গোলাকার পৃথিবীর অকাট্য প্রমাণ এবং ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির মূর্খামি

প্রাচীন ধারণা

বহুকাল আগে মানুষ ভাবতো পৃথিবী সমতল। কারণ দেখতে পৃথিবীকে সমতলই মনে হয়। সে সময়ের মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী অসীম। এর কোনো শুরু বা শেষ নেই। সূর্য নিয়েও নানারকম ধারণা ছিল তাদের মাঝে। কেউ বলতো প্রতিদিন একটা করে সূর্য তৈরি হয় আর ধ্বংস হয়। সূর্যকে দেবতা বলে মানা হতো। কেউ বলতো রথে করে দেবতা ঘুরে বেড়ায়। কারো কারো ধারণা ছিল নৌকায় করে সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরানো হয়।

প্রাচীন ভারতীয়রা বিশ্বাস করতো কতগুলো হাতি পৃথিবীকে ধরে রেখেছে, হাতিগুলো আছে কচ্ছপের পিঠে। কচ্ছপগুলো আবার পানিতে সাঁতার কাটছে। এরকম কিছু গোলমেলে ব্যাখ্যা তখন চালু ছিল। প্রাচীন মানুষেরা দূরে যেতে ভয় পেতো। দূরে গেলে যদি কখনো পৃথিবীর কিনারা দিয়ে অতল তলে পড়ে যায়!

কিন্তু এই গল্প-বিশ্বাসে সন্তুষ্ট ছিলেন না প্রাচীন গ্রিসের অ্যানাক্সিম্যান্ডার। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের কোনো এক সময়ে তিনি রাতের আকাশের তারা পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খেয়াল করলেন উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা বাদে সবগুলো তারা ছুটে বেড়ায়। ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে ঘোরে এমন কিছু বস্তুও দেখতে পান। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হচ্ছে- আকাশের বস্তুগুলো এলোমেলো ঘোরে না, নির্দিষ্ট কিছুকে কেন্দ্র করে ঘোরে।

অ্যানাক্সিম্যান্ডারের ধারণা হয় আকাশটা হয়তো একটা ফাঁপা গোলক। ফাঁপা গোলকের গায়ে তারা, সূর্য, চাঁদ এসব সেঁটে আছে। গোলকটি একটি কাল্পনিক বিন্দুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এর ফলেই চাঁদ-সূর্য উঠে এবং অস্ত যায়। সূর্য যখন এই পাতের নিচে যায় তখন রাত হয় আবার গোলক ঘুরতে ঘুরতে যখন পাতের নিচ থেকে সূর্যকে বের করে আনে তখন হয় সকাল।

অ্যানাক্সিম্যান্ডার পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করেন। এতে ভূ-মধ্য এবং কৃষ্ণসাগরের আশেপাশের অঞ্চল দেখা যায়। তৎকালীন গ্রিকরা পৃথিবী বলতে অতটুকই বুঝতো। তবে একটা বিষয়ে গ্রিকরা প্রায় নিশ্চিত ছিল। যতই পূর্ব বা পশ্চিমে যাওয়া হোক না কেন সূর্যকে ধরা যাবে না। তারা ধারণা করে পৃথিবী সমতল, কিন্তু পাতের মতো নয় বরং গোলাকার প্লেটের মতো যার চারদিকে রয়েছে সমুদ্র।

সমুদ্রকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত ভাবার কারণ ভ্রমণকারীরা যেদিকেই যাক শেষ পর্যন্ত সমুদ্রই দেখতে পায়। তাছাড়া তখনো মহাসাগর পাড়ি দেবার বিদ্যা ভালোমতো রপ্ত হয়নি। আকাশের তারাগুলো তখন জোনাকির মতো মিটমিটে আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবে সূর্য এবং চাঁদ নিয়ে অনেক ভাবতো গ্রিকরা।

গোলাকার পৃথিবীর ধারণা এবং সৌরজগতের কেন্দ্র বিতর্ক

৩৪০ খ্রিষ্টপূর্বে এরিস্টটল তার বই ‘অন দ্য হ্যাভেন’-এ পৃথিবীর গোলাকৃতির পক্ষে ২টি যুক্তি দেখান। যুক্তি দুটি হলো-

(১) চন্দ্রগ্রহণের কারণ সূর্য এবং চাঁদের মাঝে পৃথিবীর অবস্থান। চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া সবসময় গোলাকৃতির। পৃথিবী যদি সিলিন্ডার বা চ্যাপ্টা থালার মতো হতো তাহলে ছায়াটি লম্বাটে বা উপবৃত্তাকার হতো।

(২) গ্রিকরা ভ্রমণের ফলে জানতো- পৃথিবীর দক্ষিণ ভাগ থেকে তাকালে উত্তর ভাগ থেকে দেখা ধ্রুবতারাকে আকাশের অনেক নিচুতে দেখা যায়। যত উত্তরে যাওয়া যায় মনে হবে তারাটি ঠিক মাথার উপরে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু বিষুবরেখা থেকে এর অবস্থান দেখা যায় দিগন্ত রেখায়।

এছাড়াও আরো দুটি যুক্তি তিনি দেখান-

(৩) দূর থেকে যখন কোনো জাহাজ আসতো তখন মাস্তুল আগে দেখা যেতো। এর মানে জাহাজের উঁচু অংশ আগে দেখা যেতো যা গ্রিকরা অনেকদিন ধরেই খেয়াল করেছিল।

(৪) যেহেতু পৃথিবীর সবকিছু কেন্দ্র দ্বারা আকর্ষিত তাই একে গোল হতেই হবে। সমুদ্রের পানি আর বাতাস কেন পিছলে যায় না তা চতুর্থ যুক্তি থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

উপরের যুক্তিগুলো থেকে এরিস্টটল সিদ্ধান্ত নেন যে, পৃথিবী গোল। কোনোভাবেই সমতল নয়। মিশর এবং গ্রিসে ধ্রুবতারার অবস্থানের তারতম্য থেকে পৃথিবীর পরিধির অনুমানও করেন তিনি। এরিস্টটল পৃথিবীর পরিধি ৪ লক্ষ স্টান্ডিয়া নির্ধারণ করেছিলেন (১ স্টান্ডিয়া = ২০০ গজ এর মতো)। তবে বাস্তবে আমাদের গ্রহের পরিধি এর অর্ধেক।

এরিস্টটল ভাবতেন পৃথিবীটা স্থির। সূর্য এবং অন্য গ্রহ তারকারা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরে। সেই সময়ে মানুষ বিশ্বাস করতো পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত। ২য় খ্রিস্টাব্দে টলেমি মহাকাশের কেন্দ্রে পৃথিবীকে কল্পনা করে ব্রহ্মাণ্ডের মানচিত্র তৈরি করেন। চার্চের গুরুরা এই মানচিত্রটি মেনে নেয়। চার্চ একে মেনে নেওয়ার কারণ হলো- টলেমির মডেলটি ছিল গোলাকার এবং এর বাইরে স্বর্গ এবং নরকের জন্য জায়গা ছিল।

১৫১৪ সালে কোপার্নিকাস নামে একজন পোলিশ পুরোহিত সূর্যকে কেন্দ্রে রেখে একটি মডেল প্রকাশ করেন। চার্চের ভয়ে অবশ্য তিনি নিজের নাম দিয়ে প্রকাশ করেননি। এক শতাব্দী পর গ্যালিলিও এবং কেপলার কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। গ্যালিলিও তার আবিষ্কৃত টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্ত নেন সূর্য সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। এরপর গ্যালিলিওর কী হয়েছিল সেটা সম্ভবত সবারই জানা আছে।

সমতল পৃথিবী বা ফ্ল্যাট আর্থ কন্সপিরেসি

এরিস্টটলের পর সমতল পৃথিবীর ধারণা পরিত্যক্ত হয় এবং একটা সময়ে গ্যালিলিওর তত্ত্ব স্বীকৃতি পায়। মানুষ বিশ্বাস করতে থাকে পৃথিবী গোল এবং ষোড়শ শতকের পর মেনে নেয় যে পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে। তবে বর্তমানে কিছু সংখ্যক মানুষ আছে যারা ফ্ল্যাট আর্থ বা সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসী এবং সমতল পৃথিবী নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরি প্রচার করে থাকে।

আগে বোঝা দরকার কন্সপিরেসি থিওরি জিনিসটা আসলে কী এবং এটা বিজ্ঞানকে কীভাবে দূষিত করে।

ধরা যাক, কোনো একটি বিষয়কে আমরা ধ্রুব সত্য বলে জানি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আমরা জানি পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী দূরে থাক কোনো অণুজীবের অস্তিত্ত্ব পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এটিই আপনি এতদিন জেনে এসেছেন।

কিন্তু হঠাৎ করে একদিন ইন্টারনেট বা কোনো সংবাদে দেখলেন চাঁদে বুদ্ধিমান প্রাণী আছে এবং নাসার সাথে তাদের সখ্যতাও রয়েছে। বিষয়টি নাসা এতদিন গোপন করে গেছে। এ ধরনের সংবাদের সাথে মুখরোচক কোনো শিরোনাম এবং সূক্ষ্ম গ্রাফিক্সে করা কোন ছবি। একটি স্বাভাবিক খবর মানুষের মনে যতটা প্রভাব ফেলে তার থেকে অস্বাভাবিক খবর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আমরা বিচার বিশ্লেষণ না করে উপস্থাপিত তথ্যগুলো বিশ্বাস করা শুরু করে দেই।

সমতল পৃথিবীর পক্ষে দেখানো যুক্তি এবং তার ব্যাখ্যা

(১) দিগন্তরেখা সমান: সমতল পৃথিবীর ধারণায় বিশ্বাসীদের একটি খুব সাধারণ তত্ত্ব হলো দিগন্তরেখা সমান। ভূমি থেকে দিগন্তরেখাকে যেমন সমান দেখা যায় তেমনি উঁচু কোনো পাহাড় বা বিমান থেকেও দিগন্তরেখাকে সমানই দেখা যায়। সম্ভবত সমতল পৃথিবীর ধারণাকারীদের বিশ্বাসের উৎপত্তি এখান থেকেই।

এই ধারণার ব্যবচ্ছেদ করার জন্য আমরা কয়েকটি ছবি নিয়ে আলোচনা করবো। নিচের প্রথম ৩টি ছবি দ্রষ্টব্য, যা নিয়ে সমতল এবং গোলাকৃতির বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচুর বিতর্ক হয়। এই ছবি ৩টিতে দেখা যায় একটি পাল তোলা ছোট নৌকা দিগন্তরেখার পার হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে এর নিচের অংশ যেন ডুবে যাচ্ছে। সমতল ধারণায় বিশ্বাসীদের মতে এটি উত্তাল সাগরের স্রোতের জন্য হয়।

হ্যাঁ, অবশ্যই স্রোতের ক্ষমতা আছে ছোট নৌকোটিকে এমনভাবে দেখানোর। কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের সমুদ্র সৈকতে গেলে আমরা এমনটি অহরহ দেখতে পাই কিন্তু প্রথম তিনটির কোন ছবিতেই স্রোত নেই।

আচ্ছা ধরে নিলাম স্রোত আছে এবং ছোট নৌকোটির নিচের অংশ স্রোতের জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ৪ নম্বর ছবির ক্রুজশীপের যে উচ্চতা তা উত্তাল সাগর বা সাগরের স্রোত ক্রুজশীপের এতখানি অংশ অদৃশ্য করে দিতে পারে না। শীপটি দিগন্তরেখা পার করে ফেলেছে এবং এজন্যই এটার নিচের অংশ আমাদের চোখের বাইরে। হিসাব করলে দেখা যাবে অদৃশ্য হওয়া অংশ শীপের মোট উচ্চতা থেকে দৃশ্যমান অংশের বিয়োগফল।

(২) টরেন্টো শহরের সিএন টাওয়ার

নিচের ছবিতে কানাডার সিএন টাওয়ারকে দেখা যাচ্ছে যার উচ্চতা ১৮১৫ ফুট। এর পরের ছবিতে ৩০ মাইল দূর থেকে একই স্থানের ছবি তোলা হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে সিএন টাওয়ারের নিচের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে না। ৩০ মাইল দূর থেকে ১৮১৫ ফুট উচ্চতার ২৬% দিগন্তের নিচে অদৃশ্য হবার কথা এবং ঠিক সেটাই হয়েছে। সিএন টাওয়ারের ২৬% বা ৪৮৬ ফুট দেখা যাচ্ছে না।

তাহলে দিগন্তরেখা কেন সমান দেখায়? পৃথিবীর আকৃতির তুলনায় মানুষের আকৃতি এতোই ছোট যে পৃথিবীর বক্রতা আমরা বুঝতে পারি না। এমনকি ১৫০০০ ফুট উঁচুতে থাকা বিমান থেকেও না। যত উপরে উঠতে থাকা যায় দিগন্তের বিস্তৃতি তত বৃদ্ধি পায়। এমনকি ৪০০০০ ফুট উঁচুতেও দিগন্তের বাঁক মাত্র ৩.৫ ডিগ্রি।

(৩) উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থেকে তারার অবস্থানে ভিন্নতা

উত্তর মেরুতে পরিষ্কার আকাশে তারা পর্যবেক্ষণ করলে ১ম ছবির মতো কিছু তারকা-বিন্যাস পাওয়া যাবে। কিন্তু যদি দক্ষিণ মেরু থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে আগের বিন্যাসের মতো কিছুই পাওয়া যাবে না। নতুন একটি বিন্যাসের দেখা মিলবে।

দুই মেরুতে ভিন্ন ভিন্ন তারকার বিন্যাস গোলাকার পৃথিবীর পক্ষে সমর্থন প্রদান করে। পৃথিবীর গোলাকৃতির জন্য উত্তর মেরুর পর্যবেক্ষক নিচের দিকে দেখতে পায় না, একইভাবে দক্ষিণ মেরুর পর্যবেক্ষক উপরের অংশ দেখতে পায় না। তাই তারার বিন্যাসের ভিন্নতা দেখা যায়।

(৪) কেন্দ্রের তারা এবং ঘূর্ণনদিকে ভিন্নতা

রাতের পরিষ্কার আকাশে অসংখ্য তারা দেখা যায়। একটু সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ধীরে ধীরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। উত্তর মেরুতে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে তারাগুলো ঘড়ির কাটার বিপরীতে ঘুরছে এবং একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করেই ঘুরছে। কেন্দ্রের তারাটি হলো পোলারিস বা নর্থ স্টার। আকাশের অন্যান্য তারা থেকে এটি কিছুটা উজ্জ্বল। কয়েক রাত ধরে নজর রাখলে দেখা যাবে বিগ ডিপারের (একটি তারামণ্ডলী) শেষ প্রান্ত পোলারিসের দিকেই থাকে।

চিত্র: শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় বিগ ডিপারের শেষ প্রান্ত সবসময়
পোলারিস বা নর্থ স্টারের দিকেই থাকে।

দক্ষিণ মেরুতে তারার ঘূর্ণন দেখা যাবে কিন্তু তারাগুলো উত্তর মেরুর মতো ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ঘোরে না বরং ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে। দক্ষিণের তারাগুলোও সিগমা অক্টানিস নামের একটি তারাকে প্রায় কেন্দ্র করে ঘোরে। দুই মেরুর তারকার ঘূর্ণন দিকের ভিন্নতা এটা ব্যাখ্যা করে যে পৃথিবীর আকৃতি সমতল নয়।

(৫) পোলারিসের অবস্থান

সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীরা আরেকটি প্রশ্ন করে থাকে- সূর্য, পৃথিবী এবং সমগ্র মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যখন ঘুরছে তখন বছরের পর বছর পোলারিসের অবস্থান কেন এক থাকে? পৃথিবী থেকে পোলারিসের দূরত্ব ৩২৩ আলোকবর্ষ।

৬ মাস পর পৃথিবী যখন সূর্যের অপর পাশে অবস্থান করে তখন তার আগের অবস্থান থেকে দূরত্বের পরিবর্তন হয় ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। তাহলে আমাদের সাপেক্ষে পোলারিসের অবস্থান কতটুক পরিবর্তন হবে? উত্তর হলো মাত্র ০.০০০০০৫৬ ডিগ্রি। এতো কম হবার কারণ ৩২৩ আলোকবর্ষ দূরত্বের কাছে ১৮৬ মিলিয়ন মাইল খুবই সামান্য। খালি চোখে এটা দেখা অসম্ভব।

(৬) চাঁদ

চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ যা ২৯ দিনে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। সমতল পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের বেশিরভাগের মতে চাঁদ একটি ডিস্ক আকৃতির বস্তু। কিন্তু পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই চাঁদের ছবি তোলা হোক না কেন চাঁদকে গোলাকৃতির দেখায়। চাঁদ যদি ডিস্কই হতো তবে একে পৃথিবীর বিভিন্ন অবস্থান থেকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপবৃত্তাকার দেখাতো।

নিচে ১ম ছবিতে পূর্ণ চাঁদকে আকাশে দেখা যাচ্ছে। ফ্ল্যাট আর্থ তত্ত্ব অনুযায়ী চাঁদ ২য় ছবির বা ৩য় ছবির মতো ধীরে ধীরে ছোট এবং উপবৃত্তাকার হয়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না বরং চাঁদ তার নিজের আকৃতি বজায় রেখে দিগন্তের অপর পাশে হারিয়ে যায়। ফ্ল্যাট আর্থ মডেল এখানেও ব্যর্থ।

(৭) চাঁদের দূরত্ব এবং পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ

পৃথিবীর দুই মেরু থেকে চাঁদকে পর্যবেক্ষণ করে ত্রিকোণমিতির সাহায্যে চাঁদ এবং পৃথিবীর দূরত্ব পাওয়া যায় ২ লক্ষ ৩৯ হাজার মাইল যা লেজার বা রাডারে পরিমাপ করা দূরত্বের প্রায় সমান। কিন্তু ফ্ল্যাট আর্থ মডেলে একই ফর্মুলা ব্যবহার করলে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব হয় মাত্র ৩ হাজার মাইল এবং হাস্যকরভাবে এটিই ফ্ল্যাট আর্থ বিশ্বাসীরা প্রচার করে।

তাহলে উড়োজাহাজ নিয়েই বিকেলে চাঁদ থেকে ঘুরে আসা যাক! ধরি কোনোভাবে চাঁদ পৃথিবীর ৩ হাজার মাইল উপরেই আছে। যুক্তির খাতিরে এখানেও ধরে নেয়া হলো চাঁদ ডিস্ক আকৃতির। এখন মধ্যরেখার উপরে যদি চাঁদ অবস্থান করে থাকে এবং মধ্যরেখা থেকে উত্তর এবং দক্ষিণে ৩ হাজার মাইল দূরত্বের চাঁদের সাথে ভূমি থেকে দৃশ্যমান কোণ ৪৫ ডিগ্রি হবার কথা। জ্যামিতির নিয়ম অনুসারে ৪৫ ডিগ্রিই হবে। অর্থাৎ দুই মেরু থেকে চাঁদের ভিন্ন ভিন্ন অংশ দেখা যাবে (২য় ছবির মতো) কিন্তু বাস্তবে সেটা হয় না। দুই মেরু থেকে চাঁদের একই অংশ দেখা যায়।

এছাড়াও আমাদের প্রতিবেশি সব গ্রহই গোলাকৃতির। মাত্র ৫০ ডলারের কোনো টেলিস্কোপ দিয়েই প্রতিবেশি গ্রহদের পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যসব গ্রহ গোল হলে পৃথিবী আসলে কোন যুক্তিতে সমতল হতে পারে সেটার কোনো ব্যাখ্যা ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি দিয়ে থাকে না।

সমতল পৃথিবী প্রচারে সুবিধা কার?

বর্তমানে মুখরোচক শিরোনামে সমতল পৃথিবীর ধারণা প্রচারে অসাধু প্রকাশকদেরই লাভ বেশি। গতবছর “টানা ৮ দিন সূর্য উঠবে না” বা “সবুজ চাঁদ দেখা যাবে” এরকম শিরোনামে অনেক সংবাদ দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানের ন্যূনতম জ্ঞান না থাকার পরও এসব প্রচার করার কারণ একটিই, Rumor is a great traveler।

দুঃখের বিষয় এটাই যে চিন্তা-ভাবনা না করেই আমরা সব বিশ্বাস করতে শুরু করে দেই এবং নিজেদের সংবাদ মাধ্যমের প্রচার বাড়াতে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিজ্ঞানের শত বছরের গবেষণা লব্ধ ফলকে কলুষিত করছে।

তথ্যসূত্র

  1. https://www.youtube.com/watch?v=W9ksbh88OJs
  2. https://www.youtube.com/watch?v=NGZEXkSX9wI
  3. https://www.youtube.com/watch?v=FTBaOmJEQg0
  4. http://www.popsci.com/10-ways-you-can-prove-earth-is-round
  5. http://www.space.com/32599-green-moon-april-lunar-hoax-debunked.html
  6. http://www.history.com/topics/galileo-galilei
  7. http://epod.usra.edu/blog/2013/05/earths-rotation-and-polaris.html
  8. https://en.wikipedia.org/wiki/Celestial_pole
  9. https://exploratorium.edu/eclipse/video/why-dont-we-have-an-eclipse-every-month
  10. A brief history of time

featured image: klikkout.sk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *