শরতের পাতার রঙের রসায়ন

শরতের আগমনের সাথে সাথেই গাছের পাতার রঙের মধ্যে বিচিত্রতা দেখা যায়। এ বিচিত্রতা যদিও আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে চোখে পড়ে, কিন্তু এর মধ্যে যে রসায়নের খেলা চলে তা নিয়ে আমরা হয়তো খুব কমই মাথা ঘামাই।

পাতায় বিভিন্ন রঙ প্রদানকারী যৌগ সম্পর্কে জানার আগে করার আগে প্রাথমিক অবস্থায় এদের উৎপত্তি বিষয়ে জেনে নেই। এ উদ্দেশ্যে যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বন্ধনের উদ্ভব ঘটে। শরতের পাতার রঙ পরিবর্তনের পিছনে একক ও দ্বি-বন্ধনের মিশ্রিণ এবং কনজুগেশন বন্ধনেরও ভূমিকা আছে। কজুগেশন বন্ধনের কারণে পাতায় বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের দৃশ্যমান আলো শোষিত হতে পারে। চোখে আপতিত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের ভিন্নতার কারণে পাতার রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়।

ক্লোরোফিল

পাতার সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল নামের উপাদানটি। পাতার কোষের ক্লোরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকে এ ক্লোরোফিল, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। ক্লোরোফিল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ তাপমাত্রা এবং সূর্যালোক।

গ্রীষ্ম শেষ হবার সাথে সাথে যেহেতু উষ্ণতা ও সূর্যালোক উভয়ই প্রতিকূলে যেতে থাকে তাই তখন ক্লোরোফিল উৎপাদনের হারও কমতে থাকে। অন্যদিকে পাতার মাঝে সঞ্চিত ক্লোরোফিল বিয়োজিত হতে থাকে। এ অবস্থায় পাতার রঙ সবুজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আদি হলদেটে রূপ ধারণ করে।

ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড

রাসায়নিক যৌগের পরিবারের মধ্যে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েড বিশাল স্থান দখল করে আছে। এরা লাল ও হলুদ রঙের জন্য দায়ী। ক্যারোটিনয়েড এবং ফ্যাভিনয়েড ক্লোরোফিলের সাথে উপস্থিত থাকে। এমনকি এমনকি গ্রীষ্মেও। তবে গ্রীষ্মে ক্লোরোফিল উৎপাদন অপেক্ষাকৃত বেশি ঘটে থাকে বিধায় পাতার মাঝে এদের প্রভাব দেখা যায় না। ফলে পাতা সবুজ দেখায়।

তবে শরতের আগমনের সাথে সাথে আবার ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি প্রকট হতে থাকে ফলে হলুদ রঙের উদ্ভব ঘটে। এদের মাঝে ক্যারোটিনয়েড লাল আর ফ্যাভিনয়েড কমলা রঙের আবির্ভাব ঘটায়। শরত শেষ হবার সাথে সাথে ক্যারোটিনয়েড ও ফ্যাভিনয়েডের উপস্থিতি কমতে থাকে।

ক্যারোটিনয়েডের আরো কয়েকটি উদাহরণ হচ্ছে বিটা-ক্যারোটিন (গাজরে থাকে), লুটেইন (ডিমের কুসুমের হলুদ রঙের জন্য দায়ী), লাইকোপিন (টমেটোর টকটকে লাল রঙের জন্য দায়ী)।

অ্যান্থোসায়ানিন

ফ্যাভিনয়েড শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত অ্যান্থোসায়ানিন। কিন্তু ফ্যাভিনয়েডের মতো অ্যান্থোসায়ানিন সারা বছর জুড়ে পাতার মধ্যে থাকে না। বেলা নামার সাথে সাথে পাতার মাঝে অবশিষ্ট শর্করা সূর্যালোকের সাথে বিক্রিয়া করে অ্যান্থোসায়ানিনের উৎপাদন ঘটায়।

যদিও পাতার মধ্যে অ্যান্থোসায়ানিনের প্রকৃত ভূমিকা জানা যায়নি, ধারণা করা হয় অ্যান্থোসায়ানিন আলোক নিরাপত্তার কাজ করে থাকে। অর্থাৎ পাতাকে অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে রক্ষা করে। আর পাতাকে রঙ দানের ক্ষেত্রে অ্যান্থোসায়ানিন লাল, বেগুনি ও অন্যান্য মিশ্রিত রঙের আবির্ভাব ঘটিয়ে থাকে। পাতার রসের মধ্যে অম্লের উপস্থিতির কারণেও রঙের আবির্ভাবের বিঘ্ন ঘটতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ কম্পাউন্ড কেমিস্ট্রি, http://www.compoundchem.com/2014/09/11/autumnleaves/

featured image: turningstar.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *