহাবিশ্বের সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এটি তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

সে গ্রহণযোগ্যতা তার না পেলেও হবে। তিনি তার বিকলতার জীবনে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক অবিস্মরণীয় সব বৈজ্ঞানিক উপহার দিয়েছেন তা-ই তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।

কিন্তু তারপরেও আক্ষেপ হয়, তার এত চমৎকার চমৎকার কাজগুলো মানুষের দ্বারা চর্চিত হয় না। তাকে নিয়ে সকল আলোচনা হয় তিনি ঈশ্বর নিয়ে কী বললেন, এলিয়েনের অস্তিত্ব নিয়ে কী বললেন, মানব সভ্যতার টিকে থাকা নিয়ে কী বললেন, নতুন লেখা বইতে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে কী দাবী করলেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ এগুলোর কোনোটিই স্টিফেন হকিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে না।

অনেকেই তার লেখা বই, আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সেগুলোও তার গুরুত্বকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। স্টিফেন হকিংয়ের সত্যিকার গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ঘেটে দেখতে হবে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো।

চিত্র: হকিংয়ের সাড়া জাগানো দুইটি বইয়ের প্রছদ।

সত্যি কথা বলতে কি এসকল হাইপের কারণেই স্টিফেন হকিংয়ের চমৎকার কাজগুলো চাপা পড়ে গেছে। মাঝে মাঝে প্রবল আলোতে ছবি তুললে ছবিতে কিছু উঠে না, ছবির কিছু বোঝা যায় না। প্রবল আলোর দিকে তাকালে অন্যকিছু দেখাও যায় না। হকিংয়ের লেখা প্রথম বইটি এতই আলোচিত হয়েছে যে সেই আলোচনার আলোতে ঢাকা পড়ে গেছে অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যেটা আইনস্টাইন, নিউটন, ভিঞ্চি সহ অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে।

তবে এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার। যদি স্টিফেন হকিং আমাদের মুখে মুখে চর্চিত হয় তাহলে আমরা তার গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক কাজগুলোকেই আলোকিত করে তুলে ধরবো সবার আগে। অন্যান্য বিষয়গুলোও আলোচিত হবে তবে সেগুলোর আগে যেন অবশ্যই তার সত্যিকার মেধার যাচাই হয় এমন কাজগুলো আসে।

মানুষ যেন মনে করতে পারে, ডিরাক, শ্রোডিঙ্গার, ফাইনম্যান প্রভৃতির চেয়েও কোনো দিক থেকে কম নন। তিনি শুধুই বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য বিখ্যাত নন, তার বিখ্যাত হবার পেছনে ভালো কিছু কারণ আছে। সেরা সেরা বিজ্ঞানীদের নিয়ে আলোচনা করার সময় তার নামটিও চলে আসার যোগ্যতা তিনি রাখেন।

গত ১৪ই মার্চ স্টিফেন হকিং পৃথিবীর মায়া ছেড়ে মহাবিশ্বের অন্তিম ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের ওপারে চলে গিয়েছেন। তার মৃত্যুতে এই মহাবিশ্ব তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক মেধাকে হারালো।

[1] http://technologyreview.com/view/414117/the-worlds-greatest-physicists-as-determined-by-the-wisdom-of-crowds/ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ে দু’জন গবেষক মিখাইল সিমকিন ও বাণী রায়চৌধুরীর করা এক জরিপে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনুসারে বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০ জন বিজ্ঞানী হলো- ১) আলবার্ট আইনস্টাইন; ২) ম্যাক্স প্ল্যাংক; ৩) মেরি কুরি; ৪) নিলস বোর; ৫) এনরিকো ফার্মি; ৬) জি মার্কোনি; ৭) ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ; ৮) অরভিন শ্রোডিংগার; ৯) পিয়েরে কুরি; ১০) উইলহেম রন্টজেন

[2] আলোর কণার কোনো ভর নেই। এর বেগও জাগতিক সকল জিনিসের মাঝে সর্বোচ্চ। ভর নেই, তার উপর বেগও সর্বোচ্চ এরকম কোনোকিছুকে সাধারণত কোনো বস্তুই তার আকর্ষণে আটকে রাখতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝে কোনো নক্ষত্র ভরের দিক থেকে এতোই বেশি হয়ে যায় যে এ ভর থেকে সৃষ্ট বক্রতায় আলো পর্যন্তও আটকা পড়ে যায়। অতি ভরের এ ধরনের নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল।

[3] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[4] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[5] S. W. Hawking, R. Penrose, The singularities of gravitational collapse and cosmology, Proceedings of the Royal Society, 27 January 1970. DOI: 10.1098/rspa.1970.0021

[6] J. R. Oppenheimer and H. Snyder, On Continued Gravitational Contraction, Phys. Rev. 56, 455 – Published 1 September 1939

[7] Philip Ball, These are the discoveries that made Stephen Hawking famous, BBC Earth

[8] সহজ অর্থে, কোনো বক্তব্য যা একইসাথে সঠিক এবং ভুল বলে প্রতীয়মান হয় তাকে প্যারাডক্স বলে। দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী কথাও যদি একইসাথে সঠিক হয় তাহলে তাও প্যারাডক্স বলে গণ্য হয়। এখানে এক তত্ত্ব বলছে ব্ল্যাকহোল থেকে কোনোকিছু বের হতে পারে না, এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতাও আছে। আবার আরেক তত্ত্ব বলছে বের হতে পারে। এখানে শেষোক্ত বক্তব্যটিকে যদি সঠিক বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে প্রথম বক্তব্যটির সঠিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে এবং উভয় বক্তব্য মিলে একটি প্যারাডক্সের সৃষ্টি করবে।

[9] ম্যাটার এবং এন্টি-ম্যাটার পরস্পর বিপরীতধর্মী। তারা যখনই একত্রে আসে তখনই একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। অনেকটা সমান মানের যোগ বিয়োগের কাটাকাটির মতো।

[10] আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে ভর ও শক্তি আদতে একই জিনিস। কোনো বস্তুর ভর কমে যাওয়া মানে তার শক্তি কমে যাওয়া। তেমনই কোনো বস্তুর শক্তি কমে যাওয়া মানে তার ভর কমে যাওয়া।

[11] S. W. Hawking, Black Hole Explosions? Nature Volume 248, Pages 30–31 (01 March 1974) Doi:10.1038/248030a0

[12] S. W. Hawking, Information loss in black holes, Phys. Rev. D 72, 084013 – Published 18 October 2005, doi.org/10.1103/PhysRevD.72.084013

[13] https://www.telegraph.co.uk/news/science/large-hadron-collider/9376804/Higgs-boson-Prof-Stephen-Hawking-loses-100-bet.html

একজন বড় বিজ্ঞানীর টুকরো গল্প

এপ্রিলের কোনো এক পড়ন্ত বিকেল। রৌদ্রের শেষ লাল ছটা রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে টেবিলের উপর রাখা হাতের প্রান্ত ছুঁয়ে পড়ছে। লোকটি একাই বসে আছে। আসলে লোক বলা উচিৎ হবে না। দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বসে থাকার কারণে উচ্চতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একনাগারে এক নারীর দিকে চেয়ে আছে।

আসলে ছেলেটি এখানকার নিয়মিত কাস্টমার। প্রতিদিন এই মেয়েটিই তাকে সার্ভ করে। তাই কিছুটা হাই-হ্যালো কথাবার্তাও হয়। মেয়েটি এই রেস্টুরেন্টের একজন ওয়েট্রেস। কাস্টমার আজ বেশি থাকাতে কাজের চাপ বেশ। আজ কথা বলার সময় নেই। ছেলেটা কিছুক্ষণ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলো, কিন্তু তাতে লাভ হল বলে মনে হলো না। মানুষের ব্যাস্ততা নিয়ে চিন্তা করে আপন মনেই হেঁসে উঠল। শেষমেশ টিপসটা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর মেয়েটি টিপস নিতে গিয়ে দেখে দুটি পানি ভর্তি গ্লাসের মাথায় কাগজ দিয়ে উল্টিয়ে রাখা, আর সাথে একটি ছোট কাগজের নোট। সেখানে লেখা— টিপসটা একটু সাবধানে নেবেন। মেয়েটি সামান্য অবাক হলো। কিন্তু গ্লাসগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাতেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল। টিপসের কয়েনগুলো গ্লাসের ভেতরে।

মেয়েটি যদিও টিপস নিতে পেরেছিল, কিন্তু অনেক বেগ পোহাতে হয়েছিল। আর ছেলেটা? সে আসলে মেয়েটিকে ব্যাস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রেহাই দেবার জন্য ঐ কাজ করেছিল।

গল্পের এই ছেলেটির নাম রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যান। নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে? তাকে আমরা অনেকেই চিনি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি এরকম অসংখ্য মজার ঘটনা ঘটিয়েছেন জীবনে।

জিনিয়াস ও কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের মানুষটি নিউইয়র্কের ফার রকওয়ে শহরের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মা লুসিলি নি ফিলিপস ছিলেন গৃহিণী আর বাবা মেলভিল আর্থার ফাইনম্যান ছিলেন একজন সেলস ম্যানেজার।

তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড়। ছোট ভাই হেনরি ফিলিপস মাত্র ৪ সপ্তাহে মারা যায়। দুই ভাইবোনের মধ্যে নয় বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক অনেক ভাল ছিল। পরিবারের বাধা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তার কারণেই তার বোন জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে পারেন। বর্তমানে তিনি একজন নামকরা জ্যোতিঃপদার্থবিদ, নাম জোয়ান ফাইনম্যান।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ফাইনম্যানও ছিলেন একজন লেইট টকার। তিনিও দেরীতে কথা বলতে শিখেছিলেন। তিন বছর বয়সে কথা বলা শুরু করা শিশুটি এমআইটি থেকে ১৯৩৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর জন আরকিবাল্ড হুইলারের অধীনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

সেখানে তার করা গবেষণা কোয়ান্টম মেকানিক্সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে বদলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়যুক্তরাষ্ট্রেরর হয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তার অবদান ছিল। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে সারা জীবন তিনি আক্ষেপ করেছিলেন। বলেছিলেন—

আমরা বিজ্ঞানীরা চালাক একটু বেশিই চালাক আপনারা সন্তুষ্ট নন? একটা বোমা দিয়ে চার কিলোমিটার উরিয়ে দেয়া কি যথেষ্ঠ নয়? মানুষ এখনো ভাবছে। বলুন, আর কতটুক বেশি ধ্বংসাত্মক চান আপনারা!

যুদ্ধ পরবর্তী সময় তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, পরে ১৯৫০ সালে ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে আসেন।

ক্যালটেক ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন তার লেকচারসমূহ The Feynman Lecture on Physics নামে প্রকাশিত হয়। এগুলো আজও সারা বিশ্বের সকল পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম পাঠ্য বই হিসেবে স্বীকৃত।

এ ছাড়াও Quantum Electrodynamics (1961) এবং The Theory of Fundamental Processes (1961) বই দুটি তার লেকচারের উপর ভিত্তি করে লেখা। তিনি তার কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি আর পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত চিন্তাধারা নিয়ে লিখেছেন QED: The Strange Theory of Light and Matter, The Character of Physical Law সহ আরো বেশ কয়েকটি বই।

কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সে তার অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জুলিয়ান এস শোইনযার এবং জাপানী বিজ্ঞানী শিনিচিরো তোমোনাগা এ সম্মান লাভ করেন। যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন সে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে তার একটি উক্তি হলো—

আমার মনে হয়, আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি কোয়ান্টাম ম্যাকানিক্স কেউ বোঝে না

তার শেষ কাজ ছিল ১৯৮৬ সালে মহাকাশযান চ্যালেঞ্জারের ধ্বংস হবার কারণ বের করা। সেই দুর্ঘটনায় ৭ জন নভোচারী মারা যায়। যাদের একজন ছিলেন স্কুল শিক্ষক। ফাইনম্যান সফলভাবেই তার কাজ সম্পাদনা করেন। তিনি টেলিভিশন সম্প্রচারে সবার কাছে মহকাশযানটি ধ্বংস হবার কারণ নাটকীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেন, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এ জন্যে তিনি এক গ্লাস বরফশীতল ঠাণ্ডা পানিতে একটি রাবারের সিল ডুবিয়ে দেখান যে, এমন অবস্থায় রাবার স্বাভাবিক থাকে না। খুব ভঙ্গুর হয়ে যায়। বরফ শীতল সকালে মহাকাশযানের বুস্টার রকেটের রাবারের সিলটিও বেশ ভঙ্গুর ছিল। এ কারণে রকেটটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয় এবং মহাকাশযানটি ধ্বংস হয়।

চিত্র: চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান উৎক্ষেপণের মাত্র ৭৩ সেকেন্ডের ভেতর বিস্ফোরিত হয়

ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি কার্ল এবং মিশেল নামে দুই সন্তানের পিতা। ১৯৭৮ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মেডিকেল চেকআপের পর দেখা গেল তিনি লিপোসারকোমা নামক এক বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর তার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকে। এবং এক পর্যায়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

চিত্র: ফাইনম্যান ডায়াগ্রামের ডিজাইন করা ভ্যানের সামনে ফাইনম্যান এবং তার পরিবার

তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তার মৃত্যুর পর, তার প্রকাশিত সেমি-অটোবায়োগ্রাফি Surely You’re Joking Mr. Feynman! আর What Do You Care What Other People Think? এর কারণে। বই দুটি সারা পৃথিবী জুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছে তাকে। যতটুকু না বিজ্ঞানী হিসেবে, তার চেয়েও বেশি ঐ মজার মানুষ হিসেবে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। তার শেষ উক্তি ছিল—

আমি দ্বিতীয় বার মরতে চাই না, এটা খুবই বিরক্তকর।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.britannica.com/biography/Richard-Feynman
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Richard_Feynman
  3. Surely You’re Joking, Mr. Feynman! By Richard p. Feynman

আইনস্টাইনের থিসিস বিড়ম্বনা

আলবার্ট আইনস্টাইনকে বলা হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। প্রকৃতির বাস্তবতাকে তিনি যেভাবে দেখেছেন এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের বাস্তবতা সম্পর্কে যে ধারণা দিয়ে গেছেন তা সত্যি একজন সত্যিকার সৃজনশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

কম বেশি সকলেই জানে ছোটবেলায় আইনস্টাইন তেমন ছাত্র ছিলেন না। এমনও শোনা গেছে তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বাদে অন্য সব বিষয়ে ফেল করতেন। তবে ছোটবেলা থেকে তার ভাবনার জগৎ ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে ভালোবাসতেন এবং যেকোনো সমস্যার পেছনে সময় দিতে পছন্দ করতেন।

এ অধ্যবসায়ের কারণে তিনি পরবর্তীতে সফল হয়েছেন। আপেক্ষিকতা, ফটো-ইলেকট্রিক ইফেক্ট, ভর শক্তি সমীকরণ (E = mc2) ইত্যাদি আবিষ্কারের কথা আমরা জানি। কিন্তু বিখ্যাত হবার আগে এই বিজ্ঞানীকেও কিন্তু পিএইচডি সম্পন্ন করে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে হয়েছিল। আমরা তার ছোটবেলার নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও তার পিএইচড নিয়ে তেমন বেশি আলোচনা হয়নি।

তার অন্যান্য আবিষ্কারের মতো পিএইচডি থিসিসটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মজার কথা হচ্ছে তার থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪। এখন যারা পিএইচডি করেন তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। তবে এটা সত্যি যে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে থিসিসের পৃষ্ঠা সংখ্যা কম হতেই পারে।

চিত্র: জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়- আইনস্টাইন যেখানে তার পিএইচডি করেছেন

আইনস্টাইনের পিএইচডি নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়েছিল। কয়েকবার করে তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন হচ্ছিল। তার প্রথম থিসিস সুপারভাইজর ছিলেন বিজ্ঞানী হেনরি ফ্রেড্রিক ওয়েবার। ১৯০০ থেকে ১৯০১ এর মধ্যে বেশ কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় পরিবর্তন করেন। তাছাড়া আইনস্টাইনের কাছে ওয়েবারের লেকচার ভালো লাগেনি। তার লেকচারগুলো ছিল অনেক পুরনো ধাঁচের। এমনকি তার পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারে ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের কোনো উল্লেখ নাকি ছিল না।

প্রফেসরকে পছন্দ না হওয়ায় ১৯০১ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ক্লেইনের কাছে পিএইচডি করতে যান। সেখানেও প্রথম দিকে কয়েকবার তার থিসিসের বিষয় গ্রহণ করা হয়নি। পরে আবার জমা দিলে তা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেখানেও একটু সমস্যা ছিল। থিসিসটি ছিল অনেক ছোট। আইনস্টাইনের বোনের মারফত জানতে পারা যায় যে ওইবার থিসিস বড় করার জন্য তাকে ফেরত দেয়া হলে সেখানে আইনস্টাইন শুধু একটি মাত্র বাক্য যোগ করেছিলেন এবং সেভাবেই আবারো জমা দিয়েছিলেন।

ক্লেইনার, আইনস্টাইনের থিসিস সুপারভাইজর

এবার ক্লেইনার এবং আরেকজন প্রফেসর সেটি মূল্যায়ন করেন এবং থিসিসটি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তার থিসিসটি Annalen der Physik জার্নালে পাঠান। কিন্তু তারাও সেটা বাদ দিয়ে দেয়। তারা বলে যে তথ্য এবং উপাত্ত আইনস্টাইন ব্যবহার করেছে সেগুলো পুরনো হয়ে গেছে। আরও নতুন তথ্য দিতে হবে।

আইনস্টাইন এরপর সেখানে যাবতীয় নতুন তথ্য সংযোজন করেন (Addendum) এবং পুনরায় সেই জার্নালে পাঠিয়ে দেন। এবার জার্নালটিতে গবেষণাটি প্রকাশ পায়। সে সময়টিতে আসলে কী হয়েছিল আইনস্টাইনের সাথে? কেন এতবার তার থিসিস বাতিল করা হয়? কী ছিল তার পিএইচডি থিসিসে?

চিত্র: আইনস্টাইনের থিসিস

ওয়েবারের কাছে যখন প্রথম পিএইচডি-র প্রজেক্টের বিষয়ের কথা হয়, তখন প্রথমে আইনস্টাইন ব্যাতিচার যন্ত্র ব্যবহার করে আলোর বেগ c পরিমাপ করতে চেয়েছিলেন। ততদিনে মাইকেলসন ও মর্লি সেটি করে ফেলেছিল। এ সম্পর্কে আইনস্টাইন জানতেন না।

এরপর কোনো পদার্থে বিদ্যুৎ প্রবাহকালে এর উপর তাপের কী প্রভাব, তা নিয়ে কাজ করতে চান তিনি। কিন্তু এটাও বাদ দেয়া হয়। তারপর তিনি তাপ পরিবাহিতা নিয়ে কিছু গবেষণা করেন এবং ফলাফল বের করে ওয়েবারকে দেন। এটাও বাদ দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, আইনস্টাইনের করা এ গবেষণাটি ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে।

এরপর ক্লেইনারের কাছে আইনস্টাইন প্রথমে তরল থেকে গ্যাসে পরিণত হওয়ার সময় আন্তঃআণবিক বলের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞানী বোলজম্যান এটা নিয়ে কিছু কাজ করে রেখেছিলেন এবং আইনস্টাইনের দেয়া প্রস্তাবনা অনেকটাই বোলজম্যানের সাথে মিলে যাচ্ছিল। সেজন্য এটা বাদ দিতে হয়।

এরপরের বিষয়টি ছিল কোনো গতিশীল বস্তুর ইলেক্ট্রো-ডাইনামিক্স নিয়ে। কিন্তু সেটাও গ্রহণ করা হয়নি, কারণ এটা পুরোটুকুই ছিল শুধু তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। আর যে প্রফেসর এটা পর্যালোচনা করেছিলেন তারা এর মর্মই বুঝতে পারেননি।

এতকিছুর পর একদম শেষে তিনি তার পিএইচডি করতে পেরেছিলেন চিনির অণুর আনবিক মাত্রা বের করা সংক্রান্ত গবেষণায়। এখানে তিনি অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মান বের করেছিলেন। সেই অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা, যেটা আমাদেরকে মুখস্ত করতে হয়, যার মান N = 6.023 × 1023। কিন্তু এটি কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল সে সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য আমাদের দেয়া হয় না। যাহোক, তার পাওয়া ফলাফলে পরে ভুল ধরা পড়েছিল। ভুল ধরার পরে তাত্ত্বিকভাবে আবারো আইনস্টাইন আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

এখানে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার মানে কয়েক ইউনিট ভুল ছিল। তিনি যে উত্তর পেয়েছিলেন তার মান এসেছিল N = 2.1 × 1023। পরে গাণিতিক হিসাবে তার ভুল বের করতে পেরেছিলেন এবং পরে আবার তার গবেষণাপত্র ভুল সংশোধন করে ছাপা হয়েছিল। সংশোধন করার পর তার মান এসেছিলো N = 4.15 × 1023

কিছুদিন পরে রসায়নের একটি ব্যবহারিক গবেষণায় অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যার প্রকৃত মান পাওয়া যায়। যা থেকে আবারো প্রমাণিত হয় যে আইনস্টাইনের সমীকরণের কোথাও ভুল আছে। এরপর আইনস্টাইন আবারো তার গবেষণাপত্রটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং আবারো তার ভুল সংশোধন করেন। এবার তাত্ত্বিকভাবে সেই মান আসে N = 6.56 × 1023। দেখা যাচ্ছে এ মান মূল মানের অনেক কাছাকাছি পর্যন্ত ঠিক উত্তর দিতে পেরেছিল। অনেকে মনে করতে পারেন, ভুল থাকার পরেও কেন তাকে পিএইচডি দেয়া হলো?

তখনকার সময় জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকে গাণিতিক পদার্থ বিজ্ঞানে পিএইচডি পাওয়ার জন্য এই কাজ যথেষ্ট ছিল। আইনস্টাইন নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন যেটা দিয়ে এই মান মোটামটি সঠিকভাবে বের করা যাচ্ছিল। এটা অনেক বড় আবিষ্কার।

তাছাড়া জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জার্মানির অন্যান্য জায়গাতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে ব্যাবহারিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বেশী চর্চা করছিল সবাই। তাত্ত্বিক বিষয়ে গবেষণা তুলনামূলক কম হচ্ছিল। ক্লেইনার তাত্ত্বিক গবেষণা পছন্দ করতেন দেখে তিনি আইনস্টাইনকে এ বিষয়ে কাজ করতে দিয়েছিলেন।

১৯০৫ সালে তার থিসিস গবেষণাপত্রে প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পেপার প্রকাশিত হয় যেমন- Photoelectric Effect, Brownian motion, Electrodynamics of Moving Bodies, E=mc2 এবং Molecular Dimension যেটা তার থিসিসের বিষয় ছিল। শেষেরটির উল্লেখ গবেষণাপত্রগুলোতে অন্যান্যগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশীবার হয়েছে।

চিত্র: তার থিসিসটি Annalen der Physik নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়।

আইনস্টাইনের নিজের কাছেও তার থিসিসের গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। তিনি যদি একটি অণুর আকার- আয়তন বের করার কোনো মাধ্যম বা পদ্ধতি দিতে পারেন তাহলে সেটার গুরুত্ব অনেক। কারণ এতে ম্যাক্স প্লাঙ্কের রেডিয়েশন ফর্মুলা আরো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা যাবে। তাছাড়া তার এই থিসিসে এমন একটি কাজ করা হয়েছিল যেটা দিয়ে একটি আণবিক হাইপোথিসিস দাড় করানো গিয়েছিল। তার এই গবেষণার কারণে ব্রাউনীয় গতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করা সম্ভব হয়েছিল।

আসলে আইনস্টাইনের পিএইচডি-র সময় বাধা আসার মূল কারণ ছিল পরিস্থিতি। তখন তাত্ত্বিক পারমাণবিক বিষয় নিয়ে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খুব বেশী গ্রহণ করা হতো না। যদিও কেউ কেউ এসব বিষয় নিয়ে অন্যান্য জায়গায় গবেষণা করছেন, কিন্তু তখন ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন এমন সব আবিষ্কার হচ্ছিল যে, সবাই সেসব আবিষ্কার নিয়ে ব্যবহারিক গবেষণা করার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯১০ সাল পর্যন্ত এই ধারাটা চলছিল। এরপর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে।

যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা

মাঝে মাঝে প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়েও নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানী তাদের গবেষণার স্বার্থে বিভিন্ন পাগলাটে পরীক্ষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেমনই কিছু অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সম্বন্ধে আলোকপাত করা হলো এখানে।

ঘটনা ১

বিজ্ঞানপ্রেমীদের নিকট স্যার আইজ্যাক নিউটনের নাম সুপরিচিত। মহাকর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। মহাকর্ষ বলের পাশাপাশি তিনি আলোকবিজ্ঞান নিয়েও বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন। ১৬৬৫ সালে প্রিজম এবং সূর্যালোকের উপর প্রিজমের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আলো এবং রং নিয়ে তার কৌতুহলের মাত্রা পদার্থবিজ্ঞানের সকল সীমাকে ছাড়িয়ে যায়। মানুষের মন কীভাবে বিভিন্ন রঙের ধারণাগুলো উপলব্ধি করে, তা-ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আগ্রহ থেকে জন্ম নেয়া প্রশ্নের উত্তর জানতে তিনি এক ভয়ানক পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। একটি লম্বা সরু সূচ তার নিজের চোখের মধ্যে প্রবেশ করানোর সিদ্ধান্ত নেন। চোখের অক্ষিগোলক এবং অক্ষিকোটরের পেছনে থাকা হাড়ের মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে সূচটি প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার মতে বিষয়টি ছিল একটি অভিনব চিন্তা। তিনি সূচ দিয়ে তার অক্ষিগোলকের বিভিন্ন অংশে খোঁচা দেন। সে সময় তিনি বিভিন্ন রঙ্গের ছোপ দেখতে পান। তিনি হিসাব নিকাশ করে দেখেন, রংয়ের পরিবর্তন চোখের উপর প্রয়োগকৃত বল এবং গবেষণাকক্ষের আলোর উপর নির্ভরশীল।

আইজ্যাক নিউটন

এই পরীক্ষাটি আমরাও করে দেখতে পারি। তবে তার জন্য বিপজ্জনক পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে না। চোখ বন্ধ করে চোখের পাতা ঘষলে আমরা নিউটনের মতো সেই একই অনুভূতি পাবো। কারণ এখন আমরা জানি, নিউটনের এই উপলব্ধির মূল উৎস হলো আমাদের চোখের রেটিনার এক বিশেষ আলোকসংবেদী কোষ। এর নাম কোন কোষ

আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর ভিত্তি করে চোখে বিভিন্ন বর্ণের অনুভূতি সৃষ্টি করাই কোন কোষের কাজ। অক্ষিগোলকের উপর চাপ প্রয়োগের ফলে নিউটন আসলে এই কোন কোষগুলোকে উদ্দীপিত করে তুলেছিলেন। সুই দিয়ে করা তার পরীক্ষাটি নিঃসন্দেহে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানী নিউটন সেই আশঙ্কাটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পরীক্ষাটি আর অব্যাহত রাখেননি।

ঘটনা ২

সুঁইয়ের ঘটনাটিই নিউটনের জীবনের একমাত্র পাগলামি নয়। তিনি তার চোখকে আরো একবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। কোনো জিনিস দর্শনের পর আমাদের মস্তিকে তার রেশ কতটুকু সময় থাকে সেটা নিয়ে তিনি একবার অনুসন্ধান করছিলেন।

কোনো উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকানোর পর আমরা যে ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাই তাকে আফটার ইমেজ ইফেক্ট বলে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের দিকে যারা কখনো তাকিয়েছেন তারা বিষয়টি খুব ভালভাবে বুঝতে পারবেন। চোখের রেটিনার আলোক সংবেদী কোষসমুহ অতিমাত্রায় উদ্দীপ্ত হলে আফটার ইমেজ ইফেক্ট দেখা যায়। যার কারণে আলো চলে গেলেও অধিক উদ্দীপনার কারণে আলোক সংবেদী কোষগুলো তখনো সক্রিয় থাকে।

এই আফটার ইমেজ ইফেক্ট পরীক্ষার জন্য নিউটন একটি অন্ধকার রুমের এক কোনায় একটি আয়না রাখেন। এরপর সেই আয়নার উপর সূর্যের আলো ফেলার ব্যাবস্থা করেন। এরপর ডান চোখ দিয়ে আয়নার উপর আপতিত সূর্যের আলোর প্রতিফলন দেখেন। যখন আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ফেলেন, তখন সূর্যের একটি স্পট বা ছোপ দেখতে পান।

সূর্যের প্রতিফলিত প্রতিকৃতির দিকে বার বার দৃষ্টিপাত করতে থাকেন। কিছু সময় পর তিনি দেখতে পান, সূর্যের আলোর বিম্ব তার চোখকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলেছে যে ডান চোখ বন্ধ করে তাকালেও সেই ঝাপসা বিন্দুটি দেখতে পাচ্ছেন। ঠিক তখনই নিউটন ঘাবড়ে যান।

তিনি যেদিকেই তাকাচ্ছিলেন, সবখানেই শুধু সূর্যের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তার চোখ হয়ত নষ্ট হয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য তিনি নিজেকে টানা তিনদিন একটি অন্ধকার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনদিন পর তার দৃষ্টিশক্তি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরোপুরি সেরে উঠতে বেশ কয়েক মাস লেগে যায়।

বর্তমানে অনেকে মনে করেন সূর্যের উজ্জ্বল আলো ও অতিবেগুনি রশ্মি আপতিত হওয়ার কারণে নিউটনের চোখের রেটিনা সম্ভবত সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ঘটনাকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। এ সমস্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ বা ধাতব ওয়েল্ডিংয়ের সময় চোখে আলো প্রতিরোধকারী চশমা পরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

চিত্র: ক্ষতিকর আলোকরোধী চশমা, সূর্যগ্রহণের সময় ব্যবহার করা হয়।

ঘটনা ৩

পরীক্ষাগারে কাজ করার সময় নিরাপত্তার দিকে সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয়। কিন্তু ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্যার হামফ্রে ডেভি সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেন। ডেভি তখন ইংল্যান্ডের নিউম্যাটিক ইন্সটিটিউটের ল্যাব সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাসের ব্যবহার নিয়ে সেখানে কাজ করেন।

তার পরীক্ষণ পদ্ধতি ছিল ব্যাতিক্রমধর্মী ও চমকপ্রদ। প্রথমে গ্যাসসমূহের মাঝে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতেন। তারপর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অজানা গ্যাসীয় উৎপাদগুলো শ্বাসের মাধ্যমে নিজের শরীরে গ্রহণ করতেন এবং সেই গ্যাসগুলোর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করতেন। ভয়ের বিষয় হলো, যে সকল গ্যাস তার শরীরে প্রবেশ করতো তাদের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না ডেভির।

গ্যাসগুলো ক্ষতিকর নাকি উপকারী সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ডেভির শিক্ষক একবার আশ্চর্য এক গ্যাস নিয়ে কাজ করেছিলেন। গ্যাসটির নাম নাইট্রাস অক্সাইড। ডেভি এ গ্যাসটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার সাথে সাথে তার মাঝে এক তীব্র অনুভূতির সৃষ্টি হয়। শুধু তা-ই নয়, তার অনুভূতি এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি কারণে অকারণে হাঁসতে শুরু করেন।

হামফ্রে ডেভি

নাইট্রাস অক্সাইড সেবনে মানুষের শরীরে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এ কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা বা ব্যাথার উপশমে এ গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ডেন্টিস্টরা রোগীদের দাঁত তোলার পর ব্যাথা নিবারনের ডোজে নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করেন।

এক পরীক্ষায় হামফ্রে ডেভি মাত্র ৭ মিনিটে ১৫ লিটার বিশুদ্ধ নাইট্রাস অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, সে যাত্রায় তার কিছু হয়নি। তবে পরীক্ষা চালিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছিলেন সেটি তার খুব পছন্দ হয়েছিল। এমনকি তার বন্ধু বান্ধবদেরকেও এ গ্যাস গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে তোলেন। এটি রীতিমতো একটি প্রথার পর্যায়ে চলে যায়। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ ক্ষণিকের জন্য সুখের অনুভূতি পেতে এ গ্যাস সেবন করতে শুরু করে।

ডেভির এই ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাই তাকে রসায়নবিদ হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এ পরীক্ষার কয়েক বছরের মাঝেই তিনি পর্যায় সারণির কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌল আবিষ্কার করেন। সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, স্ট্রনসিয়াম এবং বেরিয়াম ছিল তালিকায়। এ মৌলগুলো অবশ্য তিনি এই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেননি।

এমনিতে নাইট্রাস অক্সাইড ছাড়াও তিনি আরো অনেক গ্যাস শুঁকেছিলেন। সেসবের মাঝে অনেক গ্যাসই ছিল বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। তাদের ক্ষতিকর প্রভাবে ধীরে ধীরে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। ৫০ বছরের কিছু বয়স পরে তিনি দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাতেই মারা যান।

বিজ্ঞানের জগতে হামফ্রে ডেভির সাফল্য অবিস্মরণীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে পরীক্ষা তাকে সাফল্যের স্বর্ণচূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল, সে পরীক্ষাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

ঘটনা ৪

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইলফলক সৃষ্টিকারী এক ব্যক্তির নাম স্টাবিন্স ফার্থ। নিজের মনে জমে থাকা কৌতুহল মেটাতে তিনি যা করেছিলেন তা অবিশ্বাস্য। ১৮০৪ সালে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ইয়েলো ফিভার বা পীতজ্বর নিয়ে থিসিস করছিলেন। এটি একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। এ রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর হয়। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশি ও জয়েন্টে ব্যাথা এমনকি জণ্ডিসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে।

স্টাবিন্স ফার্থ

১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াতে এ রোগের মহামারি দেখা দেয়। সেই মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। প্রসিদ্ধ ডাক্তাররা অভিমত দেন, পচা কফি আমদানি, লোনা পানি কিংবা দুষিত বাতাসের কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু বিজ্ঞানী ফার্থ এ অভিমতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে সচেষ্ট হন।

তিনি খেয়াল করেন ইয়েলো ফিভার তাণ্ডব চালায় মূলত গ্রীষ্মকালে। কিন্তু শীতকালে এ রোগের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এখান থেকে তিনি ধারণা করেন ইয়েলো ফিভার আসলে সংক্রামক কোনো ব্যাধি নয়।

তিনি আক্রান্ত রোগীদের বমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথমে কুকুরকে বমি খাওয়ান। কিন্তু কুকুর ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হলো না। তারপর কুকুর এবং বিড়ালের শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে বমি প্রবেশ করান। এবারও কাজ হলো না। এরপর পরীক্ষাটি নিজের উপর চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

প্রথমে চোখে বমি নেন। কাজ হলো না। এরপর বমিকে উত্তপ্ত করে গ্যাসে পরিণত করেন এবং তা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ করেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল পাওয়া গেল না। এবার মুখ দিয়েই গ্রহণ করে ফেলেন। এবারও সংক্রমিত হলেন না। এরপর আক্রান্ত রোগীর দেহের অন্যান্য তরল পদার্থ নিয়েও কাজ শুরু করেন। এতেও তিনি আক্রান্ত হলেন না। এরপর তিনি ঘোষণা দেন, ইয়েলো ফিভার কোনো সংক্রামক ব্যাধি হতে পারে না।

ঘটনা ৫

চল্লিশের দশক। ২য় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব তখন টালমাটাল। সে সময় কতিপয় বিজ্ঞানী ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। তারই ফলশ্রুতিতে নিউক্লিয়ার অস্ত্রের উত্থান ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে নিউ মেক্সিকোর গোপন পারমাণবিক গবেষণাগার তাদের তৃতীয় নিউক্লিয়ার চুল্লি নিয়ে পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এখানেই পারমাণবিক বোমা বানানোর গোপন মিশন ম্যানহাটান প্রোজেক্ট শুরু করা হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দুইটি অ্যাটম বোমা লিটল বয় আর ফ্যাট ম্যান এই লস আলামস ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা হয়েছিল।

তবে ঘটনাটি যার সাথে ঘটেছিল তার নাম লুইস স্লটিন। কানাডার এই পদার্থবিদ তৃতীয় চুল্লিতে গবেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এই চুল্লি থেকে হয়তো আরো একটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হতো।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়াতে সেখানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর সুপার ক্রিটিক্যাল অবস্থায় উপনীত হলে কী ঘটে সেটিই ছিল তাদের আগ্রহের বিষয়। নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের মুক্ত নিউট্রনের প্রভাবে স্বতঃস্ফূর্ত চেইন বিক্রিয়া ঘটতে থাকে। বিক্রিয়ার হার বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে তা সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে চলে যায়। তখন নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটে। রিয়্যাক্টরে থাকা প্লুটোনিয়ামের পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়।

লুইস স্লটিন

লুইস স্লটিন তৃতীয় পারমাণবিক চুল্লিতে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের নেতৃত্ব দেন। তাদের মূল কাজ ছিল চেইন বিক্রিয়াটি যতটুকু সম্ভব সুপার ক্রিটিক্যালের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া এবং সেই মুহূর্তের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা।

চুল্লিটি বেরিলিয়ামের তৈরি একটি গোলকের ২টি অর্ধাংশ দ্বারা আবৃত ছিল। চুল্লির ভেতরে নিউট্রনের চলাচল ও প্রতিফলনে অর্ধগোলক দুইটি খুব কার্যকর ভূমিকা পালন করত। চেইন বিক্রিয়াটি সুপার ক্রিটিক্যাল পর্যায় যাওয়া থেকে রক্ষা করতে এ দুটি অর্ধগোলককে পরস্পর থেকে পৃথক রাখাটা জরুরী ছিল। অর্ধগোলক দুটিকে আলাদা করার জন্য এক ধরনের ব্লক ছিল। কিন্তু লুইস স্লটিন সেই ব্লক ব্যবহার করতেন না। অর্ধগোলক দুটিকে পৃথক রাখার জন্য তিনি স্ক্রু ড্রাইভার ব্যবহার করতেন।

কিন্তু এ কাজের পেছনে থাকা ভয়াবহ ঝুঁকিটা তিনি ঠিকভাবে আঁচ করতে পারেননি। কয়েক মাস আগেই তার এক পূর্বসূরি এই চুল্লিতেই তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিলেন। অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে এই বিপদজনক কাজটি নিয়মিতভাবে করতেন।

এক দিন পর্যবেক্ষণের সময় অর্ধগোলক দুটিকে একে অপরের খুব কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তার হাত থেকে স্ক্রু ড্রাইভারটি ছিটকে পড়ে যায়। মুহূর্তেই নিউক্লিয়ার চুল্লিটিতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। নীল বর্ণের তেজস্ক্রিয় আলোয় চারদিকে ছেয়ে যায়। মাত্র ৯ দিনের মাথায় তিনি মারা যান।

চিত্র: বেরিলিয়ামের দুই অর্ধগোলক ও স্লটিনের ব্যবহৃত সেই স্ক্রু ড্রাইভার

হিসাব করে দেখা যায়, তিনি প্রায় ১০০০ র‍্যাড তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হন। সর্বনিম্ন যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় বিকিরণ একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট, তিনি তার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তার মৃত্যুর পরে সে চুল্লিকে ‘পিশাচ চুল্লি’ বা Demon core নামে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়াও লস আলামসে সুপারক্রিটিক্যালিটি নিয়ে সকল ধরণের গবেষণা বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

তথ্যসূত্র

  1. https://nature.com/articles/494175a
  2. http://www.slate.com/articles/health_and_science/science/2017/08/html
  3. http://www.madsciencemuseum.com/msm/pl/stubbins_ffirth
  4. https://youtube.com/watch?v=_CMql2TRQV8

featured image: allthatsinteresting.com/

নক্ষত্র হতে আগত অলংকার

পৃথিবীতে অন্যান্য মৌলের তুলনায় স্বর্ণের পরিমাণ খুবই কম। স্বর্ণ যে শুধু পৃথিবীতেই কম তা নয়, সমগ্র মহাবিশ্বেই কম। সমগ্র মহাবিশ্বে কেন কম হবে তার পেছনে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। সে কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে পৃথিবীতে যত পরিমাণ স্বর্ণ আছে তার সামান্যতম অংশও পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। অল্প-স্বল্প স্বর্ণ যা-ই আছে তার সবই এসেছে সৌরজগৎ তথা পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্ব থেকে। এটা কীভাবে হয়? এর উত্তর পেতে হলে জানতে হবে গ্রহ-নক্ষত্র কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে।

নক্ষত্র গঠনের মূল উপাদান হলো মহাজাগতিক ধূলি। এই ধূলির মাঝে থাকে হাইড্রোজেন গ্যাস, হিলিয়াম গ্যাস, লিথিয়াম গ্যাস সহ আরো অনেক উপাদান। তবে সেসবের মাঝে সবচেয়ে বেশি থাকে হাইড্রোজেন। এই হাইড্রোজেনই নক্ষত্রের ভেতরে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ভারী মৌল গঠন করে। বিগ ব্যাং এর পর পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম অনুসরণ করে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়াম মৌলগুলো তৈরি হয়েছে। এরপর মহাবিশ্বও প্রসারিত হয়েছে এবং তারাও ছড়িয়ে পড়েছে মহাবিশ্বের সর্বত্র।

কয়েক আলোক বর্ষ ব্যাপী বিস্তৃত এরকম ধূলিমেঘ থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। কোনো একটি এলাকায় কিছু গ্যাস মহাকর্ষ বলের প্রভাবে একত্র হয়। একত্র হলে ঐ অংশের ভর বেড়ে যায়। মহাকর্ষ বলের নিয়ম অনুসারে কোনো বস্তুর ভর বেশি হলে তার আকর্ষণও বেশি হবে। সে হিসেবে ঐ একত্র হওয়া ধূলির মেঘ আরো বেশি বলে আকর্ষণ করবে পাশের মেঘকে। এভাবে আরো ভর বাড়বে এবং আরো বেশি আকর্ষণ ক্ষমতা অর্জন করবে। এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।

এক পর্যায়ে দেখা যাবে ঐ বস্তুটি এত বড় হয়ে গেছে যে সেখানে প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। নিজের মহাকর্ষের শক্তিতেই নিজের পরমাণু লেপ্টে যাচ্ছে। এমন শক্তিশালী আভ্যন্তরীণ চাপে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে যায়। দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একত্র হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণু তৈরি করে।

একাধিক ছোট পরমাণু একত্রে যুক্ত হয়ে একটি বড় পরমাণু তৈরি করার এই প্রক্রিয়াকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। আমরা যে সূর্যের তাপ শক্তি ও আলোক শক্তি পাচ্ছি তার সবই আসছে এই ফিউশন প্রক্রিয়ায়।

চিত্র: সূর্যের সকল শক্তি আসছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। ছবি: Imgur

ফিউশন প্রক্রিয়ায় একত্র হতে হতে সকল হাইড্রোজেনই একসময় হিলিয়ামে পরিণত হয়ে যায়। তখন হিলিয়াম আবার একত্র হওয়া শুরু হয়। এ পর্যায়ে দুটি হিলিয়াম পরমাণু একত্র হয়ে একটি কার্বন পরমাণু তৈরি করে। হিলিয়াম পরমাণু শেষ হয়ে গেলে কার্বনও আরো ভারী মৌল তৈরি করে।

এ প্রক্রিয়ায় পর্যায় সারণীর শুরুর দিকের হালকা মৌলগুলো তৈরি হয়। লোহা বা তার চেয়েও বেশি ভারী মৌলগুলো এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না। কারণ লোহা তৈরি করতে যে পরিমাণ আভ্যন্তরীণ চাপীয় শক্তি প্রদান করতে হবে সাধারণ নক্ষত্রগুলোর সে শক্তি নেই।

যেমন আমাদের সূর্যের কথাই বিবেচনা করা যাক। এর এত তেজ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য নক্ষত্ররে তুলনায় এটি একদমই মামুলী একটি নক্ষত্র। সূর্যের আভ্যন্তরীণ চাপে শুধুমাত্র হিলিয়াম থেকে কার্বন পর্যন্ত চক্র চলবে। এরপর আরো ভারী মৌল তৈরি করতে যে পরিমাণ চাপ থাকা দরকার সূর্যের তা নেই।

তাহলে লোহা এলো কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা হিসাব নিকাশ ও পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় লোহা তৈরি হতে পারে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে পদার্থবিদ্যার কিছু নিয়ম অনুসারে প্রবল চাপে চুপসে যায় নক্ষত্র। প্রবল সে চাপে লোহা তৈরি হওয়া সম্ভব।

সুপারনোভা কেন বিস্ফোরিত হবে সেটাও একটা প্রশ্ন। সুপারনোভাও অন্যান্য নক্ষত্রের মতো বিশেষ একপ্রকার নক্ষত্র। সাধারণ নক্ষত্রে অভ্যন্তরীণ চাপ ও বহির্মুখী চাপ একটি সাম্যাবস্থায় থাকে। অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয় মহাকর্ষের ফলে। আর একাধিক পরমাণু একত্র হয়ে যে প্রবল শক্তি তৈরি করছে তা বাইরের দিকে চাপ দেয়। এই দুই বিপরীতধর্মী চাপের ফলে নক্ষত্র একটি সাম্যাবস্থায় থাকে।

কিছু ক্ষেত্রে বহির্মুখী চাপ, অভ্যন্তরীণ চাপের চেয়ে খুব বেশি হয়ে যায়। সেসব নক্ষত্র প্রচণ্ড বেগে বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এধরনের নক্ষত্রকে বলে সুপারনোভা। সুপারনোভার বিস্ফোরণেই লোহা বা তার চেয়ে সামান্য বেশি ভারী মৌলগুলো তৈরি হবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চাপ পায়।

চিত্র: সুপারনোভা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড চাপে তৈরি হয় লোহা।
ছবি: Gemini Observatory/Lynette Cook

কিন্তু স্বর্ণ? লোহার পারমাণবিক ভর ৫৬ আর স্বর্ণের পারমাণবিক ভর ১৯৬। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে লোহার চেয়ে স্বর্ণের ভর অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন এরকম কোনো বিস্ফোরণই স্বর্ণ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণে যে পরিমাণ চাপ তৈরি হয় তার চেয়েও ১০০ গুণ বেশি চাপ প্রয়োজন হবে স্বর্ণের পরমাণু তৈরিতে।

এরকম চাপ তৈরি হতে পারে খুব ভারী কোনো নক্ষত্রের সাথে আরেকটি ভারী নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে। সাধারণ নক্ষত্রের সংঘর্ষে এত চাপ তৈরি হবে না। এটি সম্ভব খুব ভারী দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষে কিংবা একটি নিউট্রন নক্ষত্র ও একটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষে। উল্লেখ্য ব্ল্যাকহোলও একপ্রকার নক্ষত্র।

তত্ত্ব অনুসারে এভাবে স্বর্ণ তৈরি হবে। কিন্তু নিশ্চিত না হয়ে তো মেনে নেয়া যায় না। কে জানে এই মহাজগতে এমন কোনো প্রপঞ্চ হয়তো লুকিয়ে আছে যার মাধ্যমে ভিন্ন উপায়ে স্বর্ণ তৈরি হচ্ছে, আর সেই প্রপঞ্চ আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ অনিশ্চয়তা নিয়ে আর মন খারাপ করতে হবে না। সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০১৭) বিজ্ঞানীরা এর একটি সমাধান পেয়েছেন। এই সমাধান সম্প্রতি পেলেও এর জন্ম হয়েছিল অনেক আগেই।

আজ থেকে ১৩০ মিলিয়ন বছর আগে, আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরের এক গ্যালাক্সিতে দুটি নিউট্রন নক্ষত্র পরস্পরের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বেশ কিছুটা সময় তারা একে অপরকে সর্পিলাকারে আবর্তন করে, সজোরে আছড়ে পড়ে একটি আরেকটির উপর।

অত্যন্ত শক্তিশালী এই সংঘর্ষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নক্ষত্রের ভগ্ন অংশ। পাশাপাশি আরো ছড়ায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং অতীব তীব্র আলোক রশ্মি। সূর্যের সাথে তুলনা করলে সে তীব্রতা হবে সূর্যের চেয়ে মিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ বেশি। এতই তীব্র যে সেগুলো মিলিয়ন মিলিয়ন আলোক বর্ষ দূরত্ব থেকেও দেখা যায়।

দুই নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে জন্ম নেয়া এসব তরঙ্গ যাত্রা শুরু করে পৃথিবীর দিকে। লক্ষ লক্ষ বছর ব্যাপী ভ্রমণ করতে থাকে পথ। করতে করতে ১৩০ মিলিয়ন বছর পার করে এসে পৌঁছায় পৃথিবীর বুকে। আর ঘটনাক্রমে এই সময়টাতেই বিজ্ঞানীরা তাক করে রেখেছিল টেলিস্কোপ সহ অন্যান্য শনাক্তকরণ যন্ত্র। আর তাক করার দিক ছিল ঠিক ঐ নক্ষত্রের দিকেই। বিজ্ঞানের কল্যাণে তাই আমরা এখানে বসে আজ থেকে দূরের ১৩০ মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে পারছি।

এই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে স্বর্ণ জন্ম নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন এরকম সংঘর্ষের মাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা স্বর্ণ ও প্লাটিনামের মতো মৌল তৈরির জন্য সকল শর্ত পূরণ করে।

চিত্র: স্বর্ণ তৈরি হয়েছে সুপারনোভা কিংবা ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষের ফলে। ছবি: Agora Economics

এ তো গেল এক রহস্যের সমাধান। দূর নক্ষত্রের মিলনে স্বর্ণের জন্ম হয় ঠিক আছে, কিন্তু এভাবে জন্ম নেয়া স্বর্ণ পৃথিবী কিংবা অন্যান্য গ্রহে কীভাবে যায়? দুই সুপারনোভার যখন সংঘর্ষ ঘটে তখন সেখান থেকে প্রচুর নাক্ষত্রিক উপাদান বাইরের দিকে ছিটকে পড়ে। সেসব ছিটকে যাওয়া পদার্থের সাথে স্বর্ণও থাকে। আবার এই সংঘর্ষের পর সুপারনোভার বিস্ফোরণ হলে তার উপাদান চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেসবের মাঝে স্বর্ণও আছে। এভাবে বিস্ফোরণের টুকরো টুকরো হয়ে গেলেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে না। মূলত এর মাধ্যমে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা হয়।

এই ছিটকে যাওয়া অংশগুলো আবার মহাজাগতিক ধূলিমেঘের সাথে মিলে আরেকটি নতুন নক্ষত্র গঠনে কাজে লেগে যায়। নক্ষত্রের গঠন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্রের সাথে গ্রহও তৈরি হয়, যেমন হয়েছিল সূর্যের পাশাপাশি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো।

ঐ যে সুপারনোভা থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল স্বর্ণগুলো সেগুলো তখন গ্রহ গঠনের সময় গ্রহের ভেতরে ঢুকে যায়। পৃথিবীতে আমরা যত স্বর্ণ দেখি তার সবই আসলে এসেছে এই দীর্ঘ আন্তঃনাক্ষত্রিক ধাপ পার হয়ে। তাই আমরা যখন নিজেদের হাতে কোনো স্বর্ণ দেখে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবো তখন ভাবতে হবে, এই স্বর্ণ নিছকই কোনো ধাতু নয়। পৃথিবীর কোনো তাপ-চাপই এর কাছে কিছু নয়। কোটি কোটি বছর ধরে সুপারনোভার চাপ এবং সংঘর্ষের অকল্পনীয় ধাক্কা পার হয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছে এই স্বর্ণ।

স্বর্ণ শুধু মামুলী অলংকার জাতীয় পদার্থ নয়, এর মাঝে লুকিয়ে আছে নক্ষত্রের গান

স্বর্ণকে অনেকেই মূল্যবান পদার্থ হিসেবে দেখে, কারণ এটি খুব দুর্লভ। কোনো বস্তু দুর্লভ হলে তার মূল্য বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে স্বর্ণকে সম্পদ হিসেবে তো দেখতে পারে সকলেই, তারাই তো অনন্য যারা স্বর্ণের ভেতরে নাক্ষত্রিক ও মহাজাগতিক কাব্যিকতা খুঁজে পায়।

তথ্যসূত্র

  1. https://theatlantic.com/science/archive/2017/10/the-making-of-cosmic-bling/543030
  2. https://quantamagazine.org/did-neutron-stars-or-supernovas-forge-the-universes-supply-of-gold-20170323/
  3. https://journals.aps.org/prl/abstract/1103/PhysRevLett.119.161101
  4. https://cnbc.com/2017/10/16/scientists-discover-neutron-star-collisions-make-gold-other-elements.html

featured image: smithsonianmag.com

বিজ্ঞানী পরিচিতিঃ স্টিফেন হকিং

মাত্র ২১ বছর বয়সে শারীরিক অক্ষমতা ধরা পড়ে। সে সময় ডাক্তাররা তার আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ২ বছর। ত্রিশ বছর বয়সের আগেই তার নড়াচড়া করার ক্ষমতা অনেকাংশ রহিত হয়ে যায়। হয়ে পড়েন স্থবির। শেষ পর্যন্ত কেবল হাতের একটি আঙ্গুল নাড়ানোর ক্ষমতা ছাড়া সর্বতভাবে অচল হয়ে যান। সে অবস্থায় নিজের দৃঢ় মনোবল আর প্রত্যয় দিয়ে হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী, হয়ছেন একজন সর্বজন নন্দিত বক্তা। তার লেখা বই বিক্রি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। তিনি বিখ্যাত কসমোলজিস্ট স্টিফেন হকিং।

courtesy: bigganpotrika.com

featured image: sciencemag.org

ক্ষুদ্র কণায় বিপুল শক্তি

সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশও প্রবেশ করেছে পরমাণু যুগের ভেতর। ফলে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তথা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট এখন সারা দেশের আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে যারা পরিবেশ নিয়ে ভাবছেন কিংবা যারা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন তারা রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করছেন।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মূলত অন্য সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রক্রিয়া একই।[1] সবগুলোতেই ট্রান্সফরমার থাকে, জেনারেটর থাকে, টারবাইন থাকে। এদের কর্মপ্রক্রিয়াও প্রায় একই, ভিন্নতা শুধুমাত্র জ্বালানীতে।

জ্বালানী না বলে বলতে হবে শক্তির মূল উৎসতে। কোনো কোনোটিতে শক্তির উৎস হিসেবে পানির বিভব শক্তি[2] ব্যবহার করা হয়, কোনো কোনোটিতে শক্তির জন্য কয়লা কিংবা গ্যাস পুড়ানো হয় আবার কোনো কোনোটিতে অণু-পরমাণুর মাঝে লুকিয়ে থাকা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রক্রিয়া। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

পরমাণুর বিশেষ কৌশলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বলা হয়। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরমাণুকে ভেঙে সেখান থেকে শক্তি বের করে আনা হয়। প্রশ্ন হতে পারে পরমাণুকে ভাঙলে কেন শক্তি উৎপন্ন হবে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে উঁকি দিতে হবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতরে।

প্রকৃতিতে চার ধরনের মৌলিক বল আছে। মহাকর্ষ বল, তাড়িতচুম্বক বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল ও সবল নিউক্লীয় বল।  এদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো সবল নিউক্লীয় বল।[3] সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি কেমন বেশি তা একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাধারণত ধনাত্মক চার্জ আকর্ষণ করে ঋণাত্মক চার্জকে। ঋণাত্মক-ঋণাত্মক কিংবা ধনাত্মক-ধনাত্মক চার্জ কখনো একত্রে অবস্থান করে না।

কিন্তু পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সেখানে ধনাত্মক চার্জের প্রোটনগুলো একত্রে অবস্থান করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সবল নিউক্লীয় বলের উপস্থিতির ফলে। সবল নিউক্লীয় বলের শক্তি এতই বেশি যে প্রোটনের পারস্পরিক বিকর্ষণকেও কাটিয়ে দিয়ে জোর করে বসিয়ে রাখতে পারে।[4]

প্রবল শক্তি দিয়ে ধনাত্মক চার্জের পরস্পর বিকর্ষণকারী প্রোটনগুলোকেও একত্রে আটকে রাখতে পারে। ছবি: সায়েন্স ব্রেইন ওয়েভ

কিন্তু সবল নিউক্লীয় বলের বড় ধরনের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এটি খুবই অল্প দূরত্ব পর্যন্ত আকর্ষণ করতে পারে। এর আকর্ষণের পাল্লা খুবই কম।[5] এতই কম যে বড় আকারের পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রে রাখতে পারে না। বড় পরমাণুর বড় নিউক্লিয়াসে যদি কোনোভাবে আঘাত করা যায় তাহলে খুব সহজেই এদেরকে ভেঙে একাধিক টুকরো করে ফেলা যাবে।

একাধিক টুকরো হলে পরমাণুর আকৃতি কমে আসবে ফলে সেখানে সবল নিউক্লীয় বল দৃঢ়ভাবে প্রভাব রাখতে পারবে। বড় পরমাণুর বেলায় সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতাকে ভিত্তি করেই মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হয়।

যেহেতু এটি বিদ্যুৎ শক্তি বা তাপ শক্তি তাই শক্তি সম্পর্কিত কোনো না কোনো সূত্রের প্রয়োগ থাকবেই। শক্তি সম্পর্কে আইনস্টাইনের বিখ্যাত একটি সূত্র আছে। সূত্রটি খুবই সহজ, E=mc^2। সচরাচর আমরা দেখি বস্তু কখনো সৃষ্টিও হয় না ধ্বংসও হয় না। এক আকৃতি থেকে আরেক আকৃতিতে রূপান্তরিত করা যায় শুধু। চাল থেকে চালের গুড়ি করা যায়, গুড়ি থেকে রুটি তৈরি করা যায়, রুটি খাওয়া যায়, সে রুটির উপাদানগুলো দেহে মিশে একসময় ভিন্ন রূপে দেহ থেকে বের হয়ে যায়।

এক বস্তু থেকে আরেক বস্তু হচ্ছে কিন্তু ঘুরেফিরে মূল বস্তুর পরিমাণ একই থাকছে। নতুন কোনো বস্তু তৈরি হচ্ছে না কিংবা ধ্বংস হচ্ছে না। শক্তির বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তর করা যায় শুধু, নতুন করে তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যায় না। যেমন মোবাইলে কথা বলকে শব্দ শক্তি রূপান্তরিত হয় যান্ত্রিক শক্তিতে, যান্ত্রিক শক্তি আবার অন্য প্রান্তের মোবাইলে গিয়ে শব্দ শক্তিতে পরিণত হয়। যেভাবেই যাক, যতগুলো ধাপ পেরিয়ে যাক মূল শক্তির পরিমাণ একই থাকছে।

এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয় শক্তি। ছবি: স্মাগমাগ

কিন্তু আইনস্টাইনের সূত্র বলছে অন্য কথা। এ সূত্র অনুসারে নতুন করে বস্তু তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে। উল্টোভাবে নতুন করে শক্তিও তৈরি কিংবা ধ্বংস করা যাবে।  সূত্রে E হলো শক্তি আর m হলো ভর। যেহেতু ভর ও শক্তি একই সূত্রে আছে তারমানে কোনো না কোনো একদিক থেকে তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অনেকে ইতিমধ্যেই ধরে ফেলেছে আইনস্টাইনের সূত্র বলছে ভরকে (অর্থাৎ বস্তুকে) শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায় এবং উল্টোভাবে শক্তিকেও বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়।

সূত্রে আরো একটি অংশ বাকি রয়ে গেছে, । এখানে c হলো আলোর বেগ। এটি গুণক হিসেবে ভরের সাথে আছে। আলোর বেগ অবিশ্বাস্য পরিমাণ বেশি। প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রায়। যেহেতু আলোর বেগের মান বেশি এবং এটি এখানে গুণ হিসেবে আছে, তারমানে অল্প পরিমাণ বস্তুকে রূপান্তরিত করলে প্রচুর পরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সবল নিউক্লীয় বলের দুর্বলতার পাশাপাশি আইনস্টাইনের এই ভর-শক্তি সম্পর্কের সূত্রটিকেও ব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়াম মৌল ব্যবহার করা হয়। এ মৌলগুলোর আকার বড় হয়ে থাকে। বাইরে থেকে একটি নিউট্রন দিয়ে যদি এদের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে তাহলে নিউক্লিয়াসটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। বিভক্ত হয়ে দুটি মৌল তৈরি করবে। মৌলের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু নিউট্রনও তৈরি করবে।

নতুন দুটি মৌল এবং নতুন তৈরি হওয়া নিউট্রনের ভর একত্রে যোগ করলে মূল ইউরেনিয়াম কিংবা প্লুটোনিয়ামের ভরের সমান হবার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এখানে মূল ভর থেকে পরিবর্তিত ভর সামান্য কম থাকে। এই কম ভরটা হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া ভরটা আইনস্টাইনের সূত্রানুসারে শক্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।[6] এই শক্তিকে ব্যবহার করেই টারবাইন ঘোরানো হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

নিউট্রনের আঘাতে ভেঙে যায় ইউরেনিয়াম পরমাণু। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

তবে প্রক্রিয়াটিকে যত সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে এটি তত সহজ নয়। ছবিটির দিকে খেয়াল করুন। প্রথম একটি নিউট্রন দিয়ে আঘাত করার ফলে পরমাণু ভেঙে আরো কতগুলো নিউট্রন তৈরি হয়েছে। সে নিউট্রনগুলো আবার অন্যান্য পরমাণুকে আঘাত করবে এবং সেসব পরমাণু থেকেও নিউট্রন অবমুক্ত হবে।

সেই নিউট্রন আবার আরো মৌলকে আঘাত করবে। এভাবে একটি চেইন বিক্রিয়ার জন্ম নেবে। এর ভয়াবহতা সহজেই আচ করার কথা। কারণ এটি সমান্তর ধারায়[7] নয়, গুণোত্তর ধারায়[8] অগ্রসর হচ্ছে। এই ঘটনাটি গুণোত্তর ধারায় অগ্রসর হবার মানে হচ্ছে একসময় শক্তির তীব্রতায় তা প্রবল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলবে।

তবে এই চেইন বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমন কোনোকিছু যদি দিয়ে দেয়া যায় যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষণ করে নেবে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্যাডমিয়াম নামে একটি মৌল আছে। এরা নিউট্রন শোষণ করতে পারে। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটরের মাঝে ক্যাডমিয়ামের রড রেখে দিলে তারা অতিরিক্ত নিউট্রনকে শোষে নিতে পারে।[9]

ক্যাডমিয়ামের নিয়ন্ত্রক রড। ছবি: টকিং আইডেন্টিটি

এখানেও কিছু জ্যামিতিক হিসেব করা যায়। রডের পরিমাণ (ক্ষেত্রফল) যদি বাড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রিত হবে, ফলে বিদ্যুৎ কম উৎপন্ন হবে। আবার যদি ক্যাডমিয়াম রড কমিয়ে নেয়া হয় তাহলে চেইন রিঅ্যাকশন অধিক হারে হবে, ফলে বিদ্যুৎ বেশি উৎপন্ন হবে।

কিন্তু কেউ যদি বেশি শক্তি উৎপাদনের জন্য কমাতে কমাতে বেশি কমিয়ে ফেলে কিংবা সম্পূর্ণই সরিয়ে ফেলে তাহলে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। রাশিয়ার চেরনোবিল দুর্ঘটনা মূলত নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণেই ঘটেছিল। এধরনের দুর্ঘটনায় এতই তাপ উৎপন্ন হতে পারে যে মুহূর্তের মাঝেই চুল্লিটিকে গলিয়ে ফেলতে পারবে।[10]

একটি বড় মৌলকে ভেঙে দুটি ছোট মৌল তৈরি করার এই ঘটনাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন। পদার্থবিজ্ঞানে খুব গুরুত্বের সাথে নিউক্লিয়ার ফিশন আলোচনা করা হয়। এরকম আরো একটি ঘটনা আছে। দুটি ছোট মৌল একত্র হয়ে বড় একটি তৈরি করা।

একাধিক মৌল মিলে একটি মৌল তৈরি করার ঘটনাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন। এতেও প্রচুর শক্তি উৎপন্ন হয়। এর জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছে আমাদের সূর্য। সূর্য থেকে যত ধরনের শক্তি পাই তার সবই তৈরি হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে। কোনো তেল নয়, কোনো কাঠ নয়, কোনো গ্যাস নয় শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যের বুকে তৈরি হচ্ছে অকল্পনীয় শক্তি।

২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ভয়ানক ক্ষমতার বোমা বানানোর জন্য পরমাণু প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে মানবকল্যাণে ব্যবহার করার চিন্তা ভাবনা করা হয়। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে দ্য এক্সপেরিমেন্টাল ব্রিডার রিঅ্যাকটর ১ থেকে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পরবর্তীতে এই ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যায়।

বর্তমানে অনেকগুলো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। পৃথিবীর সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার ১৬ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে।[11] কোনো কোনো দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই বেশি। যেমন ফ্রান্সে বিদ্যুতের সামগ্রিক চাহিদার ৭৭ শতাংশ আসে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত থেকে।[12]

অনেক দেরীতে হলেও বাংলাদেশ রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছে। এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মত আছে। পক্ষের মত বিপক্ষের মত উভয়েরই প্রয়োজন আছে। আমরাও চেষ্টা করবো পরমাণু বিদ্যুৎ ও রূপপুর প্রকল্প সম্বন্ধে আরো আলোচনা করতে।

তথ্য সূত্রঃ 

[1] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[2] বিভব শক্তিকে বলা যেতে পারে সঞ্চিত শক্তি। বাসার ছাদের উপর যদি এক টাংকি পানি থাকে তাহলে ভূমির সাপেক্ষে পানিতে অনেকগুলো শক্তি সঞ্চিত আছে। একইভাবে সমস্ত পৃথিবী থেকে সূর্যের তাপের মাধ্যমে পানির কণাগুলো বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে। তারপর পানিচক্রের মাধ্যমে নদীতে আসে। নদীতে যদি বাধ দিয়ে একপাশের পানি আটকে দেয়া যায় তাহলে একপাশে পানির স্তর উপরে উঠে যাবে এবং অপর পাশে পানির স্তর নীচে নেমে যাবে। তাহলে নীচের অংশের সাপেক্ষে উপরের অংশে শক্তি সঞ্চিত আছে। উপরের পানিকে একটি টানেল দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে পড়তে দিয়ে তাকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একেই বলে বিভব শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

[3] Fundamental Forces, http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/Forces/funfor.html

[4] https://education.jlab.org/qa/atomicstructure_04.html

[5] http://aether.lbl.gov/elements/stellar/strong/strong.html

[6] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[7] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৩, ৩-এর পর ৪, ৪-এর পর ৫, এভাবে যোগের মতো কোনো ধারা চলমান থাকলে তাকে বলে সমান্তর ধারা।

[8] ১-এর পর ২, ২-এর পর ৪, ৪-এর পর ৮, ৮-এর পর ১৬, ১৬-এর পর ৩২ এভাবে কোনো ধারা গুণ বা সূচকের মতো চলমান থাকলে তাকে বলে গুণোত্তর ধারা।

[9] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[10] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

[11] পারমাণবিক বিদ্যুৎ সমস্যা: রূপপুর প্রকল্প ও বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র

[12] আরো একটুখানি বিজ্ঞান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাকলী প্রকাশনী, ২০১১

featured image: oilprice.com

সময়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?
কাল অথবা সময় যে নামেই ডাকা হোক না কেন, চলছে যেন চলছেই।
ঘড়ির কাঁটা আমাদেরকে বলে দেয় বর্তমান সময় কত। কিন্তু, ঘড়ির কাঁটা বলে না সময় নিজে বিষয়টা কী?

সময় হচ্ছে ঈশ্বর

হিন্দুদের সময় সংস্কৃতে কাল বলা হয়। এটা ঈশ্বরের একটা অংশ। এটা শুরু হয় যখন ঈশ্বর সকল কিছুকে চালু করে এবং শেষ হয় যখন তিনি এটা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং এটাই হচ্ছে অচল হবার সময়। ঈশ্বর সময়ের বাহিরে। সময় চিরন্তর এবং সকল সময় চলছে, কিন্তু তিনি এটার মধ্যে থাকেন না। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যত তার ভিতরেই আছে।

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আইনস্টাইন যুগের আগ পর্যন্ত, মানুষ সময়কে সদা চলমান একটি রাশি হিসেবেই দেখেছে।যার হয়তোবা শুরু অথবা শেষ নেই।
আগেকার যুগের দার্শনিক চিন্তা এরকমই, সময় কখনো থামে না। প্রাচীনকালের লোকেরাও সময়কে পরিমাপ করত। তাদের পরিমাপ পদ্ধতি অবশ্য ভিন্ন ছিল। যেমন- তারা বালু ঘড়ি ব্যবহার করত।

বালু ঘড়ি

শুরু হোক বিজ্ঞান- 

সময়ের সৃষ্টি-
মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে। একটি Big Bang বা ‘মহাবিস্ফুরণের’ কারণে মহাশূণ্যের জন্ম হয়েছে। তারপর থেকে সেটা একটি বেলুনের মত অবিরাম বিস্তৃত হচ্ছে। মহাবিস্ফোরণ আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু, মহাস্ফোরণের সাথে সময় সম্পর্কিত।
কীভাবে?

মহাবিস্ফোরণ থেকে সৃষ্টি হল পদার্থ, প্রতি পদার্থের আরো সৃষ্টি হল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়- সময়!
সময় 1 x 10-43 সেকেন্ড, একদম শুরুর কথা-
এটাই পরম শুরুর সময়, যে সময় পর্যন্ত বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান যেতে পেরেছে।এর আগের মূহুর্তে কী হয়েছে তা আমরা জানি না।

মহাবিস্ফোরণের আগে কোনো সময় ছিল না, থাকতে পারে না।

নিউটনীয় যুগ- 

রেনেসাঁ যুগে এলেন গ্যালিলিও, এর পরে স্যার আইজ্যাক নিউটন। সময়ের বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যা দাড় করালেন।
একটি মতানুসারে সময় মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামোর একটি অংশ যেটি একটি বিশেষ মাত্রা এবং যেখানে ভৌত ঘটনাসমূহ একটি ক্রমধারায় ঘটে। যেমন- আপনি এই লিখাটি পড়ছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের আপনার পড়ার ঘটনাটি ঘটছে।

এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি যা স্যার আইজ্যাক নিউটনের তত্ত্বসম্মত। এই মতানুসারে সময় একটি ভৌত রাশি, যা পরিমাপযোগ্য।

আমদের ত্রিমাত্রিক শরীর আর আমাদের মহাবিশ্ব চতুর্মাত্রিক।সকল ত্রিমাত্রিক বস্তু চলেছি কালের মধ্য দিয়ে।মাত্রাগুলো এতটাই আন্তঃসম্পর্কিত যে এরা প্রকৃতিতে বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করেনা,মিলেমিশে থাকে একটা সত্তা হিসেবে। আর একেই বলে স্পেস-টাইম। সাধারনভাবে একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়।

ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা (Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica) থেকে-

Absolute, True, and mathematical Time
in and of itself and of its own nature without reference to anything external
flows uniformly
-Sir Isaac Newton 

এরপর কী?
আসলেন মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein)
তিনি বলেছেন-
“The distinction between the past, present and future is only a stubbornly persistent illusion.
অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে শুধুমাত্র একটি ক্রমাগত একগুঁয়েমি বিভ্রম” 

সময় আসলেই কি বিভ্রম?
পদার্থবিজ্ঞানে ঘোর নিয়ে এলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিয়ে এলেন স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি অথবা অপেক্ষবাদ তত্ত্ব। মাথা ঘুরিয়ে ফেললেন, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরাও বুঝতে পারছেন না থিওরি অব রিলেটিভিটিকে!

চিরায়ত বলবিদ্যা অনুযায়ী স্থান,কাল এবং ভরকে পরম বলে ধরা হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন সর্বপ্রথম দাবী করেন যে পরমস্থান, পরমকাল এবং পরমভর বলতে কিছুই নেই। স্থান,কাল এবং ভর তিনটিকেই আপেক্ষিক ধরে তিনি তার বিখ্যাত আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রস্তাব করেন।

সমবেগে চলমান সকল পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলী অভিন্ন (আপেক্ষিকতাবাদের মূলনীতি)।
তাহলে কি বেগ ভিন্ন হয়ে গেলে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলীও ভিন্ন হয়ে যাবে?

হ্যাঁ মশাই!
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিষ্ঠিত হল আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এর ফলে এমন একটা অবস্থা, সবকিছুই যেন উলটপালট হয়ে যায়।

তিনটি বিষয় সামনে চলে এলো।
১)সময় প্রসারণ- একজন চলন্ত পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ি, স্থীর পর্যবেক্ষকেরের ঘড়ির চেয়ে ধীরেধীরে টিক্ পরিমাপ করে।
২)দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন- বস্তুর গতির দিকে তার দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে বলে পর্যবেক্ষকের কাছে পরিমিত হয়।
৩)ভর-শক্তির সাম্যতা- E = mc2 (শক্তির পরিমাণ = বস্তুর ভর × আলোর বেগের বর্গ), শক্তি এবং ভর সমতুল্য এবং পারস্পরিক পরিবতনযোগ্য।
অকি!

আমাদের আলোচনার বিষয় ১ নম্বর- সময় প্রসারণ। সময় ক্যামনে প্রসারিত হয়?
ভাউ প্রসারিত হয়।
আপনাকে যদি আলোর বেগে ( সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিঃমিঃ) ছোড়া হয় তাহলে আপনি শক্তিতে পরিণত হবেন, বেঁচে থাকলে অতীত ভবিষ্যৎ সব দেখতে পারবেন!
অকি! ফাজলামো করেন মিয়া? না ভাউ, সত্য কথা।

১৯৭১ সাল- বিজ্ঞানীরা এটমিক ঘড়িকে বিমানে করে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পাঠালেন। ঘড়ি পাঠানোর আগে পৃথিবীর স্থির একটি ঘড়ির সাথে সময় মিলিয়ে নেয়া হল। যা প্রায় এটোসেকেন্ড ১০−১৮ এস (10−18 s) ক্ষুদ্রতম সময় পরিমাপ করতে পারে।

পৃথিবী ঘুরে বিমানটি ফিরে আসার পর, পুনরায় সময় মিলিয়ে নেয়া হল। দেখা গেল সময়ের পার্থক্য। পৃথিবীতে সময় বেশি অতিবাহিত হয়েছে, যদিও তা খুবই কম। কিন্তু, পরীক্ষিত হল সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব।

তাহলে আমরা বুঝলাম তাত্ত্বিকভাবে সময় ভ্রমণ (Time Travel) সম্ভব। শুধু সম্ভব না, আমরা আসলে এখনো সময় ভ্রমণ করতেছি।

কীভাবে?
আমরা সৌরজগতের পৃথিবী নামক গ্রহে বাস করি। সূর্য নিজে একটা নক্ষত্র। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে।আবার এরকম ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে আকাশগঙ্গা(milky way) ছায়াপথ। এর মাঝখানে আছে একটা বিশাল ভরের ব্লাকহোল, যাকে কেন্দ্র করে সূর্য ঘুরে।

এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ নিয়ে নিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব।তাহলে সমস্যা কী?
সমস্যা এই ছায়াপথ গুলোকে নিয়ে। সাধারণত প্রত্যেকটি ছায়াপথের মাঝখানেই একটা মেসিভ ব্লাক হোল থাকে। সেই ব্লাকহোলকে কেন্দ্র করেই ছায়াপথের সবকিছুই ঘুরতে থাকে।

এই ব্লাক হোল সব নক্ষত্রকে নিজের দিকে টানতে থাকে। সজোরে টান মারে- সূর্যের টানে পৃথিবী ঘুরে, আকাশগঙ্গা ছায়পথের টানে সূর্য ঘুরে। সৃষ্টি হয় বিশাল টানাটানি যজ্ঞ। আর এর ফলেই সৃষ্টি হয় সুন্দর জিনিস- সময়!

আবার বিভিন্ন ছায়াপথের টানাটানির ধরণ বিভিন্ন, কমবেশি হইতে পারে। তাই সময়ও বিভিন্ন! আপনি যে সময় নিয়ে এই লিখটি পড়ছেন- আমাদের ছায়াপথের বাইরে, বহুদূরের কোনো গ্রহে হয়তোবা এই সময়ে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছে। আবার আমাদের গ্রহের শতবর্ষ হয়তোবা অন্য কোনো গ্রহের কয়েক মিনিট মাত্র!

আরো বুঝার জন্য- Interstellar নামের একটা মুভি আছে, না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন।

Once confined to fantasy and science fiction, time travel is now simply an engineering problem.
MICHIO KAKU, Wired Magazine, August 2003

এইটা কি কইল মিচিও কাকু? সময় ভ্রমণ শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্যা। আসেলেই তাই।

কিন্তু, আরো কিছু সমস্যা আছে। আলোর গতি অর্জন করার জন্য আমরা যদি কোনো যান বানিয়ে ফেলি, তারপরেও সমস্যা মিটবে না। তখন সমস্যা করবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।”

তাই উড্ডয়নের সময় মানুষের তৈরি সময় যান পৃথিবীকে এমন ধাক্কা দিবে, যার ফলে পৃথিবী তার কক্ষচ্যুত হবে।

তাহলে তো আর হচ্ছে না। আরো একটা নিরাশার কথা শুনাই-

তবু আমরা আশা রাখি। জানি সময় চলে যায়, আমিও চলে যাব। তাই শেষ করি-

আমার যাবার সময় হল, আমায় কেন রাখিস ধরে। চোখের জলের বাঁধন দিয়ে বাঁধিস নে আর মায়াডোরে॥ ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি, ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি–. নাম ধরে আর ডাকিস নে ভাই, যেতে হবে ত্বরা করে।
-রবি ঠাকুর।

তথ্যসূত্র-
1.http://www.physicsoftheuniverse.com/topics_bigbang_timeline.html
2.Wikipedia
3.http://www.notablequotes.com/t/time_travel_quotes.html#m6L7OzqUT7AX4iCT.99

featured image: mks-onlain.ru

ছায়াপথে/পৃথিবীতে থাকা স্বর্ণের রহস্যময় উৎস কোথায়?

ইতিহাস আর লোককথা ঘাঁটলে দেখা যায় যে পৃথিবীতে মজুদ থাকা স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে আরো বেশি পরিমাণে স্বর্ণ পাওয়া যায় এই চিন্তা বিভিন্ন সময়ে অনেক সুন্দর এবং চমকপ্রদ ব্যাখ্যার উদ্ভব ঘটিয়েছে। ইনকারা বিশ্বাস করতো সূর্য দেবতা ইনতি’র অশ্রু কিংবা ঘামের ফোঁটা আকাশ থেকে স্বর্ণ হিসেবে ঝরে পড়তো।

অ্যারিস্টটল মনে করতেন ভূপৃষ্ঠের গভীরে থাকা পানিতে কোনোভাবে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ করলে তা সোনাতে পরিণত হতো। আইজ্যাক নিউটন পরশপাথর দিয়ে সোনা তৈরির রেসিপিই দিয়েছিলেন।আর রূপকথার রাম্পেলস্টিল্টস্কিন তো চরকি দিয়ে খড়কে সোনায় রূপান্তরিত করতে পারতো।

আধুনিক জ্যোতির্পদার্থবিদদের অবশ্য এ নিয়ে নিজেদের একটা ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো আজ থেকে চার বিলিয়ন বছর আগে যখন পৃথিবী জায়মান ছিল অর্থাৎ উৎপত্তির শুরুর পর্যায়ে ছিল তখন উল্কাপিন্ডের ছিটেফোঁটা এসে ভূপৃষ্ঠে গেঁথে গিয়েছিল।এসব উল্কাপিন্ডে অন্যসব উপাদানের সাথে সোনাও ছিল।কিন্তু আসল প্রশ্নটা এখনো থেকেই যায়ঃ মহাবিশ্বের কোথায় কীভাবে এই স্বর্ণের উৎপত্তি হলো?

কয়েক দশক ধরে ভাবা হতো যে সুপারনোভা বিস্ফোরণের কারণে স্বর্ণসহ পর্যায় সারণির নিচের সারির ডজনখানেক ভারী মৌলের সৃষ্টি হয়েছে।কিন্তু বর্তমানে সুপারনোভার কম্পিউটার মডেল আরো উন্নততর হয়েছে এবং সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে,সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় সোনা তৈরি হওয়া আর আলকেমিস্টদের পরশপাথরের ছোঁয়ায় সোনা বানানোর উপকথার মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই।

বেশ কয়েক বছর হলো একটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বেশিরভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন, দুটি নিউট্রন তারার স্থান-প্রকম্পন সমবায়ের সময় এসব ভারী ধাতু উৎপন্ন হয়।অন্যরা এর বিরোধিতা করেন।তাদের মতে সুপারনোভা বিস্ফোরণেই যদি ব্যাপারটা না ঘটে থাকে তাহলে ভিন্ন কোনো কারণের দ্বারস্থ হতে হবে।

এই বিতর্ক নিরসনের জন্য জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীগণ অপরাসায়নিক(অ্যালকেমি) প্রক্রিয়ার কম্পিউটার বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে গামা রশ্মি টেলিস্কোপ, গভীর সমুদ্রতলের ম্যাঙ্গানিজ ভূত্বক ইত্যাদিতে সূত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপারটির একটা সুরাহা করার জন্য তাদের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা চলছে যা মহাবিশ্বের অনেক জটিল একটি রহস্যের সমাধানের পথে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

১৯৫৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানী মার্গারেট ও জিওফ্রে বারবিডজ,উইলিয়াম ফাওলার এবং ফ্রেড হোয়েল নক্ষত্রের জীবন ও মৃত্যু কীভাবে পর্যায় সারণির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং এর সবগুলো স্থান পূরণ করতে পারে তার একটা কৌশল উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয় আমাদের দেহ কিংবা দেহ যেসব উপাদান দিয়ে গঠিত সেসব কোনো একসময় স্টারডাস্ট বা তারকা ধূলো ছিল। তার মানে স্বর্ণও তাই ছিল।

বিগ ব্যাং এর পরে হাইড্রোজেন,হিলিয়াম আর লিথিয়াম পড়ে থাকে।তারারা তারপরে এসব উপাদানকে একীভূত করে ভারী উপাদান তৈরি করে।কিন্তু এই প্রক্রিয়া লোহাতে এসে থেমে যায় কেননা লোহাই সবচেয়ে স্থিতিশীল মৌল। এরচে বড় নিউক্লিয়নে ধনাত্মক চার্জ এতো বেশি থাকে যে এদের একসাথে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো নির্ভরযোগ্যভাবে ভারী কণা বানাতে লোহার নিউক্লিয়াসের সাথে চার্জমুক্ত নিউট্রনের উচ্চ গতিতে সংঘর্ষ ঘটাতে হয়। এতে করে নিউট্রন ক্ষয় হয়ে প্রোটনে পরিণত হয়( একটা ইলেকট্রন আর একটা অ্যান্টিনিউট্রিনো বের হয়ে যায়)।প্রোটনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি নতুন ভারী মৌল তৈরি হয়। নিউক্লিয়াসে অতিরিক্ত নিউট্রন এদের ক্ষয় হবার তুলনায় ধীরে ধীরে নিক্ষিপ্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয়, ধীর নিউট্রিন ক্যাপচার বা s প্রক্রিয়া।

এভাবে স্ট্রনশিয়াম, বেরিয়াম আর দস্তার মতো ধাতু উৎপন্ন হয়।কিন্তু যখন নিউট্রন ক্ষয় হবার চেয়ে দ্রুত গতিতে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তাকে দ্রুত নিউট্রন ক্যাপচার বা r প্রক্রিয়া বলা হয়। আর এ প্রক্রিয়াতেই ইউরেনিয়াম আর স্বর্ণের মতো ভারী উপাদান তৈরি হয়।বারবিডজ ও তার সহকর্মীরা এ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য কিছু জিনিসের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এজন্য আপনার দরকার হবে,অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ ভেজালহীন উৎস থেকে পাওয়া নিউট্রন।সাথে লাগবে ভারী নিউক্লিয়াস যা এসকল নিউট্রনকে বন্দী করবে।

এরপর এদেরকে একটি উত্তপ্ত ঘন মাধ্যমে একত্রিত করতে হবে।আপনি চাইবেন এ প্রক্রিয়াটি একটি বিস্ফোরক ঘটনার মধ্যে হোক যাতে উৎপন্ন উপাদান মহাকাশের বাইরে ছড়িয়ে যেতে পারে। অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন এসকল শর্ত শুধুমাত্র একটি বস্তুতেই সংশ্লেষিত হতে পারেঃ সুপারনোভা।

কোন বিশালকার তারকা তার মধ্যে থাকা অন্তর্বস্তুকে যদি পর্যায়ক্রমে একীভূত করে ভারী কোনো উপাদানে রূপান্তরিত করতে পারে বিশেষ করে লোহা পর্যন্ত তাহলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটবে।এরপর একসময় ফিউশন থেমে যায় আর তারকার ভিতরগত পরিবেশের অবনমন ঘটে।সূর্যের সমান ভর মাত্র দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

অন্তর্বস্তু যখন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সমান ঘনত্বে পৌঁছে যায় তখন এটি দৃঢ়তা বজায় রাখে।তারপর শক্তি বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে আর সংঘটিত হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ যা বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূর থেকেও দৃশ্যমান। তারকার পতনের সময় ইলেকট্রন ও প্রোটন একত্রিত হতে বাধ্য হয়,নিউট্রন তৈরি হয় এবং এর কোর/অন্তর্বস্তু পরিণত হয় শিশু নিউট্রন তারকায়। এতে আয়রন প্রচুর থাকে।আর সহস্যাব্দ বছর ধরে উৎপাদিত উপাদানগুলো মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।

১৯৯০ এর দশকের দিকে কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ছবি পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় একটি বৃহদায়তন তারকা ভেঙ্গে যাবার অর্ধ সেকেন্ড পর এর নিউট্রন বাষ্পের বেগে বের হয়ে আসে যা প্রায় এক মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। এতে আয়রনের নিউট্রন থাকতে পারে যা r প্রক্রিয়ায় ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু সুপারনোভা মডেলকে আগের তুলনায় আরো বাস্তবধর্মী করার পর পরিস্থিতির মোড় ভিন্ন দিকে চলে যায়।

এতে নিউট্রিনো চালিত বাতাসে তাপমাত্রা যথেষ্ট বেশি পাওয়া যায়নি।বাতাসের বেগও খুব ধীর হয় যা প্রচুর পরিমাণে নিউক্লেই তৈরি করে কিন্তু এসকল নিউক্লেই ভারী উপাদান যেমন ইউরেনিয়াম তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত নিউট্রন পায়না।এক্ষত্রে নিউট্রিনো নিউট্রনকে পুনরায় প্রোটনে পরিণত করে ফেলতে পারে যার কারণেও নিউট্রনের সংকট দেখা দিবে।

এই ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের সুপারনোভা মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দিকে নজর দিতে বাধ্য করে যেঃ সুপারনোভা থেকে নিউট্রন তারকা সৃষ্টি হয় যা এই প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য অংশ।

১৯৭৪ সালে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথম বাইনারি নিউট্রিন তারকা পদ্ধতি আবিষ্কার করে।এতে প্রতি কক্ষপথের সাথে সাথে দুটি নিউট্রন তারকার শক্তি লোপ পেতে থাকে এবং একটা সময় এরা সংঘর্ষে লিপ্ত হবে।একই বছরে বিজ্ঞানী জেমস ল্যাটিমার ও ডেভিড স্ক্যাম দেখান যে, এই পরিস্থিতিতে দুটি নিউট্রন তারকার মধ্যে সংঘর্ষ হবে কিনা তা গণনা করা না গেলেও একটি নিউট্রন তারকা এবং ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায় ঘটবে।

যদিও সুপারনোভা বিস্ফোরণ মহাকাশের অনেক জায়গা থেকে দৃষ্টিগোচর হয় কিন্তু নিউট্রিন তারকার বেলায় তেমনটি ঘটেনা।যে সুপারনোভা ক্র্যাব নেবুলা তৈরি করেছিল তা ১০৫০ সালে অনেক স্থান দেখে পর্যবেক্ষিত হয়েছিল।কিন্তুএটি যে নিউট্রন তারকা রেখে গিয়েছিল তা ১৯৬৮ সালের আগে আমাদের দৃষ্টিসীমায় আসেনি। দুটি নিউট্রন তারকার সমবায় খুব সহজে দেখা যায়না বা বুঝাও যায়না।তবু এটা r প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণ কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণ দুটোই প্রক্রিয়া তৈরিতে সক্ষম।কিন্তু এর মধ্যে একটা বিশাল ফারাক থেকে যায়। সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে বড়জোর চাঁদের উপযোগী স্বর্ণ উৎপাদিত হতে পারে যেখানে নিউট্রন তারকা অধিগ্রহণের ফলে উৎপাদিত স্বর্ণ বৃহস্পতি গ্রহের সমান ভরের কোনো গ্রহের উপযোগী যা সুপারনোভার চেয়ে দশ গুণ বেশি। একারণেই বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি r প্রক্রিয়ার উপাদানগুলোর বন্টনের উপর যাতে করে এদের উৎস সম্পর্কে আরো সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এর ফলে উৎপাদিত যে উপজাত থেক যায় তার সন্ধান চালানো হয়।গভীর সমুদ্রের তলদেশে তেজক্রিয় আয়রন-৬০ পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে।যদিও এটা r প্রক্রিয়ার কোনো উপাদান নয়;তবে অন্য একটি অস্থিতিশীল r উপাদান প্লুটোনয়াম-২৪৪ খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া গেছে।

তবে অন্য একটি পরিষ্কার উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।অনেক বামন ছায়াপথ স্থিতিশীল হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবার আগে একবার ছোটখাটো বিস্ফোরণ অভিজ্ঞতা লাভ করে যা এই প্রক্রিয়া ঘটার একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা রেখে যায়।২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত কোনো বামন ছায়াপথে অবশ্য উপাদান সমৃদ্ধ কোনো গ্রহের দেখা পাওয়া যায়নি। এমআইটি’র স্নাতক ছাত্র অ্যালেক্স জি রেটিকুলাম-২ নামক একটি বামন ছায়াপথে r প্রক্রিয়ার উপাদান রয়েছে এমন সাতটি গ্রহ খুঁজে পান।

নিউট্রন তারকা সমবায় মডেলের সমর্থনকারীদের মতে এই মডেল বেশ ফিটফাট যদিও নিউট্রিন তারকা সংযুক্তি বেশ বিরল।আমাদের ছায়াপথে এ ধরনের সমবায় প্রতি একশো মিলিয়ন বছরে একবার বা দশ হাজার বছরে একবার ঘটে থাকে।

image source: uk.businessinsider.com

তবে একটি নিউট্রন তারকা ও ব্ল্যাকহোলের মধ্যে সমবায়ের ফলে কি হয় তা জানা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে LIGO(the Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) কাজ করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞানের কাজ কখনোই শেষ হয়ে যায়না।একের পর এক নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বকে আরো সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে জানার জন্য বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা থেমে নেই।পৃথিবীর স্বর্ণের উৎস কোথায় এবং কীভাবে তা এলো তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবেনা।কিংবা তা জানা হয়ে গেলেও আরো নতুন কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া থেমে থাকবেনা।

আমাদের কাজ শুধু চোখ কান খোলা রাখা আর কৌতুহলী মনকে সজাগ রাখা।হয়তো একদিন আমরাও বিজ্ঞানীদের কাতারে সামিল হয়ে এইসব গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নিয়োজিত করতে পারবো।

তথ্যসূত্রঃ

১।https://www.quantamagazine.org/20170323-where-did-gold-come-from-neutron-stars-or-supernovas/

২।https://www.washingtonpost.com/national/health-science/origin-of-gold-found-in-rare-neutron-star-collision

featured image: smithsonianmag.com

চুম্বকের ভেতরের কথা

গল্পটা শুরু করা যাক। ছোটবেলায় সবচেয়ে পছন্দের খেলনা ছিল চুম্বক। কোথা থেকে কি ভেঙ্গে একবার কীভাবে যেন একটা চুম্বক পেলাম। আমার নির্মমতায় তা কয়েকখণ্ড হয়ে গেল। খণ্ডগুলো দেখলাম দুষ্ট ছেলেপিলের মত একটা আরেকটাকে লাথি মারে, কখনও আবার কী ভাব তাদের! দূর থেকে দেখলেই ছুটে যায়, ধরে রাখা যায়না হাতে।

বুঝলামনা মাথামুণ্ডু কিছুই, তাড়িয়ে দেয় কীভাবে, কাছেই বা টানে কীভাবে! যেদিককে যে দিক লাথি মারে তারা আবার কখনোই নিজেদের টানেনা কাছে! পড়লাম মহা মুশকিলে।বইপত্র ঘেঁটে দেখি রাবার ব্যান্ডের মত চৌম্বকবলরেখা না কী সব যেন আঁকা, সব বস্তুর নাকি ও রেখা উৎপন্ন করার সাধ্য নেই! যাইহোক, ব্যাপারটার তল খতিয়ে দেখার স্পৃহা থেকে যতটুকু সম্ভব গভীরে গেলাম।

যে যুগে পদার্থের ভেতরের পারমাণবিক বা আণবিক বৈশিষ্ট্য জানার কোনো সুযোগ ছিলনা, বিজ্ঞানীরা তখনও মানতেন যে চুম্বক এবং চৌম্বকপদার্থ যে খেল দেখাচ্ছে তার সাথে তড়িতের কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে। চৌম্বকবলরেখা সম্পর্কে সবচেয়ে পরিচিত ছবিটির ব্যাখ্যা দেয়া যাক।

একটি দণ্ড চুম্বক। এর উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু নামক দুটি মেরু রয়েছে। সর্বজনস্বীকৃত বিধান অনুযায়ী বলবো উত্তর মেরু থেকে চৌম্বকবলরেখা নামক কিছু রেখা বেরিয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করছে। তড়িতের ক্ষেত্রে যেমন সর্বদা ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত থেকে ঋণাত্মক প্রান্তের দিকে প্রবাহের দিক ধরা হয় তেমনই একটি ব্যাপার।

এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথমত এই রেখাগুলো হচ্ছে বলরেখা বা শক্তিরেখা অর্থাৎ কোনো এক প্রকার শক্তির সূচনা হচ্ছে একটি প্রান্তে এবং সমাপ্তি অপর প্রান্তে। দ্বিতীয়ত, শক্তিরেখাগুলো এলোমেলোভাবে না ছড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করছে। কিন্তু গতিপথের চেহারা ঠিক এরূপই কেন? উত্তর দেবার আগে একটু পরমাণু জগতে ঢুঁ মারি।

বেশ, একটি ইলেকট্রন এবং একটি প্রোটন এরুপ দূরত্বে থাকলে একে অপরকে আকর্ষণ করবে, এবার চুম্বকের পোলের দিকে খেয়াল করিঃ-

একটি উত্তর মেরু এবং একটি দক্ষিণ মেরু এর মধ্যে ঠিক একই রূপ আকর্ষণ বিদ্যমান। এখনঃ-

চার্জ দুটির আশেপাশে কোথাও একটি ধনাত্মক আধান রেখে আমরা তার ওপর চার্জ দুটির প্রভাব যদি খেয়াল করি তবে দেখব ধনাত্মক আধানটি প্রোটনের বিকর্ষণ বলের দিক এবং ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল,দুই বলের লব্ধি বলের দিকে ভ্রমন করছে।

এখন একটি শক্তিশালী দণ্ড চুম্বকের পাশে আমরা যদি বিভিন্ন অবস্থানে একটি চুম্বক শলাকাকে স্থাপন করি তবে স্বাভাবিকভাবেই শলাকা এবং চুম্বকের সম পোলগুলোর মধ্যে আকর্ষণ এবং বিপরীত পোলগুলোর মধ্যে বিকর্ষণের ফলে লব্ধি বলের দিকে শলাকা অবস্থান নেবে। এখন শলাকার যে কোনো একটি পোলের অবস্থানের গতিপথ যদি আমরা যোগ করে দিই তবে সেই আকাঙ্ক্ষিত বলরেখার পথটিই পাবো।

ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হবে যদি আমরা বলরেখা বা magnetic line of flux বা magnetic line of force এর তাত্ত্বিক সংজ্ঞাটি খেয়াল করিঃ-

“যখন একটি বিচ্ছিন্ন একক চুম্বক মেরু(হয় উত্তর অথবা দক্ষিণ) একটি চুম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয়, এটি আকর্ষণ এবং বিকর্ষণ উভয় বল অনুভব করে, বিপরীত এবং সমমেরুর প্রভাবে, দুটি বলের লব্ধি বলের কারণে মেরুটি একটি পথে ভ্রমন করবে, সেই পথের নামই চৌম্বকবলরেখা। এরকম অসংখ্য পথকে সম্মিলিতভাবে magnetic flux বলা যায়।”

এই সংজ্ঞার মধ্যে একটু ঘাপলা আছে যা পরে ব্যাখ্যা করছি।

আমরা যদি উপরের ছবির প্রতিটা অবস্থানে একক মেরুটি বসিয়ে তার গতিপথ গাণিতিকভাবে নির্ণয় করতাম তবে ছোট ছোট যেই অভিক্ষেপগুলো পেতাম তার যোগফল হল একটি রেখা। তাই বলা যায় মেরুটি রেখা বরাবর যাত্রা করেনা বরং তার যাত্রাপথের ওপর লক্ষ করেই রেখাটি আঁকা হয়েছে।

এই বলরেখাগুলোর কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ-

(১)বলরেখার দিক ধরা হয় উত্তর মেরু থেকে দক্ষিনের দিকে।

(২)বলরেখাগুলো একে অপরকে ছেদ করেনা।

(৩)বলরেখাগুলো বদ্ধ লুপ বা প্যাঁচ তৈরি করে। ইলেকট্রন-প্রোটনের সাথে তুলনা বা analogy দেয়ার সময় আমরা একটি একক মেরুর সাথে একক চার্জের মিল পেলেও চার্জ এবং পোলের মধ্যে যেই সুস্পষ্ট পার্থক্যটি রয়েছে তা হল একক অস্তিত্ব। একক চার্জ খুবই সাধারণ একটি বিষয় হলেও বাস্তবজগতে একক মেরু বলে কিছু নেই, এটি একটি গাণিতিক ধারণামাত্র। ফলস্বরূপ একটি একক চার্জের চারিদিকে তার যে শক্তিরেখা তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।যেমনঃ-

কিন্তু একক মেরু বলতে যেহেতু কিছুর অস্তিত্বই নেই তাই চুম্বকের শক্তিরেখা আবদ্ধ। প্রশ্ন হতে পারে চুম্বককে দুভাগ করলেই তো হয়? তখন যা হয়ঃ-

অর্থাৎ ভগ্ন অংশ নিজেই আরেকটি স্বকীয় চুম্বকে পরিণত হয়। তখন এক মেরু থেকে যেই শক্তিরেখা বের হয় তা চারিদিকে না ছড়িয়ে বিপরীত মেরুর দিকে আকৃষ্ট হয়। একারণে চৌম্বকবলরেখা বদ্ধ হয়।

(৪) বলরেখাগুলো স্থিতিস্থাপক ইলাস্টিকের মত আচরণ করে।মোট কথা,বলরেখার স্থিতিস্থাপক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিপরীত মেরুর মধ্যে আকর্ষণ আর সমমেরুর বিকর্ষণের ব্যাখ্যা দেয়া যায় এইভাবেঃ-

ধরা যাক উত্তর মেরু থেকে কিছু রেখা দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করল। স্থিতিস্থাপক বস্তুর ধর্ম হল টানলে সরণের বিপরীত দিকে একটি বলের সৃষ্টি হয়, তাই পোল দুটি দূরত্ব কমিয়ে স্থিত অবস্থা লাভের চেষ্টা করে।

যেহেতু সমপোল হতে বলরেখা সমপোলে প্রবেশ করবেনা এবং একটি রেখা আরেকটিকে ছেদ করবেনা বা আরেকটির অভ্যন্তরে ঢুকে যাবেনা তাই দুটি বিপরীত পোল কাছাকাছি আনলে অনেকটা সঙ্কুচিত রাবার ব্যান্ডের মত অবস্থা সৃষ্টি হয় যা প্রসারিত হয়ে স্থিত অবস্থায় আসতে চায়, ফলে বিকর্ষণ বলের সৃষ্টি হয়।

চলমান চার্জের চৌম্বকীয় ধর্মঃ-

চৌম্বকবলরেখা ব্যাখ্যা করার সময় একটি দণ্ড চুম্বকের চারপাশে বিভিন্ন অবস্থানে রেখে চুম্বক শলাকা রেখে প্রভাব দেখা হয়েছিল। দণ্ড চুম্বকের বদলে যদি ওখানে কিছু চার্জ রাখা হত তবে শলাকায় কোনো বিক্ষেপ হতনা। তবে সেই চার্জগুলোই চলমান অবস্থায় থাকলে তার চারপাশে একটি চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হত যার কারণে শলাকা বিক্ষেপ দেবে। আমরা চৌম্বকক্ষেত্রকে সংক্ষেপে B বলব। এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যাসহ প্রমান করেন Oersted নামক একজন অসাধারণ বিজ্ঞানী।

চিত্রঃ একটি বর্তনীতে প্রবাহের দরুন সৃষ্ট B শলাকার বিক্ষেপ ঘটাচ্ছে।

এখানে দুটো জিনিস রয়েছে, একটি বদ্ধ বর্তনী এবং একটি চুম্বক। এইযে তড়িৎ প্রবাহের ফলে একধরনের চৌম্বকত্ব সৃষ্টি হল,একেই বলে তড়িৎচুম্বক বা electromagnet। যদি পরিবর্তনশীল বা alternating current(A.C) ব্যবহার করা হয় তবে B এর মান এবং দিক দুটিই পরিবর্তিত হবে।

তার ১২ বছর পর বিজ্ঞানের আরেক দিকপাল মাইকেল ফ্যারাডে বলেনঃ-

“যখন কোনো বদ্ধ তার কুণ্ডলীতে আবদ্ধ চৌম্বক আবেশরেখার সংখ্যা বা ফ্লাক্সের পরিবর্তন ঘটে তখন উক্ত বর্তনীতে একটি তড়িচ্চালক শক্তি আবিষ্ট হয়।”

এটি তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের প্রথম সূত্র হিসেবে বিখ্যাত।

উপরের সূত্র দুটির সম্পর্কের ব্যাপারে বলা যায়, অনেকটা এরকম, দিনের শেষে রাত আসবে আর রাতের শেষে দিন। তড়িৎ প্রবাহ থেকে চুম্বক পাব আর চুম্বক থেকে তড়িৎ। ফ্যারাডের প্রথম সূত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বর্তনী ও চুম্বকের মধ্যে আপেক্ষিক গতি থাকতে হবে তবেই তড়িৎ উৎপন্ন হবে, গতির ফলে প্রতি মুহূর্তে কুণ্ডলী দিয়ে অতিক্রান্ত ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটবে, গতি যদি না থাকে তবে অন্য কোনো উপায়ে প্রতি মুহূর্তে ফ্লাক্স সংখ্যার ভিন্নতা ঘটাতে হবে(সেটি কি হতে পারে?!)। উৎপন্ন তড়িচ্চালক শক্তি ফ্লাক্সের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক হবে। এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বিতীয় সূত্র।

বেশ পরিচিত এই সূত্র দুটি উল্লেখ করলাম যেই কারণে সেখানে এখন আসছি।

বেশ বহুল পরিচিত একটি সূত্র এটি, তড়িৎ প্রবাহের দিকে ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল দিলে বাকি আঙ্গুলগুলো উৎপন্ন B এর দিক নির্দেশ করে।

যদি একটা কাগজের তল বরাবর ওপরের দিকে তড়িৎ প্রবাহিত হয় তবে উৎপন্ন B এর দিক এমন হবে যেন পরিবাহীর ডান পাশের কাগজ ফুঁড়ে উপরে উঠছে এবং বাম পাশের কাগজে ঢুকে যাচ্ছে।

এখন কথা হচ্ছে ডান হাতের প্যাঁচ অনুসরন করে B উৎপন্ন হয়নি কাকতালীয়ভাবে দেখা গিয়েছে যে একটি পরিবাহীর মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হলে যেভাবে B উৎপন্ন হয় তা আঙ্গুলের ওরকম অবস্থানের সাথে মিলে যাচ্ছে।

বেশ, আমরা এখন বিপরীত দৃশ্যটি দেখার চেষ্টা করি।একটি বদ্ধ বর্তনীতে B প্রয়োগ করা হবে এবং প্রবাহের দিক কোনো দিকে হওয়া উচিত তা দেখবঃ-

উপরের চিত্রে কুণ্ডলীর ভেতরে B প্রয়োগ করা হচ্ছে(কাগজের তলের ভেতর থেকে আমাদের দিকে), কুণ্ডলীটি পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক কাগজ তলে অবস্থিত, যে কোনো একদিকে তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি হবে, তার দরুন পরিবাহীর নিজস্ব একটি ক্ষেত্রও সৃষ্টি হবে।

যদি প্রথম কেসটি সত্য হয় তবে প্রবাহের দরুন প্রয়োগকৃত B এর মতই উৎপন্ন B এর দিক হবে প্রথমত কাগজ ফুঁড়ে আমাদের দিকে, ঠিক তখন দুটি ক্ষেত্র একই দিকে ক্রিয়াশীল, সম্মিলিত ক্ষেত্র প্রবাহ আরও বাড়াবে, প্রবাহ আবার নিজস্ব B বাড়াবে এভাবে কুণ্ডলীর মধ্যে একটি সর্বদা চলমান অস্থিতিশীল সিস্টেমের উদ্ভব ঘটবে যা শক্তির নিত্যতার সূত্রকে ভাঙবে।

তাই এমন একদিকে প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন যার নিজস্ব ক্ষেত্র প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রকে কমানোর চেষ্টা করবে, দ্বিতীয় চিত্রটি সঠিক কিনা তা পাঠক বিচার করুন।

লেনজ নামক অসাধারণ এক বিজ্ঞানী এই ব্যাপারটি প্রথম ব্যাখ্যা করেন। লেঞ্জের সূত্রটি হলঃ

“আবিষ্ট তড়িচ্চালক শক্তি বা তড়িৎ প্রবাহের দিক এমন হয় যে এটি উৎপন্ন হবার মুল কারণের বিরোধিতা করে।”

ভেক্টরের ক্রস গুননের ব্যাপারটি আমরা জানি, দুটি ভেক্টর রাশির ক্রসগুননের ফলে উভয়ের লম্ব বরাবর আরেকটি ভেক্টর উদয় হয়। প্রথম ভেক্টর থেকে দ্বিতীয় ভেক্টরের দিকে একটি স্ক্রু ঘুরালে সেটি যেদিকে যায়, উৎপন্ন ভেক্টরের দিক সেদিকে।

এখানে ডান হস্ত সূত্র নামক একটি ব্যাপার আছে, যদি ডান হাতের তর্জনী প্রথম ভেক্টর, মধ্যমা দ্বিতীয়টি হয় তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি লব্ধি ভেক্টরের দিক বলবে, যে কোনো ভাবে আমরা দিকটি বের করতে পারি।

এতক্ষণ আমরা হয় তড়িতের প্রয়োগে চুম্বক বা চুম্বকের কারণে তড়িৎ এরূপ ব্যাপার দেখছিলাম।তড়িৎ হল চার্জের প্রবাহ যা একটি ভেক্টর রাশি আবার চুম্বকক্ষেত্রের নির্দিষ্ট দিক থাকায় সেটিও ভেক্টর রাশি,ফলস্বরূপ দুটি একসাথে কাজ করলে আরেকটি ভেক্টর রাশির উদয় ঘটবে উভয়ের লম্ব বরাবর। যা একটি বল, প্রকাশ করা হয়ঃ-

F=qVxB=qVBsin(angle)

এখানে q একটি ধনাত্মক চার্জ, যার বেগ v,B হল প্রয়োগকৃত ক্ষেত্র। ব্যাপারটি হল একটি চুম্বকক্ষেত্রে একটি আধান ক্রিয়াশীল থাকলে তা একটি বল অনুভব করবে, বলের দিক পাব ডান হস্ত সূত্র থেকে। অবশ্য চার্জটি যদি ঋণাত্মক হয় তবে ডান হস্তের বদলে বাম হস্ত সূত্র ব্যবহার হবে।তখন বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে। চিত্রে কাগজের বাইরে বেরিয়ে আসা ক্ষেত্র ও ভেতরে প্রবেশ করা ক্ষেত্রের জন্য উদ্ভূত বল F এর দিক দেখানো হয়েছে।

ফ্লেমিঙ্গের বাম হস্ত নিয়ম এবং কিছু কথাঃ-

বেশি কথা না বলে প্রথমেই চিত্রটি দিয়ে দিলাম, যদি বাম হাতের তর্জনী প্রয়োগকৃত চুম্বকক্ষেত্রের দিক, মধ্যমা কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে তবে ঐ পরিবাহী তারটি উপরের দিকে একটি বল অনুভব করবে, এক্ষেত্রে ভেক্টরের হিসেব করে দিক বের করতে হচ্ছেনা। কেবল চৌম্বকক্ষেত্র এবং প্রবাহের দিক বরাবর হাত বসালেই উদ্ভূত বলের দিক পাওয়া যাবে।

এক্ষেত্রে কিছু ছোট্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তা হলো, বিদ্যুতের প্রবাহ তো আসলে চার্জেরই প্রবাহ তাহলে ভেক্টরের বেসিক ডান হস্ত সূত্র ব্যবহার করলেই হতো আবার নতুন সূত্রের দরকার কি? দ্বিতীয়ত, ডান হস্ত সূত্রে তর্জনী বরাবর চার্জের প্রবাহ এবং মধ্যমা বরাবর B এর দিক ছিল কিন্তু এখানে উল্টো কেন?

প্রথম উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ,বিদ্যুৎ প্রবাহ আসলে চার্জেরই প্রবাহ, কোনো একটি তড়িৎ কোষে যেদিকে ইলেকট্রনের প্রবাহ ধরা হয় তার উল্টো দিকে ধরা হয় বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক।অনেকটা এরকম যেন ইলেকট্রনের বিপরীত চার্জের আরেকটি কণার প্রবাহ(কেবল দিক বোঝার সুবিধার্থে বলা হচ্ছে), এক্ষেত্রে তাই পূর্বের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধনাত্মক চার্জের জন্য বলের দিকের নিয়মটিই ব্যবহার করা যেত, কিন্তু এটি আসলে ঐ সূত্রেরই আরও সহজ রূপ। এখানে আঙ্গুল আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয় নির্দিষ্ট দিকটি বোঝাটাই আসল ব্যাপার।

ফ্লেমিঙ্গের সূত্রের সাথে তুলনা করি, ডান হাতের মধ্যমা যা আগে B বোঝানোর জন্য ব্যবহার হচ্ছিল তা উপরের চিত্রের B এর দিক বরাবর এবং তর্জনী প্রবাহের দিক বরাবর রাখলে দেখবো বল আসলে উপর দিকেই নির্দেশিত হচ্ছে তবে হাত একটু বেশি মোচড়ানো লাগছে এই আরকি!

ডান হস্ত সূত্রে একটি ব্যাপার আসলে একদম নির্দিষ্ট যে ক্রস গুননের যেই সূত্র, এক্ষেত্রে F=qV x B সেই সূত্রের প্রথম রাশি, তর্জনী বরাবর এবং দ্বিতীয় রাশি মধ্যমা বরাবর হলেই বৃদ্ধাঙ্গুলি বলের দিক বোঝাবে।কিন্তু ঐ যে উপরের চিত্রানুযায়ী আঙ্গুল স্থাপন করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাম হস্ত সূত্র তুলনামুলকভাবে প্রয়োগ করা সহজ।bঅর্থাৎ সূত্র যাই হোক, ফলাফল আসলে একই!

আর এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করা হয়।সহজভাবে বলতে গেলে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরবরাহ করা হয়, চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন একটি ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়, এভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। বিস্তারিত পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস থাকবে।

উদ্ভূত বলের বিষয়টি বাস্তবিকভাবেও অনুধাবন করা যায়, পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহ চলার সময় তার নিজের প্রবাহের কারণেই চারদিকে একটি চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়।তারপরে আবার যখন বাইরে থেকে চুম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় তখন পরিবাহীর একদিকে একই দিকে নির্দেশক ক্ষেত্ররেখা এবং আরেকদিকে বিপরীতমুখী ক্ষেত্ররেখা একে অপরের মুখোমুখি হয়।ফলস্বরূপ ভেক্টর বিয়োগের সূত্রানুযায়ী ঐ দিকে ক্ষেত্ররেখা দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষেত্ররেখার যেহেতু আবার স্থিতিস্থাপক ধর্ম রয়েছে তাই তখন বেশি ঘনত্বের দিক থেকে কম ঘনত্বের দিকে একটি বল অনুভূত হয়, রাবার ব্যান্ডের মতই। এটিই আসলে টর্ক বা বল সৃষ্টির কারণ।

ডোমেইন তত্ত্ব,চৌম্বকপদার্থ এবং অন্যান্যঃ-

চৌম্বক-পদার্থ এবং চুম্বকের মধ্যে একটা পরিষ্কার পার্থক্য রয়েছে তা হল একটি চুম্বক তার সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে। অপরদিকে চৌম্বকপদার্থের চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভের ক্ষমতা রয়েছে তবে তার পূর্বে একে চৌম্বকীকরন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।

আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে একটি চুম্বক আরেকটি চুম্বকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে, একটি চৌম্বকপদার্থের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারবে কিন্তু একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হবার পূর্বে আরেকটি চৌম্বকপদার্থের ওপর কোনোও প্রভাব ফেলতে পারবেনা।

এই আলোচনার সূত্র ধরে যেই প্রশ্নটি আসে সেটি হল ঠিক কোনো কোনো মৌলগুলো চুম্বকে পরিণত হবার ক্ষমতা রাখে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সকল পদার্থকে তিনটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছেঃ-

(১)ডায়াচৌম্বক পদার্থ (diamagnetic substance)

(২)প্যারাচৌম্বক পদার্থ (paramagnetic substance)

(৩)ফেরোচৌম্বক পদার্থ(ferromagnetic substance)

পদার্থ অণু-পরমাণু দ্বারা গঠিত। পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন ও নিউট্রন থাকে এবং ইলেকট্রনগুলো কেন্দ্রের চতুর্দিকে বিভিন্ন কক্ষপথে পরিভ্রমন করে। আবার নিজ নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ইলেকট্রনগুলোর ঘূর্ণন বা spin motion রয়েছে। ফলস্বরূপ আমরা দু’ধরনের গতি ভ্রামক পাচ্ছিঃ-

১/ কক্ষীয় গতি ভ্রামক(orbital motion moment)

২/ স্পিন গতি ভ্রামক(spin motion moment)

এক্ষেত্রে নিউক্লিয়াসের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ভ্রামক রয়েছে যার নাম nuclear magnetic moment। এসকল মোমেন্টের সমষ্টিগত ক্রিয়ার ফলে পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন চৌম্বকবৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি প্রকাশ পায়।

প্রথম প্রকার পদার্থকে চুম্বকে পরিণত করা সম্ভব নয়, হতাশার গল্প দিয়েই শুরু করছি।

ডায়াচৌম্বক পদার্থঃ-

ঘূর্ণায়মান প্রতিটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে। কিন্তু একেকটি ইলেকট্রনের ঘোরার দিকভঙ্গি বা orientation এর ভিন্নতার কারণে একটি আরেকটির চৌম্বকীয় প্রভাবকে বিলীন করে দেয়।ফলে নীট চৌম্বক প্রভাব হয় শূন্য।

এখন বাইরে থেকে কোনো ক্ষেত্র B প্রয়োগ করা হলে পরমাণুর কক্ষীয় গতির পরিবর্তন ঘটে কারণ কৌণিক গতি বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করবে প্রয়োগকৃত ক্ষেত্রের দিক কোনো দিকে এবং ঘূর্ণনের দিক সেদিকেই বা তার বিপরীতে কিনা তার ওপর।

কৌণিক বেগ পরিবর্তিত হলে কক্ষীয় গতি ভ্রামক এর পরিবর্তন হবে।বেগ বাড়লে ভ্রামক বাড়ে, কমলে কমে। ফলস্বরূপ যা ঘটে তা হল একটি মোট ভ্রামকের সৃষ্টি হয় যা সাধারন অবস্থায় শূন্য ছিল। কিন্তু এই দিক আবার প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর বিপরীত দিকে। তাই যখন চৌম্বকক্ষেত্রে রাখা হয়, এসমস্ত পদার্থ তখন ক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যায়। চৌম্বকক্ষেত্র এসব পদার্থের ওপর প্রভাব ফেলছে ঠিকই কিন্তু চুম্বকীকরন প্রক্রিয়ার দ্বারা চুম্বকে পরিণত করতে পারছেনা।তাই একটুকরো সোনা কখনই চুম্বকে পরিণত হবেনা।

এখন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া যাক। প্রথমত, ডায়াচৌম্বকত্ব একটি বৈশিষ্ট্য এবং এর উদ্ভব ঘটে কক্ষীয় গতি ভ্রামক থেকে। যেহেতু সকল পদার্থের কক্ষীয় গতি ভ্রামক রয়েছে সেহেতু সকল পদার্থের ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য রয়েছে কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত দুর্বল। যে সকল পদার্থে মোট চৌম্বক ভ্রামক শূন্য হয়না এবং নির্দিষ্ট শর্তে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্র এর দিক বরাবর ভ্রামকের অভিমুখ হয় তাদের মাঝে প্যারাচৌম্বকত্ব অথবা ফেরোচৌম্বকত্ব প্রকাশ পায় ফলে ডায়াচৌম্বকত্ব থাকা সত্ত্বেও তা ঢাকা পরে যায়।

এইটুকু আলোচনা থেকে যেই সারাংশ টানা যায় তা হল প্যারাচৌম্বক বা ফেরোচৌম্বক বৈশিষ্ট্য যদি উল্লেখযোগ্যভাবে উদ্ভব না হয় তবে যে কোনো পদার্থই ডায়াচৌম্বক এবং ঠিক এই কারণেই পৃথিবীতে ডায়াচৌম্বক পদার্থ সবচেয়ে বেশি। যথা- বিসমাথ, এন্টিমনি, তামা, সোনা, কোয়ার্টজ, মার্কারি, পানি, বাতাস, হাইড্রোজেন, বেশিরভাগ জৈব পদার্থ তার মানে যে কোনো জীবন্ত দেহও ডায়াচৌম্বকপদার্থ আর এই ব্যাপারটি কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি ঘটনা ঘটানো হয়েছেঃ-

