ক্ষমতাধর এক অঙ্গভঙ্গির সাতকাহন

আনন্দ বা খুশির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি। প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখার চেয়ে সুখের কিছু আর হয় না। প্রতিনিয়তই হেসে যাই কিন্তু কখনো কি এটি নিয়ে একটু প্রশ্ন করে দেখেছি? আমরা কেন হাসি? কেনই বা আমরা প্রিয় কারো হাসি দেখে খুশি হই?

যেকোনো ঘটনার পেছনেই থাকে কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান হাসিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে?

হাসির আগমন

যখন কোনো প্রাণী তার মুখের মাংসপেশি শক্ত করে দাঁত বের করে, তখন বোঝা যায় সে অন্য কোনো প্রাণীকে আক্রমণ করতে যাচ্ছে। হতে পারে সে ভীত, কিংবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, কিংবা সে ফাঁদে পড়েছে কিন্তু বের হতে পারছে না। বেশিরভাগ প্রাণী দাঁত বের করে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চায় বা অন্য কোনো প্রাণীকে হুমকি দিতে চায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। মানুষের ক্ষেত্রে এটি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। যখন কেউ এক পাটি দাঁত বের করে আপনার দিকে তাকাবে, তখন নিঃসন্দেহে বুঝবেন তিনি হাসছেন।

ধারণা করা হয়, এই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি আসলে বিবর্তনের ধারায় এসেছে প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে। জেনিস পোর্টেয়াস নামের একজন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক গবেষণা করেছেন হাস্যরস ও হাসির বিবর্তন নিয়ে। তার মতে, উচ্চতর প্রাণী যেমন রেসাস বানরদের ক্ষেত্রে হাসির উদাহরণ দেখা যায়।

বানরদের কোনো দলের অধস্তন সদস্যরা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের প্রতি এরকম দাঁত প্রদর্শন করে। যখন তারা এমন কোনো স্থান দখল করে যেটা সেই ঊর্ধ্বতন বা প্রভাবশালী প্রাণীরা দখল করতে চায়। এই ভঙ্গি দিয়ে তারা ঊর্ধ্বস্তন সদস্যদের মন পরিবর্তন করার চেষ্টা করে যেন কোনো ঝগড়া বা বিবাদ সৃষ্টি না হয়। অর্থাৎ কিছুটা হাসির মতো ভঙ্গিমা দিয়ে তারা একইসাথে কর্তৃত্ব মেনে নেয়া এবং কিছুটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বোঝায়। এই উদাহরণ দিয়ে মানুষের হাসির কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

আমাদের মাঝে অনেকেই ভয়ে কিংবা নার্ভাস থাকার সময় অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে। আবার অনেকসময় বাচ্চারা বকা খাওয়ার পরেও হাসি থামাতে পারে না। রেসাস বানর দলের সেই ঘটনা দিয়ে এই ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যা করা যায়। জেনিস পোর্টেয়াসের মতে, এই হাসিও বড়দের কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ করে তোলার জন্যই।

চিত্র: প্রাণীদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি থেকে হাসির আগমন বলে ধারণা করা হয়।

তাছাড়া বিজ্ঞানীরা শিম্পাঞ্জিদের মতো উন্নত প্রাণীদের মাঝেও এরকম দাঁত বের করে হাসির মতো ভঙ্গি খুঁজে পেয়েছেন। এতে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় কীভাবে হাসি মানুষের মাঝে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে প্রকাশ পেলো।

হাসি কেউ জন্মের পর শেখে না, বরং এটাকে একটা প্রিপ্রোগ্রামড ব্যবহার বলা যায় যা কিনা বিবর্তনের মাধ্যমেই আমাদের মাঝে এসেছে, এর এক অন্যতম উদাহরণ হল, যেসব মানুষ জন্ম থেকেই অন্ধ, তারাও স্বাভাবিক মানুষের মতোই একই পরিস্থিতিতে একইরকমভাবে হাসে।

হাসি কেন সংক্রামক?

ঘরভর্তি মানুষের মাঝে যদি কেউ হাসে, তাহলে দেখা যাবে, আশেপাশের প্রত্যেকে কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করছে। প্রতিটা মানুষই যেন চেতনভাবে কিংবা অবচেতনে হাসছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কেউ কারো দিকে তাকিয়ে হাসে তখন অপরপক্ষের ব্যক্তির মুখের কাঠিন্য বজায় রাখা কঠিন। কাউকে হাসতে দেখতে আমাদের মিরর নিউরন উদ্দীপিত হয়। মিরর নিউরন হলো মস্তিষ্কের বিশেষ এক ধরনের কোষ। ব্যক্তি নিজে কোনো কাজ করলে মস্তিষ্ক যেভাবে সাড়া দিতো, ঠিক একইভাবে সাড়া দেয় কাজটি কাউকে করতে দেখলে।

এর সাধারণ কোনো উদাহরণ দিলে দেখানো যায়, কোনো দুঃখী মানুষকে দেখে আমাদের সহানুভূতি তৈরি হয়, কিংবা কাউকে ভয় পেতে দেখলে কিছুটা ভয় আমাদেরকেও স্পর্শ করে। কাউকে হাসতে দেখলে মিরর নিউরনের প্রভাবে আমাদের মুখের পেশীর উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। না চাইলেও আমরা প্রিয় মানুষের হাসি দেখে নিজেদের অজান্তেই হেসে ফেলি। তাই হাসি সংক্রমিত হয়, এই কথাটি একদম বিজ্ঞানসম্মত।

তো এরপর থেকে মন খারাপ থাকলে হাসিখুশি মানুষের সাথে মিশুন। তাদের সাথে সময় কাটান। বিজ্ঞান বলছে, তাদের সংস্পর্শে আপনার মুখেও হাসি ফুটবে।

নেপথ্য বিজ্ঞান

যখন কেউ হাসে তখন কী পরিবর্তন ঘটে তার মস্তিষ্কে? একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। ধরুন, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। দেখলেন আপনার টেবিলের উপর রঙিন কাগজে মোড়া একটা উপহার। উপরে লেখা আছে প্রিয় কোনো মানুষের নাম। মুখের রেখা বদলে গিয়ে হাসি ফুটে উঠবে নিশ্চয়।

অপ্রত্যাশিত বা ভালো লাগার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে মস্তিষ্কের কর্টেক্স থেকে স্নায়ুর সংকেত যায় প্রথমে ব্রেইনস্টেমে। সেখান থেকে প্রক্রিয়া শেষে এই সিগন্যাল যায় মুখের স্মাইলিং মাসলে। মুখে তখন ফুটে ওঠে প্রথম হাসির রেখা। এই কাজটির পেছনে ভূমিকা রাখে এনডরদিন নামক এক উপাদান।

সেই হাসি আবার শুরু করে পজিটিভ ফিডব্যাক চক্র। যখন প্রথম স্মাইলিং মাসল কাজ করে, তখন মস্তিষ্কে আবার সিগন্যাল যায়। এটি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। ফলে আরো বেশি এনডরফিন নিঃসৃত হয়। সেটি আবার কাজ করে স্মাইলিং মাসলে। তারপর আবার সিগন্যাল যায় মস্তিষ্কে। এভাবে একটা চক্র চলতে থাকে। যখন আমরা হাসি তখন আমাদের মস্তিষ্ক ভালো অনুভব করে। ফলে আমরা আরো হাসি, এবং তাতে মস্তিষ্ক আরো সুখী হয়। এভাবে হাসি চলতে থাকে দীর্ঘ সময়।

যেহেতু হাসিতে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম উদ্দীপিত হয়, তাই একে তুলনা দেওয়া যায় হঠাৎ উপহার পাওয়া বা চকলেট খাওয়া কিংবা লটারি পাওয়ার মতো কোনো অনুভূতির সাথে। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, হাসির মাধ্যমে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম ততটা উদ্দীপিত হওয়া সম্ভব যতটা হতে পারে ২ হাজারটি চকলেট কিংবা কয়েক লক্ষ টাকা পেলে।

সুখী হওয়ার জন্য টাকা কিংবা চকলেটের মতো জিনিসের প্রয়োজন নেই। আপনার প্রাণখোলা হাসিই পারে আপনাকে সেই আনন্দ দিতে। ‘কোটি টাকার হাসি’ কথাটার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে বলা যায়! তাই নিজেকে ভালো রাখতে হাসুন মন খুলে। এমনকি হাসি না পেলেও মিথ্যা হাসি হাসুন। এটি পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে রিওয়ার্ড সিস্টেমকে সচল করে আপনাকে এনে দিতে পারে ভালো লাগার অনুভূতি। জীবনে হাসিখুশি মানুষের সঙ্গ তাই খুব জরুরী।

নকল হাসি

আমরা যখন হাসি, তখন প্রধানত মুখের দুই ধরনের পেশী সক্রিয় হয়। একটি হলো জাইগোম্যাটিকাস মেজর মাসল। এটি গালের ঠিক দুই পাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এটিই শুধু কাজ করে তখন সেটা আসলে সত্যিকারের হাসি নয়। একে সামাজিক হাসি বলা যায়। যেমন অপ্রিয় কোনো মানুষের সাথে দেখা হলেও ভদ্রতার খাতিরে আমরা যে ধরনের হাসি হেসে থাকি তা।

দ্বিতীয়টি হলো অরবিক্যুলারিস অক্যুলি মাসল, যা আমাদের চোখের চারপাশ ঘিরে থাকে। যখন আমাদের হাসিতে আন্তরিকতা থাকে, কিংবা আমরা সত্যিই খুশি হই, তখন এই মাসল কাজ করে। সেই হাসিই বিশুদ্ধ যে হাসিতে আমাদের চোখও হাসে।

চিত্র: সত্যিকারের হাসি এবং সামাজিক হাসিতে মুখের ভিন্ন ভিন্ন মাংসপেশি কাজ করে।

স্বাস্থ্যের উপর হাসির প্রভাব

গবেষকরা বলছেন, ক্লান্তিকর অবস্থায় হাসিমুখে কাজ করা ইতিবাচক। কেননা, হাসি ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। আপনি যখন হাসিমুখে কাজ করবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন ভেবে নেবে আপনি ভালো আছেন এবং সুখী আছেন। ফলে আপনার মুড ভালো থাকবে, কাজের প্রতি মনোযোগও বাড়বে, বাড়বে কর্মদক্ষতা।

বলা হয়ে থাকে, মন খুলে হাসলে শরীর এবং মন দুটোই অনেকটা সতেজ হয়। একে একটা ভালো ঘুমের পরের অবস্থার সাথে তুলনা দেয়া যায়। মানুষ যখন শিশুদের সংস্পর্শে থাকে, তখন অনেক বেশি সুখী অনুভব করে। কারণ বাচ্চারা বড়দের তুলনায় বেশি হাসে। ফলে তারাও হাসে। পজিটিভ ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে এটি আমাদের মাঝে আরো পজিটিভ ইমোশন তৈরি করে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪০০ বার হাসে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হাসির সংখ্যা দিনে মাত্র ২০ বার।

বায়োকেমিক্যাল-এর দৃষ্টিকোণ থেকেও এর ব্যাখ্যা দেয়া যায়। ক্লান্তির ফলে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। মানসিক অবসাদগ্রস্থতা থেকে শুরু করে স্থূলতা, হার্ট ডিসিসের মতো ভয়ংকর রোগের সূচনা করতে পারে এটি। হাসলে পরে হাসি সেই হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। তাছাড়া হাসি উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করে।

মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির ইতিবাচক কিছু প্রভাব আছে। নিউরোট্রান্সমিটার হলো কিছু শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদান। এগুলো আমাদের শারীরিক, মানসিক এবং কগনিটিভ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

ঘুম, ব্যথা, ওজন এমনকি মানসিক অবস্থাও এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই নিউরোট্রান্সমিটারের কোনো ধরনের ভারসাম্যহীনতা কিংবা সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে স্থূলতা, অ্যালকোহল, ক্যাফেইন ও নিকোটিনের প্রতি আসক্তি, হতাশা, প্যানিক অ্যাটাক, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের মতো আরো অনেক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যেহেতু নিউরোট্রান্সমিটারের উপর হাসির কিছু প্রভাব আছে, তাই সাধারণ হাসিখুশি জীবন আপনাকে শারীরিক ও মানসিক অনেক ধরনের জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সব মিলিয়ে আপনার দীর্ঘজীবী হওয়ার পেছনে হাসির একটা বড় ভূমিকা আছে।

আপনার হাসিমুখ আপনাকে অন্যদের কাছে আরো বেশি বিশ্বাসযোগ্য, আন্তরিক এবং আকর্ষণীয় করে তোলে। স্কটল্যান্ডের ফেইস রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক পরীক্ষায় একদল নারী এবং পুরুষকে কিছু মানুষের ছবি দেখিয়ে তাদের আকর্ষণীয়তার উপর রেটিং করতে বলা হয়।

দেখা যায়, ছবিতে যারা হাসিমুখে আছে তারা এগিয়ে আছে। যারা একদমই হাসেনি তাদের থেকে আকর্ষণীয়তার দিক থেকে বেশি রেটিং পেয়েছে। টিভিতে আমরা সেলিব্রিটিদের যেকোনো ইন্টারভিউ কিংবা অনুষ্ঠানে ঘন ঘন হাসতে দেখি। এতে তাদেরকে একইসাথে বেশি তারুণ্যময় ও বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

মাদার তেরেসার একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শেষ করছি। We shall never know all the good that a simple smile can do”। তাই হাসিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলুন। হাসুন, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.livescience.com/34056-evolution-smiling.html
  2. https://www.auraortho.com/a-brief-history-of-smiling-laughter/amp/
  3. https://sunwarrior.com/healthhub/15-health-benefits-of-smiling
  4. https://www.scientificamerican.com/article/how-did-the-smile-become-a-friendly-gesture-in-humans/
  5. https://www.pickthebrain.com/blog/the-science-behind-smiling/
  6. https://blog.bufferapp.com/the-science-of-smiling-a-guide-to-humans-most-powerful-gesture
  7. https://www.britishcouncil.org/voices-magazine/famelab-whats-science-behind-smile
  8. http://www.apa.org/monitor/oct05/mirror.aspx
  9. https://www.sciencedaily.com/releases/2016/02/160211140428.htm

প্রাণিজগতের কিছু অদ্ভুত হৃৎপিণ্ড

হৃৎপিণ্ড। বুকের বাম পাশের এই ঢিপ ঢিপ করতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটা ঠিক কবে কীভাবে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বলা কঠিন। সত্যিকার অর্থে হৃৎপিণ্ড ঠিক বামদিকে থাকে না। থাকে আমাদের শরীরের মাঝবরাবর ঘেঁষে বামদিকে। আর হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপারও হৃৎপিণ্ডে ঘটে না। ভালোবাসার প্রতীক হৃদয় ও সত্যিকারের হৃদয় দেখতেও এক নয়। প্রেম যদি হয়ে থাকে তবে তার উৎপত্তি মস্তিষ্কে যা আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রস্থল।

অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কাজ রক্ত সঞ্চালন করা। আমাদের দেহের সবখানে রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর প্রধান কাজ। হ্যাঁ, ভালোবাসার মানুষটিকে দেখলে আমাদের হার্টবিট বেড়ে যায় বটে। তার পেছনেও কারণ আছে। সংক্ষেপে বললে, এর কারণ এড্রেনালিন ক্ষরণ।

যখন পছন্দের মানুষটিকে আমরা দেখি তখন মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায় এড্রেনাল গ্ল্যান্ডে। সেখান থেকে হরমোন নিঃসরণের কারণেই পরবর্তীতে হার্টবিটসহ অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার ঘটে। এ কারণেই ভালোবাসলে অথবা ভালোবেসে কষ্ট পেলে হৃদয়ে তা অনুভব করি বেশি।

তবে আমাদের আজকের আলোচনা এই দিক নিয়ে নয়। এমনকি মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়েও নয়। প্রাণিজগতের কয়েকটি প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের কথা আলোচনা থাকবে এখানে। এদের হৃৎপিণ্ড আমাদের চেয়ে আলাদা এবং কিছুটা অদ্ভুত রকমের।

মানুষের স্বাভাবিক হার্টবিট প্রতি মিনিটে ৭২ বার। কিন্তু কাঠবেড়ালির হার্টবিট প্রতি মিনিটে মাত্র ৫ বার। উড়তে থাকা ছোট্ট হামিংবার্ডের হার্টবিট মিনিটে অন্তত ১২৬০ বারের মতো। অবাক করা ব্যাপার। আমাদের হৃৎপিণ্ডের ভর বড়জোর ৩০০৩১০ গ্রাম। অন্যদিকে একটি জিরাফের হৃৎপিণ্ডের ভর প্রায় ১২ কেজি। জিরাফের লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্যে বড় আর শক্তিশালী হৃৎপিণ্ডের প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাণিজগতে আরো কিছু ব্যতিক্রমী ।

তিনপ্রকোষ্ঠের হৃৎপিণ্ড

স্তন্যয়ায়ী প্রাণী (যেমন মানুষ) ও পাখিদের হৃৎপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ চারটি করে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের হৃৎপিণ্ডে থাকে তিন প্রকোষ্ঠ। দুইটি অলিন্দ আর মাত্র একটি নিলয় দিয়ে তাদের হৃৎপিণ্ড গঠিত।

সাধারণত পুরো শরীর থেকে অক্সিজেনবিহীন রক্ত হৃৎপিণ্ডে আসে। এরপর সেখান থেকে এ রক্ত ফুসফুসে যায় যেন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশতে পারে। তারপর তা আবার হৃৎপিণ্ডে আসলে হৃৎপিণ্ড সেই রক্ত পাম্প করে সমগ্র শরীরে পাঠিয়ে দেয়। মানুষের হৃৎপিণ্ডে এই অক্সিজেনযুক্ত আর অক্সিজেনবিহীন রক্ত আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে থাকে। কিন্তু ব্যাঙের বেলায় একটা মাত্র নিলয়ে ট্র্যাবেকুলি নামক বিশেষ খাঁজের মাধ্যমে এই দুই ধরনের রক্ত আলাদা থাকে।

তিমির বিশালাকার হৃৎপিণ্ড

চিত্র: তিমির হৃৎপিণ্ড আস্ত মানুষের চেয়েও বড়

প্রায় ছোটখাটো একটা গাড়ির সমান বড় এবং ওজন প্রায় ৪৩০ কেজি। নীল তিমির হৃৎপিণ্ড জীবিত সকল প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের মতো এদের হৃৎপিণ্ডও চারপ্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। প্রায় দুটি স্কুলবাসের সমান বিশালাকার তিমির দেহে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই যন্ত্রটিই কাজ করে থাকে।

সেফালোপডদের তিন হৃৎপিণ্ড

অক্টোপাস, সস্কুইড, কাটলফিসসহ কর্ষিকাযুক্ত এই শামুক প্রজাতির হৃৎপিণ্ড অন্তত তিনটি। একদিকে শরীরের দুইপাশে দুটি হৃৎপিণ্ড ফুলকার রক্তবাহিকার মাধ্যমে আসা রক্তকে অক্সিজেনযুক্ত করে। অন্যদিকে শরীরের কেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড সে অক্সিজেনযুক্ত রক্তকে পাম্প করে পুরা শরীরে ছড়িয়ে দেয়।

সেফালোপডরা মূলত নীল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী। এদের রক্তে কপারের উপস্থিতি রয়েছে বলে রক্ত নীল দেখায়। মানুষের রক্ত লাল কারণ মানুষের রক্তে রয়েছে রয়েছে হিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের আছে আয়রন। অক্সিজেনযুক্ত হলে আয়রনের রঙ হয় লাল। কিন্তু সেফালোপডদের বিশেষ উপাদানের কারণে সেখানে অক্সিজেনযুক্ত রক্তের রঙ হয় নীল।

তেলাপোকার হৃৎপিণ্ড

তেলাপোকার রক্তসংবহনতন্ত্র হলো মুক্ত প্রকৃতির। অর্থাৎ এতে কোন ধমনীশিরা নামক আলাদা রক্তসরবরাহকারী নালী থাকে না। তার বদলে ১২ থেকে ১৩ প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট অঙ্গের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।

তেলাপোকার দেহপৃষ্ঠের অবস্থিত সাইনাস এই ১৩ প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হৃৎপিণ্ডে রক্ত পাঠাতে সহায়তা করে। কিন্তু এই হৃৎপিণ্ডকে তেলাপোকার দেহে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহের কাজ করতে হয় না। কারণ তেলাপোকার দেহে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র আছে। এদের স্পিরাকল বলে। এই এদের মাধ্যমে তেলাপোকার রক্ত বাতাস থেকে অক্সিজেন পেয়ে থাকে। তাই অক্সিজেন পাওয়ার জন্যে রক্তকে দেহের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হয় না। তবে এদের হৃৎপিণ্ড কী কাজে লাগে? এদের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সমগ্র শরীরে প্রবাহিত হয়।

নকল হৃৎপিণ্ড

কেঁচোরা ‘হৃদয় দেয়া নেয়া’ করতে পারে না। কেননা এদের হৃৎপিণ্ডই নেই। এর বদলে এদের ৫টি ছদ্মহৃৎপিণ্ড থাকে। এগুলো খাদ্যনালীকে জড়িয়ে থাকে। এই ছদ্মহৃৎপিণ্ডগুলো রক্ত পাম্প করে না। বরং রক্তবাহিকাকে সংকুচিত করে রক্ত সরবরাহে সাযাহ্য করে। কেঁচোদের ফুসফুসও থাকে না। এরা দেহের সিক্ত আবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে।

মাটির নীচে কিংবা উপরে যখন কেঁচো সিক্ত থাকে তখন দেহাবরণের মাধ্যমে অক্সিজেন শোষণ করে কোষে প্রেরণ করে। এদের রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকে যা অক্সিজেন বহন করে। কিন্তু মানুষের মতো রক্তসংবহনতন্ত্র বদ্ধ নয়, মুক্ত প্রকৃতির।

জলজ প্রাণীদের হৃৎপিণ্ড

যদি কোনো কারণে হৃদয় ভেঙে যায় তো জেব্রাফিশ তা আবার নতুন করে বানিয়ে নিতে পারে। হ্যাঁ, ২০০২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিখ্যাত সাময়িকী সায়েন্স জানায়, জেব্রাফিশ তাদের মাত্র দুই মাসের মধ্যে তাদের হৃৎপিণ্ড পুনরায় তৈরি করতে পারে।

মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজে নিজেই ক্ষতিপূরণ করে নিতে পারে। উভচর আর টিকটিকি তাদের লেজ পুনরোৎপাদন করতে পারে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড? এমনটা সাধারণত দেখা যায় না। জেব্রাফিশের হৃৎপিণ্ড পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতার নমুনা থেকে ভবিষ্যতে হার্ট সম্বন্ধীয় ব্যাপারে আবিষ্কার হতে পারে চমৎকার কিছু।

অ্যাটাকামা’র মমি রহস্য

মমি– নামটা শুনলেই মানসপটে ভেসে ওঠে প্রাচীন মিশর ও পিরামিডের ছবি। এককালের মহা প্রতাপশালী ফারাও রাজারা মৃত্যুর পরও অমর হয়ে রয়েছেন এই মমির মাধ্যমে। তবে মৃতদেহকে মমি বানিয়ে অবিনশ্বর বানানোর চেষ্টা যে শুধু মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চীন, লিবিয়া, সাইবেরিয়া, ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশেও অতীতে মমিকরণের খোঁজ মিলেছে।

কিছু মমি ছিল মানবসৃষ্ট। আবার কিছু মৃতদেহ প্রাকৃতিকভাবেই মমিতে পরিণত হয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব মমির খোঁজ পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে একটা ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। মমিগুলো এককালে জীবন্ত মানুষ ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিতে ক্ষুদ্র কিন্তু অদ্ভুত এমন এক মমির খোঁজ মেলে। সাধারণ মানবদেহের কাঠামোর সাথে যার অনেক বৈশিষ্ট্যই বিরোধিতা করে।

আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমে অবস্থিত চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শুষ্কতম স্থান। বছরে সর্বোচ্চ এক মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় এখানে। এমন জায়গাও রয়েছে এই মরুভূমিতে, যেখানে কোনোদিনই বৃষ্টিপাত হয়নি। প্রায় এক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত এই জনমানবহীন স্থানে প্রাণের সন্ধান মেলে কদাচিৎ।

তবে ৭০০০ থেকে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এখানে ‘চিনচিরো’ উপজাতির বসবাস ছিল। বর্তমানে যেসকল গোষ্ঠী এখনো টিকে আছে, তাদের অধিকাংশেরই বাস সাগরের অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায়। এর মূল কারণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে বসবাসের জন্য তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়।

চিত্র: অ্যাটাকামা মরুভূমি হতে প্রাপ্ত মমি

মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম মমি নিয়ে। ২০০৩ সালে অস্কার মুনোজ নামের একজন শখের সংগ্রাহক এই অ্যাটাকামা মরুভূমিতে বেড়াতে আসেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে যান এর লা নোরিয়া নামক স্থানে। অ্যাটাকামার এই জায়গাটিকে বলা হয় ঘোস্ট ভিলেজ। কারণ বহু আগে এখানে মানুষের বসবাস থাকলেও এখন সে জায়গা পুরোপুরি পরিত্যক্ত।

মুনোজের ভাষ্যমতে তিনি সেখানে চামড়ার থলেতে মোড়ানো এক টুকরো সাদা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। সংগ্রাহকের স্বভাবজাত কৌতূহলবশত তিনি কাপড়টা অনাবৃত করলে একটি ক্ষুদ্র মানবসদৃশ প্রাণীর কঙ্কাল দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে কঙ্কাল মনে হলেও পরে এর চামড়ার আস্তরণ ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে তিনি বুঝলেন এটি আসলে একটি মমি।

দৈর্ঘে ৬ ইঞ্চি লম্বা মমিটির মাথা ছিল সাধারণ মানুষের মাথার তুলনায় অনেকাংশে লম্বা এবং চোখা। অক্ষিকোটর দুটোও ছিল অস্বাভাবিক রকমের বড় এবং প্রায় ত্রিকোণাকার। ছিল লিকলিকে লম্বা দুটো হাত ও পা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের বক্ষপিঞ্জরে হাড় থাকে ১২ জোড়া, কিন্তু এর বুকে হাড়ের সংখ্যা ছিল ১০ জোড়া।

আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এটি তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকায় মমিটি সকলে কাছে প্রায় অজানাই ছিল। এটি সর্বপ্রথম জনসম্মুখে আসে ২০০৯ সালে, যখন স্পেনের বার্সেলোনায় গবেষকদের সামনে একে উন্মোচন করা হয়।

চিত্র: অ্যাটা

এরও প্রায় চার বছর পর, ২০১৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী গ্যারি নোলান মমিটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এরপর একে একে বের হতে থাকে চমকপ্রদ সব তথ্য। প্রাপ্তিস্থান অ্যাটাকামার সাথে মিল রেখে তিনি মমিটির নামকরন করেন অ্যাটা।

নানা মুনির নানা মতের মতো অ্যাটাকে দেখার সাথে সাথেই বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ দেয়া শুরু করেন। কেউ বললেন এটি স্রেফ একটা গুজব, পুরোটাই ধোঁকাবাজি, মানুষের কারসাজি। কেউ কেউ বললেন এটি হয়তো আসলেই অজানা কোনো প্রজাতি বা এলিয়েনের নমুনা। আবার অনেকে বললেন, দেখতে যেমনই হোক, এটি আসলে একটি মানুষ।

অ্যাটাকে ধোঁকাবাজি হিসেবে দাবি করা মানুষগুলোর ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর খুব তাড়াতাড়িই মিলে গেল। এর দেহ হতে প্রাপ্ত ডিনএনএ’র নমুনা বিশ্লেষণ করে নোলান প্রমাণ করলেন, অ্যাটা কোনো মানবসৃষ্ট ধোঁকা নয়, সে এককালে জীবিত থাকা পরিপূর্ণ একটি প্রাণের নমুনা।

প্রাণ পর্যন্ত তো হলো। বাকি রইলো একটি প্রশ্ন- অ্যাটা কি এককালে মানুষ ছিল? নাকি অন্যকিছু?

অ্যাটার বক্ষপিঞ্জরে যে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় সেখানে তার হৃদপিণ্ড ও ফুসফুস ছিল। অত্যন্ত শুষ্ক স্থানে থাকার কারণে বহুকাল পরও তার দেহ প্রায় অক্ষত রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাটা’র মমিকে এক্স রে, ক্রোমাটোগ্রাফি ও জেনেটিক স্যাম্পলিং করে একে মানুষ বলেই ঘোষণা করলেন নোলান।

কিন্তু গবেষণার একটি ফল নোলানের এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। অ্যাটার ডিএনএ’র ৯১ শতাংশ মানুষের জিনোমের সাথে মিললেও বাকি ৯ শতাংশ মেলে না। নোলানের মতে, এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের অংশটুকুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, পুরো জিনোমের ক্ষেত্রে নয়। তবে এরপরও প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ মানব ভ্রূণের অনেক বৈশিষ্টের সাথেই অ্যাটার বৈশিষ্ট খাপ খায় না।

অ্যাটার করোটিতে পরিপূর্ণ দাঁতের সন্ধান পাওয়া। তার হাত ও পায়ের অস্থির গঠন ৬/৭ বছরের একটি শিশুর অস্থির গঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। মাত্র ৬ ইঞ্চি লম্বা একজন মানুষের হাড় ৬/৭ বছরের শিশুর মতো দৃঢ় কেন হবে? অপরিণত একটি মানুষের পূর্ণ বিকশিত দাঁত কীভাবে হয়? শিশু জন্মের কয়েক বছর পরই না দাঁত উঠে, তা-ও আবার থাকে অবিকশিত।

এই প্রশ্নে আবারো অ্যাটার আদি পরিচয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভক্ত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে অ্যাটার মালিক তাকে বিক্রি করে দিলে সে চলে যায় স্পেনের এক সংগ্রাহকের হাতে। ফলে থেমে যায় তাকে নিয়ে চলতে থাকা গবেষণা।

চিত্র: অ্যাটার আকার খুবই ছোট

২০১৮ সালে অ্যাটাকে নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়। এর নেতৃত্ব দেন গ্যারি নোলান এবং তার সহকর্মী অতুল বাট। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে তারা অ্যাটার ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা তথ্য বের করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব তথ্য হয়তো হয়তো বলছে এটি কোনোভাবেই এলিয়েন নয়, কিন্তু তারপরেও সেসব তথ্য কোনো অংশে কম বিস্ময়কর নয়।

গবেষণায় তারা জানতে পারেন, ভ্রূণ অবস্থাতেই অ্যাটার মৃত্যু হয়। ক্রোমোসোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে অ্যাটা ছিল একজন নারী এবং সে আসলে তৎকালীন অ্যাটাকামা অঞ্চলেরই স্থানীয় কোনো বাসিন্দার সন্তান।

মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৬ সপ্তাহের মতো। সাধারণত মৃত্যুর পর যত দিন যায়, ডিএনএ সূত্রগুলো খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ছোট হতে থাকে। সেই তুলনায় অ্যাটার ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্ট যথেষ্ট লম্বা। এ থেকে ধারণা করা হয় যে অ্যাটার এই মমির বয়স ৫০০ বছরের বেশি নয়।

গবেষকদের মতে, ভ্রূণ অবস্থায় অ্যাটার শরীরে প্রায় ৫৪ রকমের মিউটেশন ঘটে। এরই বহিঃপ্রকাশ অ্যাটার এই অস্বাভাবিক অবয়ব। প্রথম দেখায় অনেকেই বলবে এটা পৃথিবীর কোনো প্রাণ নয়, এটা নির্ঘাত এলিয়েন। মিউটেশনগুলোর মধ্যে বামনত্ব (Dwarfism) এবং প্রোজেরিয়া (Progeria) অন্যতম।

বেশ কিছু মিউটেশনের ধরন এখনো গবেষকদের কাছে অজানা। এগুলো সম্পর্কে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরিতে স্টেম সেলের মাধ্যমে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এই ৫৪টি মিউটেশন ঘটানো এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলোর বিকাশ ও ফলাফল পর্যপেক্ষণ করা। আরেকটি উপায় হচ্ছে অ্যাটার ডিএনএ’র ময়নাতদন্ত করা, যার মাধ্যমে হয়তো আমরা তার অতীতকে ঘেঁটে তার বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করতে পারব।

ছোট্ট একটা শরীরে এতগুলো মিউটেশনই অ্যাটার মৃত্যুর মূল কারণ। তার ১০ জোড়া বুকের পাঁজর, ভ্রূণ অবস্থায়ও প্রায় পরিপূর্ণ হাত ও পায়ের অস্থি, পূর্ণ বিকশিত দাঁত- সবই মিউটেশনের ফল হিসেবে ধারণা করা হয়। মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই তার মাথা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যার কারণে দেহের তুলনায় মাথার আকার বড় হয়ে যায়। অক্ষিকোটরও হয়ে যায় ত্রিকোণাকার। কিন্তু একটি সদ্য সৃষ্ট ভ্রূণের মধ্যে একসাথে এতগুলো মিউটেশন কীভাবে হওয়া সম্ভব, এর উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনো দিতে পারেননি।

চিত্র: কিশতিম ডোয়ার্ফ মমি

তবে এই মমিটিকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে অতিপ্রাকৃত গল্পই বেশি প্রচলিত রয়েছে। কারণ যিনি এটিকে সর্বপ্রথম পান, তিনি একে পাওয়ার কিছুদিন পরই পাগল হয়ে যান। এবং মমিটিও নিখোঁজ হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজনেরা বলাবলি শুরু করে যে মমিটিকে তার প্রজাতির অন্যান্য সদস্যরা ইউএফওতে করে এসে তুলে নিয়ে গেছে!যদিও অ্যাটার এই অদ্ভুত ডিএনএ মিউটেশন বিজ্ঞানীমহলে মানবভ্রূণ ও এর জিনগত বৈশিষ্ট নিয়ে নতুন প্রশ্নের উদ্ভব ঘটিয়েছে, কিন্তু এরকম মমির সন্ধানলাভ কিন্তু এই প্রথম নয়। অ্যাটারও পূর্বে, ১৯৯৬ সালে রাশিয়ার কিশতিম শহরে এরকম খর্বাকৃতির একটি মমি পাওয়া যায়, যার নামকরণ করা হয় ‘কিশতিম ডোয়ার্ফ’।

বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে কল্পনাকেও হার মানায়। চিলির অ্যাটাকামা মরুভূমির প্রাচীন কন্যা অ্যাটা তারই এক জলন্ত প্রমাণ। গবেষকরা অ্যাটাকে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে অনেক সময় নিজেরাই চমকিত হয়েছেন। শিম্পাঞ্জীর সাথে মানুষের যেখানে ৯৬ শতাংশ জিনোম মিলে যায়, সেখানে মাত্র ৯১ শতাংশ মিল নিয়ে অ্যাটা কীভাবে মানুষ হতে পারে, সে প্রশ্ন অনেকের মনেই রহস্যের উদ্রেক ঘটায়।

ডিনএনএ পোস্ট মর্টেম ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা অ্যাটাকে পুরোপুরিভাবে জানতে পারবো। তার আগে ততদিন পর্যন্ত সে অ্যাটাকামা’র বিস্ময় হয়েই থাকবে আমাদের সকলের কাছে।

তথ্যসূত্র

  1. https:// nytimes.com/2018/03/22/science/ata-mummy-alien-chile.html
  2. https:// usatoday.com/story/news/world/2018/03/23/mystery-solved-alien-mummy- human-after-all/453323002/
  3. https://gizmodo.com/alien-mummy-found-in-atacama-desert-is-actually-a-tiny-1823988455

২০ ফুট লম্বা ফিতাকৃমি

চীনের মধ্যাঞ্চলে সাধারণত ফিতাকৃমির সংক্রমণ হয় না। পরিবেশগত কারণেই হয়তোবা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে এর উৎপাত কম। কিন্তু ২০১৬ সালের শুরুর দিকে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। ডাক্তাররা এক ব্যক্তির অন্ত্রে খুঁজে পান ২০ ফুট লম্বা এক ফিতাকৃমি। একে তো ঐ অঞ্চলে এধরনের সংক্রমণ কম তার উপর এত বেশি লম্বা হওয়াতে অবাক হয়ে যায় সবাই। দুই বছর ধরে এই কৃমিটি বাস করছিল ঐ লোকের দেহে।

image source: express.co.uk

জানা যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কাঁচা মাংস খেতে ভালোবাসেতেন, নিয়মিতই খেতেন সেদ্ধ না করা মাংস। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই বছর ধরে লেগেই থাকে অসুস্থতা। বমি হতো, ক্ষুধামন্দা লেগে থাকতো, খেতে ইচ্ছে করতো না, পায়ুপথে ব্যথা করতো, শরীর দুর্বল লাগতো, আর ধীরে ধীরে ওজন কমতো। এক পর্যায়ে তিনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

ডাক্তার তার মলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখতে পান তাতে ফিতাকৃমির ডিমের অস্তিত্ব আছে। এধরনের কৃমি দেহে থাকলে দেহের সকল শক্তি শুষে নেয়। খাদ্য খেলে সেসবের পুষ্টি শরীরে না গিয়ে যায় ঐ কৃমির পেটে। অসুস্থ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক এক্ষেত্রে। সব দেখে ডাক্তার কৃমিনাশকের চিকিৎসা দিলেন। ওষুধ খাবার পর মাত্র ৩ ঘণ্টা পর বেরিয়ে আসে ২০ ফুট ৪ ইঞ্চি লম্বা ফিতাকৃমি।

image source: sites.google.com

এই ঘটনার খবর এবং কৃমির আদি-অন্ত প্রকাশিত হয় দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ। কৃমিটির বৈজ্ঞানিক নাম Taenia saginata

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

featured image: medicaldaily.com

আমিনা গুরিব-ফাকিম

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ-রাষ্ট্র মরিশাসে জন্ম তার। গাছের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ। আগ্রহ বায়োডাইভার্সিটি নিয়ে। এ্যারোমেটিক এবং মেডিসিনাল হার্ব কিংবা ফুল নিয়ে কাজ করতেন। এগুলোর বৈশিষ্ট্য জানার জন্য কখনো কখনো চলে যেতেন কবিরাজদের কাছে। বাওবাব গাছ তার সবচে প্রিয়। এতো এতো কাজে ব্যবহার হয় এ গাছ!

আমিনা ভাবতো, আমরা গাছদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। বেনজয়িনের কথাই ধরা যাক। তারা কত চতুর, পাতার আকার পরিবর্তনের পাশাপাশি আকৃতিও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। গাছেরা হলো জীববিজ্ঞানের জীবন্ত গবেষণাগার। পরবর্তীতে তিনিই একসময় মরিশাসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তখন জীববিজ্ঞানের জন্য অনেক কর্মকাণ্ড করেন।

featured image: dw.com

স্ট্রোকের সময় কী ঘটে দেহে?

প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোথাও না কোথাও একজন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এবং প্রতি ৬ জন মানুষের একজন তার জীবনকালে একবার হলেও স্ট্রোকের শিকার হয়।

মস্তিষ্কের রক্তনালী আঘাতগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে অপর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহের ফলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হয় এবং স্নায়ুকোষের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনাকে স্ট্রোক বলে।

স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী প্যারালাইসিসের শিকার হওয়াটা স্বাভাবিক। বর্তমানে মানুষের মৃত্যূর জন্য খুব সাধারণ একটি কারণ হলো স্ট্রোক। যখন কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসা অপরিহার্য। নইলে মস্তিষ্কে হয়ে যেতে পারে চিরস্থায়ী ক্ষতি।

স্ট্রোকে কেন মানুষ আক্রান্ত হয়?

আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। অক্সিজেনের অভাবে কোনো কোষ জীবিত থাকতে পারে না। এই অক্সিজেন প্রতিটি কোষে সরবরাহ হয় রক্তের মাধ্যমে। আমাদের মস্তিষ্ক যদিও সমগ্র দেহের ভরের মাত্র ২% বহন করে কিন্তু সারা দেহে সরবরাহকৃত অক্সিজেনের ২০% খরচ করে এই মস্তিষ্ক।

মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ধমনীর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ক্যারোটিড ধমনী মস্তিষ্কের সম্মুখ অংশে এবং ভার্টিব্রাল ধমনী মস্তিষ্কের পশ্চাৎ অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে।

এই দুই ধমনী পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে Circle Of Willis গঠন করে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তনালীতে বিভক্ত হয়ে যায়। ক্ষুদ্রতুম অংশে বিভক্ত হয়ে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এ সকল রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হলে স্নায়ুকোষে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাবে স্নায়ুকোষগুলো মারা যেতে শুরু করে। একেই আমরা স্ট্রোক বলি।

চিত্রঃ ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল ধমনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় Circle of Willis

স্ট্রোক দুই প্রকার। হ্যামোরেজিক স্ট্রোক (Hemorrhagic Stroke) ও ইসকিমিক স্ট্রোক (Ischemic Stroke)। আঘাত বা অন্য কোনো কারণে যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে থাকে এবং রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ঐ ব্যক্তি হ্যামোরেজিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। আর ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী আঘাতপ্রাপ্ত না হয়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মস্তিষ্কের রক্তনালীকে বন্ধ করে দেয়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ঐ ব্যক্তি ইসকিমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়। এই স্ট্রোকই বেশি পরিমাণে ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আঘাত বা রক্তপাত ব্যতীত এই রক্ত জমাট বাঁধে কীভাবে?

মাঝে মাঝে, হৃৎপিণ্ডের সংকোচন ও প্রসারণের ছন্দে গড়মিল দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ডে দুটি অলিন্দ থাকে। মাঝে মাঝে অলিন্দ দুটির স্বাভাবিক সংকোচন ঘটে না। ফলশ্রুতিতে হৃৎপিণ্ড থেকে রক্তের সঞ্চালনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই সুযোগে রক্তে বিদ্যমান অণুচক্রিকা, ক্লটিং ফ্যাক্টর এবং ফাইব্রিন একত্রিত হয়ে জমাট বাঁধা কুণ্ডলী গঠন করে। সেটি রক্তেই ভাসমান থাকে। জমাটবাধা অংশটি রক্তে সাথে প্রবাহিত হতে হতে একসময় মস্তিষ্কের অতি সরু রক্তনালীতে এসে আঁটকে যায়। এই ঘটনাকে বলে এম্বোলিজম (Embolism)।

এম্বোলিজমের কারণে উক্ত রক্তনালীতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ঐ রক্তনালী যেসকল কোষে অক্সিজেন সরবরাহ করতো, সেসকল কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যেতে শুরু করে। মস্তিষ্ক ব্যতীত অন্য কোনো অঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমরা ব্যথা পাই। কিন্তু মস্তিষ্কে ঘটলে ব্যথা পাওয়া যায় না। কারণ মস্তিষ্কে ব্যথা-সংবেদী স্নায়ুকোষ থাকে না।

অক্সিজেন সরবারহ না হওয়ায় স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশ সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কিছু কিছু আচরণগত অস্বাভাবিকত্ব ও লক্ষণ দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশটি ভাষা প্রকাশের কাজ করে থাকে তাহলে ঐ বক্তির স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সমস্যা হবে।

যদি আক্রান্ত অঞ্চল পেশি সঞ্চালনের কাজ করে তবে দেহের কোনো অঙ্গ দূর্বল হয়ে পড়বে এবং নড়াচড়া করতে সমস্যা হবে। এভাবে যদি মস্তিষ্কের অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তবে চিরস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে রক্তে টিস্যু প্লাজমিনোজেন একটিভেটর (TPA) প্রবেশ করানো হয়। এটি রক্তনালীতে আটকে থাকা রক্তকুণ্ডলীকে ভেঙ্গে দেয় এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্ত নালীতে পুনরায় রক্ত প্রবাহ শুরু হয়।

স্ট্রোকের কয়েক ঘণ্টার মাঝে এটি প্রদান করতে পারলে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। যদি কোনো কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে TPA প্রদান করা সম্ভব না হয় (রক্ত কুণ্ডলী অনেক বড় হলে কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত কোনো মেডিসিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকলে) তবে চিকিৎসকরা Endovascular Thrombectomy নামক পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

এ পদ্ধতিতে প্রথমে রক্তে ইনজেকশনের মাধ্যমে ফ্লোরোসেন্ট ডাই প্রদান করা হয়। এরপর শক্তিশালী এক্স-রে যন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কোথায় এবং কোন রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নির্ণয় করা হয়। তারপর একটি অতি সূক্ষ্ম নল পায়ের ধমনী দিয়ে প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রেরণ করা হয়। এই নলের ভিতর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম তন্তুর মাধ্যমে জমাট রক্তকুণ্ডলী বাইরে বের করে আনা হয়।

চিত্র: তন্তু ব্যবহার করে জমাট রক্তকুন্ডলী বের করে আনার কৌশল

স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা প্রদান করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত জরুরী। কেননা সময় যত যেতে থাকবে ক্ষতির পরিমাণ ও তীব্রতা ততই বাড়তে থাকবে। তাই রোগীর আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্ট্রোক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।

কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি স্ট্রোকে আক্রান্ত কিনা তা সনাক্ত করার জন্য Fast Test পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। পদ্ধতিটি নিম্নরূপ।

১) ব্যক্তিকে হাসতে বলা। মুখমণ্ডলে সংকুচিত কিংবা বাঁকা পেশি দুর্বলতার সংকেত বহন করে। যা স্ট্রোকের ফলে হতে পারে।

২) ব্যক্তিকে দুই হাত উপরে তুলতে বলা। যদি পেশি দুর্বলতার জন্য হাত উপরে তুলতে না পারে তবে এটিও স্ট্রোকের লক্ষণ।

৩) কোনো একটি শব্দ বার বার বলতে বলা। যদি ব্যক্তি এটি স্বাভাবিকভাবে বলতে না পারে তবে হতে পারে স্ট্রোকের কারণে তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা প্রকাশ কেন্দ্রে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

উক্ত তিনটি লক্ষণের একটি দেখা মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে স্ট্রোকের প্রকটতা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

তথ্যসূত্র

https://ed.ted.com/lessons/what-happens-during-a-stroke-vaibhav-goswami

featured image: thinkhealth.priorityhealth.com

ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ

এটি আট বছর বয়সী একটি শিশুর ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ। পেট্রিডিশে ব্যাক্টেরিয়ার বৃদ্ধির পুষ্টিকর মাধ্যমে হাতের ছাপ থেকে বংশবিস্তারের মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়ার এ মানচিত্র তৈরি হয়েছে।

image source: boredpanda.com

নিচের ডানদিকের বৃত্তাকার কলোনীটি Bacillus জাতীয় ব্যাক্টেরিয়ায় তৈরি। রঙ্গীন কলোনীগুলো Serratia অথবা Micrococcus কিংবা yeast। এগুলো পরিবেশে এবং চামড়ায় সহজপ্রাপ্য। সাদা ছোট কলোনীগুলো Staphylococcus হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল যা একইভাবে হাতের চামড়ায় বিদ্যমান থাকে। বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং তর্জনীর মাঝের অনুজীবগুলো বহিরাগত জীবাণু।
source: bigganpotrika

featured image: wattafact.com

সাপ যখন উড়ে চলা পাখি

যারা সাপকে ভয় পায়, তাদের জন্য এটা একটা দুঃস্বপ্ন। আর যদি সাপটি এমন হয় যেটা উড়ে উড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে, তাহলে তো কথাই নেই। এই সাপ তাদের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এমন একধরনের সাপ হচ্ছে উড়ন্ত সাপ।

প্রাণিজগতে যেসব প্রাণীর উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে, তারা গবেষকদের কাছে সবসময়ই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। পাখি, বাদুড়, পোকা-মাকড়দের উড়ে বেড়ানো নিয়ে কম গবেষণা হয়নি। এসব প্রাণীর সৃতিবিদ্যা (Kinematics) নিয়ে গবেষণার সাথে সাথে এদের বাতাসে ভেসে চলার গতি নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

কিন্তু যেসব প্রাণীর ডানা নেই, যেমন সাপ, তারা কীভাবে বাতাসে ভেসে চলে সেটা অনেক দেরীতে আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এদের বাতাসে ভেসে যাওয়ার গতি গবেষকদের সবচেয়ে বেশী আশ্চর্য করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গাছে বসবাসরত ৫ প্রজাতির সাপের মধ্যে একধরনের সাপ হচ্ছে এই উড়ন্ত সাপ। ইংরেজিতে এই সাপের পরিচিত নাম হচ্ছে Paradise tree snake। বৈজ্ঞানিক নাম Chrysopelea paradise

অনেকে এ সাপকে গেছো সাপ বলে। সাধারণত সবুজ রঙের হয় সাপগুলো, কিন্তু অন্য রঙেরও হতে পারে। সাপগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা গাছে উঠতে পারে, উঁচু স্থান থেকে লাফ দিতে পারে, মসৃণ গতিতে উঁচু স্থান থেকে নিচু জায়গায় উড়ে যেতে পারে। এমনকি উড়ন্ত অবস্থায় এই সাপগুলো নিজের যাত্রাপথ পরিবর্তনও করতে পারে!

এভাবে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যাতায়াত করে এই গাছ সাপগুলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে একটি সাপ কোনো প্রকার ডানা ছাড়া বাতাসে উড়তে পারে? কী এমন ঘটে এদের শরীরে যেটা এদেরকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে?

এ সাপগুলো প্রথমে গাছের কোনো এক শাখায় পেঁচিয়ে অবস্থান করে। দেহের সামনের  অংশ গাছের শাখার সাথে ঝুলে থাকে। বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার আগমুহূর্তে সাপগুলো একটু উপর দিক করে ঝাঁপ দেয় এবং একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে চলে যায়। গাছের শাখা থেকে যখন সাপগুলো ঝুলে পড়ে, তখন এরা শরীরের সামনের অংশ ‘J’ আকৃতির করে ফেলে এবং এরপর উপরের দিকে ত্বরণ তৈরি করে বাতাসে ঝাঁপ দেয়[১]

এই সাপগুলোর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এরা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। কীভাবে এরা নিজেদের ভার উত্তোলন (Lifting) করে শুধুমাত্র আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়? এ আশ্চর্য প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞানও এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে।

সহজ করে ব্যাখ্যা দিতে হলে এই সাপের গতিপথকে কাগজের বিমানের সাথে তুলনা করা যায়। গাছের শাখা থেকে বের হয়ে সাপগুলো যখন গতিপ্রাপ্ত হয় তখন এরা একটু অন্যরকম আচরণ করে। বাতাসে এরা ‘S’ আকৃতির রূপ নেয় এবং আনুভূমিকভাবে দুই পাশে তরঙ্গায়িত হতে থাকে।

গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই তরঙ্গায়িত হবার ফলে যে কম্পনের সৃষ্টি হয় তা ১.৩ হার্জের। অর্থাৎ এক সেকেন্ডে ১.৩ বার কম্পন সৃষ্টি হয়। এরকম হবার সাথে সাথে সাপের গতিপথ (Gliding path) ছোট হয়ে আসে। এরকম দোলন বা তরঙ্গ প্রাপ্ত হবার কারণে কোনোএকভাবে সাপের নিজের ভারবহন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। বাতাসে এই সাপগুলোর গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৮ মিটার এবং নিচের দিকে নামার সময় এদের গতি হয় সেকেন্ডে ৫ মিটার। এরা ৩০ ডিগ্রি কোণে গ্লাইড করে এগিয়ে যায়[২]

উড়ন্ত সাপগুলোর গতি নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ গবেষণাই করা হয়েছে এর ভেসে থাকা অবস্থায় ত্রিমাত্রিক গতি নিয়ে। এরা নিজেদের যাত্রাপথও পরিবর্তন করতে পারে। এদের পুরো শরীরের স্পন্দন হয় এটা আগেই বলা হয়েছে।

সাপগুলোর মাথার দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে এর শরীরের পেছনের অংশ কাত হয়ে যায় এবং দিক পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় যায়। এরকম স্পন্দন বা তরঙ্গায়িত হবার বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। তবুও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, এ ধরনের সাপের পেছনের ভাগে যে অবতল আকৃতির সৃষ্টি হয় সেটার বাম-ডানে গতি বা স্পন্দনের কারণে সাপের নিচের দিকের অবস্থান পরিবর্তন হয়।

সাপের গতিপথের ভিডিও দেখলে বোঝা যাবে যে, আসলেই লেজের দিকের অবস্থান বাম এবং ডান দিকে পরিবর্তন হয়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, যদি শরীরের পেছনের অংশ একটু কাত হয়ে একবার বামে এবং একবার ডানে যায়, তাহলে সাপের নিজস্ব ভারোত্তোলন ক্ষমতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ শরীরের লিফটিং কাজ করে বেশী[৩]

 

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে কিছু কিছু প্রাণী আছে যারা নিজেদের পাখনা ব্যবহার করে উড়তে পারে, যেমন উড়ন্ত কাঠবিড়ালী। কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে নিজের ভার উত্তোলন করে বাতাসে ভেসে চলাচল করার কোনো মাধ্যম নেই।

বাতাসের ভিতর দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যাতায়াত করা মাটির উপর দিয়ে চলাচল করার থেকে অনেক বেশী জটিল। কারণ বাতাসে পাখা ছাড়া ওড়ার কারণে নিজেকে গ্লাইডিং করতে হয় এবং সাপের শরীর বেঁকে গিয়ে পার্শ্বীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করে। সাথে সাথে বাতাসে অবতল আকৃতিও বজায় রাখতে হয়। এ দুটি কাজ একসাথে কোনো সাপ করতে পারে কিনা জানা নেই। হয়তো এ দুটি কাজ একসাথে করার জন্য কোনো বিশেষ স্নায়বিক পেশীর নিয়ন্ত্রণের দরকার পড়ে।

বাতাসে ভেসে চলাচল করা প্রাণীদের মধ্যে শিকার ধরে নিজের খাদ্য সংস্থান করে এমন প্রাণী হলো উড়ন্ত সাপ এবং Draco নামক লিজার্ড। ভেসে চলাচলের ক্ষেত্রে অনেক গবেষক ড্রাকোকে বেশী দক্ষ বলে মনে করেন। অন্যদিকে ড্রাকো দিক পরিবর্তন করলে এর গতি অনেকখানি কমে যায়, কিন্তু উড়ন্ত সাপের ক্ষেত্রে এমনটি হয় না।

তবে কিছু কিছু বিষয়ের সমাধান এবং উত্তর এখনও জানা যায়নি, যেমন উড়ন্ত সাপগুলোর বাতাসে ঝাঁপ দেয়ার ধরন দেখলে বোঝা যাবে অনেকটা বিশৃঙ্খল এবং আকস্মিকভাবে এরা লাফ দেয়। এরকম লাফ দেয়াটা শুধু যে শিকার দেখা দিলেই হয় তা কিন্তু না, সবসময়ই। এর পেছনে কী কারণ এবং প্রভাবক কাজ করে তা বিজ্ঞানীরা এখনও জানতে পারেননি।

উড়ন্ত সাপগুলো বিভিন্ন সময়ে নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন লুপ আকৃতির তৈরি করে এরপর লাফ দেয়। সাপের এরকম লাফিয়ে ভেসে যাওয়ার মধ্যে দুটি গতি থাকে। একটি হচ্ছে আনুভূমিক গতি, অপরটি হচ্ছে উলম্ব গতি। এই দুই গতির ধরন কী এক নাকি আলাদা সেটা এখনও জানা যায়নি। সাপের লাফ দেয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ধরা হয় গাছের শাখাগুলোকে। এই শাখাগুলোর দৈর্ঘ্য, ব্যাস, আকৃতি, নমনীয়তা সাপের উড়ে যাওয়াতে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করে সেটিও একটি গবেষণার বিষয়।

এ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারলে আমাদের পরিবেশের বাস্তুসংস্থানের নতুন এবং অজানা কোনো দিক সম্পর্কে আমরা জানতে পারবো। বিশেষ করে সাপের ডানা ছাড়া উড়ে যাবার কৌশল আরও বিস্তারিতভাবে জানতে পারলে বায়ুগতিবিদ্যাতে এর কলাকৌশল নিয়ে নতুন দিক তৈরি হবে[৪]

তথ্যসূত্র

[১] Holden, D., Socha, J.J., Cardwell, N.D, and Vlachos, P.P. (2014). Aerodynamics of the flying snake Chrysopelea paradisi: how a bluff body cross-sectional shape contributes to gliding performance. The Journal of Experimental Biology, 2014, pp.382-394.

[২] Walker, J. (2007). The Flying Circus of Physics, John Wiley & Sons, Inc.

[৩] Socha, J. J. (2002). Gliding flight in the paradise tree snake,” Nature, 418, 603-604.

[৪] Socha, J.J. (2006) Becoming airborne without legs: the kinematics of take-off in a flying snake, Chrysopelea paradise. The Journal fo Experimental Biology, 209, pp. 3357-3369

নর্থ ক্যারোলিনার জমে যাওয়া কুমিরের বিখ্যাত ছবি

ছবিতে নর্থ ক্যারোলিনায় একটি জমে জাওয়া জলাভুমিতে বরফের স্তরের উপর একটি কুমিরের মাথা বের হয়ে জমে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সরীসৃপ, উভচর এর শীতল রক্ত বিশিষ্ট প্রাণী। এদের বৈশিষ্ট্য হলো পরিবেশের তাপমাত্রার সাথে সাথে এদের তাপমাত্রার হ্রাস-বৃ্দ্ধি ঘটে। পরিবেশের তাপমাত্রা কমে গেলে এদের বিপাকীয় কার্যক্রম ধীর হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে খুবই কমে যায়। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

image source: theepochtimes.com

কুমিরের নাকটি বরফের উপরে রয়েছে যার মাধ্যমে এরা শ্বসন চালিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার নাম ব্রুমেশন (brumation)। কিছু প্রজাতির কুমির চার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। তবে বরফে জমে থাকা অবস্থায় এরা মোটামুটি সপ্তাহখানেক টিকে থাকতে পারে।

source: bigganpotrika.com

featured image: foxnews.com

দ্রুত বংশবৃদ্ধির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

পেকে ওঠা একটা পপি বা পোস্ত ফল ক্ষুদে ক্ষুদে দানায় ভরা; প্রত্যেকটি দানাবীজ থেকে একটি করে গাছ গজাতে পারে। যতগুলো বীজ বুনেছি তার প্রত্যেকটি থেকে যদি একটি করে গাছ গজায়, তাহলে পপি গাছের সংখ্যা কত দাঁড়াবে?

এটা বের করার জন্য আমাদের অবশ্যই জানতে হবে প্রত্যেকটি পপিতে কতগুলো করে বীজদানা রয়েছে। কাজটা হয়তো খুব ক্লান্তিকর কিন্তু ফলটা এত আগ্রহ জাগাবার মতো যে ধৈর্য ধরে কাজটা খুঁটিয়ে করলে পরিশ্রমটুকু সার্থক হবে। প্রথমত, আপনি জেনে নেবেন যে প্রত্যেকটি পপিতে গড়ে ৩ হাজার বীজদানা আছে।

তারপর? লক্ষ্য করবেন, আমাদের ঐ পপি গাছটির চারপাশে যদি যথেষ্ট ফসল ফলাবার মতো জমি থাকে তাহলে প্রত্যেকটি বীজ থেকে একটি করে গাছ গজাবে। ফলে পরবর্তী গ্রীষ্মকালে আমরা পাব ৩ হাজার পপি গাছ। মাত্র একটি পপি থেকে পুরো একটি পপি ক্ষেত।

এরপর কি হচ্ছে দেখা যাক। এই ৩,০০০ গাছের প্রত্যেকটিতে অন্তত একটি করে (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বেশি) ৩,০০০ হাজার বীজদানা সমেত পপি ধরবে। এগুলোর প্রত্যেকটি থেকে আরও ৩,০০০ নতুন গাছ গজাবে। সুতরাং দ্বিতীয় বছরের শেষে আমাদের পপি গাছের সংখ্যা দাঁড়াবে অন্তত ৩০০০ x ৩০০০ = ৯০,‌০‌০,০০।

সহজেই হিসাব করা যায় যে, তৃতীয় বছরের শেষে আমাদের একটি মাত্র আদি পপির বংশধরের সংখ্যা দাঁড়াবে— ৯০,০০,০০০ x ৩০০০ = ২৭,০০,০০,০০,০০০। পঞ্চম বছরের শেষে পৃথিবীর বুকে আমাদের এই পপিগুলোর জন্য যথেষ্ট জায়গা থাকবে না। কারণ তখন সংখ্যাটি দাঁড়াবে- ৮,১০,০০,০০,০০,০০,০০০ x ৩০০০ = ২,৪৩,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০০।

পৃথিবীর সমগ্র স্থলভাগের– অর্থাৎ সমস্ত মহাদেশ আর দ্বীপের আয়তন ১৩,৫০,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এবং এটা হল যত পপি গাছ গজিয়েছে তার প্রায় ২০০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

সমগ্র পপি গাছের সমস্ত বীজ থেকে যদি গাছ হয়, তাহলে একেকটি পপির বংশধররা পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রতি বর্গমিটারে ২০০০ পপি গাছ সমেত- ভূগোলোকের সমস্ত স্থলভাগকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এই খুদে পপি বীজদানাটির মধ্যে সত্যিই একটি রাক্ষুসে সংখ্যা লুকিয়ে আছে, তাই নয় কি?

চিত্র: পপি গাছ
চিত্র: পপির বীজে অনেক বীজদানা থাকে

আরো কম বীজ উৎপন্ন হয় এমন কোনো গাছ নিয়ে আমরা এই একই ব্যাপার চেষ্টা করে দেখতে পারি। ফলাফল দাঁড়াবে একই। শুধু এক্ষেত্রে এর বংশধররা ভূপৃষ্ঠের পুরোটা আচ্ছন্ন করে ফেলতে সময় নেবে পাঁচ বছরের সামান্য কিছু বেশি। যেমন—একটি ড্যান্ডেলিয়ন নিন যেটা গড়ে বছরে ১০০ টি বীজ উৎপাদন করে। অবশ্য এমন ড্যান্ডেলিয়নও আছে যা বছরে ২০০ পর্যন্ত বীজ উৎপাদন করে। তবে সে উদাহরণ বেশ বিরল। এ সমস্ত বীজ থেকে যদি গাছ গজাতো তাহলে আমরা পেতাম-

প্রথম বছরের শেষে ১ টি গাছ

দ্বিতীয় বছরের শেষে ১০০ টি গাছ

তৃতীয় বছরের শেষে ১০,০০০ টি গাছ

চতুর্থ বছরের শেষে ১০,০০,০০০ টি গাছ

পঞ্চম বছরের শেষে ১০,০০,০০,০০০ টি গাছ

ষষ্ঠ বছরের শেষে ১০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

সপ্তম বছরের শেষে ১০,০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

অষ্টম বছরের শেষে ১০,০০,০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

অষ্টম বছরের শেষে ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টি গাছ

ভূগোলকের সমস্ত স্থলভাগের যত বর্গমিটার জায়গা আছে এ হলো তার ৭০ গুন বেশী। সুতরাং, নবম বছরের শেষে সমস্ত মহাদেশই ড্যান্ডেলিয়নে ছেয়ে যাবে। প্রতি বর্গ মিটারে ৭০টি করে।

চিত্র: ড্যান্ডেলিয়ন

কিন্তু তাহলে পৃথিবীতে এরকম ঘটনা সত্যিই ঘটছে না কেন? কারণটা সহজ। বীজদানাগুলোর একটা বিপুল অংশ নতুন চারা হিসেবে শেকড় মেলার আগেই বিনষ্ট হয়ে যায়। হয় তারা অনুর্বর জমিতে পড়ে, শিকড় মেললেও অন্যান্য গাছের দ্বারা চাপা পড়ে যায় কিংবা পশুপাখির দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায়। বীজ আর গাছের এই ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ড যদি না ঘটতো, তাহলে দেখতে দেখতে আমাদের এই গ্রহকে আচ্ছন্ন করে ফেলত।

তবে শুধু উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই নয়, জীবজন্তুর ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। এদের যদি মৃত্যু না হতো, পৃথিবীটা আজ হোক আর কাল হোক, মাত্র একজোড়া জন্তুর বংশধরদের অত্যধিক ভিড়ে আক্রান্ত হয়ে উঠত। মৃত্যু যদি প্রাণীর সংখ্যাবৃদ্ধির পথে অন্তরায় না হতো, তাহলে কি যে ঘটতো, তা কল্পনাই করা যায় না।

অল্প-বিস্তর বিশ বছরের মধ্যে আমাদের মহাদেশগুলোর সমস্তই বনে জঙ্গলে আর স্তেপভূমিতে ছেয়ে যেতো আর তার মধ্যে কোটি কোটি প্রাণী প্রাণধারণের জায়গাটুকুর জন্য পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করতো। মহাসাগরগুলোতে এত মাছ কিলবিল করতো যে জাহাজ চলাচলের কোনো প্রশ্নই উঠত না। আকাশে উড়ন্ত অসংখ্য পাখি আর পতঙ্গের দরুন আমরা দিনের আলো প্রায় দেখতেই পেতাম না।

উদাহরণ হিসেবে, সাধারণ মাছির কথাই ধরা যাক। এদের প্রজননক্ষমতা স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো। মনে করা যাক, প্রত্যেক স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ে এবং গ্রীষ্মকালের মধ্যে এই ১২০টি ডিম থেকে বংশাণুক্রমে সাত প্রজন্ম মাছি সৃষ্টি হবে যার অর্ধেক স্ত্রী মাছি। মনে করা যাক,  প্রথম ডিমগুলো পাড়া হলো এপ্রিলের ১৫ তারিখে এবং এসব ডিম ফুটে বেরিয়ে আসা স্ত্রী মাছিগুলো (ডিম পাড়বার দিন থেকে) বিশ দিনের মধ্যে যথেষ্ট বড়সড় হয়ে নিজেরাই ডিম পাড়ার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা দাঁড়াবে এরকম

এপ্রিল ১৫ তারিখে প্রত্যেকটি স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ল, মে’র শুরুতে ১২০টি মাছি ডিম ফুটে বেরুবে- যেগুলোর মধ্যে ৬০টি স্ত্রী মাছি। মে’র পাঁচ তারিখে প্রত্যেকটি স্ত্রী মাছি ১২০টি ডিম পাড়ল এবং এই মাসের মাঝামাঝি ৬০ x ১২০ = ৭,২০০ মাছি বেরুবে ডিম ফুটে– যেগুলোর মধ্যে ৩,৬০০ টি স্ত্রী মাছি।

মে’র ২৫ তারিখে এই ৩,৬০০ স্ত্রী মাছির প্রত্যেকে ১২০টি ডিম পাড়ছে এবং জুন মাসের শুরুতে জন্ম নিয়েছে ৩৬০০ x ১২০ = ৪৩২০০০টি মাছি। এদের মধ্যে ২,১৬,০০০টি স্ত্রী মাছি। জুনের ১৪ তারিখে এই স্ত্রী মাছিগুলোর প্রত্যেকে ১২০টি করে ডিম পাড়বে এবং মাসের শেষে ডিম ফুটে বেরুবে ২৫৯২০০০০টি মাছি। এর মধ্যে আছে ১২৯৬০০০০টি স্ত্রী মাছি।

জুলাই ৫ তারিখে এই ১২৯৬০০০০ স্ত্রী মাছি প্রত্যেকে ১২০টি করে ডিম পাড়বে এবং মাসের ১৫৫৫২০০০০০ মাছি জন্মাবে (৭৭৭৬০০০০০ স্ত্রী মাছি)। জুলাই ২৫ তারিখে মাছির সংখ্যা দাঁড়াবে ৯৩৩১২০০০০০০, যাদের মধ্যে ৪৬৬৫৬০০০০০০ স্ত্রী মাছি। আগস্ট ১৩ তারিখে সংখ্যাটি দাঁড়াচ্ছে ৫৫,৯৮,৭২,০০,০০,০০০। এদের মধ্যে স্ত্রী মাছির সংখ্যা হলো ২৭৯৯৩৬০০০০০০০। সেপ্টেম্বর ১ তারিখে ৩৫৫৯২৩২০০০০০০০০ মাছি ডিম ফুটে বেরুবে।

কোনো মাছি যদি মারা না পড়ে, তাহলে মাত্র একটি গ্রীষ্মকাল জুড়ে জন্মাতে পারে এ যে মাছির দল। এদের বিপুল সংখ্যা সম্বন্ধ আরো স্পষ্ট ছবি পাবার জন্য দেখা যাক কী দাঁড়াবে যদি এরা পরপর সারি বেঁধে একটা লাইন তৈরি করে। একটি মাছির দৈর্ঘ্য ৫ মিলিমিটার হলে এ লাইনটি দাঁড়াবে ২,৫০,০০,০০,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের ১৮ গুণ বেশী। পৃথিবী থেকে বহু দূরের গ্রহ ইউরেনাসের দূরত্বের প্রায় সমান।

সবশেষে জীবজন্তুর অনন্যসাধারণ দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত আরো কিছু তথ্য উল্লেখ করছি।

আমেরিকায় একসময় চড়ুইপাখি ছিল না। শস্যের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। তাদের ধ্বংস করার মতো কোনো জন্তু বা শিকারি পাখি সে দেশে ছিল না এবং তারা অতি দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। শস্যনাশক পোকাস সংখ্যা ক্রমেই কমে আসতে লাগল কিন্তু চড়ুইদের সংখ্যা বেড়ে চললো দ্রুত হারে। শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য আর যথেষ্ট পরিমাণে কীটপতঙ্গ না থাকায়, তারা ফসল ধ্বংস করতে শুরু করে দিল।

তখন চড়ুই পাখিদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো এবং দেখা গেলো সেটা এতোই ব্যয়বহুল যে পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো জন্তুর আমদানি নিষিদ্ধ করে আইন বিধিবদ্ধ করতে হয়েছিল।

আরেকটি উদাহরণ- ইউরোপীয়রা যখন অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করে তখন সেখানে খরগোশ ছিল না। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সেখানে প্রথম কয়েকটি খরগোশ আনা হয়। খরগোশদের মেরে ফেলার মতো কোনো শিকারি জন্তু ছিল না সেখানে। তাই তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটে চলে দ্রুত হারে। অল্পদিনের মধ্যেই বিরাট বিরাট খরগোশের পাল অস্ট্রেলিয়া ছেয়ে ফেলে এবং ফসল ধ্বংস করতে থাকে। দেশজুড়ে এক সর্বনেশে অবস্থা দেখা দেয় এবং এদের ধ্বংস করার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে।

জনসাধারণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিল বলেই এই মহা বিপর্যয়কে রোধ করা গিয়েছিল। পরে ক্যালিফোর্নিয়াতেও মোটামুটি এই রকম ঘটনা ঘটেছিল।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে জ্যামাইকায়। সেখানে ছিল প্রচুর সংখ্যক বিষধর সাপ। এদের ধ্বংস করার জন্য সাপের ঘোর শত্রু হিসেবে কেরানী পাখি (Secretory Bird) আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অল্পকালের মধ্যেই সাপের সংখ্যা কমে গেল। কিন্তু এর ফলে সাপেরা যাদের গিলে খেত, সেই মেঠো ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যেতে শুরু করলো।

এই ইঁদুররা আখ খেতের এতো বড় ক্ষতি করে যে এদের বংশালোপ ঘটানোর জন্য চাষিদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়। তারা নিয়ে এল চারজোড়া ভারতীয় বেজি- যাদের ইঁদুরেরা শত্রু বলে সবাই জানে। এই বেজিদের অবাধে দ্রুত বংশবিস্তার ঘটাতে দেয়া হলো এবং অল্পকালের মধ্যেই দ্বীপটি ভরে গেল বেজিতে।

বছর দশেকের মধ্যে এরা সব ইঁদুরকে ধ্বংস করলো বটে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তারা সর্বভুক হয়ে দাঁড়ালো– শিশুদের, কুকুরছানাদের আর সদ্যজাত শুয়োরছানাদের, মুরগিছানাদের তারা আক্রমণ করতে শুরু করলো, ডিম ধ্বংস করে দিতে শুরু করলো। সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটানোর সাথে সাথে এরা ছেয়ে ফেলল সমগ্র গমের ক্ষেত, আখের ক্ষেত আর ফলবাগিচা। দ্বীপবাসীদের এবার তাদের ভূতপূর্ব মিত্রদের বিপক্ষে দাঁড়াতে হলো কিন্তু ক্ষতিটাকে রোধ করার ব্যাপারে মাত্র আংশিক সাফল্য অর্জন করতে পেরেছিল তারা।

ইয়াকভ পেরেলম্যানের বই অবলম্বনে । 

যেভাবে এলো বি-কোষ এবং টি-কোষ

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে সবার ধারণা ছিল মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সব কিছুই আসলে অ্যান্টিবডির জারিজুরি। তবে ল্যাবরেটরিতে কিংবা হাসপাতালে দৈবাৎ কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতো যার ব্যাখ্যা অ্যান্টিবডির ধারণা ব্যবহার করে দেয়া সম্ভব হতো না। তখন তারা ভেবে নিতো হয়তো অ্যান্টিবডি সম্পর্কেই এখনো তারা অনেক কিছু জানেন না, তাই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে ১৯৫০ সালের দিকে ব্যতিক্রম ঘটনার সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে, আর উপেক্ষা করা গেল না। যেমন একজনের অঙ্গ আরেক জনের দেহে প্রতিস্থাপনের কথাই ধরা যাক। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় দাতা এবং গ্রহীতার মধ্যে রক্তের গ্রুপ সহ কিছু ইমিউনোলজিক্যাল ফ্যাক্টরের মিল না থাকলে গ্রহীতার দেহ দানকৃত অঙ্গটি গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিস্থাপিত টিস্যু কিংবা অঙ্গ যখন শরীরে লাগানো হয়, তখন সে অঙ্গের কোষকে বহিরাগত ভেবে নিয়ে তার বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় গ্রহীতার দেহে।

দেহে কোনো এন্টিজেনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি একবার তৈরি হলে তা সাধারণত বাকী জীবন ঐ অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি সেই অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্তরস যদি এমন কেউ গ্রহণ করে, যার দেহে সেই অ্যান্টিবডি নেই, তখন সে-ও সুরক্ষিত হতে যায়। তবে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনাটা কেমন যেন গোলমেলে।

ধরা যাক ক এবং খ দুটি ভিন্ন জাতের ইঁদুর। যখন ক ইঁদুরের দেহে খ ইঁদুর থেকে চামড়া প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পূর্ণ অংশটি প্রত্যাখ্যান (Graft Rejection) হতে ১১ থেকে ১৩ দিন লাগে। একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার করা হলে সময় লাগলো ৫ থেক ৭ দিন। সবাই ভাবলো ইমিউনোলজিক্যাল স্মৃতি সংক্রান্ত ঘটনা। তবে প্রত্যাখ্যান যদি আসলেই অ্যান্টিবডির কারণে হয়ে থাকতো, ক ইঁদুরের রক্ত রস নিয়ে তারই কোনো আত্নীয়ের দেহে প্রবেশ করানো হলে এবং তারপর খ ইঁদুরের চামড়া প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা হলে ৫ থেকে ৭ দিন লাগার কথা। কিন্তু এবারও ১১ থেকে ১৩ দিন লাগলো।

ঘটনা এমন দাঁড়ালো যে যদিও প্রতিস্থাপিত দেহকলা প্রত্যাখ্যানের সময় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু প্রত্যাখ্যানের পেছনে তেমন একটা প্রভাব রাখে না। ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ইমিউনলজিতে এটি একটি বড় সমস্যা ছিল বহু বছর। এমনকি এর জন্য অনেকের মনে সন্দেহ হতে থাকে আসলেই দেহকলা প্রত্যাখ্যানে ইমিউন সিস্টেমের হাত আছে কিনা।

কেউই ইমিউন সিস্টেমের নতুন কোনো পদ্ধতি খুঁজতে প্রস্তুত ছিল না। কারণ কেউই জানতো না যে আসলে কী খুঁজতে হবে। কিন্তু কিছু একটা যে রয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ বিভিন্ন উৎস থেকে সামনে আসতে থাকে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণের উৎস কিন্তু মানুষ নয়, এমনকি ইঁদুর ও নয়। তবে? মুরগী! ব্রুস গ্লিক নামের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মুরগীর পরিপাকতন্ত্রের নীচের দিকে এপেন্ডিক্সের ন্যায় থলেটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। থলেটির নাম বার্সা অব ফ্যাব্রিসিয়াস।

এনাটমিতে নব্য আবিষ্কৃত কোনো বস্তুর অস্তিত্বের হেতু বোঝা না গেলে তাকে আবিষ্কারকের নামের সাথে মিলিয়ে নাম দেয়া হতো। এ জিনিসটির প্রথম বর্ণনা দেন হেরোনিমাস ফ্যাব্রিসিয়াস। আর পরে এর নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

ব্রুস গ্লিক চিরাচরিত পদ্ধতিতে ভরসা রেখে বিভিন্ন বয়সের মুরগি থেকে বার্সা ফেলে দিলেন (Bursectomy) এবং অপেক্ষা করলেন কী হয় তা দেখার জন্য। কিন্তু পরীক্ষার অন্তর্গত মুরগির সাথে সাধারণ মুরগির কোনো পার্থক্য না দেখে তিনি হতাশ হলেন। যেহেতু মুরগিগুলোতে কোনো দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি নেই তাই সেগুলা স্টকে ফেরত দিয়ে দিলেন।

গ্লিকেরই আরেক বন্ধু, নাম টনি চ্যাঙ্গ-এর কিছু মুরগি দরকার পড়লো সে সময়েই। যা দিয়ে অ্যান্টিবডি উৎপাদন পরীক্ষা করে দেখাবেন অন্য ছাত্রদের। পয়সা বাঁচানোর জন্য তিনি গ্লিকের অঙ্গ কর্তিত মুরগিগুলোই নিলেন।

কিন্তু তাকেও হতাশ করে দিয়ে মুরগিগুলো যথেষ্ট বড়সড় হবার পরেও অ্যান্টিজেনের বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করলো না। এ পর্যায়ে যে কেউই হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের গুষ্টি উদ্ধার করে মুরগিগুলো খেয়ে নিতেন। কিন্তু এ দুই পাণ্ডব বাড়তি খাবারের বাইরেও বিশাল এক সম্ভাবনার আঁচ করতে পারলেন।

তারা আরেক সহকর্মীর সাথে আরো কিছু পরীক্ষা চালালেন যা থেকে প্রথমবারের মতো বোঝা গেলো অ্যান্টিবডি তৈরিতে বার্সার ভূমিকা, যা আগে কেউ জানতো না। একসাথে বসে তারা যে প্রবন্ধটি লিখলেন সেটি ইমিউনলজির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সেটির জন্য তৈরি ছিল না তখন।

স্বনামধন্য জার্নাল সায়েন্স-এর সম্পাদকরা এটি ফিরিয়ে দেন ‘আগ্রহোদ্দীপক নয়’ বলে। শেষ পর্যন্ত পোল্ট্রি সায়েন্স জার্নাল এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। প্রকাশের পরেও বেশ কয়েক বছর সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু যখন ইমিউনোলজিস্টরা এর খোজ পেলেন, সেটি হয়ে গেলো ইতিহাসের অন্যতম সংখ্যক উদ্ধৃত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ।

তাদের পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি কিন্তু এটা নয় যে বার্সেক্টমাইজড মুরগী অ্যান্টিবডি তৈরিতে অক্ষম। তারা দেখল যে অ্যান্টিবডি ছাড়াও মুরগীগুলো ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিহত এবং দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। ফলাফল এটাই বলে যে অ্যান্টিজেনের সাথে বোঝাপড়ার জন্য অ্যান্টিবডিই একমাত্র উপায় নয় এবং অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতিতেও অপ্রতিম দেহকলা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

এই পরীক্ষাগুলোর ফলাফল মানুষকে প্রভাবিত করলো যেন তারা ইমিউন সিস্টেমে অ্যান্টিবডির বিকল্প খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যানের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার ব্যাখ্যা দেয়া যায়। অন্যান্য গবেষক এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণও অ্যান্টিবডি ব্যতীত দ্বিতীয় ইমিউন মেকানিজমের উপস্থিতির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করলো।

অনেক দিন পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেলো সেই গূঢ় গোবিন্দের। সংক্ষেপে, ইঁদুরের জন্মের পরপরই যদি দেহ থেকে থাইমাস ফেলে দেয়া হয় তখন বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া আগের মতো থাকলেও সেই ইঁদুর আর ভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা দেহকলা প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। গ্লিক মুরগীর বার্সা ফেলে দেয়ার ফলে যা হয়েছিল ঠিক যেন তার বিপরীত হচ্ছে এবার।

মুরগী আর ইদুরে তো অনেক কিছুই হলো, তাহলে মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটলো? চিকিৎসকরা শিশুদের ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সির কেসগুলোতে দুই ধরনের প্যাটার্ন ধরতে পারলেন। এক ধরনের নাম ব্রুটন’স এগামাগ্লোবিউলিনেমিয়া, যাতে আক্রান্তরা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না। তবে তারা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাফট রিজেক্ট করতে পারে।

তাদের অবস্থা বার্সার ফেলে দেয়া মুরগীর মতো। আরেক ধরনের রোগের উদাহরণ ডিগর্গ সিন্ড্রোম যাতে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া কর্মক্ষম থাকলেও ভাইরাসের আক্রমণ কাবু করে দেয়, এদের সাথে থাইমাসবিহীন ইদুরের অবস্থার মিল রয়েছে।

এসবকিছু অবশেষে বুঝালো যে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ইমিউন সিস্টেমে দুটি স্বতন্ত্র শাখা রয়েছে। এক শাখার নিয়ন্ত্রক বি-কোষ (B for Bursa)। এর কাজ অ্যান্টিবডি তৈরি করা। আরেক শাখা, যা অপেক্ষাকৃত জটিল তার নিয়ন্ত্রনে আছে থাইমাস। থাইমাস থেকে যেসব কোষ তৈরি হয়ে প্রতিরক্ষায় অংশ নেয় তার নাম টি-কোষ।

মানুষের ক্ষেত্রে বার্সা না থাকলেও, মুরগীতে বার্সা যা করে স্তন্যপায়ীতে একই কাজ করে অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো। এমন নামের ফলে শেষ পর্যন্ত বি কোষের নামের সাথে ‘বি’ রেখে দেওয়াতে মানুষ কিংবা মুরগী কেউই মনঃক্ষুন্ন হয়নি।

মাল্টিপল অ্যালিল এবং পিতৃত্বের জটিলতা

রক্ত সঞ্চালন থেকে শুরু করে নানাবিধ চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রক্তের গ্রুপ সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৫ প্রকার ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত হলো ABO এবং Rh ফ্যাক্টর ব্লাড গ্রুপ সিস্টেম।

ABO সিস্টেম অনুযায়ী চার ধরনের ব্লাড গ্রুপ বিদ্যমান। A, B, AB এবং O। গ্রুপগুলো মূলত লোহিত রক্ত কণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের ধরনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। A গ্রুপের লোহিত কণিকায় একধরনের গ্লাইকোলিপিড থাকে আর B গ্রুপের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের। AB গ্রুপে থাকে উভয় ধরনের আর O গ্রুপে থাকে না কোনোটিই।

জিনতত্ত্ব বলছে সকল বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বায়ী হলো জিন। তেমনই ABO ব্লাড গ্রুপের জন্যও দায়ী হলো জিন। A গ্রুপের জন্য আছে A অ্যালিল, B গ্রুপের জন্য B অ্যালিল, AB গ্রুপের জন্য A ও B উভয় অ্যালিল এবং O গ্রুপের জন্য নাল (শূন্য) অ্যালিল।

অ্যালিল আবার কী জিনিস? গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী জীবের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য আছে দুটি করে অ্যালিল। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। তবে এটি অনুধাবন করতে হলে কলেজ পর্যায়ের জিনতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা থাকা চাই।

ধরি কোনো একটি ইঁদুরের লেজ লম্বা। লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য জিন আছে। এর জিনোটাইপ (Tt)। এক্ষেত্রে লম্বা লেজ (T), খাটো লেজের (t) উপর প্রকট। ইঁদুরের দেহে লম্বা (T) লেজের জিন এসেছে তার পিতার জনন কোষ থেকে আর খাটো (t) লেজের জিন এসেছে তার মাতার জনন কোষ থেকে। ইঁদুরের লেজের দৈর্ঘ্যের জন্য পিতা (T) এবং মাতা (t) থেকে আগত জিন দুটির একটিকে অপরটির অ্যালিল বলে।

চিত্র: মেন্ডেলের তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যালিল সঞ্চারণ

অর্থাৎ মেন্ডেলিয় তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি জিনের দুটি করে চেহারা বা রূপ থাকে। প্রতিটি চেহারাকে অ্যালিল বলে। এ দুটির একটি অ্যালিল আসে মাতা থেকে আর অন্যটি আসে পিতা থেকে।

কিন্তু এ নিয়ম ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গেলেই বাঁধে বিপত্তি। কেননা এখানে লোহিত রক্তকণিকার কোষঝিল্লীতে বিদ্যমান গ্লাইকোলিপিডের জন্য রয়েছে A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল। তিনটি অ্যালিল কীভাবে একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে? একে মেন্ডেলিয় তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এরূপ ঘটনাকে বলা হয় মাল্টিপল অ্যালিল।

যখন কোনো একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুইয়ের অধিক অ্যাালিল কাজ করে তখন তাকে মাল্টিপল অ্যালিল বলে। মজার বিষয় হলো কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক অ্যালিল থাকলেও ডিপ্লয়েড জীব বলে আমাদের কোষে কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকা সম্ভব। মাল্টিপল অ্যালিল ব্যাপারটি সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্যাচ লেগে গেল? তাহলে একটু গল্পের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি। ধরি বাসায় ১০ জন মানুষ আছে। সবার জন্য বিস্কুট আনা হলো বাজার থেকে। তিন ধরনের বিস্কুট আছে- অরেঞ্জ বিস্কুট, চকলেট বিস্কুট এবং লেমন বিস্কট। কিন্তু শর্ত হলো প্রতিটি মানুষ শুধুমাত্র দুটি করে বিস্কুট নিতে পারবে। এ শর্তে বিস্কুট বন্টনের পর দেখা যাবে প্রতিটি ব্যক্তির কাছে যেকোনো একধরনের দুটি বিস্কুট (অরেঞ্জ-অরেঞ্জ, চকলেট-চকলেট, লেমন-লেমন) বা দুটি ভিন্ন ধরনের বিস্কুট (অরেঞ্জ-লেমন, অরেঞ্জ-চকলেট, চকলেট-লেমন) বিদ্যমান।

তাহলে সবাই কী ধরনের খাবার পেয়েছে? বিস্কুট পেয়ছে। কিন্তু বিস্কুটের ধরন ছিল ভিন্ন। তাহলে সামগ্রিকভাবে ১০ জনের জন্য কত ধরনের বিস্কুট ছিল? তিন ধরনের। ABO ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনই এক পদ্ধতি বিদ্যমান। সকল মানুষের রক্তের জন্য A, B এবং O মোট তিনটি অ্যালিল বিদ্যমান।

আগের উদাহরণে সবার জন্য যেমন বিস্কুট ছিল তেমনই এ ক্ষেত্রেও সকল মানুষের লোহিত রক্তকণিকার জন্য আছে একটি ABO জিন। কিন্তু বিস্কুটের যেমন তিনটি ধরন ছিল তেমনই মানুষের ক্ষেত্রেও ABO জিনের ধরন তিনটি। এদের নাম হলো A, B এবং O অ্যালিল।

কিন্তু যেহেতু মানুষ ডিপ্লয়েড জীব তাই আমাদের কোষে শুধুমাত্র দুটি অ্যালিল থাকতে পারে। তাই ABO জিনের ক্ষেত্রে তিনিটি অ্যালিল থাকলেও জীনোটাইপ হবে শুধুমাত্র AA, AO, BB, BO, AB এবং OO। মানে মানুষের সামগ্রিক পপুলেশনের ক্ষেত্রে তিনটি অ্যালিল প্রযোজ্য, কিন্তু একটি মাত্র মানুষের দেহে অ্যালিল থাকবে দুটি।

চিত্র: ABO ব্লাড গ্রুপ সিস্টেমে মাল্টিপল অ্যালিল পদ্ধতিতে সন্তানে অ্যালিল সঞ্চারণ

এ নিয়ম অনুযায়ী পিতা যদি হয় A ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ AO) এবং মাতা যদি হয় B ব্লাড গ্রুপ (জিনোটাইপ BO) তাহলে সন্তানের ব্লাড গ্রুপ A, B, AB এবং O এই চার ধরনেরই হতে পারে। আর যদি পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BO হয় তাহলে সন্তান হবে A এবং AB এই দুই গ্রুপের।

পিতার জিনোটাইপ AA এবং মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে শুধুমাত্র AB গ্রুপের। পিতার জিনোটাইপ AO মাতার জিনোটাইপ BB হলে সন্তান হবে AB এবং B ব্লাড গ্রুপের। পিতামাতা উভয় O হলে সন্তান সবাই O হবে।

A ও B জিন দুটি সমান প্রকট হওয়ায় তারা একত্রে থাকলে উভয়েই সমানভাবে প্রকাশ লাভ করে এবং AB ব্লাড গ্রুপ গঠন করে। কিন্তু O জিন প্রচ্ছন্ন হওয়ায় A বা B জিনের সাথে থাকলে প্রকাশ লাভ করে না। শুধুমাত্র O জিন থাকলে প্রকাশ লাভ করে O ব্লাড গ্রুপ গঠন করে।

ABO ব্লাড গ্রুপ কি সবসময় এ নিয়ম মেনে চলে? মাঝে মাঝে এ নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়। এ নিয়ম অনুযায়ী মাতা B এবং পিতা O ব্লাড গ্রুপ হলে সন্তান B কিংবা O ব্লাড গ্রুপের হওয়া সম্ভব। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানের এক পরিবারে দেখা গেল স্বামীর ব্লাড O আর স্ত্রীর ব্লাড B গ্রুপের হলেও সন্তানের ব্লাড গ্রুপ হয়েছে A। বাঁধল ঝামেলা, অভিযোগ আসল উনি এই সন্তানের বাবা নন!

আদালত পর্যন্ত গড়ালে পরে গবেষণা করে জানা গেল উনিই আসল বাবা। কিন্তু এই তথৈবচ ঘটনা কীভাবে ঘটল? মূলত এমন ব্যতিক্রম হয়েছে মিউটেশনের ফলে। কীভাবে? চলুন জেনে আসি।

খুব সহজে বলতে গেলে ডিএনএ’র মাঝে যেকোনো পরিবর্তন হওয়াকে মিউটেশন বলে। কোষ বিভাজনের পূর্বে ডিএনএ অনুলিপনের সময়ও ডিএনএতে কিছু পরিবর্তন সংঘটিত হয়। জন্মের সময় আমাদের দেহে গড়ে প্রায় ১০০ বা তারও বেশি সংখ্যক মিউটেশন ঘটে থাকে।

চিত্র: AO এবং BO জিনোটাইপের পিতামাতার সন্তানের ব্লাড গ্রুপ

আমরা জানি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড নামক অংখ্য অণু দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি নিউক্লিওটাইডে থাকে নাইট্রোজেন বেস। জিন হলো একটি রেসিপি যে রেসিপি অনুসরণ করে প্রোটিন বা এনজাইম তৈরি করা হয়। ABO ব্লাড গ্রুপের জন্য A, B এবং O অ্যালিল দায়ী।

এ তিনটি অ্যালিলের মাঝে গাঠনিক পার্থক্যও সামান্য, তাই এদের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন ব্লাড গ্রুপের ব্যতিক্রমের কারণ হতে পারে। A ও O অ্যালিলের মধ্যে মাত্র একটি নাইট্রোজেন বেসের পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে A ও B অ্যালিলের মাঝে পার্থক্য সাতটি নাইট্রোজেন বেসে।

চিত্র: A, B এবং O অ্যালিলের গাঠনিক পার্থক্য

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটিমাত্র বেস কম থাকা বা সাতটি ভিন্ন বেস থাকা তেমন কিছু না। কিন্তু কার্যত প্রতিটি জিনের ক্ষেত্রে তিনটি করে বেস একটি জেনেটিক কোড হিসেবে কাজ করে। তাই যেকোনো একটি বেসে পরিবর্তন হলে সম্পূর্ণ কোডটিকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, The old man had one new hat. বাক্যটিতে প্রতিটি শব্দে তিনটি করে অক্ষর আছে। বাক্যের প্রতিটি অক্ষরকে নাইট্রোজেন বেসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

এখন যদি প্রথম শব্দ থেকে একটি অক্ষর E কমে যায় তাহলে বাক্যটি হয়, Tho ldm anh ado nen ewh am. নতুন বাক্যে যদিও তিনটি করে অক্ষর একত্রিত হয়েছে কিন্তু একটিমাত্র অক্ষর হারিয়ে গেছে বলে বাক্যটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন। জিনে সামান্য মিউটেশনের ফলে অনেকটা এরূপ ঘটনাই ঘটে থাকে। অল্প একটু পরিবর্তনে বিশাল ফলাফল।

এরকম এক মিউটেশনের ফলেই A ব্লাড গ্রুপ থেকে O ব্লাড গ্রুপের আবির্ভাব হয়েছে। সদূর অতীতে A ব্লাড গ্রুপের জিনের মিউটেশনের ফলে একটি নাইট্রোজেন বেস হারিয়ে গেলেই আবির্ভাব হয় নতুন ব্লাড গ্রুপ O এর।

তাহলে কি B ব্লাড গ্রুপ থেকে A ব্লাড গ্রুপ পাওয়া সম্ভব? হ্যাঁ, মিউটেশনের ফলে এটিও সম্ভব। ধরুণ, আবুল নামের এক ব্যক্তির ব্লাড গ্রুপ B এবং ব্লাড গ্রুপের জিনোটাইপ BO। তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম অনু্যায়ী উনার প্রতিটি শুক্রাণুতে হয় B অ্যালিল থাকবে নয়ত O অ্যালিল। কারণ জনন কোষ হলো হ্যাপ্লয়েড তাই কেবল একটি করে অ্যালিল অবস্থান করবে।

আগেই জেনেছি যে O অ্যালিল দেখতে অনেকটা A অ্যালিলের মতো, শুধুমাত্র একটি নাইট্রোজেন বেস কম রয়েছে। তাই আবুল সাহেবের শুক্রাণু গঠনের পূর্বে যদি রিকম্বিনেশনের ফলে B ও O অ্যালিলের মাঝে অংশ বিনিময় হয়, তাহলে O অ্যালিল তার হারানো নাইট্রোজেন বেস ফিরে পেয়ে A অ্যালিল রূপে কাজ করতে পারে। এরূপ মিউটেশন হলে আবুল সাহেবের শুক্রাণু A অ্যালিল বহন করবে। এটি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব ছিল। এই শুক্রাণু A বা O অ্যালিল বিশিষ্ট্য ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন হবে।

চিত্র: BO জিনোটাইপের ব্লাডে মিউটেশনের ফলে A গ্রুপ সৃষ্টি

পূর্বে উল্লিখিত জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঠিক এরূপ ঘটনাই ঘটেছিল। এ দম্পতির মাঝে স্বামীর যেহেতু ব্লাড গ্রুপ O তাই তার সকল শুক্রাণু O অ্যালিল বহন করবে। কিন্তু স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ B বলে চিত্রে উল্লিখিত মিউটেশন হলে তার ডিম্বাণু B বা O এর পরিবর্তে A অ্যালিল বিশিষ্ট্য হতে পারবে। আবুল সাহেবের মতো একই মিউটেশনের ফলে স্ত্রীর ডিম্বাণু A অ্যালিল বহন করে যা স্বামীর O অ্যালিল বিশিষ্ট্য শুক্রাণুর সাথে মিলিত হয়ে A ব্লাড গ্রুপের সন্তান গঠন করে। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সন্তানের B বা O ব্লাড গ্রুপ হওয়ার কথা ছিল।

চিত্র: জাপানী দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ব্যতিক্রম ঘটনা

শেষ বেলায় আরো একটি তথ্য দিতে চাই। শুধুমাত্র ABO ব্লাড গ্রুপ নয়, অন্য কোনো জিনের ক্ষেত্রেও মিউটেশন বা রিকম্বিনেশনের ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা দেখা যেতে পারে।

উদ্ভিদজগতের অজানা দশ

১. ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ খাবার যোগ্য

আশ্চর্য হলেও সত্য। ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ খাওয়ার জন্য উপযোগী। যদি কখনো নতুন কোনো সবজি বা ফল খাওয়ার শখ হয় তাহলে চিন্তা করার কিছু নেই, পৃথিবীর আনাচে কানাচে আপনার জন্য এখনো অনেক সুস্বাদু সবজি ও ফল অপেক্ষা করছে। সেসবের অধিকাংশ আপনি চোখেও দেখেননি।

২. মানুষের ৯০ শতাংশ খাবার আসে মাত্র ৩০টি গাছ থেকে

এটিও যথেষ্ট আশ্চর্যজনক। যেখানে খাওয়ার মতো প্রায় ৮০ হাজারেরও বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে সেখানে আমরা খাদ্য নির্বাচন করছি মাত্র ৩০টি গাছ থেকে। এক্ষেত্রে আপনি যদি ভেবে থাকেন এই ৩০টি উদ্ভিদের খাদ্য গুনাগুণ সবচেয়ে বেশি তাই আমরা এগুলো বেশি খেয়ে থাকি, তাহলে সেটিও কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ ভূল ধারণা। কারণ…

৩. খদ্য গুনাগুণ নয়, সহজলভ্যতার ভিত্তিতে উৎপাদিত হয় শস্য

অধিকাংশ কৃষকই ফসল উৎপাদনের সময় খাদ্যগুণের কথা চিন্তা করে না, করে আর্থিক লাভ লোকসানের হিসাব। যে ফসলগুলো সহজে এবং সল্প সময়ে বেশি উৎপাদন করা যায় সেগুলোই সাধারণত উৎপাদিত হয়ে থাকে। ফলে অধিকাংশ পুষ্টিকর ফল ও শাকসবজিই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

৪. ৭০ হাজারেরও বেশি উদ্ভিদে রয়েছে ভেষজ গুনাগুণ

রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও উদ্ভিদকূলের বৈচিত্র্য কোনো অংশে কম নয়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এদের অবদান অনেক। চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাদের অর্ধেকেরও বেশি আসে কোনো না কোনো উদ্ভিদ থেকে। এসব ওষুধী উদ্ভিদের বেশির ভাগই হলো রেইন ফরেস্ট অঞ্চলের। কিন্তু রেইন ফরেস্ট থেকে অধিকাংশ ভেষজ উদ্ভিদ এসে থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে এখনো জানার আছে অনেক কিছু। কারণ…

৫. রেইন ফরেস্টের মাত্র ১শতাংশ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে

চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য রেইনফরেস্টগুলো স্বর্গস্বরূপ। সঠিকভাবে গবেষণা করতে পারলে এখনো এমন সব ওষুধ তৈরি করা সম্ভব যা দিয়ে নতুন এবং পুরাতন অসংখ্য রোগের চিকিৎসা ত্বরান্বিত হবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো এ সম্ভাবনা দিন দিন কমেই যাচ্ছে। কারণ…

৬. ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে

৮ হাজার বছর আগেও যেসব বনাঞ্চল সারা বিশ্ব জুড়ে কর্তৃত্ব করতো তার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ৫ ভাগের ৪ ভাগই মানুষ নিজ হাতে ধ্বংস করেছে। এখান থেকে একটি ব্যাপার অনুধাবন করা যায়। ঐ ৮০ শতাংশ বনাঞ্চল ধ্বংস করার সাথে সাথে আমরা এমন অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ধ্বংস করেছি যাদের সাথে আমরা হয়তো ঠিকমতো পরিচিতও হতে পারিনি। মাঝে মাঝে এক্ষেত্রে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কথা বলা হয়। কিন্তু তা-ও ফলপ্রসূ নয়। কারণ…

৭. মাত্র ১০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল সংরক্ষণ করা হয়েছে

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য মাত্র ১০ শতাংশ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখানেও রয়েছে কিছু সমস্যা। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তন করছে। এসব দূষণের প্রভাব সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতেও পড়ছে। ফলে সংরক্ষণ করার পরও বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়াও উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা আরো কঠিন। কারণ…

. অর্ধেকেরও বেশি প্রজাতি কেবলমাত্র তার নিজস্ব অঞ্চলে টিকতে পারে

বেশিরভাগ উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যে উদ্ভিদ পৃথিবীর এক প্রান্তে পাওয়া যায় সেটি অন্য প্রান্তে পাওয়া যায় না। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিলে তারা টিকেও থাকতে পারে না। যে হারে উদ্ভিদের বাসস্থান ধ্বংস করা হচ্ছে তাতে কমই আশা করা যায় যে তারা অন্য কোনো এলাকায় হলেও টিকে থাকবে।

৯. পরিচিত উদ্ভিদের ৬৮ শতাংশ আজ বিলুপ্তির হুমকিতে

বিজ্ঞানীরা মোট উদ্ভিদের ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে গবেষণা করতে পেরেছেন। সেই ক্ষুদ্র অংশেরই ৬৮ শতাংশ উদ্ভিদ নিকট ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাবার হুমকির মুখে রয়েছে। উদ্ভিদরা চলাচল করতে পারে না, তাই তাদের বাসস্থানগুলো যখন ধ্বংস করে দেয়া হয় তখন তারা এক স্থান থেকে উঠে গিয়ে অন্য স্থানে আশ্রয়ও নিতে পারে না। তাই প্রাণীকূলের তুলনায় উদ্ভিদকূলের জন্য টিকে থাকা যথেষ্ট কঠিন। আর এ কারণেই…

১০. উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক প্রকৃতি থেকে প্রায় ৫ হাজার গুণ দ্রুত গতিতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে

কেউ কেউ হয়তো বলে থাকবেন, মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া এমনিতেও একসময় না একসময় উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হতো। যেমনটি আগেও হয়ে এসেছে। কথাটি আসলেই সত্য। উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো সময়ের সাথে সাথে হয়তো একসময় বিলুপ্ত হতো। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু চিন্তার বিষয় সেটি নয়, চিন্তার কারণ হলো বিলুপ্তির হার।

বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো তাদের স্বাভাবিক নিয়মের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ দ্রুতগতিতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখার জন্য বড় ধরনের হুমকি। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, এই পরিস্থিতির জন্য আমরা মানুষেরাই দায়ী।

তথ্যসূত্র- ইকোওয়াচ

শ্লথ কেন শ্লথগতির?

থমাস জেফারসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট। ১৭৭৬ সালে কর্ণেল স্টুয়ার্ট একটি বক্সে করে তাকে ফসিল হয়ে যাওয়া কোনো এক অজানা প্রাণীর অস্থি পাঠান। ভার্জিনিয়ার একটি গুহার ভেতর এই অস্থিগুলো পাওয়া গিয়েছিল।

অস্থিগুলোর ভেতরে বেশ দীর্ঘ ও ধারালো নখযুক্ত পায়ের হাড় থাকায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন এগুলো কোনো সিংহের ফসিলের অংশ। তাই ১৭৯৭ সালের মার্চে ফিলাডেলফিয়াতে অনুষ্ঠিত হওয়া আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির কনফারেন্সে জেফারসন Certain Bones শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেই প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন এগুলো বড় আকৃতির কোনো সিংহের অস্থি।

এদের মধ্যে ধারালো নখর বিশিষ্ট অস্থি থাকায় তিনি সিংহের নামকরণ করেন Megalonyx, যার সরল অর্থ Giant Claw। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো জেফারসনের বাক্সের হাড়গুলো কিন্তু সিংহের ছিল না। সেগুলো এসেছিল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দানবাকৃতির শ্লথ হতে।

ডাঙ্গায় ঘুরে বেড়ানো প্রাগৈতিহাসিক শ্লথগুলোর আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে। উত্তর, দক্ষিণ আর মধ্য আমেরিকা মহাদেশের প্রায় পুরোটা জুড়ে বেশ কয়েক প্রজাতির শ্লথ দেখতে পাওয়া যেত। তখনকার Megalonychidae গোত্রের কিছু শ্লথ এখনো টিকে আছে যেগুলোর আকার বড়সড় বিড়ালের মতো। কিন্তু শ্লথের অধিকাংশ প্রজাতিগুলোই ছিল দানবীয় আকারের। পরবর্তীতে গবেষকরা দেখতে পান, জেফারসনের কাছে যে শ্লথের যে অস্থিগুলো গিয়েছিল সেগুলো ছিল Megalonyx গণের অন্তর্ভুক্ত।


চিত্র: জেফারসন এই ফসিল হয়ে যাওয়া অস্থিগুলোই পেয়েছিলেন

এদের ওজন ছিল প্রায় টন খানেক। এর চেয়েও বড় ছিল Megatherium গণের শ্লথগুলো। এরা ওজনে ছিল প্রায় ছয় মেট্রিক টন আর আকার আকৃতিতেও ছিল প্রমাণ সাইজের হাতির সমান। তারা নিজেদের বাহুর ওপর ভর দিয়ে জঙ্গল কিংবা সাভানার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করে বেড়াত। তীক্ষ্ম ও ধারালো নখগুলো তাদের খাবার খেতে ও গাছে উঠতে সাহায্য করত।

চিত্র: Megalonychidae গোত্রভুক্ত শ্লথ

শ্লথেরা বিবর্তনের ধারায় বেশ কয়েক মিলিয়ন বছর টিকে ছিল। কিন্তু প্রায় দশ হাজার বছর আগ থেকে অন্যান্য বেশ কিছু দানবাকৃতির প্রাণীর সাথে সাথে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন আসন্ন বরফ যুগ কিংবা ঐ অঞ্চলে ধীরে ধীড়ে মানুষের অনুপ্রবেশের ফলেই স্থলচর দানবাকৃতির শ্লথেরা বিলুপ্ত হতে শুরু করে।

শ্লথেরা উদ্ভিদভোজী হওয়ায় গাছের শীর্ষে তারা খাবার জন্যে প্রচুর পাতার সরবরাহ পায় আর গাছের শীর্ষদেশে থাকলে যেকোনো শিকারি প্রাণী সহজে তাদের আক্রমণ করতে পারবে না- মূলত এই দুটি সুবিধা থেকেই কিছু ছোট আকৃতির শ্লথ গাছের শীর্ষদেশে উঠে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে।

উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টে বর্তমানে মাত্র ছয় প্রজাতির শ্লথ টিকে আছে।

চিত্র: মানুষের সাপেক্ষে স্থলচর শ্লথগুলোর আকৃতির তুলনা

শ্লথগতির ইতিবৃত্ত

প্রাণীরা খাদ্য থেকে শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি (ATP) উৎপাদন করে। এ শক্তিই তাকে দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। এ শক্তির মাধ্যমেই প্রাণী তার সকল জৈবনিক ক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে পরিবেশে টিকে থাকে। তাই শ্বসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ প্রাণী কর্তৃক গৃহীত খাদ্যের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে।

বিবর্তনের ধারার একটা সময়ে গাছের শীর্ষদেশে বসবাস শুরু করতে থাকা শ্লথ ধীরে ধীরে সে পরিবেশেই অভিযোজিত হতে থাকে। সেই খাদ্যাভ্যাসেই তারা অভ্যস্ত হয়ে যায়। বিশেষত Bradypus গণের শ্লথগুলো খাদ্যের জন্য শুধুমাত্র গাছের পাতার উপর নির্ভর করে থাকে। গাছের পাতা থেকে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ অন্যান্য ফল মূল কিংবা আমিষ খাদ্য থেকে প্রাপ্ত শক্তির তুলনায় অনেক কম। তাই শুধুমাত্র গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকা শ্লথগুলো অন্যান্য প্রাণীগুলোর তুলনায় বেশ কম শক্তি উৎপন্ন করে।

চিত্র: Bradypus শ্লথ

তাই শ্লথদের স্বল্প শক্তি দ্বারা সকল জৈবনিক কার্যাবলী সম্পন্ন করার জন্য তাদের নিজেদের শারীরবৃত্তীয় আচরণে পরিবর্তন এসেছে। সে অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যে তাদেরকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হয়েছে।

প্রথমত, শ্লথেরা খাদ্য থেকে নির্যাস হিসেবে সর্বোচ্চ শক্তিটুকু গ্রহণ করে। তাদের পুরো শরীরের অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে কয়েক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট পাকস্থলি রয়েছে। প্রজাতিভেদে একবার খাদ্য গ্রহণ করবার পর তা সম্পূর্ণরূপে পরিপাক করতে শ্লথের পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে। এভাবে তারা খুব চমৎকার উপায়ে শক্তি সঞ্চয় করে রাখে।

দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনে তারা যত অল্প সম্ভব ঠিক ততটুকুই শক্তি ব্যয় করে। যেমন এরা না পারতে একদম নড়াচড়া করে না। এরা বেশিরভাগ সময়ই খাদ্য গ্রহণ করে বা বিশ্রাম নিয়ে কিংবা ঘুমিয়ে কাটায়। সপ্তাহে একবার প্রাকৃতিক কর্মের জন্য বিরতি নেয়। বিরতিকর্ম সম্পাদনের জন্য গাছ থেকে নামার সময়েও খুব ধীরে সুস্থে নড়াচড়া করে। এরা এক মিনিটে মোটামুটি পনেরো গজের মতো পাড়ি দেয়। ধীর গতির কারণে তারা মাটিতে নেমে আসলে খুব সহজেই শিকারির আক্রমণের শিকার হতে পারে।

যেহেতু শ্লথের খুব দ্রুত চলাচল করতে হয় না তাই শ্লথের খুব বেশি পেশিরও দরকার পড়ে না। প্রকৃতপক্ষে এদের সমান আকৃতির যেকোনো প্রাণীর চেয়ে এদের পেশির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কম।

নিজেদের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখতেও খুব বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয় না। কারণ অন্যান্য যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর চেয়ে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে প্রায় পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠানামা করতে পারে।

এই শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত অভিযোজন এবং নিজেদের অর্জিত বৈশিষ্ট্য শ্লথের শক্তির ব্যয় কমিয়ে তা পরিমিত পরিমাণে খরচ করতে সাহায্য করে। প্রসঙ্গত, তিন পায়ের পাতা বিশিষ্ট শ্লথগুলো (Bradypus) প্রাণিজগতের সবচেয়ে ধীর বিপাক হার সম্পন্ন প্রাণী।

শ্লথের এই ধীর গতি তাদেরকে এভাবে শুধুমাত্র পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে তাই-ই নয় বরং বিভিন্ন শ্যাওলা, ছত্রাক ইত্যাদির পোষক হিসেবেও কাজ করে। শ্যাওলার আবরণ আবার বনের ভেতর শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করে, যা তাদেরকে টিকে থাকার জন্য কিছুটা অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে।

বিবর্তনের ধারায় শ্লথ হয়তো তার অতিকায় দানবীয় চেহারা হারিয়েছে। কিন্তু শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত বৈচিত্র্যের দিক থেকে শ্লথ কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়।

তথ্যসূত্র

  1. Goaman, Karen, and Amery, Heather. Mysteries and Marvels of the Animal World. London: Usborne, 1983: 30.
  2. Stewart, Melissa (November 2004). “Slow and Steady Sloths”. Smithsonian Zoogoer. Smithsonian Institution. Retrieved 2009-09-14.
  3. Gilmore, D. P.; Da Costa, C. P.; Duarte, D. P. F. (2001-01-01). “Sloth biology: an update on their physiological ecology, behavior and role as vectors of arthropods and arboviruses”. Brazilian Journal of Medical and Biological Research. 34 (1): 9– doi:10.1590/S0100-879X2001000100002. ISSN 0100-879X.

রাইনো ভাইরাসের পৃথিবী জয়

আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মিসরীয় এক পণ্ডিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ ‘এবারস পাপিরাস’ লিখছলেন। তার বইয়ে বর্ণীত অনেক রোগের মাঝে একটি রোগের নাম ছিল ‘রেশ’। রোগের নাম অদ্ভুত হলেও তার উপসর্গ ছিল আমাদের চিরচেনা কফ ও সর্দি। এর রেশ হলো সাধারণ সর্দিজ্বর। এক হিসাবে দেখা গেছে একজন মানুষ তার জীবনের গোটা একটা বছর শুধু ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেয়।

চিত্রঃ এবারস পেপিরাসের অংশ।

এই ধরনের সাধারণ সর্দিজ্বর হবার কারণ হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। রোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে রাইনো ভাইরাসগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ভাইরাস।

গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস বিশ্বাস করতেন হাসি ঠাট্টা করার ক্ষমতা নষ্ট হলে ঠাণ্ডা লাগে। দুই হাজার বছর পরে ঊনিশ শতকের প্রথমদিকেও আমাদের জ্ঞানের খুব একটা উন্নতি ঘটেনি। ঐ সময় শরীরতত্ত্ববিদ

লিওনার্ড হিল বলেছিলেন সকালে বাইরে হাঁটাহাঁটি করলে কিংবা গরম থেকে ঠাণ্ডা পরিবেশে গেলে ঠাণ্ডা লাগে।

চিত্রঃ রাইনো ভাইরাস

প্রথমে অনেক বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছিলেন যে এটা হয়তো কোনো ব্যাকটেরিয়া হবে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক এলফন্স ডচেজ ১৯২৭ সালে এই ধারণা উড়িয়ে দেন। তিনি মানুষের সর্দি ফিল্টার করেন। ফিল্টারের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে ফেলার পরেও তা রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম ছিল। ব্যাকটেরিয়া আকারে তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার পক্ষে এই ফিল্টার ভেদ করে পার পাওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র অতি-ক্ষুদ্র ভাইরাসের মাধ্যমেই তা সম্ভব।জার্মান অণুজীববিজ্ঞানী ওয়ালথার ক্রুস ১৯১৪ সালে সাধারণ ঠাণ্ডা জ্বরের কারণ সম্বন্ধে প্রথম সঠিক অনুমান করেন। তিনি তার সহকারীর সর্দি নিয়ে তা লবণের দ্রবণে দ্রবীভূত করেন। এরপর তা ফিল্টার করেন। ফিল্টারকৃত সর্দি আরো বারো জন সহকর্মীর নাকে প্রবেশ করান। তাদের মধ্যে চার জন সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয়। তিনি একই কাজ ত্রিশ জন শিক্ষার্থীদের মাঝেও করেন। তাদের মধ্যে পনেরো জন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হয়। তিনি আরো পঁয়ত্রিশ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখেন যাদের উপর কোন পরীক্ষা চালানো হয়নি। তাদের মধ্যে কেবল একজন ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হন। এর ফলে মোটামুটিভাবে প্রমাণ হলো আক্রান্ত সর্দি অন্য কারো নাকে প্রবেশ করালেই কেবল রোগ ছড়াচ্ছে। ক্রুসের এই পরীক্ষা থেকে ধারণা পাওয়া গেল যে সর্দিজ্বরের জন্য কোনো একটি ক্ষুদ্র জীবাণু দায়ী যা রোগীর সর্দিতে উপস্থিত থাকে।

বিজ্ঞানীদের আরো তিন দশক লেগে যায় কাঙ্ক্ষিত এই ভাইরাসের পরিচয় জানতে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল রাইনো ভাইরাস। ‘রাইনো’ শব্দটির মানে হলো নাক। প্রতিটি রাইনো ভাইরাসে দশটি করে জিন আছে। অন্যদিকে মানুষের প্রায় ২০ হাজার জিন আছে। তবে রাইনো ভাইরাস তার অল্প সংখ্যক জিন নিয়েই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম।

নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মাধ্যমে রাইনো ভাইরাস চারদিকে ছড়িয়ে যায়। মানুষ যখন নাক ঝাড়ে তখন জীবাণু হাতে লেগে যায়। হাত থেকে আবার দরজার হাতলে লাগে। এভাবে সে যেখানেই ছোঁয় রাইনো সেখানেই ছড়িয়ে যায়। একইভাবে কোন মানুষকে ছুঁলে তা ঐ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এধরনের ভাইরাস মানুষের নাক, গলা এবং ফুসফুসের কোষ ভেদ করতে পারে। এরা কোষের ভেতরে ঢুকে পোষকের কোষকে ব্যবহার করে তার ডিএনএ’র কপি এবং তার প্রোটিন আবরণ তৈরি করে। তারপর পোষক কোষ ভেঙ্গে নতুন রাইনো ভাইরাস বেরিয়ে আসে শয়ে শয়ে।

চিত্রঃ ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন

এবারস পেপারাসের লেখক রেশের চিকিৎসা লিখে যান। চিকিৎসাটি হলো মধু, লতাপাতা ও ধোঁয়া মিশিয়ে নাকে মালিশ করা। এরকম আরো অদ্ভুত অদ্ভুত চিকিৎসার কথা পাওয়া যায় এখানে। পনেরো শতকের দিকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি বললেন যে নাকে ইঁদুর ঘষলে ঠাণ্ডা সেরে যাবে। সতেরো শতকে ইংল্যান্ডে ধারণা ছিল বারুদ, ডিম, গরুর মল এবং চর্বি একসাথে মিশিয়ে খেলে রোগ সেরে যাবে। লিওনার্ড হিল মনে করতেন তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ঠাণ্ডা লাগে। তার মতে বাচ্চারা সকাল সকাল গোসল করলে ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে পারবে।রাইনো ভাইরাস তুলনামূলক-ভাবে খুব কম কোষকে আক্রান্ত করে। কিন্তু তাও ঠাণ্ডা লাগলে আমাদের এত অস্বস্তি লাগে কেন? এর জন্যে যদি কাউকে দোষ দিতে হয় তাহলে তা আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই দিতে হবে। আক্রান্ত কোষ কিছু সিগন্যাল অণু তৈরি করে যাদের সাইটোকাইন বলে। সাইটোকাইন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা কোষকে নিয়ে আসে। ওই প্রতিরক্ষা কোষগুলোর কারণে আমাদের অস্বস্তি অনুভূত হয়। এই কারণে আমাদের গলায় খুসখুসে অনুভূতি সৃষ্টি হয়। সাথে তৈরি হয় কফ। তাই ঠাণ্ডা থেকে মুক্তি পেতে কেবল ভাইরাস থেকে মুক্তি পেলেই হবে না। সাথে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি শান্ত হওয়ার জন্যেও অপেক্ষা করতে হবে।

এই ধারণাগুলো নিয়ে হাঁসি পেতে পারে। মনে হতে পারে সেকালের মানুষেরা কত অদ্ভুত ছিল। আর কত উদ্ভট ছিল তাদের চিন্তাভাবনা। সত্যি কথা বলতে এখানে নিজেদেরকে আধুনিক ভাবার কিছু নেই। কারণ এখনো আমাদের কাছে সর্দি-জ্বরের উপযুক্ত ওষুধ নেই। সর্দিজ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনো আমাদের জানা নেই ।

এসবের মাঝে জিংক এক্ষেত্রে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জিংক রাইনো ভাইরাসের বংশবিস্তার বন্ধ করে দেয়। যারা ঠাণ্ডা লাগার এক দিনের মধ্যেই জিঙ্ক নেয় তারা অন্যদের চেয়ে দুয়েক দিন আগেই সুস্থ হয়ে যায়। বাবা মা অনেক সময় ঠাণ্ডা লাগলে বাচ্চাদের কফ সিরাপ দেয়। দেখা গেছে কফ সিরাপ ঠাণ্ডায় কোন উপকার করে না বরং উলটো এর অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তার মধ্যে খিঁচুনি, হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে যাওয়া অন্যতম। এমনকি এতে মৃত্যুও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ অধিদপ্তর শিশুদের কফ সিরাপ খাওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছে।

বেশিরভাগ সময় ডাক্তাররা ঠাণ্ডা লাগলে রোগীদের এন্টিবায়োটিক দেন। এই ধরনের চিকিৎসা পুরোপুরি বিবেচনাহীন। কারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার উপর। ভাইরাসের উপর এদের কোন কার্যকরিতা নেই। ডাক্তাররা এন্টিবায়োটিক দেবার একটি কারণ হলো তারা নিশ্চিতভাবে জানে না এটা সাধারণ ঠাণ্ডা নাকি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবিভাবকের চাপে পড়ে চিকিৎসকরা এন্টিবায়োটিক দেন। কিন্তু এন্টিবায়োটিকের এধরনের যথেচ্ছ ব্যবহার খুবই ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে পরবর্তীতে ডাক্তারদের দেয়া এন্টিবায়োটিক তো কাজ করেই না উলটো আমাদের জন্যে মরণঘাতি হয়ে ওঠে।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক আসলে ভালো কোনো সমাধান নয়।

সাধারণ সর্দিজ্বরের কোন চিকিৎসা না থাকার একটা কারণ হলো রাইনো ভাইরাসকে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। রাইনো ভাইরাসকে অনেক রূপে পাওয়া যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সবেমাত্র রাইনো ভাইরাসের জেনেটিক বৈচিত্র্য বুঝতে শুরু করেছেন। বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের প্রায় বারোটি স্ট্রেইন শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এদের মধ্যে দুটো হচ্ছে HRA-A এবং HRA-B।

কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন এবং থমাস ব্রিজ মিলে নিউইয়র্ক শহরের এমন কিছু বাসিন্দাদের নিয়ে গবেষণা করেন যাদের ঠাণ্ডার কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নয়। তারা গবেষণা করে দেখেন যে ঐসব লোকের রোগের কারণ HRA-A এবং HRA-B নয় বরং রাইনো ভাইরাসের অন্য আরেকটি স্ট্রেইন। তারা এর নাম দেন HRA-C। বিভিন্ন স্থানের HRA-C স্ট্রেইনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। এ থেকে এটা বোঝা যায় যে এই স্ট্রেইন উদ্ভুত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। বেশি দিন না হওয়া সত্ত্বের এটি খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞানীরা রাইনো ভাইরাসের যতই স্ট্রেইন আবিষ্কার করছেন ততোই তাদের বিবর্তন সম্বন্ধে জানছেন। সকল রাইনো ভাইরাস কিছু সাধারণ জিনোম বহন করে। সাধারণ বা কমন জিনোমগুলো সকল প্রকার স্ট্রেইনের রাইনো ভাইরাসে বিদ্যমান। রাইনো ভাইরাসের এই অংশ বিবর্তনে খুব অল্পই পরিবর্তিত হয়েছে। বাকি জিনোমগুলো অনবরত পরিবর্তিত হয়ে চলছে। জিনোমের এই অংশগুলো রাইনো ভাইরাসকে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে দেহের ক্ষতি সাধন করে। আমাদের দেহ যখন এক স্ট্রেইনের জন্য এন্টিবডি তৈরি করে তখন অন্য স্ট্রেইনগুলো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কারণ এন্টিবডিগুলো রাইনো ভাইরাসে যুক্ত হওয়ার জন্য উপযুক্ত সারফেস প্রোটিন পায় না। ফলে তা ঐ স্ট্রেইনের ভাইরাসগুলোকে মারতে পারে না।

চিত্রঃ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে ভাইরাসগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠলে তা মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হবে।

রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা এত কঠিন হওয়া স্বত্বেও বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধের ব্যাপারে আশাবাদী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল রাইনো ভাইরাসের একটা সাধারণ জিনোম আছে যার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। বিজ্ঞানীরা এমন একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে চাইছেন যা রাইনো ভাইরাসের জিনোমের এই অংশকে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রাইনো ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।রাইনো ভাইরাসের এই বৈচিত্র্যের ফলে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি ভ্যাক্সিন যদি একটি স্ট্রেইনের জন্য কার্যকর হয় দেখা যায় তা অন্য আরেকটি স্ট্রেইনের জন্য কাজ করছে না। আবার কোনো স্ট্রেইনের যদি সেই ভ্যাক্সিনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে তাহলে পরবর্তীতে মিউটেশনের মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা তাকে ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী করে তোলে।

রাইনো ভাইরাসের এই সাধারণ জিনোম অংশটি দেখতে অনেকটা লবঙ্গের মতো। বিজ্ঞানীদের গবেসনায় প্রত্যেক রাইনো ভাইরাসে এই লবঙ্গের গঠনটি পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা যদি এই লবঙ্গের মতো গঠনকে ভেঙ্গে দিতে পারেন তাহলে তারা পৃথিবীর সকল সর্দি-জ্বর প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

কিন্তু তা কি আসলেই ঠিক হবে? উত্তর এখনো অজানা। রাইনো ভাইরাসের ফলে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঠাণ্ডা তো বাধায়ই, পাশাপাশি এটি অন্যান্য ভাইরাসকে আক্রমণের সুযোগও করে দেয়। কিন্তু রাইনো ভাইরাস নিজে আসলে আমাদের তেমন কোনো ক্ষতি করে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এধরনের ছোটখাটো ও তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর রোগ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পরিণত ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে তা আমাদের নানা ধরনের ইমিউন ডিজঅর্ডার রোগ যেমন এলার্জি ও ক্রন হওয়া থেকে বাঁচায়। তাই রাইনো ভাইরাসকে আমাদের পুরনো শত্রু না ভেবে পুরনো শিক্ষক হিসেবে ভাবা উচিৎ।

তথ্যসূত্র

A planet of viruses (Second edition), Carl Zimmer, 2015

https://en.wikipedia.org/wiki/Walther_Kruse