পৃথিবী ও পরিবেশ

সূর্যরশ্মিঃ বন্ধু নাকি শত্রু

ছোটবেলায় মা ভরদুপুরে বাইরে খেলতে দেয় না, বেশি রোদে বাইরে বেরুতে দেয় না। বেশি রোদ দেখলে আমরা সেই রোদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কখনো ছাতা মাথায় রোদ এড়িয়ে চলি, কিংবা কখনো সানব্লক ক্রিম মাখি। এতোকিছু করা হয় শুধুমাত্র ভয়ের কারণে, রোদে পুড়ে ত্বক যেন কালো হয়ে না যায়। আবার কখনো ছেলে-বুড়ো সকল বয়সের মানুষেরা সকালের হাল্কা মিষ্টি রোদে হাটতে বের হই এই ভেবে যে, এই রোদ আমাদের শরীরের জন্য উপকারী, হালকা রোদ ভিটামিন ডি তৈরিতে সাহায্য করে।

শীতপ্রধান দেশে যেখানে মানুষ রোদের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে, সেখানে গ্রীষ্মকাল আসলেই তাদের মাঝে অন্য এক আনন্দের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সব বয়সের মানুষ দিনের সময়টা বাইরে ঘোরাঘুরি করে। রোদের সংস্পর্শে থাকার চেষ্টা করে। তারপরও বহু মানুষের মাঝে ভুল ধারণা থাকে সূর্যের আলো আমাদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করে বেশি। তাই এখানে সূর্য আমাদের কতটুকু ক্ষতি করে, কীভাবে করে, এবং কতটুকু উপকার করে তা পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করবো।

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ

তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ এক ধরনের বিচ্ছুরিত শক্তি যা তড়িৎচুম্বকীয় কৌশলে নির্গত হয়। তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্র একসাথে স্পন্দনের মাধ্যমে তরঙ্গ আকারে শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগে সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং শক্তি সঞ্চারিত করে। এখানে তড়িৎ ক্ষেত্র এবং চুম্বক ক্ষেত্রের স্পন্দনের দিক একে অপরের সাথে লম্বভাবে হতে থাকে। দৃশ্যমান সূর্যের আলো তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের একটি ভালো উদাহরণ। এছাড়াও আরো অনেক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ আছে যা আমাদের চোকে দৃশ্যমান নয়। যেমন বেতার তরঙ্গ, ইনফ্রারেড রশ্মি, এক্স রে ইত্যাদি।

2চিত্রঃ তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের কৌশল।

আমরা জানি, সূর্যরশ্মির কণা ধর্ম ও তরঙ্গধর্ম উভয়ই আছে। সূর্যরশ্মির কণা ফোটন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে স্পন্দিত হয়ে তরঙ্গ আকারে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। একটি ফোটন কণা কতটুকু তড়িৎচুম্বকীয় শক্তি বহন করে নিয়ে যায় সেটি নির্ভর করে সেই তরঙ্গের কম্পাঙ্কের উপর। বিখ্যাত বিজ্ঞানী প্ল্যাঙ্কের সমীকরণ  দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শক্তি কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক যেখানে  হলো প্ল্যাংকের ধ্রুবক,  (নিউ) হলো কম্পাংক। আবার  যেখানে  হলো আলোর বেগ এবং  হলো এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

তাহলে আমরা বলতে পারি একটি ফোটন যতটুকু শক্তি বহন করে তা তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক। এর মানে দাঁড়ায় তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বাড়তে থাকবে শক্তির পরিমাণ ততই কমতে থাকবে। সাধারণত এই বিকিরণকে আমরা ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাংক এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে প্রকাশ করি। যেমন কোনো রেডিও স্টেশন ৬৮০ কিলোহার্জ ফ্রিকোয়েন্সিতে তথ্য পাঠায়। এছাড়া তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বেলায় আমরা বলি অতিবেগুনি রশ্মি বা আল্ট্রাভায়োলেট রে ১০০-৪০০ মিলিমিটার সীমায় কাজ করে।3

আইনস্টাইনের ফটোতড়িৎ ক্রিয়া সম্পর্কে কম বেশি অনেকেই জানে। ফটোতড়িৎ ক্রিয়া দেখিয়ে ১৯১২ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন কোনো ফোটন কণা যখন কোনো বস্তুকণার উপর আঘাত করে তখন সেখান থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। এই প্রক্রিয়াটা কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। যখন পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন ফোটন কণা কোনো বস্তুকণার উপর এসে পড়ে তখন বস্তুকণার মাঝে ইলেকট্রনের উত্তেজিত অবস্থা এবং পরবর্তীতে ইলেকট্রনের প্রমোশন বা উত্তীর্ণকরণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থানকালে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তিসম্পন্ন ইলেকট্রন সাধারণত শক্তি শোষণও করে না, বর্জনও করে না এবং তা ঐ কক্ষপথে নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘুরতে থাকে। কিন্তু বাইরে থেকে শক্তি দেয়া হলে ইলেকট্রন সেই শক্তি শোষণ করতে বাধ্য হয় এবং অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একে বলে উত্তেজিতকরণ অবস্থা। এরপর সেই শক্তি নিয়ে ইলেকট্রন উপরের কক্ষপথে লাফ দিয়ে চলে যায়। একে বলে উত্তীর্ণকরণ অবস্থা। পুরো প্রক্রিয়া খুব স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হয়। ইলেকট্রন শীঘ্রই আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে এবং গ্রহণ করা অতিরিক্ত শক্তি তড়িৎচুম্বক বিকিরণ আকারে বের করে দেয়।

সূর্যরশ্মি কেন আমাদের সানবার্নের জন্য দায়ী

অতিরিক্ত রোদে চলাফেরা করলে ত্বকের বেশ ক্ষতি হয়। ত্বকের রঙ কালো হতে থাকে এবং ত্বক পুনরায় আগের রঙ ফিরে পায় না। এছাড়াও অতিরিক্ত সূর্য-রশ্মি অল্প বয়সে ত্বকে বয়স্ক ভাব এনে দেওয়া থেকে শুরু করে ক্যান্সারের ঝুকিও বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সূর্য-রশ্মি আমাদের ত্বকের এই পুড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কেন? ব্যাপারটা এমন না যে রোদে আমাদের অনেক গরম অনুভূত হয় এবং প্রচণ্ড গরমে আমাদের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আমাদের এই ক্ষতির কারণ তাপীয় প্রভাবের কারণে নয় বরং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে।

সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি নির্গত হয় তা তড়িৎচুম্বক বিকিরণের সমষ্টি, যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনী, দৃশ্যমান ও অবলোহিত বা ইনফ্রারেড অঞ্চলের মাঝে পড়ে। এদের মধ্যে কিছু বিকিরণ আমাদের পৃথিবীর উপরিভাগে পুরোপুরি এসে পৌছায় না। আমরা সবাই পৃথিবীর ওজোন স্তরের কথা জানি। সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি এই ওজোন স্তর শোষণ করে আমাদের রক্ষা করে। ওজোন স্তর ওজোন গ্যাস (O3) দিয়ে গঠিত যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি শোষণ করে নেয় এবং ভেঙ্গে একটি অক্সিজেন অণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু গঠিত করে। পরবর্তীতে এই অক্সিজেন পরমাণু আবার অপর এক অক্সিজেন অণুর সাথে মিলত হয়ে ওজোন অণু গঠন করে। এভাবে চলতে থাকে। পৃথিবীর মাঝে পানি এবং বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন সূর্যরশ্মির ইনফ্রারেড অংশ শোষণ করে ফেলে। ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান আলো যা আমাদের ত্বকের উপর পড়ে এবং আমরা গরম অনুভূত করি। এই অংশগুলোর বিকিরণ শক্তি আমাদের ত্বকের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিলেও মূলত ক্ষতি করে অতিবেগুনী রশ্মি, যার ফোটন কণা যথেষ্ট শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে।4

অতিবেগুনী রশ্মিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এরা হলো UV-A, UV-B ও UV-C। এদের মধ্যে UV-C এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক কম বলে এই রশ্মির ফোটন অনেক উচ্চ শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে। ওজোন স্তর UVC কে পুরোপুরি শোষণ করে ফেলে। যদি UVC পৃথিবীতে ঢুকে যায় তাহলে প্রাণীকুলের মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে। UVA বাকী দুটোর তুলনায় এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। এতে এর ফোটন কণার শক্তিও যথেষ্ট কম। যদিও UVA, UVC এর মতো মারাত্মক ক্ষতিকর নয় তবে এটিও আমাদের কম ক্ষতি করে না। বায়ুমন্ডল ভেদ করে যতটুকু পরিমাণ অতিবেগুনী রশ্মি আসে তার প্রায় ৯৫ শতাংশ আল্ট্রাভায়োলেটে গঠিত।

এতক্ষণ ফটোতড়িৎ ক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এর সূত্র ধরেই এখন আমরা জানবো সূর্যরশ্মি কীভাবে আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত শক্তিসম্পন্ন UV রশ্মির ফোটন কণা আমাদের শরীরের পরমাণু উপর পড়ে সেখান থেকে ইলেকট্রন সম্পূর্ণ বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। ফলের পরমাণুর আয়ন অবস্থার সৃষ্টি হতে বাধ্য হয়। ব্যাপারটা এমন যে দুটো পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রন জোড়া শেয়ারের মাধ্যমে যে রাসায়নিক বন্ধনের সৃষ্টি হয় তা এই পর্যাপ্ত শক্তির প্রভাবে এদের মাঝখানে ফাটল ধরে যাতে করে এরা দুটো র‍্যাডিক্যাল বা মুক্ত পরমাণু হতে বাধ্য হয়। এদের প্রত্যেকটির কাছে একটি করে শেয়ারের ইলেকট্রন থাকে। যে শক্তির কারণে এই অবস্থা ঘটে তাকে বন্ধন ভাঙ্গন শক্তি বলে।

মানুষ সহ সকল জৈবিক প্রাণীদের শরীর কার্বন-কার্বন পরমাণুর বন্ধন দিয়ে তৈরি। একটি একক কার্বন-কার্বন বন্ধন ভাঙ্গতে প্রায় ৩৫০-৪৮০ কিলোজুল/মোল শক্তি প্রয়োজন যা আল্ট্রাভায়োলেট বিকিরণ প্রদান করতে সক্ষম।

২০১২ সালের আগ পর্যন্ত কীভাবে সানবার্ন হয় তা বিজ্ঞানীরা জানতেন না। কিন্তু অবশেষে বিজ্ঞানী রিচার্ড গ্যালো “নেচার মেডিসিনে” প্রকাশিত তার এক নিবন্ধে সম্পূর্ণ ব্যাপারটির ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির পর্যাপ্ত পরিমাণের শক্তি আমাদের কোষের মাঝে বিশেষ ধরনের RNA কে ভেঙ্গে ফেলে এবং পরিবর্তিত করে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষ তার ভেঙ্গে যাওয়া RNA কে মুক্ত করে পাশের সুস্থ কোষগুলোকে উত্তেজিত করে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলোকে ঠিক করার জন্য সুস্থ কোষগুলোর মাঝে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটি এভাবে চলতেই থাকে।

আল্ট্রাভায়োলেটের অতিমাত্রার প্রভাবে পুড়ে যাবার আগে ত্বক ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে। ত্বকের কোষগুলোর চমৎকার আত্মরক্ষাত্মক প্রক্রিয়ায় UVA প্রতিহত করার জন্য কোষে মেলানিন নামক এক ধরনের রঞ্জক তৈরি হয় যা প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ UV বিকিরণ প্রতিহত করে। কিন্তু প্রতিহত ব্যবস্থাটি কতটুকু হবে তা নির্ভর করে আমাদের কোষে কতটুকু মেলানিন তৈরি হচ্ছে বা আছে তার উপর। সাধারণত কালো চামড়ার মানুষের দেহে যথেষ্ট পরিমাণে মেলানিন আছে যাতে করে তাদের উপর প্রভাবটা কম পড়ে। কিন্তু ফর্সা চামড়ার মানুষের দেহে মেলানিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হতে পারে না বলে UVA রশ্মি পুরোপুরি প্রতিহত হয়। এতে আমাদের কোষের ক্ষতি হতে থাকে এবং ত্বক পুড়ে যায়। যাকে বলে সানবার্ন।

সূর্য আমাদের বন্ধু নাকি শত্রু এই নিয়ে মানুষের মাঝে তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। বহু মানুষ ক্ষতির ভয়ে সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আদৌ কি সূর্যের আলো শুধু আমাদের ক্ষতিই করে যায়? না। মানবদেহে সূর্যের আলোর অনেক উপকারী দিকও আছে।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রায় ১৫ টি দেশ থেকে শীতকালীন সময়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সূর্যের আলোর উপর গবেষণা চালিয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্যগুলোর মাধ্যমে তারা ১৭৭ টি দেশের মানুষের রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ নির্ণয় করার চেষ্টা চালায়। তথ্য যাচাই-বাছাই করে অবশেষে তারা সিদ্ধান্তে আসেন, নিম্ন মাত্রার ভিটামিন ডি’র সাথে স্তন ক্যান্সার ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। তাদের মতে, যদি রক্তরসে ভিটামিন ডি’র পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তাহলে ক্যান্সারের ঝুকি অনেকাংশে কমে যায়। ডায়েট, বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যগ্রহণ, শরীর চর্চার পাশাপাশি দিনে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যাপ্ত পরিমাণে সূর্যের আলোতে থাকলে দেহ যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ পায়, যা মানবদেহের জন্য অনেক উপকারী।

সূর্যের আলোর উপকারিতা

রাতে ভালো ঘুম হওয়াঃ মানব দেহ প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। একে সার্কোডিয়ান চক্র বলে। ২৪ ঘণ্টা সময়ের মাঝে মানবদেহের দৈহিক, মানসিক, আচরণগত পরিবর্তন এবং দিনের আলো ও রাতের সময়টা মানব দেহের উপর কী প্রভাব ফেলে, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে এই চক্র গঠিত। সুস্থ ও ভালোভাবে এই চক্র সম্পাদনের জন্য সূর্যের আলোর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। দিনের বেলা আমরা জেগে তাকি, রাতে আমাদের ঘুমোতে হয়, আমাদের দেহ ঘড়ি সবসময় এই নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে চলে।

সাধারণত দিনের আলো আমাদের শরীরকে সংকেত দেয় এটা দিনের আলো এবং আমাদের শরীর ঘড়ি সচল হয়ে যায় এবং সারাটা দিন সচল হয়ে দিন কাটাতে সাহায্য করে। দিনের আলো ছাড়া কোনো মানুষকে যদি ২৪ ঘণ্টা কৃত্রিম আলোতে রাখা হয় তাহলে দেহ ঘড়ি তার নির্দিষ্ট ছন্দ গুলিয়ে ফেলে। এতে মানসিক ও দৈহিক অনেক প্রভাব ফেলে। চক্রের মাঝে বিশৃংখলা দেখা দেয়। রাতে সময়মতো ঘুম আসে না, সকালেও সময়মতো উঠা যায় না। সকালের আলো থেকে যতটা দূরে থাকবো ততই আমাদের শরীরবৃত্তিয় চক্রের মাঝে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে।

মেজাজ ফুরফুরে করাঃ মেজাজ ফুরফুরে থাকা, চিন্তা ভাবনায় সক্রিয় ও সতর্ক থাকার সাথে সূর্যের আলোর ভালো সম্পর্ক আছে। প্রতিদিন সূর্যের আলো আমাদের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে সেরেটোনিন তৈরি করে। সেরেটোনিন আমাদের মেজাজ ফুরফুরে রাখতে সাহায্য রাখে। গবেষকরা বহু মানুষের মাঝে গবেষণা করে দেখতে পান, কোনো মানুষ কত ঘণ্টা সূর্যের আলোতে ছিল এবং তাদের শরীরে সেরেটোনিনের মাত্রা কেমন হচ্ছে, এই দুইয়ের মাঝে যোগসূত্র আছে। আরো দেখতে পান পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলোতে থাকার সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে দেহে উৎপন্ন সেরোটোনিনের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

ভিটামিন ডি তৈরিঃ যে ক্রিয়া-কৌশলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি আমাদের ত্বকের ক্ষতি করে ঠিক সেই ক্রিয়াকৌশলেই আমাদের ত্বক ভিটামিন ডি তৈরি করে। সাধারণত ২৯৫-৩০০ মিলিমিটার ব্যবধির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো আমাদের ত্বক শোষণ করলে, ঐ আলো যে পরিমাণ শক্তি বহন করে তা ত্বকে দুই ধাপ সংঘটিত বিক্রিয়া সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তির যোগান দেয়। এই বিক্রিয়ায় ৭-ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল, কোলক্যালসিফেরলে পরিণত হয়। এই কোলক্যালসিফেরলকে আমরা ভিটামিন D3 নামে জানি। এখানে বলে রাখা ভাল সূর্যের আলো আমাদের ত্বকে যে ভিটামিন তৈরি করে তা খাদ্যের মাধ্যমে গৃহীত ভিটামিন ডি থেকে কিছুটা আলাদা। খাদ্যের মাধ্যমে এরগোক্যালসিফেরল বা ভিটামিন ডি-২ গ্রহণ করি।

রক্তচাপ কমায়ঃ সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ত্বক থেকে নাইট্রিক অক্সাইড নামক এক ধরনের যৌগ নিঃসৃত করায় যা আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে ও কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপের মানুষদের বেলায় মৃদু সূর্যের আলো উপকারী হতে পারে। সম্প্রতি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গবেষক ৩৪ জন মানুষের উপর UV বাতি ও সাধারণ বাতির আলোর প্রয়োগ করে এদের দেহের রক্তচাপ ও ভিটামিন ডি এর মাত্রা নির্ণয় করেন। ফলাফল হিসেবে তারা দেখেন শুধুমাত্র UV বাতির আলোতে তাদের দেহের রক্তচাপের হ্রাস ঘটে কিন্তু সাধারণ বাতির আলোতে রক্তচাপের কোনো পরিবর্তন হয় না।

সবশেষে একটা ব্যাপার লিখে এই শেষ করছি, সূর্য আমাদের উপকার করছে নাকি ক্ষতি করছে সেটি সঠিকভাবে চিন্তা করে যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব। অতিরিক্ত সূর্যের আলো যেমন ক্ষতি করে তেমনি আমাদের দৃষ্টির জন্য এটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা রাখে না। বহু মানুষ বিশেষ করে মেয়েদের মাঝে সূর্যকে ক্ষতিকর ভাবার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তারা সূর্যের ভয়ে ত্বকে বিভিন্ন রকমের সানব্লক ক্রিম মাখে। কিন্তু এই ক্রিম আসলে কতটা উপকার করে? গবেষণায় দেখা গেছে এই ক্রিম উপকারের চাইতে অপকারই করছে বেশি। বহু সানব্লক ক্রিমে জিংক অক্সাইড আছে যা সূর্যের UV রশ্মির সাথে বিক্রিয়া করে ত্বকের উপরিভাগের কোষগুলোর অনেক ক্ষতি করে। এতে করে ত্বকের সৌন্দর্য, কোমলতা নষ্ট হয়। এটা আমাদেরই দায়িত্ব সব জেনে বুঝে নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সকল সন্দেহ কাটিয়ে সঠিকটা গ্রহণ করা।

তথ্যসূত্রঃ

  1. http://www.atomsandnumbers.com/2013/why-the-sun-can-harm-you-and-wifi-cant-and-how-microwave-ovens-cook-your-food/
  2. http://www.medicaldaily.com/sun-exposure-vitamin-d-and-other-health-benefits-sunlight-246487
  3. http://articles.mercola.com/sites/articles/archive/2012/09/29/sun-exposure-vitamin-d-production-benefits.aspx

http://www.cancercouncil.com.au/25277/b1000/skin-cancer-30/protecting-your-skin/

জিয়ান ফজলে
পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সূর্যরশ্মিঃ বন্ধু নাকি শত্রু
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top