in

নিজেদের ঠাণ্ডা রাখার জন্য গাছেরাও ঘামে

গরমে গাছেরা ঘামে সালোকসংশকেষণ প্রক্রিয়া থেমে গেলেও; source: scimex.org

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অংশে সাম্প্রতিককালের গ্রীষ্মের দাবদাহ এতটা অধিক ছিল যে পিচ গলানোর দশা। যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সংকট ঘন ঘন হচ্ছে। অনেক উদ্ভিদই অভিযোজন করতে না পেরে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইউক্যালিপটাসের অন্তত একটি প্রজাতি রয়েছে যেটি অত্যধিক তাপেও ঘামতে থাকে, যখন কিনা অন্যান্য প্রক্রিয়া ক্রমশ থেমেও যায়। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

উদ্ভিদ যা করে— সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য তৈরি করে যার নাম ফটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া। পাতায় থাকা পত্ররন্ধ্র দিয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এ প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে। এ পত্ররন্ধ্রগুলো দিয়ে প্রস্বেদনের মাধ্যমে পানি জলীয়বাষ্প নির্গত হয়, যে পানি উদ্ভিদের অভ্যন্তরভাগে বিভিন্ন অংশে খনিজ পরিবহনের কাজ করে। আর পত্ররন্ধ্রগুলো সে পানিকে জলীয়বাষ্প হিসেবে বের করে দেয়ার ফলে উদ্ভিদদেহ শীতল হতে থাকে বাষ্পীভবনের ফলে। কিন্তু যান্ত্রিকতার মত বিষয়টা তত সরল নয়। সালোকসংশ্লেষণেরও একটি কার্যকরী তাপমাত্রা সীমা রয়েছে ক্রিয়াশীল থাকার ক্ষেত্রে। অত্যধিক তাপমাত্রা সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস করে দেয়— ফলে অধিকাংশ উদ্ভিদের এই ক্রিয়ার সাথে সংলগ্ন থাকা উপজাত ক্রিয়া প্রস্বেদনও হ্রাস পায়। অর্থাৎ, উদ্ভিদদেহের তাপমাত্রা হ্রাস অধিক তাপমাত্রায় ব্যাহত হচ্ছে! বিবিধ প্রজাতির উদ্ভিদ এই প্রতিকূলতা কিভাবে সামাল দিবে সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের খুব একটা জানা নেই এই অর্থে একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে উদ্ভিদের বৈচিত্র্যতার মাত্রা কেমন হবে তার ভিত্তিতে।

E. parramattensis এর পাতা; source: Peter Woodard

স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজের পরিবেশ ও বনবিদ্যা বিভাগের পরিবেশবিদ জন ড্রেক এবং তার সহকর্মীরা এক ডজন ইউক্যালিপটাস প্রজাতিয় উদ্ভিদ বড় করে তুলেছেন। চলতি নাম প্যারামাটা রেড গাম বা Parramatta red gum (বৈজ্ঞানিক নাম Eucalyptus parramattensis)। তারা এই ইউক্যালিপটাস গাছগুলো রোপন করেছেন নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াসম্পন্ন প্লাস্টিকের খাঁচায় এক বছরের জন্য অস্ট্রেলিয়ার রিচমন্ডে। এদের ছয়টিকে রাখা হয়েছিল পারিপার্শ্বিক আবহাওয়ার সামঞ্জস্যে এবং বাকি ছয়টি ছিল ঐ তাপমাত্রার চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি আবহাওয়ায়। গবেষকরা ১২টি গাছের ক্ষেত্রেই এদের মাটিতে সেচ দেন নি একমাস যাবৎ যাতে হালকা ধরনের খরা পরিস্থিতিতে গাছগুলোকে রাখা। এরপর টানা চারদিন উষ্ণতা বাড়িয়ে দেন ৩টি-৩টি করে ৬টি খাঁচার গাছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকা ৩টি আর ৩ডিগ্রি অধিক তাপমাত্রায় থাকা তিনটির আবহাওয়া নিয়ে যাওয়া হয় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়।

অত্যধিক তাপমাত্রায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া কার্যত প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গবেষকরা চমকে যান এই বিশেষ গাছগুলো প্রায় স্বাভাবিক মাত্রাতেই প্রস্বেদন ঘটিয়ে চলতে থাকায়। অর্থাৎ, এই প্যারামাটা রেড গাম গাছগুলোর বাড়তি ক্ষমতা রয়েছে সালোকসংশ্লেষণের হার হ্রাস পেয়ে যাবার পরও উত্তাপ নির্গমনে প্রস্বেদন চালু রাখতে। গবেষকরা তাদের সিদ্ধান্ত পেয়ে গেলেন— উষ্ণতর স্থানেও স্বাভাবিক আবহাওয়া ও পরিবেশের মত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে এ জাতীয় ইউক্যালিপটাস। শুধু তাই নয়, তাপমাত্রা হ্রাস পেয়ে স্বাভাবিক হলে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থাৎ, অধিক তাপমাত্রার প্রতিকূলতায় কেবল সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ করে কেবল প্রস্বেদনে ব্যস্ত থাকছে। ফেব্রুয়ারিতে এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় মাসিক জার্নাল Global Change Biology এ।

গবেষকরা মনে করেন এ বিশেষ গাছের কার্যকরী মাত্রায় প্রস্বেদনের কারণ— এরা মাটির গভীর থেকে পানি শোষণ করতে পারে। এ কারণে সালোকসংশ্লেষণ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার পরেও তাদের উত্তাপ হ্রাসে প্রস্বেদন প্রক্রিয়া চালু রাখতে পেরেছিল। তবে উত্তাপ, খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সংকট একই সময়ে হলে এ গাছেদের জন্যও আর উপযোগিতা অবশিষ্ট থাকবে না।

অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আশা যোগান দিচ্ছে এ ফলাফল। লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পরিবেশবিদ ট্রেভর কীনান মনে করেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর। অন্যান্য প্রজাতির ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করতে পারে এখন সেটাই দেখার বিষয়। এ গবেষণার প্রধান ড্রেক উত্তর আমেরিকার সুলভ গাছগুলোর উপর অনুরূপ পরীক্ষা করার আশা করেন।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বলতে বাংলাদেশেরও উচিত এ জাতীয় গবেষণায় এগিয়ে আসা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ একটি দীর্ঘ ও যথেষ্ট অনিশ্চিত প্রক্রিয়া। তাই অন্যান্য প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের অঞ্চলের যে সকল অতি প্রচলিত গাছ আছে সেগুলো কতটুকু টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে তা পরীক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কোনসকল বৃক্ষের টিকে থাকার অভিযোজন ক্ষমতা বেশি সেগুলো নিয়েই বনায়নের দিকে জোর দেয়া উচিত। কারণ টেকসই বনায়নের একটি নির্ণায়ক গাছেদের টিকে থাকার ক্ষমতা।

 

সায়েন্টিফিক আমেরিকান অবলম্বনে।

Written by Shahriar Kabir Pavel

Senior Year, Department of Physics, Shahjalal University of Science and Technology.

বয়মের মধ্যে মস্তিষ্ক সংরক্ষণ

বায়োনিক কান