পৃথিবীর ভূত্বকের নাইট্রোজেন রহস্য

পৃথিবীর বায়ুমন্ডল নাইট্রোজেনের সাগর, সে নাইট্রোজেনের সাগরে মিশে আছে যেন অক্সিজেনের শরবত। নাইট্রোজেনের পরিমাণের ব্যাপারে আপনার আন্দাজ ভূপাতিত হতে পারে যখন ভূত্বকে নাইট্রোজেনের রাজত্ব কতটুকু তা খুঁজতে যাবেন। ভূত্বকের প্রায় অর্ধেক (৪৬%) অক্সিজেন, আর দ্বিতীয় প্রাচুর্য সিলিকনের(২৮%)। ভূত্বকে প্রাচুর্যতার দিক থেকে নাইট্রোজেনের ক্রম হয়েছে ৩০টি মৌলের পরে ০.০০২% হারের উপস্থিতিতে

বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন ভূত্বকে পাওয়া নাইট্রোজেন এসেছে বায়ুমণ্ডল থেকেই। অণুজীবের মাধ্যমে অথবা বৃষ্টির মাধ্যমে বায়ু থেকে ভূমিতে সংবন্ধন ঘটেছে। কিন্তু নতুন গবেষণা উঁকি দিয়ে বলছে আরো নব্য কোনো প্রধান উৎস থাকতে পারে এই উপাদানটির। মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। ভূত্বকে থাকা নাইট্রোজেনের এক চতুর্থাংশ আসে ভূমন্ডলের পাথুরে স্তরে থেকে। এ বিষয়ক গবেষণাপত্র বেরিয়েছে সায়েন্স জার্নালে। পুরো গবেষণাপত্র পড়ুন এখানে

কিছু বিক্ষিপ্ত গবেষণা ছাড়া গবেষক সমাজ ভূগর্ভস্থ পাথরকে নাইট্রোজেনের উৎস হিসেবে দেখেনি বলে মত দেন এই গবেষণাপত্রের লেখক বেঞ্জামিন হোল্টন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিসের একজন বৈশ্বিক পরিবেশবিদ। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর নাইট্রোজেন চক্রের প্রক্রিয়ায়; এটি বিশ্বের জলবায়ু মডেলেও প্রভাব রাখতে পারে। যেহেতু নাইট্রোজেনের উৎস সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য এর দায় রয়েছে— সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বের করতে পারব কোথায় উদ্ভিদের বৃদ্ধি দ্রুত হবে পূর্বানুমানের চেয়ে। আর উদ্ভিদের অধিক বৃদ্ধি তো সম্পূরকভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের রাস্তা দেখিয়ে দিবেই।

যেহেতু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, তাই কী পরিমাণ তাপ কার্বন ডাই অক্সাইডের ফাঁদে আটকা পড়ছে তার খতিয়ান রাখা ক্রমশ গুরুতর ব্যাপার হয়ে উঠছে। তাপ আটকে থাকার বৃদ্ধির সঠিক হিসেব এখনো অনিশ্চিত, তাই বলে এর প্রতিকার প্রচেষ্টায় বসে থাকা যায় না। নতুন তথ্য কাজে লাগিয়ে কার্বন দূষণ প্রশমন করা সম্ভব।

কী পরিমাণ নাইট্রোজেন ভূত্বকের গভীরে পলির মধ্যে রয়েছে এবং কতখানি আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হচ্ছে তার মধ্যকার ভারসাম্য নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো পরীক্ষা করেছে। ‘৭০ এর দশকের শুরুতে করা কিছু গবেষণা বলছে এ ধরণের পাললিক শিলায় নাইট্রোজেন থাকার কারণ হবে মৃত গাছপালা, শৈবাল এবং প্রাচীন সমুদ্রতলে জমা প্রাণীদেহ। বেশকিছু গবেষণাপত্র বলছে নাইট্রোজেন এসকল জীবদেহ মিশ্রণে তৈরি উৎস থেকে পরিস্রুত হয়ে মাটিতে এসকল জায়গায় পাওয়া যাওয়ার কারণ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ ধরনের আবিষ্কারে নজর দেননি, আর পাললিক শিলা নিঃসৃত নাইট্রোজেনের পরিমাণ যথেষ্ঠ তাৎপরযপূর্ণ মনে করা হয়নি পূর্বে। ফলে আমরা নাইট্রোজেন চক্র যেভাবে ঘটে থাকে বলে বর্ণনা করি সে বর্ণনায় আমাদের ভুল করে গুরুত্ব না দেয়া ব্যাপার অনুপস্থিত থেকে যাচ্ছে। পাললিক শিলার নাইট্রোজেন নিঃসরণ আমাদের বর্ণনা করা নাইট্রোজেন চক্রে বিবেচনাই করা হয়নি।

রেডউড বৃক্ষের বনভূমি বেড়ে ওঠে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটিতে যে কারণে এরা এত দীর্ঘ আর অতিকায় হয়ে উঠতে পারে; source: Bob Pool, Getty Images

