পৃথিবী ও পরিবেশ

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

আলোক দূষণের বৈরী প্রভাব

১৭ জানুয়ারি, ১৯৯৪। স্থানীয় সময় ভোর ৪ টা ৫৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে ৬.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে। এই ভূমিকম্পে হতাহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে যায় আর মারা যায় কমপক্ষে ৫৭ জন। একইসাথে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিনষ্ট হয়, তাই মাত্র ১০-২০ সেকেন্ডের এই ভূমিকম্প যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ হিসেবে স্থান পেয়েছে।

এই দুঃখজনক দুর্যোগের পরে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, যখন ইমারজেন্সি নাম্বারে অস্বাভাবিক সংখ্যায় ফোন দিয়ে শত শত ব্যক্তি জানতে চান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে রাতের আকাশে যে বিশাল রুপালী মেঘের মতো দেখা যাচ্ছে তা কোনোভাবে এই ভূমিকম্পের জন্য দায়ী কিনা। তারা প্রকৃতপক্ষে মিল্কিওয়ে (আকাশ গঙ্গা) গ্যালাক্সির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, কারণ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি তারা জীবনে কোনোদিন আমাদের ছায়াপথ দেখেনি।

ইতালীয় বিজ্ঞানী এবং CieloBuio-Coordination for the protection of the night sky এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. ফ্যাবিও ফালকি পরিচালিত Light Pollution Science and Technology Institute এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শতকরা ষাট ভাগ ইউরোপিয়ান, আশি ভাগ উত্তর আমেরিকান এবং বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ রাতের আকাশে আপন গ্যালাক্সি দেখতে পারেন না। ১০ই জুন, ২০১৬ সালে প্রকাশিত National Oceanic and Atmospheric Administration(NOAA) এর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সম্পূর্ণ এবং কুয়েত, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আর্জেন্টিনার প্রায় সবটুকু আকাশ এতই উজ্জ্বল যে সেখানে কখনোই রাতে অন্ধকার নেমে আসে না। জার্মানি, হংকং, বেলজিয়ামের নানা অংশ এবং বোস্টন, লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিসের কোনো মানুষকে পরিষ্কার রাত দেখার জন্য ক্ষেত্র বিশেষে প্রায় ৫০০ থেকে ৮৫০ মাইল ভ্রমণ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট আলোর বাধার জন্য গ্রহ-নক্ষত্র দেখতে না পারাকেই যদি দূষণ (Light Pollution) বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে বিশ্বের ৮০ ভাগ এবং পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ আকাশই দূষিত।

আলোক দূষণ বলতে আমরা অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর ক্ষতিকর প্রভাবকে বুঝে থাকি; যা অপর্যাপ্ত, অনিয়ন্ত্রিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নানা সমস্যাকে নির্দেশ করে। এসকল সমস্যার মধ্যে skyglow, light trespass, glare, clutter এবং over-illumination উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত কিংবা ঊর্ধ্বমুখী আলোক উৎস থেকে আলো বায়ুমণ্ডলের জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য কণার মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে সম্পূর্ণ আকাশই অত্যন্ত উজ্জ্বল (skyglow) দেখায়, যা অনেক দূর থেকেও পরিলক্ষিত হয়।এই দীপ্তির কারণে রাতের আকাশ প্রায় দিনের মতোই উজ্জ্বল হয় এবং চাঁদ-তারা কিছুই দেখা যায় না। International Dark-sky Association এর গবেষণা অনুযায়ী লস এঞ্জেলেসের skyglow বায়ুমণ্ডলের ২০০ মাইল উচ্চতা থেকেও দেখা যায়। আকাশ মেঘলা হলে এই সমস্যা ১০,০০০ গুণ বেশি প্রকট হতে পারে।

চিত্রঃ রাতের মেক্সিকো সিটি। skyglow এর কারণে আকাশ এতই উজ্জ্বল যে চাইলে বাসার বাইরে রাতের বেলাও বই পড়া যায়।

আপনার বাসায় কিংবা জমিতে আলোর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ Light Trespass নামে পরিচিত। যেমন প্রতিবেশির ব্যবহৃত আলো জানালা দিয়ে আপনার ঘরে ঢুকতে পারে, যার ফলে শান্তিভঙ্গ কিংবা ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে International Dark-sky Association এর সহায়তায় Light Trespass থেকে জনসাধারণের অধিকার রক্ষার্থে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ফেডারাল এজেন্সি অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে।

আমাদের চোখে যদি হঠাৎ করেই অত্যুজ্জ্বল আলো (Glare) এসে পড়ে, (যেমন রাতের বেলায় রাস্তায় ছোট প্রাইভেট গাড়ি চালানোর সময় ট্রাককে মুখোমুখি অতিক্রম করতে গেলে ট্রাকটির হেড লাইটের আলো কিছুক্ষণের জন্য সরাসরি চোখে এসে পড়ে) তবে তা আমাদের দৃষ্টি ব্যাহত করতে পারে, দেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এমনকি ক্ষণিকের জন্য অন্ধও করে দিতে পারে।

অতিরিক্ত আলোকিত এলাকা, যেমন Las Vegas Strip বা Manhattan এর রাস্তায় বিভিন্ন রঙের আলোর মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল এবং জমকালো সমাবেশকে Light Clutter (আলোক-বিশৃঙ্খলা) বলে। রাস্তার চারদিকে অত্যুজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থাকলে কোনো ড্রাইভার বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। প্লেন চালানোর সময় পাইলট শহরের বাণিজ্যিক আলোক সমাবেশের সাথে সেফটি লাইট, যেমন রানওয়ের আলো গুলিয়ে ফেলতে পারে, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

চিত্রঃ গাড়ি চালানোর সময় Glare দৃষ্টি বাধাগ্রস্ত করতে পারে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আলোর অত্যাধিক ব্যবহার Over-illumination নামে পরিচিত। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল (১ ব্যারেল = ১৫৯ লিটার) তেল এজন্য নষ্ট হয়। Energy Data নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর জন্য যে পরিমাণ শক্তি ব্যবহৃত হয় তার শতকরা ৩০-৬০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং U.S. Department of Energy( DOE) হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৯ সালেই এজন্য ৮১.৬৮ টেরাওয়াট বিদ্যুৎ নষ্ট হয়েছে।

আসলে শুধু over-illumination-ই নয়, সকল প্রকার আলোক দূষণেই বিপুল পরিমাণ শক্তির অপচয় হয়। ২০০৫ সালের হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বের উৎপাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ শুধু আলো জ্বালাতেই ব্যয় হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু রাস্তা আর পার্কিং-লট আলোকিত করতে বছরে ১২০ টেরাওয়াট/ঘণ্টা শক্তি ব্যয় হয়, যা দিয়ে নিউইয়র্ক শহরের দুই বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

শুধু তাই নয়, কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যয় হয় তার প্রায় ত্রিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর তিন কোটি ব্যারেল তেল এবং ৮২ লক্ষ ব্যারেল কয়লার অপচয় ঘটে, ক্ষতি হয় ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা শোষণ করতে সাড়ে ৮৭ কোটি গাছের প্রয়োজন। ২০০৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় কৃত্রিম আলো গ্রীনহাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় (৩০-৫০%) উৎস। প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য ১০৩৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় যার জন্য ২১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার খরচ হয় এবং সেইসাথে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ টন CO2  নির্গত হয়, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী।

চিত্রঃ Las Vegas Strip এ নানা রঙের আলোর বিশৃঙ্খল সমাবেশ(Clutter)।

আলোক দূষণের কুপ্রভাব মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ দেখলেই অনুধাবন করা যায়। সুবিশাল টুইন টাওয়ারের আলোর বিম Light Trespass এর জন্য দায়ী, আশেপাশের বিল্ডিংগুলোয় অহেতুক অত্যাধিক আলো ব্যবহৃত (Over-illumination) হয়েছে এবং এইসব দূষণের ফলে শহরের আকাশ অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে গেছে এবং কোনো নক্ষত্রই দৃশ্যমান নয় (skyglow)।

চিত্রঃ একটি কসমেটিকস দোকান, যা প্রয়োজনের দ্বিগুণ আলো ব্যবহার করছে। ফলে হচ্ছে আলোক তথা শক্তির অপচয়।

আলোক দূষণের জন্য শুধু শক্তির অপচয়ই হয় না; তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যেমন মহাকাশ পর্যবেক্ষণকে অনেক কঠিন করে তোলে। চারপাশে আলোর অত্যাধিক ব্যবহারে সম্পূর্ণ আকাশই উজ্জ্বল হয়ে যায়, ফলে কোনো অস্পষ্ট গ্রহ-নক্ষত্র দেখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এজন্যই নতুন দূরবীনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করা হচ্ছে। আবার আমরা জানি, বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র কোনো নক্ষত্রের আলো কীভাবে বিভিন্ন রঙিন আলোক রেখায় ভেঙে যায় তা রেকর্ড করে।

প্রত্যেক মৌলেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী আছে, সুতরাং মহাবিশ্বের কোনো বস্তুর বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে তার ভর, উপাদান, তাপমাত্রা, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়। ফলে তা কি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু, নিউট্রন-স্টার নাকি অন্যকিছু তা বুঝা সম্ভব হয়। জ্যোতির্বিদ্যায় এই যন্ত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত কৃত্রিম আলো বর্ণালীতে উজ্জ্বল আলোক রেখার সৃষ্টি করে যা অন্যান্য লাইনকে ম্লান করে দেয়, যেমন

চিত্রঃ কুয়ালালামপুরের রাতের আকাশ।

পারদ-বাষ্প, সোডিয়াম-বাষ্প বা ধাতব-হ্যালাইড প্রদীপ তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী সৃষ্টি করে যা আমরা যে বর্ণালী দেখতে চাইছি তাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।

এজন্য জ্যোতির্বিদগণ ‘নেবুলা-ফিল্টার’ ব্যবহার করতে পারেন যা নেবুলায় সাধারণত যেসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পাওয়া যায় শুধুমাত্র সেগুলোই দূরবীক্ষণ যন্ত্রে প্রবেশ করতে দেয়। তারা এছাড়া Light Pollution Filter (LPR) ব্যবহার করে থাকেন যা এসকল প্রদীপের বৈশিষ্ট্যমূলক বর্ণালী প্রবেশ করতে দেয় না এবং ফলশ্রুতিতে আলোক দূষণের প্রভাব কমে যায়। তাই গ্যালাক্সি এবং নীহারিকার মতো ম্লান জগৎ দেখা সহজ হয়।

কিন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এসকল ফিল্টার আলোক দূষণের কু-প্রভাব একেবারে নষ্ট করতে পারে না। যেহেতু এখানে পরীক্ষাধীন বস্তুর ঔজ্জ্বল্য কমিয়ে ফেলা হয় তাই ‘Higher magnification’ সম্ভব হয় না। তাছাড়া কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে বাধা দেওয়ায় বস্তুর রঙের পরিবর্তন ঘটে এবং প্রায়ই সবুজ ছাপ পড়ে যায়। তাই অত্যাধিক দূষিত শহরে LPR Filter ব্যবহার করে শুধু উজ্জ্বল নীহারিকাই (Emission Nebulae) দেখা সম্ভব, কারণ অন্যান্য ম্লান গ্রহ-নক্ষত্র বস্তুত অদৃশ্য হয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ কিংবা ছবি তোলার জন্য কোনো ফিল্টারই অন্ধকার আকাশের সমকক্ষ হতে পারে না। আমরা কোনো স্থানের রাতের আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপ করার জন্য Bortle Scale ব্যবহার করতে পারি। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী John E. Bortle ২০০১ সালে এই স্কেলের প্রবর্তন করেন যা কোনো জায়গা থেকে কত ভালোভাবে গ্রহ-নক্ষত্র দেখা যায় এবং তা আলো দ্বারা কী পরিমাণ দূষিত তা পরিমাপ করে। এই স্কেলে ‘১’ দ্বারা অসাধারণ অন্ধকার স্থান (যেখানে অত্যন্ত ম্লান তারকারাজিও দেখা সম্ভব, অবশ্য অন্যান্য উজ্জ্বল জগতের জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে) এবং ‘৯’ দ্বারা অত্যুজ্জ্বল শহর (যেখানে আকাশ কখনই অন্ধকার হয় না, চাঁদ এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু দেখা সম্ভব হতে পারে) বুঝায়।

এতক্ষণ ধরে লেখা পড়ে মনে হতে পারে, কৃত্রিম আলোর জন্যই আকাশ কখনো অন্ধকার হয় না, এটিই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সকল গবেষণাতে সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্ত প্রকৃত অর্থে আমাদের বায়ুমণ্ডল কখনোই সম্পূর্ণভাবে অন্ধকার হয় না, কারণ উপরের দিকে (সাধারণত মেসোস্ফিয়ারে) সূর্যের অত্যন্ত কম তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে আয়ন উৎপন্ন হয় এবং তারা বিভিন্ন কণার সাথে যুক্ত হলে ফোটন নির্গত হয় যা বাষ্পদ্যুতির (airglow) সৃষ্টি করে। দিনে সূর্যের জন্য বাষ্পদ্যুতির প্রভাব বুঝা না গেলেও রাতে তা যথেষ্টই সমস্যার সৃষ্টি করে, এজন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্র অনেক ম্লান তারাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে যা ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয় না। এছাড়া সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডলে প্রতিফলিত হলেও তা মহাবিশ্বে বিভিন্ন ধুলিকণার মাধ্যমে পুনরায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আকাশকে রাতে উজ্জ্বল করে তোলে। তাই আকাশের ঔজ্জ্বল্য পরিমাপের সময় Bortle Dark Sky Scale এ ‘১’ দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ অন্ধকার’ বুঝায় না।

চিত্রঃ Bortle Dark Sky Scale (The Scale ranges from 1 to 9)

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পেছনেও আলোক দূষণের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে সকল প্রাণী উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়ের জীবনযাত্রা, দিন-রাতের নিয়মিত আবর্তনের উপর নির্ভর করে বিবর্তিত হয়েছে, কিন্ত কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্য আজ নষ্ট হতে চলেছে। আলোর প্রতি বিভিন্ন পোকামাকড়ের অদম্য আকর্ষণের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। জার্মানির Mainz বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিভাগের Gerhard Eisenbeis এর ২০০৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোর দিকে কীট-পতঙ্গের আকৃষ্ট হবার বিষয়টি তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, কিছু পোকা আলোর দিকে উড়ে গেলেও কিছুদূর গিয়ে থেমে যায় এবং সেখানেই সারারাত আটকে থাকে, যা fixated or capture effect নামে পরিচিত।

রাতের অন্ধকারের মাঝে কৃত্রিম আলোয় পোকাগুলি বিভ্রান্ত হয়ে যায়। তারা সরাসরি গরম প্রদীপের উপরে উড়ে এসে পড়ে কিংবা সারারাত ধরে আলোর চারদিকে উড়তে থাকে। দুই ক্ষেত্রেই উত্তাপ আর অবসাদে পোকাগুলির মৃত্যু ঘটে। এছাড়া তারা আলোর প্রতি এমন অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে যে সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ আলোর চারপাশেই অবস্থান করে এবং পাখি, মাকড়সা বা

চিত্রঃ বায়ুমণ্ডলের উপরে অস্থিতিশীল অক্সিজেন পরমাণুর সবুজ বাষ্পদ্যুতি, International Space Station থেকে ছবিটি তোলা।

বাদুড়ের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে বাস্ততন্ত্রের পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন, সুইডেনের কিছু শহরে নতুন ল্যাম্পপোস্ট স্থাপনের অল্পদিনের মধ্যেই Europian Lesser Horseshow নামক বাদুঢ় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, কারণ আলোর প্রতি অধিক সহনশীল Pipistrell বাদুঢ় ল্যাম্পপোস্টের দিকে আকৃষ্ট পোকামাকড় শিকার করা শুরু করায় তাদের খাবারের অভাব ঘটে।

দ্বিতীয়ত, কীটপতঙ্গের চলার পথ আলোকিত হয়ে গেলে (যেমন রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করলে) তারা সেদিক দিয়ে আর যায় না, যা Crash Barrier Effect নামে পরিচিত। এভাবে আলোর প্রবর্তনের ফলে পোকামাকড়ের চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।

সবশেষে Vacuum Cleaner Effect বিষয়টি বিবেচনা করা যায়, যা কৃত্রিম আলোর প্রভাবে নিজস্ব পরিবেশের পরিবর্তনের জন্য পোকামাকড়ের বিশাল সংখ্যায় মৃত্যুকে নির্দেশ করে। কৃত্রিম আলো বিপুল সংখ্যায় পোকামাকড়কে আকৃষ্ট করে এবং খাদ্য অনুসন্ধান কিংবা বংশবৃদ্ধির পরিবর্তে তারা আলোর চারদিকে উড়তে থাকে, ফলে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ লক্ষ Mayfly এক রাতে কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি না করেই মারা গিয়েছিল, যা সেখানকার বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। মেফ্লাই হচ্ছে এক ধরনের জলজ পতঙ্গ যা জীবনের অধিকাংশ সময় মূককীট হিসেবে পানির নিচে থাকে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধুমাত্র প্রজননের জন্য পানির উপরে উঠে আসে। এ সময় তাদের আয়ু মাত্র ৫ মিনিট থেকে একদিন হয় এবং মুখ ও পাকস্থলি না থাকায় শুধু বংশবৃদ্ধিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। গবেষকের মতে, রাস্তায় কৃত্রিম আলো ব্যবহারের জন্য এক গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ১৩০ বিলিয়ন পোকা শুধু জার্মানিতেই মারা যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যেও আলোর প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তারা সার্চলাইট টাওয়ারের চারপাশে অবসাদে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত উড়তে থাকে। আলোর প্রতি এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণ Positive phototaxis নামে পরিচিত; এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক মতবাদ থাকলেও কোনোটাই ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় এই আচরণের কারণ আজও অজানা।

আলোক দূষণের ফলে বিভিন্ন প্রাণীর বংশবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। কৃত্রিম আলো থাকলে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাঙ, জোনাকি ও ফড়িঙ প্রজননে অনুৎসাহিত হয়। যেমন Heliothis zea পোকা সম্পূর্ণ অন্ধকার না হলে কখনোই প্রজননে অংশ নেয় না। আলোর জন্য ডিম পাড়াও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। যেমন ১৯৩৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আলোর ফাঁদে আটকে পড়া স্ত্রী মথের শতকরা আশি ভাগই ডিম পাড়ার জায়গা খুঁজছিল। কৃত্রিম আলোতে গাছের পরাগায়নও হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসের ফুল রাতের অন্ধকারে স্বল্প সময়ের জন্য ফুটে এবং প্রধানত বাদুঢ় ও মথের মাধ্যমে তাদের পরাগায়ন ঘটে, তাই চারপাশে আলোর পরিমাণ বেশি হলে পলিনেটরের অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গাছের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্যও আলোক দূষণ দায়ী। Purdue University এর Forestry and Natural Resource বিভাগের William R. Chaney এর ২০০২ সালের জুন মাসের গবেষণা অনুযায়ী, গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির উপর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, ঔজ্জ্বল্য এবং দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের প্রভাব রয়েছে। তাই রাতে কৃত্রিম আলোর প্রবর্তনের ফলে পাতার আকৃতি, রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি, শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কুঁড়ির সুপ্তাবস্থা প্রভৃতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

রাতে কৃত্রিম আলোর প্রভাবে গাছের জন্য দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তাই ল্যাম্পপোস্ট থেকে 700nm-1mm তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (লাল থেকে অবলোহিত) আলো নির্গত হলে গাছের ফুল ফোটার প্যাটার্নে পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকের মতে, যদি কৃত্রিম আলো কোনো গাছের ফটো পিরিয়ডিজমে পরিবর্তন ঘটায় তবে সেই গাছের জন্য সারা বছরই গ্রীষ্মকাল থাকতে পারে (কারণ কৃত্রিম আলোর প্রভাবে সেটার জন্য রাতের দৈর্ঘ্য সবসময়ই কম থাকছে) এবং গাছের সম্পূর্ণ বৃদ্ধি কখনই সম্ভব হয় না। তিনি উদাহরণস্বরূপ একটা পাম গাছ সম্পর্কে লিখেছেন যাতে কখনই ফুল ধরে না। শীতপ্রধান দেশে তুষার জমে ডাল ভেঙে গিয়ে

গাছের ক্ষতি হতে পারে এবং এজন্যই শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। কিন্ত শীতকাল চলে আসলেও কৃত্রিম আলোর প্রভাবে পত্রঝরা গাছের পাতা ঝরে পড়ে না, যা গাছের ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

পরিযায়ী পাখিদের মৃত্যুর জন্যও আলোক দূষণ অনেকাংশে দায়ী। বহু হাজার বছর ধরে পরিযায়ী পাখিরা চাঁদ-তারার আলো ব্যবহার করে রাতে শীতপ্রধান দেশ থেকে উষ্ণ স্থানে উড়ে যাচ্ছে, কিন্ত বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যাপক ব্যবহারে তারা আর পথ ঠিক রাখতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের Fish and Wildlife Service এর হিসেব অনুযায়ী, উঁচু টাওয়ার এবং বিল্ডিং এর আলোয় আকৃষ্ট হয়ে সংঘর্ষের ফলে প্রতি বছর ৪০-৫০ লক্ষ পাখির মৃত্যু ঘটে। Fatal Light Awareness Program এর নির্বাহী পরিচালক Michael Measure এর মতে, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই ৪৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আলোকিত স্থাপনার সাথে সংঘর্ষের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় Henslow’s Sparrow, cerulean warble-ও রয়েছে। আবার সার্চলাইটের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখিরা সারা রাত ধরে তার চারদিকে উড়তে থাকে যতক্ষণ না অবসাদে মৃত্যু ঘটে। যেমন ১৯৫৪ সালের ৭-৮ অক্টোবরে জর্জিয়ায় Warner Robin Air Force Base এর ceilometer (সার্চলাইট টাওয়ার) এর চারপাশে ৫৩ প্রজাতির অর্ধ লক্ষাধিক পাখি মারা গিয়েছিল। এছাড়া কৃত্রিম আলোর জন্য পাখিরা মনে করে বসন্ত চলে এসেছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যাত্রা শুরু করে যার ফলে তারা বাসা বাঁধা, প্রজনন এবং খাদ্য সন্ধানের আদর্শ সময় মিস করতে পারে।

আলোক দূষণ আজ বিভিন্ন সরীসৃপ, বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। সাড়ে ৬ কোটি বছরের পুরনো এই প্রাণী প্রায় দুইশ বছর বাঁচতে পারে, যার অধিকাংশ সময় পানিতে থাকলেও ডিম পাড়ার জন্য তারা শত শত মাইল সাঁতরে সমুদ্রসৈকতে উঠে আসে। একটি মা কচ্ছপ বালুর মধ্যে এক-দুই ঘণ্টা থেকে প্রায় শ’খানেক ডিম পাড়ে এবং ৭-১২ সপ্তাহের মধ্যে (সাধারণত রাতে) বাচ্চা জন্মায়। বাচ্চা কচ্ছপের জীবনের প্রথম মুহূর্তগুলো খুবই কঠিন, যখন তারা পাখি, কাঁকড়া ও অন্যান্য শিকারি থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে দ্রুত সাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। অবশ্য এই কচ্ছপগুলো এতই ছোট যে বালুর উপরে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত মাথা তুলতে পারে। তাই সাগরে যাওয়ার জন্য প্রবৃত্তিগতভাবেই তারা তাদের অন্ধকার স্থান ছেড়ে নিচের দিকে সমতল আর উজ্জ্বল স্থানের দিকে ছুটে চলে। এই যাত্রা এতই বিপজ্জনক যে মাত্র দশ শতাংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে এবং এক শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্ত বর্তমানের আলোক দূষণ তাদের এই সংগ্রামকে আরো কঠিন করে তুলছে।

প্রথমত, মা কচ্ছপ ডিম পাড়ার জন্য অন্ধকারতম সৈকতই বেছে নেয়, যা খুঁজে পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, বাচ্চা কচ্ছপের সাগর খুঁজে পাওয়ার জন্য আকাশ অন্ধকার হওয়া প্রয়োজন। Florida Atlantic University এর জীববিজ্ঞানী Dr. Michael Salmon এর ১৯৯৫ এবং ২০০৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী, কৃত্রিম আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে বাচ্চা কচ্ছপেরা সাগরের বদলে শহরের দিকে চলে আসে যা তাদের ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া কিংবা গাড়ির আঘাতে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধুমাত্র ফ্লোরিডাতেই এই কারণে বছরে লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ মারা যায়।

অন্যান্য প্রাণী, যেমন ব্যাঙ, সাপ আর স্যালাম্যানডার গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে শিকার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম আলোর কারণে অন্ধকার নেমে আসতে দেরি হওয়ায় তারা কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে শিকারে বের হয়, ফলে তাদের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

শুধু প্রাণী আর পোকামাকড় নয় বরং মানুষের উপরেও কৃত্রিম আলোর কুপ্রভাব রয়েছে। আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম (২৪ ঘণ্টায় শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত পরিবর্তনের যে চক্র সম্পন্ন হয়; যা শরীরের তাপমাত্রা, স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতে পারা এবং বিভিন্ন হরমোনের সুষম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে) বহাল রাখার জন্য আলো এবং অন্ধকারের ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। উদাহরণস্বরুপ মেলাটোনিন হরমোনের কথাই বিবেচনা করা যাক। আমাদের মস্তিষ্কে অপটিক নার্ভের উপরে অবস্থিত

Suprachiasmatic Nucleus (SCN) গ্রুপের স্নায়ুকোষ পিনিয়াল গ্ল্যান্ড থেকে মেলাটনিন হরমোনের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে। Antioxidant গুণাগুণ থাকার পাশাপাশি এই হরমোন ঘুমাতে সাহায্য করে, রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে, কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে এবং থাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারিস, টেসটিস এবং অ্যাডরিনাল গ্ল্যান্ডের কাজে সহায়তা করে। সুতরাং আমাদের সুস্থতার জন্য এই হরমোন নিঃসৃত হওয়া অত্যন্ত জরুরী।

এই হরমোন অন্ধকারে নিঃসৃত হয়, তাই রাতে কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে এই নিঃসরণ বন্ধও হয়ে যেতে পারে (মাত্র ৩৯ মিনিট আলোতে থাকলেই রক্তে মেলাটনিনের পরিমাণ শতকরা ৫০ ভাগ কমে যায়) যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান Paolo Sassone-Corsi এর মতে, সার্কাডিয়ান রিদম আমাদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই আলোক দূষণে এই রিদমে যে ব্যাঘাত ঘটে তা বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, স্থুলতা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, উচ্চ-রক্তচাপ এবং কর্মদক্ষতা কমে যাবার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Plitnick and co. (2010) এর গবেষণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন রাত জেগে কাজ করলে মানুষের নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, ফলে সামান্য কারণেই মেজাজ খারাপ হয় এবং স্বাভাবিক তৎপরতাও কমে যায়। এছাড়া ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তে প্রকাশিত বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোয় মানুষের অনুভূতিও তীব্র হয়ে থাকে,তাই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝামেলা নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক পরিমাণ সূর্যালোক গ্রহণ করলে ছাত্রদের ক্লাসে দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আলঝেইমার ডিজিজের সমস্যা কমে যেতে পারে।

Breast cancer এবং prostate cancer এর পেছনেও রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ২০০৩ সালের ৪ জুন প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী যেসকল নার্স ১৫ বছর বা তারচেয়ে বেশি সময় ধরে মাসে কমপক্ষে ৩ বার রাতে ডিউটি পালন করেছেন তাঁদের ক্যান্সারের ঝুঁকি শতকরা ৩৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ২০০৭ সালে World Health Organization (WHO) এর International Agency for Research on Cancer নাইটশিফট (বা অন্য কোনো শিফটে কাজ) যা সার্কাডিয়ান রিদমে ব্যাঘাত ঘটায়, তাকে ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কৃত্রিম আলোর অনেক ক্ষতিকর দিক থাকলেও আশার কথা হলো, আমরা দৈনিক যেসকল দূষণের মুখোমুখি হই তাদের তুলনায় এই আলোক দূষণ সমস্যার সমাধান অত্যন্ত সহজ। আলোর ডিজাইন, উপকরণ এবং বিন্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এই দূষণ অনেক কমিয়ে ফেলতে পারে। International Dark-sky Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী আলোর উৎসকে ঢেকে রাখা যেন উপরের দিকে মুখ না করে থাকে। পারদ-বাষ্প, ধাতব হ্যালাইড বাষ্প কিংবা নীল আলোর এলইডি বাল্বের বদলে কমলা সোডিয়াম-বাষ্প ল্যাম্প ব্যবহার করা, টাইমার কিংবা সেন্সর যুক্ত বাতি ব্যবহার করা যাতে শুধুমাত্র ঘরে প্রবেশ করলেই আলো জ্বলে উঠে এবং আলোর ঔজ্জ্বল্য (লুমেন) কমিয়ে ফেলে সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই এই সমস্যা অনেক কমে যাবে। ২০১৩ সালে ফ্রান্স আলোক দূষণ প্রতিরোধে অর্ডিন্যান্স জারি করেছে যার কারণে প্যারিসে এখন রাত ১ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত অফিস এবং দোকানের সামনে বাতি নিভিয়ে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এসকল নিয়ম মেনে অ্যারিজোনার ফ্ল্যাগস্টাফ, ওকক্রিক, সিডোনা শহর, স্কটল্যান্ডের কোল, কানাডার বন অ্যাকর্ড শহর সহ প্রচুর জায়গা International Dark-sky City উপাধি পেয়েছে, যা কীভাবে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

উনিশ লক্ষ বছর আগে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে ১৮৭৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির প্রচলন, রাতের অন্ধকার দূর করতে আলো ব্যবহারের ইতিহাস বেশ অনেকদিনের পুরনো। কৃত্রিম আলো আজ আমাদের জীবনকে অনেক সহজ ও নিরাপদ করেছে, কিন্ত পাশাপাশি এই বৈদ্যুতিক বাতির যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য আর সর্বোপরি আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে বিরূপ প্রভাবও বয়ে আনছে। আর তাই এখন সময় এসেছে পানি, বায়ু বা শব্দের মতো আলো দূষণকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার, কারণ অল্প একটু সচেতনতা আর সামান্য একটু সমবেত প্রচেষ্টাই পারবে এই দূষণ দূর করে পরিবেশে আলোর সত্যিকারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবনে আলোর পাশাপাশি অন্ধকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য, কারণ রাতের ঐ আপাত অন্ধকার আকাশের আসল বর্ণিল সৌন্দর্য অনুভব করতে সদা জীবন্ত, উজ্জ্বল শহরের চেয়ে অন্ধকার, শীতল কোনো মরু প্রান্তরই বেশি উপযুক্ত। তাই আমরা যদি এসব নকল আলোর আবরণ সরিয়ে কোনো গভীর, একাকী রাতে উপরের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের তুচ্ছ সমস্যাগুলোকে ভুলে এই মহাবিশ্বের বিশালত্বকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবো- আমাদের এই আত্মবিধ্বংসী মানবজাতির জন্য আজ যা খুবই দরকার।

তথ্যসূত্র

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/1994_Northridge_earthquake
  2. https://www.youtube.com/watch?v=_nlFcEj41Xk
  3. http://iflscience.com/space/one-third-of-humanity-cant-see-the-milky-way-in-the-night-sky/
  4. https://www.washingtonpost.com/news/energy-environment/wp/2016/06/10/light-pollution-keeps-much-of-humanity-from-seeing-the-night-sky/
  5. https://en.wikipedia.org/wiki/Lighting
  6. https://en.wikipedia.org/wiki/Light_pollution
  7. http://darksky.org/light-pollution/wildlife
  8. http://iflscience.com/environment/light-pollution-leads-baby-sea-turtles-astray-study-shows/
  9. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-environ.html
  10. http://lightpollutionanddarkskies.blogspot.com/
  11. http://darksky.org/light-pollution/energy-waste/
  12. https://en.wikipedia.org/wiki/Bortle_scale
  13. Ecological Consequences of Artificial Night Lighting. Catherine Rich & Travis Longcore (eds). 2006. Island Press. Covelo, CA. Pages 281-304,305-344
  14. nationalgeographic.com/news/2003/04/0417_030417_tvlightpollution_2.html
  15. http://physics.fau.edu/observatory/lightpol-Plants.html
  16. Salmon (2003)."Artificial night lighting and sea turtles" (PDF). Biologist 50: 163–168
  17. https://en.wikipedia.org/wiki/Ecological_light_pollution
  18. http://darksky.org/light-pollution/human-health/
  19. http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2627884/
  20. http://science.howstuffworks.com/environmental/green-science/light-pollutionhtm
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top