ফুলেরা কীভাবে জানে কখন ফুটতে হবে?

শীতপ্রধান দেশগুলোয় শুভ্র তুষারের খাঁজ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে ফুলের পাপড়ি – এ দৃশ্যটি একটি আনন্দের খবর ইঙ্গিত করে। বসন্ত আসছে শীঘ্রই। কী বুদ্ধি! ফুলের পাপড়ির উঁকি দেখে আমরা মানুষেরা বলে দিবো বসন্ত আসছে। কিন্তু উদ্ভিদকে কে বলে দিল যে এখন ফুল ফোটার সময় হয়েছে? ড্যাফোডিল কেন বসন্ত এলেই ফুটতে যায়, গোলাপ কেন গ্রীষ্মের কাছে ধরা দেয়?

উদ্ভিদের এ ফুল ফোটানোর ছদ্মবেশী বৌদ্ধিক প্রবৃত্তির পেছনে আসলে কাজ করছে জিনগত জটিল প্রক্রিয়া।

এপেটেলা১ (Apetala1) নামের জিন উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর কাজটি করতে বলে বা এ জিনের মধ্যে ফুল ফোটার সময়ের সূত্রটি দেয়া থাকে, যেভাবেই বলা হোক আর কি।

প্রভুসুলভ এ একাকী জিনটি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধিজনিত কর্মকান্ড শুরু করার জন্য হুকুম করে বলা চলে। অনেকটা আমাদের ঘড়ি বা ফোনে এলার্ম দিয়ে রাখার মতো। সময় হলে যেমন ঘড়ি বা ফোন নিজে থেকে বেজে উঠে আমাদের জানিয়ে দেয়, তেমনি এপেটেলা১ জিনটি এলার্মের মতো উদ্ভিদকে ফুল ফোটানোর সময়টা বলে দেয়। আর ফুল ফোটা মানেই বংশবৃদ্ধির জন্য প্রস্তুতি। আর এ এলার্মিং এর কাজটি এপেটালা১ একাই করে ফেলে, অন্য কোনো জিনের সাহায্য ছাড়াই।

উদ্ভিদের মাঝে আবার এপেটেলা১ জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তার ব্যাপার আছে। এ জিন সক্রিয় থাকলে ফুল ফোটে, আর যে উদ্ভিদে নিষ্ক্রিয় সেটায় ফুল ফোটা বিরল প্রায়। ইতিবাচকভাবে কিছু ঘটলে যেটুকু হয় তা হলো তখন ফুল-পাপড়ির বদলে কান্ড পত্রবহুল হয়ে ওঠে।

আগেই বলেছি এপেটেলা১ একটি প্রভুসুলভ একাকী জিন। এটি প্রোটিন তৈরি করে, যার ফলে সে প্রোটিনগুলো আরো ১০০০টি জিনকে ফুল ফোটানো সংক্রান্ত কাজে লিপ্ত করে। এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্ল্যান্ট ডেভেলাপমেন্টাল জেনেটিক্স গবেষণাগারের গবেষকরা।

প্রায় এক দশক আগে এপেটেলা১-কে উদ্ভিদের পুষ্পায়নের পেছনে দায়ী গুরু নিয়ন্ত্রক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বিজ্ঞানীরা এপেটেলা১ কীভাবে অন্যান্য বর্ধমান জিনদের সাথে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ করে তা দেখতে সক্ষম হলেন। গত শতাব্দীর ৩০ এর দশকে রাশিয়ান বিজ্ঞানীরা পুষ্পায়পনের জন্য কল্পনা করেছিলেন কোনো এক রহস্যজনক পদার্থ দায়ী, যার ফলে ফুলের কুঁড়ির আবির্ভাব হয় গাছে। সে পদার্থটির নাম দিয়েছিলেন ফ্লোরিজেন (florigen)।

ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের স্মার্ফিট ইনস্টিটিউট অব জেনেটিক্সের ডক্টর ফ্রাঙ্ক ওয়েলমার গবেষণাপত্রটির একজন শীর্ষ লেখক। তিনি বলেন, “আমাদের আবিষ্কারটি ফুলের ক্রমবিকাশের জিনগত প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিস্তারিত অন্তর্দৃষ্টির সূত্রপাত করেছে। আমরা এখন জানি কোনো জিনটি নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন ঘটানো বা থামানো সম্ভব। এ ঘটনাটি উত্তেজনাকর এজন্য যে, আমরা বুঝতে শুরু করছি ফুল ফোটার মাধ্যমে কীভাবে উদ্ভিদ প্রজনন দশায় প্রবেশ করে।”

বিষয়টির চমক পাঠককে ধরিয়ে দিচ্ছি। ধরুন, একটি শহরের যত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আছে তার প্রতিটি যন্ত্রপাতির জন্য একটি করে সুইচ আছে। আর সবগুলো সুইচ একত্রে আপনার কাছে আছে, লক্ষ লক্ষ! আর আপনি এর মধ্যে থাকা একটি সুইচ যেটা কিনা হয়ত শহরের সাইরেনের সুইচ সেটা চিনে গেলেন। মানে হচ্ছে একটি বিরাট অজানা সংখ্যক সুইচ থেকে আপনি হয়ত কাজের একটা সুইচ বের করে ফেললেন, বা সেটি আপনার ঘরের বাতির সুইচও হতে পারে। জানা না থাকলে হয়ত আপনি নিজের ঘরের আলো জ্বালতে গিয়ে আরেকজনের ঘরের এয়ার কুলার ছেড়ে দিতেন!

এপেটেলা১ জিন হলো ফুল ফোটানোর সুইচের মতো। যখন এপেটেলা১ জিনটি সক্রিয় হয় (সুইচ অন করে), তখন অন্যান্য জিনদের প্রতি এর প্রথম কমান্ড হলো উদ্ভিদের ভাজক টিস্যুদেরকে একটি ‘স্টপ’ সংকেত পাঠানো, যাতে উদ্ভিদের পাতার উৎপাদন থেমে যায়। উদ্ভিদের বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোয় থাকা ভাজক টিস্যুগুলো তখন সতর্ক হয়ে যায় এবং পাতার পরিবর্তে ফুলগঠনের দিকে ব্যস্ত হয়।

উদ্ভিদের বিভিন্ন সময়ে ফুল ফোটানোর জন্য কিছু বাহ্যিক নিয়ামক রয়েছেঃ আবহাওয়া, তাপমাত্রা, উদ্ভিদ কর্তৃক গৃহীত সূর্যালোকের পরিমাণ প্রজননের বিকাশে প্রভাব রাখে। এ পারিপার্শ্বিক প্রভাবের তথ্যগুলো এপেটেলা১ এর কাছে পৌছে যায়। আর এপেটেলা১ বুঝে যায় যে ফুল ফোটানোর কাজ শুরু করে দিতে হবে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নাটকীয়ভাবে প্রভাব রাখছে ফুল ফোটার সময়ের উপর। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন এমন সময়ে ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা ২৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শীঘ্রতম। তথ্যটি নেয়া হয়েছে নেচার ক্যালেন্ডারের উপাত্ত থেকে। জাতীয় পর্যায়ে ব্রিটেন এই জরিপের কাজটি করেছে উডল্যান্ড ট্রাস্ট এর সহায়তায় Centre for Ecology & Hydrology (CEH) এর অধীনে।

ব্রিটেনের নাগরিকদের দেয়া তথ্য দিয়ে একটি সূচক তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে CEH এর গবেষকরা ৪০৫টি ফুলের প্রজাতির ফুল ফোটার তারিখের তথ্য বের করেছেন। তা থেকে গবেষকরা উদ্ভিদের জীবনচক্রের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণার এ শাখাটির নাম জলবায়ুবিদ্যা। তারা বলেছেন, বছরের শেষের দিকের ফুলের প্রজাতিগুলোর চেয়ে বসন্তে ফোটা ফুলের প্রজাতিগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, এ গবেষণার লাভটা কী? ফুলের ফোটার সময়ের কারণ জেনে আমরা কী করব?

উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে এপেটেলা১ এর ভূমিকা ধরে ফেলার মাধ্যমে আমরা আমরা জিন প্রকৌশলের দিকে আরো একধাপ এগিয়ে গেলাম। প্রজননকারী এবং চাষীদের সক্ষমতা তৈরি হবে আকাঙ্ক্ষিত সময়ে ফুল, আরেক অর্থে বললে ফসলের উৎপাদন করতে। উদ্ভিদের প্রজননকে নিয়ন্ত্রণ করে ফল/ফসলের উৎপাদনের সময়ও হ্রাস করে আনা সম্ভব হবে।

ওয়েলমার বলেন, “ফুল ফোটার উপর বিস্তারিত জ্ঞান প্রজননকারীদের নিপুণভাবে উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ ও বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। পরবর্তীতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য দক্ষ চাষাবাদের সুযোগ বাড়বে।”

– শাহরিয়ার কবির পাভেল

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ,শাবিপ্রবি

 

তথ্যসূত্র:

http://www.livescience.com/32529-how-do-flowers-know-when-to-bloom.html

http://www.livescience.com/377-mystery-solved-plants-flower.html

 

লম্বাগলা জিরাফ

পাশ দিয়ে ছ’ফুট লম্বা কেউ হেঁটে গেলে আমরা গলা লম্বা করে তাকাই, আর বলি বাহ কত লম্বা! জিরাফ, ডাঙার সবচেয়ে লম্বা প্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম G. Camelopardalis। একটি জিরাফ প্রায় ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। আজকে এই জিরাফ নিয়েই কিছু ব্যতিক্রমী জিনিস দেখবো।

​​লম্বা গলায় রক্ত সঞ্চালনের জন্য জিরাফের হার্ট অনেক বড় এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। জিরাফের মাথায় দুই থেকে চারটি শিং দেখা যায়। যদিও বিজ্ঞানীরা একে শিং হিসাবে মানতে নারাজ। আসলে তরুণাস্থি দিয়ে মাথার ত্বকের উপরের এই শিং আসলেই cornual process of skull নয়।

জিরাফের দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর। ফলে বহুদূরের শত্রুকেও জিরাফ সহজেই দেখতে পারে। এছাড়া জিরাফ খুব জোরে দৌড়াতে পারে। আক্রমণের শিকার হলে জিরাফকে ঘণ্টায় প্রায় ৫৬ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে দেখা গেছে। জন্মের সময় একটি জিরাফ প্রায় ৬ ফুট লম্বা হয় এবং এর ওজন থাকে গড়ে ৬৮ কেজি। অনেক জিরাফের মাথায় দুইটি বা চারটি ভোঁতা শিং থাকে। জিরাফের জিভও খুব লম্বা। নিজের কান পরিষ্কারের জন্য জিরাফ তার প্রায় ২১ ইঞ্চি লম্বা জিভ ব্যবহার করে।

দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে বলে সিংহকেও সাবধানে থাকতে হয়। কারণ জিরাফের লাথির আঘাতে সিংহ মারাত্মক আহত হতে পারে। এছাড়া আক্রমণের ভয়ে জিরাফ কখনো বসে ঘুমায় না বা বিশ্রাম নেয় না। কারণ জিরাফের বসতে যেমন সময় লাগে প্রচুর, তেমনি বসা থেকে দাঁড়াতেও অনেক সময় নেয়। এছাড়া প্রকৃতিগতভাবেই জিরাফ লম্বা হওয়ায় বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তবে দলগতভাবে থাকা অবস্থায় কিছু কিছু জিরাফ মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নেয়। পানি খাওয়া, ঘুমানো কিংবা দিনের বেলা বিশ্রামের সময় অন্তত একটি জিরাফ আশেপাশে নজর রাখে শত্রুর উপস্থিতি জানানোর জন্য। খুব নিচু আওয়াজে এরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এদের গলার আওয়াজ ২০ হার্জেরও নিচে। ফলে জিরাফের আওয়াজ মানুষ শুনতে পায় না। জিরাফ সাধারণত নিজেদের মধ্যে লড়াই করে না। তবে খেলাধুলা করার সময় কিংবা খুব বেশি রাগান্বিত হলে পুরুষ জিরাফরা মাঝেমধ্যে এক অন্যের সাথে লড়াই করে।

দীর্ঘ আকাশিয়া গাছের পাতাই এদের অন্যতম খাদ্য। অন্য প্রাণীরা অবশ্য এই লম্বা গাছের পাতা খেতেও পারে না। জিরাফের আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা উটের মতো পানি না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে একটানা সাতদিন পানি না খেলেও এদের কোনো সমস্যা হয় না। গাছের পাতায় যে পানি থাকে, তা দিয়েই তাদের চাহিদা মিটে যায়।

নাচতে জানে জিরাফ

নিজের দীর্ঘ ঘাড় ব্যবহার করে নাচ প্রদর্শন করে জিরাফ। জিরাফের এই নাচকে ইংরেজিতে বলা হয় নেকিং (necking)। নেক মানে ঘাড়। কিন্তু জিরাফের বেলায় আমরা বলতে পারি ঘাড়তেড়ামি! মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও আসলে দুই পুরুষ জিরাফের আধিপত্য ছড়ানোর লড়াই এটি। যাতে ঘাড়ই তাদের প্রধান ও একমাত্র অস্ত্র। লড়াইয়ে বিজয়ী পুরুষ জিরাফই স্ত্রী জিরাফের সংস্পর্শে আসতে পারে।

এত সুন্দর প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে। IUCN এর Red List এ নাম উঠে গেছে তার। আসুন আমরা পরিবেশের প্রতি একটু সচেতন হই। আর এই বর্ষায় অন্তত একটি করে গাছ লাগাই।

তথ্যসূত্রঃ

১। World Animal Science: Zoo Animal, Pub: Elsevier, Amsterdam-Lausanne- New York- Oxford-Shannon- Tokyo

২। https://en.wikipedia.org/wiki/Giraffe

৩। http://animals.sandiegozoo.org/animals/giraffe

৪। www.banglanews24.com/feature/news/357155

৫। IUCN Red book.

 

ডায়নোসরের ক্লোন করা কি সম্ভব?

আজকের মানুষ যেমন বিভিন্ন জাতি গোত্রে ভাগ হয়ে সমস্ত পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে, মানুষের আবির্ভাবের আগে ঠিক এমন একটা রাজত্ব ছিল ডায়নোসরদের। জলে-স্থলে সবখানেই। কোনো এক দুর্ঘটনায় বৈচিত্র্যময় ডায়নোসররা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের কোনো কোনোটির দেহাবশেষ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়। এই দেহাবশেষের সূত্র ধরে কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগে, বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত হয়েছে, উন্নত বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে কি সেই ডায়নোসরদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় না?

এই চাহিদা বা আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছিল হলিউড চলচ্চিত্র ‘জুরাসিক পার্ক’ এর মাঝে। জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রে দেখা যায় বিজ্ঞানীরা এম্বারে আটকানো অবস্থায় ডায়নোসরের সচল DNA উদ্ধার করতে পারে, এবং সফলভাবে একে কাজে লাগিয়ে ডায়নোসর উৎপাদন করতে পারে।

উল্লেখ্য এম্বার হচ্ছে এক ধরনের আঠা জাতীয় পদার্থ। প্রাগৈতিহাসিক যুগে কোনো মশা যদি কোনো ডায়নোসরকে কামড়ে এম্বারে গিয়ে বসে এবং ঘটনাক্রমে ঐ মশা এম্বারের ভেতর আটকা পড়ে যায় এবং আঠা শুকিয়ে যায় তাহলে বছরের পর বছর মশার ভেতরে থাকা ডায়নোসরের রক্ত সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এমনকি কোটি কোটি বছর পর্যন্ত তা সংরক্ষিত থাকে। এই অনুকল্পকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠেছিল স্টিভেন স্পিলবার্গের জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রটি।

চিত্রঃ এম্বারে আটকে যাওয়া প্রাগৈতিহাসিক পোকা। ছবিঃ American Museum of Natural History

কিন্তু বাস্তবতা সিনেমার মতো নয়। এম্বারে আটকে থাকা দেহাবশেষ হতে ঐ প্রাণী পুনরুৎপাদন সম্ভব নয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল এই কথাই বলে। এম্বারে হয়তো প্রাগৈতিহাসিক সময়ের DNA-র অনেক তথ্য থাকে কিন্তু তা একটি প্রাণীকে পুনরুৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়।

DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে?

প্রাণী ক্লোন করার প্রথম শর্তটি হচ্ছে ঐ প্রাণীর অবিকৃত ও নিখুঁত DNA-র উপস্থিতি। সাম্প্রতিক সময়ে অস্তিত্ব আছে এমন প্রাণীর বেলায় অবিকৃত DNA পাওয়া খুবই সহজ। কিন্তু সেই প্রাণীটি যদি হয় লক্ষ কোটি বছরের আগের তাহলে সেখানে অবিকৃত DNA প্রাপ্তি নিয়ে কিছু সমস্যা আছে।

কোনো একটা প্রাণী (বা জৈবিক সিস্টেম) মারা যাবার পর থেকেই তার DNA ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে বিভিন্ন এনজাইম যা মাটির বিভিন্ন অণুজীব বা দেহের বিভিন্ন কোষে উপস্থিত থাকে। পাশাপাশি সূর্যের অতি-বেগুনী রশ্মিও এই ক্ষয়ের পেছনে কাজ করে। উপরি পাওনা হিসেবে পানির কণা কিংবা বাতাসের অক্সিজেনও DNA-র ক্ষয়িষ্ণুতার জন্য দায়ী হতে পারে। যে যে উপাদানগুলোর কথা বলা হয়েছে তারা ততদিন পর্যন্ত DNA-র ক্ষয় করেই যাবে যত দিন না পুরো DNA টা শেষ হয়ে যায়। যখন আর কোনো কিছুই বাকি থাকবে না তখন তাদের কার্যকরীতা শেষ হবে। পরিবেশে যেহেতু এদের কোনো অভাব নেই, তাই কোনো অবিকৃত DNA-র আশা না করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

এমন পরিস্থিতিতে একটি DNA কতদিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে তা কিছুটা ঘোলাটে। বিজ্ঞানীদের ধারণা একটি DNA অনায়াসেই ১ মিলিয়ন বছর টিকে থাকতে পারে। কিন্তু কখনোই ৫/৬ মিলিয়নের বেশি সময় টিকে থাকা সম্ভব নয়। যা ডায়নোসরের DNA-র বেলায় খুবই অপ্রতুল। কম করে হলেও ৬৫ মিলিয়ন বছর টিকে থাকা লাগবে। ৬৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন বছর আগে ডায়নোসরেরা পৃথিবীতে বিরাজ করেছিল।

সত্যি কথা বলতে কি অনেক গবেষকই ডায়নোসরের ক্লোন করতে আগ্রহী, কিন্তু ক্লোন করার জন্য যতটুকু অপরিবর্তিত DNA দরকার তারা তা কখনোই সংগ্রহ করতে পারেননি।

একবার একদল গবেষক ডায়নোসরের হাড়ের ভেতর এমন এক উপাদান পেয়েছিল যা গবেষকদের আশা যোগায়। গবেষকদের ধারণা এখানে প্রাপ্ত DNA দিয়ে বিশেষভাবে হলেও ডায়নোসর ক্লোন করা যাবে।

কিন্তু এখানেও সমস্যা দেখা দেয়। ঐ উপাদান ছিল এক কপি-ই। তার উপর এটি যে ডায়নোসরের তা শতভাগ নিশ্চিত নয়। হতে পারে এটি ডায়নোসরের ভেতরে বাসা বাধা কোনো জীবাণুর, কিংবা হতে পারে ঐ সময়ে বাস করা অন্য কোনো প্রজাতির। শতভাগ নিশ্চিত হতে হলে এর সিকোয়েন্স করতে হবে, সিকোয়েন্স করলে DNA টি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যা আগের অবস্থা আর ফিরে পাবে না। সবদিক বিবেচনা করে সবেধন নীলমণি উপাদানটিকে অক্ষত রাখতেই সম্মত হয়েছেন বিজ্ঞানী দল।

চিত্রঃ কোনোভাবে মেসোজয়িক পিরিয়ডের DNA আজকের যুগে টিকে থাকলেও তা এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে যে এটি দিয়ে উল্লেখ করার মতো কিছু করা যাবে না।

তাহলে ডায়নোসরদের হাড়গুলো? হাড়গুলো আসলে ‘হাড়’ নয়। এগুলো ফসিল। ফসিলগুলো ডায়নোসরের দেহের ছাচে তৈরি হয়েছে। ডায়নোসরের হাড়ের প্রতিটি অণু-পরমাণু প্রতিস্থাপিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই ফসিল। মৃতদেহ যখন কাদার মাঝে নিমজ্জিত হয় তখন দেহের প্রতিটি অণু-পরমাণু একটি একটি করে খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণু দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। খনিজ পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো পানিতে/কাদায় নিমজ্জিত থাকে। প্রতিস্থাপিত হওয়া অণু-পরমাণুগুলো পরবর্তীতে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এগুলোকেই আমরা ফসিল হিসেবে জানি।

যুক্তির খাতিরে

তারপরও যদি যুক্তির খাতিরে ধরে নেই ডায়নোসরের DNA ঠিকঠাক মতোই সংরক্ষিত আছে এবং তা থেকে ডায়নোসর ক্লোন করা সম্ভবও, তাহলেও এখানে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত ক্লোন করতে হলে একটি পেটে ধারণকারী ‘মা’ লাগবে, যা পৃথিবীতে নেই। ডায়নোসরেরা অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এদের বংশধর বিবর্তনের মাধ্যমে পাখি হয়ে আজকের যুগে উড়ছে, কিন্তু প্রজাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক দূরে চলে গিয়েছে, তাদের মাঝে আজ অনেক পার্থক্যের দেয়াল তৈরি হয়ে আছে।

অন্য কোনো বিকল্প না থাকাতে যদি গর্ভ হিসেবে পাখিকে বেঁছে নেয়া হয় তাহলেও সমস্যা দেখা দিবে। ওখান থেকে জন্ম নেয়া প্রাণীতে পাখির বৈশিষ্ট্যও সঞ্চারিত হবে। অর্থাৎ উৎপাদিত প্রাণীটি ঠিক ঠিক কাঙ্ক্ষিত থাকবে না। কিছুটা সংকর হয়ে যাবে।

চিত্রঃ ডায়নোসরদের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার ডায়নোসর (যে কোনো প্রজাতির) তৈরি করতে হবে। ছবিঃ Todd Marshall

তার উপর বর্তমানের পরিবেশ সমস্যা করবে। যে DNA থেকে মানুষ ডায়নোসর ক্লোন করবে ঐ DNA-র প্রাণী এমন একটা পরিবেশে বেঁচে ছিল যা আজকের পরিবেশ থেকে একদমই আলাদা। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ, অক্সিজেনের পরিমাণ, তাদের তুলনামূলক অনুপাত এখনকার পরিস্থিতির চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল। তাপমাত্রাও ভিন্ন ছিল। দূষিত, বিপর্যয়গ্রস্ত ও অপরিচিত একটা পরিবেশে তার টিকে থাকাই কষ্টকর হবে। একটি ডায়নোসরকে এই পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা বেশ চেলেঞ্জিং হবে। জীবাশ্মবিদ সুইটজার মনে করেন, নবসৃষ্ট প্রাণীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হলে কম করে হলেও ৫ হাজার পরিমাণ ডায়নোসর তৈরি করতে হবে। যা সমস্যার পিঠে সমস্যাই তৈরি করে চলবে।

তথ্যসূত্র

  1. লাইভ সায়েন্স, http://www.livescience.com/54574-can-we-clone-dinosaurs.html
  2. মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি (জুন ২০১৫)
  3. বিজ্ঞান ব্লগ, org/?p=6019

 

 

মানব প্রজাতির অনন্যতা

মস্তিষ্কের আকার এবং গঠন

মানব প্রজাতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট জৈবিক বৈশিষ্ট্য হলো তার তুলনামূলক বড় মস্তিষ্ক। দেহের আকার বড় হলে মস্তিষ্কের আকার বড় হতে পারে। কিন্তু তার ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা একই রকম হবে এমন নয়। উদাহরণস্বরূপ হাতি ও তিমির কথা বলা যেতে পারে। যাদের মস্তিস্কের আকার মানুষের তুলনায় ৪-৫ গুণ বড়। বড় হলেও দেহের অনুপাতের দিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের মস্তিষ্ক খুব একটা বড় বলে মনে হবে না। আনুপাতিক দিক থেকে মানুষের মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড়।

চিত্রঃ মানুষ ও অন্যান্য কিছু প্রাণীর তুলনামূলক মস্তিষ্ক।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের আকার, শরীরের গঠন ও মেটাবলিজমের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। দীর্ঘদেহী প্রাণীদের মস্তিষ্ক অধিক পরিমাণ মেটাবলিক শক্তি উৎপন্ন করে। বিড়াল বা কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্ক ৪-৬% মেটাবলিক শক্তি ব্যবহার করে। আদিম ম্যাকাও বানরেরা ৯% শক্তি ব্যবহার করে। আধুনিক মানুষ ব্যবহার করে ২০%। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, মানব মস্তিষ্কের আকার শুধুমাত্র বড়ই নয়, গঠনগত দিক থেকেও ভিন্ন।

দ্বিপদী চলন

মানুষ এবং এপদের মধ্যে আরেকটি লক্ষ্যণীয় পার্থক্য হচ্ছে মানুষ দুই পায়ে হাঁটে। মানুষ bipedal বা দ্বিপদী। তবে এর মানে এই নয় যে এপরা দুই পায়ে হাঁটতে পারে না। তারা দুই পায়ে হাঁটতে পারে কিন্তু মানুষের মতো করে নয়। মানুষের শারীরিক অভিযোজন মানুষকে স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে দুই পায়ে হাঁটতে সাহায্য করেছে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী নয় যারা দ্বিপদী। ক্যাঙ্গারুও দুই পায়ে চলাচল করে, কিন্তু এটি মানুষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। ধীর গতিতে মানুষের চলার পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষ প্রথমে স্থির হয়ে দাঁড়ায় তারপর একটি পা সামনে বাড়ায় এতে করে মানুষ তার ভরকে ঐ পায়ের উপর স্থানান্তর করে। যখন ঐ পায়ের গোড়ালি ভূমি স্পর্শ করে তখনই সমস্ত শরীরের ভর স্থানান্তরিত হয়। এভাবে দু’পায়ের পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঁটার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। আমরা যখন হাঁটার জন্য একটি পা সামনে বাড়াই তখন অন্য পায়ের উপর ভারসাম্য রাখি। হাঁটার জন্য ভারসাম্য ও সমন্বয় উভয়েরই প্রয়োজন।

চিত্রঃ মানুষ, এপ এবং বানরের ফিমারের তুলনামূলক চিত্র।

মেরুদণ্ড মানুষকে সোজা হয়ে চলতে সাহায্য করে। মানুষের শিরঁদাড়াটি খাড়াভাবে অবস্থিত, যার কারণে শরীরের ওজনকে সোজা নিচের দিকে স্থানান্তর করতে পারে। এপদের মেরুদণ্ড কিছুটা বাঁকা তাই যখন তারা দুই পায়ে দাঁড়ায়, তখন ভারকেন্দ্র সোজা নিচের দিকে না হয়ে কিছুটা সামনের দিকে স্থানান্তরিত হয়। ফলে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে সোঁজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না।

শিকারী দাঁত

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানুষের শিকারী দাঁত কিছুটা ভিন্ন। মানুষের এই দাঁত ছোট ও অন্যান্য দাঁতের প্রায় সমান। এদের কাজ বা ব্যবহার অন্যান্য দাঁতের মতোই। কিছু বিশেষ ব্যবহারও রয়েছে এগুলোর, যেমন সুতা বা এমন সাধারণ কোনোকিছু কাটতে এই দাঁত ব্যবহার করা হয়। মানুষের এই ছোট ও অলক্ষণীয় দাঁত বিবর্তনের কারণ ও ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। যেখানে অনেক প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে শিকারী দাঁত অস্ত্র হিসাবে কাজ করে, সেখানে মানুষের বড় শিকারী দাঁত না থাকা তাদের এই অস্ত্রের অপ্রয়োজনীয়তার নির্দেশক। এমনটা হতে পারে, মানুষের পূর্বপুরুষরা যন্ত্রের ব্যবহার শুরু করার পর তাদের আর এই দাঁত ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি। লম্বা অতিরিক্ত অংশটি এক সময় অন্য সাধারণ দাঁতের পর্যায়ে এসে মিশেছে।

প্রজনন

চিত্রঃ মানুষের শ্রোণি অস্থি চক্র।
 

 

যৌনতার ব্যপারে মানুষ অন্যান্য প্রাইমেটের চেয়ে বেশি সচেতন। মানুষের সন্তান জন্মদান বা পুনরুৎপাদন অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য প্রাইমেটদের মতো। মানব শিশুর তুলনামূলক বড় মস্তিষ্কের কারণে মায়ের পক্ষে সন্তান জন্মদান করাটা তুলনামূলক কষ্টসাপেক্ষ্য। তার উপর দুই পায়ের প্রাণী হিসেবে শ্রোণির হাড়ের বিশেষ গঠনের জন্য সন্তান জন্মদান প্রক্রিয়াটা বানর জাতীয় প্রাণীদের চেয়ে বেশি জটিল ও দুষ্কর হিসেবে দেখা দেয়। বর্তমান সময়ের মানুষের শ্রোণিচক্রের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের ফলে নবজাতক সন্তানকে একটি চিকন, সরু ও গোলাকার পথে জন্মাতে হয়। অন্যের সাহায্য ছাড়া বাচ্চা জন্ম দেওয়া মানুষের জন্য কঠিন। এই সমস্যার কারণে সকল মানব সমাজে বাচ্চা জন্ম দেবার সময় অন্যের সহায়তা করার নিয়ম রয়েছে।

সাংস্কৃতিক অভিযোজন

মানুষের সামাজিক গঠন জটিল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। পরিবার, জৈবিক আচরণ, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আইন ইত্যাদি প্রায় সকল বিষয় মানব সমাজে লক্ষণীয়। এবং সমাজ ভেদে এসব নিয়ম কানুনের ভিন্ন্যতাও লক্ষণীয়। মানব সংস্কৃতিতে কোনো বিষয় সার্বজনীন নয়। যেমন একক ও একগামী পরিবারের ধারণা প্রায় সকল সমাজের আদর্শ হলেও একাধিক স্বামী বা স্ত্রীর ধারণাও সমাজে বিরল নয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ সবসময় একরকম ছিল না। সময়ের সাথে সাথে এর ব্যপক পরিবর্তন ঘটেছে। খাদ্য, যৌনতা, প্রজননের মতো জৈবিক চাহিদাগুলো মানুষের আচরণের বৈশিষ্ট্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। একটি মানব শিশু জন্মের পর অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় মা-বাবার উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হবার কারণে মানব সমাজে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদেই শক্ত পারিবারিক ভিত্তি প্রয়োজন।

মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারে, যা অন্যান্য প্রাণীরা তেমন করে পারে না। সাধারণভাবে বলা যায়, আধুনিক মানুষ হলো toolmaker যারা পরিবেশের উপাদানকে প্রক্রিয়াকরণ

করে যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করে। মানুষ প্রাকৃতিক উপাদানকে আক্রমণ এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যা অন্যান্য এপরা পারে না। এদিক থেকে মানুষকে অনন্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কিন্তু এপদের ওপর চালানো এক গবেষণার মাধ্যমে Jane Goodall দেখিয়েছেন, এপরাও যন্ত্র বা হাতিয়ার তৈরি করতে পারে। তবে তুলনামূলকভাবে তা মানুষের চেয়ে অনেক নিম্নমানের। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাখিদের কথা। পাখিরাও খড়কুঁটা ব্যবহার করে বাসা তৈরি করে। এখানে খড়কুটাকে যন্ত্র বলা যেতে পারে। এক ধরনের শিস্পাঞ্জি উইপোকা ধরে রাখার জন্য একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। তারা গাছের কাণ্ড বা লাঠি নিয়ে উই ঢিবির কাছে যায় এবং গর্তের প্রবেশপথে ঘুরাতে থাকে এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারপর লাঠি ফিরিয়ে আনে গর্ত থেকে। উইপোকাগুলো লাঠির ডগায় আটকে থাকে এবং তারা লাঠি সহ সেগুলো খেয়ে ফেলে।

চিত্রঃ পোকা শিকার করছে শিম্পাঞ্জি।

শুধুমাত্র উইপোকা শিকারই নয়, তাদের মধ্যে অনেক ধরনের হাতিয়ার তৈরির হদিস পাওয়া যায়। পিঁপড়া শিকারের ক্ষেত্রেও তারা লাঠির ব্যবহার করে। বৃষ্টির পর যন্ত্রের সাহায্য মিয়ে গাছের শাখার গর্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে। প্রায়শই গর্তের মুখগুলো তাদের মাথা ঢোকনোর জন্য ছোট থাকে। একটি পাতা নিয়ে তার সাহায্যে গর্ত থেকে পানি পান করে। অস্ত্র হিসেবে লাঠি ব্যবহার করে, টয়লেট পেপার হিসাবে পাতা ব্যবহার করে এবং গর্ত খননের জন্য হাড় ব্যবহার করে। যদিও যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শিস্পাঞ্জিদের পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তবে উক্ত ধর্মগুলো গরিলা এবং ওরাংওটাং এর মধ্যেও অনিয়মিতভাবে চর্চা করতে দেখা যায়।

তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মানুষ এবং শিস্পাঞ্জির যন্ত্র তৈরি এবং ব্যবহারের পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। এটা আরও সুস্পষ্ট যে মানুষ তাদের যন্ত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা রাখে। তারা সমস্যাগুলো দেখে এবং সমাধানের জন্য নতুন যন্ত্র তৈরি করে।

তবে মানব সংস্কৃতিতে ভাষার আবিষ্কার অন্য প্রাণী থেকে মানুষের অনন্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। ভাষাকে এখন মানুষের সম্পত্তি হিসাবে মনে করা হয়। ভাষা শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমই নয় এটা এখন যোগাযোগের একটা প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষেরা তাদের মৌলিক আবেগ দিয়ে যোগাযোগ করে। শিম্পাঞ্জিরা তাদের রাগ, ভয় বা অন্যান্য আবেগ হরেক রকম বাচন ভঙ্গি দিয়ে প্রকাশ করে। অন্যান্য প্রাইমেটরা স্পর্শানুভূতির সাহায্যে কিছু আবেগীয় যোগাযোগ রক্ষা করে। একমাত্র মানুষই ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে যা একইসাথে সহজ একটা মাধ্যম এবং জটিল একটা প্রক্রিয়া।

সারমর্ম

মানুষের সাথে অন্যান্য হোমিনিডদের মিল থাকলেও তাদের মাঝে কিছু আচরণগত ভিন্নতা দেখা যায়। মানুষের প্রধান শারীরিক বৈশিষ্ট্য একটি বড় জটিল মস্তিষ্ক, দুটি পা এবং ব্যাতিক্রমি শিকারী দাঁত। তার উপর মানুষের বৃদ্ধির অনন্য একটি ধরণ আছে যা মানুষকে অন্যান্য প্রাইমেটদের থেকে আলাদা করে। যন্ত্রপাতি তৈরি এবং ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষ ও এপদের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য তৈরি করে। ভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি এবং ভাষার ব্যবহার আধুনিক মানুষের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছে। এবং এ ভিন্নতাই তাদের টিকিয়ে রেখেছে।

তথ্যসূত্র

Bogin, B. 2001. The Growth of Humanity. New York: John Wiley & Sons. Includes a detailed review of the human life cycle with particular attention to the evolution of human growth.

Fisher, H. 1992. Anatomy of Love: A Natural History of Mating, Marriage, and Why We Stray. New York: Ballantine. A well-written and fascinating account of evolutionary explanations of human marriage and mating.

Fouts, R., and S. T. Mills. 1997. Next of Kin: What Chimpanzees Have Taught Me about Who We Are. New York: William Morrow.

Savage-Rumbaugh, S., and R. Lewin. 1994. Kanzi: The Ape at the Brink of the Human Mind. New York: John Wiley. Two excellent popular accounts of the studies of ape language acquisition.

মৃতদেহের রূপান্তর প্রক্রিয়া

জনের মৃত্যুর পর প্রায় চার ঘন্টা কেটে গেছে। মৃতদেহ সৎকারের জন্য আনা হয়েছে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সুস্থ থাকা জন কাজ করতেন টেক্সাসের তেল খনিতে। কাজের ধরনের জন্যই শারীরিকভাবে ছিলেন বেশ কর্মঠ আর শক্তিশালী। বছর দশেক আগেই ধূমপান আর মদ্যপান দুটোই ছেড়েছিলেন। তবুও একসময় হঠাৎ তার শরীরের অবনতি হতে থাকে এবং তারপর জানুয়ারির এক হিমশীতল সকালে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

এই মুহুর্তে তার মৃতদেহ রাখা হয়েছে সৎকারকর্মীর একটি ধাতব টেবিলে। ঠাণ্ডা আর প্রায় শক্ত হয়ে আসা শরীর আর ত্বকের ধূসর রক্তাভ বর্ণ ইতিমধ্যেই পচন শুরু হবার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের কেউই সাধারণত মৃত্যুর পর নিজের কিংবা পরিচিতজনদের দেহের কি হাল অবস্থা হবে তা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি না। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। মাঝে মাঝে হিমাগারে রেখে কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মৃতদেহ কিছু সময়ের জন্য তাজা রাখার চেষ্টা করা হয়, যা শবের পচন প্রক্রিয়াকে কিছুক্ষণের জন্য ধীর করে দেয়। অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্য ফরেনসিক সায়েন্স ব্যবহার করা হয় যেন মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়, কারণ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সম্বন্ধে জানা যায়। এক্ষেত্রে শবের পচনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপকে কাজে লাগানো হয়।

মরদেহ নিজে মৃত হলেও তা অন্য অনেক জীবের জীবনের সূচনা করে। অনেক বিজ্ঞানী মৃতদেহকে জটিল বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বাস্তুতন্ত্র মৃত্যুর ঠিক পরপরই শুরু হয়। ধীরে ধীরে দেহকে পচিয়ে ফেলার মাধ্যমে এই তন্ত্র বিস্তার লাভ করে।

আত্ম-পরিপাক

‘অটোলাইসিস’ বা ‘আত্ম-পরিপাক’ নামে এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর কয়েক মিনিট পর থেকেই মৃতদেহে পচন শুরু হয়। হৃৎস্পন্দন বন্ধ হবার সাথে সাথে কোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কোষের অম্লতা বেড়ে গিয়ে বিষাক্ত পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এনজাইম কোষপর্দাকে হজম করে কোষের ভাঙ্গনের সূত্রপাত ঘটায়। এটা সাধারণত যকৃতেই প্রথম ঘটে, কেননা যকৃতে এনজাইমের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তকণিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী ভেদ করে বের হয়ে আসে এবং অভিকর্ষের টানে কৈশিক নালিকা, ছোট শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে যায়। এতে করে মৃতদেহের চামড়া বিবর্ণরূপ ধারণ করতে থাকে। পাশাপাশি দেহের তাপমাত্রাও পড়তে শুরু করে। এরপর দেখা যায় ‘রিগর মর্টিস’- যার কারণে চোখের পাতা, চোয়াল, ঘাড়ের পেশী, হাত, পা সব শক্ত হয়ে যায়। জীবিত অবস্থায় আমাদের পেশীতে থাকা অ্যাকটিন আর মায়োসিন নামে দুটি সূত্রবৎ প্রোটিনের কারণে আমরা পেশী সংকুচিত-প্রসারিত করতে পারি। কিন্তু মারা যাবার পর পেশীতে শক্তি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে এ প্রোটিনগুলো এক জায়গায় আটকা পড়ে যায়, ফলে পেশীসহ বিভিন্ন অস্থিসন্ধিকে নড়নে অক্ষম করে ফেলে।

মৃতদেহ থেকে নির্গত তীব্র গন্ধ প্রায় ৪০০ রকমের উদ্বায়ী জটিল রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণে গঠিত। এই গ্যাস মিশ্রনের সঠিক গঠন মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। শব-বাস্তুতন্ত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার আধিপত্য থাকে। আমাদের শরীর কিন্তু অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার পোষক হিসেবে ভূমিকা রাখে।

অনাক্রম্যতার অবসান

বেঁচে থাকাকালে দেহের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অণুজীবমুক্ত থাকে। মৃত্যুর কিচ্ছুক্ষণের মাঝেই দেহের অনাক্রম্যতা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে অণুজীবগুলো সুযোগ পেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমদিকে পাকস্থলি, ক্ষুদ্রান্ত্র আর বৃহদান্ত্রের সংযোগস্থলে অণুজীবগুলোর আক্রমণ শুরু হয়। অন্ত্রের অণুজীব অন্ত্রকে হজম করে ফেলে। এরপর চারপাশের কোষকে হজম করতে করতে ভিতর থেকে বাইরের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে নির্গত রাসায়নিক মিশ্রণকে এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।

২০০৪ সালের আগস্টে ‘আলাবামা স্টেট ইউনিভার্সিটির’র ফরেনসিক বিজ্ঞানী গুনাল্‌জ জাভান এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো ‘থ্যাটানোমাইক্রোবায়োম’ নামে নতুন একটি বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। গ্রীক শব্দ ‘থ্যাটানোস’ অর্থ ‘মৃত্যু’। জাভান ও তার দল মৃত্যুর পর ২০ থেকে ২৪০ ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রায় ১১ টি মৃতদেহ থেকে যকৃত, প্লীহা, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড এবং রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের দুটি ভিন্ন পদ্ধতির সাথে জৈবতথ্যপ্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতিটি নমুনার ব্যাকটেরিয়াল বস্তুর বিশ্লেষণ করে দেখেন। এর আগে ‘ইঁদুরের মৃতদেহ পচনপ্রক্রিয়া’ সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মৃত্যুর পর দেহে থাকা অণুজীবগুলোর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলেও তা একটি সুনির্দিষ্ট এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এতে করে গবেষকরা মৃত্যুর তিন দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে মৃত্যুর সময় সম্পর্কে একটি সঠিক এবং নির্ভরযোগ্য ধারণা দিতে পারেন।

ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণ

জাভান লক্ষ্য করে দেখেন, মৃত্যুর বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্যাকটেরিয়াগুলো যকৃতে এসে পৌঁছায় এবং প্রায় ৫৮ ঘন্টার মধ্যে এরা সংগৃহীত নমুনাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর অর্থ ব্যাকটেরিয়াগুলো একটি সুশৃঙ্খল নিয়মানুসারে মৃতদেহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে কত সময়ের মাঝে এরা এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে পরিব্যাপ্ত হয় তা ব্যবহার করে মৃত্যুর পর কত সময় অতিবাহিত হয়েছে তা জানার একটা পথ খুলে যায়। জাভান বলেন- ‘মৃত্যুর পর দেহে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কার্যপ্রণালী বদলে যায়। এরা হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করে এবং এক সময় প্রজনন সম্পর্কিত অঙ্গগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন মৃতদেহ পচনের বিভিন্ন ধাপের সাথে সম্পর্কিত।’

প্রাকৃতিক ক্ষয়

অধিকাংশ মানুষের কাছে পচা, গলিত লাশের বীভৎস দৃশ্য অনেকটা বিরক্তিকর ভয়ানক দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু কিছু গবেষকের কাছে বিষয়টি এতটা বিভীষিকাময় নয়। যেমন ‘সাউথঈস্ট টেক্সাস এপ্লাইড ফরেনসিক সায়েন্স’ ফ্যাকাল্টির গবেষকদের জন্য এটা নিতান্ত মামুলি ব্যাপার। ২০১১ সালের শেষের দিকে গবেষক সিভিল রুচেলি, অ্যারন লিন আর তাদের সহকর্মীরা ফ্যাকাল্টির একটা নির্দিষ্ট স্থানে দুটি নতুন মৃতদেহ এনে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয় হবার জন্য রেখে দেন।

মৃতদেহে যখন আত্ম-পরিপাক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং একইসাথে ব্যাকটেরিয়াও আন্ত্রিক অংশে বিস্তার করে তখনই শুরু হয় ‘পচন প্রক্রিয়া’। এটাকে বলা হয় মৃতদেহের ‘আণবিক মৃত্যু’। নরম টিস্যুর ভাঙ্গনের মাধ্যমে তরল, গ্যাস কিংবা লবণে পরিণত হওয়া ইত্যাদি- এসবই দেহের আণবিক মৃত্যুর সূচনা করে।

এ পচন প্রক্রিয়া অক্সিজেন নির্ভর এক বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সাথে সম্পর্কিত। ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহকে খেতে শুরু করে আর দেহে থাকা চিনিজাতীয় পদার্থকে গাঁজানোর মাধ্যমে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়াসহ বিভিন্ন গ্যাসীয় পদার্থ জমা করতে থাকে। ফলে মৃতদেহ ফুলে যায়। এ ফুলে যাওয়াকে বলা হয় ব্লোটিং (Bloating)। এর পরের ধাপে শুরু হয় বিবর্ণতা। ক্ষতিগ্রস্ত নালী থেকে নির্গত রক্তকণিকার মাঝে থাকা হিমোগ্লোবিনকে এক ধরনের অবাত ব্যাকটেরিয়া (বেঁচে থাকার জন্য যাদের অক্সিজেন অপরিহার্য নয়) সালফো-হিমোগ্লোবিনে রূপান্তরিত করে। এদের উপস্থিতির কারণেই চামড়া শক্ত, সবুজাভ-কালো বর্ণ ধারণ করে।

বিশেষ ধরনের আবাসস্থল

দেহের ভেতরে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে নরম এবং আলাদা হয়ে যাওয়া চামড়া ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। এক পর্যায়ে গ্যাস এবং তরলীকৃত টিস্যু বিশোধিত হয়ে দেহের মলদ্বারসহ অন্যান্য ছিদ্রাংশ সহ অন্যান্য ছেঁড়া চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসে।‘ব্লোটিং’ বা ফুলে যাওয়াকে পচন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক এবং শেষ ধাপের মধ্যে একটি চিহ্নিত অংশ হিসেবে ধরা হয়। সাম্প্রতিক আরেক পরীক্ষায় জানা যায়, এ রূপান্তর কিছু বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গঠনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করার মাধ্যমেও চিহ্নিত করা যায়। একজন পতঙ্গবিশারদ হিসেবে বুচেলি প্রধানত পোকামাকড় কীভাবে মৃতদেহে উপনিবেশ গড়ে তুলে সে ব্যাপারে আগ্রহী। তিনি লক্ষ্য করেন, মৃতদেহ কিছু বিশেষ ধরনের নেক্রোফ্যাগাস (মড়া-ভক্ষক) পতঙ্গের আবাসভূমি। এবং এদের সমগ্র জীবনচক্র মৃতদেহকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

শূককীট চক্র

দুই প্রজাতির মাছি মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। মৃতদেহ থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধময় এবং একইসাথে পল্কা-মিষ্টি গন্ধ ছড়ায় যা এই মাছিগুলোকে আকৃষ্ট করে। এরা এসে মৃতদেহের উপর বসে এবং খোলা ক্ষত স্থানে ডিম পাড়া শুরু করে। প্রতিটি মাছি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে প্রায় ২৫০ টি ডিম দেয় এবং এই সময়ের মাঝে ডিম থেকে শূককীট বের হয়ে আসে। এরা পচা মাংস ভক্ষণ করে বড় শূককীটে পরিণত হয়। কয়েক ঘন্টা বাদে খোলস নির্মোচন করে আরো খাদ্য গ্রহণ করে বড় আকারের মাছিতে পরিণত হয়। এ মাছিগুলো আবার ডিম পাড়া শুরু করে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত খাবার জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকে। এ মাছিগুলোর উপস্থিতি আবার অন্যান্য শিকারী প্রাণীকে মৃতদেহের অবস্থানের নিশানা দেয়। গুবরে পোকা, পরজীবী কীট, পিঁপড়ে, বোলতা, মাকড়সা এসে মৃতদেহে ভাগ বসানো শুরু করে। শকুন এবং বাকি আবর্জনা-ভুক এবং মাংসাশী জীবও মৃতদেহ ভোজনক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সুযোগ ছাড়ে না।

প্রতিটি মৃতদেহেরই একটি অনন্য অণুজৈবনিক ভূমিকা আছে। মৃতদেহে অণুজীব-সম্প্রদায়ের গঠন, তাদের আন্তঃসম্পর্ক, পচনপ্রক্রিয়ার উপর তাদের প্রভাব ইত্যাদি ব্যাপারে আরো বিশদ ধারণা একদিন ফরেনসিক দলকে কোথায়, কীভাবে একজন মানুষ মারা গেল সে সম্পর্কে নিখুঁতভাবে জানতে সাহায্য করবে।

মৃতদেহের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং কিংবা এতে লেগে থাকা মাটির ধরণ অপরাধ তদন্তকারীদের অপরাধস্থলের ভৌগোলিক অবস্থান, সূত্র খোঁজার এলাকা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপারে সহায়তা করে।

উন্নত-উর্বর মাটি

মানবদেহ প্রায় ৫০-৭৫% পানি দিয়ে গঠিত। শুষ্ক দেহের প্রতি কেজি হতে প্রায় ৩২ গ্রাম নাইট্রোজেন, ১০ গ্রাম ফসফরাস, ৪ গ্রাম পটাশিয়াম আর ১ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে মুক্ত হয়। প্রথমদিকে এ কারণে মাটির উপরিভাগের কিছু ছোট গাছপালা মরে যায়। নাইট্রোজেনের বিষাক্ততা কিংবা দেহনির্গত এন্টিবায়োটিক পদার্থের জন্য এমনটি হয়ে থাকতে পারে। তবে সব মিলিয়ে মৃতদেহের জৈবিক রূপান্তর মাটিকে করে তোলে উন্নত আর উর্বর। পাশাপাশি এ পচনপ্রক্রিয়া চারপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া কবরের মাটি পরীক্ষা করে মৃত্যুর সময় বের করার একটা সম্ভাব্য উপায় আছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। পচন প্রক্রিয়ার ফলে মৃতদেহে সংঘটিত রাসায়নিক পরিবর্তন সম্পর্কিত এক গবেষণা থেকে জানা যায়, লাশ থেকে নির্গত লিপিড-ফসফরাস ৪০ দিন পর্যন্ত মাটির সাথে মিশতে থাকে যেখানে নাইট্রোজেন আর পৃথকযোগ্য ফসফরাস সময় নেয় প্রায় ৭২ থেকে ১০০ দিন। এ প্রক্রিয়ার আরো গভীর বিশ্লেষণ এবং কবরের মাটির বায়োরাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে হয়তো একদিন বের করা যাবে কতদিন আগে কোনো দেহকে মাটিতে কবরস্থ করা হয়েছে।

চিত্রঃ মৃতদেহের বিভিন্ন খনিজ পদার্থ মাটিকে জৈবশক্তি সম্পন্ন করে তোলে।

বলে রাখা ভালো, মমিকৃত লাশও একসময় পচনের শিকার হয়। কিন্তু এটা নির্ভর করে ঠিক কখন কোন পদ্ধতিতে মৃতদেহটিকে মমিকরণ করা হয়েছে তার উপর। তাছাড়া কফিনের ধরণ, কবর দেয়ার প্রক্রিয়ার উপরও মমিকৃত লাশের পচনের সময়সীমা নির্ভর করে।

আমাদের শরীরকে বলা যায় শক্তির এক আঁধার। যে শক্তি দেহের মধ্যে আটকা পড়ে অপেক্ষা করছে কখন মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। জীবিত অবস্থায় আমাদের শরীর তার অগণিত অণু-পরমাণুতে এ শক্তি ধরে রেখে স্থিতিশক্তি হিসেবে ব্যয় করে। এভাবেই দেহ নিজেকে শক্তির সাহায্যে প্রতিনিয়ত সচল রাখে।

তাপগতিবিদ্যার সূত্রানুসারে, শক্তি সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কেবল এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত হয় মাত্র। মহাবিশ্বে মোট মুক্ত শক্তির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তু প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে পড়ছে আর তাদের ভর রূপান্তরিত হচ্ছে শক্তিতে। মৃতদেহের পচনপ্রক্রিয়া যখন চুড়ান্তরূপ ধারণ করে তখন এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের সকল পদার্থই এই মৌলিক

আইন অনুসরণ করে চলে। আমাদের শরীর নশ্বর; পচনের মাধ্যমে এটা চারপাশের বস্তুজগতের সাথে ভারসাম্য তৈরি করে এবং অন্যান্য জীবিত প্রাণীর বেঁচে থাকায় সহায়তা করার জন্য পরিণত হতে থাকে শক্তিতে। যে শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ছাই থেকে ছাইয়ে, ধূলা থেকে ধূলাতে।

(মোজাইক সায়েন্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ফিউচার-সহ বিভিন্ন বিখ্যাত অনলাইন পত্রিকাতে প্রকাশিত মোহেব কস্ট্যান্ডির প্রবন্ধ ‘This is what happens after you die’ এর সংক্ষেপিত বঙ্গানুবাদ)

প্রকৃতিতে কেন ষড়ভুজের ছড়াছড়ি

মৌমাছির বাসা বা মধুর চাককে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয় তাহলে সেখানে স্তরে স্তরে সজ্জিত ষড়ভুজের সজ্জা পাওয়া যায়। মধু সংগ্রহ করে রাখার জন্য তারা যে ঘর বানায় তার স্থাপত্যশৈলী সত্যিই অবাক করার মতো। ষড়ভুজ আকৃতির প্রত্যেকটি খোপের দেয়ালের কৌণিক ঢাল সমান। খোপ ও দেয়ালের পুরুত্বও একদম ঠিকঠিক বাহুল্যবর্জিত হতে থাকে।

ষড়ভুজাকার খোপগুলো এমনভাবে হেলে থাকে যেন তরল মধুর সামান্য অংশও নিচে না পড়ে। সবগুলো খোপ একই আকারের একই আকৃতির। কোনোটার কম-বেশ হয় না। পুরো বাসাটা আবার পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সমান্তরালে অবস্থান করে।

এমন নিয়মতান্ত্রিক গঠন কেন? আর মৌমাছিরা কীভাবেই বা এরকম স্থাপত্য তৈরি করে? দুই একটা বাসায় যদি এরকম সজ্জা পাওয়া যেত তাহলে কোনো একটা কিছু দিয়ে চালিয়ে দেয়া সম্ভব হতো, কিন্তু মৌমাছির প্রতিটি বাসাতেই এরকম সজ্জার উপস্থিতি থাকে। তার উপর একটি বাসায় শত শত মৌমাছি কাজ করে।

বারোয়ারী সদস্যের কাজে বেমিল ও হেরফের হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো এক কারণে মৌমাছির বাসাগুলোতে চমৎকার নিয়মতান্ত্রিকতা দেখা যায়। এরকম নিয়মতান্ত্রিকতার উপস্থিতির কারণে একে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করা আবশ্যক।

গ্রিক দার্শনিক পাপাস মনে করতেন, মৌমাছিরা স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। এই বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা এরকম স্থাপত্য তৈরি করতে পারে। উইলিয়াম কার্বি নামে একজন ব্যক্তি ১৮৫২ সালে বলেছিলেন, মৌমাছিরা হচ্ছে ‘স্বর্গ থেকে তৈরিকৃত গণিতবিদ’।

কিন্তু প্রকৃতিবিদ চার্লস রবার্ট ডারউইন এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি মৌমাছিদের এমন ক্ষমতার পেছনের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। এর জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছিলেন। পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিলেন মৌমাছিদের এই ক্ষমতা আসলে বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত।

হতে পারে শুরুতে নিখুঁত এবং অ-নিখুঁত সকল প্রকার মৌচাকই ছিল। অ-নিখুঁত বাসার ক্ষেত্রে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সমান্তরাল না থাকার কারণে হয়তো ভালোভাবেটিকে থাকার উপযোগ কম পেয়েছে। কিংবা খোপগুলো সুষম ষড়ভুজ না হবার কারণে বা ছোট-বড় হবার কারণে সঠিকভাবে হেলানো না থাকার কারণে ভেতরে মধু আটকে থাকতে পারেনি।

মধু সাধারণত তার পৃষ্ঠটান ও সান্দ্রতা ব্যবহার করে দেয়ালে আটকে থাকে। খোপ যদি বড় হয় কিংবা খোপের দেয়ালের কৌণিক অবস্থান ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে মধুর অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠটান মধুকে দেয়ালে আটকে রাখতে পারে না।

যারা এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারেনি তারা বেঁচে থাকার জন্য ভালো উপযোগ পায়নি। টিকে থাকার ভালো উপযোগ না পাওয়াতে তারা ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু হয়েছে এবং একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে যারা ভালোভাবে বাসা তৈরি করতে পেরেছে তারাটিকে থাকার জন্য বাড়তি উপযোগ পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে অ-নিখুঁতদের উপর কর্তৃত্ব করেছে। অ-নিখুঁতরা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াতে একসময় তারাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।

পৃষ্ঠটানের এই দিকটাকে কাজে লাগিয়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বকে এক পাশে রেখে পদার্থবিদরা বলছে, মৌচাকের এরকম আকৃতির পেছনে আসলে পৃষ্ঠটান ধর্ম কাজ করছে। পৃষ্ঠটান ধর্মই তার প্রভাবের মাধ্যমে খোপগুলোকে সুষম ষড়ভুজ আকৃতি প্রদান করে।

চিত্রঃ মৌচাক। ছবিঃ Grafissimo

নিয়মতান্ত্রিকতা আছে, ভালো কথা। কিন্তু এত এত জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে ষড়ভুজের আকৃতি কেন? আসলে জ্যামিতিক স্বাভাবিকতা অনুসারে ষড়ভুজই হওয়া উচিৎ। যদি এমন কোনো জ্যামিতিক আকৃতির কথা বিবেচনা করা হয় যাদেরকে পাশাপাশি সজ্জিত করলে কোনো অতিরিক্ত ফাঁকা থাকবে না তাহলে মাত্র তিনটি আকৃতি পাওয়া যাবে। সমবাহু ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ ও ষড়ভুজ।

এদের মাঝে ষড়ভুজেই বেশি দেয়াল বিদ্যমান এবং ভেতরের জায়গা সবচেয়ে কম অপচয় হয়। বাকি দুই প্রকারের ক্ষেত্র ত্রিভুজ ও চতুর্ভুজের কোনাগুলো ব্যবহার করা যায় না, মোম বা মধু সেখানটাতে পৌঁছায় না। স্থানের অপচয় হয়। এদিক বিবেচনা করে পরিশ্রম-ক্লান্ত মৌমাছিরা অবশ্যই এমন আকৃতিকে বেছে নেবে যেখানে স্থানের ব্যবহার করা যায় সর্বোচ্চ এবং শ্রমের অপচয় হয় সর্বনিম্ন।

এখন এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে নিখুঁত ষড়ভুজ আকৃতির বাসা বানানোর জন্য বিশেষ ধরনের ক্ষমতা মৌমাছিদের আছে। তবে ষড়ভুজের প্রাকৃতিক বিস্তৃতি উপলব্ধির জন্য বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জিত গুণাবলির উপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই ষড়ভুজ উৎপন্ন করে।

পানির পৃষ্ঠে যদি বুদবুদের একটি স্তর তৈরি করা হয় তাহলে স্তরে অবস্থান করা বুদবুদগুলো ষড়ভুজ আকৃতির হবে। পুরোপুরি নিখুঁত ষড়ভুজ না হলেও মোটামুটিভাবে ষড়ভুজ হবে। ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আকৃতির বুদবুদ কখনোই পাওয়া যাবে না। যখন তিন-চারটি বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ বুদবুদ একত্র হয় তখন তারা এমনভাবে অবস্থান করে যে তিনটি বুদবুদের তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে মিলিত হয়। মার্সিডিজ-বেনজ কোম্পানির প্রতীকের মতো।

এই সজ্জাটিই সবচেয়ে বেশি সুস্থিত সুগঠিত। এভাবে অবস্থান করলেই তাদের স্থায়িত্ব বেশি হয়। অনেকটা দালান তৈরিতে ইট যেভাবে গাথা হয় তেমন। নিচের স্তরের ইটের অবস্থানের সাথে উপরের স্তরের ইটের অবস্থানের মিল নেই। দালানের ইট যদি এক মিলে একটির বরাবর আরেকটি বসিয়ে গাথুনি দেয়া হয় তাহলে দালান ভেঙে পড়তে বেশিদিন সময় লাগবে না।

চিত্রঃ মার্সিডিজ-বেনজ এর প্রতীক এবং দালানে ইটের গাথুনি। গাথুনিতে এক স্তরের সাথে আরেক স্তরের মিল নেই। ছবিঃ 123rf.com

মৌমাছির বাসার গঠনে স্বয়ং মৌমাছিরা স্থপতি হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এখানে ফেনার বেলায় এরকম সজ্জা প্রদানের জন্য কাউকে কোনো কিছু করে দিতে হয় না। এখানে শুধু পদার্থবিজ্ঞানের কিছু নিয়ম কাজ করছে। এক স্তরের বুদবুদ পেরিয়ে বহু স্তরের ফেলার বেলাতেও এই কথা প্রযোজ্য।

বালতিতে পানি রেখে তাতে ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নাড়াচাড়া করলে বেশ ফেনা উৎপন্ন হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসব ফেনার সংযোগস্থলও এখানের সংযোগস্থলের মতোই। তিনটি কোনা একটি সাধারণ বিন্দুতে বিল্ডিং ব্লকের মতো মিলিত হয়।

চিত্রঃ ষড়ভুজাকার বুদবুদ সজ্জা। ছবিঃ শাটারস্টক।

মৌমাছির বাসায় অপচয় কম হবার জন্য এবং উপযোগ বেশি পাবার জন্য মৌমাছিরা নিজেরা খেটে বিশেষ আকৃতির বাসা বানায়। কিন্তু বুদবুদের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার পেছনে কোনো জিনিস বা কোনো নিয়ম কাজ করছে? এক্ষেত্রে বলতে হবে প্রকৃতি আসলে মৌমাছির চেয়েও আরো বেশি হিসেবি। বুদবুদ ও সাবানের ফেনার প্রধান উপাদান হচ্ছে পানি। সাবানের ফেনায় পানির উপরিস্তরে সাবানের কিছু অণু থাকে। পানির পৃষ্ঠটান পানিকে যতটা সম্ভব কম ক্ষেত্রফলের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায়।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গোলক আকৃতির হয়ে থাকে। কারণ গোলক আকৃতিই হচ্ছে সকল ত্রিমাতৃক জ্যামিতিক আকৃতির মাঝে সবচেয়ে স্বল্প ক্ষেত্রফলের অধিকারী। একই আয়তনের কোনো বস্তুকে বিভিন্ন আকৃতি প্রদান করা হলে তাদের মাঝে গোলক আকৃতিই সবচেয়ে কম ক্ষেত্রফল দখল করবে।

বুদবুদ বা ফেনার বেলায় একাধিক ফেনার পাশাপাশি অবস্থান, তাদের সংযোগস্থলে সুস্থিতি অর্জন, মধ্যবর্তী স্থানের অপচয় রোধ এবং পৃষ্ঠটানের ফলে স্বল্প ক্ষেত্রফল অর্জন এসবের মিলিত প্রভাবে বুদবুদগুলো মোটামুটি ষড়ভুজ আকৃতির হয়ে থাকে।

পতঙ্গের চোখ? ম্যাক্রো ফটোগ্রাফিতে তোলা ছবিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে পতঙ্গের চোখগুলো অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের সমন্বয়ে চোখ বা অক্ষির এই পুঞ্জ গঠিত বলে এদেরকে বলা হয় পুঞ্জাক্ষি। পুঞ্জাক্ষির প্রতিটি অংশ আসলে ষড়ভুজ আকৃতির। বড় করে দেখার সুযোগ থাকলে দেখা যাবে প্রতিটি ষড়ভুজের মিলনস্থলে তিনটি কোনা একত্র হয়েছে। সেই সাবানের ফেনার দেয়াল আর ইটের বিসদৃশ ব্লকের মতো।

বিবর্তনের পথে ধীরে ধীরে পতঙ্গের মধ্যে এধরনের চোখের আবির্ভাব ঘটেছে। এধরনের পুঞ্জাক্ষি দ্রুত গতিতে চলমান বস্তু (খাবার) ধরতে সাহায্য করে। কারণ এতগুলো ক্ষুদ্র চোখে একসাথে অনেকগুলো ছবি ওঠে চলমান বস্তুর। এতগুলো চোখকে ফাঁকি দেয়া বেশ কঠিন কাজ।

প্রকৃতির পরতে পরতে অনেক জটিলতার দেখা পাওয়া যায়। আবার এসব জটিলতার মাঝেও অনেক সারল্যের খোঁজ পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে সত্যিই খুব অবাক হতে হয়। নিয়মহীন ছন্নছাড়া প্রকৃতির মাঝেও কত সুন্দর প্যাটার্ন কত সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে।

তথ্যসূত্র

  1. Why Nature Prefers Hexagons, The geometric rules behind fly eyes, honeycombs, and soap bubbles, by Philip Ball, April 7, 2016 http://nautil.us/issue/35/boundaries/why-nature-prefers-hexagons
  2. Why do Flies have Compound Eyes? http://www.pitara.com/science-for-kids/5ws-and-h/why-do-flies-have-compound-eyes

featured image: mt.nl

প্রাণিবৈচিত্র্যে বিচ্ছিন্নতার শক্তিশালী অবদান

উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির DNA অনেকটা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের মতো, ভাষা তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এই বিচ্ছিন্নতা থেকে ধীরে ধীরে একটি ভাষা থেকে আরেকটি নতুন ভাষার জন্ম হয়। ভাষা যেমন তার অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে শব্দের মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় তেমনই প্রাণীরাও তাদেরর অবস্থান থেকে বিচ্যুত হলে DNA-র মাঝে একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

দেশ, অঞ্চল ও আবহাওয়াভেদে ভাষার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রজাতির ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা কেন ঘটে? কী কারণে পৃথকীকরণ সম্পন্ন হয়? এর প্রধান একটি কারণ ও উদাহরণ হচ্ছে সমুদ্র। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের প্রজাতিরা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। তাই এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরস্পরের মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরির জোর সম্ভাবনা থাকে। আলাদা থাকার কারণে নতুন প্রজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে দ্বীপ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করে।

এখানে দ্বীপের ধারণাটা একটু পরিষ্কার করা দরকার। এখানে দ্বীপ বলতে শুধু সমুদ্রের মাঝখানে চারদিকে জল দিয়ে ঘেরা এক টুকরো ভূমিকেই বোঝানো হচ্ছে না, এর পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসকেও বোঝানো হচ্ছে। নিঃসঙ্গ মরুভূমিতে বিচ্ছিন্নভাবে একটি ব্যাঙ থাকলে ধরা যায় ঐ ব্যাঙটি দ্বীপে আছে। চারদিকে বালু দিয়ে ঘেরা, এর সাথে অন্যান্য সদস্যদের কোন যোগাযোগ নেই। মাছের ক্ষেত্রে একটি পুকুর হচ্ছে দ্বীপ। একটি পুকুরে বাস করা প্রজাতির সাথে অন্য পুকুরে বাস করা প্রজাতির কোনো যোগাযোগ নেই। একটুখানি পানি আর চারদিকে মাটি দিয়ে ঘেরা স্থান, এটাও একধরনের দ্বীপ। ভাষা ও প্রজাতির পরিবর্তনে দ্বীপই

আসল জিনিস, দ্বীপের বিচ্ছিন্নতার কারণে দ্বীপবাসীরা অন্য এলাকার সদস্যদের সাথে মিশতে পারে না, ফলে আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন এলাকায় আলাদা আলাদাভাবে ভাষা ও প্রাণীর পরিবর্তন হয়। প্রত্যেক এলাকাই তার নিজের সুবিধামতো স্বাধীনভাবে পরিবর্তিত হয়।

এরকম একটি ঘটনার কথা বলি। ৪ অক্টোবর ১৯৯৫ সালে একটি উপড়ে যাওয়া গাছ ভাসতে ভাসতে এসে হাজির হয় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপে। গাছটির সাথে ভেসে আসে ১৫ টি সবুজ ইগুয়ানা। (ইগুয়ানা হচ্ছে একধরনের গিরগিটি সদৃশ প্রাণী, এরা নিজেদের রঙ পরিবর্তন করতে পারে। যখন যে পরিবেশে যে রঙ থাকে সে পরিবেশ অনুসারে গায়ের রঙ পরিবর্তন করার চমৎকার দক্ষতা আছে এদের।)

চিত্রঃ ইগুয়ানা। ছবিঃ পিন্টারেস্ট।

এর কিছুদিন আগে ঐ এলাকার আশেপাশে দুটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। ধারণা করা হয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ১৬০ মাইল দূরের আরেক দ্বীপ গুয়াডেলুপ থেকে তারা ভেসে ভেসে এখানে এসেছিল। এই প্রজাতির ইগুয়ানাগুলো গাছে চড়তে পছন্দ করে। হয়তো গাছে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় গাছ উপড়ে গিয়েছিল এবং গাছ ছেড়ে ঐ মুহূর্তে অন্য কোথাও যাবার উপায় ছিল না। শেষমেশ জীবিত অবস্থায় ১৫ টি সদস্য এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় দ্বীপে। এই দ্বীপে আবার আগে থেকে কোনো ইগুয়ানা ছিল না। একদমই নতুন পরিবেশ। পরিবেশ নতুন হলেও তারা তাদের সনাতন জীবন-যাপন ছেড়ে ঐ দ্বীপের সাথে মানানসই হয়ে নিজেদের মাঝে বংশবিস্তার শুরু করেছিল।

তারা যে এখানে এসেছিল এই ব্যাপারটা আমরা জানি কারণ স্থানীয় মাছ শিকারিরা এদেরকে দেখেছিল। কেউ যদি না দেখতো তাহলে জানা হতো না ১৯৯৫ সালে এরা এখানে ভেসে এসেছিল। ওরা যেখান থেকে এসেছে সেখানেও হয়তো এমনই কোনো ঘটনা ঘটেছিল। কয়েক শতাব্দী আগের কোনো এক সময়ে কোনো একভাবে গুয়াডেলুপ দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল ইগুয়ানার কিছু সদস্য। এদের পৌঁছার দৃশ্য হয়তো তখন কেউ দেখেনি। এই লেখাটির পরবর্তী অংশে এই দ্বীপ সম্পর্কিত বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করা হবে। তবে তার জন্য আমরা বেছে নেব অন্য একটি দ্বীপকে, এটি ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটির নাম গ্যালাপাগোস। এই দ্বীপের প্রাণবৈচিত্র্যই চার্লস ডারউইনকে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ভাবতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।

গ্যালাপাগোস আসলে অনেকগুলো দ্বীপের সমাহার। সবগুলোকে একত্রে বলা হয় ‘গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ’। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৫০০ মাইল দূরে বিষুবরেখার কাছাকাছি প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে এদের অবস্থান। এরা আসলে আগ্নেয়গিরিজাত দ্বীপ। সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত তথা লাভা উদগিরণের ফলে এই দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি হয়েছিল। পৃথিবীর বয়সের সাথে তুলনা করলে এই দ্বীপের বয়স খুব একটা বেশিও না। মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর মাত্র। অর্থাৎ একসময় এই দ্বীপের সমস্তটাই জলের নীচে ছিল। সমুদ্রতল থেকে আগ্নেয়গিরির ঊর্ধ্বমুখী চাপে ধীরে ধীরে ভূমি উপরে ভেসে উঠেছে। তার মানে এখন যদি এই দ্বীপে প্রাণের অস্তিত্ব থাকে তাহলে ঐ প্রাণ বাইরে থেকে কোনো না কোনো একভাবে এখানে এসেছিল। সম্ভবত দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো এক দুর্ঘটনায় এখানে এসে পৌঁছেছিল প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজ। অনেক দূরের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটা দ্বীপে প্রাণী বা উদ্ভিদ এসে পৌঁছে গেলে বাকি দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়।

চিত্রঃ গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ। ছবিঃ mqltv.com

গ্যালাপাগোসেও অনেক ইগুয়ানা আছে। কেউই জানে না প্রথম ইগুয়ানাটি কখন এই দ্বীপে আরোহণ করেছিল। ১৯৯৫ সালের ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের ইগুয়ানার মতো তারাও হয়তো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে ভেসে এসে পৌঁছেছিল। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে এখনকার সময়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সবচেয়ে কাছের দ্বীপটি হলো ‘স্যান ক্রিস্টোবাল’। স্যান ক্রিস্টবালে আজকের দিনে আমরা একটি মাত্র দ্বীপ দেখতে পাই, কিন্তু লক্ষ লক্ষ বছর আগে আরো কতগুলো দ্বীপের অস্তিত্ব ছিল, এরা এখন পানির নীচে নিমগ্ন। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে সময়ের সাথে সাথে পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়াতে এরা ধীরে ধীরে পানির নীচে নিমগ্ন হয়ে যায়।

মূল ভূখণ্ড থেকে কিছু ইগুয়ানা এসে পৌঁছানোর পর সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা তথা প্রচুর পরিমাণে জন্ম লাভ করে বিস্তৃত হবার অফুরন্ত সুযোগ আছে। এখানকার পরিবেশ মূল ভূখণ্ড থেকে একদমই আলাদা। আগ্নেয়গিরির এলাকা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একদমই ভিন্ন। কোনো একভাবে তারা নতুন পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছিল।

অন্য দিকে এক দ্বীপের সাথে আরেক দ্বীপের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। তাই কোনো এক দ্বীপে আশ্রয় পাওয়া ইগুয়ানা নানা ধরনের প্রাকৃতিক কারণে সহজেই অন্য দ্বীপে পৌঁছে যেতে পারবে। মূল ভূখণ্ড থেকে কোনো দুর্ঘটনায় এখানে প্রাণী এসে পৌঁছার সম্ভাবনা হয়তো লক্ষ লক্ষ বছরে একবার, কিন্তু সেই তুলনায় কয়েক শত বছরের মাঝেই এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাবার সম্ভাবনা বাস্তব।

চিত্রঃ সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে ভাষা ও প্রাণী প্রজাতির মাঝে অনেক মিল আছে।

এর ফলাফল হিসেবে আজকে আমরা দেখতে পাই গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে ল্যান্ড ইগুয়ানা (Land iguana)-র তিনটি প্রজাতি আছে। এদের কেউই কারো সাথে মিলে সন্তান উৎপাদনে সক্ষম নয়। উল্লেখ্য সারা পৃথিবীতে শুধুমাত্র গ্যালাপাগোসেই ল্যান্ড ইগুয়ানা পাওয়া যায়। ল্যান্ড ইগুয়ানা পরিবারের প্রজাতি কনোলোফাস পেলিডাস (Conolophus pellidus) পাওয়া যায় শুধুমাত্র সান্টা ফে দ্বীপে। কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস (Conolophus subcristatus) বেশ কয়েকটি দ্বীপে বাস করে। এর মধ্যে ফার্নান্দিনা, ইসাবেলা ও সান্টা ক্রুজ অন্যতম। ধারণা করা হয় এই দ্বীপগুলোতে কনোলোফাস সাবক্রিসটাটাস বিভক্ত হয়ে কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতি তৈরি হবার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো এদের মাঝেও প্রজাতিগত ভিন্নতা দেখা দিবে। তৃতীয় প্রকার ল্যান্ড ইগুয়ানা কনোলোফাস মার্থি (Conolophus marthae) পাওয়া যায় একদম উত্তরের দিকের ইসাবেলা দ্বীপে। এই দ্বীপ পাঁচটি আগ্নেয়গিরির একটি সারি নিয়ে গঠিত। এই দ্বীপটি আকারে অন্য দ্বীপের তুলনায় কিছুটা বড়।দ্বীপগুলোর পরিবেশ আবার একটির তুলনায় আরেকটি ভিন্ন। ভিন্ন ভিন্ন হবার কারণে এবং যোগাযোগ না থাকার কারণে দূরত্ব কম হলেও পরিবেশ অনুসারে তারা ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে। যেমনটা সাধারণত দেখা যায় ভাষার ক্ষেত্রে। দূরত্ব কম হলেও শক্ত সীমানা বা বিচ্ছিন্নতার ফলে একটি ভাষা থেকে উপভাষা কিংবা নতুন আরেকটি ভাষার জন্ম হয়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের সাথে নিজেদেরকে উপযুক্তভাবে মানিয়ে নেবার জন্য অর্থাৎ আরোপিত প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য দ্বীপের ইগুয়ানাগুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন এত বেশি হয়ে গেছে যে ভিন্ন দ্বীপের সদস্যরা মিলে যৌন প্রজননে অংশগ্রহণ করলে কোনো সন্তান উৎপাদিত হয় না। পরস্পর মিলে সন্তান উৎপাদন করতে না পারার অর্থ হচ্ছে এরা পরস্পর ভিন্ন প্রজাতি। অথচ এরা একই পূর্বপুরুষ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছিল।

এই দ্বীপটি আরো একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত করে। সমুদ্রে যদি পানির স্তর আরো উপরে উঠে যায় তাহলে ইসাবেলার নিচু ভূমির সম্পূর্ণটা ডুবে যাবে। অর্থাৎ এখানে পাঁচটি আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের সৃষ্টি হবে। ফলে তৈরি হবে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে একই প্রাণী বিশ্লিষ্ট হতে পারে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা

পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক একই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়ানো বৈচিত্র্যময় প্রজাতির সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছিল।

কিছু দিক থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপের পরিবেশ একদমই ব্যতিক্রমী। এই দ্বীপ প্রাণবৈচিত্র্যে এমন কিছু প্রজাতি উপহার দিয়েছে, যা দ্বীপের পরিবেশতাত্ত্বিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি দ্বীপের পরিবেশ ল্যান্ড ইগুয়ানার স্বভাব চরিত্র একদমই বদলে দিয়েছিল। পরিবেশগত কারণে হয়তো তারা একসময় অগভীর সমুদ্রতলের শৈবাল খেতে শিখেছিল। ডুব দিয়ে দিয়ে শৈবাল সংগ্রহ করতো। ডুব দেবার দক্ষতা তাদেরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে বাড়তি উপযোগ প্রদান করেছিল। এদের থেকেই স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপত্তি ঘটেছে জলজ ইগুয়ানা বা Marine iguana-র। জলজ ইগুয়ানাও গ্যালাপাগোস ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

তাদের এমন কতগুলো ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য আছে যা তাদেরকে অন্য প্রজাতি থেকে একদমই ভিন্ন সারিতে ফেলে দিয়েছে। একদিন হয়তো এমন দৃশ্য দেখা যাবে যেখানে জলজ ইগুয়ানারাই একাধিক প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং জলজ ইগুয়ানার নতুন গণ (Genus) তৈরি হয়েছে।

গ্যালাপাগোসের অন্যান্য প্রজাতির বেলাতেও একই গল্প প্রযোজ্য। যে কারণে ইগুয়ানার বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে একই কারণে বৃহৎ কচ্ছপ, লাভা লিজার্ড, মকিং বার্ড, ফিঞ্জ সহ অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে গ্যালাপাগোস দ্বীপে।

চিত্রঃ জলজ ইগুয়ানা। ছবিঃ lemon.hu

একই ধরনের প্রক্রিয়া ঘটেছে সমগ্র বিশ্বে, সমস্ত বিশ্বের প্রাণীজগৎ ও উদ্ভিদজগতে। গ্যালাপাগোস হচ্ছে ছোট একটি এলাকার ছোট একটি উদাহরণ মাত্র। গ্যালাপাগোসের মতো অন্যান্য কত এলাকায় এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটে চলছে তার কোনো হিসেব নেই। শুধু বিচ্ছিন্ন দ্বীপই নয়, খাল-বিল-নদী-পাহাড়-মরুভূমির কারণেও নতুন নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হয়। প্রশস্ত ও বহমান একটি নদীও প্রজাতিকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। নদীর দুই পাশের জলবায়ু ও এলাকা এক হলেও তাদের এক পারের সদস্যরা আরেক পারে যাওয়া খুব কষ্টকর ব্যাপার (বুদ্ধিমান মানুষের কথা বাদ দিলাম)। বিচ্ছিন্ন হবার কারণে এক পারের সদস্যদের

তুলনায় অন্য পারের সদস্যদের মাঝে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। অনেকটা ভাষার মতো। যেমন করে বিচ্ছিন্নতার কারণে একটি ভাষা থেকে একটি উপভাষার সৃষ্টি হয়, একসময় উপভাষা যেমন ভিন্ন একটি ভাষায় পরিণত হয় তেমনই আরো পরিবর্তনের মাধ্যমে নদীর দুই পারও পরস্পর ভিন্ন প্রজাতির এলাকায় পরিণত হয়। কোনো একভাবে এদেরকে একত্র করলে দেখা যাবে এদের দিয়ে আর সন্তান উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা প্রজাতিগতভাবে ভিন্ন হয়ে গেছে। যদিও তাদের উভয়ের পূর্বপুরুষ একসময় একই প্রজাতির সদস্য ছিল।

বিস্তৃত পর্বতমালাও নদীর মতো বিচ্ছিন্নকরণে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল এলাকাব্যাপী ধু ধু মরুভূমিও এই ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ইঁদুর এবং কানাডার ইঁদুর দেখতে হয়তো এক কিন্তু তারা যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে নিশ্চয়ই নিজ নিজ পরিবেশ অনুসারে পরিবর্তিত হবে। এক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা আরেক অঞ্চলের পরিবর্তনের ধারা থেকে ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

গ্যালাপাগোস দ্বীপে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে তিন প্রজাতির ল্যান্ড ইগুয়ানার উৎপত্তি হতে কয়েক হাজার বছর লেগেছে মাত্র। কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত যদি অপেক্ষা করি পরিবর্তিত হওয়া ঐ সময়ের প্রাণীগুলোর সাথে যদি আজকের তুলনা করে দেখি তাহলে উভয়ের পার্থক্য হবে কল্পনাতীত পরিমাণ বিশাল। অনেকটা তেলাপোকার সাথে কুমিরের তুলনা করে দেখার মতো। এখানেও আবার উল্লেখ করছি এই ব্যাপারটাই ঘটেছে সমস্ত জীবজগতের ক্ষেত্রে। এটা সত্য যে তেলাপোকার দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র এমন একটি পূর্বপুরুষ ছিল যে কিনা আজকের কুমিরেরও দাদার দাদার দাদার … … … দাদা’র পূর্বপুরুষ। তেলাপোকা ও কুমির একই পূর্বপুরুষ থেকে বিশ্লিষ্ট হয়েছিল, কিন্তু আজ তাদের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য।

সময়ের উল্টোদিকে এগিয়ে যেতে থাকলে একসময় না একসময় তেলাপোকা ও কুমিরের পূর্বপুরুষ একই সদস্যে গিয়ে মিলিত হবে। এর জন্য হয়তো আমাদেরকে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরিমাণ পেছনে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারপরেও অনেক পূর্বপুরুষ অতিক্রম করে তেলাপোকা ও কুমিরের একই পূর্বপুরুষের দেখা পাবো।

এত বছর আগে তাদের প্রজাতিগত বিভাজনের জন্য কোন পরিবেশটি বাধা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল তা এতদিন পরে এসে ঠিক ঠিকভাবে জানা কষ্টকর। যেভাবেই এটা হয়ে থাকুক তা হয়েছে সমুদ্রের পরিবেশে। কারণ তখন ডাঙায় কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই ছিল না। সম্ভবত তেলাপোকা ও কুমিরের অতি-আগের পূর্বপুরুষের সন্তান অগভীর সমুদ্রের শৈবাল সম্বলিত এলাকায় বসবাস করেছিল এবং অনুধাবন করেছিল গভীর সমুদ্রের বৈরি পরিবেশের তুলনায় এই পরিবেশ বেশ উত্তম। অন্তত তাদের জন্য উত্তম। অগভীর সমুদ্র থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তন ও অভিযোজনের মাধ্যমে ডাঙায় এসেছিল তেলাপোকার পূর্বপুরুষ।

মাত্র ৬ মিলিয়ন বছর আগে ফিরে গেলেই আমরা মানুষের এমন পূর্বপুরুষের দেখা পাবো যে কিনা আজকের শিম্পাঞ্জীদেরও পূর্বপুরুষ। এই সময়টা খুব একটা বেশি নয়। ফলে তেলাপোকা ও কুমিরের মতো এখানে মানুষ ও শিম্পাঞ্জীদের বিভাজনে বাধা হিসেবে কী কাজ করেছে তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা খুব একটা কঠিন নয়। ধারণা করা হয় আফ্রিকার গ্রেট রিফট ভ্যালি এখানে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। গ্রেট রিফট ভ্যালি হচ্ছে ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উপত্যকা যা এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ হতে শুরু করে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।

চিত্রঃ গ্রেট রিফট ভ্যালির পরিবেশ। ছবিঃ Zohar African Safaris

গ্রেট রিফট ভ্যালির পূর্বদিকে বিবর্তিত হয়েছে মনুষ্য প্রজাতি আর পশ্চিম দিকে বিবর্তিত হয়েছে শিম্পাঞ্জী প্রজাতি। পরবর্তীতে শিম্পাঞ্জীদের ধারা দুটি ভাগে বিভক্ত হয় সাধারণ শিম্পাঞ্জী ও পিগমি শিম্পাঞ্জীতে (বেবুন)। ধারণা করা হয় বিভক্ত হবার জন্য কঙ্গো নদী তাদের মাঝে বাধা হিসেবে কাজ করেছিল। এই হিসেবে ১৮৫ মিলিয়ন বছর আগের সময়ে গেলে আমরা এমন এক প্রাণীর দেখা পাবো যে কিনা আজকের যুগের সকল প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ।

স্তন্যপায়ীরা প্রাণিজগতে তুলনামূলকভাবে উন্নত মস্তিষ্কের অধিকারী। অতি-আগের পূর্বপুরুষের বংশধরদের মাঝে প্রজাতিগতভাবে একের পর এক বিভাজন সম্পন্ন হয়েছে। অল্প সময়ের মাঝেই স্তন্যপায়ীর হাজার হাজার প্রজাতিতে ছেয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। স্তন্যপায়ীর ঘরে আছে ২৩১ প্রজাতির মাংসাশী (কুকুর, বিড়াল, বাঘ, ভালুক ইত্যাদি), ২ হাজার প্রজাতির ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বা Rodent, ৮৮ প্রজাতির তিমি ও হাঙর জাতীয় প্রাণী, ১৯৬ প্রজাতির দ্বি-খণ্ডিত ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী (গরু, ভেড়া, হরিণ, শূকর ইত্যাদি- এদের পায়ের ক্ষুর দ্বি-খণ্ডিত বা দুই ভাগে বিভক্ত থাকে), ১৬ প্রজাতির ঘোড়া জাতীয় প্রাণী (ঘোড়া, জেব্রা, গণ্ডার ইত্যাদি), ৮৭ প্রজাতির খরগোশ জাতীয় প্রাণী, ৯৭৭ প্রজাতির বাদুড়, ৬৮ প্রজাতির ক্যাঙ্গারু, ১৮ প্রজাতির এপ (এদের মাঝে মানুষও আছে), এবং অন্যান্য অনেক অনেক অনেক প্রজাতি যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এত পরিমাণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর পূর্বপুরুষ যিনি তার দেখা যদি পেতাম তাহলে বাংলাদেশের সাংবাদিক ধাঁচে প্রশ্ন করতাম “সমস্ত পৃথিবী তো আণ্ডাবাচ্চা দিয়ে ছেয়ে ফেলেছেন! পৃথিবী ভরিয়ে দেয়া এত পরিমাণ প্রজাতির পূর্বপুরুষ হতে পেরে আপনার অনুভূতি কী?”

লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের উপস্থিতিতে পৃথিবীতে বিরাজ করছে চমৎকার এক বৈচিত্র্য। আর এই বৈচিত্র্যময়তার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে কাজ করেছে বিচ্ছিন্নতা। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকা। বিচ্ছিন্নতা নেতিবাচক, আমরা কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। কিন্তু তারপরেও বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর জন্য বিচ্ছিন্নতার শক্তিকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

তথ্যসূত্র

১. The Magic of Reality, D Richard, Free Press, New York, 2011 (3rd Chapter)

২. সাগরের বুকে ডারউইনের পাঁচটি বছর, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, আগস্ট ২০১৩

৩. https://thenanitesolution.wordpress.com/2015/08/18/islands-of-the-galapagos-archipelago-part-ii/

 

 

উদ্ভিদের অভিযোজনের অনন্য কৌশল

উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে বৈচিত্র্যময় পরিবেশের সাথে তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য এবং জীবনধারণ পদ্ধতি মানিয়ে নিতে পারে। খাপ খাইয়ে চলতে পারে। বিশেষ এই বৈশিষ্ট্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো তাদেরকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এদের মাঝে কিছু কিছু উদ্ভিদ আছে যাদের অভিযোজন ক্ষমতা একদমই অনন্য।

রেইন ফরেস্ট এবং জলাভূমি অঞ্চলে উর্বর মাটির পরিমাণ কম। সেখানকার উদ্ভিদ যদি শুধু মাটির উপর নির্ভর করে থাকে তাহলে তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মিটবে না। তাই টিকে থাকতে হলে এসব উদ্ভিদের বিকল্প কোনো উপায় বের করে নিতেই হবে। এ ধরনের কিছু উদ্ভিদ নিয়ে আলোচনা থাকছে এখানে।

ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ

মাটি এদের পুষ্টির যোগান দিতে পারে না। তবে অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ অভিযোজিত হয়েছে মাংসাশী উদ্ভিদ হিসেবে। এদের পাতায় এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ রয়েছে যা অন্যান্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে।

যখন কোনো পতঙ্গ লোভে পড়ে ভুল করে পাতার স্পর্শক অঙ্গে ছোয়া দেয়, তখনই সম্পূর্ণ পাতা গুটিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর হজম সহায়ক নল দিয়ে পতঙ্গের নরম অংশ ভেঙ্গে ফেলে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করে নেয়। প্রায় একদিন পর পতঙ্গের কঙ্কাল ও উচ্ছিষ্ট অংশ ত্যাগ করে ফেলে দেয়।

ভেনাস ফ্লাইট্রাপের দুই পাতার ভাজে প্রায় ৬ টি স্পর্শক অঙ্গ থাকে। সেসবে কোনো পতঙ্গের ছোঁয়া লাগলে পাতা দুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফাঁদটা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ক্ষুদ্র পতঙ্গ বেড়িয়ে আসতে পারে যেগুলো পুষ্টি যোগাতে সক্ষম নয়।

চিত্র: ফাঁদে আটকা পড়া পতঙ্গ।

ইন্ডিয়ানা পাইপ

এরা দেখতে অনেকটা মাশরুমের মতো সাদা রঙের। পরিপূর্ণ বয়সে এদের দেহে ফ্যাকাশে হালকা বাদামী রং ধারণ করতে দেখা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এদের দেহে কোনো পাতা থাকে না। ক্লোরোফিলের অভাবে নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে না। এর বিকল্প হিসেবে এরা পরভোজী ছত্রাকের সাথে আত্মীয়তা করে। ইন্ডিয়ান পাইপ তাদের মূল দিয়ে ছত্রাকের দেহকে ঘিড়ে ফেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে নেয়।

কলসী উদ্ভিদ

এদের পাতা দেখতে লম্বা কলসের মতো। এভাবেই এরা বিবর্তিত হয়েছে। এরাও মাংসাশী। পাতার অংশ বিশেষ এক ধরনের তরলের সুবাসে ভরপুর। এই সুবাস অন্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। যখন কোনো পতঙ্গ পাতার অভ্যান্তরে ঢুকে পড়ে ঠিক তখনই শিকারী পাতার ঢাকনা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর শিকারী পাতা নল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসে এবং পতঙ্গকে পাতার নিচের অংশের তরলে ভাসিয়ে দেয়। এরপর হজম করার জন্য এসিড এবং ব্যাকটেরিয়া থেকে সৃষ্ট এনজাইম দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সেখান পুষ্টি শোষণ করে।

কলসী উদ্ভিদ যখন পুর্ণবয়স্ক হয় তখন শিকারি ঢাকনা উন্মুক্ত হয়। ঐ অবস্থায় ফাঁদটি শিকার ধরার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে থাকে। কলসীর অভ্যন্তরে কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পতঙ্গ বাস করে। যেমন উড়ন্ত মশা-মাছির লার্ভা ইত্যাদি। দেহের অভ্যান্তরে ব্যকটেরিয়া বসবাস করে যা এনজাইম উৎপন্ন করে কলসী উদ্ভিদের হজম কাজে সাহায্য করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে সহায়ক পাতা জন্মে যা তাদের কোথাও ঝুলে থাকতে বা আঁকড়ে ধরে থাকতে সাহায্য করে।

ব্রমেলিডাস

এদের মাটির প্রয়োজন হয় না। মাটির পরিবর্তে এরা মূল দিয়ে অন্য উদ্ভিদকে আঁকড়ে ধরে থাকে। ব্রমেলিডাস উদ্ভিদ সকল ধরনের আর্দ্রতা এবং পুষ্টি উপাদান বাতাস থেকে সংগ্রহ করে। উড়ে আসা পাতা বা আবর্জনা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। পাতাগুলো সর্পিলাকার হবার কারণে সহজেই শিশির কিংবা বৃষ্টি থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করে নিতে পারে।

এই উদ্ভিদগুলো ছোটখাটো বাস্তুসংস্থানের মতো কাজ করে। যেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ, পতঙ্গ, পোকামাকড় এমনকি ব্যাঙও আছে। এই উদ্ভিদকে কিছু প্রজাতির পতঙ্গ বসত-বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে বসবাসকারী পতঙ্গের মলমুত্র ও ময়লা আবর্জনা এদের বেড়ে ওঠার কাজে লাগে।

তথ্যসূত্র: The Big Idea – Science Book (DK)

ছোঁয়াচে প্রাণরসঃ টোবাকো মোজাইক ভাইরাস

 

মেক্সিকান সিটির চিহুয়াহুয়া প্রদেশের ৫০ মাইল দক্ষিণেএকটি শুষ্ক ও মরুময়পর্বত আছে। নাম সিয়েরা দে নাইসা। ২০০০ সালের দিকে কিছু খনি শ্রমিক ঐ পর্বতেএকটিগর্ত খনন করছিল। খনন করেকয়েক হাজার ফুট গভীরে প্রবেশ করার পর তারা এমন এক স্থানের সন্ধান পেল যা দেখে মনে হবে এটি হয়তো ভিন গ্রহের কোনো এলাকা। পৃথিবীতে এরকম স্থানের দেখা পাওয়া যায় না। তখন তাদের অবস্থান৩০ ফুট চওড়া এবং ৯০ ফুট লম্বা একটি প্রকোষ্ঠের ভেতর। উপরে নিচে এবং পুরো দেয়াল জুড়ে মসৃণ এবং স্বচ্ছ জিপসামের স্ফটিক ছড়িয়ে ছিল। এরকম অনেক গুহাতেই স্ফটিক পাওয়া যায় তবে তার কোনোটিই সিয়েরা দে নাইসার মতো নয়। প্রতিটি স্ফটিক ছিল ছত্রিশ ফুট লম্বা এবং ভরে পঞ্চান্ন টন। বুঝা যাচ্ছে এই স্ফটিকগুলো এমন নয় যে গলায় নেকলেস হিসেবে ঝুলনো যাবে। এরা পর্বতের মতো যাতে আরোহণের অপেক্ষায় থাকে প্রত্যেক অভিযাত্রী। একারণে একে স্ফটিকের গুহা বলা হয়।

চিত্রঃ নাইসা মাইনের ভূ-আভ্যন্তরীণ মানচিত্র।

গুহাটি আবিষ্কারের পর অল্প কিছু বিজ্ঞানী এতে পরিদর্শনের অনুমতি পান। জুয়ান মেনুয়েল গার্সিয়া রুইজ নামের ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন তাদের একজন। তিনি গবেষণা করে স্ফটিকগুলোর বয়স বের করেন। ২৬ মিলিয়ন বছর আগে যখন আগ্নেয়গিরি থেকে পর্বত তৈরি হচ্ছিল তখনই

স্ফটিকগুলোর জন্ম। ভূ-গর্ভস্থ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ছিল গরম খনিজ পানি। আগ্নেয়গিরির ম্যাগমা পানিকে উত্তপ্ত করে ১৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত করে যা খনিজগুলোকে স্থিতি লাভ করতেসাহায্য করে। পানি এরকম উচ্চ তাপমাত্রায়হাজার হাজার বছর ধরে থাকার ফলে তৈরি হয় বিভিন্ন আকারের স্ফটিক।

চিত্রঃ জিপসাম ক্রিস্টাল।

 

২০০৯ সালে বিজ্ঞানী কার্টিস সাটল স্ফটিকের গুহাটি দেখতে যান। সাটল ও তার সহকর্মীরা সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং তা ব্রিটিশ কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ল্যাবরেটরিতে এনে পরীক্ষা করেন। সাটলের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত পাগলামী। কারণ স্ফটিক নিয়ে কাজ করতে আসা সত্ত্বেও তার স্ফটিক বা খনিজ নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মূলত ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করেন।

গুহায় কোনো মানুষ থাকতো না। এমনকি কোনো মাছও না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুহাটি কোনো প্রাণের স্পর্শ পায়নি। সাটল যখন গুহার পানি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করলেন তখন দেখলেন পানির প্রতি ফোঁটায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ভাইরাস আছে।

একই বছর ডানা উইলনার নামের আরেকজন বিজ্ঞানী ভাইরাস অনুসন্ধানের অভিযান চালান। গুহার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন মানুষের শরীর। তিনি এবং তার সহকর্মীরা মানুষের কফ নিয়ে পরীক্ষা করেন। কফের ডিএনএগুলো ডাটাবেসে রাখা সিকুয়েন্সের সাথে তুলনা করে দেখেন বেশিরভাগ ডিএনএ মানুষের। আরবাকিগুলো ভাইরাসের। উইলনারের এই পরীক্ষার আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন সুস্থ মানুষের ফুসফুস জীবাণুমুক্ত। কিন্তু উইলনার আবিষ্কার করলেন প্রত্যেক মানুষের ফুসফুসে গড়ে ১৭৪ প্রজাতির ভাইরাস আছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশ প্রজাতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জানতো। বাকি ৯০ শতাংশ প্রজাতি বিজ্ঞানীদের কাছে তখনো স্ফটিকের গুহার মতোই রহস্যময়।

পরে দেখা গেল বিজ্ঞানীরা যেখানেই খুঁজে দেখছেন সেখানেই ভাইরাসের সন্ধান পাচ্ছেন। সাহারা মরুভূমির উড়ে যাওয়া বালু হতে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তরের মাইলখানেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া হ্রদ পর্যন্ত সর্বত্রই ভাইরাসের অবাধ বিচরণ। ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো শিশু পর্যায়ে রয়ে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে রোগ-বালাই সম্বন্ধে অবগত, কিন্তু রোগ-বালাইয়ের পেছনের হোতা যে ভাইরাস তার সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানতাম না।

ভাইরাস শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে দুটি স্ববিরোধী শব্দ থেকে। রোমান সাম্রাজ্যে সাপের বিষ বা পুরুষের বীর্যকে ভাইরাস বলতো। সৃষ্টি আর ধ্বংস যেন এক শব্দে গাঁথা। কয়েক শতক পরে ভাইরাস শব্দটির অর্থ পাল্টে

গেল। তখন কোনো ছোঁয়াচে পদার্থ যা রোগ সৃষ্টি করতে পারে তাকে ভাইরাস বলা হতো। সেই পদার্থ হতে পারে কোনো ক্ষতের পুঁজ কিংবা কোনো জিনিস যা রহস্যজনকভাবে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এটি একটি কাগজের টুকরোতেও বাসা বাঁধতে পারে এবং তাতে আঙ্গুলের সামান্য ছোঁয়াও হতে পারে রোগের কারণ।

১৮০০ শতকের দিকে ভাইরাস শব্দটি তার আধুনিক অর্থ লাভ করে। এই সময়ে নেদারল্যান্ডে তামাক চাষিরা একটি অজানা রোগ দিয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এই রোগে পাতার জীবিত ও মৃত টিস্যু মিলে একধরনের দাগ সৃষ্টি করে। পুরো তামাক চাষ এই রোগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

এডলফ মেয়ার

অবশেষে তিনি অসুস্থ গাছের রস নিয়ে তা সুস্থ তামাক গাছে প্রবেশ করালেন। এতেসুস্থ গাছগুলো অসুস্থ হয়ে গেল। মেয়ার বুঝতে পারলেন কোনো আণুবীক্ষণিক জীব গাছগুলোতে বংশবৃদ্ধি করছে। তিনি অসুস্থ গাছ থেকে রস নিয়ে তা ল্যাবরেটরিতে অনুকূল পরিবেশে রাখলেন। তাতে ব্যাকটেরিয়ার কলোনি জন্মাল। তারা ধীরে ধীরে এত বড় হলো যে তিনি এটি খালি চোখেই দেখতে পেলেন। মেয়ার এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো রোগ সৃষ্টি করে কিনা তা দেখার জন্যে বসে রইলেন। কিন্তু গাছগুলোতে কোনো রোগ সৃষ্টি হলো না। এই ব্যর্থতার সাথেই মেয়ারের গবেষণা কিছু সময়ের জন্যে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চলে গেল। ভাইরাসের পৃথিবী তাই তখনো ছিল সবার কাছে অজানা।১৮৭৯ সালে ডাচ কৃষকরা এডলফ মেয়ার নামের একজন তরুণ রসায়নবিদের কাছে সাহায্যের জন্য যান। মেয়ার তামাক গাছগুলো যে পরিবেশে জন্মায় সে পরিবেশ নিয়ে নিরীক্ষা করলেন। যেমন, মাটি, তাপমাত্রা, সূর্যালোক। কিন্তু তিনি সুস্থ ও অসুস্থ গাছকে আলাদা করার কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তিনি ধারণা করলেন গাছগুলো হয়তো কোনো অদৃশ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে বলেছেন আলু এবং অন্যান্য উদ্ভিদের রোগের জন্যে ছত্রাক দায়ী থাকতে পারে। তাই মেয়ার তামাক গাছে ছত্রাক খুঁজতে থাকলেন। কিন্তু কোনো ছত্রাক পেলেন না। তিনি পরজীবী পোকাও খুঁজলেন। তাও পেলেন না।

চিত্রঃআক্রান্ততামাকপাতা।

কয়েকবছর পরে আরেক ডাচ বিজ্ঞানী মার্টিনাস বেইজেরিঙ্ক, মেয়ার যেখানে রেখে গিয়েছিলেন ওখান থেকে শুরু করলেন। তিনি ভাবলেন হয়তো তামাক গাছের রোগের জন্য ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো জীব দায়ী। তিনি প্রথমে অসুস্থ গাছগুলোকে ছেঁচে তার রস একটা ফিল্টারের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করালেন। ফিল্টারে উদ্ভিদ কোষ এবং ব্যাকটেরিয়া উভয়ই আটকে যায়। তিনি যখন এই ছাঁকনি করা তরলকে সুস্থ গাছে প্রবেশ করালেন তখন সুস্থ গাছও রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল।

নতুন আক্রান্ত গাছগুলো থেকে রস নিয়ে তা ফিল্টারের সাহায্যে ছেঁকে আবার সুস্থ গাছে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন। সুস্থ গাছগুলো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজেরিঙ্ক বুঝতে পারলেন আক্রান্ত গাছগুলোর রসে এমন কিছু আছে যা বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ সৃষ্টিতে সক্ষম। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক এর নাম দেন ‘ছোঁয়াচে প্রাণরস’।

তবে এই প্রাণরস ছিল বিজ্ঞানীদের চেনা অন্য যেকোনো প্রাণ থেকে আলাদা। আকারে ছোট হবার পাশাপাশি এটা ছিল খুব কঠিন প্রাণ। সহজে মরতে চায় না এমন কই মাছের মতো। বেইজেরিঙ্ক সেই রসে এলকোহল যোগ করলেন, পানির স্ফুটনাঙ্ক তাপমাত্রায় তা গরম করলেন কিন্তু কিছুতেই প্রাণরস কাবু হয়নি। এই তরলে ফিল্টার কাগজ চুবিয়ে তা শুকাতে দিলেন। শুকনো ফিল্টার কাগজতিন মাস পরে পানিতে ভিজিয়ে দেখলেন, এখনো গাছকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।

বেইজেরিঙ্ক ভাইরাস শব্দটি দ্বারা ঐ তরলে থাকা রহস্যময় উপাদানটিকে বুঝিয়েছিলেন। তার এই অভিব্যক্তি আমরা এখন ভাইরাস বলতে যা বুঝি তার অনেক কাছাকাছি। তবে ভাইরাস কীসে সম্বন্ধে বলতে পারেননি তিনি। ভাইরাস কী নয় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন ভাইরাস প্রাণী, উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক কোনোটিই নয়।

বেইজেরিঙ্ক আবিষ্কৃত ভাইরাস ছিল প্রকৃতিতে থাকা অনেকগুলো ভাইরাসের মাঝে একটি প্রজাতি। ১৯০০ সালের প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা বেইজেরিঙ্কের ফিল্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্যান্য রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসকে শনাক্ত করেন। ধীরে ধীরে তারা জীবিত প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের বাইরে ভাইরাস জন্মানোর উপায় বের করেন। তারা এক্ষেত্রে প্লেট বা ফ্লাস্কে রাখা কোষের কলোনি ব্যবহার করেন।

কিন্তু তখনো বিজ্ঞানীরা ভাইরাস কী এ ব্যাপারে একমত হতে পারেননি। কারো কারো মতে ভাইরাস ছিল রাসায়নিক পদার্থ। অন্যরা মনে করতো ভাইরাস হচ্ছে পরজীবী যা কোষের ভিতরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এ নিয়ে মতবিরোধ এতই বেশি ছিল যে বিজ্ঞানীরা ঠিক করতে পারছিলেন না ভাইরাস জীব নাকি জড়! ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভাইরাসবিদ ফ্রেডেরিক টওর্ট ঘোষণা করলেন‘ভাইরাসের প্রকৃতি জানা অসম্ভব’!

কিন্তু বিজ্ঞানে অসম্ভবের প্রতিই সবার নজর থাকে। তাই ভাইরাসের প্রকৃতি জানার জন্যওয়েন্ডেল স্টেনলি নামের একজন রসায়নবিদ কাজ করা শুরু করেন। ১৯২০ সালে ছাত্রাবস্থায় স্টেনলি কীভাবে অণুর গাঠনিক আকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে স্ফটিক তৈরি করা যায় তা নিয়ে কাজ করেছিলেন। কোনো পদার্থ সম্বন্ধেস্ফটিক এমনসব তথ্য দিতে সক্ষম যা এমনিতে অজানাই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা প্রথমে স্ফটিকে এক্স-রে নিক্ষেপ করেন,তারপর এক্স-রে যে দিকে প্রতিফলিত হয়েছে তা দেখেন। এক্স-রে দ্বারা তৈরি প্যাটার্নের মাধ্যমে স্ফটিকের মধ্যকার অণুর গঠন সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

১৯০০ সালের প্রথমদিকে স্ফটিকের মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য এনজাইমের গঠন সম্বন্ধে প্রথম জানা যায়। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানতেন প্রাণী ও উদ্ভিদেরা বিভিন্ন ধরনের এনজাইম তৈরি করে এবং এনজাইমরা খাবার ভেঙে ফেলার মতো বিভিন্ন জৈবিক কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু এনজাইম স্ফটিকের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারলেন যে এনজাইম প্রোটিন দ্বারা তৈরি। স্টেনলি ভাবতে থাকলেন ভাইরাস আবার প্রোটিন নয় তো?

তার চিন্তার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তিনি ভাইরাসের স্ফটিক বানানো শুরু করলেন। এজন্য তিনি সবচেয়ে পরিচিত টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস ব্যবহার করলেন। স্টেনলি বেইজেরিঙ্কের মতো অসুস্থ তামাক গাছের রস ফিল্টারে প্রবেশ করালেন। ভাইরাসের স্ফটিক তৈরির জন্যে ঐ ফিল্টারকৃত তরল থেকে প্রোটিন ছাড়া অন্য সব ধরনের যৌগ আলাদা করে ফেলেন।

স্ফটিকগুলো ছিল একইসাথে খনিজের মতোরুক্ষ আবার অণুজীবের মতো জীবন্ত। স্টেনলি স্ফটিকগুলোকে স্টোর রুমে রাখা খাবার লবণের মতোই মাসের পর মাস সংগ্রহ করে রেখে দিলেন। স্ফটিকগুলো পানিতে মেশালেই অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হতো যা আগের মতো তামাক গাছের রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। স্টেলনির এই পরীক্ষা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় যা ছিল পুরো পৃথিবীর জন্যে এক বিস্ময়। নিউইয়র্ক টাইমস ঘোষণা দেয় যে ‘জীবওজড়ের মধ্যকার পার্থক্য কিছুটা তার গুরুত্ব হারালো’। এই পরীক্ষার ফলে প্রথমবারের মতো কোনো মানুষ খালি চোখে ভাইরাস দেখতে পেলো।

কিন্তু স্টেনলি তার গবেষণায় একটি ছোট ভুল করেছিলেন। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নরমান পিরি এবং ফ্রেড বাউডেন আবিষ্কার করেন যে, ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিন নয় বরং এর ৯৫% প্রোটিন কিন্তু বাকি ৫% নিউক্লিক এসিড নামের সূত্রাকার পদার্থ দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে আবিষ্কার করলেন নিউক্লিক এসিড হলো মূলত জিন। এরা প্রোটিন ও অন্যান্য পদার্থ তৈরির নির্দেশনা দেয়। আমাদের কোষ তাদের জিন রাখে দ্বি-সূত্রক নিউক্লিক এসিডে যা DNA নামে পরিচিত। ভাইরাস এক সূত্রক নিউক্লিক এসিড আছে যা RNA নামে পরিচিত।

স্টেনলির টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বানানোর প্রায় চার বছর পর একদল জার্মান বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো কোনো স্ফটিকের সাহায্য ছাড়া ভাইরাস দেখতে পান। ১৯৩০ সালে প্রকৌশলীরা একধরনের অণুবীক্ষণযন্ত্র বানান যা দিয়ে এমন ছোট জিনিস দেখা সম্ভব যা আগে কখনো দেখা যায়নি। গুস্তাভ কসচে, এডগার ফাঙ্কুচ এবং এলমাট রুস্কা টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাসের স্ফটিক বিশুদ্ধ পানিতে মিশিয়ে তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখেন।১৯৩৯ সালে তারা জানান, তাতে ছোট রড আকারের বস্তু দেখেছেন যা ৩০০ ন্যানোমিটার লম্বা। এতক্ষুদ্র কোনো জিনিস কেউ কখনো দেখেনি আগে। ভাইরাসের আকার বুঝানোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যদি একটি লবণের দানায় ত্বকের দশটি কোষ জায়গা নিবে অথবা একশটি ব্যাকটেরিয়া জায়গা নিবে। আর টোব্যাকো মোজাইক ভাইরাস জায়গা নিবে প্রায় এক হাজারটি।

চিত্রঃরড আকৃতির টোবাকো মোজাইক ভাইরাস।

কয়েক দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ভাইরাসেরআভ্যন্তরীণ গঠন বুঝতে সক্ষম হলেন। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও ভাইরাসের আমাদের মতো নিউক্লিক এসিড ও প্রোটিন আছে তবুও ভাইরাসের ও আমাদের কোষের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। মানুষের একটা কোষে লক্ষ লক্ষ বিভিন্ন ধরনের অণু আছে যা

তাকে পরিবেশ সম্বন্ধে ধারণা পেতে, হাঁটা চলায়, খাদ্য গ্রহণে, বৃদ্ধিতে এমনকি প্রয়োজনে নিজের ধ্বংসে সাহায্য করে। কিন্তু ভাইরাসবিদরা দেখলেন ভাইরাস এ তুলনায় অনেক বেশি সরল। ভাইরাস শুধুমাত্র প্রোটিনের আবরণ আর তার ভিতরে জিনের সমন্বয়। ভাইরাসের জিন অসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এজন্যে তারা অন্য জীবের সাহায্য নেয়। তাদের জিন ও প্রোটিন অন্য জীবে প্রবেশ করিয়ে নিজের বংশবৃদ্ধি করে। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমেএকটি ভাইরাস থেকে দিনে এক হাজার ভাইরাস পাওয়া সম্ভব।

১৯৫০ সালের দিকে ভাইরাসবিদরা ভাইরাসেরপ্রধান প্রধান দিকগুলো তুলে ধরেন। তাই বলে ভাইরাসবিদ্যা সম্বন্ধে সবকিছু জানা হয়ে গেছে, ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। ভাইরাস কীভাবে মানুষের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করে বিজ্ঞানীরা এ সম্বন্ধে এখনো খুব অল্পই জানেন। পেপিলোমা ভাইরাস কীভাবে ইঁদুরের মাথায় শিং গজায় বা প্রতিবছর হাজার হাজার মহিলার জরায়ুর ক্যান্সার কীভাবে তৈরি করে বিজ্ঞানীরা সে সম্বন্ধে জানতেন না। জানতেন না কিছু ভাইরাস কেন প্রাণঘাতী আর কিছু ভাইরাস কেন তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর। তারা জানতেন না কীভাবে ভাইরাস তার পোষকের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয় কিংবা ভাইরাস কীভাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রাণীর চেয়ে অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে তারা জানতেন নাHIV নামের একটি ভাইরাস ইতিমধ্যে শিম্পাঞ্জি ও গরিলা থেকে আমাদের প্রজাতিতে প্রবেশ করেছে এবং আগামী ত্রিশ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হবে। হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে এত বিশাল সংখ্যক ভাইরাস থাকা সম্ভব। তারা ধারণা করতে পারেননি পৃথিবীর প্রাণী বৈচিত্র্যের বেশিরভাগই ভাইরাসের মাধ্যমে উৎপত্তি লাভ করেছে। জানতেন না, যে অক্সিজেন আমরা শ্বাসের সাথেগ্রহণ করি তার বেশিরভাগই তৈরি করেছে ভাইরাসেরা। জানতেন না পৃথিবীর তাপ নিয়ন্ত্রণেও ভাইরাসের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।তারা নিশ্চিত জানতেন না আমাদের জিনোমের অংশবিশেষ এসেছে হাজার হাজার ভাইরাসের কাছ থেকে যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত করেছে। এমনকি হয়তো চার বিলিয়ন বছর আগে জীবনের শুরুও হয়েছিল ভাইরাস থেকে।

এখন বিজ্ঞানীরা এসব জিনিস জানেন। তারা জানেন স্ফটিকের গুহা থেকে শুরু করে মানুষের দেহের ভিতরে সব জায়গাতেই ভাইরাস আছে। বলা যেতে পারে পৃথিবী হলো ভাইরাসের আড্ডাখানা। কিন্তু তারপরেও ভাইরাস সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারণা এখনোসম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। বুঝা শুরু হয়েছে ভাইরাসের পৃথিবী।

লেখাটি কার্ল জিমারের বই A plantet of virusএর প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

পিঁপড়ার ব্যক্তিত্ব

একটি স্বপ্ন। একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন। একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন। এই স্বপ্নটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের একটি সাধারণ স্বপ্ন। এই স্বপ্নই মানুষকে অণুপ্রাণিত করেছে সমাজের ছায়াতলে এসে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার, স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের। কথাটি শুধু মানবসমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, ক্ষুদ্রাকার পিপীলিকা সমাজের জন্যও প্রযোজ্য।

সমাজকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সমাজের সদস্যদের সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন পড়ে। সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সদস্যের মতামতের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। মতামত কেমন হবে তা নির্ভর করে সদস্যটির ব্যক্তিত্ব, রুচিশীলতা প্রভৃতির উপর।

সমাজের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিত্ব আলাদা। এই ব্যক্তিত্বের বৈচিত্র্যের কারণে তৈরি হওয়া বিচিত্র মতামতকে বিবেচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মানুষ বৈচিত্র্যময় পন্থার কথা ভেবেছে। প্রয়োগও করেছে। তারমধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোচিত এবং প্রচলিত পন্থা সম্ভবত ভোট দেয়া। এখন পিঁপড়াদের মধ্যে তো ভোটাভুটির মতো কোনো ব্যাপার প্রচলিত নেই। তাহলে পিঁপড়া সমাজ সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে?

পিঁপড়ারা সিদ্ধান্ত নেয় কোরাম (quoram) করে। মানে কিছু পিঁপড়া কোনো ব্যাপারে একমত হলে দলের অন্যান্য পিঁপড়াও তাদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে।

পিঁপড়া সমাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটি নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ একটি ব্যাপার। তবে তারচেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে- মানব সমাজের প্রতিটি মানুষের মতো পিপীলিকা সমাজের প্রতিটি পিপীলিকার আচরণে রয়েছে বৈচিত্র্য। প্রতিটি পিঁপড়া চলনে-বলনে অন্যান্য পিঁপড়া থেকে আলাদা। বিষয়টিকে পিঁপড়ার ব্যক্তিত্বও বলা যায়।

পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা মানুষের মতোই পিঁপড়া সমাজের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়াকে প্রভাবিত করে। মোটামুটি অবিশ্বাস্য শোনালোও পিঁপড়া নিয়ে নতুন একটি গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

রক এন্টদের (Temnothorax albipennis) পাওয়া যায় ইংল্যান্ডের উপকূলীয় এলাকায়। তারা বাড়ি বানায় পাহাড়ের সরু কোনো ফাটলে। এ ধরনের ফাটল প্রচুর পাওয়া যায় তবে তা সহজেই বিনষ্ট হতে পারে পাথর ধ্বসে বা বৃহৎ প্রাণীদের উৎপাতে। যদি তাদের বাসা ভেঙে যায় বা দলের সন্ধানী পিপীলিকারা নতুন কোনো সুবিধাজনক বাসার সন্ধান পায় তাহলে তারা নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হয়।

চিত্র: রক এন্ট বা পাথুরে পিঁপড়া।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের এন্ট ল্যাবের থমাস হোয়েলার বলেন, “নতুন বাসা খোঁজার সময় অনুসন্ধিৎসু পিপীলিকারা অনেক প্রয়োজন মাথায় রাখে। তারা এমন বাসার সন্ধান করে যেখানে হালকা আলো থাকবে, বাসার দরজা হবে ১ থেকে ১.৫ মিলিমিটার মাপের, বাসার উচ্চতা হবে ২ মিলিমিটার এবং বাসার ভেতরের জায়গা হবে প্রায় ২০ বর্গসেন্টিমিটার।”

আলাদাভাবে দলের প্রত্যেকটি পিঁপড়া তাদের সম্ভাব্য বাড়ির ব্যাপারে কী ভাবে এবং এটা কীভাবে দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তা পরীক্ষা করতে হোয়েলার ও তার সহকর্মীরা ১০টি ভিন্ন ভিন্ন কলোনী থেকে ১৬টি করে মোট ১৬০টি পিপড়াকে কৃত্রিমভাবে তৈরি বাসায় ছেড়ে দেন। বাসাগুলো ছিল তিন ধরনের। খুব ভালো, তুলনামুলক কম ভালো এবং জীর্ণ।

এতে স্বাভাবিকভাবেই যা ঘটল তা হলো বাসাটা যত ভাল হলো পিঁপড়ারা তত বেশি সময় সেখানে কাটাল এবং দলের সঙ্গীরা যাতে তাদের খুঁজে পায় এজন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে রাখল। হোয়েলার বলেন “কোনো একটা বাসায় অবস্থান করে পিঁপড়ারা কার্যকরভাবে কোরামে বা একমত হবার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। যত বেশি সময় একটা পিঁপড়া কোনো বাসায় অবস্থান করবে, তত বেশি পিঁপড়া তার সাথে যোগ দেবে।”

হোয়েলারের গবেষক দল এটি থেকে দেখতে পান কোনো বিশেষ ধরনের বাসায় ভিন্ন ভিন্ন পিঁপড়াদের কাটানো সময় ভিন্ন। হোয়েলার এ সম্পর্কে বলেন, “কিছু পিঁপড়া আছে খুতখুতে, কিছু পিঁপড়া আবার স্বাধীনচেতা। তারা তাদের বর্তমান বাসার চেয়ে ভাল বাসা পেলেই খুশী। অনেকটা মানুষের মতোই।”

কিছু পিঁপড়াকে কখনোই সুখী মনে হয় না, তাদের বাসা যত সুন্দরই হোক না কেন। এই অস্থির স্বভাবের পিঁপড়ারা যে বাসায় বাস করে তারচেয়েও সুন্দর বাসার সন্ধানে থাকে। এটা কোনো সমস্যা নয়, বরং তারা সবসময় নতুন কিছুতে আগ্রহী। কোনো কোনো পিঁপড়া আবার শান্ত স্বভাবের।

গবেষক দল দেখতে পান পিঁপড়ারা নির্বোধই হোক আর চালাকই হোক দুটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে একটি বেছে নিতে তাদের নির্বোধ বা চালাক ব্যক্তিত্বের ভিন্নতা খুব একটা প্রভাব ফেলে না। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মোটামুটি একই গতিতে হয়ে থাকে।

কিন্তু পিপড়ার কলোনীটি যদি দুটি ছন্নছাড়া বাসা থেকে একটি বেছে নিতে চায় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া (heterogeneity of responses) দেখা যায়। ফলে তারা দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। একটু কড়া স্বভাবের পিঁপড়ারা কলোনীর বাসিন্দাদের এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

image source: insider.si.edu

হোয়েলারোর সহকর্মীরা এটাও পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পিঁপড়ারা তিনটি ভিন্ন মানের বাসা থেকে কোনটি বেছে নেবে তা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতার উপরও নির্ভর করে। হোয়েলারের ভাষ্যমতে, যদি পিঁপড়ারা খুব ভালো বাসা থেকে অপেক্ষাকৃত কম ভালো বাসায় যায় তাহলে তারা বুঝতে পারে যে এটা আগেরটার মতো ভালো নয়। যদি পিঁপড়ারা জীর্ণ কোনো বাসায় থাকে তাহলে পরে খুঁজে পাওয়া ভাল বাসায় বেশি সময় কাটায় তারা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পিঁপড়াদের এই ব্যক্তিত্বের পার্থক্যের কারণ কী? গবেষক ডর্নহেউস বলেন “অনেক নিয়ামকই এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত পারে। হরমোনের মাত্রায় পার্থক্য, সেন্সরি রিসেপ্টরের সংখ্যায় পার্থক্য, বয়স, দেহের আকার অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত করে কোনোকিছু বলা মুশকিল।”

এখন সামনে গবেষকদেরকে জানতে হবে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তার পেছনে কী দায়ী এবং বিবর্তনের পথে এর ভূমিকা কী। এই গবেষণা অন্তত আমাদের এটুকু জানাতে পেরেছে যে পিঁপড়াদের ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা আসলে প্রয়োজনীয় এবং তা পিপড়া কলোনীর স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

Ant’s choosiness reveals that they all have different personalities by Chris Simms, the new scientist, February 1, 2017.

featured image: aquarianonline.com

ক্ষুদ্র প্রাণীর কালের দীর্ঘায়ন

সারাদিনের ব্যস্ততার পর একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন একাকী বসে। কানের কাছে গুণগুণ করে গান ধরলো মশার দল। ক্লান্ত হাত দু’টোয় কিছুটা শক্তি এনে বসিয়ে দিলেন প্রচণ্ড এক চড়! খুশি হবেন কিনা, হাতের তালু উলটে হতাশ হলেন আপনি। মশার তো কোনো নামগন্ধ নেই-ই বরং ব্যথা পেলেন নিজেই!

আরেকদিন খাবার টেবিলের কথা। আপনার প্রিয় খাবারগুলোতে ভাগ বসাচ্ছে মাছির পাল। নিতান্ত অসহায়ের মতোই চেয়ে চেয়ে দেখতে হচ্ছে আপনাকে। যতো চেষ্টাই করুন না কেন, মাছিকে উচিত শিক্ষা দেয়া খুব কঠিন!

আপনার ঘরের বাতিটির কথাই ভাবুন। প্রতি সেকেন্ডে ওটা যে ৫০ বার করে জ্বলছে আর নিভছে- সে খেয়াল আছে? প্রথমবার শুনেই কথাটি বিশ্বাস করেছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আচ্ছা, মশা-মাছি এতো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, বিদ্যুৎ প্রতি সেকেন্ড এতোবার যাওয়া-আসা করে; এগুলো দেখেও আমরা টের পাই না কেন?

ছোট্ট এই প্রশ্নটাই চিন্তার রেখা ফুটিয়েছে বিজ্ঞানীদের কপালে। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ, গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা খানিকটা অবাক করবে আপনাকে। তাদের কথায়- প্রাণীর আকার যতো ছোট হয়, চারপাশের সব কিছুকে তারা ততোই ‘স্লো-মোশন’ এ দেখে!

কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এলে, তবেই আমরা তা দেখতে পাই। চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আলো একটি মাধ্যম। প্রাণীর আকার যত ছোট হয়, তথ্য সংগ্রহের হারও তত বেড়ে যায়। মশা-মাছি একই সময়ে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চলাফেরাও ওদের কাছে ধীর গতির মনে হয়। আর এজন্যই! হাত ওঠানোর পরপরই চোখের পলকে কেটে পড়ে পাজীগুলো।

মানুষের চেয়ে মাছির তথ্য সংগ্রহের হার ৬.৭ গুণ বেশি, কুকুরের ২ গুণ, আর বিড়ালের ১.৪ গুণ। অন্যদিকে হাঙর, কচ্ছপ আর ঈল মাছের জন্য এই হার মানুষের চেয়ে কম।

বিভিন্ন প্রাণীর তথ্য সংগ্রহের কীভাবে মাপে? খুব সহজ একটি পদ্ধতির নাম “Critical Flicker Fusion Frequency”। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রাণীর সামনে বাতি রেখে বারবার জ্বালানো আর নেভানো হয়। একবার জ্বলা আর একবার নেভাকে এক হার্জ ধরে হার্জ সংখ্যা কমানো অথবা বাড়ানো হয়। একটি ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে রেকর্ড করা হয় প্রাণীটির মস্তিষ্কের সংবেদন। সর্বোচ্চ যে কম্পাঙ্কে (হার্জ) কোনো প্রাণী আলোর জ্বলা-নেভা সনাক্ত করতে পারে, তা হলো ঐ প্রাণীটির তথ্য সংগ্রহের হার।

মানুষের তথ্য সংগ্রহের হার ৬০ হার্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের কম্পাঙ্ক (চলতড়িৎ) ৬০ হার্জ। এর অর্থ ৬০ হার্জের চল তড়িৎ ব্যবহার করে বাতি জ্বালালে, আমাদের চোখে তা সবসময় প্রজ্জলিত বলেই মনে হবে। অন্যদিকে মাছির কম্পাঙ্ক ২৫০ হার্জ! বুঝতেই পারছেন মাছি কীভাবে এত দ্রুত আমাদের উদ্দেশ্য বুঝে নেয়, আর জান বাঁচিয়ে সরে পড়তে পারে!

কোনো এক অবসন্ন বিকেলে ঘরে বসে টিভিতে মুভি দেখছেন আপনি। পোষা কুকুরটাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পাশে বসলো আপনাকে সঙ্গ দেবে বলে। সত্যি বলতে আপনার চোখে যেটি মুভি, পোষা প্রাণিটির চোখে তা ছবির স্লাইড-শো মাত্র! মানুষের ১ মিনিট তুলনামূলকভাবে কুকুরের কাছে প্রায় ৭ মিনিট বলে মনে হয়! এখন আপনিই বলুন- “কুকুর কি টেলিভিশন দেখতে পারে?”

প্রাণীদের মাঝে প্রকৃতির এমন অদ্ভুত খেয়াল কেবলই জীববৈচিত্র্য নয়। সেই আদিকাল থেকেই প্রাকৃতিক খাদ্য-শৃঙ্খলে এক প্রাণী অপর প্রাণীর খাদ্য হয়েছে। শিকারীর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য শিকারকে দক্ষ হতে হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিবর্তনের এই ধারায় স্লো-মোশন দৃষ্টি শিকারের জন্য খুবই প্রত্যাশিত এক অভিযোজন। তাই টিকে থাকার লড়াইয়ে আকার, বুদ্ধিমত্তা আর শক্তির পাশাপাশি এটিও এক অনন্য দক্ষতা হয়ে উঠেছে।

শুধু টিকে থাকাই নয়, স্লো-মোশনের ধারণা কাজে লাগিয়ে একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। তা আবার শত্রুকে অগোচরে রেখেই! গভীর সমুদ্রের কিছু প্রাণী কৃত্রিম আলো তৈরি করতে পারে। এরা শত্রুর অবস্থান আর খাবারের সন্ধান আদান প্রদান করে আলোক-তরঙ্গের মাধ্যমে।

শুধু আকারই নয়, কালের দীর্ঘায়ন নির্ভর করে বয়সের উপরেও। একই প্রজাতির প্রাণীদের মাঝে কম বয়সীরা বেশি বয়সীদের চেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর এজন্যই আমাদের ছেলেবেলা অনেক ধীর গতিতে কাটে। আবার প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের কাছে ছোটদের অনেক চঞ্চল বলে মনে হয়!

শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শ্রবণ আর ঘ্রাণের মতো ইন্দ্রিয়গুলোও কালের দীর্ঘায়ন মেনে চলে। যেমন: মানুষ সর্বোচ্চ ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কুকুর প্রায় ৪০ হাজার, ডলফিন প্রায় দেড় লক্ষ হার্জ আর বাদুড় দুই লক্ষ হার্জেরও বেশি কম্পাঙ্ক শুনতে পায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই কুকুর, ডলফিন আর বাদুড়ের কাছে সময় মানুষের চেয়ে ধীরে চলে।

স্লো-মোশন দৃষ্টির এই ধারণা প্রকৃতির রহস্যময়তার আরেকটি উদাহরণ। এমন আরো কতো বিষ্ময়কর তথ্য যে লুকিয়ে আছে আমাদের চারপাশে- চেনার মাঝে অচেনা হয়ে! তার সবকিছু প্রকৃতি হয়তো কখনোই জানতে দেবে না। তবুও কৌতূহলী মনের অনুসন্ধিৎসা চলবে নিরন্তর।

তথ্যসূত্রঃ

লেখকঃ আবু শাকিল আহমেদ

কী হতে যাচ্ছে পরবর্তী মহামারী

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দক্ষিণ-পূর্ব গিয়েনার গ্রাম মিলেন্ডাও-তে দুই বছর বয়সী একটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির নাম এমিল ওয়ামনো। প্রথমে তার জ্বর হয়। তারপর তীব্র বমি ও সাথে রক্ত আমাশয়। গ্রামে এ ধরনের রোগ কেউ আগে দেখেনি। শিশুটির পরিবারের লোকজন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেন। কিন্তু লাভ হলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ শিশুটি মারা গেলো। তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী ছিল একটি ভাইরাস।

এই ভাইরাসটি তার পরিবারের মাঝেও ছড়িয়ে যায়। শীঘ্রই শিশুটির ৪ বছর বয়সী বোনটিও একই রোগে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। একই ঘটনা ঘটে ওয়ামনোর মা ও দাদীর সাথে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো তারা সবাই মারা গেছেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে।

যদি ভাইরাসটি আর না ছড়াতো তাহলে মিলেন্ডাও গ্রামের বাইরে আর কেউ এই পরিবারের করুণ পরিণতির কথা জানতো না। কারণ গিয়েনাতে নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষই মারা যায়। কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। সে সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৭০ শতাংশ লোকই মারা যেতো।

ওয়ামনোর পরিবার থেকে এই ভাইরাস একজন নার্স ও গ্রামের একজন ধাত্রীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। ধাত্রীটিকে সেবা শুশ্রূষার জন্য তার গ্রামে নেয়া হলে সেখানও ভাইরাস ছড়িয়ে যায়। আর যারা এমিলি ওয়ামনোর দাদীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তারাও তাদের গ্রামে ভাইরাস নিয়ে গেলেন।

খুব দ্রুত ভাইরাসটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে গেলো। কারণ মিলেন্ডাও গ্রাম গিয়েনা, সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত। আর মিলেন্ডাওয়ে সবাই ব্যবসা কিংবা আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আসতো। ভাইরাসটি তখনও কিছু কিছু গ্রামে ছড়াচ্ছিল। বাইরের পৃথিবীর অতটা টনক নড়েনি এই ব্যাপারে। ২০১৪ সালের মার্চে গিয়েনার চিকিৎসা কর্তৃপক্ষ এই রোগের কারণ হিসেবে ইবোলা ভাইরাসের নাম ঘোষণা করলেন। তখন সারা পৃথিবী এই রোগের ভয়াবহতা ব্যাপারে জানতে পারলো।

কিছু ভাইরাস আমাদের পূর্ব শত্রু। রাইনো ভাইরাস প্রথম আক্রান্ত করেছে মিশরীয়দের। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাস দশ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের জিনোমে প্রবেশ করেছে। অন্য ভাইরাসরা তুলনামুলকভাবে নতুন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এইচআইভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র এক শতক হলো। নতুন ভাইরাসরাও মহামারী সৃষ্টি করছে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ভয় হতে যাচ্ছে ইবোলা।

ইবোলা ভাইরাস তার ভয়ংকর যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে যায়রে নামক এক দূরবর্তী অঞ্চলে। আক্রান্ত লোকেরা জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং বমি করে। কিছু রোগীর শরীরের সকল ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে থাকে। এমনকি চোখ থেকেও! একজন ডাক্তার এক মুমূর্ষু সন্ন্যাসিনীর রক্তের নমুনা নিয়ে কিনহাসাতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে পিটার পাইয়ট নামের একজন ভাইরাসবিদ নমুনাগুলো ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সাপের আকৃতির কিছু ভাইরাস দেখতে পান।


চিত্র: ইবোলা ভাইরাস

সেই সময় বিজ্ঞানীরা সর্পাকৃতির আরেকটি ভাইরাস সম্বন্ধে জানতেন। ভাইরাসটির নাম মার্গবার্গ ভাইরাস। মার্গবার্গ ভাইরাসটির নাম এসেছে জার্মানির মার্গবার্গ শহর থেকে। ওই শহরের ল্যাব কর্মীরা উগান্ডা থেকে আনা বানর নিয়ে কাজ করার ফলে রক্তক্ষরণ জ্বরে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাইয়ট বুঝতে পারেন তিনি যে ভাইরাসটি দেখেছেন তা মার্গবার্গ ভাইরাস নয়। বরং তার কোনো আত্মীয়।

পাইয়ট ও তার সহকর্মীরা ভাইরাসটির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে জায়েরার গ্রাম ইয়ামবুকুতে চলে গেলেন। তারা একটা অতিথিশালা খুঁজে পেলেন যেখানে যাজক ও সন্ন্যাসিরা দড়ি দিয়ে সে জায়গাটুকু আলাদা করে রেখেছেন যাতে বাইরে থেকে কেউ ভেতরে আসতে না পারে। দড়ি থেকে একটা সাইন ঝোলানো আছে যাতে লেখা “অনুগ্রহ করে থামুন। যে এই লাইন অতিক্রম করবে সে মারা যেতে পারে।”

পাইয়ট ও তার দল একটা সমীক্ষা করলেন। তারা বের করলেন কে কে আক্রান্ত হয়েছে এবং কখন হয়েছে। শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলেন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা কিংবা হামের মতো বাতাসে ছড়াচ্ছে না। বরং রোগীর শরীরের তরল পদার্থ দিয়ে তা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় হাসপাতাল যেগুলোতে একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে ওখান থেকে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। যেসব মানুষ এসব রোগীর সেবা করছে কিংবা মৃত দেহের গোসলের কাজ করছে তাদের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।

ইবোলা ভাইরাস ভয়ংকর হলেও এই ভাইরাস ছড়ানো বন্ধ করা ছিল খুব সহজ। পাইয়ট ও তার দল হাসপাতালগুলো বন্ধ করে দিলেন। আর কেউ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা করে রাখলেন। তিন মাস পরে মহামারী থামলো। ফলাফল ৩১৮ জনের মৃত্যু। পাইয়ট যদি এ উদ্যোগ না নিতেন তাহলে হয়তো মহামারীর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারতো। এখন বাকি রইলো ভাইরাসটিকে একটি নাম দেয়া। পাইয়ট পাশে বয়ে যাওয়া একটি নদীর দিকে তাকালেন। নদীর নাম ‘ইবোলা’।

চিত্র: ৪০ বছর আগে পিটার পাইয়ট আবিষ্কার করেছিলেন ইবোলা ভাইরাস।

একই বছর সুদানেও ইবোলা দেখা দেয়। এতে ২৮৪ জন মারা যায়। তিন বছর পর সুদানে আবার ইবোলা দেখা দেয়। এবার মারা যায় ৩৪ জন। তারপর বছর পনেরোর জন্য ইবোলাকে আর দেখা যায়নি। ১৯৯৪ সালে এটি গেবনে আঘাত হানে। ফলাফাল ৫২ জনের মৃত্যু।

প্রতিবার ইবোলার এই আঘাতের সাথে পাইয়টের পরবর্তী বিজ্ঞানীরা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে লাগলেন। শুধুমাত্র আক্রান্ত রোগীকে চিহ্নিত এবং বাকিদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে তারা ইবোলা ছড়ানো বন্ধ করার চেষ্টা করতো। কারণ ওই সময় কোনো ভ্যাক্সিন বা অন্য কোনো ওষুধ ছিল না।

সঠিক পরিবেশ পেলে অনেক ভাইরাসই মহামারী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু হাম অথবা জলবসন্তের মতো রোগ একবার মহামারী হওয়ার মাধ্যমে হারিয়ে যায় না। এরা তখনও কম মাত্রায় সক্রিয় থাকে। কিন্তু ইবোলার ক্ষেত্রে ঘটনাটি আলাদা। ইবোলার একবার মহামারী হলে অনেক বছর ধরে আর কোনো মহামারী হয় না। দীর্ঘ সময় পর সে তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবার হাজির হয়।

মাঝখানের বছরগুলোতে ইবোলা কোথায় হারিয়ে যায়? ভাইরাসবিদরা এই ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া শুরু করলেন। তারা দেখলেন গরিলা ও শিম্পাঞ্জীরাও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারা বাদুড়েও ইবোলার বিরুদ্ধে এন্টিবডি পেলেন। কিন্তু বাদুর এই ভাইরাস সহ্য করতে পারে। এমন হতে পারে ইবোলা এমনিতে বাদুর থেকে বাদুরে ছড়ায় কোনো রোগ তৈরি ছাড়া। আর সময়ে সময়ে মানুষে মহামারী সৃষ্টি করে।

ইবোলা ভাইরাস আমাদের কাছে নতুন হলেও এই ভাইরাস আসলে অনেক পুরনো। বিজ্ঞানীরা ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরে ইবোলার মতো একটা ভাইরাসের জিন পেয়েছেন। এন্ডোজেনাস রেট্রো ভাইরাসের মতো এই ভাইরাস তার পোষকের দেহে তার উপস্থিতির প্রমাণ রেখে গিয়েছে। ধেড়ে ইঁদুর আর নেংটি ইঁদুরের পূর্বপুরুষ বাস করতো আজ থেকে ষোল মিলিয়ন বছর আগে। আর তখনই হয়তো ইবোলা ভাইরাস তার নিকট আত্মীয় মার্গবার্গ ভাইরাস হতে বর্তমান রূপে অবতীর্ণ হয়।

মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইবোলার বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস স্তন্যপায়ীদের আক্রান্ত করে আসছে। অনেক পোষকে তারা কোনো ক্ষতি করতো না। ওই পোষক থেকে অন্য প্রজাতির কোনো পোষকে গেলে হয়তো তা তার জন্য মারণরূপ ধারণ করতো। ইবোলার শেষ আশ্রয় মানুষ।

এমন হতে পারে মানুষ যখন আক্রান্ত পশুর মাংস খায় কিংবা বাদুরের লালা যুক্ত ফল খায় তখন সে ইবোলায় আক্রান্ত হয়। ইবোলা আমাদের শরীরে প্রবেশ করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষকে আক্রান্ত করে এবং তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে ভয়াবহ ডাইরিয়া, বমি এবং অনেক সময় রক্তক্ষরণও হয়।

ইবোলা একজন মানুষকে আক্রান্ত করার পরে তা অন্য কারও কাছে ছড়াবে কি ছড়াবে না তা নির্ভর করে পাশের মানুষগুলো কাজকর্মের উপর। যদি তারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসে তাহলে তারাও ইবোলা দিয়ে আক্রান্ত হবে। ইবোলা ভাইরাসের প্রথম ৩৭ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় প্রথম মহামারী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ইবোলা ভাইরাস হারিয়ে যায়। এর একটি কারণ হতে পারে আক্রান্ত মানুষগুলো প্রত্যেকেই হয়তো মারা গিয়েছিল।

গত ৩৭ বছরে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫০ সালে আফ্রিকার জনসংখ্যা ছিল ২২১ মিলিয়ন। বর্তমানে এই সংখ্যা ১ বিলিয়নের উপরে গিয়ে পৌঁছেছে। আগে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছড়ানোই অনেক কঠিন ছিল। এখন বনজঙ্গল কেটে শহর হচ্ছে। বাড়ছে মানুষে মানুষে যোগাযোগ। আর সাথে বাড়ছে ইবোলার সংক্রমণ।

কিন্তু গিয়েনা, লাইবেরিয়া, সিয়েরা লিওনি এর মতো দেশে গণস্বাস্থ্য কর্মীর অভাব রয়েছে। বছরের পর বছর গৃহযুদ্ধ আর দারিদ্রের ফলে এসব দেশে ডাক্তার ও হাসপাতালের সংখ্যা কম। আর ইবোলায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীরাও এতে আক্রান্ত হয়। ফলে মহামারী ঠেকাতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব পড়ে।

চিত্র: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নার্সরাও ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের নাগরিক পলিনকে যিনি ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।

কেউ জানে না এমিলি ওয়ামনো কীভাবে ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশু থেকে ছড়ানো ভাইরাসটিই ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারী সৃষ্টি করে। দিনে দিনে হাসপাতালগুলোতে ইবোলা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে তাদেরকে ধুঁকে ধুঁকে মরার জন্যে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পোলিও নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তারা ইবোলাকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। পশ্চিম আফ্রিকার সরকারগুলো ইবোলায় আক্রান্ত পুরো গ্রাম কিংবা এলাকাকে জনবিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকলো। কারণ তাদের আর কিছু করার ছিল না। আর অন্যদিকে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।

ইবোলা সর্বপ্রথম বাইরের দেশে যায় এরোপ্লেনের মাধ্যমে। একবার ইবোলায় আক্রান্ত এক কূটনীতিবিদ প্ল্যানে নাইজেরিয়া যান। ওখানে তার ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন ভাইরাসে আক্রান্ত হন। আরেকটি প্ল্যানে একজন আক্রান্ত নার্সকে স্পেনে নিয়ে যাওয়া হয়। আর দুইটি প্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাস আসে। একটা হোস্টনে আরেকটা নিউইয়র্কে।

আফ্রিকার বাইরের খুব কম মানুষ ইবোলা সম্বন্ধে জানতো। একটু আধটু যা জানতো তা রিচার্ড প্রেস্টনের ‘দ্য হট জোন’ এর মতো ভীতিকর বই কিংবা ‘আউটব্রেক’ নামের কাল্পনিক মুভি থেকে। পুরো আমেরিকা ইবোলার ভয়ে ভীত ছিল। ২০১৪ সালের নেয়া এক সমীক্ষায় দেখা যায় আমেরিকার দুই তৃতীয়াংশ লোক মনে করে আমেরিকায় ইবোলার মহামারী হতে পারে। ৪৩ শতাংশ লোক মনে করেন তিনি ইবোলায় আক্রান্ত। গুজব ছড়িয়ে গেলো যে ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।

অক্টোবরের ২৩ তারিখ খবর এলো যে ডাক্তার গিয়েনাতে ইবোলায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে ফিরে আসেন। রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার আগে তিনি এক জায়গায় বোলিং করতে যান।

উদ্বিগ্ন পাঠকরা নিউইয়র্ক টাইমসকে জিজ্ঞেস করতে থাকে বল থেকে ইবোলা ছড়াতে পারে কিনা। সাংবাদিক ডোনাল্ড ম্যাকনিল জুনিয়র খুব তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বলেন, “ইবোলায় আক্রান্ত কেউ যদি রক্ত, বমি কিংবা মল বলে রেখে যায় আর আরেকজন যদি তাতে হাত রাখে। পরে সেই হাত চোখে, নাকে কিংবা নাকে লাগায় তাহলে ইবোলা ছড়াতে পারে।”

এত আশঙ্কার পরেও আমেরিকাতে ইবোলার কোনো মহামারী হয়নি। এমনকি অন্য কোথাও হয়নি। নাইজেরিয়াতে ২০ জন ইবোলায় আক্রান্ত হয়। যার মধ্যে আটজন মারা যায়। সেনেগালে মাত্র একজন আক্রান্ত হয়। মালিতে মহামারী বন্ধ করা সম্ভব হয়।

এসব দেশ মহামারী ঠেকাতে সক্ষম হওয়ার একটা কারণ হলো তাদের কাছে আগে থেকে পর্যাপ্ত সতর্কতা ছিল। অন্যদিকে লাইবেরিয়া, গিনিয়া এবং সিয়েরা লিওনিতে ইবোলার সংক্রমণ চলতে থাকে। এসব দেশে ইবোলার সংক্রমণ এতই বেশি যে সেখানে এতো সহজে তা থামার নয়।

বিশেষজ্ঞরা ইবোলার এই মাত্রা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘোষণা করলেন, এভাবে চলতে থাকলে ২০১৫ এর জানুয়ারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১ দশমিক ৪ মিলিয়নে। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং কিউবা সেসব আক্রান্ত এলাকায় ডাক্তার ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল।

নতুন ইবোলা হাসপাতাল তৈরি হলো। গণস্বাস্থ্য কর্মীরা মানুষকে সচেতন করে দিলো যাতে তারা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে সাবধানের সাথে দাফন করে। যাতে করে মৃত ব্যক্তি থেকে জীবাণু না ছড়ায়। এসব ব্যবস্থা নেয়ার ফলে লাইবেরিয়া, গিনিয়াতে মহামারীর মাত্রা কমতে থাকে। পরের কয়েক বছরে নাটকীয়ভাবে এই সংখ্যা আরও অনেক কমে যায়।

তবে মনে করার কোনো কারণ নেই যে এই মহামারী শেষ হলেই ইবোলা চিরতরে বিদায় নেবে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি ম্যাপ তৈরি করেন। যেখানে যেখানে ইবোলা ভবিষ্যতে আঘাত হানতে পারে, কোন কোন প্রাণীতে এই ভাইরাস টিকে থাকতে পারে আর ওই এলাকায় মানুষের বসবাসের অবস্থার তার উপর ভিত্তি করে এই ম্যাপটি করা হয়েছে।

এই ম্যাপের বেশিরভাগ অংশ মধ্য আফ্রিকা জুড়ে। আর বাকি অংশগুলো তানজানিয়া, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কারের কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এই ম্যাপ অনুসারে ২২ মিলিয়ন লোকের ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। আর আফ্রিকার লোক যত বাড়ছে এই ঝুকিও দিন দিন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চিত্র: ইবোলা সংক্রমণের অনুমিত ম্যাপ।

ইবোলার মতো এরকম আরও অনেক ভাইরাস নানা সময় আবির্ভাব হয়েছে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসে চীনের এক কৃষক অতিরিক্ত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। এভাবে চীনের ওই অঞ্চলের লোক ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে থাকে। কিন্তু সবাই তখনো এই রোগ সম্বন্ধে জানতো না।

একবার এক আমেরিকান ব্যবসায়ী চীন থেকে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথে এরোপ্লেনে জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্লেনটি হানই এ থামে এবং লোকটি মারা যায়। এই ঘটনার ফলে পুরো বিশ্বে নাড়া পড়ে। সারা পৃথিবী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। যদিও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় চীন ও হংকং। এই রোগে আক্রান্ত প্রায় ১০ শতাংশ লোক মারা যায়। ডাক্তাররা এই নতুন রোগের নাম দেন সার্স (Severe acute respiratory syndrome)।

চিত্র: সার্স ভাইরাস।

বিজ্ঞানীরা এই রোগে আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা নিয়ে গবেষণা করা শুরু করলেন। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মালিক পেইরিস ও তার দল এই রোগের কারণ খুঁজে পান। এই ভাইরাসটি ছিল করোনাভাইরাস (Coronavirus) গ্রুপের। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করলেন এইচআইভি এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো সার্স ভাইরাসও হয়তো এমন কোনো ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়েছে যা কোনো পশুকে আক্রমণ করতো।

চীনের মানুষেরা যেসব পশুর সাথে সচরাচর বেশি সংস্পর্শে থাকে তাদের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন। এভাবে তারা সার্স ভাইরাসের বিবর্তন বৃক্ষ পেয়ে গেলেন। জানা হলো সার্স ভাইরাসের ইতিহাস।

এই ভাইরাস হয়তো প্রথমে চীনের বাদুড়ে পাওয়া যায়। বাদুড় থেকে বিড়াল সদৃশ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘সিভিট’ (Civet)-এ ছড়ায়। সিভিট চীনের পশু বাজারে নিত্যদিন দেখা যায়। সিভিট থেকে এই ভাইরাস পরে মানুষে ছড়ায়। আর এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে খুব সহজে ছড়াতে পারে। যেমন হাঁচি-কাশির মতো খুব সাধারণ ব্যাপার থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।

ইবোলা সংক্রমণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছিল সার্সের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং সেগুলো সফলও হয়। সার্সের ফলে ৯০০০ লোক এতে আক্রান্ত হয় এবং ৯০০ লোক মারা যায়। আর এরকম ফ্লু-তে আড়াই লাখ মানুষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে। সার্স সে তুলনায় খুব অল্পতেই সেরে গিয়েছে বলা যায়।

এর এক যুগ পর আরেক ধরনের করোনাভাইরাস সৌদি আরবে দেখা যায়। ২০১২ সালে সৌদি আরবের ডাক্তাররা দেখতে পেলেন তাদের রোগীরা শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু তারা এই রোগ আসলে কী নির্ণয় করতে পারছিলেন না। আক্রান্ত রোগীর এক তৃতীয়াংশ এই রোগে মারা যায়।

রোগটি MERS (Middle Eastern Respiratory Syndrome) নামে পরিচিত হয়। খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞানীরা এই রোগের ভাইরাসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ভাইরাসের জিনোমে সিকুয়েন্সিং করে তারা এর কাছাকাছি একটি ভাইরাস আফ্রিকার বাদুড়ের মধ্যে পেলেন।

আফ্রিকার বাদুড় থেকে কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে রোগ ছড়াতে পারে বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। তারা সৌদি আরবের মানুষের জীবন যার উপর নির্ভর করে তাকে গবেষণা শুরু করলেন। আর তা হলো উট। তারা উটের সর্দিতে MERS ভাইরাস পেলেন।

এখন প্রশ্ন আসে আফ্রিকার বাদুড় হতে মধ্যপ্রাচ্যের উটে এই ভাইরাস কীভাবে আসলো? এর কেবল একটাই উত্তর হতে পারে। বাদুড় হতে উত্তর আফ্রিকার উটে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়ায়। আর উত্তর আফ্রিকা হতে মধ্যপ্রাচ্যে উট কেনাবেচা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে উত্তর আফ্রিকার আক্রান্ত কোনো উট থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উটগুলো MERS ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

SARS থেকে MERS আরও অনেক ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৌদি আরবে প্রতি বছর দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ সারা পৃথিবী থেকে হজ্জ করতে আসে। তাই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য এটা খুব ভালো পরিবেশ।

মানুষগুলো তখন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নিজের দেশে গেলে ওখানেও সেই ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ১০২৬ জন লোক MERS এ আক্রান্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গিয়েছে ৩৭৬ জন। আর এই ঘটনাগুলো সবই সৌদি আরবের ভেতরে। সৌদি আরবের বাইরে এই ভাইরাস এখনো ছড়ায়নি। এর একটা কারণ হতে পারে এই ভাইরাস শুধুমাত্র দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মানুষেই রোগ সৃষ্টি করে। এই রোগ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের জন্যে একটা হুমকির কারণ হতে পারে।

চিত্র: হজের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর লোক সমাগম হয়, যা মহামারীর জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হজযাত্রী এবং হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ভাইরাসের মহামারীর ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আমাদেরকে খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। পরবর্তী মহামারীর ভাইরাস কোনো বন্যপ্রাণী হতে আমাদের মধ্যে চলে আসতে পারে। আমরা হয়তো সেই ভাইরাস সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে সচেতন থাকার জন্যে বিজ্ঞানীরা পশুর মধ্যকার ভাইরাস সমীক্ষা করছেন।

কিন্তু আমরা যেহেতু ভাইরাসের কিলবিল করা পৃথিবীতে বাস করি তাই এই কাজটা বেশ কঠিন। কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ান লিপকিন নিউইয়র্ক শহরে ১৩৩টি ইঁদুর ধরেন এবং ১৮ ধরনের ভাইরাস পান যা মানুষে আক্রমণকারী জীবাণুর কাছাকাছি। আরেক গবেষণায় বাংলাদেশের এক প্রজাতির বাদুড়ের উপর গবেষণা চালানো হয়। দেখা যায় বাদুড়ে পাওয়া ৫৫টি ভাইরাসের ৫০টি ভাইরাসই বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা!

এই অজানা ভাইরাসের কোনো একটি থেকে হয়তো সামনে বড় ধরনের কোনো মহামারী হতে পারে। তার মানে এই না যে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। ভাইরাসগুলো যাতে অন্য প্রাণী হতে আমাদের মধ্যে না ছড়াতে পারে সেজন্যে সব ধরনের ব্যবস্থা আমাদের নিয়ে রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র

A Planet of Viruses, Carl Zimmer

featured image: sciencealert.com

ভিন গ্রহের প্রাণীরা দেখতে যেরকম হবে

ভিন গ্রহে যদি জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব থাকে তাহলে তারা দেখতে কেমন হবে? সায়েন্স ফিকশন লেখকেরা কিংবা সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভিন গ্রহের প্রাণীদেরকে মানুষের মতো করেই কল্পনা করে থাকে। কিছুটা পরিবর্তিত করে একটু অদ্ভুত চোখ, অদ্ভুত নাক, অদ্ভুত মাথা দিয়ে চালিয়ে দেয়। এলিয়েনরা বড় মাথাওয়ালা ও বড় চোখওয়ালা আংশিক মানুষ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তারা তাদের মতো করে অপরিচিত ও স্বতন্ত্র কোনো আকারেরও হতে পারে।

কোনো কোনো সায়েন্স ফিকশনে এলিয়েনদেরকে মানুষ ব্যতীত ভিন্ন কোনো আকৃতিতেও উপস্থাপন করা হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে এলিয়েনগুলো পৃথিবীরই কোনো না কোনো প্রাণীর পরিবর্তিত রূপ। যেমন মাকড়সা, অক্টোপাস কিংবা মাশরুম। সামান্য একটু আধটু এদিক সেদিক করে এলিয়েন হিসেবে চালিয়ে দেয়া।

কারো কারো মনে হতে পারে এগুলো আসলে সায়েন্স ফিকশন লেখকদের কল্পনার সীমাবদ্ধতা। তারা নিজেদের কল্পনাকে বিস্তৃত করতে পারছে না, পৃথিবীর প্রাণীগুলোতেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। তাই এলিয়েন হিসেবে যাদেরকেই কল্পনা করেন তারা সকলেই পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রাণীর সাথে মিলে যায়।

লেখকদের সীমাবদ্ধতা হোক আর যা-ই হোক, এখানে আসলে কিছু বাস্তবতাও আছে। এলিয়েনরা যদি বাইরের বিশ্বে থেকেই থাকে তাহলে তারা দেখতে আমাদের পরিচিত কোনো না কোনো প্রাণীর মতোই হবে। কেন হবে তার পেছনেও ভালো কিছু কারণ আছে। খারাপ চরিত্রের এলিয়েনগুলোকে প্রায় সময়ই বড় ও ভয়ানক চোখের দানব হিসেবে কল্পনা করা হয় সায়েন্স ফিকশনগুলোতে।

এলিয়েনরা কেন দেখতে আমাদের পরিচিত প্রাণীর মতো তার ব্যাখ্যায় এই এই খারাপ এলিয়েনকে বিবেচনা করলাম। আলোচনার জন্য চোখকে বেছে নিলাম।

আরো অনেক কিছু নিয়ে বিবেচনা-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা যেতো। আলোচনা করার জন্য পা আছে, ডানা আছে, কান আছে, মগজের আকার আছে। এগুলোও বেশ আগ্রহোদ্দীপক। কিংবা এটাও হতে পারতো- প্রাণীদের কেন চাকা নেই। কিন্তু আপাতত চোখকেই রাখলাম।

দেহের মধ্যে থাকার জন্য চোখ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই কথা তো পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাণীর জন্য তো খাটেই, পাশাপাশি পৃথিবীর বাইরে অন্যান্য গ্রহের প্রাণীর জন্যও এটি প্রযোজ্য। প্রাণ-বান্ধব গ্রহগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে খুব বেশি দূরে অবস্থান করে না। সেখানে আলো পৌঁছায়। যেখানে আলো আছে সেখানে কোনো কিছুকে খুঁজে পেতে, চলতে ফিরতে, দূরত্ব নির্ণয় করতে এটিকে ব্যবহার করা যায়। যেখানে প্রাণ আছে, আলো আছে এবং প্রাণের টিকে থাকার জন্য আলোকে কাজে লাগানোর প্রয়োজন আছে সেখানে আলোর প্রতি সংবেদনশীল কোনো অঙ্গ তৈরি হবার জোর সম্ভাবনা আছে। প্রাণীর দেহে কোনো না কোনো একভাবে চোখ বা চোখের মতো কোনোকিছু বিবর্তিত হবে, যা তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

পৃথিবীতেও একসময় সমস্ত প্রাণিজগতে চোখের উপস্থিতি ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর দেহে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চোখ বিবর্তিত হয়েছে। চোখের এক ডজনের মতো ভিন্নতা আছে, এদের কারো সাথে কারো সম্পর্ক নেই। দেহের প্রয়োজনের তাগিদে ভিন্ন ভিন্নভাবে তারা বিবর্তিত হয়েছে।

আলো আছে, প্রাণী আছ এবং প্রাণীর কাছে আলোর প্রয়োজনীয়তা আছে তাই কোনো একভাবে তারা নিজেরা নিজেদেরকে আলোর প্রতি সংবেদী করে নিয়েছে। প্রাণিজগতে এই ঘটনা এক ডজন বারেরও বেশি ঘটেছে। বিবর্তনের ধারায় একবার যাদের চোখ বিকশিত হয়েছিল, তারা নিজেদের দেহ থেকে চোখকে কখনো বাদ দিয়ে দেয়নি। চোখের উপকারীতার শেষ নেই।

চোখ বিবর্তিত হবার বেশ কয়েকটি উপায় আছে। সবচেয়ে সরল উপায়টি হচ্ছে পিন হোল ক্যামেরার মতো। এ ধরনের চোখের ক্ষেত্রে বাইরের দিকে ছোট একটি ছিদ্র থাকবে এবং এর পাশে অন্ধকার একটি চেম্বার থাকবে। ছিদ্রে একটি লেন্স থাকবে এবং আলোক রশ্মি লেন্সে আপতিত হয়ে অন্ধকার চেম্বারের দেয়ালে প্রতিচ্ছবি তৈরি করবে। দেয়ালে আলোর জন্য সংবেদনশীল কোষ থাকবে এবং এই কোষের মাধ্যমে মস্তিষ্ক বাইরের চিত্র ধারণ করতে পারবে।

এ ধরনের চোখের জন্য লেন্সেরও প্রয়োজন নেই আসলে। সাধারণ একটি ছোট ছিদ্রই এর কাজটি করতে পারে ভালোভাবে। তবে লেন্স না থাকলে ছিদ্রটি বড় হতে পারবে না। ছিদ্রটি ছোট হলে আবার এর মধ্য দিয়ে খুব বেশি আলো প্রবেশ করতে পারবে না। আলো কম প্রবেশ করবে, তার মানে হচ্ছে এই চোখের মাধ্যমে ধারণকৃত চিত্র বেশ ঝাপসা হবে।

এলিয়েনদের মাঝে এ ধরনের চোখের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব কিছু নয়। এ ধরনের চোখের এলিয়েন যদি পাওয়া যায় তাহলে আমরা এদেরকে বলবো ‘পিন-হোল’ চোখ। আগের দিনের ক্যামেরাগুলোর মতো। আগের ক্যামেরাগুলো দিয়ে এরকম পিনের মতো ছোট ছিদ্র (হোল) দিয়ে ছবি তোলা হতো বলে এদের নাম ছিল ‘পিন-হোল ক্যামেরা’।

চিত্রঃ পিনহোল চোখ ও মানুষের চোখ।

পিনহোল চোখের পাশের ছবিটি মানুষের চোখের। মানুষের চোখে লেন্স আছে। লেন্স থাকার অর্থ হচ্ছে চারদিকের অনেক আলোক রশ্মি একত্র করতে পারে। আলোক রশ্মির পরিমাণ বেশি হলে ছবির মানও অনেক ভালো হবে। মানুষের চোখের পেছন দিকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল কোষ ‘রেটিনা’ আছে। রেটিনার সাথে মস্তিষ্কের সরাসরি সংযোগ আছে। রেটিনার মাধ্যমে চোখের ছবি চলে যায় মস্তিষ্কে। এই ছবি দেখে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয় সামনের বস্তুটি আসলে কী? মশা না মাছি না মানুষ না টেবিল।

সকল মেরুদণ্ডী প্রাণীতেই এ ধরনের চোখ বিদ্যমান। এই প্রক্রিয়ায় আলোক রশ্মি ধরার জন্য বেশ কয়েকটি প্রাণী প্রজাতিতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে চোখের উৎপত্তি হয়েছিল। এই তালিকায় অক্টোপাসের চোখও আছে।

এক ধরনের মাকড়সা আছে যারা লাফিয়ে চলে। এদের একটু অদ্ভুত রকমের চোখ আছে। এদের চোখ অনেকটা স্ক্যানারের মতো। মানুষের মতো এদের কোনো রেটিনা নেই, তাই স্ক্যান পদ্ধতিতে তারা নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছে। সামনের এলাকাকে স্ক্যান করে করে তারা খাদ্য সংগ্রহ করে এবং চলাফেরা করে।

এরা যদি খুব দ্রুত গতিতে আশেপাশের অঞ্চলকে স্ক্যান করতে পারতো তাহলে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। দুঃখজনকভাবে তাদের স্ক্যান করার গতি অনেক কম। তাই তারা আশেপাশের সকল জিনিসের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে খাদ্য বা রাস্তার প্রতি কিংবা আগ্রহোদ্দীপক জিনিসের প্রতি মনোযোগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়।

পরবর্তী ছবিতে মাকড়শার চোখের পাশের চিত্রটি একটি গুচ্ছ চোখ বা জটিল চোখের ছবি। কীট-পতঙ্গ, চিংড়ি, তেলাপোকা, ও অন্যান্য প্রাণীর মাঝে এ ধরনের চোখ দেখা যায়। গুচ্ছ বা পুঞ্জ আকারে অনেকগুলো চোখ বা অক্ষি থাকে বলে এদেরকে ‘পুঞ্জাক্ষি’ বলা হয়। গাধা ফুলের মতো একটি কেন্দ্রীয় বিন্দু থেকে চারদিকে কয়েক শত লম্বাটিউব বের হয়ে আসে এদের। প্রতিটিটিউবই আলাদা আলাদাভাবে ক্ষুদ্র চোখ হিসেবে কাজ করে। শত শত ক্ষুদ্র চোখের প্রত্যেকটিতেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেন্স আছে। প্রত্যেক চোখের দিক ভিন্ন।

চিত্রঃ মকড়সার চোখ ও পতঙ্গের গুচ্ছচোখ।

প্রত্যেক চোখ ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আলাদা আলাদা চিত্র ধারণ করে। তবে এসব ছবির কোনটিই অর্থপূর্ণ হয় না। আলাদা আলাদা দিক থেকে আসা আলাদা চিত্র একত্রে মস্তিষ্কে যায় এবং মস্তিষ্ক সকল চিত্রকে সমন্বয় করে করে একটি অর্থপূর্ণ চিত্র তৈরি করে নেয়। একটি ফড়িং যখন কোনো পোকাকে খাদ্য হিসেবে ধরে নেয় তখন মনে করতে হবে ফড়িঙের চোখে শত শত ছবি উঠেছিল, মস্তিষ্ক শত শত ছবি বিশ্লেষণ করে একটি অর্থপূর্ণ ছবি তৈরি করেছে। এবং এর সাহায্যেই ফড়িং ঐ পোকাটিকে ধরতে পেরেছে।

টেলিস্কোপগুলোতে সাধারণত লেন্স ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আধুনিক টেলিস্কোপগুলোতে আয়না ব্যবহার করা হয়। আমাদের সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপটি লেন্সের পরিবর্তে বড় একটি বক্র আয়না ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। বক্র আয়না ব্যবহার করে চিত্র ধারণ করার ব্যাপারটি প্রাণিজগতেও আছে। স্কালুপ (scallop) নামে এক ধরনের ঝিনুক সদৃশ শামুক আছে যাদের চোখ বক্র আয়না পদ্ধতিতে কাজ করে।

চিত্রঃ আধুনিক টেলিস্কোপগুলোতে বক্র আয়না ব্যবহার করা হয়।
চিত্রঃ স্কালুপের বিশেষ ধরনের চোখ। ছবিঃ Azula

চোখ বিকশিত হবার আরো কতগুলো পদ্ধতি আছে। বহির্বিশ্বে যদি প্রাণের দেখা পাওয়া যায় তাহলে এই পদ্ধতিগুলোর কোনো একটি পদ্ধতির চোখের দেখা পাওয়া যাবার জোর সম্ভাবনা আছে।

এবার আমাদের কল্পনাকে আরো বেশি পরিমাণ বিস্তৃত করি। আমাদের কল্পিত প্রাণী যে গ্রহে থাকবে সে গ্রহে নক্ষত্রের আলোর প্রায় সকল বর্ণালীই থাকার থাকবে। বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের রেডিও স্তর থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের এক্স-রে পর্যন্ত সকল তরঙ্গই উপস্থিত থাকবে। আমরা বর্ণালীর এই সীমার অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশের প্রতি সংবেদনশীল। দৃশ্যমান বর্ণালীর অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ আমরা আমদের দেখার কাজে ব্যবহার করতে পারি। ভিন গ্রহের প্রাণীদেরকেও কি আমাদের মতো হতে হবে?

তাদের দেখার পরিসর আমাদের থেকে ভিন্ন হতে পারে কিংবা আমাদের চেয়ে আরো বিস্তৃত ও উন্নত হতে পারে। তাদের হয়তো রেডিও তরঙ্গের প্রতি সংবেদনশীল চোখ থাকতে পারে। কিংবা থাকতে পারে এক্স-রে’র প্রতি সংবেদনশীল চোখও।

কোনো ছবির মান নির্ভর করে তার রেজ্যুজুলেশনের উপর। রেজ্যুলেশন বেশি হলে ছবির মান ভালো হবে আর রেজ্যুলেশন কম হলে ছবির মান খারাপ হবে। বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ব্যবহার করে তোলা ছবির রেজ্যুলেশন ভালো হয় না। রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে যে ছবি তোলা হয় তার মান অন্য ছবি থেকে খারাপ আসবে এটাই স্বাভাবিক।

আমরা যে তরঙ্গকে ‘আলো’ হিসেবে জানি অর্থাৎ মানুষের চোখে দৃশ্যমান তরঙ্গের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম। তাই এই তরঙ্গ ব্যবহার করে তোলা ছবির রেজ্যুলেশন অনেক বেশি থাকে এবং ছবির মান তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো হয়।

রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে তোলা ছবি বাজে মানের হলেও যোগাযোগ করার জন্য এই তরঙ্গ বেশ সুবিধাজনক। সেজন্যই এই তরঙ্গকে ব্যবহার করে বেতার ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল। আমি যতদূর জানি পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণীর বিকাশ ঘটেনি যারা রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে দেখে বা যোগাযোগ করে। একমাত্র মানুষ নামের প্রজাতিটি যোগাযোগের কাজে রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে, তবে এই যোগাযোগ দেহের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কম, তাই ছবির মান ভালো হয়, তাহলে এর চেয়েও ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোর বেলায় কেমন হবে? উদাহরণ হিসেবে এক্স-রে’র কথাই বিবেচনা করি। এক্স-রে’কে ফোকাস করা বেশ কঠিন। সেজন্যই এক্সরের মাধ্যমে তোলা ছবিগুলো বাস্তব ছবির মতো হয় না।

এক্স-রে তরঙ্গ এতোই তীব্র যে এর মাধ্যমে তোলা ছবিতে ছবির একটি ছায়া দেখা যায় মাত্র। পৃথিবীর প্রাণিজগতে এরকম কোনো প্রাণী নেই যারা এক্সরেকে দেখার কাজে ব্যবহার করতে জানে। তবে পৃথিবীতে এরকম কোনো প্রাণী না থাকলেও ভিন গ্রহে হয়তো ঠিকই এমন প্রাণী আছে যারা দেখার কাজে এক্সরে তরঙ্গকে ব্যবহার করে।

দেখার ব্যাপারটিও নির্ভর করে আলোক রশ্মির চলাচলের উপর। কোনো গ্রহে যদি সবসময় ঘন কুয়াশার উপস্থিতি থাকে এবং এর ফলে নক্ষত্রের আলো স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ করতে না পারে তাহলে ঐ গ্রহে চোখের বিকাশ হবার সম্ভাবনা খুবই কম। এরকম পরিস্থিতিতে ঐ গ্রহে এমন কোনো ব্যবস্থার জন্ম হতে পারে যারা শব্দের মাধ্যমে দেখার কাজ চালায়।

শব্দের মাধ্যমে দেখার কাজ চালিয়ে নেবার উদাহরণ পৃথিবীতেও আছে। বাদুড়। এরা একের পর এক শব্দ উৎপন্ন করে করে চলে, এই শব্দ আবার প্রতিফলিত হয়ে তাদের কানে লাগে। প্রতিফলিত হতে কত সময় লেগেছে তা বিশ্লেষণ করে তারা সিদ্ধান্ত নেয় সামনে কী আছে। শব্দ ফিরে আসতে যদি সময় বেশি নেয় তাহলে ধরে নিতে হবে সামনের বস্তুটি দূরে আছে, আর সময় যদি কম লাগে তাহলে বুঝতে হবে বস্তুটি নিকটে আছে।

চিত্রঃ বাদুড়। এরা শব্দ তরঙ্গকে ব্যবহার করে দেখার কাজ সম্পন্ন করে।
ছবিঃ Mother Nature Network

বাদুড়ের পাশাপাশি ডলফিন প্রজাতিরাও এই পদ্ধতিতে দেখার কাজ করে। মানুষও কৃত্রিমভাবে নিজের কাজে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে। জাহাজে বা সাবমেরিনে কোনো কিছুর উপস্থিতি নির্নয়ে (বলা যায় অনেকটা দেখার কাজে) এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও ব্যাপক হারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

নদীর ডলফিনের জন্য শব্দ ব্যবহার করে দেখার প্রক্রিয়াটি খুবই উপকারি। কারণ নদীর পানি ঘোলা থাকে, তারা নিজেরাই পানি ঘোলা করে ফেলে। এমতাবস্থায় তাদের পক্ষে স্বাভাবিক চোখে দেখা খুব কষ্টকর হয়ে যেত। শব্দের ব্যবহার তাই তাদেরকে বেশ উপযোগিতা প্রদান করেছে। পৃথিবীর প্রাণিজগতে শব্দীয়-দর্শন প্রক্রিয়া বেশ কয়েক বার বিবর্তিত হয়েছে এবং তাদের সবগুলোই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে হয়েছে। যেমন বাদুড়, তিমি, ডলফিন এবং দুটি ভিন্ন ধরনের গর্তবাসী পাখি।

ভিনগ্রহে প্রাণ অনুসন্ধান করলে এরকম ‘শব্দীয়-চোখ’ সম্পন্ন এলিয়েনের দেখা পাওয়া যেতে পারে। এটা তেমন অবাক করা বিষয় নয়। বিশেষ করে যেসব গ্রহে ঘন কুয়াশা বিদ্যমান সেসব গ্রহে প্রাণ থাকলে তাদের দৃষ্টি-ব্যবস্থা এমন হবার সম্ভাবনাই প্রবল।

আমাদের পৃথিবীতে মাছের এমন এক ধরনের প্রজাতি আছে যারা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ব্যবহার করে তাদের গন্তব্য চিনে নেয়। এই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তারা নিজেরাই তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটিও সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে মাছের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে বিকশিত হয়েছে। একটি আফ্রিকা অঞ্চলের মাছ আর আরেকটি দক্ষিণ আমেরিকার মাছ।

প্লাটিপাসের একটি প্রজাতির মাঝে এক ধরনের বৈদ্যুতিক সেন্সর আছে। তার শিকারি প্রাণী যদি নড়াচড়া করে তাহলে মৃদু বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। ঐ বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রকে শনাক্ত করতে পারে প্লাটিপাসের সেন্সর। এই সেন্সর ব্যবহার করে প্লাটিপাস তার শিকার ধরে। ভিনগ্রহে যদি কোনো প্রাণী থাকে তাহলে তাদের মাঝেও প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে এরকম বৈদ্যুতিক সেন্সর থাকতে পারে, যা তাদের শিকার ধরতে কাজে লাগে। ভিনগ্রহে যদি প্রাণী থাকে তাহলে এমন অনেক কিছুই থাকতে পারে যার সাথে আমরা পৃথিবীতেই পরিচিত।

এই লেখাটি একটি দিক থেকে ভিন্ন। কারণ এখানের বিষয়গুলো আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। প্রাচীন মানুষ, যারা কোনো কিছু ব্যাখ্যা করার জন্য অলীক কল্পনা ও গাজাখোরি গল্পের জন্ম দিয়েছিল তারাও বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবে জানতো না। তবে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হচ্ছে আমরা একটি যৌক্তিক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছি। তারা কোনোকিছু না জেনে কোনোকিছু যাচাই না করেই অলীক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিল।

আমাদের পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, জীববিদ্যা সঠিকতা, নির্ভুলতা ও যৌক্তিকতায় এতো এগিয়েছে যে দূর নক্ষত্রে কী আছে বা সেখানে কী হচ্ছে তা এখানে বসে বলে দিতে পারি। বিজ্ঞানের কিছু নিয়ম নীতি মেনে যৌক্তিক উপায়েই বলে দিতে পারি হাজার হাজার আলোক বর্ষ দূরে থেকেও।

তারপরেও এসব গ্রহ-নক্ষত্র সম্বন্ধে অনেক কিছুই রহস্যময় থেকে যায়। মীমাংসা না হওয়া ব্যাপারগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা কল্পিত গল্পের অবতারণা করে বসি না। আমরা অপেক্ষা করি। বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয়, প্রযুক্তি উন্নত হয়। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও প্রযুক্তির উন্নতিকে ব্যবহার করে আমরা এসব অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর জবাব পাবার চেষ্টা করি। ধৈর্যহারা হয়ে কোনো পৌরাণিক গল্প ফেঁদে বসি না।

তথ্যসূত্র

১. দ্য ম্যাজিক অব রিয়্যালিটি, রিচার্ড ডকিন্স, অনুবাদ: সিরাজাম মুনির শ্রাবণ, রোদেলা প্রকাশনী, ২০১৭

২. ফার্মি প্যারাডক্সঃ ওরা কোথায়, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, সেপ্টেম্বর ২০১৪

featured image: ox.ac.uk

সুপার ব্যাকটেরিয়া

রেডিয়েশনের সাথে প্রাণীদেহের সম্পর্ক প্রায় দা-কুমড়া বলা যায়। রেডিয়েশনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রাণিদেহের কোষগুলোর মৃত্যু ঘটতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। আমাদের মানুষের দেহেও রেডিয়েশন সুখকর অবস্থা বয়ে আনে না। চেরোনোবিল, ফুকুশিমার মতো জায়গায় নিউক্লিয় দুর্ঘটনার অবস্থা দেখলে আমরা এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি।

রেডিয়েশন সম্পর্ক কম বেশি আমরা সবাই-ই জানি। রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা মূলত একটি প্রাকৃতিক স্বতস্ফুর্ত ঘটনা। কোনো পদার্থ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন তড়িতচুম্বক তরঙ্গ বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে রেডিয়েশন বলা হয়। আমাদের চারপাশে তড়িতচুম্বকীয় উৎসের অভাব নেই। লাইট, রেডিও, মাইক্রোওয়েভ ওভেন থেকেও তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গ শক্তি বের হয়। কিন্তু এগুলোও আমাদের ক্ষতি করে না। কিন্তু টেকনিক্যালি রেডিয়েশন বলতে আমরা সেগুলোকে বুঝি যা জীবন্ত প্রাণীদেহের অণুবীক্ষনিক গঠনে ক্ষতি সাধন করার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত রশ্নি। গামা রে, এক্স রে, আল্ট্রাভায়োলেট রে ইত্যাদি। এরা হলো আয়নাইজিং রেডিয়েশন। অর্থাৎ এ ধরনের রেডিয়েশন এতো পরিমাণ শক্তি বহন করে যে, এরা যে কোনো পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বের করে ফেলে।

এভাবে ইলেকট্রন ক্রমাগত বের হতে থাকলে পরমাণু ভাঙ্গতে শুরু করে। ফলে আমাদের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। কোষের কার্যক্রম পরিচালনার কেউ থাকে না। কোষ মারা যায়। আমাদের প্রাণিজগতের দিকে তাকালে আমার দেখতে পাই বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আছে। মানুষ প্রায় ৪-১০ গ্রে এর রেডিয়েশনে ধীরে ধীরে মারা যায়। কচ্ছপের ক্ষেত্রে এই ডোজ হয় ১৫ গ্রে, তেলাপোকা ৬৪ গ্রে। পোকামাকড় আবার এই দিক দিয়ে বেশি এগিয়ে। বিভিন্ন পতঙ্গকে দেখা যায় এর চাইলে ১০ গুণ বেশি রেডিয়েশনেও টিকে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী, ওয়াটার বিয়ার সবার থেকে এগিয়ে আছে বলা যায়। টারডিগ্রেট বা ওয়াটার বিয়ার নামের এই ক্ষুদ্র প্রাণিগুলো প্রায় এক মিলিমিটারের অর্ধেক মাপের লম্বা হয় এবং এরা প্রায় ৫০০০ গ্রে এর রেডিয়েশনের বেশি অবস্থায় টিকে থাকতে পারে।

এতক্ষণ হলো একটু ভিন্ন আলোচলা। এখন মূল আলোচলায় ফিরে আসি। বহুকোষী জগতে টারডিগ্রেট যদি সুপার ক্ষমতার অধিকারী হয়, যারা সহজে টিকে থাকতে পারে, অনেক বেশি রেডিয়েশনেও তাদের কোনো ক্ষতি হয় না, তাহলে এককোষী জগতের সুপার হিরো বলা যায় কাকে? আদৌ কি এমন কিছু আছে? হ্যাঁ, আছে। এখন বলবো এককোষী জগতের এক সুপার ব্যাকটেরিয়ার কথা, যেটি অনেক খরা অবস্থায়, খাদ্য-পুষ্টির অভাবেও বেঁচে থাকতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হলো, এরা একজন মানুষের চেয়েও হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশনের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে। এদের নাম হলো Deinococcus radiodurans সংক্ষেপে D. radiodurans বলা হয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া এককোষী জগতের এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া। এমনকি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে ইতিমধ্যে এর নাম উঠে গেছে।2

এই ব্যাকটেরিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আবিষ্কৃত হয়। Oregon Agricultural Experiment Station এ একটি পরীক্ষা পরিচালনার সময় এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। আর্থার এন্ডারসন নামের এক পরীক্ষক সেই গবেষণাধর্মী পরীক্ষা পরিচালনা করছিলেন। কৌটার মধ্যে সংরক্ষিত খাদ্য হাই ডোজের গামা রশ্নি দিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করা যায় কিনা তিনি দেখছিলেন। একটি কৌটা ভরা মাংসের উপর উচ্চ ডোজের গামা রশ্মি নিক্ষেপ করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল সকল আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব মারা যাবে তাতে। কিন্তু কিছু দিন পর দেখা গেলো সেই কৌটা ভর্তি মাংস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পরে পরীক্ষা করে প্রমাণ মেলে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি।

লাল, সর্পিলাকার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে যে কারণে এতোটা শক্তিশালী বলা হয় তা হলো তাদের নিজের ক্ষতিগ্রস্থ ডিএনএ পুনরায় নতুন করে তৈরি করার ক্ষমতা। উচ্চ ডোজের রেডিয়েশনে এদের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়, কিন্তু পরবর্তিতে এরা সেই ভাঙ্গা অংশটুকু আবার জোড়া লাগায়। এই জোড়া লাগার প্রক্রিয়া কখনো কখনো অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে হয়ে যায়। জোড়া লাগার পর নতুন ডিএনএ দেখতে আগের ডিএনএ’র মতোই হয়।

ব্যাপারটা সামান্য জটিল হলেও এদের ডিএনএতে জিনের অনেকগুলো কপি এবং এদের অভাবনীয় ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে ঠিক করার ক্ষমতার কারণেই এরা এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

১৯৯৯ সালের দিকে এই ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এদের জিনোমের গঠনের ব্যাপার থেকে অন্যান্য কোষীয় প্রাণীর ডিএনএ ঠিক করে ফেলার ব্যাপারে অনেক আহায্য আসতে পারে। এরা এদের জিনোমের চার থেকে দশটি অতিরিক্ত কপি বহন করে, একটির পরিবর্তে। এতে একটি ভেঙ্গে গেলে অন্যান্য কপি কাজে আসতে পারে, এবং নতুন জিনোম তৈরি হতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানার চেষ্টা করছে কীভাবে এরা এদের জিনোম কাজে লাগিয়ে অন্যান্য প্রোটিন ও ব্যাবস্থা দিয়ে ডিএনএ জোড়া লাগায়।

মজার ব্যাপার হলো কিছু বিজ্ঞানী ধারণা করেন এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসছে। এদের সাধারণত পাওয়া যায় এন্টার্কটিকা শুষ্ক পর্বতমালার মাঝে গ্রানাইটে বা হাতির মলে। এন্টার্কটিকার শুষ্ক পর্বতমালাকে বলা হয়ে থাকে মঙ্গল গ্রহের পরিবেশের কাছাকাছি। তাই ধারণা আসলেও এখন পর্যন্ত কেউ জানে না এই ব্যাকটেরিয়াদের প্রাকৃতিক বাসযোগ্য পরিবেশ কোনটি বা এরা আসলে কোথা থেকে এসেছে। D. radiodurans এর অস্তিত্ব এটাই প্রমাণ করে যে কোনো কিছুই সম্ভব হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এদের ব্যবহার-বিধি নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এই ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক প্রক্রিয়ার গবেষণার কাজে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। আমেরিকাতে প্রায় ৩০০০ তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার জায়গা রয়েছে এবং এদের কোনো কোনোটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় ধাতব বর্জ্য, পারদ সহ বিভিন্ন ক্যামিকেল রয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে এসব তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পরিষ্কার করে পরিবেশকে দূষনের হাত থেকে রক্ষা করা যায় কিনা। বায়োরিমিডিয়েশন নামে এক প্রক্রিয়া আছে যেখানে বিভিন্ন জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া বা আণুবীক্ষণিক প্রাণী ব্যবহার করে এসব ক্ষতিকারক বর্জ্য দূর করা হয়। কিন্তু বেশিরভাগই উচ্চ রেডিয়েশনে টিকে থাকতে পারে না। তাই D. radiodurans আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।

গবেষকরা D. radiodurans এর জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করে এক ধরনের স্ট্রেইন তৈরি করছে যা টলুইন ভাঙ্গতে পারে। টলুইন হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ যা বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ফেলার স্থানে পাওয়া যায়। এছাড়াও আরো এক ধরনের স্ট্রেইন পারদ ভেঙ্গে অনেক কম বিষাক্ত অবস্থায় রূপান্তর করতে পারে। এছাড়াও পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে এসবের ব্যবহার নিয়ে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুজে পাবার কাজে এই ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানীদের সাহায্য করতে পারে। আবার স্পেস ফ্লাইটের ভেতরের সুইজ ট্রিটমেন্ট বা বর্জ্য সংশোধনের কাজে এবং পৃথিবীর বাইরে কোনো অপরিচিত গ্রহের উপরিভাগ মনুষ্য প্রজাতি বসবাসের জন্য বাসযোগ্য ও উপযুক্ত করে তোলার কাজেও এরা সাহায্য করতে করতে পারে।

কিন্তু কে জানে? হয়তো সম্ভব হবে ভবিষ্যতে। এদের অস্তিত্ব আমাদের দেখায় সবকিছুই সম্ভব হতে পারে।

লেখকঃ জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

অ্যান্টিবডির ইতিহাস ও গাঠনিক বৈচিত্র্য

প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং সেনাপতি ছিলেন থুসিডাইডেস। স্পার্টান এবং এথেনিয়ানদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন History of the Peloponnesian War নামে একটি বই। এই বইয়ের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কী সেটা জানার অনেক অনেক আগেই মানুষ জানতো মানবদেহে এই জিনিসটা রয়েছে।

খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে থুসিডাইডেসের পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ নিয়ে লেখা বইতেও আমরা সেই উদাহরণ খুঁজে পাই। উনি লক্ষ্য করেছিলেন, যেসব সৈন্যেরা কোনো রোগে অসুস্থ হবার পর আবার সুস্থ হয়, তারাই নতুন আক্রান্ত সৈন্যদের সেবা দেয়ার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ তারা সাধারণত ঐ রোগে পুনরায় আক্রান্ত হয় না। হলেও সেটা আর মারাত্নক আকার ধারণ করে না। থুসিডাইডেস নিজের অজান্তেই বর্ণনা করছিলেন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম চমকপ্রদ একটা বৈশিষ্ট্য, যাকে বলে ইমিউনোলজিক্যাল মেমরি।

এরকম নিজের অজান্তেই বিশাল কিছু করে ফেলা আরেক অমর ব্যক্তিত্ব ব্রিটিশ সার্জন এডওয়ার্ড জেনার। ১৭০০ সালের দিকে স্মলপক্স ছিল মানুষের জন্য এক বিভিষীকা। এই স্মলপক্সেরই আরেক মৃদুরূপ দেখা যেত গরুতে। এর নাম কাউপক্স। এডওয়ার্ড সাহেব মানুষকে কাউপক্সে আক্রান্ত করার চেষ্টা করে দেখতে পান তাদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মারাত্নক স্মলপক্স থেকে সুরক্ষিত থাকছে।

উনি যেধরনের এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন এ যুগে সেটা হতো ঘৃণ্য অপরাধ। তবে তখন সময় ছিল অন্যরকম আর তার টার্গেট ছিল প্রলেতারিয়েত শ্রেণীর মানুষ তাই আইনের চোখ হয়তোবা রয়েল সোসাইটির সদস্য এডওয়ার্ড জেনারের প্রতি সহনশীল ছিল। সেই এক্সপেরিমেন্টগুলোতে গরু থেকে সংগৃহীত উপাদান ব্যবহার হতো। আর গরুর ল্যাটিন নাম হচ্ছে Vacca, সেখান থেকেই এসেছে Vaccination যাকে আমরা বাংলায় টিকা বলে থাকি।

চিত্র: এডওয়ার্ড জেনার

জেনার কিংবা অন্য কারো বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে, জিনিসটা কেন কাজ করছে। তবে দার্শনিক না হয়ে বাস্তববাদী মানুষ হওয়ায় তিনি সেটা খুব একটা গায়ে মাখেননি। যে রোগে প্রতি বছর শুধু ইউরোপেই অর্ধলক্ষাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে এবং তার প্রায় ৪ গুণ মানুষ বাকি জীবন বিকৃত চেহারা নিয়ে কাটাচ্ছে সেরকম একটা যুগেটিকার কার্যকরণ খুঁজে সময় নষ্ট করাটা ছিল বিলাসিতা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, রোগটা কেন হচ্ছে সেটাই তখন কেউ বুঝতো না। বেশিরভাগই মানুষই ভাবতো রোগব্যাধী স্রেফ দূর্ভাগ্য। পাদ্রীরা বলতো সৃষ্টিকর্তার দ্বারা মানুষকে শাস্তি দেয়ার পন্থা হচ্ছে রোগ। এডওয়ার্ড জেনারেরটিকা আবিষ্কারের প্রায় এক শতক পরে বিজ্ঞানীরা অণুজীবের অস্তিত্ব এবং ছোঁয়াচে রোগের সাথে এর সম্পর্কের কথা প্রমাণ করেন। তবে যাদেরকে চোখেই দেখা যায় না তারা নাকি জ্যান্ত আবার তারাই নাকি এমন সর্বনাশ ঘটাতে পারে সেটা সাধারণ মানুষকে বুঝাতে অবশ্যই আরো অনেক সময় লেগেছিল।

তবে আপাত অদৃশ্য জিনিসগুলো যে আসলেই রোগ সৃষ্টি করতে পারে সেটার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া যায় ঊনিশ শতকের মধ্যভাগে। না, এবার কোন মানুষ নয় বরং রেশম পোকা হচ্ছে ভুক্তভোগী। সে সময় ফ্রান্সে দেখা গেল মুলবেরী পাতা খেয়ে কিছু পোকা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর তার পরপরই পুরো পোকার পাল বিনাশ হয়ে গেলো।

অনেকেই ধারণা করলেন হয়তো মুলবেরি পাতায় থাকা বিষাক্ত কোনোকিছুর কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু লুই পাস্তুর এগিয়ে আসেন ভিন্ন ধারণা নিয়ে। তিনি দেখান যে মারা যাওয়া পোকাগুলোর ভেতরে এক ধরনের অণুজীব কিলবিল করছে যাদের মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যাচ্ছে। সে অণুজীবগুলো পৃথক করে সুস্থ পোকার দেহে ঢুকালে সেটিও আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এটাই ছিল রোগের জীবাণুতত্ত্বের (Germ Theory of Disease) জন্ম। কিছুদিনের মধ্যেই পাস্তুর আবার দেখান যে একই ঘটনা ভেড়ার এনথ্রাক্স-এর ক্ষেত্রেও সত্য।

রোগের জীবাণুতত্ত্বের অন্বেষণে ছিলেন ফ্রান্সে লুই পাস্তুর এবং জার্মানিতে রবার্ট কচ। রোগের কারণ হিসেবে অন্য কোনো ধারণার পেছনে সারাজীবন ব্যয় করা অনেক রথী মহারথীরা এই তত্ত্বকে প্রচণ্ডভাবে নাকচ করে দেয়। তবে ১৮৯১ সালে কচ যক্ষ্মার পেছনে অণুজীবের তৎপরতার শক্তিশালী প্রমাণ নিয়ে আসেন। কীভাবে এদের খুঁজে পেতে হয় তা বুঝতে পারার পর স্বাভাবিকভাবেই কিছুদিনের মধ্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন মারাত্মক রোগের সাথে জড়িত অণুজীবদের কাহিনী একের পর এক উন্মোচিত হতে থাকে।

এটা মেনে নেয়া কষ্টকর আর মেনে নিলে তো চিন্তা আরো বেড়ে যায়। যাদের দেখাই যায় না তাদের থেকে আমরা কীভাবে নিরাপদে থাকবো? সবাই কি তবে মাইক্রোস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো আর কোনো কিছু ধরা বা ছোঁয়ার আগে দেখে নিতে হবে অণুজীব মুক্ত কি না? জীবন তো তাহলে তেজপাতা হয়ে যাবে।

চিত্র: রবার্ট কচ

এবারও ত্রানকর্তা হিসেবে আসেন রবার্ট কচ। ১৮৯০ সালের দিকে জানা গিয়েছিল ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণের মাধ্যমে রোগ সৃষ্টি করে। কচের ল্যাবরেটরির ছাত্ররা করলো কি, ব্যাকটেরিয়া থেকে ধনুষ্টংকারের জন্য দায়ী এই বিষাক্ত পদার্থ সংগ্রহ করে অল্প মাত্রায় খরগোশের দেহে ঢুকিয়ে দিলো। মাত্রাটা এমন ছিল যে খরগোশটি অসুস্থ হবে কিন্তু মারা যাবে না। এরপরে তারা ঐ খরগোশের রক্ত থেকে রক্তরস (Serum) আলাদা করার পর পরীক্ষা করে পেল যে এর মধ্যে এমন কিছু আছে যা ওই ব্যাকটেরিয়াকে মারতে এবং তার বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

আরেকটি অজান্তেই আবিষ্কারের খবর, এবারের আবিষ্কার অ্যান্টিবডি! অল্পদিনেই রবার্ট কচ এবং তার দল বুঝতে পারেন এই পদ্ধতিতে শুধু প্রতিরোধই নয়, প্রতিকারও সম্ভব। ১৮৯১ সালের ক্রিসমাসে বার্লিনের বার্গম্যান ক্লিনিকে ডিপথেরিয়া আক্রান্ত এক মেয়ের দেহে প্রথম অ্যান্টিসিরাম (যে সিরামে অ্যান্টিবডি রয়েছে) দেয়া হয়।

ডিপথেরিয়া তখন একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ ছিল যা প্রায়ই বিভিন্ন শহরের হাঁসিখুশি শিশুদের খেলার মাঠকে গোরস্থান বানিয়ে দিতো। সেই মেয়েটি বেঁচে গিয়েছিল। এই চমৎকারীত্বের অন্যতম কারিগর এমিল ভন বেহরিং পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রথম নোবেল পুরষ্কার গ্রহণ করেন। অ্যান্টিসিরাম দেয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ্য করে তোলা এখনো কার্যকর। বায়োটেররিজম, সাপের দংশনে কিংবা এধরনের জরুরী অবস্থায় অ্যান্টিসিরাম বহুল ব্যবহৃত।

এই সবকিছুই ছিল শুরুর কথা। জ্ঞানের নতুন একটি ক্ষেত্রের আবির্ভাব হলো, যার নাম রোগপ্রতিরোধবিদ্যা (Immunology)। এমিল ভন বেহরিং দিয়ে শুরু করে এই ফিল্ডের গবেষকরা এখন পর্যন্ত আরো ২২টি নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন।

ইমিউনোলজি নামের বিজ্ঞানের এই নব্য শাখাটির নবীন বিজ্ঞানীদের ডাকা হয় ইমিউনোলজিস্ট বলে। প্রথম প্রজন্মের ইমিউনোলজিস্টদের মাথাব্যথাই ছিল এন্টিবডি কী সেটা আয়ত্ব করা। এই যে রক্তের মধ্যে থাকা সুরক্ষাদানকারী বস্তু যেটা প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় কিংবা কৃত্রিমভাবে প্রয়োগ করা যায় সেটা যে আসলে কী তা বুঝতে মেলাদিন সময় লেগেছিল। ৩০ বছর কাঠখড় পোড়ানোর পর জানা গেল এটা আর কিছুই না, গামা গ্লোবিউলিন শ্রেণীরই অন্তর্গত একগুচ্ছ প্রোটিন।

তবে এন্টিবডি সম্পর্কে কাজের কিছু বুঝার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। সে বছর রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরার্ড এডেলম্যান এবং লন্ডনের রডনি পোর্টার অ্যান্টিবডির গঠন বর্ণনা করেন। জেনে রাখুন এরা সেই ২২টি নোবেল পুরষ্কারের একটির যৌথ মালিক। অ্যান্টিবডি দেখতে ঠিক এরকম

চিত্রঃ অ্যান্টিবডির গঠন

এন্টিবডি Y আকৃতির। দ্বিপ্রতিসম এই জিনিসটির প্রতি অংশে রয়েছে একটি করে ভারী চেইন আর একটি হালকা চেইন। যে অংশ দুটিতে হালকা এবং ভারী চেইন পাশাপাশি রয়েছে সেই অংশটিই অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করে। কোন জিনিসটা কার জন্যে অ্যান্টিজেন হবে সেটা প্রত্যেক প্রাণীতে আলাদা।

আমার রক্ত আমার জন্য প্রয়োজনীয় কিন্তু সেটা আপনার কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর জন্য অ্যান্টিজেনস্বরূপ। যেকোনো জৈব বস্তু যা আপনার দেহে সচরাচর দেখা যায় না কিংবা বাইরে থেকে অনুপ্রবেশ করে তা-ই আপনার সাপেক্ষে অ্যান্টিজেন।

বিজ্ঞানীদের অ্যান্টিবডির অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অংশটি নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি উৎস যা থেকে প্রচুর অ্যান্টিবডি পাওয়া যাবে এবং ল্যাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ হবে। তারা এজন্য বি-সেল লিম্ফোমা (B Cell Lymphoma) নামের এক ধরনের টিউমারকে বেছে নিলেন।

এই টিউমারে যত বি-সেল রয়েছে তারা সবাই একই রকম অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কারণ টিউমারের সব বি-সেল একই রকম। এরা প্রত্যেকেই একটি কোষের ক্লোন যেটার স্বাভাবিক কোষীয় চক্র নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং এরপর থেকে উপর্যুপরি কোষ বিভাজিত হতে থাকছে।

দিনে দিনে নতুন নতুন এরকম টিউমার এবং তাদের থেকে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডিকে বিজ্ঞানীরা চিনতে পারলেন। একটি একটি নতুন টিউমারের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয় আর তাদের কপালে চিন্তার রেখা মোটা হয়। কারণ কোনো একটা অ্যান্টিবডিই অন্যটির মতো নয়। সম্পূর্ণ আলাদা।

কখনো কখনো এদের কয়েকটিকে দেখে মনে হয় এরা হয়তো কোনোভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু তবুও আলাদা। দুটি অ্যান্টিবডি, যারা একই অ্যান্টিজেনের প্রতি সাড়া দেয়, এমনকি একই প্রাণীর দেহেই তৈরি হয়, তবুও কখনোই তারা সম্পূর্ণ একরকম না।

প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল টিউমার হয়তো সুস্থ্ স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে দ্রুতই সেই ধারণা উবে গিয়েছিল। তারা যে হাজার হাজার আলাদা বি-সেল লিম্ফোমা দেখছেন তা প্রকৃতপক্ষেই দেহের মধ্যে হাজার হাজার ভিন্ন বি-সেল থাকার প্রতিফলন। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রতিটি আলাদা বি-সেল আলাদা অ্যান্টিবডিই তৈরি করে।

জিরো টু ইনফিনিটির জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত আমার লেখাটিতে বলেছিলাম অণুজীবদের প্রজনন অসম্ভব রকমের দ্রুত গতি সম্পন্ন। সংখ্যাবৃদ্ধি ও মিউটেশন আমাদের লড়াইয়ে তাদেরকে সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধব্যবস্থাও কিন্তু পিছিয়ে নেই। অ্যান্টিবডির মাধ্যমেই জীণুদের শনাক্তকরণ এবং নিষ্ক্রিয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

অনুমান করা হয় মানুষ কিংবা ইঁদুর একশ মিলিয়ন কিংবা তারও বেশি সংখ্যক আলাদা আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে, যা আলাদা আলাদা অ্যান্টিজেনকে শনাক্ত করতে পারে। এই অ্যান্টিজেনদের মধ্যে এসব জীবাণু তো রয়েছেই।

প্রশ্ন আসতে পারে এত ভিন্ন ভিন্ন অ্যান্টিবডি তৈরি করা কীভাবে সম্ভব? এর উত্তর দিতে দুই ধরনের তত্ত্বের আবির্ভাব হয়েছিল। একটা হলো জার্মলাইন থিওরি। এর মতে প্রচুর সংখ্যক অ্যান্টিবডির আগে থেকে বিদ্যমান জিন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিচালিত হয়।

অন্যটি সোমাটিক মিউটেশন থিওরি। কয়েক বছরের টানাহেঁচড়ার পর শেষ পর্যন্ত সোমাটিক মিউটেশন থিওরিই বিতর্কে টিকে যায় এবং আরেকটি নোবেল প্রাইজ ইমিউনোলজিস্টদের দখলে যায়। এবারের বিজয়ী জাপানের তরুণ বিজ্ঞানী সুসুমু তোনেগাওয়া।

দুটি অ্যান্টিবডির মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে মূলত তার পরিবর্তনশীল অংশটি। হালকা এবং ভারী চেইনের এই পরিবর্তনশীল অংশটি মিলে তৈরি হয় অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চল। এর বৈচিত্র্যের কারণেই অ্যান্টিবডিগুলো বিচিত্র সব অ্যান্টিজেন শনাক্ত করতে পারে।

বাবা-মায়ের কাছ থেকে আমরা ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার জিন পেয়ে থাকি, এসব জিনকে একসাথে বলে জিনোম। দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই এই জিনোম রয়েছে। জিনোমের মধ্যে কিছু জিন চামড়া তৈরি করে, কিছু পেশী তৈরি করে, কিছু হাড় তৈরি করে এভাবে এদের কাজ ভাগ করে দেয়া। তেমনই কিছু জিন অ্যান্টিজেন গ্রাহক তৈরি করে।

যদিও সহজ করে বুঝার জন্য আমরা বলে থাকি এই জিনটা দেহের ওই অংশটা তৈরি করে। কিন্তু ব্যাপারটা এতো সহজ না। যদি অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের কথাই চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে, শুধু এতটুকুর জন্যই অনেকগুলো জিন কাজ করে। সেই জিনগুলো আবার জিনোমের একেক জায়গায় থাকে। পাজলের মতো।

আগেই বলেছি জিনোম দেহের প্রায় প্রতিটি কোষেই থাকে। কিন্তু সব জিন সব কোষে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। শুধুমাত্র লিম্ফোসাইটের মধ্যেই এই জিনগুলো বিভিন্ন বিন্যাসে সাজিয়ে অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী অঞ্চলের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়। এটাই সোমাটিক মিউটেশন থিওরি।

এবার অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্যের একটু ক্রিটিকাল বর্ণনা দিতে চাই। তাই পাঠকের বিশেষ মনোযোগ আশা করছি। অ্যান্টিবডির চিত্রটি খেয়াল করুন, দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। V (Variable) পরিবর্তনশীল অঞ্চল এবং C (Constant) অপরিবর্তনশীল অঞ্চল।

C অঞ্চলটি একই শ্রেণীভুক্ত বিভিন্ন অ্যান্টিবডির মধ্যে স্থির থাকে আর এর কাজ মূলত অ্যান্টিবডির গাঠনিক সংযুক্তি বজায় রাখা। কিন্তু V অঞ্চল C এর তুলনায় বেশ ছোট হলেও তিন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন সেটের থেকে আসা জিনখণ্ড (Gene fragment) নিয়ে একটি কার্যকর পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরি হয়। তিনটি সেটকে আবার বলা হয় V, D এবং J।

এখন যদি একটি ভারী চেইন তৈরি করতে হয় তাহলে প্রথমে J সেটের অনেকগুলো জিনখণ্ড থেকে একটা পছন্দ করা হয়, তারপর তার সাথে D সেট থেকে একটা জুড়ে দেয়া হয়। এই জোড়ার সাথে তারপর যুক্ত হয় V সেট থেকে আসা আরেকটি জিনখণ্ড। এখন পর্যন্ত তাহলে পরিবর্তনশীল অঞ্চলটি প্রস্তুত হলো। এবার এর সাথে C অর্থাৎ অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ডটি লাগিয়ে দিলেই একটা ভারী চেইনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনটা তৈরি হলো।

এবার জেনে রাখুন V, D ও J সেটের ভেতর যথাক্রমে ৫০, ৬ এবং ২৭টি জিনের টুকরা শনাক্ত করা গেছে। তাই এদের থেকে দৈবভাবে একটা করে নিয়ে ৫০ × ৬ × ২৭ = ৮১০০টি ভিন্ন পরিবর্তনশীল অঞ্চল সম্ভব যার সাথে অপরিবর্তনশীল অঞ্চলের জিনখণ্ড যুক্ত হয়ে তৈরি হবে ভারী চেইন।

প্রায় একই উপায়ে প্রায় ৪৩৩ রকমের হালকা চেইন তৈরি সম্ভব। কিন্তু অ্যান্টিজেন গ্রাহকে তো পাশাপাশি একটা হালকা ও ভারী চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল থাকে। আর ভারী আর হালকা চেইনও যেহেতু দৈবভাবেই মিলিয়ে দেয়া হয় তাই এখানেও ৪৩৩ × ৮১০০ = ৩৫০৭৩০০ আলাদা অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব শুধুমাত্র দৈবচয়নের ভিত্তিতে।

এখানেই শেষ হয় প্রতিটা চেইনের পরিবর্তনশীল অঞ্চল তৈরির সময় যখন আলাদা আলাদা সেট থেকে আসা জিনখণ্ড যুক্ত করা হয় তখন প্রায় সময়েই বাড়তি কিছু সিকোয়েন্স চলে আসে কিংবা কিছু সিকোয়েন্স হারিয়ে যায়। তাহলে শেষ পর্যন্ত বলা যায় যে আসলে অ্যান্টিবডির বৈচিত্র্য সংখ্যায় অনুমান করা কষ্টকর।

এই মহাবিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবাণুদের সাথে পাল্লা দিতে এর চেয়ে চমৎকার সমাধান আর কী হতে পারে? হ্যাঁ, স্বাভাবিক প্রজননে জিনের গুচ্ছে অদলবদল হয়। কিন্তু তা যথেষ্ট ধীর। সেভাবে হয়তো প্রতি প্রজন্মে হাজার খানেক নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হতো। কিন্তু সোমাটিক মিউটেশনের মাধ্যকে প্রত্যেক ঘণ্টাতেই শত শত মিলিয়ন নতুন অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে আমাদের সুরক্ষায়।

অ্যান্টিবডির ইতিহাস, গঠন ও গাঠনিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার পর এবার ছোট্ট করে বলতে চাই সত্যিকারের জীবন্ত প্রাণীর দেহে অ্যান্টিবডি কীভাবে কাজ করে। অ্যান্টিবডি তৈরি করে বি সেল। এই বি সেল তৈরি হয় অস্থিমজ্জায়। এরা পরিণত হবার পর লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় অবস্থান নেয়। পরিণত হবার সময়ে প্রতিটা বি সেলের মধ্যেই ভারী চেইন এবং হালকা চেইনের জিনখণ্ডগুলোর মধ্যে উপরের বর্ণনার মতো সমন্বয় ঘটে আর সেই অনুযায়ী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়।

বি সেল একটি অ্যান্টিবডি তার কোষদেহের বাইরের দিকে সবসময় রেখে দেয়। এটা বলা যায় তার পরিচিতির মতো যে সে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। আবার এটার মাধ্যমেই সে কিন্তু সব অ্যান্টিজেনকে যাচাই করে থাকে। তাই এটাকে বলা হয় বি সেলের অ্যান্টিজেন গ্রাহক (Antigen receptor)।

যে সকল বি সেল কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা পায়নি তারা লসিকা গ্রন্থি কিংবা প্লীহায় বসবাস শুরু করে এবং অ্যান্টিজেনের জন্য অপেক্ষায় থাকে। প্রতিটা বি সেল জন্মের সময়ই তার ভেতরে কিছু আত্নবিধ্বংসী যন্ত্রপাতি নিয়ে জন্মায় এবং যদি প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সে কোনো অ্যান্টিজেনের দেখা না পায় তখন এই যন্ত্রপাতিগুলো চালু হয়ে বি সেলটি মারা যায় এবং নতুন নতুন বি সেল তার জায়গা দখল করে।

কিন্তু যখন কোনো বি সেল অ্যান্টিজেনের দেখা পায় মানে আসলে কোনো অ্যান্টিজেন যখন সেলটির গ্রাহকের সাথে রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় তখনই সে সক্রিয় হয় এবং ভুর ভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু করে। সেই অ্যান্টিবডিগুলো রক্ত ও লসিকায় ঘুরে ঘুরে সেই অ্যান্টিজেনের অন্য কপিগুলো খুঁজে।

আরেকটি ঘটনা ঘটে, তা হলো বি সেল সক্রিয় হবার পর নিজের অনেক ক্লোন তৈরি করে। ক্লোনগুলো আবার এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যেন তারা অনেকদিন টিকে থাকে এবং স্বাভাবিক বি সেলের চেয়ে অনেক দ্রুত সাড়া দিয়ে ভুরভুর করে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। এভাবেই আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোনো সংক্রমণকে চিনে রাখে যাকে বলা হয় ইমিউনোলজিক্যাল মেমরী।

এটাই সেই শত বছর আগে থুসিডাইডেস বর্ণনা করেছিলেন। আর যে পদ্ধতিতে সক্রিয় বি সেল নিজের কপি তৈরি করে তাকে বলে ক্লোনাল এক্সপানশন এবং এই তত্ত্বের জন্য ১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকফার্লেন বার্নেট… বাকিটা ধরতেই পারছেন আশা করি।

চিত্রঃ বি সেলের ক্লোনাল এক্সপ্যানশন

তথ্যসূত্র

১. In defense of self; Willian R. Clark

২. Roitt’s Essential Immunology; P. Delves

featured image: bioradiations.com