শক্তি ও পদার্থ

একটুখানি সঙ্গীত এবং এমিলি হাওয়েলের গান

কোনো এক ঝুম বৃষ্টির সন্ধ্যা ছিল সেদিন। সামনে পরীক্ষা। কিন্তু পাগল করা হাওয়া, ভেজা বাতাস, মাটির সুঘ্রাণ ইত্যাদি যাবতীয় কাব্যিক উপকরণ হাজির থাকায় পড়ায় মন বসছিল না। ওদিকে চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল অঝোর বর্ষণের অপার্থিব সুর।

সঙ্গীত বা সুর বলতে আমরা আসলে যা বুঝি তার পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। মানসিক অর্থাৎ মন সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো আবার মানুষের খুব গর্বের বিষয়। কৈশোরে পড়া অসংখ্য সায়েন্স ফিকশন গল্পের সাধারণ একটা দৃশ্য থাকতো অনেকটা এরকম- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবটেরা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশের জোর দাবী জানাচ্ছে। বিদ্রোহী নায়ক তখন গলার রগ ফুলিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাবে আর বলবে, “ঐ কপোট্রনিক খুলিগুলো আর যা-ই পারুক, কখনো কি পারবে একটা সুর সৃষ্টি করতে? পারবে শেষ বিকেলে সূর্য ডোবার একটা মাস্টারপিস ছবি আঁকতে? বা একটা বৃষ্টির কবিতা লিখতে পারবে কখনো?”

একবিংশ শতকের এমন একটি সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি যে, নায়কের প্রথম প্রশ্নের উত্তর “হ্যাঁ” হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক সুর দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করছে গান এবং শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রকাশ পাচ্ছে ‘তাদের’ একক এলবাম!

ব্যাপারটি শুরু হয়েছিল একেবারেই সাধারণভাবে, যন্ত্র তখনো সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’ শুরু করেনি। পূর্বে সংরক্ষিত ডাটা (এ ক্ষেত্রে শব্দ) পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে এবং নির্দেশনা (প্রোগ্রাম) অনুসারে কিছু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিডিও গেমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence – A.I) ব্যবহার শুরু হয়। গেমসের পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির সাথে তাল মেলানোর জন্য এ.আই এর প্রয়োগ ভিডিও গেমিং-এর অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। সময়ে সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের তাল বাড়িয়ে-কমিয়ে অথবা গেমসে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের আগমন-প্রস্থান, দৌড়াদৌড়ি- মোদ্দা কথা, বাস্তব অনুভূতি সৃষ্টির ভার পড়ে এ.আই এর ওপর। এক্ষেত্রে ন্যাচারাল লার্নিং (Natural Learning), সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস ইত্যাদি বিভিন্ন থিওরির প্রয়োগ ঘটানো হয়।

তবে এগুলো ছিল এ.আই ব্যবহারের একেবারে প্রথম দিককার কিছু কাজ। অনেকটা ছোট শিশুকে প্রাথমিক কিছু অক্ষরের সাথে পরিচিত করানোর মতো। এ বিষয়ে গবেষণা আরেকটু এগোনোর পর এ.আই মিউজিশিয়ানদের জন্য অনেকটা বন্ধুর মতো হয়ে দাঁড়ায়।

সঙ্গীত সম্পর্কিত ব্যাকরণ বা নিয়ম সৃষ্টির সূচনা ঘটেছে সেই পিথাগোরাসের যুগে এবং প্রথম দিকে সঙ্গীত গণিতজ্ঞ এবং পদার্থবিদদের গবেষণার খুব প্রিয় এক বিষয় ছিল। কেবলমাত্র পাশ্চাত্য সঙ্গীতের নিয়মের মাঝেই রয়েছে অসংখ্য তাত্ত্বিক গবেষণার ফলাফল। তাছাড়া ঢাউস আকৃতির শত শত বই বিগত শতকগুলোতে সঙ্গীত সম্পর্কিত অসংখ্য গবেষণার ফলাফল ধারণ করে।

উদাহরণস্বরূপ পাশ্চাত্য, আরব, হাঙ্গেরিয়ান, বাইজেনটাইন, পারস্য ইত্যাদি অঞ্চলভিত্তিক সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকরণ এবং স্কেল রয়েছে। স্কেল, নোট, হারমনি, মেলোডি, টেম্পো সম্পর্কিত যে আলোচনা তা কেবল সমুদ্রসমই নয়, বরং জ্ঞানের এক পৃথক শাখা এবং এ লেখার সীমা আর উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যাবে। তবুও কয়েকটি বিষয় ব্যাখ্যার দাবী রাখে।

আমরা যেসব গান শুনি তার সুরটি একজন সুরকার সৃষ্টি করেন কীভাবে? বা গানের কথার সাথে মানানসই সুর বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কী? অতি পরিচিত বাদ্যযন্ত্র কীবোর্ডের সাহায্যে ব্যাপারগুলো একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

পাশ্চাত্য সঙ্গীতে রয়েছে ১২ টি নোট, নোট বলতে আপাতত আমরা সঙ্গীতের ক্ষুদ্রতম একক ধরি, যেগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গানের প্রতিটি শব্দকে সুর হিসেবে প্রকাশ করা যায়। নোটগুলো হলো- A A (sharp) B              C C (sharp)/D (flat) D D (s)/E (f) E F F(s)/G (f) G G (s)/A (f)

চিত্রঃ পিয়ানো বা কীবোর্ডের লে আউট।

কীবোর্ডে একটি নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো নোটগুলো Chromatic Scale নামক স্কেল থেকে প্রাপ্ত। # এবং b চিহ্ন যথাক্রমে মূল নোটের তীক্ষ্ণ বা মসৃণ রূপ (শ্রুতির ভিত্তিতে) বোঝায় যেখানে A-G হলো ৭ টি মূল নোট। এদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক কম্পনাঙ্ক বা স্বর রয়েছে। দৃশ্যত কয়েকটি নোটের Sharp বা Flat স্বর নেই এবং ২ টি নোটের মাঝের Sharp বা Flat নোটগুলোকে পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাদের  ২টি নামের যেকোনো একটি দ্বারা চিহ্নিত করা যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘কী’তে পরপর একই নোটের পুনরাবৃত্তি ঘটে উচ্চতর বা নিম্ন অনুপাতের কম্পনাঙ্কে এবং প্রয়োজন অনুসারে সুরকার তা নির্ধারণ করে থাকেন।

চিত্রঃ বিভিন্ন নোটের frequency তালিকা, একই নোটের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে অনুপাত লক্ষণীয়।

এক্ষেত্রে প্রয়োগকৃত গাণিতিক সূত্রটি হলো, Frequency = 440*(2^n/12); for n = -21, -19, …27। গীটারের ক্ষেত্রে নোটগুলোর বিন্যাস Frequency সহ লক্ষ্য করি-

 

নোটগুলো এভাবে নির্ধারিত হলো কেন সেই আলোচনা যেমন বিস্তৃত তেমনই ঐতিহাসিক। তবে সুপরিচিত Exponential Graph প্রমাণ করে এক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক গাণিতিক হিসাব রয়েছে।

চিত্রঃ frequency লেখচিত্র।

এ নোটগুলোকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে স্কেল বানান যায়। স্কেল বলতে আপাতত ধরে নেয়া হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠিত ফর্মুলা যার দ্বারা নির্দিষ্ট ক্রমে নোট বের করে পরপর বাজালে শ্রুতিমধুর সুর এবং একসাথে বাজিয়ে কর্ড (Chord) বানানো যায়। কয়েকটি সুপরিচিত স্কেল ফর্মুলা-

  • Major Scale: R, W, W, H, W, W, W, H
  • Natural Minor Scale: R, W, H, W, W, H, W, W
  • Harmonic Minor Scale: R, W, H, W, W, H, 1 1/2, H (notice the step and a half)
  • Melodic Minor Scale: going up is: R, W, H, W, W, W, W, H
    going down is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Dorian Mode is: R, W, H, W, W, W, H, W
  • Mixolydian Mode is: R, W, W, H, W, W, H, W
  • Ahava Raba Mode is: R, H, 1 1/2, H, W, H, W, W
  • A minor pentatonic blues scale (no sharped 5) is: R, 1 1/2, W, W, 1 1/2, W

এখানে R বলতে Root note বা প্রথম নোট, W (Whole) দ্বারা একটি নোটের দূরত্ব এবং H (half) দ্বারা ঠিক পরবর্তী নোট বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ ভাবা যাক আমরা মেজর স্কেলের একটি সুন্দর সুর বের করতে চাই যার প্রথম নোট হবে c নোট। যেহেতু c Root note হিসেবে ব্যবহৃত হবে একে বলা হবে c Major scale এবং সেটি হলো-

C             D             E             F              G             A             B             C

লক্ষণীয় এখানে আটটি নোটের গুচ্ছকে Octave বলে এবং পুনরাবৃত্তি হওয়া c নোটটি মূল নোটের দ্বিগুণ ফ্রিকোয়েন্সির। এক্ষেত্রে r w w h w w w h সূত্রের প্রয়োগ ঘটেছে এবং ব্যাপারটি যে শুভঙ্করের ফাঁকি নয় তা হাতের কাছে থাকা কোনো

কীবোর্ড বা গীটার বা মোবাইল অ্যাপে নির্দিষ্ট ক্রমে নোটগুলো বাজালেই বোঝা যাবে, শুনতে পারবেন অতি পরিচিত সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা। এক্ষেত্রে Root note হিসেবে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে সূত্রটি প্রয়োগ করুন, সুরের অনুপাত এক থাকবে, হেরফের হবে না।

নোট বুঝলাম, স্কেল বুঝলাম, এবার কর্ডের (Chord) পালা। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে Chord বলতে তিনটি বা ততোধিক নোটের সম্মিলন বোঝায় যেগুলো একসাথে বাজালে ঐকতানে থাকবে, শ্রুতিমধুর শোনাবে। ফরাসি শব্দ Accord থেকে এর উৎপত্তি যার পরিভাষা Agreement বা চুক্তি অর্থাৎ একই সাথে মানিয়ে নেবার মতো একটি ব্যাপার।

পূর্বে আমরা Major scale বের করেছি। Chord বেরুবে স্কেল থেকে, উদাহরণস্বরূপ এ স্কেলের ১-৩-৫ নম্বর নোট একসাথে বাজালে একটি ঐকতানের সৃষ্টি হবে এবং তার নাম হবে c chord, এটিও সূত্রের প্রয়োগ। এর মাঝে আবার আরও কিছু নিয়ম আর সূত্র আছে যেগুলো প্রয়োগ করে সবগুলো Chord বের করা যায় এবং গণিতে উৎসাহী যে কেউ অনুধাবন করতে পারবে যে অসংখ্য স্কেল, তার থেকে আবার অসংখ্য Chord এর কী বিশাল সমাহার মিউজিশিয়ানদের হাতে থাকে।

এর গুরুত্ব কী? আমরা যদি কোনো গানের সাথে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে চাই, তবে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে, নির্দিষ্ট বিরতিতে নির্দিষ্ট কিছু Chord-ই বাজবে। একেকটি Chord-এর রূপ একেক রকম, যেন একেক রকম মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। অসংখ্য সম্ভাব্য বিকল্প থেকে গানের কথার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো Chord মিউজিশিয়ান বেছে নেবেন এখানেই তার মুন্সিয়ানা, তার মাথায় ঘুরতে থাকা একটি সুরেলা গল্পকে তিনি বাস্তব রূপ দেবেন এবং কুড়োবেন প্রশংসা। উৎসাহীদের জন্য বিখ্যাত Titanic সিনেমার Soundtrack – My heart will go on গানটির কিয়দংশের Chord-

সুরসাগর থেকে এক গ্লাস জল উঠিয়ে এতক্ষণ ধরে ঢাললাম মাত্র। কিন্তু এর মাঝে এ.আই এর আগমন ঘটল কীভাবে? একটু আগে বলেছি Chord এর সমন্বয় কীভাবে সাধন করবেন এটি নিয়েই সুরকারের মাথাব্যাথা। ধরা যাক, প্রথম লাইনের অর্ধেকের সাথে বাজানোর জন্য অনেক ভেবে তিনি একটি Chord বাছাই করলেন। এখন তার কাজ হলো পরবর্তী আরেকটি Chord-এর মাধ্যমে ভাবের সমন্বয় সাধন করে লাইনটি শেষ করা। ব্যাপারটি যতটা সহজে বলা গেলো ঠিক ততটাই কঠিন। আগেই বলেছি, সামনে বাছাইয়ের জন্য অপশন রয়েছে অনেকগুলো। তার মধ্যে সেরা বাছাই কোনোটি হতে পারে? গানের লাইন আছে আরও বেশ কয়েকটি এবং পুরোটুকুর মাঝে এভাবে সমন্বয় সাধন করতে হবে! উপায় একটিই ছিল। সঙ্গীত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থেকে একটি Chord বেছে নেয়া। কিন্তু এর চেয়েও ভালো একটি বিকল্প হয়তো বাদ পরে গেলো!

একটি গান সুর করতে একাধিক মাস লেগেছে এটিই সঙ্গীতে সাধারণ উদাহরণ। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি যদি একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় যা সম্ভাব্য অপশনগুলো দ্রুত বাজাবে একের পর এক এবং কোনো এক মুহূর্তে একটা সমন্বয় শুনে সুরকার বলে উঠবেন ‘ইউরেকা’, অথবা আরেকটি ভয়াবহ রকমের

সমন্বয়েরও মুখোমুখি হতে পারেন, যা নিজে সুস্থ মস্তিস্কে তিনি কখনো বাজাতেন না! যাই হোক, ঘণ্টা খানেকের মাঝেই সম্ভাব্য অনেকগুলো অপশন যাচাইবাছাই করা সম্ভব হবে, সময় বাঁচবে, গাণিতিকভাবে সম্ভাব্য সব বিকল্প ঘাটা যাবে, পৌঁছনো যাবে চূড়ান্ত একটি সিদ্ধান্তে এবং এতক্ষণ ধরে রূপকথার মতো সাধাসিধে ভঙ্গিতে যা বর্ণনা করলাম, তার গালভরা নাম হচ্ছে Algorithmic Composition। কৌশলগত আলোচনায় না গিয়ে কেবল মূল প্রক্রিয়াটি সরলভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা আরকি।

এ.আই এর দৌড় এখানেই শেষ নয়। যেমন কোনো একটা Chord-এর মাঝে অতিরিক্ত নোট যোগ, লয় (Tempo) বাড়ানো এবং একইসাথে একাধিক Chord বাজালে তার প্রভাব- ইত্যাদি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে একটি একটি করে পরীক্ষা করা যায়। তারপর সুরকার যদি নির্দিষ্ট কোনো একটি প্যাটার্ন বাছাই করে দেন যে, এই গানের সুরের আলোকে সম্ভাব্য আরেকটি সুর দাঁড় করাও, সেটিও সম্ভব। ব্যাপারটিকে বলা হয় Mimic করা যেখান থেকে এ.আই এর সঙ্গীত ‘সৃষ্টি’র পরবর্তী গল্পের অধ্যায় শুরু।

চিত্রঃ সফটওয়্যার ব্যবহার করে Synthesis করবার একটি দৃশ্য।

এতক্ষণ ধরে একটি গানের সুর তৈরি করবার বা কাঠামো দাঁড় করাবার যে পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো তা নিছকই একটি উদাহরণ মাত্র। সুর করবার মতো সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে মানুষ চাইলেই কীভাবে যন্ত্রের সহযোগিতা নিতে পারে তা সঙ্গীতের মৌলিক কিছু উপকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করা হয়েছে। অবশ্যই সুর সৃষ্টির কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। বর্তমান যুগে সঙ্গীতের জগতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেন বিতর্ক সৃষ্টি করছে তা কিছুটা হলেও হয়তো আঁচ করা যায়। এক্ষেত্রে Liquid Notes, Quartet Generator, Maestro Genesis বেশ প্রসিদ্ধ কয়েকটি সফটওয়্যার।

Experiments in Musical Intelligence (EMI)

এ.আই এর সংগীতচর্চা বিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম প্রধান একজন গবেষক হলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক ড. ডেভিড কোপ। তিনি ১৯৮০ সালের দিকে এই ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন এবং প্রায় তিন যুগ ধরে এর সাথে জড়িত আছেন। তিনি একটি প্রজেক্ট শুরু করেন যেটিকে

প্রাথমিকভাবে Experiments in Musical Intelligence (EMI) বা সংক্ষেপে Emmy হিসেবে নামকরণ করা হয়। EMI তৈরির প্রথম দিকে লক্ষ্য ছিল মূলত বিভিন্ন গান ইনপুট হিসেবে দিয়ে নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ভাঙার চেষ্টা করা। তারপর সেগুলো কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে প্রতিস্থাপন করা, যেন কোনো একটি জিন-নকশা জেনে নিয়ে তাতে কিছু পরিবর্তন করা। প্রথমদিকে তিনি EMI ব্যাবহার করে নিজের সুর করা কিছু গানকে পরিবর্তন করতেন, উল্লেখ্য তিনি একইসাথে একজন সঙ্গীতজ্ঞ।

পরবর্তী ধাপে তিনি দেখলেন EMI পদ্ধতি কেবল তার করা অপেক্ষাকৃত সরল সুরগুলোকেই নয়, Bach, Beethoven, Mahler সহ ইতিহাসের প্রসিদ্ধ সব সঙ্গীতজ্ঞদের কাজকে অনুকরণ করতে পারছে। ফলাফল ছিল অনেকটা ভৌতিক। শত বছর আগের ধ্রুপদি শিল্পীদের কাজগুলো অনেকটা পুনর্জন্ম পেতে থাকে EMI প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ডেভিড কোপের একটি উক্তি উল্লেখ করবার মতো- “You name the composer and EMI could analyze his works to spit out a new piece that sounded just like the composer had written it himself. Except he hadn’t; a computer had.”

