ক্যাফেইন আসক্তির কারণ

নিয়মিত ড্রাগের ব্যবহার মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠনকে বদলে দেয়। তাই যখন আপনি ড্রাগটি বন্ধ করবেন তখন স্বভাবতই বদলে যাওয়া মস্তিষ্ক আপনার শরীরকে বিদ্রোহে প্ররোচিত করবে। ফলশ্রুতিতে আপনি ভুগবেন ক্লান্তি এবং মাথাব্যথায়। চলে আসতে পারে বমি বমি ভাবও। ড্রাগটি বন্ধ করার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে শুরু করবে।

প্রথমে মনে হবে মনটা যেন কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত। কোনো ব্যাপারেই কোনো সচেতনতা নেই। আপনি ক্লান্তিকর কোনো কাজই করেননি। তারপরও পেশিগুলো ক্লান্ত হয়ে আসবে। মনে হবে অন্যান্য দিনের চেয়ে আপনার মেজাজটা আজ একটু বেশিই খারাপ। এরপর শুরু হবে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। ফলে কোনোকিছুতেই মনোযোগ দিতে পারবেন না। ড্রাগ বন্ধের প্রতিবাদ হিসেবে শরীরের মাংশপেশীরা খিচুনি শুরু করবে, বমি বমি ভাব এবং আরো কিছু লক্ষণ প্রদর্শন করবে।

ভাবখানা এমন ড্রাগটা যেন শরীরকে বলতে চায় ‘তুমি আমাকে ছেড়ে ভালো থাকবে, আমি তা হতে দেব কেন?’

না, আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়াতে হিরোইন, তামাক বা অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়েছেন এমন কথা বলছি না। বলছি ক্যাফেইন আসক্তির কথা যা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে এবং কখনো বাধ্যতামূলকভাবে পান করা হয়। দীর্ঘদিন ক্যাফেইন সেবনে অভ্যস্ত কারো ক্যাফেইন ছেড়ে দেয়ার সর্বশেষ এবং প্রলয়ঙ্কারী প্রভাব হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা।

প্রশ্ন হচ্ছে ক্যাফেইনের এই অদ্ভুত মাদকতা সৃষ্টির রহস্য কী। উত্তরটা লুকিয়ে আছে ক্যাফেইন কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে তার মধ্যে।

image source: livestrong.com

যখন ক্যাফেইন সম্বলিত কিছু পান করা হয় তখন তা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। পানি ও ফ্যাটে সহজেই দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা থাকায় রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। ফলে মিস্টার ক্যাফেইন সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। গাঠনিকভাবে ক্যাফেইন অনেকটা আমাদের মস্তিষ্কে থাকা এডিনোসিন অণুর মতো দেখতে। ফলে এডিনোসিনের ছদ্মবেশে ক্যাফেইন ব্রেইন সেল রিসেপ্টরকে প্রতারিত করার মাধ্যমে এর সাথে সংযুক্ত হতে পারে এবং রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়।

সাধারণত এই রিসেপ্টরে এডিনোসিন যুক্ত হলে এক ধরনের ক্লান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয়। কিন্তু ক্যাফেইন রিসেপ্টরগুলোকে ব্লক করে দেয়ার ফলে বিপরীত ঘটনা ঘটে। ক্লান্তির বদলে সৃষ্টি হয় সতেজতা এবং কয়েক ঘন্টার জন্য বেশ কিছুটা শক্তিও পাওয়া যায়।

ক্যাফেইন ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের প্রাকৃতিক কিছু উদ্দীপকগুলোর কর্মকাণ্ডেও গতি আনে। ক্যাফেইন কতৃক বিতাড়িত এডিনোসিনেরা তখন মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে এবং সারি বেঁধে এড্রেনাল গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে ক্ষরিত এড্রেনালিনও যোগ দেয় এসে উদ্দীপনা সৃষ্টিতে।

তাহলে, ‘ক্যাফেইন নিজে কোনো উদ্দীপক না বরং উদ্দীপনা সৃষ্টতে সহায়ক। আমাদের শরীরে থাকা প্রাকৃতিক উদ্দীপকগুলোর বাধ ভেঙে দিয়ে তাদের বুনো করে তোলে।’

image source: pexels.com

যেসব লোকজন ক্যাফেইনের এই উদ্দীপিত করার সুবিধাটা নিয়মিত পেতে চায় তাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক গঠন এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা হচ্ছে ক্যাফেইনের নিয়মিত এডিনোসিন রিসেপ্টর ব্লক করার ফলে ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্রেইন সেলগুলো বেশি বেশি এডিনোসিন রিসেপ্টর তৈরি করে।

গবেষণায় দেখা গেছে এর ফলে নরএপিনেফ্রিন রিসেপ্টরের সংখ্যাও কমে যায়। এ থেকে কফিপানে সতেজতা লাভে আগ্রহী নিয়মিত কফি পানকারীদের আসক্তির কারণটা অনেকটাই বোঝা যায়। তাদের এডিনোসিন রিসেপ্টর থাকে অনেক বেশি, রিসেপ্টরেরগুলোকে ব্লক করতে ক্যাফেইনও প্রয়োজন হয় অনেক বেশি।

রাসায়নিক গঠন

হঠাৎ করে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করলে শরীরের বিদ্রোহের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এটি থেকে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে যে, ক্যাফেইন আসক্তি ব্যাপারটা খুব খারাপ। তবে আশার কথা হলো অন্যান্য মাদকাসক্তির তুলনায় ক্যাফেইন আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব মোটামুটি স্বল্পস্থায়ী।

ক্যাফেইনের মাদকতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে মাত্র এক সপ্তাহ থেকে ১২ দিন ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ রাখতে হবে। তাতে যত মাথাব্যথাই হোক, যত মেজাজ বিগড়ে যাক। তাহলে প্রাকৃতিকভাবে আপনার মস্তিষ্কে এডিনোসিন রিসেপ্টরের সংখ্যা কমে যাবে। ক্যাফেইন আসক্তি দূরীভূত হবে।

তাই যারা ক্যাফেইনের কৃত্রিম সতেজতা সৃষ্টির ক্ষমতায় বিমুগ্ধ হয়ে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছেন মগের পর মগ কফি, তাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

featured image: medium.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *