গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik

স্পেস এক্সের ফ্যালকন হেভির অন্য এক গোপন উদ্দেশ্য, যার কথা খুব কম মানুষই জানে

গত সপ্তাহে স্পেস এক্সের ঐতিহাসিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণের পর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্টারম্যান এবং টেসলা। তবে সেটার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস মহাকাশে নিয়ে গেছে ফ্যালকন হেভি যার সম্পর্কে তেমন কারো আগ্রহ দেখা যায়নি।

টেসলা রোডস্টার গাড়িটির ভেতরে লুকানো ছিল বিলিয়ন বছর ধরে টিকে থাকতে সক্ষম ছোট্ট রহস্যময় একটি বস্তু। মহাকাশ কিংবা দূরবর্তী কোনো গ্রহের পৃষ্ঠেও যা থাকবে অটুট। এটার নাম আর্ক । যা দেখতে কয়েনের মতো কোয়ার্টজ ক্রিস্টালের একটা ডিস্ক। এটা তৈরি কিরা হয়েছে প্রচুর পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার জন্য।

ফ্যালকন হেভির উৎক্ষেপন; Image Source: spacenews.com

এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন নামক এক ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাদের ভাষ্যমতে আর্ক ডিস্ক স্থান কালের বাঁধা অতিক্রম করে জ্ঞানকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংরক্ষণ ও ছড়িতে দিতে পারব।

দেখে মনে হতে পারে আর্ক হলো ডিভিডি কিংবা ব্লু রে ডিস্কের মিনিয়েচার, তবে এর সংরক্ষণ ক্ষমতা ঘরের ডিস্কগুলোর চেয়ে হাজার গুন বেশি। এর ধারণক্ষমতা তত্ত্বীয়ভাবে ৩৬০ টেরাবাইট যা প্রায় ৭০০০ ব্লু রে ডিস্কের সমান।

তবে ধারণক্ষমতার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো এর আয়ুষ্কাল। আর্কের প্রথম দুটো ভার্শন আর্ক ১.১ এবং আর্ক ১.২ কে বলা হয় মানুষের দ্বারা এযাবতকালের তৈরি সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর এরা ১৪ বিলিয়ন বছর পরেও নষ্ট হবে না। এই ডিস্কে কোয়ার্টজ সিলিকা গ্লাসের গায়ে লেজার ন্যানোস্ট্রাকচারিং এর মাধ্যমে তথ্যগুলো সংরক্ষণ করা হয়।

সবচেয়ে টেকসই স্টোরেজ ডিভাইস আর্ক; Image source: www.sciencealert.com

উৎক্ষেপিত টেসলা গাড়িটি মহাকাশে ঘন্টায় ১২৯০৮ কিলোমিটার গতিতে ছুটছে, আর তাতে লুকিয়ে রাখা আর্ক ১.২ ডিস্ক বহন করে নিয়ে যাচ্ছে আইজ্যাক আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের তিনটি বইয়ের ডিজিটাল প্রতিরূপ। আর্ক তৈরির সাথে জড়িতরা এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন “সোলার লাইব্রেরি”। সহ প্রতিষ্ঠাতা নোভা স্পিভ্যাক আশা করেন, এই সোলার লাইব্রেরি বিলিয়ন বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে। তিনি আরো বলেন “ভেবে নিন এটা সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী একটি জ্ঞানের বলয়, যা মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে সৌরজগত এবং এরও বাইরে ছড়িয়ে দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ।”

২০২০ এবং ২০৩০ সালে আরো দুটি রকেট উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা মাথায় রেখে তারা কাজ করছেন। প্রথমটার উদ্দেশ্য হবে চাঁদ, পরেরটার মঙ্গল। লাল গ্রহে পাঠানোর জন্য যে ডিস্কটি তৈরি হবে সেটার সংরক্ষিত তথ্য সেখানকার উপনিবেশকারীদের স্থানীয় ইন্টারনেট তৈরিতে কাজে লাগবে।

কথাগুলো শুনতে আশ্চর্য শোনালেও সত্যিকার পরিকল্পনা আরো বড়। আর্কের পেছনের মানুষেরা চান এই আর্ক লাইব্রেরিগুলো সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ এবং তার বাইরেও ছডিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদানের বিকেন্দ্রীভূত একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে। বেশ উচ্চাভিলাসি মনে হলেও আপনি নিজেকেই প্রশ্ন করুন তো, কখনো কি ভেবেছিলেন ২০১৮ সালে টেসলা রোডস্টার সূর্যকে প্রদক্ষিন করবে?

featured image: mensxp.com

বুরানঃ একটি রুশ রূপকথা

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে এবার বুঝি আর রক্ষা পাওয়া যাবে না। মার্কিনীরা এমন এক মহাকাশযান তৈরি করছে যা মহাকাশে গিয়ে প্রায় অক্ষত অবস্থায় আবার ফিরে আসতে পারে। এবং এটি পারমাণবিক বোমা বহনেও সক্ষম। মার্কিনীরা যানটার নাম দিয়েছে ‘স্পেস শাটল’। স্নায়ুযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে এখন সোভিয়েতদেরও চাই এমন একটি যান যেটা কাজ করবে ঠিক মার্কিনীদের মহাকাশযানের মতো কিংবা তার থেকেও বেশি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এভাবেই শুরু হয় পুনরায় ব্যাবহারযোগ্য মহাকাশযান বানানোর প্রতিযোগিতা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির এক ডিক্রির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘বুরান-এনারগিয়া’ প্রজেক্ট।

চিত্রঃ মার্কিন স্পেস শাটল (বামে) ও রাশিয়ান বুরান (ডানে)।

কাজাখাস্থানের বৈকনুর কসমোড্রামের এক গোপন কারখানায় শুরু হয় এই প্রজেক্ট। রুশ ভাষায় বুরান শব্দের অর্থ ‘তুষার ঝড়’। মূল যান প্রস্তুত করার দায়িত্ব পায় সোভিয়েত ইউনিয়নের তৎকালীন রকেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি RKK Energia। প্রস্তুতকারক দলের প্রধান ছিলেন রকেট বিশেষজ্ঞ ‘গ্লেভ লোজিনো-লোজিনস্কি’, যিনি এর আগে ‘স্পাইরাল’ প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। তার সাথে যুক্ত হয় ১২০০ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং সোভিয়েত সরকারের প্রায় ১০০ মিনিস্ট্রি। বাজেট ধরা হয় প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন রুবল। সোভিয়েত রকেট বিজ্ঞানীরা ঠিক মার্কিনীদের মতোই একটি যান প্রস্তুত করতে থাকেন। তবে এটি আরো উন্নত সংস্করণ। বুরানকে মোট ১০ জন নভোচারী বহনের ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্থুত করা হয়। এর ওজন বহন ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়। এটি ৩০ টন পরিমাণ ভর নিয়ে মহাকাশে যেতে পারত এবং ফিরে আসতে পারত ২০ টন নিয়ে। এর গায়ে তাপ নিরোধক প্রায় ৩৮০০০ টি টাইলস বসানো ছিল। যে বৈশিষ্ট্যটি বুরানকে মার্কিন স্পেস শাটল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছিল তা হলো, প্রকৌশলীরা একে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা সম্পন্ন করে প্রস্তুত করেন। মানুষ্যবিহীন অবস্থায় মহাকাশে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবে।

১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে বুরান তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে। মহাকাশে গিয়ে পৃথিবীকে ২০৬ মিনিটে দুইবার প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে। ২০১০ সাল পর্যন্ত বুরান ছিল একমাত্র মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান যেটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। বুরানের এই কীর্তি সোভিয়েত নেতাদের গোপনীয়তার কারণে দীর্ঘদিন পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি।

এর কিছুদিন পরই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অন্য অনেক প্রজেক্টের মতো ‘বুরান’ প্রজেক্টও বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ জুন ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেতসিন আনুষ্ঠানিকভাবে বুরান প্রজেক্টের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এই প্রজেক্টে বুরানের কিছু প্রোটোটাইপ তৈরি হয়, যাদের একটির নাম ‘পিচকা’, এর কাজ ৯৭% সম্পন্ন হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। আরেকটি প্রোটোটাইপ ‘বৈকাল’, এর ৫০% কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এটি দীর্ঘদিন ধরে অনেক অবহেলায় একটি পুরনো গাড়ির গেরেজে পড়ে ছিল। মস্কোর ম্যাক্সিম গোর্কি পার্কের দর্শকরা সকাল-বিকাল দেখে তাদের স্বপ্নের করুণ অবস্থা। এখানেও রাখা আছে বুরানের একটি প্রোটোটাইপ। পর্যাপ্ত দেখভালের অভাবে যেটি ধ্বংসপ্রায়। প্রায় ১৫ বিলিয়ন রুবল বাজেটের এই প্রজেক্টের কোনো মেটারিয়ালই পরবর্তীতে কোথাও ব্যবহার করা হয়নি। রুশ মহাকাশ একাডেমির বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ঝিলকিয়ানভের কণ্ঠে নিদারুণ হতাশা ফুটে ওঠে- “Buran was made to shine in Space, but finally it died on Earth”।

বুরান গল্পের শুরু হয় ১৫ ই নভেম্বরের এক রৌদ্দোজ্বল দিনে। এই গল্প শেষ হয় ১২ ই মে ২০০২ সালের এক বৃষ্টিভেজা দিনে। কিছু কর্মী কাজাখাস্থান কসমোড্রামের হ্যাজ্ঞার ১১২ মেরামত করছিল যেখানে রয়েছে বুরান ১.০১। একমাত্র এই মডেলটিই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল। মেরামতের এক পর্যায়ে হ্যাজ্ঞারটির ছাদ ধ্বসে পড়ে। এই দুর্ঘটনায় ৭ কর্মীর মৃত্যু হয়। পাশাপাশি মৃত্যু হয় এক রঙিন স্বপ্নের। জন্ম হয় নতুন এক রুশ রুপকথার, যার নায়ক এক নিসঃজ্ঞ মহাকাশযান।

তথ্যসূত্র

  1. http://www.russianspaceweb.com/buran.html
  2. http://www.buran.ru/htm/molniya.htm
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Buran_programme
  4. http://www.buran.ru/htm/techno.htm

     

জেনেটিক সুপারহিরো

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে। এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন। এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা

সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য। হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

জেনেটিক সুপারহিরো

অনেক বছর আগে এক্স-ম্যান সিরিজের শুরুর দিকের কোনো একটা সিনেমাতে মিউট্যান্ট শব্দটি প্রথম শুনেছিলাম। এক্স ম্যান ছাড়াও অনেক গল্প সিনেমাতে সুপারহিরো তৈরির অন্যতম সরঞ্জাম হলো মিউটেশন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা বাস্তবে যত ধরনের মিউটেশন সম্পর্কে জানি তার বেশিরভাগের ফলাফলই ক্ষতিকর। এখন যদি কোনো মানুষের মাঝে এমন ক্ষতিকর মিউটেশন থাকা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক দিন কাটাতে পারেন, তাহলে কি তাকে একজন সুপারহিরো বলা যায়?