ডায়াচৌম্বক বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে প্রয়োগকৃত চৌম্বকক্ষেত্রকে ব্যাঙটির দেহ বিকর্ষণ করছে তাই এটি ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, ছোটখাটো আরও কয়েকটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি করা হয়েছে এবং সেইদিন হয়ত আর বেশি দূরে নয় যখন মানুষ নিজেরা এই ব্যাপারটি উপভোগ করতে পারবে।

প্যারাচৌম্বক পদার্থঃ-

ডায়াচৌম্বক নিয়ে আলোচনার সময় আমরা চিন্তাভাবনা কক্ষীয় গতি ভ্রামক –এ সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছিলাম।প্যারাচৌম্বক পদার্থে যেটি ঘটে তা হল কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর ক্রিয়ায় নতুন একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হয়।

চিত্রে ভ্রামককে কতগুলো চৌম্বক দ্বি-পোল এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছেঃ-

এ ব্যাপারটি আগে ঘটেনি। যাই হোক, উদ্ভূত এই ভ্রামক এর একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ থাকা উচিত হলেও সাধারন তাপমাত্রাতেই তাপজনিত কম্পন বেশি হওয়ায় দ্বিপোলগুলো বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকে। ফলে বহিস্থ চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ না করা হলে পদার্থের কোনো একদিকে নীট চৌম্বকত্ব থাকেনা।

ফলস্বরূপ যতক্ষণ বহিঃস্থ কোনো চৌম্বকক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয় ততক্ষণ এদের নির্দিষ্ট চৌম্বক ভ্রামক থাকে এবং এরা চুম্বক হিসেবে কাজ করে।ক্ষেত্রটি সরিয়ে নিলেই এরা চুম্বকত্ব হারিয়ে ফেলে।

ফেরোচৌম্বক পদার্থঃ-

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম স্থায়ী ভ্রামকের অভিমুখ সাধারন অবস্থায়(তাপমাত্রায়) নির্দিষ্ট দিকে থাকছেনা। ফেরোচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হল স্থায়ী ভ্রামকের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ রয়েছে। একদম প্রথম থেকে ব্যাখ্যা করছি, একটি ইলেকট্রনের কক্ষীয় গতি ভ্রামক এবং স্পিন গতি ভ্রামক এর সমষ্টিগত ক্রিয়ায় প্রথমত ধরি একটি স্থায়ী ভ্রামকের সৃষ্টি হল।

প্যারাচৌম্বক পদার্থের ক্ষেত্রে একেকটি ইলেকট্রনের ভ্রামকের অভিমুখ ছিল একেকদিকে। কিন্তু ফেরোচৌম্বকের ক্ষেত্রে পরমাণুসমূহের ভ্রামক অনেকটা জায়গা জুড়ে সংঘবদ্ধ বা locked অবস্থায় থাকে।এই যে অনেকটা জায়গা বা অঞ্চলের কথা বললাম, এর নাম হচ্ছে ডোমেইন।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট জায়গার নাম আমরা দিলাম ডোমেইন। একেকটি ডোমেইনে প্রায় 10^16 – 10^19 সংখ্যক পরমাণু থাকে যাদের চৌম্বক মোমেন্ট(স্থায়ী ভ্রামক বোঝানো হচ্ছে)পরস্পর সমান্তরাল থাকে। ক্লাসিক্যাল ফিজিক্সের সাহায্যে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা সম্ভব না হলেও কোয়ান্টাম ফিজিক্স এখানে কার্যকর এবং এই ক্ষেত্রে “বিনিময় যুগলায়ন” বা exchange integral নামক একটি কোয়ান্টাম প্রক্রিয়া ঘটে যা ডোমেইনের মধ্যে ক্রিয়াশীল।

কিন্তু একটি ফেরোচৌম্বক পদার্থের কেলাসে বা ত্রিমাত্রিক ক্ষুদ্র গঠনে অসংখ্য ডোমেইন থাকে যাদের একেকজনের মোমেন্টের অভিমুখ একেকদিকে। ফলস্বরূপ নীট ভ্রামক আবারও শূন্য!

কিন্তু এই ক্ষেত্রে যখন চৌম্বক খণ্ডটিকে কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রে স্থাপন করা হয় তখন ডোমেইনগুলো নির্দিষ্ট দিক বরাবর বিন্যস্ত হয়। মূলত তখনই খণ্ডটি বহিঃচৌম্বকত্ব প্রকাশ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল ডোমেইনগুলো বিন্যস্ত হবার পর বহিঃস্থ চৌম্বকক্ষেত্র সরিয়ে নিলেও এই বিন্যাস নষ্ট হয়না যদিনা একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার ওপর গরম করা হয় অথবা মেকানিক্যাল স্ট্রেস(যেমনঃ হাতুড়ির আঘাত) দেয়া হয়। এভাবে একটি চৌম্বকপদার্থ চুম্বকে পরিণত হয়।

উচ্চতর ভাবে চিন্তা করতে গেলে ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম, ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে একটি ইলেকট্রনের প্রভাব আরেকটির ওপর পারমাণবিক গণ্ডিতে ক্রিয়াশীল যা আমরা দেখিনা বা অনুভব করিনা। কিন্তু এরকম অসীমসংখ্যক ইলেকট্রন যখন একত্র হয়ে নির্দিষ্ট একটি দিকে প্রভাব বিস্তার করতে চায় তখন তা আর পারমাণবিক গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বাস্তবিক চোখে ধরা পরে এবং কোনো এক অদৃশ্য শক্তির মত উদয় ঘটে চুম্বকশক্তির!

তথ্যসূত্র :-

/ https://www.electrical4u.com/fleming-left-hand-rule-and-fleming-right-hand-rule/

/ http://hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/magnetic/magfor.html

/ http://www.physics.ucla.edu/marty/diamag/

/ https://en.wikipedia.org/wiki/Diamagnetism

featured image: nasa.gov

আমরা কত দূর জানতে পারি— বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধতার বাঁধা

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির রয়েছে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা আর প্রকৃতির গভীরতম রহস্যগুলোয়ে রয়েছে এক সহজাত অভেদ্যতা।

আমরা যা দেখি পর্যবেক্ষণ করি তাই প্রকৃতি নয় বরং প্রকৃতি আমাদের সামনে তাকে প্রকাশ করে আমরা কিভাবে তাকে দেখি। এ ভাবুক ভাবুক কঠিন কথা আমার নয়। জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ এই ভাব নিয়েছেন। তিনিই কিন্তু প্রথম কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে অনিশ্চয়তার ব্যাপার বিধৃত রয়েছে বলে অনুমান করেন। যারা বিজ্ঞানকে একেবারে সত্যপথের যুধিষ্ঠির ভেবে থাকেন তাদের অবাক করতে পারে। হয়ত নাখোশও করে থাকবে কতক। হাইজেনবার্গ কি বলতে চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে আরোপিত হচ্ছে? যদি তাই বলেন এবং তাকে বিজ্ঞানের যুধিষ্ঠির পথিকদের একজন স্বীকার করা হয়ে থাকে তবে কিন্তু আমরা যাকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলছি তাই এক বিরাট বিভ্রম তৈরি করে বসে। তাই না?

কেন বিমান ওড়ে, কেন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে, কেন আমরা এমন যন্ত্র বানাতে সক্ষম হই যা আশ্চর্যজনকভাবে তথ্য বিনিময়ে নিখুঁত কাজ করতে পারে?— মানুষ হয়ত বেঁকে বসবে এ ধরণের প্রশ্ন করে। নিশ্চিতভাবেই এমন আবিষ্কার আর অন্যান্য যা আছে (প্রাকৃতিক আইনকে কাজে লাগিয়ে তৈরি যেগুলো) সেসব আমাদের পর্যবেক্ষণ বা আচরণের অধীনেই কাজ করে। মহাবিশ্বে সুশৃঙ্খলা রয়েছে, বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে তা আবিষ্কার করছে।

মহাবিশ্বে যে শৃঙ্খলা রয়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানের অধিকাংশ কাজই হল বিভিন্ন আচরণের প্যাটার্ন খুঁজে বের করা। কোয়ার্ক থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী, গ্যালাক্সি, পরমাণু, জিনতত্ত্ব সবকিছুর জন্য আমরা চেষ্টা করি একটা সাধারণ নিয়ম বের করে আনতে। ক্ষেত্র বিশেষে এজন্য আমরা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বর্জন করি যেন প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারি।

এরপর আমরা কোনো পদ্ধতি, ঘটনার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা রচনা করে থাকি। কোন কোন ক্ষেত্রে এটা পর্যবেক্ষণভিত্তিক আর সবচেয়ে সেরা ক্ষেত্রে পূর্বানুমান ঠিক ঠিক মিলে যায়। আগেই জানি আমরা কী হবে, পরে কেবল নিশ্চায়ন। যেমন, ১৯১৯ এ সূর্যগ্রহণ দেখার সময় স্থান কালের বক্রতার সত্যতা নিশ্চায়ন।

কখনো কখনো আমরা যে পদ্ধতিতে কাজ করছি তার ব্যাপারে অন্যান্যদের মিথষ্ক্রিয়া প্রয়োজন পড়ে, গবেষণার অত্যুৎসাহও এর একটা দিক। আমরা কোনো ঘটনার আচরণ পর্যবেক্ষণ করি এবং গাণিতিক বা কাল্পনিক মডেল দাঁড় করাই ভালভাবে বোঝার জন্য, আর এসব করতে আমাদের কিছু যন্ত্রপাতিরও প্রয়োজন হয়। এটা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতাকে কমিয়ে আনে। যেমন খুব সূক্ষ্ম বস্তু দেখা, খুব দ্রুত গতি মাপা, বহুদূরের কোনকিছুর দূরত্ব মাপা, আবার যা বাস্তবে ধরা ছোঁয়া সম্ভব নয় এমন এমন ক্ষেত্রে (উদাহরণস্বরূপ, আমাদের মস্তিষ্কে কী আছে বা পৃথিবীর কেন্দ্রটাই বা কেমন!)।

আমরা শাদা চোখে যা দেখি প্রকৃতি কেবল তাই নয়, বরং এ ধরণের যন্ত্রপাতি এবং দক্ষতা থেকে যেসকল তথ্য বা জ্ঞান অর্জন করি তাও প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণার অংশ। অনুরূপভাবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ নির্ভর করে আমরা কী পরিমাণ ও কী কী তথ্য যন্ত্র ও দক্ষতার মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। যেহেতু যন্ত্র এবং দক্ষতার একটা সীমারেখা আছে তাই বিশ্ব সম্পর্কেও আমাদের অভিজ্ঞতা হবে স্বল্পদৃষ্টির। আমরা কেবল প্রকৃতির ততটা অর্জন করতে পারি যতটা বাস্তবতার নিরিখে আমাদের বিশ্বদেখার ক্ষমতা কাজ করে।

বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে আমরা যদি কিছু উদ্ভাবনের আগে ও পরে ঐ বিষয়ের পার্থক্যটায় খেয়াল করি। যেমন মাইক্রোস্কোপ উদ্ভাবন বা জিন সিক্যুয়েন্সিং অথবা টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে ও পরে জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা কোলাইডার উদ্ভাবনের আগে পরে কণা পদার্থবিজ্ঞান। এক একটা যন্ত্র যে নতুন যুগের সূচনা করেছিল ছিল তা ছিল প্রভূত বিপ্লব। ১৭শ শতকের তত্ত্বসমগ্রের কারণে বিশ্বের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি যেমন ছিল যন্ত্রদক্ষতার পর আজ তার বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটেছে। এই ঐতিহ্যটি বিজ্ঞানের একটি ট্রেডমার্ক বলা যায়।

কখনো কখনো লোকজন বিজ্ঞানের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিবৃতিকে “পরাজিতদের মত” হিসেবে আখ্যা দেয়। আমরা যদি কোনো কিছু জানার শেষ না করতে পারি তো সমস্যা কী— এ ধরণের বিবৃতি দিয়ে ভুল বোঝা হয়। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আবিষ্কারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্য আসলে পরাজিত হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতির গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা নির্মাণে বিজ্ঞান আমাদের সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি হিসেবে থাকবে। পরিবর্তন হবে কেবল বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা-প্রয়াসের— বিজ্ঞান পৌঁছাতে না পারলে তার বাইরে কিছু নেই এই বিশ্বাসের।

স্পষ্টতই বিজ্ঞানে জানা অসম্ভব এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রসঙ্গত প্রশ্ন থাকতে পারে, যদি বর্তমানে আমাদের মেনে নেয়া প্রাকৃতিক আইনসমূহ ভুল হয়, তবে আমরা উত্তরও বের করতে পারব না। একটি উদাহরণ হতে পারে মাল্টিভার্স: মাল্টিভার্সের কনজেকচার (অনুমান) আমাদের বলে আমাদের মহাবিশ্ব এমন বহু মহাবিশ্বের একটি যাদের প্রত্যেকটির থাকতে পারে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক আইন। অন্যান্য মহাবিশ্ব আমাদের দৃষ্টির বাইরে, (বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির বাইরে অবশ্যই) যার ফলে আমরা কখনো সেখান থেকে কোন সংকেত পাব না, পাঠাতেও পারব না। এ ধরণের সংকেতের অবশ্য প্রামাণ্য নজির চাই।

বিজ্ঞানের অজ্ঞাত এমন অন্যান্য উদাহরণ মিশে আছে সৃষ্টি সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নে। মহাবিশ্ব, জীবন এবং চেতনা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ সৃষ্টিকালীন প্রক্রিয়া আমরা আমাদের জানা জ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না। বিগ ব্যাং সংঘটনের সময় আমাদের ধারণাসঙ্গত তত্ত্ব কাজ করার কোন উপায় আমরা পাই না। উদাহরণস্বরূপ: শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কথা বলা যায় এ প্রসঙ্গে। আমাদের বিশ্ব বর্ণনায় মহাবিশ্ব কেন এই নিয়মগুলোরই অধীন, অন্য নিয়মের অধীন কেন নয় সেও তো বিজ্ঞানের প্রতি একটা আপত্তি জানানো।

অনুরূপভাবে, আমরা যতক্ষণ না জড় থেকে জীবনের উদ্ভবের সুনির্দিষ্ট কোনো একক জৈবরাসায়নিক পথ বাতলাতে না পারি, নিশ্চিতভাবে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভবের রহস্যও সমাধান পারছি না। চেতনা বা চিন্তার ক্ষেত্রে সমস্যা হল বস্তু থেকে বিষয়ে ঝাঁপ দিয়ে ফেলা— উদাহরণস্বরূপ ব্যথা পেলে অথবা লাল রঙ দেখে স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সম্ভবত এক ধরণের অপরিণত বা প্রাথমিক উপলব্ধির উত্থান ঘটে যথেষ্ঠ জটিল যন্ত্রে বা ব্যক্তিতে (যন্ত্র বলতে প্রাণীদেহের কথাই বলা হচ্ছে, উপলব্ধি উত্থানের আগের দশাকে যন্ত্র দশা মনে করে)। কিন্তু এটা আমরা কিভাবে প্রমাণ করতে পারি যে চেতনা বলে কিছু রয়েছে? প্রমাণ করতে গেলেও কি চেতনাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে?

স্ববিরোধী মনে হলেও সত্য যে, আমরা আমাদের চেতনার মাধ্যমেই এই বিশ্বকে অনুভব করি, সেটা অসম্পূর্ণভাবেই হোক কি ত্রুটিপূর্ণই হোক। আমরা কি নিশ্চিতভাবে এমন কোন কিছুর পরিপূর্ণ অর্থোদ্ধার করতে পারি– যার কিনা আবার আমরা নিজেরাই অংশ?

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সাপের মত কি আমরা আটকে আছি কোনো সীমাবদ্ধতার বৃত্তে? ;image source: publishingperspectives.com

নিজের লেজ গিলতে থাকা পৌরাণিক সেই সাপের মত আমরা আটকে আছি বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জীবন অভিজ্ঞতার বৃত্তে। আমরা এমনকি ‘আমাদের উপলব্ধ বাস্তবতা’ থেকেও ‘আমাদের বর্ণিত বাস্তবতা’কে আলাদা করতে পারি না। আমরা আছি এমন এক ক্রীড়াক্ষেত্রে যেখানে বিজ্ঞানের খেল বহুমাত্রিকতায় উৎসারিত হচ্ছে। আর আমরা যদি যা দেখতে পাচ্ছি সে নিয়ম (দেখতে পাওয়া ছাড়া যদি সব নিয়মের বাইরে ধরে নেই) অনুযায়ীই কেবল খেলি তবে তো আমরা স্পষ্টতই এড়িয়ে যাব দৃষ্টির বাইরের জগতকে। দেখতে পাব না বলে তো আর দৃষ্টির বাইরের জগত নাই হয়ে যায় না।

অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে? [১] থাকে না।

 

মূল: মার্সেলো গ্লেইসার, অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা, ডার্টমাউথ কলেজ, হ্যানোভার, যুক্তরাষ্ট্র।

[১] পঙক্তিটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতা থেকে নেয়া।