শক্তি ও পদার্থ

মাঁয়াজালের পদার্থবিজ্ঞান

‘ম্যাজিশিয়ান’ বা ভেল্কিবাজ বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে কোনো সুপারন্যাচারাল ক্যারেক্টারকে বোঝালেও এটা মানতেই হবে যে সত্যিকার অর্থে তারা বিজ্ঞানের প্রায়োগিক দিকের একজন অভিজ্ঞ প্রয়োগকারী। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে- তারা পদার্থের কিছু বিশেষ ধর্ম ও অদ্ভুত আচরণ এমন অভিজ্ঞতার সাথে আয়ত্ব এবং সুনিপুণভাবে উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের অজানা এবং তাদের কাছে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। চলুন দেখে নেই বর্তমান সময়ের কিছু সহজ ও জনপ্রিয় ম্যাজিক বা ‘অতিপ্রাকৃত’ ঘটনায় ব্যবহৃত পদার্থ, তাদের আচরণ এবং তাদের পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।

১. ম্যাগনেটিক ফ্লুইডঃ

ফেরোম্যাগনেটিক ফ্লুইড হলো এক ধরনের চৌম্বকীয় তরল যা চৌম্বক পদার্থের প্রতি আকর্ষণ করে বেয়ে চলে। খুব সহজেই এটি তৈরি করতে পারেন। যা যা লাগবে- প্রিন্টার টোনার (কালি), ভোজ্য তেল, ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক চুম্বক। একটা জারে ৫০ মিলি টোনার এবং ২ চা চামচ ভোজ্য তেল নিয়ে মেশাতে হবে। এবার জারের গায়ে চুম্বক ধরলে দেখা যাবে টোনার ওই চুম্বকের সাথে সাথে ওঠানামা করছে একই সাথে তার পৃষ্ঠতলও খাঁজকাটা আকার ধারণ করেছে।

এখানে বলে রাখা ভালো সনাতন প্রিন্টারের কালিতে এটি হবে না। কারণ এগুলো হলো প্লাস্টিক সিন্থেটিক, যা স্থিতিক তড়িতের সাহায্যে কালি কাগজে ছাপে। বর্তমান প্রায় সকল লেজার প্রিন্টারে ‘Photoconductor Metering Magnet’ রোলার ব্যবহার করা হয় যার

জন্য টোনার তৈরি করা হয় Coated Magnetic Carrier হিসাবে। তাই এটি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয়। আর এই চৌম্বক কণাগুলো একটা আরেকটার উপর বসে পিরামিড গঠন করে, যার ফলে খাঁজকাটা আকৃতি তৈরি হয়। আর তেল ব্যবহার করা হয় টোনারের ঘনত্ব কমিয়ে একে আরো পাতলা করতে।

২. ইন্সট্যান্ট আইসঃ

এটাও ঘরে বসে খুব সহজে তৈরি করা যায়। এর জন্য লাগবে শুধু ১৬.৯ আউন্সের বুদবুদ বিহীন পরিশোধিত পানি ভর্তি বোতল, যা আগে কখনোই খোলা হয়নি। এবার এটিকে ২ ঘন্টা ৪৫ মিনিট রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতে হবে। বের করে সজোরে আঘাতের পর ধীরে ধীরে পানি ঢাললে দেখা যাবে তরল পানি পড়ার সাথে সাথেই বরফ হয়ে যাচ্ছে। আরো অদ্ভুত বিষয় হলো সামান্য এক টুকরা বরফ যদি পানির গ্লাসের এক কোণায় দেওয়া হয় তবে পুরো গ্লাসের পানিই বরফ হয়ে যাবে।

এর কারণ হলো ‘নিউক্লিয়েশন’ (Nucleation process), যার মাধ্যমে পানির অণু ক্রিস্টাল আকার ধারণ করে। এর প্রয়োজনীয় শক্তি আসে আঘাত থেকে। প্রথমে একটা ক্রিস্টাল নিউক্লিয়াস তৈরি হয় তারপর একটা চেইন রিএকশনের মাধ্যমে পুরো বোতলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্লাসের ক্ষেত্রে, ঐ ফেলানো বরফ টুকরোটাই নিউক্লিয়াসের কাজ করে। আর পড়ার আঘাতটা চেইন বিক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো গ্লাসের পানিকে বরফ করে দেয়।

৩. ফ্যারাডে কেজ/সুইটঃ

ফ্যারাডে কেজ হলো একটা বদ্ধ বেষ্টনী, যার বহির্পৃষ্ঠ তড়িৎ পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। এটি গোলক, সিলিন্ডার বা বক্স যে কোনো আকৃতির হতে পারে। যা লাগবে- একটি কার্ডবোর্ড বা কাঠের তৈরি বাক্স বা অন্য যেকোনো তড়িত অপরিবাহক পদার্থ এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা যেকোনো তড়িৎ পরিবাহক পদার্থ। ভেতরের দিকে অপরিবাহক দিয়ে তার গায়ে পরিবাহক পদার্থ সেটে দেওয়া হয়। ফলে এই সুইট বা কেজ এ আবদ্ধ ব্যক্তি তার উপর দিয়ে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারেন। এই কৌশল দেখিয়ে ম্যাজিশিয়ান Wayne Houchin, 2013 সালে শত শত লন্ডনবাসীকে আভিভূত করে দিয়াছিলেন।

 

এটা সাধারণত পরিবাহক লেয়ারে আগত তড়িৎক্ষেত্র প্রতিফলিত করে, পরিবাহক আগত শক্তিকে শোষণ করে, এবং খাঁচাটা বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে। যখন কোনো বহিরাগত তড়িৎক্ষেত্র প্রয়োগ করা হয়, পদার্থের

ইলেকট্রনগুলো একপাশে সরে গিয়ে নেগেটিভ চার্জ প্রদান করে। তখন অসমতা পূরণের জন্য নিউক্লিয়াই পজিটিভ চার্জ প্রদান করে। এই প্রভাবিত চার্জগুলো একটি বিপরীত ক্ষেত্র তৈরি করে যা পুর্বে প্রদত্ত বহিরাগত তড়িৎ ক্ষেত্র কে সরিয়ে দেয়।

. বেন্ডিং ওয়াটারঃ

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে এই কৌশলটি Houchin দেখিয়েছিলেন। একটি কাঠি দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে পতিত পানির প্রবাহকে ইচ্ছামতো বাঁকাতে, ঘুরাতে, ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করতে এমনকি বিপরীত দিকেও প্রবাহিত করতে পারতেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কয়েক লক্ষ ভোল্ট। এর সরলীকৃত রূপটা এভাবে তৈরি করা যেতে পারে- একটি প্লাস্টিকের চিরুনী বা বেলুনকে চুলে ঘষে নিয়ে একে ট্যাপের খুব সূক্ষ্ম পানি প্রবাহের নিকট ধরলে দেখা যাবে পানি প্রবাহ ঐ বেলন বা চিরুনির প্রান্তের দিকে বেঁকে আসছে। এর কারণ ঘর্ষণের ফলে চিরুনী ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয় যা পানির ধণাত্বক চার্জকে আকর্ষণ করে, তাই পানি বেঁকে যায়। একই জিনিস যখন, উচ্চ ঋণাত্বক বিভবে করা হয় তখন তা আরো তাৎপর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে।

. বোতলের মেঘঃ

এটি তৈরি করতে যা যা ব্যবহার করা হয়- ১ লিটারের পানির বোতল, গরম পানি, ও দিয়াশলাই। গরম পানি বোতলের কিছুদুর পর্যন্ত ভর্তি করে এর ভেতর জ্বলন্ত দিয়াশলাই এর কাঠি ধরা হয়। যখন সম্পূর্ণ বোতল ধোঁয়া দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায় তখন এর ছিপি আটকে দেয়া হয়। ঐ অবস্থায় একে দু হাত দিয়ে সজোরে চাপ দিয়া কয়েকবার সংকুচিত করা হয়। এরপর স্বাভাবিক অবস্থায় রাখলে দেখা যায় ভেতরে ঘন মেঘের কুন্ডুলি তৈরি হয়েছে। এর ব্যাখ্যা হলো, বোতল যখন সংকুচিত করা হয় তখন এর মধ্যকার গ্যাসও সংকুচিত হয়, ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। আবার ছেড়ে দিলে গ্যাস প্রসারিত হয়, ফলে তাপমাত্রা কমে যায়। তাপমাত্রা যখন কুয়াশা বিন্দুর নিচে চলে যায়, তখন বাষ্প মেঘে পরিণত হয়।

৬. অদৃশ্য কালিঃ

লাল কালি প্রস্তুতের জন্য ফেনলফ্যথালিন (.10 g) ও ইথানল (10 ml) পানির (90ml) সাথে মেশানো হয়। এরপর গাঢ় লাল না হওয়া অবধি এতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড ড্রপার দিয়ে যোগ করা হয়। সাধারণত 3M ঘনমাত্রার ২০ টা ড্রপ। কালি প্রস্তুত হয়ে যাবে। কোনো কাপড়ে দাগ দিলে কয়েক সেকেন্ড পর তা আর দেখা যাবে না। এরূপ হবার কারণ হলো, কালি যখন দেয়া হয় এর পানি বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সাথে কার্বনিক এসিড তৈরি করে। এই কার্বনিক এসিড সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের সাথে নিউট্রালাইজেশন বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে। এবং ক্ষারকের এই নিউট্রাল অবস্থাই রঞ্জকের বর্ণ পরিবর্তন করে কালির দাগ অদৃশ্য করে দেয়।

৭. কাগজের ব্যাগে পানি ফুটানোঃ

জিনিসটাকে আরো আকর্ষণীয় করতে এটাকে উন্মুক্ত বুনসেন বার্নারের শিখায় করা হয়। বার্নারের উপর একটা রিং স্ট্যান্ড দিয়ে তার উপর শক্ত পর্দা দেওয়া হয় তাপ ভালোভাবে ছড়ানোর জন্য। প্রায় ৪”-৬” পেপার ব্যাগে ২০০ মিলি পানি নিয়ে এর উপর রাখলেই নির্দিষ্ট সময় পর ফুটতে আরম্ভ করবে। এটা হয় কারণ, কাগজ খুব কম তাপ পরিবাহক। এটি তাপ ধীরে প্রবাহিত করে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং একসময় স্ফূটনাঙ্কে পৌছে যায়। এই তাপই পানিকে কাগজ ভেদ করে বাইরে আসতে বাধা দেয়, এবং পানির উচ্চ তাপ ধারকত্ব, তাপ ধরে রেখে কাগজকে পুড়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখে।

৮. ফায়ার ব্রেথিংঃ

অধিকাংশই মুখে জ্বালানি নিয়ে করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি নিরাপদ ও বিজ্ঞান সম্মত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ উপায়ে করার জন্য দরকার পড়বে- কর্ন স্টার্চ, বড় একটা চামচ, ও অগ্নিশিখা। চামচ ভর্তি কর্ন স্টার্চ মুখে নিয়ে শ্বাস বন্ধ রাখা হয়। এরপর একটা শিখার উপর এটি ফু দিয়ে প্রবাহিত করা হয়। তখন ঐ প্রবাহিত স্টার্চ পুড়ে মুখ পর্যন্ত আগ্নিপ্রবাহ তৈরি করে। এর কারণ হলো কর্ন স্টার্চ কখনো একত্র অবস্থায় সহজে পুড়ে না। কিন্তু যখন এর গুড়া মুখ দিয়া স্প্রে করা হয় তখন এটি জ্বালানীর মতো পুড়তে থাকে। কারণ স্টার্চ হল কার্বোহাড্রেট যার গুড়া খুব দ্রুত পুড়ে যায়।

এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে যেগুলো অসাধারণ হয়ে উঠে শুধু তার উপস্থাপনের কৌশল এবং তাদের সাধারণ ধর্মের কারণে। বিভিন্ন পদার্থের ধর্মগুলো যদি একে অন্যের সাথে কোনো তাৎপর্যের ভিত্তিতে সংযুক্ত কারা যায় তাহলে দেখা যাবে, নতুন কোনো অসাধারণ ঘটনার জন্ম হয়েছে। যা আমরা সাধারণ মানুষেরা চিন্তা করি না, ম্যাজিশিয়ানরা তা ব্যবহার করেই আমাদের দৃষ্টিভ্রম করেন।

তথ্যসূত্র

http://chemistry.about.com/od/chemistrymagic/tp/Water-Tricks.htm

http://the.richest.com/amaging_experiment_you_can_do_at_home

https://en.wikipedia.org/wiki/Faraday_cage

http://iflscience.com/chemistry/turn-water-ice-instantly

http://thesurvivalistblog.net/build-your-own-faraday-cage-heres-how/

http://michaelkriss-2015-technology-and-engineering
Comments

কপিরাইট © ২০১৬ জিরো টূ ইনফিনিটি। সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত। Powered by Bintel

.

To Top