শক্তি ও পদার্থ

আলোর গল্প

আলো কী? প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করতো, আলো হচ্ছে দেবতাদের দেখার ক্ষমতা। যখন মিশরীয়দের দেবতা চোখ খুলত, তখন মহাবিশ্বে আলো আসত। সেই আলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেখতে পেত। সূর্য এবং চাঁদকে মিশরীয়রা তাদের দেবতা ‘রা’ এর দুই চোখ বলে মনে করতো। মিশরীয়দের পর পারস্যে সভ্যতা বেশ উন্নতি সাধন করে। এ পৃথিবীর আদিতম ধর্মগুলোর একটি হচ্ছে জরোআস্ট্রিয়ানিজম। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ বছর আগে তৎকালীন পারস্যে জরোআস্ট্রিয়ানিজম ধর্মানুসারী অগ্নিপূজকরা আলোকে তাদের দেবতা ‘আহুরা মাজদা’র মঙ্গল সৃষ্টি বলে মনে করতো। আর অন্ধকারকে মনে করতো অমঙ্গল সৃষ্টি। মঙ্গল আলো দিনের বেলায় পৃথিবীকে আলোকিত করতো আর রাতের বেলায় অমঙ্গল সৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে ঢেকে দিতো অন্ধকারের কালো চাদরে।

পরবর্তীতে গ্রিক পুরাণে আগুন এবং আলো ছিল দেবতাদের অধিকারে। জিউসের কাছে থেকে চুরি করে সেই আলো মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন আরেক দেবতা প্রমিথিউস। সেজন্য প্রমিথিউসকে দূর পাহাড়ে শৃংখলাবদ্ধ করে রাখা হয়। আর ঈগল এসে ঠুকরে ঠুকরে তার কলিজা খেয়ে ফেলতো। প্রাচীনকালে বেশিরভাগ সভ্যতার লোকজন এভাবেই আলোকে তাদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে ফেলতো।

চিত্রঃ প্রমিথিউস।

ধর্মের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও মনিষীরাও ধারণা করতে শুরু করেছিল আলো দুই ধরনের- বাইরের আলো এবং মনের আলো। এদের মধ্যে ছিলেন প্লেটো, এমপেডোক্লেস, ইউক্লিড, গ্যালেন ও আরো অনেকে। এ ধরনের চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম চিন্তা করেন মধ্যযুগের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইথাম (আল হ্যাজেন)। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন ক্যামেরা অবস্কিউরা বা অন্ধকুঠুরির ধারণা থেকে। ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা সর্বপ্রথম এসেছিল চীনা বিজ্ঞানী মজি’র সময়কালে (৪৭০~৩৯০

খ্রী.পূ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন, একটি অন্ধকার ঘরের পর্দায় ছোট ছিদ্র করে দিলে বিপরীত পাশে পর্দায় একটি প্রতিবিম্ব তৈরি হয়।

আল হাইথামের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, কোনোকিছু দেখার জন্যে বাইরের আলোর সাথে মনের আলো অতি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। মনের আলো এবং বাইরের আলো যখন একসাথে মিলে যায়, শুধুমাত্র তখনই আমরা দেখতে পাই। মনের আলো আসে মানুষের খাদ্য থেকে। মানুষ খাদ্য খাওয়ার পর তা আধ্যাত্মিক আলোতে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে থেকে যেতো। মানুষের মৃত্যু হলে এ আধ্যাত্মিক আলো চাঁদে গিয়ে পৌঁছতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে বেড়ে যেতো। যখন বাড়তে বাড়তে পরিপূর্ণ চাঁদ হয়ে যেতো, তখন সেখান থেকে আলো বা আত্মা ধীরে ধীরে দেবতার কাছে চলে যেতো। এর ফলে চাঁদ সময়ের সাথে ক্ষয়ে যেতো। চাঁদের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে এ আধ্যাত্মিক আলোকে সম্পর্কিত করেছিল ‘ম্যানিকায়িজম’ যা ছিল খ্রীঃ ২৫০ শতকে বর্তমানের বাগদাদে প্রচলিত ধর্ম। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আল-কিন্দী এ ধারণার প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন।

আল হাইথামের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে থাকেন বাইরের আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই আমরা দেখতে পাই। যদি চোখের আলো গিয়ে বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসলেই কেবলমাত্র আমরা দেখতে পাই, তাহলে দূরের পাহাড় বা আকাশের তারা খুব সহজেই দেখতে পারার কথা নয়। তারপর আলো যদি বাইরে থেকে চোখেই প্রতিফলিত হবে, তাহলে আমাদের ভেতরের আলো বা অন্তরের আলোর আর দরকারই পড়বে না।

আলোর ধারণাকে গণিতের সাথে সম্পর্কিত করার প্রথম চেষ্টা ছিল ধর্মযাজক গ্রোস্তেস্ট এর লেখা ‘অন লাইট’ বা ‘দে লুচে’ বইয়ে। তিনিই প্রথম আলোর বস্তু-ধারণার জন্ম দেন। তারপর আলো নিয়ে মানুষের ধারণার বিশাল পরিবর্তন হয় মধ্য যুগে গ্যালিলিও গ্যালিলির গবেষণার মাধ্যমে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান সেগুলো পাথুরে গোলাকার বস্তু ছাড়া আর কিছু নয়, যেগুলোকে এর আগে মানুষ দেবতার নিখুঁত সৃষ্টি বা দেবতার চোখ বলে মনে করতো।

বিশেষ করে চাঁদ এবং সূর্যকে মানুষ নিখুঁত মনে করত। কিন্তু গ্যালিলিও দেখতে পান, চাঁদে বেশ কিছু গর্ত রয়েছে। একইভাবে সূর্যকে আপাতদৃষ্টিতে যে কোনো ধরনের কালো দাগ মুক্ত মনে হলে আসলে তা নয়। এছাড়াও তৎকালীন ধারণা ছিল, পৃথিবীর চারপাশে সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ঘুরছে। কিন্তু বৃহস্পতির চাঁদ পর্যবেক্ষণ করে তিনি দেখতে পান, সেই চাঁদগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ না করে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করছে। গ্যালিলিও আরও মনে করতেন, কোনো বস্তুকণাকে অতি ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে থাকলে তা আলোক কণায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে নিউটনের প্রিজম পরীক্ষায় দেখা যায়, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের বর্ণালীতে বিভাজিত হচ্ছে। গ্যালিলিওর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিউটনও মনে করতেন, আলো হচ্ছে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা যা প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আসার সময় তার আকার অনুসারে আলাদা হয়েই রঙিন বর্ণালীর সৃষ্টি করছে।

সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফরাসী গণিতবিদ দেকার্ত মনে করতেন- আলো আর শব্দ একইরকম আচরণ করে। শব্দের যেমন গতি আছে, আলোরও গতি আছে। তিনি মনে করতেন আলোর গতি অসীম। আবার শব্দের চলতে যেমন মাধ্যম লাগে, আলোর চলতেও মাধ্যম লাগে এবং শব্দের মতো আলোও এক ধরনের তরঙ্গ। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে মাধ্যম কী? এভাবেই ইথারের ধারণার জন্ম হয়।

আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব জনপ্রিয়তা পায় আলোর অপবর্তন ব্যাখ্যা করতে পারায়। দূরের কোনো আলোক উৎসকে আমরা যদি দেখি, তাহলে তার পাশে আলোকে অনেকটা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাতের বেলা দূরের কোনো ল্যাম্পপোস্ট এর দিকে লক্ষ্য করলেই আমরা এটা দেখতে পারব। ফরাসী প্রকৌশলী অগাস্টিন ফ্রেনেল আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের বিস্তারিত গাণিতিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সমীকরণ সমাধান করে প’শন দেখান- আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব সত্যি হলে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব থাকবে। পরবর্তীতে ফ্রেনেলেরই বন্ধু আর্গো ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে প’শন ছায়ার অস্তিত্ব প্রমাণ করে দেখান। এতে করে আলোর তরঙ্গ ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয়।

চিত্রঃ ল্যাম্পপোস্টে আলোর অপবর্তন।

পরবর্তী সময়ে ফ্যারাডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, আলো মূলত তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। এটি পূর্ণতা পায় ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে। কিন্তু ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন অনেক বিজ্ঞানীই। পরবর্তীতে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের পর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ইথারের। মাইকেলসন-মর্লী’র পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার অস্তিত্বহীন বলেই প্রমাণিত হয়। কেননা যা আলোর গতিতে চলছে, তার জন্যে সবকিছুই অতি নিকটে, তার কখনও দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। স্থান সংকোচনের কারণে দূরত্ব অতি ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শুধুমাত্র আমরা যারা স্থির অবস্থায় আছি তাদের কাছেই সেগুলোকে দূরত্ব বলে মনে হয়। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফোটন থিওরী আলোর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গতত্ত্ব উভয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ আলো এমন কিছু যা একই সাথে কণা হিসেবে এবং তরঙ্গ হিসেবে কাজ করে। এরপর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে আইনস্টাইন প্রমাণ কর দেখান যে মহাকর্ষীয় বলের কারণে স্থান বেঁকে যায়। তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আলোও বিশাল মহাকর্ষীয় বস্তুর পাশে দিয়ে আসার সময় বেঁকে যাবে। ১৯১৯ সালে আর্থার এডিংটনের পরীক্ষায় এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আলো ভারী কোনো নক্ষত্রের পাশে দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায়।

বর্তমানে আমরা আলোকে মনে করি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, যা একই সাথে কণা ও তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে। আলোর গতি সকল প্রসঙ্গ কাঠামোতে ধ্রুবক এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে স্থান বা সময় বদলে যায়, কিন্তু আলোর গতি? কখনোই নয়।

Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top