Emily Howell এর জন্ম

২০০৩ সালের দিকে কোপ সিদ্ধান্ত নেন EMI প্রজেক্টটি নতুন মাত্রায় নেবার। এর আগ পর্যন্ত তিনি EMI এর কাজগুলো সত্যিকারের মিউজিশিয়ানদের দ্বারা রেকর্ড করাতেন, সুরটি সৃষ্টির পর। কিন্তু তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন EMI এর কাজগুলো এবার ডাটাবেজ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন একটি প্রোগ্রাম ডিজাইন করবেন, কিন্তু তার স্বকীয়তা হবে এই যে তা শ্রোতাদের কাছ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া ইনপুট হিসেবে নেবে এবং বিভিন্ন ধাঁচের সঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে একেবারেই নতুন সুরের জন্ম দেবে সত্যিকারের শিল্পীর মতো। এ ব্যাপারে তিনি ‘Computer Models of Musical Creativity’ নামক একটি বই লেখেন যাতে কৌশলগত দিকগুলোর বিশদ বিবরণ আছে।

২০০৯ সালে Centaur Records থেকে প্রকাশ পায় এমিলির প্রথম এলবাম- “From darkness, light” এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয় এলবাম- “Breathless”! এক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য এ.আই হলো ইউনিভার্সিটি অব মালাগায় তৈরি ‘Lamus’ নামক একটি Computer cluster যা সর্বোচ্চ ৮ মিনিটে পূর্ণদৈর্ঘ্য Symphony থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাঁচের নতুন সুর তৈরি করতে পারে এবং কিছুটা অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে Lamus এর করা সুর এর ওপর ভিত্তি করে ২০১২ সালে London Symphony Orchestra পারফর্ম করে একটি লাইভ অনুষ্ঠানে!

ব্যাপারটা শেষে এখানে এসে ঠেকলো যে, যন্ত্র সুর করে দিচ্ছে আর গাইছে মানুষ, যেখানে প্রথম দিককার দিনগুলোতে মানুষের তৈরি গানের বিশ্লেষণের কাজেই কেবল এ.আই ব্যবহার করা হতো! সত্যি কথা বলতে গেলে, সৃজনশীল কাজে এ.আই-এর পারদর্শিতা বৃদ্ধির ব্যাপারটি চমকপ্রদ হলেও কিছুটা ভীতিকরও বটে! এখানে উল্লেখ্য ব্যাপারটি হলো এই যে, এ লেখায় সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার যে ধাপ বা প্রক্রিয়াগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কোনো বিধিবদ্ধ সূত্র নয় যেন পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীতই এভাবে সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে! এগুলো ছিল নিছকই সাধারণ কিছু উদাহরণ এবং সঙ্গীতের বিশালতার তুলনায় কিছুটা হাস্যকরও বটে!

তবে মূল ব্যাপারটি হলো, যন্ত্র শিখছে এবং শিখছে বেশ দ্রুত। এ শিখন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ কী তা আমরা সময়ের পরিক্রমার সাথেই জানতে পারবো। সেই সাথে হয়তো নতুন করেনির্ধারিত হবে শিল্প এবং সৃজনশীলতার সংজ্ঞাও।

তথ্যসূত্র

  1. http://arstechnica.com/science/2009/09/virtual-composer-makes-beautiful-musicand-stirs-controversy/
  2. http://absolutelyunderstandguitar.com/index.php/all-hail-the-chromatic-scale
  3. https://wikipedia.org/wiki/Algorithmic_composition
  4. http://www.gizmag.com/creative-artificial-intelligence-computer-algorithmic-music/35764/
  5. https://en.m.wikipedia.org/wiki/­Diatonic_and_chromatic http://m.intmath.com/trigonometric-graphs/music.php
  6. http://www.musiclearning.com/lessoncentral/chords/buildingchords.html
  7. http://www.bandnotes.info/tidbits/scales/half-whl.htm
  8. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mathematics_of_musical_scales
  9. http://m.wikihow.com/Learn-All-the-Notes-on-the-Guitar
  10. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Musical_scale
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top