নারী কেন পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে

গড়পড়তা পুরো পৃথিবীতেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘ জীবনকাল উপভোগ করে। ডেভিড রেবসন নামে একজন লোক অনেক খেটেখুটে এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তার ভাষায়- যে মুহূর্তে আমার জন্ম হয়েছিল,সে মুহূর্ত থেকে আমার সাথে জন্ম নেয়া অর্ধেক শিশুর আগেই আমার মারা যাওয়ার নিয়তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা এমন এক অভিশাপ যা আমার এড়িয়ে যাবার কোনো অবকাশ নেই। এর কারণ? আমার লিঙ্গ। আমি পুরুষ হবার কারণে একই দিনে জন্ম নেয়া নারীদের তুলনায় প্রায় তিন বছর আগে আমার মৃত্যু হবে- পরিসংখ্যান এমনটাই বলছে।

কেন একজন ছেলে হবার কারণে আমি আমার সমবয়সী নারীদের তুলনায় আগে মারা যাব? এবং আমার কি এই লিঙ্গের অভিশাপ থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব? এই গোলমেলে বৈষম্যটি কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এর কিছু উত্তরে এসে পৌঁছেছে। একটি প্রাথমিক ধারণা হলো,পুরুষেরা নিজেরাই এর পেছনে দায়ী।

যুদ্ধে অংশ নিয়ে, খনিতে কাজ করে কিংবা জমিতে চাষ করে তারা তাদের প্রাণের উপর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। তবে, এটাই যদি মূল কারণ হয়ে থাকে তবে নারী পুরুষ উভয়কে মিলিতভাবে একই রকম পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে দিয়ে আমরা এ বৈষম্য দূর করতে পারি।

সত্যিকার অর্থে বিশাল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হলেও নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার এই বৈষম্য ঠিকয় বজায় থাকে। সুইডেনের কথাই ধরা যাক, এই দেশটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পেশ করে থাকে। ১৮০০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৩৩ বছর এবং পুরুষদের ৩১ বছর। বর্তমানে এটি যথাক্রমে ৮৩.৫ বছর এবং ৭৯.৫ বছর। এই দুই ক্রান্তিকালেই নারীরা দৃশ্যত পুরুষদের তুলনায় ৫ শতাংশ সময় বেশি বাঁচে।

2চিত্রঃ নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে, এবং এর ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থানটি পূরণ হচ্ছে না।

একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে- “পুরুষদের তুলনায় এই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বেঁচে থাকার সুবিধা নারীদের প্রাথমিক,বার্ধক্য এবং সম্পূর্ণ জীবনে; প্রতিটি দেশে,প্রতিটি বছর দেখা যায়। নারী পুরুষের মাঝে এটিই মনে হয় সবচেয়ে ক্লাসিক বৈষম্য।

এটাও দাবী করা যায় না যে, পুরুষেরা তাদের শরীর তথা জীবনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম যত্নশীল। ধূমপান,মদ্যপান এবং অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের মতো বিষয়গুলো হয়তো ব্যাপারটাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এটাই চূড়ান্ত কারণ নয়। রাশিয়াতে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা ১৯ বছর আগে মারা যায়,আংশিকভাবে যার কারণ অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নারী শিম্পাঞ্জি, নারী গরিলা এবং নারী ওরাংওটাংরাও তাদের প্রজাতির পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। আপনি কি কখনো কোনো শিম্পাঞ্জি,গরিলা কিংবা ওরাংওটাংকে সিগারেট বা মদের গ্লাস হাতে দেখেছেন? না।

এটা বোঝা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের আয়ু সংক্রান্ত উত্তরটা আমাদের বিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। “অবশ্যই সামাজিক এবং জীবনভিত্তিক বিষয়গুলো আয়ুর উপর প্রভাব ফেলে,কিন্তু তার চেয়েও গভীর কিছু রয়েছে আমাদের পরস্পরের জীববিজ্ঞানের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ইউরোপের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক টম কার্কউড।

জীববিজ্ঞানের অনেক বিষয় এর পেছনে কাজ করে। গুচ্ছ-ডিএনএ দিয়ে শুরু হোক। এরা প্রতিটি কোষের মধ্যে যা ক্রোমোসোম হিসেবে পরিচিত। ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে,এবং নারীদের দুটি X ক্রোমোসোম, পুরুষদের একটি X ও একটি Y। ক্রোমোসোম সংক্রান্ত এই পার্থক্যটি খুব চতুরভাবে কোষের বয়স পরিবর্তন করে দিতে পারে। যেহেতু নারীদের প্রতি কোষে দুটি X ক্রোমোসোম রয়েছে, তাই তাদের প্রতিটি জিনের অনুলিপি থাকে,অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত একটি থেকে যায়,যদি অপরটি কাজ না করে অথবা নষ্ট হয় তখন কাজে লাগে। পুরুষদের বেলায় এমন বিকল্প কিছু নেই।

3চিত্রঃ যদিও জীবন-যাপনের কিছু উপাদান দোষের, কিন্তু তারপরেও সেই উপাদানগুলো পরিহার করা কঠিন।

নারীদের মতো কোনো বিকল্প না থাকার কারণে ফলাফল স্বরূপ অনেক কোষই সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে যাবার সম্ভাবনায় থাকে। এতে পুরুষদের রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অন্যান্য বিকল্প বিষয়গুলোর মধ্যে ‘ব্যায়ামকারী নারীর হৃদপিণ্ড’ (jogging female heart) হাইপোথিসিস। এর ধারণাটি হলো, একজন নারীর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে রজচক্রের দ্বিতীয় অর্ধাংশে,যা পরিমিত ব্যায়ামের মতই উপযোগী। এবং এই প্রক্রিয়াটি হৃদপিণ্ডজনিত যেকোনো রোগ হবার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

অথবা হতে পারে আকৃতিগত কোনো সহজ ব্যাপার। লম্বা মানুষদের শরীরে কোষের সংখ্যা বেশি,এই ধরনের কোষগুলো ক্ষতিকরভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তুলনামূলকভাবে বড় শারীরিক গঠন অধিক পরিমাণ শক্তি দহন করে। যেহেতু পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে প্রায়ই লম্বা হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের আরো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত টেস্টোস্টেরনের মাঝে নিহিত আছে, যা অধিকাংশ পুরুষদের পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। গভীর কণ্ঠস্বর, লোমশ বুক হতে শুরু করে নিরাভরণ টাক মাথা পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য টেস্টোস্টেরন দায়ী।

কোরিয়ার Court of the Chosun Dynasty থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সম্প্রতি কোরিয়ান বিজ্ঞানী হান নাম পার্ক উনিশ শতাব্দী থেকে কোর্ট লাইফ রেকর্ডগুলো বিশ্লেষন করেন,তার মধ্যে ৮১ জন নপুংসকও ছিল। যাদের বয়ঃসন্ধির আগেই শুক্রাশয় অপসারণ করে ফেলা হয়। তার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ঐ নপুংসকেরা ৭০ বছরের মতো আয়ু পেতো, যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক পুরুষেরা আয়ু পেতো গড়ে ৫০ বছর। তাদের ১০০ তম জন্মদিন পালনের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। এমনকি ঐ সময়ের রাজারাও এমন আয়ুর কাছাকাছি আসতে পারতো না।

যদিও শুক্রাশয় নিয়ে অন্য সব গবেষণা আয়ু নিয়ে এমন পার্থক্য দেখায় না। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শুক্রাশয় ছাড়া পুরুষ মানুষ ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীরা বেশিদিন বেঁচে থাকে।

4 চিত্রঃ পুরুষ এবং নারীর ক্রোমোসোমের পার্থক্য কোষের বয়স প্রভাবিত করতে পারে।

আয়ুর পার্থক্যের সঠিক কারণগুলো এখনো অধরা। তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডেভিড জেমস মনে করেন করেন, এই ক্ষতি হয়তো বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হয়ে যাবার কারণেই হয়। তার দাবী প্রমাণের জন্য তিনি মানসিক রোগীদের কিছু বিষন্ন কেস উপস্থাপন করেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই রোগীদেরকে নপুংসকে পরিণত করতে হয়। কোরিয়ান নপুংসকদের মতো তারাও অন্যান্যদের চেয়ে অনেকদিন বেশি বেঁচে ছিল। উল্লেখ্য তাদের ১৫ বছরের আগেই খোঁজাকৃত করা হয়। টেস্টোস্টেরন হয়তো পুরুষের শরীরকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই পরিবর্তন তাদের হৃদপিণ্ডজনিত রোগ সহ অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।

উদাহারণসরূপ বলা যায়, টেস্টোস্টেরন হয়তো আমাদের দেহে সেমিনাল ফ্লুইডের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, কিংবা হৃদপিণ্ডের সংবহনন্তান্ত্রিক ক্রিয়া পরিবর্তন করে দিতে পারে যা প্রথম দিকে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করলেও পরবর্তীতে উচ্চ-রক্তচাপ, অথেরোস্ক্লেরোসিসের জন্ম দিতে পারে। এমনটাই বলেন জনাব জেমস।

নারীরা শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরনের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত নয়, পাশাপাশি তারা আরো সুবিধাও পায়। তারা নিজেদের “যৌবনের স্পর্শমণি” (elixir of youth) থেকেও সুবিধা পায়, যা তাদের ভবিষ্যতের ভয়াবহতাগুলো থেকে সহজে উৎরে যেতে সাহায্য করে। নারীর সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন একটি “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”,যা কোষে চাপ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থদের বিতাড়িত করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এটা কার্যকর। প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি হলে কিংবা যারা ইস্ট্রোজেন স্বল্পতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা বেশিদিন বাঁচে না। ঠিক বিপরীতটি ঘটে পুরুষ নপুংসকদের ক্ষেত্রে।

নপুংসকতাকে দূরে ঠেলে বংশগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এমনটি ঘটে থাকে। এ হিসেবে পুরুষের সামান্য স্বল্প আয়ু মানুষ তথা পুরো প্রাণিজগতকে বিবর্তনীয় উপযোগীতা প্রদান করে। কিছু পার্থক্য নারী-পুরুষ উভয়কেই টিকে থাকতে সাহায্য করে। মিলনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রধানত অধিক পরিমাণ পুরুষালী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তথা অধিক পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নিঃসরণকারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে করে আয়ু বৈষম্যের ধারাও অধিক হতে থাকে। চাইলেও সহজ কিছু প্রচেষ্টা কিংবা উদ্যোগ দিয়ে এটা দূর করা সম্ভব নয়।

5 চিত্রঃ বয়সের বৈষম্য হয়তো টেস্টোস্টেরনের কারণে হয়ে থাকতে পারে।

যদিও ব্যাপারটি পুরুষের ভালো লাগার কথা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর একটি সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে। কার্কউডের মতে- হরমোন সহ অন্যান্য নিয়ামক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতে পারে, এই অর্জিত জ্ঞানই আমাদের দীর্ঘ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি ফিউচার, (http://www.bbc.com/future/story/20151001-why-women-live-longer-than-men)

লেখিকাঃ ইফ্ফাত সাবরিন তুহিন

সমুদ্রের ঘ্রাণ

মেঘমালা আপনাকে সমুদ্রের কথা মনে করিয়ে দেবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু সমুদ্র না থাকলে মাথার উপরে খুব কম সংখ্যক মেঘই ভেসে বেড়াতো। কারণ সুবিশাল সমুদ্র জুড়ে অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব রয়েছে যারা ডাই-মিথাইল সালফাইড (ডিএমএস) নামক গ্যাস তৈরি করে। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ডিএমএস মেঘ গঠন শুরু করতে পারে। এই ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে আছে শৈবাল ও অণুজীব। এরা অবশ্য মেঘ তৈরির জন্য ডিএমএস তেরি করে না। ডিএমএস আসলে ডাই-মিথাইল-সালফোনিও-প্রপিওনেট (ডিএমএসপি) নামক বিপাকীয় অণুর উপজাত। সম্ভবত ভেসে বেড়ানো কিংবা প্রতিরক্ষা কিংবা উভয় কাজেই ফাইটোপ্লাঙ্কটনের ডিএমএসপি দরকার।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ঘ্রাণ আছে। এই ঘ্রাণ কখনো কখনো অপ্রীতিকর কটু গন্ধ বলে মনে হতে পারে। এ ঘ্রাণের জন্য বায়ুবাহিত ডিএমএস দায়ী। সম্প্রতি সাগরের ফাইটোপ্লাঙ্কটন এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির (Emiliania huxleyi) মাঝে এ ঘ্রাণের পেছনে যে উৎসেচক বা এনজাইম দায়ী তা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডিএমএসপি লাইয়েজ ১। এটি শৈবালের উৎসেচক যা ডিএমএসপি-কে ভেঙে ফেলে। ফলাফল হিসেবে সুগন্ধী ডিএমএস তৈরি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো অধিকাংশ ফাইটোপ্লাঙ্কটন হলো এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। এরা সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সবুজ আস্তরণ তৈরি করে। ব্লুম নামে পরিচিত এ আস্তরণ মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। ক্রান্তীয় ও সাবআর্কটিক উভয় সাগরজলে এদের উপস্থিতি সাবলীল। এসব বাস্তুসংস্থানে খাদ্যজালের গুরুত্বপূর্ণ অংশও এ ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলো। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি এককোষী ইউক্যারিয়টিক (নিউক্লিয়াস বিদ্যমান এমন প্রকৃতকোষী) ফাইটোপ্লাঙ্কটন যাদের চারপাশে কোক্কোলিথ নামক এক ধরনের আবরণ রয়েছে। কোক্কোলিথের নামকরণ করেছিলেন ব্রিটিশ তুলনামূলক দেহসংস্থানবিদ থমাস হাক্সলি (১৮২৫ – ১৮৯৫)।

2চিত্রঃ ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের নিচে এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি। বাইরে কোক্কোলিথের আবরণ দেখা যাচ্ছে।

কোক্কোলিথ ক্যালসাইট নামক খনিজ দিয়ে তৈরি। এদের নির্মাণকৌশল খুব সূক্ষ্ম ও অসাধারণ। বেশিরভাগ সময়েই এরা রঙহীন ও অস্বচ্ছ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলির কোক্কোলিথ ক্যালসাইটের চাকতি দিয়ে তৈরি। এ বিষয়টি সর্বপ্রথম বর্ণনা করেন হাক্সলি ও সিজার এমিলিয়ানি নামক আরো একজন ইতালীয় অণুজীববিজ্ঞানী। তাদের দু’জনের নামানুসারেই এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি-র নামকরণ করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় ক্যালসাইটের খোলটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা রাখে। কোক্কোলিথ হয়তো অনান্য বড় প্রাণীর ভোজে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করার একটা পদ্ধতি। অথবা এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এমনকি হয়তো ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মির বিরুদ্ধে ভৌত বাধা হিসেবেও কাজ করে। এরা হয়তো ফাইটোপ্লাঙ্কটনগুলোকে ভাসিয়ে রাখার জন্য জরুরী। অথবা গভীর সমুদ্রে বসবাসকারী প্রজাতিগুলোর সালোকসংশ্লেষণের আলো যোগাড়ের একটি পদ্ধতিও হতে পারে। এই ক্যালসাইট খোলগুলো প্রতিনিয়ত দেহ থেকে স্খলিত হয়ে সাগরতলে ডুবে যায়। গভীর সাগরে জমা হওয়া তলানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ ক্যালসাইটগুলো। ডোভার নগরীর শ্বেত পর্বতগাত্র দীর্ঘ ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে জমা হওয়া এরকম তলানীর উদাহরণ।

3চিত্রঃ ডোভার নগরের শ্বেত পর্বতগাত্র। সাগরতলে দীর্ঘদিন ক্যালসাইট খোলের তলানী পড়ে এ স্তর তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র্য ক্যালসাইট খোল ছাড়াও এমিলেনিয়া হাক্সলি ডিএমএসপি তৈরি করে। অন্যান্য ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালও এই রাসায়নিক যৌগটি তৈরি করে। এই জৈব-যৌগটি প্রতি বছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পরিমাণে সমুদ্রে যুক্ত হয় ও সাথে সাথে বদলে যায়। ডিএমএসপি অধিক পরিমাণে পাওয়া যায় বলে জৈব অণুর উপস্থিতি সমুদ্রে প্রাণের অন্যতম চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। যেহেতু এই অণুটির উৎপাদন অনেক বেশি, সুতরাং ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও সামুদ্রিক শৈবালের জীবনচক্রে ডিএমএসপি অবশ্যই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্টভাবে জানেন না এর কাজ কী। হয়তো এটি জীবকে অভিস্রবণীয় চাপ থেকে রক্ষা করে। ভেসে বেড়ানোর জন্য এর হয়তো ভূমিকা রয়েছে। এমনকি হয়তো শিকারী-শিকার সম্পর্কে এর কোনো বিশেষ কাজ রয়েছে।

ডিএমএসপি থেকে যে ডিএমএস তৈরি হয় তা সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে লোহিত শৈবাল পলিসাইফোনিয়ায় শনাক্ত করা হয়। সমুদ্র শৈবালের গন্ধের জন্য যে ডিএমএস দায়ী তা তখনই জানা ছিল। ১৯৫৬ সালে প্রথম ডিএমএসপি ভাঙার উৎসেচক শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল এরকম অনেকগুলো এনজাইমের মধ্যে একটি যাদের মধ্যে আধুনিকতম হলো ডিএমএসপি লাইএজ ১।

ডিএমএস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে গিয়ে পৃথিবীর সালফার চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর তীব্র সৌরভ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীকে সাম্ভাব্য খাদ্য-উৎসের প্রতি রাসায়নিক আকর্ষক হিসেবে কাজ করে। এসব প্রাণীর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক পাখি, বিভিন্ন অমেরুদন্ডী এবং কিছু স্তন্যপায়ী। ডিএমএস মেঘ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। এর ফলশ্রুতিতে এই যৌগটি বিশ্ব জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? যখন গ্যাসটি বায়ুমণ্ডলে নিক্ষিপ্ত হয় তখন তা তাৎক্ষণিকভাবে জারিত হয়ে যায়। ডিএমএস জারিত হয়ে তৈরি করে ডিএমএসও। ডিএমএসও পানির অণুর ঘণীভবনের নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করে। এতে তৈরি হয় মেঘ। আর যেখানেই মেঘ রয়েছে সে অঞ্চলের জলবায়ুতে এর প্রভাব থাকবেই। শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জলবায়ুতেও এর প্রভাব থাকবে। মেঘ সৌর বিকিরণের প্রতিফলন বাড়িয়ে এটিকে মহাশূন্যে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রভাবিত হয়।

ডিএমএস এর এক রকমের কটু গন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন গন্ধটা বাঁধাকপির মতো। অন্যরা কাব্যিকভাবে একে সমুদ্রের ঘ্রাণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিট-মূল, এসপারাগাস ও সামুদ্রিক খাবার রান্না করার সময়ও এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঘ্রাণ পাওয়া যায়। বিশ বছর আগে থিয়েরি থ্যালৌ নামের একজন ফরাসী রসায়নবিদ কটু গন্ধের জন্য ডিএমএস-কে দায়ী করেন। তিনি এ তত্ত্ব প্রমাণের জন্য এক ধরনের ভূগর্ভস্থ ছত্রাক ও শূকর ব্যবহার করেন। আজকাল অবশ্য ডিএমএস খুব কম মাত্রায় খাবারে দেয়া হয় মশলাদার স্বাদ নিয়ে আসার জন্য।

একটি রাসায়নিকের মেঘ তৈরির ক্ষমতা রয়েছে– এ কথাটির মধ্যে এক রকমের গীতিধর্মী আবেদন আছে। মেঘ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যা ইদানিংকালে বেশ সংবেদনশীল বিষয়। ডিএমএসপি লাইয়েজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানা গেলে বোঝা যাবে এটি বায়ুমণ্ডলে ডিএমএস তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখে। এটি আবার ব্যাকটেরিয়া ও ইউক্যারিয়টদের বৈশ্বিক বিস্তৃতির উপর নির্ভরশীল। ডিএমএস কীভাবে পরিবেশের বিভিন্ন পরিমাপ দিয়ে আক্রান্ত হয় কিংবা ডিএমএস কীভাবে পরিবেশকে প্রভাবিত করে তা আমাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে ডিএমএসপি লাইয়েজের মতো একই কাজ করা অনেক উৎসেচক সম্পর্কে আমরা কোনো কিছু জানিই না।

ফাইটোপ্লাঙ্কটনের শারীরবৃত্তীক, জৈব সংকেত লেনদেন করা, ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধের এর প্রতিরোধ ক্ষমতা, শিকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য জীবের সাথে মিথোজীবিতার ক্ষেত্রে ডিএমএস-এর ভূমিকা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক সালফার চক্রে এ ক্ষুদ্র জীবটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরেও বড়সড় ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে এ জীবটি সমগ্র পৃথিবীতেই ভূমিকা রাখে, আমরাও যার একটি অংশ। এমিলিয়ানিয়া হাক্সলি আসলে সেই প্রাণী যা লাভলকের বিখ্যাত গায়া হাইপোথিসিসকে অনুপ্রাণিত করে, যে অনুকল্পের মূল কথা হলো পৃথিবীর জৈব-রসায়ন ও ভূ-রসায়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

প্রোটিন স্পটলাইট ১৭৪ ইস্যু হতে The smell of the sea-র ভাষান্তর মূল লেখক Vivienne Baillie Gerritsen

লেখকঃ আরাফাত রহমান

প্রভাষক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়