প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের জিন গবেষণা করে খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী মিউটেশন ধারণকারী হওয়া সত্ত্বেও সুস্থ। এই সৌভাগ্যবান ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে ৮ ধরনের জিনগত ব্যাধির মিউটেশন। সিস্টিক ফাইব্রোসিস, আটেলোস্টিওজেনেসিস-সহ ৮ ধরনের ব্যাধি, যেগুলোতে আক্রান্ত শিশু জন্মের বেশি দিন বাঁচে না।

আইকান স্কুল অব মেডিসিনের এরিক শাট এবং একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সেজ বায়োনেটওয়ার্কস এর স্টিফেন ফ্রেন্ড এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। বিখ্যাত বায়োটেকনোলজি কোম্পানি 23andme এবং বেইজিং জিনোমিক্স ইন্সটিটিউট প্রাথমিকভাবে ৫৮৯,৩০৬ জনের ডিএনএ সিকোয়েন্স যোগান দেয়। এর মধ্যে ৩,৫২৪ জনের ছিল সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স। বাকিগুলো ছিল এক্সোম সিকোয়েন্স কিংবা নির্দিষ্ট কিছু জিনের মিউটেশন পরীক্ষার তথ্য।

ডঃ এরিক, ডঃ ফ্রেন্ড এবং তাদের সহকর্মীবৃন্দ শুধুমাত্র মেন্ডেলিয় ব্যাধির সাথে জড়িত জিনের মিউটেশনের উপস্থিতিকে বিবেচনা করে সিকোয়েন্স সংখ্যাকে কমিয়ে আনেন ১৫,৫৯৭ তে। ঐ জিনগুলোতে বিভিন্ন রকম মিউটেশন ঘটলেও যেসব মিউটেশনে সবসময়ই রোগ সৃষ্টি হয় তারা সেগুলোকেই নির্বাচিত করেন। এই ১৫,৫৯৭ জন ১৬৩ টি ব্যাধির সাথে জড়িত মিউটেশনগুলোর অন্তত একটি ধারণ করেন।

এই পর্যায়ে তারা যেসব সিকোয়েন্সে ভুল থাকতে পারে সেগুলো বাদ দেন। এরপরে যেসব মিউটেশন ০.৫ শতাংশে জনগণে পাওয়া যায় সেসবও বাদ দিলেন। কেননা সুলভ ধরনের মিউটেশনে সাধারণত রোগের তীব্রতা মৃদু থাকে। এই অবস্থায় মাত্র ৩০৩ জন অবশিষ্ট থাকে যাদের ডাক্তারি রিপোর্ট বলে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত মারাত্মক সব জিনগত রোগের সাথে জড়িত মিউটেশনগুলো বহন করছেন, যেসবে মানুষ বয়ঃপ্রাপ্তির আগেই মারা যায়। গবেষক দল যেসব কেসের জন্য পেরেছেন সেসবের জন্য আবার জৈব স্যাম্পল সংগ্রহ করে ডিএনএ সিকোয়েন্স যাচাই করে দেখেছেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক যাচাই বাছাই করে রইলো মাত্র ১৩ জন। কিন্তু সমস্যা যেটা এদের প্রত্যেকেরই সিকোয়েন্স হলো আংশিক সিকোয়েন্স। তাহলে, পরবর্তী যৌক্তিক ধাপ হতে পারে তাদের সম্পূর্ণ ডিএনএ সিকোয়েন্স করে দেখা। কী কারণে এই বিধ্বংসী মিউটেশন, যেগুলো সাধারণের মৃত্যুর কারণ, সেগুলো ধারণ করেও তারা বহাল তবিয়তে আছেন। এমন কোনো জিন যদি পাওয়া যায়, যেটা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তাহলে সেটাকে কেটে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে আক্রান্ত কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে পর্যবেক্ষণ করা… কী ফলাফল পাওয়া যায়। কিংবা এমনও হতে পারে তাদের জিনোমের অন্য কোনো মিউটেশন তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার এটাও হতে পারে, তারা যে পরিবেশে বসবাস করছেন সেখানকার কোনো উপাদানই হয়তো তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছে। অনেক কিছুই হতে পারে, যা

সঠিকভাবে জানা গেলে হয়তো নতুন ধরনের চিকিৎসা উদ্ভাবন সম্ভব ওই রোগগুলোর জন্য। হতাশার ব্যপার এটাই যে গবেষকরা এটা করতে পারছেন না। কারণ সাবজেক্টরা, যাদের ডিএনএ নিয়ে গবেষণাটি করা হলো, তারা সম্মতিপত্রে নিজেদের কোনো ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এই জেনেটিক সুপারহিরোদের পরিচয় একটি রহস্য। হয়তোবা তারা আমাদের আশেপাশেই ঘুরাফেরা করে চলছে, আমরা তাদের চিনতে পারছি না, তারাও নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

রোবটের চোখঃ স্পৃহা

‘জিরো টু ইনফিনিটি’র এপ্রিল সংখ্যায় আলোচিত ‘রোবোটাক্ষু’র পরিমার্জিত ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবে এবার আমরা নিয়ে এসেছি স্পৃহা বা Speech Recognition Robot for In-house Assistance (SPRRIHA)।

গত বছর আই.ইউ.টি-তে অনুষ্ঠিত প্রজেক্ট শো’তে আমরা অংশগ্রহণ করি। তাছাড়াও আমাদের টিমের ৪ জন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করে। আমাদের দলের সদস্যরা হচ্ছে নওয়াব আমিনুল হক (ক্যাড ডিজাইন), মোহাম্মাদ মেহেদি হাসান (স্পিচ রিকগনিশন, রাস্পবেরি পাই), আশিক-ই-রাসুল (ইলেক্ট্রনিক্স), ইরফান মোহাম্মাদ আল হাসিব (অবজেক্ট ডিটেকশন, রাস্পবেরি পাই), আব্দুল মুহাইমিন রাহমান (ন্যাভিগেশন, পজিশনিং সিস্টেম, কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং)। ৫ জনের এই টিমের নাম ‘উন্মাদ’।

স্পৃহার বৈশিষ্ট্য

রোবট যেন খুব দ্রুত কাজ করতে পারে সে ধরনের এলগরিদম বের করার ব্যাপারে প্রচুর টিপস পেয়েছি আমরা। আগে যে রোবট বানিয়েছিলাম সেটার অন্যতম সমস্যা ছিল, সেটাতে ইমেজ প্রসেসিং-এর কাজ করতে অনেক সময় ব্যয় হতো। ম্যাটল্যাবে কাজ করেছিলাম বলে এমন হয়েছিল।

এবার আগের রোবটের থেকেও উন্নত মানের কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করার চেষ্টা করেছি। আগের রোবট ছিল দূর নিয়ন্ত্রিত। এবার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে রোবটের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যেমন রোবটে স্পিচ রিকগনিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইংরেজিতে কিছু বললে, সেটা রোবট টেক্সটে কনভার্ট করে বুঝতে পারবে কী কী নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আপাতত খুবই প্রাথমিক কিছু নির্দেশের ব্যবস্থা করেছি। জটিল সব বাক্য গঠনের জন্য ভবিষ্যতে আরো কাজ করা লাগবে।

আরেকটি ফিচার হচ্ছে ‘অবজেক্ট ডিটেকশন’। রোবটটি কোনো রুমে কোনো বস্তুকে ডিটেক্ট করে সেদিকে যেতে পারবে। এখন রোবটে রোবটিক আর্ম লাগানোর জন্য কাজ করছি, যেন কিছুটা দূর থেকে কোনো বস্তুকে ধরে নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে স্পিচ রিকগনিশনের সাথে অবজেক্ট ডিটেকশন পাশাপাশি যুক্ত। কারণ রোবটকে নির্দেশ দিলে সে ঐ নির্দেশ অনুযায়ী বস্তুর অনুসন্ধান শুরু করবে। এক্ষেত্রেও আমরা প্রাথমিক ধাপে রয়েছি, কারণ এই রোবটে ব্যবহার করছি রাস্পবেরি-পাই। এটি একটি অন বোর্ড কম্পিউটার যার প্রসেসিং ক্ষমতা খুব একটা বেশি নয়।

উপরের ফিচারগুলো নিয়ে আমরা অনেক কাজ করলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হয়তোবা আমাদের চেয়েও ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু এই রোবটের যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে খুবই কম কাজ হয়েছে, সেটা হচ্ছে রোবটের জন্য আলাদা ‘পজিশনিং সিস্টেম’। অর্থাৎ রোবটের জন্য আলাদা জিপিএস এর মতো ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। একটিমাত্র ক্যামেরা এবং একটি জাইরোস্কোপের সাহায্যে কোনো রোবট রুমের কোনো অবস্থানে আছে সেটাও বের করতে পেরেছি।

এই পজিশনিং সিস্টেম নিয়েও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর অনেক সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রোবটের হিসাব নিকাশে অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়। আমাদের পজিশনিং সিস্টেমে একটি সার্ভার কম্পিউটার রোবটের অবস্থান বের করেই তাকে তার স্থানাংক বলে দিচ্ছে। যার ফলে রোবটের কোনো হিসাবনিকাশে বলতে গেলে কোনো সময় ব্যয়-ই হচ্ছে না! বাকি-দুটো ফিচার প্রাথমিক ধাপে থাকলেও এই ফিচারের কাজ অনেক খানি এগিয়ে গিয়েছে। বাসায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সময়ও খেয়াল করেছি ত্রুটি আসছে অনেক কম।

তবে যে বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে দুর্লভ, দেশে কম কাজ হয়, নেভিগেশন সিস্টেম নিয়ে বেশ ভালোই কাজ এগিয়েছে। রোবটটিকে তার অবস্থান বাতলে দেবার জন্য আলাদা একটি সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যা খুব ভালো কাজ করছে।

এই রোবটের আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, পজিশনিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘ইমেজ প্রসেসিং’-এর এলগরিদম এবং স্ট্রাকচারে কিছু পরিবর্তন এনেছি। একই কাজ করতে ম্যাটল্যাবে অনেক সময় লাগত। ম্যাটল্যাবের সাথে ওপেনসিভি যোগ করে, ৬ গুণ দ্রুততার সাথে করতে সক্ষম হয়েছি।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এই রোবটটি শুধুমাত্র একটি মডেল। এই কাজগুলো শতভাগ দক্ষতার সাথে করার জন্য আরো বড় সেটআপে হাই কনফিগারেশনের জিনিসপত্র লাগবে যেগুলো আমাদের পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা ছোট মডেলের ব্যবস্থা করি। ব্যবহারিক দিক বলতে অনেক কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, শিল্প কারখানাগুলোতে বিভিন্ন স্থানে বস্তু স্থানান্তর করা লাগে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পজিশনিং সিস্টেম অনেক কাজে লাগতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই রোবটের কাজ এখনো শেষ হয়নি। খুব বড় কিছু ফিচার ডেভেলপ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আরো কিছু ফিচারের কাজ বাকি আছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে সেগুলোও করা হয়ে যাবে। দলের সবারই রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে দেশের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা অনেক দিনের।

নেপথ্যে অবদান

এক্ষেত্রে Avro HighTech এর দেওয়ান আরিফ ভাইয়ের কথা উল্লেখ করতে হয়। বুয়েটেক.কম এ ফিচার বের হবার পর উনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের প্রজেক্টে আর্থিক সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

সম্ভাবনা

দেশে এখন রোবটিক্স নিয়ে খুব ভালো মানের কাজ হচ্ছে। এখানে সেখানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাও হচ্ছে। কিন্তু কিছু সমস্যার দেখাও মিলে। আমাদের কাছে মনে হয় ভালো মানের রোবটের জন্য খুব ভালো মানের আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স নিয়ে রিসার্চ ল্যাব হলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোবট গবেষণার জন্য ফান্ডিং দিলে দেশে রোবোটিক্স আরো অনেক এগিয়ে যাবে।

আগ্রহীদের প্রতি পরামর্শ

যাদের রোবটিক্সে আগ্রহ আছে তাদের জন্য দুটো শব্দই বলব, ‘লেগে থাকো’। প্রথম দিকে রোবট নিয়ে কাজ করার সময় অনেক কথা শুনতে হয়েছে। “এদেশে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে ভবিষ্যৎ নেই”, “চায়না জাপানে যেরকম সুবিধা পাওয়া যায় সেরকম সুবিধা এখানে পাওয়া যায় না” ইত্যাদি ইত্যাদি। ঐসব নেতিবাচক কথাবার্তা পাত্তা দিলে কিছুই হবে না। আমার কাছে চার্চিলের একটা কথা খুবই পছন্দের, “আপনি রাস্তা দিয়ে হাটার সময় ঘেউ ঘেউ করা প্রতিটা কুকুরকে তাড়াতে গেলে রাস্তা দিয়ে আর হাটা হবে না!”

অন্ধকার দুনিয়ায় স্বাগতম

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে Google-এর নাম শুনেনি এমন মানুষ বোধহয় Google-এ সার্চ করেও খুঁজে পাওয়া যাবে না! যে কোনো তথ্যের জন্য আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল এই জায়ান্ট সার্চ ইঞ্জিন Google। আমি এবার আপনাদের একটু চমকিত করব। আপনি জানেন কি, ইন্টারনেট দুনিয়ার অর্ধেকের চেয়েও বেশি তথ্যের খোঁজ গুগলের কাছে নেই!

ইন্টারনেট দুনিয়ার এই তথ্যসম্ভারকে আমরা দুই ভাগে করতে পারি। ১. Surface web বা Visible web। এটা হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সেই অংশ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে এ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ২. Deep web বা Invisible web। এটা surface web এর উল্টো। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যে অংশ স্ট্যান্ডার্ড সার্চ ইঞ্জিনে লিপিবদ্ধ করা নেই, সেগুলোই হলো deep web এর অন্তর্ভুক্ত।

ডিপ ওয়েবের ছোট একটা অংশকে বলা হয় ডার্ক ওয়েব। এটা হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ যেখানে আপনি সাধারণ নিয়মে ঢুকতে পারবেন না। প্রচলিত ব্রাউজারগুলো সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সেখানে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে বিশেষ সফটওয়্যার ও কনফিগারেশনের সাহায্য নিতে হবে।

আমাদের আজকের আলোচনা ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে। তার আগে একটা তথ্য জেনে নেই, সার্চ ইঞ্জিন কেন ডিপ ওয়েব বা ডার্ক ওয়েবের তথ্য হাজির করতে পারে না? সার্চ ইঞ্জিনগুলো সার্চ করার কাজটি করে থাকে web crawler-এর মাধ্যমে। Web crawer-কে web robot-ও বলা হয়। এটি এক ধরনের প্রোগ্রাম বা স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিপ্ট (ইন্টারনেট বট) যা একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্রাউজ করে। কোনো একটা ওয়েবসাইট যেন সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে না পায় তার জন্য robots exclusion

protocol ব্যবহার করা হয়, যেটি web crawlers-কে সাইটগুলো লিপিবদ্ধ করা বা খুঁজে পাওয়া থেকে বিরত রাখে।

ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো সার্ফেস ওয়েবের সাইটগুলোর মতো সাধারণ কোনো ডোমেইন (যেমন .com)  ব্যবহার করে না। এরা ব্যবহার করে pseudo top-level domain। এই ডোমেইনের মধ্যে আছে .bitnet, .csnet, .onion ইত্যাদি। Pseudo top-level domain এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অফিশিয়াল Domain Name System-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এখানে প্রবেশ যায় না। শুধুমাত্র Tor gateway-র মাধ্যমেই এখানে প্রবেশ করা সম্ভব। ডার্ক ওয়েবের ওয়েব এড্রেসগুলোও বেশ জটিল, যেমন http://zqktlwi4fecvo6ri.onion

ডার্কনেটে পণ্য কেনাবেচা হয় বিটকয়েন (Bitcoin)-এর মাধ্যমে। বিটকয়েন হলো peer-to-peer ‘cryptocurrency’ system. বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা হলো এখানে কারো ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি জরুরী না। একইসাথে কোনো থার্ড পার্টির লেনদেন ট্র্যাক করার সুযোগ নেই। ফলে tax ধার্য করারও উপায় নেই। বিটকয়েনের মূল্যমান কিন্তু অনেক বেশি। বর্তমানে ১ বিটকয়েন = ৪৪৫ ডলার!

কীভাবে সৃষ্টি হলো ?

ডার্ক ওয়েব বা ডিপ ওয়েবের জন্ম নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটি এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছিল যেখানে তারা খুব গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। সামরিক বাহিনী, বিপ্লবী, ব্যবসায়ী, হ্যাকার, এমনকি খোদ প্রশাসনই এমন এক ব্যবস্থা চেয়েছে যেখানে তারা খুব গোপনে, নিরাপদে নিজেদের ভেতর তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে।

আপনি যদি ভেবে থাকেন অনলাইনে আপনার উপর কেউ নজরদারি করছে না, তাহলে ভুল ভাবছেন। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ডাউনলোড-আপলোড নজরে রাখছে আপনার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার। যে কোনো প্রয়োজনে তারা সেই তথ্য সরবরাহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তাই স্বভাবগত চাহিদার প্রেক্ষিতেই এমন এক ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয়েছে যেখানে প্রশাসন তদারকি

করতে পারবে না। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে ডিপ ওয়েব তথা ডার্ক ওয়েবের। যদিও সিকিউরিটি এজেন্সির নজরদারি থেকে বাঁচতে এটির জন্ম, কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এখানে অপরাধের বেশ বড় একটা শাখা গ্রথিত হয়েছে।

কী আছে এখানে?

কী নেই এখানে? এখানে এমন সব জিনিস আছে, যেটা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। মাদকদ্রব্য থেকে শুরু করে এমনকি পেশাদার খুনিও ভাড়া করা যায় এখানে। উইকিলিকসের শুরু হয়েছিল ডার্ক ওয়েবেই। এখানে রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ চাইল্ড পর্নোগ্রাফির মতো বিকৃত রুচির বিনোদন। রয়েছে পতিতা ভাড়া করার সুযোগ। নিষিদ্ধ এবং কপিরাইট আইনের কারণে সার্ফেস ওয়েবে নেই এমন সব বইয়ের অসাধারণ সংগ্রহ পাবেন এখানে। Apple, Microsoft-এর বিভিন্ন প্রোডাক্ট স্বল্প দামে কিনতে চান? সেটাও পারবেন ডার্ক ওয়েবে। যে কোনো দেশের অবৈধ পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স যোগার করতে পারবেন ডার্ক ওয়েব থেকে। কিনতে পারবেন অবৈধ অস্ত্র। এমনকি বোমা-বারুদ তৈরির যাবতীয় টিউটোরিয়ালও পাবেন অনেক ওয়েবসাইটে। এখানে প্রোফেশনাল কিলারের মতো প্রফেশনাল হ্যাকারও ভাড়া করা যায়।

মাদক দ্রব্য বেচাকেনার সবচেয়ে বিখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’-এর ডার্ক ওয়েবে যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৩ সালে FBI ওয়েবসাইটটিকে বন্ধ করে দেয় এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রস উইলিয়াম উলব্রিচকে গ্রেফতার করে। জানেন কি তারা এই দুই বছরে কত টাকার ব্যবসা করেছে? প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের!

চিত্রঃ বিশ্বখ্যাত অনলাইন ব্ল্যাক মার্কেট ‘Silk Road’।

ডার্ক ওয়েবের ডার্ক সাইডের কিছু উদাহরণ স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তুলে ধরছি।

চিত্রঃ ডার্ক ওয়েবে ভাড়াতে খুনিও পাওয়া যায়।
চিত্রঃ স্বল্প দামে আইফোন বিক্রয়ের ওয়েবসাইট।

এতসব খারাপ জিনিসের ভিড়ে এবার একটা ভালো জিনিসের খবর দিচ্ছি। বিভিন্ন ধরনের রিসার্চ পেপার ডাউনলোড করতে Sci-Hub এর কোনো বিকল্প নেই। যারা প্রজেক্ট বা থিসিস নিয়ে কাজ করছেন, তারা এর গুরুত্ব ভালভাবে বুঝতে পারবে। যদি কখনো সার্ফেস ওয়েবে Sci-Hub ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে ডার্ক ওয়েবের http://scihub22266oqcxt.onion/ এই এড্রেসটা মনে রাখুন, কাজে লাগবে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে না, নাকি নিতে পারছে না- এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের জানতে হবে কীভাবে এই নেটওয়ার্ক কাজ করে। ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে হয় অনিয়ন (onion) নেটওর্য়াকের সাহায্যে। এর pseudo top-level domain হল .onion। এই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে একটা বিশেষ ব্রাউজার, এর নাম Tor। তবে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে

এখানে প্রবেশ করা যাবে না- ব্যাপারটা এমন নয়। কিছু ওয়েবসাইট আছে যারা Tor-এর proxy ব্যবহার করে তাদের রাউটারের মাধ্যমে সাধারণ ব্রাউজার দিয়েই অনিয়ন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।

Tor ব্রাউজারের default settings আপনার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। যখন আপনি এটি দিয়ে কোনো সাইটে ঢুকতে যাবেন, তখন Tor আপনার রিকোয়েস্ট জটিল এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সি এই ডাটা নিয়ে অনিয়ন রাউটারে যাবে। সেখানে যাবার আগে অনিয়ন নেটর্য়াকের প্রবেশ পথে এই ডাটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায় এবং অনিয়নের একাধিক রাউটারগুলোর মধ্য দিয়ে যাবার সময় সেটি আবারো এনক্রিপ্টেড হয়। ফলে এখানে ডাটা চুরি করে এর প্রেরক ও প্রাপককে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে এখানকার ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

এখন আপনাদেরকে আরো একটা চমৎকার তথ্য দিচ্ছি। ২০১১ তে একবার টরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিল যে টর আসলে CIA-র একটা স্লিপার নেটওয়ার্ক। এটা সত্য কিনা সে ব্যাপারে যদিও কোনো তথ্য নেই, তবে CIA নিজেরাই যে এমন গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাবলিকের কাছে সার্ভিস দিচ্ছে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? তাছাড়া সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না এরা কীভাবে ডিপ কভার অপারেশন চালায়। Silk Road বন্ধ করে দেয়াই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ডার্ক ওয়েবে যদি আপনি আপনার আসল আইডেন্টিটি নিয়ে ঢুকেন অথবা কোনোভাবে আপনার আইডেন্টিটি ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ইন্টারপোলের ঝামেলায় পর্যন্ত পড়তে পারেন!

নিজেদের প্রয়োজনেই কোনো জিনিসের ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই জানতে হয়। ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে পা-টা সরিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই জেনে বুঝে কেউ ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিকে পা বাড়াবেন না এই প্রত্যাশায় শেষ করছি।

তথ্যসূত্র

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Dark_web

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Pseudo-top-level_domain

৩. http://www.investopedia.com/ask/answers/100314/what-are-advantages-paying-bitcoin.asp

৪. http://www.coindesk.com/calculator/                                                                 

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Silk_Road_%28marketplace%29

৬. http://torlinkbgs6aabns.onion/

৭. https://en.wikipedia.org/wiki/Tor_%28anonymity_network%29

৮. http://www.networkworld.com/article/2228873/microsoft-subnet/no-conspiracy-theory-needed--tor-created-for-u-s--gov-t-spying.html

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

এক বৈদ্যুতিক বালকের গল্প

তোমরা কি আমার লেখাটা পড়ছো? সবার হাতে হাতে লেখাটা পৌঁছে গেছে না? কিন্তু কীভাবে সম্ভব হলো এটা? যে যুগের মানুষ পাথর দিয়ে আগুন ধরাতো, তাদের কাছে কি সম্ভব ছিল এটা করা? টাইম ট্রাভেল করে আমি যদি সেই যুগে যাই, এইরকম একটা কাগজের বই বানিয়ে দেখাই তখন তাদের কাছে কি মনে হবে জানো? তারা ভাববে আমি ভয়ংকর কোন এক জাদুকর, জাদুটোনা দেখাচ্ছি। সেই যুগে এতদ্রুত দূর-দূরান্তে যোগাযোগ করা যেতো না, যোগাযোগের দ্রুততা নির্ভর করতো ঘোড়া কত দ্রুত দৌড়াতে পারে তার উপর।

কিন্তু কীভাবে আমরা পারলাম এই অসাধ্য সাধন করতে? এই কাজগুলোর পেছনে ছিল একজন মানুষের হাত। দরিদ্র এক বালকের হাত, যার থেকে এত কিছু কেউ আশাই করেনি।

ঐ মানুষটি যদি জন্ম না নিতো তাহলে বর্তমানের পৃথিবীর রূপটাই অন্যরকম হতো, আমরা সেই রূপ দেখতে পেলে ভয় পেয়ে যেতাম এখন। পৃথিবীটা তো ওরকমই হতো যদি জন্মই না হতো মাইকেল ফ্যারাডের।

চিত্র ১: মাইকেল ফ্যারাডে।

হতদরিদ্র এক পরিবারে জন্ম মাইকেল ফ্যারাডের। স্কুলে পড়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলায় অবশ্য স্কুলে একবার গিয়েছিলেন তিনি। ইংরেজি R শব্দটি উচ্চারণ করতে পারতেন না বলে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। তিনি নিজের নামটিও উচ্চারণ করতেন “মাইকেল ফ্যাওয়াডে”। ইতিহাস স্বাক্ষী যে, তিনি আর কোনোদিন স্কুলে যাননি। এই মানুষটিই বদলে দেন দুনিয়ার রূপ।

তিনি যখন কৈশোরে পা দেন, তখন একটা বই বাঁধাইয়ের দোকানে কাজ পান। দিনের বেলা বই বাঁধাই করতেন, আর রাতে সেগুলো পড়তেন। এভাবেই বিজ্ঞানের জগতে ফ্যারাডের প্রবেশ, বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসার জন্ম।

২১ বছর বয়সটা ফ্যারাডের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরটাই তার জীবন বদলে দেয়। লন্ডনের রয়্যাল ইন্সটিটিউটে যান তিনি, হামফ্রে ডেভীর বক্তৃতা শুনতে। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধতা আরো বেড়ে যায় বিজ্ঞানের প্রতি। হামফ্রে ডেভীর কথাগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখে একটা বই আকারে বাঁধাই করেন। ফ্যারাডের কাছে রয়্যাল ইন্সটিটিউট তখন এক স্বপ্নরাজ্য। সেখানে কাজ করার সুযোগ পেলে হাতছাড়া করবেন না তিনি, এমন মনোভাব। বাঁধাইকৃত বইটি তাই পাঠিয়ে দেন হামফ্রে ডেভীর নাম করে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে।

এর কিছুদিন পর, ডেভী একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে যেয়ে আহত হন। তার তখন মনে হয় সেই ছেলেটির কথা, যে তার বক্তৃতায় তালি না বাজিয়ে কথাগুলো টুকে নিচ্ছিল, সেই লেখাগুলোকে বই আকারে বাঁধাই করে দিয়েছিল। বিজ্ঞানের প্রতি অপার ভালবাসা লক্ষ্য করেই তিনি ফ্যারাডেকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন র‍য়্যাল ইন্সটিটিউটে।

তখনকার সময়ে বিজ্ঞানী ওয়েরস্টেড তার অসাধারণ আবিষ্কারটি সম্পন্ন করেন; তড়িৎবাহী তারের চুম্বকের ন্যায় আচরণ। ডেভীর কাছে সেটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মনে হয়নি, কিন্তু Faraday was on fire. তিনি এটাকে ব্যবহার করে এমন এক যন্ত্র তৈরি করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে; এই যুগের সূচনা করে। তিনি তৈরি করেন বৈদ্যুতিক মোটর। হাজার হাজার জিনিসের নাম বলে যেতে পারব, এই বইয়ের পাতা শেষ হয়ে যাবে, তবু উদাহরণের তালিকা শেষ হবে না। কত সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে, কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় মুহুর্তেই বদলে গেছে দুনিয়া। সবখানে মোটরের ব্যবহার, যেখানেই কিছু ঘুরছে সেখানেই মোটর। এটাই হলো বিদ্যুৎ থেকে গতিশক্তি পাওয়ার সূচনা।

কিন্তু সহকারীর এরূপ রাতারাতি বিখ্যাত বনে যাওয়া ডেভীর কাছে ভাল লাগেনি। ডেভী ফ্যারাডের কাজ বন্ধ করে দিয়ে পাঠিয়ে দেন কাঁচের কারখানায়। যে কাঁচের ব্যাপারে ফ্যারাডে কিছুই জানতেন না, তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বেলজিয়াম কাঁচ থেকেও ভালো মানের কাঁচ বানাতে হবে। কাঁচ বানানোতে বিশেষ কিছু করতে পারেননি তিনি। ডেভীর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ফ্যারাডে এই কাজ থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি হন রয়্যাল ইন্সটিটিউটের নতুন পরিচালক। কাঁচ নিয়ে কাজ করার সময় বাজে মানের যে কাঁচ তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে সামান্য কাঁচ স্মৃতিস্বরূপ রেখে দেন তার ল্যাবে। এই কাঁচটাই পরবর্তীতে আরেকটি নতুন আবিষ্কারের সূচনা করে।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন। আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ; যা ছাড়া বর্তমান পরিবর্তী প্রবাহের কথা চিন্তাই করা যায় না। তিনি আবিষ্কার করেন, পরিবাহীর তার কুন্ডলীর মাঝ দিয়ে চৌম্বক ফ্লাক্সের পরিবর্তন বিদ্যুৎ তৈরি করে। ওটাই ছিল প্রথম জেনারেটর। এখন জেনারেটরের কতশত রূপ দেখা যায়। বিদ্যুৎ থেকে গতি, গতি থেকে বিদ্যুৎ; শক্তির এরূপ পরিবর্তন দু’টোই ছিল ফ্যারাডের দখলে।

চিত্র ৩: পরিবর্তনশীল চৌম্বকক্ষেত্র থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ।

হঠাৎ করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, বার্ধক্য ঝেঁকে বসে, তার কাছে মনে হয় তিনি সবকিছু যেন ভুলে যাচ্ছেন, কোনো কিছু মনে থাকছে না। তাও তিনি তার সাফল্য চালিয়ে যান। আবিষ্কার করেন চৌম্বক বলরেখা, কাল্পনিক এই বলরেখার কারণেই চুম্বকের আচরণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানের পাতায় যুক্ত হয় ক্ষেত্রতত্ত্ব।

চৌম্বকক্ষেত্র আর তড়িৎক্ষেত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা চিন্তা করে তিনি ভাবেন এই দুইটি অদৃশ্য বস্তুর সাথে কি আরও একটি অদৃশ্য বস্তুর সম্পর্ক থাকা সম্ভব? আলো, আলোকরশ্মির সাথে কি চৌম্বকত্ব আর তড়িৎক্ষেত্রের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে? তিনি একটা এক্সপেরিমেন্ট করলেন। আমরা জানি যে, আলোকরশ্মি চারিদিকে সঞ্চারিত হয়। ফ্যারাডে পোলারাইজার ব্যবহার করে আলোকে আনুভূমিকভাবে সমান্তরাল একক রশ্মিতে পরিণত করেন, তারপর চেষ্টা করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে আলোকতরঙ্গকে আবারো উল্লম্ব তরঙ্গে পরিবর্তন করা যায় কিনা। লেন্সের অপর পাশে একটি মোমবাতি হলো আলোর উৎস। তড়িৎচৌম্বক বলরেখা দ্বারা সেই পোলারাইজড আলোর ফাংশন পরিবর্তন করা গেলেই কেবল উৎস মোমবাতিটি দেখা যাবে।

চিত্র ৪: আলোকরশ্মিকে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা ব্যবহার করে পরিবর্তন করার চেষ্টা।

কিন্তু কোনো ফল আসলো না। তড়িৎচৌম্বক বলরেখার মধ্য দিয়েই সমান্তরাল আলোকরশ্মি অতিক্রম করতে লাগলো। ফ্যারাডে ভাবলেন, হয়তো বায়ু মাধ্যমে তড়িৎচৌম্বক বলরেখা আলোকরশ্মির উপর প্রভাবিত করতে পারছে না।

শতশত পদার্থ তড়িৎবাহী তারের উপর বসিয়ে চেষ্টা করেন তিনি; তরল, কঠিন, গ্যাস কিছুই বাদ দেননি। একসময় ল্যাবের এক জায়গায় তার নজরে আসে সেই কাঁচটি যেটি তিনি রেখেছিলেন। এনে বসিয়ে দেন তারের উপর। চোখ রাখেন লেন্সে। অপর পাশে রাখা মোমবাতিটি সাথে সাথে দৃশ্যমান হয়ে যায়।

যদি বুঝতে একটু কঠিন মনে হয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফ্যারাডের এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের বুঝে উঠতে একশো বছরের মতো লেগেছিল।

এটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার ছিল সেটা কখনো বোঝা যাবে না, যদি আমি না বলি যে এটা দিয়েই নতুন এক দরজা খুলে দেয়া হয় আইনস্টাইন আর তার পরবর্তী সকল পদার্থবিদের জন্যে। এখানে আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাখ্যা দিলাম না, রেখে দিলাম পাঠক-পাঠিকাদের জন্য। বিজ্ঞানের প্রতি এতটুকু ভালবাসাও যদি থাকে, তাহলে তারাই খুঁজে বের করবে এটা কী জিনিস। অবশ্য বিজ্ঞান শিক্ষানবিশদের ইতিমধ্যে বুঝে যাওয়ার কথা আলোক তরঙ্গ পরিবর্তন করে কি বানানো যেতে পারে।

৪০ বছর বয়সের মধ্যেই তিন বাঘা আবিষ্কার ফ্যারাডের ঝুলিতে; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার। এবার ফ্যারাডে কাজ শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখা নিয়ে। তিনি লৌহ গুড়ো ছড়িয়ে দেখতে পান যে, তড়িৎবাহী তারের চারপাশে অনেকগুলো বৃত্ত তৈরি করে। ফ্যারাডে ভাবেন যে তড়িৎবাহী তারের প্রতি কণার চারপাশেই এমন কতগুলো বৃত্ত রয়েছে, যা হলো তার বলরেখা, এর আয়ত্তে আনা হলে চুম্বকের আচরণ পরিবর্তিত হয়। তিনি এর দ্বারা পৃথিবী যে চুম্বকের ন্যায় আচরণ করে, তার ব্যাখ্যাও দেন।

চিত্র ৫: একটি চুম্বকের চৌম্বক বলরেখা।

রয়্যাল ইন্সটিটিউটের অন্যান্য সকল বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কারের কদর করতেন, কিন্তু অদৃশ্য বলরেখার ধারণা তারা মেনে নেয়নি। ব্যাখ্যা শুনিয়ে অভিভূত করতে পারলেও ফ্যারাডে বিজ্ঞানীকুলকে দিতে পারেননি কোনো সূক্ষ্ম গাণিতিক ব্যাখ্যা। গাণিতিক ব্যাখ্যা কীভাবে দিতেন তিনি? তিনি যে কখনো স্কুলেই যাননি। বিজ্ঞানের গাণিতিক তত্ত্বগুলোর উপর একদম দখল ছিল না তার। জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি মুষড়ে পড়েন।

ফ্যারাডের কাজের স্বীকৃতি দিতেই যেন জন্ম হলো ম্যাক্সওয়েলের। জেমস্ ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। রাজপরিবারে জন্ম নেয়া এক শিশু, যৌবনে পা দেয়ার আগেই পড়ে শেষ করে ফেললেন তখনকার সময়ে আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের সকল ধ্যান-ধারণা। ফ্যারাডের বই হাতে নিয়ে পড়লেন তিনি। অভিভূত হয়ে গেলেন ফ্যারাডের আবিষ্কারে। ইলেকট্রিসিটির উপরে লেখা ফ্যারাডের সব জার্নাল পড়ে ফেললেন তিনি। কিন্তু দেখলেন যে, ফ্যারাডের ব্যাখ্যার সাথে পদার্থবিজ্ঞান আর গণিতের কোনো সম্পর্ক নেই। ফ্যারাডের আবিষ্কার ছিল বৈপ্লবিক, ব্যাখ্যাগুলোও অভিভূতকারী, কিন্তু অভাববোধ করেন পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক ভাষার। তিনি বুঝতে পারেন তাকে কী করতে হবে।

ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের সব বই, আর্টিক্যাল খুঁজে নিয়ে পড়লেন। ফ্যারাডের চৌম্বক বলরেখার কথা পড়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন, এমন অদৃশ্য বস্তু কি আসলেই আছে? তিনি শুরু করলেন বলরেখার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে, সমীকরণরূপে দাঁড় করাতে লাগলেন, যার অভাবে ফ্যারাডে তার অতি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি।

ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যাগুলি বই আকারে বাঁধাই করে নিয়ে গেলেন ফ্যারাডের কাছে। বইটা হাতে পেয়ে ফ্যারাডের মনে পড়ে গেল বহুপুরনো একটি ঘটনা, তিনিও একদিন এভাবে কারও কাছে একটি বই লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন।

চিত্র ৭: নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন নিজের সামনে দেখতে পান তিনি।

ফ্যারাডে দেখলেন যে, ম্যাক্সওয়েল গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তড়িৎচৌম্বক বলরেখার একটা সমীকরণ মেলাতে পারছিলেন না। ম্যাক্সওয়েল তখন ছোট্ট এক পরিবর্তন করে দেয়, এতেই সবকিছু মিলে যায়। ফ্যারাডে ধারণা করেছিলেন তড়িৎচৌম্বক বলরেখাগুলো স্থির বৃত্ত তৈরি করে থাকে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের সংশোধনে সেটি হয়ে যায় এরূপ, বৃত্তাকার বলরেখাগুলো আলোকতরঙ্গের গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানের মাইক্রোফোন, স্পীকার এই তত্ত্বকে ভিত্তি করেই নির্মাণ করা হয়েছে।

ফ্যারাডের গল্প বলা তো শেষ, কিন্তু শেষ হয়নি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার প্রিয় বিজ্ঞানী কে? বুঝে না বুঝে উত্তর আসবে, নিউটন, আইনস্টাইন, কেউ কেউ হকিং এর নামও হয়তো নিবে। কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাদের কোন আবিষ্কারটির জন্য তারা প্রিয়? তখন অনেকেই চুপ করে যাবে।

আমি বিজ্ঞানের প্রতি সবসময় ঋণবোধ করি, বিজ্ঞানীকুলের মাঝে শুধুমাত্র মাইকেল ফ্যারাডের প্রতি ঋণবোধ করি। তিনি জন্মেছেন, অনেক কিছু দেখিয়ে গিয়েছেন, পৃথিবী এগিয়ে যাবে, হয়তো আরও বড় কিছু তৈরি করবে মানুষ, কম্পিউটার-ইন্টারনেট তৈরি করেছে। কেউ কি বলতে পারবে যে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের মাঝে ফ্যারাডের কোন আবিষ্কারকে ব্যবহার করা হয়নি? ডেক্সটপ কম্পিউটারের সিপিইউ তে কমপক্ষে দুইটা কুলিং ফ্যান ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য আবিষ্কারগুলি না হয় নাই ধরলাম, ফ্যারাডের মোটরকে ব্যবহার করা হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। দুনিয়া আরও এগিয়ে যাবে, কিন্তু মোটর আবিষ্কার করা শেষ হয়ে গেছে সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই, স্কুলে না পড়া এক ছেলের হাত ধরে।

মাইকেল ফ্যারাডে কী করে গিয়েছেন আমাদের জন্য সেটা সবাইকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয়াটাই ছিল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। আমার ধারণা পাঠক-পাঠিকাদের একটি বার হলেও ভাবাবে যে, মাইকেল

ফ্যারাডে নামের কোনো একজন বিজ্ঞানী ছিলেন, যিনি কখনো স্কুলে যাননি, কিন্তু মানবজাতির জন্য অনেক কিছু করে গিয়েছেন।

একটা কথা বলে শেষ করছি আমি। হামফ্রে ডেভী বেশকিছু মৌলিক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন। সোডিয়াম আর ক্যালসিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তারই। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে, ডেভীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ছিল মাইকেল ফ্যারাডে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Michael_Faraday
  2. http://www.thefamouspeople.com/profiles/michael-faraday-549.php
  3. http://www.famousscientists.org/michael-faraday/
  4. Cosmos: A Spacetime Odyssey: The Electric Boy
  5. 5.http://science.howstuffworks.com/dictionary/famous-scientists/physicists/michael-faraday-info.htm

একজনব্যবসায়ীর চিঠি এবং নতুন জগতের সন্ধান

“দীর্ঘ সময় ধরেকরে যাওয়া একটি কাজের জন্য এখন আমি যে প্রশংসা উপভোগ করছি, তা শুধুমাত্র প্রশংসার জন্য ছিলনা। এটি ছিল মূলত জ্ঞানের প্রতি আমার প্রবল তৃষ্ণা, যা আমি অন্যদের চেয়ে আমার মধ্যে অনেক বেশি পরিমাণে দেখেছি। পাশাপাশি যখনই আমি অসাধারণ কিছু খুঁজে পেয়েছি, আমার মনে হয়েছে এটি কাগজে লিখে রাখা আমার কর্তব্য, যেন প্রতিভাধর মানুষেরা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন”। (এন্টনি ভন লিউয়েন হুক, ১২ জুন, ১৭১৬)

বিজ্ঞানী বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা যা বুঝি লিউয়েন হুক সেরকম ছিলেন না। তার কোনো উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যা-লয়ের ডিগ্রিও ছিলনা। এমনকি তিনি তার মাতৃভাষা ডাচ ছাড়া অন্য কোনো ভাষাও জানতেন না। তিনি ছিলেন নেদারল্যান্ডেরডেল্ট শহরের একজন সাধারণ পোশাক শিল্পের উপকরণ ব্যবসায়ী। এই সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় যে ষোলো শতকের তৎকালীন কুলীন বিজ্ঞান সমাজে স্থান পাওয়ার মতো কোনো যোগ্যতাই তার ছিলনা। কিন্তু তার মধ্যে ছিল একটি নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, নিরন্তর অনুসন্ধিৎসু মন এবং কঠোর অধ্যবসায়। এছাড়াওপ্রচলিত মতবাদ এবং আবিষ্কারের বাইরে ভিন্নভাবে চিন্তা করার সহজাত দক্ষতা। এগুলো থাকার কারণেই তিনিজ্ঞানের একটি নতুন শাখা উন্মোচন করতে পেরেছিলেন এবং পরিচিতি পেয়েছেন ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এরজনকহিসেবে।
লিউয়েন হুকই সর্বপ্রথম ব্যাকটেরিয়া, আণুবীক্ষণিক পরজীবী, শুক্রাণু, রক্তকোষ, আণুবীক্ষণিক নেমাটোড,রটিফার এবং আরও অসংখ্য ক্ষুদ্রকায় বস্তু স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করেন। তার বহুল প্রচারিত এসব আবিষ্কারের ফলেই আণুবীক্ষণিক জীবের এক বিশাল জগত বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিগোচরে আসে এবং শুরু হয় পৃথিবীর অদৃশ্য এক জগতের জ্ঞানযাত্রা ‘অণুজীববিজ্ঞান’-এর। অণুজীববিজ্ঞানেরজনক লিউয়েনহুককেকখনোকখনোঅনুবীক্ষণযন্ত্রেরউদ্ভাবকবলাহয়ে থাকলেও প্রকৃতপক্ষেতিনি তার উদ্ভাবক ছিলেন না। লিউয়েনহুকের জন্মের প্রায় চল্লিশ বছর আগেইজটিল বা যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র (অর্থাৎএকাধিকলেন্সযুক্তঅণুবীক্ষণযন্ত্র) উদ্ভাবিতহয়েছিল।
লিউয়েনহুকের পূর্বসুরী এবং সমসাময়িক অনেকেইযেমনইংল্যান্ডেররবার্টহুক, নেদারল্যান্ডের জ্যান সামারড্যাম যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন এবং সেগুলো দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারও করেছিলেন। যন্ত্রেরনকশার দিক থেকে সেগুলোর অনেকগুলোই আজকের যুগে ব্যবহৃত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের অনুরূপ ছিল। কিন্তু নানা রকম কারিগরী প্রতিবন্ধকতার কারণেপ্রথম দিকের সেসব যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলো কোনো বস্তুকে তার প্রকৃত আকারের চাইতে বিশ বা ত্রিশ গুনের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো না।
কিন্তু হুকের লেন্স চুর্ণনের সহজাত দক্ষতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি এবং আলোক রশ্মিকেবস্তু দেখার কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারার কারণে তার তৈরি লেন্স দিয়ে কোনো বস্তুকে দুই শত গুণের বেশি বিবর্ধিত করতে পারতো। পাশাপাশি কোনো বস্তুকে সমসাময়িক অন্য কারো যন্ত্রের চেয়ে অধিক পরিস্কার এবং উজ্জ্বল করে দেখার সক্ষমতা এনে দিয়েছে তার যন্ত্র। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টির কারণে তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করা যায় তা হলো, যেকোনো বস্তুকেই লেন্সের নিচে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করার অসীম কৌতূহল এবং পর্যবেক্ষণের সকল বর্ণনা অতি যত্ন সহকারে লিপিবদ্ধ করার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। এমনকি তিনি নিজে ভালো আঁকতে পারতেন না বলে একজন অঙ্কনশিল্পীকে দিয়ে তিনি তার পর্যবেক্ষণ করা বস্তুগুলোর হুবহু চিত্র অঙ্কন করে নিয়েছিলেন।

চিত্রঃ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে লিউয়েন হুকের দেখা অণুজীবের অঙ্কিত চিত্র।

লিউয়েন হুকের নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলোর মধ্যে মাত্রবর্তমানে দশটিরও কম পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা করা যায়, হুকের আবিষ্কৃত যন্ত্রগুলোর নকশায়প্রধান বস্তু ছিল কেবল একটি শক্তিশালী বিবর্ধক লেন্স। হুকের নিজের অংকিত চিত্র থেকে দেখা যায়, একটি পিতলের প্লেটের কাঠামোর মধ্যে একটি ছোট গর্তে শুধুমাত্র একটি লেন্স বসানো থাকে। লেন্সের সামনে একটি সূচালো দণ্ডে পর্যবেক্ষণের জন্য নমুনা রাখা হয়।এর অবস্থান এবং ফোকাস দুটি স্ক্রু দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পুরো যন্ত্রটি মাত্র ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা ছিলএবং এটিকে চোখের একেবারে কাছে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হতো। তবে পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আলো এবং অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল, যা লিউয়েন হুক বেশ আনন্দের সাথেই করতেন।

চিত্রঃ লিউয়েন হুকের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের একটি রেপ্লিকা।

অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ব্যাপারেলিউয়েনহুক মূলত অনুপ্রাণিত হন তারই সমসাময়িক খ্যাতিমান বিজ্ঞানী রবার্ট হুকের সচিত্র বই ‘মাইক্রোগ্রাফিয়া’থেকে। ব্যাপক জনপ্রিয় এই বইতে রবার্ট হুক তার নিজস্ব আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলি তুলে ধরেছিলেন। ১৬৬৮ সালের কিছু সময়আগে লিউয়েনহুকলেন্স চূর্ণ করার পদ্ধতিশেখেন এবং তা দিয়ে আতশী কাচ বা সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করতে থাকেন। জানা যায়, লিউয়েন হুক বিভিন্ন বিবর্ধন ক্ষমতার প্রায় পাঁচ’শয়েরও বেশি পরিমাণ অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন। প্রথমদিকে এই জিনিসটির প্রয়োজন পড়েছিল তার ব্যবসায়িক কাজের খাতিরেই। তিনি এইসব অণুবীক্ষণ যন্ত্র কাপড়ের সুতার মান যাচাই করতে ব্যবহার করতেন। কিন্তু তার জ্ঞানপিপাসু মন তার দৃষ্টিকে শুধুমাত্র কাপড়ের তন্তুর মাঝেই সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। তিনি হাতের কাছে যা পেতেন তাই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিয়ে দেখতেন। এটি তার কাছে অনেকটা খেলনার মতো ছিল। কোনো কিছুই তারপর্যবেক্ষণ থেকে বাদ পড়তো না। বৃষ্টির পানি, কুপের পানি, সমুদ্রের পানি, দাঁতের ময়লা সব কিছুকেই কেবল কৌতূহলবশত তিনি তার যন্ত্রের নিচে নিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখতেন।
প্রচারবিমুখ লিউয়েনহুক তার ডাক্তার বন্ধু রেইনিয়ার ডি গ্রুফের পরামর্শে প্রথমবারের মতো তার আণুবীক্ষণিকপর্যবেক্ষণের বর্ণনা দিয়ে লন্ডনের নবগঠিত রয়েল সোসাইটি বরাবর চিঠি লিখেন ১৬৭৩ সালে। তার প্রথম চিঠিটি ছিল অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মৌমাছি, পরজীবী এবং মোল্ড পর্যবেক্ষণ নিয়ে। পরবর্তী পঞ্চাশ বছর ধরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রয়েল সোসাইটির সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমেই যোগাযোগ রেখেছিলেন। সর্বমোট ৫৬০ টির মতো চিঠি তিনি রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন। তার লেখা চিঠিগুলো ছিলসাধারণ ডাচ ভাষায় লেখা, যেগুলোপরে ইংরেজি এবং ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং “Philosophical Transactions of the Royal Society” তে মুদ্রিত হয়েছে।
প্রচলিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা কর্মের পদ্ধতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিলনা বলে তিনি তার আবিষ্কারকে কোনো নিবন্ধ আকারে প্রকাশ করেননি এবং সেরকম কোনো চেষ্টাও করেননি। তিনি তারপর্যবেক্ষণের সকল কাজ একাই করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং নিজের তৈরি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেন্সগুলোর প্রস্তুত প্রণালীও প্রকাশ করতে চাইতেন না। ফলে তার সকল অদ্ভুত পর্যবেক্ষণের ব্যাপারগুলো অন্যেরা কেবলমাত্র তার চিঠিগুলোর মাধ্যমেই জানতে পারতো।
১৬৭৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হুকের লেখা একটি চিঠিতে লেকের পানিতে ভাসমান সবুজ শৈবালস্পাইরোগাইরার বর্ণনা ছিল এরকম,“…লেকের পানির উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। …পরের দিন এই পানি পরীক্ষা করে দেখতে পেলাম তাতে অনেক ভাসমান কণাএবং কিছু সবুজ সর্পিলাকার, সুসজ্জিত, তামা বা টিন রঙের পোকার মতো কিছু।অনেকটা শিল্পকারখানায় এলকোহল জাতীয় পানীয় ঠাণ্ডা করার কাজে যে বস্তু ব্যবহার করা হয় তার মতো। প্রতিটি বস্তুর পরিধি ছিল মাথার একটি চুলের পুরুত্বের সমান… এদের প্রত্যেকেই ছোট ছোট সবুজ বর্তুলাকৃতির সংযুক্ত বস্তুনিয়ে গঠিত ছিল।সংযুক্ত বস্তুর পাশাপাশি সেখানেছোট ছোট অনেক পৃথক বর্তুলাকৃতির বস্তুও ছিল।”
১৬৮৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, লিউয়েনহুক তার নিজের দাঁতের মধ্যেকার প্ল্যাক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে রয়েল সোসাইটির উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেন,“একটি সামান্য সাদা পদার্থ, এতোটাই পুরু যেন মনে হয় দৃঢ়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে।”
তার এই পর্যবেক্ষণ আরো দুইজন মহিলার (সম্ভবত তার নিজের স্ত্রী এবং কন্যা) এবং দুইজন বৃদ্ধ লোকের দাঁতের উপর পুনরাবৃত্তি করেন। বৃদ্ধ লোকগুলো আবার সারা জীবনে কখনো দাঁত পরিষ্কার করেনি। এ বিষয়েলিউয়েনহুক তার রিপোর্টে লিখেন“আমি তখন অন্যান্য বারের মতোই চরম আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করলামযে, দাঁতের মধ্যকার সেইসব সাদা বস্তুর মধ্যে খুব সাবলীলভাবে চলমান কিছু ক্ষুদ্র জীবন্ত প্রাণী দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই ছিল… খুবই শক্তিশালী এবং ক্ষীপ্রগতির, অনেকটা পানির উপর পাইক মাছের চলাচলের মতো।”
একজন বৃদ্ধ লোকের মুখ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কেলিউয়েনহুক লিখেন“অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্তপ্রাণীদের সমাবেশ এবং তাদের অতি সাবলীল চলাচল যা আমি এ পর্যন্ত আর কোথাও দেখিনি। সবচেয়ে বড়টি… সামনে চলাচলের জন্য তাদের শরীরকে বাঁকিয়ে থাকে… তাছাড়াঅন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো সংখ্যায় এতো বেশি ছিল যে, সম্পূর্ণ পানিকেই… জীবন্ত মনে হচ্ছিল।”
লিউয়েন হুকের লেখা এই চিঠিগুলোই ছিল জীবিত ব্যাকটেরিয়া পর্যবেক্ষণের প্রথম রেকর্ড।
চিত্রঃ লিউয়েন হুকের স্বহস্তে লেখা একটি চিঠি যেটি তিনি ১৬৭৭ সালে ওডেলবার্গকে পাঠিয়েছিলেন।
১৭০২ সালের ২৫ ডিসেম্বরে এক চিঠিতে লিউয়েন হুক প্রোটিস্টের বর্ণনা দেন এভাবে- “এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলোর আকৃতি ছিল ঘণ্টার মতো, এবং এদের বৃত্তাকার উন্মুক্ত অংশের দিকে তারা এমন আলোড়ন সৃষ্টি করেযেন ঐ স্থানের কাছাকাছি পানিতে অবস্থিত কণার চলাচল শুরুহয়… আমি এরকম প্রায় বিশটি প্রাণীকে দেখেছি। তাদের লেজগুলোকে পরস্পর পাশাপাশি হয়ে তাদের ধীর গতির চলাচল, তাদের উন্মীলিত দেহ এবং সোজা হয়ে থাকা লেজ, তবুও এক নিমিষেতাৎক্ষণিকভাবে,তারা তাদের দেহ এবং লেজকে একসাথে টেনে নিয়েছিল।তাদের দেহ এবং লেজকে সংকুচিত করার সাথে সাথে তারা আবার খুব ধীরভাবে লেজগুলো বের করে এনেছিল। এভাবে কিছু সময় তাদের মৃদু গতির চলাচল অব্যাহত ছিল, যা আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দদায়ক বলে মনে হয়েছে।”

লিউয়েনহুকপ্রাণী টিস্যু, উদ্ভিদ টিস্যু, খনিজ স্ফটিক ও জীবাশ্ম সবকিছুই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আণুবীক্ষণিক ফোরামিনিফেরা দেখতে পাওয়া প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনিইরক্তকোষ আবিষ্কার করেন এবং সর্বপ্রথম প্রাণীর শুক্রাণুর জীবিত কোষ দেখতে পান। তিনিই নেমাটোড এবং রটিফারের মতো আণুবীক্ষণিক প্রাণী আবিষ্কার করেন। তার আবিষ্কারের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে এবং বাড়তেই থাকে। তার এসব আবিষ্কারের চিঠিগুলো প্রকাশ এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হবার সাথে সাথে তিনি খুব শীঘ্রই বিখ্যাত হয়ে উঠেন।
১৬৮০ সালে, রয়েল সোসাইটিতে যখন রবার্ট হুক, হেনরি ওডেলবার্গ, রবার্ট বয়েল, ক্রিস্টোফার রেন-এর মতো কিংবদন্তী বিজ্ঞানীরা সদস্য হিসেবে ছিলেন, ঠিক সে সময়ই লিউয়েন হুক রয়েল সোসাইটিতে একজন পূর্ণ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬৯৮ সালে তিনি রাশিয়ার কিংবদন্তী জার পিটারকে একটি ইলের ভিতরকৈশিক জালিকায় রক্তপ্রবাহ দেখিয়েছিলেন। তার কাছে এসব অদ্ভুত জিনিস দেখতে আসা অসংখ্য কৌতুহলী দর্শকদের আগমন অব্যাহত রেখেছিলেন। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পর্যবেক্ষণচালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৭২৩ সালের ৩০ আগস্ট হুকের মৃত্যুর পর, ডেল্ট-এরনিউ চার্চের যাজক রয়েল সোসাইটি বরাবর লিখেছিলেন,“…অ্যান্টনি ভ্ন লিউয়েনহুক বিশ্বাস করতেন, প্রাকৃতিক দর্শনে যা কিছু সত্য তা সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরীক্ষামূলক পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, কেবলমাত্র অনুভূতির প্রমাণ দ্বারা। সে কারণেইঅধ্যবসায় এবং অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা তিনি তার নিজের হাতে চমৎকার সব লেন্স তৈরি করেছেন, যার সাহায্যে তিনি প্রকৃতির অনেক রহস্য আবিষ্কার করেছেন, যা এখন পুরো বিশ্ব জুড়ে বিখ্যাত।”
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ব্রায়ান জে ফোর্ড লন্ডনের রয়েল সোসাইটির আর্কাইভ থেকে লিউয়েন হুকের ব্যবহৃত কিছু মূল নমুনা পুনরাবিষ্কার করেছেন। এই ঐতিহাসিক নমুনা, লিউয়েনহুকেরনিজের ব্যবহৃতও তৈরিকৃত অন্যান্য অণুবীক্ষণ যন্ত্র এবং অন্যান্য উপাদান নিয়েকরা গবেষণার মাধ্যমে ফোর্ড দেখিয়েছেন, পেশায় ব্যবসায়ী হলেও লিউয়েনহুক সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন দক্ষ কারিগর এবং উন্নত মানের বিজ্ঞানী। তার লেখা এই সাধারণ চিঠিগুলো তাই এখন বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ। একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হয়েও লিউয়েন হুকের জানার অসীম কৌতূহল এবং আজীবন ধরে এর পেছনে লেগে থাকা খুলে দিয়েছিল এক নতুন জগত, যার হাত ধরে পৃথিবীবাসী আজ অণুজীবকে আরো ভালোভাবে জানার মাধ্যমে নানান নতুন গবেষণার দ্বার উন্মোচন করে চলেছে।
এজন্যই বিশ্ববাসীর কাছে লিউয়েন হুক আজ ব্যবসায়ী নয় বরং ‘অণুজীববিজ্ঞানেরজনক’হিসেবে সুপরিচিত।

তথ্যসূত্র

1. https://en.wikipedia.org/wiki/Antonie van Leeuwenhoek
 2. History of Microbiology:Milton Wainwright and Joshua Lederberg
 3. Microbe Hunters: Paul De Kruif

কেলাসিত বরফঃ বিমান যাত্রার অদৃশ্য হুমকি

২০০৯ সালে রিওডিজেনিরো থেকে ছেড়ে যাওয়া প্যারিস গামী ফ্লাইট ৪৪৭ উড্ডয়নের কিছু সময় পরই ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রথমে ব্যাপারটি হালকাভাবে নেয়া হলেও যারা সে সময়ের পত্রিকার শিরোনাম গুলোতে চোখ বুলিয়েছিলেন তারা জানেন ব্যাপারটির শেষটা কতটা ভয়াবহ ছিল। এটা ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে ভয়ানক বিমান দুর্ঘটনা। ২২৮ জন যাত্রীর সকলেরই মৃত্যু ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকরতে লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যখন ব্ল্যাকবাক্স বের করা হয় তখন সেখান থেকে সফটওয়ার ত্রুটি,পাইলটের অমনোযোগিতা সহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া যায়। কিন্তু ছোট্ট একটি কারণ সমগ্র ব্যাপারটিকে নতুন একটি তাৎপর্যপূর্ণ  দিকে  আলোকপাত  করে।

বায়ুর গতিবেগ মাপার জন্য ব্যবহৃত ‘পিটটটিউব’ নামে একটি যন্ত্রাংশে বরফের প্রতিবন্ধকতা পাওয়া যায়। কিন্তু সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ফুট উপরে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আবহাওয়া সম্পর্কিত জ্ঞান বলে, সচরাচর এই উচ্চতায় পানি জমে বরফের কেলাস হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু  ফ্লাইট ৪৪৭-ই একা নয়। গত অর্ধ শতাব্দী ধরে

আকাশ থেকে বিমান পতনের সবচেয়ে ভয়ানক কারণ এই বরফের প্রতিবন্ধকতা বা‘কেলাসিত বরফ’।

পঞ্চাশের দশকের আগ পর্যন্ত বিমান পতনের কোনোকারণ বের করা সম্ভব হয়নি। তারপর বেশ কিছু গবেষণা হলেও সেগুলোর ফলাফল স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। এরপর ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ঈগল ফ্লাইট ৪১৪৪ ইন্ডিয়ানার উপর দিয়ে যাবার সময় অজানা জমাট বরফের কারণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে সয়াবিনেরবাগানে পতিত হলে এ ঘটনা আবারো চিন্তার উদ্রেক করে। উল্লেখ্য,এই দূর্ঘটনায় ৬৩ যাত্রীর সকলেই মৃত্যুবরণ করে। এ ব্যাপারে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন এডমিনিস্ট্রেশন(FAA)তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে আরো ৩২ টি ঘটনা র ক্ষেত্রে এমন ব্যাপার আবিষ্কার করে। তাদের তদন্তে অতিউচ্চতায় ইঞ্জিনের হঠাৎ থেমে যাওয়া,সেন্সরের অদ্ভুতত্রুটি ,রহস্যজনক ভারীবৃষ্টির আবির্ভাব ,আকাশ পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং রাডারে আবহাওয়া পরিবর্তনের কোনো আভাস না পাওয়া ইত্যাদি অদ্ভুত সব সমস্যার দেখা মিলে।

untitled-4

কানাডার আবহ-পদার্থবিদ ওয়াল্টারস্ট্যাপ বলেন ‘লোকজন বুঝতেই পারেনা ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে। অতি উচ্চতায় পানির জমাট বেঁধে যাওয়া নিয়ে বিভিন্নতত্ত্ব আছে।’ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট ১০ হাজার ফুট(৩০০০মিটার) এর নীচে ইঞ্জিনকে আবার চালু করতে সক্ষম হন। এবং যাত্রীরা সেই যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান যদি ও তাদেরকে ভয়ানক ঝাঁকুনির অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। তবে একটা ক্ষেত্রে ইঞ্জিন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় আর পাইলট কোনোমতে বিমান কে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

FAA-র তদন্তে পাওয়া যায় ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এক ধরনের জমাট বরফের কারণে।যদিও শুধুমাত্র বিমানের উত্তপ্ত অংশগুলোতেই কেন প্রভাব ফেল তোতা বুঝা যায় নি। সাধারণভাবে পানি জমাট বেঁধে বরফ হবার কারণ হিসেবে ধরা হয়-পানি যখন বিমানের শীতলঅংশে আসে তখন তা অতিহিমায়িত হয়ে বরফে পরিণত হয়। পাইলটরা বিমানের উইনশিল্ডের উপর এ ধরনের জমাট বরফ দেখতে পান। কানাডার ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের বিজ্ঞানী ভ্যানফুয়েলকিবলেন,‘এটা খুবই স্পষ্ট। এটা শুধু মাত্র ২২ হাজার ফুটের নীচে ঘটে এবং জমাট বৃষ্টির ব্যাপারটি রাডারেও দৃশ্যমান হয়।’ আর সে জন্য বিমানে নতুন ধরনের সেন্সর লাগানো হয় যাতে করে পাখা হতে বরফ-অপসারকস্প্রে করা যায়।

কিন্তু এসবের কিছুই কেলাসিত বরফের ক্ষেত্রে খাটে না। স্বাভাবিক বরফজমাট বাঁধার পদ্ধতি থেকে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে স্ফটিক বরফ জমাট বাঁধে।এক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পানি আর তরল থাকতে পারে না।

মূল সমস্যা সৃষ্টি করে কেলাসিত বরফের ছোট ধূম বা কণা গুলো।এদের ব্যাস ৪০ মাইক্রোমিটারের মতো। এগুলো বৃষ্টিপরিমাপক রাডারে ও ধরা পড়েনা। এই কেলাসগুলো কঠিন হবার দরুন বিমানের উইনশিল্ড এবং অন্যান্য অংশ আঘাত প্রাপ্ত হয়। যখনই বিমানের উত্তপ্ত অংশ যেমন ইঞ্জিন কিংবা পিটটটিউবের সংস্পর্শে আসে তখনই এরা গলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গরম উইনশিল্ডে লেগেও এরা গলে যায় আর ফলশ্রুতিতে একধরনের অদ্ভুত বৃষ্টি দেখা দেয়। এরকথা প্রতিবেদন গুলোতে পাওয়া যায়।

untitled-4

এসব কেলাসের একটি স্তর গলতে শুরু করলে আরো কেলাস তৈরি হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এরা ইঞ্জিনের উপর জমতে থাকে এবং এইস্তূপীকৃত কেলাস গুচ্ছ ইঞ্জিনকে ক্ষতি গ্রস্তকরে দেয়। সেন্সরের মধ্যে সৃষ্টকেলাস আরো ভয়ানক ক্ষতি করে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে বরফের কেলাস পিটটটিউবকে অবরুদ্ধ করে দেয় যার কারণে এটি ভুল পাঠ দেয়া শুরু করে। ফলস্বরূপ অটো-পাইলট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং মূল পাইলটরা ও বিভ্রান্ত হয়ে তাদের স্বাভাবিক ট্রেনিং এর বিপরীত ব্যবস্থা নিতে থাকে। তারা মনে করে ছিল বিমানটি তার উচ্চতা হারাচ্ছে। সেই কারণে বিমানটিকে তারা কৌণিক ভাবে উর্দ্ধগামী করে দেন যা বিমানটিকে একেবারে থামিয়ে দেয়।

বিমান দূর্ঘটনার কারণ হিসেবে যতই কেলাসিত বরফকে দায়ীকরা হয় ততই ব্যাপারটি স্পষ্ট হতে থাকে এবং গ্রহণযোগ্য কিছু কারণ ও পাওয়া যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত নাসার একটি প্রতিবেদন FAA এর পূর্বেকার অনুমান সংশোধন করে বলে যে,

১৯৮০ সাল থেকে প্রায় ১৪০ টি ঘটনার সাথে এই কেলাস বরফ সংশ্লিষ্ট এবং প্রতিবেদনটি একে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখার জন্য সাবধান করে দেয়।

সুতরাং বিমানের ইঞ্জিন নতুন ভাবে নকশা করার এটাই উপযুক্ত সময় যেন এ ধরনের কেলাসিত বরফ বিমানের কোনোরূপ ক্ষতি করতে না পারে। এউদ্দেশ্যেই ২০০৬ সালের একটি মাল্টিন্যাশনাল প্রোগ্রামে নাসা ,ন্যাসনালরিসার্চ সেন্টার- কানাডা,এয়ারবাস ও বোয়িং সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ইঞ্জিন ডিজাইন করার আগে তাদের জানা দরকার ছিল কীভাবে উত্তপ্ত ইঞ্জিনে এই কেলাসিত বরফ দানা বাঁধে। তার মানে ঠিক একই পরিস্থিতি ল্যাবে সৃষ্টি করতে হবে। ওহায়োও’ রক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত নাসারল্যাবে হিমশীতল তাপমাত্রা সহ ঘণ্টায় একশত মাইল গতিবেগের বাতাস এবং খুবই অল্প চাপের ব্যবস্থা করা হয় যে রকমটি একটি বিমান ৩০ হাজার ফুট উপরে সহ্য করে।

প্রায় এক বছর কাজকরার পর,কেলাসিত বরফ বিশেষজ্ঞ জুডিভ্যানজ্যান্টে এবং এরোস্পেস প্রকৌশলী অ্যাশলিফ্রেজেল একটি ‘আইসবার’-এর বিন্যাস করতে সক্ষম হন যা মিনিটের মধ্যে কেলাসিত বরফের মতো একইরকম আকৃতি এবং ঘনত্ব বিশিষ্ট কেলাস তৈরি করে ইঞ্জিনের মধ্যে দিয়ে স্প্রে করতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সেগুলো গরম ব্লেডের উপর জমতে শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ এগোলো না। তারা যখন বরফ-মেঘ জেনারেটর (তৈরিকৃত যন্ত্র) চালু করলেন তাতে একটি প্রতিবন্ধকতা দেখা দিল। সৃষ্টি হওয়া কেলাস বরফগুলো বালু-বিস্ফোরক কণার মতো আচরণ করা শুরু করল এবং সংবেদনশীল পরিমাপক যন্ত্র গুলোকে নষ্ট করে দিল। যে সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়নি সেগুলো ভুল পরিমাপ দিতে থাকল।ভ্যানজ্যান্টে বলেন ‘আমাদের আরো উন্নত মানের এবং শক্তিশালি কোনো যন্ত্র নির্মাণ করতে হবে।’

তাদের কাজ বরফ জমাট বাঁধার একটি জটিল কাঠামো উন্মোচন করল। বরফের কেলাস গুলো প্রথম দশাতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছোট ছোট কণার মেঘ তৈরি করে। তাদের এই সমীক্ষা ভিত্তিক মডেল কে কার্যকরী মডেলে রূপান্তর করা পদার্থবিদ্যার এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। এখনকার জন্য তারা নতুন একটি সহজ মডেল তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন যেন বরফ তৈরির ঝুঁকি কিছুটা কমে আসে।

‘একটি পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক মডেল বানাতে হয়তো আরো বছর দশেক লাগবে’ ফ্রজেল বললেন। এরপর মডেলটিকে ইঞ্জিনে পুনরায় রূপ দিতে প্রায় এক দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু বিমানকে আকাশে উড্ডয়নে ধরে রাখতে এবং এই রহস্যজনক কেলাসিত বরফের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের একটি তাৎক্ষণিক সমাধান প্রয়োজন।

বোয়িং কোম্পানি পূর্বে এই কেলাসবরফ এবং ক্ষীয় মাণ পরিচলন ঝড়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল। এই ঝড় ব্জ্রপাত সহকারে বিশাল পরিমাণ পানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে যায় যা সাধারণ বৃষ্টিপাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, এই ঝড় গুলোর জন্য তাপ প্রয়োজন যার কারণে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আসা ঝড়গুলো অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।

টমরাটভ্‌স্কি এবং তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিলেন,সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই ব্যাপারটি একে বারে একই পরিস্থিতিতে সরাসরি বিমানচালিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তারা যুতসই আবহাওয়ায় সেন্সরযুক্ত একটি জেটপ্লেন সমস্যাযুক্ত হটস্পটে চালিয়ে দেখলেন আর ফলাফলও পেলেন। পরিকল্পিত ভাবে জেট প্লেনকে তথাকথিত High Water Ice Condition(HWIC) এর মধ্যে দিয়ে চালিয়ে দেখলেন তাপমাত্রা হিমাংকের ও নীচে নেমে যায় যা কেলাস বরফ সৃষ্টি করার জন্য একদম আদর্শ। রাটভস্কি HWIC এবং পরিচলন ঝড়ের মধ্যকার সম্পর্ককে নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। তিনি আবিষ্কার করেন,পরিচলন ঝড় পানির কণাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ অক্ষাংশে তাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এব্যাপারটি কেবল মাত্র তখনই ঘটে যখন ঝড় কমতিরদিকে থাকে। কেন কমতির দিকে থাকলে এই ব্যাপারটি ঘটেতা জানা সম্ভব হয় নি। এটা আশা করা যায়,সবগুলো তথ্য এক ত্রক রলে HWIC সম্পর্কিত বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। গবেষকরা স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কোথায় কোথায় কেলাসিত বরফ সৃষ্টিহতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেইসাথে রাডারের মাধ্যমেও এর শনাক্ত করণের জোর চেষ্টা চলছে। আর হয়তো কয়েক বছরের মধ্যের ইঞ্জিনেরপুনঃনকশাও করা যাবে।

