সাইবেরিয়ার ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো পাতালপুরীর দরজা

এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাইবেরিয়ার ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল পাতলা বরফ দ্বারা আবৃত। এই অবস্থা জায়গাভেদে এতই মারাত্বক আকার ধারণ করেছে যে, বিশাল বিশাল গর্ত হঠাৎ করে জেগে উঠছে। স্থানীয় ইয়াকুশান লোকদের কাছে এই এলাকার সবচেয়ে বড় খাঁদটি “পাতালপুরীর দরজা” হিসেবেই পরিচিত এবং তা এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে বরফের নিচ থেকে ২,০০,০০০ বছরের পুরোনো জঙ্গল, পশুপাখির মৃতদেহ বেরিয়ে আসছে।

 

ব্যাটাগাইকা খাঁদ; image source: sciencealert.com

ব্যাটাগাইকা খাঁদ নামে পরিচিত হলেও অফিশিয়ালি এগুলোকে বলা হয় “মেগাস্লাম্প” বা “থারমোকার্স্ট”।

সাম্প্রতিক সময়ে এরকম বেশকিছু মেগাস্লাম্প সাইবেরিয়া জুড়ে দেখা গেলেও, গবেষকদের ধারণা ব্যাটাগাইকা এই অঞ্চলের মেগাস্লাম্পগুলো অন্য গুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক। এই অঞ্চলটি ইয়াকুটস্ক শহরের ৬৬০ কিলোমিটার (৪১০ মাইল) উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত।

এই খাঁদ টি যে শুধুই বড় তা কিন্তু না। প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা এবং ৮৬ মিটার (২৮২ ফিট) গভীর এই খাঁদটি ক্রমবর্ধমান।

২০১৬ সালের একটি গবেষনায় জার্মানির আলফ্রেড ওয়েজেনার ইনস্টিটিউট এর ফ্র্যাঙ্ক গানথার প্রকাশ করেন যে, গত এক দশকে এই খাঁদটি প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১০ মিটার করে বেড়ে চলছে এবং অপেক্ষাকৃত গরম সময়ে প্রতি বছরে এর বৃদ্ধি ৩০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি আরো আশংকা করেন, ভবিষ্যতে উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রার বৃদ্ধির জন্য খাঁদের আকার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং তা পার্শ্ববর্তী উপত্যকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে বরফের উপরে তৈরি হওয়া ভূমির ধ্বস হতে পারে।

বিবিসি হতে আগত মেলিসাকে গানথার বলেন,“গড়ে অনেক বছর আমরা এমনও দেখেছি যে খাঁদ এর বৃদ্ধির হার খুব বেশি বাড়েও নি আবার কমেও নি, কিন্তু এর গভীরতা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।”

প্রতিবছর ই বেড়ে চলেছে এই খাঁদ; image source :eoimages.gsfc.nasa.gov

আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এটি খুব ভালো সংবাদ নয়। এই খাঁদের গঠন প্রথম শুরু হয় ১৯৬০ সালে নিকটবর্তী বিশাল অরন্যের বিনাশ ঘটানোর পরে।

২০০৮ সালে ভয়াবহ বন্যা এই বরফের গলনকে আরো ত্বরান্বিত করে এবং খাঁদের বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

এই এলাকার অস্থায়িত্ব শুধুমাত্র স্থানীয়দের জন্য বিপজ্জনক নয়। উদ্বেগের বিষয় যে, এই খাঁদ যত গভীর হবে তত এটি কার্বনের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেবে, যা হাজার হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল।

বিবিসিকে গানথার বলেন, “বায়ুমন্ডলে যে পরিমান কার্বন রয়েছে তা সমগ্র ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল এ চাপা পড়ে থাকা কার্বনের সমান।”

খাঁদের বরফ যত গলতে থাকবে ততই এটি বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাস ছাড়তে থাকবে এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা আরো বেড়ে যাবে।

“এটাকেই আমরা বলি ধনাত্নক প্রতিক্রিয়া”, যোগ করলেন গানথার। “উষ্ণতা বাড়ায় উষ্ণতা, এবং এই প্রতিক্রিয়া অন্যান্য স্থানেও হতে পারে।”

কিন্তু সব খারাপ খবরের মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে।  ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি তে এক গবেষণায় বলা হয় যে, খাঁদে যেসকল লেয়ার আবিষ্কার হয়েছে বা হচ্ছে তাতে ২০০,০০০ বছরের পুরোনো আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষিত আছে।

এছাড়াও এখানে বরফে জমে থাকা অনেক পুরোনো বন-জঙ্গল, পরাগরেণুর নমুনা এবং এমনকি ষাঁড়, ম্যামথ এবং ৪,৪০০ বছর পুরোনো ঘোড়ার অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

জুলিয়ান মুরটনের আবিষ্কৃত গাছের গুড়ি; image source : sciencealert.com

এই রিসার্চ টি ইউনিভার্সিটি অফ সাসেক্স এর জুলিয়ান মুরটন করেছিলেন, যিনি বলেছেন এইসকল আবিষ্কৃত পলিমাটি আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে যে সাইবেরিয়ার আবহাওয়া পূর্বে কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা কিভাবে হবে।

যেখানে বিগত ২০০,০০ বছরে পৃথিবী উষ্ণ এবং ঠান্ডা উভয় অবস্থার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে সেখানে সাইবেরিয়ার আবহাওয়ার ইতিহাস একেবারেই অজানা।

কিন্তু মুরটন এর ভাষ্যমতে সাইবেরিয়ায় শেষ এই ধরনের স্লাম্পিং হয়েছিল প্রায় ১০,০০০ বছর আগে যখন পৃথিবী তার শেষ বরফ যুগ থেকে বের হয়ে আসছিল।

বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউজ গ্যাসের মাত্রা সেই সময়ের চাইতে এখন অনেক বেশি। আমরা ৪০০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) কার্বন-ডাই-অক্সাইড পার করে ফেলেছি যেখানে সর্বশেষ বরফ যুগ যখন শেষ হয় তখন তা ছিল ২৪০ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম)।

ব্যাটাগাইকার এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বরফের লেয়ার রয়েছে যেখানে দুইটি পুরু বন-জঙ্গলের আস্তরন আছে যা পুর্বের উষ্ণ থেকে উষ্ণতর আবহাওয়ার নির্দেশ করে বর্তমান সময়ের আবহাওয়ার চাইতে।

ওপরের বন-জঙ্গলের আস্তরনটি আরেকটি পুরোনো মাটির আস্তরনের উপর আছে যা সম্ভবত পূর্বে যখন আবহাওয়া উষ্ণ হয়েছিল তখন ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গলে গিয়েছিল। তবে গলে কি হয়েছিল তা জানতে পারলে হয়ত আমরা পরবর্তীতে যখন এরকম হবে তার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবো।

কাছে থেকে ব্যাটাগাইকা খাঁদ দেখতে যেমন; image source : inhabitat.com

কিন্তু এ বিষয়ে আরো গবেষনা দরকার, “কারণ খাঁদে আবিষ্কৃত পলিমাটির সঠিক বয়স আমরা এখনো জানি না” বলেন মুরটন।

তিনি এখন এই অঞ্চলে গর্ত খনন করার চিন্তা করছেন, এতে করে তিনি প্রাপ্ত পলিমাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে পারবেন অতীতে আসলেই কি হয়েছিল এখানে।

“সর্বশেষভাবে, আমরা আসলে দেখতে চাচ্ছি সাইবেরিয়াতে শেষ বরফ যুগে যা হয়েছিল তা উত্তর অ্যাটলান্টিক এর সাথে মিল আছে কি না।” – মুরটন ।

সাইবেরিয়ার ব্যাটাগাইকা খাঁদেই হয়ত হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর রহস্য লুকিয়ে আছে। এখন শুধু তা সবার সামনে আসার অপেক্ষা করছে মাত্র।

featured image: news.nationalgeographic.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *