পৃথিবীর মতো অণুজীব পাওয়া যেতে পারে লাল গ্রহে

হেল অন আর্থ। কখনো শুনেছেন এরকম ? দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকূল ঘেঁষে একটি বৃহৎ মরুভূমি আছে, যাকে পৃথিবীর নরক বলা হয়। কিন্তু এই নরকের সাথে আরেকটি লাল রঙে আচ্ছাদিত এক স্থানের মিল দেখে বিজ্ঞানীরা একই সাথে উত্তেজিত এবং চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

চিলির আটাকামা মরুভূমি হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্কতম স্থানের মধ্যে অন্যতম। এই মরুভূমি এতই শুষ্ক যে কোনো কোনো সময় কয়েক দশক বা শতক ধরেও এখানে কোনো বৃষ্টির দেখা যায় না। আর এই প্রতিকূল স্থানকে আমরা পৃথিবীর মধ্যে এক টুকরো মঙ্গল গ্রহ বলতে পারি এবং বিজ্ঞানীরা এই স্থানের ব্যাপারে এক মস্ত আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

চিলির আটাকামা ম্রুভূমি; image source: dailygalaxy.com

এই প্রথমবাবের মত গবেষকরা আটামাকার অস্বাভাবাবিক শুষ্ক মরুভূমিতে মাইক্রোবায়াল প্রাণীকে বেঁচে থাকতে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, এই শুষ্ক এবং অত্যন্ত গরম পরিবেশে সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাদের একটি নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রও আছে। তাই মঙ্গল গ্রহের প্রাণের আবিষ্কারের পূর্বে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটি আবিষ্কার।

“এটা আমাকে সবসময়ই অবাক করে দেয় যে, মানুষ যেখানে চিন্তাও করত পারে না এইরকম একটা স্থানে কোনো প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে সেইরকম পরিবেশেও দেখা যায় যে জীবন ঠিকই সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেঁচে আছে।” বলেন ওয়াশিংটন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিজ্ঞানী ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন যে, “জীবন যদি পৃথিবীর সবচাইতে শুষ্ক পরিবেশে লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে বেশ একটা ভালো সম্ভাবনা আছে যে, একইভাবে মঙ্গল গ্রহেও জীবনের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।”

যদিও এর আগে বিজ্ঞানীরা আটাকামা মরুভূমিতে জীবাণু খুঁজে পেয়েছিলেন। পূর্বের গবেষণায় বলা হয়েছিল যে, বালিমাটিতে যে সকল প্রাণের আবিষ্কার হবে তা হয় আগেই মারা গেছে বা, মৃতপ্রায় টেকসই কোষের অবশিষ্টাংশ হঠাৎ বায়ুমন্ডলীয় প্রক্রিয়ায় জমা থাকবে।

কিন্তু এইবার তারা আসলেই প্রমাণ পেয়েছেন দলবদ্ধ এবং বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় এক ধরনের জীবাণুর যারা বর্ধনশীল বা অন্তত টিকে থাকার চেষ্টা করছে প্রতিকূল পরিবেশে।

২০১৫ সালে ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক এবং তার সাথে গবেষকারা আটাকামা মরুভূমিতে পৌঁছানোর কিছু পরেই আকাশে বৃষ্টির দেখা দেয় যা কিনা খুবই দূর্লভ ঘটনা। এতটাই দূর্লভ যে ৪০ বছর আগেও মনে হয় এত বৃষ্টিপাত হয়নি বা তা রেকর্ড করা হয়নি।

এই অভাবনীয় বৃষ্টিপাতের পর পরই গবেষকরা মরুভূমির মাটিতে অস্বাভাবিক জীবত্বাত্তিক বিস্ফোরণ দেখতে পান। তারা অন্তত ৮ টি যায়গা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন এবং একই ফলাফল দেখতে পান।

এর পর তারা ফিরে আসেন এবং পর পর ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবার অনুসন্ধান চালান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা কোনো রকম বৃষ্টির দেখা পাননি এবং জীবন এর চিহ্ন পরবর্তী নমুনা গুলোতে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছিল।

আটাকামা মরুভূমিতে গবেষনায় ব্যাস্ত বিজ্ঞানীরা; image source: sciencealert.com

তবুও তারা জীনগত এবং কিছু রাসায়নিক পরীক্ষা করেন এবং টেস্টের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, এই জীবাণুরা এই বিশেষ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এইসকল কষ্টসহিষ্ণু ব্যাক্টেরিয়া দলবদ্ধভাবে মরুভূমির মাটির বেশ কয়েক হাত নিচে অনেক দিন পর্যন্ত পানি ছাড়া ঘুমিয়ে থাকে এবং যখন আবার বৃষ্টিপাত হয় তখন তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম আবার চালু হয়ে যায়।

“আটাকামার মরুভূমির মত এত প্রতিকূল পরিবেশে এত অটলভাবে বেঁচে থাকা কোনো জীবকে এই প্রথম কেউ খুঁজে পেল” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক।

তিনি আরো বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি এই সকল অণুজীব যেভাবে শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় চিলির নরকের মতো মরুভূমিতে বেঁচে থাকতে পারে ঠিক তেমনি মঙ্গল গ্রহেও এরকম অণুজীব পাওয়া সম্ভব যারা অনেক বছর ধরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।”

কিন্তু আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে চিলির আটাকাম মরুভূমি যতই রুক্ষ প্রকৃতির হোক না কেন মঙ্গল গ্রহ তার চাইতে কল্পনাতীত বেশি রুক্ষ এবং ঠান্ডা।

আটাকামা মরুভূমি এবং মঙ্গল গ্রহের মধ্যে সাদৃশ্য; image source: sciencealert.com

তারপরেও যদি বিজ্ঞানীরা মঙ্গল গ্রহে প্রাণের আশা করে থাকেন তবে চিলির মরুভূমিতে আবিষ্কৃত অণুজীব গুলোই হবে মানদণ্ড স্বরূপ, কেননা মঙ্গল গ্রহের পরিবেশ হয়তবা এরকম কোন অনুজীবকে হয়ত বাঁচতে দিবে তার মাটির কয়েক স্তরের নিচে।

নাসার বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে প্রমাণ পেয়েছেন যে ৪,০০,০০০ বছর আগেও মঙ্গল গ্রহে বরফ যুগ ছিল । এখনো মঙ্গলের মাটির নিচে বরফ আছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছে এবং তা আছে এই গ্রহের দুই মেরুতে।

“আমরা জানি যে মঙ্গলের মাটিতে পানি জমাট বেঁধে আছে এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় রাতের বেলায় মঙ্গলে বরফ পড়ে তার একটা শক্ত ধারণা আমরা পেয়েছি। ফলে রাতের বেলায় এই লাল গ্রহের মাটিতে আর্দ্রতা সম্পৃক্ত ঘটনা ঘটে যার ফলে আমাদের আশংকা যে এখনো এখানে হয়ত মাটির নিচে পাওয়া যেতে পারে পৃথিবীর মতোই কিন্তু পৃথিবীর চাইতে কয়েক গুন বেশী সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন অণুজীব।” বলেন ডুর্ক শুলজ ম্যাকেক ।

যদি কখনো মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান পাওয়া যায় তবে তা হয়ত রুক্ষ-শুষ্ক মাটির নিচের আরেকটি স্তরে পাওয়া যাবে। আর তখন এসব গবেষণায় হয়ে থাকবে পথিকৃৎ।

featured image: the-martian.wikia.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *