মূত্র থেকে প্লাস্টিক

মহাকাশ নিয়ে মানবজাতির তুমুল আগ্রহ। তারই ধারাবাহিকতায় স্পেস-এক্স এর তত্ত্বাবধায়নে এগিয়ে যাচ্ছে মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের প্রস্ততি। মঙ্গল গ্রহে যাত্রা কিংবা অন্য যেকোনো গ্রহে যাত্রা যথেষ্ট দীর্ঘ হবে। সেখানে অবশ্যই থাকবে বস্তু ও সরঞ্জামের সমস্যা। তাই সকল বস্তু পূণর্ব্যবহা্রের জন্য নভোচারীদের প্রস্তুত থাকতে হয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীরা মূত্র থেকে বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে প্রাপ্ত পানি পান করে থাকেন। মঙ্গল গ্রহের দীর্ঘ যাত্রায় সফল হতে চাইলে নভোচারীদের কাছে বিদ্যমান সবকিছুর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই সাউথ ক্যারোলিনার ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এমন এক প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন যার মাধ্যমে মূত্র ও নিঃশ্বাসের সাথে ত্যাগ করা কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে প্লাস্টিক বানানো সম্ভব।

এ প্রক্রিয়ায় Yarrowia lipolytica  নামক ইস্ট ব্যবহার করা হয়। শুরুতে মূত্র থেকে প্রাপ্ত নাইট্রোজেন ও নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টকে প্রদান করা হয়। ইস্টকে এমনভাবে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারং করা হয়েছে যেন তা নাইট্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণের পর পলিএস্টার মনোমার তৈরী করে। এসকল মনোমার থেকে তৈরী হয় প্লাস্টিক পলিমার। প্রাপ্ত প্লাস্টিক একটি থ্রিডি প্রিন্টারের মাধ্যমে ব্যবহার্য বস্তু তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

চিত্র: ঈস্ট ব্যবহার করে মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে প্লাস্টিক উৎপাদন

উক্ত ইস্টের ভিন্ন একটি স্ট্রেইন অনুরূপ প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে  মূত্র ও কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড উৎপাদনে সক্ষম। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড মানবদেহের জন্য অপরিহার্য এক উপাদান যা আমরা নিজেরা তৈরী করতে পারি না, খাদ্যবস্তু থেকে পাই।

নিঃশ্বাস থেকে প্রাপ্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড ইস্টের গ্রহণ উপযোগী করার জন্য সায়নোব্যাকটেরিয়া বা শৈবাল ব্যবহৃত হয়।

তথ্যসূত্র: BBC Focus

তার ছাড়া বাতি

টেসলা কয়েল। তারবিহীন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ শক্তি স্থানান্তরের স্বপ্ন থেকে বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা সর্বপ্রথম এই পরীক্ষাটি করেন। পদার্থবিজ্ঞানী  মাইকেল ফ্যারাডের সূত্র অনু্যায়ী, যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর দিয়ে একটি চুম্বককে দ্রুত আনা নেওয়া করা যায় তাহলে পরিবর্তনশীল চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে তারের ভেতর তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি হবে।

image source: drmegavolt.com

একইভাবে যদি কোনো কুণ্ডলিত তারের ভেতর পরিবর্তনশীল  তড়িৎ প্রবাহ চালানো যায় তাহলে ঐ কুণ্ডলির চারপাশে একটি অস্থায়ী চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি হবে।  টেসলা কয়েল পরীক্ষায় একইসাথে দুটি কুণ্ডলিত তারের ব্যবহার করা হয়। একটি তিন কুণ্ডলির তারকে প্রায় তিনশো কুণ্ডলির তারের উপর বসানো হয়, যেন তড়িৎচুম্বকীয় আবেশের দ্বারা এটি উচ্চধাপী ট্রান্সফর্মারের ন্যায় কাজ করে। এর কাজ হচ্ছে কম বিভবের তড়িৎকে উচ্চ বিভবের তড়িতে রূপান্তরিত করা।

ট্রানজিস্টর, রেজিস্ট্যান্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমে তিন কুণ্ডলির তারের ভেতর দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত করা হয়। প্রবাহের ফলে উৎপন্ন চুম্বকক্ষেত্র তিনশো কুণ্ডলির তারের চারপাশে আবিষ্ট হয়। এটি তারের দুই প্রান্তে অত্যধিক উচ্চ বিভবের সৃষ্টি করে।

image source: stevespanglerscience.com

এখন এই তারের চারপাশে যদি কোনো প্রবাহী বস্তুকে আনা হয় তখন তা অত্যধিক উচ্চ বিভবের ফলে আয়নিত বস্তুর ন্যায় আচরণ করে। কোনো বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষেত্রে তা বাতির ভেতরে তড়িৎ প্রবাহের সৃষ্টি করে। ফলে বাতিটি কোনোপ্রকার তড়িৎ সংযোগ ছাড়াই শুধু মাত্র আবেশের প্রভাবে জ্বলে উঠে। তারবিহীন বিদ্যুৎ শক্তি  স্থানান্তরের এই অসাধারণ উপায়ের নাম টেসলা কয়েল।

featured image: stepbystepprojects.co.uk

অরিগ্যামির আকাশ জয়

কাগজের ভাঁজে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসায়নি কিংবা প্লেন বানিয়ে বাতাসে উড়ায়নি, এমন মানুষ মনে হয় না খুঁজে পাওয়া যাবে। এক টুকরো কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন আকৃতিতে রূপ দেওয়ার এই শিল্পকে বলা হয় অরিগ্যামি। এর জন্ম জাপানে। ধারণা করা হয়, ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা জাপানে কাগজ নিয়ে আসার পরপরই আবির্ভাব ঘটে এই শিল্পের।

তখনকার সময়ে কাগজের মূল্য বেশি হওয়ায় কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতেই ব্যবহার হতো এ শিল্প। সেই থেকে শুরু করে এখন অবধি অরিগ্যামি শিল্পটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রসারতা পেয়েছে। এটি যে সারা বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় তার নজির মেলে অরিগ্যামি ভিত্তিক বেশকিছু সংগঠন দেখলেই।

উদাহরণস্বরূপ দেখানো যায় The British Origami Society কিংবা OrigamiUSA–র নাম। পাশাপাশি অরিগ্যামিকে আরো বৈচিত্র্যময় কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন নাসা সম্প্রতি মহাকাশযানের ডিজাইন করেছে অরিগ্যামির কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। কেন? জানতে হলে প্রবেশ করতে হবে গভীরে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মহাকাশের প্রতিটি নক্ষত্রে কম করে হলেও একটি গ্রহ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক গ্রহ আছে যেগুলো প্রাণ ধারণের উপযোগী। প্রাণের বসবাসের উপযোগী যে গ্রহগুলো আমাদের সৌরজগতের বাইরে অবস্থান করছে তাদের বলা হয় এক্সোপ্লানেট। জ্যোতির্বিদরা এখন অবধি ৩৭০৮টি এক্সোপ্লানেটের সন্ধান পেয়েছেন।

বেশিরভাগ গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে পরোক্ষভাবে। গ্রহটি কোনো নক্ষত্রকে আবর্তন করার সময় টেলিস্কোপ তাক করা হলে যদি সেটি টেলিস্কোপ ও নক্ষত্রের মাঝে বাধা হিসেবে অবস্থান করে তাহলে নক্ষত্রের একটি অংশ অন্ধকার থাকবে। এবং সে অংশটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। যেহেতু গ্রহটি আবর্তন করছে সেহেতু অন্ধকার অংশটি এগিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বলতে পারেন সেখানে একটি গ্রহের উপস্থিতি আছে।

গ্রহ শনাক্ত করার এ পদ্ধতিটিকে বলা হয় অতিক্রমণ পদ্ধতি (Transit method)। এ পদ্ধতির পাশাপাশি আরো কিছু পদ্ধতি আছে, যেগুলো ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পরোক্ষভাবে বেশকিছু গ্রহ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে সরাসরি ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে অল্প কিছু গ্রহের। ফলে বাকি গ্রহদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি এখনো।

চিত্র: ট্রানজিটের মাধ্যমে জানা যায় গ্রহের অস্তিত্ব

কোনো গ্রহের ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রধান একটি বাঁধা হচ্ছে গ্রহটির আশেপাশে কোনো নক্ষত্রের তীব্র উজ্জ্বল আলো। আলোর প্রচণ্ড বিচ্ছুরণ টেলিস্কোপের লেন্সে এসে পড়ে। প্রবল আলোর কারণে ছবির অনেক অংশ মুছে যায়। আলোর ঝলকানিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রহটিকে দেখাই যায় না। ঠিক যেমন তীব্র রোদে কারো ছবি তুলতে গেলে ছবির অনেক কিছুই আলোর তীব্রতায় ঢাকা পড়ে যায়।

নক্ষত্রগুলোর উজ্জ্বলতা তাদের গ্রহগুদের তুলনায় বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ বেশি। ফলে সে এলাকার ছবি তুলতে গেলে ঐ উজ্জ্বল জিনিসই চলে আসবে সবার আগে, অনুজ্জ্বল গ্রহ আর স্থান পাবে না নক্ষত্রের প্রাবল্যে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য নাসার বিজ্ঞানীরা একটি চমৎকার ভাবনা ভাবছেন। টেলিস্কোপকে যদি নক্ষত্রের আলো থেকে ঢেকে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়? বাস্তব জীবনে আমরা প্রায় সময়ই এই পদ্ধতিটা ব্যবহার করি। দূরে কোথাও যদি তাকাতে চাই এবং তখন যদি প্রবল সূর্যালোক থাকে তখন কপালের উপর হাত দিয়ে আলোটা ঢেকে নিয়ে বিশেষভাবে তাকাই। এতে আলো সরাসরি চোখে লাগে না বলে লক্ষ্যবস্তুটি দেখা যায়। নাসার বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনাও অনেকটা সেরকম।

এর জন্য বিজ্ঞানীদের তৈরি করতে হবে বিশাল আকৃতির একধরনের চাকতি। এর নাম তারা দিয়েছেন স্টারশেড। এর আকৃতি হবে অনেকটা সূর্যমূখী ফুলের মতো। বিশাল গোলাকার গঠন আর কিনারায় পাপড়ির ন্যায় অবয়ব।

স্টারশেডের ধারণার উদ্ভাবক মূলত মহাকাশ টেলিস্কোপের জনক লেইম্যান স্পিটযার। সূর্যগ্রহণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৬২ সালে ধারণাটি প্রস্তাব করেন। স্টারশেডের এমন আকৃতির উদ্ভাবকও তিনিই।

বিভিন্ন মডেল নিয়ে পরীক্ষা করে তারা ধারণা করছেন স্টারশেডের এরূপ আকৃতি পৃথিবীসম কোনো গ্রহের ছবি তোলার জন্য টেলিস্কোপকে ভালোভাবে ঢেকে দিতে পারবে। এটি টেলিস্কোপের লেন্সকে নক্ষত্রের আলো থেকে বিশেষভাবে ঢেকে দেবে। তবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গ্রহের দিকে ঠিকই নজর দেয়া যাবে। গ্রহ থেকে আসা আলো আরো ভালভাবে দৃশ্যমান হবে। প্রয়োজনে এটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র থেকে আলো আসতে বাঁধা দিতে পারবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রহ পর্যবেক্ষণ ছাড়াও অন্যান্য মহাকাশ গবেষণায়ও এধরনের স্টারশেড কাজে লাগানো যাবে।

এক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন, নক্ষত্র আর টেলিস্কোপের মাঝে কীভাবে একে ঠিক অবস্থানে বসানো হবে, এত বড় একটি বস্তুকে কীভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হবে। একটি স্টারশেডের ব্যাস হবে প্রায় ১০০ ফুট বা ৩০ মিটার। যা একটি বাস্কেটবল কোর্টের সমান। যথেষ্ট বড়।

অন্যদিকে কোনো রকেটের ব্যাস খুব বেশি হলে ৫মিটার। ৫ মিটারের রকেটে করে ৩০ মিটারের বস্তু নিয়ে যাওয়া? কীভাবে? রকেটে করে একে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার এক সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছেন তারা। সেটি হলো অরিগ্যামির ও গণিতের কিছু কলাকৌশল।

অরিগামির সেই বিশেষ শাখাটির নাম রিজিড অরিগ্যামি। এতে কাগজের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় দৃঢ় পাত। দৃঢ় পাত যেহেতু ভাঁজ করা যায় না তাই যেখানে ভাঁজের প্রয়োজন সেখানে আলাদা আলাদা পাতকে কবজা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। ফলে বস্তুর আকৃতির কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু কাগজের স্থলে হবে দৃঢ় পাত।

রিজিড অরিগ্যামিকে কাজে লাগিয়ে বিশাল আকৃতির স্টারশেডকে ভাঁজ করে রকেটে বহন উপযোগী আকারে নিয়ে আসা হবে। এক্ষেত্রে যে প্যাটার্নে ভাঁজ করা হবে সেটি হলো আইরিশ ফোল্ডিং প্যাটার্ন। এভাবে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার পর আবার ভাঁজ খুলে ফেলা হবে। প্রত্যেকটি ভাঁজ বেশ সূক্ষ্মভাবে খুলতে হবে যাতে এর কিনারা পর্যন্ত প্রতিটি অংশ মিলিমিটার পর্যায়ে সঠিক অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা এই ভাঁজ সঠিকভাবে খুলতে পারার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।

চিত্র: বিজ্ঞানীরা ভাজগুলো নিয়ে কাজ করছেন

মহাকাশ গবেষণায় অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো এটাই প্রথম নয়। এর আগেও কিছু যন্ত্রে অরিগ্যামির ভাঁজ করার নীতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোলার প্যানেল এবং স্যাটেলাইট। মহাকাশ গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। অল্প অল্প করে এভাবেই সীমিত গণ্ডি থেকে বের করে এনে অরিগ্যামিকে কাজে লাগানো হচ্ছে বিজ্ঞানের বিশাল জগতে।

তথ্যসূত্র

১) https://exoplanets.nasa.gov/resources/1015/

২) https://www.youtube.com/watch?v=XYNUpQrZISc

৩) https://www.youtube.com/watch?v=Ly3hMBD4h5E

যেভাবে কাজ করে অপটিক্যাল ফাইবার

পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ব্যাপারে আমরা সবাই কমবেশি জানি। আলোকরশ্মি ঘন মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা মাধ্যমে কৌণিকভাবে প্রবেশের সময় একটি নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে অভিলম্বের ওপর আপতিত হলে, আপতিত আলোর পুরোটাই প্রতিফলিত হয়। প্রতিফলিত হয়ে প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে।

এখান থেকে একটু অগ্রসর হয়ে আমরা একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারি। একটি পাত্রকে তরল পদার্থ দ্বারা পূর্ণ করা হলো। ছবিতে দ্রষ্টব্য। এরপর একদিক থেকে একটি লেজার রশ্মি তরলের ভেতর সরলরেখা বরাবর প্রক্ষেপণ করা হলো।

অপরদিকে লেজারের সাপেক্ষে একই উচ্চতায় একটি ছিদ্র করা হলো। ছিদ্র দিয়ে তরল নীচের দিকে প্রাসের গতিপথের মতো পতিত হয়। দেখা যাবে তরলের ভেতর দিয়ে আলো এমনভাবে অগ্রমুখী হচ্ছে যেন এর গতিপথ বক্র। অথচ আলো বা লেজারের গতিপথ কখনোই বক্র নয়। আসলে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের ফলে তরল আর বাতাসের সীমানায় প্রতিফলিত হয়ে হয়ে সামনে এগুচ্ছে।

ঘন তরল মাধ্যম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা বায়ু মাধ্যমে প্রবেশ করতে গেলে, নির্দিষ্ট কোণের চেয়ে বড় কোণে আপতিত আলো তরলের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কৌণিক শর্ত পূরণ হতে থাকবে, পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে আলো যে কোনো পথে এগোতে পারবে, এক্ষেত্রে প্রাসের গতিপথ বরাবর এগুচ্ছে।

উপরের চিত্রে তরল হিসেবে প্রোপিলিন- গ্লাইকল ব্যবহার করা হয়েছে। মাধ্যম কতটা ঘন তা refractive index বা প্রতিসরণাঙ্ক নামক একটি ধ্রুবক থেকে বোঝা যায়। এর মান যত বড় হবে, বুঝতে হবে মাধ্যম ততটাই ঘন। এক্ষেত্রে তীর চিহ্ন বরাবর অভিলম্বের সাথে ৪৪.৩৫ ডিগ্রি এর বেশি কোণে আপতিত হলে তরলের ভেতর পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হবে।

উপরে তরল ও লেজার আলোক ব্যবহার করে যে ব্যাপারটি আলোচনা করা হলো তা-ই আসলে অপটিক্যাল ফাইবারের মূলনীতি। অপটিক্যাল ফাইবারের ক্ষেত্রে তরলের বদলে বিশেষ ধরনের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে বলা যায় কাচ।

একটু সঠিক করে বলতে গেলে বলা যায় এক্ষেত্রে দুই স্তরের একটি মাধ্যম ব্যবহার করা হয়। ভেতরের স্তরকে বলা হয় core যা প্রধানত সিলিকন ডাই-অক্সাইড দ্বারা গঠিত। বাইরের স্তরকে বলা হয় cladding। এটি সিলিকন ডাই-অক্সাইড দিয়ে গঠিত। এতে সামান্য বোরন এবং জার্মেনিয়ামের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এটি করা হয় প্রতিসরণাঙ্ক core অপেক্ষা কিছুটা কমানোর জন্য। পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের শর্ত সৃষ্টি করবার জন্য মাত্র ১% প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যই যথেষ্ট।

এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আপতিত আলো সঙ্কট কোণের চেয়ে কম কোণে আপতিত হয়? হ্যাঁ এরকম ঘটনা ঘটতে পারে দুই উপায়ে। ১) ফাইবারের ভেতরে কিছুটা বিকৃতি থাকলে এবং ২) একটি সীমাস্থ পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফাইবারটিকে বাঁকালে।

চিত্র: ফাইবারের ভেতর বিকৃতি

চিত্র: বেশি পরিমাণে বাঁকানো

এক্ষেত্রে আলোকের নির্দিষ্ট অংশ অপচয় হবে এবং তা সামনে এগুতে পারবে না। তাই এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

তথ্যকে ডিজাটাল রূপে রূপান্তরিত করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পাঠানো যায়। যেমন বৈদ্যুতিক মাধ্যমে। এরপর একসময় আসলো অপটিক্যাল ফাইবারের ধারণা। তথ্য যদি বৈদ্যুতিকভাবে না পাঠিয়ে আলো দ্বারা কোনোভাবে পাঠানো যায়, তাহলে তার প্রেরণের গতি নিশ্চয়ই বেশি হবে। কারণ আলোর গতি সবচেয়ে বেশি।

১ এবং ০ এর বদলে আলোর উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতি দ্বারাও দুটি অবস্থা প্রকাশ করা যায়। এক্ষেত্রে যেটি করতে হবে, প্রেরক প্রান্তে প্রথমে সিগন্যালকে ০ এবং ১ এর সিরিজে পরিণত করতে হবে। তারপর ১ এর জন্য আলো পাঠানো এবং ০ এর জন্য আলোর অনুপস্থিতি নির্ধারিত থাকবে। প্রাপক প্রান্তে এভাবে বার্তা গ্রহণ করার পর তাকে আবার ১ এবং ০ এর সিরিজে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর সেখান থেকে থেকে আবার মূল সিগনালে রূপান্তরিত করা হয়।

অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করার ফলে খুব দ্রুত বেগে (আলোর বেগের ৭০% বেগে) তথ্য আদান প্রদান করতে পারছি। দ্রুততার কারণেই বর্তমানে প্রায় সকল ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহার করা হয়।

ক্যাবল বলতে আমরা যে দুই স্তর বিশিষ্ট মাধ্যমকে বোঝাচ্ছি, তা আসলে খুবই সরু। বাইরে সুরক্ষা বেষ্টনী ব্যবহার করার কারণে এটি মোটা দেখায়।

চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন
চিত্র: ফাইবার অপটিক ক্যাবল দেখতে যেমন

একেকটি সরু ফাইবারের বাইরে বেশ কয়েকটি স্তর থাকে। চূড়ান্তভাবে পুরো ক্যাবলটির ব্যাস হয় ১ ইঞ্চির মতো। সর্বপ্রথম যেই ক্যাবল-টি ব্যবহার করা হয়েছিল তা ছিল TAT-8 ক্যাবল। এতে একসাথে ছয়টি ক্যাবল একটি শক্ত ভিত্তিকে কেন্দ্র করে চক্রাকারে সাজানো হয়েছিল। বাইরে আরও বেশ কয়েকটি স্তর ছিল যার ফলে সমুদ্রের ভেতর দিয়ে ৩৫০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রথম ফাইবার দ্বারা টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। এটি একইসাথে ৪০ হাজার কানেকশন/কল স্থাপন করতে পারতো।

আজ এ পর্যন্তই, পরবর্তীতে হাজির হবো ফাইবার অপটিকের নতুন কোনো ম্যাকানিজম নিয়ে।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমঃ প্রাচীন সভ্যতার অত্যাধুনিক উদ্ভাবন

জ্যোতি:পদার্থবিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান আমাদের সকলেরই আকর্ষণের বিষয়। আলপিনতুল্য মানব সম্প্রদায় তার উৎপত্তিলগ্ন থেকেই ঐরাবতসম মহাকাশ ও তার সৃষ্টিরহস্য ভেদে বিভোর হয়ে আছে। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই মহাকাশবিজ্ঞানের অজানা সব তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। বহু আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ নক্ষত্রের নির্ভুল তথ্য আমরা এখন পৃথিবীতে বসেই জানতে পারি।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা যে কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি লক্ষ্য করছি, এর রূপরেখা আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগেই প্রাচীন গ্রীসের প্রকৌশলীরা তৈরী করেছিলেন। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামের এ প্রযুক্তিকে বলা হয় মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার।

১৯০০ সালের কথা। গ্রীসের একদল স্পঞ্জ ডাইভার দেশটির অ্যান্টিকিথেরা দ্বীপের কাছে একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে। খুঁজে পান বহু বছরের প্রাচীন সব অলংকার, মূর্তি, মুদ্রা ইত্যাদি। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত সকল বস্তুই তারা গবেষণার জন্য পাঠিয়ে দেন গ্রীসের ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে।

প্রাপ্ত বস্তুগুলোর মধ্যে কিছু ব্রোঞ্জ ও পাথরের পিণ্ডের মতো অনিয়মিত আকারের জিনিস ছিল। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ প্রথমে সেগুলোর দিকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে তারা উদ্ধারকৃত অন্যান্য জিনিসগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করেন। এর কারণে উদ্ধারের প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেগুলো নিয়ে কেউ গবেষণা করেনি। সত্যিকার অর্থে, সবুজ শ্যাওলা পড়া জিনিসগুলোর প্রতি আদপে তারা খুব একটা আগ্রহবোধ করেনি। কিন্তু কে জানতো? এই মাটির ঢিবি সদৃশ বস্তুগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার আশ্চর্য এক উদ্ভাবন!

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের অংশ বিশেষ

দুই বছর পর ১৯০২ সালে গ্রিক আর্কিওলজিস্ট ভ্যালেরিওস স্টাইস জিনিসগুলি নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা শুরু করেন। তিনি আবিষ্কার করেন, উদ্ধারকৃত পাথর ও ব্রোঞ্জের পিণ্ডগুলোর একটির মধ্যে ঘুর্নায়মান চাকা রয়েছে।

প্রথমে তিনি একে ঘড়ি ভাবলেও পরে আরো গভীর পর্যপেক্ষণের মাধ্যমে এর মধ্যে জটিল এক যন্ত্রকৌশল আবিষ্কার করেন। স্টাইসের আবিষ্কারের পর বহুদিন পর্যন্ত এ নিয়ে গবেষণা বন্ধ ছিল। মূলত এই গবেষণা হতে ফলপ্রসু কিছু পাওয়া যাবে না- এ কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ডেরেক প্রাইস এটি নিয়ে পুনরায় নাড়াচাড়া শুরু করেন। তিনি এটিকে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক্স রে ও গামা রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তিনি এর সম্ভাব্য ৮২টি টুকরোর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি এ আবিষ্কারের উপর ৭০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার। প্রফেসর প্রাইসের ভাষ্যমতে, এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৮৭ সালের দিকে তৈরী করা হয়েছিল। এর মূল উপাদান ছিল ব্রোঞ্জ এবং অল্প পরিমাণ টিন। এছাড়া পাথর ও কাঠের বিভিন্ন কাঠামোও এতে ব্যবহার করা হয়। গঠনশৈলী দেখে ধারণা করা হয় হেলেনিস্টিক সময়কালে (খ্রী: পূ: ৩২৩ – খ্রী: পূ: ৩১) এই যন্ত্রের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।

যন্ত্রটি দেখতে অনেকটা ছোটখাট ঘড়ির মতো। এতে অনেকগুলো ডায়াল এবং কাঁটা বিদ্যমান। ডায়ালগুলো চন্দ্র, সূর্য এবং পাঁচটি গ্রহকে নির্দেশ করে। এগুলো ছাড়াও এর মাঝে কয়েকটি সংখ্যা খচিত ব্লক রয়েছে। এগুলোর সাহায্যে জ্যোতির্বিদ্যার জটিল হিসাব করা যেত সহজেই।

চিত্র: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের কম্পিউটারাইজড থ্রিডি মডেল

প্রাইসের শনাক্ত করা ৮২টি টুকরোর মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে ৭টি টুকরো। ১৬টি পাওয়া গেছে ভগ্ন অবস্থায়। বাকিগুলো হয় এখনো সাগরতলেই লুকায়িত রয়েছে, না হয় কালের বিবর্তনে ধ্বংস হয়ে গেছে।

অক্ষত ৭টি টুকরোকে মেজর ফ্র্যাগমেন্ট এবং বাকি টুকরোগুলোকে মাইনর ফ্র্যাগমেন্ট বলা হয়। মেজর ফ্র্যাগমেন্টগুলোকে A, B, C, D, E, F এবং G- এ সাত ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ A-এর দৈর্ঘ্য ১৮০ মিলিমিটার, প্রস্থ ১৫০ মিলিমিটার। প্রতিটি অংশেই বিভিন্ন গিয়ার, ডায়াল ও ঘড়ির চাকতি সদৃশ বস্তুর সন্ধান মিলেছে। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্টগুলোর গায়ে বিভিন্ন সাংকেতিক লিপি খোদাই করা আছে। মাইনর ফ্র্যাগমেন্টগুলোর কাজ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হলেও এদের পৃষ্ঠেও বিভিন্ন চিহ্ন দেখা যায়।

প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন। তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতেন। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় অনেক দূর এগিয়েছিলেন। গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তনের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে তারা অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। যন্ত্রটির সামনের দিকে দুটো ডায়াল দেখা যায় যেগুলো রাশিচক্র ও সৌর বছরকে চিহ্নিত করে। সেখান থেকে আরো দুটো রেখার মতো দাগ বের হয়েছে যেগুলো চন্দ্র ও সুর্যের সম্যক অবস্থাকে নির্দেশ করে।

চিত্র: সাগরের তলদেশ হতে প্রাপ্ত যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ

যন্ত্রটির পেছনে দুটি ঘূর্ণায়মান রেখা যথাক্রমে সারস ও ক্যালিপিক চক্র নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হতো। এ চক্র দুটি প্রতি ১৮ ও ৭৬ বছরে চন্দ্রগ্রহণের সময়কাল বের করতে পারতো। মূল যন্ত্রের সাথে একটি L আকৃতির হাতল যুক্ত ছিল যার সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করা হলে যন্ত্রটি সঙ্গে সঙ্গে সেই তারিখের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতে পারত। যন্ত্রের গঠনশৈলী থেকে বোঝা যায় তৎকালীন গ্রিক পণ্ডিতরা সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নিয়েই এ যন্ত্রের নকশা করেছিলেন।

এত ছোট একটি যন্ত্র এত জটিল সব হিসেব কীভাবে সম্পাদন করতো, সে রহস্য আজও গবেষকরা পুরোপুরি ভেদ করতে পারেননি। তাদের মতে, সূক্ষ্ম এবং সঠিক মাপের গিয়ারের ব্যবহারই যন্ত্রটির আকার কমিয়ে এর কার্যকারিতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিত। অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজমের গিয়ারের বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মডেল প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে রাইট প্রপোজাল, ইভান’স প্রপোজাল ও ফ্রিথ প্রপোজাল অন্যতম।

শুধু যে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ধারণ করতেই এ যন্ত্র ব্যবহৃত হতো, তা কিন্তু না। ২০০৮ সালে করা এক গবেষণায় জানা যায়, এ যন্ত্র তৎকালীন বিভিন্ন উৎসব, যেমন প্রাচীন অলিম্পিক গেমস এর দিনক্ষণের হিসেবও রাখতো। যন্ত্রটির গায়ে থাকা লিপিগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এর সাথে একটি পূর্ণ সৌর মডেল যুক্ত ছিল যেখানে বিভিন্ন গোলকের মাধ্যমে গ্রহগুলোকে চিহ্নিত করা হতো। লিপিগুলোতে থাকা মাসের নাম ও ক্যালেন্ডার দেখে ধারণা করা হয় গ্রীসের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের করিন্থিয়া অঞ্চলে এ যন্ত্রের প্রচলন ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে এখনো। বিজ্ঞানীরা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এর পেছনে থাকা জটিল কৌশলগুলোর পুরোপুরি ব্যাখ্যা খুঁজে বের করতে। দুই হাজার বছর আগে যেখানে প্রযুক্তির অপ্রতুলতা ছিল প্রকট, জ্ঞানের পরিধি ছিল সীমিত, সেখানে সামান্য ব্রোঞ্জ, কাঠ ও পাথর দিয়ে তখনকার প্রকৌশলীরা এত নির্ভুল একটি যন্ত্র কীভাবে তৈরী করলেন, এ প্রশ্ন এখনো মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম তাই শুধুই একটি যন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি তৎকালীন গ্রীক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণের নতুন এক দ্বারও উন্মোচন করেছে।

তথ্যসূত্র

  1. http://age-of-the-sage.org/archaeology/antikythera_mechanism.html
  2. https://smithsonianmag.com/history/decoding-antikythera-mechanism-first-computer-180953979
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Antikythera_mechanism

ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ

এটি আট বছর বয়সী একটি শিশুর ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত হাতের ছাপ। পেট্রিডিশে ব্যাক্টেরিয়ার বৃদ্ধির পুষ্টিকর মাধ্যমে হাতের ছাপ থেকে বংশবিস্তারের মাধ্যমে ব্যাক্টেরিয়ার এ মানচিত্র তৈরি হয়েছে।

image source: boredpanda.com

নিচের ডানদিকের বৃত্তাকার কলোনীটি Bacillus জাতীয় ব্যাক্টেরিয়ায় তৈরি। রঙ্গীন কলোনীগুলো Serratia অথবা Micrococcus কিংবা yeast। এগুলো পরিবেশে এবং চামড়ায় সহজপ্রাপ্য। সাদা ছোট কলোনীগুলো Staphylococcus হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল যা একইভাবে হাতের চামড়ায় বিদ্যমান থাকে। বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং তর্জনীর মাঝের অনুজীবগুলো বহিরাগত জীবাণু।
source: bigganpotrika

featured image: wattafact.com

বিপ্লবী বিটটরেন্ট ফাইল শেয়ারিং এর ইতিকথা

টরেন্ট শেয়ারিং সিস্টেমের পুরোটাই মানুষের কাছে পাইরেসির মূল অস্ত্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। কোনোকিছু যখন কেবলমাত্র একটি খাতে অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয় তখন সেটির পরিচয় বদলে যায় মানুষের মনে। বাংলাদেশে এমনও অনেক মানুষ রয়েছে যাদের কাছে ইন্টারনেট মানেই হলো ফেসবুক। ফেসবুক যে ইন্টারনেটের বড় এক পরিসরের ক্ষুদ্র এক অংশ মাত্র সে ব্যাপারে তাদের জানা নেই।

পাইরেসিতে অধিক হারে ব্যবহার হয় বলে আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি যে আধুনিক প্রযুক্তির একটি অনন্য সংযোজন হলো টরেন্ট। টরেন্ট কেবলমাত্র পাইরেসির জন্য তৈরি হয়নি। ভিন্নমাত্রার একটি শেয়ারিং প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা থেকে জন্ম হয়েছে এর। এ প্রযুক্তিটি খুবই সূক্ষ্ম ও সুনিপুণভাবে কাজ করে- যেন একদম গল্পের মতো।

টরেন্ট শেয়ারিংয়ের বিস্তারিত বুঝতে হলে আপনাকে আগে জানতে হবে ডাউনলোডিং ও আপলোডিং এর প্রাচীন পদ্ধতিটি সম্পর্কে। এগুলো কম্পিউটারের শুরু থেকেই চলে আসছে। ইন্টারনেটের সংযোগবিহীন দুটি কম্পিউটারকে ক্যাবলের মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে যদি আপনি কোনো ফাইল শেয়ার করতে চান, তাহলে আপনাকে এই প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

প্রেরক কম্পিউটার থেকে প্রথমে একটি লিংক প্রদান করতে হবে প্রাপকক। এ লিংকটি বলে দেবে প্রেরকের কম্পিউটারের কোথায় রয়েছে ফাইলটি। ফাইলটির ঠিকানা ব্যবহার করে সহজেই প্রাপক ফাইলটি নিয়ে নিতে পারবে। এখানে প্রেরক কম্পিউটারটি ব্যবহৃত হয়েছে আপলোডার হিসেবে আর প্রাপক কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়েছে ডাউনলোডার হিসেবে।

এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে ফাইল শেয়ারিংয়ে তেমন কোনো জটিলতা সৃষ্টি হয় না। কিন্তু যদি দেখা যায় যে একটি কম্পিউটারে এমন একটি ফাইল রয়েছে যা একশোটি কম্পিউটার ব্যবহারকারীর প্রয়োজন তাহলে কেমন হবে?

একশোটি কম্পিউটারকে আপলোডার কম্পিউটারের সাথে ক্যাবল দিয়ে যুক্ত করতে হবে। সেই কাঙ্ক্ষিত কম্পিউটারটির আপলোডের গতি একশোটি কম্পিউটারের মাঝে ভাগ হয়ে যাবে। সাধারণ একটি কম্পিউটার দিয়ে কখনোই একশোটি কম্পিউটারের এমন বোঝা বহন করা সম্ভব হবে না।

এখানেই প্রয়োজন একটি সার্ভার কম্পিউটার। এধরনের সার্ভার অনেকগুলো কম্পিউটারের অনুরোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। আপনি আপনার কম্পিউটারকে ব্যবহার করতে পারবেন একটি ওয়েবসাইটের সার্ভার হিসেবে। ওয়েবসাইট প্রকাশ করার পর ব্যবহারকারীরা যখন ওয়েব অ্যাড্রেস দিয়ে আপনার তৈরিকৃত ওয়েবসাইটটি ব্যবহারের অনুরোধ পাঠাবে আপনার কম্পিউটারে, তখন আপনার কম্পিউটার অনুরোধকারীর নিকট পাঠিয়ে দেবে ওয়েবসাইটটিকে।

অনুরোধ পাঠানোর এ কাজটি করে থাকে ওয়েব ব্রাউজার। দুই-একজনের অনুরোধে সাড়া দেবার সামর্থ্য থাকলেও যখন শতাধিক মানুষের অনুরোধ আসবে আপনার কম্পিউটারের পক্ষে তখন আর সেই অনুরোধগুলোতে সাড়া দেয়া সম্ভব হবে না। ফলে আপনার কম্পিউটার ক্র্যাশ করবে।

ডাউনলোডের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। কোনো ফাইলের মালিক একটি সার্ভার কম্পিউটারে ফাইলটিকে রেখে তার ঠিকানাটি লিংকের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইট কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। ফাইলটি যাদের প্রয়োজন হবে, তারা উক্ত ঠিকানা ব্যবহার করে ফাইলটিকে খুঁজে নেন। অতঃপর ডাউনলোডের জন্য অনুরোধ করেন। সার্ভার কম্পিউটার তখন ডাউনলোডে সাড়া দিয়ে ফাইলটিকে প্রেরণ করতে শুরু করে।

ডাউনলোডার যত বাড়বে, সার্ভার কম্পিউটারের ক্ষমতা আর স্পীড ধীরে ধীরে ডাউনলোডারদের মাঝে ভাগ হয়ে যেতে শুরু করবে। এখন একটি সার্ভার কম্পিউটার ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত করে দেয়া হলো। ডাউনলোডের জন্য ফাইলও রাখা হলো। ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত কোটি কোটি কম্পিউটার এবার ফাইলটির জন্য অনুরোধ করতে সক্ষম। এবার এই বিপুল চাহিদায় সাড়া দিতে হবে সার্ভারকে।

এই পদ্ধতিটির একটি বড় সমস্যা হলো ব্যান্ডউইডথ। যদিও ব্রডব্যান্ডের সহজলভ্যতা আর ফাইলের সাইজ ইদানিং মানুষকে টরেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে তবুও মানুষ এখনো প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করে। সহজ-সরল পদ্ধতি বলে কথা।

যারা ব্যবহার করেন এই প্রাচীন পদ্ধতি কিংবা করতেন, তাদের একটি সমস্যা চোখে পড়ার কথা। সার্ভারে সকল ফাইলের নির্দিষ্ট ব্যান্ডউইডথ থাকে। ব্যান্ডউইডথ শেষ হয়ে গেলে আর সেটি ডাউনলোড করা যায় না। আপলোডারকে তখন নতুন করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাথায় রেখে ব্যান্ডউইডথের ব্যবস্থা করতে হয়।

ধরা যাক, একটি সার্ভারের ব্যান্ডউইডথ ৫০০ মেগাবাইট। ফাইলটির সাইজ হলো ১০০ মেগাবাইট। তাহলে মাত্র পাঁচজন ব্যবহারকারী এই ফাইলটিকে ডাউনলোড করতে পারবে। পাঁচবার ডাউনলোড হয়ে যাবার পর যারাই ডাউনলোডের অনুরোধ করবে, সার্ভার তখন ব্যান্ডউইডথ ত্রুটি প্রদর্শন করবে।

ফাইল শেয়ারিংয়ের শুরু থেকেই চলে আসছে এই সরলতম প্রাচীন পদ্ধতি। দিনে দিনে প্রযুক্তিখাত অনেক উন্নতি করেছে, ফাইলের আকার বেড়েছে। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে কিন্তু ফাইল শেয়ারিং কমেনি, উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপক হারে। বেশি আকারের সাথে সাথে পুরনো পদ্ধতিতে জটিলতাও বেড়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি কখনো পিছিয়ে থাকেনি। সময়ের সাথে আপগ্রেড হতে দেখা গেছে একে। ফাইল শেয়ারিং প্রযুক্তি-ই বা পিছিয়ে কেন থাকবে। আপগ্রেড হয়েছে, আপগ্রেডেড ভার্সন হলো এই বিটটরেন্ট অথবা টরেন্ট প্রযুক্তি।

বহুদিন থেকেই ফাইল শেয়ারিংয়ের নতুন এক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সকলের মাঝে বিরাজ করছিল। বিটটরেন্ট কাজ করে peer-to-peer শেয়ারিং এর দ্বারা। peer কী জিনিস, এই প্রশ্ন আবার রয়ে যায়। বিটটরেন্ট সিস্টেমে একজন ডাউনলোডারকে ডাউনলোডার না বলে পিয়ার বলে উল্লেখ করা হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো, শেয়ারিং হবে peer-to-peer, অর্থাৎ ডাউনলোডার থেকে ডাউনলোডারের কাছে।

বাফালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা কম্পিউটার প্রোগ্রামার ব্র্যাম কোহেন ভাবলেন, কেবলমাত্র একটি সার্ভার থেকে সকল ব্যবহারকারী ফাইল সংগ্রহ করে থাকে, কেমন হবে যদি সংগ্রহকারী প্রত্যেকেই একেকজন সার্ভারের মতো কাজ করতে পারে। অর্থাৎ যাদের ডাউনলোড শেষ হয়ে যাবে তারা আবার অন্যদের অনুরোধে সাড়া দিতে শুরু করবে। এটিই হলো মূল ধারণা। এর উপর ভিত্তি করেই করেই ব্র্যাম কাজ করতে শুরু করেন।

ধারণাটি সরল কিন্তু এতে জটিলতাও রয়েছে প্রচুর। অনেকগুলো সমস্যা সামনে চলে আসে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে। যেমন, একটি সাধারণ কম্পিউটার কখনোই সার্ভারের মতো অনুরোধ সামলাতে পারবে না, এতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে। সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে কীভাবে অর্ধেক ডাউনলোড হওয়া আরেকটি কম্পিউটার বাকি অর্ধেক ডাউনলোড করবে, কম্পিউটার তো বুঝবে না কতটুক পাওয়া যাবে।

তাছাড়া সার্ভারের মতো কাজ করতে হলে একটি কম্পিউটারকে পুরোপুরি ডাউনলোড শেষ করতে হবে, অন্য সকল অনুরোধের চাপে এই কাজটিও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। একটি কম্পিউটার ডাউনলোড শেষ করেছে এই সংবাদটি-ই বা কীভাবে অন্য ডাউনলোডারদের কম্পিউটারে পৌঁছাবে। সুন্দর আইডিয়া কিন্তু সমস্যা বেশ জটিল। জটিল হবার কারণ হলো প্রাচীন ফাইল শেয়ারিং পদ্ধতির প্রোটোকল।

সার্ভার থেকে ব্যবহারকারীদের ফাইল ডাউনলোড
পিয়ার-টু-পিয়ার শেয়ারিং

প্রোটোকলের ব্যাপারে কিছু বলে নেয়া উচিৎ। প্রোটোকলকে ফাইল শেয়ারিংয়ের আইনব্যবস্থা বলা যেতে পারে। ওয়েব ব্রাউজিং আর ফাইল শেয়ারিংয়ের নিয়মকানুন লিপিবদ্ধ থাকে এতে। এটি মেনে চলে সার্ভার ও ওয়েব ব্রাউজার। কয়েকটি প্রোটোকল হলো HTTP (Hyper Text Transfer Protocol), HTTPS (Hyper Text Transfer Protocol Secured), FTP (File Transfer Protocol) ইত্যাদি। ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর সময় সবাই HTTP কিংবা HTTPS ব্যবহার করে থাকে। তবে FTP শব্দটিও কিন্তু আপনাদের অপরিচিত নয়।

যারা ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন তাদের কাছে অতি পরিচিত শব্দ হলো FTP Server। আপনার ব্রডব্যান্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে আপনার কম্পিউটার ক্যাবলের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত রয়েছে, তাই আপনি তাদের নির্দিষ্ট যেকোনো ফাইলের মধ্য থেকে পছন্দের ফাইল ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

এখানে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করতে হচ্ছে না কেননা সরাসরি ক্যাবল দিয়ে আপনার কম্পিউটার সার্ভারের সাথে যুক্ত। ঠিক এজন্যই আপনি নির্ধারিত স্পীডের থেকেও অনেক বেশি স্পীড পেয়ে থাকেন FTP সার্ভার থেকে ডাউনলোডের সময়।

Peer-to-peer শেয়ারিংয়ের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রথমবারের মতো নতুন এক প্রোটোকল লেখার কাজে হাত দিলেন ব্র্যাম কোহেন। এই ফাইল শেয়ারিং ব্যবস্থাটি একটি ফাইলকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নেয়। বলা যায় Bit বাই Bit ভাগ। এজন্যই প্রযুক্তিটির নাম হয়ে দাঁড়ায় Bittorrent।

প্রোটোকল লেখার পর এবার নির্ধারিত ব্রাউজার প্রোগ্রাম তৈরিতে হাত দিলেন ব্র্যাম। ওয়েব ব্রাউজার সবগুলো কাজ করে HTTP, HTTPS কিংবা FTP প্রোটোকলে। নতুন প্রোটোকল মেনে চলবে এমন এক ব্রাউজার প্রয়োজন ব্রামের। ব্রাউজারটি হলো সকলের পরিচিত Bittorrent Software।

যারা চিনতে পারেননি তারা হয়তো মাইক্রোটরেন্ট সফটওয়্যারটির সাথে পরিচিত। এই মাইক্রোটরেন্ট কিংবা যেটাকে হয়তো ইউটরেন্ট বলে বলেই অভ্যস্থ আপনি, বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে খুবই বিখ্যাত। তবে এটি ইউটরেন্ট নয়, ইউ এর মত দেখে সিম্বলটিকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মাইক্রো’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে মাইক্রোটরেন্ট আর বিটটরেন্ট ব্রাউজার দুটোই বিটটরেন্ট কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে। এছাড়াও Deluge এবং BitLord এগুলো মোটামুটি পরিচিত টরেন্ট ক্লায়েন্ট অর্থাৎ বিটটরেন্ট ব্রাউজার।

বহুল ব্যবহৃত ও বিখ্যাত মাইক্রোটরেন্ট

বিটটরেন্ট প্রযুক্তিতে আরেকটি টার্মিনোলজি হলো ‘ট্র্যাকার’। ট্র্যাকারের কাজ হিসেবে বলা যায়- সার্ভার, ক্লায়েন্ট, পিয়ার সবাইকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। সকল টরেন্ট ফাইলেই ট্র্যাকার থাকে।

টরেন্ট ফাইলের কথা যেহেতু এসেছে, একটি ব্যাপারে বলে ফেলা যাক। আপনার কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির জন্য টরেন্ট ব্রাউজারকে আপনি আদেশ দেবেন একটি ফাইলের মাধ্যমে। এই ফাইলটির ফরম্যাট হলো ‘টরেন্ট’। এখান থেকেই মানুষের মুখে মুখে টরেন্ট ডাউনলোডিং কথাটি চলে এসেছে।

আরো একভাবে আপনি আদেশ দিতে পারবেন, ম্যাগনেট লিংক এর সাহায্যে। টরেন্ট ফাইল কিংবা ম্যাগনেট লিংক দুটিই কাজ করে থাকে চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন লোহাকে আকর্ষণ করতে শুরু করে, তেমনই ব্রাউজার এই টরেন্ট অথবা ম্যাগনেটকে ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফাইলটির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ডাউনলোড করে।

ইন্টারনেট যুক্ত সকল কম্পিউটারে সংরক্ষিত পূর্ণাঙ্গ ফাইল থেকে ডাউনলোড করে করে এক জায়গায় একত্র করতে শুরু করে। হাজার হাজার কম্পিউটার থেকেও অল্প অল্প করে গ্রহণ করে নিতে সক্ষম এই টরেন্ট। এজন্য সকল অবস্থাতেই টরেন্ট শেয়ারিং সুবিধাজনক।

ধরা যাক, ১০ মিটার লম্বা একটি লাঠি ডাউনলোডের উদ্দেশ্যে কম্পিউটারে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিয়ে টরেন্ট তৈরি করা হলো। এতে নির্দিষ্ট ট্র্যাকারও যুক্ত করা হলো। টরেন্ট ফাইল তৈরির সময়ই ব্রাউজার এই লাঠিকে দশ ভাগে ভাগ করে ফেললো। প্রতি ভাগে ১ মিটার করে পড়েছে, প্রতি ভাগের নাম প্রথম, দ্বিতীয়… দশম দেয়া যাক।

তিনজন মানুষের এই লাঠিটি ডাউনলোড করা প্রয়োজন। তিনজন মানুষ ডাউনলোড শুরু করলো। তিনজনই প্রথম খণ্ড থেকে ডাউনলোড শুরু করবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি আপনার টরেন্ট ব্রাউজারে কোনো ফাইল সিলেক্ট করে নিচের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন, বড় একটা বার ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে, কোথাও ব্লক আছে, কোথাও ফাঁকা। সেগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণ হচ্ছে।

প্রথমজন চতুর্থ, সপ্তম, দশম খন্ডগুলো ডাউনলোড করলো; দ্বিতীয়জন প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড করলো; তৃতীয়জন পঞ্চম, ষষ্ঠ, অষ্টম, নবম খণ্ডগুলো ডাউনলোড করে নিলো। এবার কিন্তু আর সার্ভারের প্রয়োজনই নেই। ট্র্যাকারের সাহায্য খুবই সহজে একে অপরের কম্পিউটারকে সার্ভার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করবে। পূর্ণাঙ্গ ফাইল যার কম্পিউটারে ডাউনলোড হয়ে যাবে, সে তখন সবগুলো খণ্ডের মালিক, সে সবগুলো খণ্ডের আপলোডার হিসেবে চিহ্নিত হবে।

সর্বশেষে, আরো দুটি টার্মিনোলজি ব্যাখ্যায় যেতে পারি। সীডার ও লীচার। টরেন্ট ফাইল নিয়মিত যারা ব্যবহার করেন, ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করার সময় আপনারা ফাইলের পাশে এ দুটো শব্দ দেখেছেন। আপনি যে ফাইলটি ডাউনলোড করতে চাইছেন তাকে বলা হচ্ছে সীড অর্থাৎ বীজ। অন্য যে সকল কম্পিউটারে ফাইলটি ডাউনলোড হয়েছে, এবং হবার পর আপলোড চলছে, তারা সকলেই আপলোডার বর্তমানে। তাদের সকলের মোট সংখ্যাটাই সীডার হিসেবে দেখাচ্ছে।

চিত্র: একটি ওয়েবসাইটে দেখানো সীডার ও লীচারের সংখ্যা

ঠিক একারণেই পুরনো ফাইলে সীডারের সংখ্যা শূন্য দেখায়। কারণ বেশি পুরনো হয়ে যাওয়াতে তখন কারো কম্পিউটারে সীড করা হচ্ছে না। মূল আপলোডার যদি একা সীড করেন তবুও ফাইলটি আপনার ডাউনলোডের আশা রয়েছে, কিন্তু খুবই ধীরে ধীরে, সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। তাই অ্যাক্টিভ সীডার সংখ্যা দেখে ডাউনলোড করুন, সীডার যত বেশি হবে, আপনি তত ভালোভাবে ফাইলটি ডাউনলোড করতে পারবেন।

আর লীচার হলো এমন এক ব্যবহারকারী যিনি কোনো ফাইল কিছুটা ডাউনলোড করেছেন। ফাইলটি সম্পূর্ণ ডাউনলোড হবার আগেই তার যতটুকো আছে তা থেকে তিনি আপলোড শুরু করেছেন। অর্থাৎ এখান থেকে অন্য কেউ ফাইলের অংশবিশেষ ডাউনলোড করতে পারবে কিন্তু সম্পূর্ণটি নয়। আর টরেন্ট যেহেতু অনেকগুলো ভাগে ভাগ করা থাকে তাই অংশবিশেষ ডাউনলোডে কোনো সমস্যা নেই। অন্য কোনো ব্যবহারকারীর সাথে যুক্ত হয়ে ফাইলের বাকি অংশগুলো ডাউনলোড করে নেবে।

অনেকে আছে যারা আপলোড স্পীড কমিয়ে শূন্য কিংবা এক কিলোবাইট পার সেকেন্ডে দিয়ে রাখেন কিংবা কোনোরকমে ফাইলটি পূর্ণাঙ্গরূপে ডাউনলোড শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সীড হতে না দিয়ে ব্রাউজার থেকে টরেন্ট ফাইলটি ডিলেট করে দেন। এরা শুধু স্বার্থপরের মতো নিজের আখের গুছিয়ে কাজ করে নেন, অন্য ডাউনলোডারদের উপকারের জন্য কিছু করেন না। কেউই যদি সীড না করে, তাহলে টরেন্ট ফাইলটিকে আর ব্যবহার উপযোগী রাখা সম্ভব হবে না। তাই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।

বিটটরেন্ট প্রযুক্তি পুরোটাই অনেক আপগ্রেডেড, এটি সহজে পুরনো হবার মতোও না। বিটটরেন্টকে মূলত ব্যবহার করা হয় পাইরেসির জন্য, তাই এর প্রতি মানুষের খানিকটা অবৈধ মনোভাব রয়েছে। তবে আপনি ইচ্ছা করলে একে বড় আকারের ফাইল শেয়ারিং এ খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যথায় আপনার একটি সার্ভার কম্পিউটার লাগতো কিন্তু বিটটরেন্ট ব্যবস্থায় আপনি আপনার সাধারণ কম্পিউটার দিয়েই কাজটি করতে সক্ষম হবেন।

গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো আপডেট উন্মুক্ত করতে কিংবা মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ডিস্ট্রিবিউটররা নতুন ভার্সন উন্মুক্ত করতে এই বিটটরেন্ট প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করে থাকে। এতে করে ব্যান্ডউইডথে তাদের বাড়তি কোনো খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না, এই অর্থটুকু বরং নিজেদের কোম্পানীতেই বিনিয়োগ করা যায়। আরো অনেকভাবেই এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করা সম্ভব। এ প্রযুক্তির ব্যাপারে মানুষের জানা নেই বলেই এখান থেকে সৃজনশীল কোনো ব্যবহার এখনো বেরিয়ে আসেনি আমাদের দেশে।

তথ্যসূত্র

১. https://www.howtogeek.com/141257/htg-explains-how-does-bittorrent-work/

২. https://lifehacker.com/285489/a-beginners-guide-to-bittorrent

৩. https://lifehacker.com/5897095/whats-a-private-bittorrent-tracker-and-why-should-i-use-one

৪. https://www.lifewire.com/how-torrent-downloading-works-2483513

৫. https://www.youtube.com/watch?v=urzQeD7ftbI

৬. https://www.youtube.com/watch?v=EkkFT1bRCT0

৭. https://www.youtube.com/watch?v=6PWUCFmOQwQ

featured image: faxcompare.com

জেফ বেজোসঃ অ্যামাজন ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা

জেফ বেজোস। পড়াশোনা করেছিলেন ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। চাকরি বাদ দিয়ে অনলাইন বইয়ের দোকান হিসেবে শুরু করেন amazon.com, তারপর একে একে নতুন নতুন সংযোজন এবং কাস্টোমারের কাছে নিজের কোম্পানি আর ওয়েবসাইটের পরিচিতি বাড়ানো। সেখান থেকেই তিনি আজ ছয় অঙ্কের বেতন হাঁকান আর মালিক হয়েছেন ১০৪.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের।

image source: blog.creativewebo.com

featured image: afr.com

বন্দী হবে গ্রহাণু

গ্রহাণুদেরকে একসময় মহাকাশের ভিলেন হিসেবে দেখা হতো। জ্যোতির্বিদরা দূর নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির কোনো ছবি তুলতে গেলে সেখানে প্রায় সময় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো এক গ্রহাণু। এদের যন্ত্রণায় নির্ভুল ছবি পাওয়া যায় না। অন্যদিকে গ্রহাণুরা পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে পৃথিবীর প্রাণিজগতের জন্য বিশাল হুমকি হতে পারে। পৃথিবীতে প্রতাপের সাথে দাপিয়ে বেড়ানো ডায়নোসরদের সমস্ত প্রজাতি তো বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবীতে গ্রহাণুর আছড়ে পড়ার কারণেই।

কিন্তু সময় এখন পাল্টেছে। গ্রহাণু হতে পারে মহাকাশ গবেষণার চমকপ্রদ এক বিষয়। আমাদের সৌরজগতের উৎপত্তি বিকাশ ও বিবর্তনের অনেক তথ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে গ্রহাণু নিয়ে গবেষণা-বিশ্লেষণ করলে। ভবিষ্যতের মহাকাশ বাণিজ্যের এক উল্লেখযোগ্য উপাদান হবার সম্ভাবনা আছে এই গ্রহাণুর।

image source: cnet.com

জাপানের হায়াবুসা মহাকাশযান ২০১০ সালে একটি গ্রহাণু থেকে কিছু পরিমাণ ধূলিকণা নিয়ে ফিরে এসেছিল। নাসা এর চেয়েও বড় এক প্ল্যান করেছিল। একটি মহাকাশযানের মাধ্যমে গ্রহাণু থেকে বড় আকারের নুড়ি নিয়ে আসা ছিল এ প্ল্যানের অংশ। কিন্তু পরবর্তীতে এই প্রজেক্টে নাসার পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট হয়নি, যার কারণে এটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু তারপরেও গ্রহাণুকে ধরা, এতে অনুসন্ধান ও গবেষণা করার যথেষ্ট ভালো কারণ আছে। নাসা এর পেছনে সময় ও লোকবল দিয়ে খাটছেও।

কীভাবে করা হবে এ কাজ

প্রথমে নাসা কর্তৃপক্ষ রাসায়নিক জ্বালানী সম্বলিত একটি রকেটের সাহায্যে একটি রোবটিক মহাকাশযান প্রেরণ করবে। পাশাপাশি থাকবে খুবই কার্যকর একটি ইলেকট্রিক প্রপালশন সিস্টেম। এই সিস্টেম প্রয়োজনের সময় মহাকাশযানকে উপযুক্ত স্থানে বয়ে নিতে পারবে। সূক্ষ্মভাবে মহাকাশযানকে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে অবতরণ করিয়ে সেখান থেকে উপযুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েক টন ওজনের একটি নুড়ি তুলে আনবে।

এই নুড়ি তুলে আনতে রোবটিক হাত ব্যবহার করা হবে। ভরের দিক থেকে স্বল্প হবার কারণে গ্রহাণুর অভিকর্ষীয় টান কম। অভিকর্ষীয় টান কম বলে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে এই কাজটা করতে কষ্টকর হবে। তবে আশার কথা যে গ্রহাণুর অভিকর্ষ বল কম হলেও একদমই শূন্য নয়। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।

এরপর নুড়িটিকে সযত্নে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। সম্ভব হলে পৃথিবীতে নিয়ে আসবে। একবার সফলভাবে চাঁদের কক্ষপথে স্থাপন করা গেলে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা সহজেই ছোটখাটো মিশন নিয়ে এটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা গবেষণা করতে পারবে।

কেন প্রয়োজন

আজকের যুগে পর্যটকরা যেমন বার্লিন, প্যারিস, কক্সবাজার, সুন্দরবন ঘুরে বেড়ায় তেমনই এমন এক সময় আসবে যখন এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে যাওয়াও কক্সবাজার-সুন্দরবনের মতোই মামুলি ব্যাপার হয়ে যাবে। এমন ধরনের অল্প দূরত্বের বা অধিক দূরত্বের মহাকাশ ভ্রমণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হচ্ছে পানি।

পৃথিবীতে প্রচুর পানি থাকলেও সৌরজগতের অভ্যন্তরে কিংবা নাক্ষত্রিক ভ্রমণে যথেষ্ট পরিমাণ পানি উড্ডয়নের সময় মহাকাশযানের সাথে করে নিয়ে যাওয়া যায় না। প্রকৌশলগত কিছু সমস্যা আছে তাতে। বেশি পানি নিলে ওজন বেড়ে যাবে, যা মহাকাশযানকে স্বল্প সময়ে উড়িয়ে নিয়ে যেতে বাধার সৃষ্টি করবে।

জ্বালানীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেশি জ্বালানী নিলে বেশি পথ ভ্রমণ করা যাবে, আবার খুব বেশি নিলে ভর বেড়ে যাবে যা প্রাথমিক মুক্তিবেগ কাটিয়ে উড্ডয়নে সমস্যা করবে কিংবা উড়িয়ে নিতে সমস্যা করবে।

image source: theweek.com

এ সমস্যার মোটামুটি একটি সমাধান দিতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুগুলোতে প্রচুর পানি বরফায়িত অবস্থায় থাকে। গ্রহাণুর জ্ঞাতি ভাই ধূমকেতু তো সবটাই বরফ। বর্তমানে মহাকাশে প্রতি কেজি পানি বহনে খরচ পড়ে ১০ হাজার ডলার। গ্রহাণু থেকে পানি ব্যবহার করলে খরচের পরিমাণ কমে যাবে দশ গুণ। প্রতি কেজি পানি বহন করতে লাগবে ১ হাজার ডলার।

চিত্রঃ এভাবেই নুড়ির বড় খণ্ডকে নিয়ে আসা হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে চাঁদের পৃষ্ঠেও বরফ আছে। কিন্তু চাঁদে বরফ থাকলেও তা থেকে বরফ মুক্ত করে কক্ষপথে নিয়ে আসা যথেষ্ট জটিল কাজ। চাঁদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সহজে করা যাবে গ্রহাণু থেকে পানি সংগ্রহের কাজ।

একটি গবেষণায় দুই জন বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন সৌরজগতে অনেক অনেক গ্রহাণু আছে যারা পানি বহন করে এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য এগুলো যথেষ্ট। এদের মাঝে অনেক গ্রহাণুই আছে যাদের কাছে সহজে পৌঁছা সম্ভব।  এসব গ্রহাণু থেকে বরফ সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে আসা এবং সৌরশক্তি বা যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করে তাদের গলিয়ে পানিতে রূপান্তর করা প্রকৌশলগত দিক থেকে অসম্ভব কিছু না।

যথেষ্ট পরিমাণ প্রযুক্তিগত উন্নতি লাভ করলে গ্রহাণু থেকে মহাকাশযানের জ্বালানীও সংগ্রহ করা যেতে পারে। ওজন বহনের সীমাবদ্ধতার কারণে মহাকাশযানগুলো বেশি জ্বালানী নিতে পারে না, সেক্ষেত্রে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে গ্রহাণু। গ্রহাণুর বরফকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন।

অক্সিজেন জ্বলতে সাহায্য করে আর হাইড্রোজেন ব্যবহার করা যেতে পারে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ক হিসেবে। যা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। যদিও হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়াটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। উল্লেখ্য সূর্যের সমস্ত শক্তি তৈরি হচ্ছে হাইড্রোজেনের নিউক্লীয় বিক্রিয়ার মাধ্যমেই।

অন্যদিকে  মানুষের জন্য অক্সিজেন কতটা মূল্যবান তা না বললেও চলে। পৃথিবীতে অক্সিজেন অহরহ ও সহজলভ্য হলেও মহাকাশযানে তা সহজলভ্য নয়। পৃথিবীতে যেমন না চাইলেও অক্সিজেনের সাগরে ভেসে থাকা যায় মহাকাশযানে এমন সুবিধা নেই। তাই এখানে মানবিক প্রয়োজনেও গ্রহাণু তথা অক্সিজেন খুব কাজে আসতে পারে।

আরো বেশি কাল্পনিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করলে চলে আসে মহাকাশে কলোনি তৈরির কথা। হাইটেক সায়েন্স ফিকশন। পৃথিবী দূষিত হয়ে গেছে তাই পৃথিবী থেকে বাইরে থাকতে হচ্ছে- এমন পরিস্থিতিতে মানুষের পক্ষে কলোনি তৈরি করা লাগতে পারে। আর কলোনি তৈরি করতে হলে অবশ্যই মাল মশলা লাগবে। এসব ইট পাথর কাঁচামালের যোগান দিতে পারে গ্রহাণুরা। হাজার হাজার বছর আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে ভবিষ্যতে আমাদেরকে সেবা দেবার জন্য।

তবে এখানে সমস্যা কিছু সমস্যা আছে। এই ধরনের মিশন প্রচুর ঝুঁকিপূর্ণ। ছোটখাটো একসিডেন্টে বড় ধরণের মূল্য দিতে হবে। তার উপর গ্রহাণু শিকারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হলে প্রকৌশল ও প্রযুক্তির দিক থেকে আরো উন্নত হতে হবে পৃথিবীকে। পৃথিবীবাসী হিসেবে এমন একটা দিনের আশা করছি যেখানে মানুষ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশলে এমন উন্নতি লাভ করবে যে গ্রহাণু শিকার করা একটা মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: IFLScience, University of Glasgow, NASA

কেন জন্মায় রোবটের প্রতি মায়া?

পিক্সার এনিমেশনের চমৎকার সৃষ্টি WALL-E নামের এনিমেটেড চলচ্চিত্র। এ নামে সে মুভিতে চমৎকার একটি রোবট থাকে। আদুরে রোবটটি যখন তার ভালোবাসার সন্ধানে মহাকাশের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ঘুরে বেড়ায় তখন সকলের মন ছুঁয়ে যায়। যদিও WALL-E এখানে নিছকই একটি রোবট কিন্তু তবুও তার সামান্য মানুষের মতো নিষ্পাপ চেহারাটি দর্শকদের মনের কোণে মানবিক অংশে স্থান করে নেয়। সাধারণ মানুষের বেলায় যেমন অনুভব করতো এই রোবটের বেলাতেও তেমনই অনুভব করে।

মজার ব্যাপার হলো দর্শক তার প্রতি হৃদয়ে যে সহানভূতি অনুভব করে তা শুধুমাত্র চলচ্চিত্রটির গল্প ও শৈল্পিকতার কারণে নয়। কয়েকজন মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, একজন মানুষকে কষ্টে দেখলে আরেকজন মানুষের মস্তিষ্কে যেসব কার্যক্রম হয়, রোবটকে কষ্টে দেখলেও মস্তিষ্কে একই রকম ঘটনা ঘটে।

জার্মানির ডুইশবার্গ এশেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক fMRI ব্যবহার করলেন ১৪ জন অংশগ্রহনকারী মানুষের উপর। তাদেরকে প্রথমে মানুষ, রোবট এবং প্রাণহীন কিছু বস্তুর ভিডিও দেখানো হলো। সেসব ভিডিওতে তাদের উপর স্নেহপূর্ণ কিংবা রূঢ় আচরণ করা হচ্ছে। fMRI ব্যবহার করে বিজ্ঞানীগণ ভিডিও দেখার পর মানুষগুদের প্রতিক্রিয়া, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ইত্যাদি পর্যালোচনা করলেন। গবেষণা দল লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে তাদের ফলাফল প্রকাশ করেন।

ফলাফলে দেখা যায় তারা অংশগ্রহণকারীদেরকে ডায়নোসরের মতো দেখতে Pleo নামের একটি রোবটের ভিডিও দেখান। এটিকে খাওয়ানো হচ্ছে অথবা সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। তখন দর্শকদের মস্তিষ্কের লিম্বিক অংশ কার্যকর হয়ে উঠে। এ অংশটি অনুভূতির সাথে জড়িত। আবার একইভাবে যখন তাদের মানুষের ভিডিও দেখানো হয়, যাকে ম্যাসাজ করে দেওয়া হচ্ছে, তখনো নিউরনের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই হয়।

image source: telegraph.co.uk

এবার উলটো ধরনের ভিডিও দেখানো হলো। মানুষ এবং রোবট উভয়ের সাথে বেশ রুঢ় আচরণ করা হচ্ছে এমন ভিডিও। তাদেরকে ঝাঁকানো হচ্ছে অথবা ফেলে দেওয়া হচ্ছে অথবা প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করা হচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, fMRI তে যে ফলাফল পাওয়া গেল তা হলো, মানুষকে খারাপ অবস্থায় দেখার চেয়ে রোবটকে খারাপ অবস্থায় দেখার পর অংশগ্রহনকারীদের লিম্বিক সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া অনেক অনেক বেশি।

দেখা যাচ্ছে একজন মানুষ, অন্য মানুষ বা রোবট কিংবা উভয়ের প্রতিই সহানুভূতি অনুভব করে। আমরা এখনো ভালোভাবে জানি না এ সহানুভূতির কারণ আসলে কী।

রোবোটিক্স গবেষণায় বর্তমানে একটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে এমন রোবট তৈরি করা। এ ধরনের রোবট বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দেখাশোনার ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসতে পারে। কিছু সায়েন্স ফিকশনে তো রোবটের সাথে মানুষের ঘর বাঁধাও হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় ধরে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২ জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে রোবটের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। তারা রোবটের সাথে কথা বলে, একটি নামে ডাকে, এমনকি তাদেরকে রোবটের সাথে হাসতেও দেখা যায়।

রোবটের জন্য সহানুভূতি হয়তো অনেকটা তাদের শারীরিক গঠনের উপরও নির্ভর করে। তাদের চেহারা, আচরণ, দুই পায়ে হাঁটে কিনা,  ইত্যাদি সবকিছু তাদের সাথে মানুষের স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করে।

এখানে আনক্যানি ভ্যালি তত্ত্বের কথা বলা যায়। এ তত্ত্ব অনুসারে, যেসব রোবট বা অ্যানিমেশন দেখতে মানুষের মতো নয়, দর্শক তাদের কম পছন্দ করে। Roomba নামে একটি রোবটের কথা উল্লেখ করা যায়। সে ঘর সংসারের সকল কাজ করতে পারতো। একদিন সেটি আগুনে পুড়ে যায়। তার চেহারা মানুষের মতো ছিল না, কিন্তু মানুষ ঠিকই তার প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় চেহারা মানুষের মতো না হলেও সহানুভূতি অনুভব করে মানুষ। মানব মন তথা মানব মস্তিষ্ক বড়ই রহস্যজনক।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ডট কম

featured image: bbport.ru

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!

ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।

ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।

আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion

protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion

ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি

করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।

মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!

চিত্রঃ বিশ্বখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’।

ডার্ক ওয়েবের ডার্ক সাইডের কিছু উদাহরণ স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তুলে ধরছি।

চিত্রঃ ডার্ক ওয়েবে ভাড়াতে খুনিও পাওয়া যায়।
চিত্রঃ স্বল্প দামে আইফোন বিক্রয়ের ওয়েবসাইট।

এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে

এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।

Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!

নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Dark_web

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Pseudo-top-level_domain

৩. http://www.investopedia.com/ask/answers/100314/what-are-advantages-paying-bitcoin.asp

৪. http://www.coindesk.com/calculator/                                                                 

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Silk_Road_%28marketplace%29

৬. http://torlinkbgs6aabns.onion/

৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Tor_%28anonymity_network%29

৮. http://www.networkworld.com/article/2228873/microsoft-subnet/no-conspiracy-theory-needed--tor-created-for-u-s--gov-t-spying.html

কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হবে মানুষের মস্তিষ্ক

ইলন মাস্ক এমন একটি প্রযুক্তি জন্য কাজ করছেন যার মাধ্যমে মানুষের ব্রেন সরাসরি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত করা যাবে। এই প্রযুক্তি এরকম হবে না যে মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সাথে প্লাগ ইন করা হলো। এখানে ব্যবহার হবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট। মস্তিষ্ক থেকে নির্গত তরঙ্গকে সিগনাল হিসেবে গ্রহণ করা এবং তা কম্পিউটারে প্রেরণ করা হচ্ছে ঐ হ্যালমেটের কাজ।

image source: concarez.com

তেমনই কম্পিউটারও তরঙ্গ হিসেবে সিগনাল প্রেরণ করবে যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক হ্যালমেট গ্রহণ করে মস্তিষ্কের উপযোগী করে নেবে। ফলাফল, কম্পিউটার এবং মস্তিষ্ক একে অপরের সাথে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

যদি সত্যিই এই প্রযুক্তি বাস্তবায়িত হয় তাহলে এর ফলাফল মানবজাতির জন্য অনেক কিছু বয়ে আনবে। তবে এই প্রযুক্তির প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য ছিল মস্তিষ্কের মাধ্যমে কোনো কাজ করা। যেমন প্রতিবন্ধীরা হাত পায়ের সাহায্য ছাড়াই কোনো কিছু নাড়ানো, খাওয়া, মস্তিষ্কের মাধ্যমে কথা বলা, মস্তিষ্কের সাহায্যে গাড়ি বা যানবাহন চালানো সহ আরো অনেক কিছু। ধরে নেয়া যায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক কিছুই সম্ভব, যা আগে মানুষ সম্ভব বলে ভাবতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

www.technewsworld.com/story/Elon-Musk-Plans-to-Build-a-Human-AI-Interface-84415.html

সাবমেরিনের ব্যাবচ্ছেদঃ যেভাবে কাজ করে সাবমেরিন

সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ, সুন্দর ও মিষ্টি এই নামটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কানে রক্ত শীতল করা শব্দ। ১৫৬২ সালে রাজা পঞ্চম চার্লস-এর উপস্থিতিতে ২ জন গ্রিক প্রথম সাবমারসিবল (অর্ধডুবোজাহাজ)-এর মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। এটিকে দাঁড় টেনে চালাতে হতো। পরে ১৫৭৮ সালে ইংরেজ গণিতবিদ ব্রূনো আর ১৫৯৭ সালে স্কটিশ গণিতবিদ নেফিয়ার তাদের বইতে ডুবোজাহাজ নিয়ে কিছু আঁকিবুকি করেন। পরবর্তীতে ১৮ শতকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি শুরু হয় ডুবোজাহাজের।

গঠনপ্রণালী

সাবমেরিনের নাক থেকে শুরু করা যাক। সাবমেনিরের কাঠামোর চিত্রে যেটা Bow নামে দেখা যাচ্ছে ওটাই নাক। এটা সাবমেরিনের সামনের দিক। সাবমেরিন শুধু সামনের দিকে এবং স্বল্প গতিতে পেছনের দিকেও যেতে পারে। পাশাপাশি যেতে পারে না।

নাকের নিচে Sonar Dome নামে একটি অংশ আছে যা দিয়ে জাহাজটা তার আশেপাশের বস্তুর আকৃতি, দূরত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেয়। এদের মাঝে আছে চেইন লকার নামে একটি অংশ যা ডুবোজাহাজকে কোথাও নোঙর করতে ব্যবহৃত হয়।

এদের পেছনেই থাকে টর্পেডো কক্ষ (Torpedo Room)। সাধারণত এখানে ৩ টি টর্পেডো নিক্ষেপক (launcher) থাকে। পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড বাড়তি টর্পেডো রাখার জায়গাও থাকে। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকেও এমন একটি ঘর থাকে। পার্থক্য হলো ঐ ঘরে ২ টি নিক্ষেপক থাকে। তবে উন্নত মডেলে এর পরিমাণ বাড়তে পারে।

টর্পেডো ঘরের পেছনেই অফিসারদের থাকবার জায়গা (Quarters)। এর নিচে থাকে ডুবোজাহাজের ব্যাটারির স্থান। তার নিচেই থাকে জাহাজের চালিকাশক্তির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি। এই তেলের ঘরটি আসলে ওই প্রস্থচ্ছেদের সাবমেরিনের পুরো অংশ জুড়েই খোলসের মতো থাকে। তেল ডুবোজাহাজের ভারসাম্যে রক্ষাতেও অবদান রাখে।

অফিসারদের ঘরের পেছনেই থাকে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room)। এখান থেকে পুরো সাবমেরিনকে পরিচালনা করা হয়। এর সাথেই থাকে রেডিও রুম আর উপরে থাকে কনিং টাওয়ার। টাওয়ারের অংশ থেকে রেডিও এন্টেনা ও পেরিস্কোপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্যারিস্কোপের মাধ্যমে পানির নিচে থেকেই উপরের স্তরের জাহাজ বা অন্যান্য বস্তুর অবস্থান দেখে নেয়া যায়।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিচেই পাম্প রুম। যা দিয়ে পানি কমিয়ে বাড়িয়ে ডুবোজাহাজকে ডুবানো বা ভাসানো হয়। এর সাথে লাগোয়া খোলস ঘরটি হচ্ছে ব্যালাস্ট ট্যাংক। সাধারণত সাবমেরিনের মডেল ও আকার ভেদে চারটি বা তার অধিক ব্যালাস্ট ট্যাংক থাকে। সাবমেরিনের দুই পাশে দুটি ট্যাংকের মতো অংশ থাকে। এগুলো হচ্ছে ট্রিম ট্যাংক বা ভারসাম্য শোধন ঘর।

নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পেছনেই থাকে নাবিকদের থাকার কক্ষ (Mess) ও এর সাথে লাগোয়া কর্মচারীদের কক্ষ (Crew’s Quarters)। এদের নিচে একটি ব্যাটারি কক্ষ আছে। এর চারপাশে খোলসঘরে আছে তেল। এর পেছনেই ইঞ্জিন কক্ষ। মোট চার জোড়া ইঞ্জিন থাকে যারা তেল হতে শক্তি দিয়ে ডুবোজাহাজের পেছনের টারবাইন বা পাখা ঘোরায় এবং ব্যাটারী চার্জ করে। ব্যাটারীর চার্জ দিয়ে পানির নিচে নিঃশব্দে চলা যায়।

হালকালের কিছু সাবমেরিন নিউক্লিয়ার শক্তি দিয়ে চালনা করা হচ্ছে ফলে তারা পানির নিচে থাকতে পারে অনেক সময়। কিন্তু সমস্যা হলো এর ইঞ্জিন কখনোই সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায় না। ফলে যুদ্ধে শতভাগ শব্দহীনতা এটা দিতে পারে না যা ডিজেল ইঞ্জিন চালিত পুরাতন ডুবোজাহাজগুলি দিতে পারে।

ইঞ্জিনরুমের পেছনেই ম্যানুভারিং রুম নামে একটি অংশ থাকে যেখান থেকে পুরো ডুবোজাহাজের যন্ত্রপাতির অবস্থা, বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিক চালিকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ডুবোজাহাজের পেছনের দিকে রাডার নামে একটা বৈঠা থাকে যা দিয়ে এর গমন দিক নির্ধারণ করা হয়।

খোলসের ঘরগুলোয় যাবার জন্য ডুবজাহাজের উপরের কাঠামো (Deck Casing) হতে কিছু চাকতি আকৃতির দরজা থাকে। টর্পেডো রুম হতে বের হবার জন্যও এ ধরনের দরজা থাকে।

ডুবোজাহাজের কাঠামো সাধারণত এমন ধরনের লোহা সংকরে তৈরি হয় যেন তা পানির নিচে পানির চাপ সহ্য করতে পারে। সামনের দিকের আকৃতি এমন হয় যে তা যেন সহজেই পানি ভেদ করে এগুতে পারে।

সাবমেরিনের চলন পদ্ধতি

প্রথমেই সাবমেরিনের সামনের ব্যালাস্ট ট্যাংকে আল্প পানি প্রবেশ করানো হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে মাঝের দুটি ও পেছনেরটিতে পানি প্রবেশ করানো হয়। তারপর ধীরে ধীরে ডুবা শুরু করলে ট্রিম ট্যাংক-এ পানি কম বেশি করে ডুবোজাহাজের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হয়। ভাসবার সময় পাম্প হতে উচ্চ চাপের বাতাস প্রবেশ করানো হয় ব্যালাস্ট ট্যাংকে। তা দিয়ে ঠেলে পানিকে বের করে দেয়ার মাধ্যমেই এটা ভেসে ওঠে পানির ওপরে।

নাবিকদের জন্য প্রচুর রসদ, তেল ও সব ধরনের মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে পানিতে ডোবার পর Sonar ও রাডারের মাধ্যমে পথ চিনে গুটিগুটি ছন্দে এগোয় গুপ্তবাহন এই ডুবোজাহাজগুলো। হারিয়ে যায় সমুদ্রর অতলে কয়েক মাসের জন্য।

তথ্যসূত্র

মিলিটারি ডট কম, ইউটিউব, উইকিপিডিয়া

featured image: bastion-karpenko.narod.ru

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/