in

পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়লে কী হবে?

মানুষসহ সকল প্রাণির জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ। তাপমাত্রা বা উষ্ণতা পরিবেশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। খুব কম তাপমাত্রা যেমন বসবাসের অনুপযোগী ঠিক তেমনি উষ্ণতা বৃদ্ধিও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। শীতের দিনে উষ্ণতা পেতে ভালোই লাগে কিন্তু গরমের দিনে আবার সেই উষ্ণতাই অশান্তির কারণ হয়। বর্তমানে কার্বন ডাই অক্সাইডের নি:সরণ বেশি হওয়ায় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্বের তাপমাত্রা মাত্র ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে নানা প্রতিকূল অবস্থা সৃষ্টি হবে।

image source: helpsavenature.com

এ কারণেই জলবায়ু বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার পদক্ষেপ হিসাবে আন্তর্জাতিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি সম্পাদন করেছিল জাতিসংঘ। এই চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি যেন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম থাকে।

শিল্পায়নের ফলে যখন কারখানার গ্রিন হাউজ গ্যাস বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে, তার ফলশ্রুতিতে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০ বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল জি ৮ (যদিও এটা এখন জি ৭) এর নীতি নির্ধারকরা বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আবহাওয়া মানুষ ও জীব জগতের সাথে বৈরী আচরণ করবে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো অনাবৃষ্টি, দাবানল, সাইক্লোন ও টর্ণেডো প্রভৃতি আঘাত হানবে।

কিন্তু এই দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? আমরা জানি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে। কিন্তু এর সাথে আসলে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের সম্পর্কটা কি?

প্রকৃতপক্ষে সব কিছুর একটা নির্দিষ্ট শেষ মান আছে, যে মান পর্যন্ত স্বাভবিক অবস্থা বিরাজ করে। কিন্তু তা অতিক্রম করলেই অবস্থার পরিবর্তন হয়। এই শেষ মানকে থ্রেসহোল্ড বলে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির থ্রেসহোল্ড মান হলো ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৯৭৫ সালে সর্ব প্রথম এটি নিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে মত প্রকাশ করে অর্থনীতি বিদ ড. ইউলিয়াম নর্দুয়াস বলেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা । ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর এপ্লাইড সিস্টেম এনালাইসিস এর একটি গ্রুপ যারা আন্তর্জাতিক সীমারেখায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কর্মরত, তার সহকর্মিদের তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিভাবে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড নি:সরণ নিয়ন্ত্রণ করবো? নর্দুয়াস বলেন, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড (মানুষের তৈরি কার্বন ডাই অক্সাইড দ্বারা সৃষ্ট) বৃদ্ধি পেলে তা, পৃথিবীর জলবায়ুকে এমন ভাবে পরিবর্তন করবে যা গত কয়েক লক্ষ বছর ধরে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। এক জন অর্থনীতিবিদ হিসাবে নর্দুয়াস গবেষণা করে দেখেন যে, যেভাবে কার্বন ডাই আক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে তা যদি দুইগুণ হয়, সেটা হবে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধির সম পরিমান।

image source: wattsupwiththat.com

এখন থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিপদজনক অবস্থায় থাকবে পরিবেশ। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্ববাসীকে মানুষের তৈরি গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ভয়াবহতার ব্যাপারে সর্তক করে আসছেন। ১৯৯২ সালে মানব হস্তক্ষেপের ফলে জলবায়ুর বিপদজনক পরিবর্তন বন্ধের লক্ষ্যে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কনভেনশনটি প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছেনা।

নর্দুয়াসের গবেষণার ৪০ বছর পর ২০১৬ সালে জাতিসংঘ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে রাখার পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০ শতকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ১৮৮০ সালে এই তাপমাত্রা অনেক কম ছিল। ১৯৭৫ সালের পর থেকে প্রতিনিয়ত দশমিক হারে তাপমাত্রা বাড়ছে বলে নর্দুয়াস তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। ২১ শতকের প্রতিটি বছর, অর্থাৎ, গত ২০ বছর ছিল সর্বোচ্চ উষ্ণতম বছর। ইতোমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ুর বৈরি আচরণের স্বীকার বিশ্ববাসী। মানব সৃষ্ট কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ২০১৭ সালে হারিকেন বেশি আঘাত হেনেছে এবং ১০ গুণ বেশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় খরা ও গরমের তীব্রতায় কম বৃষ্টিপাত, শুষ্ক মাটি ও দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে। যদি তাপমাত্রা ২ ডিগ্রীর বেশি বেড়ে যায় তাহলে পৃথিবী অনেক উষ্ণ হবে যার প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, কৃষি, কাঠামো ও পরিবেশের উপর। বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থার ধ্বংস এবং প্রবালদ্বীপ এবং আর্কটিক এলাকার অনেক প্রজাতি বিপন্ন হবে। গ্রিনল্যান্ড বরফ এবং আর্টিক বরফ দ্রুত গতিতে গলতে শুরু করলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চল ও ছোট ছোট দ্বীপ গুলো নিশ্চিহ্ন হবে। ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পুরো জাতির অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে। সমুদ্র উপকুলীয় পর্যটন শিল্প মারাত্বক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারে।

বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত কি তাদের কার্বন ডাই আক্সাইডের নিঃসরণ কমিয়ে উষ্ণতা ২ ডিগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেনা? পারে। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন। আই পি সিসির এক গবেষণা বলছে যে তারা ৯৫% ভাগই নিশ্চিত যে, ২১০০ সালের মধ্যে ২ ডিগ্রী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছাড়িয়ে যাবে। তাই তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সচেতন হয়ে বসবাসের উপযোগী পৃথিবী রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

featured image: pbs.org

পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

চাঁদের যত নাম