রসায়ন

চারটি নতুন মৌলের নামকরণ পূর্ণ হলো অসম্পূর্ণ পর্যায় সারণী

এতদিনে নিশ্চয় সবাই জেনে গিয়েছেন গত জুন মাসের ৮ তারিখে IUPACএবং IUPAPএর একটি যৌথ দল১১৩,১১৫,১১৭ ও ১১৮ নম্বর মৌলের আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাবিত নাম ও প্রতীক প্রকাশ করেছে। এ ঘোষণার মাধ্যমে অবশেষে পর্যায় সারণীর ৭ম পর্যায় পূর্ণ হলো। এ মৌলগুলো কারা কীভাবে তৈরি করল,কীভাবে এদের আবিষ্কারের স্বীকৃতি এল, কীসের উপরে ভিত্তি করে এদের নাম দেয়া হলো, তার আদি অন্ত নিয়েই আজকের প্রবন্ধ।

শুরুর আগে

 ২০০৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিউর এন্ড এপ্লায়েড কেমিস্ট্রি(IUPAC)এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিউর এন্ড এপ্লায়েড ফিজিক্স(IUPAP)-এর প্রেসিডেন্টদ্বয় দুই ইউনিয়ন থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে Joint Working Party (JWP)গঠন করেন। এটি একটি সাময়িক যৌথ দল, যা গঠন করার মূল উদ্দেশ্য ছিলকোনো নতুন মৌল আবিষ্কারের দাবির সত্যতা যাচাই করা এবং তা প্রমাণিত হলে মৌলগুলোর নতুন নাম দেয়া।

উল্লেখ্য, এই যৌথ দলই ১১২,১১৪ আর ১১৬ নম্বর মৌল আবিষ্কারের স্বীকৃতি দেয়। যাদের নাম পরবর্তীতে যথাক্রমে কোপার্নিসিয়াম, লিভারমোরিয়াম এবং ফ্লেরোভিয়ামদেয়া হয়। এখানে নম্বরের মাধ্যমে পারমাণবিক সংখ্যা অর্থাৎ মৌলের পরমাণুতে প্রোটনের সংখ্যাকে নির্দেশ করা হচ্ছে।

যেভাবে শুরু হলো

২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর যৌথ দলের সদস্যরা পর্যায় সারণীর ১১৩,১১৫,১১৭ এবং ১১৮ তম মৌল আবিষ্কার সংক্রান্ত পেপার রিভিউ করে রিপোর্ট জমা দেয়। তাদের এই রিপোর্টে দেখানো হয় এই মৌলসমূহের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশিত হবার আগে রিপোর্টের ড্রাফট, আবিষ্কার সংক্রান্ত ল্যাবগুলোতে পাঠানো হয় রিপোর্টের বিষয়বস্তু ও উপাত্ত যাচাই করে দেখার জন্য। উদ্দেশ্য টেকনিকাল খুঁটিনাটিতে যেনকোনো ভুল না থাকে। এরপরএই রিপোর্ট ১৫জন বিশেষজ্ঞ রিভিউ করে দেখেন যা পরে IUPAC এবং IUPAPএর নির্বাহী কমিটি গ্রহণ করে। সবশেষে IUPACএর অজৈব রসায়ন বিভাগের কমিটি দ্বারা এই রিপোর্ট গৃহীত হয়।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে এই রিপোর্ট IUPACএর জার্নাল Pure And Applied Chemistry-র ২০১৬ সংখ্যায় দুটি পেপারে প্রকাশিত হয়। রিপোর্টেজাপানের ওয়াকোতে অবস্থিত রিকেন ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের ১১৩ তম মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয়। এছাড়া বলা হয় রাশিয়ার দুবনাতে অবস্থিত জয়েন্ট ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ, আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং টেনেসি স্টেটের ওক রিড ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত সমন্বিত দল ১১৫ এবং ১১৭ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পেরেছে। এই দলটিকে দুবনা টিমনামেও ডাকা হয়।

নিবন্ধের শেষে উল্লেখ করা হয় রাশিয়ার জয়েন্ট ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার রিসার্চ এবং আমেরিকার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিরবিজ্ঞানীদের নিয়ে গঠিত সমন্বিত দল ১১৮ তমমৌলের আবিষ্কার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য,একই দলের সাথে ওকে রিজ ন্যাশলান ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা যুক্ত হয়েছিলেন ১১৫ ও ১১৭ নম্বর মৌল আবিষ্কারের জন্য। লক্ষ্যণীয়,১১৩ তম মৌল আবিষ্কারের বিস্তারিত রিপোর্ট Journal Of Physical Society of Japan-এর একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।

মৌল চারটির অস্তিত্ব প্রমাণিত হবার নিশ্চয়তা দেবার পরIUPAC এরঅজৈব রসায়ন বিভাগেরপ্রধান জন রেডিক এক বক্তব্যে জানান,IUPACএই মৌল চারটির নাম ও প্রতীক প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। এতদিন এই মৌল চারটিকে সাময়িকভাবে যথাক্রমে Ununtrium,Ununpentium, Ununseptiumএবং Ununoctium নাম দ্বারা চিহ্নিত করা হতো।

নাম ও প্রতীকের জন্য IUPACএর সুপারিশ

IUPACএর ঐতিহ্য অনুযায়ী, নতুন আবিষ্কৃত কোনো মৌলের নাম রাখা যাবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্র অনুসারে-

১. কোনো পৌরণিক চরিত্র বা ধারণা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসংক্রান্ত বস্তুর নামে।যেমন, ক্যাডমিয়ামেরনাম গ্রিক পুরাণের চরিত্রথিবিসশহরের রাজা এবং প্রতিষ্ঠাতাক্যাডমাসের নামানুসারে দেয়া হয়।প্লুটোনিয়ামের নাম সৌরজগতের বামন গ্রহ প্লুটোর নামে রাখা হয়। এই গ্রহের নাম আবার গ্রিক পুরাণের মৃত্যুর দেবতা প্লুটোর নামে রাখা হয়েছে।

২.কোনো খনিজ পদার্থের নামে।স্যামারিয়াম(Sm) মৌলের নাম খনিজ পদার্থSamarskiteএর নামে রাখা হয়েছে।

চিত্রঃ IUPAC এর লগো।

৪. ঐ মৌলের কোনো ধর্মের নামে।ব্রোমাইডের নাম গ্রিক শব্দ bromosথেকে নেয়া। এর অর্থ stenchবা দুর্গন্ধ,যা এই মৌলের নিজস্ব গন্ধের দিকে নির্দেশ করে। একইভাবে ক্লোরিনেরনাম গ্রিক শব্দ chlorosথেকে নেয়া হয়েছে। এই শব্দের অর্থ হলুদাভ সবুজ বা সবুজাভ হলুদ, যা এই গ্যাসের সবুজাভ হলুদ রঙকে নির্দেশ করে। ৩.কোনোস্থান বা ভৌগলিক অঞ্চলের নামে। আমেরিকিয়ামের নাম আমেরিকা মহাদেশের নামে রাখা হয়েছে। এরকম আরেকটি মৌল হলোইউরোপিয়াম।এর নাম ইউরোপ মহাদেশের নামে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্যআমেরিকা মহাদেশের নাম ইতালীয় নাবিক Amerigo Vespucci-র নামে রাখা হয়। পর্যায় সারণীতে এখন পর্যন্ত২৫টি মৌলের ক্ষেত্রে নাম ভৌগলিক স্থানের নামে রাখা হয়েছে।

(একেক বইতে এই গ্যাসের একেক রঙ দেয়া আছে,কেউ একে সবুজাভ হলুদ,কেউ শুধু সবুজ আর কেউ হলুদাভ সবুজ রঙের গ্যাস বলেছেন। সবচেয়ে ভালো হয়,আপনি যদি ইউটিউবে ক্লোরিন গ্যাস সংক্রান্ত ভিডিও দেখেন। তাহলে নিজের চোখেই মূল রঙ সম্বন্ধে ধারণা নিতে পারবেন।)

৫. কোনো বিজ্ঞানীর নামে। এরকম মৌলের মোট সংখ্যা ১৫।যেমন রাদারফোর্ডিয়াম, কোপার্নিকিয়াম, আইনস্টাইনিয়াম, বোরিয়াম ইত্যাদি।

এছাড়া নাম দেবার সময় আরো কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। যেমন ধরা যাক, একটি নতুন আবিষ্কৃত মৌলের জন্য একটি নাম প্রস্তাবিত হলো। কিন্ত পরে ঐ মৌলের জন্য অন্য একটি নাম ঠিক করা হলো। তাহলে জটিলতা এড়াবার জন্য গৃহীত না হওয়া প্রথম নামটিঅন্য কোনো মৌলের জন্য প্রস্তাব করা

যাবে না। মৌলের প্রতীকের ক্ষেত্রেও এই নিয়মটি প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, কোপার্নিকিয়ামেরপ্রতীক প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছিল Cp,পরে দেখা যায় এই প্রতীক আগে ক্যাসিওপিয়ামমৌলেরজন্য প্রস্তাব করা হয়েছিল।নাম হিসেবে ক্যাসিওপিয়াম গৃহীত হয়নি।মৌলটির বর্তমান নাম লুটেটিয়াম ও প্রতীক Lu।এমন অবস্থায়IUPAC কর্তৃপক্ষ‘Cp’প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করে,যে কারণে পরে এই মৌলের প্রতীক Cnঠিক করা হয়।

একইভাবে, নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নামের শেষাংশ এমন হতে হবে যা ঐ মৌলের ঐতিহাসিক এবং রাসয়নিক সঙ্গতি মেনে চলে। এই নিয়ম অনুসারে, গ্রুপ ১-১৬ এর অন্তর্ভুক্ত মৌলসমূহের নামের শেষাংশে –ium থাকবে,নতুন মৌল গ্রুপ ১৭ এর অন্তর্ভুক্ত হলে নামের শেষাংশে –ine এবং নতুন মৌল গ্রুপ ১৮ এর সদস্য হলে নামের শেষে –on থাকবে। সবশেষে,ইংরেজিতে মৌলটির নাম এমন হতে হবে যেন নামটি প্রধান প্রধান ভাষায় সহজে অনুবাদযোগ্য হয়।

এখন নতুন আবিষ্কৃত মৌলদের কাছে ফিরে যাই। জানুয়ারি মাসে IUPAC চারটি নতুন মৌলের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেবার পরে মৌল ১১৩ তম মৌলের জন্য জাপানের রিকেন ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের দলকে, ১১৫ ও ১১৭ তম মৌলের জন্য জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, ওক রিড ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সমন্বিত দলকেএবং সবশেষে ১১৮ তম মৌলের জন্য জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চএবং লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির সমন্বিত দলকে নামকরণের নিয়মাবলী অনুযায়ী নাম ও দুই অক্ষরের প্রতীক প্রস্তাবের অনুরোধ করে। অনুরোধের প্রেক্ষিতে আবিষ্কারকরা তাদের নিজ নিজ পছন্দসই নাম ও প্রতীক প্রস্তাব করে যা IUPACএর অজৈব রসায়ন বিভাগ কর্তৃক স্বীকৃত হয়।

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পর IUPAC গত জুন মাসের ৮ তারিখে নাম ও প্রতীক চারটি জনমত যাচাইয়ের জন্য উপস্থাপিত করে। ইউটিউবের Periodic Table of Videos এর অন্যতম প্রধান উপস্থাপক স্যার মার্টিন পলিয়াকফের মতে, ইতিহাসে সম্ভবত এটাই প্রথম যেখানেIUPAC একসাথে এতগুলো নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নাম প্রকাশ করল।

৫ মাসের জনমত এই বছর নভেম্বরের ৮ তারিখে শেষ হবে। আপনি চাইলে এই নাম ও প্রতীকগুলো সম্পর্কে নিজের অভিমত তুলে ধরতে পারবেন। তার জন্য এই ওয়েবসাইটে যেতে হবে।http://iupac.org/recommendations/under-review-by-the-public।জনমত শেষ হবার পর IUPAC এর সর্বোচ্চ কমিটি মৌলসমূহের নাম, তাদের দুই অক্ষরের প্রতীক এবং পর্যায় সারণীতে তাদের সংযোজনের ব্যাপারে শেষ সিদ্ধান্ত নিবে।

এবার আসুন আমরা এক নজরে মৌলগুলোর প্রস্তাবিত নাম আর প্রতীকগুলো দেখিঃ

মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা প্রস্তাবিত নাম প্রস্তাবিত প্রতীক
১১৩ নিহোনিয়াম Nh
১১৫ মস্কোভিয়াম Mc
১১৭ টেনেসিন Ts
১১৮ ওগানেসন Og

যেভাবে নাম দেয়া হলো

নতুন মৌলগুলোকে সাধারণ মৌল যেমন সোনা,লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের মতো প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না,শুধুমাত্র ল্যাবে খুবই অল্প সময়ের জন্য প্রস্তুত করা যায়। ল্যাবরেটরিতে দুটি ভিন্ন মৌলের হালকা পরমাণুর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়, পরে সংঘর্ষে সৃষ্ট ভারী নিউক্লিয়াসের ক্ষয় অনুসরণ করে যে ভারী মৌলটি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল আদৌ তা সৃষ্টি হয়েছিল কিনা এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তাহলে এই মৌলগুলো আবিষ্কার করতে এতদিন লাগল কেন?সর্বশেষ আবিষ্কৃত ১১৬ তম মৌল লিভারমোরিয়াম। এটি২০০০ সালে আবিষ্কৃত হয় এবং ২০১২ সালে IUPAC কর্তৃক স্বীকৃতি পায়। এতদিন দেরি হবার ব্যাপারে অধ্যাপক পল ক্যারল বলেন,“এসব মৌলের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মৌলগুলোর পরমাণু তৈরি হবার সাথে সাথেই অতি-অল্প সময়ের ভেতরহালকা মৌলের আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়ে যায়।এদের কিছু কিছু আইসোটোপ সম্পর্কে আমরা এতদিন জানতাম না। তাই সেসব আইসোটোপকে আবার দ্ব্যর্থহীনভাবে চিহ্নিত করতে হয়েছিল।”

উপরের কথাটি বিস্তৃত করতে হলে আমাদের কিছু বিষয়ে জানতে হবে। প্রথমেই আইসোটোপ কী তা দেখা যাক। মৌলের পরমাণুর একটি কেন্দ্র থাকে, যাকে বলে নিউক্লিয়াস। নিউক্লিয়াসে প্রধানত থাকে প্রোটন আর নিউট্রন। এর বাইরে থাকে ইলেকট্রন। আমরা কোনো মৌলকে চিহ্নিত করি সেই মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা দিয়ে। প্রোটন সংখ্যাকেই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা বলে এবং এই সংখ্যা অনুসারেই পর্যায় সারণীতে মৌল সাজানো হয়।কোনো মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যদি একটি প্রোটন থাকে, তাহলে মৌলটির নাম হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেনের বেশিরভাগ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে শুধু একটি প্রোটন থাকে, কোনো নিউট্রন থাকে না। কিন্ত অল্প কিছু পরমাণুর (০.০১৪%) নিউক্লিয়াসে ১ টি নিউট্রন আর খুবই অল্পসংখ্যক পরমাণুর (৭ x ১০-১৬%) নিউক্লিয়াসে ২ টি নিউট্রন থাকে। এই দুটি ব্যতিক্রমী পরমাণুও হাইড্রোজেন মৌলেরই পরমাণু। শুধু পার্থক্য এদের ভর সংখ্যায়। উল্লেখ্য প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যাকে ভর সংখ্যা বলে। এখানে এদের ভর সংখ্যা যথাক্রমে ১,২ ও ৩।

এখানে তিনটি ভিন্ন ভর সংখ্যা বিশিষ্ট পরমাণু প্রত্যেককে একে অপরের আইসোটোপ বলে। তিনটি পরমাণুই হাইড্রোজেনের আইসোটোপ। এদের মধ্যে ৩ ভর সংখ্যাবিশিষ্ট পরমাণুটি তেজস্ক্রিয় (অর্ধায়ু ১২.২৬ বছর)। যেহেতু হাইড্রোজেন নিজে একটি স্থিতিশীল মৌল, তাই গবেষণা করে এর কয়টি আইসোটোপ তা বের করা সম্ভব হয়েছে। হাইড্রোজেনের আরো দুটি আইসোটোপ 4Hআর7Hতৈরি করা হয়েছে ল্যাবে,এগুলো খুবই অস্থিতিশীল।অস্থিতিশীল বলে অন্য তিনটি আইসোটোপের মতো এদের প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না।

রসায়নে ভারী মৌল বলতে সেসব মৌলকে নির্দেশ করে, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ৯২ এর উপরে। প্রত্যেকটি ভারী মৌলই তেজস্ক্রিয়। এরা তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত করতে করতে ভেঙে এর চেয়ে হালকা অথবা ক্ষেত্রবিশেষে ভারী মৌলে পরিণত হয়। তেজস্ক্রিয় বলে এদের বেশিরভাগের অর্ধায়ু খুবই কম-১ সেকেন্ডের হাজার কোটি ভাগের একভাগ মাত্র। তাই এদের নিয়ে গবেষণা করা বেশ কঠিন। এদের মোট কয়টি আইসোটোপ রয়েছে,তা জানাও বেশ দুঃসাধ্য।

যখন ভারীকোনো মৌলের পরমাণু তৈরি করার চেষ্টা চালানো হয়, তখন ঐ পরমাণু তৈরি হয়েই হয়তোভেঙে এরচেয়ে হালকাকোনো মৌলের আইসোটোপে পরিণত হয়। যেহেতু এই হালকা পরমাণুও তেজস্ক্রিয় তথা অস্থিতিশীল, তাই একটা বড়রকম সম্ভাবনা থেকে যায়, যে আইসোটোপ এভাবে তৈরি হবে সেটি এর আগে কোনোদিন দেখা যায়নি। তখনআমাদের ঐ আইসোটোপকেও চিহ্নিত করতে হয়। যেটিএকইরকম কঠিন হবার কথা। কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে এরকম বড় সমস্যার মুখোমুখি হবার কারণেই মূলত মৌল আবিষ্কার এবং আবিষ্কারের স্বীকৃতি দিতে এতদিন লাগে। অবশ্য এ সমস্যার সমাধানকল্পে অধ্যাপক পল ক্যারল জানান, “ভবিষ্যতে আমরা আমাদের পদ্ধতি আরো উন্নত করতে চাই যেন আমরা প্রস্তুতকৃত মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা সরাসরি নির্ণয় করতে পারি।” এবারে মৌলগুলোর নাম কীভাবেদেয়া হলো,তা একটু খেয়াল করি।

১১৩ তম মৌল

১১৩ তম মৌলই প্রথম মৌল যেটি এশিয়ার কোনো দেশে আবিষ্কৃত হলো। এই মৌলের আবিষ্কার সম্পর্কেই সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া গেছে। আবিষ্কারকেরা এই মৌলের নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে নিহোনিয়াম(Nihonium)এবং Nhপ্রস্তাব করেছেন। Nihon-যে নাম অনুসারে এই মৌলের নাম দেয়া হয়েছে তা দিয়ে জাপানিজরা নিজের দেশকে নির্দেশ করে। ভারতীয়রাযেমন নিজের দেশকে হিন্দুস্তান বলে অনেকটা তেমন। নিহনের অর্থ হচ্ছে ‘সূর্যোদয়ের দেশ’। উল্লেখ্য,জাপানীরা নিজের দেশকে ডাকে মূলতনিপ্পনঅথবা নিহননামে। আগে এই দেশের নাম ছিল নিপ্পন কোকু বা নিহন কুকো স্টেট অব জাপান।আবিষ্কারকরা মৌলের আবিষ্কারস্থল জাপানের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য এমন নামকরণ করেন।

আবিষ্কারকরা তাদের আবিষ্কার তাদের পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী মাসাতাকা ওগাউয়াএবং তার ৪৩ তম মৌল আবিষ্কার ও নামকরণের প্রচেষ্টাকে উৎসর্গ করেছেন(নোট ১ দ্রষ্টব্য)।

রিকেন ইন্সটিটিউটেরবিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে বিসমাথ মৌলের একটি পাতলা আবরণকে আলোর বেগের ১০% বেগে গতিশীল জিংক আয়ন দিয়ে আঘাত করেন। তাত্ত্বিক নিয়ম অনুসারে এভাবে আঘাত করতে থাকলে মাঝে মাঝে ১১৩ তম মৌলের পরমাণু সৃষ্টি হওয়ার কথা। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে বিজ্ঞানীদের এই দল এই আঘাতের মাধ্যমে১০৫ তম মৌল ডুবনিয়াম-২৬২এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করেন।এটি ১১৩ তম মৌলের পরমাণু ক্ষয় হয়ে সৃষ্টি হবার কথা। কিন্ত তারপরেও এই আইসোটোপের অস্তিত্ব১১৩ তম মৌলের পরমাণু সৃষ্টি হয়েছে তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

গবেষক দলপরবর্তীতে একটি নতুন পরীক্ষা চালান।কুরিয়াম মৌলের টার্গেটে সোডিয়াম আয়নের বিম দিয়ে আঘাত করেন। ফলে বোরিয়াম-২৬৬ আইসোটোপ তৈরি হয় যা থেকে ডুবনিয়াম- ২৬২ সৃষ্টি হয়। এই পর্যবেক্ষণ ১১৩ তম মৌলের পরমাণু তৈরি হবার ঘটনাকে শক্তভাবে সমর্থন করে। গবেষকরা এরপর অপেক্ষা করতে থাকেন কখন এদের মধ্যে একটি পরমাণু স্বতঃস্ফূর্ত ভাঙ্গনের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে আলফা চেইনের মাধ্যমে ক্ষয়ে যাবে। ২০১২ সালে এই গবেষকরা তথ্য-উপাত্ত থেকে এরূপ ক্ষয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। এরপর IUPAC আরো চার বছর ধরে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে,এই পর্যবেক্ষণ ১১৩ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।

এরপরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে যৌথ সংস্থা ১১৩ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়।

১১৫ তম মৌল

এই মৌলের নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে মস্কোভিয়াম(Moscovium) এবং Mc প্রস্তাব করা হয়েছে। IUPACথেকে জানানো হয়,মস্কোভিয়াম নাম রাশিয়ার প্রাচীন রাজধানী মস্কো শহরের প্রতি সম্মানদেখিয়ে সুপারিশ করা

হয়েছে। এই শহরের দুবনাশহরে অবস্থিতজয়েন্টইন্সটিটিউটঅবনিউক্লিয়াররিসার্চ এবং ফ্লেরভ ল্যাবরেটরি অব নিউক্লিয়ার রিয়েকশনের যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষাগার ব্যবহার করে ১১৫ তম মৌল আবিষ্কারের পরীক্ষাগুলো চালানো হয়। মজার ব্যাপার হলো স্কটল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষের পদবিশুরু হয় Mcদিয়ে। সে হিসেবে মৌলটি অনেকটা রাশিয়ান-স্কটিশ মৌল।

২০০৪ এর২ ফেব্রুয়ারিতে ফিজিক্যাল রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, রাশিয়া ও আমেরিকার তিনটিল্যাবের সমন্বিত দলরাশিয়ার দুবনাতে ২০০৩ সালে আমেরিকিয়াম-২৪৩ আইসোটোপকে ক্যালসিয়াম-৪৮আয়ন দিয়ে আঘাত করে মৌল ১১৫ তম মৌলের চারটি পরমাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই চারটি পরমাণুই ১০০ মিলি-সেকেন্ডের মাঝে আলফা কণা নির্গমন করেবর্তমান ১১৩ তম মৌলনিহোনিয়ামের পরমাণুতে পরিণত হয়। কিন্ত যেহেতু তখন পর্যন্ত ১১৩ বা ১১৫ তম মৌলেরকোনোটিই আবিষ্কৃত হয়নি, তাই ১১৫ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীরা এই নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার সর্বশেষ উৎপাদ ডুবনিয়াম-২৬৮আইসোটোপ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জুন ২০০৪ ও ডিসেম্বর ২০০৫ এর দুটি পরীক্ষায় ডুবনিয়াম-২৬৮ আইসোটোপের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়। এ থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেনতাদের প্রথম পরীক্ষায় ১১৫ তম মৌলেরপরমাণু উৎপন্ন হয়েছিল।

অথচ২০১১ সালে IUPAC ও IUPAP-র যৌথ দল ঘোষণাদেয়দুবনারপরীক্ষানিরীক্ষায়প্রাপ্তফলাফল১১৫তমমৌলেরঅস্তিত্বপ্রমাণেরজন্যযথেষ্টনয়।এরপরঅন্যএকটিপরীক্ষারমাধ্যমেদুবনারগবেষকদলথেকেআবারো১১৫তমমৌলেরআবিষ্কারেরদাবিজানায়।আবার২০১৩সালেরআগস্টমাসে লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ওআরেকটি প্রতিষ্ঠানের একটিদলঘোষণাকরেতারাদুবনাতেতেপরিচালিত২০০৪সালেরপরীক্ষাটিচালিয়েএকইরকমফলাফলপেয়েছেন। দুবনার২০০৪সালেরআবিষ্কারেরদাবিটিসঠিকছিল।এরপর২০১৫সালেক্যালিফোর্নিয়াবিশ্ববিদ্যালয়েরএকটিদলওসফলভাবে এইপরীক্ষাটিচালাতেসমর্থহয়।অবশেষে২০১৫সালেরডিসেম্বরেIUPAC/IUPAP এর যৌথ দল১১৫ তম মৌলেরঅস্তিত্বপ্রমাণিতহয়েছেবলেঘোষণাদেয়।

১১৭ তম মৌল

এর নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে টেনেসিন(Tennessine)এবং Tsপ্রস্তাবিত হয়েছে। IUPACথেকে জানানো হয়, এই নাম আমেরিকার টেনেসিরাজ্যের প্রতি। এখানেঅতিভারীমৌল, যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ১০০ এর উপরে, তাদের নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। তাই ঐ রাজ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে এই নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। উল্লেখ্য,এই রাজ্যেই ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, ভেন্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি এবং টেনেসি ইউনিভার্সিটি অবস্থিত। ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে টার্গেট করে স্বতন্ত্র এক্টিনাইডউৎপাদন এবং

রাসয়নিকভাবে পৃথকীকরণ করা হয়।এবং উৎপন্ন এক্টিনয়েড ধাতু ৯টি অতিভারীমৌল আবিষ্কার এবং অস্তিত্ব নিশ্চিতকরণে ব্যবহৃত হয়েছে।

উল্লেখ্য,রসায়নে Tosylগ্রুপকে সংক্ষেপে Tsদিয়ে শনাক্ত করা হয়। ফলে ১১৭ তম মৌল ও এই গ্রুপের জন্য একই প্রতীক ব্যবহারে জটিলতা সৃষ্টির আশংকা উত্থাপিত হয়। কিন্ত IUPACএই আশঙ্কাকে গ্রহণযোগ্য আপত্তি হিসেবে বিবেচনায় নেয়নি। কারণ বহুদিন ধরে কোনো জটিলতা ছাড়াই Acদিয়ে একইসাথে এক্টিনিয়ামমৌল এবং Acylগ্রুপআর Prদিয়ে একইসাথে প্যারাসেডিমিয়াম এবং প্রোপিলগ্রুপকে নির্দেশ করা হচ্ছেকোনোরূপ সমস্যা ছাড়াই। তাই Tsনিয়ে Tosyl গ্রুপ আর টেনেসিনের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারপরেও বলা হয়,প্রতীক হিসেবে হয়তোTnকে প্রস্তাব করা যেত,কিন্তু যেহেতু আগে থেকেই রেডন-২২০আইসোটোপের জন্য Tnপ্রতীক ব্যবহৃত হয়ে আসছেতাই শেষমেশ Tsপ্রতীকই প্রস্তাবিত হয়েছে।

২০০৯ সালে ১১৭ তম মৌল আবিষ্কারের প্রচেষ্টা হিসেবে বারকেলিয়াম-২৪৯ এর আইসোটোপকে ক্যালসিয়াম-৪৮ আয়ন দিয়ে আঘাত করা হয়। ২০১০ সালে ফ্লেরভ ল্যাবরেটরি অব নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশনের বিজ্ঞানীরা অভ্যন্তরীণভাবে ঘোষণা দেন,তারা একটি নতুন মৌলের ক্ষয় হবার প্রক্রিয়া শনাক্ত করেছেন। এই পরীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্ত অধিক বিশ্লেষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরলরেন্সলিভারমোরন্যাশনালল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ঐ বছর ৯-ই আগস্ট ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার জার্নালের একটি অফিসিয়াল রিপোর্টে আনআনসেপ্টিয়ামমৌলের ২৯৩ ও ২৯৪ ভরসংখ্যাবিশিষ্ট দুইটি আইসোটোপকে শনাক্তকরণের কথা উল্লেখ করা হয়।

যেহেতু ১১৭ তম মৌলের পরমাণু ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যেসব আইসোটোপে রূপান্তরিত হয়, তাদের কোনোটিই আগে থেকে পরিচিত ছিল না, তাই এই গবেষণায় প্রাপ্ত উপাত্ত দিয়ে ১১৭ তম আবিষ্কারের দাবি জানানো যায়নি। ২০১১ সালে ১১৭ তমমৌলের একটি অপত্য আইসোটোপমস্কোভিয়ামসরাসরি তৈরি করা হয়। ২০১২ সালে দুবনা দল আগের পরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ১১৭ তম মৌলের সাতটি পরমাণু উৎপাদন করে। এবারের উপাত্ত নিয়ে দুবনা গবেষক দল নতুন মৌল আবিষ্কারের দাবি জানায়। আবার ২০১৪ সালে জার্মান ও আমেরিকান বিজ্ঞানীদের সমন্বিত একটি দল দুবনা টিমেরপরীক্ষা পুনরায় চালিয়ে ১১৭ তম মৌলের দুটি ২৯৪ ভর সংখ্যাবিশিষ্ট আইসোটোপ তৈরি করে এবং দুবনা টিমের দাবিকে সমর্থন জানায়।

অবশেষে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেIUPAC ও IUPAP-রযৌথ দল ১১৭ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। এই নামকরণের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে টেনেসিকে সম্মানিত করা হলো পর্যায় সারণীতে। এর আগে ১৯৫০ সালে আবিষ্কৃত ৯৮ তম মৌলের নাম ক্যালিফোর্নিয়াম (Cf) রাখা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সম্মানে।

১১৮ তম মৌল

এর নাম ও প্রতীক হিসেবে যথাক্রমে ওগানেসন(Oganesson)এবং Ogপ্রস্তাব করা হয়েছে। IUPACজানায়,রাশিয়ান পরমাণু বিজ্ঞানী Yuri Tsolakovich Oganessian(1933-) এর ট্রান্স-এক্টিনয়েড মৌলসমূহের গবেষণায়অগ্রগামী অবদানরাখার সম্মানে তার নামে এই মৌলের নাম প্রস্তাবিত হয়েছে। প্রথিতযশা এই বিজ্ঞানী নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি মস্কোভিয়াম,টেনেসিয়াম এবং ওগানেসন আবিষ্কারকারী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

নেচার সাময়িকীর রিচার্ড নুর্ডেনের বলেন,এই নামকরণের মাধ্যমে IUPAC-এর ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতোকোনো জীবিত বিজ্ঞানীর নামে নতুন আবিষ্কৃত মৌলের নাম প্রস্তাবিত হলো। প্রথমবার ১৯৯৩ সালে লরেন্স বারকেলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের একটি দল ১০৬ তম মৌলের জন্য সীবর্জিয়াম নামটি, তখন পর্যন্ত জীবিত আমেরিকান নোবেল বিজয়ী রসায়নবিদ গ্লেন সীবর্গ(১৯১২-১৯৯৯)এর প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রস্তাব করে। এ প্রস্তাবনা সে সময় প্রচুর বিতর্কের জন্ম দেয়।তখনকার IUPACকমিটি এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এবং সিদ্ধান্ত পাশ করে যে কোনো জীবিত বিজ্ঞানীর নামে কোনো নব-আবিষ্কৃত মৌলের নাম দেয়া যাবে না। কিন্ত১৯৯৭ সালে IUPAC ১০৬ তম মৌলের জন্য সীবর্জিয়াম(Sg)নামটি গ্রহণ করে।

এছাড়া অবশ্য গল্প প্রচলিত আছে আইনস্টাইনজানতেন একটি মৌল তার নামেনামকরণ করা হবে। ৯৯ তম মৌল আইনস্টাইনিয়াম(Es) এর নাম দেবার আগেঅবশ্য (১৯৫৭) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৯৮ সালের শেষের দিকে পোলিশ পদার্থবিদ Robert Smolańczuk এর প্রকাশিত হিসাব নিকাশে অনুমান করা হয়, সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ক্রিপটন মৌলের পরমাণুর সাথে সীসার পরমাণুর ফিউশনের মাধ্যমে ১১৮ তম মৌল আনআনঅক্টিয়াম প্রস্তুত করা সম্ভব। ১৯৯৯ সালে লরেন্স বারকেলি ন্যাশনাল ল্যাবরটরিরগবেষকরা এই অনুমানের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা-গবেষণা করেন এবং ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার জার্নালে প্রকাশিত একটি পেপারে লিভারমোরিয়াম এবং ১১৮ তম মৌল আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী তারা ক্রিপটন-৮৬পরমাণুর সাথে লেড-২০৮ পরমাণুর ফিউশনের মাধ্যমে আনআনঅক্টিয়াম-২৯৪ পরমাণু প্রস্তুত করতে সমর্থ হন। তাদের গবেষণার ফলাফল সে বছরই সায়েন্স জার্নালে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

কিন্ত২০০০ সালে এই গবেষকরা ১৯৯৯ সালের রিপোর্ট প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ আগের রিপোর্ট প্রকাশের পরে অন্য ল্যাবের গবেষকদের পাশাপাশি বারকেলি ল্যাবের বিজ্ঞানীরা নিজেরাও আগের পরীক্ষা পরিচালনা করে একই ফলাফল লাভে অর্থাৎ ১১৮ তম মৌল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পরে ২০০২ সালে

এই ল্যাবের প্রধান জানান, ১৯৯৯ সালের ঐ নিবন্ধের প্রধান লেখক ভিক্টর নিনভ মূল তথ্যে বড়রকমের জালিয়াতি করেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটিযুক্ত তথ্য থেকে ল্যাবের গবেষকরা ১১৮ তম মৌল উৎপাদনের ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

২০০২ সালে বিজ্ঞানীদেরসমন্বিত দল রাশিয়ার দুবনাতে ১১৮ তম মৌলের পরমাণুর প্রথম ক্ষয় পর্যবেক্ষণ করেন। এই দলের প্রধান ছিলেন রাশিয়ান পরমাণু বিজ্ঞানী ইউরি ওগানেসিয়ান।২০০৬ সালের অক্টোবরে এইগবেষ দল ঘোষণা করে, ক্যালিফোর্নিয়াম-২৪৯ পরমাণুর সাথে ক্যালসিয়াম-৪৮ আয়নের সংঘর্ষে মোট তিনটি (অথবা ৪টি) আনআনঅক্টিয়াম-২৯৪ পরমাণুর উৎপাদন পরোক্ষভাবে শনাক্ত করেছেন। ২০০২ সালে ১টি বা ২টি এবং ২০০৫ সালে আরো ২টি। ২০১১ সালে IUPAC ও IUPAP এর যৌথ দলপ্রথমে দুবনা-লিভারমোর এর সমন্বিত দলের ২০০৬ সালে করা গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে রায় দেয় যেহেতু এখানে ১১৮ তম মৌলের ক্ষয়ের ফলে প্রাপ্ত কোনো আইসোটোপই পরিচিত নয় তাই দলটির ১১৮ তম মৌল আবিষ্কারের দাবির শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্ত এরপরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেযৌথ কমিটি ২০০৬ সালের গবেষণায় ১১৮ তম মৌলের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়।কারণ ততদিনে ১১৮ তম মৌলের ক্ষয়ের ফলে প্রাপ্ত আইসোটোপগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গিয়েছিল। ১১৮ তম মৌলের নামকরণের জন্য বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট ঘিয়োর্সো, বিজ্ঞানী জর্জি ফ্লিয়োরভ এবং মস্কো শহরের নাম বিবেচনা করা হলেও শেষপর্যন্ত বিজ্ঞানী ইউরি ওগানেসিয়ানেরনামানুসারেই মৌলটির নাম প্রস্তাবিত হয়।

যদিও এই চারটি মৌলের স্বীকৃতির সাথে সাথে আমাদের পর্যায়সারণী কার্যত পূরণ হয়ে গেছে, কিন্ত অদূর ভবিষ্যতে রসায়নবিদদের লালিত এই সারণী নিয়ে গবেষণা শেষ হবার কোনোরকম সম্ভাবনা দেখা যায়নি। জাপানের রিকেন কোলাবোরেশন টিম এখন ১১৯ তম মৌল ও তারচেয়ে ভারী মৌলসমূহের অপ্রদর্শিত অঞ্চল (Uncharted Territory)অনুসন্ধানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাই আশা করা যায়কিছুদিন পরেই হয়তোপর্যায় সারণী নিয়ে এরকম কোনো চমকপ্রদ আবিষ্কারের খবর শোনা যাবে।

untitled-4

চিত্রঃ পূর্ণতা পাচ্ছে পর্যায় সারণী।

নোট ১:

৪৩ তম মৌলটেকনেশিয়াম(Tc) পর্যায় সারণীর সবচেয়ে হালকা মৌল যার সকল আইসোটোপ তেজস্ক্রিয় এবং অস্থিতিশীল। এটি এমন দুইটি মৌলের একটি,যাদের পরবর্তী মৌলের স্থিতিশীল আইসোটোপ রয়েছে।বহু বিজ্ঞানীপর্যায় সারণী প্রকাশের আগে ও পরে৪৩ নাম্বার মৌল আবিষ্কার ও নামকরণের জন্য ব্যগ্র হয়ে ছিলেন। কারণ এই মৌলের সারণীতে অবস্থান থেকে বুঝা যায় তখন পর্যন্ত অন্যান্য অনাবিষ্কৃত মৌলের তুলনায় এই মৌল আবিষ্কার সহজ হবার কথা।

বিজ্ঞানীদের আকুল প্রচেষ্টার কারণে বেশ কিছু ভুল দাবি উত্থাপিত হয়,যেখানে বিজ্ঞানীরা অন্য কোনো মৌলকে ভুল করে ৪৩ নাম্বার মৌল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নামও দিয়ে ফেলেছেন। জাপানী বিজ্ঞানী মাসাতাকা ওগাওয়াও তাদের অন্যতম।তিনি ১৯০৮ সালে ঘোষণা দেন, তিনি ৪৩ তম মৌল আবিষ্কার করেছেন। আবিষ্কৃত মৌলের নাম দেন নিপ্পনিয়াম, প্রতীকNp। এই প্রতীক পরবর্তীতে নেপচুনিয়ামের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্ত তার আবিষ্কার বিশ্লেষণ করে পরবর্তীতে ৭৫ তম মৌল রেনিয়াম(Re) এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও৪৩ তম মৌলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নতুন১১৩ তম মৌলের আবিষ্কারকেরা ওগাওয়ার একটি মৌলের নাম মাতৃভূমি জাপানের নামে দেয়ার এই প্রচেষ্টাকেই স্মরণ করেছেন।

তথ্যসূত্র

১.https://www.youtube.com/watch?v=wswa0NuBbMw#t=294.381

২.http://www.iflscience.com/chemistry/periodic-tables-7th-row-completed-discovery-four-new-elements/

৩. https://en.wikipedia.org/wiki/Copernicium

৪.http://iupac.org/cms/wp-content/uploads/2016/06/names-and-symbols-of-elements.pdf

৫.http://iupac.org/recommendation/names-and-symbols-of-the-elements-with-atomic-numbers-113-115-117-and-118/

৬.http://www.rsc.org/chemistryworld/2016/06/iupac-announces-proposed-new-element-names

৭.http://edition.cnn.com/2016/06/08/health/periodic-table-new-elements-names/

৮.http://www.sciencealert.com/the-4-newest-elements-on-the-periodic-table-have-just-been-named

৯.https://en.wikipedia.org/wiki/Yuri_Oganessian

১০. https://en.wikipedia.org/wiki/IUPAC/IUPAP_Joint_Working_Party

১১.http://iupac.org/discovery-and-assignment-of-elements-with-atomic-numbers-113-115-117-and-118/

১২.https://en.wikipedia.org/wiki/Cadmus

১৩. https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_chemical_element_name_etymologies

১৪.http://www.sciencealert.com/four-elements-have-just-earned-a-permanent-spot-in-the-periodic-table

১৫.https://en.wikipedia.org/wiki/Livermorium

১৬.https://en.wikipedia.org/wiki/Hydrogen

১৭.https://en.wikipedia.org/wiki/Technetium

১৮.https://en.wikipedia.org/wiki/Rhenium

১৯.https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_scientists_whose_names_are_used_in_chemical_element_names

২০.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununpentium

২১.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununseptium

২২.https://en.wikipedia.org/wiki/Ununoctium

২৩.https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_places_used_in_the_names_of_chemical_elements

২৪.https://en.wikipedia.org/wiki/Seaborgium

২৫.https://en.wikipedia.org/wiki/Glenn_T._Seaborg

২৬.https://en.wikipedia.org/wiki/Einsteinium
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top