শক্তি ও পদার্থ

মহাজগতের জ্যামিতি

মহাবিশ্বের আকার সম্পর্কে যুগে যুগে প্রচলিত রূপকথার সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। কখনো হাতির মাথায় থাকা পৃথিবী, কখনো কচ্ছপের পিঠে থাকা, কখনো বা বিরাট পানির আধারে ডুবে থাকার গল্প প্রচলিত ছিল প্রাচীন যুগের মানুষদের মাঝে। গ্রীকরা মনে করতো, মাথার উপর আকাশের শেষ প্রান্তে আছে এক গুহা, যেখানে দেবতা জিউসের তেজী ঘোড়াগুলো থাকতো। সকালে ঘোড়াগুলো আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে দৌড়ে যেত, তাই পৃথিবী আলোয় ভরে যেত। কয়েক শতাব্দী আগ পর্যন্তও মানুষের ধারণা ছিল,

মহাবিশ্ব মানে বোধহয় সৌরজগতটাই। কিন্তু যখনই মানুষ জানলো সৌরজগত আসলে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র অংশ, তখন থেকেই প্রশ্ন জমতে লাগলো, মহাজগত কী আকারে সসীম হতে পারে? যদি তা হয়, তাহলে মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? দুটি প্রশ্নই এক বিন্দুতে গিয়ে মিলে- ‘মহাবিশ্বের আকার আসলে কেমন?’

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আগে জেনে নেয়া উচিৎ তলের বক্রতা (ধনাত্মক, ঋণাত্মক বা সমতল) এবং মহাবিশ্বের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। যেমন, এর উপাদানগুলো কীভাবে একে অন্যের সাথে যুক্ত। গোলকাকৃতির পৃষ্ঠের বক্রতা হলো ধনাত্মক বক্রতা। পাম্পে ফুলানো একটা চাকার ভেতরের দিকটা হলো ঋণাত্মক বক্রতা বিশিষ্ট। যেহেতু আমরা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে জানি না, কাজেই এর সম্ভাব্য অনেক আকৃতিই আমরা ধরে নিতে পারি- গোলকাকৃতি, সিলিন্ডার আকৃতি, ঘনকাকৃতি অথবা অনির্দিষ্ট সংখ্যক বিন্যাস বিশিষ্ট ভুজ আকৃতি বা বিভিন্ন বক্রতল ও মোচড়বিশিষ্ট আকৃতি, কিংবা এমন কোনো অনির্দিষ্ট আকৃতি যার কোনো বিপরীত তল নেই।

প্রথমে আমরা আমাদের পরিচিত তিনটি আকৃতি নিয়ে চিন্তা করি। এই তিনটি আকৃতি হলো সমতল আকৃতি (flat shape), গোলকীয় আকৃতি (spherical shape) এবং বক্রতলীয় আকৃতি (hyperbolic shape)।

তলগুলোর বৈশিষ্ট্য বোঝার আগে একটি বিশেষ ধরনের জ্যামিতির সাথে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এটি হলো রেইম্যানের জ্যামিতি (Reiman’s Geometry)। আমরা সাধারণত যে জ্যামিতিক আকৃতিগুলো নিয়ে আলোচনা করি, যেমন ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বৃত্ত বা সরলরেখা, তার সবই কিন্তু আলোচনা করা হয় সমতল ক্ষেত্রের সাপেক্ষে। এটি আসলে ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। কিন্তু যদি ক্ষেত্রটি গোলকীয় বা বক্রতল হয়? এটিই হচ্ছে অমর গণিতবিদ গাউসের সুযোগ্য ছাত্র রেইম্যানের কীর্তি!

রেইম্যান প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি গোলকীয় পৃষ্ঠে দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং বক্রতলীয় ক্ষেত্রে দুই সমকোণের চেয়ে কম হবে। তিনি এটাও বলেন যে, গোলক বা বক্রপৃষ্ঠে দুটি বিন্দুর মধ্যে সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে একটি বক্ররেখা। খটকা লাগতে পারে, কেননা প্রচলিত জ্যামিতিতে আমরা জানি দুটি বিন্দুর সর্বনিম্ন দূরত্ব হলো সরলরেখা। কিন্তু সরলরেখা কল্পনা করলে তো সেটা সমতল ক্ষেত্রে চলে যায়, কাজেই সেটা ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির আওতাধীন হয়ে যায়। রেইম্যান জ্যামিতি থেকে আরও দেখা যায়, সমতল ক্ষেত্রের দুটি সমান্তরাল রেখাকে যদি গোলকীয় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে তারা একসময় নিজেদের ছেদ করবে। আবার বক্রতলে নিয়ে যাওয়া হলে তারা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে।

এখন দেখা যাক কোন আকৃতিতে মহাবিশ্ব কেমন হওয়ার কথা। আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে আকর্ষণ করছে। সে হিসেবে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সব বস্তুই আবার একীভূত হয়ে যাওয়ার কথা। এখন যদি মহাবিশ্ব সমতল হয়, তবে সেক্ষেত্রে বলা যায় মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সমতলভাবে বিস্তৃত হবে এবং এক পর্যায়ে আবার একটি বিন্দুর দিকে ফিরে আসবে।

কিন্তু সেক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। মহাবিশ্ব সমতল হতে গেলে মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তিঘনত্ব এক হওয়া প্রয়োজন। যেমন, কাগজের উপর ছড়িয়ে থাকা লোহার গুঁড়ার কাছাকাছি যদি দুটি ভিন্ন শক্তির চুম্বক রাখা হয়, তাহলে দেখা যাবে লোহার গুঁড়াগুলো যে তলে বিন্যস্ত হয়েছে সেটা সমতল থাকে না। মহাবিশ্বের

সব বস্তুর ঘনত্ব সমান নয়, এ কারণে তাদের শক্তি ঘনত্বেরও তারতম্য ঘটে। মহাবিশ্বের ঘনত্ব নির্ণয়ের একটা সুন্দর নাম আছে- Density Parameter। সমতল ভূমির ক্ষেত্রে এর মান হওয়ার কথা ১, অর্থাৎ কোনো একটাকে আদর্শ ধরে নিলে তার তুলনায় অন্য সবারই এই মান একই হবে। কিন্তু এটা সত্য নয়, কাজেই বলে দেয়া যায় মহাবিশ্ব সমতল নয়।

এবার আসি ‘মহাবিশ্ব গোলকাকার’ এ ধারণায়। প্রাকৃতিকভাবে আমরা দেখি, সব তরল বা গ্যাসই চেষ্টা করে গোলকীয় অবস্থায় থাকতে। এর কারণ, তরল বা গ্যাসের প্রতিটি ফোঁটায় যে অণু আছে তাদের মধ্যবর্তী আকর্ষণ বল তাদের ছড়িয়ে পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বলের চেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে, মহাবিশ্ব সসীম হওয়ার কথা কিন্তু তার কোনো শেষ আমরা বের করতে পারবো না। যেমন একটা ফুটবলের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি না কোনো বিন্দুতে তার শুরু এবং কোনো বিন্দুতে শেষ।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা জানি, মহাবিশ্ব এখনো প্রসারিত হচ্ছে এবং এ প্রসারণের হার ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি গোলকাকৃতির হয় তবে এই প্রসারণের হার বাড়া তো সম্ভব নয়, কেননা এই প্রসারণকে অতিক্রম করেই তো গোলক হতে হবে! রেইম্যানের জ্যামিতি থেকেও দেখা যায়, ধনাত্মক বক্রতার কোনো পৃষ্ঠে যেকোনো বল কেন্দ্রের দিকেই বেশি ক্রিয়াশীল হয়, ফলে Density Parameter এর মান ১ এর বেশি হয়। তাহলে মহাবিশ্বের প্রসারণ কমতে কমতে একসময় শূন্য এবং তারপর সংকোচন শুরু হওয়ার কথা, প্রসারণের মাত্রা বাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

তাহলে শেষ আর একটি প্রকৃতিই বাকি থাকলো, ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্র অর্থাৎ Hyperbolic Space। হাইপারবোলিক স্পেস এ Density Parameter এর মান ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ‘মহাবিশ্বের সর্বত্র শক্তি ঘনত্ব সমান নয়’-এই তত্ত্ব একমাত্র হাইপারবোলিক স্পেসের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তাছাড়া রেইম্যান জ্যামিতি থেকে দেখা যায়, একমাত্র ঋণাত্মক বক্রতাবিশিষ্ট ক্ষেত্রেই দুটি বস্তুর দূরে সরে যাওয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে।

তবে এই প্রশ্নের উত্তর যে এখানেই শেষ, তা বলা যায় না। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, মহাবিশ্ব সমতল ক্ষেত্রের উপর বিস্তৃত। এর সপক্ষে তারা উপস্থাপন করেন অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন এর চিত্র। যা দেখে কিছুটা মনে হয়, মহাবিশ্ব সম্ভবত সমতল।

চিত্রঃ অ্যানিসোট্রপিক স্পেকট্রাম থেকে প্রাপ্ত মহাজাগতিক পরিব্যাপন।

আরেকটা প্রশ্ন এখনো বাকি, মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? এ প্রশ্নের কোনো জোর উত্তর বিজ্ঞানীরা আজও দিতে পারেননি। তবে রেইম্যানের জ্যামিতি থেকে বিজ্ঞানীরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মহাবিশ্বের মাত্রা যদি তিনটির চেয়ে বেশি হয়, তবে এর সঠিক আকৃতি আমাদের তিন মাত্রার কল্পনা দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। যেমনঃ দ্বিমাত্রিক কাগজের পৃষ্ঠের উপর চলমান একটি পিঁপড়া তার তলের শুরু এবং শেষ বুঝতে পারবে। কিন্তু যদি সেই কাগজ পেঁচিয়ে ত্রিমাত্রিক সিলিন্ডার বানানো হয়, তবে পিঁপড়া সেই সিলিন্ডারের কোনো আদি-অন্ত খুঁজে পাবে না। অধুনা প্রতিষ্ঠিত ‘স্ট্রিং থিওরি’র অন্যতম বিজ্ঞানী জাপানের মিচিও কাকু গাণিতিকভাবে দেখিয়েছেন, মহাবিশ্ব দশ মাত্রার। আমাদের দৃশ্যমান তিনটি মাত্রা ছাড়া অন্য

মাত্রাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে আমরা সেগুলো বুঝতে পারি না। যেমন, ত্রিমাত্রিক লোহার টুকরোকে সুক্ষ্ম করতে করতে যদি পাতে পরিণত করা হয়, তবে সেটা আমাদের কাছে দ্বিমাত্রিকই মনে হয়।

যা হোক, স্ট্রিং থিওরীর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ দশ মাত্রাকে গাণিতিক সমীকরণের আওতায় আনতে পারলেই মহাবিশ্বের আকৃতি ও এর সীমা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে। মানুষের জ্ঞান যত বিস্তৃত হচ্ছে, মহাবিশ্বই ততই হয়ে উঠছে রহস্যময়!

তথ্যসূত্র

১. জেমস সমবার্ট, ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনঃ http://abyss.uoregon.edu/~js/cosmo/lectures/lec15.html

২. ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিঃ http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/cosmology/geometry.html

৩. প্রফেসর বারবারা রীডেন, ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটিঃ http://www.astronomy.ohio-state.edu/~ryden/ast162_9/notes40.html

৪. স্ট্রীং থিওরি, লেখকঃ হিমাংশু কর
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top