হোল্টন এবং তার সহকর্মীরা ২০১১তে একটি গবেষণা করেছিলেন দুই ধরনের বনভূমির মাটি তুলনা করে— পাললিক শিলার উপর বেড়ে ওঠা বনভূমির মাটির সাথে আগ্নেয় শিলার উপর গড়ে ওঠা বনভূমির মাটি। দেখা যায় প্রথমটির মাটির ক্ষেত্রে নাইট্রোজেনের পরিমাণ দ্বিতীয়টির দেড়গুণ! ৫০ শতাংশ বেশি! গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় নেচার জার্নালে। আগ্নেয় শিলা সমৃদ্ধ স্তর আগ্নেয়গিরি সুলভ ভূতাত্ত্বিক পরিবেশের ইঙ্গিত করে। আবার ঐ একই ধরনের বনভূমির উদ্ভিদের ক্ষেত্রে উদ্ভিদ দেহে পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ বেশি নাইট্রোজেন। যদিও স্বাভাবিকভাবে এমনটাই হওয়ার কথা যে বনের মাটিতে নাইট্রোজেন বেশি সে বনের উদ্ভিদও তো একটু বেশিই শোষণ করবে, তবুও এ গবেষণা খুব একটা সাড়া ফেলে নি বিশ্বব্যাপী।

তাদের নতুন গবেষণায়, তারা ক্যালিফোর্নিয়াকে ভূতাত্ত্বিক সিস্টেমের মডেল ধরে কাজ করেছে। কারণ, এই অঙ্গরাজ্যের ভূমন্ডল পৃথিবীর ভূত্বকের প্রায় সব ধরণের শিলা ধারণ করে। তারা ক্যালিফোর্নিয়া এবং পৃথিবীর অন্যান্য অংশের ১০০০টি স্থানের মাটির নাইট্রোজেনের মাত্রা পরিমাপ করে। এরপর একটি কম্পিউটার মডেল দাঁড় করায় কত দ্রুত পৃথিবীর ভূত্বক থেকে নাইট্রোজেন নিঃসৃত হচ্ছে।

এই নাইট্রোজেন নিঃসরণের প্রক্রিয়া চলতে চলতে অবশেষে নাইট্রেজেনের পরিণতি হয় সাগরে, যেখানে সাগরের তলদেশে পাথরে চাপা পড়ে জমতে থাকে। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ায় দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে এ পাথরসমূহের স্থানচ্যুতি হয় উপরের দিকে। পরিবর্তনের ফল হিসেবে ভেঙে যায় এবং নাইট্রোজেন নিঃসরণ করে। এই নাইট্রোজেনই উদ্ভিদ ও প্রাণীদেহের মাধ্যমে গৃহীত হয়। পরিবেশীয় প্রক্রিয়ায় এই জীবদেহ থেকে পুনরায় পাথরে ফিরে এসে তৈরি করে নাইট্রোজেন চক্র। এ নিঃসরণের ঘটনা সমুদ্রতলের পাথর থেকে ব্যতীত পর্বতময় এলাকায়ও ঘটতে পারে রাসায়নিক বিগলনের কারণে। যেমন, এসিড বৃষ্টি হলে পাথরে থাকা বিভিন্ন উপাদানের সাথে এসিডের বিক্রিয়া ঘটে থাকে। তখন বিক্রিয়ায় ক্ষয়ের কারণে পাথরের ভৌত পরিবর্তনও নাইট্রোজেন মুক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে।

কর্নেল ইউনিভার্সিটির একজন জীবভূরসায়নবিদ (biogeochemist) উইলিয়াম শ্লেশিঙ্গার,  যিনি কিনা হোল্টনের গবেষণার সাথে যুক্ত নন, তিনি ভূত্বকের পাথরসমূহের মধ্যে উপস্থিত নাইট্রোজেন পরিমাপ করেছিলেন। কিন্তু প্রসঙ্গত, দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারেন নি। যতটা থাকার কথা আর পরিমাপে পাওয়া পরিমাণের মধ্যকার সম্পর্কের সমাধান মেলেনি তার কাছে। তাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন তার পরীক্ষিত নমুনা হয়ত অন্যান্য তথ্যের সাপেক্ষে আদর্শ ছিল না। হোল্টনের গবেষণার ব্যাপারে তিনি মনে করেন তার কাজ আরো বৈশ্বিক মডেলে করা প্রয়োজন। আবার এটি আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাকে বদলে দেয়ার ব্যাপারে শ্লেশিঙ্গার দ্বিমত পোষণ করেন।

তবে যাই হোক, নতুন কারণ সম্বলিত তথ্য আমাদের ঠিকই ব্যাখ্যা করে মাটিতে নাইট্রোজের পরিমাণের রহস্য। আমাদের পূর্বে জানা কারণ দিয়ে যে পরিমাণ নাইট্রোজেন থাকার কথা ছিল তার চেয়ে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে বেশি। নিঃসন্দেহে এ আবিষ্কার সেই জানার ফোঁকড়কে হ্রাস করে। নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ বন যেগুলো কানাডা এবং রাশিয়ায় অবস্থিত পাললিক শিলার গঠনের উপর বিস্তৃত সেসব এলাকার জন্য বেশ ফলপ্রসু কাজ এটি।

হোল্টন ভূগর্ভস্থ খনন শিল্পবিপ্লব ও আধুনিকায়নের প্রভাবে নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এর ফলে নাইট্রোজেন নিঃসরণের পরিমাপ হোল্টনের দল বিবেচনায় আনে নি। বরং রক্ষণশীলভাবে পরিমাপ করার কথা মাথায় রেখে গবেষণা কাজটি করা হয়েছে। এ গবেষণায় পরিবেশ সংরক্ষণে আরেকটি সতর্কতা হয়ত যুক্ত হল।

 

— সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *