স্বপ্নে পাওয়া রাসায়নিক সংকেত

রসায়ন পড়েছে আর বেনজিন চক্রের নাম শোনেনি এমন ব্যক্তি কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। জার্মান বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল দীর্ঘদিন বেনজিন নিয়ে কাজ করেছেন। এর রাসায়নিক সংকেতও জানা হয়ে গেছে ততদিনে। কিন্তু এর গাঠনিক সংকেত বের করতে পারছিলেন কেউই। এক্স-রে ক্রিস্ট্রালোগ্রাফি কিংবা আইআর বর্ণালী বিশ্লেষণ করে গাঠনিক সংকেত নিরূপণের পন্থা তখনো বের হয়নি।

দীর্ঘদিনের জল্পনা শেষে বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল ১৮৬৫ সালে বেনজিন নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন নামক একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে। এখান থেকেই প্রথম জানা যায় বেনজিনের গাঠনিক সংকেত চক্রাকার। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো কেকুল বেনজিনের এই চক্রাকৃতি গাঠনিক সংকেতটি নাকি পেয়েছিলেন স্বপ্নযোগে!

image source: horasarvam.blogspot.com

১৮৬৫ সাল, জার্মানিতে সে বছর তীব্র শীত পড়েছে। অগাস্ট কেকুল গভীর রাতেও আগুনের পাশে বসে বেনজিনের গাঠনিক সংকেত নিয়ে কাজ করছেন। মাসের পর মাস কাজ করেও কূলকিনারা করতে পারছেন না কোনোক্রমে। প্রতিদিনের মতোই কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিন হটাৎ স্বপ্নে দেখলেন একটি সাপ নিজেই তার লেজকে খেয়ে ফেলছে। ঠিক যেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ব্যবহৃত এক প্রতীক ‘অরোবরোস’-এর মতো দেখতে।

স্বপ্নেই যেন তাকে কেউ বলে দিচ্ছিল বেনজিন দেখতে অনেকটা এইরকমই হবে। ঘুম থেকে জেগে উঠেও বিজ্ঞানী কেকুল অনেকটা আর্কিমিডিসের ইউরেকা ইউরেকা করার মতই আউরে যাচ্ছিলেন, “It’s a ring. The molecule is in the form of a ring.”

image source: web.chemdoodle.com

সেখান থেকে কেকুল নতুন করে গবেষনা শুরু করেন এবং প্রমাণ করেন বেনজিন আসলেই একটি চক্রাকৃতি যৌগ। অ্যারোমেটিক যৌগের রসায়নকে নতুন করে বোঝা শুরুর হয়েছিল এই বেনজিন রিং আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই। তাই ১৮৯০ সালে বেনজিনের চক্রাকৃতি ফর্মুলা আবিষ্কারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ‘জার্মান কেমিকাল সোসাইটি’ কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞানী অগাস্ত কেকুলকে সংবর্ধনা প্রদান করে। সেখানে তাকে তার স্বপ্নের বিষয়টি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাপারটি স্বীকার করেন। তবে এ স্বপ্ন দেখার আগে বেনজিন নিয়ে তার ২ বছরের দীর্ঘ পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি তিনি।

দুঃস্বপ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ

কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে বা আপনার সবগুলো দাঁত পড়ে গেছে। কিংবা নগ্ন অবস্থায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এরকম হয়েছে কি কখনো? বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। এগুলো আসলে দুঃস্বপ্ন। কিছু কিছু দুঃস্বপ্ন খুবই পরিচিত। পৃথিবীতে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ মিলিয়ন স্বপ্ন দেখা হয়। তার মধ্যে দুঃস্বপ্নের পরিমাণই বেশি।

গবেষকদের মতে, মানুষের আচরণের প্রতিফলন হচ্ছে এই স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নগুলো। এগুলো থেকে খানিকটা হলেও বোঝা যায় মানুষের মনের ভেতর আসলে কী ঘটে চলছে। অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটে সেরকম পরিচিত কিছু দুঃস্বপ্ন আসলে কী অর্থ প্রকাশ করে, তা নিয়ে আজকের আলোচনা।

১.দাঁত পড়ে যাওয়া

দাঁত নিয়ে স্বপ্ন দেখা আপনার চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্নতাকে প্রকাশ করে। এছাড়া অন্যেরা আপনাকে কীভাবে দেখছে এ নিয়ে চিন্তা করলেও আপনি এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পারেন। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, লজ্জা কিংবা অনাকর্ষণীয় দেখানোর ভয় থেকেও এ ধরনের স্বপ্ন জন্মাতে পারে।দাঁতকে আমরা ব্যবহার করে থাকি কামড় দিতে, ছিঁড়তে কিংবা চাবাতে। তাই দাঁত হারাবার স্বপ্ন আপনার অক্ষমতার অনুভূতিকে প্রকাশ করে অর্থাৎ আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন।

২)কেউ আপনাকে ধাওয়া করছে

এ ধরনের স্বপ্নের অর্থ আপনার বাস্তব জীবনে ভয় বা সমস্যা সৃষ্টি করছে এমন কিছু থেকে আপনি পালাতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ বিশেষ কোনো পরিস্থিতি আপনি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। যে আপনাকে ধাওয়া করছে সেও কিন্তু আপনার চিন্তারই প্রতিফলন। হতে পারে আপনার রাগ, অহমিকা, ভয় এসবই আপনাকে তাড়া করছে.

৩)টয়লেট খুঁজে পাচ্ছেন না

আপনি নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে আপনার চাহিদাগুলো প্রকাশ করতে পারছেন না, এধরনের স্বপ্নের অর্থ এটাই। হতে পারে, অন্যের চাওয়া পাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আপনি আপনার নিজের দিকটাই ঠিকমত পূরণ করতে পারছেন না। কিংবা আপনি নিজেকে সময় দিতে পারছেন না, আপনার আরো একান্ত সময়, নিজের দিকে খেয়াল প্রয়োজন।

৪)সবার সামনে নগ্ন অবস্থায়

নিজেকে নিয়ে এরকম কিছু দেখলে বুঝতে হবে আপনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অথবা আপনাকে ভুল কারণে দোষারোপ করা হয়েছে।
কিন্তু যদি নগ্ন অবস্থায় না দেখে অন্য কাউকে দেখেন খারাপ বোধ করেন তবে বুঝতে হবে সেই মানুষটির আসল রূপ নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।

৫)পরীক্ষার হলে অপ্রস্তুতভাবে

পরীক্ষা সর্ম্পকিত স্বপ্নগুলো এত বাস্তব যে, আমরা জেগে উঠেই ভাবি আসলেই হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ফেল করেছি। কমপক্ষে প্রতি ৫ জনে একজন মানুষ এই স্বপ্নগুলো দেখে থাকেন। পরীক্ষা সর্ম্পকিত এধরনের স্বপ্ন আত্মবিশ্বাসের এবং জীবনের পরবর্তী ধাপে সুদৃঢ় পদক্ষেপের অভাব প্রকাশ করে।

৬)উড়া

উড়তে দেখার অর্থ কেউ অথবা কোনো কিছু আপনাকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা দিচ্ছে।
যদি উড়তে ভয় পাচ্ছেন, এমন কিছু দেখেন তার মানে জীবনে আপনার যে লক্ষ্য স্থির করেছিলেন সেটির সাথে তাল মিলাতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আপনি একা এবং উড়ার জন্য কসরত করছেন, তার মানে আপনি আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করছেন।

image source: steemit.com

৭)পড়ে যাওয়া

আপনি কোথাও পড়ে গেলেন এবং ভয় পেলেন তার মানে কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আপনি দুশ্চিন্তায় আছেন।
যদি আপনার পড়ে যাওয়া উপভোগ করে থাকেন তবে আপনি পরিবর্তন সর্ম্পকে ততটা ভীত নন।

৮)নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন

গাড়ির স্বপ্ন আমাদের জীবন চালনা এবং তার দিক প্রতিফলিত করে। এসময় আপনি হয়তো অনুভব করছেন আপনি পথবিচ্যুত হয়ে পড়েছেন এবং আপনার পথে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।

৯)নতুন ঘর খুঁজে পাওয়া

যদি স্বপ্নে আপনি নতুন, অব্যবহৃত ঘর খুঁজে পান তবে তার মানে আপনি নিজের নতুন চেহারা,নতুন ক্ষমতা খুঁজে পেয়েছেন। যদি সেই ঘরের রঙ সাদা হয় তাহলে আপনি একটি নতুন জীবন শুরু করার জন্য প্রস্তুত।

১০)দেরী হয়ে যাওয়া

কোথাও দেরী করে ফেলেছেন এধরনের স্বপ্ন আপনার জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আপনার ভয় ও দুশ্চিন্তাকে প্রকাশ করে। কিংবা আপনি কিছু করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তার জন্য মনে হবে সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

আপনি যখন আপনার দুঃস্বপ্নের অর্থ খুঁজতে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে সচেতনভাবে মনোযোগসহকারে তা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ আপনার অসতর্কতা হয়তো সঠিক অর্থটি থেকে আপনাকে বিচ্যুত করবে

ঘুমানোর সময়, স্বপ্ন দেখার ৫ টি পর্ব তৈরি হয়। এই পর্বগুলো ১৫ থেকে ৪০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। অর্থাৎ ঘুমানোর সময় মোটামুটি আমরা ২ ঘণ্টা সময় স্বপ্ন দেখেই কাটাই।

প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৭ বিলিয়ন স্বপ্ন দেখক মিলে ৩৫ বিলিয়ন স্বপ্ন তৈরি করে ফেলেন। সবকিছু আসলে আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন স্বপ্নগুলো দ্বারা প্রতিফলিত হয় আমরা কী, আমরা কী চাই এবং আমরা কী বিশ্বাস করি।

featured image: ivanyolo.com

মেসন তত্ত্ব ও একজন ইউকাওয়া

কল্পনা করুন আপনার হাতে দুইটি লোহার দণ্ড আছে। যদি দণ্ড দুটি হাত থেকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? যদি সেগুলো বেঁধে রাখা না হয় তাহলে আলাদা হয়ে নীচে পড়ে যাবে। কিন্তু সেই লোহার দণ্ডের পরিবর্তে যদি এবার চুম্বকের দণ্ড নেয়া হয় তবে কী ঘটবে? এবার কিন্তু আর আলাদা হয়ে যাবে না। চুম্বকদ্বয় পরস্পর আকর্ষণ বলের সাহায্যে একত্রে লেগে থাকবে। অর্থাৎ কোনোকিছুকে একত্রে রাখতে হলে অবশ্যই একটি আকর্ষণ বলের প্রয়োজন। এবার কল্পনার পরিসীমা বিবর্ধিত করে কোয়ান্টাম জগতে যাওয়া যাক।

কণা হিসেবে পরমাণু হলো নিরপেক্ষ এবং স্থায়ী। এর মাঝে আছে ধনাত্মক নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে এর চারিদিকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন প্রদক্ষিণ করছে। ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস বিপরীত চার্জে চার্জিত বলে তারা পরস্পরকে আকর্ষণ বলে আকর্ষণ করছে। ইলেকট্রন এ কারণেই তার গতির জন্য ছিটকে পরমাণুর বাইরে চলে আসতে পারে না, নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাঁধা থাকে। কিন্তু নিউক্লিয়াস কোনো মৌলিক কণা নয়। এর মাঝে আছে প্রোটন ও নিউট্রনের সমাহার।

এদের মাঝে নিউট্রন নিরপেক্ষ কণা, আর প্রোটন ধনাত্মক কণা। যেহেতু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে সেহেতু দুটি প্রোটনের মাঝে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করে। এতে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব নষ্ট হবার কথা। কিন্তু তা দেখা যায় না বরং ভারী কিছু নিউক্লিয়াস ছাড়া প্রায় সব নিউক্লিয়াসই দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকদিন ধরে নাকানি-চুবানি খেয়ে অবশেষে ১৯৩২ সালে পরিত্রান পান।

১৯৩২ সালে বিজ্ঞানী চ্যাডউইক কর্তৃক আরেকটি নিউক্লিয়ন (নিউট্রন) আবিষ্কার হবার পর নিউক্লিয়াসের গঠন সম্পর্কেও বিজ্ঞানীরা কিছুটা স্পষ্ট হতে পেরেছিলেন। এর কিছু সময় পরেই এশীয় বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া তার বিখ্যাত ‘মেসন তত্ত্বে’র মাধ্যমে নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্ব ব্যাখ্যা করেন। নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের জন্য কোনো একধরনের বল দায়ী এবং সেই বলের বাহক কণা হিসেবে কোনো কণা কাজ করে। এই তথ্য ধীরে ধীরে জানা যায়। তবে মেসন তত্ত্ব প্রমাণিত হতে আরো ১৫ বছর সময় লেগে যায়।

১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি বিজ্ঞানী হিদেকী ইউকাওয়া জাপানের কিয়োটো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে অবশ্য তার নাম হিদেকী ইউকাওয়া  ছিল না, ছিল হিদেকী ওগাওয়া। স্কুল জীবনে তেমন ভালো ছাত্র না হলেও গণিতের প্রতি হিদেকীর অপার আগ্রহ ছিল। তবে কলেজ পর্যায়ে এসে হিদেকীর গণিতের উপর বিতৃষ্ণা চলে আসে।

একবার তিনি ভিন্ন নিয়মে অঙ্ক করাতে তার শিক্ষক সেটা কেটে দেয়। এতে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে হিদেকী গণিত পড়ার বা গণিতবিদ হবার ইচ্ছা বাদ দেন। আবার কলেজ পর্যায়েই একদিন বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন যার জন্য তাকে ভৎসর্না শুনতে হয়েছিল। তাই রাগ করে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা নিয়েও কাজ করবেন না বলে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন।

চিত্রঃ বিজ্ঞানী ইউকাওয়া।

অসম্ভব মেধাবী এবং খামখেয়ালী এই বিজ্ঞানী কোনোমতে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর ঝুঁকে পড়েন তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে। ১৯৩২ সালে বিয়ে করার পর নিজের পারিবারিক নাম ‘ওগাওয়া’ থেকে ‘ইউকাওয়া’তে পরিবর্তন করেন এবং ‘হিদেকী ইউকাওয়া’ রূপে পরিচিতি লাভ করেন।

১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নিবিড় গবেষণা করে তিনি তার মেসন তত্ত্ব তৈরি করেন। এর মাধ্যমে নিউক্লিয়নের মাঝে আকর্ষণ বল কীরূপে কাজ করে সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে কণা-পদার্থবিদরা জানতে পারে নতুন এক শ্রেণির কণার নাম।

নিউক্লিয়াসে পরমাণু ভেদে অনেক সংযুক্তির প্রোটন থাকে এবং কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণ বলের প্রভাবে তারা স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বলের বিপরীতে কাজ করতে পারে। এই বলের মাধ্যমে তারা একত্রে থাকতে পারে। এই বলকে বলে রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বল। আরো একপ্রকার সবল নিউক্লীয় বল আছে যা কোয়ার্ক-গ্লুয়ন এর মধ্যে কাজ করে। উল্লেখ্য কোয়ার্ক-গ্লুয়নের অবস্থান প্রোটন ও নিউট্রনের মাঝে। এখানে বিদ্যমান সবল বলের নাম মৌলিক সবল নিউক্লীয় বল।

নিউক্লিয়াসের স্থায়ীত্বের সাথে মৌলিক সবল নিউক্লীয় বলের কোনো সম্পর্ক নেই। আছে নিউক্লীয়নের উপর কাজ করা রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের। হিদেকী ইউকাওয়া দেখেছিলেন এই রেসিডুয়াল সবল নিউক্লীয় বলের বাহক কণার ভর ইলেকট্রন ও প্রোটনের ভরের মাঝামাঝি হবে। তাই গ্রীক শব্দ ‘মেসো’ অর্থ মাঝামাঝি থেকে এই বাহক কণার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তিনি এর নাম দিয়েছিলেন ‘মেসোট্রন’ কণা। পরবর্তীতে কণা পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ কর্তৃক কণাটির নাম সংশোধিত হয়ে হয়। তিনি এর পরিবর্তিত নাম প্রদান করেন ‘মেসন’ (Meson) কণা।

মেসন কিন্তু একক কোনো কণা নয়। এটি মূলত কণাদের একটি শ্রেণি। মেসন শ্রেণির কণাদের মাঝে অনেক কণা আছে। যেমনঃ পাই মেসন (পায়ন), কায়ন, রো মেসন ইত্যাদি। হিদেকী ইউকাওয়ার দেয়া মেসন তত্ত্ব বর্তমানে এসে আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক ধারণা মতে সকল মেসন কণারা যেহেতু বল বাহক কণা এবং তাদের সংখ্যায়ন বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সাথে মিলে যায় তাই তারা বোসন শ্রেণির কণা। অর্থাৎ সকল মেসনই বোসন, তবে সকল বোসন মেসন নয়।

বোসন কণারা বলবাহক কণা, অর্থাৎ তারা বল বহন করে। যেকোনো ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা থেকে সর্বদাই অগণিত বোসন কণা নির্গত হচ্ছে এবং তা পুনরায় ঐ ফার্মিয়ন কর্তৃকই শোষিত হচ্ছে। কিন্তু যখন একটি ফার্মিয়ন কণার পাশে আরেকটি ফার্মিয়ন কণা চলে আসে তখন এক ফার্মিয়ন কর্তৃক নিঃসৃত বোসন কণা আরেক ফার্মিয়ন কর্তৃক শোষিত হয়। এই সময়ই আকর্ষণ-বিকর্ষণের ঘটনা ঘটে।

নিউক্লিয়াসের প্রতিটি প্রোটন থেকে সর্বদাই মেসন কণা নিক্ষিপ্ত হয়, যে মেসন কণা পুনরায় অপর প্রোটন কর্তৃক শোষিত হয়। ফলে তাদের মাঝে একটি আকর্ষণ বল কাজ করে। সকল পরিস্থিতিতে এরকম হলে দুটি প্রোটনকে কখনোই আলাদা করা যেত না। কিন্তু এরকম হয় না।

প্রোটন-প্রোটনের এই আকর্ষণ বল খুবই অল্প পরিসরে বিরাজমান থাকে। শুধুমাত্র নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরেই এই আকর্ষণ বল কাজ করে। প্রোটন দুটির মধ্যবর্তী দূরত্ব যখন নিউক্লিয়াসের ব্যাসের চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন আর এই আকর্ষণ বল কাজ করে না। ঐ পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড বিকর্ষণ বল কাজ করবে। কারণ তখন কুলম্বের স্থির বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ বল কাজ করবে।

মেসন শ্রেণির কণাদের আয়ু খুবই কম। এ ধরনের কণা এক প্রোটন হতে নির্গত হয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই এদের আয়ুষ্কালে এরা যত দূর যেতে পারে অন্য প্রোটনটি যদি সেই সীমার মাঝে থাকে তবেই আকর্ষণ বল কার্যকর হয়। অন্যথায় এই আকর্ষণ বল কাজ করে না।

আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, যখন নিউক্লীয়নগুলো আকর্ষিত হয় তখন কি বিকর্ষণ বল কাজ করে না? অবশ্যই করে। কিন্তু আকর্ষণ বলের মান বিকর্ষণ বলের চেয়ে অনেক বেশি বলে বিকর্ষণ বল লোপ পেয়ে আকর্ষণ বলই সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ লব্ধির দিক থেকে আকর্ষণ বল জয়ী হয়।

যেহেতু এই আকর্ষণ বল বিশাল একটি বিকর্ষণ বলের বিরুদ্ধে থেকে নিজের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করে তাই এখান থেকে সহজেই বোঝা যায় এই আকর্ষণ বল কতটা শক্তিশালী। একারণেই এর নাম সবল নিউক্লীয় বল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সকল মৌলিক বলগুলির মাঝে এই বল শক্তিশালী।

চিত্রঃ প্রোটন ও নিউট্রনের আভ্যন্তরীণ গঠন।

আধুনিক ধারণা মতে মেসন কণা একটি কোয়ার্ক কণা ও একটি অ্যান্টি-কোয়ার্ক কণা দ্বারা গঠিত। যেমনঃ পায়ন কণা একটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। আবার কোয়ার্কোনিয়ামগুলোও একপ্রকার মেসন কণা।

কোয়ার্কোনিয়াম হচ্ছে একটি কোয়ার্ক ও ঐ কোয়ার্কেরই অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। যেমনঃ একটি বটম কোয়ার্ক ও একটি বটম অ্যান্টি-কোয়ার্ক দ্বারা যে বটমোনিয়াম গঠিত হয় তার নাম এপসিলন মেসন। ইউকাওয়া যে বাহক কণা কল্পনা করেছিলেন তার ভর তিনি ধরেছিলেন ১০০ MeV/c2 এর কাছাকাছি। বর্তমানে দেখা গেছে, সবচেয়ে হালকা মেসনের ভর ১৩৪.৯ MeV/c2 এবং সবচেয়ে ভারী মেসন হলো ৯.৪৬০ GeV/c2 ভরের।

১৯৩৪ সালে আবিষ্কৃত হবার পর ইউকাওয়া কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীকৃত মেসন কণার খোঁজ শুরু হয়। সর্বপ্রথম ১৯৩৬ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন কর্তৃক মিউয়ন কণা আবিষ্কৃত হয়। এর ভর মেসন কণার ভরের কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই একে মেসন মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেছে এটি ফার্মিয়ন শ্রেণির কণা ২য় প্রজন্মের একটি লেপটন মাত্র। তাই ঐতিহাসিকভাবে মিউয়নকে এখনো ভুল করে অনেকে মিউ মেসন বলে ডেকে থাকে।

সর্বপ্রথম প্রকৃত মেসন কণার খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালে। প্রথম জ্ঞাত মেসন কণার নাম হচ্ছে পাই-মেসন। এই মেসন কণা পাবার পরপরই ১৯৪৯ সালে হিদেকী ইউকাওয়াকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মাঝে হিদেকী ইউকাওয়ার নাম অত্যন্ত স্মরণীয়। কণা-পদার্থবিদ্যায় হিদেকী ইউকাওয়ার হাত ধরেই উঠে এসেছে বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা জাপানি কণা-পদার্থবিদ। তন্মধ্যে ৩য় প্রজন্মের কোয়ার্কের ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানকারী মাসাকাওয়া এবং কণাদের স্ট্রেঞ্জনেস নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানী নিশিজিমার নাম অন্যতম।

হিদেকী ইউকাওয়া জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Yukawa Institute for Theoretical Physics যা এখনো কণা-পদার্থবিদ্যা, স্ট্রিং তত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিপদার্থবিদ্যা, নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব, মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তত্ত্বের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা বিদ্যমান। ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হিদেকী ইউকাওয়া মৃত্যুবরণ করলেও বিজ্ঞানীদের নিকট এখনও তিনি একটি স্মরণীয় নাম।

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Meson
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_mesons
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Strong_interaction
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Nuclear_force
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Pion
  6. https://en. wikipedia.org/wiki/Hideki_Yukawa
  7. https://en.wikipedia.org/wiki/Yukawa_Institute_for_Theoretical_Physics
  8. http:// curtismeyer.com/material/lecture.pdf
  9. http://minimafisica.biodec.com/Members/k/machleidt-potentials.pdf

featured image: globalfirstsandfacts.com

টেলিস্কোপের চোখে

বিজ্ঞানের সবগুলো শাখার মাঝে খুব সম্ভবত জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথেই মানুষের সম্পর্ক সবচেয়ে প্রাচীন। আদিযুগের গুহা মানবেরা যখন জীবন বাঁচাতে পশুর সাথে লড়াই করতো বা খাবারের সন্ধানে বন-জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াতো তখনো হয়তো তারা বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত ও মুগ্ধ হতো।

কী আছে আকাশে? এই প্রশ্নটি হাজার হাজার বছর মানুষের ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু আকাশে সত্যিকার অর্থে কী আছে সেটা জানতে মানুষকে সহস্র বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরার মতো অসাধ্য সাধন করেছে যে যন্ত্রটি, সেটি হচ্ছে টেলিস্কোপ।

আজকের আলোচনাও সাজানো হয়েছে টেলিস্কোপের ইতিহাস ও টেলিস্কোপ সম্পর্কিত খুটিনাটি জিনিস নিয়ে। টেলিস্কোপ যেহেতু জ্যোতির্বিজ্ঞানের অপরিহার্য একটি যন্ত্র, তাই জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে সামান্য একটু আলোচনা না করলে কি হয়? জ্যোতির্বিজ্ঞান কী?

খুব সহজ ভাষায়, জ্যোতির্বিজ্ঞান হচ্ছে মহাবিশ্বের চলমান জ্যোতিষ্কদের নিয়ে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের যে শাখা মহাবিশ্বের বস্তুগুলোর উৎপত্তি, গঠন, ক্রম পরিবর্তন, দূরত্ব এবং গতি নিয়ে আলোচনা করে, তাই হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান।

তবে এখানে একটা ব্যাপার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান’ আর ‘জ্যোতিষশাস্ত্র’ কিন্তু এক জিনিস না। প্রসঙ্গটা টানলাম এ কারণে যে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নাম শুনলে কিছু মানুষকে নাক কুঁচকাতে দেখা যায়। মূল দোষটা আসলে তাদের না। তারা জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষশাস্ত্রকে একটির সাথে আরেকটি গুলিয়ে ফেলেন।

শুরু থেকে আজ পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশাল একটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এর ভেতরে ছিল নানা উথান-পতনের গল্প, আরো ছিল অজানাকে জানার মতো তীব্র দুঃসাহস। এসবের পরেই জ্যোতির্বিজ্ঞান আজকের এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আর অন্যটি পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞান।

পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংরহ করা, পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করা এবং এদের রক্ষণাবেক্ষণ করা।

আর তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় মডেল তৈরি করা। তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে সংগৃহীত তথ্যগুলোকে ব্যাখ্যা করা। এক কথায় তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে, পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তগুলো ব্যাখ্যা করা।

শুরুর দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা মূলত আকাশ পর্যবেক্ষণের মধ্যেই স্বীমাবদ্ধ ছিল। মহাজাগতিক বস্তুগুলো পৃথিবী থেকে কোটি কোটি মেইল দূরে অবস্থান করে। এত দূরের বস্তু সেখানে গিয়ে দেখা সম্ভব নয়, তাই দূরের বস্তুগুলোকে যদি চোখের সামনে নিয়ে আসা যায়, তাহলে কেমন হয়? টেলিস্কোপ মূলত এই কাজটাই করে। দূরের মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে কাছে নিয়ে আসে। টেলিস্কোপ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞান কোনোভাবেই আজকের এই অবস্থানে আসতে পারতো না।

টেলিস্কোপ হচ্ছে এক ধরনের আলোকীয় যন্ত্র, যা দূরের বস্তুর একটি প্রতিবিম্ব চোখের সামনে তুলে ধরে, ফলে দূরের বস্তুটিকে খুব সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। সাধারণ আলোকীয় টেলিস্কোপগুলোতে মূলত একটি লম্বা ফাঁপা নলের দুই মুখে দুটি লেন্স বসিয়ে এ কাজটি করা হয়। কিছু টেলিস্কোপে আবার লেন্সের পরিবর্তে আয়না বসানো থাকে।

দূরের বস্তুটিকে দেখার সময় টেলিস্কোপের এক প্রান্ত সেই লক্ষবস্তুটির দিকে স্থির করতে হয়। টেলিস্কোপের এ প্রান্তটিকে বলা হয় অভিলক্ষ (Objective lens)। অপর প্রান্তটি চোখের সামনে ধরতে হয়। এ প্রান্তের নাম অভিনেত্র (Eyepiece)। টেলিস্কোপের অভিনেত্রের তুলনায় অভিলক্ষটি অনেক বড় হয়। ফলে টেলিস্কোপে অভিলক্ষটি দূরের মহাজাগতিক বস্তু হতে আসা আলো বেশি পরিমাণ সংগ্রহ করতে পারে। এতে করে বস্তুটিও বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।

চিত্রঃ একটি প্রতিসরক টেলিস্কোপ।

টেলিস্কোপ আবিষ্কারের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে যার নামটি না নিলে না হয় তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞানী হাসান ইবনে আল হাইথাম। তাকে আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক বলা হয়।

চিত্রঃ হাসান ইবনে আল হাইথাম, আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক।

আল-হাইথাম আলোকবিদ্যা নিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী কাজ করেন। তিনি একটি বই লিখেন, নাম ‘কিতাব আল মানাযির’ যা পরবর্তীতে ইংরেজী ভাষায় ‘The Book of Optics’ নামে অনূদিত হয়। এ বইয়ে তিনি সর্প্রথম প্রাচীন গ্রীক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন। ধারণাটি ছিল এমন- আলো চোখের মধ্যে থেকে আসে এবং বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আবার চোখে ফিরে আসে।

এই বইয়ে চোখ কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আরো ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেন। চোখের ব্যবচ্ছেদের ব্যবহার করে এবং পূর্ববর্তী জ্ঞানীদের রেখে যাওয়া কাজের সহায়তায় নিয়ে, আলো কীভাবে চোখে প্রবেশ করে, ফোকাস হয়, এবং আবার চোখের পেছন দিকে অভিক্ষিপ্ত হয় সে ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন।

পরবর্তীতে আল হাইথামের এ বইটি দ্বারা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা প্রভাবিত হন এবং তার কাজের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। যার ফলে, বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে চশমা, ক্যামেরা, দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপের প্রতি আগ্রহী হন এবং এদের নিয়ে কাজ করে উন্নতি সাধন করেন।

আল হাইথামের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত টেলিস্কোপ নিয়ে কাজের তেমন কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে টেলিস্কোপের ইতিহাসে এরপরে দৃশ্যপটে একই সাথে হাজির হন তিনজন ব্যক্তি। তারা হলেন নেদারল্যান্ডের চশমা প্রস্তুতকারক হ্যান্স লিপার্সি, জাকারিয়াস জেনসন এবং জ্যাকব মিটাস।

হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কার নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। তিনি একদিন দেখলেন তার দোকানের সামনে দুইটি শিশু কাঁচের লেন্স দিয়ে খেলা করছে। তারা দুইটি লেন্সের মধ্য দিয়ে দূরের জিনিস দেখছে এবং তাদের লেন্সটিকে সামনে পেছনে করছে। লেন্সের এই সামনে পেছনে করার ফলে চোখ থেকে দূরের বস্তুর দূরত্বের পরিবর্তন হচ্ছে। এই ঘটনা থেকেই তিনি টেলিস্কোপ তৈরির ধারণা পান।

আরেকটি ঘটনাও প্রচলিত। তিনি একদিন তার দোকানে বসানো একটি স্থির লেন্সের মধ্য দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন দূরের বস্তুগুলো কিছুটা কাছে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এখান থেকেই হঠাৎ করে তিনি টেলিস্কোপের আইডিয়া পেয়ে যান। তবে এসব ঘটনার সত্যাসত্য নিয়ে মতভেদ আছে। তবে যেখান থেকেই আইডিয়া পান না কেন, তিনি ১৬০৮ সালে একটি অল্প ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ তৈরি করতে সক্ষম হন। তার এ টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে তিন গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেতো।

চিত্রঃ হেন্স লিপার্সি ও তার তৈরি টেলিস্কোপ।

তখনকার সময়ের মানুষ এ ধরনের প্রযুক্তির সাথে অপরিচিত ছিল বলে এটা সহজেই জনসাধারণের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হলো এবং ধীরে ধীরে লোকমুখে হ্যান্স লিপার্সির  আবিষ্কারের কথা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে ইতালীর বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও পদার্থবিদ গ্যালিলিও গ্যালিলির কানে এই খবর যায়। হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপ আবিষ্কারের এক বছর পর ১৬০৯ সালে হ্যান্স লিপার্সির টেলিস্কোপের উপর ভিত্তি করে আরো উন্নত একটি টেলিস্কোপ নির্মাণ করেন।

এই টেলিস্কোপটি দিয়ে দূরের বস্তুকে ৩০ গুণ বিবর্ধিত করে দেখা যেত। এ ব্যাপারে তিনি তার এক প্রবন্ধে লিখেন “আজ থেকে প্রায় ১০ মাস পূর্বে আমার কাছে একটি সংবাদ এসে পৌছায়। সংবাদটি ছিল এক ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা সম্পর্কে। এই চশমা নির্মাতা নাকি এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে দূরের বস্তুদের কাছের বস্তুর মতোই স্পষ্ট দেখা যায়। এ খবর পাওয়া মাত্রই কীভাবে এমন একটি যন্ত্র নির্মাণ করতে পারি সে ব্যাপারে ভাবতে লাগলাম।”

চিত্রঃ গ্যালিলিও গ্যালিলাই।

টেলিস্কোপের উন্নতি সাধনের পর গ্যালিলিও বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরলেন। এটি দিয়ে তিনি আকাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করেন। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে গ্যালিলিওই প্রথম ব্যক্তি যিনি দূরের গ্রহ-নক্ষত্রদের আলোক বিন্দু হিসেবে নয়, বরং তাদের প্রকৃত রূপ দেখতে পেরেছিলেন। গ্যালিলিও তাঁর নিজের টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণে মেতে রইলেন।

১৩ মার্চ, ১৬১০ সালে গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে দূরের জ্যোতিষ্কদের পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে একটি বই প্রকাশ করেন। নাম Sidereus Nuncius, যার বাংলা করলে দাড়ায় “নক্ষত্র থেকে সংবাদবাহক”। এ বইয়ে তিনি তাঁর চন্দ্র বিষয়ক বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেন।

পর্যবেক্ষণের সময় তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে অনেক খাদ লক্ষ্য করেন। পৃথিবী পৃষ্ঠের মতো চাঁদের পৃষ্ঠেও পাহাড়-পর্বত, উপত্যকা, নদী, জলাশয় প্রভৃতি আছে বলে তিনি অভিমত ব্যাক্ত করেন। চাঁদের পৃষ্ঠে তিনি কতগুলো ছোট-বড় দাগ দেখেছিলেন। তবে তিনি এগুলোকে চাঁদের সমুদ্র ভেবে ভুল করেছিলেন।

চিত্রঃ চন্দ্রপৃষ্ঠের দাগ।

গ্যালিলিওর জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপারটি হলো, তিনি তাঁর টেলিস্কোপ দিয়ে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে একসময় সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণের জন্য পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান। সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সম্পর্কে তখন জানা ছিল না।১৬১০ সালের শেষের দিকে পর্যবেক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়। এ সময় গ্যালিলিও সর্বপ্রথম সূর্যের পৃষ্ঠে কতগুলো কালো দাগ দেখতে পান। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুৎ কারণে ১৬১২ সালের মে মাসের আগে তিনি কথা প্রচার করেননি। কিন্তু গ্যালিলিওর দূর্ভাগ্য, ততদিনে জার্মানীর শাইনার, ইংল্যন্ডের টমাস হ্যারিয়ট আর নেদারল্যান্ডের জন ফ্যাব্রিসিয়াস প্রত্যেকেই আলাদাভাবে সূর্যপৃষ্ঠের কালো দাগগুলো আবিষ্কার করে ফেলেন। এগুলোকে আমরা সৌরকলঙ্ক নামে চিনি।

চিত্রঃ শিল্পীর তুলিতে, গ্যালিলিও দেখাচ্ছেন কীভাবে টেলিস্কোপ ব্যবহার করতে হয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে গ্যালিলিওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বৃহস্পতির উপগ্রহ আবিষ্কার করা। তিনি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রহরাজ বৃহষ্পতির মোট চারটি উপগ্রহ খুঁজে পান। এর মাধ্যমেই তখনকার সময়ে প্রচলিত ধারণা ‘গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি কেবল পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে’র সমাপ্তি ঘটে।

খালি চোখে দেখা যায় না এমন অনেক নক্ষত্র গ্যালিলিও তার সদ্য আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে লাগলেন। সে সময় কৃত্তিকা মণ্ডলের মাত্র ৬ টি নক্ষত্র দেখা যেত। কিন্তু গ্যালিলিও তাঁর জীবদ্দশাতে এই নক্ষত্রমণ্ডলে ৩৬ টি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন।

পর্যবেক্ষণ দ্বারা তিনি দেখান যে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে আগণিত নক্ষত্রের সমষ্টি। বেশ কিছু বিষমতারা, নক্ষত্রমণ্ডল এবং নীহারিকা আবিষ্কার করেন। পৃথিবী থেকে যে সকল নক্ষত্রের আপাত উজ্জ্বলতার মান পরিবর্তন হয় তাদের ভেরিয়েবল স্টার বা বিষম তারা বলে। হাইড্রোজেন গ্যাস, প্লাজমা ও ধূলিকণার সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের আন্তনাক্ষত্রিক মেঘকে নীহারিকা বলে।এই পর্বে আমাদের আলোচনা এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা গ্যালিলিওর তৈরি করা টেলিস্কোপটির গঠন, কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।

featured image: shutterstock.com

গোপন গোয়েন্দা যন্ত্র

“The number one benefit of information technology is that it empowers people to do what they want to do. It lets people be creative. It lets people be productive. It lets people learn things they didn’t think they could learn before, and so in a sense it is all about potential.”- Steve Ballmer

তথ্য-প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরতে মাইক্রোসফটের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভ বলমারের উক্তিটির জুড়ি খুঁজে পাওয়া আসলেই ভার। কেননা তথ্য ছাড়া আজকের দিনে আমরা এক মুহূর্তের জন্যও চলতে পারি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যহিক কাজকর্ম সেরেই কেউ বসেন পেপারের পাতা উল্টাতে, কেউ স্মার্টফোনের স্ক্রিন স্লাইড করতে, কেউ আবার টেলিভিশন চালু করে রিমোট কন্ট্রোলের বাটনে ঝড় তুলতে। উপরে উল্লেখিত তিন শ্রেণির মানুষের সবার উদ্দেশ্যই এক- ‘তথ্য জানা’।

চা বানাবেন? তাহলে আগে আপনাকে জানতে হবে চায়ের পাতি ঘরে আছে কিনা সেই তথ্য। ভাত খাবেন? তাহলে আগে খোঁজ নিন চালের ড্রামে চাল আছে কিনা সেদিকে। গোসল করবেন? তাহলে আগে জানতে হবে পানির ট্যাংকিতে পানি আছে কিনা সেই খবরটি। এগুলো তো দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত দরকারি কিছু তথ্যের নমুনা। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, খেলাধুলা, পড়াশোনা, গবেষণাসহ জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারবো। ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক না কেন, এতক্ষণ ধরে তথ্যের এতসব উপযোগিতা তুলে ধরার পর একে যদি দ্বিতীয় অক্সিজেন বলা হয়, তাহলে কি খুব বেশি কিছু বলা হয়ে যাবে?

এবার আসুন পরবর্তী প্রশ্নে- ‘আসলেই কি পৃথিবীর সব তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত?’ না-বোধক উত্তর দিতে কেউ এক মুহুর্তের জন্যও দেরি করবে না। এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় কিছু ব্যাপার স্যাপার আছে যা গুটিকতক আস্থাভাজন লোক ছাড়া আর কারো কাছেই প্রকাশ করা হবে না। একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কখনোই চাইবে না যে তার পানীয় বানানোর রেসিপি সবাই জেনে যাক। সারা পৃথিবীতে অসংখ্য গুপ্ত সংঘ আছে, আছে নানা অপরাধী চক্রও। তারাও কোনোদিন চায় না তাদের ভেতরের তথ্য কোনোদিন বাইরে পাচার হয়ে যাক। অর্থাৎ জায়গামতো সবাই নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষায় শতভাগ সচেষ্ট।

কিন্তু তাই বলে কি গোপন তথ্য ফাঁস হওয়া কখনো থেমেছে? অবশ্যই না। হাল আমলের জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, এডওয়ার্ড স্নোডেনরা আমাদের সামনে রয়েছেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা উল্টালেও এমন শত শত মানুষের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে শত্রুর আঙিনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন ছদ্মবেশে, খুঁজেছেন কিছু অত্যন্ত দরকারি তথ্য। কেউ সফল হয়ে জীবন নিয়ে ফেরত আসতে পেরেছেন, কেউবা ব্যর্থ হয়ে শত্রুর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের জীবনটিই বিলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আজকের আলোচনা এ গোপন তথ্যানুসন্ধান নিয়েই। গোপন তথ্যানুসন্ধানের নানা কৌশলের ইতিহাস দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখাটি।

বেলী বাস্টার

1

গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বেলী বাস্টার নামের এ যন্ত্রটি ব্যবহার করতো সিআইএ। দেয়াল ছিদ্র করে তাতে গোপনে শত্রুপক্ষের কথাবার্তা শোনার জন্য কোনো ডিভাইস রেখে দেয়াই ছিলো এর মূল উদ্দেশ্য। পুরো যন্ত্রটি ঠিকমতো জোড়া লাগানোর পর এর ড্রিল বিটের অপর প্রান্ত পেটের সাথে সজোরে চেপে হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়াল ছিদ্র করার কাজটি সারা হতো।

লেটার রিমুভার

2

ধরুন, শত্রুপক্ষের খামে আটকানো একটি চিঠি সৌভাগ্যক্রমে আপনার হাতে এসে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি চাইবেন চিঠিটি পড়ে দেখতে। একইসাথে আপনার শত্রু যেন ব্যাপারটি বুঝতে না পারে এটাও আপনি চাইবেন। তো এজন্য আপনাকে চিঠিটি এমনভাবে বের করতে হবে যেন চিঠিও বেরোয়, আবার খামেরও কোনো ক্ষতি না হয়। এমন কাজ সারার জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহার করা হতো সরু লেটার রিমুভার। খামের একেবারে উপরের কোনা, যেখানে আঠা খুব কমই লাগানো হয়, সেখান দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হতো ডিভাইসটি। তারপর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চিঠিকে পেঁচিয়ে ফেলা হতো এর সাথে। তারপরই ধীরে ধীরে বের করে আনা হতো আকাঙ্ক্ষিত চিঠি।

স্টেরিওস্কোপ

3

স্টেরিওস্কোপ (Stereoscopy) শব্দটি এসেছে দুটি গ্রীক শব্দ স্টেরিওস (দৃঢ়) ও স্কোপিও (দেখা) থেকে। এ পদ্ধতিতে একজন দর্শকের বাম ও ডান চোখের জন্য একই ছবি কিছুটা আলাদাভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। এ দুটো দ্বিমাত্রিক ছবিকে আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রক্রিয়াজাত করে ত্রিমাত্রিক ছবি দেখার অনুভূতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষ নানা স্টেরিওস্কোপিক ছবি দেখেই শত্রুপক্ষের সম্পর্কে ধারণা নিতো। এজন্য প্রথমে তারা এরোপ্লেন থেকে শত্রুর এলাকার নানা ছবি তুলে আনতো। তারপর এসব স্টেরিওস্কোপের সাহায্যে সেসব ছবির ত্রিমাত্রিক ধারণা নেয়ার চেষ্টা করতেন ছবি বিশ্লেষকেরা।

ড্রাগনফ্লাই ইনসেক্টোথপ্টার

4

ঘরের ভেতর একটি ফড়িং কিংবা প্রজাপতি উড়ে বেড়ালে আপনি কি কিছু মনে করবেন? অবশ্যই না। বরং এক নজর সেদিকে চোখ বুলিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিবে অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু এ প্রাণীটি যদি জৈবিক না হয়ে যান্ত্রিক হয়? যদি সে জৈবিক প্রাণীর ছদ্মবেশে আপনার উপরই নজরদারি করতে থাকে তাহলে কেমন হবে? ছবিতে আসলে এমনই একটি ইউএভি (আনম্যান্‌ড এরিয়াল ভেহিকল) দেখানো হয়েছে। ১৯৭০ সালের দিকে সিআইএ’র রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ থেকে বানানো হয়েছিলো ফড়িংয়ের মতো দেখতে এ ডিভাইসটি যা নানা তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো।

মাইক্রোডট ক্যামেরা

5

গোপনে ছবি তোলার নানা কৌশল বিভিন্ন অ্যাকশন বা থ্রিলার সিনেমায় দেখেছি। এরই এক বাস্তব উদাহরণ হলো এই মাইক্রোডট ক্যামেরা। কোনো ছবি কিংবা টেক্সটকে আকারে অনেক ছোট করে কোনো ছোট ডিস্কে ধারণ করার কৌশলকে বলা হয় মাইক্রোডট। মাইক্রোডটগুলো সাধারণত বৃত্তাকার এবং ১ মিলিমিটার ব্যাসের হয়ে থাকে। তবে চাহিদামতো এর আকার কিংবা আকৃতি পরিবর্তন করা যায়। গত শতাব্দীতে চলা কোল্ড ওয়্যারের সময় বিবিন্ন গোপন তথ্যের আদান-প্রদানের কাজে এটি ব্যবহার করা হতো। হাতের আংটি, ফাঁপা কয়েন ইত্যাদি নানা জায়গায় মাইক্রোডট লুকিয়ে রাখা যেতো।

ম্যাচবক্স ক্যামেরা

6

হাতে একটি ম্যাচবক্স নিয়ে যদি আপনি ঘোরাঘুরি করেন, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ভাববে আপনি হয়তো সিগারেট ধরাতে যাচ্ছেন। ম্যাচবক্সের ভেতর যে দেশলাইয়ের কাঠি ছাড়া অন্য কিছুও থাকতে পারে এটা কেউ চিন্তাই করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির নাম ছিলো ‘অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস (ওএসএস)’। একে বর্তমানের সিআইএ’র পূর্বপুরুষও বলা যেতে পারে। এ ওএসএস-এর জন্যই ইস্টম্যান কোডাক কোম্পানি তৈরি করেছিলো এসব ম্যাচবক্স ক্যামেরা। এগুলোর ভেতরে দেশলাইয়ের কাঠির বদলে ভরা থাকতো আস্ত ক্যামেরা। আর একজন গোয়েন্দা যে দেশে যাচ্ছেন, তিনি সেই দেশের প্রচলিত কোনো ম্যাচের মোড়ক এর গায়ে লাগিয়ে নিলেই কাজ হয়ে যেতো। তখন কেউ আর সন্দেহের অবকাশ পেতো না যে লোকটি সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে নাকি তার দেশের নিরাপত্তায় আগুন জ্বালাচ্ছে!

ডেড ড্রপ স্পাইক

7

মনে করুন, কোনো একটি এলাকায় কিছু গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য দুজন ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছে। তারা যদি একসাথে কোথাও দেখা করেন তাহলে শত্রুপক্ষ সন্দেহ করার অবকাশ পেয়ে যাবে। কিন্তু এমনটা হতে দেয়া যাবে না। আবার মাঝে মাঝে তাদের নিজেদের মাঝে কিছু তথ্যের বিনিময়ও দরকার। কিন্তু তা এমনভাবে করতে হবে যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহও করতে না পারে।

এমন পরিস্থিতির জন্য আসলে বানানো হয়েছিলো এ ডেড ড্রপ স্পাইক। এর ভেতরের ফাঁপা জায়গায় দরকারি তথ্য ভরে তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জায়গায় মাটিতে পুঁতে রেখে যেতো এক এজেন্ট। পরে অন্যজন এসে সুবিধামতো তা তুলে নিয়ে যা বোঝার বুঝে নিতো।

পিজিয়ন ক্যামেরা

8

নামটা দেখেই ভ্রু কিছুটা কুঁচকে গেছে, তাই না? ভাবছেন কবুতর দিয়ে আবার ছবি তোলানো হতো নাকি অতীতে? আসলে আপনি যা ভাবছেন তার আংশিক সত্য, আংশিক আপনার অজানা যা এখন আপনাকে জানাবো। আসলে ছবিগুলো তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো কবুতরকে। ১৯০৭ সালে জার্মান ওষুধ প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা জুলিয়াস নিউব্রোনার এর উদ্ভাবন করেন। কোনো পোষা কবুতরের গায়ে ছোট ও হালকা এ ক্যামেরাগুলো লাগিয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়া হতো। ছবি তোলার জন্য ছিল সেলফ টাইম ডিলে মেকানিজম। ফলে নির্দিষ্ট সময় পরপর আপনাআপনিই ছবি উঠতে থাকতো, কবুতরটির কাজ ছিল শুধু জায়গামতো উড়ে যাওয়া। তবে প্রযুক্তির অগ্রসরতা একসময় এ কৌশলকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। সেই সাথে কবুতরগুলোকে ঠিকমতো ট্রেনিং দেয়া, বাড়তি একটি জিনিস নিয়ে উড়তে অভ্যস্ত করানো, জায়গামতো সে আসলেই যাবে কিনা, তার গতি ইত্যাদি নানা বিষয় কবুতর দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর নজরদারিকে বেশ কঠিন করে তুলেছিল।

গোপন সংকেত দেখানো আয়না

9

এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। একজন মহিলাকে যদি আপনার সামনে ব্যাগ থেকে ছোট আয়না বের করেনিজের চেহারা সাজাতে দেখেন, তাহলে আপনি কী ভাববেন? নিশ্চয়ই আপনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিবেন, “আরে ভাই, এত ভাবার কী আছে? উনার সাজার ইচ্ছা হইছে, তাই আয়না বের করে সাজতেছে। আর কী?”

আসলে ঘটনার মোড় লুকিয়ে আছে এখানেই। কারণ নারী এজেন্টদের জন্য এমন আয়নাও ছিল (হয়তো এখনো আছে) যা দিয়ে সবার সামনে তিনি হয়তো সাজগোজ করতেন। কিন্তু আসলে সেটি থাকতো বিশেষ এক ধরনের আয়না যা একটু বিশেষ কোণে ধরলে ভেসে উঠতো তার মিশনের গোপন কোনো কোড! সেখান থেকে সহজেই পরবর্তী নির্দেশনা নিতে পারতেন তিনি।

পালিয়ে যাবার মানচিত্র

সিল্কের উপর প্রিন্ট করা এই মানচিত্রগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল একজন এজেন্টের পালিয়ে যাবার পথ চিনিয়ে দেয়া। তবে কাপড়ের উপর আঁকা বলে একজন চাইলে কৌশল হিসেবে এটিকে গায়ে জড়িয়ে কিংবা ভাঁজ করে রাখতে পারতেন। পানিরোধী রং দিয়ে এটি আঁকা হতো বলে যদি এজেন্টকে সাঁতরানো লাগতো, তাহলেও ভয়ের কিছু ছিল না। চুপচাপ জলাশয়ের অন্য পাড়ে গিয়ে শুকিয়ে নিলেই চলতো।

ফাঁপা কয়েন

10

বাইরে থেকে এ কয়েনটিকে নিরেট মনে হলেও আসলে এটি ফাঁপা! এর ভেতরে করে সহজেই কোনো ফিল্ম বা মেসেজ বিনিময় করা যেতো।

মিনক্স ক্যামেরা

11

লাটভিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ওয়াল্টার জ্যাপ ১৯৩৭ সালে এ ক্যামেরাটির ডিজাইন করেন। খুব সহজেই একে হাতের তালুর ভেতর লুকিয়ে রাখা যেতো। এর সাহায্যে তোলা ছবিগুলোর মানও ছিল বেশ ভালো। ফলে গোয়ান্দাগিরির কাজে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলোর মাঝে এটিই শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

অনাহূত অতিথি দূরীকরণ

19

নিজের বাড়িতে অন্যের ছড়ি ঘোরানো কেউই সহ্য করতে পারে না। আর সেটা যদি হয় কোনো এলাকা বা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন, তাহলে তো কথাই নেই। অবৈধভাবে যেন একজন মানুষও কোনো বিশেষ স্থানে ঢুকে পড়তে না পারে এজন্য নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীর প্রচেষ্টার অন্ত নেই। ছবিতে দেখানো ডিভাইসটি এমন কাজেই ব্যবহার করা হতো। মেটে রঙের বলে সহজে কারো চোখে ধরাও পড়ে না এটি। ভূ-কম্পনের সাহায্য নিয়ে তিনশ মিটার দূর থেকে এটি মানুষসহ অন্যান্য যেকোনো কিছুর আগমনকে শনাক্ত করতে পারতো। ছোট ব্যাটারি দিয়ে চালিত এ ডিভাইসে থাকতো বিল্ট-ইন এন্টেনা। এটি কোড করা পালসের সাহায্যে কোনো তথ্য পাঠাতে পারতো।

সিগারেট ক্যারিয়ারে ক্যামেরা

12

যাদের ধূমপানের অভ্যাস আছে, তাদের অনেকেই কেবল দোকানে কিনতে পাওয়া প্যাকেটের উপর নির্ভর করেন না। বরং নিজের খুশি মতো বাজার থেকে কিনে নেন চমৎকার কোনো বক্স। কোথাও যখন কেউ সেই বক্স থেকে সিগারেট বের করে, তখন কেউ ঐ বক্সের দিকে ওভাবে তাকায়ও না। আর এ জিনিসটি মাথায় রেখেই ছোট এ ক্যামেরাটি বানানো হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। একে সহজেই সিগারেটের বক্সে লুকিয়ে রাখা যেতো।

বোতামে লুকোনো ক্যামেরা

13

কোট-টাই পরে যখন আপনি সবার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন সবাই কিন্তু আপনার কাপড়ের রং-মান এসবই খেয়াল করে ঠিকমতো। কাউকে শোনা যায় না বোতামের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটির ভালো-মন্দ বিচার করতে।

এ বিষয়টি খেয়াল করেই বিচিত্র এক কৌশল অবলম্বন করেছিল কেজিবি। গত শতকের সত্তরের দশকে তারা অ্যাজাক্স নামের বোতামের ভেতর লুকানো এ ক্যামেরার ডিজাইন করে। ক্যামেরার লেন্স থাকতো ডানদিকের মাঝের বোতামে। যখনই সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়তো, তখনই একজন গোয়ান্দা তার পকেটে থাকা ক্যামেরার শাটারে চাপ দিতেন। সাথে সাথে উঠে যেতো ছবি। কেউই বুঝতে পারতো না!

জুতার নিচে ট্রান্সমিটার

14

গোপন তথ্য সংগ্রহের কৌশল যে আসলে শরীরের সম্ভাব্য সব জায়গাকেই ব্যবহার করেছে এ জুতাটি তার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। ১৯৬০-৭০ সালের দিকে আমেরিকান কূটনীতিকদের উপর নজর রাখতে এটি ব্যবহার করতো রোমানিয়ার সিক্রেট সার্ভিস। কূটনীতিকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করতেন না। নিজেদের দেশ থেকেই দরকারি বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসতে তারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। রোমানিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা সেগুলো পোস্ট অফিসে আটক করে আগে সেখানে ছবিতে দেখানো উপায়ে ট্রান্সমিটার লাগিয়ে তারপর ছাড়পত্র দিতো। এরপর সেই কূটনীতিকের যাবতীয় আলাপ-আলোচনা সহজেই তারা রেকর্ড করে রাখতে পারতেন!

বিষ্ঠার ভেতরেও ট্রান্সমিটার

15

রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় যখন গরু-ছাগল, কুকুর-বিড়াল ইত্যাদি নানা প্রাণীর মল আমাদের চোখের সামনে পড়ে, তখন সাবধানে পা সরিয়ে হেঁটে যাই আমরা সবাই। দুর্গন্ধময় ওসব জিনিস কে ঘাঁটাতে যাবে? এজন্যই সিআইএ মলের মতো দেখতে এই ট্রান্সমিটারটি ডিজাইন করেছিল যেন কেউ এটা নাড়াতে আগ্রহী না হয়। শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোতে আগেই এগুলো রেখে আসা হতো। এরপর এগুলো সিগনাল পাঠাতো আকাশে থাকা পাইলটদের। সেখান থেকেই এ সিগনাল অনুসরণ করে তারা বোম নিক্ষেপ করে আবার নির্বিঘ্নে ফেরত যেতো।

ঘড়ির ভেতর ক্যামেরা

16

শার্টের বোতাম, হাতের তালু আর সিগারেটের বক্সে যদি ক্যামেরা রাখা যায়, তাহলে দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ঘড়িই বা বাদ যাবে কেন? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির এক এজেন্টের কাছে এমন ঘড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এর মূল সমস্যা হলো আন্দাজের উপর ভিত্তি করে ছবি তুলতে হতো। কারণ চোখ রেখে যার বা যে জিনিসের ছবি তোলা হচ্ছে সেটি দেখার ব্যবস্থা এতে রাখা হয়নি। একেকটি ফিল্মে আটটি করে ছবি তোলা যেতো।

গাছের ভেতর বাগ

17

এখন যে গোপন তথ্য চুরির পদ্ধতি বলতে যাচ্ছি সেটা বেশ চমৎকার। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শুরুর দিককার কথা। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন একটি কৃত্রিম কাটা গাছের মতো অংশে একটি বাগ লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর এটিকে তারা মস্কোর বাইরে এক গাছপালা ঘেরা জায়গায় এমনভাবে স্থাপন করলেন যেন সহজেই একটি সোভিয়েত মিসাইল সিস্টেমের রাডার ও কমিউনিকেশন সিগনালের উপর তারা নজরদারি করতে পারেন! প্রাপ্ত সিগনালগুলো এখানে সংরক্ষণ করে পরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমেরিকায় পাঠানো হতো। এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক প্রবেশ করে ভেতরের সোলার ব্যাটারিগুলো চার্জের ব্যবস্থা করতো। এতকিছু করেও অবশ্য শেষ রক্ষা হয়নি। কেজিবি একসময় ঠিকই বাগটির অস্তিত্ব শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

ফাউন্টেন পেন

ক্যামেরা নিয়ে আজ বোধহয় বেশি কথা হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু কী করবো বলুন? কারণ এ ক্যামেরা লুকোনোর পদ্ধতিগুলোই যে ছিল বেশ চমৎকার।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফাউন্টেন পেনের ভেতর ট্রোপেল লেন্স লুকিয়ে রাখার কৌশল নেয় সিআইএ। বিভিন্ন দলিলপত্র কিংবা যন্ত্রের ছবি গোপনে তুলতেই একে কাজে লাগানো হতো। যেমন- এখানে যে ফাউন্টেন পেনটি দেখা যাচ্ছে সেটি ব্যবহার করতেন আলেকজান্ডার ওগোরোদনিক, যার কোড নেম ছিল ট্রাইগন। তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র সোভিয়েত কূটনীতিক। সিআইএ তাকে হাত করে নিয়েছিল। ওগোরোদনিক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কেজিবির হাতে ধরা পড়ে যান। অবশ্য কেজিবি তার কাছ থেকে কোনো তথ্য আদায় করতে পারেনি। এর আগেই তিনি সিআইএর কাছ থেকে পাওয়া পয়জন পিল খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আপাতত বিদায় নিচ্ছি গোপনীয়তার জগত থেকে। পরবর্তী কোনো লেখায় আশা করি গোপনীয়তায় ভরপুর অন্য কোনো জগতের গল্প নিয়ে সবার সামনে আবার হাজির হবো।

লেখকঃ মুহাইমিনুল ইসলাম

সহ-সম্পাদক, জিরো টু ইনফিনিটি

fb.com/muhaiminul.islamantik

শূন্যে শাক-সবজি চাষ

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীগণ মহাশূন্যে তাদের জন্মানো সবজির স্বাদ পরীক্ষা করে দেখেছেন। সবজি জন্মানোর এ পদ্ধতিতে লেটুস জন্মানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল কিছু বীজতলা, লাল, সবুজ ও নীল রঙের LED আর পানি। লাল আর নীল LED ব্যবহার করা হয়েছিল যেন তারা তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে বিচ্ছুরিত করতে পারে। এটি উদ্ভিদের বৃদ্ধি সাধনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। সবুজ LED সেগুলোকে খাওয়ার জন্য আরো উপযোগী করে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছিল। হয়তো একদিন মঙ্গলের দীর্ঘ অভিযানের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পুষ্টিকর ও দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যের উৎস তৈরি করা যাবে।