অদৃশ্য হত্যাকারী

ফুয়েল কি এবং তার দল সফলভাবে বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দুটি সেন্সর তৈরি করতে সক্ষম হন। প্রথমটি, একটি বিয়ার ক্যানের আকৃতির যন্ত্র যারনাম দেয়া হয়েছে পার্টিক্যাল আইস প্রোব,যা বিমানের বাইরের দিকে লাগানো যাবে। এটি বাতাসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ছোটছোট কণার উপস্থিতি শণাক্ত করতে পারে। এটি আসলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ শণাক্তকরণের জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু দলটি একে পরিবর্তন করে কেলাসিত বরফের বিশেষ সংকেত শনাক্ত করণের কাজেলাগাতে সক্ষম হয়। অন্য যন্ত্রটি একটি শব্দোত্ত র জমাট-বরফ শনাক্তকরণের সেন্সর। এটি সরাসরি ইঞ্জিনেরভেতর কার জমাট বরফ পরিমাপ করতে পারে। কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

কতগুলো ছোট আকৃতির সেন্সর শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় যার প্রতিফলন বরফ গঠনের সাথেসাথে পরিবর্তিত হয়। দুটো যন্ত্রই এতটা উন্নত যে জনাব ফুয়েলকি এগুলো বাণিজ্যিকভাবে বাজারে ছাড়ার কথা ভাবছেন।

কিন্তু বিমানে এই সেন্সর আর রাডার লাগানোর পর ও মূল সমস্যার সমাধান হলো না। একটা কারণ হলো,এখনো কেলাসিত বরফের প্রকৃত পরিমাণ মাপা সম্ভব হয়নি। যার ফলে এখনো বিমান দূর্ঘটনা ঘটেই চলছে। উদাহরণস্বরূপ,২০১৪ সালের এয়ার আলজেরিয়ার ফ্লাইট ৫০১৭ এর কথা বলা যায় যেখানে ১১৬ জনের মতো যাত্রী মারা যায়।

ফ্লাইট ৪৪৭ এর পিটটটিউব অবরুদ্ধ হবার কথা ব্ল্যাকবাক্সের মাধ্যমে জানাসম্ভব হলেও একই রকম অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে সেটাও জানা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে বিমানের অল্পবিস্তর ক্ষতি সাধিত হয়ে ইঞ্জিন আবার পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঠিক কী কারণে ১০ হাজার ফুটের নীচে আসলেই কেলাসিত বরফের সকল চিহ্ন উধাও হয়ে যায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

সমস্যাটি আরো প্রকোপ আকার ধারণ করার সুযোগ আছে। কেননা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী দিনদিন উত্তপ্ত হচ্ছে যার ফলে আবহাওয়ার অস্থিরতাও বাড়ছে। আর এমন পরিস্থিতিতে কেলাসিত বরফসৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ও প্রবল। যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটিঅবরিডিং’ এর আবহাওয়া বিদ সুগ্রেবলেন, ‘এ অবস্থা আরো সক্রিয় হবে এবং বারবার ঘটবে’। সাম্প্রতিক কালে রোলসরয়েস ইঞ্জিন ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কেলাসিত বরফ আরো প্রসার লাভ করবে এবং সহজেই সৃষ্ট হতে পারবে। এই কোম্পানির এক ইঞ্জিন বিশেষজ্ঞ ররিক্লার্কসন কোম্পানিকে এক অসুবিধা জনক কিন্তু নিরাপদ উপায় বাতলে দেন।তাহ লো,‘খারাপ আবহাওয়ায় বিমান উড্ডয়ন বন্ধরাখুন’।

তথ্যসূত্র

Hot Ice:The Invisible threat making planes fall out of the sky, New Scientist

https://www.newscientist.com/article/mg23130800-700-hot-ice-the-race-to-understand-a-sinister-threat-to-aircraft/

 

কৃষিশিল্পে বৈচিত্র্য কেন প্রয়োজন


অতীতের কৃষিশিল্পে একই সাথে বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করা হতো, বর্তমানের সাথে যার সাদৃশ্য প্রায় নেই বললেই চলে। আধুনিক প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা কৃষিব্যবস্থা কি আদৌ আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ নাকি তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা সবাই অবগত। কিন্তু ক্রমশ বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়া জীববৈচিত্র্যের ফলে যে আমাদের খাদ্যের যোগান ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার উপর অধিকাংশ মানুষই কোনো কর্ণপাত করে না। তবে আশার কথা, হাতে গোনা কয়েকজন এই বিষয়টি উপলব্ধি করেন, এবং এর সমাধানে নানা রকম ভাবনা চিন্তাও করেন।

পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের বৈচিত্র্য বিদ্যমান ছিল, কেননা তাদের সময় হরেক জাতের ফসল ফলানো হতো। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য আজকে আমাদের খাদ্য তালিকায় খুঁজে পাওয়া ভার, কারণ সেই কৃষি-ব্যবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন, যার জন্য পূর্বে উৎপাদিত হওয়া বিভিন্ন রকম শস্যের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখন আর উৎপাদনই করা হয় না। বর্তমানে আমাদের উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সিংহভাগ আসে মাত্র পনেরো জাতের উদ্ভিদ থেকে। আর পুরো বিশ্বের শর্করা চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি যোগান আসে গম, চাল আর ভুট্টা থেকে।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা কৃষি-ব্যবস্থায় কৃষক সমাজ, বিভিন্ন প্রকরণের শস্যের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে উৎপাদন করার এক বিস্ময়কর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন যাকে বলা হতো ‘ল্যান্ডরেস’। স্থানীয় পরিবেশের সাথে উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল এই পদ্ধতিটি। প্রত্যেক নবান্নের সময় কৃষকেরা পরবর্তী বছরে চাষ করার জন্য কিছু বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ করে রাখতো, ভবিষ্যতের দুর্যোগ সামাল দেবার উদ্দেশ্যেও এটি কাজ করা হতো।

যেহেতু একই জমিতে একই ফসল বার বার উৎপাদন করা হলে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে তাই কৃষকেরা প্রতি বছর ফসলের পরিবর্তন করতো। একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতো। এতে করে জমি তার উর্বরা শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতো। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি কোনো ফসল কীটপতঙ্গ বা রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতো, তাহলে তার ক্ষতি নিয়ে কৃষকরা দুশ্চিন্তা করতো না, কারণ ক্ষতি সামাল দিতে আরো বাকি ফসল রয়েছে। এটা ছিল ‘ল্যান্ডরেস’ এর একটি বড় সুবিধা।

কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে পূর্বের প্রেক্ষাপটের কোনো মিল তো নেই-ই, বরং একটি যে আরেকটির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করে, তা বললে খুব একটা ভুল বোধ হয় হবে না। কারণ বহু জাতের ফসল উৎপাদন যেখানে পূর্বের কৃষি শিল্পে প্রাধান্য ছিলো সেখানে বর্তমানের কৃষিশিল্পের প্রাধান্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এক-ফসলী উৎপাদন বা মনোকালচার।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিল্পোদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম, নিঃসন্দেহে। কিন্তু কঠিন সত্য হচ্ছে, কৃষিশিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্ব এখনো ‘দুর্ভিক্ষ’ নামক মারাত্মক সমস্যার থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

ব্যাপারটাকে একটু খোলসা করে বলা যাক। প্রতিযোগিতামূলক বাজের টিকে থাকার জন্য এসময়ের ফার্মগুলো কেবল এক জাতের ফসল উৎপাদন করার জন্য অদরকারিভাবে বিশালায়তনের জমি ব্যবহার করছে। আর এর পেছনে যে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে তা সহজেই অনুমেয়।

অত্যাধিক মুনাফা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অত্যাধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এক্ষেত্রে প্রযুক্তির কথা এসে পড়ে। বেশি বেশি ফসল ফলানোর জন্য বেশি পরিমাণে কীটনাশক, সার প্রয়োগের দরকার হয়, উন্নতমানের সেচন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আধুনিক প্রযুক্তি এই ফার্মগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারে ঠিকই কিন্তু তার পরিবর্তে মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করে সাথে সাথে। কেননা অত্যধিক পরিমাণে এসব ব্যবহারের ফলে মাটি একসময় তার বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করে।

কোন ফসল উৎপাদন করা হবে তা পুরোপুরি কৃষকদের উপর নির্ভর করলেও তারা উৎপাদনের জন্য সেই ফসলই নির্বাচন করে থাকে যা সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল এবং যা উৎপাদন করলে বাজারের অন্যান্য ফার্মদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে, এবং যেখানে আরো অনেক ফসল আছে যা তাদের পরিবেশের অবস্থা এবং মাটির ধরণ অনুযায়ী উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী। এর ফলে দেখা যায়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য তাদেরকে অত্যাধিক পরিশ্রম করে বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে হয়। এটা তাদের করতে হতো না যদি না তারা তাদের জমির জন্য উপযোগী অন্যান্য ফসলগুলো চাষ করার সিদ্ধান্ত নিতো। কিন্তু যাদের লক্ষ্য থাকে অন্যান্য ফার্মগুলোকে টেক্কা দিয়ে সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জন করা, তাদেরকে এটা বুঝাবে এমন সাধ্যি কার?

2 চিত্রঃ এই সবজিগুলো পুষ্টিতে ভরপুর এবং আমাদের খাদ্যের সিংহভাগ যোগান এরাই দিয়ে থাকে। ছবিঃ dumbonyc.

মনোকালচারের একটি পরিণতি হচ্ছে, এর ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বড্ড একঘেয়ে হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত এক শতাব্দীতে যত ধরনের শস্যাদি উৎপাদিত হতো, তার মধ্যে মাত্র দশ শতাংশ এখন অবশিষ্ট রয়েছে। আঠারো শতকে প্রায় ৭০০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদন করা হতো, আর আজকে কেবল ১০০ প্রজাতির আপেল উৎপাদিত হয়। উৎপাদনকারীরা তাদের স্বার্থ বিবেচনা করে যা উৎপাদন করবে, তাই আমাদের খেতে হবে। আমরা যে এখন তাদের উপরেই নির্ভরশীল- তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনোকালচারের আরেকটি সুবিধা হলো এটি ফসলের রোগাক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একবার যদি কয়েকটি শস্যদানা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে একটি চারাগাছ আক্রান্ত হবে, এরপর পুরো ফার্ম, এবং এরপর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ফার্মে সেই রোগের সংক্রমণ ঘটবে।

এসব নানাবিধ অসুবিধা নির্মূল করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের উচিত ‘ল্যান্ডরেস’ এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করা যাতে তারা এমন একটি জিন খুঁজে পায় যা চারাগাছগুলোকে সংক্রমণমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে। তবে রোগের সংক্রমণ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনও ফসলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বহুল প্রচলিত ‘মনোকালচার’ চলটা বদলানোর জন্য আমাদের হাতে এখনো কিছু সময় আছে। পূর্বে বর্ণিত কৃষকসমাজ ‘ল্যান্ডরেস’ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। এখন আমরা যদি ঠিক সেই কাজটির মাধ্যমে আমাদের খাদ্যাভাসে একটু পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেই তাহলে বর্তমান কৃষিশিল্প বাধ্য হবে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে। তবে আমরা যদি এজন্য খুব তাড়াতাড়ি কোনো পদক্ষেপ না নিই, তাহলে অচিরেই এ নিয়ে আমাদের বিশাল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ দ্যা সায়েন্স এক্সপ্লোরার (http://thescienceexplorer.com/nature/why-we-need-biodiversity-our-crops)

লেখিকাঃ কাজী ফাতিহা বিনতে হাবিব
আইডিয়াল কলেজ, মতিঝিল

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik